অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কিন্তু এবারে মাসি পিসি দুজনেই ডেকেছেন। আগে মাসির বাড়ি এসেছি পালকি চড়ে। সেখানে মোয়া খেয়ে পেট ধামা করেছি। এখন পালকিতে শুয়ে পিসির বাড়ি চলেছি। মাসি চাদরের খুঁটে খই বেঁধে দিয়েছেন—পথে জল খেতে; হাতে একগাছা ভূতপত্রী লাঠি দিয়েছেন—ভূত তাড়াতে; এক লণ্ঠন দিয়েছেন—আলোয়-আলোয় যেত।
হুম্পাহুমা পালকি চলেছে বনগাঁ পেরিয়ে; ধপড়ধাঁই পালকি চলেছে বনের ধার দিয়ে, মাসির ঘর ছাড়িয়ে, ভূতপত্রীর মাঠ ভেঙে, পিসির বাড়িতে।
পিসির দেশে কখনো যাইনি। শুনেছি পিসি থাকেন তেপান্তর মাঠের ওপারে সমুদ্দুরের ধারে, বালির ঘরে। শুনেছি পিসি কাঁকড়া খেতে ভালোবাসেন, কচি-কচি কুমড়ো দিয়ে কাঁকড়ার ঝোল রেঁধে লোককে খাওয়াতেও ভালোবাসেন। কিন্তু লোক তো পিসির বাড়ি যায় কত! যে ভূতপত্রীর মাঠ! দেখেই ভয় হয়! এই মাঠ ভেঙে দুপুর রাতে পিসির বাড়ি চলেছি। চলেছি তো চলেইছি: ‘হুঁইয়া মারি খপরদারি!’ ‘বড়া ভারি খপরদারি!’
মাঠের মাঝে একটা শেওড়াগাছের ঝোপ, অন্ধকারে কালো বেড়ালের মতো গুঁড়ি মেরে বসে আছে। তারই কাছে ঘোড়ার গোর, তার পরেই তেপান্তর মাঠ! হাটের বাট ওই শেওড়া-তলা পর্যন্ত; তার পরে আর হাটও নেই, বাটও নেই; কেবল মাঠ ধূ-ধূ করছে।
এই শেওড়া-তলায় পালকি এসেছে কি আর যত ঝিঁঝিঁপোকা তারা বলে উঠেছে— ‘চললে বাঁচি!’ ‘চললে বাঁচি! কেন রে বাপু, একটু না হয় বসেছি, তাতে তোমাদের এত গায়ের জ্বালা কেন? ‘চললে বাঁচি!’ চলতে কি আর পারি রে বাপু? অমনি ঝিঁঝিঁপোকা সদার দুই লম্বা-লম্বা ঠ্যাং নেড়ে বলছে, ‘ওই আসছে চিঁচিঁ ঘোড়া চিঁচিঁ!’ ফিরে দেখি গোরের ভিতর থেকে ঘোড়া-ভূত মুখ বার করে পালকির দিকে কটমট করে তাকাচ্ছে! ওঠা রে পালকি, পালা রে পালা! আর পালা! ঘোড়া-ভূত তাড়া করেছে—ঘাড় বেঁকিয়ে, নাক ফুলিয়ে আগুনের মতো দুই চোখ পাকিয়ে!
ভয়ে তখন ভূতপত্রীর লাঠির কথা ভুলে গেছি। কেবল ডাকছি—জগবন্ধু, রক্ষে কর, মাসিকে বলে তোমায় খইয়ের মোয়া ভোগ দেব। বলতেই আমার খুঁটে বাঁধা খইগুলি রাস্তায় ছড়িয়ে পড়েছে। মাসির বাড়ির খই—জুঁইফুলের মতো ফুটন্ত ধবধব করছে খই—রাস্তা যেন আলো করে। ঘোড়া-ভূত কি সে-লোভ সামলাতে পারে? খই খেতে অমনি দাঁড়িয়ে গেছে। বেচারা ঘোড়া-ভূত খই খেতে মুখটি নামিয়েছে কি, অমনি তার ভুতুড়ে নিশ্বাসে খইগুলি উড়ে পালাচ্ছে! যেমন খইয়ের কাছে মুখ নেওয়া অমনি খই উড়ে পালায়। খইও ধরা দেয় না, ঘোড়াও ছাড়তে চায় না। ঘোড়া-ভূত চায় খই খায়, খই কিন্তু উড়ে-উড়ে পালায়।
ঘোড়া চলেছে খইয়ের পিছে, খই উড়েছে বাতাসের আগে, আমি চলেছি পালকিতে বসে ঘোড়া-ভূতের ঘোড়দৌড় দেখতে মুখ বাড়িয়ে। কখন যে মাঠে এসে পড়েছি মনেই নেই। সেখানটায় বড় অন্ধকার, বড় হাওয়া—যেন ঝড় বইছে। মাসির দেওয়া একটি লণ্ঠনের মিটমিটে আলো অনেকক্ষণ নিভে গেছে। অন্ধকারে আর ঘোড়াও দেখা যায় না, খইও চেনা যায় না। বেহারাদের বলি—আলো জ্বাল; কিন্তু হাওয়ায় কথা উড়ে যায়; কে শোনে কার কথা! এমন হাওয়া তো দেখিনি! আমার ভূতপত্রীর লাঠিটা পর্যন্ত উড়ে পালাবার যোগাড়। লণ্ঠনটি তো গেছে, শেষে লাঠিটাও যাবে? আচ্ছা করে লাঠি ধরে বসে আছি। বাতাসের জোর ক্রমেই বাড়ছে।

সর্বনাশ! এ যে দেখছি বীর বাতাস! এ বাতাসের মুখে পড়লে তো রক্ষে থাকবে না—পালকি সুদ্ধু ফক, তবে ওই কি, আমার লাঠি, আমার ছাতা, ধুতি-চাদর, পোঁটলা-পুঁটলি, বিছানা-বালিশ কাগজের টুকরোর মতন কোথায় উড়ে যাবে তার ঠিকানা নেই! পথে জল খেতে দু-মুঠো খই ছিল, তা তো ঘোড়া-ভূতের সঙ্গে কোথায় উড়ে গেছে। শেষে বীর-বাতাসে আমিও উড়ে যাব নাকি? শীতেও কাঁপছি, ভয়েও কাঁপছি। পালকি ধরে বীর-বাতাস এক-একবার ঝাঁকুনি দিচ্ছে, আর হাঁক দিচ্ছি ‘সামাল, সামাল!’ ভয়ে জগবন্ধুর নাম ভুলে গেছি। পালকিখানা ছাতার মতো বেহারাদের কাঁধ থেকে উড়ে আমাকে সুদ্ধ নিয়ে গড়াতে-গড়াতে চলেছে। পিছনে ‘ধর! ধর!’ করে পালকি-বেহারাগুলো ছুটে আসছে।
একটা বুড়ো মনসা গাছ, মাথায় তার হলদে চুল, বড়-বড় কাঁটার বঁড়শী ফেলে বালির উপর মাছ ধরছিল। মনসাবুড়োর ছিপে মাছ তো পড়ছিল কত! কেবল রাজ্যের খড়কুটো আর পাখির পালক হাওয়ায় ভেসে এসে বুড়োর বঁড়শীতে আটকা পড়ছিল। এমন সময় আমার চাদরখানা গেল বড়শীতে গেঁথে। আর যার কোথা? পালকিসুদ্ধ বালির উপর উল্টে পড়েছি। বেহারাগুলো একবার আমাকে ছাড়াবার জন্যে পালকির ডাণ্ডা ধরে আমার চাদরটা ধরে টানাটানি করলে, কিন্তু বাতাসের চোটে কোথায় উড়ে গেল আমার সেই উড়ে বেহারা ছ-টা, তাদের আর টিকিও দেখা গেল না!
মনসাবুড়োর হাসি দেখে কে! ভাবলে, মস্ত মাছ পেয়েছি। কিন্তু আমার হাতে ভূতপাত্রী লাঠি আছে তা তো বুড়ো জানে না! লাঠি দিয়ে যেমন বুড়োর গায়ে খোঁচা দেওয়া অমনি ভয়ে বুড়োর রক্ত দুধ হয়ে গেছে—সে তাড়াতাড়ি আমাকে ছেড়ে দিয়েছে। পালকিটা ঠেলে তুলে, বিছানা-পত্তর পোঁটলা-পুঁটলি যা যেখানে পড়েছিল গুছিয়ে নিয়ে, চুপটি করে বসে আছে—কখন বেহারাগুলো ফিরে আসে। মনসাবুড়োর গা বেয়ে দরদর করে শাদা দুধের মতো রক্ত পড়ছে; সেও কোনো কথা বলছে না, আমিও শাদা রক্ত দেখে অবাক হয়ে চেয়ে আছি।
বুড়ো খুব রেগেছে; তার গায়ের সব রোঁয়াগুলো কাঁটার মতো সোজা হয়ে উঠেছে। অনেকক্ষণ গোঁ হয়ে বসে থেকে মনসাবুড়ো আমার দিকে চেয়ে বলছে, ‘দেখছ কি? বড় আমোদ হচ্ছে, না? বুড়োমানুষের গায়ে খোঁচা দিয়ে রক্তপাত করে আবার বসে-বসে তামাশা দেখছ, লজ্জা নেই! যাও না, ছাড়া পেয়েছ তো নিজের কাজে যাও না!’
আমি বললুম, ‘যেতে পারলে তো! পালকি-বেহারা নেই যে! তারা আসুক তবে যাব।
শুনে বুড়ো হো-হো করে হেসে বললে, “কেন পা নেই নাকি! হেঁটে যেতে পার না! নবাব হয়েছ?’
আমার ভারি রাগ হল। বুড়োর বঁড়শীর আঁচড়ে দুই পা ছিঁড়ে তখনো আমার ঝরঝর রক্ত পড়ছে। আমি রেগে বললাম, ‘পা দুটো কি তার রেখেছ! আঁচড়ের চোটে দফা শেষ করেছ যে!
‘লেগেছে নাকি!’ বলে বুড়ো খানিক চুপ করে বললে, ‘একটু দই দাও, সেরে যাবে।’
আমি বললুম, ‘এই মাঠের মধ্যে দই! তামাশা করছ নাকি?’
‘আচ্ছা তবে খানিক তেঁতুল-বাটা হলেও চলতে পারে।’
আমার হাসি পেল। নিশ্চয় বুড়োটা ঘুমের ঘোরে স্বপন দেখছে। ‘বলি ও দাদা! এখানে তুমি ছাড়া তো গাছ দেখছি নে, আরেকবার লাঠির খোঁচা দিয়ে তোমার গা থেকে দুধ বার করে নিয়ে দই পাতব নাকি?’ বলেই ভূতপত্রী লাঠিটা যেমন একটু বাগিয়ে ধরেছি, অমনি বুড়ো বলছে, ‘রও রও, কর কি, দাদা! বুড়োমানুষ কখন কি বলি, রাগ কর না। আমরা মনসাদেবীর বরে চিরকাল নানারকম স্বপন দেখি। এইখানটিতে কতকাল যে বসে আছি তার ঠিক নেই। ছিপ নিয়ে মাছ ধরছিলুম জলের ধারে—আজ সে কত কালের কথা; সে নদী শুকিয়ে জল সরে চড়া পড়ে গেছে, কিন্তু এখনো ঝোঁক কাটেনি; মনে হচ্চে নদীর ধারেই বসে মাছ ধরছি! আমার বেশ মনে পড়ছে এইখানেই একঘর গয়লা থাকত আর ঠিক তাদের ঘরের কোণে একটা মস্ত তেঁতুলগাছ ছিল, এখন তবে সেগুলো গেছে?’ বলেই বুড়ো ঝিমিয়ে পড়ে দেখে আমি তাকে জাগিয়ে দিয়ে বললুম, ‘আচ্ছা দাদা, ওই যে ঘোড়া-ভূত আর ঝিঁঝিঁপোকা দেখে এলুম, ওদের কথা তুমি কিছু জানো কি?’
‘জানি বইকি! ওরা তো সেদিনের ছেলে!’ বলেই বুড়ো গল্প শুরু করলে :
‘দেখ, এই পৃথিবী তখন সবে তৈরি হয়েছে, আমাদের মতো দু-চারটি গাছ ছাড়া পৃথিবীতে আর কেউ নেই; —নদী নেই, পাহাড় নেই, এমন কি বাতাসে শব্দটি পর্যন্ত নেই; —কেবল বালি ধূধূ করছে—ঠিক এই জায়গাটির মতো। আমার তখন সবেমাত্র কচি-কচি দুটি কাঁটা বেরিয়েছে—ছোট ছেলের কচি-কচি দুটি দাঁতের মতো। সেই সময় তারা গান বড় ভালোবাসে, তারা দেখতে অনেকটা মানুষের মতো, কিন্তু ফড়িংগুলোর মতো তাদের ডানা আছে, পাখিগুলোর মতো পা, ঝাঁক বেঁধে তারা আমাদের কাছে উড়ে এসে বসল আর গান গাইতে আরম্ভ করলে। আকাশ-বাতাস তাদের গানের সুরে যেন বেজে উঠল। সে যে কি চমৎকার তা তোমাকে আর কি বলব! আমরা তার আগে শব্দ শুনিনি, গানও শুনিনি—আনন্দে যেন শিউরে উঠলুম। বালি ঠেলে যত গাছ, যত ঘাস মাথা তুলে কান পেতে সেই গান শুনতে বেরিয়ে এল, পৃথিবীর ভিতর থেকে পাহাড়গুলো গা- ঝাড়া দিয়ে উঠে এল, পাহাড়ের ভিতর থেকে নদীগুলো ছুটে-ছুটে বেরিয়ে এল। গান শুনতে-শুনতে দেখতে-দেখতে আমরা বড় হয়ে উঠলুম। কিন্তু যারা গান গাইতে এল, কি খেয়ে তারা বাঁচে? পৃথিবীতে তো তখন ফুলও ছিল না, ফলও ছিল না; ছিল কেবল আমাদের মতো বড়-বড় গাছ; কাঁটা লতা আর পাতা। নদীতে মাছও ছিল না, আকাশে পাখিও ছিল না যে তারা ধরে খায়। তবু তারা অনেকদিন বেঁচে ছিল কেবল গান গেয়ে। একদিন হঠাৎ শুনি যে গান বন্ধ হয়ে গেছে—তারা সবাই মরে গেছে—শুকনো পাতার মতো তাদের সোনার ডানা বাতাসে উড়ে এসে আমাদের গায়ে বিঁধতে লাগল, কিন্তু তাদের গানের সুর আর শোনা গেল না। তারপর পৃথিবীতে অনেকদিন আর কোনো সাড়াশব্দ নেই; কেবল দেখছি, একদল কারা জানি না, দেখতে অনেকটা মানুষ আর ঘোড়ার মতো, এদিকে-ওদিকে চারদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে, তাদেরই খুঁজে-খুঁজে যারা গান গাইতে এসেছিল। ক্রমে দেখি তারাও মরে গেছে। পৃথিবীতে আর তখন কিছু চলে বেড়াচ্ছে না, গান গাইছে না—কেবল গাছের দল আমরা চুপ করে বসে আছি। আমাদের বয়েস ক্রমে বাড়ছে আর আমরা বুড়ো হচ্ছি। তখন জলে মাছ দু-একটি দেখা দিয়েছে; আমি কাঁটা আর বঁড়শী ফেলে এক রাত্তিরে মাছ ধরছি এমন সময়—’

বলেই মনসাবুড়ো ঝিমিয়ে পড়ল! আমি যত বলি, ‘এমন সময় কি হল দাদা? আবার বুঝি সেই ফড়িংদের মতো মানুষগুলো ঝিঁঝিঁপোকা হয়ে ফিরে এসে গান গাইছে দেখলে? দেখলে বুঝি সেই মানুষের মতো ঘোড়াগুলো ভূত হয়ে অন্ধকার থেকে মুখ বাড়িয়ে তাদের গান শুনতে এল?’ বুড়োর আর কথা নেই; কেবল একবার হুঁ বলেই চুপ করলে।

আমি ভাবছি দিই আর-এক ঘা লাঠি বুড়োর মাথায় বসিয়ে, এমন সময় দেখি দূর থেকে একটা আলো আসছে—যেন কে লণ্ঠন-হাতে আমার দিকে চলে আসছে। একবার ভাবছি বুঝি বেহারা কজন আলো নিয়ে আমাকে নিতে এল। একবার ভাবছি, কি জানি মাঠের মাঝে আলেয়া দেখা দেয়, তাও তো হতে পারে। কিন্তু দেখলুম আলোটা এসে পালকির খানিক দূরে থামল; আর চারটে জোয়ান উড়ে আমার পালকিটা কাঁধে নিলে। উড়েদের একেই একটু ভুতুড়ে চেহারা, কাজেই ঠিক আন্দাজ করতে পারলুম না যে তারা ভূত না মানুষ। একবার তাদের পায়ে দিকে চেয়ে দেখলুম, ভূতের মতো তাদের পায়ের গোড়ালি উল্টো কিনা। কিন্তু অন্ধকারে কিছু ঠিক করতে পারা গেল না। মনসাবুড়োকে ডেকে বললুম, ‘দাদা, তবে যাচ্ছি।’
দাদা আমার তখন ঝিমোচ্ছন; চমকে উঠে বললেন, ‘যাবে নাকি? গল্পটা তো শেষ হল না?’
পালকি তখন চলেছে, মুখ বাড়িয়ে বললুম, ‘দাদা, একরকম গল্পটা শেষই করেছিলে, কেবল তোমার মাথার চুল হলদে আর তোমার রক্ত শাদা কেন, সেইটে বলতে বাকি রয়ে গেল।’
‘মাস্টারমশায়ের কাছে জেনে নিও—’ বলেই দাদা আবার ঝিমিয়ে পড়লেন। হু-হু করে পালকি আমার মাঠের দিকে বেরিয়ে গেল।
একটু ভয়-ভয় করছে; বেহারাগুলো মানুষ না ভূত বুঝতে পাচ্ছিনে। পালকির দরজা বন্ধ করে চুপ করে বসে আছি, হঠাৎ একটা কথা মনে পড়ল—মানুষ-উড়ে পালকি-কাঁধে হুম্মাহুমা ডাক ছাড়ে, এরা তো হাঁক দিচ্ছে না। পড়েছি ভূতের হাতেই! পড়েছি, আর কোনো ভুল নেই। আচ্ছা দেখা যাক, ভূতপত্রী লাঠি তো আছে। তেমন-তেমন দেখি তো দুহাতে লাঠি চালাব।
ভূতপত্রী লাঠির কথা মনে করেছি কি অমনি ধপাস করে পালকিটা তারা মাটিতে ফেলেছে, কোমরটা আমার খচ করে উঠেছে। ‘তবে রে ভূত-উড়ে, আমাকে এই মাঠে একলা নামিয়ে দিয়ে পালাবে ভেবেছ! তোল্ পালকি, ওঠা সোয়ারী’ —বলেই লাঠি নিয়ে যেমন তেড়ে যাব, কোমরটা আমার বেঁকে পড়ল। ভূতগুলো দেখেই খিলখিল করে হেসে অন্ধকারে মাঠে কোথায় মিলিয়ে গেল। মহা বিপদ! এই রাত্তিরে মাঠের মাঝে ভূতের ভয়, বাঘের ভয়, সাপের ভয়, তার ওপর কোমর ভেঙে গেল! লাঠি ধরে যে গুড়গুড়ি পালাব তারও জো নেই। মনসা-কাঁটায় পা ছিঁড়ে গেছে। ‘দূর কর আর ভাবতে পারিনে, যা হয় হবে!’ বলে পালকির ভেতরে চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লুম। খিদেও পেয়েছে, তেষ্টাও পেয়েছে।

একলা থাকতে-থাকতে ক্রমে ঘুম এসেছে। একটু চোখ বুজেছি কি না অমনি খস করে একটা শব্দ হল। চোখ চেয়ে দেখি, বালির ওপরে গোটাকতক তালগাছ উঠেছে, তাদের মাথা যেন আকাশে ঠেকেছে, আর একটা আলো ঘুরে-ঘুরে সেই তালগাছে ঠেকেছে, আবার সড়সড় করে নেমে আসছে! আমি আর না-রাম না-গঙ্গা! কাঠ হয়ে পড়ে আছি কেবল দুটি চোখ চাদরের একটি কোণ দিয়ে বের করে।
দেখছি আলোটা ক্রমে এ-গাছ সে-গাছ করে ঘুরে বেড়াতে লাগল; তারপর আস্তে-আস্তে মাটিতে নেমে এল। সেই সময় দেখি পূর্ণিমার চাঁদের মতো প্রকাণ্ড একটা কাঁচের গোলা মাঠের ওপর দিয়ে বোঁ-বোঁ করে গড়িয়ে আসছে—যেন একটা মস্ত আলোর ফুটবল! তালগাছের তলায় সে আলোটা টিপ-টিপ করছিল সেটা জোনাকি-পোকার মতো উড়ে গিয়ে সেই গোলটার ওপর বসল। বসেই গোলাটাকে আমার দিকে গড়িয়ে আনতে লাগল!
গেছি, পালকিসুদ্ধ গোলাটার ভেতরে ঢুকে গেছি। হাঁড়ির ভেতরে মাছের মতো আর পালাবার জো নেই। একেবারে গড়িয়ে চলেছি—বন্বন্ করে লাঠিমের মতো ঘুরতে-ঘুরতে। সে কি ঘুরুনি! মনে হল, আকাশ ঘুরছে, তারা ঘুরছে, পৃথিবী ঘুরছে, পেটের ভেতর আমার মাসির মোয়াগুলোও যেন ঘুরতে লেগেছে! কখনো মাঠের ওপর দিকে কখনো গাছের মাথা ডিঙিয়ে, গোলাটা শাদা খরগোশের মতো লাফিয়ে, গড়িয়ে, কখনো জোরে, কখনো আস্তে আমাকে নিয়ে ছুটে চলেছে!
ভয়ে দুই হাতে চোখ ঢেকে চলেছি। ক্যাঁ-কোঁ চরকা-কাটার শব্দ শুনে চোখ খুলে দেখি এক বুড়ি সুতো কাটছে আর একটা খরগোশ তার চরকা ঘুরোচ্চে। বুড়িকে দেখেই চিনেছি, সেই আদ্যিকালের বদ্যিবুড়ি, যে চাঁদের ভেতরে বসে থাকে! আর ওই তার চরকা, ওই খরগোশ! আঃ বাঁচা গেল, এটা তবে গোলাভূত নয়! ইনিই আমাদের চাঁদমামা আর বুড়ি তো আমাদের মামি! আর এ খরগোশ তো আমাদের সেই খাঁচার খরগোশটি, বিলিতি ইঁদুরের আর গিনিপিগগুলির বড়মামা!
‘বলি মামি, এমন করে কি ভয় দেখাতে হয়!’ বলেই আমি খরগোশটাকে খপ করে কোলে তুলে নিয়েছি।
‘ওরে ছাড়, ছাড়! আমার চরকা কাটা বন্ধ করিস নে, দেখচিস নে এই চরকার জোরেই চাঁদমামার সংসার চলছে!’
সত্যিই দেখি চরকা বন্ধ হতেই চাঁদমামা গড়াতে-গড়াতে থেমে গিয়ে লাঠিমের মতো মাটির ওপর কাত হয়ে পড়েছেন! আমি খরগোশটি মামির হাতে দিয়ে বললুম, ‘কই মামি, চালাও দেখি মামাকে।’
খরগোশ চরকায় যেমন এক পাক দিয়েছে অমনি চাঁদমামা গা-ঝাড়া দিয়ে ঘুরতে লেগেছেন। বুড়ি ডাকছে, ‘দে পাক, দে পাক! খরগোশ ততই পাক দিচ্ছে আর চাঁদমামাও তত ঘুরপাক দিয়ে ডিগবাজি খেয়ে রবারের বলের মতো নাচতে-নাচতে চলেছেন। যত বলি, ‘মামি আর পাক দিও না, মামাকে আমার অত ঘুরিও না, মামা হাঁপিয়ে দম আটকে কোনদিন মারা পড়বেন যে! একটু রয়ে-বসে চালাও, শেষে বুড়ো বয়েসে মামার কি মাথা ঘুরুনির রোগ ধরিয়ে দেবে?’ জানি কি যে মামি আমার কালা! আমার একটি কথাও বুড়ির কানে যায়নি। সে কেবল বলছে, ‘দে পাক, দে পাক!’ আমি যত ইশারা করে বলি, ‘আস্তে, আস্তে!’— বুড়ি ভাবে জোরে চালাতে বলছি, ততই ডাকে, ‘দে পাক, দে পাক!’

মামা রেলের গাড়ির মতো হু-হু করে ছুটে চলেছেন। ‘ওরে মাথা! মাথা ঘুরে গেল, আর যে পারিনে’—বলেই লাঠি তুলেছি খরগোশটাকে মারতে। যেমন লাঠি তোলা অমনি খরগোশটা খ্যাঁক করে তেড়ে এসেছে, ক্যাঁচ করে চরকাটা বন্ধ হয়ে গেছে আর পটাং করে মামির হাতের সুতো কেটে গেছে। যেমন সুতো কাটা আর ঝপাং করে চাঁদামামা গিয়ে একটা নদীর জলে পড়েছেন, পড়েই ফেটে চৌচির!
‘কি করলে গো মামি!’ বলেই চমকে দেখি নদীর ওপারে পালকিসুদ্ধ আমি ঠিকরে পড়েছি! কোথায় বুড়ি, কোথায় চরকা, কোথায় বা সে খরগোশ! নদীর জলে দেখি একরাশ কাঁচের টুকরোর মতো চাঁদামামার ভাঙা আলো, খানিক চকচক করেই নিভে গেল। আকাশের দিকে চেয়ে দেখি সত্যিই চাঁদামামার আধখানা কোথায় উড়ে গেছে।
ভাগ্যি নদীতে তেমন জল ছিল না, নইলে সবাই আজ ডুবেছিলাম আরকি! বড় তেষ্টা পেয়েছিল! নদী থেকে এক ঘটি জল খেয়ে ঠাণ্ডা হয়ে তবে বাঁচি!
নদীর ধারেই একটা গাঁ রয়েছে। দেখে সাহস হল; ভাবলুম—আজ রাত্তিরে ওই গাঁয়ে কারু গোয়াল-ঘরে শুয়ে থাকি; কাল সকালে এখান থেকেই ফিরে পালাব, পিসির বাড়ি যাওয়ার আর কাজ নেই বাবা! এই মনে করে গাঁয়ের ভেতরে গিয়ে দেখি, সেখানে জনমানব নেই। ডাক-হাঁক করে কারো সাড়াও পাইনে! যাই হোক, গাঁ ছেড়ে আর এক পা-ও নড়া নয়। চাদর মুড়ি দিয়ে একটা ঘরের দাওয়ায় শুয়ে পড়লুম। যেমন শোয়া, আর ঘুম—অকাতরে ঘুম।
খানিক পরে জেগে দেখি, সেই মনসাতলার লণ্ঠন-ভূতটা আর তার চার বন্ধু আলো নিয়ে আমার মুখের কাছে বসে আছে। ‘তবে রে!’ বলেই যেমন উঠতে যাব অমনি তারা বলে উঠেছে, ‘দেখ বাবু, ফের যদি লাঠি দেখাও কি মারতে আস, তবে আবার আমরা তোমাকে ফেলে পালাব। আর যদি চুপ করে ভালোমানুষটি হয়ে পালকিতে বসে থাক, তবে ওই কি-বলে ও-কি-তলা পর্যন্ত তোমাকে আমরা পৌঁছে দেব।’ বুঝলুম, ভূতগুলো ভয়ে রামনাম মুখে আনতে পারছে না, তাই পিসির বাড়ি যেতে যে রামচণ্ডীতলার কথা শুনেছি তাকে বলছে—কি-বলে-ও-কি-তলা।

ভূতগুলো ভয় পেয়েছে দেখে সাহস হল; পালকিতে আবার উঠে বসলুম।
এবারে আর ভয় করছে না—ভোর হবার এখনো দেরি আছে কিন্তু এরই মধ্যে ভূতগুলো যেন একটু ঠাণ্ডা হয়ে এসেছে; মাঠে আর ঘন-ঘন আলেয়া দেখা দিচ্ছে না, পথের ধারে তালগাছ তো দেখাই দিচ্ছে না, কোথাও মনসাগাছের ছায়াটি পর্যন্ত আর দেখা যায় না। পুবদিক থেকে ভোরের বাতাস একটু-একটু আসছে; ভূতগুলো হাওয়া পেয়েই যেন জড়োসড়ো। আমি কিন্তু বেশ আরামে পালকিতে দরজা খুলে ঘুম দিতে-দিতে চলেছি।
ভোর হয় দেখে ভূত-বেহারা চারটে ভয় পেয়েছে, কিন্তু রামচণ্ডীতলায় আমাকে পৌঁছে দিলেই তাদের ছুটি এই ভেবে তাদের একটু আহ্লাদও হয়েছে। চার ভূত চার সুরে চিঁচিঁ, পিঁপিঁ, খিটখিট, টিকটিক করে গান গাইতে-গাইতে চলেছে—ঠিক যেন কত দূর থেকে চিল ডাকছে, আর কোলাব্যাঙ কটকট করছে। ঘুমের ঘোরে শুনছি যেন ‘কুহু কেকা’র ঠিক সেই পালকির গানটা! কিন্তু কথাগুলো সব উল্টোপাল্টা আর সুরটাও বেখাপ্পা বেয়াড়া—বেজায় ভুতুড়ে। কেবল হাড় খটখট, দাঁত কিটমিট, গোঙানি আর কাতরানি শুনে যে গায়ে জ্বর এল! ঘুমিয়ে আছি কিন্তু তবু শুনছি :
চলে চলে
হুমকিতালে
পংখী গালে
মাসিপিসি
বাঘবেরালে।
ভূতপেরেতে
চলেছে রেতে
হনহনিয়ে
ভূতপেরেতে।
পালকি দোলে
উঠতি আলে
নালকি দোলে
নামতি খালে।
আলো-আঁধারে
শেওড়াগাছ
কালোয় শাদায়
বেরাল নাচ।
মরানদী
বালির ঘাট
মনসাতলায়
মাছের হাট।
ভূতের জমি
ভূতের জমি
ভূতপেরেতের
নাইকো কমি।
উড়ছে কতক
ভনভনিয়ে
চলছে কতক
হনহনিয়ে
চলছে কতক
গাছতলাতে
দুলছে কতক
তালপাতাতে।
দিনদুপুরে
বাদুড় ঘুমোয়
রাতদুপুরে
হুতুম থুমোয়।
ভোঁদড় ভাম
ব্যাঙ-ব্যাঙাচি
টিকটিকি আর
কানামাচি।
গঙ্গাফড়িং
জোনাকপোকা
আরসোল্লা
ন্যাংটা খোকা।
ছুঁচো ইঁদুর
খ্যাঁকশেয়াল
শুকনো পাতা
গাছের ডাল।
সব ভুতুড়ে
সব ভুতুড়ে
ঘূর্ণি-হাওয়ায়
চলছে ঘুরে
জগৎ জুড়ে
ঘুরছে ধুলো
বাতাস দিয়ে
দুলছে কুলো!
সব ভুতুড়ে
সব ভুতুড়ে
আলো-আলেয়া
জ্বলছে দূরে
সব ভুতুড়ে
ভূতের খেলা
খেজুরতলায়
ইঁটের ঢেলা⋯
গানটা শুনেছি একবার— ‘ছুঁচো, ইঁদুর, কানামাছি, ভোঁদড়, প্যাঁচা, টিকটিকি, খ্যাঁকশেয়াল।’ গানটা শুনছি দু’বার— ‘গঙ্গাফড়িং, জোনাকপোকা, আরসোলা, বাদুড়!’ গানটা শুনছি তিনবার—’আলো-আলেয়া, ঘূর্ণি-হাওয়া, খেজুরগাছ, ইঁটের ঢেলা।’ একবার, দু-বার, তিনবার, বারবার তিনবার ইঁটের ঢেলা পড়েছে কি আর পালকিসুদ্ধ আমাকে ভূতগুলো ঝপাং করে মাটিতে ফেলে খেজুরগাছের তলায় একটা মরা গরু পড়েছিল সেটাকে নিয়ে লুফতে-লুফতে দৌড় মেরেছে! ওদিকে অমনি রামচণ্ডী থেকে রাত তিনটের আরতি বেজেছে—টংটং, টং-আ-টং, টংটং-আ-টং।
এই খেজুরতলা পর্যন্ত ভূত আসতে পারে, তার ওদিকে রামচণ্ডীতলা, যেখানে রাম-সীতা বসে বসে আছেন, হনুমান, জাম্ববান পাহারা দিচ্ছে, ভূতের আর সেখানে এগোবার জো নেই। ভূতপতরীর লাঠিরও জোর সেখানে খাটবে না। কাজেই পোঁটলা-পুঁটলি, লাঠি-ছাতা সমস্ত পালকিতে রেখে, কোমর ধরে, খোঁড়াতে-খোঁড়াতে বালি ভেঙে রামচণ্ডীতলায় রামসীতা দেখতে তিনটে রাতে অন্ধকার দিয়ে একলা চলেছি। সঙ্গে একটি আলো নেই, হাতে লাঠিটি পর্যন্ত নেবার জো নেই। কি জানি লাঠি দেখে যদি হনুমান মন্দিরে ঢুকতে না দেয়! তখন যাই কোথা?
‘রাম-রাম’ বলতে-বলতে বালি ভেঙে চলেছি। বালি তো বালি একেবারে বালির পাহাড়! এক-একবার পিছন ফিরে দেখছি ভূতগুলো আসছে কিনা। যদিও এখানকার বালিতে পা দিলেই তাদের মাথার খুলি ফটাস করে ফেটে যাবে তবুও খেজুরগাছটার ওপর থেকে তারা ভয় দেখাতে ছাড়ে না; টুপ করে হয়তো একটা খেজুর-আঁটি এসে গায়ে পড়ল, হয়তো দেখছি খেজুরতলায় যেন একটা কচি ছেলে ওমা-ওমা করে কাঁদছে, শুনে ইচ্ছে হয় দৌড়ে গিয়ে দেখি—বুঝি কাদের ছেলে পথ হারিয়ে কেঁদে বেড়াচ্ছে; হয়তো আমার নাম ধরেই পেছন থেকে কে একবার ডাকলে, গলাটা যেন চেনা-চেনা, ফিরে দেখি কেউ কোথাও নেই! অন্ধকারে হয়তো দেখলুম মাঠের মাঝে একটা জায়গায় খানিকটা জ্বলন্ত বালি তুবড়ি-বাজির মতো ফস করে জ্বলে উঠল, ইচ্ছে হয় গিয়ে দেখি কিন্তু গেলেই বিপদ—একেবারে ভূতে ধরে জরিমানা করে তবে ছাড়বে, নয়তো মট করে ঘাড় মটকে দেবে।
আমি আর এদিক-ওদিকে কোনোদিক না দেখে ‘সীতারাম-সীতারাম’ বলতে-বলতে চলেছি। ওই দেখা যাচ্ছে বালির পাহাড়ের ওপরে পঞ্চবটীর বন, বনের মাথায় রামসীতা মন্দিরের চুড়ো। মনে হচ্ছে এই কাছেই, আর একটু গেলেই পৌঁছে যাব, কিন্তু যতই এগিয়ে যাচ্ছি ততই যেন সব দূরে সরে যাচ্ছে—আমার কাছ থেকে দৌড়ে পালাচ্ছে। আমিও দৌড়েছি খোঁড়া পা নিয়ে, দৌড়েছি হাঁপাতে-হাঁপাতে, দৌড়েছি উঠি-তো-পড়ি বালির ওপর দিয়ে।
এইবার শুনতে পাচ্ছি মন্দিরের খোল-করতাল বাজছে; দেখতে পাচ্ছি জাম্ববানের দল আগুন জ্বালিয়ে গাছতলায় বসে আছে; হনুমানের ল্যাজ বটের ঝুরির মতো পাতার ফাঁক দিয়ে ঝুলে পড়েছে। আর ভয় কি! বলে যেমন রামচণ্ডীতলায় ছুটে যাব আর নাকটা গেল ঠুকে। একি, নাক ঠুকল কিসে? এই তো সামনে সোজা রাস্তা—গাছের তলা দিয়ে মন্দিরে উঠেছে; তবে নাক ঠোকে কিসে?
নাকে হাত দিয়ে দেখি নাকটা বিলিতি-বেগুনের মতো ফুলে উঠেছে। সামনে হাতড়ে দেখি প্রকাণ্ড কাঁচ, তার ভেতর থেকে ফ্রেমে-বাঁধা ছবির মতো রামচণ্ডীর মন্দির, পঞ্চবটী বন, হনুমানের ল্যাজ, সবই দেখা যাচ্ছে; কেবল তার ভেতরে যাওয়া যাচ্ছে না। ফড়িংগুলো যেমন লণ্ঠনের চারদিকে মাথা ঠুকে মরে, আমিও তেমনি ঘুরে বেড়াচ্ছি চারদিকে কেবল নাক ঠুকে-ঠুকে। নাকটা বেগুনের মতো গোল হয়ে ফুলে উঠেছিল, কাঁচে লেগে-লেগে ক্রমে চ্যাপটা হয়ে গেল, তবু ভেতরে ঢোকার রাস্তা কিন্তু পেলুম না।
হাঁপিয়ে গেছি, বালির ওপরে বসে পড়েছি, হনুমানের গোটাকতক ছানা আমাকে দেখে দাঁত বের করে হাসছে। ভারি রাগ হল, রাগে বুদ্ধিসুদ্ধি লোপ পেয়ে গেল। ‘জয় রাম!’ বলে দিয়েছি এক লাফ সেই কাঁচের ওপরে।
লাফ দিয়েই ভাবলুম—গেছি! হাত-পা কেটে, সকল গায়ে কাঁচ ফুটে রক্তারক্তি হল দেখছি! কিন্তু আশ্চর্য! রামনামের গুণে জলের মতো কাঁচ কেটে একেবারে ভেতরে গিয়ে পড়েছি—হনুমানের জাম্ববানের দলের মাঝখানে! আর অমনি চারদিকে রব উঠেছে—’জয় রাম! জয়-জয় রাম, সীতারাম!’ সমুদ্দুরের ডাক শুনছি—’জয়-জয় রাম!’ বাতাসে শব্দ শুনেছি—’জয় রাম!’ চারদিকে ‘জয় রাম সীতারাম!’
কেউ আমাকে একটি কথাও বললে না, আমার দিকে ফিরেও চাইলে না! আমি রামসীতা দর্শন করে একটা কাঁটাবন পেরিয়ে সমুদ্রের ধারে গিয়ে পড়েছি। সেখানে দেখি, ছটা বেহারা আমার পালকিটি নিয়ে বসে আছে—দেখতে কালো কিচ্কিন্দে।
‘কে হে বাপু তোমরা আমার পালকিটি নিয়ে?’
‘বাবুজি, আমরা তোমার পিসির চাকর—কিচ্কিন্দে, কাসুন্দে, বাসুন্দে, ঝালুন্দে, মালুন্দে, হারুন্দে।’
‘আচ্ছা বাপু, চল তো পিসির বাড়ি’—বলেই আমি পালকি চেপে বসেছি।
এবার চলেছি আরামে, কোনো ভয় নেই; পা ছড়িয়ে বসে, পালকির দুই দরজা খুলে, মনের আনন্দে চারদিক দেখতে-দেখতে চলেছি। কেমন তালে-তালে এবার পালকি চলেছে—কালকাসুন্দি, ঝালকাসুন্দি! ঝাঁকুনি নেই, পালকি চলেছে—আমকাসুন্দি, জামকাসুন্দি! যেন জলের ওপর দুলতে-দুলতে নেচে চলেছে। পিসির পালকি চলেছে—ধর কাসুন্দে, চল বাসুন্দে, বড়া ঝালুন্দে, খোঁড়া মালুন্দে। পালকির এক দরজা ধরে চলেছে হারুন্দে, আর এক দরজা ধরে চলেছে উড়েদের সর্দার—কালো কিচকিন্দে।
হারুন্দের মাথায় কালো চুলের উঁচু ঝুঁটি আর কিচ্কিন্দের মাথায় পাকা চুলের শণের নুটি। হারুন্দে ফরসা, কিচকিন্দে কালো মিশ—যেন বাংলা কালি! হারুন্দের চুল যেন বালির ওপরে মনসাগাছ—খাড়া-খাড়া, খোঁচা-খোঁচা, আর কিচকিন্দের চুল যেন সমুদ্দুরের শাদা ঢেউ—হাওয়ায় লটপট করছে। কিচকিন্দের মাঠটাও দেখছি খানিক শাদা, খানিক কালো, খানিক আলো খানিক অন্ধকার—একদিকে ধপধপ করছে শুকনো বালি আর-দিকে টলমল করছে কালো জল—নুনে গোলা। মাঠ দিয়ে চলছি, না, শাদা-কালো মস্ত একখানা সতরঞ্চির ওপর দিয়েই চলেছি!
আমার বাঁদিকে কেবল বালি—শাদা ধপধপ করছে বালি; আর আমার ডানদিকে রয়েছে কালি-গোলা সমুদ্দুর—কালো—কাজলের মতো কালো, বাঁয়ে চলেছে হারুন্দে—ডাঙার খবর দিতে-দিতে, ডাইনে চলেছে কিচকিন্দে—জলের আদি-অন্ত কইতে-কইতে। আমি চলেছি পালকিতে শুয়ে মনে-মনে দুজনের দুটো গল্প শাদা একটা শেলেটের ওপর কালো পেনসিল দিয়ে লিখে নিতে-নিতে। কিচকিন্দের গল্পটা জলের কিনা তাই সেটা লিখে নিতে-নিতেই ধুয়ে-মুছে গেছে, একটুও আর পড়া যাচ্ছে না। কিন্তু হারুন্দের গল্পটা বালির আঁচড়ের মতো একেবারে শেলেটে কেটে বসে গেছে—ধুলেও যায় না, মুছলেও যায় না—বেশ পষ্ট-পষ্ট পড়া যাচ্ছে।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন