অভিশপ্ত আহোয়া

ময়ূখ চৌধুরী (প্রসাদ রায়)

ঘুম ভেঙে গেল...

ঘুম ভেঙে যাওয়া কিছু আশ্চর্য নয়৷

সেই বীভৎস চিৎকার কানে গেলে জ্যান্ত মানুষ তো দূরের কথা, বোধহয় কবরের মড়াও ‘বাপ রে’ বলে কবরের মধ্যে ধড়মড়িয়ে উঠে বসত...

ঘুমের ঘোর তখনও চোখ থেকে কাটেনি, আমার স্তম্ভিত দৃষ্টির সম্মুখে ফুটে উঠল এক ভয়ঙ্কর দৃশ্য৷

ভালো করে চোখ মুছে চাইলুম—না, দুঃস্বপ্ন নয়, নিশ্চিত মৃত্যুর পরোয়ানা নিয়ে আমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে অনেকগুলি চতুষ্পদ জীব—তাদের রোমশ দেহের সাদা সাদা চামড়ার ওপর নাচছে অগ্নিকুণ্ডের রক্তিম আলোকধারা, জ্বলন্ত কয়লার মতো চোখে জ্বলছে ক্ষুধিত হিংসার নিষ্ঠুর প্রতিচ্ছবি৷

কাফাতো হাতের বর্শা বাগিয়ে ধরে একটু ঝুঁকে দাঁড়াল, ‘মিঃ ম্যাক, বাঁচার আশা রেখো না, সাদা শয়তানের দল যাকে ঘিরে ধরে তার নিস্তার নেই—তবে, মরার আগে মেরে মরব!’

পাশের রাইফেলটা তুলে ধরে সেফ্টি ক্যাচটা সরিয়ে দিলুম৷ সঙ্গে সঙ্গে একটা জানোয়ার অগ্নিকুণ্ডের খুব কাছে এসে চিৎকার করে উঠল—অস্পষ্ট চাঁদের আলোয় ঝক-ঝক করে উঠল তীক্ষ্ণ দাঁতের সারি৷

অগ্নিকুণ্ডর কাছে ও দূরে যে চতুষ্পদ জীবগুলি এতক্ষণ নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল তারা হঠাৎ চঞ্চল হয়ে উঠল৷

কাফাতো বললে, ‘মিঃ ম্যাক, প্রস্তুত হও—এবার ওরা আক্রমণ করবে৷’

রাইফেলের ট্রিগারে আঙুল রেখে চারপাশে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলুম৷ সামনে অগ্নিকুণ্ড, তার পিছনেই দাঁড়িয়ে আছে মূর্তিমান যমদূতের দল৷ আগুনের এধারে আমি আর কাফাতো, পিছন থেকে আমাদের বাঁ-দিক ও ডান দিক দিয়ে উঠে গেছে খাড়া পাহাড়ের প্রাচীর৷

আমার কাছে রাইফেলের কার্তুজ খুব বেশি নেই, ভরসা খালি আগুন৷ কিন্তু আগুনের তেজ কমে এসেছে জ্বালানি কাঠ, বসার টুল, এমনকী তাঁবুটাকেও আমরা জ্বালিয়ে দিয়েছি—আর এমন কিছু নেই যা দিয়ে আগুনটাকে বাঁচিয়ে রাখা যায়—এবার?

কাফাতোর দিকে তাকিয়ে দেখলুম তার কালো পাথরের মতো মুখ সম্পূর্ণ নির্বিকার, শুধু শরীরের মাংসপেশীগুলি যেন এক ভয়ঙ্কর প্রতীক্ষায় ফুলে ফুলে উঠছে...

সামনের জানোয়ারটা আরও কাছে এসে দাঁড়াল, তারপর হঠাৎ এক প্রকাণ্ড লাফ মেরে আগুন ডিঙিয়ে একেবারে আমাদের সামনে এসে পড়ল৷ আর সঙ্গে সঙ্গে দেখলুম তাকে অনুসরণ করে আরও দুটো জানোয়ার আগুনের বেড়ার ওপর দিয়ে শূন্যে লাফ মারল৷

আমার হাতের রাইফেল সশব্দে অগ্নি-উদ্‌গার করলে, সামনের জন্তুটার মৃতদেহ লুটিয়ে পড়ল৷

কাফাতো হাতের বর্শা চালিয়ে আর-একটা জন্তুকেও মাটিতে পেড়ে ফেলল কিন্তু তিন নম্বর শয়তানটা তার দেহের ওপর এসে পড়ল এবং বিকট হাঁ করে শত্রুর গলায় কামড় বসাবার উপক্রম করলে৷

ভীষণ আতঙ্কে আমার হাতের আঙুল অবশ হয়ে এল—গুলি চালাবার উপায় নেই, কাফাতোর গায়ে গুলি লাগতে পারে৷

আড়ষ্ট দেহে চোখের সামনে এক বিয়োগান্ত নাটকের রক্তাক্ত দৃশ্যের অপেক্ষা করতে লাগলুম৷

কিন্তু এত তাড়াতাড়ি নিজের দেহের রক্তমাংস দিয়ে কোনও উপবাসী শ্বাপদের উপবাস ভঙ্গ করতে কাফাতো রাজি হল না—চটপট মাথা সরিয়ে সে গলাটা বাঁচিয়ে নিল, কিন্তু তীক্ষ্ণধার দাঁতগুলি তার বাঁদিকের কাঁধের ওপর এঁকে দিল এক গভীর ক্ষতচিহ্ন৷

কাফাতোর হাতের বর্শায় আবার বিদ্যুৎ খেলে গেল—তীব্র আর্তনাদ করে জন্তুটার রক্তাক্ত দেহ মাটিতে আছড়ে পড়ল—সব শেষ৷

স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বললুম, ‘যাক্, বাঁচা গেল!’

কাফাতোর মুখে শুকনো হাসি খেলে গেল, ‘মিঃ ম্যাক, বাঁচবার আশা রেখো না—ওরা আবার আক্রমণ করবে৷’

সত্যিই তাই৷

পর-পর তিনটি সঙ্গীর মৃত্যু দেখে জন্তুগুলো একটু সরে গিয়েছিল কিন্তু একটু পরেই কয়েকটা জানোয়ার আবার আগুনের বেড়া ডিঙিয়ে আক্রমণ করল৷

আবার গর্জে উঠল আমার হাতের রাইফেল, রক্তে লাল হয়ে গেল কাফাতোর হাতের বর্শা—আমাদের সামনে আর অগ্নিকুণ্ডর ওপাশে পড়ে রইল কতকগুলি শ্বেতকায় প্রাণহীন পশুদেহ৷

কিন্তু শয়তানের দল পালিয়ে গেল না৷ কিছুক্ষণ পর পর তারা আক্রমণ করে, মাটিতে পড়ে থাকে কয়েকটা হতাহত জানোয়ার, ওরা পিছিয়ে আবার আক্রমণ করে...

হঠাৎ সভয়ে দেখলুম, রাইফেলের বুলেট ফুরিয়ে গেছে৷

অকেজো জিনিসটা ছুড়ে ফেলে দিয়ে কোমরের রিভলভারটা টেনে নিলুম—মাত্র ছয়টি বুলেট তাতে ভরা আছে, সঙ্গে আর কার্তুজ নেই৷

কাফাতোর নীরস কণ্ঠ শুনতে পেলুম, ‘মিঃ ম্যাক, ওরা আবার আসছে...’

আহোয়ার সাদা কুকুর সম্পর্কে কোনও কথা আগে শুনিনি৷ পরে যখন জানতে পারলুম তখন মনে মনে ঠিক করে ফেললুম, কয়েকটা সাদা কুকুরের চামড়া জোগাড় করতেই হবে৷

আমি জাত শিকারি, শিকার আমার শুধু নেশা নয়—পেশাও বটে৷ যেসব জানোয়ার সচরাচর দেখা যায় না তেমন জন্তু আমি শিকার করেছি এবং পৃথিবীর বিখ্যাত জাদুঘরগুলি আমার কাছ থেকে প্রচুর অর্থের বিনিময়ে সেইসব বিরল পশুচর্ম সংগ্রহ করতে কুণ্ঠিত হয়নি৷ আমার হাতে নিহত সাদা কুকুরগুলি এখন ম্যানিলা, পাপিতি এবং হনলুলুর বিখ্যাত জাদুঘরের শোভাবর্ধন করছে৷

তাদের সাদা চামড়ার শোভায় মুগ্ধ হয়ে দর্শকরা প্রায়ই চেঁচিয়ে ওঠে, ‘বাঃ! বাঃ! কী সুন্দর! কী চমৎকার!’

চমৎকারই বটে৷ এই চমৎকার চামড়া জোগাড় করতে গিয়ে আমার গায়ের চামড়াই শরীর-ছাড়া হওয়ার উপক্রম করেছিল৷ সেই কথাই বলছি৷

আহোয়া উপত্যকায় যাওয়ার আগে অবশ্য এই সাদা কুকুরদের সম্বন্ধে আমার বিশেষ কিছুই জানা ছিল না৷ পরে জানতে পারলুম হাঙ্গারির ‘কোভাজ’ জাতের কুকুর থেকেই এদের উৎপত্তি৷

এই জাতীয় কুকুরগুলি অত্যন্ত হিংস্র এবং শক্তিশালী হয় এবং এদের দেহের আয়তনও নেকড়ের চাইতে একটুও ছোট নয়৷ বিংশ শতাব্দীর প্রথমদিকে হিভাওয়া দ্বীপে কোনও এক হতভাগা ইউরোপীয় নাবিক কয়েকজোড়া কোভাজ কুকুর আমদানি করে৷ হাঙ্গারির কোভাজ বছরের পর বছর এই দ্বীপে বংশবৃদ্ধি করতে থাকে৷

কিন্তু দ্বীপের মাঝখানে মানুষের হাতের তৈরি খাবার কোথা থেকে জুটবে? অতএব ক্ষুধার্ত কুকুরদের চোখ পড়ল পাহাড়ি ছাগল, বুনো মোষ ও গোরুর দিকে—হিভাওয়া দ্বীপের ওপর শুরু হল এক বিভীষিকার রাজত্ব৷

এইভাবে সভ্য জগতের বাইরে হিভাওয়া দ্বীপের ওহিও উপত্যকায় জন্মগ্রহণ করল একদল হিংস্র রক্তলোলুপ শ্বাপদ—বিপুলবপু কোভাজ বিপুলতর হয়ে উঠল বন্য প্রকৃতির সংস্পর্শে, ধূসর রঙের ছোঁয়া লাগল তার দুধ-সাদা চামড়ায়, স্বভাবে তারা হয়ে উঠল আরও হিংস্র, আরও ভয়ঙ্কর৷

ইউরোপীয় নাবিকদের সঙ্গে আরও দুটি জানোয়ার এই দ্বীপে পদার্পণ করেছিল—ইঁদুর এবং বিড়াল৷ সাদা মানুষগুলি এখন আর নেই বটে, কিন্তু কুকুর, বিড়াল আর ইঁদুর—এরা সবাই আছে৷

কুকুরগুলি এখন বিরাটকায় নেকড়ে বাঘের আকার ধারণ করেছে, ইঁদুরগুলি প্রায় ভোঁদড়ের মতো এবং বিড়ালগুলি আমাদের পোষা বিড়ালের চাইতে অনেক বড় হয়ে বন্য মার্জারে পরিণত হয়েছে৷

ওহিও উপত্যকার ‘বনবিড়াল’ এখন ‘বুনো ইঁদুর’ শিকার করে, কুকুরগুলি ইঁদুর বা বিড়াল কাউকেই রেহাই দেয় না৷

আর ইঁদুরগুলো কী খায়?

ইঁদুররা সর্বভুক—ফল-মূল, পাখি, গিরগিটি, রুগ্ন কুকুর বা বিড়াল তো বটেই, এমনকী সুযোগ পেলে জাতভাইয়ের রক্তমাংসে উদরপূরণ করতেও তারা আপত্তি করে না৷

যে-ইউরোপীয় ভবঘুরের দল এখানে প্রথম এসেছিল তাদের কী হল?

ক্ষুধার জ্বালায় সুসভ্য নাগরিক নরখাদকে পরিণত হল—এখনও এখানকার দেশীয় অধিবাসীদের মধ্যে কিছু কিছু লোক রহস্যজনকভাবে অদৃশ্য হয়ে যায়, অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তাদের পাত্তা মেলে না৷ এখানকার দেশী মানুষদের চেহারা ও আচার-ব্যবহারে ইউরোপীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতির কোনও চিহ্নই পাওয়া যায় না৷ মিশনারিদের কল্যাণে তারা সভ্য জগতের নিয়মকানুন কিছুটা শিখেছে বটে, কিন্তু মন থেকে মেনে নেয়নি৷

কাফাতো ঠিক এদের মতো নয়৷ তার বাপ ছিল মালয়ের অধিবাসী—সমুদ্রে ঘুরে বেড়ানোই ছিল তার পেশা৷ ভবঘুরে নাবিকের রক্ত শরীরে থাকলেও কাফাতো তার দেশ ছেড়ে এদিক-ওদিক যেতে চাইত না, বরং বর্শা আর ছুরি হাতে শিকার করতেই সে বেশি ভালোবাসত৷

শিকারের হাত তার চমৎকার৷ কাফাতোর বয়স প্রায় পঁয়তাল্লিশ হয়েছিল, কিন্তু তার বেতের মতো পাকানো ছোট শরীরটা বয়সের ভারে একটুও কাবু হয়নি৷ রক্তারক্তি আর হানাহানিতে তার বড় আনন্দ, তাকে ঠিক শিকারি না বলে ‘খুনে’ বললেই সঠিক আখ্যা দেওয়া হয়৷

হিভাওয়া দ্বীপে যেদিন এসে নামলাম সেদিনই কাফাতোর সঙ্গে আমার পরিচয় হল৷ আমার উদ্দেশ্য জানতে পেরে সে বত্রিশ পাটি দাঁত বার করে হেসে ফেলল, ‘তুমি বুঝি কুকুরের মাংস খুব পছন্দ করো?’

মাংস নয়, শুধু চামড়ার জন্য মানুষ এখন বিপদের ঝুঁকি নিতে পারে একথা কাফাতোর কাছে অবিশ্বাস্য৷ তবু যখন অনেক কষ্টে তাকে বোঝাতে পারলাম যে কুকুরের মাংস খাওয়ার লোভ আমার নেই, তখন সে গম্ভীরভাবে বললে, ‘ঠিক আছে, চামড়া তোমার—মাংস আমার৷ তবে সাদা কুকুরের মাংসের রোস্ট যদি খাও তাহলে জীবনে ভুলতে পারবে না৷’

শিকারের অনুমতি নিতে আমায় অনেক ঝঞ্ঝাট পোহাতে হয়েছিল৷ হিভাওয়া দ্বীপটা ফরাসিরা শাসন করে, আর ফরাসিদের মতো সন্দেহপ্রবণ জাত দুনিয়ায় নেই৷ অনেক হাঙ্গাম-হুজ্জুত করার পরে কর্তৃপক্ষ আমাকে দয়া করে দু-সপ্তাহ সময় দিলেন—তার মধ্যে আমার কাজ শেষ করে বিদায় নিতে হবে৷

এত অল্প সময়ের মধ্যে এক অজানা দ্বীপের অপরিচিত পরিবেশের মধ্যে কাজ শেষ করতে পারব কি না এই কথা ভেবে দস্তুরমতো ঘাবড়ে গিয়েছিলুম, এমন সময় হঠাৎ কাফাতোর সঙ্গে আলাপ হওয়ায় স্বস্তি বোধ করলুম৷

পারিশ্রমিকের ব্যাপারে কাফাতো খুব উদার৷ কুকুরের মাংসের মতো লোভনীয় খাদ্যে আমি কোনও ভাগ বসাব না জেনে সে খুশি—চামড়ার মতো ‘অখাদ্য’ জিনিস নিয়ে তার কী লাভ?

‘চামড়া তোমার—মাংস আমার’, এই তার শর্ত৷

শর্তটা আমাদের দু-জনেরই খুব ভালো লাগল৷

সন্ধ্যার ধূসর যবনিকাকে লুপ্ত করে নেমে এল রাত্রির অন্ধকার৷ ক্যাম্পের সামনে আগুন জ্বালিয়ে আমি চোখ বুজে শুয়ে পড়লুম৷ ঠিক হল, প্রথম রাত আমি নিদ্রাসুখ উপভোগ করব আর কাফাতো পাহারা দেবে, বাকি রাতটা কাফাতোকে ঘুমোবার সুযোগ দিয়ে আমি জেগে থাকব৷

ক্লান্ত শরীর, ভরপেট খাওয়ার পরে চোখ বুজোতেই ঘুম এসে গেল৷

একটা বীভৎস চিৎকারে ঘুম ভেঙে গেল৷ জেগে উঠে যে-দৃশ্য চোখে পড়ল তা আগেই বলেছি৷

হ্যাঁ, ওরা আসবেই৷ এখনই তীক্ষ্ণ দাঁতের আঘাতে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে আমাদের শরীরদুটো৷ নিশ্চিত মৃত্যু করাল ফাঁদ মেলে ছুটে আসছে, ঘিরে ধরেছে আমাদের—এই ভয়ঙ্কর মরণ-ফাঁদ থেকে আমাদের নিস্তার নেই...

কিন্তু আমি এখনও আশা ছাড়িনি৷

একটা উপায় আছে—শেষ উপায়৷

হাতের রিভলভার উঁচিয়ে ধরে উপরি উপরি ছয়বার গুলি ছুড়লাম—চার-চারটে কুকুর মাটির ওপর লুটিয়ে পড়ে মৃত্যুযন্ত্রণায় ছটফট করতে লাগল৷

বাকি জন্তুগুলো আবার দূরে দূরে ছড়িয়ে পড়ল৷

ফাঁকা রিভলভারটা ফেলে দিয়ে কেরোসিনের বোতল আর টিনটা তুলে নিলাম, চিৎকার করে বললাম, ‘কাফাতো, খাড়া পাহাড়ের গা বেয়ে ওপরে উঠে যাও—আমি পিছনে পিছনে আসছি৷’

শুনেছিলাম এই কুকুরগুলোর দৃষ্টিশক্তি অতিশয় দুর্বল, এরা নির্ভর করে ঘ্রাণশক্তি ও শ্রবণশক্তির উপরে৷ জ্বলন্ত আগুনের প্রখর আভা এবং রাইফেল ও রিভলভারের অগ্নিবৃষ্টি এদের চোখ ধাঁধিয়ে দিয়েছিল—কাজেই অন্ধকারের আড়াল দিয়ে আমরা যে পাহাড় বেয়ে উঠতে শুরু করেছি এটা তারা বুঝতেই পারেনি৷ কিন্তু তাদের চোখকে ফাঁকি দিতে পারলুম না৷

খানিক পরেই পাহাড়ের গায়ে আমাদের জুতোর অস্পষ্ট আওয়াজ তাদের কানে এল, পরক্ষণেই হিংস্র গর্জন করে ছুটে এল শ্বেত বিভীষিকার দল পাহাড়ের নীচে৷

এমন লোভনীয় শিকার হাতছাড়া করতে তারা রাজি নয়৷

আমরা অনেকটা এগিয়ে গিয়েছিলুম৷ কুকুরগুলি যখন পাহাড়ের নীচে, আমি আর কাফাতো তখন অন্তত পঞ্চাশ ফুট ওপরে উঠে গেছি৷

উঁচু-নিচু পাথরের মধ্য দিয়ে সরু একটা পথ উঠে গেছে ওপর দিকে—পাহাড়ে উঠতে হলে ওই একটি রাস্তা ছাড়া অন্য পথ নেই৷ শয়তানের দল সেই পথ বেয়ে তিরবেগে উঠে আসতে লাগল, নিজেদের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি করে কয়েকটা কুকুর ছিটকে পড়ল নীচে৷

আমি কাফাতোকে ইঙ্গিত করলুম৷ সে সামনের কুকুরটাকে বর্শা দিয়ে চেপে ধরল পাহাড়ের গায়ে৷ কুকুরটার রোমশ দেহের ওপর এক বোতল কেরোসিন ঢেলে দিয়ে আমি একটা দেশলাই কাঠি জ্বালিয়ে ফেলে দিলুম৷ বিকট চিৎকার করে জন্তুটা পাহাড়ের ওপর দিয়ে গড়াতে গড়াতে নীচে গিয়ে পড়ল৷

এইভাবে পর-পর ছ’টা কুকুর উঠে এল আমাদের সামনে এবং তারা প্রত্যেকেই অগ্নিদেবের জ্বলন্ত আশীর্বাদ শরীরে বহন করে গড়িয়ে পড়ল পাহাড়ের নীচে৷

অবশিষ্ট কেরোসিন পাহাড়ের সরু পথের ওপর ঢেলে একটি জ্বলন্ত দেশলাইয়ের কাঠি ফেলে দিলুম৷ দাউ-দাউ করে আগুন জ্বলে উঠল৷ সেই তরল অগ্নিস্রোতের ওপর দিয়ে উঠে আসার ক্ষমতা কোনও প্রাণীর নেই৷

আমরা একেবারে পাহাড়ের চূড়ায় উঠে বসে নীচের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলুম৷

পাহাড়ের আগুন তখন নিভে এসেছে, কিন্তু দূরে, অনেক নীচে কতকগুলি আগুনের গোলা ছুটছে, লাফাচ্ছে, পড়াচ্ছে৷ যে-কুকুরগুলোর শরীরে আগুন লেগেছে তারা অসহ্য যন্ত্রণায় দাপাদাপি করছে৷

ধীরে ধীরে আগুন নিভে গেল, বাতাসে ভেসে এল দগ্ধ রোম ও মাংসের কটু গন্ধ৷

অস্পষ্ট চাঁদের আলোয় দেখা গেল, কয়েকটা সাদা সাদা ভূতুড়ে ছায়া মৃত কুকুরগুলোর দেহ নিয়ে টানাটানি করছে—ওহিওর সাদা শয়তান জাতভাইয়ের মাংস খেতেও আপত্তি করে না৷

রাত্রি প্রভাত হল৷

পাহাড়ের ওপর থেকে এতক্ষণ নামতে সাহস হয়নি৷ দিনের আলোয় যখন ভালো করে দেখলুম আশেপাশে একটিও জ্যান্ত কুকুর নেই তখন সাবধানে নীচে নেমে এলুম৷ প্রতি মুহূর্তে ভয় হচ্ছে, এই বুঝি শয়তানের দল তাড়া করে আসে৷ কিন্তু ভয়ের কোনও কারণ ছিল না৷ দিনের আলোয় কুকুরগুলো বিশ্রাম নিতে গেছে, এক রাতের অভিজ্ঞতার ধাক্কা সামলাতে তাদেরও বেশ খানিকটা সময় যাবে৷

নীচে দেখলুম এদিকে-ওদিকে ছড়িয়ে আছে অনেকগুলি কুকুরের মৃতদেহ৷ কতকগুলি কুকুরের ছিন্নভিন্ন দেহ দেখে বুঝলুম তাদের দেহের মাংসে তাদের স্বজাতিরাই উদরপূরণ করেছে৷ আবার কতকগুলির শরীর আগুনে পুড়ে কালো হয়ে গেছে৷

তবে কয়েকটা চামড়া একেবারে অটুট পেয়ে গেলুম৷ শুধু বুলেট এবং বর্শার ক্ষতচিহ্ন ছাড়া চামড়াগুলিতে আর কোনও দাগ পড়েনি৷

আমি আর কাফাতো কয়েকটা চামড়া ছাড়িয়ে নিয়ে একটা গ্রামে এসে পৌঁছলুম৷ আমার সমস্ত শরীর তখন ক্লান্তিতে ভেঙে পড়েছে, কিন্তু কাফাতোর বেতের মতো পাকানো দেহে অবসাদের কোনও চিহ্ন নেই—একদল লোক নিয়ে সে হইহই করে চলল সেই পাহাড়ের নীচে যেখানে পড়ে আছে কুকুরগুলির মৃতদেহ৷

কুকুরের মাংসে সেদিন রাতে এক চমৎকার ভোজ হল৷ ঝলসানো মাংস আমিও একটু চেখে দেখলুম৷ বললে বিশ্বাস করবে না, কুকুরের মাংসের রোস্ট ঠিক কুকুরের মাংসের মতোই, একটুও অন্যরকম নয়৷

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%