ভগবানের চাবুক

হেমেন্দ্রকুমার রায়

প্রথম । গোড়াপত্তন


আফগানিস্তানের উত্তরে তুর্কিস্থান। সেইখানে আছে সমরখন্দ নগর। এই সমরখন্দ কেবল প্রাচীন গৌরবের জন্যে নয়—আর এক কারণেও হতে পারে চিরস্মরণীয়।

পৃথিবীতে তিনজন দিগবিজয়ীর তুলনা নেই। খ্রিস্ট-পূর্বাব্দের আলেকজান্ডার দি গ্রেট, ত্রয়োদশ শতাব্দীর চেঙ্গিজ খাঁ ও চতুর্দশ শতাব্দীর তৈমুর লং।

জুলিয়াস সিজার, হানিবল ও নেপোলিয়ন প্রভৃতিও প্রথম শ্রেণির দিগবিজয়ী বটে, কিন্তু পূর্বোক্ত তিন বীরের কীর্তিকলাপ তাদের চেয়ে ঢের বেশি অসাধারণ ও বিস্ময়কর।

আলেকজান্ডার, চেঙ্গিজ ও তৈমুর—এই তিনজনের সঙ্গেই সমরখন্দ ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপন করতে পেরেছিল এবং ওই তিন দিগবিজয়ীই সমরখন্দ থেকে যাত্রা করেছিলেন ভারতবর্ষের দিকে। বেশ বোঝা যায়, সেকালে সোনার ভারতে পদার্পণ করতে না পারলে কেহই নিজের দিগবিজয়-কাব্য সম্পূর্ণ হল বলে মনে করতেন না।

আর কেবল সেকালেই বা বলি কেন সর্বকালেই ভারত দিগবিজয়ীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে নেপোলিয়নও আসতে চেয়েছিলেন ভারতবর্ষের দিকে। এ যুগের হিটলারও তাই চেয়েছিলেন, জাপানিদেরও প্রাণের সাধ তাই ছিল। দিগবিজয়ীদের ভারত লুণ্ঠনের পথ সর্বাগ্রে খুলে দিয়েছিলেন বোধ হয় পারস্য সম্রাট প্রথম দরায়াস।

কিছু কম ছয় শত বৎসর আগে এক মহাবীর বসেছিলেন সমরখন্দের সিংহাসনে; কিন্তু কেবল সেই ক্ষুদ্র সিংহাসনে তাঁর স্থান সংকুলান হল না, তিনি চাইলেন পৃথিবীর রাজতন্ত্র। পৃথিবীপতি হওয়ার জন্যে তিনি বার বার রণক্ষেত্রে ছুটে গেলেন এবং প্রত্যেকবারই ফিরে এলেন রক্তাক্ত বিজয়ী রূপে! তাঁর সাম্রাজ্যের দুই সীমানা হল ইউরোপের মস্কো এবং ভারতের দিল্লি!

স্পেন, ইংল্যান্ড ও ইউরোপের অন্যান্য দেশের রাজারা তাঁর মন রাখবার ও তাঁর সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্ক স্থাপন করে নিরাপদ হওয়ার জন্যে দূত ও নানা উপঢৌকন পাঠাতে লাগলেন। তিনি সেসব রাজাকে নগণ্য মনে করে খাপ থেকে তরোয়াল খুললেন না, তাঁদের আশ্বাস দিয়ে বললেন, 'ভয় নেই, সমুদ্রে খালি বড় মাছই থাকে না, ছোট মাছরাও থাকে।'

মৃত্যুর কিছুদিন আগে তিনি স্তিমিত দৃষ্টি তুলে দেখলেন, পৃথিবীতে তখনও তাঁর যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী আছে মাত্র একজন—মহাচিনের অধিপতি! এটা তাঁর সহ্য হল না—ঊনসত্তর বৎসর বয়সে তরবারি হাতে নিয়ে ধরলেন তিনি চিনের পথ। কিন্তু চিনের ছিল বরাত জোর—'ভগবানের চাবুক' ফিরিয়ে নিলেন ভগবান স্বয়ং!

এই বিচিত্র দিগবিজয়ীকে ইতিহাস তৈমুর লং বলে জানে। এঁরই বংশধর বাবর ভারতে এসে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন মোগল রাজবংশ।

তৈমুরের বংশধরদের মোগল বলা হয় বটে, কিন্তু এখানে একটু গোলমাল আছে। উত্তর এশিয়া থেকে যুগে যুগে যাযাবর জাতীয় যেসব যোদ্ধা পঙ্গপালের মতন ভারতে, চিনদেশে, পারস্যে ও ইউরোপের দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়েছিল, কোনও নির্দিষ্ট নামে তাদের পরিচিত করা সহজ নয়। গ্রিক ঐতিহাসিক হিরোডোটাস তাদের ডেকেছেন, 'সিথিয়ান' বলে, রোমানরা তাদের 'হুন' নামে ডেকেছে এবং চিনারা ডেকেছে 'হিউয়াং-নু (Hiung-nu) নামে। চেঙ্গিজ খাঁ যখন ওই যাযাবরদের এনে এক পতাকার তলায় দাঁড় করান, তখন তাদের মধ্যে ছিল মাঞ্চু, তাতার, মোগল প্রভৃতি বহু জাতির লোক। পরে চেঙ্গিজের মোগল সাম্রাজ্যের মধ্যে গণ্য হয়ে ওই নানাজাতির লোককে এক 'মোগল' নামেই ডাকা হত। আসলে তৈমুরকে কেউ বলেন তাতার, কেউ বলেন তুর্কি।

সমরখন্দ নগরের কাছে ওকগাছের অরণ্য। তারপর এক গিরিসঙ্কট—দুই দিকে তার ছয় শত ফুট উঁচু লাল বালি-পাথরের দেওয়াল। স্থানীয় লোকেরা 'লৌহ-দ্বার' বলে ডাকে এবং এর ভিতর দিয়ে দুটির বেশি উট পাশাপাশি যেতে পারে না। এখানে বর্শাদণ্ডের উপরে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে পাহারা দেয় রৌদ্রদগ্ধ তামাটে বর্ণের দীর্ঘদেহ প্রহরীরা।

এই পথ দিয়ে খানিকদূর অগ্রসর হলে একটি পাহাড়ে-ঘেরা তরু-শ্যামল ক্ষেত্রের উপরে এসে পড়া যায়। সেখানে আছে একটি নগর, নাম তার 'সবুজ শহর'। তার চারিদিকে খাল কাটা। কাবুলি ডুমুর ও খুবানি গাছের সারির উপরে দেখা যায় সাদা সাদা গুম্বুজ বা মসজিদের বুরুজ।

১৩৩৫ (মতান্তরে ১৩৩৬) খ্রিস্টাব্দে এই সবুজ শহরে তৈমুরের জন্ম।

যাত্রীর দল আসে আর চলে যায় সবুজ শহরের ভিতর দিয়ে—মুখে তাদের সর্বদাই যুদ্ধের গল্প। এই গল্প শুনতে শুনতে তৈমুর বেড়ে উঠতে লাগলেন। তৈমুর মাতৃহারা হন অল্প বয়সেই। তাঁর বাবা ছিলেন বার্লাস গোষ্ঠীর তাতার জাতীয় সর্দার, কিন্তু কোনও গ্রাম বা দুর্গ তাঁর দখলে ছিল না। তাঁর নাম তারাগাই। তিনি সংসারে উদাসীন ব্যক্তি, সর্বদাই তীর্থভ্রমণ ও ধর্মকর্ম নিয়ে ব্যস্ত। টাকাকড়ি তাঁর ছিলও না, টাকা রোজগারের চেষ্টাও তিনি করতেন না।

তৈমুর বাজপাখি, কুকুর আর সমবয়সি সঙ্গীদের নিয়ে পথে পথে খেলা করে বেড়ান। পথ দিয়ে চলে যায় দলে দলে পারসি, আরবি, ইহুদি ও হিন্দু সওদাগর; কেউ ঘোড়ায় চড়ে, কেউ উটের পিঠে, কেউ পদব্রজে,—পণ্য তাদের কিংখাব, রেশম বা কার্পেট। তাদের দলে গিয়ে ভিড়ে তৈমুর বাইরের জগতের খবর শোনেন।

তারাগাই বলেন, 'বাছা তৈমুর, এই পৃথিবীটা হচ্ছে সাপ আর বিছা ভরা সোনার পাত্রের মতন। এর প্রতি আমার কোনও মায়া নেই।'

এসব কথা তৈমুরের মনকে স্পর্শ করে না।

তিনি ভালোবাসেন দাবা ও পোলো খেলতে এবং বনে বনে শিকার করতে। অল্পস্বল্প কোরান মুখস্থ করেছিলেন, কিন্তু লেখাপড়া খুব বেশি শেখেননি। তিনি জানতেন তাতারদের ধর্ম হচ্ছে যুদ্ধ করা, তাদের আভিজাত্য হচ্ছে তরবারির আভিজাত্য।

সবুজ শহরের বার্লাস তাতাররা তখনও নিজেদের অতীতকে ভোলেনি। চেঙ্গিজ খাঁ তাদের চোখ ফুটিয়ে দিয়ে গেছেন। তাতাররা জানে একদিন তারা পৃথিবী জয় করেছিল।

তাদের মধ্যে যাদের শহরের মধ্যে বাড়ি আছে, তারাও বাস করে তাঁবুর ভিতরে। আজও তারা যাযাবর ধর্ম ছাড়তে পারেনি; বলে, 'কাপুরুষরাই দুর্গ তৈরি করে লুকোবার জন্য।'

তাদের আজানুলম্বিত বাহু, মোটামোটা দেহের হাড়, দাড়ি-গোঁফ ভরা মুখ—তারা সাধ্যমতো চেষ্টা করে, ঘোড়ার পিঠ ছেড়ে যাতে না মাটিতে নামতে হয়। যখন পায়ে হাঁটে, চলে নবাবি চালে এবং কারুকে দেখে ফিরে বা সরে দাঁড়ায় না।

পদব্রজে তারা বাঘ শিকার করতে যায় এবং লড়ায়ে যায় হাসতে হাসতে। তাদের দলে এমন লোক খুব কম, যাদের দেহে নেই অস্ত্রাঘাতের চিহ্ন। তাদের মধ্যে এমন লোকও খুব কম, ছাদের তলায় বিছানায় শুয়ে বরণ করে যারা মৃত্যুকে। ডোরা-কাটা রেশমি জামার তলায় পরে তারা ইস্পাতের বর্ম। যুদ্ধের সুযোগ না পেলে তারা সুখী হয় না। একদিকে তারা যেমন মুক্তহস্ত ও অতিথিপরায়ণ, অন্যদিকে তেমনি গোঁয়ার ও নিষ্ঠুর।

বাবার মুখে তৈমুর শুনলেন, 'বৎস, চেঙ্গিজ খাঁ যখন পৃথিবী জয় করলেন, তখন তাঁর ছেলে চাগাতাই পেলেন আমাদের এ অঞ্চলের শাসনভার। কিন্তু আজ চাগাতাইয়ের বংশধর বিলাসের স্রোতে হাবুডুবু খাচ্ছেন আর রাজ্যের সর্বেসর্বা হয়েছেন তাঁর আমির কাজগান।'

আমির কাজগানের নাম সকলের মুখে মুখে। তাতাররা দলে দলে যায় কাজগানের ফৌজে ভর্তি হওয়ার জন্যে।

তৈমুর এখন প্রথম যৌবনে পা দিয়েছেন। এই বয়সেই তাঁর দেহ হয়ে উঠেছে যেমন সুন্দর ও সুগঠিত তেমনই বৃহৎ ও বলিষ্ঠ। তীক্ষ্ণনেত্র, কঠিন চরিত্র। তিনি কথা কন কম, তাঁর কণ্ঠস্বর সুগম্ভীর ও মর্মভেদী। হাসি-ঠাট্টার ধারও মাড়ান না!

কোনও বলবান তাতার যুবকও যে-ধনুকের ছিলা মাত্র বুক পর্যন্ত টানতে পারে, তৈমুর সেই ধনুকের ছিলা আকর্ষণ করেন কান পর্যন্ত। তরবারি ক্রীড়ায় তাঁর জুড়ি মেলা ভার।

পুত্রের ভাবভঙ্গি ব্যবহারে যোদ্ধার পূর্ণ লক্ষণ দেখে পিতা তারাগাই ছেলেকে পরামর্শ দিলেন, আমির কাজগানের সভায় যাওয়ার জন্যে। পিতার পরামর্শের মধ্যে ভাগ্যদেবীর আহ্বান শুনে তৈমুর রাজসভার দিকে যাত্রা করলেন!

তাঁর জীবনের আসল অ্যাডভেঞ্চার আরম্ভ হল।

দ্বিতীয় । ভাগ্যচক্র

সমরখন্দ। তৈমুর এখন আমির কাজগানের সভাসদ।

বিশ্বজয়ী চেঙ্গিজ খাঁর বংশধররা দুর্বল হয়ে পড়তেই আমির কাজগান মাথা তুলে দাঁড়ান; কিন্তু কাজগান বুঝেছিলেন, তাঁর দেহে রাজরক্ত নেই বলে কেউ তাঁকে রাজা বলে মানতে চাইবে না। কাজেই তিনি চেঙ্গিজের এক শান্তশিষ্ট আমোদপ্রিয় বংশধরকে লোক-দেখানো রাজা সাজিয়ে রাজকার্য পরিচালনা করেন নিজের হাতেই।

তৈমুরের দেহে রাজরক্ত নেই বটে, কিন্তু তিনি বার্লাস গোষ্ঠীর সর্দারের ছেলে। কাজেই আমির কাজগান সাগ্রহে তাঁকে আশ্রয় দিলেন। তৈমুরও নিজের সাহস, বুদ্ধি ও বীরত্বের পরিচয় দিতে দেরি করলেন না। এমনকী দু-একটা ছোটখাটো যুদ্ধও জিতে ফেললেন।

রাজসভায় যেসব তাতারের 'বীর' বলে খ্যাতি ছিল, যুদ্ধযাত্রাকে যারা শোভাযাত্রা বলে মনে করত, লোকে তাদের ডাকত 'বাহাদুর' নামে। আমির কাজগান লক্ষ করলেন, তৈমুর বয়সে তরুণ বটে, কিন্তু বাহাদুরদের দলে তাঁর প্রভাব প্রতিপত্তির সীমা নেই। তিনি বুঝলেন, তৈমুর হচ্ছেন অসাধারণ যুবক, তাঁর ভবিষ্যৎ সমুজ্জ্বল।

কিছুদিন যেতে না যেতেই তৈমুর আমিরের সামনে গিয়ে আবেদন জানালেন, 'আমি বার্লাস গোষ্ঠীর সর্দারের পদ প্রার্থনা করি।'

আমির কাজগান তৈমুরের এই ব্যস্ততা পছন্দ করলেন না; বললেন, 'অপেক্ষা করো। যথাসময়েই তোমার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হবে।'

আরও কিছুদিন যায়। আমিরের এক পরমাসুন্দরী দৌহিত্রী ছিলেন, নাম তাঁর আলজাই খাতুন আগা। তিনি এক রাজার মেয়ে।

আমির বললেন, 'আলজাই হবে তৈমুরের বউ।'

তৈমুরও তাঁকে দেখেছিলেন, কারণ সে সময়ে তাতার মুসলমানদের মেয়েরা পরদার আড়ালে বাস করতেন না। তীর্থযাত্রায় ঘোড়ায় চড়ে তাঁরা হতেন পুরুষদের সঙ্গিনী। তাতার নারীরা জানতেন, দিগবিজয়ীদের বংশে তাঁদের জন্ম—বন্ধুর পথের সমস্ত বিপদ অগ্রাহ্য করবার শক্তি তাঁদের আছে।

আলজাইয়ের বয়স পনেরো বৎসর। ঐতিহাসিকেরা বলেছেন, নতুন চাঁদের মতন ছিল তাঁর রূপ আর তাঁর দেহ ছিল তরুণ লতার মতন!

তৈমুরের সঙ্গে আলজাইয়ের বিবাহ হয়ে গেল; এবং এই বিবাহের ফলে তৈমুরের সম্মান যে বেড়ে উঠল, সে কথা বলা বাহুল্য। তিনি রাজকন্যার স্বামী ও শক্তিমান কাজগানের নাতজামাই!

বউ নিয়ে তৈমুর মহাসমারোহে সবুজ শহরে ফিরে এলেন। ভালো ভালো দামি জিনিস দিয়ে সাজালেন নিজের মস্ত বাড়ি। কুড়ি থেকে চব্বিশ বৎসর বয়স পর্যন্ত তৈমুরের জীবন কেটে গেল সুখস্বপ্নের মতন। তাঁদের একটি ছেলেও হল, তৈমুর তার নাম রাখলেন জাহাঙ্গির।

তৈমুর এখন একজন ছোটখাটো সেনাপতি, তাঁর হুকুম মানে এক হাজার সৈন্য। সমরখন্দের পশ্চিমে মরুভূমিতে গিয়ে তৈমুর নতুন নতুন যুদ্ধ জয় করলেন। সমরখন্দের দক্ষিণে পাহাড়ের পর পাহাড়ের উপত্যকা এবং সেখানে আছে বিখ্যাত হিরাট শহর। হিরাটের মালিক ছিলেন কাজগানের শত্রু। তৈমুর সেখানে গিয়ে লড়াই করে হিরাটের মালিককে বন্দি করে আনলেন।

কিন্তু তৈমুরের সৌভাগ্য-সূর্য যখন ঊর্ধ্বমুখে, তখন ঘটল এক দুর্ঘটনা।

একদিন আমির কাজগান শিকার করতে গিয়ে আর ফিরে এলেন না। দুই জন বিদ্রোহী সর্দার ধনুকের তির ছুড়ে তাঁকে হত্যা করলে।

খবর পেয়ে তৈমুর ঘটনাস্থলে ছুটে গেলেন। প্রথমে আমিরের সমাধির ব্যবস্থা করলেন, তারপর আবার দলবল নিয়ে ছুটলেন হত্যাকারীদের পিছনে।

হত্যাকারী সরদাররা প্রাণের ভয়ে আমু নদী পার হয়ে দুর্গম পাহাড়ে গিয়ে উঠল; কিন্তু সেখানে গিয়েও নিস্তার নেই—তৈমুরের কঠোর প্রতিজ্ঞা, হত্যাকারীদের হত্যা না করে তিনি আর দেশে ফিরবেন না। এ পাহাড়ে, ও পাহাড়ে—তারা যায় যেখানে, তৈমুরও হাজির হন সেখানে, ছায়া যেন অনুসরণ করছে পলাতক কায়াকে! তারপর চারিধার থেকে তাদের পালাবার পথ বন্ধ করে তৈমুর গিয়ে দাঁড়ালেন দুই হত্যাকারীর সম্মুখে। বিদ্যুতের মতন জ্বলে শূন্যে উঠল নিষ্ঠুর তরবারি,—ধুলায় পড়ে গড়িয়ে গেল দুই সর্দারের মুণ্ড।

প্রতিশোধ নিয়ে তৈমুর দেশে ফিরে এসে দেখলেন, রাজ্যের হালচাল সব বদলে গিয়েছে।

মধ্য এশিয়ার কোনও রাজা মারা পড়লে তাঁর ছেলে সিংহাসন দখল করতে পারেন—যদি তিনি সক্ষম হন! নইলে রাজ্যের বড় বড় সর্দাররা এক হয়ে পরামর্শ করে নতুন রাজা নির্বাচন করেন, কিংবা সিংহাসন নিয়ে হয় ঘরোয়া যুদ্ধের অবতারণা। ওখানকার প্রবাদই হচ্ছে 'তরবারি ধারণের শক্তি আছে যে হাতের, কেবল সেই হাতই ধারণ করতে পারে রাজদণ্ড!'

আমির কাজগানের ছেলে রাজদণ্ড ধারণের চেষ্টা করলেন বটে, কিন্তু চারিদিকে বিপদের মেঘ ঘনিয়ে উঠেছে দেখে হঠাৎ একদিন অদৃশ্য হলেন। তখন দিগবিদিক থেকে তাতারদের মধ্যে প্রধান হওয়ার জন্য যাঁরা এগিয়ে এলেন, তাঁদের মধ্যে ছিলেন তৈমুরের খুড়ো হাজি বার্লাস। অন্যান্য সামন্ত রাজা বা সর্দারেরা নিজের নিজের কেল্লায় ফিরে গিয়ে স্ব-সম্পত্তি রক্ষা ও পরস্বাপহরণের জন্যে সৈন্য সংগ্রহ করতে লাগলেন।

ঠিক এই সময়ে তৈমুরের সন্ন্যাসী পিতার মৃত্যু হল।

ওদিকে উত্তর দিকের পর্বতমালার পরপার থেকে মহান খাঁয়ের টনক নড়ল। চেঙ্গিজ খাঁর বংশধরদের মধ্যে যাঁরা সম্রাটের মতন সম্মান লাভ করতেন, 'মহান খাঁ' বলে ডাকা হত তাঁদেরই। সমরখন্দ প্রভৃতি স্থানে যাঁরা শাসন করতেন, তাঁরা নিজের নিজের এলাকায় যতটাই স্বাধীনতা প্রকাশ করুন, আসলে তাঁদের সকলকার মাথার উপরে থাকতেন ওই মহান খাঁ।

একদিন খবর পাওয়া গেল, মহান খাঁ সদলবলে আসছেন সমরখন্দের দিকে। বহু বৎসর আগে এ অঞ্চলে রাজবিদ্রোহ হয়েছিল, সে কথা হঠাৎ তাঁর মনে পড়ে গেছে; এবং সেই ওজর তুলে তিনি পেয়েছেন আজ রুদ্রমূর্তি ধারণ করবার সুযোগ।

শুনেই যত তাতার আমিরদের পিলে দস্তুরমতন চমকে গেল। তাঁরা তাড়াতাড়ি নানান রকম দামি দামি উপঢৌকন পাঠিয়ে মহান খাঁয়ের মন রাখবার চেষ্টা করলেন।

হাজি বার্লাস প্রথমে খাঁয়ের সঙ্গে লড়াই করবার জন্যে প্রস্তুত হতে লাগলেন; কিন্তু তারপরেই তাঁর সাহস গেল উবে! তিনি তৈমুরকে ডেকে বললেন, 'চলো, আমরা হিরাটের দিকে সরে পড়ি।'

কিন্তু তৈমুর বললেন, 'আপনি যেখানে ইচ্ছে যান, আমি খাঁয়ের সঙ্গে দেখা করব।'

তৈমুর বুঝেছিলেন, জাট মোগলের সর্বেসর্বা এই খাঁ কেবল তাঁর পূর্ব দাবি প্রতিষ্ঠার জন্যে এদিকে আসছেন না, তাঁর মনে প্রাপ্তির আশাও আছে বিলক্ষণ। তিনি আরও বুঝলেন যে, কয়েক শত অনুচর নিয়ে বারো হাজার জাট মোগলকে বাধা দিতে যাওয়া পাগলামি ছাড়া আর কিছুই নয়। অতএব তৈমুর স্থির করলেন, তিনি বাজি মাৎ করবেন কূট চালে।

নিজের সমস্ত অস্থাবর সম্পত্তি—অর্থাৎ ভালো ভালো ঘোড়া, সোনা-রুপো ও হিরা-মুক্তো নিয়ে জাট মোগলদের জন্যে অপেক্ষা করতে লাগলেন।

মোগলদের অগ্রদূত রূপে প্রথমে সসৈন্যে এল তিনজন সেনানী। তারা তৈমুরের শ্বেতপ্রাসাদের সামনে এসে দাঁড়াতেই তৈমুর সাদরে তাদের অভ্যর্থনা করলেন। তারপর তাদের জন্যে হল ভোজের বিপুল আয়োজন। ভোজের পরে প্রচুর উপঢৌকন পেয়ে সেনানীরা পরম পরিতুষ্ট হল।

তারপর তৈমুর চললেন আসল খাঁয়ের সঙ্গে দেখা করতে। তাঁর নাম তোগলক।

তৈমুর তোগলকের সামনে গিয়ে ঘোড়া থেকে নেমে, যথারীতি অভিবাদন করে বললেন, 'হে মহান খাঁ, হে আমার পিতা, আমি হচ্ছি বার্লাস গোষ্ঠীর সর্দার, সবুজ শহরে আমার বসতি।'

তৈমুরের নির্ভীক ও বীরোচিত মূর্তি দেখে তোগলক বিস্মিত হলেন। তারপর দামি দামি ভেট পেয়ে তাঁর মেজাজ এমন নরম হয়ে গেল যে, তৈমুর সত্যসত্যই বার্লাস গোষ্ঠীর সর্দার কিনা, সে সম্বন্ধে কোনও খোঁজ নেওয়া তিনি দরকার মনে করলেন না।

তৈমুর মনে মনে হেসে বললেন, 'হুজুরের জন্যে আমি আরও অনেক ভালো উপহার আনতে পারতুম, কিন্তু তিনটে কুকুর সেসব জোর করে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে।'

তোগলক খাপ্পা হয়ে বললেন, 'কে তারা?'

তৈমুর বললেন, 'পিতা, তারা হচ্ছে আপনারই তিনজন সেনানী।'

তোগলক বললেন, 'হ্যাঁ, তারা কুকুরই বটে; কিন্তু তারা হচ্ছে আমারই কুকুর আর তাদের লোভ হচ্ছে আমার চোখের বালির মতন!'

তিনি তখনই সেনানীদের কাছ থেকে সমস্ত ধনরত্ন কেড়ে আনবার হুকুম দিলেন।

কিন্তু যা হস্তগত করেছে তা হাতছাড়া করতে রাজি না হয়ে সেনানীরা পালিয়ে গেল এবং নতুন ফৌজ গঠন করে বিদ্রোহের পতাকা উত্তোলন করল।

তোগলক বললেন, 'তৈমুর, এখন উপায়?'

তৈমুর বললেন, 'পিতা, নিজের দেশে ফিরে গিয়ে বিদ্রোহ দমন করুন।'

তোগলক তাই করলেন এবং যাবার সময়ে তৈমুরকে দশ হাজার সৈন্যের সেনাপতি করে দিয়ে গেলেন। পূর্ববর্তী মোগল যুগে পূর্বপুরুষরা এই সম্মানেরই অধিকারী ছিলেন।

ওদিকে ভাইপোর চালাকির কথা শুনে খুড়ো হাজি বার্লাস হলেন চটে আগুন! তৈমুর ঘোড়া ডিঙিয়ে ঘাস খেতে চায়! স্নেহময় খুড়ো অন্যান্য সর্দারদের সঙ্গে পরামর্শ করে স্থির করলেন, তৈমুরকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে এনে হত্যা করতে হবে।

কিন্তু ষড়যন্ত্র সফল হল না, বুদ্ধিমান তৈমুর ফাঁদে পা দিলেন না। হাজি বার্লাস তখন সদলবলে তৈমুরকে আক্রমণ করবার জন্যে সবুজ শহরে এসে হাজির হলেন। তৈমুরের অধিকাংশ সঙ্গীও হাজি বার্লাসের দলে যোগদান করল। তৈমুর তখন নাচার হয়ে তাঁর স্ত্রীর ভাই কাবুলের আমির হুসেনের কাছে সাহায্য চেয়ে পাঠালেন।

আমির হুসেন ভগ্নীপতিকে সাহায্য করবার জন্যে আফগানি সৈন্যদের নিয়ে ছুটে এলেন। আট-নয় বৎসর এইভাবে কেটে গেল। তারপর আবার হঠাৎ একদিন এই ঘরোয়া যুদ্ধের মাঝখানে হল তোগলকের পুনরাবির্ভাব। হাজি বার্লাস দক্ষিণদিকে পালিয়ে গিয়ে প্রাণ হারালেন ডাকাতের হাতে। আমির হুসেন তোগলককে বাধা দিতে গেলেন, কিন্তু তিনিও যুদ্ধে হেরে পলায়ন করলেন।

তৈমুর কিন্তু মোগলদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করলেন না। তোগলক খুশি হয়ে তাঁকে সমরখন্দের সর্দার করে দিয়ে গেলেন।

কিন্তু তৈমুর খুশি হতে পারলেন না, কারণ তাঁর মাথার উপরে প্রধান হয়ে রইলেন তোগলকের পুত্র ও সেনাপতি বিকিজুক।

উপায়ান্তর নেই দেখে তৈমুর তখনকার মতন মনের রাগ মনেই চেপে রইলেন বটে, কিন্তু কিছুকাল পরে যখন দেখলেন সেনাপতি বিকিজুক সমস্ত সমরখন্দ লুণ্ঠন করছেন, মেয়েদের ধরে বাঁদি করে জাট মোগলদের দেশে পাঠিয়ে দিচ্ছেন, এমনকী পূজনীয় সৈয়দদেরও বন্দি করতে ছাড়ছেন না, তখন তিনি আর সহ্য করতে পারলেন না, জাট মোগলদের বিরুদ্ধে উত্তোলন করলেন বিদ্রোহের পতাকা।

তোগলক হুকুম পাঠালেন—'তৈমুরকে বধ করো!'

ঘোড়ায় চড়ে দেশ ছেড়ে তৈমুর চললেন মরুভূমির দিকে।

তৃতীয় । ভারতের দ্বারে প্রথম বার

মরুভূমি—আরক্ত, অনুর্বর, বিপুল শূন্যতার রাজ্য! তারই বুক-চেরা পায়ে চলা পথে রাঙা মাটির প্রলেপ—রোদের তাতে পুড়ে শুকিয়ে ফেটে চৌচির। দুপুরের বাতাস গরম ফুঁ দিয়ে হু হু করে বালি ছড়িয়ে এমন উড়ন্ত যবনিকার সৃষ্টি করে যে, প্রভাত ও বিকাল ছাড়া অন্য কোনও সময়ে তার ভিতর দিয়ে নজর চলে না।

কিন্তু এ আসল মরুভূমি নয়। কারণ এরই মধ্যে মাঝে মাঝে দেখা যায় শুষ্ক নদীর বাঁকা রেখা—তারা এগিয়ে গিয়েছে বৃহত্তর নদী আমুদরিয়ার কোলের দিকে। এসব নদীর ধারে ধারে ছোট ছোট লতাগুল্ম ও শরবন দেখা যায়। মাঝে মাঝে পাওয়া যায় কূপ। সেসব কূপের জল মানুষের ব্যবহারযোগ্য না হলেও, জন্তুরা তা পান করে সাগ্রহেই। এবং যেখানে যেখানে জল কতকটা চলনসই, সেখানেই তুর্কি জাতীয় যাযাবররা তাঁবু ফেলে বসে থাকে—দলে হালকা পথিকদের সাংঘাতিক অভ্যর্থনা করবার জন্যে!

স্থানীয় ভাষায় এই মরু-প্রান্তরের নাম হচ্ছে, 'রাঙা বালি'।

পলাতক তৈমুর নিলেন এই রাঙা বালির আশ্রয়। সঙ্গে তাঁর সহধর্মিণী আলজাই এবং জনকুড়ি বিশ্বস্ত অনুচর। প্রত্যেকেই অশ্বারোহী ও সশস্ত্র।

দিন কয় পথ চলবার পর এইখানেই তৈমুর তাঁর শ্যালক আমির হুসেনের দেখা পেলেন। তিনিও পলাতক ও রাজ্যহারা। হুসেনেরও সঙ্গে ছিলেন তাঁর স্ত্রী বিখ্যাত সুন্দরী দিলসাদ আগা, এবং এ-দলেও কয়েকজন সৈনিক ছিল।

তৈমুর প্রথমে খিভা শহরের দিকে যাত্রা করলেন; কিন্তু সেখানকার শাসনকর্তা তাদের আশ্রয় না দিয়ে করলেন সসৈন্যে আক্রমণ!

তৈমুর ও হুসেন আত্মরক্ষার জন্যে তাড়াতাড়ি একটা পাহাড়ের বা গিরিসঙ্কটের উপরে গিয়ে উঠলেন। শত্রুরা সংখ্যায় অনেক বেশি হলেও তৈমুরের অধীনস্থ তাতাররা একটুও ভয় পেলে না—কারণ ঘোড়ার পিঠে আসন পেতে ধনুক-বাণ ধরতে পারলে তাতার সৈনিকরা যমের সঙ্গেও লড়তেও পিছপা নয়!

তাতারদের এক কোমরে থাকে ছিলা-জোড়া ধনুক আর এক কোমরে বাণ-ভরা তূণ। তাদের ছোট ঢাল বাঁধা থাকে উপর হাতে এবং তরবারি বা গদাও তারা সঙ্গে রাখে; কিন্তু অন্য অস্ত্রের চেয়ে তারা ধনুক-বাণ ব্যবহার করতেই বেশি ভালোবাসে।

বিকট চিৎকার করতে করতে তাতাররা শত্রু দলের ভিতর গিয়ে পড়ল এবং বাণ ছুড়তে লাগল বৃষ্টিধারার মতন। শত্রুরাও উত্তর দিতে ছাড়লে না। দেখতে দেখতে দুই পক্ষের অনেকগুলো ঘোড়া হল আরোহীশূন্য।

তাতারদের মধ্যে একজন বীরের নাম এলচি বাহাদুর। তিনি শত্রুদের মাঝখানে গিয়ে এমন বেপরোয়ার মতন লড়াই করতে লাগলেন যে, তৈমুর নিজে গিয়ে হাত ধরে তাঁকে টেনে আনলেন।

আমির হুসেনও পড়লেন মহা বিপদে। তিনি ঘোড়া ছুটিয়ে শত্রুদের পতাকাবাহীর উপরে গিয়ে পড়ে তাকে বধ করলেন বটে, কিন্তু শত্রুব্যূহ ভেদ করে আর বেরিয়ে আসতে পারলেন না। তৈমুর তাড়াতাড়ি তাঁকে উদ্ধার করতে গেলেন এবং শত্রুরা তখন হুসেনকে ছেড়ে তাঁকেই আক্রমণ করলে। সেই ফাঁকে হুসেন সরে পড়লেন। তৈমুরের দুই হাতে যখন দুইখানা তরবারি শত্রুর রক্তে রাঙা হয়ে উঠেছে, অন্যান্য তাতার বীররা তখন তাঁর দুই পাশে গিয়ে দাঁড়াল।

তৈমুর চিৎকার করে বললেন, 'এইবারে সবাই দল বেঁধে একসঙ্গে শত্রুদের আক্রমণ করো!'

হঠাৎ একটা তিরে আহত হয়ে হুসেনের ঘোড়া প্রভুকে পিঠ থেকে ছুড়ে ফেলে দিলে। হুসেনের স্ত্রী বীরনারী দিলসাদ তখনই নিজের ঘোড়া ছুটিয়ে স্বামীর পাশে এসে দাঁড়ালেন। স্ত্রীর ঘোড়ায় চড়ে হুসেন আবার যুদ্ধে যোগদান করলেন।

এসব দিকে তখন তৈমুরের দৃষ্টি ছিল না; কারণ তাঁর প্রধান শত্রু খিভার শাসনকর্তাকে তখন তিনি সামনাসামনি পেয়েছেন! তখনই বেজে উঠল তাঁর ধনুকের ছিলা, এবং সঙ্গে সঙ্গে গণ্ডদেশে আহত হয়ে শাসনকর্তা হলেন 'পপাত ধরণীতলে!' পরমুহূর্তে অশ্বারোহণে নিপুণ তৈমুর ঘোড়ার পিঠ থেকে না নেমেই মাটির দিকে ঝুঁকে পড়ে একটা পরিত্যক্ত বর্শা তুলে ভূপতিত শত্রুর বুকে দিলেন আমূল বসিয়ে!

নেতার শোচনীয় পরিণাম দেখে শত্রুরা পলায়ন করলে।

তৈমুর যুদ্ধে জয়লাভ করলেন বটে, কিন্তু তাঁর পক্ষে বেঁচেছিল তখন সাতজন মাত্র সৈনিক এবং তারাও প্রত্যেকেই অল্পবিস্তর আহত।

তৈমুর কঠোর হাস্য করে বললেন, 'না, এখনও আমরা অদৃষ্ট পথের শেষে এসে হাজির হইনি!'

পাছে শত্রুরা আবার দলে ভারী হয়ে আক্রমণ করতে আসে, সেই ভয়ে তৈমুর রাত্রির অন্ধকার ভেদ করে অন্ধের মতন অগ্রসর হতে লাগলেন।

তারপর আবার এল প্রভাত এবং আবার এল রাত্রি এবং আবার দিনের আলোর পর রাত্রের অন্ধকার! এর মধ্যে আরও নতুন নতুন দুর্ভাগ্যেরও অভাব হল না।—

আমির হুসেন তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে দল ছেড়ে স্বদেশের দিকে যাত্রা করলেন। তৈমুরের সঙ্গে রইল মাত্র একজন অনুচর ও দুইটি ঘোড়া। মালবহনের জন্যে একটি ঘোড়া রেখে বাকি ঘোড়াটি স্ত্রীকে দিয়ে তৈমুর পদব্রজে চললেন মরু বালু দলন করে।

জীবনে এর অগে যিনি পায়ে হেঁটে পথ চলেননি এবং এর পরে যাঁর উপাধি হবে 'পৃথিবী জেতা', তাঁর দিকে তাকিয়ে আলজাই বললেন, 'স্বামী, আমাদের অদৃষ্ট এর চেয়ে মন্দ হতে পারে না!'

বারো দিন কাটল পথে-বিপথে। তারপর হল রাঙা বালির শেষ ও নতুন দুর্ভাগ্যের আরম্ভ।

সে অঞ্চলের সর্দারের নাম আলি বেগ। পলাতক তৈমুরকে দেখে সে বুঝলে, এঁকে হস্তগত করতে পারলে প্রচুর লাভের সম্ভাবনা। আলি বেগ তখনই তৈমুর ও তাঁর স্ত্রীকে একটা গোয়ালঘরে বন্দি করে রেখে জাট মোগলদের কাছে দূত পাঠালে।

কীট-পতঙ্গ ও দুর্গন্ধ ভরা জঘন্য গোয়ালঘর। রাজার জামাই ও সবুজ শহরের কর্তা তৈমুর এবং রাজার মেয়ে আলজাই তারই ভিতরে বসে মরুভূমির তপ্ত হাওয়ায় পুড়তে পুড়তে নরক-যন্ত্রণা ভোগ করতে লাগলেন। এইভাবে কাটল দুই মাস দুই দিন।

তৈমুর এমন কষ্টের কল্পনাও করেনি কোনওদিন। বিকৃত স্বরে তিনি বললেন, 'দোষী হোক আর নির্দোষই হোক—জীবনে কারুকে কখনও আমি বন্দি করে রাখব না!'

এদিকে তৈমুরের মূল্য কত হওয়া উচিত, তাই নিয়ে জাট-মোগলদের সঙ্গে দর-কষাকষি করতে করতে আলি বেগ তার লাভের সুযোগ হারাতে বাধ্য হল।

আলি বেগের দাদা ছিলেন পারস্য দেশের এক সর্দার। সমস্ত খবর শুনে তিনি বিরক্ত হয়ে ভাইকে চিঠি লিখলেন, 'জাট-মোগলদের সঙ্গে হয়েছে সবুজ শহরের কর্তার ঝগড়া। এর মধ্যে তোমার মাথা গলানো উচিত নয়।' সঙ্গে সঙ্গে তিনি তৈমুরের জন্যে পাঠিয়ে দিলেন অনেক মূল্যবান উপহার।

আলি বেগ অনিচ্ছাসত্বেও তৈমুরকে মুক্তি দিলে। দাদার পাঠানো উপহারগুলি বুদ্ধিমানের মতন নিজের ভাগে রেখে তৈমুরকে সে দান করলে একটা বেতো ঘোড়া ও একটা বুড়ো উট।

এত দুঃখেও মিষ্টি হাসি হেসে আলজাই বললেন, 'স্বামী, এখনও আমরা পথের শেষে আসিনি!'

শরৎকালের বৃষ্টি এল—এই সময়ে আমু নদীর তীরে এক নির্দিষ্ট স্থানে হুসেনের সঙ্গে তৈমুরের যোগদান করবার কথা।

কিন্তু তৈমুর একবার লুকিয়ে নিজের দেশটা দেখে আসবার লোভ সামলাতে পারলেন না। বিশেষত, একেবারে খালি হাতে সঙ্গীহীন কাঙালের মতন কুটুম্বের কাছে যাওয়ার ইচ্ছাও তাঁর হল না। হুসেন ছিলেন রীতিমতো জাঁকি মানুষ। তিনি নিজেকে কেবল তৈমুরের চেয়ে বুদ্ধিমান নয়, উচ্চশ্রেণির লোক বলেই মনে করতেন।

আলজাইকে কাছাকাছি একটা গ্রামে লুকিয়ে রেখে ছদ্মবেশী তৈমুর এসে হাজির হলেন সমরখন্দ শহরে।

কিন্তু সেখানকার গতিক সুবিধার নয়। জাট-মোগলদের দোর্দণ্ডপ্রতাপে সবাই সেখানে ভয়ে থরহরি কম্পমান। সমরখন্দের তাতারীরা চিরদিনই যোদ্ধা নেতার অনুগামী হতে অভ্যস্ত। মুসলমানদের মতন তাদের মধ্যে ধর্মান্ধতার প্রভাব ছিল না—তারা বীরধর্মে দীক্ষিত, যুদ্ধ ছাড়া আর কোনও কিছু নিয়ে মাথা ঘামাতে চাইত না। যে নেতা তাদের বীর্যকে জাগ্রত ও বিজয় গৌরবের পথে চালনা করতে পারতেন, তারা হত তাঁরই বিশ্বস্ত অনুচর।

কিন্তু তৈমুর হচ্ছেন যুবক ও সহায়-সম্বলহীন। তাঁর অনুগামী হয়ে দুর্দান্ত জাট-মোগলদের বিষ-দৃষ্টিতে পড়বার জন্যে তাদের আগ্রহ দেখা গেল না। তবু কয়েকজন ডানপিটে লোক তৈমুরের সঙ্গী হতে রাজি হল।

ওদিকে এরই মধ্যে মোগলরা তৈমুরের পুনরাবির্ভাব আবিষ্কার করে ফেললে। তৈমুর সঙ্গীদের নিয়ে সেখান থেকে অদৃশ্য হয়ে চুপিচুপি সবুজ শহরের ভিতরে প্রবেশ করলেন।

তাঁর প্রিয় সবুজ শহর! এইখানেই তাঁর জন্ম এবং এইখানেই কেটেছে তাঁর স্বপ্নময় শৈশব ও আনন্দময় প্রথম যৌবন!

আমির কাজগানের রণপ্রবীণ বাহাদুররা তখনও সবুজ শহরে বসে নিজেদের গৌরবোজ্জ্বল রক্তাক্ত অতীতের কথা ভেবে দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে। তৈমুরের আগমন সংবাদ তাদের কাছে পৌঁছোতে দেরি লাগল না। ছুটে এল এলচি বাহাদুর, জাকু বার্লাস প্রমুখ বীরবৃন্দ।

তারা বললে, 'তৈমুর, তৈমুর! ভগবানের ধরণী যখন এখন বিপুলা, তখন আমরা আর সংকীর্ণ শহরে চার দেওয়ালের মধ্যে আবদ্ধ থাকি কেন?'

তৈমুর দৃপ্ত কণ্ঠে বললেন, 'থামো বচনবাগীশের দল! কী তোমরা করতে চাও? তোমরা কি বাজপাখির মতন শিকারের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারবে? না, তোমরা হচ্ছ কাক, জাট-মোগলদের উচ্ছিষ্ট কুড়িয়ে খেয়েই দিনের পর দিন কাটাবে?'

বাহাদুররা বললে, 'ইয়ে আল্লা! আমরা কাক নই!'

নিজের ছোটখাটো দলটি নিয়ে তৈমুর চললেন হুসেনের সঙ্গে দেখা করতে। এ দলের অধিকাংশ লোকই সৈনিক বলে আত্মপরিচয় দিতে পারে না—তাদের কেউ হচ্ছে বন্য তুর্কিজাতীয় লোক, কেউ বা বিপদপ্রিয় আরব। উচ্চাকাঙ্ক্ষা বলতে তারা খালি বোঝে হানাহানি ও লুঠতরাজ! সৈনিক হিসাবে উচ্চশ্রেণির না হলেও তৈমুর পা দিয়েছেন যে দুর্গম পথে, তারা তার পক্ষে যোগ্য সহযাত্রীই বটে!

এ পথ দুর্বলের পথ নয়। মাইলের পর মাইল, এমনি পাঁচ শত মাইল ধরে নতোন্নত পথ চলেছে সুদীর্ঘ পর্বতশ্রেণির ভিতর দিয়ে—সর্বাঙ্গে মেঘচুম্বী শিখরের পর শিখরের ছায়া। গিরিসঙ্কটের মধ্যবর্তী এক নদীর তীর ধরে এই উচল পথ ঊর্ধ্বে, ঊর্ধ্বে,—ক্রমে আরও ঊর্ধ্বে গিয়ে ডুবে গিয়েছে প্রায় দেড় ফুট পুরু তুষাররাশির মধ্যে এবং অবশেষে গিয়ে পড়েছে একেবারে আফগানিস্তানের বুকের উপরে!

মহাপর্বতের হিমানী ক্ষেত্রের পর হিমানী ক্ষেত্র! তুষারার্ত ঝঞ্ঝাবায়ু হা হা রবে বয়ে যায় অধিত্যকার উপর দিয়ে—ধ্বনি-প্রতিধ্বনি জাগিয়ে পাহাড়ের রন্ধ্রে রন্ধ্রে! সেইখানে পড়ে যাত্রীদের তাঁবু। দিনের বেলায় কোনওদিকে ভালো করে তাকানো যায় না—কারণ, তুষার ক্ষেত্রের উপর তীব্র সূর্যকর পড়ে লক্ষ লক্ষ তীক্ষ্ণ ছুরির জ্বলন্ত শিখার মতন অন্ধ করে দেয় দৃষ্টিকে!

ঘোড়াদের গায়ে পশমি আবরণ, মানুষদের পরনে নেকড়ে ও নকুলজাতীয় পশুর চর্মে প্রস্তুত পোশাক। মাঝে মাঝে স্থানীয় গিরিদুর্গের ভিতর থেকে ভেসে আসে প্রহরী ও কুকুরের চিৎকার। মাঝে মাঝে লোভী আফগানিরা হিংস্র জন্তুর মতন এসে হানা দেয়! কিন্তু তারা জানত না যে কোন শ্রেণির বেপরোয়া গোঁয়ারদের সঙ্গে পাল্লা দিতে যাচ্ছে! প্রত্যেক বারেই তৈমুরের দল তাদের হারিয়ে যথাসর্বস্ব কেড়ে নেয়!

অবশেষে হিন্দুকুশের তুষার মুল্লুক ছাড়িয়ে তৈমুর কাবুলের উপত্যকার ভিতরে গিয়ে পড়লেন।

কাবুলের সিংহাসন দখল করেছেন তখন জাট-মোগলবংশের এক ব্যক্তি। আমির হুসেন স্বরাজ্য ত্যাগ করে পলাতক।

চতুর্থ । মেঘ আর বিদ্যুৎ

কাবুল থেকে কান্দাহারের পথ। তৈমুর হয়েছেন দক্ষিণের যাত্রী।

তারপর আমির হুসেনের সঙ্গে দেখা। হুসেনের দল তৈমুরের চেয়ে ভারী।

তুষারবর্ষী শীত—মানুষের দেহকে ভাসিয়ে বরফ করে দিতে চায়। তৈমুর ও হুসেন সদলবলে বিশ্রাম করতে লাগলেন।

তন্মধ্যে সিজিস্থানের এক সর্দার এসে তাঁদের বন্ধুত্ব প্রার্থনা করলেন। তাঁর প্রজারা বিদ্রোহী হয়েছে, তৈমুর ও হুসেন সর্দারের সঙ্গে যোগ দিয়ে বিদ্রোহ দমন করতে রাজি হলেন।

তৈমুর রাজি হলেন কেবল নতুন অ্যাডভেঞ্চারের লোভে। হুসেন রাজি হলেন এই ফাঁকে দক্ষিণ প্রদেশের প্রভু হওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষায়।

এই তিন যোদ্ধার সম্মিলিত শক্তির বিরুদ্ধে সিজিস্থানের বিদ্রোহীরা দাঁড়াতে পারলে না। দুর্গের পর দুর্গ বিদ্রোহীদের হাতছাড়া হতে লাগল।

অতি লোভী হুসেন ভাবলেন, দাঁও মারবার এই মস্ত সুযোগ! তিনি গ্রামের পর গ্রাম লুণ্ঠন করতে লাগলেন, চারিদিকে নিজের সৈন্যদের ঘাঁটি বসালেন।

নির্বোধ হুসেন! ব্যাপার দেখে খাপ্পা হয়ে সিজিস্থানের সর্দার বিদ্রোহীদের সঙ্গে সমস্ত গোলযোগ মিটিয়ে ফেললেন এবং তারপর আক্রমণ করলেন তৈমুর ও হুসেনকেই।

তৈমুরের রণকৌশলে সিজিস্থানীরা পরাজিত হল বটে, কিন্তু তিনি নিজে হলেন আহত। একটা তির এসে তাঁর হাতের হাড় ভেঙে দিলে, আর একটা এসে ঢুকল তাঁর পায়ের ভিতরে। হুসেনের নির্বুদ্ধিতার জন্যে শাস্তি পেতে হল তৈমুরকেই।

সেই গিরিরাজ্যের মধ্যে আহত ও অকর্মণ্য তৈমুরকে বিশ্রাম করবার পরামর্শ দিয়ে, হুসেন নিজের সৈন্যদল নিয়ে উত্তর দিকে যাত্রা করলেন।

খবর পেয়ে স্বামীর সেবা করবার জন্যে এলেন আলজাই। জন্মযোদ্ধা তৈমুর বাধ্য হয়ে অস্ত্র ছেড়ে গার্হস্থ্য জীবনযাপন করতে লাগলেন। কোলে বসে খেলা করে ছেলে জাহাঙ্গির, পাশে বসে মিষ্টি কথা বলেন সুন্দরী আলজাই, সামনের উপত্যকা দিয়ে আঙুরলতা দুলিয়ে বয়ে যায় ফুলগন্ধী বাতাস, রাতের চাঁদ উঠে তাঁদের পানে তাকায় আলোমাখা মুখে!

তৈমুরের কিন্তু শান্তি নেই—আলস্য তাঁর পক্ষে বিষ। বিপুল বিশ্ব জাগতে চায় যাঁর নখদর্পণে, ফুলের কুঞ্জে বসে দিবাস্বপ্ন দেখতে তাঁর ভালো লাগবে কেন?

কিন্তু উপায় নেই, দেহ অপটু। অশান্ত তৈমুরের মন করে ছটফট, চারিদিকে ঘোরাফেরা করেন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে।

কিছুকাল পরে অধীর স্বরে তিনি বললেন, 'নিয়ে এসো আমার ঘোড়া, নিয়ে এসো আমার তরবারি, নিয়ে এসো আমার বর্ম আর শিরস্ত্রাণ!'

তৈমুর আবার যোদ্ধার সাজ পরলেন। তিনি সিধে হয়ে দাঁড়ালেন বটে, কিন্তু হাঁটতে গেলেই তাঁকে খোঁড়াতে হয়। তাঁর পা আর সারল না, এবং তখন থেকেই তাঁর নাম হল তৈমুর লং বা খোঁড়া তৈমুর!

তৈমুরের হাতের ভাঙা হাড় তখনও জোড়া লাগেনি, তিনি ঘোড়ার লাগাম পর্যন্ত ধরতে পারেন না; কিন্তু তবু তাঁকে যাত্রা করতে হল।

শ্যালক হুসেন আবার এক কীর্তি করে বসেছেন। বোকার মতন তৈমুরের মানা না মেনে জাট-মোগলদের আক্রমণ করতে গিয়ে হেরে ভূত হয়েছেন। তৈমুর চলেছেন তাঁকেই সাহায্য করতে।

গিরিসঙ্কটের সামনেই এক নদী। সেইখানে ছাউনি ফেলে তৈমুর অপেক্ষা করছেন, এমন সময়ে একদিন এক ঘটনা।

পরিষ্কার রাত, ধবধবে চাঁদের আলো। আড়ষ্ট খঞ্জ পদকে কার্যক্ষম করে তোলবার জন্যে তৈমুর একাকী নদীর তীরে বেড়িয়ে বেড়াচ্ছেন।

ভোরের আভাস জাগল পূর্বাকাশে—তখনও তৈমুর বিনিদ্র।

আচম্বিতে দেখা গেল, গিরিসঙ্কটের অন্য পাশ দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে দলে দলে সশস্ত্র অশ্বারোহী। তৈমুর তখনই নিজের সৈন্যদের ডাক দিয়ে একলাই ছুটে গেলেন তাদের দিকে।

চিৎকার করে বললেন, 'কে তোমরা? কোথা থেকে আসছ? কোথায় যাচ্ছ?'

উত্তর এল, 'আমরা হচ্ছি প্রভু তৈমুরের ভৃত্য। আমরা তাঁরই খোঁজে চলেছি।'

সাবধানের মার নেই। তৈমুর বললেন, 'আমিও তৈমুরের চাকর। তোমরা যদি প্রভুর কাছে যেতে চাও, আমার সঙ্গে এসো।'

তিনজন লোক এগিয়ে এসেই তৈমুরকে চিনতে পেরে মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে সসম্মানে তাকে অভিবাদন করলে।

তখন তৈমুরও চিনলেন। এরা তাঁরই—অর্থাৎ বার্লাস গোষ্ঠীর তিন সর্দার।

তাদের মুখে খবর পাওয়া গেল, জাট-মোগলেরা আবার এমন অত্যাচার শুরু করেছে যে, সারা দেশের লোক খেপে উঠছে। দেশের লোক এখন দলপতিরূপে পেতে চায় আমির তৈমুরকেই।

এত বড় সুযোগ তৈমুর ছাড়লেন না। যদিও এখনও দেহ তাঁর প্রায় পঙ্গু, তবু তিনি ছাউনি তুলে ধরলেন দেশের পথ।

আমু নদীর তীর ধরে যাত্রা করেছেন জাট-মোগলদের সেনাপতি বিকিজুক। সঙ্গে তাঁর বিশ হাজার সুশিক্ষিত অশ্বারোহী সৈন্য।

আমু নদীর আর এক তীর ধরে অগ্রসর হয়েছেন তৈমুর। তাঁর অর্ধশিক্ষিত সৈন্যের সংখ্যা পুরো পাঁচ হাজারও হবে না।

আমু নদী ক্রমে সঙ্কীর্ণ হয়ে এল। তারপর একটি পাথরের সেতু। এক মাস পরে বিকিজুক এইখানে এসে তাঁবু ফেললেন।

তৈমুর নদীর এ তীরে মাত্র পাঁচ শত লোক রেখে বাকি সৈন্য নিয়ে লুকিয়ে নদী পার হলেন। তারপর পাহাড়ের আনাচে-কানাচে নিজের সৈন্যদের ছড়িয়ে দিয়ে সকলকে রাত্রির অন্ধকারে অর্ধচন্দ্রাকারে শত্রুব্যূহের দিকে অগ্রসর হতে বললেন, তাদের উপরে হুকুম রইল, তারা যেন সকলেই মশাল জ্বেলে এগিয়ে যায়।

গভীর রাত্রে জাট-মোগলরা সভয়ে দেখলে, তাদের তিন দিক বেষ্টন করে এক অগ্নিময় বিপুল অর্ধচক্র এগিয়ে আসছে! তারা ভাবলে, শত্রুরা সংখ্যায় অগণ্য!

ভোর হওয়ার আগেই ভীত জাট-মোগলরা বিশৃঙ্খল হয়ে পালাতে আরম্ভ করলে! তৈমুর তখন আক্রমণ করলেন বিপুল বিক্রমে।

ইতিমধ্যে আমির হুসেনও সসৈন্যে এসে পড়লেন। তিনি বললেন, 'পরাজিত শত্রুর অনুসরণ করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়।'

তৈমুর বললেন, 'ওরা এখনও পরাজিত হয়নি।'

অপটু দেহেও তৈমুর দ্বন্দ্বযুদ্ধে বিকিজুক ও অন্য দুইজন সেনাপতিকে স্বহস্তে হারিয়ে বন্দি করলেন। জাট-মোগলদের দুর্দশা দেখে সাহস সঞ্চয় করে দলে দলে তাতারী এসে তৈমুরের পক্ষে যোগদান করতে লাগল।

তারপরেই খবর এল মহান খাঁ তোগলক আর ইহলোকে বর্তমান নেই। পিতার গদিতে বসবার জন্যে যুবরাজ ইলিয়াজ তাড়াতাড়ি সমস্ত জাট সৈন্য নিয়ে তখনকার মতন স্বদেশের দিকে যাত্রা করলেন।

বিজয়ী তৈমুর তাঁর প্রিয় জন্ম নগর সবুজ শহর দখল করতে ছুটলেন। এখানেও তাঁর অপূর্ব কৌশলে জাট-মোগলরা হেরে গেল বিনা যুদ্ধেই।

তৈমুর এখানেও তাঁর সেপাইদের সবুজ শহরের চারিদিকে দূরে দূরে ছড়িয়ে দিলে। তারপর তারা অসংখ্য গাছের ডাল ভেঙে ধুলো ঝাঁট দিতে দিতে অগ্রসর হল।

নগরের জাট-মোগলরা দূরে যেদিকে তাকায়, সেই দিকেই দেখে পুঞ্জ পুঞ্জ ধুলোর মেঘ! তারা ভাবলে, না জানি কত সৈন্যই আসছে আমাদের আক্রমণ করবার জন্যে!

শহর ফেলে দিলে তারা পিঠ টান!

তৈমুর এক বিপুল বাহিনীকে হারিয়ে দিলে আগুনখেলা দেখিয়ে এবং একটি নগর দখল করলেন তুচ্ছ ধুলোরাশি উড়িয়ে!

তারপরেই তৈমুরের তারকা আর একবার হল নিম্নগামী।

নতুন মহান খাঁ ইলিয়াজ নিজের পরাজয় ভুললেন না। আবার তিনি সদলবলে এলেন তৈমুরকে শাস্তি দিতে।

এবারে জাট-মোগলরা সংখ্যায় তাতারীদের চেয়ে কম বটে, কিন্তু তাদের শিক্ষা, অস্ত্রশস্ত্র ও অশ্ব ছিল তাতারীদের চেয়ে ঢের উন্নত।

তৈমুর নিজের সৈন্যদল তিন অংশে বিভক্ত করলেন—দক্ষিণভাগ, মধ্যভাগ ও বামভাগ। দক্ষিণ ভাগ ছিল সমধিক প্রবল এবং বামভাগ ছিল সবচেয়ে দুর্বল। তৈমুর ইচ্ছা করেই নিজে বামভাগের ভার নিয়ে দক্ষিণভাগে পাঠিয়ে দিলেন আমির হুসেনকে। কথা রইল, দরকার হলেই হুসেন এসে তাঁকে সাহায্য করবেন।

এদিকে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন করে মুষলধারে বৃষ্টি নেমেছে। হা হা রবে গর্জন করছে ক্রুদ্ধ ঝটিকা! ভূমি কর্দমাক্ত, চলতে পা বসে যায়; নদী খেপে উঠেছে, চারিদিকে ছুটছে বন্যার প্রবাহ; ধনুকের ছিলা ভিজে গেছে—তাতারীদের প্রিয় অস্ত্র অচল।

তবু কেবলমাত্র তরবারি-বর্শা ও কুঠার নিয়ে তৈমুর সদলবলে দুর্দান্ত সিংহের মতন জাট-মোগলদের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। অস্ত্রে অস্ত্রে ঝনৎকার, মেঘে মেঘে বিদ্যুৎ—পৃথিবীতেও অসি-বর্শার বিদ্যুৎ-চমক, অঙ্গহীন দেহ—দেহহীন মুণ্ড, ভূমিতলে রক্তহাসির উচ্ছ্বাস, জাট-মোগলদের জয়নাদ 'দার উ গুর!' তাতারীদের জয়নাদ—'আল্লা হো আকবর!' গতির ঝড়, আহতদের মৃত্যু-চিৎকার!

তৈমুর শত্রুদের পতাকা কেড়ে নিলেন। পতাকা হারিয়ে জাট-মোগলরা হতাশভাবে পশ্চাৎপদ হতে লাগল।

এই সময়ে চাই হুসেনের দলকে! হুসেন এলেই যুদ্ধজয়!

তৈমুরের দূত হুসেনের কাছে ছুটে গিয়ে বললে, 'আমার প্রভু আপনাকে আহ্বান করেছেন—শীঘ্র আসুন!'

হুসেন চটে গিয়ে দূতের গালে প্রচণ্ড এক চড় বসিয়ে দিয়ে আমিরি চালে বললেন, 'তৈমুর আমাকে হুকুম দিতে চায়, আমি কি কাপুরুষ?'

দূতের মুখে সব শুনে তৈমুর অনেক কষ্টে ক্রোধ সংবরণ করলেন। তারপর হুসেনের দুই আত্মীয়ের দ্বারা বলে পাঠালেন, 'জাট-মোগলেরা পালাবার জন্য প্রস্তুত, এখন সকলে মিলে আক্রমণ করলে জয়ী হব আমরাই।'

হুসেন সক্রোধে বললেন, 'আমি কি পশ্চাৎপদ হয়েছি? তবে আমাকে বার বার অগ্রসর হতে বলা হচ্ছে কেন? সবুর করো, আগে আমি আমার সৈন্যদের এক জায়গায় এনে জড়ো করি!'

হুসেন তখনও গেলেন না। জাট-মোগলদের সংরক্ষিত সৈন্যরা তৈমুরকে ফিরে আক্রমণ করলে। ফল, তৈমুরের পরাজয়।

তৈমুর প্রতিজ্ঞা করলেন, 'হুসেনের সঙ্গে আর কখনও যুদ্ধযাত্রা করব না।'

হুসেন তাঁর কাছে লোক পাঠিয়ে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, 'চলো, আমরা ভারতবর্ষের দিকে যাই।'

তৈমুর তখন অগ্নিশর্মা হয়ে আছেন। উত্তর দিলেন, 'ভারতবর্ষে বা নরকে, তুমি যেখানে খুশি যাও, তাতে আমার কী?'

হুসেনের দোষে নিশ্চিত জয় তাঁর হাতছাড়া হয়ে গেল। এজন্যে হুসেনকে তিনি জীবনে আর ক্ষমা করেননি। তৈমুরের শত্রুতা যে কী নিষ্ঠুর, হুসেন অল্পদিন পরেই তা বুঝতে পেরেছিলেন।

তৈমুর আবার সমরখন্দে ফিরে এসে দেখলেন, নিয়তির ভাণ্ডারে তাঁর জন্যে আরও নিদারুণ দুঃখ সঞ্চিত হয়ে আছে।—

তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী আলজাইকে মৃত্যু এসে হঠাৎ কেড়ে নিয়ে গেল।

কিন্তু এখন শোকের সময় নেই। সারা দেশ ছেয়ে ছুটে আসছে বিজয়ী শত্রুরা পঙ্গপালের মতন! বাধা দিতে হবে, তাদের বাধা দিতে হবে!

পঞ্চম । মুকুট ও সিংহাসন

'মদ্য, নৃত্য ও সংগীতের সময় এসেছে! নৃত্যের ক্ষেত্র হচ্ছে রণক্ষেত্র; সংগীত হচ্ছে অস্ত্রের ঝনৎকার আর যোদ্ধার জয়নাদ; এবং মদ্য হচ্ছে শত্রুর রক্ত!'—এই হল তৈমুরের উক্তি।

কিন্তু এই অপূর্ব 'মদ্য, নৃত্য ও সংগীত' উপভোগের শক্তি হল না তৈমুরের। মহান খাঁ ইলিয়াজের সঙ্গে লড়াই করতে পারে, তাঁর অধীনে এমন সৈন্য আড়াই শতের বেশি নেই। অতএব তৈমুর অসাধ্যসাধনের চেষ্টা করলেন না।

দিনের বেলায় যথাসময়ে নমাজ করা এবং মসজিদে গিয়ে কোরান পাঠ শ্রবণ করা হল তাঁর প্রধান কর্তব্য। রাত্রে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে বসে থাকেন দাবার ছকের সামনে। প্রতিপক্ষ না থাকলেও একলাই ঘুঁটি সাজিয়ে খেলা করেন। তিনি ছিলেন একজন বিখ্যাত দাবা-খেলোয়াড়। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী খুঁজে পাওয়া যেত না।

তৈমুর একদিন একা একা দাবা খেলছেন, এমন সময় সমরখন্দ থেকে একদল মোল্লা এসে হাজির।

'খবর?'

'বড় শুভ খবর! ভগবান তাঁর ভক্তদের দিকে মুখ তুলে চেয়েছেন।'

'তার মানে?'

'অবিশ্বাসীদের হাতে সমরখন্দ, এখনও আত্মসমর্পণ করেনি। যদিও আমির হুসেন আর তৈমুরের সাহায্য পায়নি, তবু সমরখন্দের যোদ্ধারা শত্রুদের বাধা দেবার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করে এসেছে। আজ চেষ্টার ফল ফলেছে।'

'যুদ্ধে জয় হয়েছে?'

'বিনা যুদ্ধে জয় হয়েছে। ভগবানের প্রেরিত কী এক মহামারির কবলে পড়ে জাট-মোগলদের অধিকাংশ ঘোড়া মারা গিয়েছে!'

তৈমুরের মুখ প্রফুল্ল হয়ে উঠল। তিনি জানতেন, ঘোড়া হারালে জাট-মোগলদের আর কোনও জারিজুরিই থাকে না—এমনকি তারা হারিয়ে ফেলে যুদ্ধ করবার সমস্ত শক্তিই।

মোল্লারা সানন্দে জানালেন, 'জাট-মোগলরা অস্ত্রশস্ত্র কাঁধে নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। পৃথিবীতে এর আগে কেউ কোনও দিন জাট সৈনিকদের পায়ে হেঁটে চলতে দেখেনি! তাতার অশ্বারোহীরা সুযোগ পেয়ে শত্রুদের কুকুরের মতন তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে!'

তৈমুর বুঝলেন, আবার তাঁর আলস্যের দিন হল গত। এসেছে তাঁর অপূর্ব 'মদ্য, নৃত্য ও সংগীত' উপভোগের সময়!

খবর পেয়ে আমির হুসেনও সমরখন্দে ছুটে এলেন। সমরখন্দের উপরে তাঁর দাবি সর্বাগ্রে। তিনি এখানকার ভূতপূর্ব আমিরদের নাতি। সমরখন্দের বাসিন্দারা মহোৎসবের ভিতর দিয়ে সাদরে গ্রহণ করলে তাঁকে।

খ্যাতি-প্রতিপত্তিতে তৈমুরও ছিলেন হুসেনের সমযোগ্য, কিন্তু তিনি রাজবংশে জন্মগ্রহণ করেননি। তাঁকে তুষ্ট রাখবার জন্যে হুসেন তাঁকে সবুজ শহর ও তাঁর আশপাশের অনেকখানি জায়গা ছেড়ে দিলেন।

চলতি নিয়ম অনুসারে চেঙ্গিজ খাঁয়ের এক বংশধরকে সিংহাসনে বসিয়ে হুসেন তাঁর নামেই রাজ্য চালাতে লাগলেন।

তৈমুর মুখে কোনও প্রতিবাদ করলেন না; কিন্তু মনে মনে জানতেন, হুসেনের সঙ্গে তাঁর সদ্ভাব বজায় থাকা অসম্ভব। হুসেন তাঁর শ্যালক হলেও আলজাইয়ের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের সমস্ত আত্মীয়তার সম্পর্ক চুকে গিয়েছে। হুসেন তাঁকে ছোট নজরে দেখেন, বহুবার তাঁকে অপমান বা অবহেলা করেছেন, বিপদে ফেলেছেন। তারপর হুসেনের জন্যে তাঁর শেষ পরাজয়ের জ্বালা কখনও তিনি ভুলতে পারবেন না।

এক আকাশে হাজার হাজার ছোট তারা থাকতে পারে, কিন্তু কে কবে শুনেছে একাধিক সূর্যের কথা?

কিছুদিন পরেই ছোট-বড় এটা-ওটা-সেটা নিয়ে মনান্তর আর মতান্তর হতে লাগল। দুজনেই যেখানে প্রভু হতে চায়, সেখানে গৃহ কলহ বাঁধতে কতক্ষণ?

কী নিয়ে যে আসল ঝগড়া বাঁধল, ইতিহাসে লেখা নেই, কিন্তু আরম্ভ হল যুদ্ধ। কেউ নিলে হুসেনের পক্ষ, কেউ নিলে তৈমুরের পক্ষ এবং দুই পক্ষেই রক্তপিপাসা সমান প্রবল। দেশ জুড়ে জেগে উঠল অস্ত্র ঝঞ্জনা এবং তারই মাঝে মাঝে হঠাৎ জাট-মোগলরা আবির্ভূত হয়ে দুই পক্ষেরই উপরে দুরন্ত ঈগলের মতন ছোঁ মেরে চলে যায়!

এই ভাবে কেটে গেল দীর্ঘ ছয় বৎসর!

বলা বাহুল্য, প্রথম প্রথম তৈমুরের চেয়ে হুসেনের পক্ষই ছিল সমধিক প্রবল। কিন্তু বীরত্বে, সাহসিকতায়, বুদ্ধি-চাতুর্যে ও কৌশলে তৈমুরের সঙ্গে যে হুসেনের তুলনাই হয় না, তার প্রমাণ এর আগেও পাওয়া গিয়েছে বারংবার। দেখতে দেখতে তৈমুর কেবল দলে ভারীই হয়ে উঠলেন না, যুদ্ধের পরে যুদ্ধ জয় ও কেল্লার পর কেল্লা দখল করতে লাগলেন। এসব ছোট ছোট যুদ্ধের আলাদা আলাদা বর্ণনা দেওয়ার দরকার নেই।

হুসেনের ব্যবহারও ছিল না ভদ্র ও মিষ্ট। সে জন্যেও অনেক সর্দার তার পক্ষ ত্যাগ করতে বাধ্য হলেন।

একদিন তৈমুর সদলবলে উপবিষ্ট। হঠাৎ একটি মানুষ নিতান্ত ঘরের লোকের মতন সভায় এসে, অন্যান্য সভাসদদের মাঝখানে গিয়ে বসে পড়লেন বিনাবাক্যব্যয়ে!

সবাই সবিস্ময়ে চিনলে, তিনি হচ্ছেন হুসেনের দলের এক মস্তবড় মাতব্বর ও মাথাওয়ালা লোক। তাঁর নাম সর্দার মঙ্গলি বোগা, জাতে মোগল—তৈমুরের এক প্রধান শত্রু! তৈমুর কিন্তু ব্যাপারটা বুঝলেন। কোনওরকম বিস্ময় প্রকাশ না করে মঙ্গলির দিকে দিলেন খাবারের থালা এগিয়ে।

খাবার খেয়ে মঙ্গলি বললেন, 'আজ আমির তৈমুরের লুন খেলুম। আজ থেকে আমি আর কারুর দিকে ফিরে তাকাব না।'

কিছুকাল পরে এই সর্দার মঙ্গলি বুদ্ধির জোরে তৈমুরকে একটি যুদ্ধে জয়ী করেছিলেন।

তৈমুরের তাতারিদের সঙ্গে কারা ইউসুফ নামে এক তুর্কি সর্দারের বিষম লড়াই বেঁধেছিল। তুর্কিরা এমন ভাবে তাতারিদের ঘিরে ফেললে যে, তৈমুরের জয়লাভ করবার কোনও সম্ভাবনাই আর দেখা গেল না।

হঠাৎ মঙ্গলি করলেন কী, মাটির দিকে হেঁট হয়ে পড়ে এক মৃত তুর্কির দেহ থেকে তার দাড়ি-গোঁফওয়ালা মাথা-কামানো মুণ্ডটা বিচ্ছিন্ন করে নিয়ে নিজের বর্শাদণ্ডের আগায় বসিয়ে দিলেন।

তারপর শূন্যে বর্শাদণ্ড নাচাতে নাচাতে তাতারিদের দলে ঢুকে বিকট চিৎকার করে বললেন, 'জয়, জয়! দ্যাখো—দ্যাখো, আমি কারা ইউসুফকে বধ করেছি! এই দ্যাখো তার মুণ্ড!'

তাতারিরা বিপুল আনন্দে যেন খেপে উঠে দ্বিগুণ উৎসাহে লড়তে লাগল এবং সেনাপতির মৃত্যুসংবাদ শুনে তুর্কিরা হতাশ হয়ে বেগে পালাতে আরম্ভ করলে। তারা এমন অন্ধের মতন পালাতে লাগল যে, তাদের দেহের ঠেলার চোটে অত্যন্ত জীবন্ত ও অত্যন্ত ক্রুদ্ধ কারা ইউসুফকেও ইচ্ছার বিরুদ্ধে বাধ্য হয়ে পলায়ন করতে হল!

ছয় বছর পরে দেখা গেল, তৈমুরের দল যেমন ভারী, হুসেনের দল তেমনি হালকা। হুসেন শেষ-যুদ্ধ দিলেন ইতিহাসখ্যাত বাল্ক শহরে। সেখানেও বিজয়লক্ষ্মী হলেন তাঁর প্রতি বিমুখ।

তৈমুরের কাছে হুসেন তখন আর্জি জানালেন, 'আমি পরাজয় স্বীকার ও রাজ্য ত্যাগ করছি। তুমি আমাকে মক্কায় যেতে অনুমতি দাও।'

তৈমুর নারাজ হলেন না।

তারপর কী হল সঠিক জানা যায়নি। তবে শোনা যায়, তৈমুরের দুইজন সেনানী প্রভুর মতামতের অপেক্ষা না রেখেই, গোপনে হুসেনকে হত্যা করে। খুব সম্ভব, তৈমুর ব্যাপারটা আগেই জানতে পেরেছিলেন, কিন্তু বাধা দেবার চেষ্টা করেননি।

তৈমুর বাল্ক শহর ত্যাগ করলেন না। স্থির করলেন, এই শহরে বসেই তিনি দূর করবেন ভবিষ্যতের সমস্ত অনিশ্চয়তা। তাঁর একমাত্র প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী পরলোকে, নিজেকে জাহির করবার এত বড় সুযোগ ত্যাগ করা হচ্ছে মূর্খতা। তিনি বুঝেছিলেন, হুসেনের অবর্তমানে তাতার সর্দাররা একত্র সমবেত হয়ে নতুন এক আমির নির্বাচন করতে আসবেন।

বাল্ক হচ্ছে আফগানিস্তানের অতি পুরাতন শহর। ইতিহাস-পূর্ব যুগে এই নগরে পারসি ধর্ম প্রবর্তক জোরোয়াস্তারের জন্ম ও মৃত্যু হয়েছিল। একসময়ে এখানে যে বৌদ্ধধর্মেরও প্রভাব ছিল, একটি বুদ্ধমূর্তির ধ্বংসাবশেষ সে প্রমাণ করে দেয়। গ্রিকদের ইতিহাস বিখ্যাত ব্যাকট্রিয়ার রাজধানী হয়ে এই নগর ব্যাবিলনের মতোই সমৃদ্ধিশালী হয়ে উঠেছিল। আলেকজান্ডার দি গ্রেট খ্রিস্টপূর্ব ৩২৮ অব্দে এই নগর আক্রমণ ও অধিকার করেছিলেন। ১২২০ খ্রিস্টাব্দে মোগল দিগবিজয়ী চেঙ্গিজ খাঁর হস্তে বাল্ক পরিণত হয়েছিল ধ্বংসস্তূপে। তারপর তৈমুর আবার একে গড়ে তোলেন। লোকে একে ডাকে 'নগরমাতা' বলে।

চারিদিক থেকে বাল্ক শহরে এসে জড়ো হলেন দলে দলে তাতার সর্দার। মস্ত সভা বসল। চলল তর্কাতর্কি। তৈমুর কিন্তু সভায় যোগ না দিয়ে তফাতে বসে দেখতে লাগলেন, বাতাসের গতি কোন দিকে!

এই কিছুকাল আগে তৈমুর পথে পথে ঘুরে বেড়াতেন নিরাশ্রয় ভবঘুরের মতন। তিনি বড় বংশের ছেলে হলেও তাঁর দেহে নেই রাজরক্ত। কাজেই তাঁর প্রতিপক্ষের অভাব হল না।

তৈমুরের দলভুক্ত সর্দাররা বললেন, 'রাজ্যকে সুশাসিত করতে হলে একজন যোগ্যতম প্রধান ব্যক্তির দরকার। তৈমুরের চেয়ে যোগ্য ব্যক্তি কেউ নেই।'

আর একদল বললেন, 'প্রচলিত বিধি অনুসারে কোনও তাতারই মুকুট ধারণ করতে পারবে না। সিংহাসনে বসাতে হবে চেঙ্গিজ খাঁয়ের কোনও বংশধরকে!'

মোল্লারা বললেন, 'মোগলরা হচ্ছে অবিশ্বাসী—ইসলামের বিরোধী। পুরোনো নিয়ম চুলোয় যাক—তৈমুর হচ্ছেন মুসলমান, তিনি বিধর্মীর অধীন হতে যাবেন কেন? চেঙ্গিজ খাঁয়ের তরবারির চেয়ে তৈমুরের তরবারি ছোট নয়!'

তৈমুরের দলই জয়ী হলেন। আজ থেকে তিনি হলেন স্বাধীন নৃপতি। ভারতবর্ষ থেকে অ্যারাল সমুদ্রতীর পর্যন্ত বিশাল রাজ্য হল তাঁর হস্তগত।

তৈমুরের দৃষ্টি ফিরতে লাগল পূর্বে পশ্চিমে উত্তরে দক্ষিণে! এইবার আরম্ভ হবে তাঁর দিগবিজয়ী জীবন।

ষষ্ঠ । সাম্রাজ্য ও দুর্ভাগ্য

সৈনিক তৈমুর আজ আমির তৈমুর!

এতকাল তিনি অস্ত্র ধারণ করেছেন সবল হস্তে। এবার কতখানি যোগ্যতার সঙ্গে তিনি রাজদণ্ড ধারণ করেন, তা দেখবার জন্যে সকলেই কৌতূহলী হল।

যারা ভেবেছিল রাজ্যচালনায় অনভ্যস্ত এই নতুন রাজার অনভিজ্ঞতার সুযোগে ঐশ্বর্য ভাণ্ডার দুই হাতে লুণ্ঠন করবে, দু-দিন পরেই ভেঙে গেল তাদের সুখ-স্বপ্ন!

তৈমুরের হাত দরাজ বটে, কিন্তু তাঁর তীক্ষ্ণদৃষ্টি ফেরে রাজ্যের প্রত্যেক বিভাগে। তাঁকে ফাঁকি দেওয়া অসম্ভব!

এবং যারা ভেবেছিল বন্ধুত্ব বা আত্মীয়তার খাতিরে তৈমুর এর-ওর-তার হাতে প্রচুর ক্ষমতা ছেড়ে দেবেন, তাদেরও হতে হল হতাশ।

তৈমুরের কাছে যে কোনও সময়ে যে কোনও বন্ধুর অবারিত দ্বার ছিল বটে, কিন্তু রাজ্য চালনার বলগা রইল একমাত্র তাঁর নিজের হাতেই। কোনও বিশেষ প্রিয়পাত্রকেও তিনি রাজদণ্ড স্পর্শ করতে দিলেন না।

এবং যারা ভেবেছিল রাজদণ্ড লাভ করে তৈমুর তাঁর তরবারিকে আর কোষমুক্ত করবেন না, তাদেরও বড় আশায় পড়ল ছাই।

সিংহাসনের উপরে বসে তৈমুর দেখলেন, রাজ্যের উত্তর দিকে পার্বত্য অঞ্চলে জাট-মোগলেরা এখনও যখন-তখন হানা দিতে ছাড়ছে না—গ্রামের পর গ্রাম সমর্পিত হচ্ছে সর্বগ্রাসী অগ্নির লেলিহান শিখায়—হাজার হাজার রক্তাক্ত তরবারির উত্থান-পতনে দিকে দিকে উঠছে গগনভেদী হাহাকার!

তৈমুর বুঝলেন, আত্মরক্ষার সর্বশ্রেষ্ঠ উপায় হচ্ছে প্রতিপক্ষকে আক্রমণের সুযোগ না দিয়ে আক্রমণ করা। জাট-মোগলেরা আক্রমণ করতে যেমন অভ্যস্ত, আত্মরক্ষা করতে তেমন নয়।

তৈমুর জাট-মোগলদের বিরুদ্ধে সৈন্য প্রেরণ করলেন। তারা জাট-মোগলদের দেশে গিয়ে চতুর্দিকে করলে বিষম অশান্তির সৃষ্টি। তারা গ্রামের পর গ্রামে আগুন ধরিয়ে দিলে, সর্বত্রই চলতে লাগল লুণ্ঠন, হত্যা ও অত্যাচারের অবিরাম লীলা। জাট-সৈনিকরা বাধা দিতে এসে বারবার হল পরাজিত। জাট-মোগলরা পরের উপরে যে ঔষধ প্রয়োগ করত, এবারে নিজেরা সেই ঔষধ খেতেই বাধ্য হল। তখন দায়ে পড়ে তাঁরা হার মানলে এবং তৈমুরকে স্বীকার করলে।

তারপর তৈমুরের দৃষ্টি ফিরল প্রতিবেশী রাজা-রাজড়াদের দিকে। খিভা, উরগঞ্জ ও অ্যারাল সমুদ্রের অধিপতির নাম ছিল খারেজমের সুফি।

সুফির সুন্দরী মেয়ের নাম খান জেদ। দূত-মুখে তৈমুর জানালেন, নিজের ছেলে জাহাঙ্গিরের সঙ্গে তিনি রাজকন্যা খান জেদের বিয়ে দিতে চান।

এ প্রস্তাবে সুফির বংশমর্যাদায় আঘাত লাগল। ভবঘুরে তৈমুর ভুঁইফোঁড় রাজা হয়েছেন বটে, কিন্তু আজও তিনি আভিজাত্যের গর্ব করতে পারেন না। অতএব সুফি বলে পাঠালেন, 'তোমার ছেলের সঙ্গে আমার মেয়ের বিয়ে অসম্ভব।'

অসম্ভব? আজ তৈমুরের কাছে কিছুই অসম্ভব নয়। তাঁর শতযুদ্ধজয়ী তরবারি সব অসম্ভবকেই সম্ভবপর করতে পারে।

সিংহাসন থেকে নেমে তৈমুর আবার পরলেন বর্ম এবং হাতে নিলেন চর্ম, তরবারি ও ধনুর্বাণ। সামন্ত রাজারা সদলবলে ছুটে এসে দাঁড়ালেন তাঁর পতাকার তলায়। তৈমুর করলেন যুদ্ধযাত্রা।

প্রথমেই হল খিভার পতন। তারপর তৈমুর উরগঞ্জ অবরোধ করলেন।

সুফি বলে পাঠালেন, 'তৈমুর, ঝগড়া কেবল তোমাতে-আমাতে। আমাদের ব্যক্তিগত ঝগড়ার জন্যে হাজার হাজার লোক প্রাণ দেবে কেন? তার চেয়ে এসো, আমরা দুজনেই দ্বন্দ্বযুদ্ধ করি।'

তৈমুর বললেন, 'উত্তম! রাজি। তোমার নগরের সিংহদ্বারের সামনেই আমাদের দ্বন্দ্বযুদ্ধ হবে।'

সেনাপতিরা বললেন, 'তোমার স্থান সিংহাসনে। তুমি দেবে হুকুম, আমরা করব হুকুম পালন। আমরা থাকতে তুমি তরবারি ধরবে কেন?'

তৈমুর বললেন, 'তা হয় না। সুফির কোনও সেনাপতি আমাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে আহ্বান করলে আমি তোমাদেরই কারুকে পাঠাতে পারতুম। কিন্তু আমাকে আহ্বান করেছেন একজন রাজা, সুতরাং আমাকে নিজেই যেতে হবে।'

তৈমুর ঘোড়া ছোটালেন। সৈফুদ্দিন নামে এক প্রাচীন সেনানী দৌড়ে গিয়ে তাঁর ঘোড়ার রাশ চেপে ধরে বললেন, 'না প্রভু, একজন সাধারণ সৈনিকের মতন এমন করে আপনি যুদ্ধে যেতে পারবেন না।'

তাঁর এই অতি-ভক্ত অনুচরটিকে মুখে কোনও জবাব না দিয়ে তৈমুর নিজের তরবারির উলটো পিঠের দ্বারা তাঁকে আঘাত করতে গেলেন।

সৈফুদ্দিন আঘাত এড়াবার জন্যে তাড়াতাড়ি ঘোড়ার রাশ ছেড়ে সরে এলেন।

শত্রু নগরের প্রাচীরের উপরিভাগ তখন লোকে লোকারণ্য হয়ে গিয়েছে,—আমির তৈমুর স্বয়ং একাকী এসেছেন প্রধান সিংহদ্বারের সামনে! সকলেই অবাক ও হতভম্ভ!

তৈমুর হাঁক দিলেন, 'ওহে, তোমাদের কর্তা সুফিকে খবর দাও। বলো, আমির তৈমুর তাঁর জন্যে অপেক্ষা করছেন।'

অদ্ভুত সাহস ও বীরত্ব! শত শত বল্লম ও ধনুক উদ্যত হয়ে আছে তাঁর মাথার উপরে, কিন্তু তৈমুরের ভ্রূক্ষেপও নেই! আমির তৈমুর আজও যুবকের মতনই ডানপিটে!

তৈমুর তাঁর ঘোড়া 'বাদামি ছোকরা'র পিঠে চড়ে অনেকক্ষণ এদিক-ওদিক করলেন, কিন্তু সুফির দাড়ির প্রান্তটুকুও দেখা গেল না!

তৈমুর ক্রুদ্ধ স্বরে বললেন, 'যে নিজের বাক্যরক্ষা করতে পারে না, সে নিজের প্রাণও রক্ষা করতে পারবে না!' তারপর ফিরে গেলেন নিজের দলে।

আমিরকে অক্ষত দেহে নিরাপদে ফিরে আসতে দেখে সৈন্যরা সমস্বরে জয়ধ্বনি করে উঠল—আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে বাজতে লাগল কাড়া-নাকাড়া এবং তূরী-ভেরি!

কিন্তু আর বেশিদিন তৈমুরকে নগর অবরোধ করে থাকতে হল না। তাঁর কথা ফলে গেল দৈববাণীর মতন। সুফি হঠাৎ রোগশয্যায় শুয়ে প্রাণত্যাগ করলেন। নগরবাসীরাও করলে আত্মসমর্পণ। সুফির মস্ত রাজ্য হল তৈমুরের হস্তগত, এবং রাজকন্যা খান জেদের পাণিপীড়ন করলেন তৈমুর পুত্র জাহাঙ্গির।

সে সময়ে ও-অঞ্চলে ভারত সীমান্তের হিরাট শহরের নামডাক ছিল অসাধারণ। মস্ত বড় শহর, তার মধ্যে বাস করে আড়াই লক্ষ মানুষ। তখনকার দিনে এত বেশি জনসংখ্যার জন্যে গর্ব করতে পারে পৃথিবীতে এমন শহর দুই-তিনটির বেশি ছিল না—লন্ডন ও প্যারিসেরই লোকসংখ্যা ছিল ষাট হাজারের মধ্যে। হিরাটের মধ্যে বিদ্যালয় ছিল কয়েক শত, স্নানাগার ছিল তিন হাজার এবং দোকান ছিল প্রায় দশ হাজার।

হিরাটের অধিপতির উপাধি 'মালিক'। তৈমুর দূত পাঠিয়ে জানতে চাইলেন, মালিক তাঁর সামন্ত রাজা হতে রাজি আছেন কি না?

না, মালিক রাজি নন। উলটে তৈমুরের দূতকে তিনি করলেন বন্দি।

নগ্ন অসি হস্তে তৈমুর আবার সসৈন্যে বেরিয়ে পড়লেন। হিরাটের পতন হতে দেরি লাগল না।

এই হিরাটের যুদ্ধে তৈমুরের দেহের দুই জায়গায় বিদ্ধ হয়েছিল দুইটি তির। অধিকাংশ সেনাপতির মতন তৈমুর কখনও নিজে নিরাপদ জায়গায় দাঁড়িয়ে সৈন্য চালনা করতেন না। যুদ্ধ যেখানে ভয়াবহ, তৈমুরকে দেখা যেত সেইখানেই।

হিরাট জয়ের পরে তৈমুরের রাজ্য হল চারিদিকে বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত। 'সবুজ শহর' সুন্দর নগর বটে, কিন্তু এত বড় রাজ্যের রাজধানী হওয়ার উপযোগী নয়। তৈমুর তখন সমরখন্দকে নিজের রাজধানী বলে ঘোষণা করলেন।

অতি প্রাচীন নগর এই সমরখন্দ। তৈমুরের আগে আরও দুইজন বিশ্ববিখ্যাত দিগবিজয়ী এখানে এসে আস্তানা গেড়েছিলেন—আলেকজান্ডার দি গ্রেট ও চেঙ্গিজ খাঁ।

সমরখন্দের খ্যাতি অসামান্য হলেও তার নানা দিক তখন পরিণত হয়েছিল ধ্বংসস্তূপে। তৈমুর নিজের হাতে সমরখন্দকে আবার নতুন করে গড়ে তোলবার চেষ্টায় নিযুক্ত হলেন।

নতুন নতুন পাথরে বাঁধানো প্রশস্ত রাজপথ, মনোরম তরুবীথি, রঙিন উদ্যান ও অপূর্ব সব প্রাসাদের সৌন্দর্য দেখতে দেখতে সমরখন্দ হয়ে উঠল বিচিত্র এবং মোহনীয়।

এমনকী নগরের রং পর্যন্ত গেল বদলে! তাতারিদের প্রিয় হচ্ছে নীল রং—যা থাকে অসীম আকাশে, অনন্ত সাগরে ও মেঘচুম্বী গিরিশিখরে। তৈমুর নতুন সমরখন্দেরও গায়ে মাখিয়ে দিলেন সেই রং। তার নতুন নাম হল 'নীল নগর'।

তৈমুরের প্রথম পুত্র জাহাঙ্গিরের একটি ছেলে হল।

তৈমুর নিজেও দ্বিতীয় বিবাহ করলেন শ্যালক হুসেনের পরমাসুন্দরী বিধবাকে! তার নাম সেরাই খানুম। এটা ছিল প্রাচীন মোগলদের চিরাচরিত নিয়ম। পরাজিত ও নিহত রাজাদের সহধর্মিণীদের বিবাহ করতেন বিজয়ী রাজারা।

বংশগৌরবে সেরাই খানুমের তুলনা ছিল না। তাঁর ধমনীতে ছিল চেঙ্গিজ খাঁয়ের রক্ত। তিনি তৈমুরের উপযুক্ত সহধর্মিণী—অশ্বপৃষ্ঠে প্রায়ই যেতেন গভীর অরণ্যে শিকার করতে।

কিন্তু তৈমুরের অশান্ত মন সিংহাসনের নরম গদির উপরে কোনওদিনই তুষ্ট থাকতে পারত না। রাজধানীর মধ্যে তাঁর দেখা পাওয়া যেত খুবই কম। তাঁর খবর আসত দূর দেশ থেকে। তিনি প্রকাণ্ড সেনাদল নিয়ে ফিরতেন আজ এ-দেশে, কাল সে-দেশে—কখনও পূর্বে, কখনও পশ্চিমে—কখনও খোরাসানের পথে, কখনও কাস্পিয়ানের তটে।

অবশেষে তিনি একদিন ছুটলেন উত্তর দিকে—গোবি মরুভূমির দিকে। সেখানে শেষ মোগল কামারুদ্দিন তাঁর কাছে পরাজিত হয়ে পলায়ন করলেন। মোগলদের সব আশা নির্মূল হয়ে গেল এবং তৈমুরের রাজ্য পরিণত হল সাম্রাজ্যে!

বিজেতা তৈমুর যশোগৌরবে সমুজ্জ্বল হয়ে দেশে ফিরে এলেন। সমরখন্দের নিকটবর্তী এক পথের কাছে এসে দেখলেন, তাঁর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে এক বিপুল জনতা।

জনতার ভিতর থেকে বেরিয়ে তৈমুরের সামনে এসে দাঁড়ালেন সবচেয়ে প্রাচীন ওমরাও সৈফুদ্দিন। তাঁর মাথা হেঁট, মুখ নীরব।

তৈমুর বললেন, 'দুঃসংবাদ আছে? বলতে ভয় হচ্ছে?'

সৈফুদ্দিন বললেন, 'যুবরাজ জাহাঙ্গির আর ইহলোকে নেই।'

জাহাঙ্গিরকে তৈমুর প্রাণের চেয়ে ভালোবাসতেন। কিন্তু তাঁর প্রৌঢ় মুখের একটি মাংসপেশিও কুঞ্চিত হল না। কেবল বললেন, 'সৈফুদ্দিন, তোমার ঘোড়ায় চড়ো। সৈন্যগণ, রাজধানীর দিকে যাত্রা করো।'

তৈমুর এতদিনে অসংখ্য যুদ্ধে জয়ী হয়েছেন। কিন্তু জাহাঙ্গিরের মৃত্যুর পর থেকে তিনি যেসব যুদ্ধে অস্ত্রধারণ করেছেন, সেইসব যুদ্ধই আজ পৃথিবীতে তাঁকে অমর করে রেখেছে।

সপ্তম । হৈম সংঘ

১৩৭০-১৩৮০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে চেঙ্গিজ খাঁয়ের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত মহাসাম্রাজ্যের অধিকাংশই মানচিত্রের উপর থেকে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল।

কিন্তু তৈমুরের সাম্রাজ্যের উত্তরে ও পূর্বে চেঙ্গিজের বংশধররা তখনও বিরাট এক ভূভাগের উপরে শাসনদণ্ড পরিচালনা করতেন। একে ডাকা হত 'হৈম সংঘ' নামে।

কেবল এর শাসনকর্তারা ছিলেন মোগলবংশীয়। অধীন জাতিদের মধ্যে নানাদেশীয় যাযাবরদের সঙ্গে ছিল অসংখ্য রুশীয়, বুলগেরীয়, আর্মেনিয়ান ও বেদে প্রভৃতি। আধুনিক রুশিয়ার অধিকাংশই ছিল এই হৈম সংঘের অধীনে।

শাসক সম্প্রদায় বা মোগলরা ছিল অর্ধ পৌত্তলিক। তাদের তৈমুরের তাতারদের জাত-ভাই বলা যায়। তাদের প্রধান দুই নগর ছিল ভোল্গা নদীর তীরবর্তী সরাই এবং কাস্পিয়ান সাগর তটস্থ অস্ট্রোকান। সুদীর্ঘ দেড় শত বৎসর কাল ধরে ইউরোপের শিয়রে তারা জেগেছিল দারুণ দুঃস্বপ্নের মতন। পূর্ব-ইউরোপ তাদের হস্তগত ছিল তো বটেই, তার উপর তারা পোল্যান্ডেও এসে হানা দিয়েছিল।

মস্কোর রাজকুমার মিট্রি একবার মাত্র দেড় লক্ষ রুশীয় সৈন্য নিয়ে এই মোগলদের আক্রমণ করে হারিয়ে দিতে পেরেছিলেন। কিন্তু এ সৌভাগ্য বেশিদিন স্থায়ী হয়নি।

এই সময়ে মোগল সম্রাট ছিলেন উরুস খাঁ।

উরুস খাঁয়ের এক নিকট আত্মীয়ের নাম তোক্তামিস। সম্ভবত সিংহাসনের পথ নিষ্কণ্টক করবার জন্যেই একদিন তিনি উরুস খাঁয়ের পুত্রকে হত্যা করে তৈমুরের কাছে পালিয়ে গেলেন।

মোগলদের দূত তৈমুরের কাছে গিয়ে জানালে, 'পূর্ব ও পশ্চিমের প্রভু মহামহিমময় উরুস খাঁ আমাকে পাঠিয়েছেন। তৈমুর, হয় তুমি তোক্তামিসকে আমাদের হাতে সমর্পণ করো, নয় করো অস্ত্রধারণ!'

তৈমুরের চোখে জাগছে তখন পৃথিবী বিজয়ের স্বপ্ন। তিনি বুঝলেন এ স্বপ্ন সফল করতে গেলে মোগলদের সঙ্গে একদিন-না-একদিন তাঁকে শক্তিপরীক্ষা করতে হবেই। এ সুযোগ তিনি ছাড়লেন না।

তৈমুর বললেন, 'দূত, তোক্তামিস আমার আশ্রিত। তাঁকে আমি ত্যাগ করব না। উরুস খাঁকে জানিয়ো, আমি অস্ত্রধারণ করতে প্রস্তুত।'

দূত ফিরে গেল। তৈমুর তোক্তামিসকে 'পুত্র' বলে ডাকলেন। এবং হৈম সংঘের মোগলদের কাছ থেকে দুটি শহর কেড়ে নিয়ে তোক্তামিসের হাতে সমর্পণ করলেন। উপরন্তু তাঁকে অনেক সৈন্যসামন্ত, অস্ত্রশস্ত্র ও অর্থ-সম্পত্তিও উপহার দিতে ভুললেন না।

তোক্তামিস হৈম সংঘের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করলেন, কিন্তু পরাজিত হলেন।

তৈমুর আবার তাঁকে নতুন সৈন্য দিলেন। তোক্তামিস আবার করলেন যুদ্ধযাত্রা। কিন্তু আবার হেরে ভূত হয়ে, কোনওরকমে প্রাণ বাঁচিয়ে পালিয়ে এলেন তৈমুরের কাছে।

এমনি সময়ে উরুস খাঁয়ের মৃত্যু হল এবং তোক্তামিস যুদ্ধে হেরেও লাভ করলেন হৈম সংঘের সিংহাসন।

রাজধানী সরাই শহরে গিয়ে তোক্তামিস প্রথমেই মস্কো ও রুশিয়ার রাজাদের কাছ থেকে কর চেয়ে পাঠালেন।

এরই দুই বছর আগে মিট্রির নায়কতায় রুশীয়রা হয়েছিল যুদ্ধে জয়ী। তারা কর দিতে রাজি হল না।

মোগলরা বাঁধভাঙা বন্যার মতন রুশিয়ার উপরে ভেঙে পড়ল। রুশিয়ার গ্রামের পর গ্রাম, শহরের পর শহর দিগবিদিকব্যাপী অগ্নিশিখায় পুড়ে ছাই হয়ে গেল—লক্ষ লক্ষ লোক হল হত ও আহত এবং মস্কো হল তোক্তামিসের হস্তগত। সমগ্র রুশিয়া রক্তাক্ত হয়ে আবার মোগলদের অধীনতা স্বীকার করলে।

তোক্তামিস এখন আর পলাতক ও পরের গলগ্রহ নন—হচ্ছেন অর্ধ ইউরোপ-এশিয়ার সম্রাট! তাঁর কাছে কৃতজ্ঞতার কোনওই মূল্য নেই।

সমরখন্দের আশ্চর্য ঐশ্বর্য স্বচক্ষে দেখবার সুযোগ তাঁর হয়েছে। সেখানে তৈমুরের আশ্রয়ে বেশ কিছুকাল বাস করে তিনি যে বিলাসিতার আস্বাদ পেয়েছেন, মোগল-সাম্রাজ্যের সিংহাসনে বসেও তা ভুলতে পারলেন না।

তৈমুর তখন রাজধানী থেকে বহুদূরে—কাস্পিয়ান সমুদ্রের তীরে।

ঠিক সাত দিনে নয় শত মাইল পার হয়ে রাজধানী সমরখন্দ থেকে এক অশ্বারোহী বার্তাবহ এসে উপস্থিত!

কী খবর? না, তোক্তামিসের মোগলবাহিনী সমরখন্দের অনতিদূরে এসে হাজির হয়েছে!

তৈমুর বিদ্যুৎ-বেগে তখনই যুদ্ধযাত্রা করলেন।

তৈমুরের পুত্র ওমর শেখ প্রাণপণে যুদ্ধ করেও মোগলদের কাছে হেরে গিয়েছেন, তাতার সৈন্যেরা পলাতক। শত্রুরা বোখারা পর্যন্ত এসেছে—সেখানকার রাজপ্রাসাদ পুড়িয়ে দিয়েছে। সুযোগ দেখে উরগঞ্জের সুফিরা এবং চিরশত্রু জাট-মোগলরা আবার বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে।

কিন্তু ঘটনাক্ষেত্রে তৈমুরের আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে দৃশ্য পরিবর্তন!

তোক্তামিস সদলবলে সরে পড়লেন। সুফি জাটদের দেশ প্রায় সমভূমিতে পরিণত করে তৈমুর সেখানকার বাসিন্দাদের বন্দি করে সমরখন্দে নিয়ে এলেন।

তৈমুর বললেন, 'নিমকহারাম তোক্তামিস অকারণে আমার রাজ্য আক্রমণ করেছে—আমার প্রজাদের উপরে অত্যাচার করেছে। এর প্রতিশোধ চাই।'

আমির-ওমরাওরা জিজ্ঞাসা করলেন, 'কী প্রতিশোধ সম্রাট?'

'আমি তোক্তামিসকে দমন করব, তার রাজ্য আক্রমণ করব।'

'সম্রাট, সে যে অসম্ভব। তোক্তামিসকে ধরতে হলে হাজার হাজার মাইল ব্যাপী মরুভূমির মধ্যে ছুটে বেড়াতে হবে। সে যে কোথায় লুকিয়ে আছে কেউ তা জানে না। আমাদের উচিত, আবার তার দেখা না পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা।'

'কীসের জন্যে অপেক্ষা করব? বিশ্বজয়ের সময় এসেছে এখন আর অপেক্ষা নয়। তাঁবু ওঠাও! যাত্রা করো!'

বেজে উঠল তূরী ভোঁ-ভোঁ-ভোঁ, দামামা ডিমি-ডিমি-ডিমি! উড়ল নিশান, ছুটল অশ্বারোহী, কাঁপল পৃথিবীর প্রাণ! কাতারে কাতারে তাতারের দল চলল এক বিস্ময়কর কীর্তি স্থাপন করতে।

বুদ্ধিমান আমির-ওমরাওরা সভয়ে ভাবলেন, তাঁরা আজ যাত্রা করেছেন বিরাট এক শ্মশানের দিকে—যেখানে বাস করে কেবল মৃত্যু, মড়ক ও দুর্ভিক্ষ!

তাঁদের ধারণা নিতান্ত ভ্রান্ত নয়। তৈমুরের কয়েক শতাব্দী পরে এই ভয়াবহ পথে পা বাড়িয়ে নেপোলিয়ন বিজয়ী হয়েও তাঁর বিরাট বাহিনীকে রেখে গিয়েছিলেন রুশিয়ার তুষার-সমাধির মধ্যে!

পিটার দি গ্রেট রুশিয়ারই সম্রাট। ১৬১৬ খ্রিস্টাব্দে এই পথে তুর্কিদের বিরুদ্ধে তিনি মস্ত একদল সৈন্য প্রেরণ করেন। তাদের একজনও ফিরে যায়নি।

তারও এক শতাব্দী পরে আর একদল রুশীয় সৈন্য কাউন্ট পেরোভস্কির অধীনে এই পথে যাত্রা করে। বিনা যুদ্ধেই অধিকাংশ সৈন্য হারিয়ে সেবারেও কাউন্টকে হতাশ হয়ে ফিরে আসতে হয়।

আর আজও বিজ্ঞানের এই সর্বাঙ্গীন উন্নতির যুগে রুশিয়ার তুষার-মরুর মধ্যে দুর্ধর্ষ জার্মানদের যে কী হাহাকার করতে হয়েছে, আমাদের কারুর তা শুনতে বাকি নেই।

সুতরাং আমির-ওমরাওরা অকারণে ভয় পাননি।

কিন্তু তৈমুর ফিরলেন না। তাঁর তিনটি মূলমন্ত্র ছিল।

প্রথম : নিজের রাজ্যের মধ্যে যুদ্ধ করব না।

দ্বিতীয় : আত্মরক্ষা নয়, আক্রমণ করা।

তৃতীয় : যত শীঘ্র সম্ভব, শত্রুর উপরে গিয়ে পড়া।

তৈমুর বলতেন, 'যথাস্থানে যথাসময়ে দশ হাজার লোক না পেলে দশজন লোক নিয়েও হাজির হওয়া ভালো! শত্রুরা পূর্ণশক্তি সঞ্চয় করবার আগেই তাদের আক্রমণ করা উচিত।'

তৈমুরের আগে আলেকজান্ডার ও তৈমুরের পরে নেপোলিয়নও এই যুদ্ধরীতির অনুসরণ করেছিলেন।

তোক্তামিস যুদ্ধ করবেন নিজের দেশে। তাঁকে রুশীদের জন্যে ভাবতে হবে না এবং তাঁর সৈন্য তৈমুরের তুলনায় অসংখ্য। কিন্তু তবু তৈমুর ভয় পেলেন না—ছুটে চললেন ঝড়ের মতন। তৈমুর অগ্রসর হন, তোক্তামিস যুদ্ধ করেন না, খালি পিছিয়ে যান; এবং পিছিয়ে যেতে যেতে সমস্ত গ্রাম, শহর, খাদ্য, শস্য পুড়িয়ে দিয়ে যান; অর্থাৎ নেপোলিয়নের সময়ে এবং গত দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে জার্মান আক্রমণের দিনে রুশীয়রা যে প্রথা অবলম্বন করেছে এবং এখন পৃথিবীর সমস্ত সামরিক জাতিই যে প্রথার উপকারিতা বুঝতে পেরেছে, তার প্রথম সৃষ্টি হয় সেই তৈমুরের যুগেই চতুর্দশ শতাব্দীতে।

দিনের পর দিন, হপ্তার পর হপ্তা! চলেছে তাতার সৈন্যশ্রেণি এবং তাদের সঙ্গে চলেছে এমন সব প্রকাণ্ড শকট, যেগুলোর এক-একখানা চাকাই হচ্ছে মানুষের মাথার সমান উঁচু! এইসব গাড়ির ভিতরে আছে আবশ্যকীয় সমস্ত জিনিস এবং খাদ্যদ্রব্য—ময়দা, বার্লি ও শুকনো ফলমূল প্রভৃতি। প্রত্যেক সৈন্যের সঙ্গে আছে দুটো করে ঘোড়া। প্রত্যেক সৈনিকই অশ্বারোহী।

রীতিমতো মরুভূমি—বালিয়াড়ির পর বালিয়াড়ি, ঝোড়ো হাওয়া সেই মরু-সাগরে সৃষ্টি করে বালুকার তরঙ্গ! বেজে ওঠে সাতফুট লম্বা তাতার তূরী, তারই সঙ্কেত ধ্বনি শুনে সৈন্যরা তাঁবু ফেলে বা তাঁবু তোলে।

মরু-বালুকার পর এল বৃক্ষহীন তৃণপ্রান্তরের দেশ। এ প্রান্তর যেন অনন্ত—কোথাও ছায়া নেই, আশ্রয় নেই, লোকালয় নেই—এমনকী শত্রুও নেই।

মাঝে মাঝে শত্রুর চিহ্ন দেখা যায়। উট, ঘোড়া বা মানুষের পায়ের দাগ, নির্বাপিত আগুনের চিহ্ন বা মানুষের মাংসহীন কঙ্কাল।

প্রত্যেক সৈনিকের বরাদ্দ ছিল মাসে ষোলো সের ময়দা। কিন্তু অবশেষে ফুরিয়ে গেল ময়দা। ঘোড়াদের ঘাসের অভাব হল না বটে, কিন্তু মানুষরা মূল কুড়িয়ে বা পাখির ডিম সংগ্রহ করে কোনওরকমে বেঁচে রইল মাত্র।

আমির-ওমরাওরা মাথা নেড়ে বিষণ্ণভাবে বলতে লাগলেন, 'এ আমরা আগেই জানতুম! এখন আর ফিরে যাওয়ারও উপায় নেই—এইবারে সবাইকে মরতে হবে অনাহারে।'

তৈমুরের মুখে কিন্তু চিন্তার রেখা নেই। তিনি দেখলেন, এই মালভূমিতে গাছপালা নেই বটে, কিন্তু পাঁচ-ছয়-সাত ফুট উঁচু এক জাতের তৃণ আছে।

তখন তাঁর হুকুমে এক লক্ষ সৈন্য ত্রিশ মাইল জায়গা জুড়ে দাঁড়িয়ে বিপুল এক মণ্ডলের সৃষ্টি করলে এবং ক্রমেই এগিয়ে এসে তারা মণ্ডলের আকার ছোট করে আনতে লাগল। তখন এক লক্ষ লোকের গগনভেদী চিৎকারে তূরী-ভেরি-দামামার ধ্বনিতে ভয় পেয়ে সেই সুদীর্ঘ তৃণদলের ভিতর থেকে আত্মপ্রকাশ করতে লাগল পালে পালে খরগোশ, মৃগ, বরাহ, নেকড়ে, ভালুক ও 'এলফ' বা মহিষের মতন বড় বড় হরিণ! ক্ষুধার্ত তাতারদের সেই সাংঘাতিক মণ্ডলের মধ্যে থেকে একটি মাত্র খরগোশও বাইরে পালাতে পারলে না!

খাদ্যের দুর্ভাবনা দূর হল তৈমুরের অদ্ভুত বুদ্ধিবলে। মাংস ভালো ভাবে রক্ষা করতে পারলে এখন বেশ কিছুকাল আহার্যের অভাব হবে না। শত্রুরা তাদের অনাহারে মারতে চায়, কিন্তু তৈমুরের প্রতিভা ব্যর্থ করে দিলে তাদের সেই অপচেষ্টা!

তৈমুর বললেন, 'সৈন্যগণ, আজ তোমাদের ছুটি। খাও-দাও, আমোদ করো!'

সারি সারি তাঁবু পড়ল। বহুদিন পরে সৈনিকরা পেট ভরে খেয়ে হাসিখুশি নাচ-গানে মেতে উঠল।

পরদিনেই আবার ছয় ফুট বড় ডঙ্কা গম্ভীর স্বরে বেজে উঠে সকলকে জানিয়ে দিলে—'আর বিশ্রাম নয়—যাত্রা করো, যাত্রা করো, যাত্রা করো!'

এইবার সামনে আছে আর এক ভয়ানক দেশ, লোকে যার নাম রেখেছে 'ছায়াচরের মুল্লুক'।

অষ্টম । মস্কো

নদীর স্রোতে ভেসে যাচ্ছে জলজ গাছপালা; পায়ের তলায় শৈবালদলের পিচ্ছিল স্পর্শ কিংবা সঙ্কটময় জলাভূমি; কোথাও শৈলপৃষ্ঠে আশ্রয় নিয়েছে রক্তবর্ণ লতা। এ হচ্ছে স্তব্ধতার স্বদেশ। বৃক্ষমালার উপর দিয়ে উড়ে যায় বাজ পাখিরা; কিন্তু সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে শোনা যায় না গীতকারী পাখিদের কণ্ঠস্বর; আকাশের নীলিমা অম্লান নয়, ময়লা; দূরে দূরে কুয়াশা ভেদ করে দেখা যায় পৃথিবীর গায়ে আবের মতন মাটির স্তূপ—সেগুলো হচ্ছে চিরমৌন মানুষের সমাধি।

ভ্রমণকারী ইবন বতুতা লিখেছেন; 'এ হচ্ছে ছায়াচরের মুল্লুক। এখানে যারা বাস করে, কেউ তাদের দেখা পায় না। এখানে গ্রীষ্মের দিন এবং শীতের রাত্রি হচ্ছে সুদীর্ঘ।'

তৈমুরের সেনাদল মনে করলে, তারা এমন কোনও দেশে এসে পড়েছে যেখানে মানুষের বসতি নেই। এ মরুভূমি নয় বটে, কিন্তু মানুষের চিহ্নহীন এ দেশ হচ্ছে মরুর চেয়ে ভয়াবহ। গুপ্তচররা ছুটে গেল, কিন্তু একজন মাত্র মানুষকে আবিষ্কার করতে পারলে না কোথাও!

তৈমুর তাঁর পুত্র ওমর শেখকে ডেকে বললেন, 'বিশ হাজার সৈন্য নিয়ে তুমি এগিয়ে যাও। যেমন করে পারো, হৈম সংঘের খবর আনো।'

দিন-কয় পরে খবর এল, সুদূরের বৃক্ষহীন প্রান্তরের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় সত্তরটি ভস্ম-স্তূপ পাওয়া গেছে। দুই-এক দিনের ভিতরে অনেক লোক সেখানে যেন ছাউনি ফেলে আগুন জ্বেলে রান্নাবান্না করেছিল!

এই সামান্য সূত্রকেই তৈমুর মনে করলেন অসামান্য! ছোট্ট আর একদল সৈন্য নিয়ে তখনই তিনি ছুটলেন সেই দিকে। পথে পড়ল সুমেরুগামী টোবল নদী। তৈমুর সাঁতরে নদী পার হয়ে ছেলের সঙ্গে যোগ দিলেন।

তারপর তৈমুরের চরেরা দৈবগতিকে হঠাৎ একদিন প্রধান দল থেকে বিচ্ছিন্ন দশজন শত্রু-সৈন্যকে গ্রেপ্তার করে ফেললে। বন্দিদের মুখ থেকে খবর পাওয়া গেল, তোক্তামিস সসৈন্যে যাত্রা করেছেন পশ্চিম দিকে।

আরও কিছুদিন একই লুকোচুরি খেলা চলল। তৈমুর বুঝলেন, এ বড় সহজ শত্রু নয়। এরা দেখা দেয় না, কিন্তু লুকিয়ে সব লক্ষ করে।

এরা পিছিয়ে যায়, কিন্তু যে-কোনও অসতর্ক মুহূর্তে সাক্ষাৎ মৃত্যুর মতন ঘাড়ের উপরে লাফিয়ে পড়তে পারে। দরকার হলে এরা ঘোড়ার পিঠে চড়ে এক দিনে একশো মাইল পার হয়ে যায়।

তবু তিনি দমলেন না, থামলেন না। তোক্তামিসকে হাঁপ ছাড়বার ছুটি না দিয়ে ঝড়ের মতন এগিয়ে চললেন—একেবারে উরাল নদীর ওপারে।

তোক্তামিস দেখলেন, নাছোড়বান্দা তৈমুরের হাত ছাড়ানো অসম্ভব। জনহীন খাদ্যহীন দিগবিদিকহারা মরু-প্রান্তর, বেগবতী নদীর পর নদী, তুষারের ঝটিকা, বর্ষার প্রবল ধারা,—তবু তৈমুর আসছেন তাঁর পিছনে পিছনে। অবশেষে হতাশ হয়ে তোক্তামিস সসৈন্যে ফিরে দাঁড়ালেন।

তৈমুর তো তাই চান। এত কষ্টের পর তাঁর আঠারো সপ্তাহ ধরে আঠারো শত মাইল ব্যাপী পথ চলার শেষ হল! আজ এসপার কি ওসপার! হয় জয়, নয় মৃত্যু!

নিজের দলের দিকে ফিরে তৈমুর হুকুম দিলেন, 'সৈন্যগণ, ঘোড়া থেকে নেমে পড়ো! বাকি যা খাবার আছে, সব খেয়ে শেষ করো ফ্যালো! তারপর অস্ত্র ধরো, যুদ্ধ করো!'

যুদ্ধ আরম্ভ হল। শত্রুরা সংখ্যায় বেশি, কিন্তু তাতাররা তখন মরিয়া। তারা জানে, এ যুদ্ধে জয়লাভ করতে না পারলে তাদের একজনকেও আর দেশে ফিরতে হবে না। মৃত্যুপণ করেই তারা লড়তে লাগল। তারা শত্রুর কাছে দয়াও চাইবে না, শত্রুকে দয়াও করবে না।

বহুক্ষণ যুদ্ধের পর তোক্তামিসের দল সংখ্যাধিক্যের জন্যে যখন প্রবল হয়ে উঠেছে, তৈমুর তখন নিজের রক্ষীদল দিয়ে পর্বত-প্রাচীরের মতন শত্রুদের উপরে ভেঙে পড়লেন। তার বিষম চাপ সহ্য করতে না পেরে তোক্তামিস নিজের ফৌজ ফেলে পলায়ন করলেন। নায়ককে হারিয়ে শত্রুদের সমস্ত শৃঙ্খলা ভেঙে গেল—তাতারদের হাজার হাজার তরবারি করলে রক্তসাগর সৃষ্টি!

সেইদিন হল ইউরোপবিখ্যাত মহা-পরাক্রান্ত হৈম সংঘের পতন! যুদ্ধক্ষেত্রে এক লক্ষ মৃতদেহ ফেলে বাকি মোগলরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পলায়ন করলে। তাতাররা ছুটল তাদের পিছনে পিছনে।

তারপর আরম্ভ হল লুন্ঠন। ডন নদীর দুই তীরে গ্রামে গ্রামে নগরে নগরে চলল হত্যা, অত্যাচার ও লুন্ঠনের নিষ্ঠুর লীলা। বাঁদি করবার জন্যে যে কত হাজার নারীকেও বন্দি করা হল তার আর সংখ্যা নেই। তাতাররা গোরু, মেষ ও উট এবং খেতের ফসল কিছুই ছাড়লে না। আর এত সোনা-রুপো হিরে-জহরত নিয়ে এল যে, প্রত্যেক তাতার সৈনিকের পেটের ভাবনা ঘুচে গেল জীবনের মতন!

আট মাস পরে বিজয়ী তৈমুর আবার নিজের রাজধানী সমরখন্দে ফিরে এলেন।

কিন্তু এর পরেও তোক্তামিসের জ্ঞান হল না। তিন বৎসর যেতে না যেতেই তিনি আবার কাস্পিয়ান সাগরের তটে দস্যুতা শুরু করলেন।

তৈমুর জ্বালাতন হয়ে লিখে পাঠালেন : 'তোক্তামিস, তোমার বুকের ভিতরে কোনও শয়তান আছে? তুমি নিজের সীমানার মধ্যে শান্ত হয়ে থাকতে পারো না কেন? তুমি কি গত যুদ্ধের কথা ভুলে গিয়েছ? তুমি আমার শত্রুতাও দেখেছ। অতএব স্পষ্ট করে বলে পাঠাও তুমি আমার শত্রু হবে, না বন্ধু হবে?'

তবু তোক্তামিসের হুঁস হল না, আবার এলেন যুদ্ধ করতে। যুদ্ধ হল এবং এবারের যুদ্ধে তৈমুর হেরে যেতে যেতে কোনওক্রমে বেঁচে গেলেন। রণক্ষেত্রের এক চিত্রে দেখতে পাই—কোণঠাসা, রক্তাক্ত তৈমুরের তরবারি ভেঙে গিয়েছে, তাঁর অল্প কয়েকজন সঙ্গী ঘোড়া থেকে নেমে দাঁড়িয়ে চারিপাশ দিয়ে তাঁকে আগলে রেখে লড়াই করছে প্রাণপণে।

অবশেষে সাহায্য এল। তৈমুর আহত সিংহের মতন আবার আক্রমণ করলেন, মোগলরা আবার পালিয়ে গেল। এবং অনেকে তৈমুরের পক্ষে এসেও যোগ দিলে। এর পর থেকে ইতিহাসের পৃষ্ঠায় আর তোক্তামিস ও হৈম সংঘের নাম খুঁজে পাওয়া যায় না।

তৈমুর এবার সাক্ষাৎ যমের মতন রুশিয়ার দিকে ছুটে বেড়াতে লাগলেন,—আগুনের কবলে পড়ে পুড়ে ছাই হয়ে গেল কত শহর, কত গ্রাম এবং আকাশ-বাতাস পরিপূর্ণ হয়ে উঠল মর্মভেদী মৃত্যু হাহাকারে।

মস্কো নগরে বসে রুশিয়ার গ্র্যান্ড প্রিন্সরা ভয়ে থর থর করে কাঁপতে কাঁপতে সৈন্যশ্রেণি সাজাতে লাগলেন—তাঁরা জানতেন জয়ের কোনওই আশা নেই, কিন্তু তবু তাঁদের যুদ্ধ করতে হবে!

মস্কোর পথে পথে বেরুল ভীত নর-নারীর মিছিল। খ্রিস্ট জননীর মূর্তি নিয়ে মিছিলের জনতা অগ্রসর হয় এবং পুরুষ ও নারীরা নতজানু হয়ে রাস্তার ধুলোয় বসে পড়ে জোড়হাতে সক্রন্দনে বলে ওঠে—

'ভগবানের মা, ভগবানের মা, রুশিয়াকে রক্ষা করো!'

নবম । কবি হাফিজ ও সর্দার আক বোগা

'ভগবানের মা, রুশিয়াকে রক্ষা করো!'

মস্কো শহরের পথে পথে, আবালবৃদ্ধবনিতার মুখে মুখে জাগছে এই কাতর প্রার্থনা!

রুশরা দৃষ্টান্তের পর দৃষ্টান্ত দেখে বুঝেছে, অস্ত্রের দ্বারা তৈমুরকে বাধা দিতে যাওয়া পাগলামি ছাড়া আর কিছু নয়। তাই তারা হল দেবতার দ্বারস্থ।

রুশরা বলে, ভগবানের মা তাদের প্রার্থনা ঠেলতে পারেননি। কারণ, রুশিয়ার সর্বময় কর্তা তোক্তামিসকে দমন করেই তৈমুর আবার নিজের দেশে ফিরে গেলেন। মস্কো শহরে তখন বাসিন্দার সংখ্যা ছিল মাত্র পঞ্চাশ হাজার। এমন একটা ছোট শহর তৈমুরের দৃষ্টি আকর্ষণ করল না।

মস্কো বাঁচল, কিন্তু রুশিয়ায় মোগল সাম্রাজ্যের পতন হল। তৈমুর শত্রুর বেশে রুশিয়ায় গিয়েছিলেন বটে, কিন্তু তাঁর আবির্ভাবের ফলেই রুশরা স্বাধীন ভাবে মাথা তুলে দাঁড়াবার প্রথম সুযোগ পায়।

রুশিয়ার পর পারস্যের পালা।

পারস্যের গৌরব-সূর্য তখন অস্তমিত। বহুকাল ধরে সৌভাগ্যের উচ্চশিখরে অলস ভাবে বসে থেকে তখন সমস্ত শক্তি হারিয়ে ফেলেছে পারস্যের পুরুষত্ব। তার যশ আছে, কিন্তু আত্মরক্ষার ক্ষমতা নেই। সম্রাট, আমির-ওমরাও ও রাজপুত্ররা বিপুল বিলাসে কালযাপন করেন, খোশামুদে কবিদের রচিত প্রশস্তি তাঁদের আত্মপ্রসাদকে আরও বাড়িয়ে তোলে, বড় বড় শহরের পথে পথে আরামে ঘুরে বেড়ায় রেশমি পোশাক পরা ভিখারিরা!

এরই মধ্যে কবি হাফিজের মুরুব্বি পারস্য সম্রাটের মৃত্যু হল। সমস্ত ইরান দেশ তখন খণ্ডে খণ্ডে বিভক্ত হয়ে এক-একজন রাজকুমারের অধীন হয়ে পড়ল।

১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দ। শীতের ম্লান সূর্যের আলোকে আচম্বিতে একদিন দেখা গেল, ইরানের বুক মাড়িয়ে ইস্পাহানের দিকে এগিয়ে আসছে তৈমুরের দুর্দান্ত তাতার বাহিনী!

ইস্পাহানের কর্তারা বাধা দিলেন না, বরং হাসিমুখে এগিয়ে এলেন তৈমুরকে সাদর অভ্যর্থনা করতে।

তৈমুর বললেন, 'ইস্পাহানিদের জীবন ভিক্ষা দিলুম। যদি নিষ্ক্রয়ের টাকা পাই, শহরও লুট করা হবে না।'

ইস্পাহানি আমির-ওমরাওরা বললেন, 'অবশ্য, অবশ্য! নিষ্ক্রয় দেওয়া হবে বই কি!'

কিন্তু ইস্পাহানের সাধারণ বাসিন্দারা কর্তাদের এই কাপুরুষতা সমর্থন করলে না। এক ডানপিটে কামার কোমর বেঁধে দাঁড়িয়ে সকলকে উত্তেজিত করে তুললে। ইস্পাহানিরা খাপ্পা হয়ে তাতারীদের আক্রমণ করলে। শহরের পথে পথে ছুটল রক্তস্রোত। তিন হাজার তাতারী মারা পড়ল।

বিষবৃক্ষের ফল ফলতে দেরি হল না। বজ্রকঠিন স্বরে তৈমুর বললেন, 'হত্যা করো! প্রত্যেক তাতারির হাতে আমি একটা করে ইস্পাহানি মুণ্ড দেখতে চাই।'

তারপর দেখা গেল ইস্পাহানের রাস্তায় রাস্তায় সাজানো রয়েছে সত্তর হাজার নরমুণ্ডের পাহাড়!

ইস্পাহানের পরে এল সিরাজনগরের পালা। কিন্তু সিরাজের বুদ্ধিমান বাসিন্দারা ইস্পাহানের দুর্দশা দেখে তাড়াতাড়ি চুকিয়ে দিলে নিষ্ক্রয়ের টাকা।

সিরাজে থাকতেন কবি হাফিজ। তাঁর নাম ফিরত দেশে দেশে। তৈমুর কাব্যের ভক্ত ছিলেন না। কিন্তু কৌতূহলী হয়ে একদিন কবিকে ডেকে পাঠালেন। কবিকে আসতে হল।

হাফিজ একটি কবিতায় এই মর্মে লিখেছিলেন—'সিরাজের সুন্দরী কন্যার পায়ের তলায় আমি বোখারা কি সমরখন্দ বিলিয়ে দিতে পারি।'

তৈমুর কঠোর স্বরে বললেন, 'এ কবিতা তুমি লিখেছ?'

কবি বললেন, 'রাজার রাজা, ওটি আমারই রচনা বটে।'

তৈমুর বললেন, 'কত যুদ্ধ করে কত কষ্টের পর আমি সমরখন্দ জয় করতে পেরেছি। আর তুমি কিনা এক কথায় তুচ্ছ এক নারীর পায়ে সমরখন্দ বিলিয়ে দিতে চাও?'

কবি হেসে বললেন, 'হুজুর, এমনই অমিতব্যয়িতার ফলেই আজ আমি ভিখারির মতন দীন হয়ে আপনার সামনে এসে দাঁড়িয়েছি!'

কবির জবাব শুনে তৈমুর খুশি হলেন। হাফিজের ভাগ্যে জুটল নিষ্ঠুর তিরস্কার নয়, প্রচুর পুরস্কার!

বলা বাহুল্য, দেখতে দেখতে কয়েকটি ছোটখাটো যুদ্ধের পর সমস্ত ইরান দেশ হল তৈমুরের সাম্রাজ্যের অন্তর্গত। মধ্য এশিয়ায় ও ইরান দেশে কেউ আর তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী রইল না (১৩৮৮ খ্রিস্টাব্দে)।

তৈমুরের বয়স এখন তিপ্পান্ন বৎসর। কেবল লোক দেখাবার জন্যে মাথার উপরে তিনি এখনও চেঙ্গিজের এক বংশধরকে রেখে পালন করছেন বটে, কিন্তু এই খাঁ-খানান হচ্ছেন তাঁর হাতের ক্রীড়াপুত্তলি মাত্র। তিনি গদির উপরে বসে নিশ্চিন্ত মনে ভালো ভালো খাবারদাবার খান, শিকারে যান বা খেলাধুলো আমোদ-প্রমোদ নিয়ে মেতে থাকেন।

কী রকম সব দুর্ধর্ষ লোক ছিলেন তৈমুরের সহচররা, এখানে তারও একটু পরিচয় দিলে মন্দ হবে না।

নাম তাঁর সর্দার আক বোগা—লম্বা-চওড়ায় চেহারাখানি তাঁর দানবের মতন বিরাট, তাঁকে দেখলেই বুকটা ভয়ে ধড়াস ধড়াস করতে থাকে। তাঁর প্রকাণ্ড ঢাল লোহায় তৈরি এবং ভারী ধনুকখানি হচ্ছে পাঁচ ফুট লম্বা।

একদিন ইরান দেশের এক পল্লিগ্রামে কোনও গৃহস্থের বাড়ির সামনে একলা বসে আক বোগা গোগ্রাসে পোলাও-কালিয়া কোপ্তা-কাবাব ধ্বংস করছেন, এমন সময়ে গাঁয়ের জনৈক মুরুব্বি ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে এসে খবর দিলে, পুকুরের ধারে চল্লিশ-পঞ্চাশ জন ইরানি সৈনিকের উদয় হয়েছে।

আক বোগা নিশ্চিন্তভাবে মাংসের হাড় চিবোতে চিবোতে বললেন, 'বহুৎ আচ্ছা! যাও, গাঁয়ের লোকজন নিয়ে এসো, তারপর খানা খেয়ে আমি ওদের সঙ্গে লড়াই করব।'

মুরুব্বি বললে, 'হুজুর, ওরা দলে ভারী, আপনি পালিয়ে গেলেই ভালো করবেন।'

আক বোগা বললেন, 'আরে না, না, আমি আক্রমণ করে ওদের ঘোড়াগুলো কেড়ে নেব। ইরানিরা শেয়ালের পাল, আমার মতন নেকড়ে বাঘকে দেখলেই চম্পট দেবে।'

মুরুব্বি বোকা নন, বোগা সাহেবকে চটাতে ভরসা করলে না, গাঁয়ের জনকুড়ি লোককে কোনওরকমে ডেকে আনলে।

আক বোগা খাওয়াদাওয়া সেরে মুখ মুছতে মুছতে নিজের ঘোড়ার উপরে চড়ে এগিয়ে গেলেন এবং ইরানিদের দেখেই বিকট হই হই রবে চিৎকার করে উঠলেন।

ইরানি সৈনিকরা সবিস্ময়ে নিজের নিজের ঘোড়ার উপরে উঠে বসল!

তাই দেখেই গাঁয়ের লোকেরা দিলে টেনে লম্বা!

কিন্তু আক বোগা পালাবার ছেলে নন, তিনি একাই ঘোড়া ছুটিয়ে মাথার উপরে বন-বন করে তরবারি ঘোরাতে ঘোরাতে চ্যাঁচাতে লাগলেন, 'হা রে রে রে রে, যুদ্ধং দেহি, যুদ্ধং দেহি!'

কিন্তু ইরানিরা যুদ্ধ দেবার নামও করলে না। তারা ভাবলে, এ লোকটা হচ্ছে দলের অগ্রদূত মাত্র, একা কখনও চল্লিশ-পঞ্চাশ জনকে আক্রমণ করতে আসে? আক বোগা যত জোরে হই হই করেন, তারাও তত বেগে ছুটে পালায়!

আক বোগা শেষটা হতাশ ভাবে গ্রামে ফিরে এসে ঘৃণা ভরা কণ্ঠে বললেন, 'ইরানিরা হচ্ছে শেয়ালের পাল; কিন্তু এই গাঁয়ের লোকগুলো হচ্ছে ভিতু খরগোশ।'

দশম । ভারতবর্ষ

তৈমুর আজ বনস্পতির মতন; তাঁর মাথা ছাড়িয়ে উঠেছে আর সকলের মাথার উপরে।

আশপাশের রাজা-রাজড়ারা ভয় পেয়ে একসঙ্গে জোট বাঁধলেন। তাঁদের মধ্যে প্রবীণ হচ্ছেন বোগদাদ এবং মিশরের সুলতান।

বোগদাদ প্রাচীন শহর, তার প্রতিষ্ঠা ৭৬৩ খ্রিস্টাব্দে। আরব্য উপন্যাসে অমর হারুন-অল-রশিদের রাজধানী রূপে বোগদাদ সুখ-সৌভাগ্যের চরম শিখরে আরোহণ করেছিল। তৈমুরের সময়ে বোগদাদের সুলতান ছিলেন আমেদ।

সুলতান আমেদ জানতেন, বোগদাদের ঐশ্বর্য তৈমুরকে লুব্ধ করে তুলবেই। তাই তিনি আগে থাকতেই তৈমুরকে খুশি রাখবার জন্যে দামি দামি ভেট পাঠিয়ে দিলেন।

কিন্তু তৈমুর কি এত সহজে খুশি হওয়ার ছেলে? হাত বাড়ালেই যেখানে সাত রাজার ধন মানিক পাওয়া যায়, সেখানে দু-এক খানা রঙিন কাচের টুকরো পেয়ে তুষ্ট হতে পারে কে? তৈমুর বোগদাদ দখল করবার জন্যে যাত্রা করলেন।

যুদ্ধ অবশ্য হল। কিন্তু সুলতান আমেদ ছিলেন শৌখিন ব্যক্তি। ফুলের বাগানে আরামে বসে ঠান্ডা শরবত পান করতেন আর কবিতা লিখতেন। জন্ম যোদ্ধা তৈমুরের সামনে দাঁড়িয়ে তরবারি চালনা করবার ক্ষমতা তাঁর ছিল না। সুতরাং যুদ্ধের নামে হল প্রহসনের অভিনয়। সুলতান দারুণ আতঙ্কে অন্তঃপুরের ছেলেমেয়েদের পিছনে ফেলেই সিরিয়ার মরুভূমি পার হয়ে দামাস্কাস শহরে গিয়ে হাজির হলেন। দামাস্কাস তখন মিশরের সুলতানের অধীন।

তৈমুর সমরখন্দে ফিরে এলেন। কিন্তু এত বড় হয়েও তিনি তৃপ্ত হতে পারলেন না—তাঁর মন তখন হারিয়ে গিয়েছে উচ্চাকাঙ্ক্ষার অসীমতার মধ্যে।

তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করল ভারতবর্ষ।

প্রধান প্রধান সর্দারগণের ইচ্ছা নয় যে ভারতবর্ষে যান। এমনকী তৈমুরের পৌত্র মহম্মদ সুলতানও বললেন, 'ভারতের পথে অনেক বাধা। প্রথমত, বড় বড় নদী; দ্বিতীয়ত, দুরারোহ পর্বত ও দুর্ভেদ্য অরণ্য; তৃতীয়ত, বর্মধারী সৈন্য; এবং চতুর্থত, নরহত্যাকারী হস্তীদল।'

একজন ভারত ফেরত ওমরাও বললেন, 'ওখানকার জলহাওয়া ভারী খারাপ, আমাদের সৈন্যরা দুর্বল ও রুগ্ন হয়ে পড়বে।'

কিন্তু আর একদল বলল, 'ভারত হচ্ছে রত্নাকর। ভারতের ঐশ্বর্য পেলে আমরা বিশ্বজয় করতে পারব।'

আর একদল বললেন, 'ভ্রমণকারী ইবন বতুতার মতে পৃথিবীর মধ্যে বড়ো রাজা আছেন ছয়জন : কনস্তান্তিনোপলের সম্রাট, চিনের সম্রাট, তাতারের অধিপতি, ভারতের বাদশাহ, বোগদাদের নরপতি ও মিশরের সুলতান। আমির তৈমুর যদি সর্বশ্রেষ্ঠ হতে চান তবে তাঁকে এঁদের সকলকে বশীভূত করতে হবে।'

তৈমুরেরও মনের বাসনা তাই। অনন্ত আকাশে থাকে একমাত্র সূর্যই। তিনিও হতে চান দুনিয়ার সর্বেসর্বা। এর জন্যে পৃথিবী যদি রক্তে ডুবে যায়,—ডুবে যাক। সে রক্তসাগরে সাঁতার দেওয়ার শক্তি তাঁর আছে।

তৈমুর বললেন, 'আমি ভারতবর্ষে যাত্রা করব। ভারতের ধনরত্ন এনে আমি সমরখন্দের পায়ে ঢেলে দেব। আমি তাতার যোদ্ধা, আমাকে বাধা দেয় কে? তাতারির তরবারি হচ্ছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ তরবারি। তোমরা কি সে কথা বিশ্বাস করো না?'

উৎসাহিত হয়ে সর্দাররা একবাক্যে বললেন, 'হ্যাঁ, প্রভু, আমরা বিশ্বাস করি।'

'তবে প্রস্তুত হও।'

এক লক্ষ তাতার যোদ্ধা বিপুল আগ্রহে রণসজ্জায় সজ্জিত হতে লাগল।

যে ভারতবর্ষ আক্রমণ করার জন্যে এত পরামর্শ, এত আয়োজন, তার অবস্থা কল্পনাতীত রূপে শোচনীয়।

আর্য ভারতবর্ষের অখণ্ড হিন্দু সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠাতা চন্দ্রগুপ্ত, সমুদ্রগুপ্ত ও হর্ষবর্ধনের শৌর্যকাহিনি তখন পরিণত হয়েছে অতীতের সুখস্বপ্নে। মুসলমানরাও এসে যে সাম্রাজ্যের ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তাও তখন জরাজীর্ণ ও দুর্বল হয়ে পড়েছে। মোগলবংশীয় উন্মত্ত সম্রাট মহম্মদের খামখেয়ালিতে সাম্রাজ্যের গৌরবসূর্য হয়েছে অস্তমিত। তিনি জীবিত থাকতেই সাম্রাজ্যের ভগ্নদশা আরম্ভ হয়। তাঁর সুযোগ্য খুড়তুতো ভাই ফিরোজ শা (১৩৫১-৮৮ খ্রিস্টাব্দ) বুদ্ধিমান ও সুশাসক হয়েও এবং প্রাণপণে চেষ্টা করেও সাম্রাজ্যকে অধঃপতনের কাল থেকে রক্ষা করতে পারলেন না। ফিরোজ শার মৃত্যুর পর সাম্রাজ্য গেল রসাতলে।

সমস্ত ভারতবর্ষ জুড়ে বিদ্রোহী মুসলমান ও হিন্দু যোদ্ধারা ছোট-বড়-মাঝারি খণ্ডরাজ্য স্থাপন করলেন। দিল্লির সম্রাট বলতে আর ভারতের সম্রাট বোঝায় না—দিল্লি তখন ভারতের একপ্রান্তে অবস্থিত একটি ক্ষুদ্র রাজ্য মাত্র। ভারতের একাধিক রাজা তখন দিল্লির অধিপতির চেয়ে শক্তিশালী। ধরতে গেলে দিল্লীশ্বর নাসিরুদ্দিন মামুদের রাজ্য বা শক্তি তখন সীমাবদ্ধ ছিল দিল্লি নগরের চার দেওয়ালের মধ্যেই। মোগল সাম্রাজ্যেরও শেষ দিকে দিল্লীশ্বরের অবস্থা হয়েছিল এই রকম।

তখনও ভারতবর্ষে কয়েকটি ছোট-বড় রাজ্য ছিল। কিন্তু সেগুলি দিল্লি থেকে এত দূরে অবস্থিত ছিল যে, পশ্চিম ভারতবর্ষের রাজনীতির সঙ্গে তাদের কোনওরকম সম্পর্ক ছিল না বললেই হয়। অথচ ভারতীয় রাজনীতির প্রধান রঙ্গ-মঞ্চই ছিল পশ্চিম ভারতবর্ষে—কারণ সেকালে ওইখানেই ভারতের ভাগ্য পরিবর্তন হয়েছে বারংবার, এবং একমাত্র এই কারণেই দিল্লীশ্বর তখনও ছিলেন সমস্ত ভারতবর্ষের মধ্যে সর্বপ্রধান ব্যক্তি।

দিল্লীশ্বরের আমির-ওমরাওরা যখন আপন আপন স্বার্থসিদ্ধির জন্য পরস্পরের সঙ্গে ঘরোয়া বিবাদে নিযুক্ত, আচম্বিতে তখন সংবাদ এল, দিগবিজয়ী তৈমুরের আবির্ভাব হয়েছে ভারতবর্ষে।

তৈমুরের পৌত্র পির মহম্মদ সিন্ধুনদ পার হয়েছেন। দিল্লীশ্বরের সৈন্যরা পরাজিত হয়ে মুলতান নগরের মধ্যে আশ্রয় গ্রহণ করেও আত্মরক্ষা করতে পারেনি। পির মহম্মদ মুলতান অধিকার করেছেন (১৩৯৮ খ্রিস্টাব্দে)।

এর পরে আরম্ভ হল, রক্তাক্ত নাটকের অভিনয়।

একাদশ । দিল্লি

সমরখন্দের আমির তৈমুর,—যাঁর রক্তাক্ত তরবারির সামনে হৈম সংঘ, পারস্য, আফগানিস্তান ও মেসোপটেমিয়ার পতন হয়েছে, তিনিই আসছেন আজ একতাহীন, শৃঙ্খলাহীন, শক্তিহীন, প্রায় অরাজক ভারতবর্ষের রত্নভাণ্ডার লুণ্ঠন করতে!

দুর্বল দিল্লিশ্বর নাসিরুদ্দিনের সিংহাসনই কেবল কেঁপে উঠল না, উত্তর-পশ্চিম ভারতের সমস্ত হিন্দু-মুসলমানের প্রাণও কেঁপে উঠল দুরু দুরু করে। কারণ তৈমুরের কীর্তি-কাহিনি কারুরই অজানা ছিল না। তৈমুর—তৈমুর! ভগবানের চাবুক তিনি, প্রহার করেন নির্বিচারে, হিন্দু-মুসলমান-খ্রিশ্চান সকলকেই বলি দিয়ে দেশে দেশে তিনি নরমুণ্ডের পিরামিড রচনা করেছেন এবং যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি নৃশংসেরও চেয়ে নৃশংস! গজনির মামুদের সংহার মূর্তি ভারতবর্ষ তখনও ভুলতে পারেনি, সুতরাং তৈমুরের নামে লোকের হৃৎকম্প হওয়া আশ্চর্য নয়।

পৌত্র পির মহম্মদ মুলতান দখল করলেন। কিছুদিন পরে তৈমুরও করলেন তাঁর সঙ্গে যোগদান। তারপর নব্বই হাজার তাতার অশ্বারোহী নিয়ে অগ্রসর হতে লাগলেন—লক্ষ্য তাঁর দিল্লি।

কিন্তু ভারতবর্ষ দুর্বল হলেও দিল্লির পথ নিষ্কন্টক হল না। মুসলমান, রাজপুত ও জাট-নায়করা নানাস্থানে এই বিদেশি দিগবিজয়ীকে বাধা দেওয়ার জন্যে দলবদ্ধ হলেন, কিন্তু তাঁরা কেউই আত্মরক্ষা করতে পারলেন না। পাক-পাটান, দীপালপুর, শিরা, ফতেবাদ ও তোহানা প্রভৃতি স্থানে যেখানেই অস্ত্রে অস্ত্রে সংঘাত বাধল, ভারতীয় হিন্দু-মুসলমানের রক্তধারায় মাটি হয়ে উঠল পিচ্ছিল। কত শহর ও গ্রাম পরিণত হল সমতল ক্ষেত্রে, বাসিন্দাদের নিক্ষেপ করা হল নগ্ন অস্ত্রের মুখে, চারিদিক আচ্ছন্ন হয়ে গেল আগুন ও ধোঁয়ায়! হাজারে হাজারে কাতারে কাতারে লোক ছুটে চলল দিল্লির দিকে—হতভাগ্যরা ভাবলে, পালিয়ে তারা ভগবানের চাবুককে ফাঁকি দিতে পারবে!

যুদ্ধ যা হল তা নামেমাত্র যুদ্ধ, তৈমুরের সামনে কেউ দাঁড়াতেও পারলে না, সুতরাং এসব যুদ্ধের বর্ণনা দিয়েও লাভ নেই। অধঃপতিত ভারতবর্ষের পঙ্গু পুরুষত্বের গগনভেদী আর্তনাদ ক্রমে দিল্লির কাছ পর্যন্ত গিয়ে হাজির হল।

দিল্লীশ্বরের ডান হাতের মতন ছিলেন তখন মাল্লু খাঁ। কিছু সৈন্য সংগ্রহ করে তিনি দিল্লি থেকে বেরিয়ে তৈমুরকে বাধা দিতে এলেন।

এর পর যে বিয়োগান্ত দৃশ্যের অভিনয় হল তা বড়ই মর্মন্তুদ। তৈমুরের সঙ্গে ছিল একলক্ষ হিন্দু বন্দি। দিল্লির সৈন্যেরা আসছে শুনে নির্বোধরা আনন্দ প্রকাশ না করে থাকতে পারলে না।

তৈমুর ভাবলেন, এক লক্ষ সক্ষম বন্দি বিদ্রোহী হলে বিশেষ বিপদের সম্ভাবনা। তিনি তখনই হুকুম দিলেন, 'ওদের সকলকে হত্যা করো।'

সঙ্গে সঙ্গে ঊর্ধ্বে উৎক্ষিপ্ত অস্ত্রে অস্ত্রে হল ঝকমক বিদ্যুৎ সঞ্চার এবং দেখতে দেখতে এক লক্ষ মৃতদেহ লুটিয়ে পড়ল রক্তরাঙা মাটির উপরে। তাদের কাতর কান্না আজও জেগে আছে ভারতের প্রাণে।

ইতিমধ্যে মাল্লু খাঁ আবার পশ্চাৎপদ হয়ে দিল্লির ভিতরে গিয়ে আশ্রয় নিলেন।

এর পর দুই পক্ষই চরম যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত হতে লাগল।

তাতার সৈন্যরা আবার ভয় পেলে, কারণ তারা দেখলে তাদের বিরুদ্ধে দলে দলে হাতি প্রস্তুত হচ্ছে। সেইসব অদ্ভুত, বিরাটদেহ জীবের শুঁড়ে শুঁড়ে বাঁধা নগ্ন তরবারি এবং তাদের পৃষ্ঠদেশে ছোটখাটো দুর্গের মতন সৈনিকে পরিপূর্ণ হাওদা। তাদের বিশ্বাস হল, এদের সঙ্গে লড়াই করা অসম্ভব।

সঙ্গের জ্যোতিষীরা গ্রহ-নক্ষত্র বিচার করে বললেন, 'হুজুর, মানুষ কখনও এমন আজগুবি জানোয়ারের সামনে দাঁড়াতে পারে না।'

তৈমুর অটল। ১৩৯৮ খ্রিস্টাব্দের ১৭ ডিসেম্বর তারিখে তিনি সসৈন্যে যমুনা নদী পার হয়ে ব্যূহ সাজাতে লাগলেন। হাতিদের বাধা দেওয়ার জন্যে ব্যূহের সামনে স্থাপন করলেন পরস্পরের সঙ্গে বাঁধা দলে দলে মহিষ।

দিল্লিশ্বর নাসিরুদ্দিন ও তাঁর যোদ্ধা মন্ত্রী মাল্লু খাঁয়ের সঙ্গে ছিল মাত্র চল্লিশ হাজার পদাতিক ও দশ হাজার অশ্বারোহী সৈন্য।

তাতাররা বুঝলে সংখ্যায় তারা দ্বিগুণ। সুতরাং তাদের উৎসাহ বেড়ে উঠল।

ভারতীয় সৈনিকরা আক্রমণ করলে। নিপুণ সেনাপতি তৈমুরের আদেশে তাতারদের দক্ষিণ পাশের সেনাদল ভারতীয়দের বামপাশ ক্রমে ক্রমে ঘিরে ফেলে পিছন দিকে গিয়ে হাজির হল। তখন ভারতীয়রা আক্রান্ত হল একসঙ্গে সম্মুখ ও পিছন থেকে।

ভারতের পক্ষে ফল হল মারাত্মক। দিল্লীশ্বরের সমস্ত সৈন্য প্রাণভয়ে পৃষ্ঠভঙ্গ দিতে দেরি করলে না। এমনকি যাদের জন্যে এত দুর্ভাবনা, সেই হাতির দলও পালিয়ে গেল ভীত গোরুর মতন।

পরদিনই তৈমুর দিল্লি নগর অধিকার করলেন।

যুদ্ধ থেমে গেল বটে, কিন্তু দিল্লির বিষের পাত্র তখনও পূর্ণ হল না।

বিজয়ী ও দাম্ভিক তাতারদের দুর্ব্যবহারে উত্যক্ত ও মরিয়া হয়ে দিল্লির হিন্দু বাসিন্দারা বিদ্রোহ ঘোষণা করলে। বহু পরিবারের হিন্দু নারীরা জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে দিলেন আত্মাহুতি এবং পুরুষরা মৃত্যুপণ করে তরবারি হাতে নিয়ে তাতারদের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। দিল্লির পথে পথে জাগল যোদ্ধাদের সিংহনাদ ও আর্তনাদ। কিন্তু অসংখ্য তাতারি সৈনিকদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নাগরিকরা প্রাণদান ছাড়া আর কিছুই করতে পারলে না। দিল্লির পথে পথে সাজানো হল নরমুণ্ডের পিরামিড। বাকি হিন্দুরা হল বন্দি। কথিত আছে, এমন তাতারি ছিল না, যে অন্তত বিশজন হিন্দু গোলাম সংগ্রহ করেনি।

পনেরো দিন ধরে দিল্লি লুট করে অগাধ ঐশ্বর্যের মালিক হয়ে তৈমুর স্বদেশের দিকে যাত্রা করলেন। যাত্রাপথে তৈমুরকে প্রায় প্রতিদিনই যুদ্ধবিগ্রহে লিপ্ত থাকতে হল। মীরাট, হরিদ্বার, কাংগ্রা ও জামু প্রভৃতি স্থানে তিনি যে কত হিন্দু সংহার করলেন, তার হিসাব থাকলে পৃথিবী আজও শিউরে উঠত। বেশ বোঝা যাচ্ছে, মুসলমানের চেয়ে হিন্দুরাই তৈমুরকে বেশি বাধা দিয়েছিল। তৈমুর অসংখ্য ভারতীয় শিল্পী ও কারিগরকেও বন্দি করে নিয়ে গেলেন—সমরখন্দে উচ্চশ্রেণির শিল্পীর অভাব ছিল বলে।

ঐতিহাসিকরা বলেন, একবারমাত্র যুদ্ধযাত্রা করে তৈমুর ভারতবর্ষকে যতটা দুর্দশাগ্রস্ত করে গিয়েছিলেন, ততটা আর কেউ পারেনি; এদিক দিয়ে গজনির কুবিখ্যাত দস্যু ও হত্যাকারী মামুদ পর্যন্ত তাঁর কাছে ম্লান হয়ে পড়বেন।

তৈমুরের পিছনে পড়ে রইল মরুভূমির মতন দীন উত্তর ভারতবর্ষ। সমস্ত দেশ জুড়ে জাগল দুর্ভিক্ষ ও মড়কের হাহাকার, পথ-ঘাট-মাঠ ছেয়ে রইল লক্ষ লক্ষ কাঙালে, নগরের পর নগর হয়ে গেল ভারতের বুক থেকে অদৃশ্য। এমনকী দিল্লি নগরও পড়ে রইল বিরাট এক ধ্বংসস্তূপের মতন—শহরের ভিতরে মানুষের বসবাস রইল না বললেও চলে। ইতিহাসে পড়ি, তৈমুরের প্রস্থানের পর দীর্ঘ দুই মাসের ভিতরে দিল্লি নগরে একটিমাত্র পাখিকেও উড়তে দেখা যায়নি!

কোনও কোনও ঐতিহাসিকের মত হচ্ছে, সমগ্র এশিয়ার একেশ্বর হওয়ার জন্যে তৈমুরের বাসনা ছিল যে, তখনকার প্রাচ্যদেশের সর্বপ্রধান সাম্রাজ্য চিনকেও তিনি অধিকার বা বশীভূত করবেন। চিনে যাওয়ার পথের পাশেই পড়ে উত্তর ভারতবর্ষ। পিছনে বা পাশে শত্রু রেখে পাছে তাঁকে বিপদগ্রস্ত হতে হয়, সেই ভয়েই আগে থাকতে ভারতকে তিনি পঙ্গু করে রাখলেন। এবং জয়ী হয়েও ভারতের অন্যান্য প্রদেশের দিকে দৃষ্টিপাত না করে স্বদেশে ফিরে গেলেন। কারণ যা-ই হোক, তৈমুরের ভারত আক্রমণ যে তাঁর যোদ্ধা-জীবনের একটি সংক্ষিপ্ত অধ্যায় মাত্র, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।

১৩৯৯ খ্রিস্টাব্দের ২০মে তারিখে আমির তৈমুর সমরখন্দে ফিরে এলেন এবং তার এক হপ্তা পরেই দেখি, ভারত-বিজয়কে স্মরণীয় করবার জন্যে তিনি এক বিরাট মসজিদ প্রতিষ্ঠায় নিযুক্ত হয়েছেন। অন্তত দুই লক্ষ নরহত্যা করে তিনি যে দেশে ফিরে এসেছেন, এজন্যে তাঁর মনে একটিও দুঃখের রেখা পড়ল না, সমস্ত যুদ্ধবিগ্রহ ও রক্তপাতের কথা ভুলে তিনি তাঁর মসজিদকে অপূর্ব করে তোলবার উপায় চিন্তা করতে লাগলেন।

মসজিদের বাইরের দেওয়াল যখন সম্পূর্ণ হল, ভিতরের সূক্ষ্ম কারুকার্যের জন্যে তখন নিযুক্ত করা হল ভারত থেকে বন্দি করে আনা দুই শত শিল্পীকে। মাত্র তিন মাসের মধ্যেই তারা গড়ে ফেললে চারি শত আশিটি পাথরের থাম, ভিতরদিককার ছাদ ও অলংকৃত পিতলের দরজাগুলি। মসজিদ নির্মাণ সমাপ্ত!

হঠাৎ তাঁর খেয়াল হল, সমরখন্দের ক্ষুদ্র বাজার রাজধানীর উপযুক্ত নয় এবং বাজারে আনাগোনা করবার পথটিও বড়ো সংকীর্ণ। তখনই তিনি হুকুম দিলেন—'বড় করে তোলো বাজারকে, তৈরি করো দীর্ঘ ও চওড়া একটি রাজপথ! সময় দিলুম বিশ দিন।'

যথাসময়ে হুকুম তামিল করবার লোকের অভাব হল না। তৈমুরের হুকুম—যমের হুকুম।

আমির তৈমুরের বয়স এখন চৌষট্টি বৎসর। যদিও তাঁর দেহ আগেকার মতোই বলিষ্ঠ আছে, তবু মাঝে মাঝে এখন তিনি পীড়িত হয়ে পড়েন। এখন তাঁর বিশ্রাম করবার সময়, কিন্তু বিশ্রাম সহ্য হয় না তাঁর ধাতে। আজও তিনি সেই দৃপ্ত তৈমুর—একা যিনি শত্রু-দুর্গের সিংহদ্বারের সামনে ছুটে গিয়েছিলেন দ্বন্দ্বযুদ্ধ করবার জন্যে। কেউ যুদ্ধে আহ্বান করলে এখনও তিনি শান্ত ও নিশ্চেষ্ট হয়ে থাকতে পারেন না।

এশিয়া মাইনর থেকে তাঁর সামন্ত রাজাদের তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তাঁর পুত্রদের অধীনস্থ দেশে নতুন নতুন শত্রুর আবির্ভাব হয়েছে। বোগদাদ নগর শত্রুর করতলগত হয়েছে। এসব হচ্ছে নতুন যুদ্ধের আহ্বান!

তৈমুর সাড়া দিতে কালবিলম্ব করলেন না। দেশে ফেরবার চার মাস পরেই আবার তিনি করলেন যুদ্ধযাত্রা। সমরখন্দ তিন বছর তাঁর মুখ দেখতে পেলে না।

দ্বাদশ । 'বজ্র' বেয়াজিদ ও খঞ্জ তৈমুর

তৈমুরের বিরুদ্ধে তখন একজোট হয়ে দাঁড়িয়েছে নানাদেশি শত্রু—তুর্কি, মামেলুক, সারকাস্যান, জর্জিয়া, টার্কোম্যান ও আরব! এরা সবাই যোদ্ধার জাত এবং এদের মধ্যে তখন সবচেয়ে প্রবল ও দুর্ধর্ষ ছিল তুর্কিগণ।

কিন্তু ভয় পাওয়ার ছেলে নন তৈমুর। তিনি স্থির করলেন, প্রথমেই যাত্রা করবেন বোগদাদের দিকে।

তুরস্কের প্রথম সুলতান উপাধিকারী বেয়াজিদের নাম তখন প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের দিকে দিকে। জার্মানির রাজা ও রোমের সম্রাট সিগিসমান্ড এবং ইউরোপীয় খ্রিশ্চানদের সম্মুখযুদ্ধে বিষম ভাবে হারিয়ে দিয়ে তিনি তখন তৈমুরের চেয়ে অল্প খ্যাতি অর্জন করেননি। এই বেয়াজিদের আশ্রয় গ্রহণ করেছেন তৈমুরের দুই প্রধান শত্রু—টার্কোম্যানদের কারা ইউসুফ ও বোগদাদের সুলতান আমেদ।

প্রথমটা তৈমুরের ইচ্ছা ছিল না যে, বেয়াজিদের সঙ্গে শত্রুতা করবেন। তিনি খুব ভদ্রভাবে লিখে জানালেন যে, সুলতান বেয়াজিদ যদি ইউরোপ নিয়ে খুশি হন, তাঁর তাতে আপত্তি নেই। তাঁর সঙ্গে তৈমুরের ঝগড়া করবারও ইচ্ছা নেই। কিন্তু তাঁর শত্রু ইউসুফ ও সুলতান আমেদকে যদি তিনি ত্যাগ করেন তাহলে বড় ভালো হয়।

বেয়াজিদের ডাকনাম ছিল 'বজ্র'। এবং বজ্রেরই মতন কঠিন ভাবে তিনি জবাব দিলেন, 'ওরে রক্তাক্ত কুক্কুর, ওরে খোঁড়া তৈমুর! তুর্কিরা বন্ধুদের তাড়িয়ে দিতে বা শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধে ভয় পেতে অভ্যস্ত নয়। এ কথা তুই ভালো করেই জেনে রাখিস!'

তৈমুরও চুপ করে থাকবার পাত্র নন। তিনি লিখলেন, 'মাতঙ্গের সঙ্গে যুদ্ধ করবার আগে পতঙ্গের উচিত, নিজের কথা ভেবে দেখা। আপনি আমার কথা না শোনেন, তাহলে পরে আপনাকে অনুতাপ করতে হবে।'

বেয়াজিদ জবাবে লিখলেন : 'ওরে খোঁড়া তৈমুর! আমার অনেক দিনের সাধ তোর সঙ্গে লড়াই করব। ভগবান আজ সেই সুযোগ দিয়েছেন। এর পরেও তুই যদি আমার দিকে এগিয়ে না আসিস, তবে আমিই এগিয়ে যাব তোর দিকে! তোকে হারিয়ে ভূত করব, তারপর তোর বউকে কেড়ে নেব!'

তৈমুর রাগে জ্বলে উঠে প্রতিজ্ঞা করলেন, বেয়াজিদকে তিনি ভালো করেই শিক্ষা দেবেন।

দূতের মধ্যস্থতায় দুজনের মধ্যে এমনি পত্র ব্যবহার চলেছে, ইতিমধ্যে দুটি ইতিহাস প্রসিদ্ধ বড় বড় ঘটনা ঘটে গেল।

প্রথমটি হচ্ছে, তৈমুরের দ্বারা তুর্কিরা ছাড়া অন্যান্য শত্রু দমন ও সিরিয়া অধিকার।

এবং দ্বিতীয়টি হচ্ছে, বেয়াজিদের দ্বারা ক্রিশ্চানদের প্রধান রাজধানী কনস্তান্তিনোপল অবরোধ।

কনস্তান্তিনোপলের পতন হলেই পৃথিবী বিখ্যাত রোম সাম্রাজ্যের শেষ চিহ্ন লুপ্ত হয়ে যাবে। মুসলমানদের সঙ্গে ধর্মযুদ্ধ ও কনস্তান্তিনোপলকে রক্ষা করবার জন্যে ইউরোপের চারিদিক থেকে ক্রিশ্চানরা ছুটে এসেছেন। কিন্তু মহাবীর্যবান বেয়াজিদ এমন ভাবে শহর ঘিরে রইলেন যে, ক্রিশ্চানদের কোনও জারিজুরিই আর খাটল না। ধর্মযুদ্ধের কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে অধিকাংশ ক্রিশ্চান বীরই কনস্তান্তিনোপল ছেড়ে সরে পড়লেন।

শহরের ভিতরে দারুণ খাদ্যাভাব। উপবাসী বাসিন্দারা শহরের পাঁচিল টপকে বাইরে গিয়ে শত্রু তুর্কিদের কাছেই ভিক্ষা মাগতে শুরু করল। কনস্তান্তিনোপল আত্মসমর্পণ করবার জন্যে প্রস্তুত—এমন সময়ে খবর এল, সিরিয়া জয় করে খোঁড়া তৈমুর আসছেন 'বজ্র' বেয়াজিদের সঙ্গে দেখা করতে!

'বজ্র'র পিলে গেল চমকে! তৈমুরের এতটা ভরসা হবে তিনি তা কল্পনাও করতে পারেননি। তিনি ডাকলেন,—আমি ইউরোপ-বিজেতা বজ্র, একটা খোঁড়া তাতারের এত স্পর্ধা!

তারপরেই বোধ হয় 'বজ্র'র মনে পড়ে গেল,—আমি ইউরোপ বিজয়ী বটে, কিন্তু এই খোঁড়া তাতার ঘৃণ্য হলেও নগণ্য নয়, সেও এশিয়া বিজয়ী।

তখনই 'বজ্র'র হুকুম হল—'কনস্তান্তিনোপলের চারিধার থেকে তাঁবু তোলো! সওয়াররা ঘোড়ায় চড়ো, পদাতিকরা ছুটে চলো! ইউরোপের যেখানে যত তুর্কি বীর আছে, সবাইকে ডাক দাও! শিয়রে তাতার শত্রু—এখন কনস্তান্তিনোপলের কথা ভুলে যাও!'

কনস্তান্তিনোপল ছেড়ে, ইউরোপ ছেড়ে, তুর্কিরা ছুটল আবার এশিয়া মাইনরের দিকে। এর ফলে কনস্তান্তিনোপলের ক্রিশ্চানরা নিজেদের স্বাধীনতা রক্ষা করেছিল আরও পঞ্চাশ বৎসর!

এর মধ্যেই বেয়াজিদের কবল থেকে আর আত্মরক্ষা করা অসম্ভব দেখে কনস্তান্তিনোপলের ক্রিশ্চান সম্রাট ম্যানুয়েল করুণ ভাষায় তৈমুরের কাছে এক আবেদন জানালেন, 'হে তৈমুর, তুমি আমাকে রক্ষা করো!'

সম্রাট ম্যানুয়েল মুসলমানদের বিরুদ্ধে যে ধর্মযুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন—ইতিহাসে তা 'শেষ ক্রুসেড' নামে বিখ্যাত। অথচ তিনিই মুসলমান বেয়াজিদের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে অনুরোধ করছেন মুসলমান তৈমুরকে।

প্রথম দৃষ্টিতে ব্যাপারটা হাস্যকর বলে মনে হয়। কিন্তু এর দুটি কারণ থাকতে পারে। ম্যানুয়েল জানতেন, হয়তো তৈমুরের চেয়ে বড় শত্রু বেয়াজিদের আর কেউ নেই। অথবা হয়তো তৈমুরের মধ্যে ধর্মান্ধতা ততটা প্রবল ছিল না।

কিন্তু ম্যানুয়েল সাহায্য ভিক্ষা না করলেও তৈমুর তুর্কিদের আক্রমণ করতে আসতেনই। কারণ তৈমুর জানতেন, লোকে বেয়াজিদকে তাঁর চেয়ে শ্রেষ্ঠ বলে মনে করে। এটা তাঁর পক্ষে অসহনীয়। তাঁর সবচেয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষা হচ্ছে পৃথিবীতে একমাত্র সূর্য বলে গণ্য হবেন তিনিই স্বয়ং। কেউ তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চাইলে রাগে তিনি পাগল হয়ে উঠতেন! প্রমাণ, যেসব দেশ সহজে তাঁর বশীভূত হয়েছে, তাদের উপরে তিনি কোনও অত্যাচারই করেননি। কিন্তু যেসব দেশের লোক তাঁর সঙ্গে লড়াই করতে চেয়েছে, তাদের নগর-গ্রামকে তিনি পরিণত করেছেন সমতল ক্ষেত্রে এবং তাদের মুণ্ডগুলো কেটে নিয়ে তৈরি করেছেন ভয়াবহ পিরামিড! তার উপর বেয়াজিদ তাঁকে চূড়ান্ত অপমান করেছেন এবং ইতর ভাষায় গালাগালি দিয়েছেন।

সম্রাট ম্যানুয়েল কেবল তৈমুরকে নয়, বেয়াজিদকেও জানালেন, তিনি যদি তৈমুরকে পরাস্ত করতে পারেন, তাহলে বিনাযুদ্ধেই কনস্তান্তিনোপলকে তাঁর হাতে সমর্পণ করা হবে।

পঞ্চদশ শতাব্দী এখন সবে পৃথিবীতে পদার্পণ করেছে—অর্থাৎ ১৪০২ খ্রিস্টাব্দ।

ইউরোপ-বিজয়ী বেয়াজিদ চারিদিক থেকে নিজের যুদ্ধপ্রবীণ সৈন্যদল সংগ্রহ করতে লাগলেন। তাঁর ফৌজের মধ্যে কেবল তুর্কিরাই ছিল না। ইউরোপের পরাজিত সামন্ত রাজারাও তাঁর আহ্বানে বা আদেশে সৈন্য প্রেরণ করতে বাধ্য হলেন। সার্ভিয়ার রাজা পাঠালেন বিশ হাজার অশ্বারোহী—তাদের সর্বাঙ্গ কঠিন লৌহবর্মে আবৃত, দেখা যায় কেবল তাদের চোখগুলো। এল হাজার হাজার গ্রিক, হাজার হাজার রুমানিয়ান এবং আরও নানা দেশের অসংখ্য ক্রিশ্চান। বেয়াজিদের সৈন্যসংখ্যার সঠিক হিসাব নেই। কেউ বলেন এক লক্ষ বিশ হাজার, কেউ বলেন দুই লক্ষ পঞ্চাশ হাজার।

এশিয়া মাইনরের আঙ্গোরা (তুরস্কের বর্তমান রাজধানী) শহরে গিয়ে বেয়াজিদ ছাউনি ফেললেন। সিভা থেকে এদিকে আসবার জন্যে আছে একমাত্র পথ। অতএব বেয়াজিদ আন্দাজ করলেন, এই পথেই তৈমুরের সঙ্গে তাঁর দেখা হবে।

তুর্কিদের প্রধান শক্তি পদাতিক সৈন্য। আঙ্গোরার উপকণ্ঠে কিছুদিন বিশ্রাম করবার অবসর পেলে তারা হবে আরও তেজিয়ান, আরও বলবান। কিন্তু তৈমুরকে সসৈন্যে আসতে হবে বহু যোজনব্যাপী দুর্গম পথ অতিক্রম করে। সুতরাং তাঁর সেই পথশ্রান্ত সৈন্যদের আক্রমণ ও পরাস্ত করবার জন্যে বেশি বেগ পেতে হবে না। সুলতান বেয়াজিদ নিজের জয় সম্বন্ধে সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিত হয়ে হুকুম দিলেন, 'সৈন্যগণ, তোমরা খাও-দাও, ফুর্তি করো!'

ইউরোপ-বিজয়ীর সঙ্গে এশিয়া-বিজয়ীর শক্তি পরীক্ষা! সমস্ত পৃথিবী ফলাফল দেখবার জন্যে রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করতে লাগল।

ত্রয়োদশ । আঙ্গোয়ার যুদ্ধ

ইউরোপের সঙ্গে এশিয়ার শক্তি পরীক্ষা। ও নতুন দৃশ্য নয়। স্মরণাতীত কাল থেকেই এ দৃশ্যের অভিনয় হয়েছে বারংবার। এবং প্রাচীন ও মধ্যযুগের ইতিহাসেও এজন্যে অমর হয়ে আছে পারসি দরায়ুস, গ্রিক আলেকজান্ডার, হুন আটিলা ও মোগল চেঙ্গিজ খাঁয়ের নাম। বেয়াজিদও এই অভিনয়ে যোগ দিয়ে সফল হয়েছেন।

কিন্তু ইউরোপ বিজেতার সঙ্গে এশিয়া বিজেতার শক্তি পরীক্ষার কথা আগে শোনা যায়নি। সুতরাং সারা পৃথিবী যে এই অপূর্ব পরীক্ষার ফলাফল দেখবার জন্যে উন্মুখ হয়ে থাকবে, এ হচ্ছে খুবই স্বাভাবিক কথা।

আগেই বলা হয়েছে, নিজের জয়ের সম্বন্ধে সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত হয়ে বেয়াজিদ আঙ্গোরা শহরের কাছে ছাউনি ফেলেছেন। তিনি স্থির করেছেন, বহুদূর থেকে আগত তৈমুরের পথশ্রান্ত সৈন্যদের বিশ্রামের অবকাশ না দিয়েই আক্রমণ ও পরাজিত করবেন।

বেয়াজিদ বসে বসে অপেক্ষা করছেন—অপেক্ষাই করছেন! এক দিন, দুই দিন, তিন দিন। সিভা শহর থেকে এদিকে আসবার একমাত্র পথে বিরাজ করছে কেবল ধু ধু শূন্যতা। ক্রমে সাত দিন কেটে গেল। তবু তৈমুরের দেখা নেই। গুপ্তচররা চারিদিক থেকে ফিরে এসে বললে,—তৈমুরের সসৈন্যে সিভা থেকে বেরিয়ে পড়েছেন বটে, কিন্তু তিনি যে এখন কোথায়, কেউ তা জানে না।

শত্রু যুদ্ধযাত্রা করেছে, অথচ একবারে অদৃশ্য! বেয়াজিদ এমন বেয়াড়া ও আজব ব্যাপার কল্পনায় আনতে না পেরে হতভম্ব হয়ে গেলেন। তাঁর সৈন্যরা হালিজ নদীর ধারে ব্যূহ রচনা করে যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত হয়ে আছে। কিন্তু তারা কার সঙ্গে যুদ্ধ করবে? শত্রু কোথায়?...বেয়াজিদ ছাউনি তুলে ব্যূহ ভেঙে নানাদিকে ছুটোছুটি করতে লাগলেন।

তারপর তৈমুরের খবর পাওয়া গেল। তিনি সিভার পথ ধরেননি। হালিজ নদীর অন্য তীর দিয়ে যাত্রা করে একেবারে আঙ্গোরা নগর অবরোধ করে বসেছেন। এই আঙ্গোরাই ছিল তুর্কিদের প্রধান আশ্রয়—ওখানেই জমা করা ছিল তাদের যা কিছু রসদ!

তৈমুরকে খোঁজবার জন্যে আশ্রয় ছেড়ে দূরে এসে পড়ে কী অন্যায়ই যে করেছেন, এতক্ষণে বেয়াজিদ তা ভালো করেই বুঝলেন। কিন্তু এখন আর অন্য উপায় নেই, এখান থেকে আঙ্গোরা সাত দিনের পথ—এখন এই দীর্ঘ পথই করতে হবে তাঁকে অতিক্রম। প্রথম চালে জিতে গেলেন তৈমুর।

তৈমুরকে বাধা দেওয়ার জন্যে বেয়াজিদ ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটলেন। কিন্তু যতই অগ্রসর হন ততই তাঁর চক্ষু স্থির হয়ে যায়। তৈমুর সমস্ত গ্রাম ও শস্যখেত লুণ্ঠন করেছেন—কোথাও এককণা খাবার নেই। পথিমধ্যে যত জলাশয় বা উৎস ছিল, তাতাররা সব নষ্ট করে দিয়েছে—কোথাও একফোঁটা জল নেই, এমনকী আঙ্গোরা শহরের সুমুখ দিয়ে যে নদীটি বইত, তৈমুর বাঁধ দিয়ে তারও মোড় ফিরিয়ে দিয়েছেন। সে নদী বইছে এখন তাতার সৈন্যদের পিছন দিকে। দ্বিতীয় চালেও তৈমুরের জিৎ।

তুর্কিরা এসেছে শুনে তৈমুরও আঙ্গোরা ছেড়ে এগিয়ে এলেন। তখন যুদ্ধ করা ছাড়া বেয়াজিদের আর কোনও উপায় রইল না। তাঁর সৈন্যরা পথশ্রান্ত, দারুণ পিপাসায় প্রাণ তাদের কণ্ঠাগত। এ অবস্থায় যুদ্ধ করা সম্ভব নয়—কিন্তু তাঁকে যুদ্ধ করতেই হবে।

দুই পক্ষের সৈন্যদলের সম্মুখভাগ পনেরো মাইল দীর্ঘ। তুর্কিরা হইহই রবে করতাল ও জয়ঢাক বাজাতে বাজাতে অগ্রসর হল, কিন্তু তাতাররা দাঁড়িয়ে রইল স্তব্ধ হয়ে। সূর্য তখন প্রখর।

তৈমুর তখনও ঘোড়ায় চড়া দরকার মনে করলেন না—প্রাথমিক যুদ্ধের ভার রইল সেনাপতিদের হাতেই। পৌত্র রাজকুমার মহম্মদ ছিলেন সেনাদলের মধ্যভাগের কর্তা। এখানে বর্মাবৃত হস্তীদলও ছিল। তৈমুর ভারতবর্ষ থেকে যুদ্ধে হাতি ব্যবহার করার পদ্ধতি শিখে এসেছেন।

তাতার ফৌজের দক্ষিণ ভাগ রক্ষা করছেন তৈমুরের সবচেয়ে নিপুণ সেনাপতি নূরউদ্দিন। বেয়াজিদের পুত্র সুলেমান অশ্বারোহী সৈন্যদের নিয়ে সর্বপ্রথমে সেইদিক আক্রমণ করলেন। সঙ্গে সঙ্গে তাতারদের স্তব্ধতা ভঙ্গ হল। তারা শত্রুদের উপরে নিক্ষেপ করতে লাগল ঝাঁকে ঝাঁকে তির ও জ্বলন্ত 'ন্যাপথা'।

তুর্কিরা ব্যতিব্যস্ত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল এবং সঙ্গে সঙ্গে তাতাররা আক্রমণ করলে প্রবল পরাক্রমে। সে আক্রমণ সইতে না পেরে অনেক তুর্কি রণক্ষেত্র ছেড়ে পালিয়ে গেল। সেই সময় তাতারদের বামপার্শ্বও তুর্কিদের উপর ভেঙে পড়ল সমুদ্রতরঙ্গের মতন। দু-দিক থেকে আক্রান্ত হয়ে তুর্কি অশ্বারোহীদের অবস্থা হয়ে উঠল বিষম শোচনীয়।

তখন তৈমুর তাঁর পৌত্রকেও বাছা বাছা সৈন্য নিয়ে তুর্কিদের অধীনস্থ সার্ভিয়ান অশ্বারোহীদের আক্রমণ করবার জন্যে হুকুম দিলেন। কাড়া-নাকাড়ার তালে তালে অস্ত্রে অস্ত্রে উঠল সে কী ঝনৎকার!

হাজার হাজার তরবারির বিদ্যুৎ-দীপ্তিতে চক্ষু হতে চায় অন্ধ এবং যোদ্ধাদের বিজয় হুঙ্কারে কাঁপতে থাকে যেন আকাশ-বাতাস!

খানিক পরে দেখা গেল, তুর্কিদের দক্ষিণ পার্শ্ব একেবারে ভেঙে গিয়েছে। সার্ভিয়ার রাজা পিটার নিহত এবং তাতার রাজকুমার মহম্মদ আহত (পরে আহত মহম্মদের মৃত্যু হয়)।

এতক্ষণ পরে সুসময় বুঝে মধ্যভাগের সেনাদল নিয়ে স্বয়ং তৈমুর অগ্রসর হলেন। তুর্কিদের বিখ্যাত 'ওসমানলি' পদাতিকরা তৈমুর-চালিত তাতার অশ্বারোহীদের আক্রমণ সহ্য করতে পারলে না—তারা প্রাণ নিয়ে পলায়ন করতে লাগল।

বেয়াজিদ যেন পাগলের মতন হয়ে উঠলেন! নিজের রক্ষী সৈন্যদের নিয়ে স্বহস্তে কুঠার ধারণ করে তিনি যুদ্ধ করতে লাগলেন—কিন্তু বৃথা! রক্ষী সৈন্যরা কেউ পালাল না বটে, কিন্তু একে একে সবাই মারা পড়ল এবং বেয়াজিদ হলেন বন্দি।

এর পরের দৃশ্য হচ্ছে তৈমুরের তাঁবুর ভিতরে। পুত্র শা রুখের সঙ্গে তৈমুর দাবা-বোড়ে খেলছেন। এমন সময়ে বন্দি বেয়াজিদকে নিয়ে তাতার সৈন্যদের প্রবেশ।

তৈমুর হাসতে হাসতে উঠে দাঁড়ালেন।

বেয়াজিদের আত্মগর্বে আঘাত লাগল। তিনি বললেন, 'ভগবান যাকে মেরেছেন, তাকে দেখে উপহাসের হাসি হাসা ভদ্রতা নয়।'

তৈমুর ধীরে ধীরে বললেন, 'আমি কেন হাসছি জানো? তোমার মতন অন্ধ আর আমার মতন খঞ্জের উপরেই ভগবান দিয়েছেন কিনা পৃথিবী শাসনের ভার!' তারপর গম্ভীর স্বরে বললেন, 'তোমার হাতে বন্দি হলে আজ আমার কী হাল হত সেটাও অনুমান করা কঠিন নয়।'

বেয়াজিদ এ কথার জবাব দিতে পারলেন না। তৈমুর হুকুম দিলেন, 'সুলতানের বন্ধন খুলে দাও!'

বেয়াজিদ প্রার্থনা জানালেন তাঁর পুত্রদের খোঁজখবর নেওয়ার জন্যে।

রণক্ষেত্র থেকে সুলতানের এক পুত্র—মুসাকে এনে হাজির করা হল। আর এক পুত্র যুদ্ধে মারা পড়েছেন। বাকি ছেলেরা পালিয়ে যেতে পেরেছেন।

ওদিকে নূরউদ্দিন পলাতক তুর্কিদের পিছনে ধাবিত হয়ে বেয়াজিদের রাজধানী রুসা পর্যন্ত দখল করে ফেললেন। সুলতানের সমস্ত ধনরত্ন হল তৈমুরের হস্তগত।

বেয়াজিদ যথেষ্ট আদরযত্ন পেলেন বটে, কিন্তু মুক্তি পেলেন না। এক বৎসর আগে তৈমুরকে যে অপমানকর পত্র লিখেছিলেন, আজ তারই ফলভোগ তাঁকে করতে হল। কিন্তু ইউরোপ বিজেতা বেয়াজিদকে এই চরম অধঃপতনের যন্ত্রণা বেশিদিন সহ্য করতে হয়নি। মাস কয়েক পরে বন্দি অবস্থাতেই তাঁর মৃত্যু হয়।

আঙ্গোরার যুদ্ধের ফলে তুর্কিদের বিষদাঁত একেবারে ভেঙে গেল। এরপর দীর্ঘকাল তারা আর মাথা তুলতে পারেনি। পূর্ব রোম সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্তান্তিনোপলও করলে নিশ্চিত পতন থেকে আত্মরক্ষা।

দুর্ধর্ষ তুর্কি সুলতানের এই কল্পনাতীত পরাজয়ে সমগ্র ইউরোপ হল বিস্ময়ে হতভম্ব। ইউরোপীয় রাজা-রাজড়ারা ভয়ও কম পেলেন না—কী জানি, যদি তৈমুরের ইউরোপ বেড়াবার শখ হয়, তাহলেই তো সর্বনাশ! ফ্রান্স, স্পেন, গ্রিস ও ইংলন্ডের রাজারা তাঁকে খুশি করবার জন্যে অভিনন্দন পাঠাতে দেরি করলেন না। মিশরও নত হয়ে তাঁর প্রাধান্য স্বীকার করলে।

কিন্তু তৈমুরের ইউরোপ ভ্রমণের ইচ্ছা হল না! ইউরোপের তখনকার রাজারা তাঁর কাছে ছিলেন নগণ্য, তাদের রাজ্যে এমন কোনও আকর্ষণ বা গৌরবজনক বস্তু নেই, তৈমুরের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে যা করতে পারে জাগ্রত। বেয়াজিদের দেশ থেকেই তিনি আশাতীত ঐশ্বর্য লাভ করলেন। এবং তাইতেই তুষ্ট হয়ে স্বদেশে ফিরে এলেন সসৈন্যে।

কিন্তু তাঁর চিত্তকে অধিকার করে রইল আর এক উচ্চাকাঙ্ক্ষা। তাঁর জীবনের সমস্ত স্বপ্ন সত্যে পরিণত হয়েছে, বাকি আছে কেবল একটি—

'আমি হচ্ছি সমগ্র ধরণীর একমাত্র অধীশ্বর আমির তৈমুর—পৃথিবীতে আমার কোনও প্রতিদ্বন্দ্বী রেখে যাব না!'

তৈমুরের সামনে জেগে আছে আর একটিমাত্র দেশ। তাকে দমন করতে পারলেই তাঁর সমস্ত কর্তব্য সমাপ্ত হয়!

তৈমুরের বয়স এখন ৬৯ বৎসর। তাঁর দৃষ্টিশক্তি ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে। তিনি জানতেন, তাঁর পরমায়ু শেষ হয়ে এসেছে। মহাপ্রস্থানের আহ্বান আসবার আগেই তিনি তাড়াতাড়ি শেষ যুদ্ধযাত্রার জন্য প্রস্তুত হতে লাগলেন!

চতুর্দশ । চিনের পথে অচিন দেশে

বজ্রের দর্প চূর্ণ। ঊনসত্তর বৎসরের ভার জীবনের উপর নিয়ে তৈমুর স্তিমিত দৃষ্টিতে একবার অতীতের দিকে তাকিয়ে দেখলেন—যেমন করে শেষ দৃষ্টিপাত করে অস্তাচলের সূর্য পূর্ব আকাশের দিকে।

যাদের সঙ্গে তরবারি হাতে করে তিনি যাত্রাপথে বেরিয়েছিলেন, তারা সবাই হয়েছে আজ অনন্ত পথের পথিক। যাদের সাহায্যে তিনি বড় বড় যুদ্ধে জয়ী হয়েছেন সেই সৈফুদ্দিন, জাকু বার্লাস ও আক বোগা প্রমুখ সবাই করেছে আজ মহাপ্রস্থান। সর্বপ্রথম পুত্র এবং তাঁর ছেলে মহম্মদও পরলোকে। চিরকালের জন্যে হারিয়েছেন তিনি জীবনের প্রথম সঙ্গিনী আলজাইকেও। তিনি আজ পৃথিবীর মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ শক্তির অধিকারী, কিন্তু অধিকতর শ্রেষ্ঠ কোনও শক্তিধর তাঁর কাছ থেকে একে একে কেড়ে নিয়েছেন সবচেয়ে প্রিয় সহধর্মিণী, আত্মজ, বন্ধু ও স্বজন! তিনি আজ একাকী, অত্যন্ত একাকী। অন্যান্য বংশধরও আছেন, সেনাপতিও আছেন, কিন্তু তাঁর অবর্তমানে এই বিরাট ও অতুলনীয় সাম্রাজ্যের শাসনদণ্ড গ্রহণ করতে পারেন এমন যোগ্য ব্যক্তি আর একজনও নেই। তাঁর চারিদিক ঘিরে বিপুল জনতা,—কিন্তু তিনি একাকী, বড় একাকী!

তিনি আর কী দেখলেন?

দেখলেন—নিজের হাজার হাজার ক্রোশব্যাপী অতি দীর্ঘ যাত্রাপথ—কিন্তু তার মধ্যে কোথাও নেই জীবনের মহোৎসব। সেই দূরদূরান্তরে বিস্তৃত ধু ধু পথ জুড়ে ঢেউ খেলিয়ে বয়ে যাচ্ছে কেবল রক্তের রাঙা নদী। তার দুই পাশে জেগে আছে মরুভূমির পর মরুভূমি—সেখানে ফল-ফুল-তরু-লতা-শস্য জন্মায় না, সেখানে নেই ছায়াময় গ্রাম, সমৃদ্ধ নগর, সমাজ সংসারের কলরব, তার বদলে সেখানে দেখা যায় শুধু গগনস্পর্শী অগ্নিশিখা ও কুণ্ডলী পাকানো ধূম্ররাশি এবং বীভৎস নরমুণ্ডের পাহাড়ের পর পাহাড়!

অতীতের দিকে তাকিয়ে তৈমুর কি দুঃখিত, লজ্জিত, অনুতপ্ত হলেন?

একটিমাত্র যুদ্ধের পর রণক্ষেত্রের দৃশ্য দেখে ভারত সম্রাট অশোক চিরদিনের মতন অস্ত্র ত্যাগ করেছিলেন।

কিন্তু তৈমুর অশোক নন।

স্তিমিত চক্ষে অগ্নিবর্ষণ করে বৃদ্ধ তৈমুর ঘোড়ায় চড়ে আবার গর্জন করে উঠলেন, 'অস্ত্র ধরো, অস্ত্র ধরো! এসো বীর তাতারিরা, চলো আবার দিগবিজয়ে!'

সবাই বিস্ময়ে সচকিত! সম্রাট তৈমুর যার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করতে পারেন, পৃথিবীতে এমন দেশ আর কোথায় আছে?

তৈমুর বললেন, 'আমরা প্রায় সমগ্র এশিয়া জয় করেছি, বাকি আছে কেবল চিনদেশ। আমরা এমন সব মহা মহা রাজার গর্ব চূর্ণ করেছি যে পৃথিবী চিরদিন আমাদের স্মরণ করে রাখবে। কত যুদ্ধে তোমরা আমার সঙ্গী হয়েছ, কিন্তু তোমাদের পরাজয়ের কলঙ্ক মাখতে হয়নি কখনও। চিনদেশের পৌত্তলিকের সাধ্য নেই, তোমাদের সামনে দাঁড়ায়! আমার সঙ্গে চলো সেই দেশে!'

যে চেঙ্গিজ খাঁয়ের বংশধরদের সাম্রাজ্যকে অবলম্বন করে তৈমুর করেছিলেন আত্মপ্রতিষ্ঠা, সেই মহান সম্রাট, পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ দিগবিজয়ী চেঙ্গিজও জীবন-সন্ধ্যায় বেরিয়েছিলেন দক্ষিণ চিনের পথে, নিজের দিগবিজয় ব্রত সম্পূর্ণরূপে সফল করবার জন্যে। পথেই তাঁর মৃত্যু হয়। চেঙ্গিজ হয়েছিলেন পৃথিবীর সর্বেসর্বা। কিন্তু মহাকালের পরিহাসে তাঁর শেষ ইচ্ছা পূর্ণ হয়নি। আত্মপ্রসাদে স্ফীত হয়ে তৈমুরও কি ভেবেছিলেন, চেঙ্গিজ যা পারেননি, সেই কার্যে সফল হয়ে তিনি চেঙ্গিজেরও যশকে ম্লান করে দেবেন? সম্ভব!

মহাকাল? ও হচ্ছে পৌত্তলিক অভিধানের কথা, তৈমুর তা নিয়ে মাথা ঘামালেন না।

'অস্ত্র ধরো! অস্ত্র ধরো! চেঙ্গিজ অক্ষম হয়েছিলেন, আমরা সক্ষম হব!'

অস্ত্রধারীর অভাব হল না। সমরখন্দের সিংহদ্বার দিয়ে বহির্গত হল দুই লক্ষ সৈনিক—দুই লক্ষ মৃত্যুদূত! তাঁর প্রিয় সমরখন্দের বাইরে এসে তৈমুর ঘোড়ার পিঠে বসে মুখ ফিরিয়ে নিজের রাজধানীকে আর একবার দেখবার চেষ্টা করলেন। নীলাকাশকে স্পর্শ করতে চাইছে তার শত শত গম্বুজ ও মিনার। কিন্তু তিনি কিছুই দেখতে পেলেন না।—তাঁর দৃষ্টি হয়ে এসেছে অতি-ক্ষীণ! তাঁর চোখের পাতা এমনি ঝুলে পড়েছে যে হঠাৎ দেখলে মনে হয়, তিনি নিদ্রিত। তৈমুর আবার অশ্বচালনা করলেন, কিন্তু কিছু বললেন না মুখে।

নভেম্বর মাস—শীত ফেলছে হু হু করে শীতল শ্বাস। কিছুদিন যেতে না যেতেই আরম্ভ হল বরফপাত। তারপরই জাগল তুষারের ঝড়। যে দুই লক্ষ বীর পদভারে পৃথিবীর বুক কাঁপাচ্ছিল তালে তালে, তাদের শীত-জর্জর পা-গুলো পড়ল এলিয়ে। নদীর জল দেখা যায় না, সে গায়ে দিয়েছে বরফের চাদর। রাস্তাগুলো অচল হয়ে উঠেছে পুঞ্জ পুঞ্জ তুষারে। কত সৈন্য মরল, কত ঘোড়া মরল।—শিলাপাত, তুষারপাত; যুবক যোদ্ধাদের দেহ আর বয় না—কিন্তু বৃদ্ধ যোদ্ধা তৈমুর চলেছেন, চলেছেন, চলেছেন! সত্তর বছরের উদ্দাম পথিক!

কোথায় চলেছেন? কার আহ্বানে?...

শেষটা তাঁকেও থামতে হল—ওত্রার শহরে গিয়ে।

সেনাপতিদের ডেকে তিনি বললেন, 'ওই উত্তরগামী পথ—ওই হচ্ছে চিনের পথ! আপাতত বাকি শীতকালটা এইখানেই কাটিয়ে দেব। কিন্তু মনে রেখো, বসন্তকাল এলেই আবার যাত্রা করতে হবে।'

বসন্তকাল। তৈমুরের আদেশ কেউ ভোলেনি। সৈন্যরা আবার যাত্রা আরম্ভ করলে। ১৪০৫ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাস। উত্তরগামী চিনের পথ।

আবার মেঘধ্বনি করলে কাড়া-নাকাড়া, আবার আকাশে উড়ল পতাকার পর পতাকা, প্রতি রাত্রে আবার বাজতে লাগল বেণু-বীণা—দিগবিজয়ী তৈমুরের প্রশস্তি গাইবার জন্যে।

কিন্তু এ হচ্ছে মৃত দিগবিজয়ীর প্রশস্তি গান!

পৃথিবীপতি তৈমুর পৃথিবী ত্যাগ করেছেন ওত্রার নগরে। ভগবানের চাবুক ফিরে গিয়েছে ভগবানের কাছে। তৈমুরের সুসজ্জিত শ্বেত অশ্ব সমতালে পা ফেলে, বৃহৎ বাদশাহি পতাকার ছায়া মেখে অগ্রসর হচ্ছে, কিন্তু আজ তার পৃষ্ঠে নেই সেই বিশ্ববিখ্যাত আরোহী।

শেষ দৃশ্যে দেখি—

শয্যাশায়ী তৈমুর। পাশে বসে সম্রাজ্ঞী সরাই মুল্ক খানুম। চারিদিকে দাঁড়িয়ে মন্ত্রী, সেনাপতি, আমির, ইমান ও চিকিৎসক প্রমুখ।

তৈমুর ক্ষীণ স্বরে বললেন, 'আমাকে হারিয়ে তোমরা পাগলের মতন ছুটোছুটি হাহাকার কোরো না। তাহলে সব বিশৃঙ্খল হয়ে যাবে। বীরের মতন তরবারি ধরে থাকো—একতাবদ্ধ হও। চিনদেশে যাত্রা করো—'

তৈমুরের আদেশ। সেনাদল নিয়ে সেনাপতিরা চিনদেশের দিকে ছুটলেন।

বেশি দূর যেতে হল না। দ্রুতগামী অশ্বে চড়ে দূত এসে দেশের খবর দিলে। এরই মধ্যে তৈমুরের বংশধরদের মধ্যে রাজ্য নিয়ে বিপ্লব উপস্থিত হয়েছে।

চিন আর ভগবানের চাবুকের মার খেলে না। সেনাদল নিয়ে সেনাপতিরা আবার ফিরলেন সমরখন্দের দিকে।

তৈমুর বড় হতে চেয়েছিলেন চেঙ্গিজ খাঁয়ের চেয়ে। কিন্তু চেঙ্গিজ খাঁ কেবল দিগবিজয় এবং তৈমুরের চেয়ে বৃহৎ সাম্রাজ্য স্থাপন করেননি, সেই সাম্রাজ্যের ভিত্তি এমন সুদৃঢ় করেও গিয়েছিলেন যে, তার আকার ক্রমেই বৃহত্তর হয়ে দীর্ঘকাল স্থায়ী হয়েছিল।

আর তৈমুরের দিগবিজয়ের ফলে পৃথিবীর দিকে দিকে ছড়ানো রইল ধ্বংসস্তূপের পর ধ্বংসস্তূপ এবং তাঁর মৃত্যুর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সাম্রাজ্যও গেল ধ্বংসের পথে। তৈমুর কেবল ধ্বংস করেই গেলেন, স্থায়ী কিছু সৃষ্টি করে যেতে পারলেন না। তাঁর নাম আজও তাই পৃথিবীর কাছে মহামারির মতোই ভয়ানক।

তৈমুরের পুত্র ও পৌত্ররা স্থানীয় শাসনকর্তার মতন এখানে-ওখানে রাজদণ্ড চালনা করেই তুষ্ট ছিলেন। তাঁরা কেউ তৈমুরের ভয়াবহ তরবারি ধারণ করতে সাহসী হননি—তাঁরা ছিলেন সাহিত্য ও চারুশিল্পের পৃষ্ঠপোষক। কিন্তু তৈমুরের মৃত্যুর শতাব্দীকাল পরে তাঁর বংশের মধ্যে আবার নেচে উঠেছিল প্রচণ্ড তাতারের উত্তপ্ত রক্তধারা! এবং দিল্লির সিংহাসনে বসে ভারতে মোগল রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা বাদশাহ বাবর করলেন তাঁর পূর্বপুরুষ মহান তৈমুরের স্মৃতি-তর্পণ।

এইতেই বোঝা যায়—রক্ত একবার জাগে, আবার ঘুমিয়ে পড়ে, আবার জেগে ওঠে।

সকল অধ্যায়
১.
ভারতের দ্বিতীয় প্রভাত
২.
পঞ্চনদের তীরে
৩.
মহাভারতের শেষ মহাবীর
৪.
ভগবানের চাবুক
৫.
আলেকজান্ডার দি গ্রেট
৬.
দিগবিজয়ী নেপোলিয়ন
৭.
রক্ত বাদল ঝরে
৮.
হন্তারক নরদানব
৯.
সিরাজের বিজয় অভিযান
১০.
মহাভারতের মহারথ
১১.
রক্ত পাথারের সাঁতারু
১২.
তিন সম্রাটের ত্র্যহস্পর্শযোগ
১৩.
সাতহাজারের আত্মদান
১৪.
আলেকজান্ডারের পলায়ন
১৫.
ওষ্ঠাধরে রাজদণ্ড
১৬.
মরা মানিক আর জ্যান্ত মানিক
১৭.
মুসলমানের জহরব্রত
১৮.
সূর্য দেবী, পর্মল দেবী
১৯.
মারাঠার লিওনিডাস
২০.
ভারতের একমাত্র সুলতানা
২১.
ব্যাঘ্রভূমির বঙ্গবীর
২২.
উপন্যাসের চেয়ে আশ্চর্য
২৩.
মরণ বিজয়ীর দল
২৪.
ছত্রপতির ছত্রভঙ্গ
২৫.
জগন্নাথদেবের গুপ্তকথা
২৬.
নতুন বাংলার প্রথম কবি
২৭.
শিবদাস ভাদুড়ি
২৮.
ইতিহাসের রক্তাক্ত প্রান্তরে
২৯.
বীরাঙ্গনা, পরাক্রমে ভীমা-সমা
৩০.
বর্গি এল দেশে
৩১.
হে ইতিহাস গল্প বলো
৩২.
প্রথম বাঙালি সম্রাট
৩৩.
অনামা বীরাঙ্গনা
৩৪.
ইতিহাসের রক্তাক্ত দৃশ্য
৩৫.
ছত্রপতির অ্যাডভেঞ্চার
৩৬.
বাংলাদেশের বোম্বেটেরাজ

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%