কুমারসম্ভবের কবি

শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

একালের কথা নয়, কালিদাসের কালের কাহিনী।

জনাকীর্ণ নগরীর রাজপথ দিয়া এক হরিচন্দন চিত্রিত হস্তী রাজকীয় মন্থরতায় হেলিয়া দুলিয়া চলিয়াছে। স্কন্ধে অঙ্কুশধারী মাহুত; পৃষ্ঠের মহার্ঘ কারুখচিত আসনের উপর বসিয়া ঘোষক পটহ বাজাইতেছে। ঘোষকের দুই হস্তে দুইটি মুষলাকৃতি পটহ-দণ্ড দ্রুতচ্ছন্দে পটহচর্মের উপর আঘাত বৃষ্টি করিতেছে।

চারিদিকে নাগরিকের জনতা। সকলেই ঘোষকের জ্ঞাপনী শুনিবার জন্য উৎসুক ঊর্ধ্বমুখে হস্তীর সহগমন করিতেছে। পথপার্শ্বের দ্বিতল ত্রিতল হর্ম্যগুলির গবাক্ষে অলিন্দে কুতূহলী নাগরিকদের মুখ লোভনীয় পশ্চাৎপটের সৃষ্টি করিয়াছে। জনতার কোলাহল ও পটহের রোল মিশিয়া বিচিত্র ধবনি-কল্লোল উত্থিত হইতেছে।

ডিণ্ডিম-ধ্বনি সহসা স্তব্ধ হইল। ঘোষক দৃপ্তভঙ্গিতে দক্ষিণ হস্ত ঊর্ধ্বে তুলিতেই জনতার কোলাহলও শান্ত হইয়া গেল। ঘোষক তখন শঙ্খের ন্যায় গম্ভীরস্বরে ঘোষণা আরম্ভ করিল— ‘ভো ভোঃ! শোন সবাই— মহারাষ্ট্র কুন্তল দেশের কুমার-ভট্টারিকা পরমবিদুষী রাজকন্যা হৈমশ্রী স্বয়ংবরা হবেন। সামন্ত-শ্রেষ্ঠী, চণ্ডাল-পামর, সকলে শ্রবণ কর— জাতিবর্ণ নির্বিশেষে সকলে এই স্বয়ংবর সভায় যোগ দিতে পারবে—’

জনতার এক অংশে অবধূত নামধারী একজন অতি স্থূলকায় ব্যক্তি ক্ষুদ্র ধামিতে মুড়ি লইয়া ভক্ষণ করিতে করিতে চলিয়াছিল, ঘোষণার শেষ অংশ শুনিয়া তাহার চরণ ও চর্বণ একসঙ্গে বন্ধ হইয়া গেল। সে ঘাড় বাঁকাইয়া বিস্ফারিত চক্ষে ঊর্ধ্বে ঘোষকের পানে চাহিয়া রহিল।

ঘোষক ইতিমধ্যে বলিয়া চলিয়াছে— ‘রাজকুমারী হৈমশ্রী প্রত্যেক পাণিপ্রার্থীকে তিনটি প্রশ্ন করবেন; যে ব্যক্তি তিনটি প্রশ্নেরই যথার্থ উত্তর দিতে পারবে তার গলায় কুমারী মালা দেবেন—’

উপরোক্ত কথাগুলি শুনিবামাত্র অবধূত হন্তদন্তভাবে পিছু ফিরিয়া জনতা ভেদ করিয়া বাহির হইবার চেষ্টা করিতে লাগিল, যেন স্বয়ংবর সভায় উপস্থিত হইতে তাহার আর বিলম্ব সহিতেছে না।

জনতার অন্যত্র, ঝাড়ু ও চুপ্‌ড়ি হস্তে একটি হরিজন সম্মোহিতের ন্যায় দাঁড়াইয়া ঘোষণা শুনিতেছিল; অকস্মাৎ সে সর্বাঙ্গে শিহরিয়া উচ্চ হর্ষধ্বনি করিয়া উঠিল, তারপর ঝাড়ু চুপ্‌ড়ি সজোরে রাজপথে আছড়াইয়া তীরবেগে বিপরীত মুখে দৌড়িতে আরম্ভ করিল।

ঘোষকের জ্ঞাপনী তখন শেষ হইতেছে— ‘আগামী ফাঙ্গুনী পূর্ণিমার দিন কুন্তল রাজধানীতে স্বয়ংবর সভা বসবে। অবহিত হও— সকলে অবহিত হও!’

ঘোষণার শেষে ঘোষক আবার দ্রুতচ্ছন্দে পটহ ধ্বনিত করিল।

পাহাড়ের গা ঘেঁষিয়া দীর্ঘ বঙ্কিম পথ চলিয়া গিয়াছে; পথের অপর পাশে বহু নিম্নে সমুদ্র। ইহা সহ্যাদ্রি ও আরব সাগরের মধ্যবর্তী বাণিজ্য-পথ।

পথের উপর সম্মুখেই একটি চতুর্দোলা; আটজন হৃষ্টপুষ্ট বাহক উহা স্কন্ধে বহন করিয়া চলিয়াছে। চতুর্দোলায় স্থূলকায় অবধূত উপবিষ্ট; সে উদ্বিগ্নমুখে বসিয়া একছড়া কদলী ভক্ষণ করিতেছে।

পিছন হইতে এক সুবেশধারী অশ্বারোহী অগ্রসর হইয়া আসিতেছিল। তাহার অশ্বক্ষুরধ্বনি শুনিতে পাইয়া শঙ্কিত অবধূত চতুর্দোলা হইতে গলা বাড়াইয়া দেখিল। অশ্বারোহী দন্ত বাহির করিয়া হাসিতে হাসিতে অবধূতকে অতিক্রম করিয়া গেল। অবধূত দেখিল পশ্চাতে আরও দুইজন অশ্বারোহী দ্রুত আগে বাড়িয়া আসিতেছে। আশঙ্কা ও উত্তেজনায় কদলী ভক্ষণ ভুলিয়া সে দু’হাতে বুক চাপড়াইতে চাপড়াইতে বাহকদের বলিল— ‘ওরে— ওরে! তোরা মানুষ না বলদ! জলদি চল্‌— জলদি চল্‌— সব বেটা এগিয়ে গেল—’

নিম্নে সমুদ্রের কিনারা বাহিয়া একটি ময়ূরপঙ্খী তরণী পালের ভরে চলিয়াছে। ঝিকিমিকি রৌদ্র-প্রতিফলিত নীল জলের উপর ময়ূরপঙ্খী মরালের মত ভাসিতেছে। পিছনে হাল ধরিয়া মাঝি দাঁড়াইয়া আছে। তরুণী হইতে গানের স্বর ভাসিয়া আসিতেছে—

রূপনগরীর রাজকুমারীর দেশে

চল্‌রে ডিঙা মোর— চল্‌রে ডিঙা ভেসে।

সোনার পালে বাতাস লেগেছে।

পূর্ণিমাতে জোয়ার জেগেছে

ভিড়্‌বে তরী রূপের ঘাটে রূপনগরে এসে।

চল্‌রে ডিঙা মোর— চল্‌রে ডিঙা ভেসে!—

এইরূপে নানা পথ দিয়া নানা জাতীয় যানবাহন বহু যাত্রীকে লইয়া কুন্তল রাজধানীর অভিমুখে চলিয়াছে। রাজপুত্রদের মাথায় রাজকীয় শিরস্ত্রাণ আপন আপন স্বতন্ত্র গঠনের বিচিত্রতায় শিরস্ত্রাণধারীদের পরিচয় নির্দেশ করিতেছে। উচ্চপদস্থ সেনানীগণের বক্ষে লৌহজালিক, কটিতে তরবারি। কাহারও সঙ্গে অনুচর আছে, কেহ একাকী যাইতেছে। সকলেরই গন্তব্যস্থান কুন্তলকুমারী হৈমশ্রীর স্বয়ংবর সভা।

কাননের মধ্যে একটি জলাশয়। জলাশয়ের চারিপাশে কিছুদূর পর্যন্ত উন্মুক্ত ভূমি, তারপর একটি দু’টি বড় বড় গাছ; তারপর নিবিড় বনানীর শাখায় শাখায় জড়াজড়ি। নিম্নে ছায়ান্ধকার, উপরে দূরপ্রসারী পল্লবপুঞ্জের অঙ্গে দ্বিপ্রহরে খর সূর্যকিরণের প্রতিভাস।

জলাশয়ের অনতিদূরবর্তী একটি বৃক্ষ হইতে কাঠ-ঠোকরা পাখির আওয়াজের মত একটি শব্দ আসিতেছে— ঠক্‌ঠক্‌ ঠক্‌ঠক্‌—

শব্দ অনুসরণ করিয়া অগ্রসর হইলে দেখা যায়— বৃক্ষের নিম্নতন একটি শাখায় পা ঝুলাইয়া একটি মানুষ বসিয়া আছে এবং যে শাখায় বসিয়া আছে তাহারই মূলে কুঠারাঘাত করিতেছে। মানুষটি অল্পবয়স্ক, কুড়ির বেশি বয়স হইবে না। অতি সুন্দর গৌরকান্তি যুবা, মুখে শিশুর সরলতা; হাসিটি নব-বিস্ময় ও কৌতুকে ভরা, যেন এইমাত্র কোম্‌ দৈব দুর্বিপাকে এই বিস্ময়কর পৃথিবীতে সে আসিয়া পড়িয়াছে। সাংসারিক জ্ঞান বা অভিজ্ঞতা তাহার বিন্দুমাত্র আছে বলিয়া মনে হয় না।

যুবকের ঊর্ধ্বাঙ্গ নগ্ন, কেবল স্কন্ধে উপবীত আছে। সে আপন মনে হাসিতেছে এবং ক্ষুদ্র কুঠারের সাহায্যে বৃক্ষশাখার গোড়া ঘেঁষিয়া কোপ মারিতেছে! কুঠার-দণ্ডের প্রান্তে একটি সূত্র সংলগ্ন।

যুবক মনের আনন্দে ডাল কাটিতেছে, সহসা অদূরে অন্য একপ্রকার শব্দ তাহার কানে আসিল; সে কুঠার নামাইয়া কৌতূহলভরে বাহিরের দিকে দৃষ্টি প্রেরণ করিল। যে-শব্দ যুবককে আকৃষ্ট করিয়াছিল তাহা বনভূমির শষ্পাস্তরণের উপর মন্দীভূত অশ্বক্ষুরধ্বনি।

যুবক দেখিল জলাশয়ের পাশ দিয়া একজন অশ্বারোহী আসিতেছে; আসিতে আসিতে অশ্ব ও অশ্বারোহী উভয়েই সতৃষ্ণভাবে জলাশয়ের পানে ঘাড় বাঁকাইয়া দৃষ্টি নিক্ষেপ করিতেছে; যেন ইচ্ছা, থামিয়া জলপান করে।

আরও নিকটবর্তী হইলে দেখা গেল, অশ্বারোহীর বেশভূষা ঘর্মাক্ত ও ধূলিধূসর হইলেও রাজোচিত; অশ্বও তদনুরূপ। — আরোহীর বয়স অনুমান চল্লিশ বৎসর; মাংসল দেহ, গোলাকৃতি মাংসল মুখ। মুখে শাসক-সম্প্রদায়সুলভ আত্মাভিমান সুপরিস্ফুট।

ঘোটকটি কতক নিজ ইচ্ছানুসারেই ক্রমশ মন্দবেগ হইয়া শেষে সরোবরের তীরে থামিয়া গেল; আরোহী ও মনে মনে বিচার করিল, এখানে নামিয়া অজ্ঞাত জলাশয়ে জল পান করা সমীচীন হইবে কিনা। ওদিকে শাখারূঢ় যুবক পশ্চাৎ হইতে পরম আগ্রহে তাহাদের নিরীক্ষণ করিতেছিল, তন্ময়তাবশত তাহার কুঠার স্খলিত হইয়া ঝনৎকার শব্দে মাটিতে পড়িল।

চমকিয়া অশ্বারোহী ফিরিয়া দেখিল গাছের উপর এক কাঠুরিয়া বসিয়া আছে। সে তখন ঘোড়ার মুখ ফিরাইয়া সেইদিকে অগ্রসর হইল।

যুবক ততক্ষণে সূত্রের সাহায্যে ভূপতিত কুঠারটি টানিয়া তুলিয়া লইয়াছে। তাহার কুঠার বোধহয় প্রায়ই পড়িয়া যায়, তাই উহা বিনা পরিশ্রমে উদ্ধার করিবার এই বালকোচিত কৌশল আবিষ্কার করিয়া যুবক গর্বপূর্ণ আনন্দ উপভোগ করিতেছে।

অশ্বারোহী বৃক্ষতলে উপস্থিত হইয়া অশ্ব থামাইলেন, যুবকের কার্যকলাপ নিরুৎসুক চক্ষে নিরীক্ষণ করিয়া প্রশ্ন করিলেন— ‘তুই কে রে?’

সরল হাস্যে কাঠুরিয়ার মুখ ভরিয়া গেল, সে সহজ অকপটতার সহিত উত্তর দিলে— ‘আমি কালিদাস। জঙ্গলের ঐধারে ছোট্ট গাঁ আছে, ওখানে আমি থাকি। মামা বললেন— বামুনের ঘরের এঁড়ে, লেখাপড়া শিখলি না— যা, জঙ্গলে কাঠ কেটে আনাগে যা। তাই কাঠ কাটছি।’

অশ্বারোহীর মুখভাব দেখিয়া মনে হইল তিনি কালিদাসকে নিরেট নির্বোধ বলিয়া সাব্যস্ত করিয়াছেন। তিনি কপালের ঘাম মুছিতে মুছিতে প্রশ্ন করিলেন— ‘কুন্তল রাজধানী এখান থেকে কতদূর জানিস?’

কালিদাস বলিলেন— ‘জানি। হেঁটে গেলে একদিনের পথ।’

অশ্বারোহী যেন কতকটা নিশিন্ত হইলেন, অশ্ব হইতে নামিবার উপক্রম করিয়া নিজ মনেই বলিলেন— ‘তাহলে ঘোড়ার পিঠে দু’দণ্ডে যাওয়া যাবে—’

কালিদাস বৃক্ষশাখায় বসিয়া সকৌতুকে আরোহীর অবরোহণ ক্রিয়া দেখিতে দেখিতে জিজ্ঞাসা করিলেন— ‘তুমি কে?’

অশ্বারোহী ভূপৃষ্ঠে নামিয়া তাচ্ছিল্যভরে একবার কালিদাসের পানে চোখ তুলিলেন, বলিলেন— ‘আমি সৌরাষ্ট্রের যুবরাজ মকরবর্মা।’

কালিদাসের ভাগ্যে রাজপুত্র দর্শন এই প্রথম; উত্তেজনায় তাঁহার দেহ রোমাঞ্চিত হইয়া উঠিল। কিছুক্ষণ বিস্ফারিত নেত্রে চাহিয়া থাকিয়া তিনি সংহত স্বরে বলিলেন— ‘রাজপুত্তুর! কিন্তু তোমার মন্ত্রিপুত্তুর কোটালপুত্তুর সৈন্য সামন্ত— এর সব কৈ?’

যুবরাজ, ঈষৎ হাস্য করিলেন— ‘আমার দলবল সব পাকা রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে, দেরি হয়ে যাচ্ছিল তাই আমি জঙ্গলের রাস্তা ধরেছি।’

কালিদাস উৎসুক স্বরে প্রশ্ন করিলেন— ‘তুমি বুঝি স্বয়ংবর সভায় যাচ্ছ?’

যুবরাজ ঘাড় নাড়িলেন। ইতিমধ্যে ঘোড়াটিকে তিনি কালিদাসের ঠিক নীচে গাছের একটি উপশাখায় বাঁধিয়া ফেলিয়াছেন এবং মস্তক হইতে ধাতুময় শিরস্ত্রাণটি মোচন করিয়া গাছের আর একটি গোঁজের মত ডালে ঝুলাইয়া রাখিয়াছেন। এখন ঘর্মাক্ত কুর্তাটি খুলিতে খুলিতে তিনি তাঁহার অভিপ্রায় ব্যক্ত করিলেন— ‘নাইতে হবে— ঘামে ধূলোয় কাপড়-চোপড় সব নষ্ট হয়ে গেছে। তোদের ঐ পুকুরটার জল কেমন? ভাল?’

কালিদাস বলিলেন— ‘হ্যাঁ— খুব ভাল।’

কুর্তা মাটিতে ফেলিয়া যুবরাজ নূতন বস্ত্রাদি বাহির করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। ঘোড়ার পিঠে কম্বলাসনের নীচে বহুবিধ উৎকৃষ্ট পট্ট বস্ত্রাদি পাট করিয়া রাখা ছিল; কম্বল তুলিয়া সেগুলি একে একে বাহির করিয়া যুবরাজ মকরবর্মা ঘোড়ার পিঠের উপরেই সাজাইয়া রাখিতে লাগিলেন; উদ্দেশ্য স্নান সারিয়া সেগুলি পরিধানপূর্বক বরবেশে স্বয়ংবর সভায় যাত্রা করিবেন।

তিনি আত্মগতভাবে বলিলেন— ‘স্বয়ংবর সভায় যেতে হবে, যা-তা পরে গেলে তো চলবে না— আজকালকার মেয়েদের আবার পোশাকের ওপর নজর বেশি। আমার প্রথম রানীকে যখন বিয়ে করেছিলাম, তখন এত হাঙ্গামা ছিল না—’

কালিদাস সহস্র চক্ষু হইয়া এই সব বস্ত্র-বৈভব দেখিতেছিলেন। প্রশ্ন করিলেন— ‘তোমার বুঝি অনেক রানী?’

মকরবর্মা বলিলেন— ‘না— বেশি আর কৈ— মাত্র সাতটি।’

সোনালী জরির জুতাজোড়া গাছের তলায় খুলিয়া রাখিতে রাখিতে তিনি বলিলেন— ‘হ্যাঁ দ্যাখ্‌— কি নাম তোর— কালিদাস! শোন্‌, আমি পুকুরে নাইতে চললাম। তুই এগুলোর ওপর নজর রাখিস— যেন জংলি কেউ এসে নিয়ে না পালায়— বুঝলি?’

কালিদাস ঘাড় কত করিয়া সম্মতি জানাইলেন। যুবরাজ আর বিলম্ব না করিয়া সরোবরের দিকে চলিলেন। কিন্তু কিছু দূর গিয়া তাঁহার গতিরোধ হইল, তিনি ইতস্তত করিয়া ফিরিয়া তাকাইলেন। জুতাজোড়া মাটিতে পড়িয়া রহিল, যদি শৃগালে লইয়া পলায়ন করে। তিনি ফিরিয়া আসিয়া জুতাজোড়া শিরস্ত্রাণের সঙ্গে গাছে ঝুলাইয়া রাখিলেন।

গাছের উপর কালিদাস মুগ্ধ তন্ময়তার সহিত বিচিত্র সুন্দর আভরণগুলি নিরীক্ষণ করিতেছিলেন। যুবরাজ প্রস্থান করিবার পর তাঁহার চোখ দু’টি দূরে যুবরাজের দিকে সঞ্চারিত হইল, আবার বস্ত্রগুলির দিকে ফিরিয়া আসিল, আবার যুবরাজের দিকে প্রেরিত হইল— তারপর তিনি সন্তর্পণে হাত বাড়াইয়া শিরস্ত্রাণটি তুলিয়া লইলেন। মহানন্দে কিছুক্ষণ তাহা ঘুরাইয়া ফিরাইয়া দেখিবার পর তিনি সেটি নিজ মস্তকে পরিধান করিলেন। বাঃ, একটুও বড় হয় নাই, যেন তাঁহারই মাথার মাপে প্রস্তুত হইয়াছিল। শাণিত কুঠার-ফলকে নিজ প্রতিবিম্ব দেখিয়া তাঁহার সর্বাঙ্গে উল্লসিত শিহরণ খেলিয়া গেল। অতঃপর জুতাজোড়াও তাঁহার শ্রীচরণেষু হইল। আরে! একটু আঁট হইয়াছে বটে, কিন্তু বে-মানান হয় নাই।

ওদিকে যুবরাজ তখন এক-কোমর জলে দাঁড়াইয়া পরম আরামে স্নান করিতেছেন, নাক টিপিয়া জলে ডুব দিতেছেন, দুই হস্তে সবেগে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ঘর্ষণ করিতেছেন। কালিদাসের দিকে তাঁহার নজর নাই।

কালিদাস কিন্তু ইতিমধ্যে একটি একটি করিয়া রাজবেশ অঙ্গে ধারণ করিতেছেন; বস্ত্র উত্তরীয় আঙ্‌রাখা শ্রীঅঙ্গে শোভা পাইতে লাগিল। যুবরাজ মকরবর্মা ওদিকে আপন মনে স্নান করিয়া চলিয়াছেন।

সর্বাঙ্গে রাজাভরণ পরিয়া কালিদাসের বুকে আনন্দ ধরে না। কিন্তু এত সাজসজ্জা করিয়া তো চুপ করিয়া বসিয়া থাকা যায় না, একটি কিছু করা চাই। শাখারূঢ় কালিদাস হঠাৎ কুঠারটি তুলিয়া লইয়া খটাখট্‌ ডাল কাটিতে আরম্ভ করিয়া দিলেন। নিম্নে ঘোড়াটি এই আকস্মিক শব্দে চঞ্চল হইয়া উঠিল।

শাখাটি ইতিপূর্বেই বেশ জখম হইয়াছিল, এই দ্বিতীয় আক্রমণ আর সহা করিতে পারিল না। মুহূর্তমধ্যে অনেকগুলি ব্যাপার ঘটিয়া গেল। শাখাটি সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন না হইলেও মড়্‌ মড়্‌ শব্দে নীচে নামিয়া পড়িতে আরম্ভ করিল, কালিদাসের হাত হইতে কুঠার ছিট্‌কাইয়া পড়িল। ঘোড়াটা নিম্নে লাফালাফি শুরু করিয়াছিল, শাখাচ্যুত কালিদাস তাহার পৃষ্ঠের উপর পড়িয়া ভাল্লুকের মত তাহাকে জড়াইয়া ধরিলেন। ভয়ার্ত ঘোড়া মুখের এক ঝট্‌কায় বন্ধন ছিঁড়িয়া তীরবেগে একদিকে ছুটিতে আরম্ভ করিল। কালিদাস প্রাণপণে তাহার গ্রীবা আঁক্‌ড়াইয়া রহিলেন।

স্নানরত যুবরাজের কর্ণে শব্দ প্রবেশ করিতেই তিনি উত্তেজিত হইয়া সেইদিকে তাকাইলেন। যাহা দেখিলেন তাহাতে ঘোর উদ্বেগে হাঁচোড়-পাঁচোড় করিয়া তিনি জল হইতে নিষ্ক্রান্ত হইলেন। সিক্ত বস্ত্রে দৌড়িতে দৌড়িতে যখন বৃক্ষতলে উপস্থিত হইলেন তখন অশ্ব কাঠুরিয়াকে পৃষ্ঠে লইয়া বহুদূরে চলিয়া গিয়াছে।

বনের মধ্যে কালিদাস অদৃশ্য হইয়া গেলেন। যুবরাজ মকরবর্মা হতভম্ব হইয়া কিয়ৎক্ষণ দাঁড়াইয়া রহিলেন; তাঁহার সুবর্তুল মুখে ক্রোধ ও হতাশার মিশ্রণে এক অপূর্ব অভিব্যক্তি ব্যঞ্জিত হইয়া উঠিল। তিনি সহসা ব্যাঘ্রের মত গর্জন ছাড়িয়া দুই হস্ত ঊর্ধ্বে আস্ফালন করিতে করিতে যেন পলাতক অশ্বের পশ্চাদ্ধাবন করিবার উদ্দেশ্যে দৌড়িবার উপক্রম করিলেন।

কিন্তু তাঁহাকে এক পদও অগ্রসর হইতে হইল না। তাঁহার সিক্ত বস্ত্র হইতে জল ঝরিয়া মাটি কর্দমাক্ত হইয়া উঠিয়াছিল, প্রথম পদক্ষেপের সঙ্গে সঙ্গে যুবরাজ পা পিছলাইয়া সশব্দে মৃত্তিকার উপর উপবিষ্ট হইলেন।

কুন্তল রাজধানীর কেন্দ্রস্থলে সাধারণের উপভোগ্য নগরোদ্যান। উদ্যান ঘিরিয়া চক্রাকার রাজপথ, রাজপথের অপর পার্শ্বে সারি সারি অট্টালিকা, বিপণি, মদিরাগৃহ পতাকা ও তোরণমাল্যে ভূষিত হইয়া শোভা পাইতেছে।

নগরোদ্যানের কেন্দ্রে একটি অতি সুদৃশ্য মর্মরনির্মিত কন্দর্প মন্দির; মন্দিরের দেয়াল নাই। কেবল চারিটি স্তম্ভ; তাই বাহির হইতে কন্দর্পদেবের ধনুর্ধর মূর্তি দেখা যাইতেছে। স্থানে স্থানে নাগরিকদের উপবেশনের জন্য প্রস্তরবেদিক আছে। উদ্যানের চারি প্রান্তে চারিটি প্রস্রবণ; উহার জল গো-মুখ হইতে নিঃসৃত হইয়া বৃহৎ শ্বেত জলাধারে পড়িতেছে। একঝাঁক পারাবত উদ্যানভূমিতে বসিয়া নির্ভয়ে উঞ্ছবৃত্তি করিতেছে। কুঞ্জের বিতানবাটিকায় নানা বর্ণের ফুল ফুটিয়া নব বসন্তের জয় ঘোষণা করিতেছে।

আজ মদনোৎসব; তাহার উপর রাজকন্যার স্বয়ংকর। নগরের উত্তেজনা চতুর্গুণ বাড়িয়া গিয়াছে। নানা দিগ্‌দেশ হইতে বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি এবং রাজন্যবর্গের সমাগমে নগরী গম্‌গম্‌ করিতেছে।

উদ্যান ও রাজপথের মধ্যবর্তী স্থানে অগণিত ফুলের দোকান বসিয়াছে। দারু নির্মিত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রকোষ্ঠ, চারিটি দণ্ডের উপর অবস্থিত; তাহার মধ্যে রাশীকৃত ফুল। ফুলের রাশির মধ্যে এক একটি যুবতী মালিনী বসিয়া আছে, তাম্বূলরঞ্জিত বিম্বাধরে হাসিয়া বিলাসী নাগরিকদের পুষ্পমালা পুষ্পের অঙ্গদ কুণ্ডল শিরোভূষণ বিক্রয় করিতেছে।

পথে জনস্রোত আবর্তিত। মাঝে মাঝে উষ্ট্রের সারি বাণিজ্যদ্রব্য বহন করিয়া উত্তুণ্ড অবজ্ঞাভরে চলিয়াছে। দোলা চতুর্দোলারও অভাব নাই, সম্ভ্রান্ত পুরুষ ও মহিলাদের বহন করিয়া স্থান হইতে স্থানান্তরে যাতায়াত করিতেছে।

সহসা এই পথের উপর ক্ষণকালের জন্য এক চাঞ্চল্যকর ব্যাপার ঘটিয়া গেল। প্রধান পথটি হইতে কয়েকটি শাখাপথ বাহির হইয়া গিয়াছিল; এইরূপ একটি পথ দিয়া প্রচণ্ড বেগে একটি উন্মত্ত অশ্ব বাহির হইয়া আসিল। অশ্বের পৃষ্টে একজন আরোহী অতি কষ্টে নিজেকে জুড়িয়া রাখিয়াছে। ক্ষিপ্ত অশ্ব দেখিয়া পথের জনতা সভয়ে চারিদিকে ছিট্‌কাইয়া পড়িল। একটি ফুলের দোকানের সম্মুখ পর্যন্ত আসিয়া অশ্ব দুই পায়ে দাঁড়াইয়া উঠিয়া গতিবেগ সংবরণ করিল, তারপর গতি পরিবর্তন করিয়া উগ্রবেগে অন্য একটা পথ দিয়া অদৃশ্য হইয়া গেল।

অশ্ব ও অশ্বারোহী আমাদের পরিচিত। তাহারা অন্তর্হিত হইলে পথের কোলাহল ও উত্তেজনা আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়া আসিল। যে ফুলের দোকানটিকে অশ্ববর প্রায় বিমর্দিত করিয়া গিয়াছিল, তাহার অধিষ্ঠাত্রী মালিনী এতক্ষণে ফুলের স্তূপ হইতে মাথা তুলিয়া চাহিল। দোকানের সম্মুখে তিনটি নাগরিক ছিলেন, ঘোটকের আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে তাঁহারা কে কোথায় তিরোধান করিয়াছিলেন; এখন তাঁহাদের মধ্যে দুইজন দোকানের নিম্নদেশ হইতে গুড়ি মারিয়া বাহিরে আসিলেন। বেশভূষা কিছু অবিন্যস্ত হইয়া পড়িয়াছিল, তাহার সংস্কার করিতে করিতে ও জানুর ধূলা ঝাড়িতে ঝাড়িতে এক ব্যক্তি সশব্দে নিশ্বাস ত্যাগ করিলেন, বলিলেন— ‘বাবাঃ! রগ ঘেঁষে গেছে। আর একটু হলেই উচ্চৈঃশ্রবা বুকের ওপর পা চাপিয়ে দিয়েছিল আর কি।’

দ্বিতীয় নাগরিক স্খলিত কর্ণভূষা আবার পরিধান করিতেছিলেন, বিরক্তিভরে বলিলেন— ‘অনেক রাজকুমারই তো স্বয়ংবরে এসেছে কিন্তু এমন বেপরোয়া ঘোড়সোয়ার দেখিনি। ভাগ্যে শ্রীমতীর দোকানের তলায় ঢুকেছিলাম, নইলে মুগুটি পিণ্ড করে দিয়ে চলে যেত।’

দোকানের মালিনী এবার কথা কহিল, উৎসুকভাবে বলিল— ‘নিশ্চয় কোনো রাজকুমার! চিনতে পারলে না?’

এতক্ষণে তৃতীয় নাগরিকটি, যেন কিছুই হয় নাই এমনিভাবে ফুলের পাখার বাতাস খাইতে খাইতে ফিরিয়া আসিলেন। মালিনীর প্রশ্নের উত্তর তিনিই দিলেন; অবজ্ঞায় ভ্রূ তুলিয়া আর দুইজনের প্রতি দৃক্‌পাত করিয়া বিদ্রূপপূর্ণ স্বরে বলিলেন— ‘চোখ চেয়ে থাকলে তো চিনতে পারবে! ঘোড়া দেখেই শ্রীমানদের পদ্মপলাশ নেত্র কমল কোরকের মত মুদিত হয়ে গিয়েছিল যে!’

দ্বিতীয় নাগরিক বলিলেন— ‘আরে যাও যাও, তুমি তো দৌড় মেরেছিলে। সরু সরু এক জোড়া পা আছে কিনা—’

মালিনী এই দেহতাত্ত্বিক আলোচনায় বাধা দিয়া তৃতীয় নাগরিককে জিজ্ঞাসা করিল— ‘তুমি চিনতে পেরেছ বুঝি?’

তৃতীয় নাগরিক বলিলেন— ‘চেনা আর শক্ত কি? এক নজর দেখেই চিনেছি। মাথায় শিরস্ত্রাণটা দেখলে না!’

মালিনী বলিল— ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, শিরস্ত্রণটা নতুন ধরনের— রোদ্দুরে ঝক্‌ঝ্ক্‌ করে উঠল—’

তৃতীয় নাগরিক গম্ভীরভাবে বলিলেন— ‘আর্যাবর্তের দাক্ষিণাত্যের সমস্ত রাজার রাজকীয় লাঞ্ছন আমার নখদর্পণে। ইনি হচ্ছেন সৌরাষ্ট্রের যুবরাজ।’

মালিনীর চক্ষু বিস্ফারিত হইল, সে বলিল— ‘নিশ্চয় স্বয়ংবর সভায় গেলেন। তাই এত তাড়া।’

প্রথম নাগরিক হুঁ হুঁ করিয়া আনুনাসিক হাস্য করলেন— ‘যতই তেড়ে যান গুড়্‌গুড়্‌ করে ফিরে আসতে হবে। সে বড় কঠিন ঠাঁই, রাজকুমারীর প্রশ্নের উত্তর কেউ দিতে পারছে না।’

তৃতীয় নাগরিকের নাসা অবজ্ঞায় স্ফুরিত হইল— ‘প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে বিদ্যা এবং বুদ্ধি দুই-ই দরকার— বুঝলে হে? অথচ যে-সব রাজা-রাজড়া রথি-মহারথ যাচ্ছেন, সত্যি কথা বলতে কি, তাদের কোনোটাই নেই।’

দ্বীতীয় নাগরিক শ্লেষভরে বলিলেন— ‘কিন্তু তোমার তো দুই-ই আছে; তুমি গিয়ে সভায় ঢুকে পড় না। চণ্ডাল পামর কারুর তো যেতে মানা নেই।’

তৃতীয় নাগরিক ঈষৎ রুষ্টমুখে চাহিলেন, তারপর সগর্ব মর্যাদার সহিত বলিলেন— ‘যাব। আগে রাজা-রাজড়াগুলো শেষ হয়ে যাক তারপর যাব।’

দ্বিতীয় নাগরিক অট্টহাস্য করিয়া উঠিলেন। প্রথম নাগরিকের মুখে কিন্তু একটু বিমর্ষতার ছায়া পড়িল। তিনি বিষণ্ণ কণ্ঠে বলিলেন— ‘আমিও যেতাম। কিন্তু সদর দেউড়িতে যে দুটো আখাম্বা হাব্‌শী খোলা তলোয়ার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে—’

রাজপ্রাসাদের সম্মুখস্থ তোরণ ও প্রতীহার ভূমি। অতি স্থূল তোরণস্তম্ভের গর্ভে প্রতীহারদের জন্য বিরাম-কক্ষ আছে। স্তম্ভের দুই পাশ হইতে কারুকার্য খচিত উচ্চ প্রাচীর প্রশস্ত প্রাসাদভূমিতে ঘিরিয়া রাখিয়াছে।

দুইজন ভীমকান্তি হাব্‌শী মুক্ত কৃপাণ হস্তে তোরণ-সম্মুখে প্রহরা দিতেছে। তাহাদের পশ্চাতে প্রায় শত হস্ত দূরে রাজভবনের প্রথম মহল; তাহার পশ্চাতে অন্যান্য যে-সকল মহল আছে সম্মুখ হইতে সেগুলি দেখা যায় না।

দুর রাজভবন হইতে নিষ্ক্রান্ত হইয়া একটি লোক তোরণের দিকে আসিতেছে দেখা গেল। লোকটি মহার্ঘ বেশভূষায় সজ্জিত, মস্তকে ধাতুময় শিরস্ত্রাণ। তাহার হাঁটিবার ভঙ্গি হইতে মনে হয় সে অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হইয়াছে।

তোরণের বাহিরে আসিয়া লোকটি ইতস্তত দৃষ্টিপাত করিয়া রুক্ষস্বরে বলিল— ‘নারীজাতি রসাতলে যাক। — আমার ঘোড়া কোথায়?’

হাব্‌শীদ্বয় উত্তর দিল না, প্রস্তরমূর্তির ন্যায় দাঁড়াইয়া রহিল। এই সময় একটি অশ্বের বল্‌গা ধরিয়া একজন অশ্বপাল তোরণ হইতে বাহির হইয়া আসিল। পূর্বোক্ত ব্যক্তি বিনা বাক্যব্যয়ে অশ্বপুষ্ঠে লাফাইয়া উঠিয়া বায়ুবেগে ঘোড়া ছুটাইয়া অদৃশ্য হইলেন। অশ্বপাল মুচ্‌কি হাসিয়া স্বস্থানে প্রস্থান করিল, যাইবার সময় হাব্‌শীদের দিকে একবার চোখ টিপিয়া গেল।

এইবার বোধকরি অশ্বক্ষুরশব্দে আকৃষ্ট হইয়া একটি প্রবীণ ব্যক্তি বাহির হইয়া আসিলেন। ক্ষৌরিত মস্তকে সুস্পষ্ট শিখা, কর্ণে শরের লেখনী, হস্তে তালপত্রের পুস্তিকা। ইনি রাজ্যের পুস্তপাল।

পুস্তপাল মহাশয় বিলীয়মান অশ্বারোহীর দিকে একবার দৃক্‌পাত করিয়া নিরুৎসুক কণ্ঠে হাব্‌শীদের জিজ্ঞাসা করিলেন— ‘বিদর্ভরাজকুমার চলে গেলেন?’

বিশদ হাস্যে হাব্‌শীদ্বয়ের সুকৃষ্ণ মুখমণ্ডল দ্বিধাবিভক্ত হইয়া গেল; তাহারা যুগপৎ মস্তক সঞ্চালন করিতে লাগিল। পুস্তপাল মহাশয় গম্ভীর মুখে কর্ণ হইতে লেখনী লইয়া পুস্তিকায় লিখিতে লিখিতে অস্ফুটম্বরে উচ্চারণ করিলেন— বিদর্ভকুমার— অর্থাৎ— ঊনপঞ্চাশৎ সংখ্যা—’

অতঃপর আমরা কুন্তলকুমারী হৈমশ্রীর স্বয়ংবর সভায় প্রবেশ করিতে পারি।

বৃহৎ সভাগৃহ। এত বৃহৎ যে পাঁচশত লোক অনায়াসে তাঁহাতে বসিতে পারে। গোলাকৃতি কক্ষ; প্রাচীর সাধারণ কক্ষ হইতে চতুর্গুণ উচ্চ। প্রাচীরের নিম্নভাগে নানাবিধ পৌরাণিক ঘটনার চিত্র অঙ্কিত রহিয়াছে; ঊর্ধ্বে ছাদের প্রায় নিকটে আলিসার মত প্রশস্ত মঞ্চ প্রাচীর বেষ্টন করিয়া আছে। তাহার উপর শূলধারী দুইজন হাব্‌শী রক্ষী ঘুরিয়া বেড়াইতেছে। চক্রাকারে পরিভ্রমণ করিতে করিতে পরস্পর সম্মুখীন হইবামাত্র তাহারা এক বিচিত্র অভিনয়ের অনুষ্ঠান করিতেছেঃ স্কন্ধ হইতে শূল নামাইয়া যেন পরস্পর আক্রমণ করিবার উপক্রম করিতেছে, তারপর উভয়ে উভয়কে মিত্র বলিয়া চিনিতে পারিয়া শূল স্কন্ধে তুলিয়া আবার বিপরীত মুখে পরিক্রমণ আরম্ভ করিতেছে। তাহাদের অভিনয় বস্তুত অহিংস হইলেও দেখিতে অতি ভয়ঙ্কর।

সভাগৃহের মধ্যস্থলে মণিকুট্টিমের উপর একটি সুবৃহৎ চক্রাকার বেদী, ভূমি হইতে মাত্র এক ধাপ উচ্চ। মূলত ইহা রাজসভায় সিংহাসন রক্ষার জন্য পট্টবেদিকা; কিন্তু রাজসভা স্বয়ংবর সভায় রূপান্তরিত হওয়ায় সিংহাসন অন্তর্হিত হইয়াছে। এই বেদীর সম্মুখে অল্প দূরে আর একটি অর্ধচন্দ্রাকৃতি ক্ষুদ্র বেদিকা— ইহা রাজার সহিত ভাষণপ্রার্থী মান্য অতিথির জন্য নির্দিষ্ট। উপস্থিত এই বেদিকা শূন্য।

কিন্তু প্রধান পট্টবেদিকাটি শূন্য নয়, বরঞ্চ কিছু অধিক পরিমাণেই পূর্ণ। প্রায় পঁচিশ-ত্রিশটি সুন্দরী সুবেশা তরুণী এই বেদীর উপর, পদ্মের উপর প্রজাপতির ন্যায় ইতস্তত সঞ্চরণ করিয়া বেড়াইতেছে। বেদীর স্থানে স্থানে স্বর্ণস্থালীতে মালা পুষ্প চন্দন শঙ্খ লাজ ইত্যাদি সজ্জিত রহিয়াছে। তরুণীরা কলকণ্ঠে গল্প করিতেছে, হাসিতেছে, তাম্বূল চর্বণ করিতেছে; কেহ বা বেদীর উপরে অর্ধশয়ান হইয়া অলস অঙ্গুলি সঞ্চালনে বীণার তন্ত্রীতে মৃদু আঘাত করিতেছে।

বেদীর এক পাশে দীর্ঘ স্বর্ণদণ্ডের শীর্ষে দুইটি শুক পক্ষী চরণে শৃঙ্খল পরিয়া বসিয়া আছে। একটি তরুণী মৃণাল বাহু তুলিয়া তাহাদের ধানের শীষ খাওয়াইতেছেন। এই তরুণীর মুখাবয়ব পশ্চাৎ হইতে দেখা না গেলেও তাঁহার দেহের ও গ্রীবার মর্যাদাপূর্ণ ভঙ্গিমা হইতে অনুমান হয় যে ইনিই রাজকন্যা হৈমশ্রী।

আর একটি যুবতী বেদীর কিনারায় বসিয়া গভীর মনঃসংযোগে কজ্জলমসী দিয়া ভূমির উপর আঁক কষিতেছে। অন্য কোনো দিকে তাহার দৃষ্টি নাই; মুখে উদ্বেগ ও শঙ্কা পরিস্ফুট। অবশেষে অঙ্ক শেষ করিয়া যুবতী হতাশাব্যঞ্জক মুখ তুলিল, হৃদয় ভারাক্রান্ত নিশ্বাস ছাড়িয়া বলিল— ‘ঊনপঞ্চাশ—’

যুবতীর কণ্ঠস্বরে রাজকুমারী পক্ষীদণ্ডের দিক হইতে ফিরিলেন। এতক্ষণে তাঁহার মুখ দেখা গেল। এতগুলি সম্ভ্রান্ত কুলোদ্‌ভবা রূপসীর মধ্যে তিনিই যে প্রধানা তাহা তাঁহার মুখের প্রতি একবার দৃষ্টিপাত করিলে আর সন্দেহ থাকে না। অভিমান তীক্ষ্ণবুদ্ধি বৈদগ্ধ্য ও সৌকুমার্য মিশিয়া মুখে অপূর্ব লাবণ্য যেন ঝলমল করিতেছে।

প্রিয়সখী চতুরিকার হতাশ মুখভঙ্গি দেখিয়া হৈমশ্রীও একটু বিষণ্ণ হাস্য করিলেন, তারপর অলসপদে তাহার কাছে গিয়া দাঁড়াইলেন। বলিলেন— ‘চতুরিকা, ঠিক জানিস ঊনপঞ্চাশটা? আমার তো মনে হচ্ছে, একশো ঊনপঞ্চাশ।’

চতুরিকা আবার হিসাবের দিকে দৃষ্টি নামাইল, মনে মনে হিসাব পরীক্ষা করিল, তারপর বিমর্ষভাবে মাথা নাড়িল— ‘উঁহু ঊনপঞ্চাশ। এই যে হিসেব— তেরো জন রাজকুমার, সতেরোটি সামন্ত, চৌদ্দজন শ্রেষ্ঠিপুত্র, আর পাঁচটি নাগরিক। কত হল?’

আরও কয়েকটি সখী চতুরিকার পিছনে আসিয়া দাঁড়াইয়াছিল, একজন চট্‌ করিয়া জবাব দিল— ‘সাতচল্লিশ।’

দ্বিতীয়া সখী বলিল— ‘দূর মুখপুড়ি, তিপ্পান্ন!’

রাজকুমারী হাসিলেন— ‘তোরা সবাই অঙ্কশাস্ত্রে বররুচি।’

চতুরিকা সকৌতুকে ভ্রূভঙ্গি করিয়া রাজকন্যার পানে চোখ তুলিল— ‘শুধু তোমার বুঝি বরে রুচি নেই?’

সকলে হাসিয়া উঠিল। হৈমশ্রীও হাসিতে হাসিতে চতুরিকার পাশে উপবেশন করিলেন। অন্য সকলে তাঁহাকে ঘিরিয়া বসিল। হৈমশ্রী মুখের একটি কৌতুক-করুণ ভঙ্গি করিয়া বলিলেন— ‘রুচি থেকেই বা লাভ কি বল্‌। ঊনপঞ্চাশ জনের একজনও তো প্রশ্নের উত্তর দিতে পারল না।’

চতুরিকা রাজকন্যার সবচেয়ে প্রিয় সখী, তাঁহার মনের অনেক খবর রাখে; সে মিটি মিটি হাসিয়া প্রশ্ন করিল— ‘আচ্ছা সত্যি বল পিয়সহি, এদের মধ্যে কেউ উত্তর দিতে পারলে তুমি সুখী হতে?’

হৈমশ্রীও হাসিলেন— ‘যদি বলি হতুম।’

চতুরিকা মাথা নাড়িয়া বলিল— ‘তাহলে আমি বিশ্বাস করতুম না। ওদের মধ্যে একজনকেও তোমার মনে ধরেনি।’

সখীদের মধ্যে একজন কৌতুক-তরল কণ্ঠে বলিয়া উঠিল— ‘শুধু রামছাগলটিকে ছাড়া।’

হাসির লহর উঠিল। একটি হতভাগ্য পাণিপ্রার্থীর ছাগ-সদৃশ দাড়ি লইয়া ইতিপূর্বে অনেক রঙ্গ রসিকতা হইয়া গিয়াছিল; রাজকুমারী একমুঠি ফুল ছুঁড়িয়া রহস্যকারিণীকে প্রহার করিলেন, বলিলেন— ‘রামছাগলটিকে মৃগশিরার ভারি মনে ধরেছে, ঘুরে-ফিরে কেবল তারই কথা। তোর জন্যে চেষ্টা করে দেখব নাকি? এখনো হয়তো খুঁজলে পাওয়া যাবে।’

মৃগশিরা রাজকুমারীর নিক্ষিপ্ত ফুলগুলি কবরীতে গুঁজিতে গুঁজিতে বলিল— ‘তা মন্দ কি! আমি রাজী।’

দ্বিতীয়া সখী বলিল— ‘রাজযোটক হবে— মৃগশিরা আর রামছাগল।’

চতুরিকা একটু গম্ভীর হইল, বলিল— ‘ঠাট্টা নয়, ভারি আশ্চর্য কথা। এতগুলো বড় বড় লোক, একটা প্রশ্নের জবাব কেউ দিতে পারল না।’

তৃতীয়া সখী বলিল— ‘যা বিদ্‌ঘুটে প্রশ্ন!’

রাজকুমারী শান্ত কণ্ঠে বলিলেন— ‘প্রশ্ন বিদ্‌ঘুটে নয় মালবিকা, লোকগুলো বিদ্‌ঘুটে। ওদের যদি সহজবুদ্ধি থাকত তাহলে সহজেই উত্তর দিতে পারত।’

একটি সখীর কৌতূহল দুর্নিবার হইয়া উঠিয়ছিল, সে রাজকন্যার কাছে ঘেঁষিয়া বসিয়া আবদারের সুরে বলিল— ‘বল না পিয়সহি, প্রথম প্রশ্নের উত্তর কি?’

অন্য একজন তাহাকে সরাইয়া দিয়া বলিল— ‘না না, আমরা সকলে তৃতীয় প্রশ্নের উত্তর শুনতে চাই— পৃথিবীতে সবচেয়ে মিষ্ট কী?’

রাজকুমারী অলস হাসিয়া বলিলেন— ‘তোরাই বল্‌ না দেখি।’

সকলে চিন্তান্বিত হইয়া পড়িল। একটি সরলা যুবতী উৎসাহভরে বলিল— ‘আমি বলব? রসাল! রসালের চেয়ে মিষ্টি পৃথিবীতে আর কিচ্ছু নেই।’

মৃগশিরা মুখ তুলিল— ‘আমি বুঝেছি— আখ! ইক্ষুদণ্ড! আখের চেয়ে মিষ্টি আর কী আছে। আখ থেকেই তো যত সব মিষ্টি জিনিস তৈরি হয়।’

বিদ্যুল্লতা আপত্তি তুলিল— ‘তাহলে মধু হবে না কেন? মধুই বা কি দোষ করেছে? হ্যাঁ পিয়সহি, মধু— না?’

হৈমশ্রী হাসিয়া উঠিলেন— ‘দূর হ’ পেটুকের দল। কিন্তু আর তো পারা যায় না। মাথার উপর ঊনপঞ্চাশ পাবনের নৃত্য হয়ে গেল, আর কি সহ্য হবে!’

তিনি ম্রিয়মাণ চক্ষে চতুরিকার পানে তাকাইলেন। বিদ্যুল্লতা সান্ত্বনার সুরে বলিল— ‘এরি মধ্যে হাঁপিয়ে পড়লে চলবে কেন। — এখনো সমস্ত দিন পড়ে রয়েছে।’

হৈমশ্রী অধীরভাবে মাথা নাড়িলেন— ‘তা নয় বিদ্যুল্লতা। কিন্তু আর্যাবর্তের এত অধঃপতন হয়েছে! এক অশিক্ষিতা মেয়ের তিনটে সামান্য প্রশ্নের উত্তর কেউ দিতে পারছে না!’

চতুরিকা মুখভঙ্গি করিল— ‘তুমি অশিক্ষিতা মেয়ে! বাব্বাঃ! চতুঃষষ্টি কলা শেষ করে বসে আছে!’

বনজ্যোৎস্না রাজকুমারীকে আশ্বাস দিবার চেষ্টা করিল— ‘হতাশ হয়ে না পিয়সহি, এখনো অনেক আসবে। কেউ না কেউ ঠিক উত্তর দিয়ে ফেলবেই।’

হৈমশ্রী বলিলেন— ‘উঠন্তি মূলো পত্তনেই চেনা যায়। যাঁরা আসবেন তাঁরা ওই রামছাগলের ভায়রাভাই। তার চেয়ে যদি আমার শুকসারীকে প্রশ্ন করতুম, ওরা ঠিক উত্তর দিতে পারত।’

চতুরিকা বলিল— ‘তবে তাই কর, সব হাঙ্গামা চুকে যাক। ঘরের মেয়ে ঘরেই থাকবে, শ্বশুরবাড়ি যেতে হবে না। তাহলে মহারাজকে তাই বলি, কী বল?’ রাজকুমারী বিমনাভাবে মৃদু হাসিলেন।

বাহিরে তোরণের প্রতীহার ভূমিতে কৃপাণধারী হাব্‌শীদ্বয় পূর্ববৎ দাঁড়াইয়া ছিল। অনেকক্ষণ কেহ আসে নাই। সহসা সম্মুখে চাহিয়া হাব্‌শীরা আরো সতর্ক হইয়া দাঁড়াইল।

যাহাকে দেখিয়া হাব্‌শীরা সতর্ক হইয়াছিল সে আর কেহ নয়, আমাদের অশ্বারূঢ় কালিদাস। নগরের বহু স্থান ঘুরিয়া উন্মত্ত ঘোটক অবশেষে রাজপ্রাসাদের দিকে উল্কার বেগে ছুটিয়া আসিতেছে। কালিদাস ঘোড়ার কেশর। ধরিয়া কোনো মতে টিকিয়া আছেন।

ঝড়ের মত ঘোড়া হাব্‌শীদ্বয়ের সম্মুখে আসিয়া পড়িল। হাব্‌শীরাও প্রস্তুত ছিল, ডালকুত্তার মত লাফ দিয়া দুই দিক হইতে ঘোড়ার বল্‌গা চাপিয়া ধরিল। হাব্‌শীদের কালো দেহে অসুরের শক্তি; ঘোড়া আর অধিক আস্ফালন করিতে পারিল না, শান্ত হইয়া দাঁড়াইল। কালিদাস আমনি পিছ্‌লাইয়া ঘোড়ার ঘর্মাক্ত পৃষ্ঠ হইতে নামিয়া পড়িলেন।

দীর্ঘকাল একটা উদ্দাম অসংযত ঘোড়ার পিঠে মরি-বাঁচি ভাবে আঁকড়াইয়া থাকিবার পর কালিদাসের মানসিক ক্রিয়াকলাপ প্রায় লুপ্ত হইয়া গিয়াছিল, তিনি কেবল ফ্যাল ফ্যাল করিয়া তাকাইতে লাগিলেন। অশ্বপাল আসিয়া অশ্বটিকে লইয়া গেল। পুস্তপাল মহাশয় ব্যস্তসমস্তভাবে প্রকোষ্ঠ হইতে বাহির হইয়া আসিলেন, কালিদাসকে দেখিয়া সসম্ভ্রমে অভ্যর্থনা করিলেন— ‘আসুন আসুন কুমার—’

কালিদাস থাতমত খাইয়া বলিলেন— ‘আমি— আমি—’

পুস্তপাল বলিলেন— ‘পরিচয় দিতে হবে না সৌরাষ্ট্রকুমার, আপনার শিরস্ত্রাণ কে না চেনে? আসতে আজ্ঞা হোক— এই দিকে— এই দিকে— মহামন্ত্রী প্রতীক্ষা করছেন—’

পুস্তপাল আমন্ত্রণের ভঙ্গিতে দুই হস্ত ভিতরের দিকে প্রসারিত করিলেন। হতবুদ্ধি অবস্থায় কালিদাস পুস্তপালের সঙ্গে রাজতোরণ-মধ্যে প্রবেশ করিলেন।

রাজপুরীর প্রথম ভবনে মহামন্ত্রী যুক্তকরে কালিদাসকে সংবর্ধনা করিলেন। শীর্ণকায় তীক্ষ্ণচক্ষু বৃদ্ধ মহা আড়ম্বরে সম্ভাষণ আরম্ভ করিলেন— ‘স্বাগতম্‌— শুভাগতম্‌। অষ্টোত্তর শ্রীযুক্ত পরমভট্টারক পরমভাগবত সৌরাষ্ট্রকুমারের জয় হৌক। আসুন মহাভাগ— আপনার পদদ্বন্দ্ব স্পর্শে—’

কালিদাস সম্মোহিতভাবে শুনিতে শুনিতে এতক্ষণে কেবল ‘পদ’ শব্দটি বুঝিতে পারিলেন। কিন্তু ‘পদদ্বন্দ্ব’ কী বস্তু? তিনি ত্রস্তভাবে নিজের পায়ের দিকে চক্ষু নামাইলেন— ‘পদদ্বন্দ্ব!’

মহামন্ত্রী স্মিতমুখে বলিলেন— ‘পদযুগল।’

কালিদাস তথাপি বিভ্রান্ত। বলিলেন— ‘পদযুগল!’

মহামন্ত্রী সপ্রশংস মুখে একটু হাস্য করিলেন— ‘কুমার দেখছি পরিহাস-প্রিয়। পদদ্বন্দ্ব অর্থাৎ পদযুগল— অর্থাৎ দু’টি পা—।’

কালিদাসের মুখের মেঘ কাটিয়া গেল— ‘ওঃ! দ্বন্দ্ব মানে দু’টি! তাই পদদ্বন্দ্ব বললেন!’

মহামন্ত্রী আসিয়া কালিদাসের বাহু ধরিলেন। রসিক ও কৌতুকী রাজপুত্র এ জগতে বড়ই বিরল। বৃদ্ধ স্মিতহাস্যে বলিলেন— ‘বৃদ্ধের সঙ্গে পরিহাস করবেন না কুমার, রসালাপের যোগ্যতর স্থান কাছেই আছে। আসুন, আপনাকে রাজকন্যার কাছে নিয়ে যাই—’

স্বয়ংবর সভায় বহুক্ষণ কোনো পাণিপ্রার্থীর শুভাগমন হয় নাই; এই অবকাশে সখীদের মধ্যে রঙ্গরস জমিয়া উঠিয়াছিল। রাজকুমারী একটি সখীর পৃষ্ঠে পৃষ্ঠভার অর্পণ করিয়া অলস ভঙ্গিতে বসিয়া ছিলেন; বিদ্যুল্লতা দুইটি ময়ূরপুচ্ছ হাতে লইয়া রাজকুমারীকে ঘিরিয়া ঘিরিয়া নৃত্য করিতেছে এবং অনুচ্চ জনান্তিক স্বরে গান গাহিতেছে। তাহার গানের কথাগুলিতে যে মৃদু রতিরস আছে হৈমশ্রী তাহা উপভোগ করিতেছেন। সখীরা কেহ মুখ টিপিয়া হাসিতেছে, কেহ বা ব্যক্তভাবেই কুন্দদন্ত বিকশিত করিয়া আছে। একটি সখীর অঙ্গুলির মৃদু আঘাতে ভূমিশয়ান বীণার তন্ত্রী হইতে মুগ্ধ মূর্ছনা গুঞ্জিত হইয়া উঠিতেছে।

সহসা বাধা পড়িল। কয়েকটি সখী দূরে মহামন্ত্রীকে আসিতে দেখিয়া বিদ্যুল্লতার দিকে উৎকণ্ঠ হইয়া সমস্বরে শীৎকার করিয়া উঠিল— ‘স্‌স্‌স্—!’

বিদ্যুল্লতা ঘাড় ফিরাইয়া একবার দ্বারের দিকে ত্রস্ত দৃষ্টিপাত করিয়াই থপ্‌ করিয়া বসিয়া পড়িল। হৈমশ্রী ঈষৎ চকিতভাবে দ্বারের পানে আয়ত চক্ষু ফিরাইলেন।

প্রধান দ্বারপথে মহামন্ত্রী কালিদাসকে সঙ্গে লইয়া অগ্রসর হইয়া আসিতেছেন। কালিদাসের চোখেমুখে অকুণ্ঠ বিস্ময়; মাঝে মাঝে কোনো একটি সুন্দর কারুকার্য দেখিয়া তাঁহার মন্থর গতি রুদ্ধ হইয়া যাইতেছে; মহামন্ত্রী তাঁহার বাহু স্পর্শ করিয়া আবার তাঁহাকে সম্মুখে পরিচালিত করিতেছেন।

উভয়ে দ্বিতীয় বেদীর উপর আসিয়া দাঁড়াইলেন। কালিদাস সম্মুখস্থ যুবতিযূথের প্রতি সুস্মিত বিস্ময়ে চাহিয়া রহিলেন।

সখীরাও ইতিমধ্যে উঠিয়া দাঁড়াইয়াছিল এবং সহস্রচক্ষু লইয়া এই মুকুটধারী পরম সুন্দর যুবাপুরুষকে নিরীক্ষণ করিতেছিল। রাজকুমারী একবার চক্ষু তুলিয়া আবার চক্ষু নত করিয়াছিলেন; তাঁহার মুখের নিরুৎসুক ঔদাসীন্য অনেকটা কাটিয়া গিয়াছিল। বলা বাহুল্য, এমন কান্তিমান পাণিপ্রার্থী ইতিপূর্বে স্বয়ংবর সভায় পদার্পণ করেন নাই।

মহামন্ত্রী মহাশয় একবার গলা ঝাড়া দিয়া দক্ষিণ হস্তখানি অভয়মুদ্রার ভঙ্গিতে তুলিলেন— ‘স্বস্তি। — পরমভট্টারক শ্রীমান সৌরাষ্ট্রকুমার রাজকুমারীর প্রশ্নের উত্তর দিতে এসেছেন। শুভমস্তু।’

রাজকুমারী দুই করতল যুক্ত করিয়া বুক পর্যন্ত তুলিলেন; চোখ দু’টি ঈষৎ উঠিয়া আবার নত হইল। বাহিরে কিছু প্রকাশ না পাইলেও তিনি যেন অন্তরে অন্তরে বিচলিত হইয়া উঠিয়াছেন, জোয়ারের জলস্পর্শে ঘাটে বাঁধা তরণীর মত।

এদিকে মহামন্ত্রী কালিদাসকে চক্ষু দ্বারা ইশারা করিতেছেন মাথা হইতে শিরস্ত্রাণটি খুলিয়া ফেলিতে; কিন্তু কালিদাস ইঙ্গিতটা ঠিক ধরিতে পারিতেছেন না। মহামন্ত্রী তখন তাঁহার কানের কাছে মুখ লইয়া গিয়া মৃদুস্বরে কথা বলিলেন; কালিদাস তাড়াতাড়ি শিরস্ত্রাণ খুলিয়া ফেলিলেন। কিন্তু ওটা রাখিবেন কোথায়? এদিক ওদিক স্থান না পাইয়া শেষে মহামন্ত্রীর হাতে ওটা ধরাইয়া দিয়া সহাস্য মুখে রাজকুমারীর দিকে ফিরিলেন।

কালিদাসের শিরস্ত্রাণ-মুক্ত মুখমণ্ডল দেখিয়া যুবতীদের মুণ্ড ঘুরিয়া গেল। তাহারা নিশ্বাস সংবরণ করিয়া দেখিতে লাগিল; এক ঝাঁক খঞ্জন যেন কোন্‌ মায়াবীর মন্ত্রকুহকে স্থির চলৎশক্তিহীন হইয়া গিয়াছে। শেষে মৃগশিরা আর থাকিতে না পারিয়া পাশের সখীর কানে কানে বলিল— ‘কী চমৎকার চেহারা ভাই, যেন সাক্ষাৎ কন্দর্প। এমন আর কখনো দেখেছিস!’

আশেপাশের দুই তিনজন চাপা গলায় বলিয়া উঠিল— ‘স্‌স্‌স্—!’

চতুরিকা রাজকুমারীর মনের ভাব বুঝিয়াছিল, সে তাঁহার কানের কাছে মুখ লইয়া গিয়া হ্রস্বকণ্ঠে বলিল— ‘মহেশ্বরের কাছে মানত করো এবার যেন না ফস্কায়।’

রাজকুমারী মুখ টিপিয়া হাসিলেন, আঙুল দিয়া ঠেলিয়া চতুরিকাকে পাশে সরাইয়া দিলেন। চতুরিকা বড় প্রগল্‌ভা।

প্রশ্ন করিতে বিলম্ব হইতেছে। সৌরাষ্ট্রকুমারকে কতক্ষণ দাঁড় করাইয়া রাখা যায়! মহামন্ত্রী আর একবার গলা ঝাড়া দিয়া বলিলেন— ‘কুমারি, কুমার-ভট্টারক নিজের ভাগ্য পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত হয়েছেন, এবার আপনার প্রশ্ন করুন।’

রাজকুমারী মুখ তুলিলেন। কালিদাসের সঙ্গে তিনি ঠিক মুখোমুখিভাবে দাঁড়াইয়া ছিলেন না। একটু পাশ ফিরিয়া ছিলেন। এখন মনোরম গ্রীবাভঙ্গি সহকারে তিনি একবার কালিদাসের দিকে মুখ ফিরাইলেন, তারপর আবার সম্মুখ দিকে চাহিয়া অনুচ্চ স্পষ্ট স্বরে বলিলেন— ‘প্রথম প্রশ্ন হচ্ছে— জগতে সবচেয়ে শক্তিমান কী?’

সখীরা এতক্ষণ একদৃষ্টে রাজকুমারীর পানে চাহিয়া ছিল, এখন যন্ত্র-নিয়ন্ত্রিতবৎ একসঙ্গে কালিদাসের পানে মুণ্ড ফিরাইল।

কালিদাস কিন্তু ইত্যবসরে অন্যমনস্ক হইয়া পড়িয়াছেন; চারিদিকে এত মহার্ঘ বৈচিত্র্য ছড়ানো রহিয়াছে যে চক্ষু বিভ্রান্ত হইলে দোষ দেওয়া যায় না। তিনি রাজকুমারীর প্রশ্ন করার ব্যাপারটা ভালরূপ অনুধাবন করিয়াছিলেন কিনা তাহাতেও সন্দেহ আছে। মহামন্ত্রী তাঁহার ভাব দেখিয়া মনে করিলেন ইহা সৌরাষ্ট্রদেশীয় রসিকতার একটা অঙ্গ। তিনি সসম্ভ্রমে প্রশ্নের পুনরুক্তি করিয়া কালিদাসের মনোযোগ আকর্ষণ করিলেন— ‘কুমারী প্রশ্ন করেছেন, জগতে সবচেয়ে শক্তিমান কী?’

কালিদাসের চক্ষুযুগল এই সময় বিস্ময়-বিমুগ্ধভাবে ঊর্ধ্বে উঠিতেছিল, হঠাৎ তাঁহার মুখে ভয়ের ছায়া পড়িল। ত্রাস-বিস্ফারিত নেত্র ঊর্ধ্বে রাখিয়া তিনি একটি বাহু পাশের দিকে বাড়াইয়া বৃদ্ধ মন্ত্রীর কণ্ঠ জড়াইয়া ধরিলেন। তারপর বিনা বাক্যব্যয়ে তাঁহাকে দুই হস্তে জাপ্টাইয়া ধরিয়া আলিসার পানে তাকাইতে লাগিলেন।

ঊর্ধ্বে আলিসার উপর যে হাব্‌শী রক্ষীযুগলের ভয়ঙ্কর যুদ্ধাভিনয় আরম্ভ হইয়াছিল এবং তাহা দেখিয়াই যে কালিদাসের ঈদৃশ অবস্থান্তর ঘটিয়াছে তাহা কেহ বুঝিতে পারিল না। বৃদ্ধ মহামন্ত্রী উত্ত্যক্ত হইয়া ভাবিলেন, সৌরাষ্ট্র দেশের রাজকীয় রসিকতা ক্রমশ চরমে উঠিতেছে। গলা ছাড়াইবার চেষ্টা করিতে করিতে তিনি বলিলেন— ‘প্রশ্নের উত্তর দিন কুমার।’

ব্যাপার বেশিদূর গড়াইতে পারিল না; হাবশী যুগল ইত্যবসরে দ্বন্দ্বাভিনয় শেষ করিয়া আবার শান্তভাবে বিপরীত মুখে চলিতে আরম্ভ করিয়াছিল। কালিদাস কতকটা আশ্বস্ত হইয়া মন্ত্রীকে ছাড়িয়া দিলেন। ক্ষুব্ধ মন্ত্রী কণ্ঠের ঘাম মুছিতে মুছিতে পুনশ্চ বলিলেন— ‘এইবার প্রশ্নের উত্তর!’

কিন্তু কালিদাস বাঙ্‌নিষ্পত্তি করিবার পূর্বেই রাজকুমারী কথা কহিলেন, বীণার ঝঙ্কারের ন্যায় ঈষৎ কম্পিত কণ্ঠে বলিলেন— ‘প্রথম প্রশ্নের যথার্থ উত্তর পেয়েছি।’

সকলে অবাক। উত্তেজিত সখীর দল রাজকুমারীকে ভাল করিয়া ঘিরিয়া ধরিল। চতুরিকা বলিয়া উঠিল— ‘অ্যাঁ— কী উত্তর পেলে!’

কুমারীর গণ্ডদু’টি ঈষৎ অরুণাভ হইল। তিনি ঈষৎ গ্রীবা বাঁকাইয়া স্পষ্ট অথচ সংবৃতকণ্ঠে বলিলেন— ‘প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে— ভয়। কুমার অভিনয়ের দ্বারা যথার্থ উত্তর দিয়েছেন।’

সখীর দল সশব্দে নিশ্বাস ছাড়িয়া কালিদাসের দিকে ফিরিল।

কালিদাস মন্ত্রীর পানে চাহিয়া একটু বিহ্বলভাবে হাসিতেছেন, কোন্‌ দিক দিয়া কী হইয়া গেল ধারণা করিতে পারিতেছেন না। মন্ত্রীও কতকটা বোকা বনিয়া গিয়া ঘাড় চুলকাইতে লাগিলেন।

রাজকুমারী কথা কহিলেন। তাঁহার মুখচ্ছবিতে একটু উদ্বেগ দেখা দিয়াছে; কি জানি কুমার দ্বিতীয় প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে পরিবেন কিনা। কিন্তু তাঁহার কণ্ঠস্বর তেমনি সংযত এবং আবেশহীন হইয়া রহিল। তিনি বলিলেন— ‘এবার দ্বিতীয় প্রশ্ন— দ্বন্দ্ব হয় কাদের মধ্যে?’

প্রশ্ন করিয়াই রাজকুমারী কালিদাসের পানে একটি উৎকণ্ঠা-মিশ্র দৃষ্টি প্রেরণ করিলেন।

কালিদাস এবার প্রস্তুত ছিলেন; প্রশ্ন শুনিয়া তাঁহার মুখ হর্ষোৎফুল্ল হইয়া উঠিল। তিনি মন্ত্রীর পানে কৌতুক-কটাক্ষপাত করিয়া তর্জনী তুলিলেন, যেন ইঙ্গিতে বলিতে চাহিলেন যে এ প্রশ্নের সমাধান তো পূর্বেই হইয়া গিয়াছে। তারপর বিজয়দীপ্ত চক্ষে রাজকুমারীর দিকে চাহিয়া দুইটি অঙ্গুলি ঊর্ধ্বে তুলিয়া বলিলেন— ‘দ্বন্দ্ব— দুই।’

রাজকুমারীর চক্ষে চকিত আনন্দ খেলিয়া গেল, তিনি রুদ্ধ নিশ্বাস মোচন করিলেন। চতুরিকা উত্তেজনা-বিকৃত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করিল— ‘কি হল— ঠিক হয়েছে?’

রাজকুমারী ক্ষণেক নীরব থাকিয়া বোধ করি নিজের উদ্‌গত হৃদয়বৃত্তি সংবরণ করিয়া লইলেন, তারপর ধীর স্বরে কহিলেন— ‘কুমার দ্বিতীয় প্রশ্নের যথার্থ উত্তর দিয়েছেন— দ্বন্দ্ব হয় দুই-এর মধ্যে।’

সভাকক্ষের ভিতর দিয়া উত্তেজনার একটা ঝড় বহিয়া গেল। সখীরা প্রায় সকলেই একসঙ্গে কলকূজন করিয়া উঠিয়া তৎক্ষণাৎ ‘স্‌স্‌স্‌’ শব্দের শাসনে নীরব হইল। উত্তেজনায় মৃগশিরা ঘন ঘন নিশ্বাস ফেলিতে লাগিল; বনজ্যোৎস্না ভূলুণ্ঠিত বীণাটার উপর পা চাপাইয়া দিয়া তাহার মর্মতন্তু হইতে যন্ত্রণার কাকুতি বাহির করিল; বিদ্যুল্লতার নীবিবন্ধ খুলিয়া খসিয়া পড়িবার উপক্রম করিতেছিল, হঠাৎ সেইদিকে মনোযোগ আকৃষ্ট হওয়ায় সে ব্যাকুলভাবে বস্ত্র সংবরণ করিয়া সকলের পিছনে লুকাইল। রাজকুমারী সকলের মধ্যে দাঁড়াইয়া নীহারশুভ্র উত্তরীয়টি ভাল করিয়া অঙ্গে জড়াইয়া লইলেন।

বুড়া মন্ত্রীর গায়েও বোধহয় উত্তেজনার ছোঁয়াচ লাগিয়াছিল, তিনি দুই হস্ত সহর্ষে ঘর্ষণ করিতে করিতে বলিলেন— ‘ধন্য কুমার! ধন্য কুমার। আপনি দু’টি প্রশ্নের নির্ভুল উত্তর দিয়েছেন। এবার শেষ প্রশ্ন। মাত্র একটি প্রশ্ন বাকি।’

এই সব উত্তেজনা উদ্দীপনার মধ্যে কালিদাস কিন্তু অত্যন্ত নির্লিপ্তভাবে একদিকে তাকাইয়া দেখিতেছিলেন; স্বর্ণদণ্ডের উপর পাখি দু’টি তাঁহার সকৌতুক মনোযোগ আকর্ষণ করিয়া লাইয়াছিল। তাই রাজকুমারী যখন তৃতীয় প্রশ্ন উচ্চারণ করিলেন তাহা কালিদাসের কানে গোল কিনা সন্দেহ।

যিনি প্রশ্নের উত্তর দিবেন তাঁহার কোনো উৎকণ্ঠা নাই, কিন্তু রাজকুমারীর গলা শুকাইয়া গিয়াছিল, বুকের ভিতর হৃৎযন্ত্রের ক্রিয়া ঠিক স্বাভাবিকভাবে চলিতেছিল না। কিন্তু বাহিরে কিছু প্রকাশ করা চলিবে না। কুমার যদি শেষ প্রশ্নের উত্তর না দিতে পারেন অথচ কুমারীর মনের পক্ষপাত প্রকাশ হইয়া পড়ে, তবে সে বড় লজ্জার কথা হইবে। তিনি যথাসম্ভব স্থির স্বরে কথা বলিলেন, তবু গলা একটু কাঁপিয়া গেল— ‘শেষ প্রশ্ন— পৃথিবীতে সবচেয়ে মিষ্ট কি?’

যুবতিবৃন্দ যুগপৎ কালিদাসের পানে চক্ষু ফিরাইল।

কালিদাস ফিক্‌ করিয়া হাসিলেন। কিন্তু তাঁহার মুখে কথা নাই, চক্ষু শুক-মিথুনের উপর নিবদ্ধ। রাজকুমারী ঈষৎ বিস্ময়ে চক্ষু ফিরাইয়া দেখিলেন কালিদাস অন্য দিকে তাকাইয়া আছেন; তাঁহার মুখে ক্ষণিক ক্ষোভের ছায়া পড়িল। পরক্ষণেই কালিদাস সম্মুখে অঙ্গুলি নির্দেশ করিয়া বলিয়া উঠিলেন— ‘ঐ দ্যাখো— ঐ দ্যাখো—’

সকলে একসঙ্গে তাঁহার অঙ্গুলিসঙ্কেত অনুসরণ করিয়া তাকাইলেন। ব্যাপার এমন কিছু গুরুতর নয়, দণ্ডের উপর বসিয়া শুক-দম্পতি অর্ধমুদিতনেত্রে পরস্পর চঞ্চুচুম্বন করিতেছে; তাহাদের কণ্ঠ হইতে গদ্‌গদ কূজন নির্গত হইতেছে। যিনি ভবিষ্যকালে লিখিবেন— ‘মধু দ্বিরেফঃ কুসুমৈকপাত্রে পপৌ প্রিয়াং স্বামনুবর্তমানঃ—’ তিনি এই দেখিয়াই বিহ্বল আত্মবিস্মৃত।

রাজকুমারীর চক্ষে কিন্তু আনন্দের বিজলী খেলিয়া গেল; তিনি কালিদাসের পানে সভ্রূভঙ্গ একটি কটাক্ষ নিক্ষেপ করিয়া সলজ্জ রক্তিম মুখখানি নত করিয়া ফেলিলেন।

কালিদাস হাসিতে হাসিতে রাজকুমারীর দিকে ফিরিলেন, চমকিত হইয়া দেখিলেন তিনি ধীরে ধীরে নতজানু হইতেছেন। যুক্তকরে শির অবনমিত করিয়া কুমারী অর্ধস্ফুট স্বরে বলিলেন— ‘আর্যপুত্র শেষ প্রশ্নের যথার্থ উত্তর দিয়েছেন। পৃথিবীতে সবচেয়ে মিষ্ট— প্রণয়।’

ক্ষণকালের বিস্ময় বিমূঢ়তা কাটিয়া যেন শত ছিন্ন হইয়া গেল। সখীরা আর সম্ভ্রম শালীনতার শাসন মানিল না। চিৎকার হুড়াহুড়ি অঞ্চল-উত্তরীয়ের উৎক্ষেপে তাহাদের প্রমত্ত উল্লাস একেবারে বাহ্যজ্ঞান শূন্য হইয়া পড়িল। রাজকুমারী উঠিয়া দাঁড়াইতে চার পাঁচজন ছুটিয়া গিয়া তাঁহাকে একসঙ্গে জড়াইয়া ধরিল। কয়েক জন মুঠি মুঠি লাজ লইয়া সকলের মাথার উপর বৃষ্টি করিতে লাগিল। একজন ঘন ঘন শঙ্খ বাজাইয়া তুমুল শব্দ-তরঙ্গের সৃষ্টি করিল। যাহারা অবশিষ্ট রহিল, তাহাদের মধ্যে কেহ কেহ পরস্পর হাত ধরিয়া ঘুরিয়া ঘুরিয়া নাচিতে লাগিল; অন্য কয়জন পরস্পর আঁচল টানিয়া, কবরী খুলিয়া দিয়া কপট কলহে হৃদয়াবেগ লাঘব করিতে প্রবৃত্ত হইল।

মহামন্ত্রী কালিদাসের দুই হাত চাপিয়া ধরিয়া গদ্‌গদ কণ্ঠে বলিলেন— ‘ধন্য কুমার! ধন্য আপনার কূটবুদ্ধি! আমি মহারাজকে সুসংবাদ দিতে চললাম।’ বলিয়া তিনি দ্রুতপদে সভা হইতে নিষ্ক্রান্ত হইয়া গেলেন।

বিশ্রস্তকুন্তলা চতুরিকা বেদীর কিনারায় ঊর্ধ্বমুখী হইয়া দাঁড়াইয়া দুই হাত নাড়িয়া উপরিস্থিত হাব্‌শী রক্ষীকে ইশারা করিতেছিল, মুখের কাছে সম্পুটিত করপল্লব যুক্ত করিয়া জানাইতেছিল— শিঙা বাজাও, বিষাণ বাজাও, নগরীতে সংবাদ দাও রাজকন্যা পতিবরণ করিয়াছেন।

দেখিতে দেখিতে নগরময় রাষ্ট্র হইয়া গেল, রাজকন্যা পতিবরণ করিয়াছেন। নগরোদ্যানে আনন্দ-বিহ্বল নাগরিকেরা ছুটিয়া আসিয়া সমবেত হইল; নৃত্যগীত আরম্ভ হইয়া গেল, যেন সকলের গৃহেই আজ পরমোৎসব। —

নগরোদ্যান বেষ্টনকারী পথের উপর দিয়া এক সুসজ্জিত হস্তী চলিয়াছে; চারিদিকে বিপুল জনতা। হস্তীপৃষ্ঠে আসীন ঘোষক চিৎকার করিয়া দুই বাহু আস্ফালন করিয়া বোধ করি রাজকুমারীর স্বয়ংবর সংক্রান্ত কোনো রাজকীয় বার্তা ঘোষণা করিতেছে, কিন্তু জনতার কলকোলাহলে কিছুই শোনা যাইতেছে না। ঘোষকের পশ্চাতে বসিয়া দ্বিতীয় এক পুরুষ মুঠি মুঠি স্বর্ণমুদ্র চারিদিকে ছড়াইতেছে। নিম্নে সোনা কুড়াইবার হুড়াহুড়ি মারামারি।

ক্রমে রাত্রি হইল। রাজপুরীর পূজামন্দিরে অগ্নি সাক্ষী করিয়া কুমারী হৈমশ্রীর সহিত কালিদাসের বিবাহ হইল।

রাত্রি গভীর হইতেছে। আকাশে পূর্ণচন্দ্র, দীপান্বিতা নগরী। সৌধে সৌধে আলোকমালা; গীতবাদ্যে, সুগন্ধি অগুরু-ধূমে বাতাস আমোদিত। সর্বাঙ্গে দীপালঙ্কার পরিয়া রাজপুরী সখিপরিবৃতা প্রধান নায়িকার ন্যায় শোভা পাইতেছে। রাত্রি যত বাড়িতেছে উৎসাহ উত্তেজনা ততই মন্থর রসঘন হইয়া আসিতেছে, নায়ক নায়িকার নিভৃত মিলনের আর বিলম্ব নাই।

নগরীর এক মদিরাগৃহের সম্মুখে একদল মশালহস্ত উৎসবকারী সৌরাষ্ট্রের প্রকৃত যুবরাজকে ঘিরিয়া ধরিয়াছিল এবং প্রমত্ত রঙ্গ-কৌতুকের অঙ্কুশে বিঁধিয়া তাঁহাকে প্রায় পাগল করিয়া তুলিয়াছিল। মকরবর্মা দীর্ঘ বনপথ পদব্রজে অতিক্রম করিয়া সবেমাত্র নগরে আসিয়া পৌঁছিয়াছেন; অঙ্গের বসন ছিন্ন কর্দমাক্ত, জঠরে জ্বলন্ত ক্ষুধা— তাঁহার মানসিক অবস্থা সহজেই অনুমেয়। সর্বাপেক্ষা পরিতাপের বিষয় এই যে কেহই তাঁহাকে সৌরাষ্ট্রের যুবরাজ মকরবর্মা বলিয়া বিশ্বাস করিতেছে না।

মকরবর্মা উত্তপ্ত কণ্ঠে বলিলেন— ‘আমি বলছি আমিই সৌরাষ্ট্রের যুবরাজ।’

এক ব্যক্তি মুখে চট্‌কার শব্দ করিয়া বলিল— ‘তা তো অনেকক্ষণ থেকেই বলছি, আমরাও শুনে আসছি। কিন্তু তার প্রমাণ কই বাছাধন।’

মকরবর্মা অধিকতর ক্রুদ্ধ হইয়া উঠিতে লাগিলেন, উদ্ধত স্বরে কহিলেন— ‘প্রমাণ! প্রমাণ আবার কি? দেখতে পাচ্ছ না আমি যুবরাজ?’ বলিয়া তিনি বুক ফুলাইয়া গর্বিত ভঙ্গিতে দাঁড়াইলেন। সকলে হাসিয়া উঠিল। হাসি থামিলে একজন সান্ত্বনার স্বরে বলিল— ‘আচ্ছা আচ্ছা, তুমিই সৌরাষ্ট্রের যুবরাজ। — কিন্তু যার সঙ্গে রাজকুমারীর বিয়ে হল, সে তবে কে?’

যুবরাজ মকরবর্মা এবার একেবারে ক্ষেপিয়া গেলেন, ফেনায়িত মুখে চিৎকার করিলেন— ‘সে— সে একটা কাঠুরে। চোর— প্রবঞ্চক বাটপাড়! আমার কাপড় জমা জুতো ঘোড়া সব চুরি করে নিয়ে পালিয়েছে।’

আবার উচ্চহাস্যে তাঁহার কথা চাপা পড়িয়া গেল; রাজকুমার নিষ্ফল ক্রোধে দন্ত কিড়িমিড়ি করিতে লাগিলেন। হাসি মন্দীভূত হইলে প্রথম ব্যক্তি মিটিমিটি চাহিয়া বলিল— ‘সত্যি কথা বলতে কি চাঁদবদন, তোমাদের মধ্যে কাঠুরে যদি কেউ থাকে সে তিনি নয়— তুমি। বলি, ক’ঘড়া তালের রস চড়িয়েছে?’

সকলে হাসিল। মকরবর্মা দেখিলেন। এখানে কিছু হইবে না; তিনি রূঢ় হস্তে ভিড় সরাইয়া বাহির হইবার চেষ্টা করিলেন— ‘ছেড়ে দাও— সরে যাও। আমি দেখে নেব সেই চোর কাঠুরেটাকে— শূলে দেব। যাবে কোথায় সে! একবার তাকে দেখতে চাই।’

তাহার কণ্ঠস্বর জনতার বাহিরে মিলাইয়া গেল। প্রথম ব্যক্তি নীরস কণ্ঠে মন্তব্য করিল— ‘কী আর দেখবে যাদু। তিনি এতক্ষণে রাজকন্যেকে নিয়ে বাসর-শয্যায় শয়ন করেছেন।’

আবার হাসির লহর ছুটিল।

রাজভবনের উদ্যান-মধ্যে একটি সরোবর। সরোবরের স্থির দর্পণে চাঁদের প্রতিবিম্ব পড়িয়াছে।

বাঁধানো ঘাটের পাশে মর্মরবেদী; তাহার উপর কালিদাস ও হৈমশ্রী পাশাপাশি বসিয়া আছেন। নব পরিণয়ের পীতসূত্র তাঁহাদের মণিবন্ধে জড়ানো রহিয়াছে। হৈমশ্রীর হাতে একটি ক্ষুদ্র রৌপ্যনির্মিত তীর— যাহা পরবর্তী কালে কাজললতায় রূপান্তরিত হইয়াছে।

রাজকুমারী নতমুখে তীরটি লইয়া নাড়াচাড়া করিতেছেন; কালিদাস মুগ্ধ উন্মনাভাবে চাঁদের পানে চাহিয়া আছেন। কিছুক্ষণ কথাবার্তা নাই। তারপর কালিদাস একটি নিশ্বাস ফেলিয়া বলিলেন— ‘কী সুন্দর চাঁদ! ঠিক যেন— ঠিক যেন—’ যে উপমাটি খুঁজতেছিলেন তাহা পাইলেন না। হৈমশ্রী মুখখানি একটু তুলিয়া স্মিত সলজ্জ। কণ্ঠে বলিলেন— ‘ঠিক যেন—?’

কালিদাস ক্ষুব্ধভাবে মাথা নাড়িলেন— ‘জানি না। মনে আসছে মুখে আসছে না—’

রাজকুমারী একটু নিরাশ হইলেন; নব অনুরাগের আকাঙ্ক্ষায় যে সুমিষ্ট উপমাটি প্রত্যাশা করিয়াছিলেন কালিদাসের কণ্ঠে তাহা আসিল না।

এই সময় সহসা বিকট শব্দ শুনিয়া হৈমশ্রী চমকিয়া উঠিলেন।

শব্দটি আসিল প্রাসাদ বেষ্টনকারী প্রাচীরের পরপার হইতে। প্রাচীরের বাহিরে রাজপথ গিয়াছে, সেই পথ দিয়া এক শ্রেণী ভারবাহী উষ্ট্র চলিয়াছিল। একটি উষ্ট্র বোধ করি প্রাচীরের উপর হইতে গলা বাড়াইয়া অদূরে নবদম্পতিকে দেখিয়া হর্ষধ্বনি করিয়া উঠিয়াছিল।

ভয় পাইয়া হৈমশ্রী কালিদাসের হাত চাপিয়া ধরিয়াছিলেন। কালিদাস কৌতুক অনুভব করিয়া উচ্চ হাসিয়া উঠিলেন। রাজকুমারীর শিরীষ কোমল হস্তে একটু সস্নেহ চাপ দিয়া বলিলেন— ‘ভয় নেই রাজকুমারি, ও একটা উট— যাকে সাধুভাষায় বলে— উট্র।’

সাধুভাষা বলিয়া কালিদাস উৎফুল্ল হইয়া উঠিয়াছিলেন। কিন্তু হৈমশ্রীর মুখে সংশয়ের ছায়া পড়িল; তিনি বিস্ফারিত নেত্রে কালিদাসের পানে চাহিয়া ক্ষীণস্বরে কহিলেন— ‘কি— কি বললেন আর্যপুত্র!’

কালিদাস দেখিলেন ভুল হইয়াছে। তিনি তাড়াতাড়ি ভুল সংশোধন করিলেন— ‘না না— উট্র নয় উট্র নয়— উষ্ট।’

হৈমশ্রীর মুখ শুকাইয়া গেল; শঙ্কিত সন্দেহে কালিদাসের পানে চাহিয়া থাকিয়া তিনি আপনার অবশে ধীরে ধীরে উঠিয়া দাঁড়াইলেন, অস্ফুট স্বরে বলিলেন— ‘উট্র— উষ্ট—’

তারপর চকিতে তাঁহার মুখের মেঘ কাটিয়া গেল; কালিদাস আজ প্রথম হইতে যে আচরণ করিয়াছেন তাহা মনে পড়িয়া গেল। তিনি স্বস্তির নিশ্বাস ফেলিয়া বলিলেন— ‘ও— আর্যপুত্র পরিহাস করছেন! কী পরিহাস-প্রিয় আপনি!’

কালিদাসও উঠিয়া দাঁড়াইয়াছিলেন। তিনি উত্তর দিলেন না, কেবল মৃদু মৃদু হাসিতে লাগিলেন।

এই সময়ে তোরণের ঘটিকাগৃহে মধ্যরাত্রির প্রহর বাজিল। ক্ষণস্থায়ী রাগিণীর আলাপ বন্ধ হইলে কালিদাস সবিস্ময়ে প্রশ্ন করিলেন— ‘ও কি?’

হৈমশ্রীর চোখে আবার বিস্ময়মিশ্র সন্দেহ দেখা দিল। রাজপুরীতে প্রহর বাজে সৌরাষ্ট্রের যুবরাজ তাহাও জানেন না। না, ইহাও পরিহাস!

তিনি বলিলেন— ‘মধ্যরাতের প্রহর বাজল।’

কালিদাস বলিলেন— ‘ওহো— বুঝেছি, রাত দুপুর হয়েছে। — এবার চল, ভেতরে যাই।’

তিনি অকুণ্ঠ সহজতায় হৈমশ্রীর দিকে হস্ত প্রসারিত করিয়া দিলেন। হৈমশ্রীর সংশয় আবার দূর হইল। এমন স্বচ্ছন্দ আভিজাত্য, এমন অনিন্দ্যকান্তি, রাজপুত্র নহিলে কি সম্ভব?

দুইজনে হাত-ধরাধরি করিয়া শয়নমন্দিরের দিকে চলিলেন।

ঠিক এই সময় প্রাসাদের এক বহিঃকক্ষে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকারের অভিনয় চলিতেছিল। বক্রী পাপগ্রহের ন্যায় সৌরাষ্ট্রের মকরবর্মা তির্যক গতিতে কুন্তলরাজের সম্মুখীন হইয়াছিলেন।

দীপোৎসব তখনো শেষ হয় নাই; সেই দীপাবলীর আলোকে কক্ষের মধ্যস্থলে চারিটি ব্যক্তি দাঁড়াইয়াছিলেন— সৌরাষ্ট্রের মকরবর্মা, কুন্তলের বৃদ্ধ মহামন্ত্রী, পুস্তপাল মহাশয় এবং স্বয়ং কুন্তলরাজা। সৌরাষ্ট্র কুমারের বেশবাস পূর্ববৎ, তিনি সংহত ক্রোধে ঘন ঘন নিশ্বাস ত্যাগ করিতেছেন; মহামন্ত্রীর মনের ভাব বুঝিবার উপায় নাই, পুস্তপাল মহাশয় যে ত্রস্ত ও বিপন্ন হইয়া পড়িয়াছেন তাহা বুঝিতে কাহারও বেগ পাইতে হয় না। স্বয়ং কুন্তলরাজও বিলক্ষণ বিচলিত হইয়াছেন; তিনি গম্ভীর প্রকৃতির স্বল্পভাষী দৃঢ়শরীর পুরুষ, বয়স অনুমান পঞ্চাশ, মাথার চুল ও গুম্ফ পাকিতে আরম্ভ করিয়াছে। তাঁহার চোখের স্বাভাবিক শান্ত দৃষ্টি আকস্মিক বিপৎপাতে উদ্বিগ্ন হইয়া উঠিয়াছে।

পুস্তপালের প্রাণে ভয় ঢুকিয়াছে এই অনর্থের জন্য তাহাকেই দায়ী করা হইবে। তিনি করুণ স্বরে আপত্তি করিতেছেন— ‘কিন্তু মহারাজ, এ যে— এ যে একেবারেই অসম্ভব! এই লোকটা— মানে ইনি— এও কি সম্ভব!’

প্রতিবাদে মকরবর্মা একটি অন্তর্গূঢ় গর্জন ছাড়িলেন। ক্রমাগত চিৎকার করিয়া তাঁহার গলা ভাঙ্গিয়া গিয়াছিল, শরীরও অবসন্ন হইয়া পড়িয়াছিল, তবু দক্ষিণহস্তের মুষ্টি পুস্তপালের নাসিকার অনতিদূরে স্থাপন করিয়া তিনি দন্ত খিঁচাইয়া বলিলেন— ‘সম্ভব! এই দ্যাখো সৌরাষ্ট্রের মুদ্রাঙ্কিত অঙ্গুরীয়। সম্ভব!’

পুস্তপাল মহাশয় মুষ্টির সান্নিধ্য হইতে নাসিকা দ্রুত অপসারিত করিয়া দেখিলেন তর্জনীতে সত্যই একটি মুদ্রাঙ্কিত অঙ্গুরী রহিয়াছে। তিনি বার কয়েক চক্ষু মিটমিটি করিয়া বলিলেন— ‘কিন্তু— কিন্তু— আপনি যদি সত্যিই—। আপনার সহচর ভৃত্য পরিজন কোথায়?’

মকরবর্মা বলিলেন— ‘বলছি না পরিজনদের পিছনে ফেলে আমি এগিয়ে আসছিলাম, তোমাদের জঙ্গলে একটা বাটপাড়—’

কুন্তলরাজ বাধা দিয়া বলিলেন— ‘দেখি অঙ্গুরীয়। সৌরাষ্ট্রের মুদ্রা আমি চিনতে পারব।’

মকরবর্মা অঙ্গুরীয় খুলিয়া রাজার হাতে দিলেন। রাজা লক্ষ্য করিলেন, তর্জনীর মূলে অঙ্গুরীয় পরিধানের চক্রচিহ্ন রহিয়াছে। এ ব্যক্তি যে অঙ্গুরীয় কুড়াইয়া পাইয়া বা চুরি করিয়া সদ্য অঙ্গুরীয় পরিধান করিয়াছে তাহা নয়। রাজা তখন মুদ্রাঙ্কিত অঙ্গুরীয় উত্তমরূপে পরীক্ষা করিয়া শেষে উহা প্রত্যার্পণ করিলেন, অত্যন্ত উদ্বিগ্নভাবে গুম্ফের প্রান্ত টানিতে টানিতে অস্ফুট কণ্ঠে বলিলেন— ‘হুঁ— মুদ্রা সৌরাষ্ট্রেরই বটে।’

মকরবর্মা অঙ্গুরীয় পুনশ্চ পরিধান করিতে করিতে চারিদিকে বিজয়দীপ্ত চক্ষু ঘুরাইতে লাগিলেন। পুস্তপাল মহাশয়ের মুখ কাঁদো কাঁদো হইয়া উঠিল। মহামন্ত্রী মৃদু গলা ঝাড়া দিলেন— ‘ইনি যদি সৌরাষ্ট্রের যুবরাজই হন, তাহলেও এখন তো আর—’

কুন্তলরাজ বলিলেন— ‘কোনো উপায় নেই। সে-ব্যক্তি যেই হোক, অগ্নি সাক্ষী করে আমার কন্যাকে বিবাহ করেছে—’

মহামন্ত্রী জুড়িয়া দিলেন— ‘তাছাড়া রাজকুমারীর প্রতিজ্ঞা ছিল, চণ্ডাল হোক, পামর হোক, যে-কেউ তাঁর প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে—’

সৌরাষ্ট্রকুমার বিস্ফোরকের ন্যায় ফাটিয়া পড়িলেন— ‘ভস্ম হোক প্রশ্ন আর তার উত্তর! কুন্তলরাজ, আমি আপনার কন্যাকে বিবাহ করিতে চাই না। আমি চাই— বিচার। যে চোর আমার আশ্ব আর বস্ত্রাদি চুরি করেছে সে আপনার জামাতাই হোক, আর—’

মহামন্ত্রী মোলায়েম সুরে অনুরোধ করিলেন— ‘ধীরে কুমার, সংযম হারাবেন না।’

মকরবর্মা আরও চড়া সুরে বলিলেন— ‘আমি বিচার চাই। কুন্তলরাজ্যের সীমানার মধ্যে এই চুরি হয়েছে; তস্করকে শূলে দেওয়া হোক। আর, তা যদি না হয়, সৌরাষ্ট্র দেশ নির্বীর্য নয় এ কথা স্মরণ রাখবেন।’

কুন্তলরাজ এই স্পর্ধিত উক্তি গলাধঃকরণ করিলেন; ক্রোধে তাঁহার মুখ রক্তবর্ণ হইলেও এই ব্যক্তি যে সত্যই রাজপুত্র সে প্রত্যয়ও দৃঢ় হইল। তিনি কণ্ঠ সংযত করিয়া বলিলেন— ‘এ বিষয়ে পরিপূর্ণ অনুসন্ধান না করে কিছুই হতে পারে না। আপনার অভিযোগ যদি সত্য হয়—’ রাজা মহামন্ত্রীর পানে ফিরিলেন।

চতুর মহামন্ত্রী রাজার প্রতি একটি গোপন কটাক্ষপাত করিয়া পরম আপ্যায়নের ভঙ্গিতে মকরবর্মা দিকে ফিরিলেন— ‘নিশ্চয় নিশ্চয়, সে কথা বলাই বাহুল্য। — কিন্তু শ্রীমন্‌, আপনি আজ রাত্রিটা রাজপ্রাসাদে বিশ্রাম করুন— রাত্রির মধ্যযাম অতীত হয়েছে—’

মহামন্ত্রী পুস্তপালের পেটে গোপনে কনুইয়ের এক গুঁতা মারিলেন। পুস্তপাল অমনি বলিয়া উঠিলেন— ‘হাঁ হাঁ, কুমার-ভট্টারক, আর কালক্ষয় করবেন না— সারাদিন অভুক্ত আছেন— পরিশ্রমও কম হয়নি— আসুন, কুমার, এই দিকে— এই যে বিশ্রান্তিগৃহ—’

ক্লান্ত ক্ষুৎপিপাসাতুর যুবরাজের পক্ষে প্রলোভন প্রবল হইলেও তিনি সহজে নরম হইবার পাত্র নয়। তিনি বলিলেন— ‘আমি বিচার চাই, ন্যায়দণ্ড চাই— নইলে—’

মহামন্ত্রী তাড়াতাড়ি বলিলেন— ‘অবশ্য— অবশ্য। সে তো আছেই। উপস্থিত আপনার বস্ত্রাদি ত্যাগ করা প্রয়োজন—’

পুস্তপাল সাগ্রহে বলিলেন— ‘ওদিকে ময়ূর মাংস পিণ্ডক্ষীর মাহিষ-দধি, মাধ্বী দ্রাক্ষাসব— সমস্তই প্রস্তুত রয়েছে। আসুন, আর বিলম্ব করবেন না—’

মহামন্ত্রী বলিলেন— ‘চলুন চলুন— অশুভস্য কালহরণম্‌—’

সৌরাষ্ট্রকুমার তথাপি বলিলেন— ‘কিন্তু যদি প্রতিবিধান না পাই—’

তিনি আর লোভ প্রতিরোধ করিতে পারিলেন না, মহামন্ত্রী ও পুস্তপালের সাদর আহ্বানের অনুবর্তী হইয়া বিশ্রান্তিগৃহের অভিমুখে চলিলেন। কুন্তলরাজ একাকী দাঁড়াইয়া উদ্বিগ্ন মুখে গুম্ফের প্রান্ত টানিতে লাগিলেন।

ইত্যবসরে কালিদাস ও হৈমশ্রী শয়নকক্ষে উপনীত হইয়াছেন। সখী কিঙ্করীরাও বিদায় লইয়াছে। আড়ি পাতিয়া বর-বধূকে বিরক্ত করিবার বিধি যদিচ সেকালেও ছিল, কিন্তু আজিকার দিনব্যাপী মাতামতির পর সকলেই ক্লান্ত হইয়া পড়িয়াছিল। তাছাড়া আজ বসন্তোৎসবের রাত্রে নিজস্ব মিলনোৎকণ্ঠাও কম ছিল না।

নির্জন সুবৃহৎ শয়নকক্ষটি ফুলে ফুলে আচ্ছন্ন; যূথী ও মল্লী মিলিয়া পালঙ্কের শুভ্র আস্তরণ রচনা করিয়াছে। পালঙ্কের চারিকোণে দীপদণ্ডের মাথায় সুরভি বর্তিকা জ্বলিতেছে।

প্রাচীরগাত্রে হরপার্বতী রামজানকী প্রভৃতি আদর্শ দম্পতির মিথুন চিত্র। প্রাচীরের একটি অংশ বস্ত্র দ্বারা আবৃত, বস্ত্রের উপর রাজহংসের চিত্র অঙ্কিত রহিয়াছে; হংসের চঞ্চুতে সনাল পদ্মকোরক।

রাজকুমারী কালিদাসকে লইয়া যবনিকার সম্মুখে দাঁড়াইলেন, কালিদাসের দিকে মৃদু হাসিয়া যবনিকা সরাইয়া দিলেন। দেখা গেল, প্রাচীরগাত্রে একটি কুলঙ্গি রহিয়াছে; কুলঙ্গির থাকে থাকে অগণিত পুঁথি থরে থরে সাজানো।

কালিদাসের চক্ষু মুগ্ধ আনন্দে ভরিয়া উঠিল। পুঁথির প্রতি এই গ্রামীণ যুবকের অহেতুক আকর্ষণ ছিল; তিনি একবার রাজকুমারীর দিকে, একবার পুঁথিগুলির দিকে হর্ষোৎফুল্ল দৃষ্টিপাত করিতে লাগিলেন। তারপর সন্তর্পণে একখানি পুঁথি হস্তে তুলিয়া পরম স্নেহ ও শ্রদ্ধাভরে নিরীক্ষণ করিতে লাগিলেন।

পুঁথির মলপট্টের লিখন কালিদাস পড়িতে পারিলেন কিনা তিনিই জানেন; মলপট্টের উপর বিশদ অক্ষরে লেখা ছিল—

মৃচ্ছকটিকম্‌

কালিদাস গদ্‌গদ কণ্ঠে বললেন— ‘কত পুঁথি! তুমি সব পড়েছ?’

হৈমশ্রী গ্রীবা ঈষৎ হেলাইয়া সায় দিলেন। কালিদাসের মুখ একটু ম্লান হইল। তিনি হাতের পুঁথিটির প্রতি বিষণ্ণভাবে চাহিয়া সেটি আবার যথাস্থানে রাখিয়া দিলেন, নিশ্বাস ফেলিয়া বলিলেন— ‘আমি একটিও পড়িনি। যদি পড়তে পারতাম, আজকের চাঁদ কিসের মত সুন্দর নিশ্চয় বলতে পারতাম।’

আবার কুমারী হৈমশ্রীর মুখ শুকাইল। তিনি স্খলিতস্বরে বলিলেন— ‘কিন্তু— না না, পরিহাস করবেন না আর্যপুত্র! আপনি সৌরাষ্ট্রের যুবরাজ—!’

কালিদাসের মুখে কৌতুকের হাসি ফুটিল— ‘কিন্তু আমি তো রাজপুত্তুর নই!’

হৈমশ্রীর মাথায় আকাশ ভাঙ্গিয়া পড়িল— ‘রাজপুত্র নয়! তবে— কে আপনি?’

কালিদাস বলিলেন— ‘আমি কালিদাস। — বনের মধ্যে কাঠ কাটছিলাম, এমন সময়—’

হৈমশ্রী বুদ্ধিভ্রষ্টের মত বলিলেন— ‘কাঠ কাটছিলেন! কাঠুরে! তুমি তবে সত্যিই বর্ণপরিচয়হীন মূর্খ?’

সরলভাবে কালিদাস ঘাড় নাড়িলেন— ‘হ্যাঁ, আমি লেখাপড়া জানি না। — যখনই কোনো সুন্দর জিনিস দেখি, ইচ্ছে করে তার বাখান করি। কিন্তু পারি না।’

রাজকন্যা আর শুনিলেন না; ঊর্ধ্বে মুখ তুলিয়া দুই চক্ষু সজোরে মুদিত করিয়া যেন একটা ভয়াবহ দুঃস্বপ্নকে মনশ্চক্ষুর সম্মুখ হইতে দূর করিবার চেষ্টা করিলেন। তারপর টলিতে টলিতে পালঙ্কের পাশে গিয়া নতজানু হইয়া শয্যার পুষ্পাস্তরণের মধ্যে মুখ গুঁজিলেন। প্রবল হৃদয়োচ্ছ্বাসে তাঁহার দেহের ঊর্ধ্বাঙ্গ মথিত হইয়া উঠিল।

কালিদাস কিছুক্ষণ অবাক হইয়া চাহিয়া রহিলেন, তারপর সসংকোচ পদক্ষেপে রাজকন্যার পাশে গিয়া দাঁড়াইলেন।

রাজকন্যা জানিতে পারিলেন কালিদাস পাশে আসিয়া দাঁড়াইয়াছেন, তিনি মুখ তুলিয়া তীব্রস্বরে প্রশ্ন করিলেন— ‘রাজপুত্র সেজে তুমি এখানে কি করে এলে?’

হৈমশ্রীর স্ফুরিতাধর মুখ দেখিয়া কালিদাস শঙ্কা ভুলিয়া গেলেন। ক্রোধেও মুখখানি কী সুন্দর— ঠিক যেন— ঠিক যেন—। তিনি ক্রোধ দেখিতে পাইলেন না, সৌন্দর্যই দেখিলেন। উপরন্তু ভারি মজার কাহিনীটা রাজকুমারীকে শুনাইতে হইবে। কালিদাসের মুখে হাসি ফুটিল, তিনি শয্যাপার্শে বসিয়া সহাস্যে বলিলেন— ‘সে ভারি মজার কথা। শুনবে? তবে বলি শোন—’

তিনি বলিতে আরম্ভ করিলেন। আখ্যানবস্তু আমাদের প্রত্যক্ষদৃষ্ট, সুতরাং শুনিবার প্রয়োজন নাই।

ওদিকে রাজপ্রাসাদের বিশ্রান্তিগৃহে যুবরাজ মকরবর্মা এক খট্বার উপর পৃষ্ঠে বহু উপাধান দিয়া অর্ধশয়ানভাবে অবস্থান করিতেছিলেন। সবেমাত্র বিপুল পান ভোজন শেষ করিয়াছেন, তাঁহার চক্ষু মুদিত হইয়া আসিতেছে, ঘুমাইয়া পড়িতে বেশি বিলম্ব নাই। একটি কিঙ্করী শিয়রে দাঁড়াইয়া তাঁহার মস্তকে বীজন করিতেছে।

পুস্তপাল মহাশয় স্ফটিকপাত্রে দ্রাক্ষাসব ভরিয়া মকরবর্মার সম্মুখে ধরিলেন। মকরবর্মা এক চুমুকে পাত্র নিঃশেষ করিয়া পত্রটি দূরে নিক্ষেপ করিলেন এবং জড়িতস্বরে বলিলেন— ‘বিচার! জামাতাই হোক আর বিমাতাই হোক— শূলে দেওয়া চাই। নচেৎ—’

তিনি ঘুমাইয়া পড়িলেন। তাঁহার নাসিকা হঠাৎ ঘর্ঘর শব্দ করিয়া উঠিল।

পুস্তপাল কিঙ্করীকে ইঙ্গিতে হস্ত সঞ্চালন করিয়া জানাইলেন— আরো জোরে পাখা চালাও। তারপর কতক নিশ্চিন্ত হইয়া নিঃশব্দে বিড়ালগতিতে দ্বারের পানে চলিলেন। দ্বারের ঠিক বাহিরেই কুন্তলরাজ ও মহামন্ত্রী উৎকণ্ঠিতভাবে দাঁড়াইয়া ছিলেন, পুস্তপালের দিকে ভ্রূ তুলিয়া যুগপৎ প্রশ্ন করিলেন। পুস্তপালও অঙ্গভঙ্গি দ্বারা নিঃশব্দে বুঝাইয়া দিলেন যে যুবরাজ নিদ্রিত।

তিনজনে একত্র হইলে মৃদুস্বরে কথাবার্তা আরম্ভ হইল। কুন্তলরাজ বলিলেন— ‘আজ রাত্রির মত নিশ্চিন্ত। কিন্তু— তারপর?’

মহামন্ত্রী ভ্রূবদ্ধ ললাটে বলিলেন— ‘উভয় সঙ্কট। এক, রাজজামাতাকে শূলে দিতে হয়— নচেৎ—’

কুন্তলরাজ নিশ্বাস ফেলিয়া বলিলেন— নচেৎ সৌরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ।’

তিনজন পরস্পর চাহিয়া ঘাড় নাড়িলেন। মহামন্ত্রী বলিলেন— ‘যদি যুদ্ধ হয়, সৌরাষ্ট্রের সঙ্গে শক্তি পরীক্ষায় আমাদের কোনো আশা নেই—’

রাজা বলিলেন— ‘অর্থাৎ রাজ্য ছারখার হবে।’

তিনজনে কিছুক্ষণ স্তব্ধ রহিলেন। সহসা ঘরের ভিতর হইতে যুবরাজ মকরবর্মার কণ্ঠস্বর আসিল। তিনি নিদ্রাবশে বিকৃতকণ্ঠে বলিতেছেন— ‘প্রতিশোধ— শূল—’

পুস্তপাল গলা বাড়াইয়া দেখিলেন; যুবরাজ ঘুমন্ত পাশ ফিরিতেছেন; পুস্তপাল কিঙ্করীকে জোরে পাখা চালাইবার ইশারা করিলেন। যুবরাজের গলার মধ্যে বাকি কথাগুলা অস্পষ্ট রহিয়া গেল— ‘চোরের দণ্ড— শূলদণ্ড!’

কুন্তলরাজ এতক্ষণে লৌহবলে নিজেকে সংযত রাখিয়াছিলেন, এইবার তিনি ভাঙ্গিয়া পড়িবার উপক্রম করিলেন, উদ্‌গত বাষ্পোচ্ছ্বাস কণ্ঠে রোধ করিয়া বলিলেন— ‘আমার কন্যা—’ তাঁহার দুই চক্ষু সহসা জলে ভরিয়া উঠিল।

মহামন্ত্রী ও পুস্তপাল অন্যদিকে চক্ষু ফিরাইয়া লইলেন। মহামন্ত্রীর মুখ দুরূহদ্রুত চিন্তায় ভ্রূকুটিকুটিল হইয়া উঠিল। একটা কিছু উপায় বাহির করিতেই হইবে— করিতেই হইবে—

সহসা তিনি রাজার দিকে ফিরিলেন, তাঁহার চোখের দৃষ্টি দেখিয়া রাজা ও পুস্তপাল সাগ্রহে আরো কাছাকাছি হইয়া দাঁড়াইলেন। মহামন্ত্রী বলিলেন— ‘রাজজামাতার প্রাণরক্ষার এক উপায় আছে—’ তিনি সচকিতে বিশ্রান্তিগৃহের দিকে তাকাইলেন, গলা আরো খাটো করিয়া বলিলেন— ‘আজ রাত্রেই তাঁকে চুপিচুপি রাজ্য থেকে—’ বাক্য অসমাপ্ত রাখিয়া তিনি এমনভাবে বাম হস্ত সঞ্চালন করিলেন যাহা হইতে বোঝা যায় যে তিনি রাজজামাতাকে বহু দূরে প্রেরণ করিতে চান। রাজা কিছুক্ষণ স্তব্ধ হইয়া চিন্তা করিলেন, শেষে অস্ফুটস্বরে বলিলেন— ‘কিন্তু— বিবাহের রাত্রেই আমার কন্যা—’

মহামন্ত্রী দৃঢ়স্বরে বলিলেন— ‘অন্তত রাজদুহিতা বিধবা তো হবেন না।’

উভয়ে কিছুক্ষণ পূর্ণদৃষ্টিতে পরস্পর চাহিয়া রহিলেন; তারপর রাজা ধীরে ধীরে ঘাড় নাড়িলেন।

ওদিকে শয়নমন্দিরে কালিদাস গল্প বলা শেষ করিতেছেন। রাজকুমারী শয্যাপাশে তেমনি নতজানু হইয়া আছেন; ক্ষোভে হতাশায় তাঁহার বক্ষে যে ধিকি ধিকি আগুন জ্বলিতেছে তাহা কালিদাস দেখিয়াও দেখিতে পাইতেছেন না। তিনি হাসিতে হাসিতে কাহিনী শেষ করিলেন— ‘তারপর এখানে সকলে আমাকে সৌরাষ্ট্রের যুবরাজ বলে ভুল করল— ভারি মজা হল— না?’

রাজকুমারী বিদ্যুদ্বেগে উঠিয়া দাঁড়াইলেন— ‘মজা! হা অদৃষ্ট, আমার ললাটে বিধি এই লিখেছিলেন! একটা কাঠুরের সঙ্গে— তাতেও ক্ষতি ছিল না,— কিন্তু তুমি মূর্খ— মূর্খ! পৃথিবীতে যা আমি সবচেয়ে ঘৃণা করি তুমি তাই—’

রাজকুমারী আবার শয্যায় মুখ লুকাইলেন।

হাস্যরত বালকের গণ্ডে অকস্মাৎ চপেটাঘাত করিলে তাহার মুখভাব যেরূপ হয় কালিদাসেরও সেইরূপ হইল। কোথায় কিভাবে তিনি কোন অপরাধ করিয়াছেন কিছুই ধারণা করিতে পারিলেন না। রাজকন্যার স্কন্ধ ও অংস ফুলিয়া ফুলিয়া উঠিতেছে; কালিদাস ব্যথিত স্বরে বলিলেন— ‘রাজকুমারি, তুমি আমার ওপর রাগ করলে? কিন্তু আমি তো কোনো দোষ করিনি। রাজকুমারি—’

তিনি সংকোচভরে কুমারীর স্কন্ধ স্পর্শ করিলেন। সেই স্পর্শে কুপিতা সর্পীর মত রাজকুমারী তড়িদ্বেগে উঠিয়া দাঁড়াইলেন— ‘ছুঁয়ো না! কোন্‌ স্পর্ধায় তুমি আমার অঙ্গ স্পর্শ কর? মূর্খ নিরক্ষর গ্রামীণ!—’

প্রত্যেকটি শব্দ নিষ্ঠুর কশাঘাতের ন্যায় কালিদাসের মুখে পড়িল। এই সময় দ্বারের কাছে শব্দ শুনিয়া রাজকন্যা জ্বলন্ত চক্ষু সেইদিকে ফিরাইয়া বলিয়া উঠিলেন— ‘ওঃ! পিতা!’

বিষণ্ণ গম্ভীর মুখে রাজা আসিতেছিলেন, কুমারী ছুটিয়া গিয়া তাঁহার পদপ্রান্তে পড়িলেন, জানু আলিঙ্গন করিয়া কাঁদিয়া উঠিলেন— ‘রাজাধিরাজ, আমাকে রক্ষা করুন, এই গ্রামীণের হাত থেকে আমাকে উদ্ধার করুন—’

রাজা বুঝিলেন হৈমশ্রী সত্য কথা জানিতে পারিয়াছেন, তিনি কন্যার মস্তকে হস্ত রাখিয়া কঠোর চক্ষে কালিদাসের পানে চাহিলেন— ‘এদিকে এস।’

কালিদাস কুন্ঠিত পদে কাছে আসিয়া দাঁড়াইলেন। রাজা বলিলেন— ‘তুমি শঠতা দ্বারা কুমারীর পাণিগ্রহণ করেছ?’

কালিদাস বিমূঢ়ভাবে বলিলেন— ‘শঠতা!’

রাজার কণ্ঠস্বরে ক্ষোভ মিশিল— ‘প্রিয়দর্শন বালক, তোমার এ দুর্বুদ্ধি কেন হল? তুমি চুরি করলে কেন?’

পাণ্ডুর মুখে কালিদাস বলিলেন— ‘চুরি! কিন্তু আমি তো চুরি করিনি—’

কুন্তলরাজ বলিলেন— ‘করেছ। শুধু তাই নয়, আমার রাজ্যের সর্বনাশ করতে বসেছ। কিন্তু সে তুমি বুঝবে না।’ কন্যার দিকে হেঁট হইয়া গাঢ়স্বরে বলিলেন— ‘কন্যা, অধীর হয়ো না। তুমি রাজদুহিতা, বিদুষী; ধৈর্য হারিও না।’ কন্যাকে ছাড়িয়া রাজা কালিদাসকে সংক্ষিপ্ত আদেশ করিলেন— ‘এস আমার সঙ্গে।’

রাজা ফিরিয়া চলিলেন। কালিদাস তন্দ্রাচ্ছন্নের মত তাঁহার অনুবর্তী হইলেন। দ্বার পর্যন্ত গিয়া কালিদাস একবার ফিরিয়া চাহিলেন; কুমারী হৈমশ্রী তেমনি নতজানু হইয়া বসিয়া আছেন, তাঁহার ক্ষোভ-বিধ্বস্ত মুখখানি বুকের উপর নামিয়া পড়িয়াছে।

রাত্রি শেষ হইয়া আসিতেছে, আকাশে পূর্ণচন্দ্র নীচাভিমুখী। নগর তোরণের দীপগুলি কতক নিভিয়া গিয়াছে, কতক নিব-নিব। নগরীর শব্দগুঞ্জন শান্ত হইয়াছে।

তিনটি অশ্ব পাশাপাশি তোরণ সম্মুখে দাঁড়াইয়া। দুই পার্শ্বের দুটি অশ্বের পৃষ্ঠে দুইজন রক্ষী, মধ্যে কালিদাস। প্রধান রক্ষী মস্তক সঞ্চালন দ্বারা ইঙ্গিত করিল; তিনটি অশ্ব একসঙ্গে চলিতে আরম্ভ করিল। তাহাদের গতি নগর হইতে বাহিরের দিকে। —

নিবিড় বনের উপান্ত। অশোকস্তম্ভের ন্যায় একটি স্তম্ভ নির্জনে দাঁড়াইয়া কুন্তলরাজ্যের সীমানা নির্দেশ করিতেছে। অস্তমান চন্দ্রের দূরপ্রসারী ছায়া ভূমির উপর সুকৃষ্ণ সীমারেখা টানিয়া দিয়াছে।

তিনটি অশ্ব স্তম্ভের ছায়ারেখার কিনারায় আসিয়া দাঁড়াইল। প্রধান রক্ষী নিঃশব্দে কালিদাসকে অশ্ব হইতে নামিবার ইঙ্গিত করিল; কালিদাস নামিলেন। প্রধান রক্ষী তখন সম্মুখের বনানীর দিকে বাহু প্রসারিত করিয়া গম্ভীর কণ্ঠে বলিল— ‘যাও, আর কখনো কুন্তলরাজ্যে পদার্পণ কোরো না। স্মরণ রেখো এ রাজ্যে প্রবেশ করলেই তোমার শূলদণ্ড—’

কালিদাস বাক্‌ নিষ্পত্তি করিলেন না, স্খলিত পদে বনের দিকে চলিলেন। যতক্ষণ তাঁহাকে দেখা গেল রক্ষীরা স্থিরভাবে অশ্বপৃষ্ঠে বসিয়া রহিল। তারপর ঘোড়ার মুখ ফিরাইয়া, শূন্য-পৃষ্ঠ অশ্বটিকে মধ্যে লইয়া যো-পথে আসিয়াছিল সেই পথে ফিরিয়া চলিল।

প্রভাত হইয়াছে। বনের পাতায় পাতায় সোনালী সূর্যকিরণ লাগিয়াছে, মাকড়শার জালে শিশিরবিন্দু এখনো শুকায় নাই; পাখির কাকলি ও বানরের কিচিমিচিতে বনস্থলী পূর্ণ।

একটি বৃহৎ বটবৃক্ষ। তাহার স্থূল মূলগুলি স্থানে স্থানে মাটির গোপনতা ত্যাগ করিয়া বাহির হইয়া আসিয়াছে; এইরূপ একটি মূলের উপর মাথা রাখিয়া কালিদাস ঘুমাইতেছেন। তাঁহার শয়নের ভঙ্গি দেখিয়া মনে হয়, রাত্রির অন্ধকারে যেখানে হোঁচট খাইয়া পড়িয়াছিলেন সেখানেই নিদ্রাভিভূত হইয়াছেন।

একটি বানরশিশু এই সময় এদিক ওদিক ঘুরিতে ঘুরিতে কালিদাসের কোল ঘেঁষিয়া বসিল এবং একটি বৃক্ষচ্যুত ফল তুলিয়া লইয়া পরম যত্নে নিরীক্ষণ করিতে লাগিল।

ঘুমন্ত কালিদাসের অঙ্গে উষ্ণ স্পর্শ লাগিতেই তিনি একটি হাত দিয়া বানরশিশুটিকে জড়াইয়া লইলেন। বানরশিশু এই আলিঙ্গনের জন্য প্রস্তুত ছিল না, হঠাৎ ভয় পাইয়া কালিদাসের হাতে এক কামড় দিয়া দ্রুত পলায়ন করিল। কালিদাসের ঘুম ভাঙ্গিয়া গেল।

এক হাতে ভর দিয়া কালিদাস ক্লান্তভাবে উঠিয়া বসিলেন। বেশবাস ছিন্ন, অঙ্গ ধূলিমলিন; চোখের কোলে ও গণ্ডে অশ্রুর চিহ্ন শুকাইয়া আছে। তিনি চক্ষু মার্জনা করিতে করিতে উঠিয়া দাঁড়াইলেন, তারপর একটি দীর্ঘ নিশ্বাস মোচন করিয়া শ্লথচরণে চলিতে আরম্ভ করিলেন।

বন শেষ হইয়া শুষ্ক মরুভূমি। দ্বিপ্রহরে কালিদাস এই মরুভূমির ভিতর দিয়া চলিয়াছেন। বালুকণা উড়িয়া আকাশ সমাচ্ছন্ন করিয়াছে; এই তপ্ত বালুঝটিকা উপেক্ষা করিয়া দিগ্‌ভ্রান্তের মত কালিদাস যাইতেছেন, তাঁহার চোখে মুখে এক দুর্লভ দুরাকাঙ্ক্ষা জ্বলিতেছে।

বালু-কুজ্ঝটিকার ভিতর দিয়া একটি ভগ্ন দেবায়তনের উচ্চ বহিঃপ্রাচীর দেখা গেল। কালিদাস সেই দিকে অগ্রসর হইয়া চলিলেন; প্রাচীরের নিকটবর্তী হইয়া তিনি একটি প্রস্তরখণ্ডে পা লাগিয়া পড়িয়া গেলেন।

প্রাচীর ধরিয়া কোনো ক্রমে উঠিয়া দাঁড়াইয়া তিনি ক্ষণকাল ক্লান্তিভারে চক্ষু মুদিত করিয়া রহিলেন। তারপর চোখ খুলিয়া দেখিলেন তিনি প্রাচীরের যে-স্থানে বাহুর ভর দিয়া দাঁড়াইয়া আছেন উহা একটি বিরাট মূর্তির ঊরুস্থল। কালিদাস ঊর্ধ্বে চাহিলেন; প্রাচীরের খোদিত বিশাল শঙ্কর-মূর্তি যেন এই বহ্নি শ্মশানে তপস্যারত। কালিদাস নতজানু হইয়া মূর্তির পদমূলে মাথা রাখিলেন, তারপর গলদশ্রু চক্ষু দেবতার মুখের পানে তুলিয়া ব্যাকুল প্রার্থনা করিলেন— ‘দেবতা, বিদ্যা দাও।’—

সূর্যাস্ত হইতেছে। দিগন্তহীন প্রান্তরে একাকী দাঁড়াইয়া কালিদাস যুক্তকরে বলিতেছেন— ‘সূর্যদেব, তুমি জগতের অন্ধকার দূর কর, আমার মনের অন্ধকার দূর করে দাও। বিদ্যা দাও।’

উজ্জয়িনীর মহাকাল মন্দির। কৃষ্ণপ্রস্তরনির্মিত মন্দির আকাশে চূড়া তুলিয়াছে; চূড়ার স্বর্ণত্রিশূল দিনান্তের অস্তরাগ অঙ্গে মাখিয়া জ্বলিতেছে। সন্ধ্যারতির শঙ্খঘণ্টা ঘোর রবে বাজিতেছে। মন্দিরের বহিরঙ্গনে লোকারণ্য, স্ত্রী পুরুষ সকলে জোড়হস্তে তদ্‌গত-মুখে দাঁড়াইয়া আছে। আরতি শেষ হইলে সকলে অঙ্গনে সাষ্টাঙ্গে প্রণত হইল। অঙ্গনের এক কোণে এক বৃদ্ধ প্রণাম শেষ করিয়া উঠিয়া দাঁড়াইল, যুক্তকরে মন্দিরের পানে চাহিয়া প্রার্থনা করিল— ‘মহাকাল, আয়ু দাও।’

অনতিদূরে একটি নারী নতজানু অবস্থায় মন্দির উদ্দেশ করিয়া বলিল— ‘মহাকাল, পুত্র দাও।’

বর্মশিরস্ত্রাণধারী এক যোদ্ধা উঠিয়া দাঁড়াইয়া বলিল— ‘মহাকাল, বিজয় দাও।’

বিনত ভুবনবিজয়ীনয়না একটি নবযুবতী লজ্জাজড়িত কণ্ঠে বলিল— ‘মহাকাল, মনোমত পতি দাও।’

দীনবেশী শীর্ণমুখ কালিদাস অবরুদ্ধ কণ্ঠে বলিলেন— ‘মহাকাল, বিদ্যা দাও।’

পাতা-ঝরা একটি অরণ্য। নিষ্পত্র বৃক্ষ-শাখাগুলি আকাশে জাল রচনা করিয়াছে। নির্বিঘ্ন আলোক বনতলের কুন্ঠিত লজ্জা হরণ করিয়া ভূ-লুণ্ঠিত শুষ্ক পল্লবের মধ্যে সকৌতুক ক্রীড়া করিতেছে।

একটি আট-নয় বছরের গৌরাঙ্গী বালিকা এই বনভূমির উপর দিয়া নাচিতে নাচিতে গান গাহিয়া চলিয়াছে। তাহার পরিধানে শুভ্র বস্ত্র ও উত্তরীয়, কণ্ঠে কুন্তলে বাহুতে শ্বেত পুষ্পের আভরণ। বালিকা থাকিয়া থাকিয়া বঙ্কিম গ্রীবাভঙ্গি করিয়া পিছনে তাকাইতেছে, আবার গাহিতে গাহিতে আগে চলিয়াছে—

‘নীল সরসীজলে সিত কমলদলে

আমি নাচিয়া ফিরি আমি গাহিয়া ফিরি।’

লাস্যচপল চরণে বালিকা দৃষ্টি বহির্ভূত হইয়া গেল; তাহার গানের ধ্বনিও ক্রমশ ক্ষীণ হইয়া আসিতে লাগিল।

কালিদাস মোহগ্রস্তের ন্যায় বালিকার সঙ্গীতধ্বনি অনুসরণ করিয়া আসিতেছেন। তাঁহার মুখ বিশীর্ণ, চক্ষু কোটর-প্রবিষ্ট। এক দুরন্ত উৎকণ্ঠা তাঁহাকে ওই অশরীরী সঙ্গীতের পিছনে টানিয়া লইয়া চলিয়াছে।

বনের অন্য অংশে বালিকা গাহিতে গাহিতে যাইতেছে—

‘হিম-তুষার-গলা আমি নির্ঝরিণী

মোর নূপুর বাজে রুম্‌ রিন্‌কি ঝিনি

আমি নাচিয়া ফিরি আমি গাহিয়া ফিরি।’

উপলবঙ্কিম গতি একটি সঙ্কীর্ণ জলধারা লঙ্ঘন করিয়া বালিকা নাচিতে নাচিতে চলিয়া গেল।

গানের রেশ মিলাইয়া যাইবার আগেই কালিদাস প্রবেশ করিলেন, ব্যগ্রচক্ষে চারিদিকে চাহিতে চাহিতে তিনি অগ্রসর হইতেছেন। কোথায় গেল সেই সঙ্গীতময়ী! জলধারার তীরে দাঁড়াইয়া তিনি ক্ষণেক উৎকর্ণ হইয়া শুনিলেন, তারপর স্রোত উত্তীর্ণ হইয়া আবার চলিলেন।

দূরে একটি শ্বেতকমলপূর্ণ সরোবর। বালিকা সেইদিকে চলিয়াছে, তাহার কণ্ঠ-নিঃসৃত সঙ্গীত কাকলি চারিদিকে হিল্লোল তুলিয়াছে—

‘যেথা মরাল চাহে— ফিরি ফিরি

যেথা কপোত গাহে— ধীরি ধীরি

তীরে বন নিরজনে

আমি নাচিয়া ফিরি। আমি গাহিয়া ফিরি!’

বালিকা দূরে চলিয়া গেল, কালিদাস তাহাকে দেখিতে পাইয়া উন্মাদের মত তাহার পশ্চাতে চলিয়াছেন। বালিকা সরোবরের ঘাটে দাঁড়াইয়া একবার পিছু ফিরিয়া চাহিল, তারপর মৃদু হাসিয়া সোপান অবতরণ করিতে লাগিল।

কালিদাস যখন ঘাটে পৌঁছিলেন তখন বালিকা কোথায় অদৃশ্য হইয়া গিয়াছে। ঘাটের সম্মুখে জলের উপর একদল কমল বায়ুভরে হেলিতেছে দুলিতেছে, যেন বালিকা এইমাত্র জলে ডুব দিয়া ওইখানে অন্তর্হিত হইয়াছে। ঘাটের নিম্নতন সোপানে নামিয়া কালিদাস পাগলের মত জলের পানে চাহিলেন; বাষ্পোচ্ছ্বাসে তাঁহার কণ্ঠ রুদ্ধ হইয়া গেল। চঞ্চল পদ্মগুলির দিকে একদৃষ্টে তাকাইয়া তিনি ভগ্নস্বরে বলিলেন— ‘কোথায় গেলে? দেবি, তুমি কোথায় গেলে?— শুনেছি তুমি পদ্মবনে থাক। আমাকে দয়া কর— বিদ্যা দাও— নইলে—’

তিনি মূর্ছিত হইয়া ঘাটের উপর পড়িয়া গেলেন।

মূর্ছিত অবস্থায় তিনি অনুভব করিলেন, সরসীর স্বচ্ছ জলতলে তিনি শুইয়া আছেন; দিক-আলো-করা এক পূর্ণযৌবনবতী দেবীমূর্তি শুচিস্মিত হাস্যে তাঁহার শিয়রে আসিয়া বসিলেন, তাঁহার মস্তকে হস্ত রাখিয়া স্নিগ্ধকণ্ঠে বলিলেন— ‘কালিদাস!’

কালিদাসের ভাবাতুর নেত্র নিমীলিত, তিনি যুক্তকরে গদ্‌গদ কণ্ঠে বলিলেন— ‘মা!’

দেবী বলিলেন— ‘তুমি আমার বরপুত্র, তোমার কাব্য জগতে অমর হয়ে থাকবে। বারাণসী যাও, সেখানে আচার্য পাবে। ওঠ বৎস।’

হর্ষোৎফুল্ল মুখে কালিদাস উঠিবার চেষ্টা করিলেন, তাঁহার মুখ দিয়া কেবল বাহির হইল— ‘মা মা মা—!’

দেবী অবনত হইয়া কালিদাসের শিরশ্চুম্বন করিলেন, তারপর অপূর্ব জ্যোতিরুৎসবের মধ্যে দেবীমূর্তি মিলাইয়া গেল।

ন্যূনাধিক পাঁচ বৎসর অতীত হইয়াছে।

কুন্তল রাজপুরীর অন্তঃপুরে রাজকুমারী হৈমশ্রী নিজ শয়নকক্ষে ভূমির উপর অজিনাসনে বসিয়া আছেন। তাঁহার সম্মুখে কাষ্ঠাসনের উপর একটি উন্মুক্ত পুঁথি, রাজকুমারী তন্ময় হইয়া পুঁথি পড়িতেছেন।

পাঁচ বৎসরে হৈমশ্রীর দেহলাবণ্যের অতি অল্পই পরিবর্তন হইয়াছে। তাঁহার দেহে সূক্ষ্ম শুভ্র কার্পাসবস্ত্র, কেশ একটিমাত্র বেণীতে আবদ্ধ, ললাটে আয়তির চিহ্ন কেবল একটি কুমকুমের টিপ— অলঙ্কার নাই বলিলেও চলে। চুলের ঈষৎ রুক্ষতায়, চোখের কোলে ছায়ার নিবিড়তায়, দেহের অল্প কৃশতায় তাঁহার রূপ বাহুল্য বর্জন করিয়া নিষ্কলুষ হইয়া উঠিয়াছে— বর্ষার অন্তে স্বচ্ছসলিলা শরতের স্রোতস্বিনীর মত।

পুঁথি পড়িতে পড়িতে তাঁহার মনে প্রবল ভাবাবেশ উপস্থিত হইয়াছিল, তিনি কম্পিত কণ্ঠে কাব্যের শেষ পংক্তি আবৃত্তি করিলেন—

‘মাভূদ্‌ এবং ক্ষণমপি চতে বিদ্যুতা বিপ্রয়োগঃ ॥’

গবাক্ষপথে বাষ্পাচ্ছন্ন দৃষ্টি প্রেরণ করিয়া তিনি ধীরে ধীরে পুঁথি বন্ধ করিলেন। মলপট্টের উপর বড় বড় অক্ষরে লেখা রহিয়াছে—

মেঘদূতম্‌

শ্রীকালিদাস বিরচিতম্‌

পুঁথির উপর হাত রাখিয়া রাজকুমারী উন্মনা হইয়া রহিলেন। ক্রমে তাঁহার চক্ষু পুঁথির উপর ফিরিয়া আসিল। কালিদাসের নামের উপর ললাট স্পর্শ করিয়া তিনি প্রণাম করিলেন— ‘ধন্য কবি।’

নামের দিকে চাহিয়া চাহিয়া তাঁহার মুখের ভাব আবার উন্মনা হইল, তিনি অর্ধস্ফুট স্বরে বলিলেন— ‘কালিদাস! কে তিনি?—’ তাঁহার অধর কাঁপিয়া উঠিল, তিনি বিষণ্ণভাবে মাথা নাড়িলেন— ‘না না...সে তো মূর্খ ছিল—’

অঞ্চলে চোখ মুছিয়া দ্বারের দিকে মুখ ফিরাইতেই চোখে পড়িল, দ্বারের চৌকাঠ ধরিয়া বিষাদ গম্ভীর মুখে রাজা দাঁড়াইয়া আছেন। তাড়াতাড়ি মুখে হাসি আনিবার চেষ্টা করিয়া হৈমশ্রী বলিয়া উঠিলেন— ‘পিতা!— আসুন আর্য।’

রাজা কক্ষে প্রবেশ করিলেন। হৈমশ্রী আসন ছাড়িয়া উঠিবার উপক্রম করিতেই রাজা হাত তুলিয়া তাঁহাকে নিবৃত্ত করিলেন— ‘বোসো বোসো বৎসে।’

রাজা আসিয়া দ্বিতীয় একটি আসনে বসিলেন, স্নিগ্ধস্বরে প্রশ্ন করিলেন— ‘কি পড়ছিলে?’

হৈমশ্রী ঈষৎ লজ্জিতভাবে পুঁথিটি নড়াচাড়া করিতে করিতে বলিলেন— ‘কিছু নয় পিতা— একটি নতুন কাব্য— মেঘদূত।’

রাজা প্রীতভাবে ঘাড় নাড়িলেন। সেকালে পিতাপুত্রীতে কাব্য আলোচনা, এমন কি আদিরস ঘটিত কাব্যের আলোচনা দূষণীয় বিবেচিত হইত না; আদিরসের প্রতি তাঁহাদের সম্ভ্রম ছিল।

কুন্তলরাজ বলিলেন— ‘মেঘদূত— বিরহী যক্ষ ও বিরহিণী যক্ষপত্নী! আমি পড়েছি— সুন্দর কাব্য।’

হৈমশ্রী পিতার দিকে উদ্দীপ্ত চক্ষু তুলিলেন। যে কাব্য পড়িয়া তাঁহার মন আষাঢ়ের মেঘের মতই দ্রবীভূত হইয়া গিয়াছে তাহার এইটুকু প্রশংসা তাঁহার মনঃপূত হইল না; তিনি বলিলেন— ‘সুন্দর কাব্য কী বলছেন পিতা— অপূর্ব। ভাষায় এর প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। আমি বারবার পড়েছি, তবু আবার পড়তে ইচ্ছে করে।’

কুন্তলরাজ কন্যার উৎসাহ দেখিয়া সানন্দে ঘাড় নাড়িলেন, বলিলেন— ‘সত্যই অপূর্ব। কাব্য জগতে এক অপূর্ব সৃষ্টি। — তুমি যে কাব্যশাস্ত্রের মধ্যে নিজেকে ডুবিয়ে দিয়েছ এতে আমার মনে একটু শান্তি হচ্ছে।’

রাজা কন্যার মুখের পানে চাহিলেন; হৈমশ্রীর চোখের দীপ্তি নিভিয়া গেল, তিনি মুখ নত করিলেন। রাজা একটি নিশ্বাস মোচন করিয়া নিজ মনেই বলিতে লাগিলেন— ‘পাঁচ বছর হয়ে গেল...সেই রাত্রে চুপি চুপি তাকে রাজ্য থেকে নির্বাসিত করেছিলাম, তারপর আর কিছুই জানি না। গোপনে গোপনে কত খোঁজ করিয়েছি—’

হৈমশ্রী মুখ তুলিলেন কিন্তু পিতার দিকে না চাহিয়া ধীরস্বরে বলিলেন— ‘প্রয়োজন কি পিতা! আমি তো বেশ আছি, ভালই আছি—’

রাজা বিষণ্ণভাবে মাথা নাড়িলেন— ‘না বৎসে। ভালই যদি থাকবে তবে মাঝে মাঝে তোমার চোখে জল দেখি কেন। তুমি এখনো তাকে ভুলতে পারনি। এই তো এখনি—’

হৈমশ্রী ব্যাকুল হইয়া বলিলেন— ‘ও কিছু নয় পিতা। কাব্য পড়তে পড়তে—’

কুন্তলরাজ দীর্ঘশ্বাস ফেলিলেন— ‘মা, আমার কাছে লুকোবার চেষ্টা কোরো না, তুমি এখনো তাকে ভুলতে পারনি। আমিও পারিনি। — কি জানি কী ছিল তার সেই সরল সুকুমার মুখে! যদি কোথাও তাকে পাই, ফিরিয়ে নিয়ে আসি।’

হৈমশ্রী সহসা পুঁথির উপর মাথা রাখিয়া ফুঁপাইয়া উঠিলেন, রুদ্ধস্বরে বলিলেন— ‘না না পিতা, সে মূর্খ— নিরীক্ষর—’

রাজা বুঝিলেন কন্যার হৃদয়ে প্রেম ও অভিমানে কঠিন দ্বন্দ্ব চলিতেছে। তিনি শান্তস্বরে বলিলেন— ‘সে তোমার স্বামী।’

শিপ্রা নদীর মাঝখান দিয়া একটি মধ্যমাকৃতি মহাজনী নৌকা পালের ভরে তরতর করিয়া চলিয়াছে। পাশে শিপ্রার তীরে মালব রাজ্যের রাজধানী উজ্জয়িনী মহানগরী তাহার অসংখ্য ঘাট মন্দির সৌধ লইয়া দ্বিপ্রহরের প্রদীপ্ত আলোকে জ্বল্‌জ্বল্‌ করিয়া জ্বলিতেছে। নগরীর সীমান্তে শষ্প-হরিৎ প্রান্তর; মাঝে মাঝে দুই একটি কুটির, জলের কিনারায় সৈকতলীন হংসমিথুন—

নৌকার পিছনে বসিয়া মাঝি গান ধরিয়াছে। নৌকার ছাদে পালের ছায়ায় বসিয়া এক পুরুষ একটি তন্ত্রীযুক্ত স্বরযন্ত্র অলসভাবে বাজাইয়া মাঝির গানের সঙ্গে সুর মিলাইতেছেন। পরিধানে অতি সাধারণ শুভ্র বস্ত্র ও উত্তরীয়, ললাটে শ্বেত চন্দনের তিলক। পাঁচ বছরে তাঁহার বহিরাকৃতির কোনো পরিবর্তন হয় নাই, তেমনি সরল হাসিটি মুখে লাগিয়া আছে; কিন্তু তবু মনে হয় এ ব্যক্তি সে ব্যক্তি নয়, অন্তর্লোকে বিপুল পরিবর্তন ঘটিয়া গিয়াছে।

কালিদাস যে যন্ত্রটি বাজাইতেছেন তাহা বোধ করি নাবিকদের কাহারো স্বরচিত সম্পত্তি, একটি বক্রাকৃতি তুম্বের শূন্যগর্ভ খোলসের উপর তিনটি তার চড়ানো। কালিদাস তাহাই বাজাইতে বাজাইতে মাঝির গানের প্রাকৃত ভাষা লক্ষ্য করিতেছেন—

আমার মন-তরণী ভাসল দরিয়ায়—

মরি হয় মারি হায় রে!

দখিন বায়ে রূপ লহরে চলছে তরী পালের ভরে

কিনার ডাকে কলস্বরে আয় রে তরী আয়—

মরি হায় মারি হায় রে!

কোন্‌ ঘাটেতে পথিক-বধূ আছে রে পথ চেয়

সেই কিনারে বৈঠা তুলে ভিড়াস্‌ তরী, নেয়ে,

যেথা কমল চোখে সজল হাসি অঝোর ঝরি যায়—

মরি হায় মারি হয় রে!

গান শেষ হইলে কালিদাস যন্ত্র নামাইয়া রাখিয়া চক্ষু তুলিলেন, অমনি উজ্জয়িনীর রবি-করজ্জ্বল দৃশ্যটি তাঁহার দৃষ্টি টানিয়া লইল, তিনি বিস্ময়োৎফুল্ল নয়নে চাহিয়া রহিলেন। তারপর যেন আত্মগতভাবে বলিলেন— ‘কী চমৎকার নগরী! যেন আমার কল্পলোকের অলকাপুরী। — মাঝি ভাই, এ কোন্‌ রাজ্য?’

মাঝি একবার তীরের দিকে মুখ ফিরাইল, বলিল— ‘ঠাকুর, এটা অবন্তী রাজ্য। আমরা এখন উজ্জয়িনীর পাশ দিয়ে যাচ্ছি।’

কালিদাস তন্দ্রাচ্ছন্ন চোখে চাহিয়া রহিলেন— ‘অবন্তী! উজ্জয়িনী! এতদিন শুধু কল্পনাই করেছি। — এর পর কোন রাজ্য?’

মাঝি বলিল— ‘এর পর কুন্তল রাজ্য।’

কালিদাসের মুগ্ধ তন্দ্রা ছুটিয়া গেল, তিনি সজাগ হইয়া উঠিলেন— ‘কুন্তল রাজ্য!’

মাঝি বলিল— ‘হ্যাঁ। কিন্তু কুন্তল রাজ্য অবন্তীর কাছে লাগে না। এখানকার রাজা বিক্রমাদিত্য একজন মহাবীর, অসভ্য হূণদের উনিই যুদ্ধে হারিয়েছিলেন। ভারি তেজী রাজা। শুনেছি পণ্ডিতদের খুব আদর করেন।’

মাঝি যতক্ষণ হূণ-হরিণ-কেশরী বিক্রমাদিত্যের পরিচয় দিতেছিল, কালিদাস ততক্ষণে উঠিয়া দাঁড়াইয়াছিলেন; তাঁহার মুখে দৃঢ় সংকল্প স্পষ্ট হইয়া উঠিয়াছিল। মাঝি থামিতেই তিনি বলিয়া উঠিলেন— ‘ভাই মাঝি, আমাকে তুমি এখানেই নামিয়ে দাও।’

মাঝি ঈষৎ বিস্ময়ে চোখ তুলিল— ‘এখানেই—?’

কালিদাসের দৃষ্টি শিপ্রার তীরভূমি চুম্বন করিয়া চলিয়াছিল; তিনি মাঝারি পানে না ফিরিয়াই বেদনা-বিদ্ধ কণ্ঠে বলিলেন— ‘হ্যাঁ, এখানেই। আমার কাছে সব রাজ্যই তো সমান। এই উজ্জয়িনীর উপকণ্ঠে নদীর তীরে কুটির বেঁধে আমি থাকবো—’

মাঝি একটু চুপ করিয়া রহিল, তারপর বলিল— ‘তা বেশ, আপনার যা ইচ্ছে ঠাকুর। — ওরে ওরে, পাল নামা।’

মাঝি হালের মুখ ফিরাইয়া ধরিল। অন্য যেসব নাবিকেরা নীচে ছিল তাহারা ছাদে উঠিয়া আসিল।

কয়েকদিন কাটিয়াছে।

উজ্জয়িনীর সীমান্তে শিপ্রার উপকূল। তীরভূমি ঢালু হইয়া জলে মিশিয়াছে, তীরে দূরে দূরে উপবনবেষ্টিত কুটির। যাহারা ফুলের চাষ করে নগরের বাহিরেই তাঁহাদের সুবিধা, তাই মালাকরেরা এইদিকেই পুষ্পোদ্যান রচনা করিয়াছে।

জলের কিনারা দিয়া যে হাঁটা-পথ গিয়াছে সেই পথে মালিনী নগরের দিকে চলিয়াছিল। তাহার বিশেষ তাড়া ছিল না, সূর্যাস্তের এখনো বিলম্ব আছে। বাঁ হাতের মণিবন্ধ হইতে ফুলের সাজি ঝুলিতেছে, ডান হাতে সূচী ও সূত্রের সাহায্যে মালা গড়িয়া উঠিতেছে। মালিনী অস্ফুট গুঞ্জনে গান গাহিতে গাহিতে চলিয়াছিল।

মালিনীর বয়স পনেরো-ষোল, শ্যামকান্তি পল্লবিতা দেহলতা; মনে ও দেহে দুই-একটি কুঁড়ি ধরিতে আরম্ভ করিয়াছে। মালব দেশের মালিনীদের যৌবন যেমন বিলম্বে আসে তেমনি বিলম্বে যায়। এই তরুণী মালিনীটি দেখিতে ছোটোখাটো চঞ্চলা হাস্যময়ী, চুলগুলি চিকণ করিয়া বাঁধা। পরিধানে বাসন্তী রঙ্‌ শাড়ি, ঊর্ধ্বাঙ্গে বাসন্তী রঙ আঙরাখা সর্বাঙ্গে আঁট হইয়া বসিয়াছে।

মালিনী চলিতে চলিতে মালা গাঁথিতেছে, তাহার চক্ষু তাহাতেই নিবদ্ধ। যে গানটি ঈষন্মুক্ত অধর হইতে নিঃসৃত হইতেছে তাহা বেশি দূর যাইতেছে না, ফুলের চারিপাশে ভ্রমরের মত গুঞ্জন করিয়া ফিরিতেছে। তাহার গতিভঙ্গিতেও একটু নৃত্যের স্পর্শ আছে।

মালা গাঁথা শেষ করিয়া সে এক পাক ঘুরিয়া চোখ তুলিয়া সবিস্ময়ে দাঁড়াইয়া পড়িল! এ কি, হঠাৎ একটা নূতন কুটির কোথা হইতে আসিল? সাত দিন আগেও কিছু ছিল না!

নদীতীর হইতে পঞ্চাশ হাত ব্যবধানে উঁচু জমির উপর সত্যই একটি নূতন কুটির নির্মিত হইয়াছে। ঘন সন্নিবিষ্ট পাহাড়ী বেত্রের উপর মাটির প্রলেপ দিয়া দেয়াল, উপরে কুশের ছাউনি। সম্মুখের খানিকটা স্থানে ছিটে-বেড়ার বেষ্টনী; উঠানের মধ্যস্থলে একটি ক্ষুদ্র বেদিকা।

কুটির সম্পূর্ণ হইয়াছে বটে কিন্তু তাহার প্রসাধন ও অঙ্গশোভা এখনো বাকি আছে। স্বয়ং গৃহস্বামী অধুনা এই কার্যে ব্যাপৃত। এক হাতে পিটুলি-পূর্ণ ভাঁড় ও অন্য হাতে দাঁতনের মত একটি তুলি লইয়া তিনি অভিনিবেশ সহকারে গৃহদ্বারের উপর শঙ্খ চক্র প্রভৃতি চিত্রলেখায় প্রবৃত্ত।

দূর হইতে দেখিয়া মালিনী কৌতূহল বশে সেই দিকে অগ্রসর হইল। পা টিপিয়া টিপিয়া কালিদাসের পিছনে গিয়া দাঁড়াইল। কালিদাস চিত্র রচনায় এতই নিমগ্ন যে কিছুই জানিতে পারিলেন না।

চিত্রবিদ্যায় কবির পটুত্ব কিছু কম। দ্বারের একটি কপাটে তিনি যে-শঙ্খটি আঁকিয়াছেন তাহা যে শঙ্খই এমন কথা জোর করিয়া বলা শক্ত, কুণ্ডলিত বিষধর সর্পও হইতে পারে; এইজন্য কবি তাহার নিম্নে স্পষ্টাক্ষরে চিত্রপরিচয় লিখিয়া দিয়াছেন— ‘শঙ্খ’। বর্তমানে যে-চিত্রটি আঁকিতেছেন তাহাও আশানুরূপ আকার গ্রহণ করিতেছে না। সুদর্শন চক্র গোলাকার হওয়াই বাঞ্ছনীয়, কিন্তু কবির হস্তে উহা ডিম্বের আকৃতি ধারণ করিবার চেষ্টা করিতেছে। তাছাড়া তুলিটাও ভদ্র ব্যবহার করিতেছে না, অতর্কিতে কবির চোখে মুখে রঙ ছিটাইয়া দিতেছে।

কালিদাস শেষে উত্ত্যক্ত হইয়া তুলির দ্বারা সুদর্শন চক্রের মাঝখানে একটা খোঁচা দিলেন; তুলির রঙ আমনি ধারার মত গড়াইয়া পড়িল। মালিনী এতক্ষণ কালিদাসের পিছনে দাঁড়াইয়া সকৌতুকে দেখিতেছিল; এখন খিল্‌খিল্‌ করিয়া হাসিয়া উঠিল।

চমকিয়া কবি ফিরিলেন; হাতের তুলিটা কেমন একভাবে ছিট্‌কাইয়া উঠিয়া মালিনীর মুখে চোখে রঙ ছিটাইয়া দিল।

মালিনী মুখখানি একবার কুঞ্চিত করিয়া আবার হাসিয়া উঠিল— ‘কেমন মানুষ গা তুমি! আমার মুখেও চিত্তির আঁকবে নাকি?’

কালিদাস অত্যন্ত অপ্রস্তুত হইয়া পড়িলেন— ‘এ হে হে, দেখতে পাইনি— ভারি অন্যায় হয়েছে। — তা, এ চুন নয় পিটুলি গোলা, তোমার মুখের কোনো ক্ষতি করবে না। বরং— বেশ দেখাচ্ছে—।’

মালিনীর মুখে শ্বেত বিন্দুগুলি তিলকের মত ফুটিয়া উঠিয়া সত্যই সুন্দর দেখাইতেছিল, সে স্মিতমুখে এই কান্তিময় তরুণ ব্রাহ্মণকে ভাল করিয়া নিরীক্ষণ করিল। মানুষটি দেখিতেও সুন্দর, কথাও বলে ভারি মিষ্ট। সে বলিল— ‘তুমি নতুন এসেছ না? সাত দিন আগেও এ পথ দিয়ে গেছি, তোমার কুঁড়ে ঘর তো ছিল না।’

কালিদাস বলিলেন— ‘না, এই তো ক’দিন হল এসেছি। নিজের হাতে ঘর তৈরি করেছি। কেমন, চমৎকার হয়নি?’ তিনি সগর্বে গৃহের পানে তাকাইলেন।

মালিনী বলিল— ‘বেশ হয়েছে। ওটা কি হচ্ছিল?’

মালিনীর তর্জনীনির্দেশ অনুসরণ করিয়া শঙ্খ চক্র দেখিয়া কালিদাস লজ্জিত হইলেন, আম্‌তা আম্‌তা করিয়া বলিলেন— ‘মঙ্গল চিহ্ন আঁকছিলাম, তা ওই হয়েছে।’ বলিয়া নিজেই হাসিয়া ফেলিলেন।

মালিনীও হাসিল। ফুলের মালা সাজিতে রাখিয়া সাজি কালিদাসের হাতে ধরাইয়া দিয়া বলিল— ‘তুমি সাজি ধরো আমি এঁকে দিচ্ছি। আল্‌পনা দেওয়া কি পুরুষের কাজ!’

ভাঁড় ও তুলি হাতে লইয়া মালিনী দ্বারের কাছে গেল; কালিদাস পুলকিত হইয়া বলিলেন— ‘তুমি এঁকে দেবে! বাঃ, তাহলে তো কথাই নেই। — আমরা পুরুষেরা শুধু মোটা কাজ করতে পারি, সূক্ষ্ম কাজ মেয়েরা না হলে হয় না।’

মালিনী হাসিমুখে স্বজাতির এই প্রশংসা আত্মসাৎ করিয়া আল্‌পনা অঙ্কনে মন দিল, পূর্বের অঙ্কন মুছিয়া দক্ষহস্তে নূতন করিয়া শঙ্খ আঁকিতে লাগিল। কালিদাস সপ্রশংস নেত্রে দেখিতে লাগিলেন। দেখিতে দেখিতে বলিলেন— ‘ভাল কথা, তুমি কে তা তো বললে না।’

‘ফুলের সাজি দেখে বুঝলে না?— মালিনী।’

‘ও— তা বটে। কিন্তু তোমার একটা নাম আছে তো।’

মালিনী মুখ না ফিরাইয়াই মাথা নাড়িল।

‘না, সবাই আমাকে মালিনী বলে ডাকে। আমার কেউ নেই কিনা। — গুরুবারে গুরুবারে আমি রাজবাড়িতে যাই রানী ভানুমতীকে ফুল যোগাতে। রানী ভানুমতী আমাকে খু— ব ভালবাসেন। সবাই আমাকে খুব ভালবাসে। আমার কেউ নেই কিনা।’

কালিদাস ঘাড় নাড়িতে নাড়িতে শুনিতেছিলেন, মালিনী মুখ ফিরাইয়া প্রশ্ন করিল— ‘তুমি কে?’

কালিদাস একটু ইতস্তত করিয়া শেষে বলিলেন— ‘আমি কালিদাস।’

মালিনী পরিতুষ্টভাবে ঘাড় নাড়িল— ‘বেশ নাম। — তুমি কি কাজ কর?’

কালিদাস চিন্তা করিয়া বলিলেন— ‘কাজ!— আমিও মালা গাঁথি।’

মালিনীর চক্ষু উজ্জ্বল হইয়া উঠিল— ‘ওমা সত্যি! কিন্তু— কিন্তু তোমার গলায় পৈতে রয়েছে, তুমি তো মালাকর নও।’

কালিদাস মৃদু হাসিলেন— ‘আমি কথার মালাকর— কবি।’

চিবুকে একটি আঙুল ঠেকাইয়া মালিনী কিছুক্ষণ অবাক হইয়া রহিল, তারপর রুদ্ধশ্বাসে বলিল— ‘কবি! তুমি গান বাঁধতে পার?’

কালিদাস হাসিয়া ঘাড় নাড়িলেন, মালিনীর চক্ষু বিস্ময়ে আরো বর্তুলাকার হইল। সে বলিল— ‘তবে— তবে তুমি এখানে কুঁড়ে ঘর বেঁধেছ যে? রাজসভায় যাও না কেন? রাজা কবিদের ভারি ভালবাসেন, কত সোনাদানা দেন, থাকবার বাড়ি দেন—’

কালিদাসের মুখে ঈষৎ তিক্ততার আভাস খেলিয়া গেল, তিনি আকাশের দিকে চাহিয়া বলিলেন— ‘রাজারানীর সোনাদানা আমার দরকার নেই। নিজের হাতে তৈরি এই কুঁড়ে ঘর আমার অট্টালিকা।’

মালিনী ক্ষণেক জিজ্ঞাসু নেত্রে চাহিয়া থাকিয়া মৃদু হাসিল, সদয় কণ্ঠে বলিল— ‘বুঝেছি। তুমি রাজারানীদের সঙ্গে কখনো মেশোনি কিনা তাই ভয় করছে। তুমি ভয় পেও না। ওরা খুব ভাল লোক হয়। আমার রানী ভানুমতী খুব ভাল লোক— আর কী সুন্দর! চোখ ফেরানো যায় না।’

কালিদাস একটু হাসিলেন— ‘তুমিও তো ভাল লোক; জানা-শোনা নেই তবু আমার কত কাজ করে দিচ্ছ। আর দেখতেও সুন্দর— যেন প্রতিমাটি। তবে তোমাকে ফেলে রাজারানীর পিছনে ছোটবার কী দরকার?’

মালিনী আহ্লাদে বিগলিত হইয়া গেল, বলিল— ‘আমি সুন্দর! যাঃ— তুমি কবি কিনা তাই মিছিমিছি বলছ। এবার এদিকে দ্যাখো দেখি, কেমন আল্‌পনা হয়েছে।’

কবি সহজ কৃতজ্ঞতার কণ্ঠে বলিলেন— ‘ভাল হয়েছে, যেমনটি হওয়া উচিত তেমনি হয়েছে। নারীই গৃহকে গৃহের রূপ দিতে পারে— সে গৃহদেবতা।’

মালিনী মাথা হেলাইয়া কিছুক্ষণ কবির পানে চাহিয়া রহিল। এ ধরনের কথাবার্তার সহিত সে পরিচিত নয়, তবু একটু হাসিয়া বলিল— ‘তোমার কথার মানে বুঝেছি। শুনতে হেঁয়ালির মত লাগে, কিন্তু ভাবলে মানে পাওয়া যায়। — আচ্ছা, সব কবিই কি হেঁয়ালির ছন্দে কথা বলে?’

কালিদাস হাসিয়া বলিলেন— ‘স— ব।’

ইতিমধ্যে সূর্যদেব শিপ্রার পরপারে অস্তচূড়া স্পর্শ করিয়াছেন; এখন নগর হইতে সন্ধ্যারতির শঙ্খঘণ্টাধ্বনি ভাসিয়া আসিল। মালিনী চকিতে দিগন্তের পানে চাহিয়া সন্ত্রস্ত হইয়া উঠিল— ‘ওমা কি হবে! সৃয্যি যে পাটে বসলেন! আজকেই আমি মরেছি, রানীমার ফুল যোগান দিতে দেরি হয়ে যাবে। দাও দাও, সাজি দাও, আমি চললুম—’

কালিদাসের হাতে ভাঁড় ধরাইয়া দিয়া এবং সাজিটি প্রায় কাড়িয়া লইয়া মালিনী ক্ষিপ্রপদে অঙ্গনের বাহিরে চলিল। যাইতে যাইতে একবার পিছু ফিরিয়া বলিল— ‘আবার যেদিন আসব তোমার ঘর গুছিয়ে দিয়ে যাব।’

কালিদাস স্মিতমুখে তাহার দিকে চাহিয়া দাঁড়াইয়া রহিলেন, তারপর মৃদুস্বরে আত্মগতভাবে বলিলেন— ‘মালিনী! যেন সাক্ষাৎ মালিনী ছন্দ— চপল-চরণ-ছন্দা— নন্দিনী— পুষ্পগন্ধা!’

অবন্তীর বিশাল রাজপুরী; প্রাকার-বেষ্টিত একটি নগর বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। বিস্তৃত বিহার ভূমির উপর কুঞ্জবাটিকা উপবন, মধ্যে মধ্যে এক একটি অট্টালিকা। কোনোটি মন্ত্রগৃহ, কোনোটি শস্ত্রাগার, কোনোটি যন্ত্রভবন— এইরূপ আরও অনেক।

পুরভূমির সর্ব পশ্চাতে মহাদেবী ভানুমতীর অবরোধ— নগরের মধ্যে ক্ষুদ্র নগরী। অবরোধের ভূভাগ উচ্চ প্রাচীর দ্বারা বেষ্টিত, প্রাচীরের কোল ঘেঁষিয়া সঙ্কীর্ণ পরিখা। এখানে প্রবেশের একটি মাত্র পথ; তাহাও এত সঙ্কীর্ণ যে দুইজন পাশাপাশি প্রবেশ করিতে পারে না।

যে-সময়ের কাহিনী সে-সময়ে রাজপুরীর পুরন্ধ্রীদের প্রাকার পরিখার অন্তরালে অবরুদ্ধ করিয়া রাখিবার প্রথা প্রচলিত ছিল না। কিন্তু সম্প্রতি কয়েক বৎসর পূর্বে হূণ বর্বরদের উৎপাত হইয়াছিল; সেই সময় পুরনারীদের সম্ভ্রম রক্ষার জন্য মহারাজ বিক্রমাদিত্য এই অবরোধ নির্মাণ করাইয়াছিলেন। তারপর হূণ উৎপাত দূর হইয়াছিল; কিন্তু প্রথা একবার গড়িয়া উঠিলে সহজে ভাঙ্গা যায় না। অবরোধ এবং তৎ-সংক্রান্ত বিধি-বিধান রহিয়া গিয়াছিল।

সেদিন একজন সশস্ত্র প্রহরী অবরোধের অপ্রসর প্রবেশ-পথের সম্মুখে পাহারায় নিযুক্ত ছিল। রক্ষীর বয়স কম, মাত্র উনিশ কুড়ি; কিন্তু ভারি জোয়ান। হাতের লৌহশূল অবহেলাভরে ঘুরাইতে ঘুরাইতে সে দ্বার সম্মুখে পদচারণ করিতেছিল। কেহ কোথাও নাই। দ্বারপথে অবরোধের প্রাসাদ প্রাঙ্গণ কিয়দংশ দেখা যাইতেছে; বাহিরে বকুল তমাল পিয়াল শোভিত মুক্ত ভূমি জনশূন্য। সন্ধ্যা সমাগত।

দূরে মালিনীকে আসিতে দেখিয়া রক্ষী থমকিয়া দাঁড়াইয়া সেইদিকে তাকাইয়া রহিল। তারপর একটু গদ্‌গদ হাসি তাহার মুখে দেখা দিল। মালিনীর প্রতি তাহার মনে যে বেশ প্রীতির ভাব আছে তাহা সহজেই অনুমান করা যায়।

মালিনী তাহার প্রতি ভ্রূক্ষেপ না করিয়া তাড়াতাড়ি অবরোধে প্রবেশের উদ্যোগ করিল। রক্ষী এজন্য প্রস্তুত ছিল, মালিনীর অবজ্ঞা তাহার কাছে নূতন নয়; তাহার বল্লম অর্গলের মত পড়িয়া মালিনীর পথ রোধ করিয়া দিল। চমকিয়া মালিনী অধীর রুষ্ট মুখে রক্ষীর পানে তাকাইল; বলিল— ‘কি হচ্ছে! পথ ছেড়ে দাও।’

মালিনীর ভ্রূকুটি দেখিয়া রক্ষী ঘাবড়াইয়া গেল। সে নূতন প্রেম করিতে শিখিতেছে, এখনো আনাড়ী; অথচ একটু রসিকতা না করিয়াও মালিনীকে ছাড়িয়া দেওয়া যায় না। তাই সে বোকার মত হাসিয়া বলিল— ‘বিনা প্রশ্নে তোমাকে রানীর মহলে ঢুকতে দিই কি করে? কঞ্চুকী মশায়ের হুকুম—’

মালিনী বলিল— ‘ঢের হয়েছে, এবার বল্লম নামাও। এম্‌নিতেই আমার দেরি হয়ে গেছে—’

রক্ষী বলিল— ‘কঞ্চুকী মশায়ের হুকুম, পুরুষ ঢুকতে দেবে না। এখন তুমি যে মেয়ের ছদ্মবেশে পুরুষ নও—’

মালিনী ধমক দিয়া বলিল— ‘আবার! আচ্ছা বেশ, রঙ্গই কর তাহলে—’

মালিনী অদূরস্থ বেদীর মত ক্ষুদ্র শিলাখণ্ডের উপর সাজি কোলে লইয়া বসিল, আকাশের দিকে চোখ তুলিয়া নীরসকণ্ঠে বলিল— ‘আমার কি! রানীমার এতক্ষণ চুল বাঁধা গা ধোয়া হয়ে গেছে, ফুল আর মালার জন্যে হা-পিত্যেশ করে বসে আছেন। বেশ তো, বসে থাকুন। যত দেরি হবে ততই তাঁর রাগ বাড়বে। তা আমি কি করব! আমাকে যখন তলব হবে আমি বলব—’

রক্ষী এবার রীতিমত ভয় পাইয়া গেল, ত্বরিতে দ্বার হইতে বল্লম সরাইয়া মিনতির সুরে বলিল— ‘না না মালিনী, আমি কি তোমাকে আটকেছি! আমি একটু— ইয়ে— রস করছিলাম। নাও— তুমি ভিতরে যাও।’

মালিনী উঠিল না, মুখ কঠিন করিয়া বলিল— ‘আগে নিজের হাতে কান মলো।’

রক্ষীর বয়স অল্প, তাহার কর্ণ দু’টি রক্তিম হইয়া উঠিল। কিন্তু উপায় কি? সে হাসিবার চেষ্টা করিয়া বলিল— ‘আচ্ছা, এই নাও মলছি। কিন্তু এ শুধু তোমাকে— ইয়ে— ভালবাসি বলে।’

মালিনী ফিক্‌ করিয়া হাসিল। উঠিয়া দাঁড়াইয়া গ্রীবার একটি লীলায়িত ভঙ্গি করিয়া বলিল— ‘ইঃ, ভালবাসা!’ সহসা গম্ভীর হইয়া মালিনী প্রশ্ন করিল— ‘জানো, নারীই গৃহকে গৃহের রূপ দিতে পারে? সে গৃহদেবতা— জানো?’

রক্ষী অবোধের মত ক্ষণকাল তাকাইয়া থাকিয়া বলিল— ‘কৈ, না তো।’

‘তবে তুমি কিছু জান না।’ মালিনী সদর্পে দ্বারপথে প্রবেশ করিয়া অন্তর্হিত হইয়া গেল।

মহাদেবী ভানুমতীর প্রসাধন কক্ষে একটি শিঙার-বেদিকার উপর অপরূপ রূপবতী প্রগাঢ়যৌবনা রানী অর্ধশয়ানভাবে অবস্থান করিতেছেন। চার পাঁচটি কিঙ্করী তাঁহাকে ঘিরিয়া আছে; একজন ভানুমতীর আলুলায়িত কুন্তল দুই হাতে তুলিয়া ধরিয়া ধূপের ধোঁয়ায় সুরভিত করিতেছে, দ্বিতীয়া কিঙ্করী পদপ্রান্তে নতজানু হইয়া লাক্ষারসে চরণপ্রান্ত রঞ্জিত করিতেছে। অবশিষ্ট কিঙ্করীরা প্রসাধন দ্রব্য হাতে লইয়া সাহায্য করিতেছে।

দ্রুত ব্যস্তপদে মালিনী প্রবেশ করিল; বাক্যব্যয় না করিয়া ভানুমতীর দেহ পুষ্পাভরণে সাজাইতে লাগিয়া গেল। রানী মদালস নেত্র মালিনীর দিকে ফিরাইয়া একটু হাসিলেন, বলিলেন— ‘আমার মালিনী মেয়ের আজ এত দেরি যে!’

মালিনী ক্ষিপ্রহস্তে ভানুমতীর মৃণালভুজে ফুলের অঙ্গদ পরাইতে পরাইতে হ্রস্বস্বরে বলিল— ‘কার মুখ দেখে যে আজ উঠেছিলুম, দেরি হয়ে গেল রানিমা। ফুল নিয়ে নদীর ধার দিয়ে আসছি, চোখ তুলে দেখি— ওমা, এক কবি! বল তো রানিমা, অবাক কাণ্ড না?’

রানী অধর প্রান্ত একটু কুঞ্চিত করিলেন— ‘এ আর অবাক কাণ্ড কী! মহারাজের কৃপায় উজ্জয়িনীতে এত কবি জুটেছে যে, বর্ষাকালে ইন্দ্রগোপ কীটও এত জন্মায় না।’

মালিনী মাথা নাড়িয়া বলিল— ‘ওমা না গো না, এ তোমার ন্যাড়ামাথা নাকলম্বা চিমসে কবি নয়। কি বলব তোমায় রানিমা, চেহারা যেন ঠিক— কুমার কার্তিক! গায়ের রঙ ডালিম ফেটে পড়ছে— কী নাক, কী চোখ! বয়স কতই বা হবে, বড় জোর চব্বিশ পঁচিশ।’

ঈষৎ ভ্রূভঙ্গ করিয়া ভানুমতী মালিনীকে নিরীক্ষণ করিলেন— ‘হুঁ?’

মালিনী উৎসাহভরে বলিয়া চলিল— ‘হ্যাঁ গো রানিমা। বললে বিশ্বাস করবে না, এত সুন্দর কবি আমি জন্মে দেখিনি। — নদীর পাড়ে কুঁড়ে ঘর তৈরি করেছে, সেখানেই থাকবে!’ মালিনী হঠাৎ হাসিয়া উঠিল— ‘দরজায় আল্‌পনা দিচ্ছিল— কিবা আল্‌পনার ছিরি! হাত থেকে পিটুলির ভাঁড় কেড়ে নিয়ে আমি আল্‌পনা এঁকে দিলুম। তাই না এত দেরি হল। কবির নাম— কালিদাস। বেশ মিষ্টি নাম, না? আর তেমনি কি মিষ্টি কথা— কথা শুনলে কান জুড়িয়ে যায়।’

ভানুমতী মন দিয়া শুনিতেছিলেন, তাঁহার মুখের গূঢ় হাসি গভীর হইতেছিল; মালিনী থামিতেই তিনি ভ্রূভঙ্গি করিয়া বলিলেন— ‘সত্যি!— নদীর ধারে খাসা কবি কুড়িয়ে পেয়েছিস তো! তা— কি বল্‌ল তোর কবিটি? কানের কাছে ভোমরার মত গুনগুন করে গান শুনিয়েছে বুঝি?’

মালিনী রানীর কথার ব্যঙ্গার্থ বুঝিল না; সে এখনো অতশত বুঝিতে শেখে নাই, সরলভাবে বলিল— ‘না রানিমা, গান করেনি, শুধু কথা বলেছে। কিন্তু কী মিষ্টি কথা, ঠিক যেন মধু ঢেলে দিচ্ছে।’

ভানুমতী ফিক্‌ করিয়া হাসিয়া কিঙ্করীদের পানে চাহিলেন; তাহারাও মুখ টিপিয়া হাসিতে লাগিল। রানী অলসহস্তে মালিনীর চিবুক তুলিয়া ধরিয়া তাহার কচি মুখখানি দেখিলেন, তরল কৌতুকের সুরে বলিলেন— ‘আমার মালিনী-কুঁড়িটি এতদিনে সত্যিই ফুটবে ফুটবে করছে, ভোমরাও ঠিক এসে জুটেছে। দেখিস মালিনী, তুই যেমন ভালমানুষ, তোর কবি-ভোমরা সব মধুটুকু শুষে নিয়ে উড়ে না পালায়।’

কিঙ্করীরা হাসিতে লাগিল। মালিনী ব্যাপার বুঝিতে না পারিয়া অবাক হইয়া সকলের মুখের পানে তাকাইতে লাগিল। রানী হাসিতে হাসিতে উঠিয়া মালিনীর দুই স্কন্ধের উপর হাত রাখিলেন, স্নেহ-কোমল কণ্ঠে বলিলেন— ‘বোকা মেয়ে। এখনো ঘুম ভাঙেনি। — ভয় নেই, একদিন ঘুম ভাঙবে, হঠাৎ সব বুঝতে পারবি। তোর কবি বুঝি ঘুম ভাঙাতেই এসেছে।’

কিছুদিন কাটিয়াছে।

একদা প্রভাতকালে কালিদাস নিজ কুটির প্রাঙ্গণে বেদীর উপর বসিয়া আছেন। সম্মুখে মৃত্তিকার মসীপাত্র, খাগের কলম ও একতাড়া তালপত্র। কবি রচনায় নিমগ্ন, কিন্তু যত না রচনা করিতেছেন চিন্তা করিতেছেন তাহার দশগুণ। ললাট চিন্তা-চিহ্নিত, কোথাও যেন আটকাইয়া গিয়াছে। কবি কয়েকবার মুখে বিড়্‌বিড়্‌ করিতে করিতে করাগ্রে গণনা করিলেন, তারপর অন্যমনস্কভাবে লেখনী মসীপাত্রে ডুবাইলেন। কিন্তু মনে মনে যাহা গড়িয়াছিলেন তাহা মনঃপূত হইল না, তিনি আবার কলম রাখিয়া দিলেন। তালপত্রে একটি অসমাপ্ত শ্লোক লেখা ছিল, তালপত্রটি তুলিয়া জানুর উপর রাখিয়া মৃদুকণ্ঠে শ্লোকটি আবৃত্তি করিলেন, যেন উহার ধ্বনি হইতে পরবর্তী অলিখিত পংক্তির ইঙ্গিত ধরিবার চেষ্টা করিতেছেন—

অবচিত বলিপুষ্পা বেদি সম্মার্গদক্ষা

নিয়মবিধি জলানাং বর্হিষাঞ্চোপনেত্রী

গিরিশমুপচচার প্রত্যহং সা— ভবানী!

শেষ শব্দটি তিনি সংশয়সঙ্কুল কণ্ঠে উচ্চারণ করিলেন। ‘ভবানী’ শব্দটি পত্রে লেখা ছিল না, কবি পাদপূরণের জন্য উচ্চারণ করিয়াছিলেন। ক্ষণকাল চিন্তা করিয়া তিনি মাথা নাড়িলেন— ‘উহুঁ, ভবানী চলবে না! এখনো তো দেবী ভবানী হননি। কৃশাঙ্গী—? উঁহু— মৃগাক্ষী?— উঁহু উঁহু—’

কবির ভাবাবিষ্ট চক্ষু এদিক ওদিক ঘুরিতে ঘুরিতে দ্বারের কাছে গিয়া সহসা রুদ্ধ হইল; কবি ভাবতন্দ্রা হইতে জাগিয়া উঠিলেন। প্রাঙ্গণের দ্বারপথে মালিনী হাসিতে হাসিতে প্রবেশ করিতেছে। সদ্যঃস্নাতা; হাতে তাম্রের থালিতে একরাশ ফুল, মাথার সিক্ত চুলগুলি বুকে কাঁধে ছড়াইয়া পড়িয়াছে; প্রভাতের শিশির বিন্দুর মত চৌদিকে আনন্দের রশ্মি বিকীর্ণ করিতে করিতে মালিনী কালিদাসের দিকে অগ্রসর হইল। কালিদাস চকিত বিস্ফারিত নেত্রে ক্ষণকাল চাহিয়া রহিলেন— এ কি! এ যে গিরিকন্যারই মর্ত্য প্রতিমূর্তি! যে শব্দটির অভাবে তাঁহার শ্লোক এবং কাব্যের প্রথম সর্গ সমাপ্ত হইতেছে না সেই শব্দটি বিদ্যুৎস্ফুরণের মত তাঁহার মস্তিষ্কে জ্বলিয়া উঠিল। ত্বরিতে লেখনী ধরিয়া কবি লিখিতে আরম্ভ করিয়া দিলেন, খস্‌খস্‌ শব্দে তালপত্রের উপর লেখনী চলিতে লাগিল।

ফুলের থালি হাতে মালিনী বেদীর পাশে আসিয়া দাঁড়াইল; কবি কিন্তু তাহাকে অন্য দিনের মত সম্ভাষণ করিলেন না, মুখ তুলিয়া দেখিলেন না। মালিনীর হাসিভরা মুখখানি ম্লান হইয়া গেল, অভিমানে চক্ষু ছলছল করিয়া উঠিল। কবি ব্যগ্রভাবে লিখিয়া চলিয়াছেন, যেন মুহূর্তের জন্য অন্য দিকে মন দিলেই শব্দগুলি মস্তিষ্কের পিঞ্জর খুলিয়া উড়িয়া যাইবে। মালিনী ক্ষণেক চুপ করিয়া দাঁড়াইয়া রহিল, তারপর ভারী গলায় বলিল— ‘এত কাজ— আমার পানে চোখ তুলে চাইবারও সময় নেই! বেশ!—’

কালিদাস মুখ না তুলিয়াই চাপা সুরে বলিলেন— ‘স্‌স্‌স্‌— একটু দেরি কর— এটা শেষ করে ফেলি—। নি-য়-মি-ত প-রি-খে-দা—’

মুখে অসমাপ্ত বাক্য মিলাইয়া গেল, কালিদাস লিখিয়া চলিলেন। অবশেষে লেখা সমাপ্ত হইল। লেখার নীচে কলমের একটি সাড়ম্বর আঁচড় টানিয়া তিনি মালিনীর পানে হাস্যোজ্জ্বল মুখ তুলিলেন— ‘ব্যস— ইতি প্রথম সর্গঃ।’

মালিনী মুখ ভার করিয়া রহিল, কালিদাস সোৎসাহে বলিয়া চলিলেন— ‘একটা শব্দ কিছুতেই মাথায় আসছিল না, তোমাকে দেখেই মনে পড়ে গেল— তোমার ওই কালো কালো কোঁকড়া চুল দেখে—’

মালিনীর পক্ষে আর অভিমান করিয়া থাকা সম্ভব হইল না, কৌতূহল-দীপ্ত চোখে সে কালিদাসের পানে চাহিয়া প্রশ্ন করিল— ‘কি কথা— বল না।’

কালিদাস বলিলেন— ‘কথাটি হচ্ছে— সুকেশী। তোমার সুন্দর ভিজে চুলগুলি দেখে মনে পড়ে গেল।’

মালিনী বেদীর একপাশে বসিয়া পড়িল। কৌতূহলের সীমা নাই; ফুলের থালিটি নামাইয়া রাখিয়া সে এক অঞ্জলি ফুল কবির কোলের উপর ফেলিয়া দিল, তারপর লেখনী মসীপাত্র তালপত্রের উপর দুই চারিটি ফুল ছড়াইয়া দিতে দিতে বলিল— ‘কিসের গল্প লিখছ? শিবের গীত বুঝি?’

কালিদাস বলিলেন— ‘হ্যাঁ। শিব আর পার্বতীর গল্প। শিবের সঙ্গে পার্বতীর তখনো বিয়ে হয়নি। শিব তপস্যা করছেন— কঠিন তপস্যা, আর গিরিরাজ-কন্যা উমা রোজ এসে তাঁর সেবা করেন, ফুল সমিধ আহরণ করে আনেন, পূজার জন্যে বেদী-মার্জন করে দেন। তারপর এইসব কাজ ক’রে যখন ক্লান্ত হয়ে পড়েন তখন শিবের ললাট-চন্দ্রের কিরণের তলায় বসে ক্লান্তি দূর করেন। — শুনবে শেষ শ্লোকটা?’

মালিনী অবহিত চিত্তে শুনিতেছিল, সে কেবল সাগ্রহে ঘাড় নাড়িল। কালিদাস তালপত্র তুলিয়া পড়িলেন—

‘অবচিত বলিপুষ্পা বেদি সম্মার্গদক্ষা

নিয়মবিধি জলানাং বর্হিষাঞ্চোপনেত্রী

গিরিশমুপচচার প্রত্যহং সা সুকেশী

নিয়মিত পরিখেদা তচ্ছিরশ্চন্দ্রপাদৈঃ।’

কিছুক্ষণ দুইজনে নীরব। কালিদাস ধীরে ধীরে তালপত্র নামাইয়া রাখিলেন, মালিনীর দিকে মৃদু সস্নেহ হাসিয়া বলিলেন— ‘এ ছন্দের নাম জানো?’

মালিনী বলিল— ‘না— কী?’

কালিদাস বলিলেন— ‘মালিনী ছন্দ— তোমার নামের ছন্দ। প্রত্যেক সর্গের শেষে তোমার নামের ছন্দে শ্লোক লিখব ইচ্ছা আছে। আমার কাব্য যদি বেঁচে থাকে মালিনীর নামও কেউ ভুলবে না, আমার কাব্যে তোমার নাম গাঁথা থাকবে।’

মালিনীর মুখ আনন্দে গৌরবে উদ্ভাসিত হইয়া উঠিল। কালিদাস হাসিতে হাসিতে বেদীর উপর উঠিয়া দাঁড়াইলেন। পরম বিলাসভারে আলস্য ত্যাগ করিতে করিতে অঙ্গন-বেষ্টনীর বাহিরে শিপ্রার তীরে তাঁহার দৃষ্টি পড়িল। তাঁহার হাস্য-আলস্য ভরা মুখে সহসা ভাবান্তর দেখা গেল।

শিপ্রার তীররেখা ধরিয়া এক শ্রেণী উট চলিয়াছে। আর একদিনের কথা কালিদাসের মনে পড়িয়া গেল— পূর্ণিমার নিথর রাত্রি, জ্যোৎস্নাপ্লাবিত রাজোদ্যান, প্রাকার-বেষ্টনীর পরপারে উটের সারি চলিয়াছে— তারপর—

স্মৃতির বেদনা কালিদাসের মুখে করুণ ছায়াপাত করিল। মালিনী ঊর্ধ্বমুখী হইয়া কবির পানে চাহিয়া ছিল, সে তাঁহার মুখের ভাবান্তর লক্ষ্য করিল। ঈষৎ বিস্ময়ে উঠিয়া দাঁড়াইয়া সে প্রাঙ্গণ-বেষ্টনীর ওপারে দেখিবার চেষ্টা করিল, কিন্তু দেখিতে পাইল না; তখন সেও বেদীর উপর উঠিতে উঠিতে বলিল— ‘কী দেখছ?’

কালিদাস উত্তর দিলেন না, চাহিয়া রহিলেন। মালিনী তাঁহার সম্মুখে দাঁড়াইয়া ডিঙি মারিয়া দেখিল উটের সারি। সে ঠোঁট উল্টাইয়া বলিল— ‘আ কপাল— উট! আমি বলি না জানি কী! তো হ্যাঁ কবি, উট দেখে তোমার ভয় হল নাকি?’

কালিদাস ম্লান হাসিলেন— ‘ভয় নয় মালিনী, দুঃখ হল। ঐ উটের সঙ্গে একটা বড় দুঃখের স্মৃতি জড়িয়ে আছে।’

কালিদাস দীর্ঘশ্বাস ফেলিলেন। মালিনী সপ্রশ্ন নেত্রে তাঁহার মুখের পানে চাহিয়া রহিল, কিন্তু তিনি আর কিছু বলিলেন না।

অবন্তীর রাজসভা। কুন্তল রাজসভার সহিত সাদৃশ্য থাকিলেও এ আরও বৃহৎ ব্যাপার। উপরন্তু অবরোধের মহিলাগণের জন্য প্রাচীরগাত্রে উচ্চ প্রেক্ষামঞ্চের ব্যবস্থা আছে।

অপরাহ্ণকালে সভার প্রধান বেদিকার উপর মহারাজ বিক্রমাদিত্য আসীন। পঁয়ত্রিশ বৎসর বয়সের দৃপ্তকায় পুরুষ; দণ্ড মুকুটাদির আড়ম্বর নাই, তিনি বেদীর আস্তরণের উপর কেবলমাত্র একটি স্থূল উপাধান আশ্রয় করিয়া অর্ধশয়ান আছেন।

চারিপাশে কয়েকজন অন্তরঙ্গ সভাসদ নিকটে-দূরে অবস্থান করিতেছেন। বরাহমিহির ও অমরসিংহ একত্র বসিয়া নিম্নস্বরে বাক্যালাপ করিতেছেন এবং মাঝে মাঝে তুড়ি দিয়া হাই তুলিতেছেন। এক শীর্ণকায় মুণ্ডিতচিকুর কবি দন্তহীন মুখ রোমন্থনের ভঙ্গিতে নাড়িতে নাড়িতে একাগ্র মনে শ্লোক রচনা করিতেছেন। প্রবীণ মহামন্ত্রী এক পাশে বসিয়া পারাবতপুচ্ছের সাহায্যে কর্ণকুহর কণ্ডূয়ন করিতেছেন। তাঁহার অনতিদূর পশ্চাতে স্থূলকায় বিদূষক চিৎ হইয়া উদর উদ্‌ঘাটনপূর্বক নিদ্রাসুখ উপভোগ করিতেছে।

মহারাজের শিয়রের কাছে এক তাম্বূলকরঙ্কবাহিনী যুবতী বসিয়া একমনে তাম্বূল রচনা করিয়া সোনার থালে রাখিতেছে। অন্য একটি যবনী সুন্দরী শীতল ফলাম্লরসের ভৃঙ্গার হস্তে নতজানু হইয়া চিত্রার্পিতার ন্যায় একপাশে অবস্থান করিতেছে।

কর্মহীন অপরাহ্ণের আলস্য সকলকে চাপিয়া ধরিয়াছে। মহারাজ উত্ত্যক্ত হইয়া উঠিয়াছেন, কিন্তু কেহ একটা রসের কথা পর্যন্ত বলিতেছে না। সভাটা যেন নিতান্ত ব্যাজার হইয়া শেষ পর্যন্ত ঝিমাইয়া পড়িয়াছে। তাহার মধ্যে বরাহমিহির ও অমরসিংহের মৃদু জল্পনা ঝিল্লিগুঞ্জনের ন্যায় শুনাইতেছে।

বরাহমিহির প্রকাণ্ড একটি হাই তুলিয়া হস্তদ্বারা উহা চাপা দিলেন, তারপর ঈষৎ উচ্চকণ্ঠে বলিলেন— ‘রবি এবার মকর রাশিতে প্রবেশ করবেন।’

বিক্রমাদিত্য একটু উৎসুকভাবে সেইদিকে তাকাইলেন— ‘কি বললেন মিহিরভট্ট?’

বরাহমিহির বলিলেন— ‘আমি বলছিলাম মহারাজ, যে রবি এবার মকর রাশিতে গিয়ে ঢুকবেন।’

মহারাজ আবার উপাধানে হেলান দিয়া বসিলেন, ব্যঙ্গ-বঙ্কিম মুখভঙ্গি করিয়া বলিলেন— ‘হুঁ, ঢুকবেন তো এত দেরি করছেন কেন? তাড়াতাড়ি ঢুকে পড়লেই পারেন। আমার তো এই আলস্য আর নৈষ্কর্ম্য অসহ্য হয়ে উঠেছে। এ রাজ্যে কেউ যেন কিছু করছে না, কেবল বসে বসে ঝিমচ্ছে। ইচ্ছে করে সৈন্য সামন্ত নিয়ে আবার যুদ্ধযাত্রা করি। তবু তো একটু কিছু করা হবে।’

মহামন্ত্রী কর্ণকণ্ডূয়নে ক্ষণকাল বিরতি দিয়া মিটমিটি হাসিলেন, গূঢ় পরিহাসের কণ্ঠে বলিলেন— ‘কার বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করবেন মহারাজ? শত্রু তো একটিও অবশিষ্ট নেই।’

বিরক্তি সত্ত্বেও মহারাজের মুখে হাসি ফুটিল— ‘তাও বটে। বড় ভুল হয়ে গেছে মন্ত্রী। সবগুলো শত্রুকে একেবারে নিপাত করে ফেলা উচিত হয়নি। অন্তত দু’একটা শক্রকে এই রকম দুর্দিনের জন্য রাখা উচিত ছিল।’

এই সময় রচনা-রত কবি গলার মধ্যে ঘড়্‌ ঘড়্‌ শব্দ করিলেন, তাঁহার রচনা শেষ হইয়াছে। রাজা তাঁহার প্রতি কটাক্ষপাত করিয়া বলিলেন— ‘কী হয়েছে কবি, আপনি অমন করছেন কেন? হাতে ওটা কি?’

গলা পরিষ্কার করিয়া কবি বলিলেন— ‘শ্লোক লিখেছি মহারাজ। আপনার প্রশস্তি রচনা করেছি।’

বিক্রমাদিত্য নিরুপায়ভাবে একবার চারিদিকে চাহিলেন, শেষে গভীর নিশ্বাস মোচন করিয়া বলিলেন— ‘হুঁ। বেশ পড়ুন— শুনি।’

মহারাজের প্রশস্তি পাঠ হইবে, সুতরাং অন্য সকলেও সেদিকে মন দিলেন। কবি শ্লোকটি পাঠ করলেন—

‘শত্রুণাং অস্থিমুণ্ডানাং শুভ্রতাং উপহাস্যতি।

হে রাজন্‌ তে যশোভাতি শরচ্চন্দ্র মরীচিবৎ ॥’

সকলে অবিচলিত মুখচ্ছবি লইয়া বসিয়া রহিলেন; কেবল অমরসিংহ ভ্রূকুটি করিয়া কবির দিকে তাকাইলেন। বোধহয় শব্দ প্রয়োগে কিছু ভুল হইয়া থাকিবে।

এই জাতীয় শুষ্ক কবিত্বহীন প্রশস্তি শুনিয়া রাজার কর্ণজ্বর উপস্থিত হইয়াছিল, কিন্তু তবু কবির প্রাণে আঘাত দিতে তাঁহার মন সরিল না। অথচ সাধুবাদ করাও চলে না। তিনি বিপন্নভাবে চারিদিকে দৃষ্টি ফিরাইলেন।

তাম্বূলকরঙ্কবাহিনী এই সময় তাম্বূলপূর্ণ থালি রাজার সম্মুখে ধরিল। রাজা চকিত হইয়া তাহার পানে চাহিলেন, তারপর মৃদুস্বরে বলিলেন— ‘মদনমঞ্জরি, তুমিই এই কবিতার বিচারক হও। একে কি কবিতা বলা চলে? মোট কথা, কবিকে পান দেওয়া যেতে পারে কিনা?’

মদনমঞ্জরী অতি অল্প হাস্য করিল, তাহার অধর একটু নড়িল— ‘পারে মহারাজ। কারণ কবিতা যেমনই হোক, তাতে আপনার গুণগান করা হয়েছে।’

মহারাজ একটি নিশ্বাস ত্যাগ করিলেন, পান লইয়া মুখে পুরিতে পুরিতে স্বাভাবিক স্বরে বলিলেন— ‘তাম্বূলকরঙ্কবাহিনী, কবিকে তাম্বূল উপহার দাও, তাঁর কবিতা শুনে আমরা প্রীত হয়েছি।’

মদনমঞ্জরী উঠিয়া গিয়া তাম্বূলের থালি কবির সম্মুখে ধরিল, কবি লুব্ধহস্তে একটি পান লইয়া মুখে পুরিলেন। রাজা সদয় কণ্ঠে বলিলেন— ‘কবি, আজ আপনার যথেষ্ট পরিশ্রম হয়েছে, আপনি গৃহে গিয়ে বিশ্রাম করুন।’

‘জয়োস্তু মহারাজ’ বলিয়া কবি রাজসভা হইতে প্রস্থান করিলেন।

রাজা আর একবার উপাধানের উপর এলাইয়া পড়িয়া সনিশ্বাসে বলিলেন— ‘আমার বয়স্যটি কোথায় কেউ বলতে পারেন?’

মন্ত্রী পশ্চাদ্দিকে একটি বক্র কটাক্ষপাত করিয়া বলিলেন— ‘এই যে এখানে মহারাজ; অকাতরে ঘুমোচ্ছে।’

মহারাজ আবার উঠিয়া বসিলেন— ‘ঘুমোচ্ছে! আমরা সকলে জেগে আছি— অন্তত জেগে থাকবার চেষ্টা করছি— আর পাষণ্ড ঘুমোচ্ছে। তুলে দাও মন্ত্রী।’

আদেশ পাইবামাত্র মন্ত্রী পারাবতপুচ্ছটি বিদূষকের নাসারন্ধে প্রবিষ্ট করাইয়া পাক দিলেন। বিদূষক ধড়মড় করিয়া উঠিয়া বসিল— ‘আরে রে মন্ত্রি-শাবক!— মহারাজ, আপনার এই অস্থিচর্মসার মন্ত্রীটা আমার নাকে বিষপ্রয়োগ করেছে।’

মন্ত্রীর ভ্রূক্ষেপ নাই, তিনি নির্বিকার চিত্তে কানে পালক দিতেছেন; রাজা গভীর ভর্ৎসনার কণ্ঠে বিদূষককে বলিলেন— ‘বয়স্য, রাজসভায় তুমি ঘুমোচ্ছিলে?’

বিদূষক কট্‌মট্‌ করিয়া মন্ত্রীর পানে তাকাইল, বলিল— ‘কে বলে ঘুমোচ্ছিলাম? কোন্‌ উচ্চিটিঙ্গ বলে?— মহারাজ, আমি মনে মনে আপনার প্রশস্তি রচনা করছিলাম।’

মহারাজের অধর কোণে একটু হাসি দেখা দিল; তিনি পুনশ্চ গম্ভীর হইয়া বলিলেন— ‘প্রশস্তি রচনা করছিলে? বটে। ভাল, শোনাও তোমার প্রশস্তি। কিন্তু মনে থাকে যেন, যে-প্রশস্তি আমরা এখনি শুনেছি তার চেয়ে যদি ভাল না হয় তাহলে তোমাকে শূলে যেতে হবে।’

‘তথাস্তু।’ বিদূষক আসিয়া রাজার সম্মুখে পদ্মাসনে বসিল, বলিল— ‘শ্রুয়তাং মহারাজ—

তাম্বূলং যৎ চর্বয়ামি সর্ব তে রিপুমুণ্ডবঃ।

পিক্‌ ত্যজামি পুচুৎ কৃত্বা তদেব শত্রু শোণিতম্‌।

প্রাকৃত ভাষায় অস্যার্থ হচ্ছে— আমরা যে পান খাই তা সর্বৈব মহারাজের শত্রুদের মুণ্ডু, আর পুচ্‌ করে যে পিক্‌ ফেলি তা নিছক শত্রুশোণিত।’

মহারাজের আদেশের অপেক্ষা না করিয়াই বিদূষক সুবর্ণথালি হইতে এক খাম্‌চা পান তুলিয়া মুখে পুরিল এবং সাড়ম্বরে চিবাইতে লাগিল। মহারাজ হাসিলেন; অন্য সকলেও মুচ্‌কি মুচ্‌কি হাসিতে লাগিলেন।

কালিদাসের কুটির প্রাঙ্গণের বেষ্টনীতে লতা উঠিয়াছে, লতায় ফুল ধরিয়াছে।

পূর্বাহ্ণে কালিদাস গৃহে নাই। মালিনী পরম স্নেহভরে আঁচল দিয়া কবির বেদিকাটি মুছিয়া দিতেছে। মার্জন শেষ হইলে সে কুটির হইতে কবির লেখনী মসীপাত্র ও পুঁথি লইয়া আসিল, সযত্নে সেগুলি বেদীর উপর সাজাইয়া রাখিল। তারপর ফুল দিয়া বেদীর চারিপাশ সাজাইল। অবশেষে একটি তৃপ্তির নিশ্বাস ফেলিয়া উৎসুক নেত্রে প্রাঙ্গণদ্বারের পানে তাকাইল।

মালিনীর মুখ দেখিয়া বুঝিতে বাকি থাকে না যে সে মরিয়াছে। প্রাঙ্গণদ্বার দিয়া কালিদাস সিক্ত বস্ত্র নিঙড়াইতে নিঙড়াইতে প্রবেশ করিলেন; তিনি পূজা ও স্নানের জন্য শিপ্রার তীরে গিয়াছিলেন।

মালিনী বলিল— ‘আসা হল? বাবাঃ, পুজো আর স্নান যেন শেষই হয় না। — নাও বোসো। কী হচ্ছিল এতক্ষণ?’

কালিদাস ভাল মানুষটির মত বেদীর উপর বসিলেন, মৃদু হাসিয়া বলিলেন— ‘পুজো আর স্নান।’

মালিনী সিক্ত বস্ত্র লইয়া নিজের কাঁধের উপর ফেলিল, তারপর এক রেকাবি ফল কবির কোলের কাছে ধরিয়া দিয়া বলিল— ‘আচ্ছা, এবার এগুলো মুখে দেওয়া হোক।’

কালিদাস ফলগুলি দেখিয়া বলিলেন— ‘এ কোথা থেকে এল?’

মালিনী বলিল— ‘এল কোথাও থেকে। সে খোঁজে তোমার দরকার?’

কালিদাস মৃদুহাস্যে বলিলেন— ‘আমার ভাণ্ডারে তো যতদূর মনে পড়ছে—’

মালিনী বলিল— ‘চারটি আতপ চাল আর দু’টি ঝিঙে ছাড়া কিছু নেই। — আচ্ছা, খাবার সামিগ্রি ঘরে এনে রাখতে মনে না থাকে, আমাকে বল না কেন? দুপুরবেলা না হয় দু’টি ভাত ফুটিয়ে নিলেই চলে যাবে— বামুন মান্‌ষের কথাই আলাদা— কিন্তু সকালে স্নান আহ্নিক করে কিছু মুখে দিতে হয় না? দুটো বাতাসা কি একছড়া কলাও ঘরে রাখতে নেই?’

কালিদাস করুণ কণ্ঠে বলিলেন— ‘ভুল হয়ে যায় মালিনী।’

‘ভুল— সব তাতেই ভুল। এমন মানুষও দেখিনি কখনো— খাবার কথা ভুল হয়ে যায়!’

‘ঐ তো মালিনী, কবি জাতটাই ঐ রকম। পৃথিবীতে যে-কাজ সবচেয়ে দরকারী, তাতেই তাদের ভুল হয়ে যায়। আমার এক তুমিই ভরসা।’

অনির্বচনীয় প্রীতিতে মালিনীর মুখ ভরিয়া উঠিল। তবু সে তিরস্কারের ভঙ্গিতেই বলিল— ‘আচ্ছা হয়েছে, এবার খাওয়া হোক। মনে থাকে যেন গল্প যে-পর্যন্ত শুনেছি তারপর থেকে পড়ে শোনাতে হবে।’ সে সিক্ত বস্ত্র বেড়ার উপর শুকাইতে দিতে গেল, কালিদাস প্রসন্নমুখে আহারে মন দিলেন।

আহার শেষ হইলে আচমন করিয়া কালিদাস সম্মুখে রক্ষিত পুঁথি তুলিয়া লইলেন। ইত্যবসরে মালিনী বেদীর নীচে আসিয়া বসিয়াছিল এবং বেদীর উপর একটি বাহু রাখিয়া কালিদাসের মুখের পানে চাহিয়া পরম তৃপ্তিভরে প্রতীক্ষা করিতেছিল। কালিদাস পুঁথির পাতাগুলি সাজাইতে সাজাইতে বলিতে আরম্ভ করিলেন— ‘আচ্ছা শোনো এবার। ইন্দ্রসভা থেকে বিদায় নিয়ে মদন আর বসন্ত হিমালয়ে মহাদেবের তপোবনে উপস্থিত হলেন। অমনি হিমালয়ের বনে উপত্যকায় অকালবসন্তের আবির্ভাব হল। শুকনো অশোকের ডালে ফুল ফুটে উঠল, আমের মঞ্জরীতে ভোমরা এসে জুটলো। শোনো—

অসূত সদ্যঃ কুসুমান্যশোকঃ স্কন্ধাৎপ্রভৃত্যেব সপল্লবানি

পাদেন নাপৈক্ষত সুন্দরীনাং সম্পর্কমাশিঞ্জিত নূপুরেণ ॥’

কালিদাস একটু সুর করিয়া শ্লোকের পর শ্লোক পড়িয়া চলিলেন, মালিনী মুগ্ধ তন্ময় হইয়া শুনিতে লাগিল। শুনিতে শুনিতে তাহার চোখ দু’টি কখনো আবেশভরে মুকুলিত হইয়া আসিল, কখনো বা বিস্ফারিত হইয়া উঠিল; নিশ্বাস কখনো দ্রুত বহিল, কখনো স্তব্ধ হইয়া রহিল। মন্ত্রমুগ্ধ সর্পীর মত তাহার দেহ ছন্দের তালে তালে দুলিতে লাগিল। এ কি অনির্বচনীয় অনুভূতি! প্রতি শব্দ যেন মূর্তিমান হইয়া চোখের সামনে আসিয়া দাঁড়াইতেছে। কল্পনার অলৌকিক লীলাবিলাসে, ভাবের অগাধ গভীরতায়, ছন্দের অনাহত মন্দ্র মহিমায় মালিনী আপনাকে হারাইয়া ফেলিল। এমন গান সে আর কখনো শোনে নাই। মালিনী জানিত না যে এমন গান মানুষ পূর্বে আর কখনো শোনে নাই, সে-ই প্রথম শুনিল।

তৃতীয় সর্গ সমাপ্ত করিয়া কালিদাস ধীরে ধীরে পুঁথি বন্ধ করিলেন। কিছুক্ষণ উভয়ে নীরব। তারপর মালিনী গভীর একটি নিশ্বাস ত্যাগ করিয়া বাষ্পাকুল নেত্র কালিদাসের মুখের পানে তুলিল, ভাঙা ভাঙা স্বরে বলিল— ‘কবি, স্বর্গ বুঝি এমনিই হয়? কোন্‌ পুণ্যে আমি স্বর্গ চোখে দেখলুম!— না না, আমি এর যোগ্য নই, এ গান আমাকে শোনাবার জন্যে নয়— এ গান রাজাদের জন্যে। দেবতাদের জন্যে—’সহসা মালিনী কবির হাত চাপিয়া ধরিয়া বলিল— ‘কবি, আমার একটা কথা শুনবে? রানিমাকে তোমার গান শোনাবো?’

কালিদাসের মুখে বেদনার ছায়া পড়িল— ‘মালিনী, রাজারানীদের আমার গান শুনিয়ে কী লাভ! তোমার ভাল লেগেছে, এই যথেষ্ট।’

মালিনী ব্যাকুলভাবে বলিল— ‘না না কবি, আমার ভাল-লাগা কিছু নয়, আমার ভাল-লাগা তুচ্ছ। আমি কতটুকু? আমার বুকে আমি এত ভাল-লাগা ধরে রাখতে পারি না। কবি, বলো আমার কথা শুনবে? রাজাকে শোনাতে না চাও শুনিও না, কিন্তু রানিমা’কে তোমার গান শোনাতেই হবে। বলো শোনাবে! আমার রানী ভানুমতী— ওগো কবি, তুমি জানো না— তাঁর মত মানুষ আর হয় না। তিনিই তোমার মরম বুঝবেন, তিনি তোমার গানে ডুবে যাবেন—’

কালিদাসের বিমুখতা ক্রমে দূর হইতেছিল, তবু তিনি আপত্তি তুলিয়া বলিলেন— ‘কিন্তু কাব্য যে এখনো শেষ হয়নি।’

মালিনী বলিল— ‘না হোক। যা হয়েছে তাই শোনাবে।’

কালিদাস তখন দ্বিধাগ্রস্তভাবে বলিলেন— ‘তা— ভাল। রানী যদি শুনতে চান—’

কালিদাসের কথা শেষ হইবার পূর্বেই মালিনী সোল্লাসে উঠিয়া দাঁড়াইল।

রানী ভানুমতীর মহলে একটি প্রশস্ত কক্ষের মেঝেয় স্থানে স্থানে মৃগচর্মের আস্তরণ বিস্তৃত। মধ্যস্থলে একটি গজদন্ত পালঙ্কের উপর ভানুমতী অর্ধশয়ান রহিয়াছেন। বক্ষের নিচোল কিছু শিথিল, চুলের ফুল আতপ্ত দ্বিপ্রহরে মুরঝাইয়া গিয়াছে। রানীর কাছে দাসী কিঙ্করী কেহ নাই, কেবল মালিনী পালঙ্কের পাশে হাঁটু গাড়িয়া বসিয়া ব্যগ্র-হ্রস্ব কণ্ঠে কথা বলিতেছে— ‘হ্যাঁ গো রানিমা, সত্যি বলছি তোমাকে, এমন গান তুমিও শোনোনি কখনো। শুনতে শুনতে মনে হয়—’ মালিনী দুই হাত নাড়িয়া নিজের মনের অবস্থা বুঝাইবার চেষ্টা করিল কিন্তু পারিল না— ‘কি বলে বোঝাব তোমাকে ভেবে পাই না। চোখে জল আসে, বুক ভরে ওঠে— নাঃ বলতে পারছি না। তুমি একবার নিজের কানে শোনো রানিমা। দেখো তখন, সব ভুলে যাবে, সংসার মনে থাকবে না।’

মালিনীর উদ্দীপনা দেখিয়া ভানুমতী একটু হাসিলেন— ‘বড় সরলা তুই মালিনী। সংসার ভুলিয়ে দিতে পারে এমন কবি আজকাল আর জন্মায় না। আমি সব আধুনিক কবির গান শুনেছি; তারা সব স্তাবক— চাটুকার, কেবল ইনিয়ে বিনিয়ে রাজার প্রশস্তি লিখতে জানে।’

মালিনী বলিল— ‘ওগো রানিমা, আমার কবি তেমন নয়, সে কারুর তোষামোদ করে না, সে কেবল ঠাকুর দেবতার গান লেখে। মহাদেব পার্বতী— মদন বসন্ত— এই সব।’

ভানুমতী আলস্যজড়িত স্বরে বলিলেন— ‘যাই হোক, আমার মালিনীটিকে যে-কবি এমন করে পাগল করেছে, তাকে একবার দেখতে ইচ্ছে করে—’

মালিনী উৎসাহে আহ্লাদে রানীর উপর ঝুঁকিয়া পড়িল— ‘দেখবে তাকে রানিমা? দেখবে?’

ভানুমতী বলিলেন— ‘দেখতে পারি। কিন্তু কি করে সম্ভব ভেবে পাচ্ছি না। — তোর কবি তো রাজসভায় যাবে না; আর অন্দরমহলে আনা, সেও অসম্ভব।’

মালিনী বলিল— ‘অসম্ভব কেন রানিমা, তোমার হুকুম পেলে আমি সব ঠিক করতে পারি।’

‘কী ঠিক করতে পারিস?’

‘এই— আমার কবি চুপিচুপি তোমার মহলে এসে গান শুনিয়ে যাবে, কেউ কিছু জানতে পারবে না। তুমি শুধু তোমার চেড়িদের একটু তফাতে রেখো— বাকি যা দরকার আমি করব।’

ভানুমতী ঊর্ধ্বে চক্ষু তুলিয়া একটু ভ্রূকুটি করিলেন, একটু হাসিলেন— ‘মন্দ হয় না, নতুন রকমের হয়। আর্যপুত্রকে—’

এক যবনী প্রতিহারী আসিয়া দ্বারের বাহিরে দাঁড়াইল। তাহার নীল চক্ষু, সোনালী চুল, বক্ষে লৌহজালিক; ভাঙা-ভাঙা উচ্চারণ। সে বলিল— ‘দেবপাদ মহারাজ আসছেন, সঙ্গে কঞ্চুকী মহাশয়।’

বার্তা ঘোষণা করিয়া প্রতিহারী অপসৃতা হইল। রানী তাড়াতাড়ি উঠিয়া বসিয়া উত্তরীয় দ্বারা অঙ্গ আবৃত করিলেন। তাঁহার চোখের ইঙ্গিতে মালিনী ঘরের এক কোণে গিয়া দাঁড়াইল।

বিক্রমাদিত্য প্রবেশ করিলেন, পশ্চাতে কঞ্চুকী। কঞ্চুকী নপুংসক; কৃশকায় মুণ্ডিতশীর্ষ কদাকার, চোখের দৃষ্টিতে সন্দেহ ও অসন্তোষ স্থায়িভাব ধারণ করিয়াছে। নিম্ব ভক্ষণের অব্যবহিত পরে মুখের আকৃতি যেরূপ হয়, কঞ্চুকীর মুখের সহজ অবস্থাই সেইরূপ।

ভানুমতী অঞ্জলিবদ্ধ হস্তে দাঁড়াইয়া আর্যপুত্রের সংবর্ধনা করিলেন, উভয়ের চোখে চোখে যে প্রসন্নতার বিনিময় হইল, তাহা হইতে অনুমান হয় যে এই রাজ-দম্পতির মধ্যে প্রণয়ের উৎসধারা এখনো মন্দবেগ হয় নাই। রানীর দিকে আসিতে আসিতে রাজা একবার পশ্চাদ্দিকে মুখ ফিরাইয়া বলিলেন— ‘তুমি এখন যেতে পারো কঞ্চুকী।’

কঞ্চুকী পশ্চাৎ হইতে রাজ-দম্পতিকে নমস্কার করিয়া ফিরিয়া চলিল। দ্বারের কাছে পৌঁছিয়া সে ঘরের চারিদিকে একবার সতর্ক সন্দিগ্ধ চক্ষু ফিরাইল; ঘরের কোণে দণ্ডায়মানা মালিনীর প্রতি তাহার দৃষ্টি পড়িল। ভীষণ ভ্রূকুটি করিয়া সে সেইদিকে তাকাইয়া রহিল, তারপর নিঃশব্দে মুণ্ড সঞ্চালন করিয়া তাহাকে কক্ষ হইতে নিষ্ক্রান্ত হইবার ইঙ্গিত করিল। মালিনী শঙ্কিত মুখে পা টিপিয়া টিপিয়া কঞ্চুকীর আগে আগে দ্বারপথে নির্গত হইল।

কক্ষ শূন্য হইয়া গেলে ভানুমতী দুই বাহু দিয়া রাজার কণ্ঠ আলিঙ্গন করিয়া স্নিগ্ধ কৌতুকের স্বরে বলিলেন— ‘আজ বুঝি আমার সতীন পতিদেবতাকে ধরে রাখতে পারল না?’

মহারাজ স্মিতমুখে ভ্রূ তুলিলেন— ‘তোমার সতীন?’

ভানুমতী বলিলেন— ‘তাকে আপনি চেনেন না আর্যপুত্র? পুরুষ জাতি এমনি কপটই বটে। আমার সতীনের নাম রাজসভা, যাকে ছেড়ে আপনি এক দণ্ডও থাকতে পারেন না।’

রাজা ভানুমতীর কুন্তল হইতে একটি ফুল লইয়া আঘ্রাণ করিলেন, আবার তাহা যথাস্থানে রাখিয়া দিলেন। ভানুমতী বলিয়া চলিলেন— ‘শুনেছি কনিষ্ঠা ভার্যার প্রতি পুরুষের অনুরাগ বেশি হয়, কিন্তু মহারাজের সবই বিপরীত— জ্যেষ্ঠার প্রতি তাঁর আসক্তি বেশি। রাজ্যশ্রী চিরযৌবনা, তাই বুঝি তাকে এত ভালবাসেন মহারাজ।’

বিক্রমাদিত্যের মুখ হইতে কৌতুকের ছায়া অপসৃত হইল, তিনি ভানুমতীর মুখ দুই হাতে তুলিয়া ধরিয়া কিছুক্ষণ গভীর অনুরাগভরে চাহিয়া রহিলেন, তারপর ধীরে ধীরে বলিলেন— ‘তা জানি না। রাজ্যশ্রী যদি যায়, তবু তুমি আমার বুক জুড়ে থাকবে। কিন্তু তুমি যদি যাও আমার চোখে রাজ্যশ্রীর এ সম্মোহন রূপ কি থাকবে? রাজলক্ষ্মী যে তোমারই ছায়া ভানুমতী।’

বাষ্পাকুল চক্ষে ভানুমতী পতির বক্ষের উপর ললাট রাখিলেন, গদ্‌গদ কণ্ঠে বললেন— ‘ও কথা বলতে নেই প্রিয়তম। রাজলক্ষ্মীই প্রধানা, আমি কেউ নই। মহাকাল করুন রাজলক্ষ্মীর কোলে আপনাকে তুলে দিয়ে যেন যেতে পারি।’

কিছুক্ষণ উভয়ে তদবস্থায় রহিলেন। বাহিরে মানমন্দির হইতে দিবা তৃতীয় প্রহর ঘোষণা করিয়া বাঁশি বাজিয়া উঠিল। রানীর একটি সখী মঞ্জীর বাজাইয়া কক্ষের দ্বার পর্যন্ত আসিয়া রাজ-দম্পতিকে আশ্লেষবদ্ধ অবস্থায় দেখিয়া জিহ্বাকর্তনপূর্বক লঘুচরণে পলায়ন করিল।

রাজারানী পরস্পরকে ছাড়িয়া দিয়া পালঙ্কের উপর পাশাপাশি বসিলেন; ভানুমতী হাসিমুখে বলিলেন— ‘কিন্তু আজ মহারাজ তিন প্রহরের আগেই সভা থেকে পালিয়ে এলেন কেন তা তো বললেন না। সভাকবিরা কি চিত্তবিনোদন করতে পারল না?’

রাজা মুখে কারুণ্য ফুটাইয়া বলিলেন— ‘চিত্তবিনোদন! সভাকবিদের ভয়েই তো তোমার কাছে পালিয়ে এসেছি ভানুমতী।’

হাস্য গোপন করিয়া রানী কপট ভর্ৎসনার কণ্ঠে বলিলেন— ‘ছি মহারাজ, আপনি বীর কেশরী, আর কিনা কয়েকজন নির্জীব হংসপুচ্ছধারী কবির ভয়ে পালিয়ে এলেন?’

বিক্রমাদিত্য বলিলেন— ‘উপায় কি? কবি দিঙ্‌নাগ সংবাদ পাঠালেন যে তিনি ‘কুম্ভকর্ণ-সংহার’ নামে মহাকাব্য শেষ করেছেন, আমাকে শোনাবার জন্যে উটের পিঠে কাব্য বোঝাই করে সভায় নিয়ে আসছেন। শুনে অমরসিংহ, বররুচি, বরাহমিহির— যাঁরা সভায় ছিলেন, সকলেই উঠে দ্রুত প্রস্থান করলেন। আমিও আর বিলম্ব করা অনুচিত বিবেচনা করে অন্তঃপুরের দিকে চলে এলাম। এখানে অন্তত দিঙ্‌নাগ ঢুকতে পারবে না।’

ভানুমতী কলকণ্ঠে হাসিয়া উঠিলেন। রাজা বলিলেন— ‘এবার এসো, একদান পাশা খেলা যাক।’

ভানুমতী হাস্য সংবরণ করিয়া ডাকিলেন— ‘মধুশ্রী! বনজ্যোৎস্না!’

দুইটি সখী দ্বারের কাছে আসিয়া দাঁড়াইল। ভানুমতী তাঁহাদের বলিলেন— ‘মহারাজ পাশা খেলবেন, খেলার উপযোগ কর।’

সখিদ্বয় ত্বরিতে কাজে লাগিয়া গেল। মধুশ্রী কুট্টিমের মধ্যস্থল হইতে মৃগচর্ম অপসারিত করিতেই মর্মরের উপর খোদিত অক্ষবাট বাহির হইয়া পড়িল; বনজ্যোৎস্না দুইটি পক্ষ্মল আসন তাহার দুই পাশে বিছাইয়া দিল, তারপর ঘরের কোণ হইতে গজদন্তের একটি ক্ষুদ্র পেটিকা আনিয়া অক্ষবাটের পাশে রাখিল।

রাজা ও রানী গিয়া আসনে বসিলেন; রাজা পেটিকাটি অক্ষবাটের উপর উজাড় করিয়া দিয়া পার্ষ্টি তিনটি তুলিয়া লইলেন, রানী রঙিন গুটিকাগুলি যথাস্থানে সাজাইতে লাগিলেন।

রাজা পার্ষ্টিগুলি দুই হাতে ঘষিতে ঘষিতে বলিলেন— ‘আজ তোমাকে নিশ্চয় হারাবো।’ তাঁহার কথার ভাবে মনে হয় রানীকে দ্যূতক্রীড়ায় পরাস্ত করা তাঁহার ভাগ্যে বড় একটা ঘটিয়া ওঠে না।

রানী মুখ টিপিয়া হাসিলেন— ‘ভাল কথা। কিন্তু যদি হেরে যান কী পণ দেবেন?’

বিক্রমাদিত্য উদার কণ্ঠে বলিলেন— ‘যা চাও। অঙ্গদ কুণ্ডল দণ্ড মুকুট— কিছুতেই আপত্তি নেই। — জয় কৈতবনাথ!’

মহারাজ ঘর্ঘর শব্দে পাশা ফেলিলেন। খেলা আরম্ভ হইয়া গেল।

দেখিতে দেখিতে খেলা জমিয়া উঠিল। আরো কয়েকটি সখী কিঙ্করী আসিয়া জুটিল এবং চারিদিকে ঘিরিয়া বসিয়া সকুতূহলে খেলা দেখিতে লাগিল। রাজার পাশে সুরা-ভৃঙ্গার, রানীর পাশে তাম্বূলকরঙ্ক; দু’জনেই খেলায় মাতিয়া উঠিয়াছেন। খেলার মত্ততায় তাঁহারা কখনো কলহ করিতেছেন, কখনো উচ্চহাস্য করিতেছেন; মুখের অর্গলও খুলিয়া গিয়াছে, প্রগল্‌ভ শাণিত বাক্যবাণে উভয়ে পরস্পরকে বিদ্ধ করিতেছেন। সখীরা পরম কৌতুকে এই রঙ্গরস উপভোগ করিতেছে।

ক্রমে খেলা শেষ হইয়া আসিল। মহারাজের মুখ দেখিয়া স্পষ্টই প্রতীয়মান হইল তাঁহার অবস্থা ভাল নয়। তবু তিনি বীরের ন্যায় শেষ পর্যন্ত লড়িলেন। কিন্তু কোনো ফল হইল না। বাজি শেষ হইলে ভানুমতী উচ্ছলিত হাসিয়া বলিলেন— ‘আর্যপুত্র, আবার আপনি হেরে গেলেন!’

বিক্রমাদিত্য অত্যন্ত বিমর্ষভাবে একপাত্র সুরা পান করিয়া ফেলিলেন,— তারপর কপট ক্রোধের ভ্রূভঙ্গি করিয়া বলিলেন— ‘অয়ি দর্পিতা বিজয়িনি, তোমার বড় অহঙ্কার হয়েছে। আচ্ছা, আর একদিন তোমার গর্ব খর্ব করব। এখন তোমার পণ দাবি কর।’

ভানুমতী মৃদু মৃদু হাসিতে লাগিলেন, তাঁহার চক্ষু অর্ধ-নিমীলিত হইয়া আসিল। তিনি কুহক মধুর স্বরে বলিলেন— ‘এখন নয় আর্যপুত্র। আজ রাত্রে— নিভৃতে— আমার বর ভিক্ষা চেয়ে নেব।’

রাজার চক্ষু দু’টিও প্রীতিহাস্যে ভরিয়া উঠিল।

রাজপুরীর পুরসীমার অন্তর্ভুক্ত বিহার ভূমি। অদূরে অবরোধের তোরণদ্বার দেখা যাইতেছে।

বৃক্ষ গুল্মাদি শোভিত বিহার ভূমির উপর দিয়া মালিনী ও কালিদাস অবরোধের পানে চলিয়াছেন। কালিদাসের বাহুতলে অসমাপ্ত কুমারসম্ভবের পুঁথি। মালিনী সাবধান সতর্ক চক্ষে চারিদিকে চাহিতে চাহিতে চলিয়াছে।

কবি মৃদু মৃদু হাসিতেছেন, তাঁহার ভাব-ভঙ্গিতে বিশেষ সতর্কতা নাই; তিনি যেন মালিনীর এই ছেলেমানুষী কাণ্ডে লিপ্ত হইয়া একটু আমোদ অনুভব করিতেছেন মাত্র। ক্রমে দু’জনে অবরোধদ্বারের অনতিদূরে এক বৃক্ষতলে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। মালিনী সংহত কণ্ঠে বলিল— ‘আস্তে। সামনেই দেউড়ি।’

কালিদাস উঁকি মারিয়া দেখিলেন। আমাদের পূর্বপরিচিত নবযুবক দৌবারিক শূলহস্তে পাহারায় নিযুক্ত— আর কেহ নাই।

মালিনী দ্রুত-অনুচ্চ কণ্ঠে কালিদাসকে কিছু উপদেশ দিয়া একাকিনী অবরোধদ্বারের দিকে অগ্রসর হইল; কালিদাস বৃক্ষকাণ্ডের আড়ালে দাঁড়াইয়া রহিলেন।

রক্ষী দ্বারের সম্মুখে পরিক্রমণ করিতেছিল, মালিনীকে আসিতে দেখিয়া একগাল হাসিল। মালিনী পা টিপিয়া টিপিয়া তাহার সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইল, মুখের দিকে চাহিয়া ঈষৎ হাসিল, তারপর সন্ত্রস্তভাবে এদিকে ওদিকে চাহিয়া নিজ ঠোঁটের উপর তর্জনী রাখিল।

রক্ষী ঘোর বিস্ময়ে প্রশ্ন করিল— ‘কি হয়েছে? অমন করছ, কেন?’

মালিনী চাপা গলায় বলিল— ‘চুপ— চেঁচিও না। তোমার জন্য একটা জিনিস এনেছি!’

রক্ষী সাগ্রহে জিজ্ঞাসা করিল— ‘কি জিনিস?’

মালিনী রহস্যপূর্ণভাবে বলিল— ‘লাড়ু।’ কোঁচড়ের উপর হাত রাখিয়া্‌ মালিনী ইঙ্গিতে জানাইল যে লাড়ু ঐখানে আছে। রক্ষীর মুখ আনন্দে বিহ্বল হইয়া উঠিল। সে বলিল— ‘অ্যাঁ— লাড়ু! আমার জন্যে এনেছ? দেখি দেখি।’

মালিনী মাথা নীড়িল— ‘এখানে নয়। খাবে তো ওদিকে চল— ঐ মল্লিকা-ঝাড়ের আড়ালে।’

লাড়ু খাইবার জন্য মল্লিকা-ঝাড়ের আড়ালে যাইবার কী প্রয়োজন? কিংবা মালিনীর মনে আরো কিছু আছে? উৎসাহে রক্ষী ঘর্মাক্ত হইয়া উঠিল। কিন্তু অবরোধের দ্বার ছাড়িয়াই বা যায় কি করিয়া! সে ইতস্তত করিয়া বলিল— ‘তা— তা— দেউড়ি খালি থাকবে?’

মালিনী বলিল— ‘তাতে কি হয়েছে? এ সময় কেউ আসবে না।’

রক্ষী দ্বিধাগ্রস্তভাবে বলিল— ‘তা আসে না বটে— কিন্তু কঞ্চুকী মশাই—। কাজ নেই মালিনী, তুমি লাড়ু দাও, আমি এখানে দাঁড়িয়েই খাই।’

মালিনী ক্রমেই অসহিষ্ণু হইয়া উঠিতেছিল, বলিল— ‘দেউড়িতে দাঁড়িয়ে লাড়ু খাবে! যদি কেউ দেখে ফ্যালে কী ভাববে বলে দেখি।’

রক্ষী বলিল— ‘তাও বটে। কিন্তু উপায় কি বলো? দেউড়ি ছাড়া যে বারণ।’

মালিনী রাগ করিয়া মুখ ফিরাইয়া দাঁড়াইল, বলিল— ‘বেশ, কাজ নেই তোমার লাড়ু খেয়ে, আমি আর কাউকে খাওয়াব। এত যত্ন করে নিজের হাতে তৈরি করেছিলুম—’

রক্ষী আর পারিল না, বলিল,— ‘না না মালিনী, তোমার লাড়ু খাচ্ছি। চল কোথায় যাবে।’

দেয়ালের গায়ে বল্লম হেলাইয়া রাখিয়া রক্ষী মালিনীর পিছে পিছে চলিল। ওদিকে কালিদাস গাছের আড়াল হইতে উঁকি মারিয়া দেখিতেছিলেন। তোরণ হইতে বিংশতি হস্ত দক্ষিণে একটি মল্লিকার ঝোপ ছিল, মালিনী ও রক্ষী তাহার আড়ালে গিয়া দাঁড়াইল। মালিনী সাবধানে একবার চারিদিকে চাহিয়া লইয়া রক্ষীকে দ্বারের দিকে পিছন করিয়া দাঁড় করাইল। রক্ষী ব্যাপার না বুঝিয়া বিস্ময়ভরে মালিনীকে নিরীক্ষণ করিতে লাগিল।

মালিনী বলিল— ‘হয়েছে। এবার চোখ বোজো।’

রক্ষী বলিল— ‘চোখ বুজবো? কেন?’

মালিনী ধমক দিয়া বলিল— ‘যা বলছি কর। যতক্ষণ হুকুম না দিই চোখ খুলবে না।’

রক্ষী অগত্যা চক্ষু মুদিত করিল। লাড়ুর লোভ যতটা না হোক, মালিনীকে প্রসন্ন রাখা প্রয়োজন! সে একটুতে বড় রাগিয়া যায়।

মালিনীর কিন্তু রক্ষীকে বিশ্বাস নাই; কে জানে হয়তো চোখের পাতার ফাঁকে দেখিতেছে। মালিনী তাহার মুখের কাছে মুখ লইয়া গিয়া ভাল করিয়া পরীক্ষা করিল; না, চোখ বুজিয়াই আছে, দেখিতেছে না। মালিনী তখন হাত তুলিয়া কালিদাসকে ইশারা করিল। কালিদাস বৃক্ষতল হইতে নিষ্ক্রান্ত হইয়া গুটিগুটি অরক্ষিত দ্বারের পানে চলিলেন।

রক্ষী চক্ষু বুজিয়া থাকিয়া অসহিষ্ণু হইয়া উঠিতেছিল, বলিল— ‘কি হল! লাড়ু কৈ?’

মালিনী চকিতে তাহার দিকে ফিরিয়া বলিল— ‘এই যে। হাঁ করো।’

রক্ষী হাঁ করিল, সঙ্গে সঙ্গে চক্ষু দু’টিও খুলিয়া গেল। কালিদাস তখনো অর্ধপথে; মালিনী ভয় পাইয়া বলিয়া উঠিল— ‘ও কি করছ! চোখ বন্ধ কর— চোখ বন্ধ কর।’

কালিদাস রক্ষীর পিছন দিক দিয়া যাইতেছিলেন। তাই সে তাঁহাকে দেখিতে পাইল না। সে আবার চোখ বন্ধ করিল, সঙ্গে সঙ্গে মুখও বন্ধ হইল। মালিনী গলা বাড়াইয়া দেখিল কালিদাস নির্বিঘ্নে তোরণে প্রবেশ করিলেন। তখন স্বস্তির নিশ্বাস ফেলিয়া সে রক্ষীর মুখের পানে চাহিল, হাসিয়া বলিল— ‘নাও এবার মুখ খোলো।’

রক্ষী যুগপৎ চক্ষু ও মুখ খুলিল।

মালিনী বলিল— ‘দূর, হল না। চোখ বন্ধ, মুখ খোলা— এই রকম— বুঝলে।’

মালিনী প্রক্রিয়া দেখাইয়া দিল। কিন্তু কয়েকবার চেষ্টা করিয়াও রক্ষী কৃতকার্য হইল না; হাঁ করিলেই চক্ষু খুলিয়া যায়। মালিনী হাসিতে লাগিল। রক্ষী কাতর স্বরে বলিল— ‘কি করি— হচ্ছে না যে।’

মালিনী বলিল— ‘তাহলে লাড়ু পেলে না।’

হাসিতে হাসিতে সে দ্বারের দিকে চলিল। অর্ধপথে থামিয়া ঘাড় ফিরাইয়া বলিল— ‘তুমি ততক্ষণ অভ্যেস কর। ফিরে এসে যদি দেখি ঠিক হয়েছে, তখন লাড়ু পাবে।’

মালিনী অবরোধের ভিতর অন্তর্হিত হইয়া গেল। রক্ষী বিমর্ষ মুখে ফিরিয়া আসিয়া বল্লমটি তুলিয়া লইল, তারপর স্থির হইয়া দাঁড়াইয়া গভীর মনঃসংযোগে চক্ষু মুদিত রাখিয়া মুখব্যাদান করিবার দুরূহ সাধনায় আত্মনিয়োগ করিল।

অবরোধের প্রাচীরবেষ্টনীর মধ্যে একটি উদ্যানে মহাদেবী ভানুমতীর সখী-কিঙ্করীরা জমা হইয়াছে। তাহাদের সংখ্যা কম নয়, প্রায় গুটি পঞ্চাশ। কেহ বৃক্ষশাখায় লম্বিত ঝুলায় দুলিতে দুলিতে গান করিতেছে; এক ঝাঁক যুবতী ছুটাছুটি করিয়া খেলা করিতেছে; কোথাও দুইটি সখী পাশাপাশি বসিয়া মালা গাঁথিতেছে এবং মৃদুকণ্ঠে জল্পনা করিতেছে। আজ তাহারা রানীর পরিচর্যা হইতে ছুটি পাইয়াছে।

দূর হইতে কালিদাস তাঁহাদের দেখিতে পাইয়া সেইদিকেই চলিয়াছিলেন, পিছন হইতে মালিনী ছুটিতে ছুটিতে আসিয়া তাঁহাকে ধরিয়া ফেলিল। আর একটু হইলেই সর্বনাশ হইয়াছিল; সখীরা দেখিতে পাইত অবরোধে পুরুষ প্রবেশ করিয়াছে। কঞ্চুকী মহাশয়ের কানে কথা উঠিত—

মালিনী দৃঢ়ভাবে কবির হাত ধরিয়া তাঁহাকে অন্য পথে টানিয়া লইয়া চলিল। —

মহাদেবী ভানুমতীর বিরামকক্ষটি লূতাজালের মত সূক্ষ্ম তিরস্করিণীর দ্বারা দুই ভাগে বিভক্ত করা হইয়াছে। এক ভাগে রানীর বসিবার আসন, অন্য ভাগে কবির জন্য একটি মৃগচর্ম ও পুঁথি রাখিবার নিম্ন কাষ্ঠাসন। ভানুমতী নিজ আসনে বসিয়া প্রতীক্ষা করিতেছেন, কক্ষে অন্য কেহ নাই।

ত্বরিত অথচ সতর্ক পদক্ষেপে মালিনী দ্বারের কাছে আসিয়া দাঁড়াইল, একবার ঘরের চারিদিকে ক্ষিপ্র দৃষ্টিপাত করিয়া মস্তক সঞ্চালনে রানীকে জানাইল যে কালিদাস আসিয়াছেন। রানী বেশবাস সংবরণপূর্বক ঘাড় নাড়িয়া অনুমতি দিলেন। তখন মালিনী পাশের দিকে হাতছানি দিয়া ডাকিল।

কালিদাস অলিন্দে অপেক্ষা করিতেছিলেন, দ্বারের সম্মুখে আসিলেন; উভয়ে কক্ষে প্রবেশ করিলেন। মালিনী ভিতর হইতে কক্ষের দ্বার বন্ধ করিয়া দিল।

রানীকে দেখিতে পাইয়া কালিদাস হাত তুলিয়া সংযত স্বরে বলিলেন— ‘স্বস্তি।’

কালিদাসের প্রশান্ত অপ্রগল্‌ভ মুখচ্ছবি, তাঁহার অনাড়ম্বর হ্রস্বোক্তি ভানুমতীর ভাল লাগিল, মনের ঔৎসুক্যও বৃদ্ধি পাইল। তিনি স্মিতমুখে হস্ত প্রসারণ করিয়া কবিকে বসিবার অনুজ্ঞা জানাইলেন।

কবি আসনে উপবেশন করিয়া পুঁথির বাঁধন খুলিতে লাগিলেন; মালিনী অদূরে মেঝের উপর বসিল।

অবরোধের উদ্যানে ভানুমতীর সখীরা পূর্ববৎ গান গাহিতেছে, ঝুলায় বুলিতেছে, ছুটাছুটি করিয়া খেলা করিতেছে। একটি সখী কোমরে আঁচল জড়াইয়া লীলাভরে নৃত্য করিতেছে, অন্য কয়েকটি তরুণী করকঙ্কণ বাজাইয়া গান ধরিয়াছে—

ওপথে দিস্‌নে পা

দিস্‌নে পা লো সই

মনে তোর রইবে না সুখ

রইবে না লো সই।

যদি না মন বাঁচে

কালো তোর হবে সোনার গা লো সই—

ভানুমতীর কক্ষে কুমারসম্ভব পাঠ আরম্ভ হইয়াছে। ভানুমতী করলগ্নকপোলে শুনিতেছেন, প্রতি শ্লোকের অনুপম সৌন্দর্যে মুগ্ধ হইয়া মাঝে মাঝে বিস্ময়োৎফুল্ল চক্ষু কবির মুখের পানে তুলিতেছেন। কোথা হইতে আসিল এই অখ্যাতনামা ঐন্দ্রজালিক, এই তরুণকান্তি কথাশিল্পী!

কালিদাস পড়িতেছেন— উমার রূপ বর্ণনা :

দিনে দিনে সা পরিবর্ধমান লব্ধোদয়া চান্দ্রমসীব লেখা—

ভানুমতীর বিরামকক্ষের পাশে একটি গুপ্ত অলিন্দ আছে; দেখিতে কতকটা সুড়ঙ্গের মত। প্রাচীরগাত্রে মাঝে মাঝে প্রচ্ছন্ন রন্ধ্র আছে, সেই রন্ধ্রপথে কক্ষের অভ্যন্তর দেখা যায়। অবরোধের প্রত্যেক কক্ষে, যাহাতে কঞ্চুকী মহাশয় স্বয়ং অলক্ষ্যে থাকিয়া লক্ষ্য রাখিতে পারেন সেই জন্য এইরূপ ব্যবস্থা।

রানীর একটি সহচরী— নাম ভ্রমরী— পা টিপিয়া টিপিয়া অলিন্দ পথে চলিয়াছে। তাহার মুখে সন্দেহপূর্ণ উত্তেজনার ব্যঞ্জনা। একটি ছিদ্রের নিকটে আসিয়া সে কান পাতিয়া শুনিল— কক্ষ হইতে একটানা গুঞ্জনধ্বনি আসিতেছে। তখন ভ্রমরী ডিঙি মারিয়া সন্তর্পণে ছিদ্রপথে উঁকি মারিল।

রন্ধ্রটি নীচের দিকে ঢালু; ভ্রমরী কক্ষের কিয়দংশ দেখিতে পাইল। কালিদাস কাব্য পাঠ করিতেছেন, স্বচ্ছ তিরস্করিণীর অন্তরালে ভানুমতী উপবিষ্টা। মালিনী রন্ধ্রের দৃষ্টিচক্রের বাহিরে ছিল বলিয়া ভ্রমরী তাহাকে দেখিতে পাইল না।

কিছুক্ষণ একাগ্রভাবে নিরীক্ষণ করিয়া ভ্রমরী রন্ধ্রমুখ হইতে সরিয়া আসিল, উত্তেজনা-বিবৃত চক্ষে চাহিয়া নিজ তর্জনী দংশন করিল; তারপর দ্রুত লঘুপদে ফিরিয়া চলিল।

অতঃপর ভ্রমরী উদ্যানে ফিরিয়া গিয়া তাহার প্রিয় বয়স্যা মধুশ্রীকে কী বলিল, মধুশ্রী তাহার প্রিয়সখী মঞ্জুলার কানে কানে কী বার্তা শুনাইল এবং সর্বশেষে অবরোধের রক্ষক কঞ্চুকী মহাশয়ের কাছে সংবাদটি কীভাবে বহুবর্ণে রঞ্জিত হইয়া উপস্থিত হইল তাহার বিশদ বর্ণনা প্রয়োজন নাই। গুপ্তকথার বিচিত্র ভুজঙ্গপ্রয়াত গতিভঙ্গির সহিত আমরা সকলেই অল্পবিস্তর পরিচিত।

ইতিমধ্যে, রানী ভানুমতীর কক্ষে কালিদাস রতিবিলাপ নামক চতুর্থ সর্গ পাঠ শেষ করিয়াছেন। এই পর্যন্তই লেখা হইয়াছে। মদনপ্রিয়া রতির নব-বৈধব্যের মর্মান্তিক বর্ণনা শুনিয়া দেবী ভানুমতী কাঁদিয়াছেন, তাঁহার চক্ষু দু’টি অরুণাভ। মালিনীর কপোলও অশ্রুধারায় অভিষিক্ত।

পাঠ শেষে কালিদাস ধীরে ধীরে পুঁথি বন্ধ করিলেন; ভানুমতী আর্দ্র তদ্‌গত কণ্ঠে বলিলেন— ‘ধন্য কবি! ধন্য মহাভাগ!’—

কঞ্চুকী এতক্ষণে আসিয়া গুপ্ত রন্ধ্রপথে উঁকি মারিতেছিল। কক্ষ হইতে কোমল কণ্ঠস্বর ভাসিয়া আসিল, রানী বলিতেছেন— ‘আবার কতদিনে দর্শন পাব?’

কালিদাস বলিলেন— ‘দেবি, আপনার অনুগ্রহ লাভ করে আমি কৃতার্থ; যখন আদেশ করবেন তখনি আসব। কিন্তু কাব্য শেষ হতে এখনো বিলম্ব আছে—’

ভানুমতী বাধা দিয়া বলিলেন— ‘না না, শেষ হওয়া পর্যন্ত আমি অপেক্ষা করতে পারব না।’

কালিদাস স্মিতমুখে কহিলেন— ‘ভাল, পরের সর্গ শেষ করে আমি আবার আসব।’

হাত তুলিয়া সসম্ভ্রমে অভিবাদনপূর্বক কালিদাস মালিনীর দিকে ফিরিলেন।

কঞ্চুকী রন্ধ্রমুখে কান খাড়া করিয়া শুনিতেছিল, কিন্তু আর কিছু শুনিতে পাইল না। তখন সে রন্ধ্রমুখ হইতে সরিয়া আসিয়া ভ্রূবদ্ধ ললাটে ক্ষণেক চিন্তা করিল, তারপর শিখার গ্রন্থি খুলিয়া আবার তাহা বাঁধিতে বাঁধিতে অলিন্দ হইতে অপসৃত হইল।

বিক্রমাদিত্যের অস্ত্রাগার। একটি বৃহৎ কক্ষ; নানাবিধ অস্ত্রশস্ত্রে প্রাচীরগুলি সুসজ্জিত। এই অস্ত্রগুলির উপর মহারাজের যত্ন ও মমতার অন্ত নাই। তিনি স্বহস্তে এগুলিকে প্রতিনিয়ত মার্জন করিয়া থাকেন।

বর্তমানে, কক্ষের মধ্যস্থলে একটি বেদিকার প্রান্তে বসিয়া তিনি তাঁহার সর্বাপেক্ষা প্রিয় তরবারিটি পরিষ্কার করিতেছেন। তাঁহার পাশে ঈষৎ পশ্চাতে দাঁড়াইয়া কঞ্চুকী নিম্নস্বরে কথা বলিতেছে। রাজার মুখ কালবৈশাখীর মেঘের মত অন্ধকার; চক্ষে মাঝে মাঝে বিদ্যুদ্বহ্নির চমক খেলিতেছে। তিনি কিন্তু কঞ্চুকীর মুখের পানে তাকাইতেছেন না।

কঞ্চুকী বার্তা শেষ করিয়া বলিল— ‘যেখানে স্বয়ং মহাদেবী— এঁ— লিপ্ত রয়েছেন সেখানে আমার স্বাধীনভাবে কিছু করার অধিকার নেই। এখন দেবপাদ মহারাজের যেমন অভিরুচি।’

মহারাজ তাঁহার চক্ষু তরবারি হইতে তুলিয়া ঈষৎ ঘাড় বাঁকাইয়া কঞ্চুকীর পানে চাহিলেন; কয়েক মুহূর্ত তাঁহার খরধার দৃষ্টি কঞ্চুকীর মুখের উপর স্থির হইয়া রহিল। তারপর আবার তরবারিতে মনঃসংযোগ করিয়া তিনি ধীর সংযত কণ্ঠে বলিলেন— ‘এখন কিছু করবার দরকার নেই। শুধু লক্ষ্য রাখবে। সে— সে— ব্যক্তি যদি আবার আসে তৎক্ষণাৎ আমাকে সংবাদ দেবে।’

কঞ্চুকী মাথা ঝুঁকাইয়া সম্মতি জানাইল। তাহার বিকৃত মনোবৃত্তি যে এই ব্যাপারে উল্লসিত হইয়াছে, তাহা তাহার স্বভাব-তিক্ত মুখ দেখিয়াও বুঝিতে বিলম্ব হয় না।

রাজপ্রাসাদের স্ফটিকনির্মিত ডমরুসদৃশ বালু-ঘটিকা হইতে ক্ষীণ ধারায় বালু ঝরিয়া পড়িতেছে। কয়েক সপ্তাহ অতীত হইয়াছে।

একদিন অপরাহ্ণে ভানুমতীর কক্ষে কবির জন্য মৃগচর্ম ও পুঁথি রাখিবার জন্য কাষ্ঠাসন যথাস্থানে ন্যস্ত হইয়াছে। ভানুমতী নতজানু হইয়া পরম শ্রদ্ধাভরে কাষ্ঠাসনটি ফুল দিয়া সাজাইয়া দিতেছেন। কক্ষে অন্য কেহ নাই।

মালিনী দ্বারের নিকট প্রবেশ করিয়া মস্তক-সঞ্চালনে ইঙ্গিত করিল; প্রত্যুত্তরে ভানুমতী ঘাড় নাড়িলেন, তারপর তিরস্করিণীর অন্তরালে নিজ আসনে গিয়া বসিলেন।

মালিনী বাহিরের দিকে হাতছানি দিয়া কবিকে ডাকিল, কবি পুঁথি-হস্তে দ্বারের নিকট আসিয়া দাঁড়াইলেন।

এই সময় বিক্রমাদিত্য নিজ অস্ত্রাগারে বসিয়া একাকী একটি চর্মনির্মিত গোলাকৃতি বর্ম পরিষ্কার করিতেছিলেন। কঞ্চুকী বাহির হইতে আসিয়া দ্বারের কাছে দাঁড়াইল; মহারাজ তাহার দিকে চক্ষু তুলিলেন। কঞ্চুকী কিছুক্ষণ স্থির নেত্রে চাহিয়া থাকিয়া যেন রাজার অকথিত প্রশ্নের উত্তরে ধীরে ধীরে ঘাড় নাড়িল।

রাজা বর্ম রাখিয়া দ্বারের কাছে গেলেন। দ্বারের পাশে প্রাচীরে একটি কোষবদ্ধ তরবারি ঝুলিতেছিল, কঞ্চুকী তাহা তুলিয়া লইয়া অত্যন্ত অর্থপূর্ণভাবে রাজার সম্মুখে ধরিল। রাজা একবার তীব্র দৃষ্টিতে কঞ্চুকীকে নিরীক্ষণ করিলেন, তারপর এক ঝটকায় তরবারি কোষমুক্ত করিয়া স্বহস্তে তরবারি লইয়া কক্ষ হইতে বাহির হইলেন। কঞ্চুকী পিছে পিছে চলিল।

ভানুমতীর কক্ষে কালিদাস পার্বতীর তপস্যা অংশ পাঠ করিয়া শুনাইতেছেন। কপোল-ন্যস্ত-হস্তা রানী অবহিত হইয়া শুনিতেছেন; তাঁহার দুই চক্ষে নিবিড় রস-তন্ময়তার আভাস।

গুপ্ত অলিন্দে তরবারি হস্তে মহারাজ আগে আগে আসিতেছেন, পশ্চাতে কঞ্চুকী। রন্ধ্রের সম্মুখে আসিয়া মহারাজ দাঁড়াইলেন; রন্ধ্রপথে একবার দৃষ্টি প্রেরণ করিলেন, তারপর সেই দিকে কর্ণ ফিরাইয়া রন্ধ্রাগত স্বর-গুঞ্জন শুনিতে লাগিলেন। তাঁহার মুখ পূর্ববৎ কঠিন ও ভয়াবহ হইয়া রহিল।

রন্ধ্রপথে ছন্দোবদ্ধ শব্দের অস্পষ্ট গুঞ্জরন আসিতেছে। শুনিতে শুনিতে রাজা প্রাচীরে স্কন্ধ অর্পণ করিয়া দাঁড়াইলেন। হাতের তরবারিটা অস্বস্তিদায়ক; সেটা কয়েকবার এহাতে ওহাতে করিয়া শেষে কঞ্চুকীর হাতে ধরাইয়া দিয়া নিশ্চিন্ত হইলেন। কঞ্চুকী মহারাজের দিকে বক্র কটাক্ষপাত করিল; কিন্তু তাঁহার বজ্রকঠিন মুখ দেখিয়া মানসিক অবস্থা অনুমান করিতে পারিল না। সে ঈষৎ উদ্বিগ্নভাবে মনে মনে জল্পনা করিতে লাগিল— কি আশ্চর্য! মহারাজ এখনও ক্ষেপিয়া যাইতেছেন না কেন?

ভানুমতীর কক্ষে কালিদাস পাঠ শেষ করিয়া পুঁথি বাঁধিতেছেন, রানীর দিকে চোখ তুলিয়া স্মিতহাস্যে বলিলেন— ‘ওই পর্যন্ত হয়েছে মহারানী।’

ভানুমতী প্রশ্ন করিলেন— ‘কবি, বাকিটুকু কত দিনে শুনতে পাব? আমার মন যেন আর ধৈর্য মানছে না। কবে কাব্য শেষ হবে?’

কালিদাস বলিলেন— ‘মহাকাল জানেন। তিনিই স্রষ্টা, আমি অনুলেখক মাত্র। এবার অনুমতি দিন দেবি!’

গুপ্ত অলিন্দে রাজা এতক্ষণ দেয়ালে ঠেস দিয়া ছিলেন, হঠাৎ সোজা হইয়া দাঁড়াইলেন। কঞ্চুকী মনে মনে অস্থির হইয়া উঠিয়াছিল, তাড়াতাড়ি তরবারিটি বাড়াইয়া ধরিল। রাজা তরবারির পানে আরক্ত দৃষ্টিপাত করিয়া সেটি নিজ হস্তে লইলেন, তারপর দীর্ঘ পদক্ষেপে বাহিরে চলিলেন।

কঞ্চুকীর মনে আশা জাগিল, এতক্ষণে রাজার রক্ত গরম হইয়াছে। সে উৎফুল্ল মুখে তাঁহার অনুবর্তী হইল।

রানীর কক্ষে কালিদাস পুঁথি হস্তে উঠিয়া দাঁড়াইয়াছেন, ভানুমতী দাঁড়াইয়া যুক্তকরে তাঁহাকে বিদায় দিতেছেন। মালিনী দ্বারের দিকে চলিয়াছে; কবিকে বাহিরে পৌঁছাইয়া দিয়া সে আবার ফিরিয়া আসিবে।

সহসা প্রবল তাড়নে দ্বার খুলিয়া গেল। মুক্ত তরবারি হস্তে বিক্রমাদিত্য সম্মুখে দাঁড়াইয়া। মালিনী সভয়ে পিছাইয়া আসিয়া আর্ত চিৎকার কণ্ঠমধ্যে রোধ করিল।

রাজা প্রবেশ করিলেন, পশ্চাতে কঞ্চুকী। রাজার তীব্রোজ্জ্বল চক্ষু একবার চারিদিকে বিচরণ করিল; মালিনী এক কোণে মিশিয়া গিয়া থর থর কাঁপিতেছে; কালিদাস তাঁর নিজের ভাষায় ‘চিত্রার্পিতারম্ভ’ ভাবে দাঁড়াইয়া; মহাদেবী ভানিমতী প্রশান্ত নেত্রে রাজার পানে চাহিয়া আছেন, যেন মন হইতে কাব্যের ঘোর এখনো কাটে নেই।

কবির দিকে একবার কঠোর দৃষ্টিপাত করিয়া রাজা ভানুমতীর সম্মুখে গিয়া দাঁড়াইলেন, দুইজনে নিষ্পলক চক্ষে পরস্পর মুখের পানে চাহিয়া রহিলেন। ক্রমে রানীর মুখে ঈষৎ কৌতুকহাস্য দেখা গেল। রাজা চাপা গর্জনে বলিলেন— ‘মহাদেবি ভানুমতি, এই কি তোমার উচিত কাজ হয়েছে?’

ভানুমতী বলিলেন— ‘কি কাজ আর্যপুত্র?’

বিক্রমাদিত্য গভীর ভর্ৎসনাভরে বলিলেন— ‘এই দেব-ভোগ্য কবিতা তুমি এক-একা ভোগ করছ। আমাকে পর্যন্ত ভাগ দিতে পারলে না! এত কৃপণ তুমি!’

কক্ষ কিছুক্ষণ স্তব্ধ হইয়া রহিল। কালিদাসের মুখে চোখে নবোদিত বিস্ময়। কঞ্চুকী হঠাৎ ব্যাপার বুঝিতে পারিয়া খাবি খাওয়ার মত শব্দ করিয়া কাঁপিতে আরম্ভ করিল। মহারাজ তাহার দিকে দৃষ্টি ফিরাইলেন; কঞ্চুকীর অন্তরাত্মা শুকাইয়া গেল, সে ভয়ে প্রায় কাঁদিয়া উঠিল— ‘মহারাজ, আমি— আমি বুঝতে পারিনি।’

রাজা ঈষৎ চিন্তার ভান করিয়া বলিলেন— ‘সম্ভব। তুমি জানতে না যে মহাদেবী পাশার বাজি জিতে এই পণ চেয়ে নিয়েছিলেন। যাও, তোমাকে ক্ষমা করলাম। কিন্তু— ভবিষ্যতে মহাদেবী ভানুমতী সম্বন্ধে মনে মনেও আর এমন ধৃষ্টতা কোরো না।’

বিক্রমাদিত্য হাতের তরবারিটা কঞ্চুকীর দিকে ছুঁড়িয়া ফেলিয়া দিলেন; মসৃণ হর্ম্যতলে তরবারি পিছলাইয়া কঞ্চুকীর দুই পায়ের ফাঁক দিয়া গলিয়া গেল! কঞ্চুকী লাফাইয়া উঠিল, তারপর তরবারি কুড়াইয়া লইয়া ঊর্ধ্বশ্বাসে ঘর ছাড়িয়া পলায়ন করিল।

রাজার মুখে এতক্ষণে হাসি দেখা দিল। তিনি কালিদাসের দিকে অগ্রসর হইয়া গেলেন, কবির স্কন্ধে হস্ত রাখিয়া বলিলেন— ‘তরুণ কবি, তোমার ধৃষ্টতা ক্ষমা করা আমার পক্ষে আরও কঠিন। তুমি আমাকে উপেক্ষা করে রানীকে তোমার কাব্য শুনিয়েছ। তোমার কি বিশ্বাস বিক্রমাদিত্য শুধু যুদ্ধ করতেই জানে, কাব্যের রস গ্রহণ করতে সে অক্ষম?’

কালিদাস ব্যাকুলম্বরে বলিয়া উঠিলেন— ‘মহারাজ— আমি—’

বিক্রমাদিত্য বাধা দিয়া বলিলেন— ‘কোনো কথা শুনব না। তোমার শাস্তি, আবার আমাকে তোমার কাব্য গোড়া থেকে শোনাতে হবে। আড়াল থেকে যতটুকু শুনেছি তাতে অতৃপ্তি আরো বেড়ে গেছে—’ রানীর দিকে হস্ত প্রসারিত করিয়া বলিলেন— ‘এস দেবি, আমরা দু’জনে কবির পায়ের কাছে বসে আজ দেব-দম্পতির মিলন-গাঁথা শুনব।’

রাজা ও রানী পাশাপাশি ভূমির উপর উপবেশন করিলেন; কালিদাস ঈষৎ লজ্জিতভাবে নিজ আসনে বসিবার উপক্রম করিলেন।

মালিনী এতক্ষণ এক কোণে লুকাইয়া কাঁপিতেছিল, এখন পরিস্থিতির পরিবর্তন অনুভব করিয়া দ্বিধাজড়িত পদে বাহির হইয়া আসিল। কবিকে অক্ষতদেহে আবার কাব্য পাঠের উদ্যোগ করিতে দেখিয়া তাহার মন নির্ভয় হইল— বিপদ বুঝি কাটিয়াছে।

রাজা মালিনীকে দেখিতে পান নাই, কালিদাসকে উদ্দেশ করিয়া বলিলেন— ‘কবি, কাব্যপাঠ আরম্ভ করবার আগে তোমাকে একটা কথা বলতে চাই। আজ থেকে তুমি আমার সভাকবি হলে।’

কালিদাস ত্রস্তবিব্রত হইয়া বলিলেন— ‘না না মহারাজ, আমি এ সম্মানের যোগ্য নই।’

রাজা বলিলেন— ‘সে কথা বিশ্ববাসী বিচার করুক। আগামী শারদোৎসবের দিন আমি মহান কবি-সভা আহ্বান করব, দেশ-দেশান্তরের রাজা পণ্ডিত রসজ্ঞদের নিমন্ত্রণ করব— তাঁরা এসে তোমার কাব্য শুনবেন।’

কালিদাস অভিভূতভাবে বসিয়া রহিলেন। রাজা পুনশ্চ বলিলেন— ‘কিন্তু বসন্তের কোকিলের ন্যায় তুমি কোথা থেকে এলে কবি? তোমার নাম কি?’

কবি বলিলেন— ‘অধমের নাম কালিদাস।’

‘কালিদাস— কালিদাস—’ রাজা স্মৃতি মন্থন করিতে করিতে বলিলেন— ‘কয়েক মাস আগে ঋতুসংহার নামে একটি মধুর রসের কাব্য পড়েছিলাম, মনে হচ্ছে কবির নাম ছিল কালিদাস! তুমি কি সেই কালিদাস?’

কবি বলিলেন— ‘হাঁ আর্য। ইতিপূর্বে ঋতুসংহার ও মেঘদূত নামে দু’টি খণ্ডকাব্য লিখেছি।’

রাজা বলিলেন— ‘মেঘদূত! কৈ, আমি তো দেখিনি। বোধহয় আমার বর্তমান সভাকবি সেটি আমার কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছেন। যা হোক, তুমি উজ্জয়িনীতে কোথায় বাস কর?’

মালিনী এতক্ষণে রাজার পিছনে আসিয়া দাঁড়াইয়াছিল, কালিদাসকে ইতস্তত করিতে দেখিয়া বলিল— ‘উনি যে নদীর ধারে কুঁড়ে ঘর তৈরি করেছেন— সেইখানেই থাকেন।’

রাজা ঘাড় ফিরাইয়া মালিনীকে দেখিলেন, তাহার হাত ধরিয়া টানিয়া পাশে বসাইলেন; ছদ্ম কোপের কণ্ঠে বলিলেন— ‘দূতী! দূতী! তুমি ফুলের বেসাতি কর, না ভোমরার?’

মালিনী ঈষৎ ভয় পাইয়া বলিল— ‘ফ্‌ ফুলের, মহারাজ।’

রাজা বলিলেন— ‘হুঁ। ভেবেছ তোমার কথা আমি কিছু জানি না? সব জানি। আর, শাস্তিও দেব তেমনি। কঞ্চুকীর সঙ্গে তোমার বিয়ে দেব— তখন বুঝবে।’

পরিহাস বুঝিতে পারিয়া মালিনী হাসিল। রাজা কালিদাসের পানে ফিরিলেন— ‘কিন্তু নদীর ধারে কুঁড়ে ঘর! তা তো হতে পারে না। তোমার জন্য নগরে প্রাসাদ নির্দিষ্ট হবে, সেখানে তুমি থাকবে।’

কালিদাস হাত জোড় করিলেন— ‘মহারাজ, আপনার অসীম কৃপা। কিন্তু আমার কুটিরে আমি পরম সুখে আছি।’

রাজা বলিলেন— ‘কিন্তু কবিকে বিষয়-চিন্তা থেকে মুক্তি দেওয়া রাজার কর্তব্য। নইলে কবি কাব্য রচনা করবেন কি করে? অন্নচিন্তা চমৎকারা কাতরে কবিতা কুতঃ!’

কালিদাস বলিলেন— ‘রাজাধিরাজ, আমার কোনো আকাঙ্ক্ষা নেই। মহাকাল আমাকে যা দিয়েছেন তার অধিক আমি কামনা করি না। মনের দৈন্যই দৈন্য মহারাজ।’

‘ধনসম্পদ চাও না?’

‘না আর্য। আমি মহাকালের সেবক। আমার দেবতা চির-নগ্ন, তাই তিনি চির-সুন্দর। আমি যেন চিরদিন আমার নগ্নসুন্দর দেবতার উপাসক থাকতে পারি।’

অবন্তীর বিশাল রাজমন্ত্রভবনের মধ্যে একটি কক্ষে পঞ্চাশজন মসীজীবী অনুলেখক সারি দিয়া ভূমির উপর বসিয়াছে। প্রত্যেকের সম্মুখে একটি করিয়া অনুচ্চ কাষ্ঠপীঠিকা, তদুপরি মসীপাত্র ভূর্জপত্রের কুণ্ডলী প্রভৃতি ন্যস্ত। স্বয়ং জ্যেষ্ঠ-কায়স্থ একটি লিখিত পত্র হস্তে লইয়া অনুলেখকদের সম্মুখে পাদচারণ করিতেছেন এবং পত্রটি উচ্চকণ্ঠে থামিয়া থামিয়া পাঠ করিতেছেন; অনুলেখকগণ শুনিয়া শুনিয়া লিখিতেছেন।

জ্যেষ্ঠ-কায়স্থ স্থূলকায় মধ্যবয়স্ক ব্যক্তি, অপিচ রসিক। তিনি পড়িতেছেন— ‘আগামী শারদ পূর্ণিমা তিথিতে কোজাগর মহোৎসব দিবসে— হুম্‌, হুম্‌— সভাকবি শ্রীকালিদাস বিরচিত কুমারসম্ভবম্ নামক মহাকাব্য অবন্তীর রাজসভায় পঠিত হইবে...অথ শ্রীমানের, বিকল্পে শ্রীমতীর— অহহহ— চরণরেণুকণাস্পর্শে অবন্তীর রাজসভা পবিত্র হৌক— হুম্‌—’

মন্ত্রগৃহে স্বয়ং বিক্রমাদিত্য উপবিষ্ট। তাঁহার একপাশে স্তূপীকৃত নিমন্ত্রণ-লিপির কুণ্ডলী, মহামন্ত্রী একটি করিয়া লিপি রাজার সম্মুখে ধরিতেছেন, দ্বিতীয় এক কর্মিক ক্ষুদ্র দর্বীতে দ্রবীভূত জতু লইয়া পত্রের উপর ঢালিয়া দিতেছে, মহারাজ তাহার উপর মুদ্রাঙ্গুরীয়ের ছাপ দিতে দিতে বলিতেছেন— ‘উত্তরাপথে দক্ষিণাপথে যেখানে যত জ্ঞানী গুণী রসজ্ঞ আছেন— পুরুষ নারী— কেউ যেন বাদ না যায়—’

উজ্জয়িনী নগরীর পূর্ব তোরণ। তোরণ হইতে তিনটি পথ বাহির হইয়াছে; দুইটি পথ প্রাকারের ধার ঘেঁষিয়া উত্তরে ও দক্ষিণে গিয়াছে, তৃতীয়টি তীরের মত সিধা পূর্বমুখে গিয়াছে।

পঞ্চাশজন অশ্বারোহী রাজদূত তোরণ হইতে বাহিরে আসিয়া সারি দিয়া দাঁড়াইল। পৃষ্ঠে আমন্ত্রণ-লিপির বস্ত্রপেটিকা ঝুলিতেছে, অস্ত্রশস্ত্রের বাহুল্য নাই।

গোপুর শীর্ষ হইতে দুন্দুভি ও বিষাণ বাজিয়া উঠিল। অমনি অশ্বারোহী দল তিন ভাগে বিভক্ত হইয়া গেল; দুই দল উত্তরে ও দক্ষিণে চলিল, মাঝের দল ময়ূরসঞ্চারী গতিতে সম্মুখ দিকে অগ্রসর হইল।

কুন্তল রাজ্যের রাজভবন ভূমি। পূর্বোল্লিখিত সরোবরের মর্মর সোপানের উপর কুন্তল রাজকুমারী একাকিনী বসিয়া আছেন। মুখে চোখে হতাশা ও নৈরাশ্য পদাঙ্ক মুদ্রিত করিয়া দিয়াছে, কেশ বেশ অযত্নবিন্যস্ত; বাঁচিয়া থাকার প্রয়োজন যেন তাঁহার শেষ হইয়া গিয়াছে।

সরোবরের জল বায়ুস্পর্শে কুঞ্চিত হইয়া উঠিতেছে; রাজকুমারী লীলাকমলের পাপড়ি ছিঁড়িয়া জলে ফেলিতেছেন; কোনোটি নৌকার মত ভাসিয়া যাইতেছে, কোনোটি ডুবিতেছে।

অদূরে একটি তরুশাখায় হেলান দিয়া বিদ্যুল্লতা গান গাহিতেছে, তাহার গানের গুঞ্জরন কতক রাজকুমারীর কানে যাইতেছে, কতক যাইতেছে না—

ভাস্‌লো আমার ভেলা—

সাগর জলে নাগরদোলা ওঠা-নামার খেলা

সেথা ভাস্‌লো আমার ভেলা। ...

গান শেষ হইয়া গেল; রাজকুমারী তাঁহার ভাসমান পদ্মপলাশগুলির পানে চাহিয়া ভাবিতেছেন— ‘দিনের পর দিন...আজকের দিন শেষ হল, আবার কাল আছে...তারপর আবার কাল...কালের কি অবধি নেই—?’

রাজকুমারীর পিছনে চতুরিকা আসিয়া দাঁড়াইল, তাহার হাতে কুণ্ডলিতে নিমন্ত্রণ-লিপি। সে বিষণ্ণমুখে ইতস্তত করিয়া রাজকুমারীর পাশে আসিল, সোপানের পৈঠার উপর পা মুড়িয়া বসিতে বসিতে বলিল— ‘পিয়সহি, অবন্তীর রাজসভা থেকে আমন্ত্রণ এসেছে, তোমার জন্যে স্বতন্ত্র লিপি—’

নিরুৎসুকভাবে লিপি লইয়া রাজকুমারী জতুমুদ্রা খুলিয়া দেখিলেন, চতুরিকা বলিয়া চলিল— ‘মহারাজ সভা থেকে পাঠিয়ে দিলেন। তাঁরও আলাদা নিমন্ত্রণ-লিপি এসেছে কিন্তু তিনি যেতে পারবেন না। বলে পাঠালেন, তুমি যদি যেতে চাও তিনি সুখী হবেন।’

লিপি পাঠ শেষ করিয়া রাজকুমারী আবার তাহা কুণ্ডলাকারে জড়াইতে লাগিলেন, যেন চতুরিকার কথা শুনিতে পান নাই এমনিভাবে জলের পানে চাহিয়া রহিলেন। ঈষৎ তিক্ত হাসি তাঁহার মুখে ফুটিয়া উঠিল, তিনি লিপি জলে ফেলিয়া দিবার উপক্রম করিলেন কিন্তু ফেলিলেন না। চতুরিকার দিকে না ফিরিয়াই অবসন্ন কণ্ঠে বললেন— ‘পিতা সুখী হবেন? বেশ— যাব।’

উজ্জয়িনীর পূর্ব-তোরণ পুষ্পপল্লব ও মাল্যে শোভা পাইতেছে। তিনটি পথ দিয়া পিপীলিকাশ্রেণীর ন্যায় মানুষ আসিয়া তোরণের রন্ধ্রমুখে অদৃশ্য হইয়া যাইতেছে। রাজন্যবর্গ হস্তীর গলঘণ্টা বাজাইয়া মন্দমন্থর গতিতে আসিতেছেন; যোদ্ধৃবেশধারী পদাতি অশ্ব, এমন কি উষ্ট্রও আছে। মাঝে মাঝে দু’একটি চতুর্দোলা আসিতেছে; সূক্ষ্ম আবরণের ভিতর লঘু মেঘাবৃত শরৎচন্দ্রের ন্যায় সম্ভ্রান্ত আর্য মহিলা।

একটি দোলা তোরণমধ্যে প্রবেশ করিল; সঙ্গে মাত্র দুই চারিজন পদাতি পরিচর। দোলায় ক্ষীণাবরণের মধ্যে এক সুন্দরী বিমনাভাবে করতলে কপোল রাখিয়া বসিয়া আছেন। দর্শকদের মধ্যে যাহারা দোলার উপর দৃষ্টি রাখিয়াছিল তাহারা অনুমান করিল, ইনি কুন্তল রাজদুহিতা হৈমশ্রী।

সভাগৃহের প্রবেশদ্বারে মহামন্ত্রী প্রভৃতি কয়েকজন উচ্চ কর্মচারী দাঁড়াইয়া আছেন। অতিথিগণ একে একে দুয়ে দুয়ে আসিতেছেন, মহামন্ত্রী তাঁহাদের পদোচিত অভ্যর্থনাপূর্বক তিলক-চন্দন ও গন্ধমাল্যে ভূষিত করিয়া অভ্যন্তরে প্রেরণ করিতেছেন। নেপথ্যে মধুর স্বননে বাঁশি বাজিতেছে।

সভার অভ্যন্তরে বক্তার বেদী ব্যতীত অন্য আসনগুলি ক্রমশ ভরিয়া উঠিতেছে। সন্নিধাতা কিঙ্করগণ সকলকে নির্দিষ্ট আসনে লইয়া গিয়া বসাইতেছে। ঊর্ধ্বে মহিলাদের মঞ্চেও অল্প শ্রোত্রীসমাগম হইতে আরম্ভ করিয়াছে। মহাদেবী ভানুমতীর আসন এখনো শূন্য আছে।

কালিদাসের কুটির প্রাঙ্গণে কবি সভায় যাইবার জন্য প্রস্তুত হইতেছেন, মালিনী তাঁহার ললাটে চন্দন পরাইতে দিতেছে। মালিনীর চোখ দু’টি অরুণাভ, যেন লুকাইয়া কাঁদিয়াছে। সে থাকিয়া থাকিয়া দন্ত দিয়া অধর চাপিয়া ধরিতেছে।

কুমারসম্ভবের পুঁথি বেদীর উপর রাখা ছিল, তাহা কবির হাতে তুলিয়া দিতে দিতে মালিনী একটু হাসিবার চেষ্টা করিয়া বলিল— ‘এতদিন তুমি আমার কবি ছিলে, আজ সারা পৃথিবীর কবি হলে। কত লোক তোমার গান শুনবে, ধন্যি ধন্যি করবে—’

কালিদাস সলজ্জ হাসিলেন— ‘কি যে বলো। আমার কাব্য লেখার চেষ্টা বামন হয়ে চাঁদে হাত বাড়ানো। হয়তো সবাই হাসবে।’

মালিনী তাঁহার বিনয় বচনে কান না দিয়া বলিল— ‘আজ পৃথিবীর যত জ্ঞানী গুণী সবাই তোমার গান শুনবে, কেবল আমিই শুনতে পাব না—’

কালিদাস সবিস্ময়ে চক্ষু তুলিলেন— ‘তুমি শুনতে পাবে না কেন?’

মালিনী দীনকণ্ঠে বলিল— ‘সভায় কত রাজা রানী, কত বড় বড় লোক এসেছেন, সেখানে আমাকে কে জায়গা দেবে কবি!’

কালিদাসের মুখের ভাব দৃঢ় হইল, তিনি মালিনীর একটি হাত নিজের হাতে তুলিয়া লইয়া বলিলেন— ‘রাজসভায় যদি তোমার জায়গা না হয় তাহলে আমারও জায়গা হবে না। এস।’

মালিনীর চক্ষু দু’টি সহস্য-উদ্‌গত অশ্রুজলে উজ্জ্বল হইয়া উঠিল, অধর কাঁপিয়া উঠিল।

রাজসভা অগুরুগন্ধে আমোদিত। অতিথিগণ স্ব স্ব আসনে বসিয়াছেন, সভায় তিল ফেলিবার স্থান নাই। রাজ-বৈতালিক প্রধান বেদীর উপর যুক্তকরে দাঁড়াইয়া মহামান্য অতিথিগণের সাদর সম্ভাষণ গান করিতেছেন। কিন্তু সেজন্য সভার জল্পনা গুঞ্জন শান্ত হয় নাই। সকলেই প্রতিবেশীর সঙ্গে বাক্যালাপ করিতেছেন, চারিদিকে ঘাড় ফিরাইয়া সভার শিল্পশোভা দেখিতেছেন, মন্তব্য প্রকাশ করিতেছেন।

উপরে মহিলামঞ্চও কলভাষিণী মহিলাপুঞ্জে ভরিয়া উঠিয়াছে। কেন্দ্রস্থলে মহাদেবীর স্বতন্ত্র আসন কিন্তু এখনো শূন্য।

বৈতালিক স্তবগান গাহিয়া চলিয়াছেন।

মহিলামঞ্চের দ্বারের কাছে দেবী ভানুমতীকে আসিতে দেখা গেল। তিনি কুন্তলকুমারী হৈমশ্রীর হাত ধরিয়া হাস্যালাপ করিতে করিতে আসিতেছেন। হৈমশ্রীও সময়োচিত প্রফুল্লতার সহিত কথা কহিতেছেন। মনে হয় উৎসবের বাতাবরণে আসিয়া তাঁহার অবসাদ কিয়ৎ পরিমাণে দূর হইয়াছে।

তাঁহারা স্বীয় আসনে গিয়া পাশাপাশি বসিলেন। রাজবংশজাতা অন্য কোনো মহিলা বোধ হয় আসেন নাই, কেবল কুন্তলকুমারীই আসিয়াছেন। সেকালে মহিলা মহলে বিদ্যাচর্চার সমধিক অসদ্ভাব ছিল বলিয়া মনে হয়; তাই যে দুই চারিটি বিদুষী নারী দেখা দিতেন, তাঁহারা অতিমাত্রায় সম্মান ও শ্রদ্ধার পাত্রী হইয়া উঠিতেন।

বৈতালিকের স্তুতিগান শেষ হইয়া আসিতেছে।

মালিনী ভীরু সঙ্কুচিত পদে মহিলামঞ্চের দ্বারের কাছে আসিয়া ভিতরে উঁকি মারিল। ভিতরে আসিয়া অন্যান্য মহিলাদের সঙ্গে একাসনে বসিবার সাহস নাই, সে দ্বারের কাছেই ইতস্তত করিতে লাগিল। তাহার হাতে একটি ফুলের মালা ছিল, মাধবী ও বান্ধুলি পুষ্প দিয়া গঠিত। মালাগাছি লইয়াও বিপদ; পাছে কেহ দেখিয়া হাসে। মালিনী অবশেষে মালাটি কোঁচড়ের মধ্যে রাখিয়া দ্বারের পাশেই মেঝের উপর বসিয়া পড়িল। এখান হইতে গলা বাড়াইলে নিম্নে বক্তার বেদী সহজেই দেখা যায়।

বৈতালিকের গান শেষ হইল। সঙ্গে সঙ্গে ঘোর রবে দুন্দুভি বাজিয়া উঠিয়া সভাগৃহ-মধ্যে তুমুল ধ্বনি-তরঙ্গের সৃষ্টি করিল।

তারপর—

সভা একেবারে শান্ত হইয়া গিয়াছে, পাতা নড়িলে শব্দ শোনা যায়।

কালিদাস বেদীর উপর বসিয়াছেন, সম্মুখে উন্মুক্ত পুঁথি। তিনি একবার প্রশান্ত চক্ষে সভার চারিদিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করিলেন, তারপর মন্দ্রকণ্ঠে পাঠ আরম্ভ করিলেন—

অস্ত্যত্তরস্যাং দিশি দেবতাত্মা

হিমালয়ো নাম নগাধিরাজঃ।

মহিলামঞ্চের মধ্যস্থলে কুন্তলকুমারী নির্নিমষ নেত্রে নিম্নে কালিদাসের পানে চাহিয়া আছেন। এ কে? সেই মূর্তি— সেই কণ্ঠস্বর! তবে কি— তবে কি—?

কালিদাস পাঠ করিয়া চলিয়াছেন। শ্রোতাদের মনশ্চক্ষে ধীরে ধীরে একটি দৃশ্য ফুটিয়া উঠিতেছে— তুষারমৌলি হিমালয়। দূরে একটি অধিত্যকা, তথায় একটি ক্ষুদ্র কুটির ও লতাবিতান। পতিনিন্দা শুনিয়া দক্ষদুহিতা সতী প্রাণবিসর্জন দিবার পর মহেশ্বর এই নির্জন স্থানে উগ্র তপস্যায় রত আছেন।

কালিদাস শ্লোকের পর শ্লোক পড়িয়া চলিয়াছেন। বিশাল সভা চিত্রার্পিতবৎ বসিয়া আছে; কালিদাসের কণ্ঠস্বর এই নিঃশব্দ একাগ্রতার মধ্যে মৃদঙ্গের ন্যায় মন্দ্রিত হইতেছে।

মহিলামঞ্চে কুন্তলকুমারী তন্দ্রাহতার ন্যায় বসিয়া শুনিতেছেন। বাহ্যজ্ঞান নাই, চক্ষু নিষ্পলক; কখন বক্ষ ভেদ করিয়া নিশ্বাস বাহির হইতেছে, কখন গণ্ড বহিয়া অশ্রুর ধারা নামিতেছে তাহা জানিতেও পারিতেছেন না।

মহাকাব্যের ছন্দে ছন্দে চিত্র রচিত হইতেছে। হিমালয়ের অধিত্যকায় মহেশ্বরের লতাগৃহ। দ্বারে নন্দী প্রকোষ্ঠে হেমবেত্র লইয়া দণ্ডায়মান। বেদীর উপর যোগাসনে বসিয়া মহেশ্বর ধ্যানমগ্ন।

বনপথ দিয়া গিরিকন্যা উমা কুটিরের পানে আসিতেছেন। হস্তে ফুল জল সমিধপূর্ণ পাত্র।

বেদীপ্রান্তে পৌঁছিয়া উমা নতজানু হইয়া মহেশ্বরকে প্রণাম করিলেন। শঙ্কর ধ্যানমগ্ন।

প্রথম সর্গ সমাপ্ত হইলে কালিদাস ক্ষণেক বিরাম দিয়া দ্বিতীয় সর্গ পড়িতে আরম্ভ করিলেন।

মেঘলোকে ইন্দ্রসভা। ইন্দ্র ও দেবগণ মুহ্যমানভাবে বসিয়া আছেন; মদন ও বসন্ত প্রবেশ করিল। মদনের কণ্ঠে পুষ্পধনু, বসন্তের হস্তে চূত-মঞ্জরী। ইন্দ্র সাদরে মদনের হাত ধরিয়া বলিলেন— ‘এস বন্ধু, আমাদের দারুণ বিপদে তুমিই একমাত্র সহায়।’

কৈতববাদে স্ফীত হইয়া মদন সদর্পে বলিল— ‘আদেশ করুন দেবরাজ। আপনার প্রসাদে আমি কেবলমাত্র বসন্তকে সঙ্গে নিয়ে সাক্ষাৎ পিণাকপাণির ধ্যানভঙ্গ করতে পারি।’

দেবগণ সমস্বরে জয়ধ্বনি করিয়া উঠিলেন। মদন ঈষৎ ত্রস্ত ও চিকিত হইয়া সকলের মুখের পানে চাহিল। সত্যই মহাদেবের ধ্যানভঙ্গ করিতে হইবে নাকি?—

কালিদাস কাব্যপাঠ করিয়া চলিয়াছেন। সকলে রুদ্ধশ্বাসে শুনিতেছে! মহিলামঞ্চে হৈমশ্রীর অবস্থা পূর্ববৎ— বাহ্যজ্ঞানশূন্য। ভানুমতী তাহা লক্ষ্য করিলেন, কিন্তু কিছু না বলিয়া কাব্যশ্রবণে মন দিলেন।

হিমালয়। সমস্ত প্রকৃতি শীতজর্জর, তুষার-কঠিন। বৃক্ষ নিষ্পত্র, প্রাণীদের প্রাণচঞ্চলতা নাই। তপোবনের সন্নিকটে একটি শাখাসর্বস্ব বৃক্ষ দাঁড়াইয়া আছে। মদন ও বসন্তের সূক্ষ্ম দেহ এই বৃক্ষের উপর দিয়া ভাসিয়া গেল, সঙ্গে সঙ্গে বৃক্ষটি পুষ্প পল্লবে ভরিয়া উঠিল। দূরে সহসা কোকিল-কাকলি শুনা গেল। হিমালয়ে অকাল বসন্তের আবির্ভাব হইয়াছে।

সহসা হরিতায়িত বনভূমির উপর কিন্নর মিথুন নৃত্যগীত আরম্ভ করিল, পশুপক্ষী ব্যাকুল বিস্ময়ে ছুটাছুটি ও কলকূজন করিয়া বেড়াইতে লাগিল। প্রমথগণ প্রমত্ত উদ্দাম হইয়া উঠিল।

নদী প্রকৃতির এই আকস্মিক রূপান্তরে বিব্রত হইয়া চারিদিকে কঠোর দৃষ্টিপাত করিতে লাগিল, তারপর ওষ্ঠে অঙ্গুলি রাখিয়া প্রমথদের নীরবে শাসন করিল— চপলতা করিও না, মহেশ্বর ধ্যানমগ্ন।

বেদীর উপর মহেশ্বর যোগাসনে উপবিষ্ট। চক্ষু ভ্রূমধ্যে স্থির, শ্বাস নাসাভ্যন্তরচারী, নিবাত নিষ্কম্প দীপশিখার ন্যায় দেহ নিশ্চল।

রুমঝুম মঞ্জীরের শব্দ কাছে আসিতেছে; উমা যথানিয়ত পূজার উপকরণ লইয়া আসিতেছেন। নন্দী সসম্ভ্রমে পথ ছাড়িয়া দিল।

মহেশ্বরের ধ্যানসমাধি ক্রমে তরল হইয়া আসিতেছে; তাঁহার নয়নপল্লব ঈষৎ স্ফুরিত হইল। লতাবিতানের এক কোণে দাঁড়াইয়া মদন ধনুর্বাণ হস্তে অপেক্ষা করিতেছে। পার্বতী আসিতেছেন, এই উপযুক্ত সময়।

পার্বতী আসিয়া বেদীমূলে প্রণাম করিলেন, তারপর নতজানু অবস্থায় স্মিতসলজ্জ চক্ষু দু’টি মহেশ্বরের মুখের পানে তুলিলেন। মদনের অলক্ষিত উপস্থিতি উভয়ের মনেই চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করিয়াছিল; মহাদেবের অরুণায়ত নেত্র পার্বতীর মুখের উপর পড়িল।

মদন এই অবসরের প্রতীক্ষা করিতেছিল, সাবধানে লক্ষ্য স্থির করিয়া সম্মোহন বাণ নিক্ষেপ করিল।

মহেশ্বরের তৃতীয় নয়ন খুলিয়া গিয়া ধক্‌ধক্‌ করিয়া ললাট-বহ্নি নির্গত হইল— কে রে তপোবিঘ্নকারী! তিনি মদনের দিকে দৃষ্টি ফিরাইলেন। হরনেত্রজন্মা বহ্নিতে মদন ভস্মীভূত হইল।

ভয়ব্যাকুলা উমা বেদীমূলে নতজানু হইয়া আছেন। মহেশ্বর বেদীর উপর উঠিয়া দাঁড়াইয়া চতুর্দিকে একবার রুদ্র দৃষ্টি নিক্ষেপ করিলেন। তারপর তাঁহার প্রলয়ঙ্কর মূর্তি সহসা শূন্যে অদৃশ্য হইয়া গেল।

কালিদাস মদনভস্ম নামক সর্গ শেষ করিয়া ক্ষণেকের জন্য নীরব হইলেন, সভাও নিস্তব্ধ হইয়া রহিল। এতগুলি মানুষ যে সভাগৃহে বসিয়া আছে, শব্দ শুনিয়া তাহা বুঝিবার উপায় নাই।

কালিদাস পুঁথির পাতা উল্টাইলেন, তারপর আবার নূতন সর্গ পড়িতে আরম্ভ করিলেন।

রতিবিলাপ শুনিয়া কুন্তলকুমারীর নয়নে অশ্রুধারা বহিল। ভানুমতীও আবার নূতন করিয়া কাঁদিলেন। দ্বার পার্শ্বে বসিয়া মালিনী কাঁদিল। প্রিয়-বিয়োগ ব্যথা কাহাকে বলে এতদিনে মালিনী বুঝিতে শিখিয়াছে।

কবি ক্রমে উমার তপস্যা অধ্যায়ে পৌঁছিলেন।

হিমালয়ের গহন গিরিসঙ্কটের মধ্যে কুটির রচনা করিয়া গিরিরাজসুতা উমা কঠোর তপস্যা আরম্ভ করিয়াছেন। পতি লাভার্থ তপস্যা। স্বয়ং বিশীর্ণ দ্রুমপর্ণ অর্থাৎ আপনা হইতে খসিয়া পড়া গাছের পাতা— তাহাও পার্বতী আর আহার করেন না। তাই তাঁহার নাম হইয়াছে— অপর্ণা।

কৃচ্ছ্রসাধন বহু প্রকার। গ্রীষ্মের দ্বিপ্রহরে তপঃকৃশা পার্বতী চারি কোণে অগ্নি জ্বলিয়া মধ্যস্থ আসনে বসিয়া প্রচণ্ড সূর্যের পানে নিষ্পলক চাহিয়া থাকেন। ইহা পঞ্চাগ্নি তপস্যা। আবার শীতের হিম-কঠিন রাত্রে যখন জলের উপর তুষারের আস্তরণ পড়ে তখন সেই আস্তরণ ছিন্ন করিয়া উমা জলমধ্যে প্রবেশ করেন; আকণ্ঠ জলে ডুবিয়া শীতের রাত্রি অতিবাহিত হয়। সারা রাত্রি চন্দ্রের পানে চাহিয়া উমা চন্দ্রশেখরের মুখচ্ছবি ধ্যান করেন।

এইভাবে কল্প কাটিয়া যায়। তারপর একদিন—

উমার কুটির দ্বারে এক তরুণ সন্ন্যাসী দেখা দিলেন। ডাক দিলেন— ‘অয়মহং ভোঃ!’

উমা কুটিরে ছিলেন, তাড়াতাড়ি বাহিরে আসিয়া সন্ন্যাসীকে পাদ্যঅর্ঘ্য দিলেন। সন্ন্যাসীর চোখের দৃষ্টি ভাল নয়; লোলুপনেত্রে পার্বতীকে নিরীক্ষণ করিয়া তিনি বলিলেন— ‘সুন্দরি, তুমি কী জন্য তপস্যা করছ?’

পার্বতী অনুচ্চ কণ্ঠে বলিলেন— ‘পতিলাভের জন্য।’

সন্ন্যাসী বিস্ময় প্রকাশ করিয়া বলিলেন— ‘কি আশ্চর্য! তোমার মত ভুবনৈকা সুন্দরীকেও পতিলাভের জন্য তপস্যা করতে হয়! কে সেই মূঢ় যে নিজে এসে তোমার পায়ে লুটিয়ে পড়ে না! তার নাম কি?’

পার্বতী সন্ন্যাসীর চটুলতায় বিরক্ত হইলেন, গম্ভীরমুখে বলিলেন— ‘তাঁর নাম শঙ্কর মহেশ্বর শিব চন্দ্রশেখর—’

সন্ন্যাসী বিপুল বিস্ময়ের অভিনয় করিয়া শেষে উচ্চ ব্যঙ্গ-হাস্য করিয়া উঠিলেন— ‘কি বললে— শিব মহেশ্বর! সেই দিগম্বর উন্মাদটা— যে একপাল প্রেত-প্রমথ নিয়ে শ্মশানে মশানে নেচে বেড়ায়! তাকে তুমি পতিরূপে কামনা কর! হাঃ হাঃ হাঃ!’

সন্ন্যাসীর ব্যঙ্গ-বিস্ফুরিত অট্টহাস্য আবার ফাটিয়া পড়িল। পার্বতীর মুখ ক্রোধে রক্তিম হইয়া উঠিল, তিনি সন্ন্যাসীর প্রতি একটি জ্বলন্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া কহিলেন— ‘কপট সন্ন্যাসী, তোমার এত স্পর্ধা তুমি শিবনিন্দা কর! আর আমি এখানে থাকব না।’

পার্বতী কুটিরের পানে পা বাড়াইলেন। পিছন হইতে শান্ত কোমল স্বর আসিল— ‘উমা, ফিরে চাও— দেখ আমি কে?’

উমা ফিরিয়া চাহিলেন। যাহা দেখিলেন তাহাতে তাঁহার রোমাঞ্চিত তনু থরথর কাঁপিতে লাগিল। শিলা-রুদ্ধগতি তটিনীর ন্যায় তিনি চলিয়া যাইতেও পারিলেন না, স্থির হইয়া দাঁড়াইয়া থাকিতেও পারিলেন না।

সন্ন্যাসীর স্থানে স্বয়ং মহেশ্বর। তিনি মৃদু মৃদু হাস্য করিতেছেন। পার্বতীর কণ্ঠ হইতে ক্ষীণ বাষ্পরুদ্ধ স্বর বাহির হইল— ‘মহেশ্বর!’

গিরিরাজ গৃহে হর-পার্বতীর বিবাহ।

মহা আড়ম্বর; হুলস্থূল ব্যাপার। পুরন্ধ্রীগণ হুলুধ্বনি করিতেছেন, দেবগণ অন্তরীক্ষে স্তুতিগান করিতেছেন, ভূতগণ কলকোলাহল করিয়া নাচিতেছে।

বিবাহ মণ্ডপে বর-বধূ পাশাপাশি বসিয়াছেন। রতি আসিয়া মহেশ্বরের পদতলে পড়িল। গৌরী একবার মহেশ্বরের পানে অনুনয়-ভরা দৃষ্টি নিক্ষেপ করিলেন।

আশুতোষ প্রীত হইয়া রতির মস্তকে হস্ত রাখিলেন; অমনি মদন পুনরুজ্জীবিত হইয়া যুক্তকরে দেব-দম্পতির সম্মুখে উপস্থিত হইল।

অবন্তীর রাজসভায় কালিদাস কুমারসম্ভব পর্ব শেষ করিয়াছেন। জয়ধ্বনিতে সভা পূর্ণ।

কবির মস্তকে মালা বর্ষিত হইতেছে; ক্রমে তাঁহার কণ্ঠে মালার স্তূপ জমিয়া উঠিল। তিনি যুক্তকরে নতনেত্রে দাঁড়াইয়া এই সংবর্ধনা গ্রহণ করিলেন।

উপরে মহিলামঞ্চেও চাঞ্চল্যের অন্ত নাই। কুঙ্কুম লাজাঞ্জলি পুষ্পাঞ্জলি কবির মস্তক লক্ষ্য করিয়া নিক্ষিপ্ত হইতেছে। মহিলাদের রসনাও নীরব নাই, সকলে একসঙ্গে কথা কহিতেছেন। সভা ভঙ্গ হইয়াছে তাই মহিলারাও নিজ নিজ আসন ছাড়িয়া উঠিয়াছেন, কিন্তু আশু সভা ছাড়িবার কোনো লক্ষণই দেখা যাইতেছে না। ভানুমতী মাতিয়া উঠিয়াছেন, পরম উৎসাহভরে সকলের সঙ্গে আলাপ করিতেছেন।

এই প্রমত্ত আনন্দ-অধীর সমষ্টির এক প্রান্তে কুন্তলকুমারী হৈমশ্রী মূর্ছাহতার ন্যায় বসিয়া আছেন। তাঁহার বিস্ফারিত চক্ষে দৃষ্টি নাই, কেবল অধরোষ্ঠ যেন কোন্‌ অনুচ্চারিত কথায় থাকিয়া থাকিয়া নড়িয়া উঠিতেছে— ‘আমার স্বামী— আমার স্বামী—’

মালিনীর অবস্থাও বিচিত্র। সে একসঙ্গে হাসিতেছে, কাঁদিতেছে, একবার ছুটিয়া মঞ্চের প্রান্ত পর্যন্ত যাইতেছে, আবার দ্বারের কাছে ফিরিয়া আসিতেছে। তাহার দিকে কাহারো দৃষ্টি নাই। মালিনী একবার চারিদিকে চাহিয়া দেখিল, তারপর সাবধানে কোঁচড় হইতে মালাটি বাহির করিয়া কালিদাসের শির লক্ষ্য করিয়া ছুঁড়িয়া দিল। মালাটি চক্রাকারে ঘুরিতে ঘুরিতে কালিদাসের মাথা গলিয়া পড়িল। কবি স্মিত চক্ষু তুলিয়া চাহিলেন।

রাজসভা শূন্য হইয়া গিয়াছে। নীচে একটিও লোক নাই, উপরে একাকিনী কুন্তলকুমারী বসিয়া আছেন, আর মালিনী দ্বারে ঠেস দিয়া দাঁড়াইয়া ঊর্ধ্বমুখে কোন্‌ দুর্গম চিন্তায় মগ্ন হইয়া গিয়াছে।

সহসা চমক ভাঙ্গিয়া কুন্তলকুমারী দেখিলেন তিনি একা, সকলে চলিয়া গিয়াছে। তিনি উঠিয়া দ্বারের দিকে চলিলেন। সকলে হয়তো তাঁহার ভাব-বিহ্বলতা লক্ষ্য করিয়াছে। কে কি ভাবিয়াছে কে জানে।

হৈমশ্রী দ্বারের কাছে পৌঁছিলে মালিনী চট্‌কা ভাঙ্গিয়া সোজা হইয়া দাঁড়াইল, সসম্ভ্রমে বলিল— ‘দেবি, আমার ওপর মহাদেবী ভানুমতীর আজ্ঞা আছে, আপনি যেখানে যেতে চাইবেন নিয়ে যাব।’

হৈমশ্রী নিঃশব্দে মাথা নাড়িয়া বাহির হইয়া গেলেন। কিছুদূর গিয়া তাঁহার গতি হ্রাস হইল, ইতস্তত করিয়া তিনি দাঁড়াইলেন, তারপর মালিনীর দিকে ফিরিয়া আসিলেন। বলিলেন— ‘তুমি কি মহাদেবী ভানুমতীর কিঙ্করী?’

মালিনী বলিল— ‘হাঁ দেবি, আমি তাঁর মালিনী।’

কুন্তলকুমারী আসল প্রশ্নটি সহজভাবে জিজ্ঞাসা করিবার চেষ্টা করিলেন কিন্তু গলা বুজিয়া গেল। অতি কষ্টে উচ্চারণ করিলেন— ‘তুমি— তুমি— কবি শ্রীকালিদাস কোথায় থাকেন তুমি জানো?’

মালিনী চক্ষু বিস্ফারিত করিয়া চাহিল; সহজ সম্ভ্রমের সুরেই বলিল— ‘হাঁ দেবি, জানি।’

আগ্রহের কাছে সংকোচ পরাভূত হইল, কুন্তলকুমারী আর এক-পা কাছে আসিলেন— ‘কোথায় থাকেন তিনি?’

মালিনীর মুখে একটু হাসি খেলিয়া গেল— ‘শিপ্রা নদীর ধারে নিজের হাতে কুঁড়ে ঘর তৈরি করেছেন, সেইখানেই থাকেন। তাঁর খবর নিয়ে আপনার কী লাভ দেবি? কবি বড় গরিব, দীনদরিদ্র; কিন্তু তিনি বড়লোকের অনুগ্রহ নেন না।’

হৈমশ্রী আর একটু কাছে আসিলেন— ‘তবে কি— তুমি কি— তাঁর সঙ্গে কি তোমার পরিচয় আছে?’

তিক্ত হাসিতে মালিনীর অধরপ্রান্ত নত হইয়া পড়িল— ‘আছে দেবি, সামান্যই। তিনি মহাকবি, আমি মালিনী। তাঁর সঙ্গে আমার কতটুকু পরিচয় থাকতে পারে?’

কুন্তলকুমারী কিছু শুনিলেন না, প্রবল আবেগে মালিনীর হাত চাপিয়া বলিলেন— ‘তুমি আমাকে তাঁর কাছে নিয়ে যেতে পারবে?’

মালিনীর চোখ হইতে যেন ঠুলি খসিয়া পড়িল। এতক্ষণ সে ভাবিয়াছিল রাজকুমারীর জিজ্ঞাসা বড় মানুষের ক্ষণিক কৌতূহল মাত্র; এখন সে সন্দেহ-প্রখর চক্ষে তাঁহার পানে চাহিয়া রহিল, তারপর সহসা প্রশ্ন করিল— ‘তুমি কে? কবি তোমার কে?’

ওষ্ঠাধর চাপিয়া কুন্তলকুমারী দুরন্ত বাষ্পোচ্ছ্বাস দমন করিলেন— ‘তিনি— আমার স্বামী।’

অতর্কিতে মস্তকে প্রবল আঘাত পাইলে মানুষ যেমন ক্ষণেকের জন্য বুদ্ধিভ্রষ্ট হইয়া যায়, মালিনীরও তদ্রূপ হইল। সে বিহ্বলভাবে চাহিয়া বলিল— ‘স্বামী— স্বামী?’

তারপর ধীরে ধীরে তাহার উপলব্ধি ফিরিয়া আসিল, সে ঊর্ধ্বমুখে চক্ষু মুদিত করিয়া অস্ফুট স্বরে বলিল— ‘ও স্বামী! তাই! বুঝতে পেরেছি, দেবি, এবার সব বুঝতে পেরেছি। তা আপনি তাঁর কাছে যেতে চান?’

হৈমশ্রী মিনতি করিয়া বলিলেন— ‘হাঁ। তুমি আমাকে তাঁর কাছে নিয়ে চল।’

মালিনীর বুকের ভিতরটা শূলবিদ্ধ সর্পের মত মুচড়াইয়া উঠিতেছিল, সে একটু বক্রোক্তি না করিয়া থাকিতে পারিল না— ‘দেবি, আপনি রাজার মেয়ে, সেখানে যাওয়া কি আপনার শোভা পাবে? সে একটা খড়ের কুঁড়ে ঘর, সেখানে কবি নিজের হাতে রেঁধে খান। এই দারিদ্র্য কি আপনি সহ্য করতে পারবেন রাজকুমারী?’

হৈমশ্রীর ভয় হইল মালিনী বুঝি তাঁহাকে লইয়া যাইবে না। তিনি হাতের কঙ্কণ খুলিতে খুলিতে ব্যগ্রভাবে বলিলেন— ‘তুমি বুঝতে পারছ না— আমি যে তাঁর স্ত্রী— সহধর্মিণী। এই নাও পুরস্কার। দয়া করে আমাকে তাঁর কুটিরে নিয়ে চল।’

হৈমশ্রী কঙ্কণটি মালিনীর হাতে গুঁজিয়া দিতে গেলেন, কিন্তু মালিনী লইল না, বিতৃষ্ণার সহিত হাত সরাইয়া লইল। তিক্ত হাসিয়া বলিল— ‘থাক, দরকার নেই, এইটুকু কাজের জন্যে আবার পুরস্কার কিসের! আসুন আমার সঙ্গে।’

রাজকুমারীর জন্য অপেক্ষা না করিয়াই মালিনী চলিতে আরম্ভ করিল।

কালিদাসের কুটির প্রাঙ্গণ। কুন্তলকুমারীকে সঙ্গে লইয়া মালিনী বেদীর সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইয়াছে। কালিদাস নাই; কেবল বেদীর উপর মালার স্তূপ পড়িয়া আছে। যেন কবি ক্লান্তভাবে এই সম্মানের বোঝা এখানে ফেলিয়া গিয়াছেন।

মালিনী নিজেকে অনেকটা সামলাইয়া লইয়াছে, তাহার মুখের ভাব দৃঢ়। রাজকুমারী হৈমশ্রী যেন স্বপ্নলোকে বিচরণ করিতেছেন। মালিনী ঘরের উদ্দেশে ডাকিল— ‘কবি, ওগো কবি! তুমি কোথায়?’

ঘরের ভিতর হইতে সাড়া আসিল না। কুন্তলকুমারী শঙ্কিত দীন নেত্রে মালিনীর পানে চাহিলেন।

মালাগুলি জড়াজড়ি হইয়া বেদীর উপর পড়িয়া আছে, তাহার মধ্য হইতে মালিনী নিজের মালাটি বাছিয়া বাহির করিয়া লইল। পর পর লাল সাদা ফুলে গাঁথা মালা— চিনিতে কষ্ট হয় না। মালাটি সে রাজকুমারীর হাতে ধরাইয়া দিয়া বলিল— ‘নাও— আমার সঙ্গে এস। উনি ঘরেই আছেন, হয়তো পুজোয় বসেছেন।’

মালিনী অগ্রবর্তিনী হইয়া কক্ষে প্রবেশ করিল, হৈমশ্রী কম্প্রবক্ষে দ্বিধাজড়িত পদে তাহার পিছনে চলিলেন।

কুটিরে একটিমাত্র কক্ষ, আয়তনেও ক্ষুদ্র। এক পাশে কালিদাসের দীন শয্যা গুটানো রহিয়াছে, আর এক কোণে একটি দীপখণ্ড, তাহার পাশে অনুচ্চ কাষ্ঠাসনের উপর কুমারসম্ভবের পুঁথি রহিয়াছে। কিন্তু কালিদাস ঘরে নাই।

হৈমশ্রীর দেহের সমস্ত শক্তি যেন ফুরাইয়া গিয়াছিল, তিনি পুঁথির সম্মুখে জানু ভাঙ্গিয়া বসিয়া পড়িলেন, অস্ফুট কণ্ঠে বলিলেন— ‘কই, কোথায় তিনি?’

মালিনী সবই লক্ষ্য করিতেছিল, বুঝি বা তাহার মনে অনুকম্পাও জাগিয়াছিল। সে বাহিরে যাইতে যাইতে আশ্বাসের ভঙ্গিতে বলিল— ‘তুমি থাক, আমি দেখছি। বুঝি নদীতে স্নান করতে গেছেন।’

মালিনী অদৃশ্য হইলে হৈমশ্রী হাতের মালাটি কুমারসম্ভবের পুঁথির উপর রাখিলেন, তারপর আর আত্মসংবরণ করিতে না পারিয়া পুঁথির উপর মাথা রাখিয়া সহসা কাঁদিয়া উঠিলেন।

শিপ্রার তীরে কালিদাস একাকী নদীর ধারে বসিয়া আছেন। মাঝে মাঝে নুড়ি কুড়াইয়া লইয়া অলস-হস্তে জলে ফেলিতেছেন। রাজসভার উত্তেজনা কাটিয়া গিয়া নিঃসঙ্গ জীবনের শূন্যতার অনুভূতি তাঁহার অন্তরকে গ্রাস করিয়া ধরিয়াছে। অন্তর্লোকে শ্রান্ত বাণী ধ্বনিত হইতেছে— কেন? কিসের জন্য? কাহার জন্য?

মালিনী নিঃশব্দে তাঁহার পিছনে আসিয়া দাঁড়াইল। কিছুক্ষণ নীরব থাকিয়া হ্রস্বকণ্ঠে ডাকিল— ‘কবি!’

কালিদাস চমকিয়া মুখ তুলিলেন— ‘মালিনী!’

মালিনী বলিল— ‘কি ভাবা হচ্ছিল?’

কালিদাস একটু চুপ করিয়া রহিলেন, শেষে বলিলেন— ‘ভাবছিলাম— অতীতের কথা।’

মালিনী মৃদুস্বরে বলিল— ‘কিন্তু ভাবনা সুখের নয়— কেমন?’

কালিদাস ম্লান হাসিয়া বলিলেন— ‘না, সুখের নয়। কিন্তু এ জগতে সকলে সুখ পায় না মালিনী।’

মালিনী বহমানা শিপ্রার জলে একটি নুড়ি ফেলিল— ‘না, সকলে পায় না। কিন্তু তুমি পাবে।’

কালিদাস ভ্রূ তুলিয়া মালিনীর পানে চাহিলেন, তারপর মৃদু ঘাড় নাড়িলেন— ‘কীর্তি যশ সম্মান— তাতে সুখ নেই মালিনী। সুখ আছে শুধু— প্রেমে।’

মালিনীর মুখে বিচিত্র হাসি ফুটিয়া উঠিল; সে কবির পানে একবার চোখ পাতিয়া যেন তাঁহাকে দৃষ্টি-রসে অভিষিক্ত করিয়া দিল, তারপর মুখ টিপিয়া বলিল— ‘প্রেমে জ্বালাও আছে কবি। নাও, ওঠ এখন। তোমাকে ডাকতে এসেছিলুম, একজন তোমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন।’

‘ও— কে তিনি?’

‘আগে চলই না, দেখতে পাবে।’

কালিদাস উঠিলেন। শিপ্রার পরপারে সূর্যদেব তখন দিগ্‌বলয় স্পর্শ করিয়াছেন।

প্রাঙ্গণ-দ্বারে পৌঁছিয়া কালিদাস দ্বার ঠেলিয়া ভিতরে প্রবেশ করিলেন। মালিনী কিন্তু ভিতরে আসিল না, চৌকাঠের বাহিরে দাঁড়াইয়া রহিল। কালিদাস তাহার দিকে ফিরিয়া চোখের ইঙ্গিতে তাহাকে ভিতরে আহ্বান করিলেন, মালিনী কিন্তু একটু ফিকা হাসিয়া মাথা নাড়িল।

এই সময় কুটিরের ভিতর হইতে শঙ্খধ্বনি হইল। কালিদাস মহা বিস্ময়ে সেইদিকে ফিরিলেন। মালিনী এই অবকাশে ধীরে ধীরে প্রাঙ্গণ-দ্বার বন্ধ করিয়া দিল, তাহার মুখের ব্যথা-বিদ্ধ হাসি কবাটের আড়ালে ঢাকা পড়িয়া গেল।

ওদিকে কালিদাস দ্রুত অনুসন্ধিৎসায় কুটিরের পানে চলিয়াছিলেন— তাঁহার ঘরে শঙ্খ বাজায় কে? সহসা সম্মুখে এক অপরূপ মূর্তি দেখিয়া তিনি স্থাণুবৎ দাঁড়াইয়া পড়িলেন। এ কি!

কুটির হইতে হৈমশ্রী বাহির হইয়া আসিতেছেন। গললগ্নীকৃত অঞ্চলপ্রান্ত, এক হস্তে দীপ অন্য হস্তে মালা। কালিদাসকে দেখিয়া তাঁহার গতি শ্লথ হইল না, স্থির দৃষ্টিতে স্বামীর পানে চাহিয়া তিনি কাছে আসিয়া দাঁড়াইলেন। চোখ দু’টিতে এখন আর জল নাই, অধর যদিও থাকিয়া থাকিয়া কাঁপিয়া উঠিতেছে তবু অধরপ্রান্তে যেন একটু হাসির আভাস নিদাঘ-বিদ্যুতের ন্যায় স্ফুরিত হইতেছে। তিনি প্রদীপটি বেদীর উপর রাখিলেন, তারপর দুই হাতে স্বামীর গলায় মালা পরাইয়া দিয়া নতজানু হইয়া তাঁহার পদপ্রান্তে বসিয়া পড়িলেন। অস্ফুট স্বরে বলিলেন— ‘আর্যপুত্র!’

কালিদাস জড়মূর্তির মত দাঁড়াইয়া ছিলেন; যাহা কল্পনারও অতীত তাহাই চক্ষের সম্মুখে ঘটিতে দেখিয়া তাঁহার চিন্তা করিবার শক্তিও প্রায় লোপ পাইয়াছিল। এখন তিনি চমকিয়া চেতনা ফিরিয়া পাইলেন। নত হইয়া রাজকুমারী হৈমশ্রীকে দুই হাত ধরিয়া তুলিবার চেষ্টা করিয়া বিহ্বল কণ্ঠে বলিতে লাগিলেন— ‘দেবি, দেবি— না না, পায়ের কাছে নয়—’

কুন্তলকুমারী স্বামীর মুখের পানে চোখ তুলিয়া দেখিলেন সেখানে প্রীতি ও ক্ষমা ভিন্ন আর কিছুরই স্থান নাই, এতটুকু অভিমান পর্যন্ত নাই। যে অশ্রুকে রাজনন্দিনী এত যত্নে চাপিয়া রাখিয়াছিলেন তাহা আর বাঁধন মানিল না, বাঁধ ভাঙিয়া বাহির হইবার উপক্রম করিল।

কালিদাস তাঁহাকে হাত ধরিয়া তুলিতেই দু’জনে মুখোমুখি দাঁড়াইলেন। অমনি মহাকালের মন্দির হইতে সন্ধ্যারতির শঙ্খঘণ্টাধ্বনি ভাসিয়া আসিল। —

অতঃপর কিছুক্ষণ কাটিয়াছে। ভাব-প্লাবনের প্রথম উদ্দাম উচ্ছ্বাস প্রশমিত হইয়াছে। উভয়ে বেদীর উপর উঠিয়া দাঁড়াইয়াছেন, তাঁহাদের হাত পরস্পর নিবদ্ধ।

কালিদাস মিনতি করিয়া বলিতেছেন— ‘কিন্তু দেবি, এ যে অসম্ভব। এই দীন পর্ণকুটিরে— না না, এ হতে পারে না—’

হৈমশ্রী বলিলেন— ‘যেখানে আমার স্বামী থাকতে পারেন সেখানে আমিও থাকতে পারব।’

কালিদাস বলিলেন— ‘না না, তুমি রাজার মেয়ে—’

হৈমশ্রী বলিলেন— ‘আমার ও পরিচয় আজ থেকে মুছে গেছে, এখন আমি মহাকবি কালিদাসের স্ত্রী!’

কালিদাসের মুখে ক্ষোভের সহিত আনন্দও ফুটিয়া উঠিল— ‘কিন্তু— এই দারিদ্র্য— তুমি সহ্য করতে পারবে কেন? চিরদিন ঐশ্বর্যের মধ্যে পালিত হয়েছ, রাজদুহিতা তুমি—’

হৈমশ্রী ঈষৎ ভ্রূভঙ্গ করিয়া চাহিলেন— ‘আর্যপুত্র, আপনার উমাও তো রাজদুহিতা— গিরিরাজসুতা; কিন্তু কৈ, তাঁকে মহেশ্বরের লতাগৃহে পাঠাতে আপনার তো আপত্তি হয়নি। তবে?’

কালিদাসের মুখে আর কথা রহিল না। হৈমশ্রীর দক্ষিণ হস্তটি ধীরে ধীরে উঠিয়া কবির বাম স্কন্ধের উপর আশ্রয় লইল।

সন্ধ্যা হইয়া গিয়াছে! শিপ্রার পরপারে দিগন্তের অস্তচ্ছটা ক্রমশ মেদুর হইয়া আসিতেছে। সেইদিকে চাহিয়া কালিদাস সহসা নিস্পন্দ হইয়া রহিলেন; হৈমশ্রীও তাঁহার দৃষ্টি অনুসরণ করিয়া সেইদিকে দৃষ্টি ফিরাইলেন।

এক শ্রেণী উষ্ট্র শিপ্রার কিনারা ধরিয়া চলিয়াছে।

হৈমশ্রী কালিদাসের পানে একটি অপাঙ্গদৃষ্টি প্রেরণ করিলেন, নিরীহভাবে প্রশ্ন করিলেন— ‘ও কী আর্যপুত্র?’

কালিদাসের মুখেও একটু হাসি খেলিয়া গেল, তিনি গম্ভীর হইয়া বলিলেন— ‘ওর নাম উষ্ট।’

হৈমশ্রী হাসি চাপিয়া বলিলেন— ‘কী— কী নাম বললেন আর্যপুত্র?’

কালিদাস তাড়াতাড়ি নিজেকে সংশোধন করিলেন— ‘না না, উষ্ট নয়, উষ্ট নয়— উট্র!’

উভয়ে একসঙ্গে কলহাস্য করিয়া উঠিলেন। কুন্তলকুমারীর যে হস্তটি স্কন্ধ পর্যন্ত উঠিয়াছিল, তাহা ক্রমে কালিদাসের কণ্ঠ বেষ্টন করিয়া লইল। কালিদাসও তাঁহার মাথাটি নিজের বুকের উপরে সবলে চাপিয়া ঊর্ধ্বে আকাশের পানে চাহিলেন।

পূর্ব দিগন্ত উদ্ভাসিত করিয়া শারদ পূর্ণিমার চাঁদ উঠতেছে।

এইরূপে এক বসন্ত পূর্ণিমার তিথিতে স্বয়ংবর-সভায় যে কাহিনী আরম্ভ হইয়াছিল, আর এক পূর্ণিমার সন্ধ্যায় শিপ্রাতীরের পর্ণকুটিরে তাহা পরিসমাপ্তি লাভ করিল।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%