১. প্রথম পরিচ্ছেদ – উপবঙ্গে দ্বীপমালা

সতীশচন্দ্র মিত্র

দ্বিতীয় অংশ – ঐতিহাসিক (১. হিন্দু-বৌদ্ধ যুগ)

‘চতুৰ্ব্ববর্গ-ফলপ্রাপ্তিরিতিহাসপুরাতনম্।
সঙ্কীৰ্ত্তয়েৎ সদা ভক্ত্যা দেবঋষিম্বধাভুজাম্‌॥’

যশোহর-খুলনা বঙ্গদেশের দক্ষিণভাগে অবস্থিত এবং সমুদ্র পর্য্যন্ত বিস্তৃত। বঙ্গের যে ত্রিকোণ ভূভাগ একদিকে ভাগীরথী, একদিকে পদ্মা ও দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর,—এই ত্রিসীমাবেষ্টিত তাহাকে গাঙ্গোপদ্বীপ (Gangetic delta) বা ব’দ্বীপ বলে। এই ব’দ্বীপের একাংশ এক্ষণে প্রেসিডেন্সী বিভাগ।[১] যশোহর ও খুলনা জেলা প্রেসিডেন্সী বিভাগের অন্তর্গত। বেঙ্গল বা বঙ্গদেশকে তিন ভাগে বিভক্ত করিলে, প্রেসিডেন্সী বিভাগ পূর্ব্ববঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গের মধ্যবর্ত্তী অর্থাৎ মধ্যবঙ্গভুক্ত হয়। যশোহর ও খুলনা প্রকৃতপক্ষে একই স্থান; শাসন ব্যবস্থায় ইহারা পৃথক্ হইলেও এখনও সমাজে, ধৰ্ম্মে, লৌকিক আচারে, ও স্বভাব-চরিত্রে একই আছে। এখন যেখানে খুলনা জেলা, ইংরাজ আমলের প্রারম্ভে তাহার অধিকাংশ যশোহরের অন্তর্গত ছিল। তাহারও পূর্ব্বে এখন যেখানে খুলনা জেলা, তাহাই ছিল যশোররাজ্য—এবং এখনকার যশোহর জেলা সে রাজ্যের বহির্ভূত ছিল। যাহা হউক, বর্তমানে যশোহর ও খুলনা এই দুই জেলার সীমানুসারে যে বিস্তৃত প্রদেশ হয়, তাহারই বিষয় আমাদের আলোচ্য এবং উহাই আমরা যুক্ত-জেলা নামে অভিহিত করিব। এ প্রদেশ প্রাচীন স্থান; বঙ্গের প্রাচীনত্বের সঙ্গে ইহার প্রাচীন গৌরব বিজড়িত রহিয়াছে। বঙ্গের পুরাতত্ত্বের কথিঞ্চৎ আলোচনা না করিলে, এ প্রদেশের প্রাচীন অবস্থা বুঝা যাইবে না।

বঙ্গ অতীব প্রাচীন স্থান। বেদাদি প্রাচীন গ্রন্থে বঙ্গের উল্লেখ আছে।[২] মহাভারত হইতে জানিতে পারি, মহারাজ বলি দীর্ঘতমা নামক মহর্ষির ঔরসে স্বীয় পত্নী সুদেষ্ণার গর্ভে পঞ্চপুত্র লাভ করেন। উহাদের নাম অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, পুণ্ড্র ও সুক্ষ্ম। ইহাদের নামে পাঁচটি বিখ্যাত দেশের নাম হয়।[৩] দীর্ঘতমা বেদোক্ত বিখ্যাত ঋষি। তৎপ্রণীত কতকগুলি সূক্ত আছে। সুতরাং দীর্ঘতমার ঔরসপুত্রগণ বৈদিক যুগে প্রাদুর্ভূত হইয়াছিলেন বলা যাইতে পারে।[৪] বলি রাজা উত্তর-পশ্চিম প্রদেশে গঙ্গা ও সরযু-নদীর সঙ্গমে বিখ্যাত ‘বলিয়া’ নগরে রাজত্ব করিতেন বলিয়া অনুমিত হইয়াছে। তথা হইতে বলির পুত্রগণ ৫টি রাজ্য স্থাপন করেন এবং স্বীয় স্বীয় নামে উহার নাম নিদ্দের্শ করেন।[৫] এজন্য বর্তমান বেহার প্রদেশের নাম অঙ্গ, উড়িষ্যা অঞ্চল কলিঙ্গ, দক্ষিণ-রাঢ় বা হুগলী অঞ্চল সুহ্ম, মালদহ হইতে ময়মনসিংহ পৰ্য্যন্ত সমস্ত প্রদেশ পুণ্ড্র নামে কথিত হয়। আর ভাগীরথীর উভয় তীরবর্ত্তী স্থান অর্থাৎ মুর্শিদাবাদ, বীরভূম, বাঁকুড়া, বর্দ্ধমান এবং সম্ভবতঃ রাজসাহী-পাবনার কতকাংশ ও ঢাকা অঞ্চল লইয়া বঙ্গদেশ গঠিত ছিল।[৬] তখন বঙ্গের দক্ষিণে ও পূর্ব্বে সমুদ্র ছিল। গঙ্গার সহিত সমুদ্রসঙ্গম পুণ্ড্রদেশের সীমা হইতে অধিক দূরবর্ত্তী ছিল না। বস্তুতঃ গঙ্গাই বঙ্গের বিস্তৃতির কারণ। বঙ্গের আদিম অবস্থা জানিতে হইলে, গঙ্গাপ্রবাহের ধারাবাহিক ইতিবৃত্তের আলোচনা করা আবশ্যক।

গঙ্গা অতি প্রাচীন নদী। ঋগ্বেদ হইতে আরম্ভ করিয়া বহু প্রাচীন গ্রন্থে গঙ্গার উল্লেখ দেখিতে পাওয়া যায়। ভূতত্ত্ববিৎ পণ্ডিতগণের আলোচনা হইতে এরূপ ধারণা হয় যে, সমুদ্র এক সময়ে হিমালয়ের পাদ ধৌত করিত। তখন হিমাচলের অঙ্গবাহিনী সুর-তরঙ্গিনী গঙ্গা হিমাচলের পাদদেশের অনতিদূরে সমুদ্রে পতিত হইয়াছিলেন। তৎপরে রামায়ণের সময়ে দেখিতে পাই, গঙ্গা ভগীরথ কর্তৃক ভূতলে অর্থাৎ হিমাচলের সানুদেশ হইতে আর্য্যাবর্তের সমতলে আনীত হন। গঙ্গার যে মুখ হইতে উহার প্রবাহ ভগীরথ কর্তৃক প্রসারিত হইয়া সগরের পুত্রগণের উদ্ধার সাধন হইয়াছিল, সেই স্থান হইতে গঙ্গার নাম হয় ভাগীরথী। তখন গঙ্গার শাখা পদ্মা বা নলিনীর উৎপত্তি হয় নাই। ভবিষ্যতে যখন পদ্মার উৎপত্তি হওয়ায় গঙ্গার প্রধান প্রবাহ সেই পথে ধাবিত হয়, তখন সেই পদ্মার উৎপত্তি স্থান হইতে গঙ্গার প্রাচীন খাত পৃথকভাবে ভাগীরথী নামে চিহ্নিত হইয়াছিল।[৭]

আমরা সুন্দরবনের উৎপত্তি বিচার করিতে গিয়া দেখাইয়াছি যে, বঙ্গোপসাগর ক্রমশঃ দক্ষিণে সরিতেছে। সমুদ্রকূলবর্তী স্থান সকল প্রথমতঃ নিম্ন থাকে, সেখানে সমুদ্রের জল উঠে ও জঙ্গল জন্মে। ক্রমে স্থান উচ্চ হইয়া নিম্নে যত আরও চরভূমি জাগে, সমুদ্র তত সরিয়া যায়। উপরের জঙ্গলে মানুষের বসতি হয় এবং নিম্ন চরে পুনরায় বন প্রস্তুত হইতে থাকে। এই ভাবে সমুদ্র ক্রমশঃ দক্ষিণদিকে অর্থাৎ হিমালয়ের পাদদেশ হইতে দূরে সরিতেছে। সমুদ্রের কূলে নিম্নচর, তাহার উপরে জঙ্গলাকীর্ণ চর এবং তাহার উপরে মানুষের বসতি; এই ভাবে চর ও জঙ্গল সমুদ্রকূলের চিরসঙ্গী। হিমালয়ের পাদদেশ অতিক্রম করিয়া দক্ষিণমুখে অগ্রসর হইলেই সমুদ্রের অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়। নেপাল রাজ্যের নিম্নদেশে গঙ্গপ্রবাহের উভয় পারে এক ভীষণ অরণ্য ছিল, উহার নাম চম্পারণ্য। এখন উহা চম্পারণ জেলা। এই চম্পারণ্যের মধ্য দিয়াই গণ্ডকী বা সদানীরা নদী প্রবাহিত। যখন চম্পারণ্যে ভীষণ জঙ্গল ছিল, তখন তাহারই নিম্নে এক বিস্তৃত চর পড়িতেছিল। ঐ চর হইতেই বিদেহ বা মিথিলার উৎপত্তি হয়। বিদেহ যে পূৰ্ব্বকালে সমুদ্রকূলে ছিল, তাহা ইহার তীরভুক্তি নাম হইতে স্পষ্ট বুঝা যায়।[৮] বেদে উক্ত হইয়াছে যে এ প্রদেশ জলে মগ্ন হইত।[৯] সুতরাং মিথিলা তখন সুন্দরবনের মত নিম্নস্থান ছিল। মিথিলার বিস্তৃতি ছিল গণ্ডকী হইতে কৌশিকী পৰ্য্যন্ত।[১০] ক্রমে মিথিলা উন্নত হইলে, তথায় লোকের বসতি হয়। আমরা বৈদিক বিবরণী হইতে জানিতে পারি যে, ঋষিগণ সরস্বতী নদীর উভয় পার্শ্ববর্তী দেশ হইতে পূৰ্ব্বমুখে আসিয়া, সদানীরা বা গণ্ডকী পার হইয়া মিথিলাদেশে আগমন করেন এবং তখন হইতে এ প্রদেশে আর্য্যনিবাস স্থাপিত হয়। মিথিলার পূর্ব্বসীমা কৌশিকী বা কুশী নদী। কৌশিকী নদী যেখানে গঙ্গা হইতে উঠিয়াছিল, তাহা সমুদ্রের অতি নিকটবর্ত্তী ছিল। সম্ভবতঃ এই সময়ে গাঙ্গেয় উপদ্বীপ প্রথম সমুদ্রগর্ভ হইতে উত্থিত হয়। চন্দ্রদ্বীপের উৎপত্তি-বিবরণীতে লিখিত হইয়াছে যে, মহাদেবের ললাটানলদাহে জল বিলুপ্ত হইয়া পৃথিবী স্থলীভূতা হইয়া যায়।[১১] এই ললাটানল সম্ভবতঃ ভূমিকম্প। ভূমিকম্প এইরূপ অকস্মাৎ উন্মেষের একটি কারণ হওয়া বিচিত্র নহে; বঙ্গদেশে ভূমিকম্প দ্বারা এইরূপে জমি উন্নত বা অধোগত হওয়ার বিবরণ পাওয়া গিয়াছে।

যাহা হউক, এইরূপ কোন আকস্মিক শক্তির বলে বহুবিস্তৃত চরভাগ জাগিয়া ছিল বটে, কিন্তু সৰ্ব্বত্র সমান উচ্চ হইয়া উঠে নাই; এবং সেরূপ হয়ও না। প্রথমতঃ চর জাগে, নানাস্থানে একটু একটু ভূমি উচ্চ হইয়া উঠে, মনে হয় যেন সেগুলি পৃথক্ পৃথক্ দ্বীপ। কিন্তু জলের নিম্নে সমস্ত ভূমিভাগই উন্নত হয়, উপরে তাহারা পৃথক্ বলিয়া মনে হয়। এইরূপে স্থানে স্থানে দ্বীপ জাগিলে, ভিতরে ভিতরে জল থাকে, তাহাই অসংখ্য নদীরূপে প্রতিভাত হয়। সম্ভবতঃ মহাভারতীয় যুগে কৌশিকী নদীর সঙ্গমস্থলের সন্নিকটে পূর্ব্বে ও দক্ষিণে বহুদূর পর্য্যন্ত চরভূমি একেবারে জাগিয়াছিল এবং উহাদের মধ্যে মধ্যে শত শত নদী প্রবাহিত হইতেছিল। কারণ মহাভারতে দেখিতে পাই, যুধিষ্ঠির তীর্থোপলক্ষ্যে ভ্রাতৃগণ সমভিব্যাহারে প্রথমতঃ নৰ্ম্মদা ও কৌশিকীসঙ্গমে স্নান তর্পণাদি করেন। তখন কৌশিকী হইতে সমুদ্র অধিক দূরে ছিল না। পরে তিনি গঙ্গাসাগরসঙ্গমে উপস্থিত হন; তথায় পঞ্চশত নদীর মধ্যে অবগাহন করিয়া সমুদ্রতীর দিয়া কলিঙ্গদেশে চলিয়া যান।[১২] করুণ-প্রণীত ‘রাজ-তরঙ্গিণী’র বর্ণনায় সমুদ্র যে প্রাচীন রাজধানী পুণ্ড্রবর্দ্ধন হইতে অধিক দূরে ছিল না, তাহা প্রতিপন্ন হয়। শ্রীহর্ষ যখন আদিশূরের রাজধানীতে উপনীত হন, তখন তিনি উহার সন্নিকটেই সমুদ্র দর্শন করেন।[১৩]

গঙ্গা আর্য্যাবর্তে অবতরণ করিয়া সপ্তধারে প্রবাহিত হন। হ্লাদিনী, পাবনী ও নলিনী নামক তিন স্রোত পূর্ব্বদিকে এবং সুচক্ষুঃ, সীতা ও সিন্ধু নামক তিন স্রোত পশ্চিমদিকে প্রবাহিত হয়[১৪], মধ্যভাগে ছিল ভাগীরথী বা গঙ্গার মূল স্রোত। বৰ্ত্তমান মুর্শিদাবাদ জেলার উত্তরাংশে সূতিনামক স্থানের নিকট হইতে পূৰ্ব্বকালে নলিনী বা পদ্মা বহির্গত হয়। অতি প্রাচীনকালে নলিনী সম্ভবতঃ একটু উত্তরমুখে ঘুরিয়া ক্ষীণ-ধারায় প্রবাহিত হইত। তাহার বিশাল বিস্তার ছিল না, তখন রাজসাহী ও পাবনা প্রভৃতি স্থানের সহিত নদীয়া-যশোরের ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ ছিল। পদ্মার প্রাচীন অবস্থা সম্বন্ধে বহু বিতর্ক রহিয়াছে। এস্থলে তদ্বিষয়ের বিচার করিবার প্রয়োজন নাই।[১৫] যে স্থান হইতে গঙ্গার প্রধান প্রবাহ ভাগীরথী নামে দক্ষিণদিকে প্রবাহিত ছিল, সেই স্থান হইতেই পদ্মা বাহির হইয়াছিল। কালে ভাগীরথী ও পদ্মার সঙ্গমস্থলে একটি ঘোলা হইয়া ভাগীরথীর একটু বক্রগতি হয়। এখনও সে বক্রগতির পরিচয় আছে। সম্ভবতঃ এইজন্যই গঙ্গার মহাবল প্রবাহ পদ্মার দিকে এক সরল পথের আবিষ্কার করিয়া সোজা পূৰ্ব্বমুখে প্রবাহিত হয়। কৃত্তিবাসী রামায়ণে ও ‘গঙ্গাভক্তিতরঙ্গিনী’ প্রভৃতি গ্রন্থে গল্পের অবতারণাপূর্ব্বক বলা হইয়াছে যে, গঙ্গাদেবী ভগীরথের পশ্চাতে পশ্চাতে আসিতেছিলেন; এমন সময়ে ভগীরথ একটু শ্লথগতি হওয়ায় পদ্মমুনি বা শঙ্খাসুর গঙ্গাদেবীকে পথ ভুলাইয়া পূৰ্ব্বমুখে লইয়া যান। গঙ্গা কিন্তু বুঝিতে পারিয়া সে পথ হইতে ফিরিয়া আসিয়া, ভাগীরথী-খাতে দক্ষিণ-বাহিনী হন। বাস্তবিকই পদ্মার শীর্ণ জলধারা পূর্ব্বে বিক্রমপুরের মধ্য দিয়া প্রবাহিত হইয়া মেহ্দীগঞ্জের নিকট মেঘনায় মিলিত হইত। পরে পদ্মায় গঙ্গার প্রধান প্রবাহ বহিতে থাকিলে, উহা ক্রমে ভীষণ আকার ধারণ করিয়া বহু প্রাচীন কীর্তির ধ্বংসসাধন করিয়া ‘কীর্তিনাশা’ নাম গ্রহণ করে। এক্ষণে পদ্মা কীর্তিনাশা ও ভাঙ্গনী নামক দুই শাখায় বিভক্ত হইয়া মেঘনায় পড়িয়াছে। ব্রহ্মপুত্রের মূলস্রোতও যমুনা নামক নবোত্থিত শাখা দিয়া পদ্মাতে পড়িয়া, তাহার আকার আরও ভীষণ করিয়া তুলিয়াছে। আর যে ভাগীরথীর তীরে এক সময়ে বঙ্গদেশের প্রধান প্রধান রাজধানী প্রতিষ্ঠিত ছিল, পদ্মার প্রভাবে তাহার গতি মন্দীভূত হইয়া গেল।

যখন পদ্মা এইভাবে প্রবল হইল, তখন ভাগীরথীর প্রবাহ মন্দীভূত হইতে লাগিল। নবদ্বীপ পর্য্যন্ত তাহার এই অবস্থা ছিল। তথায় জলঙ্গী নামক পদ্মার একটি শাখা আসিয়া ভাগীরথীতে মিশিয়া তাহাকে সজীব করিল। ফলে নবদ্বীপ হইতে ত্রিবেণী পর্য্যন্ত ভাগীরথী বেশ সজীব থাকিল। ত্রিবেণীতে যখন ভাগীরথী দক্ষিণে সরস্বতী ও বামে যুমনায় বিমুক্ত হইয়া গেল, তখন আবার মূলস্রোত দুর্ব্বল হইয়া পড়িল এবং অবশেষে কালীঘাটের নিম্ন দিয়া প্রবাহিত হইবার কালে উহা ক্রমশঃ অপ্রশস্ত হইতে লাগিল। ত্রিবেণী হইতে সরস্বতী নদী বেগবতী হইয়া সমুদ্রে পড়িয়াছিল এবং সেই পথে সেকালে বঙ্গদেশের শিল্প ও পণ্যবাহিনী দূরদেশে নীত হইত। ভাগীরথীর একটি ক্ষুদ্র স্রোত বৰ্ত্তমান কলিকাতা দুর্গের সন্নিকট হইতে শাখরোল নামক স্থানে সরস্বতীর সহিত সংযুক্ত হয়। ক্রমে ঐ ক্ষুদ্র খাল প্রশস্ত হয় এবং ইংরাজ আমলের প্রারম্ভে উহার কতকাংশ তাঁহাদিগের দ্বারা খনিত হয়। তাহাতে গঙ্গার মূল প্রবাহ ঐ পথে শাখরোলে আসিয়া সরস্বতীর সহিত মিশিল এবং সেস্থান হইতে সরস্বতীর মোহানা পৰ্য্যন্ত সমস্ত প্রবাহ গঙ্গার অঙ্গীভূত হইয়া গেল। এজন্য এ সময় হইতে যেস্থানে গঙ্গার সাগরসঙ্গম হইল, তাহা প্রকৃতপক্ষে সরস্বতীর মোহানা, প্রাচীন গঙ্গাসঙ্গম হইতে উহা সম্পূর্ণ পৃথক্। হুগলীতে ইংরাজদিগের একটি কুঠি ছিল। পূর্ব্বে সরস্বতী-পথে হুগলীতে তাঁহাদের জাহাজাদি যাতায়াত করিত এবং সমুদ্রপ্রবাহ শাখরোল হইতে গঙ্গার পথে প্রবর্তিত হওয়ায় তথা হইতে ত্রিবেণী পর্যন্ত সরস্বতী মজিয়া গেল। সে প্রাচীন খাত এখনও রহিয়াছে। হুগলী পর্য্যন্ত বাণিজ্যপথ গঙ্গার পথে কলিকাতার নিম্ন দিয়া উন্মুক্ত হইল, এজন্য ইংরাজগণ এ অংশের নাম রাখিলেন—হুগলী নদী। অপরদিকে কালীঘাটের নিম্নবর্ত্তী প্রাচীন খাত বা ‘আদিগঙ্গা’ টলী (Tolley) সাহেবের খনিত টালীর নালায় পরিণত হইয়া মজিয়া গেল। এবং দক্ষিণমুখে প্রবাহিত হইয়া ‘ঘোষের গঙ্গা’ ‘বোসের গঙ্গা’ নামে বদ্ধ জলাশয়স্বরূপ ম্যালেরিয়ার বাসভূমি হইয়া রহিয়াছে। গঙ্গার এই আধুনিক অবস্থার সহিত যশোহর-খুলনার ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ না থাকিলেও ইহার প্রাচীন প্রকৃতির সহিত সমস্ত বঙ্গদেশের বিশেষ সম্বন্ধ রহিয়াছে, যশোহর-খুলনারত কথাই নাই।

আমরা দেখিয়াছি যে পদ্মা ও গঙ্গার সঙ্গমস্থলের দক্ষিণে মহাভারতীয় যুগে বহুদ্বীপের উন্মেষ হইয়াছে, তাহাদের মধ্যে অসংখ্য নদী ছিল; পাণ্ডবেরা সে সকল নদীতে স্নানাদি করিয়া সমুদ্রতীর দিয়া কলিঙ্গাভিমুখে চলিয়া যান। ক্রমে ভাগীরথীর পূর্ব্বতীরে ও পদ্মার দক্ষিণতীরে চর হইতে দ্বীপ সৃষ্টি হইতে থাকে। ভাগীরথীর পশ্চিমতীরে মুর্শিদাবাদের রাঙ্গামাটী প্রভৃতি অঞ্চলের মৃত্তিকা পরীক্ষা করিলে সহজে বুঝা যায় যে, কিরূপে পূর্ব্বপারে দ্বীপ সৃজন জন্য নূতন মৃত্তিকা গঠিত হইতেছিল। হিমালয়ের গাত্রধৌত জলরাশি বহুল পর্ব্বতরেণু বহন করিয়া গঙ্গাখাতে সাগরসন্ধানে ছুটে এবং মৃত্তিকা ও বালির সংযোগে একপ্রকার পলিমাটী দেশে দেশে রাখিয়া যায়। গঙ্গার মত ভূমিগঠনের ক্ষমতা পৃথিবীর মধ্যে কোন নদীরই নাই। পূৰ্ব্বে বলা হইয়াছে যে অকস্মাৎ এক সময়ে ভূমিকম্প দ্বারা এক বিস্তৃত ভূমিভাগ স্থানে স্থানে জল হইতে মস্তক উত্তোলন করে, গঙ্গার গৈরিক মৃত্তিকা উহার উপর সঞ্চিত হইতে হইতে দ্বীপের সৃষ্টি হইতে থাকে। যশোহর-খুলনার অনেকস্থানে পুষ্করিণী বা কূপ খননকালে এই পলিমাটীর স্তর ৪/৫ ফুট হইতে ৯/১০ ফুট পৰ্য্যন্ত বিস্তৃত দেখিতে পাওয়া যায়। নিম্নবর্ত্তী আঁটাল বা জোবমাটীর সহিত এই পলির কোন সম্বন্ধ নাই। এইরূপে যখন দ্বীপ উন্নত হইতে লাগিল, তখন উত্তরদিকে ভূমি ক্রমশঃ বনাকীর্ণ ও অবশেষে জনাকীর্ণ হইতে লাগিল। দ্বীপ নিৰ্ম্মাণকাৰ্য্য তখন ক্রমশঃ দক্ষিণে সরিয়া যাইতে লাগিল

এইরূপে ভাগীরথী ও পদ্মার মধ্যে এক ত্রিকোণাকার ভূমিখণ্ড সমুদ্রসীমা পৰ্য্যন্ত বিস্তৃত হইয়া পড়িল। বকচঞ্চুবৎ আকৃতির জন্যই সম্ভবতঃ ইহার নাম হইয়াছিল বকদ্বীপ।[১৬] ইহাকেই আমরা ইংরাজীর অনুকরণে ব’দ্বীপ করিয়া লইয়াছি। বকদ্বীপই বৌদ্ধ আমলে ভাষার অপকর্ষবশতঃ বদি নামে পরিণত হয়। উহা হইতে সেনরাজগণের রাজত্বকালে একটি উপবিভাগের নাম হইয়াছিল বাগড়ী।[১৭] ব’দ্বীপ বা বদির জঙ্গলাকীর্ণ ভূভাগে যে আৰ্যপূৰ্ব্ব জাতি বাস করিত, তাহারা এখনও বাগ্দী বলিয়া পরিচিত আছে। বাঙ্গালীর সহিত এক স্থানে বহুবৎসর যাবৎ বাস করিয়াও তাহাদের বন্যপ্রকৃতি ও স্বরভঙ্গি এখনও আছে।

এই ব’দ্বীপ আজ যেমন বিস্তৃত, পূর্ব্বে এরূপ ছিল না। কিন্তু ইহার আকৃতি যাহাই থাকুক, ইহার সমুদ্রকূলবর্তী অংশ যে বহু কালাবধি কাননাবৃত ছিল, ভূতত্ত্ববিৎ পণ্ডিতগণ তাহা সপ্রমাণ করিয়াছেন। পাণিনির মহাভাষ্যে পতঞ্জলি প্রাচীন আর্য্যাবর্ত্তের সীমা নির্দ্দেশ করিতে গিয়া, উহার পূর্ব্বভাগে কালকবনের উল্লেখ করিয়াছেন।[১৮] এই কালবনই বোধ হয় সুন্দরবন।[১৯] কেহ কেহ অনুমান করিয়াছেন যে, মগধের অন্তর্গত প্রাচীন রাজগৃহের ধ্বংসাবশেষের পূর্ব্বদিকস্থ গিরিদ্বয়মধ্যবর্তী যে বন এখনও কাল্‌ল্কা জঙ্গল বলিয়া খ্যাত আছে, সম্ভবতঃ ইহা তাহাই।[২০] কিন্তু প্রাচীন আর্য্যাবর্তের যে সকল সীমা নির্দ্দিষ্ট হইয়াছে, তাহাতে মগধের বহুপূর্ব্বদিকে তাহার পূৰ্ব্বসীমা বলিয়া বোধ হয়। মগধের মৃত্তিকার অবস্থা পরীক্ষা করিলে, তাহা আধুনিক কোন সময়ে সমুদ্রগর্ভ হইতে উত্থিত হইয়াছে, এমন প্রতীয়মান হয় না। দিগ্বিজয়প্রকাশে বঙ্গদেশস্থ সরস্বতী ও কালিন্দী নদীর মধ্যবর্ত্তী ভূভাগকে কিলকিলা বলা হইয়াছে।[২১] এখনও খুলনা জেলার কালিন্দীতটে কলকলি নামে স্থান আছে। কলিকাতার নামের সহিত ইহার কোন সম্বন্ধ আছে কি না বলা যায় না। জনৈক জৈন সূরির নাম কালক। কাহারও কাহারও মতে ইনিই পর্য্যষণ পৰ্ব্ব প্রবর্তিত করেন। জৈন কালকের সহিত কালকবনের কি সম্বন্ধ, তাহাও একটি নির্ণয় করিবার বিষয়। যাহা হউক, পূর্ব্বে দেখান হইয়াছে যে গঙ্গার মোহানায় সমুদ্রকূলে চিরদিনই বন ছিল; এই বনের নাম কালকবন বা অন্য যাহা কিছু হইতে পারে। গঙ্গার মোহানা সম্বন্ধে যে কথা, শতমুখী গঙ্গার শাখা প্রশাখার সমুদ্রসঙ্গম সম্বন্ধেও সেই কথা। বঙ্গদেশে প্রায় সমস্ত দক্ষিণভাগ এই মোহানায় পরিপূর্ণ এবং তজ্জন্য সমস্ত দক্ষিণভাগ নিবিড় জঙ্গলাকীর্ণ। এই মোহানাগুলি যত সরিয়াছে, বনও তত সরিয়াছে। বনের উত্তরভাগে লোকের বসতি ক্রমে দক্ষিণদিকে বিস্তৃত হইয়া পড়িয়াছে। গঙ্গা ও পদ্মার সঙ্গম স্থান হইতে উহাদের সমুদ্রসঙ্গম পর্য্যন্ত বিস্তৃত দ্বীপই বকদ্বীপ বা ব’দ্বীপ বলিয়া খ্যাত ছিল।

এই ব’দ্বীপ সমগ্র বঙ্গের অংশ এবং ইহা বহু প্রাচীন গ্রন্থে ‘উপবঙ্গ’ বলিয়া খ্যাত। ইহা ভাগীরথীর পূর্ব্বপার হইতে আরম্ভ করিয়া দক্ষিণে সমুদ্র পর্য্যন্ত বিস্তৃত ছিল। দিগ্বিজয়প্রকাশ নামক প্রাচীন গ্রন্থে[২২] ইহার এইরূপ সীমা নির্দ্দিষ্ট হইয়াছে :

‘ভাগীরথ্যাঃ পূর্ব্বভাগে দ্বিযোজনতঃ পরে।
পঞ্চযোজনপরিমিতো হু্যপবঙ্গো হি ভূমিপ।।
উপবঙ্গে যশোরাদিদেশাঃ কানন-সংযুতাঃ।
জ্ঞাতব্যা নৃপশাৰ্দ্দূল বহুলাসু নদীষূ চ।।’

এই বহু নদনদী-সমন্বিত কাননসংযুক্ত বিস্তীর্ণ প্রাচীন উপবঙ্গ-প্রদেশ বঙ্গদেশেরই একাংশ ছিল। ইহাই বৌদ্ধযুগে সমতট ও সেন-রাজত্বকালে বাগড়ী আখ্যা পাইয়াছিল। আমাদের আলোচ্য কানন-কুন্তলা যশোহর-খুলনা এই উপবঙ্গের এক প্রধান অংশ। যশোহর ও খুলনার উৎপত্তি জানিতে হইলে, উপবঙ্গের উৎপত্তির ইতিবৃত্ত সঙ্কলন করিতে হইবে।

উপবঙ্গ একটি প্রকাণ্ড দ্বীপ। ইহা এক্ষণে একটি দ্বীপ হইলেও পূর্ব্বতন অসংখ্য দ্বীপের সমষ্টি। সব দ্বীপগুলিই গঙ্গার পলি হইতে উৎপন্ন। তাহাই বুঝাইবার জন্যই পূর্ব্বে গঙ্গার গতিপথের বিবরণ দিয়াছি। হিমালয়ের উপরে ও পাদদেশে গঙ্গার বেগ অত্যন্ত অধিক। যত সমতল ক্ষেত্রে আসিতে থাকে, গঙ্গার বেগ তত কমিতে থাকে; তৎপরে বামে দক্ষিণে বহু শাখা বিস্তার করিয়া অগ্রসর হইতে হইতে বেগ আরও মন্দীভূত হইতেছিল। এইরূপে জল কতকটা স্থির হইলে উহাতে যে বহুল পৰ্ব্বত-রেণু মিশ্রিত থাকে, তাহা নিম্নে পতিত হইয়া ভূমি গঠন করে এবং ক্রমে দ্বীপের উদ্ভব হয়। বর্ষার সময়ে গঙ্গার জলে এই গৈরিক-রেণু এত অধিক থাকে যে, জল রক্তাভ হইয়া যায়। উহার তৎকালীন বর্ণকেই গৈরিক রঙ বলে। গঙ্গার গাত্র-রঙ ভারতবাসীর বড় প্রিয় বস্তু। গঙ্গার কূলে বা সন্নিকটে যাঁহারা বাস করেন, প্রত্যহ গঙ্গাস্নান করিতে করিতে তাঁহাদের বস্ত্র গৈরিক বর্ণ ধারণ করে। গঙ্গাকূলে বাস এবং গঙ্গাস্নান এদেশে এত গৌরবের যে, সাধু- সন্ন্যাসিগণ গঙ্গা হইতে দূরে থাকিলেও তাঁহাদের সমস্ত ব্যবহার্য্য বস্ত্রাদি গিরিমাটী দ্বারা গৈরিক বর্ণ করিয়া লন। এই গৈরিকের সহিত বালুকা মিশ্রিত হইয়া, এদেশের উর্দ্ধতন মাটীর বর্ণ প্রকাশ করিয়াছে।

নিম্ন বঙ্গে থাকিয়া গঙ্গাজলের গৈরিকে দ্বীপ সৃষ্টি করিয়াছিল এবং গঙ্গা এইরূপে দ্বীপের পর দ্বীপ সৃজন করিতে করিতে সমুদ্রাভিমুখী হইয়াছিলেন। নবনির্ম্মিত দ্বীপসকলের যেমন নামকরণ হইতে লাগিল, উহাদের নামের সহিত অনেক স্থানে দ্বীপ বা দ্বীপবোধক শব্দ যুক্ত হইয়া থাকিতে লাগিল। ঘটককারিকা এবং বৈষ্ণব গ্রন্থাবলীতে এই সকল দ্বীপের বিবরণ ও সীমা দেওয়া হইয়াছে। সেনরাজগণের সময়ে যখন নবদ্বীপে অন্যতম রাজধানী ছিল, তখন সেই নবদ্বীপ রাজ্য গঙ্গা-গর্ভোত্থিত বহুসংখ্যক দ্বীপমালায় বিভক্ত ছিল;[২৩] ইহার মধ্যে ১২টি দ্বীপ প্রধান। ঐ বারটির মধ্যে নবদ্বীপ একটি এবং সেই নবদ্বীপ পুনরায় নয়টি দ্বীপের সমষ্টি।[২৪] প্রধান বারটির অন্যান্য দ্বীপের মধ্যেও দুই একটি করিয়া খণ্ড দ্বীপ আছে। সুতরাং দ্বীপের সংখ্যা অনেক। চর হইতে যখন ভূমি উচ্চ হইয়া কৃষি ও মনুষ্যাবাসের উপযুক্ত হয়, তখনই উহার নামকরণ হয়। হয়ত কোন দ্বীপের এইরূপ নামকরণ হওয়ার পূর্ব্বেই উহা অন্য দ্বীপের সহিত মিলিয়া নিজের অস্তিত্ব হারাইয়া ফেলে। এভাবেও অনেক দ্বীপের নাম আমরা জানিতে পারি নাই। এই জানিত ও অজানিত বহুসংখ্যক দ্বীপের সমষ্টি লইয়া গাঙ্গেয় উপদ্বীপ গঠিত হইয়াছে। উহার সমস্ত স্থানের ভৌম প্রকৃতি হইতেও ঐ একই কথা প্ৰতিপন্ন হয়।

পূৰ্ব্বেই বলা হইয়াছে প্রাচীন নবদ্বীপ রাজ্য প্রধানতঃ দ্বাদশটি দ্বীপে বিভক্ত। আমরা প্রথমতঃ ভাগীরথীর প্রবাহপথে উহাদের মধ্যে কতকগুলির অবস্থান নির্ণয় করিব। ভাগীরথী-পথে মুর্শিদাবাদ অঞ্চলে কতক দূর আসিলে সর্ব্বাগ্রেই (১) অগ্রদ্বীপ। উহারই মধ্যাংশের নাম কণ্টক দ্বীপ বা কাঁটোয়া।[২৫] তৎপরেই (২) নবদ্বীপ আরম্ভ। ইহা আবার ৯টি খণ্ড দ্বীপের সমষ্টি। অগ্রদ্বীপ ছাড়িয়া আসিলেই বৰ্ত্তমান ভাগীরথীর উভয় পারে মাজদিয়া অঞ্চল লইয়া (ক) মধ্যদ্বীপ; একটু দক্ষিণে আসিয়া ভাগীরথীর পূর্ব্বপারে (খ) সীমান্ত দ্বীপ-কাসিয়া ডাঙ্গা, বিল্ব পুষ্করিণী (বেলপুকুরিয়া) ও সরভাঙ্গা প্রভৃতি স্থান ইহার অন্তর্গত। এই স্থানে ধর্ম্ম নামে নৃপতি ছিলেন, তাঁহার নামানুসারে ধর্ম্মদ্বীপ বা ধৰ্ম্ম দহ[২৬] হইয়াছে। সীমান্ত দ্বীপ ছাড়িয়াই ভাগীরথীর পশ্চিম পারে (গ) রুদ্রদ্বীপ। পূৰ্ব্বস্থলী, শঙ্করপুর, রাদুপুর বা রুদ্রডাঙ্গা ইহার অন্তর্গত। পূৰ্ব্বস্থলী বিখ্যাত স্থান। সম্ভবতঃ এইস্থানে স্থলভাগ প্রথম জাগিয়া ছিল, এজন্য ইহার নাম পূৰ্ব্বস্থলী। রুদ্রদ্বীপ ছাড়িয়া একটু দক্ষিণে আসিলেই পূর্ব্ব পারে ভাগীরথীর চক্রাকার প্রবাহের অন্তর্ভাগে (ঘ) অন্তদ্বীপ এবং পশ্চিমপারে (ঙ) মোদদ্রুম দ্বীপ। মায়াপুর বা মিঞাপুর এবং ভারুইডাঙ্গা প্রভৃতি স্থান ইহার অন্তর্গত। কেহ কেহ বলেন মায়াপুরে চৈতন্যদেবের জন্ম হইয়াছিল। অন্তদ্বীপেই প্রাচীন নবদ্বীপ রাজধানী ছিল। এখন সেনরাজগণের বিস্তীর্ণ রাজধানীর ভগ্নস্তূপ ও বল্লাল-দীঘি পূর্ব্ব পরিচয় প্রদান করিতেছে। পশ্চিম পারে একডালা, মহৎপুর প্রভৃতি স্থান মোদদ্রুম দ্বীপের স্থান নির্দেশ করিতেছে। উহারই দক্ষিণে (চ) জহ্নুদ্বীপ বা জাননগর প্রভৃতি স্থান। ইহা বৰ্ত্তমান নদীয়া সহরের উত্তরপশ্চিম কোণে অবস্থিত। জহ্নুদ্বীপের দক্ষিণাংশে (ছ) ঋতুদ্বীপ; রাউতপুর, বিদ্যানগর প্রভৃতি স্থান।[২৭] ভাগীরথীর অপর পারে গাদিগাছা, সুবর্ণবিহার প্রভৃতি স্থান লইয়া (জ) গোদ্রুমদ্বীপ এবং ঋতুদ্বীপের দক্ষিণাংশে সমুদ্রগড় প্রভৃতি স্থান লইয়া প্রাচীন (ঝ) কোলদ্বীপ। এই নয়টি দ্বীপ লইয়া নবদ্বীপ T

নবদ্বীপ ছাড়িয়া ভাগীরথী-পথে দক্ষিণে আসিলেই (৩) মধ্যদ্বীপ[২৮] উলা বা বীরনগর শান্তিপুর প্রভৃতি বিখ্যাত স্থান ইহার মধ্যবর্ত্তী। মধ্যদ্বীপের পরেই (৪) চক্রদ্বীপ বা চাকদহ। ইহার উত্তর ভাগে দেবগ্রাম, মধ্যস্থানে শ্রীনগর ও দক্ষিণে কুমারহট্ট নামক প্রসিদ্ধ স্থান। চক্রদ্বীপ প্রধানতঃ যমুনা পৰ্য্যন্ত বিস্তৃত। যমুনা হইতে দক্ষিণদিকে কালীঘাট পৰ্য্যন্ত (৫) এডুদ্বীপ বা এঁড়েদহ। খড়দহ বা তৃণদ্বীপ এবং শিয়ালদহ (শিবাদ্বীপ) এই এঁডুদ্বীপের অন্তর্ভুক্ত।[২৯] কালীঘাট হইতে আরম্ভ করিয়া গঙ্গার সমুদ্রসঙ্গম পৰ্য্যন্ত সমস্ত দক্ষিণ ভাগকে (৬) প্রবালদ্বীপ বলে। জয়নগর, পলাবাটী ইহার মধ্যবর্ত্তী। ইহা হইতে দেখা যাইতেছে যে, প্রাচীন নবদ্বীপ রাজ্যের অন্তর্গত ছয়টি দ্বীপ গঙ্গার প্রধান প্রবাহ ভাগীরথী দ্বারা উৎপন্ন হইয়াছে। অপর ছয়টি দ্বীপ ইহাদেরই পূর্ব্বভাগে অবস্থিত।

চক্রদ্বীপের পূর্ব্বভাগে (৭) কুশদ্বীপ বা কুশদহ। ‘সোহপি দ্বীপো মহাদীর্ঘ ইচ্ছাপুরসমন্বিতঃ।’ ইহা একটি প্রধান দ্বীপ এবং এখানে প্রবল সমাজ ছিল।[৩০] গোবরডাঙ্গা, ইচ্ছাপুর, খাঁটুরা, জলেশ্বর প্রভৃতি প্রসিদ্ধ স্থান ইহার অন্তর্গত। চব্বিশ-পরগণার বসিরহাট, খুলনার সাতক্ষীরা ও যশোহরের বনগ্রামের অংশ লইয়া এই দ্বীপ গঠিত হইয়াছিল। কুশদ্বীপের উত্তর ভাগে এবং মধ্যদ্বীপের পূৰ্ব্বদিকে (৮) অন্ধ্রদ্বীপ অবস্থিত। চৌগাছা, যাদবপুর, বোধখানা, কাগজপুকুরিয়া, সারশা, গদখালি, লাউজানি, কেশবপুর প্রভৃতি স্থান এই অন্ধ্র বা আঁধার দ্বীপের অন্তর্গত। এখনও চৌ- গাছার উত্তর পশ্চিম কোণে আঁধার-কোঠা পূর্ব্ব নামের স্মৃতি জাগাইয়া রাখিয়াছে। যশোহর জেলার বর্তমান সারশা ও কেশবপুর থানা লইয়া এই দ্বীপ গঠিত ছিল।

(৯) বৃদ্ধদ্বীপ বা বুঢ়ন। ইহা অন্ধ্রদ্বীপের দক্ষিণ ও কুশদ্বীপের পূর্ব্বভাগে অবস্থিত। ইচ্ছামতী নদীর পূর্ব্বকূল হইতে আরম্ভ করিয়া সোজা কেশবপুরের দক্ষিণভাগ দিয়া পূর্ব্বোত্তর মুখে বর্তমান খুলনা দিয়া বলেশ্বর নদী পৰ্য্যন্ত বিস্তৃত।[৩১] সাতক্ষীরা ও খুলনার সদর উপবিভাগের অধিকাংশ এই বৃদ্ধদ্বীপের অন্তর্গত। এখনও সাতক্ষীরা সহরের উত্তর-পশ্চিমাংশে যমুনা ইচ্ছামতী হইতে কপোতাক্ষী পর্য্যন্ত বিস্তৃত প্রকাণ্ড বুঢ়ন পরগণা পূর্ব্বতন দ্বীপের স্থান নির্দ্দেশ করিতেছে। মোটামুটি বলিতে গেলে, প্রাচীন যশোর রাজ্যের পূর্ব্বাংশে বুঢ়ন দ্বীপ, পশ্চিমাংশে প্রবালদ্বীপ এবং উত্তরাংশে কুশদ্বীপ ছিল। বৰ্ত্তমান সময়ে বুঢ়ন, ভালুকা, দাঁতিয়া, খলিসাখালি, সাহস, খালিসপুর ও বেলফুলিয়া এই কয়েকটি প্রধান পরগণা বৃদ্ধদ্বীপের অধিকৃত। সাতক্ষীরা, কুমিরা, তালা, শোভনা ও সেনহাটি বৃদ্ধদ্বীপের পুরাতন নগর।

(১০) সূর্য্যদ্বীপ। অন্ধ্রদ্বীপের পশ্চিমোত্তর হইতে আরম্ভ করিয়া বৃদ্ধদ্বীপের উত্তর ভাগে মধুমতী বা বলেশ্বর পর্যন্ত বিস্তৃত প্রকাণ্ড দ্বীপের নাম সূর্য্যদ্বীপ। ইহার প্রাচীন নাম যোগীন্দ্রদ্বীপ ছিল, পরে মহারাজ বল্লাল সেন একটি অদ্ভুত কার্য্যের পুরস্কারস্বরূপ সূর্য্যনারায়ণ নামক একজন কৈবর্ত্ত[৩২] ধীবরকে যোগীন্দ্রদ্বীপের যে অংশ দান করিয়াছিলেন তাহাই সূৰ্য্যদ্বীপ হয়।[৩৩] এখন কিন্তু বিপরীত হইয়াছে। সমস্ত দ্বীপটিকে সূর্য্যদ্বীপ বলা হয় এবং উহা তিন অংশে বিভক্ত।[৩৪] ইচ্ছামতী হইতে কপোতাক্ষ পর্য্যন্ত ভৈরব নদের উভয়কূলে মহেশপুর প্রভৃতি স্থান লইয়া যোগীন্দ্রদ্বীপ, কপোতাক্ষ হইতে চিত্রা পৰ্য্যন্ত লাটদ্বীপ এবং চিত্রা হইতে মধুমতী পর্য্যন্ত পূর্ব্বাংশ কঙ্কদ্বীপ। বনগ্রামের উত্তরাংশ লইয়া যোগীন্দ্রদ্বীপ, মহেশপুর ইহার প্রধান নগর, তথায় কৈবর্ত্তজাতীয় সূর্য্যরাজার রাজধানী ছিল।[৩৫] যশোহর সদর উপবিভাগের অধিকাংশ লইয়া লাটদ্বীপ। বারবাজার, মুড়লী, খাজুরা প্রভৃতি প্রাচীন স্থান লাটদ্বীপের অন্তর্গত। পূর্ব্বে এ অংশে লাটুদিয়া পরগণা ছিল। চিত্রা হইতে বলেশ্বর পর্যন্ত বিস্তৃত অংশকে কঙ্কদ্বীপ বলিত। ইহারই দক্ষিণ সীমায় বৃদ্ধদ্বীপ। কঙ্কদ্বীপের দুইটি অংশ; চিত্রা হইতে উত্তর দিকে নবগঙ্গা পর্য্যন্ত এক অংশ; প্রাচীন কাঁকদি পরণা তাহার মধ্যবর্তী; লক্ষ্মীপাশা প্রভৃতি প্রাচীন স্থান ঐ অংশের অন্তর্গত। চিত্রা হইতে একদিকে ভৈরবের অপর পার এবং অন্যদিকে মধুমতী পৰ্য্যন্ত অন্য ভাগ; ইহারই মধ্যে চেঙ্গুটিয়া পরগণা। চেঙ্গুটিয়া, জগন্নাথপুর (সেখহাটি), নড়াইল, কালিয়া প্রভৃতি এই অংশের মধ্যে অবস্থিত।

(১১) জয়দ্বীপ—নবদ্বীপের পূর্ব্বভাগে, সূর্য্যদ্বীপের উত্তরাংশে, পূর্ব্বদিকে মধুমতী পৰ্য্যন্ত বিস্তৃত, উত্তরে গড়ই দ্বারা সীমাবদ্ধ, নবগঙ্গার পূর্ব্বকূলবর্তী বিস্তীর্ণ প্রদেশ জয়দ্বীপ। জয়পুর, জয়নগর, জয়রামপুর প্রভৃতি স্থান ইহার পূর্ব্ব পরিচয় দিতেছে; মহম্মদপুর, বিনোদপুর, নহাটা প্রভৃতি বিখ্যাত স্থানসমূহ এই দ্বীপের মধ্যবর্তী। পদ্মা হইতে গঙ্গা-সলিল লইয়া যশোহরে যে নবগঙ্গা প্রবাহিত হইয়াছিল, গঙ্গার মত তাহারও দ্বীপ গঠনের যথেষ্ট ক্ষমতার পরিচয় আছে। কুমার নদ হইতে বহির্গত হওয়ার পর কিছুদূর দক্ষিণে আসিয়াই আলুপদিয়া, সিরিজদিয়া (শিরীষদ্বীপ), ঝাকড়দিয়া, নলদী (নলদ্বীপ), সকলগুলিই এই জয়দ্বীপের অন্তর্গত।

(১২) চন্দ্রদ্বীপ—খুলনা জেলার পূর্ব্বাংশ এবং বরিশাল জেলার দক্ষিণাংশ লইয়া গঠিত প্রসিদ্ধ বাকলা রাজ্য।[৩৬]

এ পর্যন্ত আমরা যে দ্বাদশটি দ্বীপের নামোল্লেখ করিলাম, তন্মধ্যে অগ্রদ্বীপ ও নবদ্বীপ ভাগীরথীর উভয় পারবর্ত্তী এবং তদ্ব্যতীত সবগুলিই ভাগীরথীর পূর্ব্বভাগে সংস্থিত। নবদ্বীপ হইতে দক্ষিণে আসিয়াও ভাগীরথী পশ্চিমপারে দ্বীপগঠন করিয়াছেন, তবে সংখ্যায় অল্প এবং সবগুলি সংকীর্ণ। কারণ সে দিকে সুহ্ম রাজ্য বা দক্ষিণ রাঢ় অতি প্রাচীন কাল হইতে ছিল। তজ্জন্য সুহ্ম রাজ্যের দক্ষিণ ভাগে দামোদর ও গঙ্গার মধ্যস্থলে কয়েকটি দ্বীপের উদ্ভেদ হয়। যেখানে এক্ষণে তারকেশ্বরের মন্দির অবস্থিত, উহার পূর্ব্বনাম ছিল সিংহলদ্বীপ; ইহারই সন্নিকটে সিঙ্গুর বা সিংহপুর। প্রবাদ এই, সেখানে পূর্ব্বে সিংহবাহু রাজা বাস করিতেন। তৎপুত্র বিজয়সিংহ সমুদ্রপথে লঙ্কা বা তাম্রপর্ণী দ্বীপে গিয়া তাহা জয় করিয়া সিংহল নাম রাখেন, এখনও সেই নাম চলিতেছে। সিঙ্গুরে সিংহের ভেড়ী, রতনপুর (রত্নমালার ঘাট), দক্ষিণ মশাট (মশান) প্রভৃতি গ্রামগুলি পূৰ্ব্বস্মৃতি জাগাইয়া দেয়। সিংহদিগের রাজত্বস্থান যে পূর্ব্বে একটি দ্বীপ ছিল এবং প্রথমে তাঁহারা তথায় রাজ্য প্রতিষ্ঠার সময় উহার সিংহলদ্বীপ নাম রাখেন, তাহা প্রচলিত গান ও কবিতা হইতে জানা যায়।[৩৭] পরে বিজয়সিংহ যখন লঙ্কাদ্বীপে বিজয়পতাকা উড্ডীন করেন, তখন নিজের বাসভূমির আদর্শে তাহারও নাম সিংহলদ্বীপ রাখেন, ইহাই সঙ্গত বলিয়া মনে হয়।

এইরূপে গঙ্গার এপারে ওপারে এবং উহার বহুশাখার দুইপারে ধারে ধারে প্রাচীনকালে অসংখ্য দ্বীপের সৃষ্টি হইয়াছিল। সমগ্র বঙ্গদেশ এই অসংখ্য দ্বীপের সমষ্টিমাত্র। মিসর বা প্রাচীন মিশ্রদেশের অধিকাংশ যেমন নীল নদী হইতে উৎপন্ন হইয়াছিল বলিয়া তাহাকে নীল নদীর প্রদত্ত ফল (the gift of the Nile) বলিয়া উল্লিখিত হয়, বঙ্গভূমিও সেইরূপ গঙ্গার প্রদত্ত ফল (the gift of the Ganges) বলিয়া কথিত হইতে পারে। আমাদের আলোচ্য যশোহর ও খুলনা জেলা এই প্রাচীন বঙ্গের অংশমাত্র। উহাও অসংখ্য দ্বীপের সমষ্টি।

আমরা পূর্ব্বে যে দ্বাদশটি দ্বীপের উল্লেখ করিয়াছি, তন্মধ্যে কুশদ্বীপের অধিকাংশ, বৃদ্ধদ্বীপ, অন্ধ্রদ্বীপ, সূর্য্যদ্বীপ ও জয়দ্বীপের সম্পূর্ণাংশ এবং চন্দ্রদ্বীপের কতকাংশ লইয়া যশোহর-খুলনা গঠিত। তবে এই দুই জেলার সীমা ইহা অপেক্ষাও বিস্তৃত। সূর্য্যদ্বীপের উত্তরে, নবদ্বীপ ও জয়দ্বীপের মধ্যস্থলে যশোহর জেলার ঝিনাইদহ অঞ্চল কোন্ দ্বীপের অন্তর্বর্ত্তী ছিল, তাহাও স্পষ্ট জানা যায় না। ঝিনাইদহ নামেও একটি দ্বীপের কথা বুঝাইয়া দেয়; শুধু ঝিনাইদহ নহে, এ অঞ্চলে ফেনদহ, অঙ্গারদহ,৩৮ অজয়দহ, কল্যাণদহ, সাগরদহ, মধুদহ, রূপদহ প্রভৃতি দহসংযুক্ত বহুস্থান প্রাচীন দ্বীপ- সংস্থানের পরিচয় দিতেছে। ইহা ব্যতীত বৃদ্ধদ্বীপ বা বুঢ়নের দক্ষিণে অপেক্ষাকৃত আধুনিক সময়ে বহুদ্বীপের সৃষ্টি হইয়া সুন্দরবন অঞ্চলকে অনেকদূর দক্ষিণে বিস্তৃত করিয়া দিয়াছে। পূর্ব্বে সে সব অঞ্চলে লোকের বসতি ছিল না, এখনও তাহার অনেকস্থান বাসোপযোগী হয় নাই। এজন্য প্রাচীন কারিকাদি গ্রন্থে সে সকল স্থানের কোনও বিশেষ বিবরণ পাওয়া যায় না।

বৃদ্ধদ্বীপ দক্ষিণ-পশ্চিম কোণ হইতে পূর্ব্বোত্তর দিকে কোণাকোণিভাবে অবস্থিত। উহার পূর্ব্বপ্রান্তস্থিত বলেশ্বর বা বড় গঙ্গার অপর পারেই চন্দ্রদ্বীপ। পূর্ব্বে চন্দ্রদ্বীপ রাজ্য বলেশ্বরের উভয় পারে বিস্তৃত ছিল, অর্থাৎ বর্তমান খুলনা জেলার বাগেরহাট উপবিভাগের অধিকাংশ চন্দ্রদ্বীপের অধিকৃত ছিল। চন্দ্রদ্বীপ অতি প্রাচীন রাজ্য। বর্ত্তমান বালা রাজবংশের পূর্ব্বপুরুষ খৃষ্টীয় পঞ্চদশ শতাব্দীর প্রারম্ভে এখানে রাজ্যসংস্থাপন করেন বটে, কিন্তু তাহার পূর্ব্বেও চন্দ্রদ্বীপের অস্তিত্বের পরিচয় পাওয়া যায়। ধ্রুবানন্দ মিশ্রের প্রাচীন কারিকা হইতে জানা যায় যে, আদিশূর চন্দ্রদ্বীপ জয় করিয়াছিলেন।[৩৯] চন্দ্রদ্বীপ পূর্ব্বে জলমগ্ন ছিল, পরে মহাদেবের ললাটাগ্নিতে জল শুষ্ক হইলে দ্বীপের উদ্ভেদ হয়।[৪০] এই ললাটাগ্নির অর্থ ভূমিকম্প বলিয়া বোধ হয়।[৪১] বাক্লার অধিপতি মহারাজ দনুজমৰ্দ্দন দেব এইস্থানে রাজ্য সংস্থাপনের পূর্ব্বে চন্দ্রদ্বীপ অনেক বার উঠিয়াছে, পড়িয়াছে।[৪২] কেহ কেহ অনুমান করিয়াছেন যে, এবম্বিধ চন্দ্রকলাবৎ হ্রাসবৃদ্ধিই চন্দ্রদ্বীপ নামের উৎপত্তির কারণ।[৪৩] চন্দ্রদ্বীপের পশ্চিম ও বৃদ্ধদ্বীপের দক্ষিণে মধুদ্বীপ বা মধুদিয়া। ইহাও ক্রমে দক্ষিণদিকে বৃদ্ধি পাইতেছিল। এই জন্য ইহার নবোত্থিত দক্ষিণাংশকে পার-মধুদিয়া বলে। মধুদ্বীপের পশ্চিম গাত্রে রঙ্গদ্বীপ বা রাঙ্গদিয়া। ইহাও ভৈরব হইতে উত্থিত একটি বিখ্যাত দ্বীপ। খুলনা জেলার বাগেরহাট সবডিভিসনে এখনও মধুদিয়া ও রাঙ্গদিয়া বিস্তৃত পরগণা বিদ্যমান রহিয়াছে। রাঙ্গদিয়ার পশ্চিম পার্শ্বে বৃদ্ধদ্বীপের দক্ষিণে বাহিরদিয়া বা বহিদ্বীপ একটি অতি প্রকাণ্ড গণ্ডগ্রাম। বাগেরহাটের কাছে কালদিয়া, জয়দিয়া প্রভৃতিও পূর্ব্বাবস্থার ইঙ্গিত করে। এইরূপে মধুমতীর কূলে কোড়কদি ও মাণিকদহ, কপোতাক্ষকূলে আগর দাঁড়ী (অগ্রদণ্ডী), সাগর দাঁড়ী (সাগর দণ্ডী), ধানদিয়া (ধনদ্বীপ) এবং সুন্দরবনের মধ্যে গিয়া অসংখ্য মাদিয়া বা মধ্যবর্ত্তী দ্বীপ, সমস্ত উপদ্বীপ যে অসংখ্য দ্বীপের সমষ্টি তাহারই সমর্থন করে। এই বিস্তৃত আলোচনা হইতে বুঝা যাইতে পারে যে, সমগ্র উপবঙ্গের মত যশোহর ও খুলনা প্রথমতঃ কতকগুলি দ্বীপের সমষ্টিমাত্র ছিল।

পাদটীকা

১. ১৯২১ খৃঃ অব্দের আদম সুমারী অনুযায়ী।— শি মি

২. ঐতরেয় আরণ্যক, ২/১/১ [পৃ ১৫৭, পাদটীকা দ্রষ্টব্য—শি মি]

৩. দীর্ঘতমা সুদেষ্ণাদেবীকে বলিতেছেন :

‘অঙ্গো বঙ্গঃ কলিঙ্গশ্চ পুণ্ড্রঃ সুহ্মশ্চ তে সুতাঃ।
তেষাং দেশাঃ সমাখ্যাতাঃ স্বনামকথিতা ভুবি’—মহাভারত, আদিপৰ্ব্ব, ১০৪/৫০ বিষ্ণুপুরাণ, মৎস্যপুরাণ, হরিবংশ এবং ভাগবতেও এই একই বৃত্তান্ত উল্লিখিত হইয়াছে।

৪. বাঙ্গালার পুরাবৃত্ত, ১১৬ পৃ।

৫. বঙ্গের জাতীয় ইতিহাস, ব্রাহ্মণ খণ্ড, প্রথমাংশ, ৬৪ পৃ। উক্ত স্থলে নগেন্দ্রনাথ বসু মহাশয় অনুমান করিয়াছেন যে, অঙ্গ, বঙ্গ প্রভৃতি স্থানগুলির নাম পূর্ব্বে ছিল। পরে বলিপুত্রগণের মধ্যে যিনি যে দেশ অধিকার করিয়াছিলেন দেশের পূর্বতন নামানুসারে তাঁহার সেই নাম হয়। এরূপ কল্পনা করিবার বিশেষ প্রয়োজন আছে বলিয়া মনে হয় না। বৈদিক দীর্ঘতমা ঋষির প্রসঙ্গ অপেক্ষাকৃত পরবর্ত্তী পুরাণে থাকা বিচিত্র নহে।

৬. ‘রত্নাকরং সমারভ্য ব্রহ্মপুত্রান্তগং শিবে।
বঙ্গদেশো ময়া প্রোক্তঃ সৰ্ব্বসিদ্ধিপ্রদর্শকঃ॥’—শক্তিসঙ্গমতন্ত্র

৭. ভাগীরথীর পশ্চিমভাগ হইতে আরম্ভ করিয়া পদ্মার উত্তর ও পূর্ব্বভাগ লইয়া ব্ৰহ্মপুত্ৰ পৰ্য্যন্ত বিস্তৃত বঙ্গদেশের আকার অশ্বক্ষুরবৎ ছিল বলিয়া বোধ হয়। উহার মধ্যে দক্ষিণাংশে সমুদ্রগর্ভ হইতে দ্বীপের উদ্ভব হইতেছিল। ‘গণ্ডকী-তীরমারভ্য চম্পারণ্যান্তগং শিবে

৮. বিদেহভুঃ সমাখ্যাতস্তীরভুক্ত্যভিধঃ সতু।’—শক্তিসঙ্গমতন্ত্র

৯. এই তীরভুক্তি হইতে ত্রিহুত হইয়াছে, এক্ষণে বিহারের একটি বিভাগের নাম ত্রিহুত। শতপথব্রাহ্মণ ১/৪/১/১০

১০. ‘কৌশিকীন্তু সমারভ্য গণ্ডকীমধিগম্য বৈ।’- বিষ্ণুপুরাণ

১১. দ্বিতীয় অংশ : উপবঙ্গে দ্বীপমালা পরিচ্ছেদের ৪০নং পাদটীকা দ্রষ্টব্য।— শি মি

১২. ততঃ প্রষাতঃ কৌশিক্যাঃ পাগুবো জনমেজয়।
আনুপূর্ব্বেণ সৰ্ব্বাণি জগামায়তনান্যথ।।
স সাগরং সমাসাদ্য গঙ্গায়াঃ সঙ্গমে নৃপ।
নদীশতানাং পঞ্চানাং মধ্যে চক্রে সমাপ্লবম্ ॥
ততঃ সমুদ্রতীরেণ জগাম বসুধাধিপঃ।
ভ্রাতৃভিঃ সহিতো বীরঃ কলিঙ্গান্ প্রতি ভারত।—মহাভারত, বনপর্ব্ব, ১১৩/১-৩

১৩. বান্ধব, ষষ্ঠখণ্ড, ৫ম সংখ্যা, ১২৮৯; বিক্রমপুরের ইতিহাস, ৩ পৃ

১৪. হ্লাদিনী পাবনী চৈব নলিনী চ তথৈব চ।
তিসঃ প্রাচীং দিশং জগ্ মূৰ্গঙ্গা শিবজলাঃ শুভাঃ॥
সুচক্ষুশ্চৈব সীতা চ সিন্ধুশ্চৈব মহানদী।
তিস্রশ্চৈতা দিশং জগ্‌মুঃ প্রতীচীং তু দিশং শুভাঃ।
সপ্তমী চাম্বগাৎ তাসাং ভগীরথরথং তদা॥–রামায়ণ, বালকাণ্ড, ৪৩শ অধ্যায়

১৫. পরেশনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়,—বাঙ্গালার পুরাবৃত্ত, ২২-২৩ পৃ; যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত,—বিক্রমপুরের ইতিহাস (১৩১৬), ৬-৭ পৃ; নিখিলনাথ রায়,—মুর্শিদাবাদের ইতিহাস, প্রথম খণ্ড, ৫৭-৬১ পৃ; Census Report, 1891, pp. 39-40.

১৬. দুর্গাচরণ সান্যাল, ‘বঙ্গের সামাজিক ইতিহাস’, ১০ পৃ।

১৭. পরেশনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয়ও এইরূপ অনুমান করিয়াছেন—’বাঙ্গালার পুরাবৃত্ত’, ১০৮ পৃ।

১৮. ‘প্রত্যক্কালকবনাৎ দক্ষিণেন হিমবন্তমুত্তরেণ পরিপাত্রম্’–পাণিনি, ২/৪/১০ মহাভাষ্য; বিশ্বকোষ, চতুর্থ খণ্ড, ২ পৃ।

১৯. বাঙ্গালার পুরাবৃত্ত, ১৩৯ পৃ।

২০. সাহিত্য ১৯শ বর্ষ, প্রথম সংখ্যা, ৩৮ পৃ।

২১. বিশ্বকোষ, চতুর্থ খণ্ড, ১৫৫ পৃ দ্রষ্টব্য। —শি মি

২২. ‘দিগ্বিজয়প্রকাশ’ এক বিরাট্ গ্রন্থ। বিশ্বকোষ-সম্পাদক নগেন্দ্রনাথ বসু মহাশয়ের বিখ্যাত লাইব্রেরীতে ইহার হস্তলিখিত পুঁথি রক্ষিত হইয়াছে। ইহা প্রতাপাদিত্যের আবির্ভাব সময়ে বা তাহার প্রাক্কালে কবিরাম নামক এক পণ্ডিত কর্তৃক লিখিত হয়।

২৩. ‘গঙ্গাগর্ভোথিতো দ্বীপো দ্বীপপুঞ্জৈবহির্ভূতঃ।
প্রতীচ্যাং যস্য দেশস্য গঙ্গা ভাতি নিরন্তরম্’—এডুমিশ্রের কারিকা

২৪. ‘নয়দ্বীপে নবদ্বীপ নাম, পৃথক্ পৃথক্ কিন্তু হয় এক গ্রাম।’ – নরহরি চক্রবর্তি-কৃত ‘নবদ্বীপ-পরিক্রমা’। নবগঠিত বা নূতন দ্বীপ বলিয়া নবদ্বীপের নামকরণ হইয়াছে বলিয়া যে অন্য একটি মত আছে, তাহা গ্রাম্য বলিয়া বোধ হয় না (‘নদীয়াকাহিনী’, ৫ পৃ. দ্রষ্টব্য)।

২৫. ‘অগ্রদ্বীপস্য মধ্যাংশঃ কণ্টক ইতি কথ্যতে’–এডু মিশ্রের কারিকা

২৬. ‘ধৰ্ম্মনামা নৃপস্তস্য কেশরী রায়ি সংজ্ঞিতঃ।
অন্তদ্বীপস্য রাজা যশ্চক্রা গ্রদ্বীপয়োশ্চ সঃ’—এডুমিশ্র।

২৭. ইহারই সন্নিকটে মহাকবি কালিদাসের জন্মস্থান ছিল বলিয়া কেহ কেহ প্রমাণ করিবার চেষ্টা পাইতেছেন।

২৮. নবদ্বীপ যে নয়টি দ্বীপ লইয়া গঠিত তাহারও একটির নাম মধ্যদ্বীপ এবং প্রাচীন নবদ্বীপরাজ্য যে দ্বাদশ দ্বীপের সমষ্টি তাহারও একটি মধ্যদ্বীপ। এই উভয় মধ্যদ্বীপ পৃথক স্থান। কেহ কেহ উভয়কে এক করিয়া ফেলিয়াছেন (‘সম্বন্ধনির্ণয়, উপসংহার’ ৭২০ পৃ; এবং ‘কুশদহ’ পত্র, আশ্বিন, ১৩১৮, ১২২ পৃ দ্রষ্টব্য)।

২৯. ‘খড়দহ, তৃণদ্বীপ, এডুদ্বীপ অংশ’—ঘটক কারিকা; সম্বন্ধনির্ণয়, ৭৩ পৃ; ‘যমুনা পুৰ্ব্বসীমায়াং গঙ্গা যস্য পুরস্থিতা’-এডুমিশ্র।

৩০. নবদ্বীপের প্রসিদ্ধ নৈয়ায়িক রঘুনাথ শিরোমণি মিথিলানিবাসী বিখ্যাত পণ্ডিত পক্ষধর মিশ্রের নিকট যে আত্মপরিচয় দিয়াছিলেন, তাহাতে কুশদ্বীপকে একটি মহাদ্বীপ বলিয়াছেন, যথা :

‘কুশদ্বীপ মহাদ্বীপ নবদ্বীপ নিবাসিনঃ।
সিদ্ধান্ত তর্কসিদ্ধান্তে শিরোমণি মনস্বিনঃ’—কুশদ্বীপ কাহিনী’, ৭২০ পৃ।

৩১. ‘বৃদ্ধদ্বীপো বৃহৎকায়ো যস্য গর্ভে বলেশ্বরঃ – মিশ্রকারিকা।

৩২. সূর্য্যনারায়ণ কৈবর্ত্তজাতীয় ছিলেন না। সেনরাজত্ব প্রসঙ্গের পাদটীকা দ্রষ্টব্য। —শি মি

৩৩. সেনরাজত্ব প্রসঙ্গে ও মহেশপুরের বিবরণীতে যথাস্থানে এ ঘটনা বিবৃত হইবে। মহেশপুরের সূর্য্যরাজার পরিখা-বেষ্ঠিত বাড়ী এখনও ‘সূর্য্যের বেড়’ নামে গভীর জঙ্গলাবৃত হইয়া রহিয়াছে। ‘আর্য্যাবর্ত্ত ১৩১৯, আশ্বিন, ‘মহেশপুরের সূর্য্যরাজা’ প্ৰবন্ধ দ্রষ্টব্য।

৩৪. সূৰ্য্যদ্বীপ জালিক সূর্য্যের পুরস্কার’-নুলোপঞ্চাননের কারিকা

‘সূর্য্যদ্বীপস্ত্রিভির্ভাগৈঃ সরিদ্গত্যা বিভজ্যতে।
তে লাটকঙ্কযোগীন্দ্রা ভৈরবেচ্ছাদি যোগতঃ॥
যোগীন্দ্রো ধীবরপ্রাপ্তো লাটো দাসস্য রাজ্যকম্‌
কঙ্কন্তু পূৰ্ব্বসীমায়াং চিত্রা যত্র বিরাজতে॥’– এডুমিশ্রের কারিকা। লালমোহন বিদ্যানিধিকৃত ‘সম্বন্ধনির্ণয়’, ৭১৭ পৃ দ্রষ্টব্য।

৩৫. মহেশপুরে সূর্য্যরাজার যে দুইটি পুষ্করিণী আছে, তাহার একটি যোগীন্দ্র ও অন্যটি যোগিনীদহ নামে খ্যাত।

৩৬. ‘মধুমত্যাঃ পূৰ্ব্বভাগে লোহিত্যস্য পশ্চিমে চ।
আসমুদ্র ইচ্ছামতী বিস্তৃতমিদং দ্বীপদেশং’॥ ৬১– দেববংশ পুঁথি।

‘পূৰ্ব্বস্মিন্, ব্রহ্মপুত্রশ্চ, ইছামতী তথোত্তরে।
মধুমতিঃ পশ্চিমে সমুদ্রদক্ষিণে তথা—মহাবংশাবলী

৩৭. ‘বন্দিলেন বনের মধ্যে ক্ষেপা পশুপতি
চারিদিকে জলা জঙ্গল খাগড়ার বসতি;
মধ্যেতে সিংহলদ্বীপ অতি মনোহর
তা’র মধ্যে বিরাজেন প্রভু তারকেশ্বর।’—কুশদ্বীপ কাহিনী, দুর্গাচরণ রক্ষিত সংগৃহীত, ৩৬ পৃ।
‘গৌড়ের ইতিহাস’, ২য় খণ্ড, ১৪৮ পৃ দ্রষ্টব্য।

৩৮. যদুনাথ ভট্টাচাৰ্য্য প্রণীত ‘দেবল রায়’ নামক গ্রন্থে ফেনদহ ও অঙ্গারদহের বিবরণ আছে। উক্ত গ্রন্থের ভূমিকা ।/. (পাঁচ আনা) পূঃ দ্রষ্টব্য।

৩৯. ‘জিত্বা চ বৌদ্ধরাজাংস্তথা গৌড়াধিপান্ বলাৎ।
তাম্রলিপ্তিং তথা চন্দ্রদ্বীপং শ্রীহট্টসংজ্ঞকম্॥’ – মিশ্রকারিকা।

৪০. ‘চন্দ্রদ্বীপে পুরা বিপ্রাস্তোয়পূর্ণা চ ভূমিকা।
মহাদেবপ্রসাদেন শুষ্কা ভূতা হি মৃত্তিকা।
ললাটানলদাহেন বিলীনং হি জলং বহু।
স্থলীভূতা চ পৃথিবী শৈবানাং সুখকারিকা।
মেঘনাদপূৰ্ব্বভাগে পশ্চিমে চ বলেশ্বরী।
ইন্দিলপুরী যক্ষসীমা দক্ষিণে সুন্দরবনম্॥ [ভবিষ্য ব্রহ্মখণ্ড, ১২/২-৪–শি মি]

৪১. বাঙ্গলার পুরাবৃত্ত, প্রথমভাগ, ১২ পৃ।

৪২. অধুনাপ্রাপ্ত শ্রীচন্দ্রের রামপাল তাম্রলিপিতে (খৃষ্টাব্দ ১০ম বা ১১শ শতাব্দী, Epigraphica Indica, XII, p. 136 )
চন্দ্রদ্বীপ ত্রৈলোক্যচন্দ্র কর্তৃক শাসিত বলিয়া বর্ণিত হইয়াছে।—শি মি।

৪৩. চন্দ্রদ্বীপস্য সীমায়াং রত্নাকরো বিরাজতে
চন্দ্রবৎ ক্ষীয়তে অস্য চন্দ্ৰবদ্বৰ্দ্ধতে বপু॥
তস্য তদ্‌গুণযোগেন চন্দ্রদ্বীপ ইতি স্মৃতঃ।’—এডুমিশ্রের কারিকা।

সকল অধ্যায়
১.
১. প্রথম পরিচ্ছেদ – উপক্রমণিকা
২.
২. বাহ্য প্রকৃতি ও বিভাগ
৩.
৩. নদী-সংস্থান
৪.
৪. ব’দ্বীপের প্রকৃতি
৫.
৫. অন্যান্য প্রাকৃতিক বিশেষত্ব
৬.
৬. সুন্দরবন
৭.
৭. সুন্দরবনের উত্থান ও পতন
৮.
৮. সুন্দরবনে মনুষ্যাবাস
৯.
৯. সুন্দরবনের বৃক্ষলতা
১০.
১০. সুন্দরবনের জীবজন্তু
১১.
১১. সুন্দরবনে শিকার ও ভ্রমণ
১২.
১২. সুন্দরবনের জঙ্গলা ভাষা
১৩.
১. প্রথম পরিচ্ছেদ – উপবঙ্গে দ্বীপমালা
১৪.
২. দ্বীপের প্রকৃতি
১৫.
৩. আদি হিন্দু-যুগ
১৬.
৪. জৈন-বৌদ্ধ যুগ
১৭.
৫. গুপ্ত-সাম্রাজ্য
১৮.
৬. সমতটে চীন-পৰ্য্যটক
১৯.
৭. মাৎস্য-ন্যায়
২০.
৮. বৌদ্ধ-সংঘারাম কোথায় ছিল
২১.
৯. সেন-রাজত্ব
২২.
১০. সেন-রাজত্বের শেষ
২৩.
১১. আভিজাত্য
২৪.
১. তামস যুগ
২৫.
২. বসতি ও সমাজ
২৬.
৩. দনুজমৰ্দ্দন দেব
২৭.
৪. খাঁ জাহান আলি
২৮.
৫. খাঁ জাহানের কার্য্যকাহিনী
২৯.
৬. পয়োগ্রাম কসবা
৩০.
৭. খালিফাতাবাদ
৩১.
৮. খাঁ জাহানের শেষ জীবন
৩২.
৯. হুসেন শাহ
৩৩.
১০. রূপ-সনাতন
৩৪.
১১. লোকনাথ
৩৫.
১২. হরিদাস
৩৬.
১৩. রামচন্দ্র খাঁ
৩৭.
১৪. গাজীর আবির্ভাব
৩৮.
১৫. মুকুট রায়
৩৯.
১৬. দক্ষিণরায় ও গাজীর কথার শেষ
৪০.
১৭. পাঠান আমলে দেশের অবস্থা
৪১.
পরিশিষ্ট ।। ক – সুন্দরবনের বিনষ্ট নগরী নলদী
৪২.
পরিশিষ্ট ।। খ – ভরত-ভায়না স্তূপ
৪৩.
পরিশিষ্ট ।। গ – দেগঙ্গা ও বালাণ্ডা
৪৪.
পরিশিষ্ট ।। ঘ – বংশাবলী

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%