স্মরণজিৎ চক্রবর্তী
দমদম এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে চারদিকটা দেখল ইগর। এখন মে মাসের প্রথম। আকাশ থেকে আগুন ঝরছে। এত গরম সহ্য করা মুশকিল।
ইগর এর আগেও এশিয়ার এইসব অঞ্চলে এসেছে। কিন্তু তাও এখানে এলে প্রথমেই কেমন যেন মাথা গুলিয়ে যায়! এত মানুষ! ইউরোপের শহর আর এশিয়ার এই সব শহর যেন সম্পূর্ণ দুটো আলাদা গ্রহ।
সামান্য খুঁড়িয়ে সামনের দিকে এগোল ইগর। জয়রামবাবু বলেছিলেন যে গাড়ি পাঠাবেন। কিন্তু সেটা কোথায়!
ইগর মোবাইলটা বের করল। ড্রাইভারের নম্বরটা ওকে মেসেজ করে দিয়েছেন জয়রাম। ও সেই নাম্বারটায় রিং করল।
বেশ কয়েকবার রিং হয়ে যাওয়ার পরে ড্রাইভার ফোনটা ধরল। আর ধরেই ভাঙা ইংরেজিতে যা বলল তার মানে হল, ও কাছেই আছে। ট্র্যাফিক জ্যামের জন্য দেরি হচ্ছে আসতে।
ইগর কত নম্বর গেটের সামনে অপেক্ষা করছে বলে ফোন কেটে দিল।
সামনের ছোট লেনটা পার করে ট্রলিব্যাগটা টানতে-টানতে ভাড়ার গাড়ি ছাড়ার ছোট্ট আইল্যান্ডটার দিকে এগোল ইগর।
গরমে কষ্ট এসব শুধু দু’দিনের জন্য। এখানকার কাজ সেরেই ইগরকে প্যারিস ফিরে যেতে হবে।
ডান পা-টা খুঁড়িয়ে হাঁটে ইগর। ও জানে এটা কোনওদিন ঠিক হবে না। সিয়েরা লিঁওর সেই সাংঘাতিক আঘাতের পরেই এটা হয়েছে।
ছয় বছর আগে ও গিয়েছিল রাশিয়ার ইয়াকুটিয়া অঞ্চলে। সেখানে উলি ম্যামথদের দাঁত পাওয়া গিয়েছে মাটির তলায় একটা বিরাট অঞ্চল জুড়ে। ফলে সেই দাঁত মাটি খুঁড়ে বের করে বিক্রি করার জন্য একটা হুড়োহুড়ি পড়ে গিয়েছে।
তখন একেও এক ধরনের গোল্ড রাশ বলা হচ্ছিল। সেটা নিয়ে খবর করতে গিয়েছিল ইগর। আর তখনই পেয়েছিল রনিত সেনগুপ্ত নামে একজন মানুষের ডায়েরি।
সেবার মস্কো থেকে লন্ডন ফিরেছিল ইগর। কে এই রনিত সেনগুপ্ত, সেই নিয়ে খোঁজখবর করতে-করতে বেরিয়ে পড়েছিল অনেক তথ্য। আরে লোকটা যে নামকরা ফোটোজার্নালিস্ট! বেশ কিছু পুরস্কারও পেয়েছে। সঙ্গে এ-ও জেনেছিল যে, রনিত ধরা পড়েছিল মস্কোয়। আর শেষ জানা খবর অনুযায়ী ইয়াকুটিয়ার একটা প্রিজ়ন ক্যাম্পে রাখা হয়েছিল ওকে।
ডায়েরি পড়ে ইগর বুঝতে পারছিল লোকটা পালিয়েছে ক্যাম্প থেকে। তারপর সাইবেরিয়ার ওই জঙ্গলে গিয়ে লুকিয়েছে। তবে লোকটাকে যে সাহায্য করেছিল সেই দিমিত্রিকে ধরা হয়েছে এবার।
রনিতের ডায়েরিটা যেন খনি! জেলখানায় কী অবস্থায় মানুষজন থাকে তার বর্ণনা আছে ওতে। তারপর জঙ্গলে যাওয়ার পরেও কিছু লেখা আছে। তবে সেসব ভাসা-ভাসা। আর লেখা আছে বড় একটা জিনিস পেয়েছে ও। সেটা নিজের লোক ছাড়া কাউকে বলা যাবে না। ওর ভাই জয়রামকে যেন জানানো হয় সেটা। বলে জয়রামের ঠিকানা দেওয়া আছে।
সেই সময়েই জয়রামের সঙ্গে যোগাযোগ করতে চেয়েছিল ইগর। কিন্তু পারেনি। কারণ অফিস থেকে ওকে পাঠিয়েছিল পশ্চিম আফ্রিকার সিয়েরা লিয়ঁতে গৃহযুদ্ধ নিয়ে খবর করার জন্য।
আর সেখানেই বোমার ঘায়ে মারাত্মক জখম হয়ে পড়েছিল ইগর। বাঁচার আশাই ছিল না কোনও। তাও বেঁচে গিয়েছিল ইগর। তবে সম্পূর্ণ সুস্থ হতে লেগেছিল বছরদেড়েক। আর এইসবের মধ্যে স্মৃতি থেকে হারিয়ে গিয়েছিল রনিত সেনগুপ্ত ও তার ডায়েরি।
মাসখানেক আগে একটা লেখার জন্য নিজের পুরনো কাগজপত্র ঘাঁটছিল ইগর। আর তখনই একটা ধুলোজমা প্লাস্টিক ফোল্ডারের মধ্যে খুঁজে পেয়েছিল এই ডায়েরিটা।
ডায়েরিটা দেখে ধীরে-ধীরে সব মনে পড়ে গিয়েছিল ইগরের। সেই ইয়াকুৎস্ক শহর, সেই আয়সেন, সেই নদী, উলি ম্যামথের দাঁত শিকারি! আর মনে পড়েছিল একটা নাম, রনিত সেনগুপ্ত!
তীব্র অনুশোচনা হয়েছিল ইগরের। একটা মানুষ এমন একটা পরিস্থিতিতে আটকে, সেখানে ও কিছু করতে পারল না এত বছর! নিজের শরীর খারাপ ছিল বলে সবটা ভুলে গেল! ও তখনই ঠিক করেছিল এই ঠিকানায় ও নিজে গিয়ে পৌঁছে দেবে ডায়েরি।
তাই এসেছে ইগর। অফিস থেকে চারদিনের ছুটি নিয়ে এসেছে। আসার আগে জয়রাম সেনগুপ্তর ঠিকানার মাধ্যমে ইন্টারনেটে সার্চ করে ফোন নম্বর জোগাড় করে কথাও বলেছে।
জয়রাম ব্যস্ত মানুষ। ব্যবসা করেন। তাও ইগরের কাছ থেকে রনিতের কথা শুনে দেখা করতে রাজি হয়েছেন। ইগর জানে না আজ কোথায় আছে রনিত। তবু ওর এই ডায়েরিটা পৌঁছে দিতে পারলে ও নিশ্চিন্ত হবে খানিকটা।
ইগরের কাছে গাড়ির নম্বর আছে। তাই লাল রংয়ের গাড়িটা দেখে ওর চিনতে অসুবিধে হল না। নিজেই ব্যাগ টানতে-টানতে এগিয়ে গেল ও।
ড্রাইভার ছেলেটির বয়স অল্প। চটপটে। ইগরকে ব্যাগ টানতে দেখে নিজেই এগিয়ে এসে ব্যাগটা ধরল। ইগর বুঝল, ও নিজের যে ফোটো পাঠিয়েছিল জয়রামকে, সেটা নিশ্চয়ই দেখেছে এই ছেলেটা।
গাড়ির ভিতরে এ সি-র মধ্যে বসে শান্তি পেল ইগর।
গাড়িটা ভিড় আর জ্যাম কাটিয়ে এসে থামল ডানলপের কাছে একটা বড় বাগানঘেরা বাড়িতে।
বাড়িটা বেশ পুরনো। বড়। আর অনেকখানি জমি নিয়ে তৈরি। বাড়ির চৌহদ্দির মধ্যে একটা পুকুরও রয়েছে।
বড় গেট থেকে মোরামের রাস্তা বাড়ি অবধি গিয়েছে। সেই রাস্তা দিয়ে গিয়ে বাড়ির পোর্টিকোর তলায় দাঁড়াল গাড়িটা।
ইগর দেখল, জয়রাম নিজেই এসেছেন ওকে স্বাগত জানাতে।
আগেই ভিডিয়ো কলে কথা বলার দরুণ জয়রামকে চিনতে ওর অসুবিধে হল না।
জয়রাম বেশ ফরসা মানুষ। লম্বা-চওড়া। মাথায় টাক। আর কপালের ডান দিকে একটা আঁচিল।
ইগর গাড়ি থেকে নামামাত্র জয়রাম এগিয়ে এসে ওর হাতটা ধরলেন।
ওর ব্যাগটা একজন কাজের লোক নামাল। এখানেই ইগরের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। জয়রাম ইগরকে নিয়ে বসার ঘরের দিকে এগোলেন।
বসার ঘরটা বেশ বড়। খুব সুন্দর করে সাজানো। ইগর দেখে বুঝল এঁরা পয়সাওয়ালা লোক।
ইগরকে একটু ধাতস্থ হতে দিলেন জয়রাম। তারপর বললেন, “বলুন।”
ইগর কাঁধের ব্যাগের থেকে বের করল একটা বড় খাম। তারপর সেটা এগিয়ে দিল জয়রামের দিকে। বলল, “এইটা। দেখুন।”
জয়রাম খাম থেকে বের করলেন ডায়েরিটা। তারপর খুব সাবধানে উলটেপালটে দেখলেন অনেকক্ষণ ধরে।
ইগর লক্ষ করল জয়রামের মুখ-চোখ লাল হয়ে উঠেছে। এ সি-তে বসেও কপালে বিন্দু-বিন্দু ঘাম।
জয়রাম ডায়েরিটা টেবিলে রেখে বললেন, “হ্যাঁ, দাদার লেখা এটা। হাতের লেখাটা আমি চিনি। আর তা ছাড়া দাদা লেখার সময় সারাক্ষণ মার্জিনে ডুড্ল করত। আর এই কবিতার মতো লেখা। দাদা ছোটবেলায় এমন টুকরোটাকরা লিখত।”
ইগর বলল, “আপনাকে তো সব ডিটেলে আমি আগেই বলেছি। এটা আমি নিজে এসে দিতে চাইছিলাম।”
জয়রাম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “ছোট থেকেই দাদা অন্য রকম। আমাদের পারিবারিক কেমিক্যালের ব্যবসা আছে। পরে অ্যান্টিকের ব্যবসাও শুরু করি। ভগবানের আশীর্বাদে টাকা-পয়সার অভাব নেই। কিন্তু দাদাকে এসব টানত না। শুধু বলত, গ্লোবট্রটার হবে। নিজে মেটালার্জি নিয়ে লেখাপড়া করল বটে, কিন্তু সেই নিয়ে কাজ করল না। বরং হল সাংবাদিক। ফোটোজার্নালিস্ট। বাড়ির সঙ্গে প্রায় যোগাযোগ ছিল না। শেষ বাড়ি এসেছিল সেই ১৯৯০ সালে। তারপর তিরানব্বইয়ে ধরা পড়ল রাশিয়ায়। ব্যস, আর কিছু জানা গেল না। আমরা দাদাকে ছাড়ানোর চেষ্টা করেছিলাম নানাভাবে। কিন্তু কোনও ফল পাইনি। জানেন, আমার দাদাকে দেখতে খুব ইচ্ছে করে। এখন কেমন আছেন জানতে ইচ্ছে করে!”
ইগর কী বলবে বুঝতে পারল না। তাও বলল, “আসলে রাশিয়ান প্রিজ়ন ক্যাম্পগুলো তো খুবই কুখ্যাত। আগে ছিল গুলাগ। কিন্তু ১৯৬০ সালে সেসব বন্ধ করে দিলেও তার জায়গায় উঠে আসা এই প্রিজ়ন ক্যাম্পগুলো এখনও খুব সাংঘাতিক জায়গা।”
“কিন্তু আপনি তো বললেন দাদা পালিয়ে গিয়েছিল,” জয়রাম তাকালেন ইগরের দিকে।
“হ্যাঁ,” মাথা নাড়ল ইগর, “কিন্তু তারপর সাত বছর কেটে গিয়েছে। জানি না উনি কোথায় আছেন! আবার কি ধরা পড়লেন? নাকি, সরি টু সে, মারা গিয়েছেন? আমরা কেউ জানি না। তাই বলছি যে আপনার দাদাকে দেখতে ইচ্ছে করছে মানলাম, কিন্তু তার জন্য ড্র্যাস্টিক কিছু করবেন না। লাইফ ইজ় রিয়েলি টাফ ইন দ্যাট পার্ট অব দ্য ওয়ার্ল্ড।”
জয়রাম মাথা নিচু করে চিন্তা করলেন কিছু। তারপর গলা তুলে ডাকলেন, “গিরিধারী।”
ইগর দেখল, বছরতিরিশের একজন ঢুকল ঘরে। বুঝল এখানে কাজ করে লোকটা।
জয়রাম বলল, “মণিময়কে ডাকো তো। বলো এক্ষুনি আসতে।”
“জি সাব!” গিরিধারী ইগরের দিকে তাকাল একবার। তারপর মাথা নিচু করে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।
একটু সময় পরে একটা লোক ঢুকল ঘরে। বেঁটে। ফরসা। দোহারা চেহারা। দাড়ি-গোঁফ কামানো। লোকটার বয়স বছরচল্লিশ।
জয়রাম বললেন, “ইগর, এ হল মণিময় সান্যাল। আমার সেক্রেটারি।”
ইগর হ্যান্ডশেক করার জন্য হাত বাড়ালেও মণিময় দুই হাত জড়ো করে নমস্কার করল।
জয়রাম বললেন, “মণি, তোমাকে আমি বলেছিলাম, এই হল সেই ডায়েরি। এটা খুব সাবধানে রেখে দাও।”
মণিময় একবার তাকাল ডায়েরিটার দিকে। তারপর বলল, “তবে কি যেটা বলেছিলেন সেটা দেখব?”
জয়রাম মাথা নাড়লেন। তারপর ইগরের দিকে তাকিয়ে বললেন, “কাম হোয়াট মে, আমি একবার চেষ্টা করব। দাদাকে আমি খুব ভালবাসতাম। এখনও বাসি। সবাই দাদাকে ভুলে গিয়েছে। কিন্তু আমি যাইনি। এই ডায়েরিতে কী দামি জিনিসের কথা লেখা আছে আমি জানি না। জানতেও চাই না। আমি শুধু দাদাকে দেখতে চাই একবার। ব্যস। আর কিছু না।”
“কিন্তু আপনি, এই বয়সে ওখানে যাবেন?” ইগর অবাক হয়ে তাকাল।
জয়রাম হাসলেন। তারপর বললেন, “সেটা হলে তো ভালই হত। কিন্তু তা যে সম্ভব নয় সেটা তো আপনিও জানেন। তবে একজনের কথা জেনেছি।”
“কে সে?”
জয়রাম তাকালেন ইগরের দিকে তারপর বললেন, “কুষাণ সরকার।”
হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে আকাশের দিকে তাকাল কুষাণ। অন্ধকার নেমে এসেছে। প্রায় সাতটা বাজে। হাসপাতালের সামনেটায় জটলা বেশ। ভিজ়িটিং আওয়ার্স শেষ হয়েছে। লোকজন খাবার দোকান আর চায়ের দোকানের উপর হামলে পড়েছে।
ওই দিকে গেল না কুষাণ। দূরে, বড় শিরীষ গাছের বাঁধানো গোড়ায় জেঠু বসে আছে। দূর থেকে দেখলেই বোঝা যাচ্ছে যে লোকটা ভেঙে পড়েছে একদম। আসলে হওয়ারই কথা। জেঠিমার জন্য সামনে বিশাল খরচ।
জেঠিমার হার্টের অসুখ। সেটার জন্য জটিল একটা অপারেশন করাতে হবে। সব মিলিয়ে প্রায় দশ-বারো লক্ষ টাকার ব্যাপার। কিন্তু সেই টাকা কীভাবে জোগাড় করবে ও?
কুষাণ জেঠুর দিকে এগিয়ে গেল।
জেঠু মুখ তুলে তাকাল। তারপর বলল, “দেখলি? কী বুঝছিস?”
কুষাণ হাসার চেষ্টা করল। পারল না। বলল, “বাড়িতে নিয়ে গিয়ে রাখতে হবে আপাতত। তারপর...”
“কিন্তু অত টাকা কোথায় পাব বল? কেউ তো ধার দেবে না।”
কুষাণের বাবা-মা মারা গিয়েছিলেন অনেক ছোটবেলায়। তখন থেকেই জেঠু-জেঠিমার কাছে মানুষ ও। এখন ভবানীপুরে একটা ছোট্ট বাড়িতে ভাড়া থাকে ওরা।
কুষাণ খেলাধুলোয় খুব ভাল ছিল। ন্যাশনাল লেভেলে ডেকাথলন চ্যাম্পিয়ন। এমনকী, কমনওয়েলথ গেমস-এও গিয়েছে।
একটা শিপিং কোম্পানিতে চাকরি করত কুষাণ। কিন্তু বছরখানেক হল সেটা বন্ধ হয়ে গিয়েছে।
এখন যোগব্যায়াম আর তাইকোন্ডো শেখায় কুষাণ। কিন্তু সেখান থেকেও তো অত টাকা পাওয়া যাবে না। তা হলে?
জেঠু বলল, “কী ভাবছিস?”
কুষাণ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “চলো, তোমায় মেট্রোয় ছেড়ে দিই। আমায় একবার কলেজ স্ট্রিট যেতে হবে। এখান থেকে তো হাঁটা পথ।”
জেঠু উঠল। তারপর ধীরে-ধীরে বলল, “মেট্রোয় কী ছাড়বি? আমি নিজেই যেতে পারব। তুই বরং আয়। গোপালের কাছে যাবি তো?”
গোপাল মানে গোপাল ধর। পেশায় উকিল। তবে আরও নানা ব্যবসা আছে। কলেজ স্ট্রিটের যে-সংস্থায় কুষাণ ব্যায়াম শেখায় সেটারও মালিক ওই গোপাল।
কুষাণ টাকার ব্যাপারটা বলেছিল গোপালকে।
গোপাল টাকার অঙ্ক শুনে হাঁ হয়ে গিয়েছিল। বলেছিল, “এত টাকা কে দেবে তোকে? শোন, কোনও খারাপ কাজ না করলে রাতারাতি কেউ এত টাকা পেতে পারে না। তুই যেমন ছেলে ওসব তো করতে পারবি না। তা হলে?”
“আমি জানি না গোপালদা। তুমি প্লিজ় কিছু একটা ব্যবস্থা করে দাও।”
“দ্যাখ, আমি তোকে লাখদুয়েক দিতে পারি। কিন্তু বারো লাখ পারব না। তবে আমি দেখছি কী করা যায়।”
এটা দিনসাতেক আগের কথা। তারপর আচমকা আজ দুপুরে ফোন করেছিল গোপাল।
কুষাণ তখন একটা অফিসে গিয়েছিল। সিকিউরিটির লোক লাগবে ওদের। সেই নিয়ে কথা বলে বেরনোর পরেই ফোনটা এসেছিল।
গোপাল বলেছিল, “কী রে কোথায়?”
সংক্ষেপে বলেছিল কুষাণ।
গোপাল বলেছিল, “আজ সন্ধে সাতটা, সাড়ে সাতটা নাগাদ আসতে পারবি আমার অফিসে?”
কুষাণ বলেছিল, “হ্যাঁ পারব। কাজ আছে কোনও?”
“আছে,” গোপাল বলেছিল, “সন্ধেবেলা আয়, বলছি। আর ভাল কথা, তোর পাসপোর্ট আছে?”
“আছে,” ছোট করে বলেছিল কুষাণ।
“মানে ভ্যালিড আছে তো?” গোপালদা আবার জিজ্ঞেস করেছিল।
“হ্যাঁ। কেন?”
“নিয়ে আসবি সঙ্গে করে, কেমন? সাতটা, সাড়ে সাতটা কিন্তু। রাখছি,” গোপাল কেটে দিয়েছিল ফোনটা।
কুষাণ পকেটে হাত দিয়ে দেখল। পাসপোর্টটা ঠিক আছে।
জেঠু মেট্রোর দিকে চলে যাওয়ার পরে কুষাণও কলেজ স্ট্রিটে গোপালের অফিসের দিকে হাঁটা লাগাল।
চারদিকে লোকজন, চিৎকার-চেঁচামেচি। কিন্তু কিছু কানে ঢুকছে না কুষাণের। ওর কেবলই মনে হচ্ছে গোপাল কি কিছু করতে পারল? জানে অনেক টাকার ব্যাপার। কিন্তু তাও যদি কিছু করতে পারে!
জীবনে কখনও আশা ছাড়ে না কুষাণ। যত খারাপ পরিস্থিতিই হোক না কেন, ও জানে সাহস, বুদ্ধি আর পজ়িটিভ থিঙ্কিংটাই জীবনে আসল।
গোপালের অফিস টেমার লেনে। পুরনো বাড়ির একদম উপরতলায়।
ওর নানা ব্যবসা রয়েছে। যোগব্যায়াম কেন্দ্রটা তারই মধ্যে একটা। সিঁড়ি দিয়ে উঠেই সামনের বড় ঘরে ব্যায়াম শেখানো হয়। আর গোপালের অফিসটা তার পাশে।
গোপাল বসেছিল নিজের পুরনো কাঠের চেয়ারে।
গোপালের পাশে একটা লোক বসে রয়েছে। লোকটা বেঁটেখাটো, ফরসা। চোখের চাহনিটা কেমন যেন।
কুষাণ ঘরে ঢুকতেই গোপাল হাসল ওকে দেখে। তারপর পাশে বসা লোকটাকে বলল, “এর কথাই আপনাকে বলেছিলাম আগে। এ-ই কুষাণ সরকার। আর কুষাণ উনি, মণিময় সান্যাল। জয়রাম সেনগুপ্তর সেক্রেটারি।”
মণিময় তাকাল কুষাণের দিকে। বলল, “তুমি কাজ করতে চাও?”
কুষাণ মাথা নাড়ল।
মণিময় বলল, “অ্যাডভেঞ্চার ভাল লাগে?”
“মানে?” কুষাণ বুঝতে পারল না কথাটা কোন দিকে এগোচ্ছে।
মণিময় বলল, “বাঙালির লেখায় খুব অ্যাডভেঞ্চারের কথা থাকলেও জীবনে খুব একটা নেই কিনা! চাঁদের পাহাড় পড়েই সবাই খুশি, কিন্তু ক’জন বাঙালি এমন জীবন কাটিয়েছে?”
কুষাণ বলল, “শখ করে অ্যাডভেঞ্চার করতে আমার ভাল লাগবে না ঠিকই। কিন্তু জীবনে দু’-একবার এমন বিপদে আমি পড়েছি যা গড়পড়তা বাঙালি ভাবতেও পারবে না।”
“যেমন?” তাকাল মণিময়।
কুষাণ ভাবল এটা কি ওর ইন্টারভিউ হচ্ছে? কিন্তু কেউ প্রশ্ন করলে তাকে উত্তর না দেওয়া অভদ্রতা। তাই কুষাণ বলল, “একবার সোমালিয়ার জলদস্যুরা ধরেছিল আমাদের জাহাজ। আর-একবার সিসিলিয়ান কোস্টে আমাদের আক্রমণ করেছিল কিছু মাফিয়ার দলবল। ওরা মানুষ পাচারে যুক্ত ছিল।”
গোপালদা বলল, “তোর পাসপোর্টটা দে একবার। উনি দেখবেন।”
কুষাণ এগিয়ে দিল পাসপোর্ট। মণিময় খুঁটিয়ে দেখল সেটা। তারপর ফেরত দিয়ে বলল, “যে কাজটা আমরা বলছি সেটা কঠিন। কিন্তু টাকা পাবে ভাল। বারো লাখ। গোপালবাবু বলেছেন টাকাটা তোমার খুব দরকার। ছ’লাখ দেব আগে। আর ফিরে এলে আরও ছ’লাখ। তবে...”
“কী তবে?” কুষাণ কিছু বলার আগেই গোপাল জিজ্ঞেস করল।
মণিময় শ্বাস নিল একটু। তারপর কেটে-কেটে বলল, “আর তুমি যদি ফিরে আসতে না পার, তা হলে বাকি টাকাটা তোমার বাড়ির লোককে দিয়ে দেব আমরা। বুঝলে?”
মণিময়ের গাড়িটা বেশ পুরনো হয়েছে। স্টার্ট নিতে সময় নেয়। গিয়ার পালটাতে গেলে চ্যাঁ-চ্যাঁ শব্দ করে। মাঝপথে দাঁড়িয়েও যায় কখনও-কখনও। কিন্তু নতুন গাড়ি কেনার কথা ভাবতে পারে না মণিময়। টাকা-পয়সা নিয়ে খুব টানাটানির মধ্যে থাকে ও।
মণিময়, জয়রামের কাছে যে সেক্রেটারি হিসেবে কাজ করে, তাতে ভালই মাইনেপত্তর পায়। কিন্তু তাতেও ওর কুলায় না। কারণ মণিময়ের শেয়ার বাজারে টাকা লাগাবার একটা প্রবণতা আছে। আরও টাকার লোভে নিজের ক্ষমতার বাইরে গিয়ে গত বছর অনেকগুলো টাকা লাগিয়ে ফেলেছিল। সেটাও একজনের থেকে ধার নিয়ে। আর তাতে সবটাই লস হয়েছে। এখন সেই নিয়েই খুব ঝামেলায় আছে ও।
জয়রাম সেনগুপ্তর কাছে প্রায় পাঁচ বছর চাকরি করছে মণিময়। মানুষ হিসেবে জয়রাম খুবই ভাল। তাই বিপদে পড়ে জয়রামের কাছে পাঁচ লাখ টাকা ধার চেয়েছিল ও।
জয়রাম অবাক হয়েছিলেন। বলেছিলেন, “এত টাকা? কেন? কীসের জন্য দরকার?”
মণিময় আমতা-আমতা করে বলেছিল, “না, মানে একটু ব্যক্তিগত আর কী... মানে ইয়ে...”
জয়রাম বলেছিলেন, “তুমি আবার বাজার থেকে ধার করেছ, না? আবার শেয়ার মার্কেট?”
মণিময় কী বলবে বুঝতে না পেরে মাথা নামিয়ে নিয়েছিল।
জয়রাম বলেছিলেন, “আবার এসব করেছ? তোমার শিক্ষা নেই? দু’বছর আগে এমন দরকারের জন্য তুমি এক লাখ টাকা ক্যাশ থেকে সরানোর সময় হাতেনাতে ধরা পড়েছিলে সেটা ভুলে গিয়েছ? মনে নেই আমার পা ছুঁয়ে কত কান্নাকাটি করেছিলে। ক্ষমা চেয়েছিলে। মনে নেই ভগবানের নামে শপথ করেছিলে যে আর কখনও এমন করবে না? চুরি করে ধরা পড়লে তাকে পুলিশে দেওয়া হয়, নিদেনপক্ষে তাকে চাকরি থেকে ছাড়িয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু আমি তা করিনি। তারপরেও তুমি এসব বলছ! লজ্জা নেই তোমার? তোমায় এক টাকাও দেব না। যাও। না পোষালে আসবে না আর।”
মাথা নিচু করে সরে এসেছিল মণিময়। কী আর বলবে! জয়রাম সত্যি কথাই তো বলেছেন। হ্যাঁ, টাকা সরাতে গিয়ে ধরা পড়ে গিয়েছিল ও। আর সেটাও ছিল ধার মেটানোর জন্যই। তবে সেবার এক লাখ টাকা জোগাড় হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এবার পাঁচ লাখ জোগাড় হচ্ছে না কিছুতেই। আত্মীয়স্বজন সবার কাছে এতবার করে টাকা চেয়ে ফেলেছে যে আর কেউ দেবে না। নিজের বাড়িতেও এমন কিছু নেই যে বিক্রি করে টাকা মেটাবে। এই যে গাড়ি, এটার জন্য কেউ পঞ্চাশ হাজার টাকাও দেবে না!
কিন্তু টাকাটা সত্যিই খুব জরুরি। কারণ যার কাছে থেকে ও টাকা নিয়েছে সে খুব সোজা মানুষ নয়।
আজ আবার গাড়িটা মাঝপথে দাঁড়িয়ে পড়েছে। রাত হয়ে গিয়েছে বেশ। খুব একটা লোকজন নেই আশপাশে। এখন কী হবে? বিরাটির ভিতর দিকে একটা বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকে মণিময়। সেখানে ফিরবে কী করে এখন?
আজ জয়রামের কাছ থেকে বেরতে বেশ রাত হয়ে গিয়েছে। কিছু কাজ ছিল। আগামিকাল কুষাণ বলে ছেলেটা আসবে। তার কাজের জন্য একটা কন্ট্র্যাক্ট তৈরি করার ব্যাপার ছিল। গোপাল উকিল এসেছিল। কথায়-কথায় দেরি হয়ে গিয়েছে।
গাড়ি থেকে নেমে চারদিকটা দেখল মণিময়। এখানে কোনও মেকানিক পাবে, যে গাড়িটা একটু দেখে দেবে?
মোবাইল বের করে সময় দেখল মণিময়। রাত সাড়ে বারোটা বাজে। ও আকাশের দিকে তাকাল। জায়গাটা শহর নয়, তার উপর আশপাশে আলো কম বলে আকাশ বেশ স্পষ্ট! কালপুরুষ থেকে শুরু করে আবছা ছায়াপথ সব দেখা যাচ্ছে। কিন্তু সেদিকে মন নেই মণিময়ের। ও শুধু ভাবছে এখান থেকে কী করে বাড়ি যাবে!
আচমকা দূর থেকে একটা গাড়িকে আসতে দেখল মণিময়। গাড়িটা ওর বাড়ির দিকে থেকেই আসছে। ও একটু আশার আলো দেখল। ভাবল, গাড়িটা থামিয়ে ড্রাইভারকে বলবে সাহায্য করতে।
গাড়িটা এগিয়ে আসছে। ও হাত তুলে থামানোর চেষ্টা করল। গাড়িটা কাছে এসে থামল। দামি, মসৃণ গাড়ি। আওয়াজ প্রায় নেই বললেই।
মণিময় এগিয়ে গেল ড্রাইভারের দিকে। কিন্তু তার আগেই দরজা খুলে গেল। আর ও কিছু বুঝে ওঠার আগেই দু’জন লম্বা-চওড়া লোক এসে আচমকা ওকে চেপে ধরল দু’দিক থেকে।
“এটা কী হচ্ছে? এটা কী...” মণিময় বুঝতে পারল না কী করবে!
ও দেখল এবার আর-একটা লোক নেমে এল গাড়ির থেকে। আর গাড়ির আলোয় লোকটাকে দেখেই চমকে গেল মণিময়। এ কী করছে এখানে!
“মণিময় সান্যাল। আমাকে এড়াবে বলেই কি এত রাত করে বাড়ি ফিরছ? আমি একঘণ্টা বসেছিলাম তোমার বাড়ির সামনে। অপেক্ষা করছিলাম। কিন্তু তুমি তো এলেই না! কী ব্যাপার তোমার! দশ লাখ কম টাকা নয়!”
“দশ! পাঁচ লাখ তো!” মণিময় বিহ্বল গলায় বলল।
এবার আরও সামনে এগিয়ে এল লোকটা। মণিময় দেখল লোকটার রোগা, সিড়িঙ্গে মুখ। কপালে চন্দনের ফোঁটা। মুখে পান। টাকা ধার দেওয়ার কাজ লোকটার। সঙ্গে আরও নানা ব্যবসাও আছে। কিন্তু কোনওটাই সোজা পথের কাজকম্মো নয়। পুলিশের খাতাতেও এই গুলশন রাজের নাম আছে। কিন্তু প্রমাণ-অভাবে কেউ এখনও পর্যন্ত কিছু করতে পারেনি।
মণিময় ভাবল কী কুক্ষণেই যে ও এই লোকটার থেকে টাকা ধার নিতে গিয়েছিল!
গুলশন বলল, “আরে পাঁচ লাখ তো তুমি নিয়েছ। কিন্তু টাকা কি বসে থাকে? হেলথ ড্রিঙ্ক না-খেলেও সেও বাড়ে। সুদে বাড়ে। তোমার টাকাও বেড়ে হয়েছে দশ লাখ!”
“এই ক’মাসে এত বেড়েছে! এটা তো ডাকাতি!” মণিময় ছটফট করতে-করতে বলল।
গুলশন আচমকা থাপ্পড় মারল ওকে। তারপর হিসহিসে গলায় বলল, “শোন, আমার টাকা নিয়েছিস। সেটা কত বাড়বে সেটাও আমি ঠিক করব। বুঝেছিস? আর একবার বললে পনেরো লাখ হয়ে যাবে,” তুমি থেকে তুইয়ে নেমে এল গুলশন।
মণিময়ের গাল জ্বালা করছে। চোখে জলে এসে যাচ্ছে। তাও নিজেকে সামলাল। বলল, “দশ লাখ নেই আমার কাছে।”
“তোর কাছে তো পাঁচ লাখও নেই!”
মণিময় কী বলবে বুঝতে পারল না।
গুলশন বলল, “শোন, আমি যে-কারণে তোকে ধরেছি। তুই ইচ্ছে করলেই এক টাকাও না দিয়েই সব টাকা শোধ করে দিতে পারিস আমার।”
“এক টাকা না দিয়েই সব টাকা শোধ! মানে?” মণিময় অবাক হয়ে তাকাল ওর দিকে।
গুলশন কাছে এগিয়ে এল ওর। তারপর বলল, “ওই যে তোর বসের বাড়িতে এসেছিল না সাহেবটা। ওই যে ইগর না কী! সে একটা ডায়েরি দিয়ে গিয়েছে তোর বসকে। জানিস তো!”
মণিময় অবাক হল। এটা জানল কী করে গুলশন! কে বলছে ওকে?
গুলশন হাসল, “তোর বসের বাড়িতে লোক আছে আমার। তুই চিনিস তাকে। ওই বাড়িতে কাজ করে। গিরিধারী মিশ্র। সেই সব খবর দেয়। তোর বসের অ্যান্টিকের ব্যবসাও তো আছে। আমারও আছে। তবে তোর বসের ব্যবসাটা এক নম্বরি আর আমারটা দুই! তাই খবর রাখতেই হয়। বুঝলি?”
গিরিধারী গুলশনের লোক! মণিময় কী বলবে বুঝতে পারল না!
গুলশন বলল, “শোন, তুই জাস্ট ডায়েরিটা আমায় এনে দে। ব্যস, তোর সব ধার মাফ!”
এত বড় বাড়িতে কোনওদিন ঢোকেনি কুষাণ। কী বড় গেট! উঁচু পাঁচিল!
মূল বাড়িটার ভিতরে ঢোকার মুখে ও দেখল মণিময় দাঁড়িয়ে রয়েছে। লোকটাকে আজ যেন কেমন লাগছে। উসকোখুসকো। চোখ-মুখ লাল। শরীর খারাপ নাকি!
“এসো, স্যার অপেক্ষা করছেন।”
চারদিকে নানা দামি জিনিসপত্র দেখতে-দেখতে বসার ঘরের দিকে এগোল কুষাণ।
বসার ঘরটা দেখে কুষাণের মনে হল ওদের ভবানীপুরের গোটা বাড়িটাই এতে এঁটে যাবে।
গোপালের কাছে জয়রাম সেনগুপ্তর সম্বন্ধে জেনেছে কুষাণ। জেনেছে যে ভদ্রলোকের বড় কেমিক্যাল ফ্যাক্টরি আছে। সঙ্গে অ্যান্টিকের ব্যবসাও রয়েছে।
জয়রামকে দেখে হাত তুলে নমস্কার করল কুষাণ। জয়রাম হাত দিয়ে সামনের সোফায় বসতে বললেন ওকে।
কুষাণ বসল।
“গিরিধারী,” জয়রাম ডাকলেন।
একটা বছরতিরিশেকের লোক এসে ঘরে ঢুকল।
জয়রাম বললেন, “লেমোনেড আনো। আর খাবার দাও।”

“না স্যার,” কুষাণ বলল, “লেমোনেড আনলেই হবে। খিদে নেই।”
জয়রাম মাথা নাড়লেন। তারপর গিরিধারীকে বললেন, “ওকে লেমোনেড দাও আর আমার জন্য আইস-টি।”
কুষাণ দেখল ঘরে ঢোকার পর থেকেই দাঁড়িয়ে আছে মণিময়।
জয়রাম বললেন, “মণিময়, তুমি এখন যাও। দরকার হলে আমি ডাকব।”
মণিময় মাথা নেড়ে ভারী পরদা ঠেলে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।
“শোনো কুষাণ, আমি তুমি করেই বলছি,” জয়রাম সামান্য এগিয়ে বসলেন।
“হ্যাঁ স্যার, নিশ্চয়ই!” কুষাণ হাসল।
জয়রাম বললেন, “আমার দাদা সাত বছর আগে হারিয়ে গিয়েছেন রাশিয়ার এক জঙ্গলে। ক’দিন আগে আমি নিশ্চিত জানতে পেরেছি সেই ব্যাপারে। একটা ডায়েরি আছে দাদার। সেখানে হিন্টে লেখা আছে, কোন জায়গায় গেলে দাদাকে পাওয়া যেতে পারে। তবে সত্যি বলতে কী, সঠিকভাবে বলা নেই কিছু। একটা ম্যাপের মতো আঁকা আছে কেবল। আর একটা পদ্য লেখা আছে সংকেতের মতো করে। বাংলায়। মানে বাকি সব লেখা ইংরেজিতে, কেবল ওটাই বাংলায়। এখন ব্যাপারটা কী সেটাই তোমায় খুঁজে বের করতে হবে। পারবে?”
কুষাণ বলল, “আপনার দাদা অনেকদিন আগে হারিয়ে গিয়েছেন! ক্ষমা করবেন, কিন্তু তিনি এখনও যে বেঁচে আছেন সেটাই তো অনিশ্চিত, তাই না? তা হলে কাকে খুঁজব!”
জয়রাম এবার হেলান দিয়ে বসে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তারপর বললেন, “সেটাও যদি হয় তা হলে সেটাই জানতে চাই আমি। ওই নদীর ধার আর তার পাশের জঙ্গলে অনেকে যায় উলি ম্যামথের দাঁত মাটির তলা থেকে সংগ্রহ করতে। তারাও যদি কিছু জানে। তাদের যদি কিছু চোখে পড়ে! তোমায় গিয়ে এসবের খবর নিতে হবে। জঙ্গলেও যেতে হবে। তোমার যাতায়াতের খরচসহ দশ হাজার ডলার আমি সঙ্গে দিয়ে দেব। থাকা-খাওয়া প্লাস আরও যদি খরচ লাগে। আর আলাদা করে তোমায় বারো লাখ টাকা দেব। ছয় এখন আর...”
বাকিটা শেষ না করে জয়রাম মাথা নামালেন।
গিরিধারী এবার ঘরে ঢুকল। আইস-টি আর লেমোনেড রেখে তাকাল একবার কুষাণের দিকে। তারপর বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।
কুষাণ বুঝল যে এই কাজের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ঝুঁকির কথা ভেবে পুরোটা আর শেষ করলেন না জয়রাম।
কুষাণ বলল, “স্যার, আমি আর-একটা কথা বলতে চাই।”
“হ্যাঁ শিয়োর। বলো!” জয়রাম বললেন, “আরও টাকা চাও?”
কুষাণ মাথা নাড়ল, “আপনি আমায় বিশ্বাস করে এত টাকা দেবেন। প্লাস, গিয়ে হয়তো কিছুই পেলাম না। তা হলে? বা ধরুন, গিয়ে আমি বসে রইলাম নিজের মতো। কিছু না করে আবার ফিরে এলাম। তা হলে?”
জয়রাম হাসলেন। বললেন, “তুমি মস্কোয় পৌঁছনোমাত্র আমার ওখানের কনট্যাক্ট, মানে রিকো, তোমায় ইয়াকুৎস্ক অবধি নিয়ে যাবে। তারপর ইউ আর অন ইয়োর ওন। ওখানে আবহাওয়া খুব ঠান্ডা। আর জান তো, কাঁচা টাকা যেখানে ওড়ে সেখানে খারাপ লোকজনও বেশি থাকে। তার উপর পুলিশ আছে। তারাও খুব সহজ কিছু না। আমার দাদা জেল থেকে পালিয়েছিলেন। কেউ তাঁর খোঁজ করছে বুঝলে পুলিশও ছেড়ে দেবে না। রিকো তোমায় একটা স্যাটেলাইট ফোন দিয়ে দেবে। তার মাধ্যমে তুমি যোগাযোগ রাখবে আমার সঙ্গে। খবরাখবর দেবে। তা ছাড়া গোপাল আমার বহু পুরনো, চেনা মানুষ। ও ভুল কাউকে আমার কাছে পাঠাবে না। আমি ওকেও ডায়েরির ব্যাপারে বলেছি। আর ও বুঝেই তোমার কথা বলেছে। আমি বিশ্বাস করছি তোমায়।”
কুষাণ বলল, “স্যার, আমি চেষ্টা করব আপনার দাদাকে খুঁজে বের করার। কিন্তু আমার আর-একটা আর্জি আছে।”
জয়রাম বললেন, “বলো, কী চাও!”
কুষাণ বলল, “পুলিশ, খারাপ আবহাওয়া, গোলমেলে লোকজন, জঙ্গল আরও নানা অজানা বিপদ যে আছে সেটা আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু এসব পার করে যদি আমি ফিরে আসি, তা হলে স্যার, আপনার এত বড় কোম্পানি, আপনি আমায় একটা চাকরি দিতে পারেন? আমার খুব দরকার স্যার। বাড়ির অবস্থা ভাল নয়।”
জয়রাম হাসলেন। মাথা নাড়লেন। তারপর বললেন, “আরে ওভাবে বোলো না। আমায় গোপাল বলেছে। আমি জানি। সৎ, সাহসী মানুষ আমি পছন্দ করি। দেখো, তোমার মরাল আমি ভেঙে দিতে চাই না। কিন্তু তাও সামনে যে বিপদ আছে সেটা বলে দিলাম। আমি একটা কনট্র্যাক্ট পেপার তৈরি করেছি। না, এখনই সই করতে হবে না সেটায়। আজ ওটা তোমায় দিয়ে দিচ্ছি। দেখে নাও দু’দিন। তারপর এসো। রাজি থাকলে টাকা আর ডায়েরি দুটোই দিয়ে দেব। রাজি না হলেও আমি কিছু মনে করব না। আফটার অল তোমার জীবন, তোমার সিদ্ধান্ত!”
কুষাণ মাথা নাড়ল। জয়রাম সামনের টেবিলে রাখা একটা খাম বাড়িয়ে দিলেন ওর দিকে। তারপর বললেন, “এই নাও কনট্র্যাক্ট। আর শোনো, ডায়েরিতে দামি কিছু জিনিসের কথাও বলা আছে। কিন্তু সেটা ইম্পর্ট্যান্ট নয়। আমার দাদার খবর পেলেই চলবে, এটা মাথায় রেখো। একটা লোক, যাকে আমি এত ভালবাসতাম, তিনি হঠাৎ হারিয়ে গেলেন! আমি তার খবর না পেয়ে শান্তিতে মরতেও পারব না! আমি একটা ক্লোজ়ার চাই, বুঝলে!”
কুষাণ মাথা নাড়ল।
জয়রাম নিজের আইস-টি-টা তুলে নিয়ে বললেন, “লেমোনেড খেয়ে নাও।”
কুষাণ লেমোনেডটা নিতে গেল আর ওর হাত লেগে খামটা পড়ে গেল মাটিতে। ও পাশ ফিরে নিচু হয়ে সেটা মাটি থেকে তুলতে গেল আর তখনই কেমন একটা যেন মনে হল ওর।
কুষাণ দ্রুত ঘুরল দরজার দিকে। ভারী পরদার তলার ফাঁকা দিয়ে দেখল একটা ছায়া চট করে সরে গেল দরজার পাশ থেকে!
কুষাণ অবাক হল। কে দাঁড়িয়েছিল দরজার পাশে? সে কি আড়ি পেতে শুনছিল কিছু? আর শুনলে, কেন শুনছিল?
খামটা নিয়ে টেবিলে রেখে নিজের জায়গায় বসতে-বসতে কুষাণের মনে হল, তবে কি এখন থেকেই অজানা বিপদে একটু-একটু করে জড়িয়ে পড়ছে ও!
জয়রামের এই বাড়িতে মণিময়ের জন্য একটা ঘর আছে। যেদিন কাজ বেশি থাকে, সেদিন রাতে আর বাড়ি না ফিরে ও থেকে যায় এই বাড়িতেই।
আজ কাজ বেশি ছিল না। কিন্তু তাও কাজের বাহানা করে থেকে গিয়েছে। কারণ গুলশন যা চায় সেটা ওকে হাত করতে হবে আজকেই। যত দেরি করবে গুলশন, ততই সুদ বাড়াবে, চাপ দেবে। এমনকী, কাল তো ফোন করে বলেছিল যে, মণিময়কে মেরেও দিতে দ্বিধা করবে না যদি না তাড়াতাড়ি ডায়েরিটা দেয়!
সারা বাড়ি এখন নিস্তব্ধ। বিছানা থেকে উঠল মণিময়। মোবাইলে সময় দেখল। রাত দেড়টা বাজে। আর দেরি করবে না। চুপচাপ ডায়েরিটা জয়রামের ঘর থেকে নিয়ে এসে অফিস থেকে গোটা ডায়েরিটাই ফোটোকপি করে নিয়ে আবার রেখে আসবে জায়গা মতো। তা হলেই কেউ কিছু বুঝতে পারবে না।
হ্যাঁ, গুলশন ডায়েরিটা চেয়েছে। কিন্তু আসল তো হল, কী লেখা আছে ওতে, সেটা। ফোটোকপি দেখলেও তো সেটা জানা যাবে। মনে হয় না তাতে গুলশনের অসুবিধে হবে।
জয়রামের ঘুমের সমস্যা আছে। তাই উনি রোজ রাতে ঘুমের ওষুধ খান। গিরিধারী নিজেই ওষুধ বের করে গ্লাসে জল ভরে এগিয়ে দেয় জয়রামকে। জয়রাম দেখেনও না। খেয়ে নেন। আজ গিরিধারী বলেছে যে আরও বেশি পাওয়ারের ওষুধ দেবে। জয়রাম বাচ্চাদের মতো ঘুমোবেন।
মণিময়ের থাকার ঘরটা একতলায়।
নিজের ঘর থেকে আলতো পায়ে বেরল মণিময়। করিডর শুনশান। তাও ও এদিক ওদিক দেখল। তারপর ধীরে-ধীরে হালকা পায়ে বেরিয়ে এল করিডরে। তারপর করিডরের শেষ প্রান্তের সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে গেল দ্রুত।
উপরের করিডরে অল্প আলো জ্বলছে। করিডরের শেষ প্রান্তের ঘরে থাকেন জয়রাম। একাই শোন রাতে। স্ত্রী আর মেয়ে পাশের ঘরে থাকেন।
মণিময় জানে বিছানার পাশে পুরনোদিনের একটা রোলটপ ডেস্কের ড্রয়ারেই ডায়েরিটা রাখা আছে।
দ্রুত পায়ে করিডরটা পার করে একদম শেষ প্রান্তে গেল মণিময়। জয়রাম দরজা খুলেই ঘুমোন। ফলে অসুবিধে হল না। মণিময় আলতো চাপে দরজাটা খুলে ফেলল।
ঘরের মধ্যে একটা হালকা নীল আলো জ্বলছে। এ সি-র শব্দও আসছে গুঞ্জনের মতো। একটা চাদর গায়ে রোলটপ ডেস্কের উলটো দিকে মুখ করে ঘুমোচ্ছেন জয়রাম।
আর সময় নষ্ট করল না মণিময়। দ্রুত কিন্তু নিঃশব্দে ঘরে ঢুকল ও। তারপর এগিয়ে গেল বিছানার দিকে।
জয়রাম মাথার বালিশের নীচে ড্রয়ারের চাবি রাখেন।
মণিময় হাত বাড়িয়ে সাবধানে বালিশের নীচ থেকে চাবিটা বের করল। তারপর রোলটপ ডেস্কের ড্রয়ারে চাবিটা ঢুকিয়ে মোচড় দিল। ক্লিক শব্দে খুলে গেল লক। আস্তে করে ড্রয়ারটা টানল মণিময়। তারপর ভিতরে হাত দিল। আরে কোথায় গেল ডায়েরিটা!
দুপুরে এই ঘরে, এখানেই তো জিনিসটা রাখতে দেখেছিল জয়রামকে। তা হলে?
ভিতরে হাত ঢুকিয়ে তন্নতন্ন করে দেখল। নাহ নেই! কোথাও নেই! তা হলে?
“ওটা ওখানে পাবে না। ডায়েরিটা নেই ওখানে।”
মণিময় চমকে উঠে ঘুরে তাকাল। দেখল বিছানার ওপর উঠে বসেছেন জয়রাম।
মণিময় কী বলবে বুঝতে পারল না। মনে হল কেউ যেন নিমেষে ওর মুখের মধ্যে বালি ঢুকিয়ে দিয়েছে। ভয়ে ওর হাত-পা ঠান্ডা হয়ে এল। ও পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল।
জয়রাম হাত বাড়িয়ে বিছানার পাশের সুইচ টিপে বড় আলোটা জ্বালিয়ে দিলেন। তারপর বললেন, “কুষাণ আমায় বলেছিল, আমি যেন সাবধান থাকি। তাই ডায়েরিটা সবাইকে দেখিয়ে ওখানে রাখলেও পরে সরিয়ে রেখেছি! কেউ যে ওটা সরাতে পারে সেটা জানতাম। আসলে একবার যে চুরি করে সারাজীবন হয়তো সে চোরই থাকে!”
মণিময় কী করবে বুঝতে পারল না।
“রাঘব,” বলে এবার জোরে ডাকলেন জয়রাম।
রাঘব বড়সড় চেহারার মানুষ। গায়ে ভীষণ জোর। জয়রামের সঙ্গেই ঘোরে সারাক্ষণ। মণিময় দেখল গিরিধারীর ঘাড় ধরে রাঘব ঘরে ঢুকল।
জয়রাম বলল, “তোমরা দু’জনে যে প্ল্যান করছ আমি বুঝিনি ভেবেছ? আমি বোকা নাকি? কুষাণ বলার পরেই আমি সবার উপর নজর রাখছিলাম। তোমাদের দু’জনের নিচু গলায় ফিসফিসানি, চোখে-চোখে কথা বলা আমার নজর এড়ায়নি। তাই বেশি ডোজ়ের ওষুধ! কাজের বাহানায় বাড়িতে থেকে যাওয়া বুঝতে অসুবিধে হয়নি আমার।”
রাঘব বলল, “স্যার, পুলিশ ডাকব?”
জয়রাম বলল, “না। এই দুটোকে শুধু এখনই ঘাড় ধরে বাড়ি থেকে বের করে দে। কোনও কিছু যেন সঙ্গে না নিয়ে যায়। দু’জনকে দিয়েই মুচলেকা লিখিয়ে নিবি যে ওরা কী করতে গিয়ে ধরা পড়েছে। আর কোনওদিন যদি এই বাড়ির সামনে আসে তা হলে ওদের আমরা পুলিশে দেব, সেটাও লিখিয়ে নিবি। বুঝেছিস!”
মণিময় মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।
বিছানা থেকে উঠে জয়রাম এগিয়ে এলেন এবার ওর দিকে। তারপর বললেন, “কী করতে তুমি ডায়েরি নিয়ে? ওখানে দামি জিনিসের কথা লেখা আছে বলে নিচ্ছিলে? পাগল তুমি? কী দামি জিনিস সেটাই বলা নেই। বা আদৌ কিছু আছে কি না সেটাও কেউ জানে না। শুধু একটা সংকেত আছে। তাও সেটা সহজ নয়। লোভে পড়ে নিজেকে এভাবে নষ্ট করলে? লোভ সব কিছুকেই নষ্ট করে! এটাও বোঝো না!”
গুলশন তাকাল মণিময়ের দিকে। মুখ-চোখ লাল। চোয়াল শক্ত।
মণিময় মাথা নিচু করে নিল। ঘরের মধ্যে গুলশন ছাড়াও আরও চারজন লোক রয়েছে। সবার মুখ চোখ দেখলেই বোঝা যায় জীবনে গুন্ডামি ছাড়া আর বিশেষ কিছু করেনি। এরা সবাই গুলশনের কাছে কাজ করে।
এখন দুপুরবেলা। গুলশনের এই বাড়িটা রাজারহাটের বড় রাস্তা থেকে অনেক ভিতরে। এমনিতেই চারদিক শুনশান। তার উপর ঘরের ভিতরে একটা অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। শব্দ বলতে শুধু একটা দু’ টনের এ সি গুঞ্জন করছে। সবকিছু মিলিয়ে-মিশিয়ে একটা ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
ডায়েরিটা আনতে পারেনি মণিময়। তার উপর চাকরিও গিয়েছে। নেহাত জয়রাম ভাল মানুষ তাই মুচলেকা দিয়ে রেহাই পেয়েছে ও। না হলে কী যে করত কে জানে। পুলিশে দিলে তো খুব সমস্যা হয়ে যেত।
গুলশন খসখসে গলায় বলল, “গাধা! একটা কাজও করতে পারে না! এদিকে এত টাকা ধার নিয়ে বসে আছে! তোকে মেরে ফেললেই তো সব মিটে যায়। তাই না?”
মেরে ফেললে মানে? মণিময় ভয় নিয়ে তাকাল গুলশনের দিকে। বলল, “না-না প্লিজ়! আমায় মারবেন না। আমি সব শোধ দিয়ে দেব। প্লিজ়। সেদিন গিরিধারী ধরা না পড়লে আমি... আমি...”
“কী আমি?” চিৎকার করে উঠল গুলশন, “খালি অজুহাত। খালি বাজে কথা। আমি কোনও কিছু শুনতে চাই না বলে দিলাম। আমার ওই ডায়েরি চাই। যেভাবেই হোক চাই।”
“স্যার,” ভয়ে-ভয়ে বলল মণিময়।
“কী?” গুলশন লাল চোখ করে তাকাল ওর দিকে।
মণিময় বলল, “কালকেই ওই বাড়িতে আসবে কুষাণ। ওকে ডায়েরিটা দেবে জয়রাম।”
“তুই শিয়োর?” গুলশন তাকাল মণিময়ের দিকে।
“না হলে ও যাবে কী করে? কনট্র্যাক্টটা সই করতে আসবে কুষাণ। তারপর বেরবে ডায়েরি নিয়ে।”
গুলশন বলল, “তা হলে তখনই ডায়েরিটা...”
“হ্যাঁ’,’ মণিময় চোয়াল শক্ত করে বলল, “ওকে ঘায়েল করে ডায়েরিটা নিয়ে নিলেই হল। তারপর আপনার কাছে আমার সব ধার শোধ!”
গুলশন বলল, “তাই? শোধ? তুই-ই ঠিক করবি?”
মণিময় কী বলবে বুঝতে না পেরে তাকাল গুলশনের দিকে।
গুলশন এগিয়ে এল মণিময়ের দিকে। তারপর ওর জামার কলার ধরে পেঁচিয়ে বলল, “কাল তোর উপর ভার রইল ডায়েরি আনার। আর শোন, এবার কিন্তু ফেল করবি না। করলে, তুই জানিস না তোর কপালে কী নাচছে!”
রাস্তায় বেরিয়েই যেন আগুনের হলকা লাগল কুষাণের। এতক্ষণ জয়রামের ঘরের মধ্যে বসেছিল। এ সি চলছিল। ফলে গরম লাগেনি। এখন বাইরে বেরিয়ে মনে হল কে যেন আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিচ্ছে ওকে।
কাঁধের ব্যাগটা ভাল করে ধরল কুষাণ। এটার মধ্যে ছ’লাখ টাকার চেক আছে। আর আছে ডায়েরি। দুটোই ওর কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ।
টাকাটা আজকেই ব্যাঙ্কে জমা করে দেবে ও। জেঠু-জেঠিমার কিছুটা তো সুবিধে হবে। জেঠিমার চিকিৎসার ব্যাপারেও খানিকটা এগোতে পারবে। আর বাকি টাকাটা পেলে তো অপারেশনটাও হয়ে যাবে।
তবে কুষাণ ভাবছে জেঠুকে কী বলবে। একসঙ্গে এতগুলো টাকা ও পেল কোথায়! সেটা নিয়ে তো জিজ্ঞেস করবেই জেঠু। তখন কী জবাব দেবে ও।
জেঠুকে তো বলাই যাবে না যে রাশিয়ার সাইবেরিয়া অঞ্চলে একটা কাজে যাচ্ছে ও। বলা যাবে না যে সেখান থেকে ফিরতেও পারে, আবার নাও ফিরতে পারে। কারণ ও যে-কাজে যাচ্ছে সেটায় যে ঝুঁকি আছে, সেই ব্যাপারে বিন্দুমাত্র কিছু বুঝতে পারলে জেঠু কিছুতেই ওকে যেতে দেবে না।
কিন্তু না গেলেও তো হবে না। এখানে থেকে কিছুই করতে পারছে না কুষাণ। চোখের সামনে কী করে দেখবে যে জেঠিমা তিল তিল করে শেষ হয়ে যাচ্ছে!
আজ জয়রামও ওকে এই বিপদের ব্যাপারে বলেছিলেন। বলেছিলেন, “শেষবারের মতো একবার ভেবে নাও। আমার দরকার কাজের। কিন্তু তোমারও জীবনের মূল্য আছে। টাকাটাই সব নয়। যা করবে পরে যেন সেই নিয়ে আফসোস না থাকে। বুঝলে!”
ভাবার কিছু নেই। সই করে দিয়েছিল কুষাণ। তারপর বলেছিল, “যদি ফিরতে পারি ওই চাকরির ব্যাপারটা...”
“নিশ্চয়ই ফিরতে পারবে। নেগেটিভ কিছু ভেবো না। তুমি খেলোয়াড়। তোমার স্পিরিটই অন্য রকম। আর এসে তুমি আমার এখানেই জয়েন করবে। কোনও চিন্তা নেই,” জয়রাম ভরসা দিয়েছিলেন।
আজ থেকে চারদিন পর বেরতে হবে ওকে। সেভাবেই টিকিট আর ভিসার বন্দোবস্ত করা হবে। সবটাই করে দেবেন জয়রাম। পরশু এসে টাকাপয়সা আর ওখানকার কন্ট্যাক্ট পার্সনের ব্যাপারে বুঝে নিয়ে যাবে।
জয়রামের বাড়ি থেকে কিছুটা হাঁটলেই বড় রাস্তা।
আকাশ থেকে আগুন ঝরছে। আশপাশে কেউ নেই। বড় রাস্তায় উঠল কুষাণ। সামনেই বাসস্ট্যান্ড।
বাসের জন্য বেশিক্ষণ দাঁড়াতে হল না কুষাণকে। বাসে বেশ ভিড়। তাও ভিতরে ঢুকে একপাশে জায়গা পেয়ে গেল ও। ব্যাগটাকে শক্ত করে ধরে দাঁড়াল কুষাণ। বাস চলতে লাগল।
গোটা পথটা বাসে করে যাবে না কুষাণ। শ্যামবাজার পাঁচমাথার মোড়ে নেমে গিয়ে সেখান থেকে মেট্রো ধরে নেতাজি ভবন যাবে। নেতাজি ভবন মেট্রো থেকে ওর বাড়ি হেঁটে মিনিটখানেক।
বাসটা শ্যামবাজার মোড়ের কাছে চলে এসেছে। টালা ট্যাঙ্কটা পার করে গেল এই মাত্র। ইতিমধ্যে বাসে ভিড় বেড়েছে। সেই ভিড় ঠেলে সামনের দিকে এগিয়ে গেল কুষাণ।
কন্ডাক্টর চিৎকার করছে। ওই শ্যামবাজার মোড় এসে গেল। কুষাণ দরজার কাছে দাঁড়াল। বাসটা আস্তে হয়ে এসেছে।
ও আর-এক পা এগোল। আর ঠিক তখনই আচমকা হাতে সুচ ফোটার মতো একটা প্রচণ্ড ব্যথা লাগল কুষাণের। কয়েক মুহূর্তের জন্য ব্যাগ থেকে হাতটা সরে গেল ওর আর ঠিক সেই সুযোগেই পিছন থেকে একটা হাত খুব ধারালো ব্লেড দিয়ে ব্যাগের স্ট্র্যাপটা কেটে দিল। আর সামনে এতক্ষণ নিরীহ মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটা কুশানের কাঁধ থেকে আলগা হয়ে যাওয়া ব্যাগটা টান মেরে চলন্ত বাস থেকে লাফ মেরে নেমে গেল রাস্তায়।
ব্যাপারটা বুঝতে সামান্য সময় লাগল কুষাণের। তারপর সাত-পাঁচ না ভেবে ও নিজেও চলন্ত বাস থেকে লাফ মেরে নামল রাস্তায়।
রাস্তায় পড়ে গেল কুষাণ। পিছন থেকে আসা কয়েকটা বাইক কোনওমতে ব্রেক কষে দাঁড়াল। ওর উপর চিৎকার করে উঠল চালকরা।
কুষাণ পাত্তা দিল না। দেখল ইতিমধ্যে ছেলেটা ব্যাগ হাতে বাগবাজারের রাস্তা ধরে দৌড় দিয়েছে। ও নিজেও রাস্তা দিয়ে দ্রুত বেগে ধেয়ে আসা গাড়িদের কাটিয়ে দৌড়তে লাগল।
আচমকা এমনটা হয়ে যাওয়ায় আশপাশের লোকজন একটু অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। কিন্তু কুষাণের কোনও দিকে তাকানোর সময় নেই। ওই ব্যাগের মধ্যে ওর জীবন আছে। ওর জেঠু-জেঠিমার আশা আছে। ওর কাজের সম্ভাবনা আছে। ওটা নিয়ে পালাবে? এত সোজা!
বহুদিন পরে বেকার, সেভাবে কাজ না-পাওয়া, মনমরা কুষাণের মধ্যে থেকে যেন সেই পুরনো, হারিয়ে যাওয়া অ্যাথলিট কুষাণ বেরিয়ে এল।
সামনের ছেলেটা ওর চেয়ে পঞ্চাশ মিটার মতো এগিয়ে আছে। রোগা, অল্পবয়সি ছেলে। বেশ জোরেই দৌড়চ্ছে।
কুষাণের মনে পড়ে গেল ন্যাশনাল গেমসের ফাইনালে এমন করেই ডেকাথলনের প্রথমদিনে চারশো মিটার দৌড়ে তামিলনাডুর বেঙ্কাইয়া ওর চেয়ে পঞ্চাশ মিটার এগিয়ে ছিল। কিন্তু রেসে একটা সময় অবধি এগিয়ে থাকা মানেই জেতা নয়। কুষাণের খুব মনে পড়ে ওর কোচ লাটুদার কথা। লাটুদা বলত, “জানিস কুষাণ, হারজিত ব্যাপারটা না, মনের মধ্যে ঘটে। তুই যদি ভাবিস যে হেরে গেলি তবে হেরেই যাবি।”
সেদিন ভেঙ্কাইয়া হাওয়ার মতো ছুটছিল। কিন্তু কুষাণও ছাড়েনি। মনে-মনে হেরে যায়নি। আর আজও হেরে যাবে না।
কুষাণ গতি বাড়াল। পুরো পায়ের পাতার উপর না দৌড়ে পায়ের পাতার সামনের অংশের উপর ভর করে দৌড়তে লাগল।
সামনের ছেলেটা এবার হাঁফাচ্ছে। বারবার পিছন দিকে তাকাচ্ছে। মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে কুষাণকে এভাবে একনাগাড়ে তাড়া করতে দেখে ও খুব অবাক হয়েছে। কিছুটা ভয়ও পেয়েছে।
কুষাণ আরও গতি বাড়াল। আর কুড়ি মিটার। আর পনেরো। দশ। এবার পাঁচ। সামনে আর-একটা বড় রাস্তা। এটা পার হয়ে গেলে আবার ধরা মুশকিল হয়ে যাবে ছেলেটাকে।
কুষাণ আর চান্স নিল না। তাইকোন্ডো জানে ও। ফলে উড়ে গিয়ে সামনের পা-টা দিয়ে ছেলেটার পিঠে মারল। ছেলেটা আচমকা অমন মার খেয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ল রাস্তায়। আশপাশের লোকজন ঘাবড়ে গিয়ে ছিটকে গেল এদিক ওদিক।
ছেলেটার মারধর খাওয়া অভ্যেস আছে। মাটিতে পড়ে গিয়ে চোট পেলেও উঠে দাঁড়াল চট করে। তারপর পকেট থেকে একটা ছুরি বের করে চকাৎ করে মেলে ধরল সামনে। বলল, “আয়, আয় এবার...”
কুষাণ চোয়াল শক্ত করে এগিয়ে গেল। এখান থেকে আর ফেরার কোনও মানে নেই। ছেলেটা বাঁ-হাতে ধরে রয়েছে ওর ব্যাগ, আর ডানহাত দিয়ে ছুরিটা হাওয়ায় এলোপাথাড়ি চালাচ্ছে।
কুষাণ সামনে যাওয়ামাত্র ছেলেটা ছুরিটা আড়াআড়িভাবে চালাল ওর পেট লক্ষ করে। কুষাণ সরে গিয়ে জুতোর সোল দিয়ে প্রচণ্ড জোরে লাথি মারল ছেলেটার কবজিতে। ছেলেটার হাত থেকে ছিটকে পড়ে গেল ছুরিটা। কুষাণ ছেলেটাকে নড়ার সুযোগ দিল না আর। ঝাঁপিয়ে পড়ে পিছন দিক থেকে ওর ঘাড় আর মাথা লক করে ধরল হাত পেঁচিয়ে। তারপর একটা ঝাঁকুনি দিয়ে ফেলে দিল মাটিতে। হাত থেকে ব্যাগ পড়ে গেল ছেলেটার। কুষাণ ছেলেটাকে ছেড়ে দিয়ে কুড়িয়ে নিল সেটা।
ছেলেটা হাঁফাচ্ছে। মাটিতে শুয়েই তাকাচ্ছে ওর দিকে।
কুষাণ বলল, “কে পাঠিয়েছে তোকে? বল কে পাঠিয়েছে?”
ছেলেটা আচমকা তিড়িং করে লাফিয়ে উঠল মাটি থেকে। তারপর তিরবেগে দৌড়ে গিয়ে সামনে দিয়ে যাওয়া একটা বাসে উঠে পড়ল।
কুষাণ আর ধাওয়া করল না। ব্যাগটা পেয়ে গিয়েছে। আর ঝামেলা বাড়িয়ে লাভ নেই।
আশপাশ থেকে এবার লোকজন এগিয়ে আসছে ওর দিকে। কেউ জিজ্ঞেস করছে, কী হয়েছে? কেউ বলছে, আজকাল দিনকাল কেমন খারাপ! কেউ আবার ওকে পুলিশে যেতে বলছে।
কিন্তু কুষাণ কাউকে উত্তর না দিয়ে নিজের পথ ধরল। ব্যাগটার স্ট্র্যাপটা নষ্ট হয়ে গিয়েছে। তা হোক। আর বেহাত না হলেই হল।
ভুরু কুঁচকে আছে কুষাণের। ও জয়রামের কাছে শুনেছে যে ডায়েরিটা চুরি করার চেষ্টা হয়েছে। ও সাবধান করেছিল জয়রামকে যে এমনটা হতে পারে। তারপর ওর সঙ্গেও এমন হল! ব্যাপারটা ভাল ঠেকছে না। বিদেশ-বিভুঁইয়ে যাবে। সেখানে যে কী হবে! কুষাণ বুঝতে পারছে সামনের দিনগুলো খুব কিছু সহজ হবে না।
ইয়াকুটিয়া রাশিয়ার মধ্যে একটি অটোনমাস রিপাবলিক। আয়তনে এটা প্রায় ভারতবর্ষের মতোই বড়। ইয়াকুৎস্ক এর রাজধানী। পূর্ব সাইবেরিয়ার অন্যতম শীতল আর পুরনো শহর হল এই ইয়াকুৎস্ক।
জুন মাস এখন। এখানে তথাকথিত গরমকাল। রাতে তাপমাত্রা ছয়-সাত ডিগ্রি নামলেও সকালে কুড়ি ডিগ্রির কাছাকাছি থাকে।
এখানে গতকাল এসে পৌঁছেছে কুষাণ। গরমকাল বলে এখানে এখন ঠিক রাত হয় না। এই ব্যাপারটা ও আগে শুনলেও ঠিক বুঝত না। এখন এখানে এসে দেখেছে যে সূর্য ডুবছে রাত দশটার কাছাকাছি আর আবার সূর্য উঠেও যাচ্ছে রাত পৌনে তিনটে নাগাদ। আর মাঝের সময়টাতেও যে খুব একটা অন্ধকার হচ্ছে, তা নয়। বরং কেমন একটা শেষ বিকেলের মতো আলো চারদিকে। এখানকার লোকে একে বলে হোয়াইট নাইট বা সাদা রাত্রি!
শীতকালে শুনেছে মাইনাস পঞ্চাশ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি পৌঁছয় তাপমাত্রা। আর কেউ যদি ঠিকমতো নিজেকে ঢেকে না রাখে তা হলে অনেকেরই পায়ের হাতের আঙুল বা নাক খসে যায়।
এখন এসব ঝামেলা নেই। তাও বাইরে বেরনোর সময় পিঠের ব্যাগে কুষাণকে মোটা জ্যাকেট রাখতে বলেছে রিকো।
রিকো ছেলেটার বয়স বছরচব্বিশের মতো। মস্কোর ছেলে। কিন্তু ইয়াকুৎস্কেও ওর যোগাযোগ খুব ভাল। আসলে জয়রামের যে অ্যান্টিক জিনিসের ব্যবসা আছে তার সূত্রেই পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গার মানুষদের সঙ্গে ওঁর জানাশোনা আছে।
রিকো কুষাণের লোকাল কনট্যাক্ট। মস্কো থেকে ওর সঙ্গে এসেছে ইয়াকুৎস্কে। কালকের মধ্যে কুষাণকে রিকো সব ব্যবস্থা করে দেবে যাতে জঙ্গলে খুঁজতে পারে রনিতকে।
কলকাতা থেকে দিল্লি। সেখান থেকে মস্কো হয়ে ইয়াকুৎস্কে আসতে অনেকক্ষণ সময় লেগেছে কুষাণের। জেট ল্যাগ চলছে ওর। কিন্তু সেটাকে খুব একটা আমল দিচ্ছে না।
ও এখন বসে রয়েছে ইয়াকুৎস্কের ম্যামথ মিউজ়িয়ামে। এখান থেকে ওকে রিকো নিয়ে যাবে সেভেন্টিন্থ কোয়ার্টার বলে একটা জায়গায়।
ম্যামথ মিউজ়িয়ামটা ইয়াকুৎস্কের অন্যতম আকর্ষণ।
এখানে রিকোর এক দিদি আছেন। ইরিনা নাম। ইরিনা বিজ্ঞানী। প্যালিয়েন্টোলজিস্ট। প্রাণীদের জীবাশ্ম ও তাদের দেহাবশেষ নিয়ে কাজ করে।
রিকোর ব্যক্তিগত কীসব কাজ আছে ইরিনার সঙ্গে। তাই কুষাণকে বাইরে একটা ছোট লাউঞ্জ মতো জায়গায় বসিয়ে নিজে সামনের অফিসে ঢুকেছে।
কুষাণ চারদিকটা দেখল। এখানে লোকজন খুব কম। রাস্তাঘাট পরিষ্কার। জুন মাস বলে মাঝে-মাঝে বৃষ্টি হচ্ছে। তারপরেই আবার মেঘ কেটে নীল আকাশ দেখা যাচ্ছে। চারদিকে চাইনিজ় লোকজন দেখা যাচ্ছে বেশ। রিকো বলছিল এদের অনেকেই নাকি এখানে পাকাপাকিভাবে বসবাস করে।
হাতের মোবাইল ফোনটা দেখল কুষাণ। এখানে এসে লোকাল কানেকশন নিয়েছে। ফোন থেকে জয়রাম আর জেঠুর সঙ্গেও কথা বলেছে।
জেঠু তো খুবই চিন্তিত ছিল। কিছুতেই আসতে দিচ্ছিল না কুষাণকে।
বলেছিল, “তোকে যেতে হবে না অত দূরে! কী হবে টাকা দিয়ে? আমার গ্রামে যেটুকু জমি আছে সেটা বিক্রির চেষ্টা করছি। তাই দিয়ে তোর জেঠিমার যতটুকু চিকিৎসা করার করাব।”
কুষাণ আসলে সত্যি কথা বলেনি জেঠুকে। বলেছিল, কাজে যাচ্ছে। জয়রাম সেনগুপ্ত নামে একজন ভদ্রলোক ওকে কিছু অ্যান্টিক জিনিস আনার অর্ডার দিয়েছেন। সেই হিসেবে ও যাচ্ছে রাশিয়া। জেঠু যে বিশ্বাস করেছে তা নয়। তাই কিছুতেই এখানে আসতে দিচ্ছিল না। আসলে অতগুলো টাকা কেন কেউ এই কাজের জন্য দেবে সেটা জেঠুকে বোঝাতে পারছিল না কুষাণ। জেঠু ভাবছিল নিশ্চয়ই কোনও কঠিন আর ঝুঁকির কাজ করতে হবে কুষাণকে! খারাপ কাজও হয়তো করতে হবে!
জেঠুকে অনেক বুঝিয়েও শেষে না পেরে কুষাণ বলেছিল, “আমায় তো বিশ্বাস করো নাকি? তোমার মনে হয় আমি কোনও খারাপ কাজ করব!”
জেঠু বুঝেছিল যে আপত্তি করে লাভ হবে না।
সামনের দরজা এবার খুলে গেল। কুষাণ দেখল রিকো বেরিয়ে এসেছে। ওর সঙ্গে একটি মেয়েও আছে। কুষাণ উঠে দাঁড়াল।
রিকো এসে দাঁড়াল ওর সামনে। তারপর কুষাণের দিকে তাকিয়ে বলল, “মিট মাই সিস্টার। ইরিনা। আমি এর কথাই তোমায় বলেছিলাম।”
ইরিনা বেশ লম্বা। কুষাণের প্রায় মাথায়-মাথায়। ফরসা। লাল চুল। চোখে সোনালি ফ্রেমের চশমা।
কুষাণ ইরিনাকে দেখে হাসল।
ইরিনা কিন্তু হাসল না বরং ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে রইল ওর দিকে। তারপর বলল, “তুমিও এখানে মাটির তলা থেকে ওই ম্যামথের দাঁত বের করতে এসেছ! কেউ কি তোমরা একবারও পরিবেশ আর বিজ্ঞানের কথা ভাববে না!”
কুষাণ ঘাবড়ে গেল! বলল, “আমি? মানে... আমি কী করলাম!”
ইরিনা বলল, “বিস্তীর্ণ সাইবেরিয়া অঞ্চলে হাজার-হাজার বছর আগে উলি ম্যামথরা ঘুরে বেড়াত। পরে তারা বিলুপ্ত হয়ে যায়। আর এই অঞ্চলের মাটির তলায় চাপা পড়ে যায়। সাইবেরিয়া যেহেতু খুবই ঠান্ডা জায়গা তাই এর মাটির তলায় বরফের মোটা লেয়ার আছে। একে বলে পারমাফ্রস্ট। এই বরফের মধ্যে হাজার-হাজার বছর ধরে উলি ম্যামথরা চাপা পড়ে আছে। আর মাঝে-মাঝে তাদের দাঁত বেরিয়ে আসে মাটির উপর। যেহেতু এগুলোও হাতির দাঁতের মতোই তাই এরও দাম অনেক। ফলে প্রচুর মানুষ মাটি খুঁড়ে এই দাঁত বের করতে সাইবেরিয়ান তুন্দ্রায় যায়। জঙ্গলে ঘোরে! তারা লাঠি দিয়ে খুঁচিয়ে আগে এই দাঁত বের করত। কিন্তু তাতে সময় বেশি লাগায়, এখন ওয়াটার জেট পাম্প ব্যবহার শুরু করেছে। নদী থেকে পাম্পের সাহায্যে জল তুলে হাই প্রেশারে মাটিতে মেরে মাটি সরিয়ে হাঁতির দাঁত বের করার চেষ্টা করছে মানুষজন। এতে যে তারা খুব একটা সফল হচ্ছে তা নয়। কারণ সাইবেরিয়া বিশাল অঞ্চল। অধিকাংশ সময়ই দাঁত পাওয়া যায় না। কিন্তু এতে যে মাটির ক্ষয় হচ্ছে, এই যে নদী দূষণ হচ্ছে, ডিজ়েলচালিত পাম্পের ধোঁয়ায় পরিবেশ দূষণ হচ্ছে, সেসব কি কেউ ভাববে না? তা ছাড়া ম্যামথের দাঁত নির্বিচারে বিক্রি করা হচ্ছে। ওই দাঁত কিন্তু বৈজ্ঞানিক গবেষণার ব্যাপারে খুবই কাজে লাগত। ওই দাঁত দেখে সেই সময়ে উলি ম্যামথদের জীবনযাপন, সেই সময়ে তাদের পরিবেশসহ আর কত কী যে জানা যায়! কিন্তু সেসব করতে দেওয়ার আগেই সব বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। যার অধিকাংশই বেআইনিভাবে। তাই বলছি এসব করার আগে ভাবো। পৃথিবীকে এভাবে টাকার লোভে ধ্বংস কোরো না!”
ইরিনা উত্তেজিতভাবে কথা শেষ করে চশমাটা খুলে ফেলল। কুষাণ দেখল মেয়েটার মুখ রাগে লাল হয়ে গিয়েছে। হাঁফাচ্ছে বেশ।
ও হাসল। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য বলল, “আমি ওসব করতে আসিনি। সাইবেরিয়ান জঙ্গলের উপর একটা লেখা লিখব। আর কিছু না। আপনি প্লিজ় উত্তেজিত হবেন না।”
ইরিনা থমকাল। সামান্য লজ্জাও পেল যেন।
কুষাণ দেখল রিকো হাসছে। আসলে কুষাণ এখানে কেন এসেছে এই বিষয়ে কেউ জিজ্ঞেস করলে কী বলতে হবে, সেটা রিকোই বলে দিয়েছিল।
ইরিনা বলল, “সরি, আসলে এখানে ২০১২ সাল থেকে এমন একটা অবস্থা শুরু হয়েছে! তার আগেও মাটি থেকে উলি ম্যামথের দাঁত বেরিয়ে থাকত। কিন্তু সহজ-সরল গ্রামবাসীরা সেসব বুঝত না। ভাবত এগুলো কোনও ভয়ংকর প্রাণীর খোলস বা কোনও অপদেবতার চিহ্ন। ফলে এগুলো ওরা ধরেও দেখত না। কিন্তু এখন পরিস্থিতি পালটে গিয়েছে। বাইরের লোকজন বুঝে গিয়েছে সাইবেরিয়ার মাটির তলায় সোনা আছে! সাদা সোনা!”
“সাদা সোনা?” কুষাণ তাকাল ইরিনার দিকে।
“হ্যাঁ, সাদা সোনা। হাতির দাঁতকে সাদা সোনাই বলে। কয়েক লক্ষ ডলার দাম এক-একটা দাঁতের। চিন, জাপানে এর চাহিদা খুব। তুমি এখন সাদা সোনার দেশে এসেছ,” ইরিনা বলল।
কুষাণ হাসল, “হতে পারে। কিন্তু আমি জঙ্গল এক্সপ্লোর করব। আর কিছু না।”
ইরিনা হাসল এবার। তারপর বলল, “সাইবেরিয়া পৃথিবীর অন্যতম রহস্যময় জায়গা। অন্যতম বিপদসংকুলও বটে। তুমি দূর দেশ থেকে এসেছ। ফলে সাবধানে যাবে। এখানে সামান্য ভুল হলেই কিন্তু মৃত্যু! ফলে বি অন ইয়োর গার্ড! তোমার জার্নি সহজ হবে না।”
কুষাণ মাথা নাড়ল। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস চেপে বলল, “আমি জানি। আর সেভাবে প্রস্তুত হয়েই এসেছি। এই জার্নিটা আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। আই উইল টেক কেয়ার অব মাইসেল্ফ।”
ক্যাফেটা ছোট। লোকজনও কম। আর সামনের কাচের দরজা দিয়ে উলটো দিকের ম্যামথ মিউজ়িয়ামটা দেখা যাচ্ছে। একটু আগে একটা রাশিয়ান ছেলের সঙ্গে কুষাণ ঢুকেছে ওখানে। এখনও বেরয়নি। বেরলেই আবার পিছু নেবে মণিময়। এক মুহূর্তের জন্যও ওকে চোখের আড়াল করা যাবে না।
হাতঘড়িটা দেখল মণিময়। তারপর পাশে তাকাল। ওর সঙ্গে আরও দু’জন আছে। জিজি আর টম। দু’জনেই এখানকার লোক। আর দু’জনেই অন্ধকার জগতের।
জিজি লোকটা মধ্যচল্লিশ। কম কথা বলে। আগে রাশিয়ান আর্মিতে ছিল। জিজি গুলশনের খুব পরিচিত ও বিশ্বস্ত। আর টম ছুটকোছাটকা নানা বেআইনি কাজকম্মো করে। এদের সঙ্গে করেই কাজে নেমেছে মণিময়। আসলে নামতে বাধ্য হয়েছে। ওর যে পরিমাণ টাকা ধার আছে গুলশনের কাছে তার বিনিময়ে ওকে এই কাজটা করতেই হচ্ছে।
গুলশনকে দেওয়া কথামতো কলকাতায় কুষাণের থেকে ডায়েরিটা নেওয়ার একটা চেষ্টা করেছিল মণিময়। কিন্তু সফল হয়নি। বরং যে ছেলেগুলোকে বলেছিল অপারেশানটা করতে, তারা প্রাথমিকভাবে সফল হলেও পরে কুষাণের হাতে এমন হেনস্থা হয়েছে যে বলার নয়।
কুষাণ খুব ফিট আর তাইকোন্ডো জানা ছেলে। ওর সঙ্গে ডিরেক্ট কমব্যাটে জেতা মুশকিল। তাই মণিময়কে বুদ্ধি খাটাতে হবে।
ডায়েরিতে দামি কিছু জিনিসের হদিশ লেখা আছে। কিন্তু সেটা কী, কেউ সঠিক জানে না। এটা এক রকম অন্ধকারে তির চালানোর মতোই।
মণিময় আগে ভেবেছিল যে কুষাণের থেকে ডায়েরিটা কেড়ে নিয়ে নিজেরাই খুঁজে নেবে দামি জিনিসটা কী! কিন্তু তারপরে মত বদলেছে। ভেবেছে, আসল কাজটা কুষাণই করুক। কারণ ওতে একটা সংকেত আছে। সেটার মানে বের করা ওর কম্মো নয়।
তাই ঠিক করেছে ওরা শুধু কুষাণকে ফলো করে যাবে। তারপর সত্যি যদি কিছু খুঁজে পায় কুষাণ, তা হলে ঠিক সময়ে আচমকা ওকে আক্রমণ করে কেড়ে নেবে জিনিসটা। আর তখন যদি কুষাণ বাধা দেয়! মণিময় জানে কুষাণকে শেষ করে দিতে হাত কাঁপবে না জিজির।
গতকাল কুষাণ এসেছে ইয়াকুৎস্কে। কিন্তু কুষাণ জানে না যে কলকাতা থেকেই ওর পিছু নিয়েছে মণিময়।
“ওই যে,” পাশ থেকে টম আলতো করে খোঁচা দিল মণিময়কে।
মণিময় দেখল রাস্তার উলটো দিকে মিউজ়িয়াম থেকে বেরিয়েছে কুষাণ। সঙ্গে সেই রাশিয়ান ছেলেটাও রয়েছে।
মণিময়রা ক্যাফে থেকে বেরিয়ে একটা বড় গাড়ির আড়ালে দাঁড়াল। ওদের সঙ্গে গাড়ি রয়েছে। সেটা কাছেই পার্ক করেছে ওরা।
মণিময় টমকে চাপা গলায় বলল, “তুমি গাড়িতে বসে গাড়িটা স্টার্ট দিয়ে রাখো। ওরা কোনও গাড়ি ধরলেই আমরা ফলো করব ওদের। কেমন?”
টম মাথা নেড়ে চলে গেল পার্ক করা গাড়িটার দিকে।
মণিময় দেখল কুষাণের সঙ্গের ছেলেটা মোবাইলের অ্যাপ থেকে একটা ক্যাব ডাকল। তিন-চার মিনিটের মধ্যে চলে এল গাড়ি। কুষাণ আর ছেলেটা গাড়িতে উঠে বেরিয়ে গেল।
মণিময় একটু দূরে দাঁড়ানো টমকে ইশারা করল গাড়ি নিয়ে আসার জন্য। টম প্রস্তুত ছিল। নিমেষের মধ্যে গাড়িটা এনে দাঁড় করাল ওদের সামনে। মণিময় আর জিজি লাফিয়ে উঠল গাড়িতে। তারপর বলল, “চলো গাড়িটার পিছনে।”
টম কুষাণদের গাড়ি লক্ষ করে এগোতে লাগল।
মণিময় দেখল জিজি মোবাইল বের করে ডায়াল করে কানে লাগাল।
মণিময় নিজেও মোবাইল বের করল এবার। তারপর একটা নম্বর ডায়াল করে কানে লাগাল। চারবার রিং হওয়ার পর ওদিক থেকে ধরল একজন। মণিময় বলল, “আয়াম অন দ্য টার্গেট।”
গুলশন ফোনটা নামিয়ে হাসল নিজের মনে। যাক, একদম ঠিকঠাক আছে সব কিছু। মণিময়কে যতটা অপদার্থ ভেবেছিল ততটাও নয়। কাজটা যদি সফল হয় তা হলে যে পরিমাণ লাভ হবে ভাবা যায় না।
ওই সাইবেরিয়া অঞ্চলে সোনা আর প্ল্যাটিনামের খনি আছে। তবে ও যেটা ভাবছে সেটা যদি থাকে, তা হলে তো কথাই নেই!
রোডিয়াম! পৃথিবীর সবচেয়ে দামি আর দুর্লভ ধাতু! রাশিয়ায় এর অস্তিত্ব আছে। আর ওর কাছে গোপন সূত্রে খবর আছে যে সাইবেরিয়ার কোথাও এর খনি আছে। কিন্তু এমনিতে সরকার থেকে সেটা অস্বীকার করা হয়েছে।
রনিত সেনগুপ্তকে নিয়ে কিছুদিন হল লেখাপড়া করেছে গুলশন। মেটালার্জিস্ট। কিন্তু মেটালার্জি ছেড়ে ফোটোগ্রাফার হয়ে যায় লোকটা। ডায়েরিতে যে জিনিসের কথা বলা আছে তা খুব রেয়ার আর দামি। সেরকমই ওকে বলেছে গিরিধারী আর মণিময়। কিন্তু জিনিসটা কী সেটা লেখা নেই।
ইশ, ডায়েরিটা যদি পাওয়া যেত! তা হলে ও নিজে দেখত কিছু ক্লু পাওয়া যায় কি না লেখা থেকে। কিন্তু সে তো হল না। এখন দেখা যাক মণিময় কত দূর কী করে।
গাড়িতে আর-একটু আরাম করে বসল গুলশন। দুপুর নামছে কলকাতায়। ইয়াকুৎস্কের চেয়ে সাড়ে তিন ঘণ্টা পিছিয়ে আছে এখানকার সময়। মনে-মনে ও যেন দেখতে পেল কুষাণদের গাড়ি ফলো করে এগিয়ে চলেছে মণিময়, জিজিরা। নিজের মনে হাসল গুলশন। রোডিয়াম যদি পাওয়া যায়, তা হলে কত টাকার যে মালিক হয়ে যাবে ভাবতে পারছে না ও। দক্ষিণ আফ্রিকার একটা সংস্থার সঙ্গে কথা হয়ে আছে ওর। দু’জনে মিলে পার্টনারশিপে ধাতু বের করবে। ওখানে সরকারকে সামলাবে ওই সংস্থা। টাকাপয়সা দিয়ে ম্যানেজ করা হবে। তারপর বাকিটা শুধু ডলার আর ডলার! ভাবা যাচ্ছে না!
আরামে চোখ বন্ধ করল গুলশন। টাকার চেয়ে বেশি ও আর কিছু ভালবাসে না।
কিন্তু দিবাস্বপ্নে না ডুবে যদি সামান্যও লক্ষ করত গুলশন, তা হলে দেখতে পেত একটু পিছনে একটা ছোট্ট হ্যাচব্যাক গাড়ি, ওর গাড়ি লক্ষ করে আসছে। আসলে টাকার স্বপ্নে মশগুল গুলশন জানে না যে গাড়িটা বেশ কিছুদিন ধরেই লক্ষ করছে ওকে।
রিকো গাড়িটা রাস্তার ধারে পার্ক করল। তারপর ইশারা করল কুষাণকে। ওরা দু’জনেই নামল।

জায়গাটার নাম সেভেন্টিন্থ কোয়ার্টার। অপেক্ষাকৃত গরিব মানুষদের বাস এখানে।
ইগর নামের যে সাংবাদিকটি জয়রামের কাছে এসেছিল, সে নিজের পুরনো রেকর্ড ঘেঁটে আয়সেন নামে একজনের ঠিকানা দিয়েছে। সে এই সেভেন্টিন্থ কোয়ার্টার অঞ্চলে থাকে। তবে সাত বছর আগের ঠিকানা। লোকটা না-ও থাকতে পারে এখন। তাও খোঁজ তো নিতেই হবে।
খানিকক্ষণ খুঁজে রিকো ঠিক বের করে ফেলল আয়সেনের বাড়ির লোকেশন।
কুষাণ আর রিকো আবার গাড়িতে উঠল। এখান থেকে মিনিটদশেক দূরে একটা ছোট মুদিখানা আছে। তার পাশ দিয়ে সরু গলি ঢুকে গিয়েছে। সেই গলিতেই আয়সেন থাকে।
মুদিখানা বা গলিটা সহজেই দেখতে পেল কুষাণরা। গলির একদম মুখেই বাড়িটা।
গাড়িটা বড় রাস্তায় রেখে আয়সেনের বাড়ির দরজায় টোকা দিল কুষাণ।
পুরনো, কাঠের বাড়ি। মাথায় কালো হয়ে যাওয়া চিমনি। দেখেই বোঝা যাচ্ছে যে, খুব একটা রক্ষণাবেক্ষণ নেই বাড়িটার।
আবার টোকা দিল কুষাণ। এবার বাড়ির ভিতর থেকে ইয়াকুৎস্কের ভাষা অর্থাৎ তুর্কিক ভাষায় কিছু কথা ভেসে এল। তারপর দরজাটা খুলে গেল।
একটা ছেলে। রোগা। ফ্যাকাসে। মাথায় বড় চুল। গালে এলোমেলো দাড়ি। দেখেই বোঝা গেল ছেলেটা ওদের দেখে খুব বিরক্ত হয়েছে।
রিকো তুর্কিক ভাষা জানে। ফলে ওই কথাবার্তা বলল। কুষাণ শুধু বুঝল যে আয়সেন মারা গিয়েছে। আর এ হল আয়সেনের ভাইয়ের ছেলে। নাম কুদুক।
রিকো ওদের ভাষায় সংক্ষেপে যা বলল তা হল, ছয় বছর আগে ইগর নামে একজন সাংবাদিককে আয়সেন নিয়ে গিয়েছিল জঙ্গলে ম্যামথ টাস্কের শিকারিদের জীবনযাত্রা আর কাজ দেখার জন্য। এখন ছয় বছর পরে তাদের কাজের কতটা পরিবর্তন হয়েছে সেই নিয়ে খবর করতে এসেছে কুষাণ। তাই কুদুকের সাহায্য চায়।
কুদুকও নিজের ভাষায় উত্তর দিল।
রিকো গোটা কথোপকথনটা বিস্তারিতভাবে বলল কুষাণকে।
কুষাণ বুঝল যে, আয়সেন না থাকলেও কুদুক আছে এখন। ও নিয়ে যেতেই পারে কুষাণকে। আর কুদুক শুধু বোটই চালায় না। ও নিজেও একজন টাস্ক শিকারি। তবে বেআইনি ভাবে কাজ করে। লাইসেন্স নিয়ে এই ম্যামথের দাঁত শিকার করতে গেলে খুব হ্যাপা। তাই ওসবের মধ্যে ওরা যায় না। কুদুকদের তিনজনের একটা দল আছে। প্রতি বছর ওরা বেরয়। আর খুব ভাল সময়ে এসেছে কুষাণ। কারণ পরশুদিনই ওরা বেরবে জঙ্গলে। ইচ্ছে হলে ওদের সঙ্গে যেতেই পারে কুষাণ। তবে ওকে চার হাজার ডলার দিতে হবে যাওয়ার জন্য। আর অতিরিক্ত এক হাজার ডলার দিতে হবে কুষাণের রেশনের জন্য। কারণ জঙ্গলে তো খাবার পাওয়া যায় না, তাই এখান থেকেই সব খাবার কিনে নিয়ে যেতে হয়। আর-একটা শর্ত দিয়েছে কুদুক, যে ওদের ব্যাপারে কাউকে কিছু বলতে পারবে না কুষাণ।
কুষাণ হেসে বুড়ো আঙুল তুলে দেখাল যে সব ঠিক আছে।
কুদুক তাকাল কুষাণের দিকে, তারপর বলল, “ইউ এগ্রি?”
কুষাণ অবাক হল, “তুমি ইংরেজি জান?”
কুদুক বলল, “না জেনে উপায় আছে? আমাদের টাস্ক কেনে চিনারা। ওরা তো তুর্কিক ভাষা বলে না। তাই ইংরেজি শিখেছি আর কী। আসলে পেটের খাতিরে আমরা সব কিছু করতে পারি।”
রিকো বলল, “তোমার উপর ভরসা করা যায় তো?”
কুদুক হাসল। বলল, “আয়সেন আমার কাকা ছিলেন। আমায় মানুষ করেছেন। তার রেফারেন্সে এসেছ তোমরা। আমি জীবন দিয়ে তোমার বন্ধুকে প্রোটেক্ট করব। পরশু সকালে চলে এসো এখানে। সাতটা নাগাদ। চার হাজার ডলার তখন দিলেই হবে। আজ শুধু হাজার ডলার দিয়ে যাও। রেশন তুলে রাখব। আর শোনো, মশারি নেবে। আর মৌমাছি চাষের সময় যেমন নেট ঢাকা টুপি পরে, তেমন টুপিও নেবে। কেমন?”
কুষাণ অবাক হল, “কেন?”
“ম্যালেরিয়ায় মারা যেতে চাও?” কুদুক হাসল, “জঙ্গলে প্রচণ্ড মশার উপদ্রব।”
হাজার ডলার দিয়ে পরশু আসবে বলে গাড়িতে গিয়ে উঠল কুষাণ আর রিকো। নিজের ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে হাত নাড়ল কুদুক। হাসল।
কুষাণরা গাড়ি করে বেরিয়ে গেল।
একটু দূরে গাড়ির মধ্যে বসে ঘটনাটা পুরোটা দেখল মণিময়। তারপর জিজিকে বলল, “ফিরে চলো এখন। কাল আমরা এখানে আসব একবার।”
“এখানে? কেন?” অবাক হল জিজি।
মণিময় হাসল। বলল, “সব কি এখনই বলে দেব?”
জিজি অবাক হয়ে তাকাল মণিময়ের দিকে।
মণিময় হাসল। তারপর বলল, “ক্রমশ প্রকাশ্য। চলো এখন।”
চারদিকে লার্চ আর স্প্রুস গাছের জঙ্গল। এখানে-ওখানে ছোটখাটো পাহাড়। মাঝে আবার কোথাও ঢেউখেলানো মাঠের মতো ফাঁকা। এর মাঝখান দিয়ে কলিমা নদী এঁকেবেঁকে বয়ে গিয়েছে।
সকালে বেরিয়েছে কুষাণ, কুদুক আর সুলুস। কুষাণ বলেছিল রিকোকে যেতে। কিন্তু রিকো কিছুতেই রাজি হয়নি। বরং বলেছে, “দরকারে আমি এই কাজ ছেড়ে দেব, কিন্তু ওইখানে যাব না।”
কুষাণ আর কিছু বলেনি। কী হবে বলে? যে ইচ্ছুক নয়, তাকে জোর করার মানে নেই।
সকালবেলা বেরিয়েছে ওরা। আর এতক্ষণে অনেকটা পথ চলে এসেছে। পথে আরও দুটো দলকে দেখেছে যারা ওদের মতোই যাচ্ছে জঙ্গলে।
কুদুক ছেলেটা মোটামুটি ইংরেজি বলতে পারে। সুলুসও পারে, তবে ভাঙা-ভাঙা। এই ছেলেটা নাকি কুদুকের সঙ্গেই কাজ করে।
কুষাণ ঘড়ি দেখল। দুপুর একটা বাজে। বেশ ঠান্ডা। ঝিরঝির করে বৃষ্টি হচ্ছে মাঝে-মাঝে। চারদিকে যত দূর চোখ যাচ্ছে, জনমানবহীন আদিম পৃথিবী ছড়িয়ে রয়েছে।
ওদের বোটটা ছোট। রংচটা। সামনে কাচের উইন্ডস্ক্রিন। বোটের পাটাতনের নীচে লাগেজ রাখার জায়গা। সেখানে তাঁবু ও বাকি সরঞ্জাম রাখা। আর আছে একটা ওয়াটার জেট পাম্প। ডিজ়েলের ট্যাঙ্ক।
সুলুস জিজ্ঞেস করল, “আমরা কি দাঁড়াব কোথাও? আমার একটু দরকার আছে। তা ছাড়া একটু আগুন জ্বালিয়ে খাবার গরম করে নেব। লাঞ্চ তো করতে হবে।”
কুদুক হাসল, “তা ঠিক। অনেক্ষণ বেরিয়েছি আমরা।”
কুদুক সাবধানে বোটটাকে নদীর একপাশে দাঁড় করাল। সুলুস নেমে গেল আগে। তারপর একটা লোহার বড় লাঠি মাটিতে পুঁতে তার সঙ্গে বোটের মোটা কাছি, মানে দড়িটা বেঁধে দিল। এতে বোটটা নদীর স্রোতের টানে ভেসে চলে যাবে না।
ওরা সবাই হাঁটু অবধি গামবুট পরে রয়েছে। নদীর পাড়টা কাদামাটিময়। নরম। মাটিতে পা বসে যাচ্ছে। তাও সাবধানে নামল কুষাণ। একটা ছোট স্টোভ আর কয়েকটা খাবারের টিনসহ বাসনপত্র নামাতে সাহায্য করল কুদুকদের।
কুষাণের কেন কে জানে কুদুককে খুব একটা ভাল লাগছে না। সারাক্ষণ কেমন একটা ঢুলুঢুলু চোখ। টাকা নিয়ে কথা। মুখটা ব্যাজার।
সকালে কুষাণ নিজের জিনিসপত্র নিয়ে আসা মাত্রই বলেছিল, “আমার চার হাজার ডলার?”
কুষাণের বিরক্ত লেগেছিল। ও পালিয়ে যাচ্ছে নাকি! যারা টাকাপয়সা নিয়ে খিটিরমিটির করে তাদের একদম পছন্দ করে না কুষাণ। ওর নিজেরই টাকাপয়সা নিয়ে টানাটানি চলে, তা বলে কিন্তু কোনওদিন সেটা নিয়ে বাড়াবাড়ি করে না।
চার হাজার ডলার দিয়ে দিয়েছিল কুষাণ। কথা বাড়ায়নি। কিন্তু ওর মনে হচ্ছিল এই লোকটার সঙ্গে থাকাটা মুশকিল হবে।
নদীর পাড়ে নেমে একটা পাথরের উপর বসল কুষাণ। তারপর পিঠের ব্যাগ থেকে একটা ফোন বের করল। স্যাটেলাইট ফোন। এটাও রিকো দিয়েছে ওকে। জঙ্গলে যে এমনি ফোনের নেটওয়ার্ক পাবে না সেটাই স্বাভাবিক।
কুদুক দেখল ফোনটা, তারপর তাচ্ছিল্যের গলায় বলল, “এটা দিয়ে কী হবে?”
কুষাণ বলল, “এটা স্যাটেলাইট ফোন। যেখানে এমনি ফোন নেটওয়ার্ক পায় না সেখানেও এটা দিয়ে কথা বলা যায়।”
কুদুক বোতল থেকে জল খেল একটু। তারপর বলল, “আমি কি জানি না!”
সুলুস স্টোভটা জ্বালিয়ে ফেলেছে। তার উপর একটা পাত্রে মাংস ঢেলে গরম করতেও শুরু করেছে।
কুদুক এবার কাছে এল কুষাণের। তারপর বলল, “তুমি কি সত্যি এখানে আমাদের জীবনযাত্রা নিয়ে লিখতে এসেছে? নাকি অন্য কোনও ধান্দা আছে?”
“মানে?” কুষাণ তাকাল ওর দিকে।
কুদুক বলল, “আমার মনে হচ্ছে অন্য ধান্দা আছে। কারণ এতটা পথ এলে, কিন্তু কোনও ফোটো তুললে না! মানে ক্যামেরাই নেই তোমার সঙ্গে। তারপর নোট নিলে না কোনও। কিছু জানতেও চাইছ না আমার বা সুলুসের থেকে। তোমার গল্পটা কী, সত্যি করে বলবে?”
কুষাণ তাকাল কুদুকের দিকে। লোকটা বুদ্ধিমান। আর সত্যি বলতে কী, ওর নিজের এটা ভুল হয়েছে। আসলে এমন কাজ তো কোনওদিন করেনি। অত জানবে কী করে?
কুষাণ কী বলবে বুঝতে পারল না। তাও কিছু তো একটা বলতে হবে। কিন্তু কিছু বলার আগেই আচমকা দূর থেকে কেমন যেন টায়ার ফাটার শব্দ হল আর ওর পাশের গাছটার গায়ের চোকলা উঠে গেল।
কুদুক সময় নষ্ট না করে একদম ঝাঁপ মারল কুষাণের দিকে। তারপর ওকে ধরে মাটিতে পড়ে গেল। তারপর টানতে-টানতে নিয়ে গেল পাথরের পিছনে।
কুষাণ বুঝতে সময় নিল একটু। ব্যাপারটা কী! কী হচ্ছে এসব!
কুদুক হাঁফাচ্ছে ভয়ে। ও চাপা গলায় বলল, “গুলি! গুলি চলছে!”
গুলি! ঘাবড়ে গেল কুষাণ। সে কী! কে চালাবে গুলি? এখানে কে আছে যে গুলি করছে ওদের উপর! তা হলে কি কলকাতার উৎপাতটা এখানেও এত দূরে এসেছে! কিন্তু তা কী করে সম্ভব!
কুদক চিৎকার করে নিজেদের ভাষায় কিছু একটা বলল সুলুসকে। আর কুষাণ পাথরের আড়াল থেকে দেখল সুলুস দ্রুত হাতে স্টোভ আর খাবার গুটিয়ে বোটের দিকে দৌড়চ্ছে।
আবার গুলি চলল। একটা পাথরের চল্টা উঠল! ধুলো উড়ল!
কুদুক দ্রুত শ্বাস নিতে-নিতে বলল, “আমার কথা শোনো, আমি জানি না তুমি কী করতে এখানে এসেছ। কিন্তু আমি তোমার থেকে টাকা নিয়েছি। তোমায় কথা দিয়েছি যে সেফলি নিয়ে যাব। আমি কথা রাখি।”
কুষাণ কী বলবে বুঝতে পারল না। সামনে কিছুটা ফাঁকা এবড়োখেবড়ো জমি। তারপর জঙ্গল। সেখানেই কোনও গাছের আড়ালে বসে আছে আততায়ী। হাতে বন্দুক। মারতে চাইছে ওদের। কিন্তু ওকেই কি মারতে চাইছে? কুদুকের কোনও শত্রু নেই তো? এই উলি ম্যামথের দাঁত খোঁজার ব্যাপারেও তো প্রতিদ্বন্দ্বী থাকে। তেমন কেউ ওদের গুলি করছে না তো!
কিন্তু এটা মনে এলেও বলতে পারল না কুষাণ। সুলুস পৌঁছে গিয়েছে বোটে। এবার ওদের লক্ষ করে আবার গুলি চলল।
কুদুক দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “কী যে করেছ তুমি! তোমার জন্য না আমরা মরি!”
“আমি কিছু করিনি,” কুষাণ বলল।
কুদুক চোয়াল শক্ত করে তাকাল জঙ্গলের দিকে। তারপর কুষাণকে বলল, “আমি তিন গোনার সঙ্গে-সঙ্গে জীবন বাজি রেখে দৌড়বে বোটের দিকে। বুঝেছ? মাঝে পড়ে গেলে কিন্তু আমার দায় নেই। পারবে তো দৌড়তে?”
কুষাণ চোয়াল শক্ত করে বলল, “ঠিক আছে। লেটস ডু ইট!”
কুদুক জঙ্গলের দিকে তাকাল। তারপর লম্বা করে শ্বাস নিয়ে বলল, “এক, দুই, তিন... রান।”
তিরের মতো ছিটকে বেরল কুষাণ। সামনে ছোট-বড় পাথর, কাদামাটি, ঝোপঝাড় পড়লেও ও পেরিয়ে গেল সহজেই। ওদিকে চারবার গুলির আওয়াজ শুনতে পেল কুষাণ। কিন্তু কিছু লাগল না ওর গায়ে। এদিক ওদিক লাগছে গুলি। আর পায়ের আওয়াজ শুনে বুঝল পিছনেই আসছে কুদুক।
জলের মধ্যে নেমে ছোটার গতি কমল কুষাণের। কিন্তু একটাই রক্ষে যে বোটটা খুব একটা দূরে নেই।
কুষাণ বোটের কাছে এসে হাতের ভর দিয়ে লাফিয়ে উঠল। তারপর নিজের শরীরটা ছুড়ে দিল ভিতরে। একটু পরে ওভাবেই কুদুক ঝাঁপিয়ে উঠল বোটে। আর সঙ্গে-সঙ্গে সুলুস ছেড়ে দিল বোট।
গড়গড় শব্দ তুলে বোটটা নদী চিরে এগোতে লাগল।
কুষাণ মাথা তুলে দেখতে চেয়েছিল জঙ্গলের দিকে। কিন্তু কুদুক ওকে চেপে বোটের পাটাতনে শুইয়ে দিল। বলল, “গুলি খাওয়ার শখ হয়েছে খুব? চুপ করে শুয়ে থাকো। উঠবে না!”
কুষাণ চুপচাপ শুয়ে থাকল বোটের পাটাতনের উপর।
সুলুস আর কুদুক কোনও কথা বলল না। প্রায় আধঘণ্টা খুব জোরে বোট চলার পরে আস্তে-আস্তে গতি কমে এল বোটের। আর নদীর একটা বাঁকের কাছে দাঁড় করানো হল বোটটা।
“ওঠো!” কুদুক বলল।
এবার উঠল কুষাণ। দেখল নদীটা এখানে সরু মতো। আর বেশ পাথুরে।
ও বলল, “এখানেও যদি আসে!”
কুদুক হাসল এবার। তারপর বলল, “অত সহজ নয়। ওটা মূল নদী ছিল। সোজা। তাই খুঁজে পেয়েছে। এবার খুঁজে পাওয়া মুশকিল। কারণ মূল নদী থেকে কম করে ছোট-বড় দুশোটা খাঁড়ি বেরিয়েছে। তার একটায় ঢুকে বসে আছি আমরা।”
কুষাণ আশ্বস্ত হয়ে হাসল সামান্য।
কুদুক কিন্তু হাসল না। বরং দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিসে গলায় বলল, “এবার বলো তো চাঁদ, কেন তোমার পিছনে এরা লেগেছে? ব্যাপারটা কী! না বললে কিন্তু তোমায় আর এক পা-ও আমাদের সঙ্গে নিয়ে যাব না বলে দিলাম। বুঝেছ? তাই লক্ষ্মী ছেলের মতো বলে দাও। কাম অন। স্পিক আপ। বলো, না হলে কিন্তু বিপদে পড়বে!”
কুষাণ দেখল শেষ কথাটার সঙ্গে-সঙ্গে একটা রাইফেল বের করে ওর দিকে তাক করল কুদুক।
মণিময় এবার জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এল। আকাশে মেঘ করেছে আবার। ও নদীর দিকে তাকাল। সামনে সব কিছু শুনশান। তারপর জিজিকে বলল, “এখানেই ক্যাম্প করো। ডিপ ফরেস্টে ঢোকার এখনই কোনও মানে নেই। বুঝেছ?”
জিজি অবাক হল, “আরে ওরা তো পালিয়ে গেল। আপনি যেতে দিলেন? গুলি চালানোটাও...”
“চুপ!” ঠোঁটে আঙুল দিয়ে ওকে থামতে বলল মণিময়, “সব তুমি বুঝলে আমি এখানে কী করছি? যা বললাম তাই করো। আর মশা তাড়ানোর কয়েল জ্বালাও। এখানে যা মশা, মারা পড়ব বেশিদিন থাকলে!”
মণিময় দেখল জিজি আর টম জমির একটা দিক পরিষ্কার করে চারদিকে কার্বলিক অ্যাসিড ছড়াল। তারপর গোটানো তাঁবুটা খুলে টাঙাতে শুরু করল।
মণিময় হাঁটতে-হাঁটতে জলের কাছে এল। ওই সামনে বাঁকের পিছনে একটা বড় পাথরের আড়ালে ওদের বোট রাখা আছে। কেউ চট করে দেখতে পাবে না। ও হাসল নিজের মনে। তারপর পকেট থেকে স্যাটেলাইট ফোনটা বের করে একটা নম্বর ডায়াল করল।
আর প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কিলোমিটার দূরে কলকাতায় ডেকে উঠল একটা ফোন।
একটা হাত ফোনটা তুলল। তারপর কানে লাগিয়ে বলল, “বলো।”
মণিময় সময় নিল একটু। তারপর বলল, “আমি অনেকটা করেছি। এবার আপনিও যদি... মানে...”
“দেখছি।”
ফোনটা কেটে নদীর দিকে তাকাল মণিময়। কী খুঁজতে এসেছে ও! সেটা পেলে সব ধার মুকুব করে দেবে গুলশন! কিন্তু সত্যি কি দেবে? আর যদি না দেয়! গুলশন পাক্কা শয়তান! ওকে বিশ্বাস নেই! তা হলে?
তা হলে ওর ব্যাকআপ প্ল্যান আছেই! এখন সেটা ঠিকমতো কাজ করলেই হয়।
মণিময় আকাশের দিকে তাকাল। বৃষ্টিটা শুরু হল আবার। জিজিদের তাঁবু টাঙানো হয়ে গিয়েছে। ও সেদিকে পা বাড়াল।
বাইরে আলো আছে এখনও। আসলে এখানে গরমকালে একটাই সুবিধে যে, আলো থাকে। কখনওই পুরো অন্ধকার হয়ে যায় না। তাও তাঁবুর ভিতরে শেষ রাতে উঠে রেডি হওয়ার সময় একটু আলো লাগে।
আর সেটা জ্বালালেই যত বিপত্তি। নানা পোকামাকড় এসে হাজির হয়।
এখানে মশা খুব। সারাক্ষণ কানের কাছে পিনপিন করে। আর একটু খালি জায়গা পেলেই ছেঁকে ধরে।
একটু আগে হাতের গ্লাভস খুলেছিল কুষাণ, কিন্তু প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই পরে নিয়েছে।
বাইরে একটু দূরে পাম্পের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। কুদুক আর সুলুস কাজে ব্যস্ত। নদীতে পাম্প লাগিয়ে জেট শাওয়ারের মাধ্যমে জলকামানের মতো মারছে মাটির গায়ে। আর নানা জায়গা থেকে মাটি খসে, ধুয়ে যাচ্ছে। ওরা মাটির নীচে চাপা পড়া উলি ম্যামথের দাঁত খুঁজছে।
তাঁবুতে একটু আগে ফিরেছে কুষাণ। তারপর টিনের মাংস আর রুটি খেয়েছে একটু।
এখন কুদুক আর ওকে অমন সন্দেহের চোখে দেখছে না। বরং ভাল ব্যবহারই করছে।
সেদিন নদীর ধারে কিন্তু কুদুক এমন ছিল না। বরং রাইফেল হাতে তো ওকে বেশ নিষ্ঠুর আর নৃশংসই লাগছিল। ও বারবার জিজ্ঞেস করছিল কুষাণের আসল পরিচয় কী!
কুষাণ দেখেছিল যে আর কিছু লুকিয়ে রাখা যাবে না। ও তাই বলেছিল সবটা।
কুদুক অবাক হয়ে বলেছিল, “হারিয়ে যাওয়া মানুষকে এতদিন পরে খুঁজতে এসেছ? পাগল নাকি? তা হলে তোমাকে মারতে চাইছে কেন এরা?”
কুষাণ বলেছিল, “আমি সত্যিই জানি না কেন। হতে পারে জয়রামের কোনও পুরনো শত্রুতা আছে। বা অন্য কিছু। কিন্তু আমি সত্যিই জানি না।”
কুদুক চোখ সরু করে বলেছিল, “কোনও গুপ্তধনের গল্প নেই তো!”
গুপ্তধন! চোয়াল শক্ত করে নিয়েছিল কুষাণ। ডায়েরিতে দামি কিছুর ইঙ্গিত আছে বটে। একটা সংকেতও আছে। কিন্তু সেটা কী, কেউ জানে না!
“থাকলেও আমি জানি না,” কুষাণ বলেছিল।
কুদুক এবার রাইফেল সরিয়ে নিয়ে বলেছিল, “ঠিক আছে, তুমি খোঁজো তোমার মতো করে। যদিও পাগলামি হবে সেটা। আর দেখো বেঘোরে মারা পোড়ো না যেন।”
ডায়েরিটা সঙ্গে করেই নিয়ে এসেছে কুষাণ। এখানে ভাল করে উলটেপালটে দেখেছে। একটা ম্যাপ মতো করা আছে। কিন্তু তাও পেনসিল দিয়ে। সময়ের সঙ্গে সেটা বেশ আবছা। ডায়েরিতে নানা কথা ইংরেজিতে লেখা থাকলেও এই ম্যাপটার চিহ্নিত জায়গাগুলোর নাম বাংলায় লেখা। আর তার সঙ্গে আছে বাংলায় লেখা একটা ছোট্ট ছড়া। মানে সবাই যাতে পড়তে না পারে সেটাই আসল লক্ষ্য ছিল রনিতের।
ও ছড়াটা আবার পড়ল,
“ভালুকমাথার পাহাড় ছিল রক্তফুলের ছড়িয়ে থাকা ঘাঁটি
মাটির নীচে জলবায়ু, মাটির নীচে আগুন রাখি খাঁটি
মাটির নীচে যত্ন করে লুকিয়ে রাখি অন্য রকম মাটি।
নকল ফুলের চিহ্ন ধরে রোমানভের সঙ্গে সবাই হাঁটি
দানব ঘুমোয় হাজার বছর জড়িয়ে গায়ে গোলাপ শীতলপাটি।”
ভল্লুকের মাথার মতো দেখতে একটা পাহাড়ের কথা লেখা আছে। আর লেখা আছে লাল ফুলের কথা। রক্তফুলের ঘাঁটি। মানে জায়গাটায় নিশ্চয়ই লাল রংয়ের ফুল হয় অনেক। কিন্তু মাটির নীচে জলবায়ু মানে? মাটি দিয়ে মাটি লুকনো মানে? আর রোমানভ কোথা থেকে আসে এখানে? আর তার সঙ্গে আবার দানব! কিছুই বুঝতে পারছে না কুষাণ। জঙ্গলে থাকতে-থাকতে কি আস্তে-আস্তে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছিলেন রনিত!
নদীটা বিশাল বড়। জঙ্গলটাও। সেখানে কোথায় এমন পাহাড়! গতকাল আর আজ আশপাশটা ঘুরে দেখেছে রনিত। সেভাবে কিছু চোখে পড়েনি। কী যে করবে বুঝতে পারছে না।
ডায়েরিটা ব্যাগের ভিতর ঢুকিয়ে রাখল কুষাণ। বাইরে পাম্প বন্ধ হয়েছে কিছুক্ষণ আগে। পায়ের আওয়াজ আসছে। মানে কুদুক আর সুলুসরা ফিরে আসছে।
কুদুক অনেক কথা বললেও সুলুস লোকটা চুপচাপ থাকে।
তাঁবুর ভিতর কুদুক ঢুকল আগে। তারপর সুলুসকে দেখা গেল। দু’জনেই যে ক্লান্ত বোঝা যাচ্ছে।
নিজেদের বেড রোলটা খুলে দু’জনেই শুয়ে পড়ল।
কুষাণ জিজ্ঞেস করল, “এনি লাক? কিছু পেলে?”
“নাহ,” মাথা নাড়ল কুদুক, “পাওয়া সহজ নয়। সাইবেরিয়ার এই অঞ্চলটা বিশাল বড়! তা ছাড়া এতদিন ধরে এত লোক আসছে, সহজ নয় দাঁত খুঁজে পাওয়া! যেটা পেয়েছি সেটা হল কয়েকটা এমনি বুনো প্রাণীর হাড়। যদিও কাজের নয় কিছু। গতবার পেয়েছিলাম দুটো দাঁত। ভাল কামাই হয়েছিল। কিন্তু তার আগের দু’বার কিছু পায়নি। এবার যে কী হবে কে জানে! আমাদের আসতে বেশ দেরি হয়েছে এবার। দেখা যাক।”
কুষাণ মাথা নাড়ল।
“তোমার দিন কেমন কাটল। কিছু পেলে?” কুদুক উঠে বসল এবার।
কুষাণ বলল, “ভল্লুকের মাথার মতো দেখতে পাহাড়! সেটা কেমন? কোথায়! সেটাই বুঝতে পারছি না।”
কুদুক বলল, “পাহাড় মানে কিন্তু বিশাল কিছু ভেবো না। টিলা হতে পারে। আর থাকলেও টাস্ক হান্টারদের জলের তোড়ে অনেক টিলা নষ্ট হয়ে গিয়েছে। আর কি কোনও চিহ্ন নেই?”
কুষাণ চুপ করে রইল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, “এখানে কি কোথাও লাল ফুলের জঙ্গল আছে?”
“লাল ফুল?” কুদুক অবাক হয়ে তাকাল, “আমি ওসব জানি না।”
“ক্রাস্নি মাকি!” আচমকা বলে উঠল সুলুস।
“কী?” দু’জনেই এক সঙ্গে তাকাল সুলুসের দিকে।
সুলুস হাসল ওদের দিকে তাকিয়ে। তারপর বলল, “ক্রাস্নি মাকি। মানে রেড পপি! লাল রঙের পপি ফুল। সাইবেরিয়ায় গরমকালে হয়।”
“এখানেও হয়?” কুষাণ জিজ্ঞেস করল।
সুলুস মাথা নাড়ল, “হয়। কিন্তু এখানে নয়, এখান থেকে দশ কিলোমিটার দূরে নর্থ ইস্ট ডিরেকশনে।”
“কীভাবে যাওয়া যাবে?” কুষাণ তাকাল সুলুসের দিকে।
সুলুস বলল, “বোটে করে।”
“আমি যাব!” কুষাণ উত্তেজিত হল।
কুদুক বলল, “আরে দাঁড়াও-দাঁড়াও! অত ছটফট কোরো না। যাব বললেই হল নাকি? তারপর আমাদের বোট নিয়ে গিয়ে হয়তো তুমি আমাদের ছেড়ে পালিয়ে গেলে! তখন?”
কুষাণ বলল, “দেখো, আমি পালাব না। আমি না হয় এক্সট্রা টাকা দেব। কিন্তু প্লিজ় আমায় একবার যেতে দাও।”
কুদুক মাথা নাড়ল, “আমিও যাব। একা ছাড়া যাবে না তোমায়।”
“তুমি যাবে মানে? এখানে কাজ?” সুলুস অবাক হল।
“একা করবে তুমি,” কুদুক বলল, “তা ছাড়া এটাও তো রোজগার হবে। তাই না?”
সুলুস অবাক হল, “রোজগার হবে মানে?”
কুদুক হাসল। তারপর কেটে-কেটে বলল, “টাকা দেবে তো আমায় কুষাণ। এক হাজার ডলার। কী কুষাণ, দেবে না?”
মাঝরাতে ফোনটা এল গুলশনের কাছে। সাধারণত এমন সময় কেউ ফোন করে না। তাই ফোনটা আসায় সামান্য চিন্তিত আর বিরক্ত হল গুলশন।
সারা দেশ জুড়ে ওর কাজকারবার চলে। কে জানে কোথায় কী ইমার্জেন্সি হয়েছে।
মাথার কাছের আলোটা জ্বালিয়ে ফোনটা হাতে নিল গুলশন।
একটা অজানা নম্বর থেকে এসেছে ফোনটা।
গুলশন কানে লাগাল ফোনটা, “হ্যালো?”
“শুনুন, ভাল করে শুনুন। আমি জাস্ট একবার বলব।”
গলাটা ভারী, খসখসে। শুনেই বোঝা যাচ্ছে যে গলা পালটে কথা বলছে।
“কে বলছেন?” গুলশন কড়া গলায় কথা বলল।
“আপনি ওই ডায়েরির ব্যাপারটা ভুলে যান।”
“মানে?” গুলশন বুঝতে পারল না কী বলতে চাইছে লোকটা।
“মানে ওই ডায়েরি। যেটা নিয়ে কুষাণ গিয়েছে রাশিয়ায়। আর তার পিছনে আপনি ফেউ হিসেবে লাগিয়েছেন মণিময়কে, সেটা ভুলে যান।”
“মাঝরাতে ফোন করে ইয়ার্কি হচ্ছে?” গুলশন কড়া গলায় বলল।
“ইয়ার্কি মারতে হলে এখন ফোন করতাম না। আপনার ভালর জন্য বলছি। মণিময়কে বলুন চলে আসতে। আর ওর টাকার ব্যাপারটাও ভুলে যান। না হলে বিপদে পড়বেন।”
“কে রে তুই?” গুলশনের মাথায় চড়াৎ করে রক্ত উঠে গেল, “আমায় থ্রেট করছিস? জানিস আমার হাত কত লম্বা? তোকে খুঁজে বের করে যদি কপালের মাঝে গুলি না মারি তা হলে আমার নাম গুলশন নয়।”

“আর আমি যা বললাম সেটা যদি আপনি না করেন তা হলে ওটা আপনার সঙ্গেও হতে পারে, বুঝলেন? এই ক’দিন আমি আপনাকে ফলো করছি সেটা কি আপনি বুঝতে পেরেছেন? এমন করেই আচমকা আপনার যদি কিছু হয়ে যায়!”
গুলশন চিৎকার করে বলল, “এত সাহস তোর? কে বলছিস তুই? কে...”
“মনে রাখবেন। ডায়েরিটা ভুলে যান। শেষবার বললাম। আর বলব না।”
লোকটা আর কিছু বলতে না দিয়েই কেটে দিল ফোনটা।
মোবাইলের দিকে তাকাল গুলশন। কে লোকটা! এত সাহস পেল কোথা থেকে? ঘরে এ সি চলছে, তাও উত্তেজনায় আর রাগে ঘাম হচ্ছে। মনে হচ্ছে লোকটাকে হাতের কাছে পেলে ছিঁড়ে ফেলবে।
ও মোবাইলটা নিল আবার। তারপর মণিময়ের স্যাটেলাইট ফোনের নম্বরটা ডায়াল করল। কিছু সময় পরে রিংটা শুনতে পেল গুলশন।
“হ্যালো...” মণিময়ের গলায় যেন ঘুম।
“এই, তুই ঘুমোচ্ছিস? তোকে ওখানে ঘুমোতে পাঠিয়েছি আমি?” গুলশন চিৎকার করল।
“আরে এখানে এখন ভোর রাত। কী হয়েছে?” মণিময় জিজ্ঞেস করল।
“লোকে এখানে আমায় থ্রেট করছে! বলছে তোর থেকে পাওয়া টাকা নাকি ভুলে যেতে হবে! তুই এখানে লোক রেখে গিয়েছিস?”
“আরে,” মণিময় অবাক গলায় বলল, “কীসব বলছেন আপনি? আমি বসে আছি মেরুর কাছের একটা জায়গায়, সেখান থেকে আমি এসব করব! আর তেমন হলে এত দূর আসতাম আমি? পাগল নাকি আপনি?”
“তুই কিছু করিসনি? বেশি চালাকি করবি না মণিময়। জিজি কিন্তু আমার লোক। মনে থাকে যেন ওই দামি জিনিসটা আমার চাই-ই। না হলে এখানে তোর নিস্তার নেই!”
মণিময় বলল, “আপনি কি পাগল হয়ে গেলেন? আমি আপনার বিরুদ্ধে যাব? আর কিছু যদি পাওয়া যায় সেটা তো আপনার। কথা তো হয়েইছে সেই ব্যাপার নিয়ে।”
গুলশন দাঁতে দাঁত ঘষে বলল, “কোনও চালাকি নয় মণিময়। আমি কিন্তু গুলশন রাজ, মনে রাখিস।”
বোট থেকে নেমে সামনের জঙ্গলের দিকে এগোল কুষাণ। এখানে জঙ্গলটা বেশ ঘন। কুষাণ হাতের লাঠিটা দিয়ে গাছপালা সরাতে-সরাতে সামনের দিকে এগোতে লাগল। কুদুক ওর পাশেই আছে।
সুলুস আসেনি, কিন্তু একটা কাগজে এঁকে দিয়েছে নদীর কোন দিকে যেতে হবে আর সেখান থেকে নেমেই বা কীভাবে সেই লাল ফুলের জঙ্গলে যাবে।
গাছপালার ফাঁক দিয়ে আলো এসে পড়ছে। পায়ে চলার পথ নেই। তবু ওরা এগোচ্ছে।
বড় একটা মোটা গাছের কথা বলেছে সুলুস। সেটা দেখতে পেল এবার।
গাছটা মরা। আর এমন করে ডালপালাগুলো ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে যে, দেখলে মনে হয় আকাশের দিকে হাত তুলে প্রার্থনা করছে।
এবার কোন দিকে? সুলুসের এঁকে দেওয়া ম্যাপটা আবার দেখল কুষাণ। তারপর কম্পাসটা বের করে দিকনির্ণয় করে কুদুককে বলল, “ওই দেখো সামনে একটা ছোট্ট একটা জলের ধারা, এর ডান দিকে যেতে হবে আমাদের।”
ওরা ছোট্ট ঝিরঝিরে জলের ধারাটা পেরিয়ে সামনে এগোল। জঙ্গলের নিজের একটা শব্দ আছে। সেটা বাদ দিলে শুধু ওদের নিজেদের পায়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে।
কুদুক একবার বলল, “তোমার জন্য কোথায়-কোথায় ঘুরে মরতে হচ্ছে আমায়। শেষে প্রাণটাই না যায়!”
কুষাণ পাত্তা দিল না।
ওরা আরও এগোল। সামনে একটা টিলা। সেটা পার করল দু’জনে। এবার খানিকটা খোলা জমি। সেই দিকে এগোতে গেল কুষাণ। কিন্তু আচমকা কুদুক ওকে টেনে ধরল পিছন থেকে।
“দাঁড়াও।”
কুষাণ থমকে গেল, “কী হয়েছে?”
“এই দেখো,” কুদুক পাশে পড়ে থেকে একটা বড় পাথর তুলে ছুড়ল সামনের খোলা জায়গাটার দিকে।
কুষাণ অবাক হয়ে দেখল পাথরটা সামনের খোলা জায়গায় পড়ে আস্তে-আস্তে তলিয়ে গেল নীচে।
“চোরাবালি!” কুদুকের দিকে অবাক হয়ে তাকাল কুষাণ।
‘হ্যাঁ। চারদিকে জঙ্গল আর মাঝে এমন হঠাৎ ফাঁকা কেন? কারণ ওখানে কিছু জন্মায় না। এদিকে পুকুর বা ঝিলও নেই! তা হলে?” কুদুক বলল, “জঙ্গলে চলতে গেলে একটু চোখ-কান খোলা রাখতে হবে।”
ওরা খোলা জায়গাটার পাশ দিয়ে এগোতে লাগাল আবার। কম্পাস পথ দেখাচ্ছে। মাথার উপর কখনও রোদ, কখনও আবার মেঘলা। মাঝে-মাঝে বৃষ্টি পড়ছে।
কিছু দূর এগিয়ে আচমকা থমকে গেল কুষাণ।
কুদুক বিরক্ত হল সামান্য, “কী হল?”
কুষাণ কিছু না বলে মাটির দিকে দেখাল। কুদুক দেখে অবাক হল। কুষাণের মুখে সামান্য হাসি!
কুষাণ দেখল মাটিতে বেশ কিছু লাল পাপড়ি পড়ে আছে। আর শুধু পড়েই নেই, এমনভাবে পড়ে আছে যে বোঝা যাচ্ছে কোন দিক থেকে হাওয়ায় ভাসতে-ভাসতে এসেছে এগুলো।
কুষাণ আর কুদুক দ্রুত পায়ে এগোতে লাগল সেই দিকে।
সামনে রাস্তাটা উঠে গিয়েছে একটু। ওরা উঠল সেই পথ ধরে আর তারপরেই থমকে গেল। সামনের সবটা জায়গা লাল হয়ে রয়েছে। লাল ফুলের জঙ্গল!
কিন্তু ওটা কী!
কুষাণ এগিয়ে গেল সামনের দিকে। একটা ছোট্ট প্রাণী। পড়ে আছে মাটিতে।
কুদুক এগিয়ে এল। তারপর ঝুঁকে বলল, “আরে এটা তো মাস্কঅক্সের বাচ্চা! আহত! সর্বনাশ!”
“কেন?” কুষাণ বিভ্রান্ত হয়ে তাকাল কুদুকের দিকে।
কুদুক বলল, “মাস্কঅক্সের পাল কাছাকাছি থাকলে বিপদ খুব। আর তা ছাড়াও আছে ভাল্লুক। সাইবেরিয়ান ব্রাউন বেয়ার! ওরা যদি এই আহত মাস্কঅক্সের শিকারের লোভে আসে তা হলে...”
কিন্তু কথা শেষ করতে পারল না কুদুক। আচমকা চারদিকের মাটি কাঁপতে আরম্ভ করল। ওরা দেখল দূরে ধুলোর মেঘ করেছে যেন।
কুদুক শুধু বলল, “পালাও...”
তারপর নিজেই দৌড় দিল পিছন ঘুরে। কুষাণ বুঝতে সময় নিল একটু। দেখল সামনে থেকে ধুলোর ঝড় তুলে বেশ কিছু মাস্কঅক্স মাথা নামিয়ে দৌড়ে আসছে এইদিকে। সর্বনাশ! কাছে এসে গেলে আর রক্ষে নেই! কুষাণ পিছন ফিরে দৌড়তে শুরু করল এবার।
সামনে জঙ্গলের নানা বাধা, কিন্তু কুষাণ দাঁড়াল না। কখনও লাফিয়ে, কখনও মাথা নিচু করে দৌড়তে লাগল। একটা সময় কুদুককেও পিছনে ফেলে দিল ও। পিছনে এখনও দৌড়ে আসছে মাস্কঅক্সের দল।
কুষাণ গতি বাড়াল। গাছের পাতা লাগছে হাতে, শরীরে, মুখে। ব্লেডের মতো ধারালো কোনও-কোনও পাতা। তাতে কেটে যাচ্ছে মুখ। কিন্তু থামলে আরও বিপদ।
সামনে সেই সরু জলের ধারা! সেটা টপকে গেল কুষাণ। পিছনে কুদুক আসছে। আরও পিছনে একপাল জন্তু!
কুষাণ দৌড়চ্ছে। ঠান্ডা হাওয়া এসে লাগছে মুখে। বুঝতে পারছে নদীর পারের দিকে যাচ্ছে ওরা।
সামনে সেই বড় গাছ! পিছনে পায়ের শব্দ যেন কাছে আসছে আরও। গাছটা পার করল কুষাণ। তারপর একবার এক মুহূর্তের জন্য পিছনে ফিরল। কুদুক কই! আর তখনই পায়ে ঠোক্কর লাগল একটা। কুষাণ টাল সামলাতে পারল না আর। হুড়মুড় করে মাটিতে পড়ে তারপর গড়িয়ে গেল সামনের দিকে। আর তার পিছনে মাস্কঅক্সদের পায়ের শব্দ আরও জোর হল।
আর ঠিক তখনই প্রচণ্ড শব্দ করে বন্দুক ঝলসে উঠল। কুষাণ পড়ে যাওয়া অবস্থায় দেখল মাস্কঅক্সের পাল থমকে গিয়েছে। আবার বন্দুক ঝলসে উঠল জঙ্গল খানখান করে!
না, আর এগোল না মাস্কঅক্সগুলো। বরং এবার উলটো দিকে দৌড়ে মিলিয়ে গেল জঙ্গলের গভীরে!
কুষাণ ঘুরে সামনে তাকাল। পাশে কুদুকও এসে পড়েছে। হাঁফাচ্ছে। তাকিয়ে আছে সামনে। ওর চোখে ভয়!
কুষাণ দেখল ওদের সামনে চারজন মানুষ। বড়সড় চেহারা। গায়ে ইউনিফর্ম! লোকগুলো চোয়াল শক্ত করে বন্দুক তাক করে রেখেছে ওদের দিকে! কুষাণ বুঝল নড়ার চেষ্টা করলে লোকগুলো গুলি করতে দ্বিধা করবে না।
মণিময় স্যাটেলাইট ফোনটা গুটিয়ে ঢুকিয়ে রাখল কোমরের পাউচে। প্রায় মাঝরাত এখন। আকাশে কেমন যেন কয়লা পোড়া আলো! শীত করছে।
আজ মাংস আর কর্নফ্লেক্স ফুরিয়ে গিয়েছে। বোট নিয়ে টম গিয়েছে শহরে এসব আনতে। এই তাঁবুতে ও আর জিজি আছে শুধু।
জিজি বাইরে গিয়েছে আগুন জ্বালাতে। আগুনের পাশে বসলে ভাল লাগে মণিময়ের। এমন ঠান্ডা ওর সহ্য হয় না।
এখানে জঙ্গলটা পাতলা। তাও রাতে ভল্লুকের ভয় থাকে। সাইবেরিয়ায় বাদামি ভল্লুকের খুব উপদ্রব। একবার সামনে পড়লে খুব সমস্যা।
আলো জ্বালালে ভল্লুক একটু দূরে থাকে।
তাঁবু থেকে বেরিয়ে আগুনের সামনে গিয়ে দাঁড়াল মণিময়।
জিজি তাকাল ওর দিকে। তারপর ছোট্ট করে জিজ্ঞেস করল, “কথা হয়ে গেল?”
“কথা! মানে?” অবাক হয়ে তাকাল মণিময়।
“মানে এই যে ফোনে কথা বলছিলে... হয়ে গেল?” জিজি কয়েক পা এগিয়ে এল।
“কী বলছ তুমি? আমি ফোনে দেখছিলাম এই জায়গার কোঅর্ডিনেটটা। আর তো কিছু না। কারও সঙ্গেই কথা বলিনি। বলব কেন?”
“তাই?” আচমকা জিজি এগিয়ে এসে কলারটা ধরল মণিময়ের, “ইয়ার্কি হচ্ছে? কলকাতায় বসকে ফোন করে থ্রেট করানো হচ্ছে লোককে দিয়ে। এখানে এসে এভাবে কারণ ছাড়া জঙ্গলে বসে থাকা হচ্ছে আর তুমি জান না? ন্যাকা?”
“আরে... আরে...” মণিময় কী বলব বুঝতে পারল না।
জিজি আচমকা একটা চড় মারল ওকে। গায়ের কী জোর লোকটার! মণিময় পড়ে গেল মাটিতে।
জিজি ঝুঁকে পড়ে বলল, “এখানে আমাদের আটকে রেখে সময় নষ্ট করানো না? কী মতলব তোমার? বলো আমায়, না হলে আজকেই তোমায়...”
জিজি কথা শেষ না করে পিস্তল বের করল।
“আরে-আরে কী করছ? আমি সব প্ল্যান করে রেখেছি। প্লিজ়... শোনো আমার কথা!”
জিজি চোয়াল শক্ত করে পিস্তলটা সামনে নিয়ে এল। তারপর চিৎকার করে বলল, “বলো কে ফোন করছে বসকে? বলো কেন তোমার পাওনা টাকার কথা ভুলে যেতে বলছে? বলো... বলো...”
জিজি আচমকা ট্রিগার টেনে দিল। মণিময় ভয়ে কুঁকড়ে গেল মাটিতে। আর ওর প্রায় কান ঘেঁষে গুলিটা গিয়ে লাগল পাথরে। ভাঙা একটা টুকরো ছিটকে লাগল ওর গালে। কেটে গেল।
মণিময় ভয়ে কাঁপতে-কাঁপতে গালে হাত চাপা দিয়ে বলল, “প্লিজ় প্লিজ়, বিশ্বাস করো আমি কিছু জানি না। প্লিজ়...’
জিজি তাকিয়ে রইল ওর দিকে। তারপর আচমকা পিস্তলটা পকেটে ঢুকিয়ে নিল। বলল, “ওকে! তুমি পাশ করে গিয়েছ। আমি তোমাকে পরীক্ষা করছিলাম। বস আমাকে বলেছিলেন তোমায় একবার বাজিয়ে দেখতে। মাঝরাতে ফোন করে বসকে কেউ থ্রেট করলে তো আমাদের ব্যাপারটা দেখতেই হয়। এমনি-এমনি তো তাকে ছেড়ে দেওয়া যায় না। তাই না?”
মণিময়ের হাত-পা কাঁপছে। এভাবে কেউ পরীক্ষা করে! একটু হলেই তো প্রাণটা গিয়েছিল। এখনও মনে হচ্ছে বুকের মধ্যে ঘোড়া দৌড়চ্ছে।
জিজি হাত বাড়িয়ে দিল, “ওঠো। ভয় পেয়েছ বুঝতে পারছি, কিন্তু আর এসব ভেবো না। তবে তোমার প্ল্যানটা কী সেটা একটু বোলো আমায়। এখানে কতদিন বসে থাকব এভাবে? আমাকেও তো ব্যাপারটা বুঝতে হবে!”
জিজির বাড়ানো হাত ধরে উঠে দাঁড়াল মণিময়। চোয়াল শক্ত করে তাকাল ওর দিকে।
জিজি হেসে একটা পোড়ানো ভুট্টা বাড়িয়ে দিল ওর দিকে। বলল, “রিল্যাক্স। অত সিরিয়াসলি নিয়ো না ব্যাপারটা।”
মণিময় ভুট্টাটা হাতে নিল। তারপর আগুনের দিকে তাকাল। মনে-মনে বলল, আজ যেটা জিজি করল, এর ফল ভোগ করতে হবে ওকে।
সুলুস আজ শুকনো মাংস আর রুটি দিয়েছে সবাইকে খেতে। পানীয় জলের যে বোতলগুলো নিয়ে এসেছিল তার অনেকটাই প্রায় শেষ। সুলুস বলেছে পরশু জিনিসপত্র কিনতে শহরে যাবে।
এখন তাঁবুতে বসে রয়েছে কুষাণ আর কুদুক। সুলুস গিয়েছে কাছের জঙ্গল থেকে কাঠ জোগাড় করে আনতে।
কুদুক কাল থেকেই বেশ চুপচাপ আছে। এখনও খাবার নিয়ে খাচ্ছে না, নাড়াচাড়া করছে। কারণটা জানে কুষাণ। কাল চারশো ডলার বেরিয়ে গিয়েছে ওর!
আসলে পুলিশের থেকে রেহাই পেতে কুদুককে টাকাটা দিতেই হয়েছে।
এখনও গতকালের ঘটনাটা মনে পড়লে গায়ে কাঁটা দিচ্ছে কুষাণের। ও ভাবতেই পারেনি যে, ওকে এমন একটা অবস্থায় পড়তে হবে। আর একটু হলেই শেষ হয়ে গিয়েছিল আর কী!
বন্দুকের আওয়াজ বাঁচিয়ে দিয়েছিল কুষাণদের। তবে তার পরক্ষণেই কুষাণের মনে হয়েছিল এরা আবার কারা! এভাবে বন্দুক তাক করে রয়েছে ওদের দিকে।
আসলে কুষাণ জানে, মানুষের মতো নৃশংস প্রাণী এই পৃথিবীতে আর কেউ নয়। তারা কারণে-অকারণে অন্যকে কষ্ট দিয়ে, নির্যাতন করে নিজের স্বার্থসিদ্ধি করতে চায় শুধু।
কুদুক লোকগুলোর বন্দুক দেখে নিজের মনেই মাথা নেড়েছিল। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে বলেছিল, “জোসেফ স্যার! আবার আপনি!”
“স্যার!” মানে? কুষাণ তাকিয়েছিল বন্দুক হাতে লোকগুলোর দিকে। দেখছিল ওরা হাসছে কুদুককে দেখে।
কুদুক ইংরেজিতেই কথা বলছিল। ও বলেছিল, “আপনারা কি সব জায়গাতেই আমাকে এভাবে ধরবেন!”
জোসেফ লোকটার চেহারা রোগা, লম্বা। গায়ে ইউনিফর্ম। মাথায় টুপি।
জোসেফ হেসে বলেছিল, “তোদের কতবার বলেছি এভাবে এসে মাটি খুঁড়ে ম্যামথের দাঁত বের করবি না। এটা ইললিগাল। এর জন্য তো লাইসেন্স দেওয়া হয়। সেটা নিয়ে এলেই তো পারিস! এই যে আসিস এখানে। মাটিফাটি খুঁড়ে চারদিকসহ নদীটাকেও নোংরা করে দিস, এতে লাভ হয়? বেশির ভাগ সময়ই তো পাস না কিছু! তা হলে!”
“এবার আমি সেজন্য আসিনি। এই ছেলেটি,” কুষাণকে দেখিয়েছিল কুদুক, “একজন রাইটার। এই জঙ্গল নিয়ে লিখতে এসেছে এখানে। আমি গাইড হিসেবে এসেছি!”
জোসেফ হেসেছিল, “তুই গাইড! লুকিয়ে লাইসেন্স ছাড়া ম্যামথের দাঁত মাটি খুঁড়ে বের করিস, আমি জানি না! এর আগেও দু’বার তোকে ধরেছিলাম, মনে নেই! আমায় এসব গল্প দিস না। নে, ফাইন দে!’
“আরে স্যার, আমি গরিব মানুষ! কী করে টাকা দেব!” কুদুক অনুনয়-বিনয় শুরু করেছিল।
কিন্তু জোসেফ বলে লোকটি যথেষ্ট কড়া। হাসিমুখে কথা বললেও ঠিক টাকা আদায় করেছিল কুদুকের থেকে। বলেছিল, “আমি না বাঁচালে তো মরতিস! আর টাকা যদি না-ই দিতে চাস তা হলে চল তোকে লকআপে ঢুকিয়ে দিই! চল।”
সাতশো ডলার চেয়েছিল জোসেফ। কিন্তু হাতে-পায়ে ধরে দরদাম করে সেটাকে চারশোয় নামিয়েছিল কুদুক।
টাকাপয়সা বুঝে নিয়ে জোসেফরা চলে গিয়েছিল। যাওয়ার আগে শুধু বলেছিল, “আর ঘোরাঘুরি করবি না, সোজা ফিরে যা। বুঝেছিস?’
মাস্কঅক্স থেকে রেহাই পেলেও জোসেফের থেকে রেহাই পায়নি কুদুক। তারপর থেকেই মনমরা হয়ে গিয়েছে।
আজ সারাদিন ডায়েরিটা নিয়েই বসেছিল কুষাণ। কিন্তু নতুন কিছু পায়নি। তারপর বিকেলের দিকে গিয়েছিল কুদুকদের কাছে।
কুদুক আর সুলুস ব্যস্ত ছিল নিজেদের কাজে। ছোট-ছোট টিলার গায়ে জলের জেট স্প্রে দিয়ে ওরা খুঁড়ছিল। টিলাগুলোর গায়ে গোল-গোল গর্ত হয়ে গিয়েছে। ভিতরে মাটির গায়ে বরফ লেগে। এটাই পারমাফ্রস্ট। এর মধ্যে ম্যামথের দাঁতগুলো হাজার-হাজার বছর থাকে বলে নষ্ট হয় না!
যেখানে কুদুকরা কাজ করছে সেখানটা জলে জলাকার। কাদা হয়ে আছে চারদিক। তার সঙ্গে ডিজ়েলের গন্ধ, ধোঁয়া। আর জেট স্প্রে ধরে রাখতে গেলে কী পরিশ্রমটাই না করতে হয়! এত পরিশ্রম করেও বেশির ভাগ মানুষ কিছু পায় না। সবটাই অনিশ্চিত! তাও তারা ঘুরে-ঘুরে আসে এখানে! এ যেন লটারির টিকিট কাটার মতো ব্যাপার! ম্যামথের দাঁত পেলে কপাল ফিরে যাবে। আর না পেলে সব পরিশ্রমই বৃথা। ওদের সঙ্গেই তাঁবুতে ফিরে এসেছিল কুষাণ।
এখন কুষাণই প্রথম কথা বলল, “কুদুক, এখানে এভাবে বসে থাকার মানে নেই। আমি কালকেই আবার ওই জায়গায় যেতে চাই। ফুলের ওই জায়গাটা তো পেয়েই গিয়েছি! এবার বাকিটা দেখে নিতে হবে। আমি জানি ওখানেই কিছু একটা পেয়ে যাব!”
কুদুক তাকাল ওর দিকে। তারপর বলল, “কাল মরতে-মরতে বেঁচেছি! আবার যাবে?”
“আমি কী করতে এসেছি বলো! লাল ফুলের জঙ্গলটা পেয়েছি যখন, তখন কি আর-একবার চেষ্টা করব না? আমি বসে থাকব? ঠিক আছে, তুমি যেতে না-ই চাইতে পার, কিন্তু আমায় যেতেই হবে। আমায় তুমি শুধু তোমার বোটটা দাও। আমি চলে যাব। তোমার ভয় নেই, আমি পালাব না! এই গোলকধাঁধার মতো জায়গা থেকে আমি একা চিনে শহরে ফিরতে পারব না! প্লিজ় আমার কথাটা একটু শোনো!”
কুদুক তাকাল ওর দিকে। সামনের খাবারের প্লেটটা সরিয়ে রাখল। তারপর উঠে দাঁড়াল। বলল, “একটা শর্ত আছে।”
“কী?” কুষাণ জিজ্ঞেস করল।
কুদুক বলল, “যদি ওখানে ভ্যালুয়েবল কিছু পাও তা হলে আমি তার শেয়ার চাই! রাজি?”
কুষাণ বলল, “দেখো, কিছু পেলেও তো সেটা আমার নয়। আমি কী করে সেটার ভাগ তোমায় দেব?”
কুদুক মাথা নাড়ল, “রাজি হলে বলো। না হলে...”
কিন্তু কুদুক কথা শেষ করতে পারল না। আচমকা দূর থেকে একটা চিৎকার শুনল ওরা। কুষাণ সচকিত হয়ে তাকাল বাইরের দিকে। তারপর আর সময় নষ্ট না করে ওরা দু’জনেই বেরিয়ে এল বাইরে। গলাটা ওদের চেনা। সুলুস চিৎকার করছে!
কুদুক এদিক ওদিক তাকাল। তারপর ও নিজেও পালটা সুলুসের নাম ধরে চিৎকার করল!
সামান্য সময় পরে চিৎকারটা ফিরে এল আবার। এবার বোঝা গেল কোন দিক থেকে চিৎকার করছে সুলুস!
কুদুক দ্রুত তাকাল সেই দিকে। তারপর আবার ঢুকে গেল তাঁবুতে। তারপর রাইফেল আর ডিজ়েলের ছোট জ্যারিকেন নিয়ে এল!
জ্যারিকেনটা কুষাণের হাতে দিয়ে বলল, “এসো!”
মেঘ করে আছে আজ। বিকেলের নিভে আসা আলোর মতো আকাশ। জঙ্গলের মধ্যে সেই আলো যেন আরও কমে গিয়েছে।
তাও তার মধ্যে সুলুসের চিৎকার যেদিক থেকে এসেছে, সেই দিকে দৌড়ল কুষাণ আর কুদুক।
আবার চিৎকার শুনতে পেল ওরা। আর সেই সঙ্গে একটা বড় গাছ পার করেই দেখল দৃশ্যটা!

সুলুস দাঁড়িয়ে আছে। একটা জ্বলন্ত কাঠ হাতে মশালের মতো জ্বলছে। আর ওর সামনে দু’পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে গর্জন করছে বিশালকায় এক বাদামি ভল্লুক!
কিন্তু হাতে আগুন থাকায় ভল্লুকটা এগোচ্ছে না। আর সুলুসও হাতের আগুনটা সামনে তরোয়ালের মতো ঘোরাতে-ঘোরাতে চিৎকার করে যাচ্ছে।
কুষাণদের আর সুলুসের মাঝে রয়েছে ভল্লুকটা।
কুদুক রাইফেলটা তুলে এগোতে লাগল তাক করে। আর সুলুসের দিকে তাকিয়ে তুর্কিক ভাষায় কিছু বলতে লাগল।
আওয়াজ পেয়ে ভল্লুকটা ঘুরল এদিকে! কুষাণ দেখল ভল্লুকটা এবার ওদের মুখোমুখি! ওদের মধ্যে তিরিশ মিটারের মতো দূরত্ব।
ভল্লুকটা আচমকা লাফ দিয়ে এগিয়ে এল ওদের দিকে। আর কুদুক সঙ্গে-সঙ্গে দু’বার গুলি চালাল।
জান্তব চিৎকার করে ভল্লুকটা পড়ে গেল মাটিতে। ছটফট করল খানিকটা। এই সুযোগে কুদুক আবার বন্দুকে গুলি ভরে নিয়ে চালাল ভল্লুকটাকে লক্ষ করে।
একটা লাগল আর অন্যটা ফসকে গেল। ভল্লুকটা আহত অবস্থাতেও উঠে দাঁড়াল। আর আগের চেয়েও জোরে চিৎকার করে এগিয়ে এল ওদের দিকে। কুদুকের কাছে আর গুলি নেই। ও কী করবে বুঝতে পারল না!
কুষাণ দেখল ভল্লুকটাকে। পেটের মধ্যে কী একটা গেঁথে আছে। মাটিতে পড়ার সময় পেটে গেঁথে গিয়েছে নিশ্চয়ই!
ভল্লুকটা হাত দিয়ে ঝটকা মেরে পেটে গাঁথা হাড়ের মতো জিনিসটা ফেলে দিয়ে আরও এগিয়ে গেল ওর দিকে। কুদুক পিছতে গিয়ে এবার পড়ে গেল মাটিতে। ওকে যদি ভল্লুকটা একবার ধরে, তা হলে মৃত্যু নিশ্চিত!
নিমেষে কুষাণ কর্তব্য স্থির করে নিল। তারপর হাতের জ্যারিকেনের মুখটা খুলে তার ভিতরের ডিজ়েল ছুঁড়ে মারল ভল্লুকটার গায়ে। ভিজে গিয়ে সামান্য থমকে গেল ভল্লুকটা। আর এই সুযোগে পিছন থেকে সুলুস নিজের হাতের আগুনজ্বলা লাঠিটা ছুড়ে দিল ভল্লুকটার শরীর লক্ষ করে।
সঙ্গে-সঙ্গে দাউদাউ করে জ্বলে উঠল ভল্লুকটা। আর জান্তব চিৎকার করতে-করতে কিছু দূরে গিয়ে পড়ে গেল মাটিতে। কিছুক্ষণ নড়ার পরে স্থির হয়ে গেল একদম।
আগুন জ্বলতে লাগল শুধু। সুলুস হাঁফাতে-হাঁফাতে এসে বলল, “গুলির আঘাতেই মারা গিয়েছে। আগুনে পোড়ার কষ্ট খুব একটা পায়নি।”
কুদুক তখনও বিহ্বল অবস্থায় পড়ে আছে মাটিতে।
কুষাণ এগিয়ে গিয়ে হাত ধরে তুলল ওকে।
কুদুক উঠে তাকাল ওর দিকে। সুলুস এগিয়ে এল। হাতে একটা জিনিস। কী এটা?
কুষাণ দেখল, আরে, এটা যে সেই হাড়ের মতো জিনিস, যেটা ভল্লুকের পেটে গেঁথে গিয়েছিল!
সুলুস উত্তেজিত গলায় বলল, “কুদুক, এটা দেখো... এটা... এটা উলি রাইনোর খড়্গ!”
কুদুক তাকিয়ে দেখল জিনিসটা। চোখ-মুখে একটা চাপা খুশি।
কুষাণ জানে উলি রাইনোর খড়্গ খুব দামি জিনিস। এই যেটা আছে সুলুসের হাতে, তারই দাম হবে প্রায় পঞ্চাশ হাজার ডলার! এটাই পারমাফ্রস্ট থেকে বেরিয়েছিল, যার উপর পড়ে গিয়েছিল ভল্লুকটা।
কুদুক হাতে নিল খড়্গটা। তারপর তাকাল কুষাণের দিকে। বলল, “ঠিক আছে। তোমার কথাই থাকল। কাল যাব আমরা। আর থ্যাঙ্কস ফর সেভিং মাই লাইফ!”
আজ গরম পড়েছিল খুব। তারপর সন্ধেবেলায় হঠাৎ বৃষ্টি হয়েছে। ফলে আবহাওয়া একদম পালটে গিয়েছে। সারাক্ষণ এ সি-তে থাকতে ভাল লাগে না গুলশনের। তাই গাড়ির জানলা খুলে দিয়েছে আজ। সুন্দর হাওয়া আসছে। ঠান্ডা, মনোরম।
মাঝের সিটে আরাম করে বসল গুলশন।
এই গাড়িটা নতুন। সামনে ওর একজন বডিগার্ড বসে আছে। পিছনের সিটেও আছে একজন। আসলে সঙ্গে রাখতে হয় এদের। নানা বাঁকা কাজকম্মো করে ও। শত্রু তো কম নেই! এই যে দুর্গাপুর গিয়েছিল, সেটাও তো টাকা আদায় করতে। একজন বেশ কিছু টাকা ধার নিয়েছিল। সুদে-আসলে সেটা বেড়ে গিয়েছিল বেশ। কিন্তু গুলশন চাপ দিয়ে, ভয় দেখিয়ে যা প্রাপ্য, তার অনেক বেশি টাকা আদায় করেছে।
গুলশন জানে, এই পৃথিবীতে ভাল করে বাঁচতে হলে সোজা সরল হয়ে থাকলে হয় না। এখানে জোর যার মুলুক তার! এমনি-এমনি কি এত টাকা রোজগার করেছে গুলশন? ওর বাবার সামান্য একটা মুদিখানার দোকান ছিল। সেখান থেকে আজ কয়েকশো কোটি টাকার মালিক ও। এটা তো এমনি-এমনি হয়নি!
গাড়ি দ্রুত চলছে। বর্ধমানের গলসি ছাড়িয়ে হু হু করে ছুটছে। রাত প্রায় একটা বাজে। হাইওয়েতে বড়-বড় লরি যাচ্ছে শুধু। জানলা দিয়ে সুন্দর হাওয়া আসছে। আজ মনটা ভাল হয়ে আছে। ওদিকের কাজটাও শেষ হয়ে এল। আর কয়েকদিনের মধ্যেই হাতে এসে যাবে দামি কিছু জিনিস!
জয়রাম সেনগুপ্ত সহজ মানুষ নয়। দামি কিছু না থাকলে কি এমনি-এমনি এত টাকা খরচ করে কেউ ওই পাণ্ডববর্জিত জায়গায় লোক পাঠায়? টাকা কি খোলামকুচি? হারানো দাদাকে নাকি খুঁজতে চায়! হাসি পায় ভাবলে। আসলে জয়রাম চায় আসল জিনিস। রোডিয়াম বা অমন দামি কিছু। অত সহজ নয় গুলশনকে ধোঁকা দেওয়া। ওর সামান্য সন্দেহ হলেই সেটাকে খুঁটিয়ে দেখে ও। এই যেমন মণিময়ের উপর সন্দেহটা পরখ করিয়ে নিয়েছে জিজিকে দিয়ে। অত সহজ নয় গুলশনকে বোকা বানানো।
“স্যার, সামনে একটু দাঁড়াব?” ড্রাইভারটা মুখ না ঘুরিয়েই জিজ্ঞেস করল।
“কেন?” গুলশন জিজ্ঞেস করল।
ড্রাইভারটা বলল, “একটু বাথরুম যাব। মানে অনেকক্ষণ চালাচ্ছি তো! তাই... মানে...”
“ঠিক আছে, ঠিক আছে। রাখ বাঁ দিকে,” গুলশন হাতের ছোট ডিবে খুলে পান বের করে মুখে পুরল। রাতে গাড়ি চালানো রিস্কি ব্যাপার! ড্রাইভারদের ব্রেক না দিলে মুশকিল। এই ছেলেটা সদ্য কাজে যোগ দিয়েছে। নাম নিখিল। চুপচাপ থাকে। তবে কথা বললে শোনে।
ড্রাইভারটি জলের বোতল বের করে বলল, “আপনি বসুন গাড়িতে, আমি পাঁচ মিনিটে আসছি।”
গুলশন দেখল চারদিক। জায়গাটা শুনশান। নির্জন। তবে হাওয়া আছে আজ। ড্রাইভার ছেলেটা অন্ধকারে কোথায় যেন চলে গেল। যাক গে। গুলশন পকেট থেকে মোবাইলটা বের করল দেখবে বলে। ওর সামনে আর পিছনে দু’জন বডিগার্ড পাথরের মতো বসে রয়েছে।
মোবাইলটা খুলে সেদিকে তাকাল গুলশন। আচমকা মনে হল গাড়ির ভিতরটা যেন আলোয় ভরে গেল একদম! আরে এটা কী! এত আলো কেন? পিছন থেকে এত আলো আসছে কোথা থেকে! সঙ্গে এমন গাড়ির গর্জন!
গুলশন পিছনে ফিরল আর দেখল একটা বিশাল বড় ট্রাক ধেয়ে আসছে রাস্তার পাশে দাঁড় করানো ওর গাড়িটার দিকে। সর্বনাশ! ট্রাকটা ব্রেক ফেল করল নাকি?
গুলশন শেষ চেষ্টা করল গাড়ির দরজা খুলে বাইরে লাফ মারার। কিন্তু তার আগেই ট্রাকটা এসে প্রচণ্ড জোরে ধাক্কা মারল গাড়িটাকে।
দূরে, অন্ধকারে একটা ঝোপের মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো ঘটনাটা দেখল নিখিল। ট্রাকের ধাক্কায় গুলশনের গাড়িটা দুমড়েমুচড়ে একশা হয়ে গিয়েছে। ট্রাকটা আর দাঁড়ায়নি। কাজ সেরেই পালিয়ে গিয়েছে দ্রুত গতিতে।
নিখিলের হাত-পা কাঁপছে। সামনে তিনটে জলজ্যান্ত লোক মারা গেল! আর ওর হাত রইল এতে!
নিখিল কাঁপা হাতে মোবাইলটা বের করল। তারপর একটা নম্বর ডায়াল করে বলল, “স্যার কাজ হয়ে গিয়েছে। তবে... আমার টাকাটা...”
ওদিকের লোকটা বলল, “সব শেষ তো? হাফ ডান করে ছেড়ে দেয়নি তো?”
নিখিল বলল, “কমপ্লিট স্যার! আমার...”
“পেয়ে যাবে। সঙ্গে টিকিটও... এখানে থাকবে না। নেপাল চলে যাবে। সেখান থেকে জাস্ট হারিয়ে যাবে তুমি। ঠিক আছে?”
নিখিল ফোনটা কেটে দিল। নিজেকে ঠিক করার চেষ্টা করল। এখন ওকে অসহায় ড্রাইভারের ভূমিকায় অভিনয় করতে হবে। কেউ যেন সন্দেহ না করে।
সর্বনাশ হয়ে গিয়েছে এমন ভান করে নিখিল দৌড়ে গেল দুমড়েমুচড়ে গোল্লা পাকানো গাড়িটার দিকে।
বোট থেকে নেমে সতর্কভাবে চারদিকে দেখল কুদুক। না, আজ আর পুলিশ বা এনভায়রনমেন্ট গার্ডরা কেউ নেই! তাও হাতের রাইফেলটা ভাল করে ধরে সামনে এগোল কুদুক। ওর পিছনেই রয়েছে কুষাণ।
এখন সকাল এগারোটা বাজে। তা হলেও আকাশে আলো কম। মেঘ করে আছে খুব আর ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়ছে!
সামনেই জঙ্গল। সেই পথ। সেদিন চপারের মতো ধারালো অস্ত্র দিয়ে গাছপালা কাটতে-কাটতে কুদুক এগোচ্ছিল! সেই কাটা গাছপালার চিহ্ন পড়ে আছে চারদিকে। সেই চিহ্ন ধরে-ধরে ওরা দু’জনে এগোতে লাগল।
জঙ্গলের মধ্যে সেই বড় মৃত গাছটা চিনতে পারল ওরা। শুকনো ডালপালা আকাশের দিকে যেন হাত মেলে প্রার্থনা করছে। সেটার পাশ দিয়ে গিয়ে সেই সরু জলের ধারাটাও দেখতে পেল এবার। সেটা টপকে এগোতে লাগল ওরা। জঙ্গলটা এখানে পাতলা হয়ে এসেছে। ওই তো সামনে সেই চোরাবালি! সেদিন এটাতেই তো আর-একটু হলে পা দিয়ে দিচ্ছিল কুষাণ!
সেটার পাশ দিয়ে সামনে এগোতে লাগল ওরা।
এইখানে পথটা একটু উপরের দিকে উঠে গিয়েছে! কুষাণ জানে ওই পথের ওইদিকে রয়েছে সেই লাল ফুলের জঙ্গল!
ও কুদুককে ছাড়িয়ে ওইদিকে দৌড়ে গেল।
“আস্তে,” কুদুক চাপা গলা বলল, “এখানেই সেদিন মাস্কঅক্সের ছানাটাকে পাওয়া গিয়েছিল, মনে নেই? এভাবে যাচ্ছ কেন? আগে চারদিকটা দেখে নাও। একবার বরাতজোরে বেঁচে গিয়েছ, তার মানে এই নয় যে সব বার বেঁচে যাবে তুমি!’
কুষাণ বুঝল কুদুক ঠিক বলছে। ও সামলে নিল নিজেকে। তারপর কুদুককে এগোতে দিল সামনে। যতই হোক, এইসব জঙ্গলে চলাফেরা করার অভিজ্ঞতা আছে কুদুকের, কুষাণের নেই।
আজ লাল রংয়ের ফুলের অঞ্চলটা আরও অদ্ভুত লাগছে যেন। বৃষ্টি থেমে গিয়েছে। তবু মাথার উপর গাঢ় ধূসর আকাশ। চারদিকে কালচে সবুজ জঙ্গল আর তার মাঝে এমন একটা লাল ফুলের বিস্তীর্ণ অঞ্চল।
কিন্তু তারপরে? তারপরে কোন দিকে যাবে ওরা?
কুষাণ দেখল লাল ফুলের অঞ্চলটা বেশ অনেকটা ঢালু হয়ে নেমে গিয়েছে সামনে। তারপর আবার আস্তে-আস্তে টিলার মতো উঠে গিয়েছে। আরে, টিলার মাথাটা সত্যি তো ভল্লুকের মতোই দেখতে!
এদিকে পথ নেই একদম। বোঝা যাচ্ছে মানুষজন এখনও এখানে এসে পৌঁছয়নি তাদের ওই দাঁত খোঁজার যন্ত্রপাতি নিয়ে।
কুদুক বলল, “তা হলে? এবার কোন দিকে?”
কুষাণ একটা বড় গাছের নীচে দাঁড়াল। তারপর ওর ওয়াটারপ্রুফের মধ্যে থেকে ডায়েরিটা বের করল। দেখল ম্যাপে, লাল ফুলের এই অঞ্চলের শেষে, মানে ওই একদম অন্য মাথায় চারটে গোলাপ ফুল আঁকা রয়েছে। আর কিছু নেই! সংকেতটা আবারও পড়ল। কিছুই বুঝতে পারল না।
চারটে গোলাপ ফুল কেন?
কুদুকও আজ উঁকি মেরে দেখছে ম্যাপটা। ও বাংলা না বুঝলেও গোলাপ ফুলটা বুঝল।
“এটা কী?” ও অবাক হল।
“রোজ়,” ছোট করে বলল কুষাণ। তারপর আর না দাঁড়িয়ে এগোতে লাগল।
দেখাই যাক না কী আছে ওখানে। কুদুকের মুখ দেখে ও বুঝল যে কুদুক কিছুই বুঝতে পারছে না! কিন্তু তাও ওর সঙ্গে যাচ্ছে।
লাল ফুলের গাছগুলো প্রায় পাঁচশো মিটার বিস্তৃত।
টিলাটার আছে এসে ফুলগুলো শেষ হয়ে গিয়েছে। এবার?
কুষাণ টিলার দিকে তাকাল। তারপর ঘড়ির কাঁটার দিক বরাবর গোল করে টিলাটাকে প্রদক্ষিণ করতে লাগল। আর তখনই দেখল জিনিসটা!
গোলাপফুলের গাছ আর তাতে ফুটে আছে কী সুন্দর ফুল! আর একটা নয়। চারটে! লাল রংয়ের গোলাপ! তাজা, চকচকে! আর তার পাশেই টিলার মধ্যে গুহার মতো বেশ কয়েকটা পথ!
“এখানে গোলাপ ফুল!” অবাক হল কুদুক।
কুষাণ নিজেও অবাক! গোলাপ ফুল কীভাবে এল এখানে! তাও এমন তাজা! টকটকে লাল! আর টিলার গায়ে গুহার মতো এমন পথ কেন?
ওরা যেখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে ফুলগুলো সেখান থেকে বেশ কিছুটা দূরে। কুষাণ এগিয়ে গেল ফুলগুলোর দিকে। তারপর ঝুঁকে পড়ে ধরল ফুলগুলো। আর চমকে উঠল। এ কী! এগুলো যে ভেলভেটের! নকল! এখানে নকল ফুল কেন? আর গাছগুলোও তো তাই। কুষাণ আবার বের করল ডায়েরিটা। আর-একবার দেখতে হবে। কুদুকের সাহায্যও নিতে হবে।
পিছনে ঘুরে কুদুককে সেটা বলতে গেল কুষাণ, কিন্তু পারল না। বরং তার আগেই দেখল কুদুকের পিছনের জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসছে তিনজন মানুষ! আর তিনজনের হাতেই বন্দুক! মুখ দেখা যাচ্ছে না। মাথা টুপির সঙ্গে লাগানো জাল দিয়ে মুখ ঢাকা!
“কুদুক!” কুষাণ দৌড়ে কুদুকের দিকে যেতে-যেতে চিৎকার করে ওকে সতর্ক করে দিতে গেল। কিন্তু তার আগেই আকাশের দিকে লক্ষ করে ওই তিনজন মানুষের মাঝের জন গুলি চালাল। সচকিত হয়ে কুদুক ঘুরল পিছন দিকে।
তিনজন সামনে এগিয়ে এল এবার। বন্দুকগুলো ওদের দিকে তাক করা। মাঝের লোকটা মাথা থেকে খুলে ফেলল টুপি!
আর অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল কুষাণ! এ কী! মণিময়!
মণিময় হাসছে। হাতে ধরা বন্দুকটা এবার নামাল। বলল, “তা হলে শেষ পর্যন্ত আমাদের সাহায্য করলে কুষাণ!”
“আপনি! আপনি এতটা দূরে? মানে... আপনি তো...” কুষাণ কী বলবে যেন বুঝতে পারল না। এসব কী হচ্ছে?
মণিময় বলল, “মানে জেনে কী করবে তুমি? শোনো, হাতের ডায়েরিটা এবার দিয়ে দাও! সেই কলকাতা থেকে ওটা হাতানোর চেষ্টা করছি আমরা। এবার দাও!”
কুষাণ চোয়াল শক্ত করে বলল, “কেন, কী করবে নিয়ে?”
মণিময় বলল, “কী করব জেনে তোমার কী হবে? কী ভেবেছ, একা-একাই তুমি গুপ্তধন হাতিয়ে নেবে? অত সহজ? দাও বলছি, না হলে... জিজি, টেক দ্যাট ফ্রম হিম।”
পরের কথাগুলো যাকে বলল সেই লোকটা এবার এগিয়ে আসতে গেল ওর দিকে।
কুষাণ দ্রুত ঠিক করে নিল কী করবে। তারপরেই পকেট থেকে বের করল লাইটার। আর সেটা জ্বালিয়ে বলল, “সাবধান, আর এক পা এগোলেই কিন্তু আমি ডায়েরিটায় আগুন লাগিয়ে দেব।”
“ও মিথ্যে বলছে,” মণিময় চিৎকার করল, “জিজি, তুমি কেড়ে নাও ডায়েরিটা। নাও।”
জিজি দ্রুত এগিয়ে এল কয়েক পা। তারপর বন্দুক তুলল। বলল, “গিভ ইট টু মি। অর...”
কিন্তু কথা শেষ করার আগেই আগুন ঝলকে উঠল কুদুকের রাইফেল থেকে। আর কুষাণ দেখল জিজি ছিটকে পড়ল মাটিতে। তারপর নিথর হয়ে গেল।
কুদুক দ্রুত ঘুরে মণিময়ের পাশের অন্য লোকটিকে লক্ষ করেও গুলি চালাল। ঘটনার দ্রুততায় লোকটাও নড়তে পারল না। কাটা গাছের মতো পড়ে গেল মাটিতে।
কুষাণ দেখল মণিময় তাকিয়ে আছে অবাক হয়ে। কুদুক এবার মণিময়ের দিকে বন্দুক তুলল।
কুষাণ দ্রুত এগিয়ে গেল কুদুকের দিকে। তারপর বলল, “না, কুদুক! মেরো না! ওকে মেরো না।”
কুদুক তাকাল কুষাণের দিকে। তারপর বলল, “কী আছে ডায়েরিতে?”
কুষাণ ডায়েরিটা এগিয়ে দিল কুদুকের দিকে। বলল, “ওই গোলাপগুলো...”
কিন্তু কথা শেষ করার আগেই আচমকা কুদুক ঘুরল কুষাণের দিকে। তারপর বন্দুকের বাটটা দিয়ে মারল কুষাণের মাথায়!
কুষাণের মনে হল মাথার ভিতর একটা বোমা ফাটল যেন। ওর চারপাশের সারা পৃথিবী অন্ধকার হয়ে গেল নিমেষের জন্য! ও পড়ে গেল মাটিতে।

কী প্রচণ্ড ব্যথা! তাও কোনও মতে চোখ খুলল কুষাণ। দেখল কুদুকের হাতে ধরা রয়েছে ডায়েরিটা। কুদুক হাসছে। আর ওর পাশে দাঁড়িয়ে হাসছে মণিময়!
এটা কী হচ্ছে! মণিময়! কুদুক! একসঙ্গে?
কুষাণ বুঝতে পারছে ওর মাথার ডান দিক দিয়ে রক্ত পড়ছে। যন্ত্রণা করছে খুব! বুঝতে পারছে এবার ওকেও মেরে দেবে ওরা। আর রক্ষা পাবে না কিছুতেই। শুধু বুঝতে পারছে না কী করে দু’জন একসঙ্গে হল! কুদুক তা হলে এতটা সময় ধরে ওর পাশে থাকার অভিনয় করে গেল?
মণিময় এগিয়ে এসে হাঁটু গেঁড়ে বসল ওর পাশে। তারপর সামান্য হেসে বলল, “অবাক লাগছে না অ্যাথলিটবাবু? তুমি কি ভেবেছ যে নিজেই বুদ্ধি করে এড়িয়ে যাবে সবকিছু? কলকাতায় যখন তোমার থেকে ডায়েরি নিতে পারলাম না, তখন ভাবলাম ডায়েরি নিয়েই বা কী হবে? তার চেয়ে তোমাকে ফলো করলেই তো হয়! ওসব ম্যাপ দেখা, সংকেত বোঝা আমার কম্ম নয়। তাই তোমার পিছু নিলাম। কিন্তু তোমায় একদম ছেড়ে রাখাও তো যায় না। তাই ইয়াকুৎস্কে তুমি যখন কুদুককে বললে এখানে তোমায় নিয়ে আসার জন্য তখন তোমায় আমি ফলো করছিলাম। তুমি কুদুকের সঙ্গে কথা বলে চলে যাওয়ার পরের দিন গিয়ে আমি ওর সঙ্গে কথা বলেছিলাম। রাজি করিয়েছিলাম ওকে, যাতে তোমার কাছে থেকেও আমার হয়েই কাজ করে। তোমার খবর যেন স্যাট ফোনের মাধ্যমে আমায় জানায়। লোকেশন যেন জানাতেই থাকে। কিন্তু তারপরেও প্রশ্ন হল, তুমি ওকে বিশ্বাস করে নিজের সঙ্গে নেবে কেন? একাই তো তুমি খুঁজতে যেতে পার? তা হলে এমন কিছু করতে হবে যাতে তোমার ওর উপর বিশ্বাস জন্মায়! সেটাই করলাম নদীর ধারে তোমাদের উপর নকল হামলা চালিয়ে। সেখানে কুদুক তোমাকে বাঁচানোর ভান করল। তুমি ভাবলে লোকটা খিটখিটে হলেও ভাল। তোমায় বাঁচিয়েছে! কিন্তু তুমি জানো না যে ও ট্রোজ়ান হর্স! আগের দিন ও এসেছিল তোমার থেকে এই লোকেশনটা দেখে নেওয়ার জন্য। কিন্তু সবটাই পণ্ড হয়। আজ আমায় জানিয়েছিল যে তুমি আর ও এখানে আসবে। আমি তাই আগে থাকতেই চলে এসেছিলাম। তারপর এখানে এসে ফলো করলাম তোমাদের। আর অবশেষে আমরা এখানে মিলিত হলাম! আর ডায়েরিটাও আমার হল!”
কুদুক বিরক্ত হল এবার। বলল, “অত কথার কী আছে? ওকে শেষ করো! তারপর ওই টিলার গায়ের গুহাগুলোয় ঢুকে খুঁজলেই হবে। নিশ্চয়ই ওখানেই আছে গুপ্তধন!”
মণিময় এক মুহূর্তের জন্য গুহা দেখতে পিছনে ফিরল। আর সেই সুযোগে কুষাণ উঠতে গেল। কিন্তু পারল না। ভেজা মাটিতে পা পিছলে পড়ে গেল আবার। আর মাথাটা জোরে ঠুকে গেল পাথরে! কুষাণের চোখের সামনে পৃথিবী যেন ঝাপসা হয়ে গেল নিমেষের জন্য। মনে হল চারদিকে যেন ঝিঁ ঝিঁ ডাকছে। মাথা কাজ করছে না। ও দেখল মণিময় ওর দিকে চোখ রেখেই কয়েক পা পিছিয়ে গেল। তারপর হাত তুলে কী একটা বলল কুদুককে।
কুষাণের হাত-পা অবসন্ন। মাথার ব্যথাটা সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়েছে। চোখ বুজে আসছে। জ্ঞান হারিয়ে ফেলছে ক্রমশ।
সেই অবস্থাতেও কুষাণ দেখল কুদুক ওর দিকে তাক করে বন্দুক তুলল। আর মণিময় ঘুরিয়ে নিল মুখ। যেন কুষাণের মৃত্যুটা ও দেখতে চায় না।
এই তবে শেষ! এভাবেই শেষ হল সব! জেঠুর কথা মনে পড়ল কুষাণের। মনে পড়ল জেঠিমার কথা! কলকাতা শহরের কথা। তারপর ধীরে-ধীরে বন্ধ হয়ে এল ওর চোখ।
আর সেই জ্ঞান হারানোর ঠিক আগের মুহূর্তে বাতাসে কীসের একটা শব্দ পেল কুষাণ। আর ঝাপসা চোখে দেখল তিরের মতো কী যেন হাওয়ায় শিস তুলে এসে গেঁথে গেল কুদুকের বুকে আর মণিময়ের গলায়! কিছু বোঝার আগেই দু’জনে লুটিয়ে পড়ল। আর দু’জনের মরণ-আর্তনাদ খণ্ড-খণ্ড হয়ে হারিয়ে গেল জঙ্গলের হাওয়ায়।
আর কুষাণও ডুবে গেল অন্ধকারে।
আলো! এত আলো!
চোখ খুলেই আবার বন্ধ করে নিল কুষাণ! আলোটা যেন পিনের মতো ফুটল মাথায়! কী যন্ত্রণা! নিজের অজান্তেই মাথায় হাত উঠে গেল ওর। কষ্ট হচ্ছে খুব। তবে এটাও বুঝতে পারছে যে বেঁচে গিয়েছে! কিন্তু কোথায় আছে ও? এটা কোন জায়গা!
আবার চোখ মেলল কুষাণ। আলো আসছে। ডান দিকের একটা গোলমতো গর্ত থেকে আলোর লাঠি এসে পড়ছে ওর মুখে!
কুষাণ বুঝল ওর মাথায় ব্যান্ডেজ করা হয়েছে। কে করল ব্যান্ডেজ? আর এই জায়গাটাই বা কী!
“কী, শরীর কেমন? উঠতে পারবে?”
গম্ভীর গলার স্বর শুনে চমকে উঠল কুষাণ। কে কথা বলছে বাংলায়!
ও ধীরে-ধীরে উঠে বসল। দেখল সামনে একজন ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে রয়েছেন। বিশাল লম্বা-চওড়া চেহারা। মুখভর্তি বড় দাড়ি-গোঁফ। গায়ে একটা অলিভ ওয়াটারপ্রুফ। আর মাথায় টুপি। কপালটা শুধু দেখা যাচ্ছে লোকটার। আর তাতে একটা আঁচিল!
কুষাণের চোখদুটো বড় হয়ে গেল! আরে, এটা তো ও চেনে। এখানে আসার আগে জয়রামবাবু দেখিয়েছিলেন ফোটো! তবে দাড়ি-গোঁফ কামানো ছিল সেই ফোটোয়। কিন্তু মাথার আঁচিলটাও তো একই রকম! আর সেই লম্বা-চওড়া চেহারা!
কুষাণ বুঝল ওর সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন রনিত সেনগুপ্ত!
কুষাণ চারদিকটা দেখল এবার। বুঝল একটা গুহার ভিতরে রয়েছে ও। এখানে মাটিটা পরিষ্কার। তার উপরে কম্বল ধরনের একটা জিনিসের উপরে ওকে শুইয়ে রাখা হয়েছিল।
রনিত হাসলেন। তারপর বললেন, “আশ্চর্য হয়েছ! ডায়েরিটা তুমি পেলে কী করে? জয় পাঠিয়েছে তোমায়? কী নাম তোমার?”
কুষাণ বিহ্বল হয়ে বলল, “আমি কুষাণ। জয়রামবাবু পাঠিয়েছেন আপনাকে খুঁজে বের করতে। কিন্তু আমার পিছনে কিছু লোক লেগেছিল। বাজে লোক। আপনি ডায়েরিতে লিখেছিলেন যে দামি জিনিস আছে। সেই লোভে তারা পিছু নিয়েছিল আমার। তারপর...”
“ওদের তির দিয়ে মেরে দিয়েছে ভোভা আর ফিওদর!”
“কে?” কুষাণ বুঝতে পারল না।
রনিত শিস দিল একটা। আর সামনের আর-একটা গোল মতো গর্ত থেকে বেরিয়ে এল দু’টি অল্পবয়সি ছেলে। ফরসা, রোগা। দু’জনের হাতেই লোহার তৈরি তির-ধনুক!
রনিত বললেন, “কাছের গ্রামে আমার সঙ্গেই থাকে ওরা।”
“গ্রাম! এখানে?” কুষাণ জিজ্ঞেস করল।
রনিত মাথা নাড়লেন, “হ্যাঁ, তবে এখানে মানে নব্বই কিলোমিটার দূরে। খুব ছোট গ্রাম। কয়েকটা মাত্র বাড়ি আছে। সাইবেরিয়ান ক্র্যানবেরি আর মাশরুম কুড়িয়ে দিন যায় ওদের। ইউরোপ আর চিন দেশে এগুলোর খুব চাহিদা। আমিও ওখানে থাকি। পাণ্ডববর্জিত জায়গা বলতে পার।”
“তো আপনি জঙ্গলে থাকেন না?”
“আমি কি রবিনসন ক্রুসো?” হাসলেন রনিত, “জঙ্গলে থেকেছি কিছুদিন। প্রায় মরতে বসেছিলাম ঠান্ডায় আর খিদেয়। তারপর এই গ্রামের একজন এসে নিয়ে গিয়েছিল ওদের ওখানে। অনেকেই আছে ওখানে, যারা আমার মতো রাশিয়ান প্রিজ়ন ক্যাম্প থেকে পালিয়ে এসেছে। আমি শুধু চলে যাওয়ার আগে ডায়েরিটা আয়সেনকে দিয়ে গিয়েছিলাম। ওকে বলেছিলাম ওটা দিমিত্রিকে যেন পৌঁছে দেয়! দিমিত্রি ডায়েরিটা পেলে নিশ্চয়ই সেটা জয়কে পাঠানোর বন্দোবস্ত করত। আর তার ফলে যদি কেউ কোনওদিন আমাকে এখানে খুঁজতে আসত! এই ছিল ইচ্ছে। আসলে আমার পক্ষে তো আর লোকালয়ে যাওয়া সম্ভব নয়! ভোভা এখানে ঘুরে বেড়ায়। ও আমায় খবর দিয়েছিল যে গত পরশু এখানে মাস্কঅক্সরা দু’জনকে তাড়া করেছিল। একজনের চেহারার বর্ণনা শুনে মনে হয়েছিল ভারতীয়। আমার সন্দেহ হয়। আমি ওদের নিয়ে কাল থেকে এখানে এসে অপেক্ষা করছিলাম যদি আবার কেউ আসে, সেই আশায়!”
কুষাণ বলল, “ডায়েরিটা অনেকদিন পরে জয়রামবাবুর হাতে এসেছিল। আর তাই উনি আমায় পাঠালেন। কিন্তু দামি জিনিস বলতে আপনি কী বলেছিলেন? যারা আমায় মারতে এসেছিল তারা তো গুপ্তধন ভেবেছিল!”
রনিত কিছু না বলে হাসলেন।
কুষাণ বলল, “গুপ্তধন নেই, জানি। আমি আপনাকে পেয়ে গিয়েছি। এটাই গুপ্তধন আমার কাছে। আপনাকে আমি ফিরিয়ে নিয়ে যাব। জয়রামবাবু খুব আশা করে আছেন!”
“কে বলেছে গুপ্তধন নেই?” রনিত তাকালেন কুষাণের দিকে।
কুষাণ কী বলবে বুঝতে পারল না!
“এসো,” রনিত এগিয়ে গেল সামনে। কুষাণ ধীরে-ধীরে পিছনে গেল।
গুহার ভিতরে গোলকধঁাধার মতো পথ। সেই পথ ধরে ওরা এসে দাঁড়াল বাইরে। দেখল, আরে! এখানেই তো ওরা ছিল। ওই তো গোলাপফুলের গাছগুলো! কিন্তু কুদুক আর মণিময়!
রনিত বলল, “শয়তানদুটোকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ভোভারা সরিয়েছে। ওদের আর কেউ খুঁজে পাবে না কোনওদিন! এদিকে এসো।”
কুষাণ রনিতের সঙ্গে এগিয়ে গেল গোলাপ গাছগুলোর সামনে।
রনিত জিজ্ঞেস করল, “এগুলো কী, দেখেছ?”
“নকল গোলাপ গাছ। কিন্তু চট করে দেখলে আসলের মতো লাগে! কিন্তু এগুলো এখানে কেন?”
রনিত দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “কারণ এগুলোই আসল। তুমি রোমানভদের কথা জান?”
মাথা নাড়ল কুষাণ। কোথায় যেন শুনেছে। নামটা চেনা। কিন্তু আর কিছু মনে করতে পারছে না।
রনিত বললেন, “রোমানভ বংশ বা হাউজ় অব রোমানভরা রাশিয়ায় রাজত্ব করেছিলেন ১৬১৩ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯১৭ অবধি। এই রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন মিখাইল রোমানভ। তাঁর খুব শখ ছিল ফুল গাছের। বলা হয় তিনিই প্রথম গোলাপ গাছ এনে গোলাপ বাগান তৈরি করেছিলেন রাশিয়ায়। তার নিজের সংগ্রহে ছিল বহুমূল্যবান চারটে হিরে। নাম দিয়েছিলেন চারটে এলিমেন্ট-এর নাম অনুযায়ী। ফায়ার, আর্থ, এয়ার, ওয়াটার! এসবের কথা রোমানভরা ছাড়া আর কেউ জানত না। তারপর রাশিয়ান রেভোলিউশনের সময় জ়ার নিকোলাস টু-কে বন্দি করে সপরিবার হত্যা করা হয়। জ়ারদের বিপুল সম্পত্তি সরকার বাজেয়াপ্ত করল। কিন্তু তাও রোমানভ বংশের কিছু মানুষ পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিলেন। দিমিত্রি ছিলেন তাঁদের একজন। দিমিত্রির কাছে ছিল সেই চারটে হীরকখণ্ড। দিমিত্রি আমায় যখন নিজের বাড়িতে আশ্রয় দেয় তখন ও নিজেও খুব একটা নিরাপদ ছিল না। বরং সরকার-বিরোধীদের সঙ্গে যোগাযোগ থাকায় ওর উপর নজর ছিল পুলিশের। আমায় নিরাপদে পার করে দিয়ে ও বলেছিল এই হিরেগুলো যেন আমি লুকিয়ে রাখি। ও কোনওদিন আমার কাছে ফিরতে পারলে এগুলো নেবে। না হলে এগুলো আমার! দিমিত্রি ফিরতে পারেনি। আমি গ্রামে থাকি। সেখানেও ভাল লোকজন নয় সবাই। তাই...”
কুষাণ দেখল রনিত ঝুঁকে পড়ে চারটে নকল ফুলগাছ তুলে ফেলল মাটি থেকে। আরে, গাছগুলোর গোড়ায় প্লাস্টিক বাঁধা!
কুষাণকে দেখিয়ে প্লাস্টিকগুলো খুলে ফেললেন রনিত। আর নিজের হাতের পাতা মেলে ধরলেন। আর কুষাণ অবাক হয়ে দেখল হাতের পাতায় ঝলমল করছে চারটে হীরকখণ্ড!
কুষাণ বলল, “ ‘মাটির নীচে জলবায়ু, মাটির নীচে আগুন রাখি খাঁটি/ মাটির নীচে যত্ন করে লুকিয়ে রাখি অন্য রকম মাটি।’ জল, বায়ু, আগুন আর মাটি! জলবায়ু একটা কথা নয়! আলাদা-আলাদা দুটো কথা! আর ‘নকল ফুলের চিহ্ন ধরে রোমানভের সঙ্গে সবাই হাঁটি’ মানে এই নকল ফুল গাছ। রোমানভের রেফারেন্স। তাই ম্যাপে গোলাপ আঁকা। এই নকল গোলাপ গাছ। মানে এটাই গুপ্তধন!”
“হ্যাঁ! সত্যিকারের গোলাপ পুঁতলে নষ্ট হয়ে যেত গাছ। আমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল কেউ না-কেউ একদিন না-একদিন আসবেই। তাই সে যেন গাছটা দেখতে পায় বলেই নকল গাছ রেখেছিলাম। যে এতটা পথ আসবে এটাই তার পুরস্কার! তবে এটাই শুধু গুপ্তধন নয়। নট এন্টায়ারলি! আরও আছে। তবে এখানে নয়! কারণ শেষ লাইনটা! ‘দানব ঘুমোয় হাজার বছর জড়িয়ে গায়ে গোলাপ শীতল পাটি।’ সেটা? এসো,” রনিত ওকে নিয়ে আবার গুহায় ফিরলেন।
গুহার মধ্যে আবার সেই গোলকধাঁধা পেরিয়ে বেশ কিছুটা মাটির গভীরে নেমে গেল কুষাণরা। এখানে আলো কম।
রনিত হাতের আলো জ্বাললেন। বললেন, “এখানে সাবধান। খুব পিছল। এসো।”
বেশ ঠান্ডা চারদিক। কুষাণ কাঁপছে রীতিমতো। রনিত ওকে নিয়ে দাঁড়ালেন একটা জায়গায়। তারপর আলো ফেললেন সামনের মেঝেয়।
একটা বিশাল প্লাস্টিক বিছানো রয়েছে। তাতে গোলাপ ফুল আঁকা! রনিত গিয়ে প্লাস্টিকের ঢাকনা সরিয়ে দিলেন। আর কুষাণ চমকে উঠল। এটা কী!
ও দেখল ওর সামনে বিরাটাকার বরফের চাঁইয়ের মধ্যে যেন নিশ্চিন্তে ঘু্মিয়ে রয়েছে হাজার-হাজার বছর আগে পৃথিবী থেকে মুছে যাওয়া এক উলি ম্যামথ! দানব শীতলপাটি জড়িয়ে ঘুমোচ্ছে!
রনিত বললেন, “এই হল গুপ্তধন। বরফের মধ্যে জমে থাকা উলি ম্যামথ। যাতে কেউ সহজে বুঝতে না পারে তাই বাংলায়, সংকেতে লিখেছিলাম। জানতাম জয়ের কাছে ডায়েরিটা পৌঁছলে ও কিছু একটা করবেই! আমি অনেক বছর এটাকে আগলে রেখেছি। এখানে চারদিকে বরফ বলে ঠিকও আছে। কিন্তু জানি না আর কতদিন ঠিক থাকবে! ম্যামথের দাঁতশিকারিদের যা লোভ! কাকে ভরসা করব? কার হাতে দিয়ে যাব এসব! আমি তো প্রকৃত লোকালয়ে যেতে পারি না। পুলিশের ভয় আছে যে। দেখো, ঈশ্বর ঠিক সময়ে পাঠিয়েছেন তোমায়। এটার ব্যাপারে তুমি আমায় সাহায্য করতে পারবে? মানুষের সামনে যাতে এটা যেতে পারে তার ব্যবস্থা করতে পারবে? এমন একটা হারিয়ে যাওয়া প্রাণী! এর থেকে আগামী দিনে মানুষ কত কী জানতে পারবে! বৈজ্ঞানিক গবেষণায় কত কী কাজে লাগবে। বিজ্ঞানের উপকার হবে কত। আমার কাছে এটাই তো আসল গুপ্তধন। তাই না!”
“পারব,” ছোট করে বলল কুষাণ।
রনিত হেসে হাত রাখলেন কুষাণের মাথায়। তারপর বললেন, “এমনই সৎ থেকো। দেখো সব ভাল হবে।”
কলেজ স্ট্রিটের ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে কী যে ভাল লাগল কুষাণের! কত্তদিন পরে যেন নিজের মাটিতে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
কাল রাতে ফিরেছে কুষাণ। তারপর থেকে জেটল্যাগ চলছে। মাথা যেন কাজ করছে না। সারাক্ষণ কেমন একটা ভার-ভার ভাব। ঘাড়ে, মাথায় ব্যথা! চোখের পাতা দুটো ভারী। চারদিকে সবই হচ্ছে, কিন্তু কিছুই ওর মনের মধ্যে ঢুকছে না!
ও ভেবেছিল অন্তত আজকের দিনটা বিশ্রাম নিয়ে কাল যাবে জয়রামবাবুর কাছে। সেরকম ফোন করেও জানিয়ে দিয়েছিল কুষাণ। জয়রামবাবুরও আপত্তি ছিল না। কিন্তু তারপর কী যে হল! গোপালকে দিয়ে জয়রামবাবু ওকে আজকেই দেখা করতে বলেছেন। তাও নিজের বাড়িতে নয়। কলেজ স্ট্রিটে গোপালের ওই পুরনো, চারতলা বাড়ির অফিসে।
কুষাণ খুব অবাক হয়েছিল গোপালের ফোন পেয়ে। ও বলেছিল, “কিন্তু জয়রামবাবু তো বললেন কালকে দেখা করলেই হবে! তা হলে!”
গোপাল বলেছিল, “আরে আচমকা জয়রামবাবুকে কাল ভোরের ফ্লাইটে বাগডোগরা চলে যেতে হবে। তাই আমাকে বললেন তোকে খবর দিতে। তবে তোকে অত দূর ওর বাড়িতে ঠ্যাঙাতে হবে না। আমার অফিসে আয়। সেটা ওর পক্ষেও সুবিধেজনক। বাড়িতে অত দামি জিনিস লেনদেন করলে মুশকিল। জানিসই তো কাজের লোক থেকে সেক্রেটারি সব কেমন ধরা পড়েছিল! তুই একটা কাজ কর, সন্ধে সাতটা নাগাদ আমার অফিসে চলে আয়। তুই ওঁর জিনিস দিয়ে দিবি আর নিজের ওই ছ’লাখ টাকাও নিয়ে নিবি। ঠিক না?”
তা ঠিক। বাকি টাকা পাওনা আছে ওর। আর চাকরি! হ্যাঁ, সেটা নিয়েও জয়রামবাবু প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
তবে জয়রামবাবুর আসল কাজ ও ওখানেই সেরে দিয়েছে। নিজের ফোন থেকে রনিতের সঙ্গে কথা বলিয়ে দিয়েছে। দুই ভাই এতদিন পরে কথা বলতে পেরে কী যে খুশি হয়েছিলেন! রনিতকে দেখেই সেটা বোঝা গিয়েছিল।
কিন্তু রনিত আসতে পারেননি। কারণ, নানা আইনি জটিলতা হবে। তা ছাড়া দরকারি কাগজপত্রও নেই! জয়রাম বলেছেন, এর পর উনি নিজে যাবেন রাশিয়ায়। যা করার করে কাগজপত্রসমেত বের করে আনবেন দাদাকে!
আর-একটা কাজ করেছে কুষাণ। তবে সে-ব্যাপারে ওকে সাহায্য করেছে রিকো আর ওর বোন ইরিনা! ওই মৃত উলি ম্যামথটাকে গুহা থেকে বের করে নিয়ে এসে রাখা হয়েছে ইয়াকুৎস্কের মিউজ়িয়ামে। ইরিনা যে কী খুশি হয়েছে সেটা বলে বোঝানো যাবে না। কুষাণকে বলেছে, সবাই যে লোভী নয় সেটা কুষাণকে না দেখলে ও বিশ্বাস করত না!
রাশিয়ার ট্রিপটা খুবই সফল হয়েছে। আর বাড়িতে ফিরে আসার পরে জেঠু-জেঠিমাও খুশি হয়েছেন খুব! কুষাণ এসে জেনেছে যে জেঠিমার চিকিৎসাও ভালভাবে হচ্ছে। এতদিন টাকার অভাবে ভাল করে চিকিৎসা হচ্ছিল না। এখন সেই অভাব অনেকটা মিটে যাওয়ায় ঠিকমতো হচ্ছে সব কিছু। ফলে জেঠিমার শরীরও আগের চেয়ে বেশ কিছুটা ভাল হয়েছে!
কুষাণ জানে আজ যে বাকি টাকাটা পাবে, তাতে জেঠিমার চিকিৎসাটাও আরও ভাল করে হয়ে যাবে।
পুরনো বাড়িটার সিঁড়ি ভেঙে উঠতে গিয়ে ঘেমেনেয়ে একশা হল কুষাণ। কলকাতায় কী গরম! সত্যি গোপাল পারেও বটে! খুঁজে-খুঁজে অফিসও বের করেছে!
সিঁড়ি দিয়ে উঠে গোপালের অফিসের দিকে গেল কুষাণ। আজ গোটা অফিস শুনশান। যোগব্যয়ামের ক্লাস হচ্ছে না। গোপাল নিশ্চয়ই নিজের চেম্বারেই আছে।
চেম্বারে ঢুকেই থমকে গেল কুষাণ। জয়রামবাবু বসে আছেন! আর তো কেউ নেই। গোপাল কই?
“এসো-এসো,” জয়রাম হেসে বললেন, “আমিও এই এলাম।”
কুষাণ টেবিলের অন্য দিকে বসল। বলল, “গোপালদা নেই?”
“আছে-আছে! এই কোথায় যেন গেল। তা বলো, কেন এমন করে ডাকলে?”
কুষাণ পকেট থেকে একটা ভেলভেটের ছোট্ট পাউচ বের করে বলল, “এই যে আপনার ভাইয়ের দেওয়া ওই চারটে হিরে! আর...” কুষাণ থমকাল, “আমি ডেকেছি! মানে?”
জয়রাম সামান্য অবাক হলেন, “মানে গোপাল বলল যে তুমি আমায় এখানে ডেকেছ!”
কুষাণ ভুরু কুঁচকে বলল, “কিন্তু গোপালদা তো বললেন আপনি আমায় ডেকেছেন!”
“আমি কেন ডাকব?” জয়রাম অবাক হয়ে গেলেন, “তোমার সঙ্গে তো কথাই হয়ে গিয়েছিল যে তুমি আমার বাড়িতে আসবে কালকে। আমি এগুলো নেব আর তোমার বাকি টাকাটাও দিয়ে দেব!”
“সে কী!” কুষাণ অবাক হয়ে গেল, “গোপালদা এমন করবে কেন? মানে... আমি তো কিছুই...”
“গাধা, গাধা... তাই বুঝতে পারছিস না!”
আচমকা দরজার দিক থেকে গোপালকে ঘরে ঢুকতে দেখল কুষাণ। আর দেখল গোপালদার দু’হাতে দুটো পিস্তল ধরা! আর দুটোই ওর দিকে তাক করা!
“গোপালদা, এসব কী!” কুষাণ অবাক হয়ে তাকাল।
“বন্দুক!” গোপাল হাসল, “অনেক কাঠখড় পুড়িয়েছি আমি। এত দূর সব প্ল্যানমতো করেছি। এবার আমার লাভ করার পালা!”
“মানে?” কুষাণ দেখল ওর মতো জয়রামও হতভম্ব!
গোপাল বলল, “জয়রামবাবু, আপনি আমায় যেদিন বলেছিলেন এই ডায়েরির কথা আর তার ভিতরের সংকেতের কথা, সেদিনই আমি ভেবেছিলাম কী করে এটা হাতানো যায়। আমি ইচ্ছে করেই কুষাণকে আপনার কাছে পাঠাই। কারণ ও সৎ আর সাহসী, কিন্তু বোকাও। জানি দামি কিছু জিনিস পেলে ও নিজে সেটা আত্মসাৎ করবে না। বরং কলকাতায় ফিরিয়ে আনবে। আর আমি এই কাজে সঙ্গী হিসেবে পেয়ে গিয়েছিলাম মণিময়কে। ও নিজে গুলশন বলে একটা লোকের থেকে টাকা ধার করে ফেঁসে গিয়েছিল। সেই গুলশনের থেকে বাঁচতে মণিময় ওকে বলে দিয়েছিল ডায়েরির ব্যাপারটা। গুলশন ওকে রাশিয়ায় যেতে বলে কুষাণের পিছন-পিছন। মণিময় ভয় পেয়েছিল। আমি ওকে বলেছিলাম নিশ্চিন্তে রাশিয়া যেতে। এদিকটা আমি দেখে নেব। তা নিয়েওছি। যাতে গুলশন রাজ এই জিনিসে ভাগ না বসাতে পারে তার বন্দোবস্ত করেছি। গুলশন আর ইহলোকে নেই!”
“তুমি... তুমি মানুষ মেরেছ!” কুষাণ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল গোপালের দিকে! এই গোপালকে ও চেনে না।
“হ্যাঁ, মেরেছি। আবারও মারব! আমায় ওই হিরেগুলো না দিলে তোদেরও মারব।”
“তোমায় আমি বিশ্বাস করে সব বললাম আর তুমি আমার সঙ্গে এমন করলে! আমাদের এতদিনের চেনাশোনা! সব মিথ্যে! আর এসব যে করছ, এখান থেকে পালাবে কী করে শুনি?” জয়রাম গোপালের দিকে তাকালেন!
“আমি বলেছিলাম বিশ্বাস করতে? আর পালাব কী করে?” গোপাল হাসল, “দেখুন, আমার দু’হাতে দুটো পিস্তল। একটা দিয়ে ওকে মারব আর অন্যটা দিয়ে আপনাকে। তারপর দু’জনের হাতে পিস্তল ধরিয়ে দেব। আমার হাতে গ্লাভস আছে। ছাপ পড়বে না আমার। পুলিশকে আমিই ডাকব। বলব দু’জনে এখানে এসে রাগারাগি করে এসব করেছেন! আমি উকিল মানুষ। আমি জানি কী করে বেঁচে বেরতে হয়!”
“তুমি এমন করবে!” কুষাণ অবাক হল।
“নে, অনেক হয়েছে। এবার বের কর হিরেগুলো। আগে দেখি। তারপর আমার হাতে দিয়ে দিবি। বের কর,” গোপাল এগিয়ে এল টেবিলের ধারে।
কুষাণ পাউচ থেকে চারটে হিরে বের করে নিজের হাতের পাতায় রাখল।
“কই দে, দে...” গোপাল অধৈর্য হয়ে উঠেছে।
“এই যে,” কুষাণ আচমকা চারটে হিরেই শূন্যে ছুড়ে দিল।
গোপাল ঘাবড়ে গেল আর হাত থেকে একটা পিস্তল ফেলে ধরতে গেল হিরেগুলো। আর এই সুযোগটাই নিল কুষাণ। এক পা পিছিয়ে গিয়ে শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে লাথি মারল টেবিলটাকে। টেবিলটা ছিটকে গিয়ে প্রচণ্ড জোরে লাগল গোপালের পেটে। গোপাল সেই ধাক্কা সামলাতে না পেরে পড়ে গেল মাটিতে। আর এই সুযোগে কুষাণ টেবিল টপকে প্রায় উড়ে গিয়ে দ্বিতীয় লাথিটা মারল গোপালের বুক লক্ষ করে। গোপাল নড়ার সময় পেল না! ছিটকে গিয়ে পড়ল পিছনের দেওয়ালে। প্রচণ্ড জোরে মাথা ঠুকে গেল ওর। গোপাল স্থির হয়ে শূন্য দৃষ্টিতে তাকাল কুষাণের দিকে। তারপর অজ্ঞান হয়ে ঢলে পড়ল মাটিতে!
জয়রাম উঠে গিয়ে সরিয়ে নিলেন বন্দুকদুটো। তারপর দ্রুত পুলিশে ফোন করলেন।
অন্য ঘর থেকে নাইলনের দড়ি এনে কুষাণ বেঁধে ফেলল গোপালকে। মাটি থেকে পাথরগুলো কুড়িয়ে জয়রামবাবুকে দিল। তারপর চোখে-মুখে জল ছিটিয়ে জ্ঞান ফিরিয়ে আনল গোপালের।
দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসে গোপাল তাকাল কুষাণের দিকে। কেমন একটা ভয় পাওয়া দৃষ্টি। বুঝতে পেরেছে যে ওর খেল খতম!
কুষাণ বলল, “পাপের শাস্তি পেলে তো? কারও বিশ্বাস ভাঙলে জানবে এমনটাই হয় গোপালদা। তুমি লোভের বশে এমন করলে! ছিঃ!”
এর দশ মিনিটের মধ্যে পুলিশ এসে গেল। সমস্ত ঘটনা বলে গোপালকে পুলিশের হাতে তুলে দিলেন জয়রাম।
তারপর কুষাণের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তোমায় কী বলে যে ধন্যবাদ দেব! কাল থেকেই কি তুমি আমার কাজে জয়েন করতে পারবে? মণিময় তো নেই। আমার একজন বিশ্বস্ত সেক্রেটারির খুব দরকার। কী বলো কুষাণ, আমার সঙ্গে কাজ করবে?”
কুষাণ কিছু বলল না। হাসল শুধু। মাথা নামিয়ে নিল।
ভাল লাগা আর কৃতজ্ঞতা অধিকাংশ সময়ই মানুষকে এমনভাবেই চুপ করিয়ে দেয়! আসলে এসব অনুভবের বিষয়। উচ্চকিত স্বরে সব কিছু বলার দরকার পড়ে না সব সময়। ওর মনে পড়ে গেল রনিতের সেই কথাগুলো, “সৎ থেকো। দেখো, সব ভাল হবে।”
ভাল হোক বা মন্দ, কুষাণ জানে সারাজীবন ও সৎ-ই থাকবে। থাকবেই।
(এই গল্পটি কাল্পনিক। কোনও ব্যক্তি বা ঘটনার সঙ্গে মিল থাকলে তা আকস্মিক।)
————
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন