শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
এই ষষ্ঠীগাঁয়ে কী ভূতের অভাব ছিল রে বাপু! গাছে গাছে ভূত ঝুলে থাকত। ঘরের চালে যেমন লাউ কুমড়ো ফলে থাকে তেমনি ভূত ফলে থাকত। দিব্যি পুরুষ্টু পুরুষ্টু ভূত, নধরকান্তি চেহারা।
বলেন কী মহাই? ভূত বেশি হৃষ্টপুষ্ট হওয়া কি ভালো! তাতে কি ভূতের মহিমা থাকে?
কেন বাপু, পুরুষ্টু বলে ভূতের মহিমা টসকাচ্ছে কীসে?
দূর মহাই, রস কষ শুকিয়ে চিমসে না মারলে কী ভূত হওয়া যায়? নাকি সেই ভূতকে কেউ সমীহ করে? না মহাই, আপনার ভূত একেবারেই অচল মাল। তা আপনার সেই নধরকান্তি ভূতেরা গেল কোথায়? এই গাঁয়ে এসে অবধি একটা ভূতের আঁশও শুকলুম না।
সেই দুঃখের কথাই তো বলছি রে বাপু। ধৈর্য হারালে কী চলে?
ষষ্ঠীগাঁয়ের আটচালাকে চণ্ডীমণ্ডপও বলা যায়। পুজোর সময়ে পুজোটুজোও হয়। আর সারাবছর এটাই হল গাঁয়ের মাতব্বরদের গুলতানির জায়গা।
দুখীরাম হুঁকোয় তামাক খেতে খেতে বলে, নষ্টের মূল হল ওই ভজা বোষ্টম। যেবার নবদ্বীপে গিয়ে মন্তর নিয়ে এল, তারপর খোল করতাল নিয়ে হরি সংকীর্তনে নেমে পড়ল, উদ্দণ্ড কেত্তন কচ্চেচ। তাতে মানুষেরই পালাই—পালাই অবস্থা তো ভূত কোন ছার। ওই কেত্তনের তাড়া খেয়েই ভূতেরা সেই যে গা—ঢাকা দিয়েছে, আর তাদের টিকিটিও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
আপনার একটা দোষ কী জানেন দুখুবাবু? আপনি সব কিছুতেই বড্ড বাড়াবাড়ি করে ফেলেন।
কেন বাপু, বাড়াবাড়ির কী দেখলে বলো তো?
এই তো সেদিন বলছিলেন ষষ্ঠীগাঁয়ের মতো এত উৎকৃষ্ট চোর নাকি ভূভারতে নেই। এখানকার চোরেরা নাকি সব ইউনিভার্সিটির ডিগ্রিধারী চোর। চুরিবিদ্যেয় পিএইচ ডি। তারা নাকি হাসতে হাসতে হাঁস মুরগির তলা থেকে ডিম চুরি করতে পারে, সূক্ষ্ম দেহে ব্যাঙ্কের ভল্টে ঢুকে যায়, জমিদার নীলকান্তবাবু যখন ছাদে পায়চারি করছিলেন তখন নাকি চিতে চোর তাঁর পা থেকে হরিণের চামড়ার চটিজোড়া সরিয়ে ফেলেছিল, তিনি টেরও পাননি। তারপর এও বলেছিলেন বোষ্টমপুকুরে নাকি জাহাজর মতো বড়ো বড়ো মাছ ছিল, যার একটা কেটে রান্না করে সাত গাঁয়ের সাতশো লোককে ভোজ খাওয়ানো হয়েছিল, বলেননি?

দুখীরাম মিটমিট করে চেয়ে বললেন, বলেছি বই কী! তা সত্যিকথা বলব তাতে দোষের কী বাপু? চোরও ছিল, মাছও ছিল। তবে কিনা কানাই দারোগা এসে অবধি চোরদের ভারি দুরবস্থা কিনা, তারা সব হাজতে। আর মাছের আর দোষ কী বলো, মাছশিকারি নন্দবাবু রিটায়ার করে গাঁয়ে ফিরে আসায় আমাদের কপাল পুড়েছে।
লোকে কিন্তু অন্য কথা বলে।
আহা, লেকের কথায় তোমার কান দেওয়ার দরকার কী বাপু? তা তারা বলে কী?
তারা বলে, দুখীরামবাবু গুলবাজ।
বলে নাকি?
বলেই তো! এ গাঁয়ে ভূত নাকি বড়ো একটা দেখা যায় না, চোর—ছ্যাঁচড় আছে তা সব জায়গায় যেমন থাকে, আর বোষ্টমপুকুরে নাকি চ্যাং মাছ ছাড়া আর কোনো মাছই নেই।
দুখীরাম খুব গম্ভীর মুখে কিছুক্ষণ মন দিয়ে তামাক খেয়ে বললেন, বটে?
হ্যাঁ।
তুমি কি তাদের কথাই বিশ্বাস করো?
করি। আপনাকে আমার গুলবাজ বলেই মনে হয়।
আহা, তা নাহয় হল, তা বলে সব কথাই উড়িয়ে দেওয়াটা ভালো অভ্যেস নয়। বুঝেছ?
আমার আর বুঝে দরকার নেই মহাই। এখন একটু ঝেড়ে কাশুন তো! পাতিরাম কানুনগোর প্রতিষ্ঠিত তিনশো বছরের পুরোনো কালীমন্দিরটা কোথায়? লোকে বলে মন্দিরটার কথা শোনা যায়, কিন্তু কেউ কখনো দেখেনি।
লোকে সব কথাই তো আর ভুল বলে না। এটা ঠিক কথাই কানুনগোর কালীমন্দির আজ অবধি কেউ দেখেনি, শুধু একজন ছাড়া।
সেই লোক কি আপনি নাকি?
তা যদি আমিই হই তাতে কি দোষের কিছু আছে?
না মহাই, দোষের আর কী থাকবে! তবে কিনা কথাটা বিশ্বাস হবে না। এই আর কী!
বুঝেছি বাপু, গাঁয়ের লোক তোমার মাথাটা চিবিয়ে খেয়েছে। এখন যা—ই বলি তা—ই তোমার কাছে গুলগল্প হয়ে দাঁড়াবে।
আচ্ছা মহাই, আপনার তো বেশ বয়স হল। আমাদের মতো ছেলেছোকরা নন! তা এই ষাট পঁয়ষট্টি বছর বয়সে ওইসব গুলগল্প করেন কী করে?
কেন বাপু, বয়সের সঙ্গে গল্পের কোথাও আড়াআড়ি আছে নাকি?
তা তো আছেই। গুল মানে মিথ্যে কথা। আর মিথ্যে কথা পাপ।
ওই দেখ, এর মধ্যে পাপ—পুণ্যি এনে ফেলা কি ভালো হল বাপু! তবে তোমার ঘাবড়ানোর দরকার নেই। কানুনগোর কালীমন্দির আমিও দেখিনি। দেখেছে পার্শ্বনাথ।
তিনি আবার কে?
খুঁজে নাও গে যাও।
আরে মহাই, রাগ করলেন নাকি? আপনাকে গুলবাজ বললেও গাঁয়ের লোকেরা কিন্তু স্বীকার করে যে, এই গাঁয়ের সব ইতিহাস একমাত্র আপনিই জানেন। গত ছয় মাস এই গাঁয়ে ভগ্নীপোতের বাড়িতে পড়ে আছি, আজ অবধি গাঁয়ের কাউকে চিনতে বাকি নেই, কিন্তু এই পার্শ্বনাথটা কে তা তো বুঝতে পারছি না। ও নামে কি সত্যিই কেউ আছে?
অনেকক্ষণ নিমীলিত চোখে তামাক খাওয়ার পর দুখীরাম হঠাৎ বলে উঠলেন, ছিল।
তার মানে?
তার মানে, এখন নেই।
হেঁয়ালি করছেন নাকি দুখীরামবাবু?
না হে বাপু, হেঁয়ালি জন্মে করিনি। এই পার্শ্বনাথের কথাই বলছিলুম হে। পার্শ্বনাথ একজন ছিল। তবে এখন নেই।
তা তিনি গেলেন কোথায়?
কাছেপিঠেই আছে। রথতলার মাঠটা তো চেনো, তার পাশেই বাঁশবন। তার পেছনেই খাঁড়া মুৎসুদ্দির পোড়ো বাড়ি, সেখানেই।
পোড়ো বাড়ি বলছেন, সেখানে লোক থাকবে কী করে?
তোমাকে কি বলেছি যে ওখানে লোক থাকে? থাকে তো পার্শ্বনাথ আর তার কিছু স্যাঙাৎ।
পার্শ্বনাথ কি তবে লোক নন?
পরলোক বলতে পারো, লোক বলি কোন সুবাদে?
এই তো ফের গোলমাল পাকালেন। ভূতপ্রেত এনে ফেললে কাজের কথা এগোয় কী করে বলুন তো? কানুনগো কালীবাড়ির কথা যা শুনেছি তা এক ঐতিহাসিক জিনিস। এই গাঁয়েই কোথাও তার ধ্বংসস্তূপ থাকার কথা। এখন কি ভূতপ্রেত ধরে সেখানে যেতে হবে নাকি?
তুমি কি নাস্তিক?
কেন মহাই, নাস্তিক হলে দোষ কী? কতবড়ো মানুষই তো নাস্তিক।
তুমি কি বড়ো মানুষ?
আজ্ঞে না।
তাহলে? বড়োমানুষের মেলা টাকাপয়সা, লোকলস্কর, নামডাক, প্রতিপত্তি থাকে বলে নাস্তিক হলেও মানিয়ে যায়। গরিবগুর্বোদের কী নাস্তিক হলে চলে বাপু?
বুঝলাম। তা না হয় আমাকে একরকম আস্তিক বলেই ধরে নিন। তাতে যদি একটু সুবিধে হয়।
তুমি তো দেখছি কানুনগো কালীবাড়ির জন্য বড্ড হন্যে হয়ে পড়েছ বাপু! ব্যাপার কী বলো তো? গুপ্তধন—টনের খবর আছে নাকি?
আজ্ঞে না। কী যে বলেন! গুপ্তধনের খবর থাকলে কি আর পাঁচকান করতুম। শুনেছিলুম কালী নাকি বড্ড জাগ্রত!
তা আর বলতে। ঠিকই শুনেছ বাপু! জাগ্রত কী বলছ, একেবারে জ্যান্ত কালী। অমাবস্যার রাতে কতজনা দেখেছে মা হাতে খাঁড়া নিয়ে লকলকে জিব বের করে গাঁয়ের রাস্তায় রাস্তায় রোদে বেরিয়ে পড়েছেন। ওঃ, সে এক দিন গেছে!
আপনিই দেখেছেন বুঝি?
বললেই তো বলবে গুলবাজ। না বাপু, আমি আর ওসব বলতে যাচ্ছি না। তা তুমি কালীমন্দিরটা খুঁজছ কেন বাপু? মতলবটা কী?
কৌতূহল বলতে পারেন। আমার পুরো নামটা কি আপনি জানেন?
না বাপু, আমি তোমার আধখানা নাম জানি। হারু। লোকে তো ওই বলেই ডাকে কিনা। তা তোমার বুঝি একটা জম্পেশ নামও আছে?
যে আজ্ঞে। নামটা হল হারাধন দাস কানুনগো।
কানুনগো! এই তো মুশকিলে ফেলে দিলে হে! কানুনগো মানে কী? তুমি কি বলতে চাও তুমি কানুনগোদের বংশধর? এই ষষ্ঠীগাঁয়েরই লোক?
যে আজ্ঞে।
দেখ কেলেঙ্কারি! এসব আগে বলতে হয়।
আজ্ঞে, আমার বাবা হলেন বিশ্বনাথ কানুনগো, ঠাকুরদা হরনাথ, তস্য পিতা অম্বরনাথ, তস্য পিতা বিদ্যাপতি, তস্য পিতা ডমরুনাথ, তস্য পিতা পরেশনাথ, তস্য—
বাপ রে! তুমি তো বাহাদুর ছেলে! সাত পুরুষের নাম অবধি মনে রেখেছ! আজকালকার ছেলেছোকরাদের তো ঠাকুরদার নাম জিজ্ঞেস করলেও মাথা চুলকোতে থাকে। তোমার বাবা বিশ্বনাথ আর আমি একেবারে সেই ন্যাংটাবেলার বন্ধু। তবে কিনা বিশু ছিল ভারি ভালো ছেলে, আর আমি ত্যাঁদড়।
তা আপনি এখনও একটু আছেন। তা পার্শ্বনাথের কথা কী এবার একটু বলবেন।
বলব বই কী বাবা, অবশই বলব, তবে বললে কি তোমার বিশ্বাস হবে?
বলেই দেখুন না।
এই যদি ধরো বলি, এই আমিই পার্শ্বনাথ?
অ্যাঁ!
বিশ্বাস হল না তো! নাস্তিকদের তো ওইটেই অসুবিধে কিনা। বিশ্বাসযোগ্য কথা হলেও বিশ্বাস করতে চায় না। তবে বলি বাপু, কানুনগো কালীমন্দির হাটখোলার পিছনে শাপলা বনের মাঝখানে। একটা উঁচুমতো ঢিবি দেখতে পাবে। সেটা খুঁড়লেই বেরিয়ে পড়বে।
বলেই হঠাৎ হুঁকো—টুকো সমেত দুখীরাম বাতাসে গায়েব হয়ে গেল।
হারু হাঁ।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন