ইমানুল হক
ভারতে সুপ্রিম কোর্ট শব্দটার জন্ম ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে৷ ১৭৭৪ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় ফোর্ট উইলিয়মে স্থাপিত হয় সুপ্রিম কোর্ট অফ জুডিকেচার৷ প্রথমেই দ্বন্দ্ব বাধে বিচার বিভাগ ও শাসন বিভাগের মধ্যে৷ কার কর্তৃত্ব কতটা ও কতদূর? সুপ্রিম কোর্টের মত ছিল, বাংলা বিহার ওড়িশার যে কোনো অধিবাসীর বিচার তাঁরা করতে পারবেন৷ ওয়ারেন হেস্টিংসের কর্তৃত্বাধীন সুপ্রিম কাউন্সিল চেয়েছিল সুপ্রিম কোর্টের সীমাবদ্ধ ক্ষমতা৷ অবশেষে ১৭৮১ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ সংসদ রায় দিল—কলকাতা, বাংলা বিহার ওড়িশার যে কোনো ব্রিটিশ অধিবাসীর বিচার করতে পারবে সুপ্রিম কোর্ট৷ কিন্তু যে কোনো বাসিন্দার নয়৷
সুপ্রিম কোর্ট ও তার রায় নিয়ে বিতর্ক আছে শুরু থেকে৷ ওয়ারেন হেস্টিংসের সঙ্গে দ্বন্দ্ব বাধে নন্দকুমারের৷ সিরাজউদ্দৌলাকে প্রতারণা করে ইংরেজ সহচর হয়েছিলেন নন্দকুমার, হয়ে ওঠেন ক্লাইভের বন্ধু৷ এর পর কিন্তু হেস্টিংসের সঙ্গে তাঁর বনিবনা হয় না৷ তখন কোম্পানির শাসন চলত সুপ্রিম কাউন্সিলের নামে৷ কাউন্সিলের চার সদস্য৷ তিন সদস্য হেস্টিংসের বিরুদ্ধে৷ নন্দকুমার ফ্রান্সিস-সহ তিনজনকে হেস্টিংসের বিরুদ্ধে ঘুষ ও দুর্নীতির নানা তথ্য সরবরাহ করতে থাকেন৷
১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে ওয়ারেন হেস্টিংসের সহায়তায় মোহনপ্রসাদ নামে এক ব্যক্তি নন্দকুমারের বিরুদ্ধে জালিয়াতির মামলা আনেন৷ সুপ্রিম কোর্ট প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পাঁচ বছর আগের ঘটনা৷ প্রশ্ন উঠল, যখন সুপ্রিম কোর্ট ছিল না, তখনকার ঘটনার বিচার সুপ্রিম কোর্ট করতে পারে কি না? সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি এলিজা ইম্পে ছিলেন হেস্টিংসের স্কুলের সহপাঠী৷
তিনি রায় দিলেন, পারেন৷ এবং শেষ পর্যন্ত সাজানো বিচারে নন্দকুমারের ফাঁসির আদেশ হল৷ ভারতীয় আইনে কোনো ভারতীয়ের ফাঁসি হতে পারে না৷ এই যুক্তিতে এর আগে এক ব্যক্তিকে ফাঁসির আদেশ দেয়নি সুপ্রিম কোর্ট৷ কিন্তু নন্দকুমারের ক্ষেত্রে তার ব্যতিক্রম হল৷ নন্দকুমার ফাঁসিতে ঝুললেন৷
এ-নিয়ে ব্রিটিশ সংসদে ঝড় উঠল৷ হেস্টিংস ও প্রধান বিচারপতি এলিজা ইম্পের বিরুদ্ধে৷ শেষ পর্যন্ত নিষ্কৃতি পেলেন৷ কিন্তু হেস্টিংসের জীবনীকারকে লিখতে হল, হেস্টিংস ও প্রধান বিচারপতি এলিজা ইম্পে জালিয়াত ও চরম দুর্নীতিগ্রস্ত৷
আঠারো শতকে সংবাদপত্র যে সাহস দেখিয়েছিল আজকের ভারতে তা অবশ্য স্মরণযোগ্য৷ জেমস অগাস্টাস হিসি (১৭৪০-১৮০২) ছিলেন একজন আইরিশ৷ তিনি ১৭৮০ খ্রিস্টাব্দে ‘বেঙ্গল গেজেট’ নামে এক পত্রিকা প্রকাশ করেন৷ তাতে বাক্স্বাধীনতার পক্ষে সওয়াল করেন৷ ওয়ারেন হেস্টিংসের দুর্নীতি, অত্যাচারের বিরুদ্ধে বারেবারে লেখেন৷ তাঁর কাগজ বন্ধ করা হয়৷ তাঁকে জেলে পাঠানো হয়৷ নির্বাসিত করা হয়৷ তবু দমেননি৷ ওয়ারেন হেস্টিংসকে ‘নপুংসক’ পর্যন্ত লেখেন৷ আজকে ‘যুদ্ধোন্মাদ’ সময়ে তাঁকে অবিশ্বাস্য মনে হবে, তিনি সাম্রাজ্যবিস্তার, সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধের বিরুদ্ধে কলম লেখেন৷ গরিবের পক্ষে দাঁড়ান৷ প্রতিনিধিত্বমূলক করের পক্ষে প্রচার চালান৷ তৎকালীন শাসকরা তাঁর বিপক্ষে একটি কাগজ প্রকাশে মদত দেন৷ ইন্ডিয়া গেজেট৷ কোনো বিজ্ঞাপন পাননি হিকিসাহেব৷ বিপরীতে ইন্ডিয়া গেজেটের আর্থিক রমরমা৷
সবচেয়ে বড় কথা সুপ্রিম কোর্টের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এলিজা ইম্পেকেও তিনি রেয়াত করেননি৷ তাঁকে পক্ষপাতদুষ্ট ও দুর্নীতিগ্রস্ত বলে অভিযুক্ত করেন৷
হেস্টিংস হিকির পত্রিকা ডাকে পাঠানো বন্ধ করেন৷ তবু তাঁকে দমানো যায়নি৷ বিচারপতি এলিজা ইম্পের কাছে সম্পাদক হিকির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়৷ ১৭৮১ খ্রিস্টাব্দে চারটি সাজানো শুনানির পর তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে জেলে পাঠানো হয়৷ জেলে গিয়েও দমেন না৷ সেখানে থেকেই তাঁর পরিচালনায় প্রকাশিত হতে থাকে সাপ্তাহিক ‘বেঙ্গল গেজেট’৷ অবশ্য সুপ্রিম কোর্টের রায়ে তাঁর প্রেসের সমস্ত টাইপ বাজেয়াপ্ত করে সংবাদপত্রের প্রকাশ বন্ধ করা হয় ১৭৮২ খ্রিস্টাব্দে ৩০ মার্চ৷ হিকি রাষ্ট্র, বিচার বিভাগ এবং ধর্মের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন তাঁর সংবাদপত্রে৷ আজ হিকিরা কোথায়? হিকির অনুগামীরা প্রায় বিরল৷ রবীশ কুমার, অভিসার শর্মা, প্রসূন বাজপেয়ীরা চেষ্টা করছেন৷ দি টেলিগ্রাফ, হিন্দু পত্রিকা এখনও তেমন মাথা নোয়ায়নি৷ তাই কেন্দ্রীয় সরকারের কোনো বিজ্ঞাপন পায় না—এই দুই সংবাদপত্র৷ ‘দি টেলিগ্রাফ’ তো অসাধারণ সব শিরোনাম করছে৷ কুর্নিশ সম্পাদককে৷
কিন্তু বাকি সব করে রব৷
ইংরেজরা পরবর্তীকালে কলকাতা, মুম্বাই, মাদ্রাজের সুপ্রিম কোর্ট বাতিল করে৷ ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দে রাজ্যে রাজ্যে হাইকোর্টও তৈরি হয় ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দের ইন্ডিয়ান হাইকোর্টস আইন মোতাবেক৷ ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দের ২৬ জানুয়ারি স্বাধীন ভারতের সুপ্রিম কোর্ট গঠিত হয় নতুন সংবিধান অনুযায়ী৷ ২৮ জানুয়ারি কাজ শুরু হয়৷
ভারতে সুপ্রিম কোর্ট এক অভূতপূর্ব বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করে৷ লোকে কোনো প্রতিকার না পেলে বলতো, কোর্টে দেখা হবে৷ সুপ্রিম কোর্টে দরকারে যাব৷ সুপ্রিম কোর্ট শাসনবিভাগের সঙ্গে স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেছে৷ অনেককেই রেয়াত করেনি৷ সিবিআইকে বলেছিল, খাঁচায় বন্দি তোতাপাখি৷ পুলিশ সম্পর্কে মন্তব্য ছিল, সংগঠিত গুন্ডাবাহিনী৷
শবরীমালা প্রশ্নে ঐতিহাসিক রায় দিয়েছে৷ তিন তালাক নিয়েও৷ কিন্তু বাবরি মসজিদ-সহ কয়েকটি ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের রায়ে ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হয়নি বলে অনেকের মনে হয়েছে৷ সিজারের পত্নীকে সব সময় সন্দেহের ঊর্ধ্বে থাকতে হয়৷ কিন্তু তা কতটা হচ্ছে, সে নিয়ে নানা সংশয়৷ ২০১৮-এ সুপ্রিম কোর্টের চার বিচারপতি বিদ্রোহ করেন৷ যা অভূতপূর্ব ছিল৷ বিচারব্যবস্থায় শাসকের হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ছিল৷
বিচারপতি চেলামেশ্বর এক ঐতিহাসিক মন্তব্য করেন৷ প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্রের নাম জড়িয়েছিল জমি দুর্নীতিতে৷ সদ্য প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈয়ের নামে সুপ্রিম কোর্টের এক তরুণী কর্মী শ্লীলতাহানির অভিযোগ আনেন৷
এরপর কিছু রায় ঘিরে প্রশ্ন উঠতে থাকে৷ কর্ণাটক বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ঐতিহাসিক রায় দেন সুপ্রিম কোর্ট৷
দেশের প্রকাশ্য এবং গোপন ফ্যাসিবাদী সুপ্রিমোর কবলে নির্বাচন কমিশন, সিবিআই, ইডি আয়কর-সহ বহু প্রতিষ্ঠান৷
সুপ্রিম কোর্ট যেন সুপ্রিমোর আদেশে না চলে এই প্রার্থনা৷
পুনশ্চঃ ২০২৩-এ দেশের নির্বাচন কমিশনার ও সহ-কমিশনার নিয়োগ প্রক্রিয়া থেকে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতিকে বাদ দিয়ে দিল মোদী সরকার।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন