স্মরণজিৎ চক্রবর্তী
আয়সেন তাকাল পাশে। লোকটার নাম ইগর। না, ঠিক লোক নয় ছেলেই বলা যায়। চব্বিশ-পঁচিশের বেশি বয়স নয় ওর।
ইগর রোগা, ফরসা। মাথার চুলগুলো লালচে। চোখদুটো ছোট্ট বিড়ালছানার মতো কৌতূহলী।
ইয়াকুৎস্ক শহর থেকে বেশ কয়েক ঘণ্টা নদীপথে গেলে জঙ্গল শুরু হয়। নদীর দু’ধারে ছড়িয়ে থাকা এই জঙ্গল বেশ ঘন। আজকাল এখানেই যেন একটা নতুন গোল্ড রাশ শুরু হয়েছে।
আগে আয়সেনদের সংসার চালাতে খুব অসুবিধে হত। কিন্তু আচমকাই একদিন সব বদলে গেল। আর সেটা হল এই নতুন সোনার জন্য! না, এ সোনা আমাদের পরিচিত মূল্যবান ধাতু নয়। এ অন্য সোনা। আইভরি। অর্থাৎ হাতির দাঁত। এখানের লোকে একেই বলে সাদা সোনা। ইয়াকুটিয়া অঞ্চল এখন সাদা সোনার দেশ!
যুগ-যুগ ধরে সারা পৃথিবীতে হাতির দাঁতের খুব চাহিদা। রাজারাজড়া থেকে সাধারণ মানুষ, সবার কাছে এর মূল্য ও চাহিদা বিশাল।
কিন্তু হাতির দাঁত তো গাছেও ফলে না বা মাটির তলাতেও পাওয়া যায় না। তাই এর বিশাল চাহিদা জোগান দিতে গিয়ে যুগ-যুগ ধরে হাতিদের মেরে তাদের দাঁত কেটে নেওয়া হয়। এর ফলে দাঁতাল হাতি বা টাস্কারদের সংখ্যা ব্যাপক হারে কমতে থাকে সারা পৃথিবীতে। নানা দেশের সরকার হাতি মারার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা জারি করে।
তার মধ্যেও পোচার বা চোরাশিকারিরা লুকিয়েচুরিয়ে যতটা পারে হাতি মেরে, তাদের দাঁত কেটে নেওয়ার মতো খারাপ কাজ চালিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু তা হলেও সেই দাঁতের পরিমাণ আগের মতো করে সারা পৃথিবীতে আইভরির যে চাহিদা তার জোগান দিতে পারছিল না।
ঠিক সেই সময় আচমকা সাইবেরিয়ার এই অঞ্চলে, কোলাইমা নদীর ধারের লার্চ আর স্প্রুস গাছের ঘন জঙ্গলে মাটির নীচ থেকে উঠে থাকতে দেখা গেল পাকানো গোঁফের মতো কার্লি আর হাড়ের মতো শক্ত কিছু জিনিস!
কাছের গ্রামের লোকজন আগেও এসব দেখত। কিন্তু তারা এতদিন ভাবত, এসব আসলে কোনও বিশাল বড় সরীসৃপের খোল বা ভৌতিক কোনও জিনিস। ভাবত, এসব ধরলে ভগবান পাপ দেবেন।
কিন্তু এবার শহর থেকে জঙ্গলে ঘুরতে আসা লোকেদের চোখে পড়ল এই পাকানো গোঁফের মতো শক্ত জিনিসগুলো। তারা বুঝল এসব হল মহামূল্যবান দাঁত। হারিয়ে যাওয়া উলি ম্যামথের দাঁত! যদিও উলি ম্যামথ যে সরাসরি এখনকার হাতির সঙ্গে সম্পর্কিত তা নয়, তা হলেও জিনগত ভাবে এরা এশীয় হাতিদের কাছের প্রজাতি। তাই এদের দাঁতও হাতির দাঁতের মতোই দামি।
ব্যস, আর যায় কোথায়। মানুষ আসতে লাগল পিলপিল করে। শুরু হল খোঁড়াখুঁড়ি। মাটি খুঁড়ে পাওয়া এই আইভরিকে বলা হল এথিকাল আইভরি। কারণ, এই দাঁত পেতে তো আর হাতি মারতে হচ্ছে না। এসব দাঁত তো বহু হাজার বছর আগে মারা যাওয়া, মাটির নীচের বরফে জমে থাকা উলি ম্যামথের। এসবের চাহিদা প্রচুর। দামও লাখ-লাখ ডলার। আর কে না জানে যেখানে টাকা সেখানেই মানুষ গিয়ে হাজির হয়!
আয়সেন তাকাল ইগরের দিকে। ছেলেটা ক্যামেরা বের করে ফটফট করে ফোটো তুলছে। আর একটা ছোট্ট যন্ত্র বের করে ইংরেজিতে কী সব কথা রেকর্ড করে রাখছে।
ছেলেটা সাংবাদিক। উলি ম্যামথের দাঁত মাটির তলা থেকে খুঁড়ে বের করার জন্য যে নতুন গোল্ড রাশ চালু হয়েছে তার খবর করতে এখানে এসেছে ও।
আয়সেন নিজে এই দাঁতশিকারিদের দলে নাম লেখায়নি। কারণ বিশাল বড় এই জঙ্গলে সবাই যে দাঁত খুঁজে পায়, তা নয়। খুব কম মানুষই আছে যারা মাটি খুঁড়ে দাঁত বের করতে পারে। তবু সেসব দাঁতের দাম অনেক বলে প্রচুর মানুষ জঙ্গলে, ঠান্ডার মধ্যে হাজার বিপদ তুচ্ছ করে হলেও পড়ে থাকে।
আয়সেন সেইসব দাঁতশিকারিদের শহর বা কাছের গ্রাম থেকে জঙ্গলের নানা জায়গায় পৌঁছে দেওয়ার কাজ করে। আর তাতে বেশ ভাল টাকাই পায়।
ইগরকে এই জঙ্গলে সাতদিন আগে নিয়ে এসেছিল আয়সেন। আর কথামতো আজ আবার ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এর জন্য মোট দু’হাজার ডলার পাবে আয়সেন। ও এতেই খুশি।
ইগর ক্যামেরাটা পাশে রেখে চলন্ত বোটের মধ্যে উঠে টলমল করে হেঁটে এসে বসল আয়সেনের পাশে। তারপর বলল, “আচ্ছা, আপনি তো এখানে নদীতে লোকজনকে নিয়ে যাতায়াত করেন। আপনার অভিজ্ঞতা কেমন?”
“মানে?” আয়সেন অবাক হল। ছোকরা ওর ইন্টারভিউ নিচ্ছে নাকি?
“মানে, কী ধরনের লোকজন যায়? তাদের সঙ্গে কথা বলেন? তেমন কোনও উল্লেখযোগ্য ঘটনা মনে করতে পারেন?”
আয়সেন বলল, “আমার তো তোমায় নিয়ে আসা-যাওয়ার কথা ছিল। এসব প্রশ্ন-উত্তরের কথা তো ছিল না। এসব জানতে চাইলে আমার আরও টাকা লাগবে!”
“আরও টাকা!” ইগর অবাক হল।
“হ্যাঁ,” আয়সেন মাথা নাড়ল, “তুমি তো সাংবাদিক। এসব লিখে টাকা কামাবে। তা হলে আমি কেন টাকা পাব না?”
“থাক তবে বলার দরকার নেই,” ইগর দীর্ঘশ্বাস ফেলে মুখ ঘুরিয়ে নিল।
“এক হাজার ডলার,” আয়সেন বলল।
“কী! পাগল নাকি তুমি? ডলার গাছে ফলে?” ইগর বিরক্ত হল, “এখানে কারা যায়, কী করে এসব জানার জন্য এক হাজার ডলার! তুমি চুপচাপ বোট চালাও।”
আয়সেন হাসল। তারপর নিচু হয়ে একটা কাপড়ে মোড়ানো জিনিস বের করল। বলল, “না, সেজন্য হাজার ডলার নয়। এটার জন্য হাজার ডলার!”
“এটা কী?” ইগর হাত বাড়াল।
আয়সেন চট করে সরিয়ে নিল কাপড়ে মোড়ানো জিনিসটা। বলল, “এটা আমার। একটা ডায়েরি আছে এতে।”
“কীসের ডায়েরি? কার লেখা!”
“একটা লোকের। বিশাল লম্বা-চওড়া চেহারা তার। গত বছর সেপ্টেম্বরে ওকে আমি ছেড়ে এসেছিলাম জঙ্গলে। তার দু’মাস পরে একবার শেষ দেখেছিলাম ওই নদীর ধারেই। তারপর দেখিনি। শেষবার দেখার সময় লোকটা আমায় দিয়েছিল এটা। বলেছিল, এটা যেন দিমিত্রিকে দিই!”
ইগর হাসল, “কী না কী লেখা আছে এতে! হয়তো কোনও মানেই নেই। সেটার জন্য তোমায় হাজার ডলার দেব? পাগল নাকি?”
আয়সেন বলল, “তোমায় বলছি, কাউকে বোলো না, লোকটা যেমন-তেমন কেউ নয়। আর খুব অদ্ভুত কিছুই লেখা আছে। না হলে লোকটা কেন বলবে এটা সাবধানে রাখতে। কেন বলবে দিমিত্রিকে দিতে?”
“দিমিত্রি কে? আর তাকে যখন দিতে বলেছে তখন তাকে দাওনি কেন?”
আয়সেন বলল, “দিতে পারিনি কারণ, দিমিত্রিকে পুলিশ ধরে নিয়ে গিয়েছে লোকটাকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য। আমি জেনেছি লোকটা জেল থেকে পালিয়ে আসা একজন আসামী।”
“কী!” ইগর নড়েচড়ে বসল, “আমি দুশো ডলার দেব।”
আয়সেন বলল, “আমি মাছ বিক্রি করতে এসেছি নাকি? ঠিক আছে, সাড়ে সাতশো!”
ইগর মাথা নেড়ে বলল, “পাঁচশোর এক ডলার বেশি নয়। তাতে দাও, না হলে সঙ্গে করে নিয়ে ঘোরো। কোনওদিন পুলিশের সার্চপার্টির কাছে এটা সমেত ধরা পড়লে বুঝবে প্রিজ়ন ক্যাম্প কেমন হয়!”
আয়সেন চুপ করে ভাবল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, “ঠিক আছে।”
ইগর পকেট থেকে ডলার বের করে এগিয়ে দিল আয়সেনকে। আয়সেন গুনল সেটা। তারপর এগিয়ে দিল ডায়েরিটা। বলল, “নাও, দেখো। আমি লেখাপড়া জানি না। কিন্তু তাও মনে হয় এর মধ্যে যা আছে তা অনেক দামি!”
জিনিসটা হাতে পেয়েই ইগর দ্রুত খুলে ফেলল মোড়কটা। তারপর দেখল একটা ডায়েরি। বেশ পুরনো। ধারগুলো দোমড়ানো। স্পাইনের দিক থেকে ছেঁড়া। ও সাবধানে খুলল ডায়েরিটা। প্রথম পাতাটায় থমকাল একবার। নাম লেখা আছে। ও অস্ফুটে পড়ল, “রনিত সেনগুপ্ত!”
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন