শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
বিশ্বম্ভর রোগাভোগা নিরীহ মানুষ। ভারি ভীতুও বটে। তা সেই বিশ্বম্ভরের কাছে একদিন পোস্টকার্ডে খবর এল যে, তার এক দূরসম্পর্কের জ্যাঠা সম্প্রতি মারা গেছেন। নদিয়ার সাতপুরা গাঁয়ে তাঁর বসতবাড়ি আর জমিজমার হক বর্তেছে বিশ্বম্ভর বিশ্বাসের ওপর। সে যেন অতি সত্বর গিয়ে সম্পত্তির দখল নেয়, নইলে অন্য বন্দোবস্ত হবে।
বিশ্বম্ভরের অবস্থা এমনিতেই খারাপ, দিন আনি দিন খাই অবস্থা, রোজগারপাতি নেই। সামান্য জমিজমা যাও ছিল তা মহাজনের কাছে বাঁধা। ভাগ্য ভালো সে সংসারে সে একদম একা, সম্বল একখানা কুঁড়েঘর আর যৎসামান্য তৈজসপত্র।
সুতরাং চিঠিটা একরকম ভগবানের আশীর্বাদ বলেই তার মনে হল। তবে সাতপুরার জ্যাঠার কথা তার জানা ছিল না। পোস্টকার্ড পেয়েই প্রথম জানল। প্রথমটা ভেবেছিল কেউ তার সঙ্গে রসিকতা করেই হয়তো চিঠিটা লিখেছে। তারপর বিবেচনা করে দেখল, তার মতো অধম মনিষ্যির সঙ্গে রসিকতা করার মতো লোকই বা কে আছে। আর পোস্টকার্ডে সাতপুরা ডাকঘরের ছাপও রয়েছে যখন, গিয়ে দেখে এলে হয়।
বিশ্বম্ভরের জিনিসপত্র বিশেষ নেই, যা ছিল তা পাশের বাড়ির জিম্মায় রেখে, দরজায় একটা তালা ঝুলিয়ে, পুঁটলি বগলে বেরিয়ে পড়ল। যা থাকে কপালে। সঙ্গে চেনা দেওয়ার প্রমাণপত্র হিসেবে ভোটের কার্ডখানা সম্বল।
সকালে বেরিয়ে সাতপুরায় পৌঁছোতে বিকেল গড়িয়ে গেল প্রায়। গাঁয়ের মোড়লমশাই তার পরিচয় পেয়ে খুব গম্ভীর হয়ে বললেন, তাহলে তুমিই নিবারণদাদার ভাইপো! আমি বাপু সাচ্চচা লোক, বেঁচে থাকতে এ গাঁয়ে কোনো অধর্ম হতে দেব না। তা যাও বাপু, নিজের জ্যাঠার সম্পত্তি বুঝে নাও গে। সঙ্গে লোক দিচ্ছি, সে বাড়ি চিনিয়ে দেবে।
বিশ্বম্ভর বাড়ি দেখে হাঁ, রাজপ্রসাদ নয় বটে, কিন্তু তার মতো হাঘরে লোকের কাছে এতবড়ো পাকাবাড়ি প্রাসাদের কমও কিছু নয়। সঙ্গের লোকটা চাবি দিয়ে দরজা খুলে দিল, বলল, ব্যবস্থা সব ভালোই হে, আতান্তরে পড়বে না। যাও, ঢুকে পড়ো।
তা ঢুকেই পড়ল বিশ্বম্ভর। একতলা বাড়ি হলে কী হয়, গোটা চারেক বড়ো বড়ো ঘর, ভিতরে দরদালান, উঠোন, বাইরের দিকে চওড়া বারান্দা। বাগানও আছে বেশ বড়োসড়ো। না হোক এক—দেড় বিঘে জমি।
ঘরে জিনিসপত্রের কোনো অভাব নেই। চৌকি আছে, খাট আছে, চেয়ার—টেবিল আছে, আলনা আছে, মেলা বাক্স—প্যাঁটরা আছে। রান্নাঘরে গিয়ে দেখল, গ্যাসের ব্যবস্থা আছে। চাল—ডালও পাওয়া গেল। উঠোনের পাতকুয়ো থেকে ঠান্ডা জল তুলে হাত—মুখ ধুয়ে চাট্টি চিঁড়ে ভিজিয়ে এ আকস্মিক সৌভাগ্যের কথা ভাবছিল। জ্যাঠার নাম নিবারণ বিশ্বাস। অনেক ভেবে তার মনে পড়ল, ছেলেবেলায় একজন পালোয়ানের মতো লোক মাঝে মাঝে তাদের গাঁয়ে আসত বটে।
যতদূর মনে পড়ে তাঁর নাম নিবারণ ছিল বটে।
গাঁয়ের দু—চারজন মাতব্বর মতো লোক এসে তার সঙ্গে দেখা করে গেল। সে ঠিক লোক কিনা তাও একটু যাচিয়ে দেখল। বিশ্বম্ভর ভয়ে তটস্থ। যেন পানাপুকুর থেকে বড়ো গাঙে এসে পড়েছে।
একজন একটু ঠেস দিয়ে বলে গেল, নাঃ, ভাইপো মোটেই নিবারণদার মতো হয়নি। নিবারণদা কত ডাকাবুকো মানুষ ছিল।
তা হবে। রাতে ডাল—ভাত রান্না করে খেয়ে সে একখানা হারিকেন জ্বেলে শোওয়ার ঘরে এসে আরাম করে বসল। তার ভারি একটা আনন্দ হচ্ছে। রোজ সকালে উঠে পেটের চিন্তা করতে হবে না, ধার—বাকির খোঁজে হন্যে হয়ে ঘুরতে হবে না, উঞ্ছবৃত্তি বোধহয় এবার ঘুচল।
হঠাৎ একটু আঁতকে উঠল বিশ্বম্ভর। হারিকেনের আলোয় সামনের দেওয়ালে একটা বেশ লম্বা—চওড়া লোকের ছায়া পড়ছে। লোকটা ডন দিচ্ছে হুপহাপ করে। বিশ্বম্ভর তো হাঁ। ই কী কাণ্ড রে বাবা! সিঁটিয়ে বসে সে দেখল লোকটা দুশো ডন দিয়ে উঠে নিজের হাত—পা—বুক দু—হাতে মালিশ করে নিয়ে ফের দুশো বৈঠকি দিল। বড়ো বড়ো শ্বাসের শব্দও শুনতে পাচ্ছে বিশ্বম্ভর। বৈঠক শেষ করে লোকটা হঠাৎ কুঁজো হয়ে দুই ঊরুতে থাবড়া মারতে মারতে বলে উঠল, চলে এসো।
সঙ্গে সঙ্গে দেয়ালের অন্য ধার থেকে একটা পেল্লায় চেহারার ছায়া এগিয়ে এল। তারপর দুই ছায়ায় কী কুস্তি। ধুন্ধুমার কাণ্ড যাকে বলে। এ ওকে তুলে আছাড় মারে, তো ও একে তুলে পটকে দেয়। দুইজনের হুমহাম শব্দে বাড়ি একেবারে সরগরম।

ভয়ে কুঁকড়ে গিয়েছিল ঠিকই, তবে বিশ্বম্ভরের কুস্তি দেখতে তেমন খারাপও লাগছিল না। কুস্তিতে যে কত রকমের প্যাঁচ—পয়জার আছে তা জানাও ছিল না তার। প্রথমটায় ভেবেছিল হারিকেনটা নিবিয়ে দেবে। কিন্তু সেটা আর করেনি।
রাত প্রায় বারোটা অবধি কুস্তি করার পর দুই পালোয়ান ক্ষ্যান্ত দিল আর বিশ্বম্ভরও হারিকেন কমিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল।
পরদিন আবার একটু রাতের দিকে ওই কাণ্ড। দু—জন পালোয়ানের লড়াই। আজ আরও নতুন নতুন সব প্যাঁচ, নতুন ধরনের ল্যাং মারা, নতুন সব রদ্দা। বিশ্বম্ভর খুব মন দিয়ে দেখতে লাগল। ভয়ডর উবে গেছে। বরং বেশ নেশাই হচ্ছে তার।
পরদিন বিশ্বম্ভর একেবারে কোণের ঘরে পালোয়ান জ্যাঠামশায়ের মুগুর, বারবেল, ডামবেল, ডন মারা খড়ম সব খুঁজে পেল। একটু লজ্জা—লজ্জা করছিল বটে, কিন্তু চট করে কয়েকটা ডন—বৈঠক দিয়ে নেওয়ার লোভও সামলাতে পারল না সে। তবে অনভ্যাসে হাড়গুলো সব মড়মড় করে উঠল। হাত—পা ভেরে এল। আর রাতে হল গায়ে প্রচণ্ড ব্যথা।
তবে দেয়ালে দুই পালোয়ানের ছায়ার কুস্তি রোজই রাতে চলতে লাগল। রোজই খুব মন দিয়ে দেখে বিশ্বম্ভর এবং সকালে আর বিকেলে রীতিমতো কোণের ঘরে গিয়ে ব্যায়াম করে।
কয়েকদিনের মধ্যেই তার খাওয়া দ্বিগুণ, তিনগুণ বেড়ে গেল। আর রোগা রোগা হাত—পায়েও যেন ডুমো ডুমো মাংস ফুটে উঠতে লাগল, বুকখানাও যেন ঠেলে উঠল পালোয়ানদের মতো, গাঁয়ের লোক বলাবলি করতে লাগল, না হে, এ নিবারণদাদার উপযুক্ত ভাইপোই বটে।
এরপর যে ঘটনাটা ঘটল সেটা সাংঘাতিক। এক রাতে হঠাৎ প্রথম পালোয়ানের ছায়াটা তাকে ইশারা করে উঠে আসতে বলল। সে ভয়ে ভয়ে বিছানা ছেড়ে নামতেই ছায়াটা লাফিয়ে পড়ে তাকে সাপটে ধরে ল্যাং মেরে ফেলে দিল মেঝের ওপর। কিন্তু বিশ্বম্ভর আর আগের মতো রোগা দুর্বল নয়, সেও লাফিয়ে উঠে পালটা প্যাঁচ কষে ছায়াটাকে লড়াই দিতে লাগল। ছায়াটা বলল, শাবাশ বিশে।
এইরকম রোজই হতে লাগল। আর হতে হতে বিশ্বম্ভর দিব্যি মুগুরের মতো হাত—পা বানিয়ে ফেলল, পেল্লায় বুকের ছাতি। গাঁসুদ্ধ লোক তাকে বাহবা দিয়ে বলল, তবে আর কী! নিবারণদাদা যাকে কোনোদিন হারাতে পারেননি সেই নবকুমার এবার লড়তে আসছে গাঁয়ে। যদি তাকে হারাতে পারে তাহলে খালু মহাজন দশ হাজার টাকা প্রাইজ দেবে।
শুনে তো বিশ্বম্ভর ভয়ে অস্থির। কিন্তু নিবারণ জ্যাঠার ছায়া অভয় দিয়ে বলল, নবকুমারের অস্ত্র হচ্ছে ওর পেল্লায় পেট। ওই পেট দিয়ে চেপে ধরেই ও সবাইকে হারায়। তুই ওর পেটটা এড়িয়ে চলিস, তাহলেই হবে।
লড়াইয়ের দিন গাঁ ভেঙে পড়ল আখড়ায়। বিকট গর্জন করতে করতে নবকুমার নেমে পড়ল আসরে। বিশ্বম্ভরকেও ঠেলে নামিয়ে দিলে গাঁয়ের মাতব্বররা।
প্রথমদিকে বিশ্বম্ভর বিশেষ সুবিধে করে উঠতে পারছিল না বটে। নবকুমারের গায়ে সাংঘাতিক জোর। প্যাঁচ—পয়জারও জানে ভালো। কিন্তু বিশ্বম্ভর একটু চালাকি করে হঠাৎ দূরে সরে গিয়ে তারপর খ্যাপা ষাঁড়ের মতো তেড়ে গিয়ে নবকুমারকে বিস্মিত করে তার পেটে একটা ঢুঁ মারল। কামানের গোলার মতো সেই ঢুঁ খেয়ে নবকুমার সেই যে চিতপাত হল, তারপর উঠল তিন মিনিট বাদে। ততক্ষণে লড়াই শেষ।
বিশ্বম্ভরের জয়ধ্বনিতে সাতপুরায় তখন কান পাতা দায়।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন