বীরবিক্রমকিশোর মাণিক্য

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

আজকের এই অস্তোন্মুখ সূর্যের মতোই আমার হৃদয় আমার জীবনের পশ্চিম দিগন্ত থেকে তোমার প্রতি তার আশীর্বাদ বিকীর্ণ করছে।

তোমার সঙ্গে আজ আমার এই মিলন আর-একদিনকার শুভ সম্মিলনের আলোকেই উদ্দীপ্ত হয়ে দেখা দিলে। সে কথা আজ তোমাকে জানিয়ে দেবার উপলক্ষ ঘটল বলে আমি আনন্দিত। তখন তোমার জন্ম হয় নি, আমি তখন বালক। একদা তোমার স্বর্গগত প্রপিতামহ বীরচন্দ্র মাণিক্য তাঁর মন্ত্রীকে পাঠিয়ে দিলেন জোড়াসাঁকোর বাড়িতে, কেবল আমাকে এই কথা জানাবার জন্যে যে তিনি আমাকে শ্রেষ্ঠ কবির সম্মান দিতে চান। দেশের কাছ থেকে এই আমি প্রথম সমাদর পেয়েছিলুম। প্রত্যাশা করি নি এবং এই বহুমানের যোগ্যতা লাভ করবার দিন তখন অনেক সুদূরে ছিল। তার পরে স্বাস্থ্যের সন্ধানে কার্সিয়াঙে যাবার সময়ে আমাকে তাঁর সঙ্গে ডেকে নিয়েছিলেন। তিনি বয়সে আমার চেয়ে অনেক বড়ো ছিলেন কিন্তু আমার সঙ্গে সাহিত্য আলোচনা করতেন প্রিয় বয়স্যের মতো। তাঁর সংগীতের জ্ঞান অসাধারণ ছিল কিন্তু আমার সেই কাঁচা বয়সের রচিত ছেলেমানুষি গান তিনি আদর করে শুনতেন, বোধ হয় তার মধ্যে ভাবী পরিণতির সম্ভাবনা প্রত্যাশা করে। এ যেন কোন্‌ অদৃশ্য রশ্মির লিপি অঙ্কিত হয়েছিল তাঁর কল্পনার পটে। আজ সকলের চেয়ে বিস্ময় লাগে এই কথা মনে করে যে, বাংলা সাহিত্য সম্বন্ধে মহারাজার মনে যে-সকল সংকল্প ছিল, আমাকে নিয়ে তিনি সে সম্বন্ধে পরামর্শ করতেন এবং আমাকে সেই সাহিত্য অনুষ্ঠানের সহযোগী করবেন বলে প্রস্তাব করেছিলেন। তার অনতিকাল পরেই কলকাতায় ফিরে এসে তাঁর মৃত্যু হল; মনে ভাবলুম এই রাজবংশের সঙ্গে আমার সম্বন্ধসূত্র এইখানেই অকস্মাৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। কিন্তু তা যে হল না সেও আমার পক্ষে বিস্ময়কর। তাঁর অভাবে ত্রিপুরায় আমার যে সৌহৃদ্যের আসন শূন্য হল মহারাজ রাধাকিশোর মাণিক্য অবিলম্বে আমাকে সেখানে আহ্বান করে নিলেন। তাঁর কাছ থেকে যে অকৃত্রিম ও অন্তরঙ্গ বন্ধুত্বের সমাদর পেয়েছিলুম তা দুর্লভ। আজ এ কথা গর্ব করে তোমাকে বলবার অধিকার আমার হয়েছে যে, ভারতবর্ষের যে কবি পৃথিবীতে সমাদৃত, তাঁকে তাঁর অনতিব্যক্ত খ্যাতির মুহূর্তে বন্ধুভাবে স্বীকার করে নেওয়াতে ত্রিপুরা রাজবংশ গৌরব লাভ করেছেন। তেমন গৌরব বর্তমান ভারতবর্ষের কোনো রাজকুল আজ পর্যন্ত পান নি। এই সম্মেলনের যে একটা ঐতিহাসিক মহার্ঘতা আছে আশা করি সে কথা তুমি উপলব্ধি করেছ। যে সংস্কৃতি, যে চিত্তোৎকর্ষ দেশের সকলের চেয়ে বড়ো মানসিক সম্পদ, একদা রাজারা তাকে রাজৈশ্বর্যের প্রধান অঙ্গ বলে গণ্য করতেন, তোমার পিতামহেরা সে কথা মনে মনে জানতেন। এই সংস্কৃতির সূত্রেই তাঁদের সঙ্গে আমার সম্বন্ধ ছিল, এবং সে সম্বন্ধ অত্যন্ত সত্য ছিল। আজ তোমার আগমনে সেদিনকার সুখস্মৃতির দক্ষিণ সমীরণ তুমি বহন করে এনেছ। আজ তুমি বর্তমান দিনকে সেই অতীতের অর্ঘ্য এনে দিয়েছ, এই উপলক্ষে তুমি আমার স্নিগ্ধ হৃদয়ের সেই দান গ্রহণ করো যা তোমার পিতামহদের অর্পণ করেছিলুম, আর গ্রহণ করো আমার সর্বান্তঃকরণের আশীর্বাদ।

আনন্দবাজার পত্রিকা,২৫ পৌষ, ১৩৪৫

সকল অধ্যায়
১.
সাম্রাজ্যেশ্বরী
২.
আচার্য জগদীশের জয়বার্তা
৩.
জগদীশচন্দ্র বসু
৪.
জগদীশচন্দ্র
৫.
সতীশচন্দ্র রায়
৬.
মোহিতচন্দ্র সেন
৭.
রমেশচন্দ্র দত্ত
৮.
সুহৃত্তম শ্রীযুক্ত রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী
৯.
রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী
১০.
দ্বিজেন্দ্রলাল রায়
১১.
শান্তিনিকেতনের মুলু
১২.
ছাত্র মুলু
১৩.
শিবনাথ শাস্ত্রী
১৪.
বিদ্যাসাগর
১৫.
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
১৬.
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর – ০২
১৭.
সুকুমার রায়
১৮.
সুকুমার রায় – ০২
১৯.
উইলিয়াম পিয়ার্সন
২০.
পরলোকগত পিয়র্সন
২১.
মনোমোহন ঘোষ
২২.
সরোজনলিনী দত্ত
২৩.
জগদিন্দ্র-বিয়োগে
২৪.
লর্ড সিংহ
২৫.
উমা দেবী
২৬.
অরবিন্দ ঘোষ
২৭.
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
২৮.
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (সংবর্ধনা উপলক্ষে পত্র : ৩)
২৯.
মণীন্দ্রচন্দ্র নন্দী
৩০.
হরপ্রসাদ শাস্ত্রী
৩১.
হরপ্রসাদ শাস্ত্রী – ০২
৩২.
প্রফুল্লচন্দ্র রায়
৩৩.
আশুতোষ মুখোপাধ্যায়
৩৪.
শ্যামকান্ত সর্দেশাই
৩৫.
প্রিয়নাথ সেন
৩৬.
জগদানন্দ রায়
৩৭.
উদয়শঙ্কর
৩৮.
স্বামী শিবানন্দ
৩৯.
নন্দলাল বসু
৪০.
খান আবদুল গফ্‌ফর খান
৪১.
দিনেন্দ্রনাথ
৪২.
দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর
৪৩.
কমলা নেহরু
৪৪.
বীরেশ্বর
৪৫.
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
৪৬.
মৌলানা জিয়াউদ্দিন
৪৭.
লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়া
৪৮.
কামাল আতাতুর্ক
৪৯.
কেশবচন্দ্র সেন
৫০.
বীরবিক্রমকিশোর মাণিক্য
৫১.
ঈ. বী. হ্যাভেল
৫২.
দীনবন্ধু অ্যাণ্ডরুজ
৫৩.
রাধাকিশোর মাণিক্য
৫৪.
প্রমথ চৌধুরী
৫৫.
অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%