সাল ২০১২

স্মরণজিৎ চক্রবর্তী

রনিতের কথা

কাঠের লগ বয়ে নিয়ে যাওয়া বিরাট বড় ট্রাকের নীচে কোনও মতে নিজেকে ঝুলিয়ে রেখেছে রনিত। ঠান্ডায় হাত-পা সহ গোটা শরীর জমে যাচ্ছে ওর। হাতের গ্লাভসটা চামড়ার। কিন্তু গত কয়েক বছরের অমানুষিক পরিশ্রমের ফলে জায়গায়-জায়গায় ফুটো হয়ে গিয়েছে। আর সেই ফুটো হয়ে যাওয়া জায়গা দিয়ে বরফের সুচের মতো ঢুকে আসছে ঠান্ডা।

মনে হচ্ছে সাইবেরিয়ার তুন্দ্রা অঞ্চলের নেকড়ে যেন কামড়ে ধরেছে হাত।

রনিত জানে এমন প্রচণ্ড ঠান্ডায় কী করে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে হয়। গত উনিশ বছর ধরে রাশিয়ান প্রিজ়ন ক্যাম্পে আটকে ছিল ও। সেই ক্যাম্পের প্রচণ্ড ঠান্ডা আর অমানুষিক অত্যাচার সহ্য করা খুব কঠিন। কিন্তু তাও রনিত পেরেছে। ওর এই বিশাল লম্বা-চওড়া ছ’ফুট আট ইঞ্চির শরীরটা অত সহজে কাবু হয় না।

রনিত মেটালার্জি নিয়ে লেখাপড়া করলেও সেই নিয়ে কাজ করেনি। এখন ও একজন ফোটোগ্রাফার। কলকাতার ছেলে হলেও, কাজের সূত্রে লন্ডনে থাকত। লন্ডনের একটা বড় ম্যাগাজ়িনের হয়ে ট্র্যাভেল সেকশনের ফোটো তুলত ও। পরে সেটা ছেড়ে দিয়ে নিজেই ফ্রিলান্স করতে শুরু করে। আসলে সারা পৃথিবীর নানা দর্শনীয় আর টুরিস্ট স্পটে ঘুরে-ঘুরে ফোটো তুলে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল ও।

রনিতের মনে হত ওর এমন কাজ করা উচিত, যা মানুষের কাজে লাগে। পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় নানা রাজনৈতিক অস্থিরতা, যুদ্ধ, গৃহযুদ্ধ, মহামারি, সাধারণ মানুষের উপর ক্ষমতাশালী মানুষের অত্যাচার আর তার ফলে সাধারণ মানুষের প্রতিরোধের মতো নানা ঘটনা প্রতিদিন ঘটে চলেছে। সেসবের ফোটো যদি সারা পৃথিবীর মানুষের কাছে না পৌঁছনো যায়, তা হলে ফোটোজার্নালিস্ট হিসেবে ওর কাজের কোনও মূল্য নেই।

তাই পৃথিবীর নানা উপদ্রুত জায়গায় ঘুরতে শুরু করে রনিত। ফোটো তুলতে শুরু করে। আর খুব কম সময়ের মধ্যে রনিত সেনগুপ্তর নাম ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে।

আর ঠিক সেই সময়েই, মানে এখন থেকে উনিশ বছর আগে, সেই ১৯৯৩ সালে অস্থির হয়ে ওঠে রাশিয়া।

সেই রাজনৈতিক অস্থিরতা এমন জায়গায় পৌঁছয় যে, প্রায় গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়।

এর ফোটো তুলতেই মস্কোতে পৌঁছে যায় রনিত। আর দুর্ভাগ্যক্রমে পুলিশ ধরে ফেলে ওকে। যেদিন ধরে সেদিন ওর সঙ্গে প্রেস কার্ড ছিল না। নিজের অ্যাপার্টমেন্ট থেকে চারশো মিটার দূরে একটা দোকানে গিয়েছিল খাবার কিনতে। কিন্তু আচমকা রাস্তায় মারামারি শুরু হয়ে যায়। আর নিজের অ্যাপার্টমেন্টে ফেরার পথে সেই ঝামেলার মাঝখানে পড়ে যায় রনিত। পুলিশ আর মিলিটারি আসে। আর অনেকের মতো ধরা পড়ে যায় রনিত।

কেউ ওর কোনও কথা শোনেনি। অকথ্য মার আর অত্যাচারের পরে ওর নামমাত্র বিচার হয়েছিল শুধু। তারপর ওকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল সাইবেরিয়ার ইয়াকুটিয়ার প্রিজ়ন ক্যাম্পে।

সাইবেরিয়ান প্রিজ়ন ক্যাম্প বা জেল হল পৃথিবীর অন্যতম কুখ্যাত জায়গা। সেখানে বন্দিদের দিয়ে যে শুধু প্রচণ্ড পরিশ্রমের কাজ করানো হয় তাই নয়, তার সঙ্গে চলে অকথ্য অত্যাচার।

দুর্দান্ত ঠান্ডার মধ্যে, নামমাত্র খাবার খেয়ে ওভাবে অত্যাচার সহ্য করে থাকতে না পেরে অনেকেই মারা যায়।

কিন্তু রনিত খুব শক্তপোক্ত মানুষ। তাই এত বছর টিকে গিয়েছে। আর শুধু টিকেই যায়নি, বারবার চেষ্টা করে গিয়েছে কী করে এই নরক থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।

অবশেষে এসেছে ওর সুযোগ।

জেলখানার প্রাচীর ঠিক করার জন্য বড়-বড় কাঠের লগ বা গুঁড়ি নিয়ে আসা হয়েছিল কয়েক মাস আগে। তার মধ্যে বেশ কিছু গুঁড়ি আর কাজে লাগবে না বলে বড় ট্রাকে করে সরিয়ে দেওয়ার কথা ছিল আজ।

আর এই সুযোগটাই নিয়েছিল রনিত।

ওকে এই জেলখানা থেকে খনিতে কাজ করতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে কয়েকদিন ধরে ও বারুদ নিয়ে এসেছিল লুকিয়ে। তারপর আজ মোক্ষম সময়ে জেলের এক প্রান্তের বড় গুদামখানায় আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল রনিত। নিমেষে দাউদাউ করে জ্বলে উঠেছিল সেই গুদাম। সবাই যখন সেই নিয়ে ব্যস্ত ছিল, রনিত এসে লুকিয়ে পড়েছিল লগ বয়ে নিয়ে যাওয়া এই বিশাল বড় ট্রাকের নীচে।

খনিতে কাজ করতে-করতে রনিতের হাত দুটো এখন অনেক মজবুত হয়ে গিয়েছে। তাই নিজের শরীরের ভার সহ্য করে ও প্রায় দেড় ঘণ্টা এমন করে ঝুলে আছে।

রনিত জানে, কিছুক্ষণের মধ্যেই রক্ষীরা জেনে যাবে যে ও পালিয়ে গিয়েছে। আর তারপরেই শুরু হবে খোঁজ। একবার যদি ওকে ধরতে পারে তবে আর প্রাণে বাঁচার আশা নেই।

রনিত বড় ট্রাকের নীচে ঝুলন্ত অবস্থায় চাকার ফাঁক দিয়ে যতটুকু দেখল, তাতে বুঝল সামনে কোনও একটা শহর আসছে। ইয়াকুৎস্ক হতে পারে।

যদিও ট্রাকটা শহরের মধ্যে ঢুকবে না। পাশ দিয়ে বেরিয়ে যাবে। কিন্তু এখানে যে করেই হোক ওকে নামতে হবে। দরকারে চলন্ত ট্রাকের তলা থেকে রাস্তায় খসে পড়তে হবে। চাকার তলায় পিষে যেতে পারে, এই ঝুঁকি নিয়েও ওকে এটা করতে হবে।

উনিশ বছর প্রচণ্ড খারাপ পরিস্থিতিতে থাকতে-থাকতে অনেক কিছু ভুলে গিয়েছে রনিত। তাও যতটুকু মনে আছে সেটাই ওর সম্বল।

সামনের শহরটা যদি ইয়াকুৎস্ক হয়, তা হলে ওর একটা বেঁচে যাওয়ার সুযোগ আছে। কারণ এখানেই থাকে দিমিত্রি।

কিন্তু রনিতের ভাগ্য ভাল আজ। শহরের ঢোকার মুখে ট্রাকটা একবার দাঁড়াল। আর সেই সুযোগে টুপ করে ট্রাকের নীচের থেকে খসে পড়ে গেল রনিত।

ট্রাক চলে যাওয়ার পরে ও উঠে দাঁড়িয়ে একটা বড় গাছের নীচে রাখা বেঞ্চে বসল।

দুটো হাত টনটন করছে। ঘাড় থেকে শুরু করে সারা শরীরে ব্যথা। ক্লান্তিতে মনে হচ্ছে এই বেঞ্চেই ঘুমিয়ে পড়ে। কিন্তু এখন ঘুমিয়ে পড়া যাবে না।

এখন সেপ্টেম্বরের শুরু। চারদিকে বেশ ঠান্ডা। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে উঠে দাঁড়াল রনিত। ওর সারা শরীর বড়, ভারী কোটে ঢাকা। কিন্তু সেটা খুব নোংরা আর ছেঁড়াখোঁড়া। যে কেউ ওকে দেখলে ভাববে ভবঘুরে ভিখিরি।

মূল শহরের দিকে এবার হাঁটা দিল রনিত। মাথার টুপিটা যত দূর সম্ভব টেনে নামিয়ে নিল সামনে। এমনিতেই দাড়ি-গোঁফে মুখ ঢেকে আছে। তাও যতটা সম্ভব মুখটা ঢেকে রাখতে হবে।

ইয়াকুৎস্ক একটা বন্দর শহর। লেনা নদীর ধারে এই শহরটা পূর্ব সাইবেরিয়া সাখা রিপাবলিকের অন্তর্গত। এখানেই থাকে দিমিত্রি।

ধরা পড়ার দু’বছর আগে দিমিত্রির সঙ্গে রনিতের আলাপ হয়েছিল বেইরুটে। দিমিত্রি সেখানে গিয়েছিল ব্যবসার কাজে। সেখানেই একটা বিপদ থেকে দিমিত্রিকে নিজের যোগাযোগের জোরে বাঁচিয়েছিল রনিত। সেদিন দিমিত্রি বলেছিল, “কোনওদিন দরকার পড়লে আমার কাছে এসো।”

রনিত ভেবেছিল, দিমিত্রি থাকে ইয়াকুৎস্কে, সেখানে ও কেন যাবে? কিন্তু দেখো, আজ ভাগ্য ওকে সেখানেই এনে ফেলেছে!

সেই উনিশ বছর আগে রাশিয়ায় আসার সময়, রনিত এমনিই দিমিত্রির ঠিকানাটা নিজের ছোট্ট নোটবইয়ে লিখে রেখেছিল। আর আজ সেটা দেখেই প্রায় আড়াই ঘণ্টা খোঁজার পরে দিমিত্রির বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল রনিত।

এই নোটবইটা ওর সঙ্গে আছে এত বছর। জেলে নিজে যে ঘরে থাকত, সেখানে একটা পাথরের নীচে লুকিয়ে রাখত ও। খনির অফিস থেকে লুকিয়ে আনা পেনসিল দিয়ে লিখত। আজ পালিয়ে আসার সময় এটা নিয়ে এসেছে ও। এতে জেলজীবনের নানা কথা লেখা। ভয়াবহ অভিজ্ঞতার বর্ণনা রয়েছে। সারা পৃথিবীর সামনে সেগুলো আনতে চায় রনিত।

কিন্তু সেসব পরে। আগে দিমিত্রির দেখা চাই ওর। দিমিত্রি হল সেই মুষ্টিমেয় মানুষদের অন্যতম, যাদের শরীরে এখনও রোমানভ রাজবংশের রক্ত বইছে। ১৯১৭ সালের রাশিয়ান বিপ্লবের আগে পর্যন্ত এই রাজবংশই প্রায় তিনশো বছর রাজত্ব করেছে রাশিয়ায়।

সারাদিন কিছু খাওয়া হয়নি। ওভাবে ঝুলে-ঝুলে এতটা পথ আসা। তার উপর এমন ঠান্ডা। রনিতের মনে হল এবার মাথা ঘুরে পড়ে যাবে রাস্তায়।

তাও শরীরের সব শক্তি এক করে নিজেকে সজাগ রেখেছে ও। কিন্তু বড় সাদা বাড়িটার সামনে দাঁড়িয়ে যখন দেখল নেমপ্লেটে লেখা আছে ‘দিমিত্রি আলেকজ়ান্ড্রোভিচ’ তখন ও যেন আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। কোনওমতে ডোরবেলের দড়িটা টেনে বসে পড়ল মাটিতে।

একটু পরেই দরজা খোলার আওয়াজ পেল রনিত। ও অবসন্ন চোখদুটো তুলে তাকাল।

একজন মধ্যবয়স্ক লোক এসে দাঁড়িয়েছে সামনে। চোখে-মুখে বেশ বিরক্তি।

রনিত নিজের ডান হাতটা তুলল তারপর ক্লান্ত গলায় বলল, “দিমিত্রি?”

লোকটা থমকে গেল এবার। তারপর হাঁটু গেড়ে বসল সামনে। চোখে নানা প্রশ্ন।

রনিত কোনওমতে নিজের টুপিটা খুলল। তারপর বলল, “বেইরুট! রিমেম্বার?”

দিমিত্রির চোখে এবার বিস্ময়। ও ঝুঁকে পড়ল রনিতের দিকে। তারপর হাতে-ধরা ফোনের আলো জ্বালিয়ে ফেলল রনিতের মুখে। চোখ কুঁচকে গেল রনিতের। ও হাত তুলে চোখ আড়াল করল।

দিমিত্রি সরিয়ে দিল রনিতের হাতটা। তারপর বিস্মিত গলায় বলল, “সেনগুপ্তা!”

অধ্যায় ১ / ৩
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%