শুধু একটা রাত

অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী



ভদ্রলোকের সঙ্গে প্রথম আলাপ
আমার নামটা কনফার্ম করার পরেই ফোনের উলটোদিকের ভদ্রলোক বলে উঠলেন—
—তুমি আমার থেকে বয়সে অনেক ছোট। তাই তুমি বলেই বলছি। একজনের কাছে শুনেছিলাম তুমি নাকি খুব ভালো ভয়ের গল্প লেখো। সেটা শুনে তোমার কয়েকটা বই জোগাড় করে পড়েও ফেললাম।খুব ভালো লাগল। তবে কিছু মনে করো না ভাই, তেমন ভয় পেলাম না।
আমি অবাক হলাম ফোনটা পেয়ে। ইংল্যান্ডের নাম্বার থেকে ফোন। গলা শুনে মনে হচ্ছে উলটোদিকে বেশ বয়স্ক একজন মানুষ। কথা বলার ধরনে শিক্ষার ছাপ। ধীরেসুস্থে কথাটা বললেন। বলার মধ্যে বিনয়ও আছে, আবার আত্মবিশ্বাসও আছে। উচ্চারণে সামান্য ইংরেজি টান। কিন্তু পরিষ্কার বাংলায় কথা বলছেন।
সবথেকে বড় কথা ইংল্যান্ডে থেকেও সাম্প্রতিককালের বাংলা গল্প পড়েন। আমার বাংলা গল্প পড়েছেন।
কিন্তু হঠাৎ করে এরকম ফোন! কিছু বলার আগেই ফের বলে উঠলেন—
—ভয় যদি সত্যি পেতে চাও, তাহলে একদিন আমার বাড়ি এসো। শুধু একটা রাত থাকতে হবে। রোজ যখন ঘুম ভাঙে, অবাক হই যে আরেকটা রাত কাটিয়ে এখনও বেঁচে আছি। ঘোর কাটতে বেশ কিছুক্ষণ কেটে যায়। ভয়ের গল্প ঠিক সেরকম হবে। সেই ভয়ের শিহরণ যেন বেশ কিছুক্ষণ পাঠকের সঙ্গে থেকে যায়। শেষ করার পরে বুকে হাত দিয়ে দেখতে হবে হার্টবিট ভয়ে থেমে গেছে কিনা! তা না হলে আর কী ভয়ের গল্প!
একটু থেমে ভদ্রলোক ফের বলে উঠেছিলেন—
এসো। যদি বেঁচে ফেরো, তবে তুমি সত্যিকারের ভয়ের গল্প লিখতে শিখবে। ভয়ের গল্প লেখার জন্য ভয়কে খুব কাছ থেকে দেখা দরকার। কেন? তা আগে বলব না। একটাই কথা শেষের তিন মাইল একটু শক্ত রাস্তা। আর সেখানে কোনও মানুষ থাকে না।
যেন 'মানুষ' এই শব্দটার উপরে একটু বেশ জোর দিয়েছিলেন। কেন সেটা এখন বেশ বুঝতে পারছি।
আমার সামনে এখন সেই শেষের তিন মাইল। জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে। দূরে গাছগাছালির মাথার উপর দিয়ে সে বাড়িটা দেখা যাচ্ছে। ঠিক যেরকম বলেছিলেন। কিন্তু একটু শক্ত পথ? এ তো সামনে সেরকম কোনও পথই নেই! শুধু জঙ্গল।
একটু খোঁজাখুঁজি করার পরে সেই পথ খুঁজে পেলাম।
একটা পায়ে হাঁটা সরু মাটির পথ জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে নীচের দিকে এগিয়ে গেছে। কিন্তু তার মধ্যে দিয়ে এতটা পথ এগোতে হবে? এ পথ কি আদৌ ওই বাড়ি অব্দি যাবে? আমি যেখানে দাঁড়িয়ে আছি সেটা বেশ উঁচু জায়গা। সমতল পাহাড়চূড়া বা হিলটপ। তাই চারদিকে বেশ দূর অব্দি দেখা যাচ্ছে।
এখান থেকে কিছু দূর অব্দি গাড়ির রাস্তা ছিল। গাড়িতে এসেছি। সেখান থেকে মিনিট তিনেক হেঁটে এই উঁচু জায়গাটায় এসেছি। এখান থেকে বাড়িটা খেয়াল করলে দূরে দেখা যাচ্ছে। চারদিকের সবুজের মধ্যে প্রায় একা মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে রাতের আকাশে শুকতারার মতো।
এবারে ভদ্রলোকের পরিচয় করাই। স্যার বীরেন ঘোষ। ফোন করার পরে খোঁজখবর নিয়েছিলাম। যেখান থেকে আমার ফোন নাম্বারও খোঁজ পেয়েছিলেন, সেটাও ভদ্রলোক বলেছিলেন। গতবছর ওয়েলসের 'লিটারেচার ফেস্টিভ্যাল'-এ লেখক হিসেবে ডাক পেয়েছিলাম অংশগ্রহণ করার। সেখান থেকেই বীরেনবাবু আমার খোঁজ পেয়েছিলেন।
বীরেনবাবু বিখ্যাত নৃতত্ত্ববিদ, বা অ্যানথ্রোপলজিস্ট ছিলেন। দীর্ঘদিন অক্সফোর্ডে পড়াতেন। ইংল্যান্ডে প্রায় ষাট বছর আছেন। এ বিষয়ের উপরে অনেক বইও লিখেছেন। তবে অবসর নেওয়ার পর থেকে সবকিছুর সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছেন। অ্যানথ্রোপলজির উপরে বেশ কিছু প্রামাণ্য বই ওঁর লেখা। বিখ্যাত প্রফেসার ছিলেন। কিন্তু এখন লোকচক্ষুর আড়ালে থাকতে পছন্দ করেন।
সেদিনের পরে আরও দুবার ফোনে কথা হয়েছে। খুব সদাশয় ভদ্রলোক। কথা বলতে বেশ লাগে। প্রাজ্ঞ মানুষ। বিভিন্ন বিষয়ে প্রচুর পড়াশোনা।
শুনলাম ক্লাস সেভেনে থাকতে এদেশে এসেছিলেন বাবার সঙ্গে ১৯৬০ সালে। সেদিক দিয়ে বয়স সত্তরের উপরে হবে। ওঁর মার ছিল বাংলা বই পড়ার নেশা। সে নেশা বীরেন বাবুর মধ্যেও সংক্রামিত হয়েছে। এখনও খুঁজে খুঁজে বিভিন্ন জায়গা থেকে বই নিয়ে আসেন। সে সূত্রে আমার বাংলা ও ইংরেজি দু ধরনের লেখার সঙ্গেই ওঁর যথেষ্ট পরিচিতি আছে।
আমি অবশ্য ওঁর মতো বেশিদিন এখানে নেই। ইংল্যান্ডে এসেছি বছর পাঁচেক। এখন এখানে থেকেই লেখা চালিয়ে যাচ্ছি। কর্মক্ষেত্রে অন্য বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত হলেও কয়েক বছর ধরে আমার লেখক হিসেবে বেশ নামডাক হয়েছে। এখানে ও সুদূর বাংলায়। বিশেষ করে ভয়ের গল্পের ক্ষেত্রে।
তা সে কথা যাক। বাড়ির সম্বন্ধে উনি অবশ্য বেশি কিছুই বলেন নি। কেন ওই কথাগুলো বলেছিলেন, কেন ভয় পাব, সে ব্যাপারেও কিছু বলতে চান নি। শুধু বলেছিলেন যে শেষ মাইল তিনেক হেঁটে যেতে হবে। আর কোথায় গাড়ি পার্কিং করতে হবে সে জায়গাটার ঠিকানা আর পোস্টকোড পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। ঠিক সেরকম নির্দেশমতোই এসেছি।
একটু অবাক হয়েছিলাম। এখানে থাকেন, অথচ গাড়ি ব্যবহার করেন না! শুনেছিলাম বেশ কয়েকবছর উনি বাড়ির কর্মচারীদের উপরেই নির্ভর করেন বাইরের জগতের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে। নিজে বেরোন না। কিছু ঘোড়া আছে। নিতান্ত যাওয়ার দরকার হলে, তাতে চড়েন। শুনেছি এখনকার সভ্যতার আর প্রযুক্তির থেকে সবরকম সম্ভাব্য দূরত্ব উনি রাখেন।
এসব শোনার পরে আর ওঁর অনুরোধে সাড়া না দিয়ে পারিনি। ওখানে গিয়ে ভয় পাওয়ার অভিজ্ঞতা না হোক, এখনকার দিনে এরকম এক ইন্টারেস্টিং ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ কে ছাড়ে!
সেই বাড়ির পথে
ওই পথে ঢোকার আগেই দেখলাম বন দপ্তরের সতর্কবার্তা। এখানে বিষাক্ত অ্যাডার সাপ আছে। সে থাকুক গে! আমার মতো ভারতের গ্রামবাংলায় যারা বড়ো হয়েছে,তারা অন্তত এসব সাপ-এ ভয় পায় না।
সে পথ দিয়ে এগোলাম। জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে কিছু লোকের নিশ্চয়ই যাতায়াত আছে। হয়ত ওঁর বাড়িতে যারা কাজ করে, তারাই এ পথে যাতায়াত করে। বেশকিছু জায়গায় জল-কাদায় মাটির রাস্তার অবস্থা বেশ খারাপ। আগস্ট-এর শেষ দিক। নীল ল্যাভেন্ডার, সানফ্লাওয়ারও আরও নানান ধরনের অচেনা জংলী ফুল। সারি দিয়ে হথহর্ন গাছ। সেখানে ছোট ছোট কুলের মতো অজস্র লাল বীজ হয়েছে।
পথে বেশ কয়েকটা ব্ল্যাকথরন গাছও পড়ল। সেখানে আবার থোকা থোকা নীল ব্লুবেরীর মতো বীজ হয়েছে। বেশ কিছু গাছে আপেল ও পিয়ারও হয়েছে।
কিছু গাছের পাতায় রঙের ছোঁয়া লাগতে শুরু করেছে। চেস্টনাট গাছগুলো লালচে হলুদ পাতায় সেজে উঠেছে।
এক মাইল জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে হাঁটার পরে একটা খোলা উপত্যকায় এসে পড়লাম। সেখানে উঁচুনিচু রাস্তা। ঘাসজমির মধ্যে দিয়ে। সে পথ দিয়ে এগোলাম আরও বেশ খানিকটা পথ। অ্যাডার সাপ-এর দেখা পেলাম না বটে, কিন্তু পথে কয়েকটা হরিণ, খরগোশ আর কাঠবেড়ালীর দেখা পেলাম।
প্রায় এক ঘণ্টা হাঁটার পরে বাড়িটার কাছাকাছি এলাম। বিকেল ছ'টা বাজে। এখনও যথেষ্ট আলো আছে। পুরো বাড়ির ধার দিয়ে পাথরের দেওয়াল। এরকম প্রাচীর আমি আগেও দেখেছি। অনেক পুরনো এলাকায় থাকে। পরপর শুধু সরু সরু পাথর সাজিয়ে তৈরি করা হয়। হাজার হাজার বছর ধরে এরকম দেওয়াল টিঁকে থাকে।
প্রাচীরের পাশ দিয়ে খানিকটা হেঁটে বাড়ির সামনের দিকে এলাম, যেখানে বাড়িতে ঢোকার বড় গেট। ভেজানো ছিল। ঠেলতে খুলে গেল।
বাগানের মধ্যে দিয়ে চওড়া নুড়ি বাঁধানো পথ। নুড়ি বাঁধানো পথ এসে একটা ঘাসের লনে শেষ হয়েছে। তারপরে বিশাল বাড়ি। ডানদিকে বাড়ির পাশে একটা প্যাডক আছে। সেখানে কয়েকটা ঘোড়া দাঁড়িয়ে আছে।
কিন্তু এরকম একটা সম্পূর্ণ জনবিচ্ছিন্ন জায়গায় এত বড় জায়গা জুড়ে শুধু একটাই কাঠের বাড়ি!
বাড়ির ছোট কাঠের দরজার দিকে এগিয়ে গেলাম। বাইরে কোনও কলিংবেল নেই। আশ্চর্য। ধাক্কা দেব কিনা ভাবছি, এমন সময় দরজা খুলে গেল। সামনে দাঁড়িয়ে আছেন রোগা ছোটখাটো চেহারার এক সৌম্যদর্শন ভদ্রলোক। স্যার বীরেন ঘোষ।
চোখে কালো ফ্রেমের চশমা। তার আড়ালে উজ্জ্বল চোখ। তীক্ষ্ন দৃষ্টি। কিন্তু একই সঙ্গে চোখে যেন কিরকম ক্লান্তির চিহ্ন। যেন ভালো করে ঘুম হয়নি। এক গাল কাঁচাপাকা দাড়ি। বয়স সত্তরের উপরে হলেও দেখেই বোঝা যায় বেশ সুস্থ।
এক গাল হেসে বাংলায় বলে উঠলেন—তুমি এতো কষ্ট করে এসেছো। খুব আনন্দ হচ্ছে তোমাকে দেখে। শুধু আমি নই। পুরো বাড়ি তোমার অপেক্ষায় বসে আছে।
কেন শেষের কথাটা বললেন সেটা অবশ্য আমি বুঝলাম না।

অবশেষে সেই বাড়িতে
আমি ওঁর পিছু পিছু ভেতরে ঢুকে এলাম। ঢোকার পরেই একটা বেশ বড় লবির মতো জায়গা। সেখানে একটা দেরাজ, একটা বড় প্রায় দেড় মানুষ হাইটের একটা গ্র্যান্ডফাদার ক্লক। সেখান থেকে চওড়া ওক কাঠের সিঁড়ি ওপরে উঠে গেছে। লবির মতো জায়গাটার পরে চওড়া প্যাসেজ। তার দু'দিকে ডাইনে বাঁয়ে ঘর।
আমরা ডানদিকের প্রথম ঘরে ঢুকলাম। বিশাল ঘর। নিচু ছাদ। ওপরে চওড়া চওড়া ওক কাঠের বীম। এ ঘরের বয়স দুশোর কম হলে অবাক হব। দূরে একটা বিশাল ফায়ার প্লেস। তাতে আগুন জ্বলছে। ঘরের দেওয়ালে বিভিন্ন কাঠের তাক করা। সেখানে ও ফায়ারপ্লেসের উপরে ছোটখাটো নানান জিনিস রাখা। সেসব মূর্তি, সেরকম ছবি আমি আগে কোথাও দেখিনি। অদ্ভুত দর্শন কিছু নারী-পুরুষের ছবি। তাদের কারুর নাক বেজায় লম্বা, কারো মাথায় টুপি। কারো আবার বিশাল লম্বা কান, কারো আবার ডানা আছে।
পায়ের নীচে পাথরের মেঝে। পাশে একটা বড় জানলা। রঙিন স্টেনড গ্লাসের, অনেক চার্চে যেমন থাকে।
আমাকে একটা সোফায় বসতে বলে নিজে ডান পাশের অন্য সোফায় বসলেন।
এদিক ওদিক তাকিয়ে কাউকে দেখতে না পেয়ে বলে উঠলাম—আপনার সঙ্গে এ বাড়িতে কে থাকেন?
—কেউ না। আমার দুজন কর্মচারী আছে। তারা সকালে এখানে চলে আসে। বিকেল পাঁচটা অব্দি থাকে। তারপরে চলে যায়। রাতে একাই থাকি।
—আপনার সন্ধ্যে বেলা-রাতে এখানে একা থাকতে ভয় লাগে না?
কোনও উত্তর না দিয়ে ভদ্রলোক বলে উঠলেন—তা আসতে কোনও অসুবিধে হয়নি তো? জঙ্গলের মধ্যে এমনি কোনও অসুবিধে নেই। ওই অ্যাডার সাপ কামড়ালে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিতে হয়, এই আর কি!
যেন ব্যাপারটা বেশ স্বাভাবিক এমনভাবেই বললেন।
সামনেই টেবিলে কফির পট রাখা। সেটা দেখিয়ে বলে উঠলেন
—কফি চলে তো?
সম্মতি জানাতে দুটো কাপে কফি ঢেলে একটা আমার দিকে এগিয়ে দিলেন। আমি আবার বলে উঠলাম—আপনি একা এরকম একটা জায়গায় থাকেন। কোনও অসুবিধে হয় না!
কফির কাপে চুমুক দিয়ে যেন একটু রহস্যজনকভাবে তাকালেন আমার দিকে।
তারপরে মৃদুস্বরে বলে উঠলেন—আসলে আমার চিরকালই ইচ্ছে ছিল এরকম খুব পুরনো কোনও ম্যানর হাউসে থাকার। সামর্থ্যে কুলোচ্ছিল না। ইংল্যান্ডের বেশিরভাগ এরকম ক্যারেকটার হাউসের বাড়ির দাম হয় কমপক্ষে দুই থেকে তিন মিলিয়ন পাউন্ড। ক্যারেকটার হাউস মানে বোঝো তো? এর অর্থ হল এমন একটা বাড়ি যে বাড়ি সেই জায়গার বা সেই সময়ের চরিত্রকে ধরে রেখেছে।
হঠাৎ করে এ বাড়িটা পেয়ে গেলাম জলের দরে। তখন আর লোভ সামলাতে পারলাম না। এমনিতে আমি অকৃতদার। সারাজীবন একা একা কাটিয়েছি। তবে কাটিয়েছি অক্সফোর্ডের মতো অপেক্ষাকৃত জনবহুল জায়গায়। এরকম নিরিবিলি জায়গায় থাকার ইচ্ছে ছিল। চলে এলাম।
—আপনি বলার পরে বুঝেছিলাম যে এ জায়গাটা লোকালয়ের বাইরে। কিন্তু এতটা নির্জন বুঝিনি। এখানে মনে হল না আর কোন বাড়ি আছে! এরকম জঙ্গলের মধ্যে হঠাৎ করে আলাদা একটা বাড়ি!
—আসলে এখানে মধ্যযুগে একটা গ্রাম ছিল। সে তেরশো সালের কথা। এই বাড়িটা সেই সময়ের। পরে বিশেষ কিছু কারণে এখানকার জনবসতি উঠে যায়। আশেপাশের সব কিছু জঙ্গলের আড়ালে চলে যায়। গ্রামের সব রাস্তাও আস্তে আস্তে গাছের দাপটে হারিয়ে যায়। এই যে তুমি এলে সেটাও সেরকমই একটা পথ ধরে। দূরে একটা চার্চের ধ্বংসাবশেষ দেখবে। এ গ্রামকে এখন শুধু মানুষ নয়, সময়ও যেন ভুলে গেছে।
দীর্ঘশ্বাস ফেললেন ভদ্রলোক।
খেয়াল করে দেখলাম আমার ফোনে নেটওয়ার্ক নেই। ওটার দিকে বারবার তাকাচ্ছি দেখে বীরেনবাবু হেসে বলে উঠলেন—ওসব জিনিস এখানে চলবে না। এখানে কোনও নেটওয়ার্ক নেই।
—সে কি? মানে? নেটওয়ার্ক নেই? এখনকার দিনে এরকম কোনও জায়গা থাকতে পারে! তাও ইংল্যান্ডে!
—এরকম জঙ্গলের মধ্যে কোথায় নেটওয়ার্ক! একদিক থেকে ভালো। কোনও উপদ্রব নেই। পড়াশোনার ক্ষতি করে। আমার একমাত্র সঙ্গী এখানে বই। আমার কর্মচারীরা আমার প্রয়োজনমতো বই নিয়ে আসে। পড়ি।
বলে একটু থেমে কিছু দূরে একটা কাঠের স্ট্যান্ডের ওপরে রাখা একটা আদ্যিকালের টেলিফোনের দিকে আঙুল তুলে বলে উঠলেন—বুঝলে, ওটাই হল আমার আর বাইরের মনুষ্যজগতের মধ্যে একমাত্র যোগাযোগের মাধ্যম। তাও মাঝেমধ্যে ঝড়জল হলে ওটা বিগড়ে বোবা হয়ে যায়।
—কিন্তু এখানে গ্রাম ছিল বলছিলেন না? সেটা হারিয়ে গেল কেন? এখানে এখন আর কোনও জনবসতি নেই কেন?
—বলছি। 'ট্রুথ ইজ স্ট্রেঞ্জার দ্যান ফিকশন'—মার্ক টোয়েন বলেছিলেন। এখানে সেরকমই ঘটনা। তবে তার আগে তোমাকে তোমার ঘর দেখিয়ে দিই। একটু রেস্ট নিয়ে নাও। তারপরে আরামসে আড্ডা মারা যাবে। আমি একটু তাড়াতাড়ি ডিনার করি। সাড়ে সাতটা নাগাদ ডিনার করলে তোমার কোন অসুবিধে নেই তো?
—না, না। একদম ঠিক আছে। আমিও রাতে একটু তাড়াতাড়ি খেয়ে নিই।
—বাহ। তবে চলো। তোমাকে তোমার ঘর একটু দেখিয়ে দিই।
—আপনি আবার আমার সঙ্গে যাবেন কেন? আপনি বলে দিলেই আমি দেখে নিচ্ছি।
—আরে না-না, সারাদিন এভাবে হাঁটাচলা করেই তো নিজেকে সুস্থ রেখেছি। তাছাড়া তুমি হলে আমার অতিথি। প্রথম এ বাড়িতে এসেছ।
আর আপত্তি করলাম না। আমাকে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠলেন। আমার ঘর দেখিয়ে বাড়ির কোথায় কী আছে সংক্ষেপে জানিয়ে আবার চলে গেলেন।
আমার শোওয়ার ঘরটা দোতলায় বাড়ির সামনের দিকে। বেশ বড় ঘর। এক দিকের দেওয়াল জুড়ে বড় কাচের জানলা। ঘরে একটা দেওয়াল-আলমারি, একটা বড় হাতলওয়ালা চেয়ার, একটা দেরাজ আর একটা পুরনো দিনের ডিজাইনের কাঠের কারুকাজ করা খাট। ঘর বেশ পরিপাটি করে সাজানো। পায়ের নীচে পুরু সাদা কার্পেট। মাথার উপরে এ ঘরেও মোটা ওক কাঠের বীমের ভরসা।
জানলা দিয়ে উঁকি মারলাম। সামনের দিকের ঘাসের লন, নুড়িপথ দেখা যাচ্ছে। তারপরে এ বাড়ি ঘিরে পাহারাদারের মতো দাঁড়িয়ে আছে পাইন, সিলভার বারচ, ওক, চেস্টনাট, উইলো, এলম, ম্যাপল গাছের সারি। যদ্দূর দেখা যায় শুধু গাছের মাথা। বহু দূরে আবছা পাহাড় দেখা যাচ্ছে। সে পাহাড়ের ঢেউ যেন নিস্পন্দ, নিস্তব্ধ, রহস্যময়।
এরকম জায়গায় ভদ্রলোক একা রাতে থাকেন কি করে জানি না! খুব সাহসী লোক না হলে এখানে এক রাতও থাকা সত্যি সম্ভব নয়।
তবে তার জন্যে আমার আদর আপ্যায়নের কোনও খামতি নেই। আমার ঘরে টেবিলের উপরে আপেল, কিউই, চেরী সাজিয়ে রাখা আছে। আগে থেকেই এসব ব্যবস্থা করে রেখেছেন। বাথরুমে গিয়েও দেখলাম ভদ্রলোক ছোটখাটো সব ব্যাপার আগে থেকেই ভেবে গুছিয়ে রেখেছেন।
জামাকাপড় পরিবর্তন করে, বিশ্রাম নিয়ে, এক ঘণ্টা বাদে নীচে ড্রয়িংরুমে ফিরে এলাম।
বীরেনবাবুর সঙ্গে আড্ডা
বীরেনবাবু আমার জন্যে অপেক্ষা করছিলেন। নামতেই বললেন—চলো সবার আগে ডিনার করে নিই। তারপরে গল্প করা যাবে।
ডিনার করার আগে আমাকে বাড়ির একতলার ঘরগুলো ঘুরিয়ে দেখিয়ে দিলেন। আগে খেয়াল করি নি। বাড়ির পিছন দিকে কিছুটা দূরে একটা চ্যাপেলও আছে। বাড়ির থেকে বাগানের মধ্যে দিয়ে একটা পাথরের রাস্তা চ্যাপেলের দিকে এগিয়ে গেছে। আমাকে ওই চ্যাপেলে নিয়ে গেলেন উনি। চ্যাপেলের ছাদ খুব উঁচু। প্রায় দোতলার বাড়ির মতো উঁচু ছাদ। ওক বীম-এর উপরে ছাদ দাঁড়িয়ে আছে। একটা দিকে অনেকটা জায়গা জুড়ে বিশাল রঙিন কাচের জানলা। কিছু ভাঙাচোরা জিনিস ঘরে এদিক ওদিক ছড়িয়ে রাখা আছে। দেখেই বোঝা যায় এই চ্যাপেল এখন আর কোনও ভাবে ব্যবহৃত হয় না।
উনি বলে উঠলেন—আমার মনে হয় একটা সময়ে এই পরিবার গ্রামের চার্চে যেতে পারত না। তখন এই প্রাইভেট চ্যাপেল বানিয়েছিল। এখানেই হয়তো তারা প্রার্থনা করত।
—কেন এ পরিবার চার্চে যেতে পারত না?
—কিছু ঘটনা ঘটেছিল সে সময়ে। ডিনারের পরে সেসব কথা বলছি।
আবার বাড়িতে ফিরে এলাম। এবারে উনি আমাকে পড়ার ঘরে নিয়ে গেলেন। ওঁর পড়ার ঘরটা অনেক লাইব্রেরীকে হার মানাবে। বাড়ির মধ্যে সবথেকে বড় ঘর। এই ঘরে আলো বেশি ঢোকে না। ঘরের বাতাসে যেন পুরনো বই এর গন্ধ মিশে আছে। সার দিয়ে দু সারি চওড়া চওড়া বুক কেস। অনেক বই বেশ পুরনো।
১৮৫০ সাল থেকে সংগৃহীত বিভিন্ন নিউজপেপার, ইকনমিস্ট এর মতো ম্যাগাজিন বই হিসেবে বাঁধিয়ে সার দিয়ে রাখা আছে। দেখার মতো কালেকশান।
আমাকে বলে উঠলেন—সব বই আমার নয়। আমি যার কাছ থেকে কিনেছিলাম, তারা এখানে প্রায় পাঁচশ বছর ধরে ছিল। বাড়ির সঙ্গে তাদের সব বইও পেয়েছিলাম। ওরা আর নিয়ে যেতে চায় নি।
আমি বইগুলো কাছ থেকে গিয়ে দেখলাম। প্রচুর দুষ্প্রাপ্য বই আছে এখানে। কিছু লাল শালুতে মোড়া। বেশ কিছু বই চামড়া দিয়ে বাঁধানো। বুঝতে পারছিলাম এর আগে যারা এখানে ছিল, তাদেরও বই-এর শখ ছিল খুব। এরকম কালেকশন চট করে হয় না।
একটা চামড়ায় বাঁধা খুব পুরনো বই চোখে পড়ল—'বুক অফ ডেমোনোলজি' কিং সিক্সথ জেমস-এর লেখা।
হাতে নিয়ে পাতা ওলটাচ্ছি দেখে বীরেনবাবু পাশ থেকে বলে উঠলেন—এখানে এলে আর এসব বই-এর দরকার পড়ে না। তবে এটা খুব রেয়ার মহা মূল্যবান একটা বই। আমি যদ্দূর জানি এর বাইরে ঠিক আর চারটে বই আছে। তার মধ্যে কোনটাই প্রাইভেট কালেকশনে নেই। সবই ইউনিভারসিটির লাইব্রেরীতে। এটা স্কটল্যান্ডের রাজা সিক্সথ জেমস যাকে আমরা ইংল্যান্ডের রাজা প্রথম জেমস বলে চিনি, তার লেখা। ১৫৯৯ সালে লেখা। এর আরও দুখণ্ড আছে। এখানেই আছে। শয়তান, ডাইনি, নেকড়ে মানুষ—এসব ব্যাপারে কী করা উচিত তা নিয়ে লেখা।
—কী অবস্থা! সে সময়ের রাজা এসব বিষয়ের উপরে লিখছেন।
—তার মানে ভাবো তখন সাধারণ মানুষের মনে এসবের উপরে কতটা বিশ্বাস ছিল! তাই রাজ্য শাসনের সঙ্গে সঙ্গে এসব বিষয় নিয়ে জ্ঞান না থাকলে সে রাজার দক্ষতা নিয়ে হয়তো প্রশ্ন উঠত। শেক্সপিয়ারের ম্যাকবেথও কিন্তু এই বই-এর দ্বারা প্রভাবিত।
একটু থেমে ফের বলে উঠলেন—তবে এখানে থাকলে এসব বই লাগবে না। এক রাতে অনেক বেশি জেনে যাবে।
আমি অবাক হয়ে বই থেকে মুখ সরিয়ে ওঁর দিকে তাকালাম। দেখলাম মুখে সেই রহস্যময় হাসি। চশমার উপর দিয়ে সেই দৃষ্টি।
ওই ঘর থেকে বেরিয়ে এসে আরেকটা ঘরে ঢুকলাম। তারপরে আরেকটা ঘরে। টি রুম। কার্ড রুম। কীচেন। ডাইনিং। একটা শোয়ার ঘর। একটা বড় কনজারভেটরি। রুমের পরে রুম। শুধু কোথাও কোনও লোক নেই।
রান্না রেডী ছিল। দুজনে মাইক্রোওয়েভে গরম করে নিলাম। দেখলাম বীরেনবাবু এখনও ভারতীয় খাবারই খান। তবে সেরকম এলাহি কিছু আয়োজন নয়। ভাত, ডাল, ফুলকপির তরকারি, চিকেনকারি, স্যালাড।
খাওয়ার পরে আমরা বাইরে বাগানে এসে বসলাম। রাত এখন প্রায় সাড়ে আটটা। মেঘের আড়াল থেকে উঁকি মারছে ভারী সুন্দর সোনালি আলো। সেই আলো গাছগুলোর ওপরের দিকের ডালপালায় ছড়িয়ে পড়েছে। ঘরফেরা পাখিদের ডাকে চারপাশ যেন একটু চঞ্চল হয়ে উঠছে। কিন্তু তার বাইরে কোনও শব্দ নেই। মনে হচ্ছে ওরা যে মুহূর্তে ওদের ডাক থামাবে এ বাড়ি যেন ফের ফিরে যাবে মধ্যযুগীয় নীরবতায়।
—এদিকটা এমনিতে দিনের বেলা খুব নির্জন। রাতের দিকে জমজমাট।—কীরকম যেন হঠাৎ করে বলে উঠলেন বীরেন বাবু। জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে ফের বলে উঠলেন—এখানে আমার নিকটতম প্রতিবেশীরা সবাই মাটির নীচে থাকে। চারদিকে ঘন জঙ্গল থাকায় মাঝেমধ্যে ফেন্সের আর পাথরের পাঁচিলের ফাঁক দিয়ে হরিণ, শেয়াল, খরগোশ এসে ঢোকে। হয়তো আরও অজানা কিছু প্রাণী এসে ঢোকে। তবে বাড়ির মধ্যে ঢোকে না।
আমার দিকে এবারে গভীরভাবে তাকালেন ভদ্রলোক। বুঝতে পারছি উনি আমাকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করছেন। ভৌতিক গল্পলেখকরা কল্পনাপ্রবণ হতে পারে, কিন্তু তাদের হার্ট যথেষ্ট মজবুত হয়। তাই আমাকে ভয় পাওয়ানো অত সহজ হবে না।
উলটে আমি প্রশ্ন করে উঠলাম—আপনার ভয় লাগে না? বিশেষ করে সন্ধের পরে? কাছাকাছি কোনও লোকজন নেই। চুরি ডাকাতি হয় না এদিকে?
হেসে উঠলেন।—চুরি, ডাকাতি? এ এলাকায় রাতের পরে আসার মতো বুকের পাটা কারুর নেই। এখানে এখন কিছু নেই। কিন্তু যারা ছিল, তারা কেউ ছেড়ে যায়নি।
বুঝতে পাচ্ছিলাম। উনি আমাকে আরও উস্কে দিচ্ছেন। যাতে প্রশ্ন করে জানার চেষ্টা করি। কিন্তু তার থেকেও বড় একটা প্রশ্ন মাথায় ঘুরছিল। এখানে এতটা জায়গা জুড়ে জঙ্গল গ্রাস করেছে একটা পুরনো দিনের পরিত্যক্ত গ্রামকে।
কারুর সে গ্রামকে পুনরুদ্ধারের আগ্রহ নেই! বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এ সব জায়গা আবার করে গড়ে তোলা হয়। ইতিহাসকে এত সহজে হারিয়ে যেতে দেওয়া হয় না। বিশেষ করে ইংল্যান্ডে। কিন্তু এর বেলায় ব্যতিক্রম কেন?
জিজ্ঞেস করে উঠলাম—আচ্ছা, এখানে যে গ্রাম ছিল, তা উঠে গেল কী করে?
—শুধু গ্রাম নয়, বলা যায় ১৩০০ সাল নাগাদ এটা ছিল এক ব্যস্ত জনপদ। বিউবোনিক প্লেগের কথা শুনেছ তো? যাকে ব্ল্যাক ডেথও বলা হয়।
—হ্যাঁ, ইংল্যান্ডের কিছু জায়গায় হয়েছিল শুনেছি। ১৩৫০ সাল নাগাদ।
—ঠিক বলেছ। একদম ঠিকভাবে বলতে গেলে এসেছিল ১৩৪৮ সালের মাঝামাঝি। এখানেও সে মড়ক লেগেছিল। শুনেছি প্লেগে এত লোক মারা যায় এ গ্রামে যে ১৩৫০ সালের পরে সামান্য কিছু পরিবার বেঁচেছিল। তখন থেকেই আস্তে আস্তে এ এলাকা বিস্মৃতি আর জঙ্গলের আড়ালে চলে যায়। হয়ত সত্যি কারো শাপ লেগেছিল।
—কার শাপ? আপনি এসব বিশ্বাস করেন?
—না, আমার মধ্যে কোনও কুসংস্কার নেই। অন্তত এখানে আসার আগে ছিল না। তবে এখন জানি না কেন মনে হয়, হতেও পারে! সব রহস্য বিজ্ঞান কোনওদিন সমাধান করতে পারবে না। পরে বলছি। রাত এখনও অনেক বাকি।
—কিন্তু আপনি এসব কী করে জানলেন?
—কিছুটা শোনা কথা, কিছুটা লাইব্রেরীর আর আমার বাড়ির বই পড়ে। কিছুটা পুরনো ঐতিহাসিকদের সঙ্গে কথা বলে।
বীরেনবাবু এবারে প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে আমার লেখালেখি নিয়ে আলোচনা শুরু করলেন। বাংলা সাহিত্যে এখন কীরকম লেখা হচ্ছে, আগেকার লেখকদের সঙ্গে এখনকার লেখার ধারায় কোথায় তফাত-ইত্যাদি নানান প্রসঙ্গ।
বুঝলাম ভদ্রলোক এখানে থাকলেও বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে গভীর যোগাযোগ ধরে রেখেছেন। একই সঙ্গে সাংঘাতিক স্মৃতিশক্তি। বিভূতিভূষণের 'অশনি সঙ্কেত' এর মতো উপন্যাসেরও সব চরিত্রের নাম মনে রেখে দিয়েছেন।
আড্ডা বেশ জমে উঠেছে, এরকম সময়ে উনি হঠাৎ বলে উঠলেন—
চলো রাত প্রায় ন'টা হয়ে এল। আর বাইরে থাকা ঠিক হবে না।
—হ্যাঁ, এখনই ঠান্ডা ঠান্ডা লাগছে। সেপ্টেম্বর শুরু হল না। এখনই ঠান্ডা পড়ে গেছে।
উনি চশমার উপর দিয়ে তাকিয়ে ফের সেই রহস্যময়ভাবে তাকিয়ে হেসে বললেন—আমি কিন্তু তার জন্য বলিনি। বলেছি না, এ জায়গাটা বিশেষ সুবিধের নয়!
এতক্ষণ গল্পে মেতে থাকায় খেয়াল করিনি। সত্যি চারদিক যেন হঠাৎ করে কিরকম নিস্তব্ধ হয়ে গেছে। দিনের আলো মলিন হয়ে এসেছে। সবাই যেন একটা ঝড়ের অপেক্ষায় আছে। আশপাশ থেকে ফুলের মিষ্টি গন্ধ ভেসে আসছে। সঙ্গে একটা বুনো গন্ধ। মনে হয় কাছেপিঠে হরিণ বা শেয়াল আছে।
অন্ধকার হয়ে এলেও টের পেলাম যে মাথার উপরে মেঘশূন্য নীল আকাশ আর নেই। কালো মেঘের ভিড় বাড়ছে। এ বাতাস যেন শুধু ঠান্ডা নয়, কিরকম যেন শিরশিরানি মিশে আছে এ বাতাসে। হঠাৎ করে চারপাশের গাছগাছালি যেন ছায়ার আড়ালে নিজেদের লুকিয়ে ফেলেছে। যেন অস্তিত্বহীন এক গ্রাম, এক জঙ্গল পড়ে আছে চোখের সামনে। শুধু কাদের ফিসফিসানি শোনা যাচ্ছে তিরতির করে কাঁপতে থাকা গাছের পাতায়।
আমি ওঁর সঙ্গে পিছু পিছু এগোলাম। ঢুকতে গিয়ে দেখি বাড়ির বাইরের দেওয়ালে একটা লাল ক্রস এর চিহ্ন। এটা আগে চোখে পড়েনি। অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম।
সামনে থেকে বীরেনবাবুর তাড়া এল।
—দেরী করো না। ন'টা বাজতে চলেছে। এরপরেই ঝপ করে অন্ধকার হয়ে যাবে।

রাত ন'টার পরে
আমরা এবারে ভেতরে এসে টিরুমে বসলাম। এই ঘরটার দু দিকে জানলা। বাইরের বাগান এখান থেকে বেশ ভালো দেখা যায়। এ ঘরেও ফায়ার প্লেস আছে। কাঠের আগুন থেকে উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ছে ঘরে।
বাইরে বাগানে আলো জ্বলে উঠেছে। তবে তাতে আলোর থেকে ছায়াই হয়েছে বেশি।
বীরেনবাবু এবারে ঘরের আলো জ্বেলে দিলেন। শুধু তাই নয়, টেবিলের উপরে রাখা একটা খুব সুন্দর কাচের মোমদানিতে মোমবাতি জ্বেলে দিলেন।
ঘরে আরও দুটো মোমবাতির আলো জ্বেলে বলে উঠলেন—এখানে আরেকটা সমস্যা হঠাৎ করে যেকোনো সময় বিদ্যুৎ চলে যায়। তুমি এখানে বসো। আমি বাড়ির আলোগুলো জ্বালিয়ে দিয়ে আসি। হুশ করে যখন আলো নিভে যাবে, তখন আর আলো জ্বালানোর সময় থাকবে না।
উনি ব্যস্ত হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
সত্যি এটা ভেবে দেখি নি, বাড়ির সব ঘরে এত সুন্দর সুন্দর মোমদানি রাখা কেন! ইংল্যান্ডে অবশ্য লোডশেডিং হতে বিশেষ দেখি নি। তবে এরকম প্রত্যন্ত জায়গায় কি হয়, সেটা জানা নেই। এমারজেন্সি লাইট থাকতে পারত। কিন্তু ভদ্রলোক যেন সেই মধ্যযুগের পরিবেশকেই ধরে রাখতে চেয়েছেন।
অবশ্য সেটা খানিকটা স্বাভাবিকও বটে। এরকম পরিবেশ ভালো না লাগলে উনি তো আর এখানে থাকতে পারতেন না।
এই ঘরটা খেয়াল করে দেখলাম। বেশ বড় ঘর। কিন্তু সে তুলনায় আসবাব কম। ঘরের মাঝে একটা ছোট গোলটেবিল। সেই টেবিলের দুদিকে দুটো বিশাল পুরনো দিনের ডিজাইনের দামি লেদার সোফা, যার একটাতে আমি বসে আছি।
ঘরের দেওয়ালের রং বেশ লাল। একটা জানলার সামনে কারুকার্য করা টেবিল। সেটাতেই মনে হয় বীরেনবাবু পড়াশোনার কাজ করেন। বেশ কিছু বই তার উপরে রাখা। আগের ঘরের মতো এ ঘরেও নানান অদ্ভুত জিনিস নানান জায়গায় রাখা আছে।
ঘরের কোণের দিকে রাখা একটা সুদৃশ্য কারুকার্য করা কাঠের বড় টেবিল আছে। তার উপরে নানান ধরনের জিনিস রাখা আছে। তার মধ্যে অন্য ধরনের দেখতে একটা কাঠের বোতলও আছে। কাছে গিয়ে দেখলাম। দেখতে অনেকটা ছোট কুঁজোর মতো। ফাঁকা নয়। ভেতরে কিছু একটা তরল জাতীয় জিনিস আছে। বিদঘুটে গন্ধ। মনে হল সেই বোতলের মধ্যে ভারী পেরেক জাতীয় ধাতব জিনিস আছে। নাড়াতে ঠকঠক করে আওয়াজ হল। এরকম একটা তরল রাখার জন্য এত ভালো একটা কারুকার্য করা কাঠের পাত্র!
—আরে করেছ কী? সাবধানে রেখে দাও। পরে বলছি।
চমকে উঠে দেখি বীরেনবাবু ঘরে ঢুকেছেন। গলার স্বরে উদ্বেগ। বলতেই হবে বয়সের তুলনায় অত্যন্ত সুস্থ। এত হাঁটাচলা করেন। কোনও ক্লান্তি নেই।
—কিন্তু এটা কী?
—এটা হল ডাইনী বোতল। উইচ বটল।
—মানে?
—এটা হল ডাইনী আটকে রাখার একটা উপায়। মধ্যযুগীয় অ্যান্টি উইচক্রাফটের একটা পদ্ধতি। অর্থাৎ ডাইনী তাড়ানোর উপায়। এটা আমি এ ঘরের ফায়ার প্লেসের নীচে একটা লুকনো চেম্বারে খুঁজে পাই। খুব সাবধানে রাখা ছিল। তোমাকে দেখানোর জন্যে বার করে এখানে রেখেছি।
—কিন্তু ফাঁকা নেই তো? কি রেখেছেন এখানে?
হেসে বললেন,—পেরেক আছে। তরলটার কথা পরে বলছি। বুঝলে এটা হল ডাইনী আটকে রাখার উপায় যাতে বাড়িতে ভয়ে ডাইনী না ঢোকে। ঢুকলে বিপদে পড়ে যাবে।
—আপনি এসবে বিশ্বাস করেন?
—না করে উপায় কি! তুমিও আজ রাতের পরে বিশ্বাস করবে। দাঁড়াও, আরও কিছু জিনিস দেখাই।
বলে টেবিলের উপর থেকে একটা অদ্ভুত দর্শন জিনিস তুলে নিয়ে বলে উঠলেন—এটা কী বলতে পারো?
এক ফুট লম্বা একটা মানুষের হাত না থাকলে যেরকম চেহারা হয় সেরকম। কিন্তু মনে হয় কোনও গাছের শিকড়। বীরেনবাবুর হাতে যেটা আছে, তার মতো আরও কয়েকটা আছে এই টেবিলে। বিভিন্ন অদ্ভুত সব শেপের।
হাতে নিয়ে দেখলাম। দেখলেই কীরকম যেন অস্বস্তি লাগে। একটা দেখে মনে হচ্ছে যেন কোনও লোকের হাতের পাঁচটা আঙুল। হাতটা নীচের দিকে করে রাখা, তিনটে আঙুল ভাঁজ করা। তর্জনী কিছুর দিকে নির্দেশ করছে। একটা দেখে মনে হচ্ছে যেন বিশাল হাঁ করা একটা মুখ কিছু গিলতে চাইছে। একটা যেন মাথা কাটা মানুষ। হাত পা সব আছে। শুধু ধড়ের উপরে মাথা নেই। আরও বেশ কয়েকটা। একটা কথা স্বীকার করতেই হবে যে এই চেহারাগুলো এই আধো-অন্ধকারে বেশ ভীতিপ্রদ।
—কোনো গাছের শিকড়?
—ঠিক বলেছো। এগুলো হল ম্যান্ড্রেক গাছের শিকড়।
বলে উঠলাম।—আপনি কি এগুলো সংগ্রহ করেন?
—হ্যাঁ। বেশ কয়েকটা এ বাড়িতে আগে থেকে ছিল। সেগুলো দেখে আগ্রহ বাড়ে। তারপরে আরও কিছু সংগ্রহ করেছি 'স্টাও অন দ্য ওয়ালডে'র একটা অকশন হাউস থেকে। হাতে ধরলেই বেশ একটা শিরশিরানির ব্যাপার হয়। এক সময়ের উইচ ক্রাফটে-এর অনেক ব্যবহার ছিল। এগুলোর প্রত্যেকটাই অবশ্য বেশ পুরনো। ঐতিহাসিক মূল্য যথেষ্ট।
আমরা ফের সোফায় এসে বসলাম। এবারে আমাদের আলোচনার টপিক হল এখানকার প্রবাসী বাঙালি। বীরেনবাবুর ছোটবেলার কথা। বাংলাদেশে কাটানো সেসব অস্পষ্ট স্মৃতিকথা।
উনি ক্লাস ফোর অব্দি বাংলাদেশে পড়েছিলেন। বলছিলেন কীভাবে দাদুর প্রভাব পড়েছিল ওঁর উপরে। দাদুর কাছে উপকথার গল্প শুনে শুনে উনি বিভিন্ন দেশের, বিভিন্ন জাতির মানুষের আচার-ব্যবহার সম্বন্ধে জানতে আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন। তার থেকেই পরে এসব বিষয় নিয়ে পড়াশোনার আগ্রহ গড়ে ওঠে।
হঠাৎ এর মধ্যে ঘরের আলো নিভে গেল। ঘাসের লনে লাগানো বাইরের আলোও সব একসঙ্গে নিভে গেলো। কারেন্ট চলে গেছে। মোমবাতির আলো আছে বলে বাঁচোয়া। না হলে ঘরের মধ্যেও কিছু দেখা যেত না।
বীরেনবাবু হেসে বলে উঠলেন—কী সীট বেল্ট পরা আছে তো? এভাবেই ঝড় শুরু হয়। মাঝেমধ্যে এরকম সময়ে আলো চলে যায়। আগে ন্যাশনাল গ্রিডকে ফোন করে কমপ্লেন করতাম। এখন আর জানাই না। মনে হয় ওদেরও আয়ত্বের বাইরে। হয়তো এখানে আলো না থাকাই উচিত। যে অন্ধকার যুগ শুরু হয়েছিল সাতশো বছর আগে, সেই অন্ধকার এখনও এখান থেকে কাটেনি।
একটু থেমে ফের বলে উঠলেন—আমি প্রথমে এ বাড়ি কেন এত কম দামে পেয়েছিলাম, সেটা বুঝিনি। পরে বুঝেছিলাম।

এ বাড়ির অভিশপ্ত ইতিহাস
মোমবাতি জ্বলছিল। দেখলাম বীরেনবাবুর চোখের মণি যেন সে আলোয় জ্বলজ্বল করে উঠল।
ভদ্রলোক যেন কিছু একটা ভাবলেন।
তারপর একটু দ্বিধা নিয়ে আস্তে আস্তে বলতে শুরু করলেন—এই বাড়ির এক ইতিহাস আছে। অভিশপ্ত ইতিহাস। আমি নিজে আগে অবশ্য জানতাম না। ব্রিস্টল, অক্সফোর্ড ও লন্ডনের ব্রিটিশ লাইব্রেরীর থেকে মধ্যযুগীয় কিছু বই পড়ে ও তারপরে এখানকার বিভিন্ন ঘটনাস্থলে ঘুরে কি হয়েছিল তার একটা আন্দাজ করতে পেরেছি। ইতিহাসে অনেক কিছুই লেখা হয় না। ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা মানুষগুলোর বিপক্ষে যায়, এমন ঘটনা ইতিহাসে লেখা থাকে না। ইতিহাস সবসময় ক্ষমতাশালীদের পছন্দমতো কথা বলে।
কিছু দূরে জঙ্গলের মধ্যে এক চার্চ আছে। এখন অবশ্য ঘন জঙ্গলের মধ্যে তার শুধু ধবংসাবশেষ পড়ে আছে। শুধু তার অল্টারটা এখনও খানিকটা টিঁকে আছে। তার পিছনের ভেঙে যাওয়া পাথরের দেওয়ালে পেয়েছিলাম এই ক্লার্ক পরিবারের কয়েকজনের নাম। খোদাই করে লেখা ছিল। সহজে পড়া যাচ্ছিল না। তার উপরে অক্ষরগুলো আবার উলটো সিকোয়েন্সে লেখা। তার নীচে যেন একফোঁটা চোখের জলের ছবি। তার মাঝবরাবর এক লম্বালম্বি লাইন।
-তার মানে? নাম না হয় চার্চে লেখা থাকতে পারে। হয়তো ক্লার্ক পরিবারের বড় কোনও অবদান ছিল। কিন্তু ওরকমভাবে লেখা কেন?
—ইংল্যান্ডে মধ্যযুগে ওই সিম্বলের অর্থ ছিল অভিশাপ। অর্থাৎ কেউ এই ফ্যামিলির উপরে এতটাই চটে ছিল, যে এদের শাপশাপান্ত করতেও ছাড়েনি।
—সে কি! চার্চে এরকম লেখা থাকত! নিশ্চয়ই চার্চেরই কেউ তাহলে এর সঙ্গে যুক্ত ছিল। তাই না?
—ঠিক বলেছ। চার্চের অনুমতি না থাকলে এরকম অভিশাপ চার্চের দেওয়ালে লেখা থাকত না। আমাকে অবশ্য ওটা খুঁজে বার করতে অনেক কষ্ট করতে হয়েছিল। আমার কাজই তো এসব নিয়ে। তাই আগ্রহ আরও বেড়ে গিয়েছিল এই পরিবারের সম্বন্ধে জানার, খবর সংগ্রহ করার।
—তা আপনি কী সেই ক্লার্ক পরিবারের কারুর কাছ থেকে এ বাড়ি কিনেছিলেন?
—তা জানি না। আমি যার কাছ থেকে কিনেছিলাম, তাদের পরিবারের পদবী ছিল মিলার। তবে ১৫৩৮ সালের আগে ইংল্যান্ডে পদবী কিন্তু বংশপরম্পরায় সন্তানরা পেতো না। বরঞ্চ সে কি কাজ করত, তাই বোঝাতো। যেমন শিক্ষক বা পাদ্রী বা কোনও স্কলারের পদবী হত ক্লার্ক। পদবীর থেকে সে লোকটার কাজের পরিচয় পাওয়া যেত।
—তাই নাকি? এটা তো জানা ছিল না।
—হ্যাঁ, এর পিছনে একটা ছোট ইতিহাস আছে। ইংল্যান্ডে ১০৬৬ সালে নরমান আক্রমণের পর থেকে জনসংখ্যা হঠাৎ করে খুব বেড়ে যায়। একই সঙ্গে বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের মধ্যে যোগাযোগ অনেক বেড়ে যায়। যার জন্য নামের সঙ্গে সঙ্গে লোকের কাজের পরিচয় জানার প্রয়োজন দেখা দেয়। এভাবে ক্লার্ক পরিবারের কোনও ছেলে মিল বা ফ্যাক্টরিতে কাজ করলে, তার নাম মিলার হয়ে যেতে পারে। তাই জানি না আমি যাদের কাছ থেকে কিনি, তারা একই পরিবারের কিনা। তবে আমার আরও কিছু লেখা পড়ে মনে হয়েছিল যে এই পরিবারের সঙ্গে গ্রামের কিছু প্রভাবশালী লোকেদের, বিশেষ করে চার্চের সম্পর্ক ভালো ছিল না। বলা যায় চার্চ এ পরিবারের বিরুদ্ধে ক্ষেপে উঠেছিল।
—কেন? হঠাৎ করে এরকম হওয়ার কারণ?
—এর কারণ পিটার ক্লার্ক ছিল খুব সাহসী ও পণ্ডিত মানুষ। ক্যাথোলিক ধর্মের কিছু গোড়ামিতে ওর আপত্তি ছিল। চার্চ যেভাবে সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছিল, তার বিরুদ্ধেও কথা বলেছিল। অন্য দিকে ক্লার্ক ফ্যামিলি যথেষ্ট অর্থবান হওয়ার জন্য ওদের বিরুদ্ধে সবার কিছুটা ঈর্ষাও ছিল। সে জন্যই হয়তো এরকম অভিশাপ দেওয়া হয়েছিল যাতে ওদের পরিবারের সর্বনাশ হয়।
—আপনি কি এসব জেনে কিনেছিলেন?
—না, এতসব জানা ছিল না। তবে কিছুটা আন্দাজ করেছিলাম। কিন্তু এ বাড়ি বা পরিবারকে কেন্দ্র করে যে এতকিছু একটা সময় ঘটেছিল, তা বুঝিনি। তবে যত জেনেছি, তত আরও বেশি আগ্রহী হয়ে উঠেছি। মধ্যযুগের ইংল্যান্ডের লোকেদের আচার-ব্যবহার, সে সময়ের অন্ধবিশ্বাস—এসব নিয়ে আমার পড়াশোনাও ছিল। এ পরিবারের উপর কেন এত অত্যাচার হয়েছিল, সে রহস্য বুঝতে তা সাহায্য করেছিল।
ইতিমধ্যে সামনের টেবিলে উনি একটা দামি রেড ওয়াইনের বোতল দুটো বেশ ঐতিহাসিক-দর্শন ওয়াইনের গ্লাস এনে রাখলেন। হেসে বলে উঠলেন—খুব ভালো আর্জেন্টিনার পিনো নঁয়ার ওয়াইন। খেতে শুরু করো। এরকম এক রাতে একটু সাহস যোগাবে।
বলে উনি ড্রিংক করতে শুরু করলেন। একটু একটু করে গ্লাস ঠোঁটে ছোঁয়াচ্ছিলেন। যেন কোনও তাড়া নেই। যেকোনও ভাবে এ রাত কাটিয়ে ওঠাটাই প্রধান। মাঝেমধ্যে বাইরের দিকে তাকাচ্ছিলেন। আমিও ওঁকে সঙ্গ দিতে ড্রিংক করতে শুরু করলাম।
জানলার বাইরে তাকালাম। বাইরে তখন পরিচয়হীন অন্ধকার। শুধু জঙ্গলের ছায়াশরীর দেখা যাচ্ছে। তার ফাঁক দিয়ে নখের মতো সরু একটা চাঁদ চারদিকের অন্ধকারে যেন আঁচড় বসাতে চাইছে। সামনের বিশাল ওক গাছটা তাকে আড়াল করে দাঁড়িয়ে আছে। বাইরের লন জুড়ে শুধুই গভীর অন্ধকার, যেন তাতে চাঁদের আলোর পা বাড়ানোরও অনুমতি নেই।
জঙ্গলের ভিতরে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নভাবে এই রাত কাটানোর অনুভূতির মধ্যে একটা অস্বস্তির ভাব আছে। আমরা বাইরের কিছু দেখতে না পেলেও বাইরে থেকে আমাদের নিশ্চয়ই এই মোমবাতির আলোয় দেখা যাচ্ছে। শুধু এই অদ্ভুত নির্জন পরিবেশ অনুভব করার জন্যই কি উনি আমাকে এখানে এতদূর টেনে এনেছেন? নাকি কিছুর অপেক্ষায় আছেন!
গ্র্যান্ডফাদার ক্লকটা গম্ভীর স্বরে কয়েকবার সশব্দ হয়ে উঠে জানাল যে রাত দশটা বেজে গেছে। ভদ্রলোক কী আমাকে এভাবে সারারাত বসিয়ে রাখবেন?
বলে উঠলাম-আচ্ছা, আপনি যে বললেন এ বাড়িতে একরাত থাকলে আমার সত্যি ভয়ের অনুভূতি হবে! সেরকম কিছু কি এখানে হয় নিয়মিত?
পরিষ্কার কোন উত্তর দিলেন না। বলে উঠলেন।-তুমি কি এখন শুতে যাবে ভাবছ?
আবার মুখে সেই রহস্যজনক হাসি।
—না, মানে আপনি কখন শুতে যান?
—যাই না। গত কয়েক বছরে আমার অভ্যেস বদলে গেছে। এখন রাতে ঘুমোই না। এখানেই বসে থাকি। ভোরের দিকে কখনো-সখনো ঘুমিয়ে পড়ি।
—কেন?
—ওই যে আগেই বললাম না, রাতের বেলা এখানে বেশ জমজমাট! ঘুম বারবার ভেঙে যায়। একটা অদ্ভুত অন্যরকম অস্বস্তি হয়। মনে হয় যেন আমার শেষসময় এসে গেছে। অদ্য শেষ রজনী। তুমিও ঘুমের প্ল্যান করো না। ঝড়ের রাতে মাঝসমুদ্রে সেলিং বোটে কেউ ঘুমোয় না! যেকোনও সময় বিপদ এসে হানা দিতে পারে।
একটু থেমে উঠে দাঁড়িয়ে বলে উঠলেন—দাঁড়াও, তুমি ভাবছ বুড়োর ভীমরতি হয়েছে। তোমাকে কিছু জিনিস দেখাই। তুমি বুঝবে। আমার সঙ্গে এসো।
হাতে একটা শেজবাতি ধরে ভদ্রলোক আমাকে নিয়ে ফের ওঁর লাইব্রেরীতে নিয়ে গেলেন। বিশাল বড় ঘর। কাঠের দেওয়ালে নানান ধরনের কাজ। আগেও দেখেছি। ঘরের একটা কোণে নিয়ে এসে আলোটা তুলে ধরলেন। বললেন—কাঠের উপরে করা এ নকশাটা দেখেছ?
দেখেই বোঝা যায় সামনের কাঠের কাজ খুব পুরনো। কিন্তু এ নকশা ভারী অদ্ভুত। যেন একটা বড় হাঁ করা মুখ। তার দুটো বড় বড় দাঁত। একটা লম্বা জিভ তার থেকে বেরিয়ে আছে। তার উপরে তারার মতো একটা পেন্টাগ্রাম আঁকা।
বীরেনবাবু বলে উঠলেন—ছবিটা হল শয়তানের। সে যেন এখানে বেরোতে না পারে, তাই তার উপরে এরকম তারা আঁকা। এই ঘরটা খুব পুরনো। এ কাঠের দেওয়াল কয়েকশো বছরের। বুঝতেই পারছ, আমি কোনও পরিবর্তন করিনি। এরকম আরও অনেক ছবি, অনেক জিনিস ছড়িয়ে আছে এ বাড়িতে। যেরকম ছিল, সেরকমই আছে। কিন্তু তোমার কী মনে হয় শুধু শুধু এখানে আছে এগুলো?
পড়ার ঘর থেকে বেরোনোর পরে প্যাসেজের একটা জায়গায় এসে থমকে দাঁড়ালেন। শেজবাতিটা আমার হাতে দিয়ে উনি নিচু হয়ে কাঠের মেঝের একটা অংশের কাঠ টেনে পাল্লার মতো খুলে ফেললেন।
তারপরে বলে উঠলেন—আলো ফেলো, এই কাঠের নীচের দিকে কিছু দেখতে পাচ্ছো?
আমি বসে পড়ে খুব খেয়াল করে দেখার চেষ্টা করলাম। বলে উঠলাম
—হ্যাঁ, যেন কারোর নখ দিয়ে বা খুব ধারালো কিছু দিয়ে আঁচড়ানোর দাগ।
উনি কাঠের পাল্লাটা ফের নামিয়ে দিয়ে বলে উঠলেন—এটাকে বলা হয় উইচ মার্ক। আসলে বলা উচিত অ্যান্টি উইচ মার্ক। যাতে ডাইনী না জেগে ওঠে এ বাড়িতে। বছরের পর বছর, শতকের পর শতক যেন এ বাড়িকে ডাইনি থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করা হয়েছে।
—ডাইনি, এ বাড়িতে?
—হ্যাঁ, সেটাই বলছি। আমি এ বাড়ি কেনার পরে এসব সিম্বল, অ্যান্টি উইচ মার্ক দেখে খুব অবাক হই। যত দিন যায়, তত বেশি এরকম নানান ছবি খুঁজে পাই। একটাই উদ্দেশ্য যেন যেকোনও উপায়ে কোন এক ডাইনিকে এ বাড়ির থেকে দূরে রাখা খুব জরুরি। পরে আসল গল্পটা জানতে পারি। চলো, টী রুমে গিয়ে তোমাকে সে গল্প বলছি।
এমার কথা
আবার আমরা ওই টী রুমে ফিরে আসলাম। বীরেন বাবু ওয়াইনে চুমুক দিয়ে বলে ওঠেন—তোমাকে একটু সেই সময়ে ফিরিয়ে নিয়ে যাই। গল্পের টাইম মেশিনে করে। তা না হলে এ ঘটনাটা ঠিক বুঝতে পারবে না।
তখন কিন্তু ইংল্যান্ড মানে কুসংস্কার, চার্চের আধিপত্য, মানুষে মানুষ হিংসা। খারাপ কোন কিছু ঘটলে বা কোনো কিছু বুঝতে না পারলেই তার পিছনে ডেভিল বা শয়তান আর ডাইনীকে খুঁজে বার করা। এটা সেই সময়ের কথা। ১৩৪০ সাল। এমনিতেও সেই একশো বছর ইংল্যান্ডের জন্য খুব খারাপ ছিল। আসলে রোমান সময় থেকে এই সময় অব্দি চাষবাসের পদ্ধতিতে কোনওরকম উন্নতি হয়নি। একইরকম অনুন্নত ছিল। কিন্তু লোকসংখ্যা সেখানে বেড়ে গিয়েছিল অনেকগুন।
এজন্য ১৩১৭-১৮ সালে দুবছর ধরে বড় খরা দেখা যায়। একইসঙ্গে অনেক গৃহপালিত পশু কোনও এক অজানা অসুখে মারা যায়। খাবারের বড় সঙ্কট ছিল এই সময়।
এ বাড়িতে থাকত ক্লার্ক পরিবার। সুখী উচ্চবিত্তপরিবার। স্বামী-স্ত্রী, দুই ছেলে ওএক মেয়ে। সঙ্গে পিটারের বৃদ্ধা মা। বাড়িতে বেশ কিছু কাজের লোক। পিটার খুব শিক্ষিত মানুষ ছিলেন। ল্যাটিন জানতেন। এজন্য চার্চ ও অ্যাবের স্থানীয় লোকেরাও ওঁর সাহায্য নিতে মাঝে মধ্যে আসত। অনেকটা জমি ছিল পিটারের। সেখানে চাষীদের দিয়ে চাষবাস করাতো। অনেক গরু ভেড়া ছিল। ভেড়ার উল দিয়ে পোশাক তৈরি করে ইউরোপে পাঠাত। সে ব্যবসা আস্তে আস্তে বেশ বড় হয়ে ওঠে।
পিটার ছিল খুব বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ। কিছু একটা বিষয় নিয়ে পিটারের সঙ্গে এখানকার চার্চের বিরোধ বাধে।
—চার্চ তো সে সময় খুব শক্তিশালী। শুনেছি রাজার দরবারেও চার্চের নেতারা উপস্থিত থাকত।
—ঠিক বলেছ। এমন কেউ ছিল না যে চার্চে রোববারে প্রার্থনা করতে যেত না। তখন অসুখ-বিসুখ লেগে থাকত। সবার ধারণা ছিল যীশুর অর্থাৎ চার্চের উপদেশ না মানলে নরকে তার স্থান হবে। শুধু সাধারণের মনের উপরেই যে চার্চের এই একচ্ছত্র অধিকার ছিল তাই নয়, চার্চ ও মনাস্ট্রি বই প্রকাশ করত, স্কুল-হাসপাতাল চালাত। বলতে পারো সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করত। অনেকটা আজকের রাজনীতির মতো।
—এখানে মনাস্ট্রি ছিল নাকি?
—এখান থেকে মাইল খানেক দূরে ছিল। সেখানেও সবাই পিটারকে চিনত ওঁর পাণ্ডিত্যের জন্য। তা যা বলছিলাম। আমার মনে হয় পিটার ক্লার্ক বিজ্ঞানকে বিশ্বাস করায় চার্চের বিরুদ্ধে কিছু কথা বলেছিলেন। সেখান থেকেই শুরু। চার্চ ও ক্যাথোলিক ধর্মাবলম্বী বেশ কিছু লোক পিটারের উপরে ভারী ক্ষেপে যায়। নেহাত পিটার অর্থবান ছিল, এখানকার অনেকে তাকে খুব ভালোবাসত। তাই সরাসরি কোনও ক্ষতি করতে পারেনি।
সে সুযোগ এল। ১৩৪৮ সাল। এই ওয়াইন থেকেই।—বলে ওয়াইন গ্লাস টা তুলে ধরে বীরেনবাবু ফের বলে উঠলেন। ১৩৪৮ সালের জুন মাস নাগাদ ইংল্যান্ডের ডরসেটে প্লেগ শুরু হয়। ফ্রান্সের বোরদো থেকে একটা জাহাজ এসেছিল। সেই জাহাজে শুধু ওয়াইন ছিল না, ছিল প্লেগ জীবানুবাহী ইঁদুর। তার থেকে প্লেগ ছড়িয়ে পড়ে পুরো ইংল্যান্ডে। এখানে আগস্টে শুরু হয়। কেউ এরকম অসুখ আগে দেখেনি। কি করতে হবে তাও জানত না। হঠাৎ করে মৃত্যুর অভিযান শুরু হল। সকালে সুস্থ লোক রাতে মারা যাচ্ছে।
সবার ধারণা হয়েছিল কোনও কারণে ভগবান ক্ষেপে গেছেন। হয়তো এর মধ্যে কোনও শয়তান বা ডাইনীর কারসাজি আছে। কোন মানুষের পাপের ফল। চার্চ পিটারের নাম সবার সামনে এনে দিল। বলে দিল পিটার আর পিটারের পরিবারের জন্যই বিপদ ঘনিয়ে এসেছে পুরো তল্লাটে। যদি বাঁচতে হয়, সে পরিবারের মধ্যে লুকিয়ে থাকা ডাইনীকে মারতে হবে।
গ্রামবাসীদের জানা ছিল না যে এ সমস্যা শুধু এখানকার নয়। ১৩৪৭-এর অক্টোবরে সিসিলি থেকে সারা ইউরোপে ছড়িয়ে পড়েছে এ মারাত্মক অসুখ। যার কোনও চিকিৎসা নেই। শয়ে শয়ে মানুষ মরছিল শুরু এখানে নয়, পুরো ইউরোপে। অসুস্থ ইদুর থেকে অসুস্থ ফ্লী বা নীলমাছির মাধ্যমে এ রোগ ছড়িয়ে পড়ছিল মানুষে। তখন সব বাড়িতেই অজস্র ইঁদুর থাকত। এত পরিচ্ছন্নতা ছিল না। তাই এই সংক্রমণ খুব দ্রুত ছড়িয়ে যাচ্ছিল।
কিন্তু এই অসুখের পিছনে যে এসব কারণ আছে, তা বোঝার ক্ষমতা কারুর ছিল না। সে সময়ে সেরকমভাবে কোনও ডাক্তার বা চিকিৎসা ব্যবস্থা ছিল না। যারা ছিল সব হাতুড়ে ডাক্তার। কেউ কেউ শরীরের কিছু জায়গা কেটে খারাপ রক্ত বার করে দিয়ে বাঁচানোর চেষ্টা করত। কিন্তু তাতে কিছু লাভ হত না।
যার সংক্রমণ হত, তার বগলে, কুচকিতে বা ঘাড়ে চামড়া খানিকটা ডিমের মতো ফুলে উঠত। সঙ্গে অসহ্য যন্ত্রণা ও বমি। ডায়েরিয়া। খুব জ্বর হত। সঙ্গে ক্লান্তি। নাক মুখ দিয়ে রক্তবমি। তারপরে সারা গায়ে ব্যথা, একটানা কাশি। তিন দিনের মধ্যে রোগীর মৃত্যু।
শুধু তাই নয়, যারা তার সংস্পর্শে এসেছিল তাদের সবারই এক দশা হত।
আগেই বলেছি, তখনকার সময়ে যা বোঝা যেত না, তার পিছনেই কোনও ডাইনী খুঁজে বার করা হত। এক্ষেত্রেও তাই হল।
সব আঙুল উঠল এ পরিবারের দিকে। নির্ঘাত এর পিছনে ক্লার্ক পরিবারের হাত আছে। চার্চ সে কথা সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিল।
—তারপর?
—সে সময় চার্চ সত্যি খুব ক্ষমতাশালী ছিল। যার বিরুদ্ধে দাঁড়াতো, তার পক্ষে ঘুরে দাঁড়ানো খুব শক্ত ছিল। সে যতই অর্থবানই হোক না কেন। ক্লার্ক পরিবারের একই অসুবিধের মধ্যে পড়তে হল। প্রায় সমাজ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। একই সঙ্গে অনেকেরই ধারণা হয়েছিল যে এই মহামারীর পিছনে পিটার ক্লার্ক এর পরিবারের কারুর হাত আছে। সেটাও চার্চ বলে দিয়েছিল। বলে দিয়েছিল যে এর পিছনে আছে পিটারের পনেরো বছরের মেয়ে এমা। এমা হচ্ছে আসলে ডাইনী।
মনের অন্ধকার যখন ছড়িয়ে পড়ে, এভাবেই ছড়িয়ে পড়ে। একজন থেকে আরেকজনে। প্লেগ শুধু মানুষকে শারীরিক দিয়ে অসুস্থ করেনি, করেছিল মানসিক দিক দিয়েও।
সে সময় কিছু নিয়ম কানুন ছিল। তা হল কাউকে ডাইনী সন্দেহ হলে, তাকে সে যে ডাইনী নয়, তা প্রমাণ করতে হবে।
—কিন্তু এমা তো বাচ্চা মেয়ে। হঠাৎ করে ওর উপরে সবার সন্দেহ হল কেন?
—ভালো প্রশ্ন—বীরেন বাবু চশমা খুলে ক্লান্ত চোখের পাতার উপরে আঙুল বুলিয়ে ফের বলে উঠলেন—খুব দুর্ভাগ্যজনক। একটা নিরীহ বাচ্চা মেয়ে। একটাই দুর্বলতা ছিল ওর। তোতলাতো। সে জন্য কিনা জানি না ও সে লজ্জায় চার্চে যেতে চাইত না। এ ছাড়া চার্চের ওর উপরে রেগে যাওয়ার আরেকটা কারণ ছিল। ও একটা ছেলেকে ভালোবাসত। সে ছিল ভিনদেশী, অন্য সম্প্রদায়ের। পিটারের ব্যবসার সঙ্গে সে ছেলেটা যুক্ত ছিল। সে প্রেমে চার্চের অনুমতি ছিল না।
সে সময়ে একটা ধারণা ছিল যে ডাইনীরা বাইবেল পড়তে পারে না। বিশেষ করে 'লরডস প্রেয়ার' এর অংশটা। এমাকে ওরা জোর করে ধরে নিয়ে গিয়ে পরীক্ষা করে। তোতলা হওয়ায় ও সে টেস্ট ফেল করে। অবশ্য পরীক্ষা এমনভাবে করা হয়েছিল যাতে ও ফেল করে। বুঝতেই পারছ তার ফল কি হয়।
আরেকটা টেস্ট করা হয় ওর উপরে। ও জলে ডুবে যায় কিনা। হাত পা বেঁধে এখান থেকে কিছু দূরে একটা নদীর জলে ওকে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। একটা ধারণা ছিল যে ডাইনীরা জলে ডোবে না। কীভাবে জানি এমা জলে ডোবেনি। ভেসে ছিল বেশ খানিকক্ষণ। ওই সময়ের একটা বইতে সে খবরটা পেয়েছি। এটা ছিল ডাইনী প্রমাণ করার মূল টেস্ট। তাতেও ফেল করার পরে আর কোনও প্রশ্নের অবকাশ ছিল না যে ওই মেয়েটা ডাইনী। সবার ধারণা হয় যে ওর জন্যই এখানে এরকম মারণ রোগ দেখা দিয়েছিল।
—তা ক্লার্ক ফ্যামিলি সেক্ষেত্রে গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে পারত। এখানে পড়েছিল কেন?
—হ্যাঁ, তা পারত। তবে সে সময় খারাপ খবর ঠিকই পৌঁছে যেত আশেপাশের গ্রামে। ওরা যেখানেই যেত লোকে একই রকমভাবে সন্দেহ করত এমাকে। তা ছাড়া মনে রেখো তখন ইংল্যান্ডের বিভিন্ন জায়গা অত্যন্ত বিচ্ছিন্ন ছিল। এত সহজে একটা জায়গা থেকে আরেকটা জায়গায় একটা বড় পরিবারের পক্ষে চলে যাওয়া সম্ভব ছিল না। ব্যবসা শুরু করাও সহজ হত না।
—তারমানে এখানেই থেকে গিয়েছিল ক্লার্ক পরিবার। কিন্তু তারপরে কী হয়েছিল?
বীরেনবাবু খুব গম্ভীরভাবে ওয়াইনে আরেকটা হালকা চুমুক দিয়ে বলে উঠলেন—এসব কিন্তু আমি সেসব বই পড়েই জেনেছি, যা চার্চের লোকেদের লেখা। সেখানে বলা হয়েছে ওকে আগুনে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল।
—মানে? ওই টুকু বাচ্চা মেয়েকে?
—হ্যাঁ, সে তো জোয়ান অফ আরক-কেও মারা হয়েছিল এর আরও প্রায় আশি বছর পরে ডাইনী অপবাদে। এরকম আরও অনেক ঘটনা খুঁজে পাবে। আসলে ডাইনী সাব্যস্ত করা ছিল বেশ সহজ কাজ।
—কিন্তু পিটার মেয়েকে বাঁচাতে পারেনি?
—বাড়ির মধ্যে লুকিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল ক্লার্ক পরিবার। কিন্তু পুরো গ্রাম ক্ষেপে উঠলে আর কী করবে? বিশেষ করে যদি চার্চের নেতারাই, ফাদাররাই তাদের নেতৃত্ব দেয়। একরাতে এ বাড়ি পুরো ঘিরে ফেলে গ্রামের লোক। তার পুরোভাগে ছিলেন ফাদার ফারডিন্যান্ড। পড়েছি মেয়েটা লুকিয়ে ছিল এই ঘরে ওই আলমারির মধ্যে। ওই যে সামনের আলমারির মধ্যে।
ঘরের কোণে রাখা আলমারির দিকে আঙুল তুলে বলে উঠলেন বীরেনবাবু। তারপরে ফের বলতে শুরু করেন—সেই রাতে দরজা ভেঙে লোকজন ঢুকে আসে। ওর বাবার ব্যবসায় যুক্ত ছিল যে ছেলেটা, যে নাকি এমাকে ভালোবাসত, সে এমাকে নিয়ে পালানোর চেষ্টা করে। কিন্তু পারেনি। ওদেরকে গ্রামের লোকেরা ধরে ফেলে। তারপরে আগুনে পুড়িয়ে দেয়।
—ছি। ছি। কী বলব জানি না। এখন এরকম একটা অভিশপ্ত বাড়ির মধ্যে বসে আছি। সব শুনে মনটা সত্যি খুব খারাপ হয়ে গেল।-একটু থেমে আবার বলে উঠি—তা আপনি এত কিছু জানলেন কিভাবে?
—অনেক ইতিহাসের বইতে এই ঘটনা লেখা আছে। কিছুটা আমি রিসার্চ করে জেনেছি যে ঠিক কি হয়েছিল। সে জন্য এ বাড়িটার উপরে একটা মায়া পড়ে গেছে। মেয়েটার উপরেও।
—তা তারপরেও এতো বছর ধরে এখানে এরকম ডাইনী তাড়ানোর ব্যবস্থা কেন? মেয়েটাকে তো পুড়িয়ে মারা হয়ে গিয়েছিল।
—আসলে আমার আগে যারা ছিল, তারা নিশ্চয়ই এ ব্যবস্থাগুলো নিয়েছিল এ বাড়ির দুর্নামের কথা শুনে। ১৬০০ সালের পর থেকে রাজা প্রথম জেমস এমনিতেও ডাইনী তাড়ানোর এসব ব্যবস্থা নিষিদ্ধ করে দেয়। তারপরেও এ বাড়িতে এরকম অনেক জিনিস লুকিয়ে রাখা ছিল। এই উইচ বটলটাও খুব যত্নে ফায়ার প্লেসের সামনে কাঠের নিচে লুকোনো ছিল। আমি খুঁজে পাই।
—আপনিও কি এসবে বিশ্বাস করেন? এগুলো রেখে দিয়েছেন কেন?
—না, পুরোপুরি যে বিশ্বাস করি তা নয়। তবে কোনওরকম গণ্ডগোল শুরু হোক, সেটা অবশ্যই চাই নি। মনের মধ্যে হয়তো একটা ভয় ছিল। রিস্ক নিইনি। যেখানে যেরকম আছে, সেরকমই থাক।
আমি উত্তেজিত হয়ে উঠে দাঁড়ালাম। চোখের সামনে যেন দেখতে পাচ্ছিলাম সে মেয়েটাকে পোড়ানোর দৃশ্যকে। কীরকম যেন বিষাক্ত মনে হচ্ছিল এ ঘরের বাতাস।
এগিয়ে গিয়ে কাঠের উইচ বটল-টা হাতে তুলে নিয়ে বলে উঠলাম—এরকম একটা ঘটনা শোনার পরে আমার মনে হচ্ছে এসব জিনিস ঘরে রাখা যেন একরকম এই অন্যায়কে মেনে নেওয়া। সেটাকে সমর্থন করা। একটা বাচ্চা মেয়েকে ডাইনী সন্দেহে মারা হয়েছিল। আগুনে পুড়িয়ে। সে অপরাধ যে আমরা আজও মেনে নিয়েছি, তার প্রমাণ এটাই। একই রকম ভুল করে চলেছি।
কথাটা বলতে বলতে উঠে গিয়ে বোতলটা তুলে নিয়ে ভেতরের তরলটা কিছু দূরে বেসিনে ঢেলে দিলাম। ইচ্ছে হচ্ছিল কাঠের বোতলটা ছুঁড়ে ফেলে দিই।
বীরনবাবু প্রথমে ব্যাপারটা বোধহয় বোঝেননি। উত্তেজিত হয়ে চিৎকার করে উঠলেন—এ-এ কী করলে?—বলে উঠে এসে আমার হাত থেকে বোতলটা নিয়ে নিলেন। দেখলাম উনি যেন ভয়ে কাঁপছেন। মুখ যেন ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে গেছে।
বেসিনের মধ্যে মোমবাতির আলো উঁচু করে ধরলেন।
না, সে তরল আর বোতলে ফিরিয়ে আনার উপায় নেই। আমিও বুঝলাম উত্তেজিত হয়ে এটা করা একেবারে উচিত হয়নি। ক্ষণিকের উত্তেজনায় করে ফেলেছি। অন্য একজনের বাড়িতে বেড়াতে এসে আমার এটা করা উচিত হয়নি।
বীরেনবাবু দেখি স্থানুর মতো আমার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। খানিকবাদে যেন আবার সম্বিৎ ফিরে পেলেন।
উনি বেসিনে পড়ে থাকা কয়েকটা পেরেক জাতীয় জিনিস কুড়িয়ে নিয়ে উইচ বটলটার ভেতরে ফেলে কাঁপা হাতে টেবিলের উপরে বটলটা রাখলেন। তারপরে সোফায় গিয়ে বসলেন। মাথায় হাত দিয়ে মাথা নিচু করে খানিকক্ষণ বসে রইলেন। কিছুক্ষণ কথা বললেন না।
তারপর মৃদু স্বরে বলে উঠলেন—খুব বড় ভুল করলে। এটা ঠিক করো নি।
আমি লজ্জিত হয়ে বসেছিলাম। চুপ করে।
বাইরে ইতিমধ্যে ঝড় শুরু হয়েছিল। অন্ধকারে গাছের অবয়ব শুধু দেখা যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল যেন একদল দানব ঘিরে ধরেছে বাড়িটা। কাছে-আরও কাছে তারা এগিয়ে আসছে।
ঝড়ের তীব্রতা আস্তে আস্তে বাড়তে লাগল। এক রুগ্ন চাঁদের আলোয় জানলা দিয়ে দেখা যাচ্ছিল যে দূরে গাছেরা যেন প্রবল ভাবে মাথা দোলাচ্ছে। একটা আরেকটা উপরে গিয়ে পড়ছে মাতালের মতো। একটা সোঁ-সোঁ আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল। নেহাত মোটা ডাবল গ্লেড কাচ, তাই শব্দ সেভাবে জোরে শোনা যাচ্ছিল না। কিন্তু শিরশির করে ঠান্ডা হাওয়া ঢুকছিল ঘরে। ভিজে সে বাতাস। ফায়ার প্লেসে আগুন জ্বললেও সেই আগুন যেন এই ঠান্ডা বাতাসকে আর সামলাতে পারছিল না।
বেশ খানিকক্ষণ বাদে এই অস্বস্তিকর নীরবতাকে কাটানোর জন্যেই আমি বলে উঠলাম—ওই বোতলে কি তরল ছিল, জানেন?
—ইউরিন। মন্ত্রপুত পেচ্ছাপ। সাড়ে ছ'শো বছর পুরনো। টেস্ট করে দেখেছিলাম। এরকমই করা হত। যাতে ডাইনী না আসতে পারে। সেই ডাইনী যদি এখন এখানে ফিরে আসতে চায়, তাকে আটকানো যাবে না।
বীরেনবাবু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—এ আপনি কী বলছেন? কে ফিরে আসবে? এমা? কেন?
—দেখো কী হয়। এখানে যা যা কাণ্ড হয় হঠাৎ করে। হয়তো এটা আমদের রক্ষা করত। এখন আর করবে না।
—কিন্তু এমা তো ডাইনী ছিল না। কেউ তো ডাইনী হতে পারে না!
—দেখো মানুষের বিশ্বাস একজন নিরীহ মানুষকে দেবতাও করে তুলতে পারে, ডাইনীও করে তুলতে পারে।
আমি আর কথা বাড়ালাম না। ভদ্রলোক খুব শকড। জানি ভদ্রলোক সম্পূর্ণ আজগুবি কথা বলছেন। কিন্তু সে যাইহোক, আমি নিজে যেভাবে ঝোঁকের বশে করে ফেলেছি, সেটা ভেবে নিজেরই খারাপ লাগছে। হাজার হোক এর একটা ঐতিহাসিক মূল্য ছিল। পুরনো দিনের উইচ ক্রাফট এভাবে সংরক্ষিত আর ক'টা জায়গায় আছে?
দেখলাম বীরেন বাবু সোফার হেলান দিয়ে বসেছেন। যেন হাল ছেড়ে দিয়েছেন। চোখদুটো বন্ধ করে মাথা পিছন দিকে একটু হেলিয়ে বসেছেন। সামনে কাচের সুদৃশ্য মোমদানিতে রাখা মোমবাতির আলো যেন ভয়ে কাঁপছে। বাইরে ঝড়ের জন্যই ভেতরে ঠান্ডা হাওয়া ঢুকছে। তাতেই কাঁপছে মনে হয়। তার জন্য দেওয়ালে যেন অনেকগুলো ছায়া চঞ্চল হয়ে উঠেছে। চারদিক এতটাই নিস্তব্ধ যে নিজের নিশ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দ যেন শুনতে পাচ্ছি।
দূরে টেবিলের উপরে একটা মোটা চামড়ায় বাঁধানো বই ছিল। দেখেই বোঝা যায় বেশ পুরনো। হয়তো আমাকে দেখাবেন বলেই রেখেছেন। বীরেনবাবুকে বিরক্ত না করে, বইটা নিয়ে এসে পড়তে শুরু করলাম। ইংরেজি হরফ। কিন্তু কিছুই যেন পড়ে বুঝতে পারলাম না।
—কীসের বই এটা?
জিজ্ঞেস করে উত্তর পেলাম না। মনে হল ঘুমিয়ে পড়েছেন বীরেনবাবু।
পাতা ওলটালাম। বিশাল ভারী বই। কিছু ছবি আছে। প্রত্যেক পাতার বেশ কিছু অক্ষর সোনার জলে লেখা। এসব বই এককথায় অমূল্য।
আমাকে যে উনি এভাবে এখানে ডেকে এনে এসব দেখাচ্ছেন, এর জন্য ওঁর কাছে চিরকৃতজ্ঞ থাকতে হবে। বই এর কিছু ছবি বেশ ভয়ানক। বুঝতে পারলাম এটাও ডাইনী-উইচক্রাফট এসবের উপরে।
পড়তে গিয়ে দেখলাম আর পড়া যাচ্ছে না। মোমবাতির আলো যেন আরও বেশি করে কাঁপছে। মনে হল একই সঙ্গে ঘরের উষ্ণতা যেন বেশ কমে গেছে। গায়ে একটা জ্যাকেট থাকলেও রীতমতো কাঁপছি।
এর মধ্যে ঘরের ভিতরে একটা অস্বস্তিকর খসখস আওয়াজ শুরু হল। ঘরের মধ্যে মথ জাতীয় কোনও কিছু ঢুকেছে হয়তো। বীরেনবাবু দিব্যি সোফায় হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে যাচ্ছেন। আমি নিজে উঠে কোথা থেকে আওয়াজটা আসছে দেখতে গিয়ে যে দৃশ্য দেখলাম, সেরকম দৃশ্য আগে কোনওদিন দেখিনি। ঘরের কোনে যে কাঠের আলমারি আছে, তার সামনে প্রায় হাজার খানেক লার্ভা। ওই দিকে একটা মোমবাতি জ্বলছে। তার আলোয় দেখলাম সাদা সাদা হাফ ইঞ্চি দৈর্ঘ্যের অজস্র লার্ভা ঘরের ওই দিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে। খুব সম্ভবত মাছির লার্ভা। কিন্তু হঠাৎ করে উদয় হল কি করে? এরকম হয়তো অসম্ভব নয়, কিন্তু কিছুক্ষণ আগেও তো ছিল না!
নাহ, বীরেনবাবুকে ডাকা ছাড়া কোনও উপায় নেই।
এবারে গায়ে হাত দিয়ে ধাক্কা দিলাম। ভদ্রলোক দেখি হঠাৎ চমকে সোজা হয়ে উঠে বসলেন। আমি ওঁকে দেখালাম ঘরে ছড়িয়ে থাকা হাজার হাজার মাছির লার্ভা। উনিও দেখে বেশ অবাক। এগুলো সারা বাড়িতে ছড়িয়ে পড়লে সাত-আট দিন বাদে এ বাড়িতে মাছির উৎপাতে থাকা মুস্কিল হয়ে যাবে।
আমি অবশ্য ওঁকে হাত দিতে দিলাম না। ড্রয়িং রুম থেকে ঘর পরিষ্কারের একটা জিনিস নিয়ে সব লার্ভা পাশের টয়লেটে গিয়ে ফেললাম। কিন্তু সেটা করতেই প্রায় এক ঘণ্টা কেটে গেল।
বীরেনবাবুও অবশ্য সঙ্গে সঙ্গে সাহায্য করছিলেন। আলো ধরেছিলেন।
এবারে আবার সোফায় বসে বলে উঠলেন—নাহ, আমিও কিন্তু এরকম আগে দেখি নি। কোথা থেকে এগুলো এল কে জানে? এসব কিসের লক্ষণ? যেন কিছুর অশুভ সংকেত।
একটু লজ্জিত হয়ে ফের বলে উঠলেন—আসলে তুমি আছো বলেই হয়তো খানিকটা নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।
—আচ্ছা, এমাকে মেরে ফেলার পরে এ পরিবারের লোকেরা কী করেছিল? এখানে ছিল?
—হ্যাঁ, ওরা এখানেই ছিল। তবে এখানে এতো মৃত্যু হয়েছিল যে ১৩৫১ সালে নাগাদ এ গ্রাম প্রায় জনশূন্য হয়ে যায়। সংক্রমণের ভয়ে অনেকে মৃতদেহ গ্রামের রাস্তায় ফেলে চলে যেত। অনেকের মৃতদেহ মাসগ্রেভে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হত। শুনেছিলাম এখানে যে মঠ ছিল, সেই মঠেও এমন মড়ক লেগেছিল যে প্রায় সব মঙ্ক বা সন্ন্যাসী মারা যায়।
সামান্য কিছু পরিবার পড়েছিল। পরে তারাও এ গ্রাম ছেড়ে চলে যায়।
শুধু এই গ্রাম নয়, পুরো ইংল্যান্ড জুড়ে জনসংখ্যা এতো কমে গিয়েছিল যে শ্রমিক আর পাওয়া যাচ্ছিল না। শ্রমিকদের বেতনও এজন্য বেড়ে যায়। বলতে পারো ইংল্যান্ডে বড় কিছু পরিবর্তন নিয়ে আসে এই ব্ল্যাক ডেথ।
—কীরকম?
—শ্রমিক সংখ্যা খুব কমে যাওয়ায় চাষবাসের জন্য লোক আর পাওয়া যাচ্ছিল না। উপায়? মনে রাখবে প্রত্যেকটা বিপর্যয় নতুন সম্ভাবনার সুযোগ সৃষ্টি করে। সবাই তখন ভেড়া পুষতে শুরু করল। ঘাসজমিতে অনেক ভেড়া রাখলে আর লাঙল চালানোর বা চাষবাস করার দরকার পড়ে না। এভাবে ঘাসজমির ঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ সম্ভব। একই সঙ্গে ভেড়ার পশম থেকে উলের ব্যবসা ফুলে ফেঁপে ওঠে। উল, উলের তৈরি পোশাক ইংল্যান্ডের প্রধান পণ্য হয়ে ওঠে, যা এখান থেকে উত্তর ইউরোপ আর স্পেনে রপ্তানী হতে শুরু করে।
বুঝলে, একটার সঙ্গে আরেকটা ঘটনা ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। এর জন্য ইংল্যান্ডের বন্দরগুলো খুব তাড়াতাড়ি গড়ে ওঠে। দেশবিদেশের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য গড়ে ওঠে।
—বাহ। ব্ল্যাকডেথের অনেক ভালো দিক ছিল তো!
—একদম। কুসংস্কারে ঢাকা সমাজে অনেক ভালো পরিবর্তন এনেছিল ব্ল্যাকডেথ। ব্ল্যাকডেথের আগে এখানে জমিদারী প্রথা ছিল। সে সব জমিদারী প্রথাও উঠে যায় ব্যাক ডেথের পরে। চাষীরা আর জমিদারের হয়ে তাদের জমিতে চাষবাস করতে আগ্রহী ছিল না। তারা তার থেকে অনেক বেশি রোজগার করতে পারত নিজেদের জমিতে। এজন্য সব তৈরি করা জিনিসের দাম আকাশছোঁয়া হয়ে যায়। নুন থেকে লোহা, সব কিছু। অন্যদিকে, গরু, ভেড়া, ষাড়—এসবের দাম একেবারে কমে যায়।
জমিদারদের এজন্য সমস্যা হয়। এক তো কাজের লোকেদের অভাব, তারপরে যারা কাজ করত তাদের দিন-মজুরিও অনেক বেড়ে গিয়েছিল। অন্যদিকে এসব ফার্মে যে সব জিনিস তৈরি করা যেত, সেসবের দাম ও চাহিদাও কমে এসেছিল। এর জন্য জমিদাররা নিজেদের অধিকারে যে জমি রাখত, তার পরিমাণ কমিয়ে দেয়। ভাড়া দিয়ে দেয় অন্যদের।
—নিশ্চয়ই চার্চের উপরেও লোকেদের আস্থা কমে গিয়েছিল? এতো মৃত্যু! তাদের মধ্যে আবার চার্চের পাদ্রীদের মৃত্যুর সংখ্যাও নিশ্চয়ই অনেক ছিল। তাহলে তারা আর কী করে ক্ষমতাশালী ও ঈশ্বরের আশীর্বাদপ্রাপ্ত হতে পারেন? নিজেদের বাঁচাতে পারছেন না, অন্যদের বাঁচাবেন কি করে?
—ঠিক বলেছ। এর জন্য সাধারণ লোকের চার্চের উপরে বিশ্বাস কমে আসে। অনেক পাদ্রী মারা যায়। চার্চের সংখ্যাও কমে আসে। ফ্রিডেল কি বলেছিল জানো? বলেছিল আধুনিক মানুষ এর জীবনযাত্রা শুরু হয়েছিল ব্ল্যাক ডেথের পর থেকে। কথাটা একদম ঠিক।
—আচ্ছা, আপনাকে জিজ্ঞেস করছিলাম, আপনি তখন বললেন না, বাড়ির বাইরে যে লাল ক্রশটা দেখলাম, ওটা কি?
—লাল ক্রশ? কোথায় দেখলে?—একটু যেন উত্তেজিত হয়ে উঠলেন বীরেনবাবু।
—ওই যে বাড়ির বাইরের দরজার পাশের দেওয়ালে।—বলে টেবিলের উপরে আঙুল দিয়ে ক্রশ এঁকে দেখালাম।
—আশ্চর্য। আমার চোখে তো পড়েনি! এরকম কিছু দেখিনি তো কোনওদিন। ভুল দেখেছ। তবে জানো কিনা জানি না মধ্যযুগে কোন বাড়িতে প্লেগ হলে, তার দেওয়ালে লাল ক্রশ দাগ দেওয়া হত। চিহ্নিত করার জন্য এরকম সিম্বল ব্যবহার করা হত। তবে এক্ষেত্রে নিশ্চয়ই তোমার চোখের ভুল।
হয়তো তাই হবে। কথা বাড়ালাম না।
আরও কিছুক্ষণ কথা হল। এরমধ্যেই ঘড়ি সংক্ষিপ্তভাবে সবথেকে কম সময় নষ্ট করে একটার ঘণ্টা বাজাল। বেশ ঘুম পেয়ে গেছে। এবার শুয়ে পড়ি। এখানে কিছুই করার নেই। না টিভি, না ফোন, না ইন্টারনেট। বীরেনবাবু যে কী করে সময় কাটান কে জানে!
আমার উসখুস ভাব দেখে উনি অনিচ্ছাসত্ত্বেও বলে উঠলেন—ঠিক আছে। তোমাকে আর আটকাবো না। তুমি শুতে চলে যাও। আমি এখানেই বসব। গুড নাইট।
আমিও আর ভদ্রতা না দেখিয়ে উঠে পড়লাম। সারাদিন যা গেছে।
বাড়ির বাইরে ওরা কারা?
আমি আমার ঘরে শুতে গেলাম। এতো ক্লান্ত ছিলাম যে শুতে না শুতেই ঘুম এসে গেল।
ঘুমের মধ্যে দেখলাম কারা যেন আমার পিছু নিয়েছে। একটা খোলা মাঠের মধ্যে দিয়ে আমি ছুটে যাচ্ছি কার যেন হাত ধরে। কিন্তু চারদিক থেকে অনেক লোক আমাদের ঘিরে ধরছে। মনে হচ্ছে আমি যেন কিছু একটা চুরি করে পালাচ্ছি। যত জোরেই ছুটি না কেন, ওরা আমদের ধরে ফেলছে। একটা সময় ধরে ফেলল। যার হাত ধরে ছিলাম, সে কোথায় গেল? তাকে আর খুঁজে পেলাম না। লোকগুলো আমাকে ধরে একটা গাছের সঙ্গে বেঁধে ফেলল। গায়ে কী একটা তরল ছিটিয়ে আমার গায়ে মশাল দিয়ে আগুন লাগিয়ে দিল।
সে কি অসহ্য যন্ত্রণা। ছটফট করছি, অথচ হাত পা বাঁধা থাকার জন্য কিছুই করার উপায় নেই। কোনরকমে সে আগুন থেকে বেরিয়ে আসার জন্য চেষ্টা করছি। কিন্তু পারছি না।
ঘুম ভেঙে গেল। দেখি বুক ধড়ফড় করছে। খাটের উপরে উঠে বসেছি। এই ঠান্ডার মধ্যেও ঘামছি। এটা যে স্বপ্ন, সত্যি নয়, কোথায় আছি সেটা বুঝে উঠতে, এককথায় বলতে গেলে নিজেকে ফিরে পেতে বেশ খানিকটা সময় লাগল।
স্বপ্ন বাস্তবের এত কাছাকাছি চলে আসতে পারে! মনে হচ্ছিল তখনও যেন সারা গায়ে আগুন জ্বলছে।
ঘরে যেন বাইরে থেকে খুব ঠান্ডা হাওয়া ঢুকছে। সদ্য ঘুমভাঙা চোখে দরজার দিকে তাকালাম। ঘরের দরজাটা আধখোলা। ওটা তো বন্ধ করে শুয়ে ছিলাম। যাক গে। দরজা খোলা থাকলেই বা কি! কম্বলটা গায়ে জড়িয়ে ফের শুয়ে পড়লাম।
কিন্তু ঘুম আর এলো না। মনে হল ধীরপায়ে সিঁড়ি দিয়ে কে যেন উঠে আসছে। হাল্কা পায়ের শব্দ। সে শব্দ যেন কাছে এগিয়ে আসতে লাগল। হয়তো বীরেনবাবু উঠে আসছেন। কিন্তু খেয়াল করতে মনে হল, এটা বীরেনবাবুর হতে পারে না। এটা বাচ্চা কারো পায়ের শব্দ। হাল্কা শব্দ। উপরে উঠে আমার ঘরের দরজার সামনে থেমে থাকল খানিকক্ষণ।
একটা অজানা ভয়ে আচ্ছন্ন হয়ে শুয়ে থাকলাম কিছুক্ষণ।
তারপর কী জানি মনে হল! কম্বল ফেলে উঠে বসলাম। ঘরে একটা মোমবাতি জ্বলছিল। তবে তার উপর ভরসা না করে আমার পাশে ফোনটা হাতে নিয়ে নিলাম। ফোনে টর্চ জ্বালিয়ে ঘরের বাইরে ফেললাম। সিঁড়িতে। প্যাসেজে। কেউ কোথাও নেই।
পাশাপাশি চারটে ঘর। তাহলে কি অন্য কোনও ঘর থেকে আওয়াজটা এসেছে। খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে কিছু না দেখতে পেয়ে অন্য ঘরগুলোতে ঢুকে এক এক করে দেখলাম। কেউ নেই।
ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। বীরেনবাবু ঠিক বলেছেন, এ বাড়িতে এমন কিছু আছে যে ঘুম আসে না। কিন্তু বীরেনবাবু কি এখনও নীচেই?
নীচে নেমে এলাম। দেখি বীরেন বাবু সোফায় বসে বসে ঘুমোচ্ছেন। ফায়ারপ্লেস-এ আগুন জ্বলছে।
কি মনে হল উপরে না গিয়ে নীচে ওঁর পাশের সোফায় বসে বইটা ফের দেখতে শুরু করলাম। বাইরে গভীর অন্ধকার। বাড়ির ভেতর ফের নিস্তব্ধ। ভালো করে শুনলাম কোনও শব্দ নেই। কিন্তু কীরকম যেন একটা অস্বস্তি হচ্ছে। মনে হচ্ছে কে যেন আমাকে লক্ষ্য করছে। খুব গভীরভাবে লক্ষ্য করছে। কিন্তু আমি তাকে দেখতে পাচ্ছি না। লক্ষ্য করলাম মোমবাতির আলো একই ভাবে তিরতির করে কাঁপছে। তার সঙ্গে সঙ্গে ঘরময় দেওয়ালে-মেঝেতে কিসের যেন ছায়া কাঁপছে।
হঠাৎ মনে হল বাইরের প্যাসেজে আবার যেন সেই পায়ের শব্দ। কানখাড়া করে খানিকক্ষণ বসে থাকলাম। তারপরে একটা মোমবাতি নিয়ে বাইরে গিয়ে দেখি, আবার সেই। কেউ কোত্থাও নেই। আবার সব চুপ। ফিরে এলাম।
এখন বুঝতে পারছি, আজ এতোদিন বাদে বীরেনবাবু কেন এত নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারছেন। আজ আমি এখানে আছি। কিন্তু আমার পক্ষে ঘুম আর জোর করে ডেকে আনা অসম্ভব।
মনটাকে অন্যদিকে করার জন্যই সোফায় বসেই ইংল্যান্ডের ইতিহাসের উপরে একটা বই পড়তে শুরু করলাম। ইতিহাসে আমার সামান্য আগ্রহ আছে। কিন্তু এরকম গুরুগম্ভীর ইতিহাসের বই হাতে নিয়ে পড়লে ইতিহাসের প্রফেসাররাও ঘুমিয়ে পড়বেন। আমারও তাই হল।
পড়তে পড়তে বোধহয় একটু ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। আচমকা যেন প্রচণ্ড শব্দ পেয়ে চমকে উঠে বসলাম। কারা যেন ঘরের কাচের জানলায় ধাক্কা মারছে। একই রকম আওয়াজ মূল দরজার উপরে। বেশ জোরে জোরে ধাক্কা।
জানলার দিকে তাকাতে ভয়ে হার্টবিট কিছুক্ষণের জন্য থেমে গেল। বাইরে বাগান আর অন্ধকার নেই। যেন অনেক মশালের আলো এ বাড়িকে চারদিক থেকে ঘিরে ধরেছে। কিছু আলো জানলার একদম সামনে। কে ধাক্কা দিচ্ছে এতো রাতে? বীরেনবাবু বলেছিলেন এখানে কেউ থাকে না! কোনও বড় বিপদ হল নাকি! কেউ কি সেটাই জানাতে এসেছে?
বাইরে থেকে অনেক লোকের গলা ভেসে আসছে। কিন্তু তাদের কথা বোঝা যাচ্ছে না। কিরকম যেন অস্পষ্ট উত্তেজিত কণ্ঠস্বর। সাহস জড়ো করে জানলার কাছে গিয়ে দেখার চেষ্টা করলাম।
জানলার বাইরে জায়গায় জায়গায় ঘন কুয়াশা। জমাট বাঁধা কুয়াশা বাগানে যেন চাদর গায়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সে কুয়াশা আর মশালের আগুনের বাইরে অন্য কোনো কিছুরই যেন কোন অস্তিত্ব নেই। কিন্তু একই সঙ্গে বাইরের কাঠের দরজায় আর ঠিক সামনের জানলায় কারা যেন ধাক্কা দিচ্ছে। সে ধাক্কায় বারবার বাইরের দরজা-জানলা কেঁপে কেঁপে উঠছে। মনে হচ্ছে যে কোন সময় জানলা ভেঙে ঢুকে আসবে।
নাহ, বীরেনবাবু এর মধ্যে কিভাবে নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছেন কে জানে! এতো গভীর ঘুম।
ওঁকে না ডেকে আর কোনও উপায় নেই। যদি সত্যি কোন জরুরি কারণে এত লোক বাইরে জড়ো হয়, সেটা ওঁর জানা উচিত।
—বীরেন বাবু, বীরেন বাবু, বী-ডাকতে গিয়ে গলার থেকে আর কোনও আওয়াজ বেরোল না।
আগে খেয়াল করিনি। বীরেনবাবুর এ কি হয়েছে? ঠোঁটের পাশ থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। নাক আর কানের থেকেও রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। মুখের রং যেন বেশ কালো হয়ে গেছে। নিষ্প্রাণ চোখদুটো মাটির দিকে তাকিয়ে আছে। গায়ে হাত দিলাম। গাতো বেশ গরম। কি করে এই সামান্য সময়ের মধ্যে এরকম হল? কি বীভৎস লাগছে মুখটা!
গায়ে হাত দিতেই শরীরটা সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ল। পালস দেখলাম। নেই। মারা গেছেন? কীভাবে?
ডাক্তার ডাকব কি? আমার কিছু পরিচিত ডাক্তার আছে। অন্তত তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা ফোনে জানাতে পারবে, এরকম পরিস্থিতিতে কি করা যায়!
ছুটে ড্রয়িংরুমে গিয়ে ফোন-এর ভারী রিসিভারটা তুললাম। কোনও রিং টোন নেই। ডেড ফোন। কয়েকবার চেষ্টা করে হাল ছাড়লাম।
বাইরে দরজার ধাক্কা যেন বেড়ে গেছে। দরজা রীতিমতো কাঁপছে। একই সঙ্গে সে কম্পন যেন আমার মধ্যেও হচ্ছে। যেন যে কোনও মুহূর্তে দরজা ভেঙ্গে ওরা ভেতরে ঢুকে আসবে। কিন্তু কারা এরা? ড্রয়িংরুমের জানলা দিয়ে দেখার চেষ্টা করলাম। নাহ, কারুর শরীর দেখা যাচ্ছে না। কুয়াশায় ঢাকা পড়েছে। শুধু মশালের আগুন দেখা যাচ্ছে। আর শোনা যাচ্ছে উত্তেজিত কণ্ঠস্বর।
কি বলছে শোনার চেষ্টা করে কিছুই বুঝতে পারলাম না। কিন্তু সবাই যেন একই কথা সুর দিয়ে বলছে।
যেন বলছে 'উঁই অয়ান্টেথ ইয়ন্ড বেলডামস, রিসিভেথ হার আউট'।
মনের মধ্যে অজানা কে যেন আমাকে অনুবাদ করে বলে দিল তার অর্থ। 'আমরা ওই ডাইনীকে চাই। বার করে দাও।'
কিন্তু কারা এরা? কেন মধ্যযুগীয় ইংরাজিতে কথা বলছে? কে ডাইনী? সেরকম কেউ কি বাড়ির মধ্যেই আছে?
আবার টীরুমে ফিরে আলাম। এ কী হল? আমার চোখের সামনে বীরেনবাবু মারা গেলেন! আমি কিছুই টের পেলাম না! দরজা খুলে দেব! কিন্তু এরা কারা? এরকম বিচ্ছিন্ন জঙ্গলের মধ্যে। তাও কারো মুখ দেখা যাচ্ছে না।
আবার ওর গায়ে হাত দিলাম। গায়ের উষ্ণতা কমছে যেরকম মৃত্যুর পর হয়। চোখ এখনও খোলা। কিন্তু সে চোখে দৃষ্টি নেই। মাথা কাত হয়ে একদিকে হেলে গেল। যা দেখছি তা যে স্বপ্ন নয়, তার প্রমাণ নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে পেলাম। শুধু মুখ-চোখ থেকে রক্ত বেরিয়েছে তা নয়, গায়ের চামড়া ফেটেও রক্ত চুইয়ে চুইয়ে বেরিয়েছে। সে রক্ত আমার হাতেও এসে লেগেছে।
শেষ পর্যন্ত আমার জন্যেই কি বীরেনবাবু মারা গেলেন? আমি ওই বোতলের তরল ফেলে দিয়েছিলাম বলেই কী ওঁর এই অবস্থা হল? তার মানে এখন এ বাড়িতে কী সেই ডাইনী এসে গেছে? সে কি এখন এ বাড়িতেই আছে আমার আশেপাশে কোথাও? সে ডাইনীর খোঁজেই এ বাড়ী ঘিরে ধরেছে সে সময়ের অশরীরী গ্রামবাসীরা? জানি এ ধরণের চিন্তাভাবনা কতটা অবান্তর। কিন্তু সামনে কম্পমান মোমবাতির আলোর শিখা যেন তাতে সায় দিচ্ছে। এসব প্রশ্ন এক অজানা ভয়ে আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল। মনে হল যেন মাথা আর কাজ করছে না।
পায়ের নীচের মেঝের পাথর যেন বরফের মতো ঠান্ডা মনে হল। মনে হল পা দুটো যেন কেউ পাথরের মেঝেতে গেঁথে দিয়েছে। ফের সোফায় বসে পড়লাম।
আলমারির মধ্যে কে?
এতক্ষণ মনের মধ্যেযেটুকু জোর ছিল, মনে হল আর নেই। হাত-পা অসার হয়ে গেছে। যেন কেউ খুব কাছেই কেউ আছে। শুধু দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু সে আমাকে দেখছে। খুব খুঁটিয়ে দেখছে। যেন এ বাতাসে সে নিশ্বাস নিচ্ছে। দাঁড়িয়ে আছে আমার পাশেই।
মনে হল ছুটে বাইরে বেরিয়ে যাই। কিন্তু বাইরে ওরাই বা কারা? ওদেরও কী বাস্তবে কোনও অস্তিত্ব নেই? ওরাও কি সব অশরীরী?
আমি নিজে বিজ্ঞানের ছাত্র। ভূতে সামান্যতম বিশ্বাস নেই। কিন্তু আমার আশেপাশে যা ঘটছে, তাকে তো অন্য কোনওভাবেই ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। বিশেষ করে এরকম অচেনা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন জায়গায় বসে যেখানে আমার একমাত্র জীবিত সঙ্গীও আর বেঁচে নেই।
আমার মৃত্যুও কি এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা? মনটাকে শান্ত করার চেষ্টা করলাম।
চারদিক ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম। নাহ, ঘরে কেউ নেই। অন্তত যেটুকু জায়গা দেখা যাচ্ছে, সেখানে নেই। অবশ্য ঘরের প্রত্যেকটা অংশ দেখা যাচ্ছে না। জানলার বাইরে মশালের আলো থাকলেও ঘরের ভেতরে মোমবাতির আলোর বৃত্তের বাইরে শুধুই অন্ধকার। লোকগুলোর মতো বাইরের মশালের আলোও যেন ঘরের ভেতরে আসতে পারছে না।
এখানেই কি এমা আছে? আমার পাশে কোথাও? সে কী আমার সাহায্য চায়? নাকি যে কোন সময়ে সে আমার সামনে এসে তার উপরে হওয়া অন্যায়ের বদলা নেবে? মনকে সান্ত্বনা দিলাম সে তো এক সাধারণ অসহায় মেয়ে। সে তো কোনও দোষ করে নি! হয়তো সে আজও এ বাড়ির এঘর থেকে ওঘর ছুটোছুটি করে খেলতে চায়। আজও কোনও বন্ধুর অপেক্ষায় থাকে।
নিজের অসহায়তার সঙ্গে সঙ্গে একটা অদ্ভুত বিষণ্ণতা যেন আমাকে গ্রাস করছিল। যেন মনে হচ্ছিল এ ঘরের বাতাসে কারো কান্না মিশে আছে। কে যেন আঙুল দিয়ে কাচের জানলায় আমাকে মনে করানোর জন্য তার নাম লিখছে। কে যেন আমাকে তার কত না বলা কথা শোনাতে চায়। এ বাড়ির সব ছবিতে যেন তার হাতের ছাপ। তার বহু শতকের অপূর্ণ ইচ্ছে আমাকে যেন গভীরভাবে ছুঁয়ে যাচ্ছে। কেউ যেন অব্যক্ত ইশারায় বারণ করছে বাইরের দরজা খুলতে।
মনে হল আমিও যেন সেই সময়ের, সেই ঘটনারই অংশ। যেন দিন-রাতের বেড়া টপকে সময়ও এখানে এগোতে পারছে না। ঘুরে ফিরে কোন এক বিশেষ দিনের ঘেরাটোপে আটকে পড়ে আছে। সময়ও যেন সে অপরাধকে পিছনে ফেলে এগোতে পারছে না।
মনে হচ্ছে আমার খুব বড় কোনও আপনজন যেন এখানে আমার জন্যে বহু বছর ধরে আমার অপেক্ষায় দিন গুনছে। আমি আজ হঠাৎ করে এখানে হাজির হই নি। এ যেন ভবিতব্যই ছিল। আজ সে সময় এসে গেছে। তাকে উদ্ধার করতেই আমি এসেছি। ওকে উদ্ধার করতে হবে এই বাইরের শকুনদের হাত থেকে। শুধু আমিই সেটা পারি।
এই অনুভুতি যেন খানিকক্ষণের জন্য আমাকে আচ্ছন্ন করে দিয়েছিল। নিজেকে খানিকবাদে ফিরে পাওয়ার পরে খেয়াল করলাম গলা শুকিয়ে কাঠ।
খাবার জল টেবিলের উপরে একটা জাগে রাখা ছিল। উঠে গিয়ে জল খেতে গেলাম। আবার তখনই সেই মাছির লার্ভা চোখে পড়ল। সাদা সাদা অজস্র লার্ভা মেঝের উপর দিয়ে যেন কাঁপতে কাঁপতে এগিয়ে চলেছে। খানিক আগেই পরিষ্কার করে দিয়েছিলাম। আবার এরা এসে গেছে!
কোথা থেকে আসছে? খেয়াল করতে দেখলাম কোণের আলমারির দিক থেকে যেন ওদের যাত্রাপথ শুরু হয়েছে। আলমারির মধ্যেও কি ওরা আছে? ওদিকে গিয়ে কোনের আলমারির কাঠের দরজা টানতে খুলে গেল।
সঙ্গে সঙ্গে আমার উপরে হিংস্র শ্বাপদের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল ঘন অন্ধকার আর পচা একটা গন্ধ।
আর তারপরেই যেন একটা হাই ভোল্টেজ শক খেলাম। মাথা যেটুকু কাজ করছিল যেন সেই মুহূর্তে থেমে গেলো। সামনের জমাট বাঁধা অন্ধকার যেন কারো চেহারার ছদ্মবেশ নিয়ে সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। সে অন্ধকার আমার চোখের সামনে আস্তে আস্তে একটা মেয়ের চেহারা নিয়ে ধরা দিল।
আমার সামনে ঠিক একফুট দূরে আলমারির মধ্যে সাড়ে পাঁচ ফুট উচ্চতার একজন ইংরেজ মেয়ে। মুখ দেখে মনে হয় বছর পনেরো-ষোলো হবে। মুখে অসহায়তার ছাপ। মুখের মধ্যে অদ্ভুত এক ইনোসেন্স। খুব ভয় পেয়েছে। ভয়ে মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। চোখের দৃষ্টিতে এক অজানা বিষণ্ণতা। চুলের দু-দিকে বিনুনি। গায়ে একটা পা অব্দি সাদা গাউন। জামার হাতা কনুই অব্দি। খুব মিষ্টি দেখতে।
নীলচোখ দুটো যেন পাথরের। আমার দিকে নিবব্ধ। আমাকে দেখে যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে। মুখে আস্তে আস্তে হাসি ফুটে এলো। আমারও মনে হল যেন ওকে আমি খুব ভালো করে চিনি। কোথায় যেন ওকে বহুদিন দেখেছি।
—প্রি-প্রিথি সাভেথ মি। দো-দোস জেন্টস আরট গোইং টু কিলেথ মি।
অর্থাৎ 'আমাকে বাঁচাও। ওরা আমাকে মেরে ফেলবে।'
কিন্তু আমি ওর কথা বুঝতে পারছি কী করে?
এই কি এমা? একেই কী খুঁজছে ওরা? বাইরের লোকজন।
আমি কিছু বোঝার আগেও আমার হাত ধরার জন্য ওর ডান হাত বাড়িয়ে দিল। আমার সাহায্য চায়। আমি সে হাত না ধরে থাকতে পারলাম না।
আর সে হাত ধরার সঙ্গে সঙ্গে যেন মনে হল এ বহুজন্মের সম্পর্ক। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সব কিছুর থেকেও ও যেন আমার কাছে বেশি মূল্যবান। এই মুহূর্তের জন্য যেন আমি কত জন্ম অপেক্ষা করে আছি। মনে হল এ হাত ধরে আমি যেন সমুদ্রের পর সমুদ্র পেরিয়ে যেতে পারি। এক মহাবিশ্ব থেকে আরেক মহাবিশ্ব পাড়ি দিতে পারি।
ওকে টেনে আলমারির মধ্যে থেকে বার করে নিলাম। ও প্রায় আমার গায়ের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ল। যেন বহু শতক পরে নিশ্চিন্ত আশ্রয় পেয়েছে।
মুহূর্তে মনে হল এ বাড়ীর সব কিছু যেন আমি জানি। এর ইতিহাসের মধ্যে আমিও ছিলাম। এর সঙ্গে আমার যেন বহু জন্মের পরিচয়। ঠিক এমার মতো।
আমি জানি কি করতে হবে। ওর হাত ধরে ছুটে বাড়ির পিছন দিকের কনসারভেটরির মধ্যে দিয়ে বাগানে বেরিয়ে এলাম। চ্যাপেলের দিকে ছুটে গেলাম। চ্যাপেলের মধ্যে একটা আলমারির পিছনে একটা গুপ্তদরজা আছে। সেটা দিয়ে বেরোলে ঝোপঝাড়ের মধ্যে দিয়ে একটা গুপ্ত পথ আছে। সেই পথ মাটির নীচ দিয়ে গেছে। আমরা সেই পথ দিয়ে ছুটে চললাম। একটা পাহাড়ী গুহার মধ্যে দিয়ে খানিকটা গিয়ে সেই পথ আরেকটা পথে গিয়ে মিশল। সেখান দিয়ে ওকে নিয়ে বেরিয়ে এলাম। খানিক বাদে একটা সরু রাস্তা পেলাম। গ্রামের রাস্তা।
আমি ওকে বাঁচাবোই। তার জন্যে যদি আমার প্রাণের মূল্য দিতে হয় তাও ঠিক আছে। ওকে ধরতে পারলেই সবাই ওকে মেরে ফেলবে। সে আমি জানি। সরু রাস্তা দিয়ে দুপাশের ছোট ছোট মাটির বাড়ির পাশ দিয়ে ছুট লাগালাম। এসব বাড়ী এ জঙ্গলের মধ্যে এলো কোথা থেকে? আসার সময় দেখি নি তো?
বেশ কিছু জায়গায় রাস্তার দুধারে মৃতদেহ পড়ে আছে। রাস্তার দুধার দিয়ে অনেক আবর্জনা। চারদিকে বিশ্রী পচা গন্ধ। কিছু কুকুরের ডাক শুনলাম। মেঘের আড়ালে লুকিয়ে থাকা অস্পষ্ট চাঁদের আলো ছাড়া সবাই যেন অন্ধকারের মধ্যে লুকিয়ে আমাদের লক্ষ্য করছে।
কিন্তু এ নীরবতা যেন হঠাৎ করে হারিয়ে গেলো। কিছু পায়ের শব্দ। মনে হল উল্টোদিক থেকে কিছু লোক যেন আসছে। ও দু-হাত দিয়ে আমার হাত শক্ত করে ধরল। আমরা রাস্তা ছেড়ে পাশের জঙ্গলের কাঁটাঝোপের মধ্যে দিয়ে ছুটতে শুরু করলাম।
হঠাৎ কিছু দূর থেকে ফের যেন কোলাহল শুনতে পেলাম। আমাদের পিছু নিয়েছে একদল লোক। আরও জোরে ছোটার চেষ্টা করলাম। কিন্তু না। এমা আর পারছে না। বারবার পিছিয়ে পড়ছে। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ছোটার চেষ্টা করছে। ওর গাউন জঙ্গলের চোরাকাটায় আটকে আটকে যাচ্ছে। মশালের আলোর সঙ্গে আমাদের দূরত্ব কমে আসছে।
বলে উঠলাম 'রানেথ ফেস্টিনেটর'। জোরে ছোট।
ও আর পারছে না। দাঁড়িয়ে পড়েছে। চোখে জল।
ওকে কোলে নিয়ে নিলাম। মনে হল যেন একটা ঠান্ডা মৃত শরীর তুলে নিলাম। বেশ ভারী। ছুটতে পারলাম না বেশিক্ষণ। হঠাৎ উলটো দিক থেকে যেন কিছু লোক আমাদের পথ আগলে দাঁড়ালো।ও ভয়ে আমাকে জড়িয়ে ধারেছে। আমার আর কিছুই করার নেই। মশালের আড়ালে থাকা সব মুখগুলো এবারে দেখতে পাচ্ছি। সবার মুখে রক্ত, কারো কারো মুখ পুড়ে গেলে যেমন কালো হয়ে যায়, সেরকম কালো। প্লেগে মারা গেলে যেরকম হয়। চোখ বলে কিছু নেই। সেখানে যেন গভীর কালোগর্ত। বুলেটের গর্তের মতো।
আমাদের চারদিক থেকে ওরা ঘিরে ধরছে। এমা যেন আমার গায়ের মধ্যে মিশে গেছে। আমাকে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। অজস্র ছায়া আমাদের কাছে, আরও কাছে এগিয়ে আসছে। কী হতে চলেছে তা আমি খুব ভালো করে জানি। এ সময়, এ মুহূর্ত, দূরে মেঘের আড়ালে লজ্জায় মুখ লুকনো নীরব চাঁদের আলো আমি যেন আগেও দেখেছি। এমা-কে আমার আরও কাছে টেনে নিলাম।
হঠাৎ মাথায় যেন কি লাগল? লাঠির বাড়ি? অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলাম।

ফিরে পাওয়া
একমাস পরের কথা। দীর্ঘদিন হাসপাতালে ভর্তি ছিলাম। প্লেগ, একই সঙ্গে নার্ভাস ব্রেকডাউন। মাথাতেও চোট পেয়েছিলাম। বারমিংহ্যাম হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে বাড়িতে যখন ফিরলাম, তখনও যেন মনে হচ্ছিল সে রাতেই পড়ে আছি। সে রাত যেন আর শেষ হবে না।
শুনেছিলাম জঙ্গলের মধ্যে আমাকে অচেতন অবস্থায় একদিন পরে খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল। গায়ে তখন আমার খুব জ্বর। বীরেনবাবু মারা গিয়েছিলেন। প্লেগে। ওঁর কাজের লোকেরা পরের দিন আমাকে খুঁজে পায়।
কী করে যে আমাদের দুজনের অত কম সময়ের মধ্যে প্লেগ হয়েছিল, সে এক রহস্য। বিশেষ করে আজকের দিনে। বাড়ির কাজের লোকেদের তো হয় নি! কীভাবে একরাতের মধ্যে বীরেনবাবু প্লেগে মারা গেলেন, তারও কোনও কারণ খুঁজে পাওয়া যায়নি।
আমাকে পুলিস অনেক জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল। আমি ঠিক যা হয়েছিল, তা বলেছি। কিন্তু আমি যা বলেছি, মনে হয় না কেউ কিছু বিশ্বাস করেছে। তবে আমি যে ওঁর মৃত্যুর কারণ নই, সেটা অন্তত বুঝেছিল।
বলতে নেই ভদ্রলোক আমার এক খুব বড় উপকার করে দিয়ে গিয়েছেন। আমাকে উপহার দিয়েছেন এমন এক অনির্বচনীয় ঘটনা, যা শুধু যে আমাকে গল্প লিখতে উদ্বুদ্ধ করবে, তাই না! সে ঘটনা থেকে পাওয়া কিছু অভিজ্ঞান আমার সঙ্গে থেকে যাবে সারা জীবন। হয়তো আমাকে ডেকে নিয়ে যাওয়ার পিছনে সে কারণও ছিল।
আগামীকাল আমার লন্ডন অফিসে জয়েন করব। আমি আগে এতদিন কখনো ছুটি নিই নি। এতোদিন ধরে অফিস থেকে দূরে আছি, ওদিকে কী হচ্ছে কে জানে!
আমিও এক' দিনে অনেক পালটে গেছি। ছোটখাটো ভালোলাগার, চাহিদার বাইরে জীবনকে অন্যভাবে দেখতে শিখেছি। বুঝেছি শুধু ভালোবাসার জন্য সময়ের সব হিসেবের বাইরে গিয়ে অপেক্ষা করা যায়।
আমার ফ্ল্যাটে বসে চুপচাপ এসব ভাবছিলাম। সামনে দূরে একটা বড় ম্যাপল গাছ। তার পাতায় ভারী সুন্দর লাল—গোলাপি রঙের ছোঁয়া। ঠিক এমার গোলাপি ঠোঁটের মতো। গাছের পাতার মধ্যে যেন ওই লুকিয়ে আছে। কিন্তু সেই রূপসী গাছের পিছনে সিগন্যালহীন টিভির মতো ঘোলাটে আকাশ।
হঠাৎ ঘরের কোন থেকে আমার সেই পরিচিত ফিসফিসানি কণ্ঠস্বরটা ভেসে এলো। সামান্য তোতলামোর সঙ্গে সে নারীকন্থ বলে উঠল—হোও-হোওয়ার আরট দি লি-লিয়েফ?
যার অর্থ—কোথায় তুমি প্রিয়?
বলে উঠলাম—আই আম হার। আমি এখানে।
ও এমার কথা তোমাদের বলা হয় নি। ও এখন আমার সঙ্গেই থাকে। আমার বাড়িতে। ও এখানে থাকলেও ওর জগতেই থাকে, সামনে আসে না। সেখানে কাউকে অনুভব করা যায়, কিন্তু ছোঁয়া যায় না। আকাশের মতো। চোখের সামনে থাকলেও শুধু শব্দ আর অনুভূতি দিয়ে ওকে ছোঁয়া যায়।
আমি ওকে সত্যি খুব ভালোবাসি। মনে হয় আমরা আবার নিজেদের ফিরে পেয়েছি।
আমরা এখন অনেক সময় নিজেদের মধ্যে গল্প করে সময় কাটাই। মুখোমুখি বসে। যেরকম আগে করতাম। কীভাবে সময় কেটে যায় বুঝি না। ঘণ্টা, মিনিটের কাঁটা অসহায় দর্শকের মতো আমাদের সামনে বসে থাকে। সাতশ বছরের অনেক গল্প জমে আছে। সেটা শেষ করতে এক জন্ম যথেষ্ট নয়।

অধ্যায় ৪ / ৪
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%