নির্জন স্টেশনে

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

রূপনগর স্টেশনটা এমনিতেই ছোট্ট। ব্রাঞ্চ লাইন বলে লোকজনেরও বিশেষ গতায়াত নেই। সন্ধ্যের পর ছোট্ট স্টেশনঘরে কেরোসিনের বাতি জ্বলে। প্ল্যাটফর্মে সে বালাইও নেই। ঝুপসি ঝুপসি গাছে আচ্ছন্ন প্ল্যাটফর্মটায় অন্ধকার যেন ঝুলে ঝুলে দোল খায়। হেমন্তের কুয়াশার ভিতর দিয়ে দূরে সিগন্যালের লাল আলো আকাশ—প্রদীপের মতো জ্বলে থাকে। একজোড়া রেললাইন তেপান্তর থেকে তেপান্তরের দিকে উধাও হয়ে গেছে।

হেমন্তেই এই অঞ্চলে শীত পড়ে গেছে। কুয়াশাও যেন গাঢ়।

পিয়াল টিকিট কাটতে গিয়ে দেখল, কাউন্টারে লোক নেই। অনেক ডাকাডাকির পর একজন রোগা বুড়ো মানুষ এসে টিকিট দিল।

পিয়াল শুনেছে, কুসুমপুর যাওয়ার গাড়ি সাতটা কুড়িতে। যটাতেই হোক, পিয়ালের কিছু যায় আসে না। আজকাল সে উদভ্রান্তের মতো কোথায় যাচ্ছে, কী করছে তার কিছুরই ঠিক নেই।

পিয়াল নির্জন অন্ধকার শীতার্ত কুয়াশাচ্ছন্ন প্ল্যাটফর্মের একটা বেঞ্চে এসে বসল, সে যে কতখানি ক্লান্ত তা বসবার পরই যেন টের পেল। সারাদিন রোদে রোদে, ধুলোয়, মাঠে ঘাটে কত মাইল ঘুরেছে যে তার হিসেব নেই। মউলি বলে একটা জায়গায় একটা ছোট্ট হোটেলে দুপুরে ভাত খেয়েছিল। এখন সে পেটে খিদের কষ্টও অনুভব করছে। কিন্তু এসব কষ্ট এখন তার কাছে কিছুই নয়। গত দিনদশেক যাবৎ সে এইরকমভাবেই সাতসকালে কোনো অচেনা জায়গার উদ্দেশে বেরিয়ে পড়ে। তারপর উদভ্রান্তের মতো সারাদিন ঘোরে। রাতে কুসুমপুরে ফিরে যায়। বাড়ির লোকজন, বন্ধুবান্ধব বা পরিচিতদের কাছে মুখ দেখাতেও তার লজ্জা করে।

ঘটনাটা তার পক্ষে লজ্জাজনকই। দিন কুড়ি আগে নীপা নামে একটি মেয়ের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। মা—বাবার সম্বন্ধ করা মেয়ে। নীপা দেখতে ভারি সুন্দর, ঢলঢলে এবং নম্র স্বভাবের। তাকে ফুলশয্যায় রাতে ভারি পছন্দও হয়ে গেল পিয়ালের। কিন্তু মুশকিল হল কেন যেন বড্ড কাঁটা হয়ে থাকছিল নীপা। শরীর ছুঁতে দিচ্ছিল না। কিছু মেয়েলি অজুহাত দেখাল। মিশ খেতে চাইছিল না তার সঙ্গে। মেয়েদের ব্যাপারে পিয়ালের কোনো অভিজ্ঞতাই নেই। সে চিরকাল লেখাপড়া আর খেলাধুলা নিয়ে থেকেছে। মেয়েদের সে একটু এড়িয়েই চলত। ভাবল, মেয়েরা বুঝি এরকমই হয়। থাক, হয়তো সময় লাগবে। দিনদশেক আগে এক রাতে নীপা শোওয়ার ঘরে হঠাৎ কান্নায় ভেঙে পড়ে যা বলল তার মর্মার্থ হল, সে একটি ছেলেকে ছেলেবেলা থেকে ভালোবাসে, তাকে ছাড়া...ইত্যাদি। মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল পিয়ালের। কাউকে ভালোই যদি বাসে তা হলে আর একজনকে বিয়ে করল কেন?

নীপা যা বলল তার অর্থ দাঁড়ায়, ছেলেটা বেকার এবং পাড়ায় সুনাম নেই বলে তার কথা উত্থাপনই করতে পারেনি সে। বাবা আর মায়ের ভয়ে বিয়ে করেছে বটে, কিন্তু এখন বিষ খাওয়া ছাড়া তার উপায় নেই। পিয়াল কী তাকে একটু বিষ জোগাড় করে দিতে পারে? পিয়াল পারেনি, বিষের খবর সে রাখে না, রাখলেও সে নীপাকে মরবার ব্যাপারে সাহায্য করতে পারত না।

তা হলে উপায়?

উপায় একটাই। পিয়াল তাকে বলল, ওই ছেলেটির সঙ্গেই গিয়ে সে ঘর বাঁধুক, তার আপত্তি হবে না।

প্রদীপ নামে সেই ছেলেটির কাছ অবধি নীপাকে পৌঁছে দিয়ে ফিরে এল পিয়াল। গ্লানিতে মনটা ভরা, তার চেয়েও বড়ো কথা নীপাকে তার বড়ো ভালো লেগেছিল।

ব্যাপারটা জানাজানি হতে দেরি হল না। পিয়াল তেমন প্যাঁচালো বুদ্ধির মানুষ নয়। সাজিয়ে বানিয়ে মিথ্যে কথা বলতেও পারে না। কী হয়েছে তা বুঝে বাড়ির লোক তুমুল একটা হই—হট্টগোল বাধিয়ে তুলল। পিয়ালের শ্বশুরবাড়িতেও পড়ে গেল হুলস্থুল।

উদভ্রান্ত পিয়াল তাই গত দশ দিন যাবৎ বাড়ি থেকে পালিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। কী করা উচিত ছিল তার, তা সে জানে না। যা উচিত বলে মনে হয়েছে তাই করেছে। কিন্তু লোকে বলছে অত সহজে নীপাকে ছেড়ে দেওয়া উচিত হয়নি তার। এমনকী নীপার বাবা এসে অবধি বলে গেছে, ওকে জুতোপেটা করোনি কেন? জলবিছুটি দাওনি কেন? বিষ চেয়েছিল, তো তাই দিলে না কেন? মরলে আমার হাড় জুড়োত।

বিভ্রান্তিটা আজও পিয়ালের মাথায় ভর করে আছে। গত দশ দিন যাবৎ সে তার মনোহারী দোকানটা খোলেনি। গত দশ দিন সে বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে মেলামেশা করেনি। গত দশ দিন যাবৎ সে শুধু ভোর থেকে গভীর রাত অবধি চেনা—জানা পরিবেশ ছেড়ে অচেনা জায়গায় ঘুরে বেড়াচ্ছে।

রূপনগর জায়গাটাতেও সে এই প্রথম এল। সারাদিন ঘুরেছে, তবু সে বলতে পারবে না জায়গাটা কেমন। সে কিছুই দেখেনি। সে কিছুই ভালো করে বুঝতে পারছে না আজকাল। স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে কয়েকটা বেঞ্চ রয়েছে। রেলের মজবুত বেঞ্চ। কেউ নেই। তবু প্ল্যাটফর্মের এক প্রান্তে একেবারে অন্ধকারে ঝুপসি একটা গাছের নীচে একটা বেঞ্চে ক্লান্ত শরীরে বসে রইল সে। পৌনে সাতটা বাজে, সাতটা কুড়ির ট্রেন আসতে দেরি আছে। না এলেও ক্ষতি নেই। সে বেঞ্চে সারারাত বসে থাকতে পারবে।

চোখ বুজে ভাবছিল পিয়াল। ভাবনার যেন শেষ নেই, বুকে একটা দাউ দহন যেন সবসময়ে রাবণের চিতার মতো জ্বলছে। লজ্জাটা যেন তারই। তার কোনো দোষ নেই, তবু সবসময়ে নিজেকেই তার অপরাধী বলে মনে হয়। সে আসলে নিজের কাছ থেকেই পালানোর চেষ্টা করছে। পেরে উঠছে কী? বেঞ্চের অন্য প্রান্তে যে আর একটা লোক বসে আছে সেটা সে লক্ষই করেনি। ঘড়ি দেখতে গিয়ে আচমকা নজরে পড়ল। না, পিয়াল চমকাল না, ভয় পেল না, কোনো প্রতিক্রিয়াও হল না। সে বরং মুখটা ফিরিয়ে নিয়ে ফের চোখ বুজে ভাবতে লাগল। ভাবা মানে মাথার ভিতর যেন এক দীর্ঘস্থায়ী ঘূর্ণিঝড়। তাতে নানা কথা, নানা ঘটনা, নানা স্মৃতির এলোমেলো টুকরো উড়ে উড়ে ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

তন্দ্রার মতো এসেছিল। চটকা ভেঙে প্রথমেই লোকটাকে দেখল। অন্ধকারে দেখা যাচ্ছে না। শুধু বোঝা যাচ্ছে, একজন বসে আছে। সে চুপচাপ, লোকটাও চুপচাপ। দু—জনেই পাথরের মূর্তির মতো বসে আছে বেঞ্চের দু—ধারে। কারও সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করে না পিয়ালের। নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া অচেনা মানুষের সঙ্গে গত দশ দিন কথাই বলেনি সে। কিন্তু মুখে কথা না বললেও তার মনে কিন্তু সর্বদাই নানা কথার বুদবুদ তৈরি হচ্ছে, ভেসে আসছে কাল্পনিক সংলাপ, উঠে আসছে নানা বিতর্ক। এসব কথার বেশিরভাগটাই হচ্ছে নীপার সঙ্গে। নীপা— যাকে সে ঘটনা না জেনেই খুব ভালোবেসে ফেলেছিল, সেই ভালোবাসা প্রত্যাহার করে নিতে হল বোকার মতো। সম্পূর্ণ প্রত্যাহৃত হলও না সে। সাত সাতটা ঘোড়ার লাগাম টেনে টেনে ফেরানোর চেষ্টা করছে পিয়াল।

যে অন্ধকারে আমাকে ফেলে গিয়েছ, সেই অন্ধকারই একদিন গ্রাস করবে না তোমাকেও?

নিজের কণ্ঠস্বর শুনে নিজেই চমকে উঠল পিয়াল। এ কী? সে যে আপনমনে কথা বলছে! পাগলামির লক্ষণ নয় তো?

চকিতে সে একবার লোকটির দিকে তাকাল। শুনেছে নাকি? শুনলে খুবই লজ্জার কথা। আর একবার ঘড়ি দেখল পিয়াল। ঘড়ির কাঁটা যেন এক জায়গাতেই থেমে আছে! মাঝে মাঝে সময় যে কেন এত ধীরে চলে কে জানে?

ঘড়ি দেখে ফের চোখ বুজল পিয়াল। সারাদিনের ক্লান্তি ঘুম হয়ে নেমে আসছে চোখে। মেয়েরা তো পৃথিবীর ফুল। নীপা, তুমিই শেখালে আমাকে মেয়েদের ঘেন্না করতে, ভয় করতে। আর কোনো মেয়েকেই কখনো বিশ্বাস হবে না আমার।

ফের চমকে ওঠে পিয়াল! এ কী! এ যে তার নিজের পরিষ্কার কণ্ঠস্বর শুনল সে। হ্যাঁ, সে কথা বলছে, আপনমনে কথা বলছে!

লোকটার দিকে ফের তাকাল পিয়াল।

পাথরের মূর্তির মতো বসে আছে। বড্ড আবছা দেখাচ্ছে লোকটাকে। এত আবছা যে মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে, ওখানে কেউ নেই, সে ভুল দেখছে। লোকটা কী শুনল তার কথা? ছিঃ ছিঃ, কী লজ্জার কথা!

পিয়াল উঠে পড়ল এবং প্ল্যাটফর্মের আর এক প্রান্তে আরও অন্ধকার একটা কোণে কুয়াশায় ভেজা বেঞ্চে বসল এসে। তার একা থাকা দরকার। জনসমাজে লোকসমক্ষে তার থাকা উচিত নয়। সে একা একা কথা বলছে। লোকে তাকে পাগল ভাববে।

ফিরেই যাবে যদি তবে কেন উন্মোচন করেছিলে এ হৃদয়? কেন ভালোবাসায় ভেসে গিয়েছিল বুক! তুমিই তো! তুমিই তো জিয়নকাঠি ছুঁইয়ে দিয়েছিলে! খুলে দিলে বন্ধ দরজা। অন্য লগ্না, তোমার এ অপরাধ কে ক্ষমা করবে বলো!

আধোঘুম থেকে ফের ধড়মড় করে উঠে বসল পিয়াল। এসব কী হচ্ছে? কেন কথা কইছে সে?

চট করে সে বেঞ্চের অন্য প্রান্তে চেয়ে দেখল। দেখে থ হয়ে গেল সে। কুয়াশায় মাখা প্রগাঢ় অন্ধকারে আবছায়ায় ওই তো বসে আছে লোকটা! আশ্চর্য! আশ্চর্য! ভালো বোঝা যাচ্ছে না, কিন্তু মনে হচ্ছে, সেই লোকটাই। কালো র্যাপার মুড়ি দিয়ে জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে। অবিকল একইরকম দেখাচ্ছে।

বড্ড পাগল পাগল লাগছে পিয়ালের। সে উঠে পড়ল এবং বেঞ্চ বদল করে আর একটা বেঞ্চে গিয়ে বসল, তারপর ক্লান্তিতে চোখ বুজে ঘুমে ঢুলে পড়ল।

আমি আর কোথাও যাই না, কোথাও ফিরি না, আমার রাত নেই, দিন নেই। সময় থেমে আছে, ভিতরে দেখ, ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত যতেক নির্মাণ, ঝড়ে ভেঙে যাওয়া এক জাহাজ যেন অসহায় ভেসে যাচ্ছে স্রোতে। পৃথিবীর সব আলো নিবে গেল নাকি? উৎসবের শেষে লণ্ডভণ্ড বাড়িটাকে দেখেছ, এঁটোকাঁটা নিয়ে নেড়ি কুকুরের খেয়োখেয়ি। আমার ভিতরটা তেমনি এক উৎসব শেষের মণ্ডপ।

তটস্থ হয়ে সোজা হল পিয়াল। স্পষ্টই তার কণ্ঠস্বর। কেন সে কথা বলছে? কেন বলছে? কাকে বলছে?

চকিতে বেঞ্চের অন্য প্রান্তে দৃষ্টিক্ষেপ করল সে, এবং হঠাৎ তার শীত করে উঠল, লোকটা বসে আছে নাকি? আছেই তো মনে হচ্ছে! কালো র্যাপারে মুড়িসুড়ি দিয়ে ওই তো! লোকটা কী বার বার তার সঙ্গেই বেঞ্চ বদল করে এসে কাছে বসে থাকছে! একটাই লোক! নাকি আলাদা আলাদা?

কে জানে! পিয়ালের মনে হল একা একা কথা বলার চেয়ে বরং কারও সঙ্গে কথা বলাই ভালো। তার ইচ্ছে হচ্ছে না বটে, কিন্তু নিজের কাছ থেকে রেহাই পেতে হলে এটাই একমাত্র পথ।

পিয়াল লোকটার দিকে চেয়ে বলল, আপনি কি রূপনগরের লোক?

জবাবটা এল খানিকক্ষণ পরে। ঠিক গলার স্বরও নয়, যেন বাতাসের একটা কম্পনের ভিতরে খুব ফিনফিনে শব্দের আভাস মাত্র।

লোকটা যেন বলল, না।

তবে আপনি কোথাকার লোক?

তেমনি সংকেতের মতো, বাতাসের ঘনীভূত একটা কম্পনের মতো জবাব এল, অনেক দূরের।

এ জায়গায় বুঝি কাজে এসেছেন, নাকি বেড়াতে!

ডিউটি করছি।

ডিউটি! ওঃ তাই বলুন! কীসের ডিউটি? রেলের?

না।

তা হলে?

নজর রাখছি।

নজর রাখছেন? কী আশ্চর্য! নজর রাখছেন?

হ্যাঁ।

কার ওপর? এখানে তো কেউ নেই?

আপনি আছেন।

আমি! আ—আমি! আপনি কি আমার ওপর নজর রাখছেন?

হ্যাঁ।

কিন্তু কেন?

ওটাই আমার ডিউটি।

আপনি কে?

চিনবেন না।

কে আপনাকে আমার ওপর নজর রাখতে বলেছে?

ডিউটি।

ডিউটি! ডিউটি কথাটার তো মানেই হয় না। কীসের ডিউটি? কার ডিউটি?

ডিউট শুধু ডিউটিই।

আপনি বললেন নজর রাখছেন। ভালো কথা। তার মানে কি আমি বিপদে পড়লে বা আত্মহত্যা করার চেষ্টা করলে আপনি আমাকে বাঁচাবেন? নাকি আপনি নজর রাখছেন আমাকে ফাঁসিয়ে দেবেন বলে।

তা জানি না, আমাকে শুধু নজর রাখতে বলা হয়েছে।

কে বলেছে?

জানি না।

জানেন না? না বলতে চাইছেন না?

জানলে বলতে পারতাম।

কবে থেকে নজর রাখছেন?

প্রথম থেকে।

প্রথম বলতে?

জন্ম থেকে।

জন্ম! সে কী!

আমি আর আপনি একই সঙ্গে জন্মেছি।

আপনি আসলে কে?

চিনবেন না।

দম ধরে খানিকক্ষণ বসে থাকে পিয়াল।

তারপর বলে, আপনি কি আমাকে চেনেন?

চিনি।

আমি কে?

পিয়াল রায়।

আশ্চর্য! আমার বাড়ি কোথায়?

কুসুমপুর।

আমার বাবার নাম?

হরিবল্লভ রায়।

আপনি কি আমার স্ত্রীর নাম জানেন?

জানি। নীপা রায়।

আপনি কি জানেন আমার স্ত্রী আমাকে ভালোবাসে না। প্রদীপকে বাসে!

জানি।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পিয়াল বলে, আপনি সবই জানেন। কিন্তু আমি যে আপনার কিছুই জানি না।

জানবার কিছু নেই।

আপনি আমার সঙ্গেই জন্মেছিলেন?

হ্যাঁ।

আপনার বাড়ি কোথায়?

কোথাও নয়। আপনি যেখানে আমিও সেখানে।

বাঃ, বেশ কথা। কিন্তু আমি যে আজই আপনাকে প্রথম দেখলাম।

দেখলেন?

হ্যাঁ তো! এই যে দেখছি!

দেখছেন না। অনুমান করছেন।

আপনি কি বাস্তব নন?

বাস্তব।

রিয়েল?

রিয়েল।

আমি আপনাকে ছুঁয়ে দেখতে পারি?

না।

কেন?

ছোঁওয়া যায় না বলে।

হঠাৎ দূরের ফাঁকা মাঠঘাট থেকে হাহাকারের মতো একটা বাতাস বয়ে গেল। তার ভিতরে বিরহের হু হু শব্দ, প্রেতিনীর দীর্ঘশ্বাসের মতো, আর জলজ উদ্ভিদের গন্ধ, আর চোরা শীত।

আপনি জাদুকর নন তো?

না।

গোয়েন্দা?

না।

আপনি কি আমার ভারাক্রান্ত হৃদয়ের কথা জানেন?

জানি।

তাহলে আপনার কাছে সব কথা বলা যায়, যায় না?

ইচ্ছে হলে।

বড়ো গ্লানি, বড়ো অপমান। এত পালিয়ে বেড়াচ্ছি, ঘুরে মরছি, কই একটুও তো ভুলতে পারি না। শুনেছি সময়ের প্রলেপে সব ঢাকা পড়ে যায়, যাচ্ছে না তো!

কী ভুলবেন?

গ্লানি, অনুশোচনা, সব ভুলতে চাই। পারছি না, বুকে এত জ্বালা!

জানি।

কী করব?

জানি না।

যদি মরতে চাই?

একটা মেয়ের জন্য?

হ্যাঁ।

একটা তুচ্ছ মেয়ের জন্য?

ধরুন, তাই।

একটা দীর্ঘশ্বাস ভেসে এল।

শুনছেন?

শুনছি।

আজ রাতটি বড্ড মনোরম, অন্ধকার, রহস্যময় কুয়াশা, ভূতুড়ে একটা স্টেশন, আর প্রেতলোক থেকে আসা কারও মতো আপনি। এইসব আমাকে প্ররোচিত করছে মরার জন্য। মরলে সব শেষ, সব শান্তি, সব সমাধান।

আবার একটা দীর্ঘশ্বাস।

সাতটা কুড়ির ট্রেন এত দেরি করছে কেন বলুন তো!

ট্রেন আসবে।

ওই ট্রেনের চাকায় যদি নিজেকে সমর্পণ করে দিই?

কোনো জবাব নেই।

আপনি কি আছেন?

আছি।

আপনি কি সবসময়ে আমার সঙ্গে থাকেন?

থাকি।

আচ্ছা, লাইনের ওপর দিয়ে ওটা কী আসছে বলুন তো!

একটা ট্রলি।

ট্রলি! ট্রলি কেন আসছে?

আপনার জন্য।

আমার জন্য? ট্রলি করে আমি কোথায় যাব?

দু—বছর পর।

দূর? কী যে বলেন!

ট্রলি সামনে এসে দাঁড়াল, লোকটা বলল, উঠে পড়ুন।

ভারি মজা পেল পিয়াল। ট্রলিতে সে জীবনে কখনো ওঠেনি, উঠবে? অদ্ভুত ঘটনা এটা, তবু পিয়াল হঠাৎ ট্রলিতে উঠে পড়ল, সঙ্গে সঙ্গে ধুন্ধুমার বেগে ট্রলিটা ছুটতে শুরু করল।

কোথায় যাচ্ছি মশাই, অ্যাঁ! কোথায় যাচ্ছি সত্যিকারের!

দু—বছর পর, লোকটা পেছন থেকে বলল।

এর কোনো মানেই হয় না, কী হচ্ছে এসব?

দেখা যাক।

ট্রলি লাইন ছেড়ে কোথা দিয়ে যে কোথায় চলল তা বুঝতেই পারছিল না পিয়াল, কিন্তু সে একটা ঘরে পৌঁছে গেল, তার নিজেরই ঘর। ঘরে আলো জ্বলছে। ভারি সুন্দর মুখশ্রীর একটা মেয়ে খাটে বিছানা পাতছে, বালিশ সাজাচ্ছে। তাকে দেখে খুশির হাসি হেসে বলল, ও মা, তুমি এসে গেছ?

নীপা!

দেরি দেখে যা ভাবনা হচ্ছিল!

কিন্তু প্রদীপের কী হল, নীপা?

নীপা ভ্রূ কুঁচকে অভিমানী মুখ করে বলল, আচ্ছা, হঠাৎ আবার ও কথা কেন বলো তো! কতবার তো বলেছি, ও আসলে আমাকে চায়নি, চেয়েছিল দু—দিন ফুর্তি করে কেটে পড়তে। আমি তাই ওকে আমার শরীর ছুঁতে দিইনি, পালিয়ে গেছি মামার বাড়িতে। মামাও তো বলেছে তোমাকে! বলেনি? তবে কেন আজও বিশ্বাস করো না আমাকে? কেন করো না?

আবেগভরে কী একটা বলতে যাচ্ছিল পিয়াল। কিন্তু আচমকা ছবিটা মুছে গেল। জলার দিক থেকে প্রেতিনীর শ্বাসের মতো একটা বাতাস বয়ে এল। তাতে হাহাকারের শব্দ। অন্ধকার প্ল্যাটফর্মে বসে আছে পিয়াল।

এটা কি সত্যি?

কে জানে?

তবে দেখলাম কেন?

হতেও পারে তো! জীবনে কত সম্ভাবনা থাকে!

মিথ্যেও হতে পারে তো!

পারে।

কোনটা সত্যি, কোনটা মিথ্যে বুঝব কী করে?

অপেক্ষা করা যাক।

অপেক্ষা?

অপেক্ষা।

দূর থেকে একটা আলো এসে পড়ল রেললাইনের ওপর। চকিত উদ্ভাস, প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়ল সেই আলো। পিয়াল চেয়ে দেখল বেঞ্চের কোণে কেউ নেই। কেউ হয়তো ছিলই না। বিভ্রম।

পিয়াল ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল, ট্রেন আসছে।

___

অধ্যায় ২৫ / ২৫
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%