মহাভারতের শেষ মহাবীর

হেমেন্দ্রকুমার রায়

প্রথম । পালা শুরুর আগে

আধুনিক ইতিহাস বলে, কুরুক্ষেত্রের যোদ্ধাদের কাহিনি হচ্ছে পৌরাণিক রূপকথা। এখানে ঐতিহাসিকদের সঙ্গে তর্ক করবার দরকার নেই। রামায়ণী কথাকেও তাঁরা আমল দেন না। এ নিয়েও গোলমাল করে লাভ নেই।

কিন্তু আজ আমরা যে মহাবীরের কাহিনি বলতে বসেছি, তিনি পৌরাণিক ইতিহাস-পূর্ব যুগের মানুষ নন। কেবল প্রাচীন ইতিহাসে, ভ্রমণ কাহিনিতে, কাব্যে ও নাট্য-সাহিত্যেই তাঁর নাম অমর হয়ে নেই, তাঁকে সত্যিকার রক্ত-মাংসের মহাবীর বলে স্বীকার করেছেন আধুনিক ঐতিহাসিকরাও। সপ্তম শতাব্দীর আর্যাবর্ত গৌরবোজ্জ্বল হয়ে আছে একমাত্র তাঁরই নামের মহিমায়। তিনি হচ্ছেন ভারতের শেষ হিন্দু-সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা। এই বলে তিনি নিজের নাম সই করতেন—মহারাজাধিরাজ শ্রীহর্ষ। ইতিহাস তাঁকে হর্ষবর্ধন বলে জানে।

ভারতে সাম্রাজ্য-প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে হর্ষবর্ধন হচ্ছেন চতুর্থ স্থানীয়। ঐতিহাসিক ভারতে সর্বপ্রথম সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন গ্রিকবিজয়ী চন্দ্রগুপ্ত (৩২৩ বা ৩২২ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে কিংবা তারও দুই-এক বৎসর আগে)। তাঁর সাম্রাজ্য মৌর্যসাম্রাজ্য নামে বিখ্যাত। এই বিশাল সাম্রাজ্যের উপরে পূর্ণ গৌরবে প্রভুত্ব বিস্তার করেন যথাক্রমে তাঁর পুত্র ও পৌত্র বিন্দুসার ও অশোক। ২৩২ খ্রিস্ট-পূর্বাব্দে সম্রাট অশোকের মৃত্যুর প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই মৌর্যসাম্রাজ্যের অধঃপতন আরম্ভ হয়। তারপর অর্ধ শতাব্দী যেতে না যেতেই লুপ্ত হয়ে যায় মৌর্যরাজ্য।

মৌর্যদের কয়েক শতাব্দী পরে দ্বিতীয় ভারতীয় সাম্রাজ্য স্থাপন করেছিলেন সম্রাট সমুদ্রগুপ্ত। তিনি সিংহাসনে আরোহণ করেন ৩৩০ খ্রিস্টাব্দে। দিগবিজয়ে বেরিয়ে প্রায় সারা ভারতবর্ষ তিনি জয় করেছিলেন। এই দ্বিতীয় ভারতসাম্রাজ্য ইতিহাসে গুপ্তসাম্রাজ্য নামে বিখ্যাত। সমুদ্রগুপ্তের আরও তিন জন প্রসিদ্ধ বংশধর হচ্ছে সম্রাট দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত (কালিদাসের কাব্যের বিক্রমাদিত্য), সম্রাট প্রথম কুমারগুপ্ত এবং সম্রাট স্কন্দগুপ্ত। শেষোক্ত সম্রাটের মৃত্যুর (৪৬৭ খ্রিঃ) পর গুপ্তসাম্রাজ্যের পতন আরম্ভ হয় বটে, কিন্তু গুপ্তরাজারা আরও কিছুকাল পর্যন্ত সিংহাসন রক্ষা করতে পেয়েছিলেন।

সম্রাট স্কন্দগুপ্তের মৃত্যুর পরে ভারতের উপরে বিদেশি ও বর্বর হুনদের প্রাধান্য ক্রমেই বেড়ে উঠতে থাকে। হুন রাজা মিহিরকুল শেষটা এমন অত্যাচার আরম্ভ করে যে, মালবের অধিপতি যশোধর্মদেব তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করতে বাধ্য হন। যশোধর্মদেবের আহ্বানে ভারতের আরও কয়েকজন রাজা এসে তাঁর সঙ্গে যোগ দেন। ৫২৮ খ্রিস্টাব্দে মিহিরকুলের সঙ্গে যশোধর্মদেবের স্মরণীয় যুদ্ধ হয়। মিহিরকুল পরাজিত হয়ে পালিয়ে যায়।

এই যশোধর্মদেবই হচ্ছেন তৃতীয় ভারতীয় সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর যে শিলালিপি পাওয়া গিয়েছে তাতে স্পষ্ট ভাষায় লেখা আছে, তিনি পূর্বে ব্রহ্মপুত্র নদ থেকে পশ্চিমে আরব সাগর পর্যন্ত এবং উত্তরে হিমালয় থেকে দক্ষিণে ত্রিবাঙ্কুরের শেষ পর্যন্ত ভূভাগের অধিকারী ছিলেন। তাঁর আনুমানিক মৃত্যুকাল হচ্ছে ৫০০ খ্রিস্টাব্দ।

আশ্চর্য কথা হচ্ছে এই যে, এত বড়ো একজন দিগবিজয়ী সম্রাট সম্বন্ধে ইতিহাস আর বিশেষ কিছুই বলতে পারে না। কিংবা এ জন্যে বিস্মিত না হলেও চলে। কারণ, ইংরেজ ঐতিহাসিক যে সম্রাট সমুদ্রগুপ্তকে 'ভারতীয় নেপোলিয়ন' উপাধি দিয়েছেন, এক শত বৎসর আগেও আমরা তাঁর নাম পর্যন্ত জানতুম না। দৈবগতিকে এলাহাবাদের অশোক স্তম্ভের উপরে উৎকীর্ণ সমুদ্রগুপ্তের সভাকবি হরিষেণের লিখিত এক শিলালিপি পাওয়া গিয়েছে, তাই আজ আমরা তাঁর অপূর্ব ও বিচিত্র কাহিনি জানতে পেরেছি। সুতরাং এমন আশা করলে অন্যায় হবে না যে, হয়তো অদূর-ভবিষ্যতে ওই ভাবেই আমরা হঠাৎ একদিন সম্রাট যশোধর্মদেবেরও সম্পূর্ণ বা প্রায়-সম্পূর্ণ ইতিহাস সংগ্রহ করতে পারব।

ষষ্ঠ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ভারতবর্ষের মধ্যে একমাত্র বৃহৎ নাম ছিল যশোধর্মদেবের। কিন্তু ষষ্ঠ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে ভারতবর্ষের রাজনৈতিক বা সামাজিক অবস্থা কীরকম ছিল, আজ পর্যন্ত তা আবিষ্কৃত হয়নি। বড়জোর এইটুকু বলা যায়, যশোধর্মদেবের মৃত্যুর পর উত্তরভারতে আর কোনও একচ্ছত্র সম্রাট বিদ্যমান ছিলেন না। উত্তরাপথের ভিন্ন ভিন্ন দেশে রাজত্ব করতেন ভিন্ন ভিন্ন রাজারা এবং মিহিরকুল না থাকলেও উত্তর-পশ্চিম পাঞ্জাবের এখানে-ওখানে মাথা তোলবার চেষ্টা করত ছোট ছোট হুন রাজারা বা তাদের নিকট সম্পর্কীয় গুর্জর-বংশীয় দলপতিরা।

উত্তর ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে তখন (ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষ ভাগে) রাজত্ব করতেন যেসব অপেক্ষাকৃত পরাক্রান্ত রাজা, তাঁদের মধ্যে প্রধানত এই তিনজনকে নিয়ে আমাদের কাহিনি আরম্ভ করব। থানেশ্বরের প্রভাকরবর্ধন। মালব দেশের গুপ্তবংশীয় রাজা দেবগুপ্ত। মগধ, গৌড় ও রাঢ় দেশের গুপ্তবংশীয় রাজা শশাঙ্ক নরেন্দ্রগুপ্ত।

দ্বিতীয় । যুবরাজের যুদ্ধযাত্রা

কুরুক্ষেত্র।

এ নাম শুনলে আজও প্রত্যেক হিন্দুর ধমনিতে চঞ্চল হয়ে ওঠে রক্তস্রোত। এ কেবল কুরু-পাণ্ডবের আত্মঘাতী যুদ্ধক্ষেত্র নয়, এখানেই প্রথমে পার্থসারথিরূপে ভগবানের অবতার শ্রীকৃষ্ণের পবিত্র মুখে আত্মপ্রকাশ করেছিল গীতার মহাবাণী। এখানে একদিকে যেমন ভীমার্জুন, কর্ণ, ভীষ্ম ও দ্রোণ প্রভৃতি মহা মহা যোদ্ধারা অপূর্ব বীরত্ব দেখিয়ে অর্জন করেছিলেন অমরত্ব, আর একদিকে তেমনি নিঃশেষিত হয়ে গিয়েছিল আর্য-ভারতের সমস্ত ক্ষাত্র-বীর্য। এই শতস্মৃতি-বিজড়িত ভূমির উপরে গিয়ে দাঁড়ালে আজও হৃদয়ের মধ্যে অনুভব করা যায় শত মৃত পুত্রের শোকে কাতর গান্ধার-কন্যা গান্ধারীর করুণ ক্রন্দন, নিষ্ঠুর সপ্তরথীর দ্বারা আক্রান্ত বালক অভিমন্যুর নিষ্ফল সিংহনাদ, দুঃশাসনের রক্তপান করে তৃতীয় পাণ্ডবের উন্মত্ত তাণ্ডব, রক্তবন্যায় ভাসতে ভাসতে অষ্টাদশ অক্ষৌহিণীর উনচল্লিশ লক্ষ ছত্রিশ হাজার ছয় শত সৈন্যের চরম মৃত্যুযন্ত্রণা! এই বিরাট নরমেধযজ্ঞের ফল কী? পাণ্ডবদের মৃত্যুর পরে আর্যাবর্তে এমন কোনও ক্ষত্রিয় রইল না, বিদেশি যবনদের বাধা দেওয়ার জন্যে সবল হস্তে যে অস্ত্রধারণ করতে পারে। তাই তারই কিছুকাল পরে উত্তর ভারতের নাট্যশালার মধ্যে প্রবেশ করতে দেখি ইরানি এবং গ্রিক দিগবিজয়ীদের।

ষষ্ঠ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে কুরুক্ষেত্র বা থানেশ্বরের সিংহাসনে উপবিষ্ট ছিলেন প্রভাকরবর্ধন। তখন গুপ্তসাম্রাজ্যের পতন হয়েছিল বটে, কিন্তু গুপ্তবংশীয় ক্ষুদ্রতর রাজারা তখনও ভারতবর্ষের মধ্যে সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত বলে গণ্য হতেন। প্রভাকরবর্ধনের রানি ছিলেন যশোমতী। তিনি গুপ্তবংশজাতা এবং সেইজন্যে তাঁর স্বামী নিজেকে ভাগ্যবান বলে মনে করতেন। তাঁদের দুই পুত্র। জ্যেষ্ঠ রাজ্যবর্ধন এবং কনিষ্ঠ হর্ষবর্ধন। রাজশ্রী নামে তাঁদের এক কন্যার নাম ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছে। তিনি ছিলেন কান্যকুব্জের অধিপতি গ্রহবর্মার সহধর্মিণী।

তখন ভারতের প্রত্যেক রাজাই ভাবতেন, বাহুবলে পররাজ্য অধিকার করাই হচ্ছে রাজার বা বীরের ধর্ম! যে রাজা নিজের রাজ্যের নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ হয়ে থাকতে চাইতেন, তাঁদের যোগ্যতা সম্বন্ধে জনসাধারণ উচ্চ ধারণা পোষণ করত না। সত্য কথা বলতে কী, আজও পৃথিবী একটুও বদলায়নি। আজও পৃথিবীর যত যুদ্ধবিগ্রহের একমাত্র কারণ হচ্ছে পররাজ্য লোভ।

গুপ্তরাজকন্যা যশোমতীকে বিবাহ করে প্রভাকরবর্ধনের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ক্রমেই উচ্চতর হয়ে উঠছিল! উত্তরে পাঞ্জাবের কয়েকটি প্রদেশ করতলগত করে, দক্ষিণে মধ্য-ভারতের মালব দেশ পর্যন্ত তিনি নিজের বিজয়-পতাকা বহন করে নিয়ে গেলেন। মালবের গুপ্তবংশীয় রাজা খুব সম্ভব যুদ্ধক্ষেত্রেই জীবন বিসর্জন দিলেন। সেই বংশের দেবগুপ্তকে সামন্তরাজরূপে মালবের সিংহাসনে বসিয়ে প্রভাকরবর্ধন আবার থানেশ্বরে ফিরে এলেন। তখন ভারতে সম্রাট পদবির চলন ছিল না। যাঁরা সাম্রাজ্যের অধিকারী হতেন তাঁরা গ্রহণ করতেন একরাট কিংবা মহারাজাধিরাজ পদবি। প্রভাকরবর্ধন মহারাজাধিরাজরূপে পরিচিত ছিলেন।

৬০৪ খ্রিস্টাব্দ। খবর এল উত্তর-পশ্চিম পাঞ্জাবের দুর্ধর্ষ হুনরা আবার বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে।

প্রভাকরবর্ধন যুবরাজকে ডেকে বললেন, 'রাজ্যবর্ধন, আমি ক্রমেই বৃদ্ধ হয়ে পড়ছি। অদূর-ভবিষ্যতে তুমিই হবে মহারাজা। আমি বর্তমান থাকতেই তোমার উচিত, রাজকার্যে অভ্যস্ত হওয়া। বিজাতীয় হুনরা বিদ্রোহী হয়েছে, তুমি তাদের দমন করতে যেতে পারবে কি?'

তরুণ যুবক রাজ্যবর্ধন নতমস্তকে হাস্যমুখে বললেন, 'ক্ষত্রিয় আমি, অস্ত্রধারণ করাই আমার কর্তব্য। মহারাজের আদেশ হলেই আমি যুদ্ধযাত্রা করতে পারি।'

প্রভাকরবর্ধন বললেন, 'উত্তম, বৎস! এবারে হুনদের এমন শিক্ষা দিয়ে আসবে, ভবিষ্যতে তারা যেন আর মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে। কিন্তু স্মরণ রেখো যুবরাজ, এই হুনরা সহজশত্রু নয়। তোমার জননীর পূর্বপুরুষরা এক সময়ে ছিলেন ভারতবর্ষের সম্রাট। কিন্তু দুরাত্মা হুনদের দৌরাত্ম্যেই তাঁদের বিপুল সাম্রাজ্য আজ পরিণত হয়েছে অতীতের স্বপ্নে।'

রাজ্যবর্ধন বললেন, 'স্মরণ রাখব মহারাজ।'

পিতার নয়নের মণি। তিনি তাড়াতাড়ি এগিয়ে এসে বললেন, 'পিতা, আমিও কি ক্ষত্রিয় নই? দাদা যাবেন যুদ্ধে, আর আমি বসে থাকব রাজপ্রাসাদে? কেন, আমার কি অস্ত্রশিক্ষা হয়নি।'

প্রভাকরবর্ধন তার মাথার উপরে সস্নেহে হস্তার্পণ করে বললেন, 'এখনও সময় হয়নি পুত্র! যথাসময়ে তুমিও যুদ্ধযাত্রা করবে বইকি।'

কিন্তু হষবর্ধন বোঝ মানে না।

মহারাজা তখন বাধ্য হয়ে বললেন, 'বেশ বাছা, তুমিও কিছু সৈন্য নিয়ে যুবরাজের পিছনে পিছনে যাও। যুদ্ধক্ষেত্রের অনতিদূরে পার্বত্য অরণ্যে তুমি মৃগয়ার অনেক সুযোগ পাবে। সেইখানে শিবির স্থাপন কোরো। দরকার হলে যুবরাজ তোমাকে আহ্বান করবেন।'

এ ব্যবস্থা মন্দের ভালো। হর্ষবর্ধন আর কিছু বললেন না।

তৃতীয় । হরিষে বিষাদ

নীলাকাশের অনেকখানি আচ্ছন্ন করে দাঁড়িয়ে আছে পর্বতের পর পর্বত, নীল মেঘমালার মতো। তাদের শিখরগুলো বিপুল শূন্য ভেদ করে উঠে গিয়েছে উপর দিকে, তারা যেন কোনও দুর্গম দানব-লোকের কোলে পাথরে গড়া সারি সারি পূজা-দেউল। সেই পার্বত্য রাজ্যের নীচের দিকটা আচ্ছন্ন করে আছে, বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত এক গহন অরণ্যের লতাগুল্মতরুর নিবিড় শ্যামলতা।

সেখানে বনস্পতিদের মাথার উপরে রবিকররেখার সোনার ঝালর দেখে ভেঙে গিয়েছে গানের পাখিদের রাতের ঘুম; উত্তপ্ত জীবনের আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে তারা প্রেরণ করছে আকাশে বাতাসে পৃথিবীর দিকে দিকে গীতিময়ী প্রীতির বাণী।

কিন্তু কলকণ্ঠ বিহঙ্গদের স্তম্ভিত ও স্তব্ধ করে আচম্বিতে অদূরে জেগে উঠল বৃহৎ এক জনতার উত্তেজিত কোলাহল। সঙ্গে সঙ্গে শোনা গেল হস্তীর বৃংহতি, ধাবমান অশ্বদলের দ্রুত পদধ্বনি।

চঞ্চল হয়ে উঠল অরণ্যের অমানুষ বাসিন্দারা। এসব বিপজ্জনক ধ্বনি তাদের কাছে অপরিচিত নয়। কোন অন্তরালে একটি মৃত মৃগের দেহ নিয়ে বসে চিত্রবিচিত্র ব্যাঘ্র নিশ্চিন্ত প্রাতরাশের আয়োজন করছিল; কোন ঝোপের আড়ালে শুয়ে শুয়ে মাটির উপরে লাঙ্গুল আছড়ে বাঘিনি আহ্বান করছিল তার শাবকদের খেলা করবার জন্যে। সারারাত বনে বনে ঘুরে ভল্লুক ও ভল্লুকি ক্লান্ত দেহে গিরিগুহায় ফিরে দিবানিদ্রার জন্যে প্রস্তুত হচ্ছিল; অন্ধকারের বিভীষিকা দূর হয়েছে দেখে হরিণ-হরিণীরা সাহস সঞ্চয় করে দলে দলে বেরিয়ে এসেছিল নতুন রোদে চিকন শিশিরস্নাত তৃণভূমির উপরে। সমবেত মানুষদের ভয়াল সাড়া পেয়ে তারা সবাই আতঙ্কে শিউরে উঠে যে যেদিকে পারল সরে পড়ল। বনতল শব্দিত ও কম্পিত করে একসঙ্গে মিলেমিশে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে লাগল বাঘ, ভালুক, বরাহ, বয়ার, নেকড়ে, হরিণ ও শশকরা। উপরেও গাছের শাখা ছেড়ে আকাশের আশ্রয় নিলে সারস, বক, হাঁস, ময়ূর ও আরও নানা জাতের পাখিরা। বানররা আরও উঁচু ডালের উপরে উঠে ঘনপত্রের আড়ালে আত্মগোপন করে কিচিরমিচির শব্দে চারিদিকে রটিয়ে দিতে লাগল একই আসন্ন বিপদের সংবাদ। বনবাসী এই সব জীব কেউ কারও বন্ধু নয় বটে, কিন্তু তারা সব চেয়ে ভয়ানক শত্রু বলে মনে করে মানুষদের। বাঘ জীবহিংসা করে কেবল নিজের প্রাণরক্ষার জন্যে, কিন্তু মানুষ হত্যা করে অকারণ আনন্দেই। হরিণরা বনে থেকে বাঘের খোরাক হতেও রাজি, তবু মানুষের কাছে লোকালয়ে আসতে প্রস্তুত নয়।

বনে আজ শিকার করতে বেরিয়েছেন থানেশ্বরের রাজকুমার হর্ষবর্ধন। সঙ্গে আছে তাঁর বয়স্যরা এবং সৈন্যগণ।

দীর্ঘদংষ্ট্রা বিপুলবহু এক বরাহ—দুই চক্ষে তার ক্রোধের অগ্নি, নাসারন্ধ্রে ঝড়ের ঝাপটা, চার পায়ে বিদ্যুতের গতি! পেছনে পেছনে ধেয়ে আসছে এক তেজি ঘোড়া, পৃষ্ঠে আসীন তরুণ হর্ষবর্ধন, দক্ষিণ হস্তে তাঁর উদ্যত বর্শাদণ্ড।

হঠাৎ অরণ্যপথে দেখা দিলে আর এক অশ্বারোহী, দূর থেকেই সে চিৎকার করে বললে, 'রাজকুমার, রাজকুমার। ক্ষান্ত হোন—অশ্বরশি সংযত করুন।'

রাশ টেনে ধরতেই হর্ষবর্ধনের ঘোড়া দাঁড়িয়ে পড়ল এবং সেই অবসরে এক লাফ মেরে পাশের ঝোপের ভিতরে অদৃশ্য হয়ে গেল বরাহটা।

অনতিবিলম্বে অশ্বারোহী কাছে এসে পড়ল।

হর্ষবর্ধন বিরক্তিপূর্ণ স্বরে বললেন, 'এমন অসময়ে এসে আমাকে বাধা দিলে, কে তুমি?'

অশ্বারোহী মাটির উপরে নেমে পড়ে নতমস্তকে অভিবাদন করে বললে, 'রাজকুমার, আমি মহারাজাধিরাজ প্রভাকরবর্ধনের বার্তাবাহ।'

'কী বার্তা তুমি এনেছ?'

'মহারাজা মৃত্যুশয্যায় শায়িত।'

হর্ষবর্ধন সচমকে বললেন, 'সেকী, আমি যে পিতাকে সম্পূর্ণ সুস্থ অবস্থায় দেখে এসেছি।'

বার্তাবহ বললে, 'জীবন হচ্ছে স্রোতের ফুলের মতো—এই আছে এই নেই। মহারাজা মৃত্যুশয্যায় শুয়ে আপনাকে স্মরণ করেছেন। অবিলম্বে রাজধানীতে ফিরে না গেলে আপনি তাঁকে জীবন্ত দেখতে পাবেন না।'

চতুর্থ । আবার দুঃসংবাদ

সপ্তাহ কাল পরে হর্ষবর্ধন যখন অশ্রুভারাক্রান্ত চক্ষে পিতার রোগশয্যার পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন, মহারাজা প্রভাকরবর্ধনের সংজ্ঞা তখন লোপ পেয়েছে।

বিপদের উপরে বিপদ। মহারানি যশোমতী প্রতিজ্ঞা করেছেন, স্বামীহারা পৃথিবীতে তিনি এক মুহূর্ত বাস করতে রাজি নন, প্রভাকরবর্ধনের আগেই দেহত্যাগ করবেন জ্বলন্ত চিতায়।

হর্ষবর্ধন মায়ের পায়ের তলায় আছড়ে পড়ে আকুল কণ্ঠে বলে উঠলেন, 'মা, মা। আমি কি একসঙ্গে মাতৃপিতৃহারা হব?'

যশোমতী বললেন, 'বাছা, স্নেহের মোহে আমাকে অভিভূত করবার চেষ্টা কোরো না। সন্তানকে ইহলোকে রেখে পিতামাতা পরলোকে গমন করবেন, এই হচ্ছে ভগবানের নিয়ম। কিন্তু তার পরও পিতামাতা জীবিত থাকেন সন্তানের মধ্যেই। সুতরাং আমাদের অভাব তোমাকে অনুভব করতে হবে না। ধার্মিক হও, বীর্যবান হও, আর্যাবর্তের গৌরব হও,—তোমার প্রতি এই আমার শেষ আশীর্বাদ।'

প্রধানমন্ত্রী এসে বললেন, 'মহারানি, মহারাজের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, আজকের রাত কাটে কি না সন্দেহ! এখন আমাদের কর্তব্য কী? যুবরাজ সুদূর রণস্থলে, কিন্তু রাজসিংহাসন তো এক মুহূর্ত শূন্য থাকতে পারে না। তবে কি আমরা ছোট রাজকুমারকেই সিংহাসনের অধিকারী বলে মনে করব?'

যশোমতী শান্ত স্বরে বললেন, 'মন্ত্রীবর, জ্যেষ্ঠ আর কনিষ্ঠ, জননীর কাছে সব পুত্রই সমান। যাকে যোগ্য মনে করেন, তাকেই আপনারা সিংহাসনের উপরে স্থাপন করতে পারেন। আমি এখন পরলোকের যাত্রী, ঐহিক বিষয় নিয়ে আর কেন আমার সঙ্গে পরামর্শ করতে এসেছেন? আমার চোখের সামনে এখন জাগছে কেবল স্বামী দেবতার পবিত্র পাদপদ্ম, তাই দেখতে দেখতে এইবারে আমি অগ্নিশয্যায় শয়ন করব' বলতে বলতে তিনি সেখান থেকে প্রস্থান করলেন দ্রুতপদে।

প্রধানমন্ত্রী দ্বিধাজড়িত কণ্ঠে বললেন, 'তাই তো, মহারাজা এখন হতবাক, মহারানিও আমাদের কোনও স্পষ্ট নির্দেশ দিয়ে গেলেন না। আমাদের কর্তব্য কী, কিছুই বুঝতে পারছি না।'

হর্ষবর্ধন বললেন, 'আপনাদের কর্তব্য তো খুব স্পষ্ট।'

মন্ত্রী সবিস্ময়ে বললেন, 'কী রকম?'

'পিতৃদেবের মৃত্যু সুনিশ্চিত। এখন আপনাদের কর্তব্য হল যুবরাজের জন্যে অপেক্ষা করা।'

'রাজকুমার, আপনি বালক, তাই এমন কথা বলতে পারলেন। শূন্য সিংহাসন যে কত বিপদের আধার, সে জ্ঞান এখনও আপনার হয়নি। কার জন্যে আমরা অপেক্ষা করব? যুবরাজ! তিনি গিয়েছেন ভয়াবহ হুনদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে। যুদ্ধে তিনি যদি বার বার পরাজিত হন তাহলেও ততটা চিন্তার কারণ নেই, কারণ এর পরেও শত্রুদের দ্বিতীয় বার বাধা দেওয়ার সুযোগ হতে পারে। কিন্তু ভগবান না করুন, যুদ্ধে যদি যুবরাজের মৃত্যু হয়, তাহলে এই বিশাল সাম্রাজ্যকে রক্ষা করবে কে?'

হর্ষবর্ধনের পূর্ণকণ্ঠে বললেন, 'রক্ষা করব আমি। দাদার অবর্তমানে আমি আছি। কিন্তু মন্ত্রীমহাশয়, এটুকু ভালো করেই জেনে রাখবেন, যুবরাজ বর্তমান থাকতে কোনওদিনই আমার মনে ঠাঁই পাবে না তুচ্ছ রাজ্যলোভ।'

হর্ষবর্ধনের কচি মুখে এখনও দেখা যায়নি গোঁফের রেখা! সেই শিশুর মতন সরল মুখের পানে তাকিয়ে প্রবীণ মন্ত্রী মনের ভিতর থেকে একটুও জোর পেলেন না। মনে মনে বললেন, 'তোমার মুখ দেখলে এখনও তোমাকে নারী বলেই সন্দেহ হয়। হুনযুদ্ধে যুবরাজের পতন হলে তুমিই রাজ্য রক্ষা করবে বটে।'

হর্ষবর্ধন দাঁড়িয়েছিলেন প্রাসাদের এক বাতায়নের সামনে। বাইরের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ তিনি বলে উঠলেন, 'দেখুন মন্ত্রীমশাই, দেখুন দেখুন।'

'কী রাজকুমার!'

'এক অশ্বারোহী সৈনিক বায়ুবেগে অশ্বচালনা করে প্রাসাদের সিংহদ্বারে এসে নামল। নিশ্চয় যুদ্ধক্ষেত্রের কোনও বার্তা এসেছে।'

পরক্ষণেই শোনা গেল ঘন ঘন ভেরি, দামামা ও বহু কণ্ঠের উচ্চ জয়ধ্বনি।

মন্ত্রী উত্তেজিত কণ্ঠে বললেন, 'তাহলে কি যুবরাজ হুনযুদ্ধে জয়লাভ করেছেন?'

হর্ষবর্ধন বললেন, 'নিশ্চয়। বর্বর হুনদের সাধ্য কী আমার দাদাকে পরাজিত করবে?'

প্রাসাদের প্রধান প্রহরী বেগে ছুটে এসে খবর দিল, 'রণক্ষেত্র থেকে অগ্রদূত সংবাদ বহন করে এসেছে, মহাবীর রাজ্যবর্ধনের প্রবল প্রতাপের সামনে দুর্বৃত্ত হুন-দস্যুদল ঝটিকাতাড়িত তৃণদলের মতো নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে! অসংখ্য হুন-বন্দি নিয়ে যুবরাজ রাজধানীর দিকে আগমন করছেন।'

চারিদিকে শোক-দুঃখের সঙ্গে আনন্দের বিচিত্র সম্মিলন। মহাসতী মহারানি যশোমতীর চিতাগ্নিশিখা ম্লান হতে না হতেই মহারাজাধিরাজ প্রভাকরবর্ধনের অন্তিম নিশ্বাস মিলিয়ে গেল অনন্তের অতলে। এবং ক্রন্দন-মুখরিত রাজপুরীর মধ্যে যখন প্রবেশ করলেন নতশিরে সাশ্রুনেত্রে যুবরাজ রাজ্যবর্ধন, তখন তার মুখে দেখা গেল না যুদ্ধজয়ের কোনও আনন্দেরই নিদর্শন।

রাজ্যবর্ধনও তরুণ যুবক, হর্ষবর্ধনের চেয়ে মাত্র চার বৎসরের বড়ো। যথাসময়ে তিনি পিতৃসিংহাসনে আরোহণ করলেন বটে, কিন্তু ভাগ্য তাঁর প্রতি সুপ্রসন্ন হল না। তিনি ভালো করে সিংহাসনে বসতে না বসতেই পাওয়া যেতে লাগল দুঃসংবাদের পর দুঃসংবাদ।

প্রথমেই শোনা গেল, মালব দেশের গুপ্তবংশীয় রাজা দেবগুপ্ত বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন।

রাজ্যবর্ধন মন্ত্রণাসভা আহ্বান করলেন।

কিন্তু মন্ত্রণা সভার কর্তব্য স্থির হতে না হতেই পাওয়া গেল চরম দুঃসংবাদ।

মালবরাজ দেবগুপ্ত কান্যকুব্জ আক্রমণ করেছেন। সেখানকার রাজা এবং রাজ্যবর্ধনের সহোদরা রাজশ্রী দেবীর স্বামী গ্রহবর্মা যুদ্ধে পরাজিত ও নিহত হয়েছেন। রাজশ্রীও বন্দিনী, 'সাধারণ দস্যুর স্ত্রীর মতো তাঁর দুই চরণে পরিয়ে দেওয়া হয়েছে লৌহশৃঙ্খল।'

কেবল তাই নয়, মগধ-গৌড়-রাঢ় দেশের গুপ্তবংশীয় মহারাজা শশাঙ্ক নরেন্দ্রগুপ্ত মালবপতির সঙ্গে যোগ দেওয়ার জন্যে সসৈন্যে এগিয়ে আসছেন দ্রুতবেগে!

দারুণ ক্রোধে কাঁপতে কাঁপতে রাজ্যবর্ধন বললেন, 'কী, আমার নিরপরাধ ভগিনীর অপমান! আমি এখনই যুদ্ধযাত্রা করব।'

মন্ত্রীগণ ও সেনাপতি জানালেন, 'মহারাজ, আমাদের সমগ্র বাহিনী এখনও প্রস্তুত হওয়ার সময় পায়নি।'

রাজ্যবর্ধন অধীর কণ্ঠে বললেন, 'চাই না তোমাদের সমগ্র বাহিনী! আমার সঙ্গে চলুক কেবল দশ হাজার অশ্বারোহী! দুরাচার দেবগুপ্তের মতো তুচ্ছ পতঙ্গের পক্ষচ্ছেদ করতে সেই সৈন্যই যথেষ্ট। থানেশ্বরের রাজকন্যা বিধবা, আমার সহোদরা বন্দিনী, আমি কি আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা করতে পারি?'

পঞ্চম । বাংলার রাজা শশাঙ্ক

মধ্য ও পশ্চিম ভারত মহারাজাধিরাজ প্রভাকরবর্ধনের অধিকারভুক্ত ছিল বটে, কিন্তু উত্তর-পূর্ব ভারতেও প্রায় তাঁর মতনই ক্ষমতাশালী আর এক নরপতি ছিলেন, তাঁর নাম শশাঙ্ক নরেন্দ্রগুপ্ত। উত্তর-পূর্ব ভারতের মগধ, গৌড়ও, রাঢ়দেশ শশাঙ্কের অধীনতা স্বীকার করেছিল; এমনকি, দক্ষিণ ওড়িশার কোঙ্গোদমণ্ডলের মাধববর্মাও ছিলেন তাঁর সামন্তরাজা।

মহারাজা শশাঙ্কের মনে ছিল অত্যন্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষা। যে পরাক্রান্ত গুপ্তসম্রাটরা এক সময়ে সসাগরা ভারতভূমির শাসনদণ্ড দৃঢ় হস্তে পরিচালনা করতেন এবং যাঁদের রাজত্বকালে ভারতবর্ষ জ্ঞান-বিজ্ঞান, সাহিত্য ও ললিতকলা এবং সভ্যতা ও সংস্কৃতির উচ্চতম শিখরে আরোহণ করেছিল, সেই সম্ভ্রান্ত বংশেই তাঁর জন্ম। গুপ্ত-বংশের এক কন্যা মহাসেনগুপ্তাকে জননীরূপে পেয়ে থানেশ্বরের প্রভাকরবর্ধন নিজেকে যার-পর-নাই ভাগ্যবান বলে মনে করতেন। সুতরাং সেই রাজবংশেরই মুকুটধারী পুত্র হয়ে শশাঙ্কের মনে যে বিশেষ উচ্চাকাঙ্ক্ষা জাগ্রত হবে, এ জন্যে বিস্মিত হওয়ার দরকার নেই।

শশাঙ্কের প্রবল ইচ্ছা ছিল যে, আবার তিনি ফিরিয়ে আনবেন গুপ্তবংশের পূর্বগৌরব। এই ইচ্ছার বশবর্তী হয়ে তিনি জয় করতে লাগলেন রাজ্যের পর রাজ্য। কেবল মগধ, রাঢ় ও গৌড়বঙ্গের অধীশ্বর হয়েই তিনি পরিতুষ্ট হতে পারলেন না। তিনি দেখলেন, কামরূপের রাজা ভাস্করবর্মা কর্ণসুবর্ণ (এখন রাঙামাটি নামে খ্যাত। এ স্থানটি মুর্শিদাবাদের বহরমপুরের দক্ষিণে আছে) নগর পর্যন্ত আক্রমণ ও অধিকার করতে সাহসী হয়েছেন। তিনিও তখন কামরূপরাজকে আক্রমণ ও পরাজিত না করে নিশ্চিন্ত হতে পারলেন না।

এমন সময়ে গুপ্তবংশীয় আর এক রাজা, মালবের দেবগুপ্তের কাছ থেকে এল এক আমন্ত্রণলিপি।

দেবগুপ্ত লিখেছেন :

'মহারাজা শশাঙ্ক নরেন্দ্রগুপ্ত

একই পবিত্র বংশে আমাদের জন্ম। আমাদের দুজনেরই দেহের ভিতরে আছে একই পূর্বপুরুষের রক্ত। সেই রক্তের দোহাই দিয়ে আমি আপনার সাহায্য প্রার্থনা করছি।

গুপ্তবংশের সন্তান আমি, এত দিন বাধ্য হয়েই থানেশ্বরের প্রভাকরবর্ধনের প্রাধান্য স্বীকার করেছিলুম। কিন্তু এত দিন পর ভগবান মুখ তুলে চেয়েছেন। প্রভাকরবর্ধন আর ইহলোকে বিদ্যমান নেই। তাঁর দুই পুত্র অপ্রাপ্তবয়স্ক। তাই আমি বিদ্রোহ ঘোষণা করেই ক্ষান্ত হইনি, প্রভাকরবর্ধনের জামাতা কান্যকুব্জের মুখর বংশীয় রাজা গ্রহবর্মাকেও যুদ্ধে পরাস্ত ও নিহত করেছি এবং তার সহধর্মিণী রাজশ্রীও এখন আমার হস্তে বন্দিনী।

কিন্তু আমার লোকবল আপনার মতো প্রবল নয়। গুপ্তচরের মুখে সংবাদ পেলুম, থানেশ্বরের নতুন রাজা রাজ্যবর্ধন আমার বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেছেন। আমার এই দুঃসময়ে আপনি যদি আমাকে সাহায্য করতে আসেন, তাহলে কেবল যে আমি একাই উপকৃত হব তা নয়, আমরা দুজনে মিলে হয়তো আমাদের পূর্বপুরুষদের হৃতগৌরব পুনরুদ্ধার করতেও পারব। মহাশয়ের অভিমত অবিলম্বে জানতে পারলে বাধিত হব। ইতি'

মধ্য ও পশ্চিম ভারত পর্যন্ত নিজের অধিকার বিস্তৃত করবার এমন সুযোগ শশাঙ্ক ছাড়তে পারলেন না। তিনি উত্তরে লিখলেন :

'মহারাজা দেবগুপ্ত,

আপনার সাহায্যের জন্যে আমি যত শীঘ্র সম্ভব যাত্রা করব।

কিন্তু বিনা অপরাধে আপনি রাজশ্রীদেবীকে বন্দিনী করেছেন কেন? এ যে গুপ্তবংশের পক্ষে কলঙ্কের কথা। গুপ্তবংশের কেউ কোনও দিন নারীর বিরুদ্ধে হাত তোলেননি। অতএব অবিলম্বে রাজশ্রীদেবীকে মুক্তিদান করলে আমি অত্যন্ত আনন্দিত হব। ইতি'

কালবিলম্ব না করে মহাসমারোহে শশাঙ্ক সৈন্যসজ্জা আরম্ভ করলেন। নির্বোধরা এবং শত্রুরা আজ অপবাদ দেয়, বাঙালি সামরিক জাতি নয়, বাঙালি অস্ত্রধারণ করতে জানে না। কিন্তু আগে—এমনকি খ্রিস্টপূর্ব যুগেও বাঙালিদের কেউ কাপুরুষ বলতে ভরসা করত না। সাধারণত মগধ ও বঙ্গ বলতে সবাই তখন এক দেশই বুঝত। কারণ, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা গিয়েছে, মগধ ও বঙ্গের সিংহাসনে বিরাজ করছেন একই রাজা।

ইতিহাস-পূর্ব যুগেও দেখা যায়, মধ্য এশিয়া থেকে আগত বিদেশি আর্য জাতি উত্তরাপথের অধিকাংশ অধিকার করেও মগধ ও বঙ্গের স্বাধীনতা হরণ করতে পারেননি। বিখ্যাত গ্রন্থ 'শতপথ ব্রাহ্মণ' রচনাকালেও মগধ ও বঙ্গ বাহুবলে আপন স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রেখেছিল। মহাভারত ও রামায়ণেও বাঙালি রাজাদের নাম আছে। স্বর্গীয় মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী দেখিয়েছেন : 'বুদ্ধদেবের জন্মের পূর্বে বাঙালিরা জলে ও স্থলে এত প্রবল হইয়াছিল যে, বঙ্গরাজ্যের একটি ত্যাজ্যপুত্র সাত শত লোক লইয়া নৌকাযোগে লঙ্কাদ্বীপ দখল করিয়াছিলেন।...প্রাচীন গ্রন্থে দেখিতে পাওয়া যায় যে বড় বড় খাঁটি আর্যরাজগণ, এমনকি যাঁহারা ভারতবংশীয় বলিয়া আপনাদের গৌরব করিতেন, তাঁহারাও বিবাহসূত্রে বঙ্গেশ্বরের সহিত মিলিত হইবার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করিতেন।'

মগধ ও বঙ্গের শুদ্র অধিপতি মহাপদ্মনন্দই হচ্ছেন আর্যাবর্তের সর্বপ্রথম সম্রাট বা 'একরাট'। খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে দিগবিজয়ী সম্রাট আলেকজান্ডার যখন ভারতের পঞ্চনদ প্রদেশ অধিকার করেন, তখন বহু বিজ্ঞাপিত আর্যবীরগণ প্রাণপণেও তাঁর অগ্রগতি রুদ্ধ করতে পারেননি। সে-সময়ে আর্যাবর্তের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্রাট বাস করতেন মগধবঙ্গের যুক্ত সাম্রাজ্যে। তাঁকে জয় না করলে ভারতবর্ষ জয় করা হয় না। অতএব আলেকজান্ডার মগধবঙ্গকে আক্রমণ করতে অগ্রসরও হয়েছিলেন। কিন্তু গ্রিক ঐতিহাসিকেরই বর্ণনায় দেখি, মগধবঙ্গের শূদ্র রাজার মহাশক্তির কথা শুনে আলেকজান্ডার ভয় পেয়ে সমগ্র আর্যাবর্ত জয় করবার দুরাশায় জলাঞ্জলি দিয়ে পশ্চাৎপদ না হয়ে পারেননি।

মহারাজা শশাঙ্কের পরলোক গমনের অনেক পরেও দেখি, বাঙালির বাহুবল অধিকতর প্রবল হয়ে উঠেছে। অষ্টম শতাব্দীতে গৌড়-বঙ্গের অধীশ্বর ধর্মপাল উত্তরে দিল্লি ও জলন্ধর পর্যন্ত ও দক্ষিণে বিন্ধ্যগিরিশ্রেণি পর্যন্ত নিজের সাম্রাজ্য বিস্তৃত করেছিলেন। উপরন্তু বাঙালি সৈন্যদল জয়যাত্রায় বেরিয়ে রাজপুতানার কতক অংশ (ভোজদেশ ও মৎস্যদেশ), পাঞ্জাব (কুরু ও যদু), গান্ধার ও যবন, কীর (কাঙ্গড়া) ও অবন্তী (উজ্জয়িনী) প্রভৃতি দেশের রাজাদের অনায়াসে পরাজিত করেছিল।

পৃথিবীর ইতিহাসে বারংবার দেখা গিয়েছে, প্রত্যেক দেশেই উন্নতি ও অবনতির এক-একটা যুগ আসে। কোথায় আজ প্রাচীন মিশর, পারস্য, গ্রিক, রোমীয়, তাতার ও আরব সাম্রাজ্য? এক জাতি ওঠে এবং এক জাতি পড়ে।

বাঙালির ক্ষাত্রবীর্য দুর্বল হয়ে পড়েছিল মুসলমান অধিকারের যুগেই। কিন্তু বাঙালি কোনওদিনই নিঃশেষে আত্মসমর্পণ করতে রাজি হয়নি। মুসলমানরা যখন ভারতে অত্যন্ত প্রবল, তখনও স্বদেশের স্বাধীনতা-যজ্ঞে ইন্ধনের মতন আপন আপন জীবন বিলিয়ে দিয়েছিলেন বাংলার প্রতাপ, সীতারাম, চাঁদ রায় ও কেদার রায় প্রভৃতি। তবু দুষ্ট রসনায় শুনি মিথ্যা কথা—বাঙালি ভীরু, বাঙালি যোদ্ধা নয়। একেই বলে অদৃষ্টের পরিহাস।

বার বার পড়েও চিন আবার দাঁড়িয়ে উঠছে। বাঙালিও পড়ে মরবে না, আবার মাথা তুলে দাঁড়াবে।

অতঃপর আমাদের কাহিনির সূত্র ধরা যাক। মহারাজা শশাঙ্কের সৈন্যসজ্জা সমাপ্ত হল। বিপুল এক বাহিনী নিয়ে তিনি মালবরাজ দেবগুপ্তকে সাহায্য করবার জন্য অগ্রসর হলেন। তাঁর মনে আনন্দের সীমা নেই। এত দিন পরে তিনি লাভ করেছেন দিগবিজয়ে যাত্রা করবার যথার্থ সুযোগ। তাঁরও বুকের ভিতরে আজ যেন আবার জাগ্রত হয়েছে ভারতবিজয়ী সমুদ্রগুপ্তের অমর আত্মা।

দেবগুপ্ত আছেন কান্যকুব্জে। মগধবঙ্গ থেকে বহু—বহু দূরে। সেকালের কোনও সৈন্যদলই একালের মতো দ্রুতবেগে যুদ্ধযাত্রা করত না বা করতে পারত না। অশ্ব ও হস্তী অপেক্ষাকৃত দ্রুতগতিতে পথ পার হতে পারে বটে, কিন্তু কোনও বাহিনীই তো কেবল অশ্বারোহী, গজারোহী বা রথারোহী সৈন্য নিয়ে গঠিত নয়, সঙ্গে সঙ্গে থাকে অসংখ্য পদাতিকও এবং তাদেরও পিছনে ফেলে রেখে অগ্রসর হওয়া চলে না। তার উপরে সেকালের পথ-ঘাটের অবস্থাও ভালো ছিল না। কাজে-কাজেই যদিও শশাঙ্কের মন যাচ্ছিল বাতাসের আগে আগে, তবু তাঁর এবং সৈন্যদের দেহের গতি হল মন্থর।

অবশেষে শশাঙ্ক সদলবলে এসে উপস্থিত হলেন কান্যকুব্জের অনতিদূরে।

সেইখানে গুপ্তচরে মুখে শোনা গেল চরম এক দুঃসংবাদ!

যাঁকে সাহায্য করবার জন্য শশাঙ্ক নদ-নদী, পর্বত, কান্তার ও প্রান্তর অতিক্রম করে স্বরাজ্য ছেড়ে এত দূরে এসে পড়েছেন, সেই মালবরাজ দেবগুপ্ত ইতিমধ্যেই থানেশ্বররাজ রাজ্যবর্ধনের দ্বারা আক্রান্ত, পরাজিত ও নিহত হয়েছেন!

শশাঙ্কের উচ্চাকাঙ্ক্ষা পেলে আঘাত। কিন্তু তিনি অনেক দূর অগ্রসর হয়েছেন, এখন আর প্রত্যাগমন করা চলে না। তাহলে দেশব্যাপী নিন্দুকের জিহ্বা তাঁকে 'কাপুরুষ' বলে অখ্যাতি রটনা করবে। তার উপরে এখনও তাঁর প্রতিশোধ নেওয়া হয়নি। দেবগুপ্ত আর তিনি একই বংশজাত। রাজ্যবর্ধন তাঁর আত্মীয় ও বন্ধুকে হত্যা করেছেন, তাঁকে শাস্তি না দিয়ে তিনি এ স্থান ত্যাগ করবেন না।

গুপ্তচরের দিকে ফিরে শশাঙ্ক শুধোলেন, 'প্রভাকরবর্ধনের কন্যা রাজশ্রী কোথায়?'

'মহারাজা দেবগুপ্ত তাঁকে মুক্তি দিয়েছেন। কিন্তু তার পর তিনি যে কোথায় গিয়েছেন, কেউ তা জানে না।'

'দুর্বল নারীর প্রতি সবল পুরুষের অত্যাচার হচ্ছে মহাপাপ। হতভাগ্য দেবগুপ্তকে হয়তো সেই পাপের জন্যেই নিজের প্রাণ দিয়ে প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়েছে। চর, তুমি আর কোনও সংবাদ জানো?'

'আজ্ঞে হ্যাঁ মহারাজ! কিন্তু তাও সুসংবাদ নয়।'

'কী রকম?'

'থানেশ্বরের মহারাজা রাজ্যবর্ধন আপনার আগমন সংবাদ পেয়েছেন।'

'এটা খুবই স্বাভাবিক। তার পর?'

'তিনি আপনাকে আক্রমণ করবার জন্যে প্রস্তুত হচ্ছেন।'

'তাঁর সৈন্যসংখ্যা জানো?'

'জানি। তিনি দশ হাজার অশ্বারোহী নিয়ে কান্যকুব্জ আক্রমণ করেছিলেন। কিন্তু এখন তাঁর সৈন্যসংখ্যা আরও কম। কারণ, মহারাজা দেবগুপ্তের সঙ্গে যুদ্ধে প্রায় তিন হাজার সৈন্য হতাহত হয়েছে।'

শশাঙ্ক নীরবে কিছুক্ষণ চিন্তা করলেন। তারপর বললেন, 'চর, তুমি মূল্যবান সংবাদ এনেছ। তোমাকে পুরস্কৃত করব। এখন যাও।'

গুপ্তচর অভিবাদন করে বিদায় নিলে।

শশাঙ্ক সহাস্যে মনে মনে বললেন, 'আমার এক লক্ষ সৈন্যের বিরুদ্ধে রাজ্যবর্ধনের সাত হাজার সৈন্য। যুদ্ধে আমার জয় অনিবার্য'।

ষষ্ঠ । বাঙালি পাখি

শশাঙ্ক স্থির করলেন, রাজ্যবর্ধনকেই আগে আক্রমণ করবার সুযোগ দেবেন।

রাজ্যবর্ধন তরুণ যুবক, তাঁর প্রকৃতিও নিশ্চয় উগ্র; নইলে শশাঙ্কের বিপুল সৈন্যবল সম্বন্ধে কোনও সন্ধান না নিয়েই মাত্র সাত হাজার সৈনিকের সঙ্গে এমনভাবে অগ্রসর হতে সাহস করতেন না।

শশাঙ্ক মৃদু হাস্য করে সেনাপতিকে ডেকে বললেন, 'আমার কী মনে হচ্ছে জানেন? উত্তর-পশ্চিম ভারতের লোকেরা উত্তর-পূর্ব ভারতের লোকদের বরাবরই তুচ্ছ বলে জ্ঞান করেন। মগধ আর বঙ্গের বাসিন্দারা তাই তাঁদের মতে নগণ্য 'পক্ষী' মাত্র। রাজ্যবর্ধন বোধহয় ভেবেছেন, তাঁর সাত হাজার যোদ্ধাকে দেখলেই আমার এক লাখ সৈন্য ভীরু পাখির পালের মতোই উড়ে পালিয়ে যাবে।'

সেনাপতি বললেন, 'চমৎকার যুক্তি বটে।'

শশাঙ্ক বললেন, 'অতিরিক্ত সৌভাগ্য মানুষের সুবুদ্ধি হরণ করে। উত্তর-ভারতের লোকেরা আমাদের কেবল 'অনার্য' বলে ডেকেই তুষ্ট নয়। তারা বলে কিনা, মগধ আর বঙ্গদেশে পদার্পণ করলেও তাদের পাতিত্য দোষ জন্মাবে, তাদের আবার প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে। অহমিকা এর ঊর্ধ্বে আর উঠতে পারে না। অতিদর্পে লঙ্কা আর অতি মানে কৌরবদের পতন হয়েছিল। আজকেও আবার তারই পুনরাভিনয় হবে। সেনাপতিমহাশয়, আপনি অর্ধচন্দ্র-ব্যূহ রচনা করে শত্রুদের জন্যে অপেক্ষা করুন। ব্যূহের দক্ষিণ আর বাম বাহুতে স্থাপন করুন রথারোহী সৈন্যদের। শত্রুরা যখন ব্যূহের মধ্যভাগ আক্রমণ করবে, তখন আপনার কর্তব্য কী জানেন?'

হাস্যমুখে সেনাপতি বললেন, 'আপনাকে আর কিছু বলতে হবে না মহারাজ! আমি বেশ বুঝতে পারছি, আজ যুদ্ধের নামে হবে প্রকাণ্ড একটা ছেলেখেলা।'

দুই ভুরু কুঞ্চিত করে শশাঙ্ক বললেন, 'পতঙ্গ যখন অগ্নিতে আত্মাহুতি দেয় তখন অগ্নিকে কেউ তার জন্য দায়ী করে না। স্বরাজ্য ছেড়ে এত দূরে আমি ছেলেখেলা করতে আসিনি, কিন্তু শত্রুরা যদি ছেলেখেলা করে তাহলে আমার কী দোষ?

সেনাপতি বললেন, 'যুদ্ধে যে আমাদের জয় হবে সে বিষয়ে কোনওই সন্দেহ নেই। তারপর রাজ্যবর্ধনকে নিয়ে আমরা কী করব?'

শশাঙ্ক চিন্তিত মুখে কিছুক্ষণ মৌন থেকে বললেন, 'সেনাপতিমহাশয়, রাজনীতি বড় নির্মম, কারণ রাজনীতি বড় স্বার্থপর, আমাদের প্রধান পূর্বপুরুষ সমুদ্রগুপ্ত দিগবিজয়ে বেরিয়ে অধিকাংশ প্রতিদ্বন্দ্বী রাজাকেই 'সমূলে উৎপাটন না করে ক্ষান্ত হননি।'

সেনাপতি কিঞ্চিৎ ইতস্তত করে বললেন, 'কিন্তু মহারাজ রাজ্যবর্ধনকে বালক বললেও চলে।'

—'সিংহশিশু অবহেলার যোগ্য নয়। আর একটা কথা ভুলবেন না। আমার রাজ্যের সীমান্ত প্রদেশে আছে রাজ্যবর্ধনের রাজ্য শুনেছি, সে ধার্মিক বলে প্রজারা তাকে ভালোবাসে। রাজনীতি বলে যে, সীমান্ত প্রদেশের রাজা ধার্মিক হলে নিজের রাজ্যের কল্যাণ হয় না। এর পরে আপনাকে আর কিছু বলা বাহুল্য। আমি রাজ্যবৃদ্ধি আর নিজের রাজ্যের কল্যাণ চাই। বুঝলেন?'

অভিবাদন করে বিদায় নিলেন সেনাপতি।

শশাঙ্ক আপন মনে বললেন, 'রাজ্যবর্ধন, তোমার উন্নতি আমার উচ্চাকাঙ্ক্ষার বিরোধী। কিন্তু তোমার জন্যে আমি দুঃখিত।'

রাজ্যবর্ধন দুর্ধর্ষ হুন-সমরে বিজয়ী হয়ে ইতিহাসে স্থায়ী খ্যাতি অর্জন করেছেন। কিন্তু বয়সে তিনি কাঁচা হলেও তাঁর বুদ্ধিকে অপরিণত বলে মনে করা চলে না। তাঁরও আগে তাঁরই মতন বয়সে গ্রিক-দিগবিজয়ী আলেকজান্ডার অসাধারণ সামরিক জ্ঞানের পরিচয় দিয়েছিলেন। কিন্তু এক্ষেত্রে রাজ্যবর্ধনের মস্তিষ্কের স্থিরতা ছিল না। একে তাঁর সহোদরার স্বামী নিহত, তার উপরে বিধবা রাজশ্রীও নিরুদ্দেশ এবং তারও উপরে পঞ্চনদ অঞ্চলের সাধারণ কুসংস্কারের বশবর্তী হয়ে তিনিও সত্য সত্যই মনে করেছিলেন যে থানেশ্বরের সাত হাজার সৈন্য বঙ্গাধিপের লক্ষ সৈন্যের চেয়েও বলবান।

এই ভ্রান্ত ধারণার অবশ্যম্ভাবী ফল ফলতেও দেরি লাগল না। শশাঙ্ক যে ফাঁদ পেতেছিলেন, রাজ্যবর্ধন সেই ফাঁদেই পা দিলেন অন্ধের মতো। থানেশ্বরের সাত হাজার অশ্বারোহী মগধবঙ্গের বিপুল বাহিনীর মধ্যভাগ আক্রমণ করল। মগধবঙ্গের মধ্যভাগের গজারোহী, পদাতিক ও অশ্বারোহী সৈন্যগণ তাদের বাধা দিতে লাগল এবং সেই অবকাশে তাদের অর্ধচন্দ্র ব্যূহের দক্ষিণ ও বাম বাহুও এগিয়ে এসে পরস্পরের সঙ্গে সম্মিলিত হয়ে সমগ্র থানেশ্বর বাহিনীকে একেবারে ঘিরে ফেললে। ঠিক বেড়াজালের মধ্যে আবদ্ধ হয়েও রাজ্যবর্ধনের সৈন্যরা যুদ্ধ করতে লাগল বটে বিপুল বিক্রমে, কিন্তু এক লক্ষের সামনে সাত হাজারের শক্তি কতটুকু? দেখতে দেখতে থানেশ্বরের ক্ষুদ্র বাহিনী নিঃশেষে হারিয়ে গেল সমুদ্রের মাঝখানে ঠিক নদীর মতোই।

শিবিরের বাইরে যুদ্ধের কোলাহল—অস্ত্রে অস্ত্রে ঝনৎকার, আহতের আর্তনাদ, যোদ্ধার গর্জন, দামামার ডিমি-ডিমি-ডিমি, কিন্তু মহারাজ শশাঙ্ক তখন জনৈক পারিষদের সঙ্গে নিশ্চিন্ত মনে দাবা-বোড়ে খেলায় নিযুক্ত হয়েছিলেন। জ্যোতিষী না হলেও তিনি জানতেন যে, আজকের যুদ্ধের ফলাফল কী হবে।

বার্তাবাহ সংবাদ নিয়ে এল,—স্থানেশ্বরের বাহিনী প্রায় নির্মূল, রাজ্যবর্ধন নিহত।

ভ্রূসঙ্কোচ করে শশাঙ্ক শুধোলেন, 'নিহত? কার হস্তে?'

'সেনাপতিমহাশয়' থানেশ্বরের মহারাজাকে স্বহস্তে বধ করেছেন।'

শশাঙ্ক স্তব্ধ হয়ে রইলেন গম্ভীর মুখে। তারপর ধীরে ধীরে বললেন, 'পণ্ডিতরা বলেন, অমঙ্গল থেকেই মঙ্গলের উৎপত্তি হয়। উচ্চাকাঙ্ক্ষার আর এক ধাপ উপরে উঠলুম। থানেশ্বরের অমঙ্গলের উপরে মগধবঙ্গের মঙ্গলের প্রতিষ্ঠা। এ জন্যে রাজনীতি আমাকে অপরাধী বলে মনে করতে পারবে।'

সপ্তম । নায়কের মঞ্চে প্রবেশ

প্রভাত কাল। থানেশ্বরের রাজপ্রাসাদ।

আজ থেকে কিঞ্চিদধিক তেরোশো পঞ্চাশ বৎসর আগেকার কথা বলছি। বর্তমানের পটে সেদিনকার আর্যাবর্তের আলোকচিত্র একেবারেই ঝাপসা হয়ে গিয়েছে বটে, কিন্তু আজও অপরিবর্তিত হয়ে আছে সেদিনকার দৃশ্যমান প্রকৃতি।

নির্মল নীলাকাশ, জ্যোতির্ময় প্রভাত-সূর্য, সোনালি কিরণ-বন্যা, মুক্তকণ্ঠ গানের পাখি, স্নিগ্ধ সমীরণ-হিন্দোলায় ছন্দে ছন্দে আন্দোলিত শ্যামলতা। প্রকৃতি বর্ণনা করতে বসলে আজকের লেখকও এর চেয়ে নতুন কিছু দেখাতে পারবেন না।

রাজকুমার হর্ষবর্ধন আপন মনে করছিলেন কাব্য রচনা।

কৃপাণ এবং লেখনী, এই দুটিই হর্ষবর্ধনের কাছে ছিল সমান প্রিয়। বালক বয়স থেকে ভালোবাসতেন তিনি কবিতাকে এবং পরিণত বয়সে এই কাব্যানুরাগ তাঁর খ্যাতিকে কতখানি অমর করে তুলেছিল, সেটা আমরা দেখতে পাব যথাসময়েই। হর্ষবর্ধনের নিজের সৃষ্ট কাব্যালোকের মধ্যে আজও তাঁর মনের কথা উত্তপ্ত ও জীবন্ত হয়ে আছে বিশ্বসাহিত্যের মধ্যে।

হর্ষবর্ধন সেদিন কবিতা রচনা করছিলেন। কিন্তু প্রথম শ্লোকটি শেষ করতে না করতেই হঠাৎ বিঘ্ন উপস্থিত হল।

পরিচারক এসে জানালে সেনাপতি সিংহনাদ দ্বারদেশে অপেক্ষা করছেন। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে তিনি দুঃসংবাদ নিয়ে এসেছেন।

হর্ষবর্ধন সচমকে বললেন, 'দুঃসংবাদ? কী দুঃসংবাদ?'

'আমি জানি না প্রভু!'

'বেশ, সেনাপতিকে এখানে আসতে বলো।'

সেনাপতি সিংহনাদ ঘরের ভিতর এসে দাঁড়ালেন! তাঁর মুখ চোখ উদ্ভ্রান্তের মতো।

'কী ব্যাপার সেনাপতি?'

সিংহনাদ প্রায়-অবরুদ্ধ কণ্ঠে বললেন,

'দেব দেবভূয়ং গত নরেন্দ্রে দুষ্টগৌড়ভুজঙ্গজগ্ধজীবিতে চ।

রাজ্যবর্ধনে বৃত্তেহস্মিন মহাপ্রলয়ে ধরণীধারণায়াধুনাত্বং শেষঃ।'

হর্ষবর্ধনের বুকের মধ্য দিয়ে যেন উল্কাগতির প্রচণ্ড ঝড় বয়ে গেল, খসে পড়ল তাঁর হাত থেকে লেখনী! আড়ষ্ট কণ্ঠে তিনি বলে উঠলেন, 'সেনাপতি, কী বললেন? দুষ্ট গৌড়ভুজঙ্গের দংশনে মহারাজা রাজ্যবর্ধন স্বর্গে প্রস্থান করেছেন?'

'আজ্ঞে হ্যাঁ দেব!'

'গৌড়ভুজঙ্গ? মগধবঙ্গের রাজা শশাঙ্ক? সেই গৌড়াধম হত্যা করেছে আমার দাদাকে?'

'আজ্ঞে হ্যাঁ দেব! কেবল তাকেই হত্যা নয়, সেই দুরাচারের কবলে পড়ে আমাদের সাত হাজার সৈন্য একেবারে ধ্বংস হয়ে গিয়েছে।'

'আর আমার দিদি রাজশ্রী? তাঁর খবর কী? দাদা তো তাঁকেই উদ্ধার করতে গিয়েছিলেন।'

'থানেশ্বরের রাজকন্যার কথা কেউ সঠিক বলতে পারছে না। কেবল এইটুকু জানা গিয়েছে যে তিনি এখন আর বন্দিনী নন। কিন্তু মহারাজা রাজ্যবর্ধনও তাঁর সন্ধান পাননি। লোকের মুখে প্রকাশ, রাজকন্যা নাকি বিন্ধ্য পর্বতের কোথায় গিয়ে আত্মগোপন করে আছেন।'

হর্ষবর্ধন আবার কী জিজ্ঞাসা করতে যাচ্ছিলেন, এমন সময়ে ঘরের ভিতরে এসে দাঁড়ালেন তাঁর ভ্রাতৃ-সম্পর্কীয় ভণ্ডি ও আরও কয়েকজন মন্ত্রী।

ভণ্ডি বললেন, 'কুমার হর্ষবর্ধন, রাজ্যের চারিদিকে বিষম আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে, থানেশ্বরের সিংহাসন আবার শূন্য। মহারাজা রাজ্যবর্ধনের শোচনীয় অকালমৃত্যু। আমাদের সকলকেই স্তম্ভিত করে দিয়েছে বটে, কিন্তু এখন আমাদের আত্মহারা হওয়ার বা শোক করবারও অবকাশ নেই। হর্ষবর্ধন, রাজ্যের মঙ্গলের জন্যে এখনই তোমাকে মুকুট ধারণ করতে হবে।'

হর্ষবর্ধন বেগে উঠে দাঁড়ালেন, তাঁর দুই বিস্ফারিত চক্ষে ঠিকরে উঠল আগুনের ফিনকি। দৃপ্তকণ্ঠে তিনি বললেন, 'মুকুট? আমি এখন মুকুট ধারণ করব? ছার এই মুকুট! আমার অত্যাচারিতা অভাগিনি বিধবা সহোদরা নিরুদ্দেশ, আমার দাদার—থানেশ্বরের মহারাজাধিরাজের পবিত্র মৃতদেহ নিয়ে এখন হয়তো কাড়াকাড়ি করছে শকুনি-গৃধিনীর দল, এই সময়ে মুকুট ধারণ করব আমি? আপনারা জ্যেষ্ঠ, আপনারা জ্ঞানী, কিন্তু এ কী বলছেন আপনারা! মুকুট এখন আমার কাছে তুচ্ছাদপি তুচ্ছ, এখন আমার কাম্য কেবল প্রতিহিংসা—প্রতিহিংসা—প্রতিহিংসা! আজ আপনারা সকলে আমার এই প্রতিজ্ঞা শুনে রাখুন, যত দিন না দিদি রাজশ্রীকে উদ্ধার করতে পারছি, যতদিন না আমার দাদার শত্রুদের শাস্তিবিধান করতে পারছি, ততদিন আমি দক্ষিণ হস্ত দিয়ে অন্নগ্রহণ করব না!'

অষ্টম । রাজশ্রী

হর্ষবর্ধনের সামনে রয়েছে এখন দুটি প্রধান কর্তব্য। ভ্রাতৃহন্তা বঙ্গেশ্বর শশাঙ্ককে শাস্তি দেওয়া এবং নিরুদ্দিষ্টা ভগিনী রাজশ্রীকে উদ্ধার করা।

কিন্তু সর্বাগ্রে রাজশ্রীর সন্ধান না নিলে চলবে না। রাজশ্রী হর্ষের চেয়ে আট-দশ বৎসরের বড় ছিলেন। শৈশবে তিনি দিদির কোলে চড়েছেন, তাঁর কাছে কত আবদার করেছেন! দিদিকে তিনি কেবল ভালোবাসতেন না। তাঁকে দেখতেন অত্যন্ত শ্রদ্ধার চক্ষে। কারণ রাজশ্রী ছিলেন একাধারে বিদ্যাবতী ও বুদ্ধিমতী। হর্ষের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, রাজ্যশ্রী যদি পুরুষ হতেন তাহলে তিনি থাকতে থানেশ্বরের সিংহাসনে বসবার যোগ্যতা হত না আর কারুর।

সেনাপতি সিংহনাদ নিবেদন করলেন, 'দেব, রাজশ্রীদেবীকে আগে উদ্ধার করতে গেলে নরাধম গৌড়াধিপতি যদি পালিয়ে যায়? বঙ্গ হচ্ছে দুর্গম দেশ, সেখানকার লোকদের আশ্রয় কেবল স্থলপথ নয়, জলপথও। একবার সে পলায়নের সুযোগ পেলে আর কি আমরা তাকে ধরতে পারব?'

হর্ষ বললেন, 'হয়তো পারব না, তবু উপায় নেই। রাজশ্রীদেবীর ধমনিতে প্রবাহিত হচ্ছে আমার স্বর্গীয় পিতৃদেবের পবিত্র রক্ত। তার উপরে আমি পিতা-মাতাকে হারিয়েছি, একমাত্র ভ্রাতাকেও হারিয়েছি, পৃথিবীতে এখন দিদি ছাড়া আমার আর আপনজন নেই। আমার দিদির সঙ্গে একশত শশাঙ্ক তুল্যমূল্য নয়। আগে দিদিকে ফিরিয়ে আনি, তারপর অন্য কথা।'

'আমার প্রতি আপনার কী আদেশ।'

'আপনি এখন থেকেই নতুন সৈন্য সংগ্রহের চেষ্টা করুন। ইতিমধ্যে আমি এক হাজার লোক নিয়ে দিদির সন্ধানে যাত্রা করব। ফিরে এসে যেন সেনাদলকে প্রস্তুত অবস্থায় দেখতে পাই।

হর্ষের কবি-বন্ধু বানভট্ট সাবধান করে দিলেন, 'দেখবেন রাজপুত্র, রাজশ্রীদেবীকে উদ্ধার করতে যেন বিলম্ব না হয়! নিজের প্রতিজ্ঞার কথা সর্বদাই স্মরণ রাখবেন। বাঙালি-পাখি শশাঙ্ক যদি উড়ে পালায়, তাহলে সারা জীবনই আপনাকে নোংরা বাম হাত দিয়ে অন্নগ্রহণ করতে হবে।'

সে কথার উত্তর না দিয়ে সিংহনাদের দিকে ফিরে হর্ষ বললেন, 'প্রধান সেনাপতি স্কন্দগুপ্ত এখন কোথায়?'

সিংহনাদ বললেন, 'তাঁকে আমি যুদ্ধক্ষেত্রে দেখেছিলুম বটে, কিন্তু এখন তিনি জীবিত কী মৃত বলতে পারি না।'

বাণভট্ট বললেন, 'রাজপুত্র, আপনি কি সেই স্কন্দগুপ্তের কথা জিজ্ঞাসা করছেন, যাঁর মহা নাসিকা আপনার সম্ভ্রান্ত পূর্বপুরুষদের নামের তালিকার চেয়েও বেশি দীর্ঘ?'

'কবি, তোমার এই উপমাটি বেশ রুচিসম্মত হল না! যাক সেকথা। হ্যাঁ, আমি সেই স্কন্দগুপ্তের কথাই জিজ্ঞাসা করছি। তুমি কি তাঁর সম্বন্ধে কিছু জানো?'

'জানি বইকি রাজপুত্র। শশাঙ্ক-পক্ষীর চঞ্চু-তাড়নায় যুদ্ধক্ষেত্র থেকে লম্বা দিয়ে তিনি এমন ভীষণ লজ্জিত হয়ে পড়েছেন যে, নিজের বাড়ির অন্দর-মহলে রমণীর মতো ঘোমটায় বদন ঢেকে অবস্থান করছেন।'

'এখন পরিহাস রাখো কবি। একবার প্রধান সেনাপতির কাছে যাও, তাঁকে বলে এসো—যুদ্ধে জয় পরাজয় দুই-ই থাকে, প্রকৃত বীরকে কোনওদিন স্পর্শ করতে পারে না পরাজয়ের গ্লানি। তিনি যদি প্রতিশোধ নিতে চান তাহলে শশাঙ্কের সঙ্গে আবার দেখা করবার জন্যে যেন প্রস্তুত হয়ে থাকেন। আমি চললুম।'

হর্ষ প্রস্থান করলে পর বাণভট্ট বললেন, 'ওহে বাপু সিংহনাদ, স্কন্দগুপ্তের কেবল অতিদীর্ঘ নাসা নয়, তাঁর কেশও অতিপক্ক। রাজপুত্র শ্রীহর্ষ তাঁকে যে কথাগুলি বলতে বললেন তা শুনলে তিনি কী মনে করবেন বলো দেখি?'

'কী মনে করবেন?'

'মনে করবেন, ছেলেটি গোঁফ না গজাতেই জ্যাঠামহাশয় হওয়ার চেষ্টা করছে।'

সিংহনাদ কোনও রকম নাদসৃষ্টি না করে মুখ টিপে একটুখানি হাসবার চেষ্টা করলেন, কিন্তু স্পষ্টাস্পষ্টি হাসলেন না।

বিন্ধ্য পর্বতমালার পাদদেশে জঙ্গলাকীর্ণ প্রদেশ! এমন ঘন জঙ্গল যে পাঁচ হাত অগ্রসর হলেই দৃষ্টি হয় বন্ধ। সেখানে বাঘ, ভালুক, অজগর ও বিষাক্ত সর্পাদি তো আছেই, তার উপরে যে সময়ের কথা বলছি তখন সেখানে পশুরাজ সিংহেরও প্রতাপ বড় কম ছিল না।

সেখানে বাস করত মানুষও। কিন্তু তারা সভ্য মানুষ নয়, অসভ্য ভিল। এক সময়ে তাদেরই পূর্বপুরুষরা ছিল ভারতের আদিম বাসিন্দা। কিন্তু বিদেশি আর্য জাতির দ্বারা যখন উত্তরাপথ অধিকৃত হল, তখন তারা এসে আশ্রয় গ্রহণ করেছিল এমনই সব দুর্গম গহন বনে বা পর্বতের অন্তরালে। তাদের আত্মরক্ষার সম্বল ছিল কেবল মাত্র বল্লম বা তিরধনুক। তারই সাহায্যে তারা করত দুর্দান্ত সিংহ-ব্যাঘ্রদেরও প্রাণে ভীতির সঞ্চার করেছিল। শিকারই ছিল তাদের প্রাণধারণের প্রধান উপায়, কিন্তু শিকার না জুটলেও তাদের খাদ্যের অভাব হত না কোনওদিন। অসংখ্য বৃক্ষদেবতা হাজার হাজার পত্রশ্যামল শাখা-বাহু বিস্তার করে তাদের সামনে ধরত অফুরন্ত ও সুমিষ্ট অমৃত ফল এবং তাদের তৃষ্ণা নিবারণ করবার জন্যে নাচতে নাচতে ছুটে আসত সাগ্রহে সংগীতমুখরা ও সুধাময়ী নির্ঝরিনী আর তটিনীরা। ছিল না কোনও অভাব, ছিল না সংকীর্ণ সমাজের বাঁধন। নাগরিক এবং পরম শত্রু আর্যদের কার্য বা অকার্য নিয়ে তারা মাথা ঘামাত না একটুও, বনে বনে বা পাহাড়ের শিখরে শিখরে আগলভাঙা উদ্দাম পুলকে স্বাধীনভাবে বিচরণ করত প্রকৃতির একান্ত প্রাণের দুলালের মতো।

স্থানীয় ভিলদের এক সরদার ছিল, নাম তার লটনা। বয়স পঞ্চাশের ওপারে, কিন্তু জোয়ান সে তিরিশ বৎসরের যুবকের মতো। তার সেই সাত ফুট লম্বা দেহ ও পঁয়তাল্লিশ ইঞ্চি চওড়া বুকের পাটা দেখলে চমকে ওঠে দুর্দান্ত সিংহদেরও চক্ষু!

সভ্য মানুষদের নির্দয় অসভ্যতার কবল থেকে নিস্তার পাওয়ার জন্যে এই লটনা-সরদারেরই কাছে এসে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন থানেশ্বরের রাজকন্যা ও কান্যকুব্জের সিংহাসনচ্যুতা মহারানি রাজশ্রীদেবী।

বয়স তাঁর চব্বিশ-পঁচিশের বেশি হবে না, কিন্তু এখনও তাঁকে দেখলে মনে হয় পনেরো-ষোলো বছরের বালিকার মতো। বর্ণ তাঁর হস্তীদন্তশুভ্র নয়, পক্ক আপেলের মতন রঙিন। সুডৌল তনু, পরিপুষ্ট বাহু, কোমলতা-মাখানো মুখখানি দেখলে কঠোর পাথরও বুঝি তরল হয়ে যায়! আর সেই দুটি আয়ত নয়ন, তাদের ভিতর থেকে বেরিয়ে আসছে যেন আত্মসমাহিত দিব্যদৃষ্টি।

আলুলিত কেশ, বিধবার শুভ্র বেশ। দেখলেই মনে হয়, যেন মূর্তিধারণ করেছে সুপবিত্র এক অচঞ্চল হোমাগ্নিশিখা!

সেদিন সকালে স্তম্ভিত লটনা-সর্দার দাঁড়িয়েছিল চিত্রার্পিতের মতো। তারই সামনে ভূমিতলে নতনেত্রে উপবিষ্টা রাজকন্যা, রাজমহিষী রাজশ্রী। কিছু দূরে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সরদারের অনুচররা।

অবশেষে মূক লটনা খুঁজে পেলে যেন তার আড়ষ্ট কণ্ঠস্বর। সসম্ভ্রমে হেঁট হয়ে বললে, 'লেড়কি, তাহলে সত্যিই কি তুই আমাদের ফাঁকি দিবি?'

রাজশ্রী ধীর কণ্ঠে বললেন, 'বাছা, এখনও কি তুমি আমার মনের ব্যথা বুঝতে পারছ না?'

লটনা অত্যন্ত দুঃখিতভাবে মাথা নাড়তে নাড়তে বললে, 'বুঝতে পারছি বেটি, বুঝতে পারছি। যার সোয়ামি নেই, তার কেউ থাকে না বটে! কিন্তু মায়ি, আমরা—-তোর বেটারা এখনও তো তোর সামনেই দাঁড়িয়ে! তুই আগে ছিলি শহরের রানি, কিন্তু আমরা যে আজ তোকে বনের রানি করে রাখতে চাই! তোদের শহরের চেয়ে কি আমাদের বন ভালো ঠাঁই নয়?'

রাজশ্রী বললেন, 'বাবা, শহর ভালো কি বন ভালো, তা নিয়ে কোনও কথা হচ্ছে না। কিন্তু আমার পক্ষে আর বেঁচে থাকবার কোনও কারণ নেই! আমার স্বামী পরলোকে গিয়েছেন, আমি হিন্দু নারী—আমারও উচিত সহগমন করা। তুমি বোধহয় শুনেছ, আমার মা ছিলেন থানেশ্বরের মহারানি। আমার মৃত্যুশয্যাশায়ী বাবা শেষ-নিশ্বাস ফেলবার আগেই মা করেছিলে জ্বলন্ত চিতায় আত্মদান। সেই পরম সতী-জননীর কন্যা আমি, বিধবা হয়েও তবু এই তুচ্ছ জীবন আঁকড়ে আছি। কিন্তু কেন জানো? ভেবেছিলুম আমার স্বামীর হত্যাকারীর উপযুক্ত শাস্তি না দেখে মরব না। কিন্তু সে আশা আজ স্বপ্নে পরিণত হয়েছে। দেবগুপ্তের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে এখানে পালিয়ে এসেছি বটে, কিন্তু সেই দুরাচার হয়তো আজও আমার স্বামীর সিংহাসন অধিকার করে আছে। এখানে আসবার আগে কেবল এইটুকু খবর পেয়েছিলুম যে, দেবগুপ্তকে আক্রমণ আর আমাকে উদ্ধার করবার জন্যে আমার ভাই মহারাজা রাজ্যবর্ধন করেছেন যুদ্ধযাত্রা। এখন আমার কী ধারণা জানো? যুদ্ধে নিশ্চয়ই আমার ভ্রাতার পরাজয় হয়েছে! কারণ তিনি জয়ী হলে এতদিনে নিশ্চয়ই আমার খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করতেন। কে জানে, আমার ভাই জীবিত আছেন কি না! বাবা, দেবগুপ্ত যদি আবার আমার সন্ধান পায়, তাহলে আবার আমাকে বন্দি আর অপমান করতে পারে। আমার আর কোনও আশাই নেই। এখন আমার বিধবা হয়েও বেঁচে থাকা হচ্ছে মহাপাপ। সরদার, আমার প্রতি যদি তোমার বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা থাকে, তাহলে আর আমাকে বাধা দিয়ো না, আমার জন্যে এখনই চিতাশয্যা রচনা করো!'

লটনা সাশ্রু নেত্রে দুই হাতজোড় করে বললে, 'কিন্তু মায়ি—'

এইবারে রাজশ্রীর কণ্ঠস্বর হয়ে উঠল বিরক্ত ও ক্রুদ্ধ! তীক্ষ্ণ চক্ষে ও তীব্র কণ্ঠে বাধা দিয়ে তিনি বলে উঠলেন, 'এখনও 'কিন্তু'? সরদার, সরদার! এখনও তুমি যদি আমার অনুরোধ রক্ষা না করো, তাহলে আমি অন্য যে কোনও উপায়ে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হব!'

'মা, আমার একটি নিবেদন শোনো—'

'না, না, আমি আর কোনও কথাই শুনতে চাই না। এই পৃথিবীর প্রত্যেক মুহূর্ত আমার পক্ষে এখন বিষাক্ত। এখনই চিতার কাষ্ঠ আনাও, করো সেই কাষ্ঠে অগ্নিসংযোগ। যে নিজে মরতে চায়, তাকে তোমরা বাঁচাবে কেমন করে?'

রাজশ্রীর দৃঢ়প্রতিজ্ঞ মূর্তি দেখে লটনা আর কোনও কথাই বলতে সাহস করলে না। অত্যন্ত বিমর্ষের মতো ধীরে ধীরে নিজের অনুচরদের কাছে গিয়ে অনুচ্চ স্বরে কী বললে, রাজশ্রী তা শুনতে পেলেন না।

দাউ-দাউ জ্বলন্ত চিতা! ঊর্ধ্বে উঠে শূণ্যকে দংশন করবার চেষ্টা করছে শত শত রক্তাক্ত লকলকে অগ্নিসর্প! আরও ঊর্ধ্বে তাদেরই দৃশ্যমান নিশ্বাসের মতো উঠে যাচ্ছে পুঞ্জ-পুঞ্জ ধূম্রকুণ্ডলী!

রাজশ্রী প্রস্তুত। ভয়শূন্য মুখে দৃঢ়পদে এগিয়ে গেলেন চিতার দিকে।

আচম্বিতে খানিক দূরে জাগ্রত হল ঘন ঘন আকাশ কাঁপানো দামামা ধ্বনি।

রাজশ্রী বেগে চিতার দিকে অগ্রসর হতে হতে সচকিত কণ্ঠে বললেন, 'সরদার, সরদার, দুরাত্মা দেবগুপ্ত নিশ্চয় আবার আমাকে বন্দি করতে আসছে।'

অধিকতর বেগে ছুটে গিয়ে লটনা দাঁড়াল রাজশ্রীর পথরোধ করে। বললে, 'একটু অপেক্ষা করো মা। এ নিশ্চয় শত্রুর দামামা নয়। কাউকে গোপনে বন্দি করতে হলে কেউ কখনও দামামা বাজিয়ে নিজের আগমন সংবাদ দেয় না।'

—'শত্রু নয়, বন্ধু? এই পৃথিবীতে আর আমার বন্ধু বলতে কে আছে সরদার?'

উত্তর পেতে বিলম্ব হল না। ঘন জঙ্গলের সবুজ প্রাচীর ভেদ করে আবির্ভূত হল এক অশ্বারোহী মূর্তি! উচ্চ স্বরে সে বলে উঠল, 'রাজপুত্র হর্ষবর্ধন! থানেশ্বরের রাজপুত্র হর্ষবর্ধন এসেছেন তাঁর সহোদরা রাজশ্রীদেবীকে সানন্দ সম্ভাষণ করতে!'

নবম । প্রত্যাদেশবাণী

চিতার দিকে পিছন ফিরে দাঁড়ালেন রাজশ্রী।

অরণ্যের অন্তরাল থেমে আত্মপ্রকাশ করছে দলে দলে অশ্বারোহী। অশ্বদের ধূলি-ধূসরিত দেহ এবং ফেনায়িত মুখ দেখলে বুঝতে বিলম্ব হয় না যে, বহু দূর থেকে অতি বেগে পথ অতিক্রম করে তারা এসে উপস্থিত হয়েছে এখানে।

অশ্বারোহীদের পুরোভাগে দেখা গেল হর্ষবর্ধনকে। এক লাফে মাটির উপরে নেমে পড়ে তিনি ছুটে এলেন রাজশ্রীর কাছে। ব্যাকুলভাবে নিজের দুই হাত দিয়ে ভগিনীর দুই হাত চেপে ধরে উচ্ছ্বসিত বিস্ময়ে বলে উঠলেন, 'দিদি, দিদি, এ কী দেখছি! তোমার সামনে জ্বলন্ত চিতা কেন?'

বিষাদ-মাখা হাসি হেসে রাজশ্রী ধীরে ধীরে বললেন, 'ভাই, ওই চিতাই যে এখন আমার একমাত্র শয্যা।'

'তা হয় না দিদি, তা অসম্ভব। তোমাকে হারালে এই পৃথিবীতে আমি যে হব একেবারে একলা।'

'একবারে একলা? কেন, তোমার মাথার উপর তো আছেন রাজ্যবর্ধন।'

'তিনি এখন স্বর্গে।'

রাজশ্রী বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলেন।

হর্ষ বললেন, 'মগধ-গৌড়ের রাজা শশাঙ্ক তাঁকে হত্যা করেছে।'

খানিকক্ষণ স্তম্ভিতের মতো থেকে রাজশ্রী বললেন, 'তুমি কী দুঃসংবাদ দিলে হর্ষ? এক বৎসরের মধ্যেই আমি মাতা, পিতা, ভ্রাতা আর স্বামীকে হারালুম? আর সেই পাষণ্ড দেবগুপ্ত এখন কোথায়?'

'নরকে। তাকে পরাজিত আর নিহত করবার পরেই আমার দাদা মারা পড়েছেন দেবগুপ্তের বন্ধু শশাঙ্কের হাতে। সেই খবর পেয়েই আমি আগে তোমাকে উদ্ধার করতে ছুটে এসেছি। এরপর আমাকে যেতে হবে শশাঙ্কের পিছনে। সে নাকি সমগ্র আর্যাবর্তে আবার গুপ্তসাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে চায়। আগে কান্যকুব্জ অধিকার করে সে নাকি থানেশ্বরও আক্রমণ করবে। কিন্তু আমি তাকে সে সুযোগ দেব না।'

রাজশ্রী বললেন, 'হর্ষ, সম্ভ্রান্ত রাজবংশে তোমার জন্ম! তুমি যে রাজকর্তব্য পালন করতে পারবে, সে বিষয়ে কোনওই সন্দেহ নেই। কিন্তু আমার স্বামীহন্তা শাস্তি পেয়েছে, আমি আর এ পৃথিবীতে থাকতে চাই না।'

'কিন্তু দিদি, তোমার ভ্রাতৃহন্তা তো এখনও শাস্তি পায়নি।'

'সে জন্যে তুমি রইলে হর্ষ।'

'না দিদি, না! আমি যাব এখন শশাঙ্ককে শাসন করতে। আমার অবর্তমানে থানেশ্বরের শুভাশুভ দেখবে কে? যুদ্ধের পরিণাম অনিশ্চিত। রণক্ষেত্রে যদি আমারও মৃত্যু হয়? তখন তুমি ছাড়া পিতার বংশে রাজ্যচালনা করবার জন্যে তো আর কেউ থাকবে না।'

রাজশ্রী সবিস্ময়ে বললেন, 'তুমি কী বলতে চাও হর্ষ। আমি রাজ্যচালনা করব? তুমি কি ভুলে গিয়েছ, আমি নারী?'

হর্ষ আবেগ-কম্পিত কণ্ঠে বললেন, 'কিছুই ভুলিনি দিদি, কিছুই ভুলিনি! তুমি নারী বটে, কিন্তু তুমি কি যে-সে নারী? পিতা বলতেন, বিদ্যা-বুদ্ধিতে তোমার সঙ্গে তুলনীয় কোনও পুরুষ তাঁর সমগ্র রাজ্যে নেই। আমার কথা রাখো দিদি! তুমি যদি থানেশ্বরের ভার গ্রহণ করো, আমি তাহলে নিশ্চিন্ত মনে শশাঙ্কের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করতে পারি।

দ্বিধা জড়িত কণ্ঠে রাজশ্রী বললেন, 'ভাই হর্ষ—'

হর্ষ বাধা দিয়ে বললেন, 'দিদি, এখনও তুমি সব কথা শোনোনি। রাজ্যে বিষম বিশৃঙ্খলা উপস্থিত হয়েছে। বেশিরভাগ মন্ত্রীর ইচ্ছা নয় যে, আমি সিংহাসনে আরোহণ করি। তাঁদের মতে আমি নাবালক, রাজ্যচালনা করবার মতো বুদ্ধি বা শক্তি আমার নেই। কেবল আমার জ্ঞাতি-ভ্রাতা ভণ্ডী তাঁদের মুখ বন্ধ করে রেখেছেন। তিনি আমার পক্ষে না থাকলে থানেশ্বরের সিংহাসন এর মধ্যেই হয়তো আমার হাতছাড়া হয়ে যেত। দিদি, তোমার বিদ্যাবুদ্ধির কথা জানে না, রাজ্যে এমন লোক নেই। আমি চিরদিনই তোমার কাছ থেকে পেয়ে এসেছি মায়ের স্নেহ। এই দুঃসময়ে তুমি যদি আমার মাথার উপরে থাকো, তাহলে পরম শত্রুরাও বাধ্য হয়ে আমার আনুগত্য স্বীকার করবে।'

এখনও রাজশ্রীর দ্বিধার ভাব কাটল না! বাধোবাধো গলায় তিনি বললেন, 'ভাই হর্ষ, তোমার প্রস্তাব শুনে আমি ভীত হচ্ছি।'

হর্ষ দৃঢ়কণ্ঠে বললেন, 'ভয়'? কোনও ভয় নেই দিদি! তোমার কাছে আসবার আগেই আমি এক বৌদ্ধ মঠে গিয়েছিলুম নিজের ভবিষ্যৎ জানতে। দিদি, আমি কী প্রত্যাদেশবাণী পেয়েছি জানো। জম্বুদ্বীপে প্রথম সাম্রাজ্য ছিল মৌর্যরাজাদের। দ্বিতীয় সাম্রাজ্য স্থাপন করেছিলেন মহারাজাধিরাজ সমুদ্রগুপ্ত। তৃতীয় সাম্রাজ্যের অধিকারী হয়েছিলেন হুনবিজেতা যশোধর্মদেব। প্রত্যাদেশবাণী যদি মানতে হয়, তাহলে আমিই হব নাকি এখানকার চতুর্থ সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা। এই বিচিত্র বাণী শুনে পর্যন্ত অমার আশা হয়ে উঠেছে অনন্ত—সমস্ত চিত্ত আমার বিচরণ করছে অসীম আকাশে। দিদি, আমি কী স্থির করেছি তাও বলি শোনো। নিন্দুকদের মুখ বন্ধ করবার জন্যে আমি আপাতত 'মহারাজাধিরাজ' উপাধি গ্রহণ করব না। যত দিন না প্রাপ্তবয়স্ক হই, যত দিন না নিজের শক্তির পরিপূর্ণ পরিচয় দিতে পারি, তত দিন আমি রাজপুত্র শিলাদিত্য, এই নাম গ্রহণ করে নিজের কর্তব্যপালন করব। দিদি, আসলে রাজ্যচালনার ভার থাকবে তোমার উপরে, কেবল অস্ত্রচালনা করব আমি। এই খণ্ড খণ্ড আর্যাবর্তকে আবার আমি অখণ্ড করে তোলবার চেষ্টা করব। কিন্তু দিদি, তুমি সহায় না হলে আমার পক্ষে এই সুপবিত্র ব্রত উদযাপন করা সম্ভবপর হবে না।'

রাজশ্রী পূর্ণকণ্ঠে বললেন, 'হর্ষ, তোমার কথায় দেশের মঙ্গলের জন্যেই আমার জীবনকে উৎসর্গ করলুম। ভগবানের ইচ্ছায় সফল হোক তোমার স্বপ্ন! সরদার, নিবিয়ে ফ্যালো চিতার আগুন।

দশম । মরীচিকার অবসান

নিয়তি বড় নিষ্ঠুর, বহুবার নির্মূল করেছে সে মানুষের বহু উচ্চাকাঙ্ক্ষা।

শশাঙ্ক ভেবেছিলেন, মালবরাজ দেবগুপ্তের সঙ্গে সম্মিলিত হয়ে পশ্চিম উত্তরাপথকে করতলগত করবেন। কিন্তু দেবগুপ্ত পড়লেন মৃত্যুমুখে। রাজা ও নেতার পতনের সঙ্গে সঙ্গে মালব-সৈন্যরা হয়ে গেল ছত্রভঙ্গ এবং শশাঙ্কও হলেন তাদের মূল্যবান সাহায্য থেকে বঞ্চিত।

তারপর অভাবিত উপায়ে রাজ্যবর্ধনকে পথ থেকে সরিয়ে শশাঙ্ক আবার কিঞ্চিৎ আশান্বিত হয়ে উঠেছিলেন বটে। কিন্তু দৈবচক্রে আবার নিবু-নিবু হল তাঁর আশার বাতি।

অকস্মাৎ সৈন্যদলের মধ্যে দেখা দিলে এমন মহামারী যে, শশাঙ্কের অগ্রগতি একেবারে রুদ্ধ হয়ে গেল। রাজ্যবর্ধনের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই তিনি যদি কান্যকুব্জ ও থানেশ্বর আক্রমণ করতে পারতেন, তাহলে তাঁর সাফল্য ছিল সুনিশ্চিত। কারণ অপ্রস্তুত শত্রু দমন করা কঠিন নয় কিছুমাত্র।

শশাঙ্কের সে সৌভাগ্য হল না। একই স্থানে অচল হয়ে বসে বসে অসহায়ভাবে তিনি দিনের পর দিন চোখের সামনে দেখতে লাগলেন, বিনা যুদ্ধে কেবলমাত্র মহামারির কবলগত হয়ে ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে পড়ছে তাঁর বিপুল বাহিনী। অবশেষে কয়েক মাস পরে মহামারি শান্ত হল বটে, কিন্তু সৈন্যবলের দিক দিয়ে শশাঙ্ক হয়ে পড়েছেন তখন রীতিমতো দুর্বল।

তার উপরে গুপ্তচরের মুখে শত্রুপক্ষের খবর শুনে শশাঙ্কের দুশ্চিন্তা ক্রমেই বেড়ে উঠতে লাগল। পরামর্শের জন্য তিনি সেনাপতি ও মন্ত্রীগণকে আহ্বান করলেন।

শশাঙ্ক বললেন, 'থানেশ্বরের রাজপুত্র হর্ষবর্ধন আমাকে আক্রমণ করবার জন্যে অসংখ্য সৈন্যসংগ্রহ করছেন। এখনও তাঁর সৈন্যসজ্জা সম্পূর্ণ হয়নি, এখনও যদি আমরা থানেশ্বর আক্রমণ করতে পারি, তাহলে হয়তো বিজয়লাভ করব আমরাই। কিন্তু বর্তমান অবস্থায় আমাদের পক্ষে সেটা সম্ভবপর হবে কি?'

সেনাপতি বললেন, 'অসম্ভব মহারাজ, অসম্ভব। মড়ক আমাদের অর্ধেক সৈন্যকে হত্যা করেছে। যারা বেঁচে আছে তাদের ও অধিকাংশ দেহ আর মন এত দুর্বল যে মৃতপ্রায় বললেও চলে। এখন আমরা আক্রমণ করব কী, কোনওরকমে আত্মরক্ষা করতে পারব কি না সন্দেহ।

শশাঙ্ক বললেন, 'জানি সেনাপতি, আমিও সে কথা জানি। কিন্তু আরও দুঃসংবাদ আছে। আপনারা সকলেই জানেন, কিছুকাল আগে কামরূপরাজকে যুদ্ধে আমরা পরাজিত করেছিলুম। আজ আমার বিপদ দেখে কামরূপ আবার সাহস সঞ্চয় করেছে। শুনলুম, আমার বিরুদ্ধে হর্ষবর্ধনের সঙ্গে যোগ দেওয়ার জন্যে কামরূপের রাজপুত্র ভাস্করবর্মা প্রবল এক সৈন্যদলের সঙ্গে অগ্রসর হয়েছে। এখন আমার কী করা উচিত?'

মন্ত্রী বললেন, 'মহারাজ, এই উভয়-সঙ্কট থেকে মুক্তিলাভের একমাত্র উপায় হচ্ছে আবার বঙ্গদেশে ফিরে যাওয়া।'

শশাঙ্ক মাথা নেড়ে বললেন, 'বিনা যুদ্ধে পলায়ন? এ অঞ্চলের লোকেরা একে তো বাঙালিকে মানুষ বলে গণ্য করতে চায় না, তার উপরে বিনা যুদ্ধে শত্রুভয়ে পলায়ন করলে আর্যাবর্তে আমাদের আর মুখ দেখাবার উপায় থাকবে না। হারি আর জিতি, যুদ্ধ আমাদের করতেই হবে।'

নিরুত্তর হয়ে রইলেন মন্ত্রী ও সেনাপতি।

শশাঙ্ক অধীরভাবে এদিকে-ওদিকে পদচালনা করতে করতে বললেন, 'এক জায়গা থেকে আমি সাহায্য পেতে পারি। দাক্ষিণাত্যের মহাপ্রতাপশালী চালুক্যরাজ দ্বিতীয় পুলকেশী আমার পরম বন্ধু। এই বিপদের সময়ে সাহায্য প্রার্থনা করলে তিনি নিশ্চয়ই আমাকে নিরাশ করবেন না। আপনারা কী বলেন?'

সেনাপতি বললেন, 'মহারাজ, এ উত্তম প্রস্তাব। কিন্তু আমার সন্দেহ হচ্ছে, চরম মুহূর্ত উত্তীর্ণ হয়ে যাওয়ার আগে চালুক্যরাজ আমাদের সাহায্য করতে পারবেন না।'

শশাঙ্ক বললেন, 'তবু চেষ্টা করে দেখব। ইতিমধ্যে হর্ষবর্ধন যদি আক্রমণ করেন, আমরা আত্মরক্ষার জন্যে যতটকু দরকার কেবল ততটুকু বাধাই দেব, সাধ্যমতো এড়িয়ে চলব সম্মুখযুদ্ধ। আমরা আক্রমণ করব চালুক্যরাজের সাহায্য আসবার পরেই।'

বিপক্ষের জন্যে বেশি দিন অপেক্ষা করতে হল না—যথাসময়ে উত্তর-পশ্চিমের বিশাল প্রান্তরের উপরে দেখা দিলে হর্ষবর্ধনের বিপুল বাহিনী।

শশাঙ্ক বুঝলেন, অবিলম্বে চালুক্যরাজের সাহায্য না পেলে এই বৃহৎ বাহিনীকে ঠেকিয়ে রাখবার সাধ্য তাঁর হবে না।

গোড়ার দিকে হল কয়েকটা খণ্ডযুদ্ধ। বোঝা গেল, নিপুণ সেনানায়কের মতো হর্ষবর্ধন পরীক্ষা করে দেখছেন, মগধ-বঙ্গের ব্যূহের দুর্বল অংশ কোথায়!

উভয় পক্ষই যখন বৃহত্তর শক্তিপরীক্ষার জন্যে প্রস্তুত হচ্ছে, এমন সময়ে শশাঙ্ক স্বদেশ থেকে পেলেন আর এক বিষম দুঃসংবাদ। বৌদ্ধধর্মানুরাগী হর্ষবর্ধন, শৈব শশাঙ্ককে আক্রমণ করেছেন শুনে বুদ্ধগয়া, পাটলিপুত্র ও কুশীনগরের বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা অত্যন্ত উৎসাহিত হয়ে উঠেছেন এবং তাঁদের প্ররোচনায় মগধ-বঙ্গের দিকে দিকে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে বিদ্রোহীরা। শশাঙ্কের নিজের সিংহাসন পর্যন্ত বিপদগ্রস্ত।

বিকৃত কণ্ঠে শশাঙ্ক বললেন, 'দৈব প্রতিকূল! এর পরও আর সাম্রাজ্যের স্বপ্ন দেখা চলে না। সেনাপতি যত দিন পারেন শত্রুদের বাধা দিন, কিছু সৈন্য নিয়ে এখনই আমাকে ফিরে যেতে হবে বিদ্রোহ দমন করতে। গৃহশত্রুর চেয়ে বড় শত্রু আর নেই। বৌদ্ধরা মুখে করে অহিংসার জয়গান, অথচ আমার প্রজা হয়ে তারাই করতে চায় আমাকে পিছন থেকে দংশন! কিন্তু এই বকধার্মিকরা এখনও আমাকে ভালো করে চিনতে পারেনি—আমি হচ্ছি ধ্বংসের দেবতা শ্মশানপতি শিবের শিষ্য! বৌদ্ধদের এমন শাস্তি দেব, যা তারা আর কোনও দিনই ভুলতে পারবে না!'

একাদশ । দিগ্বিজয়

হর্ষ যদিও রাজ-উপাধি গ্রহণ করে রাজপুত্র শিলাদিত্য নামে পরিচিত হলেন, তবু তাঁর রাজ্যকাল গণনা করা হয় রাজ্যবর্ধনের মৃত্যুর পর থেকেই (৬০৬ খ্রিঃ)।

রাজশ্রীদেবীর উপরে প্রতিনিধি-নৃপের কর্তব্যভার অর্পণ করে হর্ষ হলেন অনেকটা নিশ্চিন্ত। রাজশ্রী ললিতকলার ও শাস্ত্রালোচনার যথেষ্ট কৃতিত্ব দেখিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন বৌদ্ধধর্মেও বিশেষরূপে শিক্ষিতা। তাঁর এই বৌদ্ধধর্মানুরাগ হর্ষকেও বড় কম প্রভাবান্বিত করেনি। তিনি নিজে শৈব ও সূর্যোপাসক ছিলেন। কিন্তু বৌদ্ধধর্মে দীক্ষিত না হয়েও তিনি হিন্দুর চেয়ে বেশি ভালোবাসতেন বৌদ্ধদেরই।

দিদির হাতে রাজদণ্ড দিয়ে হর্ষ স্বহস্তে ধারণ করলেন শাণিত তরবারি। কেবল শশাঙ্ককে পরাজিত ও বিতাড়িত করেই তিনি তুষ্ট হতে পারলেন না, মুক্তকণ্ঠে চারিদিকে প্রচারিত করে দিলেন, 'সমগ্র আর্যাবর্তকে আমি আনব বিপুল একচ্ছত্রের ছায়ায়। আমার আদর্শ নেবেন মহারাজাধিরাজ চন্দ্রগুপ্ত, সমুদ্রগুপ্ত ও যশোবন্তদেব। বহু খণ্ডে খণ্ডিত উত্তরাপথ ধাপে ধাপে নেমে যাচ্ছে চরম অধঃপতনের দিকে, শিয়রে তার সর্বদা জাগ্রত হয়ে রয়েছে যবন ও হুন দস্যুদের শনির দৃষ্টি! ছোট ছোট রাজারা পরস্পরের সঙ্গে আত্মঘাতী গৃহযুদ্ধে নিযুক্ত হয়ে আর্যদের ক্ষাত্রবীর্যকে ক্রমেই ঠেলে দিচ্ছেন ধ্বংসের মুখে! আর্যাবর্তকে আবার অখণ্ড করে তুলতে হলে তথাকথিত রাজাদের নির্মমভাবে সমূলে উৎপাটিত করতে হবে তুচ্ছ আগাছার মতো। যত দিন না এই মহান ব্রত উদযাপন করতে পারি, তত দিন আমার তরবারিকে করব না কোশবদ্ধ। স্বদেশের জন্যে যাঁর এতটুকু প্রাণের টান আছে, তাঁকেই আমি সাদরে আমন্ত্রণ করছি আমার পতাকার তলায়।'

হর্ষবর্ধনের এই দৃপ্ত আহ্বানবাণী শ্রবণ করে আর্যবীরদের বুকের ভিতর আবার নতুন করে জেগে উঠল দেশাত্মবোধের উত্তপ্ত মত্ততা। দেশ-দেশান্তর থেকে একে একে নয়—দলে দলে যোদ্ধারা এসে যোগ দিতে লাগল তাঁর বাহিনীতে! যশোধর্মদেবের বহুকাল পর আবার এক তরুণ আর্যবীর দিগবিজয়ের জন্যে প্রস্তুত হচ্ছেন, তা তাঁর সঙ্গীর অভাব হল না।

এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে, কীরকম সৈন্য নিয়ে হর্ষবর্ধন যুদ্ধযাত্রা করেছিলেন? এ প্রশ্নের উত্তর অন্যত্র আর একবার দিয়েছি, এখানে তারই দ্বিরুক্তি না করে উপায় নেই।

৩২৭ খ্রিস্ট-পূর্বাব্দে গ্রিক আলেকজান্ডার যখন ভারত আক্রমণ করেছিলেন, তখন থেকে ষষ্ঠ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ভারতীয় রাজাদের ফৌজ গঠনের পদ্ধতি ছিল প্রায় অপরিবর্তিত।

মৌর্য চন্দ্রগুপ্ত তাঁর বাহিনীকে ছয় ভাগে বিভক্ত করেছিলেন। পরিচালনার জন্যে তিনি প্রধান কর্মচারী রেখেছিলেন তিরিশ জন—অর্থাৎ প্রত্যেক বিভাগে পাঁচজন করে। বিভাগগুলি এই :

১। নৌ-বিভাগ। ২। রসদ-বিভাগ (মাল চালান দেবার, দামামা বাদক, সহিস, কারিগর ও ঘেসেড়া প্রভৃতিরও খোরাকের জন্য ভালো বন্দোবস্ত ছিল)। ৩। পদাতিক বিভাগ। ৪। অশ্বারোহী বিভাগ। ৫। গজারোহী বিভাগ। ৬। রথারোহী বিভাগ।

ভারতীয় ফৌজ চিরকালই পদাতিক, অশ্বারোহী, রথারোহী ও গজারোহী—এই চার অঙ্গ নিয়ে গঠিত হত। চন্দ্রগুপ্তের প্রতিভা এই সঙ্গে অতিরিক্ত আরও দুটি অঙ্গ জুড়ে দিয়েছিল—নৌ ও রসদ বিভাগ। হয়তো গ্রিক ফৌজ পর্যবেক্ষণ করে এই দুইটি অঙ্গের প্রয়োজনীয়তা তিনি বিশেষভাবে উপলব্ধি করেছিলেন।

গ্রিক ঐতিহাসিক প্লিনি বলেন, ভারতীয় ফৌজের প্রত্যেক রথে থাকত সারথি ও দুজন করে যোদ্ধা এবং প্রত্যেক হাতির উপর থাকত মাহুত ও তিনজন করে ধনুকধারী!

চন্দ্রগুপ্তের মন্ত্রী চাণক্যের মত ছিল, ফৌজের পক্ষে সব চেয়ে দরকারি হচ্ছে, রণহস্তীরা। কারণ, শত্রু-সৈন্য ধ্বংস করা যায় তাদের দ্বারাই (মধ্যযুগের দিগবিজয়ী তৈমুর লং যখন ভারতবর্ষ আক্রমণ করেছিলেন, ভারতীয় রাজা-বাদশাহরা তখনও রণহস্তী ব্যবহার করতেন। কিন্তু তিনি এক নতুন কৌশল অবলম্বন করে ব্যর্থ করে দিয়েছিলেন হাতিদের সার্থকতা। তার ফলে ভারতীয় ফৌজের রণহস্তীরা হয়ে উঠত ভারতীয়দের পক্ষেই অধিকতর বিপজ্জনক)।

চন্দ্রগুপ্তের প্রত্যেক অশ্বারোহীর কাছে থাকত একখানা করে ঢাল ও দুটি করে বল্লম। পদাতিকদের প্রধান অস্ত্র ছিল চওড়া ফলকওয়ালা তরবারি এবং অতিরিক্ত অস্ত্ররূপে তারা সঙ্গে নিত শূল বা ধনুকবাণ। আমরা এখন যেভাবে বাণ ছুড়ি, তারা সেভাবে ছুড়ত না। গ্রিক ঐতিহাসিক এরিয়্যান বলেন, ভারতীয় সৈনিকরা ধনুকের এক প্রান্ত মাটির উপরে রেখে, বাম পায়ের চাপ দিয়ে এমন ভয়ানক জোরে বাণ ত্যাগ করত যে, শত্রুদের ঢাল ও লৌহবর্ম পর্যন্ত কোনও কাজে লাগত না। বোঝা যাচ্ছে, সেকালের ভারতীয় ধনুক হত আকারে রীতিমতো বৃহৎ।

হর্ষবর্ধনের যুগেও ভারতীয় বাহিনী যে প্রায় ওই ভাগেই গঠন করা হত, এটুকু অনুমান করা যেতে পারে। কিন্তু তিনি ভারতীয় বাহিনীর চতুরঙ্গ থেকে বাদ দিয়েছিলেন প্রধান একটি অঙ্গ। যে কারণেই হোক, তিনি রথারোহী সৈন্য পছন্দ করতেন না, তাঁর সঙ্গে রথ থাকত না। তিনি যখন প্রথম দিগবিজয়ে যাত্রা করেন, তখন তাঁর সঙ্গে ছিল পাঁচ হাজার রণহস্তী, বিশ হাজার অশ্বারোহী ও পঞ্চাশ হাজার পদাতিক।

আরম্ভ হল রাজপুত্র শিলাদিত্যের দিগবিজয়যাত্রা। পরিপূর্ণ হয়ে গেল আকাশ-বাতাস বিজয়ী বীরবৃন্দের জয়নাদ ও শত শত দামামার গম্ভীর মেঘ-গর্জনে, হাজার হাজার গজ ও অশ্বের পদভারে থরথর কাঁপতে লাগল পৃথিবীর বুক। চিনা পরিব্রাজক হিউ-এন সাঙের বর্ণনায় দেখি, সসৈন্য হর্ষবর্ধন ছুটে চলেছেন কখনও পশ্চিম দিকে এবং কখনও পূর্বাঞ্চলে, অবাধ্যদের দমন করতে করতে দিনের পর দিন যায়। হাতিদের পিঠ থেকে নামানো হয় না হাওদা, সৈনিকরা খোলবার অবকাশ পায় না শিরস্ত্রাণ।

দ্বাদশ । যুদ্ধের দুঃখ

এইভাবে কেটে গেল সাড়ে পাঁচ বৎসর।

ওদিকে আর্যাবর্তের উত্তর-পশ্চিম প্রদেশ এবং এদিকে বঙ্গদেশের অনেক অংশ হল হর্ষবর্ধনের করতলগত। তিনি রীতিমতো এক সাম্রাজ্যের অধিকারী।

তাঁর সামরিক শক্তিও হয়ে উঠেছে এখন অতুলনীয়। তিনি ইচ্ছা করলেই যে কোনও সময়ে ৬০ হাজার রণহস্তী, এক লক্ষ অশ্বারোহী ও তার চেয়ে বেশি পদাতিক নিয়ে অবতীর্ণ হতে পারেন রণক্ষেত্রে।

কিন্তু মগধ ও গৌড় থেকে আসছে দুঃসংবাদের পর দুঃসংবাদ। শৈব নরপতি শশাঙ্কের অত্যাচারে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা অত্যন্ত আর্ত ও বিপদগ্রস্ত হয়ে উঠেছেন।

মধ্য-ভারতে পরাজিত হয়েও শশাঙ্ক স্বরাজ্যে নিজের প্রতিষ্ঠা সম্পূর্ণ অক্ষুণ্ণ রাখতে পেরেছেন। তিনি কেবল বুদ্ধগয়া, পাটলিপুত্র ও কুশীনগরের বৌদ্ধ বিদ্রোহীদের দমন করেই ক্ষান্ত হননি, উপরন্তু পবিত্র বোধিদ্রুম উৎপাটিত এবং বুদ্ধদেবের পদচিহ্ন ও বহু বৌদ্ধকীর্তিও নষ্ট করে ফেলেছেন। বৌদ্ধরা পালিয়ে গিয়ে নেপালের পর্বতমালার মধ্যে আশ্রয় নিয়েও শশাঙ্কের কবল থেকে আত্মরক্ষা করতে পারছেন না।

বৌদ্ধধর্মের প্রতি আন্তরিক শ্রদ্ধা ও অনুরাগ থাকলেও বুদ্ধিমান হর্ষের এটা বুঝতে বিশেষ বিলম্ব হল না যে, অতঃপর তাঁর প্রথম কর্তব্য হচ্ছে স্বরাজ্যে ফিরে গিয়ে প্রকাশ্যে রাজা-উপাধি গ্রহণ ও রাজমুকুট ধারণ করা। এত দিন তাঁকে নাবালক ভেবে যারা বিরুদ্ধতা করে আসছিল, এইবারে তারা বিশেষভাবে অনুভব করতে পেরেছে তাঁর সবল বীরবাহুর শক্তি। তার অঙ্গুলি তাড়নায় বৃহত্তর আর্যাবর্ত আজ মাথা নত করতে বাধ্য হয়েছে, বিনা বাধায় সিংহাসন অধিকার করবার এমন সুযোগ ত্যাগ করা উচিত নয়। শশাঙ্ক? সে তো হচ্ছে পলাতক সর্প, নিজের বিবর ত্যাগ করে বাইরে আসবার সাহস আর তার হবে না। আগে নিজের সিংহাসনের ভিত্তি সুদৃঢ় করি, তার পর তাকে শাসন করতে বেশি দিন লাগবে না।

প্রায় ছয় বৎসর পরে বিজয়ী বীর হর্ষবর্ধন আবার ফিরে এলেন থানেশ্বরে। প্রজারা তাঁর অভ্যর্থনার আয়োজন করলে মহাসমারোহে। রাজপথে বিপুল জনতা, প্রত্যেক ভবন পত্র-পুষ্প-পতাকায় অলংকৃত, পুরনারীরা অলিন্দে দাঁড়িয়ে শঙ্খধ্বনির সঙ্গে তরুণ রাজপুত্রের মাথার উপরে ছড়িয়ে দিচ্ছেন লাজাঞ্জলি। সকলের চক্ষে উৎসাহ, মুখে হাসি ও কণ্ঠে জয়ধ্বনি। থানেশ্বর আজ শিলাদিত্যের অপূর্ব বীরত্বের জন্যে গর্বিত, শত্রুরাও গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছে নিশ্চেষ্ট মৌনব্রত।

কবিবন্ধু বাণভট্ট এসে হাস্যমুখে বললেন, 'রাজপুত্র শিলাদিত্য, আমার অভিনন্দন গ্রহণ করো।'

হর্ষবর্ধন বললেন, 'কবি, তোমার অভিনন্দন লাভ করে মহারাজাধিরাজ হর্ষবর্ধন যুদ্ধজয়ের চেয়ে বেশি গৌরব অনুভব করছেন।'

বাণভট্ট দ্বিধাজড়িত কণ্ঠে বললে, 'মহারাজাধিরাজ হর্ষবর্ধন'!

—'হ্যাঁ বন্ধু, রাজপুত্র শিলাদিত্য এর পর থেকে ওই নামেই পৃথিবীতে পরিচিত হবেন।'

বাণভট্ট উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলে উঠলেন, 'জয় মহারাজাধিরাজ হর্ষবর্ধনের জয়।

হর্ষবর্ধন অগ্রসর হয়ে বাণভট্টের স্কন্ধে একখানি হাত রেখে স্নিগ্ধস্বরে বললেন, 'কিন্তু কবি, রাজ্যের চেয়ে কাব্য—আর রাজার চেয়ে কবি বড়। মহারাজা বিক্রমাদিত্য যত দিন বেঁচে ছিলেন, নিজের রাজ্যে নিজে প্রজাদের পূজা পেয়েছেন। কিন্তু তাঁর সভাকবি কালিদাস সর্বযুগের সর্বদেশের পূজা থেকে বঞ্চিত হবেন না। এ রাজ্যের বাইরের লোকদের কাছে আমি মহারাজাধিরাজ বটে, কিন্তু তুমি যে আমার মনের মানুষ, তোমার কাছে আমি শ্রীহর্ষ ছাড়া আর কেউ নই।'

'খালি শ্রীহর্ষ নয়, তুমি হচ্ছ মহাকবি শ্রীহর্ষ। আমি ভবিষ্যদ্বাণী করছি, পৃথিবীর দেশে দেশে তুমি ওই নামেই অমর হয়ে থাকবে।'

'দুঃখের কথা বন্ধু, বেঁচে থেকে কেউ নিজের অমরত্বের সঠিক প্রমাণ পায় না। তাকে অমর করে ভবিষ্যতের মানুষ।'

'কিন্তু মহারাজ, তোমার অমরত্বের প্রমাণ পেয়েছি আমি বর্তমানেই। আমি কি তোমার রচনা পাঠ করিনি? তার ছত্রে ছত্রে আছে যে অমরত্বের নিশ্চিত নিদর্শন!'

হর্ষবর্ধন হাসতে হাসতে বললেন, 'তোমার মুখে এ কথা শুনলে লোকে বলবে চাটুবাদ।'

'লোকের কথায় আমি কান দিই না। কিন্তু তুমি বিশ্বাস করো মহারাজ, এ হচ্ছে আমার আন্তরিক কথা।'

'উত্তম, তাহলে তোমাকে পুরস্কৃত করবার জন্যে তোমার উদরগহ্বর পরিপূর্ণ করে দেব আমি মিষ্টান্নের স্তূপে। যাই বন্ধু, গুরুতর রাজকার্য আছে।'

হর্ষবর্ধনের প্রস্থান। সেনাপতি সিংহনাদের প্রবেশ। এসেই বললেন, 'মহারাজা মিষ্টান্নের কথা কী বলছিলেন না?'

'হ্যাঁ। তিনি বলছিলেন যুদ্ধক্ষেত্রে সেনাপতি সিংহনাদকে মিষ্টান্ন জোগাতে জোগাতে তাঁর প্রাণান্ত-পরিচ্ছেদ হয়েছে।'

ঘনঘন ঘাড় নেড়ে সিংহনাদ ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বলে উঠলেন, 'না, মহারাজা এ কথা বলতে পারেন না, এ হচ্ছে তোমারই বানানো কথা। কলম নেড়ে কালি মেখে দিন কাটাও, তুমি কী বুঝবে হে যুদ্ধক্ষেত্রের কথা? সেখানকার অদ্বিতীয় নীতি হচ্ছে—হয় মারো, নয় মরো। সেখানে থাকে কেবল রক্ত আর মড়া, মিষ্ট বা তিক্ত কোনও রকম অন্নই সেখানে পাওয়া যায় না—বুঝলে?'

'না বুঝলুম না।'

'এমন সোজা কথাটা বুঝলে না?'

'উঁহু।'

'মানে?'

'বললে, যুদ্ধক্ষেত্র অন্ন পাওয়া যায় না; তাহলে তোমরা ভক্ষণ করতে কী? বায়ু?'

'যা ভক্ষণ করতুম তা বায়ু না হলেও মোটেই আহার্য বলে স্বীকার করা যায় না। তোমাদের ঘাসের রুটি খাওয়ার অভ্যাস আছে?'

'থু, থু, রামচন্দ্র! তাও আবার মানুষ খায় নাকি?'

'সময়ে সময়ে তাও আমাদের অমৃত বলে গ্রহণ করতে হয়েছে।'

'তাহলে যুদ্ধক্ষেত্রটা তো দেখছি ভারি খারাপ জায়গা!'

'খারাপ বলে খারাপ, একেবারে জঘন্য।'

'আহা, তোমার জন্য আমি দুঃখিত।'

'ভায়া, সাড়ে পাঁচ বছর আগে আমার উদরদেশটি ছিল এমন প্রশস্ত যে গৃহস্থেরা আমাকে নিমন্ত্রণ করতে ভয় পেত! কিন্তু আজ তার অবস্থা দেখছ?'

'কই, আমি তো উদরদেশের কিছুই নিরীক্ষণ করতে পারছি না।

'তুমি ভাসা-ভাসা চোখে খালি উদরের উপরটাই লক্ষ করছ। কিন্তু কুখাদ্য আর অখাদ্য খেয়ে খেয়ে এর ভিতরটা হয়ে গেছে শুকিয়ে এতটুকু।'

'তাই তো, তুমি আমাকে ভাবালে।'

'কেন?'

'মহারাজা এই মাত্র বলে গেলেন, আমার জন্যে প্রচুর মিষ্টান্ন পাঠিয়ে দেবেন। ভেবেছিলুম তোমাকে নিমন্ত্রণ করব। কিন্তু তোমার শুকনো নাড়িতে সুখাদ্য সহ্য হবে কি?'

'কেন হবে না, আমি প্রাণপণে সহ্য করবার চেষ্টা করব। নিমন্ত্রণ থেকে আমাকে বাদ দিয়ো না দাদা।'

'বেশ তবে নিমন্ত্রণ রইল।'

'ধন্যবাদ।'

ত্রয়োদশ । ভিখারি হর্ষবর্ধন

আর্যাবর্তে আবার ফিরে এল রামরাজত্ব।

হর্ষবর্ধনের সাম্রাজ্যের পশ্চিম সীমান্ত ছিল আরব সাগর। জলন্ধর ও নেপাল ছিল উত্তর সীমান্ত এবং তার দক্ষিণ সীমান্ত দিয়ে প্রবাহিত হত নর্মদা নদী। এমন প্রকাণ্ড সাম্রাজ্য পাঁচ-সাত বৎসরে হর্ষবর্ধনের হস্তগত হয়নি। আর্যাবর্তকে একই ছত্রের ছায়ায় আনতে তাঁর কেটে গিয়েছিল সুদীর্ঘ সাঁইত্রিশ বৎসর কাল।

কিন্তু কেবল অসি নয়, মসিকেও করেননি তিনি অবহেলা। যখনই অবকাশ পেতেন বাণভট্টের সঙ্গে করতেন কাব্য আলোচনা এবং একান্ত সাহিত্য সাধনার ভিতর দিয়ে তাঁর কেটে যেত দিনের পর দিন। তাঁর বিচিত্র সাহিত্য সাধনার অমর নিদর্শন আছে তিনখানি সুবিখ্যাত নাটকের মধ্যে—'নাগানন্দ', 'রত্নাবলী' ও 'প্রিয়দর্শিকা'। তিনি কবি হলেও তাঁর ব্যাকরণ সম্পর্কীয় রচনাও আছে এবং সুন্দর হস্তাক্ষরের জন্যে তাঁর নাম খুব বিখ্যাত। তাঁর হস্তাক্ষরের নমুনা আজও বিদ্যমান আছে।

উপরন্তু তিনি কেবল নাট্যকার নন, অভিনেতাও ছিলেন। স্বরচিত নাটকে ভূমিকা গ্রহণ করে অবতীর্ণ হতেন রঙ্গমঞ্চে। বোঝা যাচ্ছে, তাঁর প্রতিভা ছিল সর্বতোমুখী।

পরামর্শ দেওয়ার জন্যে মন্ত্রীরা ছিলেন বটে, কিন্তু রাজ্যচালনা করতেন তিনি স্বয়ং। প্রজাদের ভালোমন্দ দেখতেন স্বচক্ষে এবং তাদের অভিযোগ শ্রবণ করতেন স্বকর্ণে।

থানেশ্বর থেকে তিনি রাজধানী তুলে নিয়ে গিয়েছিলেন কান্যকুব্জে—সেখানকার মহারানি ছিলেন তাঁর সহোদরা রাজশ্রীদেবী। কিন্তু রাজকার্যের জন্যে রাজধানীতে তিনি স্থির হয়ে বসে থাকতে পারতেন না। দেশে দেশে যুদ্ধক্ষেত্রে করতেন যোদ্ধার কর্তব্য পালন এবং অসি যখন কোশবদ্ধ হত তখন তিনি করতেন রাজধর্ম পালন। বর্ষাকাল ছাড়া বৎসরের আর সব সময়েই সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রদেশে তিনি ভ্রমণ করতেন যাযাবরের মতো। অসাধুকে দিতেন শাস্তি, সাধুকে দিতেন পুরস্কার।

দেশ থেকে দেশান্তরে যাবার ব্যবস্থা ছিল এই রকম। হর্ষবর্ধন ভ্রমণের জন্যে লতা-পাতা-শাখা দিয়ে তৈরি করিয়ে নিতেন একটি চলন্ত প্রাসাদ। যখন যেখানে গিয়ে থামতেন, তখন সেইখানেই ওই প্রাসাদ স্থাপন করা হত এবং তিনি তা ত্যাগ করলে সেটিকে পুড়িয়ে ফেলা হত।

তাঁর সঙ্গী হত হাজার হাজার লোকজন। এবং কয়েক শত দামামা-বাদক। রাজার প্রত্যেক পদক্ষেপের তালে তালে বাজিয়ে চলত শত শত সোনার দামামা। অর্থাৎ রাজা যদি একশো বার পা ফেলতেন, তাদের দামামা বাজাতে হত একশো বার। আর্যাবর্তের আর কোনও সামন্তরাজার এই অধিকার ছিল না।

হর্ষবর্ধনের যুগে অপরাধীদের শাস্তি দেওয়ার পদ্ধতি ছিল যথেষ্ট নিষ্ঠুর। গুরুতর অপরাধের জন্য যারা ধরা পড়ত তাদের অবস্থা হত রীতিমতো শোচনীয়। তাদের মানুষ বলে গণ্য করা হত না। কেউ তাদের সাহায্য করতে পারত না। মানুষের বসতির বাইরে নিয়ে গিয়ে তাদের ফেলে দিয়ে আসা হত, তারা কেমন করে বাঁচবে বা মরবে তা নিয়ে কেউ মাথা ঘামানো দরকার মনে করত না।

কোনও কোনও অপরাধের জন্যে নাক, কান, হাত বা পা কেটে নেওয়া হত। ছেলে পিতামাতার প্রতি কর্তব্য পালন না করলেও এই রকম শাস্তিলাভ করত কিংবা কখনও কখনও লাভ করত নির্বাসন দণ্ড। লঘু পাপের জন্যে দিতে হত জরিমানা।

জল বা অগ্নি পরীক্ষারও চলন ছিল। অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গভীর জলে বা জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করা হত। ডুবে গেলে বা পুড়ে মরলে ধরে নেওয়া হত সত্য সত্যই তারা অপরাধী। কে জানে এইভাবে মারা পড়ত কত নিরপরাধ।

আগেই বলা হয়েছে, হর্ষবর্ধন শিবকেও পূজা করতেন, সূর্যকেও মানতেন এবং সঙ্গে সঙ্গে বুদ্ধদেব ও বৌদ্ধধর্মের ও প্রতি ছিল তাঁর অটল ভক্তি। তিনি তাই নিয়মিতভাবে মঠ ও মন্দিরের জন্যে করতেন অর্থব্যয়।

আধুনিক বিহার প্রদেশে নালন্দা নামে এক বিখ্যাত মঠ ছিল, সেখানে কেবল বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা বাস করতেন না। তার মধ্যে ছিল প্রকাণ্ড এক বিশ্ববিদ্যালয়। হর্ষবর্ধনের যুগে সেখানে থেকে লেখাপড়া করত দশ হাজার ছাত্র। প্রতিদিন সেখানে একশত বেদি প্রতিষ্ঠিত হত এবং তার উপরে উপবিষ্ট হয়ে এক শত অধ্যাপক করতেন নানা শাস্ত্র নিয়ে আলোচনা। জ্ঞানার্জনের জন্য ছাত্রদের আগ্রহ ছিল এমন গভীর যে অধ্যাপনার সময়ে তাদের কেউ এক মিনিটের জন্যও অনুপস্থিত থাকত না।

এই বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য রাজা দান করেছিলেন একশত খানি গ্রাম। তারই আয় থেকে ছাত্রদের সমস্ত ব্যয় সংকুলান হত, ফলে তারা শিক্ষাগ্রহণ করতে পারত পরম নিশ্চিন্তভাবে।

প্রতি চার বৎসর অন্তর হর্ষবর্ধন আর একটি এমন কর্তব্য পালন করতেন, পৃথিবীর আর কোনও রাজা আজ পর্যন্ত তা করতে পারেননি। আধুনিক এলাহাবাদে গঙ্গা-যমুনার সঙ্গমস্থলে এখন যেখানে কুম্ভমেলার অনুষ্ঠান হয়, হর্ষবর্ধন সেখানে নিয়ে উপস্থিত হতেন সদলবলে। তার পরে গত চার বৎসর ধরে রাজভাণ্ডারে যত ঐশ্বর্য সংগৃহীত হত, তা নিঃশেষে দান করতেন সমাগত প্রার্থীগণকে।

হর্ষবর্ধন যখন নিজের সাম্রাজ্যে সুপ্রতিষ্ঠিত, সেই সময়ে (৬৪৩ খ্রিস্টাব্দে) চৈনিক পরিব্রাজক হুয়েন সাং-এর সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। প্রয়াগের (বা এলাহাবাদের) সেই বিচিত্র দানোৎসবে হুয়েন সাং নিজে উপস্থিত ছিলেন। তিনি স্বচক্ষে সমস্ত দেখে যা বলেছেন তার সারমর্ম হচ্ছে এই :

গঙ্গা-যমুনার সঙ্গমস্থলে এসে সমবেত হয়েছেন হর্ষবর্ধনের সঙ্গে অসংখ্য রাজকর্মচারী, অনুচর, সৈন্য ও সামন্ত রাজার দল। নির্দিষ্ট দিনে সেখানে এস উপস্থিত হল বিরাট এক জনতা—তার মধ্যে ছিল বহু নিমন্ত্রিত ব্রাহ্মণ ও নানা ধর্মাবলম্বী সাধু-সন্ন্যাসী এবং অনাহুত ও রবাহূত অনাথ ও ভিখারির দল—সংখ্যায় তারা পাঁচ লক্ষের কম হবে না।

হুয়েন সাংকে সম্বোধন করে হর্ষবর্ধন বললেন, 'পরিব্রাজক, আমাদের বংশে পুরুষানুক্রমে একটি রীতি পালন করা হয়। সেই রীতি অনুসারে প্রতি পঞ্চম বৎসরে আমি প্রয়াগের এই পুণ্যতীর্থে এসে, আমার সঞ্চিত সমস্ত ঐহিক সম্পত্তি জাতিধর্মনির্বিশেষে দান করে যাই। আজ তিরিশ বৎসর ধরে আমি এই কর্তব্য পালন করে আসছি। এবারে আমার ষষ্ঠ দানযজ্ঞ।'

দুই মাস পনেরো দিন ধরে চলল সেই অসাধারণ দানোৎসব।

উৎসবের প্রারম্ভে দেখা গেল, সানুচর সামন্তরাজগণের সুদীর্ঘ শোভাযাত্রা। সে এক বর্ণবহুল ও ঐশ্বর্যময় অতুলনীয় দৃশ্য, কারণ আপন আপন রাজকীয় মহিমা অক্ষুণ্ণ রাখবার জন্যে কোনও রাজাই প্রাণপণ চেষ্টায় ত্রুটি করেননি।

পাঁচ লক্ষ দর্শকের মাঝখানে উচ্চাসনের উপরে বসে আছেন মহারাজাধিরাজ হর্ষবর্ধন। তাঁর দক্ষিণ পার্শ্বে উপবিষ্টা রাজশ্রীদেবী। তারপর যথাযোগ্য নির্দিষ্ট স্থানে আসন গ্রহণ করেছেন অমাত্য ও পদস্থ রাজকর্মচারীগণ, সভাকবি বাণভট্ট ও অন্যান্য পণ্ডিতগণ।

প্রথম দিনে বুদ্ধদেবকে স্মরণ করে দানকার্য আরম্ভ হল। নদীর তটে একটি পর্ণকুটিরের মধ্যে স্থাপন করা হল বুদ্ধদেবের মূর্তি। তারপর দুই হাতে বিলি করা হল মূল্যবান সাজপোশাক ও অন্যান্য উপহার।

দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিন হচ্ছে যথাক্রমে সূর্য ও শিবের দিন। কিন্তু বুদ্ধদেবের দিনে যত জিনিস দান করা হয়েছিল, এই দুই দিনের দানের পরিমাণ তার আধা-আধির বেশি হল না।

চতুর্থ দিবসে দান গ্রহণ করতে এলেন দশ হাজার নির্বাচিত বৌদ্ধ ধার্মিক। তাঁরা প্রত্যেকে লাভ করলেন এক শত স্বর্ণমুদ্রা, একটি মুক্তা, একটি তুলার পোশাক এবং বাছা বাছা খাদ্যসামগ্রী, পানীয়, ফুল ও গন্ধদ্রব্য।

তারপর বিশ দিন ধরে কাতারে কাতারে ব্রাহ্মণদের দল এল দান গ্রহণ করতে। ব্রাহ্মণদের পর জৈন এবং অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের পালা। তাঁদের তুষ্ট করতে লাগল পুরো দশটি দিন। বহু দূরদেশ থেকে যেসব শ্রমণ এখানে এসে জুটেছিলেন মধুলোভী ভ্রমরের মতো, তাঁরাও আরও দশ দিনের আগে খুশি হলেন না। তারপর গোটা এক মাস ধরে দান নিয়ে গেল লক্ষ লক্ষ দরিদ্র, অনাথ, পঙ্গু ও ভিক্ষুকের দল।

এইভাবে অকাতরে দান করতে করতে রাজভাণ্ডারে পাঁচ বৎসরের সঞ্চিত অর্থ একেবারে ফুরিয়ে গেল। হস্তী, অশ্ব ও সামরিক সাজসজ্জা ছাড়া রাজার নিজস্ব সম্পত্তি আর কিছুই রইল না। কিন্তু ওগুলিকে দানসামগ্রী বলে গণ্য করা চলে না, কারণ রাজ্যচালনা অসম্ভব হয়ে উঠবে তাদের অভাবে।

হর্ষবর্ধন তখন সিংহাসন ছেড়ে নেমে এসে নিজের গা থেকে মণিমাণিক্যখচিত মুকুট, জড়োয়ার কণ্ঠহার, মৌলিমালা, কর্ণের কুণ্ডল ও বাহুর বলয় প্রভৃতি—এমনকি রাজপরিচ্ছদ পর্যন্ত খুলে বিলিয়ে দিলেন হাসিমুখে।

তারপর রাজশ্রীদেবীর দিকে ফিরে দাঁড়িয়ে বললেন, 'দিদি, আজ আমি সর্বহারা। আমার লজ্জা রক্ষা হয়, তোমার কাছে এমন বস্ত্র ভিক্ষা করি।

রাজশ্রী তখন সেই আশ্চর্য রাজভিখারির দিকে এগিয়ে দিলেন একটি আটপৌরে পুরাতন পোশাক।

সেই পোশাক পরে হর্ষবর্ধন প্রশান্ত মুখে প্রথমে দশ দিকের বুদ্ধদেবের উদ্দেশ্যে বন্দনা ও প্রণাম করলেন। তারপর পবিত্র আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে জোড়হস্তে বললেন, 'এই বিপুল ঐশ্বর্য সুরক্ষিত স্থানে পুঞ্জীভূত করেও আমি নিশ্চিন্ত থাকতে পারতুম না কিন্তু আজ আমি পরম নিশ্চিন্ত। ধর্মের নামে যা দান করলুম, তা রক্ষিত হল যথাযোগ্য স্থানেই। আহা, ভবিষ্যতে আমি যেন জন্মে জন্মে এইভাবে দান করে বুদ্ধদেবের কৃপালাভ করে ধন্য হতে পারি।'

ঐতিহাসিক হর্ষবর্ধনের এই কল্পনাতীত দানশীলতার দৃষ্টান্ত দেখে বেশ বোঝা যায়, পৌরাণিক দাতাকর্ণের কাহিনি অবিশ্বাস্য নয়। সম্রাট অশোকও যাপন করে গিয়েছেন সর্বহারা ভিক্ষুর জীবন। তাঁর পিতামহ সম্রাট চন্দ্রগুপ্তও নিজের পূর্ণ গৌরবের সময়ে স্বেচ্ছায় সিংহাসন ছেড়ে সন্ন্যাস নিয়ে প্রাণত্যাগ করেছিলেন প্রায়োপবেশনে। অদ্ভুত দেশ এই ভারতবর্ষ। এখানকার মাটিতে যা জন্মায়, অন্য কোনও দেশ তা স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারে না।

কিন্তু রাজর্ষি হর্ষবর্ধন বারে বারে এইভাবে সর্বহারা হয়েও সকলকে খুশি করতে পারেননি। বৌদ্ধরা উচ্ছ্বসিত হয়ে বলত, 'জয়, রাজাধিরাজ হর্ষবর্ধনের জয়। রাজর্ষি অশোকই আবার হর্ষবর্ধনের মূর্তি ধারণ করে অবতীর্ণ হয়েছেন ধরাধামে।'

কিন্তু ব্রাহ্মণরা হাসিমুখে তাঁর দান গ্রহণ করেও তাঁকে দুই চক্ষে দেখতে পারত না। হিন্দু রাজার এই বৌদ্ধপ্রীতি তাদের কাছে অস্বাভাবিক ও অন্যায় বলেই মনে হত। হর্ষবর্ধনের বিরুদ্ধে তারা চক্রান্ত করতে লাগল। এবং আর্যাবর্তে বিদ্রোহের আগুন জ্বালবার জন্যে গোপনে ইন্ধন জোগাতে লাগল হর্ষেরই এক মন্ত্রী, অর্জুনাশ্ব।

ইতিমধ্যে ঘটেছে কয়েকটি প্রধান ঘটনা।

মগধ-গৌড়ের মহারাজা শশাঙ্কের মৃত্যু হয়েছে (সম্ভবত ৬১৯ খ্রিস্টাব্দের পরে)। তাঁর রাজ্য এসেছে হর্ষবর্ধনের অধিকারে।

শশাঙ্কের বন্ধু চালুক্যরাজ দ্বিতীয় পুলকেশীকে আক্রমণ করতে গিয়ে হর্ষবর্ধন নিজেই পরাজিত হয়েছেন (৬২০ খ্রিস্টাব্দে)। তারপর তাঁর উচ্চাকাঙ্ক্ষা আর দাক্ষিণাত্যের দিকে দৃষ্টিপাত করেনি।

৬৪৩ খ্রিস্টাব্দে হর্ষবর্ধন গঞ্জামে গিয়ে শেষ যুদ্ধ করে তরবারি ত্যাগ করেছেন। তিনি হয়েছেন অহিংসার উপাসক।

গঞ্জামে তাঁর সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন চিনা পরিব্রাজক হুয়েন সাঙ।

চতুর্থশ । ভগ্নপ্রাণ সম্রাট

পুষ্পিত বকুল গাছের স্নিগ্ধ ছায়ায় একটি মর্মর বেদি, তারই উপরে বসে রাজকবি বাণভট্ট একমনে 'হর্ষচরিত' রচনায় নিযুক্ত হয়ে আছেন।

এমন সময়ে সেনাপতি সিংহনাদ সেখানে এসে উচ্চকণ্ঠে ডাকলেন, 'ওহে বাণভট্ট।'

বাণভট্ট মুখ তুলে বললেন, 'ব্যাপার কী? কাব্যকুঞ্জবনে মত্তহস্তীর প্রবেশ কেন?

সিংহনাদ বললেন, 'একে তো তোমাদের মতো মেয়েলি কবিদের পাল্লায় পড়ে মহারাজা অসি ছেড়ে মসির ভক্ত হয়েছেন, তার উপরে ওই চিনা পরিব্রাজকটা এসে আমাদের অন্ন যে একেবারে মারবার চেষ্টা করছে, সে-খবর রাখো কি?'

'তুমি পরিব্রাজক হুয়েন সাঙের কথা বলছ?'

'হ্যাঁ গো, হ্যাঁ! সে যে মহারাজকে নিজের হাতের মুঠোর ভিতরে পুরে ফেলেছে!'

'পরিব্রাজকের হাতের মুঠো এমন প্রকাণ্ড যে তার মধ্যে আমাদের এত বড় মহারাজার স্থান সংকুলান হয়েছে?'

'তা ছাড়া আর কী বলি বলো? ওই চিনা পরিব্রাজক জাদু জানে হে, জাদু জানে! মহারাজা এত দিন হীনযান সম্প্রদায়ের বৌদ্ধদের প্রতি পক্ষপাতিত্ব দেখাতেন, প্রজারা তা পছন্দ না করলেও কোনও রকমে সহ্য করে থাকত। কিন্তু ওই চিনা পরিব্রাজকের পরামর্শে মহারাজা এখন মহাযান সম্প্রদায়কেও মাথায় তুলতে চান। আহার নেই, নিদ্রা নেই,—দিনরাত তিনি 'বুদ্ধ বুদ্ধ' করে পাগল। হিন্দু হয়েও তিনি বুদ্ধের পায়ে দাসখত লিখে দিয়েছেন। তাঁর কড়া হুকুম হয়েছে, সাম্রাজ্যের কোথাও আর জীবহিংসা করা চলবে না। যে আমিষ খাবে তার প্রাণদণ্ড অনিবার্য।

বাণভট্ট হেসে বললেন, 'এ জন্যে তুমি উত্তেজিত হচ্ছ কেন বন্ধু? মহারাজা তোমার বেতন বন্ধ করে দেওয়ার আদেশ তো দেননি?'

'বাণভট্ট, তুমি হচ্ছ একটি আস্ত পণ্ডিত-মূর্খ! বেতন এখনও পাচ্ছি বটে, কিন্তু তার পর? আমরা তোমাদের মতো শাস্ত্রজীবী নই, আমরা হচ্ছি অস্ত্রজীবী। কিন্তু রাজ্যের সকলকেই যদি অহিংসার সাধনা করতে হয়, তাহলে তো সমস্ত অস্ত্রশস্ত্রই হবে ব্যর্থ! সে ক্ষেত্রে, অস্ত্রজীবীদের অকারণে বসিয়ে বসিয়ে মাহিনা দিয়ে পুষে রাখবেন, আমাদের মহারাজা এতটা নির্বোধ নন।'

বাণভট্ট বললেন, 'সিংহনাদ ভায়া, তোমার আর্তনাদ থামাও। তুমি কি বলতে চাও, অহিংসা বলতে বোঝায়, সাপ কামড়াতে এলেও আমরা তাকে মারতে পারব না? কোনও শত্রুদেশ আক্রমণ করতে এলেও আমাদের মহারাজা হাত গুটিয়ে বুক পেতে দেবেন?'

সিংহনাদ মাথা চুলকোতে চুলকোতে বললেন, 'কী জানি ভাই, আমার কেমন সন্দেহ হচ্ছে!'

বাণভট্ট সসম্ভ্রমে গাত্রোত্থান করে বললেন, 'তাহলে তোমার সন্দেহ-ভঞ্জন করো; ওই দ্যাখো, মহারাজা নিজেই এই দিকে আসছেন।'

হর্ষবর্ধন আসতে আসতে হাসতে হাসতে বললেন, 'এক আসরে অসি আর মসির সেবক! লক্ষণ তো ভালো নয়! কিন্তু মনকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্যে কিছুক্ষণ কাব্যগুঞ্জনে যোগ দিতে এলুম, কিন্তু এখানেও নতুন কোনও ষড়যন্ত্রের আয়োজন হচ্ছে নাকি?'

'ষড়যন্ত্র মহারাজ?'

'হ্যাঁ বন্ধু ষড়যন্ত্র—ষড়যন্ত্র—আমার বিরুদ্ধে চারিদিকেই চলছে বিষম ষড়যন্ত্র! তুমি কি এরই মধ্যে সব কথা ভুলে গেলে? রাজধানীর পরিব্রাজক হুয়েন সাঙের ধর্মোপদেশ শোনবার জন্যে আহ্বান করেছিলুম বিরাট সভা! আমার আমন্ত্রণ রক্ষা করেছিল চার হাজার বৌদ্ধ শ্রমণ, তিন হাজার জৈন আর ব্রাহ্মণ। পবিত্র গঙ্গা-তটে বিপুল এক মঠ স্থাপন করে আকাশচুম্বী দেউলের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করেছিলুম আমার দেহের সমান উঁচু বুদ্ধদেবকে। কয় দিন ধরে চলল মহোৎসব। আমন্ত্রিতদের আদর-আপ্যায়নের কোনওই ত্রুটি হয়নি। বুদ্ধ, ধর্ম আর সংঘের সম্মান রক্ষার জন্যে চারিদিকে মুক্ত হস্তে ছড়িয়ে দিয়েছিলুম মণি-মুক্তা, স্বর্ণ-রৌপ্য। কিন্তু তার ফল হল কী? আমি বৌদ্ধধর্মের অনুরাগী বলে ব্রাহ্মণরা চক্রান্ত করে মঠে আগুন ধরিয়ে দিলে। অনেক কষ্টে কোনওক্রমে মঠের কতক অংশ রক্ষা পেল বটে, কিন্তু আমি নিজে হলুম এক নির্বোধ ব্রাহ্মণের দ্বারা আক্রান্ত! ভগবান বুদ্ধের কৃপায় সে যাত্রা রক্ষা পেলুম। তার পর জানা গেল, পাঁচ শত ব্রাহ্মণ লিপ্ত ছিল সেই হীন ষড়যন্ত্রে।'

বাণভট্ট বললেন, 'জানি মহারাজ, এত শীঘ্র যে ভীষণ ষড়যন্ত্রের কাহিনি ভুলিনি। কিন্তু সেই ব্রাহ্মণের দল তো আজ নির্বাসিত?'

'হ্যাঁ, কিন্তু রাজ্যে এখনও অসংখ্য দুরাত্মার অভাব নেই। নিরপরাধ, নির্বিরোধী পরিব্রাজক হুয়েন সাং! ব্রাহ্মণরা তাঁকেও হত্যা করতে চায়, কেবল আমার জন্যেই তাদের সেই দুরভিসন্ধি সিদ্ধ হচ্ছে না। বোধ করি, এই সব দেখে-শুনেই পরিব্রাজক তাঁর স্বদেশে ফেরবার জন্যে ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন। আমিও সম্মতি না দিয়ে পারিনি। আগামী সপ্তাহেই পরিব্রাজক তাঁর স্বদেশের দিকে যাত্রা করবেন।'

বাণভট্ট বললেন, 'আজ্ঞে হ্যাঁ মহারাজ, পরিব্রাজকের উপরে দেশের লোক—বিশেষ করে ব্রাহ্মণরা মোটেই খুশি নয় বটে।'

হর্ষবর্ধন বললেন, 'বন্ধু, তুমিও তো ব্রাহ্মণ?'

বাণভট্ট সহাস্যে বললেন, 'হ্যাঁ মহারাজ, আমি ব্রাহ্মণ বংশে জন্মগ্রহণ করেছি বটে! কিন্তু কবি হয়ে আমি নিজের জাত খুইয়েছি!'

'কী—রকম?'

'কবির জাত নেই। কবির মানসী জন্মদান করে সর্বজাতির সর্বশ্রেণির মানুষদের। কিবা রাজা, কিবা রাখাল, কিবা ব্রাহ্মণ, কিবা চণ্ডাল—কবির আত্মীয়তা সকলের সঙ্গেই, কবির সহানুভূতি সকলেরই উপরে।'

হর্ষবর্ধন সানন্দে বললেন, 'সাধু কবি, সাধু! বন্ধু, রাজাও হচ্ছেন কবির মতো—তাঁরও উচিত নয় জাতবিচার করা। ব্রাহ্মণ থেকে চণ্ডাল পর্যন্ত সবাই তাঁর পুত্রস্থানীয়। প্রত্যেক ধর্মকেই সম্মান করা হচ্ছে রাজার কর্তব্য। কিন্তু সেই কর্তব্যই পালন করেছি বলে আজ আমার বিরুদ্ধে হচ্ছে এত ষড়যন্ত্র।'

সিংহনাদ বললেন, 'না মহারাজ, চিনা পরিব্রাজক দেশত্যাগ করলেই ব্রাহ্মণদের আপত্তির আর কোনও কারণ থাকবে না।'

হর্ষবর্ধন তিক্ত স্বরে বললেন, 'তাই নাকি? রাজ্যে এখন যুদ্ধবিগ্রহ নেই বলে নিশ্চয়ই আপনি দিবারাত্রব্যাপী নিদ্রাদেবীর সাধনা করছেন?'

সিংহনাদ আমতা আমতা করে বললেন, 'না মহারাজ, না মহারাজ! যুদ্ধও নেই, পরিশ্রমও নেই। তাই আমি আজকাল অনিদ্রা রোগে ভুগছি।'

'তবে এ-কথা শোনেননি কেন যে আমাকে হত্যা করবার জন্যে ব্রাহ্মণদের উত্তেজিত করেছিল আমারই অন্যতম অমাত্য অর্জুনাশ্ব?'

সিংহনাদ সচমকে বললেন, 'বলেন কী মহারাজ? কোথায় সেই পাষণ্ড? মহারাজের আদেশ পেলে আমি তাকে চুলের মুঠি ধরে এখানে টেনে আনতে পারি।'

'পারবেন না সেনাপতি। অর্জুনাশ্ব আপনার চেয়ে নির্বোধ নয়। সে এখন পলাতক। তবে এইটুকু খবরও পেয়েছি, নির্বাসিত সেই পাঁচ শত ব্রাহ্মণের সঙ্গে মিলে অর্জুনাশ্ব আমার বিরুদ্ধে অসভ্য জাতিদের উত্তেজিত করবার চেষ্টা করছে। বন্ধু বাণভট্ট, আমার মন ভেঙে গিয়েছে।'

'কেন মহারাজ?'

'বৃদ্ধ হয়েছি, পরলোকের দরজা চোখের সামনেই খোলা রয়েছে। সারা জীবন ধরে যাদের জন্যে এই বিশাল সাম্রাজ্য গঠন করে গেলুম, আমার দানের অধিকারী হওয়ার মতো যোগ্যতা তাদের কোথায়? আমি অপুত্রক। আমার অবর্তমানে এই সাম্রাজ্যের কর্ণধার হওয়ার মতো কেউ নেই। অদূর ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আমি বেশ দেখতে পাচ্ছি—অরাজকতা, রক্তপাত, অত্যাচার! আমার এত সাধের সার্থক স্বপ্ন, কোথায় মিলিয়ে যাবে শরতের লঘু মেঘের মতো!'

পঞ্চদশ । তৈলহীন দীপ

মহারাজাধিরাজ শ্রীহর্ষবর্ধনের দুঃস্বপ্ন সত্যে পরিণত হতে বেশি দিন লাগল না।

চৈনিক পরিব্রাজক হুয়েন সাঙ ৬৪৩ খ্রিস্টাব্দে যখন স্বদেশ যাত্রা করলেন, হাঁপ ছেড়ে বাঁচল আর্যাবর্তের বাসিন্দারা। এই বৌদ্ধ পরিব্রাজকের অন্ধ ভক্ত হয়ে হর্ষবর্ধন ব্যবহার করতে আরম্ভ করেছিলেন গোঁড়া বৌদ্ধের মতো। সেই জন্যে হুয়েন সাঙ হয়ে উঠেছিলেন দেশের লোকের চোখের বালির মতো।

বুদ্ধভক্ত অহিংসাবাদী সম্রাট প্রিয়দর্শী অশোকের মৃত্যুর সঙ্গে-সঙ্গেই বিশাল মৌর্য সাম্রাজ্যের ভাঙন আরম্ভ হয় এবং তার পর অর্ধ শতাব্দী যেতে না যেতেই তা একেবারে বিলুপ্ত হয়ে যায় (খ্রিঃ পূঃ ১৮৫)। আর্যাবর্তে হয় হিন্দু সামাজ্যের পুনঃপ্রতিষ্ঠা।

ভারতে তখন হীনযান বৌদ্ধমত প্রচলিত ছিল। মৌর্যসাম্রাজ্যের পতনের সঙ্গে-সঙ্গেই আরম্ভ হয় বৌদ্ধধর্মের অধঃপতন। শক বা কুশান সম্রাট কনিষ্কের (১২০-১৬০ খ্রিস্টাব্দ) যুগে তা আবার মাথা তোলবার চেষ্টা করেছিল বটে, কিন্তু কনিষ্কের মৃত্যুর পরে বৌদ্ধধর্মের উপরে ক্রমেই বেশি প্রাধান্য বিস্তার করতে থাকে হিন্দুধর্ম।

হর্ষবর্ধনের যুগে (৬০৬-৬৪৮ খ্রিস্টাব্দ) বৌদ্ধধর্মের যথেষ্ট অবনতি হলেও হুয়েন সাঙের বর্ণনায় দেখা যায়, ভারতবর্ষের বিভিন্ন মঠ বা সঙ্ঘারামে তখনও বাস করতেন প্রায় দুই লক্ষ ভিক্ষু বা বৌদ্ধ সন্ন্যাসী। সুতরাং সে সময়ে গৃহী-বৌদ্ধের সংখ্যা যে অগুনতি ছিল এটুকু অনুমান করা যেতে পারে অনায়াসেই।

বলা বাহুল্য, ওদের অধিকাংশই ছিল হীনযান সম্প্রদায়ের লোক। চৈনিক পরিব্রাজকের প্রভাবে পড়ে হর্ষবর্ধন গ্রহণ করলেন মহাযান সম্প্রদায়ের মত—যার প্রতি হীনযানীদের এতটুকু শ্রদ্ধা তো ছিলই না, উপরন্তু আক্রোশ ছিল যথেষ্ট। হিন্দুদের শাক্ত ও বৈষ্ণব এবং মুসলমানদের সিয়া ও সুন্নিদের মতো তখনকার হীনযানী ও মহাযানী বৌদ্ধদেরও মধ্যে দলাদলি ও হানাহানির অন্ত ছিল না। কাজেই বৌদ্ধধর্মের অনুরাগী হয়েও হর্ষবর্ধন হীনাযানীদের তুষ্ট করতে পারলেন না।

একই অহিংসার মন্ত্র গ্রহণ করেও জৈনরা এখনকার মতন তখনও ছিলেন বৌদ্ধবিরোধী। হর্ষবর্ধনের বৌদ্ধপ্রীতি তাঁরাও সহ্য করতে পারতেন না।

হিন্দুদের তো কথাই নেই। হর্ষবর্ধন পৈতৃক হিন্দুধর্ম ত্যাগ করেননি বটে, কিন্তু শিব ও সূর্যদেবের উপরে প্রাধান্য দিতেন বুদ্ধদেবকে। ব্রাহ্মণদের কাছে এটা ছিল অমার্জনীয় অপরাধ।

হর্ষবর্ধন সর্বধর্মসমন্বয়ের জন্যে চেষ্টা করেছিলেন কি না এতদিন পরে তা জোর করে বলা যায় না বটে, কিন্তু কী জৈন, কী হিন্দু—এমনকি বৌদ্ধ ধর্মেরও বৃহত্তর সম্প্রদায় পর্যন্ত তাঁর উপরে হয়ে উঠেছিল রীতিমতো খড়গহস্ত।

হুয়েন সাঙ দেশে ফিরে গেলেন। লোকে কতকটা নিশ্চিন্ত হয়ে ভাবলে, হর্ষবর্ধন বোধহয় বৌদ্ধদের নিয়ে আর বেশি বাড়াবাড়ি করবেন না।

সত্য কথা বলতে কী, হর্ষবর্ধন অল্পবিস্তর বাড়াবাড়ি করতেও বাকি রাখেননি। বড় বড় ব্রাহ্মণ-পণ্ডিতেরা হুয়েন সাঙের মত অসার ও ভ্রান্ত বলে প্রমাণিত করবার জন্যে প্রায়ই তাঁকে তর্কযুদ্ধে আহ্বান করতেন। সে সময়েও (এখনকার মতো) তর্কের সময়ে হাতাহাতি হত যথেষ্ট।

কিন্তু হর্ষবর্ধন তাঁর প্রিয়পাত্রের প্রতিযোগীকে জয়লাভ করবার সুযোগ দেওয়ার জন্যে প্রস্তুত ছিলেন না।

তিনি ঘোষণা করে দিয়েছিলেন : 'যে কোনও ব্যক্তি চৈনিক গুরুর গায়ে হাত দেবে বা তাঁকে আহত করবে, তার প্রাণদণ্ড হবে। যে কোনও ব্যক্তি তাঁর বিরুদ্ধে কথা কইবে, তার জিভ কেটে ফেলা হবে। আর যারা তাঁর উপদেশবাণী শুনে লাভবান হতে চায় তাদের কোনও ভয় নেই।'

বলা বাহুল্য, এই ঘোষণার পর আর কোনও সাহসী পণ্ডিত হুয়েন সাঙের সঙ্গে তর্ক করতে অগ্রসর হননি। তর্কের খাতিরে জিহ্বাকে বলি দেওয়ার জন্যে কারুরই লোভ হতে পারে না।

কিছুদিন যায়। সাম্রাজ্যের কোথাও বহিঃশত্রু নেই। সিংহাসন নিষ্কণ্টক। বাণভট্টের সঙ্গে নিরুদবেগে কাব্যচর্চা করেন রাজকবি শ্রীহর্ষবর্ধন। এ জীবনের মতন তিনি কোশবদ্ধ করেছেন তরবারিকে। তাঁর কাছে রাঙা রক্তের চেয়ে প্রিয় হয়ে উঠেছে কালো কালি।

বৌদ্ধ চিনসম্রাট হর্ষবর্ধনের সভায় এক রাজদূত পাঠালেন, নাম তাঁর ওয়াং-হিউএন-সি। দূতের সঙ্গে এল তিরিশ জন অশ্বারোহী দেহরক্ষী।

আবার একে চিনা দূত! জনসাধারণের মনে নতুন করে জেগে উঠল সন্দেহ ও অসন্তোষ। কে জানে, এই নবাগত কী গূঢ় উদ্দেশ্য নিয়ে পদার্পণ করেছে ভারতবর্ষে! এর কুমন্ত্রণা শুনে এবার হিন্দুদের মুখে ভালো করে কালি মাখাবার জন্যে মহারাজা হয়তো প্রকাশ্যেই গ্রহণ করবেন বৌদ্ধধর্ম।

পলাতক মন্ত্রী অর্জুনাশ্ব গোপনে কোথায় বসে দিন গুনছিল। এতদিন পরে এসেছে তার আত্মপ্রকাশের লগ্ন! সে রাজ্যের চারিদিকে গুপ্তচর পাঠিয়ে দিলে। তারা চুপি চুপি প্রচার করে বেড়াতে লাগল, 'অতি বার্ধক্যে রাজার মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে, তিনি বৌদ্ধধর্ম অবলম্বন করে সনাতন হিন্দুধর্মের মূলে কুঠারাঘাত করতে চান। প্রত্যেক হিন্দুর উচিত, এমন স্বধর্মবিদ্বেষী রাজার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করা।'

তারপর ভারতের দুর্ভাগ্য নিয়ে এল এক দুর্দিন।

এক সঙ্ঘারামে বুদ্ধদেবের সন্ধ্যারতি দেখে হর্ষবর্ধন প্রাসাদে ফিরে আসছিলেন।

অন্ধকার ফুঁড়ে যমদূতের মতো বেরিয়ে এল একদল অস্ত্রধারী লোক। তারা হর্ষবর্ধনকে আক্রমণ করলে একসঙ্গে।

রক্ষীরা প্রাণপণে বাধা দিলে, কিন্তু শেষ রক্ষা করতে পারলে না। দলে তারা হালকা।

মহারাজাধিরাজ শ্রীহর্ষবর্ধনের রক্তাক্ত দেহ পৃথিবীর কোলে শুয়ে ত্যাগ করলেন অন্তিম নিশ্বাস।

মহাভারতের শেষ মহাবীর! আর্যাবর্তের শেষ হিন্দু সম্রাট!

ষোড়শ । যোদ্ধা এবং কবি

কবি শ্রীহর্ষ, যোদ্ধা শ্রীহর্ষ, রাজর্ষি শ্রীহর্ষ। তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে ভারতের ভাগ্যলক্ষ্মী হলেন আর্যাবর্তের নাট্যশালা থেকে অদৃশ্য।

বিশাল সাম্রাজ্য হয়ে গেল খণ্ডবিখণ্ড। মৌর্য চন্দ্রগুপ্ত, বিন্দুসার, অশোক, গুপ্তবংশীয় সমুদ্রগুপ্ত, চন্দ্রগুপ্ত-বিক্রমাদিত্য, কুমারগুপ্ত, দেবগুপ্ত, মালবরাজ যশোধর্মদেব এবং সর্বশেষে থানেশ্বরের হর্ষবর্ধন। তারপর আর্যাবর্তে এমন কোনও শক্তিধর মহাবীর আত্মপ্রকাশ করেননি, যিনি সম্রাট উপাধি ধারণ করতে পারেন। প্রায় দুই শতাব্দী পরে (৬৪০-৮১০ খ্রিঃ) মিহির ভোজ কান্যকুব্জের সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন, উত্তরাপথের অধিকাংশই ছিল যাঁর করতলগত। কিন্তু ভাগ্যক্রমে তাঁর যুগে মেগাস্থেনিস, ফাহিয়েন বা হুয়েন সাঙের মতন বিদেশি রাজদূত বা পরিব্রাজক আর্যাবর্তে আসেননি এবং হরিষেণ বা বাণভট্টের মতন কবিও রাজসভা অলংকৃত করেননি, কাজেই মহারাজাধিরাজ মিহির ভোজের কীর্তিকাহিনির সঙ্গে ইতিহাস কোনও পরিচয়ই স্থাপন করতে পারেনি। কথায় বলে 'কৃপাণের ঘরে শক্তিশালী হচ্ছে লেখনী'। ভুল কথা নয়; গ্রিক রাজদূত মেগাস্থেনিস না থাকলে মৌর্য চন্দ্রগুপ্তের, কবি হরিষেণ না থাকলে সমুদ্রগুপ্তের, চৈনিক পরিব্রাজক ফাহিয়েন না থাকলে চন্দ্রগুপ্ত-বিক্রমাদিত্যের এবং পরিব্রাজক হুয়েন সাঙ ও কবি বাণভট্ট না থাকলে হর্ষবর্ধনের প্রকৃত পরিচয় ইতিহাস আজ জানতেই পারত না।

প্রামাণিক ইতিহাসের পৃষ্ঠায় দেখি, হর্ষবর্ধনের মৃত্যুর পর উত্তরাপথের দিকে দিকে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছেন খুদে খুদে রাজার দল, পরস্পরের সঙ্গে মারামারি, কাটাকাটি করেই তৃপ্ত হত তাঁদের রাজধর্ম। একাধিক অপেক্ষাকৃত বৃহৎ রাজ্য ছিল বটে, কিন্তু সেগুলিকে সাম্রাজ বলে সন্দেহ করা চলে না। বড় বড় সাম্রাজ্যের পতনের পর ভারতবর্ষের বরাবরই হয়েছে এই একই দুরবস্থা এবং বরাবরই ওই একতাহীনতা ও দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ভারতবর্ষের মধ্যে প্রবেশ করেছে পারসি, গ্রিক, শক, হুন, মোগল ও ইংরেজ প্রভৃতি বিদেশি শত্রুরা। খ্রিস্ট জন্মাবার তিন শত সাতাশ বৎসর আগে দিগবিজয়ী আলেকজান্ডার ভারতবর্ষে এসে দেখেছিলেন ঠিক এই বিসদৃশ দৃশ্যই। তারপর হর্ষবর্ধনের কয়েক শত বৎসর পরে মুসলমানরাও ভারতের মাটিতে পা দিয়ে দেখেছিল ওই রকম দৃশ্যেরই পুনরাভিনয়।

হর্ষবর্ধনের ধর্মমত ছিল সে যুগের পক্ষে যথেষ্ট উদার। বুদ্ধদেবের প্রতি তাঁর অচলা ভক্তি থাকলেও তিনি নিজে বৌদ্ধ ছিলেন না, শিব ও সূর্যও লাভ করতেন তাঁর শ্রদ্ধা। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর আর্যাবর্তের মধ্যে আরম্ভ হয়ে গিয়েছিল ধর্মে ধর্মে সংঘর্ষ। হিন্দু মাত্রই নির্বিচারে ঘৃণা করত বৌদ্ধদের! কিন্তু বিভিন্ন সম্প্রদায়ের হিন্দুদেরও মধ্যে ছিল দস্তুরমতো অহি-নকুল সম্পর্ক। তারা কেউ ছিল শিবের, কেউ ছিল বিষ্ণুর এবং কেউ ছিল অগ্নির বা গণেশের বা সূর্যের বা ভৈরবের বা কার্তিকের বা যমের বা বরুণের উপাসক। তা ছাড়া অনেকের পূজ্য ছিল আকাশ বা জল বা বায়ু বা বৃক্ষ বা সর্প—এমনকি ভূতপ্রেত পর্যন্ত।

কিন্তু সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হল বৌদ্ধরা। সম্রাট অশোক, কনিষ্ক ও হর্ষবর্ধন এবং তারপর পালরাজগণের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে সব দিক দিয়েই শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল ভারতীয় বৌদ্ধধর্ম। ওঁদের সাহায্যেই বৌদ্ধধর্ম ভারতের বাইরেও সুদূর দেশ-দেশান্তরে ছড়িয়ে পড়বার সুযোগ পেয়েছিল। সম্রাট অশোক বুদ্ধধর্ম প্রচার করবার ফলে ভারতের বাইরে এশিয়ার নানা দেশে—এমনকী ইউরোপ ও আফ্রিকাতেও প্রচারকদের প্রেরণ করেছিলেন। হর্ষবর্ধনও চিন দেশের সঙ্গে বৌদ্ধধর্ম সম্পর্কীয় যোগস্থাপন করতে ত্রুটি করেননি।

এই রাজ-সাহায্য হারিয়ে বৌদ্ধদের দুরবস্থার সীমা রইল না। ওদিকে উদয়ন বৌদ্ধদের বিরুদ্ধে ধর্মযুদ্ধ ঘোষণা করে শঙ্কারাচার্যের জন্যে পথ তৈরি করে দিলেন। সেই পথ দিয়ে অগ্রসর হলেন যখন (৭৮৮-৮২০ খ্রিঃ) অদ্বৈতবাদী শঙ্করাচার্য, বৌদ্ধদের অবস্থা হয়ে উঠল তখন একান্ত অসহায়।

হর্ষবর্ধনের চিতা প্রায় শীতল হতে-না-হতেই প্রতিক্রিয়া শুরু হল। হর্ষবর্ধন নিঃসন্তান ছিলেন। হত্যাকারী অর্জুনাশ্ব যখন কান্যকুব্জের সিংহাসন অধিকার করলে, তখন তাকে বাধা দিতে পারে রাজবংশে এমন কেউ ছিল না।

অর্জুনাশ্বের পক্ষে ছিল দলে দলে অসভ্যজাতীয় যোদ্ধা। অর্থ দিয়ে এবং বেপরোয়া লুণ্ঠনের লোভ দেখিয়ে অর্জুনাশ্ব তাদের বশীভূত করেছিল। দেশের দিকে দিকে বৌদ্ধ মঠ-মন্দিরের অভাব ছিল না এবং রাজানুগ্রহে সেগুলির মধ্যে সজ্জিত হয়েছিল প্রচুর ধনরত্ন ও বহু মূল্যবান দ্রব্য। প্রথমেই সেই সব মঠমন্দিরের ভিতরে আরম্ভ হল আবার লুণ্ঠনলীলা।

অধিকাংশ ব্রাহ্মণই ছিল বৌদ্ধদের পরম শত্রু। হর্ষবর্ধনের দোর্দণ্ডপ্রতাপে এত দিন এই ব্রাহ্মণের দল কুঞ্চিতফণা ফণীর মতো মনে মনেই পুষে আসছিল মনের যত রাগ ও আক্রোশ, এইবার সুযোগ পেয়ে তারাও অর্জুনাশ্বের সঙ্গে যোগ দিয়ে বৌদ্ধদের আক্রমণ করলে পৈশাচিক উল্লাসে।

কবি বাণভট্ট বললেন, 'ওহে সেনাপতি সিংহনাদ!'

সিংহনাদ ম্রিয়মান কণ্ঠে বললেন, 'আমাকে আর সেনাপতি বলে ডেকে ব্যঙ্গ কোরো না বাণবট্ট।'

'ব্যঙ্গ?'

'তা নয় তো কী? আমাকে যে সেনাপতি বলে ডাকছ, আমার সৈন্য কোথায়?'

'মানে?

'স্বর্গীয় মহারাজের বৌদ্ধপ্রীতির জন্যে সেনাদলের অনেকেই খুশি ছিল না। তাদের বেশিরভাগ লোকই দুষ্ট অর্জুনাশ্বকে রাজা বলে মেনে নিয়েছে। চক্ষুলজ্জার খাতিরে যারা অতটা নীচে নামতে পারেনি, তারাও চুপ করে আছে নিরপেক্ষর মতো।'

'তুমি কি বলতে চাও, সেনাদলের মধ্যে মহারাজের বিশ্বাসী লোক ছিল না?'

'ছিল বইকি! কিন্তু তারা দলে হালকা। তারা হতাশ হয়ে দেশ ত্যাগ করেছে।'

'অতএব?'

'অতএব আমি এখন হয়ে পড়েছি সোনার পাথরবাটির মতো—অর্থাৎ সৈন্যহীন সেনাপতি।'

'তাহলে এখন কী করা উচিত?'

'উচিত কান্যকুব্জের বাইরের দিকে দ্রুতবেগে পদচালনা করা।'

'আরে নির্বোধ, বিদেশবিভুঁইয়ে গিয়ে খাব কী?'

'বায়ু কিংবা ঘাস কিংবা ভুষি। এখানে থাকলে খাবি ভক্ষণ করতে বিলম্ব হবে না। সেটা অধিকতর ভয়াবহ। ওই শোনো, বিদ্রোহীদের জয়-কোলাহল। ইচ্ছা হয়তো তুমি এখানে অবস্থান করো, এই আমি সবেগে প্রস্থান করলুম!'

'তিষ্ঠ ভায়া, কিছুক্ষণ তিষ্ঠ! এখনও তুমি নিরস্ত্র নও, পথে-বিপথে বিপদ ঘটলে তোমার তরবারি আমাকে রক্ষা করতে পারবে।'

'এসো তাহলে দেরি করছ কেন?'

'ব্রাহ্মণী যথাসময়ে মরে বেঁচে গিয়েছেন। এখন তোমার তরবারির মতো আমারও প্রধান সম্বল কাব্যপুথিগুলি। দাঁড়াও, চটপট সেগুলি গুছিয়ে নিয়ে বগলদাবা করি। হা মহারাজ হর্ষবর্ধন, হা আমার কাব্যকুঞ্জ, হা আমার এত সাধের 'হর্ষচরিত'।'

সপ্তদশ । বিশ্বাসঘাতকের পরিণাম

অর্জুনাশ্ব সকলকে সম্বোধন করে বললে, 'বন্ধুগণ, চিনসম্রাট উত্তরাপথে বৌদ্ধধর্ম প্রচার করার জন্যে আবার একদল লোক পাঠিয়েছে, এ কথা তোমরা সকলেই জানো। কিছুদিন আগে এইরকম এক প্রতারক প্রচারক এসে কেবল হর্ষবর্ধনের ধর্মনাশই করেনি, রাজার যোগ্য উপঢৌকন হস্তগত করে আবার স্বদেশে পলায়ন করেছে। এবারের চৈনিক প্রচারকও যথেষ্ট মূল্যবান সামগ্রী উপহার পেয়েছে। তারাও পলায়ন করতে চায়। কিন্তু এবারে আমরা তাদের বাধা দেব, তাদের হত্যা করব আর তাদের সমস্ত সম্পত্তি লুণ্ঠন না করে ছাড়ব না। হিন্দুর সম্পত্তি অহিন্দুর হস্তগত হবে, এ অন্যায় আমি প্রাণ থাকতে সহ্য করতে পারব না। বন্ধুগণ, সৈন্যগণ, অগ্রসর হও। জয় দেবাদিদেব মহাদেবের জয়!'

চৈনিক দূত ওয়াং-হিউয়েন-সি ও তাঁর সঙ্গীগণ তখন তিরিশ জন দেহরক্ষী নিয়ে তিরহুতের কাছে গিয়ে পড়েছেন। এত শীঘ্র দেশে ফেরবার ইচ্ছা তাঁদের ছিল না, কিন্তু এই সুদূর বিদেশে প্রবীণ পৃষ্ঠপোষক হর্ষবর্ধনের মৃত্যুর পর আর তাঁদের ভারতের থাকবার ভরসা হয়নি।

আচম্বিতে বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো অর্জুনাশ্ব তার দলবল নিয়ে চৈনিক দূতমণ্ডলীর উপরে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল। বিদেশিরা এই অতর্কিত আক্রমণের জন্যে প্রস্তুত ছিলেন না, তাঁরা একেবারে ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলেন। দেহরক্ষীরা মারা পড়ল এবং সমস্ত সম্পত্তি লুণ্ঠিত হল বটে, কিন্তু ওয়াং-হিউয়েন-সি তাঁর জন কয় সঙ্গী নিয়ে কোনওরকম পলায়ন করে নেপালে গিয়ে উপস্থিত হলেন।

নেপাল তখন তিব্বতের বিখ্যাত বৌদ্ধরাজা স্রং-স্যান গ্যাম্পোর অধীন। তিনি লাসা নগরের প্রতিষ্ঠাতা এবং তিব্বতে বৌদ্ধধর্মের প্রতিষ্ঠা হয় তাঁরই চেষ্টায়। রাজা গ্যাম্পো বিবাহ করেছিলেন চিনসম্রাটের এক কন্যাকে।

তাঁর শ্বশুরের প্রেরিত দূতমণ্ডলীর উপরে বিশ্বাসঘাতক অর্জুনাশ্বের অত্যাচারের কথা শুনে রাজা গ্যাম্পো অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে উঠলেন, বললেন, 'রাজদূত, আমি যদি আপনাকে সৈন্য দিয়ে সাহায্য করি তাহলে আপনি কি নিজের অপমানের প্রতিশোধ নিতে পারবেন?'

'আজ্ঞে হ্যাঁ মহারাজ, আমার হস্ত অস্ত্রধারণ করতেও সক্ষম।'

'উত্তম। আপনার সঙ্গে যাবে আমার বাছা-বাছা বারো শত সেরা সৈনিক! তার উপরে থাকবে সাত হাজার নেপালি অশ্বারোহী। হিমালয় ছেড়ে নেমে যান আবার সমতল ক্ষেত্রে, চিনসম্রাটের মানরক্ষা আর ধার্মিক হর্ষবর্ধনের হত্যাকারীর শাস্তি বিধান করুন।'

অর্জুনাশ্ব তখনও তিরহুত পরিত্যাগ করেনি। গুপ্তচর মুখে সে ওয়াং-হিউয়েন-সির পুনরাগমনের সংবাদ পেয়ে রীতিমতো ভীত হয়ে উঠল, কারণ সে বেশ বুঝল যে, তার অধীনে যারা অস্ত্র ধরবে তারা সংখ্যায় বেশি থাকলেও যুদ্ধে দক্ষ সুশিক্ষিত তিব্বতি, নেপালি সৈন্যদের সমকক্ষ নয়। সে তাড়াতাড়ি বাগমতী নদীর তীরবর্তী দুর্গের ভিতর গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করলে।

কিন্তু পূর্ণ হয়ে উঠেছে তখন অর্জুনাশ্বর বিষের পাত্র। মাত্র তিন দিনের চেষ্টার পর ওয়াং-হিউয়েন-সি দুর্গের মধ্যে প্রবেশ করলেন সদলবলে। অসভ্য জাতের অশিক্ষিত সৈন্যদের নিয়ে অর্জুনাশ্ব দুর্গ ছেড়ে পলায়নের চেষ্টা করলে। কিন্তু তার দশ হাজার সৈন্য বাগমতী নদীর গর্ভে লাভ করল সলিলসমাধি এবং তিব্বতিদের তরবারির মুখে উড়ে গেল তিন হাজারের মুণ্ড।

অর্জুনাশ্ব পালিয়ে গেল, কিন্তু তখনও পরিতৃপ্ত হল না তার রাজ্যলিপ্সা। তাড়াতাড়ি নতুন সৈন্য সংগ্রহ করে আবার সে যুদ্ধক্ষেত্রে অবতীর্ণ হল। কিন্তু ভগবান মুখ তুলে তাকালেন না তার মতো প্রভুহন্তা বিশ্বাসঘাতকের প্রতি। এবারেও সে হেরে গেল। যুদ্ধে তার কত লোক মারা পড়েছিল সে হিসাব জানবার তো উপায় নেই। কিন্তু তিব্বতি ও নেপালিরা এক হাজার শত্রুর মুণ্ডচ্ছেদ করেছিল এবং বন্দি করেছিল বারো হাজার লোক। অর্জুনাশ্বও ধরা পড়ল সপরিবারে। বিজয়ী তিব্বতিদের হস্তে আত্মসমর্পণ করলে ভারতের পাঁচশত আশিটি প্রাকারবেষ্টিত নগর।

ওয়াং-হিউয়েন-সি এবারে অর্জুনাশ্বকেও ছাড়লেন না, তাকে বন্দি করে নিয়ে গেলেন সুদূর চিন দেশে। ছুটে গেল তার সাম্রাজ্যের লিপ্সা।

হর্ষবর্ধনের মৃত্যুর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই মগধবঙ্গের অধিপতি শশাঙ্কর উত্তরাধিকারী (মাধবগুপ্ত বা আদিত্যসেন) আবার স্বাধীনতা অর্জন করেছিলেন। তার পর কেবল মগধবঙ্গ নয়, উত্তরে পশ্চিমে দক্ষিণেও রাজ্যের পর রাজ্য করল আপন আপন স্বাতন্ত্র্য ঘোষণা। আর্যাবর্ত আবার ডুবে গেল অন্ধযুগের বিস্মৃতির মধ্যে। তাকে সূর্যের আলোকে আমন্ত্রণ করবার জন্যে আর কোনও চন্দ্রগুপ্ত, আর কোনও সমুদ্রগুপ্ত, আর কোনও হর্ষবর্ধন এসে দাঁড়াননি 'এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে!'

সকল অধ্যায়
১.
ভারতের দ্বিতীয় প্রভাত
২.
পঞ্চনদের তীরে
৩.
মহাভারতের শেষ মহাবীর
৪.
ভগবানের চাবুক
৫.
আলেকজান্ডার দি গ্রেট
৬.
দিগবিজয়ী নেপোলিয়ন
৭.
রক্ত বাদল ঝরে
৮.
হন্তারক নরদানব
৯.
সিরাজের বিজয় অভিযান
১০.
মহাভারতের মহারথ
১১.
রক্ত পাথারের সাঁতারু
১২.
তিন সম্রাটের ত্র্যহস্পর্শযোগ
১৩.
সাতহাজারের আত্মদান
১৪.
আলেকজান্ডারের পলায়ন
১৫.
ওষ্ঠাধরে রাজদণ্ড
১৬.
মরা মানিক আর জ্যান্ত মানিক
১৭.
মুসলমানের জহরব্রত
১৮.
সূর্য দেবী, পর্মল দেবী
১৯.
মারাঠার লিওনিডাস
২০.
ভারতের একমাত্র সুলতানা
২১.
ব্যাঘ্রভূমির বঙ্গবীর
২২.
উপন্যাসের চেয়ে আশ্চর্য
২৩.
মরণ বিজয়ীর দল
২৪.
ছত্রপতির ছত্রভঙ্গ
২৫.
জগন্নাথদেবের গুপ্তকথা
২৬.
নতুন বাংলার প্রথম কবি
২৭.
শিবদাস ভাদুড়ি
২৮.
ইতিহাসের রক্তাক্ত প্রান্তরে
২৯.
বীরাঙ্গনা, পরাক্রমে ভীমা-সমা
৩০.
বর্গি এল দেশে
৩১.
হে ইতিহাস গল্প বলো
৩২.
প্রথম বাঙালি সম্রাট
৩৩.
অনামা বীরাঙ্গনা
৩৪.
ইতিহাসের রক্তাক্ত দৃশ্য
৩৫.
ছত্রপতির অ্যাডভেঞ্চার
৩৬.
বাংলাদেশের বোম্বেটেরাজ

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%