অভিজিৎ সেনগুপ্ত

শনিবারের শীতের সন্ধ্যা৷ বুবাই বাইরের ঘরে চাদর মুড়ি দিয়ে তারস্বরে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে পড়েই যাচ্ছে-পৃথিবীর তিনভাগ জল, একভাগ স্থল, পৃ-থি-বী-র তি-ন-ভা-গ-৷ আসলে বুবাই এতক্ষণ ধরে কী যে পড়েছে তা সে নিজেই জানে না৷ একদম মন লাগছিল না তার পড়ায়৷ কিন্তু উপায় কী? মা পাশের ঘরে ছ্যাঁক ছ্যাঁক বড়া ভাজতে ভাজতে শুনছে বুবাই কালকের ইশকুলের পড়া ঠিকমতো করছে কি না৷ বুবাইয়ের ভীষণ কান্না পাচ্ছিল৷ বাবা কেন আসছে না এখনও৷ বাইরের বারান্দায় একটু কিছুর শব্দ হয়েছে কি বুবাইয়ের কান খরগোশের মতো খাড়া সেদিকে৷ ওই কি বাবা এল তার? না, কোথায় বাবা? বাবার পায়ের শব্দও তো খুব ভালো করেই চেনে বুবাই৷
কান্না পাবে না কেন বুবাইয়ের? গত শনিবারও তো বাড়ি আসেনি বাবা সুন্দরবন থেকে৷ এরকম তো আগে আর কখনো হয়নি৷ বাবার জন্য বিছানায় বসে ঢুলতে ঢুলতে শেষে কখন একসময় ঘুমিয়েই পড়েছিল বুবাই৷ সকাল বেলা মুখে রোদ পড়তে ধড়মড় করে জেগে উঠেই বুবাই ভেবেছিল নিশ্চয়ই তাহলে অনেক রাতে বাড়ি ফিরেছেন বাবা৷ এক্ষুনি ভরাট গম্ভীর গলায় ডেকে বলবেন, এই যে বুবাই দেখো তোমার জন্য কী নিয়ে এসেছি এবার৷
চট করে নীচু হয়ে খাটের তলায় তাকায় বুবাই যদি বাবার কাদামাখা হান্টিং-শু জোড়া দেখতে পায়৷ সুন্দরবন থেকে যখন বাড়ি আসেন বাবা তখন ওই হান্টিং-শু পরেই তো আসেন৷ কিন্তু না, খাটের তলা ফাঁকা৷ বুবাইয়ের বুকটাও একেবারে ফাঁকা হয়ে যায়৷ গত শনিবারের মতো এ শনিবারও কি তবে আসবেন না বাবা?
বুবাইয়ের বাবা নন্দলালবাবু সুন্দরবনের ফরেস্ট রেঞ্জ অফিসার৷ সারা সপ্তাহটা সুন্দরবনেই থাকতে হয় তাঁকে৷ শনিবার সুন্দরবন থেকে রওনা হয়ে ভর সন্ধ্যে বেলা বাড়ি ফেরেন৷ রবিবার সারা দিনটা বাড়িতে কাটিয়ে আবার সোমবার কাকপক্ষী না জাগতে জাগতেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েন সুন্দরবনের উদ্দেশে৷ সারাটা সপ্তাহ বুবাই শুধু এই দুটো দিনের জন্য হাপিত্যেশ করে বসে থাকে৷ বাবা বাড়িতে না থাকলে তার কিছু ভালো লাগে না৷ তা ছাড়া সুন্দরবন থেকে যখন আসবেন বাবা বুবাইয়ের জন্য অবশ্যই কিছু সঙ্গে করে নিয়ে আসবেন৷ অদ্ভুত অদ্ভুত সব জিনিস৷ একবার বুবাইয়ের জন্য নিয়ে এলেন প্রায় একমানুষ সমান লম্বা বিরাট সাদা একটা হাড়ের করাত৷ বুবাই দেখে অবাক৷ নন্দলালবাবু বুঝিয়ে দিলেন ওটা হল করাত মাছের নাকের খড়্গ৷ হাঙর-জাতীয় মাছ৷ গভীর সমুদ্রে থাকে৷ বাইরের সমুদ্রে মাছ ধরতে যায় যে জেলেরা তাদের জালে ধরা পড়েছিল৷ করাতটা কেটে নিয়ে ওরা নন্দলালবাবুকে উপহার দিয়ে গেছে৷ এত বড়ো করাত মাছ সচরাচর দেখা যায় না৷ আর একবার নন্দলালবাবু টিনে করে নিয়ে এলেন আস্ত একটা মৌচাক৷ দেখে তো বুবাইয়ের চোখ ছানাবড়া৷ মধুতে একেবারে টইটুম্বুর চাকটা আর খাঁটি মধুর কী ভুরভুরে মিষ্টি গন্ধ৷ যেন কোথায় একসঙ্গে হাজার হাজার ফুল ফুটেছে৷ নন্দলালবাবু বুবাইকে বললেন যে এটা হল খলসি ফুলের মধু৷ হাজার রকমের ফুল ফোটে সুন্দরবনে৷ তার মধ্যে সবচেয়ে সুগন্ধি আর সুস্বাদু মধু হল খলসি ফুলের৷ এক মাস ধরে সেই মধু পাউরুটিতে মাখিয়ে তারিয়ে তারিয়ে খেয়েছিল বুবাই৷ খেতে খেতে বুবাই ভেবেছে বড়ো আশ্চর্য জায়গা তো এই সুন্দরবন! বড়ো হয়ে ও যদি কখনো বাবার মতো সুন্দরবনের চাকরি পায় তাহলে খলসি ফুলের মধু আর পাউরুটি ছাড়া আর কিচ্ছু খাবে না সে৷
আরও কত কত আজব জিনিসই যে বুবাইয়ের জন্য ইতিমধ্যে নিয়ে এসেছেন নন্দলালবাবু৷ তবে সবচেয়ে তাজ্জব বনে গিয়েছিল বুবাই যখন বাবা ওর জন্য একবার একটা অদ্ভুত প্রাণী নিয়ে এলেন সুন্দরবন থেকে৷ মরা নয় একেবারে জ্যান্ত৷ বড়ো কালো একটা উপুড় করা বাটির মতো-পিছনে একটা লম্বা ছুঁচলো-মুখ দাঁড়া আকাশের দিকে মুখ করে ঘুরছে৷ ভারি মজার দৃশ্যটা৷ সিনেমায় এ্যান্টি-এয়ারক্রাফট গানের ছবি দেখেছে বুবাই-কামানের নল আকাশের দিকে তাগ করে পাক খাচ্ছে, অবিকল সেরকম দেখতে৷ প্রাণীটার চোখ নেই মুখ নেই, খালি ওই একটা দাঁড়া৷ বুবাই তো প্রথমটায় ভয়ই পেয়ে গিয়েছিল৷ ওই দাঁড়া দিয়ে শরীরে বিষ-টিষ ঢুকিয়ে দেবে না তো? পরে বাবার কাছ থেকে জানতে পারল-ওটা আর কিছুই নয়, কিং-ক্র্যাব৷ একরকম সামুদ্রিক কাঁকড়া৷ ওই হুলটা হল ওদের একরকমের চোখ৷ ওটা দিয়েই ওরা বুঝে নেয় আশেপাশে তার কেউ আছে কি না৷ খুবই নিরীহ প্রাণী৷ বুবাই চৌবাচ্চার জলে ছেড়ে দিয়ে পুষবার চেষ্টা করেছিল ওকে৷ ভাত দিত খেতে৷ রুটির টুকরো ও মাছ দিত৷ কিন্তু কিছু খেত না ও৷ শেষে মারা গেল৷
এইসব কথাই খালি মনে পড়ছিল বুবাইয়ের৷ আর মনটা খুব ভারী হয়ে আসছিল৷ আজ কি সত্যি আসবে না বাবা? কিছু নিয়ে আসবে না ওর জন্য?
ছ্যাঁক ছ্যাঁক শব্দটা আর আসছে না রান্নাঘর থেকে৷ মা বোধ হয় জল ঢেলে দিয়েছে কড়াইয়ে৷ আর পারছে না বুবাই৷ আঠায় যেন আটকে আসছে দু-চোখের পাতা৷
বইয়ের উপর ঝুঁকে পড়ে এইসব কথাই ভাবছিল বুবাই, হঠাৎ দরজায় মৃদু টোকা৷
-দরজা খোলো বুবাই৷
রক্ত যেন ছলাৎ করে লাফিয়ে উঠল বুবাইয়ের মাথায়৷ বাবা! বাবা! তড়াক করে খাট থেকে নেমে দরজা খুলে দিতেই নন্দলালবাবু বুবাইয়ের গালে সস্নেহে একটি চাপড় মেরে ঘরের ভিতর ঢুকলেন৷ পায়ে সেই কাদামাখা হান্টিং শু৷ কিন্তু হাতে কিছু নেই নন্দলালবাবুর৷ ফাঁকা৷
-এতদিন আসোনি কেন তুমি বাবা? বুবাইয়ের গলার স্বর ভারী হয়ে আসে অভিমানে৷
-কাজে আটকা পড়ে গিয়েছিলাম বাবা, তাই আসতে পারিনি৷ চেয়ারে বসে পড়ে পায়ের জুতো খুলতে থাকেন নন্দলালবাবু৷
বুবাই আড়চোখে নন্দলালবাবুর খালি হাতের দিকে আর একবার তাকায় তারপর হতাশ স্বরে জিজ্ঞাসা করে, আমার জন্য কিছু আনোনি তুমি বাবা?
মা কখন এসে দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়েছিলেন বুবাই খেয়াল করেনি৷ মা বললেন, ও কী রে বুবাই-বাবা আসার সঙ্গে সঙ্গে বায়না জুড়ে দিলি-একটু জিরোতে দিবি না মানুষটাকে-
নন্দলালবাবু কিন্তু মিটিমিটি হাসছিলেন৷ হাসতে হাসতেই বললেন, এবার বুবাই তোমার জন্য যা একটা জিনিস নিয়ে এনেছি, এরকম জিনিস আগে কখনো দেখোনি তুমি৷
কী জিনিস বলো না বাবা-বুবাই আর একমুহূর্তও ধৈর্য ধরতে পারছিল না৷
দরজাটা খোলাই ছিল৷ নন্দলালবাবু দরজার বাইরে মুখ বাড়িয়ে আস্তে ডাকলেন, অর্জুন, এদিকে এসো৷
দরজা দিয়ে তাকাতেই বুবাই খুব আশ্চর্য হয়৷ একটা লোক যে ছায়ার মতো এতক্ষণ বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল একদম খেয়াল করেনি সে৷ নন্দলালবাবুর ডাক শুনে আস্তে আস্তে দরজার কাছে আসতেই ঘরের আলোয় পরিষ্কার দেখতে পেল তাকে বুবাই৷ তাল গাছের মতো রোগা ঢ্যাঙা৷ মাথায় পাখির বাসার মতো ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া চুল৷ ঝিঙেবিচির মতো মিশমিশে কালো গায়ের রং৷ শরীরে একতিলও মেদ নেই কিন্তু হাত দু-খানা নৌকার বৈঠার মতো শক্ত আর চ্যাপটা৷ লোকটার গলায় ঝিনুক আর কড়ি দিয়ে তৈরি একটা কিম্ভুতকিমাকার মালা৷ কোমরে ছোটোখাটো একটা ধুতি৷ আর লোকটার ডান হাতে ধরা একটা খাটো মোটা লাঠি৷ সারা গায়ে আর হাতে লোকটার অজস্র কাটা আর ক্ষতের দাগ৷
নন্দলালবাবুর ডাকে কীরকম নিরীহ ভীরু পশুর মতো কুন্ঠিত ভঙ্গিতে সামনে এসে দাঁড়াল সে৷
নন্দলালবাবু বললেন, এই আমাদের বাড়ি অর্জুন৷ কোনো লজ্জা নেই তোমার এখানে৷ বোসো, ওই টুলটার ওপর আরাম করে বোসো৷
নন্দলালবাবু হাত দিয়ে দরজার সামনে রাখা একটা উঁচু টুল দেখিয়ে দিলেন৷
লোকটা টুলটার দিকে একবার তাকাল তারপর মুখে কী একটা অস্ফুট বিড়বিড় শব্দ করে দরজার সামনে ঠান্ডা মেঝের উপরেই হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল৷ লাঠিটা কোলের ওপর রেখে বাচ্চা ছেলের মতো হাঁ করে চারপাশে তাকাচ্ছিল সে৷ সিলিং ফ্যান, তাকের উপর রাখা রেডিয়ো, দরজার কোণে জ্বলন্ত হিটার যেদিকেই চোখ পড়ছে সেদিকেই যেন চোখ দুটো আঠার মতো আটকে থাকছে তার৷ সবচেয়ে মজার দৃশ্য হল যখন পর্দার ফাঁক দিয়ে ওঘরের টিভিটা চোখে পড়ল তার-মনে হচ্ছে বিস্ময়ে যেন চোখ দুটো ঠেলে কোটর থেকে বেরিয়ে আসবে৷ ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া চুল আর ওই বোবা অবাক চোখ-মানুষ নয়, হঠাৎ যেন বনমানুষের মতো দেখাচ্ছিল তাকে৷
বুবাইয়ের মা নিঃশব্দে দেখছিল ওকে৷ লোকটার হাঁটু অবধি পুরু কাদা শুকিয়ে সাদা হয়ে আছে এতক্ষণে চোখে পড়ল ওদের৷ নন্দলালবাবু বললেন, বুবাই বাথরুমটা দেখিয়ে দাও ওকে৷ পায়ের কাদা ধুয়ে আসুক৷
লোকটার জন্য এতক্ষণে বেশ একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে পেরে বুবাই খুব খুশি৷ বলল, এসো অর্জুন আমার সঙ্গে৷
নন্দলালবাবু হঠাৎ খুব গম্ভীরস্বরে বললেন, শোনো বুবাই, অর্জুন তোমার চেয়ে বয়সে অনেক বড়ো৷ অর্জুনদা বলে ডাকবে ওকে৷
বুবাই লজ্জা পেয়ে বলল, এসো অর্জুনদা৷
আস্তে আস্তে লোকটি উঠে ঠিক যেন পোষা জীবের মতো গেল বুবাইয়ের পিছু পিছু৷ বুবাই ওকে বাথরুমটা দেখিয়ে দিয়েই এক ছুটে বাবার কাছে ফিরে গেল৷ বুবাই জানে নির্ঘাত মাকে এখন লোকটির গল্প বলবেন বাবা৷ গল্পটা শুনতেই হবে বুবাইকে৷
নন্দলালবাবু স্ত্রীকে বললেন, বাড়িতে কাজের জন্য তুমি একটা বিশ্বাসী লোক খুঁজছিলে-তাই নিয়ে এলাম ওকে৷ এরকম বিশ্বাসী লোক আর পাবে না আজকালকার দিনে৷
নন্দলালবাবুর স্ত্রী সুরমা কৌতূহলী সুরে বললেন, হুঁ, কিন্তু এরকম অদ্ভুত একটা লোক জোটালে কোত্থেকে তুমি?
বুবাই মাঝখান থেকে জিজ্ঞেস করল, ও কি সুন্দরবনের লোক বাবা?
নন্দলালবাবু বুবাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন-হ্যাঁ৷ কী করে ওর সঙ্গে দেখা হল শোনো সে-কথা৷ সে ভারি আশ্চর্য কাহিনি৷
একটা সিগারেট ধরিয়ে বুবাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন নন্দলালবাবু, নিশ্চয়ই তোমরা ইশকুলের ভূগোল বইয়ে দেখেছ, হুগলি নদী যেখানে বঙ্গোপসাগরে এসে মিশেছে তার মুখে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অগুন্তি ছোটো-বড়ো দ্বীপ-বাংলা 'ব'-এর মতো দেখতে৷
-হ্যাঁ, হ্যাঁ, উৎসাহে প্রায় লাফিয়ে ওঠে বুবাই৷ আমি জানি বাবা, ব-দ্বীপ বলে ওগুলিকে, তাই না?
নন্দলালবাবু সপ্রশংস দৃষ্টিতে ছেলের দিকে তাকিয়ে বলেন, ঠিক৷ ব-দ্বীপ৷ তা হুগলির মোহনায় অজস্র এরকম ব-দ্বীপ ভরতি নানারকম জঙ্গলে৷ এগুলি সবই রিজার্ভ ফরেস্ট৷ অর্থাৎ গভর্নমেন্টের অনুমতি ছাড়া এসব জঙ্গলে গাছ কাটা, মাছ ধরা, মৌচাক ভাঙা কিংবা কোনো পশুপাখি শিকার করা নিষেধ৷ বেআইনিভাবে যদি কেউ এসব করে তাহলে কঠোর সাজা হতে পারে তাদের৷ তা দিন পনেরো আগে আমাদের খুব পুরোনো একজন ফরেস্ট গার্ড রামতারণ হন্তদন্ত হয়ে অফিসে এসে খবর দিল তমলুক চরার জঙ্গলে একটা মাদি হরিণের ডেড বডি পাওয়া গেছে৷ অসুখে কিংবা অন্য কোনো কারণে মারা যায়নি৷ কেউ মেরেছে তাকে, কেননা পেটের নীচে গুলির দাগ৷ খুব শক্তিশালী কোনো বন্দুকের গুলি৷ ফরেস্ট গার্ডরা কাউকেই অবশ্য দেখতে পায়নি জঙ্গলে৷ সম্ভবত গুলি খাওয়ার পর গভীর জঙ্গলে ঢুকে পড়েছিল হরিণটা প্রাণ বাঁচাতে, সেখানেই রক্তক্ষরণ হয়ে মারা গেছে৷ হত্যাকারীরা সুতরাং তাকে আর খুঁজে পায়নি৷ হত্যাকারীরা বললাম এই কারণে, এসব জঘন্য অপরাধ সাধারণত কেউ একা করতে সাহস পায় না৷ যারা এসব কুকর্ম করে তারা দল বেঁধেই করে৷ আমি রামতারণকে ও অন্যান্য ফরেস্ট গার্ডদের নির্দেশ দিলাম জঙ্গলের চারদিকে কড়া নজর রাখতে এবং কোনো কিছু সন্দেহজনক দেখামাত্রই খবর দিতে রেঞ্জ অফিসে৷
চারদিনের দিন ক-জন জেলে এসে খবর দিল-জঙ্গলে তারা ক-জন অচেনা লোককে মধু ভাঙতে দেখেছে৷ নিশ্চয়ই তাদের মধু ভাঙার কোনো পারমিট নেই৷ যাদের পারমিট আছে তাদের সবাইকেই চেনে জেলেরা৷ আমিও দেখলাম সঠিক কথাই বলেছে জেলেরা, গত ছ-সাত মাসের মধ্যে সত্যি নুতন কোনো লোককেই মধু ভাঙার পারমিট দেওয়া হয়নি৷ অনুমান করতে মোটেই কষ্ট হল না-যারা হরিণ মেরে রেখে গেছে জঙ্গলে এটাও তাদেরই কীর্তি৷
রাগে শরীর রি-রি করে জ্বলছিল আমার৷ কিন্তু ধরার উপায় কী এই বোম্বেটেগুলোকে? সুন্দরবন তো আর ছোটো জায়গা নয়৷ যেমন অগুন্তি দ্বীপ আর জঙ্গল তেমনি মাকড়সার জালের মতো চারদিকে ছড়ানো অসংখ্য ছোটো-বড়ো খাল আর খাঁড়ি৷ তার কোনো একটাতে গা ঢাকা দিলে খুঁজে বের করা স্বয়ং শিবেরও অসাধ্য৷ তার উপরে বিরাট এই জঙ্গলের এলাকার তুলনায় ফরেস্ট গার্ডের সংখ্যাও খুবই অল্প৷ যাহোক, যে জেলেরা খবর দিতে এসেছিল তাদের বলে দিলাম-এরপর ওই ডাকাতদের কাউকে দেখলেই কালবিলম্ব না করে অফিসে এসে খবর দিতে৷ যে সঠিক খবর এনে দিতে পারবে তাকে পুরস্কার দেওয়া হবে৷ এরপর দিনসাতেক কিন্তু আর ওদের কোনো খবর নেই৷
সপ্তাহখানেক পরে নৌকো আর লোকজন সঙ্গে নিয়ে কলসের জঙ্গলে পৌঁছেছি, গাছের গায়ে নম্বর দিতে৷ এটাই জঙ্গলের নিয়ম৷ কয়েক বছর অন্তর অন্তর বুড়ো গাছগুলি কেটে ফেলা হয়-কেটে ফেলার আগে নম্বর মেরে দেওয়া হয় গাছের গায়ে যাতে পরে যাদের গাছ কাটার ইজারা দেওয়া হবে তারা ইচ্ছেমতো গাছ না কাটতে পারে৷
জঙ্গলের কাছাকাছি গিয়ে পৌঁছেছি হঠাৎ দেখি উত্তর দিকের আকাশ কালো করে অজস্র শকুন উড়ছে৷ এত শকুন সুন্দরবনে? কোনো সুস্বাদু খাবারের সন্ধান পেয়েছে ওরা ওখানে? খুব কৌতূহল হল৷ রামতারণ ও আর দু-জন ফরেস্ট গার্ডকে তৎক্ষণাৎ পাঠিয়ে দিলাম ব্যাপারটা দেখে আসতে৷ ওরা কয়েক মিনিট বাদেই হাঁপাতে হাঁপাতে ফিরে এসে বলল-একটা বিরাট বাঘ মরে পড়ে আছে কয়েক-শো গজ দূরে৷ কিন্তু বাঘটার গায়ের ছাল ছাড়ানো, মুণ্ডুটা তো নেই-ই, থাবার নখগুলো অবধি লোপাট৷ যারা মেরেছে তারা সব কেটে নিয়ে গেছে৷ ছাল ছাড়ানো জানোয়ারটার আকার দেখেই বোঝা যাচ্ছে ওটা প্রমাণ সাইজের রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার না হয়ে যায় না৷
বুবাই নন্দলালবাবুর চেয়ারের কাছে টুল টেনে নিয়ে হাঁ করে শুনছিল৷ কী সাংঘাতিক জমে উঠেছে গল্পটা৷ একেবারে বইয়ে পড়া গল্পের মতোই৷
বুবাই নিশ্বাস বন্ধ করে বলল, কেন? ছাল ছাড়ানো কেন বাবা?
নন্দলালবাবু বললেন, বাঘের চামড়া খুব চড়া দামে বিক্রি হয় বাজারে৷ জুতো, মেয়েদের ভ্যানিটি ব্যাগ ও আরও দামি শৌখিন জিনিস তৈরি হয় তা দিয়ে৷ বিশেষ করে বাইরের দেশে দারুণ চাহিদা এসব জিনিসের৷
-আর নখগুলো বাবা? বুবাইয়ের জিজ্ঞাসা আর শেষ হয় না-
-হ্যাঁ৷ সাধারণ লোকের বিশ্বাস বাঘের নখ, দাঁত এসব দিয়ে নাকি অনেক দুরারোগ্য অসুখ সারানো যায়৷ তাই এসব জিনিসও প্রচুর দামে বিক্রি হয় চোরাবাজারে৷ যাক তারপর শোনো৷ সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা একেই কমে আসছে তার উপরে জঙ্গলে এরকম নিষ্ঠুরভাবে ব্যাঘ্রহত্যা! রামতারণ পঁচিশ বছরেরও বেশি পুরোনো ফরেস্ট গার্ড৷ খুব অল্প বয়েস থেকে সে ফরেস্ট গার্ডের কাজ করছে৷ বলতে গেলে একরকম জঙ্গলেই সে মানুষ৷ দেখলাম তার চোখ দিয়ে যেন রাগে আগুন ঠিকরে বেরোচ্ছে৷
রামতারণ এসে বলল-স্যার, জান পণ আমার৷ যে করেই হোক এই বদমায়েশগুলোকে শায়েস্তা করতে হবে৷ আপনি আমাকে ভার দিন স্যার-আমি দেখব কত হিম্মত ওদের৷ তার জন্য যেকোনো বিপদের মুখোমুখি হতে হয় হব স্যার৷ আমি কোনো বিপদকে পরোয়া করি না৷
দেখলাম খুবই উত্তেজিত হয়ে উঠেছে রামতারণ৷ হওয়াটাও স্বাভাবিক৷ এতদিন জঙ্গলে থেকে জঙ্গলের প্রতি ওর একটা নিবিড় ভালোবাসা গড়ে উঠেছে৷
বললাম, উত্তেজিত হয়ে লাভ নেই রামতারণ৷ মনে হচ্ছে যারা করছে এসব, তারা বেশ একটা বড়ো দল৷ জঙ্গলের ঘাঁজ-ঘোঁজ সব জানে৷ তাই আমাদের ফরেস্ট গার্ডরাও পাত্তা করতে পারছে না ওদের৷ দলটাকে ধরতে হলে আমাদের খুব ঠান্ডা মাথায় সন্তর্পণে এগোতে হবে৷ অফিসে ফিরে গিয়ে সবাই একসঙ্গে বসে একটা প্ল্যান ঠিক করতে হবে৷ প্রয়োজন পড়লে কলকাতায় হেড অফিসে জানাতে হবে৷
দু-দিন ধরে সেই জঙ্গলের বড়ো বড়ো গেঁয়ো, গরান, খলসি আর বাইন গাছে নম্বর দিয়ে আমরা মাতলা নদী দিয়ে বিকেল বেলা নৌকো করে ফিরে আসছি৷ পালে উত্তুরে বাতাস লেগে হু-হু করে এগোচ্ছে আমাদের পাঁচ-শো মনি নৌকো৷ হঠাৎ রামতারণ আঙুল তুলে চেঁচিয়ে উঠল, ওই ওই দেখুন স্যার!
তাকিয়ে দেখি প্রায় মাইলখানেক দূরে যেখানে মাতলা নদী বঙ্গোপসাগরে মিশেছে সেখানে জঙ্গলের আড়ালে একটা সবুজ রঙের নৌকো নোঙর করা রয়েছে৷ আমাদের নৌকোর থেকে আকারে অনেক ছোটো একটা নৌকো৷
রামতারণ ফিসফিস করে বলল, এ নির্ঘাত ওই বদমায়েশদের নৌকো স্যার৷ জেলেরা বলছিল একটা সবুজ নৌকোকে ওরা ক-দিন ধরে ঘোরাফেরা করতে দেখেছে জঙ্গলে৷ জঙ্গলের গাছপালার আড়ালে গা-ঢাকা দেওয়ার জন্যই ওরা নৌকোয় রং করেছে এরকম৷
এরকম অপ্রত্যাশিতভাবে সুযোগ হাতের মুঠোয় এসে যাবে ভাবিনি৷ এটা যে দুর্বৃত্তদের নৌকো সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই৷ নৌকোটা বেশ লম্বাটে গড়নের এবং মুখটা ছুঁচলো৷ এরকম অদ্ভুত আকৃতির নৌকো তো কখনো আগে দেখিনি এ তল্লাটে৷ মাঝিকে হুকুম দিলাম নিঃশব্দে জঙ্গলের গা ঘেঁষে ঘেঁষে নৌকোটার দিকে এগোতে যাতে ওরা মোটেই না দেখতে পায় আমাদের৷ আমাদের নৌকোর দাঁড়ি-মাঝিরা খুবই অভিজ্ঞ৷ তক্ষুনি নৌকোর পাল নামিয়ে ফেলে একেবারে জঙ্গলের গা ঘেঁষে লগি ঠেলে ঠেলে নৌকো এগিয়ে নিয়ে চলল তিন দাঁড়ি আর এক মাঝি৷ আমার হাতে বন্দুক৷ নিশ্বাস বন্ধ করে আমরা অপেক্ষা করছি৷ কিন্তু ফার্লং খানেক পথ যেতে-না-যেতেই ওরা দেখে ফেলল আমাদের৷ হঠাৎ শুনি নোঙর তোলার শব্দ৷ তরতর করে বিরাট সবুজ পাল উঠে গেল দূরের নৌকোটায়, আর মুহূর্তে যেন হাউইবাজির মতো এক ধাক্কায় জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এসেই সাঁ সাঁ করে জল কেটে কেটে নৌকোটা মাছের মতো দ্রুত এগোতে লাগল সামনে৷ সোজা দক্ষিণে সমুদ্রের দিকে মুখ নৌকোটার৷ আমাদের দুটো নৌকোর ব্যবধান বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেল৷ বুঝলাম ওই লম্বা আর ছুঁচলো আকৃতির জন্যই অদ্ভুত গতিসম্পন্ন নৌকোটা৷ পালে বাতাস পেয়ে যেন উড়ে যাচ্ছে সমুদ্রের দিকে৷ মতলবটা বুঝতে অসুবিধা হল না৷ বাইরের বিশাল সমুদ্রে একবার পড়তে পারলে তারপর আর কে ধরে তাদের৷
বুড়ো মাঝি লক্ষ্মণ অসহায়ের মতো একবার তাকাল আমার মুখের দিকে৷ আমি বললাম, কুছ পরোয়া নেই লক্ষ্মণ৷ চালাও নৌকো ওদের পিছু পিছু৷ যদি নরক অবধি যেতে হয় যাব আমরা আজ৷
রামতারণ সোৎসাহে বলল-ঠিক বলেছেন স্যার৷ দেখি আজ কোথায় পালায় ওরা৷ নরকে না যাই, দরকার হলে আন্দামান অবধিই যাব আজ৷
আবার পাল তুলে দেওয়া হল আমাদের নৌকোয়৷ সবুজ নৌকোটা ইতিমধ্যে গিয়ে সমুদ্রে পড়েছে৷ আমাদের নৌকোও চলল ওর পিছু পিছু৷ ততক্ষণে সন্ধ্যে হয়ে এসেছে৷ অনেক দূরে জম্বু দ্বীপের কালো গাছগাছালিগুলো দেখাচ্ছে যেন ভয়ে-কাঁটা-দেওয়া কোনো জন্তুর গায়ের লোম৷ তার পিছনে অস্ত যাচ্ছে অতিকায় লাল চাকার মতো সূর্যটা৷ চারপাশের ধু-ধু করছে মরা মাছের চোখের মতো ফ্যাকাশে সাদা জল৷ কুলকিনারা নেই তার৷ আর এই অসীম জলের মধ্যে আর কিছু নেই-শুধু দুটো নৌকো৷
হাওয়াটা হঠাৎ কেন জানি না ঝুপ করে পড়ে গেল আর হাওয়াটা পড়ে যাওয়ার সঙ্গেসঙ্গেই দুটো নৌকোর ভিতরের দূরত্ব আস্তে আস্তে কমে আসতে লাগল৷ কেননা নৌকো এবার চলতে লাগল শুধু দাঁড়ে আর আমাদের তিনজন দাঁড়িই অত্যন্ত জোয়ান আর পরিশ্রমী৷ ওরাও সমানে দাঁড় টানছে কিন্তু পেরে উঠছে না আমাদের দাঁড়ির সঙ্গে৷ এরকম আর আধঘণ্টা পাল্লা দিতে পারলেই আমরা শয়তানগুলোকে বামাল ধরে ফেলতে পারি৷ কিন্তু তার আগেই একটা কাণ্ড ঘটে গেল৷
-কী কাণ্ড বাবা? উত্তেজনায় বুবাইয়ের গলার স্বর প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম৷
-সবুজ নৌকোটা আমাদের কাছ থেকে মোটে যখন পাঁচ-শো গজ দূরে তখন দেখতে-না-দেখতে একটা হালকা সাদা কুয়াশা যেন ডানা মুড়ে ঝুপ করে নেমে এল জলের উপরে-শীতের বিকেলে যেমন ধোঁয়া নেমে আসে মাটির উপরে৷ মুহূর্তের মধ্যেই কুয়াশাটা থকথকে সাদা হয়ে আকাশ আর জল একাকার করে দিল৷ এত ঘন হয়ে উঠল কুয়াশা যে, দু-হাত দূরের জিনিস অবধি আর দেখা যাচ্ছে না৷ লক্ষ্মণ মাঝি তাও শুধুমাত্র আগের নৌকোটার দাঁড়ের ছপছপ শব্দ শুনেই পিছন পিছন চালিয়ে যাচ্ছিল আমাদের নৌকোটা৷ কিন্তু এভাবে বেশিক্ষণ নৌকো চালানোটাই অত্যন্ত বিপজ্জনক৷ হুগলি নদীর মোহনায় অজস্র ডুবো চর ছড়ানো আছে এদিকে-ওদিকে৷ বেমক্কা তার কোনোটাতে নৌকো ঠেকে গেলে আর রক্ষা নেই৷ নির্ঘাত সলিল সমাধি৷ মাঝিকে হুকুম দেওয়ামাত্রই সে দাঁড় বন্ধ করে নোঙর ফেলে দিল৷ সামনের নৌকোটা কিন্তু সমানে দাঁড় টেনেই চলেছে৷ ছপছপ শব্দ শোনা যাচ্ছিল তার দাঁড়ের৷ হালকা নৌকো৷ সুতরাং ডুবো চরে ধাক্কা খাওয়ার সম্ভাবনা ওদের কম৷ তার উপরে ওরা পালাচ্ছে প্রাণের দায়ে৷ ধরা পড়লে ক-বছর জেলের ঘানি টানতে হবে তার ঠিক নেই৷ কিছুক্ষণের মধ্যেই ওদের দাঁড়ের শব্দ ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হতে হতে অসীম নৈঃশব্দ্যে মিলিয়ে গেল৷ কোথাও আর কোনো সাড়াশব্দ নেই৷ এত আশ্চর্য নৈঃশব্দ্য চারিদিকে যে জলের উপর থুথু ফেললেও যেন তার শব্দ শোনা যাচ্ছিল৷
কুয়াশা ক্রমশই ঘন হয়ে উঠছিল৷ আমরা আকাশ না জল কোথায় আছি-জলের উপর ভাসছি না মহাশূন্যে ঝুলছি কিছুই আঁচ করতে পারছিলাম না৷
এরকম ত্রিশঙ্কু অবস্থায় তো রাতটা কাটল৷ বেলা আটটা নাগাদ কুয়াশা কেটে যেতেই বোঝা গেল আমরা গভীর সমুদ্রে এসে পড়েছি৷ চারদিকে কোথাও কুলকিনারা চোখে পড়ছে না, শুধু আমাদের নৌকো থেকে অল্প দূরে একটা চরা মতো দেখা যাচ্ছে৷ জলের কিনারা ঘেঁষে লম্বা লম্বা ধানি ঘাসের জঙ্গল৷ ভিতরে বালির উপরে পুরু কার্পেটের মতো সবুজ আইপোমিয়া লতার একটা আস্তরণ৷ ভারি সুন্দর বেগুনি রঙের ফুল ফুটে আছে তাতে৷ নন্দলালবাবু বুবাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, আইপোমিয়া হল কলমি জাতীয় একরকম লতানে গাছ৷ সমুদ্রের ধারে বালির চরায় সাধারণত এরা প্রচুর জন্মায়৷
দাঁড়ি-মাঝিরা কেবিনের বাইরে এসে একনজরে দেখছিল চরাটাকে৷ হঠাৎ ওদের মধ্যে ইয়াসিন বলে একজন সভয়ে বলে উঠল, ইয়া আল্লা-এ যে চুপ সাহেবের চরা! আমরা তাহলে বাবু মানুষ-বয়াও পিছনি ফেলে চলে এসেছি৷ হায় হায় এ কোথায় এলাম আমরা৷
সুরমাও ছেলেমানুষের মতো এতক্ষণ হাঁ করে শুনছিলেন নন্দলালবাবুর গল্প৷ এবার তিনিও কৌতূহলী সুরে প্রশ্ন করেন, মানুষ-বয়া? সে আবার কী?
নন্দলালবাবু বললেন, মানুষ-বয়া হল গভীর সমুদ্রে বয়ার মতো নোঙর করা বিরাট লোহার ঘর৷ পালা করে টানা ছ-মাস মানুষ থাকে অকূল সমুদ্রে ভাসমান এই ঘরের ভিতরে৷ তীরমুখী জাহাজদের দিকনির্দেশ করাই এদের কাজ৷ মানুষ থাকে বলেই সুন্দরবনের জেলে মাঝিরা একে বলে মানুষ-বয়া৷
তা আমরা সবাই চরার দিকে তাকিয়ে আছি হঠাৎ রামতারণ প্রচণ্ড বিস্ময়ে চেঁচিয়ে উঠল, ওদিকে দেখুন স্যার, ওদিকে! কী? ওটা কী?
বুবাই ভয়ে আর উত্তেজনায় টুল ছেড়ে একলাফে উঠে একেবারে মা-র গা ঘেঁষে দাঁড়াল৷ সুরমা হেসে জড়িয়ে ধরেন ওকে৷
নন্দলালবাবু বললেন, আমরা সামনে নজর চালিয়ে দেখি অনেক দূরে আইপোমিয়ার জঙ্গলে অতিকায় একটা পোকার মতো কী যেন নড়েচড়ে বেড়াচ্ছে৷ আমাদের দিকেই আস্তে আস্তে এগিয়ে আসছে৷ অনেক দূরে থাকার জন্য জিনিসটা কী চোখে ঠিক ঠাহর হচ্ছে না৷ আমরা জিনিসটা কী বুঝে ওঠার চেষ্টা করছি, হঠাৎ যেন মানুষের গলার ক্ষীণ আর্তনাদের মতো একটা আওয়াজ ভেসে এল৷
গায়ের লোম খাড়া হয়ে উঠেছে বুবাইয়ের৷ পোকার গলায় মানুষের আর্তনাদ! জুলে ভার্নে নাকি এইচ জি ওয়েলসের রোমাঞ্চকর গল্প শুনছে সে? সুরমা সবিস্ময়ে প্রশ্ন করেন, মানুষের গলা?
-হ্যাঁ৷ কিন্তু আওয়াজটা খুব স্পষ্ট নয়৷ শুধু মনে হচ্ছিল সাংঘাতিক বিপদে পড়ে কেউ যেন সাহায্য চাইছে৷ ব্যাপারটা কী দেখতে ভীষণ কৌতূহল হল আমার৷ নৌকো থেকে লাফ দিয়ে আমি চরায় নামলাম৷
আমাকে চরায় নামতে দেখে নৌকোর দাঁড়ি-মাঝিদের মুখ তো ভয়ে শুকিয়ে গেছে৷ এমনকী রামতারণেরও৷ হাত-পাওয়ালা রক্তমাংসের মানুষ, তারা যত হিংস্র আর ভয়ংকরই হোক না কেন তাদের সঙ্গে মোকাবিলায় পেছুপা নয় রামতারণ৷ কিন্তু মানুষ নয় যারা, তাদের সঙ্গে কি লড়াই চলে? লক্ষ্মণ হাতজোড় করে বলল, আপনি উঠে আসুন স্যার, এই বিজন বিভুঁই জঙ্গলে জিন-পরি না কী আছে কে জানে? মাঝখান থেকে একটা সাংঘাতিক বিপদ ঘটে যাবে স্যার-
সুরমার দিকে তাকিয়ে নন্দলালবাবু ঈষৎ হেসে বললেন, ওরা সবাই আমাকে খুব ভালোবাসে বলেই আরও বেশি ভয় পেয়ে গেছে৷ কিন্তু জানোই তো ওসব ভূতপ্রেত দত্যিদানোয় কোনোদিনই কোনো বিশ্বাস নেই আমার৷ একাই আমি এগিয়ে চললাম শব্দটা লক্ষ করে৷ শুনি পিছনে ইয়াসিন বিড়বিড় করছে-হায় আল্লা, ওকে মেহেরবানি করে বাঁচাও তুমি, ইয়া আল্লা৷
এবার সুরমার মুখও ভয়ে শুকিয়ে গেছে৷ শুকনো গলায় বললেন, একাই চললে তুমি? ভূতপ্রেত না থাকুক বাঘ-টাঘ থাকতে পারত তো!
তার জন্য তো বন্দুকই সঙ্গে আছে-নিশ্চিন্ত গলায় বললেন নন্দলালবাবু-তারপর শোনো, অনেক দূরে সেই পোকার মতো প্রাণীটার দিকে নজর রেখে তো এগোচ্ছি৷ যতই কাছে আসছি ততই মনে হচ্ছে ওটা মানুষই বটে৷ কোনো পোকা কি এরকম চার হাত-পায়ে হামাগুড়ি দিয়ে হাঁটে? প্রাণীটার কয়েক-শো গজের মধ্যে গিয়ে যখন পৌঁছেছি তখন হঠাৎ আচমকা ভয়ে সারা গায়ে যেন আমার কাঁটা দিয়ে উঠল৷ মনে হল হাত থেকে যেন আমার বন্দুক খসে পড়ে যাবে৷ আইপোমিয়ার জঙ্গলের ভিতর থেকে দু-পায়ে ভর দিয়ে বনমানুষের মতো কষ্টকর ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়িয়েছে বিকট একটা মনুষ্যমূর্তি৷ মানুষেরই মূর্তি কিন্তু মানুষ নয়৷ মানুষ এরকম ভয়াবহ দেখতে কী করে হতে পারে? ঠিক যেন একটা জীবন্ত কঙ্কাল আমার সামনে দাঁড়িয়ে৷ কোমরে তার একফালি কাপড় জড়ানো৷ মাথা-ভরতি সাপের মতো পাকানো চুল-চোখ দুটোর সে যে কী অস্বাভাবিক দৃষ্টি তা কথায় বোঝানো অসম্ভব৷ হাতে আবার একটা লাঠি ধরা তার৷
-আমি বোঝার চেষ্টা করছি এ কোন প্রাণী আমার সামনে দাঁড়িয়ে-হঠাৎ জানোয়ারের মতো চার হাত পায়ে হামাগুড়ি দিয়ে সেই মনুষ্যাকৃতি প্রাণীটা সোজা আমার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল৷ মুহূর্তে শিরদাঁড়া বেয়ে আমার একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল-ইচ্ছে হল ছুটে পালাই৷ কিন্তু ততক্ষণে যথেষ্ট দেরি হয়ে গেছে৷ একেবারে আমার মুখোমুখি এসে গেছে সে৷ আমি বন্দুকের ট্রিগারে আঙুল রেখে কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে আছি৷
আমার কাছে এসেই সেই জীবন্ত কঙ্কালটা হঠাৎ দু-হাতে আমার পা জড়িয়ে ধরতে যেতেই আমি দু-পা পিছিয়ে গিয়ে চিৎকার করে উঠলাম, দাঁড়াও ওখানে৷ কী চাও তুমি?
লোকটা কী একটা কথা বলতে গেল কিন্তু কোনো কথা বেরোল না মুখ দিয়ে৷ অস্পষ্ট একটা গোঙানির মতো শব্দ শুনতে পেলাম শুধু৷ দু-হাত ঠোঁটের কাছে জড়ো করে কী একটা যেন বলতে চাইছে সে৷
আমি বললাম, তেষ্টা পেয়েছে? জল খাবে তুমি?
অনেকটা পাখির ছানার মতো মুখটা হাঁ করে মাথা নাড়ল সে৷ আমি দেখলাম লোকটার জিভ ফুলে ঢোল হয়ে আছে৷ সে জন্যই বোধহয় কোনো কথা বলতে পারছে না সে৷
আমি আবার নৌকোর কাছে ছুটে গিয়ে লক্ষ্মণকে বললাম তাড়াতাড়ি জল নিয়ে আসতে৷ আমার কোনো ক্ষতি হয়নি দেখে ওরা এতক্ষণে সাহস ফিরে পেল৷

লক্ষ্মণ এক জগ জল নিয়ে আসতেই প্রায় বাঘের মতো লক্ষ্মণের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েই জগটা ছিনিয়ে নিল সে, তারপর ঢকঢক করে পুরো এক জগ জল এক চুমুকে শেষ করে দিল৷ নৌকো থেকে আর এক জগ জল নিয়ে এল লক্ষ্মণ৷ তাও এক চুমুকে শেষ৷ মনে হচ্ছিল অগস্ত্যের মতো আস্ত একটা সমুদ্রই যেন শুষে খেয়ে ফেলবে সে৷ এত ভয়ানক তার জলতেষ্টা৷
দু-জগ জল শেষ করে লোকটা হঠাৎ কোনো কথা না বলে চিত হয়ে শুয়ে পড়ল মাটির উপর৷ তারপর চোখের পলক ফেলতে না ফেলতেই গভীর ঘুমের মধ্যে ডুবে গেল৷ দেখে মনে হচ্ছিল যেন মরে গেছে সে৷ আমার নির্দেশ মতো দাঁড়ি-মাঝিরা ধরাধরি করে ওকে নৌকায় নিয়ে এসে পাটাতনে শুইয়ে দিল৷ টানা তিন-চার ঘণ্টা ঘুমোল লোকটা৷ ঘুমের মধ্যেই মাঝে মাঝে বিড়বিড় করে যেন কী বলছিল সে৷ মাঝে মাঝে কোনো ভীষণ দুঃস্বপ্ন দেখে ভয়ানক চিৎকার করে জেগে উঠেই আবার ঘুমিয়ে পড়ছিল৷ একটা আশ্চর্য জিনিস-লাঠিটা সবসময়েই কিন্তু হাতের মুঠোয় ধরা আছে তার৷ যেন কোনোভাবেই ওই বস্তুটি সে হাতছাড়া করতে রাজি নয়৷
দিনকয়েক পরে খাওয়া-দাওয়া করে লোকটা একটু চাঙ্গা হয়ে উঠলে আমরা গোল হয়ে ওর চারপাশে বসে শীতের অন্ধকার রাতে গল্প শুনতে বসলাম-কী করে ও এই দ্বীপে এল৷
লোকটা জানাল, সে জাতে বহরদার৷
বহরদার কী তোমরা জানো না বোধ হয়? স্ত্রী আর ছেলের দিকে তাকিয়ে এবার জিজ্ঞাসা করলেন নন্দলালবাবু৷
দু-জনেই একসঙ্গে মাথা নাড়ল৷
নন্দলালবাবু বললেন-বহরদাররা হল সুন্দরবনের বিশেষ এক জাতের মানুষ৷ এরা নাকি মন্ত্র পড়ে বাঘ, সাপ, কুমির ইত্যাদি হিংস্র জন্তুকে এমনভাবে বশ মানাতে পারে যাতে তারা আর মানুষের কোনো ক্ষতি করতে না পারে৷ সুন্দরবনে প্রতি বছর কাঠ কাটতে, মধু ভাঙতে কিংবা মাছ ধরতে যায় যেসব বাউলিয়া ও জেলেরা তারা বহরদারদের সঙ্গে নেয়৷ শুধু হিংস্র জন্তুর আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়াই নয়-এমন মন্ত্রও নাকি জানে ওরা যে সুন্দরবনের দুর্ভেদ্য জঙ্গলে চলতে গিয়েও কেউ গাছের কাঁটার খোঁচায় সামান্য জখমও হবে না কখনো৷ সুন্দরবনে হেঁতাল ও অন্যান্য অনেক লতা ও গাছ আছে-মারাত্মক তার কাঁটা৷ সেই কাঁটার হাত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্যই এই ব্যবস্থা৷ বহরদাররা জঙ্গলে নেমেই কোনো জায়গা ঠিক করে নিয়ে সেখানে বাঘ, সাপ, কুমির আর কাঁটা খোঁচা বন্ধর মন্ত্র পড়ে দেবে-ব্যস৷ আর সেখানে এসব কোনো কিছুরই জোর খাটবে না৷ বহরদারের মন্ত্রের কাছে এরা তখন সব কেঁচো৷
-এসব সত্যি বাবা? বুবাই থাকতে না পেরে এবার সন্দিগ্ধভাবে প্রশ্ন করে৷
নন্দলালবাবু, একটু হেসে বললেন, সত্যি কি মিথ্যা আমি বলব না বুবাই৷ তবে সুন্দরবনের যারা আদত মানুষ তারা গভীরভাবে বিশ্বাস করে এসব৷ এই বিশ্বাস নিয়েই বছরের পর বছর এখানকার অসহায় মানুষেরা এই সব হিংস্র জন্তু আর বিষাক্ত সরীসৃপদের মধ্যে বেঁচে আছে৷ সভ্য মানুষের মাপকাঠিতে এদের সব কিছু বিচার করতে যাওয়াটাই বোধ হয় ভুল হবে৷ এতদিন জঙ্গলে থেকেও আমি ওদের সমস্ত কিছু জানি না৷ ওরা একেবারে ওদেরই মতো৷
যাক এতক্ষণে বোধ হয় তোমরা আঁচ করতে পেরেছ যে ওই লোকটিরই নাম অর্জুন মণ্ডল৷
সুরমা বুবাই দু-জনেই মাথা নাড়ে৷ বুবাই আনন্দে চিৎকার করে উঠল, হ্যাঁ বাবা, অনেকক্ষণ আগেই আমি বুঝতে পেরেছি৷
নন্দলালবাবু জিজ্ঞাসা করলেন, কী ভাবে বুঝলে তুমি?
বুবাই চটপট জবাব দিল, কেন বাবা? তুমি যাকে নিয়ে এসেছ তার হাতেও তো একটা লাঠি আছে৷
বেশ, বেশ, নন্দলালবাবু হাসতে হাসতে বললেন, তুমি দেখছি গোয়েন্দা গল্প পড়তে পড়তে একেবারে গোয়েন্দা হয়ে উঠেছ৷ যাক, এবার শোনো অর্জুন মণ্ডলের গল্প৷
কাকদ্বীপের নির্মল পাড়ুয়া খুব বড়ো একজন কাঠের গোলাদার৷ কাকদ্বীপ বাজারে তার মস্ত কাঠের গোলা৷ প্রতি বছর হাজার হাজার টাকা দাদন দেয় সে বাউলিয়াদের আর বাউলিয়ারা সুন্দরবনের গভীর জঙ্গল থেকে কাঠ কেটে এনে নির্মল পাড়ুয়ার গোলায় তুলে দিয়ে যায়৷ এ বছর শীতের মুখটায় শোনা গেল বাঘনার জঙ্গলে একটা বিরাট 'কুপ' (গাছকাটাই) হবে৷ অনেক পুরানো মোটা মোটা গাছ৷ নিবিড় জঙ্গল৷ অনেকদিন কোনো গাছ কাটা হয়নি সেখানে৷ সুতরাং ফরেস্টের লোকেরা যেই ঘের দিয়ে যাবে সেই ঘেরের মধ্যে হাজার হাজার গাছ পড়বে৷ ঠিক দরে ইজারা নিতে পারলে প্রচুর লাভ৷
নির্মল পাড়ুয়া ঝানু ব্যবসায়ী লোক৷ এক মুহূর্তও দেরি না করে কয়েক হাজার টাকা নিয়ে সে ফ্রেজারগঞ্জে তার বাঁধা বাউলিয়াকে টাকা দাদন দিয়ে এল বাঘনা জঙ্গলে গিয়ে গাছ কাটার জন্য৷ বাউলিয়ারা শুভ দিনক্ষণ দেখে নৌকোর দেবতা 'কাষ্ঠবুড়ি'-কে পুজো দিয়ে বাঘনার উদ্দেশে রওনা হয়ে গেল৷ অর্জুন মণ্ডল তাদের সঙ্গে চলল বহরদার হিসেবে৷ অর্জুন মণ্ডল নামকরা বহরদার ওসব অঞ্চলের৷
ক-দিন থেকেই ছিঁড়ে-যাওয়া দুধের মতো হালকা ছ্যাকড়া ছ্যাকড়া মেঘ ভাসছিল আকাশে৷ মাঝে মাঝে উত্তর-পশ্চিম কোণ থেকে কনকনে ঠান্ডা হাওয়া! পৌষ মাসের পক্ষে একটু অস্বাভাবিক আবহাওয়া কিন্তু ওরা গা করল না৷ বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসের দোখনোয় (দক্ষিণা হাওয়া) যাদের বাইরের সমুদ্রে নৌকো চালাবার অভ্যাস আছে তাদের কাছে এ তো কোনো ব্যাপারই নয়৷ তা অর্জুনদের নৌকো ফ্রেজারগঞ্জ থেকে রওনা হয়ে সপ্তমুখী পেরিয়ে যখন ঠাকুরান নদীর মুখে গিয়ে পড়েছে তখন বিকেল হয়ে গেছে৷ হাওয়ার জোর প্রচণ্ড বেড়ে উঠল হঠাৎ৷ নৌকোর মাঝি পাল নামিয়ে দিয়ে আপ্রাণ শক্তিতে হাল চেপে ধরেছে যাতে হাওয়ার চাপে নৌকো বার সমুদ্রে না গিয়ে পড়ে৷ মাইলখানেক দূরে দেখা যাচ্ছে তমলুক চরার কালো জঙ্গলের রেখা৷
হঠাৎ নৌকোর সবাই একটা অত্যন্ত আশ্চর্য দৃশ্যের মুখোমুখি হল৷ তমলুক চরার উপরের আকাশে কোত্থেকে কিছু নেই হঠাৎ লাখখানেক পাখি উড়ে এসে বোঁ বোঁ করে পাক খেতে লাগল৷ লাখখানেক নয় কয়েক কোটি পাখি৷ সেদিকে চোখ পড়ামাত্রই নৌকোর পুরোনো বৃদ্ধ মাঝির চোখ-মুখ ভয়ে একেবারে সাদা হয়ে গেল৷ পাগলের মতো চেঁচিয়ে উঠল সে, খুলি ফ্যালো, যার যা জামা-কাপড় আছে সব খুলি ফেলে পাটাতনের উপর শুয়ি পড়ো৷
কেউই বুঝতে পারছে না ব্যাপারটা কী৷ এমনকী অর্জুন, যে এতদিন ধরে সুন্দরবনের জলেজঙ্গলে ঘুরেছে, সেও নয়৷ কিন্তু মাঝির গলার স্বরে এমন একটা ভয়ানক বিপদের আভাস ছিল যে কেউ আর দ্বিরুক্তি না করে যতদূর সম্ভব জামাকাপড় খুলে পাটাতনের উপর সটান উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ল৷
বুড়ো মাঝি খালি বিড়বিড় করে বলছে, হাতিশুঁড়- হাতিশুঁড়-
তারপরই সেই অবিশ্বাস্য ঘটনাটা ঘটল৷ নৌকোয় উপুড় হয়ে শুয়ে থাকা মানুষগুলো দেখতে পেল নদীর জল পাক খেয়ে সোজা আকাশের দিকে উঠে যাচ্ছে৷ যেন মনে হচ্ছে অতিকায় একটা শঙ্খচূড় সাপ লেজের উপর খাড়া দাঁড়িয়ে আকাশটাকে ছোবল মারতে চাইছে৷ এগিয়ে আসছে সেই দৈত্যাকৃতি সরীসৃপটা ...এগিয়ে আসছে... মুহূর্তে ওদের নৌকোর কাছে এসেই সোজা ওদের নৌকো লক্ষ করেই ছোবল মারল৷ অর্জুনদের মনে হল একটা পাহাড় যেন ওদের মাথার উপর আছড়ে ভেঙে পড়ল৷ জলের ধাক্কায় সেই বিরাট পাঁচ-শো মনি নৌকোটার হাল গেল ভেঙে৷ অর্জুন নৌকো থেকে ছিটকে গিয়ে পড়ল জলে৷ হাতের কাছে একটা ভাঙা কাঠের তক্তা পেয়ে সেটাই আঁকড়ে ধরল অর্জুন৷ ওর মাথার উপর দিয়ে তখন পাগলা হাতির মতো ঢেউ ছুটে যাচ্ছে৷ ঢেউয়ের পর ঢেউ৷
সুন্দরবনের মানুষ অর্জুন৷ অত্যন্ত চৌকশ সাঁতারু৷ কিন্তু এই তুফানের মধ্যে সাঁতার কাটার কথা ভাবাটাই হাস্যকর৷ সন্ধ্যার অন্ধকারে তমলুক চরার গাছগাছালি তখনও আবছা আবছা দেখা যাচ্ছে কিন্তু অর্জুন এক তিলও সেদিকে এগোতে পারল না৷ হাওয়া আর স্রোতের ধাক্কায় ক্রমশই সে গভীর সমুদ্রের দিকে ভেসে যেতে লাগল৷ এরপরই শুরু হল মুষলধারায় বৃষ্টি, সঙ্গে কনকনে বরফের মতো ঠান্ডা হাওয়া৷ সমস্ত শরীর জমে যাচ্ছে ঠান্ডায় তার সঙ্গে ভয় আর উৎকন্ঠা৷ ধু-ধু অসীম জল তার মধ্যে সে-ই শুধু একমাত্র প্রাণী-কাঠের তক্তায় ভাসছে৷ তারপর কখন জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল জানে না অর্জুন৷ যখন জ্ঞান ফিরে এল তখন ভোর হয়ে গেছে৷ ঝড়বৃষ্টি কিছু নেই৷ আকাশ একেবারে ভাঙা কাচের টুকরোর মতো ঝকঝকে পরিষ্কার৷ তিড়িক তিড়িক করে কানের কাছে বাটাং পাখির ডাক না? খুব আশ্চর্য হয়ে গেল অর্জুন৷ স্বপ্ন দেখছে নাকি সে? এই অকূল সমুদ্রের মধ্যে বাটাং পাখি আসবে কোত্থেকে? সমস্ত শরীরে বিষের মতো ব্যথা৷ কষ্ট করে কোনোরকমে ঘাড় তুলতেই অবাক অর্জুন৷ কাঠের তক্তায় অকূল সমুদ্রে ভাসার বদলে নরম ধানি ঘাসের জঙ্গলে সে শুয়ে আছে৷ সামনে দেখা যাচ্ছে বিরাট বালির চরা৷ কোনোক্রমে তাহলে প্রাণে বেঁচে গেছে সে৷ নৌকোর আর সকলের কী হয়েছে কে জানে? প্রাণটা ফিরে পেয়ে খুব খুশি অর্জুন কিন্তু এর পরের কষ্ট যে কী তা ধারণায় ছিল না তার৷
ধু-ধু নির্জন চরা৷ চরাটার বয়স যে খুব বেশি নয় তা অর্জুন আন্দাজ করতে পারল অজস্র ধানি ঘাস আর নীল ফুলে ছাওয়া কেটকির জঙ্গল দেখে৷ সমুদ্রের বুকে নতুন জেগে ওঠা নরম মাটিতেই সাধারণত এ-জাতীয় গাছ বেশি জন্মায়৷ চরার মাঝখানটাতে কচ্ছপের পিঠের মতো গোল বালির ঢিবি৷ সেখানটা আবার আইপোমিয়া ফুলে বেগুনি হয়ে আছে৷ কোথাও কোনো প্রাণের সাড়া নেই, শুধু বালির উপরে কিছু লাল এক-দাঁড়াওয়ালা কাঁকড়া আর জলের ধারে কয়েকটা বাটাং পাখি লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়াচ্ছে কাদার উপর হালকা পায়ের ছাপ এঁকে৷ ভয়ে উৎকন্ঠায় গতকাল দুপুর থেকেই খিদে তেষ্টার কথা ভুলে ছিল অর্জুন৷ এবার সে আস্তে আস্তে খিদেটা টের পেতে শুরু করল৷ অর্জুনের মনে হচ্ছিল যেন একবছর পেটে কিছু দানা পড়েনি তার৷ পাকস্থলীতে তার রাবণের চিতে জ্বলছে৷ সেই সঙ্গে জলতেষ্টা৷ ব্রহ্মতালু অবধি যেন শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে তার৷ কিন্তু কোথায় খাবার কোথায়ই বা জল? খিদে তাও বুঝি সহ্য করা যায় কিন্তু জলতেষ্টার কষ্টটা অবর্ণনীয়৷ নিরুপায় হয়ে সমুদ্রের জল একবার ছোঁয়াতে গেল ঠোঁটে কিন্তু এত ভীষণ নোনা সে জল যে, সেই প্রচণ্ড পিপাসাতেও অর্জুনের মনে হল যেন নাড়িভুঁড়ি উলটে বমি হয়ে যাবে তার৷
দু-দিনের দিন ধানি ঘাস ছিঁড়ে তাই চিবুতে লাগল অর্জুন যদি একটু রস পাওয়া যায় তা থেকে৷ কোথায় রস? কাগজের মতো শুকনো খটখটে পাতা৷ মাঝখান থেকে পাতার দু-পাশে করাতের মতো ধারে জিভ আর গাল কেটেকুটে একশা অর্জুনের৷ কিন্তু জল না পেলে যে বেঘোরে মারা পড়বে সে৷ সমুদ্রের মধ্যে এই ধরনের বালির চরে গর্ত খুঁড়লে অনেক সময় নীচ থেকে মিষ্টি জল চুঁইয়ে আসে জানত অর্জুন৷ কিন্তু শক্ত বালিতে আঙুল ঢোকে না৷ কোনোক্রমে হাত দেড়েক গর্ত করা গেল মাত্র৷ কিন্তু কোথায় জল? গর্তের নীচের বালি একটু ভিজে উঠল এইমাত্র৷ তাই তো অনেক৷ গোরুর মতো নীচু হয়ে চার হাত-পায়ে ভর দিয়ে জিভ দিয়ে সেই ভেজা বালি চাটতে লাগল অর্জুন-যতটা জল পাওয়া যায়৷ খিদের কষ্ট সহ্য করতে না পেরে তিন দিনের দিন কাঁকড়া ধরে খেতে গেল অর্জুন৷ কিন্তু অদ্ভুত চালাক কাঁকড়াগুলো৷ পেরিস্কোপের মতো মাথার অনেকটা উপরে উঁচু হয়ে আছে ওদের একজোড়া চোখ৷ ফলে অনেকটা দূর অবধি তারা দেখতে পায়৷ অর্জুন কাছাকাছিও যেতে পারে না, তার আগেই তারা ছুটতে ছুটতে বালির উপরে ছড়ানো অজস্র গর্তের যেকোনো একটাতে ঠিক ঢুকে পড়ে৷ এক ঘণ্টা চেষ্টা করেও একটাও ধরতে পারল না অর্জুন৷ বাটাং পাখিগুলো তো আরও ধুর্ত আর সন্দেহপ্রবণ৷ তাদের এই একচ্ছত্র রাজত্বে যে অর্জুনের মতো অদ্ভুত জীবের উপস্থিতিটা একান্তই অনভিপ্রেত ও সন্দেহজনক তা তারা বুঝিয়ে দিচ্ছিল তাদের হাবেভাবে৷ অর্জুনের মাথার উপরে অনবরত চক্রাকারে পাক খেতে খেতে ডাকছিল তারা৷ ভয় পেলে ওরা এরকমই ডাকে৷
কিন্তু এত কষ্টের মধ্যেও অর্জুনের মনে একটা ক্ষীণ আশা ছিল যে, শীতকালে গভীর সমুদ্রেও মাছ ধরতে আসে জেলেরা৷ সেরকম কোনো নৌকো নিশ্চয়ই একসময়ে আসবে কাছাকাছি তখন অর্জুন চিৎকার করে ডাকলেই ওরা এখান থেকে উদ্ধার করবে অর্জুনকে৷ কিন্তু তিন দিন পেরিয়ে গেলেও যখন আশেপাশে কোথাও কোনো নৌকো দেখা গেল না তখন ভয়ে বুকের রক্ত হিম হয়ে গেল অর্জুনের৷ সে পরিষ্কার বুঝতে পারল সমুদ্রে ভাসতে ভাসতে এতদূরে চলে এসেছে সে যে, কোনো জেলে নৌকোও মাছ ধরতে আসে না এখানে৷ তাহলে এই বিজন বিভুঁই দ্বীপে কি পিপাসায় অনাহারে এরকম বেঘোরেই প্রাণটা যাবে তার? কিন্তু আশ্চর্য মানুষের বেঁচে থাকার ইচ্ছা৷ ভয়ানক মৃত্যু অবধারিত জেনেও যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ আশ৷
চার দিনের দিন পাগলের মতো চেষ্টায় দুটো অসাবধানী কাঁকড়াকে ধরে ফেলল অর্জুন, তারপর দাঁড়া ভেঙে ভিতরের মাংস চুষে খেয়ে নিল৷ সেগুলোর বিশ্রী আঁশটে একটা গন্ধ৷ কয়েক মিনিটের মধ্যেই যা খেয়েছিল বমি করে উগরে দিল অর্জুন৷ যেটুকু শক্তি শরীরে অবশিষ্ট ছিল তাও যেন এই বমি করার পরিশ্রমে উবে গেল৷ তারপর ক-দিন ক-রাত্রি কী করে কেটেছে অর্জুনের তা আর বলতে পারে না সে৷ পিপাসায় জিভ ঢোল হয়ে গেল৷ মরার মতো বালির উপর পড়ে থাকত সে৷ আর দিন দু-তিনেক এ অবস্থায় থাকলেই হয়তো মারাই পড়ত লোকটা৷ তার আগেই আমরা ভাগ্যক্রমে দেখতে পেলাম তাকে৷
অর্জুনের এই ভয়াবহ গল্পটা বলতে গিয়ে যেন অত্যন্ত একটা মানসিক পরিশ্রম হচ্ছিল নন্দলালবাবুর৷ গল্প শেষ করে তিনি কুঁজো থেকে গড়িয়ে এক গ্লাস জল ঢকঢক করে খেয়ে নিলেন৷ গল্পটা বলতে গিয়ে তিনি আসলে অর্জুনের সঙ্গে এমনভাবেই মিশে গিয়েছিলেন যে, মনে হচ্ছিল তিনিই এতক্ষণ ওই ভয়ানক জলতেষ্টার কষ্ট পাচ্ছিলেন৷
হাঁ করে বুবাই এতক্ষণ গল্প শুনছিল৷ এবার সে নন্দলালবাবুকে প্রশ্ন করল, কিন্তু বাবা ওই যে তমলুকের মাথার উপর কয়েক লাখ পাখি উড়ছিল সেগুলি কী পাখি?
নন্দলালবাবু বললেন, হ্যাঁ বলতে ভুলে গেছি-ওগুলি আসলে পাখি নয়৷ অত পাখি হঠাৎ আসবে কোত্থেকে? ওগুলো আসলে গাছের পাতা৷
-গাছের পাতা? রীতিমতো অবাক বুবাই৷
-হ্যাঁ, নন্দলালবাবু বললেন, হাওয়ার যে চাপে সমুদ্রের জল আকাশ অবধি ঠেলে উঠেছিল সেই চাপেই তমলুক চরায় গেঁওয়া, গরান, হেঁতাল জঙ্গলের পাতা গাছ থেকে উপড়ে পাক খেয়ে সব আকাশে উঠেছিল৷ মাঝি এটা বুঝতে পেরেছিল বলেই সবাইকে সাবধান করে দিয়েছিল৷
-কিন্তু জামাকাপড় খুলতে বলল কেন সবাইকে বাবা? বুবাইয়ের প্রশ্ন আর শেষ হয় না৷
নন্দলালবাবু বললেন, হাওয়ার যা প্রচণ্ড জোর তাতে কারুর জামাকাপড়ে সেই হাওয়া একবার বাধলে তাকে শূন্যে বেলুনের মতো উড়িয়ে নিয়ে গিয়ে সমুদ্রের জলে আছড়ে ফেলত৷ সবাইকে তাই শুয়ে পড়তে বলেছিল মাঝি যাতে গায়ে যতদূর সম্ভব কম হাওয়া বাধে৷ নিশ্চয়ই তোমরা বুঝতে পারছ ওই হাতিশুঁড় হল আসলে জলস্তম্ভ৷ অনেক সময় বাতাসের প্রচণ্ড চাপে অনেকটা জায়গা জুড়ে জল ওরকম পাক খেয়ে উঠে যায় আকাশে৷
বুবাই ক্রমশই আশ্চর্য হতে থাকে৷ সত্যি সত্যি যেন কোনো বইয়ের গল্পই শুনছে সে৷ বুবাই জিজ্ঞেস করল, আর ওই লাঠিটা কীসের বাবা?
নন্দলালবাবু বললেন, এই দেখো, আসল কথাটাই বলা হয়নি তোমাদের৷ অর্জুনের হাতে ওই যে পলাকাটা লাঠিটা দেখলে ওটাকে বলে আশাবারি৷ বেল কিংবা নিমকাঠ দিয়ে তৈরি৷ বহরদারেরা যেখানেই থাক না কেন তাদের সঙ্গে থাকে এই মন্ত্রপূত লাঠি৷ ওদের বিশ্বাস এ লাঠি সঙ্গে থাকলে কোনো বিপদ-আপদ থেকে ভয় নেই ওদের৷ চুপ সাহেবের চরার সেই ভীষণ বিপদের হাত থেকে যে শেষ অবধি রক্ষা পেল অর্জুন-তাও নাকি ওই আশাবারির জোরেই৷
একেবারে মগ্ন হয়ে সুরমা শুনছিলেন এতক্ষণ এই অদ্ভুত কাহিনি৷ এবার জিজ্ঞেস করলেন, তারপর কী হল? নন্দলালবাবু বললেন, সুস্থ হয়ে ওঠার পর আমি একদিন ডেকে তাকে জিজ্ঞেস করলাম তার গ্রাম কোথায়? সে বলল, বুড়োবুড়ির তট৷ অর্থাৎ সুন্দরবনের সেই আর এক মাথায়৷ আমি বললাম, অর্জুন তুমি তো সুস্থ হয়ে উঠেছ৷ আর এখানে থেকে কী হবে? বাড়ির লোকজনও নিশ্চয়ই চিন্তা করছে তোমার জন্য? তোমাকে কিছু পয়সা দিয়ে দিচ্ছি-তুমি বুড়োবুড়ির তটে ফিরে যাও৷
অর্জুন বলল, আমার আর কেউ নেই বাবু৷
বললাম, কেউ না থাকুক সেখানেই তো তোমার বাড়ি ঘরদোর-এখানে কেন পড়ে থাকবে তুমি?
বলামাত্রই অর্জুন একটা কাণ্ড করে বসল-আমার দুটো পা জড়িয়ে ধরে হাউহাউ করে কেঁদে উঠল৷
আমি আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, এ কী করছ অর্জুন! ওঠো ওঠো-
ও হাউহাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলল-আপনি আমার জান বাঁচিয়েছেন বাবু-আপনি না থাকলি চুপ সাহেবের চরায় আমি মইরে পইড়ে থাকতাম৷ আমার সাদা হাড়গুলা পড়ে থাকত বালির চরায়৷ আপনাকে ছেড়ে আমি কউঠি যাবনি৷ আপনি যে কাজ বলবেন আমি কইরে দিব-শুধু আমাকে আপনার কাছ থেকতি তাড়িয়ি দিবেননি বাবু৷
আমি অনেক করে বোঝাবার চেষ্টা করলাম ওকে, কিন্তু খালি বাচ্চা ছেলের মতো কাঁদতে লাগল ও৷ আমাকে ছেড়ে ও কোথাও যাবে না৷ অনেক ভাবলাম কী করা যায় ওকে নিয়ে৷ ফরেস্ট অফিসে তো আর সত্যি কোনো বহরদারের দরকার নেই৷ শেষে ঠিক করলাম ওকে এখানেই নিয়ে আসি৷ আমাদের তো কাজের লোক নেই কোনো৷ আর যাই হোক খুবই সৎ ও বিশ্বাসী লোক অর্জুন৷ ওকে একটু শিখিয়ে পড়িয়ে নিতে পারলে কাজের লোকের সমস্যাটা মিটবে তোমার৷
নন্দলালবাবু উঠে ঢকঢক করে আর এক গ্লাস জল খেলেন৷
সুরমা লাফ দিয়ে উঠে বললেন, সর্বনাশ! আমার ভাত বোধ হয় এতক্ষণে পুড়েই গেছে তোমার গল্প শুনতে গিয়ে৷
কতক্ষণ ধরে তারা গল্প শুনছিল খেয়াল নেই৷ বুবাই উঠে দেখতে গেল কী করছে অর্জুন৷ বারান্দায় বেরিয়ে এসে দেখে অর্জুন বারান্দার একেবারে শেষ মাথায় উবু হয়ে বসে অন্ধকার বাগানটার দিকে চুপ করে তাকিয়ে আছে৷ আশাবারিটা তার ঘাড়ের উপর দিয়ে দেখা যাচ্ছে৷ হঠাৎ বুবাইয়ের মনে হল এটা যেন তাদের দমদমের বাড়ির বারান্দা নয়৷ এটা যেন চুপ সাহেবের চরা৷ সামনে যেন অন্ধকার বাগান নয়-বঙ্গোপসাগর৷ সামনে বসে থাকা লোকটা এক্ষুনি যেন বনমানুষের মতো চার হাত পায়ে হামাগুড়ি দিয়ে এসে জল চাইবে ওর কাছে৷ গা-টা ছমছম করে উঠল বুবাইয়ের৷
ওরে বাবারে, এটা কী রে?
নন্দলালবাবু পরদিনই সুন্দরবনের উদ্দেশে রওনা হলেন কিন্তু অর্জুন থেকে গেল তাদের সঙ্গে৷ বুবাইয়ের আনন্দ দেখে কে? যেন মস্ত বড়ো রাজা-মহারাজা কেউ এসে অতিথি হয়েছে তাদের বাড়িতে৷ ইশকুলে যাওয়ার আগে বইপত্র গোছাতে গোছাতে বুবাই বলল, আজ কিন্তু মা আমি তিন পিরিয়ড করেই ফিরে আসব৷
-কেন? ভুরু কোঁচকান সুরমা৷
-অর্জুনদাকে কথা দিয়েছি আজ রেলগাড়ি দেখাব৷ রেলগাড়ি দেখেনি তো কখনো অর্জুনদা৷ দমদম স্টেশনে নিয়ে যাব ওকে৷
-বলিস কী রে? রেলগাড়ি দেখেনি কখনো লোকটা? বিস্ময়ে আর কথা জোগায় না সুরমার মুখে৷
-সত্যি দেখেনি মা-ভারি মজা পেয়েছে বুবাই৷ চোখ বড়ো বড়ো করে বলে, কাল অনেক রাতে রেলগাড়ির শব্দ শুনে কীরকম ভয় পেয়ে গিয়েছে জান? আমাকে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করছে, ও কোন জানোয়ারের আওয়াজ গো খোকা? বুঝে দেখো মা-রেলগাড়ি নাকি জানোয়ার! বলতে গিয়ে এত হাসি পেয়ে যায় বুবাইয়ের যে হাসতে হাসতে মাটিতে প্রায় গড়িয়ে পড়ে আর কি৷
সুরমাও কোনোক্রমে হাসি চেপে রেখে বলেন-অ্যাই বুবাই, পাগলের মতো হাসছিস কেন? তারপর কী হল বল?
আমি বললাম, জানোয়ার নয় অর্জুনদা, ও হল রেলগাড়ি৷ রেলগাড়ি দেখোনি কখনো?
অর্জুনদা বলল, শুনেছি কলকাতায় লোহার লাইনের উপর দিয়ে লোহার গাড়ি চলে-আমি দেখিনি কখনো খোকা৷
নরম গলায় বলে বুবাই, তা হবে মা৷ সুন্দরবনে তো আর রেলগাড়ি নেই৷
সুরমা হাসবেন না কাঁদবেন বুঝতে পারছিলেন না৷ মৃদুস্বরে বলেন, বেশ, নিয়ে যা আজ অর্জুনকে স্টেশনে৷ প্রাণভরে রেলগাড়ি দেখিয়ে নিয়ে আয়৷ তারপর হঠাৎ হেসে ফেলে বলেন, রেলগাড়িদের আজ জন্ম সার্থক৷
ইশকুল থেকে বাড়ি ফিরে এসে বারান্দায় পা দিতেই একটা মজার দৃশ্য চোখে পড়ল বুবাইয়ের৷ বারান্দার শেষ মাথায় সিলিং থেকে মাটির টবে ঝুলছে একটা তেঁতুল গাছের বনসাই৷ নন্দলালবাবু মাসখানেক আগে নিউমার্কেট থেকে অনেক দাম দিয়ে কিনে নিয়ে এসেছেন গাছটা৷ গাছটার গুঁড়িটা বেশ মোটা কিন্তু লম্বায় মোটে ইঞ্চি ছয়েক৷ মাঝে মাঝে ছোটো ছোটো তেঁতুলও হয় ওই খুদে বেঁটে গাছটায়৷ বুবাই দেখল গাছটার কাছে দাঁড়িয়ে অর্জুন কী করছে৷ নিশ্চয়ই অবাক হয়ে দেখছে গাছটা৷ খুব খুশি হল বুবাই৷ অর্জুনদাকে অবাক করে দিতে পারলে সে আর কিছু চায় না৷ কাছে গিয়ে দেখে, কী অবাক কাণ্ড৷ কুকুরে অনেকসময় যেমন গাছের পাতার গন্ধ শোঁকে অর্জুন তেমনি গাছটার চারদিক থেকে গন্ধ শুঁকে চলেছে৷ বুবাইকে দেখতে পেয়েই সরে এল অর্জুন৷ চোখেমুখে কেমন একটা অপ্রস্তুত হতভম্ব ভাব৷ খুব মজা লাগল বুবাইয়ের৷ বয়স্ক মানুষের মতো ভঙ্গিতে বেশ গম্ভীর গলায় বলল, এটা কী গাছ বুঝলে না অর্জুনদা? এটা তেঁতুল গাছ৷
-তেঁতুল গাছ? বিড়বিড় করে বলে অর্জুন৷ কী হয়েছে খোকা গাছটার?
-হবে আবার কী? হো-হো করে হেসে ওঠে বুবাই-একে বলে বনসাই৷ গাছটাকে ওরকম ছোটো বানিয়ে রাখা হয়েছে৷ ওমা! তুমি বুঝি দেখোনি আগে কখনো?
বুবাইয়ের দিকে কেমন অদ্ভুতভাবে তাকিয়ে থাকে অর্জুন৷ বিড়বিড় করে বলে, তোমরা কলকাতার লোকেরা গাছপালা বুঝি সব ছোটো ছোটো কইরে রেখে দাও?

ধ্যেৎ! কী যে বলে অর্জুনদা মাথামুণ্ডু কিছু বোঝে না বুবাই৷ বনসাই ছোটো হবে না তো কি তাল গাছের মতো হবে৷ মাথাটা একেবারেই খারাপ অর্জুনদার৷ না হলে বনসাই দেখে হঠাৎ এরকম গম্ভীর হয়ে যাওয়ার মানে আছে কোনো?
নাঃ, রেলগাড়ি দেখতে যাওয়ার মজাটাই মাটি হল বুঝি৷ বুবাই এবার বেশ রাগ করে বলে, চুপ করে বসে রইলে যে অর্জুনদা? রেলগাড়ি দেখতে যাবে না তুমি? অর্জুনের আচমকা যেন একটা ঘোর ভেঙে যায় বলে, হ্যাঁ হ্যাঁ, চলো খোকা চলো৷
ওরা দু-জনে বাড়ি থেকে বেরিয়ে রাস্তায় পা দিয়েছে, হঠাৎ চেঁচিয়ে ওঠে অর্জুন-এই দেখো খোকা, আশাবারিটা ফেইলে এসেছি৷ নিয়ি আসি৷ তোমাদের কলকাতাটা ভালো জায়গা না মোটেই৷
ছুটে বারান্দা থেকে আশাবারিটা কুড়িয়ে আনে অর্জুন৷ বুবাই দেখো পাঁচপলা কাটা সেই লাঠিটা হাতে নেওয়ার সঙ্গেসঙ্গেই মুখটা বেশ খুশি খুশি হয়ে উঠেছে অর্জুনের৷ মুখে বেশ একটা আত্মবিশ্বাসের ভাবও ফুটে উঠল৷
গলি থেকে বেরিয়ে বড়ো রাস্তায় পা দিতেই সে এক দারুণ মজার কাণ্ড৷ সাঁ সাঁ করে এক-একটা বাস, লরি কিংবা মোটরগাড়ি ছুটে যাচ্ছে ওদের পাশ দিয়ে আর সঙ্গেসঙ্গে অর্জুন একেবারে বাচ্চাছেলের মতো বুবাইয়ের পিছনে গিয়ে সাঁৎ করে লুকিয়ে পড়ছে৷ অবিকল ফাঁদে-আটকা পড়া খরগোশের মতো তার চোখের দৃষ্টি৷
সবচেয়ে মজার ব্যাপার ঘটল রাস্তা পেরোবার সময়৷ কিছুতেই রাস্তা পেরোবে না অর্জুন৷ বুবাই শেষে গম্ভীর গলায় বলল, রাস্তা না পেরোলে রেলগাড়ি দেখা হবে না অর্জুনদা৷ দেখবে না রেলগাড়ি?
ভয়ানক দোটানায় পড়েছে অর্জুন বোঝা যায়৷ রাস্তা পেরোতে ভয় অথচ রেলগাড়ি দেখারও খুব ইচ্ছে তার৷ শেষে এক কাণ্ডই করল অর্জুন৷ একেবারে বুবাইয়ের গায়ের সঙ্গে লেপটে বুবাইয়ের জামার খুঁটটা ডান হাতে চেপে ধরল অর্জুন তারপর বাঁ-হাতে আশাবারিটা নিয়ে বলল, চলো খোকা৷
বুবাইয়ের ভয় হচ্ছিল রাস্তায় এক্ষুনি ভিড় জমে না যায়-ঝাঁকড়াচুল, তাল গাছের মতো লম্বা অর্জুনদার এইসব উলটোপালটা ভীষণ ছেলেমানুষের মতো হাস্যকর কাণ্ডকারখানা দেখে৷
স্টেশন অবধি সমস্ত রাস্তাটাই বুবাই আগলে নিয়ে গেল অর্জুনকে৷ উলটোডাঙা স্টেশনে উঠে কথাই বন্ধ হয়ে গেল অর্জুনের৷ একেই বলে রেললাইন? এ মাথা থেকে ওমাথা অবধি ধু-ধু করছে৷ লাইনের মাথার উপর দিয়ে লোক যাচ্ছে আবার৷ বুবাইয়ের জামার খুঁটটা কিন্তু ধরেই রেখেছে অর্জুন৷ স্টেশনে ওরা পৌঁছোতে না পৌঁছোতেই দার্জিলিং মেলের সবুজ সিগন্যাল দিয়ে দিল৷ অর্জুনকে প্ল্যাটফর্মের ধারে নিয়ে গিয়ে বুবাই বলল, এখানে দাঁড়াও অর্জুনদা, দেখো এখুনি গাড়ি এসে পড়বে একটা৷ অর্জুনের মুখখানা দেখে মনে হয় যেন তিরিশ বছর বয়েসের একটা অবোধ বাচ্চা ছেলে সে৷ গাড়ি আসছে৷ রেল লাইন দিয়ে গড়িয়ে আসছে চাকার শব্দ৷ রেললাইনের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছে অর্জুন৷ যেন রেললাইন ফুঁড়েই বেরিয়ে আসবে গাড়িটা৷ ডিসট্যান্ট সিগন্যাল পেরিয়ে যখন চলে এসেছে গাড়িটা তখন অর্জুনের কাণ্ডজ্ঞান সব লোপ পেয়ে গেছে৷ এতক্ষণ অনেক সাহস দেখিয়েছে সে৷ আর নয়৷ এক লাফে প্ল্যাটফর্মের কিনার থেকে ছিটকে ভিতরে চলে এল সে৷ বুবাই ইতিমধ্যে কখন সরে গিয়ে একটু দূরে একটা থামের আড়ালে গা-ঢাকা দিয়ে মজা দেখছিল৷ তা ছাড়া তার একটু লজ্জাই করছিল অর্জুনের কাছাকাছি থাকতে৷ মাঝে মাঝে যা একেকটা কাণ্ড করছে অর্জুনদা, সভ্যসমাজে মুখ দেখানো দায়৷ অর্জুনের ভীরু দুটো চোখ ভিড়ের মধ্যে খুঁজে বেড়াল বুবাইকে৷ বুবাই তো অদৃশ্য থামের পিছনে৷
এদিকে ভীষণ দৈত্যের মতো, সুন্দরবনের হাজার হাজার রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের মতো সেই অতিকায় জানোয়ারটা যেন অর্জুনের ঘাড়ের উপর লাফিয়ে পড়ার জন্যই গোঁ গোঁ শব্দে ছুটে আসছে৷ থামার কোনো লক্ষণই তো নেই তার৷ আর থাকতে পারল না অর্জুন৷টাক-মাথা চশমাপরা একজন নিরীহমতো বুড়ো ভদ্রলোককে হাতের কাছে পেয়ে তাকেই আচমকা জড়িয়ে ধরে বিড়বিড় করে সে প্রলাপ বকার মতো বলতেই লাগল-ওরে বাবা এটা কী রে, ও বাবা এটা কী রে-ওরে বাবা এটা কী রে! বেচারি ভদ্রলোক৷ ধাক্কার চোটে তার চশমা ছিটকে গিয়ে পড়েছে প্ল্যাটফর্মে৷ তা গেছে যাক-চশমা গেছে আবার হবে৷ কিন্তু প্রাণটা! বদ্ধ একটা উন্মাদের হাতে পড়ে সেটাও যাবে নাকি? আচমকা ভয়ে মৃগীরোগীর মতো দু-চার বার পিছনে ঠ্যাং ছুড়লেন ভদ্রলোক কিন্তু বিশেষ সুবিধে করতে পারলেন না৷ অর্জুন চেঁচাচ্ছে-ও বাবা রে এটা কী রে-ও বাবা এটা কী রে৷ আর ভদ্রলোক তারস্বরে চেঁচাচ্ছেন-মার ডালা-এ রামজি-মার ডালা৷
ভদ্রলোক হিন্দিভাষী না ভয়ের চোটে বাংলা ভুলে গেছেন কে জানে? বুবাইয়ের পেট ঠেলে হাসি উঠে আসার জোগাড়৷ কিন্তু হাসির সময় নয় মোটেই এটা৷ গাড়ির শব্দে এখন কিছু বোঝা যাচ্ছে না কিন্তু গাড়ি চলে গেলেই তো সব লোক জড়ো হবে ওখানে৷ তখন? বুবাই আর দেরি না করে এক ছুটে সেখানে গিয়ে কেউ কিছু বোঝার আগেই প্রায় হিড়হিড় করে অর্জুনকে টেনে নিয়ে প্ল্যাটফর্মের বাইরে চলে এল৷
বাইরে বেরিয়ে এসে ভ্যাবাচাকার মতো চারদিকে তাকাচ্ছে অর্জুন আর বুবাই বুঝে উঠতে পারছে না সে কি খুব রাগ করবে অর্জুনদার উপর তার এই অদ্ভুত বোকামির জন্য না কি সব ভুলে হো-হো করে গলা ফাটিয়ে হেসে উঠবে৷
অর্জুনের মুখের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে যাচ্ছে বুবাই৷ এ কী রকম আশ্চর্য লোক৷ সুন্দরবনের সাপ আর রয়াল বেঙ্গল টাইগারের মধ্যে যে নির্ভয়ে ঘুরে বেড়ায় কলকাতায় তার এত ভয়? দার্জিলিং মেল কি রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের থেকেও বেশি ভয়ানক?
সারাটা রাস্তা কেমন গুম হয়ে থাকল অর্জুন৷ কেন কে জানে? বুবাই কয়েকবার কথা জমাবার চেষ্টা করল কিন্তু অর্জুন কোনো কথার জবাব দিল না৷ বুবাইয়ের খারাপ লাগছিল খুব৷ অর্জুনদা মন খারাপ করে থাকলে বুবাইয়েরও কিছু ভালো লাগে না৷ বাড়ি ফিরতেই সুরমা জিজ্ঞেস করলেন, কি অর্জুন, রেলগাড়ি দেখলে?
অর্জুন দাঁড়াল না৷ বোধ হয় খুব লজ্জা করছিল ওর৷ মৃদু গলায়, 'হ্যাঁ মা' বলে সামনে ওর ঘরের দিকে চলে গেল৷ বুবাইয়ের কাছে সব শুনে সুরমার তো হাসতে হাসতে প্রাণ বেরিয়ে যাবার জোগাড়৷ বুবাই প্রমাদ গোনে৷ অর্জুনদার কানে গেলে কী ভাববে অর্জুনদা? ফিসফিস করে বলে, আস্তে হাসো মা, আস্তে হাসো৷ কী ভাববে বল তো ও?
রাতে খেতে খেতে হঠাৎ সুরমা জিজ্ঞেস করলেন অর্জুনকে, কত বয়স হল তোমার অর্জুন?
বুবাই দেখে প্রশ্নটা শুনেই অর্জুন কেমন যেন জড়োসড়ো হয়ে গেল৷ যেন ভীষণ লজ্জায় পড়ে গেছে সে৷ ভাতের থালার উপর মাথাটা ঝুঁকে পড়ে অর্জুনের৷ ব্যাপার কী? বয়েস বলতে এত লজ্জা কীসের ওর? বয়েস জানে না নাকি?
সুরমা সকৌতুকে বলেন, কি? বয়েস জানো না বুঝি?
জানি মা, অর্জুন মৃদু গলায় বলে, কত আর বয়স হবে আমার মা? আট কি নয়৷
সুরমা অবাক৷ ঠাট্টা করছে নাকি অর্জুন৷ কিন্তু না, তা কী করে হয়? অর্জুনের মতো মানুষ কখনো ঠাট্টা করতে পারে ওর সঙ্গে?
-তোমার বয়স আট-নয়? তোমার কি মাথা খারাপ অর্জুন?
-সত্যি মা, অর্জুন মৃদু গলায় বলে, তার গলায় ঠাট্টার লেশমাত্র নেই৷ আমি লাটের লোক মা, পড়া নেই শুনা নেই৷ কত আর বয়েস হবে আমার?
দারুণ অবাক হয়ে বলেন সুরমা-বেশ৷ তাহলে বুবাইয়ের বয়েস কত হবে?
অর্জুন বেশ খানিকক্ষণ গভীরভাবে চিন্তা করে নিয়ে বলে-খোকার বয়েস মা কুড়ি বছরের কম কিছুতে হবেনি৷
-কেন? জিজ্ঞেস করেন সুরমা৷
-খোকা ইশকুলে যায়, কত মোটা মোটা বই পড়ে, কত কিছু জানে৷ খোকার বয়েস কি তার কম হোতি পারে মা?
-ঃও৷ আর তোমার বাবুর? ভীষণ মজা পেয়ে জিজ্ঞেস করেন সুরমা৷
-বাবুর? তা বাবুর বয়স কি আর এক-শো বছরের কম হবে মা? এত বড়ো অফিসার বাবু, এত টাকা বেতন পান-হাত জোড় করে কপালে ঠেকায় অর্জুন৷
আর নিজেকে সামলাতে পারেন না সুরমা৷ অনেক কষ্টে তিনি এতক্ষণ হাসি চেপে রেখেছিলেন৷ হো-হো করে এবার হাসতে হাসতে বিষম-টিষম খেয়ে ভাতের থালা ছেড়ে উঠে দাঁড়ান তিনি৷
অর্জুন হাঁ করে তাকিয়ে থাকে৷ একটু মনক্ষুণ্ণই দেখায় তাকে৷ এত হাসির কী হল বুঝতে পারে না সে৷ সে অন্যায্য কথা বলেছে না কি কিছু৷
সুরমা বলে বুবাইকে, সত্যি! এমন একজন অদ্ভুত লোককেই নিয়ে এসেছে তোর বাবা৷ সারা পৃথিবী খুঁজলেও বোধ হয় এমন দ্বিতীয় আর একজনকে পাওয়া যাবে না৷
নন্দলালবাবু পরের সপ্তাহে বাড়ি ফিরে এলে ঠিক হল রবিবার সবাই মিলে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হল দেখতে যাওয়া হবে৷
ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হল আগে দেখেনি কখনো বুবাই৷ কিন্তু তা প্রথম দেখার চেয়েও বুবাইয়ের বেশি আনন্দ অর্জুনদা ওদের সঙ্গে যাবে বলে৷ ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের কাছে এসে হঠাৎ নন্দলালবাবু ঠোঁট টিপে রহস্যময় হাসি হাসতে লাগলেন৷ বুবাই বুঝতে পারছে না বাবা ওরকম হাসছেন কেন? অর্জুন ধবধবে সাদা পাথরের বাড়িটা সবিস্ময়ে দেখছিল৷ চমক ভাঙল নন্দলালবাবুর গলার স্বরে৷
নন্দলালবাবু বাড়িটার দিকে হাত তুলে অর্জুনকে জিজ্ঞেস করলেন, এটা কী জানো অর্জুন?
-না বাবু, লজ্জিত মৃদু গলায় বলে অর্জুন৷
-ইন্দ্রের নাম শোনোনি?
সঙ্গেসঙ্গে অর্জুন দু-হাত জোড় করে মাথা নাড়লেন-হ্যাঁ বাবু, দেবতাদের রাজা৷
-বেশ৷ এই হল সেই ইন্দ্রের রাজপ্রাসাদ-ইন্দ্রপুরী৷ আর ওই যে দেখছ বাগান৷ বড়ো বড়ো ফুল ফুটেছে, ওই হল গিয়ে ইন্দ্রের নন্দনকানন৷
-সত্যি বাবু? অর্জুনের চোখ দুটো ফুটবলের মতো বড়ো বড়ো হয়ে যায়৷
-হ্যাঁ, সত্যি৷ আর ওই যে দেখছ রং-বেরঙের শাড়ি পরে প্রজাপতির মতো সব উড়ে বেড়াচ্ছে, ওরা হল ইন্দ্রের রাজসভার অপ্সরা, মেনকা, উর্বশী, রম্ভা৷ দেখো, ভালো করে দেখে নাও৷
-ইন্দ্রপুরী? অপ্সরা? নন্দনকানন? হায় ভগবান, বিড়বিড় করতে করতে বলে অর্জুন, একি সত্যি? আমার এত ভাগ্য বাবু? আমি মুখ্যু মানুষ, আমি কিনা ইন্দ্রের নন্দনকানন... হায় ভগবান ... বিড়বিড় করতেই থাকে অর্জুন আর ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হলের দিকে তাকিয়ে ক্রমাগত দু-হাত জোড়া করে কপালে ঠুকতে থাকে৷
সুরমা অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে ফিকফিক করে হাসছিলেন আর নন্দলালবাবু কোনোমতে হাসি চেপে গম্ভীর হয়ে থাকেন৷ বুবাইয়ের কিন্তু অর্জুনদার জন্য কেমন একটা দুঃখ হয়৷ এত বড়ো মানুষ অর্জুনদা-এই সমান্য জিনিসটা বুঝতে পারছে না যে সবাই তাকে নিয়ে ঠাট্টা করছে?
বাড়ি ফিরে এসেও অর্জুন উত্তেজনায় ঘুমোতে পারে না৷ বুবাইয়ের কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বলে-জান খোকা, আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি আমি ইন্দ্রপুরী দেখতি পাব... আমি যখন বুড়োবুড়ির তটে ফিরি যাব তখন লাটের সব লোককে বলবু আমাকে কলকাতার বাবু ইন্দ্রপুরী দেখিয়েছেন৷ সবাই অবাক হয়ি যাবে বল খোকা-আনন্দে ছেলেমানুষের মতো হি-হি করে হাসতে থাকে অর্জুন৷
বুবাই অবাক হয়ে দেখে ওকে৷ এরকম অদ্ভুত মানুষ জীবনে আর কখনো দেখবে কি সে?
মাসখানেক কেটে গেছে৷ ঘরের মানুষের মতোই থাকে অর্জুন৷ খায় দায়, টুকিটাকি কাজ করে ঘরের৷ যদিও দূরে কোথাও ওকে কোনো কাজে পাঠাতে ভরসা পান না সুরমা, মাঝেমধ্যে মোড়ের মুদির দোকানটা থেকে তেল, নুন কিনে নিয়েই ফিরে আসে অর্জুন৷ বাড়ির সামনের ছোটো গলিটা দিয়ে মাঝেমধ্যে বিকট হর্ন দিয়ে ট্যাক্সি ছুটে যায়, নয়তো স্কুটার কিংবা অটো৷ গলিটা যখন পেরোয় অর্জুন তখন সত্যি সে এক দৃশ্য৷ আশাবারিটা হাতে নিয়ে সে চারদিকে একবার ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাবে তারপর হঠাৎ চোখ-টোখ প্রায় বন্ধ করে গণ্ডারের মতো সোজা গোত্তা মেরে ছুটে যাবে রাস্তার মাঝখানে৷ কোনোদিকে তাকাবে না-পাছে বদমায়েস গাড়িঘোড়াগুলো তাকে দেখতে পেয়ে তার ঘাড়ের উপর লাফিয়ে পড়ে৷ রাস্তার মাঝখানে কিছুক্ষণ থমকে দাঁড়িয়ে আবার গুঁড়ি মেরে রাস্তাটা পার হয়ে যাবে৷ দেখে বুবাইয়ের হঠাৎ কেন জানি না মনে হয় সুন্দরবনের রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারকে কলকাতার রাস্তায় ছেড়ে দিলে ঠিক এমনি ভঙ্গিতেই বোধ হয় রাস্তা পেরোবে৷ রয়্যাল বেঙ্গলের কথাই কেন মনে হয় কে জানে?
অর্জুনের চুপচাপ স্বভাব আর সরলতার জন্য বাড়ির সবাই ওকে মোটামুটি ভালোবাসে৷ যদিও সুরমা মাঝেমধ্যে আক্ষেপ করেন লোকটা যদি গুঁড়ি না মেরে সোজা হয়ে রাস্তা পেরোতে শিখত তাহলে অল্পস্বল্প কিছু কাজ করানো যেত ওকে দিয়ে৷ নন্দলালবাবু বলেন, আহা থাক না৷ মুখ্যুসুখ্যু মানুষ, কী কাজ আর করাবে ওকে দিয়ে৷ যা করছে তাই ঢের৷ প্রশ্রয় ঝরে পড়ে নন্দলালবাবুর গলার স্বরে৷ আর বুবাই? বুবাইয়ের তো মনে হয় এক মুহূর্তও বুঝি সে অর্জুনদাকে ছেড়ে থাকতে পারবে না৷ কত আশ্চর্য গল্পই যে জানে অর্জুনদা৷ আজ অবধি কোনো বইয়ে সেরকম গল্প পড়েনি বুবাই৷ যাই বলে অর্জুনদা, তাই সত্যি মনে হয় বুবাইয়ের৷
রায়মঙ্গলের মোহনায় একটা দ্বীপে একবার নৌকা করে কাঠ কাটতে গিয়ে মাঝনদীতে নৌকো আটকে গিয়েছিল অর্জুনদার৷ দু-খানা পাল তুলে দিয়েছে মাঝি, জোর দোখনো (দক্ষিণা হাওয়া) লেগেছে পালে কিন্তু নৌকো এক চুলও এগোচ্ছে না৷ কী ব্যাপার? শেষে নৌকোর মাঝি জলের দিকে তাকাতেই মুহূর্তে সব ব্যাপারটা পরিষ্কার৷ জলের রং কালি গোলার মতো ঘোর কালো৷ অর্থাৎ শক্তিশালী চুম্বক আছে জলে-নৌকোর নীচের লোহার 'জলুই'য়ের (পেরেক) সঙ্গে সেই চুম্বক আটকে যাওয়ার ফলে নৌকো আর এক ইঞ্চিও এগোতে পারছে না৷ দেবী চণ্ডীর পুজো দিয়ে যারা জঙ্গলে কাঠ কাটতে যায় তাদের কখনো কোনো বিপদ-আপদ হয় না৷ কেননা দেবী চণ্ডী স্বয়ং চণ্ডী-চিলের রূপ ধরে নৌকোর মাথার উপর ঘুরে ঘুরে বিপদ-আপদ থেকে সাবধান করে দেবেন নৌকোর আরোহীদের৷ আরও কত বিচিত্র সব গল্প-বাঘের, ভূতের, সাপের৷ শুনতে শুনতে হুঁশ থাকে না বুবাইয়ের, কখন ঘড়িতে ঢং ঢং করে রাত বারোটা বেজে গেছে৷
কিন্তু এত সব কিছু সত্ত্বেও অর্জুনের ভাবভঙ্গি কেমন যেন ছাড়া ছাড়া, আনমনা৷ মনটা তার যেন সবসময় অন্য কোথাও পড়ে আছে৷ কেন ভেবে পায় না বুবাই৷ তাদের এখানে ভালো লাগছে না অর্জুনদার? তারা সবাই এত ভালোবাসে তাকে-তবুও?
দিন কয়েক পরে একটা কাণ্ড ঘটল৷ সেদিন বুবাইয়ের ইশকুল ছুটি৷ অ্যানুয়াল পরীক্ষা সবে হয়ে গেছে৷ সকাল বেলা উঠেই বুবাই অর্জুনের ঘরে গিয়ে গল্প শুনতে বসেছে৷ মৌসুনি দ্বীপের পাহারাদার হিসহিস শিস দেওয়া এক অজগর সাপের গল্প৷ চেনাগাং নদীর মাঝিরা যখন কাঁকড়ামারির চরা পেরিয়ে মৌসুনির খালের মুখটায় ঢোকে তখনই তারা শুনতে পায় সেই হিসহিস শব্দ৷ গায়ের লোম খাড়া হয়ে ওঠে তাদের৷ কিন্তু আজ অবধি কোনো দাঁড়ি-মাঝি দেখতে পায়নি তাকে৷ শুধু হিসহিস শব্দই শুনেছে তারা৷
শুনতে শুনতে বুবাইয়েরও গায়ের লোম খাড়া হয়ে উঠেছে- হঠাৎ সুরমা মূর্তিমান রসভঙ্গের মতো সেখানে এসে হাজির৷ হাতে তার কুড়ি টাকার তিনটে নোট৷ সুরমা বললেন, অর্জুন ওই মোড়ের মাথায় নাকি গঙ্গা থেকে একেবারে সদ্য ধরা টাটকা ইলিশ বিক্রি হচ্ছে৷ খুব ভিড়৷ লোকে প্রায় লাইন দিয়ে কিনছে৷ কিলোখানেক একটা মাছ নিয়ে এসো দেখি চট করে-
অর্জুন কেমন শুকনো মুখে তাকিয়ে থাকে৷ সুরমা বলেন, কিছু ভয় নেই অর্জুন, কলকাতায় থাকতে গেলে আস্তে আস্তে সব তো শিখতে হবে৷ যাও৷ রাস্তাটা খালি সাবধানে দেখে পেরোবে৷ ছুটবে না৷
টাকা হাতে নিয়ে খুব বিমর্ষভাবে অগত্যা বেরোয় অর্জুন৷ রাস্তাটা সে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের মতো গুঁড়ি মেরেই অবশ্য পার হয়৷ মাছের দোকানের সামনে বিরাট লাইন৷ সামনের দিকে একটা গোলমাল হইচই চলছে৷ অর্জুন চুপচাপ লাইনের পিছনে এসে দাঁড়ায়৷ বিরাট গোঁফওয়ালা ষণ্ডা মতো একটা লোক অর্জুনের সামনে কনুইয়ের ঠেলা দিয়ে ঢোকার চেষ্টা করছে৷ অর্জুন ভয়ে ভয়ে দু-পা পিছনে সরে দাঁড়ায়৷ লাইনের সামনে আরও কয়েকজন লোক৷ অর্জুন সরে দাঁড়াবে কি না ভাবছে, হঠাৎ একজন বেশ ভদ্র চেহারার লোক অর্জুনের সামনে এসে বলে, আরে অর্জুন না?
অর্জুন অবাক৷ তার মতো একটু মুখ্যু মানুষকে ধোপদুরস্ত ফর্সা জামাকাপড় পড়া এরকম একজন ভদ্রলোক চিনলেন কী করে? মুখ দিয়ে কথা বেরোয় না তার৷ ভদ্রলোক হেসে বললেন-আমি তোমাকে চিনি৷ নন্দলালবাবুদের বাড়ি থাক না?
অর্জুন মাথা নাড়ে৷
ভদ্রলোক বললেন, মাছ কিনবে তো এত বেলায় আসতে হয়? তুমি যখন ওখানে পৌঁছোবে তখন তো মাছের আঁশটুকুও পড়ে থাকবে না৷ ঠিক আছে টাকাটা দাও আমাকে-দেখি সামনের লোককে বলে কিছু ব্যবস্থা করতে পারি কি না৷ তুমি দাঁড়িয়ে থাকো এখানে৷ লাইন ছেড়ো না কিন্তু৷
কৃতজ্ঞতার চোখে জল এসে যেতে চায় অর্জুনের হাত থেকে টাকাটা নিয়ে চলে যায় লোকটি এবং আর ফেরে না৷ লোকটা কি তাহলে ঠগ? বিশ্বাস হয় না তার৷ একেবারে ধুতি-চশমা পরা ভদ্রলোক যে৷ অনেকক্ষণ দাঁড়িয়েই থাকে অর্জুন৷ তারপর যখন লাইনের সব লোক মাছ নিয়ে চলে যায় তখন সংবিৎ ফেরে তার৷ বাড়ি ফিরে গিয়ে অর্জুন সুরমার সামনে এসে নিঃশব্দে দাঁড়ায়৷
সব শুনে সুরমা রাগে ফেটে পড়েন-কচি খোকা তুমি অর্জুন! জানা নেই শোনা নেই রাস্তার একটা উটকো লোককে ষাটটা টাকা দান করে এলে?
-কিন্তু ওতো ভদ্রলোক মা, অর্জুন মিনমিন করে, আমি কী করে বুঝব যে টাকাটা নিয়ে-
-চুপ করো, তীব্র স্বরে ধমক দেন সুরমা, কী করে বুঝব মানে? মাথায় কিছু নেই তোমার? টাকাটা চাইল অমনি দিয়ে এলে? যাও, ওই সুন্দরবনেই ফিরে যাও তুমি, কলকাতায় থাকা তোমার মতো লোকের কর্ম নয়৷ আমি বাবু এলে বলব তোমাকে সুন্দরবনে আবার পাঠিয়ে দিতে৷
অর্জুন মাথা নীচু করে সুরমার বকুনিগুলো নিঃশব্দে হজম করছিল৷ কখন বুবাই পিছন দিক থেকে এসে হাত ধরে অর্জুনের৷ নরম গলায় বলে, চলো অর্জুনদা৷
ভীষণ মন খারাপ হয়ে যায় বুবাইয়ের৷ মা এভাবে বকাবকি করবে অর্জুনদাকে কল্পনাও করতে পারেনি কখনো সে৷ রাগ করে সত্যি যদি অর্জুনদা সুন্দরবনে চলে যায়? ভাবতেই বুকের মধ্যে কেমন করে ওঠে বুবাইয়ের৷
উঠোন পেরিয়ে নিজের ঘরের দিকে যেতে যেতে অর্জুন বিড়বিড় করে, ভদ্রলোক! একে বলে ভদ্রলোক! থুঃ-
রাগ করে মাটিতে থুতু ফেলে অর্জুনদা৷
অর্জুনের ঘরটা ছোটো৷ দড়ির চারপাইতে একটা মোটে তেল চিটচিটে বালিশ আর একটা চাদর পাতা৷ আশাবারিটা শিয়রে রেখে অর্জুন নিঃশব্দে চারপাইতে শুয়ে পড়ে৷ বুবাই খানিকক্ষণ দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে থেকে শেষে সাহস করে অর্জুনের কাছে গিয়ে বলে, অর্জুনদা, তুমি কি সত্যি সুন্দরবনে চলে যাবে?
অর্জুন নীরবে বিছানার উপর উঠে বসে, তারপর খানিকক্ষণ বাদে কেমন নিঝুম গলায় বলে, না, খোকা, বাবু আমার প্রাণ বাঁচিয়েছেন, আমি কী করে বাবুকে ছেড়ি চলি যাবু?
বুবাই আশ্বস্ত হয় কিন্তু তারপর বেশ কিছুদিন যে অর্জুনদা খুব গম্ভীর হয়ে থাকে তা বুঝতে দেরি হয় না বুবাইয়ের৷
পরের সপ্তাহে বাড়ি ফিরে এসে নন্দলালবাবু সুরমাকে জিজ্ঞেস করলেন, অর্জুনকে কেমন গম্ভীর দেখছি৷ কী ব্যাপার বলো তো, কী হয়েছে ওর?
অচেনা একটা লোককে ষাটটা টাকা দান করে আসার গল্পটা সবিস্তারে বললেন সুরমা৷ শুনে নন্দলালবাবু হো-হো করে হেসে উঠলেন৷ বললেন, একেবারে শিশুর মতো সরল লোক বুঝলে?
সুরমা বিরক্ত মুখে বলেন, তা তো বুঝলাম, কিন্তু এরকম লোককে বাড়িতে রেখে কী লাভ শুনি৷
নন্দলালবাবু বললেন, ও কিছু না, আর কিছুদিন যাক-সব দেখেশুনে ঠিক হয়ে যাবে৷
বাগানে একটা সন্ধ্যামণি গাছের গোড়ায় খুরপি দিয়ে মাটি দিচ্ছিল অর্জুন৷ নন্দলালবাবু কাছে গিয়ে দাঁড়াতে অর্জুন শশব্যস্ত হয়ে উঠে দাঁড়াল৷
নন্দলালবাবু সস্নেহে বললেন, কী অর্জুন! মন খারাপ? এখানে ভালো লাগছে না বুঝি?
কেমন অভিমানী শিশুর মতো দেখায় অর্জুনকে৷ ঘাড় নেড়ে বলে, না বাবু৷
-বুড়োবুড়ির তটে ফিরে যাবে? বলো, ব্যবস্থা করে দিচ্ছি৷
-না বাবু, ঘাড় নাড়ে অর্জুন৷
-লজ্জা কী অর্জুন, কেউ কিছু মনে করবে না৷
-না, বাবু না, আমি কউঠি যাবুনি আপনাকে ছেড়ি৷ অদ্ভুত মিনতি ভরা গলায় বলে অর্জুন৷
-বেশ, বেশ৷ যেতে হবে না তোমাকে, অপ্রস্তুত গলায় বলেন নন্দলালবাবু৷ অর্জুন চুপ করে দাঁড়িয়েই ছিল৷ নন্দলালবাবু অর্জুনের কাঁধে আলতো হাত রেখে হালকা গলায় বলেন, চলো, কাল সবাই মিলে আমরা এক জায়গায় বেড়াতে যাব৷ সেখানে গেলে দেখবে তোমার মন একদম ভালো হয়ে গেছে৷
পরদিন চিড়িয়াখানায় যাওয়া ঠিক হল৷ রাতটা উত্তেজনায় প্রায় না ঘুমিয়েই কাটল বুবাইয়ের৷ চিড়িয়াখানায় যাওয়ার জন্য ঠিক নয়৷ চিড়িয়াখানায় তো আগে তিনবার গেছেই বুবাই৷ জন্তুজানোয়ারের নামও প্রায় সবই শিখে ফেলেছে৷ আসল কথা অর্জুনদা তো কখনো চিড়িয়াখানা দ্যাখেনি-অর্জুনদাকে সে শেখাবে সব৷ সুন্দরবনে নয় বাঘ, শুয়োর, বাঁদর আর কুমির প্রচুর আছে কিন্তু গণ্ডার আর জিরাফ তো নেই৷ অর্জুনদা দেখে কীরকম হাঁ হয়ে যাবে ভেবেই মজা লাগে বুবাইয়ের৷ শিম্পাঞ্জি যে মানুষের মতো সিগারেট ধরিয়ে খায় এ খবর কি জানা আছে অর্জুনদার?
চিড়িয়াখানায় ঢুকে পাখির খাঁচা ছাড়িয়ে ওরা সামনে এগিয়ে গেল৷ গ্রিজলি ভালুকটা গরম বলে তার ঠান্ডা অন্ধকার খুপড়ি থেকে বেরোলই না৷ বুবাই কিন্তু দমবার পাত্র নয়৷ গ্লিজলি ভালুক সম্বন্ধে যতটা পারল বক্তৃতা দিয়ে গেল-অর্জুন চুপ করে শুনে গেল৷ পাখির খাঁচা ছাড়িয়ে আসার পর থেকে অর্জুন আর একটি কথাও বলছে না৷ বুড়ো একটা গোমড়ামুখো বেবুন, অর্জুনদাকে দেখে অন্যায় ভাবে দু-পাটি দাঁত বের করে ভেংচে দিল৷ তাও অর্জুনদার কোনো ভাববিকার নেই৷
একের পর এক খাঁচা পেরিয়ে গিয়ে ওরা শেষে কালো চিতার খাঁচার সামনে এসে দাঁড়াল৷ কালো চিতা অর্থাৎ ব্ল্যাক প্যান্থার৷ নামটা শুনলেই গা-টা কেমন ছমছম করে ওঠে৷ আকৃতি আর চালচলনও তেমনি জানোয়ারটার৷ ব্ল্যাক প্যান্থারের খাঁচার সামনে এসে দাঁড়ালেই বুবাইয়ের মনে হয় কী এক সাংঘাতিক আকর্ষণে যেন পা দু-খানা আটকে গেছে তার৷ কী অদ্ভুত দেখতে৷ সারা গায়ে যেন কেউ ব্ল্যাক জাপানের মিশমিশে কালো পোঁচ টেনে দিয়ে গেছে-সবুজ চোখ দুটো ধকধক করে তার মধ্যে জ্বলছে৷ সমস্ত শরীর যেন স্প্রিং দিয়ে তৈরি৷ হাড়গোড় কোথাও কিছু নেই৷ যেমন খুশি তেমনি ছুটছে খাঁচার মধ্যে, পাক খাচ্ছে, ওই বিরাট পাঁচমনি শরীরটা নিয়েই বেড়ালের চেয়েও নিঃশব্দ৷ ক্ষিপ্র ভঙ্গিতে হঠাৎ খাঁচার শিক দিয়ে সোজা উঠেই খাঁচার ছাতে একটা ডিগবাজি খেয়ে ফের দেওয়াল বেয়ে জলের মতো গড়িয়ে নেমে আসছে৷
ব্ল্যাক প্যান্থারের খাঁচার সামনে রীতিমতো একটা ভিড় জমে গেছে৷ এরকম ক্ষিপ্র, সুদৃশ্য, ছটফটে আর হিংস্র জানোয়ার চিড়িয়াখানায় আর একটিও নেই৷ ছাত থেকে একটা চরকির মতো পাক খেয়েই চিতাটা হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে কিছুটা কৌতূহল আর কিছুটা বিরক্তির চোখে তাকাচ্ছিল দর্শকদের দিকে৷ ঠিক সেই সময়ে একটি সুন্দর শার্ট-প্যান্ট পরা ছেলে রাস্তা থেকে একটি ভারী পাথরের খোয়া কুড়িয়ে নিয়ে হঠাৎ মজা করে সজোরে ছুড়ে মারল চিতাটার মুখ লক্ষ করে৷ খাঁচার শিকের ফাঁক দিয়ে খোয়াটা সোজা গিয়ে লাগল জানোয়ারটার দু-চোখের মাঝখানে৷ যন্ত্রণায় অবিকল যেন কুকুরের মতোই একবার কিঁউ শব্দ করে উঠল চিতাটা আর পরমুহূর্তেই সমস্ত চিড়িয়াখানা বিকট গর্জনে কাঁপিয়ে খাঁচার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল৷ লোহার শিকগুলো ঝনঝন করে কেঁপে উঠল, যেন ভেঙে বেরিয়ে যাবে৷

মজা পেয়ে হো-হো করে হেসে উঠল ছেলেটা-সঙ্গে সঙ্গে ভিড়ের আরও অনেকে৷ এরকম মজার দৃশ্য সত্যি তারা খুব কমই দেখেছে৷ ছেলেটা উৎসাহ পেয়ে আবার একটা খোয়া তুলেছে বাঘটাকে ছুড়ে মারার জন্য, ঠিক সে-মুহূর্তেই একটা কাণ্ড ঘটল৷
ব্ল্যাক প্যান্থারের চেয়েও তীব্র বেগে ছুটে এসে অর্জুন সোজা লাফ দিয়ে পড়ল ছেলেটার উপর, তারপর মুহূর্তে চিত করে ফেলে দিয়ে বুকের উপর চেপে বসল তার৷ হাতের লাঠিটা দিয়ে পাগলের মতো সপাসপ মারতে শুরু করল তাকে৷ চোখের পলকে এতগুলো ঘটনা ঘটে গেল৷ ছেলেটা হতভম্ব হয়ে চিৎকার করছে, ওরে বাবারে মেরে ফেলল রে-৷ অর্জুন কিন্তু কোনো কথা বলছে না-বাঘের মতোই একটা ক্রুদ্ধ অস্ফুট গোঙানির শব্দ শুধু বেরিয়ে আসছে তার গলা থেকে৷
ছেলেটির সঙ্গের লোকজনেরা ইতিমধ্যে সংবিৎ ফিরে পেয়েছে৷ তারা একযোগে এবার ঝাঁপিয়ে পড়ল অর্জুনের উপর, তারপর বৃষ্টির ধারার মতো অজস্র কিলচড় ঘুষি পড়তে লাগল তার উপরে৷
বুবাই চিৎকার করে উঠল ভয়ে৷ অর্জুনদাকে মেরে ফেলবে নাকি ওরা৷ ছেড়ে দিন, অর্জুনদাকে ছেড়ে দিন আপনারা৷ খুব ভালো লোক অর্জুনদা৷ ওমা, রক্ত বেরোচ্ছে, আর মারবেন না ওকে-
-আমাদের লোকের গায়ে হাত তুলেছে-আজ ওর জান নিয়ে ফিরে যেতে দেব না আমরা-ভিড়ের মধ্যে থেকে দাঁতে দাঁত চেপে বলে ষণ্ডা মতো একটা লোক৷
নন্দলালবাবু আর সুরমা গিয়েছিলেন অল্পদূরে বাদাম কিনতে৷ হট্টগোল শুনে কাছে গিয়ে দেখেন এই কাণ্ড৷ লোকেদের হাতে-পায়ে ধরে নন্দলালবাবু কোনোক্রমে ছাড়িয়ে আনলেন বটে অর্জুনকে, কিন্তু ওর দিকে তখন আর তাকানো যাচ্ছে না৷ ঠোঁট কেটে ফুলে গেছে৷ সমস্ত মুখে কালশিরার দাগ৷ রক্ত গড়িয়ে পড়ছে কানের নীচ দিয়ে৷ কোনোমতে টলতে টলতে হাঁটছিল অর্জুন৷
নন্দলালবাবু প্রচণ্ড রাগ ভিতরে চেপে রেখে চাপা গলায় ফিসফিস করে বলেন, তুমি কি বদ্ধ পাগল অর্জুন? ছেলেটাকে কেন মারলে তুমি?
অর্জুন কেমন ঝিমধরা গলায় বলল, কালো বাঘটাকে মারবে কেন ও? কালো বাঘটা কী করিঠে ওর?
-বেশ করবে মারবে, তীব্রস্বরে ধমক দিয়ে উঠলেন নন্দলালবাবু, তোমার কী তাতে? সব কিছুতে তোমার মাথাব্যথা কীসের শুনি? উজবুক কোথাকার৷
অর্জুন চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে৷ নন্দলালবাবু একটু শান্ত হয়ে বলেন, নাঃ, কলকাতা শহরে তোমার মতো লোকের সত্যি থাকা চলবে না অর্জুন৷ অসম্ভব৷
বিরক্তিতে আর হতাশায় ঘাড় নাড়তে থাকেন নন্দলালবাবু৷ অর্জুন আর একটিও কথা বলে না৷ একেবারে পাথরের মূর্তির মতো স্তব্ধ হয়ে যায়৷
বাড়ি ফিরে এসে অর্জুন নিঃশব্দে তার ঘরের দিকে হাঁটা দেয়৷ বুবাই ছায়ার মতো পিছনে যায় তার৷
চারপাইয়ে বসে দু-হাত দিয়ে অনেকক্ষণ মুখ ঢেকে রাখে অর্জুন৷ বুবাইয়ের বুকে যেন ঢেঁকির পাড় পড়তে থাকে৷ কাঁদছে নাকি অর্জুনদা? না৷ বুবাইয়ের দিকে মুখ তুলে অর্জুন থমথমে গলায় বলে, তোমরা শহরের লোকেরা এত নিষ্ঠুর কেন খোকা? বনের পশুকে খাঁচায় আটকে রেখি তাদের উপর যা খুশি তাই অত্যাচার কর৷ বনের পশুরা তো দোষ করেনি কোনো৷
হঠাৎ হাতজোড় করে কী বিড়বিড় করে অর্জুন৷ তারপর বলে-যারা এরকম কষ্ট দেয় বনের পশুদের মা বনবিবি ক্ষমা করবেনি তাদের৷ তুমি দেখে নিয়ো খোকা-
বুবাইয়ের মনে অনেকক্ষণ থেকেই একটা প্রশ্ন আসছিল- বলবে কি না ভাবতে ভাবতে শেষে বলেই ফেলল বুবাই, তোমরা সুন্দরবনের লোকেরাও তো বাঘদের মার অর্জুনদা৷
অর্জুন খানিক চুপ থেকে গম্ভীর গলায় বলল, আমরা বাঘ মারি না খোকা৷ সুন্দরবনে অনেক মানুষ আছে তারা এমন মন্ত্র জানে যে, সে-মন্ত্র পড়লে বাঘ পাথরের মূর্তির মতো স্থির হয়ে যাবে৷ এক-পা নড়ারও ক্ষমতা থাকবে না তার৷
-তুমি জান সেই মন্ত্র? ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করে বুবাই৷
-জানি৷
-একটু বলবে অর্জুনদা মন্ত্রটা?
-শুনবে সেই মন্ত্র? অর্জুনের চোখ দুটো হঠাৎ কেমন অস্বাভাবিক উজ্জ্বল দেখায়৷ হঠাৎ মনে হল বুবাইয়ের তা যেন সেই ব্ল্যাক প্যান্থারের চোখ জোড়ার মতোই জ্বলছে৷
-হ্যাঁ অর্জুনদা, ছাতে চলো৷ সেখানে গিয়ে শুনব৷
থমথমে অন্ধকার চিলেকোঠার ছাত৷ দূরে একটা নারকেল গাছের ঝাঁকড়া মাথা ভূতের মতো দেখাচ্ছে৷ একটা রাতের পাখি কুব কুব করে অদ্ভুত সুরে ডাকছে কোথায়৷ বাগানের করবী গাছটায় হাওয়া বাধার অল্প ফিসফাস শব্দ৷ আকাশ ভরতি তারা উঠেছে৷ দূরে ডিসট্যান্ট সিগন্যালের লাল আলো৷ এর মধ্যে অর্জুনকে কেমন রহস্যময় ছায়ার মতো দেখায়৷ আশাবারিটা দু-হাতে শক্ত করে ধরে শিরদাঁড়া টান করে দাঁড়ায় অর্জুন তারপর অদ্ভুত গলায় অদ্ভুত একটানা একটা সুর আউড়ে যায়-

পুবে হামজার বন্ধ
দক্ষিণে কোলেফ আল্লার বন্ধ
পশ্চিমে সোলেমন পয়গম্বরের বন্ধ
উত্তরে ভানু বসকরের বন্ধ
এই চারি বন্ধে যে দিবে হানা
মহম্মদের শির সে করিবে ফানা
হো মুহম্মদ রসুল্ল - লা-লা-লা-হ-হ-
হাঁ করে শোনে বুবাই৷ কী মন্ত্রের মানে কিছুই বোঝে না বুবাই কিন্তু তার সমস্ত শরীরটা কেমন যেন শিরশির করে ওঠে৷ নিঃশব্দ রাত্রির সেই পরিবেশে অর্জুনের গলার স্বরটা শোনাচ্ছে যেন অনেকদূর থেকে ভেসে আসা মেঘের গর্জনের মতো৷ অন্ধকারে নজর করলে যেন দেখা যাবে চোখ দুটো ঝকঝক করে জ্বলছে৷ বুবাই সব ভুলে যায়-তার ইশকুল, খেলার মাঠ, বন্ধুবান্ধব, বাবা-মা, উলটোডাঙার বাড়ির ছাদ-সব৷ সব যেন ধোঁয়া৷ বুবাইয়ের চোখের সামনে ভেসে ওঠে সম্পূর্ণ আলাদা আশ্চর্য একটা জগৎ৷ সেখানে শুধু ঝুপসি নিঝুম বড়ো বড়ো গাছ, থমথমে খাল খাঁড়ি, অন্ধকারে আর কিছু দেখা যায় না শুধু গোল দুটো আগুনের ভাঁটা৷
সুরমা নীচ থেকে খেতে ডাকলে হঠাৎ চটকাটা ভেঙে যায় বুবাইয়ের৷ কোথায় ঝুপসি জঙ্গল-কোথায় কী? উলটোডাঙার বাড়ির ছাদে বসে আছে সে৷ দূরে ভি.আই.পি. রোড দিয়ে গোঁ গোঁ করে গাড়ি ছুটে যাচ্ছে৷ মনটা খারাপ হয়ে যায় তার৷ কবে যে সে সুন্দরবনে যেতে পারবে৷
চিড়িয়াখানার সেই ঘটনার পর থেকে অর্জুন একেবারেই যেন চুপচাপ হয়ে গেল৷ সুরমা যা কাজ করতে দেন নিঃশব্দে করে অর্জুন৷ এছাড়া সমস্তক্ষণ সামনের বাগানটাতেই পড়ে থাকে সে৷ গাছের গোড়া খোঁড়ে, জল দেয়৷ মাঝে মাঝে বিড়বিড় করে নিজের মনে কী বলে৷ যেন কথা বলার লোক খুঁজে না পেয়ে সে বাগানের গাছের সঙ্গেই কথা বলছে৷ বুবাই জিজ্ঞেস করে, কী হয়েছে তোমার অর্জুনদা? এখানে কি তোমার একদম ভালো লাগছে না?

শশব্যস্ত হয়ে অর্জুন ঘাড় নাড়ে, না না খোকা, কিছু হয়নি তো আমার৷ আমি ভালো আছি-খুব ভালো-
এই ঘটনার সপ্তাহখানেক পরে একটা দারুণ খবর নিয়ে এলেন নন্দলালবাবু৷ তিনি সামনের মাস থেকে ধঞ্চিতে বদলি হয়ে যাচ্ছেন৷ ধঞ্চি সুন্দরবনের একটা দ্বীপ৷ ধঞ্চির কথা নন্দলালবাবুর কাছে বুবাই আগেও শুনেছে৷ গেঁয়ো, গরান, হেঁতাল, বাইনের গভীর জঙ্গল নাকি সেখানে৷ ওপারে কলসের জঙ্গল থেকে মাঝেমধ্যেই বাঘ সাঁতরিয়ে চলে আসে ধঞ্চির জঙ্গলে শিকারের সন্ধানে৷
গভীর নিঃশব্দ রাতে কালো আকাশ আর কালো জঙ্গল যেখানে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে সেখানে মাটির একেবারে অন্তস্থল থেকে মাঝেমধ্যেই উঠে আসে জঙ্গলের সম্রাটের ক্ষুধার্ত চিৎকার৷ আকাশ জল অন্ধকার কেঁপে ওঠে সেই চিৎকারে৷ কখনো কখনো নাকি এত কাছ থেকে উঠে আসে সেই চিৎকার যে, মনে হয় দু-পাঁচ গজের মধ্যে এসে গেছে সেই ক্ষুধার্ত জানোয়ার৷ কিন্তু আসলে হয়তো তখন সে আছে দু-মাইল দূরে৷ এমনি নাকি তাদের ডাকের অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য৷ শুনে শুনে বুবাইয়ের মনে হয় সে যেন চোখ বুজলেই ধঞ্চির ছবিটা পরিষ্কার চোখের সামনে দেখতে পাবে৷
নন্দলালবাবু খুশি খুশি গলায় বললেন, বেশ হয়েছে, বুবাইয়েরও ছুটি পড়ে যাবে-এবার সবাই মিলে চলো ধঞ্চিতে মাসখানেকের জন্য বেড়িয়ে আসবে৷
সুরমা সভয়ে বললেন, ওরে বাবা সে নাকি বাঘ আর কুমিরে ভরতি৷ সেখানে প্রাণ হাতে নিয়ে কে যাবে?
নন্দলালবাবু বললেন, আরে বাঘ, কুমির তো কী হয়েছে? লোকে কাশ্মীর আর কন্যাকুমারীকা বেড়াতে যায়-একবার দেখে আসবে চলো কাকে বলে প্রাকৃতিক দৃশ্য৷ কলকাতায় আর কখনো ফিরে আসতে ইচ্ছে করবে না৷
অর্জুন যে এতক্ষণ দরজার কাছে দাঁড়িয়ে সব শুনছিল কেউ খেয়াল করেনি৷ অর্জুনদার দিকে চোখ পড়তেই বুবাই দেখে সমস্ত মুখ যেন ওর খুশিতে একেবারে ঝকমক করে উঠেছে৷ নন্দলালবাবু রহস্যের সুরে বললেন, কি অর্জুনবাবু, এবার খুশি তো?
অর্জুন মাটির দিকে চোখ রেখে অল্প হাসে৷ অনেক অনেক দিন পর যেন বুবাই তাকে হাসতে দেখল৷ আনন্দে বুবাইয়ের হাততালি দিয়ে উঠতে ইচ্ছে করে৷ সে সুন্দরবনে যাবে সঙ্গে থাকবে অর্জুনদা-এর চেয়ে বেশি সুখ আর কি কল্পনা করতে পারে সে?
অনেক রাত অবধি আলোচনা চলল কোন রাস্তা দিয়ে কীভাবে সুন্দরবনে যাওয়া হবে৷ শেষ অবধি ঠিক হল, সোজা নামখানার হাতানিয়া দোয়ানিয়া খাল পেরিয়ে বকখালি যাবে৷ সেখানে ফরেস্টের হাউস বোট থাকবে৷ হাউস বোট করে ওরা বকখালি থেকে সোজা নদীপথে ধঞ্চি যাবে৷ অনেকটা রাস্তা তাহলে তারা নৌকোয় যেতে পারবে নদীর দৃশ্য দেখতে দেখতে৷ নন্দলালবাবু বললেন, শীতকালের সুন্দরবনের এসব অঞ্চলের নদীনালার দৃশ্যের সঙ্গে নাকি পৃথিবীর কোনো জায়গার সৌন্দর্যেরই তুলনা হতে পারে না৷
যাওয়ার দিন রাতে উত্তেজনায় বুবাইয়ের দু-চোখে আর ঘুম আসে না৷ কখন যে ভোর হবে-কখন যে তারা সবাই গিয়ে এসপ্ল্যানেড থেকে নামখানার বাস ধরবে৷
কাকভোরে ওরা উলটোডাঙা থেকে রওনা হল৷ যত তাড়াতাড়ি নৌকোয় গিয়ে পৌঁছোনো যায়৷ নামখানার বাসে উঠেই অর্জুনদা হঠাৎ একেবারে ছেলেমানুষের মতো ছুটে গিয়ে জানালার পাশের একটা সিট দখল করে বসল৷ অর্জুনের পাশে গিয়েই বসে বুবাই৷
বাস ছেড়ে দিল৷ কলকাতা শহরটা-জাদুঘর, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হল, প্ল্যানেটোরিয়াম সমেত হু-হু করে ছুটে যাচ্ছে তাদের জানালার পাশ দিয়ে৷ বুবাই হঠাৎ একবার চোখ রগড়ে নেয়, যা দেখছে সে সব স্বপ্ন নয় তো? সত্যি সত্যি এই বাস তাহলে সুন্দরবনের দিকেই যাচ্ছে? অর্জুনদার কাছে গল্প শোনা সেই সুন্দরবন?
কতক্ষণ ধরে বাস চলছে খেয়াল নেই বুবাইয়ের৷ কলকাতা শহর অনেকক্ষণ পেরিয়ে গেছে৷ পাকা বাড়ি এখন আর চোখেই পড়ে না প্রায়৷ দু-পাশে ধু-ধু ধান খেত জলা, রাস্তার পাশে টানা লম্বা নয়ানজুলি-লগি ঠেলে লম্বা তালগুঁড়ির মতো দেখতে একধরনের নৌকো বেয়ে চলেছে গ্রামের লোকেরা৷ কী অদ্ভুত দৃশ্য৷ দু-চোখে গোগ্রাসে গিলতে গিলতে যায় বুবাই৷
কুলপি! কুলপি! কী অদ্ভুত নাম জায়গাটার৷ একটা খাল পেরিয়ে গেল ওরা৷ দু-পাশে ঝুপসি জঙ্গল৷ কী গাছ জানে না বুবাই৷ অর্জুন এতক্ষণ চুপ করে দেখছিল৷ হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল-গরান! গরান! ওই দেখো খোকা গরান গাছ৷ কী ফুর্তি অর্জুনের দু-চোখে৷ যেন অনেকদিন পর সে তার পরিচিত কোনো বন্ধুকে দেখতে পেল৷
গরান? এই সেই বিখ্যাত গরান যার কথা বইয়ে পড়েছে বুবাই আর হাজার বার শুনেছে অর্জুনদার মুখে? কিন্তু সে গাছ তো সুন্দরবনে হয়৷ এখানে সে গাছ আসবে কী করে? জিজ্ঞাসু চোখে পিছন ফিরে নন্দলালবাবুর দিকে তাকায় বুবাই৷ পিছনের সিট থেকে নন্দলালবাবু বলেন, হ্যাঁ বুবাই, সত্যি বলতে কি, এখান থেকেই সুন্দরবন আরম্ভ হল৷ বৃটিশ আমলে যে ম্যাপ তৈরি হয়েছে এ অঞ্চলের, তাতে কুলপির উপর দিয়ে একটা রেখা কল্পনা করা হয়েছে৷ সেই রেখার দক্ষিণ থেকেই সুন্দরবন শুরু৷ ব্যাপারটা বুবাইয়ের ঠিক মঃনপূত হয় না৷ বাস চলেছে, দু-দিকেই তো খালি মাঠ মাঠ আর মাঠ৷ সুন্দরবনের বন কোথায়? দুপুর বেলা নাগাদ ওরা নৌকায় হাতানিয়া দোয়ানিয়া খাল পেরোল৷ অজস্র নৌকো খালে৷ ডান দিকটা দেখা যাচ্ছে ধোঁয়া ধোঁয়া৷ কোথায় কতদূর গেছে খালটা? খালের স্বচ্ছ জলে কেমন একটা নীলচে সবুজ আভা৷ আকাশের গায়ে লম্বা লম্বা মাস্তুলের মিছিল৷ তার উপরে চিল উড়ে বেড়াচ্ছে৷ ভারি সুন্দর দৃশ্য তো!
নৌকো থেকে নেমে মাটিতে পা দিয়েই নন্দলালবাবু বললেন, এই যে বুবাই, আমরা এবার সুন্দরবনের একটা দ্বীপে পা দিলাম৷ এরকম অজস্র দ্বীপ ছড়িয়ে আছে চারিদিকে৷
বুকের মধ্যে কেমন করে ওঠে বুবাইয়ের৷ সত্যি তার পায়ের নীচে সুন্দরবনের একটা দ্বীপ-যে দ্বীপের কথা সে এতদিন শুধু বইয়েই পড়ে এসেছে৷ এই তো সেদিনও একটা বই পড়ল সে 'সুন্দরবনের ভয়ংকর'৷ কী সাংঘাতিক সব গল্প৷ তাতেও তো-
এখান থেকে এবার একটা বাসে উঠল ওরা৷ ধুলোর মেঘ উড়িয়ে আবার চলতে শুরু করল বাস৷ কিন্তু বুবাইয়ের মনের খটকা আর যায় না ৷ এটা দ্বীপ হল কী করে সে বুঝে উঠতে পারে না৷ জেটির চারদিকে ধানের মাঠ, খেতখামারি, চাষিদের গাঁ, গোরু ছাগল চরে বেড়াচ্ছে, মাছ ধরছে কাদায় নেমে মেয়ে-বউরা, মাঝে মাঝে আবার এক একটা হাটও পড়ছে-মেলা লোক জড়ো হয়েছে সেখানে চালডাল তরিতরকারি নিয়ে-দৃশ্যগুলো সবই অন্য যেকোনো গ্রামের মতোই৷ হায় ভগবান! এই শেষে তাহলে সুন্দরবনের দ্বীপ! অর্জুনদা তাকে যা বলেছে সব গাঁজাখুরি গল্প তাহলে৷ জঙ্গল, বাঘ, কুমির কিছু নেই তাহলে সেখানে?
একটা জিনিস কিন্তু লক্ষ করেছে বুবাই-ওদের যাওয়ার রাস্তায় মাঝেমধ্যেই আঁকবাঁকা এক একটা খাল পড়ছে৷ ছোটো ছোটো পুলের উপর দিয়ে চলে যাচ্ছে বাসটা৷ দু-পাশে সবুজ ঘাসের জমি৷ তার মধ্যে স্থির খালের জলকে দেখাচ্ছে যেন তুলিতে আঁকা ছবির মতো৷ এত খাল কেন? কোথাও কোথাও উপরে ঝুপসি হয়ে ঝুঁকে পড়েছে ত্যাড়াব্যাঁকা ডালপালাওয়ালা হরেক রকমের গাছ, কুলপিতে যেরকম সে দেখেছিল৷ যতই এগোচ্ছে ওরা সামনে ততই এরকম খাল আর গাছের সংখ্যা বেড়ে চলেছে৷ কিন্তু বুবাই একটা জিনিস বুঝতে পারছে না, একটা দ্বীপ অর্থাৎ চারদিকে জল মধ্যিখানে স্থল সেটা লম্বায় আর কতবড়ো হতে পারে? একঘণ্টা ধরে তাদের বাস চলেছে-কই এখনও তো দ্বীপের কোনো শেষ দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না৷
নন্দলালবাবুকে কথাটা জিজ্ঞেস করবে বুবাই, হঠাৎ ক্যাঁচ করে একটা ব্রেক কষে থেমে গেল বাসটা৷ বাসের সব যাত্রীরা, বুবাইরা ছাড়া সবাই প্রায় জেলে অথবা চাষি, হুমড়ি খেয়ে পড়ল সামনে৷ কী ব্যাপার? বুবাই বাইরে তাকিয়ে দেখল ধান খেতের আলের উপর দিয়ে ছুটে আসছে একটা চিমসে ঢ্যাঙা মতো লোক-হাত তুলে চেঁচাচ্ছে হে-ই-ই হে-ই-ই আর তার অনেকটা পিছনে আপাদমস্তক ঘোমটায় মুড়ি দেওয়া একটা বউ কোনোক্রমে টলতে টলতে আসছে৷ দেখে মনে হচ্ছে খুব জোরে ছুটবার চেষ্টা করছে সে কিন্তু পারছে না৷
বাসটা কিন্তু দাঁড়িয়েই আছে, কখন ওরা এসে বাসে উঠবে৷ বুবাই ভাবে, বাঃ বেশ মজা তো-কতদূর থেকে ছুটে আসছে ওরা আর ওদের জন্য বাসটা থেমে গেল৷ বাসের অন্য কোনো যাত্রীও কিছু বলছে না৷ এখানকার ব্যাপার-স্যাপারগুলো তো ভারি অদ্ভুত৷ আলের উপর দিয়ে কোনোমতে হোঁচট খেতে খেতে ছুটতে ছুটতে ওরা দু-জনে বাসে এসে উঠতেই বাস আবার ছেড়ে দিল৷ বাসের পিছনের সিটটা ফাঁকা ছিল একেবারে৷ দু-জনে সেখানে গিয়ে বসল৷ ঢ্যাঙা চিমসে লোকটা ট্যাঁক থেকে একটা বিড়ি বের করে ধরাল তারপর ফুকফুক করে টানতে লাগল৷ বউটি হেলান দিয়ে বসল-লম্বা ঘোমটায় তার মুখটা দেখা যাচ্ছে না৷
এতক্ষণ বুবাই একদম খেয়াল করেনি-হঠাৎ অর্জুনদার দিকে চোখ পড়তেই দেখল অর্জুনদা এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে বউটির দিকে৷ চোখের পলক অবধি পড়ছে না তার৷ বুবাই অবাক৷ কী হয়েছে অর্জুনদার? বউটির দিকে কেন ওরকমভাবে তাকিয়ে আছে? সঙ্গের লোকটি সামনের দিকে তাকিয়ে নির্বিকারভাবে বিড়ি টেনেই চলেছে৷ বুবাই দেখল ছুটে আসার ফলেই বোধ হয় বউটি খুবই ক্লান্ত, সিটের উপর কাত হয়ে প্রায় শুয়েই পড়ল৷ সঙ্গেসঙ্গে সিট ছেড়ে উঠে দাঁড়াল অর্জুন৷ চোখের দৃষ্টি তার অস্বাভাবিক উজ্জ্বল৷ হঠাৎ একরকম ছুটে গিয়েই লোকটার সামনে দাঁড়াল অর্জুন৷ তারপর কর্কশ আর অদ্ভুত গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল-কী সাপ?
লোকটা প্রচণ্ড চমকে উঠেছে বোঝা যায়৷ অর্জুনের চোখের দিকে একবার হতভম্বের মতো তাকাল তারপর কাঁপা কাঁপা গলায় বলল-শিয়রচাঁদা৷
বুবাই মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারছিল না৷ যেন সাংকেতিক কোনো ভাষায় কথা হচ্ছে৷ গোয়েন্দা বইতে যেরকম পড়েছে বুবাই অনেকটা সেরকম৷ বাসের অন্যান্য লোকেরাও চুপচাপ৷ সবাই অর্জুনের দিকে তাকিয়ে আছে৷ অর্জুন তেমনি গম্ভীর গলায় আবার জিজ্ঞেস করল-কখন হল?
লোকটার বিড়ি খাওয়া আগেই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল৷ অর্জুনের দিকে তাকিয়ে এবার হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল-ও আমারই মেয়ে দাদা৷ শ্বশুরবাড়ি থেকে কাল এঠি বেড়াতি এয়েছিল৷ গোরুকে জাবনা দেবে বলে আজ বিচুলি গাদায় গিইথিলা৷ বিচুলিগাদায় লুকিয়ি ছিল সাক্ষাৎ যম৷ দেখতি পায়নি৷ আঙুলে কামড়ে দিয়িঠে এই এতবড়ো একটা শিয়রচাঁদা৷ দু-হাত ফাঁক করে দেখায় লোকটা৷ হাসপাতালে নিয়ি যাচ্ছি-কিন্তু মেইয়ে কি আমার বাঁচবে? কী হবে ও বাবা গো, আমার কী হবে? হাউ হাউ করে কাঁদে লোকটা৷
শিয়রচাঁদা! বুবাইয়ের বুকের রক্ত হিম হয়ে যায়৷ শিয়রচাঁদা সাপের গল্প সে অনেক শুনেছে অর্জুনের কাছে৷ সুন্দরবনে এর চেয়ে ভয়ংকর সাপ নাকি আর কিছু নেই৷ এরা নাকি ঘুমন্ত মানুষের গায়ের ঘাম চেটে চেটে খায়-আর ঘুমের মধ্যে সেই মানুষটির হাত গিয়ে যদি পড়ে শিয়রচাঁদার গায়ে তাহলেই আর রক্ষা নেই৷ একবার শুধু দাঁত দিয়ে ছুয়ে দেবে সে৷ শিয়রচাঁদার কামড় খেয়েও বেঁচে ফিরে এসেছে এমন লোক নাকি সুন্দরবনে অল্পই আছে৷
শিয়রচাঁদার কথা শুনেই অর্জুনের কেমন মাথা ঘুরে গিয়েছিল৷ হঠাৎ তার সংবিৎ ফিরে এল একটা আর্ত চিৎকারে৷ কী ব্যাপার! সামনে তাকিয়েই বুবাইয়ের চক্ষুস্থির৷ অর্জুন তার হাতের আশাবারিটা দিয়ে বেধড়ক মারছে সেই বউটাকে৷ আর বউটা ব্যথার চোটে মা গো, বাবা গো বলে চিৎকার করে উঠে বসেছে৷ অর্জুন কিন্তু আশাবারির বাড়ি মেরেই চলেছে বউটাকে আর সেই কর্কশ গলায় চিৎকার করছে-আর ঘুমোবে? অ্যাঁ, ঘুমোবে আর?
অর্জুনের হাবভাব, গলার স্বর, চোখের দৃষ্টি সব কেমন বেমালুম পালটে গেছে৷ বুবাইয়ের চোখের সামনে যেন সম্পূর্ণ অন্য একটা মানুষ৷ উলটোডাঙা স্টেশনে ইলেকট্রিক ট্রেন দেখে গোবেচারা আর নিরীহ যে অর্জুন ভয়ে 'ওরে বাবারে' বলে ছেলেমানুষের মতো চেঁচিয়ে উঠেছিল তার সঙ্গে এই অর্জুনের বাস্তবিক কোনো মিলই যেন নেই৷ এ-অর্জুন বুবাইয়ের সম্পূর্ণ অচেনা৷
বাসের যাত্রীদের এতক্ষণে হুঁশ ফিরে এসেছে৷ বউটি আশাবারির বাড়ি খেয়ে আবার আর্তনাদ করে ওঠার সঙ্গেসঙ্গেই কয়েকজন ঝাঁপিয়ে গিয়ে অর্জুনের হাত ধরে ফেলল-মাথা খারাপ নাকি তোমার বাবু অ্যাঁ৷ কেন পিটছ বউটাকে? কী করিঠে ও? অর্জুন এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে নিয়ে একেবারে স্পষ্ট হুকুমের গলায় বলল, তোমরা গিয়ি বোসো দিকি বাবু৷ ওঠি, যাও৷ সাপে কাটা রুগিকে যে ঘুমোতে দিতি নেই তাও জাননি? চুপ করি বসি দেখো সবাই আমি বিষ ঝেড়ি দিইঠি৷ আমার নাম অর্জুন৷
নিজের বুক ঠুকে অর্জুন বিড়বিড় করে মন্ত্র পড়তে লাগল৷ সেদিন ছাতে উঠে অর্জুন যে সুরে মন্ত্র পড়ছিল অনেকটা সেই সুরেই৷ বাসের সব যাত্রীরা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে৷ সবাই বিস্ময়বিমূঢ়৷
সেই লোকটা শুধু এবার অর্জুনের পায়ের কাছে বসে পড়ে পাগলের মতো কাঁদতে লাগল-তুমি গুনিন ঠাকুর? আমার লক্ষ্মীকে বাঁচিয়ি দাও-
ইতিমধ্যে হাসপাতালের কাছে পৌঁছে গেছে বাসটা৷ এই দ্বীপের একমাত্র হাসপাতাল৷ দূরে গাছের পিছনে একতলা হলুদ বাড়িটা দেখা যাচ্ছে৷ হাসপাতালের স্টপেজে বাসটা থেমে গেল৷ লোকটা হঠাৎ কান্না থামিয়ে চারদিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকাচ্ছে- যেন সে বুঝতে পারছে না এবার কী করবে৷ এখানেই নেমে পড়বে না ওই গুনিনের হাতেই মেয়ের জীবন-মরণের ভার ছেড়ে দেবে? লোকটির ভ্যাবাচ্যাকা ভাব দেখেই হয়তো অর্জুন কিছু বলতে যাচ্ছিল কিন্তু তার আগেই পিছন থেকে ভেসে এল নন্দলালবাবুর গম্ভীর স্পষ্ট গলার আওয়াজ-অর্জুন-৷
বাবার এরকম আওয়াজ আগে শোনেনি কখনো বুবাই-এত মৃদু কিন্তু এত গম্ভীর৷ অর্জুন আশ্চর্য হয়ে ফিরে তাকাল নন্দলালবাবুর দিকে৷ নন্দলালবাবু অর্জুনের চোখের দিকে স্থির চোখ রেখে বললেন, ওকে হাসপাতালে নেমে যেতে দাও অর্জুন৷
অর্জুন কেমন বিহ্বল চোখে তাকাল নন্দলালবাবুর দিকে তারপর কুন্ঠিত গলায় বলল, বাবু ভয় পাবেননি, আমি ওকে ঠিক সারিয়ি তুলবু৷
-মানুষের জীবন নিয়ে খেলা কোরো না অর্জুন৷ তোমার মন্ত্রের কাজ নয় এসব৷ ছেড়ে দাও ওকে-
বাসের যাত্রীরা সব চুপ৷ তারা বুঝতে পারছিল না কী করবে৷ কিন্তু নন্দলালবাবুর গলার স্বরে এমন একটা কিছু ছিল যে অনিচ্ছাসত্ত্বেও অর্জুন ফিরে এসে ওর সিটে চুপ করে বসল৷ মেয়েকে নিয়ে লোকটি হতভম্বের মতো এদিক-ওদিক তাকাতে তাকাতে বাস থেকে নেমে গেল৷
চুপ করে জানালার কাছে মাথা রেখে বসে আছে অর্জুন৷ অর্জুনের গায়ে আলতো হাত রেখে নরম গলায় বলে বুবাই, অর্জুনদা, তোমার খুব দুঃখ হয়েছে?
বিষণ্ণ একটা হাসি হাসল অর্জুন৷ বলল, বাবু বিশ্বাস করল না যে আমি ওকে মন্ত্র পড়ে সারিয়ে তুলতি পারতাম৷ কিন্তু শিয়রচাঁদা সাপের ওষুধ শহরের ডাক্তাররা কোত্থেকে জানবে খোকা? শুধু সুন্দরবনের গুনিনরাই জানে এর ওষুধ৷ মেয়েটি মারা যাবে খোকা-নির্ঘাত মারা যাবে৷
এমনভাবে বলে অর্জুনদা যে বুকের ভিতরটা ছমছম করে ওঠে৷ সে বুঝতে পারে না কার কথা ঠিক অর্জুনদার না বাবার? কার কথা বিশ্বাস করবে সে৷
সারা পথ আর অর্জুনদা একটা কথাও বলে না৷
বকখালি পৌঁছোতে বিকেল হয়ে গেল৷
বাস থেকে নেমে বুবাই একটা আশ্চর্য দৃশ্য দেখতে পেল৷ উঁচু উঁচু ঝাউ গাছের পিছনে একটা বিরাট লাল লাট্টুর মতো ঘুরপাক খেতে খেতে সূর্য ডুবে যাচ্ছে৷ এতবড়ো সূর্য জীবনে দেখেনি বুবাই৷ ইচ্ছে করে শুধু হাঁ করে সূর্যের দিকেই তাকিয়ে থাকে৷ একটা গুমগুম শোঁ-শোঁ আওয়াজ অনেকক্ষণ থেকেই কানে আসছিল বুবাইয়ের৷ খানিকটা দূর থেকে ভেসে আসছে শব্দটা৷ বুবাই বুঝতে পারছিল না শব্দটা কীসের৷ নন্দলালবাবু বললেন, শোনো বুবাই ঢেউয়ের শব্দ৷আমরা সমুদ্রের খুব কাছে এসে গেছি৷
সমুদ্র! সমুদ্র! বুবাইয়ের বুকের ভিতরটা লাফিয়ে ওঠে৷ তার এতদিনের বইয়ে পড়া সমুদ্র! গল্পে শোনা সমুদ্র! অল্প একটু জঙ্গল আর কাদা ভেঙে ওরা কাঠের পুলের নীচে বাঁধা ফরেস্টের হাউসবোটে গিয়ে ওঠে৷ বাঃ কী সুন্দর ছিমছাম নৌকোটা৷ দু-পাশে দুটো খাট, তাতে পরিষ্কার চাদর পাতা৷ একেবারে বাড়ির মতোই৷ নৌকোর শুকনো কাঠের কী সুন্দর মিষ্টি একটা গন্ধ ভেসে আসছে৷ বুক ভরে গন্ধটা নেয় বুবাই৷ এই নৌকো করেই তাহলে তারা সুন্দরবনের খাল আর খাঁড়ি বেয়ে ধঞ্চি অবধি যাবে? ঃআ, আনন্দে যেন চোখ বুজে আসতে চায় বুবাইয়ের৷ সত্যি এরকম সৌভাগ্য কখনো আসবে তার জীবনে ভাবতে পেরেছিল সে? কোথায় তাদের উলটোডাঙার বাড়ির অন্ধকার ঘরে ঢুলতে ঢুলতে ল.সা.গু., গ.সা.গু-র অঙ্ক কষা আর কোথায় এই ময়ূরপঙ্খির মতো হাউসবোটে চড়ে সমুদ্রের ঢেউ খেতে খেতে ধঞ্চি যাওয়া৷ স্বপ্ন দেখছে না তো সে!
বুবাই নৌকোর পাটাতনের উপর এসে দাঁড়াল৷ অসম্ভব সুন্দর দৃশ্য চারদিকে৷ সবুজ খোলের শাড়ির সাদা পাড়ের মতো দেখাচ্ছে আঁকাবাঁকা খালটাকে৷ দু-পাশে যতদূর চোখ চলে ঝুপসি গাছের জঙ্গল৷ জঙ্গলের মাথায় থোকা থোকা সাদা ফুলের মতো বিরাট বিরাট বক বসে আছে৷ মাথায় লম্বা টিকি বকগুলো ভারি মজার দেখতেঃও, বোষ্টমির মতো টিকি বলে এগুলোকেই অর্জুনদা বলেছিল বোষ্টুমি বক৷
নৌকো একদম একদিকের পাড় ঘেঁষে চলছিল৷ এদিকেই খালের জল বেশি গভীর৷ বুবাই নজর চালিয়ে দেখল জঙ্গলের গাছগুলি দেখতে খুব অদ্ভুত৷ প্রতিটি গাছের গোড়া থেকে হাজার হাজার শুঁয়োর মতো ছোটো ছোটো শিকড় কাদার উপরে মাথা তুলে রয়েছে৷ গাছগুলির শিকড় মাটির নীচে না গিয়ে আকাশের দিকে ওঠে নাকি?
নন্দলালবাবু বললেন, বুবাই, এই হল সুন্দরবনের গাছের বৈশিষ্ট্য৷ শুধু সুন্দরবন নয়, সমুদ্রের মোহানায় যেখানে জোয়ার-ভাঁটা খেলে সেখানকার গাছ এরকমই হয়৷ ওই যে আকাশের দিকে মাথা তুলে আছে ওগুলিকে বলে ব্রিদিং রুট অর্থাৎ শ্বাসমূল- সরাসরি ওরা বাতাস থেকে অক্সিজেন নেয় বলে ওদের এই নাম৷ নদীর মোহানায় এই ধরনের ব-দ্বীপ ছাড়া আর কোথাও এরকম গাছ দেখা যাবে না৷
ঘণ্টা খানেকের মধ্যে ওদের নৌকো বড়ো নদীতে গিয়ে পড়ল৷ নদী না বলে বোধ হয় সমুদ্র বলাই ভালো৷ ও পাড়টা সরু একটা কালো রেখার মতো দেখাচ্ছে৷ এখান থেকে ওদের নৌকো কিছুটা উত্তরমুখী গিয়ে পূর্ব সপ্তমুখীতে গিয়ে পড়বে৷
নৌকো মাঝ নদী বরাবর যেতেই শুরু হল ভীষণ ঢেউ৷ ঢেউয়ের মাথায় যেন কাগজের নৌকোর মতো ভাসছে তাদের হাউসবোটটা৷ এক-একটা ঢেউ আসছে যেন পাহাড়ের মাথায় উঠে যাচ্ছে তাদের নৌকোটা-ঢেউটা সরে যাওয়ার সঙ্গেসঙ্গেই ঝুপ করে নৌকোটা খাড়া নেমে যাচ্ছে অতল কোনো গর্তে আর বুবাইয়ের বুকের ভিতর পেটের ভিতর কেমন শিরশির করে উঠছে৷ ভয় করছে আবার কেমন একটা মজাও লাগছে৷
সুরমা কলকাতার মেয়ে৷ জীবনে কখনো এত বড়ো নদীতে নৌকো করে যাওয়ার কথা কল্পনাও করেননি৷ ভয়ে তাঁর মুখটা একরকম শুকিয়ে গিয়েছিল৷ কাঁদো-কাঁদো গলায় এবার বলে ওঠেন সুরমা, মাঝিকে নৌকো ফেরাতে বলো৷ আর যাব না আমি৷
নন্দলালবাবু ঠোঁট টিপে হাসেন সুরমার ভয় দেখে৷ বললেন, এতেই ভয় পাচ্ছ তুমি, সুন্দরবনের জেলেরা ডিঙি নৌকো নিয়ে যায় সমুদ্রে মাছ ধরতে৷ সেখানে এর তিন গুণ উঁচু ঢেউ জানো-
কথাটা শেষও করতে পারেননি নন্দলালবাবু তার মধ্যেই একটা ধুন্ধুমার কাণ্ড ঘটল৷ মচমচ করে নৌকোটার সমস্ত শরীরে, মাস্তুলের আগায় একটা বিকট শব্দ হল-যেন খুলে যাচ্ছে ভেঙে যাচ্ছে নৌকোটার সমস্ত জোড়গুলি৷ তারপরই নৌকোটা একদম হেলে পড়ল একদিকে৷ ঝনঝন করে নৌকোর বাসনকোসনগুলো সব গড়িয়ে গেল সেদিকে৷ নৌকোর নীচু জানালা দিয়ে নদীর জল ঝপাং করে ঢুকে পড়ল ভিতরে৷ বিছানা-টিছানা ভিজে একসা৷ বুবাই সুরমা নন্দলালবাবু সব চিতপটাং বিছানার উপরে৷ এমনকী অর্জুন-যে বেশ আত্মবিশ্বাস নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিল নৌকোর ছাতে, পাটাতনে সেও দড়াম করে উলটে পড়ল একটা জলের জালার উপরে৷ নৌকোটা কি ঠেকে গেছে কোনো ডুবো বালির চড়ায়? এরকম গল্প তো অনেক পড়েছে বুবাই৷ নন্দলালবাবু উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করে আবার কাত হয়ে পড়ে গিয়ে হো-হো করে হেসে উঠলেন৷ এই ঘোর বিপদে বাবার এত হাসি আসে কোত্থেকে ভেবে কূলকিনারা পাওয়ার আগেই নন্দলালবাবু বললেন, বুঝলে বুবাই, একে বলে নৌকোয় গোণ দেওয়া৷ হাওয়ার উলটোমুখে যখন পাল খাটিয়ে যেতে হয় তখন এভাবে কোনাকুনিই যায় তারা, এর ফলে নৌকো একদিকে কাত হয়ে যায়৷ এটা সুন্দরবনের মাঝিদের বিশেষ কায়দা৷
ঢেউটা হঠাৎ পড়ে গেল৷ ওদের নৌকোটা এবারে একটা সুন্দর জায়গায় এসে পৌঁছেছে৷ চরের পর চর গজিয়ে জায়গাটা দেখাচ্ছে অবিকল একটা হ্রদের মতো৷ চারপাশে কালো কালো জঙ্গলের মাথা৷ নন্দলালবাবু বললেন, যা দেখছ সবই সুন্দরবনের বিভিন্ন বদ্বীপ৷
এত নিঃশব্দ সবকিছু যে, আকাশের অনেকটা উপর দিয়ে মালার মতো উড়ে যাওয়া একঝাঁক সাদা বকের শাঁ-শাঁ পাখার শব্দও যেন ক্ষীণ শোনা যাচ্ছিল৷ নৌকোটা যেন পালতোলা জাহাজ আর সে কলম্বাস কিংবা ক্যাপ্টেন স্কট জাহাজ নিয়ে ভেসে পড়েছে কোনো অজানা মহাদেশের উদ্দেশে৷
একটা জিনিস জানতে খুব কৌতূহল হচ্ছিল বুবাইয়ের-এই অকূল সমুদ্রে চুপ সাহেবের চরাটা কোনদিকে? কথাটা অর্জুনকে জিজ্ঞেস করাতে, আকাশ জল মিলেমিশে যেখানে একাকার হয়ে গেছে সেখানে খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইল অর্জুন চুপ করে৷ মনে মনে খুব লজ্জা পায় বুবাই৷ একথা জিজ্ঞাসা করা উচিত হয়নি তার৷ চুপ সাহেবের স্মৃতি খুব সুখের স্মৃতি নয় অর্জুনদার কাছে৷
নৌকোটা একদম থেমে গেল কেন বুঝতে পারছে না বুবাই৷ কখন ধঞ্চি গিয়ে পৌঁছোবে তারা? ছাতের উপর ইয়াসিন দাঁড়ি তামাক টানছে৷ তার ভুরভুর মিষ্টি গন্ধ৷ জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে বুবাই৷ হঠাৎ একটা হইহই শব্দ৷ ইয়াসিন নৌকার মাথা থেকে চিৎকার করে উঠল-সামাল মাঝি সামাল৷ নৌকোটা যেন হঠাৎ একটা ঝটকা খেয়ে ঘুরে গেল৷ বুবাই দেখল কালো রঙের একটা কী জিনিস উল্কার মতো প্রচণ্ড বেগে নৌকোর গা ঘেঁষে বেরিয়ে গেল৷ প্রচণ্ড বেগেই সেটা ছুটে চলেছে সামনে৷
বুবাই আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞাসা করে, অত জোরে ওটা কী ছুটে যাচ্ছে বাবা?
নন্দলালবাবু বললেন, ওটা ছুটছে না খোকা৷ ছুটছি আমরা৷
কথাটা বুঝতে না পেরে বুবাই হাঁ করে তাকিয়ে থাকে বাবার মুখের দিকে৷
নন্দলালবাবু বললেন, ওটা হল কাঠের পিপে৷ জেলেরা জাল পেতেছে ওখানে৷ জাল ভাসিয়ে রাখার জন্য ওরকম কাঠের পিপে জালের সঙ্গে বেঁধে দেয় জেলেরা৷ পিপেটা আসলে মাটিতে নোঙর করা৷ এক জায়গায় থেমে আছে৷ আমাদের নৌকোটাই স্রোতের টানে প্রচণ্ড বেগে ছুটে চলেছে বলেই এরকম মনে হচ্ছে৷ চলন্ত ট্রেনের জানালা থেকে যেমন মনে হয় দু-দিকের গাছপালা ছুটে যাচ্ছে৷ খুব বড়ো ফাঁড়া গেছে৷ মাঝি হুঁশিয়ার ছিল বলেই নৌকোর মুখ ঘুরিয়ে দিতে পেরেছে৷ ওটার সঙ্গে ধাক্কা লাগলে দেখতে হত না৷ নির্ঘাত সলিল সমাধি৷
এতবড়ো একটা ফাঁড়া গেছে মাঝিকে দেখে বোঝার উপায় নেই৷ কেমন চুপচাপ সে হাল ধরে দাঁড়িয়ে আছে৷ সুন্দরবনের এইসব মানুষেরা সত্যই বড়ো অদ্ভুত৷
কিছুক্ষণ পর ঘন কালো জঙ্গলের সিঁথিতে আটকানো বিরাট সোনার টায়রার মতো যেন পূর্ণিমার চাঁদ উঠল৷ নদীর কালো জলে জ্যোৎস্না ছড়িয়ে পড়ল৷ হ্রদের মতো জায়গাটা পেরিয়ে ওরা একটা খালের ভিতর ঢুকল৷ সরু খাল৷ দু-পাশে ঘন গাছপালা৷ কোথাও কোনো জনপ্রাণীর সাড়াশব্দ নেই৷ হঠাৎ সেই নিস্তব্ধতায় দাঁড়ের ছপছপ শব্দ শুনে বুবাই দেখে একটা ছোটো ছইওয়ালা নৌকো জঙ্গল থেকে বেরিয়ে তাদের পিছু নিয়েছে৷ দু-জন লোক আপ্রাণ দাঁড় টানছে৷ যেন হাউসবোটটার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তারা এগিয়ে যেতে চাইছে৷ অর্জুন গলুইয়ের কাছে দাঁড়িয়ে একনজরে দেখছিল নৌকোটাকে৷ চারপাশের স্তব্ধতাকে খানখান করে দিয়ে হঠাৎ সে গর্জন করে ওঠে-হুঁ-শি-য়া-র৷ ফরেস্টের নৌকা এটা৷
বুবাইয়ের শিরদাঁড়া বেয়ে হঠাৎ একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে যায়৷ এতক্ষণে সে বুঝতে পেরেছে ব্যাপারটা৷ এরকম গায়ে কাঁটা দেওয়া গল্প সে অনেক পড়েছে বইয়ে৷ শীতের গভীর অন্ধকার রাত্রি৷ যাত্রী নিয়ে এগিয়ে চলেছে গহনা নৌকো৷ হঠাৎ নিকষ অন্ধকার ফুঁড়ে একটা ছিপ নৌকো বেরিয়ে এল, তারপর মাছের মতো দ্রুতগতিতে ছুটে চলল গহনা নৌকোর পিছু পিছু৷ ছিপ থেকে মুখ বাড়িয়ে খুবই নিরীহ গলায় একজন জিজ্ঞেস করল গহনা নৌকোর মাঝিকে-ও কত্তা, আগুন দেবা একটু? তামাক খাবু৷ গহনা নৌকার মাঝি নিপাট ভালো মানুষ৷ বলল, ছিপ লাগাও নৌকোর গায়ে৷ আগুন দিতেছি৷ ব্যস সঙ্গেসঙ্গে ছিপ গিয়ে লাগবে নৌকোর গায়ে আর পিলপিল করে উঠে আসবে একদল ষণ্ডামার্কা লোক ছিপের ভিতর থেকে৷
উঃ তারপর-তারপর যে কী হবে সে তো অর্জুনদার মুখে অনেকবার শুনেছে বুবাই৷ সুন্দরবনের জলদস্যুরা নাকি ভয়ংকর বেপরোয়া আর নিষ্ঠুর৷ সুন্দরবনের জলপথে কোনো কোনো কুখ্যাত জায়গা নাকি এমনি আছে যে সেখানে প্রাণ হাতে নিয়ে চলাফেরা করতে হয় নৌকোর যাত্রীদের৷
নন্দলালবাবু শুয়ে পড়েছিলেন৷ মৌজ করে একটা সিগারেট ধরাতে যাবেন-অর্জুনের চিৎকার শুনেই দেওয়ালে ঝোলানো বন্দুকটা পেড়ে নিয়ে বেরিয়ে এলেন বাইরে৷ বুবাই দেখল বাবার চোখের দৃষ্টি বাজপাখির মতো সতর্ক তীক্ষ্ণ৷
নৌকোটা কিন্তু এগিয়েই আসছিল৷ দূরত্ব ক্রমশই কমে আসছে৷ নন্দলালবাবুর হাত ট্রিগারে৷ পজিশন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি৷
নৌকোটা একেবারে কাছাকাছি এগিয়ে আসতেই নন্দলালবাবু বন্দুক তাগ করে চিৎকার করে ওঠেন-কে তোমরা? কী চাও?
রোগা নিরীহমতো একটা লোক এবার বেরিয়ে এল ছইয়ের নীচ থেকে৷ মৃদুস্বরে জিজ্ঞেস করল-এটা কি রেঞ্জার সাহেবের নৌকো? আমাদিগের একটা প্রার্থনা আছে৷
আগুন নিশ্চয়ই আগুন-বুবাইয়ের শরীরের রক্ত ঠান্ডা হয়ে আসে৷ এক্ষুনি হাত বাড়িয়ে বলবে-একটু আগুন দিবেন? তামাক খাবু-
নন্দলালবাবু কঠোর স্বরে জিজ্ঞেস করেন, কী প্রার্থনা?
লোকটি হাতজোড় করে বলে, আমরা গরিব জেলে বাবু৷ মাছ বেচি খাই৷ কিন্তু এ বছর মাছ ধরতি পারছিনি বাবু৷ একটা পাজি ধাড়ি কুমির কিছুতেই আমাদের পিছু ছাড়ছেনি৷ যেঠি যাবু সেটিই যাইঠে কুমিরটা৷ একটা লোক কাল জলে নেমি জাল পাততি গিয়িথিলা৷ তাকে টানি নিয়ি গিইঠে৷ হুজুর যদি কুমিরটারে মেইরে দেন তাহলি গরিবদের প্রাণ বেঁচি যায়৷
ডাকাতদের মুখোমুখি হওয়ার পরিবর্তে এরকম একটা ব্যাপার নন্দলালবাবু মোটেই আশা করেননি৷ লোকটির গলায় শিশুর মতো অসহায়তা আর নির্ভরতার সুর৷ যেন রেঞ্জার সাহেব ইচ্ছে করলেই যা খুশি তাই করতে পারেন৷ এই অসীম জলরাশির মধ্যে কোথায় সেই পাজি ধাড়ি কুমির লুকিয়ে আছে তা খুঁজে নিয়ে তাকে গুলি করা যেন তার কাছে কিছুই নয়৷ নন্দলালবাবু কী জবাব দেবেন ভাবছেন হঠাৎ লোকটি আঙুল দেখিয়ে চিৎকার করে উঠল-ওই যে হুজুর, ওই যে-
সবাই তাকাল সেদিকে৷ বুবাই দেখল পরিষ্কার জলে কালো কাঠের গুঁড়ির মতো কী আস্তে ভেসে যাচ্ছে৷ গুঁড়ির উপরের দিকটা জ্যোৎস্না পড়ে চকচক করছে৷ কুমির! কুমির! কুমির এরকম কাঠের গুঁড়ির মতো দেখতে হয় নাকি?
-মারুন, বাবু মারুন৷ এই সেই শয়তানটা-
হঠাৎ কী হয় নন্দলালবাবুর৷ চকিতে বন্দুক তুলে কুমিরটার দিকে তাক করেন বন্দুকের নল৷ হাত তার ট্রিগারে৷ ভয়ে চোখ বুজে ফেলেছে বুবাই৷
সেই মুহূর্তে অর্জুন কেবিনের ছাত থেকে বাঘের মতো লাফ দিয়ে একেবারে নন্দলালবাবুর বন্দুকের সামনে৷ চিৎকার করে ওঠে অর্জুন, মারবেননি বাবু-মারবেননি-
সঙ্গেসঙ্গে গুড়ুম করে বন্দুকের গুলির আওয়াজ৷ বুবাই দেখল বন্দুকের নল থেকে একটা আগুনের হলকা যেন অর্জুনের গা ঘেঁষে বেরিয়ে গেল৷ নন্দলালবাবুর বলিষ্ঠ হাতের আচমকা এক ধাক্কায় অর্জুন তার আগেই হুমড়ি খেয়ে পড়েছে নৌকোর পাটাতনে৷ ওদিকে বন্দুকের শব্দে ভয় পেয়ে লেজের প্রচণ্ড ঝাপটায় অনেকটা সাদা ফেনা তুলে জলের নীচে অদৃশ্য হয়ে গেছে সেই কালো জলচর জীবটা৷ চোখের পলকে এতগুলি ব্যাপার ঘটে গেল৷ নন্দলালবাবুর সারা শরীর যেন থরথর করে কাঁপছে৷ হাতের পায়ের বল হারিয়ে দড়াম করে তিনি বসে পড়লেন পাটাতনের উপর রাখা একটা বেতের চেয়ারে৷ ইয়াসিন মাঝি কেবিনের ছাদে বিড়বিড় করে বলে-সর্বনাশ হতি যাচ্ছিল খোকা, বড়ো বেঁচি গেছেন বাবু-এক্ষুনি গুলিতে মারা পড়ত অর্জুন৷

বেশ কিছুক্ষণ পর সংবিৎ ফিরে পেয়ে বলেন নন্দলালবাবু, তোমাকে খুন করার দায়ে আমার হাতে আজ হাতকড়া পড়ত জানো অর্জুন৷ কোন আক্কেলে তুমি বন্দুকের নলের সামনে হঠাৎ এসে দাঁড়িয়ে পড়লে?
অর্জুন বিড়বিড় করে বলে, আমি ভাবলাম বাবু আপনি কুমিরটাকে মারতি যাচ্ছেন৷ রেঞ্জার সাহেব নিজে যদি কুমির মারেন তাহলি তো সুন্দরবনের-
নন্দলালবাবু চিৎকার করে ওঠেন, চোপ রও অর্জুন! তোমার আস্পর্ধা তো দেখছি মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে৷ আমি কী করব না করব তার কৈফিয়ত তোমাকে দিতে হবে নাকি?
ধমক খেয়ে অর্জুন চুপ করে থাকে৷ অর্জুনের আর মুখদর্শন করবেন না বলেই বোধ হয় নন্দলালবাবু কেবিনের মধ্যে চলে যান৷
বুবাই শুধু চুপ করে দাঁড়িয়েই থাকে৷ বাইরে ধপধপে জ্যোৎস্নায় হেঁতাল, গেঁয়ো, গরানের ছায়া পড়েছে সাদা ঘোলাটে জলে৷ ওইখানেই ডুব মেরেছে সেই কুমিরটা৷ বাবার মুখে আগে শুনেছে সুন্দরবনের কুমির হল পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো আর হিংস্র কুমির-আকারে এবং হিংস্রতায় একমাত্র ভেনেজুয়েলার ওরিনাকো নদীর কুমিরই নাকি এদের কাছাকাছি আসতে পারে৷
বুবাইয়ের মনটা কেমন যেন হয়ে যায়৷ দূরে জ্যোৎস্নায় ইতিমধ্যে মিলিয়ে গেছে সেই মাছধরা নৌকোটা৷ শুধু মাঝিদের অস্ফুট একটা গানের সুর ভেসে আসছে-জনম দুঃখী কপাল পোড়া গুরু আমি একজনা আ-আ-
এই গানটা অনেকেই গায় এখানে৷
চুপচাপ দাঁড়িয়েই থাকে বুবাই৷ চারপাশে থমথমে নিঝুম জঙ্গল, জঙ্গলের মাথায় বকের পাখার মতো ডানা মেলা ধবধবে জ্যোৎস্না, নীচে নিথর নিস্পন্দ জল, মাঝে মাঝে জলের অতলে কোনো বড়ো জলচর প্রাণীর ঘাই মারার শব্দ, দূর থেকে দূরে মিলিয়ে যাওয়া সেই গানের সুর... এ কোন এক জাদু পৃথিবীতে এসে পড়েছে সে৷ আপনমনে উঠে সে সিঁড়ি বেয়ে কেবিনে নামতে যাবে তখন দেখে অর্জুন চুপ করে গলুইয়ের কাছে বসে আছে৷ অর্জুনের মন খারাপ বুঝতে পারে বুবাই৷ বুবাই মৃদুস্বরে জিজ্ঞেস করে, অর্জুনদা তুমি ওরকম করে বন্দুকের সামনে গিয়ে দাঁড়ালে কেন? কী সাংঘাতিক বিপদ হত বল তো আজ৷ সুন্দরবনের কুমির তো পৃথিবীর সবচেয়ে হিংস্র কুমির৷ কী হত ওটাকে মারলে? ওটাকে বাঁচাতে গিয়ে তো তুমি আজ নিজেই মারা পড়তে৷
অর্জুন খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বলে, জানো খোকা, এককালে আমাদের জন্মের অনেক আগে সুন্দরবনের নদীনালা সব মাছ আর কুমিরে ভরতি ছিল৷ এই জঙ্গল ভরতি ছিল হরিণ বাঘ আর শুয়োরে৷ শীতকালে কত পাখি আসত এঠি বাসা বাঁধতি আর ডিম পাড়তি৷ গাছের মাথা সব ভরি থাকত পাখিতে৷ সাদা লাল হলুদ-কতরকমের পাখি৷ মানুষের হাতে হাজার হাজার মারা পড়ল তারা, লোভী ভামবিড়ালের মতো মানুষ বালির চড়া থেকতি চুরি করে নিল হাজার হাজার জলপায়রা আর কাছিমের ডিম৷ এখন আর ভয়ে পাখিরা আসতি চায় না৷ একদিন আসবে যখন সুন্দরবনে বাঘ থাকবেনি, কুমির থাকবেনি, হরিণ থাকবেনি -শুধু মানুষ থাকবে৷ মানুষ মানুষ আর মানুষ৷ সুন্দরবন তখন কলকাতা হয়ি যাবে৷
চুপ করে শোনে বুবাই৷ কীরকম করুণ উদাস অর্জুনদার গলার স্বর৷ এ কি সেই অর্জুনদাই যে রেলগাড়ি দেখে চিৎকার করে উঠেছিল বাচ্চা ছেলের মতো? ইন্দ্রের প্রাসাদ ভেবে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হলকে হাতজোড় করে প্রণাম করেছিল! কলকাতা শহরই কি এতটা পালটে দিয়েছে অর্জুনদাকে৷
বুবাই চুপ করে বসে থাকে আরও কিছুক্ষণ৷ চাঁদ আরও উপরে উঠে আসায় শীতলপাটির মতো নিথর নদীর জলে জ্যোৎস্নার অপার্থিব শুভ্রতাটা যেন আরও স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে৷ কী একটা রাতজাগা পাখি টিরিক-টিরিক করে ডাকতে ডাকতে হঠাৎ চরকির মতো আকাশে উঠেই জঙ্গলের মধ্যে ডুবে গেল৷ কী অদ্ভুতই যে লাগছে৷ জঙ্গল নদী জ্যোৎস্নার এই শোভা দেখে সারারাত কাটিয়ে দিতে পারে সে৷
হঠাৎ একটা মৃদু শব্দে ঘোর ভেঙে চমকে তাকাতেই বুবাই দেখল, জঙ্গলের কিনারা ঘেঁষে অনেকটা জায়গা জুড়ে জল যেন ফুটছে৷ বিজবিজ শব্দটা আসছে সেখান থেকেই৷
শব্দটা অর্জুনেরও কানে গেছে৷ খানিকক্ষণ একমনে কান পেতে শুনে বুবাইয়ের হাত ধরে ফিসফিস করে বলে, ইলিশের ঝালা যেতিছে খোকা-ইলিশ-৷
সুন্দরবনের জেলেরা মাছের ঝাঁককে যে বলে ঝালা তা অর্জুনদার কাছ থেকেই জেনেছে বুবাই৷ কিন্তু এভাবে ঝাঁক বেঁধে বেঁধে যায় ইলিশ নদী দিয়ে? নদীর জল তখন এরকম করে ফোটে?
বুবাই বলে, তবে অর্জুনদা, তুমি বলেছিলে নদীতে আর মাছ নেই-
অর্জুন বলে, জন্তুজানোয়াররা সব ভুলি যায় খোকা, কিছু মনে রাখতি পারে না৷ কুকুরকে মারলি কুকুর আবার ঘরে এসি ওঠে৷ মানুষের নিষ্ঠুর ব্যবহারের কথা তারা মনে রাখে না৷ তাই মাছেরা ফের দল বেঁধি যাইঠে নদীতে ডিম ছাড়তি৷
ফনার মতো পাকানো মাথার চুলে কেমন অদ্ভুত লাগছে অর্জুনদাকে দেখতে৷ খইয়ের মতো ফুটতে থাকা সেই জলের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ একটা অদ্ভুত কাণ্ড করে বসে অর্জুন৷ আপ্রাণ চেঁচিয়ে ওঠে, যা যা তোরা ফিরে যা সমুদ্রে-যা-
ঝপাং করে একটা শব্দ জলে৷ আবার শীতলপাটির মতো নিস্তরঙ্গ জল৷ সব মাছ বোধ হয় ভয় পেয়েই জলের অতলে ডুব মেরেছে৷ অর্জুনের কথা ওরা বুঝতে পেরেছে নাকি?
নন্দলালবাবু হঠাৎ কেবিন থেকে বেরিয়ে এসে বলে-আর নয় বুবাই, এবার ভিতরে যাও৷
বুবাইয়ের একদম ভালো লাগছিল না এখন কেবিনের খোলে গিয়ে ঢুকতে৷ বাইরে যেন জ্যোৎস্নায় ফুলপরির স্বর্গরাজ্য৷ সারারাত সে জ্যোৎস্নায় এরকম বাইরে বসে থাকতে পারে৷ কথাটা নন্দলালবাবুকে বলতে তিনি বললেন, হ্যাঁ, বাঘের পেটে চলে গেলে আর এই জ্যোৎস্না দেখার সুযোগ পাওয়া যাবে না৷ সুন্দরবনের বাঘ নৌকো থেকে এমন নিঃশব্দে মানুষ নিয়ে যায় যে পাশের লোক অবধি তা টের পায় না৷ এমন অনেক ঘটনার কথা শোনা যায়৷ সুতরাং আর কোনো কথা নয়-
অগত্যা বুবাই উঠে নন্দলালবাবুর সঙ্গে কেবিনে ঢুকতে যাবে-হঠাৎ সামনে চোখ পড়তেই চক্ষুস্থির৷ ওরকম অদ্ভুত সুন্দর দৃশ্য জীবনে কখনো দেখেনি বুবাই৷ লম্বা কালো গাছের ছায়া পড়ে পুরোনো কাতলা মাছের চোখের মতো গহন নদীর কালোজল- সেই কালো জলে আলোর অজস্র পুঁতিতে গাঁথা একটি মালা যেন কেউ বিছিয়ে রেখেছে৷ গত বছর হরিদ্বারে গিয়ে সেখানে দেখেছিল গঙ্গায় এরকম সারি সারি প্রদীপ ভেসে যাচ্ছে৷ এখানে এই বাঘ-কুমিরের রাজত্বে কে আসবে প্রদীপ ভাসাতে?
নন্দলালবাবু বুবাইকে অবাক হতে দেখে বলেন, ওই আলোর নীচে পাতা আছে ইলিশ মাছ ধরার ছাঁদি জল৷ পাছে অন্ধকারে কোনো নৌকো জালের ওপর এসে পড়ে তাই কাঠের পিপের উপরে এরকম কেরোসিনের কুপি জ্বালিয়ে রেখেছে জেলেরা৷ ওখানে যে জাল পাতা আছে তারই চিহ্ন৷
বুবাই বুঁদ হয়ে তাকিয়ে থাকে আলোর মালার দিকে৷ মনে হয় ওগুলো শুধু আলো নয়-অকূল অন্ধকারে সুন্দরবনের গরিব জেলেদের ভীরু আশা-আকাঙ্খার প্রতীক৷
সুন্দরবন ভয়ানক নিষ্ঠুর, কিন্তু সুন্দরবন আশ্চর্য সুন্দর৷
কাঠের বাড়ি
সকাল বেলা বুবাইয়ের ঘুম ভেঙে গেল ভারি সুন্দর মিষ্টি একটা গন্ধে৷ বুবাই বুঝতে পারে এ হল খলসি ফুলের গন্ধ৷ সুন্দরবনের গাছে গাছে এখন ফুল এসে গেছে৷ বুবাইয়ের চোখের সামনে টিয়ে পাখির পালকের মতো ঝকঝকে সবুজ একটা পৃথিবী৷ চারদিকে আর কিছু চোখে পড়ে না৷ শুধু হাজার রকমের গাছ গাছ আর গাছ৷ নৌকোটা নদীর কিনারে একটা কাঠের সিঁড়ির কাছে এসে নোঙর করল৷ সিঁড়িটা জল থেকে অনেকটা উঠে জঙ্গলের ভিতরে চলে গেছে৷ সিঁড়ির শেষ মাথায় একটা সবুজ রঙের কাঠের বাড়ি৷ মাটি থেকে অনেকটা উপরে মোটা মোটা কাঠের খুঁটির উপর দাঁড়িয়ে আছে৷ পাপুয়া কিংবা নিউগিনির আদিম উপজাতিরা যেমনি উঁচু গাছের মাথায় ঘর বেঁধে থাকে, ভূগোল বইয়ে ছবি দেখেছে বুবাই, তেমনি লাগছিল কাঠের বাংলোটাকে৷ এটাই তাহলে নন্দলালবাবুর অফিস ও বাংলো তার চারপাশে তাদের তাহলে ধঞ্চির জঙ্গল? যেন সবুজের ঢেউ খেলানো সমুদ্র৷ আবার জঙ্গলের মাথা পেরিয়ে ওদিকে যতদূর চোখ চলে নীল জলের সমুদ্র৷ তার মধ্যে কাচপোকার টিপের মতো ছোট্ট একটু সবুজ দ্বীপ৷ ভাবতেই পারছে না বুবাই এরকম অবিশ্বাস্য সুন্দর একটা জায়গায় কখনো থাকার সৌভাগ্য হবে তার৷ ওদের সাড়া পেয়ে জঙ্গলের মাথা থেকে একটা বাদামি রঙের অতিকায় পাখি ডানা মেলে আকাশে উড়ে গেল কর্কশ কন্ঠে ডাকতে ডাকতে৷ এতবড়ো পাখি আগে কখনো দেখোনি বুবাই৷ ছবির বইয়ে দেখা প্রাগৈতিহাসিক টেরাডেকটাইলের মতোই বিশাল তার আকার৷ নন্দলালবাবু বলেন, দেখো বুবাই, একে বলে শামখোল পাখি৷ এই শীতে নানারকমের যাযাবর পাখি আসে সুন্দরবনে৷ গাছের মাথা ভরতি হয়ে যায় পাখিতে৷ আরও কতরকমের পাখি দেখবে এখানে৷ কিন্তু মানুষের নিষ্ঠুরতার জন্য এরা আস্তে আস্তে সব নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে৷
হঠাৎ নীচে তাকাতেই বুবাইয়ের চোখে পড়ল, বাংলোর একটা খুঁটির গোড়ায় নরম মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে অত্যন্ত গম্ভীর সন্দিগ্ধ চোখে একমনে কী দেখছে অর্জুন৷
মাটির দিকে মুখ রেখেই অর্জুন বলল, এঠি কাল রাতে তিনি এসেছিলেন বাবু৷
নন্দলালবাবু এতক্ষণ একনজরে দেখছিলেন অর্জুনকে৷ এবার হেসে বলেনঃ ও৷ তুমি এতক্ষণ তাই দেখেছিলে অর্জুন? তা এখানে তিনি আসবেন না তো কি তেনার মাসি বেড়াল আসবে?
নন্দলালবাবুর ঠাট্টার উত্তরে অর্জুন আলাদা একরকমভাবে তাকিয়ে আস্তে বলল, বাঘটা বুড়ো বাবু৷ নখগুলো সব ক্ষয়ি গিইঠে৷
বুবাই স্পষ্ট দেখল কথাটা শোনামাত্রই নন্দলালবাবুর মুখের হাসি কেমন যেন হঠাৎ মিলিয়ে গেল৷
-তুমি ঠিক বলছ অর্জুন? বলেই সিঁড়ি বেয়ে দ্রুত নীচে নেমে গেলেন৷ তারপর পায়ের ছাপ পরীক্ষা করে থমথমে গলায় বললেন, রোজ রাতে ইনিই তাহলে আসেন এখানে?
বুবাই বাবার এই হঠাৎ গম্ভীর হয়ে যাওয়ার কারণ কিছুই অনুমান না করতে পেরে বলে, বাঘটা বুড়ো তাতে কী হয়েছে বাবা?
নন্দলালবাবু একবার দেখে নিলেন সুরমা তার কথা শুনছে কি না তারপর বললেন, বুড়ো বাঘরাই সাধারণত মানুষখেকো হয় বুবাই৷ বুড়ো হয়ে গেলে তাদের হরিণ, শুয়োর, বানর, শিকার করার শক্তি থাকে না৷ মানুষের নখ দাঁত থাবা নেই তাই মানুষই সবচেয়ে সহজ শিকার, তাই তারা তখন মানুষ শিকার করার সুযোগ খোঁজে৷
অর্জুনের দিকে তাকিয়ে বলেন নন্দলালবাবু, আমাদের এবার তাহলে একটু সাবধানে থাকতে হবে, কী বল অর্জুন৷
অর্জুন মৃদুস্বরে বলল, আমি যতক্ষণ আছি বাবু, আপনাদের কোনো ভয় নেই৷
অর্জুনের এ কথায় নন্দলালবাবু খানিকক্ষণ অর্জুনের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন এবং বুবাই নিতান্ত বাচ্চা হলেও দেখতে পেল বাবার ঠোঁটের কোণে মৃদু কৌতুক এবং অনুকম্পার হাসি ঝিলিক দিয়ে উঠেই মিলিয়ে গেল৷
বুবাই নিশ্চিন্ত হল যে বাবার এই হাসির অর্থ অর্জুনদা অন্তত বুঝতে পারেনি৷
বিকেল বেলা আকাশ-নদী-জঙ্গল জুড়ে কী অপূর্ব সৌন্দর্য৷ অস্তোন্মুখ সূর্যের আলোর ছটা লেগে বড়ো গাঙের মুখ আগুনের শিখার মতো ঝলমল করছে৷ নীল শান্ত আকাশে কুন্দফুলের মালার মতো সাদা বক উড়ে যাচ্ছে৷ কোথাও আর একটু কাদা দেখা যাচ্ছে না৷ টলটলে জোয়ারের জল পাড় ছাপিয়ে উঠে বড়ো বড়ো গাছের গায়ে ছলাৎ ছলাৎ শব্দে বাড়ি খাচ্ছে৷ কাঠের সিঁড়ির উপর জলের কিনারে বসে ছিল বুবাই আর অর্জুন৷ বুবাইয়ের একটু ভয় ভয় করছিল৷ বুড়ো বাঘটার ছবি যেন কল্পনায় দেখতে পাচ্ছিল সে৷ ওরা বসে আছে নদীর দিকে মুখ করে৷ জঙ্গলের দিক থেকে যদি সেই ধূর্ত জানোয়ার নিঃশব্দে তাদের পিঠের উপর-৷ ভাবতেই শিরদাঁড়া বেয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল বুবাইয়ের৷ তড়াক করে পিছন ফিরে দাঁড়াল সে৷ ওর ভয় দেখে অর্জুন মৃদু হেসে তার পিঠে হাত রেখে বলে, ভয় নেই খোকা, আমি তো আছি৷
বুবাই অর্জুনের গা ঘেঁষে বসে৷ অর্জুন যেন এই জঙ্গলের একচ্ছত্র সম্রাট৷ সে কাছে থাকলে আর ভয় কীসের? আশাবারিটা হাঁটুর উপর রেখে অর্জুন দূরের সবুজ দ্বীপটার দিকে তাকিয়ে ছিল৷ বুবাই আড়চোখে তাকে দেখে নিয়ে জিজ্ঞেস করল, অর্জুনদা, এই জঙ্গলে তুমি আগে কখনো এসেছ?
অর্জুন হাসে৷ তারপর বলে, আমি এই জঙ্গলের প্রতিটি গাছ চিনি৷ প্রত্যেক 'সয়াল' আমার চেনা খোকা৷ কতবার আমি বাউলিয়াদের সঙ্গে এ-জঙ্গলে কাঠ কাটতি মধু ভাঙতি আয়িঠি৷
আরও একটা কী কথা জিজ্ঞাসা করতে যাবে বুবাই, হঠাৎ সেই মুহূর্তে জঙ্গলের সেই অলৌকিক নিস্তব্ধতা খানখান হয়ে গেল একটা পাখির তীক্ষ্ণ কর্কশ চিৎকারে৷ ট্যাঁ-ট্যাঁ-ট্যাঁয়া-ট্যাঁ-ট্যাঁ-ট্যাঁ-ঘুরে ঘুরে গলা ফাটিয়ে পাখিটা ডাকছে৷ আকাশে গোঁত্তা খেয়ে উঠে আবার সাঁ করে ডুবে যাচ্ছে জঙ্গলের মধ্যে৷ অদ্ভুত অস্থির মতিচ্ছন্ন পাখি তো৷ অর্জুন হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়েই বুবাইয়ের কাঁধে হাত রেখে চাপা গলায় বলল, চলো খোকা বাংলোয় চলে যাই-অন্ধকার হয়ে গেছে৷
কেমন যেন একটা তাড়া অর্জুনের গলায়৷ কাঠের সিঁড়ি বেয়ে বাংলোর দিকে যেতে যেতে মনে হল অর্জুনদা যেন তাকে প্রায় হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে যাচ্ছে৷ ব্যাপার কী?
সিঁড়ি বেয়ে বাংলোর বারান্দায় উঠল যখন পাখিটা তখনও সমানে ডেকেই চলেছে৷ বুবাই জিজ্ঞেস করে, কী ব্যাপার, অর্জুনদা? এরকম হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে এলে কেন আমাকে!
-ও কিছু নয় খোকা এমনি৷ সন্ধ্যে হয়ে আসছিল তো৷ তেমনি হালকাভাবেই বলে অর্জুন কিন্তু বুবাইয়ের স্পষ্ট মনে হয় অর্জুনদা কিছু একটা গুরুত্বপূর্ণ জিনিস যেন গোপন করতে চাইছে তার কাছে৷ কিন্তু কী সেটা?
কাঠের বাড়িতে ইতিমধ্যে এক সপ্তাহ কেটে গেছে তাদের৷ বেশ কাটছে দিনগুলি৷ নিশ্চিন্ত নির্বিকার৷ কোনো ভাবনা নেই চিন্তা নেই৷ বিশেষ করে বুবাইয়ের তো মনে হচ্ছে স্বর্গে গিয়ে আস্তানা গড়লেও বুঝি সে এর চেয়ে বেশি সুখে থাকত না৷ পড়াশুনো নেই, লসাগু গসাগুর অঙ্ক কষা নেই, সারাদিন খালি অর্জুনদার সঙ্গে গল্প করো৷ মাঝে মাঝে নদী থেকে ধরা টাটকা পারসে ভাঙন ভেটকি মাছ গরম গরম ভাজা খাও, জানালা খুলে সামনে আদিগন্ত নদী আর আকাশ দেখো, আবার রাত হলে কাঠের মিষ্টি গন্ধে ভরা ঘরে ঘেঁষেঘেঁষি বসে বাবার কাছে দেশ-বিদেশের গল্প শোনো৷ গভীর রাতে বাবার গায়ের সঙ্গে লেপটে গিয়ে শোনো দূরের জঙ্গল থেকে ভেসে আসা কাকুর হরিণের তীক্ষ্ণ টানা ডাক৷ কী অদ্ভুত রোমাঞ্চকর সুস্বাদু জীবন৷
নন্দলালবাবুকে দিনের সারাটা সময়ই প্রায় অফিসের কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়৷ নতুন বদলি হয়ে এসেছেন তিনি এ জঙ্গলে৷ অনেক কাজ বুঝে নিতে হচ্ছে৷ সুতরাং বলতে গেলে অর্জুনই সুবিধে-অসুবিধে সব কিছু দেখাশোনা করে বুবাই আর সুরমার৷ ধঞ্চি দ্বীপটা পুরোপুরিই রিজার্ভড ফরেস্ট৷ লোকবসতি নেই কোনো৷ নদীর ওপারে উত্তর-পশ্চিম কোণে এক টুকরো মরকত মণির মতো গাছপালায় ঘেরা যে দ্বীপটা চোখে পড়ে সেটাই আশেপাশের একমাত্র লোকবসতি-নারায়ণতলা৷ একটা ছোটো টিনের ডোঙা বেয়েই রোজ নদী পেরিয়ে ওপারে নারায়ণতলা যায় অর্জুন-ডিম কিংবা শাকসবজি কিনে নিয়ে আসে সেখান থেকে৷
দেখতে দেখতে আরও এক সপ্তাহ কেটে গেল৷ বুবাইয়ের মনটা খুব খারাপ হয়ে থাকে৷ বিশেষ করে বিকেল বেলাটা-সূর্য যখন ডুবে যেতে থাকে বড়ো গাঙের মুখে-গাছের লম্বা ছায়া পড়ে থমথম করে খালের শান্ত কালো জল৷ তখনই তার মনে পড়ে যায় আরও একটা দিন শেষ হল-সুন্দরবনে থাকার মেয়াদ কমল আরও একটা দিন৷ এরপরই ইশকুল খুলে যাবে ওর৷ হায় ভগবান, এই আকাশ, নদী, জঙ্গল ছেড়ে আবার ঢুকতে হবে তাকে জেলখানার মতো ইশকুলের চার দেওয়ালের মধ্যে? ভাবতেই কান্না পেয়ে যায় ওর৷ কী করে যাবে ও এ-জায়গা ছেড়ে? তখনও কি ও জানত যে, কুড়ি দিনের মাথায় এমন একটা কাণ্ড ঘটবে যে সবকিছু ওলটপালট হয়ে যাবে তার৷ বুবাই এ-দিনটার কথা সারা জীবনে কখনো ভুলবে না৷
কার্তিক মাস৷ কিন্তু দু-দিন ধরেই আকাশে ছাড়া ছাড়া কালো মেঘ, সেই সঙ্গে ঠান্ডা ঝোড়ো হাওয়া আর টিপটিপ করে বৃষ্টি৷ গেঁয়ো গরান পশরের জঙ্গলে অবুঝ দৈত্যশিশুর মতো বাতাস যেন একঘেয়ে কান্না কেঁদে যাচ্ছে৷ দু-একটা ছাড়া নদীতে কোনো নৌকোও বেরোয়নি সেদিন৷ গাঙের জল উথালপাথাল৷ সূর্য ডুবে যেতে-না-যেতেই সুরমা খাওয়া-দাওয়ার পাট চুকিয়ে দিলেন তারপর সবাই মিলে ঘরে আরাম করে বসে শুরু হল গল্প৷ বাইরে ঝোড়ো বাতাস; মাঝে মাঝে বন্ধ জানালার পাল্লার উপরে ধাক্কা দিচ্ছে৷ রাতের দিকে বৃষ্টি আরও ঝেঁপে এল৷ লন্ঠনের আলোয় শুধু ওরা কয়েকজন মুখোমুখি বসে৷ বেশ গা-ছমছম করা এক ধরনের মজা লাগছে বুবাইয়ের৷ বাইরে এক তুমুল ঝড়বৃষ্টি কিন্তু ভিতরে কী নিরাপদ ওরা৷ কী চমৎকার আরাম আর গরম ঘরের ভিতরে৷ বুবাই একেবারে বসেছে সুরমার গা ঘেঁষে৷ অর্জুন বসে ছিল দরজার কাছটায়৷ এখানে টিভি নেই, হিটার নেই, পাখা নেই, সুতরাং অর্জুন অনেকটা নিশ্চিন্ত৷ আশাবারিটা কোলের উপর রেখে দেওয়ালে ঠেস দিয়ে বসে সে সুরমা আর নন্দলালবাবুর কথা মন দিয়ে শুনছিল৷
হঠাৎ একসময়ে লন্ঠনের মৃদু আলোয় অর্জুনদার দিকে তাকিয়েই বুবাইয়ের মনে হল অর্জুনদা কেমন যেন একটা অস্বাভাবিক আচরণ করছে৷ ও কেমন একটা অদ্ভুত ভঙ্গি করছে যেটা ঠিক যেন মানুষের নয়৷ কেমন একটা উশখুশ ভাব৷ যেন ঘরের মধ্যে বসে থাকতে চাইছে না৷ বুবাইয়ের গায়ের মধ্যে হঠাৎ কেমন ছমছম করে উঠল৷ সুরমার গায়ে আরও নিবিড় হয়ে ঘেঁষে সুরমা আর নন্দলালবাবুর মুখের দিকে তাকাল৷ তারাও অর্জুনদার দিকে তাকিয়ে আছে কিন্তু কিছু বলছে না তো? তাহলে কি তারই চোখের ভুল! কিন্তু লন্ঠনের আলোয় পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে বুবাই অর্জুনের নাকের পাটাটা কাঁপছে৷ অদ্ভুত দ্রুত কাঁপছে৷ কোনো মানুষের পক্ষে যেরকম কাঁপাটা খুবই অস্বাভাবিক৷ তারপরই যে-দৃশ্য দেখল বুবাই তাতে নিজের চোখকেই যেন সে বিশ্বাস করতে পারছিল না৷ দরজার দিকে ফেরানো যে-কানটা অর্জুনের সেটা আলাদাভাবে অবিকল কুকুরের কানের মতো নড়ছে৷ কোনো মানুষের পক্ষে কখনো সম্ভব ওরকম কুকুরের মতো কান নাড়ানো?
বুবাই ভয়ে প্রায় সুরমার কোলের উপর উঠে বসে কানের কাছে মুখ এনে অর্জুনের এই অদ্ভুত ব্যবহারের কথা বলতে যাবে, তার আগেই অর্জুন একটা অদ্ভুত কাণ্ড করে বসল৷ বিদ্যুৎবেগে দাঁড়িয়ে উঠেই দরজার একটা পাল্লা খুলে সেই তুমুল ঝড়বৃষ্টির মধ্যে বাইরে বেরিয়ে পড়ল আচমকা৷ ঠান্ডা ঝোড়ো হাওয়া যেন একপাল নেকড়ের মতো মুহূর্তে ঝাঁপিয়ে পড়ল ঘরের ভিতর৷
নন্দলালবাবু হঠাৎ এত স্তম্ভিত হয়ে গেছেন অর্জুনের এই কাণ্ডটায় যে অর্জুনকে ডাকতেও তিনি ভুলে গেলেন৷ খোলা জানালা দিয়ে ঠান্ডা হাওয়া আর জল ঘরে ঢুকছে তাও যেন খেয়াল নেই৷

সুরমাও ভয় পেয়ে নন্দলালবাবুর দিকে তাকায়৷
-কী ব্যাপার গো? অর্জুন কেন করছে একরম? নন্দলালবাবু কী একটা উত্তর দিতে যাবেন তার আগেই আবার অর্জুন দ্রুত ঘরে ঢুকেই দড়াম করে দরজাটা বন্ধ করে দিল৷
এতই রহস্যময় অর্জুনের ব্যবহার যে ভীষণ অবাক হয়ে নন্দলালবাবুকে খানিকক্ষণ চুপ করে থাকতে হয় তারপর আস্তে আস্তে জিজ্ঞাসা করেন, কী ব্যাপার বলো তো অর্জুন? বাইরে গিয়েছিলে কেন?
সেই ভীষণ অস্থির ভাবটা তখনও কাটেনি অর্জুনের৷ নন্দলালবাবুর দিকে তাকিয়ে মৃদু গলায় বলে, কিছু না বাবু, এমনি৷ দেখতি গিয়েছিলাম আকাশে কীরকম মেঘ আছে৷ বৃষ্টি কতক্ষণ হবে আর৷
অর্জুনদা যে মোটেই সত্যি কথা বলছে না সেটা বুবাইও তার ক্ষুদ্র বুদ্ধিতে বুঝতে পারল৷ আবার একটা কিছু গোপন করতে চাইছে অর্জুনদা কিন্তু সেটা কী? কানটা ওর কুকুরের মতো নড়ছিলই বা কেন?
বাতাসটা রাতের দিকে আরও বাড়ল৷ অর্জুন পাশের ঘরে গিয়ে শুয়েছে৷ এঘরে বুবাই নন্দলালবাবুর গায়ের সঙ্গে লেপটে ঝড়ের শব্দ শুনছে৷ একফোঁটা ঘুম আসছে না তার চোখে৷ সব কিছুই তার অত্যন্ত রহস্যময় লাগছে৷ এই হাওয়ার সু-ই-ই-ই সু-ই-ই-ই কান্না, গাছপালার একটানা গোঙানি, তার সঙ্গে অর্জুনদার এই অদ্ভুত ব্যবহার-যেন অর্জুনদা তাদের চেনাশোনা কেউ নয়-সম্পূর্ণ অন্য একজন মানুষ৷
হঠাৎ বুবাইয়ের বুক কেঁপে উঠল অদ্ভুত গম্ভীর একটা আওয়াজে৷ ঝড়ের শব্দ গাছপালার শব্দ ছাপিয়ে অন্য আর একটা শব্দ যেন বন্ধ দরজা জানালা ভেদ করে ঢুকে পড়তে চাইছে ঘরে৷ শব্দটা কীসের বুঝতে পারছিল না বুবাই কিন্তু এটা আন্দাজ করতে পারছিল শব্দটা হাওয়া জল গাছপালার মতো কোনো অচেতন পদার্থের নয়৷ এর ভিতরে যেন একটা ভয়ানক কোনো জিঘাংসা আছে, ক্ষুধা আছে৷ প্রচণ্ড আক্রোশে যেন সে সব গ্রাস করতে চায়৷ ভয়ে কাঠ হয়ে শুয়ে থাকে বুবাই৷ হঠাৎ মনে হয় শব্দটা একেবারে পিঠের নীচের কাঠের মেঝে ফুঁড়েই উঠে আসছে৷
এতক্ষণে বোধ হয় শব্দটা কানে যায় নন্দলালবাবুরও৷ তড়াক করে লাফিয়ে উঠে বসেন বিছানার উপর৷
-নাঃ৷ সারারাত জ্বালাবে দেখছি৷ বিড়বিড় করে বলেন নন্দলালবাবু৷
কোনোরকমে গলা দিয়ে ক্ষীণ আওয়াজ বেরোয় বুবাইয়ের, ওটা কীসের শব্দ বাবা?
-সেই বুড়ো বাঘটা মনে হচ্ছে৷ শিকার খুঁজছে৷ কেমন নিশ্চিন্ত গলায় বললেন নন্দলালবাবু৷
-বাঘ! সিঁড়ির নীচেই বাঘ বাবা!
নন্দলালবাবুকে ভয়ে জড়িয়ে ধরে বুবাই৷
-না বুবাই৷ মনে হচ্ছে সিঁড়ির নীচে কিন্তু আসলে অনেক দূরে৷ ওরা মাটিতে মুখ রেখে ডাকে বলেই এরকম মনে হয়৷ ঘুমোও৷ ভয় নেই৷
কিন্তু নন্দলালবাবু তার কথা শেষ না করতে করতেই যে আওয়াজটা হল তাতে মনে হল যেন জানলা দরজার পাল্লাই ঠক ঠক করে কেঁপে উঠল৷ সঙ্গেসঙ্গেই দরজায় ধাক্কা৷ যেন কেউ ঠেলছে দরজাটা৷ বাঘ! উপরে উঠে এসেছে! নন্দলালবাবুর দুই চোখ বিস্ফারিত হয়ে উঠেছে৷ ছুটে দেওয়াল থেকে বন্দুকটা পেড়ে নিয়েই তিনি দরজা তাগ করে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন৷ আবার দরজায় ধাক্কা-সঙ্গে সঙ্গে অর্জুনের ব্যস্ত কন্ঠস্বর-
-বাবু, বাবু, আপনাদের কোনো ভয় নেই৷ আমি আছি৷ আমি অর্জুন৷
-অর্জুন! তুমিই তাহলে দরজায় ধাক্কা দিচ্ছিলে এতক্ষণ! কী? হয়েছে কী?
নন্দলালবাবুর গলায় যেন রাগ ফেটে পড়তে চায় অর্জুনের এইসব অদ্ভুত কাণ্ডকারখানায়৷ উঠে দরজা খুলে দিতেই অর্জুন ঘরের ভিতর ঢুকে পড়ে৷
-মা, আপনারা ভয় পাবেননি৷ আমি আছি৷ আমি ঘুমুইনি বাবু৷ আমি জানতাম মা বনবিবির বাহন আসবেন আজ রাতে৷ আপনারা ভয় পাবেন বলে বলিনি৷ বিকেল বেলাতেই তিনি একবার এখান থেকতি ঘুইরে গেছেন শিকারের খোঁজে৷ আমি তেনার গায়ের গ্যাস (গন্ধ) পেয়েই তখন বাইরে বেইরেছিলাম বাবু৷
বুবাই হতবাক৷ এজন্যই তাহলে তখন নাকের পাটা কাঁপছিল অর্জুনদার৷ অর্জুন নন্দলালবাবুর দিকে তাকিয়ে বলে-আপনি শুয়ি পড়েন গিয়ে বাবু৷ আমি আছি, কোনো ভয় নাই আপনাদের৷
বাবার মুখে আবার সেদিনকার সেই হাসিটা দেখতে পেল বুবাই৷ সেই চাপা কৌতুকের হাসি-ঈষৎ তাচ্ছিল্য আর অনুকম্পা মেশানো৷
বন্দুকটা হাতে নিয়ে নন্দলালবাবু বললেন, তুমি গিয়ে শোও অর্জুন, আমার কথা তোমাকে ভাবতে হবে না৷ দেখছ তো আমার হাতে এটা কী৷
এবার নন্দলালবাবুর দিকে সোজাসুজি তাকাল অর্জুন৷ অদ্ভুত সে চোখের দৃষ্টি৷ তার অর্থ যেন ঠিক বুঝতে পারে না বুবাই৷
বিছানায় শুয়ে তারপর অনেকক্ষণ ধরে বুবাই সেই দৃশ্যটার কথা ভাবছিল৷
বাবা-ডোরাকাটা স্লিপিং গাউন পরা, পরিষ্কার দাড়ি-গোঁফ কামানো, ছিমছাম চেহারা, হাতে বন্দুক-কলকাতার সভ্য মানুষ৷ আর অর্জুন-সাপের ফনার মতো ঝাঁকড়া চুল, গাল-ভরতি খোঁচা খোঁচা দাড়ি, হাঁটু অবধি তোলা খাটো ধুতি, হাতে বন্দুকের বদলে পলাকাটা বেলকাঠের লাঠি-সুন্দরবনের অসভ্য বহরদার৷ দু-জনে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে৷ দু-জনেই দু-জনকে যেন চোখের দৃষ্টি বুলিয়ে তন্নতন্ন পড়ে নিতে চাইছে৷
দৃশ্যটা বহুদিন মনে ছিল বুবাইয়ের৷
পরদিন সমস্ত সকাল বাতাস চলল৷ দুপুর বেলা বাতাসটা একটু পড়ে এল বটে৷ কিন্তু নদী তখনও ভীষণ অস্থির উত্তাল৷ সুরমা চায়ের কেটলি উনুনে চাপিয়ে বললেন, বাড়িতে তরকারি কিছু নেই অর্জুন, কিন্তু আজ আর তোমাকে নারায়ণতলা যেতে হবে না৷ ডিম আলু পেঁয়াজ আছে৷ রাতে খিচুড়ি চাপিয়ে দেব৷ সঙ্গে ডিমভাজা ব্যস৷
বুবাই হঠাৎ বায়না ধরল, রাতে আজ কাঁকড়া খাব মা৷ (ইস কী ঘটতে যাচ্ছে তখন যদি ঘুণাক্ষরেও তা আঁচ করতে পারত বুবাই!) কতদিন কাঁকড়া খাই না৷
সুরমা ধমকে উঠলেন, রোজ রোজ কাঁকড়া কী? এই তো তিন দিন আগেই খেলে কাঁকড়া৷ কে ঝড়বৃষ্টি মাথায় করে এখন আনতে যাবে কাঁকড়া?
দুপুরের খাওয়া সেরে অর্জুন দরজার কাছে উবু হয়ে বসে হেঁতাল পাতা দিয়ে একটা 'কুস্তে' (ঝাঁটা) বানাচ্ছিল৷ উঠে দাঁড়িয়ে বলল, আহা মা, খোকার শখ হয়িঠে রাতে কাঁকড়া খাওয়ার, আমি ধইরে নিয়ি আসিঠি৷ এরকম কাঁকড়া তো আর কউঠি পাওয়া যাবেনি৷
একটা মাটির হাঁড়ি আর একটা বাঁকানো লোহার শিক নিয়ে বেরিয়ে যায় অর্জুন, নদীর পারের গর্ত থেকে গোদা ঠ্যাংওয়ালা কাঁকড়া ধরতে৷
বুবাইয়ের মন কৃতজ্ঞতায় ভরে যায়৷ অর্জুনকে সত্যি কী ভালোই যে বাসে সে৷ বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখে জঙ্গলের ভিতরের সরু 'সয়াল' ধরে চলে যাচ্ছে অর্জুনদা৷ গরানের ঝোপের আড়ালে মিলিয়ে গেল একসময়ে৷ বেলা বেশ খানিকটা পড়ে গেছে তখন৷
আধঘণ্টা হয়ে গেছে অর্জুনদা গেছে৷ বুবাই বারান্দায় বসে হেঁতালের ফল খাচ্ছিল-বেশ সুপারির মতো কষ কষ লাগে খেতে৷ হঠাৎ জঙ্গলের দিকে চোখ পড়তে দেখল সয়াল ধরে কে একজন পড়ি কি মরি করে ছুটতে ছুটতে আসছে৷ আরে, এ তো অর্জুনদাই৷ কীসের ভয়ে ছুটতে ছুটতে আসছে ওরকম!
অর্জুনকে ছুটতে দেখে নন্দলালবাবু বাইরে বেরিয়ে এসেছেন৷ সুরমাও৷ অর্জুন হাঁপাচ্ছিল৷ কথা বলতে পারছে না৷
-কী হয়েছে অর্জুন? উৎকন্ঠায় সুরমার গলা দিয়ে কথা বেরোতে চাইছে না৷
-বাবু, বড়ো খালের মুখে একটা সবুজ নৌকো বাঁধা৷
-সবুজ নৌকো? বুবাইয়ের মনে হল নন্দলালবাবুর চোখ যেন হঠাৎ বাঘের চোখের মতোই জ্বলে উঠল৷
-ঠিক দেখেছ তুমি অর্জুন? নন্দলালবাবু তীব্র গলায় জিজ্ঞেস করলেন৷
-হ্যাঁ বাবু, সবুজ নৌকো৷ নৌকার খোল গাছের গুঁড়িতে ভরতি৷
-সেই শয়তানের গ্যাং৷ বিড়বিড় করে নিজের মনে বললেন নন্দলালবাবু ৷ তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠেছে৷ অর্জুনের দিকে তাকিয়ে বললেন, গতবার আমাকে বোকা বানিয়েছিল ওরা৷ সে অপমান আমি ভুলিনি৷ এবার আর নয়৷ বাছাধনরা এবার টের পাবে কত ধানে কত চাল৷
দ্রুত হাতে হান্টিং শু-টা পরে নিয়েই নন্দলালবাবু দেওয়ালে ঝোলানো বন্দুকটা পেড়ে নিয়ে ঘাড়ে ফেললেন তারপর পা বাড়ালেন সিঁড়ির দিকে৷
সুরমা দু-হাতে সিঁড়ির মুখ আটকে ভয়ে পাংশু মুখে বলে, একা কোথায় যাচ্ছ তুমি?
নন্দলালবাবু দৃঢ় গলায় বললেন, একাই যেতে হবে সুরমা৷ বাস্তুঘুঘু ওরা৷ অনেকে মিলে গেলেই টের পেয়ে যাবে৷ নিঃশব্দে পিছন থেকে গিয়ে ধরে ফেলতে না পারলে এমন একটা সুযোগ হাতছাড়া হবে৷ চললাম৷ স্বয়ং ভগবানও এবার ওদের বাঁচাতে পারবে না আমার হাত থেকে৷
-আমি আপনার সঙ্গে যাই বাবু৷ অনুনয়ের গলায় বলে অর্জুন৷
-কিছু দরকার নেই৷ তুমি বরং আমি যতক্ষণ ফিরে না আসি ওদের দেখো৷ ফরেস্ট গার্ড রামতারণকে দেখতে পেলে বলে দিয়ো ওরা যেন তৈরি থাকে৷ দরকার হলে আজই বদমায়েসগুলোকে কাকদ্বীপ নিয়ে গিয়ে থানায় চালান করতে হবে৷
-কিন্তু বাবু, এ-জঙ্গল তো আপনার কাছে একেবারেই অজানা৷ একা যাওয়া ঠিক হবেনি আপনার৷ তা ছাড়া-
অুর্জনকে কথা শেষ করতে না দিয়েই জোরে ধমকে ওঠেন নন্দলালবাবু, আমি যা বলছি তা করো অর্জুন৷ কী ঠিক হবে কী হবে না তা আমার ব্যাপার আমিই বুঝে নেব৷ আমার হাতে যতক্ষণ এই লোহার নলটা আছে আমি শয়তানকেও ভয় করি না৷
কেউ আটকাতে পারল না নন্দলালবাবুকে৷ তাঁকে যেন ভরে পেয়েছে৷ সিঁড়ি বেয়ে দু-লাফে নীচে নেমে গেলেন তিনি৷ তারপর যে-পথ দিয়ে হরিণ আর শুয়োরেরা খাবারের খোঁজে কিংবা নোনামাটি চাটতে যাতায়াত করে জঙ্গলের মধ্যে, সেই 'সয়াল' ধরে হরিণের মতো ক্ষিপ্র ভঙ্গিতেই জঙ্গলের ভিতর অদৃশ্য হয়ে গেলেন তিনি৷ সুরমা ভয়ে প্রায় কেঁদে ফেলে বলেন, চিরকাল মানুষটা অমনি গোঁয়ার, জানো অর্জুন৷ কখনো কারও কথা শুনবে না৷ কী হবে বলো তো এখন ওর?
অর্জুন সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করে, আপনার কিছু ভয় নাই মা, আপনারা বারান্দায় গিয়ি বসুন আমি দেখি রামতারণকে পাই কি না-
তারপর সে কী এক প্রতীক্ষা৷ জীবনে এরকম অভিজ্ঞতা হবে সুরমা ভাবতেও পারেননি কখনো৷ এক-একটি মুহূর্ত মনে হচ্ছে যেন এক-একটি যুগ৷
খানিক বাদেই হাওয়াটা একেবারেই পড়ে গেল৷ আর হাওয়া পড়ে যাওয়ার সঙ্গেসঙ্গে সমস্ত জঙ্গলটা যেন একেবারে নিজঝুম৷ একটি পাখির ডাকও কোথাও নেই৷ একটা পাতা খসে পড়লেও তার শব্দ শোনা যাবে৷ মনে হয় কোনো এক ভীষণ অমঙ্গলের আশঙ্কায় সমস্ত জঙ্গলটা বোবা হয়ে আছে৷ দেওয়ালে টাঙানো ঘড়িটা টক টক শব্দ করে জানিয়ে দিচ্ছে সময় বয়ে চলেছে৷ বুবাই আর সহ্য করতে পারছিল না৷ গলা ছেড়ে কেঁদে উঠতে ইচ্ছে করছিল তার৷ যদি জঙ্গলের এই ভয়ংকর প্রাণহীন নিস্তব্ধতাটা অন্তত খানখান হয়ে ভেঙে যায় তাতে৷ কিন্তু কাঁদতে পারছিল না বুবাই৷ ঘড়ির কাঁটা ঠিকই চলছে কিন্তু সুরমা বুঝতে পারছিল না সময় কত এখন? সকাল, বিকেল না রাত্রি? রাত্রি না হলে এরকম মহাশ্মশানের মতো স্তব্ধ হয়ে যায় কী করে সবকিছু? গাছের মাথায় ও কি বিকেলের নরম লাল রোদ না কি জ্যোৎস্না? না, না, নির্ঘাত জ্যোৎস্নাই৷ অর্থাৎ রাত এখন৷ অর্থাৎ এসব কোনো কিছুই যেন সত্যি নয়৷ ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে একটা দুঃস্বপ্ন দেখছে তারা৷
ঘণ্টা খানেক কেটে গেল কিন্তু কোথায় নন্দলালবাবু? সুরমা পাথরের মূর্তির মতো বাইরে কাঠের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে৷ হঠাৎ সেই ভীষণ স্তব্ধতায় শব্দের ক্ষীণ আঁচড় কেটে অনেক দূরে একটা পাখি ডেকে উঠল-টি-ট্রির টি-ট্রির টি-ই-ই৷ শব্দটা ঠেলে আকাশের দিকে উঠছে আবার গভীর জঙ্গলের ভিতর ডুবে যাচ্ছে৷ সে পাখিটা-বুবাইয়ের মনে পড়ল-যে পাখির ডাক শুনে অর্জুনদা সেদিন অমনি ভয় পেয়ে তার হাত ধরে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে এসেছিল বাংলোয়৷ এখন কেন ডাকছে ওই পাখিটা?
কিছুক্ষণ আগে অর্জুন ফিরে এসেছে৷ নিজের অজান্তেই বুবাই একবার অর্জুনদার মুখের দিকে তাকাল৷ অর্জুনদা কিন্তু কান খাড়া করে পাখিটার ডাক শোনার পর থেকেই কীরকম অস্থির হয়ে উঠেছে৷ আশাবারি হাতে একবার বারান্দার এপাশে আর একবার বারান্দার ওপাশে পায়চারি করছে৷ এদিকে মেঘের আড়ালে সূর্য ডুবে যাচ্ছে৷ আর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নেমে আসবে কৃষ্ণপক্ষের ঘোর অন্ধকার৷ আকাশ জঙ্গল মাটি একাকার হয়ে যাবে সব৷ আর পারে না বুবাই৷ অর্জুনের হাত ধরে হঠাৎ প্রায় ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে, অর্জুনদা বাবার কী হয়েছে? আসছে না কেন, বাবা?
অর্জুন নরম গলায় বলে, কেঁদোনি খোকা৷ ভয় নাই৷ আমি তো আছি৷ হয়তো তোমার বাবা-অর্জুনের মুখের কথা মুখেই থেকে যায় হঠাৎ জঙ্গলের একেবারে শেষ মাথা থেকে একটা অদ্ভুত আওয়াজ ভেসে এল-কু-উ-উ-উ-
চমকে ওঠে বুবাই৷ কীসের এরকম অদ্ভুত শব্দ! মানুষ, জন্তু না কোনো আজব পাখি?
শব্দটা শোনামাত্রই থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে অর্জুন৷ আর দিনের আলোয় এবার স্পষ্টই দেখতে পেল বুবাই সেদিনের মতো মৃদু কান নড়ছে অর্জুনদার৷ সমস্ত শরীর নিস্পন্দ পাথর৷ শুধু কানটাই নড়ছে৷
আবার হয় শব্দটা৷ আবার৷ কু-উ-উ-উ-উ-উ৷ মৃদু কিন্তু স্পষ্ট৷
ফিসফিস করে বলে বুবাই, ওটা কীসের শব্দ অর্জুনদা?
থমথমে গলায় বলে অর্জুন, আমি যা ভয় করেছিলাম তাই হয়িঠে খোকা৷ বাবু পথ হারিয়ে ফেলিঠে-
তৎক্ষণাৎ মনে পড়ল বুবাইয়ের অর্জুনদা ওকে বলেছিল বটে একদিন যে, সুন্দরবনের জঙ্গলে যারা কাঠ কাটতে বা মধু ভাঙতে আসে তারা কেউ কখনো কারুর নাম ধরে ডাকে না৷ সুন্দরবনের সব মানুষের অদ্ভুত বিশ্বাস যে, এই জঙ্গলে যারা মানুষখেকো বাঘের হাতে মারা পড়ে তারা বাঘাভূত হয়ে ঘুরে বেড়ায় জঙ্গলের আনাচে-কানাচে৷ সুন্দরবন এরকম অজস্র বাঘাভূতে ভরতি৷ নাম ধরে কাউকে এখানে ডাকলে সে যদি তাতে সাড়া দেয় তাহলে এই বাঘাভূতেরা তাদের ঘাড়ে চেপে বসে৷ সেজন্য সুন্দরবনে এরকম ডাকাই নিয়ম৷ সত্যই কি তাহলে বাবা ভীষণ বিপদে পড়ে অর্জুনদাকে ডাকছে এরকম?
অর্জুন ছুটে গিয়ে বারান্দার এক মাথায় দাঁড়াল তারপর দু-হাতের পাতা ঠোঁটের কাছে জড়ো করে তীব্র তীক্ষ্ণ একটা চিৎকার করল কু-উ-উ-উ-উ৷ খাল পেরিয়ে জঙ্গলের মাথার উপর দিয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে সেই শব্দটা যেন নৈঃশব্দ্যের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে গেল- কু-উ-উ-উ-উ৷ তারপর ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে মিলিয়ে গেল৷ অর্জুন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে৷ কয়েক মুহূর্ত পরেই জঙ্গলের ওমাথা থেকে প্রত্যুত্তর ভেসে এল কু-উ-উ-উ-উ৷ কু-উ-উ-উ-উ পর পর দু-বার৷ তারপর আবার সব চুপচাপ৷

অর্জুনের মুখ সাদা হয়ে গেছে৷ সুরমাকে বলল-ভয় নেই মা, আমি থাকতি বাবুর কেউ কোনো ক্ষতি করতি পারবেনি৷ আমি এক্ষুনি গিয়ি বাবুকে নিয়ি আসবু৷
তরতর করে সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে গেল অর্জুন, তারপর মুহূর্তে জঙ্গলের মধ্যে হারিয়ে গেল৷ হেঁতাল গরানের গভীর জঙ্গল থেকে আর একবার সেই শব্দ ভেসে এল কু-উ-উ-উ-উ৷
বুবাইয়ের কাছে সমস্ত পৃথিবী শূন্য...ধোঁয়া..ধোঁয়া৷ বাবা যদি না থাকে তাহলে...৷ উঃ আর ভাবতে পারে না সে৷ ছুটে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরে বুবাই৷ সুরমা পাথরের মূর্তির মতো স্থির৷ তার দুটো চোখ জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে রয়েছে কিন্তু সে চোখে যেন কোনো দৃষ্টি নেই৷
মেঘের আড়াল থেকে এক লহমা বেরিয়ে সূর্য জম্বুদ্বীপের পিছনে ডুবে যাচ্ছে৷ শেষ আলোর আভা তার আকাশে৷ ঝাউ গাছের ম্লান ছায়া লম্বা হয়ে খালের জলে পড়েছে৷ রাক্ষসখালির দিক থেকে এক ঝাঁক সাদা গাংচিল ট্যাঁ ট্যাঁ শব্দে ডাকতে ডাকতে উড়ে গেল পশ্চিমে...৷ দূরে নদীর দিক থেকে ভেসে এল একটা ভয় পাওয়া হরিণের তীক্ষ্ণ টানা চিৎকার৷
এক যুগ কি পার হয়ে যায়নি ইতিমধ্যে? আর ক-যুগ তাদের অপেক্ষা করতে হবে এরকম? দিনের শেষ আলোটুকুও মরে গেল জলের উপর৷ এবার তো চরাচর জুড়ে নেমে আসবে অন্ধকার৷
সুরমা বোধ হয় জ্ঞান হারাতে বসেছিলেন৷ সেইসময়ে চোখে পড়ল দূরে হেঁতালের জঙ্গলে কী নড়ছে৷ দু-টি মানুষের মূর্তি৷ একজন যে অর্জুন তাতে সন্দেহ নেই৷ কিন্তু তার কাঁধে ভর দিয়ে ও কি নন্দলালবাবুই! সমস্ত জামাকাপড় ছেঁড়াখোঁড়া৷ মুখ হাত-পা সব ছড়ে গিয়ে রক্ত বেরোচ্ছে৷ অর্জুন এক হাত দিয়ে বয়ে নিয়ে আসছে নন্দলালবাবুকে৷ আর এক হাতে তার আশাবারি৷
কাছে আসতেই সুরমা ছুটে বেরিয়ে গিয়ে ধরে নন্দলালবাবুকে৷ ডুকরে কেঁদে উঠে বলেন, এ কী হয়েছে গো তোমার?
বারান্দায় উঠে প্রলাপের রুগির মতো জোরে বলেন নন্দলালবাবু, আমি মরতে চলেছিলাম সুরমা৷ ওই অর্জুনই আমাকে বাঁচিয়েছে৷
অর্জুন হাতজোড় করে বলে, ওকথা বলবেননি বাবু৷ আপনিও তো একদিন প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন আমার৷
-সে তো দৈবাৎ অর্জুন৷ কিন্তু আজ কী ভয়ংকর বিপদ হতে পারত তোমার৷ শোনো সুরমা কী হয়েছিল৷
-ও কথা থাক এখন-নন্দলালবাবুর মুখে হাত দেন সুরমা৷
-না, না আমাকে বলতে দাও কী বিপদ থেকে অর্জুন বাঁচিয়েছে আমাকে৷
বিড়বিড় করে মাঝে মাঝে জল খেয়ে দম নিয়ে নন্দলালবাবু তারপর যে কাহিনি বলে যান তার মর্মার্থ মোটামুটি এরকম-
চোরাশিকারিদের 'গ্যাং'-টাকে পিছন থেকে ধরবেন বলে নন্দলালবাবু নদীর ধার ধরে না গিয়ে আড়াআড়িভাবে হাঁটতে শুরু করেছিলেন জঙ্গলের মধ্য দিয়েই৷ যতই এগোচ্ছিলেন ততই বুঝতে পারছিলেন জঙ্গল ক্রমশই অত্যন্ত নিবিড় ও দুর্ভেদ্য হয়ে উঠছে৷ গেঁয়ো গরান বাইনের জঙ্গল প্রায় চার মানুষ সমান উঁচু৷ সয়াল দিয়ে দ্রুত হাঁটছিলেন তিনি৷ এরকম অচেনা জঙ্গলে হাঁটার সময় ফরেস্ট ট্রেকিংয়ের সাধারণ যে নিয়ম অর্থাৎ গাছের গায়ে চিহ্ন রেখে রেখে এগিয়ে যাওয়া তা বেমালুম ভুলে গিয়েছেন নন্দলালবাবু উত্তেজনার মাথায়৷ মিনিট পনেরো হাঁটার পর তিনি হেঁতাল আর পশরের একটা দুর্ভেদ্য জঙ্গলে এসে পৌঁছোলেন৷ অথচ আড়াআড়িভাবে চললে তো এতক্ষণে তাঁর বড়ো নদীর সমান্তরাল একটা খালে পৌঁছে যাওয়ার কথা৷ তাহলে কি এতক্ষণ ভুল রাস্তায় এসেছেন তিনি? নন্দলালবাবু ঠিক করলেন ঢলের রাস্তাটা ধরবেন৷ তাতে অবশ্য চোরাশিকারিদের নজরে পড়ে যাওয়ার ভয় আছে কিন্তু ঢলের রাস্তা ধরা ছাড়া গত্যন্তর নেই৷ ঘন হেঁতালের জঙ্গল প্রতি পদক্ষেপে গতিরোধ করছে৷
বুবাই চুপ করে শুনছিল গল্প৷ ঢল কাকে বলে তা সে বাবার কাছে শুনেছে৷ সুন্দরবনের গভীর জঙ্গলের ভিতরে অনেকসময় অনেকটা জায়গা জুড়ে ঘন চুলের মাঝখানে টাকের মতো ফাঁকা জায়গা দেখা যায়৷ খাটো লাল লোনাশাক আর কেটকি ছাড়া এখানে আর কিছু জম্মায় না৷ হরিণ মাটির নুন চাটতে আসে এখানে৷ এই ফাঁকা জায়গাকে বলে ঢল৷ একটা মোটা গরান গাছের গায়ে বন্দুকের নল দিয়ে 'এন' অক্ষর লিখে যে পথে এসেছিলেন সে-পথ দিয়েই চললেন ঢলে পৌঁছোবেন বলে৷ কিন্তু হাঁটছেন তো হাঁটছেনই৷ পনেরো মিনিট হয়ে গেল-কোথায় ঢল? রীতিমতো তাজ্জব নন্দলালবাবু৷ কয়েক-শো বিঘার মতো ফাঁকা ঢল যেখানে তিনি ক-দিন আগেও এসেছিলেন গেল কোথায়? রাতারাতি গাছ গজিয়ে গেল নাকি সেখানে? তাও কি সম্ভব? কোনদিকে এবার তিনি এগোবেন ভাবতে ভাবতে চারদিকে তাকাতে গিয়েই নন্দলালবাবুর রক্ত হিম হয়ে গেল৷ যে গরান গাছটার গায়ে কিছুক্ষণ আগেই দাগ দিয়ে গিয়েছিলেন সেই গরান গাছটাই তার সামনে৷ অর্থাৎ এতক্ষণ ঘুরেফিরে তিনি সেই গরান গাছটার কাছেই আবার ফিরে এসেছেন৷ নন্দলালবাবু বইয়ে পড়েছেন ইংরেজিতে একে বলে 'ডেথ সার্কেল'-দিকচিহ্নহীন বিশাল মরুভূমিতে কিংবা গভীর জঙ্গলে এরকম হয়ে থাকে অভিযাত্রীদের৷ দিকভ্রষ্ট হয়ে একই জায়গায় ঘুরেফিরে তারা পাক খেতে থাকে৷ সেই মৃত্যুচক্রের খপ্পরেই পড়েছেন তিনি তাহলে?
এদিকে মেঘলা দিনের আলো দ্রুত নিভে আসছে৷ একবার অন্ধকার হয়ে এলে এই গভীর জঙ্গল থেকে বেরোবার আর কোনো উপায় থাকবে না৷ কিন্তু বেরোতে তো হবেই আর তা অন্ধকার হওয়ার আগেই৷ না, হাল ছেড়ে দেবেন না তিনি৷ কিন্তু ঘুরে দাঁড়িয়ে আবার এগোতে গিয়েই যে-দৃশ্য চোখে পড়ল তাঁর তাতে মনে হল শরীরের সমস্ত শক্তি নিঃশেষ হয়ে তিনি যেন সত্যি এবার মাটির উপরে লুটিয়ে পড়বেন৷ নন্দলালবাবু দেখলেন, তিনি যেখানে দাঁড়িয়ে আছেন তার পাঁচ হাত দূরে স্পষ্ট পায়ের ছাপ৷ না, কোনো মানুষের না, চোরাশিকারিদের না৷ এই আদিম কুমারী অরণ্য অন্ধকারে যারা শাসন করে তাদেরই একজনের৷ গর্তটায় এখনও জল চুঁইয়ে ঢুকছে৷ অর্থাৎ মাত্র মিনিট পনেরোর পুরানো পায়ের ছাপটা৷ আর একটু নজর করে পায়ের ছাপটা দেখতে গিয়েই নন্দলালবাবু সভয়ে দেখলেন পায়ের নখগুলো সব ক্ষয়ে গেছে৷ সেই বুড়ো বাঘটাই তাহলে-কাল রাতেও যে তাদের বাংলোর নীচ থেকে নিঃশব্দে ঘুরে গেছে? পনেরো বছর ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টে রেঞ্জ অফিসারের চাকরি করছেন নন্দলালবাবু, কতবার কত বিপদে- আপদে পড়েছেন কিন্তু এরকম অভিজ্ঞতা তার আগে কখনো হয়নি৷ একটা অলৌকিক অপার্থিব ভয় তার সমস্ত বোধবুদ্ধি যেন আচ্ছন্ন করে ফেলল৷ নন্দলালবাবুর হঠাৎ মনে হল ওটা শুধুমাত্র বুড়ো একটা মানুষখেকো জানোয়ারমাত্র নয়৷ ও যেন এই আদিম অন্ধকার অরণ্য-যেখানে লোভী স্বার্থপর মানুষ তার অধিকার কায়েম করতে চাইছে-তারই অপমানিত লাঞ্ছিত আত্মা৷ যেহেতু এই জঙ্গলে রেঞ্জ অফিসার নন্দলালবাবুই সেই লোভী মানুষের প্রতিনিধি সুতরাং সে ওই রেঞ্জ অফিসারের রক্ত চায়৷ কথাটা মনে হওয়ার সঙ্গেসঙ্গেই নন্দলালবাবুর চলৎশক্তি লোপ পেয়ে গেল৷ মনে হল কী ভয়ানক নির্মম নিষ্ঠুর ওই শক্তি৷ কাউকে ও ছেড়ে দেবে না৷ কী লাভ ওর হাত থেকে আত্মরক্ষার চেষ্টা করার৷ তার চেয়ে ওর হাতে নিঃশর্তে আত্মসমর্পণ করা কত শান্তির, কত আরামের৷ আসুক অরণ্যের সেই অপরিতৃপ্ত ক্ষুধার্ত আত্মা-গ্রাস করে নিক নন্দলালবাবুকে তার অন্ধকার জঠরে৷ তিনি কোনো বাধা দেবেন না৷
কতক্ষণ এভাবে মোহগ্রস্তের মতো দাঁড়িয়েছিলেন নন্দলালবাবু জানেন না৷ হঠাৎ তাঁর চমক ভেঙে গেল সেই নির্জনতায় একটা তীক্ষ্ণ তীব্র টি-ট্টি-টি-ট্টি শব্দে৷ নন্দলালবাবু জানেন এটা বামুনবাদশা পাখি৷ সুন্দরবনের মানুষের বিশ্বাস বিপদের আঁচ পেলেই নাকি ওই পাখি ওরকম ডাকতে থাকে৷ কতবার এসব বিশ্বাস হেসে উড়িয়ে দিয়েছেন তিনি কিন্তু আজ ভয়ে তাঁর সমস্ত শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল৷ দেহে যেন সামান্য শক্তিও আর অবশিষ্ট নেই তাঁর৷ হঠাৎ যেন টনক নড়ল নন্দলালবাবুর৷ এই মহাসর্বনাশের মুখে এরকম ক্লীবের মতো দাঁড়িয়ে আছেন কেন তিনি! তাকে তো বাঁচতে হবেই৷ বন্দুক কাঁধে ফেলে নাক বরাবর ছুটলে একসময় না একসময়ে তিনি জঙ্গলের শেষ মাথায় পৌঁছে যাবেন নিশ্চয়ই৷ পায়ের নীচের কেটকির কাঁটা হান্টিং শু ফুঁড়ে বিঁধতে চাইছে৷ চোঙ্গলতার ফাঁসে আটকে মুহুর্মুহু হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন মাটিতে৷ কিন্তু উঠে দাঁড়িয়ে আবার ছুটছেন৷ যে করেই হোক এই মত্যুর ফাঁদ ছিঁড়ে তাঁকে বেরিয়ে যেতেই হবে৷ ছুটতে ছুটতে একসময়ে দাঁড়িয়ে গেলেন তিনি৷ সামনে জঙ্গল অত্যন্ত ঘন৷ ভেদ করে যাওয়ার উপায় নেই৷ বাঁ-দিকে একটা সয়াল৷ সেই সয়াল দিয়ে ঢুকতে যাবেন তিনি, স্তম্ভিত হয়ে দেখেন সামনে আবার সেই গরান গাছটা৷ গায়ে 'এন' লেখা আর গাছের গুঁড়ির পাশে একবারে সদ্য টাটকা পায়ের ছাপ৷ জল চুঁইয়ে চুঁইয়ে ঢুকছে৷ এবার আর বুঝতে ভুল হল না নন্দলালবাবুর-অরণ্যের সেই নিজের হিংস্র ক্ষুধা অত্যন্ত নিঃশব্দে তার পিছু নিয়েছে৷ নিজের জঠরে গ্রাস না করা অবধি তার শান্তি হবে না৷
প্রচণ্ড ভয়ে হতাশায় জ্ঞানই হারিয়ে ফেলতেন নন্দলালবাবু যদি না সে মুহূর্তে তার অর্জুনের কথা মনে পড়ে যেত৷ হয়তো এখনও বাঁচার সম্ভাবনা আছে তাঁর৷ কোনোমতে একটা গেঁয়ো গাছের মাথায় চড়ে তিনি আপ্রাণ শক্তিতে কু-উ-উ শব্দে ডাকলেন৷ এই ভয়ানক বিপদেও নন্দলালবাবু এই বুদ্ধিটুকু বজায় রাখতে পেরেছিলেন যে, এই ডাকের অর্থ বোঝার মতো মানুষ পৃথিবীতে একজন অন্তত আছে-যে একমাত্র আজ বাঁচাতে পারে তাঁকে৷ নন্দলালবাবু যে ভুল করেননি তার প্রমাণ তিনি এখন এই বাংলোয় বসে কথা বলছেন৷ নাহলে এতক্ষণে তার হাড়গোড়গুলি পড়ে থাকত গরান গাছের নীচে৷ জঙ্গলের কাঠুরিয়ারা ওখানে একটা গরান গাছের ডাল পুঁতে তার মাথায় ঝুলিয়ে দিত সাদা কাপড়৷ সুন্দরবনে কেউ বাঘের হাতে মারা গেলে ওটাই তার চিহ্ন৷
নন্দলালবাবু তার গল্প শেষ করলেন৷ অর্জুন কখন উঠে বাইরে চলে গেছে৷ হয়তো নিজের কথা নিজের কানে শুনতে লজ্জা করছিল ওর৷
বুবাই বলে, কিন্তু তোমাদের কেন বাঘে ধরল না?
নন্দলালবাবু খানিক চুপ থেকে বলেন, সে রহস্য আমাদের জানা নেই৷ এই অসভ্য বুনো মানুষেরা এমন কিছু জানে যা আমরা সভ্য মানুষেরা হাজার বই পড়েও জানতে পারিনি৷ এই বনের গাছপালার মতো এরাও যেন বনেরই একটি অংশ হয়ে গেছে৷ সুতরাং যেভাবে অন্য প্রাণীরা বাঘের হাত থেকে বাঁচে, বাঁচায় নিজের বাচ্চাকে তেমনি বাঘের মুখ থেকে অর্জুন বাঁচিয়ে নিয়ে এসেছে আমাকে৷
সুরমা বললেন, আমার খুব খারাপ লাগছে জানো৷ কলকাতায় কত গালমন্দ করেছি ওকে ওর বোকামির জন্য কিন্তু বোকা হলে কি আজ ও বাঁচাতে পারত তোমাকে?
-মা, এবার কলকাতা ফিরে গিয়েই কিন্তু আমার মেকানো সেটটা আমি অর্জুনদাকে দিয়ে দেব৷ নিশ্চয়ই অর্জুনদা খুব খুশি হবে তাহলে, বুবাই বলে৷
এত ক্লান্তির মধ্যেও বুবাইয়ের কথা শুনে নন্দলালবাবু মৃদু হাসলেন৷
-ঠিক বলেছ বুবাই৷ অর্জুনদা নিশ্চয়ই খুব খুশি হবে তাহলে৷
পাঁচ দিন পর৷ বিকেল বেলা বুবাই একা বসে ছিল কাঠের সিঁড়িটার উপর৷ মন ভালো নেই তার৷ ফুরিয়ে গেল সুন্দরবনের মেয়াদ৷ কালই কলকাতা ফিরে যেতে হবে তাদের৷ কী সুন্দর যে বিকেল বেলাটা৷ নদীর জল ডালিমের রোঁয়ার মতো স্বচ্ছ৷ লাল সাদা পাল তুলে জেলে নৌকোগুলো সমুদ্র থেকে মাছ ধরে ফিরে আসছে৷ নীলকান্ত মণির মতো টলটলে নীল একটা তারা উঠেছে কালো পশর গাছটার পিছনে৷ বুবাই জানে ওটা সন্ধ্যাতারা-শুক্রগ্রহ৷ উলটোডাঙায় বুবাই বরাবর দেখে এসেছে ওটাকে স্টেশনের মালঘরের টিনের চালটার পিছনে৷ কলকাতা ফিরে গেলে ওই তারাটা দেখে কি ওর এই পশর গাছটার কথাই মনে পড়বে? কাছেই কোথাও কোনো খলসি গাছে ঝেঁপে ফুল ধরেছে নিশ্চয়ই৷ বাতাসে তারই মিষ্টি ভুরভুরে গন্ধ৷ বুবাই জানে এখনই একঝাঁক সাদা পাখি মালার মতো গোল হয়ে আকাশের অনেক উঁচু দিয়ে উড়ে যাবে ওই ঠাকুরান নদীর দিকে-তার ওদিকে রায়মঙ্গল৷ ওগুলি নাকি সমুদ্রের পাখি-হাঁড়িভাঙার চরে উড়ে যায় বালির গর্তে রাত কাটাতে৷ এসব তাকে বলেছে অর্জুনদা৷ বুবাই জানে অর্জুনদা যা বলে সব সত্যি৷ সুন্দরবন সম্বন্ধে কিছুই অজানা নেই অর্জুনদার৷ ওই পাখিগুলি আকাশে মিলিয়ে যাওয়ার সঙ্গেসঙ্গেই ঝুপ করে নেমে আসবে অন্ধকার৷ একটা দুটো তারা ফুটে উঠবে আকাশে৷ ধ্রুবতারা সমস্ত রাত জ্বলজ্বল করবে হেঁতাল জঙ্গলের পিছনে৷ বুবাইও আস্তে আস্তে উঠে যাবে অর্জুনদার কাছে গল্প শুনতে৷ এমন সব গল্প যা আজ অবধি কোনো বইয়ে পড়েনি বুবাই৷
হঠাৎ কাছেই একটু ঝুপ করে শব্দ হল জলে৷ ঝুপ ঝুপ ঝুপ৷ হয়েই চলেছে শব্দটা৷ মুহূর্তের মধ্যে দেখতে পেল বুবাই খালের মুখ থেকে বিদ্যুৎগতিতে বেরিয়ে এল একটা টিনের ডোঙা৷ দু-দিকে বাঁশ মেরে মেরে ডিঙিটা চালিয়ে আসছে একজন৷ একী! এ তো অর্জুনদা! মা-র কী কাণ্ড! এই শেষবেলায় অর্জুনদাকে পাঠাচ্ছে নারায়ণতলায় তেল-নুন কিনে আনতে৷ সন্ধ্যে বেলার গল্পটাই তো তাহলে মাটি তার৷
ছুটে নদীর পারে গিয়ে দু-হাত মুখের কাছে জড়ো করে চেঁচায় বুবাই৷ অর্জুনদা-আ-আ... নদীর ভেতর থেকে প্রতিধ্বনির মতো ভেসে আসে অর্জুনের কন্ঠস্বর-আমি চলি যাইঠি খোকা৷ আমি আর কলিকাতায় ফিরি যাবুনি৷ মা-বাবাকে বোলো-অর্জুনদা যেখান থেকতি আসিথিলা সেঠি ফিরি গিইঠে৷ আমার পেরণাম জানিয়ো ওদের খোকা-
বুবাই কিছু বুঝতে পারছিল না৷ ও পাগলের মতো চিৎকার করে উঠল, কোথায় চলে যাচ্ছ তুমি অর্জুনদা? কোথায়? শোনো অর্জুনদা আ-আ-
কী যেন বলতে চাইল অর্জুন কিন্তু শেষের কথাগুলো আর শোনা গেল না তার৷ ডোঙাটা ততক্ষণে প্রচণ্ড স্রোতের টানে জঙ্গলের বাঁকে অদৃশ্য হয়ে গেছে৷ তক্ষুনি চারিদিকে নেমে এল অকল্পনীয় গাঢ় নৈঃশব্দ্য৷ ডোঙার ঢেউ-এর শেষ রুপালি রেখাটুকুও মিশে গেল নদীর জলে৷
বুবাই চারদিকে অবাক চোখে তাকায়৷ কোথায় চলে গেল অর্জুনদা! কেন চলে গেল?
বুবাই পাগলের মতো ছুটতে ছুটতে সিঁড়ি বেয়ে ওঠে৷ নন্দলালবাবু, সুরমা চায়ের কাপ হাতে গল্প করছিলেন বারান্দায়৷ বুবাইকে এভাবে ছুটতে দেখে সুরমা উৎকন্ঠায় উঠে পড়েন চেয়ার থেকে৷ -কী রে! কী হয়েছে তোর?
বুবাই হাঁপাতে হাঁপাতে বলে, অর্জুনদা চলে গেছে মা৷ আর ফিরবে না৷
সুরমা অবাক হয়ে বলেন, চলে গেছে মানে? কোথায় চলে গেছে?
বুবাই আর পারে না৷ হাউহাউ করে কেঁদে উঠে বলে-কিছু জানি না মা, কিছু বলে যায়নি৷ শুধু বলল আমি চলে যাচ্ছি৷
সুরমা ব্যাকুলভাবে নন্দলালবাবুর দিকে তাকিয়ে বলেন, কী বলছে গো বুবাই-কিছুই তো বুঝতে পারছি না৷ একবার দেখো কোথায় গেল লোকটা সন্ধ্যে বেলা কাউকে কিছু না বলে-কয়ে৷ আমাদের অনেক উপকার করেছে ও৷
এইরকম একটা খবর শুনেও কিন্তু নন্দলালবাবু স্থির হয়ে বসেই রইলেন৷ সুরমার কথায় ঠোঁটের কোণে হাসির একটু রেখা শুধু ফুটে উঠল শুধু৷ আস্তে আস্তে বলেন, কোনো লাভ নেই সুরমা৷ ও যে যাবেই আমি তা জানতাম৷ একদিন আমি ওর প্রাণ বাঁচিয়েছিলাম সেই কৃতজ্ঞতায় শুধু এতদিন আমাদের ছেড়ে যেতে পারেনি৷ কলকাতার অন্ধকূপে নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে দিন কাটিয়েছে৷ এবার তো সে-ও আমার প্রাণ বাঁচিয়েছে৷ এখন সে মুক্ত৷ সুতরাং তার নিজের রাজত্বে আবার ফিরে গেছে সে৷ বনের পশুরা যেরকম বনে ফিরে যায়৷ কোন শিকল দিয়ে তুমি তাকে বাঁধবে সুরমা?
কোনো কথা না বলে নিঃশব্দে জানালার কাছে উঠে এলেন সুরমা৷ বাইরে তাকিয়ে দেখলেন সমস্ত সুন্দরবন ডুবে গাঢ় অন্ধকারে৷ আকাশ থেকে মাটি আর জল যেন আলাদা করে চিনে নেওয়া যাচ্ছে না৷ এই অসীম অন্ধকারে এই আদিম জল-মাটি-আকাশ যেন নিজের হারানো জিনিস নিজের বুকের কাছে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে৷ কোথাও আর খুঁজে পাওয়া যাবে না তাকে৷
দাঁড়িয়েই থাকেন সুরমা৷
ঝাঁকড়া পশর গাছের পিছনে সেই সন্ধ্যাতারাটা মানুষের হৃৎপিণ্ডের মতো দপদপ করে কাঁপছে৷ কাঁপছেই৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন