গল্পের থেকেও এগিয়ে

অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী



—তারপরে কী হল?
—ওখানেই গল্প শেষ। ছোটগল্পের সবকিছু কি বলে দিতে হয়? রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন না—'শেষ হয়ে হইল না শেষ'! বাকিটা বুঝে নিতে হয়।
—তন্ময় বিজ্ঞের মতো বলে উঠল।
—আমি কিন্তু কিছুই বুঝলাম না। তুই বলে না দিলে শেষ যে হল, তাও বুঝতাম না।
—পাশ থেকে প্রতীক বলে উঠল।
—আমিও সেই দলে। ভালো হচ্ছিল। কিন্তু শেষে যে কি হল কিছুই বোঝা গেল না।
—সহেলীও সায় দিল।
বিশ্বজিৎদাও সেই কোরাসে যোগ দিল—নাহ, তন্ময় এসব তোর দ্বারা হবে না। একমাত্র অনিলিখাই পারে। অনিলিখার গল্পগুলো যতই গাঁজাখুরি হোক না কেন, বেশ জম্পেশ হয়। চট করে ফাঁক-ফোকর খুঁজে পাওয়া যায় না। কিন্তু তোরটা যেন গল্প হিসেবেই দাঁড়ায়নি।
তন্ময় এবারে বেজায় খেপে অভিমানী গলায় বলে উঠল—নাহ, আর তোমাদের কষ্ট করে গল্প লিখে শোনাব না। এক সপ্তাহ ধরে লিখলাম। রাত জেগে। ভাবলাম তোমাদের ভালো লাগবে।
আজ অনিলিখাদি একদম ভারতীয় পোশাকে। একটা সবুজ সিল্কের শাড়ি পরে এসেছে। কানে সোনার দুল। খোলা চুল। দেখেই বোঝা যায় আজ সময় নিয়ে এসেছে। খুব মন দিয়ে শুনছিল।
অনিলিখাদি তন্ময়ের সমর্থনে এগিয়ে এলো।—না, না, ভালো চেষ্টা। লিখতে লিখতে আরও ইমপ্রুভ করবে। গল্প লেখা অত সহজ নয়। তা না হলে এত লোক লেখার চেষ্টা করে, কিন্তু এত কম ভালো লেখক কেন? এটা খুব শক্ত একটা কাজ। লেখা কথাও যতটা জরুরি, গল্পের না লেখা কথাগুলোও ঠিক ততটাই জরুরি। গল্পের শুরু লেখক করলেও গল্পের শেষ পাঠকই করে।
—ঠিক বলেছ অনিলিখাদি। সে জন্য স্টিফেন কিং বলেছেন ছোটগল্প হল এক অচেনা মানুষের কাছ থেকে অন্ধকারে চুম্বন পাওয়ার মতো।
—তন্ময় আত্মপক্ষ সমর্থনে বলে ওঠে। যদিও এ মন্তব্যের প্রাসঙ্গকিতা আমরা কেউ বুঝতে পারলাম না।
অনিলিখাদি ফের বলে ওঠে—গল্প লেখা খুব শক্ত কাজ। কম্পিউটার এতো কিছু করতে পারে। আমরা আরটিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, মেসিন লার্নিং—এসব নিয়ে এতো কথা বলি, কিন্তু আমাদের রবিঠাকুর আজ থেকে একশো বছর আগেও যেরকম গল্প লিখে গেছেন, সেরকম মানের গল্প লিখতে কম্পিউটার আজ থেকে আরও একশোবছর পরেও পারবে কি?
—কম্পিউটার গল্প লিখবে মানে? এ আবার কি বিদঘুটে কথা! কোনদিন সম্ভব?
—বিশ্বজিৎদা বলে উঠল।
—একেবারে অসম্ভব বলব না। তবে সময় লাগবে। হয়তো সবার আগে ফ্যান্টাসি লিখতে শিখবে। কিন্তু হৃদয়কে স্পর্শ করার ব্যাকরণ শিখতে আরও কয়েক যুগ লেগে যাবে। ভালো গল্প লিখতে শেখা আরটিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স-এর উন্নততম পর্যায়। সেটা আমরা চাইব না, কারণ এর অন্য অনেক অপপ্রয়োগ হবে।
—কেন? তাতে অসুবিধে কি?—বিশ্বজিৎদা বলে উঠল।
—কারণ যেদিন সেটা ওরা করতে শিখবে, সেদিন ওরা শুধু পাঠকের মন নিয়ে খেলা করবে না, সাধারণ মানুষকে প্রভাবিত করার ক্ষমতাও রাখবে। সেটা কি আমরা কোনওদিন চাইব? সেদিন—ফেক নিউজ তৈরি করবে, মানুষের অনুভূতি নিয়ে খেলতে শিখে যাবে, যুদ্ধ বাধিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখবে। যদি আগামীদিনে তোমার বাড়ির কাজের রোবটের আড়ালে থাকা প্রোগ্রাম রান্নার কাজ কমাতে বাজার থেকে এসে বলে যে বাজারে ইলিশ ওঠেনি, উচ্ছে-ভাজা খাওয়াই ভালো। সেটা কি তুমি চাইবে?
—অনিলিখাদি বলে উঠল।
বিশ্বজিৎদা হাইহাই করে কি একটা বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু সেটা বলার আগেই সহেলী বলে উঠল—কি ব্যাপার, কোনও একটা গল্প আছে এ ব্যাপারে মনে হচ্ছে অনিলিখাদি!
আমিও বলে উঠলাম—বলো না অনিলিখাদি, এটা তো তোমারই সাব্জেক্ট। এরকম কোনও অভিজ্ঞতা হয়েছে তোমার?
আমরা সবাই একজোট হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লাম। এরকম সুযোগ হাতছাড়া করা যায় না।
অনিলিখাদি শুধু বলে উঠল—ঠিক আছে বলছি। তবে ব্যাপারটা এখনও আন্ডার ইনভেস্টিগেশন। তাই কিছু নাম-স্থান-কাল-পাত্র পাল্টে বলতে হবে।
—ওরেব্বাবা, এতো সাংঘাতিক ব্যাপার! মাছের কচুরির সঙ্গে যা জমবে না!
অনিলিখাদি বিদেশ থেকে বেশ কয়েকটা টিনে করে টুনা মাছ এনে দিয়েছিল। তাই দিয়ে আজ প্রতীকের বাড়িতে শনিবারের আসরে আমাদের টুনা মাছের কচুরি হচ্ছে। তার সঙ্গে বাইরে হঠাৎ বেশ জোরালো ঝড় শুরু হয়েছে। এর থেকে ভালো গল্পের পরিবেশ আর হয় না!
অনিলিখাদি বলতে শুরু করে—
প্রায় তিনমাস আগের কথা। ডেনমার্কের কোপেনহেগেন শহরে ঘটনাটা ঘটেছিল। কোপেনহেগেন খুব নিরাপদ ছিমছাম শহর। জুন মাস। বেশ ভালো ওয়েদার। যেখানে ছিলাম সেটা কোপেনহেগেনের সিটি সেন্টারের কাছে। রাতে খাওয়ার পরে হাঁটতে বেরোলাম।
বেশ কিছুটা সময় ১৪১৬ থেকে ১৫২৩ সাল অব্দি কোপেনহেগেন ছিল নরডিকসের বড়ো একটা অঞ্ছলের রাজধানী। এখনকার সুইডেন, ফিনল্যান্ড, নরওয়ে, ডেনমার্ক জুড়ে বিশাল একটা জায়গা ছিল একটাই রাজপরিবারের অধীনে। আর তার রাজধানী ছিল কোপেনহেগেন।
শহরের বিভিন্ন জায়গায় সে অতীতের প্রাচুর্যের পরিচয় এখনও খুঁজে পাওয়া যায়। একই সঙ্গে শহরের হাজার বছরের ইতিহাস সুন্দরভাবে সুরক্ষিত রয়েছে। সেজন্য পুরনো শহরের দিকে গিয়ে যেমন মধ্যযুগের পাথরের বাড়ি, পাথরের রাস্তা, ক্যাসল, চার্চ, প্যালেস এসব চোখে পড়ল, ঠিক তেমনই তার থেকে কিছু দূরে দেখলাম বিশাল বিশাল অত্যাধুনিক বিল্ডিং-এর আড়ালে আকাশ যেন ঢাকা পড়েছে।
ব্যাংকিং আর লাইফ সায়েন্স মেডিকাল রিসার্চের সঙ্গে যুক্ত বেশ কিছু বড় বড় কোম্পানি আছে ডেনমার্কে। এখানেই আছে বিশ্বের প্রথম বিনোদন পার্ক 'ব্যাকেন' যা কিনা ১৫৮৩ সালে খোলা হয়েছিল।
দিনের বেলা বেশ গরম থাকলেও সন্ধের সঙ্গে সঙ্গে উষ্ণতা কুড়ির কাছাকাছি নেমে এসেছে। তার মধ্যে বেশ ফুরফুরে হাওয়া দিচ্ছে। সব মিলিয়ে খুব উপভোগ্য। একটা আইসক্রিম কিনে পুরনো শহরের মধ্যে ছোট একটা বাগানে বসলাম।রাত দশটা নাগাদ সূর্যাস্ত হয়েছে। তারপরে আরও বেশ খানিকক্ষণ কেটে গেছে। পুরনো শহরের ষড়ভুজ গ্যাস ল্যাম্পগুলো জ্বলে উঠেছে। তাদের নরম আলোর আঙুলের ছোঁয়ায় আশেপাশের স্থাপত্যের বার্ধক্যের বলিরেখা যেন আরও বেশি করে ফুটে উঠেছে। সব মিলিয়ে মায়াবী পরিবেশ।
রাস্তায় লোক কমে এসেছে। কিছু কমবয়সী ছেলেমেয়ে শুধু কিছু জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে আড্ডা দিচ্ছে। দূরে রাস্তায় একধারে গায়ে শাল জড়িয়ে একটা ভিখিরি বসে আছে। তার পাশে একটা পিয়ানো অ্যাকোরডিয়ন রাখা। সে বোধহয় খানিক আগেও ওটা বাজাচ্ছিল। এখন রাস্তার ধারে বসে ঝিমোচ্ছে। সামনে একটা বাটি রাখা, সেখানে যে যা পারছে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে।
আমার কি মনে হল জানি না। লোকাল কারেন্সী 'ক্রোন' ছিল না। ওই দোকান থেকে কারডে একটা আইসক্রিম কিনে লোকটাকে দিয়ে এলাম। লোকটা মাথা ঝুঁকিয়ে আমাকে ধন্যবাদ জানাল।
দেখলাম লোকটা স্থানীয় হবে। নীলচে চোখ, সোনালি চুল, লম্বা চওড়া চেহারা। এখানকার গ্রামের দিকের লোকেদের মুখ-চোখ একটু ভোঁতামতো হয়। এ লোকটার মুখও সেরকমই।
আবার বাগানের বেঞ্চিতে এসে বসলাম। এখানে আলোটা কম। আইসক্রিম খাচ্ছি, হঠাৎ লক্ষ্য করলাম আমার থেকে কিছু দূরে আরেকটা বেঞ্ছিতে একজন লোক বসে আছে। সেও যেন ওই লোকটাকে খুব কৌতূহল নিয়ে দেখছে। একবার চোখাচোখি হতেই চমকে উঠলাম। এতো 'কেন লিউ'। লোকটা অন্যদিকে মুখ ঘোরালেও ঠিক চিনতে পেরেছিলাম। নাহ, কোনও ভুল নেই। বিশেষ করে 'কেন'—এর মুখ একবার দেখলেই মনে রাখা যায়। বেশ অন্য ধরনের। মুখটা সরু লম্বা মতো। চওড়া ভুরু। নাকটা বেশ বড়। নাক আর পাতলা ঠোঁটের মধ্যের গ্যাপটা একটু যেন বেশি। একবার দেখলেই মুখটা ভোলা যায় না।
একটু থেমে অনিলিখা বলে উঠল—এখানে ব্যাপারটা বিচারাধীন বলে আমি নামটা বদলে নিলাম। আসল নামটা বলা উচিত নয়।
যা বলছিলাম। সামনে দেখি 'কেন লিউ'। ওঁকে সারা বিশ্ব চেনে বিখ্যাত কল্পবিজ্ঞানের লেখক হিসেবে। তবে ইদানীং উনি একটু বেশি ডার্ক লেখার দিকে ঝুঁকেছেন। খুন—মৃত্যু—ভয়-এসব নিয়ে বেশি লিখছেন। কিছুদিন আগেও ওঁর এক ছোটগল্পের সংকলন পড়েছিলাম। তাতে এই পরিবর্তন আরও বেশি চোখে পড়েছে। সেই 'কেন' যে এখন এখানে থাকেন, কোপেনহেগেনে তা জানতাম না। অবশ্য উনিও আমার মতো বেড়াতে এসেছেন, এরকম হতে পারে।
'কেন'কে আমি অন্য পরিচয়েও চিনতাম। 'কেন' আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, মেসিন লারনিং-এর গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ও 'ইটিএইচ জুরিখ' ইউনিভারসিটিতে পড়াতেন।
আমিও ওই একই বিষয়ে গবেষণায় যুক্ত ছিলাম বলে আমার সঙ্গে একবার জুরিখের একটা কনফারেন্সে দেখা হয়েছিল। তখন লাঞ্চের সময় প্রায় আধ ঘণ্টা কথা হয়েছিল। তখনই ওঁর মুখে প্রথম শুনেছিলাম যে উনি মেসিনলার্নিংকে গল্প লেখার কাজে ব্যবহার করছেন। একই সঙ্গে সেটা যে তখনও একদমই ভালো কিছু লিখতে পারছে না, সেটাও বলেছিলেন।
—বলো কি? তখনই? কিভাবে এটা সম্ভব? লোকটা তো জিনিয়াস।—সৌগত উত্তেজিত হয়ে বলে উঠল।
—হ্যাঁ, 'কেন' সত্যি জিনিয়াস। তাছাড়া এরকমদুটো বিষয়েই দক্ষতা থাকায় এটা ওঁর পক্ষে করা আরও সহজ হয়েছিল। অনেক প্যারামিটার এর সাহায্য নিয়ে এক্ষেত্রে ডিপলার্নিংকে সুপারভাইজ বা পরিচালিত করা যায়। ভাষা শিখতে, উপযুক্ত তথ্য সংগ্রহ করতে, চরিত্র গঠন করতে বা গল্পের পরিবেশ সৃষ্টি করতে, উনি আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সকে ব্যবহার করছিলেন। ডিপলার্নিং এর সাহায্য নিয়ে প্রোগ্রাম এমনভাবে করা যায় যাতে তা বিভিন্ন লেখকের নানা ধরনের লেখা পড়ে ক্রমশ শেখে।
ধরা যাক একটা প্রোগ্রাম 'ফেলুদা'র সব লেখা পড়ে ফেলল। তারপর তাকে বাংলা ব্যাকরণ শিখিয়ে দেওয়া হল। কিভাবে চরিত্র তৈরি করা যায়, সেটার জন্য গল্পের বিভিন্ন জায়গায় কিভাবে একটা চরিত্রের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে তার কিছু উদাহরণ দেওয়া হল। তারপরে তাকে একটা নতুন ' ফেলুদা'র গল্প লিখতে বলা হল। এটাকে সুপারভাইজড বা পরিচালিত ডিপলার্নিং বলা যায়।
একই ভাবে গল্পের যে অন্য বিভিন্ন এলিমেন্ট থাকে, যা পাঠককে পাঠে নিবিষ্ট রাখে, সে সবের উপরেও কম্পিউটার প্রোগ্রামকে শেখানো যায়, যাতে প্রোগ্রাম আরও উন্নত হয়। 'কেন' নিজে খুব ভালো লেখক বলে এটা শেখানো তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল।
—এসব করে কি লাভ?
—এক তো এর মাধ্যমে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সকে আরও বেশি উন্নত করা যায়, যার ব্যবহার অন্য অনেক ক্ষেত্রে হতে পারে। তাছাড়া আমার মনে হয়েছিল 'কেন' একটা বিশেষ কারণে এটা ব্যবহার করতে চান। ওঁর গল্পে নতুন ধরনের প্লট সৃষ্টি করার জন্য। এটাই যে কোনও লেখকের পক্ষে সব থেকে শক্ত কাজ।
—কিন্তু মানুষের থেকে কি প্রোগ্রাম ভালো কল্পনা করতে পারে?
—একটা শিশু যেভাবে কল্পনা করতে পারে, একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষ সেভাবে কল্পনা করতে পারে না। তার কারণ আমরা যত বড় হই, তত বিভিন্ন নিয়ম কানুন, সংস্কার এসব শিখি। কিন্তু কম্পিউটারের কাছে কোনও বাধানিষেধ না থাকায় তা যেকোনও কিছু কল্পনা করতে পারে। তাছাড়া এমন কিছু ভাবতে পারে যা হয়তো মানুষ কখনই ভাবতে পারে না। তবে সে কথা পরে বলছি।
কোপেনহেগেনে যখন দেখা হল, সেটা জুরিখের প্রায় দুই বছর পরে। দুমাস আগে 'কেন'-এর একটা ছোট গল্পের সংকলন প্রকাশিত হয়েছে। ভালো লেখা। একেবারে আনকোরা সব নতুন প্লট। কিন্তু বড় ডার্ক। সব গল্প ঘিরে যেন অন্ধকার জগতের ছাপ।
তা সে যাই হোক, আমি লক্ষ্য করলাম উনি একা বসে আছেন। এরকম আলাপ করার সুযোগ কে ছাড়ে?
এগিয়ে গিয়ে আলাপ করলাম। আমাকে অবশ্য চিনতে পারলেন না।
কথায় কথায় জিজ্ঞেস করলাম—অনেক দিন কোনও সায়েন্স ফিকশন পাচ্ছি না। যা পড়ছি প্রায় সব ডার্ক থিমের উপরে লেখা—খুন-রহস্য। কবে নতুন সায়েন্স ফিকশন পেতে পারি?
একটু যেন অন্যমনস্ক হয়ে বলে উঠলেন—আসলে প্লট যখন যেমন আসে, তেমনই লিখি।
বলে উঠলাম—প্লট মানে আপনি কি কম্পিউটার প্রোগ্রামকে ব্যবহার করে গল্প লিখছেন?
একটু যেন চমকে উঠলেন।
মনে হয় 'কেন' ভুলে গিয়েছিলেন আমার সঙ্গে বছর দুয়েক আগে দেখা হওয়ার কথা।
তারপরে সায় দিলেন, বলে উঠলেন—হ্যাঁ, আমি গল্প লেখার জন্য মাঝে মধ্যে প্রোগ্রামের দেওয়া প্লট ব্যবহার করি। তারপরে অবশ্যই আমার মতো করে পরিবর্তন করে নিই।
—এসব ব্যাপারে প্রোগ্রাম এখন কতটা উন্নত?
—এখনও শিক্ষানবীশ। আসলে আমাদের বিভিন্ন মানুষের চরিত্র, সম্পর্ক, কথা বলা,কাজকর্ম—এসব এত জটিল যে প্রোগামের পক্ষে মানুষকে পুরোপুরি বোঝার ক্ষমতা আজও নেই। কে কী বলতে পারে, কী করতে পারে সেটা ঠিক আন্দাজ করতে পারে না। সে জন্য প্রচুর আজগুবি প্লট তৈরি করতে পারলেও, সেটা মূলত ফ্যান্টাসির ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ। এখনও আমাদের থেকে অনেক পিছিয়ে আছে।
—কিন্তু এরকম নয়তো যে ওই প্রোগ্রামের তৈরি করা প্লট আপনাকে প্রভাবিত করছে? সে জন্যই কি এত ডার্ক লেখা পাচ্ছি?
একটু যেন উত্তেজিত হয়ে বলে উঠলেন—কেন? কেন বলছ এ কথা? একটা সামান্য প্রোগ্রামের এত ক্ষমতা হবে যে তা আমার মতো লেখকের চিন্তাভাবনা পরিচালিত করতে পারবে? এটা খুব হাস্যকর চিন্তা। আমি আমার মতোই লিখি।
—আসলে মনে হচ্ছে আপনার লেখার মধ্যে ইদানীং যেন একটা আমূল পরিবর্তন হয়েছে। তাই জিজ্ঞেস করছিলাম। আগে আপনার লেখায় ভবিষ্যতের অনেক সম্ভাবনার কথা ফুটে উঠত। সেটা এখন দেখছি না। তবে অনেক ভালো ভালো ডার্ক রহস্য, থ্রিলার লেখা পাচ্ছি।
—আসলে গল্পের প্রয়োজনে, পাঠকের যেরকম ভালো লাগবে সেরকমই তো লিখব, তাই না? আচ্ছা। এবার আসি।—বলে 'কেন' প্রায় হঠাৎ করে উঠে পড়লেন।
এতটাই অপ্রত্যাশিতভাবে উঠে দাঁড়ালেন যে মনে হল যেন মুখে না প্রকাশ না করলেও আমার প্রশ্নে খানিকটা রেগে গিয়েছিলেন।
আমিও আর বেশিক্ষণ বসেছিলাম না। হোটেলে ফিরে এলাম।
এর দু-দিন বাদে আমাকে ওখান থেকে স্টকহোম যেতে হয়েছিল। পথে কোপেনহেগেন এয়ারপোর্ট—এরেন ডিয়ারের মাংস খেতে খেতে 'কোপেনহেগেন পোস্টে' খবরটা চোখে পড়ল।
ছোট খবর। একটা বছর কুড়ির মেয়ে গতকাল রাতে খুন হয়েছে। সেটা বড় কথা নয়। খুন হয়েছে একটা গৃহহীন মানুষের হাতে। তাকে পুলিস ধরেছে। সে ছবিটা দেখে বুঝলাম যাকে ধরা হয়েছে সেই লোকটা আর কেউ নয়, সেদিনের সেই ভিখারি, যাকে আইসক্রিম খাইয়েছিলাম। লোকটা অপরাধ স্বীকারও করে নিয়েছে। জায়গাটা ঠিক যেখানে আমি সেদিন বসে ছিলাম।
হঠাৎ করে আমার মনে কি যে হল পুলিসে যোগাযোগ করলাম।
—কেন?
—'কেন'-এর গল্প সংকলনের সব ক'টা গল্প আমার পড়ার সুযোগ হয়েছিল। সে কথা আগেই বলেছি। তার মধ্যে একটা গল্পে অনেক কিছুর মধ্যে একটা ঘটনা ছিল যেখানে এক গৃহহীন ভিখারী রাতে ঠিক রাত বারোটার পরে যে ওখান দিয়ে যেত তাকেই খুন করত। বিনা কারণে। তার পিছনে একটা অত্যন্ত জটিল রহস্য ছিল। সেটা এখানে বলছি না। এক্ষেত্রে ওই মেয়েটা ঠিক রাত বারোটা দশে খুন হয়েছিল।
—তার মানে? এত কোয়েনসিডেন্স। তাতে 'কেন'-এর দোষ কি?
—আমার মনে হয়েছিল 'কেন' এ ঘটনার সঙ্গে যুক্ত ছিল। 'কেন' লোকটাকে টাকা দিয়ে ঘটনাটা ঘটিয়েছিল। হয়তো ওঁকে ওখানে দেখেছিলাম বলে আরও সেটা মনে হয়েছিল। আমার জন্যেই সেদিন রাতে কোনও একজন অচেনা পথিক বেঁচে গিয়েছিল। কিন্তু দু দিন বাদে সেটাই ঘটল।
এটা অবশ্য শুধু একটা ঘটনার উপরে নির্ভর করে আমি অনুমান করিনি। এরকম আরেকটা ঘটনা আগেই শুনেছিলাম। সে ঘটনাটা ঘটেছিল সুইজারল্যান্ডে লুসারন শহরে। ঘটনাটা বলি।
একটা বাচ্চা ছেলে হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যায়। পরে তদন্ত করে পুলিস একটা বছর তিরিশের মেয়েকে অপরাধী বলে চিহ্নিত করেছিল। সে মেয়েটি নার্সের কাজ করত। ছেলেটার বয়স ছিল বছর দশেক। উচ্চবিত্ত পরিবারের ছেলে। বাবার বিশাল হোটেলের ব্যবসা। ছেলেটা বাড়ির পাশে বাগানে খেলতে গিয়ে হারিয়ে যায়। লুসারন খুব নিরাপদ শহর। তাই এরকম ঘটনায় নড়েচড়ে বসেছিল সেখানকার পুলিস। অনেক তদন্ত হয়।
শেষে বাড়ির কিছু ডিজিটাল ছবি দেখে পুলিস প্রথম সূত্র পায়। ছেলেটার অনেক ছবিতে দূরে একটা মেয়েকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছিল। ডিজিটালি বড় করে দেখা যায় যে ভিন্ন ভিন্ন সময়, ভিন্ন ভিন্ন জায়গা হলেও অনেক ছবিতে ওই একই মেয়ে আছে, যাকে বাড়ির কেউ চেনে না। শুধু ছবিতে যেন ধরা পড়ে গেছে।
তখনই পুলিস প্রথম সন্দেহ করে যে মেয়েটা এ অপহরণের সঙ্গে যুক্ত ছিল। হয়তো এ জন্যই ছেলেটার পিছু নিচ্ছিল। কিন্তু সেই মেয়েটাও রাতারাতি উধাও হয়ে যায়। বেশ কিছু দিন বাদে একটা বাচ্চা ছেলের কঙ্কাল পাওয়া যায়। লুসারনের থেকে প্রায় তিরিশ মাইল দূরের একটা নদীর ধারে।
মেয়েটাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। মনে করা হচ্ছিল যে মেয়েটা দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছে।
পুলিস যে অপরাধীকে বার করতে পেরেছিল তার পিছনে অনেকটাই 'কেন'-এর কৃতিত্ব ছিল। ওর এরকম একটা গল্প ছিল। যেখানে একটা মেয়ে এভাবে টাকার লোভে এক খুব সম্ভ্রান্ত পরিবার থেকে বাচ্চা কিডন্যাপ করবে। পরে ছবি থেকে সেই মেয়েটাকে সনাক্ত করা হবে। মেয়েটা স্বীকারও করবে। আমি সে গল্প পড়েছি। আমি প্রথমে সন্দেহ না করলেও ওই কথাটাও আমার মাথায় এসেছিল। মনে হয়েছিল 'কেন' ইচ্ছে করে মেয়েটার আড়ালে থেকে এরকম কিছু করেনি তো? ওই মেয়েটাকে এখনও খুজে পাওয়া যায়নি। তাকেও হয়ত মেরে ফেলা হয়েছে। 'কেন'-ই মেরেছে।
—কিন্তু কেন?
—এখানেই আসল প্রশ্ন। একটা কারণ খুব সহজে মনে হয় যে এরকম ঘটনা আগে লিখে ফেলার জন্য সে বই-এর প্রতি পাঠকদের আগ্রহ অনেক বেড়ে যাবে।
—ও মাই গড, তাই তো? গল্প সত্যি হয়ে গেলে আমরা সবাই পড়তে আরও বেশি আগ্রহী হয়ে উঠি।
অনিলিখাদি ফের বলে উঠল—তার বাইরেও একটা কারণ ছিল। 'কেন'-এর মনে হয়তো হয়েছিল যে উনি কম্পিউটার প্রোগ্রামের কাছে হেরে যাচ্ছেন। কেন স্বীকার না করলেও ওই প্রোগ্রামটা এতটাই শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল। একটা প্রোগ্রাম ওঁর থেকে অনেক ভালো ভালো গল্পের প্লট তৈরি করতে পারছে, আর ওঁকে প্রভাবিত করছে, সেটা উনি মেনে নিতে পারছিলেন না। শুধু যে ওঁকে প্রভাবিত করছিল তাই নয়, উনি ওঁর নিজস্ব প্লট—আইডিয়া হারিয়ে ফেলছিলেন।
তাই হয়তো চাইছিলেন তার উপরে আরেকটু পরিবর্তন এনে আরেকটা গল্প তৈরি করা, যেটা ঘটবে বাস্তবে। যাকে বলে খোদার উপরে খোদকারি। যেন এটা প্রমাণ করতে চাইছিলেন যে উনি প্রোগ্রামের থেকে আরও এগিয়ে আছেন। খানিকটা প্লট চুরির অপরাধবোধ কাটিয়ে ওঠার জন্যও হতে পারে। সে জন্যই আমার কথায় ওভাবে রেগে গিয়েছিলেন।
—শেষে 'কেন'—এর কি হল?
অনিলিখা একটুক্ষণ চুপ করে একটু জল খেয়ে বলে উঠল—বললাম যে ব্যাপারটা আন্ডার ইনভেস্টিগেশন।এখানে মনে করিয়ে দিই 'কেন' নামটা কিন্তু পুরোপুরি আমার কল্পিত। 'কেন' না হয়ে নামটা অন্য কিছুও হতে পারত।
—বলেই দাও না কে সে লোক? আমরা কি আর বলে বেড়াবো—সহেলী যেন একটু অভিমান করেই বলে উঠল।
—'কেন'-এর মতো দক্ষতা, ব্যাকগ্রাউন্ড কার আছে সেটা ভাবলেই আন্দাজ করতে পারবি।
তন্ময় মাতব্বরের মতো বলে উঠল কয়েকটা নাম।—আরনেস্ট ক্লিন, পিটার ওয়াটস, ডেনিস টেলর। কিন্তু ওঁরা তো মেসিল লার্নিং নিয়ে গবেষণা করছেন না!
—ব্যাস, তাহলে তো মিলল না।
পাশ থেকে সহেলী বলে উঠল—সে তো তুমিও হতে পার। 'কেন'—এর মতো তোমারও খুব ভালো কল্পবিজ্ঞানের গল্প লেখার ক্ষমতা আছে, আবার ওই মেসিন লার্নিং-এর মতো বিষয় নিয়ে তোমারও অনেক রিসার্চ আছে।
আমরা সবাই চমকে উঠে সহেলীর দিকে তাকিয়ে বলে উঠলাম
—মানে?
অনিলিখাদি কিছু বলল না। শুধু মুচকি হেসে উঠল। বলে উঠল
—হ্যাঁ, সেটাও অবশ্যই সম্ভব। তাছাড়া আমি ওই দুটো জায়গাতেই ছিলাম।
বিশ্বজিৎদা জল খাচ্ছিল। অনিলিখাদির কথায় বেজায় বিষম খেয়ে যা কাণ্ড করল সেটা নিয়ে আরেকটা গল্প অবশ্যই লেখা যেত।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%