পরিশিষ্ট

শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

[শরদিন্দু অম্‌নিবাস ষষ্ঠ খণ্ডে সুকুমার সেন-লিখিত ভূমিকায় শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঐতিহাসিক গল্প সম্পর্কিত অংশটুকু এখানে প্রাসঙ্গিকতা সূত্রে পুনর্মুদ্রিত হল। ]

গল্পের (এবং উপন্যাসের) প্রধান গুণ— একমাত্র গুণ হ’লেও ক্ষতি নেই— মনোহরণ-সামর্থ্য। যত বিভিন্ন বয়সের বিভিন্ন স্তরের বিভিন্ন সমাজের ব্যক্তির এবং যত বেশি ব্যক্তির ভালো লাগবে গল্পের গুণ ততই স্বীকৃত হবে। এই মাপে বিচার করলে শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্পের মান ও মর্যাদা উঁচুদরের। একদা গল্প লেখা হত পদ্যে। তখন গল্পের কোনো পাঠক ছিল না, ছিল শ্রোতা, এবং শ্রোতাদের অবসর ও ধৈর্য এখনকার পাঠকের মতো পরিমিত ছিল না। তাই কথকের চেষ্টা ছিল গল্পের সূত্রকে পাকিয়ে পাকিয়ে যতদূর পারা যায় টেনে যাওয়া। এই কাজে সহায়ক ছিল ভাষা এবং সে ভাষার বাহন সঙ্গীত। একালের গল্প-কবিতা সঙ্গীতের নভোযানে আবির্ভূত হয় না, তাকে যেতে হয় ছাপা বইয়ের পৃষ্ঠায় প্রবহমান গদ্যের রাজপথে। সে পথ যতই অবন্ধুর ও সরল হবে গল্পের গতি ও আকর্ষণ ততই বাড়বে। শরদিন্দুবাবুর গদ্যরীতির অনায়াস-সৌষম্যের কথা আগে বলেছি তাঁর ডিটেক্‌টিভ গল্পের প্রসঙ্গে। এখানে সে কথা তুলছি এইকারণে যে অত্র ষষ্ঠ খণ্ডে শরদিন্দুবাবুর প্রথম দিকের রচনা অনেকগুলিই আছে। সে সব রচনাতেও তাঁর প্রসন্ন-বাহিনী লেখনীর টানা স্রোত ব’য়ে চলেছে। এ গল্পগুলির অধিকাংশই ঐতিহাসিক-রঙা।

ইতিহাসের কাহিনী নিয়েই আমাদের দেশে গদ্য গল্পের সূত্রপাত। বিগত শতাব্দীর ঠিক মাঝখানে শশিচন্দ্র দত্ত ইংরেজীতে কিছু গল্প লিখেছিলেন ইতিহাস অবলম্বনে। শশিচন্দ্রের পথ অবলম্বন ক’রে ভূদেব মুখোপাধ্যায় বাংলায় দুটি গল্প লিখেছিলেন। তার মধ্যে একটি ‘অঙ্গুরীয় বিনিময়’ বঙ্কিমচন্দ্রের দুর্গেশনন্দিনীতে কিঞ্চিৎ ছায়া ফেলেছে। বঙ্কিমচন্দ্র ইতিহাসকে পশ্চাৎপট ক’রে তাঁর রোমান্সগুলির গল্প জমিয়েছেন। তার পর শশিচন্দ্রের স্নেহলালিত ভ্রাতুষ্পুত্র রমেশচন্দ্র দত্ত রীতিমত ইতিহাস-অনুগত উপন্যাস লিখলেন। ‘ঐতিহাসিক উপন্যাস’ বাংলায় প্রতিষ্ঠিত হ’ল। ঐতিহাসিক উপন্যাসেরই খণ্ড ছিন্ন রূপ দেখা গেল হরিসাধন মুখোপাধ্যায়ের গল্পে। তার পর এলেন যদুনাথ ভট্টাচার্য। ইনি বাংলার ইতিহাস থেকে কিছু বীর পুরুষ বেছে নিয়ে কল্পনা সংযোগে উপন্যাস লিখলেন। তা স্বদেশী এবং ঐতিহাসিকও হ’ল বটে কিন্তু ঠিক উপন্যাস হ’ল না, অর্থাৎ পাঠকের মন ভোলাতে পারে নি। তার পরে এলেন রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়। ঐতিহাসিক উপন্যাস রচনায় পূর্বগামীদের সঙ্গে এঁর কিছু পার্থক্য ছিল। রাখালদাস ইতিহাসের পাঠক ছিলেন না, ছিলেন ইতিহাসের গবেষক এবং ইতিহাসের লেখক। ইনি ইতিহাস বিদ্যাকে অধিগত করেছিলেন, তাই তাঁর উপন্যাসের ঐতিহাসিক মালমশলা টাটকা সবজির মতো স্বাদু। রাখালদাসের উপন্যাস পড়লে ইতিহাস পড়ার ফল হয়। গল্পরসও আছে, কিন্তু সে রস খাঁটি হ’লেও নবীন নয়। তিনি বঙ্কিমচন্দ্রেরই জের টেনেছিলেন। সাধারণ পাঠকের কাছে রাখালদাসের উপন্যাস— বোধ করি ‘ময়ূখ’ ছাড়া— যতটা সমাদর পাওয়া উচিত ছিল ততটা পায় নি। সে দোষ হয়ত সম্পূর্ণ সাধারণ পাঠকের নয়।

তার পরে এলেন শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়। ইনি ঐতিহাসিক ছিলেন না। ভারতবর্ষের ইতিহাস উদ্ধারের কোন মহৎ ব্রত ইনি অবলম্বন করেন নি। শরদিন্দুবাবু ছিলেন ইতিহাস-পিপাসু পাঠক, ভক্ত। আগেকার লেখকদের মতো শরদিন্দুবাবু দূরবীনের চোঙার মধ্য দিয়ে কিংবা নাকে দূরদৃষ্টির চশমা এঁটে ইতিহাস হাতড়ান নি বা খোঁজ চালান নি। ইনি যেন চোখে কন্‌ট্যাক্‌ট লেন্স লাগিয়ে ইতিহাসকে হাতের নাগালে পেয়েছিলেন। প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে সপ্তদশ শতাব্দী পর্যন্ত শরদিন্দুবাবুর ঐতিহাসিক গল্পের কালপ্রসার। এর মধ্যে কোথাও গল্পের পরিবেশ গল্পরসের তীক্ষ্ণতার হানি করে নি। দূরের দৃশ্যপটকে নিকটে এনে দূরের মানুষকে কাছের মানুষ করতে পেরেছেন শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়। এইখানেই ঐতিহাসিক গল্পলেখক রূপে তাঁর বিশেষ কৃতিত্ব।

আগেকার ঐতিহাসিক গল্প-উপন্যাসে মোগল-অন্তঃপুর, শাহী দরবার, আরাবল্লীর গিরিদুর্গ— এসব নিয়ে অনেক অনেক লেখা হ’য়েছে। শরদিন্দুবাবু তাই মুসলমান অধিকার কালে তিন-চারটির বেশি গল্প ফাঁদেন নি। দুটি গল্পের কাল আলাউদ্দিন খিলজির সময়ে (‘শঙ্খ-কঙ্কণ’ ও ‘রেবা রোধসি’), একটি শিবাজীর বিষয়ে (‘বাঘের বাচ্চা’) আর একটির কাল শাহ সুজার সময়ে (‘তক্ত্‌ মোবারক’)। দুটি গল্পের কাল পঞ্চদশ-ষোড়শ শতাব্দী (‘রক্ত-সন্ধ্যা’ ও ‘চুয়াচন্দন’)। তিনটি গল্পের কাল চতুর্থ-পঞ্চম শতাব্দীতে (‘মৃৎপ্রদীপ’, ‘অষ্টম সর্গ’ ও ‘মরু ও সঙ্ঘ’) এবং তিনটি খ্রীস্টপূর্ব ষষ্ঠ-পঞ্চম শতাব্দীতে কল্পিত (‘অমিতাভ’, ‘বিষকন্যা’ ও ‘সেতু’)। একটির কাল হ’ল আর্যদের আগমনের গোড়ার দিকে (‘প্রাগ্‌জ্যোতিষী’), একটির কাল তারও আগে (‘ইন্দ্রতূলক’)। একটির কাল প্রাচীন তবে অনির্দেশ্য (‘রুমাহরণ’)। আর একটির বীজ মিশরের প্রাচীন ইতিহাস থেকে নেওয়া (‘আদিম’)। বাকী ঐতিহাসিক গল্পটির কাল রচনার (১৯৩৬) প্রায় সমসাময়িক (১৯৩৪— ‘চন্দন-মূর্তি’)।

দূর-কালের ইতিহাসকে বর্তমান কালের গোচরে আনবার যে অভিনব কৌশলটি শরদিন্দুবাবু অবলম্বন করেছেন তা হ’ল জাতিস্মর কল্পনা। শরদিন্দুবাবু জাতিস্মর ঘটনায় বিশ্বাসী ছিলেন কি না ঠিক জানি না— বোধ হয় ছিলেন। কিন্তু সে যাই হোক তিনি যে গল্প রচনায় স্বীয় জাতিস্মরতা প্রতিপন্ন করেছেন তা সহৃদয় পাঠক অবশ্যই স্বীকার করবেন। শরদিন্দুবাবুর জাতিস্মর সাহিত্যদৃষ্টিই ভূতকালের ভূতত্বের সপিণ্ডীকরণ ক’রেছে।

অত্র খণ্ডে সঙ্কলিত ত্রিশটি গল্পের মধ্যে সতেরটি ঐতিহাসিক। তার মধ্যে পাঁচটি ‘বৌদ্ধ’ কালের। বৌদ্ধধর্মের ও ‘বৌদ্ধ’ যুগের ইতিহাসের উপর শরদিন্দুবাবুর টান একটু বেশি ছিল। তার কারণও আছে। এঁর জীবনের পূর্বাংশ কেটেছিল দক্ষিণ মগধ অঞ্চলে। পাটলিপুত্র, রাজগৃহ, শ্রাবস্তী এঁর সবিশেষ পরিচিত ছিল। শরদিন্দুবাবুর আগে গুপ্ত যুগের আগেকার ইতিহাস নিয়ে কেউ গল্প-উপন্যাস লেখেন নি (অবশ্য নাটক লেখা হয়েছিল আলেকজাণ্ডারের ভারত-আক্রমণ ও তার পরবর্তী ঘটনা নিয়ে, বুদ্ধের জীবনী নিয়েও। কিন্তু সে-সবের কাহিনী চর্বিত চর্বণ ছাড়া কিছু নয়। রাখালদাসের ‘হেম-কণা’ বা ‘পাষাণের কথা’ ঠিক গল্প উপন্যাস নয়। ) ‘বৌদ্ধ’ ইতিহাসে শরদিন্দুবাবুর আগ্রহ যে কতটা গভীর তার পরিচয় রয়েছে ‘মরু ও সঙ্ঘ’ গল্পে। চীনীয় তুর্কিস্থান একদা সরস উর্বর ভূখণ্ড ছিল। সেখানে বৌদ্ধধর্মের বিশেষ চর্চা হ’ত। কালক্রমে গোবি মরুভূমির বালিরাশি সে ভূখণ্ডকে গ্রাস ক’রে ফেলে এবং সব কিছুই বালিতে চাপা পড়ে যায়। বর্তমান শতাব্দীর প্রারম্ভে চীনীয় তুর্কিস্থানের মরুভূমি খুঁড়ে প্রাচীন শহরের ও বিহারের ভগ্নস্তূপ এবং বহু লেখ পাওয়া যায়। তাতে সে দেশের ইতিহাস, সে দেশের সঙ্গে ভারতবর্ষের সম্বন্ধ এবং তত্র বৌদ্ধধর্মের পরিণতি সম্বন্ধে অনেক তথ্য মিলেছে। চীনীয় তুর্কিস্থানের এই মরুগ্রাস ঘটনাকে অবলম্বন ক’রে এই গল্পটি লেখা হয়েছে।

আমার সব চেয়ে বিস্ময় লেগেছে ‘অষ্টম সর্গ’ গল্পটির অসাধারণ কৌশলে ও দক্ষতায়। কালিদাস তাঁর কুমারসম্ভব কাব্য ক’ সর্গ পর্যন্ত লিখেছিলেন তা নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে দু-চার শ’ বছর ধরে বিতণ্ডা চলে এসেছে। কতক পণ্ডিত বলেন কালিদাস সপ্তম সর্গে শিব-পার্বতীর বিবাহ ঘটিয়ে দিয়েই কাব্যটি শেষ করেছিলেন। কতক পণ্ডিত মনে করেন যে অষ্টম সর্গটিও কালিদাসের লেখা। এঁদের যুক্তি হ’ল, অষ্টম সর্গের রচনায় কালিদাসের লেখনীর স্পর্শ যেন বোঝা যায়, এবং মল্লিনাথও অষ্টম সর্গ পর্যন্ত ব্যাখ্যা লিখে গেছেন। নবম থেকে সপ্তদশ সর্গ পর্যন্ত অংশটি যে কালিদাসের লেখা নয় তা বুঝদার পণ্ডিত মাত্রেই স্বীকার করেন। কয়েকজন নেই-আঁকুড়ে অবশ্য এ নয় সর্গও কালিদাসের রচনা ব’লে মানেন। শরদিন্দুবাবু গল্পটির মধ্যে দেখাতে চেয়েছেন যে কালিদাস সাত সর্গ পর্যন্ত লিখে থেমে গিয়েছিলেন। কারণ আমাদের অলঙ্কার শাস্ত্রমতে বিবাহঘটনার পরবর্তী দাম্পত্য সহবাস কাব্যে অথবা নাট্যে বর্ণনীয় বিষয় নয়। কাব্যনামটির কথা স্মরণ ক’রে কবির মন বাসরঘরের চৌকাট অবধি এসে থেমে যাওয়ায় মন সরছিল না। যেভাবে তাঁর কবিদৃষ্টি দেবদম্পতির দ্বারপ্রান্ত থেকে উঁকি দেবার ঔৎসুক্য পেয়েছিল। তাই-ই রচনাটির গল্পসত্ত্ব।

— যবে অবশেষে

ব্যাকুল শরমখানি নয়ননিমেষে

নামিল নীরবে, কবি, চাহি দেবী-পানে

সহসা থামিলে তুমি অসমাপ্ত গানে ॥

— রবীন্দ্রনাথের কবিতার এই ইঙ্গিতটুকু শরদিন্দুবাবু অত্যন্ত সহৃদয়তায় ও দক্ষতায় তাঁর গল্পে এঁকে দিয়েছেন।

একটি ঐতিহাসিক গল্পেও লেখকের নিপুণ কুশলতা দেখিয়ে দেওয়া আবশ্যক। ‘চন্দন-মূর্তি’ গল্পটিতে ‘বৌদ্ধ’ যুগ প্রায় গল্প-রচনার কাল পর্যন্ত টেনে আনা হ’য়েছে। গল্প-সমাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে কালেরও পরিসমাপ্তি ঘটিয়েছেন শরদিন্দুবাবু সমসাময়িক বিহার ভূমিকম্পকে উপলক্ষ্য ক’রে। লেখক নিজের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে অভিনবত্ব দেখিয়েছেন।

ঐতিহাসিক গল্পগুলির মধ্যে ‘আদিম’ একটু দুর্বল। তার কারণ এ গল্পের কাহিনীতে ইতিহাসের খেই ঠাসবুনোনি গাঁথতে পারে নি। ইতিহাস প্রাচীন মিশরের। সে ইতিহাসের সঙ্গে আমাদের মনের সম্পর্ক কিছু নেই। প্রাচীন মিশরের রাজ-সংসারে ভাইবোনের বিয়ে হ’ত প্রধানত রাজবংশের বিশুদ্ধি রাখবার জন্যে। সাধারণ সমাজে ভাইবোনের বিয়ে কতটা চলত তা জানি না, তবে কিছু হয়ত চলত। তবে আমাদের কাছে এ ব্যাপার অত্যন্ত ঘৃণ্য ঠেকে। শরদিন্দুবাবু গল্পটিতে দেখাতে চেয়েছেন, যে ভালোবাসা জন্মাবধি তা রক্তের মধ্যে রয়ে যায়। তাই সোমভদ্র শেষ পর্যন্ত শফরীকে পরিপূর্ণ ভালোবেসেই বিয়ে করলে।

বর্তমান মুহূর্তে রামায়ণের ঐতিহাসিক আলোচনা-প্রসঙ্গে বলা হচ্ছে যে পালি জাতকে রামের গল্পে সীতাকে তাঁর ভগিনী এবং ভার্যা বলা হয়েছে। এই সূত্রে কেউ কেউ বলছেন যে আমাদের দেশে সুপ্রাচীন কালে হয়ত ভাইবোনের বিয়ে অজ্ঞাত ছিল না। শরদিন্দুবাবুর গল্পটির প্রসঙ্গে এই অনুমানের বিষয়ে আমার মন্তব্য এখানে উপস্থাপিত করলে আশা করি উৎকটরকম অপ্রাসঙ্গিক হবে না।

বৈদিক দেবতাদের কারো কারো আচরণে ভগিনীবিবাহের মতো অত্যন্ত অবৈধ প্রচেষ্টার উল্লেখ পাওয়া যায়। কিন্তু বৈদিক মিথলজি এত প্রাচীন এবং এমন জটিল যে তার থেকে কোন বিশেষ মানবগোষ্ঠীর সামাজিক রীতিনীতির কোন নিষ্কর্ষ পাওয়া যায় না। ঋগ্‌বেদের অর্বাচীন অংশে যে যম-যমী সূক্ত আছে তার থেকে উল্টা সিদ্ধান্তই করতে হয় যে ভাই-ভগিনীর বিবাহ আর্যসমাজে অত্যন্ত ঘৃণ্য ব্যাপার গণ্য হ’ত। যমী যমকে বিবাহ করতে চায়, যম কিন্তু কিছুতেই রাজি নয়, সে বলে সূর্যের চোখ মুহুর্মুহু উন্মীলিত হয়ে দিন রাত্রি করছে, স্বর্গ ও মর্ত্য মিথুন, আত্মীয়, আর যমী যমের সঙ্গে অত্যন্ত গর্হিত কাজ করবে।

ভ্রাতা-ভগিনীর সংলাপের ফল যে কী হয়েছিল তার কোন হদিস নেই ঋগ্‌বেদে। তবে পরবর্তী বৈদিক ঐতিহ্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে যমের মৃত্যু ঘটেছিল। এখনকার গল্প হ’লে যমীর আক্রমণ এড়াতে যম আত্মহত্যা করত।

মনে হয় পালি জাতকের গদ্য অংশে ভুল ক’রে সীতাকে রামের পত্নী করা হয়েছে। আসলে হয়ত সীতা ভগিনীই। তার কারণ বলছি। খ্রীস্টীয় তৃতীয় শতাব্দীতে চীনা ভাষায় অনুবাদ করা একটি জাতকে— এই জাতকের মূল পালিতে পাওয়া যায় নি— রাম-কথা আছে। সেখানে রাম লক্ষ্মণ ও সীতা ভাইবোন। বনবাস অন্তে অযোধ্যায় ফিরে এসে রাম ও সীতা সিংহাসনে বসলেন এবং তাঁদের বিবাহ হ’ল। এইখানেই গোল বেধেছে। রাম-সীতা পতি-পত্নী হ’লে আগেই উল্লেখ থাকত। তা নেই। মনে হয় ভাইবোনে যুগপৎ রাজ্য করেছিল, তারা রাজা ও রানী। জাতকটি যিনি লিখেছিলেন তিনি রাজা ভাই ও রানী বোনকে প্রচলিত প্রথায় স্বামী-স্ত্রী ক’রে দিয়েছেন।

ঐতিহাসিক গল্পগুলির অধিক আলোচনা নিষ্প্রয়োজন। সাধারণ পাঠক স্বচ্ছন্দো ‘ঐতিহাসিক’ মন্তব্যটুকু বাদ দিতে পারেন। তাতে গল্পগুলির ঘটনার বৈচিত্র্য ও নাটকীয়তার এবং বর্ণনার জাদুর কিছুমাত্র খর্বতা ঘটবে না। গল্পগুলি শিক্ষাগর্ভ নয়, গল্পগুলিতে পাণ্ডিত্যের কর্কশতা নেই, এগুলি বিশুদ্ধ রোমান্টিক এবং সহৃদয় ও উপাদেয় গল্প।

শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের পূর্বগামী লেখকদের ঐতিহাসিক গল্প-উপন্যাসে ‘জীবন্ত’ ভূমিকা যে মেলে নি এমন নয়। কিন্তু সে-সব ভূমিকা জীবন্ত হয়েছে বাইরের আলোকরশ্মি প্রতিফলিত হওয়ায়, অর্থাৎ লেখকের উজ্জ্বল বর্ণনায় উদ্ভাসিত হওয়ার ফলে। শরদিন্দুবাবুর গল্পের ভূমিকাগুলি জীবন্ত হয়েছে বাইরের থেকে আলোকসম্পাতে নয় তাদের অন্তরের জ্যোতি থেকেই। শরদিন্দুবাবুর বর্ণনা নয় তাঁর দৃষ্টিই ভূমিকাগুলিকে ইতিহাস-মঞ্চের পুতুলীবাজি থেকে নামিয়ে এনে যেন সমসাময়িক জীবনে ভূমিষ্ঠ করিয়েছেন। ...(২৮.২.১৯৭৬)

অধ্যায় ২৪ / ২৪
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%