হনিমুন

জয়দীপ চক্রবর্তী

প্ল্যানটা মূলত তিতিরেরই ছিল। বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক হবার আগে আগেই ও আমাকে বলে রেখেছিল, 'এই শোনো, বিয়ের পরে আমরা একটা দারুণ জায়গায় হনিমুন ট্রিপে যাব।'

আমি একটু কুণ্ঠিত হয়েই জিজ্ঞেস করেছিলাম, 'দারুণ জায়গা মানে?'

সত্যি বলতে কী, আমি মনে মনে বেশ ভয় পেয়েই গিয়েছিলাম। দীর্ঘ লকডাউনে এমনিতেই কোম্পানি টালমাটাল। টুয়েন্টি পার্সেন্ট স্যালারি কমিয়ে দিয়েছিল মাঝখানে। এখন সবে পরিস্থিতি স্বাভাবিকের দিকে এগোচ্ছে। দুম করে তিতির যদি কস্টলি কোনো টুরের প্ল্যান কষতে বসে, আমি গেছি একেবারে। এমনিতেই বিয়ের সময় গুচ্ছের খরচ হবে। আমি মনে মনে হিসেব কষে দেখেছি, ভাড়া বাড়ি আর ক্যাটারিং-এই অন্তত লাখ তিনেক খসবে। তারপর অন্যান্য খরচ খরচা তো আছেই। এমনিতে এত তাড়াতাড়ি বিয়ে থা করার ব্যাপারে আমার বেশ আপত্তিই ছিল। ভেবেছিলাম আরও এক দু-বছর সময় নেব। ততদিনে খানিকটা গুছিয়ে নেওয়া যেত নিজেকে। কিন্তু আমার মা আর মাসির জোরাজুরিতে তিতিরের সঙ্গে বিয়েতে রাজি হতেই হল। সম্বন্ধটা মাসিই এনেছিল। শ্বশুর বাড়ির দিক থেকে তিতিরের মায়ের সঙ্গে কী একটা দূর সম্পর্কের আত্মীয়তা আছে মাসির। মাসি তিতিরের সঙ্গে খুব কায়দা করে আমার আলাপটা করিয়ে দিয়েছিল একটা ফ্যামিলি গেট টুগেদার অ্যারেঞ্জ করে। লক্ষ্য করেছিলাম, তিতির একটু চাপা স্বভাবের। তুমুল হইচই হুল্লোড়ে তার অনীহা। তবু আমার অবিশ্যি তাকে খারাপ লাগেনি। প্রথম প্রথম সপ্তাহে এক আধবার, তারপর প্রায় নিত্যিই দেখা হত আমাদের। তিতির মালটিমিডিয়ার কোর্স করছিল একটা। অফিস ফেরত সন্ধের দিকে ওর ইন্সটিটিউট থেকে ওকে তুলে নিতাম আমি।

তিতির খুব আহ্লাদি মুখ করে বলল, 'এমন একটা জায়গায় যাব, চট করে সেখানে কেউ গিয়ে থাকে না বিয়ের পর...'

মনে মনে প্রমাদ গুনলাম। মেরেছে। তিতির ফরেন ট্রিপ ফিপের কথা ভাবছে নাকি? বছর তিনেক আগে ওর মামার মেয়ের বিয়ে হয়েছে। ওরা সিঙ্গাপুর না কোথায় যেন ঘুরতে গিয়েছিল বিয়ের পর। তিতিরই সে খবর শুনিয়েছিল একদিন আমায় কথার পিঠে। তিতির এইবার না আমার কাছে ইউরোপ ভ্রমণের বায়না করে বসে। ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলাম, 'তেমন কোনো জায়গার কথা ভেবেছ নাকি?'

'উঁহু', তিতির ডান হাত দিয়ে আমার বাঁ-হাত জড়িয়ে নিয়ে আদুরে গলায় বলল, 'সে ভাবনা তো তোমার। আমি শুধু আমার চয়েসটা জানিয়ে রাখলাম। এমন একটা জায়গা খুঁজে রেখ, যেখানে মানুষজন হইহই করবে না সর্বক্ষণ। নিরিবিলি আর সুন্দরী প্রকৃতির মাঝখানে তুমি আর আমি। শপিং করব না, আজ এখানে কাল ওখানে হ্যারিকেন টুর করব না। নির্জন কোনো এক জায়গায় আমি তোমার সঙ্গে, আর তুমি আমার সঙ্গে সময় কাটাব দুটো কি তিনটে দিন।'

'ব্যস?' আমি একটু অবাক হয়েই বলি।

'হ্যাঁ ওইটুকুনিই', তিতির খুব মিষ্টি করে হাসল, 'বড়জোর আমরা যেখানে থাকব তার আশেপাশে একটা নদী থাকতে পারে। মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলে তোমাকে দু-হাতে আঁকড়ে ধরে আমি সেই নদীর শব্দ শুনব।'

আমি তিতিরের কপালে আলতো চুমু খেয়ে বলেছিলাম, 'তুমি তো কবি হয়ে গেলে গো...'

কথাটা শুনেই তিতির কেমন যেন থম মেরে গেল। স্পষ্ট দেখলাম, ওর দু-চোখ যেন টলমল করে উঠল। তিতিরের নরম এবং ভারী বুক দুটো দ্রুত ওঠানামা করল কয়েক বার।

'কী হল?' আমি থতমত খেয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম।

'না না কিছু নয়', মুহূর্তের মধ্যে নিজেকে সামলে নিয়ে দু-হাত দিয়ে আমার গলা জড়িয়ে ধরল তিতির, 'ইয়ার্কি নয়, বলো এমন একটা জায়গায় নিয়ে যাবে আমায় বিয়ের পর?'

'যাব', মাথা নেড়ে নরম গলায় তিতিরকে বললাম, 'নিশ্চয়ই নিয়ে যাব। অমন জায়গা আমার নিজেরও ভারী পছন্দের। বেড়াতে বেরিয়ে ঘোড়ায় জিন লাগিয়ে সারাক্ষণ এ জায়গা ও জায়গা চষে বেড়াতে আমারও একটুও ভালো লাগে না।'

আমার বিয়েটা এমন একটা সময় হল, যেটা খুব সুখের সময় নয়। অমিক্রণের দাপাদাপি কাটিয়ে সবে আমরা সুস্থতার দিকে হাঁটছি তখন। আমি আর একটু সময় নিতে চাইছিলাম। তিতিরের মা-বাবা কিছুতেই আর অপেক্ষা করতে রাজি হলেন না। কী এত তাড়া ছিল তাঁদের কে জানে! আমি তো আর তিতিরকে ছেড়ে অন্য কোনো মেয়েকে পছন্দ করে বসতাম না দুম করে। তিতিরকে কথাটা বলতে গিয়ে এমন একটা শীতল ঔদাসীন্য পেলাম, যে বেশি যুক্তি-তক্কের ইচ্ছেই হল না।

আমাদের বিয়ে হল আড়ম্বর এক্কেবারে বাদ দিয়ে। বলতে গেলে এক প্রকার নম নম করেই। কোভিড বিধির জন্যে খুব বেশি লোককে আমন্ত্রণ জানাতে পারিনি। এমনকী আমার কাছের বন্ধুদেরও সঙ্গে পেলাম না জীবনের এমন একটা গুরুত্বপূর্ণ দিনে। তবু তিতিরের কথাটা আমার মাথায় ছিল। ওর ইচ্ছেটা শুনে তখনই ঠিক করে ফেলেছিলাম ডুয়ার্সে যাব। ডুয়ার্স আমার বড় পছন্দের জায়গা। বার বার যেতে ইচ্ছে করে। তিতির যেমনটি চায়, তেমন জায়গার ওখানে অভাব নেই। জয়ন্তী নদীর কাছে অথবা সুন্তানেখোলার কাছাকাছি কোথাও থেকে যাব ঠিক করলাম মনে মনে। মোবাইল অ্যাপে দেখলাম ট্রেনে টিকিট পেতে অসুবিধে হবে না। আসলে ভয়ে লোকজন তেমন বেরোচ্ছেই না এখনও বাড়ি থেকে। 'জয় মা' বলে আমাদের দুজনের যাওয়া আসার টিকিট বুক করে ফেললাম আমি।

আলিপুরদুয়ারে থাকে অমিত রাহা। গাড়ির ব্যবসা ওর। নিজেও গাড়িতে টুরিস্ট নিয়ে সারা বছর উত্তর-পূর্ব ভারত চষে বেড়ায় ছেলেটা। এর আগে বার দুই ওর গাড়িতে ঘুরেছি আমি। গাড়ি চালানোর হাত চমৎকার। উত্তরবঙ্গের সমস্ত এলাকা হাতের তালুর মতো চেনে। আর স্বভাবটাও এত মিষ্টি যে অমিতকে ভালো না বেসে থাকাই যায় না। অমিতের ফোন নম্বর সেভ করাই ছিল। ওকে ফোনে আমার পরিকল্পনার কথা জানাতে দু-এক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর বলল, 'দাদা, একটা কথা বলব?'

'শিওর', আমি বললাম।

'জয়ন্তী টয়ন্তি বাদ দিন।'

'তাহলে?'

'বউদিকে নিয়ে রঙ্গো চলে যান।'

'রঙ্গো, সেটা কোথায়?' অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, 'এ জায়গাটার নাম তো শুনিনি কখনও!'

'দারুণ জায়গা দাদা। এক্কেবারে নির্জন। লোকজন ওদিকে যায় না বললেই চলে', অমিত বলে চলল, 'জায়গাটা একটু উঁচুতে। ঠান্ডাও খানিক বেশি। কিন্তু সিনিক বিউটি এত ভালো, গেলে আপনাদের চোখ জুড়িয়ে যাবে দেখবেন। রঙ্গো নদীর ঠিক ওপরেই আমার বন্ধুর হোম স্টে। আমি ব্যবস্থা করে দেব। অসুবিধা হবে না। গভীর রাতে ঘুম ভেঙে গেলে রঙ্গোর গান শুনতে পাবেন। দারুণ এক্সপিরিয়েন্স...'

চমকে উঠলাম আমি। তিতির ঠিক এমন আব্দারই তো করেছিল আমার কাছে! অমিতকে বললাম, 'ঠিক আছে। ব্যবস্থা করো। দিন তিনেক থাকব ওখানে।'

'আর কোথাও যাবেন না?' অমিত একটু অবাকই হল।

'উঁহু', আমি বললাম।

'ঠিক আছে দাদা। ব্যবস্থা হয়ে যাবে। আপনি ট্রেন থেকে নামার মিনিট কুড়ি পঁচিশ আগে একবার ফোন করে নেবেন। আমি ট্রেনের সময় জানি। তবু... আমি স্টেশনের বাইরেই গাড়ি নিয়ে ওয়েট করব আপনাদের জন্য।'

'বেশ। তাই হবে,' নিশ্চিন্ত হয়ে ফোন রাখলাম আমি।

চাপরামারি পেরিয়ে যে রাস্তা ধরে এগোচ্ছিলাম, সে পথটা আমার চেনা। অমিতকে বললাম, 'এ তো ঝালং, বিন্দু যাওয়ার পথ হে।'

'হ্যাঁ দাদা, ঠিকই বলেছেন', আমার দিকে মাথা না ঘুরিয়েই বলল অমিত, 'এই রাস্তা দিয়ে খানিক এগোলেই ঝালং, বিন্দু যাওয়ার পথটা ডান দিকে বেরিয়ে যাবে। আমরা যাব তার উলটোদিকে। আরও উঁচুতে।'

'আচ্ছা', বলে তিতিরের দিকে চাইলাম আমি। চাপরামারির জঙ্গলে ঢোকার পর থেকেই দেখছি ও যেন এক্কেবারে চুপ হয়ে গেছে। আমি একটা হাত তিতিরের পিঠের ওপর দিয়ে ছড়িয়ে দিয়ে বললাম, 'কী হল, এক্কেবারে ফিউজ হয়ে গেলে যে!'

'কিছু না' তিতির হাসার চেষ্টা করল। অবিশ্যি তার হাসিটা খুব একটা খেলল না। ওকে কেন যেন খুব অন্যমনস্ক লাগছিল আমার। আমি খুব নরম গলায় বললাম, 'তিতির তোমার এ জায়গাটা ভালো লাগছে না?'

'খুউউব ভালো লাগছে', তিতির আমার বুকের ওপর মাথা রাখল।

অস্বস্তি লাগছিল। অমিত লুকিং গ্লাসে দেখছে হয়তো। তবে সে ভাবনাকে খুব একটা মাথা চাড়া দিতে দিলাম না। তিতির খুব ধীরে, প্রায় ফিসফিস করেই বলল, 'তোমাকে একটা কথা বলা দরকার। আমি জানি, কথাটা অনেক আগেই বলা উচিত ছিল। কিন্তু আমি ভয়ে বলে উঠতে পারিনি...'

'কীসের ভয়?'

'তোমাকে যদি না পাই জীবনে, সেই ভয়...'

আমি হাসলাম, 'তাহলে এখন বলতে চাইছ কেন? এখন ভয়ের কারণ আর নেই বলছ?' খানিক মজা করেই বলি আমি।

'এখন তো তোমাকে আমি পেয়েই গেছি', বলেই মুখ নামিয়ে নিল তিতির, 'তবে ভয়টা এখনও যায়নি মন থেকে। এখনও সে কথা বলতে আমার বুক কাঁপছে। তবু আমি জানি, কথাটা তোমাকে বলা দরকার। আমাদের মধ্যে কোনো আড়ালই থাকা উচিত নয় আর...'

'কী এমন কথা তিতির?' আমি অবাক হয়ে বললাম নীচু স্বরে।

'এখানে নয়' তিতির জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল, 'একটা ছোট্ট কাজ বাকি আছে আমার। সে কাজটা যদি সেরে ফেলতে পারি তাহলেই মুক্ত আমি...' তিতিরের মুখে জানালার বাইরের গভীর রহস্যময় জঙ্গলেরই ছায়া পড়ল যেন।

অবাক হয়ে আমি জিজ্ঞেস করলাম, 'কী কাজ তিতির? কীসের থেকে মুক্তি চাইছ তুমি?'

'বহুদিন আগে একজনকে দেওয়া প্রমিস...' থেমে থেমে বলল তিতির, 'আগু পিছু কিচ্ছু না ভেবেই কথা দিয়েছিলাম তাকে, তবু সেই কথার সত্য রক্ষার দায় আমাকে যে নিতেই হবে...'

আমার মাথার মধ্যে সব কেমন যেন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছিল। তিতিরকে আমার আরও একটু কাছে টেনে নিয়ে বললাম, 'কাকে কী কথা দিয়েছিলে তুমি?'

'আজ নয়। প্লিজ', তিতির আমার হাত শক্ত করে নিজের মুঠোয় ধরল, 'কাল ভোরের আলো ফুটলে নদীর শব্দ শুনতে শুনতে সব বলব তোমায়। তারপর আমার সে না বলা অতীতটুকু চিরকালের জন্যে পাহাড়ি খরস্রোতায় ভাসিয়ে দেব', তিতির হাসল। এতক্ষণ পরে তাকে খানিক সপ্রতিভ দেখালো, 'তোমারও যদি তেমন কিছু ভাসিয়ে দেবার থাকে, তাহলে তুমিও দিও। অপ্রয়োজনীয় অতীত অযথা বয়ে বেড়িয়ে লাভ কী বলো...'

আমার বুকের মধ্যে ধুকপুক আওয়াজ হচ্ছে। সে আওয়াজ যেন নিজের কানে শুনতে পাচ্ছি আমি। বাইরে বেশ ঠান্ডা। জানালার কাচ একটু নামানো ছিল। তাই দিয়েই হু হু করে ঠান্ডা হাওয়া ঢুকে কাঁপিয়ে দিচ্ছিল আমায়। তিতিরের হাতে বন্দি থাকা আমার হাতটা সরিয়ে নিয়ে আমি জানলার কাচ তুলে দিলাম। তারপর বড় করে শ্বাস নিয়ে বললাম, 'বেশ, তাই হবে।'

অমিত বলল, 'দাদা, দলগাঁও ভিউ পয়েন্ট পৌঁছে গেছি। এখানে টিকিট করতে হবে।

আমি জানালার কাচের ওপারে দেখার চেষ্টা করছিলাম। অমিত বলল, 'দাদা, বউদিকে সঙ্গে নিয়ে নেমে পড়ুন। একটু এগিয়ে গেলেই দুর্দান্ত ভিউ পাবেন। তা ছাড়া অনেকক্ষণ গাড়িতে বসে আছেন। নেমে একটু হাঁটাহাঁটি করে নিতে পারলে ভালোই লাগবে।'

জায়গাটা সত্যিই বড় সুন্দর। খোলামেলা। পাহাড়ের ওঠানামা, গাছপালা, প্রজাপতির ঝাঁক ও পাখিদের ওড়াউড়ি, আর অনেক নীচে উপত্যকায়, গায়ে কুয়াশা মেখে রুপোলি রঙের সরু ফিতের মতো একটা নদীর একটানা বয়ে চলা...

'ঠিক শিল্পীর আঁকা ছবিটিরই মতো সুন্দর, বলুন?' একটা অচেনা খসখসে গলা আমার ঠিক পিছন থেকে কথাগুলো বলে উঠতেই সম্বিৎ ফিরল। বেশ অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলাম। তিতির আমাকে পিছনে ফেলে এগিয়ে গেছে অনেকখানি। মুখ তুলে দেখলাম, সে ঘোরানো সিঁড়ি বেয়ে দূরের উঁচু ওয়াচ-টাওয়ারের মাথায় উঠে পড়েছে ততক্ষণে। অমিতকেও কাছেপিঠে দেখতে পেলাম না।

'জায়গাটা বড় সুন্দর', রোগা চেহারার লম্বা লোকটা আবার বলে উঠল।

লোকটার বয়েস বেশি নয়। আমার থেকেও অনেকটাই কম। লোক না বলে ওকে ছেলে বলাই ভালো। দেখলে মনে হয়, কলেজ ইউনিভার্সিটির ছাত্র টাত্র হবে। এক মাথা উলোঝুলো চুল। মুখে হালকা দাড়ি। জিন্সের ওপরে খদ্দরের পাঞ্জাবি, ব্যস। একটা হাফ সোয়েটার পর্যন্ত গায়ে নেই তার।

ওয়াচ-টাওয়ারের ওদিকের গভীর খাদের দিক থেকে হু হু করে ঠান্ডা হাওয়া এসে লাগছিল আমার গায়ে। মাথার টুপিটাকে আরও একটু টেনে নামিয়ে দু-কান চাপা দিলাম আমি।

ছেলেটার দিকে অবাক চোখে চেয়ে জিজ্ঞেস করলাম, 'আপনি শুধুই একটা পাঞ্জাবি পরে রয়েছেন। আপনার শীত করছে না?'

কী একটা পাখি চিৎকার করে ডাকতে ডাকতে আমার মাথার ওপর দিয়ে উড়ে চলে গেল। মাথা উঁচু করে সেদিকে দেখতে দেখতে বাতাসের মতোই মিহি এবং উদাস স্বরে সে বলল, 'না তো! আর তো শীত করে না!'

ওর উত্তরটা যেন কেমন অদ্ভুত শোনালো। আমি হেসে ফেললাম, 'সে আবার কী কথা?'

সেও হাসল। মৃদু, শব্দহীন হাসি। তারপর আমার প্যান্টের পকেটের দিকে শীর্ণ হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, 'আপনার ফোন—'

এতক্ষণ বুঝতে পারিনি। ছেলেটা বলতে খেয়াল হল, পকেটের মধ্যে ফোনটা ভাইব্রেট করছে। ফোন বের করে দেখলাম, তিতির।

আমার দিকে চেয়ে সে আবার হাসল। সেই একই রকম শব্দহীন বাতাসের মতো হাসি। বলল, 'যান। উনি ডাকছেন।'

ফোনটা রিসিভ করে 'হ্যাঁ, আসছি, আসছি' বলতে বলতেই আমি সামনের পথে পা বাড়ালাম। কিছু দূর গিয়ে পিছু ফিরে দেখি ছেলেটা একই জায়গায় সেই একই ভঙ্গিতে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমি পিছন ফিরে চাইতেই চোখাচোখি হয়ে গেল তার সঙ্গে। সে চোখ সরিয়ে নিল না। তাকিয়েই রইল। তার চোখের দৃষ্টিটা কেমন অন্যরকম। তার দু-চোখ জুড়ে যেন রাজ্যির মেঘ এসে জুটেছে। আমার দিকে তাকিয়েও সে আমায় দেখছে না। আমাকে ভেদ করে তার দৃষ্টি অন্য কোনো দূরের আকাশে চলে যাচ্ছে যেন। পকেটের মধ্যে ফোনটা আবার কাঁপতে শুরু করেছে। আমি ঘুরে দাঁড়িয়ে ওয়াচ টাওয়ারের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম আবার। তিতির একা রয়েছে অনেকক্ষণ।

দলগাঁও থেকে রঙ্গো পৌঁছতে খুব বেশি সময় লাগল না। রাস্তার পাশে একটা ফাঁকা জায়গা দেখে গাড়ি দাঁড় করিয়ে দিল অমিত। এখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দু-চারটে বাড়ি। রাস্তার বাঁ দিকে একটা দোকান। এক মহিলা মোমো বানাচ্ছেন। অমিত ডান দিকে একটা সরু ঢালু রাস্তার দিকে হাত বাড়িয়ে বলল, 'আসুন। এখানে এই একটাই থাকার জায়গা। সাবধানে আসবেন। রাস্তাটা বড্ড গড়ানে। খাড়া নেমে গেছে নীচের দিকে।'

'রঙ্গো রিভার রিসর্ট' সত্যিই ছবির মতো সুন্দর। কাঠের তৈরি পাশাপাশি তিনখানা ঘর। সামনে লম্বা বারান্দা। বারান্দা থেকে নামলেই বাঁ দিকে লম্বাটে ডাইনিং হল। আর ডাইনিং হলের সামনে খানিকটা রেলিং দেওয়া খোলা জায়গা। সেই ফাঁকা জায়গাটুকুর অনেকখানিই প্রায় শূন্যে ঝুলে আছে। অনেক নীচে বড় বড় পাথরের ফাঁক দিয়ে ঝর ঝর ঝর শব্দ করে রঙ্গো নদী দৌড়েই চলেছে, বিরামবিহীন।

আমাদের ঘরটাও সুন্দর। বেশ ছিমছাম, রুচিসম্মত। আয়তনেও ঘরটা বেশ বড়। একটা ডাবল বেডের সঙ্গে উলটোদিকের দেওয়াল ঘেঁষে সিঙ্গল খাটও রয়েছে একখানা। আমাকে সেদিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে রেসর্ট মালিক রেশম বাহাদুর হেসে বললেন, 'এটা স্যার অ্যাকচুয়ালি ফ্যামিলি অ্যাকোমোডেশনের কথা ভেবে বানানো। এখন তো টুরিস্টের চাপ নেই। আপনাদের তাই ওই ঘরটাই দিয়ে দিলাম। আরাম করে থাকুন হাত পা ছড়িয়ে।'

রেশম অমিতের খুবই বন্ধু। আমাদের সঙ্গেও দিব্বি ভাব জমে গেল তাঁর। তিতিরের দিকে চেয়ে খুব আন্তরিক কণ্ঠে বললেন, 'ভাবিজি, আপনারা স্নান টান করে রেডি হয়ে নিন। আমরা গরম জল পাঠিয়ে দিচ্ছি। ততক্ষণে লাঞ্চ রেডি করে ফেলছি আমরা।'

'কী খাওয়াবেন?' জিজ্ঞেস করলাম।

'ডাল সবজি, লোকাল মুরগির ঝোল।'

'বাহ', বলে তিতিরের দিকে ফিরলাম, 'তুমি আগে স্নান করে নাও। আমি ততক্ষণ চারদিকটা একটু সার্ভে করে আসি।'

তিতির মিষ্টি করে হাসল, 'দেরি কোরো না। আমার কিন্তু খুব বেশি সময় লাগবে না।'

রেশমও গম্ভীর গলায় বলল, 'জাদা দেরি করবেন না বাবু। খানা ঠান্ডা হয়ে যাবে।'

'ঠিক আছে', আমি হাত নেড়ে হাসলাম।

রিসর্ট থেকে পাথরের খাড়া সিঁড়ি নেমে গেছে নীচে, একেবারে নদী পর্যন্ত। আমি সে পথ না ধরে রেসর্ট থেকে তিন চারটে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠলাম। এখান থেকে একটা বাঁধানো রাস্তা সামনের দিকে এগিয়ে গেছে। একটু এগিয়েই দেখলাম, একটা কাঠের সেতু রঙ্গো নদীর ওপর দিয়ে অপর পারে চলে গেছে। আমি সেতু পেরিয়ে অন্য দিকে এসে দাঁড়ালাম। এদিকটা আশ্চর্য নির্জন। জনবসতির চিহ্ন নেই। সবুজ অরণ্যে ঢাকা উঁচু পাহাড় আকাশ আড়াল করে দাঁড়িয়ে আছে বেজায় গম্ভীর মুখ করে। একটা পাকদণ্ডী এগিয়ে গেছে ছোট ছোট ঝোপে ঢাকা পাহাড়ি উপত্যকাকে চিরে। আমি সেই পাকদণ্ডী ধরে এগোতে শুরু করলাম। একটু এগিয়েই রাস্তাটা পাহাড়ের খাঁজ ধরে অনেকখানি বাঁক নিয়েছে। আমি সেই পথ ধরে ডান দিকে বেঁকতেই ঝোপঝাড়ের মধ্যে পাথরের ফাঁকে ফোকরে দাঁড়িয়ে থাকা, অনেকটা চোপ্তেনের আদলে তৈরি শিলাস্তম্ভগুলো দেখতে পেলাম। থমকে দাঁড়িয়ে পড়লাম আমি।

এটা এ অঞ্চলের একটা পুরোনো সমাধিক্ষেত্র। একটা সমাধিফলকের ওপরে ঝুঁকে পড়ে আমি দেখার চেষ্টা করছিলাম তার ওপরে কিছু লেখা টেখা আছে কিনা। আচমকাই মনে হল কে যেন আমার ঠিক পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে। চমকে পিছু ফিরে কাউকে দেখতে পেলাম না। কনকনে হাওয়া বইছিল। যথেষ্ট শীতবস্ত্র থাকা সত্ত্বেও সেই হাওয়ায় আমার সারা শরীর সিরসির করে উঠল। অলৌকিকে আমার বিশ্বাস নেই, কিন্তু আজ একা এই সমাধিক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে আমার গা ছমছম করে উঠল।

একটা অচেনা অস্বস্তি ক্রমশ ছড়িয়ে যাচ্ছিল মনের মধ্যে। বেলাও দ্রুত গড়াচ্ছে। বুঝতে পারলাম, অহেতুক এখানে আর না দাঁড়িয়ে থেকে এইবার আমার ফিরে যাওয়াই উচিত। পা চালিয়ে দ্রুত রিসর্টে ফিরতে শুরু করলাম। কাঠের সেতুটার ওপরে পৌঁছে অকারণেই চোখ চলে গেল নীচে, যেখানে পাহাড় থেকে নেমে আসা পাথরের গায়ে আছড়ে পড়ছে রঙ্গোর ছুটে আসা জল। আর তখনই দেখলাম, সেখানে, সেই পাথরের খাঁজে, গুঁড়ো গুঁড়ো জলের মধ্যে প্রায় মিশে গিয়ে সে দাঁড়িয়ে আছে। স্থির, যেন প্রাণ নেই, একটা পাথরের মূর্তি। উদাস দৃষ্টি আমাদেরই রিসর্টের দিকে। তেমনই উলোঝুলো চেহারা। দলগাঁওতে যেমন দেখেছিলাম, ঠিক সেই রকমই জিন্স-এর ওপরে শুধুই একটা খদ্দরের পাঞ্জাবি আর পায়ে কমদামি স্যান্ডেল...

আমার বেশ অবাকই লাগল। এখানে থাকার জায়গা তো এই একটাই। ছেলেটা তাহলে উঠেছে কোথায়? আমাদের সঙ্গেই কি? আনমনে সেতু পেরিয়ে এদিকে এলাম। হেঁটে আমাদের রিসর্টের কাছে পৌঁছতেই দেখতে পেলাম তিতিরকে। ডাইনিং হলের সামনে সেই খোলা জায়গায় রেলিং-এর ওপরে দু-হাতের ভার রেখে নদীর দিকে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে আছে সে।

আমি তিতিরের পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। নীচু গলায় জিজ্ঞেস করলাম, 'ছেলেটা কি আমাদের পাশের ঘরেই উঠেছে নাকি?'

'কোন ছেলেটা?' তিতির মনে হল যেন চমকে উঠল।

'ওই যে দেখতে পাচ্ছ না, নীচে নদীর জল ছুঁয়ে যে দাঁড়িয়ে আছে', আমি বলে উঠলাম, 'দলগাঁও ভিউ পয়েন্ট থেকেই তো দেখে আসছি ওকে...'

'কই, কোন ছেলে? কেউ তো নেই নীচে?' তিতির বলল আবার, 'থাকলে আমি তো দেখতেই পেতাম।'

'আরে ওই তো', বলেই যেখানে দেখেছি ছেলেটাকে সেদিকে হাত বাড়িয়ে দিয়েই থতমত খেয়ে গেলাম আমি। সত্যিই তো কেউ নেই ওখানে! ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ছোট বড় পাথরের ওপর দিয়ে রঙ্গো নদী একা একাই বয়ে যাচ্ছে আপন খেয়ালে। ছেলেটার কোনো চিহ্নই নেই আশেপাশে। নদী থেকে ওপরে উঠে আসার একটাই সিঁড়ি। আর সেটা আমাদের এক্কেবারে পাশেই। তাহলে?

আমাকে অমন হাঁ করে নীচের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে তিতির হালকা ঠেলা মারল, 'যাও, জলদি স্নান সেরে চেঞ্জ করে এসো। খুব খিদে পেয়ে গেছে আমার।'

অবেলায় খেয়ে বিছানায় কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়েছিলাম একটু। এখানে জবরদস্ত ঠান্ডা। কম্বলের মধ্যে ঢুকে বেশ আরাম লাগছিল। অনেকখানি পথ গাড়িতে এসেছি। কাল রাতে ট্রেনেও ভালো ঘুম হয়নি। আমার চোখদুটো বুজে আসছিল। ঘুমিয়ে না পড়ার অনেক চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত ঘুমিয়েই পড়লাম আমি।

ঘুম যখন ভাঙল, বাইরে সন্ধে নেমেছে। অদ্ভুত নিস্তব্ধ হয়ে আছে ঘরের ভিতরটা। পাশে তিতির শুয়ে আছে অনুভব করতে পারছিলাম। তার ক্ষীণ নিশ্বাসের শব্দ আসছে আমার কানে। ওই মৃদু শব্দটুকু ছাড়া ঘরে আর কোনো আওয়াজ নেই। আলস্য জড়িয়ে ধরেছে আমায়। উঠতে ইচ্ছে করছে না। কম্বলের মধ্যে থেকেও আমার শরীর আরও একটু উষ্ণতা চাইছিল। চোখ না খুলেই তিতিরের দিকে পাশ ফিরে হাত বাড়িয়ে ছুঁতে গেলাম ওকে। আর তখনই আবিষ্কার করলাম, তিতির বিছানায় নেই। আতঙ্কে চোখ খুলে ফেললাম আমি। তাহলে? এইমাত্র কার নিশ্বাস প্রশ্বাসের শব্দে জেগে উঠলাম আমি? ঘরের মধ্যে নাইট ল্যাম্পের মৃদু আলোয় নিজের ছায়া দেখেও শিউরে উঠলাম। বাতাস ভারী ঠেকছে। কম্বল ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বিছানা থেকে নেমে ঘরের আলোগুলো সব জ্বালিয়ে দিলাম।

উজ্জ্বল আলোয় সিঙ্গল খাটটার দিকে চোখ পড়তেই চমকে উঠলাম আমি। পুরো বিছানাটা লন্ডভন্ড। কম্বল গুটিয়ে পড়ে আছে একধারে। চাদর ওলট-পালট। আমার মাথায় ঢুকছিল না কিচ্ছু। কেউ কি ঘরে ঢুকেছিল? কে? তিতিরই বা সন্ধেবেলা অচেনা জায়গায় এমন একলা একলা কোথায় চলে গেল আমাকে কিচ্ছু না জানিয়ে! গায়ে একটা চাদর জড়িয়ে নিয়ে দরজা খুলে ফেললাম আমি। তিতির, তিতির বলে ডাক দিলাম। কিন্তু সাড়া পেলাম না কোনো।

আমার ভয় করছিল। কেন জানি না। শুধু মনে হচ্ছিল, আমার অগোচরে কী একটা যেন ঘটে চলেছে। আমি তার আঁচ পাচ্ছি, কিন্তু বুঝে উঠতে পারছি না। বারান্দায় কোথাও নেই তিতির। তিন চার ধাপ সিঁড়ি বেয়ে রাস্তায় উঠলাম। সামনে পিছনে যত দূর দৃষ্টি গেল, তিতিরের চিহ্ন নেই। অমিত তার গাড়ির কাছেই একটা ঘরে উঠেছে। সেখানেই তার থাকা খাওয়ার বন্দোবস্ত। রঙ্গো রিভার রিসর্টে আসা অতিথিদের ড্রাইভারদের জন্যে এই ব্যবস্থাই চলে আসছে। আমি অমিতকে ফোন করার চেষ্টা করলাম। পেলাম না। আমার ফোনের নেটওয়ার্ক নেই এখানে। আবার নেমে এলাম ফাঁকা জায়গাটায়। মাথার ওপরে খোলা আকাশ। আজ মস্ত চাঁদ উঠেছে। নদীর দিক থেকে কনকনে হাওয়া বইছে। রান্নাঘরে রান্নার আয়োজন চলছে। আমাকে বাইরে দেখে একজন বেরিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল, 'স্যার চা দেব?'

আমি সে কথার উত্তর না দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, 'ম্যাডামকে দেখেছ?'

'না স্যার', সে দু'দিকে মাথা নাড়ল, 'আপনারা তো ঘরেই ছিলেন দুপুরের পর থেকে...'

আমি আর দাঁড়ালাম না। এগিয়ে গেলাম। খানিক এগোতেই নদীতে নামার সিঁড়ি। ওপরের খোলা চত্বরে ইলেকট্রিক আলো জ্বলছে, কিন্তু সিঁড়ির ধাপের এক দুটোর বেশি সে আলো পৌঁছচ্ছে না। আজ অবিশ্যি চাঁদের আলো আছে। আমি আনমনে নীচে, নদীর দিকে নামতে লাগলাম সিঁড়ির ধাপ মাড়িয়ে মাড়িয়ে। অদ্ভুত নিস্তব্ধ চারপাশ। শুধু নদীর একটানা বয়ে চলার শব্দ। আর কোনো শব্দ নেই। বেশ কয়েক ধাপ নামার পরেই হঠাৎই নদীর সেই একঘেয়ে গান গেয়ে চলা ছাপিয়ে মৃদু অথচ স্পষ্ট একটা আওয়াজ কানে এল। থমকে দাঁড়িয়ে পড়লাম আমি। আরও খানিক নীচে নদীর প্রায় গায়েরই ওপরে একটা চ্যাটালো পাথর। তার ওপরে নিজের দু-পা দু-দিকে ফাঁক করে চিৎ হয়ে একা শুয়ে আছে তিতির। তার নিম্নাঙ্গের পোশাক নেমে গেছে হাঁটুর কাছে। নদীর পাশে পাথরের ওপরে তার শরীরে জ্যোৎস্না এসে লুটিয়ে পড়েছে। তিতির যেন তার শরীরের ওপরে নুয়ে পড়া সেই জ্যোৎস্নাকেই প্রাণপণে আঁকড়ে ধরেছে প্রসারিত দুই হাতে। আর জ্যোৎস্নাসঙ্গমী তিতিরের মায়াবী শরীর দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে বারংবার। তার শরীরের প্রতিটি মোচড়ের সঙ্গে তীব্র শীৎকারের শব্দ উঠে আছড়ে পড়ছে শীতার্ত রাত্রির বুকে। সেই শীৎকারে মিশে আছে স্পষ্ট পরিতৃপ্তি।

আমি হাঁ করে সেই অপার্থিব দৃশ্য দেখলাম কয়েক মুহূর্ত। আমার শরীর শিথিল হয়ে আসছিল। বুকের ভিতরটাও যেন খালি হয়ে আসছে। কী যে একটা অচেনা কষ্ট পাক খেয়ে উঠছে মনের গভীর থেকে। অথচ তিতির একাই শুয়ে আছে পাথরের ওপরে! আমি নিজের চোখকে অস্বীকার করি কী করে? এই আশ্চর্য সন্ধ্যায় সব কিছুই যেন ওলটপালট হয়ে যাচ্ছে আমার মনের মধ্যে। একটু সময় নিয়ে নিজেকে সামলালাম আমি। তিতির ততক্ষণে স্থির হয়েছে। দ্রুত নিশ্বাস পড়ছে তার। অসম্ভব ক্লান্ত অথচ তৃপ্তিতে ভরপুর তার মুখ। সেই মুখের ওপরে যেন হালকা কুয়াশা এসে নেমেছে। তাড়াহুড়ো করে সিঁড়ি ভেঙে আমি তার কাছে গিয়ে পৌঁছলাম। আতঙ্কে, বিস্ময়ে চিৎকার করে ডেকে উঠলাম, 'তিতির, তিতির...'

তিতিরের চোখ বন্ধ। আমার ডাকে সাড়া দিল না সে। তবে তার শরীর জুড়ে যেন আবার তীব্র ঢেউ উঠল বার কয়েক। তারপর তা বন্ধ হয়ে গেল। তিতির কেমন অস্থিরভাবে দু-তিনবার ছটফটিয়ে উঠেই স্থির হয়ে গেল আবার। বাইরে তুমুল শীত, তবু এখন এই পাথরের চাতালে অদ্ভুতভাবে আমি গরম বোধ করছিলাম। দ্রুত তিতিরের কাছে গিয়ে হাঁটু মুড়ে বসলাম। দেখলাম তার কপালে এই শীতেও ঘামের কুঁড়ি ফুটেছে।

হঠাৎই একটা ভীষণ জোরালো দমকা হাওয়া যেন তিতিরের শরীরের ওপরে কয়েকবার পাক খেয়ে আমার গায়ের ওপর দিয়ে চলে গেল হু হু শব্দে। সে হাওয়ার এতটাই জোর, আমি উলটে পড়েই যাচ্ছিলাম। কোনোক্রমে ডান পাশের মস্ত গোলচে পাথরটাকে আঁকড়ে ধরে বাঁচালাম নিজেকে। হাওয়াটা যেন ওই পাথরটার ওপরে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে থেকে নদী পেরিয়ে কাঠের ব্রিজের ওপারে চলে গেল। আর তখনই আমার চোখের ভুল কিনা কে জানে, নদীর অপর প্রান্তে আবছা আলোয় মিশে তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম আমি কয়েক মুহূর্ত। সেই জিন্স, পাঞ্জাবি, উলোঝুলো চুল। ওই কয়েক মুহূর্তের জন্যেই। তারপর দেখলাম যত দূর চোখের দৃষ্টি যায়, কেউ নেই। সমস্ত চরাচর জুড়ে শুধু সাদাটে কুয়াশা আর ফিকে জ্যোৎস্না, জড়াজড়ি করে শুয়ে আছে। তিতিরের শরীর ছুঁয়ে যে আবছা কুয়াশার চাদর ছিল, তা সরে গেছে এখন। সেই গরম ভাবটাও দ্রুত হারিয়ে গিয়ে হু হু করে ঠান্ডা বাতাস বইতে লাগল। সেই ঠান্ডায় ঠকঠক করে কাঁপতে শুরু করলাম আমি।

তিতিরের শরীর এখন বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে গেছে। আমি তার জামাকাপড় ঠিক করে দিলাম। নদীর কনকনে ঠান্ডা জলই রুমাল ভিজিয়ে আলতো ছুঁইয়ে দিলাম তার চোখে, কপালে। তিতির চোখ খুলল। কেঁপে উঠে জড়ানো গলায় বলল, 'আমি কথা রেখেছি তো উড়ান। এবার আমাকে ছেড়ে দাও, প্লিজ...'

আমি কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। হতভম্বের মতো দু-হাত দিয়ে তিতিরকে ঝাঁকাতে লাগলাম আমি। চিৎকার করতে লাগলাম, 'কাম অন তিতির। কী বলছ এসব? এ কী হয়ে গেল তোমার?'

নীরব রাতে আমার চিৎকার বেশিই জোরে শোনা গিয়েছিল নিশ্চিত। দুদ্দাড় করে সিঁড়ি দিয়ে একাধিক পায়ের শব্দ নীচে নেমে আসছিল। একটু পরেই জোরালো একটা আলো এসে পড়ল আমাদের গায়ে। রেশম আর তার রিসর্টের কেয়ারটেকার সুরেশ...

আমাদের ওই অবস্থায় দেখে ব্যস্তসমস্ত হয়ে কাছে এগিয়ে এল ওরা। উদ্বিগ্ন গলায় জিজ্ঞেস করল, 'এনি প্রোবলেম স্যার?'

আমি ইচ্ছে করেই সবটা বললাম না। শুধু বললাম, 'হঠাৎ করেই তিতির অসুস্থ হয়ে পড়ল। কী যে হল কিচ্ছু বুঝতে পারছি না। প্লিজ ওকে ঘরে নিয়ে যাবার জন্যে আমাকে একটু সাহায্য করুন।'

থিতু হতে অনেকটাই সময় নিল তিতির। রেশম গরম দুধ পাঠিয়ে দিয়েছিল। সঙ্গে একটা ব্র্যান্ডির বোতল। আমি ইতস্তত করছি দেখে সে আশ্বস্ত করেছিল আমাকে, 'কোই দিক্কত নেহি সাব। সামান্য ব্র্যান্ডি দুধের সঙ্গে মিশিয়ে খাইয়ে দেখুন। উনি আরও দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবেন...'

এখন তিতির সামলে নিয়েছে নিজেকে। কম্বলের মধ্যে পা ডুবিয়ে দেওয়ালে হেলান দিয়ে সে বসে ছিল চুপ করে। আমি খুব নরম গলায় জিজ্ঞেস করলাম, 'উড়ান কে তিতির?'

আমার প্রশ্ন শুনে চমকে উঠল সে। একবার আমার চোখের ওপরে চোখ রেখেই মুখ নামিয়ে নিল তিতির।

আমি আবার বললাম, 'আমাকে সব খুলে বলতে পার তুমি। হেজিটেট কোরো না প্লিজ। স্বামী স্ত্রী-র সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে আমি তো বরাবর তোমার প্রিয় বন্ধুই হতে চেয়েছি তিতির। তুমি নিশ্চিত স্বীকার করো, প্রকৃত বন্ধুত্বে কোনো আবডাল থাকে না।'

তিতির ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল, 'দোষটা আমারই। আরও অনেক আগেই কথাটা বলা উচিত ছিল তোমাকে। কিন্তু আজ সন্ধ্যায় যা ঘটে গেছে তা আমার নিজেরই বিশ্বাস হচ্ছে না এখনও। মনে হচ্ছে সবকিছু যেন একটা স্বপ্ন ছিল, একটা ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন...'

'কী হয়েছিল?' আমি তিতিরের কপালে আলতো চুমু খেলাম। তিতির শিউরে উঠল। সারা শরীর থরথর করে কেঁপে উঠল ওর।

আমাকে দু-হাতে আঁকড়ে ধরে তিতির বলতে শুরু করল, 'উড়ান ভারি অদ্ভুত ছেলে ছিল, জানো?'

আমি তিতিরের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম চুপটি করে। সে যেন স্মৃতির জগতে ডুব দিল। তার দু-চোখের দৃষ্টি আমাকে তো বটেই, এমনকী এই ঘরের দেওয়ালটাকেও যেন অতিক্রম করে দূরে, আরও দূরে চলে যাচ্ছে এখন। সেই দূরস্থিত অন্য সময়ে চোখ রেখে সে ঘোর লাগা গলায় বলে চলল, 'উড়ান বরাবরই একটু উলোঝুলো। উদাস উদাস চেহারা ছিল তার। সবসময়েই দেখেছি, পরনে একটা রং চটা জিন্স আর পাঞ্জাবি, ব্যাস। শীতকালেও ওকে কখনও গরম জামা বা চাদর ইউজ করতে দেখিনি...'

'স্ট্রেঞ্জ!' আমি সোজা হয়ে উঠে বসলাম, 'আমি মনে হয় তাকে দেখেছি।'

'দেখেছ?' অবাক হয়ে গিয়ে বলে তিতির, 'তাকে কী করে দেখবে তুমি? সে যেমন ঝড়ের মতো আমার জীবনে এসেছিল, তেমনই একদিন কর্পূরের মতো উবে গিয়েছিল। এই এতদিনে একটি বারের জন্যেও তাকে আর কোত্থাও দেখিনি আমি। কেউ তার কোনো খোঁজটি পর্যন্ত দিতে পারেনি...'

'তবু আমার মনে হচ্ছে তাকে আমি দেখেছি।'

'কোথায়?'

'দলগাঁও ভিউ পয়েন্টে প্রথম দেখেছিলাম তাকে। তারপর আবার এখানে। আজ সকালে। মনে পড়ছে, লাঞ্চের আগে একজনের কথা বলছিলাম তোমাকে। যে নদীর জল ছুঁয়ে দাঁড়িয়েছিল', বলে আমার দেখা সেই ছেলেটির নিখুঁত বর্ণনা দিলাম তিতিরকে। তিতিরের দু-চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল, 'হ্যাঁ, উড়ানকে অমনই দেখতে ছিল।'

'বার বার তুমি এমন করে বলছ কেন তিতির?' আমি অবাক হয়ে বললাম, 'ছিল কেন, সে তো আছে, এখনও।'

তিতির চুপ করে রইল।

'তুমি কি উড়ানকে ভালোবেসেছিলে?' খুব নরম গলায় জিজ্ঞেস করলাম আমি তিতিরকে।

'বেসেছিলাম', তিতির বিছানার চাদরের দিকে চোখ নামিয়ে বলল, 'কিন্তু...'

'কিন্তু?' আমি ওর কাঁধে হাত রাখলাম, 'ব্রেক আপ হয়ে গিয়েছিল?'

'উঁহু।'

'তাহলে রেলেশনটা টিকল না কেন?'

তিতির একটুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল, 'ওর সঙ্গে আমার সম্পর্কটা বছর দুই আড়াই কন্টিনিউ করেছিল বোধহয়। তখন সদ্য কলেজ পেরিয়েছি। নিউ গড়িয়া স্টেশনে ট্রেন থেকে নেমে বাঘাযতীনের দিকে খানিক হেঁটে গিয়ে একটা বাড়িতে টিউশন পড়াতাম সপ্তায় দু দিন। রাস্তাটা খুব সুন্দর ছিল। ফাঁকা, দু'দিকে গাছ। এক দুটো লেকও ছিল। রাত্রিবেলা পড়িয়ে ফেরার সময় দেখতাম আকাশে চাঁদ উঠেছে। স্ট্রিট লাইটের আলো টপকে সেই চাঁদের আলো আমার গায়ে কিংবা রাস্তার ওপরে এসে পৌঁছাত না। তবু আমার ভালো লাগত। গাছের ডালে ডালে পাখিরা তখন ঘুমিয়ে পড়েছে। রাস্তায় কদাচিৎ লোক চলাচল করত। এত নির্জন চারপাশ, নিজের পায়ের শব্দও শুনতে পেতাম। আমি কেমন যেন হারিয়ে যেতাম...'

'তোমার ভয় করত না?' আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, 'অমন নিঝুম রাতে একলা একটি মেয়ে হেঁটে আসতে, রিস্কও তো ছিল। এখনও এ দেশে দুর্ভাগ্যজনকভাবে মেয়েদের একা পথ চলায় যে কত বিপদ!'

'না, আমার ভয় করত না', বলে তিতির থামল। চুপ করে থাকল খানিক। তারপর একটা শ্বাস ফেলে বলল, 'রোজ যখন ওই রাস্তা দিয়ে হেঁটে আসতাম, মনে হত কে যেন আমার সঙ্গে আছে। বেশ বুঝতাম, আড়াল থেকে সে আমাকে দেখছে।'

'কী করে বুঝতে?'

'প্রকৃতি সব মেয়েকেই বোধহয় এই ক্ষমতাটি দিয়ে রেখেছেন', তিতির হাসল, 'আমরা বুঝতে পারি, আর এও বুঝতে পারি, যে আমাদের দেখছে তার চোখের দৃষ্টিতে কোনো বদ অভিসন্ধি আছে কিনা...'

'কিন্তু তুমি তো তাকে দেখতেই পাওনি', আমি ওর কথার মাঝখানেই বলে উঠি, 'তার চোখের দৃষ্টিতে ভালো, মন্দ কী আছে, তুমি বুঝলে কী করে?'

'কেন মনে হয়েছিল জানি না, কিন্তু আমি নিশ্চিত ছিলাম, যে আমাকে আড়াল থেকে দেখে রোজ, সে আমার শত্রু নয়...'

'তারপর?'

'অমনই একদিন পড়িয়ে ফিরছি। সেদিন ঝিরঝির বৃষ্টি পড়ছিল। সঙ্গে উথালপাথাল হাওয়া। নিম্নচাপের বৃষ্টিতে যেমন হয়। হঠাৎই দেখতে পেলাম তাকে। আমার থেকে হাত দশেক তফাতে রাস্তার ধারে একটা লাইট পোস্টের নীচে সে দাঁড়িয়ে ছিল। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমাকে দেখছিল আর ভিজছিল। এক মাথা অবিন্যস্ত চুল। পরনে ফেডেড জিন্স আর মোটা কাপড়ের পাঞ্জাবি...'

'কিন্তু এই যে সেই লোক তুমি কী করে বুঝলে? যে লোকটাকে দেখলে সে তো অন্য কোনো মানুষও হতে পারত...'

'কেন জানি না, কিন্তু আমি তার দিকে একবার চেয়েই বুঝে গিয়েছিলাম, এ সে লোক না হয়েই যায় না। আর সে জন্যেই আমি সোজা তার দিকে এগিয়ে গেলাম। আর সেও স্থির হয়ে দাঁড়িয়েই রইল। আমি তার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে তার চোখে চোখ রেখে জিজ্ঞেস করলাম, 'কে আপনি?'

'উড়ান। বলে থমকে গেল সে। আমার দিকে তাকাল পূর্ণদৃষ্টিতে। আর আমার আনখশির যেন কেঁপে উঠল। মনে হল বুকের ভিতর কী যেন উথালপাথাল ভালোলাগার স্রোত বইছে আমার। আমি যেন পূর্ণ হয়ে উঠছি ক্রমাগত...'

তিতিরকে দেখে মনে হচ্ছিল সে যেন কোন স্বপ্নের দেশ থেকে কথা বলছে এখন।

আমি কি উড়ানকে ঈর্ষা করছি মনে মনে? চিন্তাটা মনে আসতেই আপন মনে হেসে ফেললাম আমি। সেই শব্দহীন হাসি তিতিরের নজর এড়াল না। একটু কুণ্ঠিত হয়েই সে জিজ্ঞেস করল, 'আমাকে খুব খারাপ ভাবছ তুমি তাই না?'

'না, না', আমি খানিক অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে বলি, 'তুমি উড়ানের কথা বলো তিতির।'

'সে যখন তার নাম বলল আমি একটু মজা করেই তাকে জিজ্ঞেস করলাম, শুধু উড়ান, ব্যাস, এইটুকুই?'

'তুমি পদবি টদবি মিলিয়ে প্রথম দিনেই সম্বন্ধ পাকা করে নিতে চাইছিলে নাকি?' পরিস্থিতি হালকা করার জন্যে আমি মজা করে বললাম।

অনেকক্ষণ পরে তিতির হাসল। লাজুক হাসি। আমার প্রশ্ন শেষ হতে না হতে মুখ লাল করে সে বলে উঠল, 'ধ্যাৎ, পারোও বটে তুমি।'

আমি বললাম, 'আচ্ছা আচ্ছা, ঠিক আছে। এখন উড়ানের কথা বলো।'

তিতির বলল, 'সে বলল, আমি উড়ান। শুধুই উড়ান। আগে পিছে আর কিচ্ছুটি নেই।'

'অদ্ভুত তো!' আমি বলে উঠলাম।

'অদ্ভুতের কীই বা দেখলে তুমি', তিতির হাসল, 'উড়ানের সব কথা শুনলে তোমার মনে হবে এ এক আশ্চর্য রূপকথা...'

'কী রকম?' আমি আগ্রহ নিয়ে বলি।

'উড়ানের সঙ্গে রোজ দেখা হতো তারপর থেকে, অমনই রাত্রিবেলা। আলো-আঁধারি পথে। গাছের নীচে, যেখানে আলো কম, সেখানে সে দাঁড়িয়ে থাকত আমার দিকে চেয়ে। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে গলে এসে আলো পড়ত তার মুখে। আমার কেন যেন মনে হত তার মুখ কুয়াশায় মাখামাখি হয়ে আছে সর্বক্ষণ...'

'মানে?' আমি অবাক হয়ে বলি।

'জানি না', তিতির বলে, 'কিন্তু আমার তেমনই মনে হত। একদিন তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি আলোয় আসো না কেন আমার কাছে? চলো না, একদিন দিনের বেলা কোথাও মিট করি আমরা...'

'সে কী বলল? এক কথায় রাজি হয়ে গেল নিশ্চিত' আমি একটু মজা করেই বললাম, 'সে তো তখন বুঝে গেছে, তিতির বোসের মতো সুন্দরী, বিদুষী তার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে একেবারে...'

'উঁহু।' দু'দিকে মাথা নাড়ল তিতির।

'ধ্যাত তাই আবার হয় নাকি?' আমি তিতিরকে তাতানোর চেষ্টা করলাম, 'কোনো ফাঁকা ফ্ল্যাট ট্যাট...'

তিতির রাগল না। কোনো গোপন অপরাধ হঠাৎ করে সামনে বেরিয়ে পড়ার অস্বস্তিও ফুটে উঠল না তার চোখে। খুব ঠান্ডা গলায় সে বলল, 'উড়ান আমাকে সত্যি যদি তেমন প্রস্তাব দিত, গররাজি হতাম না বোধহয়। অস্বীকার করব না, মনে মনে আমি তাকে তখন সম্পূর্ণভাবেই পেতে চাইছিলাম...'

তিতিরের কথা শুনে আমার বুকের মধ্যে মোচড় দিয়ে উঠল একবার। সেই অস্বস্তিটুকু যত্নে আড়াল করে আমি জিজ্ঞেস করলাম, 'তাহলে?'

'সাব, ডিনার লাগিয়ে দিয়েছি', রেশম বাইরে থেকে দরজায় নক করল, 'প্লিজ আসুন। আমরা বেশি রাত করি না এখানে। দশটার মধ্যে বাইরের লাইট অফ করে দিই আমরা...'

আমার উঠতে ইচ্ছে করছিল না। উড়ানের সঙ্গে ঠিক কতখানি ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়েছিল তিতিরের তা জানার তীব্র কৌতূহল বোধ করছিলাম মনে মনে। কিন্তু তিতির উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল। মুখে আলগা হাসি টেনে এনে বলল, 'চলো। আর দেরি করা ঠিক হবে না। আমাদের জন্যে অপেক্ষা করে আছে ওরা। কাল আবার ভোর হতে না হতে উঠে কাজকর্ম শুরু করতে হবে ওদের।'

ঘরে ছিলাম বলে বুঝতে পারিনি। দরজা খুলে বাইরে বেরোতেই কনকনে ঠান্ডা হাওয়া ঝাঁপিয়ে এসে একেবারে হাড় কাঁপিয়ে দিল আমাদের। দ্রুত পা চালিয়ে ডাইনিং হলে ঢুকে পড়লাম। রেশম তিতিরের দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করল, 'এখন তবিয়ত ঠিক আছে তো ম্যাডাম?'

'ঠিক আছি', তিতির হাসল, 'আর কোনো অসুবিধা নেই।'

'আপনি তো ভয় পাইয়ে দিয়েছিলেন আমাদের', রেশম বলল, 'ঠিক কী হয়েছিল বলুন তো ম্যাডাম?'

তিতির মুখ নামিয়ে নিল।

আমি অস্বস্তি বোধ করছিলাম। নীচে নেমে যে অবস্থায় আমি তিতিরকে দেখেছিলাম... পরিস্থিতি সামাল দিতে ওই মুহূর্তে যা মনে এল বলে দিলাম আমি, 'ওর এটা হয় বুঝলেন তো, আগেও দেখেছি। দুম করে অল্টিচিউড গেইন করলেই মাথা ঘোরে। গাড়ি থেকে নেমেই বলছিল শরীর খারাপ লাগছে, মাথা ঘুরছে। তেমন গুরুত্ব দিইনি তখন। শরীর খারাপটা ছিলই বোধহয় তখন থেকে। সন্ধেবেলা সিঁড়ি দিয়ে নদীর কাছে নেমে একটা পাথরের ওপরে বসেছিল ও। আচমকাই শরীরে অস্বস্তিটা বাড়তে শুরু করল। গা গুলিয়ে উঠেই দুম করে চোখ মুখ ধোঁয়া হয়ে গেল। ভাগ্যিস পড়ে টড়ে মাথায় চোট পায়নি। বুদ্ধি করে সম্পূর্ণ ব্ল্যাক আউট হবার আগে চট করে নিজেই শুয়ে পড়েছিল সিঁড়ির ওপরে...'

'অল্টিচিউড প্রোবলেম নয়', রেশম হেসে ওঠে, 'রঙ্গো এমন কিছু উঁচুতে নয়। গ্যাস ফর্ম করে গিয়েছিল প্রোব্যাবলি...'

'মে বি', আমি হাসলাম।

'আর অসুবিধা হবে না', রেশম তিতিরের দিকে তাকাল, 'এখানকার জল হাওয়া খুবই সুন্দর। পাথর খেলেও দেখবেন চটজলদি হজম হয়ে গেছে। যো হো গিয়া ও বিলকুল ভুলে গিয়ে এন্তারসে এনজয় করুন।'

তিতির ঘরে চলে গেছে। আমি নদীর দিকের রেলিং-এর সামনে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছিলাম। মনটা বিক্ষিপ্ত হয়ে আছে। বুকের গভীরে চাপা কষ্ট। আকাশে গোল চাঁদ। নদী, উপত্যকার ওপরে বিছিয়ে থাকা কুয়াশার সঙ্গে চাঁদের আলো মিলেমিশে গিয়ে মায়াবী করে তুলেছে চারপাশ। সামনে, নদীর উলটোদিকে দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড় আর সেই পাহাড়ের পায়ের কাছে লুটিয়ে থাকা বুগিয়ালের দিক থেকে ঠান্ডা হাওয়া বইছে। আমার গায়ের শীতপোশাক ভেদ করে সেই হাওয়া কাঁপিয়ে দিচ্ছিল আমাকে। তবু এক্ষুনি ঘরে ঢুকে পড়তে ইচ্ছে করছে না আমার। রেলিং-এর একদম কাছে সরে এসে রেলিং-এ হাতের ভর দিয়ে নীচে ঝুঁকে নদীর দিকে চাইলাম আমি। চাঁদের আলো আর কুয়াশা এসে জমেছে নদীর ওপরেও। নদীর জল আর জলের পাশের পাথরগুলো অস্বচ্ছ লাগছে। তবু একটা বড় পাথরের গায়ে হেলান দিয়ে যে দাঁড়িয়ে আছে সে যে উড়ানই তা বুঝতে একটুও অসুবিধা হল না আমার।

হোম স্টে-র বাইরের আলোগুলো একে একে নিভে যাচ্ছে।

আকাশ থেকে গড়িয়ে নামা আলো ছাড়া আর কোনো আলোর রেখা নেই এই উপত্যকা জুড়ে। অসমান ধাপের যে পাথুরে সিঁড়ি নদীর দিকে নেমে গেছে, সেখানে চাপ চাপ অন্ধকার। সে পথে নীচে নামা যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ। তবু, প্রায় সম্মোহিতের মতো সিঁড়ি বেয়ে রঙ্গো নদীর দিকে দুদ্দাড়িয়ে নামতে শুরু করলাম আমি।

উড়ান দাঁড়িয়েছিল নদীর প্রায় মাঝখানেই। একটা বেশ বড় চ্যাটালো পাথরের ওপরে দাঁড়িয়েছিল সে আকাশের দিকে মুখ করে। কুয়াশার পাতলা আবরণ এমনভাবে ঘিরে আছে তাকে যে তার শরীরটা কেমন যেন আবছা মনে হচ্ছে আমার। তবু বুঝলাম, তার পরনে সেই একই জিন্স আর পাঞ্জাবি। এই হাড় হিম করা ঠান্ডাতেও... ওর দিকে তাকিয়ে কেন কে জানে, গা ছমছম করে উঠল আমার। তবু আমি নিজেকে সামলে নিলাম। উড়ানের সঙ্গে একটা শেষ বোঝাপড়া আজ করতেই হবে আমাকে। তিতিরের সঙ্গে ঠিক কী সম্পর্ক তার? সে সম্পর্ক আর কত দূরে টেনে নিয়ে যেতে চায় সে! অন্তত আজ সন্ধেয় যে অবস্থায় আমি দেখেছি তিতিরকে তাতে আমার মনে হয় এখনই একটা নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছবার প্রয়োজন আমাদের।

আমি গলাটাকে যতটা সম্ভব গম্ভীর করে ডাক দিলাম, 'উড়ান—'

সে উত্তর দিল না। অমনভাবেই একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল আকাশের দিকে। রঙ্গোর অপর পার থেকে তীব্র হাওয়া বইতে শুরু করেছে। সেই হাওয়ায় উড়ানের মাথার চুল এলোমেলো হয়ে উড়তে উড়তে কুয়াশা আর জ্যোৎস্নার সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। তার সম্পূর্ণ শরীরটাও কি হাওয়ায় হাওয়ায় দুলছে তিরতির করে? কিন্তু তা কেমন করে সম্ভব?

আমি আবারও ডাকলাম তার নাম ধরে।

এইবারে সে ঘুরল আমার দিকে।

উড়ানের মুখের দিকে চেয়ে বুক কেঁপে উঠল আমার। অসম্ভব জানি, তবু স্পষ্ট মনে হল তার মুখ যেন আজ রাতের রঙ্গো নদীর ওপরে জমে থাকা জ্যোৎস্না আর কুয়াশা দিয়েই গড়া। সে মুখে রক্ত নেই, মাংস নেই। মনটাকে থিতু করতে দু-এক মুহূর্ত সময় নিলাম আমি। তারপর আবারও বললাম, 'তুমি তাহলে সত্যিই উড়ান।

'আমি আসলে কেউ নই আর', সে বলল। বলার সময় হাওয়ায় হাওয়ায় তার সারা শরীর কেঁপে উঠল।

আমি তার কথায় তেমন গুরুত্ব না দিয়ে বললাম, 'আমি তোমার সঙ্গে কথা বলতে চাই উড়ান। তোমার সঙ্গে কথা বলাটা খুব জরুরি আমার জন্যে। এ আমার সারা জীবনের প্রশ্ন। তিতিরের সঙ্গে আমার সম্পর্কটাকে আর বয়ে নিয়ে যাব কিনা তা তোমার সঙ্গে এই কথোপকথনের ওপরেই নির্ভর করছে...'

'কেন?' সে যেন অবাক হল, 'তিতিরের সঙ্গে নিজের জীবনকে তুমি এগিয়ে নিয়ে যেতে চাও না?'

'তাই তো চেয়েছিলাম, কিন্তু...' আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলি, 'তোমার সঙ্গে তার এই গোপন সম্পর্কের কথা আমার তো জানা ছিল না...'

'তিতিরকে ভালোবাসো না তুমি?'

'বাসি, খুবই ভালোবাসি। আর সেইজন্যেই আমি ভিতরে ভিতরে চুপি চুপি ভেঙে টুকরো হয়ে যাচ্ছি উড়ান...'

পাথরে পাথরে পা রেখে কেমন যেন ভাসতে ভাসতে আমার দিকে খানিক এগিয়ে এল উড়ান। সে এখন আমার প্রায় সামনেই এসে দাঁড়িয়েছে। তবু তাকে কেন যেন আমার ধোঁয়াটে, আবছা মনে হচ্ছিল। দু-হাতে নিজের চোখদুটো রগড়ে পরিষ্কার করার চেষ্টা করলাম আমি। উড়ান তাই দেখে হাসল। বাতাসের মতো যেন উপত্যকা জুড়ে বয়ে গেল তার সেই হাসি। আমার অকারণ গা ছমছম করে উঠল সেই বাতাসের মতো মিহি হাসির শব্দে। উড়ানকে দেখে একটা অদ্ভুত অস্বস্তি জেগে উঠছে এখন মনের মধ্যে। আমার সমগ্র চেতনা আমাকে জানান দিচ্ছিল, উড়ান আমার মতো সাধারণ মানুষ নয়। বার বার মনে হচ্ছে, এই যে সে আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে, তার মধ্যে কী একটা যেন ভয়ানক গোলমাল রয়ে গেছে। মনে মনে কেঁপে উঠলাম আমি।

উড়ান আবার হাসল। শব্দহীন মৃদু হাসি। তারপর ধীর গম্ভীর গলায় বলল, 'আমি সত্যিই তোমার মতো নই। আর নই বলেই তিতির কখনও কোনোদিন আমার হবে না। মনে একটুও দ্বিধা রেখ না। সে শুধু তোমারই...'

আমি চমকে উঠলাম। উড়ান কি আমার মনের মধ্যেটা দেখতে পাচ্ছে নাকি?

উড়ান খুব স্বাভাবিক স্বরেই বলল, 'হ্যাঁ, আমি তোমার চিন্তাতরঙ্গকে প্রতি মুহূর্তেই ধরতে এবং পড়ে ফেলতে পারছি।'

'কী ভাবে?' অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।

'আমরা যে ফ্রিকোয়েন্সিতে বাস করি, সেখানে সকলেই এটা পারে। এর মধ্যে কোনো অলৌকিকতা নেই। এটা খুবই সাধারণ একটা বিজ্ঞান।'

'মানে?' আমি চমকে গিয়ে বলি, 'তোমার কথাবার্তা আমার কাছে হেঁয়ালির মতো মনে হচ্ছে উড়ান। তুমি আমাদের এই পৃথিবীতে থাকো না বলছ?'

'না না, তা নয়', উড়ান মাথা ঝাঁকায়, 'এই পৃথিবীতেই থাকি। কিন্তু তোমরা পৃথিবীতে যে নির্দিষ্ট তরঙ্গজগতে বাস করো, আমরা তার সমান্তরাল অন্য এক তরঙ্গ দ্বারা গঠিত জগতের বাসিন্দা।'

আমার মাথার মধ্যে সব কেমন যেন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছিল। আমি হাঁ করে তাকিয়ে ছিলাম উড়ানের দিকে। তার শরীর আগের চেয়ে আরও স্বচ্ছ, আরও অস্পষ্ট এবং ধোঁয়াটে হয়ে উঠছিল। তার মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হল যেন একখণ্ড আলোকিত মেঘ। তার চোখ, নাক, ঠোঁট, কিছুই আর আলাদা করে চিনতে পারছিলাম না আমি। মনে হচ্ছিল, চোখের সামনে যেন এক অদ্ভুত স্বপ্নের মতো দাঁড়িয়ে আছে সে। আমার সারা গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। ছোটবেলার মতো ভয়ে গলা শুকিয়ে উঠল আমার। কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলাম, 'তুমি কি আর বেঁচে নেই উড়ান?'

'উড়ানের মুখ যদিও আর স্পষ্ট নয়, তবু মনে হল সে হেসে উঠল আমার কথা শুনে। তার সারা শরীর বাতাসে দুলে দুলে উঠল সেই হাসির দমকে। তারপর নীচু রিনরিনে গলায় সে বলে উঠল, 'মৃত্যু শব্দটাই তো মিথ্যে। মৃত্যু বলে এ মহাজগতে আসলে কিছু নেই। ছিল না কখনও। এমনকী জন্ম বলেও কিছু নেই...'

'এ তুমি কী বলছ উড়ান?' আমি প্রতিবাদ করার চেষ্টা করি।

'ঠিকই বলছি', উড়ানের কণ্ঠস্বর ক্ষীণতর হল, 'এ মহাবিশ্বে কিছুই হারিয়ে যায় না। সব থাকে। হ্যাঁ, সবকিছুই। শুধু সেই থাকার রূপটুকু বদলে যেতে পারে। আর সেই বদলের সাপেক্ষে তার বাসস্থানের ফ্রিকোয়েন্সিও বদলে যায়। যেমন এক সময় আমারও তোমার বা তিতিরের মতোই একটা জড় শরীর ছিল। যাকে আমরা স্থূলশরীরও বলতে পারি। সেই সময় আমি তোমাদের এই জগতেই থাকতাম। কিন্তু সে শরীর গিয়ে যখন আমি সূক্ষ্মশরীরে বাঁচা শুরু করলাম, তখন তোমাদের সমান্তরাল জগৎ হল আমার বাসস্থান। সে বাসভূমি আমি এখনও নিজের মতো করে সাজিয়ে তুলছি প্রতিদিন।'

'সে জগৎ আমাদের কাছেই আছে বলছ?'

'একেবারে গায়ে গায়েই আছে।'

'তাহলে সে জগতের বাসিন্দাদের আমরা দেখতে পাই না কেন?'

'ভিন্ন কম্পাঙ্কের দেওয়াল দিয়ে তাকে আলাদা করে রাখা আছে এ জগৎ থেকে', উড়ান থামল একটু। তারপর বলল, 'আমার এই মায়াশরীরটাকে ভাসিয়ে রাখা আর সম্ভব হচ্ছে না। ক্রমশই সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর হয়ে পড়ছি আমি। বিদায় দাও। এইবার আমাকে যেতেই হবে।'

'মায়াশরীর?' আমি অবাক হয়ে বলি।

'হ্যাঁ। তোমাদের মতো রক্ত-মাংসের যে শরীরটা ছিল আমার, অনেক আগেই তা ভিন্ন ভিন্ন শক্তি হিসেবে বদলে গিয়ে এই পঞ্চভূতে লীন হয়ে গেছে। আমার এই মায়াশরীর তৈরি হওয়ার কথা ছিল না। কিন্তু এক রাতে এখান থেকে অনেক দূরের এক জনপদে, নির্জন রাস্তার ধারে তা হয়েছিল তিতিরের মনের মধ্যে জেগে ওঠা বাসনার প্রতিবিম্ব হিসেবে...'

'বাসনা?'

'হ্যাঁ। সে বাসনার ঢেউ এমনই শক্তিশালী। অসীম শক্তিতে সেই ঢেউ আমাকে আকর্ষণ করে টেনে নিয়ে এসেছিল ভিন্ন কম্পাঙ্কের শক্তিস্তর থেকে।'

'তারপর?'

'তারপর তিতিরের স্বপ্ন, তিতিরের মনের মধ্যে মুহুর্মুহু তৈরি হওয়া ভালোবাসার বিভিন্ন দৈর্ঘ্যের তরঙ্গমালা আমাকে জমাট বাঁধতে বাধ্য করল। ধীরে ধীরে এই মায়াশরীরটি শক্তিবৃদ্ধি করছিল তিতিরের কল্পনার তরঙ্গকে আশ্রয় করে। প্রথমে শুধু তাকে অনুভব করাতে পেরেছিলাম যে আমি আছি। তখনও দৃশ্যমানতা তৈরি হয়নি আমার সূক্ষ্মশরীরের। এভাবে কিছুদিন যাবার পর একটা আধা স্বচ্ছ কোলয়ডিয় শরীর পেলাম, তারপর আরও পরে, যখন আমার সম্পর্কে তিতিরের মন আরও সংবেদনশীল, তখনই একদিন নিজেকে ত্রিমাত্রিক প্রতিবিম্বে পালটে ফেললাম আমি। হাজির হলাম তিতিরের চোখের সামনে। সে অবশ্য আমাকে প্রতিবিম্ব বলে ধরতে পারেনি। সে আমাকে সত্যি ভেবে এসেছে চিরকাল।'

'তুমি আমাদের মতো মানুষ নও?'

'উঁহু', উড়ান মৃদু হাসে, 'ওই যে বললাম, আমি নিছক একটি প্রতিবিম্ব...'

'কীসের প্রতিবিম্ব?'

'তিতিরের মনের মধ্যে তৈরি হওয়া একটা ছবির। একটা ছেলে। তার উলোঝুলো চেহারা, একমাথা অবিন্যস্ত চুল। পরনে জিন্স আর পাঞ্জাবি। যে কবিতা ভালোবাসে আর ভালোবাসে পাহাড়, নদী, নির্জনতা...'

'তার মানে তুমি সত্য নও উড়ান? তুমি শুধুই কল্পনার ঘনীভূত রূপ?'

'কে বলেছে সত্যি নই?' উড়ান হাসে, 'আবার এক অর্থে সত্য নইও বটে।'

'মানে?' ভয়ানক অবাক হয়ে গিয়ে বলি আমি।

'আজ আমাকে বিদায় দাও। এ জগতে ভেসে থাকতে কষ্ট হচ্ছে আমার। যাবার আগে শুধু এটুকুই বলার, তিতিরকে ভুল বুঝো না। সে বড় নির্মল। ভালোবাসা তার স্বভাব-সৌন্দর্য। সে সৌন্দর্যের আলো যার ওপরে গিয়ে পড়ে সে নিজেও সুন্দর হয়ে ওঠে দেহে মনে...' বলতে বলতে রাতের কুয়াশা আর চাঁদের আলোর সঙ্গে মিশে যায় উড়ান। রঙ্গো নদীর ওপরে ঝোড়ো বাতাস বইতে শুরু করে। সে বাতাস পাক খেতে খেতে জড়িয়ে ধরে আমার শরীর। এক অজানা আলিঙ্গন টের পাই আমি। কে যেন ফিসফিস করে কানের কাছে এসে বলতে থাকে, 'কাল এসো, কাল। রাত্রিবেলা।'

'তিতির কেমন করে ভিন্ন ফ্রিকোয়েন্সি থেকে টেনে এনেছিল তোমাকে তার চোখের সামনে?'

'আমাকে না, আমার প্রতিবিম্বকে', বাতাস এসে কানে কানে বলে আরেকবার।

'কিন্তু কী ভাবে?'

'কাল এসো, কাল। রাত্রিবেলা। শেষবারের মতো কথা বলব আমরা এই পৃথিবীর নদী, জ্যোৎস্না, কুয়াশায় মাখামাখি হতে হতে।'

আমার চারপাশে জমে থাকা জমাট কুয়াশা হাওয়ায় ভর দিয়ে দ্রুত উড়ে গেল নদীর অপর প্রান্তে।

আমি তিতিরকে আজ সঙ্গে নিয়ে আসতে চাইনি, কিন্তু সে জোর করল। বলল, 'উড়ানের কাহিনি আমার হাতেই তো শুরু হয়েছিল একদিন। আজ সত্যিই যদি সে কাহিনি উপসংহারে এসে পৌঁছোয়, সেখানে আমার থাকাটা জরুরি।'

আমি জোর করে আটকাতে চাইনি ওকে। জোর করার প্রশ্নও ওঠে না। আমাদের দুজনের মধ্যে কোনো আড়াল থাক এ তো আমার অভিপ্রায় ছিল না। আমি ভয় পাচ্ছিলাম দুটো কারণে। এক তার শরীর। আর দুই, মনে মনে কোথাও একটা ভয়, একটা আত্মবিশ্বাসের অভাববোধ করছিলাম আমি। মনে হচ্ছিল, উড়ানকে চোখের সামনে দেখার পর তিতির যদি দুর্বল হয়ে পড়ে কোনোভাবে? কাল একসময় ভেবেছিলাম তিতিরকে ছাড়াও নিজের জীবনকে ভাবতেই পারি আমি। কিন্তু তারপর কাল সারা রাত, আজ সারাদিন ধরে ভেবে দেখেছি, আসলে তিতিরকে ছেড়ে থাকা কিছুতেই সম্ভব নয় আমার পক্ষে। আমাকে অনেকেই বলে, প্রয়োজনেও কঠিন হতে পারি না আমি। কথাটা মিথ্যে নয়। তবু আজ তিতিরের জন্যে এই দুর্বলতার কারণে নিজের ওপরে একটুও রাগ হল না আমার। বরং মনে মনে বেশ স্বস্তিই বোধ করলাম। এতদিন নিজেই নিজেকে চিনতাম না আমি...

আজ কুয়াশা কালকের থেকে খানিক কম। আকাশের মস্ত গোলচে চাঁদের ঝকঝকে প্রতিবিম্ব রঙ্গোর স্বচ্ছ জলে তীব্র স্রোতের তোড়ে ভেঙেচুরে টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে যাচ্ছে ক্রমাগত। রিসর্টের আলোগুলো নিভে গেছে বলে জ্যোৎস্নার মায়াবী আলোয় সমগ্র উপত্যকা আজ যেন আরও বেশি রহস্যময় লাগছে। ইচ্ছে করেই আজ একটু বেশি রাতে নেমেছি নদীর কাছে। আমি আর তিতির ছাড়া এ তল্লাটে আর কেউই জেগে নেই এখন। হ্যাঁ, উড়ান জেগে আছে। অবশ্য আমি জানি না, তার জগতে আদৌ ঘুমের প্রয়োজন আছে কিনা। দীর্ঘ ও গাঢ়তম ঘুমে এ শরীর বিসর্জন দিয়ে তবেই তো পৌঁছতে হয় সেই সূক্ষ্মতর স্তরে।

রঙ্গো নদীর এক্কেবারে গা ঘেঁষে, সেই চ্যাটালো পাথরটার ওপরে এসে দাঁড়ালাম দু-জনে। এই পাথরের ওপরে শুয়েই কাল সন্ধ্যায় অলীক সঙ্গমে শীৎকার করছিল তিতির। আমি দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। নদীর জলের ছন্দবদ্ধ বয়ে যাওয়ার শব্দ ছাড়া আর কোনো আওয়াজ নেই চরাচরে। তাই আমার দীর্ঘশ্বাসের শব্দ তিতিরের কানে গিয়ে পৌঁছালো। সে কথা বলল না। শুধু তার বাঁ-হাত দিয়ে আমার ডান হাতটা আঁকড়ে ধরল শক্ত করে। আমি তিতিরের দিকে চাইলাম। চাঁদের আলো এসে পড়েছে তার মুখে। ভারী সুন্দর দেখাচ্ছে আজ তিতিরকে। রঙ্গো উপত্যকার প্রকৃতিরই মতো শীতল অথচ স্নিগ্ধ লাগছে তাকে।

নরম, মৃদু গলায় তিতির জিজ্ঞেস করল, 'কোথায় সে? আমি তো কই তাকে দেখতে পাচ্ছি না।'

'আমিও পাচ্ছি না', তিতিরকে নিজের বুকের মধ্যে টেনে নিলাম আমি। নদীর অপর পারের উঁচু পাহাড়ের দিক থেকে হাড় কাঁপানো হাওয়া বইছিল। গায়ে যথেষ্ট শীতবস্ত্র চাপিয়েও ঠকঠক করে কাঁপছিলাম আমি। তিতিরও। তিতির আমার হাত ধরে টান দিল, 'কতক্ষণ এই ঠান্ডায় কাঁপব দু-জনে? চলো ফিরে যাই।'

'কিন্তু সে যে আসতে বলেছিল আমাকে।'

'কে জানে, আমারই মতো তুমিও হয়তো কল্পনা দিয়েই কাল তাকে গড়ে তুলেছিলে এখানে।'

'না না, তা কী করে হবে' আমি প্রতিবাদ করে উঠি, 'আমি যে তার সঙ্গে অতক্ষণ কথা কয়েছি।'

'আমিও তো অতদিন ধরে রাতের রাস্তায় তার সঙ্গে দাঁড়িয়ে থেকেছি, গল্প করেছি। স্বপ্ন দেখেছি, একদিন সে আমাকে নিয়ে এমনই নির্জন পাহাড়ি উপত্যকায় হনিমুনে আসবে...'

আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম তিতিরের দিকে। ধীরে ধীরে বললাম, 'আমরা দুজন শুধুই হ্যালুসিনেট করেছি তাকে তিতির? উড়ান বলে কেউ নেই, কেউ ছিল না কোনোদিন? তার অস্তিত্বের পুরোটাই অলীক কল্পনা?'

'না, তা কেন হবে?' পাহাড়ের দিক থেকে বয়ে চলা হাওয়ার মধ্যে থেকে ভেসে উঠল উড়ানের কণ্ঠস্বর, 'আমি কালই তো বলেছিলাম, উড়ান সত্য আবার সত্য নয়। সে আছে, কিন্তু নেই...'

'তুমি এসেছ?' আমি চমকে উঠে বলি। তিতিরের চোখে মুখেও অপার বিস্ময়।

'আমি তো তোমাদের সঙ্গেই আছি। ছিলামও চিরকাল...'

'তুমি বড্ড হেঁয়ালি করো উড়ান। তোমাকে আমি বুঝতে পারি না...'

'এ জগতে কত বিস্ময়, কত রহস্য। সব কি জানা যায়, না বোঝা যায়?'

'তুমি আমাদের সামনে এসে দাঁড়াও।'

'আর তা সম্ভব নয়।'

'কেন?'

'যে শক্তিতে আমি একসময় ঘনীভূত হয়েছিলাম, সেই শক্তিক্ষেত্র এখন ভিন্ন অভিমুখে সঞ্চারিত হচ্ছে।'

'মানে?'

'একদিন তিতিরের মনের মধ্যে জেগে ওঠা ভালোবাসার ঢেউ তরঙ্গে তরঙ্গে তৈরি করেছিল আমাকে... আজ সে ভালোবাসা উপযুক্ত ক্ষেত্র খুঁজে পেয়ে গেছে। তার কল্পনায় এ মুহূর্তে আমার কোনো ছবি অবশিষ্ট নেই...'

'কিন্তু আমিও যে তোমাকে দেখেছিলাম। কাল তুমি স্পষ্ট ছিলে না, তবু তোমাকে আমি তো দেখেছিলাম...'

'তোমার মনের মধ্যে তৈরি হওয়া সন্দেহ আর ঈর্ষা আমাকে ঘনীভূত হতে সাহায্য করেছিল', উড়ানের কণ্ঠস্বর ক্ষীণ হয়ে এল, 'এখন তিতিরের মনের মধ্যে আমার জন্যে অবশিষ্ট থাকা ঢেউয়ের মতোই তোমার মনের সন্দেহ ও ঈর্ষাও ফিকে হয়ে গেছে...'

'আর কখনও তুমি আমাদের মধ্যে এসে দাঁড়াবে না তো উড়ান?' তিতির আকুল হয়ে বলে।

'যদি তোমরা আমাকে জোর করে দুজনের মধ্যিখানে টেনে এনে দাঁড় না করাও...' বলতে বলতেই উড়ানের কথা থেমে গেল। একটা হালকা হাওয়া আমাদের দু'জনের শরীরের চারপাশে পাক খেয়ে বয়ে গেল নদীর ওপর দিয়ে।

তিতির বলল, 'চলো ফিরি এইবার। বাইরে বড় ঠান্ডা।'

'চলো', বলে তিতিরকে জড়িয়ে নিয়ে জ্যোৎস্নায় ভিজতে ভিজতে পাথুরে সিঁড়ি বেয়ে ক্রমশই নীচ থেকে ওপরের দিকে উঠে আসতে থাকি আমি।

অধ্যায় ১ / ৪
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%