হুপ্পোকে নিয়ে গপ্পো

শৈলেন ঘোষ

ঝুমকির বাঁদরের নাম হুপ্পো

অনেক, অনেকদিন আগে ঝুমকি বলে একটি মেয়ে ছিল। সেই ছোট্ট মেয়ে ঝুমকির ছিল ছোট্ট একটা বাঁদরছানা। তার নাম হুপ্পো।

বাবাকে বলে একটা ছোট্ট ঘর করে দিয়েছিল ঝুমকি হুপ্পোর জন্যে। মাকে বলে দুটো প্যান্ট আর দুটো জামা তৈরি করে দিয়েছিল হুপ্পোর পরার জন্যে। বয়ে গেছে পরতে। এমন দুষ্টু, গায়ে রাখলে তবে তো! প্যান্ট ছিঁড়ে ফর্দাফাঁই। জামা ছিঁড়ে টুকরো-টুকরো। বলো, আদুল গায়ে দেখলে কী বিচ্ছিরি লাগে! কী লজ্জাই না করে ঝুমকির! তার ওপর হুপ্পো নিজের ঘরে যে একদণ্ড থাকবে, তা-ও না। শোবার সময় ঝুমকির পাশে এসে শোবে। খাবার সময় ঝুমকির সঙ্গে বসে খাবে। ঝুমকি যখন পড়বে, ও অমনি ঝুমকির কাছে এসে বসবে। বসুক, তাতে ক্ষতি নেই। কিন্তু ওই যে, এসেই হাত নিশপিশ। একবার বইটা টানছে। ঝুমকি যেই কেড়ে নিল, অমনি খাতাটা টানল। পেনসিলটা মুখে পুরে দিল। কলমটা নিয়ে খাতায় হিজিবিজি কেটে দিল। দু-দণ্ড যে চুপটি করে বসবে, সেটি ধাতে সয় না। ভারি রাগ ধরে ঝুমকির। একদিন ঠাস করে চড় বসিয়ে দিয়েছিল হুপ্পোর গালে। ওমা! চড় খেয়ে বাঁদরের একটুও লজ্জা নেই! কিন্তু ঝুমকির মন যে খারাপ হয়নি, সে-কথা কেউ বলবে না। বাঁদরটা যতই বাঁদরামি করুক, আহা! ঝুমকি যে তাকে খুব ভালোবাসে!

ঝুমকির বাবার গানবাজনার খুব শখ। ঝুমকিও গান গাইতে পারে। গানও গাইতে পারে, নাচতেও পারে। বাবা যখনই পিয়ানো বাজিয়ে গান গাইবে, ঝুমকি হুপ্পোকে কোলে নিয়ে বাবার পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গুনগুন করবে! তখন ঝুমকির মুখের দিকে কেমন জুলজুল করে চেয়ে থাকে হুপ্পো! মুখ দেখলে মনে হবে, ওরও গলা খুসখুস করছে। পায় তো পিয়ানো বাজিয়ে সে-ও গান করে।

পিয়ানো ছাড়া ঝুমকির বাবার আর ছিল জলতরঙ্গ। অনেকগুলি ছোট্ট ছোট্ট বাটিতে জল ভরতি করে বাবা যখন দুটো ছোট্ট কাঠি নিয়ে, এপাশ থেকে ওপাশে হাত নাচিয়ে নাচিয়ে জলতরঙ্গ বাজাত আর জলতরঙ্গের মিষ্টিমিষ্টি সুরগুলো টুং টুং করে লাফিয়ে লাফিয়ে হুপ্পোর কানের ভেতর ঢুকে পড়ত, তখন ভারি মজা লাগত হুপ্পোর। হুপ্পো ভাবত, টুং টুং শব্দগুলো কানের ভেতর গিয়ে কোথায় থাকে? নিশ্চয়ই কানের ভেতর ঘরদোর আছে! ও ভাবে, দেখ, জলতরঙ্গের শব্দগুলো যদি টুং টুং না-বেজে ঝুমকির পায়ের নূপুরগুলো ঝুনঝুন করে বাজে, তবুও সেগুলো কানের ভেতর ঢুকে পড়ে। আবার নূপুরের ঝুনঝুন শব্দগুলো ঝুনঝুন না-বেজে যদি পিয়ানোটা টুনটুন করে বেজে ওঠে, সেগুলোও কানের ভেতর লুকিয়ে পড়ে। আবার যখন হুপ্পো খুব দুষ্টুমি করে আর ঝুমকি চেঁচিয়ে বলে, 'মা, দেখো, হুপ্পো কী করছে' সেই মিহি মিহি রাগরাগ চ্যাঁচানিটাও কেমন চটপট কানের ভেতর সেঁধিয়ে যায়! বাবা! তাহলে কানের ভেতর কতগুলো ঘর!ে তবে হ্যাঁ, বাজনার শব্দগুলো যেমন মিষ্টি মিষ্টি, শুনলে আনন্দ লাগে খুব, বকুনি খেলে কিন্তু ঠিক উলটো। কানে ঢুকলেই বুক দুরুদুরু! হুপ্পোর বড্ড ইচ্ছে, শব্দগুলোকে হাতের মুঠোয় ধরে রাখে। কিন্তু দেখতেই পায় না তো ধরবে কী করে! অন্তত বকুনিটাকে একবার যদি ধরতে পারে হুপ্পো!

অবিশ্যি এই শব্দ ধরার মতলবটা যে তার মাথায় অনেকদিন থেকেই ঘুরঘুর করছিল, তা কিন্তু ওর মুখ দেখে বোঝাই যায়নি। হয়েছে কী, সেদিন মা ঘরকন্নার কাজ সেরে দুপুরবেলা শুয়েছে। বামুনঠাকুর পান চিবুতে চিবুতে ছেলেকে চিঠি লিখছে দেশে। ঝুমকি ইস্কুলে, বাবা অফিসে। হুপ্পো তখন এই নিজঝুম দুপুরে বাবার যে-ঘরে পিয়ানো আছে, লুকিয়ে লুকিয়ে সে-ঘরে ঢুকে পড়েছে। ঘরে ঢুকেই হুপ্পো দরজা-জানলাগুলো আঁট আঁট করে ভেজিয়ে দিল। সোফায় একটা বালিশ ছিল। খামচে খামচে ছিঁড়ে তার ভেতর থেকে খানিকটা তুলো বার করে নিল। তুলোটা কানে গুঁজতে গুঁজতে নিজের মনে ভাবতে লাগল, ঘরের দরজা বন্ধ করে দিলে যদি বাইরের শব্দ ঢুকতে না পায়, তা হলে কানের দরজা বন্ধ করলেও বাজনার শব্দগুলো কানে ঢুকতে পারবে না। ঘরের মধ্যেই থাকবে। তখন ও ঠিক হাতের মুঠোয় শব্দগুলোকে ধরে ফেলতে পারবে!

জলতরঙ্গের জলভরতি বাটিগুলো ঘরের একদিকে সাজানোই আছে। বাবা কাল রাত্তিরে বাজিয়েছে, আর গুছিয়ে রাখেনি। হুপ্পো কাঠি দুটো নিয়ে প্রথমে জলতরঙ্গটাই বাজাতে শুরু করে দিল, টুং টুং, টুং টুং। খুব বাজাও। কিন্তু মুশকিল কী, বাজনা ঠিকই বাজছে, শব্দটা হুপ্পোর তুলো-চাপা কানে চাপা চাপা ভেসেও আসছে, কিন্তু যার জন্যে এত কাণ্ড সেই শব্দ তো কোথাও দেখা যাচ্ছে না। তখন হুপ্পো খুব জোরে জোরে বাজাতে শুরু করে দিল, টুং টুং টুং, ট্যাং ট্যাং ট্যাং। কোথায় শব্দ! দেখাই গেল না। আচ্ছা, তবে এবার পিয়ানোটা বাজিয়ে দেখা যাক।

জলতরঙ্গ ছেড়ে এবার পিয়ানোর ঘাড়ে লাফিয়ে বসল হুপ্পো। শুরু হয়ে গেল, টুটুন টুটুন, টিনি টিনি, টুরু নুন। যে-কে সে-ই! এবারও শব্দের টিকিটি পর্যন্ত দেখতে পেল না হুপ্পো! হুপ্পো ভাবল, তাই তো! তাহলে ব্যাপারটা কী! হঠাৎ ঝুমকির নাচের নূপুর দুটো নজরে পড়ল। দেওয়ালে টাঙানো। যেমন নজরে পড়া, অমনি ইচ্ছে হল পায়ে পরতে। পিয়ানোর ওপর দাঁড়িয়ে, হাত বাড়াতেই একেবারে নাগালে। তারপর পায়ে বেঁধে নাচ শুরু করে দিল, ঝুমুর-ঝুমুর, ঝুম-ঝুম-ঝুম। ওঃ! বাঁদরের সে কী নাচের বহর! হাত ঘুরিয়ে, ঝুম-ঝুম-ঝুম। গা দুলিয়ে, ঝুম-ঝুম-ঝুম। কোমর বেঁকিয়ে, ঝুম-ঝুম-ঝুম। পিয়ানোর ওপর লাফিয়ে লাফিয়ে, ঝুম-ঝুম-ঝুম। পিয়ানো ছেড়ে টেবিলের ওপর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে, ঝুম-ঝুম-ঝুম। নাচছে তো নাচছেই। তারপর টেবিল থেকে মাটিতে মেরেছে এক লাফ। যা! সববনাশ হয়ে গেছে! লাফিয়েছে কী, একেবারে হুড়মুড় করে পড়ে গেছে জলতরঙ্গের বাটিগুলোর ওপর। ঝুন-ঝান, ঠুন-ঠান, ঝন-ঝন-ঝনাৎ করে বাটি ছিটকে-গড়িয়ে ভেঙে টুকরো টুকরো। জল ছিটকে-ছড়িয়ে ঘর একেবারে নৈরেকার!

এত জোরে শব্দ হয়েছে, মা ওঘর থেকে শুয়ে শুয়েও শুনতে পেয়েছে। সবে একটু তন্দ্রা এসেছিল। একেবারে ধড়ফড়িয়ে উঠে পড়েছে মা। 'কে রে, ওঘরে কে ঢুকেছে?' হন্তদন্ত হয়ে মা ছুটে এসে দেখে, ঘরের দরজা বন্ধ। অবিশ্যি ভেজানো তো, ঠেলা দিতেই খুলে গেল। 'ওমা!' দরজা খুলেই চমকে উঠেছে মা। 'যাঃ! জলতরঙ্গের বাটিগুলো ভেঙে খানখান করেছে বাঁদরটা!'

মাকে দেখেই এক লাফে হুপ্পো খাটের নীচে। আর খাটের নীচে! মা খাটের নীচে উঁকি মেরে চিলের মতো চেঁচিয়ে উঠল, 'হতচ্ছাড়া বাঁদর, আয় আয়, বেরিয়ে আয়!'

বললেই তো আর হুপ্পো বেরোচ্ছে না।

মা আবার ডাকল, 'আয় বলছি!'

হুপ্পো সিঁটিয়ে খাটের কোণে ঢুকে পড়ল।

'যাচ্ছিস কোথা! পায়ে নূপুর পরে তোর নাচা বার করছি। আগে তোর ঠ্যাং ভাঙব, তবে অন্য কথা,' বলে মা খাটের নীচে মাথা গলিয়ে দিল। হাত বাড়াতেই মা হুপ্পোর ল্যাজটা ধরে ফেলেছে। তারপর হিড়হিড় করে এক টান। হুপ্পো কিচমিচ করে চেঁচিয়ে উঠল। ভীষণ লেগেছে!

হাতের কাছে কিছু না পেয়ে মা জলতরঙ্গের কাঠি দিয়েই হুপ্পোর পিঠে পটাপট লাগিয়ে দিল ক-ঘা। 'দূর হয়ে যা, দূর হয়ে যা হতচ্ছাড়া বাঁদর,' বলে ধমকাতে ধমকাতে কান দুটো ধরে বাইরে টেনে ছিটকে ফেলে দিল মা হুপ্পোকে। পায়ের নূপুর দুটো তো আর তেমন আঁটসাঁট করে বাঁধা হয়নি। তাই বাঁ-পায়ের নূপুরটা খুলেই গেল। একপায়ে নূপুর পরেই হুপ্পো ওখান থেকে মারল টেনে এক লাফ। তারপর ছুট? ছুটতে ছুটতে পগারপার!

না, ঝুমকি যখন বিকেলবেলা ইস্কুল থেকে ফিরল, তখনও হুপ্পো আসেনি।

বাবা যখন সন্ধেবেলা অফিস থেকে ঘরে এল, তখনও হুপ্পো ফেরেনি।

হুপ্পোর জন্যে ঝুমকির ভারি মন খারাপ। সত্যি, বাঁদরটা গেল কোথা? যতই দুষ্টুমি করুক, যতই কথা না-শুনুক, তবু বড্ড ভালোবাসে ঝুমকি হুপ্পোকে। ঝুমকি ভাবল, মায়ের হাতে মার খেয়ে হয়তো হুপ্পো চিরদিনের মতো চলেই গেল। আর হয়তো ফিরবে না, কোনোদিন না। চোখ দুটি ছলছলিয়ে উঠল ঝুমকির।

পরেরদিন খুব সকালে ঘুম ভেঙে গেছল ঝুমকির। রোদের আলো আকাশে তখনও ছড়িয়ে পড়েনি। শুধু পুব-আকাশে রঙের আবির যেন গুঁড়িয়ে গুঁড়িয়ে রঙিন ছবি এঁকে দিচ্ছে! কিন্তু ঝুমকির মন সে-রঙে রাঙছে না। হুপ্পোর কথাই খালি মনে পড়ছে। চোখ দুটি ভিজে ভিজে টুলটুল করছে।

ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে এল ঝুমকি। উঠোনের ওই কোণটা হুপ্পোর ঘর। চোখ দুটি একবার সেদিকে ফিরে চাইল। তারপর হঠাৎ যেন চোখের পাতা দুটি চমকে উঠল! ওই ঘরের সামনে কী যেন পড়ে আছে! ওমা! ও যে হুপ্পো! একেবারে পড়ি মড়ি করে ছুটে গেল ঝুমকি। হুপ্পোকে দু-হাত দিয়ে মাটি থেকে তুলে নিল। একপায়ে একটি নূপুর তখনও হুপ্পো পরে আছে। তুলতেই নূপুরটি বেজে উঠল। হুপ্পো ঘুমোচ্ছিল। চমকে উঠেছে। তারপর ঝুমকির গলা জড়িয়ে ধরেছে।

ঝুমকি খুশিতে খলখল করে হেসে উঠেছে। বলল, 'দুষ্টু, দুষ্টু কোথাকার! সারারাত কোথায় ছিলি? আমি এদিকে ভেবে ভেবে মরি!'

হুপ্পো ঝুমকির মুখের দিকে দুষ্টু-দুষ্টু চোখে চাইল খালি।

'ও মা,' চেঁচিয়ে মাকে ডাক দিল ঝুমকি। 'ও মা, দেখো, হুপ্পো এসেছে।'

মাকে ডাকতেই হুপ্পো ভয়ে কুঁচকে গেছে। ছটফট করে উঠল হুপ্পো। এইরে, মা যদি আবার মারে!

না, ঝুমকির কোলে হুপ্পো যতক্ষণ থাকবে, কিছু ভয় নেই তার, কিচ্ছু না।

হুপ্পো আর হাঁসছানার ডিগবাজি

ঝুমকিদের বাড়ির পেছনদিকে একটা পুকুর। পুকুর যে আছে, এটা হুপ্পো ঝুমকির মুখে আগেই শুনেছে। কিন্তু বাড়ির পেছনদিকে তো আর যেতে পারে না হুপ্পো। বারণ। ওদিকে ময়লা-জঞ্জাল! গেলেই এমন বকাবকি করে ঝুমকি। বলে, 'মা রাগ করবে।'

হুপ্পো মনে মনে ভাবে, মায়ের আর কী! মা তো একটুতেই তিরিক্ষি! মায়ের কিছু দেখতেও ইচ্ছে করে না, ঘুরতেও শখ যায় না! একদম কুনো। হোক না বাঁদর, তারও তো সাধ-আহ্লাদ থাকতে পারে! সে-কথাটা কেউ বোঝে না। শুধু দুটি খাও আর ঘুমাও। ভাল্লাগে? তাই তক্কে-তক্কেই ছিল হুপ্পো। সময় এলেই একবার বাড়ির পেছন দিকটাতে কী আছে, ভালো করে দেখে আসবে।

কিন্তু সুযোগটা যে অমন চট করে এসে যাবে, সে-কথা হুপ্পো একদম ভাবতেই পারেনি। সেদিন দুপুরবেলা বাসনওয়ালা যাচ্ছিল সদর রাস্তা দিয়ে ঢং ঢং করে কাঁসার থালা বাজিয়ে। হাঁকছিল, 'কাঁসার থালা-বাসন চাই-ই-ই।'

মা বামুনঠাকুরকে ডেকে বলল, 'ও ঠাকুর, ও ঠাকুর, বাসনওয়ালাকে ডাকো তো।'

বাসনওয়ালা ঘরের দোরগোড়ায় এসে বাসনের ঝাঁকাটা খুলে বসল, আর মা 'এটা কী দাম, ওটা কী দাম' শুরু করে দিল। হুপ্পো ভাবল, বারে-বা, এই তো সুযোগ! মা এখন বাসন সওদা করতে ব্যস্ত। এই তালে তো টুক করে বাড়ির পেছনটা ঘুরে আসতে পারে সে!

যেমন ভাবা তেমনি কাজ। হুপ্পোর তো আর বেশি সময় লাগে না। এক লাফে এ-ঘর পেরিয়ে পেছনের উঠোন। উঠোন থেকে আর এক লাফে পাঁচিলের ওপর।

পাঁচিলে বসে বসে হুপ্পোর মনে হল, মোটেই ছোট্ট না পুকুরটা। বেশ বড়োই। জলটাও বেশ পরিষ্কার ঝকঝকে। পুকুরের পাড়ে, সামনের দিকে খুব ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া দুটো বটগাছ। আর ডানদিকে একটা তেঁতুলগাছ। পুকুরটার ওই ওপারে একটা রাস্তা সিধে চলে গেছে। দুপুরবেলা চারদিক নিজঝুম। শুধু সামনের বাড়ির ছাদে একটা লালপাড় কাপড় শুকোচ্ছে আর দূরে ওই বাড়িটার জানলায় হেলান দিয়ে কাদের যেন বউ বই পড়ছে, একমনে।

হঠাৎ প্যাঁক-প্যাঁক করে একটা হাঁসছানা পুকুরের জলে নেমে পড়ল। গলাটা হেলিয়ে-দুলিয়ে সাঁতার কাটতে শুরু করে দিল। চারদিক নিজঝুম বলে হাঁসের ডাক হুপ্পোর কানে পৌঁছোতে একটুও দেরি লাগল না। ওর চোখ দুটো চটপট ঘুরে গেল। হাঁসছানা জলে ডিগবাজি মারছে আর কী যেন খাচ্ছে। হুপ্পো ভাবলে, যাঃ বাবা! জলের ভেতর ডিগবাজি মারলেই খাবার! বেড়ে মজা তো! হুপ্পোর একটা ব্যাপারে ভারি মুশকিল। কাউকে খেতে দেখলেই ওর খিদে পেয়ে যায়! ঝুমকির বাবা যখন অফিস যাবে, বাবা খেতে বসলেই হুপ্পোর খিদে পেয়ে যাবে। ঝুমকি ইস্কুলে যাবার আগে ভাত খেতে বসলেই হুপ্পোর মনটাও খাই খাই করে উঠবে। তবে মা খেতে বসলে, হুপ্পো তার ধারে-কাছেও যাবে না। শুধুমুধু কানমলা খেতে কার ইচ্ছে যায় বল? তা ছাড়া যেদিন মা কান মলে দেয় উঃ, এমন টান দেবে যে মাথাশুদ্ধু ঝনঝন করে উঠবে।

অবিশ্যি হাঁসছানার জলের তলে ডুবে ডুবে খাওয়ার বহর দেখার চাইতেও, জলের মধ্যে হাঁসের ডিগবাজি খাওয়াটা দেখতে হুপ্পোর আরও ভালো লাগছিল। ওইটুকু পুঁচকে একটা ছানা-ছানা হাঁস কেমন পেট উলটে ছলাৎ ছলাৎ করে জলের ভেতর চাকার মতো ঘুরে যাচ্ছে। হুপ্পোও ডিগবাজি মারতে পারে। তবে সে তো শূন্যে। শূন্যে ডিগবাজি খেয়ে কোনো লাভ নেই। জলের ভেতর যদি ও একবার ডিগবাজি মারতে পারে, তাহলে খুব মজা! কিন্তু মারবে কেমন করে? জলের ভেতর ডিগবাজি মারতে তো সে জানেই না।

হুপ্পো মনে মনে ভাবল, আচ্ছা, হাঁসছানাটা তো তাকে শিখিয়ে দিতে পারে? কিন্তু মুশকিল কী, ছানাটা যদি একবার তাকে দেখতে পায়, তাহলে শিখিয়ে দেওয়া দূরে থাক, দেখলেই পালাবে।

তবে কী করা যায়!

হুপ্পো ভাবল, আগে হাঁসটার সঙ্গে তো ভাব করা যাক!

একটুখানি এদিক-ওদিক চোখ ফিরিয়ে দেখে নিল হুপ্পো। না, কাছে পিঠে কেউ নেই। তারপর পাঁচিলের ওপর থেকে তেঁতুলগাছে মারল লাফ। গাছের ডালপালা নড়ে উঠতেই শুকনো পাতাগুলো ঝুরঝুর করে ঝরে পড়ল। হাঁসছানাটা জলের ওপর দুলতে দুলতে, থমকে থেমে, গাছের দিকে চেয়ে দেখল। ওমা! একটা বাঁদরছানা! তার দিকে চেয়ে চেয়ে হাসছে! আহা! থ্যাবড়া মুখে কী হাসি দেখো! যেমন মুখের ছিরি, তেমনি হাসির ছিরি! দেখেই, হাঁসছানাটা মুখ বেঁকিয়ে চোখ সরিয়ে নিল। পেছন ঘুরে আবার তিরি তিরি করে জলের বুকে সাঁতার দিল। মনে মনে ভাবল, কী অসভ্য বাঁদর, ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে চেয়ে কেমন হাসছে! বেহায়া!

হাঁসছানাটা পেছন ফিরে সরে যেতেই, হুপ্পো তার হাসি মুখে আরেকটু হাসি মাখিয়ে আদুরেগলায় ডাকল, 'এই হাঁসছানা!'

হাঁসছানা শুনেও সাড়া দিল না। নিজের মনে সাঁতার কাটতে লাগল, ডিগবাজি মারতে লাগল আর ঠোঁট নেড়ে নেড়ে খাবার খেতে লাগল। বাঁদর ডাকছে তো ডাকছে, শুনতে বয়েই গেছে।

সাড়া না-পেয়ে হুপ্পো ভাবল, ছানাটা বোধ হয় শুনতে পায়নি। তাই, এবার গলাটা ঝেড়েঝুড়ে, মিঠে সুরে, জোরেই ডাকল, 'ও হাঁসছানা!'

উঁঃ! সেফটিপিনের মতো চিনচিনে গলা করে কেমন ডাকছে দেখো! গা জ্বলে যায়! মনে মনে রেগে গেল হাঁসছানাটা। সে এতক্ষণ তিরি তিরি করে সাঁতার কাটছিল। এবার রেগেমেগে তুরু তুরু করে জল ঠেলতে লাগল। গ্রাহ্যই করল না হুপ্পোকে।

হুপ্পো ভাবল, বারে-বা! এত করে ডাকছি, হাঁসটা কথা কানেই নিচ্ছে না! কী রে বাবা, কানে খাটো নাকি! তাই হুপ্পো এবার তেঁতুলগাছে ল্যাজ জড়িয়ে ঝুপ করে ঝুলে পড়ল। আরি ব্যস! বাঁদরের কী কেরামতি! হাত-পা, বুক-পেট, মাথা-মুণ্ডু সব একসঙ্গে গোঁত্তা মেরে জলের দিকে ঝুলে ঝুলে দুলছে! ঝুলতে ঝুলতে হুপ্পো এবার আরও জোরে চেঁচিয়ে উঠল, 'এই হাঁসছানা-আ-আ!'

হাঁসছানাটা এবার ঘাড় ফিরিয়ে বাঁদরছানার দিকে তুরু তুরু সাঁতার কাটতে কাটতে তেড়েমেড়ে এগিয়ে এল। বলল, 'আ গেল! অমন ত্যাঁদড়ের মতো চ্যাঁচাচ্ছিস কেন রে বাঁদরটা!'

বাঁদরটা বলল, 'আমি বাঁদরটা নই, বাঁদরটা নই।'

হাঁসটা বলল, 'বাঁদরটা, বাঁদরটা নয় তো কী বাঁদরটা সিংগিটা? ইস কী আদরটা!'

বাঁদরটা বলল, 'আমি সিংগিটাও নই, শেরটাও নই, ভালুকটাও নই, শ্যালটাও নই। আমি হুপ্পোটা।'

বাঁদরের কথা শুনে, 'প্যাঁক-প্যাঁক' করে হাসতে হাসতে হাঁসছানাটা জলের ওপর চিতপাত। তাই দেখে হুপ্পো হাঁদা! কাজ নেই, কম্ম নেই, হাঁসটা হাসে কেন?

হুপ্পো একটু অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করল, 'হাসছিস কেন রে হাঁসছানা?'

হাসতে হাসতে হাসিটা থমকে গেল হাঁসছানার। মুখখানা কেমন ভে^ংচি-কাটা ভে^ংচি-কাটা করে বলল, 'এই বাঁদরটা, আমাকে হাঁসছানা বলছিস কেন রে?'

হুপ্পো বলল, 'সে আবার কী কথা! হাঁসছানাটা হাঁসছানা নয়তো, হাঁসছানাটা কীসের ছানা?'

'আমার নাম বেগনি।'

এতক্ষণ ধড়ঝোলা হয়েছিল হুপ্পো। বেগনি নামটা শুনে তিড়িং করে লাফিয়ে, বেদম হেসে উঠল। হাসতে হাসতে বলল, 'বেগনি আবার কী ধরনের নাম? বেগনি তো মুড়ি দিয়ে খায়!'

'খায় তো খায়! ফুসকুড়ি কোথাকার!' রেগে মুখ ঝামটা দিয়ে উঠল হাঁসছানাটা।

ফুসকুড়ি বলতেই হুপ্পো চটিতং! গাছ থেকে মাটিতে লাফ দিয়ে একেবারে তেড়েমেড়ে চেঁচিয়ে উঠল, 'এই বেগনি, আমায় ফুসকুড়ি বললি কেন রে! আমি ফুসকুড়ি তো তুই ছোলাভাজা।'

ছোলাভাজা বলতে বেগনিও রেগে আগুন, তেলে-বেগুন। প্যাঁক-প্যাঁক স্বরে খেঁকিয়ে বলল, 'আমি ছোলাভাজা তো তুই গুড়-মুড়ি।'

হুপ্পোও ছাড়বে না। বলল, 'তুই ডুগি-তবলা!'

'তুই সরষের তেল!'

'তুই ফ্যান-ভাতে!'

'তুই তেঁতুলবিচি!'

'তুই লাউডগা!' বলেই হুপ্পো থমকে গেছে। ভাবল, যাঃ! কাজের কাজ কিছু হল না, মধ্যিখান থেকে বেগনির সঙ্গে ঝগড়া করে ফেলল! এখন জলের মধ্যে ডিগবাজিটা শেখা হবে কী করে? ভেবেই হুপ্পো রাগ-রাগ মুখখানা চটপট ঠান্ডা-ঠান্ডা করে ফেলল। ঠোঁটে আধো আধো হাসি বুলিয়ে বলল, 'এই দেখ! শুধুমুধু কথা বাড়িয়ে আমরা ঝগড়া করছি! যাকগে, যাকগে! আসলে আমি তোর সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে এলুম, করতে এসে ঝগড়া করে বসলুম!'

বেগনি ঠোঁট উলটে ভে^ংচি কেটে বলল, 'উঁ! আমার আর খেয়েদেয়ে কাজ নেই, বাঁদরের সঙ্গে বন্ধুত্ব করবে!'

হুপ্পো এবার একদম চটল না। বলল, 'বেগনি, বেগনি, কথা বাড়ালেই বেড়ে চলে, শেষ হয় না। বন্ধুত্বটা পাতিয়ে ফেললে ঝগড়াটা এক্ষুনি শেষ হয়!'

বেগনি বলল, 'খুব হয়েছে! ঘরের ছেলে ঘরে যা! তোর সঙ্গে আর বন্ধুত্ব পাতিয়ে কাজ নেই আমার!'

হুপ্পো বলল, 'আহা রাগ করছিস কেন বেগনি, আমি কী তোর পর? বলে বেগনির মুখের দিকে একদৃষ্টে তাকাল হুপ্পো। তাকিয়ে এবার আমতা আমতা করে বলল, 'বেগনি, বেগনি, আমায় জলের মধ্যে ডিগবাজি খেতে শিখিয়ে দিবি?'

'ডিগবাজি খেতে শিখিয়ে দিবি!' বলে ঠোঁট উলটে ভে^ংচি কেটে দিল বেগনি। 'আহ্লাদেপনা দেখো!' বলে তরতর করে ডাঙায় উঠতে গেছে যেই, হুপ্পো অমনি ছুট্টে তার দিকে গেছে। বেগনি ভয়ে-ময়ে আবার জলের ওপর লাফিয়ে পড়েছে!

বেগনি সাঁতার কেটে পুকুরের আর একদিকে যেতে যেতে বলল, 'না, না, আমি ডিগবাজি-টিগবাজি শেখাতে পারব না।'

বেগনি যেদিকে গেল, হুপ্পোও সেদিকে ছুট দিল। বলল, শিখিয়ে দে, নইলে আমিও তোকে ডাঙায় উঠতে দেব না।'

'না, দিবি না!' বলে বেগনি ঝিলিকিচি করে পুকুরের আর এক কোণে সাঁতরে গেল। ভাবল, ওইখান দিয়েই ডাঙায় উঠবে।

হুপ্পোও সঙ্গে সঙ্গে ছুটে গেল ওই কোণে। বেগনির ওঠা হল না।

আবার আর একেদিকে গেল বেগনি।

হুপ্পোও গেল। তারপর হাঁসে আর বাঁদরে জলে-ডাঙায় চোর-পুলিশ খেলা শুরু হয়ে গেল।

হুপ্পো চ্যাঁচায় আর লাফায়, 'ছাড়ব না, ছাড়ব না।'

বেগনি রাগে আর হাঁকে, 'মারব তোকে!'

বেগনি ওদিক যায়, তো হুপ্পোও ওদিক ছোটে। বেগনি এপার আসে, তো হুপ্পোও এদিকে লাফায়!

শেষে হয়েছে কী, একটা নেড়িকুত্তা দেখতে পেয়েছে হুপ্পোটাকে। দেখতে পেয়ে, তেড়ে এসে হুপ্পোর পেছনে এমন আচমকা 'ঘেউ ঘেউ' করে ডেকে উঠল যে, হুপ্পো থতমত খেয়ে, পা ফসকে একেবারে পুকুরের জলে। পড়েই হাবুডুবু খেতে শুরু করে দিল। তাই দেখে কুকুরটাও দিল ঝাঁপ। হুপ্পোও প্রাণের ভয়ে সাঁতার কাটতে শুরু করে দিল। সাঁতরে সাঁতরে পালাতে লাগল। হাঁসছানাটা সামনে সামনে সাঁতার কাটে প্যাঁক-প্যাঁক করে। পেছন পেছন হুপ্পো ছোটে কিচমিচ করে। সব পেছনে কুকুর ডাকে ঘেউ ঘেউ করে। জলের ওপর হাঁসে-পুÅকুরে, বাঁদর-কুকুরে সে এক তোলপাড় কাণ্ড!

হাঁসছানাটা ডাকতে ডাকতে ফাঁক পেয়ে ডাঙায় উঠে পড়ল। উঠেই ছুট।

হাঁসকে ছুটতে দেখে হুপ্পোও জল থেকে উঠে পড়ে হাঁসের পেছনে তিড়িড়িং, ত্যাড়াড়াং করে লাফ দিল।

ডাঙার ওপর বাঁদরকে লাফাতে দেখে, কুকুরটাও জল ছেড়ে উঠে পড়েছে। ঘেউ ঘেউ করে ডাকতে ডাকতে পাড়া মাত করল।

হুপ্পো চোখ-কান বুজে দে ছুট, দে ছুট।

কুকুরও ছাড়বে না। সে-ও ছুটতে ছুটতে চেঁচাল, 'ঘেউ, ঘেউ, ঘেউ, ঘেউ!'

আর দেখতে নেই! একটা কুকুরের ডাক শুনে অমন পঞ্চাশটা কুকুর এদিক থেকে, ওদিক থেকে ছুটে এল, ঘেউ, ঘেউ

ঘেউ,  ঘেউ,

ঘেউ,  ঘেউ,  ঘেউ,

ঘেউ,

ঘেউ,  ঘেউ।

একেবারে কান ঝালাপালা।

হাঁসছানাটা নাদুসনুদুস ছুটতে ছুটতে সটান রাস্তায়। হুপ্পোও কুকুরের তাড়া খেয়ে রাস্তা দিয়েই ছুটতে আরম্ভ করে দিল। বাপরে বাপ! কুকুরের কী তাড়া! হুপ্পোটাও আচ্ছা হাঁদা! কারো বাড়ির পাঁচিলে তো উঠে পড়তে পারিস! উঠবে কী, কুকুর তো আর একটা নয়! পঞ্চাশটা কুকুর তাকে একেবারে ঘিরে ধরেছে। পালাবার পথটি নেই! এক্ষুনি ধরে ফেলবে! তারপর কামড়ে রক্তারক্তি কাণ্ড করে দেবে! ওই ল্যাজকাটা কুকুরটার কী তেজ দেখো! কীরকম ছুটছে! উঃ! এই বুঝি হুপ্পোর ল্যাজটা কামড়ে ধরে! ধরল, ধরল! না, পারল না।

হুপ্পো লাফ মেরেছে। উঠে পড়েছে।

কোথায় উঠল?

রাস্তা দিয়ে ঝাঁকা মাথায় একটা লোক যাচ্ছিল। লোকটা খানিকটা খানিকটা ছুটছিল, মাঝে মাঝে হাঁটছিল। হুপ্পো তিড়িং করে লাফ মেরে তার ঝাঁকার ওপরই উঠে পড়েছে।

'কঁক, কঁক, কোঁকোর কোঁ!'

ওমা! ঝাঁকার মধ্যে যে মোরগ! এক ঝাঁকা মোরগ! ঠাসাঠাসি চাপাচাপি ভরতি করে লোকটা নিয়ে যাচ্ছে!

হুপ্পোকে দেখেই মোরগগুলো চিৎকার করে ডানা ঝটপটিয়ে উঠল।

লোকটা ছুটছে। কুকুরগুলো মুখ উঁচিয়ে তার পেছনে ডাকছে, আর ল্যাজ পাকাচ্ছে!

লোকটা পেছন ফিরে দেখার আগেই হুপ্পোর মাথায় চট করে একটা বুদ্ধি এসে গেল। ফটফট করে ঝাঁকার দড়িগুলো হাত দিয়ে খুলে ফেলল। ব্যাস! অমনি সঙ্গে সঙ্গে ঝাঁকার মোরগ কঁক কঁক, কিঁ কিঁক, কোঁকর কোঁ-ও-ও করে ডাকতে ডাকতে, ঝাঁকা থেকে ঝপাঝপ রাস্তায় উড়ে পড়ে মার ছুট।

ঝাঁকা থেকে ঝটাপট মোরগগুলো বেরিয়ে আসতে, কুকুরগুলো দেখেশুনে থতমত খেয়ে গেছে। ভয়ে-ময়ে পেছন ফিরে দে লম্বা। আচ্ছা মজার ম্যাজিক তো!

ঝাঁকা মাথায় লোকটাও এবার হাঁ। 'হা হা' করে চেঁচিয়ে উঠে ঝটাপট ঝাঁকাটা মাথা থেকে যেই নামাতে গেছে, দেখে কী, ঝাঁকার ওপর একটা বাঁদর। লোকটা 'ওরে বাবারে' বলে পালাতে গেছে, আর মাথা থেকে ঝাঁকাটা ছিটকে পড়েছে। সঙ্গে সঙ্গে বাকি

ক-টা মোরগও এদিক, ওদিক, সেদিক, যে যেদিকে পারল ছুট মারল। হুপ্পোও লাফ মারল একটা গাছের ওপর। লোকটা হতভম্ব হয়ে মোরগগুলোকে ধরবার জন্যে লম্ফঝম্প লাগিয়ে দিল! ধরা কী অত সোজা! একটা মোরগ হলে না হয় কথা ছিল। এ যে একেবারে পাঁচগণ্ডা। তা ছাড়া মোরগের সঙ্গে ছুটেও পারা দায়! এমন ভড়কি দিয়ে ছুটবে, কার সাধ্যি ধরে!

লোকটা ঝাঁকা-টাকা ফেলে তবু ছুটতেই লাগল। হুপ্পোও গাছের ডালে চুপটি করে বসে জুলজুল করে চেয়ে চেয়ে দেখছে। দেখতে দেখতে যখন বুঝল, লোকটা এখন মোরগের পেছনে চরকিই খাবে, এদিকে আর আসবে না, তখন টুপ করে গাছের আগডাল থেকে নেমে মাঝডালে বসল। ল্যাজটাকে গুটিয়ে এমন করে লুকিয়ে রাখল যে, কেউ টেরও পাবে না। তারপর মাঝডাল থেকে টেনে এক লাফ রাস্তায়। না, এখন আর রাস্তায় কুকুর-টুকুর নেই। নেই তো এই তাল! দে লম্বা লম্বা লাফ। একেবারে বাড়ির দিকে। যেমন করে এসেছিল ঠিক তেমন করে পুকুর পেরিয়ে, পাঁচিল ডিঙিয়ে ঘরের ছেলে ঘরে ফিরল। ঘরে পৌঁছে দেখে, মা তখনও বাসন কিনছে। উঃ রক্ষে! মা কিচ্ছু জানতে পারেনি। জানতে পারলে নিস্তার ছিল! শেষ করে দিত। কিন্তু তার আগে তো কুকুরগুলোই তাকে শেষ করে দিয়েছিল। ভাগ্যিস!

হুপ্পো আর চচ্চড়ি-ভাজা-বুড়ির ছাগল

হুপ্পো আজ বাঁদরনাচ দেখেছে।

রাস্তায় ডুগডুগ, ডুগডুগ করে যেই ডুগডুগি বেজে উঠবে, জানবে, বাঁদরনাচিয়ে ঝুমকিদের বাড়ির পাশ দিয়ে যাচ্ছে ডুগডুগি বাজাতে বাজাতে। তার কাঁধে একটা পুঁটলি। সঙ্গে দুটো বাঁদর আর একটা ছাগল। ছাগলটার আবার দাড়ি। লম্বা লম্বা। যায় বটে পাড়া দিয়ে, কিন্তু নাচ একদিনও হয়নি।

রাস্তায় ডুগডুগির বাজনা শুনলেই হুপ্পোর মনটাও ছটফট করে ওঠে। তিড়িং করে লাফ মেরে ছাতে উঠে পড়বে। চেয়ে চেয়ে দেখবে, দুটো বাঁদর আর একটা ছাগল নিয়ে লোকটা চলে যাচ্ছে।

আজ কিন্তু লোকটা চলে গেল না। রাস্তার মোড়ে পুঁটলিপোঁটলা খুলে, ডুগডুগি বাজিয়ে, বাঁদরনাচের খেলা শুরু করে দিল। দেখতে দেখতে কত লোক জমে গেল। ছেলে, বুড়ো, ছুটকো-ছাটকা। ঝুমকিও হুপ্পোকে কোলে নিয়ে ছুটল। মা অবিশ্যি একবার বলেছিল, 'যাসনি ঝুমকি।' ঝুমকি বলেছিল, 'আসছি এক্ষুনি।'

তারপর সারাক্ষণ ঝুমকির কোলে চেপে নাচ দেখেছে হুপ্পো। নাচ শেষ হতেই বাঁদর-নাচিয়ে হুপ্পোকে ঝুমকির কোলে দেখে, এগিয়ে এসে, হাসতে হাসতে যখন জিজ্ঞেস করেছিল, 'বাঁদর কার আছে, তোমার?' তখন লোকটার চাউনিটা কেমন যেন ভালো লাগেনি হুপ্পোর। 'হ্যাঁ, আমার বাঁদর', বলে ঝুমকি যখন হুপ্পোর গাল টিপে আদর করল, তখন বাঁদরনাচিয়ের কী হাসির ধুম। হাসতে হাসতে লোকটা হুপ্পোর গায়ে হাত বুলিয়ে বলল, 'দেখে মনে হচ্ছে, বাঁদরটা চালাক আছে।'

'সে আর বলতে! এক নম্বরের দুষ্টু! একদম কথা শোনে না।' বলে ঝুমকি হুপ্পোর মুখের দিকে চাইল। তারপর বলল, 'এর পর কথা না শুনলে তোমায় দিয়ে দেব। রাস্তায় রাস্তায় নেচে বেড়াবে।'

কথাটা শুনেই হুপ্পো ঝুমকির মুখের দিকে তাকাল। মনে মনে ভাবল, সে তো ভালোই

হয়। নাচ দেখাতে তার ভালোই লাগে। তবে এই লোকটার সঙ্গে না। লোকটা ভালো না।

ঝুমকি আদর করে জড়িয়ে ধরল হুপ্পোকে। জিজ্ঞেস করল, 'আর দুষ্টুমি করবি না তো?'

হুপ্পো ঝুমকির গলাটাও দু-হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরল। বাঁদরনাচিয়ে হেসে উঠল, 'না, না, আর দুষ্টুমি করবে না। তা খোকি, তুমি থাক কোথা?'

ঝুমকি হাত নেড়ে দেখাল, 'ওই বাড়িতে।'

তারপর বাঁদরনাচিয়েও নাচের খেলা শেষ করে চলে গেছে আর ঝুমকিও হুপ্পোকে নিয়ে ঘরে ফিরে এসেছে।

ঘরে ফিরে স্থির থাকতে পারে কী হুপ্পো? রাস্তার বাঁদরের নাচ দেখে ঘরের বাঁদরের সে কী নাচ! দুর! ওই নাচিয়েওলার বাঁদর দুটো কিসসু না। ওদের চেয়ে হুপ্পো অনেক ভালো নাচতে পারে। তবে হ্যাঁ, রঙিন পা-জামা পরে, ঝলমলে জামা গায়ে দিয়ে, মাথায় পাগড়ি বেঁধে যখন একটা বাঁদর ছাগলের পিঠে চেপে বিয়ে করতে যাচ্ছিল, তখন কিন্তু বেশ লাগসই হয়েছিল। আবার বাঁদর-বাঁদর কনেটিও বেশ। ঘাগরা পরেছে, গায়ের ওড়না মাথায় জড়িয়ে বরকে দেখে তার কী লজ্জা! মরে যাই! হুপ্পোরও যে বিয়ে করতে ইচ্ছে যায় না, তা নয়। তবে ঝুমকি বলে, ও নাকি এখনও ছোট্ট। বড়ো হলে, সুন্দরী মেয়ে দেখে হুপ্পোর বিয়ে দেবে। ঝুমকিরও সাধকে বলিহারি যাই! বাঁদরের আবার সুন্দরী বউ! শুধু সুন্দরী বউ না। সানাই বাজবে, লোকজন নেমন্তন্ন করে খাওয়াবে, খুব ধুমধাম করে বিয়ে দেবে।

এই সব কথা শুনলে কার আর ছোট্টটি থাকতে ইচ্ছে করে? হুপ্পোর মনে হয়, এক্ষুনি সে খুব বড়ো হয়ে যায়! ও তো ভেবেই পায় না, যারা ছোট্ট, তারা কেন ছোট্ট থাকবে, বড়োরা বড়ো। বড়োরা যা খুশি করবে, কেউ কিচ্ছু বলবে না। যখন ইচ্ছে রাস্তায় যাবে। ইচ্ছে হলেই গাড়ি চড়বে, দোকান থেকে খাবার কিনে খাবে। মন চাইলে অফিস যাবে, তা না হলে ঘরে শুয়ে ঘুম। যখন ইচ্ছে ঘুম থেকে ওঠো। যখন ইচ্ছে চান করো। খাও আর সিনেমা দেখো। রাত্তিরবেলা ঘরে ফিরতে যদি দেরিও হয়ে যায়, কেউ একবারটি জিজ্ঞেসও করবে না। আর ছোটোদের বেলায়? সববনাশ! পানের থেকে চুন খসলেই সাংঘাতিক কাণ্ড! হুপ্পোর কথাই ধরো, দিনে অন্তত পঞ্চাশবার ধাতানি খাচ্ছে। আচ্ছা, হুপ্পো না হয় বাঁদর, ওর কথা না হয় না-ই ধরলুম। কিন্তু ঝুমকি? ও তো আর হুপ্পোর মতো দুষ্টু নয়। তবু উঠতে-বসতে হাজার রকমের ফিরিস্তি শোনো। এটা করো না, ওটা নেড়ো না, পড়ার সময় খেলো না। হাত না ধুয়ে খেয়ো না। দাঁত দিয়ে নখ কাটবে না। চান করে চুলে চিরুনি দেবে। কাজের সময় গল্প করবে না। বড়োরা যখন দাঁড়িয়ে থাকেন, ছোটোরা তখন বসে থাকবে না। আরও সব কত রকমের হুকুম। অবিশ্যি কথাগুলো যে ঠিক সে কথা একশো বার। কিন্তু এমন কথা বড়োরা কি মানে? বয়ে গেছে।

তবে বাপু ওই হুকুম-টুকুম শুনতে একদম ভালো লাগে না হুপ্পোর। কেউ হুকুম করলেই ওর যেন মনে হয় বেশি দুষ্টুমি করতে। বেশি করে লাফালাফি করতে, টানতে, ওটা ছিঁড়তে। ছাতে ছাতে ছুটতে, লাফাতে। উঠোনে বসে বসে কাক তাড়াতে। কাকগুলো ভারি শয়তান! এমন পেছনে লাগে। একবার যদি দেখতে পেয়েছে তো কা-কা করে চিল্লিয়ে একেবারে বাড়ি মাথায় করে ছাড়ে। ধরাও যায় না। ভারি চালাক। একটু যদি মুখ খিঁচিয়ে তেড়ে যাও তো ফুড়ুৎ!

নাচিয়েবাঁদর দুটোও কেমন নাচতে নাচতে মুখ খিঁচিয়ে তেড়ে যাচ্ছিল। যাবেই তো! একটা ন্যাংটা ছেলে বার বার ওদের ল্যাজ ধরে টানছিল কেন? যাই বলো, তাই বলো, ল্যাজে হাত দিলে বাপু ভারি রাগ ধরে! মানুষেরও যদি ল্যাজ থাকত, তখন ঠিক বুঝত, ল্যাজের কত মান। ওরা ভাবে ল্যাজ মানে মজা! তাই বই কী! হিংসুটে, হিংসুটে, মানুষগুলো একদম হিংসুটে। নিজেদের ল্যাজ নেই তো, তাই। আরে, ল্যাজ না থাকলে মানায় কখনো। দুনিয়ায় কার শুনি ল্যাজ নেই? নেই তো খালি মানুষের! অমন যে ছাগল তারও একটুখানি ল্যাজ। ল্যাজের ডগায় একটু একটু লোম। ল্যাজের আগায় মাছি বসলেই ফিরফির, ফিরফির করে ছাগলের ল্যাজটা কেমন নেচে নেচে ওঠে।

আজও নেচে উঠছিল। হুপ্পোর ঠিক নজরে পড়েছে! বর আর কনে বাঁদর দুটো একসঙ্গে যখন ছাগলের পিঠে চেপে ঘুরে বেড়াচ্ছিল, তখন ছাগলের ল্যাজটা নড়ে নড়ে কী যেন একটা তাড়াচ্ছিল। সত্যি, নাচিয়েবাঁদর দুটোকে দেখলে হিংসে হয়! সারাদিন রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে ঘুরে নাচ দেখিয়ে বেড়াচ্ছে আর ছাগলের পিঠে চেপে বিয়ে করতে যাচ্ছে। অবিশ্যি এটা খেলা-খেলা বিয়ে। যতবার খেলা ততবার বিয়ে!

বিয়ে না হোক, হুপ্পোর ভারি ইচ্ছে করে ছাগলের পিঠে চাপতে। আহারে! ঝুমকির যদি একটা ছাগল থাকত! কেন যে একটা ছাগল পোষেনি ঝুমকি, ভেবে পায় না হুপ্পো। কেন, একটা ছাগল পুষলে মহাভারত কি একেবারে অশুদ্ধ হয়ে যেত? বাবার কাছে একটু আবদার করলেই তো হয় বাপু, অমনি একটা ছাগল এসে যায়! হুঁ! তবেই হয়েছে!

নাই হোক। অনেক আগেই হুপ্পো একটা ছাগলের সন্ধান পেয়েছে। ওই তো পাশের বাড়িটা পেরিয়ে একটু গেলেই একটা বুড়ির ঘর। বুড়ির ঘরে বুড়ি আর তার ছাগল। ছাগলটা হুপ্পোকে দেখলেই ভয় পেয়ে এমন ম্যা-এ্যা-এ্যা করে ডেকে উঠবে, কী বলব! তবে এ ছাগলটার দাড়ি নেই। এক-একটা ছাগলের এমনি হয়, নিঃদাড়ি! তাতে কী হয়েছে! দাড়ি নিয়ে তো আর হুপ্পোর কিছু লাভ-ক্ষতি নেই। ছাগলটা গাড়ির মতো হাঁটতে পারলেই হচ্ছে। তা বাপু মিথ্যে বলব না, বুড়ির ছাগলটা বেশ তেজি! হাঁটতে তো কালকের ছেলেও পারে। কিন্তু এমন ছোটে না ছাগলটা, দেখলে তাজ্জব বনে যাবে। ছুটলে ফিরিক ফিরিক ল্যাজটা কেমন নড়বে! এখন তার কাছে যেতে পারলেই হল।

সেইটাই ভাবছিল হুপ্পো। আর সেই সুযোগই খুঁজছিল। ইচ্ছে করলে যে সে এক্ষুনি পাঁচিল ডিঙিয়ে যেতে পারে না, তা নয়। তবে কেউ দেখতে পেলেই ভণ্ডুল। তার ওপর আজ আবার ছুটির দিন। ঝুমকিও ইস্কুলে যায়নি, ঝুমকির বাবারও অফিস নেই, মা-ও একবার রান্নাঘর, একবার ভাঁড়ারঘর করছে। কারুর চোখে ধুলো দেওয়া মুশকিল। তাই হুপ্পো চুপটি করে নিজের ঘরেই বসেছিল।

হঠাৎ বাড়ির দরজার সামনে পি-পি করে একটা গাড়ি এসে দাঁড়াল। ঝুমকি ছুটতে ছুটতে বাইরে বেরিয়ে রাস্তা থেকেই চেঁচিয়ে উঠল, 'মা, মাসিমা এসেছে।' মা-ও 'কই, কই' বলে এমন ধেই ধেই করে হেঁটে গেল, একটু বেসামাল হলে আর রক্ষে ছিল না। তারপর হুপ্পো দেখে কী, একবাড়ি লোক এসে হাজির। মাসিমা, মেসোমশাই, তাদের ছেলেমেয়ে। একটা মেয়ে প্রায় ঝুমকির মতো। আর তার ভাইটা পুঁচকে, এইটুকু। ঝুমকি তাকে কোলে নিয়ে, আদর করতে করতে একেবারে নাচানাচি লাগিয়ে দিল। তারপর কী গোলমাল শুরু হয়ে গেল। মা-ও হাসে, মাসিও হাসে, ঝুমকির বাবাও হাঁকে, মেসোও ডাকে। ঝুমকি চ্যাঁচায়, ঝুমকির মাসির মেয়েটাও হাঁপায়। মনে হচ্ছে বাজার বসে গেছে। কী যে কথা হচ্ছে, হুপ্পো ঠিক-ঠিক বুঝতেই পারছে না। হুপ্পোর বাপু এত চ্যাঁচামেচি ভালো লাগে না। তাই বলি মা সকাল থেকে এত রান্নাঘর ভাঁড়ারঘর করছিল কেন! আজ মাসিমাদের নেমন্তন্ন।

মাসিমা, মেসোমশাইকে নিয়ে ঝুমকির বাবা-মা বসার ঘরে চলে গেল। ঝুমকি পুঁচকে ছেলেটাকে কোলে নিয়ে মাসতুতো বোনের সঙ্গে গল্পে ডগমগিয়ে ছাতে উঠে গেল। ছাতটা ঘুরে-ফিরে, এ-বাড়িটা কাদের, ও-বাড়িতে কে থাকে, জিজ্ঞেস করতে করতে যখন নীচে হুপ্পোকে হঠাৎ দেখতে পেল, তখন ছাত থেকে চেঁচিয়েই মাসির মেয়ে বলে উঠল, 'আরে! একটা বাঁদর যে রে!' বলে খিলখিল করে কী হাসি! হাসি শুনে হুপ্পোর পা থেকে মাথা অবধি জ্বলে যায়। মনে হল, নীচ থেকেই মেয়েটাকে একটা ভে^ংচি কেটে দেয়। কিন্তু ঝুমকিও যে মেয়েটার সঙ্গে হাসতে শুরু করে দিয়েছে! হাসতে হাসতে বলল, 'আমার। খুব পোষমানা। চ না, দেখবি চ।' বলতে বলতে ছাত থেকে তরতর করে নেমে, সটান একেবারে উঠোনে, হুপ্পোর ঘরের সামনে। ঘরের সামনে এসে মেয়েটা যেমন করে কুকুর ডাকে তেমনি করে হাতটা বাড়িয়ে, 'আয় বাঁদর, আয়, আয়' করে এমন ডেকে উঠল যে, হুপ্পোর মনে হল এরকম অপমান সে আর কোনোদিন হয়নি! তাই কোনো কিছু

না ভেবে একদম খিঁকিয়ে তেড়ে গেল মেয়েটাকে। মেয়েটা ভয়ে-ময়ে 'বাবা গো' বলে দে ছুট। ঝুমকির পেট ফেটে হাসি এসে গেল। ঝুমকিকে হাসতে দেখে, হুপ্পোও হেসে ফেলল। মেয়েটা ততক্ষণে ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ে, মাকে জড়িয়ে ধরে চ্যাঁচাচ্ছে, 'বাঁদর, বাঁদর!'

মা চেঁচিয়ে উঠল, 'কী হল রে, কী হল?'

ঝুমকি হাসতে হাসতে ঘরে এসে বলল, 'দুর বোকা, ভয় পেয়ে পালিয়ে এলি কেন? কিচ্ছু করবে না!'

মা বলল, 'কী হয়েছে, কী?'

ঝুমকি বলল, 'হুপ্পো মজা করে ওকে তেড়ে গেছে, তাই ভয় পেয়ে পালিয়ে এসেছে।'

মা তো ভীষণ রেগে গেল। 'ওঃ, ওই এক হয়েছে! কোত্থেকে যে হতচ্ছাড়া বাঁদর জুটেছে, জ্বালাতন! দিন নেই, রাত নেই, খালি নষ্টামি করে বেড়াচ্ছে! বাড়িতে চারদণ্ড শান্তিতে থাকবার যো নেই কারুর! দাঁড়া, এবার বিদেয় করে দিচ্ছি!' বলে ঘর থেকে মা হুপ্পোর দিকে তেড়ে গেল।

হুপ্পো মায়ের চেয়ে অনেক চালাক। মাকে দেখতে পেয়েই সদর দরজা দিয়ে ভোঁ-কাট্টা!

'দূর হ, বেরো, বেরো, বলে মা গাল পাড়তে লাগল।' 'রাতদিন বাঁদরামি করে বেড়াচ্ছে!'

বাড়িতে এত লোকজন, এত আনন্দেও ঝুমকির মনটা ভীষণ খারাপ লাগছে। সত্যি বলতে কী, হুপ্পোকে কেউ কিছু বললে, ও একটুও সহ্য করতে পারে না। মায়ের ওপর রাগ হলেও কিন্তু ঝুমকির মুখ দেখে কেউ বুঝবে না, ও রেগে গেছে, কী মনে দুঃখ হয়েছে! কেন শুধুমুধু হুপ্পোকে দূর দূর করে তাড়িয়ে দিল মা? মা জানে না, ঝুমকি হুপ্পোকে কত ভালোবাসে? মায়ের আর কী, সারাদিন ঘরকন্না নিয়েই ব্যস্ত। কিন্তু ঝুমকিকেও তো সারাদিন কত কাজ করতে হয়! পড়াশোনা, ইস্কুলে যাওয়া, নাচ শেখা, পিয়ানো বাজানো। তার ফাঁকে ও না হয় একটু হুপ্পোকে নিয়ে খেলা করে। এতে এত রাগারাগির কী আছে? আচ্ছা, এই যে মা রাতদিন হুপ্পোকে 'বাঁদরামি করছে, বাঁদরামি করছে' বলে বকাবকি করে, এর কী মানে বলো? বাঁদর বাঁদরামি করবে না তো কী ক্যাবলামি করবে! যাই বলো, হুপ্পো বাঁদর ঠিকই, কিন্তু ক্যাবলা নয়।

হুপ্পোর তো তাড়া খেয়ে ভালোই হল। মনে মনে ও এটাই তো চাইছিল। বুড়ির ওই ছাগলের কথাটা যখন থেকে মনে এসেছে, তখন থেকেই বাইরে বেরিয়ে পড়ার জন্যে ও ছটফট করছিল। এখন সুযোগ এসে গেছে। যে যতই বকাবকি করুক, হুপ্পোর বয়ে গেছে। এখন তো ও বরটি সেজে, ছাগলের পিঠে চেপে বিয়ে করতে যেতে পারবে!

বর সাজব বললেই কি সাজা যায়? বরের ঝলমলে জামা নেই, রংচঙে কাপড় নেই,

ঝকমকে পাগড়ি নেই। হুপ্পো ভাবল, কিছু না থাক, অন্তত ছাগলের পিঠে তো চাপা যাবে!

বুড়ির ঘরের চালে গিয়ে যখন বসল হুপ্পো তখন দেখল, বুড়ি রান্নাঘরে ছোলার ডালের বড়ি ভাজছে, আর ছাগলটা উঠোনে গা এলিয়ে ঘাস চিবোচ্ছে। হুপ্পোকে তখনও দেখতে পায়নি ছাগলটা। হুপ্পো কী করবে, কী করবে ঠিক করতে না পেরে বুড়ির ঘরে চাল থেকে খালি উঁকিঝুঁকি মারছিল আর ভাবছিল, ছাগলটাকে চুপিচুপি ডাকবে, না উঠোনে ঝপাং করে নামবে! না, প্রথমেই হুট করে উঠোনে নামাটা ঠিক হবে না। কেননা ছাগলটা চমকে উঠে চেঁচামেচি লাগিয়ে দিলে সব ভণ্ডুল! তা ছাড়া বুড়িটাও যদি দেখতে পায়!

বরঞ্চ চালের ওপর বসে বসেই ছাগলটাকে ডেকে দেখা যাক। তাই হুপ্পো চোখটা ইদিক- উদিক ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে, মুচকি মুচকি হাসতে হাসতে ডাকল, 'এই ছাগল!'

ছাগলটা ওপর নীচে কোনোদিকে না চেয়ে, যেমন করে গা এলিয়ে ঘাস চিবোচ্ছিল, তেমনি শুয়েই সাড়া দিল, 'কে-হ্যাহ্যাহ্যা?'

হুপ্পো উত্তর দিল, 'এই যে আমি। ওপর দিকে।'

ছাগলটা তেমনিভাবেই জিজ্ঞেস করল, 'কোন ওপরে?'

হুপ্পো বলল, 'মাথার ওপরে।'

ছাগলটা মাথা তুলে, ওপর দিকে তাকিয়ে বলল, 'মাথার ওপরে তো পেটকাটা

ঘুড়ি!'

হুপ্পো উত্তর দিল, 'ঘুড়ি না, ঘুড়ি না। তার নীচে?'

'তার নীচে প্যায়রা-পাকা গাছ।'

'প্যায়রা খাবি?' হুপ্পো জিজ্ঞেস করল।

'হ্যাঁ-হ্যাঁ-হ্যাঁ-হ্যাঁ!' ছাগল যেমন গলা কাঁপিয়ে ডাকে, তেমনি ডেকে সাড়া দিল।

তখন হুপ্পো ঝুপ করে ঘরের চাল থেকে গাছের ডালে লাফ মারল। ডাল থেকে একটা পাকা দেখে পেয়ারা ছিঁড়ে নিয়ে ছাগলকে ছুড়ে দিয়ে বলল, 'এই নে।'

কে নেবে পেয়ারা? কোথায় ছাগল? হুপ্পোকে চাল থেকে গাছে লাফ মারতে দেখেই বাছাধন ঘর থেকে বেরিয়ে দে চম্পট!

হুপ্পো একদম হাঁদা! এদিক-ওদিক দেখতে না পেয়ে ভাবল, আরি ব্যাস! ছাগলটা তো ভয়ানক ঘুঘু! ঠকিয়ে দিল। সব গুবলেট? যাক গে, আর তো করবার কিছু নেই। যখন পেয়ারাগাছে উঠেছে, তখন পাকা-পেয়ারাই খাক। ভেবে, হুই-ই-ই আগডালে ঝপাঝপ উঠে বসল। বসে, যেই একটা পেয়ারা ছিঁড়তে যাবে, অমনি চোখ দুটো ধাঁধিয়ে গেছে। আরে! ছাগলটা একটু দূরে, একটা ঘরের দেওয়ালে গা সিঁটিয়ে লুকিয়ে আছে যেন! সঙ্গে সঙ্গে টুপটাপ, ঝুপঝাপ গাছের ডাল ডিঙিয়ে হুপ্পো আচমকা ছাগলের সামনে হাজির।

ছাগল তো হুপ্পোকে দেখেই ভড়কি খেয়ে গেছে। হাঁক পাড়ল, 'ম্যা-হ্যা-হ্যা'। ডেকেই পালাতে গেছে। হুপ্পো পথটি আগলে দাঁড়িয়ে পড়ল। তখন ছাগল নট-নড়ন, নট কিচ্ছু।

হুপ্পো প্রথমটা খুবই আপনজনের মতো, মিঠে গলায় জিজ্ঞেস করল, 'ছাগল, ছাগল, আমায় দেখে ভয় পাচ্ছিস?'

ছাগল ভয়ে ভয়ে মুখ বেঁকিয়ে বলল, 'হ্যাঁ-হ্যাঁ-হ্যাঁ!'

হুপ্পো বলল, 'দুর বোকা, আমাকে ভয় কী রে! আমি তোর বন্ধু।'

ছাগল উত্তর দিল, 'না-আ-আ।'

'কেন, আমাকে তোর বন্ধু করতে ইচ্ছে নেই?'

'নেই-ই-ই।'

হুপ্পো ভাবল, ছাগলটা তো ভারি তেএঁটে! ভাব করবার জন্যে এত সাধছি, কিছুতেই রাজি হচ্ছে না! তাহলেও এখনই কিন্তু ছাগলটার সঙ্গে ঝগড়া করা ঠিক হবে না। সব মাটি হয়ে যাবে ঝগড়া করলে। তার চেয়ে বুঝিয়ে-সুঝিয়েই যতটুকু পারা যায়। তাই হুপ্পো হাসি-হাসি মুখে খুকখুক করে একটু কাশল। কাশতে কাশতে বলল, 'ছাগল, ছাগল, আমার বিয়ে।'

ছাগল বলল, 'তোর বিয়ে তো আমার কী!'

হুপ্পো উত্তর দিলে, 'তোর নেমন্তন্ন।'

ছাগল বলল, 'বাঁদরের আর বিয়ে, তার আবার নেমন্তন্ন।'

হুপ্পো চট করে কথাটা ঘুরিয়ে নিয়ে জিজ্ঞেস করল, 'ছাগল, তোর বিয়ে হয়েছে?'

'এখনও হয়নি, হবে।'

'কবে?'

'ভালো মেয়ে পেলে।'

কথাটা শুনে সাঁই করে হুপ্পোর মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেল। ভাবল, এবার তো বাছাকে বাগে পেতে কষ্ট নেই। তাই বলল, 'ছাগল, ছাগল, আমার জানা একটি মেয়ে আছে। বিয়ে করবি?'

ছাগল তো দু-পায়ে খাড়া।

জিজ্ঞেস করল, 'দেখতে কেমন?'

'খুব ভালো।'

'সাজতে জানে?'

'খুব ভালো।'

'গাইতে জানে?'

'খুব ভালো।'

'নাচতে জানে?'

'খুব ভালো।'

'সত্যি?' ছাগলের মুখখানা আনন্দে উপচে গেল।

হুপ্পো বলল, 'আমার ঝুটমুট মিথ্যে বলে কী লাভ? ইচ্ছে করলে এক্ষুনি দেখাতেও পারি।'

'মেয়ের ঘর কতদূর?'

'কাছেই, যাবি?'

ছাগল বলল, 'চ না, দেখে আসি।'

বাঁদর বলল, 'তবে আমি তোর পিঠে বসি।'

ছাগল বলল, 'বস।'

'হুপ্পো ঝুপ করে ছাগলের পিঠে বসল। বসেই কথা নেই, বার্তা নেই, ছাগলের পেটে হঠাৎ এমন কাতুকুতু লাগিয়ে দিল যে, ছাগল একেবারে নাস্তানাবুদ! পাগলা ঘোড়ার মতো চরকি লাগিয়ে চ্যাঁচাতে লাগল, 'ছেড়ে দে, ছেড়ে দে।'

হুপ্পো ছাড়বার পাত্তর!

ছাগলের তো হাসতে হাসতে দম যায়-যায়। হুপ্পো যতই কাতুকুতু দেয়, ছাগল ততই চ্যাঁচায়, ম্যা-হ্যা-হ্যা! মো-হো-হো! ব্যাউ-হু-হু!

হাসতে হাসতে হঠাৎ যেন খ্যাঁচ করে হাসিটা ছাগলের পেটে আটকে গেল। হাসিটা মুখের ওপর থমকে থেমে যেতেই, ছাগলটা চার ঠ্যাং ছরকুট্টে ভট করে মাটিতে শুয়ে পড়ল। তারপর দু-চোখ কপালে তুলে জ্ঞান হারাল।

হুপ্পো ভাবল, ভালো রে ভালো। এ আবার কী হল? ছাগলের পিঠে বসেছিল বলে হুপ্পোও মাটিতে থুপসি মেরে পড়েছে। অবিশ্যি লাগেনি তেমন। তাড়াতাড়ি মাটি ঝেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে হুপ্পো ডাকল, 'এই ছাগল, কী হল রে?'

ছাগলের মুখে না কা, না কু।

হুপ্পো আবার ডাকল, 'এই ছাগল, ভয় দেখাচ্ছিস?'

ছাগলের মুখে না দা, না দু।

হুপ্পো ছাগলের ঠ্যাং ধরে নাড়া দিল।

ছাগলের মুখে না মা, না মু।

ছাগল যখন কাকু ডাকল না, দাদু ডাকল না, মামু ডাকল না, মুখ থুবড়ে পড়েই রইল, তখন হুপ্পো ভয়ে কাঠ! ভাবল, ছাগলটা নিশ্চয়ই পটল তুলেছে! সর্বনাশ! এখন যদি তাকে বুড়িটা একবার দেখতে পায়, ঠেঙিয়ে বিষ ঝেড়ে দেবে। পালা, পালা। হুপ্পো ছুটতে ছুটতে পালাল।

বাড়ি এসে, নিঃসাড়ে নিজের ঘরে লুকিয়ে পড়ল হুপ্পো। রক্ষে যে কেউ দেখে ফেলেনি। ঘরের মধ্যে ঘাপটি মেরে বসে হাঁপাতে লাগল, আর রান্নাঘরে ইলিশমাছ ভাজা হচ্ছে, তার ছ্যাঁক-কলকল শব্দ শুনতে লাগল।

এদিকে হুপ্পো পালিয়ে যেতেই এক ভীষণ ভূতুড়ে কাণ্ড! ছাগলটা হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়েছে! কী সর্বনাশ! দাঁড়িয়েই ব্যা-হ্যা-হ্যা করে হাসতে শুরু করে দিল! হাসতে হাসতেই বলল, 'নিজেদের ভারি চালাক ভাবে বাঁদরগুলো! এখন কেমন ঠকিয়েছি! ভাবল, আমি বুঝি মরেই গেছি। যা শিক্ষে দিয়েছি এদিকে আর কোনোদিন আসতে হবে না।'

ওমা! তবে কিচ্ছু হয়নি ছাগলটার! হুপ্পোকে ভয় দেখানোর জন্যে ঝুটমুট ভাঁওতা দিয়েছে! তবে কে বলে ছাগল বোকা! পেটে পেটে কী বুদ্ধি!

ছাগলটা ঘরে ফিরে, আবার উঠোনে বসে নিশ্চিন্তে ঘাস চিবোতে শুরু করে দিল। বুড়িটা তখন বড়িভাজা শেষ করে, বড়ি দিয়ে চচ্চড়ি রান্না শুরু করেছে।

কালো ছায়ার সঙ্গে হুপ্পোর লড়াই

নিজের ঘরে তখন ঘুমিয়ে ছিল হুপ্পো। এত রাত্তিরে কে-ই বা জেগে থাকে। মা-ও ঘুমোচ্ছে, বাবাও ঘুমোচ্ছে, ঝুমকিও ঘুমোচ্ছে। একদম নিজঝুম। নিজঝুম মানে কী আর শুধু ঝুমকিদের বাড়ি। সারা শহরটাই যেন ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে ঝিমিয়ে আছে। আশ্চর্য লাগে ভাবতে! সারাদিন ধরে হুল্লোড় আর হইচই! শুধু শব্দ আর শব্দ। কখনো গান শুনবে, কখনো হাঁক শুনবে, হাসি শুনবে, কান্না শুনবে! নয়তো গাড়ির শব্দ, হাঁচির শব্দ। ফেরিওয়ালার দাম শুনবে, ছাতাওয়ালার ডাক শুনবে, দোকানদারের বাত শুনবে। নয়তো ঝগড়াঝাঁটির কচকচানি, পায়রার বকুম বকবকানি। লেগেই আছে। আর এখন? ঘুম। ঘুম মানেই তো থমকে থেমে থাকা। নিশ্চিন্তে আরাম। তাই বলে যদি দিনের বেলা এমন হয়? মানুষ ঘুমিয়ে পড়ে! সব কিছু থেমে পড়ে? তাহলে ভারি মুশকিল। কাজকম্ম সব বন্ধ! কাজ না করলে চলবে কী করে?

তখন রাত্তির একটা না দুটো, তা বলা যাচ্ছে না। কারণ ঘুম পেলে চোখেও আসে, আবার কানেও ঢোকে। তা না হলে ঘড়ির শব্দটা পর্যন্ত শোনা যায় না কেন?

আজ কিন্তু এই গভীর রাত্তিরে হুপ্পোর ঘুমটা হঠাৎই ভেঙে গেল। একটা যেন কীসের খসখস শব্দ শোনা যাচ্ছে এই অন্ধকার রাত্তিরে! শব্দটা যে খুব জোরে শুনতে পাচ্ছে হুপ্পো, তা নয়। কিন্তু খুব স্পষ্ট। প্রথমটা শুয়ে শুয়েই শুনতে পাচ্ছিল হুপ্পো। নিশ্চুপ রাত্তিরে এমন একটা বুক-কাঁপানি শব্দ শুনলে, আচ্ছা আচ্ছা পাট্টার ধাত ছেড়ে যায়, তো হুপ্পো! ও তো একটা ছোট্ট বাঁদর। তবু বলব, হুপ্পোর সাহস আছে। প্রথমটা একটু ভয়-ভয় লাগছিল। এখন নেই।

শব্দটা যেন একটু কাছে এগিয়ে আসছে। হুপ্পো উঠে বসল। ঘরের দরজাটা একটু ফাঁক করে উঁকি মারল। উরি বাবা! কী ওটা? কালো মতো! ঘুরঘুট্টি অন্ধকার রাত্তিরে, আলতো আলতো পা ফেলে, ঘুরঘুর করছে! কিংবা বলা যায়, কী যেন খুঁজে বেড়াচ্ছে। অন্ধকারে ওই কালো মূর্তিটা দেখে হুপ্পো সত্যিই ভয় পেয়ে গেল এবার। বুকের ভেতরটা ঢিপঢিপিয়ে উঠল। হুপ্পোর চোখ দুটো ড্যাবডেবিয়ে ঠিকরে বেরিয়ে এল। কালো কালো অন্ধকারে, কুচকুচে কালো একটা কাপড় জড়িয়ে কী ও? মানুষ, না অন্য কিছু? মাথা থেকে পা অবধি সারা অঙ্গই ঢাকা। চোখ, মুখ, কান কিছুই দেখা যাচ্ছে না। না, ভয় পেলে কিন্তু চলবে না। ওটার কী মতলব সেটা দেখা দরকার।

হুপ্পো সাহসে বুক বাঁধল। কী কাণ্ড! ওটা যে দেখি সিঁড়ি দিয়ে ছাতে উঠছে। হুপ্পো চট করে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। চটপট লাফ মেরে ছাতের আলসের নীচে লুকিয়ে পড়ল। হ্যাঁ, সেই কালো ভূতটা ছাতের ওপরেই হাজির। ছাতের এদিক-ওদিকটা দেখে আবার নেমে গেল। হুপ্পোও আলসের আড়াল থেকে ছাতে উঠল। ওর পিছু নিল। ভূতটা সিঁড়ি দিয়ে নামে, হুপ্পোও এক পা এক পা নামে। ভূতটারও পায়ে শব্দ নেই, হুপ্পোও জানে সাবধানের মার নেই। নামতে নামতে হঠাৎ অন্ধকারেও হুপ্পো ঠাওর করল, ওই কেলেকিষ্টি ভূতের পায়ের পাতা দুটো কিন্তু বেশ বড়োসড়ো। তোমার আমার যেমন পা হয়, তার চেয়েও অনেক বড়ো। ওই বড়ো বড়ো পা টপাটপ ফেলে উঠোনে এসেছে। হুপ্পোও জুজুবুড়ির মতো দেওয়ালের আড়ালে চুপচাপ দাঁড়িয়ে পড়েছে। এবার কালোছায়াটা বামুনঠাকুরের ঘরের সামনে খাড়া! বামুনঠাকুর তো এখন নাক ডাকাচ্ছে। জানলা দিয়ে উঁকি মারল। উঁকি মেরে, কী ভেবে, ঝুমকিদের শোবার ঘরের সামনে দাঁড়াল। খুব আলতোভাবে দরজাটা ঠেলল। শব্দ হল না। দরজাও খুলল না। দরজায় খিল দেওয়া তো! এবার ভাঁড়ারঘরের সামনে উপস্থিত। ঘরের শেকলে তালা ঝুলছে। এটা নিয়ম। রোজ রাত্তিরে শোবার আগে মা ভাঁড়ারঘরে তালা দিয়ে যায়। তালাটা নেড়ে নেড়ে দেখল কালোভূতটা। তারপর কী একটা যন্তর বার করল। তালাটার গায়ে লাগিয়ে বার দুই চাড় দিতেই, কটাং। যাঃ তালা ভেঙে গেছে! আওয়াজ হতেই ছায়াটা চট করে সরে গেল পাশে, একটু আড়ালে। চুপচাপ নিঃসাড়ে দাঁড়িয়ে রইল। ওঃ! এখন কী ভয়ানক থমথম করছে চারিদিক! হুপ্পোও যেন বুকের ধুকধুকুনিটাকে চেপে রাখতে পারছে না। মনে হচ্ছে, নিশ্বাসের শব্দটাও যেন নিস্তব্ধ রাত্তিরে সাপের ফোঁস-ফোঁসানির মতো আওয়াজ তুলে হুপ্পোর নাক দিয়ে বেরিয়ে আসছে!

আড়াল থেকে আবার কালো ভূতটা বেরিয়ে এল। ভাঁড়ারঘরের সামনে আর একবার থমকে দাঁড়াল। আর একবার ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগল, এদিকে-ওদিকে কেউ আছে কি-না। হুপ্পো অবিশ্যি এমন জায়গায় আস্তানা গেড়েছে যে, ওকে আর দেখতে হচ্ছে না। কিন্তু ও নিজে সব কিছু দেখতে পাচ্ছে।

কিন্তু এ কী হল! হঠাৎ কালো-ছায়াটা ছুট্টে সরে গেল কেন? ও, বামুনঠাকুর যে দরজা খুলে বাইরে আসছে! কেন? বাইরে কেন? আর আসতে হল না। ঘর থেকে একটি পা বাইরে ফেলেছে কি-না-ফেলেছে, অমনি কালো কাপড়-চাপা ভূতটা ঠিক তিরের মতো ছুট্টে গিয়ে বামুনঠাকুরকে জাপটে ধরল। বামুনঠাকুর 'বাপরে' বলে চ্যাঁচাতে যাবে কী, ভূতটা ঠাকুরের মুখটা এমন জোরে চেপে ধরল যে, টুঁ শব্দটি পর্যন্ত আর মুখ দিয়ে বেরোতে পারল না। কিন্তু ঠাকুরও কী ছাড়বার পাত্তর! ভূতের সঙ্গে খামচাখামচা লাগিয়ে দিল। ঠাকুর পারবে কেন ওই রকম একটা গুণ্ডার সঙ্গে! ভূতটা একদম কাবু করে ফেলল ঠাকুরকে। ওই তো মুখটা বেঁধে ফেলছে। ঠাকুর আর চ্যাঁচাতেও পারল না, নড়তেও পারল না। চিতপটাং হয়ে পড়ে গেল। কিন্তু তারপরের কাণ্ডটা দেখেই হুপ্পোর আত্মারাম খাঁচা ছাড়া। কী কাণ্ড? কালোভূতটা ট্যাঁক থেকে একটা ঝকঝকে ছোরা বার করল। ছোরাটা এত ঝকঝকে যে, ওই অন্ধকারেও স্পষ্ট দেখতে পেল হুপ্পো। এবার নিশ্চয়ই ওটা ঠাকুরের বুকে বসিয়ে দেবে! কী হবে? হুপ্পো আড়াল থেকে মেরেছে এক লাফ। মেরেই পেছন থেকে ভূতটাকে জড়িয়ে ধরল। আচমকা থতমত খেয়ে ভূতটা নিজেকে যেই সামলাতে গেছে, ব্যাস! হাত থেকে ছোরাটা ছিটকে একেবারে মাটিতে। তারপর ভূত আর বাঁদরে ধামসা-ধামসি লেগে গেল। ভূতটা যতবার হুপ্পোকে সামনে টেনে আনার চেষ্টা করছে, হুপ্পো ততই তেড়ে তেড়ে খামচে ধরছে! শেষকালে ভূতের কালো কাপড়টা ধরেই টানাটানি লাগিয়ে দিল। এই বুঝি কাপড়টা খসে পড়ে গা থেকে, ভূতের চালচিত্তির বেরিয়ে পড়ে! অতই কী সোজা! ভূত নিজেই কালো কাপড়ের ঢাকনিটা ঝট করে গা থেকে সরিয়ে নিল। কাপড় দিয়ে হুপ্পোকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে বেঁধে ফেলল। হুপ্পো কিছু বোঝবার আগেই সব খতম। তার মাথা, মুখ, হাত,-পা মানে সারা দেহটাই সেই কাপড়ের মধ্যে, বস্তার মতো বাঁধা পড়ে গেল। হুপ্পো হাঁকপাঁকিয়ে হাত-পা ছুড়ে ধস্তাধস্তি লাগিয়ে দিল। দম আটকে প্রাণ যায়-যায়। আর তো হাত-পা ছুড়ে কোনো লাভ নেই। কেননা, ওই জড়ানো-মড়ানো কাপড়ের বাঁধন খুলে আর বাছাকে বেরোতে হচ্ছে না!

কাপড়টা সরিয়ে ফেলতে এখন আর ভূতটাকে ভূত বলে মনেই হচ্ছে না। ওমা! ও তো একটা ষণ্ডামার্কা লোক। অন্ধকার তাই ঠিক ঠিক চেনা যাচ্ছে না। কিন্তু কাপড়টা যে মালকোচা মেরে পরে আছে, সেটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।

বামুনঠাকুরের অবস্থা কাহিল। বেচারি আর নড়েওনো, চড়েও না। কী হল? অক্কা পেয়ে গেল নাকি? না, ভূতের ভয়ে মূর্ছা গেছে! তাহলে কী হবে?

যা হবার তাই হবে।

সেই ষণ্ডামার্কা লোকটা আর একটুও দেরি করল না। ভেবেছিলুম, ভাঁড়ারঘর যখন ভেঙেছে, তখন হয়তো কিছু হাতড়াবার মতলব আছে! না, লোকটা আর ভাঁড়ারঘরে ঢুকলই না। হয়তো ভাবল, যা একটু-আধটু খুটখাট শব্দ হয়েছে, তাতে যদি আবার কারো ঘুম ভেঙে গিয়ে থাকে! তা হলেই ফ্যাসাদ! তাই কালো কাপড়ে জড়ানো হুপ্পোকে, ঝটপট, পিঠে নিয়ে, চটপট কেটে পড়ল। অবিশ্যি যাবার সময় ছোরাটি কুড়িয়ে নিতে ভুলল না শয়তানটা!

হুপ্পোর তো দম ফেটে যায়! এমন দুর্দশা তার আগে আর কখনো হয়নি! এমন বিপদে সে আর কখনো পড়েনি। এমন বস্তাবন্দি হয়ে, আর কারো পিঠে এর আগে, সে আর কখনো ওঠেনি তো! পিঠে চেপে ছোটেওনি! কালো কাপড়ের মতো বাইরেটাও কালো অন্ধকারে ঢাকা। সে যে কোথা চলেছে, কিছুই বুঝতে পারছে না। কাপড়ে একটু ফুটোফাটা থাকলেও হয়তো কাজ হত। কিন্তু তাও নেই। সবটাই বাঁধা। কী থেকে কী হয়ে গেল। আবার কী হবে, তাই বা কে জানে! ওই ছোরাটা দিয়ে যদি হুপ্পোকে কেটে ফেলে! কিন্তু এখন, এই এক্ষুনি তার যা কষ্ট হচ্ছে তার কী হবে? বেচারা কুঁচকে-মুচকে একটা তেলেভাজা ফুলুরির মতো গুটিয়ে গেছে কালো কাপড়টার পুঁটলিতে!

অনেকক্ষণ পর লোকটা থামল। থামল তার বাড়ির সামনে। হুপ্পোকে সেই কাপড়-জড়ানো অবস্থাতেই ঘরের এক কোণে থুপসিয়ে ফেলে রাখল। হুপ্পো কোনো রকমে ধুঁকিয়ে ধুঁকিয়ে নিশ্বাস নিয়ে বেঁচে রইল। শেষকালে তাকে কী পুঁটলির মধ্যেই থাকতে হবে চিরদিন!

কে জানে বাবা!

হুপ্পো আর নাচের বাঁদর, নাচের ছাগল

না, কাপড়ের পুঁটলির মধ্যে আর থাকতে হয়নি বেশিক্ষণ। সকাল হতেই লোকটা পুঁটলিটা খুলে ফেলল। আঃ! সকালের আলো আর হাওয়া গায়ে লাগতে হুপ্পোর ধড়ে প্রাণ এল। কিন্তু একী! লোকটার মুখের দিকে তাকিয়েই চমকে ওঠে কেন হুপ্পো? আরে! এ যে সেই লোকটা! কোন লোকটা? সেই যে বাঁদরনাচিয়ে লোকটা? এই লোকটাই তো সেদিন ঝুমকিদের বাড়ির সামনে বাঁদর নিয়ে নাচ দেখাচ্ছিল। যাঃ চ্চলে! রাত্তিরে যে-লোকটা ভূত সেজে কিম্ভূতের মতো সব কাণ্ডকারখানা করছিল, এখন হুপ্পো দেখল, সে একটা জ্যান্ত হাত-পা-ওলা মানুষ! এ তো আচ্ছা অদ্ভুতুড়ে কাণ্ড! ভাবি, লোকটা পুঁটলিটা খুলেই বুঝি হুপ্পোকে ছেড়ে দেবে। উঁহু! সেটি হচ্ছে না। লোকটার হাতে ইয়া লম্বা একটা লোহার শেকল। চটপট হুপ্পোর গলায় বেঁধে ফেললে। ঘাড় এঁকিয়ে-বেঁকিয়ে ঘোরালে কী হবে! হুপ্পো কখনো পারে! টানা-হ্যাঁচড়ানিতে লোকটার গায়ে যে একটু খিমচিয়ে দেয়নি হুপ্পো, তা নয়। কিন্তু তাতে কী ভবি ভোলবার? টেনে এক চাঁটা মারল হুপ্পোর মাথায়। হুপ্পো হাত দিয়ে সামলাতে গেল, পারলই না। তারপর গলার শেকলটা ধরে, টানতে টানতে লোকটা হুপ্পোকে নিয়ে চলল।

বেশি দূর অবিশ্যি গেল না। বাড়িটার মধ্যে একখানা ঘর। বাইরে এক চিলতে একটু উঠোনের মতো। ওইখানে আর একটা ঘর। খাঁচার ঘর। খাঁচাটার দিকে চাইতেই হুপ্পোর নজরে পড়ল, তার ভেতর যে-দুটো বাঁদর নিয়ে লোকটা খেলা দেখায়, সে-দুটো বসে আছে। খাঁচার ঠিক বাইরে, সেই ছাগলটা। টানতে টানতে লোকটা হুপ্পোকে খাঁচার কাছেই নিয়ে এল। তা বলে খাঁচার ভেতরে ঢোকাল না। বাইরে একটা খুঁটির সঙ্গে শেকলটা বেশ করে বাঁধল। বেঁধে চলে গেল।

চোখ আর মুখের চেহারা দেখলে ঠিক বুঝবে, হুপ্পোকে দেখে খাঁচার বাঁদর দুটো বেজায় অবাক হয়ে গেছে। কিন্তু দুটো বাঁদরই যে খুব খুশি, সেটা বুঝতেও একটু কষ্ট হবে না। বাঁদর যখন হাসে, তখন মানুষ তো তার মুখ দেখে বুঝতে পারে না। কি-বা হাসি, কি-বা কান্না! সব সমান। কিন্তু বাঁদর তো বোঝে! তাই হুপ্পো ওদের মুখের দিকে চেয়েই বুঝল, দুজনেই অবাক চোখে, তার দিকে চেয়ে আছে বটে, কিন্তু ঠোঁটে মুচকি মুচকি হাসি ভেসে বেড়াচ্ছে। হাসির কারণটা আর হুপ্পোর বুঝতে বাকি রইল না। হুপ্পোকে ধরে এনে, শেকল দিয়ে বেঁধে রেখেছে বলেই যে তারা আহ্লাদে আটখানা, সে-কথা বুঝতে কি আর কষ্ট হয়? রাগে হুপ্পোর শরীর জ্বলে যাচ্ছে। কিন্তু হুপ্পোর মুখ দেখে বুঝবেই না, ভেতরে ভেতরে সে চটেছে। কারণ হুপ্পো জানে, রাগ যতই হোক, চেপে রাখাই ভালো। এখন এই বেপট জায়গায় রাগারাগি করলে লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি। তা ছাড়া রাগ করে চ্যাঁচামেচি করলে তো আর তার গলার শেকলটা ফস করে খুলে যাবে না! তার চেয়ে ভালোমানুষ সেজে থাকাই ভালো। সত্যি কথাই! কী বুদ্ধি দেখো হুপ্পোর! হ্যা, বুদ্ধিটা তার বরাবরই একটু বেশি। বাঁদর হলে কী হবে!

'কিঁই-ই-ই-ই।' হাসির শব্দ। বাঁদর দুটোর মুখে এতক্ষণ হাসি চাপা ছিল। এবার ফেটে পড়ল।

চমকে একটু থতমত খেয়ে গেল হুপ্পো। খাঁচার বাঁদর দুটো বেদম হেসে উঠেছে। হাসতে হাসতে একটা আর একটার গায়ে ঢলে ঢলে পড়ছে। হুপ্পো চমকে গেলেও থমকাল না। খাঁচার বাঁদর দুটোর সঙ্গে নিজেও হাসি জুড়ে দিল, ক্যাঁ-এ্যাঁ-এ্যাঁ-এ্যাঁ। এতক্ষণ পাশের ছাগলটা চুপচাপ ছিল। তিনটে বাঁদরের বাঁদুরে হাসি শুনে সে আর থাকতে পারল না। তারও হাসি পেয়ে গেল। সে-ও হেসে ফেলল, ব্যা-এ্যা-এ্যা-এ্যা! ছাগুলে হাসি, বাঁদুরে হাসি যে একসঙ্গে না শুনেছে, কিছুতেই বুঝবে না সে-হাসিতে কী বিদঘুটে মজা!

অবশ্য হুপ্পোর হাসি শুনে খাঁচার বাঁদর দুটো যে একটু থমকিয়ে যায়নি, তা নয়। গেছিল। কারণ ওরা ভেবেছিল, হেসে দিলে দারুণ ঠাট্টা করা হবে আর হুপ্পো সেই ঠাট্টা-মার্কা হাসি শুনে অপমানে গুমরে উঠবে। মান-সম্মানে আঘাত লাগলে কার আর মেজাজ ঠিক থাকে! কিন্তু হুপ্পো যখন ওদের হাসি শুনে নিজেই হেসে গড়িয়ে গেল, তখন নাচের বাঁদর দুটোই বেবাক! চুপ করে গেল তারা কিন্তু হুপ্পো চুপ করল না। ছাগলটাও হাসি থামাল না। হুপ্পোও হাসছে, ছাগলটাও হাসছে। তখন বেদম রেগে গেছে খাঁচার বাঁদর দুটো। বিচ্ছিরি মুখ খিঁচিয়ে এমন ভেংচি কেটে উঠল, ক্যাঁ-এ্যাঁ-এ্যাঁ-এ্যাঁ!

হুপ্পো আর ছাগলটা খিঁচুনি শুনে দুম করে বুম মেরে গেল। খাঁচার বাঁদর দুটোর মধ্যে রাস্তায় নাচ দেখাবার সময় যে-বাঁদরটা বর সেজেছিল, সে তার থ্যাবড়া মুখখানা আরও ভোঁতা করে চেঁচিয়ে হুপ্পোকে বলল, 'এই, ক্যাবলার মতো হাসছিস কেন রে?'

ক্যাবলা বললে কার মাথা গরম হয় না বল? কিন্তু তবু এবারও হুপ্পো চটল না। উলটে ভাবল, ওদের সঙ্গে ভাব করে ফেলাই ভালো। কারণ, বলা যায় না কে, কখন, কোন কাজে লাগে। চটামটি করে বিপদের ঘাড়ে বিপদ ডেকে লাভ আছে? তাই হুপ্পো খুব মোলায়েম গলায় উত্তর দিল, 'সত্যি বলছি, তোমাদের ভেংচি কেটে আমি হাসিনি। আহা! তোমাদের দুজনারই মুখের হাসি কী মিষ্টি! শুনে আমার প্রাণ জুড়িয়ে যায়!'

হুপ্পোর প্রাণ জুড়িয়ে যাক আর না যাক, কথাটা শুনে নাচিয়েবাঁদর দুটোর যে মন জুড়িয়ে গেল, সে-কথা আর বলতে! তখন বর-বাঁদরটা যে-বাঁদরটা কনে সেজেছিল তার কানে কানে বললে, 'না রে, ছেলেটা ভালো।'

কনে-বাঁদরটা হুপ্পোর চোখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতে থাকতে উত্তর দিল, 'ভালোই তো মনে হচ্ছে। আবার চেনাও তো লাগছে।' তারপর একটু চুপ থেকে, কী যেন ভাবতে ভাবতে হঠাৎ বলে উঠল, 'ওই হয়েছে রে! মনে এসেছে!'

বর-বাঁদরটা জিজ্ঞেস করল, 'কী?'

কনে বলল, 'ওই সেদিন যখন নাচ দেখাচ্ছিলুম, ও একটা মেয়ের কোলে চেপে আমাদের নাচ দেখছিল।'

বর বলল, 'জিজ্ঞেস করে দেখিই না।' বলে হুপ্পোকে জিজ্ঞেস করল, 'হ্যাঁরে, তুই সেদিন একটা মেয়ের কোলে চেপে আমাদের নাচ দেখছিলি?'

হুপ্পো বলল, 'হ্যাঁ, হ্যাঁ। তোমাদের ঠিক মনে আছে তো! আমার নাম হুপ্পো। আর যার কোলে উঠেছিলুম, তার নাম ঝুমকি।'

কোথাও কিচ্ছু নেই, হঠাৎ ছাগলটা ছাগুলে-গলায় ব্যা-এ্যা-এ্যা করে চেঁচিয়ে উঠে বলল, 'ঝুমকি? আমার খুড়-শাউড়ির নামও তো ঝুমকি! কী মিল দেখ!'

ছাগলের কথা শুনে বর আর কনে দুটো বাঁদরই একসঙ্গে হেসে উঠল। হাসতে হাসতে কনে-বাঁদরটা বলল, 'নামে মিল থাকলে কী হবে! মানুষ তো আর ছাগল নয়!'

হঠাৎ বর-বাঁদরটা চেঁচিয়ে উঠে বলল, 'মানুষ ছাগল নয় ঠিকই, কিন্তু বাঁদর। অবশ্য আর একটু খোলসা করে বললে মানে হয়, মানুষ আমাদের বংশধর। মানে এক সময় মানুষ বাঁদর ছিল।'

ছাগলটা উত্তর দিল, 'তা মানুষ যদি বাঁদরই ছিল, তবে তোরা কেন বাঁদর রয়ে গেলি? মানুষ হলি না? তোদের গলায় দড়ি বেঁধে মানুষ কেন নাচিয়ে বেড়ায়?

বর-বাঁদরটা তেড়েমেড়ে খিঁকিয়ে উঠল, 'সাধ করে কী আর তোদের নাম ছাগল। আরে সব বাঁদর মানুষ হয়ে গেলে বাঁদর বংশটাই তো লোপ পেয়ে যায়।'

কনে-বাঁদরটা ঠাট্টা করে বলল, 'বুদ্ধির গোড়ায় একটু হাওয়া দিয়ে নে, ছাউলে!'

ছাগল উত্তর দিল, 'হাওয়া কেন দেব রে? আমি কীসে কম যাই? আমার খুড়-শাউড়ির মেয়ের যখন বিয়ে হয়, তখন কনে পছন্দ করেছিল কে জানিস? এই শর্মা।'

বর ঠাট্টা করল, 'ছাগলের আবার বিয়ে!'

ছাগল রেগে গিয়ে হাউ হাউ করে উঠল, 'দেখ, ছাগল ছাগল করিসনি বাঁদর!'

বাঁদর উত্তর দিল, 'বাঁদর বাঁদর করিসনি ছাগল।'

'বাঁদরকে বাঁদর বলবে না তো কী বলবে র্যা? এত বড়ো ন্যাজ নিয়ে নিজেদের মানুষের সঙ্গে তুলনা করিস কী বলে? শখ আছে ষোলো আনা!'

'তুই তো খালি চোপরদিন বসে বসে জাবর কাটছিস! তোর আর কী কাজ

আছে!'

'তোদেরই বা কী কাজ! খাচ্ছিস-দাচ্ছিস ধিঙ্গিপনা করে বেড়াচ্ছিস!'

হুপ্পো এতক্ষণ চুপ করেছিল। যখন দেখল ঝগড়াটা বেড়েই যাচ্ছে তখন মুখ খুলল, 'দেখো, শুধুমুধু নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করে কোনো লাভ নেই। আসলে আমরা কেউ-ই মানুষ নই এ-কথা সত্যি! আর মানুষকে আমরা হিংসেও করতে চাই না। তবে কথা হচ্ছে, মানুষ আমাদের বড্ড হেনস্থা করে। এই দেখো না, আমাদের গলায় দড়ি বেঁধে রাস্তায় রাস্তায় নাচিয়ে বেড়ায়। ছাগলের পিঠে চাপিয়ে মিথ্যে মিথ্যে বর-কনে সাজায়। আমাদের গ্রাহ্যের মধ্যে আনে না। অবিশ্যি সব মানুষই যে এমন, তা নয়। এই দেখো না ঝুমকি, মানুষ হলে কী হবে, ভারি লক্ষ্মী মেয়ে। আমায় খুব আদর করে। আর ঝুমকির মা? সে-কথা জিজ্ঞেস করো না। ভীষণ রাগী। আমি তো দেখলেই লুকিয়ে পড়ি। অবিশ্যি ঝুমকির বাবা অমন নয়। ঝুমকির বাবাই আমাকে রথের মেলা থেকে কিনে নিয়ে আসে। যত্ন করে, আবার আমি দুষ্টুমি করলে বকেও। দেখো, আদরযত্ন করলে বকুনি খেতেও ভালো লাগে। মনে হয় আমাদের ভালোর জন্যেই তো বকছে। আবার দেখো, ঝুমকিদের বামুনঠাকুর, সে তো আমাকে দেখলেই পালাবে। আমাকে দেখে ভয় পাবার কী আছে, কে জানে! সত্যি বলছি, আমি তাকে কোনোদিন মুখও ভেংচাইনি, তেড়েও যাইনি। তবে, বামুনঠাকুর একদিন চুপিচুপি আমার একটা কলা খাচ্ছিল, আমি দেখে ফেলেছি। বামুনঠাকুরকে আমি তবে কোনো দোষ দিই না। মুখের সামনে সব সময় খাবার নিয়ে নাড়াচাড়া করলে, নোলার জল সামলানো যায়? সেই থেকে ঠাকুরও আমাকে এড়িয়ে এড়িয়ে চলে।'

'তোদের বামুনঠাকুরের টিকি আছে?' ছাগলটা জিজ্ঞেস করল।

'বলতে! কী লম্বা!'

বর-বাঁদরটা জিজ্ঞেস করল, 'মানুষ টিকি রাখে কেন বলত?'

কনে-বাঁদরটা উত্তর দিল, 'কী বোকা-রে তুই, জানিস না, টিকি রাখলে মানুষের রূপ

বাড়ে!'

হুপ্পো বলল, 'বামুনঠাকুরের আবার রূপ! সে ঝুমকি। চোখে কাজল পরছে, মাথায় বেণি আঁটছে, পায়ে আলতা পরছে, ঠোঁটে আবার লাল-লাল একটা কী মাখে। ভারি সুন্দর দেখায়।'

'তুই মেখেছিস, কোনোদিন?' জিজ্ঞেস করল কনে-বাঁদরটা।

'মিথ্যে বলব না, আমি ভাই ওসব কোনোদিন মাখিনি। আমার ভাই মেয়েদের মতো সাজতে লজ্জা করে!'

ছাগলটা বলল, 'সত্যি! মেয়েদের সাজ-পোশাকগুলো কেমন যেন হাবজা-গোবজা! এই আমার খুড়-শাউড়ি, তারও ভারি ভাবন!'

বরটা তেড়েমেড়ে উঠল ছাগলটাকে, 'কথায়-কথায় খুড়-শাউড়ি, খুড়-শাউড়ি করিসনি তো! কী রকম আদেখলেপনা দেখ! যেন আর কারো খুড়-শাউড়ি নেই!

ছাগল বলল, 'নেই-ই তো। তুই তো একটা বাউন্ডুলে। ওই নেচেই বেড়াবি। বিয়েও হবে না, আর শাউড়িও হবে না।'

হুপ্পো জিজ্ঞেস করল, 'ছাগল, ছাগল, তোমার শ্বশুরবাড়ি কোথা?'

ছাগল বলল, 'দূরে নয়, কাছেই।'

'বউ কোথা?'

বউ-এর কথা বলতেই ছাগলের মুখটা কেমন যেন শুকিয়ে গেল। বলল, 'অনেকদিন ভাই দেখিনি তাকে। বউ-এর জন্যে মনটা বড্ড কেমন-কেমন করে। ছেলেপুলে নিয়ে কেমন আছে কে জানে!' হুপ্পো বর আর কনে-বাঁদরকে জিজ্ঞেস করল 'তোমাদের বাড়ি কোথা?'

কনে উত্তর দিল, 'দূর ছাই, মনে আছে কী! নেচে-নেচেই সব গেল।'

বর বলল, 'আমার অবশ্য মনে আছে। আমাদের বাড়ি লছমনঝোলা। আমরা দুজনেই রেলে চেপে এসেছি। আমার মাকেও মনে আছে, বাবাকেও। বড্ড মন খারাপ লাগে ওদের জন্যে, কান্না পায়! কিন্তু কী করব! মানুষের জ্বালায় মা-বাবা সবাইকে ভুলতে বসেছি।'

'দেখতে ইচ্ছে করে না?' হুপ্পো জিজ্ঞেস করল।

'কী বলছিস তুই? দেখতে ইচ্ছে করবে না? মা-বাবাকে ভুলে থাকা যায়, বল? কিন্তু উপায় তো নেই!' হুপ্পো আবার জিজ্ঞেস করল, 'কেন?'

'দেখেছিস না খাচায় বন্দি।'

'বন্দি তো নিজেদের দোষেই হয়েছে!'

'কেন?'

'কেন নয়! তোমাদের সাহস নেই তাই। যদি সাহস থাকত, বুদ্ধি থাকত, তবে খাঁচা ভেঙে ভেগে পড়তে।'

'তুই পাগল। খাঁচা কী ভাঙা যায়?'

'বুদ্ধি থাকলেই যায়।'

'তোরও তো গলায় লোহার শেকল, ছিঁড়তে পারবি?' হুপ্পো একটু মুচকি হাসল।

ছাগল জিজ্ঞেস করল, 'হাসছিস কেন রে? তুই বুঝি শেকল ছিঁড়তে জানিস?'

হুপ্পো উত্তর দিল, 'গায়ে এত জোর কোথা?'

কনে জিজ্ঞেস করল, 'তবে ও-কথা বলছিস কেন?'

'বলছি, কারণ তোমরা তিনজন, আর যে-লোকটা তোমাদের নাচায়, সে একা। তোমরা নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করো, অথচ লোকটা যখন লাঠি নিয়ে ঠেঙায়, তখন বর সেজে, কনে সেজে ছাগলের পিঠে বিয়ে-বিয়ে খেলা দেখাও। তোমাদের বাপু মানসম্মান নেই।'

ছাগলটা বলল, 'ঠিক বলেছিস!'

কনে বলল, 'তা বাপু একশোবার!'

বর বলল, 'হক কথা। লোকটা আমাদের একদম বুদ্ধু বানিয়ে রেখেছে। না, আমরা আর নাচব না, কিছুতেই না।'

ছাগল বলল, 'বাঁদরের বুদ্ধিই অমনি! লম্বা-চওড়া কথা তো খুব বলছিস। যখন পিঠের ওপর ধাঁই ধাঁই করে লাঠির ঘা পড়বে, তখন না-নেচে থাকতে পারবি?'

'কেন পারব না! মনের জোর থাকলে সব হয়। কত মারবে!'

'বেশ তো, তাহলে আজ থেকে আমরা আর নাচব না।' বরের কথায় কনে-বাঁদরটা সায় দিল।

হুপ্পো বলল, 'তা তো বুঝলুম। কিন্তু দেখো, না নাচলে লোকটা হয়তো জব্দ হবে, কিন্তু তোমরা তো ছাড়ান পাবে না।'

ছাগলটা হেসে উঠল।

আচমকা ছাগলের হাসি শুনে বর জিজ্ঞেস করল, 'হাসির আবার কী হল?'

ছাগল উত্তর দিল, 'হাসব না? আসলে নাচ থামালে যে তোরা বন্দি দশা থেকে নিস্তার পাচ্ছিস না, এটা আর তোদের মগজে এল না।'

কনে বলল, 'সত্যি কথাই তো!'

বর জিজ্ঞেস করল, 'তাহলে উপায়?'

ছাগল বলল, 'মাথা খাটা, মাথা খাটা।'

বর রেগেমেগে উত্তর দিল, 'হ্যাঁ, আমরা মাথা খাটাই, আর উনি খুড়-শাউড়ির স্বপ্ন দেখুন।'

'আরে আমার খুড়-শাউড়ি আজ এখানে থাকলে, তোদের এ দুর্দশা হত? এমন বুদ্ধি খাটাত যে বর্তে যেতিস!'

'থাক, আর বকবক করতে হবে না। ছাগলের কত বুদ্ধি সে আর আমাদের জানতে বাকি নেই!'

আবার যখন ছাগলে-বাঁদরে লেগে যাচ্ছিল, হুপ্পো তখন চট করে বলল, 'দেখো, আবার নিজেদের মধ্যে ঝগড়া বেঁধে যাচ্ছে। ঝগড়া করলে তো আর ফয়সালা হবে না।'

কনে বলল, 'তা বাপু ঠিক। নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করাটা ঠিক না। কিন্তু আমরা তো ভেবেচিন্তে কিছু ঠাওর করতে পারছি না। তুই একটা কিছু বুদ্ধি-টুদ্ধি দে না।'

হুপ্পো উত্তর দিল, 'বুদ্ধি আমি দিতে পারি, কিন্তু করতে তো তোমাদের হবে! পারবে তো?'

বর-বাঁদরটা বলল, 'কী বলিস, তা আর পারব না!'

'আমার কথাটা কিন্তু খুব গোপন। চালাচালি হয়ে গেলে ভারি বিপদ!'

বর আর কনে দুটো বাঁদরই একেবারে দু-পায়ে উঁচিয়ে উঠল। বলল, 'সে জ্ঞানটুকু আমাদের আছে।'

হুপ্পো ছাগলের দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করল 'তুমি'? ছাগল উত্তর দিল, 'বিশ্বাস আমাকেও করতে পার।'

হুপ্পো হাসতে হাসতে বলল, 'খুড়-শাউড়িকে বলে দেবে না তো?'

ছাগল উত্তর দিল, 'এখানে খুড়-শাউড়ি কই, যে বলব?'

কনেটা, বরটা আর হুপ্পো তিনজনেই হেসে উঠল একসঙ্গে।

ছাগল বলল, 'তুইও দেখি ঠাট্টা করিস! যা বলবার তাড়াতাড়ি বল। লোকটা এসে পড়লে, আর কিছু করতে হবে না।'

হুপ্পো বলল, 'আমার ওপরও রাগ করছ? আচ্ছা, তাহলে একটু কাছে এগিয়ে এসো।' বলে হুপ্পো নিজের গলার শেকলটা টেনে টেনে কনে আর বরের খাঁচার কাছে এগিয়ে গেল। ছাগলটাও গলার দড়ি যতখানি যায় টেনে টেনে হুপ্পোর মুখের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল। হুপ্পো তিনজনকে ফিসফিস করে কী সব বলতে লাগল। কী যে বলছে, সেটা ছাগল, বর আর কনে-বাঁদর ছাড়া কেউ শুনতে পাচ্ছে না।

ফিসফিসুনি শেষ হতে কনে আর বরটা বলল, 'বাবা, তোর কী বুদ্ধি রে!'

ছাগল বলল, 'ওঃ, একদম ডাঁসা বুদ্ধি।' বলেই ব্যা-এ্যা-এ্যা, ব্যা-এ্যা-এ্যা করে এমন চ্যাঁচাতে লাগল আর লাফাতে লাগল মনে হচ্ছে যেন হাতে স্বগ্গ পেয়ে গেছে। আর ঠিক যা ভেবেছি, তাই। চ্যাঁচামেচি শুনে, লোকটা কোথায় ছিল ছুটে এসেছে। হবেই তো। যতই আনন্দ হোক, সবকিছু একটু সামলে-সুমলে করা উচিত। একেবারে বে-আক্কেলের মতো অমন হাঁকাহাঁকি আর লাফালাফি করাটা কি ঠিক হল?

লোকটাকে দেখেই কিন্তু ভারি ভালোমানুষের মতো চুপ করে গেল বর আর কনে-বাঁদর দুটো। হুপ্পোও স্পিকটি নট। আর ছাগলটাও গোবর-গণেশের মতো হাবাগোবা সেজে চুপ মেরে গেল। লোকটা হুপ্পোর কাছেই এগিয়ে গেল। ভাবল, নিশ্চয়ই এই নতুন বাঁদরটা ছাগলটাকে কিছু করেছে। তাই ছাগলটা চিল্লাচ্ছে! খুঁটির সঙ্গে বাঁধা শেকলটা খুলে, হুপ্পোকে হিড়হিড় করে টানতে টানতে উঠোনে নিয়ে গেল। উঃ। ভয়ানক লেগেছে হুপ্পোর! তারপর হাতের ঠেঙাটা নিয়ে সাঁই সাঁই করে হুপ্পোর পিঠে বসিয়ে দিল। আচমকা যে অমন করে মারবে, হুপ্পো এটা মোটেই বুঝতে পারেনি। কিন্তু হুপ্পোও কী কম চালাক! মার খেয়ে মুখে টুঁ শব্দটি পর্যন্ত করল না। উলটে বাঁদর-নাচিয়ের গলাটি জড়িয়ে ধরল এমন করে, যেন কতদিনের পোষমানা বাঁদর।

লোকটাও অবাক। আচ্ছা তাজ্জব বাত তো! এ নয়া বাঁদরটা মার খেয়েও তাকে কামড়ে দিল না, খামচে দিল না। উলটে গলার ওপর পাক খাচ্ছে!

লোকটা আর মারল না হুপ্পোকে। মারল না বটে, তা বলে ভেব না মোটেই হুপ্পোর আদরে গলে গেল। লোকটা শয়তানের বাড়া। দেখছ না মুখখানা! হুপ্পো শুনেছে, মুখ দেখলেই নাকি মন বোঝা যায়! অতশত গোলমেলে কথা বুঝতে পারে না হুপ্পো। তবে উনি যে মোটেই সুবিধের নন, সে তো হুপ্পোর আগেই জানা। নইলে মশাই নিজঝুম রাত্তিরে অমন করে চুরি করে আনে তাকে! হুপ্পোকে ঘাড় থেকে টেনে নামিয়ে আনল লোকটা। শেকলটা হাতে ধরে, হাতের ঠেঙাটা হুপ্পোর পায়ের কাছে এমনভাবে চালাতে লাগল, হুপ্পো পা বাঁচাতে তিড়িং তিড়িং লাফ দিল। প্রথমটা বুঝতেই পারেনি হুপ্পো যে, লোকটা তাকে নাচাবার জন্যে অমনি করছে। বা, বলতে পার নাচ শেখাচ্ছে। ক-বার এমনি ঠেঙা ঠোকার পর হুপ্পো যখন লাফাতে লাগল, তখন লোকটা চেঁচিয়ে উঠল, 'নাচ, নাচ, নাচ।'

লোকটার মাথায় কী আছে, সেটুকু বুঝতে হুপ্পোকে বেশি মাথা খাটাতে হল না। নিজেই নাচতে শুরু করে দিল। আর ঠ্যাঙার দরকারই লাগল না।

ফুঃ! ও হুপ্পোকে নাচ শেখাবে! হুপ্পো বলে ঝুমকির নাচ দেখে নিজে নিজেই কতদিন নেচেছে, লুকিয়ে লুকিয়ে। ঝুমকির নাচ তো কত শক্ত। আর এদের নাচ, ফুঃ!

নাচতেই লাগল হুপ্পো। লোকটা শেকলটা ধরে আবার হিড়হিড় করে টান দিল। ঘরে গেল। একটা ডুগডুগি দেওয়ালে ঝোলানো। সেটা নিয়ে বাইরে এসে ডুগডুগি বাজাতে শুরু করে দিল। হুপ্পোও তেড়েমেড়ে নাচন-কোঁদন লাগিয়ে দিল। নাচতে নাচতে

ক-বার ডিগবাজিও লাগাল। লোকটা ভাবল, 'ভালো রে, ভালো। এ যে দেখি তৈরি

বাঁদর!'

নাচতে নাচতে হাঁপিয়ে গেল হুপ্পো। লোকটা নাচও থামিয়ে দিল। নাচ থামিয়ে ছাগলটাকে ডাকল, 'আ--বু-উ-উ!'

ডাক শুনে ছাগলটাও 'বুঁ-উঁ-উঁ' করে সাড়া দিল। যার মানে, 'এ্যাঁ'? কী বলছ? ছাগলের কথা তো! এগিয়ে গেল ছাগলটা। লোকটা তার মুখের দড়িটা ধরে একটু ওপর দিকে টানতেই, ছাগলটা দু-পায়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। ওমা! ওমা! দেখো, কী মজাদার দেখতে লাগছে! হুপ্পোও খুব আশ্চর্য হয়ে গেল। ভাবল, ছাগলটা বেশ কায়দা জানে তো! কী জানি কেন, ছাগলটার অমন ভঙ্গিবহর দেখে, হুপ্পো ঠিক থাকতে পারল না। মারল ছাগলের পিঠে এক লাফ। ছাগলটা প্রথমে হুপ্পোর ধাক্কা খেয়ে একটু টলকে গেছল। তারপর সামলে, হুপ্পোকে পিঠে নিয়েই, দু-পায়ে নাচ শুরু করে দিল! বাঁদর ঘাড়ে সে এক বেড়ে ছাগুলে নাচ!

বাঁদর-নাচিয়ে লোকটাও দেখেশুনে একদম হাঁদা! না শেখাতেই বাঁদর আর ছাগলটা এই দুর্দান্ত নাচ শিখল কোত্থেকে! এ-নাচটা যে নির্ঘাৎ আরও অনেক পয়সা এনে দেবে, সে-মতলবটা লোকটার মাথায় তখন সেঁদিয়ে গেছে! কিন্তু এদিকে যে হুপ্পো ছাগলের পিঠে চেপে, গলাটি জড়িয়ে, তার কানে কানে কী বলছে সেটা আর বাঁদর-নাচিয়ের চোখে পড়ল না। পড়লেও ও আর কী করে বুঝবে হুপ্পো বলছে, 'ছাগল, ছাগল, জোরে জোরে নাচ।'

তা বলে বাপু দু-পায়ে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ ধরে জোরে জোরে নাচা ছাগলের সাধ্যি নয়! মানুষ হলে এক কথা ছিল! লম্বা-ঢ্যাঙা মানুষগুলো কেমন দু-পায়ে দাঁড়িয়ে হাঁটে-ফেরে, নাচে-ছোটে। যাই বলো, তাই বলো, ভগবানের মানুষের জন্যে একটু বেশি ভাবনা। তা না হলে ধরে-বেঁধে গাধা-ঘোড়া, ছাগল-ভেড়া এসব জন্তুর দেহে চারটে করে পা জুড়ে দেবে কেন? দুটোতেই কি কাজ হত না? চারটে পা ভাগ করে দুটো হাত, দুটো পা করে দিলে কী ক্ষতি ছিল।

ছাগলটা আর বেশিক্ষণ হুপ্পোকে পিঠে নিয়ে নাচতে পারল না। ঝপ করে মাটিতে চার ঠ্যাং-এ দাঁড়িয়ে পড়ল। হুপ্পোও চটপট ছাগলের পিঠ থেকে নেমে পড়ে সাঁই-ই-ই করে শূন্যে একটা ডিগবাজি মারল। লোকটা খুশিতে হেঁকে উঠল, 'সাবাস!' তারপর ছাগলের পিঠে আর হুপ্পোর গায়ে তারিফ করে হাত বোলাতে লাগল।

হঠাৎ লোকটা বর আর কনে-বাঁদরের খাঁচার দিকে মুখ ঘোরাল। হয়তো মতলব ও দুটোকে নিয়েও একটু নাচানাচি করা। কিন্তু আশ্চর্য দেখো, হুপ্পো আর ছাগলের এমন মজাদার কাণ্ড দেখার জন্যে বর আর কনে-বাঁদরটা তো খাঁচায় মুখ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে নেই! খাঁচার মধ্যে বাঁদর দুটো কেমন পড়ে পড়ে ধুঁকছে!

কী হল বর-কনের? অমন করে ধুঁকছে কেন?

বর আর কনে-বাঁদরের ধুঁকুনি দেখে অমন সাবধানী বাঁদর-নাচিয়ে হঠাৎ যে এমন অসাবধানের মতো কাজ করে বসবে, ভাবা যায়নি! লোকটা করেছে কী, হুপ্পো আর ছাগলকে খুঁটির সঙ্গে না-বেঁধেই, ছুট্টে গিয়ে বর আর কনে-বাঁদরের খাঁচার দরজা খুলে ফেলেছে। তাড়াতাড়ি বর-কনেকে খাঁচার থেকে টেনে বারও করে ফেলেছে। আর ঠিক এই সময় হুপ্পো গলার শেকল গলায় নিয়েই মেরেছে এক লাফ ঘর থেকে বাইরে। মেরেই ছুট। নাচিয়ে লোকটা তাই না দেখে থ। আগু-পিছু কিচ্ছু না ভেবে, বর-কনেকে খাঁচার বাইরে ফেলে রেখেই হুপ্পোকে দুড়দাড়িয়ে ছুটে ধরতে গেছে।

বর-কনে বাঁদর দুটো এতক্ষণ পর্যন্ত ধুঁকছিল। কে বুঝবে, ওরা মিথ্যে মিথ্যে অমন করে মটকা মেরে পড়ে আছে! পড়ে থাকবে না? এ-সব হুপ্পোর বুদ্ধি। তখন কানে কানে ফিসফিসিয়ে এই মতলবটাই তো হুপ্পো ওদের দিয়েছে। তাই, যেই না লোকটা হুপ্পোর পিছু ছুট দিয়েছে, বর আর কনে-বাঁদর দুটোও তিড়িং-মিড়িং দাঁড়িয়ে উঠে, মেরেছে বোম্বাই লাফ। ঘর থেকে বাইরে, বাইরে থেকে রাস্তায়, রাস্তা থেকে গাছে। গাছের ওপর ডাকাডাকি, আর নাচানাচি।

বাঁদর-নাচিয়ে লোকটা হুপ্পোর পিছু ছুটতে গিয়ে থমকে দাঁড়াল। বর আর কনে-বাঁদরকে গাছের ডালে নাচতে দেখে তার তো চক্ষু চড়কগাছ! তরতর, তরতর করে গাছের ডালে উঠে পড়ল লোকটা। বাঁদর দুটোও চটপট চটপট নেমে পড়ল গাছ থেকে। আরে বাবা, বাঁদরকে ধরা অত সহজ! ওরা ছুটতে পারে, লাফাতে পারে। এ-বাড়ি, ও-বাড়ির ছাত পেরিয়ে, পালাতে পারে।

হলও তাই। বরও পালাল, কনেও পালাল। আর লোকটা আঁকপাঁকিয়ে গাছ থেকে নামতে নামতেই, সক্কলে হুস!

লোকটাও ছাড়বে কেন? আহা! বাঁদর না নাচলে, সে খাবে কী! বাঁদর না বাঁচলে, সে পরবে কী! অত সহজে বাঁদরের মায়া কাটানো যায়? যতই হোক বাঁদর তার বড়ো আদরের ধন। এ-বাড়ির ছাদ, ও-বাড়ির ঘর, এদিকের গলি, ওদিকের রাস্তা খুঁজতে খুঁজতে লোকটা একেবারে দিশেহারা হয়ে গেল। সারাটাদিন না-খেয়ে না-দেয়ে বাঁদর খুঁজতে কেটে গেল। আর মনে মনে ভাবতে লাগল, শেষকালে বাঁদরগুলো বুদ্ধু বানিয়ে দিল!

খুঁজতে খুঁজতে হয়রান হয়ে ঘরে যখন ফিরল, তখন দেখল, আহা! অমন নাদুস-নুদুস ছাগলটিও নেই। সে-ও তার গলার দড়ি ছিঁড়ে, রাস্তা দেখেছে। তাই দেখে সঙ্গে সঙ্গে মেজাজ তিরিক্ষি! নিজের মনে চ্যাঁচাতে লাগল, 'গেলি তো, গেলি, বয়ে গেল আমার। ভেবেছিস, তোরাই শুধু নাচতে জানিস, আর আমি জানি না? এই দেখ,' বলে ডুগডুগিটা বাজিয়ে নিজে নিজে একাই নাচতে লাগল আর আপন মনে হা-হা করে হাসতে লাগল।

নাচতে নাচতে, হাসতে হাসতে রাত ভোর হয়ে গেল, তবু থামল না। পাড়া-পড়শি লোকজনেরা ছুটে এল। বলাবলি করতে লাগল, বাঁদরের শোকে লোকটা বোধহয় পাগল হয়ে গেছে। হবে হয়তো!

ভারি মজার ঝুলন্ত কাণ্ড

কথা ছিল, বাঁদর-নাচিয়ের বাড়ি থেকে পালিয়ে ওরা হুপ্পোর সঙ্গে দেখা করবে। যে-জায়গায় দেখা করবে সেটা এখান থেকে বেশ খানিকটা দূরে। অবশ্যি ওদের তেমন ভোগান্তি হয়নি। যেমন যেমন ভেবে রেখেছিল, কাজও তেমন তেমন হয়েছে। মোদ্দা কথা, হুপ্পোর জন্যেই আজ বর আর কনে-বাঁদরের হাত-পা ঝাড়া। যাই বল, হুপ্পোর মাথা আছে! মতলবটা কেমন ভেবে-চিন্তে বার করেছে! তবে, প্রথমটা ও নিজে একটু বিপদে পড়েছিল। গলার সেই লোহার শেকলটা তো তার গলাতেই বাঁধা ছিল। সেটি তো আর খুলতে পারেনি বাছাধন! একটা নেড়া-মাথা ছেলে, হুপ্পোকে দেখতে পেয়ে, এমন পিছু পিছু ছুট দিয়েছিল যে, আর একটু হলেই ছেলেটা শেকলটা ধরে ফেলেছিল। কিন্তু হুপ্পোও তো কম যায় না! মেরেছে সেই উঁচু বাড়িটার ওপর লাফ! তারপর ছুট। তবে রক্ষে, ও যখন একটা গাছে লাফ মেরেছিল, গাছের ডালে শেকলটা আটকে যায়নি। তাহলেই কেলেঙ্কারি ব্যাপার! গাছেই হুপ্পোকে ঝুলতে হত। বর-বাঁদরটাই হুপ্পোর গলার শেকলটা খুলে দিল। বর আর কনে-বাঁদরের গলার বকলেশ দুটো হুপ্পো ছিঁড়ে ছুড়ে ফেলে দিল।

কিন্তু কথা হচ্ছে, এখন করবে কী ওরা! যদিও একটা মস্ত বড়ো বট-ঝুরি গাছের ডালে

ওরা আস্তানা গেড়েছে, তবু এখানে তো আর বেশিক্ষণ থাকা যাবে না। ও মশাই বাঁদর-নাচিয়ে লোকটাকে বিশ্বাস নেই। কখন বলতে কখন নজরে পড়ে যায়! তখন এমন ভেল্কিবাজি শুরু

হয়ে যাবে যে, শত বুদ্ধি খাটিয়েও আর বাছাদের নিস্তার পেতে হবে না।

কিন্তু এখন যায় কোথা? দেখো, কনে আর বর-বাঁদরের কথা ছেড়ে দাও। এরা তো লছমনঝোলা থেকে এসেছে। ওদের ঘরে ফেরাই মুশকিল! সে আবার রেলে চড়ে যেতে হয়! রেলে চড়লে টিকিট লাগবে। টিকিট কাটতে পয়সা লাগবে। হাজারটা ঝামেলা! কে এত ঝক্কি পোয়াবে! আর হুপ্পো? তার মন তো ঝুমকির জন্যে কেমন-কেমন করছেই। কিন্তু মন-কেমন করলে কী হবে বল? ঝুমকির বাড়ির রাস্তাটাই সে গুলিয়ে ফেলেছে! কাছে-পিঠে হলে না হয় কথা ছিল। একটু চেষ্টা করা যেত! কিন্তু কে জানে ঝুমকিদের বাড়ি কোথায়, কোন ধাধধারা গোবিন্দপুরে!

কনে-বাঁদরটাই প্রথম কথা বলল। বলল, 'ছাড়া তো পেলুম! এখন?'

বর উত্তর দিল, 'ছাড়া যখন পেয়েছি, তখন ছন্নছাড়ার মতো এদিক সেদিক ঘোরাঘুরি করে তো কোনো লাভ নেই। তাতে বিপদ বেশি। ছাড়া পেয়ে যদি যে-যার ঘরের মুখ দেখতেই না পেলুম, তবে ছাড়া আর না-ছাড়া এক কথা।'

কনে উত্তর দিল, 'ঘরে যেতে হলে তো রেলে যেতে হবে! টিকিট কাটতে হবে! তার ওপর ঠিক গাড়িতে ঠিক সময়ে না বসলে, বেঠিক জায়গায় গিয়ে পড়ব। বেঠিক জায়গায় গিয়ে পড়লে সে তো আর এক লেঠা!'

বর বলল, 'ঠিক-বেঠিকের কী আছে! যে রেলগাড়ি কু-কু ডাকে, ঝিক-ঝিক ছোটে, সেই গাড়িই তো বাড়ি যায়!'

কনেটা খিঁকিয়ে উঠল, 'দূর বোকা, তাই হয় নাকি! জানিস না, দখনের গাড়ি দখনে যায়, উত্তুরের গাড়ি উত্তুরে যায়! যার যেদিকে ঘর সে সেদিকে যায়!'

বর জিজ্ঞেস করল, 'তাহলে আমরা যাব কোনদিকে? আমাদের ঘর কোনখানে?'

কনে বলল, 'যেদিকে লছমনঝোলা।'

বর বলল, 'সেদিকটা কোনদিকে? উত্তুরে, না দখনে?'

হুপ্পো এতক্ষণ চুপচাপ শুনছিল। হঠাৎ কথা বলে উঠল। বলল, 'কোন দেশটা কোনদিকে, ঝুমকি থাকলে এক্ষুনি বলে দিত। কোনদিকে লছমনঝোলা, কী কোনদিকে শিমুলতলা, কিংবা কোনদিকে ট্যাংরা, টেরিটিবাজার বা সোনদা, টুং, শিলং কী ঘুম, ঝুমকির একেবারে জলের মতো মুখস্থ!'

বর, কনে দুজনেই হইচই করে উঠল। বলল, 'তা হলে চল না, ঝুমকির কাছে!'

হুপ্পো বলল, 'মুশকিল তো সেইখানেই। ওদের বাড়ি যাবার রাস্তাটাই ভুলে বসে আছি।'

কনে উত্তর দিল, 'যাঃ! তাহলে তো বড়ো ঝামেলা হয়ে গেল। আমরা ঘর হারিয়েছি, তুমিও রাস্তা ভুলেছ! এখন তো আমাদের নাজেহাল হবার গতি।'

'নাজেহাল হবি কেন? মার খুড়-শাউড়ি কী মরে গেছে?'

কথাটা শুনে তিনটে বাঁদরই চমকে উঠেছে। গাছের ওপর থেকে নীচে রাস্তার দিকে, অবাক হয়ে চেয়ে দেখে, ছাগলটাও এসে পড়েছে। এতক্ষণ ছাগলটার কথা ওরা ভুলেই গেছল!

ছাগল বলল, 'দেখ, আমার কথা তোরা ভুলতে পারিস, তোদের কথা কিন্তু আমি

ভুলিনি!'

কনে উত্তর দিল, 'সত্যি! বড্ড লজ্জার কথা! তো এলি কী করে?'

'আমায় একবার একটা কথা বলে দিলে সহজে ভুলি না। আমি বলে কেন, ছাগল বংশের গুণই তো তাই।'

বর বলল, 'যাক গে, যাক গে, যা হবার হয়ে গেছে। এখন কথা হচ্ছে, তুই নীচে, রাস্তায় দাঁড়িয়ে, আর আমরা ওপরে, গাছে বসে। খুড়-শাউড়ির বাড়ি যেতে হলে হয় তোকে ওপরে আসতে হয়, তা না হলে আমাদের নীচে নামতে হয়।'

কনে বলল, 'ও তো ছাগল। গাছে উঠবে ক্যামনে?'

বর-বাঁদরটা মুখখানা হাঁদার মতো গোমড়া করে উত্তর দিল, 'তাই তো! তা হলে তো আমাদের নামতে হয়!'

অবিশ্যি এখন আর নামতে কোনো বাধা নেই। কেননা, অনেকক্ষণ কেটে গেছে। আর যে বাঁদর-নাচিয়ে এদিকে আসবে, তেমন কোনো ভয়ও নেই। তবু এখনো তো দিন! রাস্তায় এখনো গাড়ি-ঘোড়া লোকজনের চলাচল, হই-হুল্লোড়। গাছটা খুব ঝাঁকড়া বলে তাই। লুকিয়ে বসে থাকতে মজা। তিনটে বাঁদরকে একসঙ্গে দেখলে, পিছু লাগবার লোকের অভাব হয় না। বাঁদর দেখলে কী যে মজা পায় বুড়ো-বুড়ো লোকরা ভগবানই জানেন! বুড়োদের কথাই বা বলি কেন! ছুটকো ছুটকো ছেলেগুলো কী কম শয়তান। একবার দেখতে পেলে হয়! এমন চিল্লাবে, যেন ভাগাড়ে শুকনি পড়েছে।

হুপ্পোই সাবধান করল, 'এখন নামা ঠিক নয়। রাত না হওয়া পর্যন্ত আমাদের গাছেই লুকিয়ে থাকতে হবে।'

'তাহলে আমি কী করব?' ছাগল জিজ্ঞেস করল। 'আমি বাপু একা একা এখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারব না। কে কখন দেখে ফেলবে!'

হুপ্পো উত্তর দিল, 'তোমাকে তো গাছে তোলাই মুশকিল।'

'মুশকিল-টুশকিল জানি না।' আবদার ধরল ছাগলটা। 'তোমরা মজা করে গাছের ডালে লুকিয়ে থাকবে আর আমি এমন খোলামেলা জায়গায় চরে বেড়াব? বিপদ হতে তো আর সময় লাগে না।'

বর-বাঁদরটা ঘাড় নেড়ে মুরুবিবর মতো উত্তর দিল, 'কথাটা কিন্তু ঠিক।'

কনে বলল, 'ঠিক কথা তো সবাই জানে। কিন্তু করবার তো কিছু নেই।'

হুপ্পো এতক্ষণ কী ভাবছিল। বলল, 'করা যে যায় না, এমন নয়। এক যদি ওকে ওপরে টেনে তোলা যায়!'

অমন একটা ধুমসো ছাগলকে গাছের ওপর টেনে তোলা তো চারটিখানি ব্যাপার নয়! তবু কথাটা যখন হুপ্পোর মুখ দিয়ে একবার বেরিয়েছে, তখন মতলবটাও হুপ্পো নিশ্চয় আগেই ঠাউরে ফেলেছে।

সত্যিই একটা বুদ্ধি খাটিয়েছে হুপ্পো। হুপ্পো বরকে বলল, 'তুমি এক কাজ কর, তোমার ল্যাজ দিয়ে নীচের ওই ডালটা জড়িয়ে ধরে মাটির দিকে মুখ নামিয়ে ঝুলে থাকো।'

বর-বাঁদরটা হুপ্পোর কথা মতো ঝুলে পড়ল।

এবার কনে-বাঁদরটাকে বলল, 'তুমি লাফাও।' বরকে বলল, 'ও লাফালেই তুমি হাত দিয়ে ওর পেছনের ঠ্যাঁ দুটো ধরে ফেলবে।'

বাঁদরের পক্ষে এ তো আর এমন কিছু শক্ত কাজ নয়। ওরা তো চোপরদিন এই কাণ্ডই করছে। তাই যেমন বলা, তেমনি কাজ। বর আর কনে চ্যাং-ঝোলা হয়ে দুলতে লাগল।

এবার হুপ্পোর পালা। হুপ্পো কনের হাতের কাছে নিজের ল্যাজটা এগিয়ে দিয়ে বলল, 'এবার আমার ল্যাজাটা টেনে ধরো।' কনে-বাঁদর হুপ্পোর ল্যাজ টেনে ধরল। হুপ্পো একেবারে ছাগলের পিঠের কাছে ঝুলে পড়ল।

'ছাগল, ছাগল, ঠ্যাং বাড়াও।'

ছাগল অমনি দু-পায়ে খাড়া হয়ে ঠ্যাং বাড়াল। হুপ্পো ধরে ফেলল ছাগলের ঠ্যাং দুটো দু-হাত দিয়ে। ছাগলকে চ্যাংদোলা করে দুলতে লাগল। ছাগলও দুলছে, হুপ্পোও দুলছে, কনেও দুলছে, বরও দুলছে। ছাগলের তো ভয়ে বুক ঢিপঢিপিয়ে উঠছে! এই না হাত ফসকে যায়! ফসকালে দেখতে হবে না। মাথা ফেটে ফুটিফাটা!

ওর নাম বাবা হুপ্পো। ফসকাবে বললেই হল! হুপ্পো একেবারে কবজার মতো ছাগলের ঠ্যাং দুটো চেপে ধরেছে। চ্যাঁচাল, 'বর-বাঁদর, কনে-বাঁদর, এবার ওপরদিকে টানো।'

অমনি বর ল্যাজ দুলিয়ে কনেকে টানতে লাগল। কনে মুখ খিঁচিয়ে হুপ্পোকে টানতে লাগল। হুপ্পো ঠ্যাং বাগিয়ে ছাগলকে ওপরে আনতে লাগল। সে একটা ছাগলে-বাঁদরে ভারি মজার ঝুলন্ত কাণ্ড!

দেখতে দেখতে হুপ্পো ছাগলকে গাছের ওপর টেনে তুলল। তুলে, ছাগলকে বলল, 'তুমি এখানটায় হামাগুড়ি দিয়ে বসে থাকো। বেশি নড়নি-চড়ুনি। তাহলে আবার হড়কে পড়ে যাবে।'

ছাগল তো ভয়ে আমচুর! হুপ্পোর কথা শুনে বটগাছের ডাল জড়িয়ে উপুড় হয়ে বসে রইল। বসে বসে ভাবছে, 'এবার নামব কী করে?'

হুপ্পো বলল, 'উঠেছ যখন, নামবে ঠিকই। তবে ধকলটা আমাদেরই সইতে হবে!'

ছাগল বলল, 'তা বাপু, তোর বুদ্ধি আছে।'

বর-বাঁদরটা নিজের ল্যাজে হাত বুলোতে বুলোতে বলল, 'থাকবে না? ও যে ঝুমকির হুপ্পো!'

হুপ্পো বলল, 'হ্যাঁ, সত্যিই তো! ছোট্ট হলে কী হবে, ঝুমকির মতো বুদ্ধি ক-জনার! প্রত্যেক বছর কেলাসে ফাস্টো হয়। ঝুমকি বলেছে আমাকেও ইস্কুলে ভরতি করে দেবে। আমিও ফাস্টো হব।'

বর আর কনে-বাঁদর দুটো ফ্যালফ্যাল করে হুপ্পোর মুখের দিকে চেয়ে চেয়ে ভাবতে লাগল, বাবা, ফাস্টো আবার কী!

ছাগলটা জিজ্ঞেস করল, 'হ্যাঁরে ফাস্টো কেরে? কেস্টর ভাই?'

হুপ্পো হো হো করে হেসে উঠল।

ছাগলটা চমকে গিয়ে ভাবতে লাগল, 'বাবা, বাঁদরটা হাসে কেন?'

নিজঝুম রাত্তিরে তাজ্জব কাণ্ড

যতক্ষণ না রাত হল, ততক্ষণ ওরা চুপচাপ ঘাপটি মেরে বসে রইল গাছের ডালে। বাঁদরের তো আর কোনো কষ্ট নেই। ওদের তো গাছের ডালেই ঘর। কিন্তু গাছের ডালে হামাগুড়ি দিয়ে বসে থাকতে থাকতে ছাগলের পেটে-বুকে খিল ধরে একশেষ। সত্যি কথাই! অমন করে সারাক্ষণ বসে থাকা যায়! একটু হেলতে পারবে না, একটু ফিরতে পারবে না। ঘুম পেলে হাই তুলতে পারবে না। চাই কী হাঁচি পেলে হাঁচতেও পারবে না। তা হলেই গাছ ফসকে আলুর দম!

কিন্তু তার চেয়েও বড়ো ভাবনা আর একটা ছিল। ওই তিনটে বাঁদরকে আর ছাগলটাকে কেউ যদি গাছের ওপর নজর করে ফেলত! তখন কী হত?

এখন অবিশ্যি সে-সবের আর ভয় নেই। এখন নিজঝুম রাত্তির। মোটরগাড়ি, ট্রামগাড়ি, বাস, ট্যাক্সি, রিকশা, ঠেলার সোঁ-সোঁ, সাঁ-সাঁ, টুং-টুং, ঠুং-ঠাং কিচ্ছুরই সাড়া শব্দ নেই। লোকজনেরও হই-হুল্লোড় থেমে গেছে। যে যার ঘরে ঢুকে পড়েছে। রাত্তিরবেলা ভয় করে তো! রাতবিরেতে কে বাবা একলা একলা রাস্তায় বেরুবে! কত রকমের বিপদ থাকতে পারে। যদিও পুলিশ রাস্তায় চৌকিদারি করে বেড়ায়, তবুও বলা যায় না তো! পুলিশ আর কতদিকে নজর রাখবে! এত বড়ো শহরে গলিঘুঁজির তো আর শেষ নেই!

প্রথমে ছাগলটাই মুখ খুলল, 'দেখো বাপু, আমি আর এমন করে গাছ খামচে বসে থাকতে পারছি না। আমার নড়া টনটন করছে। হয় নামো, না হয় একটা কিছু করো।'

হুপ্পো বলল, 'হ্যাঁ, এখন ভয়টা অনেক কম। নামা যেতে পারে। তবে তোমার খুড়-শাউড়ির বাড়ি কোনদিকে, কোনদিকে যাবে, সেটা আগের থেকেই ঠিক করে নিতে হবে।'

'আগের থেকে ঠিক করব কী করে?' ছাগলটা উত্তর দিল। 'গাছে বসে বসে আমার মাথায় ভোঁ-চক্কর লেগে গেছে। আমার দিগবিদিক গুলিয়ে গেছে। নীচে না নামলে কিছুই চিনতে পারছি না।'

বেশ তাই হোক। আগে নীচেই নামা যাক।

আবার তেমনি করে বর-বাঁদর গাছের ডালে ল্যাজ জড়িয়ে, কনে-বাঁদরের ঠ্যাং ধরে ঝুলে পড়ল। কনে-বাঁদর হুপ্পোর ল্যাজ ধরল। তারপর হুপ্পো ছাগলের ঠ্যাং ধরে যেই লাফ মেরেছে, তখন এক ভীষণ কাণ্ড! হয়েছে কী, হুপ্পো লাফ মারতেই বর আর কনে-বাঁদরের ল্যাজে এমন হ্যাঁচকা লেগেছে যে, ব্যস! গেছে ফস করে গাছের ডাল ফসকে! হুড়মুড় দুড়মুড়!

ঠিক সেই সময় গাছের নীচ দিয়ে যাচ্ছিল একটা পুলিশ। এই দেখো! কেউ দেখতেই পায়নি! অমন যে হুপ্পো, অত সাবধানী সে-ও মশাই নজর করেনি! করলেই বা কী! পুলিশ তো আর আগের থেকে জানান দিয়ে আসেনি। পাহারা দিতে দিতে হঠাৎ এসে পড়লে কে আর কী করবে! পুলিশকেও বলি, তোমারও কি বাবা যাবার সময় ছিল না? ছাগল পড়বি তো পড় ঠ্যাং ফসকে তার ঘাড়ে। পুলিশের ঘাড়ে ছাগল, ছাগলের পিঠে হুপ্পো, হুপ্পোর ধড়ে বর আর কনে-বাঁদর। ওঃ সে কী জগাখিচুড়ি কাণ্ড!

একটা ছাগল আর তিনটে বাঁদরের আচমকা ধাক্কা পুলিশ কখনও সহ্য করতে পারে? ধড়াদ্ধড় যেই তার ঘাড়ে পড়েছে, পুলিশও ধপাস-ধপ করে মাটিতে ছিটকে গেছে। কিন্তু পুলিশ তো! ভীষণ চালাক। পড়ে গিয়েই সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়িয়ে মার ছুট! কীরে বাবা! গাছের ওপর ভূত নাকি!

এদিকে বর আর কনে-বাঁদরটা ব্যাপারটা যে কী ঘটল ভালো করে বোঝার আগেই তিড়িং মিড়িং লাফিয়ে উঠেছে। সাঁই সাঁই করে আবার গাছের ডালে ঝুলে পড়েছে!

ওঃ! লেগেছে ছাগলটার! তেমনি ভয়ও পেয়েছে। ভয় পেয়ে এমন ব্যা-ব্যা করে চিৎকার শুরু করে দিল যে, ওকে সামলাতেই হুপ্পো হিমসিম। হুপ্পোর তো আর চোখ এড়ায় না কিছু। ওরা যে পুলিশের ঘাড়ে পড়েছে, সেটা স্পষ্ট দেখেছে সে। এইবারই বিপদ! পুলিশের ঘাড়ে পড়া মানেই, হাতকড়া! কিন্তু ছাগলটাকে তো আগে সামলাতে হয়! তাই তাড়াতাড়ি ছাগলের মুখে হাত চেপে হুপ্পো চাপা-গলায় চেঁচিয়ে উঠল, 'চেঁচিও না, পুলিশ!'

'পুলিশ!' নাম শুনেই তো ছাগলের চক্ষু কপালে! 'বাপরে' বলে, আঁৎকে উঠে মারল ছুট! কিন্তু ছুটতে গিয়ে কীসে যেন ঠোক্কর খেল ছাগলটা! টকাস! একটা বাঁশি! এইরে! এটা যে পুলিশের বাঁশি! ধাক্কাধাক্কিতে নিশ্চয়ই পড়ে গেছে। হুপ্পো ঝপ করে বাঁশিটা মাটি থেকে তুলে নিয়ে, বর আর কনে-বাঁদরকে ডেকে বলল, 'এখান থেকে পালিয়ে চল। নইলে বিপদ।'

কিন্তু বর আর কনে ভয়ে জুজুবুড়ি। নামতেই চায় না।

ওরাও নামবে না, ছাগলটাও থামবে না। এমন বিটকেল চ্যাঁচাচ্ছে, বিপদ ঘটতে আর দেরি নেই। এত ভয় পেলে চলে! ছাগলগুলো এমনিতেই একটু ভীতু। কিন্তু চ্যাঁচালেই কি ভয় কাটবে! তখন তো আরও বিপদ হাজির হবে!

বলতে বলতেই বিপদ হাজির। হুপ্পো আগেই জানত, পুলিশটা আবার এখানে হাজির হবে। তাই কানটাকে ও খাড়াই রেখেছিল। হুট করে একটু আওয়াজ হতেই চেয়ে দেখে, অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে সেই পুলিশটা এইদিকেই আসছে গুটিগুটি! হুপ্পোও নিঃসাড়ে গাছে উঠে পড়েছে। কী কায়দা! টুক কি টাক একটুও শব্দ হল না। কিন্তু ছাগলটা কী প্যানপ্যানে দেখো! থাম না। নইলে শ্রীঘরে যেতে হবে যে!

কে কার কথা শোনে!

আসলে কিন্তু পুলিশটার যত ভয়, তার চেয়ে ভাবনা বেশি। বাঁশিটা যে হারিয়ে গেছে! তাই গুটিগুটি এসে টর্চটা চট করে জ্বেলে জায়গাটা খুঁজতে লাগল। ছাগলটা তখনও চেঁচাচ্ছে। চুপ করবি তো! কী বোকারাম দেখো। এক্ষুনি দেখতে পেলে--!

দেখতে তো পাবেই। একটা ছাগল যদি হরবকত ব্যা-ব্যা করে হাঁক পাড়ে তবে লোকের মনে সন্দেহ হবে না? তার ওপর পুলিশ বলে কথা। সব সময় সাবধানী।

পুলিশসাহেব সত্যি-সত্যিই বাঁশি খুঁজতে খুঁজতে টর্চের আলো ছাগলের গায়েই ফেলেছে! ছাগলমহারাজ আলো দেখে দিশেহারা! পুলিশসাহেব ছাগল দেখে ভ্যাবাচাকা! তখনই যেন হঠাৎ পুলিশসাহেবের মনে হল, আরে, এই ছাগলটাই তো তার ঘাড়ে পড়েছিল! হ্যাঁ, বটেই তো! তা গাছ থেকে ছাগল পড়ে কেমন করে! ধরতে হয় তো ছাগলটাকে!

ছাগলটাও যেই না দেখেছে পুলিশ তার দিকেই আসছে, অমনি ছুট।

পুলিশও এই ধরি, এই ধরি, করে হাত বাড়িয়ে সেদিকে যেতেই ছাগলও যেমন করে কিতকিত খেলে, তেমনি ভড়কি দিয়ে প্যাঁচ মারতে লাগল। কিন্তু যতই হোক পুলিশকে প্যাঁচ মেরে কাত করা তো আর ছাগলের কম্ম নয়! অগত্যা ধরা পড়ে গেল!

ব্যাপারটা কতটা গড়ায়, গাছের ওপর থেকে হুপ্পো এতক্ষণ চুপটি করে সেইটাই দেখছিল। ওর আগেই জানা, ছাগলটা নির্ঘাৎ ধরা পড়বে। তবু একটু একটু আশা করছিল যদি পালাতে পারে। কিন্তু শেষ অবধি যখন পারলই না, পুলিশের হাতের মুঠোয় কানটা তার টনটনিয়ে টান খাচ্ছে, তখন হুপ্পো করল কী, ওই গাছের ওপর থেকেই পুলিশের বাঁশিটা বাজিয়ে দিয়েছে, পি-পি-ই-ই!

একদম থমকে গেছে পুলিশটা। চমকে সামনে তাকাতেই ছাগলটা ফাঁক বুঝে শিং দিয়ে তড়াং করে মেরেছে পুলিশের পেটে এক গোঁত্তা। অমনি পুলিশের হাত থেকে কানটা গেছে ফসকে। সেই তক্কে ছাগলও মার ছুট।

উঁ! পুলিশকে ঠকানো যদি অতই সোজা হত! কেউ যে গাছের ওপর থেকেই বাঁশি বাজাচ্ছে, এটা একটা বাচ্ছা ছেলেও বলে দিতে পারে! তাই পুলিশসাহেব ছাগলের পিছু না ছুটে গাছের ওপরই টর্চের আলো ফেলল। আর এমনই ভাগ্য, আলো পড়বি তো পড় সিধে বর আর কনে-বাঁদরের মুখের ওপর। হঠাৎ আলোর ঝলকানিতে চোখ ঝলসে গেছে। বাঁদর দুটো সাংঘাতিক ঘাবড়ে গেছে। বোকার মতো গাছ থেকে লাফ মেরে সটান দৌড়!

ইস! ছি ছি ছি কী কাণ্ড দেখো। হুপ্পোর সমস্ত মতলবটা ভেস্তে দিল। ও ভেবেছিল পুলিশকে ভূতের ভয় দেখাবে, আর মধ্যিখান থেকে এমন একটা বে-আক্কেলে কাণ্ড করে বসল বর আর কনে-বাঁদর! তবে পুলিশও একটু ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেছে। কেননা, একটু আগে এই গাছ থেকে তার ঘাড়ে ছাগল পড়ল। এখন আবার সেই গাছ থেকে দুটো বাঁদর লাফাল! কী ভীষণ গোলমেলে ব্যাপার! গোলমেলে ব্যাপার মানেই রহস্য!

ছাড়বার পাত্তর পুলিশও নয়। ছাগল আর বাঁদর দুটোর মধ্যে যখন একটা রহস্যের গন্ধ পাওয়া গেছে, তখন বাঁদর দুটোকে ধরতেই হবে। তাই চোখ-কান বুজে বাঁদর দুটোর পেছনে তাড়া লাগাল।

বাঁদর ধরা অতই সোজা! এমন এদিক, ওদিক, এ-চাল, ও-চাল ডিঙিয়ে মার-ছুট দেবে, কার সাধ্যি তাদের নাগাল পায়। তবু বলা যায় না। ফস করে ধরা পড়ে গেলে!

ভাগ্য বলতে হয় হুপ্পোর। পুলিশসাহেব ঘুণাক্ষরেও জানতে পারেনি, এই গাছের ওপর, তারই বাঁশি হাতে হুপ্পো নামে আর একটি রহস্য চুপটি করে বসে আছে। এখন পুলিশকে বর আর কনে-বাঁদরের পেছনে ছুটতে দেখে, হুপ্পোও তরতরিয়ে গাছ থেকে নেমে পড়ল। বাঁশিটা বাজিয়ে দিল, পি-পি-ই-ই।

পুলিশ ছুটছিল সামনে-মুখো, বাঁশি বাজল উলটো-মুখো। থমকে গেল। ছুটতে ছুটতে ঝপ করে দাঁড়িয়ে ঘুরে দাঁড়াল। দাঁড়াতে না দাঁড়াতে বাঁদর দুটোও হাওয়া। হাওয়া বলে হাওয়া। একেবারে ম্যাজিক! হুস করে উবে গেল। একেই বলে প্রাণের ভয়!

ভয় কিন্তু হুপ্পোর একদম নেই। ও তো জানে, পুলিশ তাকে যতই চেষ্টা করুক, কিছুতেই পাকড়াও করতে পারবে না। কিন্তু মজা কী জানো? ছাগলটা এই তক্কে কোথায় কেটে পড়েছে। তার আর সাড়াও নেই, শব্দও নেই। যাঃ বাবা! বাঁশির কত গুণ বলো? বাজিয়ে দিতেই ছাগলটা পার পেয়ে গেল, বাঁদর দুটোও মার খেতে খেতে বেঁচে গেল। এখন দেখো হুপ্পোর কী হয়!

বাঁশি হাতে হুপ্পোকে পেছন ফিরে দেখতে পেয়েই, পুলিশ বর-কনেকে ছেড়ে হুপ্পোকে তেড়ে এল। হুপ্পো সুট করে, পুলিশের চোখকে ফাঁকি দিয়ে, লুকিয়ে পড়ল। লুকিয়ে পড়লেও পুলিশ অত সহজে ছাড়বে না। টর্চের আলো ফেলে তন্ন তন্ন করে খুঁজতে লাগল হুপ্পোকে।

রাত্তিরবেলা তো প্রায়ই এ-রাস্তা ও-রাস্তা দিয়ে পুলিশের কালো কালো গাড়িগুলো আলো জ্বেলে ছোটাছুটি করে। ওদের কাজই হচ্ছে, চোর-ডাকাতের হাত থেকে শহরকে রক্ষা করা। এমনই বরাত ঠিক সেই সময় হুস-স-স-স-স করে একটা পুলিশের গাড়ি সেখানেই হাজির। টর্চ হাতে একজন পুলিশকে এ-ধার ও-ধার ছোটাছুটি করতে দেখে গাড়ি ক্যাঁচ-চ-চ করে থেমে গেল। গাড়ি ভরতি পুলিশ। তাদের হাতে বন্দুক। বন্দুকধারী পুলিশরা সব খট খট করে গাড়ি থেকে নেমে পড়ে ব্যাপারটা জেনে নিল। নিয়ে, এদিক-ওদিক তল্লাশি চালাতে লাগল।

হুপ্পোকে ধরা অত সহজ নয়! এমন একটি জায়গায় সে ঘাঁটি গেড়েছে, সেখানে আর কাউকে টেরটি পেতে হচ্ছে না! কিন্তু একবার যদি কেউ নজর করে ফেলে, তাহলে আর নিস্তার নেই। পুলিশের হাতে বন্দুক। গুড়ুম করে একবার চালালেই হল। সঙ্গে সঙ্গে হুপ্পোর ভবলীলা সাঙ্গ হয়ে যাবে!

তবে, ওর বড্ড ইচ্ছে পুলিশের সঙ্গে একটু মজা করে। ইচ্ছে হল, এই লুকনো জায়গাটা থেকে বাঁশিটা আর একবার বাজিয়ে দেয়। কিন্তু, এত দুঃসাহস ভালো নয়। না, দুঃসাহসের কথা নয়। ওর মতলব হচ্ছে, বাঁশিটা এদিকে বাজিয়ে দিয়ে, চটপট ওদিকে পালাবে, পুলিশেরা ওকে এদিকে খুঁজবে। ও তখন ওই দিক দিয়ে পগারপার! বর আর কনে-বাঁদর দুটোকে তো খুঁজে বার করতে হরে!

পুলিশের বুটজুতো খট-খট করে রাস্তার ওপর পড়ছে। ওরা হুপ্পোকে খুঁজছে। অনেকক্ষণ খুঁজেও কিন্তু হুপ্পোকে ওরা দেখতে পেল না। যখন দেখল, কেউ কোথাও নেই এদিকে, তখন তারা আবার গাড়িতে উঠে পড়ল। ভাবল, আসামি ভাগলবা! গাড়ি যেই ছাড়ব-ছাড়ব হয়েছে, তখন হুপ্পো সত্যি সত্যি আর একবার বাঁশিটা বাজিয়ে দিয়েছে, পি-পি-ই-ই।

এই দেখো, গাড়ি ছাড়তে ছাড়তেও ছাড়ল না। পুলিশরা গাড়িতে বসতে বসতেও বসল না। ঝটপট করে গাড়ি থেকে নেমে পড়তেই হুপ্পোকে দেখে ফেলেছে। হুপ্পো এদিক থেকে ওদিকে একেবারে তিরের মতো লাফ দিয়ে পালাচ্ছিল। অমনি পুলিশ-কর্তা চেঁচিয়ে উঠল, 'ফায়ার!'

গুড়ুম! বন্দুক গর্জে উঠল।

তারপর ধুপ করে একটা আওয়াজ। তারপর সব ঠান্ডা!

দেখতে পেয়েছিল একজন পুলিশ। হুপ্পো ধুপ করে লাফ দিয়ে একটা ঝোপ মতো জায়গায় লুকিয়ে পড়েছে। তাহলে বন্দুকের গুলি তার গায়ে লাগেনি? অন্ধকারে হয়তো তাক ঠিক হয়নি। কিন্তু একজন পুলিশ যে তাকে দেখতে পেয়েছে, এটা হুপ্পো আগেই সন্দেহ করেছে। ওঃ! বলব কী, ও একেবারে নিমেষের মধ্যে মেরেছে লাফ। লাফ দিয়েই মার ছুট।

অমনি পুলিশগাড়ির সাইরেন বেজে উঠল, উঁ-উঁ-উঁ-উঁ, উঁ-উঁ-উঁ-উঁ। গাড়ি হুপ্পোর পিছু তাড়া লাগিয়ে ছুটল। হুপ্পো ভাবল, এবার মরণ! কারণ পুলিশের গাড়ির সঙ্গে ও ছুটে পারবে কেন? তাও যদি এখন রাস্তায় গাড়িঘোড়ার জট পাকানো থাকত, তাহলে এক কথা ছিল। এই রাত্তিরবেলা রাস্তা ফাঁকা। হু-হু শব্দে গাড়ি ছুটছে। বন্দুকের নল তাক করে তার দিকে সকলে চেয়ে আছে। একটু বেকায়দায় দেখলেই, গুড়ুম! ওদের গুলি হুপ্পোর বুকে এসে লাগবে।

হুপ্পো দেখল, আর কোনো উপায় নেই। এবার নির্ঘাৎ ধরা পড়বে। তাই আর ছোটাছুটি করে কোনো লাভ আছে বলে মনে হল না। হাঁপিয়ে পড়েছে, পা-ও আর চলছে না। তাই ভাবল, বাঁশিটা পুলিশের গাড়ির দিকে ছুড়ে ফেরত দিয়ে দেয়।

হয়তো ছুড়েই সে দিত। কিন্তু মাথায় হঠাৎ আবার কী খেলে গেল! ধাঁই করে একটা ডিগবাজি মেরে, সে যে আবার উলটো দিকে ছুটবে, সেটা তো কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। বাঁদরকে হঠাৎ উলটোদিকে ছুটতে দেখে, গাড়িও ক্যাঁ-চ-চ। ব্রেক কষল। থেমে গেল। থেমে পিছন ফিরে গাড়ি যতক্ষণে ঘুরবে, ততক্ষণে হুপ্পো হাওয়া। হুপ্পো দেখল, এখন এ-যাত্রা নিস্তার পেয়েছি, তখন আর বাইরে থাকা নয়। কারো ঘরের মধ্যে লুকিয়ে পড়ি। তা হলে পুলিশ টেরই পাবে না।

আর সত্যি সত্যিই ও একটা ঘরের মধ্যেই ঢুকে পড়ল।

কিন্তু কার ঘর এটা?

গাধার নাম গোবর্ধন আর একটা বাঘ

কিন্তু ঘরে ঢুকতে গিয়ে যে সে একটা গাধার ঘরে সেঁদিয়ে পড়বে, তা হুপ্পো নিজেও জানত না। আসলে কী, কেউ বিপদে পড়লে তাকে বাঁচতে তো হবে। বাঁচতে গিয়ে আগুপিছু ভাববার বুদ্ধি থাকে তখন?

গাধাটাকে প্রথমে দেখতে পায়নি হুপ্পো। কিন্তু গাধাটা হুপ্পোকে দেখে ফেলেছে ঠিক। যতই হোক নিজের আস্তানায় বাইরের কেউ ঢুকে পড়লে টের পেতে সময় লাগে!

'কে হ্যা?' গাধার গলাটা যেমন ঘ্যানঘ্যানে, তেমনি হেঁড়ে।

আচমকা গাধার ডাক শুনে হুপ্পোর পিলে চমকে উঠেছে। যাঃ বাবা! যা-ও বা পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে এখানে লুকাল, এখানেও স্বস্তি নেই!

কোনো সাড়া-শব্দ না পেয়ে গাধাটা আবার হেঁকড়ে উঠল, 'কে?'

হুপ্পো ঘাবড়ে গিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতেই বলে ফেলল, 'আমি।'

'আমি তো আপনাকে চিনি না!'

'আমিও আপনাকে চিনি না,' হুপ্পো উত্তর দিল।

'কেন, আমার ন্যাজ নেই? কেন, আমার কান নেই? কেন, আমার ঠ্যাং নেই?'

'কেন থাকবে না। আমি অন্ধকারে ঠাওর করতে পারছি না।'

'এই বয়েসেই চোখের মাথা খেয়ে বসে আছিস? আমি তো তোকে ঠাওর করতে পারছি। তুই বাঁদর না?'

'আমি হুপ্পো।'

'ওই হল। যার নাম বাঁদর, তারই নাম হুপ্পো।'

হঠাৎ হুপ্পো চেঁচিয়ে উঠল, 'ও, আমিও আপনাকে ঠাওর করে ফেলেছি। আপনি একটা বেঁটে ঘোড়া না?'

অমনি গাধাটা 'চোপ' বলে দাবড়ি দিল। 'কার ছাউলরে তুই? আমাকে ঘোড়া বলছিস! আমি গাধা। আমার নাম গোবর্ধন।'

'ওমা!' হুপ্পো অবাক হয়ে গেল। 'ঝুমকিদের বাড়িতে যে দুধ দেয়, তার নাম তো গোবর্ধন! মানুষের যা নাম আপনারও তাই নাম?'

'নাম কী কারো একার কেনা? মানুষের নাম গোবর্ধন হলে, গাধার কেন হতে পারে না রে?'

'কেন পারবে না! তবে গাধার তো আর মানুষের মতো বুদ্ধি নেই!'

গাধাটা আবার ধমকে উঠল, 'চোপ! বুদ্ধির তুই কী জানিস রে? কালকের ছেলে, গলা টিপলে দুধ বেরোয়! জানিস, আমি সাইকিল চালাতে পারি।' গাধাটা আবার সাইকেলকে সাইকিল বলে।

সঙ্গে সঙ্গে হুপ্পো উৎসাহে গলা বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করল, 'সত্যি? সত্যি?'

'তুমি আমার কে একেবারে এক কেলাসের বন্ধু যে, তোমার সঙ্গে মিথ্যে মিথ্যে ইয়ার্কি করব! '

'ক-চাকার সাইকিল চালান আপনি?'

'দু-চাকার।'

'আমায় শিখিয়ে দেবেন?'

'পারবি না,' গম্ভীর গলায় গাধা উত্তর দিল।

হুপ্পো বলল, 'কেন পারব না? আপনি যদি পারেন, আমিও পারব।'

'চোপ! আমার সঙ্গে তুই নিজের তুলনা করিস! আমার ক্ষেমতা আর তোর ক্ষেমতা! আমারই শিখতে বছরখানেক লেগে গেছে। তোর তো শিখতে শিখতে জীবন কেটে

যাবে!'

হুপ্পো বলল, 'জানেন, সাইকিল, কিংবা ধরুন ট্রামগাড়ি, ডবল-ডেকার বাস, মোটর সাইকিল মানে এককথায়, গাড়ির ড্রাইভার হবার আমার খুব শখ। আজকাল রাস্তায় আবার মিনিবাস বেরিয়েছে, কী সুন্দর দেখতে লাগে বলুন!'

গাধা জিজ্ঞেস করল, 'এরোপ্লেন চালাতে ইচ্ছে করে না?'

'খুব। কিন্তু মুশকিল কী জানেন, আমি তো আকাশে উড়তে পারি না।'

'এরোপ্লেন চালাতে গেলে, আকাশে উড়বি কেন?'

'এরোপ্লেন তো আকাশ দিয়ে উড়ে যায়! কিন্তু আমি যতটা লাফাতে পারি, তার চেয়ে অনেক উঁচু দিয়ে তো এরোপ্লেন যায়! উড়তে না পারলে, ধরব কী করে?'

গাধাটা এবার বিকট চিৎকার করে হেসে উঠল, 'হো-হো-হো।' হাসতে হাসতে বলল, 'দুর বোকা, এরোপ্লেন ধরতে উড়তে হবে কেন? জায়গায় জায়গায় ইস্টিশান আছে। এই যেমন, তোকে এখানে এরোপ্লেন ধরতে গেলে দমদম যেতে হবে!'

হুপ্পো বলল, 'দমদম!' বলেই হেসে ফেলল।

'হাসছিস কেন?'

'বেড়ে নামটা।'

'কেন, এর আগে শুনিসনি?'

হুপ্পো বলল, 'না তো!'

'তুই বুঝি খবরের কাগজ পড়িস না? খবরের কাগজে তো রোজই বেরোয় দমদম বিমানবন্দরের কথা। অমুক দেশের রানি দমদম বিমানবন্দরে অবতরণ করে দু-ঘন্টা বিশ্রাম নিয়েছেন। কিংবা অমুক দেশের প্রধানমন্ত্রী সাংবাদিকদের সঙ্গে হাসি-ঠাট্টা করেছেন।'

হুপ্পো গাধার কথা শুনে, নিজে কোনো কথাই বলতে পারল না। ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল।

গাধাটা এবার মুচকি মুচকি হাসতে হাসতে বললে, 'তোকে এবার কাত করে দিয়েছি। নিশ্চয়ই ওই বিমানবন্দর মানেটা তুই বুঝিসনি। আরে, ওর মানে হল এরোপ্লেনের ইস্টিশান। ইংরিজিতে বলে, এরোড্রাম।'

'আপনি বুঝি ইংরিজিও জানেন?' জিজ্ঞেস করল হুপ্পো।

গাধাটা উত্তর না দিয়ে খালি তাচ্ছিল্যের সুরে এমন 'হে-হে' করে সাড়া দিল, যার মানে ফুঃ! ইংরিজি তো আঙুলের টুসকি!

'আপনি রোজ খবরের কাগজ পড়েন?'

'নইলে আমার এত জ্ঞান হয়! দেখবি ইংরিজিতে একটা পদ্য বলব! আমার মুখস্থ জলবৎ তরলং .

'চিক চিক চ্যাং চ্যাং দ্যাট ম্যান ফ্যাট

চুং চুং ফিং ফিং ক্যাচ ক্যাচ র্যাট!'

'বাবা, আপনি তো তাহলে সাহেবগাধা। আপনার তো বিলিতি-গাধানির সঙ্গে বিয়ে হওয়া উচিত।'

গাধার মুখটা হঠাৎ কেমন দুঃখ দুঃখ হয়ে মিইয়ে গেল। ধরা-ধরা গলায় বলল, 'বিয়ে তো আমার বিলিতি-গাধানির সঙ্গেই হত। সেবার যখন বিলেতে গেছলুম, কথাবার্তা তো প্রায় পাকাই হয়ে গিছল। কিন্তু হঠাৎ বিলেত থেকে ফিরতে হল। সামনে কোনো বিয়ের দিনও ছিল না। অগত্যা বিয়েও হল না।'

হুপ্পো অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, 'আপনি বিলেতেও গেছেন?'

'যাব না? বিলেত কেন, সারা দুনিয়াটাই আমি ঘুরে এসেছি। সারা দুনিয়াতেই আমাদের খেলা দেখিয়ে বেড়াতে হয়! দি গ্রেট সার্কাস অফ দি ওয়ার্লড-এর আমি ওয়ান্ডার অ্যাস, মানে আজব গাধা।'

সার্কাস নামটা শুনেই হুপ্পোর শরীর শিউরে উঠেছে। ওমা! ও এতক্ষণ বুঝতেই পারেনি যে, ও একটা সার্কাসের তাঁবুর ভেতর, গাধার ঘরে ঢুকে পড়েছে। তাই আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করল, 'আপনারা সার্কাস পার্টি?'

গাধা বলল, 'এতক্ষণ তুই কী চোখে ঠুলি গুঁজেছিলি?'

'না, মানে হঠাৎ ঢুকে পড়েছি তো!'

'আয়, দেখবি আয়,' বলে গাধাটা হুপ্পোকে নিয়ে ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে গেল।

বাইরে বেরিয়ে হুপ্পো দেখল কী, দুটো হাতি দাঁড়িয়ে। আরও একটু দূরে খাঁচার ভেতর বাঘ। চারটে জেব্রা। একটা শিম্পাঞ্জি, দুটো গন্ডার, একটা ভাল্লুক।

গাধা হুপ্পোকে সাবধান করল, 'কথা কও না। ওরা দেখতে পেলে চ্যাঁচামেচি করবে। চুপচাপ চলে এসো।'

হুপ্পোকে কথা কইতে হল না। কিন্তু যিনি কইবার, তিনি ঠিকই কইলেন। বাঘের চোখকে ফাঁকি দেওয়া ভারি মুশকিল। ঠিক দেখতে পেয়েছে! বাঘ ডাকল, 'কী রে গোবর্ধন, বাঁদরটা কোত্থেকে এল রে?'

গোবর্ধন মানে গাধাটা চমকে উঠে বলল, 'দাদা, আপনি এখনও ঘুমোননি?'

বাঘ বলল, 'ক-দিন ধরে অনিদ্রায় ভুগছি। শরীরটাও ভালো যাচ্ছে না। তা ওটি কে? নতুন এল? খেলা দেখাবে নাকি?'

'আজ্ঞে না দাদা। আমার সাইকিল খেলা দেখবে।'

'খেলা দেখাবি যে, টিকিট কেটেছে?'

'আজ্ঞে ও তো বাঁদর।'

'দেখি, আমার কাছে নিয়ে আয় দিকি।'

হুপ্পোর তো মুখ শুকিয়ে এইটুকু!

গাধা সাহস দিয়ে বলল, 'ছর বোকা, কোনো ভয় নেই।'

হুপ্পো জানে, ভরসাও কিছু নেই। বাঘ মানে যে কী, সেটা কে না জানে! তবু তার সাহস এই যে, বাঘটা খাঁচার মধ্যে বন্দি। তাই গুটিগুটি বাঘের খাঁচার সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল।

বাঘ হুপ্পোকে দেখে হেসে উঠল। বাঘ হাসতে হাসতে বলল, 'এই খোকা, কোথায় থাকিস?'

খোকা বলতে, হুপ্পোর পা থেকে মাথা অবধি অপমানে জ্বলে গেল। বাঘ, বাঘ হতে পারে, কিন্তু তাকে এমন তাচ্ছিল্য করে খোকা বলবে, এটা কেমন ভদ্রতা ! বাঘের সামনে সে রাগ দেখাতেও পারত। রাগ দেখালে বাঘ যে এখন তার কিছুই করতে পারবে না, সেটাও হুপ্পো জানত। কারণ বাঘ তো আর খাঁচা ভেঙে বাইরে আসতে পারছে না। কিন্তু হুপ্পো ভাবল, না, খুঁচিয়ে কোনো লাভ নেই। এখন, অন্তত রাতটা না গড়ানো পর্যন্ত তাকে এখানেই থাকতে হবে। বাইরে পুলিশ। হাতে তার পুলিশের বাঁশি। পুলিশ বাইরে তাকে হয়তো এখনও খুঁজছে। এখানে লুকিয়ে থাকলে পুলিশের সাধ্যি কী তাকে খুঁজে বার করে। তা ছাড়া হুপ্পোর মনে মনে ইচ্ছে, একবার যদি ভুলিয়ে-ভালিয়ে গাধার কাছ থেকে সাইকিল চালানোটা শিখে ফেলতে পারে। তাই খুব লক্ষ্মীছেলের মতো হুপ্পো বলল, 'আমার বাড়ি তো ঝুমকিদের বাড়িতে। আমি হারিয়ে গেছি।'

বাঘ জিজ্ঞেস করল, 'ঝুমকি? ঝুমকি বুঝি মানুষ?'

হুপ্পো বলল, 'মেয়েমানুষ।'

'ছোটো।'

'ছোটো ছোটো মেয়েমানুষগুলো ভয়ানক ভীতু!'

হুপ্পো উত্তর দিল, 'না, না। ঝুমকি কিন্তু একটুও ভীতু নয়। ভীষণ সাহসী। একবার মায়ের কাছে বকুনি খেয়ে, একটুও কাঁদেনি। তবে মা ঝুমকিকে খুব একটা বকেও না।'

বাঘ বলল, 'আমার কাছে নিয়ে আয় না একবার, দেখি মেয়ের আস্পর্ধা কত! এমন ধমক মারব চোখ কপালে উঠে যাবে!'

হুপ্পো বলল, 'ধ্যাৎ, তাই হয় নাকি। আমিই আপনাকে দেখে ভয় পাচ্ছি না, তো ঝুমকি আপনার ধমক শুনে ভয় পাবে। ফুঃে!' অমনি সঙ্গে সঙ্গে রেগে গেছে বাঘটা। রেগে এমন 'হালুম' করে গর্জে উঠল যে, সমস্ত সার্কাস-পাড়াটা কেঁপে উঠল।

হুপ্পোর বয়েই গেছে। হুপ্পো বাঘের ডাক শুনে হেসে উঠল খিলখিল করে। বলল, 'আপনার তো ভয়ানক গলার জোর।'

বাঘটা আরও খেপে গেল। একেবারে অগ্নিশর্মা! চেঁচিয়ে উঠল, 'তোর বাঁদরের নিকুচি করেছে। বড়োদের সঙ্গে ফাজলামি!' বলে খাঁচার গায়ে থাবা দিয়ে এমন আচড় মারতে লাগল, মনে হল এক্ষুনি খাঁচা ভেঙে বুঝি বেরিয়ে পড়বে! গাধাটা সঙ্গে সঙ্গে হুপ্পোকে ঠেলা মেরে বলল, 'চ, চ পালিয়ে চ। দিলি তো খেপিয়ে!' বলে গাধা বাঁদরকে নিয়ে সেখান থেকে কেটে পড়ল।

বাঘ 'খ্যাঁউ খ্যাঁউ' করে গজরাতে গজরাতে মুখ বেঁকিয়ে সেদিকে চেয়ে রইল।

হুপ্পো বলল, 'আমি তো কিছুই বললুম না। অমন হুট করে রেগে গেল কেন বাঘটা? আমি বাবু, কারো খোশামুদি করতে পারি না। সে বাঘই হোক, আর যেই হোক!'

গাধা উত্তর দিল, 'আমারও বাপু কারো খোশামোদ করা ধাতে সয় না। আমাকেও বাঘটা একবার খ্যাঁক-খ্যাঁক করে যা-তা বলেছিল। হাতিটা কিন্তু খিঁটখিঁটে নয়, যাবি?'

হুপ্পো বললে, 'না, আর দরকার নেই বাবা! যা নমুনা। তার চেয়ে চলুন সাইকিল চড়ব।'

'শখ যখন এতই,' তখন গাধা বললে, 'তাহলে আয়।'

যে-ঘরটার সামনে এসে দাঁড়াল, সাইকেলটা সেখানেই ছিল। সাইকেলটা টেনে এনে গাধা জিজ্ঞেস করল, 'আমি চালাব, না তুই চড়বি?'

হুপ্পো বললে, 'আগে আপনি একটু চালান দেখি।'

গাধা তিড়িং করে সাইকেলের ওপর চেপে পড়ে, কিড়িং কিড়িং করে ঘন্টা বাজাতে শুরু করে দিল। হুপ্পো প্রথমটা হাততালি দিয়ে চেঁচিয়ে উঠেছিল। তারপর হাতের বাঁশিটা মুখে পুরে, পি-পি করে বাজিয়ে দিলে। সামনের জায়গাটা ফাঁকা। বেশ নির্ঝঞ্ঝাটে সাইকেল চেপে ঘুরপাক খাওয়া যায়! বাঁশির আওয়াজ শুনেই গাধাটা থেমে, সাইকেল থেকে নেমে পড়ল। জিজ্ঞেস করল, 'বাঁশি পেলি কোথা?'

হুপ্পো থতমত খেয়ে গেছে। আমতা আমতা করে বলল, 'এই--আমার।'

'বাঁশিটা আমার কাছে দে। এবার তুই চাপ।'

হুপ্পো বাঁশিটা গাধার হাতে দিয়ে, সাইকেলের গায়ে একটু হাত বুলিয়ে বলল, 'আপনি একটু ধরুন। নইলে উঠব কী করে?'

গাধা সাইকেলটা ধরে বলল, 'বেশ চড়, আমি ধরেছি।'

হুপ্পো তো আর কোনোদিন সাইকেল চড়েনি। কিন্তু দেখেছে তো অনেককে। তাই সাইকেলের সিটে বসে, হ্যান্ডেল দুটো ধরে, সামনে হেলে, গাধাকে বলল, 'এবার একটু ঠেলে চালিয়ে দিন।'

গাধা জিজ্ঞেস করল, 'পারবি? পড়ে যাবি না তো?'

হুপ্পো উত্তর দিল, 'না, না।'

গাধা তখন দিল এক ঠেলা। ব্যাস! হুপ্পো সাইকেলফাইকেল নিয়ে, একেবারে দুম-ফটাস! হুপ্পোটা সাইকেলের ঘাড়ে পড়ল, না সাইকেলটা হুপ্পোর ঘাড়ে চাপল, সেটা তো বোঝাই গেল না। কিন্তু এদিকে যে হাতিটা, ঘোড়াটা, বাঘটা, ভাল্লুকটা হুপ্পোর কাণ্ডটা লুকিয়ে লুকিয়ে দেখছিল, সেটা হুপ্পো বুঝতেই পারেনি। তাই সাইকেল থেকে পড়ে চিৎপাত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সব ক-টা এমন হো হো করে চেঁচিয়ে হেসে উঠল যে কী বলব! হুপ্পোর তো ভীষণ লেগেছে। তার ওপর হঠাৎ সব ক-টার হাসি শুনে লজ্জায় মরে যায়! বাঘটা তো হাসবেই। কিন্তু আর গুলোও যে উঁচিয়ে ছিল, এটা কে জানত বাবা!

গাধা ছুট্টে গিয়ে হুপ্পোকে টেনে তুললে। বলল, 'বললুম পারবি না। লেগেছে?'

হুপ্পো ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে বললে, 'একটু।'

গাধা জিজ্ঞেস করল, 'কোনখানটায় লাগল?'

হুপ্পো ঠ্যাং দেখিয়ে বলল, 'এইখানটায়।' বলে খোঁড়াতে খোঁড়াতে গাধার কাঁধ ধরে বললে, 'একটু বসব।'

গাধা বললে, 'চ', বলে হুপ্পোকে ধরে ধরে নিজের ঘরে নিয়ে চলল।

গাধার ঘরে যেতে হলে, বাঘের খাঁচার সামনে দিয়েই যেতে হবে। বাঘ হুপ্পোর অবস্থা দেখে হেসে-গড়িয়ে চেঁচিয়ে উঠল, 'খোঁড়া ল্যাং, ল্যাং--'

হুপ্পো এবার সত্যি-সত্যি রেগে গেল। বাঘকে বলল, 'আপনার মশাই, মানসম্মান জ্ঞান নেই। একটা বাঁদরের সঙ্গে ঠাট্টা করছেন! আপনি তো আচ্ছা চ্যাংড়া!'

বাঘ তো রেগে কাঁই। একটা কিনা পুঁচকে বাঁদর তাকে চ্যাংড়া বললে। রেগে ধাঁই ধপাধপ নাচানাচি শুরু করে দিয়ে গর্জন করে বলে উঠল, 'এই ল্যাংড়া, আয় তোকে

ঠ্যাঙাই!'

ঠেঙাবে কী, ততক্ষণে হুপ্পো গাধার ঘরে ঢুকে পড়েছে। ঢুকে মাটিতে শুয়ে পড়েছে। শুয়ে শুয়ে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে আর আ-উ করছে। থেকে থেকে বাঘের গর্জন শুনছে। শুনতে শুনতে গাধাকে বলল, 'গোবর্ধন-কাকু, আমার বাঁশি?'

কাকু বললে, 'এই তো।'

বাঁশি নিয়ে, বাঘের গর্জন শুনতে শুনতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়ল হুপ্পো, বুঝতেই পারল না।

বাঘও রেগেছে, হুপ্পোও ভেগেছে

সাংঘাতিক ঘুমিয়ে পড়েছিল হুপ্পো। চোখে যে এত ঘুম জড়িয়ে ছিল, সেটা আগে বুঝতেই পারেনি। বুঝবে কী করে বলো? পুলিশের তাড়া খেলে আর ঘুম! পুলিশের তাড়া মানে কী, সেটা যে খেয়েছে সেই বুঝেছে।

কিন্তু ঘুমেরও কী ছিরি-ছাঁদ নেই? সেই কাল রাতে শুয়েছে, আর এই এখন ঘুম ভাঙল! মানে, একটা রাত্তির পেরিয়ে আর একটা সন্ধে এসে গেল!

যদিও হুপ্পো সাইকেল থেকে পড়েছিল বেশ মোক্ষম মতো, কিন্তু ভাগ্য বলতে হবে, চোটটা তেমন জববর হয়নি। গায়ে-হাতে টাটানিটা অবশ্য এখনও বেশ মালুম দিচ্ছে। তাহলেও তখন যেমন মনে হয়েছিল হাত-পা বুঝি ভেঙে গুঁড়িয়ে গেছে, এখন তেমনটা মনে হচ্ছে না। উঠে দাঁড়াল হুপ্পো। দু-পা লেংচে দেখল, আর ব্যথা নেই।

আচ্ছা, না হয় হুপ্পো পড়েই গেছে, তা বলে অত বড়ো একটা ধিঙ্গি বাঘের অমন হ্যা হ্যা করে হাসাটা কি ঠিক হল?

ঘুম ভাঙতে হুপ্পোর বাঘের কথাটাই প্রথমে মনে হয়েছে। সুযোগ পেলে ও একহাত দেখে নেবে বাঘটাকে! হুপ্পো পড়ে যেতে যদিও হাতিটা, ঘোড়াটা, ভালুকটা সক্কলেই হেসেছে, তবু তার বাঘটার ওপরই যেন রাগটা বেশি। কী দম্ভ! তবু যদি না খাঁচায় বন্দি থাকত! তবে কথা হল কী, বাঘকে তো আর সহজে জব্দ করা যায় না। তার ওপর হুপ্পো বাঁদর! বাঁদর কি আর বাঘের সঙ্গে পারে! গায়ের জোরে তো নয়ই। বুদ্ধির জোরই বা কতটুকু আছে হুপ্পোর! ও তো বাচ্চা। হ্যাঁ, হত যদি বর আর কনে-বাঁদরটা তার সঙ্গে থাকত, ও একবার দেখে নিত! কিন্তু সব তো গোলমাল হয়ে গেল। পুলিশের তাড়া খেয়ে কে যে কোনদিকে ছিটকে পড়ল! মনে মনে হুপ্পোরও খুব ইচ্ছে ছিল, রেলের টিকিট কিনে ওই বর আর কনে-বাঁদরের সঙ্গে লছমনঝোলাটা ঘুরে আসবে। মনের ইচ্ছে মনেই রয়ে গেল। কোথায় বর আর কোথায় কনে! আর কোথায়-ই বা ছাগল!

তবে ছাগলকে নিয়ে কোনো কাজ হত না। ভয়ানক ভীতু ছাগলটা। ভয় পেলে ব্যা ব্যা করে পাড়া মাথায় করে ছাড়বে।

কিন্তু হঠাৎ চমকে উঠল হুপ্পো। ও এতক্ষণ খেয়ালই করেনি, ঘরে গাধাটা নেই। যাঃচ্চলে! ওকে ফেলে গাধাটা কোথায় কেটে পড়ল।

ঘুমভাঙা চোখ কচলাতে কচলাতে হুপ্পো একেবারে হন্তদন্ত হয়ে গাধার ঘর থেকে বেরিয়ে এল। বাইরে এসে অবাক! চারদিকে আলো আর আলো। মাইকে বাজনা বাজছে। লোকজনে গিসগিস করছে চারদিকে। সবাই ব্যস্ত। হইহই কাণ্ড। বাইরে, ওই মস্ত তাঁবুর ভেতর সার্কাসের খেলা শুরু হয়ে গেছে।

গাধাটা তো আচ্ছা হাঁদা! ওকে তো জাগিয়ে দেবে! তা না, হুপ্পো পড়ে রইল ঘরে আর নিজে চলে গেল খেলা দেখাতে!

সার্কাস আর কে না দেখতে চায়! হুপ্পোর তো ষোলো আনা। শুনেছে সার্কাসের কথা অনেকবার, কিন্তু দেখতে তো পায়নি কখনো। আজ সেই সুযোগ এসেছে। তবে কথা হচ্ছে, সার্কাসের খেলা দেখতে গেলে তো তাঁবুর ভেতরে ঢুকতে হবে। সেও তো এক ঝামেলা। চারদিক এমন ঘেরা যে, কার সাধ্যি ভেতরে ঢোকে।

কিন্তু ইচ্ছে করলে হুপ্পো এখনই ঢুকে যেতে পারে। এক লাফ মারবে তাঁবুর চালে। তারপর তাঁবুর ওই একদম ওপরের ফাঁকটা দিয়ে সুড়সুড় করে ভেতরে চলে যাবে। এর জন্যে তাকে বেশি কসরতও করতে হবে না। কিন্তু তাতে বিপদ। কেউ দেখে ফেললে? না, মতলবটা ঠিক না। তবে একটা কাজ করতে পারে। তাঁবুর নীচে ফাঁক। ওই ফাঁকে মাথা গলিয়ে যদি ও ঢুকে পড়তে পারে, তাহলে কেউ দেখতে পাবে না।

তাই-ই করল হুপ্পো। চুপিসাড়ে তাঁবুর কাপড় ঠেলে, হামাগুড়ি দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল। আর এমনই মজা, ও যখন ঢুকছে, তখন তো কেউ দেখতে পেলই না, এমনকী ভেতরে যখন গিয়ে পৌঁছোল তখনও কারো নজর গেল না তার দিকে। তাঁবুর ভেতর বসার জায়গা, উঁচু উঁচু গ্যালারি। গ্যালারিতে লোকে লোকে ঠাসাঠাসি। সক্কলে একমনে খেলা দেখছে। গ্যালারির নীচটা তো ফাঁকা। হুপ্পো গ্যালারির ওই নীচেই হাজির। এখানে চুপটি করে বসে থাকলে ওকে কে দেখবে শুনি? খেলাটা ভালো করে দেখার জন্যে নীচ দিয়ে ও একটু এগিয়েই গেল। হ্যাঁ, এখান থেকে বেশ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ভারি বুদ্ধু বানিয়েছে হুপ্পো সবাইকে। ওপরে, গ্যালারিতে বসে বসে লোকেরা টিকিট কেটে খেলা দেখছে, আর হুপ্পো কেমন টিকিট না কেটেই গ্যালারির নীচে বসে বসে মজা দেখছে?

মজাই বলো আর যাই বলো, ওই তারের ওপর ছাতা হাতে নিয়ে মেয়েদের নাচ দেখানো খেলাটা ভারি শক্ত কিন্তু! ফসকে গেলেই গেল। দেখতেও বেশ লাগে। তারপর গাধার সাইকেল চালানো। হাতির চার পা এক করে টুলের ওপর দাঁড়ানো। ভাল্লুকের ডিগবাজি মারা। দেখতে দেখতে অবাক হয়ে যেতে হয়! কিন্তু হুপ্পো একটুও অবাক হচ্ছিল না। ওর মুখ দেখে মনে হচ্ছে, ও ভেতরে ভেতরে নিশ্চয়ই কিছু মতলব ভাঁজছে!

এবার বোধহয় বাঘের খেলা দেখাবার পালা। সার্কাসের লোকেরা সামনের জায়গাটা বড়ো বড়ো লোহার বেড়া দিয়ে ঘিরে ফেললে। তারপর একটা খাঁচার-গাড়ি টানতে টানতে বাঘকে নিয়ে এল সেখানে। এনে, খাঁচার দরজা খুলে দিতেই বাঘ 'হালুম' করে হাঁক পেড়ে লাফিয়ে পড়ল। ওই যে ইয়ালম্বা গোঁফওলা লোকটা, ওর নাম রিং-মাস্টার। কী সাহস! বাঘের সামনে দাঁড়িয়ে চড়াং করে এমন চাবুক চালালে, বাঘ ভয়ে এ-পাশ থেকে ও-পাশে মারল এক লাফ! বেশ করেছে মেরেছে। বাঘের মুখখানা দেখেই হুপ্পোর সববশরীর জ্বলে গেল। কাল হুপ্পোকে বাঘটা খোঁড়া ল্যাং ল্যাং বলে ভে^ংচি কেটেছিল। আরও দু-ঘা দিয়ে দিক না!

বাঘের খেলা দেখতে দেখতে বাচ্ছা ছেলেমেয়েরা কিন্তু খুব খুশি! খুশিতে এমন চেঁচিয়ে উঠছে, মনে হচ্ছে, যদি পায় তো এক্ষুনি বাঘের পিঠে লাফ দেয়। তবে ভয় কি পাচ্ছে না? কেউ কেউ তো ভয়ে আঙুল চুষছে, কেউ কেউ চোখ রগড়াচ্ছে! হুপ্পো গ্যালারির নীচে চুপটি করে বসে যত না বাঘের খেলা দেখছে, বাচ্চাদের হাসি হাসি মুখগুলি দেখছে তার চেয়েও বেশি। ভালো লাগে, হুপ্পোর খুব ভালো লাগে এই হাসি-হাসি মুখগুলি দেখতে। ঝুমকির মুখখানি যখন হাসিতে উছলে ওঠে, তখন কী সুন্দর দেখতে লাগে!

হঠাৎ হুপ্পোর চোখ থেকে সার্কাসের ওই অগুনতি ছেলেমেয়ের মুখগুলি নিমেষে মিলিয়ে গিয়ে, একটি মুখ ভেসে উঠল। অগুনতি ছেলেমেয়ের হাসির সুরগুলি হারিয়ে গিয়ে, একটি মুখের হাসি ওর কানে ছড়িয়ে পড়ল। চমকে উঠল হুপ্পো। একদম সামনে, হুপ্পো যেদিকে বসে আছে ঠিক তার উলটোদিকে বাবার সঙ্গে বসে ঝুমকি সার্কাস দেখছে! ইচ্ছে করলে, এখুনিই, এখান থেকে একটা লাফ মেরে ও ঝুমকির কোলের ওপর গিয়ে বসে পড়তে পারে! কিন্তু বাধ সেধেছে ওই রেলিং দিয়ে ঘেরা বাঘের খেলার জায়গাটা।

ঝুমকিকে দেখে আনন্দে শিউরে উঠল হুপ্পো। গ্যালারির নীচ থেকে হুপ্পো ঝড়ের মতো আছাড় খেয়ে বেরিয়ে এল। একবারও মনে হল না, সবাই ওকে দেখে ফেলবে। দেখতে পেলে যে কী কাণ্ড ঘটে যেতে পারে, সে-কথাও ভাবল না। ধরো, যদি বাঘটা দেখতে পায়!

দেখতে পায় মানে! বাঘটা কি কানা যে দেখতে পাবে না? হুপ্পো নিজেই তো দেখা দিয়ে বসল। গ্যালারির নীচ থেকে বেরিয়েই ওই সামনের খাঁচার রেলিংগুলোর ওপর লাফ মেরেছে। কারণ, খাঁচা না ডিঙোলে, হুপ্পো এ-পাশ থেকে ও-পাশে ঝুমকির কাছে যাবে কী করে? আর কোনো কথা শোনে বাঘ! কাল থেকে বাঁদরটার ওপর একেই চটে আছে। এখন দেখতে পেয়ে একেবারে হালুম করে লাফিয়ে উঠল। কী চিৎকার, কী গর্জন! হুপ্পোও বাঘের গর্জনে আঁতকে উঠেছে। তিড়িং করে লাফিয়ে ছিটকে পড়েছে।

প্রথমটা সকলে ভেবেছিল, এটাও বুঝি আর একটা নতুন খেলা। বাঘ-বাঁদরের লড়ালড়ি। কিন্তু তা তো নয়! এ তো দেখি, বাঘটা ভীষণ খেপে গেছে! কী কান-ফাটানি হাঁক পাড়ছে! রিং-মাস্টারও চাবুক চালাচ্ছে, সপাং সপাং। কিন্তু বাঘ শুনছেই না। ও লাফাচ্ছে, হুপ্পোকে ধরবে। হুপ্পোও জানে, বাঘ যতই চেষ্টা করুক, তাকে ধরতে পারবে না। কিন্তু লোকজনের ভীড় ঠেলে ও তো ঝুমকির কাছেও যেতে পারছে না। আচ্ছা, ঝুমকিও কি হুপ্পোকে চিনতে পারছে না? চেনা শক্ত। বাঁদরগুলো তো একইরকম দেখতে। ওর গায়ে তো আর হুপ্পো নামের ছাপ মারা নেই।

হঠাৎ বাঘটা ধাঁই করে খাঁচার রেলিং-এর গায়ে ধাক্কা মেরে চেঁচিয়ে উঠল, 'আয় বাঁদরটা, ভাঙি আদরটা।'

বাঘের এই রাগ-রাগ কথাগুলো হুপ্পো ছাড়া আর কে বুঝবে! হুপ্পো বাঘকে আরও রাগিয়ে দেবার জন্যে হি হি করে হেসে উঠল। তরতর করে তাঁবুর দড়ি ধরে ওপরে উঠে গেল। উঠে গিয়ে চ্যাঁচাল .

'আমায় যে বলেছে ল্যাংড়া,

তাকে লাথি মারে ব্যাংরা।'

বলে হাত দিয়ে বগ দেখাল। ব্যাস! হইহই কাণ্ড! বাঘ আর বশে নেই। রিং-মাস্টারকেই হালুম করে তেড়ে গেছে। রিং-মাস্টার চাবুক-টাবুক ফেলে, দে লম্বা। বাঘ হালুম হালুম ডাকতে ডাকতে, রেগে-খেপে খাঁচাটা থাবা দিয়ে ধাঁই ধাঁই করে পেটাতে লাগল। তিড়িং তিড়িং লাফিয়ে লাফিয়ে হুপ্পোকে ধরবার চেষ্টা করতে লাগল। ওঃ! সে কী ভয়ানক ব্যাপার!

ব্যাপারটা যখন গড়াতে গড়াতে লড়ালড়িতে ঠেকেছে, তখনই সবাই বুঝতে পারল, এটা তো খেলা নয়! যখন দেখল, রিং-মাস্টার বাঘের ভয়ে পালিয়েছে, তখন বুঝল বাঘ খেপেছে! তাঁবুর ভেতর হইহুল্লোড় লেগে গেল।

যাঃ! সার্কাসের খেলা ভণ্ডুল!

বাঘ গর্জায় হালুম হালুম!

লোক পালাচ্ছে গেলুম গেলুম!

হুড়োহুড়ি করে ভয়ে-ময়ে যে যেদিকে পারছে, পালাচ্ছে। কী ঠেলামেলি! চেপটাচেপটিতে এই বুঝি অঘটন ঘটে যায়! পালাতে গিয়ে কেউ হোঁচট খায়, কেউ হুমড়ি খেয়ে পড়ে যায়, কেউ 'বাবাগো মাগো' বলে কান্নাকাটি লাগিয়ে দেয়। সে যেন এক কুরুক্ষেত্র!

ঝুমকিও যে বাবার হাত ধরে, তাঁবু ছেড়ে ছুটছে, এত গোলমালেও সেটা কিন্তু হুপ্পোর চোখ এড়ায়নি। হুপ্পো তাই না দেখে, বাঘকে ছেড়ে ঝুমকির দিকেই নজর রাখল। কিন্তু এখান থেকে নামা তো মুশকিল! চারদিকে লোকে লোকে ছত্রাকার। সব লণ্ডভণ্ড। কোথায় নামবে?

এদিকে সার্কাসের ম্যানেজার-সাহেব যে, এর মধ্যে টেলিফোনে থানায় খবর পাঠিয়েছে, সে-কথা তো হুপ্পোর জানার কথা নয়। থানায় খবর গেছে, দমকলেও খবর গেছে। একেবারে হু-হু শব্দে পুলিশের গাড়ি সেখানে হাজির। ঢং ঢং করে ঘন্টা বাজিয়ে দমকলের ইঞ্জিনও পৌঁছে গেছে। পুলিশ কেন এসেছে হুপ্পো সেটা বুঝতে পেরেছে। কিন্তু দমকল কেন? ঢং ঢং করে দমকলের গাড়িটা গেট ভেঙে তাঁবুর মধ্যে ঢুকে পড়ল। গটমট গটমট করে পুলিশও ঢুকেছে। ফটফট ফটফট করে দমকলের লোকেরা, সিঁড়ি খাটিয়ে ওপরে উঠতে আরম্ভ করে দিল। বুঝেছি, তাঁবুর ওপর থেকে হুপ্পোকে ধরবার ফন্দি। সববনাশ! এখন তো তাহলে বিপদ! বিপদ-টিপদ মানে না হুপ্পো। হুপ্পোর চোখ এখন ঝুমকির দিকে। এখনও ভীড় ঠেলে ঝুমকি বেরুতে পারেনি। কিন্তু পুলিশের লোক দেখে, এই বিপদের সময়েও যে ওর মগজটা দুষ্টুমিতে এমন কিলবিল করে উঠবে, তা কি কেউ ভাবতে পেরেছিল? ও হাতের বাঁশিটা আবার বাজিয়ে দিয়েছে, পি-পি-ই-ই।

বাঁশির আওয়াজ শুনেই পুলিশকর্তা চমকে উঠেছেন। আরে! এই বাঁদরটাই তো কালকের সেই বাঁদরটা। পুলিশকর্তা হুপ্পোকে চিনে ফেলেছেন। চেঁচিয়ে উঠেছেন, 'ওই হ্যায়, পাকড়াও।'

হুপ্পো ভাবল, আর নিস্তার নেই। নীচে পুলিশ পাকড়াই পাকড়াই করছে। মধ্যিখানে বাঘ কামড়াই কামড়াই করছে। আর ওপরে দমকলের লোক থাবড়াই থাবড়াই করছে। হুপ্পো তাঁবুর দড়ি ধরে এদিক থেকে ওদিকে দোল খেতে শুরু করে দিল। নাও, এবার ধরো।

কিন্তু হুপ্পো এখান থেকে বেরোয় কেমন করে?

কেমন করে বেরোতে হয় সে হুপ্পো জানে। এদিক থেকে ওদিকে দোল খেতে খেতে তাঁবুর গায়ে ও যে একটা ফাঁক দেখতে পেয়েছে, সে তো আর কেউ জানত না। ওই ফাঁকটা দিয়ে ও তো বেশ সহজেই বেরিয়ে যেতে পারে! যেমন ভাবা তেমনি কাজ। চক্ষের নিমেষে সাঁই-ই-ই করে মারল এক লাফ। ওই ফাঁকটা দিয়ে সুট করে গলে ও একেবারে তাঁবুর ওপরে।

ততক্ষণে ঝুমকিও বাবার সঙ্গে বেরিয়ে এসেছে। ওই ভীড়ের মধ্যে খুঁজে পাওয়া তো শক্ত। কিন্তু হুপ্পোর চোখ। ও ঠিক দেখতে পেয়েছে। ঝুমকিকে সঙ্গে নিয়ে ঝুমকির বাবা ছুটছে। ছুটতে ছুটতে রাস্তায়। হুট করে একটা ট্যাক্সি ধরে একেবারে তার ভেতরে। ট্যাক্সি ছুটল হুস-স-স।

হুপ্পোও ততক্ষণে তাঁবুর চাল ডিঙিয়ে নেমে পড়েছে। হুপ্পোও ছুটল। ছুটল ট্যাক্সির পেছনে। ঝুপ করে লাফ মারল ট্যাক্সির চালে। তারপর চটপট জানলা গলে একেবারে ভেতরে। ঝুমকির কোলে।

তাঁবুর ভেতর থেকে পুলিশরাও বেরিয়ে এসেছে। হুপ্পোকে তারা দেখতেও পেয়েছে। পুলিশও চটপট গাড়িতে উঠে পড়ল। গাড়ি ছুটল হুপ্পোকে ধরতে, উঁ-উঁ-উঁ!

ঝুমকি, হুপ্পো আর পুলিশের বড়োবাবু

একটু দেরি হয়ে গেছল পুলিশের গাড়িটা ছাড়তে। তবে অনেকখানি দূরে চলে গেলেও ওরা ঠিকই নজর রেখেছে ট্যাক্সিটার ওপর। ওরা ঠিকই পেছন নিয়েছে।

পিচ-ঢালা রাস্তার ওপর দিয়ে হুস হুস করে বাস, লরি, মোটর গাড়ি ছুটে চলেছে। তাদের কাটিয়ে কাটিয়ে ঝুমকিদের বাড়িতে ট্যাক্সি যখন পৌঁছোল, তখন পুলিশগাড়ির পাত্তা নেই। কিন্তু মজা কী, এটা ঘুণাক্ষরে ঝুমকিও জানে না, ঝুমকির বাবাও জানে না, হুপ্পোকে ধরবার জন্যে একগাড়ি পুলিশ তাদের পেছনে তাড়া লাগিয়েছে।

বাড়ির দরজায় নেমে, হুপ্পোকে কোলে নিয়ে, ঝুমকি একেবারে নাচতে নাচতে ঘরে ঢুকে গেল, 'মা, মা, হুপ্পো!'

মা ছুটে এল। ঠাকুরও ছুটে এল। বাবাও ঘরে ঢুকে হুপ্পোর চেহারাটা ভালো করে দেখার জন্যে এগিয়ে এসেছে। ঠিক তখনই, ক্যাঁচ করে আওয়াজ। একটা গাড়ি এসে থামল যেন ওদের বাড়ির সমানে। দরজায় ধাক্কা পড়ল, 'বাড়িতে কে আছেন? দরজা খুলুন।'

ঝুমকির বাবা ছুটে গেল। দরজা খুলেই তার চক্ষুস্থির! দরজার সামনে একগাড়ি পুলিশ।

'আপনাদের ট্যাক্সিতে চেপে একটা বাঁদর এসেছে?' পুলিশের বড়োবাবু জিজ্ঞেস করলেন।

বাবা উত্তর দিল, 'আজ্ঞে হ্যাঁ, ও তো হুপ্পো। আমাদের পোষা বাঁদর!'

'সেকি মশাই!' বড়োবাবু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন। 'বাঁদরটাকে তো আমরা নিয়ে যাব।'

'কেন?'

'বাঁদরটা আমাদের একটা বাঁশি নিয়ে পালিয়েছে। সার্কাসের তাঁবুতে ঢুকে সব লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে। বাঁদরটা খেপে গেছে।'

ততক্ষণে হুপ্পোকে কোলে নিয়ে ঝুমকিও সেখানে হাজির হয়েছে। ঝুমকির কোলে হুপ্পোকে দেখে পুলিশের বড়োবাবু আঁতকে উঠে, 'খেপা-বাঁদর খেপা-বাঁদর' বলে এমন চেঁচিয়ে উঠলেন যে ঝুমকির হাসি পেয়ে গেল।

ঝুমকি বলল, 'ওমা! আপনি ভয় পেয়ে গেলেন? খেপা কেন হবে! আমায় কামড়াচ্ছে? আমার পোষা। নিন না, আপনি কোলে নিন, কিচ্ছু বলবে না।'

কোলে নেওয়ার কথা শুনে বড়োবাবু 'না, না' বলে এক-পা পিছিয়ে গেলেন। পিছিয়ে অবাক হয়ে একবার হুপ্পোর মুখের দিকে আর একবার ঝুমকির মুখের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে লাগলেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমার পোষা?'

'হ্যাঁ তো।'

'কামড়ে দেয় না?'

'না তো!'

হুপ্পোটা যে খেপা নয়, এ-কথা জেনে আর ঝুমকির মিষ্টি মিষ্টি মুখখানা দেখে, বড়োবাবুর রাগী-রাগী চোখ দুটোতে কেমন যেন ঠান্ডা-ঠান্ডা মেজাজ ভেসে উঠল। অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমার নিজের বাঁদর? কোথা পেলে?

'বাবা কিনে দিয়েছে।'

'তুমি বাঁদর নিয়ে খেলা করো?'

'আমি হুপ্পোকে ভালোবাসি।'

'স্কুলে যাও না?'

'ফার্স্ট হই।'

'ভেরি গুড।' বলে পুলিশের বড়োবাবু ঝুমকির মাথায় হাত দিয়ে আদর করলেন।

ঝুমকি বলল, 'হুপ্পোও আমার সঙ্গে পড়ে।' তারপর হুপ্পোর গালটা টিপে জিজ্ঞেস করল, 'না রে?'

হুপ্পো ঘাড় নাড়ল, কী মাথা হেলাল বোঝা গেল না। কিন্তু পুলিশের বড়োবাবু আর একগাড়ি পুলিশ একসঙ্গে এমন হো-হো করে হেসে উঠলেন কথাটা শুনে যে, ঝুমকির নিজেরই লজ্জা করল।

বড়োবাবু বললেন, 'জানো, তোমার বাঁদরটা আমাদের বাঁশি চুরি করেছে। আমরা যদি ধরে নিয়ে যাই?'

'বাঁদর আবার চুরি করে নাকি?' ঝুমকির উত্তর।

ঝুমেকির উত্তর শুনে বড়োবাবু একটু থতমত খেয়ে গেলেন। বললেন, 'চুরি না ঠিক, মানে দিচ্ছে না।'

'কই বাঁশি?' ঝুমকি জিজ্ঞেস করল।

বড়োবাবু বললেন, 'ওই তো, ওর হাতে।'

ওঃ! কী দুষ্টু দেখো। বাঁশিটা হাতের মুঠোর মধ্যে এমন লুকিয়ে রেখেছে যে, এতক্ষণ ঝুমকি দেখতেই পায়নি! ঝুমকি হুপ্পোকে বলল, 'বাঁশিটা দিয়ে দে।'

সঙ্গে সঙ্গে হুপ্পো হাত বাড়িয়ে বাঁশিটা বড়োবাবুকে দিয়ে দিল। বড়োবাবু বাঁশিটা হাতে নিয়ে অবাক হয়ে বললেন, 'বা! বেশ কথা শোনে তো!'

ঝুমকির বাবা এতক্ষণ চুপ করেছিল। এবার বলল, 'ভেতরে আসুন, একটু চা-টা--'

বড়োবাবু বললেন, 'না, না, চায়ের দরকার নেই। চা তো মশাই সারাদিন খাচ্ছি। আর আমাদের খাবারের আছেই বা কী! সময়ই বা কই? খুনি-ডাকাতের পেছনে ছুটতে ছুটতেই তো জীবন কেটে গেল। মানুষের পেছনে ছোটা এক জিনিস। দেখুন, বাঁদরের পেছনেও ছুটতে হচ্ছে।' কথাটা বলেই বড়োবাবু হেসে উঠলেন। ঝুমকির বাবাও হাসতে হাসতে সায় দিল।

ঝুমকি বলল, 'তা বলে আমার হুপ্পো কিন্তু ডাকাত নয়।'

বড়োবাবু বললেন, 'ডাকাত নয়। কিন্তু বড্ড দুষ্টু। আমায় ভয়ানক হেনস্তা করেছে।'

ঝুমকি বলল, 'দুষ্টুমি করে বলেই তো ওর নাম বাঁদর।'

বড়োবাবু হাসতে হাসতে বললেন, 'ঠিক কথা।' তারপর ঝুমকির বাবার দিকে মুখ ফিরিয়ে বললেন, 'সত্যি মশাই, ঘরে দুষ্টুমি করার মতো কেউ না থাকলে, ঘর যেন মানায় না। এই দেখুন না আমার ছোটো ছেলেটা, এমন দুষ্টু, কী বলব! তাকে সামলাতে তার মায়ের তো হাড়-মাস কালি। আমার তো দুষ্টুমি করলে বেশ ভালো লাগে।'

'একটু চা হবে না?' ঝুমকির বাবা আবার জিজ্ঞেস করল।

'না মশাই, চলি। ধরতে এলুম বাঁদর, উলটে আপনার মেয়েটিকে দেখে আমার মন ভুলে গেল। আপনার মেয়েটি বড্ড ভালো।' বলে ঝুমকির গালটা টিপে দিলেন। তারপর বললেন, 'তাহলে চলি। হ্যাঁ, তোমার বাঁদরের নাম তো বললে হুপ্পো, তোমার নিজের নাম বললে না তো?'

'ঝুমকি।'

'বা! বেশ নামটি! একদিন এসো আমাদের ওখানে।'

'কোথায়? জেলখানায়?'

'আরে না, না। আমার বাড়িতে।'

'আপনি আবার আসবেন তো?'

'হ্যাঁ, নিশ্চয়ই আসব। কী খাওয়াবে?'

'পায়েস। মা খুব ভালো কমলালেবুর পায়েস করতে পারে।'

'তাই নাকি? ভেরি গুড!'

'কবে আসবেন?'

'তোমার বাঁদরের যেদিন বিয়ে হবে!'

'সত্যি!' খুশিতে মুখখানি উছলে গেল ঝুমকির।

হাসতে হাসতে বড়োবাবু গাড়িতেই উঠতে যাচ্ছিলেন। তারপর কী মনে হল, ফিরে দাঁড়ালেন। বললেন, 'না, এই বাঁশিটা আমি তোমার বাঁদরকেই দিয়ে দিলুম।' বলে হুপ্পোর দিকে চেয়ে বললেন, 'এই নে, নে।'

হুপ্পো হাত বাড়াল।

তারপর পুলিশের বড়োবাবু গাড়িতে চাপলেন। ঝুমকির দিকে চেয়ে হাত নাড়লেন। গাড়ি চলে গেল। ওমা! হুপ্পোটা কী শয়তান! গাড়ি ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাঁশিটা বাজিয়ে দিল, পি-পি-ই-ই। গাড়ি কিন্তু আর থামল না।

ঝুমকির কী আনন্দ! 'দুষ্টু, দুষ্টু, কোথায় গেছলি?' বলে গালটা টিপে এমন আদর করতে লাগল, হুপ্পোর মনে হল, এখন ছেড়ে দিলে বাঁচি। এখন ওর যা খিদে পেয়েছে! আদর খেয়ে কি পেট ভরে?

ঝুমকির আনন্দ দেখে, বামুনঠাকুরও আজ আহ্লাদে ডগমগ।

আর মা? হুপ্পো আজ সব প্রথম দেখল, হুপ্পোর মুখের দিকে চেয়ে মা-ও মুচকি মুচকি হাসছে। আজ মাকে বেশ লাগছে হুপ্পোর। সত্যি, মায়ের মুখখানি যে এত মিষ্টি, হুপ্পো যেন আজই প্রথম সে-কথাটা বুঝতে পারল!

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%