প্রথম অভিযান

অমরেন্দ্র চক্রবর্তী

আমবাগানের ছায়ায় তিনটে ছেলে

এই ছুটছে, গাছে উঠছে, দিচ্ছে ঠেলে ফেলে

গাছ থেকে তার সঙ্গীকে আর হাসছে হাহা হিহি

হঠাৎ দূরে ঘোড়ার চিঁহি-হি

শুনেই তারা চুপ ৷

ঠিক যেখানে প্রাচীন রাজার বাড়ির ধ্বংসস্তূপ

ভাঙা দেয়াল, ঝোপঝাড় আর অশথগাছে ঘেরা,

দৌড়ে গিয়ে সেইখানটায় লুকায় বালকেরা ৷

টগবগ টগ টগবগ টগ ক্রমেই আসছে কাছে

কী সর্বনাশ! একটা তো নয়, আর কি রক্ষা আছে?

অনেকগুলো খুরের শব্দ–– ভয়েই ওরা কাঠ!

টগবগ টগ টগবগ টগ বাজাচ্ছে ডুগডুগি––

সূর্যও ঠিক ডুবুডুবু ৷ খেলবার হুজুগই

কাল হল আজ ৷

খুরের আওয়াজ

আরো কাছে, এসে পড়ল বলে!

টুপ করে ওই সূর্য পড়ল ঢলে ৷

হুড়মুড়িয়ে পাঁচটা ঘোড়া থামল এসে বনে

একটি সওয়ার তলোয়ারটা হাওয়ায় অকারণে

নাচিয়ে নিল

তারপরে ঠিক গুনে গুনে উনিশটি শিস দিল ৷

ঘোড়ার পিঠে ও কারা?

ছেলে তিনটি দেখছে, বাক্যহারা ৷

কোথায় ছিল উনিশটি লোক, বিকেলবেলা কোথায় তারা ছিল?

হঠাৎ যেন মাটি ফুঁড়ে উপরে উঠিল!

শিস দিয়েছে যে, তার সামনে দাঁড়াল জোড়হাতে––

তিনটি ছেলে দমবন্ধ, কী আছে বরাতে!

খাপে পুরে তলোয়ার

ঘোড়া থেকে ওই সওয়ার

এক লাফে নামল মাটিতে ৷ গমগমে গলা তার,

বলে হও তৈয়ার!

উনিশজন জো হুকুম সর্দার ৷

সর্দার খবরদার!

ভীষণ দরকার ছাড়া কেউ

বহাবে না রক্তের ঢেউ ৷

উনিশজন যে আজ্ঞা

কিন্তু সর্দার, মাঝে-মধ্যে খুন-টুন না হলে যে চুলকোয় গা!

সর্দার চোপ!

দেব এক কোপ!

যা যা

ঢাক আন কাঠি আন, ঢাকে দিই ঘা

সঙ্গের ঘোড়সওয়ারদের ছি ছি! ঈশ!

ঘোড়াকে জল খাইয়েছিস?

এখুনি দে জল

তারপরে নে, চল ৷

আহা কী সুন্দর ফুটেছে দোপাটি!

ভর সন্ধেয় ঢাকে পড়ল কাঠি!

ঢাকের তালে মাথা নড়ছে, শাদা চুল আর দাড়ি

বনের হাওয়ায় করছে মারামারি ৷

বুকের মধ্যে গুরুগুরু,

মশা কামড়ে চামড়া পুরু,

সন্ধ্যা মুছে নেমে আসছে রাত––

লোকগুলো নিশ্চয়ই ডাকাত!

ঢাক বাজাচ্ছে, এবার নিশ্চয়ই করবে কালীপুজো––

বাবা গো মা, বনের মধ্যে মরা ছেলের হাড়-মাংস খুঁজো!

তিন বন্ধুর প্রাণ উড়ে যায়, দ্যাখে

গাছের থেকে নামাচ্ছে একে-একে

দড়িবাঁধা মস্ত মস্ত খাঁড়া!

ঢাক থামিয়ে ডাকাত বলে দাঁড়া,

এবার একটু বাঁশি বাজাই,

তারপরে আয় মাকে সাজাই,

তারপরে... এই, দ্যাখ তো ওই ঝোপটা কেন নড়ছে?

একজন ডাকাত কার হারানো ছাগল হয়তো চরছে

সর্দার যা বলছি কর––

পুলিশের চর

হলেই মুণ্ডু নিবি!

বলে তারা ঘিরল রাজার ঢিবি ৷

উনিশজন আর পাঁচ সওয়ার––

আর কী হবে যা হওয়ার!

সামনে ডাকাত, মাথার ওপরে প্যাঁচা ৷

ছেলে তিনটি দু-হাত তুলে চেঁচায়

হেই দাদা গো পায়ে পড়ি

দ্যাখো হাতে নেই লাঠি-ছড়ি

আমরা রাখাল ছেলে

এসেছিলাম খেলতে কাজ ফেলে ৷

তবে কেন মারবে গো প্রাণে?

তলোয়ারটা নিয়ে হ্যাঁচকা টানে

সর্দার মারতে তোদের কে চায়!

কে রে তোরা? থাকিস কোথায়?

মিথ্যে বললে খবরদার––

আমি হীরু, ডাকাত সর্দার!

দারোগার কে কী তোরা হোস?

অন্যরা করছে ফোঁস ফোঁস!

হয়েছে কী, একজন দারোগার শ্বশুরের বাড়ির রাখাল ৷

বললে যদি রক্তে ভাসে খাল!

রাখাল ছেলে পুলিশ কী করে হবে মোদের চাচাজী!

একজন ডাকাত চোপ পাজি!

সর্দার, এ ছোকরা ঠিক মিথ্যে বলছে!

সর্দারের তো ততক্ষণে দু-চোখ জ্বলছে ৷

আরেকজন ডাকাত সর্দার, পুলিশ আজকাল শুনছি, ছোট-ছোট ছেলে

চারদিকে ছড়িয়ে দিচ্ছে, যদি খবর মেলে

হীরু ডাকাতের!

সর্দার ফয়সালা হবে আজ রাতে ৷

বাঁধ,

ঘুঘু দেখল, দেখবে ঘুঘুর ফাঁদ!

ছেলেরা ও বাবা গো!

আর্তনাদ করে ওঠে তারা

অশ্বারোহী দিচ্ছে পাহারা ৷

সর্দার পৃথিবীতে আর তোদের থাকবে না দাগও!

গাছে গাছে অট্টহাস্য করে উঠল বোধহয় বাতাসই ৷

সর্দারের ঠোঁটে ওঠে বাঁশি ৷

আহা, সে কী সুর!

রাত হল দুপুর ৷

অশথগাছের পাতায় বসল চাঁদ ৷

সর্দার কাঁদ তোরা, যত পারিস কাঁদ!

বাঁশি থামিয়ে বলল ডাকাত হীরু

এই বয়েসে মিথ্যে বলিস, ভীরু!

ইচ্ছে করে দিই তুলে আছাড়!

ছেলেদের তো প্রাণ নেই আর ধড়ে

রাখাল ছেলে হীরুর পায়ে পড়ে ৷

সর্দার পা ছাড়!

বলে হীরু হনহনিয়ে গেল দলের দিকে ৷

দলের অন্য লোকরা তখন টিপে মারছে বাদুড় ও চামচিকে,

মায়ের পূজার রক্ত তো চাই

এদিকে আর সময়ও নাই––

জঙ্গলে ঘোর হীরু বসল পুজোয়,

থালা ভরা ফলমূল আর দুধ রয়েছে কুঁজোয় ৷

ঢাক বাজিয়ে পুজো হল

প্রসাদ প্রায় থালা-ষোলো

হীরু কিন্তু ছোঁয় না কিছু

থালায় নিয়ে আখ আর লিচু

বন্দীদের কাছে এসে দাঁড়ায় ৷

আনমনা সে লিচুর খোসা ছাড়ায় ৷

হঠাৎ গম্ভীর স্বরে

বল, কে কে আছে ঘরে?

কোথা থেকে জোটে রোজ ভাত?

ছেলে তিনটি শুকনো মুখে

শুধু চায় সম্মুখে

একজন বলল হঠাৎ

রোজ কি ভাত হয় ঘরে!

পুকুরের গুগলি ধরে

শাক-পাতা দিয়ে খাই প্রায়ই ৷

বাপ-মায়ের নেই কোনো আয়ই ৷

কে খাওয়াবে ভাত?

উপায় কী, যেমন বরাত!

সর্দার ঠিক বাঘের মতন ছাড়ল হুংকার

দৌড়ে এল তেইশ জোয়ান খাওয়া ফেলে যে-যার ৷

ছেলে তিনটি কঁকিয়ে কেঁদে উঠতে

সর্দার পারবি না কি ফুলের মতো ফুটতে?

পাস যদি এই ঘোড়া তলোয়ার?

হ্যাঁ কিংবা না–– তোদের কী আছে বলবার!

ছেলেরা গরু চরাই, ঘোড়ায় মারবে চাট ৷

বড্ড ভারি তলোয়ারের বাঁট!

সর্দার ভেড়া তোরা, যা না কামাখ্যা!

এই নে আখ খা!

না খেয়ে খেয়ে হাড়জিরজিরে চেহারা––

এক চুমুকে দুধটুকু খা, এই নে কালীর পেয়ারা!

হাত-পা বাঁধা নিরুপায়

ডাকাত তখন খাইয়ে দেয় ৷

সর্দার দুধ খাবি ফল খাবি

গায়ে হাতির বল পাবি ৷

ছেলেরা ফল খাওয়ালে, দুধ খাওয়ালে, তোমরা তো নয় মন্দ লোক

এবার তবে বাড়ি যেতে প্রভু তোমার আজ্ঞা হোক!

হাত টাটাচ্ছে, পা টাটাচ্ছে, গা হয়েছে চচ্চড়ি––

এ যে গরুর দড়ি!

সর্দার না,

কোথাও যাবি না ৷

আরো দু-তিন প্রহর বনে থাক ৷

এই, এদের গাছে বেঁধে রাখ!

দসু্যর দল তিন ছেলেকে বাঁধল গাছের গোড়ায়

পাঁচজনে লাফ দিয়ে উঠল পাঁচটি কালো ঘোড়ায়

উনিশজনের হাতে জ্বলছে মশাল ৷

এসব কবে ঘটছে জানো? সেটা উনিশশো সাল ৷

রাক্ষুসে সেই আলোর শিখা অন্ধকারকে নাচায়

ডাকাত যাও প্রাণে রাখল, এবার আর কে বাঁচায়!

প্রথম ছেলে ভাইরে, হাজার বেহ্মদত্যি খড়ম পায়ে ছুটছে!

দ্বিতীয় ছেলে কী যে বলিস, ঘোড়াগুলো বন ছাড়িয়ে পাকা রাস্তায় উঠছে––

ও তারই আওয়াজ

প্রথম ছেলে কুচকাওয়াজ

করছে যেন কারা!

তৃতীয় বাঁশঝাড়ে ওই বলছে কী তেনারা!

দ্বিতীয় যাঃ! ও তো বাঁশ ঝাড়েরই শব্দ ৷

প্রথম লক্ষ্য ওদের আমরা না?

দ্বিতীয় ওসব ছাড়, হাতের দড়ি কামড়া না ৷

প্রথম উঃ, চারপাশ কী স্তব্ধ!

তৃতীয় বাঁশ গাছে ওই শব্দ হয়? ও শব্দ কার?

প্রথম উঃ, কী ঘন অন্ধকার!

এমন সময়, সবাইকে যে সাহস দিচ্ছে, সাহসী সেই ছেলে

ভয়-পাওয়া তার ভীষণ দু চোখ মেলে

চেঁচিয়ে উঠল বাঁচাও!

রক্ষা করো, রক্ষা করো, বদলে দেব যা চাও ৷

অন্ধকারে ভীষণ কিছু আসছিল,

কেউ জানে না ঠিক ওটা যে কী ছিল ৷

হনহনিয়ে আসছে তেড়ে––

তিন বন্ধুই গলা ছেড়ে

কেঁদে উঠল বাঁচাও, বাঁচাও, ও বাবা, মা, মাসি!

সামনে এসে দাঁড়াল উঃ কী ভীষণ সন্ন্যাসী!

দু-চোখে তার জ্বলন্ত দুই গুল ৷

বাঁ হাতে এক ছুঁচলো ত্রিশূল

ভস্ম মাখা গা,

কথা বলছে, কিন্তু হাতের ত্রিশূল নামায় না ৷

সন্ন্যাসী কে তোদের বেঁধেছে এভাবে?

নিজেকে সে বড্ড বীরই ভাবে!

এসেছিল একা কিংবা সবাই?

কই রে, জবাব দে, নয়তো করব জবাই!

সন্ন্যাসীর মাথার ওপর দিয়ে

উড়ে গেল মস্ত একটা টিয়ে

সাহসী ছেলে তোমায় দেখে ভেবেছি হিংস্র ভূত––

তুমি তো দেবদূত!

দু-হাত বাঁধা, নইলে তোমার পায়ে

ঝাঁপিয়ে পড়ে ধন্য হতাম আমরা তিনটি ভায়ে ৷

তিন কূলে কেউ নেই গো মোদের, না মা, না মাসি––

প্রণাম তোমায়, প্রণাম সন্ন্যাসী ৷

সন্ন্যাসী ভাই-ই যদি, একরকম কেন দেখাচ্ছে না?

তিন ছেলে এক গাঁয়ে বাসা হলে ভাই হবে না?

এক গাঁয়ে একই মাঠের ধারে

একই খিদে তিনজনকে মারে

ছোট্ট থেকে আমরা তিনটি ছেলে

একসঙ্গে বেড়াই খেটে-খেলে––

ভাই না?

সন্ন্যাসী যা যা

ওসব ছেঁদো কথা রাখ ৷

ঠিক করে বল, একটু আগে এই বনে কেউ বাজিয়েছিল ঢাক?

জটার মধ্যে লুকনো উন্মুখ

চোখে পড়ল দোনলা বন্দুক ৷

হীরু ডাকাত ফল দিয়েছে, দুধ দিয়েছে মুখে––

এ লোক শুধু চোখ রাঙাচ্ছে, সাহসে বুক ঠুকে

বলল তুখোড় বালক

ঢাকী একটা এসেছিল, মাথায় গোঁজা পালক

নেচে নেচে গান গাইল

কেঁদে কেটে পান চাইল

খেলতে খেলতে বুঝে গেলাম লোকটা বদ্ধ পাগল

সঙ্গে ছিল একটা খোঁড়া ছাগল ৷

মন্ন্যাসী তবে তোদের বাঁধল কে?

পাগলে আর ছাগলে?

তুখোড় ছেলে আমরা ওকে খ্যাপাচ্ছিলাম

ছুঁড়ে মারছি যা পাচ্ছিলাম ৷

হঠাৎই ও হাওয়ায় কিছু ওড়াল ৷

ঠিক মনে হয় ব্যাঙের মাংস পোড়াল

বাবা কী দুর্গন্ধ!

দম হল যে বন্ধ!

বুকের মধ্যে আনচান,

হলাম ক্রমে অজ্ঞান ৷

উলট-পালট লেগে গেল পেটের নাড়িভুঁড়িতে ৷

জেগে দেখি বাঁধা আছি মস্ত গাছের গুঁড়িতে ৷

সন্ন্যাসী এসব কি ঠিক? এই তোরা বল ৷

অন্য দুজন বুঝিনি তো পাগলের এত ছল!

সন্ন্যাসী সত্যি? পাগল তো সত্যি?

আমি না এলে তবে মরতি?

সাহসী ছেলে তাছাড়া উপায় কী?

দিন কারো একভাবে যায় কি?

এই দেখুন না, একটু আগে মৃত্যু ছিল অনিবার্য

আপনি এলেন, আপনি ঋষি, আপনি মোদের আচার্য

(ঋষি না ছাই! ঋষির থাকে আগুনভরা অস্ত্র?

সন্ন্যাসী হয় শুধু পরলেই গেরুয়া রাঙানো বস্ত্র!)

আপনি প্রভু, প্রভু গো প্রভু, বাঁধন খুলে দাও ৷

সন্ন্যাসী যা বলেছিস মিথ্যে নয় একটাও?

পাগল যদি, সঙ্গে কেন ঢাক?

সাহসী ছেলে প্রভু, আমরা কথার মধ্যে রাখিনি কোনো ফাঁক

সন্ন্যাসী সত্যি পাগল?

অন্য দুজন যা দেখেছি সব বলেছি, এমনকি সেই ছাগল

ছিল একটু খোঁড়া––

বলেছি হুবহু ৷

সন্ন্যাসী কাছাকাছি ছিল না কোনো ঘোড়া?

সাহসী ছেলে উঁহু ৷

ঘোড়া কি আর পিঁপড়ে কিংবা ঝিঁ-ঝি?

দেখেও তবুও মিথ্যে বলব, ছি!

সন্ন্যাসী মনে মনে ঢাকের কথায় খটকা লাগছে মনে

আসার কথা ছিল তো এই বনে ৷

হুকুম ছিল সাধুর ছদ্মবেশে

আলাপ করে জানব অন্ধিসন্ধি ৷

দারোগা সাহেব সেপাই নিয়ে এসে

করবে পালের গোদাটাকে বন্দী!

হঠাৎ রেগে ত্রিশূল ছুঁইয়ে রাখালছেলের বুকে

শিখেছিস তো দিব্যি কথার ঠাঁট ৷

ভাবিস, যা-তা যেমন খুশি বোঝাবি উজবুকে!

বল, তোদের বাড়ি কোথায় বল––

মিথ্যে বললে এই চেয়ে দ্যাখ ত্রিশূলখানার বাঁট!

শূলের খোঁচায় বুক ভেসে যায়, রক্ত অনর্গল

দূরের থেকে চেঁচাল কে, কাঁপল তল্লাট

দূরের কণ্ঠ বাড়ি চাঁদের হাট!

সন্ন্যাসী কে রে ওটা, কোন হনুমান, সাহস তো কম নয়,

রং তামাসা করতে আসিস, যাবি কি যমালয়?

কে? কে ওটা? রঙ্গ জানে, জানে না সাধুর শাপ?

দূরের কণ্ঠ আমি তোর বাপ ৷

বজ্রস্বরে বলে উঠে মাথার ওপর গাছপালা তোলপাড়

করে ভীষণ ঝড়ের মতো সাধুর ঘাড়ে পড়ল এক পাহাড়––

আর কেউ নয়, স্বয়ং হীরু ডাকাত ৷

সাধুর গলায় সাঁটা তার দুই হাত ৷

ছিটকে গেল হাতের ত্রিশূল

খুলে পড়ল জটবাঁধা চুল,

সাধু যতই হাঁসফাঁসিয়ে তুলছে বন্দুক

হীরু ততই দুই হাঁটুতে ডলছে সাধুর বুক ৷

কুড়িয়ে নিয়ে শক্ত নকল জটা

সাধুর গায়ে বাঁধন দিল ছটা ৷

হীরু আপাতত দরকার নেই আর

একটু পরেই হবে তোর বিচার ৷

বেতনভোগী ভীরু!

হদিশ চাস হীরুর?

কী ভাগ্যিস, ছিল বনের টিয়ে

বিপদ দেখে গেল খবর নিয়ে ৷

সন্ন্যাসী আগে জানলে বদমাস মুখপোড়ার

ঘুচিয়ে দিতাম ওড়া ৷

হীরু অনেকক্ষণই শুনছি তো তোর জেরা

অবাক করল রাখাল বালকেরা ৷

বুক ভেসে যায় রক্তে, জ্বালা করে,

রাখাল বলে উচ্ছ্বসিত স্বরে

বন্দুক দেখেই বুঝেছিলাম

মতলব নয় এর ভালো

মিথ্যে গল্প খুঁজেছিলাম

ভণ্ডকেই ভোলালো ৷

সর্দার সাবাস, সাবাস তোরা ভাই!

আজ একে করব জবাই!

আপাতত খাক গড়াগড়ি––

আয়, আগে খুলে দিই দড়ি ৷

সর্দার কী একটা বুনো লতা

ঘষে নিয়ে রাখালছেলের ক্ষতে লাগাল তা

বন্ধ হয়ে গেল রক্ত পড়া ৷

সর্দার সন্ন্যাসী ধুলোয় গড়াক!

সাহসী ছেলে কোথায় তোমার ঘোড়া, সর্দার, কোথায় বা দলবল?

সর্দার হোসনি চঞ্চল!

আসছে তারা, এসে পড়বে ঠিকই ৷

কী রে, টিকটিকি,

ছিঁড়ে গেল জাল?

তিন ছেলে সন্ন্যাসীর কী হয়েছে হাল,

সাহসী ছেলে আহা রে!

সর্দার মারের ব্যথা মনে পড়ে না, যখন কাউকে মারে!

তিন ছেলে টগবগ টগবগ টগবগ টগবগ আসছে ফিরে তারা

কী ভাগ্যিস এক টিয়ে পাখি দিচ্ছিল পাহারা!

খবর নিয়ে গেল পাখি

হীরু ফিরল রক্ত-আঁখি

নয়তো অক্কা পেতুম

সন্ন্যাসীর ছাই খেতুম

এখন সামনে হীরের থালা

ভয় ডর সব যা যা পালা

ষণ্ডাগণ্ডা ছয় গণ্ডা বন্ধু ডাকাতদল

সর্দার, এবার বিদায় দাও, আর কোরো না ছল ৷

সর্দার যাবি? না না, কোথায় যাবি?

খিদেতে কী খাবি?

তার চেয়ে চল আমার সঙ্গে

নদীঘেরা দক্ষিণ বঙ্গে––

তিন ছেলে তখন বললে চাঁদের হাট, চাঁদের হাটটা কী?

নিছক ওটা কথার কথা? নেহাত ঠাট্টা কি?

সর্দার যাবি তোরা? চল ৷

নদী ছলাৎছল

শোনাবে গান রাতদিন দিন-রাত

নদীর গানের সঙ্গে গরম ভাত!

চল তোরা, থাকবি চাঁদের হাট ৷

এমন সময় মার মার কাট কাট

শব্দে ছুটে এল হীরুর চ্যালা

তেইশ জোয়ান এল যেন ঝড় উঠল বনে ৷

কবে এসব ঘটছে জানো? ঠিক উনিশশো সনে ৷

তিন ছেলে খেলতে এসে উঃ কী মজার খেলা!

ঘোড়ার পিঠে সোনাদানা বস্তা বস্তা চাল

পোঁটলা বাঁধা ক্ষীর আর ছানা, কাপড় জামা শাল ৷

গোঙাচ্ছে সেই ভেকধরা সন্ন্যাসী––

তবে কি হায় জ্যান্ত হবে ফাঁসি!

তেইশ জোয়ান সর্দার, এই সে দুশমন?

আমাদের রক্ত নিয়ে করতে চায় আচমন?

সর্দার বজ্জাত বর্বর!

দুজনে দু-ঠ্যাং ধর

হুকুম দিচ্ছে হীরে

একটানে ফেল চিরে!

তেইশ জোয়ান ধর তো সাধুর গোড়ালি!

এক জোয়ান এত বড় বীর, রাজার মুখ তো পোড়ালি!

সন্ন্যাসী বাবা গো বাবা! প্রাণে মারিস না,

বড্ড কষ্ট, পেয়েছে তৃষ্ণা ৷

এক ফোঁটা জল দে ৷

দয়ালু হীরে থাকতে আমায় প্রাণে মারবে কে?

তেইশ জোয়ান হা হা হা হা!

আরেক জোয়ান তুইও শেষে দেখলি ওঁর দয়া!

সর্দার, সইবে কি এর ন্যাকামি?

সর্দার এ লোকটা তো মরেই আছে, আবার মারব আমি?

তেইশ জোয়ান এই রে, সর্দারের এই বড় দোষ!

একে ছেড়ে দিলে কিন্তু করবে আফসোস!

সর্দার তোল, একে ঘোড়ার পিঠে তোল ৷

তেইশ জোয়ান মাথায় ঢালি ঘোল?

সর্দার এখন সময় নয় ৷

তেইশ জোয়ান সর্দার, এটা কি উচিত হয়?

সর্দার মরা লোককে মারার চেয়ে ঢের

বড় কাজটা বাকি, দরিদ্রদের

অন্নবস্ত্র কখন বা আর দিবি?

ওই চেয়ে দ্যাখ, ফরসা হচ্ছে ঢিবি ৷

চাঁদের হাটে যাবার পথে থামে

তেইশ জোয়ান এ-গ্রামে ও-গ্রামে

হীরু যাচ্ছে সবার আগে আগে

ঘুমন্ত সব কুঁড়েঘরের সামনে ভাগে ভাগে

রেখে দিচ্ছে চাল ডাল আর জামা––

এমন সময় হঠাৎ দামামা

বেজে উঠল দূরে চতুর্দিকে ৷

সর্দারের চোখ জ্বলে উঠল হিংস্র এক ঝিলিকে ৷

সূর্য ওঠার তখনো কিছু বাকি

তবুও আঁধার গাছে হাজার পাখি

জেগে উঠল, ডেকে উঠল ভয়ে ৷

বনের আড়াল দিয়ে কারা আসছে শয়ে-শয়ে––

অস্ত্রে-শস্ত্রে সুসজ্জিত, গোরা ও গোর্খা পুলিস!

হীরু হাত তুলতে বললে দু-হাত তুলিস ৷

দমকা হাওয়ার মতন দৌড়ে, বলল দলের লোককে

সাধুর বেশে ফাঁকি দেব শয়তানদের চোখকে

পথে পড়বে বুড়ো শিবের মন্দির,

সেখান দিয়েই নিয়ে যাবে করে তোদের বন্দী

এই পাঁচু, তুই দৌড়ে যা

সময় বুঝে ফাঁস লাগা

মন্দিরের সেই সুড়ঙ্গে শিস দে

না পারিস তো এই নে বিষ নে ৷

পাঁচু ক’জন এরা জানি না ঠিক মতো

সুড়ঙ্গে ফাঁস আছে তো শত শত?

হীরু তিনশোটা ফাঁস আছে ৷

পথের পাশে সমস্ত গাছে গাছে

ঘাপটি মেরে লোক থাকা চাই দুহাতে ফাঁস নিয়ে,

লোক ডাকবি সুড়ঙ্গে শিস দিয়ে ৷

পাঁচু শিস দিলেই কি আসবে একশো লোক?

হীরু বুদ্ধুটাকে বোঝাই কাঁহাতক?

সুড়ঙ্গে শিস দিলেই ইসমাইল

বাছা বাছা ফাঁসুড়েতে ভরবে বিশ মাইল ৷

মনে রাখিস, মন্দিরের ঠিক দক্ষিণেই!

সেখানে কোনো রক্ষী নেই ৷

চটপট কর, ওই বিলে ডুব দে––

বিল পেরিয়ে––, মাঠ পেরিয়ে–– কে?

হিঁচড়ে এনে বন্দীটাকে, হাতের বাঁধন খোলা!

একজন ডাকাত পুলিস দেখে ফরফরাচ্ছে শয়তান আরশোলা!

সর্দার! বাঁধন খুলছে, পালাচ্ছে বদমাস!

সর্দার গেরুয়া, জটা খোলার আগে খুলে নিই হাড়মাস!

সাধুর ঘাড়ে চালায় তরোয়াল

ধড়ের থেকে পড়ল মাথা–– ভাদ্রমাসের তাল!

গেরুয়া, জটা পরে হীরু সাজল গুপ্তচর

গায়ে-মুখে ধুলো মাখল, দলের লোকে বাঁধল জব্বর ৷

আলো ফুটছে, সেপাই সান্ত্রী এগিয়ে আসছে কাছে

দামামা যারা বাজিয়েছিল তাদের দেখা যাচ্ছে দূরের গাছে ৷

একজন ডাকাত সর্দার, শেষ অব্দি তো এ কৌশলে হারতে পারি!

তার চেয়ে আজ মরার আগে শত্রু মারি!

সর্দার জানি রে জানি, নকল ধরা দিতেও লজ্জা লাগে ৷

সর্দারের ঠোঁট কেঁপে উঠল ঘৃণায় এবং রাগে ৷

গাছের আড়াল দিয়ে আরো ঘনিয়ে এল ওরা

সর্দার সময় নেই আর! যা বলেছি, বুঝেছিস তো তোরা?

এবার স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, মাথায় টুপি, বাগানো বন্দুক ৷

দেখে তো সেই তিনটি ছেলের প্রাণ করে ধুকপুক ৷

আড়াল ছেড়ে লম্ভ দিয়ে হীরুর দলকে যেই না ফেলল ঘিরে,

নকল স্বরে চেঁচিয়ে উঠল হীরে

গুলি করুন, গুলি করুন, গুলি করুন হুজুর!

দেখুন কেমন বেঁধে রেখেছে, ভয়েই ছিলাম জুজু ৷

এক গুলিতে উড়িয়ে দেন প্রাণডা

দলের মধ্যে আছে দলের পাণ্ডা ৷

দারোগা হ্যাণ্ডস আপ, হাত তোলো, নড়লেই গুলি!

হীরে হুঁ হুঁ বাবা, নড়লেই উড়ে যাবে খুলি!

বাইশটি ডাকাত

মাথায় তুলল হাত ৷

দারোগা অস্ত্রেশস্ত্রে কাজ কী বাপু, কাজ কী ঘোড়ার আর!

ওই ঘোড়াটা কার? পিঠে কে ছিল সওয়ার?

দুহাত তুলে সারিবদ্ধ দাঁড়া!

ফেল, ছুঁড়ে ফেল বন্দুক আর খাঁড়া ৷

হীরে হীরের দলকে বিশ্বেস নেই, ছুঁড়ুন হুজুর গুলি!

দারোগা ধন্য তোমার সাহস, আহা বেতন তো মামুলি!

বলতে পারো, ওই ঘোড়াটার পিঠটা কেন খালি?

হীরে ডাকাতরা রোজ পুজো করে ওদের মহাকালী––

পুজোর বলি ছেলাম আমি ওই ঘোড়াটায় বাঁধা ৷

দারোগা ডাকাতদের এই পুজো একটা ধাঁধা!

কিন্তু, ওই ছেলে তিনটে কে?

ছেলেরা মনে মনে এই রে সেরেছে!

হীরে এরাও পুজোর বলি ৷

হুজুর, প্রভু, সাহস দেন তো বলি––

হুজুর মা-বাপ, এই অধমের বাড়ান একটু বেতন ৷

দারোগা হো যায়েগা ৷ দাঁড়াও আগে ওড়াই বিজয়কেতন ৷

একদল সেপাইকে সেপাই, ইহার বাঁধন খুলে দাও

কুড়াও অস্ত্র যেখানে যত পাও ৷

সামনে সেপাই, পেছনে সেপাই, মধ্যে ডাকাতদল

কেউ বাজাচ্ছে শিঙা, আবার কেউ বাজায় মাদল ৷

হীরু হাঁটছে দারোগার বাঁ পাশে

মাটিতে চোখ, কান দুটি আকাশে ৷

দারোগা খুব খুশি

চলতে চলতে হঠাৎ জোরে হাওয়ায় মারছে ঘুষি ৷

দারোগা পুরো একটা টাকা বৃদ্ধির করব সুপারিশ!

হীরুর দুকান খাড়া হল, হাওয়ায় শুনল শিস!

হীরু হেঁ হেঁ আজ্ঞে, আপনি মা-বাপ, আপনি রাজা!

বাজা বাজা, ওরে জোরসে বাজা!

দারোগা বাইশজনের কোনটা যে ঠিক পাণ্ডা!

হীরু খেলেই দু-ঘা ডাণ্ডা

কবুল করতে পথ পাবে না বাপধন!

হীরু যদি বেজি, তবে আপনিও কি সাপ নন!

দূরের থেকে মন্দিরটার চুড়ো দেখে, থেমে

দেখুন উত্তেজনায় উঠছি ঘেমে––

হুজুর, একটা গোপন কথা, খুবই গোপন

ঘোড়ার পিঠে বাঁধা আছে সোনা ক’মণ!

গাধাগুলো এগিয়ে যাক, আপনি একা––

হেঁ হেঁ আজ্ঞে, বড়ই মধুর সোনার ছ্যাঁকা ৷

কথাগুলো বুঝলেন তো?

চোরের ওপর–– বুঝলেন তো?

দারোগা সত্যি নাকি? কী কাণ্ড অ্যাঁ! সোনার বোঝা?

হীরু হীরু যদি সেয়ানা ভূত, আপনি ওঝা!

ওস্তাদের মার বাটপাড়িতে, ঠিক কি-না ভুল?

দারোগা রাত-বিরেতে ডাকাত ধরা, চ’ তবে আজ করি উশুল

সেপাইদের আগে বাঢ়ো আগে বাঢ়ো, লেফট রাইট

লেফট রাইট লেফট রাইট লেফট রাইট!

হীরুকে তোলা ভরি না, সের পোয়া না, পুরো এক মণ?

হীরু এক মণ তো বটেই, মাপলে ঠিক মতন––

দারোগা বলিস কী রে!

হীরু শুধু কি তাই, সঙ্গে হীরে!

দারোগা বেচারা হীরু! গারদে পচবে সোনার শোকে!

দু-মণ হলে পুরো দু-সের দেব তোকে ৷

ঘোড়ার পিঠে বস্তা বাঁধা

জয় মা কালী, জয় মা রাধা!

জয় মা কালী ৷ জয় মা মেরি

বাদশা বনতে আর কী দেরি!

কল্পনাতেই চোখ ধাঁধাচ্ছে সোনা পান্না হীরে ৷

হঠাৎ পেছন ফিরে

হীরু দেখল সেপাইরা সব এখন অনেক দূর!

হীরু হুজুর!

শক্ত হাতে বাগিয়ে তার দোনলা বন্দুক

জিভে আওয়াজ করল চুকচুক

হীরু ধরাকে জ্ঞান করিস বুঝি সরা!

দারোগা এ কী, এ কী! এ কেমন মস্করা!

হীরু হীরুর কিন্তু নিশানা নিখুঁত!

এবার তোকে বা৺চায় কে রে, ব্রিটিশরাজের পুত!

যেই দারোগা বন্দুকে হাত ছোঁয়ায়

এক গুলিতে দোনলা তার উড়িয়ে হীরু ফেলল পথের খোয়ায়!

হীরু জয় মা কালী, হরিবোল!

মাথার ওপর দু-হাত তোল!

দারোগা হীরু-ডাকাত?

ছলচাতুরি করেই ভাবিস করবি বাজিমাৎ ৷

একটু আগেই কী বলছিলি?

সোনা দেখেই হীরু হলি?

তের টাকার মাইনে করা চাকর!

হীরু হাঁ কর––

হুকুম দিচ্ছে হীরে ৷

একটানে তোর জিভটা ফেলব ছিঁড়ে!

দারোগা মিথ্যে ভয় দেখাস কাকে মূর্খ!

বড়সাহেব দেবেন তোকে হুড়কো!

নামা বলছি, নামা ওই বন্দুক!

গুপ্তচরের বেয়াদবি! হুইশিলে দিই ফুঁ!

হীরু ডাকাত! এতই ভীরু হীরু ডাকাত!

হীরু সাবধান! নামালেই হাত––

বন্দুকের শুধু একটু ঝাঁকি,

উড়ে যাবে তোর প্রাণপাখি ৷

দারোগা থাম, থাম ৷ আরে শোন, তোর বেইমানি

হবে না কোথাও জানাজানি ৷

বখরা পাবি আধা-আধি

আয় দু-ভাগে বস্তা বাঁধি ৷

হীরু ভাবিস বুঝি দুনিয়াটাই দারোগার?

দাসের চামড়া ছাড়া হয় না কারো গা?

ইংরেজের দাস, আমি হীরে!

দারোগা পেতাম যদি বন্দুকটা ফিরে

হীরেগিরি ছুটিয়ে দিতাম তোর আজ

তের টাকার গোলা পায়রা, হলি কিনা শিকরে বাজ!

হীরু এবার খুলল গুপ্তচরের জটা বস্ত্র ৷

হীরু এই নে রে তোর অস্ত্র

সতর্ক পায় কুড়িয়ে নিয়ে ছুঁড়ে দিল বন্দুক ৷

সত্যি হীরে! দারোগার তো লাগল বুকে ধুকপুক!

তাক করতে গেলেই যদি–– ও বাবা না থাক!

কথার ছলে ভুলিয়ে দেখা যাক ৷

সামলে নিয়ে দারোগা খুব চেঁচিয়ে উঠল জোরে

সূর্য অস্ত যায় নাকি রোজ ভোরে?

ছদ্মবেশী, ধূর্ত শেয়াল, ভণ্ড!

আমি না তুই–– বল আজ কে পাষণ্ড?

সাহস থাকলে তখনই তো লড়তিস

দেখে নিতাম, কী করে এখন এমন বড়াই করতিস!

তখন কত কাঁদুনি

কথার সে কী বাঁধুনি!

কথার ফাঁকে চোখ রেখেছে তীক্ষ্ণ

গুলি করার ফাঁক যদি পায় কখনো!

হীরু শঠের সঙ্গে করেছি শঠতা!

ঘুচিয়ে দিই কথা?

আমার সঙ্গে খেলতে এলি শখের কানামাছি!

হাতের কাছে হীরে পেয়েও বন্দুকের মাছি

করলি না ঠিক?

ধিক দারোগা, ধিক!

বলতে বলতে লাফিয়ে এসে দারোগাকে মারল থাপ্পড়

চড়, ঘোড়ায় চড়!

দু-চোখ বেঁধে বসিয়ে ঘোড়ার পিঠে

ঘোড়ার সঙ্গে দারোগাকে বাঁধল শক্ত গিঁটে ৷

লুটের জিনিস যেমন ছিল রইল বাঁধা পেছনে ৷

দারোগাবাবুর কান্না তখন কে শোনে!

দারোগা ছেড়ে দে বাপ, ছেড়ে দে বাবা হীরে!

অনেক দূরে ময়ূরাক্ষী তীরে

তিনটে বউ, দশটা ছেলেমেয়ে

বসে আছে আমারই পথ চেয়ে ৷

পায়ে পড়ি, তোমার পায়ে ধরি

চোদ্দ পেটের জ্বালায় চাকরি করি ৷

এবার ক্ষমা দাও––

হীরু ঘোড়া থেকে নামার চেষ্টা করলে এক পাও––

দারোগা হাত-পা বাঁধা, আধমরা,

এরপরেও নড়াচড়া!

পাঠাচ্ছ কি আমায় ফাঁসিকাঠে?

হীরু আপাতত যাবি চাঁদের হাটে ৷

দারোগা চাঁদের হাট! সেই যে তোমার ডেরা?

এমন সময় দৌড়ে এল রাখালবালকেরা ৷

তিন ছেলে সর্দার, সর্দার, শোনো!

কত অব্দি গুণতে পারো গোনো ৷

তিন কুড়ি সাত কত?

এক শত, না দুই শত?

তিন কুড়ি সাত সেপাই

দেখে যায় না চেনাই

গলায় বাঁধা দড়ি

খাচ্ছে গড়াগড়ি

হাহা হিহি হোহো

তিন কুড়ি সাত কত?

হীরু খুব করেছিস রঙ্গ!

তিন ছেলে ভরেছে সুড়ঙ্গ

তিন কুড়ি সাত সেপাই

চল গিয়ে ফের খ্যাপাই ৷

আরে আরে আরে

এ যে দারোগারে!

সবসে বড়া সেপাই

খুলেছে খুব চেকনাই!

পা ধা নি সা ধা নি

টিকি থাকলে টানি!

মাথার ওপর নিভছে আকাশ, পড়ন্ত রোদ্দুর

তিনটি ছেলে ভাবছে কেবল আর কতটা দূর!

হীরুর মুখে অদ্ভুত এক হাসি

ঝুলির থেকে বার করেছে বাঁশি ৷

হঠাৎ দূরে নদীর বুকে–– ও বজরা কার?

ডাকাতদলের হাত নিশপিশ–– কোন জমিদার

সোনাদানা খাবারদাবার যাচ্ছে নিয়ে?

কয়েকজন ডাকাত চল দিই গে ব্যাটার সঙ্গে যমের বিয়ে ৷

আরেকজন ডাকাত নির্ঘাত এ রসুলপুরের!

হীরু ডাকাত কাঁদছে তখন বাঁশির সুরে ৷

সূর্য ডুবল, ফুটেছে শুকতারা ৷

পাঁচটি ঘোড়া জলে নামল, জল খেয়েছে, দিয়েছে মুখ নাড়া,

এমন সময় জ্বলে উঠল ডাকাতদলের মশাল ৷

কবে এসব ঘটছে জানো? সেটা উনিশশো সাল ৷

একজন ডাকাত সর্দার, চাঁদের হাট তো এসেই গেল, এই তো এটা কাকদ্বীপ!

আরেকজন ডাকাত এবার তবে বজরাটাকে সবাই মিলে হাঁক দিই?

বাঁশি গেল ঝুলির তলায়

মেঘ ডেকেছে হীরুর গলায়

হীরু কে যায়? বজরা রোখো ৷

দু-তিনজন ডাকাত সর্দার, রসুলপুরের জোঁক ও!

হীরু বজরা ভিড়াও!

হুকুম দিচ্ছে হীরু ডাকাতের দল!

ডাকাতদল সঙ্গে আছে হীরাও!

হীরু বজরা ভিড়াও!

নইলে রাঙা হবে নদীর জল!

একজন ডাকাত রসুলপুরের চাষির ঘরের সামান্য গুড়চিড়াও

খাজনা বলে কেড়ে নিয়েছে, মেরেছে চাবুক!

আরেকজন গুলি ছুঁড়ি? বজরা ডোবাই, জলে নাবুক––

হীরু এ কাজটা তো সোজা––

আরেকজন ডাকাত শোধ নিতে দাও, আমিই ছিলাম রসুলপুরের প্রজা

হীরু বজরা ডুবলে সবই যাবে

গ্রামের লোক কি খাবিই খাবে?

ছিপ নৌকোয় করব ওকে ঘেরাও!

দশ গুনছি, বাঁচতে চাও তো আগেই বজরা ভেড়াও ৷

একজন ডাকাত সর্দার, ওই দেখুন, ওই পালাচ্ছে রাক্ষস!

আরেকজন উঃ এ যে কী নিদারুণ আফসোস!

হীরু এতই সোজা?

আমি কি অন্ধ? আমার কি চোখ বোজা?

পাঁচটি ঘোড়া ছুটল অন্ধকারে

সেই যেখানে লুকোনো সারে সারে

হীরুর নৌকো রয়েছে নদীর খাঁড়িতে ৷

হীরুর চোখে আগুন, বাঁ হাত বোলাচ্ছে তার দাড়িতে ৷

হীরু গুলি করে ফুটো কর পাল

গুলি করে বজরার হাল

টুকরো টুকরো করে দে––

বলেই গুলি ছুঁড়ল স্বয়ং হীরে ৷

জ্বলছে মশাল, উঠছে হাঁক,

প্রাণ গেল রে, গেল বেবাক

মাঝনদীতে অন্ধকারে উঠল রোল কান্নার

তিন ছেলে আর না, হীরু, আর না ৷

বজরা ঘিরে ছিপ নৌকো জুটল ঝাঁকে ঝাঁকে––

চাঁদের হাটটা কেমন চলো দেখে আসি এই ফাঁকে ৷

চাঁদের হাটের আমাদের এই গ্রামের নামটি চাঁদের হাট ৷

বাসিন্দারা চাঁদের হাটের হীরু ডাকাত ভয়ঙ্কর,

দিনের বেলা বাঁশি বাজান, বয়েস ষাট,

রাতের বেলা মন্দলোকের আতঙ্ক ৷

আমাদের এই গ্রামে কোনো শেয়াল নেই,

দুইটি বাড়ির মধ্যে কোনো দেয়াল নেই ৷

সব বাড়িতেই ঘরের সামনে মস্ত উঠান,

সেইখানে বউ কাপড় মেলেন, ভাতও ফুটান ৷

গ্রামের তেঁতুল শশার কথা জানে সবাই

ফুলও প্রচুর, তিন রকমের শুধু জবা-ই ৷

জবাবনের ধারে থাকেন হীরু ডাকাত––

জবাবনই ঘরের দেয়াল, আকাশটা ছাত!

হীরু ডাকাতের সাদা চুল আর সাদা দাড়ি ৷

গ্রামে গ্রামে হীরু ঘোরেন বাড়ি বাড়ি ৷

কার কী অভাব, কার কী দুঃখ,

কার শাড়ি নেই, বা চুল রুক্ষ,

কিংবা কে আজ দু-দিন ধরে কষ্ট পাচ্ছে,

চাল নেই তাই গাছের পাতা সিদ্ধ খাচ্ছে––

সবই দেখেন, সবই শোনেন, সব মানুষের দুঃখ গোনেন,

তারপরে যেই বাঁশি বাজান আপন মনে––

ঠিক মনে হয় কাঁদছে হীরু, কাঁদছে প্রবল ৷

ঠিক মনে হয় বাঁশিটি তার চোখেরই জল ৷

ঠিক মনে হয় হাওয়া কাঁদছে, কাঁদছে মাটি ৷

সন্ধে হলেই হীরু দেবেন ঢাকে কাঠি ৷

আমাদের এই গ্রামের নামটি চাঁদের হাট ৷

এই গ্রামেরই বেত থেকে হয় ছাতার বাঁট ৷

এখানকার এই হীরু ডাকাত বিখ্যাত,

রাতে ডাকাত, দিনে করেন ভিক্ষা তো ৷

ভোরের বেলা ফেরেন যখন জবা বনে

লুটের অন্ন রেখে আসেন দুঃখীলোকের হিম উঠোনে ৷

হীরু কী খান?

ভিক্ষা যা পান ৷

অধ্যায় ১ / ৩
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%