সুধীন্দ্রনাথ রাহা
সবে শুরু পঞ্চদশ শতাব্দীর। কলম্বাস এখনও আমেরিকা আবিষ্কার করেননি। এমনি সময় একদিন এক মাঝবয়সি নাবিক এসে হাজির হলেন লিসবনের রাজসভায়। কথাবার্তা তার এলোমেলো। সে নাকি ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের কাছাকাছি কোনো এক জায়গায় জাহাজডুবি হয়ে মরতে বসেছিল। নেহাত দৈবানুগ্রহে ভাসতে ভাসতে গিয়ে ওঠে এক অজানা দ্বীপে (ওদিককার প্রায় সব দ্বীপই তখন অজানা। আমেরিকার মূল মহাদেশ তো বটেই)। সে-দ্বীপে কোনো অসভ্য জাতির বাস সে দেখতে পায়নি। যাদের দেখেছিল, তারা খাঁটি খ্রিস্টান। তারা খুব আদরযত্ন করেছিল তার। একখানা নৌকোও তারা ওকে দিয়েছিল দেশে ফিরে আসবার জন্য। কিন্তু নৌকোর পক্ষে কি আর আটলান্টিক পাড়ি দেওয়া সহজ? সে নৌকাও ডুবে যায়। কিন্তু এবারও প্রাণটা রক্ষা হয়। শেষ পর্যন্ত এক স্পেনদেশীয় জাহাজ তাকে উদ্ধার করে সমুদ্র থেকে।
নাবিকটির কাহিনির এ অংশে অসম্ভাব্য কিছু নেই। স্পেন-পোর্তুগালের অনেক জাহাজই তখন নতুন দেশ আবিষ্কারের আশায় সমুদ্রে সমুদ্রে টহল দিচ্ছে। কেউ যাচ্ছে দক্ষিণে, কেউ যাচ্ছে পশ্চিমে। দক্ষিণে আফ্রিকার উপকূল সম্পর্কে অনেক কিছু তথ্য তারা আহরণ করেছে ইতিমধ্যে। তবে পশ্চিমে ক্যানারির ওপিঠে এখনও হানা দেয়নি তারা। এখনও নাবিকদের ধারণা, ক্যানারির পশ্চিমের মহাসমুদ্রে পারাপার নেই। যে দুঃসাহসী ওদিকে যাবে জাহাজ নিয়ে, সে আর ফিরে আসবে না।
তবে হ্যাঁ, ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের প্রায় সব দ্বীপই ওদের জানা হয়ে গিয়েছে ইদানীং। লোকবসতি আছে ওখানে, তবে তারা খ্রিস্টান তো কেউই নয়! আর গোষ্ঠীপরিচয়ে তারা ইউরোপীয়দের সগোত্রও কেউ নয়। লালচে তাদের গায়ের রং, পূজা করে অদ্ভুত সব দেব-দেবীর। আচার-ব্যবহারও তাদের সভ্যোচিত নয়। তবে এই মাঝবয়সি নাবিক বলে কী?
তা, অনেক কথাই ও বলেছে বই কী! এমন কথাও বলেছে যে খ্রিস্টানদের সেই দ্বীপে যারা বাস করছে এখন, তাদের পূর্বপুরুষেরা গোড়ায় ছিল এই পোর্তুগাল দেশেরই লোক। শো-তিনেক বছর আগে মরক্কোর মুসলমানেরা যখন এ দেশ দখল করে নিলেন, কিছুসংখ্যক পোর্তুগিজ পরাধীনতা বরণ করার চাইতে স্বদেশ থেকে সেচ্ছা নির্বাসনকে পছন্দ করলেন বেশি। এক ধর্মগুরু বিশপ নেতৃত্ব গ্রহণ করলেন এই ব্যাপারে। সাতখানা জাহাজ ভরতি নর-নারী পোর্তুগাল থেকে রওনা হয়ে গেল আটলান্টিকের বুকে কোনো অজানা দ্বীপে নতুন দেশ গড়ে নেবার জন্য। দ্বীপ তারা পেয়েছিলও একটা। অভিযানের নেতা বিশপ ব্রানডানের স্মৃতি অমর করে রাখবার জন্য তার নামও দিয়েছিল সেন্ট ব্রানডান দ্বীপ। সেখানে নতুন আর একটা পোর্তুগাল রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হল তাদের চেষ্টায়, সাত সাতটা সমৃদ্ধ নগরী মাথা তুলল সেই নতুন দেশে। তাই থেকে ‘সপ্তনগরীর দেশ’ও সেন্ট ব্রানডানকে বলে ওরা কখনো কখনো।
নাবিক এমন জ্বলন্ত ভাষায় বর্ণনা দিল ওই সেন্ট ব্রানডান দ্বীপের যে, অনেকেই তার কথাকে সত্য বলে মেনে নিল। আর মেনে নেওয়া মানেই তো কৌতূহলী হয়ে ওঠা। অনেকেই জল্পনা শুরু করল এই বলে যে, এক্ষুনি একদল অভিযাত্রীর রওনা হয়ে যাওয়া উচিত— সপ্তনগরীর দেশ আবিষ্কারের জন্য। পোর্তুর্গিজ রক্ত ওদেশের লোকের ধমনীতে বইছে, ধর্মবিশ্বাসেও তারা খ্রিস্টান। সুতরাং খ্রিস্টজগতের জীবনধারা থেকে আর তাদের বিচ্ছিন্ন করে রাখা উচিত হবে না।
অভিযাত্রী পাঠানো উচিত— এবিষয়ে অনেকেই একমত। কিন্তু পাঠানোর ব্যাপারটা প্রভূত ব্যয়সাপেক্ষ। পোর্তুগিজ গভর্নমেন্টের উচিত সে-ব্যয় বহন করা। রাজার কাছে কতিপয় উৎসাহী নাগরিক একটা আবেদনও পাঠালেন সেই মর্মে। কিন্তু রাজা দুঃখপ্রকাশ করে বললেন যে, দেশের কোনো কোনো অংশ এখনও মুর-পদানত রয়ে গিয়েছে। রাজার এখন প্রধান কাজ হল সেই মুরদের দেশ থেকে বিতাড়িত করা। রাজকোষ সেই মহৎ কর্মেরই ব্যয় বহন করতে অপারগ যখন, সপ্তনগরীর দেশে (যদি সত্যিই সেরকম কোনো দেশ থাকেও) অভিযান পাঠানো আপাতত সম্ভব হয় কী করে?
রাজার কথা যে যুক্তিসম্মত, কে তা অস্বীকার করতে পারে? হতাশ হয়ে আবেদনকারী নাগরিকেরা ফিরে এলেন। এবার একটা কথা উঠল, রাজকোষ যখন অভিযানের ব্যয় বহনে অক্ষম, লিসবনের ধনী মহলেরই উচিত চাঁদা তুলে সে কাজটা সমাধা করা। এ নিয়েও আলাপ আন্দোলন হল অনেক, কিন্তু ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াবার উৎসাহ কোনো ধনীর সন্তানই দেখালেন না তেমন। একে একে পিছু হটলেন সবাই।
না, সবাই নয়। একজন হটতে নারাজ। তিনি হলেন ডন ফার্নান্ডো দ্য আলমো। লিসবনের সবচেয়ে ধনী এবং সবচেয়ে দুঃসাহসী অভিজাত যুবক। পৈতৃক অর্থ তাঁর অগাধ রয়েছে। তিনি সিদ্ধান্ত করলেন, একাই তিনি বেরিয়ে পড়বেন দু-খানা জাহাজ নিয়ে। একাজে নেতৃত্ব করবার যোগ্যতা তাঁর চেয়ে বেশি অন্য কার আছে? তিনি একাধারে বীর, বুদ্ধিমান এবং বেপরোয়া। ষাঁড়ের সঙ্গে মানুষের দ্বন্দ্বযুদ্ধ হল স্পেন, পোর্তুগালের অতি জনপ্রিয় জাতীয় ক্রীড়া। সে-খেলা খেলতে গিয়ে শতকরা পঞ্চাশটা ক্ষেত্রে ষাঁড় মরে যদি, বাকি পঞ্চাশটা ক্ষেত্রে মানুষও মরে থাকে। ফার্নান্ডো দ্য আলমো অতবড়ো ধনীর সন্তান হয়েও ষাঁড়ের লড়াইয়ে নেমেছেন এযাবৎ চৌষট্টি বার। স্রেফ বাহাদুরি দেখাবার জন্যই। বলা বাহুল্য, সেই চৌষট্টিটা ষাঁড় ঘায়েল হয়েছে। কোনোটা একেবারেই মরেছে, কোনোটা-বা মক্ষম মতো জখম হয়ে নেংচে নেংচে পথে পথে ঘুরছে— ডন ফার্নান্ডোর শৌর্যের জ্যান্ত বিজ্ঞাপন।
সিদ্ধান্ত স্থির করেই রাজা দ্বিতীয় আইয়ামোর সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন ডন ফার্নান্ডো। অনুমতি চাইলেন অভিযান নিয়ে সপ্তনগরীর দ্বীপে যাওয়ার জন্য। দ্বীপটা আবিষ্কার করার পরে সেটা অবশ্য পোর্তুগালের রাজছত্রের অধীনেই নিয়ে আসবেন ফার্নান্ডো। কিন্তু রাজার কাছ থেকে তিনি এরকম একটা প্রতিশ্রুতি চান যে ও-রাজ্যের রাজপ্রতিনিধি বা অ্যাডালান্টাডোর পদে ফার্নান্ডো ছাড়া অন্য কাউকেই রাজা নিয়োগ করবেন না।
রাজা একটুও আপত্তি করলেন না প্রতিশ্রুতি দিতে। প্রতিশ্রুতি কেন, লিখিত নিয়োগপত্রই তিনি দিয়ে দিলেন একটা। ফার্নান্ডো দ্য আলমো সেইদিন থেকেই অধিষ্ঠিত হলেন সপ্তনগরী দ্বীপের অ্যাডালান্টাডো পদে। সে দেশের শাসনকর্তৃত্ব বহাল হওয়ার পরে যেদিক থেকে যত অর্থাগমই হোক ফার্নান্ডোর, তার দশভাগের একভাগ রাজকর হিসেবে লিসবনে পাঠাবেন তিনি। এই মর্মে একটা শর্তও স্থান পেল সেই নিয়োগপত্রে।
রাজার কাছ থেকে এইটুকু পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করার পরে অভিযানের ব্যাপারে ফার্নান্ডো একান্তভাবেই তৎপর হয়ে উঠলেন। দু-খানা জাহাজ কেনা হয়ে গেল। পঞ্চাশ জন করে নাবিক থাকবে এক এক জাহাজে। প্রথমে নিয়োগ করা হল দু-জন ক্যাপ্টেন, অধীনস্ত নাবিকদের নিয়োগের ভার স্বভাবতই ন্যস্ত হল ক্যাপ্টেনের উপরে। বলাই বাহুল্য যে ক্যাপ্টেন থেকে শুরু করে ঝাড়ুদার ছোকরাগুলোকে পর্যন্ত মবলগ অর্থ আগাম দিতে হল। না-দিলে এই বিপজ্জনক অভিযানে কে যোগ দেবে? অর্থটা তারা নিজের নিজের সংসারে দিয়ে যাবে। যদি তারা না-ফেরে আর, কিছুদিন তো ওই অর্থেই চলতে পারবে সংসারগুলো।
বিপুল, সুবিপুল, অতিবিপুল খরচা! অগাধ নগদ অর্থ ছিল ফার্নান্ডোর সিন্দুকে। দেখতে দেখতে সে সিন্দুক খালি হয়ে গেল। তারপর ফার্নান্ডো জমিদারি বেচতে শুরু করলেন একটা একটা করে। যে সপ্তনগরীর অ্যাডালান্টাডো বনে গিয়েছে, পোর্তুগালের জমিদারির কী দাম তার কাছে? জমি বেচে অভিযান সাজাতে একটুও দ্বিধা নেই ফার্নান্ডোর মনে। জ্বলন্ত উৎসাহ তাঁর। দেশের লোকের মুখে ফার্নান্ডোর অভিযানের কথা ছাড়া অন্য কথাই নেই। সেইসব কথা কানে আসে তাঁর। স্তাবকেরা শতগুণ অতিরঞ্জিত করে জনগণের প্রশস্তি বয়ে আনে দিনের পর দিন। গৌরবে ফুলে ওঠে ফার্নান্ডোর মন।
মনটা এক এক সময় মুষড়ে যায়, কিন্তু শত গৌরবের মাঝে বসেও একটা ব্যাপারে তাঁকে খুবই কষ্ট পেতে হবে মনে হচ্ছে। সেটা হল এই যে, ডন র্যামিরোর সুন্দরী মেয়ে সেরাফিনার সঙ্গে বিয়ে ঠিক হয়ে গিয়েছিল তাঁর। হঠাৎ ডন র্যামিরো বেঁকে বসেছেন। তিনি সাফ বলে দিয়েছেন, অভিযান থেকে আস্ত হাত-পা নিয়ে ফিরে আসুক আগে ফার্নান্ডো, তারপর তিনি মেয়ের বিয়ে দেবেন। সুখে থাকতে যে লোককে ভূতে কিলোচ্ছে, ভূতের ভয় থেকে সে মুক্তি পাওয়ার আগে র্যামিরো তাকে কন্যাদান করতে অক্ষম। ফার্নান্ডোর বক্তৃতা বিচলিত করতে পারেনি র্যামিরোকে। বিগলিত করতে পারেনি সেরাফিনার অশ্রুও। উলটে তাঁকে করে তুলেছে কঠোর। পাছে সেরাফিনাও তাঁর অগোচরে ফার্নান্ডোর অভিযানে ভিড়ে যায়, সেই ভয়ে তিনি শেষপর্যন্ত তালাবন্ধ করে রেখেছেন মেয়েকে। তিনি জানেন মেয়েটা ফার্নান্ডোর অনুরাগিনী এবং অভিযানে ফার্নান্ডোর সুনিশ্চিত সাফল্য সম্পর্কে ফার্নান্ডোর নিজের চাইতেও কিছু বেশি বিশ্বাসিনী। অতএব বুড়ো বাপকে আঙুল দেখিয়ে চম্পট দেওয়া কিছুমাত্র অসম্ভব নয় সে মেয়ের পক্ষে।
তালা যখন পড়ল সেরাফিনার দরোজায়, ফার্নান্ডোর সম্বল রইল শুধু জানালা। জানালা অবশ্য দোতলায়, তাতে কী? নীচের বাগানে দাঁড়িয়ে চন্দ্রালোকিত নিশীথে সেরাফিনার কাছ থেকে শেষ বিদায় নিল ফার্নান্ডো। ‘যাব আর আসব। বড়োজোর ছ-টা মাস। তারপর তো আর তোমার বাবা আপত্তি করতে পারবেন না। সপ্তনগরীর অ্যাডালান্টাডো যে একটা কেউকেটা লোক, সেটা আমার সেদিনকার জাঁকজমক দেখলে তাঁর মগজে ঢুকবে আশা করি।’
অনেক চোখের জল ফেলল সেরাফিনা, অনেক আশ্বাস দিল ফার্নান্ডো, তারপর ফার্নান্ডো জাহাজে গিয়ে চড়ল। দু-খানা জাহাজ ভোরের আলোতে টেগাস নদীর লালচে জলে নাচতে নাচতে সমুদ্রে গিয়ে পড়ল অনুকূল হাওয়ায়।
ক্যাপ্টেনেরা দক্ষ লোক, ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জ পর্যন্ত জাহাজ চালিয়ে নিয়ে গেলেন নির্ঝঝঞ্ঝাটে। ফার্নান্ডো আসন্ন ভাগ্যোদয়ের সুখস্বপ্নে মশগুল। আর কী! এই তো এসে পড়া গিয়েছে। এ সমুদ্রে দ্বীপের ছড়াছড়ি। ডাইনে-বাঁয়ে অন্তত এক-শো দ্বীপ। একটা থেকে আর একটা দূর আছে বটে অনেকখানি, তাতে আর হয়েছে কী? জাহাজ রয়েছে, প্রত্যেকটাতে এক একবার করে দেখা দেওয়ার অপেক্ষা শুধু। খ্রিস্টানেরা যে-দ্বীপে আছে, সেখানে পোর্তুগালের জাহাজ পৌঁছোনো মাত্রই তো একটা উৎসব শুরু হয়ে যাবে। তিন-শো বছর পরে সভ্যজগতের বার্তা নিয়ে আসছে যে লোক, তাকে অ্যাডালান্টাডোর রাজমর্যাদা তো তারা সানন্দেই দেবে! দেবে অশেষ কৃতজ্ঞতার সঙ্গেই!
কিন্তু হায়! কে জানত যে আশার সপ্তম স্বর্গ থেকে একান্ত আচম্বিতে ফার্নান্ডো নিক্ষিপ্ত হবে নৈরাশ্যের নরককুণ্ডে! এক রাত্রে উঠল প্রচণ্ড ঝড়। ফার্নান্ডোর দু-খানা জাহাজ সেই ঝটিকার তাড়নায় দুই দিকে চলে গেল। সারারাত্রি ঝড়ের আগে আগে উদ্দামবেগে ছুটে চলার পরে, ভোর বেলায় ফার্নান্ডোর নিজের জাহাজের ক্যাপ্টেন এসে বললেন, ‘মালিক! কোথায় যে এসে পড়েছি, তা কিছুই বলতে পারিনে। সমুদ্রের এ অংশের কোনো মানচিত্র আমাদের কাছে নেই। তবে আশার কথা, উত্তর-পশ্চিমে ডাঙা দেখা দিয়েছে, একটা পাহাড় যেন চোখে পড়ছে; কিংবা খুব উঁচু একটা অধিত্যকাও হতে পারে।’
একখানা জাহাজ নিরুদ্দেশ, নিজের অধিকৃত জাহাজও ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত, তবু ডাঙার সন্ধান পাওয়া গিয়েছে শুনে উৎফুল্ল হয়ে উঠল ফার্নান্ডো। সেই দিকেই জাহাজ চালাতে বলল ক্যাপ্টেনকে। ঝড়ের রেশ তখন অনেক কমে গিয়েছে, দাঁড় টেনে টেনে ধীরে ধীরে ডাঙার দিকে এগুনো সম্ভব হতে পারে বলেই আশ্বাস দিলেন ক্যাপ্টেন।
ডাঙার খুব কাছে পৌঁছেই কিন্তু কাকের বাসার১ প্রহরী ঘোষণা করল যে, অদূরেই একটা নদীর মোহানা দেখা যাচ্ছে এবং সেই নদীপথে একখানা বৃহৎ বজরা বেরিয়ে আসছে জাহাজখানাকেই লক্ষ করে। সে আরও জানাল, বজরাখানার গড়ন-পেটন হুবহু পোর্তুগালের বজরার মতোই।
এই শেষোক্ত সংবাদটুকুই সবচেয়ে উৎফুল্ল করল ফার্নান্ডোকে। পোর্তুগিজ বজরা পোর্তুগালের লোক ছাড়া আর কে গড়বে? অনিবার্য সিদ্ধান্ত এই দাঁড়ায় যে, ফার্নান্ডো এসে গিয়েছেন তাঁর সপ্তনগরীর দ্বীপে। ভগবানের দয়া ছাড়া আর কী? অজানা এই দ্বীপে নিজের চেষ্টায় পৌঁছোতে হলে কতকাল কেটে যেত, তার ঠিক কী? অথচ এক রাত্রির ঝড়ে ভগবান তাকে পৌঁছে দিলেন সেখানে। মন্দ থেকেই ভালোর উদ্ভব হয়, কে-না শুনেছে সে কথা?
তবে কিনা, একখানা জাহাজের পাত্তা নেই। যাক গে, আসল কাজ যদি উদ্ধার করা যায়, নষ্ট হলই বা একখানা জাহাজ! একখানা জাহাজ আছে এবং ফার্নান্ডো নিজেও আছেন— এইটেই বড়ো কথা।
বজরা এসে পড়েছে। প্রহরীর কথা অক্ষরে অক্ষরে সত্যি। হুবহু যেন পোর্তুগিজ বজরা একখানা। যেরকম বজরা হামেশাই টেগাস নদীতে দেখতে পাওয়া যায়।
বজরা এসে পড়ল। ছাদের উপর দাঁড়িয়ে আছেন হোমরাচোমরা এক ব্যক্তি। কী আশ্চর্য! এ যেন লিসবন রাজসভারই কোনো পদস্থ কর্মচারী। বেশভূষায়, দাঁড়াবার ভঙ্গিমায়, পার্থক্যই খুঁজে পায় না ফার্নান্ডো।
আর সন্দেহ নেই। এইটিই যে সপ্তনগরীর দ্বীপ, তার অকাট্য প্রমাণ তো ওই ভদ্রলোকই। পোর্তুগাল থেকে যদি ওঁর পূর্বপুরুষেরা না-এসে থাকবেন, তাহলে ওরকম চেহারা কেন ওঁর?
কাছে এসে নিজের বজরা থেকেই ভদ্রলোক খাঁটি পোর্তুগিজ ভাষায় হেঁকে উঠলেন, ‘এ জাহাজ কার?’
ফার্নান্ডোর নির্দেশমতো ক্যাপ্টেন জবাব দিলেন, ‘সপ্তনগরীর দ্বীপের মহান অ্যাডালান্টাডোর। পোর্তুগালের রাজা কর্তৃক নিযুক্ত ও প্রেরিত।’
‘অ্যাডালান্টাডো আসবেন— এরকম একটা ভবিষ্যদবাণী তিন-শো বছর আগে করে গিয়েছিলেন আমাদের সেন্ট ব্রানডান। আমি কি জাহাজে উঠতে পারি?’
ক্যাপ্টেনের আমন্ত্রণে জাহাজে এসে উঠলেন ভদ্রলোক। সসম্ভ্রমে অভিবাদন করলেন অ্যাডালান্টাডোকে এবং নিজের পরিচয় দিলেন এ দ্বীপের শাসকসভার অন্যতম সদস্য বলে। ‘সবাই আমাকে মহামন্ত্রী বলে ডাকে।’ বললেন সদস্য মহাশয়।
ফার্নান্ডো নিজের পরিচয়পত্র দেখাতে চাইল। রাজা দ্বিতীয় আইয়ামোর সিলমোহর আর সই আছে যাতে!
‘এত তাড়া কী, অ্যাডালান্টাডো? আগে চলুন, আলাপ-পরিচয় খাওয়া-দাওয়া হোক। সারা শহর উৎসব সজ্জায় সেজে রয়েছে আপনাকে যথোচিত সম্মানের সঙ্গে অভ্যর্থনা করবার জন্য। আজ পরিচয়পত্র থাকুক। বিশেষ করে একা আমি তা দেখে করবই বা কী? গোটা মন্ত্রিসভা একসাথে দেখবে, শাসনভার একবাক্যে হস্তান্তর করবে আপনার কাছে। কোনো গোল হবে না অ্যাডালান্টাডো। এই রকমটাই যে হবে একদিন, তা আমরা বংশপরম্পরায় শুনে আসছি তিন-শো বছর ধরে।’
ফার্নান্ডোর মনটা আনন্দে নৃত্য করছে। সে মহামন্ত্রীর সঙ্গে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে। ক্যাপ্টেন আড়ালে ডেকে বললেন, ‘অপরিচিত লোকের সঙ্গে অজানা স্থানে যাচ্ছেন, একদল দেহরক্ষী অন্তত নিয়ে যান।’
ফার্নান্ডো জিভ কাটল, ‘তাও কি হয়? আমি তো নিজের লোকের কাছেই যাচ্ছি। মহামন্ত্রীই তো আমার রক্ষী। জাহাজ থেকে রক্ষী নিয়ে যাই যদি, তাতে তো বোঝাবে যে আমি অবিশ্বাস করছি ওদের।’
একাই বজরায় গিয়ে উঠল ফার্নান্ডো। বজরায় মাঝিরা একেবারে তটস্থ তার সামনে। খাতির করছে যেন খোদ সেন্ট ব্রানডানই নেমে এসেছেন স্বর্গ থেকে। বজরা নদীতে ঢুকেছে। নদীর দুই পারে সশস্ত্র সৈনিকের ঘাঁটি। যখন যে-পার দিয়েই যাক বজরা, ঘাঁটি থেকে প্রশ্ন আসছে, ‘কে যায়?’
মহামন্ত্রী উত্তর দিচ্ছেন, ‘সপ্তনগরীর দ্বীপের অ্যাডালান্টাডো।’ অমনি ঘাঁটি থেকে জয়ধ্বনি উঠছে, ‘স্বাগত অ্যাডালান্টাডো! জয় হোক অ্যাডালান্টাডোর।’
অবশেষে নগরে এসে ভিড়ল বজরা। মহামন্ত্রী নামিয়ে নিলেন ফার্নান্ডোকে। জেটিতে লাল বনাত পাতা। পুষ্পমাল্য, পতাকার সজ্জা প্রতি রাজপথে। সেকেলে পোর্তুগিজ অশ্বযানে আরোহণ করে চলেছে ফার্নান্ডো, ডাইনে-বাঁয়ে পোর্তুগিজ সৈনিকবেশী দেহরক্ষীরা। নগরপতি অ্যাকলেইডের গৃহে নিয়ে গেল তারা ফার্নান্ডোকে। বিরাট রাজপ্রাসাদ। সেখানে নাচ, গান, ভোজ, বক্তৃতা। এ যেন লিসবন রাজসভারই কোনো উৎসব।
ভোজের পরে মহামন্ত্রী বললেন, ‘চলুন অ্যাডালান্টাডো, আপনাকে জাহাজে পৌঁছে দিয়ে আসি আবার। কার্যভার গ্রহণের আগে নগরের ভিতরে বাস করা আপনার উচিত নয়, এক রাত্রির জন্যও। বিশেষত আপনি না-গেলে জাহাজের লোকেরা ভাববে।’
তেমনি উৎসবসজ্জায় হাস্যময়ী নগরীর রাজপথ বেয়ে ফার্নান্ডো এসে বজরায় উঠল। বজরা তাকে নিয়ে গেল জাহাজে। ফার্নান্ডো উঠতে যাবে জাহাজে, এমন সময়ে মহামন্ত্রী করল এক আশ্চর্য কাণ্ড। তার মাথার উঁচু টুপিটা, ধার যার অত্যন্ত চওড়া, এতক্ষণ হাতেই ছিল তার। অ্যাডালান্টাডোর সমুখে টুপি মাথায় দেবে সে কোন সাহসে? হ্যাঁ, টুপি তার হাতেই ছিল, সেইটা হঠাৎ সে চাপিয়ে দিল ফার্নান্ডোর মাথায়। ফার্নান্ডো হকচকিয়ে গেল, কিছু বুঝে উঠবার আগেই অনুভব করল যে টুপিটা তার মাথা থেকে পা পর্যন্ত ঢেকে ফেলেছে। সে যেন আটকে পড়েছে একটা পিপের ভিতর। দুই-একবার হাঁইফাঁই করে সে অজ্ঞান হয়ে পড়ল।
জ্ঞান যখন ফিরল, তখন সে নিজের জাহাজের একটা ক্ষুদ্র ভাঙা টুকরোর উপরে পড়ে আছে। একেবারে লিসবন শহরের জেটিতে।
জাহাজের টুকরোটা চিনল, কারণ টুকরোর গায়ে নাম লেখা আছে জাহাজের। আর লিসবনকে চিনবে না? ওই বড়ো গির্জা, ওই কেল্লা— ওইসব বড়ো বড়ো গুদোম—
সে কী বিড়ম্বনা! কেউ তাকে চেনে না, পরিচয় দেওয়ার পরেও না। নিজের বাড়িতে গেল, সেখানে অন্য লোক বসবাস করছে, তারা ফার্নান্ডোর নামও শোনেনি। পাগল বলে তাড়িয়ে দিল তাকে। গেল ডন র্যামিরোর বাড়িতে। সোজা ঢুকে পড়ল ভিতরে। এতক্ষণে ধড়ে প্রাণ এল তার। ওই যে সেরাফিনা! বসে বসে বীণ বাজাচ্ছে। ওই তো সেরাফিনা! যেমনটি দেখে গিয়েছিল, ঠিক তেমনটিই!
‘সেরাফিনা! সেরাফিনা! আমি এসেছি—’ ছুটে আসতে আসতে আকুল কণ্ঠে ডেকে উঠল ফার্নান্ডো।
‘সেরাফিনা?’ মেয়েটি লাফিয়ে উঠল, ‘সেরাফিনা তুমি কাকে বলছ? সেরাফিনা ছিল আমার প্রপিতামহীর নাম। তিনি তো মারা গিয়েছেন আজ এক-শো বছর। আমি দেখতে হুবহু সেরাফিনার মতো হয়েছি, তা ঠিক। ওই যে দেয়ালে তাঁর ছবি রয়েছে। কী বলো, একরকম না?’
ফার্নান্ডো তাকিয়ে দেখল, সত্যিই সেরাফিনার ছবি দেয়ালে টাঙানো আছে, তার নীচে লেখা আছে মৃত্যুর তারিখ। সে তারিখ পুরো এক-শো বছর আগের একটা তারিখ।
এ কী হল? সে কি পাগল হয়ে গেল, না পাগল হয়ে গেল শহরসুদ্ধ সব লোক? এক-শো বছর সে সমুদ্রে ভেসে বেড়িয়েছে, ঘুমন্ত অবস্থায় জাহাজের একটা ভাঙা টুকরো মাত্র অবলম্বন করে, এও কি সম্ভব?
____
১ মাস্তুলের মাথায় একটা ছোটো খাঁচা। এর ভিতর বসে প্রহরী সমুদ্রের দিকে নজর রাখে। একে বলে ‘ক্রোক নেস্ট’ বা কাকের বাসা।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন