সতীশচন্দ্র মিত্র
খাঁ জাহান আলি কে, তাহা আমরা পূর্ব্ব পরিচ্ছেদে আলোচনা করিয়াছি। আমাদের অনুমানের পরিপোষণ জন্য কতকগুলি প্রমাণও দিয়াছি। তিনি যিনিই হউন, তিনি যে সুন্দরবনাঞ্চলের ভারপ্রাপ্ত শাসনকর্তা হইয়া এদেশে আসিয়াছিলেন, তাহাতে সন্দেহ নাই। এইরূপ ভার তিনি দিল্লী হইতে পাইয়াছিলেন, বোধ হয়; কারণ, বঙ্গের কর্ম্মচারী স্বকীয় কার্য্যস্থান বাগেরহাটের নাম খালিফাতাবাদ রাখিতেন না। তিনি নিজে স্বাধীনও ছিলেন না; কারণ, তিনি নিজনামে কোন মুদ্রাঙ্কন করিয়াছেন বলিয়া একাল পৰ্য্যন্ত জানা যায় নাই। যদি তিনি জৌনপুরের প্রতিষ্ঠাতা খাজা জাহানই হন, তাহা হইলে ইব্রাহিম শাহের মৃত্যুর পর (১৪৪০) তাঁহাকে দিল্লী বা বঙ্গের অধীনতা স্বীকার করিয়া চলিতে হইয়াছিল। জৌনপুরের গর্ব্ব ইব্রাহিমের সঙ্গে সঙ্গে অস্তমিত হয়। তখন দিল্লী ও জৌনপুর রাজ্যে দীর্ঘকালব্যাপী ভীষণ যুদ্ধবিগ্রহ চলিতেছিল; এ সময়ে নাসির উদ্দীন মামুদ শাহ বঙ্গের রাজা (১৪৪২-৬০); তাঁহার রাজত্ব শান্তিতে নিৰ্ব্বাহ হইতেছিল। এই রাজত্বকালেই খাঁ জাহানের প্রধান প্রধান কীৰ্ত্তি স্থাপিত হয়।
খাঁ জাহান সদলবলে প্রথমে বারবাজারে আসিয়া অবস্থান করেন। সম্ভবতঃ বারজন ফকির ধর্মপ্রচারার্থ এ প্রদেশে তাঁহার পূর্ব্বেই আসিয়াছিলেন, তাঁহারাই বারবাজারের নূতন নাম রাখেন। পূর্ব্বে এইস্থানের নাম সম্ভবতঃ ছাপাই নগর বা চাম্পাই নগর ছিল। খাঁ জাহান ধার্মিক প্রকৃতির লোক ছিলেন। তিনি আসিলে ফকিরেরা তাঁহার অনুচরভুক্ত হন। এমন আরও কত অনুচর জুটিয়াছিল। এই সময়ে বারবাজারে কতকগুলি দীঘি ও মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়। উহার ভগ্নাবশেষ এখনও আছে। আমরা পূর্ব্বে দেখাইয়াছি যে, বৌদ্ধপ্রধান স্থান বলিয়াই এস্থানে পাঠানদিগের প্রথম আস্তানা হয়। তখন প্রাচীন বৌদ্ধগণ কতক কতক মুসলমান ধর্ম্ম পরিগ্রহ করেন এবং কতক কতক স্থান ত্যাগ করিয়া দক্ষিণ-পূর্ব্ব মুখে পলায়ন করেন। খাঁ জাহান বারবাজারে কয়েক বৎসর অনুচরবর্গ সহ অবস্থান করিয়াছিলেন।
বারবাজার হইতে বহির্গত হইয়া খাঁ জাহান ও তাঁহার অনুচরবর্গ প্রথমতঃ যশোহরে উপনীত হন। খাঁ জাহান এখানে অধিষ্ঠান করিয়াছিলেন বলিয়া বোধ হয় না। তবে তাঁহার সহচর দুইজন সাধু ফকির এখানে স্থায়িভাবে থাকিয়া যান। এ সম্বন্ধে একটা গল্প প্রচলিত আছে। খাঁ জাহান তাঁহার সহযাত্রী গরিব শাহ ও বেরাম শাহ নামক দুই ফকিরকে তাঁহার ও অনুচরবর্গের জন্য খাদ্য প্রস্তুত করিয়া রাখিতে পূর্ব্বে প্রেরণ করেন। উঁহারা যশোহরে পৌঁছিয়া খাদ্যের চেষ্টা করিতে থাকেন কিন্তু সময় মত খাদ্য প্রস্তুত হইয়াছিল না। খাঁ জাহান পৌঁছিয়া দেখিলেন খাদ্য প্ৰস্তুত নাই, এজন্য তিনি এস্থানে অবস্থান করিলেন না এবং গরিব শাহ ও বেরাম শাহকে সঙ্গে লইলেন না। তদবধি ঐ দুইজন এইস্থানে রহিয়া গেলেন। এটি একটি গল্পকথা। মোটকথা, খাঁ জাহানের উদ্দেশ্য ছিল— মুসলমানধর্ম প্রচার ও রাজ্য প্রতিষ্ঠা। তিনি ভৈরবকূলে মুড়লীতে একটি প্রধান কেন্দ্র সংস্থাপন করিলেন। ক্রমে ঐ স্থানে একটি সহর হইল। উহার নাম হইল মুড়লী-কসবা। কসবা শব্দে সহর বা নগর বুঝায়। এইরূপ ভাবে সহর প্রতিষ্ঠা করিয়া খাঁ জাহান অগ্রসর হইতে থাকিলেন। মুড়লীতে ধর্মপ্রচারকার্য্যে গরিব শাহ ও বেরাম শাহকে রাখিয়া গেলেন। তাঁহার নানা বুজরুকী বা অলৌকিক শক্তি এবং সাধুজীবনের আদর্শ দেখাইয়া বহু লোককে মোহিত ও বশীভূত করিলেন। অনেকে মুসলমানধর্ম্ম পরিগ্রহ করিল; যাহারা মুসলমান হইল না, তাহারাও ফকিরদিগকে দেবতার মত ভক্তি করিত। এখনও সে ভক্তি চলিতেছে। এখনও দূরবর্ত্তী স্থানের লোকেও মোকদ্দমা করিতে বা অন্য কার্য্যে যশোহরে আসিলে, গরিব শাহের দরগায় সেলাম ও সিনী না দিয়া কোন কার্য্য করে না। পুরাতন কসবায় যশোহরের ফৌজদারী আদালতের অনতিদূরে ভৈরবকূলে গরিব শাহের ক্ষুদ্র মসজিদটি সৰ্ব্বজাতীয় লোকের তীর্থস্বরূপ হইয়া রহিয়াছে। বেরামের দরগা আরও পশ্চিমদিকে গেলে সাহেবদিগের গোরস্থানের সন্নিকটে দেখিতে পাওয়া যায়। সাধুতা যে জাতিভেদের গণ্ডীর বহির্ভূত এবং সর্ব্বজাতির ভক্তির জিনিস, এই সাধু ফকিরদিগের দরগা তাহা শিক্ষা দিতেছে।
মুড়লী-কসবা হইতে খাঁ জাহানের প্রচার-বাহিনী দুইভাগে বিভক্ত হয়। একদল সোজা দক্ষিণমুখে কপোতাক্ষের পূর্ব্বধার দিয়া ক্রমে সুন্দরবনের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে; অন্যদল পূৰ্ব্ব- দক্ষিণমুখে ক্রমে ভৈরবের কূল দিয়া বাগেরহাট অঞ্চলে পৌঁছে। সঙ্গে সঙ্গে এই উভয় পথে দুইটি রাস্তা বা জাঙ্গাল প্রস্তুত হইয়া যায়। বারবাজার হইতে যে রাস্তা যশোহর পর্য্যন্ত আসিয়াছে, তাহার পূর্ব্বনাম গাজীর জাঙ্গাল। আমরা গাজীর কথা পরে বলিব। জনৈক গাজী বারবাজারে মুসলমান প্রতিপত্তি স্থাপনা করেন। তাঁহার নামানুসারে পরবর্ত্তীকালে উক্ত গাজীর জাঙ্গাল নাম হইয়াছিল। যশোহর হইতে দুইদিকে দুইটি খাঞ্জালির জাঙ্গাল আরম্ভ হইয়াছে।
এক প্রবীণ পুরুষ খাঁ জাহানের প্রধান পার্শ্বচর ছিলেন; তাঁহার অন্য কি নাম ছিল জানা যায় না; তিনি সাধারণতঃ বুড়া খাঁ নামেই পরিচিত। ইঁহার সঙ্গে ইঁহার পুত্র ফতে খাঁ ছিলেন। উভয়েই সাস, কর্মতৎপরতা ও ধর্ম্মনিষ্ঠার জন্য বিখ্যাত ছিলেন। দক্ষিণদিকে আবাদ পত্তন ও ধর্মপ্রচারের ভার এই পিতাপুত্রের উপর দিয়া, নিজে ভৈরবতীর দিয়া পূর্ব্বমুখে অগ্রসর হইয়াছিলেন। বুড়া খাঁ ও ফতে খাঁ বহুসংখ্যক সৈন্যসামন্ত ও সাধু ফকির সঙ্গে লইয়া মুড়লী হইতে দক্ষিণদিকে গিয়া প্রথমতঃ খানপুরে অবস্থান করেন। তাঁহারা রাস্তা প্রস্তুত করিতে করিতে, খাঁ জাহানের উপদেশ ও দৃষ্টান্তে উভয়পার্শ্বে দীঘি খনন করিয়া লোকের জলকষ্ট নিবারণ করিতে করিতে অগ্রসর হইতেছিলেন। খানপুরে বহুলোকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করিয়াছিলেন এবং তদবধি বহু নিষ্ঠাবান্ মুসলমানের বাস জন্য এ স্থান পবিত্র হইয়াছিল; এখন মুসলমান অধিবাসীর সংখ্যা খুব বেশী, কিন্তু সে নিষ্ঠা এক্ষণে বিবাদ-বিসম্বাদে পর্যবসিত হওয়ায় অধিবাসীরা মোকদ্দমার খরচে উৎস যাইতেছেন। এখান হইতে খাঁ জাহানের দল কেশবপুরের পথে বিদ্যানন্দকাটির নিকট আসিয়া আড্ডা করেন। এখানে একটি প্রকাণ্ড দীর্ঘিকা খনিত হয়। আমরা পূর্ব্বে বলিয়াছি, বিদ্যানন্দকাটি একটি প্রাচীন গ্রাম, এখানে পাঠান যুগের পূর্ব্বকালীন কীৰ্ত্তিচিহ্নও ছিল এবং বহুসংখ্যক বৌদ্ধের বাস ছিল। বিদ্যানন্দকাটির দীঘি উত্তর-দক্ষিণে দীর্ঘ; সম্ভবতঃ কোন পুরাতন বৌদ্ধযুগের দীঘি পুনরায় খনন করা হয়; ইহার দৈর্ঘ্য প্রায় ১৬০০ হাত এবং প্রস্থ ৭০০ হাত হইবে। প্রতি বৎসর এই দীঘির দক্ষিণ পাহাড়ের উপর দোলপূজার দিন খাঁ জাহানের উদ্দেশ্যে মেলা হয়। খাঁ জাহান এতদঞ্চলের লোকের নিকট পীর বা দেবতার মত সম্মানিত হন। লোকের গাভী দুগ্ধবতী হইলে প্রথম দুগ্ধ তাঁহার উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করিয়া যায়। এক সময় এমন ছিল যে, স্থানীয় লোকে কোন ইমারত নির্ম্মাণ করিবার পূর্ব্বে খাঁ জাহানের স্মৃতিস্থানের উপর একখানি ইট না লাগাইয়া কার্য্যারম্ভ করিত না। উক্ত দীঘি খনন করিবার সময় খাঁ জাহান স্বয়ং কিছুদিন আসিয়া এখানে ছিলেন এবং হয়ত তাঁহার কোন অনুচরের স্মৃতিরক্ষা জন্য তাহার নামানুসারে নিকটবর্ত্তী সারবাবাদ বা সারবাবাজের নাম হইয়াছে। এই সারবাবাদে ও পার্শ্ববর্তী মীর্জাপুরে কতকগুলি ‘খাঞ্জালি’ দীঘি আছে। বিদ্যানন্দকাটির দীঘি সম্বন্ধে অনেক অদ্ভুত জনশ্ৰুতি চলিয়া আসিতেছে, আমরা এখানে সে সকল অনর্থক গল্পের অবতারণা করিতে চাহি না। তাহার একটি গল্প আছে যে, এই দীঘি খনন কালে বাগেরহাটের ঠাকুরদীঘির খননকালের মত একটি যোগীমূর্তি বাহির হইয়াছিল; ঠাকুরদীঘির ধ্যানী বুদ্ধমূর্ত্তির মত এখানেও কোন বুদ্ধমূর্ত্তি আবিষ্কৃত হওয়া বিচিত্র নহে।
বিদ্যানন্দকাটি হইতে খাঁ জাহানের অনুচরবর্গ রাস্তা প্রস্তুত করিতে করিতে সুন্দরবনের গভীর অরণ্যে প্রবেশ করেন। এই রাস্তার চিহ্ন বৰ্ত্তমান আছে। সম্প্রতি উহা ডিষ্ট্রীক্টবোর্ডের রাস্তায় পরিণত হইয়াছে। একটি রাস্তা যশোহর, খানপুর, কেশবপুর, বিদ্যানন্দকাটি ও তথা হইতে মাগুরাঘোনা, আটারই, জেয়ালা বারুইহাটির পূর্ব্বধার, তালা, চাপানঘাট, খলিননগর, গঙ্গারামপুর, ঘোষনগর, কপিলমুনি, রামনাথপুর, গদাইপুর ও মঠবাড়ী দিয়া পাইকগাছায় গিয়াছে। সেখানে শিবসা নদী পার হইয়া লক্ষ্মীখোলা, গজালিয়া ও আলমতলা দিয়া মজিদকুড়ে মিশিয়াছে; তথা হইতে আমাদি ও পরে গভীর অরণ্যের মধ্যবর্ত্তী বেদকাশী নামক স্থানে গিয়াছে এই পথের পার্শ্বে স্থানে স্থানে কীৰ্ত্তিচিহ্ন আছে। মাগুরাঘোনায় একটি মসজিদ ও দীঘি ছিল। দীঘি এখনও আছে, মজিদের চিহ্নও বিলুপ্ত হয় নাই। এই মজিদে একখানি পাথর ছিল। আরসনগরে একটি মসজিদ ও দীঘি ছিল। সে দীঘি এখনও আছে, উহা উত্তর-দক্ষিণে দীর্ঘ। এখনও উহাতে বেশ জল থাকে। দীঘির পশ্চিমকূলে ৪৫’×৪০’ একটি মজিদ ছিল, তাহার ভগ্নাবশেষ এখনও আছে।
এই মজিদে একখানি পাথরে তুগ্রা (Tughra) অক্ষরে আরবী ভাষায় একটি লিপি ছিল। পাথরখানি এখনও আছে। এখনও উহার পাঠোদ্ধার করা হয় নাই। পাথরের একটা ছাপ লওয়া হইয়াছিল, কিন্তু তাহা হইতে পড়া যায় নাই। ভালভাবে পুনরায় ছাপ লওয়া আবশ্যক। পাথরখানি শাহাজী নামক এক ফকির জঙ্গলের মধ্যে মসজিদের ভগ্নাবশেষের উপর পান। উহা হইতে পঞ্চমপুরুষে সিরাজ, মফেজ ও অহেদ সেখ বর্তমান। ইঁহারা পুরুষানুক্রমে দুগ্ধাদি দিয়া পাথরখানির পূজা করিয়া আসিতেছেন। পাথরখানি অন্য কাহাকেও দিবেন না। পাথরের পরিমাণ ১’-৯১/২’’ × ৯১/২’’ × ৪১/২’’, জনপ্রায় পঁচিশ সের।
পাইকগাছার নিকট মঠবাড়ীতে প্রাচীন মসজিদাদির ভগ্নাবশেষ আছে; লস্করবেড় নামক স্থানে একটি প্রকাণ্ড দীঘি আছে। ইহাকে লস্কর দীঘি বলে; দীঘির জল অতি মিষ্ট, এখনও বৎসর ভরিয়া যথেষ্ট জল থাকে এবং নিকটবর্ত্তী লোকের জলকষ্ট হইতে দেয় না। মসজিদকুড়ে বুড়া খাঁ ও ফতে খাঁ প্রধান আস্তানা করিয়াছিলেন। স্থানটির প্রকৃত নাম আমাদি, উহারই উত্তরাংশে বুড়া খাঁ মজিদ নির্মাণ করেন, সুন্দরবনের বিপ্লবে ঐ স্থান অনেককাল পৰ্য্যন্ত জঙ্গলাকীর্ণ হইয়া থাকে। সেই জঙ্গল কাটিয়া মাটী খুঁড়িয়া যখন মজিদ বাহির হয়, তখন সে স্থানের নাম রাখা হয়, মসজিদকুড়।
মসজিদকুড়ের বিখ্যাত নবগুম্বজ মসজিদ সুন্দরবন প্রদেশের একটি প্রধান স্থাপত্য-নিদর্শন। ইহার উভয়দিকে তিনটি করিয়া মোট ৯টি গুম্বজ। তন্মধ্যে সৰ্ব্বমধ্যবর্ত্তী গুম্বজটি কিছু বড়। চিত্রে ভুলক্রমে তাহা প্রদর্শিত হয় নাই। সমগ্র মজিদের ভিতরের মাপ ৪০x৪০ ফুট, ভিত্তি ৭ ফুট। চারি কোণে ৪টি মিনার আছে। পশ্চিমদিক বদ্ধ; সেদিকে ভিতরে তিনটি মিরহাব বা কুলুঙ্গ (niche) আছে। অপর তিনদিকে তিনটি করিয়া খিলান ও খোলা দরজা। প্রত্যেক দিকেই মধ্যবর্তী দরজাটি কিছু বড়। সকল মসজিদের মত ইহারও পূর্ব্বদিকে সদর ছিল, সেদিকে কার্ণিসে ও খিলানের উপরে ইষ্টকে কারুকার্য্য আছে। কতকগুলি ইষ্টকে পদ্ম উৎকীর্ণ : কতকগুলিতে একপ্রকার মালা বা রজ্জু নানাভাবে বিলম্বিত ও সংযুক্ত; কেহ কেহ বলেন উহা বঙ্গেশ্বর নাসিরউদ্দীন মামুদ সাহের রাজচিহ্ন।[১] এরূপ জড়োয়াবৃত্ত বাগেরহাটে ষাট-গুম্বুজের গায়েও আছে। বেষ্টনপ্রাচীর ব্যতীত মধ্যস্থানে চারিটি স্তম্ভের উপর গুম্বুজগুলি গঠিত হইয়াছে। স্তম্ভগুলি প্রত্যেকে ইষ্টকভিত্তির উপর ৮/৯ ফুট উচ্চ; কিন্তু উপযুক্ত ভার সহ্য করিবার মত সুস্পষ্ট বলিয়া বোধ হয় না। তাহাতে নানা সন্দেহের উদ্রেক হয়। আমরা এ সম্বন্ধে পূর্ব্বে একবার আলোচনা করিয়াছি; ওয়েষ্টল্যাণ্ড সাহেবও এ সম্বন্ধে তাঁহার স্বাধীন মত প্রকাশ করিয়াছিলেন।[২] খিলান ও গুম্বুজের গঠন এত সুন্দর যে, বোধ হয়, এক্ষণে স্তম্ভগুলি সরাইয়া লইলেও তাহারা ঠিক থাকে।
এই সুন্দর মসজিদটি বড় হীন অবস্থায় আছে। মিনার কয়েকটির শীর্ষদেশ ভাঙ্গিয়া গিয়াছে, মজিদের উপর সম্পূর্ণরূপে জঙ্গলে আবৃত হইয়া রহিয়াছে, খিলানের ইটগুলি লোকে ভাঙ্গিয়া লইয়া যাইতেছে; স্তম্ভের মাথা দিয়া বর্ষার সময় জল পড়ে; উহাতে স্তম্ভ ক্রমশঃ ক্ষয়প্রাপ্ত হইতেছে এবং মসজিদের ভিতর জল জমিয়া বর্ষাকালে অব্যবহার্য্য হয়। সহৃদয় গবর্ণমেণ্টের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ পুরাকীর্তি রক্ষার জন্য বহুস্থানে বহু অর্থ ব্যয় করিতেছেন, কিন্তু এই অজ্ঞাত এবং অবজ্ঞাত সুন্দরবন অঞ্চলে এই সুন্দর কীর্তিমন্দির রক্ষার দিকে তাঁহাদের দৃষ্টি আকৃষ্ট হইলেও উপযুক্ত সংস্কারের ব্যবস্থা হইতেছে না, ইহাই দুঃখের বিষয়। এদেশে যাতায়াতের অসুবিধাই কি এই অবহেলার কারণ? যেখানে সকলে যায়, সকলে দেখে, সকলে তাহারই রক্ষার জন্য চেষ্টা করে। কিন্তু এই লবণাক্ত বায়ুর রাজ্যে-নিঃস্ব নিরক্ষর কৃষকের দেশে প্রাচীন কীর্তি রক্ষার ভার লইয়া কাৰ্য্য সম্পাদন যে কৃতিত্বের পরিচায়ক, তাহাতে সন্দেহ নাই।
এই মজিদের দক্ষিণ-পশ্চিমদিকে বিস্তৃত কপোতাক্ষ, অন্য তিনদিকে গড়খাই ছিল। এখনও দক্ষিণদিকে একটি পরিখা খালের আকারে আছে। নদীর দিক্ হইতে মজিদের ফটো লওয়া হয়। মজিদকুড়ের দক্ষিণ গায়ে আমাদি গ্রাম। আমাদি পুরাতন গ্রাম; ইহার সম্বন্ধে কিছু প্রাচীন কথা পূৰ্ব্বে বলিয়াছি। আমাদি গ্রামে পশ্চিম দিকে নদীর কূলে বুড়া খাঁ ও ফতে খাঁ উভয়ের কবর ছিল। অল্পদিন হইল বুড়া খাঁর কবর ভাঙ্গিয়া নদীতে পড়িয়া গিয়াছে; এখনও একটি গোলকচাঁপা ফুলের গাছতলায় ফতে খাঁর সমাধির ভগ্নাবশেষ আছে। এখনও বহু হিন্দু মুসলমানে এই সমাধি স্থানে মানসা করে এবং তাহার চিহ্নস্বরূপ ফুলের গাছটির গাত্রে ইষ্টকখণ্ডসমূহ ঝুলাইয়া রাখিয়া যায়।
বুড়া খাঁ যে শুধু ধৰ্ম্মপ্রচার জন্য এখানে ছিলেন, তাহা নহে। তাঁহার প্রধান কাজ ছিল, রাজ্যশাসন ও জমিপত্তন। তাঁহার সমাধিস্থানের অনতিদূরে তাঁহার গড়বেষ্টিত কাছারি বাড়ী ছিল; এখন গড়ের এবং বাড়ীর ভগ্নাংশের নানা চিহ্ন আছে। দুইদিকে নদী ও অপর দুইদিকে খনিত খালে পরিখার কার্য্য করিয়াছিল। এই খালকে এক্ষণে খাকা বলে, নিকটে যে প্রকাণ্ড ‘কালিকা’ দীঘি আছে, তাহা জনৈক প্রাচীন রাজা ইন্দ্রনারায়ণ চৌধুরীকৃত। সে কথা পূর্ব্বে বলিয়াছি।৩ সম্ভবতঃ এই জন্যই এখানে বুড়া খাঁ কর্তৃক কোনও পুষ্করিণী খনিত হয় নাই। ইন্দ্রনারায়ণের সময় নির্দেশ করা যায় নাই। তিনি যদি বুড়া খাঁর পরবর্ত্তী যুগের লোক হন, তাহা হইলে হয়ত পাঠান আমলের দীঘিকে নিজের বলিয়া প্রচারও করিতে পারেন। কিন্তু ইন্দ্রনারায়ণ তত আধুনিক বলিয়া বোধ হয় না।
বুড়া খাঁ, ফতে খাঁ শুধু আমাদিতে থাকিতেন এবং অন্যত্র যাইতেন না, তাহা নহে। বাগেরহাটে বুড়া খাঁর দীঘি আছে। প্রতাপাদিত্যের রাজধানী যশোর-ঈশ্বরীপুরে ও তাহার পশ্চিম- দক্ষিণ কোণে, এই দুইস্থানে বুড়া খাঁর আস্তানা ছিল বলিয়া প্রদর্শিত হয়। বেদকাশী আবাদে যে অতি প্রকাণ্ড ‘কালী-খালাস খাঁ’ দীঘির কথা পূৰ্ব্বে আলোচিত হইয়াছে,° সে খালাস খাঁ এই বুড়া খাঁর অনুচর ছিলেন বলিয়া বোধ হয়। কেবল খালাস খাঁ নহেন, দক্ষিণ বিভাগের ভারপ্রাপ্ত বুড়া খাঁর আরও কয়েকজন অনুচর বিদ্যানন্দকাটি হইতে পশ্চিমমুখে আসিয়া কপোতাক্ষের কূল দিয়া দক্ষিণদিকে অগ্রসর হইয়াছিলেন। তন্মধ্যে ত্রিমোহানীর সন্নিকটে গোপালপুরে একজন ছিলেন; তাঁহার নাম জানা যায় না। গোপালপুরে নদীর ধারে একটি সুন্দর খাঞ্জালি মসজিদ এখনও বৰ্ত্তমান রহিয়াছে। এখানে নদীর পাহাড়ের উপর মাটী ফেলিয়া উচ্চ করিয়া তাঁহার উপর মসজিদ নিৰ্ম্মিত হইয়াছিল। গোপালপুর হইতে দক্ষিণদিকে কপোতাক্ষের কূল দিয়া অগ্রসর হইলে, মেহেরপুরে পীর মেদ্দিন বা মেহের উদ্দীনের সমাধিমন্দির দৃষ্টিপথে পতিত হয়। এ মজিদটি খুব ছোট, বাহিরে ১৬’-৩” ×১৬’-৩’’, চারিকোণে চারিটি গাত্রলগ্ন মিনার, একটিমাত্র দরজা (৫’ × ২’-২’’), উহার পার্শ্বে উপরিভাগে কারুকার্য্য করা ইষ্টক আছে। মসজিদের সম্মুখে একটি বেদী, পরে চারিপাশে প্রাচীর বেষ্টিত। প্রাচীরের দ্বারে একটি সুন্দর বকুলগাছ ছায়াদানে স্থানটির গাম্ভীৰ্য্য বৃদ্ধি করিতেছে। উহাও ইষ্টকের বেদী দ্বারা চিহ্নিত। উত্তরের দিকে একটি পাকা ইন্দারা ও কৃয়া আছে। মেহেরপুর হইতে আরও দক্ষিণদিকে অগ্রসর হইলে মাগুরা নামক গ্রামে পীর জয়ন্তী নামক ফকিরের দরগা দেখিতে পাওয়া যায়। ইনিও খাঁ জাহান আলির অনুচর হইতে পারেন। এই ফকিরের যথেষ্ট পীরোত্তর আছে। অম্বুবাচীর সময়ে এখানে মেলা হইয়া থাকে। কপোতাক্ষ বাহিয়া আর একটু অগ্রসর হইলে, সুজনশাহা বা সতিসা গ্রামে এক সুজনশাহ ফকিরের আস্তানা দেখিতে পাওয়া যায়। ইহারা সকলেই খাঁ জাহানের অনুচর।
পাদটীকা :
১. Khulna Gazetteer. P. 183.
২. বৰ্ত্তমান পুস্তক, দ্বিতীয় অংশ : অষ্টম পরিচ্ছেদ— বৌদ্ধ সংঘারাম কোথায় ছিল দ্রষ্টব্য; Westland’s Report, PP. 16-17
৩. দ্বিতীয় অংশ : অষ্টম পরিচ্ছেদ—বৌদ্ধ সংঘারাম কোথায় ছিল দ্রষ্টব্য।
৪. প্রথম অংশ : অষ্টম পরিচ্ছেদ—সুন্দরবনে মনুষ্যাবাস দ্রষ্টব্য।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন