অরণ্য-বিভীষিকা

হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়

লোহার আলমারিটা খোলবার আগে রাজনারায়ণ ঘরের দরজাটা চেপে বন্ধ করে দিলেন। বাইরের কোনও লোক দেখতে না পায়। ঘরের মধ্যে শুধু দুজন। রাজনারায়ণ আর তাঁর স্ত্রী মহামায়া।

পইতায় বাঁধা চাবিটা দিয়ে রাজনারায়ণ আলমারি খুললেন, তারপর ছোটো একটা ড্রয়ার খুলে মাঝারি সাইজের ক্যাশবাক্স বের করলেন।

মহামায়ার দিকে ফিরে বললেন, এসো, এগিয়ে এসো। নায়েব দুপুরবেলা কলকাতা থেকে সব নিয়ে এসেছে। তুমি ঘুমাচ্ছিলে বলে তোমাকে তখন আর ডাকিনি। আলমারির ভিতর তুলে রেখেছি।

মহামায়া এগিয়ে এসে আলমারির সামনে পা মুড়ে বসল।

রাজনারায়ণ এক-এক করে ক্যাশবাক্স থেকে নামিয়ে সিল্কের কাপড়ের ওপর রাখলেন।

সীতাহার, রতনচূড়, মান্তাশা, কঙ্কণ, হাঙরমুখো অনন্ত, চন্দ্রহার, কান, সিঁথিমৌর, তোড়া। ঝাড়লন্ঠনের আলোয় গহনাগুলো ঝকঝক করে উঠল। মহামায়া খুব খুশি।

পশুপতি স্যাকরার হাতের কাজ ভারী চমৎকার। সোনা তো নয় যেন আগুন। কী ঝকঝকে পালিশ। আমার তো মনে হয় সূর্যকান্তবাবুরা গহনা দেখে খুবই আনন্দ পাবে।

রাজনারায়ণ মাথা নাড়লেন।

এর ওপর করকরে মোহর আছে। সেগুলো থলিতে মজুত। সম্প্রদানের সময় বাবাজির সামনে রাখব। তা ছাড়া আরও একটা জিনিস—

খুট করে একটা শব্দ।

বাইরের বারান্দায় কী একটা এসে পড়ল।

রাজনারায়ণ তাড়াতাড়ি গহনাপত্র আলমারিতে তুলে ফেললেন। চাবি ঘুরিয়ে বন্ধ করে দিলেন আলমারি। কী হল? মহামায়া অবাক হয়ে গেল।

কী একটা আওয়াজ হল বারান্দায়। দেখে আসি। দরজা খুলে রাজনারায়ণ বারান্দায় বেরিয়ে এলেন। মহামায়া চুপচাপ বসে রইল ঘরের মধ্যে।

মিনিট পাঁচেক পরে রাজনারায়ণ যখন ঘরের মধ্যে এসে ঢুকলেন, তখন তাঁকে দেখে মহামায়া চমকে উঠল।

পাংশু মুখ, বিস্ফারিত দুটি চোখ, ঠোঁট দুটো থরথর করে কাঁপছে। কী হল?

রাজনারায়ণ কোনও উত্তর দিলেন না। একটা হাত মহামায়ার দিকে এগিয়ে দিলেন। হাতের মুঠোয় একটা তির। তিরের আগায় একটা কাগজের টুকরো।

মহামায়া ঠিক কিছু বুঝতে পারল না। চিঠিটাই বা কীসের? কালু সর্দারের চিঠি।

বিরাট ঘরে রাজনারায়ণের গম্ভীর কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হতে লাগল।

আর কিছু বলতে হল না। আর কিছু বলার দরকারও ছিল না।

কালু সর্দারের নামেতেই বিশখানা গাঁয়ের লোক থরথরিয়ে কাঁপত। কোনও শক্তি নেই কালুকে বাধা দিতে পারে। কোনও অস্ত্র নেই যাতে কালুর পরমায়ু হরণ করতে পারে। এটাই ছিল সকলের বিশ্বাস।

কালু সর্দার কোথাও আসবার আগে চিঠি লিখে তার দিনক্ষণ জানাত। পাইক, বরকন্দাজ, লোকলশকর যতই তৈরি থাক, কালু সর্দারের দল ঠিক কাজ হাসিল করে যাবেই। তাকে কেউ আটকাতে পারত না।

আটকাতে যে পারত না, তার কারণও ছিল। সবাই বলে কালু মা বাশুলির পুত্র। মায়ের পুজো দিয়ে, পূজার সিঁদুর কপালে নিয়ে সে ডাকাতিতে বের হত, সেইজন্য সে ছিল অবধ্য। কোনও অস্ত্র তার ত্রিসীমানায় আসতে পারত না।

রনপায় ভর দিয়ে কালু চলাফেরা করত। এক-একরাতে বিশ-ত্রিশ মাইল দূরে ডাকাতি করে নির্বিঘ্নে নিজের আস্তানায় ফিরে আসত। গায়ে একটা আঁচড়ও লাগত না।

এখন যেখানে দুর্গাপুরের কারখানা, জমজমাট শহর, অনেক বছর আগে সেখানে অজগর বন ছিল। দিনের বেলাও সূর্যের আলো প্রবেশ করত না। অবিশ্রাম ঝিঁঝি ডাকত। ভয়ংকর জন্তুজানোয়ার তো ছিলই, তার চেয়েও মারাত্মক ছিল ডাকাত আর ঠ্যাঙাড়ের দল।

কেউ পথ ভুলে সে জঙ্গলে ঢুকলে প্রাণ নিয়ে আর বের হতে পারত না।

দুর্গাপুরের সেই গভীর জঙ্গল ছিল কালু সর্দারের ডেরা।

অনেককালের পুরোনো এক বিশালাক্ষীর মন্দির ছিল। আশপাশের লোকেরা বলত বাশুলির মন্দির। বিরাট আটহাত কালীমূর্তি। মূর্তির দুটো চোখ আর লকলকে জিভ দেখলে অনেক সাহসী লোকেরও বুকের রক্ত হিম হয়ে যেত। তারই কাছে কালু সর্দার থাকত।

কালু একলা নয়, তার সঙ্গে থাকত তার একশো অনুচর। বেশির ভাগই বাগদি আর আগুরি। তাদের লাঠি হাতে থাকলে বন্দুকের গুলিও দেহ ছুঁতে পারত না।

অনেকবার কালু কোম্পানির টাকা লুঠ করেছে।

অবশ্য চিঠি দিয়ে নয়, আচমকা। বিহার থেকে বাংলায় খাজনার টাকা আসছিল, পালকিতে, চারপাশে অশ্বারোহী সিপাই। হাতে গাদা বন্দুক। এ ছাড়াও বর্শা হাতে আরও লোক থাকত।

পাশে গভীর জলা, জঙ্গল। ছোটো ছোটো টিলা।

হঠাৎ একেবারে 'বাশুলি মায়িকি জয়' বলে বন্যার স্রোতের মতন কালু সর্দারের দল দু-দিক থেকে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল।

বন্দুকধারী সিপাইরা অবসরই পায়নি। তারা সচেতন হবার আগেই ভোজালি আর বর্শায় কারো মুণ্ড দেহচ্যুত, কারো বা শরীর এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে গিয়েছিল।

তারপর কালু সর্দারের অনুচরদের পক্ষে টাকার থলি নিয়ে জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে পড়া মোটেই শক্ত হয়নি।

একবার শুধু কোম্পানি খেপে গিয়েছিল।

সেবার পালকির মধ্যে টাকা আগলে নিয়ে যাচ্ছিল এক লালমুখো সাহেব। মিস্টার কানিংহাম।

গোলমাল শুরু হতেই কানিংহাম দু-হাতে দুটো পিস্তল নিয়ে পালকি থেকে লাফিয়ে পড়েছিল।

অসীম সাহস ভদ্রলোকের, তেমনি অদ্ভুত লক্ষ্য।

কালু সর্দারের ডান হাত গগন দলুই। খুব ভালো তলোয়ার খেলত। পিস্তলের এক গুলিতে তার চোয়াল ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল কানিংহাম। তারপর আর-একটা গুলিতে বিজয় সামন্ত মুখ থুবড়ে মাটিতে পড়ল। বিখ্যাত লাঠিয়াল বিজয়।

কালু সর্দার একটু দূরে রনপার ওপর ভর দিয়ে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করছিল। ব্যাপার দেখে রনপা চড়েই হুংকার দিয়ে কানিংহামের সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল।

এত আচমকা যে কানিংহাম একটু হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল।

কালু সর্দার তার মাথার অনেক ওপরে।

পিস্তল উঁচু করার আগেই কালু খাঁড়া দিয়ে কানিংহামের মাথাটা দু-ফাঁক করে দিয়েছিল।

তারপর কোম্পানির সিপাই আর কেউ দাঁড়ায়নি। ছত্রভঙ্গ হয়ে যে যেদিকে পেরেছিল, পালিয়েছে। সেই সময় কোম্পানি খেপে উঠেছিল।

কলকাতা থেকে একগাদা সিপাই এসেছিল বন্দুক, বল্লম, সড়কি নিয়ে।

ওপরওয়ালার হুকুম ছিল যেমন করে হোক সাহেব মারার প্রতিশোধ নিতেই হবে।

কোম্পানির সিপাই কিন্তু বনের মধ্যে কিছুটা গিয়েই থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছিল।

শুধু ঝিঁঝি আর তক্ষকের আওয়াজ। মাঝে মাঝে বানরদের এক ডাল থেকে আর-এক ডালে লাফিয়ে পড়ার শব্দ। কোথাও জনমানব নেই। দিনের বেলাতেও ঘুটঘুটে অন্ধকার। বার বার পায়ে বুনো লতা জড়িয়ে গেল।

যেসব সিপাইরা ঘোড়ায় চড়ে ভিতরে ঢুকেছিল, তাদের ঘোড়াগুলো ভয় পেয়ে সামনের পা তুলে চিঁহি করে উঠল।

হিন্দু সিপাইরা বলল, এ জঙ্গলে ভূত আছে হুজুর। আমরা আর এগোব না। মুসলমান সিপাইরা বলল, এটা শয়তানের এলাকা। আমরা ফিরছি। সবাই ফিরে এসেছিল।

সেই কালু সর্দার, যাকে লোকে যমের দোসর বলে মনে করে, সে চিঠি পাঠিয়েছে রাজনারায়ণ চৌধুরীর বাড়ি।

ব্যাপারটা যথেষ্ট ভয়ের তো বটেই। মহামায়া প্রশ্ন করল, কী লিখেছে চিঠিতে?

একটু কেশে রাজনারায়ণ গলাটা পরিষ্কার করে নিলেন।

বাতির তলায় দাঁড়িয়ে ঝুঁকে পড়ে চিঠিটা পড়তে লাগলেন।

যথাবিহিত সম্মানপুরঃসর নিবেদনমেতৎ,

মহাশয়,

আগামী অমাবস্যার রাত্রে বাশুলি মায়ের পূজার আয়োজন করিয়াছি। আমি মায়ের দীন সেবক। মায়ের পূজার ব্যয় বহন করিবার সামর্থ্য আমার নাই। সেইজন্য আপনার নিকট ভিক্ষা চাহিতেছি। অমাবস্যার আগের রাত্রি দ্বিপ্রহরে আপনার আলয়ে উপস্থিত হইব, আপনি অনুগ্রহপূর্বক অর্থ, রত্ন, অলংকারাদি লইয়া প্রস্তুত থাকিবেন। মায়ের কর্মে বাধা প্রদান করিয়া কোনওরূপ অশান্তি সৃষ্টি করিবেন না বলিয়াই বিশ্বাস করি।

দীনের প্রণাম গ্রহণ করিবেন।

বিনীত

বাশুলি মায়ের সেবায়েত

কালু।

একবারে নয়, থেমে থেমে রাজনারায়ণ চিঠি পড়া শেষ করলেন।

মহামায়া প্রস্তরমূর্তির মতন পাশে দাঁড়িয়ে রইল।

রাজনারায়ণ থামতে মহামায়া বলল, এই কি ডাকাতির চিঠি?

হ্যাঁ, কালু সর্দার এইভাবেই সকলকে চিঠি লেখে। পূজার সাহায্য চেয়ে। আমার মনে হয়, তারার বিয়ের জন্য কলকাতা থেকে গহনাগাটি এনেছি, মহাল থেকে কাঁচা টাকা, সবই কালু জানতে পেরেছে। তার চর সর্বত্র। সেইজন্যই এ বাড়িতে চড়াও হতে চায়।

কী হবে? এবার মহামায়ার কণ্ঠে কান্নার সুর।

মহামায়ার কথার কোনও উত্তর রাজনারায়ণ দিলেন না। দরজা দিয়ে খোলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে গম্ভীর কণ্ঠে ডাকলেন, ভৈরব, ভৈরব।

মিনিটকয়েক পরেই সামনের সিঁড়ি দিয়ে এক লাঠিয়াল উঠে এল। কাঁধ পর্যন্ত ঝাঁকড়া চুল। গলায় লাল পাথরের মালা। লাল পাথরের মতনই আরক্ত দুটি চোখ। হাঁটু পর্যন্ত খাটো হলুদ রঙের ধুতি। কোমরে গামছা। হাতে তেল-চুকচুকে লাঠি।

বারান্দায় এসেই লাঠিটা রাজনারায়ণের পায়ের কাছে রেখে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে হাতজোড় করে বলল, ডেকেছেন হুজুর?

নায়েবমশাইকে একবার ডেকে দে। সদরে আসতে বল।

ভৈরব নেমে যেতে খড়ম পায়ে দিয়ে রাজনারায়ণও নেমে গেলেন। একতলায়, সদরে।

বিরাট তক্তপোশ পাতা। ইতস্তত কয়েকটা তাকিয়া। একপাশে একটা আলবোলা। দেয়ালে অনেকগুলো তৈলচিত্র। রাজনারায়ণের পূর্বপুরুষদের।

রাজনারায়ণ তক্তপোশের ওপর একটা তাকিয়ায় ঠেস দিয়ে বসলেন।

থানা এখান থেকে প্রায় বিশ ক্রোশ। সেখান থেকে কোনও সাহায্য পাওয়া যাবে এমন আশা দুরাশা। একটি দারোগা আর গুটি দুই-তিন সিপাই, এরা আর বিপদে কি সাহায্য করতে পারে?

অমাবস্যার আর ঠিক পাঁচ দিন বাকি। তার মানে কালু সর্দার আসবে চার দিন পরেই। যা কিছু ব্যবস্থা এর মধ্যেই করে ফেলতে হবে।

রাজনারায়ণ একবার ভাবলেন, অলংকার, অর্থ সমস্ত কলকাতায় সরিয়ে ফেলবেন, কিন্তু তারপরই মনে হল, তাতে বিপদ আরও বেশি। কালু সর্দারের চারদিকে সতর্ক দৃষ্টি। টাকা আর অলংকার কোনওদিনই কলকাতায় পৌঁছাবে না। পথেই কালু সর্দারের লোকের হাতে পড়বে।

কী ব্যাপার, এমন অসময়ে ডেকেছেন? নায়েব এসে তক্তপোশের পাশে দাঁড়াল।

রাজনারায়ণ মুখ তুলে দেখলেন, তারপর বললেন, বসুন নায়েবমশাই। আপনি আজই কলকাতা থেকে ফিরেছেন, নিশ্চয় খুব ক্লান্ত।

নায়েব স্বীকার করল, একটু পরিশ্রান্ত বোধ করছি অবশ্য। সারাটা পথ নৌকায়। গঙ্গার অবস্থাও খুব শান্ত ছিল না। কিন্তু কী ব্যাপার বলুন তো গহনাপত্রের কি কোনও গরমিল হয়েছে? আমি তো দু-দুবার তালিকা দেখে মিলিয়ে নিয়েছি।

না, না, রাজনারায়ণ হাত নাড়লেন, সেসব কিছু নয়। গহনাপত্র ঠিক আছে। আপনার কাজ চিরদিনই নিখুঁত। এটা দেখুন।

তাকিয়ার তলা থেকে রাজনারায়ণ তিরবিদ্ধ চিঠিটা বের করে নায়েবের দিকে এগিয়ে দিলেন।

একবার ঝুঁকে চিঠির কোণে রক্তাক্ত খাঁড়ার চিহ্ন দেখেই নায়েব শিউরে উঠল, সর্বনাশ, এ তো কালু সর্দারের চিঠি। এ আপনি কোথা থেকে পেলেন?

একটু আগে তিরটা ওপরের বারান্দায় এসে পড়ল। বাইরে থেকে কেউ ছুড়েছে।

নায়েব পিরানের পকেট থেকে চশমা বের করে চোখে লাগিয়ে নিল। অনেকক্ষণ ধরে গভীর মনোযোগ দিয়ে চিঠিটা পড়ল।

তারপর রাজনারায়ণের দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে বলল, এখন উপায়?

উপায়ের ব্যাপারেই তো আপনাকে ডেকে পাঠিয়েছি।

নায়েব গালে হাত দিয়ে কিছুক্ষণ বসে রইল। তারপর বলল, আমাদের তৈরি থাকা ছাড়া আর কী উপায় আছে?

কিন্তু কালু সর্দারের বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত কেউই তো তৈরি থেকেও পার পায়নি। কালু যা বলেছে, তা করেছে।

তা বলে নিশ্চেষ্ট হয়ে ফটক খুলে তাকে তো আর আহ্বান জানানো যায় না। আমাদের ভিল, সাঁওতাল আর যত লেঠেল প্রজা আছে সব এখানে এনে জড়ো করব, পাহারা দেবার জন্য। তারা আপনার জন্য জান দেবে। দেখি কী করে কালু এখানে ঢোকে। আর ধন-অলংকারের আপনি অন্য ব্যবস্থা করুন।

কী ব্যবস্থা?

নায়েব আস্তে আস্তে উঠে বাইরে গেল। তীক্ষ্ন দৃষ্টি বুলিয়ে এদিক-ওদিক দেখল তারপর আবার ঘরের মধ্যে ঢুকে চাপাকণ্ঠে বলল, আপনি সবকিছু চোরাকুঠুরিতে চালান দিন। আর পূজার সময় বারোয়ারি যাত্রাদলের যে মেকি গহনা আমাদের কাছে আছে, সেইগুলোই আপনার আলমারিতে সাজিয়ে রাখতে হবে।

রাজনারায়ণের মুখ দেখে মনে হল নায়েবের এ ব্যবস্থায় তিনি কিছুটা সন্তাোষ লাভ করেছেন।

বললেন, বেশ, আপনার কথামতোই ব্যবস্থা করে দেখি। আর-একটা কথা নায়েবমশাই।

বলুন।

এ চিঠির কথা আপনি পাঁচকান করবেন না। কে শত্রু কে মিত্র চেনা দুষ্কর।

আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন হুজুর। দ্বিতীয় ব্যক্তি এ সম্বন্ধে কিছু জানবে না।

নায়েব বেরিয়ে যেতে রাজনারায়ণ উঠে পড়লেন।

ওঠবার মুখেই বিপত্তি।

অন্দরের পরিচারিকা বিরজা দ্বারপথে এসে দাঁড়াল।

হুজুর, একবার শিগগির ওপরে আসুন।

রাজনারায়ণ একটু অন্যমনস্ক ছিলেন। বিরজার চিৎকারে চমকে উঠলেন।

কী, কী হল?

মা-র ফিট হয়েছে।

ফিট! বিরজার পিছন পিছন রাজনারায়ণ দ্রুতপায়ে ওপরে উঠে এলেন।

ঘরের মাঝখানে মহামায়া শুয়ে। তাকে ঘিরে আরও দুজন পরিচারিকা। বোধহয় মহামায়ার মাথায় জল ঢালা হয়েছিল। ঘরের মেঝে জলে ভরতি।

এমন ফিট মহামায়ার মাঝে মাঝে হয়। কোনও শোক বা ভয় পেলে। এবার অনেকদিন হয়নি।

কবিরাজ একটা ওষুধ দিয়েছেন। কিন্তু সে ওষুধ খাওয়ানোই মুশকিল। এই সময় দাঁতে দাঁতে এমন আটকে যায়, মুখই খোলা যায় না।

রাজনারায়ণ ওষুধটা এনে বিরজার হাতে দিয়ে বললেন, এখনই এটা খাইয়ে দাও। তারা কোথায়, তারা?

একজন পরিচারিকা বলল, দিদিমণি ঠাকুরঘরে।

এত রাত পর্যন্ত ঠাকুরঘরে?

কথাটা বলেই রাজনারায়ণ বুঝতে পারলেন ব্যাপারটা মোটেই অস্বাভাবিক কিছু নয়।

পূর্বপুরুষের প্রতিষ্ঠিত কালীমূর্তি। রাজনারায়ণের গৃহদেবী। দু-বেলা পূজা হয়, আরতি।

পুরোহিতের সঙ্গে তারাই থাকে। সব ব্যবস্থা করে দেয়।

গৃহদেবীর সঙ্গে মিল রেখেই রাজনারায়ণ মেয়ের নাম রেখেছিলেন তারা। মেয়ে সামান্য শ্যামাঙ্গী, কিন্তু অপরূপ লাবণ্যময়ী। দীর্ঘকেশ, আয়তলোচন।

পণ্ডিতরা গণনা করে বলেছেন, তারার দেবী অংশে জন্ম। এ মেয়ে ঐশী সম্পদের অধিকারিণী।

তারা যখন দরজার কাছে এসে দাঁড়াল, তখন মহামায়া উঠে বসেছে। পরিচারিকারা সরে গেছে সে ঘর থেকে। তারা একবার মা-র দিকে চেয়ে বাবাকে প্রশ্ন করল।

মা-র কী হয়েছে বাবা?

হঠাৎ আবার ফিট হল আজকে।

কেন? আজ হল কেন?

কেন হল, তার উত্তর মেয়েকে দেওয়া সম্ভব নয়, তাই তিনি শুধু বললেন, কী জানি, বুঝতে পারছি না। রাত অনেক হয়েছে, তোমরা শুতে যাও।

মহামায়াকে ধরে তারা বাইরে চলে গেল।

রাজনারায়ণ বারান্দায় গিয়ে এদিক-ওদিক দেখলেন। পাশেই আমবাগান। নিঝুম অন্ধকার। শুধু এখানে-ওখানে জোনাকির চুমকি। দেউড়িতে লাঠি হাতে ভৈরব পায়চারি করছে।

বারান্দায় দরজা বন্ধ করে রাজনারায়ণ আবার আলমারি খুললেন। ক্যাশবাক্সটা সাবধানে বের করে নিয়ে এদিকের দরজা দিয়ে বাইরে এলেন।

ঘোরানো সিঁড়ির কাছে দেয়ালের গায়ে বিরাট এক তৈলচিত্র। অশ্বারোহী এক যোদ্ধার। রাজনারায়ণের পূর্বপুরুষদের একজন, যিনি একসময়ে বর্গির আক্রমণ ঠেকিয়ে রেখেছিলেন।

রাজনারায়ণ এদিক-ওদিক দেখে চিত্রের পায়ের কাছে জুতার ওপর সজোরে টিপে ধরলেন।

খট করে একটা শব্দ। তৈলচিত্র দরজার মতন খুলে গেল। ভিতরে আবছা সিঁড়ির থাক দেখা গেল। ক্যাশবাক্স বগলে করে রাজনারায়ণ সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেলেন।

কিছুটা গিয়েই বেশ অন্ধকার। আর দেখা যায় না। রাজনারায়ণ হাতড়ে হাতড়ে পাশের কুলুঙ্গি থেকে চকমকি পাথর বের করলেন, তারপর পাথরে পাথরে ঠুকে আগুন জ্বালিয়ে সিঁড়ির এককোণে রাখা মশাল ধরালেন।

সামনেই চোরাদরজা দেখা গেল। দরজা ঠেলে রাজনারায়ণ ভিতরে ঢুকলেন।

দেয়ালের গায়ে বিরাট সব গর্ত। তারই একটার মধ্যে ক্যাশবাক্সটা ঠেলে রেখে দিলেন।

সঙ্গে সঙ্গে ঠুকঠুক করে কোথায় একটা আওয়াজ হল। ভ্রূ কুঞ্চিত করে রাজনারায়ণ ফিরে দাঁড়ালেন। পরিশ্রমে, উত্তেজনায় তাঁর কপাল বেয়ে দরদর করে ঘামের ধারা গড়িয়ে পড়ছে। চওড়া বুক ওঠানামা করছে।

পায়ের শব্দ বলেই যেন মনে হল, কিন্তু এ চোরাকুঠুরিতে কোথা থেকে পায়ের শব্দ আসবে। এ চোরাকুঠুরির কথা জমিদারির দু-একজন শুধু জানে। রাজনারায়ণ, নায়েব আর ভৈরব। পরিবারবর্গের মধ্যে একমাত্র মহামায়া। তারাও জানে না।

কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকেই রাজনারায়ণ বুঝতে পারলেন, সবই তাঁর মনের ভুল। নিজের বুকের স্পন্দনই তিনি শুনেছেন। বাইরের কোনও আওয়াজ নয়।

সিঁড়ি বেয়ে রাজনারায়ণ ওপরে উঠে এলেন।

তৈলচিত্র দেয়ালের সঙ্গে লেপটে ছিল। উলটোদিক থেকে হাতল ঘোরাতেই চিত্রটি খুলে গেল। রাজনারায়ণ এদিকে এসে আবার তৈলচিত্র আটকে দিলেন।

নিস্তব্ধ রাত্রি। কেউ কোথাও নেই। শুধু অন্ধকার আর স্তব্ধতা চিরে মাঝে মাঝে ভৈরবের হুংকার শোনা যাচ্ছে, হুঁশিয়ার!

এই চোরাকুঠুরি নির্মিত হয়েছিল বহুকাল আগে। যখন পাঠানদের অত্যাচারে মানুষের প্রাণ দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল। কোনও কারণ নেই, প্ররোচনা নয়, হঠাৎ সৈন্যের দল ঘোড়া ছুটিয়ে জমিদারির মধ্যে ঢুকে পড়ত। শিশু-নারী-বৃদ্ধ তাদের অত্যাচারের কাছে কেউ রেহাই পেত না। ধনরত্ন তো ছিনিয়ে নিতই, প্রাণ নিয়ে ছিনিমিনি খেলত।

সেই সময় বাড়ির মেয়েরা এই চোরাকুঠুরিতে আশ্রয় নিত। শিশুরাও। পুরুষরা দেউড়ি পাহারা দিত। প্রাণ দিত।

পাঠানের অত্যাচার থামতে, মোগলের গণ্ডগোল কিছুদিন শুরু হয়েছিল, কিন্তু সে খুব তীব্র নয়। শেষদিকে আরম্ভ হয়েছিল বর্গিদের তাণ্ডব। তখন আবার চোরাকুঠুরির প্রয়োজন হয়েছিল।

তারপর সাত সমুদ্র তেরো নদীর পার থেকে কোম্পানি এল ব্যাবসা করতে। দাঁড়িপাল্লা হাতে এল বটে, কিন্তু নজর মসনদের ওপর।

তবে একটা কথা, দেশে কিছুটা শান্তি ফিরে এল। অহেতুক অত্যাচার বন্ধ হল।

কিন্তু একেবারেই কি বন্ধ হল? ডাকাতের দল উঠল। রঘু ডাকাত, বিশে ডাকাত, কেনারাম, সবশেষে এই কালু সর্দার। মানুষের ত্রাস।

এদের হাত থেকে রক্ষা পাবার কোনও উপায় কোম্পানি করতে পারল না। কোম্পানির লোক নিজেরাই এদের হাতে নাজেহাল হয়ে গেল। রাজনারায়ণ চোখ বন্ধ করলেন।

সকাল থেকে একটা ব্যস্ততার ভাব। অমাবস্যার আগের দিন।

তারার প্রথম নজরে পড়ল। খুব ভোরে উঠে স্নান সেরে কালীর মন্দিরে যায় পূজার আয়োজন করতে। জবা ফুল তুলে মালা গেঁথে রাখে। ধূপ-ধুনো জ্বালায়। তারপর ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে পুরোহিত এসে হাজির হয়।

আবছা অন্ধকারে মন্দিরে যেতে যেতেই তারা লক্ষ করল সদর ফটক দিয়ে পিলপিল করে লোক ঢুকছে। পালপার্বণে যেমন আসে।

চোখ কুঁচকে ভালো করে দেখল, কারো হাতে লাঠি, কারো হাতে টাঙ্গি, কারো বর্শা, কারো বল্লম। সকলেরই খালি গা। কাপড় মালকোঁচা দেওয়া। তারা অবাক হয়ে গেল।

এদিক-ওদিক দৃষ্টি ফেরাতেই দেখতে পেল ওপরের বারান্দায় রাজনারায়ণ দাঁড়িয়ে আছেন।

তারা ঘুরে বাপের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। একদম কাছে নয়। কারণ স্নান সেরে এসেছে, এখন আর ঘরের মধ্যে ঢোকা উচিত হবে না।

বাবা!

কে রে?

আমি তারা।

কী খবর মা? রাজনারায়ণ অপুত্রক। একটিমাত্র সন্তান তারা। স্বামী-স্ত্রী দুজনেই প্রাণ দিয়ে ভালোবাসেন।

তার ওপর আর কিছুদিন পরেই তারা পরের বাড়িতে চলে যাবে। জমিদার সূর্যকান্তবাবুর বাড়ি। এখান থেকে অনেক মাইলের পথ। তখন আর ইচ্ছা করলেই রাজনারায়ণ মেয়েকে দেখতে পাবেন না।

এত লোক এখানে ঢুকছে কেন বাবা? এত ভোরে?

রাজনারায়ণ প্রথমে ভাবলেন, মেয়েকে কিছু একটা মনগড়া কথা বলবেন, যাতে তারা ভয় না পায়। তারপর ভাবলেন, সত্যি কথাটা বলে দেওয়াই ভালো। তাতে মেয়ে মন শক্ত করে নিতে পারে।

রাজনারায়ণ মেয়ের দিকে একটু এগিয়ে কালু সর্দারের চিঠির কথাটা বলে দিলেন। আজ মাঝরাতে যে কালুর আসবার কথা আছে, তাও বললেন।

তারা মন দিয়ে সব শুনল, তারপর বলল, এসব হাঙ্গামা না করলেই তো ভালো ছিল বাবা।

হাঙ্গামা! মেয়ের কথা শুনে রাজনারায়ণ অবাক হয়ে গেলেন।

মিছামিছি হয়তো কতকগুলো প্রাণহানি হবে, তার চেয়ে কালু সর্দার যা চাইছে সেটা তাকে দিয়ে দিলেই হত। অলংকার আর অর্থ।

রাজনারায়ণ একবার তারার দিকে দেখেই অন্যদিকে মুখ ফেরালেন। তারা এমনই মেয়ে। সাজসজ্জার দিকে কোনওদিন ঝোঁক নেই। টাকাপয়সা সম্বন্ধে কোনও কৌতূহল নয়। মায়ের পূজা নিয়েই ব্যস্ত থাকে। পালপার্বণে উৎসবে কোমর বেঁধে প্রজাদের সেবায় মাতে।

দশ বছরের মেয়ে হলে হবে কী, চালচলনে আধবুড়িদের মতন। ধর্মের কথা শুনতে খুব ভালোবাসে। তার মুখেই এমন কথা শোভা পায়।

রাজনারায়ণ আর কিছু বললেন না। দুটো হাত পিছনে রেখে পায়চারি করতে লাগলেন। তারা আস্তে আস্তে সরে গেল বাপের সামনে থেকে।

বিকালবেলা মহামায়া এসে দাঁড়াল। বিবর্ণ, পাংশু মুখ।

আমরা কি চোরাকুঠুরির মধ্যে চলে যাব?

রাজনারায়ণ একটু খুশিই ছিলেন। প্রতিরক্ষাব্যবস্থা খুব পাকা হয়েছে। কালু সর্দার আর তার দল বিশেষ কিছু করতে পারবে এমন ভরসা কম।

জমিদারবাড়ির এলাকা লাঠিয়ালে ঘিরে ফেলেছে। প্রচুর মশালের ব্যবস্থা করা হয়েছে। দরকার হলে সব ক-টা জ্বালিয়ে দেওয়া হবে।

রাজনারায়ণ গাদাবন্দুক হাতে সারারাত বারান্দায় পাহারা দেবেন। সঙ্গে নায়েবও থাকবে।

স্ত্রী-র দিকে মুখ তুলে বললেন, চোরাকুঠুরিতে এখন আশ্রয় নেবার কোনও দরকার নেই। সেরকম অবস্থা হলে আমি তোমাকে বলব। তুমি আর তারা পরিচারিকাদের নিয়ে শোবার ঘরে থেকো। সব জানলা-দরজা বন্ধ করে দিয়ো। চিৎকার-গোলমাল যদি কিছু শোনো, খবরদার বাইরে এসো না।

মহামায়া ঘাড় নেড়ে ভিতরে চলে গেল।

সন্ধ্যার অন্ধকার নামার সঙ্গে সঙ্গে সারা জমিদারবাড়িতে মৃত্যুর স্তব্ধতা নেমে এল। একটা ছুঁচ পড়লেও বুঝি শব্দ শোনা যায়। মানুষের নিশ্বাসের আওয়াজও যেন থেমে গেল।

রাত বাড়ল। প্রহরে প্রহরে শিয়ালের ডাক শোনা গেল। দ্বিপ্রহর পার হয়ে গেল।

ঠিক যে মুহূর্তে বারান্দায় বসে নিশ্চিন্ত নিশ্বাস ফেলে রাজনারায়ণ ভাবলেন, এই প্রথম বোধহয় কালু সর্দার কথা রাখতে পারল না, তখনই পশ্চিমের আকাশ লাল হয়ে উঠল। একটানা অনেকগুলো লোকের চিৎকার ছাপিয়ে হুংকার শোনা গেল, 'বাশুলি মায়িকি জয়!'

রাজনারায়ণ বন্দুক হাতে টান হয়ে দাঁড়ালেন। পাশে নায়েব দাঁড়িয়ে পড়ে ইতস্তত দেখতে লাগল।

নীচে পাইকদের মধ্যে একটা বিশৃঙ্খলা। সবাই ফটকের কাছে এসে জড়ো হল।

একটু পরেই কে একজন খবর আনল, কালু সর্দারের দল নায়েবের ঘরে আগুন লাগিয়ে লুঠপাট শুরু করেছে।

নায়েব ব্যাকুলকণ্ঠে চিৎকার আরম্ভ করল, বাঁচান হুজুর, আমার সর্বনাশ হয়ে গেল। আমার মেয়ে-জামাই কাল রাতে এসেছে। গয়নাগাটি তো রয়েইছে, তা ছাড়া কালু সর্দারের কাছে প্রাণের কোনও দাম নেই। এতক্ষণে বোধহয় সব শেষ করে দিল।

নায়েব দ্রুতপায়ে নীচে নেমে এল। পিছন পিছন রাজনারায়ণ।

নামতে নামতেই রাজনারায়ণ ভাবতে লাগলেন, সবটাই কালু সর্দারের চালাকি। জমিদারবাড়ি আক্রমণ করার ভয় দেখিয়ে নায়েববাড়ি চড়াও হয়েছে। লোকলশকর সব জমিদারবাড়িতে, নায়েবের বাড়ি একেবারে অরক্ষিত। কালু সর্দার সেই সুযোগের সদব্যবহার করতে চায়।

রাজনারায়ণের নির্দেশে পাইকের দল মশাল জ্বালিয়ে নায়েবের বাড়ির দিকে ছুটে গেল। আগে আগে নায়েব পাগলের মতন দু-হাতে বুক চাপড়াতে চাপড়াতে দৌড়োতে লাগল।

ঠিক সেই মুহূর্তে উত্তেজনার মুখে কেউ লক্ষ করল না, ঝাঁকড়া আম গাছের যে ডালগুলো জমিদারবাড়ির ছাদের ওপর ঝুঁকে পড়েছে, সেই ডালগুলো বেয়ে কালো কালো কয়েকটা মূর্তি টুপটুপ করে ছাদের ওপর লাফিয়ে পড়ল।

রাজনারায়ণ নায়েবের বাড়ির অবস্থা পর্যবেক্ষণ করার জন্য ছাদের ওপর উঠলেন। মনে হল আগুন অনেকটা স্তিমিত, হল্লার শব্দও যেন কিছুটা কম।

তিনি যখন দূরের আকাশের দিকে চেয়ে ছিলেন, তখন লক্ষ করলেন না, যে একদল মুখোশ-আঁটা মানুষ নিঃশব্দে সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেল।

যদিও মহামায়াকে নিষেধ করা হয়েছিল, হাজার গোলমালের আওয়াজেও সে যেন ঘর ছেড়ে না বের হয়, কিন্তু আর সে কৌতূহল দমন করতে পারল না।

পা টিপে টিপে চৌকাঠের কাছে এসেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল।

দেয়ালে লাগানো তৈলচিত্রটা ঠেলে কারা যেন চোরাসিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে গেল। আধো-অন্ধকারে মহামায়া তাদের ঠিক চিনতে পারল না।

চিৎকার করতে গেল, কিন্তু তার গলা দিয়ে কোনও স্বর বের হল না। একটু পরেই দেখল লোকগুলো আবার তৈলচিত্র খুলে বেরিয়ে আসছে। মনে হল একজনের বগলে যেন ক্যাশবাক্সের মতন কী একটা রয়েছে।

এবার প্রাণপণে শক্তি সঞ্চয় করে মহামায়া চেঁচিয়ে উঠল, কে?

কোনও উত্তর নেই।

কে তোমরা? আবার মহামায়া চিৎকার করল।

ছায়ামূর্তিগুলো নক্ষত্রবেগে ছাদের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গেল।

এবার মহামায়া বেশ বুঝতে পারল কিছু একটা অঘটন ঘটেছে। ক্যাশবাক্স নিয়ে দুর্বৃত্তরা সরে পড়ার চেষ্টা করছে।

মহামায়া সাহস করে ছাদের সিঁড়ির কাছে এগিয়ে এল। যতটা সম্ভব উচ্চকণ্ঠে চেঁচাতে লাগল, ডাকাত পড়েছে, ডাকাত।

মহামায়ার চিৎকার এইবার ছাদে দাঁড়ানো রাজনারায়ণের কানে গেল।

তিনি ছুটে নামতে লাগলেন। কী হল? কী হল?

মহামায়ার আর চিৎকার করার শক্তি নেই। সেইখানেই দেয়ালে ঠেস দিয়ে বসে পড়ল।

ইচ্ছা করেই সেদিন সব বাতিদানে আলো দেওয়া হয়নি। যাতে কেউ আক্রমণ করলে কোথায় কোন ঘর তার হদিশ না পায়।

অন্ধকার রাত। তবু সেই অন্ধকারে মহামায়ার সাদা শাড়ির কিছুটা রাজনারায়ণের চোখে পড়ল। কে, মহামায়া?

মহামায়ার কণ্ঠ আর-একজনও শুনতে পেয়েছিল। সে ভৈরব। মশাল হাতে ভৈরব ছুটে ওপরে চলে এল।

সেই মশালের আলোতেই রাজনারায়ণ দেখতে পেলেন, তৈলচিত্রটি সরানো। চোরাকুঠুরির দরজা একেবারে খোলা।

দুই

সর্বনাশ, চোরাকুঠুরির দরজা খোলা।

সব ভুলে রাজনারায়ণ চেঁচিয়ে উঠলেন, তারপর উন্মত্তের মতন টলতে টলতে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেলেন।

অল্প কয়েকক্ষণ, তারপরই রাজনারায়ণ আবার ছুটে ওপরে উঠে এলেন।

উসকোখুসকো চুল, আরক্ত চোখ, সমস্ত শরীর থরথরিয়ে কাঁপছে।

আমার সর্বনাশ হয়ে গেছে ভৈরব, চোরাকুঠুরি থেকে ক্যাশবাক্স নিখোঁজ। কালু সর্দার আমার সর্বনাশ করেছে।

ভৈরব আর দাঁড়াল না। হুংকার দিয়ে লাঠি ঘোরাতে ঘোরাতে নীচে নেমে গেল। কয়েকজন পাইক হতবুদ্ধি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ওপরের ঘরের চিৎকারের অর্থ তার ঠিক বুঝতে পারেনি। একটু শব্দ নেই, বাইরের কোনও মানুষ ভিতরে ঢোকেনি, অথচ কীসের এত গোলমাল? হুজুর এভাবে চিৎকার করছেন কেন?

রাজনারায়ণ ছুটে নিজের শোবার ঘরে এলেন। উদ্দেশ্য চাবি দিয়ে লোহার আলমারি খুলে দেখবেন, যাত্রার দলের মেকি গহনাগুলো ঠিক আছে কি না। উত্তেজনার মুহূর্তে তিনি ভুলে গেলেন যে চাবিবন্ধ অবস্থায় ভিতরের জিনিস চুরি যেতে পারে না। কিংবা এও হতে পারে, তিনি ভেবেছিলেন, কালু সর্দারের অসাধ্য কিছু নেই।

কিন্তু আলমারি আর খুলতে হল না, চাবি দিয়ে নিচু হতেই আর্তনাদ করে ছিটকে মেঝের ওপর পড়ে গেলেন।

মহামায়া রাজনারায়ণের পিছন পিছন চৌকাঠ পর্যন্ত এসেছিল, স্বামীকে ওভাবে মেঝের ওপর লুটিয়ে পড়তে দেখে উচ্চরোলে কেঁদে উঠল।

পরিচারিকারা এতক্ষণ ঘরের মধ্যে জড়ো হয়ে বসে মা কালীর নাম জপ করছিল, মহামায়ার কান্না কানে যেতে আর চুপ করে বসে থাকতে পারল না।

প্রথমে বিরজা, পিছন পিছন অন্য পরিচারিকারা ছুটে এল।

ঠিক আলমারির সামনে রাজনারায়ণ উপুড় হয়ে পড়ে আছেন। পিঠের মাঝখানে একটা তির। সারা পিঠ রক্তাক্ত। তিরের পিছনে সাদা একা কাগজ।

পাশে মহামায়া মূর্ছিত হয়ে পড়ে আছে।

সিঁড়িতে অনেকগুলো লোকের পায়ের শব্দ। কলরবও শোনা গেল।

বিরজা এগিয়ে দেখল, নায়েব ওপরে উঠছে। পিছনে কিছু পাইক।

সর্বনাশ হয়েছে নায়েবমশাই। বিরজা কেঁদে উঠল।

কী, কী হয়েছে?

নায়েব ওপরে উঠে এল।

বিরজা কিছু বলল না। আঙুল দিয়ে ঘরের মধ্যে দেখাল।

উঁকি দিয়ে দেখেই নায়েব আর্তস্বরে বলে উঠল, এ কী!

নায়েব ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ল। পাইকরাও ঢুকছিল, কিন্তু ঘরের মধ্যে মহামায়া পড়ে আছে দেখে তারা চৌকাঠের ওপারে থমকে দাঁড়াল।

সাবধানে তিরটা রাজনারায়ণের পিঠ থেকে তুলতে তুলতে নায়েব বলল, তোমাদের একজন শিগগির গিয়ে কবিরাজমশাইকে ডেকে নিয়ে এসো। এখনই যাও, একটু দেরি কোরো না।

তিরটা তুলতেই রাজনারায়ণের পিঠের ক্ষত থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটতে লাগল অবিরাম ধারায়।

নায়েব একটা হাত রাজনারায়ণের নাকের তলায় রাখল। নিশ্বাস-প্রশ্বাস অনুভব করার জন্য।

তার মুখে-চোখে হতাশার ভাব ফুটে উঠল। তারপরই দৃষ্টি পড়ল তিরের ডগার দিকে।

মনে হল একটা চিঠি। লাল কালিতে লেখা। চিঠির কোণের দিকে চোখ যেতেই নায়েব শিউরে উঠল। একটা রক্তাক্ত খাঁড়ার ছবি।

চিঠিটা খুলে নায়েব পড়তে আরম্ভ করল। একমনে।

খুব ছোটো চিঠি। লাইন চারেকের।

সবিনয় নিবেদন,

বাশুলি মায়ের পূজার জন্য সামান্য উপকরণ চাহিয়াছিলাম, আপনি আপনার আচরণে বুঝাইয়া দিয়াছেন যে মায়ের পূজায় কোনওরকম সাহায্য করিতে আপনি অসম্মত। শুধু তাহাই নহে, আপনি আমাদের ভুলাইবার জন্য আসল স্বর্ণালংকারের পরিবর্তে মেকি অলংকার আলমারিতে রাখিয়া দিয়াছেন। যদি সরলতাবশত আমরা ওই মেকি অলংকার মায়ের সম্মুখে নিবেদন করিতাম তাহা হইলে আমাদের সকলকে নরকস্থ হইতে হইত।

মায়ের রোষবহ্নি বিষমুখ তিরের আকার লইয়া আপনার প্রাণহরণ করিল। আপনার কৃতকর্মের ফল আপনি ভোগ করিলেন। আমি নিমিত্তমাত্র।

ইতি

বিনীত

মায়ের একান্ত সেবক— কালু।

চিঠিটা পড়া শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে রাজনারায়ণের দেহটা থরথর করে কেঁপে উঠেই একেবারে নিস্পন্দ হয়ে গেল।

পরিচারিকারা কেউ মহামায়ার মুখে জলের ঝাপটা, কেউ তাকে বাতাস করতে ব্যস্ত ছিল, রাজনারায়ণের শেষ অবস্থা কেউই লক্ষ করল না। আধো অন্ধকারে দেখলেও বিপদের গভীরতা হয়তো উপলব্ধি করতে পারত না।

নায়েব আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল। বুঝতে পারল, আর কিছু করার নেই। রাজনারায়ণ সকল চিকিৎসার বাইরে।

দুটো হাত বুকের কাছে জড়ো করে ভগ্নকণ্ঠে নায়েব বলল, তারা কোথায়? তারা?

নায়েব ভেবেছিল রাজনারায়ণের মৃতদেহের কাছে তারার থাকা দরকার। মহামায়ার যা অবস্থা। তাকে এখান থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়াই উচিত। নয়তো, এই চরম দুঃসংবাদ তার কানে গেলে তার জীবন বিপন্ন হয়ে উঠবে। চেতনা হলেও আবার মূর্ছিত হয়ে পড়বে।

বিরজা উঠে দাঁড়াল। নায়েবের দিকে ফিরে বলল, আমাদের সঙ্গে তারাদিদিমণি ওই ঘরেই তো ছিল। চুপচাপ বসে ছিল। ঘরের মধ্যেই আছে।

জমিদারের নায়েবকে অনেক অপ্রিয় কাজ করতে হয়। অনেক ঝড়ঝাপটা তাকে নিতে হয় মাথা পেতে। নায়েব এগিয়ে ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে ডাকল, তারা, তারা।

কোনও উত্তর নেই।

হঠাৎ ভিতরবাড়িতে ঢোকা সমীচীন হবে না। এত গোলমালে তারা ঘুমিয়ে পড়েছে এমন অসম্ভব কল্পনা কেউ করবে না।

তবে কি মহামায়ার মতন তারাও ভয়ে অচেতন হয়ে পড়েছে?

নায়েব সরে এসে বিরজাকে ডাকল, বিরজা।

বিরজা মহামায়ার কাছ থেকে উঠে নায়েবের সামনে এসে দাঁড়াল।

নায়েব বলল, দেখ তো, তারাকে ডাকছি, সাড়া পাচ্ছি না। তারা কোথায় গেল?

বিরজা ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ল।

সেই সময় ভৈরবও এসে দাঁড়াল। তার এক হাতে জ্বলন্ত মশাল।

মশালের আলোয় অনেকটা জায়গা পরিষ্কার দেখা গেল।

সর্বনাশ হয়েছে নায়েবমশাই, চোরাকুঠুরিতে ক্যাশবাক্স নেই। জমিদারবাবু কোথায়, হুজুরকে এই সর্বনাশের খবরটা দিয়ে আসি।

নায়েব হাত তুলে বারণ করল। একটু দাঁড়াও ভৈরব। অনেক কথা আছে।

ক্যাশবাক্সের কথা রাজনারায়ণ ভৈরবকে বলেছিলেন। চোরাকুঠুরি সতর্কভাবে পাহারা দেওয়ার কথাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন।

বিরজা পাংশু মুখে বেরিয়ে এল। তারা তো ঘরের মধ্যে নেই।

নায়েবের দুটো পা-ই টলমল করে কাঁপতে লাগল। দুঃসংবাদের পর দুঃসংবাদ শুনে শুনে তার উন্মাদ হবার জোগাড়।

ভৈরবকে ডেকে বলল, ভৈরব, তুমি তারাদিদিমণিকে আগে খুঁজে দেখো। সে নিশ্চয় মন্দিরে গেছে।

নায়েবের অনুমান ঠিক। কিন্তু ভৈরব একটু দেরি করে ফেলল।

তারা গোলমাল শুনেই আস্তে আস্তে সকলের অলক্ষে মন্দিরের মধ্যে ঢুকে পড়েছিল। দুটো হাত জোড় করে চোখ বন্ধ করে কালীমূর্তির সামনে বসে ছিল। তারপর কোলাহল একটু কমতে দেয়ালে টাঙানো কালীর একটা পট বুকের মধ্যে চেপে ধরে বাইরে বেরিয়ে এসেছিল।

ছোটো বাগান। বেশির ভাগই ফুলের গাছ। এই বাগানটুকু পার হতে পারলেই অন্তঃপুরে যাবার সিঁড়ি।

তারা সেইদিক লক্ষ করেই এগোচ্ছিল।

হঠাৎ গন্ধরাজের ঝোপটা ভীষণভাবে নড়ে উঠল। তারার মনে হল লোহার মতন শক্ত একটা হাত এসে তার মুখ চেপে ধরল, তারপর অবলীলাক্রমে তাকে কাঁধে ফেলে সেই দৈত্যাকার শক্তি ছুটতে শুরু করল।

কিছুক্ষণ তারার চেতনা ছিল, তার মধ্যেই সে কঠিন হাতে লোকটার চুলের গোছা চেপে ধরেছিল, তারপর একটু একটু করে চেতনা বিলুপ্ত হতে, তার মুঠি আলগা হয়ে এল।

খুব অস্পষ্ট ঘোড়ার খুরের শব্দ কানে এল। গালে একটা মানুষের উত্তপ্ত নিশ্বাস, মাঝে মাঝে ঘামের ধারাও ঝরে পড়ল।

তারপর তারার আর কিছু মনে নেই।

যখন তারার জ্ঞান হল তখন ভোর হয়ে আসছে।

সমস্ত শরীরে অসহ্য যন্ত্রণা, দেহে রীতিমতো উত্তাপ। তারা চোখ মেলেই চমকে উঠল।

অজগর বন। চার কোণে চারটে মশাল পোঁতা। দু-একটা পাখির কাকলির জন্য বোঝা যাচ্ছে ভোর হয়েছে, তা না হলে অরণ্যে এখনও গভীর অন্ধকার।

মাঝখানে মাটির একটা বেদি। তার ওপর দীর্ঘ সবল একটি লোক বসে। তার দু-পাশে বর্শাধারী দুজন শরীররক্ষী। ইতস্তত আরও অনেকে জটলা করছে।

ঘাসের শয্যা। তার ওপর মাদুর পাতা। খড়ের বালিশ।

তারা উঠে বসল। কালীর পট তখনও তার বুকে ঝুলছে। পটটা সে হারের সঙ্গে বেঁধে নিয়েছিল।

তারা বেদির ওপর বসা লোকটার দিকে একবার দেখল, তারপর ক্রুদ্ধকণ্ঠে বলল, কে তোমরা? কেন আমাকে এখানে এভাবে ধরে এনেছ?

লোকটি তীক্ষ্নদৃষ্টিতে একবার তারার আপাদমস্তক দেখল, তারপর মৃদুকণ্ঠে বলল, আমার অনুচর তোমাকে এখানে নিয়ে এসেছে মা! তার জন্য আমি তাকে শাস্তি দিয়েছি। আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাচ্ছি।

তারা আশ্চর্য হয়ে গেল।

এরা যে ডাকাত, এটা যে ডাকাতের আস্তানা সেটা বুঝতে তার কোনও অসুবিধা হয়নি। কিন্তু ডাকাতের কাছ থেকে এমন কোমল কণ্ঠস্বর সে প্রত্যাশা করেনি।

আমি বাড়ি যাব। তারা উঠে দাঁড়াল।

সঙ্গে সঙ্গে সামনের লোকটিও দাঁড়িয়ে উঠল। বলল, মা, তোমার শরীর এখনও ক্লান্ত। এতটা পথ ঘোড়ার পিঠে যাওয়াও তোমার পক্ষে কষ্টকর। তুমি বিশ্রাম করো। কিছু আহার করো। আমি কালু সর্দার, আমি কথা দিচ্ছি, তুমি যেখানে বলবে, আমি নিজে তোমাকে সেখানে পৌঁছে দেব।

এই কালু সর্দার? সারা বাংলার ত্রাস? যার নামে কোম্পানি পর্যন্ত বিচলিত হয়?

তারার বয়স দশ বছর কিন্তু বয়সের অনুপাতে তার বুদ্ধি অনেক প্রখর। সে বুঝতে পারল, যেমন করেই হোক এদের এলাকা থেকে সরে না গেলে নিস্তার নেই।

তাই সে বলল, তোমাদের এখানে কিছু খাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। চুরির জিনিস স্পর্শ করলেও পাপ হয়। তুমি এখনই আমাকে নিয়ে চলো।

পলকের জন্য কালুর দুটি চোখে যেন আগুন জ্বলে উঠল, তারপরই সে সংযত করল নিজেকে। মুখে হাসি ফুটিয়ে শান্তকণ্ঠে বলল, এখানকার গাছে অজস্র ফল আছে। এ গাছ কারো সম্পত্তি নয়। তুমি নিজে ফল পেড়ে না হয় আহার করো। তাতে আশা করি তোমাকে পাপ স্পর্শ করবে না।

না, তারা মাথা নাড়ল, তারপর দৃঢ়স্বরে বলল, আমি একদণ্ড এখানে থাকব না। এখনই আমায় নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করো।

বেশ। কালু এগিয়ে এসে সজোরে হাততালি দিল।

দুজন সশস্ত্র অনুচর এসে সামনে দাঁড়াল।

কালু নিচু গলায় তাদের কী বলল, তারপর তারার দিকে চেয়ে বলল, এসো মা।

একটু দূরে একটা বট গাছের ডালে একটা ঘোড়া বাঁধা ছিল। তার কাছে এসে কালু বলল, ছোটো ঘোড়া, তোমার উঠতে কোনও অসুবিধা হবে না। আমি তোমার পাশে পাশেই রইলাম। কোনও ভয় নেই।

ভয় যে তারার একেবারে হয়নি, তা নয়, কিন্তু কালুর সামনে কোনওরকম দুর্বলতা প্রকাশ করল না।

বট গাছের নিচু ডালে পা রেখে আস্তে আস্তে ঘোড়ার পিঠে উঠে পড়ল। শক্ত হাতে লাগাম ধরতেই ঘোড়াটা ঠুক ঠুক করে এগিয়ে চলল। পাশে পাশে কালু সর্দার।

তোমার সঙ্গে আমার এক জায়গায় কিন্তু খুব মিল আছে তারা। কালু সর্দার বলল।

বিস্মিত তারা প্রশ্ন করল, তুমি, আমার নাম জানলে কী করে?

কালু হাসল, বলল, তুমি-আমি দুজনেই মা কালীর ভক্ত।

তারা ভ্রূকুঞ্চিত করে কালুর দিকে চেয়ে বলল, আমি তোমার মতন নিরীহ মানুষদের ওপর অত্যাচার করি না। খুন করি না তাদের।

কালু একটু বিচলিত হল। সব ঘটনাটা মনে মনে একবার স্মরণ করার চেষ্টা করল।

কালু যখন পাতার আড়ালে আম গাছের ডালে তির নিক্ষেপ করার জন্য অপেক্ষা করছিল, তখনই লক্ষ করেছে, তারা ছুটে মন্দিরের মধ্যে গিয়ে ঢুকল। তারপর রাজনারায়ণের দেহে বিষাক্ত তির নিক্ষেপ করে অন্ধকারের সুযোগে মন্দিরের সামনে দিয়ে কালু যখন দৌড়ে পালাচ্ছিল, তখনও লক্ষ করেছে মন্দিরের দরজা বন্ধ।

তার অনেক পরে অনুচর ফটিক তারাকে হরণ করে নিয়ে এসেছে। তার জন্য ফটিককে অবশ্য শাস্তিও পেতে হয়েছে।

চাবুকের ঘায়ে তার সর্বশরীর রক্তাক্ত হয়ে গেছে। অন্তত সাত দিন সে উঠে দাঁড়াতে পারবে না।

নারী, শিশু, গাভীকে স্পর্শ করা বা আঘাত করা কালু সর্দারের নিষেধ।

তারার কথার কালু কোনও উত্তর দিল না। ঘোড়ার পাশে পাশে চলতে লাগল।

পায়ে-চলা পথ। মাঝে মাঝে গাছপালার জন্য তারাকে মাথা নিচু করতে হল। যাতে গাছের ডাল মাথায় না লেগে যায়।

একেবারে বনের প্রান্তে এসে কালু থামল। তারাকেও থামাল।

বলল, আমি আর জঙ্গলের বাইরে যাব না। তুমি চলে যাও। একটু গিয়েই একটা দোকান পাবে, সেখানে আমার লোক থাকবে। যদি আমার লোক না পৌঁছে থাকে, তুমি একটু অপেক্ষা করো। লোক দুজন পৌঁছে যাবে।

তারা খুব সাবধানে ঘোড়া থেকে নেমে পড়ল। কালু ঘোড়ার লাগাম চেপে ধরে রইল।

তারা বন থেকে বেরিয়ে চলতে আরম্ভ করল।

পরিশ্রমে আর মানসিক দুশ্চিন্তায় তারার শরীর খুবই দুর্বল হয়ে পড়েছে। সে খুব ধীরপায়ে হাঁটতে লাগল।

যেখানে বন শেষ হয়েছে সেখানেই একটা মুদির দোকান। দোকানে কোনও লোক নেই, শুধু মুদি বসে বসে হাতপাখা দিয়ে বাতাস করছে।

তারা গিয়ে সামনের বেঞ্চে বসল।

মুদি হাতপাখা থামিয়ে অবাক হয়ে চেয়ে দেখল।

জমিদারের মেয়েকে তার দেখার সুযোগ হয়নি, কারণ পালপার্বণ ছাড়া তারা কোনওদিনই প্রজাদের সামনে আসেনি। মুদি অন্তত তাকে কোনওদিন দেখেনি।

তবে তারাকে জঙ্গল থেকে এভাবে বের হতে দেখেই অবাক হল বেশি। তারা যে বড়ো ঘরের মেয়ে সেটা বুঝতে তার দেরি হল না। এত বড়ো বাড়ির মেয়ে এভাবে পথেঘাটে বের হয় না।

মুদি কিছু জিজ্ঞাসা করার আগে তারাই বলল, একটু জল খাব।

মুদি শশব্যস্ত হয়ে মাটির গেলাসে জল আর শালপাতায় দুটো বাতাসা দিল।

তারা বাতাসা ছুঁল না, ঢকঢক করে জল খেল।

তুমি কোথায় যাচ্ছ মা? এলেই বা কোথা থেকে?

মুদির কথার উত্তর দিতে গিয়েই তারা থেমে গেল।

গৌর হে, কৃপা করো! মৃদু খঞ্জনির শব্দ। মুখে গান।

তারা পিছন ফিরে দেখল, দুটি বৈষ্ণব এসে দাঁড়িয়েছে। নাকে তিলক, কপালে ফোঁটা, গায়ে নামাবলি। একজনের হাতে খঞ্জনি, আর-একজনের গলায় ঝোলানো মৃদঙ্গ।

কই হে, গৌরাঙ্গর সেবার জন্য কিছু দাও।

মুদি হাতপাখা রেখে উঠে পড়ল। পাশের দরমার দরজা খুলে বাইরে চলে গেল।

মুদি সরে যেতেই, একজন বৈষ্ণব তারার কাছে এসে দাঁড়াল।

মৃদুকণ্ঠে বলল, আমরা কালু সর্দারের লোক। চলো, তোমাকে জমিদারবাড়ি রেখে আসি। সর্দার তা-ই বলে দিয়েছে।

তারা একদৃষ্টে কিছুক্ষণ দুজনের দিকে চেয়ে দেখলে, তারপর উঠে দাঁড়াল।

আর-একজন বৈষ্ণব বলল, দাঁড়াও, মুদির কাছ থেকে ভিক্ষাটা নিই আগে।

কথার সঙ্গে সঙ্গেই মুদি একটা মাটির সরায় চাল, আলু আর পটোল নিয়ে এসে দাঁড়াল।

কই, এসো বাছা, এগিয়ে এসো।

একজন বৈষ্ণব থলির মধ্যে ভিক্ষার জিনিসগুলো নিল। তারপর তারার দিকে চেয়ে বলল, তুমিও তো জমিদারবাড়ির দিকে যাবে বলছিলে? চলো তাহলে।

তারা উঠে দাঁড়াল। বৈষ্ণব দুজন আগে আগে, একটু ব্যবধান রেখে তারা তাদের অনুসরণ করল।

তিন

জমিদারবাড়ির কাছাকাছি যখন তিনজনে এসে পৌঁছল, তখন রোদ বেশ চড়া। ফটকের সামনে নায়েব দাঁড়িয়ে রয়েছে। তার কাছে দাঁড়িয়ে জমিদারবাড়ির পুরোহিত পঞ্চানন তর্কতীর্থ।

একটা ঝাঁকড়া বট গাছের নীচে বৈষ্ণব দুজন দাঁড়িয়ে পড়ল।

তারাকে বলল, যাও, তুমি চলে যাও। আমরা আর এগোব না। আমরা এখানে দাঁড়িয়ে রয়েছি, তুমি ফটকের মধ্যে ঢুকলে আমরা ফিরে যাব। সর্দারের তা-ই নির্দেশ।

তারা কোনও উত্তর দিল না। উত্তর দেবার মতন মনের অবস্থা তার ছিল না। সে ফটকের দিকে এগিয়ে গেল।

নায়েবের কাছাকাছি যেতেই নায়েব চমকে উঠল। মানুষ ভূত দেখে যেমন চমকায়, ঠিক তেমনই। আমি এসেছি নায়েবকাকা।

নায়েব তারার কথার কোনও উত্তর দিল না। ফিসফিস করে পুরোহিতের সঙ্গে কী আলোচনা করল, তারপর তারা আর-একটু এগোতেই দুটো হাত প্রসারিত করে তাকে বাধা দিল। তারা, দাঁড়াও।

তারা থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল।

তোমাকে ডাকাতরা হরণ করে নিয়ে গিয়েছিল, তুমি তো এ বাড়িতে আর ঢুকতে পারবে না। তোমাকে বাড়িতে স্থান দিলে আমরা সবাই সমাজে পতিত হব।

এমন কথা তারা আশাও করেনি। সব ভুলে সে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।

তাহলে আমি কোথায় যাব নায়েবকাকা? তা ছাড়া আমাকে যে ডাকাতে চুরি করে নিয়ে গিয়েছিল, সে কি আমার দোষ? এত পাইক-বরকন্দাজ রেখেও তো তোমরা আমাকে বাঁচাতে পারলে না।

নায়েব এসব কথার কোনও উত্তর দিল না। হয়তো এসব কথার উত্তর তার জানা নেই। একটু পিছিয়ে লোহার ফটকটা সজোরে বন্ধ করে দিল।

মুখে আঁচল চাপা দিয়ে এবার তারা বেশ জোরেই কেঁদে উঠল।

তোমার পায়ে পড়ি নায়েবকাকা, আমাকে ঢুকতে দাও। নইলে পথে পথে আমি কোথায় ঘুরে বেড়াব? কে আমায় আশ্রয় দেবে? আমি বাবা আর মা-র সঙ্গে একবার দেখা করতে চাই।

এবার পুরোহিত কথা বলল। রুক্ষ, কর্কশ কণ্ঠস্বর।

জমিদারমশাই ডাকাতদের হাতে প্রাণ দিয়েছেন। তোমার জাত গিয়েছে। এ বাড়িতে তোমার ঠাঁই হতে পারে না।

বাবা নেই?

তারা পথের ধুলার ওপর লুটিয়ে পড়ে কাঁদতে লাগল। অনেকক্ষণ পরে যখন চোখ মুছে উঠে দাঁড়াল দেখল সামনে কেউ নেই। লোহার কঠিন ফটকটা পথরোধ করে রয়েছে। অনেক দূরে কয়েকজন প্রজা দাঁড়িয়ে রয়েছে। জাত-হারানো মেয়ের কাছে আসার সাহস তাদের নেই।

কাপড় দিয়ে তারা ঘষে ঘষে চোখের জল মুছে ফেলল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাড়িটার দিকে একবার চেয়ে দেখল। সব জানলা-দরজা বন্ধ। কোথাও কোনও প্রাণের চিহ্ন নেই।

ঠিক আছে, ঠিক আছে।

মনে মনে বিড়বিড় করে তারা ঘুরে দাঁড়াল। তারপর জোরে জোরে পা ফেলে যেদিক থেকে এসেছিল, সেইদিকেই চলতে শুরু করল।

কোথায় চলেছে তা সে নিজেই জানে না। বার বার চোখের জলে সামনের পথ ঝাপসা হয়ে গেল। আঁচল দিয়ে চোখ মুছে সে চলার গতি আরও দ্রুত করল। কোনও কিছু চিন্তা করার শক্তি তার নেই, শুধু এইটুকু বুঝতে পারল, নিজের গাঁয়ে, নিজের বাড়িতে তার স্থান নেই। সম্পূর্ণ বিনা দোষে।

তারা। তারা। তারা চমকে ফিরে দেখল।

বট গাছের তলায় সেই বৈষ্ণব দুজন তখনও বসে রয়েছে। তাদের একজন তারাকে ডাকছে।

তারা তাদের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

এখন কোথায় যাবে?

জানি না।

তারা মাথা হেঁট করল।

বৈষ্ণব দুজন উঠে দাঁড়াল। চলো আমাদের সঙ্গে।

কোথায়?

সর্দারের কাছে। ভ্রূ কুঁচকে তারা চেয়ে রইল।

এমন যে হবে সর্দার জানত। সেইজন্যই আমাদের অপেক্ষা করতে বলেছিল। তোমাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবার জন্য।

তারা কোনও প্রতিবাদ করল না। বুঝল প্রতিবাদ করে লাভ নেই। এ গাঁয়ে কেউ তাকে আশ্রয় দেবে না। দেখাই যাক ডাকাতের সর্দার কী বলে। কী ব্যবস্থা করে তার জন্য।

জঙ্গলের মধ্যে বেশ কিছুটা যাওয়ার পর দেখল একটা পাকুড় গাছের নিচু ডালে একটা ঘোড়া বাঁধা। যে ঘোড়ার পিঠে চড়ে তারা জঙ্গলের বাইরে এসেছিল, সেই ঘোড়া।

তার মানে, তারার ফেরার সমস্ত বন্দোবস্ত সর্দার করে রেখেছে।

ঘোড়ায় চড়তে গিয়েই কথাটা তারার মনে পড়ে গেল। সে সরে দাঁড়িয়ে বলল, না, আমি তোমাদের সঙ্গে যাব না।

কেন?

তোমরা আমার বাবাকে মেরে ফেলেছ। পিতৃহন্তার আশ্রয়ে আমার প্রয়োজন নেই।

ততক্ষণে বৈষ্ণব দুজন তাদের ফোঁটা তিলক মুছে ফেলেছে। পোশাক বদলেছে। ডাকাতের অনুচর বলে এবার চেনা যাচ্ছে।

একজন গম্ভীরকণ্ঠে বলল, সব কথা সর্দারের কাছে শুনতে পাবে। চলো।

তারার আর কোনও কথা বলার সাহস হল না। আস্তে আস্তে ঘোড়ার পিঠে চড়ে বসল।

পথে একটিও কথা হল না। কথা বলার ইচ্ছাও তারার হল না। সারাক্ষণ কেবল বাপের মুখ মনের মধ্যে ভাসতে লাগল। মা-র অসহায় অবস্থা।

অনেকক্ষণ পর ক্লান্তিতে, পরিশ্রমে যখন তারার দুটো চোখ বুজে এসেছে তখন শাঁখ-ঘণ্টার আওয়াজে সে সোজা হয়ে বসল।

ঘোড়ার দু-পাশে দুজন অনুচর চলেছে।

তারা জিজ্ঞাসা করল, কী হচ্ছে?

মা-র পুজো।

একটু এগিয়ে তারাকে ঘোড়া থেকে নামানো হল।

সামনেই মন্দির। শাঁখ-ঘণ্টার শব্দ সেখান থেকেই আসছে।

মন্দিরের চাতালে গিয়ে তারা দাঁড়াল।

বিরাট বাশুলিমূর্তি। লোলরসনা। হাতে খর্পর।

সামনে রক্তাম্বর পরে কালু সর্দার পূজা করছে। দু-পাশে অনুচররা, কেউ চামর দোলাচ্ছে, কেউ শাঁখ, ঘণ্টা, কাঁসর বাজাচ্ছে।

দু-হাত জোড় করে প্রণাম করে তারা মন্দিরের চাতালে উঠতে গিয়েই বাধা পেল।

একজন অনুচর সামনে এসে দাঁড়াল।

মন্দিরে যেয়ো না।

কেন?

তুমি অস্নাত। তা ছাড়া তোমার এখন অশৌচ।

অশৌচ কথাটা কানে যেতেই তারার বুকটা আবার যন্ত্রণায় মোচড় দিয়ে উঠল। আঁচল দিয়ে দুটো চোখ চেপে তারা আস্তে আস্তে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এল।

অনুচরের নির্দেশে পুকুরে স্নান সেরে তারা ফলমূল আহার করে নিল। ছোটো একটা পর্ণকুটিরে তার থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল। শয্যায় শোয়ামাত্র তার চোখে গভীর ঘুম নেমে এল।

কতক্ষণ ঘুমিয়েছিল তারার খেয়াল নেই, হঠাৎ কানে অস্পষ্ট একটা কণ্ঠস্বর যেতেই সে ধড়মড় করে উঠে পড়ল।

উঠে বসতে কণ্ঠস্বর আরও স্পষ্ট হল। আরও গম্ভীর।

মা, মা।

কুটিরের দরজায় দাঁড়িয়ে কে ডাকছে। কিন্তু তারাকে এমন সম্বোধন কে করবে?

তারা দরজার কাছে গিয়েই দাঁড়িয়ে পড়ল।

কালু সর্দার দাঁড়িয়ে রয়েছে। পরনে রক্তাম্বর। কপালে প্রকাণ্ড সিঁদুরের টিপ। হাতে মোটা লাঠি।

তুমি আমায় ডেকেছ মা? আমি এতক্ষণ পূজায় ব্যস্ত ছিলাম।

কিছুক্ষণ তারা কোনও কথা বলতে পারল না। কালু সর্দারকে কখন ডেকেছে মনে করতে লাগল।

মনে করতে করতেই তারার মুখ-চোখ আরক্তিম হয়ে উঠল।

বলল, তোমরা আমার বাবাকে মেরে ফেলেছ?

মানুষ মানুষকে মারতে পারে না তারা-মা। আমরা উপলক্ষমাত্র। নিজের অন্যায়ের জন্যই তোমার বাবা নিজের বিপদ ডেকে এনেছিলেন। নিজের চরম বিপদ।

নিজের অন্যায়ের জন্য? তারা বিস্মিত হল।

হ্যাঁ, দেব-দেবীর সঙ্গে ছলনা করা পাপ, অন্যায়।

তারা চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। কথাগুলো ঠিক বুঝতে পারল না।

কালু সর্দারের কণ্ঠ এবার আরও গম্ভীর।

মায়ের পূজার জন্য তোমার বাবার কাছে অর্থ আর অলংকার সাহায্য চাওয়া হয়েছিল। তিনি অর্থ লুকিয়ে ফেলেছিলেন। স্বর্ণালংকার সরিয়ে সেই জায়গায় মেকি অলংকার রেখে দেবীকে বঞ্চনা করার চেষ্টা করেছিলেন। প্রবঞ্চনা আর অন্যায়ের শাস্তি মৃত্যু। সেই মৃত্যুই তাঁকে গ্রহণ করতে হয়েছিল। যাক মা, আসল কথাটা শোনো।

কথাটা বলবার আগে কালু তীক্ষ্ন দৃষ্টি দিয়ে তারার আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করল, তারপর বলল, তোমার কথা আমি সব শুনেছি। এমন ব্যাপার যে হবে সেটা আমি আগেই অনুমান করেছিলাম। হিন্দুসমাজ শুধু বাইরের কাঠামোটা আঁকড়ে ধরে আছে। ভিতরে কোনও সারবস্তু নেই। মানুষকে রক্ষা করার ক্ষমতা নেই, অথচ তাকে বর্জন করতে একটুও দ্বিধা করে না। এ ভালোই হয়েছে মা। কালুর মা নেই। আমার একজন মায়ের প্রয়োজন ছিল। সমস্ত রাত পরিশ্রম করে এসে একজনের কাছে বিশ্রাম করার জন্য। তুমি এখানে থাকো, আমার মা হয়ে। দেখবে, বাইরের লোক তোমার ছেলের যতটা বদনাম করে, আমি ততটা খারাপ নই।

এরপর কালু এক আশ্চর্য কাণ্ড করল।

লাঠিটা পাশে রেখে তারার পায়ের কাছে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করল।

সমস্ত ব্যাপারটা বুঝতে তারা বেশ সময় নিল। এত বড়ো ডাকাত— সারাটা এলাকা যার নামে থরথরিয়ে কাঁপে, সে এভাবে তাকে প্রণাম করল! নিজের লোক বিনা অপরাধে তাকে তাড়িয়ে দিল বাড়ির দরজা থেকে, আর নিঃসম্পর্কীয় এই দস্যু এমনভাবে তাকে নিজের কাছে টেনে নিতে চাইছে।

শুধু আশ্রয় দেওয়া নয়, নিজেকে নিবেদন করছে তার পায়ের তলায়।

কালু সর্দার উঠে দাঁড়াল। লাঠিটা কুড়িয়ে নিয়ে বলল, এসো মা, আজ থেকে তুমি আমার কাছে থাকবে। মা-ব্যাটা একঠাঁই থাকব। আমি যখন তোমার ছেলে, তখন গোটা দলেরই তুমি মা। এসো আমার সঙ্গে।

কালু আগে আগে, তারা তাকে অনুসরণ করল।

অরণ্যের আরও অন্ধকারে পাশাপাশি দুটি কুটির। মাটির দেয়াল। খড়ের চাল।

সেই কুটিরের সামনে এসে কালু থামল।

এই আমার আস্তানা মা। এখন থেকে আমরা দুজনে এখানে থাকব।

কুটিরের সামনে দুজন অনুচর বর্শা হাতে পায়চারি করছিল, কালুকে দেখেই অভিবাদন করে স্থির হয়ে দাঁড়াল।

আজ থেকে মা আমার কাছে থাকবে। এদিকের এই কুটিরে তার থাকার ব্যবস্থা করে দাও।

অনুচর দুজন সেখান থেকে সরে গেল।

কালু তারাকে সঙ্গে নিয়ে এদিকের কুটিরে ঢুকল।

দেয়ালের গায়ে বিরাট একটা কালীর পট। গোটা দুয়েক জলচৌকি। একটা কাঠের আলনা। এদিকে নিচু তক্তপোশে একটা বিছানা। বিছানার ওপর বাঘের ছাল পাতা।

মা। কালু তারার দিকে ফিরে বলল।

বলো।

সকাল থেকে আমি অভুক্ত। ওই পাশে আমার খাবার রয়েছে। আসন করে দাও।

তারা আসন পেতে দিল। কোণের মাটির হাঁড়ি থেকে জল গড়িয়ে গ্লাসে রাখল। এদিক-ওদিক চোখ ফেরাতেই নজরে পড়ল কলাপাতা-ঢাকা একটা থালা।

সাবধানে থালাটা তুলে তারা আসনের সামনে রাখল।

কলাপাতা সরিয়েই দেখল ফলমূল সাজানো।

তুমি এই অবেলায় শুধু ফলমূল খাবে?

আজ রাত্রে কাজে বের হতে হবে, সেইজন্যই পুজোর এত ঘটা। যেরাতে কাজে বের হই, সেদিন ফলমূল ছাড়া কিছু খাই না।

কালু খেতে বসতেই বাইরে থেকে একটা অনুচর এসে পাখা নেড়ে বাতাস করতে লাগল।

দু-এক মুহূর্ত। তারপরই তারা তার হাত থেকে পাখাটা চেয়ে নিল।

পাখাটা আমায় দাও। আমি বাতাস করছি।

অনুচর একটু দ্বিধাগ্রস্তভাবে কালুর দিকে দেখল, তারপর কালু ইঙ্গিত করতে পাখাটা তারার হাতে দিয়ে আস্তে আস্তে বাইরে চলে গেল।

তারা বাতাস করতে লাগল।

একটু পরেই কালু বলল, থাক মা, আর বাতাস করার প্রয়োজন নেই। তুমি এমনিতেই আজ ক্লান্ত। যাও, পাশের কুটিরে গিয়ে বিশ্রাম করো।

তারা সত্যিই খুব পরিশ্রান্ত বোধ করছিল। পাখাটা রেখে দিয়ে পাশের কুটিরে চলে গেল।

কুটিরের মধ্যে ঢুকেই অবাক হয়ে গেল।

একপাশে তক্তপোশে বিছানা পাতা। আলনায় সার সার নতুন শাড়ি আর শেমিজ। কুটিরের দেয়ালে ছোটো একটি কালীর পট। যেটা তারা নিয়ে এসেছিল।

যে অনুচরটি কুটিরের দরজায় পাহারায় ছিল সে তারাকে বলল, তুমি নিশ্চিন্তে শুয়ে পড়ো। আমি দরজায় রইলাম। আমার নাম দিনু। কোনও দরকার হলে আমাকে ডেকো।

তারা বিছানায় শুয়ে পড়ল। ভেবেছিল শোবার সঙ্গে সঙ্গেই চোখের পাতায় ঘুম নেমে আসবে, কিন্তু ঘুম এল না, পরিবর্তে রাজ্যের চিন্তা এসে তাকে ঘিরে ধরল।

এ কী করছে সে? মা বলে ডেকেছে বলেই পিতৃঘাতীদের দলে মিশে গেছে! তাদের সেবা করছে, তদবির-তদারক।

পরমুহূর্তেই মনে হল, এ ছাড়া সে কী-ই বা করতে পারত? বাবা নেই। থাকলেও সমাজের বিধানের কাছে বাবা অসহায়। তারাকে বাড়িতে ফিরিয়ে নেওয়া তাঁর পক্ষেও সম্ভব হত না। বাবা নেই, মা-র অবস্থা তো আরও করুণ। পুরোহিত যে নির্দেশ দেবে সেটা তাকে মানতেই হবে।

জোর করে জমিদারবাড়িতে তারাকে স্থান দিলে প্রজারা খেপে উঠবে।

কাজেই তারার একমাত্র আশ্রয় এই অরণ্য। নির্ভর অরণ্যের চেয়েও ভয়ংকর এই মানুষের দল। একবার যখন এদের কবলে এসেছে তখন পালাবার পথও বন্ধ। একটু সন্দেহ হলেই এরা রেহাই দেবে না।

কতক্ষণ তারা ঘুমিয়েছিল খেয়াল নেই, দারুণ একটা কোলাহলে তার ঘুম ভেঙে গেল।

ঠিক কুটিরের বাইরে প্রচণ্ড চিৎকার। বাশুলি মায়িকি জয়।

তারার বুকটা কেঁপে উঠল। কিছু বলা যায় না। পরিচারিকাদের কাছে শুনেছিল, কালু সর্দার কালীর কাছে নরবলি দেয়। তারাকে এত তোয়াজ করে এখানে রাখার উদ্দেশ্যই হয়তো তাকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে গিয়ে বলি দেবে। মন্দিরের সামনে একজোড়া হাড়িকাঠ সে দেখেছে।

মা। মা।

সব কোলাহল ছাপিয়ে কালুর বজ্রকণ্ঠ শোনা গেল।

তারা তক্তপোশ থেকে নামল। কুটিরের মধ্যে চুপচাপ বসে থাকলেই যে সে বাঁচতে পারবে এমন ভরসা কম। ওরা ঘরের মধ্যে ঢুকে টানতে টানতে ওকে বের করে নিয়ে যাবে।

দরজার কাছে গিয়েই দেখল বাইরেটা মশালের আলোয় উজ্জ্বল। একটা নয়, অনেকগুলো মশাল জ্বলছে।

সেই আলোতে তারা দেখল দেয়ালে টাঙানো কালীর পট।

পটটা খুলে বুকে চেপে নিল।

মনে পড়ে গেল, গতকাল বিপদের সময় এমনইভাবে কালীর পট বুকে চেপে ধরেছিল, কিন্তু বাঁচতে পারেনি। ডাকাতের হাতে ধরা পড়েছিল।

তা পড়ুক, তবু বিপদের সময় মায়ের সান্নিধ্য সে ছাড়তে পারবে না। যদি মৃত্যু আসে, যদি এরা তাকে টেনে নিয়ে মায়ের মন্দিরে বলি দেয়, তাহলে কালীর এই পট বুকে জড়িয়েই সে মরবে।

মা, মা। আবার কালু সর্দারের কণ্ঠ। এবার আরও উদবিগ্ন।

তারা বুঝতে পারল সে বাইরে না এলে কালুই ভিতরে ঢুকবে।

কালীর নাম জপ করতে করতে তারা দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

অনেক মশালের আলোয় পরিষ্কার দেখা গেল তারাকে। উসকোখুসকো চুল বাতাসে উড়ছে। বিস্ফারিত দুটি চোখ। ঠোঁট দুটো থরথরিয়ে কাঁপছে। বুকে দুলছে কালীর পট।

তারা মায়িকি জয়।

প্রথমে কালুর গলা, তারপর পিছনে দাঁড়ানো সমস্ত অনুচর তার কণ্ঠে কণ্ঠ মেলাল।

কালু সর্দার হাঁটু মুড়ে বসল। সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত অনুচরবৃন্দ।

মায়ের কাজে বের হচ্ছি মা। তোমার আশীর্বাদের জন্য এসেছি।

তারার চাঞ্চল্যের অবসান হল। তাহলে এরা তাকে ধরতে আসেনি। কোথায় ডাকাতি করতে যাবে তাই আশীর্বাদ ভিক্ষা করতে এসেছে।

কোথা থেকে কী হল তারা নিজেই জানে না। নিজের ডান হাত প্রসারিত করে সে কালুর মাথার ওপর রাখল।

সঙ্গে সঙ্গে অনুচরেরা আবার জয়ধ্বনি করে উঠল।

যতক্ষণ না শেষ ডাকাত অরণ্যের অন্ধকারে মিলিয়ে গেল, ততক্ষণ তারা চুপচাপ দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। বোধহয় একটু দূরে কোথাও অনেকগুলো ঘোড়া রাখা ছিল, কারণ একটু পরেই সম্মিলিত ঘোড়ার খুরের শব্দ শোনা গেল।

সব শব্দ মিলিয়ে যেতে তারা চোখ ফেরাল। দেখল বর্শা হাতে অনুচরটি পাশে দাঁড়িয়ে আছে।

দিনু।

মা।

এরা কোথায় গেল ডাকাতি করতে?

তা তো জানি না মা। সর্দার, আর দু-একজন চাঁই ছাড়া কেউ জানে না।

একটু চুপ করে থেকে অনুচর আবার বলল। তোমার খাবার সময় হলে বোলো, খাবার এনে দেব।

কোনও উত্তর না দিয়ে তারা কুটিরের মধ্যে ঢুকল। একটু পরেই ছোটো একটা ছেলে এসে পিলসুজের প্রদীপটা জ্বালিয়ে দিয়ে গেল।

বাইরে ঘন অন্ধকার। মাঝে মাঝে জোনাকির ঝাঁক দেখা যাচ্ছে। কুটিরের মধ্যে সামান্য আলো। সেই আলোটিকে সম্বল করে তারা দেয়ালে হেলান দিয়ে চুপচাপ বসল।

প্রত্যেক রাতে এরা এমনই ডাকাতি করতে বেরিয়ে যাবে। ডাকাতি করতে বেরোনো মানেই একজনের সর্বনাশ করা। মানুষ খুনজখম করবে, টাকাপয়সা লুঠ করবে, তারার মতন এমনই কত লোকের চরম বিপদ হবে।

এমন একটা আসন্ন সর্বনাশকে তারা কী করে নির্বিবাদে আশীর্বাদ করল? এতক্ষণ পরে তারার খেয়াল হল, তার বুকে তখনও কালীর পটটা ঝুলছে।

পটটা তারা আস্তে আস্তে খুলে ফেলল। চোখের সামনে রেখে নিরীক্ষণ করে দেখল। ভীষণদর্শনা মূর্তি নয়, দুটি চোখে যেন প্রচ্ছন্ন হাসির আভাস।

চার

দিন তিন-চার পরে আবার কালু এসে তারার দরজায় দাঁড়াল।

মা।

জানলায় মাথা রেখে তারা চুপচাপ বসে ছিল। তার ধারণা ছিল এ অঞ্চলে কেবল বুঝি পুরুষের দলই আছে। মেয়ে সে একলাই। কিন্তু আগের দিন আধবুড়ি একজন তার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে।

বলেছে, আমাকে কালু তোমার কাছে পাঠিয়ে দিলে।

তার কথায় তারা একটু আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিল। এখানে কেউ অমনভাবে নাম ধরে ডাকে না। সবাই বলে সর্দার।

আমার কাছে?

হ্যাঁ, আমি তোমার কাছে থাকব। দেখাশোনা করব।

তারার ভালো লেগেছে। তবু কথা বলবার একজন লোক পাওয়া গেল। এভাবে দিনের পর দিন মুখ বুজে থাকতে পারছিল না।

বুড়ির নাম সুখদা। সে এসেই তারার খুব যত্ন করতে আরম্ভ করেছে। চুলের জট ছাড়িয়ে চুল আঁচড়ে দিয়েছে। গায়ে খড়ি উঠছিল, ভালো করে তেল মাখিয়ে দিয়েছে। বসে বসে অনেক গল্প করেছে।

সেই সময় বলেছে। সুখদা কালুর মাসি। কালুর যখন মা মারা যায় তখন কালুর বয়স বছর চারেক। ভালো করে কিছু বুঝতেই পারেনি। বাপ যখন গেল, তখন কালু দশ বছরের। অনেক টাকা খাজনা বাকি ছিল, জমিদারের পাইক এসে মড়া আটকাল।

যত জিনিসপত্র টেনে টেনে বের করে উঠানে ফেলে দিল। যেসব লোক দাহ করার জন্য এসে জড়ো হয়েছিল, তাদের গালাগালি দিয়ে সরিয়ে দিল। কালু চুপচাপ দাওয়ার ওপর বসে দেখছিল। তারপর যখন একজন পাইক পা দিয়ে তার বাবার দেহটা নাড়িয়ে দিয়ে বলেছিল, ব্যাটা সত্যি মরেছে তো, না খাজনার ভয়ে মটকা মেরে পড়ে আছে, তখন সে আর চুপ করে থাকতে পারেনি।

ঘরের কোণ থেকে লাঠি তুলে নিয়ে পাইকদের এলোপাথাড়ি মারতে আরম্ভ করেছিল। কিন্তু যমদূতের মতন পাইকদের সঙ্গে ওইটুকু ছেলে আর কতক্ষণ লড়বে। আধমরা কালুকে টানতে টানতে পাইকরা জমিদারবাড়ি নিয়ে গিয়েছিল। তারপর থামে বেঁধে কী প্রচণ্ড মার। চোখে দেখা যায় না। চামড়া কেটে রক্ত গড়িয়ে পড়েছিল।

সন্ধ্যার দিকে আমিই কোলে করে কালুকে বাড়ি নিয়ে এসেছিলাম। সারা গায়ে ব্যথা। নড়াচড়া করতে পারে না। ছেলে জ্বরে বেহুঁশ। বাড়িঘর-জমিজমা সব জমিদারের কবলে, তাই কালুকে আমার বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলাম।

সেরে উঠেই কালু রুখে দাঁড়াল।

আমাকে বলল, দেখো মাসি, এ অত্যাচারের প্রতিশোধ আমি নেবই। জমিদারকে ঠিক অমনি করে গাছে বেঁধে আমি চাবকাব।

তারপর কালু নিখোঁজ। কোথাও তার আর সন্ধান পাওয়া যায়নি। পনেরো বছর পরে এক অন্ধকার রাত্রে কালু যখন আমার সামনে এসে দাঁড়াল, তখন সে কালু ডাকাত। তার নামে জমিদাররা থরথর করে কাঁপে।

কালু আমাকে এখানে নিয়ে এসে প্রথমেই মায়ের মন্দিরের সামনের বাজ-পড়া তাল গাছটার কাছে নিয়ে গিয়েছিল।

বলেছিল, মাসি, এই গাছে পিছমোড়া করে বেঁধে রতনপুরের জমিদারকে আমি চাবুক মেরেছি। দুধ-ঘি-খাওয়া চেহারা কিনা, তাই সহ্য করতে পারল না। ঘণ্টাখানেক পরেই একেবারে খতম হয়ে গেল।

চুপ করে রইলাম। রতনপুরের জমিদারের দেহ জমিদারবাড়ির ফটকের সামনে পাওয়া গিয়েছিল, সে কথা জানি। কার কাজ তাও সবাই জানতে পেরেছিল, কারণ জমিদারের কপালে খাঁড়ার চিহ্ন আঁকা ছিল। তখন কি আর আমি জানি, সেটা আমাদের কালুর কীর্তি।

দু-গালে দুটো হাত রেখে তারা চুপচাপ বসে বসে শুনেছে। সব ব্যাপারের একটা কারণ থাকে। একটা ইতিহাস।

আজ জমিদারদের ওপর, বড়োলোকদের ওপর কালু সর্দারের এই যে ঘৃণা আর আক্রোশ তার কারণ তারা জানতে পারল, বুঝতে পারল।

কালু সর্দারের গলার স্বর কানে যেতেই তারা দরজার কাছে এসে দাঁড়াল।

মাসি কই?

স্নান করতে গেছে।

কথা বলতে বলতেই মাসি ভিজে কাপড়ে এসে ঢুকল।

এই যে মাসি, তুমি মা-কে ভালো করে স্নান করিয়ে মন্দিরে নিয়ে এসো। দেরি কোরো না।

তারা আর থাকতে পারল না। জিজ্ঞাসা করে ফেলল, কেন? এত সকালে মন্দিরে কেন?

আজ তোমার শুদ্ধি মা। আজ তুমি আমাদের দলের মা হবে।

কথাটা তারা বুঝতে পারল না, কিন্তু জিজ্ঞাসা করার উপায় নেই। কথাটা বলেই কালু চলে গেছে। খুব দ্রুতপায়ে। তাকে দেখে খুব ব্যস্ত বলে মনে হল।

মাসি তারার হাত ধরে বলল, চলো পুকুরঘাটে চলো। আমি তেল আর গামছা নিয়ে যাচ্ছি।

স্নান সেরে ফিরে এসে তারা দেখল একটা থালার ওপর লালপাড় গরদের শাড়ি। এক কৌটা সিঁদুর।

শাড়িটা পরে কপালে সিঁদুরের টিপ এঁকে তারা তৈরি হয়ে নিল।

জনা তিন-চার লোক তারাকে সঙ্গে করে বিশালাক্ষীর মন্দিরে নিয়ে গেল। মন্দিরের সামনে গিয়েই তারা অবাক।

সামনের জমিতে ত্রিপল খাটানো হয়েছে। তার নীচে বাজনদারের দল। এপাশে-ওপাশে বহু লোক। বট গাছের তলায় একপাল ছাগল বাঁধা।

তারা যেতেই কালু এগিয়ে এল।

এসো মা, আমরা সবাই তোমার অপেক্ষা করছি। ছ-টায় লগ্ন। তার আগে আমাদের পূজায় বসতে হবে।

তারা ঠিক ব্যাপারটা বুঝতে পারল না, কিন্তু প্রতিবাদ করল না। বুঝতে পারল প্রতিবাদ করে লাভ নেই। তা ছাড়া সবাই এখন এত ব্যস্ত যে তার প্রশ্নের উত্তর দেবার সময়ও কারো নেই।

মূর্তির সামনে তারাকে বসানো হল। একপাশে কালু, আর-একপাশে পুরোহিত। অনেকক্ষণ ধরে মন্ত্র পড়া হল। ফাঁকে ফাঁকে বাজনার শব্দ।

পূজা শেষ হতে পুরোহিতকে তারা সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করল। পুরোহিত তারার কপালে সিঁদুরের রেখা টেনে দিল।

বাইরে সকলে চিৎকার করে উঠল, তারা মায়িকি জয়।

তারাকে নিয়ে কালু মন্দিরের বাইরে এল। চাতালে একটি লোক অপেক্ষা করছিল, তার কাছে এসে কালু বলল, এইখানে একটু বোসো মা। তোমার ডান হাতটা বাড়িয়ে দাও।

তারা নিজের ডান হাত প্রসারিত করে দিল।

লোকটা নিপুণ হাতে তারার কবজির একটু ওপরে সুচ ফুটিয়ে একটা খাঁড়া এঁকে দিল। এবার তারার মনে পড়ল, ঠিক এইরকম উলকি সে কালু থেকে শুরু করে তার অনুচরদের হাতেও দেখেছে। এমনকী কালুর মাসির হাতেও।

উলকির কাজ শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে আবার প্রচণ্ড বেগে বাজনা বেজে উঠল। রামশিঙা, ঢাক-ঢোল-কাঁসি।

কালু বলল, মা, এবার থেকে তুমিও আমাদের দলের লোক হলে। আমাদের এক জীবন, এক উদ্দেশ্য।

তারা বিস্ফারিত দুটো চোখের দৃষ্টি কালুর ওপর ন্যস্ত করে বলল, তার মানে, আজ থেকে আমিও ডাকাত হলাম! মানুষ খুনজখম করা আমারও পেশা হল?

কিছুক্ষণ কালু চুপ করে রইল। বোধহয় কী বলবে মনে মনে তা-ই ভেবে ঠিক করতে লাগল। তারপর বলল, অপ্রয়োজনে মানুষকে খুনজখম আমরা করি না মা। প্রজাদের রক্ত শুষে জমিদার যে সম্পদ গড়ে তোলে, আমরা তার সেই সম্পদ অপহরণ করি। কোম্পানি দেশের লোকের বুক নিংড়ে কর আদায় করে নিজেদের ভোগবিলাসিতার জন্য খরচ করে, নিজেদের দেশে চালান দেয়, সেই অর্থ লুটে নিয়ে আসি। আমাদের এই অন্যায় কাজে যারা বাধা দেয়, তাদের শাস্তিবিধান করতে হয়। তারা মরে, আহত হয়। আমরা মায়ের সেবক। এই অর্থ মায়ের পূজায় ব্যয় করি। দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করি। তুমি লক্ষ করে থাকবে, আমরা বিলাসিতার জীবন যাপন করি না।

চুপ করে তারা শুনল। কোনও উত্তর দিল না। সব কথাগুলো যে বুঝতে পারল এমন নয়। হাতে উলকি পরার সঙ্গে তার সারা শরীরে একটা আতঙ্কের শিহরন বয়ে গেল। ভালো-মন্দবোধও যেন লোপ পেয়ে গেল।

এবার এদিকে এসো মা।

মন্দিরের সিঁড়ি বেয়ে কালু নেমে এল। পিছন পিছন তারা।

মাঠের মাঝখানে যমদূতের মতন একটি লোক দাঁড়িয়ে। ঝাঁকড়া চুলে লাল কাপড়ের ফেট্টি বাঁধা। করমচার মতন লাল দুটি চোখ। পরনে খাটো লাল রঙের কাপড়। হাতে তেল-চুকচুকে মোটা বাঁশের লাঠি।

এই নিশি ওস্তাদ। তোমাকে লাঠি আর ছোরা খেলা শেখানোর ভার এর ওপর।

এইবার তারা চমকে উঠল। বিড়বিড় করে বলল, লাঠিখেলা, ছোরাখেলা?

হ্যাঁ, মা। তুমি আজ থেকে আমাদের একজন হলে, তাই সবই তোমাকে শিখতে হবে। তির-ধনুক আর বন্দুক ছোড়া আমি নিজে তোমায় একসময়ে শিখিয়ে দেব।

এবার নিশি কথা বলল। যেমন চেহারা, তেমনই কণ্ঠস্বর।

বাজখাঁই আওয়াজে বলল, এসো লাঠিখেলা দিয়েই শুরু করি।

কালু একটু দূরে একটা গাছের ছায়ায় গিয়ে বসল। একটা অনুচর লাঠির গোছা এনে তারার সামনে ফেলে দিল।

নিশি তার মধ্য থেকে বেছে বেছে ছোটো মজবুত একটা লাঠি তুলে নিয়ে তারার হাতে দিল।

তারপর শুরু হল লাঠিখেলা শেখানোর আদিপর্ব। তামেচা, বাহেরা, শির।

তারা আঁচলটা শক্ত করে কোমরে জড়িয়ে নিল। চুলের রাশ বেঁধে নিল। ওস্তাদের নির্দেশক্রমে লাঠি চালাতে লাগল।

প্রায় আধ ঘণ্টার ওপর কসরত চলল। তারার সারা শরীর ঘামে ভিজে গেল। লাল হয়ে উঠল দুটি গাল। ক্লান্ত দুটি পা টলতে লাগল।

নিশি বলল, থাক মা, আজ এই পর্যন্ত। আবার কাল ভোরে হবে।

হাতের লাঠিটা ছুড়ে ফেলে তারা বসে পড়ল।

ঠিক পিছনেই মাসি দাঁড়িয়ে ছিল।

সে বলল, এবার চলো, বেলা হয়েছে, খাওয়াদাওয়া সেরে বিশ্রাম করবে।

মাসির সঙ্গে কুটিরে ফিরতে গিয়েই তারা অবাক হয়ে গেল।

তার যাবার পথের দু-পাশে ডাকাতরা সার দিয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের দুটি হাত বুকের ওপর জোড় করা।

তারা তাদের সামনে যেতেই তারা নমস্কার করল। আস্তে আস্তে বলল, সন্তানদের আশীর্বাদ করো মা।

কুটিরে ফিরে তারা মাসিকে জিজ্ঞাসা করল, আমাকে এরা দলে নিতে চায় কেন বলো তো? আমি কি পুরুষমানুষ? এদের মতন অন্ধকারে ঝাঁপিয়ে পড়ে আমি কি ডাকাতি করতে পারি?

পুরুতমশাই তোমাকে দেখেই বলেছেন, তোমার দেবী অংশে জন্ম। তুমি যে দলে থাকবে, যাদের সহায় হবে, তাদের কখনো বিনাশ হবে না।

তারা এত আশ্চর্য হয়ে গেল যে অনেকক্ষণ কোনও কথা বলতে পারল না।

মাসি বলল, তা ছাড়া কালু তোমাকে স্বপ্নও দেখেছে।

আমাকে স্বপ্ন দেখেছে?

হ্যাঁ, তোমাকে ধরে নিয়ে আসার কদিন আগে বাশুলিদেবী বলেছেন, কালু, ঘটনাচক্রে যে আসবে তাকে যত্ন করবি। সে সাধারণ মানুষ নয়। সে এলে তোর দল অজেয় হয়ে উঠবে। তোর প্রতিপত্তি বাড়বে। তারপরই তুমি এলে।

তারা গালে হাত দিয়ে চুপচাপ বসে রইল।

পাঁচ

এর পর থেকে তারার দৈনিক জীবনযাত্রা একেবারে এক নিয়মে চলল। ভোরবেলা উঠে ছোলা-ভিজানো খেয়ে লাঠি আর ছোরা খেলা শেখা। বিশ্রাম করে শরবত আর অন্য কিছু খেয়ে নিয়ে সর্দারের কাছে তির ছোড়া শেখা। তা ছাড়া সাঁতার, গাছে চড়া, দৌড়ানো তো আছেই।

কালু বলে, আমাদের সবকিছু শিখে রাখতে হয় মা। কখন কী অবস্থায় পড়ি কিছুই ঠিক নেই।

দুপুরবেলা খেয়েদেয়ে বিশ্রাম। বিকালে রঘুর কাছে কুস্তি, ঘোড়ায় চড়া শেখা।

এ ছাড়াও অনেক কিছু করতে হয়।

একদিন অসময়ে কালু ডেকে পাঠাল। সবে তারা ঘুম থেকে উঠে কুস্তি শিখতে যাবার জোগাড় করছে, অনুচর এসে দাঁড়াল।

মা, সর্দার ডাকছে।

আমাকে?

হ্যাঁ, সর্দার বদনতলার মাঠে দাঁড়িয়ে রয়েছে।

তারা বেরিয়ে পড়ল। অনুচর সঙ্গে সঙ্গে চলল।

বদনতলার মাঠ বাশুলির মন্দিরের ঠিক পিছনে। এখানেই তারা দৌড়ানো অভ্যাস করে। সেখানে পৌঁছে তারা দেখল একটা মাটির ঢিপির ওপর কালু বসে আছে।

তারাকে দেখে বলল, এসো মা, এখানে বোসো।

তারা সর্দারের পাশে গিয়ে বসল। কোথাও কিছু নেই। মাঠ খালি। এখানে চুপচাপ কেন বসে থাকতে হবে তারা বুঝতে পারল না।

হঠাৎ একটা শেয়ালের চিৎকারে তারা চমকে উঠল।

চেয়ে দেখল দুজন লোক একটা শেয়ালের গলায় দড়ি বেঁধে টানতে টানতে নিয়ে আসছে।

ঠিক সর্দার আর তারার সামনে শেয়ালটাকে নিয়ে এসে একটা বাঁশের খুঁটিতে বাঁধল। একজন অনুচর শালপাতায় একটা মাংসের টুকরো এনে তারার সামনে ধরল।

নাও, এটা শেয়ালটাকে দিয়ে দাও। খুব কাছে যেয়ো না। শেয়ালটা খেপে আছে।

খুব সাবধানে এগিয়ে তারা মাংসটা শেয়ালটার সামনে ছুড়ে দিল।

শেয়ালটা কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইল, তারপর আর লোভ সামলাতে না পেরে একটু একটু করে মাংসের সামনে এগিয়ে গেল। এদিক-ওদিক দেখল, মাংসটা শুঁকল, তারপর এক গ্রাসে মাংসটা মুখে পুরে দিল।

মিনিট পাঁচেক, তারপরই আকাশ ফাটিয়ে আর্তনাদ করে উঠল। ল্যাজটা গুটিয়ে পেটের মধ্যে চলে গেল। চারটে পা প্রসারিত করে মাটি আঁচড়াতে লাগল। জিভটা একদিকে ঝুলে পড়ল। দুঃসহ একটা যন্ত্রণায় শরীরটা কুঁকড়ে গেল। সমানে কাতর চিৎকার করতে লাগল।

শেয়ালটা অমন করছে কেন?

তারা কালুকে জিজ্ঞাসা করল।

কালু কোনও উত্তর দিল না। হাত দিয়ে তারাকে থামিয়ে দিল। একটু পরে শুধু বলল, দেখো-না মজা।

প্রায় মিনিট কুড়ি আর্তনাদ করতে করতে শেয়ালটা স্থির হয়ে গেল। চার পা ছড়িয়ে টান হয়ে শুয়ে পড়ল। গায়ের লোমগুলো খাড়া হয়ে উঠল। দুটি চোখ বিস্ফারিত।

এইবার কালু উঠে দাঁড়াল।

তারাকে বলল, শেয়ালটাকে মাংসের সঙ্গে সেঁকো বিষ দেওয়া হয়েছিল। মানুষ হলে পাঁচ মিনিটেই সাবাড় হয়ে যেত, কিন্তু শেয়ালের কড়া জান অনেকক্ষণ লড়েছে।

কিছু বুঝতে পারল না তারা। হঠাৎ এভাবে শেয়ালটাকে বিষ দিয়েই বা মারা হল কেন? আর শেয়ালের মৃত্যু দেখবার জন্য তাকেই বা ডেকে আনল কেন কালু সর্দার?

তোমার তো এখন কুস্তি শেখার সময়, তা-ই না মা?

হ্যাঁ। তারা মাথা নাড়ল।

যাও তাহলে। রঘু অপেক্ষা করছে।

তারা চেয়ে দেখল একটু দূরে একটা তেঁতুল গাছের তলায় রঘু অপেক্ষা করছে।

কুস্তি শেখা শেষ হলে সন্ধ্যার ঝোঁকে তারা রঘুকে কথাটা জিজ্ঞাসা করল। বিষ দিয়ে শেয়াল মারার কথা।

গামছা ঘষে ঘষে রঘু শরীর থেকে মাটি তুলছিল, তারার দিকে চেয়ে বলল, ডাকাতের দলে থাকতে হলে মনকে লোহার মতন কঠিন করতে হয় মা। অনেক রকমের যন্ত্রণাকর মৃত্যু আমাদের দেখতে হয়। অনেক সময় এমনও হয়, নিজের দলের লোককে আধমরা অবস্থায় ফেলে আমাদের পালিয়ে আসতে হয়। তাকে তুলে আনবার সুযোগ হয় না। এমনও হয়, বল্লমের খোঁচায় দলের একটা লোক যন্ত্রণায় ছটফট করছে, তাকে সরিয়ে আনতে পারছি না, কিন্তু তাকে যদি কোম্পানির লোক ধরে নিয়ে যায় তো খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে আমাদের দলের কথা, আস্তানার কথা জেনে নেবে, তাই পালাবার সময় আমরাই বর্শা দিয়ে কিংবা লাঠির ঘায়ে তাকে খতম করে দিয়ে আসি। যাতে সে আর কথা বলতে না পারে।

দু-হাতে মুখ ঢেকে তারা উঃ করে চেঁচিয়ে উঠল।

একটু পরে বলল, কী নিষ্ঠুর তোমরা!

আমরা কিছুই করি না। বাশুলি-মা-ই আমাদের হাত দিয়ে সবকিছু করান। জন্ম-মৃত্যু সবই তো মায়ের খেলা। আমরা নিমিত্তমাত্র। যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যুর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবার জন্যই সর্দার ওভাবে তোমার সামনে শেয়ালটাকে বিষ দিয়ে মারল।

তারা আর কোনও কথা বলল না। সে জানে কথা বলে কোনও লাভ নেই। তার ফিরে যাবার পথ যখন বন্ধ, তখন এদের মধ্যেই তাকে থাকতে হবে। এদের কথাতেই সায় দিতে হবে।

মাসের পর মাস ঘুরে বছরও শেষ হয়ে গেল।

লাঠি আর ছোরা খেলায় তারা অসম্ভব উন্নতি করেছে। তির-ধনুকে তার অব্যর্থ লক্ষ্য। ডাকাতদের জীবনের সঙ্গে তার জীবন অনেকটা মিশে গিয়েছে। কালু সর্দার যখন দলবল নিয়ে ডাকাতি করতে বের হত, তখন ঘোড়ায় চড়ে তাদের সঙ্গে তারা বনের শেষ পর্যন্ত যেত।

মাঝে মাঝে কালু সর্দারের কাছে আবদারও করত।

ছেলে, আমায় কবে নিয়ে যাবে তোমাদের সঙ্গে?

কালু হাসত। নিয়ে যাব মা, সময় হলে ঠিকই নিয়ে যাব।

তারা অভিমান করত।

কেন, আমি তোমার দলের লোকের চেয়ে কীসে কম? আজকাল তো বন্দুক ছোড়াও শিখেছি।

কালু বলত, তুমি কারো চেয়ে কম নয় মা। কম কেন হবে, তুমি যে সকলের মা। তোমার বয়সটা আর-একটু বাড়ুক, মা আর ছেলে পাশাপাশি বের হব।

সারা দলে বন্দুক মাত্র তিনটে। গাদাবন্দুক। কোম্পানির সিপাইয়ের কাছ থেকেই ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল।

কালু নিজের হাতে তারাকে বন্দুক ছোড়া শিখিয়েছিল।

প্রথম দিন তো বন্দুকের ধাক্কায় তারা চিতপাত হয়ে পড়েই গিয়েছিল ঘাসের ওপর।

তারপর আস্তে আস্তে তারা বন্দুক ছোড়া শিখে নিয়েছিল। প্রথম প্রথম শেয়াল, গাছে ঝুলন্ত সাপ, তারপর উড়ন্ত বক এক গুলিতে খতম করে দিত।

কালু হাততালি দিয়ে বলত, শাবাশ, মা, শাবাশ!

প্রথম যেদিন কালু তারাকে সঙ্গে নিল, তখন তারার বয়স তেরো।

সারারাত তারা ঘুমোতে পারেনি। বিছানায় ছটফট করেছে। ভয়ে নয়, উত্তেজনায়।

ঠিক সন্ধ্যা হতেই সবাই বেরিয়ে পড়ল। শাড়িটা তারা পুরুষদের মতন মালকোঁচা দিয়ে পরে নিল। মাথায় পাগড়ি বাঁধল, যাতে দরকারের সময় চুল খুলে মুখ-চোখ ঢেকে বিব্রত না করে। কোমরে বড়ো ছোরা, হাতে বর্শা।

তারাকে মাঝখানে রেখে দলটা এগিয়ে গেল।

অনেকটা পথ। অনেকবার অন্ধকারে তারা গাছের শিকড়ে হোঁচট খেল। তারপর কালুর নির্দেশে একটা ঝাঁকড়া অশথ গাছতলায় সবাই দাঁড়াল।

চকমকি জ্বেলে একজন আলো জ্বালাল। সেই আলোতে তারা দেখল এক পুরোহিত দাঁড়িয়ে।

পুরোহিত তারাকে বলল, আমি যা বলছি, সেই কথাগুলো উচ্চারণ করো মা। যদি কোনওভাবে ধরা পড়ি তাহলে যতই দৈহিক যন্ত্রণা দিক শত্রুরা কিংবা অর্থে বশীভূত করার চেষ্টা করুক, আমি প্রাণান্তেও দলের কারো নাম বলব না, কোনও আস্তানার খবর দেব না। মা বাশুলির দিব্যি।

পুরোহিত চকচকে একটা খাঁড়া তারার কাঁধের ওপর রাখল।

তারা পুরোহিতের কথাগুলো উচ্চারণ করল। তারপর পুরোহিত সিঁদুর নিয়ে তারার কপালে টিপ এঁকে দিল।

কালু বলল, এবার পুরুতমশাইয়ের পায়ের ধুলো নাও মা।

তারা হাঁটু মুড়ে বসে পুরোহিতের পদধূলি নিল।

সঙ্গে সঙ্গে অরণ্য কাঁপিয়ে গর্জন উঠল, বাশুলি মায়িকি জয়!

আবার যাত্রা শুরু হল।

ছোটো ছোটো জলা, বাঁশঝাড় পার হয়ে সবাই একটু ফাঁকা জায়গায় এসে পৌঁছাল।

আকাশে চাঁদের ফালি। খুব অল্প আলো। পরিষ্কার কিছু দেখবার উপায় নেই।

কালু বলল, সব গাছে উঠে পড়ো। আমি তলায় রইলাম। সময় হলে খবর দেব।

অন্য সকলের সঙ্গে তারাও গাছে চড়ল। অনেক ডালপালা-ছড়ানো বট গাছ। উঠতে কোনও অসুবিধা হল না।

একটা মোটা ডাল আঁকড়ে তারা চুপচাপ বসে রইল। এই টের পেল তার বুকের ভিতর ঢেঁকির পাড় চলেছে। দুপ দুপ শব্দ। এতদিন যা শিখেছে, আজ হাতেকলমে তার পরীক্ষা।

একটু বোধহয় তন্দ্রা এসেছিল তারার। হঠাৎ চাপা গম্ভীর গলায় কালু সর্দারের সাবধানবাণী 'হুঁশিয়ার' কানে যেতেই সে সোজা হয়ে বসল।

অনেক দূর থেকে ঘুঙুরের মতন একটা শব্দ ক্রমশ এগিয়ে আসছে।

ঝুন, ঝুন, ঝুন।

ম্লান অন্ধকারে তারা দেখল অনুচরেরা সবাই গুঁড়ি দিয়ে এগিয়ে চলেছে। প্রায় মাটির সঙ্গে মিশে। তারপর একে একে মাটিতে বুক দিয়ে সবাই শুয়ে পড়ল।

পশ্চিম দিক থেকেই ঘুঙুরের আওয়াজটা আসছিল। সেইদিকটাই আলো হয়ে উঠল।

মশালের আলো।

গাছের ওপর থেকে তারা এবার স্পষ্ট দেখতে পেল। দুটো লোক ছুটে আসছে। এক হাতে লাঠি, লাঠিতে ঘুঙুর বাঁধা, আর-এক হাতে জ্বলন্ত মশাল।

তার পিছনেই একজন অশ্বারোহী সিপাই। তারপর বাহকরা পালকি বয়ে আনছে। বন কাঁপিয়ে বাহকদের গলার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। হুম না, হুম না, হুহুম না।

পিছনে আরও অনেকগুলো পাইক।

বন্যজন্তু তাড়াবার জন্য ওই মশালের আলো আর ঘুঙুরের শব্দ। কুখ্যাত এই দুর্গাপুরের জঙ্গলের কথা তাদের জানা, তাই যতটা সম্ভব দ্রুতপায়ে জায়গাটা পার হবার চেষ্টা করছে।

বাশুলি মায়িকি জয়! কালুর ভয়াল কণ্ঠস্বর। তারপর তার অনুচরদের হুংকার শোনা গেল। মাটি ফুঁড়ে যেন ছায়ামূর্তির আবির্ভাব।

কে একজন সবেগে সড়কি চালাল ঘোড়ার পায়ে। ঘোড়াটা পা মুড়ে বসে পড়ল, তার পিঠের লোকটা ছিটকে পড়ল জলার ওপর। মশালধারী দুজন তিরের ঘায়ে খতম।

সঙ্গে সঙ্গে পালকির পিছন থেকে লাঠিয়ালের দল ছুটে এসে পালকিটা ঘিরে রাখল।

লাঠির ফটাফট শব্দ, তিরের শোঁ শোঁ আওয়াজ, মানুষের মৃত্যুযন্ত্রণার কাতরোক্তিতে মুহূর্তে জায়গাটা যেন নরকে পরিণত হল।

হঠাৎ দিগন্ত কাঁপিয়ে গুড়ুম গুড়ুম শব্দ।

সিপাইরা বন্দুক ছুড়তে শুরু করেছে।

ডাকাতদের দু-একজনও মশাল জ্বালিয়েছে।

সেই মশালের আলোয় তারা দেখল, শুধু সিপাইরাই নয়, পালকি থেকে একজন লালমুখো সাহেব বেরিয়ে হাঁটু মুড়ে বসে বন্দুক ছুড়ছে। লাঠিয়ালরা তাকে ঘিরে রয়েছে।

ডাকাতদের তরফে বন্দুক মোটে তিনটি। তারা জানে দুটি আনা হয়েছে। একটি মেরামতের অপেক্ষায় আস্তানায় পড়ে আছে।

বন্দুকে সুবিধা যেমন আছে, অসুবিধাও কম নয়।

দূর থেকে লক্ষ করা যায় সত্য কথা, কিন্তু একবার গুলি ছোড়া হয়ে গেলেই আবার বারুদ ঠাসতে হয়। তাতে অনেক সময় নেয়। মুখোমুখি লড়াই করার পক্ষে খুব মুশকিল। বারুদ ঠাসবার সময় প্রতিপক্ষ আঘাত করার সুযোগ পায়। লাঠিয়ালরা লালমুখো সাহেবকে বেষ্টন করে রেখে তাকে বারুদ ভরবার সুযোগ দিচ্ছে।

মনে হল ডাকাতদের কয়েকজন বন্দুকের গুলিতে যেন ঘায়েল হল। আর্তকণ্ঠ শোনা গেল। একজন তো তারা যে গাছের ডালে বসেছিল, তার তলাতেই উপুড় হয়ে পড়ল। দু-একবার কেঁপে উঠেই নিস্পন্দ হয়ে গেল।

খুব বেগতিক অবস্থা। ডাকাতরা কিছুটা পিছিয়ে এল।

আচমকা লাঠিয়ালদের মধ্যে একটা বিশৃঙ্খলা শুরু হল।

হইচই চিৎকার। দু-একজন পড়েও গেল মাটির ওপর।

বাশুলি মায়িকি জয়!

তারা বুঝতে পারল কালু সর্দারের গলার আওয়াজ।

কালু কিছু অনুচর নিয়ে ঝোপঝাড়ের আড়াল দিয়ে এগিয়ে গিয়ে ওদের পিছন থেকে আক্রমণ করেছে।

কালুর গলায় সাহস পেয়ে ডাকাতরা যারা পিছিয়ে এসেছিল, তারাও নতুন বিক্রমে লাঠিয়ালদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।

অসহ্য চিৎকার, গোঙানির শব্দ, মাথার খুলি ফাটার ফটাস ফটাস আওয়াজ।

আচমকা তারা দেখল লালমুখো সাহেবটা ছুটতে ছুটতে গাছের তলায় এসে দাঁড়িয়েছে। অন্ধকারে তাকে বোধহয় কেউ লক্ষ করেনি।

সাহেব কিন্তু পালিয়ে গেল না। গাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে ডাকাতদের দিকে বন্দুকের নলটা ফিরিয়ে তাক করতে লাগল।

দু-এক মুহূর্ত। কোথা দিয়ে কী হয়ে গেল তারা নিজেই বুঝতে পারল না। হাতের বল্লমটা সজোরে তুলে তারা সাহেবের পিঠ লক্ষ করে ছুড়ে দিল। বল্লমটা সাহেবের পিঠে অনেকটা গেঁথে গেল।

মর্মান্তিক আর্তনাদ করে সাহেব পড়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গে ফিনকি দিয়ে তাজা রক্তের স্রোত তারার শরীর, কাপড় ভিজিয়ে দিল।

ছয়

তারার শরীর থরথর করে কেঁপে উঠল। দু-হাতে গাছের একটা ডাল ধরে না থাকলে সে বোধহয় ঠিকরে মাটিতেই পড়ে যেত।

কোম্পানির লোক ছত্রভঙ্গ হয়ে নানা দিকে ছুটতে শুরু করল। মশালের আগুনে পালকিটা দাউদাউ করে জ্বলতে লাগল। অবশ্য তার আগে ডাকাতরা টাকার থলিগুলো বের করে এনেছে।

ফেরার মুখে সবাই এসে গাছতলায় জড়ো হল। কালু সর্দার প্রথমেই চিৎকার করে উঠল, তারা মায়িকি জয়!

সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত বনভূমি প্রতিধ্বনিত করে সুর উঠল, তারা মায়িকি জয়!

কালু কাঁধে করে তারাকে গাছ থেকে নামাল।

তখনও তারার চেতনা নেই। দু-হাতে কালুর মাথাটা আঁকড়ে ধরে নিঝুম হয়ে বসে রইল।

চলতে শুরু করার আগে কালু পাশে দাঁড়ানো অনুচরকে বলল, এই মেঘা, সাহেবের বন্দুকটা নিয়ে আয়। ও বন্দুক মা-র পাওনা।

অনেকটা পথ গিয়ে তারার চেতনা হল।

আস্তে আস্তে বলল, আমাকে নামিয়ে দাও।

কালু তারাকে মাটির ওপর নামিয়ে দিল।

হাঁটতে গিয়েই তারা অনুভব করল তার দুটো পা ঠকঠক করে কাঁপছে। খুব দুর্বল বোধ হচ্ছে শরীর। হেঁটে চলার শক্তি তার নেই।

কালু সেটা বুঝতে পারল। বলল। মা, তুমি আমার শরীরে ভর দিয়ে চলো। আর মাইলখানেক গেলেই ঘোড়া পাওয়া যাবে।

সত্যিই কিছুটা পথ যেতেই দেখা গেল একটা গাছের ডালে গোটা তিনেক ঘোড়া বাঁধা রয়েছে।

টাকার থলিগুলো নিয়ে একজন একটা ঘোড়ায় উঠল। কালু তারাকে সামনে নিয়ে আর-একটায় উঠল। বাকি ঘোড়ার ওপর দুজন জখম অনুচরকে চাপানো হল।

যখন আস্তানায় গিয়ে পৌঁছাল, তখন অন্ধকার কিছুটা তরল হতে শুরু হয়েছে। ভোর হবার আর বাকি নেই।

মাসি কুটিরের দরজায় অপেক্ষা করছিল।

তারার অবস্থা দেখেই আঁতকে উঠল।

এ কী রে, মেয়ের শরীর যে রক্তে ভেসে গেছে। এ সর্বনাশ কী করে হল?

কালু হাসল, নিজের রক্ত নয়, মাসি, দুশমনের রক্ত। প্রথম রাতেই মা একটা সাহেব খতম করেছে বল্লমের ঘায়ে। তুমি কাপড়চোপড় ছাড়িয়ে অন্য কাপড় পরিয়ে দাও। শরীর সাফ করে দাও। খুব ক্লান্ত। এখন ঘুমানো দরকার।

তারাকে কালু খুব সাবধানে নামিয়ে মাসির কাছে দিল।

কতক্ষণ তারার খেয়াল নেই। ঘুম যখন ভাঙল, তখন সর্বাঙ্গে ব্যথা, দেহে ভীষণ উত্তাপ।

উঃ মা গো! তারা চিৎকার করে উঠল।

মাসি পাশেই বসে ছিল। তারার কপালে, গালে হাত দিয়ে উত্তাপ পরীক্ষা করেই চিন্তিত হয়ে পড়ল। বাইরে প্রহরারত অনুচরকে ডেকে ফিসফিস করে কী বলল।

তারপর আবার যখন তারা চোখ মেলল দেখল, পাশে কালু সর্দার আর একজন মোটা বেঁটে লোক দাঁড়িয়ে। তাদের কথাবার্তাও তারার কানে এল।

কোবরেজমশাই, ভয়ের কিছু নেই তো?

না, না, ভয়ের কিছু নেই। আমি যে পাঁচনটা দিয়ে গেলাম ওটা খাইয়ে দিয়ো। আর এই শিশির তেলটা সর্বাঙ্গে মালিশ করতে হবে। তাজা খুন, তাও আবার মানুষের, চোখের সামনে দেখলে কত জোয়ানও ভিরমি যায়, এ তো বাচ্চা মেয়ে। কীরকম থাকে, পরশু নাগাদ আমাকে একবার খবর দিয়ো।

কালু ঘাড় নাড়তে, কবিরাজ বেরিয়ে গেল।

কালু বসে বসে তারার মাথায় হাত বোলাতে লাগল। দিন চারেক পরই তারা উঠে বসল।

উঠেই দেখল তার মাথার কাছে দেয়ালে বন্দুকটা ঝুলছে। বন্দুকের বাঁটে সিঁদুর মাখানো। তার মানে বাশুলিদেবীর কাছে বন্দুকটা উৎসর্গ করা হয়েছিল। ম্লেচ্ছের বন্দুক ব্যবহার করতে যাতে অসুবিধা না হয়। পাপ না স্পর্শ করে।

আরও দিন তিন-চারের মধ্যেই তারার শরীর ঠিক হয়ে গেল।

কালু রোজই তাকে দেখতে আসত। তারা সেরে উঠতেই বলল, কাল একটা উৎসব আছে। কদিন আগেই উৎসবটা হত, কিন্তু তুমি অসুস্থ বলে দিন পিছিয়ে দিয়েছিলাম।

কীসের উৎসব?

এখন বলব না। কাল টের পাবে। কাল ভোরে উঠে স্নান সেরে নিয়ো, আমার লোক এসে তোমায় নিয়ে যাবে।

তা-ই হল। প্রায় রাত থাকতে উঠে তারা স্নান সেরে নিল। বেশ শীত পড়েছে। ভোরের দিকে কাঁপিয়ে দেয়।

তারার সঙ্গে মাসিও স্নান করল। নতুন চওড়া লালপাড় কাপড় পরে দুজনে রওনা হল। তারা ভেবেছিল মন্দিরে যেতে হবে। সেখানে কোনও পূজার ব্যাপার আছে।

কিন্তু মাসি সেদিকে গেল না। পায়ে-চলা আঁকাবাঁকা পথ ধরে দুজনে জঙ্গলের বাইরে চলে এল।

ফাঁকা এবড়োখেবড়ো মাঠ। কাশ আর ঘেঁটু ফুলে বোঝাই। চারপাশে আসশেওড়া আর ঘোড়ানিমের গাছ। একেবারে এককোণে বাঁশের খুঁটির ওপর একটা গোলপাতার ছাউনি। দেখলেই বোঝা যায় ছাউনিটা সদ্য তৈরি হয়েছে।

ছাউনির তলায় কারা ঘোরাফেরা করছে। আধো অন্ধকারে তারা ঠিক বুঝতে পারল না।

একটু এগোতেই কালু সামনে এসে দাঁড়াল।

এসো, এসো মা এসো।

তারা জিজ্ঞাসা করল, এখানে কীসের উৎসব? এই মাঠের মাঝখানে?

কালু হাসল, আসল উৎসব মা। একটু পরেই দেখতে পাবে।

রোদ উঠতেই তারা অবাক হয়ে গেল। ঝোপঝাড়ের অন্তরাল থেকে পিলপিল করে লোক এসে মাঠের ওপর বসল। ছেলে, বুড়ো, মেয়ে। সকলেরই শীর্ণ, পাঁজরাসম্বল চেহারা।

কালু পিছনদিকে আঙুল দিয়ে দেখাল।

তারা দেখল, পর পর তিনটে গোরুর গাড়ি আসছে। তার ভিতরে মাটির হাঁড়ি, কলসি আর পোঁটলা।

এরা সব আশপাশের গাঁয়ের লোক, খেতে না পেয়ে কীরকম চেহারা হয়েছে দেখো। জমিদারের খাজনা দিতে দিতে পাঁজরা কখানা ছাড়া এদের সব গেছে। নিজেরা চাষি, অথচ ঘরে এক কণা চাল নেই। কয়েকজন পেটের দায়ে হালের গোরু পর্যন্ত বিক্রি করে দিয়েছে।

শেষদিকে কালুর কণ্ঠ গম্ভীর হয়ে উঠল।

জমিদাররা এভাবে খাজনা চায় কেন? তারা জিজ্ঞাসা করল।

জমিদাররা বলে কোম্পানি খাজনা বাড়িয়ে দিয়েছে। ঠিক সময়ে তাদের খাজনা কোম্পানির ঘরে জমা না দিলে, জমিদারি নিলামে উঠিয়ে দেবে। ফলে, এ বেচারিদের মুখে রক্ত উঠছে।

তারা চুপ করে শুনল। সে-ও জমিদারের মেয়ে। অন্তত একসময়ে ছিল। কীভাবে খাজনা আদায় হত, প্রজাদের দেহ নিংড়ে কি না, সেটা তার জানা নেই। কোনওদিন জানার সুযোগ হয়নি। সে বেশির ভাগ সময় মন্দিরেই পড়ে থাকত। পূজা-অর্চনা নিয়ে।

ইতিমধ্যে লোকগুলো সার দিয়ে বসেছে। কালুর অনুচরেরা সকলের সামনে শালপাতা পেতে দিল।

এবার কালু তারাকে ডাকল, এসো মা, এবার তোমার কাজ শুরু।

কালুর পিছন পিছন তারা এগিয়ে গেল।

গোরুর গাড়ি থেকে হাঁড়ি-বালতি সব নামানো হয়েছে। ভাত, ডাল, ভাজা, তরকারি।

কালু বলল, হাতায় করে ভাত নিয়ে সকলের পাতে দাও। অবশ্য সকলের পাতে দিতে পারবে না, যতগুলো পারো দাও, তারপর আমার লোকেরা দেবে।

তারা আঁচলটা কোমরে জড়িয়ে নিল। চুলগুলো পিঠের ওপর খোলা অবস্থায় ছিল, হাত দিয়ে এলোখোঁপা করে নিল। তারপর হাতায় ভাত নিয়ে পরিবেশন আরম্ভ করে দিল।

কালু তারার দিকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে চিৎকার করে বলল, আমার মা। আমাদের সকলের মা।

লোকগুলো মুখ তুলে দেখল। চওড়া লালপাড় শাড়ি পরা। কপালে সিঁদুরের টিপ। টানা টানা দুটি চোখ। ডান হাতে হাতার মধ্যে ভাতের স্তূপ।

একসঙ্গে অনেকগুলো লোক চেঁচিয়ে উঠল, জয়, অন্নপূর্ণা মায়ের জয়!

তারপরই যত লোক খেতে বসেছিল, সবাই সমস্বরে চিৎকার করল, অন্নপূর্ণা মায়ের জয়!

লজ্জায় তারা অনেকক্ষণ মুখ তুলতে পারল না।

সব লোককে পরিবেশন করা তারার পক্ষে সম্ভব হল না। তাও প্রায় একশোজনের পাতে সে ভাত দিল, তারপর ক্লান্ত হয়ে মাঠের ওপরই বসে পড়ল।

খাওয়া শেষ হতে সবাই পুকুরে গিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে এল, তারপর লাইন বেঁধে দাঁড়াল।

এবার পোঁটলাগুলো খোলা হল। ধুতি আর শাড়ি। পুরুষদের ধুতি আর মেয়েদের শাড়ি। কালু ধুতি আর শাড়ি একখানা একখানা করে তারার হাতে তুলে দিল। তারা বিলি করতে লাগল।

আবার জঙ্গল কাঁপিয়ে তারার জয়ধ্বনি উঠল।

সব শেষ হতে বেলা গড়িয়ে পড়ল। তারা ফিরল গোরুর গাড়িতে। শুধু তারা নয়, দলের সবাই অভুক্ত।

মন্দিরের চাতালে বাশুলিকে প্রণাম করে সবাই খেতে বসল।

রাত্রিবেলা মাসি তারাকে বলল, এইরকম বছরে চার-পাঁচবার কালু লোকজনদের খাওয়ায়, কাপড় বিলোয়। যে ডাকাতিতে তুমি সাহেবকে খতম করলে, সেটাতে বিশ হাজার টাকা লুঠ করে পেয়েছিল। এত টাকা কালু অনেকদিন পায়নি। এই রকমের বড়ো কিছু পাবার পরই কালু উৎসব করে।

চুপ করে বসে তারা শুনল।

চিরকাল তারা জানত, ডাকাতরা নির্মম, মানুষ খুন করে, আচমকা পথচারীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাদের টাকাপয়সা লুঠপাট করে নেয়। কিন্তু ডাকাতরা যে এভাবে গরিবদের উপকার করে, বিপদে সাহায্য করে, সেটা তার জানা ছিল না।

কালুর কাছ থেকে তারা অনেক কিছু শুনল।

এই যে সেদিন কোম্পানির টাকাটা লুঠ করলাম, দাওয়ায় পা ছড়িয়ে বসে কালু একদিন বলল। তারা পাথরের ওপর ছোরার ফলা শান দিচ্ছিল।

মানভূম থেকে টাকাটা আসছিল বর্ধমানের খাজাঞ্চিখানায়। প্রজাদের রক্তশোষা টাকা। আজ তিন বছর অজন্মা চলেছে মানভূমে। এক ফোঁটা বৃষ্টি নেই, এক ছটাক শস্য হয়নি। ঘরে ঘরে কান্নাগোল উঠেছে। লোকে পেটের ছেলে-মেয়ে বিক্রি করছে সেখানে। গাছের শেকড় খেয়ে ভেদবমি হয়ে মারা যাচ্ছে। গাঁ-কে গাঁ উজাড় হয়ে যাচ্ছে। খাজনা মকুব করার জন্য লাটের দরবারে দরখাস্ত পর্যন্ত পাঠিয়েছিল।

কী হল সে দরখাস্ত? তারা বিস্মিত কণ্ঠে প্রশ্ন করল।

সে দরখাস্ত লাট অবধি পৌঁছায়নি। আমলারাই ছিঁড়ে ফেলেছে। লোকের বসতবাটী, চাষের জমি সব নিলামে উঠিয়ে লোকেদের ভিখারি করে খাজনা আদায় করা চলল। সে দরখাস্ত যেমন লাট অবধি পৌঁছায়নি, সে খাজনার টাকাও তেমনি বর্ধমান অবধি আসেনি। কালু সর্দারের খপ্পরে পড়ে গেল।

কথা শেষ করে কালু বিকট গলায় হেসে উঠল।

সেই হাসির শব্দে তারা চমকে উঠেই নিজেকে সামলে নিল।

সাহেবের পিঠে বল্লম ফোঁড়ার দৃশ্যটা আবার যেন চোখের সামনে ভেসে উঠল।

কালুকে বলল, আচ্ছা যে সাহেবটাকে খতম করলাম সে কে?

কোম্পানির কর্মচারী। নামটাম জানি না। চলো, কাল রাতে আবার বের হতে হবে।

কাল আবার কোথায়?

আজ সকালে চর সন্ধান এনেছে মুকুন্দপুরের জমিদার কাশী যাচ্ছে। সঙ্গে লোকলশকর যেমন আছে, তেমনি কাঁচা টাকাও নিয়ে যাচ্ছে। বাপের নামে বুঝি মন্দির করবে। এই জঙ্গলের পাশ দিয়েই যাবে। আমাদের তৈরি থাকতে হবে।

মেঘা লাঠি হাতে দরজার বাইরে বসে ছিল। সে ঘাড় ফিরিয়ে বলল, হ্যাঁ সর্দার, রাত্তিরবেলা জমিদার পথ চলবে তো? কোনও চটিতে হয়তো রাত কাটাবে।

না, কালু মাথা নাড়ল, খবর এসেছে চটিতে থামবে না, দেরি হয়ে যাবে। দু-একটা বড়ো বড়ো শহরে রাত কাটাবে। তিন মাসের মধ্যে কাশী পৌঁছাতেই হবে। মন্দির স্থাপনের ভালো দিন আছে। তা ছাড়া, সঙ্গে অঢেল লোকলশকর রয়েছে বলে সাহসও হয়েছে। দেখা যাক। আজ উঠি মা।

কালু উঠে দাঁড়াল।

আশ্চর্য, তারার প্রথমটা একটু ভয় করছিল। সেরাতের মতন আবার হইহল্লা, চিৎকার, আর্তনাদ। মৃত্যুর হোলিখেলা। কিন্তু একটু পরেই কেমন উত্তেজনা বোধ করল। এই তো জীবন। চুপচাপ ঘরের কোণে বসে থাকার কোনও মানে হয়? দেহে- মনে যেন শ্যাওলা পড়ে যায়।

এ অন্যায় নয়। একটু আগেই কালুর কথায় তারা বুঝতে পেরেছে লোকদের বঞ্চিত করে যে টাকা সংগৃহীত হয়, সেটা ছিনিয়ে নিলে পাপ হয় না।

উপাস্য দেবী বাশুলির হাতে খর্পর। অত্যাচারীকে, শোষককে হত্যা করলে অন্যায় হয় না।

পরের দিন সন্ধ্যায় সকলে মাঠে জড়ো হল। এবারের অভিযানে লোক অনেক কম। এবারে বল নয়, কৌশল। সমস্ত ব্যাপারটা কালু সকলকে বুঝিয়ে দিল।

রাত খুব অন্ধকার নয়। ফিকে জ্যোৎস্নার একটা আস্তরণ সারা জঙ্গলের ওপর। এক-একজন এক-একটা গাছের নীচে আত্মগোপন করে রইল।

প্রায় মধ্যরাতে মশালের আলো দেখা গেল। সামনে-পিছনে অনেক লোক। মাঝখানে সুদৃশ্য পালকি।

কোনও চিৎকার নেই। সবাই নিঃশব্দে এই সর্বনেশে জায়গাটা পার হবার জন্য দ্রুত পদক্ষেপ করছে।

হঠাৎ আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে একটা আর্তস্বর। তারপর একটানা গোঙানি।

সামনের লোকগুলো থেমে গেল। মশাল নিচু করে এদিক-ওদিক দেখতে দেখতে নজরে পড়ে গেল।

পথের একপাশে একটা লোক শুয়ে কাতরাচ্ছে। গায়ে নামাবলি, বুকে পইতার গোছা। চোখে-মুখে কালশিটের দাগ।

কীহয়েছে?

লোকটা গোঙাতে গোঙাতে বলল, সর্বনাশ হয়ে গেছে বাবারা। আমার যথাসর্বস্ব ডাকাতরা লুটে নিয়েছে। পায়ে লাঠির চোট মেরেছে, উঠে দাঁড়াবার উপায় নেই।

ঠাকুরমশাই, কতক্ষণ আগে?

মিনিট পনেরো হবে। ওই ঝোপের মধ্যে পালিয়েছে। আমার সর্বস্ব নিয়ে গেছে। পথের ভিখারি করে দিয়েছে আমাকে।

লোকটা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল।

গোটা তিনেক লশকর লোকটাকে সাবধানে তুলে পালকির মধ্যে নিয়ে গেল আর বেশির ভাগ বল্লম, সড়কি উঁচিয়ে ঝোপটা ঘিরে ফেলল।

পালকির মধ্যে জমিদার বসে ছিল। কোলের ওপর টাকার থলি।

বেশির ভাগ লোক ঝোপের মধ্যে ঢুকতেই পলকে এক কাণ্ড হয়ে গেল। আহত লোকটা চোখের নিমেষে টাকার থলিটা তুলে নিয়ে পাশের অশ্বারোহীকে সবেগে পদাঘাত করল। তারপর সে মাটিতে পড়ে যেতেই একলাফে ঘোড়ার ওপর চড়ে বসে বিদ্যুদবেগে ঘোড়া ছুটিয়ে জঙ্গলের মধ্যে উধাও হয়ে গেল।

সমস্ত ঘটনাটা এত দ্রুত ঘটল যে দলের লোকেরা কিছুক্ষণের জন্য হতবুদ্ধি হয়ে গেল।

কিন্তু একটু পরেই গুড়ুম গুড়ুম করে বন্দুকের শব্দ। পালকির ভিতর থেকে জমিদার বন্দুক ছুড়েছে।

কাজ শেষ। ডাকাতের দল পিছিয়ে গিয়ে ঘন জঙ্গলে মিশিয়ে গেল। পরিকল্পনা ঠিক এইরকমই ছিল। কালু সর্দার আহত ব্রাহ্মণ সেজে কৌশলের আশ্রয় নেবে।

আস্তানার কাছে গিয়ে সবাই দেখল ঘোড়াটা একটা সুপুরি গাছের সঙ্গে বাঁধা। কালু ধারেকাছে কোথাও নেই।

একটু এগোতেই নিধের সঙ্গে দেখা হল। কালুর তদারক করে এই নিধিরাম।

সে বলল, সর্দার চোট খেয়েছে। বন্দুকের গুলির চোট।

সে কী?

সবাই চমকে উঠল।

কই, সর্দার কোথায়?

শুয়ে আছে ঘরে। আমি কোবরেজমশাইকে একবার খবর দিয়ে আসি।

একটা গাছের নীচে দুটো বড়ো বড়ো বাঁশ শোয়ানো ছিল। নিধি সে দুটো তুলে নিল। বাঁশ নয়, রনপা। তার ওপর উঠে নিধি তিরবেগে অদৃশ্য হয়ে গেল।

সবাই ছুটল কালুর কুঁড়ের দিকে।

বিছানার ওপর কালু শুয়ে রয়েছে। সারাটা রাস্তায়, ঘরের মেঝের ওপর ফোঁটা ফোঁটা রক্তের দাগ। বিছানাতেও রক্তের ছোপ।

কী হল সর্দার?

একজন কালুর দিকে ঝুঁকে পড়ল।

কালু চোখ খুলল। সারা মুখ আরক্ত। যন্ত্রণা সহ্য করার চেষ্টায় গালের পেশিগুলো শক্ত হয়ে উঠেছে।

জমিদারব্যাটার হাতের টিপ দারুণ। অন্ধকারেও ঠিক পিঠে একটা গুলি বিঁধিয়েছে।

বোঝা গেল এই ক-টা কথা বলতেই কালুর বেশ কষ্ট হল।

মাথার কাছে মাসি বসে ছিল। তারা পায়ের কাছে গিয়ে বসল।

কালু তারার দিকে একবার চোখ ফিরিয়ে দেখে ম্লান হাসল।

কবিরাজ এল প্রায় এক ঘণ্টা পরে। ঘোড়ায় চড়েই এসেছে।

কালুকে উপুড় করে ফেলে অনেকক্ষণ ধরে দেখল। পিঠের কাছে বেশ বড়ো একটা গর্ত। গর্তের চারপাশে বারুদের কালো দাগ।

হামানদিস্তাতে একটা ওষুধ বেটে পিঠে লাগিয়ে দেওয়া হল।

কবিরাজ বের হয়ে যাবার সময় তারা গিয়ে দাঁড়াল।

কেমন দেখলেন?

সবই বাশুলি-মায়ের ইচ্ছা। আমাদের শক্তি আর কতটুকু।

কবিরাজ আর দাঁড়াল না। ঘোড়ার ওপর গিয়ে উঠল।

তারা ধীরপায়ে কালুর বিছানার কাছে ফিরে এল।

কালু চোখ বন্ধ করে চুপচাপ শুয়ে আছে। বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছে।

একটু পরেই কালু কথা বলল, তারা-মা।

বলো।

লুটের টাকাটা মাসির কাছে রয়েছে। তুমি থলিটা নাও। রঘু, মেঘাকে বলো উৎসবের আয়োজন করতে। গাঁয়ে গাঁয়ে খবর দিতে। শীত আসছে, সবাইকে একখানা করে যেন গরম গায়ের কাপড় দেওয়া হয়।

তারা বলল, তাড়ার কী আছে। তুমি সেরে ওঠো, তখন ব্যবস্থা করা যাবে।

কালু ম্লান হাসল, আমি আর সেরে উঠব না তারা-মা।

তারা চমকে উঠল, সে কী অলক্ষুনে কথা! কী এমন হয়েছে, তুমি সেরে উঠবে না?

ঘা বিষিয়ে উঠেছে। বিষ রক্তের সঙ্গে মিশে গিয়েছে। আমি জানি এবার আমার নিস্তার নেই। বাশুলি-মা স্বপ্নে দেখা দিয়ে সেই কথা বলে গেছেন।

তারা এগিয়ে এসে কালুর শিয়রে বসল। একটা হাত তার মাথার চুলের ওপর রাখল। নরম গলায় বলল, তুমি ঘুমোবার চেষ্টা করো তো। এসব কথা তোমায় ভাবতে হবে না।

কালু আর কথা বলল না। চোখ দুটো বন্ধ করল।

সেইরাত থেকেই কিন্তু জ্বরে কালুর গা যেন পুড়ে যেতে লাগল। কেমন আচ্ছন্ন ভাব। বার বার ডাকলে কোনওরকমে একবার ক্ষীণকণ্ঠে সাড়া দেয়।

রাত বাড়তে তারা কবিরাজকে খবর দিল। মেঘাকে পাঠিয়ে।

ঘুম থেকে কবিরাজকে উঠিয়ে আনতে বেশ সময় নিল। তারা ছটফট করতে লাগল।

কালুকে পরীক্ষা করে কবিরাজের মুখ রীতিমতো গম্ভীর হয়ে উঠল। এককোণে এগিয়ে এসে বলল, আমি বাপু কালুর অবস্থাটা ভালো বুঝছি না। ওষুধ তো কোনও কাজ করছে না। আর এইরকম জ্বরের তাপ, মনে হচ্ছে শরীরের মধ্যে বিষ কাজ করতে আরম্ভ করেছে।

তাহলে?

দুটো হাত জড়ো করে কবিরাজ কপালে ঠেকাল। সবই বাশুলি-মায়ের ইচ্ছা।

সাত

সারাটা রাত একভাবে কাটল। সবাই জেগে বসে রইল কালুকে ঘিরে।

পরের দিন ভোরে কালু চোখ মেলল। মুখ-চোখের ভাব যেন একটু পরিষ্কার।

তারা বাশুলির পুজো দিতে বেরিয়ে পড়ল। মাসিকে সঙ্গে নিয়ে।

ফিরল যখন বেশ বেলা হয়েছে। কাছাকাছি এসেই থমকে দাঁড়াল। দলের প্রায় সবাই এসে জড়ো হয়েছে। কেউ ঘরের মধ্যে, কেউ উঠানে, কেউ বাগানে বসে আছে।

সামনে নিধিরামকে দেখে তারা জিজ্ঞাসা করল, কী হল?

নিধিরাম মাথা নিচু করে বলল, সর্দারের অবস্থা ভালো নয়।

লোক ঠেলে তারা ভিতরে গেল। পুজোর সিঁদুর কালুর কপালে পরিয়ে দিল। সাবধানে তাকে হাঁ করিয়ে চরণামৃত ঢেলে দিল মুখে।

ইঙ্গিতে কালু তারাকে কাছে বসতে বলল।

তারা বসল।

দলের চাঁইরা সবাই চারপাশে দাঁড়িয়ে। ক্লান্ত দৃষ্টি বুলিয়ে কালু একবার সকলের দিকে দেখল, তারপর আস্তে আস্তে বলল, আমি বুঝতে পারছি আমার দিন শেষ হয়ে আসছে। মা বাশুলির ইচ্ছাই পূর্ণ হোক। আমি যখন থাকব না, তখন দল চালাবার ভার দিয়ে গেলাম তারা-মায়ের ওপর। আমাকে যেমন সম্মান দেখাতে, একেও তেমনই দেখাবে। জীবন দিয়ে এর সেবা করবে।

কালু মেঘাকে ইঙ্গিত করল। মেঘা কোণ থেকে রুপো-বাঁধানো কালুর লাঠিটা এনে তারার দিকে এগিয়ে দিল। তারা লাঠিটা কপালে ঠেকাল।

সঙ্গে সঙ্গে সবাই চেঁচিয়ে উঠল, তারা মায়িকি জয়!

কালুর ক্লান্ত মুখে ম্লান হাসি ফুটে উঠল।

কোথা দিয়ে কী হয়ে গেল তারা বুঝতে পারল না। তার সমস্ত শরীর রোমাঞ্চিত হয়ে উঠল। বুকের মধ্যে অশ্রান্ত দাপাদাপি। এত বড়ো একটা দলের সে অধিনায়িকা। এ গুরুদায়িত্ব বহন করার তার শক্তি কোথায়!

কালু একটা হাত রাখল তারার মাথায়। তারা নিচু হয়ে কালুকে প্রণাম করল।

তারা সোজা হয়ে দাঁড়াল। তার দু-চোখ বেয়ে টপটপ করে জলের ধারা গড়িয়ে পড়তে লাগল। একদৃষ্টে সে কালুর দিকে চেয়ে রইল।

কালুর দুটি চোখ নিমীলিত। ঠোঁট দুটো অল্প অল্প কাঁপছে। মনে হল দেবতার নাম জপ করছে।

সেরাত এমনিভাবেই কাটল।

পরের দিন খুব ভোরে উঠে তারাকে স্নান সেরে নিতে হল। স্নান সেরে চওড়া লালপাড় নতুন শাড়ি অঙ্গে জড়াল। তারপর দলের দুজনের সঙ্গে বাইরে বেরিয়ে দেখল দরজার গোড়ায় পালকি দাঁড়িয়ে।

এ কী পালকি কেন?

তোমাকে মায়ের মন্দিরে নিয়ে যাওয়া হবে। হেঁটে যাবার দরকার নেই।

তারা আর কথা বলল না। পালকির মধ্যে গিয়ে বসল।

মন্দিরের সামনে দলের প্রায় সকলেই এসে জুটেছে। কাঁসরঘণ্টা বাজছে। পুরোহিত খুব ব্যস্ত।

তারাকে মূর্তির সামনে পাতা কার্পেটের একটা আসনে বসতে হল।

সংস্কৃত তারা একবিন্দুও বোঝে না, কিন্তু পুরোহিতের সঙ্গে মন্ত্র উচ্চারণ করতে করতে বার বার তার সারা দেহ রোমাঞ্চিত হয়ে উঠল। তারপর পুরোহিত মন্ত্র থামিয়ে বাংলায় যখন তাকে বুঝিয়ে দিল যে সামনে যে বিরাট শক্তি রয়েছে তারা সেই বাশুলি-মায়েরই শক্তির অংশ, অমিত বীর্যের অধিকারিণী, তখন শুনতে শুনতে তারার শরীর থরথর করে কেঁপে উঠল। মনে হল, সত্যিই যেন মা বাশুলি নিজের শক্তির কিছুটা তাকে অর্পণ করেছেন।

শেষকালে পুরোহিত বলল, এবার শোণিত দাও মা।

শোণিত? তারা একটু চমকে উঠল। কথাটা ঠিক বুঝতে পারল না।

পুরোহিত আবার বলল, তোমার অভিষেকের দিনে মা-কে রক্ত অর্ঘ্য দিতে হয়।

তারা বিস্মিত দৃষ্টি মেলে পুরোহিতের দিকে চেয়ে রইল।

পুরোহিত তারার ডান হাতটা টেনে নিল নিজের দিকে, তারপর পাশে রাখা চকচকে একটা ছোরা তুলে নিয়ে অনামিকার ওপর আস্তে বসিয়ে দিল।

ফিনকি দিয়ে তাজা রক্তের স্রোত ছুটল।

পুরোহিত তারার হাতটা টেনে মূর্তির পায়ের ওপর রাখল। টপটপ করে রক্তের ফোঁটা বাশুলি-মায়ের পায়ের ওপর ঝরে পড়তে লাগল।

ফেরার সময় পালকিতে নয়, তারাকে মাঝখানে রেখে দলের সবাই জয়ধ্বনি করতে করতে চলল।

বাড়ির কাছ বরাবর এসেই সবাই থেমে গেল। কালুর কাছে মাসি ছিল, আর দরজায় একজন অনুচর।

দুপুরের থমথমে আবহাওয়া ছাপিয়ে মাসির কান্নার সুর ভেসে উঠল।

তারার হাতে কলাপাতায় মোড়া প্রসাদ ছিল। কান্নার শব্দ কানে যেতেই সে প্রসাদ বুকের মধ্যে চেপে ধরে ছুটতে আরম্ভ করল।

পিছন পিছন দলের আর সবাই।

কালু সর্দার চিত হয়ে শুয়ে আছে। দুটো হাত বুকের ওপর। যন্ত্রণায় মুখটা কিছুটা বিকৃত। মাথার কাছে বসে মাসি চোখে আঁচল চাপা দিয়ে কাঁদছে।

প্রসাদটা পাশে রেখে তারা ঝাঁপিয়ে পড়ল কালুর শরীরের ওপর। দলের সবাই কালুর প্রাণহীন দেহ ঘিরে দাঁড়াল মাথা নিচু করে।

তারার খেয়াল ছিল না। হাতের আঙুল থেকে বিন্দু বিন্দু রক্তক্ষরণ শুরু হয়ে গেল আবার। ফোঁটায় ফোঁটায় রক্ত কালুর কপালে রক্তচন্দনের মতন শোভা পেতে লাগল।

দলের সবাই চেঁচিয়ে উঠল, কালু সর্দারের জয়! তারা মায়িকি জয়!

বিকালের দিকে কালু সর্দারকে নিয়ে যাওয়া হল। দলের প্রত্যেকের হাতে লাঠি। তারার হাতেও।

মাইল তিনেক দূরে শ্মশান। শুধু দলের লোকই নয়, কোথা থেকে খবর পেয়ে কাছাকাছি গ্রাম থেকে অনেক লোক এসে জুটল।

কেউ কেউ এগিয়ে এসে তারাকে প্রণাম করল।

বলল, রানিমা, এবার আপনি ভরসা। সন্তানদের দেখবেন।

প্রথম প্রথম তারার একটু ভয় হয়েছিল। কী জানি তার এভাবে দলের সর্দার হওয়াটা দলের অন্য সবাই হয়তো তেমন পছন্দ করবে না। বিশেষ করে চাঁইরা।

কিন্তু দিনের পর দিন কেউ একটু প্রতিবাদ করল না। বরং মেঘা, চরণ, মনা এরা সব অন্য কথা বলল।

জানো তারা-মা, সর্দার স্বপ্ন পেয়েছিল। একবার, দুবার নয়, বার বার তিনবার।

কী স্বপ্ন? তারা জিজ্ঞাসা করেছিল।

বাশুলি-মা স্বপ্ন দিয়েছিল, এবার আমার দেহ থেকে অংশ দেব তোদের। আমার শক্তির অংশ। আর কোনও ভয় থাকবে না।

কথাগুলো শুনতে শুনতে তারার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। শরীরের রক্ত যেন ফুটতে লাগল টগবগিয়ে। সত্যিই বুঝি সে বাশুলি-মায়ের প্রেরিত।

তারপরই তুমি এলে। তোমাকে দেখেই সর্দার বলেছিল আমাদের, মা-র লোক এসে গেছে রে। এবার আমার যাবার পালা। একে ভালো করে সব শিখিয়ে দে। আর তোদের মার নেই।

তারা আর কিছু বলেনি। দাওয়ায় পা ঝুলিয়ে চুপচাপ বসে থেকেছে। নিজের মধ্যে সত্যিই একটা শক্তির উৎস অনুভব করেছে। মনে হয়েছে দুনিয়ার কোনও বাধাই তার প্রতিবন্ধক হতে পারবে না। তারা মায়ির দল অজেয়, অক্ষয়।

দিন তিনেকের মধ্যে খবর এল।

তারা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দলের লাঠিখেলা দেখছিল, একজন বৈরাগী এসে প্রণাম করে পিছনে দাঁড়াল।

খবর আছে মা।

তারা পিছিয়ে এল।

কী খবর?

পরশু মাঝরাতের কিছু পরে শক্তিগড়ের লোচন রায়ের গোমস্তা এই পথ দিয়ে যাবে কলকাতার সেরেস্তায় টাকা জমা দিতে।

সঙ্গে লোক কত?

এবার এক নতুন কায়দা করেছে মা। লোকজন নিয়ে হইচই করে যাবে না।

তবে?

এক পুরোহিত যাবে নারায়ণ কোলে করে। সঙ্গে জন চারেক লাঠিয়াল।

টাকা?

পুরোহিত আর লাঠিয়ালদের কোমরে থাকবে।

ঠিক আছে, যদি টাকা আমাদের কবলে আসে, পরে দেখা কোরো, পুরস্কার পাবে।

লোকটা আবার প্রণাম করে বিনীতকণ্ঠে বলল, গরিবকে মনে রাখবেন মা। অধীনের নাম নফর সামন্ত। নসিপুরের বাসিন্দা।

তারা ঘাড় নাড়ল।

লোকটা মাঠ পার হয়ে ঝোপের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে যেতে, তারা মেঘার কাছে এগিয়ে গিয়ে বলল, একটা খবর আছে। সন্ধ্যার পর তোমরা আমার সঙ্গে দেখা কোরো।

দলের পাঁচজন চাঁই ঠিক সন্ধ্যার পর তার ঘরে গিয়ে ঢুকল।

তারা সবে পূজা শেষ করে দেবীর পটের সামনে আরতি করছিল, মেঘাদের ঢুকতে দেখে ইঙ্গিতে বসতে বলল।

আরতি শেষ করে তাদের কাছে বসে নফর সামন্তর দেওয়া খবরের কথা বলল।

মনা বলল, লোক যদি এত কম হয় তো আমরা জন চারেক গিয়েই তো কাজ হাসিল করতে পারি। বেশি লোকজন নিয়ে হইচই করার কী দরকার। কী বলো?

সমর্থনের আশায় মনা সকলের মুখের দিকে দেখে শেষকালে তারার দিকে চোখ ফেরাল।

তারা কিছুক্ষণ কী ভাবল, তারপর চাপা গলায় বলল, আমি ভাবছি, আর-একটা কাজ করলে হয়।

মেঘা বলল, কী?

বিনা রক্তপাতে কাজ উদ্ধার করা যায় না?

কী করে?

তারা খুব ফিসফিস করে মতলবটা দলের কাছে বলল। শুনে হাসির হল্লা উঠল।

চৈতন মাথা নেড়ে বলল, বুদ্ধি বটে তারা মায়ির!

ঠিক দিনে শক্তিগড়ের গোমস্তা আসবার পথের ধারে এক বিরাট জিয়ল গাছের নীচে জটাজূটধারী এক সন্ন্যাসীকে দেখা গেল। সামনে ধুনি জ্বলছে। এধারে-ওধারে ছড়ানো নরকঙ্কাল। সন্ন্যাসীর সামনে এক নরকরোটিতে রক্তাভ পানীয়। সন্ন্যাসীর পরনে রক্তাম্বর। গলায় রুদ্রাক্ষের মালা, হাতে রুদ্রাক্ষের বলয়।

মধ্যযাম পার হতেই পথের বাঁকে দুটো মশালের আলো দেখা যায়। তার মানে, শক্তিগড়ের লোকেরা আসছে। কাছে আসতেই বোঝা গেল সবাই বেশ দ্রুত পদক্ষেপে চলেছে। কোনওরকমে এ অঞ্চলটা পার হতে পারলেই ভোরের দিকে সেবায়েতপুরের চটিতে আশ্রয় নিতে পারবে। মাঝপথে যে চটি আছে, সেটা খুব নিরাপদ নয়।

সন্ন্যাসীর কাছাকাছি আসতেই সন্ন্যাসী বজ্রকণ্ঠে হুংকার ছাড়ল, কে যায়?

আচমকা আওয়াজে সমস্ত দলটা থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।

পুরোহিত পিছনের লোকগুলোর দিকে ফিরে বলল, সর্বনাশ, কাপালিকের পাল্লায় পড়লাম যে!

এত রাতে এ পথ দিয়ে কোথায়?

পুরোহিত জোড়হাত করে সন্ন্যাসীর সামনে বসে পড়ল।

আজ্ঞে, আসছি শক্তিগড় থেকে, যাব কলকাতা। কলকাতার শোভাবাজারের হুজুরদের নতুন বাড়িতে বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা হবে, তাই গৃহদেবতাকে নিয়ে চলেছি।

কে হুজুর?

আজ্ঞে লোচন রায়। তাড়াতাড়ি ছুটছি, এলাকাটা তো ভালো নয়। কালু সর্দারের এলাকা।

সন্ন্যাসী ভ্রূ কুঞ্চিত করে পুরোহিতের দিকে একবার দেখল।

কালু সর্দার তো মারা গিয়েছে।

মারা গিয়েছে?

হ্যাঁ, যেমন কর্ম, তেমনই ফল। ইংরেজের বন্দুকের গুলিতে খতম।

তার দল?

ছড়িয়ে পড়েছে এধার-ওধার। তা ছাড়া তোমাদের সঙ্গে নারায়ণ রয়েছে, তোমাদের কী ভয়?

সেইজন্যই তো আরও ভয় প্রভু। কী জানি দুর্বৃত্তের দল যদি ঠাকুরকে অপবিত্র করে!

মূর্খ, সন্ন্যাসী গর্জন করে উঠল, ভগবানকে অপবিত্র করে কার সাধ্য! এই নাও কারণবারি।

সন্ন্যাসী নরকরোটি এগিয়ে দিল পুরোহিতের হাতে।

পুরো দলটাই সন্ন্যাসীকে ঘিরে গোল হয়ে বসে পড়েছিল। পথশ্রমের ক্লান্তি কিছুটা দূর হবে। তা ছাড়া, এমন নির্জন অরণ্যে কাপালিক যেন একটা ভরসা।

পুরোহিতের হাত থেকে দলের সবাই নরকরোটি নিয়ে সেই রক্তাভ পদার্থ পান করল। একের পর এক।

সন্ন্যাসী ধুনির পাশ থেকে ছাই তুলে নিয়ে সকলের কপালে টিপ পরিয়ে দিতে দিতে বলল, যা, এবার যাত্রা শুরু কর। সব অমঙ্গল কাটিয়ে দিলাম। কারো সাধ্য নেই তোদের স্পর্শ করে।

কিন্তু আশ্চর্য কাণ্ড, উঠে দাঁড়ানোর বদলে সবাই পথের ওপর নেতিয়ে পড়ল। চেতনাহীন।

ঠিক সেই সময় আশপাশের গাছের ডালগুলো দুলে উঠল।

প্রথমে তারা, তারপর মনা, চৈতন আর গোকুল। এক-এক করে মাটিতে লাফিয়ে পড়ল।

তারা হাসল, কী, কেমন মতলব দিয়েছিলাম?

সন্ন্যাসী উঠে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে উঠল, তারা মায়িকি জয়!

ঠিক আছে, এবার দেখো কী আছে। সাবধান, বিগ্রহের যেন কোনও ক্ষতি না হয়!

সবাই একটু সরে দাঁড়াল। সন্ন্যাসীরূপী মেঘা পুরোহিত আর সঙ্গীদের দেহ তন্ন তন্ন করে তল্লাশ করে নোট আর টাকার থলি বের করে নিল।

ধুনির আগুন নিভিয়ে সবাই অরণ্যের মধ্যে গা-ঢাকা দিল।

কিছুটা গিয়ে মনা বলল, টাকা লুঠ করা হল বটে, কিন্তু এতে গা গরম হল না তারা মা।

তারা চলতে চলতে বলল, আপশোসের কী আছে মনা, এক মাঘে কি আর শীত পালায়। দিন আসবে।

সেরাত্রেই মন্দিরের চাতালে বসে গোনা হল। নোটে টাকায় মিলে নগদ ত্রিশ হাজার টাকা। বিনা রক্তপাতে খুব ভালো উপার্জন।

চৈতনই বলল, আরও কিছু গাদাবন্দুক আমাদের দরকার তারা-মা। সর্দার বন্দুকের গুলিতে মারা গেল, এ দুঃখ আমাদের যাবার নয়। আমাদের হাতে কয়েকটা বন্দুক থাকলে লালমুখোদের সাধ্য কী আমাদের আক্রমণ করার সাহস পায়।

তারা বলল, কিন্তু বন্দুক অতগুলো জোগাড় হবে কী করে? এ তো এমন নয় যে পয়সা ফেললেই মুড়ি-বাতাসার মতন দোকান থেকে কিনতে পারব। এক উপায়, ইংরেজরা যখন এ তল্লাট দিয়ে যাবে, তখন তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে টাকার সঙ্গে বন্দুকও কেড়ে নেওয়া।

আজকাল শুনছি নাকি ইংরেজরা টাকা নিয়ে জলপথে যাচ্ছে। সে পথেও অবশ্য ছিপ নিয়ে জলদস্যুরা বসে আছে, আর তা ছাড়া সময়ও অনেক বেশি লাগে।

দেখা যাক। অপেক্ষায় থাকো। বাশুলি-মা সুযোগ দিলে ঠিক কাজ হাসিল হয়ে যাবে।

দিন সাতেক পরেই চৈতন একটা লোককে তারার কাছে নিয়ে এল। এ লোকটাকে তারা আগেও দেখেছে। জনমেজয় মিত্তির। এখানকার সব ক্রিয়াকলাপের হিসাবনিকাশ, লেখাপড়ার কাজ এ-ই করে। অনেক সময় জমির সীমানা নিয়ে ঝগড়াঝাঁটির ব্যাপার গাঁয়ের লোকেরা মিটমাটের জন্য কালু সর্দারের কাছে নিয়ে আসত। আইন-আদালতের ওপর তাদের আস্থা নেই। কালু সর্দার যা করবে, যা বলবে, তা-ই শিরোধার্য। তখন এই জনমেজয় মিত্তির দলিল-দস্তাবেজ সব পড়ে কালু সর্দারকে জমির সীমানার ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিত। দলের মধ্যে লেখাপড়া-জানা লোক আর ছিল না। তারা অবশ্য দ্বিতীয় ভাগ পর্যন্ত পড়েছে। তাও ভালো করে নয়। ছাপা লেখা যা-ও বা পড়তে পারে, হাতের লেখা পারে না।

কী হল? তারা বল্লমের ফলাটা শানে ঘষে চকচকে করতে করতে প্রশ্ন করল।

ব্যাপারটা বলো-না জনমেজয়। চৈতন লোকটাকে বলল।

জনমেজয় উড়ুনিতে বাঁধা হলদে রঙের ভাঁজ করা একটা কাগজ বের করল, তারপর সুতো-বাঁধা চশমাটা চোখে দিয়ে একবার তারার দিকে চেয়ে বলল, পড়ি?

বিস্মিতভাবে তারা মাথা নাড়ল।

জনমেজয় পড়তে আরম্ভ করল।

এতদ্দ্বারা জ্ঞাত হয় যে দেশের স্থানে স্থানে স্থলদস্যু ও জলদস্যুদের আপদ ইংরাজ সুশাসনের পক্ষে বিঘ্নস্বরূপ। আশা করা যায় সকলেই এ ধরনের বিঘ্ন উৎপাটিত করার জন্য যত্নবান হইবেক। গবর্নর বাহাদুরের অনুমতিক্রমে ইহা জ্ঞাপিত হইল যে দুর্গাপুর অরণ্যের তিলক সর্দার, তারা মায়ি আর ফটিকচরণকে যে বা যাহারা নিধন করিতে পারিবেক, তাহাদের সরকারের সেরেস্তা হইতে নগদ দুই হাজার টাকা পারিতোষিক দেওয়া হইবেক। জলদস্যু রামবাহাদুর ও পর্তুগিজ পিড্রজকে নিধন করিতে পারিলেও অনুরূপ অর্থ প্রদত্ত হইবেক। এ বিষয়ে সরকারও যথাসাধ্য তৎপর হইবেক।

পড়া শেষ করে জনমেজয় কাগজটা ভাঁজ করে আবার রেখে দিল।

এ ইস্তাহার কারা দিয়েছে? তারা গম্ভীর গলায় জনমেজয়কে জিজ্ঞাসা করল।

বর্ধমানের নরিশ সায়েব। কালেক্টর। শুনলাম বিরাট দলবল নিয়ে এদিকে আসবে, উদ্দেশ্য দুর্গাপুরের জঙ্গল পরিষ্কার করা।

হাঁটুর ওপর মুখটা রেখে তারা চুপচাপ বসে রইল। সামনাসামনি লড়াইয়ে এদের সঙ্গে পেরে ওঠা দুষ্কর। সঙ্গে প্রচুর বন্দুক-বারুদ থাকে। শিক্ষিত সৈন্যের সংখ্যাও কম নয়, একমাত্র ভরসা এ জঙ্গল এদের নখদর্পণে নয়। আচমকা পিছন থেকে আক্রমণ করে ঘায়েল করতে হবে। বন্দুক ছোড়ার সুযোগ না দিয়ে।

কিছুক্ষণ পর তারা চৈতনের দিকে ফিরল। একটা কাজ করতে হবে চৈতন।

বলো।

এখনই রনপা দিয়ে দুজন লোককে তিলক আর ফটিকের কাছে পাঠিয়ে দিতে হবে।

তারার কথা শুনে চৈতন অবাক হয়ে গেল।

আট

এ জঙ্গলে ডাকাতদের তিনটে বড়ো দল আছে। নামকরা। একেবারে পুব মুখে তিলক সর্দারের দল। তিলক জাতে বিহারি। তার দলের লোক ইদানীং অনেক কমে গেছে। কোম্পানির আমল থেকেই পাইকের কাজে লেগে গেছে। আসলে তিলক ঠগি। আচমকা লোকের গলায় মোম-দেওয়া দড়ির ফাঁস লাগিয়ে হত্যা করে।

বর্ধমানের কাছাকাছি আছে ফটিকচরণের দল। সংখ্যায় অনেক। এদের দলেই কয়েকজন আছে, হাতে বেঁটে লাঠি, অসম্ভব ক্ষিপ্রতায় সেই লাঠি ঘুরিয়ে পথিকের পায়ের ওপর ছুড়ে দেয়। অব্যর্থ লক্ষ্য। পায়ের হাড় ভেঙে লোকটা সেই যে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে, নিজের শক্তিতে আর কোনওদিন উঠতে পারে না। চিরজীবনের মতন খঞ্জ হয়ে যায়।

দুটো দলেরই একটা বড়ো অসুবিধা, অনেক লোক একসঙ্গে এলে তখনই মুশকিলে পড়ে যায়। মোম-লাগানো দড়ির ফাঁস আর বেঁটে লাঠি, এত লোকের বেলা কার্যকরী হয় না। এ বিষয়ে তারার দলের সুবিধা অনেক বেশি।

তিনটে দল, কিন্তু একজনের সঙ্গে আর-একজনের কোনও যোগাযোগ নেই। নিজের নিজের এলাকায় সবাই স্বাধীন। কেউ কোনওদিন কারো সঙ্গে দেখা করে না।

তারা প্রথম যেন এই নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটাতে চাইছে। সেইজন্যই চৈতন আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিল।

লোক গিয়ে কী বলবে?

একটা চিঠি দেব, সেটা দিয়ে আসবে। দুজনকে আমার সঙ্গে দেখা করার চিঠি।

দেখা করবে তোমার সঙ্গে?

দেখা করা-না-করা তাদের ইচ্ছা।

চৈতন ব্যাপারটা যেন ভালো চোখে দেখল না।

বলল, কী জানি, ওরা যদি ভাবে, আমরাই বা কেন যাব। তারাই আসুক আমাদের কাছে।

তারা মাথা নাড়ল, না, তা হয়তো ভাববে না, কারণ আমি মেয়েছেলে। আমার মনে হয় ওরা আসতে কোনও দ্বিধা করবে না। তুমি বুঝছ না, চৈতন, এই সময় আমাদের একজোট হতে হবে। কোম্পানির লোকেরা যেমন আমাদের উচ্ছেদ করতে বদ্ধপরিকর, তেমনই আমাদেরও বাঁচবার পথ খুঁজতে হবে।

কথাগুলো তারা খুব নরম সুরেই আরম্ভ করেছিল, কিন্তু উত্তেজিত হয়ে উঠতে গলার স্বরও চড়া হয়ে গেল।

আশপাশে দলের যে কজন ছিল, তারা এসে সামনে দাঁড়াল।

মেঘা বলল, কী হল তারা মায়ি?

তারা তার সিদ্ধান্তের কথা সবাইকে বলল।

মেঘা, চরণ, মনা, সিধু দলের অন্য চাঁইরা স্বীকার করল। যুক্তিটা মন্দ নয়। ওরা যেমন একজোট হচ্ছে, তেমনি আমাদেরও একজোট হতে হবে। তা ছাড়া, এসব ব্যাপারে বেশি লোকের পরামর্শ নেওয়াও মন্দ নয়।

তারা জনমেজয়কে দিয়ে দুটো চিঠি লেখাল। দু-লাইনের চিঠি। তলায় নাম নেই, শুধু দলের প্রতীকচিহ্ন।

দলের দুজন রনপা চড়ে দু-দিকে বেরিয়ে গেল।

চিঠিতে লেখা ছিল, সামনের শনিবার বাশুলির মন্দিরের চাতালে তিনজনের সভা বসবে। সভার উদ্দেশ্য নরিশ সাহেবের ইস্তাহারের বিষয় আলোচনা করা।

পরের দিনই চর দুজন ফিরে এল। সংবাদ শুভ। তিলক আর ফটিক আসতে রাজি।

তারা ঠিক করল, সভায় সবাইয়ের থাকার কোনও প্রয়োজন নেই। তারা ছাড়া দলের আর পাঁচজন চাঁই থাকবে। এ কথাও দলের দুজনকে বলে দিল, যেন জঙ্গলের পুব-পশ্চিম দু-দিকে অপেক্ষা করে। তিলক আর ফটিকচরণকে অভ্যর্থনা করে নিয়ে আসবে।

অন্ধকার রাত। চাঁদ উঠবে একেবারে শেষের দিকে। মন্দিরের চাতালের দু-পাশে দুটো মশাল জ্বালাবার ব্যবস্থা হল। সভার শেষে আহারাদির ব্যবস্থা। ভাত আর পাঁঠার মাংস। শেষ পাতে চালতার অম্বল। তিলক বিহারি মিষ্টান্নের ভক্ত। তাই বোঁদেও রাখতে হল।

শিয়াল ডাকার সঙ্গে সঙ্গে তিলক এসে হাজির। ঘোড়ার পিঠে। সঙ্গে দলের দুজন। বোধহয় পরামর্শদাতা।

অনেকক্ষণ কাটল, ফটিকের দেখা নেই। অভ্যর্থনার জন্য যাকে পাঠানো হয়েছিল, সে ফিরে এল।

তারা-মা, কই কেউ তো এল না। মশার কামড়ে দুটো পা ফুলে ঢোল হয়ে উঠেছে। কতক্ষণ আর দাঁড়াব।

তারা চাতালের ওপর তিলকের পাশে বসে ছিল। তিলকের দিকে চেয়ে বলল, আসবে বলে তো কথা দিয়েছিল ফটিকচরণ। বিপদ-আপদ হল না তো?

বিপদ-আপদ শত্তুরের হোক।

অন্ধকারে ভারী কণ্ঠস্বরে তারা আর তিলক দুজনেই একটু চমকে উঠল।

ঝোপের পাশ থেকে লাঠি হাতে এক মূর্তি এগিয়ে এল। দু-পায়ে ন্যাকড়ার ফালি। তাতে রক্তের ছোপ। সারা মুখে কালো কালো দাগ।

লোকটা সিঁড়ির ধাপে বসে পড়ে বলল, আমিই ফটিকচরণ। আসতে সামান্য দেরি হয়ে গেল।

তারা দাঁড়িয়ে উঠল, এ কী, এ অবস্থা কী করে হল?

মাথা নিচু করে পায়ের ন্যাকড়া খুলতে খুলতে ফটিক বলল, অবস্থাটা আমাকেই করতে হল। পুলিশের চর ঘুরছে। এখানে-ওখানে। কে তাদের খবর দিয়েছে মার্শাল সাহেবের দুটো পা নাকি আমিই জন্মের মতন খোঁড়া করে দিয়েছি। তাই এই রাজবেশ ধারণ করতে হল।

মুখের দাগগুলো মুছে নিয়ে ফটিক সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে তারার দিকে চেয়ে বলল, আদেশ করো তারা মায়ি, আমাকে তলব করেছ কেন?

ফটিক উঠে তিলকের পাশে গিয়ে বসল।

তারা নরিশ সাহেবের ইস্তাহারের কথাটা দুজনকে শোনাল।

দুজনেই এর আগে শুনেছে।

ফটিক আরও গোপন কথা বলল।

এ আর কী। শুনলাম নতুন লাট হয়েছে বেন্টিঙ্ক সাহেব। কলকাতার লাট। তামা-তুলসী হাতে নিয়ে বুঝি প্রতিজ্ঞা করেছে দেশ থেকে ডাকাতদের উচ্ছেদ করবে। আমরা নাকি দেশে অশান্তির সৃষ্টি করছি। লাটের আবার এক চেলা জুটেছে শ্লিম্যান।

চেলা?

চেলা ছাড়া আর কী। নিজের তো অত সময় নেই, তাই চোর-ডাকাত খতম করার ভার দিয়েছে এই চেলাটির ওপর।

এতক্ষণে তিলক কথা বলল, তা শ্রীমান কী করে খতম করবে আমাদের?

ফটিক হাসল, শ্রীমান নয় গো শ্লিম্যান। পাইক-বরকন্দাজ নিয়ে নাকি ঘেরাও করবে দুর্গাপুরের জঙ্গল। একটি প্রাণীকেও রেহাই দেবে না।

তারা বলল, একটা মতলব ঠিক করার জন্যই তোমাদের ডেকেছি। এত বড়ো জঙ্গল ঘেরাও করা তো আর মুখের কথা নয়। কোম্পানির তাঁবে এত লোক নেই। তবে আমাদের খুব সাবধানে থাকতে হবে। ফাঁদে ফেলার চেষ্টা নিশ্চয় করবে।

ফাঁদে ফেলবে কী করে? আমরা কি চিড়িয়া যে চট করে ধরা দেব?

একটা পায়ের ওপর আর-একটা পা তুলে নাচাতে নাচাতে ফটিক বলল, আমাদের ফাঁদ হচ্ছে টাকার তোড়া। টাকার লোভ দেখিয়ে না-ধরার চেষ্টা করে।

তিলক বলল, তার মানে?

মানে, হয়তো বিধবা সেজে কোম্পানির লোক তীর্থযাত্রা ভান করে এই পথ দিয়ে হাঁটবে। আমরা ঝাঁপিয়ে পড়লেই থান কাপড়ের তলা থেকে বন্দুক বের করবে। ঝোপঝাড় থেকে দলে দলে সিপাই আমাদের ঘিরে ধরবে।

তাহলে উপায়? তিলক হাতের লাঠিটা ঠুকতে লাগল।

উপায় হচ্ছে, যখনই লোক জানিয়ে এ পথ দিয়ে কেউ যাবে, তখনই সাবধান। লোক জানিয়ে মানে, টাকা নিয়ে অসহায় লোক যাচ্ছে এমন একটা কথা লোকের মুখে যদি রাষ্ট্র করে দেয়, যাতে আমাদের কানে আসে, তাহলেই বুঝতে হবে ভিতরে গলদ আছে। তাদের আক্রমণ না-করাই বুদ্ধির কাজ হবে।

দলের একজন ভাঁড়ে শরবত নিয়ে এসে দাঁড়াল। তারা শরবত বিলাতে বিলাতে বলল, কাজের কথা শোনো। তোমরা দুজন দু-দিকে আছ, আমি মাঝখানে। যদি গোলমাল হয় তো তোমরাই আগে টের পাবে। এমন একটা ব্যবস্থা করো যাতে গোলমালের আভাস পেলেই আমাকে খবরটা দিতে পারো। একজন যদি বিপদে পড়ে, তাহলে দলবল নিয়ে আমরা দুজন এগিয়ে যাব তার সাহায্য করতে।

খুব ভালো কথা। আমরাও একজোট হব। তেমন কিছু হলে তারা-মা আমি তোমাকে খবর দেব, তুমি খবর দেবে ফটিককে। দেখি, কোম্পানির কী সাধ্যি আমাদের শেষ করে।

মাঝরাতের পর সভা শেষ হল। তিলক আর ফটিক দুজনে দু-দিকে চলে গেল। দুজনেরই রনপা ছিল। যেতে দেরি হল না।

তারা নিজের কুঁড়েঘরে ফিরে এল।

বিছানায় শুল, কিন্তু তারার চোখে ঘুম এল না। শুয়ে শুয়ে চিন্তা করতে লাগল। বড়ো কম ভাবনার কথা নয়। সমস্ত দলের নিরাপত্তার ভার তার ওপর। মঙ্গল-অমঙ্গল সব চিন্তা তাকেই করতে হবে। কালু সর্দার দলকে তারই হাতে তুলে দিয়ে গেছে।

কোম্পানির কর্তারা কোনওদিনই তাদের ভালো চোখে দেখেনি। এভাবে টাকাপয়সা লুঠতরাজ করলে কে-ই বা দেখে। কিন্তু মা বাশুলি জানেন, টাকাপয়সা লুঠ করেছে বটে, কিন্তু নিজের দলের জন্য সে টাকাপয়সার আর কতটুকু খরচ করেছে; বেশির ভাগই আশপাশের গাঁয়ের লোকদের জন্য খরচ করেছে। তাদের ক্ষুধা মিটিয়েছে, পরনের কাপড়চোপড় দিয়েছে, শীতের সময় গরম জামাকাপড় বিলি করেছে।

জমিদাররা যা করেনি, ইংরেজ সরকার যা করেনি, তারা তা-ই করেছে।

ভাবতে ভাবতে একসময়ে তারা ঘুমে অচেতন হয়ে পড়ল।

দিন পনেরো-কুড়ি একেবারে চুপচাপ। লোকজন পথ চলা বুঝি বন্ধই করে দিল। যে দু-একজন গেল, তারা মোটেই লোভনীয় শিকার নয়। একেবারে নিঃসম্বল পথিক। শহরের দিকে চলেছে চাকরির সন্ধানে।

বসে বসে দলের লোকদের শরীরে প্রায় মরচে ধরার জোগাড়।

হঠাৎ এক খবর এল। খবর আনল কানা গোবিন্দ। গোবিন্দ দু-চোখেই দেখতে পায়। বরং একটু বেশিই দেখে। কী একটা গাছের আঠা মাখিয়ে মাঝে মাঝে চোখের পাতা দুটো বেমালুম জুড়ে দেয়। খুব কাছের লোকও টের পায় না। ভাবে বেচারি দৃষ্টিহীন।

গোবিন্দ খবর আনল খাস ইংরেজের তাঁবু থেকে।

এখান থেকে মাইল পাঁচেক দূরে রানিসায়র। লোকে বলে রানির বিল। এই বিলের ধারে ধারে শীতকালে হরেক রকমের পাখি আসে। কোথা থেকে আসে কে জানে। এখানকার লোকেরা সব পাখির নামও জানি না। পাখি শিকারের লোভে শহর থেকে ছোকরা সাহেবরা আসে। বিলের পাশে তাঁবু ফেলে। পাঁচ-সাত দিক কাটিয়ে যায়। পাখি মারে। নিজেরাই পালক ছাড়িয়ে আগুনে ঝলসে খেয়ে ফেলে।

গোবিন্দ বলল, এবার প্রায় জন পাঁচেক সাহেব এসেছে। সঙ্গে ছ-টা বন্দুক। কোনওরকমে বন্দুকগুলো হাত করতে পারলেই কাজ হয়। তারার দলে বন্দুকের প্রয়োজন, সে খবর গোবিন্দ রাখত।

একটা উপায় বাতলে দাও তারা-মা। বন্দুক ক-টা তোমাদের এনে দিই।

এ কথা গোবিন্দ বলল বটে, তবে সে মনে মনে ভালো করেই জানত এ প্রায় অসম্ভব। বরং বাঘিনির কোল থেকে তার বাচ্চা টেনে আনা যেতে পারে, কিন্তু ইংরেজদের কাছ থেকে বন্দুক ফুসলে আনা কিছুতেই যাবে না।

দিনের বেলা বন্দুকগুলো তারা তো কাছে কাছে রাখেই, রাত্রিবেলা শোবার সময় মাথার কাছে তাঁবুর হুকে বন্দুকগুলো আটকে রাখে। ইংরেজদের খানসামার সঙ্গে কথা বলে গোবিন্দ এ খবর সংগ্রহ করেছে।

তারা চিন্তায় পড়ল। এতগুলো বন্দুক এত কাছে রয়েছে, অথচ পাবার কোনও পথ নেই।

দলসুদ্ধ ইংরেজদের তাঁবুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে, কিন্তু অতগুলো বন্দুকের মুখে কী হয় বলা যায় না। এ দেশি সিপাই হলে ভয়ের কিছু ছিল না, কিন্তু ইংরেজের বাচ্চারা শেষ পর্যন্ত লড়বে।

তারা বলল, আচ্ছা গোবিন্দ, তুমি দুপুরের দিকে একবার আমার সঙ্গে দেখা করো। আমি একটু চিন্তা করে দেখি।

দুপুরের দিকে গোবিন্দ আবার এসে দাঁড়াল। তারার পাশে মেঘা, চৈতন আর মনাও ছিল। গোবিন্দকে কাছে ডেকে তারা ফিসফিস করে কিছুক্ষণ ধরে পরামর্শ করল।

গোবিন্দর মুখে হাসি ফুটে উঠল।

হাসতে হাসতেই বলল, ঠিক আছে তারা-মা, আমি কাল ভোরেই সাহেবদের তাঁবুতে একবার যাব। যদি কাজ হাসিল করতে পারি, তাহলে মেঘা, চৈতন আর মনাকে বলে যাব। ওরা যেন তৈরি থাকে।

পরের দিন ভোরে গোবিন্দ যখন তাঁবুর কাছে গিয়ে দাঁড়াল তখন তার অঙ্গে কানা ভিখারির সাজ। হাতে খঞ্জনি।

সাহেবরা গোল হয়ে তাঁবুর সামনে মাঠের ওপরে বসে বন্দুক পরিষ্কার করছিল, গোবিন্দকে দেখে একজন বলল, এই সাঢু, একঠো গান শুনাও। ভালো গান। রাঢা-কিষ্ট গান।

সঙ্গে সঙ্গে খঞ্জনিতে ঘা দিয়ে গোবিন্দ কীর্তন শুরু করে দিল।

গোবিন্দর গলা চমৎকার। যেমন মিষ্ট, তেমনই সুরেলা। সাহেবরা না বুঝলেও তালে তালে মাথা নাড়তে লাগল।

গানের শেষে গোবিন্দ কাঁধের থলি বাড়িয়ে দিল। খানসামা তাতে আলু, বেগুন, চাল ঢেলে দিল।

গোবিন্দর কিন্তু যাবার নাম নেই। সে চেপে সাহেবদের সামনে বসল।

হ্যাঁ সাহেব, তোমরা জল আনো কোথা থেকে? কোথাকার জল খাও?

কেন?

চারদিকে মহামারি শুরু হয়েছে। মায়ের দয়া, তাই জিজ্ঞাসা করছি।

সাহেবরা কথাটা ঠিক বুঝতে পারল না। পাশে দাঁড়ানো খানসামাকে মানে জিজ্ঞাসা করল।

খানসামা বুঝিয়ে দিল মায়ের দয়া মানে বসন্ত।

এই রোগটাকে সাহেবরা যমের চেয়েও ভয় করে। প্রাণে বাঁচাই এ রোগে দুষ্কর, বাঁচলেও মুখের এমন অবস্থা হয়, রীতিমতো ভীতিপ্রদ।

এই বিল ঠেকে জল আনি। আগুনে গরম করিয়া পান করি।

এই বিল থেকে? গোবিন্দ যেন আঁতকে উঠল।

কী হইল?

আর কী হইল! বছর তিনেক আগে এখানকার জল খেয়ে জমিদারের পুরো বরকন্দাজের দল একেবারে খতম।

সাহেবরা চমকে উঠল।

জল ফুটিয়ে খেলে হবে না সাহেব, অন্য জায়গা থেকে জল আনার ব্যবস্থা করো।

সাহেবরা মুশকিলে পড়ল। কাছাকাছি কোনও বড়ো জলাশয় নেই। দু-একটা যা পুকুর আছে, তাদের অবস্থা আরও শোচনীয়। শীতকালে শুকনো খটখট করছে।

উপায়!

এক কাজ করতে পারি সাহেব, তবে বেশি দিন পারব না।

কী কাজ?

আমি যে গাঁয়ে থাকি, সেখানে প্রকাণ্ড এক ইঁদারা আছে, তার জল গরম করে এনে দিতে পারি। তবে তার জন্য পয়সা চাই আমার। আর দিন তিনেকের বেশি পারব না।

ঠিক আছে। পাবে পয়সা। দিন তিনেকই তুমি নিয়ে এসো, তার চেয়ে বেশি দিন আমরা থাকবও না। শিকার মাথায় থাক।

তা-ই ব্যবস্থা হল। বাঁকের দু-ধারে কলসি বসিয়ে কলসির মুখে কলাপাতা ঢাকা দিয়ে গোবিন্দ সাহেবদের জন্য পানীয় জল এনে দিয়ে পরিশ্রমের মূল্য নিল।

তার পরের ব্যাপারটা খুবই সহজ।

রাতের অন্ধকারে মুখে কালি মেখে মেঘা, চৈতন আর মনা তাঁবুতে ঢুকল। খানসামা বাইরে ঘুমাচ্ছিল, তারই কাপড় দিয়ে গোবিন্দ তার মুখ-হাত-পা বেঁধে ফেলল।

জল পান করে সাহেবরা বেহুঁশ। ষণ্ডামার্কা তিনটে লোক তাঁবুতে ঢুকতে একবার চোখ মেলেও দেখল না।

কয়েক মুহূর্তের মধ্যে তারার অনুচরেরা সব ক-টা বন্দুক বগলদাবা করে বেরিয়ে এল। শুধু বন্দুক নয়, টেবিলের ওপর কার্তুজের বাক্স ছিল। সেগুলো আনতেও ভুল হল না।

তারা খুব খুশি। বিনা রক্তপাতে তার মতলব হাসিল হয়েছে বলে নয়, দলের শক্তি অনেক বেড়ে যাবে ছ-টা বন্দুক পেয়ে।

এতদিন তারার ভয় ছিল, খুব ভারী একটা দল প্রচুর বন্দুক নিয়ে এ পথে এলে তাদের মোকাবিলা করতে একটু অসুবিধাই হয়। ফলে সম্ভব হত না বলেই কৌশলের আশ্রয় নিতে হত।

এবার আর সে ভয় নেই, তখন তারা একটা খারাপ খবর পেল।

ইংরেজ সিপাইদের হাতে তিলক সর্দার ধরা পড়েছে। সংবাদ দিল তারই দলের একজন।

তিলক সর্দারের আস্তানার মাইল দুয়েকের মধ্যে ইংরেজ কালেক্টরের তাঁবু পড়েছিল। সঙ্গে সিপাই-বরকন্দাজ অনেক ছিল, তিলক টের পায়নি। সবাই চাষার ছদ্মবেশে ঘোরাফেরা করছিল।

কালেক্টর সাহেব চাঁদিনি রাতে ঘোড়ার ওপর চড়ে এদিক-ওদিক বেড়াচ্ছিল, তিলকও ওত পেতে ছিল।

সে ভেবেছিল লোকটাকে ঘায়েল করতে পারলে টাকাপয়সা বেশ কিছু পাওয়া যাবে। সাহেবরা কোথায় টাকা রাখে, তিলকের জানা। কোমরবন্ধের মধ্যে পকেট থাকে, সেখানেই সবকিছু। এমনকী রাত্রে শোবার সময়ও সাহেবরা কোমরবন্ধ খোলে না।

কালেক্টর সাহেব একটা বাঁশের বাঁশি বের করে ফুঁ দিচ্ছিল। আকাশে-বাতাসে মিষ্ট একটা সুর।

ঝোপের আড়ালে বসে তিলক দড়ির ফাঁস ঠিক করে নিয়েছিল, সাহেব কাছ বরাবর আসতেই দড়িটা মাথার ওপর ঘুরিয়ে ছুড়ে দিয়েছিল।

তিলকের বরাত। এ পর্যন্ত কোনওদিন সে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়নি। সবাই বলে তিলকের ফাঁসে মাছি পর্যন্ত আটকে যায়।

কিন্তু সাহেব যেন দড়ির গন্ধ পেয়েছিল। সঙ্গে সঙ্গে ঘোড়ার ঘাড় জড়িয়ে সোজা হয়ে শুয়ে পড়েছিল। দড়িটা চাবুকের মতন সপাৎ করে পিঠের ওপর এসে পড়েছিল।

পলকের মধ্যে দড়িটা টেনে নিয়ে তিলক দ্বিতীয়বার ছোড়বার জন্য তৈরি হবার আগেই বিপদ ঘটেছিল।

ঘোড়ার পিঠে শুয়ে শুয়েই সাহেব অপূর্ব সুরে বাঁশি বাজাতে শুরু করেছিল, আর দড়ি হাতে করে তিলক সর্দার পাথরের মতন দাঁড়িয়ে পড়েছিল।

আশপাশের গাছপালার পিছন থেকে ছুটে এসেছিল অন্তত পঞ্চাশজন সিপাই। সকলের হাতে উদ্যত বন্দুক। তিলকের দম নেবার পর্যন্ত সময় দেয়নি। পিঠে-বুকে বন্দুক ঠেকিয়ে তাকে হাঁটিয়ে তাঁবুর মধ্যে নিয়ে ঢুকিয়েছিল।

দলের আর সবাই কোথায় ছিল? তারা উদবিগ্নকণ্ঠে প্রশ্ন করল।

অনেকেই শিকারের খোঁজে এদিক-ওদিক ঘুরছিল। আমরা কয়েকজন কাছাকাছি ছিলাম, কিন্তু অতগুলো বন্দুকের সামনে কী করব?

তারপর?

তারপর সর্দারকে ছই-ঢাকা গোরুর গাড়িতে চাপিয়ে শহরের দিকে নিয়ে চলে গেল। দলের সব লোক এদিকে-ওদিকে ছিটকে পড়ল। আমরা জন দশেক এখনও আছি। কিন্তু মুণ্ড ছাড়া ধড় আর কী করবে বলো? চুপচাপ বসে রয়েছি। আমাদের তোমার দলে নিয়ে নাও তারা-মা।

তারা খুব চিন্তিত ছিল। কোনও উত্তর দিল না।

লোকটা বলল, একটা খবর পেয়েছি।

কী?

সাহেবটা কালেক্টর নয়, অন্য কী একটা নাম।

মেঘা পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। বলল, বুঝেছি, বুঝেছি, ওই হচ্ছে ছিরিমান।

তারা মুচকি হাসল, ছিরিমান নয়, শ্লিম্যান।

সে আবার কে?

লাটসাহেবের লোক আমাদের খতম করার প্রতিজ্ঞা করেছে। তিলক সর্দার গেল। বাকি রইলাম আমি আর ফটিকচরণ।

চৈতন বলল, এবার থেকে আমাদের খুব সাবধানে থাকতে হবে তারা-মা। কিছুদিন না হয় চুপচাপ বসে থাকব। শিকারের লোভ করে দরকার নেই। কোথায় কোম্পানি কী ফাঁদ পেতে রাখবে বলা যায়।

তারা সায় দিল। বলল, সত্যি এখন কিছুদিন গা-ঢাকা দিয়ে থাকাই ভালো। দলের যারা নিজেদের গাঁয়ে ফিরে যেতে চায় যাক। দরকার হলে ডেকে নেব।

এখন আমাদের কিছুদিন চুপচাপ থেকে সাহেবদের হালচাল লক্ষ করে যাওয়া উচিত। একজনকে যখন ধরেছে, তখন মনে হয়, ওরা এদিকেও জাল বিছোবার চেষ্টা করবে।

নয়

কিন্তু চুপচাপ তারা বসে থাকতে পারল না। লোকে তাকে বসে থাকতে দিল না।

দিন কুড়ি পরেই তারা বাশুলির মন্দির থেকে পূজা সেরে বাইরে এসেই চমকে গেল।

মন্দিরের সিঁড়ির সামনে জন ত্রিশেক লোক। অস্থিচর্মসার চেহারা, কোটরাগত চোখ, পথশ্রমে যেন ধুঁকছে।

তারাকে দেখেই সবাই মাটির ওপর লুটিয়ে পড়ে বলল, মা, আমাদের বাঁচাও!

তারা একটু থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।

কে তোমরা?

আমরা রাইপুরের চাষি মা। পাঁচ কোশ পথ হেঁটে তোমার কাছে এসেছি।

আমার কাছে কেন?

তোমারই নাম শুনেছি। তুমি গরিবের মা। জমিদার আমাদের খেতের ফসল সব নিজের গোলায় আটকে রেখেছে। চালের মন দু-টাকা। কী করে আমরা বাঁচব মা বলো?

জমিদারের কাছে গিয়ে বলো তোমরা।

বলেছি মা। অনেক বলেছি। উত্তরও পেয়েছি, এই দেখো।

সামনের কয়েকজন চাষি পিছন ফিরে দাঁড়াল।

তাদের পিঠে চাবুকের রক্তাক্ত দাগ।

ইস, এইরকমভাবে মেরেছে?

এ আর কী মা। কত লোককে দিনের পর দিন ঠান্ডা গারদে পুরে রেখেছে। পরে দেহগুলো খালের জলে ভাসিয়ে দিয়েছে। জমিদার নয় মা, পিশাচ।

ঠিক আছে, তোমরা মাঠে বিশ্রাম করো। আমি দেখি কী করতে পারি।

চাষিরা গাছের ছায়ায় বসল। তারা চরণকে ডেকে তাদের মুড়ি আর গুড় দিতে বলল।

দুপুরের দিকে সভা বসল।

তারা বলল, এমন তো নয়, এরা কারসাজি করে আমাদের বিপদে ফেলতে চায়? কোম্পানির লোকের সঙ্গে এদের যোগসাজশ আছে।

মেঘা জিভ কাটল, না তারা-মা, সে ভয় নেই। এরা সব আমাদের জানা লোক। মধু, পচা, ফকরে, নিতাই এরা কতবার উৎসবে এসেছে নেমন্তন্ন খেতে। কালু সর্দারের আমলে অনেক খবরাখবরও এনেছে।

তাহলে তো আমাদের সামনে শুধু একটা পথ খোলা আছে।

কী? কী পথ?

রাইপুরের জমিদারের বাড়ি আক্রমণ করা।

তারপর?

তারপর গোলার চাবি নিয়ে গোলার দরজা খুলে দেব। গাঁয়ের চাষিরা ধান লুঠ করে নেবে। এতে একটা সুবিধা হবে, চাষিরাও আমাদের দলের হয়ে যাবে। কোনওরকম বাধা দেবে না।

মাটিতে লাঠি ঠুকে মেঘা বলল, খুব ভালো কথা তারা-মা। চুপচাপ বসে থেকে থেকে গা-গতরে বাত ধরে গেল। তাহলে একটা দিন ঠিক করা হোক।

চৈতন বলল, ও আর দিন দেখাদেখি কী। তারা-মায়ের কাজ সর্বদাই শুভকাজ। আর দিন দশেক পরেই অমাবস্যা। সেরাতেই বেরিয়ে পড়া যাবে।

কিন্তু একটা কথা আছে। তারা বলল।

সবাই তারার দিকে মুখ ফেরাল।

কী কথা?

কালু সর্দারের দল কখনো বিনা চিঠিতে ডাকাতি করতে যায় না। আমরা যে যাব, সেটা রাইপুরের জমিদারকে চিঠি লিখে আগে জানিয়ে দেব।

দলের সকলেই যেন একটু বিব্রত বোধ করল।

মনা বলল, আগে থেকে জানান দেওয়াটা কি ঠিক হবে? দিনকাল খারাপ, আগের দিনের কথা ছেড়ে দাও। এখন যদি জমিদার কোম্পানির সিপাইয়ের সাহায্য নেয়? বন্দুক নিয়ে সবাই ওত পেতে বসে থাকে?

তারা ভ্রূ কোঁচকাল।

যা-ই হোক, কালু সর্দারের নিয়ম ভাঙতে পারব না। বিনা চিঠিতে আমাদের দল কোথাও যাবে না। বন্দুক আমাদেরও আছে। ভয়টা কীসের?

তা-ই ঠিক হল, অমাবস্যার দু-দিন আগে চিঠি যাবে। অমাবস্যার রাত্রে দল গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে জমিদারবাড়িতে। তার আগে চৈতন আর পরান চাষিদের খবর দিয়ে দেবে, তারা যেন তৈরি থাকে।

চিঠি লেখবার সময় তারা বলল, কালিতে লিখলে চলবে না। এই দিয়ে লেখো।

পাশ থেকে বর্শার ফলা তুলে নিয়ে আস্তে আঙুলে বসিয়ে দিল। ফিনকি দিয়ে রক্তের স্রোত বইতে শুরু করল।

আঙুলটা এগিয়ে দিয়ে তারা বলল, লাল অক্ষরে লেখো চিঠি। জমিদারের পড়তে সুবিধা হবে।

ঠিক অমাবস্যার দু-দিন আগে চিঠি নিয়ে পরান ছুটল। রনপায়ে ভর দিয়ে।

তিরের ফলায় চিঠিটা আটকে ছুড়ে দেবে জমিদারের বাড়িতে।

সব ঠিক হল। কাজ শেষ করে পরান ফিরে এল।

রাইপুরের জমিদার পতাকী ঘোষাল। যেমন উচ্ছৃঙ্খল স্বভাব, তেমনই দুর্দান্ত প্রকৃতির। প্রজারা দু-বেলা তার মরণকামনা করে। তিন কূলে কেউ নেই। বিয়ের বছরখানেকের মধ্যে স্ত্রী মারা গিয়েছিল। লোকে বলে পতাকী ঘোষালই বিষ খাইয়ে মেরে ফেলেছিল বউকে। তার কী একটা অন্যায় কাজের প্রতিবাদ করেছিল বলে।

খুব ভোরে উঠে পতাকী ঘোষাল ঘোড়ার পিঠে বেড়াতে বের হয়। অর্ধেক জমিদারিটা একবার চক্কর দিয়ে ফেরে। পথের ওপর প্রজার দেখা পেলে সপাসপ তার পিঠে চাবুক চালায়। একেবারে বিনা কারণে।

সেদিনও বেড়িয়ে বাড়িতে ফেরার মুখে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। ঘোড়াসুদ্ধ। দেউড়ির ফটকের ওপর একটা তির গাঁথা। তিরের মুখে চিঠি।

ঘোড়া থেকে নেমে পতাকী ঘোষাল একটানে তিরটা উঠিয়ে ফেলল। চিঠিটা পড়তে পড়তে তার দুটি চোখ আরক্ত হয়ে উঠল।

একজন পাইকের হাতে ঘোড়া ছেড়ে দিয়ে ওপরে নিজের ঘরে এসে ঢুকল।

কয়েক লাইনের চিঠি। লাল অক্ষরে লেখা। চিঠির কোণে রক্তাক্ত খাঁড়ার চিহ্ন।

যথাবিহিত সম্মানপুরঃসর নিবেদনমেতৎ,

আপনার বিশাল ধনসম্পত্তি ও দুর্দান্ত চরিত্রের কথা আমরা অরণ্যবাসী হইয়াও অবগত আছি। দুইই কিঞ্চিৎ খর্ব করার মানসে আগামী অমাবস্যা রাত্রের দ্বিতীয় যামে সানুচর আপনার গৃহে পদার্পণ করিবার বাসনা রাখি। আপনি প্রস্তুত থাকিবেন।

আমাদের ভক্তিসহ প্রণাম গ্রহণ করিবেন।

ইতি

বাশুলি-মায়ের দাসী

তারা।

স্পর্ধা! দাঁতে দাঁত চেপে পতাকী একটা কড়মড় শব্দ করল। মুখে-চোখে হিংস্র ভাব ফুটে উঠল।

ঠিক আছে, তুমি কত বড়ো বাশুলি-মায়ের দাসী আমিও দেখে নিচ্ছি। মেয়েছেলের এত বাড় ভালো নয়।

অমাবস্যার দ্বিতীয় যাম। অমাবস্যা হচ্ছে কাল। হাতে সময়ও কম।

দুপুরের মধ্যে পতাকী ঘোষাল জমিদারির পর পাইক-বরকন্দাজদের ডেকে পাঠাল। তারা আসতে বলল, এ জমিদারির ইমান রাখার ভার তোমাদের ওপর। ডাকাত চিঠি দিয়ে শাসিয়েছে আমার ধনসম্পত্তি লুঠ করবে। বেইজ্জত করবে। কী তোমাদের মত বলো?

সর্দার পাইকরা হাতের লাঠি তুলে চেঁচিয়ে উঠল, আমাদের জ্ঞান থাকতে তা হতে দেব না। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন হুজুর।

কাল মাঝরাতে ওরা হানা দেবে। সম্ভবত জমিদারবাড়িই আক্রমণ করবে। তোমরা সবাই দা, সড়কি, বর্শা নিয়ে জমিদারবাড়ি ঘিরে থাকবে। ওপরের বারান্দায় আমি নিজে থাকব বন্দুক নিয়ে। কিন্তু বরকন্দাজ রাখব একেবারে জমিদারিতে ঢোকবার মুখে। প্রথমে তারা বাধা দেবে। অবশ্য ডাকাতরা খুব চালাক। হঠাৎ কোন দিক দিয়ে আসে কিছু বলা যায় না। আমাদের সব দিকে সর্বদা হুঁশিয়ার থাকতে হবে।

আবার সর্দাররা লাঠি তুলে নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিল।

সব ব্যবস্থা ঠিক হয়ে গেল। পতাকী ঘোষাল একরকম নিশ্চিন্ত হল। ডাকাতদের সাধ্য নেই তার জমিদারিতে ঢোকে। তিন পুরুষে তাদের এলাকায় কোনওদিন ডাকাতি হয়নি। কেউ সাহস করেনি মাথা গলাতে।

এবার দেখা যাক বাশুলির দাসীর কতটা বিক্রম।

পরের দিন ঠিক তিনটে নাগাদ পাইক-বরকন্দাজরা চমকে দেখল অনেক দূরে ধুলো উড়িয়ে এক ঘোড়সওয়ার তিরবেগে আসছে।

পতাকী ঘোষাল লোহার আলমারি খুলে দামি অলংকারগুলো একবার মিলিয়ে নিচ্ছিল, পাইকদের চিৎকার শুনে তাড়াতাড়ি আলমারি বন্ধ করে বারান্দায় এসে দাঁড়াল।

ততক্ষণে ঘোড়সওয়ার অনেকটা কাছে এগিয়ে এসেছে। মাথার টুপি খুলে হাত নেড়ে কী বলছে। প্রখর রৌদ্রে ঘোড়সওয়ারের সুগৌর রং দেখে বোঝা গেল লোকটা ইংরেজ।

পাইক-বরকন্দাজরা তাদের হাতের অস্ত্র উদ্যত করে রেখেছিল, পতাকীর আদেশে সবাই সরে দাঁড়াল।

ঘোড়সওয়ার ফটক পার হয়ে উঠানে এসে ঘোড়া থেকে নেমে পড়ল।

পতাকী ঘোষালও সিঁড়ি দিয়ে নেমে উঠানে এসে দাঁড়িয়েছে।

ঘোড়সওয়ার টুপিটা বুকের কাছে রেখে অভিবাদন করে বলল, আপনি কি রাইপুরের জমিনদার?

পতাকী ঘোষাল বলল, হ্যাঁ সাহেব।

আমি কলভিন। মহামান্য ইংরেজ বাহাদুরের সৈন্যবিভাগের লোক। আপনার কাছে কিছু সাহায্য প্রার্থনার জন্য আসিয়াছি।

বলুন।

দুর্গাপুর জঙ্গল ডাকাতের আস্তানা তা নিশ্চয় আপনি জানেন। এ ডাকাতরা মাঝে মাঝে আশপাশের লোকদের শান্তি নষ্ট করে। পথচারীর প্রাণনাশ করে তাদের সর্বস্ব লুণ্ঠন করে।

পতাকী ঘোষাল ঘাড় নাড়ল।

আজ আমরা ডাকাতের একটি দলকে গ্রেপ্তার করিতে চাই। খোঁজ পাইয়াছি তাহারা আপনার জমিদারির দিকেই আসিতেছে।

এবার পতাকী ঘোষাল আরও কয়েক পা এগিয়ে এল। সাহেবের কাছ বরাবর। বলল, আমি আগেই খবর পেয়েছি ডাকাতরা আমার এখানেই হামলা করতে আসবে, মানে চিঠি দিয়ে তা-ই জানিয়েছে। আপনারা কি তাদের গ্রেপ্তার করেছেন?

প্রায়। তবে তাহারা দলে ভীষণ ভারী। আমাদের সৈন্য সংখ্যায় কিছু অল্প। লড়াই হইলে কী হইবে বলা যায় না। তাই আমাদের দলপতি আপনার কাছে পাঠাইলেন, আপনি আপনার লোক দিয়া সাহায্য করুন।

পতাকী ঘোষাল ব্যস্ত হয়ে উঠল।

নিশ্চয়, নিশ্চয়, এ আবার একটা কথা। এতে তো আমারই লাভ। দলটাকে জব্দ করার জন্য আমিও লোক তৈরি রেখেছিলাম।

কথার শেষে পতাকী দু-হাতে তালি বাজাল। সঙ্গে সঙ্গে বল্লমধারী একজন পাইক এসে দু-হাত জোড় করে নমস্কার করল।

হুকুম করুন হুজুর।

জন দশেক পাইক এখানে রেখে বাকি সবাইকে নিয়ে সাহেবের সঙ্গে চলে যাও। যে ডাকাতের দলের আজ রাতে এখানে আসার কথা, তাদের ইংরেজের লোক আগেই আটকাতে চাইছে। তোমরা তাদের সাহায্য করবে।

পাইক আবার নমস্কার করে দলের মধ্যে গিয়ে দাঁড়াল। সাহেব ঘোড়ার পিঠে উঠতেই তার পিছন পিছন সবাই দল বেঁধে অনুসরণ করল।

তারা পথের বাঁকে না মিলিয়ে যাওয়া পর্যন্ত পতাকী ঘোষাল দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখল, তারপর সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠতে উঠতে নিজের মনে খুব হেসে নিয়ে বলল, যা শত্রু পরে পরে। ষাঁড়ের শত্রু বাঘে মারুক, মাঝখান থেকে আমি বেঁচে যাব।

পতাকী ঘোষাল নিশ্চিন্ত মনে নিজের ঘরে ঢুকল।

দশ

মাঝরাতের একটু পরেই পতাকীর ঘুম ভেঙে গেল। বাইরে দারুণ একটা হট্টগোল। চোখ চেয়ে দেখল মশালের আলোয় আকাশ লাল হয়ে উঠেছে। একবার মনে ভাবল তার বরকন্দাজরা বোধহয় ডাকাতদের শায়েস্তা করে ফিরছে। তারপরই কিন্তু জয়ধ্বনির ভাষা শুনে চমকে উঠল।

তারা মায়িকি জয়! হা রে রে রে!

বিছানা থেকে উঠে বাইরে এসেই পতাকী চিৎকার করে উঠল।

দু-পাশে বর্শাধারী দুজন ডাকাত। মাঝখানে খুব কমবয়সি একটি মেয়ে। কপালে মস্ত বড়ো সিঁদুরের টিপ। এলোখোঁপা। চওড়া লালপাড় শাড়ি গাছকোমর বাঁধা। হাতে বন্দুক। বন্দুক ঠিক পতাকীর বুকের দিকে উদ্যত।

কে, কে তোমরা?

মেয়েটা মুচকি হাসল, বাশুলি-মায়ের দাসী। এরাও মায়ের অনুচর।

কী চাই আমার কাছে?

তোমার গোলাঘরের চাবি।

তারা বন্দুক আরও এগিয়ে আনল। তাহলে আর আমার দোষ নেই। ভেবেছিলাম বিনা রক্তপাতেই কাজ হবে। এক দুই তিন বলব। এর মধ্যে যদি চাবি না পাই, তাহলে ঘোড়া টিপতে বাধ্য হব।

পতাকী আর দ্বিরুক্তি না করে কোমরে বাঁধা চাবির গোছাটা ফেলে দিয়ে বলল, লাল সুতো-বাঁধা বড়ো চাবিটা।

তারা বন্দুক সরাল না। মুখও ঘোরাল না। পতাকীর দিকে চোখ রেখেই বলল, মেঘা, চাবিটা তুলে নিয়ে চলে যাও। আমরা এখানে রইলাম। যদি ভুল চাবি দিয়ে থাকে, খবর দিয়ো, পাষণ্ডকে এক গুলিতে নিকেশ করে দেব।

মেঘা নিচু হয়ে চাবির থোলো কুড়িয়ে নিয়ে ছুটে নীচে নেমে গেল। মেঘার জায়গায় আর-একজন বল্লমধারী এসে দাঁড়াল।

মিনিট কুড়ি পরেই বাইরে দারুণ চিৎকার শোনা গেল। অনেকগুলো কণ্ঠের সম্মিলিত চিৎকার।

তারা-মায়ের জয়! আমাদের প্রাণ বাঁচালে মা।

তারা বুঝতে পারল গাঁয়ের লোকেরা ধান নিয়ে যাচ্ছে গুদাম থেকে। তাদের আগেই বলে রাখা হয়েছিল।

পাছে কেউ তাদের চিনতে পারে, তাই সবাইকে মুখে কালিঝুলি মেখে আসতে বলা হয়েছিল। তারা তাই এসেছে। পতাকী ঘোষালের পাইকরা তাদের দেখে চিনতে পারবে এমন ভরসা কম। তা ছাড়া কিছু পাইক আহত হয়েছে, বাকি সবাইকে বেঁধে ডাকাতরা এক জায়গায় ফেলে রেখেছে।

গাঁয়ের চাষিদের চেনবার সুযোগও তারা পাবে না।

আওয়াজটা একেবারে মিলিয়ে যেতে তারা বলল, এবার জমিদারের ব্যবস্থা করো।

দুজন লোক দু-দিক থেকে এগিয়ে এসে মোটা দড়ি দিয়ে পতাকীকে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধল। তারপর তাকে টানতে টানতে শোবার ঘরে এনে পালঙ্কের পায়ার সঙ্গে মোক্ষমভাবে বাঁধল। তার পরনের ধুতির কিছুটা খুলে মুখে গুঁজে দিল। যাতে সহজে না চেঁচাতে পারে।

বাঁধাছাঁদা শেষ হতে ডাকাতের দলের সাধুচরণ এগিয়ে গিয়ে বলল, পেন্নাম হই কত্তা। কেমন সাহেব সেজেছিলাম বলুন? একেবারে খাস ইংরেজ। আপনার পাইক- বরকন্দাজরা জঙ্গলে বিশ্রাম করছে। কাল ভোরে ফিরবে। আসি কত্তা।

পতাকী দুটো চোখ বিস্ফারিত করে শুধু চেয়ে রইল। মুখ বাঁধা না থাকলে বোধহয় বিস্ময়ে চেঁচিয়েই উঠত।

তারাকে মাঝখানে নিয়ে দলটা দেউড়ি পার হয়ে গেল।

পতাকী অনেক চেষ্টা করেও বাঁধন খুলতে পারল না। সে শুধু একটা কথা ভেবে আশ্চর্য হল, বাড়িতে এত সোনাদানা, মোহর, জহরত থাকতে ডাকাতদের ধানের গোলার ওপর লোভ কেন?

সম্ভবত খাবার নেই। পয়সা দিলেই বা ডাকাতদের কে ধান বিক্রি করবে। কিন্তু পতাকীর কপাল চাপড়াতে ইচ্ছা করল। চালের দর দু-টাকা মন উঠেছে, আরও হয়তো কিছু উঠত। কলকাতায় চালান দিতে পারলে বেশ লাভ হত। পতাকীর একেবারে সর্বনাশ হয়ে গেল।

এদিকে রাইপুরের চাষিরা দু-হাত তুলে তারার জয়ধ্বনি করতে লাগল।

তারা তাদের বোঝাল, খুব সাবধান, এমন ভান করবে যেন এখনও তোমরা অভাবগ্রস্ত। জমিদারের কাছে দরবার করবে। না হলেই তোমাদের সন্দেহ করবে। জানতে পারলে অত্যাচারের শেষ থাকবে না।

চাষিরা নিজেদের বাড়িতে ফিরে গেল।

তারপর দিন কুড়ি আবার সব চুপচাপ।

এ পথ দিয়ে লোকচলাচল বেশ কমে গেল। মনে হল ইংরেজরা সবাইকে সাবধান করে দিয়েছে। বুঝিয়ে দিয়েছে পথের বিপদের কথা। হয়তো এমন কথাও বলেছে, শীঘ্রই এসব জঞ্জাল দূর করে দেবে। ডাকাতদের সম্পূর্ণরূপে শায়েস্তা করবে, তারপর এসব পথ দিয়ে লোকেরা নির্বিঘ্নে চলাফেরা করতে পারবে।

কিছুদিন পরেই আর-এক দুঃসংবাদ এল।

তারা ঘুমাচ্ছিল, হঠাৎ দরজায় শব্দ।

তারার ঘুম খুব সজাগ। তাড়াতাড়ি বিছানা থেকে উঠে পড়ল।

দরজার গোড়ায় ভৈরব শুয়ে থাকে। কাছে বর্শা নিয়ে। সে-ও উঠে বসল।

কী ব্যাপার, এত রাত্রে দরজা ঠেলাঠেলি কেন?

ইংরেজরা আস্তানা ঘিরে ফেলল না তো!

ভৈরব দরজা খুলে সরে দাঁড়াল।

দরজার ওপারে মেঘা।

কী খবর মেঘা? তারা প্রশ্ন করল।

বড়ো খারাপ খবর মা।

এসো, ভিতরে এসো।

মেঘা চৌকাঠ পার হয়ে মেঝের ওপর বসল।

তারা প্রদীপের সলতেটা উসকে দিল। ঘরটা কিছু আলোকিত হল।

কী বলো?

মেঘা বিরসকণ্ঠে বলল, ফটিকচরণকে খতম করে দিয়েছে।

খতম করে দিয়েছে? কে?

সাহেবরা।

কী করে?

বন্দুকের গুলিতে।

কিছুক্ষণ চুপচাপ। কেউ কোনও কথা বলল না।

অনেক পরে তারা খুব আস্তে জিজ্ঞাসা করল, সাহেবরা জঙ্গল ঘিরে ফেলেছিল নাকি?

না, তা ঘেরেনি। তবে অনেক সিপাই-সান্ত্রি নিয়ে ফটিকচরণের দলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। এলোপাথাড়ি গুলি চালিয়েছিল। শুধু ফটিকচরণই নয়, তার দলের আরও দশ-পনেরোজন খতম।

আগে থেকে কেউ বুঝতে পারেনি?

বোধহয় না। অন্ধকার রাত্রে গুঁড়ি মেরে সিপাইরা এসেছিল। তাদের সঙ্গে রবার্ট সাহেব।

রবার্ট কে?

ওই যে লাটসাহেবের অনুচর ছিরিমান না কে?

শ্লিম্যান।

হ্যাঁ, হ্যাঁ, সে-ই রবার্ট সাহেবকে নিয়োগ করেছে এ তল্লাট থেকে ডাকাতদের উৎখাত করতে।

তারা বসে ছিল। উঠে দাঁড়াল।

পায়চারি করতে করতে বলল, এবার তাহলে আমি বাকি, মানে আমরা। তাহলেই দুর্গাপুরের জঙ্গল সকলের পক্ষে নিরাপদ হয়, তা-ই না?

মেঘা মাথা নিচু করে বসে রইল। কোনও উত্তর দিল না।

একটু পরে তারা বলল, এটা কবেকার ঘটনা?

পরশু রাতের। আজ একটু আগে ফটিকচরণের দলের দুজন লোক এসেছিল, তারা বলল।

লোক দুজন কি আমাদের দলে আসতে চায়?

না, আমি তাদের জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তারা রাজি হল না।

রাজি হল না?

উঁহু। বলল, আর ডাকাতি নয়। ইংরেজরা যেরকম উঠে-পড়ে লেগেছে, এ দেশে ডাকাতি করে আর খেতে হবে না। তারা নিজেদের দেশে ফিরে গেল। চাষবাস করবে।

রবার্ট সাহেবের দল কি এবার আমাদের দিকে আসছে?

না, ফটিকচরণের লাশ নিয়ে তারা বর্ধমান ফিরে গেছে। সেখান থেকে কলকাতা যাবে।

এতক্ষণে ভৈরব কথা বলল, তা লাশটা নিয়ে গেল কেন?

মেঘা উত্তর দিল, লাশটা দেখালে কোম্পানির কাছ থেকে বকশিশ পাবে। নাম হবে রবার্ট সাহেবের।

এবার আমরা কী করব বলো?

তারার কণ্ঠে হতাশার সুর।

মেঘা বলল, তোমাকে আমি আর কী মতলব দেব তারা-মা। তুমি নিজে যথেষ্ট বুদ্ধি রাখো।

আমার মনে হয় লুঠের মালগুলো আমাদের সরিয়ে ফেলা উচিত। সেসবের সাহেবরা খোঁজ না পায়।

তা না হয় করা যাবে। এখান থেকে মাইল দুয়েক দূরে একটা ভগ্নস্তূপ আছে। কোনওকালে বোধহয় কোনও জমিদারের বাগানবাড়ি ছিল। এখন সাপখোপের আড্ডা। সবকিছু সেখানে সরিয়ে রাখা যেতে পারে।

ভগ্নস্তূপ?

হ্যাঁ, লোকেরা বলে, বর্গিরা জমিদারবাড়ি আক্রমণ করে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল। অনেককাল আগে। রতন সর্দারের আমলে মুসলমানদের ভয়ে একবার ধনরত্ন সব সেখানে সরিয়ে রাখা হয়েছিল। গোলমালের আশঙ্কা কমতে আবার সেসব এখানে নিয়ে আসা হয়। এবারেও না হয় তা-ই করা যাবে, কিন্তু আমাদের কী ব্যবস্থা হবে?

আমরা একজোট হয়ে থাকব না। ছড়িয়ে থাকব। যদি কেউ নিজেদের গাঁয়ে ফিরে যেতে চায়, বাধা দিয়ো না। যেতে দিয়ো। তারপর বিপদ কেটে গেলে আবার আমরা একসঙ্গে হব। শুধু তোমরা, মানে দলের প্রধান যারা, তারা আমার সঙ্গে থাকো। পরামর্শ করার জন্য দরকার হবে। তবে আমার মনে হয়, আমাদেরও ঠাঁই বদল করা দরকার। আমাদের যেমন চর আছে, তেমনই ইংরেজেরও গুপ্তচর আছে। আমাদের ঘাঁটির সন্ধান রাখছে। কাজেই এখান থেকে সরে আমাদের আরও ভিতরে চলে যেতে হবে।

মেঘা ঘাড় নাড়ল, ভালো ব্যবস্থা। তাহলে কাল থেকেই মাল সরাবার আয়োজন করি। তারপর নিজেদের আস্তানা সরিয়ে নিয়ে যাব।

তা-ই হল। লুঠের মাল সব সরিয়ে ফেলা হল। দলের সবাইকে ডেকে বলে দেওয়া হল, যাদের যাবার জায়গা আছে, তারা যেন চলে যায়। দল বেঁধে এক জায়গায় থাকাটা বর্তমান অবস্থায় বিপজ্জনক, কারণ ইংরেজরা ডাকাতদের উচ্ছেদ করার জন্য বদ্ধপরিকর।

এ কথাও বলে দেওয়া হল সময় একটু অনুকূল হলেই আবার তাদের ডেকে আনা হবে।

যাবার সময় তাদের প্রত্যেককে নতুন ধুতি, উড়ানি আর অর্থ দেওয়া হল। তারাকে প্রণাম করার দিন থেকে খুঁটিনাটি অনেক কথা তার মনে পড়ল। কালু সর্দার নিজে হাতে তাকে সবকিছু শিখিয়েছিল। দলের ভার যাতে নিতে পারে তার উপযুক্ত করে গড়ে তুলেছিল। গোটা দলকে তারা যেমন ভালোবাসত, তেমনই দলের সকলের ভালোবাসাও সে অর্জন করেছিল।

কিন্তু এখন চারদিকের আবহাওয়া দেখে মনে হচ্ছে দল রাখা হয়তো আর সম্ভব হবে না। এতদিন ইংরেজরা নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রাখার চিন্তায় ব্যস্ত ছিল, অন্য কোনওদিকে নজর দিতে পারেনি। এখন ইংরেজ এ দেশের বুকে আসন কায়েমি করে নিয়েছে, কাজেই যা কিছু উৎপাত বলে মনে করে, সব সরাবার চেষ্টা করবে।

এখন আমরা কী করব তারা-মা?

পাশেই চৈতন দাঁড়িয়ে ছিল। সে জিজ্ঞাসা করল।

চারদিকে চর পাঠিয়ে সন্ধান রাখতে হবে। ইংরেজরা কী করছে, কী তাদের মতলব, সেটা আগেভাগে জেনে নিতে হবে আমাদের। ওদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে লড়াই করা হয়তো আমাদের পক্ষে সম্ভব হবে না, কারণ ওরা সংখ্যায় অনেক। হাতিয়ারও প্রচুর। তবে এটা ঠিক, আমরা কেউ জীবন্ত ধরা দেব না। ওদের নাস্তানাবুদ করে তুলব।

দলের আর যাঁরা দাঁড়িয়ে ছিল, তারা কেউই কোনও কথা বলল না। সবাইয়েরই কেমন বিষণ্ণ ভাব। মনোবল যেন ভেঙে পড়েছে। বিশেষ করে তিলককে গ্রেপ্তার আর ফটিকচরণের মৃত্যুর সংবাদে এরা অসহায় হয়ে গেছে।

সারা দুর্গাপুরের জঙ্গলে এখন শুধু তারা-মায়ের দল। ইংরেজ এই দলকে ছেড়ে দেবে এমন আশা দুরাশা।

অনেকদিন চরেরা কোনও খবর আনল না। সব চুপচাপ। সিপাইদের খোঁজ পাওয়া গেল না। সবাই সরে গেছে জঙ্গল থেকে। এটা তাদের কোনও কৌশল কি না বোঝা গেল না। অবশ্য এমনও হতে পারে, রাজধানীতে তাদের জরুরি ডাক পড়েছে। তাই আপাতত ডাকাতদের চিন্তা ছেড়ে অন্য কাজে চলে যেতে হয়েছে।

তবে চর সজাগ রইল। ইংরেজদের গতিবিধির সামান্য খবর পেলেই যাতে তারাকে জানাতে পারে।

ঠিক এই সময় তারার কাছে একদিন একটি প্রৌঢ়া এসে দাঁড়াল। পরনে আধময়লা থান। রুক্ষ চুল। মুখ দেখে মনে হয় প্রৌঢ়া খুব দুশ্চিন্তাগ্রস্ত।

তারা গাছের তলায় চুপচাপ বসে ছিল।

আচমকা প্রৌঢ়াকে সামনে দেখে বলল। কে? কে তুমি?

প্রৌঢ়া হাঁটু মুড়ে একেবারে তারার পায়ের কাছে বসে পড়ল।

আমাকে তুমি চিনবে না মা। আমি নিরুপায় হয়ে তোমাকে বিরক্ত করতে এসেছি।

সময় খুব খারাপ। শত্রুরা চারদিকে জাল পেতেছে। ছলেবলেকৌশলে তারাকে ধরাই তাদের উদ্দেশ্য।

তারা একবার এদিক-ওদিক দেখল।

একটু দূরে চৈতন দাঁড়িয়ে ছিল। তার দৃষ্টি তারার দিকে।

তারা গম্ভীরকণ্ঠে বলল, আমার কাছে তোমার কী দরকার?

এবার প্রৌঢ়া হাউমাউ করে কেঁদে উঠল।

তুমি গরিবের মা। তোমার কথা চারপাশের সবাই জানে। তুমি আমাকে বাঁচাও।

প্রৌঢ়ার ভণিতায় তারা বিরক্ত হল।

আসল কথাটা কী বলো-না? কেবল তো কাঁদুনি গাইছ।

তারার ধমকে কাজ হল।

প্রৌঢ়া আঁচল দিয়ে চোখ মুছে বলল, বলছি মা, বলছি। সব কথা তোমাকে বলবার জন্যই তো এসেছি।

প্রৌঢ়া ভালো হয়ে বসল মাটির ওপর। আস্তে আস্তে বলল, আমার একটিমাত্র মেয়ে মা। বারো বছর প্রায় বয়স হতে চলল, এখনও বিয়ে দিতে পারলাম না। আমাকে যে নরকে যেতে হবে।

তা, মেয়ের বিয়ে দিচ্ছ না কেন?

কী করে দেব মা? দেবার মুরোদ কোথায়?

তারা অল্পক্ষণ কী ভাবল, তারপর বলল, বেশ, কত টাকা লাগবে বলো, আমি সাহায্য করার চেষ্টা করব।

শুধু টাকার জন্য আটকাচ্ছে না।

তবে?

তোমার যদি সময় থাকে তাহলে সব কথা বলি মা।

বলো।

তারা গাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে বসল।

প্রৌঢ়ার ভাবভঙ্গি দেখে তারা বুঝতে পারল তার কাহিনি অল্প কথায় শেষ হবে না।

ঠিক তা-ই।

প্রৌঢ়া সবিস্তারে বলতে শুরু করল।

আমার ওই একটিমাত্র সন্তান মা। ওর বয়স যখন ছ-বছর, তখন ওর বাপ কলেরায় মারা যায়। সেই থেকে বুকে করে মেয়েকে মানুষ করেছি। সংসারের কুটোটি নাড়তে দিইনি।

নাম কী তোমার মেয়ের?

মেয়ের নাম থাকমণি। কী বলব মা, মেয়ে যেন সোনার প্রতিমা। যেমন রং তেমনই নাক, মুখ, চোখ আর চুলের ঢাল।

এই পর্যন্ত বলেই প্রৌঢ়া থেমে গেল।

আড়চোখে একবার তারার দিকে চেয়ে বলল, অবশ্য রূপে তোমার পায়ের যোগ্য নয় মা। আমাদের ঘরের তুলনায় সুন্দরী।

তারা একটু বিব্রত হয়ে বলল, ঠিক আছে। বলে যাও।

হ্যাঁ, বলছি মা। রোজগারের কোনও উপায় নেই। পরের বাড়ি ধান ভেনে, মুড়ি ভেজে কোনওরকমে মা-মেয়ের ভরণপোষণ চালাতাম। আকাল এল। চারদিকে নেই নেই রব। লোকেরই পেট চলে না। আমাকে কাজ দেবে কী!

এইখানে প্রৌঢ়া থেমে আঁচল দিয়ে কপাল মুছল। তারপর বলল, সেই সময় ভদ্রাসনটুকু বাঁধা পড়ল, মানে বাঁধা দিতে হল। এ ছাড়া আর উপায়ও ছিল না।

কার কাছে বাঁধা দিলে?

প্রৌঢ়া যেন একটু সন্ত্রস্ত হয়ে উঠল।

এই অবেলায় তার নাম কী করে করি বলো তো মা।

কেন?

আর কেন? তার নাম করলে হাঁড়ি ফাটে। সবাই তাকে বলে একাদশী ঘোষাল।

তারা হেসে ফেলল। বাঃ, বেশ নাম রেখেছ তো।

হ্যাঁ মা, নাম করলে সেদিন আর পেটে অন্ন জোটে না। একাদশীর উপোস করতে হয়। তার কাছে সব বাঁধা দিলাম। ব্যাস, সেই সর্বনাশের শুরু। এখন একাদশী ঘোষাল উলটো চাপ দিচ্ছে।

কীসের উলটো চাপ?

রোজ দু-বেলা এসে তাগাদা দিচ্ছে। দেনা শোধ করো।

প্রৌঢ়া আকুল দৃষ্টি মেলে তারার দিকে দেখল, তারপর বলল, কোথা থেকে শোধ দেব বলো তো মা? হাতে কি একটা কানাকড়ি আছে? আবার কী বলছে জানো?

কী?

বলছে, যদি আমার কথা শোনো, তাহলে তোমায় একটি পয়সা ধার শোধের জন্য দিতে হবে না।

বটে? তারা এবারে সোজা হয়ে বসল।

হ্যাঁ মা, কিন্তু নচ্ছার কী বলে জানো?

তারা কোনও কথা বলল না।

প্রৌঢ়া বলে গেল বলে, থাকর সঙ্গে আমার বিয়ে দাও, তাহলে বন্ধকি কাগজপত্র সব ছিঁড়ে ফেলব। তোমার বাড়ি-জমি তোমারই থাকবে।

তারা রীতিমতো কৌতূহলী হয়ে উঠল।

বেশ তো তা-ই দাও-না। তোমার মেয়েরও তো বয়স হচ্ছে।

প্রৌঢ়া সশব্দে একটা হাত নিজের কপাল ঠুকল।

মুখপোড়ার বয়স ষাটের কম নয়। বাড়িতে তিন-তিনটে বউ। আর চেহারা কী বলব মা, ঠিক যেন বুড়ো চামচিকে।

তবে তো মুশকিল।

তাই তো বলছি মা, আমার হয়েছে উভয়সংকট। ওরকম একটা লোকের হাতে মেয়েকে দিতে পারি না, আবার না দিলে ভিটেমাটি থেকে উৎখাত করে পথে দাঁড় করাবে।

কত টাকা তোমার দরকার?

একশো টাকা ধার নিয়েছিলাম, একাদশী ঘোষাল বলছে সুদে-আসলে তা-ই নাকি আড়াইশো টাকাতে দাঁড়িয়েছে।

বেশ, তুমি কাল এসে টাকাটা আমার কাছ থেকে নিয়ে যেয়ো।

কিন্তু তারার আশ্বাসবাণীতেও প্রৌঢ়ার মুখ থেকে ভয়ের ছাপ গেল না।

সে বলল, সমস্যা তো এতে মিটবে না মা।

কেন?

একাদশী ঘোষাল টাকা নিতে যদি অস্বীকার করে?

তারা বিস্মিত হল।

কেন, অস্বীকার করবে কেন? টাকা ধার দিয়েছে, সুদসুদ্ধ টাকা শোধ দিয়ে দিচ্ছ। ব্যাস, হয়ে গেল।

তার ঝোঁক আমার মেয়েকে বিয়ে করার দিকে।

তুমি যদি বিয়ে না দাও তার সঙ্গে তো কী করবে?

একাদশী ঘোষালকে তুমি চেনো না মা। সে সব পারে। তার হাতে অনেক লেঠেল। আমার মেয়ের বিয়েই বন্ধ করে দেবে। জোর করে মেয়েকে বিয়ের রাতে ছিনিয়ে নিয়ে যাবে।

পলকের জন্য তারার চোখ জ্বলে উঠল। দুটি ভ্রূ-র মাঝখানে বিরক্তির আঁচড়।

গম্ভীরকণ্ঠে বলল, ঠিক আছে, তুমি তোমার মেয়ের বিয়ে ঠিক করো। তারপর আমি আছি।

এবার প্রৌঢ়া আসল কথা বলল, বিয়ের কথাবার্তা কিছুটা হয়েই আছে মা।

তা-ই নাকি? কোথায়?

গোবিন্দপুরের রাখালের সঙ্গে। ছেলেটা চাষবাস করে, বয়সও বেশি নয়।

বেশ, তুমি বিয়ের দিন ঠিক করে আমাকে জানিয়ে যেয়ো।

প্রৌঢ়ার সন্দেহ গেল না।

কিন্তু বিয়ে দিতে কি পারব মা?

আমি নিজে যাব তোমার মেয়ের বিয়েতে। দেখি কে বিয়ে আটকায়।

এবার প্রৌঢ়ার মুখে হাসি ফুটল। সে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ঠিক আছে মা। আমি কালই একাদশী ঘোষালের কাছে যাব। সে টাকার কথা কী বলে তোমাকে জানিয়ে যাব।

আর-একবার প্রণাম করে প্রৌঢ়া মেঠোপথ ধরে এগিয়ে গেল।

প্রৌঢ়া পথের বাঁকে অদৃশ্য হয়ে যেতেই চৈতন তারার কাছে এসে দাঁড়াল।

এতক্ষণ কী বকবক করছিল মেয়েছেলেটা?

তারা সব বলল। তারপর চৈতনকে প্রশ্ন করল, তুমি একটা কাজ করতে পারবে চৈতন?

চৈতন অপ্রস্তুত হল। লাঠিটা তারার পায়ের কাছে রেখে বলল, এ আবার কী কথা মা? আদেশ করো, কী করতে হবে।

তারা বলল, আমরা যেরকম অবস্থার মধ্যে রয়েছি, তাতে কাকেও বিশ্বাস করা উচিত নয়। কিছুই বলা যায় না, এ মেয়েছেলেটা হয়তো ইংরেজের চর। ফাঁদ পেতে আমাকে ধরার চেষ্টা করছে।

ঠিক বলেছ মা, কাউকে বিশ্বাস নেই। চারদিকে দুশমনের চর ঘুরছে।

তুমি এক কাজ করো চৈতন!

বলো।

মেয়েছেলেটা বেশি দূর যেতে পারেনি, তুমি ওর পিছন পিছন যাও। খোঁজ নিয়ে এসো, যা বলে গেল, সব সত্যি কি না।

ঠিক আছে মা। ওই মেয়েছেলেটার বাড়ি ধারেকাছেই হবে। আমি আজ রাতেই তোমার কাছে সব খবর নিয়ে আসব।

চৈতন কোমরের গামছা মাথায় বাঁধল। তারপর লাঠিতে ভর দিয়ে দ্রুতপায়ে বেরিয়ে গেল।

তারা কিছুক্ষণ চৈতনের দিকে দেখে বিপরীতদিকে চলতে আরম্ভ করল।

খাওয়াদাওয়া সেরে তারা উঠানে বসে ছিল, ঠিক সেই সময় চৈতন এসে দাঁড়াল।

এসে গেছি মা।

কী খবর চৈতন বলো?

চৈতন একটু ব্যবধান রেখে তারার সামনে বসল।

মেয়েছেলেটা মিথ্যা বলেনি মা।

তা-ই নাকি?

হ্যাঁ, এখান থেকে এক ক্রোশ দূরে রতনপুরে থাকে। বাড়িতে শুধু ওর একটি মেয়ে। আর কেউ নেই। গিয়ে মেয়ের কাছে সব কথা বলছিল, আমি জানলায় কান রেখে সব শুনেছি।

কী বলছিল?

তোমার কথা মা। তারা-মা অভয় দিয়েছে, সব ঠিক হয়ে যাবে। মেয়েটা কিন্তু অঝোরধারায় কেবল কাঁদছিল, আর বলছিল, আমার বড্ড ভয় করছে মা। লাঠিয়াল দিয়ে যদি আমাকে ধরে নিয়ে যায়। তোমাকে ছেড়ে আমি কী করে বাঁচব মা?

আহা, বেচারা। তারা সহানুভূতির সুরে বলল।

ওর মা ওকে অনেক বোঝাল। এমন সময় এক কাণ্ড।

কী কাণ্ড?

সেই মহাদেব ঘোষাল এসে হাজির।

কে মহাদেব ঘোষাল?

ওই যে যার কাছে এদের ভিটেমাটি সব বাঁধা।

একাদশী ঘোষাল?

হ্যাঁ, গাঁয়ের মুদির কাছে খবর পেলাম সবাই ওকে ওই নামেই ডাকে। একেবারে হাড়কৃপণ আর চামারের বেহদ্দ। এসেই লাঠি ঠুকে চিৎকার।

মেয়েছেলেটা বেরিয়ে এসে বোঝাল যে তিন দিনের মধ্যে ঘোষালের দেনা শোধ করে দেবে।

তা-ই শুনে ঘোষাল একটু যেন থমকে গেল।

চোখ-মুখ কুঁচকে বলল, দেবে যে, টাকাটা কি আশমান ফুঁড়ে আসবে?

মেয়েছেলেটা বলল, সে খোঁজে তো আপনার দরকার নেই। আপনার টাকা পেলেই হল।

ঘোষাল বলল, হুঁ। তারপর মেয়ের বিয়ের কী করলে?

মেয়ের বিয়ে এখন দেব না।

তা-ই শুনে লাঠি ঠুকে যেতে যেতে ঘোষাল বলল, বুঝতে পেরেছি, সোজা আঙুলে ঘি উঠবে না। ঠিক আছে, মহাদেব ঘোষালের চোখে কী করে ধুলো দাও ঠাকরুন, আমিও দেখব। মেয়েটা সুখে থাকত, ভালো ঘরে-বরে পড়ত, সেটা তাহলে ইচ্ছা নয়। ঠিক আছে। ঠিক আছে।

তারা বলল, চৈতন, তুমি এবার যাও। বিশ্রাম করো। বোঝা যাচ্ছে মেয়েছেলেটা সত্যি কথাই বলেছে।

চৈতন চলে যেতে তারা বাড়ির মধ্যে ঢুকল।

খাবার নিয়ে মাসি অপেক্ষা করছিল।

তারা ঢুকতে বলল, কী গো বাছা, বিয়ে বিয়ে করে কী বলছিলে? কানে যেন এল।

তারা হাসল। আমার বিয়ে গো মাসি।

তারার কথা শুনে মাসি অবাক।

ও মা সে কী গো? কবে? কার সঙ্গে?

কবে এখন বলতে পারছি না মাসি। দিনক্ষণ দেখতে হবে। আর বিয়ে বোধহয় ইংরেজের সঙ্গে।

মাসি এবার একটু সরে এসে বসল।

কী মশকরা করছ?

মশকরা কেন হবে? ইংরেজের সঙ্গে বিয়ে বলেই তো সরকারের লোক আমার এত খোঁজ করছে। দেখতে পেলেই হাতে মালা জড়িয়ে, পায়ে মল পরিয়ে টেনে নিয়ে যাবে।

শেষদিকে তারার গলাটা যেন ভারী ঠেকল।

নাও বাছা খেতে বোসো। রাত অনেক হল! মাসি হাই তুলতে তুলতে বলল।

তারা খেয়ে নিয়ে শুয়ে পড়ল।

শুল বটে কিন্তু ঘুম এল না। বাইরে পায়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে।

দলের দুজন সারারাত কুটির পাহারা দেয়।

দিনকাল খারাপ। শত্রুর শক্তি প্রবল। কোথা দিয়ে কী হয়ে যায় বলা যায় না।

তারাও বালিশের নীচে দা দিয়ে শোয়। মাথার কাছে দেয়ালে বন্দুক ঝোলানো থাকে। কখন কোনটার দরকার হয় কে জানে।

দু-দিন পরে প্রৌঢ়া এসে দাঁড়াল।

খাওয়াদাওয়ার পর তারা চুল খুলে রোদে বসে ছিল।

সামনে ছায়া পড়তেই চোখ তুলে দেখল, প্রৌঢ়া দাঁড়িয়ে।

তারা মুখ তুলতেই প্রৌঢ়া তারাকে প্রণাম করল।

কী খবর?

প্রৌঢ়া বসল।

খবর তো এদিকে ভালোই মা। পাত্রের খুড়ো এসে মেয়ে পছন্দ করে গেছে। বিয়ের দিন ঠিক হয়েছে সামনের মাসের দোসরা।

দোসরা? তাহলে হাতে আর কদিন আছে?

আজ হল গিয়ে তোমার সতেরোই। আর দিন পনেরো।

তাহলে তো আর দিনও বেশি নেই।

না মা, একলা মানুষ তো। সবই আমাকে করতে হবে।

তুমি কি টাকাটা আজ নিয়ে যাবে?

তুমি যদি দয়া করো, নিয়ে যেতে পারি, কিন্তু একটা মুশকিল হয়েছে মা।

আবার কী হল?

একাদশী ঘোষাল রাজি হচ্ছে না।

কীসে রাজি হচ্ছে না?

টাকা নিয়ে আমার জমিজমা ছেড়ে দিতে।

সে কী?

হ্যাঁ মা, ঘোষাল বলছে, টাকার তার দরকার নেই। মেয়ে দিতে হবে তাকে। গাঁয়ে একাদশী ঘোষালের চর চারদিকে মা। আমার মেয়েকে যে দেখতে এসেছিল, সে কথা ঠিক তার কানে গিয়েছে। আমাকে কী বললে জানো মা?

কী বললে?

বললে, এসব কায়দা করতে যেয়ো না ঠাকরুন, বিপদে পড়বে। আমি বেঁচে থাকতে, তোমার মেয়েকে কেউ গাঁয়ের বাইরে নিয়ে যেতে পারবে না।

একটু বোসো, আমি আসছি। তারা উঠে ভিতরে চলে গেল।

বেশ কিছুক্ষণ পরে ফিরে এল একটা তোড়া হাতে করে।

এই নাও, এর মধ্যে আড়াইশো টাকা আছে। গুনে নাও।

এ আর কী গুনব মা। তুমি দয়া করে দিচ্ছ, মাথায় করে নিচ্ছি।

প্রৌঢ়া দু-হাতে টাকার তোড়াটা বুকে তুলে নিল।

প্রৌঢ়া চলতে শুরু করতেই তারা বলল, দাঁড়াও।

প্রৌঢ়া থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল।

এতগুলো টাকা নিয়ে তোমার এভাবে যাওয়া ঠিক হবে না। আমি একজন লোক সঙ্গে দিচ্ছি।

দলের একজন কাছেই দাঁড়িয়ে ছিল। তারা তাকে হাততালি দিয়ে ডাকল।

সে কাছে এসে দাঁড়াতে বলল, তুমি এর সঙ্গে যাও। একেবারে বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে আসবে। প্রৌঢ়ার দিকে ফিরে তারা বলল, আর শোনো।

বলো মা।

মেয়ের বিয়ের ঠিক আগের দিন আমাকে খবর দিয়ে যাবে। বিয়ের দিন আমি যাব।

তুমি যাবে মা?

কথাটা প্রৌঢ়ার যেন বিশ্বাসই হল না।

যাব বই কী। যদি তোমাদের ঘোষাল মশাই গোলমাল করে, ঠেকাতে হবে তো।

হ্যাঁ, মা, আমার আর কেউ নেই। মনে হচ্ছে একাদশী ঘোষাল গোলমাল করবেই।

ঠিক আছে, তুমি আর দেরি কোরো না। অনেকটা পথ যেতে হবে।

হ্যাঁ, যাই মা।

প্রৌঢ়া আর-একবার তারাকে প্রণাম করে চলতে শুরু করল। তারার লোকটি ঠিক তার পিছনে পিছনে রইল।

প্রৌঢ়া চলে যেতে তারা উঠে দাঁড়াল। কে আছ?

ধারেকাছে কেউ ছিল না। কেউ উত্তর দিল না।

তারা একটু এগিয়ে গেল।

একটা বাবলা গাছের নীচে জনা চারেক বসে ছিল। তারাকে দেখে সবাই উঠে দাঁড়াল।

এই, একবার মেঘাকে খবর দাও তো। বলো, খুব জরুরি দরকার, এখনই যেন দেখা করে।

দুজন লোক ছুটতে ছুটতে বেরিয়ে গেল। মিনিট পনেরোর মধ্যে মেঘা এসে দাঁড়াল।

ঘরের মধ্যে তারা চাটাই পেতে শুয়েছিল, ঘুমায়নি। মেঘার ডাকে তারা উঠে বসল।

ভিতরে এসো।

মেঘা ভিতরে গিয়ে ঢুকল।

বোসো এখানে।

তারা চাটাইয়ের একটা কোণ দেখিয়ে দিল।

মেঘা কিন্তু চাটাইয়ের ওপর বসল না। মাটির ওপর বসল।

কী মা? কোথাও ডাকাতি করতে যেতে হবে? কোনও খবর আছে?

তারা মাথা নাড়ল। না।

অস্ত্রশস্ত্রগুলো যে মরচে পড়ে নষ্ট হয়ে গেল মা। আমরা অকেজো হয়ে যাচ্ছি।

তুমি তো জানো মেঘা, সময় আমাদের অনুকূল নয়। এখন কিছু করতে যাওয়া নিরাপদ হবে না। ইংরেজরা প্রতিজ্ঞা করেছে আমাদের উচ্ছেদ করবেই। আমরা নাকি দেশের শত্রু, সকলের শত্রু। শেষদিকে গলার আওয়াজ অশ্রুরুদ্ধ হয়ে উঠল।

তারা নিজেকে সংযত করে বলল। শোনো মেঘা, তোমাকে বিয়ের নিমন্ত্রণে যেতে হবে।

মেঘা অবাক।

বিয়ের নিমন্ত্রণে? কোথায়? আমাদের আবার কে নিমন্ত্রণ করবে?

রতনপুরে।

কিছু বুঝতে পারছি না মা। রতনপুরে আমাদের কী আছে?

সব কথাটা খুলে না বললে বুঝতে পারবে না।

তারা চাপা গলায় অনেকক্ষণ ধরে মেঘাকে বোঝাল।

সব শোনার পর মেঘা হাসতে লাগল।

ঠিক আছে মা। লাঠি ধরবার জন্য হাত নিশপিশ করছে। আমি দলের সবাইকে একবার বলে আসি। মেঘা বেরিয়ে গেল।

ঠিক সময়ে প্রৌঢ়া এসে হাজির। মা, এইবার যে যাবার ব্যবস্থা করতে হবে।

বিয়ের সব ঠিক হয়ে গেছে?

হ্যাঁ মা। কালই বিয়ে। আজ আর বেশিক্ষণ থাকতে পারব না মা। এখনই উঠব। কী যে হবে কিছু বুঝতে পারছি না।

কেন?

কাল থেকে একাদশী ঘোষালের লোক বাড়ির আশপাশে ঘুরছে।

তা-ই নাকি?

হ্যাঁ মা। আমরা যা করছি সবকিছুর ওপর নজর রাখছে।

রাখুক। তোমার কোনও ভয় নেই। তুমি তোমার কাজ করে যাও।

প্রৌঢ়া বলল। সবই তো করে যাচ্ছি মা, তবে ভয়ে আমার হাত-পা পেটের ভিতর সেঁধিয়ে যাচ্ছে।

বিয়ের লগ্ন কখন?

মাঝরাতে। আরও একটা মুশকিলে পড়ছি মা।

কী আবার মুশকিল?

কোনও ভটচাজ আসতে চাইছে না একাদশী ঘোষালের ভয়ে।

ঠিক আছে, ভটচাজ আমি সঙ্গে নিয়ে যাব।

তুমি কখন যাবে মা?

আমি কাল বিকালের দিকে যাব।

বাড়ি চিনবে কী করে?

আমার যে লোক তোমার সঙ্গে টাকার তোড়া নিয়ে গিয়েছিল, সে-ই পথ চিনিয়ে নিয়ে যাবে।

তাহলে অভয় দিচ্ছ মা?

আমি অভয় দেবার কে? তুমি বাশুলি-মা-কে ডাকো। তিনিই রক্ষা করবার মালিক। যা করবার, তিনিই করবেন।

প্রৌঢ়া বাশুলি-মায়ের উদ্দেশে কপালে দুটো হাত ঠেকিয়ে শূন্যে প্রণাম করল, তারপর বলল, তাহলে ঠিক সময়ে যেয়ো মা। আমি তোমার পথ চেয়ে বসে থাকব।

প্রৌঢ়া চলে গেল।

তারা অনেকক্ষণ দুটো হাত কোলের ওপর রেখে চুপচাপ বসে রইল।

হয়তো এই ব্যাপারের পর ইংরেজরা আরও তৎপর হবে। তারাকে খুঁজে বের করবার চেষ্টায় সর্বশক্তি নিয়োগ করবে, কিন্তু যা-ই হোক, কথা যখন দিয়েছে, তখন তারাকে প্রতিশ্রুতি রাখতেই হবে।

পরের দিন বিকাল হবার সঙ্গে সঙ্গেই একটা পালকি এসে দাঁড়াল। তারার উঠানের ওপর। দুজন বেয়ারা বয়ে নিয়ে এল। সঙ্গে আর দুজন।

মিনিট পনেরোর মধ্যে তারা বেরিয়ে এল।

পরনে লালপাড় গরদের শাড়ি। মাথায় ঘোমটা। কপালে সিঁদুরের টিপ। দু-পায়ে আলতা।

শাড়ির ফাঁকে লুকানো ছোরাটা অবশ্য দেখা গেল না।

তারা পালকির কাছে এসে দাঁড়াতেই বেয়ারাগুলো একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠল, জয়, তারা মায়িকি জয়।

তারা হেসে নিজের ঠোঁটের ওপর আঙুল রাখল।

না, না, আমি এখন তারা মায়ি নয়, আমি চৌধুরীদের ছোটোবউ। আমার দূর সম্পর্কের এক আত্মীয়ার মেয়ের বিয়েতে চলেছি।

একজন বেয়ারা মাথা চুলকে বলল, তাহলে কী বলে জয়ধ্বনি করব মা?

কিছু বলতে হবে না। যা বলবার ঠাকুরমশাই বলবেন।

পাশেই পুরোহিত দাঁড়িয়ে ছিল। বাশুলি মন্দিরের পুরোহিত।

পরনে নামাবলি। টিকিতে জবা ফুল বাঁধা।

পুরোহিত হাত নেড়ে বলল। তোমাদের কিছু বলতে হবে না বাপু, কেউ খোঁজ নিলে, যা বলবার আমিই বলব।

তারা পালকিতে ওঠবার আগে একবার ফিরে দাঁড়াল।

একটু দূরে মেঘা দাঁড়িয়ে ছিল।

তারা তার দিকে দেখতেই সে এগিয়ে এল।

কিছু বলবে মা?

সব ঠিক আছে তো?

হ্যাঁ, সব ঠিক। সন্ধ্যার একটু আগেই আমরা রওনা হয়ে যাব। রতনপুরে সন্ধ্যার সঙ্গে সঙ্গেই গিয়ে পৌঁছাব।

তাহলে আমি চলি।

তারা পালকিতে উঠে দরজা বন্ধ করে দিল।

হুম, হুম, হুমনা শব্দ করতে করতে বেয়ারা দুজন পালকি নিয়ে ছুটল। পিছন পিছন বাকি দুজন বেয়ারা আর পুরোহিত।

একটু চলার পরেই পুরোহিত চেঁচাল, ওরে বাবাসকল, একটু আস্তে। আমি বুড়ো মানুষ কি ওরকম দৌড়াতে পারি?

পথে কোনও বাধা হল না।

নির্বিঘ্নে পালকি চলল।

রতনপুর গাঁয়ে ঢোকবার মুখে একটা বিরাট অশথ গাছ। বাঁধানো বেদি।

পালকি যখন অশথতলা পার হচ্ছে তখন শব্দ এল।

কে যায়?

পালকি-বেয়ারা দুজন পালকি থামাল না, গতি মৃদু করল।

পুরোহিত বলল, বাঁশখালির চৌধুরী বাড়ির ছোটোবউ, কেন?

এই সময় তারা দরজাটা একটু ফাঁক করে দেখল।

বাঁধানো বেদির ওপর একটি কুৎসিত চেহারার বৃদ্ধ। হাতে হুঁকা। তার দু-পাশে আরও দুটি লোক বসে আছে।

তারা বুঝতে পারল এই হচ্ছে মহাদেব ঘোষাল।

ঘোষাল আবার প্রশ্ন করল, কাদের বাড়ি?

এবার পুরোহিত কোনও উত্তর দিল না। চলতে আরম্ভ করল।

কী হে, কথা কানে গেল না?

এবারও পুরোহিত কোনও কথা বলল না।

পিছন থেকে ঘোষাল বলল, বৃথাই যাচ্ছ। পালকি ফেরাও, ও বিয়ে হবে না।

কথা শেষ করে ঘোষাল উচ্চকণ্ঠে হেসে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে পাশের লোক দুটোও।

তারা আস্তে আস্তে দরজাটা টেনে বন্ধ করে দিল। তার সারা মুখ আরক্ত হয়ে উঠল।

পালকি প্রৌঢ়ার বাড়ির কাছে যেতেই প্রৌঢ়া ছুটে এল।

পালকি থামল। দরজা খুলে তারা বেরিয়ে এল।

গাঁয়ের যে কজন ঝি-বউ এসে জড়ো হয়েছিল, তারা উঁকি দিয়ে দেখতে লাগল।

তারা প্রৌঢ়াকে একান্তে টেনে নিয়ে গিয়ে চুপি চুপি বলল, শোনো, আমার আসল পরিচয় কাউকে দিয়ো না।

না মা, তা দেব না, কিন্তু কী বলব?

কিছু একটা বলো।

প্রৌঢ়া কী ভেবে বলল, মাসির মেয়ে বলব? আমার এক মাসির মেয়ে দূরে থাকে।

বলো।

প্রৌঢ়া তারাকে কোণের ঘরে নিয়ে বসাল।

এ ঘরে একটা আসনের ওপর কনে বসে আছে।

বিরস মুখ, যেন ভয়ার্ত মনে হল।

তারা তার কাছে যেতেই মেয়েটি ভূমিষ্ঠ হয়ে প্রণাম করল।

তারা অবাক হয়ে চেয়ে চেয়ে দেখল।

অপরূপ মুখশ্রী। রং খুব ফরসা নয়, কিন্তু কালো চুলের ঢাল কোমর ছাপিয়ে পড়েছে। নিটোল গড়ন।

তারা মেয়েটির মাথায় হাত দিয়ে বলল, তোমার নাম কী?

থাক, থাকমণি।

ও, তোমার মা-র কাছে শুনেছিলাম নামটা, মনে ছিল না।

তারা একবার এদিক-ওদিক চেয়ে দেখল।

পাড়ার বউ-ঝি-রা কেউ ধারেকাছে নেই। যে যার কাজে লেগে গেছে।

তারা নিশ্চিন্ত হয়ে বসল।

আমাকে চেনো?

থাক মাথা নাড়ল, না।

তোমার মা আমার কথা কিছু বলেনি তোমায়?

বলেছিল, কে একজন আসবেন। খুব দূর সম্পর্কের আত্মীয়া।

নিজের মেয়ের কাছেও যে প্রৌঢ়া তারার পরিচয় দেয়নি, এ কথা ভেবে তারা খুব খুশিই হল।

আজ তোমার বিয়ে, কিন্তু তোমার মুখটা এত শুকনো কেন?

থাক ঘাড় নিচু করে রইল। তারা থাকর কাঁধে একটা হাত রাখল। কী, বলো?

আমার বড়ো ভয় করছে।

কীসের ভয়?

মনে হচ্ছে আমার বিয়ের সময় একটা গোলমাল হবে।

কীসের গোলমাল?

থাক একবার তারার দিকে চেয়েই মুখ নামাল।

মা-কে জিজ্ঞেস করবেন। মা বলবে আপনাকে।

তুমি একাদশী ঘোষালের কথা বলছ তো?

থাক চমকে উঠল, আপনি জানেন সব?

কিছু কিছু জানি। তোমার মা বলেছে। আমি বলছি শোনো, কোনও ভয় নেই। একাদশী ঘোষাল তোমার কোনও ক্ষতি করতে পারবে না।

থাকর চোখে অবিশ্বাসের ছায়া ফুটে উঠল।

সেটা তারার চোখ এড়াল না। তারা বলল, আমার কথা বিশ্বাস করো থাক, কিছু হবে না। তোমার আঁচলে আমি বাশুলি-মায়ের পূজার ফুল বেঁধে দিচ্ছি, কোনও অমঙ্গল তোমাকে স্পর্শ করতে পারবে না।

তারা সত্যি সত্যিই নিজের আঁচল থেকে ফুল আর বেলপাতা নিয়ে থাকর মাথায় ছুঁইয়ে তার আঁচলে বেঁধে দিল।

রাত একটু হতেই কনেকে সাজাবার উদ্যোগ শুরু হল।

প্রৌঢ়া তারাকে বলল, তুমিই থাককে সাজিয়ে দাও মা।

তারা মাথা নাড়ল।

না, আমার কিছু করা ঠিক হবে না। আমি সংসারী নই, এসব শুভকাজে আমার থাকা উচিত নয়। আমি এসেছি শুধু তোমাকে বিপদ থেকে উদ্ধার করার জন্য।

তারা জানলার ধারে চুপচাপ বসে রইল।

কনে সাজানো তখনও শেষ হয়নি, হঠাৎ গোলমাল শুরু হল।

একটা লোক ছুটতে ছুটতে উঠানে এসে দাঁড়িয়ে চিৎকার করতে আরম্ভ করল।

থাকর মা, ও থাকর মা।

প্রৌঢ়া বোধহয় এইরকম একটা সংবাদের অপেক্ষায় উদবিগ্ন হয়েছিল। ছুটে বেরিয়ে এল। কী হয়েছে তারক?

সর্বনাশ হয়েছে থাকর মা। একাদশী ঘোষালের লোক জামাইয়ের পালকি আটকেছে।

ও মা, কী সর্বনাশ হল গো!

প্রৌঢ়া উঠানের ওপর আছড়ে গিয়ে পড়ল।

সব কথাগুলোই তারার কানে গিয়েছিল। সে-ও বাইরে এসে দাঁড়াল।

কোথায় আটকেছে পালকি?

একেবারে গাঁয়ের মুখে অশথতলায়।

লোক কজন?

তা প্রায় জন ছয়-সাত লেঠেল হবে।

তারা ফিরে এল।

বাড়ির পিছনদিকে শরবন, আসশেওড়া আর ঘোড়ানিম গাছের জঙ্গল। কোমর থেকে ছোটো একটা রামশিঙা বের করে তারা বাজাল।

একবার, দুবার, তিনবার।

শরবন দুলে উঠল। আসশেওড়া আর ঘোড়ানিমের ডাল থেকে ঝুপঝাপ শব্দ।

ঝাঁকড়া চুল, মাথায় লাল কাপড়ের ফেটি বাঁধা, হাতে কারো ভোজালি, কারো বর্শা। জন কুড়ি-পঁচিশ অনুচর তারাকে ঘিরে দাঁড়াল।

চলো, গোলমাল শুরু হয়ে গেছে।

বাশুলি মায়িকি জয়। তারা মায়িকি জয়।

গাছপালা, ঝোপঝাড়, রাত্রের আকাশও কেঁপে উঠল।

চলো।

তারার মাথায় ঘোমটা নেই। আঁচল কোমরে বাঁধা। চুল খোলা। হাতে ঝকঝকে ছোরা।

আগে তারা, পিছনে যমদূতের মতন অনুচরের দল। বাতাসের বেগে বেরিয়ে গেল।

সেই অশথতলার একটু আগে।

পালকি পথের ওপর। পালকি ঘিরে জন চারেক লাঠিয়াল। বাঁধানো বেদির ওপর মহাদেব ঘোষাল নিশ্চেষ্ট হয়ে বসে তামাক খাচ্ছে।

হা রে রে রে।

তারার অনুচররা লাঠিয়ালদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।

তারা মায়িকি জয়।

লড়াই আর হল না। তারার নাম শুনেই লাঠিয়ালদের হৃৎকম্প শুরু হয়েছিল। মাথার ওপর বর্শার খোঁচা লাগতেই সবাই পথের ওপর লুটিয়ে পড়ল।

তারা নিজে গিয়ে দাঁড়াল মহাদেব ঘোষালের সামনে।

গম্ভীরকণ্ঠে বলল, চলো, বিয়ের লগ্নের আর দেরি নেই।

মহাদেব ঘোষাল কাঁপতে কাঁপতে সটান শুয়ে পড়ে তারার দুটো পা জড়িয়ে ধরল। দোহাই মা, আমি কিছু জানি না। আমি বুড়ো মানুষ, বসে তামাক খাচ্ছিলাম, হঠাৎ এই হাঙ্গামা।

তারা ডান হাতটা তুলল।

অন্ধকারের মধ্যেও ঝকঝক করে ছোরার ফলা জ্বলে উঠল।

একটা কথা নয়। চলো আমাদের সঙ্গে।

মহাদেব ঘোষালের কোঁচার খুঁটটা গায়ে জড়ানো ছিল, তারা সেটা পাকিয়ে তার গলায় টেনে দিল।

বাঁচাও মা, আমি নিরপরাধ।

মেঘা।

আর কিছু বলতে হল না। মেঘা ছুটে এসে সবেগে ঘোষালের গালে একটা চড় বসাল।

ঘোষাল ছিটকে পড়ল হুঁকার ওপর। কলকে থেকে আগুন ছিটকে তার গায়ে গিয়ে পড়ল।

সঙ্গে সঙ্গে পরিত্রাহি চিৎকার।

ওরে বাবা রে পুড়ে মলুম। তোমার দুটো পায়ে পড়ছি মা, আমি এর বিন্দুবিসর্গ কিছু জানি না।

তারার দুজন অনুচর ঘোষালকে ধাক্কা দিয়ে নিয়ে চলল।

প্রৌঢ়ার উঠানে আর তিলধারণের জায়গা নেই। খবর পেয়ে এপাশ-ওপাশ থেকে বহু লোক এসে জড়ো হয়েছে।

একেবারে প্রথমে মহাদেব ঘোষাল। দু-পাশে মেঘা আর চৈতন। তাকে ঠেলা দিতে দিতে নিয়ে আসছে।

পিছনে তারা। হাতে ছোরা।

তারপর পালকি। পালকিতে বর আর বরের খুড়ো। পালকি ঘিরে তারার অনুচরবৃন্দ।

উঠানের ওপর দাঁড়িয়ে তারা বলল, কই গো তোমরা শাঁখ বাজাও, উলু দাও, একাদশী ঘোষাল এসেছে বিয়ে করতে।

সবাই হেসে উঠল।

যতক্ষণ বিয়ে হল, মহাদেব ঘোষালকে উঠানের পাশে আম গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখা হল। বিয়ের পর তারা বাসরঘরের দরজায় এসে দাঁড়াল।

রাখালকে ডেকে বলল, শোনো।

রাখাল তারার সামনে এসে দাঁড়াল।

তোমার দেশে কে আছে?

রাখাল বলল, কেউ নেই, শুধু এই খুড়ো। খুড়ি দু-বছর আগে মারা গেছে।

তাহলে এক কাজ করো, তোমার শাশুড়িকেও তোমার সঙ্গে নিয়ে যাও। বুঝতেই তো পারছ, ঘোষাল এ গাঁয়ে তোমার শাশুড়িকে থাকতে দেবে না। অত্যাচার করবে। বার বার তো আর আমার আসা সম্ভব নয়।

রাখাল খুশি।

তাহলে তো ভালোই হয়। মা যদি আমাদের সঙ্গে যায়, তাহলে সংসারের ভাবনা আর থাকে না। এ বাড়িঘর তো ঘোষাল মশাইয়ের কাছে বাঁধা। এ বাড়িঘর ছাড়তেই তো হবে।

হ্যাঁ, তা হবে। অবশ্য সে ব্যবস্থাও আমি করতে পারি। একাদশী ঘোষালকে টাকা দিয়ে বাড়ি-জমি ছাড়িয়ে নেওয়াও যায়, কিন্তু বললাম যে, তোমার শাশুড়ির এখানে থাকা মুশকিল।

রাখাল বলল। ঠিক আছে, মা আমাদের সঙ্গেই যাবে।

এবার তারা প্রৌঢ়ার কাছে গেল।

আমি চলি।

ও মা সে কী কথা, তুমি কিছু মুখে দিলে না মা। রাত ভোর হোক, তখন যাবে।

আমি আর কিছু খাব না। একটু মিষ্টি হাতে দাও। বরং আমার দলের যারা এসেছে, সম্ভব হলে তাদের খাইয়ে দাও।

প্রৌঢ়া বলল, তাদের খাইয়ে দিয়েছি, তুমি একটু বোসো মা, তোমার ঋণ আমি জীবনে শোধ করতে পারব না।

প্রৌঢ়া পাশের ঘরে গিয়ে আবার বেরিয়ে এল। হাতে কলাপাতার ওপর কিছু মিষ্টি।

খেতে খেতে তারা বলল, আমি তোমার জামাইয়ের সঙ্গে কথা বলে নিয়েছি। তুমি কাল মেয়ে-জামাইয়ের সঙ্গে চলে যাও। বুঝতেই পারছ, এরপর তোমার এখানে থাকতে অসুবিধা হবে।

প্রৌঢ়া একগাল হেসে বলল, তাহলে তো বেঁচে যাই মা। একটিমাত্র মেয়ে, তাকে ছেড়ে আমি থাকতে পারব না।

তারা যখন খাওয়া শেষ করে উঠে দাঁড়াল, তখন প্রৌঢ়া তার হাতে একটা পুঁটলি দিল।

এটা কী?

ওই আড়াইশো টাকা, যেটা তুমি দিয়েছিলে। আমি যখন গাঁ ছেড়েই চলে যাচ্ছি, তখন তো আর ও টাকাটা দরকার হচ্ছে না।

তারা পুঁটলিটা প্রৌঢ়ার হাতে ফেরত দিয়ে বলল, ও টাকাটা আমি তোমার মেয়ে-জামাইকে যৌতুক দিলাম। তুমি এটা রেখে দাও।

প্রৌঢ়া পুঁটলিটা বুকে চেপে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল, তোমার দয়া আমি জীবনে ভুলব না। যাবার আগে একবার আমার মেয়ে-জামাইকে আশীর্বাদ করে যাও মা। এরা যেন সুখী হয়।

বেশ, চলো। তারা বাসরঘরের চৌকাঠের কাছে গিয়ে দাঁড়াল।

থাক একপাশে ঘুমাচ্ছে। মুখে কনেচন্দন আঁকা। ঠোঁটের কোণে হাসির আভাস।

রাখাল দেয়ালে ঠেস দিয়ে বসে। তারও দুটি চোখ বন্ধ।

প্রৌঢ়া ওদের জাগাতে যাচ্ছিল, তারা বারণ করল। না, না, ছেলেমানুষ, ঘুমিয়ে পড়েছে, ওদের ডেকো না। আমি এখান থেকেই আশীর্বাদ করছি।

এরপর তারা উঠানে এসে দাঁড়াল মহাদেব ঘোষালের সামনে।

এবার আমাকে ছেড়ে দাও মা। বাঁধ খুলে দাও, তোমার সামনে নাক-কান মলছি। আর জীবনে এ কাজ করব না।

তারা ঘোষালের কথার কোনও উত্তর না দিয়ে মেঘার দিকে ফিরে বলল, তোমরা কজন থাকো। মেয়ে-জামাই আর মেয়ের মা গাঁ পার হয়ে গেলে, তবে বুড়োকে ছাড়বে।

তারা পালকিতে উঠল।

দলের কয়েকজন আর পুরোহিত পিছনে রয়ে গেল। মেয়ে-জামাই রওনা হলে তবে আসবে।

সারাটা পথ তারা চিন্তামগ্ন রইল।

চোখ বন্ধ করলেই ভেসে উঠল থাকমণির বধূর বেশ।

এভাবে ডাকাতেরা যদি তাকে হরণ করে নিয়ে না আসত, তাহলে কবে তারার বিয়ে হয়ে যেত।

এইরকম ইংরেজের ভয়ে বনের মধ্যে আত্মগোপন করে থাকতে হত না।

কিছুক্ষণ পরেই তারা মাথাটা ঝেড়ে চিন্তা দূর করার চেষ্টা করল।

ছি, ছি, এসব কী ভাবছে।

কালু সর্দার তাকে দলের ভার দিয়ে গেছে। বাশুলি-মায়ের পা ছুঁয়ে তারা এই দায়িত্ব মাথায় নিয়েছে। সমস্ত দলের মঙ্গল-অমঙ্গল চিন্তা তার।

এই দলের প্রত্যেকটি মানুষ তারার একটি কথায় প্রাণ বিসর্জন দিতে পারে।

দলের চিন্তা ছেড়ে তারা নিজের চিন্তা করছে।

তারা বাশুলি-মায়ের নাম জপ করতে শুরু করল। যাতে অন্য চিন্তা ধারেকাছে না আসে।

পরের দিনই তারা দলের সর্দারদের ডেকে পাঠাল।

তারা আসতে বলল, সত্যিই আমরা বড়ো ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছি। আবার জোর দিয়ে তোমরা লাঠিখেলা, ছোরাখেলা, বন্দুকের তাগ শুরু করো।

মেঘা বলল, এই সময় হইহই করাটা কি ঠিক হবে তারা-মা? আপাতত ইংরেজের চর ধারেকাছে নেই বটে, কিন্তু কখন কোথা দিয়ে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে ঠিক আছে?

তারা গম্ভীরকণ্ঠে বলল, একদিন তো মরতেই হবে মেঘা। ইংরেজ তাড়া করে টুঁটি চেপে ধরে বন্দুকের গুলিতে মারবে, তার চেয়ে তাদের সঙ্গে মুখোমুখি লড়াই করতে করতে মরব। আমরা বাশুলি-মায়ের আশ্রিত। মরতে আমাদের ভয় নেই।

সারা দল আবার মেতে উঠল।

মাঝে মাঝে তারাও নেমে যেত তাদের সঙ্গে।

পাকা বাঁশের লাঠি হাতে নিয়ে ঘোরাতে ঘোরাতে বলত, নাও, তোমরা ঢেলা ছোড়ো। লাগাও আমার গায়ে, দেখি।

চারদিক থেকে ঢিল পড়ত, কিন্তু একটাও তারার শরীর ছুঁতে পারত না। লাঠির ঘায়ে সব গুঁড়িয়ে যেত।

সারাটা দিন তীব্র উত্তেজনার মধ্য দিয়ে কাটত, কিন্তু রাত হলেই তারা একেবারে অবসন্ন হয়ে পড়ত।

বিছানায় শুয়ে এপাশ-ওপাশ করত। ঘুম আসত না। অদ্ভুত সব ছবি চোখের সামনে ভাসত।

দিনকয়েক পরেই তারা বলল, এবার ঘটা করে বাশুলি-মায়ের পূজা করব।

পুরোহিত বলল, কিন্তু মা, এ তো মায়ের পূজার সময় নয়।

তারা একটু ইতস্তত করে বলল, কাল রাত্রে মা স্বপ্ন দিয়েছেন। পূজা চান।

এর ওপর আর কথা চলে না।

পুরোহিত বলল, ঠিক আছে মা, সামনের অমাবস্যাতেই ব্যবস্থা করব।

তবে একটা কথা।

পুরোহিত ফিরে দাঁড়াল। কী মা?

এবার আর চারপাশের গাঁয়ের লোকদের বলার দরকার নেই। দিনকাল খারাপ। ভিড়ের মধ্যে লুকিয়ে শত্রুর চর ঢুকে পড়া বিচিত্র নয়।

তা-ই ঠিক হল। মায়ের পূজায় এবার আর অতিথিভোজন হবে না। শুধু মন্দিরের মধ্যে পূজার উৎসব।

সকাল থেকে তারা একলা পূজার সব কাজকর্ম করল। মালা গাঁথা, ফল কাটা, নৈবেদ্য সাজানো।

তারপর পুরোহিত যখন পূজায় বসল, তখন তারা তার পাশে বসল। দুটি চোখ নিমীলিত, দুটি হাত বুকের উপর জড়ো করা।

মন্ত্রপাঠের সঙ্গে সঙ্গে তারার শরীর দুলতে লাগল। চোখ বেয়ে জলের ধারা গড়িয়ে পড়ল।

আশপাশে যারা দাঁড়িয়ে ছিল, মেঘা, চৈতন, পরান তারা সবাই অবাক হয়ে গেল।

পূজা শেষ হবার পরও তারা আবিষ্টের মতন চুপচাপ বসে রইল।

তারপর একসময়ে মন্দিরের সিঁড়ি বেয়ে নীচে নামতেই, একজন চর এসে নমস্কার করে বললে, খবর আছে মা।

খবর? কীসের খবর?

এক জমিদার শ্রীক্ষেত্র যাচ্ছেন। সঙ্গে অনুচরের সংখ্যা খুব কম। তবে গোপনে প্রচুর অর্থ নিয়ে চলেছেন। নিজে একেবারে গৈরিক পোশাক পরেছেন। গলায়, হাতে রুদ্রাক্ষের মালা। সঙ্গে বিগ্রহ। বিগ্রহ শ্রীক্ষেত্রে নিয়ে যাচ্ছেন। জগন্নাথদেবকে স্পর্শ করিয়ে ফিরিয়ে এনে নিজের জমিদারিতে প্রতিষ্ঠিত করবেন।

বোধহয় শ্রীক্ষেত্রে পূজা দেবার উদ্দেশ্যেই প্রচুর অর্থ নিয়ে চলেছেন। অনেকগুলো ঢোলকের মধ্যে অর্থ ভরে নেওয়া হয়েছে। যাতে কেউ সন্দেহ না করে।

তারা দলের চাঁইদের সঙ্গে বৈঠকে বসল।

খুব সম্ভবত জমিদারের ধারণা হয়েছে যে দুর্গাপুরে ডাকাতদের উৎপাত আর নেই। ইংরেজরা তাকে হয়তো এই কথাই বুঝিয়েছে। সেইজন্যই সঙ্গে জমিদার বেশি অনুচর নেয়নি।

এই আমাদের অপূর্ব সুযোগ। কোম্পানির বরকন্দাজ যে-কোনও কারণেই হোক সরে গেছে। এতগুলো টাকা নির্বিবাদে আমাদের এলাকা পার হয়ে যাবে, এ কিছুতেই হতে দেওয়া উচিত নয়।

দলের সবাই চিৎকার করে তারাকে সমর্থন করল।

তারা বলল, চরের মুখে খবর পেলাম পুরন্দরপুরের চটিতে রাত কাটিয়ে জমিদার ভোরবেলা রওনা হবে। তার মানে এখান দিয়ে যাবে রাতের দ্বিতীয় প্রহরে। তোমরা সব তৈরি হয়ে নাও। এবার আর কোনও কৌশল নয়। সদলে আমরা ঝাঁপিয়ে পড়ব। তবে এ অভিযানের পুরোভাগে থাকব আমি।

এবারেও চাঁইরা হাতের লাঠি আকাশে তুলে তারার জয়ধ্বনি করল।

সন্ধ্যার একটু পর থেকেই সবাই তৈরি হতে শুরু করল। দলের আর সবাই মুখে কালি-ভুসো মেখে নিল, কেবল তারা ছাড়া।

সে হেসে বলল, না, আমি কিছু মাখব না। ওসব মেখেও নিজেকে লুকাতে পারব না। সবাই বুঝতে পারবে আমি মেয়ে। আর দুর্গাপুরের জঙ্গলে মেয়ে ডাকাত এই একজনই আছে, তারা।

বেশ একটু অন্ধকার হতে সবাই রওনা হল।

ঘোড়ার পিঠে তারা। তাকে ঘিরে আর সবাই। প্রায় সকলের হাতেই বন্দুক, কোমরে ছোরা। শত্রু খুব কাছে এসে গেলে বন্দুকে সুবিধা হয় না, তখন ছোরাই ভালো। শুধু তারা হাতে বর্শা নিল। অবশ্য তার কোমরেও ছোরা।

আজ প্রায় সারাদুপুর তারা বাশুলির মন্দিরে কাটিয়েছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাতজোড় করে বসে থেকেছে মূর্তির সামনে। পুজো দিয়েছে।

এতদিনের গড়ে-তোলা একটা দলের অস্তিত্ব নিয়ে চিন্তার কারণ শুরু হয়েছে। তারার অধিনায়কত্বের সময় যদি দল ভেঙে দিতে হয়, বা দল ধরা পড়ে তাহলে তারার লজ্জা সবচেয়ে বেশি।

সেই অপমান যেন তার জীবনে না আসে, তারা বাশুলি-মায়ের কাছে সেই প্রার্থনাই জানিয়েছিল।

ঝোপের পিছনে সবাই বসল।

ঘুটঘুটে অন্ধকার। এধারে-ওধারে শুধু জোনাকির মেলা। একটু দূরে দূরে শেয়াল ডেকে চলেছে। মশার উৎপাতও বড়ো কম নয়। দলের প্রায় সবাই গায়ে বেশ করে সরষের তেল মেখে আসে। মশা যাতে গায়ে বসতে না পারে। আর-একটা কারণও আছে। কেউ ধরলে যাতে পিছলে যেতে পারে।

শুধু একটা জিনিসে তাদের একটু ভয়। সাপ। এ জঙ্গল বিষধর সাপের আস্তানা। যাদের স্পর্শে মৃত্যু। তাই মাঝে মাঝে সবাই বন্দুকের বাঁট মাটিতে ঠুকছিল। শব্দে যাতে বিষধর না আসে।

অনেকক্ষণ পরে পথের বাঁকে আলো দেখা গেল। মশালের আলো। সবাই টান হয়ে দাঁড়াল।

তার একটু পরেই বট আর পাকুড় গাছের ফাঁক দিয়ে দেখা গেল দুজন মশালধারী ছুটে আসছে। তার পিছনে গোটা চারেক অস্ত্রধারী পাইক। তাদের মাঝখানে পর পর দুটো পালকি।

দুটো পালকি দেখে তারা একটু চিন্তিত হল। দুটো কেন? একটায় সম্ভবত জমিদার, আর-একটায়?

এমন তো নয়, একটা পালকিতে ইংরেজের সশস্ত্র সৈনিক কিংবা রবার্ট সাহেব নিজেই রয়েছে বন্দুক উঁচিয়ে।

এতখানি এগিয়ে এসব চিন্তা করার কোনও মানে হয় না। এখান থেকে ফিরে যাওয়া মানে অপমানের চূড়ান্ত। দলের লোকরা মুখে কিছু বলবে না, কিন্তু মনে মনে টিটকারি দেবে এমন সর্দারকে যে পিছিয়ে আসে। পিছিয়ে আসার মানেই বেইজ্জত হওয়া।

তারা বলল, তোমাদের বন্দুকে গুলি ভরা আছে তো?

সবাই ঘাড় নাড়ল, হ্যাঁ আছে।

ওই দেখো পর পর দুটো পালকি আসছে। এমনও হতে পারে একটাতে বন্দুক নিয়ে ইংরেজ সিপাই বা খোদ রবার্ট সাহেবও থাকতে পারে। আমাদের খুব সাবধানে আক্রমণ করতে হবে। শোনো, কাছাকাছি গিয়ে আমরা যেমন হুংকার ছাড়ি, তেমনই ছাড়ব। দেখা যাক, পালকির দরজা খুলে কেউ উঁকি দেয় কি না।

তা-ই হল, সড়কের কাছাকাছি গিয়েই সবাই বিকট শব্দে চিৎকার করে উঠল।

বাশুলি-মায়ের জয়! তারা-মায়ের জয়!

কাজ হল। অনুচরগুলো থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। মশালধারীরা জোরে জোরে পা ফেলে রাস্তা ছেড়ে নাবাল জমি বেয়ে চলতে আরম্ভ করল।

প্রথম পালকির দরজা খুলে গেল।

গম্ভীর কণ্ঠ শোনা গেল, রামলাল আমাকে বন্দুকটা দাও।

পাশের অনুচর বন্দুকটা পালকির দরজার দিকে এগিয়ে দিল।

বোঝা গেল প্রথম পালকিতে জমিদার। কিন্তু পরের পালকির দরজা খুলল না।

তারার সন্দেহ দৃঢ়তর হল। সাধারণত ডাকাতদের চিৎকারের সঙ্গে সঙ্গে সবাই পালকির দরজা খুলে ব্যাপারটা জানবার চেষ্টা করে, কোন দিক থেকে আক্রমণ হচ্ছে। যারা আক্রমণ করছে তারা সংখ্যায় কতজন।

তারা ফিসফিস করে বলল, তোমরা বন্দুক নিয়ে দ্বিতীয় পালকিটা ঘিরে ফেলো। আমার মনে হচ্ছে ভিতরে গোলমেলে ব্যাপার আছে। দুজন শুধু আমার সঙ্গে এসো। জমিদারকে আমি শায়েস্তা করতে পারব।

একসঙ্গে সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ল।

তারা বর্শা দিয়ে প্রবলবেগে জমিদারের কবজির ওপর আঘাত হানল। তার বন্দুকটা ছিটকে জঙ্গলের মধ্যে পড়ে গেল।

জমিদার চিৎকার করে উঠল, খবরদার আমার বিগ্রহ কেউ স্পর্শ করবে না। তোমরা নীচ, মহাপাতকী, তোমরা বিগ্রহ স্পর্শ করলে বিগ্রহ অপবিত্র হয়ে যাবে। সে বিগ্রহ আমি প্রতিষ্ঠা করতে পারব না।

জমিদার বিগ্রহ আগলে পালকির মধ্যে উপুড় হয়ে রইল।

তার হাতের ফাঁক দিয়ে তারা স্পষ্ট দেখতে পেল, শুধু বিগ্রহ নয়, গোটা তিনেক বড়ো আকারের ঢোলকও রয়েছে পাশাপাশি।

তাহলে চর মোটেই ভুল খবর দেয়নি। ওই ঢোলক ভরতি সোনা আর টাকা।

সরে যাও, নইলে খতম করে দেব।

নিজের কণ্ঠের কর্কশতায় তারা নিজেই বিস্মিত হল। যেভাবে জমিদার তাদের নীচ, মহাপাতকী বলে গালিগালাজ করেছে, তাতে এমনিতেই তার মেজাজ রুক্ষ হয়ে গিয়েছিল। তার ওপর বিগ্রহ সামলানোর নাম করে জমিদারের অর্থ বাঁচাবার চেষ্টা দেখে তারা ধৈর্য হারাল।

না, কিছুতেই নয়। আমাকে না মেরে আমার বিগ্রহ ছুঁতে পারবে না।

বেশ, তা-ই হোক।

তারা সবলে হাতের বর্শা জমিদারের পিঠে ঢুকিয়ে দিল। একটা আর্তনাদ, ফিনকি দিয়ে রক্তস্রোত ছুটল। তারার শাড়ি ভিজে গেল সেই রক্তে। এতক্ষণ বাহকরা পালকি ধরে থরথর করে কাঁপছিল, এবার পালকি ফেলে দিয়ে যে যেদিকে পারল তিরবেগে ছুটতে লাগল।

পিছনের পালকিটা বাহকরা আগেই রাস্তার ওপর রেখে পালিয়েছিল। ডাকাতের দল পালকিটাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে ছিল আর মাঝে মাঝে বন্দুকের বাঁট দিয়ে পালকির গায়ে আঘাত করছিল। সাহেব বেরিয়ে আসবে এই আশায়।

এগারো

জমিদারের আর্তস্বর শোনা যেতেই পালকির দরজা খুলে গেল। গৌরবর্ণের এক প্রৌঢ়া মুখ বের করে জমিদারের অবস্থা দেখেই ডুকরে কেঁদে উঠল।

পালকি থেকে জমিদার গড়িয়ে রাস্তার ওপর পড়েছে। গৈরিক বসন রক্তাপ্লুত। মুখটা আকাশের দিকে। দুটো চোখ বিস্ফারিত। অন্তিম যন্ত্রণায় ঠোঁটের দুটি প্রান্ত কুঞ্চিত।

পলকের জন্য চিৎকারে আকৃষ্ট হয়ে তারা পালকির দিকে মুখ ফেরাল। ডাকাতের দলের দুজন মশাল নিয়ে পালকির কাছে দাঁড়িয়েছে। বাকি দুজন অর্থসংগ্রহে ব্যস্ত।

সেই মশালের আলোয় তারা স্পষ্ট দেখতে পেল, প্রৌঢ়াও তার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে রয়েছে। তারা একবার নিহত জমিদারের দিকে আর একবার প্রৌঢ়ার দিকে দৃষ্টি ফিরিয়েই চিৎকার করে উঠল। তারপর ঝোপঝাড় ভেদ করে বিদ্যুদবেগে জঙ্গলের দিকে ছুটতে শুরু করল।

মেঘা, সাধু, চৈতন, রতন সবাই কিছুক্ষণ অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। একবার ভাবল পিছনে বোধহয় পাইক-বরকন্দাজের দল আসছে, কিন্তু এদিক-ওদিক চেয়েও কাউকে দেখতে পেল না। আবার ভাবল, তারার কি কোথাও চোট লেগেছে? তা-ই বা কী করে হবে? তারাই তো জমিদারের পিঠে বর্শার ফলা গে�থে দিয়েছে। তার নিজের দেহে তো আঁচড়টি লাগেনি।

তবে?

সর্দারনি যখন সরে গেছে, তখন দলের অন্য সকলের থাকাটা সমীচীন নয়। তাই যতটুকু অর্থ সংগ্রহ করেছে ততটুকু নিয়েই সকলে ছুটতে আরম্ভ করল।

সকলে জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে দেখল ঘোড়া নেই। তার মানে তারা ঘোড়ায় চড়ে আগেই চলে গেছে। দলের কারো জন্য অপেক্ষা করেনি।

সব ব্যাপারটাই কেমন অস্বাভাবিক। এমন কী হল তারার যে লুঠের মাল ভালোভাবে কুড়োবার অবসর না দিয়ে এভাবে পালিয়ে এল?

দলের সকলেই বেশ চিন্তিত হয়ে পড়ল। জোরপায়ে ঘাঁটির দিকে চলতে আরম্ভ করল।

বাশুলির মন্দিরে তারা নেই। তার কুঁড়েতেও খোঁজা হল, তারাকে পাওয়া গেল না।

মেঘা মাথায় হাত দিয়ে পথের ওপরই বসে পড়ল।

সর্বনাশ, তারা-মা গেল কোথায়?

তারা আস্তানায় ফেরেনি। আরও গভীর জঙ্গলের মধ্যে বাঁশবনে শুয়ে পড়ে ভেউ ভেউ করে কাঁদছিল।

মা বাশুলি, এ কী করলে মা! আমি সত্যিই মহাপাতকী হলাম। কীসে আমার প্রায়শ্চিত্ত হবে!

পালকিতে বসা ভীতা-সন্ত্রস্তা প্রৌঢ়াকে একনজরেই তারা চিনতে পেরেছিল। এত বছরের অদর্শন সত্ত্বেও। প্রৌঢ়াও যে মেয়েকে চিনতে পেরেছে সে বিষয়ে তারার কোনও সন্দেহই নেই।

আর তারার বর্শার আঘাতে যে জমিদার প্রাণ হারিয়ে পথের ওপর লুটিয়ে পড়েছিল, তাকেও চিনতে পেরেছে তারা। মায়ের সহোদর ভাই। জমিদার শশীকান্ত রায়।

মনে পড়ছে ছোটোবেলায় এই মামা কতবার এসেছেন তারাদের বাড়িতে। তারাকে কোলেপিঠে করে কত আদর করেছেন। কত রঙিন খেলনা এনেছেন তার জন্য।

সেই মামাকে তারা নিজের হাতে শেষ করে দিয়ে এল।

চরের কাছ থেকে আর-একটু বিশদভাবে খোঁজ নিলে বোধহয় এ বিপদ ঘটত না। জমিদার আসছে প্রচুর অর্থ নিয়ে এইটুকু খবর শুনেই তারা লোভে উন্মত্ত হয়ে উঠেছিল। ছি ছি!

আঁচলে চোখ মুছে তারা উঠে দাঁড়াল। এ পাপের প্রায়শ্চিত্ত তাকে নিজেই করতে হবে। এ ছাড়া আর অন্য পথ নেই।

নিজের কুটিরের সামনে এসে দেখল দলের প্রধানরা সব গোল হয়ে বসে রয়েছে।

তারাকে দেখে সকলে উঠে দাঁড়াল।

সাধু বলল, কোথায় ছিলে তারা মা? আমরা চারদিক তন্ন তন্ন করে খুঁজলাম।

তারা কোনও উত্তর দিল না। পাশ কাটিয়ে নিজের ঘরে ঢুকল।

পিছন পিছন আর সকলে ঢুকে পড়ল।

তারা মেঝের ওপর বসে পড়ে বলল, আমি এবার তোমাদের কাছে বিদায় নেব। আর কারো ওপর দলের ভার দাও।

সবাই অবাক। পরস্পরের দিকে চেয়ে রইল।

মেঘা বলল, এ কী কথা তারা মা? কালু সর্দার আমাদের ভার তোমার ওপর দিয়ে গেছে। আমাদের ফেলে তুমি কোথায় যাবে?

আমার প্রায়শ্চিত্ত করার দরকার মেঘা। আমি ঘোরতর অন্যায় করেছি।

অন্যায়?

এ পথই হয়তো অন্যায়ের পথ। লোভ আর উত্তেজনার জন্য এতদিন এ কথাটা ভাবিনি। মানুষ মেরেছি নির্বিবাদে। লোকের জীবন আর টাকাপয়সা নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছি কিন্তু আজ নিজের মামাকে বর্শাবিদ্ধ করে বুঝতে পেরেছি, যাদের মেরেছি, যাদের কপর্দকহীন করেছি, তাদের আত্মীয়স্বজনের মনের অবস্থার কথা। নিজের মামার রক্ত আর মায়ের চোখের জল আমাকে সবকিছু নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে। এ পাপের আমি প্রায়শ্চিত্ত করব।

প্রায়শ্চিত্ত? কী প্রায়শ্চিত্ত করবে?

আমি ধরা দেব।

এবার দলের সকলের মুখ বিবর্ণ হয়ে গেল।

সে কী তারা-মা, ধরা দেবে কী? আমরা বেঁচে থাকতে কার সাধ্য তোমায় স্পর্শ করে!

না, পরান, আমি অনেক ভেবেছি। বাশুলি-মায়ের কাছে জিজ্ঞাসা করেছি, এ ছাড়া আমার আর অন্য পথ নেই। তোমাকে একটা কাজ করতে হবে সাধু।

বলো তারা-মা।

আমার একটা চিঠি নিয়ে ইংরেজের তাঁবুতে দিয়ে আসতে হবে। যদি রবার্ট সাহেবকে দিতে পারো তো ভালোই হয়।

কী লেখা থাকবে চিঠিতে?

লেখা থাকবে বাশুলি-মায়ের মন্দিরের চাতালে আমি অপেক্ষা করব। রবার্ট সাহেব এসে যেন আমাকে ধরে নিয়ে যান।

মেঘা মুচকি হাসল।

তোমার কী ধারণা সাহেবরা এ কথা বিশ্বাস করবে তারা-মা? তারা ভাববে এটা তাদের বিপদে ফেলার নতুন একটা জাল।

বিশ্বাস করা-না-করা তাদের খুশি। যদি সাহেবদের এ জঙ্গলে ঢুকতে ভয় করে, তাহলে তাদের অধীনে যত সিপাই আছে নিয়ে আসতে পারে। সিপাই, গোলাগুলি, কামান। আমাদের কোথাও কোনও লোক থাকবে না। কেউ বাধা দেবে না।

কিন্তু তোমাকে ধরার পর যদি নির্যাতন শুরু করে?

তুমি বৃথা ভয় পাচ্ছ পরান, যতই নির্যাতন করুক, আমাদের দলের সম্বন্ধে একটি কথাও জানতে পারবে না। আমি বাশুলি-মায়ের সেবিকা। আমার দ্বারা দলের কোনও অনিষ্ট হবে না।

পরান জিভ কাটল, না তারা-মা, সে কথা আমি একবারও মনে আনিনি। আমি বলছিলাম, সাহেবরা তোমায় দারুণ কষ্ট দেবে।

তারা হাসল, কষ্টই তো পেতে চাই। মানুষকে অযথা অনেক দুঃখ দিয়েছি, অনেক কষ্ট দিয়েছি।

আর কোনও কথা হল না। সারাটা রাত তারা চুপচাপ বসে রইল। তাকে ঘিরে দলের আর সবাই।

ভোর হতে তারা উঠে দাঁড়াল। এলোচুল। উদাস দৃষ্টি। মুখ-চোখের ভাব দেখে মনে হল যেন অনেকদিন রোগভোগের পরে সবে উঠেছে।

আমি বাশুলি-মায়ের মন্দিরে যাচ্ছি। কেউ যেন আমাকে বিরক্ত না করে। সমস্ত দিন সেখানে থাকব। বিকালে একবার জনমেজয়কে আমার সঙ্গে দেখা করতে বলো।

জনমেজয় চিঠিপত্র সব লিখে দেয়। দলের লোকেরা বুঝতে পারল, আজ বিকালেই তারা চিঠি লেখার কাজ শেষ করবে। তারপর সেই চিঠি নিয়ে সাধুকে ইংরেজের তাঁবুতে যেতে হবে।

সত্যিই সারাটা দিন তারা মন্দিরেই রইল। নিজের হাতে মালা গেঁথে বাশুলি-মায়ের গলায় পরিয়ে দিল। ধূপধুনো জ্বেলে আরতি করল। তারপর মূর্তির পায়ের কাছে উপুড় হয়ে শুয়ে রইল। মাঝে মাঝে শুধু কান্নার বেগে তার দেহটা কেঁপে কেঁপে উঠল।

বিকালে মন্দিরের দরজা খুলে যখন তারা বের হয়ে এল, তখন তার চেহারা অনেক শান্ত। চোখে জল নেই। গলায় বাশুলি-মায়ের প্রসাদি মালা।

সিঁড়ির চাতালে সবাই অপেক্ষা করছিল। জনমেজয়ও। তারা সিঁড়ির চাতালে তাদের মাঝখানে এসে বসল।

জনমেজয়, লেখো।

জনমেজয় তৈরি ছিল। লিখতে শুরু করল।

পরের দিন ভোরে চিঠি নিয়ে সাধু রওনা হল বাউলের বেশে। ইতিমধ্যে এটুকু খবর সংগ্রহ করেছিল সে, রাতের ডাকাতির খবর ইংরেজদের কানে পৌঁছেছে। রবার্ট সাহেব তার সিপাই-বরকন্দাজ নিয়ে এগিয়ে এসেছিল। জমিদারের বোনকে মূর্ছিত অবস্থায় পেয়েছে। জমিদারের দেহ তুলে নিয়ে গেছে। একটা ব্যাপারে রবার্ট সাহেব খুব আশ্চর্য হয়েছে। টাকাপয়সা-সোনাদানা সব ডাকাতরা লুঠ করেনি। মনে হয়েছে লুঠ করতে করতে হঠাৎ যেন ভয় পেয়ে পালিয়েছে। জঙ্গলের এধারে-ওধারে বেশ কিছু টাকাপয়সা ছড়ানো ছিল।

এবার রবার্ট তাঁবু পেতে বসল ঠিক এই জায়গায়। কলকাতা থেকে কড়া নির্দেশ এসেছে যেমন করে হোক এইসব ডাকাতদের দলকে উচ্ছেদ করতেই হবে। এর জন্য যত সৈন্যসামন্ত প্রয়োজন, সরকার দিতে প্রস্তুত।

লাটসাহেব বেন্টিঙ্ক আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। দেশের বুকে শান্তি আনতেই হবে।

শুধু দুর্গাপুরের জঙ্গলেই নয়, সুন্দরবনে, গঙ্গা নদীর ওপর জলদস্যুর অত্যাচার বন্ধ করার জন্য অভিযান শুরু হয়েছে। প্রলোভন দেখিয়ে ডাকাতের দলের লোককে ইংরেজ সরকার সিপাই করে নিচ্ছে। ভালো মাইনে, ভালো পোশাক, নিশ্চিন্ত জীবন।

বাউলবেশে সাধু যখন ইংরেজের তাঁবুতে গিয়ে পৌঁছাল, তখন রবার্ট সাহেব বসে বসে তামাক টানছে। পাশে হুঁকোবরদার হাজির। দুজন সিপাই বিরাট আকারের তালপাখা দিয়ে বাতাস করছে।

গোপীযন্ত্রের শব্দ শুনে রবার্ট নল থেকে মুখ সরাল।

কে বাজাচ্ছে?

পাখা রেখে একজন সিপাই বাইরে থেকে দেখে এসে বলল, একজন বাউল হুজুর, গান শোনাতে চায়।

নিয়ে এসো।

সাধু সামনে এসে আভূমি নত হয়ে প্রণাম করল।

কী খবর?

একটা গান বেঁধেছি। হুজুরকে শোনাব।

রবার্ট সরিয়ে রাখা নলটা আবার মুখে তুলে বলল, শোনাও।

সাধু গোপীযন্ত্র বাজিয়ে গান শুরু করল। ইংরেজের বন্দনাগান। ইংরেজরা নবরূপী দেবতা। লোকের দুঃখ মোচন করতে ধরাধামে অবতীর্ণ হয়েছে। শান্তি ও সম্পদের দূত।

গান শেষ করে সাধু হাত পেতে দাঁড়াল।

বকশিশ হুজুর।

রবার্ট চেয়ারে হেলান দিয়ে বজ্রগম্ভীর কণ্ঠে বলল, সিপাই।

দু-দিক থেকে দুজন সিপাই এসে দাঁড়াল।

এই বাউলকে আটক করে চাবুক লাগাও।

এর জন্য সাধু তৈরি ছিল না। পালাবার আগেই সিপাই দুজন বাঘের মতন তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল, তারপর টানতে টানতে তাকে রবার্টের সামনে থেকে সরিয়ে নিয়ে গেল।

আধ ঘণ্টা পর রবার্ট যখন আহারে ব্যস্ত, তখন একজন সিপাই এসে দাঁড়াল।

হুজুর, ওই বাউলের পোশাকের ভিতর থেকে এই চিঠিটা পাওয়া গেছে।

রবার্ট হাত বাড়িয়ে চিঠিটা নিল। চিঠির ওপর তার নাম লেখা।

ফোর্ট উইলিয়ামে পণ্ডিতদের কাছে রবার্ট কিছুটা বাংলা পড়েছে। চিঠি পড়তে তার কোনও অসুবিধা হল না।

মান্যবর ইংরেজ বাহাদুর রবার্ট সাহেব,

আমাদের শাস্ত্রে পাপ করিলে প্রায়শ্চিত্ত করার বিধি আছে। আমি স্বজনহত্যার পাপ করিয়াছি। তজ্জন্য প্রায়শ্চিত্তস্বরূপ নিজেকে আপনার হাতে অর্পণ করিতে চাই। আগামীকাল বাশুলি-মায়ের মন্দিরের চাতালে আমি একাকিনী থাকিব, আপনি আমাকে গ্রেপ্তার করিবেন।

ইতি

বাশুলি-মায়ের সেবিকা

তারা।

অনেকবার রবার্ট চিঠিটা পড়ল। পড়তে পড়তে তার মুখ আরক্ত হয়ে উঠল। খাঁজ পড়ল দুটি ভ্রূ-র মাঝখানে।

আহার ছেড়ে উঠে পড়ে বলল, সেই বাউল কোথায়?

দিঘির পাড়ে একটা তাল গাছের সঙ্গে তাকে বেঁধে রাখা হয়েছে।

সিপাইয়ের সঙ্গে রবার্ট দিঘির পাড়ে এসে দাঁড়াল।

সর্বাঙ্গে চাবুকের রক্তাক্ত দাগ। অর্ধ অচেতন সাধু গাছতলায় পড়ে আছে।

রবার্ট কিছুক্ষণ নিরীক্ষণ করে বলল, এবার নিগারটাকে চাঙ্গা করে তোলো। কাল ওকে আমাদের প্রয়োজন হবে।

রবার্ট মনে মনে ঠিক বুঝতে পেরেছিল ডাকাতের দলের সর্দারনির এ একটা কায়দা। বোধহয় ভেবেছে আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে রবার্ট একলাই, কিংবা জন দুয়েক সঙ্গী নিয়ে জঙ্গলে ঢুকবে, আর ডাকাতের দল সুবিধামতো তাদের ঘেরাও করে ফেলবে।

সেরাত্রেই রবার্ট ব্যাপারটা লিখে একজন বিশেষ বাহককে দিয়ে চিঠিটা কলকাতায় পাঠিয়ে দিল।

তারপর সিপাই-বরকন্দাজদের নিয়ে বৈঠকে বসল। পরামর্শ করতে।

পরের দিন বিকাল হতেই রবার্ট বরকন্দাজ নিয়ে যাত্রা শুরু করল। একটা ঘোড়ার ওপর সাধুকে বসিয়ে দিল। পিছমোড়া করে বেঁধে। ঠিক তার পিছনে দুজন সিপাই। তাদের দুটো বন্দুকের নল একেবারে সাধুর পিঠে ঠেকানো। আশপাশে বন্দুক, বল্লম, বর্শা নিয়ে অসংখ্য বরকন্দাজ।

মাঝখানে কালো ঘোড়ার ওপর রবার্ট। হাতে বন্দুক।

ব্যাপার দেখে মনে হল যেন সব লড়াইয়ে চলেছে।

ঘন জঙ্গলের মধ্যে ঢুকেই রবার্ট একটা টিনের চোঙা মুখে দিয়ে চিৎকার করে উঠল, ডাকাতরা যদি আক্রমণের কোনও চেষ্টা করে তাহলে সঙ্গে সঙ্গে এই ডাকাতকে গুলি করে মারা হবে। খুব সাবধান।

জঙ্গলের ভিতর অনেকটা প্রবেশ করার পরও কোনওদিক থেকে কোনও সাড়া পাওয়া গেল না। গাছের ডালে ঝিমিয়ে-পড়া পাখিগুলো শুধু ডানা ঝাপটে আকাশে উড়ে গেল।

আর-একটু এগোতেই জঙ্গল অনেক ফাঁকা হয়ে গেল। মশালের আলোয় বাশুলির মন্দিরের কাঠামোটা দেখা গেল।

রবার্ট দাঁড়িয়ে পড়ল। সঙ্গে সমস্ত সিপাই-বরকন্দাজ।

ওই তো মন্দির? রবার্ট সাধুকে প্রশ্ন করল।

নির্জীব সাধু কোনওরকমে ঘাড় নাড়ল।

রবার্ট কয়েক পা এগিয়ে চোখ কুঁচকে দেখল। মন্দিরের চাতালে কেউ অপেক্ষা করছে না। চাতাল ফাঁকা।

তার মানে মিথ্যা হয়রানি করিয়েছে তাকে। বলা যায় না, হয়তো কৌশল করে সব সিপাই-বরকন্দাজদের এদিকে সরিয়ে এনে ডাকাতের দল অন্যদিকে ডাকাতি করতে বেরিয়েছে।

নিজেকে রবার্টের বড়ো বোকা মনে হল। ছি ছি, একটা মেয়েছেলের ধাপ্পাবাজিতে ভুলল! ঊর্ধ্বতন সাহেবরা হাসাহাসি করবে এই নিয়ে। শ্লিম্যান তাকে অপদার্থ ভাববে।

এতটা যখন এসেছে তখন শেষ দেখে যাবে।

রবার্ট আদেশ দিল বরকন্দাজদের, মন্দির ঘিরে ফেলো।

সাধুকে একটা গাছের সঙ্গে বেঁধে দুজন সিপাই পাহারায় রইল। বাকি সবাই ঘিরে ফেলল বাশুলির মন্দির।

রবার্ট আর-একবার সাবধান করে দিল।

গাছের ওপরেও চোখ রেখো। গাছের ডাল থেকে ঝাঁপিয়ে পড়াও কিছু বিচিত্র নয়।

রবার্ট দুজন সিপাইকে সঙ্গে নিয়ে মন্দিরের সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগল।

সিঁড়ির দু-পাশে দুটো মশাল মাটির মধ্যে পোঁতা। সমস্ত জায়গাটা আলোয় ভরে গেছে। কোথাও ছিটেফোঁটা অন্ধকার নেই।

চাতালে কেউ নেই, রবার্ট সেটা আগেই দেখেছিল। তবু একবার এদিক-ওদিক দেখল।

তারপর একটু এগিয়েই থমকে দাঁড়াল।

ঠিক চৌকাঠের ওপর। মাথাটা মূর্তির দিকে। এলোচুল মেঝের ওপর ছড়িয়ে পড়েছে। পরনে লালপাড় শাড়ি। গলায় জবা ফুলের মালা। বুকের মাঝখানে শাড়িটা রক্তে লাল হয়ে উঠেছে।

রবার্ট উত্তেজিত কণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠল, একটা মশাল এদিকে নিয়ে এসো।

মশাল নিয়ে একজন রবার্টের কাছে গিয়ে দাঁড়াল।

নিচু হয়ে রবার্ট নিরীক্ষণ করে দেখল।

একটু দূরে রক্ত-মাখা খাঁড়া পড়ে রয়েছে। শুধু বুকে নয়, মন্দিরের দেয়ালেও রক্তের ছোপ।

রবার্ট বিস্মিত হয়ে গেল। ডাকাতরা নৃশংসভাবে মেয়েটিকে হত্যা করে রেখে গেছে আর এই নারকীয় দৃশ্য দেখবার জন্য তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

রবার্ট আবার চেঁচাল, শয়তানকে নিয়ে এসো এখানে।

দুজন সিপাই দড়ি-বাঁধা অবস্থায় সাধুকে এনে দাঁড় করাল।

কর্কশকণ্ঠে রবার্ট বলল, দেখ নিগার, তোদের দলের কীর্তি। কচি একটা মেয়েকে মূর্তির সামনে বলি দিয়ে গেছে।

সাধু একবার দেখেই ভেউ ভেউ করে কেঁদে উঠল। আছড়ে পড়ল চৌকাঠের পাশে।

এ কে, চিনিস একে তুই?

সাধু মুখ তুলল না। ক্রন্দনরত কণ্ঠে বলল, আমাদের মা, আমাদের তারা-মা। দলের প্রাণ, দলের শক্তি।

এই তারা। দুর্ধর্ষ একটা দলের নেত্রী। এত কম বয়স!

তাহলে তারা কথা রেখেছে। বাশুলির মন্দিরে নিজেকে অর্পণ করার জন্য তৈরি হয়ে রয়েছে। অনায়াসেই রবার্ট তাকে গ্রেপ্তার করতে পারে।

তারপর অনেকদিন কেটে গেছে। অনেক বছর। রক্তের পথ পার হয়ে, অনেক প্রাণ অর্ঘ্য দিয়ে দেশে স্বাধীনতা এসেছে।

জননেতারা দেশকে নবরূপে গড়ে তোলবার প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করেছেন। দুর্গম অরণ্য বুলডোজারের আঘাতে নিশ্চিহ্ন করে নানা জায়গায় জেগে উঠেছে কলকারখানা। জাতীয় শিল্পপ্রচেষ্টার বাস্তব রূপ।

দুর্গাপুরের জঙ্গলও পরিষ্কার করা শুরু হল। গাছপালা উধাও, বিল, সায়র, জলা ভরাট হল। জোনাকির আলোর বদলে নিয়নের বিদ্যুৎ-দীপ্তি।

জঙ্গল সাফ করতে করতে কুলিমজুররা দেখল, ভাঙা জরাজীর্ণ এক মন্দির। গাছপালা সমাচ্ছন্ন। বিগ্রহ নেই। মন্দিরের তিনদিকের দেয়াল ভেঙে পড়েছে। শুধু সামনের দেয়ালের কিছুটা আছে। সে দেয়ালে গাঢ় রক্তের ছোপ।

কুলিরা পিছিয়ে গেল, ভাঙতে পারব না সাহেব। ঠিকাদারের দিকে চেয়ে বলল, দেয়ালের ওই রক্তের দাগ তারা-মা-র রক্তের। বাপ-ঠাকুরদার কাছে গল্প শুনেছি, এই সেই মন্দির যেখানে তারা-মা নিজেকে নিবেদন করে প্রায়শ্চিত্ত করেছিল।

সে মন্দিরও আর নেই। ঠিকাদাররা অন্য প্রদেশ থেকে কুলি আনিয়ে বেশি টাকা রোজ দিয়ে, সে মন্দির ধূলিসাৎ করে দিয়েছে।

আজ সেখানে দুর্গাপুর কারখানার বিরাট একটা ফার্নেস বসানো হয়েছে। রক্তের চেয়েও লাল আগুনের আভা তার বুকে।

'রক্ত দেউল' নামে 'শুকতারা' এপ্রিল ১৯৬৮ ধারাবাহিক

অধ্যায় ১ / ১২
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%