আফ্রিকার মহিষাসুর

ময়ূখ চৌধুরী (প্রসাদ রায়)

ঝড়ের কালো মেঘের মতো গায়ের রং, পেশীবহুল বিরাট দেহ, প্রশস্ত স্কন্ধ এবং সেই স্কন্ধদেশের উপরে বসানো মস্ত মাথাটার দু-ধার থেকে ঠেলে উঠেছে একজোড়া বাঁকা তলোয়ারের মতো একজোড়া বাঁকা-বাঁকা শিং, দুই চোখের উগ্র দৃষ্টিতে জ্বলছে বন্য হিংসার নিষ্ঠুর প্রতিচ্ছবি৷

কেপ-বাফেলো! আফ্রিকার মহিষাসুর! বন্য মহিষ-মাত্রেই উগ্র ও হিংস্র, এমনকী গৃহপালিত মহিষকেও একেবারে নিরীহ জীব বলা চলে না৷ কিন্তু আফ্রিকার কেপ-বাফেলোর মতো এমন হিংস্র, উগ্র, প্রতিশোধপরায়ণ নাছোড়বান্দা জানোয়ার পৃথিবীর অন্য কোনও অঞ্চলের মহিষগোষ্ঠীর মধ্যে দেখা যায় না৷

আফ্রিকার শ্বাপদ-সঙ্কুল অরণ্যে যত্র-তত্র নির্ভয়ে ঘুরে বেড়ায় কেপ-বাফেলো৷ মহিষ পরিবারের অন্যান্য জন্তুর মতো কেপ-বাফেলোর প্রধান অস্ত্র হচ্ছে শিং এবং খুর৷ তার ওপর শিরস্ত্রাণধারী যোদ্ধার মতো তার মাথায় থাকে কঠিন হাড়ের স্থূল আবরণ (Boss of the horns), শ্বাপদের নখ-দন্ত কিংবা শক্তিশালী রাইফেলের বুলেট এই কঠিন আবরণ ভেদ করে মহিষের মস্তিষ্কে কামড় বসাতে পারে না৷ লেপার্ড, হায়েনা প্রভৃতি মাংসাশী পশুরা কেপ-বাফেলোকে দেখলেই চটপট এদিক-ওদিক সরে পড়ে৷ স্বয়ং পশুরাজ সিংহও পূর্ণবয়স্ক মহিষের শিং আর খুরের সঙ্গে নখ-দন্তের ধার পরীক্ষা করতে সাহস পায় না৷ যে-বন্য কুকুরের দল আফ্রিকার অরণ্য ও প্রান্তরে সন্ত্রাসের রাজত্ব ছড়িয়ে বিচরণ করে, যাদের দলবদ্ধ আক্রমণের মুখে সিংহের মতো ভীষণ জানোয়ারও মৃত্যুবরণ করতে বাধ্য হয়, তারাও মহিষাসুরের বিপজ্জনক সাহচর্য সভয়ে এড়িয়ে চলে৷

নিগ্রো অধিবাসীরা মাংসের লোভে কখনও কখনও বর্শা হাতে মহিষকে আক্রমণ করে৷ নিজের দেহ দিয়ে কয়েকটি ক্ষুধার্ত মানব-সন্তানের জঠর-জ্বালা নিবারণ করবে এমন উদারতা মহিষের কাছে আশা করা যায় না—আক্রান্ত মহিষ হিংস্র আক্রোশে ঝাঁপিয়ে পড়ে শিকারিদের ওপর এবং অস্ত্রাঘাতে জর্জরিত হয়ে প্রাণত্যাগ করার পূর্বে তার নিষ্ঠুর শিংদুটো শত্রুপক্ষের ভিতর থেকে শিকারের মাশুল আদায় করে নেয়৷

মহিষের মৃতদেহের আশেপাশে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকে একাধিক নিগ্রো শিকারির হতাহত দেহ৷

একমাত্র শ্বেতাঙ্গ শিকারির শক্তিশালী আগ্নেয়াস্ত্রকে ভয় করে কেপ-বাফেলো৷ এই জানোয়ার যেমন বলিষ্ঠ তেমনই ধূর্ত—সে বুঝে ফেলেছে খোলা মাঠের ওপর রাইফেলের সম্মুখীন হওয়া অতিশয় বিপজ্জনক, তাই ফাঁকা জমিতে রাইফেলধারী শিকারিকে দেখলেই সে অধিকাংশ সময়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে পলায়ন করে এবং দৈবাৎ গুলিতে আহত হলে ঘন ঘাস-ঝোপের ভিতরে আত্মগোপন করে সুযোগের প্রতীক্ষায় ওৎ পেতে থাকে৷

দুর্ভেদ্য লতা ও ঘাস-জঙ্গলের মধ্যে দূর থেকে গুলি চালিয়ে মহিষকে হত্যা করা সম্ভব নয়৷ খুব কাছাকাছি না এলে শিকারির চক্ষু ঘন উদ্ভিদের আবরণ ভেদ করে মহিষকে আবিষ্কার করতে পারে না—কিন্তু তীব্র ঘ্রাণশক্তির মহিমায় মহিষ বহুদূর থেকেই তার শত্রুর অবস্থান বুঝতে পারে৷ দৈবাৎ বাতাসের গতির জন্য যদি কখনও মহিষের নাসিকা শিকারির অস্তিত্বকে আবিষ্কার করতে না পারে তাহলেও রক্ষা নেই এই জন্তুর শ্রবণশক্তি এবং দৃষ্টিশক্তি অতিশয় প্রখর—ঝোপের আড়াল থেকে অনুসরণ-রত শিকারির গতিবিধি মহিষ খুব সহজেই বুঝতে পারে...ঘন উদ্ভিদের যবনিকা ভেদ করে যখন মহিষ শত্রুকে আক্রমণ করে তখন শিকারি একবারের বেশি গুলি ছুড়বার সময় পায় না, আর প্রথম গুলিতেই যদি শিকারি মহিষকে হত্যা করতে না পারে তবে অধিকাংশ সময়েই ক্ষিপ্ত পশুর শৃঙ্গ হয় নররক্তে রঞ্জিত, শিকারি পরিণত হয় শিকারে...

বিখ্যাত ও অখ্যাত শিকারিরা অনেকেই কেপ-বাফেলো সম্পর্কে নানারকম রোমহর্ষক কাহিনি লিখে গেছেন৷

নিম্নলিখিত কাহিনিটি একজন পেশাদার শিকারির লিখিত বিবরণী থেকে তুলে দেওয়া হল—

‘‘আমার মক্কেল দুজন ক্যালিফোর্নিয়ার অধিবাসী—আমি আর আমার ভাই মাইক তাদের সঙ্গে চুক্তি করলাম যে, আফ্রিকার শিকার-অভিযানে উপযুক্ত পারিশ্রমিক নিয়ে আমরা তাদের সাহায্য করব৷ মক্কেল দুজন একেবারেই ছোকরা, তার ওপর তারা বেশ ধনীও বটে—এমন শাঁসালো খরিদ্দার পেয়ে আমরাও খুব খুশি হয়েছিলাম৷ আমাদের তাঁবু পড়ল টানা নদীর উত্তর তীরে ইতালীয় সোমালিল্যান্ডের সীমানা ছুঁয়ে...

প্রথম দিন আমিই মক্কেলদের নিয়ে গাড়ি ছুটিয়ে দিলাম শিকারের উদ্দেশে—মাইকের হাঁটুটা মচকে যাওয়ায় সে আমাদের সঙ্গে আসতে রাজি হল না, একখানা অচল মোটরগাড়িকে সচল করার চেষ্টায় সে ব্যস্ত হয়ে পড়ল৷

যে-গাড়িখানায় আমরা আরোহী ছিলাম তার স্টিয়ারিং ছিল ডানদিকে, গাড়ি চালাচ্ছিলাম আমি৷ আমার পাশে ছিল বিশ্বস্ত বন্দুকবাহক কানিনি আর পিছনের আসনে বসে ছিল দুই মক্কেল৷ গাড়ি এসে পড়ল একটা শুষ্ক জলাশয়ের তীরে৷ এই ধরনের জলাশয়গুলিকে আফ্রিকার স্থানীয় ভাষায় বলে ‘ডোঙ্গা’৷

এই ডোঙ্গাটার ভিতর থেকে কখন যে এক বদমেজাজি মহিষ বেরিয়ে এসেছে আমি বুঝতেই পারিনি—যখন তাকে দেখতে পেলাম তখন ধাবমান মহিষাসুর গাড়ি থেকে প্রায় ত্রিশ গজ দূরে এসে পড়েছে৷

আমি যেদিকে চালকের আসনে বসেছিলাম সেদিকেই ছিল শুকনো ‘ডোঙ্গা’—মোড় ফিরতে গিয়েই আমার চোখে পড়ল ধাবমান মহিষের রুদ্র-মূর্তি৷ কিন্তু গাড়ির অন্যান্য আরোহীরা তখনও তাকে দেখতে পায়নি৷

আমার পিলে চমকে গেল—মহিষের গুরুভার-দেহ যদি সবেগে গাড়ির ওপর এসে পড়ে তাহলে আরোহী-সমেত গাড়িখানার অবস্থা হবে অতিশয় শোচনীয়—

ছুট! ছুট! ছুট!

আমি বোঁ করে গাড়ি ঘুরিয়ে নিলুম, সাঁ সাঁ করে কয়েক মুহূর্তের মধ্যে গাড়িখানা পেরিয়ে এল প্রায় একশো গজ জায়গা৷

আমার দ্রুত গাড়ি চালাবার ক্ষমতা দেখে আমি নিজেই হলুম চমৎকৃত—আমি যে এত দ্রুতবেগে গাড়ি চালাতে পারি সে কথা নিজেও জানতুম না৷

পিছনদিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলুম৷ হতভাগা মহিষ প্রায় পঞ্চাশ গজ দূরে থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে এবং মাথা উঁচু করে জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে গাড়িখানার দিকে৷

গাড়ির আরোহীরা তখনও মহিষকে দেখতে পায়নি৷ তারা ভেবেছিল আমি বোধহয় আশেপাশে কোনও সিংহের অস্তিত্ব বুঝতে পেরেছি আর সেইজন্যই বোধহয় গাড়ি ছুটিয়েছি পাগলের মতো৷

আমি যখন গাড়িখানাকে ঘুরিয়ে মহিষের সম্মুখীন হলুম তখনই আরোহীরা তার অস্তিত্ব সম্বন্ধে সচেতন হয়ে উঠল৷ বিস্ময়ের ধাক্কা সামলে একজন শিকারি রাইফেল তুলে মহিষকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ল৷ উপরি-উপরি দুবার গর্জন করলে রাইফেল, মহিষের প্রাণহীন দেহ হল ভূতলে লম্বমান৷

আগের শিকারি দুজন একটু নিরাশ হল৷

এ যেন ‘পড়ল আর মরল’—শিকারের উত্তেজনা না থাকলে কি আর শিকারির ভালো লাগে?

সেদিন রাতে খাওয়া-দাওয়ার পরে জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডের ধারে বসে আমরা গল্প করছিলুম৷ মক্কেলদের মধ্যে একজন বললে, ‘বন্য মহিষকে আমি মোটেই বিপজ্জনক জানোয়ার বলে মনে করি না৷ ইচ্ছে করলে বলদ-টানা গাড়িতে একটা কেপ-বাফেলোকে বেঁধে দেওয়া যায়—অন্তত আমার তাই ধারণা৷’

আমি প্রমাদ গুনলুম৷ এই ভয়ঙ্কর জানোয়ার সম্বন্ধে এমন ধারণা নিয়ে গভীর জঙ্গলে প্রবেশ করলে দুর্ঘটনার সম্ভাবনা খুব বেশি৷ আমি তাকে বোঝাবার চেষ্টা করলুম ম’বোগো (আফ্রিকার স্থানীয় ভাষায় ‘মহিষ’) অতি ভীষণ জানোয়ার৷ হস্তী এবং গন্ডার অবশ্য মহিষের চেয়ে অনেক বড়—কিন্তু ওইদুটি জন্তুর স্বভাবে অনেক দুর্বলতা আছে৷ রাইফেলের গুলিতে আহত হলে হাতি বা গন্ডার ভয় পায়, অনেক সময়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে, কিন্তু ম’বোগো যখন আক্রমণ করে, তখন সে আর ফিরে যায় না—হয় মারো নয় মরো, এই হল মহিষের রণনীতি৷

জানি, গন্ডারের শ্রবণশক্তি ও ঘ্রাণশক্তি খুবই বেশি কিন্তু দৃষ্টিশক্তি অতি ক্ষীণ আবার লেপার্ড, সিংহ প্রভৃতি হিংস্র শ্বাপদের চক্ষু ও কর্ণ অতিশয় সজাগ হলেও ঘ্রাণশক্তি প্রায় নেই বললেই চলে৷ বন্য মহিষের চক্ষু, কর্ণ ও নাসিকার অনুভূতি বড় প্রখর—ভয়ঙ্কর ত্র্যহস্পর্শ৷

পূর্ণবয়স্ক মহিষের দেহের ওজন এক টনের মতো অর্থাৎ প্রায় চল্লিশ মণের কাছাকাছি৷ সম্পূর্ণ বিনা কারণেও মহিষ আক্রমণ করে, আর যতক্ষণ পর্যন্ত শিকারকে হত্যা করতে না পারে ততক্ষণ পর্যন্ত সে কিছুতেই থামতে চায় না৷ হাতি কিংবা গন্ডারের প্রথম আক্রমণটা যদি কোনওরকমে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয় তাহলে তারা অনেক সময়েই ঝোঁকের মাথায় সামনের দিকে ছুটে চলে যায়—ফিরে আসার চেষ্টা করে না৷ কিন্তু মহিষের কবল থেকে এভাবে রক্ষা পাওয়া অসম্ভব৷ প্রথম আক্রমণের মুখে সে যদি শিকারকে মারতে না পারে তাহলে আবার ঘুরে আসবে৷ ওই বিরাট দেহটা বিদ্যুৎ-বেগে ঘুরতে থাকে ডাইনে-বাঁয়ে, সামনে-পিছনে—শত্রুকে হত্যা না করে সে কিছুতেই শান্ত হয় না৷

এই খুনে জানোয়ারের বুদ্ধি তার দেহের মতো স্থূল নয়৷ আহত হলে সে ঘন ঘাস-ঝোপের ভিতর ঢুকে যায় এবং বৃত্তাকারে ঘুরে এসে অনুসরণকারী শিকারিকে পিছন থেকে আক্রমণ করে৷ আচম্বিতে পিছন থেকে আক্রান্ত হয়ে শিকারি হয়ে পড়ে হতবুদ্ধি৷ হাতের রাইফেল তার হাতেই থেকে যায়—দু-খানা প্রচণ্ড শৃঙ্গের নিষ্ঠুর প্রহারে তার প্রাণহীন দেহ লুটিয়ে পড়ে মাটির ওপর...নিরস্ত্র মানুষ গাছে উঠেও নিস্তার পায় না৷ ঘণ্টার পর ঘণ্টা মহিষ শিকারকে পাহারা দেয়, দূরে সরে গিয়ে ঘন জঙ্গলের মধ্যে গা-ঢাকা দিয়ে মানুষটাকে লক্ষ্য করতে থাকে৷ সে জানে, লোকটি যখন আশেপাশে তাকিয়ে শত্রুর দেখা পাবে না তখন ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত অবস্থায় এক সময়ে গাছ থেকে নেমে আসবে৷

নীচে নেমেও লোকটি সতর্ক দৃষ্টি নিক্ষেপ করবে এদিক-ওদিক, তারপর যাত্রা করবে গন্তব্যস্থলের দিকে৷

সে জানে না যে, একটু দূরেই যে-ঝোপটাকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করেও সে মহিষের অস্তিত্ব আবিষ্কার করিতে পারেনি তার মধ্যেই উপবিষ্ট অবস্থায় লুকিয়ে আছে একটি কৃষ্ণবর্ণ দেহ আর লম্বা লম্বা ঘাসের ফাঁকে ফাঁকে তাকেই লক্ষ করছে একজোড়া হিংস্র চক্ষুর নির্নিমেষ দৃষ্টি—

যখন মানুষটি তার ভুল বুঝতে পারে তখন আর উপায় থাকে না, অরণ্যের অন্তরাল থেকে সগর্জনে ধেয়ে আসে রুদ্রমূর্তি মহিষাসুর—তীক্ষ্ণ শৃঙ্গ ও খুরের আঘাতে ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে যায় হতভাগ্যের সর্বাঙ্গ৷

আমাদের মক্কেল দুই ছোকরা শিকারি পরস্পরের দিকে তাকিয়ে দৃষ্টি-বিনিময় করলে, তারপর দন্তবিকাশ করে হাসল৷ সে হাসির অর্থ বুঝতে আমার দেরি হল না—অর্থাৎ তারা মনে করছে অনভিজ্ঞ শাঁসালো মক্কেলের কাছে লম্বা লম্বা বক্তৃতা ঝেড়ে আমরা নিজেদের দর বাড়াবার চেষ্টা করছি৷ আমি আর কথা বাড়ালুম না, মাইকও তাদের মনোভাব বুঝে মৌনব্রত অবলম্বন করলে৷

কিন্তু পরের দিন যে ঘটনা ঘটল তাতে দুই সবজান্তা ছোকরার আক্কেল গুড়ুম হয়ে গেল—

সকালবেলায় ঘুম থেকে উঠে মাইক ঘোষণা করলে, তার পা বেশ সেরে গেছে, অতএব সে এখন স্বচ্ছন্দে আমাদের শিকার-অভিযানে যোগ দিতে পারবে৷ খুব তাড়াতাড়ি প্রাতরাশ সেরে নিয়ে আমরা গাড়ি ছুটিয়ে দিলুম৷ নদীর তীর ধরে ছুটে চলল গাড়ি আর তার ভিতর থেকে তীক্ষ্ণ অনুসন্ধানী দৃষ্টিতে চারদিক নিরীক্ষণ করতে লাগলুম আমরা—যদি কোনও শিকারের দেখা পাওয়া যায়...

শিকার পাওয়া গেল বটে, কিন্তু সে আমাদের শিকার নয়—

মোটরের রাস্তার পাশ্ববর্তী ঝোপ থেকে আচম্বিতে পথের ওপর আবির্ভূত হল এক উলঙ্গ মনুষ্যমূর্তি৷ মূর্তির মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত রক্তে মাখামাখি, নাভির নিম্নদেশে উদরের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত হাঁ হয়ে আছে এক ভয়াবহ ক্ষত, এবং সেই বিদীর্ণ ক্ষতমুখ থেকে ঝুলতে ঝুলতে পথের ওপর লুটিয়ে পড়ছে রক্তাক্ত নাড়িভুড়ি—

বীভৎস দৃশ্য!

কোনও এক অরণ্যচারী দানবের শিকার!

তাকে দেখেই বুঝলুম লোকটি জাতে সোমালি৷

লোকটির আর তখন কথা বলার ক্ষমতা ছিল না৷ শুধু সোমালি জাতির অস্বাভাবিক সহ্যশক্তি তাকে তখনও দাঁড় করিয়ে রেখেছে—অন্য কোনও জাতের মানুষ হলে এই অবস্থায় নির্ঘাত ভূমি আশ্রয় করে লম্বমান হয়ে পড়ত...

আমরা তাকে গাড়িতে তুলে নিয়ে তাড়াতাড়ি তাঁবুর দিকে ফিরে চললুম৷ গন্তব্যস্থলে উপস্থিত হয়ে দেখলুম, লোকটির দেহে প্রাণ নেই৷ আশ্চর্য হইনি—এতক্ষণে যে কী করে সে বেঁচে ছিল এটাই আশ্চর্যের বিষয়৷

আমাদের তাঁবু থেকে একটু দূরে একটা সোমালি ‘মানিয়াট্টা’ ছিল৷

আমরা মৃতদেহটাকে নিয়ে সেই গ্রামের উদ্দেশ্যে গাড়ি ছুটিয়ে দিলুম৷ গ্রামের প্রবেশ পথেই একজন সোমালি যুবকের সঙ্গে আমাদের সাক্ষাৎ হল৷

মৃতদেহটার দিকে একনজর তাকিয়েই যুবকটি এমন তীব্র কণ্ঠে চিৎকার করে উঠল যে, স্থানীয় পুলিশটা ঊর্ধ্বশ্বাসে আমাদের কাছে ছুটে এল—তার পিছন পিছন এল একজন সোমালি বৃদ্ধ৷

রক্তাক্ত দেহটার দিকে দৃষ্টি পড়তেই বৃদ্ধ আর্তক্রন্দনে ভেঙে পড়ল৷ শোকের আবেগে থরথর করে কাঁপতে লাগল তার সমস্ত শরীর৷

আমি বৃদ্ধের সঙ্গে সোয়াহিলি ভাষায় কথা বলতে চেষ্টা করলুম, কিন্তু সে আমার কথা বুঝতে পারল না৷ সৌভাগ্যক্রমে স্থানীয় শান্তিরক্ষকটি সোয়াহিলি ভাষা জানত, সে আমাদের মধ্যে দো-ভাষীর কাজ করতে লাগল৷

তার সাহায্যে বৃদ্ধের মুখ থেকে শুনলাম এক করুণ কাহিনি—

যে-লোকটির মৃতদেহ আমরা বহন করে এনেছি সে হচ্ছে বৃদ্ধের দ্বিতীয় পুত্র৷ প্রথম পুত্রটি কয়েকদিন আগে বিশেষ কাজে পাশের গ্রামে গিয়েছিল৷ কয়েকদিনের মধ্যেও যখন সে নিজের বাসস্থানে ফিরে এল না তখন একদল গ্রামবাসী তাকে খুঁজতে বেরুল এবং শেষ পর্যন্ত তার মৃতদেহকে আবিষ্কার করলে৷

শবভোজী হায়েনার দল তার শরীরটাকে ছিন্ন-ভিন্ন করে মাংস খেয়েছে—তবু সেই ভুক্তাবশেষ দেখে মানুষটাকে সনাক্ত করতে কারও অসুবিধা হয়নি৷ আশেপাশে জমির ওপর যেসব চিহ্ন ও পায়ের ছাপ দেখা গেল তার থেকে সকলেই বুঝল যে হত্যাকারী হচ্ছে একটি বন্য মহিষ৷

সোমালিদের মধ্যে পারিবারিক বন্ধন হয় অত্যন্ত দৃঢ়৷

নিহত যুবকের ছোট ভাই প্রতিজ্ঞা করলে, যেমন করেই হোক ওই খুনে জানোয়ারটাকে হত্যা করে সে ভ্রাতৃহত্যার প্রতিশোধ নেবে৷ সোমালি গোষ্ঠীর বয়স্ক লোকেরা তাকে বুঝিয়ে বললে এই কাজের জন্য বন্দুকধারী শ্বেতাঙ্গদের সাহায্য নিলেই ভালো হয়, কিন্তু তরুণ রক্তে তখন আগুন জ্বলেছে৷

ক্ষিপ্ত যুবক কারও কথায় কান দিলে না, বর্শা হাতে সে ছুটে গেল মহিষের সন্ধানে৷ ফলাফল কী হয়েছিল সে-কথা তো আগেই বলেছি—বৃদ্ধের ধারণা, তার প্রথম পুত্রের হত্যাকারী মহিষটাই তার দ্বিতীয় সন্তানের মৃত্যুর জন্য দায়ী৷

পর-পর দুটি উপযুক্ত সন্তানের মৃত্যু দেখে বৃদ্ধ শোকে প্রায় পাগলের মতো হয়ে উঠল, সন্তান হত্যার প্রতিশোধ নেবার জন্য সে বারবার অনুরোধ জানাতে লাগল৷ বললে, ‘আমি জানি শয়তান ম’বোগো কোথায় থাকে৷ সাদা মানুষরা যদি ওই খুনি জন্তুটাকে মারতে চায় তবে আমি নিজে তাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাব৷’

লোকটি কাঁদতে লাগল৷

গুন্ডা মহিষ কিংবা গুন্ডা হাতি যদি নরহত্যা করতে থাকে তবে অবিলম্বে সেই জানোয়ারকে বধ করা উচিত৷

আমি আর মাইক তৎক্ষণাৎ বৃদ্ধের কথায় রাজি হয়ে গেলুম৷ মৃত মানুষটিকে একটা কুঁড়েঘরের মধ্যে শুইয়ে রেখে আমরা গাড়িতে উঠলুম৷ সঙ্গে চলল বৃদ্ধ ও তার কনিষ্ঠ পুত্র—তিন ছেলের মধ্যে এটি তার শেষ সম্বল৷

বাপ-বেটা দুজনেই সঙ্গে নিলে বর্শা৷

মরণাহত যুবকটিকে আমরা প্রথম যেখানে দেখেছিলুম ঠিক সেই জায়গায় শোকার্ত পিতা আমাদের গাড়ি থামাতে বললে৷ গাড়ি থেকে নীচে নেমে সে তন্ন তন্ন করে খুঁজে দেখল চারপাশের জমি এবং খুব তাড়াতাড়ি আবিষ্কার করে ফেলল মহিষের পদচিহ্ন৷ উত্তর-পূর্ব দিক থেকে বয়ে আসছিল বাতাস, আর ওই খুনি মহিষটার পায়ের ছাপও চলে গেছে উত্তর-পূর্ব দিকে৷

ব্যাপারটা আমার কাছে খুব সুবিধের মনে হল না, কারণ মহিষ যেদিকে আছে আমাদের গায়ের গন্ধ নিয়ে বাতাস ছুটছে সেইদিকেই৷

কিন্তু বর্তমানে আমাদের পথ-প্রদর্শক হচ্ছে সেই সোমালি বৃদ্ধ—তর্ক না করে মুখ বুজে তাকেই অনুসরণ করলুম৷

মোটরের রাস্তা ছাড়িয়ে আমরা তখন জঙ্গলের মধ্যে ঢুকেছি...প্রায় মিনিট কুড়ি পরে হঠাৎ সামনের ঝোপের ভিতর থেকে কয়েকটা টিক্ বার্ড।

কলকণ্ঠে চিৎকার করে শূন্যে পাখা মেলে দিল৷

আমরা এগিয়ে চললুম৷ একটু পরেই আমাদের চোখ পড়ল একটা গাছের নীচে৷

ছায়াচ্ছন্ন অন্ধকারের মধ্যে বিশ্রাম নিচ্ছে দুটো বন্য মহিষ৷ আমাদের নেতা সেই বৃদ্ধ সোমালি জানিয়ে দিলে যে, এই জানোয়ার দুটিকে বিরক্ত করার দরকার নেই৷ বৃদ্ধের ছোট ছেলেটি কিছু কিছু সোয়াহিলি ভাষা জানত, সে বললে এই জন্তুদুটোর সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনও সম্পর্ক নেই—তার দুই ভাইকে হত্যা করেছে একটা বয়স্ক গুন্ডা মহিষ৷

যদি এই মহিষদুটো আমাদের গায়ের গন্ধ পেয়ে ছুটে পালায় তবে তাদের খুরের শব্দে আসল শত্রু সাবধান হয়ে যাবে৷ আমরা খুব সতর্কভাবে জন্তুদুটিকে প্রদক্ষিণ করে এগিয়ে গেলুম, তারা আমাদের অস্তিত্ব বুঝতে পারল না৷

গুন্ডা মহিষটার পায়ের চিহ্ন আবার খুঁজে পাওয়া গেল৷ সেই চিহ্ন অনুসরণ করে ঘণ্টাখানেকের কিছু বেশি সময় আমরা হেঁটে চললুম৷ হঠাৎ আমাদের গতি রুদ্ধ হল—ঝোপের মধ্যে এক জায়গায় জমির ওপর যেন রক্তের ঢেউ খেলছে৷ আমরা বুঝলুম, এইখানেই মহিষ তার দ্বিতীয় শিকারকে ঘায়েল করেছিল৷ রক্তের পরিমাণ দেখে আমরা আশ্চর্য হয়ে গেলুম—অতখানি রক্তপাতের পর একটা মানুষ কী করে এতটা রাস্তা হেঁটে আসতে পারে তা আমাদের বুদ্ধির অগম্য৷

বৃদ্ধের চোখ দিয়ে ঝরঝর করে জল পড়ছিল৷

প্রায় একশো গজ দূরে অবস্থিত একটা ঘন ‘ম্যালিয়েশা’ ঝোপের দিকে আঙুল দেখিয়ে সে বললে, ‘ওই হচ্ছে ম’বোগোর আস্তানা, ওইখানেই সে আমার বড় ছেলেকে খুন করেছে!’

আমরা আর মহিষের পায়ের চিহ্ন অনুসরণ করার চেষ্টা করলুম না, ঝোপটাকে মাঝখানে রেখে গোল হয়ে ছড়িয়ে পড়লুম৷

জায়গাটা বড় বেয়াড়া৷ ঝোপের মধ্যে ঘনসন্নিবিষ্ট উদ্ভিদের বেড়াজাল ভেদ করে আমাদের চক্ষু শত্রুর অস্তিত্ব আবিষ্কার করতে পারলে না, কিন্তু ফাঁকা জায়গার ওপর দণ্ডায়মান অবস্থায় আমাদের দেহগুলিকে ঝোপের ভিতর থেকে লক্ষ করা যায় খুব সহজেই৷

কে জানে, আমাদের গায়ের গন্ধ পেয়ে খুনি জানোয়ারটা হয়তো ঝোপের মধ্যেই সুযোগের অপেক্ষায় ওৎ পেতে আছে...

যাই হোক, এখন আর পিছিয়ে আসা চলে না৷ নিঃশব্দ ইশারায় সঙ্গীদের জানিয়ে দিলুম, ‘আমায় অনুসরণ করো,’ তারপর এগিয়ে গেলুম ঝোপটার দিকে৷

লক্ষ্যস্থল থেকে প্রায় ত্রিশ গজ দূরে আমি একবার থমকে দাঁড়ালুম—রাইফেলের সেফ্টি ক্যাচের ওপর রাখলুম বৃদ্ধাঙ্গুলি—ঝোপের ভিতর যদি কিছু নড়ে ওঠে তাহলে মুহূর্তের মধ্যে সেফ্টি ক্যাচ সরিয়ে গুলি ছুড়ব৷

এমন একাগ্র দৃষ্টিতে আমি ঝোপের দিকে তাকিয়ে ছিলুম যে, আমাদের দুই মক্কেলের মধ্যে একজন যে আমার পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে তা বুঝতেই পারিনি৷

অকস্মাৎ ঝোপের ভিতর থেকে বিনা মেঘে বজ্রাঘাতের মতো সগর্জনে আত্মপ্রকাশ করলে মহিষ—সে অন্য কারও প্রতি দৃক্পাত করলে না, সোজা তেড়ে এল আমার দিকে৷

আমার পিছনে যে মক্কেলটি দাঁড়িয়ে ছিল সে হঠাৎ ছুটে পালাবার জন্য ঘুরল, আর ঘোরার মুখেই তার দেহটা জোরে ধাক্কা মারলে আমার দক্ষিণ স্কন্ধে৷

সে কী ধাক্কা!

ধাক্কার চোটে আমার বুড়ো আঙুলটা সরে এল সেফ্টি ক্যাচের ওপর থেকে এবং মাথার হেলমেট হঠাৎ চোখের ওপর নেমে এসে দৃষ্টিকে করে দিল অন্ধ৷

আমি আজ নিয়ে এসেছিলুম একটা নতুন রেমিংটন রাইফেল৷ বিশ্বস্ত পুরোনো সঙ্গী মসারের সেফ্টি ক্যাচের সঙ্গে রেমিংটনের কোনওই মিল নেই—আমার বুড়ো আঙুল সেই সঙ্গিন মুহূর্তে রাইফেলের সেফ্টি ক্যাচ আবিষ্কার করতে পারলে না৷

হেলমেটটা সরিয়ে সম্মুখে দৃষ্টিপাত করলুম৷

ঝড়ের মতো ছুটে আসছে শৃঙ্গধারী মৃত্যু, আমার দিকে৷ আমার হাতে গুলিভরা রাইফেল, কিন্তু সেফ্টি ক্যাচটা বন্ধ থাকায় সেটা এখন সম্পূর্ণ অকেজো৷ মহিষের দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে সেফ্টি ক্যাচের দিকে নজর দেবার উপায় নেই—উন্মত্ত মহিষ প্রায় আমার ঘাড়ের ওপর এসে পড়েছে৷

মাইকের .৫০৫ রাইফেলের গম্ভীর গর্জন শোনার আশায় প্রতিটি মুহূর্ত অপেক্ষা করতে লাগলুম কম্পিত বক্ষে—কিন্তু কোথায় কী?

.৫০৫-এর বজ্রকণ্ঠ সম্পূর্ণ নীরব৷

আসল ব্যাপারটা পরে জানতে পারলুম—

যে হতভাগা মক্কেল আমার পিছনে দাঁড়িয়ে ছিল সে দিক্-বিদিক্ জ্ঞান হারিয়ে ছুটেছিল গুলির লক্ষ্যপথ ধরে, তাই মাইক কিংবা অন্য শিকারিটি রাইফেল ছুড়তে সাহস পায়নি৷

আর সময় নেই—মহিষ একেবারে সামনে এসে পড়েছে৷ আমি রাইফেলটাকে বর্শার মতো বাগিয়ে ধরে জন্তুটার মুখে সজোরে খোঁচা মারলুম৷ মহিষের ধারালো শিং দুটো তখন মারাত্মক ভঙ্গিতে শূন্যে দুলে উঠেছে, পরের মুহূর্তেই প্রচণ্ড আঘাতে বিদীর্ণ হয়ে যাবে আমার উদর—হঠাৎ মুখের ওপর রাইফেলের নলটা এগিয়ে আসতেই মহিষ লক্ষ্যভ্রষ্ট হল৷ একটুর জন্য বেঁচে গেলাম আমি, একজোড়া জীবন্ত বল্লমের মতো একজোড়া শিং আমার দেহের প্রায় দু-ইঞ্চি দূরে শূন্যে ছোবল মারলে৷

আক্রমণের বেগ রোধ করতে না পেরে মহিষ আমাকে ছাড়িয়ে বেশ কিছুটা এগিয়ে গেল৷ এত কাছাকাছি সে এসে পড়েছিল যে তার ধাবমান দেহ আমার শরীর স্পর্শ করেছিল৷

লক্ষ্যভ্রষ্ট মহিষ আবার ফিরে দাঁড়াল৷

সঙ্গে সঙ্গে গর্জে উঠল মাইকের রাইফেল৷

গুলি মহিষকে মাটিতে শুইয়ে দিতে পারলে না বটে কিন্তু জন্তুটার পা কেঁপে উঠল, থমকে দাঁড়াল সে কয়েকটি মুহূর্ত৷

ওইটুকু সময়ই যথেষ্ট, নিমেষের মধ্যে সেফ্টি ক্যাচ-এর সমস্যা সমাধান করে রাইফেল তুলে ধরলুম শত্রুর দিকে৷

ধেয়ে এল রুদ্রমূর্তি মহিষ, হত্যার উদগ্র আগ্রহে নিচু হল তার শৃঙ্গশোভিত বিশাল মস্তক৷

সঙ্গে সঙ্গে অগ্নি-উদগার করে গর্জে উঠল আমার রাইফেল৷ মুখ থুবড়ে পড়ল সেই বিশাল জানোয়ার আমার পায়ের কাছে৷ আবার গুলি ছুড়লাম—সব শেষ৷

খুব বড় নয় মহিষটা৷

তার মাথার অস্থি-আবরণ অতিশয় শীর্ণ, শৃঙ্গদুটির অবস্থাও ভালো নয়৷ রোমশ দেহের স্থানে স্থানে বার্ধক্যের সাক্ষ্য দিচ্ছে রোমহীন শুষ্ক চর্ম৷ কানিনি যখন মহিষের মাথার চামড়াটা ছাড়িয়ে ফেললে তখন দেখলুম শিং-এর গোড়ায় গোড়ায় ভগ্ন অস্থি-আবরণের নীচে অসংখ্য পোকা কিলবিল করছে৷ এই পোকাগুলির অত্যাচারেই মহিষটা পাগল হয়ে উঠেছিল৷

আস্তানার আশেপাশে প্রায় পঞ্চাশ গজের মধ্যে প্রত্যেকটি গাছের গুঁড়িতেই আছে শৃঙ্গাঘাতের চিহ্ন, যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে গাছে গাছে মাথা ঠুকেছে মহিষ৷ এমন জানোয়ার যদি খেপে গিয়ে মানুষ মারতে শুরু করে তাহলে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই৷

একটা গাছের নীচে একটা শার্ট আমার চোখে পড়ল৷ শার্টে রক্ত শুকিয়ে আছে৷ বৃদ্ধ সোমালি সেটাকে বড় ছেলের পরিধেয় বলে সনাক্ত করলে৷ আর একটু দূরেই ঝোপের মধ্যে আমরা প্রচুর রক্ত দেখলুম৷ খোঁজাখুঁজি করতেই আমাদের দৃষ্টিপথে ধরা দিল একটা ছিন্নভিন্ন রক্তাক্ত কান্‌জো (উত্তরীয়)৷

বৃদ্ধ বললে, এটা তার ছোট ছেলের জিনিস৷

কিছুক্ষণ নির্নিমেষ দৃষ্টিতে মহিষের মৃতদেহের দিকে তাকিয়ে বৃদ্ধ সশব্দে থুথু ফেললে৷ তারপর পিছন ফিরে অন্যদিকে হাঁটতে শুরু করলে৷

শোকার্ত পিতার প্রতিহিংসা চরিতার্থ হয়েছে বটে, কিন্তু তার মৃত সন্তান-দুটি আর ফিরে আসবে না৷


* কাঁটা-বসানো দেয়াল দিয়ে যখন একটা গ্রামকে ঘিরে ফেলা হয় তখন সেই কণ্টক আবৃত গ্রামকে স্থানীয় ভাষায় বলে মানিয়াট্টা।

* এই পাখিগুলো মহিষের শরীর থেকে পোকা বেছে খায়।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%