আজব বাঘের আজগুবি

শৈলেন ঘোষ

আমি আগে কখনো মানুষ দেখিনি। বলতে কী, মানুষের নামগন্ধও শুনিনি। প্রথম মানুষের নাম শুনে কেমন যেন একটা অদ্ভুত মজা লেগেছিল আমার। এমন মজা তোমার যদি লাগত, তুমি নিশ্চয়ই হেসে ফেলতে। কিন্তু আমি বাঘ। আমায় কেউ হাসতে শেখায়নি। এমনকী, আমার ঠাকমাকেও আমি কোনোদিন হাসতে দেখিনি।

এখন আমার ঠাকমা বুড়ি হয়ে গেছে। তা হলেও, এখনও যদি হাঁক পাড়ে, বন থরহরি। ইচ্ছে করলে এখনও এক থাবায় ইয়া পেল্লাই বুনো-মোষের ঘাড় লটকে দিতে পারে। বুনো-মোষকে পিঠে নিয়ে বন ডিঙিয়ে লাফ মেরে পালাতে পারে।

ঠাকমার যে অনেক বয়েস, তুমি অবশ্য তা দেখলে বুঝতে পারবে না। কারণ, এখনও একটিও দাঁত পড়েনি। চোখের তেজ একটুসুও কমেনি। থাবার নখ এতটুকু ভোঁতা হয়নি। আমি হলফ করে বলতে পারি, তুমি দেখলে ভয় পেয়ে যাবে। আমি নিজেও তো দেখেছি, একটা বড়ো হরিণ ধরে এনে থাবার নখ তার গায়ের ওপর একবার শুধু আলতো করে বুলিয়ে দিল, অমনি হরিণের গায়ের চামড়া দু-ফাঁক হয়ে ঝুলে পড়ল। কিন্তু আমি যদি ঠাকমার পাশে এসে দাঁড়াই, তখনই তোমার মনে হবে, ঠাকমার বয়েস হয়েছে। ঠাকমার পাশে আমাকে দেখলে তুমি ভাববে, বয়েসে আমি নেহাতই নাবালক।

আসলে তাই। আমার কী আর এমন বয়েস! তা হলেও কিন্তু ঠাকমার চেয়ে আমি অনেক বেশি লাফালাফি করতে পারি। ঠাকমা তো একটু বেশি ছোটাছুটি করলে হাঁপিয়ে পড়ে। আমার ওসব নেই। চুপচাপ বসে থাকতে আমার ধাতে সয় না। তা ছাড়া আমার নিজের চেহারার দিকে আমি যখনই তাকাই, আমার তখনই বুক ফুলিয়ে হাঁটতে ইচ্ছে করে। আমার গায়ে রঙের বাহার কী! ডোরা ডোরা দাগগুলো ঝকঝক করছে। থাবার নখগুলো চকচক করছে। আমার নিজেরই নিজেকে এত ভালো লাগে!

আমি আমার ঠাকমার কাছেই প্রথম মানুষের কথা শুনি। আমার ঠাকমা অনেকবার মানুষ দেখেছে। আমি শুনেছি, আমাদের মতো মানুষের চারটে পা নয়। পায়ে থাবাও নেই। মানুষের দুটো হাত আর দুটো পা। দু পায়ে খাড়া দাঁড়িয়ে হাঁটা-ছোটা, চলাফেরা করতে মানুষের কোনো অসুবিধেই হয় না। একথা শুনে আমার খুব অবাক লেগেছিল। আমি নিজেও যে দুপায়ে দাঁড়িয়ে হাঁটাচলা করতে চেষ্টা করিনি, তা নয়। কিন্তু একেবারে অসম্ভব! তবে আমাদের এখানে ভাল্লুকগুলো পারে। বাচ্চা ছেলেকে বুকে নিয়ে মা-ভাল্লুক যখন হাঁটে, তখন বেড়ে দেখতে লাগে! ভাল্লুকের অমন হাঁটা দেখেই আমি মানুষেরও একটা মোটামুটি চেহারা ধারণা করে নিয়েছিলুম। অবশ্য মানুষের গায়ে যে ভাল্লুক অথবা আমাদের মতো লোম নেই, সেটা ঠাকমা আমায় আগেই বলেছিল। ঠাকমার ধারণা মানুষের মাথাটা দেহের এক্কেবারে ওপরে বলে ওদের বুদ্ধি খুব। তবে সাহস নিয়ে অনেক তর্ক-বিতর্ক আছে। কেউ বলে, মানুষ ভীষণ সাহসী, আবার কেউ কেউ বলে, ফুঃ! ওদের হাতে বন্দুক থাকে বলে ওদের এত সাহস। একা-একা লড়ে যাক! তবে ঠাকমা বলে, বাঘকে মানুষ যমের মতো ভয় করে। বাঘের সামনে বন্দুক ছাড়া এক পা এগোতে পারে না। কিন্তু ভাল্লুক বলো, কী হাতি বলো, মানুষ ওদের ধরে নিয়ে গিয়ে সহজেই পোষ মানায়। শুনেছি রাস্তায় রাস্তায় ভাল্লুকের নাচ দেখিয়ে বেড়ায়।

সত্যি বলছি, প্রথম যেদিন নাচের কথা শুনি, মানে ভাল্লুক নাচে এই কথাটা শুনলাম, সেদিন আমি এক্কেবারে থ। প্রথমত নাচ ব্যাপারটা কী, নাচলে সাপের পাঁচ পা দেখা যায় কি না, কিম্বা নাচ জিনিসটা চোখে দেখার অথবা পেটে খাওয়ার, তা আমি একদমই জানতুম না। তারপর মশাই, নাচের মানেটা যখন আমার মাথায় ঢুকল, যখন জানলুম, নাচ মানে পা ঠুকে ঠুকে ধেই ধেই করা আর ধেই ধেই করে কোমর বেঁকিয়ে ঘাড় দুলিয়ে লাফ মারা, তখন সত্যিই আমি তাজ্জব বনে গিয়েছিলুম। কারণ, ভাল্লুকের চেহারাটা এমন বিদঘুটে হোক্কাই চমচমের মতো যে, সে কোমর বেঁকিয়ে নাচবে, এ আমি ভাবতেই পারি না। আমি ভাবতে পারি চাই নাই পারি, ভাল্লুক নাচে, নাচছে, নাচবে!

সুতরাং, একদিন আমার মনে হল, ভাল্লুক যদি নাচতে পারে তা হলে আমিও পারি। আর তাই একদিন নিজঝুম চাঁদনি রাতে আমার খুব নাচতে ইচ্ছে করছিল। জানো তো, আমি বাঘ বলে আমার ফ্যাচাং-এর ঠেলা কত! নাচতে হলে আমায় লুকিয়ে-ছাপিয়ে নাচতে হবে। কেন না, কেউ দেখে ফেললে বদনামের একশেষ! বাঘ আবার চ্যাংড়ার মতো নাচবে কী! যার হুংকারে বনের পিলে ফাটবার গোত্তর, সে ধেই ধেই করে নাচছে, এটা কারো নজরে পড়লে মুখ দেখাবার যো থাকবে! কাজেই আমার নাচ আমি ছাড়া আর যাতে কেউ না দেখতে পায়, সেইজন্যে বনের যেদিকটা সবচেয়ে নিরিবিলি সেইখানেই চার-পা তুলে ধাঁই-ধপাধপ শুরু করে দিলুম। সুখের কথা, আমার নাচ দেখবার জন্যে টিকিট নিয়ে মারামারি কাটাকাটি লেগে যায়নি। কারণ, কেউ জানতেই পারেনি আমি এখানে নাচের আসর বসিয়েছি। কিন্তু দুঃখের কথা, চাঁদনি রাতে আকাশ উপচে সেদিন জ্যোৎস্না ছড়িয়ে পড়লেও, নাচ ব্যাপারটা আমার নিজের কাছে নেহাৎ-ই একটা ফালতু ব্যাপার বলে মনে হয়েছিল। আমার মনে হয়েছিল, এ-সব উদ্ভুট্টি কাণ্ডকারখানা ভাল্লুক-টাল্লুকদেরই সাজে! ওসব কম্ম বাঘের জন্যে নয়। ছ্যাঃ! ছ্যাঃ! বাঘ কোমর বেঁকিয়ে নাচবে কী! বাঘ কি যাত্রাপার্টির সঙ!

সৌভাগ্যই বলো আর দুর্ভাগ্যই বলো, আমি আগে বন্দুক জিনিসটা কী, জানতুমই না। বন্দুক নাকি একটা সাংঘাতিক যন্তর। ঠাকমা বলে, বন্দুকের গুলি গায়ে লাগলে রক্ষে নেই। অজান্তে বন্দুকের সামনাসামনি পড়লে নির্ঘাত মরণ! আমার মাকে নাকি আমি সেই বন্দুকের গুলিতেই হারিয়েছি! শুনি, আমার মা ছিল মানুষখেকো!

আমি তখন খুব ছোটো। জ্ঞানগম্যি বলতে বিশেষ কিছু ছিল না। তাই মা যখন আমায় ছেড়ে চলে গেল, তখনকার কথা আমার আবছা আবছা মনে আছে। আমি মায়ের যেটুকু আদর পেয়েছি, তা-ও আমার স্পষ্ট মনে নেই। ঠাকমাই আমাকে বড়ো করে তুলেছে।

মানুষখেকো কথাটা শুনলেই আমার কেমন গা ঘিনঘিন করে। সত্যি বলতে কী, বাঘে মানুষ খায়, এ-কথাটা আমি বিশ্বাসই করতে পারি না। কিন্তু আমার বিশ্বাস-অবিশ্বাসে কী আসে-যায়। মা পঞ্চাশটার ওপর মানুষ মেরেছিল। মেরে মেরে মানুষের রক্ত খেয়েছিল। দুর্দান্ত সাহস ছিল আমার মায়ের। মা রাত্তিরবেলা বন ডিঙিয়ে মানুষ-পাড়ায় চলে যেত। মানুষের ঘর থেকে চুপিসাড়ে ষণ্ডা ষণ্ডা মানুষ ধরে নিয়ে আসত। শুনেছি, মানুষ শিকার করা নাকি সবচেয়ে সোজা। অবশ্য আমার ঠাকমা মাকে অনেকবার বারণ করেছিল। বলেছিল, 'বেশি বাহাদুরি করা ঠিক না।' কিন্তু আমার ঠাকমার কথা মা শোনেইনি। তা ছাড়া শুনেছি নাকি, মানুষের রক্ত পেটে পড়লে তার লোভ ছাড়া দায়! মানুষের রক্ত নাকি খুব মিষ্টি! একবার স্বাদ পেলে আর রক্ষে নেই! নেশা ধরে যায়!

মা সাধ করে মানুষখেকো হয়নি। মানুষের ওপর মায়ের ছিল ভীষণ রাগ। অবশ্য এর জন্যে আমি মাকে খুব দোষ দিই না। দোষ যদি দিতে হয়, মানুষকেই দেব। যদি বলো কেন, তাহলে বলি, আমার বাবাকে মানুষ ধরে নিয়ে গেছে! নিশ্চয়ই জানো, বাঘ ধরা ব্যাপারটা অত সহজ নয়। কিন্তু ওই যে বলেছি, ঠাকমা বলে, মানুষ দারুণ চালাক।

বুদ্ধিতে বাবাও কম যেত না। কিন্তু আমার অমন বুদ্ধিমান বাবাকেও যে মানুষগুলো এমন বোকা বানিয়ে দেবে এ-কথাটা বাবা কেন, কেউই ঘুণাক্ষরে বুঝতে পারেনি।

বাবার ছিল দারুণ স্বাস্থ্য, নিটোল। আর খুব চমৎকার গড়ন। গর্জন করতে করতে বন কাঁপিয়ে বাবা যখন হাঁটত, তখন দেখলে মনে হত, সত্যিই বাবা বনের রাজা। বাবা কাউকে কেয়ারই করত না। কেয়ার করার দরকারই ছিল না। কারণ, বাবার মূর্তি দেখলে ধারে-কাছে ঘেঁষে এমন সাধ্যি কার!

কিন্তু এই কেয়ার না করাটাই যে কাল হয়ে দাঁড়াবে, আগেভাগে সেকথা আর কে জানতে পারবে? কে বুঝবে, বনের রাজাকে ধরবার জন্যে বনের আনাচে ফন্দি এঁটে মানুষ ঘাপটি মেরে বসে আছে! সত্যিই সেদিন এক মস্ত হার হয়ে গেল আমাদের। বাবা মানুষের হাতে বন্দি হয়ে গেল।

বাবার সেই বন্দি হয়ে যাওয়ার কথাটাই তোমাদের আগে বলি।

রোজই তো বাবা সন্ধের ঝোঁকে শিকার করতে বেরোয়। সেদিনও বেরিয়েছিল। সেদিন হয়তো বাবার ইচ্ছে ছিল হরিণ ধরবে। কিন্তু তোমরা হয়তো জান না, হরিণ ধরা খুব শক্ত। নজরে পড়লে এমন ছুটবে, শত চেষ্টাতেও তাদের ধরা যাবে না। এক যদি ওই লম্বা শিংগুলো লতাপাতায় আটকে না যায়। কিন্তু হরিণ ধরতে গিয়ে বনের অন্ধকারে বাবা যে আচমকা একটি নধরকান্তি ভেড়া দেখতে পাবে, এ-কথা কে জানবে! সেটি যে মানুষই চালাকি করে ছেড়ে রেখেছিল, তা বাবা একদম বুঝতে পারেনি। তাই ভেড়াটিকে দেখতে পেয়েই বাবা টিপ করে মেরেছে লাফ। অমনি সঙ্গে সঙ্গে, দুম দুম! আওয়াজটা বন্দুকের নয়, বোমার। প্রচণ্ড আওয়াজ। বাবা হকচকিয়ে সাংঘাতিক চমকে উঠেছে। ভেড়াটাকে ছেড়ে মার ছুট! ছুটবে কোন দিকে? যেদিকে ছুটবে সেদিক থেকেই অমনি শয়ে শয়ে মানুষ ক্যানেস্তারা, ঘন্টা পিটিয়ে খেদা লাগাল। বাবার তো চক্ষু চড়কগাছ। সামনে ছুটতে গিয়ে থমকে থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে পড়েই, পেছনে ছুটতে গেল। অমনি পেছন থেকেও শয়ে শয়ে মানুষ চিলের মতো চেঁচিয়ে উঠে বাবাকে তেড়ে এল। বাবা আকাশ-পাতাল কিচ্ছু ভেবে না পেয়ে, চোখ-কান বুজে মারল লাফ। ব্যস! বাবা যে একটা শুকনো পাতা চাপা দেওয়া গর্তের মধ্যে লাফ মেরে পড়বে, সে কথা আর কে জানত? সত্যি, একেবারে হুমড়ি খেয়ে একটা গর্তের মধ্যে মুখ গুঁজরে বাবা পড়ে গেল! কী গভীর গর্তটা! সেখান থেকে শত লাফালাফি করেও বাবা উঠতে পারল না। আকাশ ফাটিয়ে তর্জন-গর্জন করেও কোনো লাভ হল না। বাবা এখন মানুষের ফাঁদে পড়েছে। বাবাকে ধরবে বলে মানুষ গর্ত কেটে, তার ভেতরে একটি লোহার খাঁচার ফাঁদ তৈরি করে রেখেছিল। তারা জানত, আমার বাবা শিকার ধরতে এদিকেই আসবে। তারপর শুকনো পাতা দিয়ে সাজানো এই ফাঁদে পড়ে বন্দি হবে।

বাবা বন্দি হয়েছিল। ওই লোহার খাঁচায় বন্দি করে বাবাকে মানুষের দল ধরে নিয়ে গেল। তারপর যে বাবার কী হল, কেউ জানে না।

আর এইতেই আমার মায়ের মাথা গেল বিগড়ে। যাবারই কথা। বাবার জন্যে আমার মা এমন মুষড়ে পড়ল যে, মনে হল মা বুঝি আর বাঁচবেই না। কিচ্ছু খেত না, কোথাও যেত না। শুধু পড়ে পড়ে গুমরাতো। আর ঠাকমারও মনে ভীষণ লেগেছিল। ঠাকমা অত দুঃখেও ভেঙে পড়েনি। মাকে বলত, 'বউ, ওঠ। খেয়ে নে। অমন উপোষ করে থাকলে মরবি যে। নিজের কী দশা হয়েছে, একবার চেয়ে দেখেছিস? ছেলেটাকে তো বাঁচিয়ে রাখতে হবে!'

ছেলেটা মানে, আমি। আগেই তো বলেছি, আমি তখন একদম ছোটো। আর সেইজন্যেই বাবার কী হল না হল, সে-সব নিয়ে আমার মাথা ঘামাবার কথা নয়। আমি নিজের খেয়ালেই মত্ত। ছুটি, লাফাই, খেলা করি। বাবাকে দেখতে না পেয়ে, হঠাৎ হঠাৎ যখন বাবার কথা আমার মনে পড়ে যায়, জিজ্ঞেস করলেই ঠাকমা বলে, 'তোর বাবা বে-বাড়ি গেছে নেমন্তন্ন খেতে।' আমি শুনে নিশ্চিন্ত হয়ে উত্তর দিতুম, 'ও।' কিন্তু দেখতুম, আমার কথা শুনে আর আমার মুখের দিকে চেয়ে, মায়ের চোখ ছলছল করছে। আমি ভাবতুম, মায়ের বোধ হয় ব্যামো হয়েছে। পেট কামড়াচ্ছে, তাই কাঁদছে। পেট কামড়ালে আমিও কাঁদি। সে তো এক-একদিন। কিন্তু মা তো রোজই পড়ে পড়ে কাঁদে। তাহলে কী মায়ের ভারি অসুখ করল!

অনেকদিন কেটে গেল। সত্যিই আর বাবা ফিরে এল না। ফিরে যে আসবে না, এ-তো জানা কথা। তবু তো বলা যায় না। অঘটন ঘটেও তো যেতে পারে। কিন্তু না, কিছুই ঘটল না। এটা ভাবাও তো মিথ্যে যে, লোহার খাঁচা ভেঙে বাবা পালিয়ে আসবে! এ-তো সবাই জানে, মানুষের খপ্পর থেকে নিস্তার পাওয়া মানে, যমের দুয়ার থেকে ফিরে আসা। অত সোজা! সোজা নয় ঠিকই, কিন্তু কেউ আশা কি ছাড়ে?

মায়ের আশা যখন সত্যি সত্যি ভেঙে গেল, বাবা যখন সত্যিই ফিরল না, সেই তখন থেকেই আমার মা মানুষের ওপর খেপে গেল ভয়ংকর রকম। মানুষ দেখলেই তাকে মারো। তার টুঁটি টিপে রক্ত শুষে খেয়ে ফেলো, এই হল মায়ের গোঁ! আর এই করতে করতেই মা হয়ে উঠেছিল পাকা মানুষখেকো। মানুষ মারার জন্যে মা জঙ্গল ডিঙিয়ে চুপিসাড়ে পাড়ি দিয়েছে লোকালয়ে। যাকে পেরেছে খতম করেছে। নিজের গায়ের জ্বালা মিটিয়েছে। শেষে এমন স্বভাব হয়ে গেল, যেন মানুষ মারাটা কিছুই নয়। হাতের টুসকি।

বেশি গোঁয়ারতুমি করাটা যে মোটেই বুদ্ধিমানের কাজ নয়, এ-কথা মাকে কে বোঝাবে? মার খেতে খেতে মানুষও যে চুপটি করে হাত গুটিয়ে হরিনাম জপছে না, এ তো আর মা জানত না। তাকে মারবার জন্যে মানুষও যে মতলব আঁটতে পারে, এটা মগজে ঢোকেইনি মায়ের। তাই মায়ের সাহস যেন লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে গেল। শেষে একদিন দিনদুপুরেই এক ভয়ানক কাণ্ড করে বসল মা।

আমাদের বনটা পেরোলেই যে বস্তিটা নজরে পড়ে, সেখানে যে অনেক লোকজন, তা নয়। দু-চার ঘর। তা হলেও, আমি বলব, দিনের বেলা সেখানে বাঘ-ভাল্লুকের যাওয়া মোটেই উচিত নয়। আমার মা কিন্তু তাই করে বসল। হুট করে ভরদুপুরেই সেখানে হাজির হল। জায়গাটা মোটেই খোলামেলা নয়। কারণ, বস্তিটা বনের একেবারে কোলে। এদিকে বনটা অনেকটা হালকা হয়ে এসেছে বটে, কিন্তু গাছগাছালি, ঝোপঝাড় যথেষ্ট আছে। দেখলে মনে হবে, ঘন জঙ্গলের গায়ে গা ঠেকিয়ে বস্তিটা দাঁড়িয়ে আছে। তখন কাঠফাটা রোদ্দুর। একটা ছোটো ছেলে এই নির্জন দুপুরে ঘোড়াকে খাওয়াবে বলে, বনের ধারে ঘাস কাটতে এসেছিল। ছেলেটা নাকি রোজই আসে। রোজই নাকি তার সঙ্গে কেউ না কেউ সঙ্গী থাকে। মা ক-দিন ধরেই লক্ষ করেছে। কিন্তু শিকার করার তেমন জুতসই সুযোগ আসেনি। এ-কথাটা তো ঠিক, রাগ দেখিয়ে হুট করে কিছু করতে গেলে বিপদ সবারই হতে পারে। সুতরাং, মা ঝোপের আড়ালে ওঁত পেতে বসে থাকে আর সুযোগ খোঁজে।

আজ সুযোগ মিলে গেল। কে জানে কেন, ছেলেটার সঙ্গে আজ কোনো সঙ্গী ছিল না। আজ ছেলেটা একাই এসেছে। মা যেদিক থেকে ছেলেটাকে লক্ষ করছিল, সেদিকে পেছন করেই ছেলেটা ঘাস কাটছে। সেই তক্কে মা ছেলেটার ঘাড়ে মেরেছে এক লাফ! লাফ মেরেই থাবার বাড়ি এক ঝটকা। ছেলেটার মুখ দিয়ে রা পর্যন্ত বেরোল না। সেখানেই লুটিয়ে পড়ল। মা সঙ্গে সঙ্গে ছেলেটাকে মুখ দিয়ে চেপে ধরে টানতে টানতে নিয়ে গেল একটা ঝোপের মধ্যে। সেখানে লুকিয়ে রাখল। কারণ, মা জানে এখন এটাকে খাওয়া যাবে না। এক্ষুনি চারিদিকে হইচই পড়ে যাবে। ছেলেটার খোঁজ করতে দলে দলে লোক এসে পড়বে। এখন এখানে থাকলে বিপদও হতে পারে। অন্ধকার রাত্তির হচ্ছে সবচেয়ে ভালো সময়। তাই রাত্তিরে আসার মতলব এঁটে মা ছেলেটাকে লুকিয়ে রেখে ওখান থেকে সরে পড়ল। মা নিশ্চিত জানত, যে-জায়গায় তার শিকার লুকিয়ে রেখেছে, সে-জায়গার হদিশ আর কাউকে পেতে হচ্ছে না।

কিন্তু চালে ভুল করে বসল মা। মানুষের সঙ্গে চালাকি করতে গিয়ে অজানতে নিজের ফাঁদ নিজেই ফেঁদে বসল। অন্য-অন্যবার মা কাউকে শিকার করে সঙ্গে সঙ্গে শিকারটাকে ঘাড়ে নিয়ে পালিয়ে যায়। তাই মাটিতে কোনো চিহ্ন থাকে না। এবার কিন্তু মা তার শিকারকে ঘাড়ে করে নিয়ে গেল না। এখন দিনদুপুর! এই দিনদুপুরে কেউ পাছে দেখে ফেলে, তাই মা তড়িঘড়ি ছেলেটাকে মাটিতে হ্যাঁচড়াতে হ্যাঁচড়াতে নিয়ে গেল। তার ফলে হল কী, টানা-হ্যাঁচড়ার দাগ আর রক্ত সারাটা পথে ছড়িয়ে রইল। এটা কিন্তু মা জানতেই পারল না। তাই নিশুতি রাতে মা যখন ছেলেটাকে খাবে বলে সেখানে হাজির হয়েছে, তখন একদম টের পায়নি, ওই হ্যাঁচড়ানি আর রক্তের দাগের হদিশ পেয়ে তাকে মারবার জন্যে গাছের ওপর একটা মানুষ বন্দুক উঁচিয়ে বসে আছে। মা কী ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পেরেছিল, তার দিন শেষ হয়ে এসেছে! তাই হুমড়ি খেয়ে বসে বসে নিশ্চিন্তে তার শিকারের মাংস খাচ্ছিল। তারপর--গুড়ুম।

একেবারে মায়ের মাথার ভেতর বন্দুকের গুলি ঢুকে গেল। মা গর্জন করতে পেরেছিল একবারটি। তারপর ছিটকে পড়ল ক-হাত দূরে। মাটিতে লুটিয়ে পড়ে ছটফট করতে লাগল। আর একবার গুলি ছুটল, মায়ের ছটফটানি নিস্তেজ হয়ে গেল। তারপর যে কী হল কেউ জানে না।

এ-সব তো আমি বড়ো হয়ে ঠাকমার কাছে শুনেছি। কিন্তু তোমাকে তো আমি আগেই বলেছি, মা যখন আমায় ছেড়ে চলে যায়, তখন আমি খুব ছোটো। তাই সেই ছোটোবেলায়, সেদিন মাকে ফিরতে না দেখে আমি ভেবেছি, মা-ও বুঝি বাবার মতো বে-বাড়ি গেছে নেমন্তন্ন খেতে।

সে যাই হোক, মা-ও বাবার মতো আর কোনোদিন ফেরেনি। তখন আমি মনে মনে অবাক হয়ে ভেবেছিলুম, বে-বাড়ি সে কেমন বাড়ি যে, সেখানে কেউ একবার গেলে আর ফেরে না। বে-বাড়ির নেমন্তন্ন খাওয়ার ব্যাপারটা যে কী, সেটি জানার জন্যে তাই আমার মনটা সব সময়েই ছুকছুক করত। যখনই ফাঁক পেতাম ব্যাপারটা জানার জন্যে তখনই ঠাকমাকে ঘ্যানঘ্যান করে জ্বালাতন করতুম। ঠাকমা কিন্তু কিছুতেই বলত না। আমিও ছাড়তুম না। শেষে একদিন আমার জ্বালায় তিতিবিরক্ত হয়ে, এইসা ধমক দিয়েছিল যে, সেইদিন থেকে বে-বাড়ির নেমন্তন্ন খাওয়ার ব্যাপারটা আমার মগজ থেকে একদম হাওয়া। আমি অবশ্য বড়ো হয়ে, অনেকদিন পরে, বে-বাড়ির নেমন্তন্ন খাওয়ার মানেটা বুঝেছিলুম। বুঝেছিলুম ছোটোবেলায় আমাকে ভোলাবার জন্যেই ঠাকমা ওই কথাটি পেড়েছিল।

বয়েস হলে সকলের অনেক জ্ঞান বাড়ে। অনেক কিছু জানতে পারে। আমার ঠাকমাও তাই। বাঘ হলে কী হবে, ঠাকমার মানুষের ঘরের নাড়ি-নক্ষত্র সব জানা ছিল। ঠাকমা জানত, মানুষ যেমন গাঁয়ে-গঞ্জে থাকে, তেমনি থাকে শহরপাড়ায়। গাঁয়ে যেমন মাটির বাড়ি, শহরে তেমনি কোঠাবাড়ি। গাঁয়ে লোকজন নামমাত্র, শহরে অগুনতি, অসংখ্য। এ-সব কথা কতদিন আমায় ঠাকমা গল্প করেছে। ঠাকমার মুখেই শুনেছি, মানুষের বিয়ে হয় খুব ধুমধাম করে। বর টোপর মাথায় দিয়ে বিয়ে করতে আসে কনেকে। অনেক সব মন্তর-টন্তর পড়া হয়। শাঁখ বাজে। মেয়েরা মুখে হুলু-হুলু করে কী রকম ডাক দেয়। বিস্তর লোক জমায়েত হয়ে লুচি, মাংস, রসগোল্লা সব খায়। এইটাকেই নেমন্তন্ন খাওয়া বলে। আমি অবশ্য কাঁচা মাংস অনেক খেয়েছি, কিন্তু রান্না করা মাংস কখনো খাইনি। তাই ওর স্বাদ-গন্ধ আমার জানা নেই। শুনেছি লুচির তেমন কোনো স্বাদ নেই। কিন্তু রসগোল্লার স্বাদ নাকি সাংঘাতিক। রস ভরতি বড়ো বড়ো গামলায় যখন রসগোল্লা ভাসে, বসে দেখলে নোলার জল সামলানো দায়!

শেষমেষ বাবা-মা দুজনকেই যখন আমি হারালুম, তখন ঠাকমার যে কী হল, আমাকে একদম কাছছাড়া হতে দিত না। সব সময় নজরে নজরে রাখত। আমাকে আরও বেশি করে আদর করত। কারণ, বাপ-মা-মরা ছেলে তো! ভালো ভালো শিকার ধরে এনে ঠাকমা আমায় খাওয়াতো। কোনোদিন হরিণ, কোনোদিন মোষের গর্দান আবার কোনোদিন ভাল্লুকছানা। একদিন একটা বুনোশুয়োর এনেছিল। বেড়ে খেতে কিন্তু!

কিন্তু তাই বলে তো চিরটাকাল ছোট্ট সেজে আমি থাকতে পারি না। ঠাকমা আমায় শিকার ধরে এনে আমার মুখে তুলে দেবে, আর আমি খাব, এ কেমন কথা! সুতরাং আমিও যখন একটু একটু করে বড়ো হয়ে উঠলুম, আমারও তখন মনে মনে ইচ্ছে হত, আমি নিজে নিজে শিকার ধরব। পরের মুখ চেয়ে থাকতে তখন কেমন যেন বাধো-বাধো ঠেকত! লজ্জাও করত! ঠাকমাও জানত, ছেলেটাকে চিরদিন বসিয়ে বসিয়ে খাওয়ালে অভ্যেস খারাপ হয়ে যাবে। কুটোটি নেড়ে কিচ্ছু করতে চাইবে না। কুঁড়ের মতো শুয়ে-বসে ঝিমুবে। তাই ঠাকমা একদিন আমায় বলল, 'চ, শিকার করতে শিখবি চ।' সত্যি বলছি, কথাটা শুনে আমার পা থেকে মাথা অবধি আনন্দে শিউরে উঠল। আকাশ থেকে চাঁদটি পেড়ে এনে কে যেন আমার হাতে তুলে দিল। এখন আমার বয়েসটা এমন যে, সব সময় মনে হয় একটা কিছু করি। এমন একটা কিছু, যাতে বেশ মারামারি আছে। বেশ সাহস দেখানো যায়। কিংবা বুক কাঁপানো উত্তেজনা। তাই ঠাকমার কথায় রাজি তো হলুমই, এমনকী ঠাকমার কথা মুখ থেকে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে জঙ্গলের মধ্যে মারলুম লাফ। ঠাকমা চেঁচাল, 'একা একা যাসনি।' কিন্তু কে শুনছে কার কথা!

অবশ্য ঠাকমা আমায় একা যেতে দিল না। দু-লাফে আমায় ধরে ফেলল। রেগে ভীষণ ধমক দিল। বলল, 'অমন করলে আর কোনোদিন আনবো না। বিপদে পড়লে তখন দেখবে কে?'

আসলে, বিপদেই তো আমি পড়তে চাই। বিপদে না পড়লে মজা কী? কিন্তু এটাও তো ঠিক, মজা পেতে গিয়ে প্রাণও যেতে পারে। মিথ্যে বলব না, গা-ছমছম জঙ্গলে ঢুকে একটু একটু ভয়ও পাচ্ছে। যতই হোক প্রথম দিন তো! তাই আমি আর অবাধ্যের মতো বেশি হুটোপাটি না করে, শান্তশিষ্টের মতো ঝোপঝাড়ের আড়াল ডিঙিয়ে ঠাকমার সঙ্গে শিকার খুঁজতে লাগলুম।

একটা নির্জন জায়গার কাছে এসে ঠাকমা দাঁড়াল। আমায় ইশারা করল, আমিও দাঁড়িয়ে পড়লুম। আমি ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করলুম, 'দাঁড়ালে কেন?'

ঠাকমা চাপা-গলায় বলল, 'এখানে চুপটি করে বসে থাক!'

আমি গলার স্বর আরও নীচু করে, ঠাকমার গায়ে গা ঘেঁষিয়ে জিজ্ঞেস করলুম, 'বসব কেন?'

ঠাকমা উত্তর দিল, 'এক্ষুনি শিকার আসবে।'

কথাটা শুনে আমার চোখ দুটো যদিও তক্ষুনি চনমন করে চমকে সামনে তাকিয়েছিল, কিন্তু শিকারের কোনো লক্ষণই দেখা গেল না। কে জানে, ঠাকমা কেমন করে বুঝল শিকার আসবে! সে যাই হোক, ঠাকমার কথা শুনে আমি বসে পড়লুম ঝোপের মধ্যে। ঠাকমাও উপুড় হয়ে আমার পাশে বসে পড়ল।

বুনো-গাছের ডালপালা দিয়ে এ-জায়গাটা এমন ঘেরা যে, শত চেষ্টা করেও কেউ আমাদের দেখতে পাবে না। কিন্তু আমরা ঝোপের মধ্যে দিয়ে উঁকিঝুঁকি মেরে সব ঠাওর করতে পারছি। আমার সামনে একটা নালা। নালাটা দিয়ে তিরতির করে জল বয়ে যাচ্ছে। দূর থেকে মনে হচ্ছে, দু-একটা মাছও জলে ভাসছে। আমার মাথার ওপর একটা মস্ত বড়ো ঝাঁকড়া-গাছ। কী গাছ, জানি না। ওপর দিকে চাইতেই দেখি, একটা গিরগিটি গাল ফুলিয়ে আমার দিকে চেয়ে আছে। আমার দিকে চেয়ে হঠাৎ টকাস টকাস করে এমন ডেকে উঠল, মনে হল আমায় যেন ভ্যাংচাচ্ছে! ভেতরে ভেতরে আমার ভীষণ রাগ হয়ে গেল! কিন্তু রাগ দেখিয়ে তো কোনো লাভ নেই। কেননা, গিরগিটি ধরা আমার সাধ্যি নয়। ধরতে গেলেই ভড়কি দিয়ে কোন ফোকরে যে সেঁধিয়ে পড়বে, দেখতেই পাব না। তার চেয়ে ওকে ডাকতে দাও। ডাকতে ডাকতে মুখ ব্যথা হয়ে গেলে আপনিই চুপ মেরে যাবে।

এই দেখো, ঠাকমা ফুস! ঘুমিয়ে পড়েছে। বয়েস হয়ে গেলে এই এক জ্বালা। একটু ঠান্ডা-জিরোন জায়গা পেলেই গা এলিয়ে নাক ডাকাবে। থাক, ঘুমুক। ঠাকমাকে দেখে বড্ড দুঃখ হয়। ছেলে-বউ সব ছিল। সবাইকে হারিয়ে মনের মধ্যে দুঃখু নিয়ে বেঁচে আছে। এখন বড্ড একা। বুড়ো বয়েসে অমন দু-দুটো আঘাত পেয়ে আরও বুড়িয়ে গেছে ঠাকমা। আমিই এক ভরসা, এই যা।

যেন কী একটা নড়ে উঠল! চকিতে আমার চোখ দুটো সামনে চেয়ে স্থির হয়ে গেল। একটা হনুমান। মাটির ওপর তিড়িং তিড়িং লাফ মেরে ছুটছে। ছুটতে ছুটতে নালাটার সামনে এসে মুখ ঠেকিয়ে জল খাচ্ছে। আমার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। আমিও নিঃসাড়ে ঝোপের জঙ্গল ঠেলে বেরিয়ে এলুম। এখান থেকে দুটো লাফ মারলেই আমি হনুমানটার ঘাড়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারি। আর তর সইল না। আমি মারলুম লাফ। কিন্তু সব গড়বড় হয়ে গেল। আমি নিশানা ঠিক করতে পারিনি, না, হনুমানটা বুঝতে পেরে একটু সরে গেল, তা আমি জানি না। তাই আমি হনুমানটার ঘাড়ে না পড়ে সিধে ওই নালাটার জলের ভেতর ঝপাং করে হুমড়ি খেয়ে পড়লুম। ততক্ষণে হনুমানটা এক লাফে গাছের ওপর। গাছের ওপর উঠে, এমন বিচ্ছিরি ক্যাঁচ-ম্যাঁচ করে চিৎকার শুরু করে দিল যে, আমি বুঝতে পারলুম না, সে আমার এই দুর্দশা দেখে ঠাট্টা করে হাসছে, না ভয় পেয়েছে। আমি হুড়মুড়িয়ে জল থেকে উঠে পড়েছি। উঠে দেখি, হনুমানের হল্লা শুনে ঠাকমাও ছুটে এসেছে! আমার কাণ্ডকারখানা দেখে ঠাকমা আমায় একটুও বকাবকি করল না। উলটে যে-গাছটায় হনুমানটা লাফিয়ে লাফিয়ে চিৎকার করছিল, সেই গাছের দিকে লাফ মারল। ধরা শক্ত। কারণ, অত ওপরে লাফ মেরে কি ওঠা যায়! গাছে ওঠবার জন্যেই যে ঠাকমা লাফ দিচ্ছিল, তা নয়। যতদূর মনে হচ্ছে, ওকে ভয় দেখাবার জন্যে। ঠাকমার মাথার মধ্যে কী ছিল আমি জানি না। কিন্তু ঠাকমাকে লাফাতে দেখে হনুমানটা যে ভীষণ ভয় পেয়েছে, সেটা আমি ঠিক বুঝতে পেরেছি। ঠাকমা শেষবার যখন গলায় বিকট গর্জন করে লাফ মারল, আমি তাজ্জব বনে গেলুম দেখে, হনুমানটা গাছ ফসকে ধপাস করে মাটিতে পড়ে গেল! আর দেখতে নেই, আমি ঝড়ের মতো লাফিয়ে উঠে হনুমানের ঘাড়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছি। ওঃ! আনন্দে আমার শরীর-মন শিউরে উঠেছে! আমার জীবনে আমি সর্বপ্রথম নিজের মুখে শিকার ধরলুম। যদিও হনুমান, শিকার তো!

তারপরও দু-চারবার আমি ঠাকমার সঙ্গেই শিকারে গেছি। ক্রমে একটু একটু করে আমার সাহস বাড়তে লাগল। তারপর আমি একদিন একাই শিকার ধরে আনলুম।

একা-একা শিকার ধরতে এখন আমার কোনো ভয়ই হয় না। যতই একা-একা শিকার ধরছি, ততই সাহসে আমার বুকটা ফুলে ফুলে উঠছে। মনে হচ্ছে আমার সামনে এখন কে দাঁড়াবে! এই জঙ্গলটা এখন আমার কথায় উঠবে বসবে। এখন আমি এই জঙ্গলের রাজা। আমার সামনে সব মুড়ি-মুড়কি!

আমার ঠাকমা ধীরে ধীরে বয়েসের ভারে নুয়ে পড়ছে। ঠাকমা এখন আর তেমন খাটতে পারে না। তেমন লাফাতে পারে না। সারাদিন ঘুমের ঘোরে ঢুলুনি দেবে। ভারি কষ্ট লাগে। আমি নিজেও আর চাই না, ঠাকমা আমার জন্যে কষ্ট করুক। এখন তো আমি ছোট্টটি নই যে, সব সময় পায়ে পায়ে ঘুরঘুর করব! কিংবা ঠাকমার কোলে বসে আদর খাব! আমি চাই, ঠাকমা এখন চুপচাপ শুয়ে থাকুক। যে ঠাকমা একদিন শিকার ধরে এনে আমায় খাওয়াত, আজ সেই ঠাকমাকে আমি শিকার ধরে এনে খাওয়াই। আমার যে কী আনন্দ লাগে! আমার বাবা-মা আমার জন্যে কতটুকু করতে পেরেছে! কিছু করার আগেই তো তারা হারিয়ে গেল। যা কিছু করেছে সে তো আমার ঠাকমাই। তাই ঠাকমার জন্যে কিছু করতে পারলে আনন্দ হবে না?

একদিন ঠাকমা আমায় বলল, 'এখন তো আমি বুড়ো হয়ে গেলুম। আমি তো এবার মরব। আমি মরে গেলে তুই একা থাকতে পারবি তো?'

আমি উত্তর দিয়েছিলুম, 'তুমি মরবে কী ঠাকমা! আমি তোমায় মরতে দেব না। আমি যতদিন বাঁচব, তোমায় ততদিন বাঁচিয়ে রাখব।'

ঠাকমা বলেছিল, 'তোর তো এখন উঠতি বয়েস, তাই বয়েস বাড়লে বেঁচে থাকার যে কী জ্বালা, তুই তা বুঝবি না।'

ঠাকমার কথা শুনে আমার মনটা কেমন যেন খারাপ হয়ে গেল। ঠাকমাকে জিজ্ঞেস করলুম, 'তোমার জ্বালা কীসের ঠাকমা? আমি কি তোমায় কষ্ট দিচ্ছি?'

ঠাকমা উত্তর দিল, 'না রে। এতদিন তোকে নিয়ে আমার বুক ভরে ছিল। তোকে চোখে চোখে রাখতুম, খাওয়াতুম, সাধ-আহ্লাদ করতুম। তাতে যে আমার কী আনন্দ ছিল, সে-কথা তোকে আমি বোঝাতে পারব না। আজ তুই বড়ো হয়েছিস। নিজে নিজে সব পারিস। আমার কাজ শেষ হয়ে গেছে। আমার দিনও শেষ হয়ে এসেছে। তাই দিন-রাত তোর মুখের দিকে চেয়ে বসে থাকি।'

আমি বললুম, 'ঠাকমা, একদিন যে আমিও তোমার মুখের দিকে চেয়ে বসে থাকতুম?'

ঠাকমা উত্তর দিল, 'দুটোর মধ্যে তফাৎ আছে রে, বাছা।'

'কী তফাৎ ঠাকমা?'

ঠাকমা বলল, 'আমি কষ্ট করেছি তোকে বড়ো করে তোলবার জন্যে। আর তুই কষ্ট করছিস যার জন্যে, সে তো আর বেশিদিন বাঁচবে না। এখন আর আমার দাম কী বল? আমার জন্যে তোর কষ্ট করে লাভ কী?'

আমি বললুম, 'একী কথা বলছ ঠাকমা? তুমি না থাকলে আমায় এত আদর-যত্নে কে বড়ো করে তুলত? তোমার জন্যে কষ্ট করতে আমার ভালো লাগে।'

আমার কথা শুনে ঠাকমার চোখ দুটো কেমন ছলছল করে উঠেছিল। আমার মনের ভেতরটাও কেমন দুঃখে ভার হয়ে গেছিল।

আমাদের এখানে একপাল হাতি এসেছে। খবর পেয়েছি, পালে কটা হাতির বাচ্চাও আছে। নিজেদের চেহারাগুলো অমনি বিরাট বিরাট বলে, হাতিগুলো যেন কারোর তোয়াক্কাই করে না। ওদের দাপটে সবাই জুজু। খবরটা কানে আসা অবধি আমার পা থেকে মাথা অবধি রাগে জ্বলছে। আস্পর্ধা তো কম নয়! আমি থাকতে হাতির দল বনে দেমাক দেখিয়ে ঘুরে বেড়াবে আর আমাকে তা সহ্য করতে হবে। সুতরাং আমি মনে মনে ঠিক করলুম, হাতিগুলোকে শায়েস্তা করতে হবে।

কথাটা বলা সহজ, কিন্তু করাটা সহজ নয়। কারণ, গায়ের জোরে হাতিও কম যায় না। তবে হাতির চেহারাটা যেমন গদাই-লস্করের মতো, বুদ্ধিটাও যদি তেমনি হত, তাহলে রক্ষে ছিল না। কিন্তু এ কথাও বলি না, ওদের বুদ্ধি একেবারে নেই। এমন বুদ্ধি, দল বেঁধে যখন হাঁটবে, তখন বাচ্চাগুলোকে মাঝখানে আগলে নিয়ে হাঁটবে। মতলবটা হচ্ছে, বাচ্চাকে বাঘে না ছোঁ মেরে নিয়ে পালায়। সত্যি কথা বলতে, একটা পুরুষ্ট হাতিকে পিঠে নিয়ে পালাবার ক্ষমতা বাঘের নেই। তবে চেষ্টা করলে একটা বাচ্চাকে পিঠে ফেলে পালানো যায়।

আমায় অবশ্য ঠাকমা বলেছিল, 'হাতির সঙ্গে কখনো একা লাগতে যাস নে। ওদের গায়ে ভীষণ জোর। একবার যদি শুঁড় দিয়ে ধরে ফেলে তাহলে নির্ঘাত পায়ে টিপে মেরে ফেলবে।'

অতই সোজা! আমাকে শুঁড়ে ধরে টিপে মারবে! আমি বাঘের ব্যাটা! তাই আমি যখন প্রথম ওদের নজর করি, তখন ইচ্ছে করেই গা ঢাকা দিয়ে, একটা ঝোপের মধ্যে ঘাপটি মেরে বসে ওদের কাণ্ডকারখানা লক্ষ করছিলুম। মনের সুখে যত পারে করে নিক নাচন-কোঁদন। একটু পরেই তো বাছাদের ভবলীলা সাঙ্গ হবে। আমার ধান্ধা ছিল, ওরা একটু অন্যমনস্ক হলে প্রথমেই একটা বাচ্চার পিঠে লাফিয়ে পড়ব! কিন্তু তারপরেই কথাটা ভালো করে ভেবে দেখতেই, নিজেকে এমন ছোটো বলে মনে হল। ছিঃ! ছিঃ! বাঘের মনে এ-রকম কাপুরুষের মতো ভাবনা! আমার বাবা না বনের রাজা ছিল, আমি না তার ছেলে! না, না, চোরের মতো নয়। লড়তে যদি হয়, মরদের মতো সামনাসামনি লড়ব। বাচ্চা মেরে হাতে গন্ধ করার মধ্যে কোনোই বাহাদুরি নেই!

বাহাদুরি তো নেই, কিন্তু এদিকে ওদের দেখে তো এই বাহাদুর বাঘের চক্ষু স্থির। লড়াই করব কী! ওরা এমনভাবে দল বেঁধে আছে, লড়াই তো দূরের কথা, কাছেই ঘেঁষা যাবে না। হ্যাঁ, হতে পারে, আচমকা যদি একটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারি। তাতেও এক বিপদ। কারণ, একটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল, আর দশটা একসঙ্গে তেড়ে আসবে। তখন সাংঘাতিক বিপদ। তাই ভাবলুম, দলটাকে তছনছ করে দিই। এই ভেবে, আমি ঝোপের আড়াল থেকে ভয়ংকর হুংকার ছাড়লুম। কিন্তু বলব কী, আমার হুংকার শুনে ওই হাতির পাল এতটুকু ভয় পেল না, ছুটেও পালাল না। উলটে দাঁড়িয়ে পড়ল। আর শুঁড় উঁচিয়ে ডাক ছাড়ল। যেন বলতে চাইল, 'আয় একবার দেখি!'

বুদ্ধিমানের কাজ হচ্ছে এখন হুট করে এখন থেকে বেরিয়ে না পড়া। আমি আবার প্রচণ্ড গর্জন করে উঠলুম। ওই হাতির পালের যেটা সর্দার ছিল, সে ঘুরে দাঁড়াল। কুঁতকুঁতে চোখ দুটো এদিক-ওদিক ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আমাকে খুঁজতে লাগল। তারপর ক-পা এগিয়ে এল। মজা কী, সর্দার এগিয়ে এল বটে, কিন্তু সর্দারের সঙ্গে আর কেউ এল না। আর সকলে বাচ্চা আর বাচ্চার মায়েদের আগলে দাঁড়িয়ে রইল। আমি মনে মনে চাইছি সর্দার আরও একটু এগিয়ে আসুক। ওর চলার বহর আর হাবভাব দেখে বেশ বুঝতে পারছি, আমি কোথায় লুকিয়ে আছি, ও তার হদিশই করতে পারছে না। তাই আলটপকা ও যখন আমার প্রায় কাছাকাছি চলে এসেছে, আমি মেরেছি লাফ। একেবারে সর্দার হাতিটার সামনে। আমায় দেখতে পাবার সঙ্গে সঙ্গে এতটুকু ভড়কে গেল না হাতিটা। ওই বিরাট দেহটা নিয়ে হাতি আমার দিকে তিরের মতো তেড়ে এল। তার গলা দিয়ে বিকট চিৎকার বেরিয়ে আসছে। আমিও গর্জে উঠলুম। বন কেঁপে উঠল। আমি লাফিয়ে ক-পা পিছিয়ে আসতেই, হাতিটা ঝোপ-জঙ্গল মাড়িয়ে-পিষে আমার দিকে গোঁৎ মারল। আমি হাতির পেছন দিকে লাফ মেরে পালালুম। হাতিটা চোখের নিমেষে গা ছলকে দেহটাকে ঘুরিয়ে নিয়ে আমার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পড়ল। ভেবেছিলুম, এই পেছন দিক থেকে সর্দার হাতির পিঠের ওপর লাফিয়ে পড়ব। কিন্তু একদম বেআক্কেলের মতো কাণ্ড করে বসেছি। অর্থাৎ লাফ মেরে ভুল করেছি। হঠাৎ দেখি, হাতির দু-নম্বর সর্দারটা কোত্থেকে ছুটে এসে একেবারে আমার সামনে। আমার মনে হল, ওরা আমায় ঘিরে ফেলছে। এখন যদি আর দুটো হাতি ছুটে এসে ডাইনে-বাঁয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে, তাহলে তো নির্ঘাত মরণ! কিন্তু আমি বাঘ। আমার ভয় পেলে তো চলবে না। মুখখানা বিচ্ছিরিরকম খিঁকিয়ে উঠে, এক ধমক মেরেছি আমি দু-নম্বর সর্দারকে। নম্বর যখন দুই, তখন বুঝতেই পারছ বয়েস কম। একটু বেশি দুর্দান্ত। আমার ধমক ও গ্রাহ্যি করবে কেন? আমার দিকে গোঁৎ গোঁৎ করে তেড়ে এল। মুখের শুঁড়টা লকলক করে উঠছে-নামছে। দাঁত দুটো সাদা ঝকঝকে ছুঁচোলো। একবার পেটে ঘুঁষিয়ে দিলেই শেষ। আমি আগুপিছু কিচ্ছু না-ভেবে দু-নম্বর সর্দারের মাথার ওপর মেরেছি এক লাফ। ডান কানটা খাবলে নিয়ে, মাথায় দিয়েছি টেনে থাবার এক ঝটকা। আমি দেখতে পেলুম দু-নম্বর সর্দারের মাথাটা ফেটে গলগল করে রক্ত বেরিয়ে এল। আমিও বন কাঁপিয়ে হাঁক দিচ্ছি, হাতিও চিল্লাচ্ছে। শুঁড়টা দিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরবার জন্যে আঁকপাঁক করছে। আমি জানতুম, আর একবার যদি ওর মাথার খুলির ওপর আর একটা থাবা মারতে পারি, তবে হাতির কম্ম শেষ। কিন্তু সর্দার হাতিটা আমায় তা করতে দিল না। নিমেষের মধ্যে ছুটে এসেছে। বিদ্যুৎ চমকে ওঠার মতো আচমকা শুঁড় দিয়ে খপাত করে আমায় চেপে ধরেছে। আমি বুঝে নিলুম এবার আমার শেষ। কী প্রচণ্ড শক্তি এই শুঁড়টার। আমায় যখন টিপে ধরল, মনে হল, আমার বুকের পাঁজরাগুলো মড়মড় করে গুঁড়িয়ে বুঝি শেষ হয়ে গেল। কিন্তু আমারও শক্তি বা কীসে কম! যখন সর্দার হাতিটা শুঁড় দিয়ে চেপে ধরে আমায় নীচে নামাচ্ছে আমায় পা দিয়ে টিপে মারবে বলে, সে তখন জানত না, তার শুঁড়টাকে আমি কামড়ে ধরবার চেষ্টা করছি। ও যদি আমার গলাটা শুঁড় দিয়ে চেপে ধরত, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে আমি দম ফেটে মরতুম। কিন্তু হুড়োমুড়িতে সে আমার বুক আর পিঠটা জড়িয়ে ধরেছে। আমার মুখের নাগালে আমি ওর শুঁড়টা পেয়ে গেছি। আমার দাঁতে যত জোর ছিল, সব জোর দিয়ে দিয়েছি কামড়ে। আমি জানি না, আমার কামড়ের জোরে ওর শুঁড়টা ছিঁড়ে পড়ে গেল কি না। কিন্তু সর্দারটা প্রচণ্ড চিৎকার করে আমায় ছেড়ে দিল। আমি আর সেখানে দাঁড়ালুম না। বুকের প্রচণ্ড যন্ত্রণায় নিয়ে আমি লাফ দিলুম। তারপর আর কিছু জানি না। গভীর জঙ্গলের মধ্যে যন্ত্রণা ছটফটিয়ে কাতরাতে লাগলুম। ঠাকমার কাছে যখন ফিরলুম, দেখলুম তখনও ঠাকমা ঘুমোয়নি। আমার জন্যে বসে আছে। আমি কাতরাতে কাতরাতে ঠাকমার কোলের কাছে গিয়ে শুয়ে পড়লুম। ঠাকমা ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল, 'কী হয়েছে রে?'

আমি কুঁতিয়ে কুঁতিয়ে উত্তর দিলুম, 'হাতির সঙ্গে লড়াই।'

ক-দিন পরে শরীরটা যখন আবার চাঙ্গা হয়ে উঠল, যখন মনে হল, নতুন করে হাতির সঙ্গে আমি আবার লড়াই করতে পারি, তখন আমি আবার বনের রাজার মতো গর্জন করতে করতে বন কাঁপিয়ে ঘুরে বেড়াতে লাগলুম। কিন্তু হাতির সঙ্গে লড়াই করার পর ব্যাপারটা চারিদিকে যে হাওয়ার মতো ছড়িয়ে পড়েছে, এ-কথা আমি জানতেই পারিনি। এমনকী মানুষের কানেও পৌঁছে গেছে। আর সেই নিয়ে মানুষের কাছে এটা একটা মস্ত খবর। বনে-জঙ্গলে বাঘের সঙ্গে হাতির লড়াই হবে, এ আর এমনকী নতুন কথা! বাঘ, সিংগি, গন্ডার নানান জন্তুর সঙ্গে খুটখাট হামেশাই লেগে আছে। আর এইটাই তো জঙ্গলের জীবন। তা না হলে তো জন্তুরা জঙ্গল ছেড়ে কেতাদুরস্ত ভদ্রলোকের মতো ঘোড়ার গাড়ি চেপে শহর ঘুরতে বেরোত!

খবরটা মানুষের কানে পৌঁছোবার পর থেকে তারা যে আমার পিছু নিয়েছে, আমায় খুঁজে বার করবার চেষ্টা করছে, এ-কথা আমি আর কেমন করে জানব? কারণ, আমি তো থাকি জঙ্গলে। ওরা ভেতরে ভেতরে গুজগুজ করে কী শলা-পরামর্শ করছে, আমার কানে তো সেই খবর পৌঁছে দেবার কেউ নেই। আমাকে না-দেখেই তারা ভাবছে, আমি একটা দুর্দান্ত বাঘ। তারা হয়তো ভয় পাচ্ছে, এ-বাঘটা হাতির সঙ্গে যখন লড়াই করেছে, তখন হুট করে কোনোদিন না কোনোদিন মানুষ-পাড়ায় এসে মানুষেরও তো ক্ষতি করতে পারে!

সত্যি বলছি, মানুষের কোনো ক্ষতি করব, এ ভাবনা আমার মাথায় এতদিন পর্যন্ত একদম ঢোকেনি। তবে বড়ো হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে আমার মা আর বাবার দুর্দশার কথা মাঝে মাঝে আমার মনটাকে ভীষণ দুঃখে ভরিয়ে তুলত। তখন মনে হত, মানুষকে পাইতো ছিঁড়ে খাই। কিন্তু তখনও পর্যন্ত মানুষকে ছিঁড়ে খাওয়ার কোনো সুযোগ আসেনি। আর আসবে কি না তাও জানি না।

আজ আমার ভাগ্যটা ভালো বলতে হবে। কেননা, দিনদুপুরে হঠাৎ একটা শিকার মিলে গেল। বেশ বড়োসড়ো একটা বুনো-শুয়োর। আপাতত আমার পেটে জায়গা নেই। একদম খিদে পাচ্ছে না। তাই এখন এটাকে মুখে করে তুলে নিয়ে ওই ঝোপটার মধ্যে লুকিয়ে রাখাই ঠিক করলুম। ভাবলুম, সন্ধে নাগাদ যখন খিদে পাবে, তখন রসিয়ে খাওয়া যাবে। ঠাকমার জন্যে কাল একটা হরিণ শিকার করে দিয়েছি। সেটা খেয়ে শেষ করতে পারেনি। আজও চলে যাবে। আমি শুয়োরটাই খাব।

মুশকিল হচ্ছে কী, শিকার মেরে তুমি যদি বনের মধ্যে খোলামেলা ফেলে রেখে যাও, ভেবে থাকো পরে এসে খাবে, তাহলেই ভুল করে বসবে। কারণ, তুমি চোখের আড়াল হলেই, পাঁচ-ভূতে তোমার খাবার সাবড়িয়ে, তোমার জন্যে পেসাদ রেখে যাবে খটখটে হাড় ক-খানি। তাই আমি এটাকে একটা ঘুপচি-ঝোপে লুকিয়ে রেখে বড়ো বড়ো শুকনো-পাতা দিয়ে ঢেকে রেখে গেছলুম।

কিন্তু রাত্তিরে শিকারের কাছে ফিরে যে দৃশ্য দেখলুম, তাতে তো আমার চক্ষু ছানাবড়া। দেখি কী, একটি হৃষ্টপুষ্ট ভাল্লুক বেশ বহাল তবিয়তে আমার শিকার দিয়ে পেটপুজো করছে। আমি যে এসেছি, সেটি পর্যন্ত বাছাধন টের পাননি। আর যদি টের পেয়েও থাকেন, তাহলে বলব আমাকে সে গ্রাহ্যই করেনি। আমার মাথা গেল বিগড়ে। রেগেমেগে এমন হুংকার ছেড়েছি যে, বেচারা ভাল্লুকের পিলে বুঝি ফট হয়ে যায়! ও বাবা! ভাল্লুকটাও কম যায় না! আমার দাবড়ি খেলে পালাবে কোথায়, তা না, ডাক ছেড়ে রুখে দাঁড়াল। আচ্ছা একগুঁয়ে তো! তবে রে! তোর ভাল্লুকের নিকুচি করেছে! আমি ঝাঁপিয়ে পড়লুম ভাল্লুকের ঘাড়ে। ভাল্লুকটাও ছাড়বার পাত্র নয়। ঠ্যাং দিয়ে সে-ও আমাকে জড়িয়ে ধরেছে। তারপর যা লেগে যা ঝটাপটি! প্রচণ্ড লড়াই! ভাল্লুকও চেঁচায়, আমিও গর্জন করি। ধামসাধামসি, খামচাখামচি, মাটির ওপর গড়াগড়ি।

চিৎকার, গর্জন আর ধামসাধামসির আওয়াজটা এমন সাংঘাতিক হয়েছিল যে, সেই আওয়াজ আমার ঠাকমার কানেও পৌঁছে গেছে। বুড়ি ঠাকমা হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসেছে। সেদিন দেখলুম এই বয়েসেও ঠাকমার কী তেজ! ছুটে এসে, মুখে কোনো কথা না বলে ঠাকমাও ভাল্লুকটার ওপর লাফিয়ে পড়েছে। আমি বলব কী, ঠাকমা যেই লাফিয়েছে অমনি সঙ্গে সঙ্গে--

গুড়ুম, গুড়ুম

গাছের ওপর থেকে মানুষ ঠাকমাকে গুলি করেছে। আওয়াজের সঙ্গে সঙ্গে অন্তত দশ হাত দূরে আমার ঠাকমা ছিটকে পড়ল। ঠাকমার বুকে গুলি বিঁধেছে! আমি একদম হতভম্ব! কী করব, না করব সেই বুদ্ধিটুকু মাথায় আসতে না আসতেই আবার আওয়াজ--

গুড়ুম

কী হল জানি না। শুধু মনে হল, আমার গায়ের ওপর কে যেন আগুনের গোলা ছুড়ে মারল। আমি ছিটকে গেলুম। প্রচণ্ড গর্জন করে, লাফ মেরে পালাতে গিয়ে ভীষণ জোরে একটা গাছের সঙ্গে ধাক্কা খেলুম। পড়ে গেছি। সঙ্গে সঙ্গে আবার উঠেছি। আবার গুলির শব্দ--

গুড়ুম

আমাকেই তাক করে মেরেছে। এবার তাক ফসকে গেল। লাগেনি। লাগল গিয়ে গাছের গায়ে। সেই তক্কে ওখান থেকে আর একটা লাফ মেরে আমি ছুট দিলুম। অন্ধকার রাত্তির তাই রক্ষে!

ছুটতে ছুটতে আমার মনে হচ্ছে, হয়তো এখনকার মতো আমি বেঁচে আছি। কিন্তু পরে কী হবে, জানি না। কী প্রচণ্ড যন্ত্রণা হচ্ছে আমার পিঠে। বুঝতে পারছি, গুলিটা পিঠেই এসে লেগেছে। গলগল করে রক্ত বেরোচ্ছে পিঠ দিয়ে। গুলি আমার পিঠে লাগল বলে আমি এখনও ছুটতে পারছি। কিন্তু গুলি ঠাকমার বুকে বিঁধল, তাই ঠাকমা আর উঠতে পারল না। ছিঃ! ছিঃ! শেষ বয়েসে ঠাকমাকেও মানুষের হাতে মরতে হল!

আমার এতো ভয় করছে! মনে হল আর একটু পরে আমিও হয়তো মরে যাব! আমি আর ছুটতে পারছি না। আমার দেহটা কীরকম টলমল করছে। একটু দাঁড়ানো যায় না? দাঁড়ালেই যদি আবার গুলি করে দেয়! না, তাই টলতে টলতেও আমি ছুটতে লাগলুম।

মনে হল অনেকটা পথ বন ডিঙিয়ে পালিয়ে এসেছি। এবার বোধ হয় দাঁড়ানো যায়। সামনে একটা খাবলা-কাটা খাদ। তার ভেতর ঝটপট লুকিয়ে পড়লুম। জায়গাটা বেশ ঘুপচি। এখানে লুকিয়ে থাকলে আমায় নিশ্চয়ই কেউ খুঁজে পাবে না। যদিও মনে হচ্ছিল অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছি, কিন্তু কতটা যে পথ এসেছি, সেটা ভেবে বার করার মতো বুদ্ধি তখন আমার ছিল না। কারণ, উত্তর-দক্ষিণ, পূর্ব-পশ্চিম কোনদিকের পথ ধরে এ যে কোথায় এলুম, এই অন্ধকার রাতে তা ঠাওর করার অবস্থাও আমার একদম ছিল না। পিঠের অসহ্য যন্ত্রণায় সারা শরীরটা তখন থরথর করে কেঁপে কেঁপে উঠছে। কী ভীষণ জ্বালা। আমি ওই খাদটার মধ্যেই লুটিয়ে পড়লুম। তারপর কখনো চিত হয়ে, কখনো উপুড় হয়ে খাদের মধ্যে গড়াগড়ি খেয়ে কাতরাতে লাগলুম।

কতক্ষণ এমনি করেছি আমার মনে নেই। মনে নেই যন্ত্রণাটা আমার বাড়ছিল না কমছিল। কিন্তু আমি হঠাৎ শুনতে পেলুম, একটা যেন কীসের শব্দ, এই নির্জন বনে টুং টুং করতে করতে আমার কানে এসে বাজছে! আমি চমকে উঠলুম। আমি এতদিন বনজঙ্গলে বাস করছি, এ-রকম অদ্ভুত শব্দ আর কোনোদিন শুনিনি। কেমন যেন ভালো লাগছিল। ঠিক এই সময়ে আমি বুঝতে পারছিলুম না, পিঠের এই যন্ত্রণাটা আমায় বেশি জ্বালা দিচ্ছে, না ওই শব্দটা আমার মনকে বেশি খুশি করে তুলছে।

আমি গড়াগড়ি খেতে খেতে উঠে বসলুম। কান দুটো খাড়া করে শুনতে লাগলুম। আমি এখন স্পষ্ট বুঝতে পারছি, সেই অন্ধকার বনের গাছপাতার ফাঁক দিয়ে, ঝোপঝাড় ডিঙিয়ে ডিঙিয়ে সেই টুং টুং শব্দটা ভেসে ভেসে আমার কানে এসে বেজে উঠছে। হঠাৎ গুলি-খাওয়া যন্ত্রণাটা এত কম বলে মনে হচ্ছে কেন! আমি নিজেই আশ্চর্য হয়ে গেলুম। এতক্ষণ যে যন্ত্রণার জ্বালায় আমি ছটফটিয়ে মরছিলুম, সেটা যে হঠাৎ এমন চট করে কমে যাবে, এ তো ভাবাই যায় না। পিঠের রক্তটা পেট দিয়ে চুঁইয়ে চুঁইয়ে গড়াচ্ছে। আমি চেটে-চুটে পরিষ্কার করে ফেলছি। একটু আগেও আমার মনে হয়েছিল, আমি বাঁচব না। এখন যেন সে ভয়টাও আমার কেটে যাচ্ছে। কেননা, আমি বেশ বুঝতে পারছি, বন্দুকের গুলি আমার পিঠে ঢোকেনি। শুধু পিঠের ওপর ঠোক্কর মেরেছে। পিঠ ছুঁয়ে বাইরে ফসকে উড়ে গেছে। তাই আমি এখনও বেঁচে আছি। পিঠ ফুঁড়ে পেটে ঢুকলে এতক্ষণ আর আমার ট্যাঁ-ফুঁ করতে হত না। যাক, এখন আমি সত্যিই মরছি না।

আমি মরতুম, নিশ্চয়ই, যদি ঠাকমা না থাকত! বুড়ি ঠাকমা আমাকে বাঁচাতে এসে নিজেই প্রাণ দিল। সেই গাবদা-গাবুস ভাল্লুকটার যে কী হল, তা দেখার আর সুযোগ হল না। সেটাও হয়তো অক্কা পেয়েছে।

একদিন ঠাকমা বলেছিল, 'আমি তো বুড়ি হয়েছি। আমার আর দাম কী বলো?' কথাটা যে কত মিথ্যে, ঠাকমা আমায় বাঁচাতে এসে সেটাই প্রমাণ করে গেল। আজ আমি স্পষ্ট বুঝেছি, ছোটো থাকো কিংবা বুড়ো হও, যতদিন বেঁচে থাকবে, জীবনের দাম কোনোদিনই কমবে না।

ঠাকমার শেষ অবধি যে কী হল কে জানে! ওখানেই ছিটকে পড়ে রইল, না মানুষ তাকে বয়ে নিয়ে গেল নিজেদের আস্তানায়, জানি না! ঠাকমার ছালটা গা থেকে খুলে নিয়ে হয়তো নিজেদের ঘরে সাজিয়ে রাখবে। কী নিষ্ঠুর! আজই প্রথম, আমার জ্ঞানে আমি ঠাকমার কাছ থেকে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেলুম। চিরদিনের মতো। আর আমি ঠাকমাকে কোনোদিনই দেখতে পাব না।

সত্যিই, বনের এদিকটা আমার এক্কেবারে অচেনা। এদিকে কোনোদিন এসেছি বলে আমার মনেই হচ্ছে না। আমি বাঘ। এরকম একটা বেপট জায়গায় কতক্ষণ লুকিয়ে থাকা যায়! কেউ না কেউ দেখে ফেলতে পারে। তখন আবার আর এক ঝামেলা। এক বিপদ থেকে আর এক বিপদ! সুতরাং যা হোক করে ঘরের ছেলে ঘরে ফিরতে হবে। কিন্তু এখনই যদি তুমি আমার মুখখানা দেখতে পেতে, তাহলে তোমার বুঝতে এতটুকু কষ্ট হত না, ঘর যে আমার কোনদিকে তা আমি একদম ভুলে গেছি।

ভুলে গেছি ঠিক, তবু আমায় খুঁজে বার করতে তো হবে!

ঘরে ফিরলেও ঘরের ছেলেকে ছেলে বলে ডাকবার আর কেউ নেই। এখন আমি একা। সঙ্গীহীন। কী ভাগ্য আমাদের দেখো, একটা বংশের সক্কলে মানুষের কবলে পড়ে কেমন শেষ হয়ে গেল। এখন মনে হয়, ওই বন্দুক নামে গুলি ভরতি যন্ত্রটা যে বার করেছিল সে যতই বুদ্ধিমান হোক, তাকে আমি কোনোদিন ভালোবাসতে পারব না। এখন আমার ভাগ্যেই বা কী আছে, কে জানে!

ওই শোন সেই টুং টুং শব্দটা একটানা বেজে চলেছে। আঃ! ভারি মিষ্টি! কিন্তু কীসের শব্দ ওটা? আর কোথা থেকেই বা আসছে, এখান থেকে তো বোঝাই মুশকিল। কেমন যেন মন চাইছে শব্দটার কাছে চলে যেতে। কিন্তু আবার যদি কোনো বিপদ হয়!

আমি উঠে দাঁড়ালুম। গুটি গুটি পা-পা এগিয়ে চললুম। খুব সাবধানে ঘুরেফিরে দেখতে লাগলুম। তবু রক্ষে, জঙ্গলটা এখানেও এতটুকু হালকা নয়। সুতরাং লুকিয়ে-ছাপিয়ে চলতে ফিরতে খুব অসুবিধে নেই। আমি ওই শব্দটার দিকে কান স্থির রেখে এগিয়ে চললুম। ঝরে পড়া শুকনো শুকনো পাতার ওপর মাঝে মাঝে আমার পা যখন পড়ছে, তখনই কেমন খসখসানি আওয়াজটা আমায় থমকে থামিয়ে দিচ্ছে। থামছি, আবার আলতো পায়ের ডিঙি মেরে এগিয়ে চলছি। এখন মনে হচ্ছে ঠিক পথেই হাঁটছি। কেননা, শব্দটা আরও স্পষ্ট হয়ে আমার কানে ভেসে আসছে। মনে হচ্ছে, আর ক-পা হাঁটলেই নাগাল পেয়ে যাব।

সত্যিই নাগাল পেয়ে গেলুম। দৃশ্যটা দেখে আমি চমকে গেছি। হতভম্বের মতো থমকে দাঁড়িয়ে দেখি, ওই অন্ধকারে, ঘন জঙ্গলের একটা গাছের গোড়ায় চুপটি করে বসে বসে একটা ছোট্ট ছেলে হাত দিয়ে কী যেন বাজাচ্ছে! আর সেই বাজনাটা দিয়ে ওই মিষ্টি শব্দটা বেরিয়ে আসছে। আমি অবশ্য পরে জেনেছিলুম, ওই বাজনাটার নাম বেহালা। একটা মানুষকে এই সর্বপ্রথম চাক্ষুষ দেখেও, আশ্চর্য, আমার কিন্তু মনে হল না, ওর টুঁটিটা টিপে ওর কম্ম শেষ করে দিই! তার বদলে আমি অবাক হয়ে চেয়ে রইলুম আর থ হয়ে বেহালার সুর শুনতে লাগলুম! কিন্তু কে এই ছেলেটি একা, এই জঙ্গলে? আর একটু এগিয়ে যাই, আমার আর এমন সাহস হল না। কারণ, আমায় দেখতে পেয়ে ভয়েময়ে ছেলেটি যদি পালায়! তাহলে আমি তো আর ওই বাজনাটা শুনতে পাব না। তাই এখানেই হামাগুড়ি দিয়ে বসে পড়লুম। আর তার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে রইলুম।

তারপরেও অনেকক্ষণ বাজনা বাজল। অনেকক্ষণ ধরে আমি শুনলুম। ঠিক এই সময়ে কেন জানি আমার হঠাৎ মনে হল, আমিও যদি ওই বাজনাটা বাজাতে পারতুম! কিন্তু এমন চিন্তা আমার মগজে আসাই মিছে। বাঘ কখনো বাজনা বাজাতে পারে?

বাজাতে পারে না, কিন্তু শুনতে শুনতে বাঘ যে এমন মশগুল হয়ে যেতে পারে, তা জানা ছিল না। সত্যি, আমার তখন মনে হচ্ছিল, দিনের পর দিন যদি ওটা বেজে যায়, তাহলে দিনের পর দিন আমি চুপটি করে বসে বসে ওর সুর কান পেতে শুনে যাব!

মাঝে মাঝে গাছের ডালে এক-একটা পাখি হঠাৎ মিষ্টি সুরে ডেকে ওঠে। কিন্তু সে-ডাক আমায় এমন অবাক করে দেয় না। কারণ, ওরা তো ডাকেই। ডাকবেও। পাখির ডাক আমার কাছে কিছু নতুন বলে মনে হয় না। জন্ম থেকেই ওদের ডাক শুনে আসছি। আমার এতদিন জানা ছিল মানুষ খালি বন্দুক উঁচিয়ে আমাদের মারবার জন্যে গুলি চালায়। কিন্তু তারা যে এমন বাজনা বাজাতে পারে, সে-কথা তো আমায় কেউ বলে দেয়নি। আশ্চর্য, যে-হাত দিয়ে মানুষ ভয়ংকর অস্ত্র চালায়, সেই হাত দিয়েই আবার এমন সুর বেরোয়!

হঠাৎ চমকে উঠলুম। যে-শব্দটা এতক্ষণ একটানা বেজে যাচ্ছিল, সেটা আচমকা থেমে গেছে! কীরকম নিশ্চুপ হয়ে গেল চারিদিক। জমাট থমথমে। আমার চোখটাও থতমত খেয়ে সেই ছেলেটির দিকে তাকাল। দেখলুম, উঠে দাঁড়াচ্ছে। দাঁড়াতে কষ্ট হচ্ছে। পাছে আমায় দেখতে পায়, আমিও তাই চট করে আরও একটু আড়ালে সরে গেলুম। কানদুটোকে সজাগ রেখে, তার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলুম।

হঠাৎ ঠং করে কী যেন বেজে উঠল। এ তো বাজনার শব্দ নয়! দেখলুম ছেলেটি হাঁটছে। আবার বাজল ঠং। তারপর ঠং ঠং। দেখছি যতবারই পা পড়ছে ততবারই ঠং ঠং করে শব্দ বেজে উঠছে। আমার দৃষ্টি যতটা স্পষ্ট করা যায়, সে-চেষ্টার কসুর করলুম না। আমি দেখতে পেলুম, এতক্ষণ যেটা সে বাজাচ্ছিল, সেটা হাতে নিয়ে পা দুটো টেনে টেনে সে হাঁটছে। তার পায়ের দিকে চোখ পড়তেই দেখি, তার দুটি পা-ই বাঁধা। হাঁটতে পারছে না সে। তবু হাঁটছে। আর পায়ের বাঁধার শব্দটা ঠং ঠং করে বাজছে।

অমনি কষ্ট করেই খানিকটা এল সে। আমিও এক-পা এক-পা করে এগিয়ে এসেছি। দাঁড়াল সে। আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি যেখানে সে দাঁড়াল সেখানটায় একটা উঁচু মতো ঢিপি। সেই ঢিপিটার সামনে নুয়ে পড়ে মাথা ঠেকাল। তারপর নরম গলায় ফিসফিস করে বলল, 'মা, তুমি ঘুমিয়েছ মা? আর যে আমি পারছি না মা। আমার যে হাত ব্যথা করছে!' বলতে বলতে ছেলেটি ডুকরে ডুকরে কেঁদে ফেলল। কাঁদতে কাঁদতে সেই ঢিপিটার গা-ঘেঁষে, বাজনাটা মাথার কাছে রেখে, নিজেও শুয়ে পড়ল।

আমি তো ভেবেই পাচ্ছি না, ওখানে কোথায় ওর মা! আর থাকলেও অন্তত একবারও তো আমি দেখতে পেতুম। আমি উৎসুক দৃষ্টিতে চেয়ে রইলুম। ভাবলুম, শুয়ে থাকলে যদি ওর মা আসে! আমার ঠাকমাও তো কতদিন আমার ঘুম পেলে আমায় আদর করত! আর ওর মা করবে না?

বেশ কিছুক্ষণ বসে রইলুম। কিন্তু ওর মায়ের দেখা পেলুম না। না, ওর মা এল না। দেখলুম ছেলেটার চোখ দুটি বুজে গেছে। হাত দুটি কেমন নিস্তেজ হয়ে লুটিয়ে পড়েছে। নিশ্চয়ই ঘুমিয়ে পড়ল।

এখন কেন জানি আমার মনে হচ্ছে, অন্তত কিছুক্ষণের জন্যেও যদি আমি বাঘ না হয়ে মানুষ হতে পারতুম, শুধু একটিবারের জন্যে ওর মতো আমিও বাজনা বাজিয়ে ওকে খুশি করতে পারতুম, তাহলে কী ভালোই না হত! তখন আমি সাহস করে ওর সামনে যেতে পারতুম। ওর সঙ্গে একটু গল্প করতে পারতুম। চাই কি, ওর মতো আমিও বাজনা বাজিয়ে ওকে খুশি করতুম। তা তো হবার নয়। বাঘ মানুষ হতে পারে না। বাঘ সে বাঘই। কিন্তু বলিহারি যাই মাকে! এত করে ডাকল ছেলেটি, কাঁদল, তবু সাড়া দিল না।

আমি বুঝতে পারছি না, ওর পা দুটো এমন করে বাঁধা কেন! ও হাঁটছিল আর ঠং ঠং করে বাজছিল, ওটা কি দিয়ে বাঁধা? ঠাকমা বলেছিল, লোহার খাঁচায় শেকল বেঁধে বাবাকে ধরে নিয়ে গেছে মানুষ। তবে কি লোহার শেকল দিয়েই কেউ ওর পা দুটি বেঁধে দিয়েছে! একটি ছোট্ট ছেলে কী এমন দোষ করেছে যে, তার এই দুর্দশা! আমার মন কেমন-কেমন করছে! মনে হল, এক্ষুনি গিয়ে আমার থাবা দিয়ে ওই শেকলটা টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলি!

কিন্তু এখনই ওর সামনে যাওয়াটা ঠিক হবে না। কারণ, যতই হোক আমি বাঘ। আমায় দেখলে ভীষণ ভয় পেয়ে যেতে পারে। আর যাই হোক, অমন একটি ছোট্ট ছেলেকে আমি ভয় দেখাতে নারাজ। তাই এখানে চুপটি করে বসেই রইলুম।

এর মধ্যে যে কী একটা অদ্ভুত কাণ্ড ঘটে গেছে, তা তোমাদের বলাই হয়নি। ছেলেটিকে দেখে, সে-কথা বলতে ভুলেই গেছলুম। শুনলে খুশি হবে কি না জানি না। তবু বলছি, বন্দুকের গুলি-লাগা আমার পিঠের জ্বালা এখন একদম থেমে গেছে। আর একফোঁটাও রক্ত পড়ছে না। কী মজার ভেলকিবাজি! আনন্দে চার ঠ্যাং ছুড়ে বনবন করে ঘুরপাক খেতে ইচ্ছে করছে। থাক বাবা! ঘুরপাক খেতে গিয়ে শেষে ঘোর-পাকে পড়লে, তখন আর দেখবার কেউ থাকবে না।

ছেলেটি অঘোরে ঘুমিয়ে পড়েছে। খুব ইচ্ছে হচ্ছিল, এই সুযোগে ওর কাছে একবার যাই। ওর মুখখানি একটু ভালো করে চোখ মেলে দেখি। অন্তত ওর মায়ের মুখখানাও তো একবার দেখতে পারি! এ কেমন মা-বাবা, ছেলে ডাকলে সাড়া দেয় না!

আমি চারপাশটা খুব ভালো করে দেখে নিলুম। তারপর সত্যি-সত্যিই পা টিপে টিপে চোরের মতো এগিয়ে গেলুম। হুট করে একেবারে সামনে হাজির হওয়াটা ঠিক নয়। ওর মা দেখে ফেলতে পারে! কিংবা ছেলেটিরও ঘুম ভেঙে যেতে পারে! পেছনদিক দিয়ে গিয়ে, চুপি চুপি ওর মাথার কাছাকাছি এসে দাঁড়ালুম। ওর মাকে উঁকি মেরে খুঁজতে লাগলুম। আশ্চর্য! কই ওর মা? কাউকেই তো দেখতে পাচ্ছি না! যখন থেকে ছেলেটিকে দেখতে পেয়েছি, সেই তখন থেকে একটিবারের জন্যেও আমি চোখ ফেরাইনি। তাহলে বলো ওর মা আমার চোখকে ফাঁকি দিয়ে যাবে কোথায়? বাঘের চোখকে ঠকানো কি এতই সোজা!তাই খুব সাবধানেই আঁতিপাতি চোখ ফিরিয়ে উঁকিঝুঁকি মারলুম। ফোক্কা! ছেলেটির মাকে কাছে পিঠে দেখতে না পেয়ে তখন একটু সাহস করে ঘুমন্ত ছেলেটির মুখের কাছে গিয়ে দাঁড়ালুম। একদম কাছে, এত কাছ থেকে একটা মানুষের চেহারা এই সর্বপ্রথম আমি চোখ মেলে দেখছি। ছেলেটি যেন বড্ড ক্লান্ত। শত ছিন্ন একটা কাপড় পরে আছে। মাথার চুলগুলো এলোমেলো রুক্ষ। আর পায়ের লোহার শিকলটা ওর পায়ের তুলনায় অ-নে-ক--অনেক বড়ো। ছেলেটির বয়েস আমি বলতে পারব না। আমার নিজেরই বয়েস আমি জানি না। কিন্তু এটা বুঝতে কষ্ট হল না, ছেলেটির যত বয়েস তার চেয়ে আমি অনেক বড়ো। ছেলেটির গড়ন দেখে আমার বেশ মনে হল, এক সময়ে ছেলেটির স্বাস্থ্য ছিল সুন্দর। তুমি হয়তো জিজ্ঞেস করতে পার, 'সুন্দর স্বাস্থ্য বলতে তুমি কী বোঝ হে ছোকরা?' উত্তরে আমি শুধু বলতে পারি, তা জানি না। জানি শুধু ছেলেটিকে আমার ভালো লাগছে!

হঠাৎ ওর মাথার দিকে ওই বাজনাটার ওপর আমার নজর পড়ল। আমি আর একটু কাছে এগিয়ে গেলুম। ভালো করে এবার বাজনাটাই দেখতে লাগলুম। বললে তুমি বিশ্বাস করবে না, এই অন্ধকার রাত্তিরে হঠাৎ আমার মাথায় একটা আজগুবি চিন্তা গজিয়ে উঠেছে। আমার মন বলছে, আমিও তো বাজনাটা বাজাতে পারি! শুনে তুমি নিশ্চয়ই ভাবছ, আমার মতো গো-মুখখু এ-জগতে দুটি নেই। বাঘ আবার বাজনা বাজাবে কী! আমি গো-মুখখু কী অন্য কিছু, এ-সব ভাববার তখন আমার সময়ই হয়নি! তখন আমার কেবলই মনে হচ্ছিল, বাজালে কেমন হয়! হয়তো ভালোই হয়, কিন্তু বাজাব কেমন করে!

মুশকিল আমার হাজারটা। প্রথমত ছেলেটির মতো ওই বাজনাটা আমি ধরতেই পারব না। আমার তো থাবা। তারপর যদিও ধরা যায়, বাজাবো কী ঠ্যাং দিয়ে?

যা কপালে আছে! লাগে তাক, না লাগে তুক! আমি মুখ দিয়েই বাজনাটা তুলে নিলুম ঝট করে। ছুট্টে, একটু দূরে, একটা ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে পড়লুম! এইরে যা! সেই যে লম্বা ছড়িটা, যেটা দিয়ে টেনে টেনে বাজাচ্ছিল, সেটা যে আনতে ভুলে গেলুম! যাকগে, থাবার নখ দিয়েই বাজাই। দেখা যাক না!

সত্যিই, নখগুলো বাজনার ওই তারের ওপর বুলিয়ে দিতেই বেজে উঠল, টুং-টুং-টুং! বুকের ভেতরটা কেমন শিউরে উঠল। ওঃ! আমি তাহলে বাজাতে পেরেছি! আর একবার দেখি! আবার বেজেছে, টুং-টুং-টুং! কী মজার কাণ্ড! তবে তো দেখছি ব্যাপারটা খুব শক্ত নয়। শক্ত নিশ্চয়ই। কেননা, ওই ছেলেটি যেভাবে বাজাচ্ছিল, আমি তো সেরকম পারছি না। ওর হাতে কেমন একটা টানা-টানা সুর বেজে বেজে কেঁপে উঠছিল। আর আমি বাজাচ্ছি, কাটা কাটা টুং-টুং-টুং! বেজেই ফুরিয়ে যাচ্ছে। হাওয়ায় ভেসে বেড়াচ্ছে না। তবু কিন্তু বাজাতে ভালো লাগছে। আমি বাজাতে লাগলুম। একফাঁকে একবার উঁকি মেরে দেখে নিলুম ওদিকটা। না, না, ছেলেটি এখনও ঘুমুচ্ছে। তবে খুবসে বাজাই! ট্যাং-ট্যাং, টুং-টুং!

আমি একটা আস্ত গাধা। দ্যাখো, একটু সাবধান তো হওয়া উচিত। তা নয়, একেবারে জ্ঞান হারিয়ে বাজনা বাজাচ্ছি! একবার মনেও হল না, ছেলেটির ঘুম ভেঙে যেতে পারে!

পারে মানে কী? ঘুম তো ভেঙেই গেছে। ওর পায়ে-বাঁধা শেকলটার ঠং ঠং আওয়াজ ওই তো শোনা যাচ্ছে! এই রে! কী হবে এবার!

ঝট করে বাজনা থামিয়ে উঁকি মেরে দেখি, সত্যিই তো ছেলেটি এদিকেই আসছে। আর থাকে এখানে! বাজনা-টাজনা ফেলে দে চম্পট। মার এক বোম্বাই লাফ! জঙ্গল বলে রক্ষে। এদিক-ওদিক ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে পড়া সোজা। লুকিয়ে লুকিয়ে ঝোপের ভেতর থেকে একে-ওকে দেখাও খুব সোজা। আমিও ঝোপের ফাঁক দিয়ে দেখলুম, আমি যেখানে বাজনাটা ফেলে এসেছি, ছেলেটি ওই পায়ের শেকল টেনে সেইখানে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল। বাজনাটা হাতে তুলে নিল। তুলে নিয়ে কেমন ফ্যালফ্যাল করে এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখতে লাগল। আমি নিশ্চিত জানি, ওর পায়ে যদি ওই ভারি শেকলটা বাঁধা না থাকত, তবে ও এ-ঝোপ ও-ঝোপ ছুটে ছুটে ঠিক আমায় খুঁজে বার করত। এখুনি আমি যদি ওর নজরে পড়ে যাই, তাহলে কী কাণ্ডটা হয় বলো? হয় এক্ষুনি আমায় ডাক ছেড়ে পালাতে হবে, আর তা না হলে ওর ঘাড়ের ওপর লাফিয়ে পড়ে, ওকে আঁচড়ে-কামড়ে শেষ করে ফেলতে হবে!

আমার ভাগ্যটা খুব ভালো। দুটোর কোনোটাই করতে হল না। আমায় দেখতে পেল না ছেলেটি। দেখতে না পেয়ে, বাজনাটা হাতে নিয়ে আবার পায়ের শেকল টানতে টানতে হাঁটা দিলে। ওকে ওভাবে হাঁটতে দেখে, সত্যি বলছি, আমার নিজের ওপর এমন রাগ হল! মনে হল, ছ্যাঃ ছ্যাঃ, আমার জন্যেই তো ওর ঘুম ভেঙে গেল। আমার জন্যেই এমন কষ্ট করে ওকে মোটা শেকলটা টানতে টানতে এখানে উঠে আসতে হল!

আবার সেই নিজের জায়গায় গিয়ে বসল ছেলেটি। বসে, তেমনিভাবেই অবাক চোখে তাকিয়ে রইল এইদিকেই। আমি কিন্তু গুড়গুট্টি মেরে ঠায় বসে। না নড়ছি, না টুঁ শব্দ করছি। কোন কিছুর সাড়া-শব্দ না পেয়ে কী আর করে ছেলেটি, আবার শুয়ে পড়ল। হয়তো আবার ঘুমিয়ে পড়ল।

এক্ষুনি এখান থেকে বেরনো একদম বুদ্ধিমানের কাজ নয়! কারণ, ওর চোখে এখনও যদি ঘুম না এসে থাকে! তাই আরও কিছুক্ষণ চুপচাপ ঝোপের মধ্যে অমনি করেই বসে রইলুম।

এখন ছেলেটি সত্যিই ঘুমিয়ে পড়েছে। নিশ্চিন্ত হয়ে আমি আবার বেরিয়ে এসেছি। আবার থমকে থমকে হেঁটেছি ওর দিকে। এবার ঝোপের আড়াল দিয়ে গা ঘেঁষিয়ে ওর সামনে এসে দাঁড়ালুম। এবার আর বাজনাটার দিকে নজর না, ওর পায়ের দিকে নজর গেল। ওই ছোট্ট পা দুটিকে কে যে এমন করে লোহার শেকল দিয়ে বেঁধে দিয়েছে! তার কোনো দয়ামায়া নেই? দেখতে দেখতে আমার মনে হচ্ছে, যে ওর পা দুটি বেঁধে দিয়েছে, সে হয়তো চেয়েছে, ওই পা চিরদিনের মতো থেমে যাক। ও যেন আর ছুটতে না পারে! এই বন পেরিয়ে হাঁটতে না পারে! থাক বন্দি হয়ে এই গভীর জঙ্গলে!

আমি ভালো করে দেখব বলে, আর একটু এগিয়ে গিয়েছিলুম। দেখব, শেকলটা খোলা যায় কি না! কিন্তু হঠাৎ এমন আচমকা খিলখিল করে হেসে উঠেছে ছেলেটি, আমি একেবারে থতমত খেয়ে গেছি! এত চালাক, আমায় ধরবে বলে, ঘুমের ভান করে চুপ মেরে শুয়েছিল! উঃ, আমায় ধরা তো অত সহজ নয়! আমিও মেরেছি এক ডিগবাজি। তাই দেখে ছেলেটি আরও জোরে হেসে উঠল। বলল, 'কোন দেশের বাঘ বাবা, আমায় খেতে এসে পালাল!'

আমার মুখ দিয়ে কি আর কথা সরে? ঝোপের আড়ালে জুজু-বুড়িটির মতো নিজঝুম মেরে বসে রইলুম। ছেলেটি উঠে দাঁড়াল। বলল, 'পালাবে কোথায়! এক্ষুনি ধরছি!'

আমি তো জানি, ও ধরতে পারবে না। তাহলেও কিন্তু এবার আমার উঁকিঝুঁকি মারতে সাহস হল না। কেননা, একটা জ্যান্ত মানুষকে সামনে পেয়েও, বাঘ হয়েও আমি ভীতুর মতো পালালুম। পাঁচজনের পাঁচকান হলে একেবারে ছ্যাঃ ছ্যাঃ পড়ে যাবে চারিদিকে!

ছেলেটি কী সাবধানি দেখো! দেখে আমি আশ্চর্য হয়ে গেলুম! এবার যে সে হেঁটে হেঁটে এদিকেই আসছে, তা আমি বুঝতেই পারিনি! কারণ, পা টিপে টিপে এমন নিঃশব্দে হেঁটেছে যে, তার পায়ের ওই শেকলটার ঠং ঠং শব্দটি পর্যন্ত আমার কানে ঢোকেনি। আমার পেছনদিক দিয়েই এসেছিল সে। আর আমি হাঁদার মতো সামনে মুখ উঁচিয়ে বসে আছি। ছেলেটি করেছে কী, পেছনদিক দিয়ে এসে আমাকে আচমকা জড়িয়ে ধরে চেঁচিয়ে উঠল, 'এই ধরেছি!'

আমি যে তখন কী সাংঘাতিক ভয় পেয়ে গিয়েছিলুম, তা এখন মুখে বলা আমার কম্ম নয়। ভয় পেয়ে ছেলেটিকে এক ঝটকা দিয়ে আমি মারলুম লাফ। ছেলেটি মুখ থুবড়ে আছাড় খেল। আর আমি সিধে লম্বা!

সত্যি বলছি, আমি ভয় পেয়েছি, এই কথাটা ভাবতে এত লজ্জা করছে! বাঘের মুখে ভয়ের কথা শোভা পায়? কী বদনাম! না, না, চম্পট দিয়ে ভেগে পড়াটা একদম উচিত না। একটা মানুষের বাচ্চা-ছেলের কাছে আমি হেরে যাব! কক্ষনো না। আমি হার মানি না, মানবো না। আমি ছেলেটাকে আচ্ছা করে শিক্ষা দিয়ে দেব। আমাকে কী ঠাউরেছে! আমি কী ল্যাজ-নাড়া কুত্তা!

আমি যেমন তিরের মতো লম্বা দিয়েছিলুম, ঠিক তেমনি তিরের বেগে ফিরেও এলুম। কিন্তু বললে হাসবে হয়তো, ছেলেটিকে শিক্ষা দেওয়া দূরে থাক, ওর তখনকার সেই অবস্থা দেখে আমি সাংঘাতিক ঘাবড়ে গেলুম। দেখি, ছেলেটি আমার ঝটকা খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। উঠতে পারছে না। পায়ের শেকলটা একটা আগাছার সঙ্গে প্যাঁচ লেগে জড়িয়ে গেছে। ভীষণ কষ্ট করে টানাটানি করছে। কিন্তু শেকলটা যে খুলবে তেমন সাধ্য ওর কী আছে?

আমি সামনে এসে দাঁড়াতে, অত কষ্টেও ছেলেটি মুখখানা হাসি হাসি করে বলল, 'আমায় ধাক্কা মেরে ফেলে দিলি বলে দেখ, আমার কী হল!'

আমি ভাবলুম, ও নিজে আরও যদি বেশি টানা-হ্যাঁচড়া করে, তবে পা কাটবে, রক্ত পড়বে। ওর কষ্ট দেখতে দেখতে আমার পায়ের থাবা চারটে নিশপিশ করে উঠল। আমার মনে হল, এখনই এই থাবা দিয়ে ওর পায়ের শেকলটা দুমড়ে মুচড়ে খান খান করে ফেলি। আমার দাঁতগুলো কড়মড় করে উঠল। নিমেষের মধ্যে শেকলের আংটাটা দাঁতে চেপে ধরলুম। চেপে থাবা দিয়ে যেই চাপ দিয়েছি, 'খটাং!' খালি একটা আওয়াজ। তারপর টুকরো হয়ে শেকলটা ছিটকে পড়ল। এ তো একটা ভাঙল। আর কটা? একটা যখন ভেঙেছে আর একটা কি থাকে? সেটাকেও চুরমার করে দিলুম!

ওঃ! যাক এতক্ষণ ঠিক ঠিক কাজে লাগাতে পেরেছি আমার গায়ের জোরটাকে। ছেলেটিও অবাক হয়ে এতক্ষণ আমার দিকেই চেয়েছিল। এবার খুশিতে তার মুখখানি উছলে উঠল। আমাকে দু-হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরল সে। চিৎকার করে উঠল। তারপর ছুটে পালাল। ছুটতে ছুটতে মায়ের কাছে চলে গেল। বলল, 'মা, দেখো দেখো, বাঘ আমার পায়ের শেকল ভেঙে দিয়েছে মা। দ্যাখো, এখন আমি ছুটতে পারছি। মা, দ্যাখো, আমি লাফাচ্ছি।'

কিন্তু এবারও আমি ওর মাকে দেখতে পেলুম না। দেখলুম, ছেলেটি কেঁদে ফেলেছে। হয়তো আনন্দে কিংবা খুশিতে। কাঁদতে কাঁদতে বলল, 'মা, তোমাকে যারা মেরেছে তাদের আমি কিছুতেই ক্ষমা করব না মা, কিছুতেই না। এবার আমি বাবাকে মুক্ত করে আনব। বলো না পারব না?'

আমি তখনও দূরে দাঁড়িয়েছিলুম। দূর থেকেই কথাগুলো আমার কানে এল। কী রকম গোলমাল হয়ে গেল আমার মাথাটা। আমি কিছু বোঝবার আগেই, অবাক হয়ে ও নিজের মনেই আবার বলে উঠল, 'আমার গায়ে রক্ত কোথা থেকে লাগল!'

হঠাৎ আমি নিজের গায়ের দিকে চেয়ে দেখি, আমার গায়েও রক্ত! গুলির আঘাত লেগে যেখানটা আমার কেটে গেছে, সেখান দিয়ে আবার রক্ত পড়ছে। থেমে গেছিল। কিন্তু লাফালাফি করতে গিয়ে বোধ হয় আবার লেগে গেছে! মনে হচ্ছে, আমার গায়ের রক্ত ওই ছেলেটির গায়ে লেগেছে! ও আমায় যখন জড়িয়ে ধরেছিল, বোধ হয় তখন।

ছেলেটি ছুটে আমার কাছেই এল। এবার আমি কিন্তু স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলুম। ও আমার পিঠে হাত দিল। আমার পিঠে গুলির আঘাত দেখে আঁতকে উঠল। তারপর নিজের ছোট্ট হাত দিয়ে, আমার পিঠে হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করল, 'কে তোকে গুলি মেরেছে রে? আহা!'

ছেলেটির মুখে এই মিষ্টি আদর-মাখানো কথা শুনে তখন যে আমার কী ভালো লেগেছিল, আমি এখন তা বলতে পারবো না। আমি বাঘ, নইলে আমি হয়তো কেঁদে ফেলতুম! কিন্তু কাঁদার বদলে তখন তো আমি একদম হাঁদা! বোকার মতো জুলজুল চোখে ওর মুখের দিকে তাকিয়েছিলুম। বলতে লজ্জা কি না জানি না, তখন আমি নিজেই নিজেকে বাঘ বলে মনে করতে পারছিলুম না। আমার যেন মনে হচ্ছিল, এই ঘুপ-চুপ নির্জন বনে এখন এই ছেলেটি আমার একান্ত বন্ধু। কিংবা বলা যায়, আমি ওর আপনজন।

ঠিক এখনই আমি মনে করতে পারছি না, ছেলেটি কতক্ষণ আমার পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়েছিল। মনে করতে পারছি না, কী কথা তখন সে আমায় আদর করে বলেছিল। আমি সত্যিই বেবাক হয়ে গিয়েছিলুম। অত্যন্ত আশ্চর্য হয়ে ভেবেছিলুম এ-ও হয়? মানুষ আমাকে মারবে বলে তাক করে বন্দুক মেরেছে , আবার সেই মানুষ আমার পিঠের রক্ত মুছিয়ে দিয়ে, আমার পিঠে হাত বুলিয়ে আদর করছে!

হঠাৎ ছেলেটি বলল, 'বোধ হয় ভেবেছিলি, আমি তোকে দেখে ভয় পাব? হুঃ! আমার আবার ভয় কীসের! আমাকে তো ওরা বাঘের পেটে দেবে বলেই, আমার পায়ে শেকল বেঁধে এই বনে ফেলে দিয়ে গেছে।'

আমি ওর কথা শুনলুম, কিন্তু কিছু বলতে পারলুম না।

ছেলেটি আবার বলল, 'আমি কতদিন ধরে বনে বনে ঘুরছি, কেউ তো আমায় খেয়ে ফেলল না। তুই-ও এলি, অথচ আমায় মারলি না। আমার বেহালা নিয়ে বাজাতে শুরু করলি। কোন দেশের বাঘ রে তুই? কীরকম বাঘ?'

আচ্ছা লজ্জায় পড়লুম তো! বলতে পারো, ছেলেটি আমায় ওই কথা বলে ভীষণ ফ্যাসাদে ফেলে দিয়েছে। সত্যিই তো! বাঘ কোথায় বনে বনে হাঁক ছেড়ে ঘুরে বেড়াবে, তা নয়, বেহালা নিয়ে বাজনা বাজাচ্ছে! কে শুনেছে এমন কথা! কিন্তু পালাবো যে, তাও তো পারছি না। বলতে লজ্জা নেই, এখন আমি ওই ছোট্ট ছেলেটিকে ছেড়ে পালাবার কথা ভাবতেই পারছি না। ওর কথা শুনে মনে হচ্ছে, ভীষণ সাহসী। আমাকে একটুও ভয় পেল না! যাই বলো, তাই বলো, বীরের মতো মাথা উঁচিয়ে যে সাহস দেখায়, তাকে কে না ভালোবাসে? কারণ, বাঘও তো বীর। তবে আমাকে হয়তো বীর বলতে তোমার মন না-ও চাইতে পারে। ভাবতে পারো, বাঘ হয়ে একটা ছোট্ট ছেলের সঙ্গে ভাব করার জন্যে যে উসখুস করে, তাকে বীর বলবে না আর কিছু! তুমি যাই ভাবো, আমার কিন্তু ছেলেটিকে বড্ড ভালো লেগেছে।

রক্ত থেমে গেছে। ছেলেটি আমায় ছেড়ে আবার ছুটে গেল। ছুটে গেল ওর মায়ের কাছে। ছুটতে ছুটতে বলল, 'যাই, মায়ের ঘুম ভেঙে গেছে! আমার বাজনা শুনতে না পেলে মা ভাববে। মায়ের চোখে ঘুম আসবে না।'

ছোট্ট ঢিপিটার কাছে বসে বসে সে আবার বাজনায় সুর বাজাল। মিষ্টি সেই সুরের রিনিঝিনি হাওয়ার দোলনায় ভেসে ভেসে দোল খাচ্ছে। আর আমি মনে মনে ভাবছি, ও যদি ওইটা বাজাতে শিখিয়ে দেয়! আমি তো কথা বলতে পারি না। ওকে কেমন করে বোঝাব, আমি বাজনা শিখতে চাই।

কখন অজানতে আবার ছেলেটির কাছেই আমি হাঁটতে হাঁটতে চলে এসেছি! আমাকে দেখতে পেয়ে ও থামল। আমার কানের কাছে মুখ এনে নীচু গলায় বলল, 'চুপ, কথা বলিস না যেন। মা ঘুমুচ্ছে, এইখানে, এই মাটির নীচে।'

আমি চোখ ফিরিয়ে দেখলুম। ভাবলুম, 'বাববা! মানুষ মাটির নীচে ঘুমোয় কেমন করে?' সমস্ত ব্যাপারটা আমার কাছে কীরকম একটা রহস্য বলে মনে হচ্ছে। সবটার মধ্যে কী যেন গোলমেলে গন্ধ! আমি ওই ঢিবিটার দিকে আবার তাকালুম। কিছুই দেখতে পেলুম না।

ছেলেটিই বলল, 'তুই দেখতে পাবি কী করে? আমি ছাড়া মাকে কেউ দেখতে পায় না। রোজ আমার মা এই মাটির নীচ থেকে উঠে এসে, আমার চিবুক ধরে আদর করে। আমার কপালে চুমু খায়। আমি 'মা' বলে ডেকে ওঠে, মাকে আদর করে যেই জড়িয়ে ধরি, মা হারিয়ে যায়!' বলতে বলতে হঠাৎ থেমে পড়ল ছেলেটি। আমি অন্ধকারেও লক্ষ করলুম, তার চোখ দুটি ছলছল করছে। চোখের জল গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে। তারপর ঠোঁট দুটি ওর কেঁপে উঠল। আমার চোখের দিকে কীরকম অসহায়ের মতো তাকিয়ে অস্ফুট স্বরে বলল, 'ওরা আমার মাকে মেরে এইখানে শুইয়ে রেখে গেছে।' বলতে বলতে থামল ছেলেটি , কেমন মন আনমনা করা সেই নিস্তব্ধতা। সেই নির্জন নিস্তব্ধতায় সে আবার হঠাৎই চিৎকার করে উঠল, 'শয়তান! শয়তান! নির্দয়, ভয়ংকর সেই শয়তান! সেই শয়তানের নাম হুড্ডা-গুড্ডা।'

আমি অবাক হয়ে ওর মুখের দিকে তাকালুম। চারিদিক নিস্তব্ধ! নিস্তব্ধ বনের অন্ধকারে আমি দেখতে পেলুম, ওর চোখ দুটো যেন জ্বলছে। হয়তো রাগে। না কি আর কিছু আছে ওর মনে, আমি তা বুঝতে পারিনি। আমার শুধু মাথায় তখন একটা কথাই ফিরে ফিরে ঘুরে আসছে। আমি ভাবছি, হুড্ডা-গুড্ডা কী কোনো জন্তু, না মানুষ! হুড্ডা-গুড্ডা বলে কোনো জন্তুর নাম তো কখনো শুনিনি!

আবার ছেলেটি কথা বলল। বলল, 'জানিস, আমার বাবা খুব ভালো বেহালা বাজাতে পারে! আমার হাতে এই যে বেহালাটা দেখছিস, এটা বাবাই আমায় কিনে দিয়েছে। আমি বাবার কাছেই এটা বাজাতে শিখেছি! আমার বাবা কে জানিস? আর আমি? আমার বাবা রাজা। আমি রাজপুত্র!' এইটুকু বলে ছেলেটি থামল। একটুখানি ক্লান্ত হাসি ওর ঠোঁট দুটি ছুঁয়ে মিলিয়ে গেল।

আমি বোকার মতো ওর মুখের দিকে চেয়ে চেয়ে ভাবতে বসলুম, যাচ্চলে, ওর বাবাও রাজা! রাজা তো আমার বাবাও ছিল। তার মানে, যার যখন খুশি এখন-তখন যে কেউ রাজা হয়ে যেতে পারে!

তারপর নিজেই জিজ্ঞেস করল, 'তুই শুনবি আমার কথা?'

আমি কী বলব!

'তুই শুনেই বা কী করবি! তুই তো বাঘ! আমার কথা বুঝবি কিছু?'

আমি ঘাড় নেড়েছিলুম কি না জানি না। কিন্তু আমার ল্যাজটা অজানতে নেড়ে ফেলেছিলুম। হয়তো সেই নাড়ন্ত ল্যাজ দেখেই ও বুঝেছিল, আমি ওর কথা শুনতে চাই। ও তাই শুরু করেছিল।

এখন তাই শোনা যাক সেই ছেলেটির গল্প।

'আমার বাবা এই দেশের রাজা। কিন্তু আমার বাবাকে দেখলে রাজা বলে কেউ মনেই করতে পারবে না। রাজার মস্ত প্রাসাদ, সোনার সিংহাসন, মণি-মুক্তা-সাজানো রাজমুকুট, হাতি-ঘোড়া সৈন্যসামন্ত সব ছিল। কিন্তু আমার বাবার ছিল না রাজার দেমাক। তাই গরিব-বড়োলোক সবার বাড়িতে বাবা ছুটে যেত। রাজপ্রাসাদে তাদের ডেকে আনত। আদর করে বসিয়ে তাদের নিজের হাতে বাজনা শোনাত। চাই কি, যে শিখতে চাইত তাকে শিখিয়ে দিত। বাবা ছিল খুব সুখী। বাবার রাজত্বে ছিল প্রচুর আনন্দ। কোনোদিন যুদ্ধ করতে হয়নি বাবাকে। কেন করতে হবে। কারুর সঙ্গে তো শত্রুতা ছিল না তার। অন্য কোনো রাজ্যের একমুঠো মাটিও বাবা কোনোদিন নিজের হাতে ছোঁয়নি। কিন্তু উলটে নিজের দেশের মাটি সোনায়-সোনায় উপচে গেছিল। বেহালা বাজানো এটা তো ছিল বাবার শখ। আর তাই শখ করে বাবা আমাকেও বাজনা শেখাত। আমি যখন শিখতাম, বাজনার তারে সুর ছড়িয়ে যখন মাথা নাড়তুম, তখন বাবা মাকে ডেকে বলত, 'রানি, দেখো, দেখো, তোমার ছেলে তার বাপকেও হার মানাবে।' এ কথা শুনে আমার তখন ভীষণ লজ্জা করত। কিন্তু কী আনন্দ যে লাগত! আমার বাবা জানতেই পারেনি, আমাদের এই সুখের রাজত্বে এক শয়তানের দৃষ্টি পড়েছে! কে জানত, এখানে এক শয়তান বাসা বেঁধেছে!

'দলবল নিয়ে গভীর জঙ্গলে আস্তানা গেড়েছিল এই শয়তানটা! মানুষ খুন হয়ে রাস্তায় পড়ে আছে, আমাদের রাজত্বে এই কথা কেউ কোনোদিন ভাবতেই পারে না। কিন্তু ঠিক তাই হল। একদিন দেখা গেল, আমাদের এক সৈনিক বন্দুকের গুলিতে মারা গেছে। রাস্তায় পড়ে আছে। আর একদিন খবর এল, এক প্রজার বাড়ি লুঠ হয়ে গেছে। কেমন করে লুঠ হল, আর কারাই-বা লুঠ করল, কেউ বলতে পারছে না। কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্য, একদিন বাবার নিজের আদরের হাতিটিকে কারা গুলি করে মেরে ফেলেছে! রাজপ্রাসাদের হাতিশালে ঢুকে, হাতিকে মারা তো সোজা কথা নয়! সবাই বুঝল, এমন দুঃসাহসের কাজ যে করতে পারে, সে এক ভয়ংকর শয়তান!

'বাবা পড়ল ভীষণ ভাবনায়। নাওয়া-খাওয়া বন্ধ হল বাবার। হাতের বাজনা থেমে গেল। হুকুম হল, যে এ-কাজ করছে তাকে খুঁজে বার করতেই হবে। তখন শুরু হয়ে গেল সেই শয়তানকে খুঁজে বার করবার জোর তোড়জোড়। বাবা নিজেও বাজনা ছেড়ে বন্দুক ধরল। অন্ধকার রাতে নিজের সেনাদের নিয়ে সেই শয়তানকে খুঁজে বেড়াতে লাগল।

'কিন্তু কদিন হয়ে গেল, কিছু কিনারাই হল না। সেই শয়তান ধরা পড়ল না। অবাক কথা, সে যে কখন আসে, কোথা দিয়ে আসে, কেমন করে আসে, কেউ দেখতেও পায় না, বুঝতেও পারে না!

'হঠাৎ একদিন ধরা পড়ল! ধরা পড়ল বটে, কিন্তু সেই শয়তানটা নয়, তার দলের একটা লোক। এই লোকটা ছিল শয়তানটার খুব বিশ্বাসী। তাই তাকে পাঠানো হয়েছিল রানিকে খুন করে, তার গলায় যে মরকতের মালাটি রয়েছে, সেটি হরণ করে আনতে। আমি বলছি না, শয়তানের এই লোকটি খুব বোকা ছিল। কিন্তু আমার মা ছিল তার চেয়ে অনেক চালাক। অবাক লাগে, লোকটা ছদ্মবেশে পরে লুকিয়ে-ছাপিয়ে আসেনি! রাজপ্রাসাদের ভেতরমহলের চাকর সেজে সে সুযোগ খুঁজছিল। ঘরের চাকরকে কে আর সন্দেহ করবে? তা ছাড়া রাজবাড়ির অত দাসদাসির মধ্যে কে কোথায়, কোন মহলে কখন যাচ্ছে, কখন আসছে, তার হিসাব রাখা তো সোজা কথা নয়! কিন্তু আমার মা রাজরানি হলেও, ঘরকন্নার খুঁটিনাটি কাজ সব নিজের হাতে করত! আর সেইজন্যে মা ঝি-চাকর, দাসদাসি, সবাইকে চিনত! ওই-লোকটা যে একদম অচেনা, সেটা মা তাকে এক নজরেই বুঝতে পেরেছে। তবু কিচ্ছু বলেনি। তার চলাফেরা, তার কাজকম্ম, হাবভাব সব চুপচাপ লক্ষ করে যাচ্ছে।

'তারপর তক্কে তক্কে এক সময় হঠাৎ মায়ের শোবার ঘরে ঢুকে পড়েছিল লোকটা। ঢুকে, পালঙ্কের নীচে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে পড়ল। মা কিন্তু ঠিক দেখে ফেলেছে। যেন কিছু জানে না, মা মিথ্যে ভান করে কখনো ঘরে ঢুকছে, এটা ওটা খুঁটিনাটি নাড়ানাড়ি করছে, বেরিয়ে আসছে! এমনি করতে করতে এক সময় চট করে বাইরে থেকে ঘরের দরজা বন্ধ করে শেকল তুলে দিল মা! লোকটা ভেতরে আটকা পড়ে গেল! মায়ের সত্যি কী সাহস, কী বুদ্ধি!

'লোকটা ধরা পড়ল। প্রাণের দায়ে সব কথা ফাঁস করে দিল। সে-ই বলল, তারা দস্যু। তাদের সর্দারের নাম হুড্ডা-গুড্ডা। তাদের আস্তানাটা সে বাতলে দেবে।

'দিলও তাই। তার কথা মতো, একদিন রাজসেনাদের নিয়ে বাবা ঘোড়ার খুরে ধুলো উড়িয়ে গভীর জঙ্গলে সেই হুড্ডা-গুড্ডার আস্তানায় হানা দিল। একটা পাহাড়ে, অন্ধকার গুহার মধ্যে তাদের আড্ডা। আচমকা সেখানে ঝাঁপিয়ে পড়ল রাজসেনারা। কিন্তু তখন সেই দস্যু-সর্দার হুড্ডা-গুড্ডা সেখানে কোথায়? শুধু তার সাকরেদরা গুহা পাহারা দিতে সেখানে হাজির রয়েছে। চমক দিয়ে রাজসেনার বন্দুকের গুলি গর্জে উঠল। তারা তো হকচকিয়ে গেছে। কিছু করবার সুযোগই পেল না। আগুনের ফুলকি ছুটে ছুটে হুড্ডা-গুড্ডার গুহার আস্তানা তছনছ করে দিল। সব ক-টা লোক বন্দি হল। গুহার ভেতর থেকে উদ্ধার করা হল হাজার হাজার মোহর। দামি দামি হিরে-জহরত আরও নানান জিনিস। সেইসব মালপত্তর দশটা হাতির পিঠে চাপিয়ে রাজপ্রাসাদে নিয়ে আসা হল। তারপর ঢোল-শহরৎ করে সেইসব জিনিস গরিবদের মধ্যে বিলিয়ে দিল বাবা। লোকে রাজার জয়ধবনি দিতে দিতে ঘরে ফিরে গেল।

'ধীরে ধীরে দেশের লোক হুড্ডা-গুড্ডার কথা ভুলে গেল। কেননা, তারপর থেকে দেশে আর দস্যুর অত্যাচার রইল না। বাবা আবার বাজনা ধরল।

'কিন্তু হঠাৎ এক কাণ্ড ঘটল। সেদিনটা ছিল বাবার অভিষেকের দিন। যেদিন বাবা প্রথম সিংহাসনে বসে, প্রত্যেক বছর সেদিনটা খুব ধুমধামে উৎসব করা হয়। সারা শহরটা আলোর মালা, রঙিন পতাকা আর নানান ফুল দিয়ে সাজানো হয়। সে সময়ে শহরটা দেখতে লাগে যেন রঙিন আলোর দেশ। কত দূর দূর থেকে, কত মানুষ এই উৎসব দেখতে আসেন। কত রাজরাজড়া, কত গণ্যমান্য মানুষ, কবি-গায়ক উৎসবে যোগ দেন। তাঁদের নেমন্তন্ন করে খাওয়ানো হয়। দেওয়া হয় প্রচুর উপহার। আর সবশেষে রাজদরবারে আসর বসিয়ে বাবা তাঁদের শোনায় নিজের হাতে বেহালার বাজনা।

'এবারেও অভিষেকের দিনে এসেছিলেন হাজার হাজার লোক। এবার আর বাবা নিজে বাজনা শোনাল না। বলল, এবার আপনাদের বাজনা শোনাবে আমার ছেলে।

'রাজদরবার লোকে লোকারণ্য। অত লোক দেখে, আমার কিন্তু একটুও ভয় করেনি। আমি বেহালায় সুর ধরলুম। এখন আমি মনে করতে পারছি না, কতক্ষণ আমার বাজনায় সুর বেজেছিল। আর কত লোক আমার বাজনা শুনছিলেন, কত লোক থেকে থেকে আনন্দ আর খুশিতে বাহবা দিচ্ছিলেন। আমি যেমন একমনে বাজনা বাজাচ্ছি, আর সকলেও তেমনি একমনে শুনছেন। কেউ তখন জানতেও পারেননি সেই দস্যু শয়তান হুড্ডা-গুড্ডা আর তার দলবলও রাজদরবারে হাজির রয়েছে। ছদ্মবেশে ওই অগুনতি লোকের মধ্যে মিশে এখুনই যে তারা এক ভীষণ কাণ্ড করবে বলে ওত পেতে বসে আছে সে-খেয়াল কার আছে?

'দুম দুম! কোথাও কিছু নেই, হঠাৎ রাজদরবারে অসংখ্য লোকের মধ্যে বোমা পড়ল। আগুনের ঝলকা এসে বাবার চোখে-মুখে লাগল। আবার দুম দুম। আগুনের ঝলকা থেকে ধোঁয়ার কুণ্ডলী সারা দরবারে ছড়িয়ে পড়ল। প্রথমটা হঠাৎ আচমকা এই শব্দে দরবারের প্রতিটি লোক হকচকিয়ে গেছিল। তারপর প্রচণ্ড চেঁচামেচি আর হুড়োহুড়ি! কে আগে পালাবে, সেই নিয়ে ঠেলাঠেলি আর হট্টগোল। কেউ পড়ল, কেউ মরল, কেউ অজ্ঞান হয়ে গেল। তখন কে রাজা, কে প্রজা আর কেই-বা গণ্যমান্য। প্রাণ বাঁচাতে সবাই কান্নাকাটি জুড়ে দিল।

'আমার চোখ দুটোও ভীষণ জ্বালা করছে। কিন্তু হাতের বাজনা আমি ছাড়িনি। ওই ধোঁয়ার কুণ্ডলী আমার চোখের ওপর যখন আছড়ে পড়ল, আমি ভেবেছিলুম, আমি বুঝি অন্ধ হয়ে গেছি। অন্ধ আমি হইনি। আমি আবছা চোখে দেখতে পেলুম, বাবা দু-চোখে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বাবার গা দিয়ে রক্ত ঝরছে। আমি ভয়ে চিৎকার করে বাবাকে জড়িয়ে ধরলুম। বাবা আমাকে কোলে নিয়ে ছুটতে গেল! কিন্তু পালাবে কোথায়? সেই সর্দার হুড্ডা-গুড্ডা ওদিক থেকে ছুটে এসে বাবার পায়ে লাঠির বাড়ি এমন জোরে মারল, বাবা হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেছে। আমিও পড়লুম। সঙ্গে সঙ্গে দস্যুরা ছুটে এল। আমার দিকে না তাকিয়ে বাবাকে ওরা বেঁধে ফেলল। বাবাকে বাঁধতে দেখে, আমি লাফিয়ে উঠে সর্দারের বুকে মেরেছি এক ঘুষি। সর্দার চিৎকার করে আমার গলাটা টিপে ধরল। এমন টিপে ধরেছে, মনে হল, আমি এক্ষুনি দম আটকে মরে যাব। আমি মরলুম না। সে আমার গলায় ভীষণ জোরে এক ধাক্কা মারল। আমি চিতপাত হয়ে মাটিতে পড়ে গেলুম। আমার হাতের বাজনেটা আর একটু হলে টুকরো টুকরো হয়ে যেত। খুব বরাত ভালো, অনেক কষ্টে বাঁচাতে পারলুম। কিন্তু বাবাকে ওদের হাত থেকে ছাড়াতে পারলুম না। ওরা বাবাকে বেঁধে নিয়ে কোথায় যে চলে গেল জানতে পারিনি। আর আমাকে ওরা চ্যাং-দোলা করে ঘোড়ার পিঠে তুলল। আমি উঠব না কিছুতেই। আমি কি পারি? সর্দার নিজেই ঘোড়া ছোটাল। ততক্ষণে রাজদরবার তছনছ হয়ে গেছে।

'আমার মা এতক্ষণ কোথায় ছিল জানি না। সর্দার আমায় নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে দেখে, ঘোড়ার পিঠে চেপে বন্দুক নিয়ে ছুটে এসেছে মা। এতদিন আমি মাকে দেখেছি রাজরানি বেশে। আশ্চর্য! আজ দেখলুম মায়ের অন্য মূর্তি। মায়ের বন্দুক গর্জে উঠল গুড়ুম! সর্দার আমাকে পাকড়াও করে ঘোড়ার পিঠে ছুটছে। মা-ও পেছনে ঘোড়ার পিঠে। হাতে বন্দুক। মা হয়তো ভেবেছিল, ঘোড়াটাকে যদি বন্দুক মেরে কোনোরকমে খোঁড়া করে দিতে পারে তাহলে আমি উদ্ধার পাব, দস্যু-সর্দারেরও দফা শেষ হবে। তাই গুলি চালাল মা ঘোড়ার পায়ের ওপর। ঘোড়া চিঁহিঁহিঁ করে ডেকে উঠে মাটিতে ছিটকে পড়েছে। আমিও পড়লুম, দস্যুটাও পড়ল ঘোড়ার ঘাড়ের ওপর। সঙ্গে সঙ্গে সর্দার উঠে দাঁড়াল। ঘুরে দাঁড়িয়ে গুলি ছুড়ল মায়ের দিকে। আমাকে ওই সর্দার-দস্যুটা এমনভাবে তার সামনে দাঁড় করিয়ে নিজে আমার আড়ালে দাঁড়াল যে, মা আর গুলি ছুড়তে পারে না। কারণ, ছুড়লেই আমার বুকে লেগে যাবে। তাই মা ছুট্টে আড়ালে চলে গেল। মা হয়তো ভেবেছিল, নিঃসাড়ে সর্দারটার পেছনে চলে যাবে। পেছন থেকে গুলি মেরে সর্দারের পিঠটা ঝাঁঝরা করে দেবে। মা সর্দারের পেছনেই গেছিল। হয়তো বন্দুকও তুলেছিল। কিন্তু তার আগেই শয়তানের দল মায়ের বুকে গুলি চালিয়ে দিয়েছে। মা ঘোড়ার পিঠ থেকে মুখ থুবড়ে মাটিতে পড়ে গেছে। তারপর আর কথা বলতে পারেনি মা।

'রাজপ্রাসাদটা দখল করে নিলে শয়তানের দল। তারা বাবাকে বন্দি করে রাজপ্রাসাদের গারদখানায় আটকে রাখলে। আমি যতদূর জানি, বাবা এখনও সেখানেই আছে। আমাকে আর আমার মায়ের নিস্তেজ দেহটা তারা এই জঙ্গলে নিয়ে এল। তারা আমাকে মারল না। আমার পা দুটো শেকল দিয়ে বেঁধে দিল। আমি যেন পালাতে না পারি। তারা ভেবেছিল, বনের বাঘ এসে আমায় জ্যান্ত খেয়ে ফেলবে। আর আমার মায়ের দেহটা ওরা এইখানে, এই মাটির নীচে পুঁতে রাখল আমার চোখের সামনে। কিন্তু তখন মাকে পুঁততে দেখে আমার চোখ দিয়ে একটুও জল পড়েনি। আমি ভেবেছিলুম, তবু ভালো, আমি যদি মরি আমার মায়ের কাছেই মরতে পারব। এখন একটা কথা কিন্তু ভাবতে ভারি আশ্চর্য লাগে। আমি যেমন আমার হাত থেকে বাবার দেওয়া বেহালাটা ছাড়িনি, ওরাও যে কেন আমার হাত থেকে এটা কেড়ে নেয়নি, আমি তা আজও জানি না। তাই এটা আমার কাছেই আছে। আমি এই বেহালাটা বাজিয়ে রোজ মাকে জাগাই, ঘুম পাড়াই। আর ভাবি, এখন আমার বাবা কী করছে রাজপ্রাসাদের গারদখানায়?'

কথা তার শেষ হল। ছেলেটি থামল। আমার মুখের দিকে চাইল সে। হয়তো ভেবেছিল, আমি কিছু বলব তাকে। তারপর যখন দেখল বাঘ হয়েও হাঁদার মতো আমি চুপ করে আছি, ওর মুখে কেমন একটা দুঃখ-মেশানো হাসি ঝিলিক দিয়ে হারিয়ে গেল। নিজের মনেই বেহালাটা বুকে তুলে নিল। তারপর আবার বাজাতে শুরু করল। এখন ওর এই বাজনার সুরটা আমার মাথায় ঢুকছে কি না বুঝতে পারছি না। কিন্তু ওর কথাগুলো গুনগুন করে আমার সমস্ত মনটাকে নাড়া দিচ্ছে। আমি ভাবছি আর অবাক হয়ে যাচ্ছি। ভাবছি, মানুষ বন্দুক নিয়ে শুধু বাঘই মারে না। মানুষ বন্দুক দিয়ে মানুষকেও মারে!

আমার চোখে চোখ পড়তে ওর বাজনা থামল। আমায় বলল, 'তুই তো জন্তু। মানুষের মতো কথা তো বলতে পারিস না! মানুষের মতো বাজনা বাজাতে পারবি? আমি শিখিয়ে দেব।'

আমার মনটা যেন 'ধ্যাং' করে উঠল।

তারপর বলল, 'তুই তো বাজাচ্ছিলি। এই নে, আবার বাজা!' বলে বেহালাটা আমার দিকে এগিয়ে দিল।

আমি একটুখানি দোনোমনো করেছিলুম। তারপর সামনের একটা থাবা এগিয়ে দিলুম বাজনাটার দিকে। বাজনার তারে ঘা পড়ল, 'টুং!'

ছেলেটি বলল, 'বারে! বেশ তো পারিস!'

আমি আর একবার আর একটা তার টানলুম, 'টাং!'

তারপর আর একটা, 'টিং!'

শেষকালে একসঙ্গে, 'টুং-টাং-টিং!'

একবার দুবার, তারপর বারবার, 'টুং-টাং-টিং!'

একবার, দুবার, তারপর বারবার, 'টুং-টাং-টিং! টুং-টাং-টিং! টুং-টাং-টিং!'

ছেলেটি খুশিতে হেসে উঠল।

১০

হঠাৎ চমকে উঠেছিলুম আমি। ছেলেটিও বোধ হয় চমকে গেছিল! একসঙ্গে অনেকগুলো ঘোড়া ছুটে এলে যেমন শব্দ ওঠে নির্জন বনে, আমি শুনলুম, তেমনি যেন শব্দ আমার কানে ভেসে আসছে। ছেলেটি চটপট উঠে দাঁড়াল। আমায় বলল, 'দস্যু আসছে! তুই এখান থেকে পালা!'

পালাবো কেন? আমি কাকে ভয় পাই! ওখানে থেকে উঠে আমি একটা ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে পড়লুম। আমি আগে কখনো দস্যু দেখিনি। আমি ভাবলুম, যাক, ঝোপের আড়ালে বসে এবার তাহলে দস্যু দেখা যাবে! যে কখনো দস্যু দেখেনি, তার তো দস্যু জিনিসটা কেমন দেখতে এটা জানার ইচ্ছে হবেই।

আমি লুকিয়ে পড়লুম, কিন্তু ছেলেটি যেখানে আগে বসেছিল, আবার সেখানেই বসে পড়ল। আবার বেহালাটা বাজাতে লাগল।

ততক্ষণে দস্যুরা সেখানে হাজির। ওদের চেহারা আমি দেখতে পেয়েছি। ঘোড়ার পিঠে ছুটে আসছে। আগাগোড়া বিচ্ছিরি কালো রঙের পোশাক পরে আছে। চোখগুলো কালোকাপড়ের ঢাকনি দিয়ে এমনভাবে মোড়া, তুমি শত চেষ্টা করলেও ওদের চোখ দেখতে পাবে না। কিন্তু ওরা তোমায় ঠিক দেখতে পাবে। সক্কলের কাঁধে একটা করে বন্দুক। দলে ক-জন আছে আমি বলতে পারব না। কিন্তু অনেকজন।

বাজনার শব্দটা শুনেই বোধ হয় ওরা ঘোড়া দাঁড় করাল। তারপর ঘুরে ঘুরে খুঁজতে লাগল। খুঁজতে কতক্ষণ লাগবে? ছেলেটি তো সামনেই বসে আছে। একজন দস্যু ছেলেটিকে প্রথম দেখতে পেয়ে অবাক হয়ে গেল। সবাইকে ডেকে বলল, 'আরে! একে তো এখনও বাঘে খায়নি! এখনও তো বেঁচে আছে!'

ছেলেটি কিন্তু ওদের কথা কানেই নিল না। সে যেমন বাজাচ্ছিল, তেমনিই বাজাচ্ছে!

একজন দস্যু ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে কাছে এগিয়ে গেল। ক্যারকেরে গলায় জিজ্ঞেস করল, 'এই, এখানে কী করছিস?'

ছেলেটি তোয়াক্কাই করল না।

একজন হঠাৎ ওর পা দুটো দেখতে পেয়েছে। চেঁচিয়ে উঠল, 'আরে! পায়ের শেকলটা তো পায়ে বাঁধা নেই! খোলা পড়ে আছে!'

সত্যিই শেকলটা ওর পাশেই পড়ে ছিল।

হঠাৎ দস্যুটা ওর হাত থেকে বাজনাটা কেড়ে নিয়ে, ছুড়ে ফেলে দিল। ভাঙেনি রক্ষে! তারপর ওর ঘাড়টা ধরে টেনে তুলল। জিজ্ঞেস করল, 'পায়ের শেকল খুলেছিস কেন?'

ছেলেটি এতক্ষণে কথা বলল। বলল, 'বেশ করেছি!'

আমি অবাক হয়ে গেলুম ওর কথা শুনে। দারুণ তেজিয়াল ছেলে তো! একটুও ভয় পেল না!

আমি বুঝতে পারলুম, দস্যুটা ওর কথা শুনে ভীষণ খেপে গেছে। ঘাড়টা ধরে খুব জোর ঝাঁকুনি দিল। বলল, 'মুখের ওপর কথা! সাহস তো কম নয়! মেরে দাঁতগুলো উপড়ে ফেলব!'

ছেলেটি উত্তর দিল, 'আমিও দাঁত উপড়ে নিতে পরি!'

ছেলেটির কথা শুনে দস্যুটা কীরকম ঘাবড়ে গেল! থতমত খেয়ে গেছে! সঙ্গে সঙ্গে ঘোড়ার পিঠ থেকে আর একটা দস্যু চেঁচিয়ে বলল, 'দে না, একদম খতম করে দে!'

'তাই দেব,' বলে যেই দস্যুটা ওর ঘাড় ছেড়ে, নিজের কাঁধ থেকে বন্দুক নামিয়েছে ছেলেটিও মাটি থেকে লোহার শেকলটা তুলে নিয়েছে। হাত ঘুরিয়ে চোখের নিমেষে ধাঁই করে ওর মুখের ওপর মেরে দিয়েছে। লোকটা ছিটকে পড়ে যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠল। কী দুর্দান্ত সাহস!

কিন্তু এবার তো ওর নিশ্চয়ই বিপদ! এবার ওকে নিশ্চয়ই মারবে! কিন্তু মজা কী, মারবার আগে ও নিজেই চেঁচিয়ে উঠল, 'আয়, আয়, দেখি তোদের কত সাহস!' বলে সেই লোহার শেকলটা বনবন করে ঘুরিয়ে এগুতে লাগল। ঘোড়াগুলোও ভয়ে পিছু হটছে। তা বলে তো আর লোহার শেকল ঘুরিয়ে বন্দুকের গুলি আটকানো যায় না! দস্যুরা ঝটপট বন্দুক তুলল। আমি দেখলুম ওর এবার নির্ঘাত মরণ!

ওরা বন্দুক ছোড়ার আগেই ঝোপের ভেতর থেকে আমি হঠাৎ হুংকার ছাড়লুম, 'হালুম!'

থমকে গেল ওদের বন্দুক। চমকে উঠল ওদের বুক। ওরা কিছু বুঝতে না বুঝতেই, আমি দস্যুদের ঘাড়ের ওপর লাফিয়ে পড়লুম। ওরা ভয়ে মরাকান্না কেঁদে উঠল। ঘোড়াগুলো চার পা তুলে লাফাতে লাগল। আমি এক-একটা থাবা মারি আর এক-একটা দস্যু মাটির ওপর চিতপাত হয়ে লুটিয়ে পড়ে! আমার গর্জন, ওদের চিৎকার আর ঘোড়াগুলোর চিঁহিঁ-চিঁহিঁ ডাক, সব মিলিয়ে তখন যেন সেখানে কুরুক্ষেত্র! আমি বেশ মনে করতে পারছি, সেদিন সব ক-টা দস্যুকে আমি খতম করে দিয়েছিলুম। সব ক-টার বন্দুক হাত থেকে পড়ে মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছিল। আর ঘোড়াগুলো, কোনোটা মরেছে, কোনোটা মাটিতে পড়ে ছটফট করছে আর কোনোটা এদিক-ওদিক ছুটে ছুটে পালাচ্ছে। এই সুযোগে একটা কিন্তু কাণ্ড ঘটে গেল। একজন দস্যু আমাকে ফাঁকি দিয়ে ঘোড়ার পিঠে চেপে দে চম্পট। আমার নজর এড়ায়নি। আর এই ব্যাপারটাই যে সাংঘাতিক বিপদ ডেকে আনবে, আমি সেটা তখনই বুঝতে পেরেছিলুম। বুঝলে কী হবে! আমি তো কথা বলতে পারি না। আমি তো ছেলেটিকে বলতে পারিনি, এখানে আর থাকা উচিত নয়। আর যদিও বলি, ও আমার কথা শুনবে কেন? ও কি এখান থেকে মাকে ছেড়ে যাবে?

দস্যুগুলোকে হারিয়ে দিয়ে জেতার গর্বে আমার বুকটা ফুলে ফুলে উঠছিল। আর এমন একজন সাহসী ছেলের সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতাতে পেরে আমার যে কী আনন্দ, বলতে পারছি না। বীরের সঙ্গে বীরেরই পোষায়! ল্যাদাড়ুস ল্যাংচা-মার্কাদের নিয়ে কাজ হয়!

আমি হাঁপাচ্ছিলুম। ঠিকই, একটু হাঁপিয়ে গেছিলুম। ছেলেটি ছুটে এসে আমায় জড়িয়ে ধরল। আমায় আদর করল। আমিও আমার এই হাঁড়ির মতো মস্ত মুখটা দিয়ে ওর গালটা ঘষে দিলুম।

ছেলেটা খুশিতে ছুটে গিয়ে ওই মরা দস্যুদের বন্দুকগুলো তাড়াতাড়ি তুলে নিয়ে ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে রাখল। বলল, 'কোনোদিন আর যদি কেউ আসে, এই বন্দুক দিয়ে তাকে শেষ করব।'

আমি জানতুম, যদি কেন, নিশ্চয়ই আসবে। কারণ, যে-দস্যুটা পালিয়েছে, সে কি তার দলবলকে এ-কথা বলবে না? দস্যুসর্দার হুড্ডা-গুড্ডা কি ছেড়ে কথা বলবে? ওই দস্যুটা ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে যেতে আমার তাই এতো আফশোস হল! আমায় বোকা বানিয়ে দিল! আমিই বা কী করব! একা সক্কলের সঙ্গে লড়তে হয়েছে। ব্যাপারটা তো চারডিখানি নয়! তার ওপর সববার হাতে বন্দুক। একবার চালিয়ে দিলেই হল! কিন্তু বন্দুক চালানোর সুযোগ কাউকে দেওয়া চলবে না। সুতরাং হাওয়ার মতো ছুটে ছুটে আমায় কাজ করতে হয়েছিল। এখন সেই ফাঁকে কেউ পালালে, আমার বরাত ছাড়া আর কী বলব!

বন্দুকগুলো যখন সব ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে ফেলল ছেলেটি, তখন বেহালাটা আবার তুলে নিল। ভালো করে পরখ করল। নাঃ, ভাঙেনি। আমায় বলল, 'আয়, এবার তোকে বেহালা বাজাতে শিখিয়ে দিই।'

সত্যি বলছি আমার তখন ওই বেহালা-টেহালা বাজাবার মতো মনের অবস্থা নয়। মন তখন পড়ে আছে অন্যখানে। ভয় হচ্ছে, দস্যুরা এবার না লুকিয়ে লুকিয়ে চলে আসে। কিন্তু ছেলেটির কথা না শুনলে ও যদি দুঃখ পায়! সত্যিই, ওকে দুঃখু দিতে কষ্ট লাগে! আর সেই কথা ভেবেই, ইচ্ছে না থাকলেও, বেহালা শিখতে আমি আপত্তি করলুম না। ওর পাশে গিয়ে বসলুম।

ছেলেটি বলল, 'প্রথমে তোকে সা-রে-গা-মা শিখিয়ে দিই।'

তোমাকে তো আগেই বলেছি আমি বাঘ। ওই হাসি-টাসি ব্যাপারগুলো আমার ধাতে সয় না। কিন্তু সা-রে-গা-মা কথাটা শুনে আমার হঠাৎ এমন মজা লাগল! মনে হল, কে যেন হাসিয়ে দেবার জন্যে আমার পেটে কাতুকুতু দিয়ে দিল। যে হাসতে জানে না, তার কাতুকুতু লাগলে যে এমন দুর্দশা হবে, আমি তা মোটেই ভেবে পাইনি। আমার মনে হচ্ছিল, হাসিটা আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসবার জন্যে যতই আঁচড়-পাঁচড় করছে, ততই আমার পেটের ভেতরে সেটাকে কে যেন আঁকপাকিয়ে টেনে ধরে রাখতে চাইছে। সে এক ভয়ানক হেসুড়ে ব্যাপার! হাসি পাচ্ছে অথচ হাসতে পারছি না।

শেষকালে ফট করে পেটের ভেতর থেকে ফসকে হাসিটা মুখ দিয়ে হা-হা-হা শব্দে বেরিয়ে এল। আমি হেসে ফেললুম। বাঘের হাসতে সত্যি মানা কি না জানি না। কিন্তু একবার যখন হেসে ফেলেছি, তখন সেটাকে থামাবার চেষ্টা না করে, হাসতে-হাসতেই বেহালায় সা-রে-গা-মা-পা-ধা-নি শিখতে লাগলুম।

১১

বেশিক্ষণ হাসতে হল না। সা-রে-গা-মা-ও শিখতে হল না। যা ভেবেছি তাই! আবার ঘোড়া ছুটে আসছে! শব্দ পাচ্ছি! এইবার নির্ঘাত বিপদ! ছেলেটিও শুনতে পেয়েছে। এবার যেন অনেক ঘোড়ার পায়ের শব্দ। ছেলেটি চটপট বেহালাটা অন্ধকারে সরিয়ে রেখে আমায় বলল, 'ওরা নিশ্চয়ই আবার আসছে! তুই লুকিয়ে পড়!' বলে নিজে ছুটে চলে গেল দস্যুদের সেই বন্দুকগুলো যেখানে লুকিয়ে রেখেছিল, সেই ঝোপের মধ্যে। আর আমিও লুকিয়ে পড়লুম একটা মস্ত ঝাঁকড়া গাছের আড়ালে।

দেখতে দেখতে দস্যুর দল সেখানে হাজির। এবার একজন-দুজন নয়। অগুনতি। এবার ওদের সঙ্গে লড়া, আমার একার কম্ম নয়। কারণ, এবার ওরা তৈরি হয়ে এসেছে। বাহাদুরি দেখাতে গেলে, নিস্তার নেই!

দস্যুগুলো সামনে এসে দাঁড়াল। অন্ধকার রাত্তির বলে ঠাওর করতে ওদের মুশকিল হচ্ছে। ঘোড়ার পিঠ থেকে ঝটপট নেমে পড়ল। একটু আগে যে-দস্যুগুলোকে আমি মেরে ফেলে রেখেছি, সেগুলোকে নেড়েচেড়ে দেখল। যদি কেউ বেঁচে থাকে! যখন দেখল কেউ বেঁচে নেই, তখন বন্দুক উঁচিয়ে সেই জায়গাটা ঘিরে ফেলল। খোঁজাখুঁজি করতে লাগল।

'গুড়ুম!' হঠাৎ বন্দুক গর্জে উঠল। আমি ঠিক দেখতে পেলুম, ছেলেটি যে ঝোপটার ভেতরে বসে আছে, সেখান থেকে গুলি ছুটে এসে একটা দস্যুর বুকে বিঁধেছে। চিৎকার করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল দস্যুটা। সঙ্গে সঙ্গে আর সকলে ঝপাঝপ মাটিতে শুয়ে পড়ল। বন্দুক উঁচিয়ে, হামাগুড়ি দিতে দিতে ওই ঝোপের দিকে এগিয়ে চলেছে তারা। আবার ঝোপের ভেতর থেকে শব্দ এল, 'গুড়ুম!'

'গুড়ুম! গুড়ুম!' দস্যুরাও বন্দুক ছুড়ল।

তারপর ঝোপের ভেতর থেকে আর দস্যুদের বন্দুক থেকে শব্দ আর শব্দ, 'গুড়ুম! গুড়ুম!' সত্যিকারের একটা যুদ্ধ লেগে গেল দস্যুদের সঙ্গে ছেলেটির।

কতক্ষণ ধরে যুদ্ধ চলেছিল, আমি বলতে পারব না। জানি না, যুদ্ধে কটা দস্যু মরেছিল। কিন্তু খানিক পরেই ছেলেটির বন্দুক থেমে গেল। তখনই আমার ভয় হয়েছিল, বন্দুকের গুলি বোধ হয় ফুরিয়ে গেছে!

আমার কথা মিথ্যে নয়। এবার দস্যুর দল আগের মতোই মাটি কামড়ে গুঁড়িশুঁড়ি মেরে চারদিক থেকে ওই ঝোপের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। ঝোপ ছেড়ে ছেলেটি ছুটতে গেল, কিন্তু পারল না। ছেলেটিকে দস্যুর দল হ্যাঁচড়া-টানে ঘোড়ার পিঠে তুলে নিয়ে, ছুট দিল। ছেলেটি হাত-পা ছুড়ে ছটফটিয়েও আর ছাড়ান পেল না। একবার মনে হয়েছিল, আমি লাফিয়ে পড়ি ওদের ওপর। সাহস হল না। ভেবেছি, হট করে এমন কাজ করাটা ঠিক না। তাহলে আমাকেও মরতে হবে। তুমি হয়তো আমার এ-কথা শুনে ভাবছ, আমি এক নম্বরের ভীতু। ভীষণ স্বার্থপর। ভাবতে পারো। কিন্তু একটা কথা শুনে রাখলে ভালো করবে। অনেক সময় খামোকা গাজোয়ারি করার চেয়েও বুদ্ধির জোরে কাজ হয় অনেক বেশি। তাই ওরা যখন ছেলেটিকে নিয়ে ঘোড়ার পিঠে ছুট দিল, আমিও তখন গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসেছি। ওই যে বেহালাটা মাটিতে পড়েছিল, ওটা মুখে নিয়ে নিঃসাড়ে ঘোড়ার পিছনে আমিও ছুট দিয়েছি।

একটা যে বাঘ ওদের পেছনে পেছনে ছুটছে, এটা কিন্তু ওরা খেয়ালই করেনি। ওরা জানতে পারল না, ওদের পেছনে যম। জানতে পারা সম্ভবও নয়। কারণ, ওরা তখন শিকার ধরে জয়ের আনন্দে দিশেহারা। আর আমি তখন শিকার ধরবার জন্যে সাবধানে তাদের পেছনে লাফিয়ে ছুটছি।

১২

ছুটতে ছুটতে ওরা বন পেরিয়ে গেল। বোধ হয় শহরে পড়ল। বিপদ আমার। কেননা, বন-জঙ্গলে গা ঢাকা দিয়ে থাকতে কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু শহরে তো তা হবার যো নেই। পরিষ্কার ঝরঝরে রাস্তাঘাট। লুকোবার জায়গাই নেই। আমি চেয়ে দেখি, ঠাকমা যেমন আমায় বলেছিল, শহরটা ঠিক তেমনি। এ-পাশে ও-পাশে বড়ো বড়ো কোঠাবাড়ি। কিন্তু রক্ষে এই, তখন নিজঝুম রাত্তির। লোকজন সব ঘুমিয়ে পড়েছে। রাস্তাঘাট ফাঁকা।

আমি দেখলুম, ছেলেটিকে জাপটে ধরে ঘোড়া ছুটিয়ে দস্যুর দল একটা মস্ত বাড়ির ফটক পেরিয়ে ঢুকে গেল। বাইরে থেকে বাড়ির চেহারা দেখে আমার বুঝতে বাকি রইল না, এইটা রাজপ্রাসাদ। ওরা তো ঢুকে গেল গটগটিয়ে। কিন্তু বাঘ কেমন করে ঢুকবে? চোরের মতো আর সকলের চোখ এড়িয়ে টুপ করে তো আর ঢুকে পড়তে পারবো না! আমার চেহারাটা যদি ছোটোখাটো হত তা হলে ভাবনা ছিল না। এই পেল্লাই দেহটা নিয়ে অন্যের চোখকে ফাঁকি দেওয়া মুখের কথা নয়! তার ওপর আবার ফটকের সামনেও বন্দুক উঁচিয়ে দু-দুজন দস্যু-পাহারাদার দাঁড়িয়ে আছে। এই সময় আমি বাঘ না হয়ে, বাঘের মাসি হলে ভালো হত!

আমার মাসিকে আমি কখনো দেখিনি। শুনেছি, আমার মাসির চেহারাটা খুব ছোট্টখাট্টো! মাসি আমার রান্নাঘরে, ভাঁড়ারঘরে হুট হুট করে ঢুকে পড়তে পারে। মাছটা, দুধটা উলটে-পালটে খেয়ে ফেললেও কেউ জানতে পারে না। আমার মাসিকে অবশ্য তোমরা সবাই চেনো। অনেকে আদর করে ঘরে পোষ মানাও। ভালোবেসে ডাক দাও, 'মিনি-মিনি-মিনি!'

কিন্তু সে তো হল। এখন তো যা-হোক করে আমাকে রাজপ্রাসাদের ভেতরে যেতেই হয়। দেরি হয়ে গেলে, ছেলেটিকে হয়তো আর আস্তই রাখবে না। যেমন করে হোক তাকে বাঁচাতেই হবে। এখন ঝঞ্ঝাট আমার এই বেহালাটা নিয়ে। বাজনাটাকে কোথাও লুকিয়ে না রাখলে বাজনাটাও যাবে আর আমারও অসুবিধে। কিন্তু রাখি কোথায়?

এখানে দাঁড়িয়ে হঠাৎ সামনের দিকে নজর পড়তে দেখি, রাজপ্রাসাদের প্রায় সামনা-সামনি একটা বেশ উঁচু বাড়ি। ইচ্ছে করলে, এই বাড়িটার ছাতে উঠে পড়া যায়। সেই ভালো! রাতদুপুরে বাড়ির লোকজনেরাও সবাই ঘুমিয়ে আছে। এই তাল। আমি এগিয়ে গেলুম। সাঁই করে বাড়ির পাঁচিলে লাফ দিলুম। পাঁচিলের ওপর ডিঙি মেরে ছাতের ওপর টপকে উঠে পড়লুম। ছাতের এইখানে, এই কোণে বেহালাটা লুকিয়ে রাখলে কেউ দেখতে পাবে না। বেশ ঘুপচি। আমার মুখ থেকে নামিয়ে বেহালাটা এইখানেই রেখে দিলুম।

ছাতটা সত্যিই বেশ নির্ঝঞ্ঝাট। আমি এখানে দিনের পর দিন যদি ঘাপটি মেরে বসে থাকি তা হলেও কেউ দেখতে পাবে না। অথচ আমার সব কিছু দেখতে অসুবিধা নেই। অন্ধকারেও রাজপ্রাসাদটা বেশ স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, রাজপ্রাসাদের গা বরাবর একটা মস্ত ঝিল। জল চিকচিক করছে। অবশ্য দেখতে পাচ্ছি রাজপ্রাসাদের বাইরেটা। ভেতরে কী হয় না-হয় মা ভগাই জানে। কিন্তু মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে আছে। ছেলেটিকে ভেতরে নিয়ে গিয়ে কী করল কে জানে!

ঝটপট আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এসে গেল। মনে হল, অন্তত ওই ফটকের পাহারাদার দুটোকে যদি শেষ করে ফেলতে পারি, তাহলে ফটক পেরিয়ে প্রাসাদের ভেতরে তো ঢোকা যায়! কিন্তু আমি জানতুম না, ভেতরেও অগুনতি পাহারাদার। না-জেনেই আমি আবার ছাত থেকে লাফ মেরেছি। গুঁড়িশুঁড়ি মেরে ফটকের সামনে হাজির হয়েছি। ওরা তো আনমনে দাঁড়িয়ে আছে। আমায় দেখতে পাওয়ার সুযোগই দিলুম না। ধাঁই করে একটার ওপর মেরেছি লাফ। একটি থাপ্পড়েই বাছাধন ছিটকে পড়ে অক্কা গেল। আর একজন সেই দেখে পালাতে যাবে কী, আমি তার টুঁটিটা টিপে ধরতেই, তিনি আর মা বলবার সময়ই পেলেন না। দুটোকেই ওখান থেকে চটপট সরিয়ে ফেললুম। পাশের ঝিলটার মধ্যে টেনে নিয়ে ফেলে দিলুম। জলের ভেতর দুজনেই ডুবে রইল। দেখলুম, ঝিলের জল ওদের রক্তে লাল হয়ে উঠেছে। ওদের যেখানে মেরেছিলুম সেই রাস্তাটা, ফটকের সামনেটাও যে তাদের রক্তে লাল হয়ে-ছিল, সেটা অবশ্য আমি দেখবার সময় পাইনি। কেননা, ওদের ঝিলের মধ্যে ডুবিয়ে রেখেই আমি রাজপ্রাসাদের ফটকের মধ্যে ঢুকে পড়েছি। শ

ফটক ডিঙিয়েই দেখি, সামনে ইয়া লম্বা একটা চত্বর। এমন খোলামেলা যে গা-ঢাকা দেওয়া অসম্ভব। তার ওপর চত্বরেও দেখি, জনা পাঁচেক দস্যু বন্দুক নিয়ে ঘোরাফেরা করছে। দেখে মনে হল, আমি যে ওদের দুজন সঙ্গীকে খতম করে ফেলেছি, ওরা সেটা টেরই পায়নি। রাতটা অন্ধকার বলে তাই। তা না হলে জেনে রাখো, ওরা আমায় নির্ঘাত দেখে ফেলত! তারপর কী হত, সে তো বুঝতেই পারো! এগিয়ে যাওয়াটা ঠিক হবে বলে মনে হল না। অগত্যা আমি চত্বরের একটি কোণে জুজুবুড়ির মতো বসে রইলুম! দেখতে পেলুম রাজবাড়ির ওপর দিকে বারান্দাটা একদম ফাঁকা। ইচ্ছে করলে লাফ মেরে উঠে পড়তে পারি। ওখানে উঠে, লুকিয়ে থাকলে কেউ কিসসু বুঝতেই পারবে না। কিন্তু, আসলে আমি তো লুকিয়ে থাকতে আসিনি। ছেলেটিকে উদ্ধার করতে এসেছি। আশ্চর্য, তার তো কোনো পাত্তাই নেই!

এমন সময় হঠাৎ যেন বাইরে একটা কাক ডেকে উঠল। একটা ডাকল বলে সঙ্গে সঙ্গে আরও একটা ডাকল। তারপর এমনি করে একটি দুটি ডাকতে ডাকতে অনেক ক-টি কা-কা শুরু করে দিল। আমি একদম বুঝতে পারিনি, এতো তাড়াতাড়ি রাত কেটে ভোর হয়ে আসছে। এইরে! এইবারেই তো বিপদ! আমি এক্কেবারে বুদ্ধু বনে গেছি। আমার মাথায় একবারও এল না, রাতের অন্ধকার চিরটাকাল ধরে আকাশের গলা জড়িয়ে বসে থাকবে না। আলো আসবেই। না, আর বোধ হয় ছেলেটিকে বাঁচাতে পারলুম না। দিনের আলো স্পষ্ট ফোটার আগেই এখান থেকে কেটে পড়তে হবে। কিন্তু কোথায় যো কাটবো, জানি না।

ঠাকমার মুখে শুনেছি, শহরটা গাঁ-ঘরের মতো নয়। গাঁ-ঘরে লোকজন কম। গাছপালা, ঝোপঝাড় আছে। তবু লুকিয়ে থাকা যায়। কিন্তু শহরে সেটি হবার যো নেই। এক্ষুনি ঘুম ভাঙলেই সব হইহই করে বাইরে বেরিয়ে পড়বে। মাঠে, বাজারে লোকে লোকে ছয়লাপ হয়ে যাবে। আমি বেরিয়ে পড়লুম রাজপ্রাসাদ থেকে। ভাবলুম কী করি! ছুট দেব! কিন্তু ছুটবো কোনদিকে, কোথায় ছুটবো? রাস্তাঘাট কিচ্ছু চিনি না। আমার সব গোলমাল হয়ে যাচ্ছে। আমি এখন ভীষণ প্যাঁচে পড়ে গেছি।

বলতে বলতেই হাত-পা কেঁপে উঠল। সাংঘাতিক ব্যাপার। দেখি, রাস্তায় একটি-দুটি লোক হাঁটাহাঁটি শুরু করে দিয়েছে। এখানে দাঁড়িয়েই বা থাকি কী করে?

মাথায় যখন কোনো বুদ্ধি আসছে না, তখন যে বিপদ আমার ঘাড়ের ওপর এক্ষুনি লাফিয়ে পড়বে, সেটুকু বুঝতে পারছি। তাই আগু পিছু না ভেবে, যে-ছাতে বেহালাটা লুকিয়ে রেখে এসেছি, সেইখানেই আবার লাফিয়ে উঠে লুকিয়ে রইলুম। অন্তত এখনকার মতো তো থাকা যাক। তারপর দেখা যাবে।

ভাগ্যি ভালো যে, এই বাড়ির এখনও কারো ঘুম ভাঙেনি। তাই আমিও নির্ঝঞ্ঝাটে উঠতে পেরেছি। ছাতের ওপর উপুড় হয়ে বসে রইলুম।

১৩

দেখতে দেখতে আকাশ ফরসা হয়ে গেল। চারিদিকে লোকজন চলাফেরা শুরু করে দিল। কথা-কওয়া, চান-খাওয়া, অফিস-যাওয়া চালু হয়ে গেল। বোঝো এখন কাকে বলে ঠেলার নাম বাবাজি! তুমি হয়তো বলবে, 'কী দরকার ছিল তোমার অমন বাহাদুরি দেখানোর? ছেলেটার সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতিয়ে লাভটা কী হল? বাঘের ছেলে, বাঘের মতো, বাঘের বনেই থাকলে পারতে! এখন কেমন জব্দ!'

তা বলতে পারো জব্দ হয়েছি। তা নইলে বাঘ বলে বাঘ, সে কিনা ছাতের কোণে লুকিয়ে বসে আছে! লোকে শুনলে থু-থু করবে না? তা ছাড়া এই চৌদিক ফাঁকা ছাতের ওপর, একটা ধুমসো বাঘ কতক্ষণই বা চোরের মতো বসে থাকতে পারে? নিজেরই এখন নিজেকে ছ্যাঃ ছ্যাঃ বলে ভ্যাংচাতে ইচ্ছে করছে। ওদিকে যার জন্যে এতখানি ছুটে আসা, ধড়িবাজ দস্যুর দল এখনও তাকে আস্ত রেখেছে বলে মনে তো হয় না। কারণ, এখান থেকে বসে বসে রাজপ্রাসাদের মধ্যে কী হচ্ছে না হচ্ছে, তা জানার তো কোনোই উপায় নেই। তবে এখন এটাকে রাজপ্রাসাদ না বলে সিধেসিধি দস্যুপ্রাসাদ বলা ভালো। কেননা, প্রাসাদটা তো এখন রাজার নয়। রাজাকে বন্দি করে, রাজপ্রাসাদটা কেড়ে নিয়ে, গোটা রাজত্বটাই এখন হুড্ডা-গুড্ডা দখল করে বসে আছে। তাই বলতে পারো, এখন হুড্ডা-গুড্ডা এখানকার রাজা। তাই-ই হয়! তুমি ভালো হও, চাই নাই হও, তোমার বুদ্ধি থাকুক আর নাই থাকুক, তোমার কাছে বন্দুক, গোলা, কামান থাকলেই হচ্ছে। দুম-দাম, গুড়ুম-গুড়ুম ছুড়বে, দেখবে জবরদস্ত রাজা-উজিরও ল্যাজ নাড়তে নাড়তে তোমায় খাতির করবে। তোমাকে মাথায় নিয়ে নাচানাচি করবে।

এ-সব মানুষের বেলায়। তবে আমাদের ওটি পাবে না। ওই তো আমার বুড়ি ঠাকমা, ইচ্ছে করলে তো গায়ে পড়ে মানুষের সঙ্গে ভাব করতে পারত। করলে তা? উলটে মানুষের গুলিতে বীরের মতো প্রাণ দিল। আর আমি? আমার কথা ধরো। এইতো আমার পিঠে গুলির দাগটা এখনও দগদগে হয়ে আছে। ঠিক কথা, রক্ত পড়া থেমেছে, কিন্তু এখনও তো একটু একটু জ্বালা আছে। তাই বলে কি আমি পা জড়িয়ে মানুষের খোসামোদি করতে গেছি! বয়ে গেছে! আমি বাঘের ছা। ও ধাতুতে আমরা গড়া নই।

একটু একটু ঘুম পাচ্ছে। তার মানে আমার ভয় কেটে গেছে। তুমি দেখো, ভয় যখন পায়, তখন ঘুম পায় না। আর ঘুম যখন পায়, তখন ভয় পায় না। ঘুমের আর দোষ দেব কী! কাল রাত থেকে যা ধকল যাচ্ছে। মরতে মরতে বেঁচে গিয়ে, শেষে ছেলেটার পাল্লায় পড়ে এমন জড়িয়ে গেছি! জড়ানো উচিত ছিল না। কিন্তু বাঘ হলেও আমার তো একটু-আধটু দয়া-মায়া থাকতে পারে! মোদ্দা কথাটা ভুলো না কেউ, আমার জন্ম একটা খাঁটি আর সত্যিকারের রাজবংশে! তার মানে, আমাকে তুমি জানোয়ার বলতে পারো, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এটাও বলতে হবে, আমি বনের রাজা!

'দুম'--কী সাংঘাতিক শব্দ! ভাবা যায় না, এই সক্কালবেলা এমন একটা শব্দ আচমকা অমন করে ফেটে পড়বে। সত্যি বলছি, আমি চমকে উঠেছি। আমার বুকটা কেঁপে উঠেছিল ভয়ংকর। ছাতের আলসের পাশ দিয়ে উঁকি মেরে দেখি, ঘোড়ার পিঠে দস্যু। একাট বোমা ফেটেছে ঠিক রাজবাড়ির ফটকের সামনে। ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাক খেতে খেতে আকাশে উঠছে। সারাটা জায়গায় অন্ধকার। দেখো, রাস্তার লোকগুলো চিল-চেঁচাতে চেঁচাতে কী রকম পাঁই পাঁই করে ছুট দিয়েছে। আবার বোমা ফাটাল, 'দুম! দুম!' দস্যুর দল ঘোড়া ছুটিয়ে হল্লা শুরু করে দিল, 'হাট যাও হাটো, হাটো।' রাস্তার লোকেরা কোনো রকমে প্রাণ নিয়ে পগারপার! কী, ব্যাপারটা কী? তাহলে কি কাল রাতে যে দুটো পাহারাদারকে মেরেছি, তার খবর পেয়ে দস্যুর দল খেপেছে!

চক্ষের নিমেষে রাস্তাঘাট সব খাঁ খাঁ। যে যেদিকে পারল ভেগে পড়ল। ঘরদোর সব বন্ধ হল। ঘোড়সওয়ার দস্যুগুলো ঘোড়ার পিঠে লাফিয়ে তাণ্ডব নাচ শুরু করে দিল। ওদের হালচাল দেখে মনে হচ্ছে, যদি কেউ এদিকে আসে কিংবা যদি কেউ ঘরের জানলা দরজা খোলে তার বারোটা বাজিয়ে ছাড়বে। এ তো আচ্ছা রাজার রাজত্ব! বটেই তো! রাজত্বটা এখন কার দেখতে হবে তো! রাজার নাম, দস্যুসর্দার হুড্ডা-গুড্ডা।

আমি তো এতক্ষণ ধরে ছাতের ওপর চুপটি করে বসে ঘোড়ার পিঠে দস্যুগুলোর ছোটাছুটি দেখছিলুম আর ওই বোমা-ফাটানো ধোঁয়ার হাত থেকে নিজের চোখ দুটোকে সামলাচ্ছিলুম। কিন্তু হঠাৎ দেখি কী, ওই ফাঁকা রাস্তার ওপর ক-টা দস্যু বন্দুক-টন্দুক উঁচিয়ে এগিয়ে আসছে। কী রে বাবা! আমায় দেখতে পেল নাকি! আরও দেখি কী, দুজন ষণ্ডা-মার্কা দস্যু সেই ছেলেটিকে বেশ করে বেঁধে, টানতে টানতে রাজপ্রাসাদের ফটকের বাইরে নিয়ে আসছে। এতক্ষণ যে এতো বোমা ফাটাফাটি হল, কিংবা ঘোড়া ছোটাছুটি করল তাতে আমি একটুও ঘাবড়াইনি। কিন্তু হঠাৎ ছেলেটিকে অমনি করে ফটকের বাইরে আনতে দেখে, আমার পা থেকে মাথা অবধি ঠকঠক করে কেঁপে উঠল। আমি উত্তেজনায় দাঁড়িয়ে পড়লুম। আমার একটিবারের জন্যেও খেয়াল হল না, কেউ আমায় দেখে ফেলতে পারে। কিন্তু ভাগ্য বলতে হবে, তখনও পর্যন্ত আমায় কেউ দেখতে পায়নি। ছেলেটিকে টানতে টানতে নিয়ে এসে ওরা খোলা রাস্তায় দাঁড় করাল। আমি দেখলুম একজন বেশ লম্বা-চওড়া দস্যু ভীষণ হম্বিতম্বি করে ছেলেটির সামনে এগিয়ে আসছে। সবাই তাকে দেখে তটস্থ হয়ে সরে যাচ্ছে, সেলাম ঠুকছে। আমার মনে হল, ইনিই বোধ হয় হুড্ডা-গুড্ডা। ইনিই এখন রাজা।

রাজাই তো। তবে দস্যুরাজা। রাজার ইশারা মতো ছেলেটির সামনাসামনি, একটু তফাতে, একজন বন্দুক উঁচিয়ে দাঁড়াল। এবার আমার কাছে সব ব্যাপারটা জলবৎ তরলং। এখন ওরা ছেলেটিকে এই খোলা রাজপথে গুলি করে মারবে।

লোকটা বন্দুক উঁচিয়ে দাঁড়াতেই হুড্ডা-গুড্ডা চেঁচিয়ে উঠল, মানে হুকুম চালাল, এক, দো--

আমি তিন বলতে দিলুম না। আমি জানি, তিন বললেই বন্দুকে ছুটবে--গুড়ুম! আমার মাথায় নিমেষের মধ্যে একটা দুষ্টু বুদ্ধি খেলে গেল। তিন বলার আগেই পড়ি-মরি বেহালাটা তুলে নিয়ে বজিয়ে দিয়েছি, টুং-টাং-টিং! বেশ জোরেই তারে টান পড়েছে! হুড্ডা-গুড্ডা থমকে গেছে। মুখে কোনো কথা না বলে মিটমিট করে এদিকে-ওদিকে দেখতে লাগল। কিন্তু দেখবেই বা কাকে আর বুঝবেই বা কী! তাই আবার হাঁক দিল, এক, দো--

টুং-টাং-টিং।

হুড্ডা-গুড্ডার গলায় এবার মেঘ ডাকল, 'কৌন হ্যায়! বাজনা বাজায় কে?'

সেই ডাক শুনে তো ওর সাঙ্গোপাঙ্গদের মুখ শুকিয়ে আমচুর। সবাই ভয়ে ভয়ে এ-ওর চোখ চাওয়াচাওয়ি করছে। কিন্তু কিছুর হদিশই পাওয়া গেল না। হুড্ডা-গুড্ডা ভাবল, তার বোধ হয় নিজেরই শুনতে ভুল হয়েছে। তাই সে আবার হাঁক পাড়ল, এক, দো--

'হুজুর, বাঘ!' হঠাৎ একজন দস্যু ছাতের দিকে চেয়ে চিৎকার করল।

এই রে! আমায় দেখতে পেয়েছে!

আর দেখতে আছে! ওর মুখের কথা শেষ হতে দিলুম না। ছাতের ওপর বেহালাটা ফেলে রেখেই নিমেষের মধ্যে মেরেছি লাফ একেবারে সিধে হুড্ডা-গুড্ডার ঘাড়ের ওপর। ওর টুঁটিটা কামড়ে ধরে ঘাড়টা মটকে দিয়েছি। হুড্ডা-গুড্ডা মাটির ওপর চিতপটাং। তাই-না-দেখে আর সব দস্যুগুলো, 'মারে,' 'বাপরে' বলে যে যেদিকে পারল ছুট দিল। আমার সঙ্গে পারবে কেন? টপাস টপাস করে একটি একটি ধরছি, আর শেষ করছি। একেবারে লণ্ডভণ্ড। এমন হুংকার ছাড়ছি যে, বাছাদের সেই ভয়েই হাত-পা পেটের মধ্যে সেঁধিয়ে যাচ্ছে। আমি সব তছনছ করে দিয়েছি। কিন্তু সব ক-টাকে একসঙ্গে শেষ করি কী করে? এতো আর আমার একার দ্বারা সম্ভবও নয়। তখন দেখি কি, ছেলেটি নিজের বাঁধনটা কষ্টেসৃষ্টে খুলে ফেলেছে। একটা দস্যুর হাত থেকে বন্দুক ছিনিয়ে নিয়ে, দুমদাম সেও লেগে পড়ল। তাই-না-দেখে যে পারল, পালালো। যে সামনে পড়ল সে মরল। আমার কী লম্ফঝম্ফ তখন যদি দেখতে! সে যেন একটা সত্যি-সত্যি যুদ্ধক্ষেত্র। অন্তত হাজারটা দস্যুর দেহ মাটিতে পড়ে রক্ত-গঙ্গায় হাবুডাবু খাচ্ছে। আমিও ভীষণ হাঁপিয়ে গেছি। হাঁপাতে হাঁপাতেই তেড়েমেড়ে ছোটাছুটি করে খোঁজাখুঁজি করছি।

১৪

না, যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে। আর কাউকে দেখছি না। তবু আর একবার হুড্ডা-গুড্ডার দেহটার কাছে এগিয়ে গেলুম। বিশ্বাস নেই, বেঁচেও তো থাকতে পারে! পা দিয়ে ওর গলাটা চেপে ধরতেই, চোখ দুটো ঠিকরে এল। লোকটা একদম খতম।

কতক্ষণেরই বা ব্যাপার! এইটুকু সময়ের মধ্যে এখানে যে এমন সাংঘাতিক তুলকালাম কাণ্ড ঘটে যাবে, এটা আগে কে ভেবেছিল? দস্যুগুলো তো জানতই না। আমি-যে-আমি, ভাবতে পেরেছিলুম? এ যেন সেই বিনা মেঘে বাজ পড়ার মতন।

হঠাৎ এদিক ওদিক চেয়ে দেখি, ছেলেটি তো নেই! বোঁ করে আমার মাথাটা ঘুরে গেল। তা হলে কি ছেলেটিকে ওরা ছিনতাই করে নিয়ে পালালো! রাস্তাঘাট ফাঁকা। থাকলে দেখতেই পেতুম। এদিক ওদিক ব্যস্ত হয়ে খুঁজলুম। দেখতে পেলুম না। একবার রাজবাড়ির ভেতরটা তো দেখা দরকার! ভেবে রাজবাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়েছি।

কিন্তু তুমি বললে বিশ্বাস করবে না, দিনের আলোয় রাজবাড়ির ভেতরটা দেখে আমি এক্কেবারে ট্যারা হয়ে গেছি। কী বিরাট আর কী চমৎকার! এক-একটা চত্বর পেরিয়ে এক-একটা মহল। এক-একটা মহলে অগুনতি ঘর। সুন্দর সাজানো-গোছানো! ওরই মধ্যে হন-হনিয়ে হেঁটে হেঁটে আমি ছেলেটিকে খুঁজতে লাগলুম।

খুঁজে পেলুম না। খুঁজে পাওয়া সম্ভবও না। তবু খুঁজতে খুঁজতে যে-জায়গায় গিয়ে পড়লুম, দেখলুম সেখানে কয়েদখানা! সারি সারি গারদে দেখি, রাজার সেনারা বন্দি হয়ে আছে। আমি দূর থেকেই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখেছি। সামনে গেলে বাঘ দেখে যদি ওরা ভয় পায়!

হঠাৎ আবার বন্দুকের আওয়াজ--'গুড়ুম!'

আমি হকচকিয়ে গেছি! কী হল আবার! আবার বন্দুক ছোটে কেন? তখনই আমি হঠাৎ ছেলেটিকে দেখতে পেলুম। দেখলুম সে ছুটছে। হাতে বন্দুক। ছুটতে ছুটতে ও কয়েদখানার দস্যু পাহারাদারের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল। তার বুকে বন্দুক চালালো। ছেলেটি পাহারাদারের ট্যাঁক থেকে ঝটপট চাবির গোছাটা টেনে বার করে নিল। গারদের ফটকটা খুলে ফেলে 'বাবা' বলে চিৎকার করে উঠল। ওই গারদে দস্যুর দল ওর বাবাকে বন্দি করে রেখেছিল! ওর বাবার বুকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল ছেলেটি। আমি দূরেই ওদের চোখের আড়ালে দাঁড়িয়ে। আমি দেখতে পেলুম ওর বাবা ওকে বুকে তুলে নিয়ে গারদ থেকে বেরিয়ে আসছে। ছেলেটি বাবার গলা জড়িয়ে হাউ হাউ করে কাঁদছে। আমি এতটা দূর থেকে ঠিক দেখতে পাইনি, ছেলের কান্না দেখে ওর বাবার চোখেও জল এসেছিল কি না। তবে দেখলুম, ওর বাবা ছেলের হাত থেকে সেই চাবির গোছটা নিয়ে একটি করে কয়েদখানার সব ক-টি ফটক খুলে ফেলল। অমনি সেই বন্দি সেনারা আনন্দে চিৎকার করে কয়েদখানা থেকে বেরিয়ে এল দলে দলে। রাজপুত্তুরের জয়ধবনি দিতে দিতে খুশিতে নাচতে লাগল।

ওরা যখন আনন্দে দিশেহারা, আমি তখন মনে মনে ভাবলুম, আর তো এখানে থাকা ঠিক নয়! মানে মানে কেটে পড়তে হয়! নইলে মান রাখতে প্রাণ নিয়ে টানাটানি পড়ে যেতে পারে।

আমি কেটেই পড়লুম। আমি আবার পাশের বাড়ির ছাতে উঠে পড়েছি। বেহালাটা নিলুম। নিয়ে ভাবছি এখন কী করা যায়! ঝট করে একটা বুদ্ধি এসে গেল আমার মাথায়। আচ্ছা, এখন এ-বাড়ির ছাতে লুকিয়ে না থেকে রাজবাড়ির ছাতে উঠে পড়ল তো হয়! আমি তো জানি, এক্ষুনি ছেলেটি আমায় খুঁজবে!

বাঘ দেখে, দস্যু দেখে আর বোমা-গুলির দুমদাম আওয়াজ শুনে শহরের লোকেরা সেই যে ঘরে খিল এঁটেছে, আর বেরুবার নামটি নেই। রাস্তাঘাট খাঁ খাঁ করছে। যেন মরুভূমি! আমিও তাই এই তালে এই ছাত থেকে লাফ দিয়ে রাজবাড়ির পেছনদিকে ছুটে গেছি। রাজবাড়ির পেছনদিকের পাঁচিল বেয়ে, এক তালা, দো তালা টপকে টপকে যখন ছাতে পৌঁছোলুম, ভাগ্যি ভালো, আমায় কেউ দেখতে পায়নি! দেখবেই বা কেমন করে! তখন কয়েদখানা থেকে মুক্তি পেয়ে রাজার সেনারা, রাজবাড়ির দাসদাসিরা আনন্দে মশগুল যে! বাঘ নামে এই মস্ত জন্তুটার চেহারা তখন ওদের নজরেই পড়ল না। তা ছাড়া আমিও কী অত বোকা যে, চট করে ওদের দেখা দিয়ে বসে থাকি! আমি জানি কেমন করে খুব সাবধানে সবার নজর এড়িয়ে কাজ করতে হয়।

১৫

ছাতে উঠে কান পেতে শুনি রাজবাড়ির ভেতরে তখনও ভীষণ হইহল্লা চলছে। আমার তখন মনে হল, এখন একটু মজা করলে তো হয়! এই কথাটা ভেবেই আমি আবার বেহালা বাজাতে শুরু করে দিলুম। এবার টুং-টাং-টিং নয়। তুমি শুনলে অবাক হয়ে যাবে, আমি রীতিমতো সা-রে-গা-মা বাজাতে শুরু করে দিয়েছি। আর সেই সা-রে-গা-মা যতই ছড়িয়ে পড়তে লাগল, রাজবাড়ির হইহল্লাটা ততই থমকে থমকে থিতিয়ে এল। তারপর এক্কেবারে চুপ! আমি তখন ঠিক শুনতে পেলুম, বাজনাদারকে খুঁজে না পেয়ে ছেলেটি চিৎকার করছে, 'আমার বাঘ বাজনা বাজাচ্ছে। আমার বাঘ কোথায় গেল?'

আমি তো পাকা ওস্তাদের মতো একমনে বাজনায় মশগুল। এদিকে কখন যে বাবার হাত ধরে শহরের রাজপুত্তুর বনের রাজপুত্তুরের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, আমি তা টেরই পাইনি। ও ছুটে এসে, আনন্দে আমার পিঠের ওপর লাফিয়ে বসল। আমার পিঠের সেই গুলিবেঁধা জায়গাটা যদিও হঠাৎ একটু ব্যথিয়ে উঠেছিল, তবু আমি তাকে নিয়ে নাচতে শুরু করে দিলুম। তার হাতে বেহালাটা তুলে দিলুম। সে আমার পিঠে বসেই বাজনার সুর ধরল। আমি তাকে পিঠে নিয়ে তরতর করে সিঁড়ি বেয়ে ছাত থেকে নেমে এলুম। রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছি। ছেলেটি আমার পিঠে বসে বাজনা বাজায় আর আমি রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতে থাকি।

এতো চেনা বাজনার জানা সুর। এ শহরের সবাই তো আগে রাজপুত্তুরের বাজনা শুনেছে। তাই চেনা-চেনা বাজনা শুনে, চেনা মুখটি দেখার জন্যেই সবাই একটু একটু, দরজা ফাঁক করল। সবার চোখে বেবাক চাউনি! বাঘের পিঠে বসে রাজপুত্তুর! নিজেদের চোখকে নিজেরাই বিশ্বাস করতে পারছে না! এতদিন তারা হুড্ডা-গুড্ডার কবলে পড়ে কোনো রকমে দিন কাটাচ্ছিল। তাই আজ বাঘের পিঠে রাজপুত্তুরকে দেখে তারা বিশ্বাস করে কী করে?

তবু তাদের বিশ্বাস করতে হল। সর্বপ্রথম একটি ছোট্ট ছেলে বেরিয়ে এসেছিল রাস্তায়। আমার পিঠে রাজপত্তুরকে দেখে হাততালি দিয়ে চেঁচিয়ে উঠেছিল, 'মা, বাঘের পিঠে রাজপুত্তুর!' চেঁচাতে চাঁচাতে সে ছুটে এসেছিল রাজপুত্তুরের কাছে। অবাক কথা, বাঘ দেখে সে একটুও ভয় পায়নি! রাজপুত্তুর তাকে আমার পিঠে তুলে নিয়ে আবার বাজনা বাজাতে শুরু করল। সেই ছোট্ট ছেলেটি আমার পিঠে বসে বাজনার তালে তালে হাততালি দিতে লাগল।

দেখতে দেখতে চারদিক থেকে কাতারে কাতারে মানুষ ছুটে এল। কাতারে কাতারে মানুষ সেই বাজনার তালে তালে নচাতে শুরু করে দিল। নাচতে নাচতে আমার পিছু পিছু হাঁটা দিল। আমি দেখতে পেলুম, গোটা শহরটাই যেন আনন্দে উপচে পড়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছে আর আমার সঙ্গে নেচে নেচে হেঁটে চলেছে।

তারা আমার সঙ্গে রাজবাড়িতেই ফিরে এল। আবার তারা দেখতে পেয়েছে তাদের রাজাকে। আবার তারা রাজার গলায় মালা পারিয়ে দিল। রাজাকে নিয়ে আনন্দে মেতে উঠল।

রাজা সিংহাসনে বসলেন। দরবার ডাকলেন। দরবার ডেকে রাজা নিজের গলায় মালা আমার গলায় পরিয়ে দিয়ে বললেন, 'এ মালা আমার গলায় মানায় না। এ-মালা কেউ যদি পাবার যোগ্য হয় তো সে শহরের এই রাজা নয়, বনের এই রাজপুত্তুর। এই বাঘই আমাদের শত্রু হুড্ডা-গুড্ডাকে খতম করে, আমাদের সম্মান ফিরিয়ে এনেছে। সুতরাং মালা দিন এই বাঘকে।'

রাজার মুখের কথা শেষ হল না। বলব কী, অমন শয়ে শয়ে মানুষ ফুলের মালা নিয়ে আমার গলায় পরিয়ে দেবার জন্যে ছুটে এল। অত মালা আমার গলায় ধরবে কোথায়? একজন সিপাই ছুটে এল আমার কাছে। আমার গলায় একটি-একটি মালা পরিয়ে দিচ্ছে দেশের মানুষ, ও তখন একটি-একটি মালা খুলে নিয়ে পাশে রাখছে। আর কী হাততালি!

শেষ, আমি নিজেই ক্লান্ত হয়ে গেছি। যখন মালা দেওয়া শেষ হল, দেখলুম, দরবার ঘরটা উপচে গেছে ফুলে-ফুলে। আমার বেশ মনে আছে, সব-প্রথম আমার গলায় মালা পরিয়ে দিয়েছিল রাজা আর সব শেষে আমায় মালা দিয়েছিল রাজপুত্তুর। শ্বেত গোলাপের গুচ্ছ। ভারি মিষ্টি!

শুনলে অবাক হয়ে যাবে, রাত্রে আমার সম্মানে বসল এক বিরাট সভা। কত মানুষ সেখানে জমায়েত হল। কত জ্ঞানীগুণী, কত গণ্যমান্য। সক্কলে আমার গুণগানে পঞ্চমুখ। আমার এত তারিফ করতে লাগল তারা, মনে হল, আমি কি ঠিক অতটা পাবার যোগ্য!

সভার শেষে, আমাকে শোনাবে বলে রাজা নিজেই সেদিন বাজনা ধরল। সক্কলে গদগদ হয়ে বাজনা শুনছে আর থেকে থেকে 'আহা, উহু, ওহো' করে সভাকে মাতিয়ে রাখছে। আমিও বোকার মতো চেয়ে চেয়ে, তাদের সঙ্গে মনে মনে 'উহু, উহু' করতে লাগলুম।

কী সুন্দর করে সাজিয়েছে এই সভাটা! কত ফুল, কত রঙিন পতাকা। কত ফানুস উড়ছে, কত আলোর তারা! কেমন সব রং-বেরঙের পোশাক পরে সক্কলে এসেছে! কী রঙের বাহার! কী সুন্দর সুন্দর পোশাক! চোখ ধাঁধিয়ে যায়!

ধাঁধিয়ে গেল সত্যিই। আমার চোখ না, আমার মন। সকলের গায়ে ওই অমন সুন্দর সুন্দর পোশাক দেখে আমার এমন লজ্জা করে উঠল! ছিঃ ছিঃ ছিঃ! আমার তো গায়ে পোশাক নেই! রংচঙে না-ই বা হল, সাদামাটাও তো একটা থাকবে! এত সব রং-ঝলমল পোশাকপরা গণ্যমান্য মানুষের মধ্যিখানে আমি নির্লজ্জের মতো বসে আছি! আমি ন্যাং--

ছিঃ ছিঃ! কী লজ্জা, কী লজ্জা!

অধ্যায় ৬ / ৬
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%