সৈকত মুখোপাধ্যায়

এইটা পড়—বুধোদা ওর কম্পিউটারের সামনের চেয়ারটাতে বসেই ব্যাঙ-বাজির কায়দায় একটা বেশ মোটাসোটা A4 সাইজের খাম আমার দিকে ছুঁড়ে দিল আর আমিও সেটাকে তৎক্ষণাৎ ক্যাচ লুফে নিলাম।
বুধোদার সঙ্গে এমনিতে আজকাল দেখাসাক্ষাৎ একটু কমই হয়। ওর অ্যান্টিকের ব্যবসা 'মহারাজা কালেকশনস' এই কয়েক বছরের মধ্যেই বেশ ফুলে ফেঁপে উঠেছে, তাই ওকে দুষ্প্রাপ্য সব জিনিসের খোঁজে সারা ভারতে দৌড়ে বেড়াতে হয়। এদিকে ইলেভেনে ওঠার পর থেকে আমারও পড়ার চাপ খুব বেড়ে গেছে; হেমকুঞ্জে আর আগের মতন প্রতিদিন যাওয়া হয় না। তবে বুধোদা মাঝে-মাঝেই আমাকে ফোন করে। বিশেষ করে অ্যান্টিক কালেকশন করতে গিয়ে অদ্ভুত কোনো অভিজ্ঞতার মধ্যে পড়লে।
ওর ওই রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার গল্পগুলোই আমার প্রতিদিনের ভিটামিন। বাকি জীবনটা তো শুধু ইন্টিগ্রাল আর ডিফারেনশিয়াল, অরগ্যানিক আর ইনঅরগ্যানিক। জ্বালিয়ে দিল, সত্যি।
গতকাল রাতে ফোন করে অবশ্য বুধোদা সেরকম কোনো অভিজ্ঞতার গল্প বলেনি। শুধু বলেছিল, শোন রুবিক! তোর রঘুদা কয়েকটা ডকুমেন্টস পাঠিয়েছে। বেশ ইন্টারেস্টিং। যদি দেখতে চাস তো আসতে পারিস।
বুধোদার কথা শুনে বোধহয় পাভলভ রিঅ্যাকশনেই আমার মাথার চুলগুলো সব খাড়া হয়ে গেল। আসলে বুধোদার বন্ধু এই রঘুদা, মানে চান্ডিলের রঘুনাথ দ্বিবেদীর একটা চিঠির সূত্র ধরেই আমরা কিছুদিন আগে মাদলপাহাড়ের বামনসন্ন্যাসীর কাছে পৌঁছিয়ে গিয়েছিলাম।
সেবার যদি অন্য গ্রহের যন্ত্রদানব গুঙ্গাদানোর বুকের ব্যাটারি মোক্ষম সময়ে শেষ না হয়ে যেত তাহলে মাদলপাহাড়ের একটা গুহায় এতদিনে আমার আর বুধোদার কঙ্কাল পড়ে থাকত। তাই মনে মনে ভাবলাম, আবার রঘুদা? আবার ডকুমেন্টস? তার মানে কি আবার একটা কেলেঙ্কারিয়াস গোছের কিছু হতে যাচ্ছে? মনের উত্তেজনা মনেই চেপে রেখে বুধোদাকে বললাম, কাল তো নেতাজীর জন্মদিন, আমার স্কুল ছুটি। সকালেই দেখা করছি তাহলে?
হ্যাঁ, আসিস। মা বলছিল মাছের কচুরি বানাবে। সাড়ে-আটটার আগে এলে পেয়ে যাবি। এই বলে বুধোদা ফোন রেখে দিয়েছিল।
বলা বাহুল্য, আজ ঠিক সময়েই চলে এসেছি এবং বুধোদার ঘরের পেল্লায় পালঙ্কের ওপর বসে, কোলের ওপর থালা নিয়ে, জ্যাঠাইমার বানানো সেই অনবদ্য মাছের কচুরি খান আষ্টেক শেষ করেছি। বুধোদা ডেস্কটপের সামনে বসেই খাওয়া সারল এবং হাতের তেল মাথায় আর দাড়িতে মুছে নিয়ে আবার ঝুঁকে পড়ল মনিটরের ওপর। এইরকমই ওর স্বভাব। যখন যেটা করে একেবারে হান্ড্রেড পার্সেন্ট মন দিয়ে করে। তবে ট্র্যাকসুট পরে আছে দেখে বুঝতে পারছিলাম ভোরের দিকে মর্নিং-ওয়াকটা সেরে এসেছে। ফিটনেসের ব্যাপারে বুধোদা ভয়ঙ্কর খুঁতখুঁতে। মানে, ওখানেও হান্ড্রেড পার্সেন্ট।
আমার মন চাইছিল তখনই বুধোদাকে বলি, কই, রঘুদা কীসব পাঠিয়েছে বলছিলে, সেগুলো দাও! কিন্তু তার আগে কালো-সাদা মার্বেল টাইলসে মোড়া বিশাল বারান্দার বেসিনে হাত ধুতে যেতে হল আর সেখানে গিয়েই একটু দেরি হয়ে গেল। উত্তরপাড়ার বনেদী মজুমদার-ফ্যামিলির বসতবাড়ি, একশো-আঠেরো বছরের পুরোনো এই হেমকুঞ্জের পূবের বারান্দার ঠিক নীচ দিয়েই বয়ে চলেছে গঙ্গা। কোনাকুনি উল্টোপাড়ে দক্ষিণেশ্বরের মন্দির আর তার একটু পেছনে নদীর ওপরে একটা বিশাল রুপোলি বিছের মতন আড়াআড়ি শুয়ে রয়েছে বিবেকানন্দ সেতু। বিখ্যাত সরোদিয়া মানস ব্যানার্জি প্রতিদিনের মতন ওনার পোষা লোটন পায়রাগুলোকে বাড়ির ছাদ থেকে আকাশে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। জানুয়ারির এই সকালের উজ্জ্বল রোদে সবকিছুই যেন ক্যালেন্ডারের ছবি। মিনিট পাঁচেক দাঁড়িয়ে এইসব না দেখে ঘরে ফিরতেই পারলাম না।
ঘরে ঢুকতেই বুধোদা খামটা আমার দিকে ছুঁড়ে দিল। খামের ওপরে স্টেপলার দিয়ে আটকানো রিসিট-টা দেখে বুঝলাম ওটা গতকালই ক্যুরিয়ারে বুধোদার কাছে পৌঁছেছে। মুখটা খোলাই ছিল। আমি সাবধানে ভেতরের কাগজগুলো খাটের ওপরে ঢেলে এক এক করে দেখতে শুরু করলাম। মোট পাঁচটা কাগজ। তার মধ্যে চারটে রঙিন ছবি আর বাকি কাগজটার দু-পিঠে রঘুদার কালো-পিঁপড়ের মতন গুড়িগুড়ি হাতের লেখায় ঠাসা একটা চিঠি।
স্বাভাবিকভাবেই প্রথমে ছবিগুলোর দিকেই আমার চোখ চলে গেল। দেখে মনে হল কোনো বইয়ের পাতা থেকে স্ক্যান কিংবা কালার-জেরক্স করে প্রিন্ট নেওয়া হয়েছে। চারটে ছবিই কোনো না কোনো ছোট প্রাণীর। একটা ইঁদুর, একটা বড় গঙ্গাফড়িং, একটা কাঠবেড়ালি আর একটা দোয়েলপাখি। নিখুঁত ফোটোগ্রাফ। গায়ের রোঁয়া, খোলস ইত্যাদি দেখে মনে হচ্ছিল নখ দিয়ে খুঁটলে উঠে আসবে। ছবিগুলোর মধ্যে একটা ত্রিমাত্রিকতার আভাস পাচ্ছিলাম। কিন্তু কোনো ছবিটারই রং তেমন উজ্জ্বল নয়।
সেইজন্যেই মনে হচ্ছিল ফোটোগুলো পুরোনো। পুরোনো ফোটোগ্রাফ কি অ্যান্টিকের মধ্যে পড়ে? কে জানে? সাদাকালো ফোটো হলে তবু কথা ছিল। কিন্তু এগুলো তো কালারড ফোটো আর তার ইতিহাস তো খুব বেশিদিনের নয়। অবশ্য বোধিসত্ত্ব মজুমদারের যে পুরোনো জিনিস নিয়েই কারবার সেটা তার বন্ধু রঘুনাথ দ্বিবেদী ভালো করেই জানে। অ্যান্টিকের সঙ্গে যোগাযোগ না থাকলে সে এসব ছবি পাঠাবেই বা কেন?
আমি ছবিগুলোর দিক থেকে চোখ তুলে বুধোদার দিকে তাকালাম। দেখলাম ও এর মধ্যেই ডেস্কটপে একটা পুরোনো রাশিয়ান না ইরানি ঝাড়লণ্ঠনের ইমেজের মধ্যে ডুবে গেছে। আমি তাও ডাক দিলাম— বুধোদা!
কম্পিউটারের স্ক্রিনের দিক থেকে চোখ না সরিয়েই বুধোদা বলল—বল!
ফোটোগুলো কি অনেক পুরোনো?
রঘুর চিঠিটা পড় না! সব বুঝতে পারবি।—ঝাড়লণ্ঠনের ছবিটা জুম করতে করতে বুধোদা জবাব দিল।
পড়লাম। তবে সেই চিঠিতে কী লেখা ছিল সেটা বলার আগে রঘুদার পরিচয়টা একটু দিয়ে রাখা দরকার।
অ্যান্টিকের খোঁজ পাবার জন্যে বুধোদাকে বহু লোকের ওপর নির্ভর করতে হয়। তারা কেউ মাইনে করা ইনফর্মার আবার কেউ ওর বন্ধু, যারা ওর এই ব্যবসার খবর রাখেন। এরকমই একজন বন্ধু হল রঘুনাথ দ্বিবেদী। রঘুনাথ দ্বিবেদীর বয়েস বুধোদার কাছাকাছি। বাড়ি ঝাড়খণ্ডের টাটানগর থেকে একটু দূরে চান্ডিল বলে একটা শহরে। বছর পাঁচেক আগে চাঁইবাসার এক অভ্রখনির মালিকের বাড়ি থেকে একটা উনিশ শতকের জার্মান টেবল-ক্লক সংগ্রহ করতে গিয়ে ওর সঙ্গে বুধোদার আলাপ হয়। তারপর গত পাঁচবছরে জঙ্গলমহলের পড়তি জমিদারবাড়ি থেকে রঘুদার কালেক্ট করে আনা ভালো ভালো শ্বেতপাথরের মূর্তি, পুরোনো গ্রামাফোন রেকর্ড, অয়েল-পেইন্টিং এমনকী ভিন্টেজ মোটরকার অবধি মহারাজা কালেকশনসের শো-রুম থেকে বিক্রি হয়ে গেছে।
রঘুদার ব্যবসা কিন্তু অ্যান্টিক সংগ্রহ নয়, কবিরাজি। চান্ডিলের দ্বিবেদী পরিবার খুব নামকরা কবিরাজ পরিবার। রঘুদাও তার পূর্বপুরুষদের সেই পেশা নিয়েই ব্যস্ত। তবে ওই পেশার কারণেই তাকে রাজবাড়ি থেকে গরিবের কুঁড়েঘর অবধি সর্বত্র যেতে হয়, আর এরকম যাতায়াতের ফলেই সে নানান আশ্চর্য জিনিসের খোঁজ পেয়ে যায়। খোঁজ পেলে সে নিজে কিছু করে না, বুধোদাকে জানায়। তার কারণ, আসল আর নকল, চোরাই আর জেনুইন, অত শত নিয়ে মাথা ঘামাবার সময় কিংবা ইচ্ছে কোনোটাই ওর নেই। ও কাজটা করে স্রেফ বুধোদার সঙ্গে বন্ধুত্বের খাতিরে।
সেই যেবার মাদলপাহাড়ের রহস্যের পেছনে ছুটেছিলাম সেইবারেই রঘুদার সঙ্গে কয়েকটা রোমাঞ্চকর দিনরাত্রি কাটিয়েছিলাম আর তার মধ্যেই আমাদের সম্পর্কটা দাদা-ভাইয়ের মতন হয়ে গিয়েছিল। আমি ওকে তুমি করেই কথা বলি, ও আমাকে তুই। বুধোদার মতন ও আমার আরেকটা দাদা।
এবার রঘুদার চিঠির বক্তব্যে ঢুকে পড়ি। রঘুদা লিখেছে—
প্রিয় বোধিসত্ত্ব,
তুমি যেমন শুধু পেশার কারণেই অ্যান্টিক খুঁজে বেড়াও না—অ্যান্টিক যেমন তোমার নেশা—আমিও তেমনি শুধু কবিরাজি গাছ-গাছালির খোঁজে দলমাপাহাড়ের বনেজঙ্গলে ঘুরে বেড়াই না। বন আমার নেশা। বনের জন্তু, বনের পাখি আর গাছপালা—এরা আমাকে সেই কিশোর- বয়স থেকেই কী যেন এক মায়ায় বেঁধে ফেলেছে।
কিন্তু জঙ্গলে তো শুধুই পশুপাখি আর গাছপালা থাকে না। দলমাপাহাড়ের প্রাচীন-অরণ্যের মাঝে-মাঝে, অরণ্যের মতনই প্রাচীন কিছু মানুষের বসতিও রয়েছে। পাঠান, মোগলরা ভারতে আসার অনেক আগে, এমনকী সিন্ধুনদী পার হয়ে আর্যরা এই উপমহাদেশে পা রাখারও আগে থেকে ওই গ্রাম আর গ্রামের মানুষগুলো এইভাবেই জঙ্গলের মধ্যে গা ঢাকা দিয়ে ছিল। ওরা ভারতের আদিবাসী।
গত সপ্তাহে...তারিখটা ছিল সতেরোই জানুয়ারি...ওরকমই একটা গ্রামে রুগি দেখতে গিয়েছিলাম। চান্ডিল থেকে তিরিশ কিলোমিটার দূরে গভীর জঙ্গলে ঘেরা সেই গ্রামটার নাম লোহুরং—মানে রক্তের রং। সার্থক নাম। কেন, সেটা একটু পরে বলছি। ভীষণ সাদামাটা সেই গ্রামটা থেকে জমাট আতঙ্ক নিয়ে ফিরে এলাম। মন থেকে কিছুতেই সেই আতঙ্কটা মুছে ফেলতে পারছি না, তাই তোমাকে এই চিঠি। কী হয়েছিল বলি।
সেদিন তিরিশ কিলোমিটার জঙ্গল ভেঙে, নিজে জিপ চালিয়ে, বিনা-পয়সায় রুগি দেখতে গিয়েছিলাম। কেন জানো? ওই সতেরোই জানুয়ারি সকালে বাজার করতে গিয়ে দেখি বাসস্ট্যান্ডের সামনের ফুটপাথে বসে একজন আদিবাসী যুবক শিশুর মতন কাঁদছে। তার বয়স বড়জোর পঁচিশ বছর হবে। সুঠাম সুন্দর স্বাস্থ্য। কোমরে একটা ধুতি অর্ধেক করে জড়ানো। গলায় রঙিন পুঁতির মালা। কানে বাঘনখের মাকড়ি আর পিঠে ধনুক। দৃশ্যটা চান্ডিলের মতন বড় শহরে এতই বেমানান যে ছেলেটাকে ঘিরে ততক্ষণে বেশ ভিড় জমে গিয়েছিল। আমি সেই ভিড় ঠেলে ছেলেটার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম।
হয়তো ভিড়ের মধ্যে অনেকেরই তাকে সাহায্য করার ইচ্ছে ছিল, কিন্তু ওর ভাষা কেউ বুঝতে পারছিল না। আমি কিন্তু বুঝতে পারলাম। গত কুড়িবছর ধরে পায়ে হেঁটে দলমা পাহাড় চষে ফেলার ফলে আমি এখানকার আদিবাসীদের মধ্যে প্রচলিত এগারোটা উপভাষা বুঝতে পারি।
ছেলেটার কান্নার মধ্যে জড়ানো কথাগুলো একটু মন দিয়ে শুনে চমকে উঠলাম। ও আমার নাম বলছিল। আর যা বলছিল তা শুনে একইসঙ্গে আমার চোখে জল চলে এল আর মাথার মধ্যে জ্বলে উঠল আগুন। ভাঁজ করা বাজারের থলি বগলেই রইল; আমি ছেলেটাকে সঙ্গে নিয়ে একটা রিকশায় উঠে চলে এলাম সোজা নিজের বাড়িতে। প্রথমে ওকে কিছু জলখাবার খাওয়ালাম, কারণ, দেখেই বোঝা যাচ্ছিল বেচারা খিদেয়, তেষ্টায় আর ক্লান্তিতে নড়তে পারছে না। তারপর ওর মুখ থেকে ওর দুঃখের কাহিনি শুনলাম।
ওর নাম শঙ্কু পাহান।
ভারতের একটা ছোট্ট আদিবাসী সম্প্রদায়ের নাম বীরহোর। তার জীবিত সদস্যের সংখ্যা সাকুল্যে হাজার দশেক হবে। শঙ্কু ওই বীরহোর গোষ্ঠীর মানুষ। ওরা এখনো চাষবাস কিংবা পশুপালন জানে না। আদিম মানবদের মতন ওরাও বনের জীবজন্তু শিকার করে আর ফলমূল কুড়িয়ে খেয়ে বেঁচে থাকে।
পঁচিশ-বছর বয়সের মধ্যে সেদিনই শঙ্কু প্রথম লোহুরঙের বাইরে বেরিয়েছিল। সেদিনই প্রথম বাসে উঠেছিল। অশেষ হেনস্থার মধ্যে দিয়ে কোনোরকমে চান্ডিলে পৌঁছিয়ে তারপর হাল ছেড়ে দিয়ে কাঁদতে বসেছিল। ও চান্ডিলে এসেছিল বৈদ্যরাজ রঘুনাথ দ্বিবেদীর খোঁজে। তার কারণ, ওর মেয়ে টুসাই মরে যাচ্ছে। চারবছরের মেয়ে টুসাই গত তিনদিন ধরে পেটের যন্ত্রণায় ছটফট করছে আর জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে তার গা। আমিই যে রঘুনাথ দ্বিবেদী সেটা জানার পর শঙ্কু আমার হাঁটুদুটো জড়িয়ে ধরে আবার কাঁদতে শুরু করল।
অন্য গ্রামের সাঁওতাল কিংবা মুন্ডা অধিবাসীদের কাছ থেকে শঙ্কু পাহান আমার নাম শুনেছিল। তারা অনেকেই আমাকে দেবতা মানে। কিন্তু বীরহোররা চিকিৎসার জন্যে ওদের নিজেদের গোষ্ঠীর গুণিন ছাড়া কারুর ওপরে ভরসা করে না। আমি যে এতদিন ধরে এত আদিবাসী গ্রামে গিয়ে চিকিৎসা করেছি, সেদিন অবধি কোনো বীরহোর গ্রাম থেকে কিন্তু ডাক পাইনি। তাহলে এমন কী হল যে, শঙ্কু পাহান মেয়ের উপযুক্ত চিকিৎসকের খোঁজে একেবারে চান্ডিলের মতন অজানা অচেনা শহরে চলে এল?
সেই কথাটাই শঙ্কুকে জিগ্যেস করলাম। শঙ্কু যা উত্তর দিল তা শুনে রহস্য পরিষ্কার হল। শঙ্কু বলল, ওদের গ্রামের গুণিন ভিসুক পাহান স্পষ্ট বলে দিয়েছেন যে, টুসাইকে লোহুরঙের ডাইনি বাণ মেরেছে। তার এমন ক্ষমতা নেই যে টুসাইকে বাঁচায়। কাজেই তখন শঙ্কুর শেষ ভরসা বলতে আমি।
আমার ওপরে ওর ভরসা দেখেই যে চোখে জল চলে এসেছিল সেটা নিশ্চয়ই বুঝিয়ে বলতে হবে না। কিন্তু মাথায় রক্ত চড়ে গিয়েছিল ওই ডাইনির কথা শুনে। আমাদের এদিকে, বিশেষ করে আদিবাসীদের মধ্যে, ডাইনের কুসংস্কার একটা অভিশাপ। নিজেদের যা কিছু অকর্মণ্যতা, যা কিছু অক্ষমতা, সবকিছুর দায় ডাইনির অভিশাপের ওপর চাপিয়ে দিয়ে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকাটাই এদের ট্র্যাডিশন।
এতে দু-দিক দিয়ে ক্ষতি হয়। এক তো নিরীহ বুড়োবুড়িদের ডাইনি অপবাদ দিয়ে, তাদের ওপর গ্রামের বাকি লোকজন অকথ্য অত্যাচার শুরু করে। অনেক সময় ঢিলিয়ে কিংবা আগুনে পুড়িয়ে মেরে ফেলে। সেইসব ডাইনি হত্যার খবর নিশ্চয়ই তোমাদের ওদিকের খবরের কাগজেও মাঝেমধ্যে দেখতে পাও। আর দুই, ডাইনগিরিতে বিশ্বাসের ফলে বিজ্ঞানকে এরা গ্রামের ত্রিসীমানায় ঢুকতে দেয় না। খুঁজতে চায় না কোনো অসুখ কিংবা দুর্ঘটনার পেছনে নিতান্তই প্রাকৃতিক কোনো ব্যাখ্যা রয়েছে কিনা।
তাই শঙ্কু পাহান সেদিন যেটা করেছিল সেটা ছিল একটা বিপ্লব। ও ডাইনির তত্ত্বে বিশ্বাস না রেখে চান্ডিল শহরে আমার কাছে চলে এসেছিল। আধুনিক চিকিৎসাবিদ্যার সামনে সেদিন ও একটা বিরাট চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছিল। আমি যদি সেদিন লোহুরঙে না যেতাম, তাহলে নিজের কাছেই নিজে সারাজীবন অপরাধী হয়ে থাকতাম।
সেইজন্যেই আর দেরি না করে শঙ্কুকে আমার পাশের সিটে বসিয়ে লোহুরঙের দিকে রওনা হয়ে গেলাম। শঙ্কুর মেয়ের অসুখের ব্যাপারটা এমন কিছু জটিল ছিল না। মারাত্মক একটা ইনফেকশন হয়েছিল ঠিকই কিন্তু তার ওষুধও আমার কাছে ছিল। সূর্য ডোবার আগেই মেয়েটাকে আটআনা সুস্থ করে তুলতে পারলাম। বাকি আটআনার জন্যে রাতটাও ওখানে থাকতে হল আর তারমধ্যেই ঘটে গেল এক বীভৎস ঘটনা। সেই ঘটনার কথা পরে বলছি। তবে তার আগে সঙ্গের ছবি চারটে দেখো।
দেখে হয়তো ভাবছ এগুলো ফোটোগ্রাফ। কিন্তু তা নয়। এগুলো হাতে আঁকা ছবি। ক্যানভাসের ওপরে সম্ভবত অয়েল পেন্ট দিয়ে আঁকা, কারণ, হাত দিয়ে ছুঁলে ক্যানভাসের ওপর উঁচু হয়ে জমাট বেঁধে থাকা রঙের ব্যাপারটা দিব্যি টের পাওয়া যায়। কোনো ফোটোগ্রাফিক-পেপারের ওপরে রং অমন উঁচু হয়ে জমাট বেঁধে থাকে না। কপিগুলোতে তুমি হয়তো সেই ব্যাপারটা বুঝতে পারবে না, তবে নিজের চোখে দেখলেই বুঝবে। তাছাড়া এগুলো পঞ্চাশ বছরের পুরোনো ছবি। ছবির নীচে আর্টিস্টের নামের আদ্যাক্ষর আর তারিখ সেই কথাই বলছে।
তোমার কাছেই আমি জোসেফ ডালটন হুকারের 'হিমালয়ান জার্নাল' বইটা দেখেছি। তাছাড়া অ্যালান অক্টাভিয়াস হিউমের 'গেম বার্ডস অফ ইন্ডিয়া'। দুটো বইতেই অজস্র পাখি, ফুল, প্রজাপতির হাতে আঁকা ছবি রয়েছে। ওগুলো মোটামুটি দেড়শো বছর আগে আঁকা। যখন কালারড ফোটোগ্রাফির চল হয়নি তখন সারা পৃথিবীতেই উদ্ভিদ আর প্রাণীবিদ্যার বই-ই বলো আর বৈজ্ঞানিকদের নিজস্ব ক্যাটালগই বলো, সব জায়গাতেই স্পেসিমেনের হাতে-আঁকা ছবিই থাকত। কিন্তু এই ছবিগুলোর মতন এমন আশ্চর্য ছবি, যা দেখলে ফোটো বলে ভুল হয়, তেমন কোথাওই দেখিনি। তুমি কি দেখেছ বোধিসত্ত্ব? কে এই নাম না জানা শিল্পী যিনি পঞ্চাশ বছর আগে এমন নিখুঁত রঙিন লাইফ স্টাডি করেছিলেন?
একটু আগে গুণিন ভিসুক পাহানের কথা লিখলাম না? সেই-ই মারা যাওয়ার কিছুক্ষণ আগে এই ছবিগুলো আমার হাতে তুলে দিয়েছিল। ছবিগুলো ও কোথা থেকে পেয়েছিল জানো? লোহুরঙের ডাইনিবাংলো থেকে। সত্যিই ওখানে পাহাড়ের চূড়ায় ডাইনি-বাংলো রয়েছে। সেখানে ডাইনি থাকে। ভিসুক পাহান বলেছিল না, শঙ্কুর মেয়েকে ডাইনিতে বাণ মেরেছে। এই সেই ডাইনি। তাহলে কি ছবিগুলোর সঙ্গে উইচ-ক্র্যাফটের কোনো সম্পর্ক রয়েছে?
জানি না এই লেখা পড়ে তুমি হাসছ কিনা। কিন্তু একটা ব্যাপার খেয়াল করে দ্যাখো। ছবিগুলো সবই কিন্তু মৃত প্রাণীর। চোখ বন্ধ করে হাত-পা গুটিয়ে ওরা পড়ে আছে। বিজ্ঞানের বইয়ে এভাবে ছবি আঁকা হয় না। মৃতপ্রাণীকে সামনে রেখেও যদি শিল্পী ছবি আঁকেন, তিনি চেষ্টা করেন সেগুলোকে যথাসম্ভব জীবন্ত করে আঁকতে। যেমন হিউমের বইতেই যদি এই দোয়েলপাখিটার ছবি থাকতো, তাহলে নির্ঘাত সেই পাখি কোনো গাছের ডালে বসে গলা তুলে গান গাইত। এমন পালক ছেতরে শুয়ে থাকতো না।
মৃত্যুর গন্ধ ওই বাংলোর সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রয়েছে। মৃত্যুর গল্পও বলতে পারো। ভিসুক পাহানের মুখে পঞ্চাশবছর ধরে চলে আসা সেইসব গল্পের কয়েকটা আমি শুনেছিলাম। তখনো জানতাম না ওর নিজের আয়ু শেষ হয়ে এসেছে। ডাইনি ওকেও মারবে।
জঙ্গলের অন্ধকার থেকে চান্ডিল শহরের আলোয় ফিরে আসবার পরে হয়তো সেসব গল্পকে গল্প বলেই উড়িয়ে দিতাম। আমরা শহুরে শিক্ষিত মানুষেরা তাই তো দিই; যা-কিছু আমাদের অভিজ্ঞতার বাইরে তাকেই বলে দিই গাঁজাখুরি গল্প। কিন্তু আর তা পারব না। কারণ, নিজের চোখেই দেখে এলাম ডাইনির শেষ শিকার। দেখে এলাম ভিসুক পাহানের লাশ।
তুমি একবারটি এসো বোধিসত্ত্ব। রুবিককে সঙ্গে নিয়েই এসো। এতদিন তো শুধু জড়বস্তু নিয়েই নাড়াচাড়া করলে। সেসব জিনিসকে হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করা যায়, এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় সরিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়। এবার ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না এমন একটা অ্যান্টিক আতঙ্কের চেহারা দেখেই যাও না! যে আতঙ্ক পঞ্চাশ-বছর ধরে আদিবাসী গ্রাম লোহুরঙের ওপরে কালো মেঘের মতন ঝুলে রয়েছে।
এই কথাগুলো লিখতে লিখতেই দেখতে পাচ্ছি তোমার আর রুবিকের ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি। তোমরা মনে মনে বলছ, রঘুনাথ দ্বিবেদী তিলকে তাল করার বিদ্যেটা ভালোই আয়ত্ব করেছে। নইলে এক আদিবাসী গুণিনের মৃত্যুর সঙ্গে শুধুমুধু ডাইনিবিদ্যাকে জড়াচ্ছে কেন?
কী জানি, সত্যিই তিলকে তাল করছি কিনা। কিন্তু যতবার নিজের ঘরে বসে সেই মৃতদেহটার কথা ভাবছি ততবারই মনে হচ্ছে পাগল হয়ে যাব।
আচ্ছা বোধিসত্ত্ব, তুমি এমন কোনো মৃতদেহ দেখেছ, কিংবা এমন কোনো মৃতদেহর কথা শুনেছ, যা কাচের মতন স্বচ্ছ?
নাঃ, আর লিখতে পারছি না। বুঝতে পারছি লেখাটা কেমন যেন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। শেষ করছি। যদি আসো তাহলে বাকি কথা নিজের মুখেই বলব। ইতি...
গাড়িটা বুধোদার। এটা ও নতুন কিনেছে। অলিভ গ্রিন এস ইউ ভি। চওড়া রেডিয়াল টায়ার আর উঁচু স্যাসির জন্যে খারাপ রাস্তায় ড্রাইভ করার পক্ষে আদর্শ। কাল দুপুরে উত্তরপাড়া থেকে রওনা হয়ে এই গাড়িটা চালিয়েই বুধোদা আর আমি চান্ডিল চলে এসেছি। রঘুদার বাড়িতে যখন ঢুকেছি তখন রাত বারোটা।
আজ অবশ্য গাড়িটা রঘুদাই চালাচ্ছে। কারণ লোহুরঙে যাবার ভাঙাচোরা পাথুরে পথে অভ্যেস না থাকলে নাকি গাড়ি চালানো অসম্ভব। ড্রাইভারের পাশের সিটে বুধোদা বসে রয়েছে। পেছনে আমি। মিনিট দশেক একটানা ড্রাইভ করে গাড়িটাকে চান্ডিল শহরের বাইরে বার করার পর রঘুদা প্রথম মুখ খুলল। বলল, জানতাম তোমরা আসবে। তবে একেবারে আক্ষরিক অর্থে পত্রপাঠ চলে আসবে সেটা ভাবিনি।
গাড়ির জানলার কাচগুলো ওঠানো ছিল, তবু ছোটনাগপুর মালভূমির সকালের হিমেল হাওয়ায় আমার দাঁতে দাঁতে ঠকঠকি লেগে যাচ্ছিল। বুধোদা উলের টুপিটাকে কানের ওপর আরেকটু টেনে নিয়ে উত্তর দিল, পত্রপাঠ চলে আসার একটা কারণ হল রুবিকের স্কুল। নেতাজীর জন্মদিন, শনি-রবি, আর প্রজাতন্ত্র দিবস মিলিয়ে ওর এখন চারদিন ছুটি আছে বলেই আসতে পারল। আর অন্য কারণ তোমার টোপ। ওই ছবিগুলো আমার মাথা খারাপ করে দিয়েছে।
যদি সত্যিই ওগুলো হাতে আঁকা হয় তাহলে মানতেই হবে সেটা পেইন্টিং-এর দুনিয়া তোলপাড় করে দেওয়ার মতন ঘটনা। ফোটোগ্রাফির চল হওয়ার আগে প্রকৃতিবিদেরা স্পেসিমেনের ছবি হাতেই আঁকতেন একথা ঠিক। তার মধ্যে রঙিন ছবিও যে ছিল না তা নয়। মারিয়া সিবিলা মেরিঅ্যান নামে এক জার্মান ভদ্রমহিলা তো সেই কবে সতেরোশো-পাঁচ সালেই নিজের হাতে আঁকা রঙিন ছবি দিয়ে একটা বই বার করে ফেলেছিলেন। নাম 'মেটামরফোসিস ইনসেক্টোরাম সুরিনামেনসিয়াম'। মানে সুরিনাম দ্বীপের পোকামাকড়দের রূপবদল। সেই বইতে একেবারে ডিম থেকে শুঁয়োপোকা হয়ে প্রজাপতি অবধি সবক'টা স্টেপের ছবি ছিল। কিন্তু তবু সেইসব ছবিকে হাতে আঁকা ছবি বলে দিব্যি বোঝা যায়। তোমার ডাইনি-বাংলোর অ্যালবামের মতন এমন ফোটোগ্রাফিক কোয়ালিটির জীবজন্তুর ছবি দেখিনি।
বুধোদার কথা শুনতে শুনতে আমি আমার পাশেই সিটের ওপরে রাখা অ্যালবামটা হাতে তুলে নিলাম। বারবার নেড়েচেড়ে দেখতে হচ্ছে বলে বুধোদা এটাকে আর কোনো ব্যাগের মধ্যে ঢোকাতে দেয়নি।
দেড়ফিট বাই দু-ফিট মাপের ওইরকম বাইশটা ছবি একসঙ্গে ফিতে দিয়ে সেলাই করা আছে। সবই হয় পোকামাকড় আর নাহলে ছোটখাটো জীবজন্তুর লাইফ-স্টাডি।
বুধোদাও ছবিগুলো দেখেই বলেছিল, ক্যামেরা-ট্যামেরার গল্পই নেই। ওগুলো রঙ দিয়েই আঁকা। ম্যাগনিফাইং-গ্লাসের নীচে ছবিগুলোকে ধরলে পিগমেন্টের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম দানাগুলো নাকি দিব্যি দেখা যাচ্ছে। তবে কী ধরনের রং সেটা ও এখনো বুঝতে পারেনি। তার জন্যে বোধহয় ফরেনসিক ল্যাবরেটরির হেল্প লাগবে।
যে-জিনিসটা দেখে বুধোদার মুখে সত্যিকারের খুশি ফুটে উঠেছিল, সেটা হল প্রতিটি ছবির নীচে সন তারিখের উল্লেখ। রঘুদা একটুও বাড়িয়ে বলেনি। ছবিগুলো সবই উনিশশো সাতষট্টি থেকে উনসত্তরের মধ্যে আঁকা। মানে প্রায় পঞ্চাশ বছরের পুরোনো।
অ্যান্টিক বলা যায় বইকী।
কাল রাতে যখন চান্ডিলে পৌঁছে প্রথমবার রঘুদার মুখের দিকে তাকিয়েছিলাম, তখন আমার আর বুধোদার দুজনেরই মনে একটাই প্রশ্ন জেগেছিল—রঘুনাথ দ্বিবেদীর মতন একজন হাসিখুশি ফুর্তিবাজ এবং চরম দুঃসাহসী মানুষ কেমন করে এতটা পালটে যেতে পারে? রঘুদার মুখে তখন হাসি তো ছিলই না, বরং যেভাবে সামান্য শব্দেই চমকে উঠছিল এবং বারবার চেয়ার ছেড়ে উঠে গিয়ে জানলা দিয়ে বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকাচ্ছিল, তাতে পরিষ্কার বুঝতে পারছিলাম একটা আতঙ্ক রঘুদাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। একটা অমঙ্গলের আশঙ্কায় রঘুদা ভয়ে কাঁটা হয়ে রয়েছে।
কতটা ভয় পেলে রঘুদার মতন একজন যুক্তিবাদী, সাহসী মানুষের এই হাল হয় সেটা ভেবে পাচ্ছিলাম না। কিন্তু একথাও ঠিক, রঘুদা কিন্তু ভয়ের সামনে থেকে পিছিয়ে আসেনি। বরং ডাক দিয়েছে ওর নিজের গোত্রেরই আরেকজন মানুষকে। বুধোদাকে।
রঘুদা জানে, যে-কাজে ও একলা এগোতে সাহস পায়নি, বুধোদা সঙ্গে থাকলে ঠিক সেখানে পৌঁছে যেতে পারবে। রঘুদা কথায়-কথায় বললও সেই কথা। বলল, রুবিক! মন থেকে লোহুরঙের ডাইনির ভয় যদি তাড়াতে না পারি, তাহলে আমি আর কোনোদিন স্বাভাবিক হতে পারব না।
আজ সকালে রঘুদার মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হল, এক রাত্তিরেই রঘুদা অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। সত্যিকথা বলতে কি, সেইমুহূর্তে মসৃণ ন্যাশনাল হাইওয়ে ধরে গাড়ি চালাতে চালাতে রঘুদা স্টিয়ারিং-এর ওপরে আঙুলের টোকা দিয়ে কী যেন একটা দেহাতি সুরও ভাঁজছিল। বুধোদা সেটা খেয়াল করে বলল, গান গাইলেই হবে রঘু? চিঠিতে তো বিস্তারিত লিখতে পারোনি। কাল রাতে মুখেও কিছু বলতে পারলে না। তোমার নাকি গলা শুকিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু এই যে আমাদের লোহুরং নিয়ে যাচ্ছ, এখনো যদি না বলো তোমার ডাইনির গল্প...স্যরি, ঘটনা...তাহলে কেমন করে চলে বলো তো?
রঘুদা হেসে ফেলল। বলল, স্যরি ইয়ার! কাল রাতে সত্যি আমার ইয়ে...মানে মনটা একটু খারাপ ছিল। যাগগে, এখন শুনবে? চলো তাহলে, ওই ধাবাটায় নাস্তা সেরেনি। নাস্তা করতে করতেই বাকি চ্যাপটার-টুকু তোমাদের শুনিয়ে দেব।
হাইওয়ের ধারে একটা পাঞ্জাবি-ধাবার উঠোনে পেতে-রাখা খাটিয়ায়, পিঠে রোদ নিয়ে, আরাম করে তিনজনে বসলাম। রঘুদা গলা তুলে ধাবার মালিককে আন্ডা-ভুজিয়া আর আলু-পারাঠার অর্ডার দিয়ে কাহিনী শুরু করল—
শঙ্কু পাহানের সঙ্গে লোহুরং গ্রামে যখন প্রথম পা রাখলাম তখন দুপুর হয়ে গেছে। রাতটা কেটে গেল ওর পাতার কুঁড়ের মধ্যে টুসাইয়ের বিছানার পাশে বসে। প্রতি ঘণ্টায় মেয়েটার মুখে ওষুধ দিচ্ছি আর নাড়ি দেখছি।
আগের তিনটে রাত জাগার ক্লান্তিতে শঙ্কু পাহান আর তার বউ ঘরের অন্য এক কোনায় মেঝেতে পাতা চাটাইয়ের ওপরে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল। আমি জেগে ছিলাম আর আমার সঙ্গে জেগেছিল ভিসুক পাহান। হ্যাঁ, সেই গুণিন—যে শঙ্কুকে বলেছিল, ওর মেয়েকে ডাইনিতে বাণ মেরেছে; তাকে বাঁচানোর নাকি আর কোনো উপায় নেই।
গুণিন লোকটাকে দেখে কিন্তু আমার রাগের বদলে মায়াই হচ্ছিল বেশি। ওর কানদুটো অদ্ভুত রকমের বড়। মাথার চুল কড়ুয়া তেলে জবজবে করে ভিজিয়ে উল্টে আঁচড়ানো। কপালের ওপরে একটা মুরগির ডিমের সাইজের আব। কিন্তু সবার আগে চোখে পড়ে লোকটার রোগা, হাড় জিরজিরে, না-খেতে-পাওয়া চেহারা। বীরহোররা নিজেরাই এত গরিব, তারা গুণিনকে আর কত ভিজিট দেবে? লোকটাকে অভাবী বলে বুঝতে পারছিলাম বলেই মায়া হচ্ছিল।
ভিসুক ডাইনি সম্বন্ধে নানান অদ্ভুত অদ্ভুত কথা বলে আমাকে ভয় দেখাবার চেষ্টা করছিল। সেগুলোকে একেবারেই গাঁজাখুরি গল্প বলে উড়িয়ে দিতাম যদি না গল্পগুলোর মধ্যে কয়েকটা অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য থাকত।
সাধারণত এইসব আদিবাসী গ্রামের বাসিন্দারা তাদের কোনো বৃদ্ধ বা বৃদ্ধা প্রতিবেশীকেই ডাইন বা ডাইনি হিসেবে চিহ্নিত করে। বলে, ওই বুড়িই ডাইনি। ও তোর ছেলেকে বাণ মেরেছে, তাই তোর ছেলের জ্বর সারছে না। কিংবা বলে, ওই বুড়ো ডাইন। ও তোর গোয়ালে নজর দিয়েছিল বলে তোর গোরুগুলো সব মরে গেল। তারপর সেই অসহায় বুড়োবুড়িদের ওপর যতরকমের অত্যাচার শুরু করে। গ্রামের গুণিনরাই এসবের পেছনে থাকে। তারাই সাধারণ মানুষদের খেপিয়ে তোলে।
ভিসুক পাহান কিন্তু বলছিল, লোহুরঙের ডাইনি মোটেই ওদের সমাজের লোক নয়। তার গায়ের রং ধবধবে সাদা। মাথার চুল সোনালি। সে সাগরের ওদিকের কোনো দেশ থেকে ঝাঁটায় চেপে লোহুরঙে উড়ে এসেছে। ডাইনি গ্রামের ভেতরে থাকে না, থাকে টিলার মাথায় একটা বাংলোয়। একশোবছর আগে ডাইনির দাদু ওই বাংলোটা বানিয়েছিল।
দ্বিতীয়ত, ওই বিদেশি ডাইনি বরাবর লোহুরঙে থাকেনি। পঞ্চাশ বছর আগে কিছুদিনের জন্যে এসে একটা মানুষকে মেরেছিল। পঞ্চাশ বছর বাদে এখানে ফিরে এসেই আবার তার কালাজাদু শুরু করেছে। নাহলে টুসাইয়ের এমন অবস্থা হবে কেন? এর আগে গ্রামে যতগুলো ডাইনি ছিল সবকটাকেই তো ভিসুক গ্রামছাড়া করেছে। এখন তো ওই ফরসা বুড়ি ছাড়া ডাইনি হবার মতন আর কাউকে ধারেকাছে দেখা যাচ্ছে না।
আমি থার্মোমিটার দিয়ে টুসাইয়ের জ্বর মাপতে মাপতে জিগ্যেস করলাম, তুমি সেই ডাইনিকে দেখেছ?
দেখেছি মানে? রীতিমতন কথা বলেছি। আমি তো প্রায় প্রতিদিনই ওর ওখানে যাই। বাজারহাট করে দিই।
আমি ঠাট্টা করে বললাম, সাগরপাড়ের ডাইনি তোমার সঙ্গে কোন ভাষায় কথা বলেন? তুমি কি বিদেশি ভাষা বোঝো?
ভিসুক চটে উঠে বলল, বিদেশি ভাষা বলবে কেন? বললাম না, ছোটবেলায় ওর বাবার সঙ্গে ওই বাংলোতেই অনেকবছর থেকেছিল। তখন ওর বয়েস ছিল ষোলো কি সতেরো। সেবারে ও একটা মেয়েকে বাণ মেরে শেষ করে ফেলেছিল। তারপর ওরা বাপ-বেটি লোহুরং ছেড়ে পালিয়েছিল। আজ পঞ্চাশ বছর বাদে আবার ফিরে এসেছে।
আমি বললাম, বুঝেছি। সেইজন্যে উনি তোমাদের ভাষা জানেন। সেই ভাষাতেই তোমার সঙ্গে কথা বলেন। তাহলে ওনাকে ডাইনি বলছ কেন?
ভিসুক বলল, ওসব আমরা বুঝতে পারি। এই যে শঙ্কুর বেটি টুসাই, ও বয়ড়া-ফল কুড়োতে টিলার মাথায় উঠেছিল। তখনই ডাইনির নিশ্বাস ওর গায়ে লেগে গিয়েছে। পুরোপুরি নজর লাগলে আপনারও ক্ষমতা ছিল না ওকে বাঁচানোর।
ব্যঙ্গের সুরে বললাম, তোমার গায়ে নজর লাগে না?
হাড় জিরজিরে বুকের খাঁচাটা যতটা সম্ভব ফুলিয়ে ভিসুক পাহান উত্তর দিল—মনে রাখবেন কোবরেজমশাই, আমি একজন গুণিন। যত বড়ই ডাইনি হোক, আমার কিছু করতে পারবে না। আমরা আর ডাইনিরা অনেকটা একই গোত্রের লোক। শুধু আমাদের অলৌকিক ক্ষমতা আমরা মানুষের ভালোর জন্যে ব্যবহার করি। আর ডাইনিরা সেই একই ক্ষমতা দিয়ে মানুষের ক্ষতি করে।
ভিসুক আমার সঙ্গে কথা বলতে বলতে মাঝে-মাঝেই একটা শুকনো লাউয়ের খোলা থেকে কী যেন এক ঝাঁঝালো গন্ধের লিকুইড গলার মধ্যে ঢালছিল। বারণ করে লাভ ছিল না। নেশা ছাড়া এসব লোক বাঁচতে পারে না। আমি তাই ওর দিকে নজর না দিয়ে টুসাইয়ের নার্সিং-এর কাজটাই মন দিয়ে করে যাচ্ছিলাম। মুশকিল হল, যতই সেই লিকুইড ভিসুকের পেটের মধ্যে যাচ্ছিল ততই ওর মধ্যে একটা বীররস জেগে উঠছিল। ও বোধহয় বুঝতে পারছিল ওর গল্পগুলো আমি খুব একটা ধর্তব্যের মধ্যে আনছি না। তাই হঠাৎ একটা সময়ে ও টলতে টলতে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, দাঁড়ান কোবরেজমশাই। আপনাকে একটা জিনিস দেখালেই আপনি বুঝতে পারবেন ওই ডাইনির কত ক্ষমতা। এই বলে নিজের কুঁড়েঘর থেকে ওই ছবির অ্যালবামটা এনে আমার হাতে দিল।
শঙ্কু পাহানের ঘরের কাঁপা কাঁপা লম্ফের আলোয় সেই প্রথম আমি দেখলাম নানান পোকামাকড় আর জীবজন্তুর অসমান্য রঙিন ছবিগুলো। তুমি নিশ্চয়ই একমত হবে, ছবিগুলোর বিবর্ণতা দেখলে একজন সাধারণ মানুষও বুঝতে পারে ছবির নীচে লেখা তারিখগুলো জাল নয়। ছবিগুলো সত্যিই পুরোনো। সব মিলিয়ে তাই আমি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম। ভিসুককে জিগ্যেস করলাম, এগুলো কোথায় পেলে ভিসুক?
ডাইনি দিয়েছে। ডাইনি বলেছে এগুলোর খরিদ্দার দেখতে। ওর খুব পয়সার দরকার। পয়সার জন্যেই ও সমুদ্রের ওপার থেকে এখানে উড়ে এসেছে। ও বলেছে এরকম ছবি ওর কাছে আরও অনেক রয়েছে—আরও বড়, আরও জীবন্ত।
ভিসুককে জিগ্যেস করলাম, ছবি ছাড়া আর কী আছে? তখন আমার মাথায় তোমার মহারাজা কালেকশনসের কথা ঘুরছিল। ভাবছিলাম, যেমন অ্যান্টিক কোনো মানুষ কখনো চোখে দেখেনি, তেমন কিছু তোমার হাতে তুলে দিতে পারি কিনা।
ভিসুক আমার প্রশ্ন শুনে হঠাৎ যেন মহা দোটানায় পড়ে গেল। যেন একটা কোনো গোপন কথা বলবে কি বলবে না তাই নিয়ে ভাবতে ভাবতে হঠাৎ আবার হাতের লণ্ঠনটা নিয়ে দরজার দিকে পা বাড়াল। আমি জিগ্যেস করলাম, কোথায় চললে?
ভিসুক ফিসফিসে গলায় বলল, আরও একধরনের অদ্ভুত জিনিস ওই বাংলোয় দেখেছি। সেগুলোকে ডাইনিটা ওর বাবার ছবি আঁকার ঘরে লুকিয়ে রেখেছিল, তবু আমি দেখে ফেলেছি। আমি একবার আপনাকে দেখাতে চাই।
তারপর একেবারে আমার কানের কাছে মুখ এনে বলল, ছবির বইটা যদি আপনি কেনেন তাহলে সে পয়সা আমি ডাইনিটাকে দিয়ে দেব। কিন্তু এখন আমি যে জিনিসটা আনতে যাচ্ছি, সেটা যদি আপনি কেনেন তাহলে পুরো পয়সাটাই আমার, কেমন?
আমি ঘাড় হেলিয়ে বললাম, রাজি। সঙ্গে সঙ্গে সেই গভীর রাতে ভিসুক পাহান রওনা দিল টিলার মাথায় ডাইনি বাংলোর দিকে। উত্তুরে হাওয়ায় একবার ঘরের দরজায় ঝুলিয়ে রাখা চাটাই উড়ে যেতেই দেখলাম, জমাট কুয়াশার মধ্যে ভিসুকের লণ্ঠনের আলো একটা হলুদ জোনাকির মতন দুলতে দুলতে দূরে চলে যাচ্ছে। কুয়াশার আড়ালে ভিসুককে আর দেখা যাচ্ছে না।
জ্যান্ত অবস্থায় ভিসুককে সেই শেষবার দেখেছিলাম।
ভোর-রাতের দিকে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। সেই কাঁচা ঘুমও ভেঙে গেল শঙ্কুর ঘরের বাইরে অনেক মানুষের ভয়ার্ত গলার শব্দে। বাইরে বেরিয়ে দেখি দলে দলে নারীপুরুষ দ্রুতপায়ে হেঁটে চলেছে টিলার দিকে। ঘরে শঙ্কু নেই। শঙ্কুর বউ ওর মেয়েকে কোলের মধ্যে জড়িয়ে নিয়ে ভীষণ ভয় পাওয়া মুখে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রয়েছে। ওকে কয়েকবার জিগ্যেস করলাম, কী হয়েছে? ও কোনো উত্তর দিল না। মনে হল প্রবল আতঙ্কে ওর কথা বলার ক্ষমতা লোপ পেয়েছে। অগত্যা গায়ে ব্লেজারটা চাপিয়ে ওইসব মানুষজনের পেছন পেছন টিলার দিকে হাঁটা লাগালাম।
টিলার মাথায় উইচ-কটেজ। তার ঠিক নীচ থেকে শুরু হয়েছে একটা বিশাল ধস। পুরো জায়গাটায় এক কুচি ঘাস অবধি নেই। শুধুই টকটকে লাল পাথর আর কাঁকর। কাল যখন গ্রামে ঢুকছিলাম তখনই জায়গাটা চোখ টেনেছিল। কিন্তু তখন জায়গাটা ছিল খটখটে শুকনো, আর রঙটা ছিল ফিকে। এখন ভিজে কাদা হয়ে রয়েছে আর রং হয়েছে রক্তের মতন লাল। যে কেউ বুঝতে পারবে, গ্রামের মাথার কাছে ঝুলে থাকা ওই রক্তমাখা জিভের মতন জমিটার জন্যেই গ্রামের নাম হয়েছে লোহুরং। শুধু একটা ব্যাপারই আশ্চর্য লাগছিল। এত জল এল কোথা থেকে? রাতে তো বৃষ্টি হয়নি।
সেই ধসে যাওয়া জমির নীচের প্রান্তে, যেখানে জমিটা একটু সমতল হয়ে এসেছে, সেখানেই গ্রামবাসীদের ভিড়টা একটা বৃত্তের মতন জমাট বেঁধে দাঁড়িয়েছিল। আমি ভিড় ঠেলে এগিয়ে গিয়ে দেখলাম, বৃত্তের মাঝখানে চিৎ হয়ে পড়ে রয়েছে লোহুরং গ্রামের গুণিন, ভিসুক পাহান। তার হাড়-জিরজিরে চেহারা, খাড়া খাড়া কান, উলটিয়ে আঁচড়ানো চুল আর কপালের মস্ত আব—সমস্তই ঠিক কাল রাতে যেমন দেখেছিলাম তেমনই রয়েছে। শুধু এখন সব কিছুই বদলে গেছে ঘোলাটে রঙের কাচে। রক্ত নয়, মাংস নয়, চামড়া নয়—শুধু কাচ।
অনেকক্ষণ অবধি আমার চোখ ছাড়া অন্য সমস্ত ইন্দ্রিয় অসাড় হয়ে গিয়েছিল। চোখ দিয়ে গিলছিলাম সেই বীভৎসের চেয়েও বীভৎস দৃশ্য। কতক্ষণ পরে কে জানে, আবার কানে শব্দ ঢুকতে শুরু করল। শুনলাম, আশেপাশের লোকজন ফিসফিস করে বলছে—ডাইনির বাণ, ডাইনি ওকে মেরেছে। ঠিক এইভাবে পঞ্চাশ বছর আগে ওই ডাইনি একটা মেয়েকে মেরেছিল। তাকেও ঠিক এইভাবে কাচের পুতুল বানিয়ে দিয়েছিল।
আমাদের খাবার সার্ভ করে দিয়েছিল। রঘুদা কথা থামিয়ে এক টুকরো আলু-পারাঠা নিয়ে মুখে ঢোকাল। বুধোদা চিন্তিত মুখে বলল, তার মানে শুধু শিল্পী নন, লোহুরঙের উইচ-কটেজে একজন ভাস্করও বাস করেন যিনি গ্লাস-স্কাল্পচার বানাতে ওস্তাদ। পঞ্চাশবছর আগেও তিনি ছিলেন, আজও রয়েছেন। তিনি কি ওই বিদেশি মহিলা? নাকি অন্য মানুষ? যাই হোক, আর্ট সম্বন্ধে যদি এতবছরে সামান্য কিছুও শিখে থাকি, তাহলে এটুকু বলতে পারি ওই কুঁড়েঘরের মধ্যে রাজার সম্পদ লুকোনো রয়েছে।
বুধোদার কথাটা শুনেই রঘুদা হঠাৎ ভয়ঙ্কর উত্তেজিত হয়ে পড়ল। বলল, মনে হচ্ছে তোমরা আমার কথাগুলোকে সিরিয়াসলি নিচ্ছ না। কিসের শিল্প? কিসের ভাস্কর্য? তোমাকে বললাম না, ওখানে পড়েছিল একটা কাচের মৃতদেহ? ভিসুক পাহানের লাশ? সেটা তাহলে তোমার কাছে ভাস্কর্য? এই তোমার মানবিকতা?
শান্ত হও রঘুনাথ, শান্ত হও। বুধোদা এক হাত দিয়ে বন্ধুর কাঁধ জড়িয়ে ধরল। তারপর বাচ্চাছেলেকে বোঝানোর মতন করে বলল, তুমি ব্যাপারটা একটু অন্যভাবে ভাব রঘুনাথ। তুমি যা দেখেছ, তা কাচের স্ট্যাচু ছাড়া কিছু নয়। গ্লাস-স্কাল্পচার। চূড়ান্ত সুন্দর, চূড়ান্ত নিখুঁত। তবু মূর্তি ছাড়া সেটা আর কিছু হতে পারে না।
আর শোন, ভিসুক পাহান মরেনি। সে কোথাও লুকিয়ে রয়েছে। ওই বিদেশি ভদ্রমহিলা কিংবা অন্য কেউ ভিসুক-কে মডেল হিসেবে ব্যবহার করে যে কাচের মূর্তিটা বানিয়েছিলেন সেটাকেই তোমরা টিলার নীচে পড়ে থাকতে দেখেছ। এর মধ্যে কোনো ডাইনিগিরি নেই। কোনো অলৌকিক নেই।
তোমার মনে আছে, ভিসুক শেষবার ডাইনি-বাংলোয় যাবার আগে তোমাকে বলে গিয়েছিল, ওখানে আরেক ধরনের অদ্ভুত জিনিস রয়েছে? আমার মনে হয়, ও গ্লাস-স্কাল্পচারের কথাই বলেছিল। ওই ভদ্রমহিলার বানানো আরও মূর্তি ওই বাংলোয় রয়েছে।
রঘুদা একটু থমকে গেল। ওর চোখের দৃষ্টি আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হয়ে এল। বলল, তাই তো! এভাবে তো ভাবিনি। ইয়েস, দ্যাটস পসিবল। তার মানে, ভিসুক আমাকে দ্যাখানোর জন্যে ওর নিজের মূর্তিটা নিয়েই নেমে আসছিল। তারপর হয়তো নেশার ঝোঁকে ওটাকে ওইখানেই নামিয়ে রেখে অন্য কোথাও হাঁটা লাগিয়েছে।
বুধোদা বলল, রাইট। এবার তাহলে আমরা লোহুরঙের দিকে রওনা দিই?
চলো!
রঘুদা খাবারের দাম মিটিয়ে পকেট থেকে গাড়ির চাবিটা বার করে আঙুলে ঘোরাতে ঘোরাতে এস ইউ ভি-র দিকে হাঁটা লাগাল। পেছন পেছন আমি আর বুধোদা।
ঘণ্টাখানেক চলবার পর আমরা হাইওয়ে ছেড়ে জঙ্গলের নুড়িপাথরের রাস্তায় ঢুকে পড়লাম। সঙ্গে সঙ্গেই কে যেন আকাশের হাজার-ওয়াটের রোদ্দুরটার ওপরে একটা শ্যাওলারঙের ল্যাম্পশেড পরিয়ে দিল। আকাশছোঁয়া শাল মহুয়ার গাছের নীচ দিয়ে একটা সবুজ সুড়ঙ্গের মতন এঁকেবেঁকে চলল রাস্তা। জঙ্গলের সেই খুব পরিচিত সোঁদা সোঁদা, বুনো বুনো গন্ধটা নাকে এসে ঝাপটা মারল আর চারিদিকের মাইল-মাইল নৈঃশব্দকে চতুর্গুণ বাড়িয়ে দিয়ে একটা মাত্র কাঠঠোকরা কোন গাছের ডালে বসে যেন শব্দ তুলতে শুরু করল ঠক ঠক, ঠক ঠক।
আরও ঘণ্টাখানেক চলার পরে হঠাৎই জঙ্গল ভেদ করে আমরা একটা সরু কিন্তু খরস্রোতা নদীর ধারে এসে পৌঁছলাম। গাড়িটাকে একটা বড় চিকরাশি গাছের নীচে পার্ক করে রেখে রঘুদা ডানদিকের দরজা খুলে লাফ মেরে নেমে পড়ল। বলল, ব্যস, গাড়ির দৌড় এই অবধিই। এই নদীটার নাম টুরা। আমরা এটাকে পেরোব বোল্ডার থেকে বোল্ডারে লাফ মেরে। গাড়ি তো ওইভাবে লাফিয়ে লাফিয়ে পেরোতে পারবে না। চলে এসো বোধিসত্ত্ব! রুবিক, আয়।
আমরা তিনজনেই পিঠে রাকস্যাক ঝুলিয়ে নিলাম। ওর মধ্যেই রইল অন্তত দুটোদিন কাটাবার মতন খাবারদাবার আর পোশাকআশাক। বুধোদার রাকস্যাকের মধ্যে যে রিভলবার আছে সেটা জানি। আর রঘুদা ওর চিরসঙ্গী কোবরেজি ওষুধের ঝোলাটাকে আমাদের চোখের সামনেই চেপেচুপে ওর স্যাকের ভেতরে ঢুকিয়ে নিল।
হাঁটা শুরু করেই রঘুদা বলল, একটা কথা আগেই বলে দিই। লোহুরঙে বিদ্যুৎ আছে। কিন্তু পাহাড়ে ঘেরা বলেই কিনা জানি না, মোবাইলের টাওয়ার পাওয়া যায় না। নেটের কানেকশনও নেই।
নদীর উল্টোদিকে একসারি বড় গাছ দেয়ালের মতন দাঁড়িয়ে ছিল। ওই দেয়ালটা পেরোতেই চোখের সামনে ভেসে উঠল লোহুরঙ গ্রাম। একটা গাছে ছাওয়া ছোট টিলার পায়ের কাছে তিরিশ চল্লিশটা পাতার কুটির।
কুটিরগুলোর চেহারা আমাদের বাংলার চেনা কুঁড়েঘরের মতন নয়। এখানে ইট, কাঠ, খড়, মাটির কোনো গল্প নেই। শুধু শুকনো পাতা দিয়ে গড়া টোপরের মতন কিছু স্ট্রাকচার। একদিকে একটা ফাঁক, সেটাই ঢোকার দরজা। জানলা বলতেও কিছু নেই। রঘুদা বলল, এগুলোই নাকি বীরহোরদের ট্র্যাডিশনাল ঘরের নমুনা—হয়তো কুড়িহাজার বছরেও যা এতটুকু পালটায়নি।
গ্রামের দিকে হেঁটে যাচ্ছিলাম ঠিকই। কিন্তু ওই টিলাটার দিক থেকে চোখ সরাতে পারছিলাম না। টিলাটা বড়জোর সাত-আটশো ফিট উঁচু হবে। এমনিতে পুরোটা সবুজ ঘাস আর এলোমেলোভাবে দাঁড়িয়ে থাকা গাছে ছাওয়া। শুধু চূড়া থেকে মাঝামাঝি অবধি একটা বড়সড় ফুটবল মাঠের সাইজের জমির ওপরের নরম মাটির স্তর ধসে ধুয়ে গেছে। বেরিয়ে এসেছে নীচের কাঁকর আর পাথর। আর সেই কাঁকর পাথরের সে কী রং! এত লাল যে কোনো পাথর হতে পারে তা আমি জানতাম না। মনে হচ্ছে যেন বলিদানের থকথকে তাজা রক্তে ভেসে যাচ্ছে পুরো ন্যাড়া জমিটা। রঘুদা ঠিকই বলেছিল, জমিটার আকৃতি ঠিক মানুষের জিভের মতন। ওপরটা চ্যাটালো। দুটো প্রান্ত নীচের দিকে গোল হয়ে মিশে গেছে। কাজেই দূর থেকে মনে হচ্ছে একটা বিশাল রক্তমাখা জিভ টিলার মাথা থেকে ঝুলে পড়েছে।
চোখ কুঁচকে কিছুক্ষণ টিলার মাথার দিকে তাকিয়ে থেকে বুধোদা হঠাৎ বলল, আচ্ছা, ওই জিভের মতন জায়গাটার একেবারে ডগায়, মানে ধস-টা যেখানে শুরু হয়েছে, ওখানে গাছপালার ফাঁক দিয়ে মাঝে-মাঝে রোদের রিফ্লেকশন দেখতে পাচ্ছি বলে মনে হচ্ছে। ওই যে, চুড়োটার একটু নীচে।
রঘুদা বলল, ঠিকই দেখেছ। ওটাই হচ্ছে ডাইনি-বাংলো। বীরহোরদের কুঁড়ের মতন পাতার তৈরি নয়। একদম ইট, কাঠ, পাথরের তৈরি সলিড ব্রিটিশ আমলের বাংলো। বাংলো ঘিরে যে টানা বারান্দা সেটা পুরোটাই কাচের জানলা দিয়ে ঢাকা। তুমি যেটা দেখছ, সেটা ওই কাচের জানলার ওপরে আলোর ঝলক। আমি আগের বারেই কিছুটা এগিয়ে গিয়ে দেখে এসেছিলাম। চলো, এবার তো আমাদের ওখানে যেতেই হবে। তখন সবকিছুই আরও ভালো করে দেখবে।
একটু পরেই আমরা পৌঁছে গেলাম লোহুরং গ্রামের ঘরগুলোর কাছাকাছি। সঙ্গে-সঙ্গেই সাত-আটটা বাঘের মতন কুকুর কোথা থেকে যেন উদয় হয়ে তারস্বরে চিৎকার করতে-করতে আমাদের ঘিরে ধরল। ভাগ্যিস তাদের চিৎকারে তাদের মালিকেরাও সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে এল। তাই সে যাত্রায় বেঁচে গেলাম। আমাদের ঘিরে ধরল অন্তত জনা কুড়ি নারীপুরুষ। ছেলে-বুড়ো সবারই পোশাক, রঘুদা শঙ্কু পাহানের পোশাকের যে ডেসক্রিপশন দিয়েছিল, সেইরকম। মেয়েরা পরেছিল একধরনের মোটা কাপড়ের সাদা শাড়ি। ছেলে মেয়ে সকলেরই গলায় কানে নানারকমের পাথর আর পেতলের রঙচঙে গয়না শোভা পাচ্ছিল। এত শীতেও কারুর গায়ে ছেঁড়া কাঁথা ছাড়া অন্য কোনো গরমজামা দেখলাম না।
ওদের মধ্যে থেকেই একজন যুবক যেভাবে দৌড়ে এসে রঘুদার হাতদুটো জড়িয়ে ধরল, তাতে সন্দেহ রইল না যে এই সেই শঙ্কু পাহান। শঙ্কুর পেছনেই একটা ছোট বাচ্চাকে কোলে নিয়ে একটা মেয়ে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ওই নিশ্চয় শঙ্কুর বউ আর ওর কোলের বাচ্চা মেয়েটা টুসাই—যাকে রঘুদা সারিয়ে তুলেছে।
শঙ্কু আর অন্যান্য কয়েকজন বৃদ্ধ, যাঁরা নিশ্চয় গাঁয়ের মোড়লই হবেন, তাদের সঙ্গে রঘুদা অনেকক্ষণ অবোধ্য ভাষায় কী যেন আলোচনা করল। তারপর আমার আর বুধোদার দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল, এনারা কিছুতেই আমাদের ডাইনি-বাংলোয় যেতে দিচ্ছিলেন না, বুঝেছ। কোনোরকমে একগাদা মিথ্যে কথা বলে রাজি করালাম। বললাম, তুমি হচ্ছ ডাইনিদের অন্ধ ভক্ত। যেখানেই ডাইনির খবর পাও সেখানেই তাদের পায়ে মাথা ছোঁয়াতে যাও।
বুধোদা তাই শুনে দুটো হাত আকাশের দিকে তুলে, ডাইনি বাংলোর দিকে তাকিয়ে হুঙ্কার দিয়ে উঠল,—'বম মহাদেব ধুস্তুরস্বামী, দস্তুরমতো প্রস্তুত আমি।'
বীরহোরদের মধ্যে কেউ বাংলা জানে না, পরশুরামের ধুস্তুরীমায়া গল্পটাও পড়েনি। তাই তারা সেই ভয়ঙ্কর ভক্তির প্রকাশ দেখে প্যান্টশার্ট পরা নবীন সাধকের কাছ থেকে একটু দূরে হটে গেল আর আমি হাসি চাপবার জন্যে প্রাণপণে লগারিদমের ফর্মুলা আওড়াতে লাগলাম।
যাই হোক, মোদ্দা কথা হচ্ছে সেদিন, চব্বিশে জানুয়ারি বেলা এগারোটার সময় আমরা তিনজন লোহুরঙের ডাইনি-বাংলোর বন্ধ দরজায় কড়া নাড়লাম। দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন একজন শ্বেতাঙ্গিনী মহিলা, যাঁর বয়স ষাটের বেশ কিছুটা ওপরে।
ছোটখাটো ঘরোয়া চেহারা। একটা ফুলছাপ গাউন পরে আছেন। কাঁধের ওপর দিয়ে ঝোলানো রয়েছে হালকা উলের চাদর। পিঠের ওপর লুটিয়ে পড়া চুলগুলো এককালে নিশ্চয় পুরোপুরি সোনালি ছিল, এখন অনেক জায়গায় বয়সের ধূসর ছোপ ধরেছে। ওনার ভারী দুই চোখের পাতা কিছুটা নেমে এসে চোখের সাদা অংশকে ঢেকে রেখেছিল আর সেইজন্যেই মনে হচ্ছিল উনি যেন একটা স্বপ্নের ঘোরে ডুবে রয়েছেন। চোখের তারা ঘন কালো। মোটকথা আমাদের কল্পনার ডাইনির সঙ্গে কোথাওই কোনো মিল পেলাম না।
আমাদের মতন তিনজন অপরিচিতকে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভদ্রমহিলা স্বাভাবিকভাবেই অবাক হলেন। অবাক গলাতেই প্রশ্ন করলেন—ইয়েস, হোয়াট ক্যান আই ডু ফর ইউ?
বুধোদা সঙ্গে-সঙ্গেই অমায়িক হেসে করমর্দনের জন্যে মহিলার দিকে ডান হাতটা বাড়িয়ে দিল এবং নিজের পরিচয় দিল—বোধিসত্ত্ব মজুমদার। অ্যান্টিক হান্টার। তারপর মহারাজা কালেকশনস-এর লোগো ছাপানো ভিজিটিং কার্ডটা ওনার দিকে বাড়িয়ে ধরল। মহিলা হাত বাড়িয়ে কার্ডটা নিলেন এবং চোখের কাছে ধরে পুরোটাই পড়লেন। খেয়াল করলাম, ওনার মুখে গভীর আগ্রহ ফুটে উঠল। উনি মুখ তুলে ইংরিজিতেই বললেন, আসুন জেন্টলমেন, ভেতরে আসুন।
আমরা বারান্দার লাগোয়া প্রথম ঘরটাতে বসলাম। পুরো বাংলোটাই যেমন কাঠের দেয়াল, টিনের ছাদ দিয়ে বানানো, এই ঘরটাও তার ব্যতিক্রম নয়। মেঝেয় পুরু কার্পেট। দেয়ালে শম্বরের শিং আর চিতাবাঘের ছাল। এক কোণে পাথরের ফায়ারপ্লেস। সব মিলিয়ে টিপিকাল সাহেবি বাংলো। তবে সবকিছুর ওপরেই সময়ের পুরু সর পড়েছে। একশো বছর সময়টা তো কম নয়।
মেমসাহেব আমাদের বসিয়ে রেখে লাগোয়া কিচেনে ঢুকলেন। তারপর সেখান থেকে তিনটে কাটগ্লাসের পাত্রে কমলালেবুর সরবত নিয়ে এসে আমাদের সামনে সেন্টার-টেবলের ওপরে নামিয়ে রাখলেন। বুধোদা ওর গ্লাসটা হাতে তুলে নিয়ে একটু ঘোরাতেই সেটার ভেতর দিয়ে হাজারটা কমলা আলোর রশ্মি প্রতিসরিত হল। রত্নপাথরের মতন ঝলমল করে উঠল গোটা পাত্রটাই। বুধোদা মুগ্ধগলায় বলে উঠল— হ্যাম্পশায়ার। প্রোব্যাবলি উনিশশো দশ কিংবা কুড়ির মেক।
বুধোদার কথার পিঠে-পিঠেই আমাদের সবাইকে যাকে বলে বিস্ময়ে বিমূঢ় করে দিয়ে সেই মেমসাহেব বিশুদ্ধ হিন্দিতে মন্তব্য করলেন—সাব্বাশ! কেয়া জানকারি হ্যায় ভাইসাব!
আবারও উনি প্রশংসার সুরে বলে উঠলেন—আপকা আন্দাজ বিলকুল সহি হ্যায়। ইয়ে ডিকান্টার হ্যাম্পশায়ারমেই বনা হুয়া হ্যায়। হ্যাম্পশায়ার, ব্রিটেন।
তারপরেই আমাদের তিনজনের হতভম্ব মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি ছোট্ট করে কপাল চাপড়ালেন। হিন্দিতেই বললেন, দেখেছ? নিজের পরিচয়টা যদি ভদ্রলোকের মতন প্রথমেই দিয়ে রাখতাম তাহলে আপনারা এতটা অবাক হতেন না। আমি টিমোথি। মিস টিমোথি হেবার্ড সায়গল। বাবার নাম লেট প্যারিমোহন সায়গল। আমাদের দেশ পাঞ্জাবের লুধিয়ানায়। উনিশশো-চল্লিশ সালে আমার বাবা প্যারিসে ছবি আঁকা শিখতে গিয়েছিলেন। ওখানেই বিয়ে করেছিলেন এক ব্রিটিশ নার্স, লিজা হেবার্ডকে। আমি সবদিক থেকেই মায়ের চেহারা পেয়েছি। বুঝতেই পারছেন হিন্দিটা বাবার কাছ থেকেই শিখেছিলাম।
আপনার পূর্বপুরুষেরা কোন পেশার লোক ছিলেন মিস সায়গল? বুধোদা প্রশ্ন করল।
মিস সায়গলকে দেখে মনে হল, উনি কথা বলতে পেরে খুশিই হচ্ছেন। গড়গড় করে বলে চললেন—আমার দাদু লেট জানকীনাথ সায়গল ছিলেন টিম্বার-মার্চেন্ট এবং সিভিল কন্ট্রাকটর। জামসেদপুর থেকে তিনি কোটি-কোটি টাকার ব্যাবসা চালাতেন, বেশিরভাগ লেনদেনটাই ছিল টাটা স্টিল প্ল্যান্টের সঙ্গে। লোহুরঙে এই প্রপার্টিটা আসলে ছিল দাদুর কারখানা।
কারখানা? কিসের কারখানা?
আমার তো অত টেকনিক্যাল-নলেজ নেই, তাই সঠিক বলতে পারব না। তবে শুনেছি বড় বড় ইন্ডাস্ট্রিতে একরকমের লেদার, মানে চামড়ার ফিল্টার লাগে। চামড়ায় যে খুব সূক্ষ্ন ছিদ্রগুলো থাকে সেগুলোই ছাকনির কাজ করে। ঠিকঠাক মাপে এই ফিল্টার বানানো মুখের কথা নয়। একশো বছর আগে সব লেদার-ফিল্টারই জার্মানি থেকে তৈরি করিয়ে আনতে হত, অথচ তার কাঁচামাল, মানে চামড়া যেত ইন্ডিয়া থেকে। দাদু দেখলেন, যদি জিনিসটা এখানেই তৈরি করিয়ে নিতে পারেন তাহলে দাম পড়বে অর্ধেক। হিসেবে ভুল ছিল না। লোহুরঙের কারখানায় তৈরি হওয়া ফিল্টার তো একসময়ে উনি রাশিয়ায় এক্সপোর্ট অবধি করেছিলেন।
দাদু যে পরিমাণ সম্পত্তি রেখে গিয়েছিলেন তাতে বাবার আর কিছু করার প্রয়োজন ছিল না। তিনি ছিলেন শিল্পী মানুষ। ব্যবসা জিনিসটা ধাতে সইত না। বাবা তাই সারাজীবন নিজের নানান শখ নিয়ে মেতেছিলেন। সবচেয়ে বড় শখ তো ছিল পেন্টিং। তাছাড়া ফোটোগ্রাফির শখ ছিল। শিকারের শখ ছিল। নানা ধরনের বিদেশি গাড়ি কিনতেন আবার কিছুদিন চালিয়ে বিক্রিও করে দিতেন। একেবারে প্রিন্সের মতন লাইফ-স্টাইল ছিল আমার বাবার।
জানতে পারলাম, অল্প বয়সে আপনি তিনবছর এখানে কাটিয়ে গিয়েছিলেন। কেন জানতে পারি কি? বুধোদা খুব বিনয়ী ভঙ্গিতে প্রশ্ন করল।
মিস সায়গলের মুখটা ম্লান হয়ে গেল। উনি বললেন, খুব হ্যাপি ফ্যামিলি ছিল আমাদের, জানেন মিস্টার মজুমদার! কিন্তু হঠাৎ মাত্র তিনদিনের জ্বরে মা মারা গেলেন। তারপরেই বাবার মাথাটা গোলমাল হয়ে গেল। আমাদের সাসেক্সের ওই বাড়িতে মায়ের শূন্যতা উনি সহ্য করতে পারছিলেন না। তাই আমাকে সঙ্গে নিয়ে উনি এই লোহুরঙের বাংলোয় চলে আসেন। এখানেই পেছনের বাগানে নিজের স্টুডিও বানিয়ে নেন। সারাদিন বাড়ির থেকে সম্পূর্ণ ডিট্যাচড সেই স্টুডিওর মধ্যে দরজা বন্ধ করে ছবি আঁকতেন। মাঝে-মাঝে বন্দুক আর ক্যামেরা নিয়ে জঙ্গলে যেতেন। কখনো খরগোশ টরগোশের মতন ছোটখাটো জন্তু শিকার করে আনতেন ঠিকই তবে বেশিরভাগ সময়েই শিকারের বদলে ক্যামেরায় ছবি নিয়েই ফিরতেন।
ভদ্রমহিলার গলার স্বর আর বলার ভঙ্গি এত সুন্দর যে, আমরা তিনজনেই ওনার কিশোরীবেলার দুঃখের কাহিনির মধ্যে মগ্ন হয়ে গিয়েছিলাম। ডাইনি-টাইনির ব্যাপারে ওনাকে জড়িয়ে যে কিছু ভেবেছিলাম সেটা ভেবেই তখন লজ্জা লাগছিল।
রঘুদা জিগ্যেস করল, আপনার সময় কাটত কীভাবে?
আমার একজন গভার্নেস ছিলেন। তার নাম ছিল শিবানী রায়। আপনাদের মতনই বাঙালি, কলকাতায় বাড়ি ছিল। শিবানীদিদি খুব ভালোবাসতেন আমাকে।
শিবানী রায়ের কথা বলতে গিয়ে মিস সায়গলের মুখে বিষাদের ছায়া পড়ল। হয়তো অনেক পুরোনো স্মৃতি মনে পড়ে গিয়েছিল।
কিছুক্ষণ আমরা সকলেই চুপ করে বসে রইলাম। তারপরে বুধোদা জিগ্যেস করল, তিনবছর বাদে ফিরে গেলেন কেন? কোথায় ফিরলেন?
মিস টিমোথি সায়গল দুদিকে মাথা নাড়লেন। বললেন সেটাও একটা বিটার মেমরি। মনে রাখতে চাই না। তবু এতবছর পরেও আমাকে হন্ট করে বেড়ায়। আমার গভর্নেস, সেই শিবানী রায় মারা গিয়েছিলেন। ন্যাচারাল ডেথ। তখন এদিকে জাঙ্গল-ম্যালেরিয়ায় বহু লোক মারা যেত। শিবানী রায়ের বাড়ির লোকেরা ব্যাপারটা বুঝেছিলেন, তারা কিছু বলেননি। কিন্তু ওই নীচের গ্রামের লোকেরা আমাকে...ভাবতে পারেন...আমাকে ডাইনি বলে দেগে দিয়েছিল। কয়েকদিনের মধ্যেই অবস্থা এমন হল যে, আমি আর বাবা ভয় পেয়ে গেলাম—ওরা হয়তো সুযোগ পেলে আমাকে আগুনে পুড়িয়ে কিংবা পাথর ছুড়ে মেরে ফেলত। আমরা তখন আবার ইংল্যান্ডেই পালালাম।
তারপর?
তিনবছর আগে বাবা মারা গেলেন, অ্যাট দা এজ অফ নাইনটি। ইতিমধ্যে আমরা খুব গরিব হয়ে গিয়েছিলাম। দাদুর রেখে যাওয়া টাকা, তা সে যতই বেশি হোক না কেন, একসময় তো ফুরোত। ফুরিয়েও গিয়েছিল। তাই সাসেক্সের বাড়িটা বিক্রি করে দিয়ে ডাউন-টাউনের একটা ছোট ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে থাকতে শুরু করলাম। বাড়ি বিক্রি করে যে টাকা পেয়েছিলাম তাই দিয়ে কোনোরকমে আমার চলছিল।
এইসময়েই একটা ঘটনা ঘটল।
সেই পঞ্চাশবছর আগে লোহুরঙে থাকার সময়ে বাবা কিছু লাইফ-স্টাডি করেছিলেন। তেলরঙ দিয়ে এঁকেছিলেন এখানকার জঙ্গলের ছোট ছোট জীবজন্তুর ছবি। সেরকম একটা ছবি আমার কাছে এতবছর এমনিই পড়েছিল। সেটা ছিল একটা মনগুজের ছবি। আপনারা মনগুজ-কে কী বলেন?
বেজি।—রঘুদা জলদি উত্তর দিল।
হ্যাঁ, সেই বেজির ছবিটা আমার এক আর্ট লাভার বন্ধুর চোখে পড়ে যায়। তিনি ছবিটা অকল্পনীয় দাম দিয়ে কিনে নেন। উনিই বলেছিলেন ওটা নাকি অমূল্য, ওরকম জীবন্ত ছবি পৃথিবীতে নাকি আর দুটি নেই।
কিন্তু আমি জানতাম, রয়েছে। রয়েছে এই লোহুরঙের বাংলোয়, বাবার তালাবন্ধ স্টুডিওর মধ্যে।
আমি ওগুলো নেবার জন্যেই আবার পঞ্চাশ বছর বাদে ফিরে এলাম। থ্যাঙ্ক গড, আমি খুঁজেও পেয়েছি বাবার সেই ছবিগুলো। এত বছরেও সেগুলো নষ্ট হয়ে যায়নি। এবার হয়তো আমি ওগুলো বিক্রি করে বাকি জীবনটা একটু স্বাচ্ছন্দ্যের মধ্যে কাটাতে পারব।
বুধোদা কাঁধের ব্যাগের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে ভিসুক পাহানের দেওয়া সেই ছবির অ্যালবামটা বার করে সেটাকে সেন্টার-টেবলের ওপর রেখে বলল, এই ছবিগুলোর কথা বলছেন কি?
মিস সায়গল অবাক হয়ে বললেন, একি! এটা আপনার কাছে গেল কেমন করে? এটা তো আমি ওই কাবার্ডের মধ্যে রেখেছিলাম। কথা বলতে বলতেই মিস সায়গল উঠে গিয়ে ঘরের কোনায় রাখা একটা পুরোনো কাঠের কাবার্ডের পাল্লায় চাবি ঢোকাতে গিয়েও থেমে গেলেন। চাবির দরকার ছিল না। পাল্লাদুটো ভেজানো ছিল।
উনি একবার উঁকি দিয়ে কাবার্ডের ভেতরটা দেখলেন। তারপর ঘুরে দাঁড়িয়ে কঠিন গলায় বললেন, দ্যাট স্কাউন্ড্রেল...ভিসুক পাহান। ওই-ই নিশ্চয় এটা চুরি করে নিয়ে গিয়েছিল। ভিসুককে বাড়িতে এন্ট্রির দেওয়াটাই আমার ভুল হয়েছিল। কিন্তু কী করব? গ্রামের সঙ্গে যোগাযোগের একটা মাধ্যম না থাকলে এখানে থাকতাম কেমন করে? ভিসুক ছাড়া আর কারুর তো ডাইনির বাড়িতে পা দেওয়ার সাহস নেই। যাই হোক, জিনিসটা আলটিমেটলি দেখছি, ঠিক লোকের হাতেই পড়েছে। আপনার কী মনে হয় মিস্টার মজুমদার? হাউ মাচ মানি দিস অ্যালবাম ক্যান ফেচ টু মি?
বুধোদা অ্যালবামের কয়েকটা পাতা অন্যমনস্কভাবে ওল্টাতে-ওল্টাতে বলল, দ্যাট ডিপেন্ডস মিস সায়গল। যদি কিছু প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেন, তাহলে এগুলোর দাম অনেক বাড়বে। ছবি যারা কেনেন তাঁরা ছবির সঙ্গে তার ইতিহাসটাও কেনেন কিনা।
মিস সায়গল চিন্তিত মুখে বললেন, যেমন?
যেমন আপনার বাবা যে-সময়ে প্যারিসে ছবি আঁকা শিখতে গিয়েছিলেন, সেই সময়টা ছিল ইওরোপে অ্যাবস্ট্র্যাক্ট পেইন্টিংস-এর যুগ। সুর-রিয়ালিজমের যুগ। অর্থাৎ বস্তু নয়, বস্তুর ভেতরের ভাবটাকে ছবিতে ফুটিয়ে তোলাই ছিল তখনকার ট্রেন্ড। পল ক্লী, ক্যানডনস্কি, সালভাদোর দালি, মন্দ্রিয়ার মতন শিল্পীরা তখন এই ধারায় ছবি এঁকে খ্যাতির মধ্যগগনে। শিল্পের জগতে তখন কেউই রিয়ালিটিকে ফলো করতেন না। তাহলে কোন গুরুর কাছে আপনার বাবা এমন রিয়ালিস্টিক ছবি আঁকা শিখেছিলেন? কেনই বা শিখেছিলেন?
এর উত্তর আমার জানা নেই। আর কিছু?
স্বর্গত প্যারিমোহন সায়গলের অ্যালবামের একটা পাতার ওপরে আঙুল বোলাতে বোলাতে বুধোদা বলল, এই যে মিডিয়ামটার ওপরে ছবিটা আঁকা হয়েছে, এটা কাগজ নয়। ক্যানভাসও নয়। এটা কী?
এর উত্তরও আমার জানা নেই।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বুধোদা অ্যালবামটা বন্ধ করল। তারপর বলল, মিস সায়গল! আমার ভিজিটিং-কার্ডটা দেখলে বুঝবেন, আমি নিছক অ্যান্টিকের ব্যবসায়ী নই। আমি অ্যান্টিক হান্টার। আপনি সাহায্য করলে প্রশ্নের উত্তরগুলো আমি নিজেই খুঁজে বার করতে পারি। করবেন সাহায্য?
না। তীক্ষ্ন গলায় সপাট উত্তরটা চাবুকের মতন ছিটকে এসে পড়ল আমাদের মুখের ওপরে। এক মুহূর্তের জন্যে আমি মিস সায়গলের মুখে হিংস্র এবং উন্মাদ এক জন্তুর মুখের ছায়া দেখলাম। পরক্ষণেই ওনার গলার স্বর আগের মতন মধুর হয়ে গেল। উনি শান্ত গলায় বললেন, না, মিস্টার মজুমদার। আমার বাবা জীবনে অনেক শোক পেয়েছেন। মৃত্যুর পরে ওনার অতীত নিয়ে টানা হেঁচড়া করতে দেওয়ার ইচ্ছে আমার নেই। আপনি বরং ছবিগুলো আমাকে ফিরিয়েই দিন। আমি ইংল্যান্ডে ফিরে ওখানকার আর্ট-ডিলারদের সঙ্গে যোগাযোগ করে যা করার করব।
অ্যাস ইউ উইশ। বুধোদা অ্যালবামটা সেন্টার টেবিলের ওপরে রেখেই উঠে দাঁড়ালো। সঙ্গে সঙ্গে আমরাও।
অত্যন্ত অপ্রাসঙ্গিকভাবে মিস সায়গল জিগ্যেস করলেন, আপনারা আর কতদিন এখানে থাকছেন?
বুধোদা বলল, আমার এই বন্ধু ডাক্তার। ওর একটি ক্রিটিকাল পেশেন্ট রয়েছে ওই নীচের গ্রামে। সেই বাচ্চাটা কেমন থাকে তার ওপরেই ডিপেন্ড করছে আমরা কবে ফিরব সেই ব্যাপারটা।
রঘুদা দেখলাম এই কথা শুনে হাঁ করে বুধোদার মুখের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। টুসাই-কে একটু আগেই নিজের চোখে গাছে উঠতে দেখে এসেছে কিনা। আমি রঘুদার হাতে টান দিয়ে বললাম, চলো, বেরোই।
বেরোতে গিয়েও বুধোদা হঠাৎ দরজার কাছে দাঁড়িয়ে পড়ল। সরাসরি মিস সায়গলের চোখে চোখ রেখে বলল, আরেকটা কথা। ভিসুক পাহানকে গত আঠেরো তারিখ থেকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ওর ব্যাপারে কিছু জানেন?
মিস সায়গল বললেন, তাই নাকি? চিন্তায় ফেললেন তো। ভালো করে দেখতে হবে ঘর থেকে আরও কিছু দামি জিনিস হারিয়েছে কিনা। বদমাশটা নিশ্চয় চোরাই মাল বিক্রি করে কোথাও ফুর্তি করছে।
তাই হবে। বুধোদা একটা ছোট্ট শ্রাগ করে দরজা খুলে বাইরে বেরোল। পেছন পেছন আমি আর রঘুদা। আমাদের পেছনে বাংলোর দরজা বন্ধ হয়ে গেল। তিন ধাপ সিঁড়ি বেয়ে আমরা বারান্দা থেকে বাগানে নেমে এলাম।
এই প্রথম ভালো করে চারিদিকে তাকিয়ে দেখলাম। টিলার মাথার কাছে প্রায় দু-বিঘে জমিকে সমতল করে তার ওপরে তৈরি হয়েছে এই বাংলো আর বাংলোকে ঘিরে গোল বাগান। বাগানে এককালে নিশ্চয় ফুলগাছ ছিল। এখন আর নেই। তবে ফলের গাছ অঢেল। চারিদিকের দৃশ্য মন ভরিয়ে দেবার মতন। পূবে তাকালে টুরা নামের সেই নদীটাকে দেখা যাচ্ছে, আসবার পথে যেটা আমরা পেরিয়ে এলাম। এমনকী আমাদের গাড়িটাকেও দেখাচ্ছে যেন নদী থেকে উঠে আসা একটা ছোট কচ্ছপ—বালির ওপরে শুয়ে রোদ পোয়াচ্ছে। চারদিকে জমাট ঢেউয়ের মতন ছড়িয়ে রয়েছে দলমা রেঞ্জ। পাহাড়কে ঢেকে রেখেছে জঙ্গল আর সেই জঙ্গল এখন পাতা ঝরিয়ে অনেকটাই নিঃস্ব।
বুধোদাও কোমরে হাত রেখে চারদিকটা দেখছিল। হঠাৎ কী মনে হতে বলল, চল, একটু পেছনদিকটায় ঘুরে আসি।
চলো!—রঘুদা একপায়ে খাড়া। যে-ডাইনির ভয়ে চার-পাঁচ রাত ঘুমোতে পারেনি, তার হাত থেকে একটু আগে লেবুর শরবত খেয়ে মনে হচ্ছে জীবন ফিরে পেয়েছে। আর আমার তো না যাবার প্রশ্নই নেই। ঘোরার জন্যেই তো এসেছি। আবার পড়াশোনায় ফিরে যাওয়ার আগে যতটা অক্সিজেন বুকে ভরে নিয়ে যেতে পারি ততই আমার ভালো।
বাগানের বেড়ার গা দিয়েই ইটের পায়ে-চলা রাস্তা। সেই রাস্তা ধরে আমরা বাংলোটাকে বেড় দিয়ে পেছনের দিকে চললাম। যেতে যেতেই দেখছিলাম, বাংলোর সবক'টা জানলা আষ্টেপৃষ্ঠে বন্ধ। সেটা অবশ্য অস্বাভাবিক কিছু নয়। যেরকম উত্তুরে হাওয়ার দাপট, তাতে সেটাই বরং স্বাভাবিক।
বাংলোর পেছনে বেশ কিছুটা জায়গা ছেড়ে দিয়ে তারপর একটা একতলা বিশাল ঘর দাঁড়িয়ে রয়েছে। ঘরটা কিন্তু মূল বাড়ির মতন কাঠ আর টিনের তৈরি নয়; ইট সিমেন্টের শক্তপোক্ত স্ট্রাকচার। জানলাগুলো দেয়ালের অনেক উঁচুতে বসানো। চওড়া দরজা লোহার শাটার টেনে বন্ধ করা রয়েছে।
রঘুদা ঘরটার দিকে তাকিয়ে বলল, লেট প্যারিমোহন সায়গলের ছবি আঁকার স্টুডিও।
উঁহু। বুধোদা ঘাড় নাড়ল, এটা তস্য পিতা লেট জানকীনাথ সায়গলের কারখানা ঘর। ওই দ্যাখো।
দেখলাম, বুধোদা যেদিকে আঙুল দেখাচ্ছে সেদিকে দরজার অনেকটা ওপরে প্রমাণ-সাইজের সিমেন্টের অক্ষরে কী যেন লেখা। শ্যাওলা-জমা দেয়ালের গায়ে রঙচটা রোমান হরফগুলো প্রায় মিশে গেছে, তবু একটু চেষ্টা করতেই পড়তে পারলাম—'লুধিয়ানা লেদার ইন্ডাস্ট্রি'। তার মানে বুধোদা ঠিকই বলেছে। এটা আদতে সেই লেদার-ফিল্টার বানানোর কারখানাই ছিল। পঞ্চাশ বছর আগে মিস সায়গলের বাবার হাতে স্টুডিওয় বদলে গিয়েছে।
আমরা তিনজন পায়ে পায়ে ঘরটার দিকে এগিয়ে গেলাম। তারপর ঘরটাকে একটা বেড় দিয়ে চলে গেলাম পেছনদিকটায়। মুখে কেউ কিছু না বললেও তিনজনেরই যে মনের ইচ্ছেটা এক ছিল তা বুঝতে পারছিলাম। সেটা আর কিছুই নয়, একবার ঘরের ভেতরটায় ঢোকার ইচ্ছে। কিন্তু কোথাওই সেরকম কোনো ফাঁকফোঁকর দেখতে পাচ্ছিলাম না।
ঘরটার পেছনেই বাগানের এদিকের শেষ সীমানা। ওখান থেকেই পাহাড়ের ঢাল প্রায় আটশো ফিট নেমে গিয়ে মিশেছে লোহুরং গ্রামের রাস্তায় আর সেই ঢালের গায়েই ধসে পড়া লাল কাঁকরের ক্ষতচিহ্ন। এই সবই আমরা বাউন্ডারির তারের বেড়ার পাশে দাঁড়িয়ে দেখতে পাচ্ছিলাম।
হঠাৎ আমাদের অবাক করে দিয়ে ওই ঢাল বেয়েই উঠে এল একটা মেয়ে। প্রথমে দেখতে পেলাম কোঁকড়া-কোঁকড়া চুলে ভর্তি মাথা। তারপর কপাল, চোখ, মুখ। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই আস্ত মেয়েটা তারের বেড়ার ওপাশে এসে দাঁড়াল।
মেয়েটাকে দেখে মনে হল ক্লাস এইট কি নাইনে পড়ে। মানে হয়তো চোদ্দো কি পনেরো বছর বয়স। রোগা, ফরসা, বড়বড় চোখ আর একটু বোঁচা নাক। একটা নীল ডেনিম আর হাতা গোটানো সাদা শার্ট পরে রয়েছে। কাঁধে ঝুলছে নীল ক্যানভাসের মেসেঞ্জার ব্যাগ। দেখলাম, ওর নাকের ডগায় চড়াই ভাঙার পরিশ্রমে গুড়িগুড়ি ঘামের ফোঁটা জমে রয়েছে। অল্প অল্প হাঁফাচ্ছিলও মেয়েটা। তবে মানতেই হবে, শক্তপোক্ত হেলথ। ঠিক দুবার লম্বা শ্বাস নিয়েই ফিট হয়ে গেল। বেড়ার একটা আলগা অংশ একহাতে তুলে ধরে, তার নীচ দিয়ে স্মার্টলি এদিকে গলে এসে, অল্প হেসে বলল, আমার পুরো নাম সপ্তদ্বীপা রায়। সবাই অবশ্য দীপা বলেই ডাকে। আপনারা?
মেয়েটা যখন হাসল, তখন দেখলাম ওর ক্যানাইন টিথ দুটো একটু উঁচু। যাকে বলে গজদন্ত। আর সেইজন্যেই বোধহয় ওর হাসিটা আমার চেনা অন্য সব মেয়ের চেয়ে অন্যরকম। অন্যরকমের ভালো।
সপ্তদ্বীপার আত্মপরিচয় দেওয়ার ধরন দেখে বুধোদাও হেসে ফেলল। ওকে নকল করে বলল, আমার পুরো নাম বোধিসত্ত্ব মজুমদার। সবাই অবশ্য বুধো বলেই ডাকে। তুমি বুধোদা বলতে পারো। ইনি রঘুনাথ দ্বিবেদী, এ হচ্ছে মাল্যবান মিত্র। ডাকনাম রুবিক। আমরা মিস সায়গলের কাছে কয়েকটা ছবির ব্যাপারে কিছু জানতে এসেছিলাম। তুমি কোথায় থাক? বেড়াতে এসেছ?
দীপা তার কাঁধের মেসেঞ্জার ব্যাগের মধ্যে হাত গলিয়ে তিনটে বেশ বড়সড় পাকা আতা বার করে আমাদের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, খান, খুব মিষ্টি।
বুঝলাম আতা সংগ্রহেই বেরিয়েছিল মেয়েটা।
আমরা ফেরার পথ ধরেছিলাম। আমাদের পাশে পাশে হাঁটতে হাঁটতে সপ্তদ্বীপা বুধোদার প্রশ্নের উত্তর দিল,—না, ঠিক বেড়াতে আসিনি। মোতিদিদাকে আগলাতে এসেছি।
বুধোদা দীপার কথায় হো হো করে হেসে উঠল। বলল, ভেরি সুইট, ভেরি ইনটেলিজেন্ট। টিমোথি হেবার্ড থেকে মোতিদিদা। সপ্তদ্বীপা রায়! তুমি শিবানী রায়ের কে হও?
নাতনি। যাকে আমাদের বাংলার টিচার রঞ্জনা-ম্যাম বলেন, দৌহিত্রী। মানে মেয়ের মেয়ে।
বুধোদা একটু আগে চোখটোখ কুঁচকে কী ভাবছিল। সেটা মুহূর্তের মধ্যে আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল। টিমোথি সায়গলের বাড়িতে এক বাঙালি মেয়ের উপস্থিতির কারণ। তবে টিমোথির গভর্নেস শিবানী রায়, যিনি পঞ্চাশ বছর আগে জাঙ্গল ম্যালেরিয়ায় এই লোহুরঙের বাংলোবাড়িতেই মারা গিয়েছিলেন, তাঁর সঙ্গে সপ্তদ্বীপা রায়কে আমাদের দুজনের মধ্যে কেউই মেলাতে পারিনি। বুধোদা পেরেছে।
হাঁটতে হাঁটতে আমরা বাংলোর কাছাকাছি চলে এসেছিলাম। বুধোদা হঠাৎ একজায়গায় দাঁড়িয়ে পড়ল। ওখানে বাগানের রাস্তার একপাশে একটা বড় চ্যাটালো পাথর পড়েছিল। বোঝাই যায়, পুরো জমিটাকে চৌরস করার সময় ইচ্ছে করেই পাথরটাকে সরানো হয়নি, যাতে ওটাকে একটা ন্যাচরাল বেঞ্চের মতন ব্যবহার করা যায়। সেই পাথরটার ওপর বসে বুধোদা বলল, দীপা, তুমি আমার পাশে একটু বোসো। রঘু, রুবিক তোরাও আয়। দীপা তোমার কাছে আমার কয়েকটা প্রশ্ন আছে।
দীপা বুধোদার পাশে বসল। রঘুদাও। আমি দাঁড়িয়ে রইলাম। বুধোদা দীপার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, তার মানে তোমাদের ফ্যামিলির সঙ্গে সায়গল ফ্যামিলির এতগুলো বছর ধরে যোগাযোগ রয়ে গেছে, তাই না? তুমি জন্মানোর আগেও সেই যোগাযোগ ছিল। ইনিশিয়েটিভটা কার দীপা?
দীপা বলল, মোতিদিদার। ওনার মনের মধ্যে আমার দিদার মৃত্যুর জন্যে একটা গিলটি-ফিলিং রয়ে গেছে। দিদা যখন মারা যান তখন দিদার বয়স ছিল মাত্র আঠাশবছর আর আমার মায়ের পাঁচ। দাদু তার তিন-বছর আগে মারা গিয়েছিলেন। অভাবে পড়ে নিজের একমাত্র মেয়েটাকে তার পিসির কাছে রেখে এই লোহুরঙে গভর্নেসের চাকরি করতে এসেছিলেন দিদা।
সেই থেকে যতদিন না মা নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছেন ততদিন মোতিদিদা প্রতিমাসে মায়ের জন্যে বিদেশ থেকে টাকা পাঠিয়েছেন। মায়ের বিয়ের সময় উনি শেষবারের জন্যে কলকাতায় এসেছিলেন। আমি বড় হওয়ার পর থেকে উনি আমার সঙ্গেও রেগুলার ই-মেলে, স্কাইপে যোগাযোগ রেখে চলেছেন। ভীষণ ভালোবাসেন আমাকে। আমিও ওনাকে ভালোবাসি।
দাঁড়াও। বুধোদা হাত তুলে দীপার কথার তোড় থামালো। তারপর জিগ্যেস করল, 'গিলটি-ফিলিংস' কেন?
আমার দিদার মৃত্যু স্বাভাবিক ছিল না।
জাঙ্গল ম্যালেরিয়ায় মারা যাননি উনি?
মোস্ট প্রোব্যাবলি, না।
তাহলে?
ব্যাপারটা শুনলে হয়তো আমাকে পাগল ভাববেন। তবুও বলেই ফেলি। আসলে এখানে আমার বড্ড একলা লাগছে, বড্ড ভয় করছে। আপনাদের বললে আপনারা যদি একটু আমার পাশে দাঁড়ান।
দেখলাম, সপ্তদ্বীপার ঝলমলে মুখটায় সত্যিকারেই ভয়ের ছায়া পড়েছে। বুধোদা ওর আংটি-আংটি চুলে ভর্তি মাথার পেছনে হাত রেখে বলল, বলে ফেল দীপা। তারপর আমিও তোমাকে বলব আমাদের ভয়ের কথা।
দীপা হাসল।
দীপা বলল, আপনাকে একটু আগে যা বলেছিলাম বুধোদা, সেটা পুরোপুরি সত্যি নয়। আমি এখানে মোতিদিদাকে আগলাতে আসিনি। আমি নিবেদিতা গার্লস স্কুলের ক্লাস নাইনে পড়া একটা মেয়ে, আমার কি ক্ষমতা আছে ওনাকে আগলাব? আমার এখানে আসার পেছনে অন্য একটা উদ্দেশ্য রয়েছে।
পঞ্চাশ বছর আগে যখন দিদার মৃত্যুর খবর কলকাতায় পৌঁছেছিল, তখন আমার দিদার এক ভাই এসেছিলেন দিদার মৃতদেহের সৎকার করতে। তিনি এখনো বেঁচে আছেন, তাকে আমি মামাদাদু বলে ডাকি।
এমনিতে মামাদাদু তখন ছিলেন কাঠ বেকার, অপদার্থ। কিন্তু সেবার তিনি এই লোহুরং থেকে এত ক্যাশ টাকা নিয়ে বাড়ি ফিরলেন যে, তাই দিয়ে বাগবাজারের মোড়ে একটা জমকালো শাড়ি-কাপড়ের দোকান খুলে ফেললেন। এখনো সেই দোকান সেইখানেই রয়েছে।
বটে? কথা যাতে পাঁচকান না হয় তার জন্যে ঘুষ? তারপর...? বুধোদার গলাটা কেমন শুকিয়ে গেছে।
এমনিতে মামাদাদু আমার বা মায়ের সঙ্গে কোনোদিনই সম্পর্ক রাখেননি, যদিও তাঁর বাড়ি ছিল আমাদের বাড়ির খুব কাছেই। কিন্তু রিসেন্টলি সেই দাদুর মাথাখারাপের মতন হয়ে গেছে। এখনকার কোনো ঘটনা মনে রাখতে পারেন না, কোনো লোককে চিনতে পারেন না। কিন্তু চল্লিশ বছর আগে কোন বন্ধুর বিয়েতে কী খাইয়েছিল দিব্যি গড়গড় করে বলে যান। মাথা খারাপ হয়ে যাওয়ার পর থেকে আমাকে দেখলেই ভারি খুশি হয়ে ওঠেন। মাঝে-মাঝে আমাকে শিবু বলে ডাকেন, মানে শিবানী রায়ের ডাকনামে। বুঝতে পারি, দিদার সঙ্গে আমাকে গুলিয়ে ফেলছেন।
মানসিক রুগির ওপরে তো আর রাগ পুষে রাখা যায় না। তাছাড়া উনি আমাকে দিদার ছোটবেলার অনেক গল্প বলেন। আমার খুব ভালো লাগে শুনতে। যে-দিদাকে কখনো চোখে দেখিনি, মনে হয় তাকে যেন ওই গল্পগুলোর মধ্যে দিয়ে ছুঁতে পারছি। কিন্তু উনি আজকাল প্রায়ই একটা কথা বলেন, যেটা শুনে আমার গায়ের রক্ত হিম হয়ে যায়।
আমরা তিনজনেই চোখে প্রশ্ন নিয়ে সপ্তদ্বীপার মুখের দিকে চেয়ে রইলাম। ও কিছুক্ষণ মুখ নীচু করে বসে রইল। হয়তো মনে মনে সেই ভয়ঙ্কর কথাটা বলার জন্যে সাহস সঞ্চয় করছিল। তারপর হঠাৎই মুখটা তুলে ও এক নিশ্বাসে কথাটা বলেই ফেলল, মামাদাদু বলেন, আমার দিদা নাকি মারা যাওয়ার পরে কাচ হয়ে গিয়েছিলেন। ম্যালেরিয়ায় মারা গেলে কারুর শরীর কাচের মতন স্বচ্ছ হয়ে যায় না। কখন যায় তাও আমি জানি না। আপনারা জানেন?
এতক্ষণ অনেক রকমের শব্দ ভেসে বেড়াচ্ছিল চারিদিকে। পাখির ডাক, শুকনো পাতার মধ্যে দিয়ে উত্তুরে হাওয়ার শনশনানি, নীচের গ্রাম থেকে ভেসে আসা লোকজনের গলার আওয়াজ। হঠাৎই কিছুক্ষণের জন্যে আমার কান থেকে সব শব্দ মুছে গেল। শুধু একটাই কথা আমাকে পাক দিয়ে দিয়ে ঘুরতে লাগল—কাচের মতন স্বচ্ছ...কাচের মতন স্বচ্ছ...
সাড় ফিরল দীপার কথাতে। শুনলাম ও বলছে—মামাদাদুর মাথার গন্ডগোল আছে ঠিকই। হয়তো সেইজন্যে কোনো কোনো ঘটনার কথা বলতে গেলে একটু সময়ের এদিক-ওদিক হয়ে যায়। কিন্তু ওনার গল্পে তথ্যের কোনো ভুল থাকে না। ওনার দূরের স্মৃতি ভয়ঙ্কর ধারালো।
জানেন বুধোদা! তাই এবারে যখন মোতিদিদা আমাকে জানালেন যে উনি লোহুরঙে আসছেন, আমি আর কৌতূহল সামলাতে পারলাম না। বায়না ধরে ওনার সঙ্গে চলে এলাম। দিদা কেমন করে মারা যাওয়ার পরে কাচের পুতুল হয়ে গিয়েছিলেন, সেটা আমাকে খুঁজে বার করতে হবে। করতেই হবে।
সপ্তদ্বীপার এই আশ্চর্য গল্পে প্রথম রিঅ্যাকট করল রঘুদা। বলল, তাহলে ভিসুকের ওই কথাটা মিথ্যে ছিল না? সেই যে, ও বলেছিল, পঞ্চাশ বছর আগে ডাইনি আরেকটা মেয়েকে কাচের পুতুল বানিয়ে দিয়েছিল।
দীপা বলল, হ্যাঁ, আমিও শুনেছি।
কী শুনেছ? কোথায় শুনেছ? রঘুদা জিগ্যেস করল।
সেদিন যখন ভিসুক পাহানের ডেডবডি এই টিলার নীচে পড়েছিল, তখন ওকে ঘিরে যে ভিড়টা জমেছিল তার মধ্যে আমিও ছিলাম। আপনি আমাকে খেয়াল করেননি, কিন্তু এটা নিশ্চয় শুনেছিলেন, ভিলেজার্স-রা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করছে যে, ডাইনিবুড়ি পঞ্চাশ বছর আগে আরেকটা মেয়েকে ঠিক এইভাবে মেরে কাচের পুতুল বানিয়ে দিয়েছিল। সেই মেয়েটিই ছিলেন আমার দিদা। বাই দা ওয়ে, ওরা ডাইনি বলছিল কাকে? মোতিদিদাকে?
রঘুদা অপ্রস্তুত মুখে বলল, ওসব নিয়ে ভেব না। এরা যাকে-তাকে যখন তখন ডাইনি বানিয়ে দেয়। সমস্যাটা অন্যজায়গায়। আমরা তো ভেবে নিয়েছিলাম যে, পঞ্চাশ বছর আগেই হোক বা এই সেদিনই, কাচের মানুষ মানে আসলে কাচের পুতুল। কিন্তু তুমি যা বলছ তাতে তো আবার সেই অলৌকিকের দিকেই ব্যাপারটা মোড় নিচ্ছে। যিনি নিজের হাতে শিবানী রায়ের সৎকার করেছিলেন, তিনিই যদি তোমাকে বলে থাকেন যে শিবানী রায়ের মৃতদেহ কাচ হয়ে গিয়েছিল, তাহলে তো আর কিছু বলার থাকে না।
বুধোদা বলল, দীপা, তুমি তো গত দশদিন এখানে মিস টিমোথি সায়গলের সঙ্গে রয়েছ। যে রহস্যের সন্ধানে এসেছিলে তার কোনো সূত্র পেলে?
না। তবে এমন একটা জিনিস পেয়েছি, যেটার সঙ্গে হয়তো এর কোনো রিলেশনসিপ থাকতেও পারে। এই বলে দীপা তার ব্যাগের মধ্যে হাত গলিয়ে একটা কাচের তৈরি কুকুর বার করে বুধোদার হাতে দিল। কুকুরটা খুব ছোট, একটা খরগোশের মতন সাইজ হবে। ছুঁচলো মুখ, বেঁটে বেঁটে পা। স্ট্যাচুটা দেখে মনে হচ্ছিল সারা গা বুরুশকুচির মতন ছোট ছোট লোমে ঢাকা ছিল এবং অদ্ভুত ব্যাপার—গলা ঘিরে এখনো ওই রকম ঘন চকোলেট রঙের কুচি কুচি লোম লেগে রয়েছে। যেন কাচের কুকুরটার গলায় একটা লোমের বকলশ পরানো রয়েছে।
বুধোদার মতন কঠিন ধাতের মানুষের মুখটাও কুকুরটাকে হাতে নিয়েই কেমন যেন বিকৃত হয়ে উঠল। আমরা তিনজনেই পরিষ্কার বুঝতে পারছিলাম, ওটা কাচের তৈরি কুকুর নয়। ওটা আসলে একটা মরা কুকুর, যার শরীরটা কাচে বদলে গিয়েছে। নাহলে ওর স্বচ্ছ চামড়ার ভেতর দিয়ে কাচের তৈরি হার্ট, কাচের লাং, কাচের সরু পাইপের মতন প্যাঁচানো-প্যাঁচানো ডাইজেস্টিভ ক্যানাল সব দেখা যাবে কেন? কোন শিল্পীর দায় পড়েছে অত পরিশ্রম করে পুতুলের ভেতরের দেহাংশগুলো বানাবার?
ওটা দেখেই রঘুদার মুখে সেই পুরোনো ছাইয়ের মতন রং আবার ফিরে এল। রঘুদা কোনোরকমে বলল, ভিসুকের মৃতদেহটাও ঠিক এইরকম ছিল, জানো।
বুধোদা দীপার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, ইনক্রেডিবল। কোথায় পেলে এটা?
দীপা বলল, যেদিন ভিসুক পাহান মারা গেল, সেদিন আমাদের বাংলোয় সকাল থেকে একফোঁটা জল ছিল না। মোতিদিদার বাড়িতে জল আসে এই টিলার মাথায় একটা ছোট্ট ঝোরা থেকে। ঝোরার সরু জলের ধারা প্রথমে ওই স্টুডিওঘরের মেঝের নীচে একটা বিশাল ট্যাঙ্কের মধ্যে জমা হয়। তারপর সেখান থেকে পাইপের মধ্যে দিয়ে বাংলোয় পৌঁছয়। বাড়তি জল একটা ড্রেন দিয়ে টিলার নীচে বয়ে যায়, গ্রামের লোকেরা সেই জল ইউস করে। যখন স্টুডিওঘরে কারখানা ছিল, তখন থেকেই এইরকম সিস্টেম। আমি এতসব জানতাম না। সেদিন মোতিদিদাই আমার হাতে স্টুডিওঘরের চাবি দিয়ে বললেন, একবার ট্যাঙ্কটায় উঁকি দিয়ে দেখে আয় তো দীপা, জল আছে না নেই?
বুধোদা প্রশ্ন করল, তুমি ওই ঘরে ঢুকেছিলে?
ঢুকেছিলাম, ওই একবারই। তবে বেশিক্ষণ থাকতে পারিনি। ভীষণ ভয় করছিল।
কেন? ভয় করছিল কেন?
কি জানি, ঠিক বুঝিয়ে বলতে পারব না। ঘরটা পুরোপুরি অন্ধকার হলে হয়তো ভয় করত না। কিন্তু সেরকম অন্ধকার তো ছিল না। জানলা-টানলা সব চেপে বন্ধ করা ছিল ঠিকই, কিন্তু সেদিনই প্রথম দেখলাম, ওই ঘরের ছাদের ঠিক মাঝখানে একটা বিরাট গোল কাচের স্কাইলাইট রয়েছে। নীচ থেকে দেখা যায় না, কিন্তু রয়েছে। ঠিক যেন একটা ক্যামেরার লেন্স। সেটার মধ্যে দিয়ে অদ্ভুত সবজেটে একটা আলো এসে পড়েছিল মেঝের একটা লোহার প্ল্যাটফর্মের ওপরে। সেটাকে দেখতে আবার অবিকল একটা ডাবল বেড খাটের মতন। খাটের মতোই চারটে পায়া, চারকোনায় মশারি টাঙানোর ছত্রীর মতন চারটে রড। শুধু মশারির বদলে ছত্রীর মাঝখানে একটা স্বচ্ছ পাথরের স্ল্যাব আটকানো রয়েছে। সকালের আলো প্রথমে লেন্সের মধ্যে দিয়ে এসে তারপর ওই পাথরের স্ল্যাবের মধ্যে দিয়ে নানান রঙে ভেঙে গিয়ে খাটের ওপরে এসে পড়েছিল।
কিছুক্ষণ ওইদিকে তাকিয়ে থাকার পরেই আমার মনে হল কেউ যেন খাটটার...স্যরি, লোহার প্ল্যাটফর্মটার ওপরে শুয়ে রয়েছে। কোনো মহিলা। তার খোলা চুল প্ল্যাটফর্মের একদিক দিয়ে মেঝেয় লুটিয়ে পড়েছে। ভালো করে চোখ রগড়ে তাকিয়ে দেখি, কই। কেউ নেই তো।
ওই প্ল্যাটফর্মটার নীচে পাঁজা করে রাখা আছে চৌকো করে কাটা অনেকগুলো মোটা চামড়ার টুকরো। সেইজন্যেই মনে হয় ওটা একটা প্রেস, যার ওপরে মোতিদিদার দাদুর কারখানায় লেদারের ফিল্টার তৈরি হত। কিন্তু তার সঙ্গে ওই লেন্স আর কাচের স্ল্যাবের কী সম্পর্ক থাকতে পারে বুঝতে পারছি না।
তারপর আমি কোনোরকমে সাহস করে এগিয়ে গেলাম ঘরের কোনায় জলের ট্যাঙ্কের মুখের কাছে। আমার সেলফোনের আলোয় ট্যাঙ্কের ঢাকনা তুলে ভেতরে উঁকি মারলাম। সারাক্ষণ মনে হচ্ছিল ট্যাঙ্কের নীচে কেউ বসে আছে। এক্ষুনি সে আমার হাত ধরে আমাকে নীচে টেনে নেবে। যাইহোক, সেসব কিছু হয়নি। পুরোটাই আমার মনের কল্পনা ছিল।
সেদিন সকালে ট্যাঙ্কের ভেতরে জল ছিল না বললেই চলে। তবে ঝোরার জল তিরতির করে খালি ট্যাঙ্কের ভেতরে জমা হচ্ছিল, তার শব্দ পাচ্ছিলাম। বিকেলের মধ্যেই নিশ্চয় আবার ট্যাঙ্ক ভরে গিয়েছিল। কারণ, আমাদের বাংলোর পাইপ-লাইনেও জল ফিরে এসেছিল।
কিন্তু কুকুরটা? বুধোদা জিগ্যেস করল।
দীপা বুধোদাকে বলল, বলছি, দাঁড়ান। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে খুব ক্যাজুয়ালি বলল, রুবিকদা, একটু জল খাওয়াও না। আমার ব্যাকপ্যাকের সাইড-পাউচে জলের বোতলটা ও দেখতে পেয়েছিল। আমি তাড়াতাড়ি বোতলটা ওর হাতে ধরিয়ে দিতেই ও এক নিশ্বাসে অনেকখানি জল খেয়ে, হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে ঠোঁট মুছে বলল, থ্যাঙ্কইউ।
তারপর আবার শুরু করল।
রাউন্ড স্কাইলাইটের মধ্যে দিয়ে যে অদ্ভুত সবজেটে আলোটা ঘরে ঢুকেছিল, তার তেজ সবচেয়ে বেশি ছিল ঘরের মাঝখানে। প্রায় দিনের আলোর মতোই। তারপর আলো কমতে কমতে দেয়ালগুলোর লাগোয়া অংশে আর আলো বলতে কিছুই প্রায় ছিল না। ঘর থেকে বেরোতে গিয়েও মাথায় যে কী ভূত চাপল, মনে হল ওই অন্ধকার কোণাগুলো একটু দেখে নিই তো, কিছু পাওয়া যায় কিনা।
ওই দেয়ালের ধারে-ধারেই ডাঁই করে রাখা ছিল মোতিদিদার বাবার আঁকার সরঞ্জাম—ঘুন ধরা ট্রাইপড, রঙের প্যালেট, অজস্র বিদেশি রঙের দোমড়ানো মোচড়ানো টিউব আর গুটিয়ে রাখা ক্যানভাস। একটা মরচে ধরা বড় লোহার বাক্সের মধ্যে দেখলাম অন্তত কুড়িটা পুরোনো আমলের ক্যামেরা। আর এক জায়গায় ওই স্কাইলাইটের লেন্সটার মতন বড় বড় লেন্স, তার মধ্যে অনেকগুলোই ক্র্যাক করে গেছে। সেলফোনের আলোয় এক এক করে জিনিসগুলো দেখতে দেখতে যাচ্ছিলাম। হঠাৎই এক জায়গায় একটা বড় চটের বস্তার কাছে এই কুকুরটাকে পড়ে থাকতে দেখে কুড়িয়ে নিলাম।
বস্তাটা এত বছরের জলে হাওয়ায় পচে গিয়েছিল। ছিঁড়ে গিয়েছিল। ওরকমই একটা ছেঁড়া ফুটোর মধ্যে দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এসেছিল এই স্ট্যাচু-টা। আমার খুব ভয় করছিল, তবু একহাতে সেলফোন ধরে অন্য হাত দিয়ে বস্তার মুখটা ফাঁক করলাম। করতেই ভেতর থেকে একগাদা কাচের পুতুল মেঝের ওপরে ছড়িয়ে পড়ল। সবই ছোটখাটো জন্তুর কাচের রেপ্লিকা—ইঁদুর, ব্যাঙ, বেজি। পাখিও ছিল কয়েকটা। সবচেয়ে বড় জন্তু বলতে একটা খ্যাঁকশেয়াল। সবক'টাই রেপ্লিকা, কিন্তু মৃতপ্রাণীর রেপ্লিকা। সবারই চোখ বন্ধ, দাঁত বেরিয়ে এসেছে, একেকটা জন্তুর ঘাড় বেঁকে রয়েছে একেক দিকে।
সেলফোনের জোরালো আলোয় পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিলাম ওদের পেটের ভেতরের কাচের নাড়িভুড়ি। এত গা গুলিয়ে উঠেছিল যে কী বলব। তবু এই কুকুরটাকে হাতছাড়া করলাম না। কেন জানেন? আমি একে চিনি, এর ছবি দেখেছি। মোতিদিদার ঘরের দেয়ালে একটা ফ্রেমে বাঁধিয়ে টাঙানো রয়েছে ওর ছবি। ওই অ্যালবামের ছবিগুলোর মতন রঙিন আর মরা ছবি নয়, ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইটে জ্যান্ত ছবি। সেই ছবিতে ওর চোখ জ্বলজ্বল করছে, জিভ লকলক করছে, ছোট্ট ল্যাজটা যতটা পারে উঁচিয়ে রেখেছে।
ওটা ক্যামেরায় তোলা ছবি। মোতিদিদার বাবা তুলেছিলেন। ওই কুকুরটা ছিল মোতিদিদার পোষা কুকুর। ওর নাম ছিল জিজো।
জিজোকে ব্যাগের মধ্যে লুকিয়ে নিয়ে বেরিয়ে এলাম। সামনের দরজার শাটার টেনে, তালা দিয়ে, বাংলোয় ফিরতে না ফিরতেই দেখি মোতিদিদা আমার অপেক্ষায় সিঁড়ির মুখে রুদ্রমূর্তিতে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। আমাকে দেখেই সে কী বকুনি! কোথায় ছিলে এতক্ষণ? তোমার ট্রাউজার্সের হাঁটুতে এত কাদা কেন? সারা জামায় কী করে এত ধুলো মেখেছ? তোমাকে একটাই ছোট কাজ দিয়ে পাঠিয়েছিলাম, তুমি সেটা না করে এতক্ষণ কী করছিলে ওই ঘরের মধ্যে?
সত্যি বলছি, এতদিনের মধ্যে আমি মোতিদিদার অমন ভয়ঙ্কর রূপ কক্ষনো দেখিনি। উনি তো এমনিতে ভেরি নাইস লেডি। কিন্তু ওই স্টুডিও-ঘরে সময় কাটানোর ব্যাপারে ওনাকে অমন চটে উঠতে দেখেই আমার মনে হল, জিজোকে দ্যাখানো উচিত হবে না। সেই থেকে একে ব্যাগের মধ্যে লুকিয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছি।
বুধোদা কুকুরটাকে দীপার হাতে ফেরত দিয়ে সংক্ষেপে ওকে আমাদের এখানে আসার ইতিহাসটা বুঝিয়ে বলল। তারপর বলল, বুঝতেই পারছ, আমরা একই রহস্যের পেছনে দৌড়চ্ছি। তুমি আমাদের থেকে অনেকটা এগিয়ে গিয়েছ। এবার ব্যাটনটা আমাদের হাতে দিয়ে দাও। কারণ আমার মন বলছে বাকি রাস্তাটায় হার্ডলস অনেক বেশি। দৌড়টা আমরা শেষ করি।
আমি পারব না?
না। তুমি বড্ড ছোট। উইন করব কিন্তু আমরা সবাই, অ্যাস আ টিম। বুধোদা আবার সপ্তদ্বীপার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।
সপ্তদীপা ঠোঁট বাকিয়ে আমার দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, আর উনি আমার থেকে অনেক বড়, না কি? ওর কথা শুনে রঘুদা আর বুধোদা অত্যন্ত বিশ্বাসঘাতকের ভঙ্গিতে হেসে উঠল। আমি চেষ্টা করলাম সপ্তদ্বীপার ওপরে খুব রেগে উঠতে, কিন্তু পারলাম না। এক্ষুনি এই মেয়েটা তার নাইট- অ্যাডভেঞ্চারের যে গল্প শোনাল তাতে আমার সত্যিই মনে হচ্ছিল, আমি যা পারি ও-ও তাই পারে। হয়তো একটু বেশিই পারে।
হাঁটতে হাঁটতে আমরা কখন যেন বাংলোর কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলাম। দেখতে পাচ্ছিলাম, সিঁড়ির মুখে কোমরে হাত রেখে মাথা উঁচু করে মিস টিমোথি সায়গল দাঁড়িয়ে রয়েছেন। দীপা একবার সেদিকে তাকিয়ে বলল, মোতিদিদা আবার খেপে গেছেন মনে হচ্ছে। একটু দাঁড়ান। একটা শেষ কথা বলে দিই আপনাদের। হয়তো এটাও পুরো ব্যাপারটার সঙ্গে রিলেটেড।
আমি আর মোতিদিদা বাড়ির ভেতরের দিকে একটা ঘরে পাশাপাশি দুটো খাটে শুই। আমি অবশ্য বলেছিলাম, আমার দিদা যে-ঘরে শুতেন আমি সেই ঘরেই শোব। কারণ, ওই ঘরটায় এখনো দিদার গল্পের বই, সাজগোজের টেবিল, এমনকী দেয়ালে আমার মায়ের ছোটবেলার একটা ছবি অবধি টাঙানো রয়েছে। কলকাতা ছেড়ে লোহুরঙে চাকরি করতে আসার সময় দিদা ওইসবই কলকাতার বাড়ি থেকে নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু মোতিদিদা আমার কথায় রাজি হলেন না। ওই ঘরটা আসলে যাকে বলে 'অ্যাটিক', মানে চিলেকোঠার ঘর। একটাই মাত্র জানলা আর খুব ঠান্ডা। তাই উনি নিজের ঘরেই আমার শোবার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।
আঠেরো তারিখ রাতে খুব ঠান্ডা পড়েছিল। শীতের চোটে অনেক রাতে আমার ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। আমি ভাবলাম একটা কার্ডিগান গায়ে চাপিয়ে কম্বলের নীচে ঢুকি। তাহলে শীতটা একটু কম লাগবে। কার্ডিগানটা ছিল ঘরের বাইরে করিডরের দেয়ালে বসানো একটা ওয়ার্ডরোবের মধ্যে। ওটা নিতে গিয়েই করিডরের জানলা দিয়ে দেখলাম, ঘন কুয়াশার মধ্যে দিয়ে একটা লণ্ঠনের আলো পাহাড়ের ঢাল বেয়ে উঠে আসছে।
জানলার কাচে মুখ ঠেকিয়ে চিনবার চেষ্টা করলাম, লোকটা কে। কিন্তু ভালো করে কিছু বোঝার আগেই ওই ঢালের মাঝখানে একটা জায়গায় লন্ঠনের আলোটা হারিয়ে গেল। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকেও যখন আর কিছু দেখতে পেলাম না তখন ভাবলাম আমার চোখের ভুল। ঘরে ফিরে শুয়ে পড়লাম।
রঘুদা আমাদের মুখের দিকে আড়চোখে তাকাল। যেন বলতে চাইল, মনে আছে তো? আমি বলেছিলাম, ভিসুক পাহান আঠেরো তারিখ রাতে লণ্ঠন নিয়ে ডাইনি বাংলোর দিকে রওনা দিয়েছিল।
হ্যাঁ, মনে আছে। শুধু ভাবছিলাম, ভিসুক যদি সেই রাতে বাংলো অবধি পৌঁছিয়ে না থাকে, তাহলে মরল কেমন করে? লোহুরঙের ঘাতক কি তাহলে এই বাংলোর বাইরে ছড়িয়ে-থাকা জঙ্গল পাহাড়ের মধ্যে কোথাও গা ঢাকা দিয়ে বসে আছে?
এইসব ভাবতে ভাবতে আমরা আবার হাঁটতে শুরু করেছিলাম। দীপা পেছন থেকে ডাক দিয়ে বলল, না, দাঁড়ান। আরও একটা কথা বলার আছে। ওইদিনই ভোরের দিকে মোতিদিদা একাই কোথাও বেরিয়ে গিয়েছিলেন। ফিরেছিলেন অন্তত ঘণ্টাখানেক পরে। এমন কাজ উনি কখনো করেন না। যখন ফিরেছিলেন তখন ওনার গাউন ঘামে ভিজে গিয়েছে। ওনারও হাতে পায়ে আমার মতন ধুলো। আমি কোনো প্রশ্ন করিনি। মটকা মেরে বিছানায় পড়েছিলাম। আর কিছু বলার নেই।
দীপার কথা ভাবতে ভাবতেই আমরা বাংলোর দিকে এগিয়ে চলেছিলাম। কিন্তু যে-মুহূর্তে বাংলোর দরজার সামনে পৌঁছেছি সেই মুহূর্তেই আমাদের চমকে দিয়ে মিস সায়গল তীক্ষ্ন গলায় বিশুদ্ধ ইংরিজিতে চিৎকার করে উঠলেন। উনি জানতে চাইছিলেন, কার অনুমতি নিয়ে আমরা বাংলোর বাগানে ট্রেসপাস করেছি। কেন আমরা যেখানে সেখানে ঘুরে বেড়াচ্ছি। সর্বোপরি উনি সপ্তদ্বীপার কাছে জানতে চাইছিলেন, এই অভদ্র লোকগুলোর সঙ্গে ওর এত কথা বলার দরকার কী?
বুধোদা হাত তুলে ওনাকে শান্ত করার ভঙ্গিতে বলল, ওয়েল ওয়েল মিস সায়গল। উই আর লিভিং ইয়োর প্লেস জাস্ট নাও। আরও অনেক কিছুই বলল, কিন্তু মিস সায়গল কিছুই শুনতে চাইছিলেন না। মনে হচ্ছিল উনি পাগল হয়ে গিয়েছেন। দীপা ইতিমধ্যে ওর মোতিদিদার কাছে গিয়ে ওনাকে জড়িয়ে ধরে শান্ত করার চেষ্টা করছিল। হঠাৎ আমাদের সবাইকে অবাক করে দিয়ে মিস টিমোথি সায়গল দীপার চুলের মুঠি ধরে এক হ্যাঁচকা টানে ওকে দরজা দিয়ে ঘরের ভেতরে ঢুকিয়ে দিলেন। দীপা যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠল।
হোয়াট দা হেল! বুধোদা রাগে গরগর করে উঠল। রঘুদার ফর্সা মুখটাও লাল টকটকে হয়ে উঠল। আমরা তিনজনেই দৌড়লাম মিস সায়গলের হাত থেকে দীপাকে ছাড়ানোর জন্যে, কিন্তু তার আগেই আমাদের মুখের ওপরে ভারী শালকাঠের দরজা বন্ধ হয়ে গেল। পরিষ্কার শুনতে পেলাম, দীপার কান্নার আওয়াজ ক্ষীণ হতে হতে ওই ডাইনি-বাংলোর খুব ভেতরের কোনো ঘরে মিলিয়ে গেল।
একটুক্ষণ সেই বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে থেকে বুধোদা দাঁতে দাঁত পিষে বলল, আচ্ছা! আমারও নাম বোধিসত্ত্ব মজুমদার। এর শেষ দেখে ছাড়ব। চল রুবিক। চলো রঘুনাথ।
ফেরার পথে ইট-বাঁধানো পাকদণ্ডী রাস্তা ছেড়ে বুধোদা সেই রক্তলাল ধসের মাথার দিকে হাঁটা লাগাল। আমি বললাম, ওদিকে কোথায় চললে বুধোদা?
ওদিক দিয়েই নামব। মনে হয় না ব্যাপারটা খুব একটা কঠিন হবে। একটা মাতাল যদি ওই জমি বেয়ে উঠতে পারে তাহলে আমরাও নামতে পারব।
কিন্তু কেন? লাভ কী? আমি আবারও জিগ্যেস করলাম।
দেখতে হবে না ভিসুক পাহান কোথায় হারিয়ে গেল?
সত্যিই তো। এটা মাথায় ছিল না। মনে মনে জিভ কাটলাম।
ধসে-যাওয়া জমি বেয়ে নামার কাজটা সত্যিই খুব একটা কঠিন হল না। কারণ, ওখানে পাথর বা নুড়ি খুব একটা আলগা ছিল না আর ঢালটাও ছিল ম্যানেজেবল। কিন্তু যে ব্যাপারটা অবাক লাগছিল, সেটা হল, পুরো জায়গাটাতে গাছপালা তো দূরের কথা, একটা ঘাসের কুচি অবধি নেই। তাহলে ভিসুক পাহান সেদিন দীপার চোখের সামনে থেকে ভ্যানিস হয়ে গিয়েছিল কেমন করে? কোথায় লুকিয়েছিল?
তিনজনে প্রায় একসঙ্গেই উত্তরটা খুঁজে পেলাম। বলা ভালো, উত্তরের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়লাম।
একটা টানেল। হ্যাঁ, কংক্রিটে বাঁধানো প্রায় চার ফিট ডায়ামিটারের একটা টানেল। যে বড় পাথরটা দিয়ে ওই টানেলের মুখটা আড়াল করা ছিল সেটাতেই হোঁচট খেয়ে পড়তে পড়তে আমি সামলে নিলাম। আমার ঠিক পেছনেই ছিল বুধোদা আর রঘুদা। ওরাও মাটিতে পা গেঁথে কোনোরকমে দাঁড়িয়ে পড়ল।
বুধোদা বলল, সন্দেহ নেই এই টানেলটার মধ্যেই ঢুকে পড়েছিল ভিসুক। এখন আমাদের কী করণীয়?
বুধোদার সঙ্গে ঘুরে ঘুরে একটা ব্যাপারে আমার বেশ বিশ্বাস জন্মে গিয়েছে—যে-কোনো রহস্যের সমাধানে রাত্রিবেলাটাই সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। সে কালো-অর্কিডের খোঁজই হোক, কিংবা নেকড়ে-মানুষের পিছু নেওয়া। কাজেই বিন্দুমাত্র না ভেবেই বলে দিলাম, আজ রাতে একবার টানেলটার ভেতরে ঢুকলে হয় না বুধোদা?
অবশ্যই। এই না হলে চ্যালা! এই বলে বুধোদা এত জোরে আমার পিঠ চাপড়ে দিল যে, আরেকটু হলে টিলার ঢাল গড়িয়ে পড়ে যাচ্ছিলাম। সেসব খেয়াল না করে বুধোদা বলল, এখন মিস সায়গল নিশ্চয় জানলার ফাঁক-ফোকর দিয়ে চারিদিকে নজর রাখছেন। কাজেই রাত ছাড়া সময় কোথায়? চলো রঘুনাথ। গ্রামে ফিরে নিজেদের হাতে ফুটিয়ে দুটি ডালভাত খাই। পেটে ছুঁচোয় ডন মারছে।
এরপর আমরা তিনজন লোহুরঙ গ্রামে শঙ্কু পাহানের ঘরে দুপুরের আশ্রয় নিলাম। ডালভাত খেতে হয়নি। শঙ্কু আমাদের সম্মানে দেশি মুরগির ঝোল রেঁধেছিল। বুধোদা আর রঘুদা সেই ঝোল আর কুদরিভাজা দিয়ে যতগুলো করে বাজরার রুটি খেল তাতে মনে হল সেই চিকেন-কারির স্বাদ ভালোই হয়েছিল। কিন্তু আমার মুখে কিছুই ভালো লাগছিল না।
আমি শুধু ভাবছিলাম, দীপা কি আজ খেতে পেল, নাকি উপোসেই রইল?
এরকম হাতের মুঠোর মতন বড় বড় তারা শুধু কোনো পাহাড়ি রাত্রির আকাশেই দেখা যায়। এরকম তারা দেখেছিলাম মেঘালয়ের ভ্যালি-অফ- ডেথ-এ। এরকম তারা দেখেছিলাম কুকড়াঝোরা টি-এস্টেটের সমাধিক্ষেত্রের ভেতরে দাঁড়িয়ে। আর আজ সেই একইরকম তারাভরা আকাশ দেখছি লোহুরঙের ডাইনি বাংলোর বাগানে দাঁড়িয়ে।
বুধোদা কিছুতেই কোনো কথা শুনল না। কিছুক্ষণ আগে ও একাই টানেলের মধ্যে ঢুকে পড়ল। ও বলেছিল, বিপদ যদি আসে তাহলে সেটা স্টুডিও-ঘরের বাইরে থেকেই আসবে, ভেতর থেকে নয়। কারণ, ভেতরে কেউ নেই। আর বাইরে থেকে ওই ঘরে ঢুকবার দুটিই মাত্র রাস্তা—এক, ডাইনি-বাংলোর বাগানের দিকে শাটার ফেলা মূল-দরজা। আর দুই, ওই টানেল। কাজেই ও রঘুদাকে দিয়ে গেছে টানেলের মুখ আগলাবার ভার আর আমাকে বাগানের দিকের দরজার।
হ্যাঁ, টানেলটা যে আসলে স্টুডিও-ঘরের মেঝের নীচের জলের ট্যাঙ্ক থেকেই বেরিয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। 'টানেল' বলছি ঠিকই, কিন্তু ওটা আসলে জল বেরোনোর একটা মোটা পাইপ ছাড়া আর কিছুই নয়। ওই পাইপ ধরে উঠে গেলে স্টুডিও-ঘরের জলের ট্যাঙ্কে পৌঁছে যাওয়া যায় আর সেখান থেকে শরীরটাকে চাড় দিয়ে ঘরের মেঝেয় তুলে ফেলা এমন কিছু কঠিন কাজ নয়। বুধোদা এখন সেইভাবেই স্টুডিও-ঘরে ঢুকবার চেষ্টা করছে।
ওর কাজটা সহজ হবে না। একটু ভাবলেই বোঝা যায়, পাইপটা ট্যাঙ্কে মেশার আগে কোথাও একটা বড়সড় ভালব থাকবে; তা না হলে তো সারাক্ষণই পাইপ দিয়ে জল বেরিয়ে যেত। তা তো আর হচ্ছে না। তবে সেই ভালব সরিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ার কোনো ব্যবস্থাও নিশ্চয়ই রয়েছে। ভিসুক সেটা জানত। ওই পথেই ও স্টুডিও-ঘরের ভেতর থেকে কাচের জন্তুদের মৃতদেহ চুরি করতে গিয়েছিল।
ভিসুক যদি পেরে থাকে তাহলে বুধোদাও পারবে। এটাই ছিল বুধোদার যুক্তি। তবে একটা বাড়তি প্রোটেকশন বুধোদা নিয়েছিল। টানেলে ঢোকার আগেই ওর নর্মাল জিন্স আর উলেন সোয়েটারের ওপরে ওয়াটারপ্রূফ জ্যাকেট আর প্যান্ট গলিয়ে নিয়েছিল। ও নিজেই বলেছিল, এই মাঘমাসের ঠান্ডায় ট্যাঙ্ক ভর্তি ঝোরার বরফজল গায়ে লাগিয়ে নিউমোনিয়া বাঁধাবার কোনো ইচ্ছেই ওর নেই।
যাই হোক, আপাতত আমরা তিনজনে কেউই কাউকে দেখতে পাচ্ছি না। রঘুদা বসে আছে টানেলের মুখ আগলিয়ে। বুধোদা টানেলের ভেতর দিয়ে এগিয়ে আসছে স্টুডিও-ঘরের দিকে আর আমি ডাইনি-বাংলোর বাগানের রাস্তা ধরে গুঁড়ি মেরে এগিয়ে যাচ্ছি স্টুডিও-ঘরের দরজাটার দিকে।
গুঁড়ি মেরে এগোতে হচ্ছে মিস সায়গলের ভয়ে। কে জানে, উনি কোথাও থেকে বাগানের দিকে নজর রেখেছেন কিনা। যদিও সেটা খুব কঠিন কাজ। কারণ, এখন আমার সেলফোনে সময় দেখাচ্ছে রাত তিনটে বেজে বাইশ মিনিট। এইসময়ে নজরদারি চালাতে গেলে মিস সায়গলকে সারারাতই জেগে থাকতে হয়। তা কি উনি থাকবেন?
না, মিস সায়গল নন। কিন্তু অন্য একজন জেগে আছে। সে আমাকে দেখেও ফেলেছে।
ডাইনি-বাংলোর ছাদে দুদিক থেকে দুটো চালা উঠে গিয়ে ঠিক যেখানটাতে প্রণামের ভঙ্গিতে মিশেছে সেই মেশার জায়গাটার নীচেই একটা ছোট্ট জানলা আর সেই জানলার পাল্লা খুলে যে দাঁড়িয়ে রয়েছে, এত দূর থেকে তার মুখ দেখতে না পেলেও, চিনতে অসুবিধে হচ্ছে না। দীপা।
দীপা আমাকে হাতের ইশারায় কাছে ডাকল। আমি জানলার নীচে একটা গাছের আড়ালে গিয়ে দাঁড়ালাম। কথা বলা অসম্ভব, কারণ, দীপা যে-জানলায় দাঁড়িয়ে রয়েছে, তার হাইট মাটি থেকে অন্তত পঁচিশ ফিট। কথা বলতে গেলে চেঁচিয়ে বলতে হবে আর এই নিস্তব্ধ রাতে সেই শব্দ যে মিস সায়গলকে ডেকে আনবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
কাজেই ইশারাতেই আমাদের কথাবার্তা চলল। দীপা একটা হাতের কব্জি অন্য হাতের কব্জির ওপরে ক্রশ করে রেখে ইশারায় আমাকে বোঝাল যে, ও বন্দি। আমি হাঁ করে মুখে গাল পোরার ভঙ্গি করে জানতে চাইলাম, খেয়েছ কিছু? ও বুড়ো আঙুল নেড়ে কাচকলা দ্যাখালো।
মিস সায়গল ভয়ঙ্কর চটেছেন দেখছি। নাহলে ফেবারিট নাতনিকে এইভাবে শাস্তি দিতেন না। কী করা যায়?
ভাবতে ভাবতে মনে পড়ে গেল আমার ব্যাকপ্যাকের মধ্যে একটা কাজুবাদামের প্যাকেট রয়েছে। পাহাড়ে যেতে গেলে সঙ্গে কিছু ড্রাই ফুড সবসময়েই রেখে দিতে হয়, সেই হিসেবেই ওটাকে রাখা।
আমি একটু পিছিয়ে গিয়ে স্কাই ক্যাচ তোলার কায়দায় প্যাকেটটাকে নিখুঁত ভাবে দীপার জানলা দিয়ে গলিয়ে দিলাম। দীপা চেষ্টা করেও ক্যাচটা ধরতে পারল না। তবে তাতে অসুবিধে নেই। পরে ঘরের মেঝে থেকে কুড়িয়ে নেবে নিশ্চয়ই। ওর মুখের খুশির হাসি এতদূর থেকেও বুঝতে অসুবিধে হল না আমার।
কিন্তু তারপরে দীপা যে-ইশারাটা করল, সেটা বুঝতে আমার বেশ সময় লাগল। ও নিজের দু-গালে হাত বুলিয়ে কী যেন জিগ্যেস করছিল। কিছুক্ষণ পর বুঝতে পারলাম, ও দাড়িওলা বুধোদার কথা জিগ্যেস করছে। আমি আঙুল দিয়ে স্টুডিওঘরের দিকে দেখাতেই দীপা কয়েক মুহূর্ত পাথরের স্ট্যাচুর মতন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর থেকেই শুধু প্রবলবেগে দু-দিকে মাথা নাড়ছে আর হাতজোড় করে আমাকে বোঝাবার চেষ্টা করছে, যেন বুধোদাকে ওখান থেকে ফিরিয়ে আনি।
কী আর করব? প্রায় দৌড়তে দৌড়তেই গিয়ে দাঁড়ালাম স্টুডিওঘরের তালাবন্ধ শাটারের সামনে। খুঁজেপেতে দেখলাম, দুটো লোহার পাতের মাঝখানে মর্চে ধরে সরু একটা ফাটল তৈরি হয়েছে। সেখানে চোখ লাগিয়ে দেখলাম, মোক্ষম সময়ে এসেছি।
ঠিক তখনই বুধোদা মেঝেয় বসানো একটা ম্যানহোলের ঢাকনা তুলে ঘরের মেঝেতে উঠে এল। তারপর পিঠ থেকে নাইলনের ওয়াটার-প্রূফ ব্যাগটা বার করে তার মধ্যে জ্যাকেট আর প্যান্টটা ভাঁজ করে ঢুকিয়ে রাখল। তারপর ওই ব্যাগ থেকেই একটা জোরালো এল ই ডি টর্চ বার করে এদিক ওদিক ঘুরিয়ে যখন দেখছে তখনই আমি একটা নুড়িপাথর দিয়ে লোহার শাটারের ওপর কয়েকবার আস্তে ঠোকা মারলাম। বুধোদা চমকে দরজার দিকে তাকাল। আমি ফিসফিস করে ডাকলাম, বুধোদা...বুধোদা!
বুধোদা দরজার কাছে এগিয়ে এসে ফাটলটায় চোখ রাখল। বিরক্তসুরে বলল, কী হয়েছে?
দীপা তোমাকে ফিরে যেতে বলছে।
বুধোদার দাঁতের কিড়মিড়ানি স্পষ্ট শুনতে পেলাম। রাগে গরগর করতে করতে বলল, ইয়ার্কি মারছিস নাকি তোরা? কেন, ফিরে যেতে বলছে কেন?
আমি শুকনো গলায় বললাম, সেটা কেমন করে জানব? ওকে তো মিস সায়গল অ্যাটিকে আটকে রেখেছেন। অত দূর থেকে কথা বলতে পারছি না। শুধু ইশারায় দেখাচ্ছে তোমাকে যেন ফিরিয়ে নিয়ে যাই।
বুধোদা বলল, তাই হয় নাকি? এতদূর এগিয়ে এসে ফেরা যায়? শোন রুবিক। তোকে কিছুই করতে হবে না। তুই এই দরজার সামনে বসে থাক। বাংলোর দিকে আর যাবারও দরকার নেই, দীপার সঙ্গে কথা বলবারও দরকার নেই। আমি ঘরটায় কী আছে দেখে নিয়েই বেরিয়ে যাচ্ছি। পনেরো মিনিটের বেশি সময় লাগবে না।
বলেই বুধোদা আবার এমন একটা কর্নারের দিকে চলে গেল যেদিকটায় আমার চোখ পৌঁছচ্ছিল না।
জীবনে এই প্রথমবার বোধহয় আমি বুধোদার কথা অমান্য করলাম। আমি ফিরে গেলাম যেখানে দীপা অপেক্ষা করছে।
আমায় দেখতে পেয়েই দীপা আবার খাঁচায় বন্দি পাখির মতন ছটফট করে উঠল। আমি ঘাড় নেড়ে বোঝালাম বুধোদা রাজি হল না। তারপর ওকে ইশারায় দেখালাম, ও যা ভাবছে, তা একটা কাগজে লিখে নীচে ফেলে দিতে। ও করুণমুখে ঘাড় নাড়ল। তার মানে ওই ঘরে কাগজ কলম কিছুই নেই।
কিছুক্ষণ দুজনেই দুজনের মুখের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।
দীপা দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে, ভুরু কুঁচকে কী যেন ভাবছিল। হঠাৎ এক দৌড়ে চলে গেল ঘরের ভেতরে। একমিনিট কেটে গেল, দু-মিনিট। ও কি আর ফিরবে না?
না, ফিরল। ওর হাতে একটা ছোট বই রয়েছে। ও বইটা তুলে আমাকে ইশারা করল জানলার নীচে এসে দাঁড়াতে। আমি জানলার নীচে গিয়ে দাঁড়াতেই ও বইটা হাত থেকে ছেড়ে দিল। আমিও সেটাকে ক্যাচ লুফে নিলাম।
বইটার মলাটে সেলফোনের আলো ফেলেই চমকে উঠলাম। এ যে আমার খুব চেনা বই। জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই বাবার হাতে এই বইটাকে ঘুরতে দেখছি। বাবার গলায় শুনে শুনে নিজে পড়তে শেখারও আগে এই বইয়ের অনেক কবিতা আমার মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল।
রবি ঠাকুরের ক্ষণিকা।
কিন্তু এই বই নিয়ে এখন আমি কী করব? চোখ তুলে দীপার দিকে তাকালাম। ও হাওয়ায় হাত ঘুরিয়ে পরপর দুটো চার আঁকল। আর কিছু বলবার সময় পেল না। কারণ, আমি নীচ থেকেই দেখতে পেলাম, ওর পেছনে অন্ধকার ঘরে একটা হলুদ আলোর আভা ছড়িয়ে পড়ছে। তার মানে মিস সায়গল দেখতে আসছেন দীপা কী করছে।
দীপা মুহূর্তের মধ্যে জানলা থেকে সরে গেল আর আমিও হাতের মধ্যে ক্ষণিকা বইটা নিয়ে ঝোপঝাড়ের আড়াল দিয়ে দিয়ে চলে গেলাম বাগানের পেছনদিকটায়, যেখানে বাংলো থেকে আমার ওপরে নজর রাখা যাবে না। তারপর মোবাইলের টর্চটা জ্বালিয়ে রেখেই ক্ষণিকার পাতা ওলটাতে শুরু করলাম।
মলাটের পরের পাতাতেই গোটা গোটা হাতের লেখায় লেখা—শ্রীমতি শিবানী রায়। দেখেই বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল। মনে হল, কতবছর আগে একজন আদ্যোপান্ত বাঙালি মহিলা অচেনা পরিবেশে, অচেনা লোকজনের মধ্যে থাকতে এসেছিলেন এরকম কয়েকটা বইকে সম্বল করে। হয়তো ছোটনাগপুর মালভূমির এই রুক্ষ পাহাড়ে ঘেরা বাংলোয়, ওই অ্যাটিকের ঘরে বসে, তিনি এই বইটা থেকেই পড়তেন—
মনে পড়ে সেই আষাঢ়ে
ছেলেবেলা
নালার জলে ভাসিয়েছিলেম
পাতার ভেলা।
বৃষ্টি পড়ে দিবস-রাতি,
ছিল না কেউ খেলার সাথি,
একলা বসে পেতেছিলেম
সাধের খেলা।
নালার জলে ভাসিয়েছিলেম
পাতার ভেলা।।
আর পড়তে পড়তে তার চোখ বেয়ে জল গড়াত। তার মনে পড়ে যেত কতদূরে বাগবাজারের একটা জলজমা রাস্তার ধারে বসে তার পাঁচ বছরের খুকিটি হয়তো সেই মুহূর্তেই রাস্তার জমা জলে কাগজের নৌকো ভাসাচ্ছে।
তিনি আর তার মেয়ের কাছে ফিরতেই পারলেন না। এখানেই কোথায় কোন নদীর বালির নীচে কাচের শরীর নিয়ে শুয়ে রইলেন কে জানে!
কাচের শরীর। শব্দদুটো এক মুহূর্তে কবিতার জগৎ থেকে আমাকে ঘাড় ধরে এক ঠান্ডা হিম মৃত্যুর দেশে ঠেলে ঢুকিয়ে দিল। আমি কেঁপে উঠলাম। হঠাৎই মনে হল, সময় নেই। আর একটুও সময় নেই। দীপা হাওয়ায় পরপর দুটো চার এঁকেছিল। আমি তাই তাড়াতাড়ি পাতা উল্টে পৌঁছে গেলাম ক্ষণিকার ৪৪ নম্বর পাতায়। এই পাতাতেই কি দীপা কোনোভাবে লিখে পাঠিয়েছে বুধোদাকে নিয়ে ওর চিন্তার কারণ?
না তো! ৪৪ আর ৪৫ নম্বর পাতা জুড়ে তো শুধু আমার আরেকটা চেনা কবিতা—বোঝাপড়া।
এটা কিছুই অপূর্ব নয়,
ঘটনা সামান্য খুবই—
শঙ্কা যেথায় করে না কেউ
সেইখানে হয় জাহাজডুবি।
মনেরে তাই কহ যে,
ভালো মন্দ যাহাই আসুক
সত্যেরে লও সহজে।।
কিন্তু এছাড়া আর একটা পেনসিলের আঁচড়ও নেই দুটো পাতার কোনোটায়। তাহলে কি দীপা ইংরিজিতে এইট্টি-এইট বুঝিয়েছিল? দ্রুত পাতা উলটে চলে আসি অষ্টআশি নম্বর পাতায়। উঁহু, সেখানেও তো শুধু পাতাভর্তি ছাপা অক্ষরে আরো একটা প্রিয় কবিতা—'আমি ছেড়েই দিতে রাজি আছি সুসভ্যতার আলোক, আমি চাই না হতে নববঙ্গে নবযুগের চালক। আমি নাই বা গেলেম বিলাত, নাই বা পেলেম রাজার খিলাত, যদি পরজন্মে পাই রে হতে ব্রজের রাখাল-বালক...'
আমি বইটা হাতে নিয়েই উঠে গেলাম স্টুডিও-ঘরের লোহার শাটারের সামনে। সেই ভাঙা ফাটলটায় চোখ লাগিয়ে দেখলাম বুধোদা কী করছে? না, এখনো অবধি তো কোনোরকম বিপদের বি-ও দেখা যাচ্ছে না। বুধোদা কোথা থেকে যেন দুটো প্রমাণ সাইজের ক্যানভাসে আঁকা ছবি খুঁজে বার করেছে। সেই দুটোকে মেঝের ওপরে পেতে, পাশে হাঁটু গেঁড়ে বসে, মন দিয়ে কী যেন দেখছে।
ওকে পেছনদিক থেকে দেখতে পাচ্ছিলাম। ওর শরীরেই ছবিদুটো আড়াল হয়ে ছিল। একটু বাদে বুধোদা ছবিদুটোকে ওখানেই ফেলে রেখে উঠে দাঁড়াল। ওরই হাতের টর্চলাইট থেকে কিছুটা আলো ছিটকে ওর মুখে গিয়ে পড়েছিল। সেই আলোয় দেখতে পেলাম ওর কপালে অনেকগুলো ভাঁজ। বুধোদা কিছু একটা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করছে। কীসের চিন্তা?
বুধোদা হঠাৎ একশো আশি ডিগ্রি ঘুরে মেঝেয় পেতে রাখা ছবিদুটোর ওপরে আলো ফেলল। যেন আরেকবার দেখে নিতে চাইল, যা দেখেছে তা সত্যি কিনা।
এতদূর থেকে ভালো দেখতে পেলাম না। তবে মনে হল দুটো মানুষের মাথা থেকে পা পর্যন্ত সম্পূর্ণ পোর্ট্রেট মেঝের ওপর পড়ে রয়েছে। এরপরেই বুধোদা টর্চ নিভিয়ে দিল। মনে হল ও পায়ে পায়ে এগিয়ে যাচ্ছে ঘরের মাঝখানে ওই লোহার প্ল্যাটফর্মটার দিকে। আমিও ঘরের দিক থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে আবার ক্ষণিকার চুয়াল্লিশ নম্বর পাতা খুললাম।
কিছুই কি আর নেই ওখানে? সপ্তদ্বীপা কি শুধু শুধু এতটা রিস্ক নিয়ে এতটা রাত অবধি জেগে ছিল? আমি আরেকবার খুব খোলা মন নিয়ে আমার সামনে খুলে রাখা পাতাদুটোর দিকে তাকালাম।
না, রয়েছে তো! এত বেশি স্পষ্টভাবে রয়েছে যে, এর আগে দেখতে পাইনি। ছাপা অক্ষর নয়, হাতে লেখা নয়। রয়েছে একটা ফুল। অনেকেই যেমন বইয়ের ভাঁজে ঠাকুরের ফুল রেখে দেয় তেমনই একটা শুকনো নীল অপরাজিতা ফুল চুয়াল্লিশ আর পঁয়তাল্লিশ নম্বর পাতার ভাঁজে গোঁজা রয়েছে। হয়তো পঞ্চাশ বছর আগে শিবানী রায় নিজেই বইয়ের পাতার ভাঁজে ফুলটাকে রেখে দিয়েছিলেন। বছরের পর বছর ওইভাবে থাকতে থাকতে ফুলটা হয়ে গেছে বিবর্ণ, প্রায় সাদা। অপরাজিতার নীল-রং পাপড়িগুলোকে ছেড়ে বইয়ের পাতায় ছড়িয়ে পড়েছে। পাতার ওপরে আঁকা হয়ে গেছে নিখুঁত এক নীল অপরাজিতা।
হঠাৎ আমার মাথার মধ্যে বিদ্যুৎ চমকাল। হঠাৎই আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল ডাইনি-বাংলোর ছবি আর কাচের মৃতদেহের রহস্য, তাদের সম্পর্ক। আমি শাটারের ভাঙা টুকরোর মধ্যে দিয়ে একবার কেবল ভেতরে তাকিয়ে দেখলাম, বুধোদা লোহার প্ল্যাটফর্মটার ওপরে চিৎ হয়ে শুয়ে আছে আর সেই ভারী পাথরের স্ল্যাবটা আস্তে আস্তে নেমে আসছে বুধোদার শরীরের দিকে।
আমি বইটাকে কোনোরকমে আমার ব্যাকপ্যাকের মধ্যে ঢুকিয়ে রেখে, জীবনের সেরা হার্ডল রেস শুরু করলাম। দৌড়ের মধ্যেই টপকে গেলাম বাগানের বেড়া। তারপর সেই রক্তলাল ধসের জায়গাটা ধরে কখনো দৌড়ে কখনো গড়িয়ে নীচে নামতে-নামতেই ডাক দিলাম—রঘুদা। গেট রেডি। আমাদের স্টুডিও ঘরে ঢুকতে হবে। বুধোদা মারা যাচ্ছে। অপরাজিতা ফুলের মতন চাপা পড়ে যাচ্ছে বুধোদা।
রঘুদা আমাকে আগে থেকে চিনত বলেই নিশ্চয় আমাকে পাগল ভাবল না। বরং আমি টানেলের মুখে পৌঁছবার সঙ্গে সঙ্গেই ও নিজের ব্যাকপ্যাকটা কাঁধে তুলে নিয়ে আমার হাত ধরে টানেলের মধ্যে ঢুকে পড়ল।
টানেলের মধ্যে ঢুকেই বুঝতে পারলাম, এই টানেল আর আগের মতন নেই। মৃত টানেল যেন কোনো মন্ত্রের উচ্চারণে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। আমাদের পা ভিজিয়ে দিয়ে বইতে শুরু করেছে ঠান্ডা হিম জলস্রোত। মুহূর্তে মুহূর্তে সেই জলের লেভেল বেড়ে উঠছে। প্রথমে যা ছিল হাঁটুজল, কিছুক্ষণের মধ্যেই তা আমাদের বুক অবধি উঠে এল। তার সঙ্গে শুরু হল থরথর করে কাঁপুনি। কোথাও লুকিয়ে-রাখা একটা বিশাল মেশিন চালু হয়ে গিয়েছিল আর তার দাপটে ভিত-সমেত পুরো স্টুডিও-ঘরটাই থরথর করে কাঁপছিল। ভিত মানে এই টানেল, যেটার মধ্যে দিয়ে আমি আর রঘুদা কোনোরকমে উঠে চলেছি স্টুডিও-ঘরের মেঝের ম্যানহোলের দিকে।
জানি না ঠিক কতক্ষণ লেগেছিল আমাদের ওই দুশো-মিটারের টানেলটুকু পেরোতে। তখন তো মনে হয়েছিল অনন্তকাল। আমাদের সামনে কোনো ভালবের বাধা ছিল না। জলকে বেরোনোর রাস্তা করে দেওয়ার জন্যে ভালব তখন আপনা থেকেই খুলে গিয়েছিল। সেইজন্যে কিছুটা সময় বেঁচেছিল। যাই হোক, ম্যানহোলের মধ্যে থেকে হাতের ভরে স্টুডিও-ঘরের মেঝেয় উঠে এসেই দেখলাম এক অদ্ভুত দৃশ্য।
দেখলাম, বুধোদা আগের মতোই চিৎ হয়ে শুয়ে রয়েছে। সেই স্বচ্ছ পাথরের ভারী ব্লকটা একইভাবে মসৃণগতিতে নেমে আসছে। এখন সেটার সঙ্গে বুধোদার শরীরের ব্যবধান বড়জোর তিন-ফুট। কিন্তু এই সবকিছুর সঙ্গে যোগ হয়েছে একটা আলো। হ্যাঁ। তীব্র সবুজ চোখ-ধাঁধানো একটা আলো ছাদের ওই স্কাইলাইট থেকে নেমে এসে ধুইয়ে দিচ্ছে বুধোদার পুরো শরীর। যেন এক আশ্চর্য সার্জিকাল টেবিলের ওপরে শুয়ে রয়েছে বুধোদা। ওর রক্তহীন মুখ সবুজ আলোয় সবুজ হয়ে গেছে।
বুধোদা কি আর বেঁচে নেই? বুধোদা কি মারা গেছে?
আমি সমস্ত গোপনীয়তার চিন্তায় গুলি মেরে প্রাণপণে চিৎকার করে উঠলাম—বুধোদাআআ! তারপরে ওই স্ল্যাবের নীচে কাঁধ ঢুকিয়ে প্রাণপণে চাড় মেরে ওটাকে ওপরের দিকে ওঠাবার চেষ্টা শুরু করলাম। আমার দেখাদেখি রঘুদাও একইভাবে কাঁধ দিয়ে ভারী স্ল্যাবটার অধোগতি আটকাবার চেষ্টা শুরু করল, কিন্তু বৃথা। কয়েক সেকেন্ড কাটতেই বুঝতে পারলাম, আমরা কিছুই করতে পারছি না। ওই ভারী স্ল্যাব যেমন নামছিল তেমনই নামছে। এখন ওটার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে একটা পোড়া গন্ধ। নতুন রং করা কোনো টিনের পাতকে আগুনের ওপর ধরলে যেমন রং-পোড়ার ঝাঁঝালো গন্ধ ওঠে, সেরকম গন্ধ।
আতঙ্কিত হয়ে দেখলাম, বুধোদার গলা আর মুখের চামড়া থেকে ধোঁয়া উঠছে। আমার গলা কান্না আর রাগে বুজে গিয়েছিল। তবু ওই অবস্থাতেই আবার চিৎকার করে উঠলাম—বুধোদাআআ! যেন আমি চেঁচিয়ে গলা ফাটালেই বুধোদা নেমে আসবে ওই লোহার মৃত্যুশয্যা থেকে।
না, বুধোদা নেমে এলো না ঠিকই। কিন্তু আমার ওই চিৎকারে ওর চোখের পাতাদুটো কাঁপতে কাঁপতে হঠাৎ খুলে গেল। দাঁতের ওপর শক্ত হয়ে বসল দাঁত। মনে হচ্ছিল বুধোদা শরীরের শেষ শক্তি আর চেতনার শেষ বিন্দুটুকু জড়ো করে কী একটা করার চেষ্টা করছে।
কী করার চেষ্টা করছে বুধোদা?
না, কিছু করার চেষ্টা করছে না। কিছু বলবার চেষ্টা করছে। ওর ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে খুব অস্ফুটে দুটো শব্দ বেরিয়ে এল—রুবিক, রুবিক!
স্ল্যাবটার চাপে আমার কাঁধের হাড়গুলো বোধহয় গুঁড়িয়ে যাচ্ছিল। চোখ তুলে দেখলাম, রঘুদার মুখ ঘামে ভেসে যাচ্ছে। ওর মুখেও যন্ত্রণার ছাপ। খুব বেশি হলে আর দশ কি বারো-সেকেন্ড আমরা এই পাথরের ওজনকে ধরে রাখতে পারবো। তারপর আমাদের তিনজনকেই একসঙ্গে পিষে দিয়ে এই বিরাট ওজন নেমে আসবে লোহার বিছানার ওপরে। তার ফলে কী হবে আমি আর ভাবতে পারছিলাম না। কিন্তু আপাতত বুধোদা আবার একটা কিছু বলছে।
কী বলছ বুধোদা? আমি চিৎকার করে বললাম।
রুবিইইইক! জড়ানো গলায় বুধোদা আমাকে ডাকলো। আমি আরেকটু নিচু হয়ে কানটা বুধোদার মুখের কাছে নিয়ে গেলাম।
রুবিক! জিজো...বকলশ...মানে, মানে, ট্যানড লেদার...। সবুজ আলোকে আটকায়...।
বুধোদার চোখদুটো আবার বুজে গেল।
মাথার মধ্যে ফের বিদ্যুৎ খেলে গেল। এক সন্ধেয় দু-বার। বুধোদা ঠিক বলেছে। কোনো সন্দেহ নেই। ট্যানড লেদার জিনিসটা নিশ্চয়ই ওই অদ্ভুত সবুজ আলোকে প্রতিহত করে। আটকে দেয় তার রং শুষে নেওয়ার কাজ।
আমি জানি, বুধোদার মাথায় কোথা থেকে এই চিন্তাটা এসেছে। জিজোর মৃতদেহ থেকে। সেই পোষা কুকুরটার গলায় নিশ্চয় চামড়ার কলার পরানো ছিল। সেইজন্যেই ওর পুরোদস্তুর কাচের মূর্তির গলায় কাচের বদলে লোমের ব্যান্ড। ওই জায়গাটুকুতে সবুজ আলো থাবা বসাতে পারেনি।
আমি কোনোরকমে লোহার প্লাটফর্মের নীচে জড়ো করে রাখা মোটা চামড়ার চাদরগুলোর মধ্যে থেকে একটাকে পা দিয়ে টেনে বার করলাম। পায়ের আউট-স্টেপের একটা জোরালো লাথিতে সেটাকে উড়িয়ে দিলাম হাওয়ায়। তারপর হাওয়াতেই সেটাকে বাঁ-হাতে ক্যাচ লুফে নিয়ে পেতে দিলাম বুধোদার পুরো শরীরের ওপরে।
সঙ্গে সঙ্গে দুটো অদ্ভুত কাণ্ড হল। পাথরের স্ল্যাবটা দ্রুতগতিতে উঠে গিয়ে লোহার চালের গায়ে আটকে গেল। নিভে গেল স্কাইলাইটের অলৌকিক সবুজ আলো। আর এতক্ষণ ধরে যে মেশিন চলার শব্দে ঘরটা থরথর করে কাঁপছিল সেটাও বন্ধ হয়ে গেল।
অন্তহীন নৈঃশব্দ্যের মধ্যে তখন শুধু মেঝের নীচের খালি ট্যাঙ্কের ভেতর তিরতির করে ঝোরার জল পড়ার শব্দ। আবছা অন্ধকারের মধ্যে আমি আর রঘুদা চুপ করে দাঁড়িয়ে তাই শুনছিলাম। আমাদের বুকের থেকে একটা পাথর নেমে গেছে, কারণ জলের শব্দ ছাড়াও আরো একটা শব্দ তখন বেশ পরিষ্কার শুনতে পাচ্ছিলাম। সেটা হল বুধোদার স্বাভাবিক নিশ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ। পোড়া গন্ধটাও আর পাচ্ছিলাম না।
একটু বাদে বাগানের দিকের দরজাটায় চাবি ঘোরানোর আওয়াজ পেলাম। দরজা খুলে গেল। সৌর লন্ঠনের সাদা আলোয় ভরে উঠল ঘর। আলো নিয়ে আমাদের দিকেই এগিয়ে আসছিলেন মিস সায়গল, কিন্তু এক দৌড়ে তাঁকে অনেকটা পেছনে ফেলে বুধোদার মুখের ওপরে ঝুঁকে পড়ল সপ্তদ্বীপা। ঠিক তখনই বুধোদা চোখ খুলে তাকাল। মাথাটা দুদিকে দুবার ঝাঁকিয়েই আস্তে আস্তে পা ঘুরিয়ে নেমে পড়ল লোহার প্ল্যাটফর্ম থেকে।
দীপা দুহাত দিয়ে চোখ থেকে যেটা মুছছিল, সেটাকেই নিশ্চয় ওর বাংলার টিচার রঞ্জনা-ম্যাম 'আনন্দাশ্রু' বলে থাকেন। ওই অবস্থাতেই আমার দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি খুব ভালো চিৎকার করতে পারো রুবিকদা! ভাগ্যিস চেঁচিয়েছিলে। না-হলে মোতিদিদা তো জানতেই পারতেন না, এমন বিপদ হয়ে গেছে।
আমি অবাক হয়ে বললাম, কেন? তুমি ওনাকে বলোনি, আমরা যে এদিকে এসেছি?
ও বলল, না। আমি ভেবেছিলাম, তোমরা রহস্য-টহস্য উদ্ধার করে ঠিকঠাক বেরিয়ে আসতে পারবে। বিশেষ করে যখন জীবন্ত ছবি আর মৃত পুতুলের সম্পর্কটা তোমাকে বুঝিয়েই দিয়েছি।
ওর পাশে পাশে দরজার দিকে এগোতে এগোতে বললাম—আমাকে ...ইয়ে...আমাদের আগে ওই ছবি আর মূর্তির রিলেশনের কথাটা বললে না কেন?
কেমন করে বলব? আমি নিজেই তো ব্যাপারটা ধরতে পারলাম আজ সন্ধেবেলায়, যখন মোতিদিদা অলটারের যিশুমূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন—আরো একটা ছবি আমার গ্যালারিতে জমা হল প্রভু। ভিসুক পাহানের ছবি। নিজে হাতে পাহাড় থেকে গড়িয়ে ফেললাম ভিসুকের মতন একটা গরিব লোকের ডেডবডি। এ পাপ আমি কোথায় রাখব?...এরপর আর কিছু বুঝতে বাকি থাকে, বলো?
তারপর দীপা হঠাৎ আড়চোখে আমার দিকে তাকিয়ে জিগ্যেস করল, আচ্ছা রুবিকদা, তুমি বইয়ের মধ্যে ফুলের ব্যাপারটা ধরতে পেরেছিলে তো?
আমি বললাম, মাল্যবান মিত্র অত বোকা নয়।
উপসংহার
ছাব্বিশে জানুয়ারি সকাল। জামশেদপুর স্টেশনের বাইরে বুধোদার অলিভ গ্রীন এস ইউ ভি পার্ক করে রাখা আছে। আমরা একটু বাদেই বাড়ির দিকে রওনা হব। তার আগে স্টেশনে ঢুকেছি সপ্তদ্বীপা রায়কে সী-অফ করতে। ওর মা-বাবা গতকাল দুপুরেই কলকাতা থেকে চলে এসেছিলেন। রাতটা ওনারা ছিলেন চান্ডিলের একটা হোটেলে, আমরা দুজনে রঘুদার বাড়িতে। তবে সন্ধেটা আমরা সবাই একসঙ্গে রঘুদার বাড়িতে চমৎকার আড্ডা মেরে কাটিয়েছিলাম। আমার জীবনের একটা স্মরণীয় সন্ধ্যা।
বুধোদা ভালো আছে। কাল রাত অবধি ওর গলা আর মুখের চামড়া একটু লাল হয়ে ছিল। রঘুদা একটা সিন্ধুগোলাপ না বসরাই সারস কিসের যেন রস লাগানোর ফলে আজ দেখছি পুরোপুরি সেরে গেছে।
মিস সায়গল কাল রাতের ফ্লাইটেই লন্ডন রওনা হয়ে গিয়েছেন। তার আগে, কাল সকালে, আমরা সবাই মিলে প্যারিমোহন সায়গলের সেই ভয়ঙ্কর ছবির অ্যালবাম আর যত কাচের পুতুল সব টুরা নদীর তীরে দাহ করে এসেছি। ও হ্যাঁ, অ্যালবামের বাইরে দুটো ছবি ছিল। দুটোই পূর্ণবয়স্ক মানুষের ছবি। একটা পঞ্চাশ বছরের পুরোনো ছবি, শিবানী রায়ের। অন্যটার উৎপত্তি হয়েছে এই সেদিন। সেটা ভিসুক পাহানের ছবি। সেই ছবিদুটোকেও আমরা নদীর তীরে সৎকার করেছি। শিবানী রায় আর ভিসুক পাহানের কাচের মূর্তিদুটো তো আগেই তাদের আত্মীয় বন্ধুরা সৎকার করে ফেলেছেন।
'সৎকার' কথাটা বারবার ব্যবহার করছি একটাই কারণে। প্রতিটা ছবিই তো আসলে একটা মৃতদেহের অংশ, যেমন প্রতিটা কাচের পুতুলও মৃতদেহের অংশ। আর মৃতদেহের সৎকারই করা যায়, অন্য কিছু নয়।
প্যারিমোহন সায়গলের আবিষ্কৃত ওই আশ্চর্য লোহার প্ল্যাটফর্মের ওপর ওজন চাপলেই চালু হয়ে যায় বিদ্যুতের সার্কিট। যদি সেই ওজন জীবন্ত কোনো প্রাণীর হয় তাহলে সেই প্রাণীর আর নড়াচড়া করার ক্ষমতা থাকে না। ইতিমধ্যে স্বচ্ছ পাথরের স্ল্যাব তাকে পিষে ফেলতে থাকে আর লেন্সের মধ্যে দিয়ে ছড়িয়ে পড়া অদ্ভুত আলো তার শরীরের সমস্ত রঙিন পিগমেন্টকে নিংড়ে নিয়ে জড়ো করে লোহার বিছানার ওপরে পেতে রাখা মসৃণ চামড়ার চাদরের ওপরে। পড়ে থাকে কাচের মতন বিবর্ণ কঠিন শরীরটুকু, যাকে গতকাল অবধি আমরা সবাই কাচ ভেবেছি।
উন্মাদ বৈজ্ঞানিক কেন যে অমন ভয়ঙ্কর যন্ত্র আবিষ্কার করেছিলেন তা বলতে পারব না। তবে ওই আবিষ্কারের ফলে প্রতিটি জীবন্ত প্রাণীর শরীর থেকে তৈরি হত দুটো জিনিস। একটা রঙিন ছবি আর একটা কাচের মূর্তি।
গতকাল ভোরে, স্টুডিও-ঘর থেকে বেরিয়ে, আমি, বুধোদা, রঘুদা, সপ্তদ্বীপা আর মিস সায়গল—সবাই মিলে মিস সায়গলের ড্রইং-রুমে বসেছিলাম। মিস সায়গল কাঁদছিলেন। দীপা ওনাকে দু-হাতে জড়িয়ে রেখেছিল।
উনি কাঁদছিলেন আর বলছিলেন, আমি তোকে অনেক কষ্ট দিলাম দীপা। কিন্তু বিশ্বাস কর, আমি শুধু চেয়েছিলাম এই কমবয়সি ছেলেগুলো যেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই অভিশপ্ত বাংলো ছেড়ে চলে যায়। আর কিছু না। তুই যতই ওদের সঙ্গে কথা বলতিস, যতই ওদের কাছে খুলে বলতিস তোর নিজের দিদিমার কথা কিংবা কাচের পুতুলের কথা, ততই ওদের রহস্যভেদের রোখ চেপে যেত।
তবু দ্যাখ, আটকাতে তো পারলাম না। যা ভাবছিলাম ঠিক তাই হল।
বুধোদা একবার শুধু জিগ্যেস করেছিল, স্টুডিও-ঘরের ভেতরের ওই মেশিন কেমন করে কাজ করে তা আপনি জানতেন না, তাই না?
আজকের আগে সত্যিই জানতাম না, মিস্টার মজুমদার। বিশ্বাস করুন। পঞ্চাশ বছর আগে লোহুরঙে আমি মহা আতঙ্কে দিন কাটাতাম। প্রথমে আমার প্রিয় কুকুর জিজো ওই ঘরে ঢুকে মরে গেল। তারপর আমার একমাত্র সঙ্গী শিবানীদিদি। কেন যে শিবানীদিদি ওই ঘরে ঢুকেছিল, কে জানে। যাই হোক, এই দুটো মৃত্যু আমাকে পাথর করে দিয়েছিল। তাই গ্রামবাসীরা যখন আমাকে ডাইনি বলে মারতে উঠল তখন সেটা আমার পক্ষে শাপে বর হল। আমি লোহুরঙের নরক থেকে মুক্তি পেলাম।
রঘুদা অনেকক্ষণ ধরে হাতের ওপর থুতনি রেখে কী যেন ভাবছিল। ও এবার বলল, মেশিনের পুরো ওজনটাই ওঠা-নামা করত হাইড্রলিক প্রেসের সাহায্যে। এক একটা মৃত্যু মানে মেঝের নীচের জলের ট্যাঙ্ক থেকে সমস্ত জল বেরিয়ে টানেলের মধ্যে দিয়ে টিলা-র গায়ে ছড়িয়ে যাওয়া। তাই মৃত্যু মানেই ওই ধসের জমি ভিজে লাল হয়ে ওঠা। রক্তের মতন লাল। ওঃ, কী ভয়ঙ্কর!
বুধোদা বলল, আমারও তাই মনে হয়। ওই হাইড্রলিক প্রেস আসলে ছিল মিস সায়গলের দাদু জানকীনাথের লেদার ফিল্টার বানানোর মেশিনের ড্রাইভ। পুরো প্ল্যাটফর্মটাই তাই। এককালে ওর ওপরে চামড়ার শিট রেখে, তাকে চাপ দিয়ে, সাধারণ ফিল্টারই বানানো হত। পরে প্যারিমোহন সায়গল ওটাকে নিজের মতন করে মৃত্যুযন্ত্রে বদলে নেন।
গীতাঞ্জলি এক্সপ্রেস সিটি বাজিয়ে নড়ে উঠতেই আমি অতীত থেকে বর্তমানে ফিরে এলাম।
আমরা তিনজনেই দীপাদের জানলার কাছ থেকে একটু সরে দাঁড়ালাম। আঙ্কল আর আন্টি আমাদের দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে হাত নাড়লেন। আঙ্কল গলা তুলে বললেন, আমাদের বাড়ি আসবেন কিন্তু মিস্টার মজুমদার। আন্টি বললেন, রুবিক, তুমিও এসো। ভুলো না যেন।
আমি দীপাকে লক্ষ করছিলাম। ওর মুখে সেই চেনা হাসিটা নেই। ভীষণ গম্ভীরমুখে উল্টোদিকে তাকিয়ে বসেছিল। হঠাৎ আমার একটা জরুরি কথা মনে পড়ে গেল। আমি চটপট ব্যাগ থেকে ক্ষণিকা বইটা বার করে জানলার কাছে এগিয়ে গেলাম। বললাম, দেখেছ, আর একটু হলেই ভুলে যাচ্ছিলাম। তোমার বইটা যে আমার কাছে থেকে যাচ্ছিল।
দীপা খুব ক্যাজুয়ালি হাত বাড়িয়ে বইটা নিয়ে দু-একটা পাতা উলটিয়েই ওটা ওর ব্যাগের মধ্যে ঢুকিয়ে রাখল। ও আমার দিকে তাকাল না। হাতও নাড়ল না। কিন্তু একটা চাপা হাসি একমুহূর্তের জন্যে ওর ঠোঁটে খেলা করে গেল।
গীতাঞ্জলি এক্সপ্রেস স্পিড তুলে প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে বেরিয়ে গেল। আমি আর বুধোদাও স্টেশন থেকে বেরিয়ে রঘুদাকে টা-টা করে হাইওয়ে ধরলাম। এইসব ফাঁকা জায়গায় বুধোদা আমার হাতে স্টিয়ারিং ছেড়ে দেয়। আমিই চালাচ্ছিলাম। বুধোদা পাশে বসেছিল।
বড় জোর মিনিট পাঁচেক চালাবার পরেই আমার সেলফোনে পিড়িং করে সেই মেসেজটা ঢুকল, যেটার জন্যে এতক্ষণ ওয়েট করছিলাম।
'এই নাকি উত্তরপাড়া গভমেন্ট স্কুলের ফার্স্ট বয়! বইয়ের পাতার মধ্যে মোবাইল-নাম্বার পাঠানো হয়েছে? বিচ্ছু!'
বুধোদা আড়চোখে আমার দিকে তাকাল। বলল, রুবিক, গাড়িটা সাইড করে দাঁড় করা। আমাকে ড্রাইভ করতে দে। লোহুরঙের ডাইনি-বাংলোয় ছবি হওয়ার হাত থেকে সদ্য বেঁচে ফিরলাম। এখন আর অন্যমনস্ক ড্রাইভারের হাতে মরতে একটুও ইচ্ছে করছে না।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন