দ্বিতীয় অভিযান

অমরেন্দ্র চক্রবর্তী

শ্রাবণ মাসের রাত ৷

আকাশ ভেঙে নেমেছে আজ ভীষণ জলপ্রপাত ৷

এক হাত দূরের গাছপালাও দেখা যায় না মোটে,

বৃষ্টি ছাড়া শব্দ নেই আর, পথ ভাসিয়ে বৃষ্টির জল ছোটে ৷

বৃষ্টিতে আর অন্ধকারে দারুণ হুলুস্থুলু ৷

তারই মধ্যে হঠাৎ যেন উলু-

ধ্বনি শোনা গেল দূরের গ্রামে ৷

এসব যখন ঘটছে তখন সবাই কাঁপে হীরু ডাকাতের নামে ৷

বৃষ্টি হচ্ছে সকাল থেকে––

অনেক গাছই গেছে বেঁকে ৷

বৃষ্টি চাবুক মারছে সপাৎ সপাৎ ৷

বাজ পড়বে বলে আকাশ জ্বলে উঠল হঠাৎ ৷

দেখা গেল ষোলোটি লোক–– সবাই রণ-পা চড়ে

হনহনিয়ে হেঁটে যাচ্ছে বাঁকুড়া আর বর্ধমানের মোড়ে ৷

যেন তাদের খুবই তাড়া–– চলেছে তাড়াতাড়ি––

বাঁ-হাতি পথ সোজা গিয়েছে দুর্গাপদ চৌধুরীর বাড়ি ৷

চলতে চলতে একজনের কান খাড়া––

যেদিক থেকে উলু এসেছে সেদিককারই পাড়ায়

উঠল যেন কান্না!

একজন লোক দেখুন, দেখুন, দৌড়ে আসছে নিলু বিলু আর পান্না!

দ্বিতীয় বার বিদু্যৎ চমকালো

ঝলসে উঠল চোখ ধাঁধানো আলো ৷

আরেকজন লোক ঠিক দেখেছিস? আমাদেরই তিন ছেলে?

প্রথম লোক বলতে পারি যে কোনো বাজি ফেলে––

দ্বিতীয় লোক আহ! কথায় কথায় বাজি––

আরেকজন লোক হাঁ জী,

আমারও যেন তেমনি মনে হল ৷

দ্বিতীয় লোক ত্রিপল-বাঁধা একটা মশাল খোলো,

কেরোসিনে ভিজিয়ে জ্বালো মশাল!

এসব যখন ঘটছে তখন ঠিক উনিশশো ছ’সাল ৷

অন্ধকারে দৌড়ে এল তিনটি ভেজা ছেলে

ষোলোটি লোক দেখল তাদের মুখে মশাল ফেলে ৷

লোকেরা কোথায় তোরা ছিলি?

দ্বিতীয় লোক এমন রাতে কোথায় গিয়েছিলি?

ছেলেরা দ্বিতীয় লোককে সর্দার শোনো, সময় নেই আর

বরের বাবা আস্ত চামার

বিয়ের পিঁড়ি থেকে বরকে

তুলে, কাঁদায় বিয়ের ঘরকে ৷

সর্দার চলো, পায়ে পড়ি-

কনের মা যায় গড়াগড়ি!

সর্দার কাদের বাড়ি? গাঁয়ের কী নাম?

একজন ছেলে মেয়ের বাবা বুড়ো ছিদাম––

আরেকজন ছেলে ঘোড়ামারির ছিদাম দাস ৷

সর্দার তোরা কি কাটছিলি ঘাস?

ছেলেরা বরযাত্রী ষাট জন

সঙ্গে লেঠেল আট জন ৷

আমরা ওদের সঙ্গে পারি?

সর্দার দলের সবাইকে চ’ তবে আজ শেয়াল মারি––

পরে যাবো বাঘের গুহায় ৷

লোকেরা হুঁ-হুঁ–– হাঁ-হাঁ––

সর্দার শেয়ালটা কে? চিনিস নাকি?

ছেলেরা শুনছিলাম তো বাড়ি টাকী ৷

সর্দার অ্যাদ্দুরে সে এসছে বিয়ে দিতে?

ছেলেরা কনে আমাদের মিতে

কনে তো না, পরী, তবু এ-বিয়ে হবে না?

কনের বাপ বরের বাপের ধরে রয়েছে পা ৷

সর্দার বুড়ো শ্যালটা কী চায়?

একজন ছেলে ছ-ভরি সোনা পায় নি বলে বাপরে কী দাঁত খিঁচায়!

সর্দার লোকটা কে রে?

দলের লোককে লেঠেল নিয়ে ঘোরে ফেরে

চিনিস না কি কেউ?

একজন লোক মনে হচ্ছে, ব্যাটা টাকীর মহাজনের ফেউ ৷

রণ-পা পরা দলের সঙ্গে ছুটে চলেছে নিলু বিলু আর পান্না

এবার আরো স্পষ্ট হচ্ছে আস্ফালন আর কান্না

সর্দার দাঁড়া

বল্লম আর খাঁড়া

সঙ্গে যেমন বাঁধা আছে থাকুক

কয়েকজন যাক লুকিয়ে রেখে আসুক

রণ-পা এবং মশাল ৷

এসব যখন ঘটছে তখন ঠিক উনিশশো ছ’ সাল ৷

রণ-পা আর মশাল তারা বেঁধে রাখল বনে ৷

সর্দার কই গো? কোথায় কনে!

এলাম কনের মাসির গাঁয়ের লোক––

ছিদামের বৃদ্ধ পড়শী আসুন, আসুন, আসতে আজ্ঞা হোক ৷

বাজ পড়েছে যেন বাড়ির ছাতে!

বরের বাবা ভুরু কোঁচকায়–– অতিথি এমন রাতে!

তিনটি ছেলে কান্নাকাটি হট্টগোল

সব এবারে শিকেয় তোল

বরের বাপকে সামনে তোমার হী––

সর্দার চোপ! ছি-ছি-ছি-ছি!

মুখু্য তোরা, কারা তোদের বাপ?

দেখছিস না বাড়িতে শোক-তাপ!

বাড়ির লোকের উদ্দেশে অঘটন কি ঘটল কিছু? কেন চুপচাপ সব?

বিয়ে বাড়ি–– তবুও কেন দেখাচ্ছে ঠিক বিয়ে বাড়ির শব?

বরের বাবা মশায়ের নাম?

সর্দার এজ্ঞে, কালোজাম ৷

বরের বাবা আমাকে কি রঙ-তামাসার পাত্র পেলেন?

সর্দার কী যে বলেন! হঠাৎ যখন রেগেই গেলেন––

মাপ করে দিন নিজ গুণে

বরের বাবা ভদ্রতা থাক–– ধন্য হব নামটা শুনে ৷

সর্দার এই না বললাম––

নামটি কালোজাম!

আপনিই কি বরের বাবা?

বরের বাবা এ লোকটা তো আচ্ছা হাবা––

দেখছেন না সোনার বোতাম, কানে দামী আতর?

বরের বাবার পায়ের কাছে কনের বাবা পাথর ৷

সর্দার পেন্নাম বাবু, পেন্নাম ৷

সাত সহস্র পেন্নাম!

বরের বাবা ছিদাম তোমার কে হয়?

সর্দার যদি দেন গো অভয়––

বরের বাবা বলেই ফেলো, সত্য বলা হোক––

সর্দার আজ্ঞে, আমরা ওনার নিজের শালীর গাঁয়ের লোক ৷

কনের মাসির বড্ড ইচ্ছে মনে

মনের মতন সাজিয়ে দেবেন কনে ৷

নিজের তো তাঁর ছেলে-মেয়ে নেই

বোনের মেয়েকেই

নিজের মেয়ে মনে করেন তিনি ৷

মেয়ের জন্য রেখেছেন পাঁচগিনি––

সেই সঙ্গে বাউটি, বালা আর

একটা বিছে হার ৷

বরের বাবা কোথায়, সে সব কোথায়?

সর্দার চিংড়িপোতায় ৷

বরের বাবা ষাঁড়ের মতো গণ্ডা চারেক লোক পাঠাল রাতে

তোমাদেরই হাতে

গয়না-গিনি পাঠাতে কী দোষ ছিল?

সর্দার দোষের কথা বলেন যদি

গ্রাম হয়েছে গঙ্গানদী

সাতটা গরু বারোটা মোষ ছিল

দড়ি ছিঁড়ে পাঁচটা পগার পার––

এর পরে ঘর ছেড়ে আসা সাধ্য বিধবার?

বরের বাবা আহা–– তিনি কেন?

তোমরা হেন

পড়শী থাকতে–– এলেই যখন অ্যাদ্দুর––

সর্দার হুজুর, আমরা দিনমজুর

গাঁয়েতে কাজ নেই

কাজের খবরেই

বৃষ্টি মাথায় করে আমরা যাচ্ছি সোনাইবিঘি

সোনাইবিঘির রাজা নাকি রানীর নামে কাটাচ্ছেন এক দীঘি ৷

সোনাইবিঘি শুনেই এনার শালী––

বরের বাবা কী নাম এনার শালীর?

সর্দার আজ্ঞে, নেত্যকালী ৷

তা, বললেন কী, আজ বোনঝির বিয়ে

ইচ্ছে তো হয় সাজাই নিজে গিয়ে

সোনাইবিঘির কাছেই বোনের বাড়ি

কতদিন যে আগলে আছি বিয়ের গয়না শাড়ি ৷

তোমরা বাবা যাচ্ছ তো ওইদিকেই

আমার বোনঝিটিকে

বোলো মাসির আসা তো হয় না

দিলাম তাকে এই ক’টা গয়না ৷

গেঁজের মধ্যে লুকিয়ে নিয়ে যেও গো সাবধানে––

বরের বাবা লম্ভ দিয়ে দাঁড়াল মাঝখানে!

বরের বাবা তাই বলো ভাই, স্পষ্ট দেখছি পাঁচটা গিনির ছটা!

সর্দার পাগল হলেন? ঘাড়ে আমার মুণ্ডু আছে ক’টা?

ন-ক্রোশ রাস্তা গয়না বইব! ভেবেই আমার বেরচ্ছে কালঘাম!

মশায়, আপনি শোনেননি কি হীরু ডাকাতের নাম?

ষোলোজন লোক শ্রাবণ মাসের রাতে

মরব নাকি হীরু ডাকাতের হাতে?

বরের বাবা হীরু ডাকাত? হুঁ!

ষোলোটা জোর ফুঁ

দিলেই ডাকাত কাৎ!

তাছাড়া এই ঝড়বৃষ্টির রাত––

ডাকাতও তো মানুষ, নাকি?

ছিদামের পড়শী বাবা, এখনো বিয়েটা বাকি ৷

সর্দার বরের বাবাকে কী জানি বাবু, শুনি তো ওদের শীতগ্রীষ্ম নেই ৷

বরের বাবা ওসব গুজব ৷ তাছাড়া ওর অত শিষ্য নেই ৷

সর্দার সে যাক বাবু, সামান্য লোক, ওসব বড় ব্যাপার––

ছিদামের পড়শী আহা, সবাই ভিজে এয়েছেন, কোথায় পাই ষোলোখানা র্যাপার?

সর্দার ব্যস্ত হয়ে লাভ কী, বরং শুভস্য শীঘ্রম––

ষোলজন ডান হাতের কাজ হোক গরমাগ্রম!

বরের বাবা কিন্তু কিছুই ঠিক হল না

সর্দার দলের লোককে যাও না, কনের পিঁড়ি তোলো না––

কই হে, বরবাবাজী কই?

বরের বাবা আমায় তুমি মাচায় তুলে কেড়ে নিয়েছ মই ৷

সর্দার কোথায় গেলে বরবাবাজী?

বর এই বিয়েতে বাবা রাজি?

বরের বাবা ছ’ভরি সোনা এখনো পেলাম কই?

সর্দার পাঁচ গিনি আর বাউটি, বালা পাবেন নিশ্চয়ই ৷

বরের বাবা সঙ্গে বিছে হার?

সর্দার তাও পাবেন ৷ চলুন এবার করুন কিছু আহার––

তাড়াতাড়ি বিয়েটা হোক

বিয়ে বাড়িতে অভুক্ত লোক––

বরের বাবা শাড়িটা কি––

সর্দার সবই আমরা পৌঁছে দেব টাকী ৷

বরের বাবা কিন্তু সেটার নিশ্চয়তা কী?

সর্দার মাসির বড় আদরের ধন মাসির বোনঝিটি

মাসি তাকে দেবেনই গয়না ৷

বরের বাবা না না, সে হয় না ৷ এ বিয়ে আমি কিছুতে দেব না ৷

সর্দার মানুষ কি গো ভিখিরি সোনা-হীরের?

ভেবে দেখুন ফিরে––

এখনো আছে লগ্ন ৷

কনের বাবা হতেন যদি, থাকতেন কি এমন জেদে মগ্ন?

বরের বাবা অসম্ভব এ, সম্ভব নয়!

সর্দার আমার কাছে অসম্ভব নয় কিছু–– শম্ভু-মলয়!

শম্ভু ও মলয় হুকুম দিন, মুণ্ডু নিই

শম্ভু প্রথমে বুড়োর মুণ্ডুটি––

সর্দার হুকুম দিচ্ছে হীরে

সবাইকে ফেল ঘিরে

বল্লম আর খাঁড়া

দু হাতে নিয়ে দাঁড়া!

বরযাত্রীর দল উঠল কেঁদে

লাঠিয়ালদের বেঁধে

উঠোনে ফেলে রাখ!

বাড়ির ভেতরের দিকে ফিরে কোথায় গেলে মা-লক্ষ্মীরা, বাজাও দেখি শাঁখ ৷

অর্ধেক লোক কাঁদছে এবং অর্ধেক লোক হাসছে,

ভয়ে এবং আনন্দে আজ বিয়েবাড়ি ভাসছে ৷

বুড়ো বুড়ো লোকজনদের দেখতে যদি কান্না––

বরকর্তা কনেকর্তা নিলু বিলু আর পান্না ৷

নিলু বিলু পান্না বিয়েবাড়ি হইচই

মাথায় খাঁড়া, পাতে দই

দিচ্ছে উলু বাজছে শাঁখ

আমরা সবাই ভিজে কাক

হাত-পা বাঁধা লেঠেলরা সব ভিজছে উঠোনে

বরের বাবা জবুথবু, মুখেও কথা নেই ৷

বাপরে বাপ! সাক্ষাৎ যম–– স্বয়ং হীরু ডাকাত!

বরের বুকও ধড়াস ধড়াস–– কাটবে তো এই রাত!

কনের মা ছেলের বাবা ভয়েই অথব্ব

মেয়ের মাথায় কে ধানদুব্বো

দেবে গো আজ? হীরুই বরং দিক––

হীরু না না, সেটা কি হবে ঠিক?

তাছাড়া আমি ডাকাত––

কনের মা তা হোক বাবা, মেয়ের মাথায় রাখো তোমার হাত––

তুমিই কন্যা করবে সম্প্রদান ৷

নইলে মেয়ের হবে যে অকল্যাণ ৷

যত্ন-আত্তি হয়নি কিছুই, নিয়ো না অপরাধ ৷

হীরু বরের বাবাই করবে আশীর্বাদ ৷

বরের বাবাকে যান, ওখানে যান

কনের মাথায় তুলুন দুব্বো ধান ৷

ডাকাত ঘিরে বিয়ে হচ্ছে কেউ দেখেছ কখনো?

বিয়ে যখন সুসম্পন্ন, রাত্রি বাকি তখনো ৷

হীরু দলের লোককে এবার একটু বাঁশি বাজাই, তারপরে চ’ ফিরি

দলের একজন কালকে রাতে শিকার তো চৌধুরী?

হীরু আহ! এখন ওসব কথা থাক!

সেই লোকটি এই মলেছি নাক ৷

হীরু নিজের বাঁশিটিতে যেই দিয়েছে ফুঁ––

অসময়ে ডেকে উঠল আচমকা এক ঘুঘু ৷

এক নিমেষে বাঁশি ধুতির তলায় ৷

যেন-বা বাঘ গরজে উঠল ত্রু�দ্ধ হীরুর গলায়

হীরু এখানকারই কেউ

ঠিক পুলিসের ফেউ!

কে

আমার খবর দিয়েছে পুলিসকে?

ইঙ্গিতে তার ঝলসে উঠল জোড়ায় জোড়ায় বল্লম আর খাঁড়া

বরপক্ষের লোক, এ গ্রাম ছাড়ো, বর-কনে আর বরের বাবা ছাড়া!

দলের লোককে বনের পথে এদের তোরা এগিয়ে নিয়ে যা

দুজন গেছে আনতে মশাল আর যত রণ-পা––

তারাই ঘুঘুর ডাক ডাকল বনে ৷

বার্তা নিয়ে সেখানে যা একজনে ৷

টাকীর দলকে টাকীর পথে পাঠা ৷

বরপক্ষের লোককে পালাও, নইলে এক-এক কোপে মাথা পড়বে কাটা!

ট্যাঁ-ফুঁ করলে–– খবরদার হে

থাকবে না রক্ষে!

দলের লোককে বরপক্ষের লোকরা দূরে গেলে, ছাগলচরার বনে তোরা থাকিস––

হাওয়ায় কানটা রাখিস ৷

অনেক দূরে যেই যাবে বরপক্ষ,

মাঝে মাঝে ডেকে উঠবি–– তক্ষ!

লাঠিয়ালদের বাঁধন খুলে দাও,

লাঠি থাকুক উঠোনে

লাঠিয়ালদের সবাই মুখে কুটো নে ৷

প্রাণের ভয়ে ডাকাতদলের সঙ্গে সবাই উধাও ৷

লাঠিয়ালরাও ছাড়া পেয়ে, মুখে কাঠি, চলল সবার সাথে ৷

কবে এসব ঘটছে জানো? উনিশশো ছয় সালের শ্রাবণরাতে!

ঘুঘু ডাকল ছ-বার ৷

ছেলে তিনটি ভয়েই সারা, হবে তো যা হবার!

একজন ছেলে হীরু কি আজ পড়বে ধরা?

আরেকজন ভাল্লাগে না–– কী যে করা––

প্রথমজন দলের লোককে ছাড়ল কেন ও যে!

দ্বিতীয়জন খালি হাতে আসবে পুলিস হীরু ডাকাতের খোঁজে!

প্রথমজন দলের সঙ্গে পালাতে পারত!

তৃতীয়জন কনেকে কে আস্ত রাখত?

প্রথমজন যা একখানা শ্বশুর ৷

রাক্ষস বা অসুর!

হীরু বরের বাবাকে বোবা কালা সেজে তুমি থাকবে চোখের সামনে

একটা কথা বলতে গেলেই–– এখনই হরির নাম নে

ধরা পড়বার আগেই মুণ্ডু নেব! খবরদার––

আমি হীরু ডাকাতসর্দার!

নিমন্ত্রিত পড়শীদের আপনাদের আর বলব বা কী, আপনারা তো নিমন্ত্রিত অতিথ ৷

এই বলে সে সাজল যেন আজন্ম এক পুরোহিত ৷

কনের মা-বাপ আর কনেকে শেখাল দুচার কথা,

আলতা ঢেলে ভিজিয়ে দিল কনের কাজললতা ৷

নিমন্ত্রিত পড়শীরা আমরা তবে বাড়ির দিকে যাই?

ঠিক তখনই উঠল গলার আওয়াজ বাজখাঁই––

হীরু ডাকাত! রক্ষা নেই আর আজ!

নিংড়ে নেব তোর সমস্ত ঝাঁঝ ৷

পালাতে গেলেই গুলি করব সোজা ৷

তুমি ডাকাত–– আমি ডাকাতের ওঝা!

বাইরে এসো!

তেরো গুনব! টিকবে না আর কোনো ছদ্মবেশও!

বেরো বলছি, বেরো!

এগারো বারো তেরো!

কনের মা দারোগাবাবু, বাঁচান, বাঁচান, কী ভয়ানক রাত!

দারোগা কোথায় হীরু ডাকাত?

ব্যাটাকে বেঁধেছিস?

কনের মা ওগো আমরা পায়ে ধরে তেনাকে সেধেছি––

মেরো না বাপ, প্রাণে মেরো না,

মেয়ের বিয়ের শেষ সম্বল এভাবে কেড়ো না!

দারোগা সেপাই দিয়ে ঘিরেছি পুরো গাঁ––

ভয় নেই আর, এবার পথ দেখা––

কনের বাবা হুজুর, বাবু, আপনাদিগের ঘ্রাণ

পেয়েই ওরা দিয়েছে পিঠটান ৷

দারোগা পালিয়েছে–– অ্যাঁ!

পুরোহিত হ্যাঁ, হুজুর, হ্যাঁ!

দারোগা পুরুৎ ব্যাটার টিকি কাটব আমি!

কনের মা হুজুর, এনার দোষ নিয়ো না, গরিব পুরুৎ পায় না তো �প্রণামী!

দারোগা সব কটাকে বেঁধে করব চালান!

পুরোহিত হুজুর কেন পোড়া লোককে জ্বালান?

গ্রহের ফেরে হারে রে রে ডাকাত পড়ল দেখে

ভগবানকে মনে-প্রাণে কেঁদে বললুম ডেকে––

ঠাকুর বাঁচাও, পাঠাও দারোগাকে!

বর-কনেকে তখনো বাঁধা হয়নি যে সাত পাকে ৷

ঠাকুর আমার মুখটি তুলেছেন––

তাই তো তোমায় শয্যে থেকে ডেকে তুলেছেন

দারোগা ছিল ওরা ক’জন?

একটি ছেলে দু-কুড়ি আর ন-জন ৷

দারোগা তোরা কে রে? ঠিক ধরেছি–– হীরুর দলের ছেলে!

শুনেছি তিনটি খোকা––

তৃতীয় ছেলে হীরু কি আর বোকা––

দলের ছেলে দারোগাবাবুর মুখে যাবে ফেলে!

বাঘের মুখে ছাগল!

দারোগা হেসে বেশ বলেছিস–– বাঘ!

হীরু ডাকাত জানে না আমার রাগ!

ও দরজাটা বন্ধ কেন? খোলো আগল ৷

বন্ধ কেন ঘর?

কনের বাবা হুজুর, ওটা বাসর, কনের সঙ্গে আছে বর ৷

ডাকাত দেখে মেয়ের আমার লেগেছে দাঁতকপাটি ৷

পুরোহিত উঠোনের ওই লাঠি

দেখেই বুঝুন কী ঝঞ্ঝাটাই গেল!

দারোগা নিজের চোখে দেখতে চাই হে, দরজা খুলে ফেল!

কনের বাবা মেয়ের গায়ের গয়না নিয়েও করেছে টানাটানি

কম না ৷

দারোগা জানি জানি ৷ দসু্যটাকে জানি ৷

আমিও কি ওর যম না!

কনের বাবা খোল মা নীরজা,

খোল দেখি দরজা ৷

হুজুর, ওরা ভয়েই ফ্যাকাসে ৷

দারোগা এই ঘরে কি ঢুকেছে একা সে?

পুরোহিত ঠিক ধরেছেন ৷ এসেই টানল হার––

দারোগা আঃ! তখন এই ঘরটার দ্বার

বন্ধ করে দিলে না কেন কেউ?

কনের বাবা তাহলে হুজুর, ঘরে বইত লাল রক্তের ঢেউ ৷

পুরোহিত তবু তো বুদ্ধি করে

বিয়ের কনে ছুঁড়ল গায়ের জোরে

হাতের কাজললতা––

এক মুহূর্ত হীরু ডাকাতের বন্ধ ছিল কথা!

মেয়েও ভারি শক্ত,

এই দেখুন না কাজললতায় লেগে রয়েছে রক্ত ৷

বরের বাবা আওয়াজ করছে গোঁ-গোঁ––

দারোগা এ লোকটা কে? তখন থেকে গোঁ গোঁ

করছে–– যা ভাগ, পালা!

পুরোহিত আজ্ঞে কনের মেসোমশাই–– বোবা এবং কালা!

হুজুর, এবার অনুমতি করুন––

বিঘৎ-দুয়েক সরুন ৷

যা একখানা ফাঁড়া গেল, মন খচখচ করে––

বরকন্যের ঘরে

শান্তিজল ছেটাই––

দারোগা ইচ্ছে করে আচ্ছা করে পেটাই

পুরুৎ বুড়োটাকে––

হাতে পেয়েও হাতকড়াতে দলের মুড়োটাকে

পেলাম না, উঃ, এ যে কী আফসোস!

পুরোহিত হুজুর, হীরু ডাকাত তো না, আস্ত রাক্ষস!

দেখেই করেছিলাম দু চোখ বন্ধ!

দারোগা ছুঁচো মেরে করব না হাত গন্ধ,

নইলে তোমার হীরুর গুণগান––

কনের বাবা আসুন, আজ্ঞে, একটু তামাক খান ৷

ছিদামের পড়শী কাজের বাড়ি–– মিষ্টিমুখ করুন একটু আজ্ঞে ৷

সময় বুঝে এসেছিলেন ভাগ্যে!

পুরোহিত হেঁ হেঁ এজ্ঞে, দারোগাবাবুর দয়ায় ভালোয় ভালোয়

কাটল রাতের কালো ৷

তোমার মেয়ের বিয়েটা শেষ হল––

পাঁচ জনকে বোলো ৷

পুরুৎ মশাই হলেন কৃতাঞ্জলি

দারোগাকে হুজুর যদি অভয় দেন তো বলি––

এত বড় বিপদ গেল–– বরের বাড়ি গিয়ে

ইচ্ছে আছে শোধন করে আসব ওদের তিল-তুলসী দিয়ে ৷

ভোর হতে আর কতটুকু বাকি––

এখুনি তো রওনা হব টাকী,

একটা শুধু ভয়

পথে যদি হঠাৎ বিপদ হয়––

হীরু ডাকাত যদি কোথাও ঘাপটি মেরে থাকে!

হুজুর, অনুনয় করছি দেশের দারোগাকে––

দারোগা পাগল নাকি!

ছাগলটা কি

প্রাণেরও ভয় করে না?

দারোগা দেখেও ঘাপটি মারবে–– প্রাণে কি পুলক ধরে না?

পুরোহিত দারোগা সে দেখেনি, শুধু শুনেছে––

দারোগা তাতেই প্রমাদ গুনেছে!

পুরোহিত হুজুর আপনি সাহসী বীর, আমরা ভীরু

আবার যদি সামনে এসে দাঁড়ায় হীরু––

দারোগা ঠিক আছে, বেশ, সঙ্গে চলো–– যাব থানায়––

পুরোহিত পথে পড়বে ছাগলচরার ডোবা-খানা––

সেইখানটায় বড্ড ভয়ই করে!

দারোগা ভিতু লোক তো রোজ দুবেলা মরে!

টাকী যদি যাবে চলো–– আমায় আবার লিখতে হবে এখুনি রিপোর্টটা

সেপাইদের দু-চারজন এখানে থাক, বাকিরা সব থানায় ফিরে যা ৷

পুরোহিতকে চলো হে তাড়াতাড়ি––

বর-কনে আর বরের বাবার সঙ্গে হীরু চড়েছে গরুর গাড়ি ৷

বিদায় নেবার সময় মা আর কতক্ষণ বুক বাঁধে!

মেয়েও কাঁদে, মাও কাঁদে, বাবাও বুঝি কাঁদে ৷

ছেলে তিনটি হল কনের সাথী ৷

ঘোড়ায় চড়ে ঘোড়ার পেটে দারোগা মারে লাথি ৷

পেছনে তার চার সিপাহী ছোটে ৷

পুব আকাশের ঠোঁটে

গোলাপী রং লাগে ৷

প্রথম জাগে যেসব পাখি, সেসব পাখি জাগে ৷

পুরোহিত হুজুর, টাকীর পাশেই কি তমলুক?

দারোগা আস্ত উল্লুক!

পুরোহিত হুজুর, টাকীর চারপাশে কি বেড়া?

দারোগা এ লোকটা কি ভেড়া?

পুরোহিত হুজুর, আমি শিখিনি লেখাপড়া,

বিদ্যে বলতে সমোস্কৃত ছড়া––

হুজুর আপনি টেনেছিলেন অন্যের গড়গড়া!

দারোগা বামুন পুরুৎ, হল কী তোর? কথা ফুটছে দিব্যি মিঠে-কড়া!

পুরোহিত আজ্ঞে হুজুর, আপনি আছেন সঙ্গে––

ভয় কেটে যায় রসিকতায় রঙ্গে ৷

আপনি হলেন দারোগা––

বেয়াদপি দেখলে দেবেন বারো ঘা!

দারোগা তা তো বটেই! হলাম গিয়ে দেশের শান্তিরক্ষক––

পুরোহিত হুজুর, শুনুন ডাকছে কেমন তক্ষক!

দারোগা ডাকছে ডাকুক, তোর কী?

পুরোহিত আচ্ছা হুজুর, ডাকাতটাকে দেওয়া যায় না জ্যান্ত ধরে গোর কি?

দারোগা আর কি আছে এদেশে সে? আমার ভয়েই হয়েছে কাশীবাসী ৷

পুরোহিত হুজুর, এবার শুনুন আমার বাঁশি ৷

এই বলে সে বাঁশি তুলল মুখে

চলতে চলতে থমকে দাঁড়ায় দারোগা সম্মুখে ৷

পুরোহিত আপনি বললেন কাশী গেছে, আমার কিন্তু তেমন মনে হয় না ৷

দারোগাবাবু ভুরু কোঁচকায়–– পুরুতে তো এতটা কথা কয় না!

তার ওপর এই বাঁশি! তবে কী-তবে কী––

দারোগা সাবধান হে! সত্যি বলো তোমার পুরো নাম কী?

পুরোহিত বাঁশি বাজাই, শুনুন––

দারোগার চোখ জ্বলছে যেন জ্বলন্ত এক উনুন!

পুরোহিত উঁহু, উঁহু, হাতের অস্ত্র মাটিতে শোয়ান––

গাছ ফুঁড়ে লাফ দিয়ে নামল সশস্ত্র সব জোয়ান!

ছদ্মবেশ খুলে হীরু দাঁড়ায়

বাঁশি ফেলে বল্লমে হাত বাড়ায় ৷

হীরু দারোগা সাব! এবার চেনা লাগে?

দারোগা তো ফুঁসছিল খুব রাগে––

ভয়ে এবার কেঁপে উঠল গা ৷

দারোগা হীরু ডাকাত না?

চার সিপাহী থ’ ৷

হীরু এটাই তোমার ছাগলচরা দ’ ৷

হুইশিলে ফুঁ দিলেও কেউ আসবে না এই বনে ৷

কিন্তু তোমায় মারব না আজ, সঙ্গে আমার আছে যে বর-কনে ৷

তিন ছেলে কেমন মজা দারোগার!

নিজের পিঠেই বারো ঘা?

হীরু যাও, এবারে থানায় ফিরে যাও––

চাইলে যেন আবার দেখা পাও ৷

তখনও হীরুর হাতে বাঁশি, মনে নতুন সুর ৷

অনেক দূরে নদীর পাড়ে ওই মেদিনীপুর ৷

হীরু মাগো, তুমি যাচ্ছ শ্বশুরবাড়ি

তোমার সঙ্গে এবার ছাড়াছাড়ি ৷

শোনো গো বর, শোনো গো বরের বাবা,

বাঘের থাবা

খেলার জিনিস না ৷

আমার মেয়ের গায়ে তুললে হাত

আমার সঙ্গে ফের হবে সাক্ষাৎ ৷

কনেকে বিদায় দাও গো মা ৷

তিন ছেলে সর্দার এবার আদেশ দাও, যাব কনের সঙ্গে?

হীরু যা না, দুদিন ঘুরে আয় ৷ ঘুরবি গোটা বঙ্গে ৷

এসব যখন ঘটছে তখন ঠিক উনিশশো ছ’ সাল ৷

হীরু নামাও এবার রণ পা, নামাও মশাল ৷

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%