বিশ্বজিৎদা সেদিন হঠাৎ ঝড় তুলল। ফুটবল—ক্রিকেট নয়, রাজনীতি নয়, খাওয়ার কথাও নয়। একেবারে চার্লস ডারউইন। কথা হচ্ছিল সাগ্নিকের জাহাজে করে আন্দামানে বেড়াতে যাওয়া নিয়ে। সেখান থেকে একেবারে চার্লস ডারউইনের বিগলে করে সমুদ্রযাত্রায়। হঠাৎ প্রসঙ্গ পরিবর্তন। এটাই বিশ্বজিৎদার স্বভাব। কিছু একটা বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করলেই হল! কোনও—না—কোনওভাবে বিষয়টাকে তুলবেই।
বিশ্বজিৎদা বলতে শুরু করে,—ডারউইনের কেরিয়ারটা আমারই মতন। ছাত্রজীবন একেবারে সাদামাটা। বাবা—ই জোর করে কেমব্রিজে জিওলজি নিয়ে পড়াশোনা করতে পাঠিয়েছিলেন। কেমব্রিজ থেকে বাড়ি ফেরার পর উনি একটা চিঠি পান। ক্যাপ্টেন ফিৎজরয়ের কাছ থেকে। উনি বিশ্বভ্রমণে বেরোচ্ছেন। একজন প্রকৃতিবিদকে জায়গা দিতে পারেন। তবে সে—বাবদ উনি কোনওরকম টাকা দেবেন না। ডারউইনের হার্টের প্রবলেম ছিল। বাবারও আপত্তি ছিল। তা সত্ত্বেও ডারউইন ওই দীর্ঘসফরে বেরিয়ে যান...বল তো যাত্রা শুরুর সালটা কত ছিল?
আমাদের নিরুত্তর দেখে বিশ্বজিৎদা দ্বিগুণ উৎসাহে বলে ওঠে,—তোরা পড়ার বইয়ের বাইরে কোনও কিছুই তো জানলি না। শুনে রাখ, সালটা ছিল ১৮৩১।
আর দিনটা ছিল ২৭শে ডিসেম্বর।—খোলা দরজার সামনের চাতালে জুতো খুলতে—খুলতে অনিলিখা বলে ওঠে। অনিলিখাকে দেখেই বিশ্বজিৎদার সমস্ত উৎসাহ উবে গেল। উবে যাওয়ারই কথা। অনিলিখার সামনে আর জ্ঞান জাহির করা চলে না। এমন কোনও বিষয় নেই যা অনিলিখার অজানা। অতীতেও আমরা এর অনেক প্রমাণ পেয়েছি। অনিলিখার কথাই আমাদের কাছে বেদবাক্য। এমনকি বিশ্বজিৎদাও অনিলিখাকে আজকাল বেশ খাতির করে চলে।
তা অনিলিখা ফের বলে ওঠে,—ইংল্যান্ডের ড্যাভেনপোর্ট থেকে যাত্রা শুরু হয়। দু—দুবার যাত্রা শুরু করেও বাজে আবহাওয়া, ঝড় ইত্যাদির জন্য ফিরে আসতে হয়। কে তখন জানত, পৃথিবীর ইতিহাসে সবথেকে উল্লেখ্য—যাত্রা হতে চলেছে! এই অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল চিলি, পেরু ও প্রশান্ত মহাসাগরের আরও কয়েকটা দ্বীপের তটভূমি সার্ভে করা। ১৭ই ফেব্রুয়ারি বিগল নিরক্ষরেখা অতিক্রম করে দক্ষিণ—গোলার্ধে প্রবেশ করে। ১৮৩২ সালের ২৯শে ফেব্রুয়ারি ওরা ব্রাজিলের বাহিয়া পৌঁছয়। ৩রা এপ্রিল, ১৮৩২ রিও—ডি—জেনেরোতে। ২০শে অক্টোবর, ১৮৩৫ সালে বিগল গ্যালাপাগোস দ্বীপ থেকে ইংল্যান্ডের উদ্দেশ্যে ফিরতে শুরু করে। তাহিতি, নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, মরিশাস, কেপ অফ গুডহোপ, সেন্ট হেলেনা, অ্যাসিকন দ্বীপ ছুঁয়ে ফলমাউথ পৌঁছয় ১৮৩৬ সালের ২রা অক্টোবর।
ডারউইন ফলমাউথে সেই ছোট জাহাজ ত্যাগ করেন। ১৮৩১ থেকে ১৮৩৬ প্রায় পাঁচ বছর ডারউইনের কেটেছিল ওই জাহাজে। ডারউইনের ছিল ডায়েরি লেখার নেশা। রীতিমতো সাহিত্যিকের চোখে সবকিছু দেখতেন। ওঁরা কবে কোথায় গিয়েছিলেন, কী করেছিলেন তার যাবতীয় বিবরণী পাওয়া যায় ডারউইনের ডায়েরিতে।
ডারউইনের এই ডায়েরি বই আকারে প্রকাশ হয়েছে। অনেকে পড়েছে। আমিও পড়েছি। কিন্তু একটা জিনিস আমার চোখে বেশ অদ্ভুত লেগেছে। যিনি প্রায় প্রতিদিন ডায়েরি লিখে গেছেন, তিনি হঠাৎ করে মাঝের পনেরো দিন লেখা ছেড়ে দিলেন কেন? আবার লেখা শুরু করলেন এমনভাবে যে তাতে কোনও বৈজ্ঞানিক বা অন্য তথ্যের ব্যাপার নেই, খালি দার্শনিকতা। ডায়েরির শেষের দিকের ডারউইন যেন আগের থেকে একেবারে আলাদা। এমন কী ঘটেছিল ওই পনেরো দিনে?
প্রশ্নটা হাওয়ায় ছুঁড়ে দিয়ে ইতিমধ্যেই অনিলিখা উঠে দাঁড়িয়েছে। যেতে—যেতে বলে ওঠে,—পরের শনিবার পুরো ব্যাপারটা বলা যাবে। আজ বিশাল কাজের লিস্ট নিয়ে বেরিয়েছি। পাঁচমিনিট ঢুঁ মেরে গেলাম।
অনিলিখার কাছ থেকে জোর করে গল্প আদায় করা শিবেরও অসাধ্য। অন্তত এক সপ্তাহের অপেক্ষা।
পরের শনিবার ঠিক দুটোর সময় অনিলিখা হন্তদন্ত হয়ে ঢুকল। আমরা সবাই অনেক আগেই জড়ো হয়েছি। অনিলিখার হাতে বেশ কয়েকটা কাগজ। চেয়ারটা টেনে নিয়ে ও সোজাসুজি বলতে শুরু করে,—মাঝের পনেরো দিন লেখা হয়নি কথাটা ঠিক নয়। লেখা হয়েছিল। যাতে সবাই এই পনেরো দিনের কথা জানতে না—পারে, তাই ডারউইন অংশটা বাদ দিয়েছিলেন। আমি কী করে ওই পনেরো দিনের ডায়েরির খোঁজ পেলাম সে—সবের মধ্যে যাচ্ছি না। অরিজিনাল লেখাটা পড়ার ঠিক এক ঘণ্টা সময় পেয়েছিলাম। পরে সেটা অনুবাদ করে সংক্ষেপে লিখে রাখি। আজ সেটাই পড়ে শোনাচ্ছি।
অক্টোবর ১, সকাল দশটা
খানিক আগে আমরা টিয়েরা—ডেল—ফুয়েগো ছেড়েছি। টিয়েরা—ডেল—ফুয়েগো দক্ষিণ আমেরিকার দক্ষিণতম প্রান্ত। ৫৩° দক্ষিণ অক্ষাংশে কিরকম ঠান্ডা হয় তা নিশ্চয়ই বলে বোঝাতে হবে না। জাহাজের মধ্যে একজায়গায় আগুন জ্বালিয়ে তাকে ঘিরে বসেছিলাম। জাহাজটা খুবই ছোট। জায়গার বড়ই অভাব। তবু তারমধ্যেই প্রায় তিনবছর কেটে গেল। এখন অনেকটা অভ্যস্ত হয়ে গেছি। টিয়েরা—ডেল—ফুয়েগো ভারি অদ্ভুত জায়গা। তটভূমির প্রায় গা দিয়েই সারমিয়েন্টো পাহাড়। উচ্চতা বেশি নয়। সাতহাজার ফুট। কিন্তু পুরো বরফে ঢাকা। মাঝে—মাঝেই ভীষণ শব্দ করে বরফের চাঁই জলে এসে পড়ছে। অজস্র হিমবাহ জলে ইতস্তত ভাসছে। এর আঘাতে কত জাহাজের যে সলিলসমাধি হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। ক্যাপ্টেন ফিৎজ তাই বিশেষ সতর্কতার সঙ্গে আস্তে—আস্তে জাহাজ চালাচ্ছেন। হিমবাহগুলো ভয়ংকর হলে কী হবে! নীলচে হিমবাহর উপর সূর্যের আলো পড়ে যে অপূর্ব বর্ণচ্ছটার সৃষ্টি করে, তার সৌন্দর্য বর্ণনা করা কঠিন। একনাগাড়ে তাকিয়ে থাকলে চোখের খুব ক্ষতি হয়, অথচ চোখ সরাতেও ইচ্ছে হয় না। আপাতত আমরা উত্তরের দিকে চলেছি। ভাল পারেসোর দিকে।
যেতে—যেতে পুমার কথা মনে হচ্ছে। পুমা আসলে একধরনের সিংহ। মূলত দক্ষিণ আমেরিকাতেই পুমা দেখা যায়। অবশ্য পৃথিবীর অনেক জায়গাতেই এর অস্তিত্ব আছে। কিন্তু প্রত্যেক জায়গাতেই এদের আচার—ব্যবহার আলাদা। খানিকটা পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় এদের চেহারাতেও। নিরক্ষরেখার উষ্ণ বনাঞ্চলেও যেমন এদের পাওয়া যায়, তেমনই আবার এদের দেখতে পাওয়া যায় টিয়েরা—ডেল—ফুয়েগোর মতো ঠান্ডা জায়গাতেও। সমতলেও যেমন দেখেছি, তেমনি এদের পায়ের ছাপ দেখেছি চিলির কর্ডিয়েলাতে দশহাজার ফুট উঁচুতে। ল্যা—প্লাভায় পুমার শিকার হয় হরিণ, অস্ট্রিচের মতো প্রাণীরা। মানুষের উপরে এরা কখনও আক্রমণ করে না। কিন্তু চিলিতে যেহেতু হরিণ অত সহজলভ্য নয়, তাই মানুষের উপর আক্রমণের ঘটনা প্রায়ই শোনা যায়।
এবার হামিংবার্ড—এর কথায় আসা যাক। লিজার মতো গরম জায়গাতেও যেমন পাওয়া যায়, তেমনই পাওয়া যায় টিয়েরা—ডেল—ফুয়েগোর বনে। তবে প্রয়োজন মতো এদের চেহারা পরিবর্তন হয়েছে তাই ঠান্ডা জায়গায় যে হামিংবার্ড দেখেছি তারা অনেক বড়সড় পুরু পালকে মোড়া।
লেখায় বাধা আসছে। খানিকক্ষণ ধরে উপরে একটা গণ্ডগোল শুরু হয়েছে। দেখে আসি কী ব্যাপার! আজকে লেখা এইটুকুই থাক!
অক্টোবর ২, রাত একটা
ভারি অদ্ভুত এই দ্বীপ, দ্বীপটা না দেখলে আমাদের পুরো যাত্রা বিফলই হতো মনে হয়। তা—কী করে এই দ্বীপে এসে পৌঁছলাম? না, তাহলে একটু আগে থেকেই বলতে হয়।
সেদিন ডেকে চিৎকার—চেঁচামেচি হচ্ছে দেখে উপরে উঠে আসি। একটা অদ্ভুত প্রাণী জালে ধরা পড়েছে। দেখতে অনেকটা ডলফিনের মতো। কিন্তু ডলফিনের মতো দাঁত নেই। রঙ উজ্জ্বল লাল। আর ডানার পাশ দিয়ে হাতের মতো কিছু একটা বেরিয়ে আছে। ডাঙায় হাঁটার সময় সেটায় ভর করে হাঁটে। এরকম কোনও জীবের অস্তিত্বের কথা আমার জানা ছিল না। সবথেকে অবাক ব্যাপার—আমরা যে ওকে ধরেছি, ওর কোনও ক্ষতি করতে পারি, এরকম কোনও বোধই ওর মধ্যে নেই। দিব্যি আনন্দে আমাদের মধ্যে ঘুরে—ফিরে বেড়াতে লাগল।
খানিকবাদে হঠাৎ দেখি ক্যাপ্টেন আমাকে ডাকছে। দূরবিন হাতে খানিকটা দূরে জলের দিকে কী দেখাচ্ছে। দূরবিন চোখে দিলাম। আমাদের ধরা ওই প্রাণীটার মতোই একঝাঁক প্রাণী সাঁতরে যাচ্ছে উত্তর—পশ্চিম দিকে। আমরা ওই ঝাঁকটার পিছু নিলাম। দেখা যাক ওরা কোথায় যায়। আমাদের ধরা প্রাণীটাকেও খানিকবাদে জলের মধ্যে ছেড়ে দিলাম। ও গিয়ে ঝাঁকের মধ্যে মিশল।
মিনিট কুড়ি বাদে দেখলাম, আমরা একটা সবুজ তটভূমির দেখে এগোচ্ছি। ম্যাপে এই দ্বীপের কোনও চিহ্ন নেই।
আমরা দ্বীপের দিকেই এগোলাম। দ্বীপটা পাহাড় দিয়ে ঘেরা। সমুদ্র থেকে সোজা উপর দিকে উঠে গেছে। সমুদ্রের নীচে থেকে হঠাৎ করে আগ্নেয়গিরি জেগে উঠে শুনেছি এরকম ভূখণ্ডের সৃষ্টি করে। হয়তো বেশিদিন হল এই দ্বীপ সৃষ্টি হয়নি। তাই এর অস্তিত্বের কথা সবার অজানা।
দ্বীপের ধার দিয়ে বেশ খানিকটা ঘোরার পর খানিকটা সমতল তটভূমির সন্ধান পাওয়া গেল। এখান দিয়ে হেঁটে দ্বীপের মধ্যে ঢোকা যাবে। জাহাজ নোঙর করে আমরা ভেতরের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। গাছগাছালির মধ্যে দিয়ে হাঁটার সময় লক্ষ্য করলাম এখানকার গাছগুলো ভিন্ন প্রজাতির। আর সব গাছেই কিরকম একটা অদ্ভুত বুনো গন্ধ। খুব তীব্র পারফিউমের মতো। পথে কয়েকটা জলাশয় পড়ল। বিশ্রাম নেবার জন্য একটা জলাশয়ের ধারে গিয়ে বসলাম।
বেশ খানিকক্ষণ হয়ে গেল, দ্বীপটার মধ্যে কিন্তু একটাও জীবজন্তুর দেখা পেলাম না। প্রাণহীন দ্বীপ নাকি? ভাবতে—ভাবতেই হঠাৎ দেখি ঝোপের ভেতর থেকে একটা হরিণশ্রেণীর প্রাণী বেরিয়ে জলাশয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। হরিণশ্রেণী বলছি, কারণ হরিণের মতো রঙ নয়, গা
ঢ় নীল। আমি প্রাণীটার দিকে এগিয়ে গেলাম। আরও কাছ থেকে দেখব বলে। কিন্তু আমাকে দেখে ও বিন্দুমাত্র ভ্রূক্ষেপ করল না। উলটে ও যেন আমার মতোই একইরকম কৌতূহলে আমাকে মুখ তুলে দেখতে লাগল। ওর এই অদ্ভুত রঙের জন্য খুব সহজেই অন্য প্রাণীর শিকার হয়ে উঠতে পারে।
সব জায়গাতেই কিছু লোক থাকে যারা বুদ্ধি—বিবেচনা দিয়ে কোনও কাজ করে না। ক্রিস পেচি ওরকমই একজন। হঠাৎ করে কোথা থেকে ক্রিস পেচি ছুটে এসে প্রাণীটাকে গাছের ডাল নিয়ে তাড়া করল। অবশ্য তাড়া করায় আমার ভালোই হল। দেখলাম এই প্রাণীটার হরিণের সঙ্গে আরেকটা তফাত আছে। তা হল এই প্রাণীটা হরিণের দশভাগের একভাগ বেগেও ছুটতে পারে না।
সেদিন আমরা ঠিক করলাম জাহাজে না—ফিরে তাঁবু খাটিয়ে দ্বীপেই রাত কাটাব। তেমন হিংস্র কোনও জানোয়ার এ—দ্বীপে আছে বলে মনে হয় না। আর থাকলেও আত্মরক্ষার জন্য অনেক অস্ত্র আমাদের কাছে আছে।
রাতে খাবার পর আগুন জ্বালিয়ে তাঁবুর বাইরে এসে বসলাম। কী অপূর্ব এই দ্বীপ! পাহাড়—হ্রদ—সমুদ্র সবুজে—ঢাকা উপত্যকা—কী নেই এ—দ্বীপে! কেউ যেন পৃথিবীর সব সৌন্দর্য একজায়গায় এনে জড়ো করেছে। কিন্তু এত সুন্দর হওয়া সত্ত্বেও কোনও কিছু একটার যেন অভাব আছে। আর তাই বোধহয় সামনের পাইনের বনে ঝাঁপিয়ে পড়া চাঁদের আলো দেখেও মন খারাপ লাগছিল।
তিনবছর হল বাড়ি ছেড়ে বেরিয়েছি, বাবা—দাদা কে কেমন আছেন কিছুই খবর পাইনি। কী লাভ হয়েছে এই তিনবছর জাহাজে করে দেশ—বিদেশ ঘুরে! নানান ধরনের জীবজন্তু, গাছপালা আর জীবাশ্মের সন্ধানে জীবনের তিনটে মূল্যবান বছর হারিয়ে বসে আছি। জীবজগতের এই সৃষ্টির রহস্য ভেদ করার ক্ষমতা আর যারই থাকুক না—কেন, এটুকু বুঝেছি আমার নেই।
আমার পাশে বসে আছে কেন ডারিংটন। মাঝারি চেহারা। জাহাজের কলকব্জা খুব ভালো বোঝে। মেনটেনান্সের জন্য ওকে নিয়ে আসা হয়েছে। সারাক্ষণ হইচই করতে ভালোবাসে। তা সে—ও দেখছি মনমরা হয়ে বসে আছে। দু—একটা কথা বলার চেষ্টা করলাম। হুঁ—হাঁ বলে কাটিয়ে গেল। বুঝলাম ওর মনের অবস্থা ভালো নেই।
এরমধ্যে খানিকক্ষণ ধরে একটা খস—খস আওয়াজ শুরু হয়েছে। মাঝে—মাঝে পাচ্ছি, মাঝে—মাঝে হারিয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ কেন—ই আবিষ্কার করল—শজারু। আমার ঠিক দুফুট দূরে নির্ভয়ে বসে আছে। ভয় অবশ্য আমারই পাওয়ার কথা! কাঁটা ফুটলে আর দেখতে হবে না। কিন্তু সতর্ক হবার আগেই ঘটনাটা ঘটে গেল। আবার অবশ্য নয়—কেন—এর। কেন কী একটা ফল খাচ্ছিল। তারই আকর্ষণে কিনা জানি না, হঠাৎ করে কেন—এর গা ঘেঁষে শজারুটা গিয়ে বসল। কেনও চমকে উঠেছিল। কিন্তু এবার আমার চমকে ওঠার পালা। কেন শজারুটাকে কোলে তুলে দিব্যি আদর করছে। খানিকবাদে নিস্তব্ধতা ভেঙে ও বলে উঠল,—ডারউইন, হাত দিতে পার। এটা শজারু নয়। এর কাঁটাগুলে একেবারে নরম। হাত দিলে বেশ আরাম হয়।
একটু দ্বিধা নিয়ে কেন—এর কথামতো শজারুটার গায়ে হাত দিলাম। আশ্চর্য, কাঁটাগুলো শজারুর মতো শক্তও নয়, বিঁধেও যায় না। খুব নরম লম্বা—লম্বা রোমের উপর হাত দিলে যেমন লাগে সে—রকম। আর এ—প্রাণীটাও সত্যি অদ্ভুত। এরও কোনও ভয়ডর নেই। দিব্যি নিশ্চিন্তে আমাদের মাঝখানে বসে রইল। যেন আমাদের পোষমানা, আমাদের সান্নিধ্য উপভোগ করছে।
রাত বাড়ার সঙ্গে—সঙ্গে ঠান্ডাটাও বাড়ছে। তাঁবুর ভেতরে ঢুকে তাই মোমবাতির আলোয় ডায়েরি লিখতে বসেছি। খানিকক্ষণ ধরে মনের মধ্যে যে—ভাবনাটা শুরু হয়েছে সেটা আর আজকে লিখলাম না। কালকে দেখা যাবে সেটা নেহাতই অমূলক কিনা!
অক্টোবর ৪, সন্ধে আটটা
দুদিনের মধ্যে অনেক কিছু ঘটে গেল। জানি না আমিও এই দ্বীপ ছেড়ে বেরতে পারব কিনা! নাকি আমার অবস্থাও কেন, রোজ, ডেভ, জনের মতো হতে চলেছে। আর তাই এই ডায়েরি—লেখাটা আরও বেশি প্রয়োজন। যাতে লোকে এরকম একটা ব্যতিক্রমী জায়গার অস্তিত্বের কথা জানতে পারে।
শুরু করা যাক কাল সকাল থেকে। পরশু রাতে কেন—এর নাক—ডাকা ছাড়া আর কোনও ঘটনা ঘটেনি। শজারু শ্রেণীর প্রাণীটাও আমাদের তাঁবুর মধ্যে এসে শুয়েছিল। সকালে ঘুম ভেঙে দেখি কোথায় চলে গেছে।
আরেকটু পরে আমরা দ্বীপের মধ্যে ঘুরতে বেরলাম। দ্বীপের আরও ভেতরের দিকে। গাছ থেকে যে—গন্ধটা পাচ্ছিলাম, সেটা যেন আরও তীব্র হচ্ছে। এখানকার আবহাওয়া ট্রপিকাল না—হলেও যে—জঙ্গলটায় ঢুকলাম তার সঙ্গে ট্রপিকাল ফরেস্টের অনেক মিল। আকাশ ছোঁয়া লম্বা—লম্বা গাছ সূর্যের মুখ দেখতে দেয় না। তবে এ—ধরনের বনে জীবজন্তু, পশুপাখি অজস্র থাকে। এখানে কিন্তু সে—রকম কিছু চোখে পড়ল না। একটা গাছের উপর খালি একটা শকুন বসে থাকতে দেখলাম। খানিকবাদে একটা সাপ চোখে পড়ল। নেতিয়ে মাটিতে পড়ে আছে। কিং কোবরা। সাপের রাজাকে এ—রকম নিস্পৃহভাবে পড়ে থাকতে দেখা যায় না। লাঠি দিয়ে খোঁচা দিতেও ফণা না—তুলে আস্তে—আস্তে ঝোপের মধ্যে ঢুকে পড়ল। অসুস্থ হবে হয়তো।
ওদিকে ডেভ হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল,—লাল ইঁদুর!
ওর অঙ্গুলিনির্দিষ্ট দিকে তাকিয়ে দেখলাম সত্যিই তাই। সাপটার থেকে হাতদুয়েক দূরে টকটকে লাল রঙের ইঁদুর। শিকার ও শিকারির এভাবে পাশাপাশি বসে থাকা কল্পনা করা যায় না। যেন দুজনেই আরও কোনও গভীর চিন্তায় নিমগ্ন। ইঁদুরের রঙ মেটে হলে চট করে লক্ষ্য করা যায় না। কিন্তু এক্ষেত্রে লাল বলে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল।
আমার মাথার মধ্যে সব চিন্তাধারা কিরকম জট পাকিয়ে যাচ্ছিল। তাহলে কি আমার এতদিনের পরিশ্রম, চিন্তাভাবনা সবই মিথ্যে? বিভিন্ন দেশের অজস্র জীবজন্তু উদ্ভিদশ্রেণী দেখে আমি সিদ্ধান্তে আসতে চলেছিলাম যে প্রত্যেক জীব তার জীবনধারণের জন্য পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিজের মধ্যে পরিবর্তন ঘটায়। সেই পরিবর্তন ঠিক দিকে হলে সেই জীব এই জীবজগতে টিকে যায়। না—হলে বিলুপ্ত হয়ে যায়। একেক দেশের পুমার চেহারা তাই এক—একরকম। হামিংবার্ড এক—একরকম। কিন্তু এখানে যেন সবকিছুই অন্যরকম। কারও কোনও আত্মরক্ষার অস্ত্রই নেই। তবু তারা কীভাবে যে জীবনসংগ্রামে টিকে আছে এটাই আশ্চর্য!
এসব ভাবতে—ভাবতে হাঁটতে থাকলাম। খানিকবাদে উপত্যকার মতো একটা জায়গায় এসে পৌঁছলাম। জায়গাটা থেকে চারদিকে বেশ কয়েকটা পাহাড় উঠে গেছে। একটা কমখাড়া পাহাড়ের গা—বেয়ে উপরে উঠতে লাগলাম।
বেশ খানিকটা ওঠার পর জঙ্গল কিছুটা কমে গেল। আমরা ওই পাহাড়ের প্রায় উপরে উঠে গেছি। দ্বীপের বেশ খানিকটা জায়গা এখান থেকে দেখা যায়। সবুজ বনভূমির মধ্যে ছড়িয়ে থাকা লেকগুলো উপর থেকে দারুণ লাগছে। মুগ্ধ হয়ে দেখছি। এরই মধ্যে হঠাৎ বন্দুকের আওয়াজ পেলাম। একবার নয়, তিন—তিনবার। ঘাবড়ে গিয়ে ঘাড় ঘুড়িয়ে দেখি জনের বন্দুক থেকে তখনও ধোঁয়া বেরোচ্ছে। আর ওর থেকে মোটামুটি কুড়ি হাত দূরে একটা চিতাবাঘ মরে পড়ে আছে। চিতাবাঘটা নাকি পাশের ঝোপ থেকে বেরিয়ে আস্তে—আস্তে আমাদের দিকেই এগিয়ে আসছিল। এগিয়ে গিয়ে চিতাবাঘটাকে কাছ থেকে দেখলাম। অদ্ভুত। এর পায়ের পেশী দেখে মনে হয় না, গাছ বেয়ে উঠতে পারে। আমার এ—বিষয়ে অনেক পড়াশোনা আছে। দেখে মনে হল না এ খুব জোরে ছুটতে পারে। শরীরের গঠন সে—রকমভাবে গড়ে ওঠেনি।
চিতাবাঘটা যেদিক দিয়ে এসেছিল, আমরা ঝোপ সরিয়ে—সরিয়ে সেদিকে এগোতে লাগলাম। খানিকটা এগোবার পরে আরেকটা ফাঁকা জায়গায় এসে পৌঁছলাম। চারদিকে বেশকিছু চতুষ্পদ প্রাণীর কঙ্কাল পড়ে আছে। একটু দেখতেই বুঝলাম, এগুলো অন্য কোনও প্রাণীর নয়, চিতাবাঘের। তবে একটা নয়। বেশ কিছু চিতাবাঘের। কী ব্যাপার! এখানে কি কোনও দাবানল লেগেছিল! চারদিকের গাছ—মাটি দেখে তো অন্তত তা মনে হয় না। তাহলে কি আরও কোনও শক্তিশালী প্রাণীর শিকার হয়েছে এরা? কে জানে?
বেলা অনেক হয়ে গেছে। সবার খিদেও পেয়েছে খুব। তাই তাঁবুর উদ্দেশ্যে ফিরতে শুরু করলাম।
দুপুরে খাওয়াটা বেশ জব্বর হল। টার্কির রোস্ট হয়েছিল। খাওয়ার পরে বিশ্রাম না—নিয়ে আবার বেরিয়ে পড়লাম। একটু অন্যদিকে। সবাই খুব হতোদ্যম। বেরনোর আর উৎসাহ নেই, তাই একাই বেরোতে হল!
বনের মধ্যে দিয়ে ঘণ্টাখানেক হাঁটার পর একটা হথহর্ন গাছের তলায় বিশ্রাম নিতে বসলাম। গাছের সেই বিদঘুটে গন্ধটা মনকে কেমন অবসন্ন করে দিচ্ছে। বেঁচে থাকা বা না—থাকা, কাজ করা বা না—করা সবকিছুতেই কেমন যেন নির্লিপ্তি গড়ে উঠছে। জীবনকে সেই মুহূর্তে এতটাই অর্থহীন মনে হল। সে—গাছের তলাতে বসেই রইলাম।
বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। যখন ঘুম ভাঙল তখন সন্ধে হয়ে গেছে। অন্য সময় হলে হয়তো ভয় পেয়ে যেতাম। একা এই ঘন—বনে রাত কাটানো। কিন্তু তখন সেই ভয়ও নেই। রওনা হলাম তাঁবুর উদ্দেশ্যে। কিন্তু চাঁদের আলোতে এই বনবনানীর মধ্যে দিয়ে ঠিক পথ খুঁজে পেলাম না। ঘণ্টাখানেক এদিক—ওদিক ঘোরার পর বুঝলাম পথ হারিয়েছি। সকাল হবার আগে ফেরার চেষ্টা করা বৃথা।
ঘন জঙ্গলের মধ্যে রাত না—কাটিয়ে একটু খোলা জায়গায় থাকা ভালো। তারই সন্ধানে এগোতে গিয়ে মনে হল দূরে আলো দেখা যাচ্ছে।
খানিকক্ষণ এগোবার পরে যে—দৃশ্যটা দেখতে পেলাম তা লিখে বোঝানো মুশকিল। খানিকদূরে একটা লেক দেখা যাচ্ছে। আর সেই লেকের ধারে প্রায় জনা—তিরিশ লোক জড়ো হয়েছে। লোক বলাটা উচিত হল কিনা জানি না। প্রায় একলক্ষ বছর আগে পৃথিবীতে যেরকম গুহামানব ছিল বলে ধারণা করা হয়, সে—রকম। বিশাল—বিশাল লোমশ চেহারা। ঘাড় বলে কোনও বস্তু নেই। হাঁটু অবধি লম্বা হাত।
ওদের মধ্যে কোনও প্রতিযোগিতা জাতীয় কিছু হচ্ছে বলে মনে হল। বেশ কয়েকটা একইধরনের ছোট—ছোট কাঠ পাশাপাশি মাটিতে রাখা আছে। এক—এক করে জনাদশেক লোক এসে যে—যার মতো কাঠ নির্বাচন করল। এবার উলটে কাঠের অন্যদিক দেখতে লাগল। মনে হল কাঠের অন্যদিকে কিছু একটা চিহ্ন আছে। একজনকে হঠাৎ খুব আনন্দিত ও উত্তেজিত মনে হল। বোধহয় সেই ঠিক কাঠ নির্বাচন করে জিতেছে। একজন প্রধান—জাতীয় লোক এসে সেই লোকটার গলায় কাঠের টুকরো দিয়ে বোনা একটা মালা পরিয়ে দিল।
লেকের ধারে একজায়গায় বেশ কিছু কাঠ জড়ো করে চিতার মতো করা ছিল। লোকটা গিয়ে শুয়ে পড়ল তার ওপর। কয়েকটা লোক লতাপাতা দিয়ে লোকটাকে আষ্টেপৃষ্ঠে কাঠের সঙ্গে বাঁধল। আরও কিছু কাঠ—চাপানো হল। কী হতে চলেছে বুঝতে পারছি না। এবার একটা মেয়ে এসে ওই কাঠের উপর কী একটা তরল ছড়িয়ে চকমকি ঘষে আগুন লাগানোর চেষ্টা শুরু করল।
কী হতে চলেছে? পুরস্কার হিসেবে জীবন্ত আগুনে পোড়ানো হচ্ছে? এখানে কি তবে মৃত্যুটাই সবথেকে আকাঙ্ক্ষিত পুরস্কার?
এসব ভাবছি, ইতিমধ্যে আগুন জ্বলে উঠল। মেয়ে—পুরুষ সবাই মিলে সুর করে মন্ত্রজাতীয় কিছু একটা বলতে লাগল। তার মানে এরা একেবারে অনুন্নত নয়। এদের ভাষা আছে। হয়তো লিখতেও পারে। কারণ কাঠের উলটোদিকে কোনও একটা লেখা বা সংকেতজাতীয় কিছু একটা দেখেছিল নিশ্চয়ই।
মন্ত্র পড়া হয়ে গেলে ওরা সবাই গোল হয়ে আগুন ঘিরে বসল। কারওর মুখে কোনও কথা নেই। হাসি নেই। এ—এক অদ্ভুত সভা। আমিও যে কতক্ষণ বসেছিলাম কে জানে!
সকাল হতে ওই লোকগুলো উলটোদিকের বনে ঢুকে গেল। আমাকেও আশা করি ওরা দেখতে পেয়েছিল। কিন্তু সে—ব্যাপারে বিন্দুমাত্র আগ্রহ প্রকাশ করল না। মনে হল ওদের পিছু নিই। ওদের সম্বন্ধে আরও জানা দরকার। কিন্তু আশ্চর্য, উৎসাহ পেলাম না। মনে হল এখানেই বসে থাকি। আরও ঘণ্টাখানেক পরে জোর করে উঠে দাঁড়ালাম। খিদে পেয়েছে, ফিরতেই হবে।
ফিরতে—ফিরতে আরও একঘণ্টা হয়ে গেল। পরপর অনেকগুলো তাঁবু, আমাকে আসতে দেখেই ক্যাপ্টেন ফিৎজরয় একটা তাঁবু থেকে বেরিয়ে এল,—কাল রাতে কোথায় ছিলে? আমি প্রচণ্ড চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম। ভাবছিলাম তোমার অবস্থাও কেন, ডেভের মতো হল কিনা!
একটু থেমে ফিৎজরয় ফের বলে উঠল,—না, না এ—দ্বীপে আর নয়। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বেরিয়ে পড়ব। সবাই কিরকম নিস্তেজ হয়ে পড়েছে।
—কেন, ডেভের কী হয়েছে?
—শুধু কেন, ডেভ! কালকে সন্ধে থেকে তোমাকে নিয়ে সবসুদ্ধ আটজন নিখোঁজ। রাত আটটা নাগাদ তোমরা কেউ ফিরলে না—দেখে আমরা মশাল নিয়ে বেরোলাম। কালকে দুপুরে যেদিকে গিয়েছিলাম, সেদিকেই তোমাদের যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি বলে ওদিকে এগোলাম। কালকে আমরা যদ্দূর গিয়েছিলাম তার থেকে আরও ঘণ্টাখানেক এগিয়ে গেলাম। এখানকার পাহাড়টা বেশ ন্যাড়া, গাছ বেশ কমে এসেছে, তাই দূর থেকে হঠাৎ কেন আর ডেভকে দেখতে পেলাম। ওরা দুজনেই বিপজ্জনকভাবে পাহাড়ের প্রান্তের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ছুটে গিয়ে কেনকে ধরে ফেললেও, ডেভকে ধরতে পারিনি। তার আগেই নীচে ঝাঁপ দিয়েছে। ওর কোনও চিহ্নই নেই। খাড়া পাহাড়টার নীচের দিকে জঙ্গল। তারমধ্যে উপর থেকে কিছুই বোঝার উপায় নেই। কেন—এর তখনও ঘোর কাটেনি। বারবার বলে চলেছে, আমি মরতে চাই, আমি মরতে চাই। কালকের পর থেকে এখনও অবধি ওর ওই অবস্থা চলছে। ঘুমের ওষুধ খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে।
—আর ডেভ?
—আমরা পাহাড়ের থেকে নেমে ওই জঙ্গলের মধ্যে ঢুকলাম। ডেভের মৃতদেহ পেলাম না, তবে যা দেখলাম তা বিস্ময়কর। চারদিকে হাজার—হাজার কঙ্কাল ছড়িয়ে আছে। দেখেই বোঝা যায় এরাও প্রত্যেকে পাহাড়ের উপর থেকে ঝাঁপ দিয়েছে। কতধরনের প্রাণীর কঙ্কাল যে ছড়িয়ে আছে, তা বলে বোঝানো যাবে না। কিছু—কিছু কঙ্কাল তো আমার পরিচিত সব প্রাণীর থেকে অনেক বড় চেহারার প্রাণীর বলে মনে হল। মনে হল ওই জায়গাটা সবাই সুইসাইড—স্পট হিসেবে ব্যবহার করে। ওখান থেকে আমরা সোজা ফিরে এলাম। রাত অনেক হয়ে গেছিল। সবাই ক্লান্ত, অবসন্ন, মন খারাপ। বাকিদের খোঁজ এখনও পাইনি।... তা তোমার কী খবর?
আমিও আমার রাতের অভিজ্ঞতা ফিৎজরয়কে খুলে বললাম।
—আমার মনে হয় এ—দ্বীপের পরিবেশে এমন কিছু আছে, যার জন্য এই দ্বীপের জীবজন্তুদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা খুব বেশি। হয়তো তারা বেঁচে থাকার আগ্রহই হারিয়ে ফেলে। আরেকটা জিনিসও লক্ষ্য করার মতন। এ—দ্বীপের গাছ, পশুপাখি পৃথিবীর বাকি যে—কোনও জায়গার থেকে একদম অন্যরকম। আমার মনে হয় এ—দ্বীপে বেশ কিছুদিন থেকে এখানকার জীবজন্তুদের স্টাডি করা দরকার।
আমার কথা থামিয়ে ক্যাপ্টেন অসহিষ্ণুভাবে বলে উঠল,—ডারউইন, তোমার মতো শুধু গবেষণা করতে আমি আসিনি। আমার দায়িত্ব হচ্ছে আমার সহযাত্রীদের সাবধানে দেশে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া। আর তাই আমার ইচ্ছে কালকেই এ—দ্বীপ ছেড়ে বেরিয়ে পড়ব। কাল সকালেই। সবাইকে আমি এই দ্বীপে হারাতে চাই না।
ক্যাপ্টেনের সঙ্গে কথা বলার পরে আমরা বাকি পাঁচজনের খোঁজে বেরলাম। দ্বীপের বেশ কিছু জায়গা একেবারে দুর্গম। দিনের শেষে আমরা যখন ফিরে এলাম তখন ওই পাঁচজনের খোঁজ তো পাওয়া যায়ইনি, উলটে আরেকজন খালাসিকেও শুনলাম সকাল থেকে পাওয়া যাচ্ছে না। সে—ও নিখোঁজ।
সত্যিই এ অভিশপ্ত দ্বীপে আর থাকা উচিত হবে না। অন্তত সব সহযাত্রীদের ঝিমিয়ে পড়া অবস্থা দেখে তাই মনে হচ্ছে।
অক্টোবর ৬, সকাল দশটা
আর কয়েকঘণ্টার মধ্যেই আমরা ভাল পারেসোতে পৌঁছে যাব। অদ্ভুত ব্যাপার। দ্বীপ ছাড়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আবার সবার মধ্যে সেই নির্জীব ভাবটা কেটে গেছে। আমারও। মনে হচ্ছে জীবনটা কত মূল্যবান। তবে ওই দ্বীপের কথা এখনও মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। গত কয়েকদিনের কথা সবার কাছ থেকে লুকিয়ে রাখা যাবে কিনা জানি না। দেশে ফিরে ওই দ্বীপের কথা বললে, জানাজানি হয়ে গেলে অনেকেই সে—কথার সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলবে।
জীবজগতের মধ্যে পরিবেশের সঙ্গে খাপ—খাওয়ানোর জন্য যুগ—যুগ ধরে পরিবর্তন হয়। এই পরিবর্তন জীবের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য আবশ্যক। পরিবেশের সঙ্গে সেভাবে খাপ খাওয়াতে না পারলে সেই জীব হারিয়ে যায়, বিলুপ্ত হয়। খালি শক্তিমানেরাই টিকে যায়। কিন্তু এই দ্বীপ সবদিক দিয়েই ব্যতিক্রম। তার কারণ এ—দ্বীপের প্রত্যেকটা জীব—মৃত্যুর জন্য উন্মুখ হয়ে অপেক্ষা করে। অভিশপ্ত জীবন তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যাক এই কামনা করে। তাই কোনও জীবনসংগ্রাম নেই, কোনও প্রতিযোগিতা নেই, লড়ে বেঁচে থাকার তাগিদ নেই। এ—ধরনের পরিবেশে কি দরকার অভিযোজনের? কি দরকার পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর? এখানে তাই শক্তিমানেরা হারিয়ে যায়। তারা আত্মঘাতী হয়। পড়ে থাকে তারাই যারা দুর্বল, যারা নিরীহ। যেমন আমার হাতে ধরা এই শজারুটা, আমাদের সেই প্রথম দিনের বন্ধু।