১৩. পাগলা গ্রহ

সুধীন্দ্রনাথ রাহা

অভ্যেস?— কচু!

অভ্যেসে অনেক জায়গায় অনেক কিছু হতে পারে, হয়েও থাকে, কিন্তু এই পাগলা গ্রহ প্লাসেৎ-এ নয়। দিনের-পর-দিন যা দেখে আসছ, হঠাৎ একদিন দেখলে তার উলটোটা ঘটছে।

সেদিন সকালেও তাই হল। অবশ্য সকাল সেটাকে বলা যেতে পারে কি না— সেটাও একটা বিচার্য বিষয়। হিসাবমতো সেটা রাত্তির। কিন্তু প্লাসেৎ-এর হিসাব মানতে গেলে আমাদের মতো পৃথিবীর জীবকে দু-দিনে ওখানে উদ্দাম পাগল বনে যেতে হবে। সে চেষ্টা তাই করি না আমরা। চোখে দেখছি রাত্তির, আমরা তবু তাকে বলছি সকাল। কারণ, পৃথিবীর ঘড়ি অনুযায়ী সূর্য না থাকলেও সেটা সকাল ছাড়া কিছু নয়।

প্লাসেৎ-এর হিসাব? করো দেখি সে হিসাব— কার সাধ্য আছে? আজকের দিনটা হল ধরো ছ-ঘণ্টার দিন, তারপর রাত্রি এল, তার পরিমাণ সাকুল্যে দু-ঘণ্টা। সে রাত যখন ভোর হল, শুরু হল একটা পনেরো ঘণ্টার দিন। সেটার শেষে চকিতের জন্য উঁকি দিয়ে গেল স্রেফ একটি ঘণ্টার একটি রাত্রি। করো হিসাব, যে পারো।

এমনটা কী করে হয়?

না-হয়ে যায় কোথায়? সূর্য ওখানে একটা নয়, দুটো। দুই রকমের দুটো। সেই দুই সূর্যের আশেপাশে প্লাসেৎ-এর কক্ষপথ মোড় খেয়ে খেয়ে চলে গিয়েছে একটা ইংরেজি আট-এর আকারে। গ্রহটা এদিক থেকে ধেয়ে আসছে, পরক্ষণেই ফুড়ুৎ করে ওদিক থেকে পালিয়ে যাচ্ছে। নরকের বাদুড় যেন নরক থেকে বেরিয়ে এধার-ওধার এলোমেলো চক্কোর দিচ্ছে খানিকটা। তারপরই আবার হুমড়ি খেয়ে পড়ছে সেই নরকের গর্তে।

সূর্য দুটো ততক্ষণ কী করছে? প্রদক্ষিণ করছে। অন্য কাউকে নয়, পরস্পরকে। এত নিকটে নিকটে প্রদক্ষিণ, আর এমন দ্রুত প্রদক্ষিণ, যে পৃথিবীর গ্রহ-বিজ্ঞানীদের মনে অনেক দিনই এমনি ধারণা ছিল যে, সূর্য ওখানে একটাই রয়েছে। সে ধারণা ভুল বলে প্রমাণিত হল, এই সবে বিশ বছর আগে, ব্ল্যাক্সলি অভিযানের ফলে।

অন্য প্রত্যেক গ্রহেই আবর্তনের আর কক্ষপথ অতিক্রমণের মধ্যে একটা সুস্থির সম্পর্ক থাকে। প্লাসেৎ কিন্তু সেরকম সম্পর্কের ধার ধারে না। ধারে না যে তার কারণ, ওই বিশেষ অংশটা মহাশূন্যের যুগল সূর্যের মাঝখানে অবস্থান করে, যা আলো-আঁধারের ভূতুড়ে খেলা দেখাচ্ছে অবিরত। অংশটার নামকরণ হয়েছে ব্ল্যাক্সলি প্রান্তর।

আলোকের গতিবেগ সেকেন্ডে এক লক্ষ ছিয়াশি হাজার মাইল বলে একটা ধারণা আছে না তোমাদের? সে ধারণা যে সনাতন সত্য নয়, তা বুঝতে পারবে এই ব্ল্যাক্সলি প্রান্তরের মুখোমুখি দাঁড়াবার সুযোগ যদি কখনো পাও। ওখানে আলো যেন হামাগুড়ি দিয়ে পথ চলে। আর আলোকে পিছনে ফেলে প্লাসেৎ এগিয়ে যায় দুর্বার বেগে নিজের অষ্টাবক্র কক্ষপথে।

ব্ল্যাক্সলিদের রিপোর্ট পড়োনি নিশ্চয়? তা হলে শোনো যা বলি। হাতের মাথায় দেয়াল-টেয়াল থাকলে, শক্ত করে সেটা ধরে থাকো, নইলে অ্যায়সা চমক খাবে শুনতে গিয়ে, মাথা ঘুরে পড়েও যেতে পারো।

প্লাসেৎ গ্রহে একই সময়ে দুই দিক থেকে গ্রহণ হয়ে থাকে। অন্য কারও ছায়ার দরুন নয়— নিজেরই ছায়ায় ঢাকা পড়ে নিজে।

প্রতি চল্লিশ ঘণ্টায় একবার করে নিজেকেই তেড়ে আসে মুখব্যাদান করে। নিজেরই তাড়া খেয়ে আবার ছুটেও পালায় চোখের আড়ালে।

বিশ্বাস হয় না বুঝি? সত্যি বলতে কী, বিশ্বাস করি না আমিও। মানে, দেখে দেখে জেনে গেছি যে ব্যাপারগুলো সবই মায়া। যা চোখে দেখি, তা ভুল দেখি। প্রথম যেদিন এলাম এখানে, আড়ষ্ট হয়ে গেলাম ব্যাপার দেখে। প্লাসেৎ-এর উপরেই দাঁড়িয়ে আছি, অথচ দেখছি ওদিক থেকে সেই প্লাসেৎই ধেয়ে আসছে আমার উপরে ঝাঁপিয়ে পড়বার জন্য।

আড়ষ্ট হয়ে গেলাম বই কী! সব জেনেশুনেও আড়ষ্ট হয়ে গেলাম। ব্ল্যাক্সলি রিপোর্ট আমার পড়া ছিল। ব্যাপারখানা ঠিক কী যে হচ্ছে, কেন যে হচ্ছে, অজানা ছিল না আমার। তবু, সব জেনেশুনেও আমি পিছনপানে ছুট। মারবার একটা অদম্য ঝোঁক অনুভব করেছিলাম সেদিন।

অনেকটা সেই সেকালের ছায়াছবির মতো। রেলগাড়ির ঠিক সামনে ক্যামেরা বসানো রয়েছে। দর্শকেরা দেখছে, যেন ইঞ্জিনটা ছুটে আসছে ঠিক তাদেরই চাপা দেওয়ার জন্য। ছুটে পিটটা দেবার ঝোঁকই হচ্ছে তাদের, যদিও তারা বিলক্ষণ জানে যে ইঞ্জিন-টিঞ্জিন সত্যিই কিছু নেই তাদের সামনে।

কিন্তু, কী নিয়ে যেন কথা শুরু করেছিলাম।

হ্যাঁ, সেদিনকার সকালের কথা নিয়ে।

বসে ছিলাম সেদিন সকালে, নিজের ডেস্কে। বসে বসে দেখছি, টেবিলের উপরটা ঘাসে ঢাকা। পা দুটো রয়েছে জলের উপর। সে জলে ঢেউ উঠছে আবার! কিন্তু মজা দেখো, পা ভিজছে না আমার।

ডেস্কের উপর ঘাস, ঘাসের উপর গোলাপি ফুলদানি একটি। সে ফুলদানিতে কিন্তু ফুল নেই, আছে একটা উজ্জ্বল সবুজ সরীসৃপ, যে জাতীয় সরীসৃপকে আমরা শনি গ্রহের বাসিন্দা বলেই জানি। জীবটা নাক ঢুকিয়ে দিয়েছে ফুলদানির তলায়, সেঁটে আছে সেখানে।

ওই ফুলদানি হল আমার দোয়াত, সরীসৃপটা কলম। চোখে দেখে এটা বুঝছি না, বুঝে নিতে হচ্ছে সাধারণ বুদ্ধির সাহায্যে।

ফুলদানি, সরীসৃপ ছাড়াও তৃতীয় একটি জিনিস সমুখে রয়েছে আমার, চিকনের কাজ করা সেলাই একখানা। তাতে লেখা, ‘ভগবানের করুণায় ধন্য হোক আমাদের পৃথিবী’। সেলাইটা যে সেলাই নয় আসলে, পৃথিবীর সেন্টার থেকে সদ্যপ্রাপ্ত একখানা রেডিয়োবার্তা— সে জ্ঞান অবশ্য আমার আছে। স্রেফ ওই সাধারণ বুদ্ধিটুকুর দৌলতেই আছে।

বার্তাটা যে কী, তা আমি জানি না তখনও। জানবার চেষ্টা করিনি। করিনি শুধু এই কারণে যে, বিলক্ষণ জানি, সে চেষ্টা বিফল হতে বাধ্য। পড়বার চেষ্টা করলে চোখের সামনে ফুটে উঠবে আজেবাজে কিছু লেখন, বা লেখন না-হয়ে সেটা বানরের লেজও হতে পারে।

হতে পারে। কারণ, একে এটা চোখে ভুল দেখার সময়, তায় আবার আমার মেজাজ রয়েছে চটে। ক্ষেপে রয়েছি আমি। কী বার্তা এসেছে পৃথিবী থেকে, জানবার জন্যে বয়ে গেছে আমার। তিতোবিরক্ত হয়ে গেছি আমি সব কিছুর উপরেই।

কারণটা খুলে বলি। ওই যে ব্ল্যাক্সলি প্রান্তরে ভূতুড়ে আলো, ওর প্রকোপ শুরু হয় ঠিক সেই সময়, যখন গ্রহটা ঘুরতে ঘুরতে এসে পড়ে আর্গাইল-১ আর আর্গাইল-২-এর মাঝামাঝি। ওই সূর্য দুটো আর কী। ওদেরই নাম আর্গাইল-১ আর আর্গাইল-২।

এখন আর্গাইল-১ হল পৃথিবীজাতীয় জ্যোতিষ্ক, আর্গাইল-২ তা নয়। দুটো থেকে শক্তি বিচ্ছুরিত হচ্ছে দুইরকম। তাদের সংঘাত ঘটছে ওই ব্ল্যাক্সলি প্রান্তরে। ফলে আলোর গতি ওখানে হয়ে যাচ্ছে মন্থর, নেমে যাচ্ছে শব্দের গতিরও নীচে।

অথচ, প্লাসেৎ-এর গতিবেগ হল শব্দের সমান।

তারই ফল দাঁড়াচ্ছে, ওই প্রান্তরে প্লাসেৎ ছোটে আলোর চেয়ে দ্রুতবেগে। কাজেই, এমন পরিস্থিতি হামেশাই ঘটছে। যখন প্লাসেৎ চলে গিয়েছে দৃষ্টির বাইরে, অথচ তার ছায়া পড়ে আছে অনেক পিছনে।

প্লাসেৎ সময় নেয় ছাব্বিশ ঘণ্টা, ওই প্রান্তরখানি পেরুতে। ততক্ষণে সে আবার একটা সূর্যকে প্রদক্ষিণও করে ফেলেছে। প্রদক্ষিণ শেষ করে ফেরার পথে। অতএব, তাকে পড়তে হল তারই পিছনে ফেলে আসা ছায়ার সামনাসামনি। মাঝপ্রান্তরে একটা ছায়া আসছে, একটা ছায়া যাচ্ছে। দুটো ছায়া একসাথে পড়ছে প্লাসেৎ-এর উপরে, একসাথে দুটো গ্রহণ দেখছি আমরা।

জিনিসটা যেন এইরকম, রেলগাড়ি আসছে, তার গতি শব্দের চেয়ে বেশি। এক মাইল দূরে থাকতে সে বাঁশি বাজায়। বাঁশি তুমি শুনতে পাওয়ার আগেই গাড়িখানা তোমার পাশ দিয়ে ছুটে বেরিয়ে গেল। তারপরে এক মাইল দূরের সেই বাঁশির শব্দ তোমার কানে এসে পৌঁছোল। গাড়ি কিন্তু তখন আর নেই সেখানে।

পরিবেশ যেখানে এইরকম, মাথা সেখানে ঠিক থাকতে পারে? চোখের স্নায়ুকেন্দ্র, আর তাদের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত থাকে মগজের যে দিকটা, তারা সব রীতিমতো ধাক্কা খায় প্রান্তরের ওই ভেলকিবাজিতে। মাদক সেবনের ফলে যেরকম আড়ষ্ট হয়ে আসে অনুভূতি, সেইরকমই হয়ে দাঁড়ায়। সামনে যা ঘটছে, তার বিকৃত ছবি ধরা পড়ে তোমার দৃষ্টিতে এবং দৃষ্টির ভিতর দিয়ে চেতনায়।

এটা আমি বেশ জানি যে, আমার ডেস্কের উপরটাতে ঘাস নেই, আছে কাচ, আর যার উপরে আমি শ্রীচরণ বিন্যাস করেছি, সেটা প্লাস্টিকের মেজে, ঢেউ-খেলা জল নয়। এটাও টনটনে জ্ঞান রয়েছে যে টেবিলের উপরকার জিনিসটা দোয়াত আর কলম মাত্র, ফুলদানির ভিতর সরীসৃপ কদাচ হতে পারে না। সেই কথাই খাটে রেডিয়ো-বার্তাটার সম্পর্কে, যাকে মনে হচ্ছে বুটিদার ঝাড়ন বলে।

হ্যাঁ, দেখছি একরকম, জানছি অন্যরকম। কাজে কাজেই দরজা খুলে ঘরে যখন ডবল মাথাওয়ালা একটা বিকট জানোয়ার এসে ঢুকল, আমি সঙ্গেসঙ্গে বুঝতে পারলাম যে, জানোয়ার বলে যাকে মনে হচ্ছে, সে আসল রিগান, আমার সহকারী।

‘কী হে রিগান? সম্ভাষণ জানালাম তাকে।

ডবল মাথাওয়ালা জানোয়ার বলল, ‘কত্তা, মেশিনঘর নড়বড় করছে। মাঝবেলায় কোনো কাজে হাত না দেওয়াই নিয়ম, কিন্তু এক্ষেত্রে সে নিয়ম মানতে গেলে চলবে না বোধ হয়। পড়ে যাবে ঘরটা।’

মাঝবেলা হল সেই সময়টা, যখন প্লাসেৎ অবস্থান করে আর্গাইল-১ আর আর্গাইল-২-এর মাঝখানে। আলোর ভেলকি তখনই খুব জোর খেলে কিনা!

আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘পাখি তো?’

একসঙ্গে দুটো মাথাই নড়ল রিগানের, জোরে জোরেই নড়ল। অর্থাৎ পাখি ছাড়া অন্য কিছুই দায়ি নয় মেশিন ঘরের নড়বড়ে অবস্থার জন্য। এই হয়েছে আর এক জ্বালা। প্লাসেৎ-এর এই সৃষ্টিছাড়া জাতের পাখি। এদের চেহারা কখনো কেউ চর্মচক্ষে দেখেনি। এদের অস্তিত্ব টের পাওয়া যায় শুধু ডানা ঝটাপটির শব্দে। সে শব্দ আসে মাটির নীচে থেকে। এই মুহূর্তে আমার এই অফিস ঘরের মেঝের তলায় শুনতে পাচ্ছি সে আওয়াজ।

হ্যাঁ, মাটির নীচে বাস ওদের। মাটি হোক, পাথর হোক, লোহা বা ইস্পাত হোক, কোনোকিছুই ওদের গতিরোধ করতে পারে না। মাখনের ভিতর দিয়ে সূচের মতো অক্লেশে ওরা এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে বেরিয়ে যায় অন্য পিঠে। প্লাসেৎ-এ বাড়ি তৈরি করে বসবাস করা অসম্ভব হয়েছে ওদের জন্য। যত মজবুত করেই ভিত গড়া যাক না কেন, ওরা তার ভিতর দিয়ে গলে বেরিয়ে যাবেই। দু-দিনেই ভিত ঝাঁঝরা হয়ে যায়, তৃতীয় দিন মড়মড় শব্দে ভেঙে পড়ে বাড়ি।

তারই দরুন প্লাসেৎ-এ ভারী বাড়ি একটাও করিনি আমরা। ভিত অবশ্য যতদূর সম্ভব মজবুত করা হয়, কিন্তু উপরে সব হালকা কাজ। কাঠের বেড়া, টিনের চাল, প্লাস্টিকের মেজে। ব্যস! পড়ছে, আর তুলছি— তুলছি আর পড়ছে। অসুবিধে? হলে করছি কী? ওই অদৃশ্য পাখির ঝাঁককে শায়েস্তা করার উপায় যতদিন না আবিষ্কার করতে পারছি।

রিগান বলছে, ‘এবার আর্ক (পৃথিবী থেকে প্লাসেৎ পর্যন্ত যে খেয়া-বিমান পারাপার করে তিন দিন পরে পরে, তারই নাম হল আর্ক) যে কংক্রিটের গরাদগুলো আনবে, তা ভিতের মধ্যে লাইন করে বসিয়ে দিলে—’

বসিয়ে দিলে, সে ভিতের ভিতর দিয়ে গলে বেরুনো ওই ভূতুড়ে পাখিদের পক্ষেও সম্ভব হবে না বোধ হয়।’ বললাম আমি।

বললাম বটে, কিন্তু বলতে গিয়ে গলায় জোর পেলাম না। ফন্দিটা আমারই। পৃথিবীতে ওই বিশেষ জাতীয় গরাদের আমিই অর্ডার দিয়েছিলাম, তাও ঠিক। কিন্তু যতই চালানটা আসবার দিন এগিয়ে আসছে, ততই বিশ্বাস উবে যাচ্ছে আমার মন থেকে। নিরেট লোহা রুখতে পারে না যাদের, কংক্রিটের গরাদে তাদের করবে কী?

হুড়মুড় হুড়মুড়! মেশিনঘর ভেঙে পড়ল।

চেঁচিয়ে উঠলাম, ‘দেখো! দেখো! কেউ চাপা পড়ল না তো?’

‘মাঝবেলা তো ছুটির সময়! এ সময়ে কে থাকবে মেশিনে? তবু দেখি’ ছুটল রিগান।

ছুটোছুটির অন্ত নেই বেচারি রিগানের। আমি তো চিন্তা করে করেই সময় পাইনে। এই পাগল গ্রহের হাজার পাগলামির মোকাবিলা কীভাবে করা যাবে, সেই সমস্যা নিয়েই বিব্রত। হাতে-কলমে কাজ যত কিছু রিগানকেই করতে হয়। সে কাজের বহর কম নয়। বেচারির মেহনতের পরিমাণ দেখে দুঃখ হয় আমার। এজন্য আর একজন সহকারীও চেয়েছি পৃথিবী সেন্টারের কাছে। জবাব আসেনি। না-ও আসতে পারে। বেশি মাইনের লোক বাড়াতে কর্তৃপক্ষ হঠাৎ রাজি হন না। একটা সেক্রেটারি চেয়েছিলাম বছর খানিক আগে। তা এক বছর থেকেই জবাব আসছে মাঝে মাঝে, ‘উপযুক্ত লোক কেউ অতদূরে যেতে চাইছে না। অর্থাৎ মহিলাদের ভিতর কেউ। পুরুষ সেক্রেটারি হলে যদি চলে, এক্ষুনি পেতে পারো।’

কথা শুনলে অঙ্গ জ্বলে যায়। পুরুষেরা আবার সেক্রেটারির কাজ করতে পারে নাকি? খানিকটাই চলে হয়তো। যেমন নাকি মানুষের কাজ খানিকটা চলে রোবট দিয়ে।

রিগান ফিরে এল যখন, তাকে দেখাচ্ছে একটি কঙ্কালের মতো।

তবে কঙ্কালটা সবাক, এসেই বলল, ‘মানুষ কেউ জখম হয়নি, তবে মেশিন সব ঠিক আছে কিনা, কত্তার একবার বাজিয়ে দেখা দরকার। আবর্জনাগুলো সরাই আগে।’

অঙ্গ শীতল আর কী! বাহাত্তরটা মেশিন কত্তার একবার দেখা দরকার! মজার কথা নয়? কমসে কম ছ-টা দিনের মেহনত! হবে না, পারব না, চুলোয় যাক!

কী যে হল আমার! রিগান বেরিয়ে যায়, পিছন থেকে ডেকে বললাম, ‘একটা রেডিয়োগ্রাম করে দিও তো আর্থ-সেন্টারে। স্রেফ দুটো কথা, ‘আই কুইট’ (আমি কাজ ছাড়ছি)।’

কী আশ্চর্য! এমন এটা কথা শুনেও রিগানটা তিলমাত্র বিচলিত হল না? ‘ঠিক আছে’ বলে বেরিয়ে গেল পিছনপানে একবারটিও না-তাকিয়ে। মানুষ চেনা কী শক্ত! আমি জানতাম, ও লোকটা আমার উপর অনুরক্ত একটুখানি। ছাত্র ছিল একসময়, এ কাজও আমি দিয়েছি। অথচ আজ দেখো, আমি ছেড়ে চলে যাচ্ছি শুনেও ‘আহা’ শব্দটি করল না একবার। ধুত্তোর! পৃথিবীতে কেউ কারও না। পৃথিবীতেও না, প্লাসেৎ গ্রহেও না।

আর্ক আসবার সময় হয়েছে। এতক্ষণ নেমে পড়বার কথা এখানে। দেরি করছে বোধ হয় মাঝবেলাটার জন্য। এ সময়ে নামবার চেষ্টা করলে দুর্ঘটনা ঘটতেও পারে। কোনো কিছুকেই স্বরূপে দেখা যায় না কিনা! মাঠকে দেখাবে হ্রদের মতো, মানুষকে মালুম হবে ভাল্লুক বলে। এ সময়ে নামে না আর্ক, ঠিকই করে। এ সময়ে প্লাসেৎ-এর কারোই কিছু না-করা উচিত।

হঠাৎ লাফিয়ে উঠলাম।

কারো কিছু না-করা উচিত। ঠিকই তো! না-করলে ক্ষতি কী? সবাই যদি বিশ্রাম নেওয়া যায় এই মাঝবেলাটায়, ঘুমোনোই যদি যায় বিছানায় নাক ডাকিয়ে, কী এসে যাবে তাতে? কী? কী? কী লোকসান হবে আমাদের বা আর্থ-সেন্টারের?

চটপট-চটপট— টেপ করে ফেলাম একটা অর্ডার। ‘এখন থেকে প্লাসেৎবাসীরা মাঝবেলায় দেবে নিদ্রা, এইটাকেই এখানকার রাত্রি বলে গণ্য করতে হবে। তার ফলে ভুল দেখার অভিশাপ থেকে রেহাই পাবে এ গ্রহের বাসিন্দারা।’

যাকে বলে যুগান্তকারী প্রেরণা। আশ্চর্য এই যে, এ কথাটা এতদিন কারও মাথায় আসেনি। থাকি প্লাসেৎ-এ, প্লাসেৎ-এর সূর্য দেখেই কার্যক্রম নির্ধারিত করব। কোথায় পড়ে আছে পৃথিবীর সূর্য, তার হুকুমমতো শোয়া-বসা করতে গেলে এখানকার লোকের অসুবিধা না-হয়ে পারে কখনো?

ঠিক হয়েছে। চমৎকার হয়েছে। চাকরিতে ইস্তফা দেবার পরেও মূল্যবান উপহার দিয়ে যাচ্ছি প্লাসেৎ-এর পরিচালকদের। মনে রাখবে ওরা, রাখতে বাধ্য হবে। কী রত্ন ওরা হারাল, হাড়ে হাড়ো উপলব্ধি করে হাত কামড়াবে আপশোসে।

রিগান এল একটি বানরের মূর্তি নিয়ে, ‘রেডিয়োগ্রাম করে এলাম।’

উঃ, তর সইছে না লোকটার! বোধ হয় ভাবছে, আমি চলে গেলে এই চেয়ারে ও নিজেই বসতে পারবে। তা হয়তো পারতেও পারে। কারণ, ওর চেয়ে যোগ্য লোক আর্থ-সেন্টার পাবেই বা কোথায়? বাজারে যে ক-টা লোক আছে, আমি আর না-চিনি কাকে? আমারই ছাত্র তারা সব। ওই রিগান তো ছাত্র ছিল আমার আর্থ-সেন্টারের পলিটেকনিকে। আমি যদি চলে যাই, রিগান আসুক আর ভগবান আসুক, একই হাঁড়ির হাল হবে প্লাসেৎ-এর।

যাকগে, টেপ রেকর্ড শুনিয়ে দিলাম রিগানকে। সে তো কষে লাফ দিল গুনে গুনে এক ডজন, ‘বাপস! এমন না-হলে ব্রেন! জিনিসটা এত সোজা যে সত্যিকার প্রতিভাধর লোক ছাড়া অন্য কারও মাথায় এটা খেলা অসম্ভব। বাঁচা গেল, মাঝবেলায় আর মুখ দেখাতে হবে না কাউকে। বানরের মতো দেখাক, হাঙরের মতো দেখাক, একমাত্র আমিই তা দেখব। আর যদি আয়নার দিকে না-তাকাই, তাও দেখতে হবে না।’

যাক, তুড়িলাফ খেতে খেতে ও বেরিয়ে পড়ল আবার। মাঝবেলা পেরুল, আর্ক নামবে এইবার। নিয়ে আসবে কংক্রিটের গরাদ। ভিতের মধ্যে ওইগুলো বসিয়ে দিলেও কি হতচ্ছাড়া পাখিগুলোকে আটকানো যাবে না? মেশিনঘরটা পড়েছে, আজকালের মধ্যেই তুলতে হবে। হবেই, নইলে কাজ চলবে কেমন করে? আমি ইস্তফা দিয়েছি বলেই তো প্লাসেৎ-এর কাজ বন্ধ হয়ে যাবে না! যতক্ষণ বদলির লোক না-আসছে, আমাকেই করতে হবে সব।

বসে আছি, বসে আছি, আস্তে আস্তে টেবিলের উপরে দু-হাত বেঁধে, তার উপরে মাথা রাখলাম, ঘুমিয়েই পড়লাম একটু। বেশিক্ষণ না, চটকাটুকু ভেঙে গেল পায়ের শব্দে। রিগানের পা নয়, এ পা নেহাত হালকা। মাথা তুললাম। দেখলাম, লাল সোনালি চুলওয়ালা একটা মাথা।

ধ্যেৎ! তাই কখনো হয় নাকি? মহিলা প্লাসেৎ-এ আছে দু-চারজন, কারিগরদের স্ত্রীরা। তাদের কারও মাথায় অমন লালচে-সোনালি চুল কস্মিনকালেও ছিল না, নেই। নাঃ, মাঝবেলা পেরোয়নি তাহলে। যা-তা দেখেছি! এতটু তফাত হয়েছে অবশ্য। এ-যাবৎ দেখেছি, মাঝবেলার আবির্ভাবগুলো কুৎসিত আর উদ্ভটই হয়, এবার উলটো।

‘আমায় চিনতে পারছেন না মিস্টার র‌্যান্ড?’

স্বরটা মিষ্টি, আবার কেমন যেন পরিচিতও লাগছে। চট করে ঘড়ির দিকে তাকালাম। আগেও কয়েক বার তাকিয়েছি গত এক ঘণ্টার মধ্যে। ঘড়িতে ঘড়ি দেখিনি, কোনোবার দেখেছি রাক্ষসের মুখ, কোনোবার দেখেছি গোলাপফুলের তোড়া। এবারে কিন্তু ঘড়িটাকে ঘড়ির আকারে দেখতে পেলাম। তার মানে, মাঝবেলা উত্তীর্ণ। সমুখের জীবটাকে এ-সময় যদি মহিলার আকারে দেখে থাকি, তাহলে বাস্তবেও সে মহিলা না-হয়ে যায় না। লাল-সোনালি মাথাওয়ালি এক মহিলা।

পরিচয় হল। মাইকেলিনা উইট। সংক্ষেপে শ্রীমতী মাইক উইট। আর্থ সিটির পলিটেকনিকে ও আমার ছাত্রী ছিল। প্লাসেৎ-গ্রহের চিফ মিস্টার র‌্যান্ড একজন সেক্রেটারি চান। বিজ্ঞাপনে এই তথ্যটি অবগত হয়ে ও দেখা করেছিল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে। চাকরি পেয়েই সঙ্গে সঙ্গে আর্ক-এর সওয়ার হওয়া, প্লাসেৎ-এ চলে আসা।

মনের আনন্দ চেপে রাখার ব্যর্থ চেষ্টা করতে করতে বললাম, ‘তুমি চিরকালই হঠকারী। এখানে এসেছো, পস্তাবে দেখো। কিন্তু একটা রেডিয়োগ্রাম তো করতে পারত আর্থ-সেন্টার। তোমার ঘরটর গুছিয়ে রাখা যেত!’

‘করতে আমিই নিষেধ করেছিলাম মাস্টারমশাই, আপনাকে অবাক করে দেব বলে।’ অম্লানবদনে স্বীকার করল মাইক।

শুধু হঠকারী নয়, স্পষ্টভাষীও মেয়েটা।

অবাক? তা অবাক আমি হয়েছি। শুধু মাইককে পেয়ে নয়, আমার প্রতিভার নব নব স্ফূরণ দেখে। রিগান এল হাহাকার করতে করতে, ‘পৃথিবীর লোকগুলো গোল্লায় যাচ্ছে দিন দিন। কংক্রিটের গরাদ না-পাঠিয়ে ক্রেট ভরতি হাওয়া পাঠিয়েছে শুধু। ক্রেটগুলো একদম খালি।

‘তা বেশ তো।’ মনের আনন্দে রসিকতা করলাম একটু, ‘ক্রেট ভরতি হাওয়া পাঠিয়েছে যখন, ওই হাওয়া দিয়েই ভিত তৈরি করো।’

কথা মুখ দিয়ে বেরুতে-না-বেরুতে আমি উত্তেজিত হয়ে উঠেছি। উত্তেজনায় ক্ষিপ্ত একেবারে। এ কী বাণী বেরুল— অকাট্য, অভ্রান্ত, অমোঘ? বিজ্ঞানের দেবতা কে, তা জানি না; কিন্তু তিনিই কি কৃপা করে হঠাৎ ভর করলেন ফিল র‌্যান্ডের উপরে?

রিগান কথাটাকে অবশ্য নিছক রসিকতা বলেই নিয়েছে। ও কথার আর উত্তর না-দিয়ে তৎপর হয়েছে মাইক উইটের সঙ্গে পুরোনো আলাপ ঝালিয়ে নেওয়ার জন্য। ওরা তো একসাথে পড়েছে আমার কাছে আর্থ-সিটির পলিটেকনিকে।

ওদের আলাপে যোগও দিচ্ছি না, ব্যাঘাতও ঘটাচ্ছি না। আমি আমার নিজের চিন্তায় ডুবে আছি। চিন্তা শেষ হতে বেশি সময় লাগল না। রিগান যখন আবার জিজ্ঞাসা করল যে মেশিন ঘরের ভিত এবার কী দিয়ে গড়া হবে, আমি গম্ভীর হয়েই বললাম, ‘আগেই তো বলেছি, হাওয়া দিয়ে। কথাটাতে তুমি গুরুত্ব দাওনি, নয়?’

যে সুরে আমি কথা কইছি, তাতে আর রসিকতা বলে সে কথাকে ভাববার উপায় নেই। রিগান এবং মাইক ফ্যালফ্যাল করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে দেখে ওদের কিঞ্চিৎ জ্ঞান দান করবার জন্য তৈরি হলাম আমি।

‘কথাটা আমার ইয়ার্কি নয়, ভেবে দেখলেই বুঝতে পারবে। পাখিতে ভিত ঝাঁঝরা করে দেয়, অথচ সে পাখিকে বাইরে কখনো দেখা যায় না। তার মানে, নিশ্চয়ই এই যে, প্লাসেৎ-এর পাখিরা বাতাসে চলতে পারে না। সুতরাং আমরা বাতাসই ভরে রাখব ভিতে। মাটির নীচে বিরাট বিরাট চৌবাচ্চা করব। চৌবাচ্চার চার দেয়ালের বাইরে থাকবে আরও চার দেয়াল, অনেক তফাতে। ব্যবধানটাও বাতাসে ভরতি থাকবে। বাড়ি উঠবে ভিতরের চৌবাচ্চার চার দেয়ালের উপর। পাখি সে দেয়ালের কাছেই পৌঁছোতে পারবে না।’

রিগান ততক্ষণে লাফাতে আরম্ভ করেছে, ‘এত সোজা সমাধান যে সত্যিকার প্রতিভাধর ছাড়া অন্য কারও মাথাতেই আসত না। আপনি যতদিন প্লাসেৎ-এ আছেন, এ গ্রহে মুশকিল বলে কিছু থাকবে না।’

‘আমি যতদিন আছি?’ বিমর্ষভাবে আমি বললাম, ‘আমি তো যাচ্ছি। আগামী ক্ষেপ আসবার সময় আর্ক নিশ্চয় আমার বদলি লোক নিয়ে আসবে। তুমিই আজ সকালে রেডিয়োগ্রামে আমার ইস্তফা পাঠালে না? আই কুইট বলে?’

‘না তো!’ রিগান হতভম্বভাবে বলল, ‘আমি তো পাঠালাম ”আইক উইট”। এই মাইকের ভাই আইক। আমি ভাবছিলাম, সকালে পৃথিবী থেকে যে রেডিয়ো এসেছিল, তারই উত্তর ওটা।’

‘সকালে রেডিয়ো এসেছিল? হ্যাঁ তো! এসেছিল তো! আমি তখন মাঝবেলার ভেলকিতে তিতিবিরক্ত হয়ে টেবিলের উপরে ঘাস দেখছি। বার্তাটাকে মনে হয়েছিল বুটিদার ঝাড়ন, ফেলে রেখেছিলাম দেরাজে। তাড়াতাড়ি সেটা খুলে দেখি কর্তারা জানতে চেয়েছেন সহকারীপদে আমি কাকে পেতে চাই। তারই জবাব গিয়েছে, ‘আইক উইট।’ ‘আপনি আইককেও পাঠাতে বলেছেন এখানে?’ বলে মাইক আমার হাত চেপে ধরল, ‘বেশ হবে, সবাই মজাসে একসাথে থাকব।’

সকল অধ্যায়
১.
১. আলফা সেন্টৌরির পথে
২.
২. লতার নাম হাঁউ-মাঁউ-খাঁ
৩.
৩. দশ লাইট-ইয়ার দূরত্বে
৪.
৪. মহাকাশের পালকওয়ালা মানুষ
৫.
৫. নক্ষত্র? না, ক্ষেপণাস্ত্র
৬.
৬. মঙ্গলের প্লেগ
৭.
৭. জীবন-মৃত্যুর লটারি
৮.
৮. পৃথিবী যখন ধ্বংস হল
৯.
৯. জীবন-মৃতের জাদুঘর
১০.
১০. এগিয়ে চলো অসম্ভবের মুখে
১১.
১১. এম-১
১২.
১২. কালচক্রের সওয়ার
১৩.
১৩. পাগলা গ্রহ
১৪.
১৪. রোবট বন্ধুর মৃত্যু
১৫.
১৫. অস্য দগ্ধোদরস্যার্থে
১৬.
১৬. ক্লোরোফাগ
১৭.
১৭. সন্ত্রাসবাদী বৈমানিক
১৮.
১৮. কত রহস্য ওই অসীমে!
১৯.
১৯. মহাবিমানের উল্লম্ফন
২০.
২০. জীবন কোথায় নেই?
২১.
২১. আঙুল যাদের ছ-টা
২২.
২২. আজি হতে শতবর্ষ পরে
২৩.
২৩. ফিরে চলো গুহামানবের যুগে
২৪.
২৪. ধূমকেতুর উদরে
২৫.
২৫. হাসপাতালের ‘টি’ ওয়ার্ড
২৬.
২৬. দেহান্তরী
২৭.
২৭. অ্যাপিনের গবেষণা
২৮.
২৮. মঙ্গলের পথে সেকেলে কাপ্তেন
২৯.
২৯. ত্রিমূর্তি
৩০.
৩০. এক ঘুমে এক-শো বছর
৩১.
১. ভৌতিক কুকুর
৩২.
২. মোড়ের দোকান
৩৩.
৩. রাক্ষসীর পূজা
৩৪.
৪. অশরীরী স্নেহ
৩৫.
৫. অশরীরী ঈগল

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%