শৈলেন ঘোষ

এক ছিল পুতুলওয়ালা। সে পুতুলনাচ দেখাত। নাচ দেখাত আর গান গাইত।
তার মাথা ভরতি চুল, ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া। ডাগর ডাগর চোখ, টানা টানা। ইয়া পেল্লাই গোঁফ, কাঁচা-পাকা।
রেশমি পোশাক ঝলমলানো, গায়ে দিত। লাল পাগড়ি চুমকি আঁটা, মাথায় দিত। নাগরা জুতো শুঁড় তোলা, পায়ে দিত।
সববাই বলে লোকটা ভেলকি জানে।
জানে হয়তো। নইলে হাত তো দুটো। দু-হাত দিয়ে নাচায় কেমন করে পুতুলদের অমনি? নাচ দেখলে কে বলবে পুতুল? পুতুল না তো, যেন সব সত্যি-সত্যি! জ্যান্ত-জান্ত!
বাজনা বাজল টুং টাং, পুতুলওয়ালার হাতের আঙুল নড়বে টুকটুক। অমনি পুতুলরা ঝুনঝুন নাচবে। গটমট হাঁটবে। টগবগ ছুটবে। অবাক কাণ্ড! অবাক বলে অবাক!
পুতুলওয়ালার অনেক পুতুল। কোনোটা টাট্টুঘোড়া টগবগ। তার পিঠে ঘোড়স-ওয়ার। কোনোটা হাঁসের ছানা প্যাঁক প্যাঁক। সাদা ধবধব। এক রাজা। তার মাথায় সোনার মুকুট। ময়ূরপঙ্খি নাও। তাতে আবার পাল তোলা পুতুল-হাতি, মাহুত-ছেলে, সিপাই-সেনা, বাঘ-সিংগী। উরি বাবা কত! বলে আর শেষ করা যায় না।
আর ছিল কে?
ছিল মিতুল।
নামটি মিতুল। ছোট্ট পুতুল। দুষ্টু-দুষ্টু চোখ। মিটিমিটি চাইবে। টুকটুকে ঠোঁট। মুচকি মুচকি হাসবে। ভারি দস্যি ছেলে! দেখলে আর চিনতে বাকি থাকে না!
নাচ যখন শুরু হয়, প্রথমে বাজনা বাজবে। তারপর আলো জ্বলবে। নাচতে নাচতে আসবে একটি মেয়ে-পুতুল। নাচন-নাচন মেয়ে। নীল-নীল আলো তার সারা অঙ্গে ছড়িয়ে পড়বে। কমলা রঙের শাড়ি তার ঝলমল করবে। মেয়ে নাচবে। খুশিতে দুলবে। ওমা! ঠিক তক্ষুনি মিতুল লাফিয়ে পড়বে নাচন-নাচন মেয়ের সামনে। কোথায় ছিল? ভেংচি কাটবে। মারবে ডিগবাজি, একটা-দুটো-তিনটে। তারপরে দেবে এক টান মাথার বিনুনি ধরে। কী দুষ্টু! মেয়ে নাচতে নাচতে চিৎপটাং! একী কাণ্ড! অমনি হাততালি। চেঁচামেচি। হাসিতে আকাশ ভরে যায়।
মিতুল না থাকলে কী নাচ জমে! মিতুল নেই তো নাচ কীসের! মিতুলের জন্যেই তো সবাই ছোটে নাচ দেখতে। মিতুল নেই যেখানে, মজা নেই সেখানে। মজা নেই তো হাসিও নেই। হাসি না থাকলে কি নাচ হয়!
ভারি মজাদার পুতুল এই মিতুল। হাড়গোড় যেন কিচ্ছু নেই। ডিগবাজি মারছে। গাছে উঠছে। লাফাচ্ছে। ছুটছে। বসছে। উঠছে। ঘুরছে। নাচছে। গড়াচ্ছে। যা খুশি তাই!
মিতুলের একটা খেলা ভারি মজার। ঘোড়া ছুটছে টগবগ টগবগ। মিতুল ছুটছে ঘোড়ার পিছু পাঁই পাঁই, পাঁই পাঁই। তিড়িং করে মারবে লাফ। ঘোড়ার ল্যাজটা ধরে ফেলবে। ল্যাজে ঝুলে সটান ঘোড়ার পিঠে। ওমা! দেখো, দেখো, ঘোড়ার পিঠে যে রাজকন্যা! লাল টুকটুক রাজকন্যা! রাজকন্যার গলায় হিরা মোতির মালা টুং টাং-টুং টাং বাজছে। এমন সময় মিতুল ঘোড়ার পিঠে চাপবে। চুপি চুপি আসবে পিছন দিকে। রাজকন্যার কানের কাছে মুখটি আনবে। তারপর এমন জোরে 'কু' দেবে যে কী বলব! আচমকা চমকে উঠে থমকে যাবে রাজকন্যা। টাল সামলাতে পারবে না। মারবে ঘোড়ার পিঠ থেকে ডিগবাজি মাটিতে। আহা-রে লেগেছে! বড্ড লেগেছে! লেগেছে তো বয়েই গেছে। মিতুল সটান দাঁড়িয়ে পড়বে ঘোড়ার পিঠের ওপর! নাচবে আর হাততালি দেবে। তার সেই নাচ যারা দেখবে, তারাও না নেচে থাকতে পারে!
দুচক্ষে দেখতে পারে না রাজকন্যা মিতুলকে। একদম না। মিতুল দুষ্টুমি করবে আর সবাই তাই দেখে হাসবে! মজা করবে! কেউ কিচ্ছু বলবে না! বা রে! রাজকন্যা ভাবে আর রাগে।
রাজকন্যা তো রাজকন্যা। তার দেমাক কত! মাটিতে পা পড়ে না। পড়বে কেন? যেমন তার দেহের গড়ন, তেমনি তার দুধের বরণ। প্রজাপতির পাখার মতো ফিনফিনে পোশাক তার গায়ে। রং-ছড়ানো! চোখ জুড়ানো! মুক্তা মানিক, পান্না চুনি ঝিলিক ঝিলিক। পায়েতে সোনার নূপুর ঝুনুঝুনু। আহা-রে! হাঁটতে যেন পারেন না। কইতে যেন জানেন না। যেন ফুলের ঘায়ে মূর্ছা যাবেন। পুতুল না তো, আহ্লাদি!
আর মিতুল? তার কী আছে? এই এক ইয়া লম্বা ইজের। ঢলঢলে। জামা ঢলঢলে। মাথায় একটা তালপাতার টুপি। ব্যস! চলবে গটমট। ছুটবে ছটফট। আর সব উলটাপালটা! গান গাইতে বললে কাঁদবে। কাঁদতে বললে হাসবে। হাসতে বললে ডিগবাজি খাবে। বেড়ে মজা তো! তাকে কিনা সবাই ভালোবাসে! তাকে দেখতেই সবাই আসে! হিংসেয় ফেটে পড়ে রাজকন্যা। তাই কথা বলে না মিতুলের সঙ্গে। চায় না তার দিকে। আড়ি।
মিতুল কিন্তু আড়ি-টারি ওসব জানে না। রাজকন্যা মুখটি ভার করলে মিতুল দেবে ভে^ংচি কেটে। আরও রেগে যাবে রাজকন্যা। আরও রাগবে মিতুল। রাজকন্যার গোমড়া মুখের চাউনি বেশ দেখতে লাগে মিতুলের। রাজকন্যা যদি পায় তো খুব মারে মিতুলকে! কিন্তু মারবে কী! মারতে এলে এমন মিষ্টি মিষ্টি হাসে মিতুল মুখের দিকে চেয়ে।
পুতুলওয়ালারও কী কম ভাবনা মিতুলের জন্যে! ভাবনাও যেমন, যত্নও তেমন। যত্ন না করলে মিতুলই বা পারবে কেন অত সইতে? পারবে কেন অত ছুটোছুটি লাফালাফি করতে? ওর বুঝি কষ্ট হয় না? হাজার হোক পুতুল তো!
কী সুন্দর তুলতুলে বিছানা মিতুলের। পাখির পালকের গদি। পালকের বালিশ। একটা মাথার বালিশ। দুপাশে দুটো। পায়ে একটা। আঃ! আরাম করে ঘুমোয় মিতুল রাত্তিরবেলা। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখে মিতুল। হয়তো ভাবে রাত যেন ফুরিয়ে না যায়। এমনি ঘুম ঘুম রাত, নিজঝুম।
না, রাত চলে যায়। সকালে সোনার আলো ছড়িয়ে পড়ে টুপটুপ করে মিতুলের দুটি চোখে। ঘুম ভেঙে যায় মিতুলের! আলোর দিকে চেয়ে থাকে মিতুল। সকালের আলো। আহা কী মিষ্টি সকাল! আজকের সকাল কি কালকের চেয়েও মিষ্টি! ভাবে মিতুল।
এমনি করে কত সকাল চলে গেল। ভাবতে ভাবতে। চলে গেল রোদ-ঝিলমিল দিন। দিনের পর মাস। তারপর বছর।
এক দেশ থেকে আর একে দেশে যায় মিতুল। নাচ দেখাতে। শহর থেকে গ্রামে যায়। গ্রাম থেকে গঞ্জে। গঞ্জ থেকে হাটে যায়। হাটের শেষে মেলা। কত টাকা! ঝন ঝন ঝন!
পুতুলওয়ালার ছোট্ট বাড়ি বড়ো হল।
আরও বড়ো।
অনেক বড়ো।
একশো টাকা দুশো হল।
হাজার হল।
লক্ষ লক্ষ।
এখন পুতুলওয়ালা মস্ত লোক। মস্ত লোক তাই ব্যস্ত লোক। কথা বলে না যখন-তখন। বললেও তা দেখেচিনে। কাজ করে না আগের মতন। করলেও তা একটি দুটি। করবে কেন? লোক গমগম বাড়িতে। বাড়ি ভরতি গাড়িতে। কাজ করে না। হুকুম করে। হুকুম করে, আঙুল নাড়ে।
হুকুম করে, একশো পুতুল দুশো করো।
দুশো হল। চারশো হল। পাঁচশো হল।
আর কি সেদিন অছে? সেই পুরোনো নড়বড়ে দিন! চলে গেল সেই দিনগুলি! একটি একটি। সেই খুশিমাখা মিতুলের দিনগুলি!
নতুন নতুন পুতুল এখন। তাদের চোখ জুড়ানো রং। নতুন নতুন নাচবে পুতুল। তাদের নতুন নতুন ঢং।
মিতুল এখন ফেলনা পুতুল। মিতুল আর নাচ দেখায় না।
কেন?
মিতুলের জামা কেটেছে পোকায়। ময়লা ধরেছে। টুপি ভেঙেছে। রং চটেছে। পালকের গদি গেছে। রেশমি চাদর গেছে। তার সঙ্গে আদর গেছে।
আদর গেছে মিতুলের। আদর গেছে রাজকন্যার।
রাজকন্যার ফিনফিনে পোশাক। তার রং ঝরেছে। রাজকন্যার গলার হার নতুন পুতুল গলায় দিয়েছে। তার পায়ের নূপুর, নতুন কন্যার পায়ে বেজেছে। ঘরের এক কোণে পড়ে থাকে মিতুল আর রাজকন্যা। ধুলোয়। কেউ দেখে না। কথাও বলে না। নতুন যারা এল তারাও না। পুতুলওয়ালাও না। পুতুলওয়ালা আসেই না এদিকে! তার অত সময় কোথায়? সময় কোথায় মিতুলের কথা ভাববার? রাজকন্যার কথা মনে রাখবার? ভাঙা পুতুলের কথা ভাবতে কার অত মাথাব্যথা পড়েছে? তাই পড়ে থাকে। পড়ে থাকে আর জুলজুল করে তাকিয়ে থাকে মিতুল আর রাজকন্যা।
ছোট্ট দুটি চোখ রাজকন্যার। ভারি মিষ্টি। একদিন চোখ দুটি জলে ভরে গেছিল রাজকন্যার। কেঁদেছিল লুকিয়ে লুকিয়ে। আর ভেবেছিল তাদের আদর গেল কেন? কেমন করে?
না, দেখতে পায়নি মিতুল। দেখতে পায়নি রাজকন্যার জলভরা দুটি চোখ। ইস। দেখলে কী লজ্জা! এখনও তো কথাই নেই রাজকন্যার মিতুলের সঙ্গে। দেখতে পেলে ভাবত কিছু। হাসত হয়তো। আহা রে! এখন যদি মিতুলের সঙ্গে রাজকন্যার ভাব থাকত!
মিতুল কিন্তু একদিন কথা বলেছিল। ডেকেছিল নামটি ধরে, 'রাজকন্যা।'
রাজকন্যা উত্তর দেয়নি। পারেনি উত্তর দিতে। লজ্জায় মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিল। খুব খারাপ লেগেছিল সেদিন মিতুলের।
সত্যি কেউ নেই আর। সেই পুরোনো দিনের বন্ধুরা কেউ নেই। আছে রাজকন্যা। সে-ও কথা বলে না। তাই একদিন মিতুল ভাব করতে গেল নতুন পুতুল টাট্টুঘোড়ার সঙ্গে।
মিতুল বলেছিল, 'টাট্টু ঘোড়া, টাট্টু ঘোড়া, আমার সঙ্গে ভাব করবে?'
টাট্টু ঘোড়া কথা বলেনি। ডেকেছিল, 'চিঁহিঁহিঁ!'
মিতুল আবার বলেছিল, 'টাট্টু ঘোড়া, টাট্টু ঘোড়া, আমার সঙ্গে খেলা করবে?'
টাট্টু আবার ডেকেছিল, 'চিঁহিঁহিঁ!'
মিতুল শেষবার বলেছিল, 'টাট্টু ঘোড়া, টাট্টু ঘোড়া, আমি তোমার পিঠে চাপব? তুমি ছুটবে?'
টাট্টু ঘোড়া আর একবার ডেকেছিল, 'চিঁহিঁহিঁ!'
তারপর মিতুল টাট্টুর গায়ে হাত দিয়েছে। উঠতে গেছে। ব্যস! টাট্টু মিতুলের পেটে মেরেছে এক লাথি। ধাঁই। মিতুল ছিটকে পড়েছে। সাত হাত দূরে। আচমকা। উঃ! কী জোর লেগেছে! আর একটিও কথা বলেনি মিতুল। ভাব করতেও যায়নি আর কারো সঙ্গে। আর যায়!
একদিন রাজকন্যা মনে মনে ভেবেছিল, 'আহা-রে! আমি যদি পাই তো রাজার কাছে যাই।'
তাই সে একদিন রাজার কাছে গেল। বলল, 'রাজামশাই, রাজামশাই, আমি রাজকন্যা।'
রাজা একবার বাঁ-চোখ ফিরিয়ে দেখল রাজকন্যাকে।
রাজকন্যা আবার বলল, 'রাজামশাই, রাজামশাই, আমি নাচতে পারি ঝুনঝুন, গাইতে পারি গুনগুন।'
রাজামশাই ডান চোখ ঘুরিয়ে দেখল রাজকন্যাকে।
রাজকন্যা শেষবার বলল, 'রাজামশাই, রাজামশাই, তোমার মুখে হাসি, দেখতে ভালোবাসি।'
'চোপরাও!' ওমা, ধমকে উঠল রাজা। হাসির বদলে খিঁচিয়ে উঠল রাজা! কোত্থেকে দুজন পলটন পুতুল এসে রাজকন্যার কান ধরল। হিড়হিড় করে টানতে টানতে রাজার চোখের সামনে থেকে সরিয়ে নিয়ে গেল। যাঃ! ফেলে দিল রাজকন্যাকে ঘাড় ধরে। মাটিতে।
সেইদিন থেকে রাজকন্যাও আর কারো সঙ্গে ভাব করতে যায়নি। চেয়ে চেয়ে দেখত দুজনে--মিতুল আর রাজকন্যা। দেখত নতুন নতুন পুতুলদের। আর ভাবত তাদের দিন গেল কেন? আর কি আসবে না ফিরে সেই আলো-ঝলমল দিনগুলি? আর কি আসবে না পুতুলওয়ালা তাদের আদর করতে?
এসেছিল পুতুলওয়ালা একদিন সেই ঘরে। একদিন সকালবেলা চোখ খুলে দেখেছিল মিতুল আর রাজকন্যা। ছোট্ট দুটি বুক খুশিতে উছলে গেছল। সাজানো সাজানো পুতুল। নতুন নতুন পুতুল দেখছে পুতুলওয়ালা। আরও কত লোক সঙ্গে। একটি একটি কথা বলছে। এক পা এক পা হাঁটছে। এটা ওটা করতে বলছে। আর ক-পা এলেই পুতুলওয়ালা দেখতে পাবে মিতুল আর রাজকন্যাকে। কতদিন পরে দেখবে পুতুলওয়ালা মিতুল আর রাজকন্যাকে। কত, কত দিন পর। দেখবে তার আদরের মিতুল আর রাজকন্যা ঘরের কোণে পড়ে আছে। কেউ দেখে না তাদের দিকে চেয়ে। কেউ বলে না একটি কথা! সবচেয়ে পাজি ওই দুটো লোক। ওই যে আসছে পুতুলওয়ালার পিছু পিছু! যেন কিচ্ছু জানেন না। ওরাই তো কেড়ে নিয়েছে সব মিতুল আর রাজকন্যার! দেখলে যা বকবে লোক দুটোকে। আঃ! তুলে নেবে বুকে পুতুলওয়ালা মিতুলকে আর রাজকন্যাকে। গালে এটা টুসকি মারবে মিতুলের। আর একটা রাজকন্যার। কত আদর করবে। ওঃ কী মজা! খুশিতে চেঁচাতে ইচ্ছে করছে মিতুলের। নাচতে ইচ্ছে করছে রাজকন্যার।
'এ দুটো এখানে কেন?' হঠাৎ ধমকে উঠল পুতুলওয়ালা।
চমকে উঠল মিতুল আর রাজকন্যা। তাকাল পুতুলওয়ালার দিকে। কটমট করে চেয়ে আছে তাদের দিকে পুতুলওয়ালা। পা দিয়ে ঠেলে দিল মিতুলকে। বলল, 'এ দুটোকে এখানে রেখেছ কেন? জঞ্জাল। ফেলে দিতে পার না?'
বুক কেঁপে উঠল। মিতুলের মনে হল পুতুলওয়ালার পা দুটো জড়িয়ে ধরে বলে, 'না, না, আমাদের ফেলো না। আমাদের থাকতে দাও।' বলবে কী! ততক্ষণে ঘরের জানলা দিয়ে রাস্তায় জঞ্জালের গাদায়। মুখ থুবড়ে পড়ে রইল মিতুল আর রাজকন্যা। চোখ ফেটে জল এল।
অনেকক্ষণ পড়ে রইল। কেউ দেখল না তাদের দিকে। কেউ জিজ্ঞেসও করল না তাদের কথা। কার আর বয়ে গেছে ওদের কথা জিজ্ঞেস করতে! অমন রাস্তাঘাটে কত কী পড়ে থাকে। কে দেখে চোখ ফিরিয়ে?
'মিতুল।' কে ডাকল যেন। চমকে চাইল। চাইল রাজকন্যার দিকে, অবাক হয়ে। কে ডাকছে তাকে? রাজকন্যা?
রাজকন্যাই ডাকল আবার, 'মিতুল।'
খুশিতে উছলে গেল মিতুলের বুকখানা। এত দুঃখেও মিতুলের চোখ দুটি যেন নেচে উঠল। আস্তে আস্তে এগিয়ে গেল মিতুল রাজকন্যার কাছে। গলাটি জড়িয়ে ধরল। চোখে জল রাজকন্যার। মিতুল বলল, 'তুমি কাঁদছ রাজকন্যা?'
রাজকন্যা বলল, 'আমায় কী আর ও নামে মানায় এখন? আমি তো আর রাজকন্যা নই। আজ থেকে আমি তোমার বন্ধু। আমায় অন্য নামে ডেকো।' গড়িয়ে গেল চোখের জল গাল দুটি বেয়ে রাজকন্যার।
ছোট্ট দুটি হাত দিয়ে মুছে দিল মিতুল রাজকন্যার চোখের জল। না, থাকতে পারল না মিতুল। তারও চোখ ছলছল করছে। জিজ্ঞেস করল, 'তবে কী নামে ডাকব তোমায়?'
রাজকন্যা বলল, 'যা খুশি।'
'তবে বোনটি বলে ডাকি?'
দুটি হাত দিয়ে গলাটি জড়িয়ে ধরল মিতুলের রাজকন্যা। বলল, 'ভাইটি আমার, তাই ডেকো।'
সকালের সূর্যি সোনার সব আলো যেন খুশির মতো ছড়িয়ে গেল। হাসিভরা মুখখানি মিতুলের উছলে গেছে। ভারি মিষ্টি লাগছে, সকালের রোদে। রাজকন্যা তাকে ভাই বলেছে! মনে হল খুব জোরে গান গেয়ে ওঠে মিতুল। মনে হল নাচে আজ সে সারাক্ষণ। খুশির নাচন। কিন্তু নাচবে কেমন করে? এই রাস্তায়? জঞ্জালে? রাস্তায় কি নাচা যায় এই সকালের রোদের আলোয়?
সেই আলো কই? সেই রং রং আলো? আলো আলো মিষ্টি! মানিকের বিষ্টি!
'মিতুল!' আবার ডাকল রাজকন্যা।
'কী বলছ বোনটি?' সাড়া দিল মিতুল।
'আমাদের কী হবে? এইখানে পড়ে থাকব? জঞ্জালে?'
মিতুল বললে, 'রাত না এলে যাব কোথায়? রাত এলে আমরা চলে যাব অনেক দূরে। যেখানে পুতুলওয়ালা নেই। পুতুলওয়ালার মতো মানুষ নেই। নিষ্ঠুর মানুষ।'
'রাত কি আসবে?'
'রাত আসবে। তারা উঠবে। তারা দেখে দেখে আমরা পথ চলব।'
'না মিতুল। রাত নয়। এখনই এখান থেকে চলে যাই।'
'কেউ দেখতে পেলে?'
'কে দেখতে পাবে? কাউকে দেখতে পেলে লুকিয়ে পড়ব। এই বিচ্ছিরি জঞ্জালে বসে থাকতে গা ঘিনঘিন করছে।'
মিতুল চুপিসাড়ে উঠে দাঁড়াল। কেউ না দেখতে পায়! সত্যি তারও ঘেন্না-ঘেন্না লাগছিল। এখানে না থাকাই ভালো। আড় চোখে দেখল মিতুল এদিক-ওদিক। না কেউ নেই। কাছেও নেই, দূরেও নেই। তাই হাত ধরল মিতুল রাজকন্যার। কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল, 'চলো বোনটি, পালাই।'
ছুটতেই যাচ্ছিল রাজকন্যা মিতুলের হাত ধরে।
'ঘেউ-ঘেউ-উ-উ!' আরি বাবা! একটা কুকুর ডেকে উঠেছে। থতমত খেয়ে গেল মিতুল আর রাজকন্যা। ছুটতে গিয়ে পা থামল। বুক ধুকধুক কাঁপতে লাগল। লুকিয়ে পড়ল। সেই জঞ্জালের গাদায়। কুকুরটা ডাকছেই--ঘেউ-ঘেউ-ঘেউ।
ঘড়-ঘড়-ঘড়। কীসের শব্দ আসছে না কানে?
হ্যাঁ তো রে! উঁকি মারল মিতুল। উঁকি মারল রাজকন্যা। একটা গাড়ি আসছে। গাড়ি টানছে জমাদার। রাস্তা সাফ করছে। রাস্তার ময়লা গাড়িতে তুলে নিচ্ছে। কী রে বাবা! ওই গাড়িতে তাদেরও যেতে হবে নাকি!
আর বলতে! সত্যি সত্যি গাড়িটা তাদের সামনে এসে দাঁড়াল। কী রকম দেখতে গাড়িটা! একটা চাকা। তার হাতল দুটো। ক্যাঁচ করে সামনে দাঁড়াতেই ছ্যাঁৎ করে উঠল রাজকন্যার বুকটা। জড়িয়ে ধরল মিতুলকে।
মিতুলের তো চক্ষুস্থির! কত বড়ো বড়ো চোখ রে বাবা জমাদারের! ড্যাবড্যাবে! মাথাটা এতখানি। হাঁড়ির মতন। ওদের সামনে গাড়ি থামিয়ে ফিক করে হেসে ফেলল। বাবা! দাঁত না-তো, যেন এক-একটা কুড়ুল! হাসছে কেন?
'বা-রে! বেশ তো পুতুল দুটো!' গলার কী আওয়াজ! যেন কোলা ব্যাঙের ঘ্যাং-ঘ্যাঙানি। ঘ্যাং-ঘ্যাং করেই চেঁচিয়ে উঠল লোকটা। খুশিতে চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে।
তুলে নিল মিতুলকে আর রাজকন্যাকে। নেড়ে নেড়ে দেখতে লাগল। নাচাতে লাগল। দোলাতে লাগল আদর করে। ধুলো ঝেড়ে দিল। জামার ধুলো। মিতুল আর রাজকন্যার জামা ছিঁড়ে গেছে। চেঁচিয়ে উঠল, 'কে এমন বেআক্কেলে রে? তোদের রাস্তায় ফেলে দিয়েছে? এমন সুন্দর পুতুল! দয়ামায়া নেই। ছ্যা ছ্যা! চ আমার সঙ্গে। আমার বাড়িতে চ। আমার সঙ্গে খেলবি। আমার বউ-এর কাছে থাকবি।'
জমাদার গাড়ির দু-হাতলে দু-জনকে বসাল। যেন ঘোড়ার পিঠে চেপেছে। খুশিতে দুলে গাড়ি ঠেলল জমাদার। গাড়ি চলল ঘড়ঘড়, ঘড়ঘড়। দুলতে লাগল রাজকন্যা আর মিতুল। এমন করে কোনোদিন তো গাড়ি চড়েনি তারা। এমনি হাতলে বসে! ভালো লাগছে। ভয়ও করছে। তারা যাচ্ছে কোথা? কোথা নিয়ে যাচ্ছে তাদের জমাদার? মিতুলও ভাবছে। ভাবছে রাজকন্যা। ভাবছে আর মাঝে মাঝে চাইছে এ ওর দিকে চুপি চুপি। আড় চোখে।
হঠাৎ জমাদার গান ধরল। হেঁড়ে গলায়। বাবা কী চীৎকার! একে কি গান বলে! গান না ছাই! পিলে চমকে যায়।
কেমন যেন ভালো লাগল লোকটাকে। ভালো লাগল মিতুল আর রাজকন্যার। বিচ্ছিরি দেখতে লোকটা। মনটা কী সুন্দর!
গাড়ির হাতলে চেপে ঘুরে বেড়াল মিতুল আর রাজকন্যা। অনেকক্ষণ। অনেকক্ষণ পর জমাদার ঘরে ফিরল। ঘরের দরজা ঠেলে ডাক দিল জমাদার, 'ও বউ, ও বউ কোথা গেলি? এই দেখ, তোর জন্যে কী এনেছি!'
বলতে বলতেই বউ বেরিয়ে এল। দেখেই তো পিলে শুকিয়ে গেল মিতুল আর রাজকন্যার। যত বড়ো নাক, তারে চেয়েও অনেক বড়ো একটা নথ নাকে। কানে দুটো এইসা বড়ো মড়ো মাকড়ি। হাতে মোটা মোটা বালা। পায়ে মল। পা ঠুকতে ঠুকতে বেরিয়ে এল। জিজ্ঞেস করল, 'কী এনেছিস?' বাবা! কী তিরিক্ষি মেজাজ।
জমাদার বউকে দেখতে পেয়ে এক গাল হেসে বলল, 'এই দেখ।' বলে মিতুল আর রাজকন্যাকে এগিয়ে দিল বউ-এর দিকে।
'পুতুল! কী হবে?' বউ ধমক দিল।
'আহা! অমন ধমক দিচ্ছিস কেন? শোন না। আমাদের তো ছেলেমেয়ে নেই। তাই তোর জন্যে নিয়ে এলুম। রাস্তায় পড়ে ছিল। দেখ, দেখ, কী সুন্দর! আমার ছেলে, আমার মেয়ে।' বলে জমাদার মিতুল আর রাজকন্যার গাল টিপল। আদর করল।
আর দেখতে হয়! জমাদারের বউ রেগে আগুন, তেলেবেগুনে। একেবারে চিলের মতো চেঁচিয়ে উঠল, 'চালাকির জায়গা পাওনি! রাস্তা থেকে দুটো পুতুল এনে বলে ছেলেমেয়ে! আমাকে কী ঠাউরেছিস? কচি খুকি, না রাস্তার ভিখিরি? যা ফেলে দিয়ে আয়। খবরদার ঘরে ঢোকাবি না। তাহলে তোর একদিন কী আমার একদিন!'
ধমক খেয়ে ভয় পেয়ে গেল জমাদার। আমতা আমতা করে বলল, 'আহা রাগ করছিস কেন বউ? একবার চেয়েই দেখ না! কী সুন্দর পুতুল! চোখগুলো দেখ। যেন আমাদের ডাকছে।'
কোথায় ছিল বউ। দৌড়ে এসে ছিনিয়ে নিল মিতুল আর রাজকন্যাকে জমাদারের হাত থেকে। ছুড়ে ফেলে দিল উঠোনে। রাগে গজরাতে গজরাতে বলল, 'ভীমরতি ধরেছে! যা চান করে খেয়ে নে। পুতুল নিয়ে খেলা। বুড়ো বয়সে মরণদশা!'
এবার আর থাকতে পারল না জমাদার। কী ভীষণ রেগে গেল! বউ-এর মুখের ওপর যে টুঁ শব্দ করে না, সে রেগে কাঁই! কী! তার পুতুলকে ছুড়ে ফেলে দিয়েছে! চেঁচিয়ে উঠল জমাদার, 'বেশ করেছি পুতুল এনেছি! তা বলে তুই ফেলবি কেন? তোর না ভালো লাগে, আমার কাছে থাকবে। খবরদার! যদি পুতুলের গায়ে হাত দিবি তো ঘাড় ধরে বার করে দেব!' বলে জমাদার মিতুল আর রাজকন্যাকে তুলে নিল আবার বুকে। আদর করল, 'কোথা লেগেছে রে? খুব লেগেছে?'
লেগেছিল। যা জোরে ছুড়েছে জমাদারের বউ। লাগবে না? ব্যথা ভুলে গেল মিতুল আর রাজকন্যা। আদরে। জমাদারের আদরে। নিজের বিছানায় বসিয়ে দিল জমাদার মিতুল আর রাজকন্যাকে। বাটি বাটি খাবার নিয়ে এল। ঘটি ঘটি দুধ নিয়ে এল। মিতুল আর রাজকন্যার জন্যে। খাবে কী! ওরা তো পুতুল। নোলায় জল আসছে খালি!
মিতুল আর রাজকন্যাকে নিয়ে জমাদারের সে কী খুশির দিন! কখনো গাইছে। কখনো হাসছে। নিজের মনে কথা বলছে। চেয়ে চেয়ে দেখছে মিতুল আর রাজকন্যা। ভাবছে, আহা-রে! লোকটা সত্যিই ভালো!
জমাদারের বউ সেই ধমক খেল, ব্যস! আর মুখে রা নেই। চুপচাপ। রাগছে। ভিতরে ভিতরে ফুলছে। মুখ দেখলেই বোঝা যায়। এমন করে মিতুল আর রাজকন্যার মুখের দিকে চাইছে মাঝে মাঝে। বুক শুকিয়ে যায়।
রাত্তির এল। আদরে আদরে ঘুমিয়ে পড়ল মিতুল আর রাজকন্যা। ঘুমুবে না? সারাদিন যা ধকল গেছে!
কোলের কাছে ঘুম পাড়িয়ে মিতুল আর রাজকন্যাকে জমাদারও ঘুমিয়ে পড়ল।
জেগে রইল জমাদারের বউ। কী যেন বুদ্ধি তার পেটে পেটে! কী সে ভাবছে, সে-ই জানে!
ঠিক তাই। শীত পড়েছে খুব। কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমোচ্ছে জমাদার অঘোরে। নাক ডাকাচ্ছে। বউ চুপি চুপি উঠল। উঁকি মারল জমাদারের মুখের দিকে। না, এখন আর ঘুম ভাঙবে না। চেপে ধরল মিতুল আর রাজকন্যার ঘাড় দুটো। ঘরের দরজা ঠেলে বাইরে এল। ছুড়ে দিল। দুজনে ধুপ ধুপ করে পড়ল রাস্তায়। ঘুম ভেঙে গেল আচমকা মিতুল আর রাজকন্যার। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল দুজনে মুখের দিকে। মিতুল হাত দিল রাজকন্যার মাথায়। জিজ্ঞেস করল, 'লেগেছে?'
অন্ধকারে ভালো করে দেখতে পেল না মিতুল। দেখতে পেল না রাজকন্যার চোখ দুটো। জল টলমল। মিতুলের আদরমাখা হাতখানি এত মিষ্টি! আগে তো জানত না রাজকন্যা। এত ভালো, এত লক্ষ্মী মিতুল! ছিঃ ছিঃ, তার সঙ্গে শুধুমুধু ঝগড়া করেছে এতদিন। মিথ্যে মিথ্যে হিংসে করেছে। মিতুলের হাতটা টেনে নিল রাজকন্যা। বলল, 'তোমার লেগেছে?' চোখ দিয়ে ক-ফোঁটা জল গড়িয়ে এল। টুপ টুপ। মিতুলের হাতে। মিতুল বলল, 'চল, এখান থেকে চলে যাই।'
'কোথায় যাবে?' জিজ্ঞেস করল রাজকন্যা। উঠে দাঁড়াল মিতুলের হাত ধরে। এগিয়ে চলল সামনে।
আলো নেই তো দেখবে কেমন করে? ছোট্ট ছোট্ট তারাগুলো কত ওপরে! ওখান থেকে কি আলো আসে? আহা-রে! একটি তারা যদি নেমে আসে মাটিতে! মিতুল আর রাজকন্যার হাত ধরে বলে, 'চল, তোমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাই।' তাহলে কেমন মজা হয়! আচ্ছা, আকাশে তো অত তারা। লক্ষ লক্ষ। একটিও তো আসতে পারে। আসে না কেন? ওরা কি দেখতে পায় না কত কষ্ট হচ্ছে মিতুল আর রাজকন্যার! না কি ওদের একটুও দয়া নেই শরীরে!
রাজকন্যা চলতে চলতে হঠাৎ থামল। চাপা গলায় ডাকল, 'মিতুল!'
'কী'?
'কীসে পা ঠেকল।'
'কই?'
'এই তো!' নীচু হয়ে বসল রাজকন্যা। অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে দেখতে লাগল।
'মিতুল!' আবার ডাকল রাজকন্যা। 'দেখ, দেখ কী রকম নরম।'
'কই দেখি।' হাত বুলিয়ে দেখতে দেখতে মিতুল বলল, 'নরম আবার গরম। গদির মতন। শুয়ে পড়লে কেমন হয়?'
রাজকন্যা বলল, 'বেশ হয়। যা ঘুম পাচ্ছে।' বলে রাজকন্যা আগেভাগে উঠতে গেছে সেটার ওপর। উঠেছেও। ওমা! তবু বুঝতেই পারেনি একটা ছাগলের ঘাড়ে চাপছে। ঘুমোচ্ছে ছাগলটা, সেও টের পায়নি। বসে পড়ল ছাগলের পিঠে রাজকন্যা। ডাকল, 'মিতুল এদিকে এসো।'
মিতুল করেছে কী, একেবারে আঁকপাঁকিয়ে উঠতে গেছে। দেখতে পায়নি ছাগলের নাকটা। ব্যস! নাকের ভিতর আঙুল ঢুকে গেছে। মিতুলের ছোট্ট হাতের আঙুল। 'ফ্যাঁচচচ'! আরে বাবা! এক বোম্বাই হাঁচি হেঁচে দিয়েছে ছাগলটা। নাকে যে সুড়সুড়ি লেগে গেছে! হেঁচেই মেরেছে লাফ, তিড়িং। 'ম্যাঁএÉÒ±এÉÒ±' করে ডাকতে ডাকতে মার ছুট। মিতুল তো সাত হাত দূরে ছিটকে পড়ল। আর রাজকন্যা? কাছেই ছিল নিম গাছ। একেবারে তার ওপরে। নিমগাছের মগডালে।
মগডালে পেঁচার বাসা। খাসা মৌতাতে বসেছিল ঠাকুরদাপেঁচা বাসায়। পড়বি তো পড় রাজকন্যা একেবারে তার ঘাড়ে। পড়েই জাপটে ধরেছে ঠাকুরদাপেঁচাকে। ভয়েময়ে। প্রথমটা ঠাকুরদাপেঁচা বুঝতেই পারেনি। থতমত খেয়ে গেছল। তারপর হেসে উঠেছে, 'ক্যাঁএ্যাঁএ্যাঁ।' কী হাসি! হাসতে হাসতে প্রাণ বেরিয়ে যাবার গোত্তর। হাসবে না? এমন ধরেছে রাজকন্যা ঠাকুরদাদাকে! কাতুকুতু লেগে গেছে যে। ঠাকুরদাদা হাসছে।
রাজকন্যাও ভয়েময়ে ততই জড়িয়ে জড়িয়ে ধরছে।
হাসতে হাসতে ঠাকুরদাদা গাছের ডালে ঝটাপটি লাগিয়ে দিল। 'ছাড়, ছাড়', চেঁচিয়ে উঠল ঠাকুরদাদা। কে কার কথা শোনে! আর থাকতে পারল না। রাজকন্যাকে পিঠে নিয়েই আকাশে উড়তে আরম্ভ করে দিল।
মিতুলের তো চক্ষু চড়কগাছ! পেঁচার বিটকেল হাসি শুনে আকাশে তাকাল। তাকিয়ে অবাক! বোনটি তার পেঁচার পিঠে গেল কী করে? মিতুল আকাশের দিকে চেয়ে ডাকল, 'বোনটি।'
কে শুনবে? রাজকন্যাকে পিঠে নিয়েই অন্ধকার রাত্তিরে আকাশে ছুটতে লাগল ঠাকুরদাপেঁচা। উড়ে উড়ে হাসতে লাগল বিটকেল সুরে।
রাজকন্যা উড়ছে পেঁচার পিঠে আকাশে। তাই দেখে দেখে মিতুল ছুটছে মাটিতে, ছুটছে আর ডাকছে, 'বোনটি।' উড়তে উড়তে পেঁচাও উড়ে গেল। আর ডাকতে ডাকতে মিতুলেরও ডাক ফুরিয়ে গেল। হারিয়ে গেল বোনটি। হারিয়ে গেল ভাইটি। যাঃ!
তবুও ছুটছিল মিতুল। একটা বনে এসে পড়েছে। রাত্তিরবেলা বুঝতেও পারেনি, চিনতেও পারেনি। চিনবে কী করে? মিতুল তো আগে বনবাদাড় দেখেনি। তাই ভাবল কী তো কী? বনের মধ্যে ঢুকে খুঁজতে লাগল রাজকন্যাকে। গভীর বন। ছুটতে লাগলো। ডাকতে লাগল, খুঁজতে লাগল। এতক্ষণ ধরে তবুও আলো দেখা যাচ্ছিল, একটু একটু। এখন একদম ঘুরঘুট্টি। আকাশও নেই। ছাই আলোও নেই। যেটুকু মিতুল দেখতে পাচ্ছে তা-ও আবছা-আবছা। ছুটছে। হোঁচট খাচ্ছে। আবার উঠছে।
ওমা! থমকে দাঁড়াল কেন মিতুল? ছুটতে ছুটতে?
'হুক্কাহুয়া!' কে ডাকল?
হুক্কাহুয়া এগিয়ে এল। মিতুলের পথ আগলে দাঁড়াল। মিতুল প্রথমটা থতমত খেয়ে গেছিল। ডাক শুনে। ভয় পেল না।
হুক্কাহুয়া সামনে দাঁড়াল মিতুলের। চোখগুলো বড়ো বড়ো করে বলল, 'কেরে তুই? ছোটো-খাটো, বেঁটে-খাটো, গেঁড়ি-মেড়ি-তেড়ি!'
হেসেই ফেলল মিতুল। গেড়ি-মেড়ি-তেড়ি! সে কী রে বাবা! অত দুঃখেও মজা লাগল, শিয়ালের কথা শুনে। বলল, 'আমি মিতুল, ছোট্ট পুতুল।'
'আয় তোকে খাই।' শেয়াল ধমকাল।
মিতুল বলল, 'ওমা! কেউ আবার পুতুল খায় নাকি! তুমি কী রাক্ষস!'
'কী আমায় রাক্ষস বললি। আমি রাক্ষস হতে যাব কী দুঃখে! আমি শেয়াল, হুক্কাহুয়া!'
'ও তুমিই বুঝি শেয়ালভায়া?'
অমন রাগে টকটক চোখ দুটো শেয়ালের, কেমন যেন ফস করে ঠান্ডা ঠান্ডা হয়ে গেল। ছেলেটা তাকে ভাই বলল! আহা-রে তাহলে তো ছেলেটা ভালো। তবুও মিথ্যে মিথ্যে রাগ দেখাল। গলাটা ভারী করে বলল, 'একা একা কোথা যাস? বাঘে খাবে যে!'
মিতুল ডাকল, 'শেয়ালভায়া, শেয়ালভায়া।'
আদরে গলে গেল শেয়াল ডাক শুনে। বলল, 'উঁ, উঁ!'
'আমার বোনকে দেখেছ?'
শেয়াল বলল, 'কেমন দেখতে, বোনকে তোর?'
'আমার মতো ছোট্ট, আবার আমার মতো বড়ো। আমার মতো পুতুল, আবার আমার মতো মানুষ।'
'দেখেছি।'
'কোথায় দেখেছ?' হাত বাড়িয়ে এগিয়ে গেল মিতুল।
'ঠাকুরদাপেঁচার পিঠে। উড়ে যাচ্ছে।'
'কোন দিকে?'
'উই দিকে', বলে শেয়াল সামনে দেখাল।
'আমি তাহলে ওই দিকে যাব।'
'কোথায় যাবি অন্ধকারে, বনবাদাড়ে?' বলে শেয়াল মিতুলের ছোট্ট হাতটা চেপে ধরল।
মিতুল বলল, 'অন্ধকারই হোক, আর বনবাদাড়ই হোক, বাঘই আসুক, কী সিংগীতে খাক, আমাকে যেতেই হবে। ও যে আমার বোন। হারিয়ে গেছে। খুঁজে বার করতে হবে না?'
শেয়ালটার মনটা যেন কেমন করে উঠল। বলল, 'কিন্তু খুঁজবি কোথায় বল তো? তা ঠাকুরদাপেঁচার পিঠে চাপল কেমন করে?'
মিতুলের কান্না পেয়ে গেল। বলল, 'জানি না।'
মিতুলের কান্না-কান্না চোখ দুটি শেয়াল স্পষ্ট দেখতে পেল। শেয়ালের মনটাও কেঁদে উঠল। বলল, 'রাতবিরেতে কোথায় খুঁজবি বল তো! কোনদিকে যাবে, কেউ বলতে পারে?' বলে একটু ভাবল শেয়াল। তারপর বলল, 'আচ্ছা, এক কাজ করো। এই রাস্তা ধরে সিধে চলে যা। খানিকটা গেলে একটা ভালুকের বাসা দেখতে পাবি। তাকে ভালো করে জিজ্ঞেস করবি। সে বলে দেবে।'
মিতুল বলল, 'শেয়ালভায়া তুমি সত্যি ভালো।' বলে মিতুল পা-টি পা-টি হাঁটল। এক-পা গেছে কী দু-পা গেছে, শেয়াল ছুট্টে তার সামনে এসে হাজির। কী ভাবল?
বলল, 'মিতুল-মিতুল ছোট্ট পুতুল, আমার পিঠে চাপো। আমি তোকে পৌঁছে দিই ভালুকের কাছে।'
মিতুলের মুখখানা উছলে গেল খুশিতে। বলল, 'সত্যি বলছ শেয়ালভায়া?'
শেয়াল বলল, 'একা একা কতক্ষণে যাবি? এইটুকু-টুকু পা ফেলে? তার চেয়ে চ আমার সঙ্গে।'
শেয়াল উপুড় হয়ে বসল। মিতুল পিঠে উঠল। শেয়াল ছুট দিল।
বাববারে বাবা! কী সব রাস্তাঘাট। এইখানটা উঁচু। ওই দিকটা নীচু। এই দিকটা বেঁকে গেছে। ওই পাশটা সিধে গেছে। ভয় করে।
ছুটতে ছুটতে শেয়াল বলল, 'কীরে মিতুল ভয় করছে?'
মিতুল বললে, 'তুমি তো আছ?' জিজ্ঞেস করল, 'আরও অনেক দূর যেতে হবে বুঝি?'
শেয়াল বলল, 'আর পোটাক।'
'সেখানে গেলেই ভালুক বলে দেবে?' মিতুল জিজ্ঞেস করল।
'বলে দেবে। চাইকি তোর বোনের কাছে পৌঁছে দেবে।'
'তাই বুঝি?' ভালুক বুঝি মন্তর জানে?
'জানে বোধ হয়।'
'তুমি জান না কেন?'
'শিখিনি বলে।'
'তোমার বুঝি শিখতে ইচ্ছে করে না?'
শেয়াল এবার থমকে দাঁড়াল। বলল, 'মিতুল, এবার নামতে হবে।'
মিতুল নামল। শেয়াল বলল, 'আমি আর যাব না। ওইদিকে গেলেই ভালুককে দেখতে পাবি। আমায় দেখলে তেড়ে আসবে।'
'কেন?'
'ওদের স্বভাবই অমনি।'
'তুমি আদর করে ডাকলেও তেড়ে আসবে? তাহলে আমাকেও যদি তেড়ে আসে?'
'না, তোকে কিচ্ছু বলবে না। তুই যে পুতুল!'
শেয়াল বলল, 'লক্ষ্মী মিতুল!' গালে একটা চুমু খেল মিতুলের। শেয়ালের চোখ দুটি ছলছল করে উঠল।
দাঁড়াল না মিতুল। হাঁটি হাঁটি পা পা করে একটু গেছে। দেখে কী, অন্ধকার কালো ঘুরঘুট্টি বন। বনের মধ্যে আরও কালো একটা কী দাঁড়িয়ে আছে! তার দিকে চেয়ে আছে। চমকে থামল মিতুল। ভাবল, এই বোধ হয় ভালুক।
মিতুলকে দেখে ভালুক রাগি রাগি গলায় হাঁকল, 'কে যায় রে কে যায়?'
মিতুল বলল, 'আমি যাই।'
ভালুক সাংঘাতিক ধমক দিয়ে বলল, 'আমিটা কে?'
'আমি মিতুল।'
'মিতুল! সেডা আবার কেডা?'
'আজ্ঞে আমি। আমায় তো আপনি চিনবেন না। আমি তো কোনোদিন আসিনি আপনার কাছে।'
'আজ এসেছিস কেন? আমার খিদে মেটাতে! আয়, তোকে গিলি!'
মিতুল বলল, 'ওমা! আমায় গিলবেন কেমন করে! আমি যে পুতুল। গলায় আটকে যাবো।'
'আয় তবে, তোকে ছেঁচি!'
'ছেঁচতে চান ছেঁচুন। কিন্তু আপনি কে জানতে পারলুম না তো?'
'আমি ভালুক।'
'ও আপনিই ভালুকদাদা?'
দাদা বলতে ভালুকের কোথায় রাগ থামবে, তা না, আরও রেগে গেল! বলল, 'এই আমায় দাদা বললি কেন রে!'
মিতুল উত্তর দিল, 'বারে! দাদা বলব না? আপনি আমার চেয়ে কত বড়ো! দেখুন না আমি কতটুকুনি। আপনি ফুস করলে, আমি হুস করে উড়ে যাব!'
'তবে দিই তোকে হুস করে উড়িয়ে!' তেড়ে এল ভালুকটা।
মিতুল বলল, 'দাঁড়ান, দাঁড়ান। তার আগে একটা কথা জিজ্ঞেস করব আপনাকে।'
'কী কথা? তাড়াতাড়ি জিজ্ঞেস কর।'
'আমার বোনকে না ঠাকুরদাপেঁচা পিঠে নিয়ে উড়ে গেছে। কোথায় গেছে জানেন তো বলুন না?'
'ও! সেটা তোর বোন বুঝি?' ভালুকটা কেমন গম্ভীর গলায় তাচ্ছিল্য করে হাসল।
মিতুল বলল, 'হ্যাঁ।'
'তবে আমি জানি না!' বলে ভালুকটা মুখ ঘুরিয়ে নিল।
'ভালুকদাদা, ভালুকদাদা, এই দেখুন না সারারাত ধরে তাকে খুঁজছি? আমায় দেখে আপনার দয়া হচ্ছে না! দিন না বলে!'
ভালুকটা চেঁচিয়ে উঠল, 'জানলেও বলব না!' বলেই মিতুলকে ফুস করে উড়িয়ে দিতে গেল।
ফুস করবে কী! কেমন যেন কাঁপতে লাগল ভালুকটা। কাঁপতে কাঁপতে পড়েই গেল। পড়ে গোঁ গোঁ করতে শুরু করে দিল।
মিতুল ভাবল, বাবা এ আবার কী! অসুখ-বিসুখ করল নাকি! সঙ্গে সঙ্গে গায়ে হাত বুলোতে বুলোতে জিজ্ঞেস করল, 'কী হয়েছে? কী হয়েছে ভালুকদাদা?'
কী আবার হবে? ভালুকদাদাকে জ্বরে ধরেছে। মিতুল আর অতশত জানবে কী করে? জানবে কী করে যে থেকে থেকে ভালুকের জ্বর হয়! তাই খুব আদর করে ভালুকের মাথায় গায়ে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল।
একটু পরেই জ্বর ছাড়ল। উঠে বসল ভালুক।
মিতুল ব্যস্ত হয়ে বলল, 'উঠবেন না। উঠবেন না। শুয়ে থাকুন। আমি গায়ে হাত বুলিয়ে দিই।'
ভালুকের কোথায় রাগ আর কোথায় কী! গলে জল। এতক্ষণ তিরিক্ষি গলায় বকাঝকা করছিল। এখন একেবারে ঠান্ডা! বেশ নরম গলায় বলল, 'বাঃ বেশ লক্ষ্মী ছেলে তো! চ তোর বোনকে খুঁজে দিই।' উঠে দাঁড়াল ভালুকটা।
মিতুল বলল, 'এ আবার কেমনতর অসুখ! এই হল, এই ভালো হয়ে গেল!'
ভালুক বলল, 'আমাদের জ্বর হলে অমনিই হয়। এই ধরল। এই ছাড়ল।'
মিতুল বলল, 'ভাগ্যিস জ্বর হওয়ার আগে আমায় গিলে খাননি! তাহলে হয়তো, জ্বর আর ছাড়তোই না। যা রাগ আপনার!'
'হেঁ হেঁ হেঁ, যা বলেছিস!' বলেই ভালুকটা কেমন হাসতে লাগল। হাসতে হাসতে নীচু হয়ে বসল। বলল, 'নে, আমার পিঠে চাপ।'
মিতুল পিঠে চাপতে চাপতে বলল, 'আপনি বুঝি জানেন, আমার বোনটি কোথায় আছে?'
'আমি জানি না, নেকড়ে জানে।'
'সে আবার কে?'
'তার কাছেই তোকে নিয়ে যাচ্ছি।'
ভালুক হাঁটা দিল, মিতুল দুলতে লাগল ভালুকের পিঠে বসে।
বেশ কিছুটা যাবার পর ভালুক থামল।
মিতুল জিজ্ঞেস করল, 'দাঁড়ালেন যে। আমার বেশ লাগছে। আপনার পিঠটা বেশ নরম!'
ভালুক বলল, 'নেকড়ের বাসা এসে গেছে। নেমে পড়।'
'এসে গেছে?' ভালুকের পিঠ থেকে নামতে নামতে জিজ্ঞেস করল মিতুল। ' কোনদিকে?'
'উই দিকে।'

'আপনি যাবেন না?'
'আমি গেলে তোর কাজ হবে না!'
'তবে গিয়ে কাজ নেই। আমি একাই যাচ্ছি।' মিতুল একা একা চলে গেল।
ভালুকটা মিতুলের দিকে চেয়ে দাঁড়িয়ে রইল। মায়া লাগছে ছেলেটার জন্যে। আহা-রে বেচারা রাতবিরেতে বোনকে খুঁজে বেড়াচ্ছে! বনে বনে।
দেখতে দেখতে মিতুল চলে গেল। ভালুকের চোখের আড়ালে। খানিকটা গিয়েই দেখে, কী ওটা? নেকড়েটা? তার চোখ দুটো জ্বলজ্বল। ঠোঁট দুটো খাই খাই। কান দুটো খাড়া খাড়া। দাঁতগুলো বার করা। মিতুলের দিকে চেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই প্রথম যেন ভয় ভয় করল মিতুলের। তবু সাহস এনে দাঁড়াল তার সামনে। বলল, 'নেকড়ে মামা, নেকড়ে মা--'
কথা শেষ করতে হল না।
'গাঁক!' কী বিকট হাঁক দিল নেকড়েটা। হাঁক দিয়েই লাফ দিল। একেবারে মিতুলের ঘাড়ে। মিতুল তো ছোট্ট। টুপ করে বসে পড়ল। আর নেকড়েটা শুকনো মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়েছে ধাঁই করে, মিতুল সঙ্গে সঙ্গে ভোঁ কাট্টা!
ভোঁ কাট্টা কী! বাঘ তো বাঘ, নেকড়ে বাঘ! ছাড়বার পাত্তর নাকি! উঠে পড়েই আবার লাফ। মিতুলের দিকে। মিতুলও গাছের আড়ালে লুকিয়ে পড়ল। নেকড়েটার মাথা ঠুকে গেছে। ঠুকবি তো ঠোক গাছের গুঁড়িতে। উঃ হু হু হু! কী জোর লেগেছে। লাগলে কী, উঠেই চরকি বাজি। গাছের চারদিকে ছুটোছুটি লাগিয়ে দিল। মিতুলও ছুটছে, লুকোচ্ছে। নেকড়েও ছুটছে, খুঁজছে। একেবারে লুকোচুরি খেলা। বনের ভিতর লুকোচুরি খেলতে ভারি মজা। মজা না ছাই! মিতুলের প্রাণ যায় যায়! নেকড়ের সঙ্গে পারা কি চারটিখানি কথা! এক গাছ থেকে আর এক গাছ। এক পাশ থেকে আর এক পাশ। সামনে থেকে পিছনে। ছুটছে। দাঁড়াচ্ছে। বসছে। হাঁপাচ্ছে। কতক্ষণ পারবে নেকড়ের সঙ্গে? ব্যস! নেকড়েটা ধরে ফেলেছে মিতুলকে। চেপে ধরেছে থাবা দিয়ে। মিতুলের দম বেরিয়ে যাবার গোত্তর!
ওমা! একী! একী! মিতুলের ভালুকদাদা এসে পড়ল কোত্থেকে? কোথায় ছিল?
লুকিয়ে ছিল। ঝাঁপিয়ে পড়ল একেবারে নেকড়ের ঘাড়ে। জাপটে ধরল। নেকড়ে ধাক্কা খেয়ে টাল রাখতে পারল না। টুক করে বেরিয়ে এল মিতুল। নেকড়ের থাবার ভিতর থেকে। তারপর যা লেগে যা ঝটাপটি। নেকড়েতে আর ভালুকে।
ঝটাপটি কামড়াকামড়ি। খিমচা-খিমচি। রক্তারক্তি। এ কামড়ায়, তো ও খামচায়। এ মারে, তো ও পড়ে। কী ভয়ংকর চিৎকার।
মিতুল বেরিয়ে পড়েছে। পড়েই ছুট-ছুট-ছুট। নেকড়ের চোখ তো! ঠিক দেখতে পেয়েছে! ভালুককে ছেড়ে মিতুলের দিকে ছুটল! ভালুক ঝট করে নেকড়ের ল্যাজটা টেনে ধরলে। আবার লেগে গেল ধাঁই ধপাধপ। মারল ঝটকা। ছুটল নেকড়ে। ছুটল ভালুক!
মিতুলও অনেকটা ছুটে গেছে। গেলে কী হবে? নেকড়ের দৌড়ের সঙ্গে পারবে কেন? মিতুল ছুটছে আগে আগে। নেকড়ে ছুটছে পাছে পাছে। সবার পিছনে ভালুকদাদা।
সামনে একটা বাঘ! এই খেয়েছে! গায়ে তার ডোরা ডোরা দাগ! বাঘবাবাজি আলিস্যি ভাঙছিল আনমনে। চেঁচামেচি শুনে পিছন ফিরে চমকে চাইল। চেয়েই দেখে তার পিছনে একটা ছোট্ট মতো মানুষ! দেখেই বাঘের চক্ষু ছানাবড়া। 'বাপরে' বলে ল্যাজ গুটিয়ে মার ছুট। ল্যাজ আর গুটোতে হল না! তার আগেই মিতুল বাঘের ল্যাজ ধরে ফেলেছে। ল্যাজে সুড়সুড়ি! মারল লাফ গাঁক করে! বন কেঁপে উঠল। মিতুলের বুকটা দুরদুর করে উঠল। তবু ল্যাজ ছাড়ল না। বাঘও ছুটছে। ল্যাজ ধরে, ল্যাজের ওপর বসে মিতুলও ছুটছে।
বাঘ ছুটেছে আগু আগু,
বাঘের ল্যাজে মিতুল বাবু।
নেকড়ে পিছে মারছে ছুট,
ছুটছে ভালুক থুপুস থুপ।
ছুট। ছুট। ছুট।
বাঘের সঙ্গে পারবে কেন? ছুটতে ছুটতে কে কোথায় পিছিয়ে গেল। ভালুকও রইল না নেকড়েও রইল না। শুধু বাঘের ল্যাজের ওপর বসে রইল মিতুল। চুপটি করে। বাঘ কিন্তু ছুটছেই।
যাঃ চলে থামে না তো! কতক্ষণ হয়ে গেল! কী বিচ্ছিরি গন্ধ। বাঘের গায়ের গন্ধ! মিতুল আর অতশত জানবে কেমন করে? জানবে কেমন করে যে এটা বাঘ! অন্ধকারে সামনে যা পেয়েছে তাই ধরে ফেলেছে। বাঘের গন্ধ এমন বিচ্ছিরি!
খুব বেঁচে গেছে কিন্তু মিতুল! নেকড়েটা আর একটু হলেই গিলে ফেলত! তখন কী হত? কোথায় থাকত মিতুল আর কোথায় তার বোনটি!
আশ্চর্য এই বনের জন্তুরা! কেউ মিতুলকে ভালোবাসল। আদর করল। তার বোনটিকে খুঁজে দেবার জন্য কত চেষ্টা করল। কেউ মারতে এল। কেন এমন হয়?
এ এক আচ্ছা ফ্যাসাদে পড়েছে মিতুল। কিছুতেই থামছে না কেন, এই ছুটন্ত জন্তুটা! সত্যি গায়ের গন্ধটা যাচ্ছেতাই। পেটের নাড়িভুঁড়ি বেরিয়ে আসে! নিজের নাকটাও যে চেপে ধরবে মিতুল তারও উপায় নেই। তাহলেই হাত ফসকে আলুরদম! লাফিয়ে পড়বে মিতুল? না, সাহস হচ্ছে না। কিন্তু কতক্ষণ এমনি করে থাকা যায়! এমনি করে বাঘের ল্যাজের ওপর বসে!
মিতুল আর থাকতে পারল না। ল্যাজ টেনে ডাক দিল, 'ওগো মশাই, থামুন।'
মিতুলের কথা শুনতেই পেল না বাঘটা।
মিতুল আবার ডাকল, 'মশাই, মশাই, থামুন। আমায় ছেড়ে দিন। আমি নেমে পড়ি। আপনার গায়ে বিচ্ছিরি গন্ধ!'
তবু শুনল না বাঘটা।
মিতুল ভাবল, আচ্ছা জ্বালাতনে পড়া গেল তো! এবার আর ডাকল না। এক রামচিমটি কেটে দিল বাঘের ল্যাজে। বাঘটা 'গাঁক-ক-ক' করে চেঁচিয়ে উঠল। ল্যাজটা পাক দিয়ে মারল এক ঝাপটা। মিতুল হুস! ল্যাজ ফসকে তিরের মতো আকাশে উড়ে গেল! বাববা ঝাপটার কী জোর!
মিতুল গাছের মাথা, গাছের ফল, গাছের পাতা, গাছের ফুলে ধাক্কা খেতে খেতে কোথায় যে গিয়ে পড়ল কেউ জানতেও পারল না।
রক্ষে! মিতুলের খুব একটা লাগল না। লাগবে না তো জানাই। অমন কত লাফ দিয়েছে মিতুল, যখন নাচ দেখাত! ফুঃ! এ তো কিছুই নয়! কিন্তু যারা কখনো মিতুলের নাচ দেখেনি, তারা ভাববে নিশ্চয়ই ওর দফা শেষ!
যতই হোক ভয় পেয়েছিল মিতুল। আচমকা ল্যাজের ঝাপটা খেয়ে ওর নিজেরই মনে হয়েছিল এই বুঝি শেষ।
না। যেখানে পড়ল মিতুল বনের শেষ সেদিকটা। উঠে দাঁড়াল। কেউ কোত্থাও নেই। চারিদিক নিজঝুম। নিঃসাড়! কেমন যেন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে মিতুলের। কিচ্ছু ভাবতে পারছে না। এতদিন ঘরের মধ্যে ছিল। কিচ্ছু জানত না। বাইরে এত গোলমাল! এত ঝামেলা! বিচ্ছিরি তো!
একটি পাখি ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে ডেকে উঠল। গাছের ডালে। চমকে চাইল মিতুল। হয়তো স্বপ্ন দেখছে পাখিটা। কী আরাম এই সময়ে যারা ঘুমিয়ে থাকে! মায়ের কোলের পাশে যদি ঘুমোতে পায় মিতুল চুপটি করে! দূর! মিতুল তো পুতুল। ওর আবার মা কোথায়?
সামনে ওটা কী? থতমত খেয়ে গেল মিতুল। একটা যেন বাড়ি-বাড়ি! তাই তো! বনের মধ্যে বাড়ি! কে করেছে রে বাবা!
এগিয়ে গেল মিতুল। বাড়িটার দিকে। ঝোপের মধ্যে যেন জুজুবুড়ি। মাথা মুড়ি দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দরজা জানলাগুলো বন্ধ। কী আছে ভিতরে? ঠেলা দিল মিতুল দরজাটা আস্তে আস্তে। হঠাৎ মনে হল তার বোনটিকে কেউ বন্দী করে রাখেনি তো এখানে? মিতুল আবার ঠেলা দিল। ঠেলা দেওয়ার যা বহর! একে তো ওইটুকুনি দেখতে। অতো বড়ো দরজা নড়েও না, চড়েও না।
না, দরজা ঠেলে ঢোকা যাবে না ঘুরতে লাগল বাড়ির চারপাশে। দেখতে লাগল বাইরে থেকে। কই, ঢোকার রাস্তা?
আচ্ছা, ওই নর্দমাটার ভিতর দিয়ে ঢোকা যায় তো! গুঁড়ি মেরে! হেঁট হয়ে দেখতে লাগল মিতুল! মাথাটা সেঁধিয়ে দিল নর্দমার ভিতরে। হামাগুড়ি দিল। বাঃ। একেবারে সরসর করে ঢুকে গেল মিতুল ভিতরে।
একটা অন্ধকার ঘর। ঘুরঘুট্টি। ওদিকটা ঝুঁকি দিল, কেউ কোত্থাও নেই। খাঁ খাঁ করছে।
হঠাৎ কীসে পা পড়ল? হোঁচট খেল মিতুল। আর একটু হলেই হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেছিল। বসে পড়ল মেঝেতে। মেঝেতে একটা মস্ত বড়ো পোঁটলা। কী বাঁধা আছে ভিতরে? টানাটানি লাগিয়ে দিল।
ফস করে খুলে গেল পোঁটলাটা। যাঃ। টুং টাং, টিংটিং, ঝুনঝুন, টুনটুন কত রকমের বাজনা বেজে উঠল। তারপর চোখের সামনে আলো-আলো-আলো। ঝিকমিক করে উঠল অন্ধকার ঘরটা। ঘর ভরতি ছড়িয়ে গেল, মণি-মুক্তা-চুনি-পান্না। এই সববনাশ করেছে!
অবাক! মিতুলের চোখ দুটি ঝলসে যাচ্ছে। অবাক চোখে চাইছে। আর ভয়ে বুকটা কাঁপছে। কী হবে এবার?
কী আর হবে? ঘরে কেউ থাকলে, তবে তো!
ঘরে কেউ নেই। তবে এ কি গুপ্তধন! বনের মধ্যে লুকানো আছে! হাতে নিয়ে দেখতে লাগল মিতুল। একটি একটি। ভাবতে লাগল, আহা-রে! তার বোনটি যদি থাকত! মানিক দিয়ে সাজিয়ে দিত!
ঘরটা মস্ত বড়ো। মিতুল স্পষ্ট দেখতে পেল। ঘরে পেল্লাই দেরাজ। তালা আঁটা। মোটা মোটা শিকল বাঁধা দেরাজগুলো। এক কোণে একটা নড়বড়ে খাট। বিছানা পাতা তিনটে বালিশ। খালি পড়ে আছে। আলনায় জামা ঝোলানো। কীসের যেন বাসা কড়িকাঠে! নোংরা। চামচিকে হবে হয়তো! আর ওটা? ওটা কী? ওরে বাবা! চকচক করছে একটা তরোয়াল। এই সেরেছে! এ কোথায় ঢুকেছে মিতুল!
দেওয়ালের গায়ে একটা টিকটিকি। টিকটিক ডেকে উঠল। ভাঙা দেওয়ালের গায়ে কালো ঝুল। বড়ো বড়ো মাকড়সা। মিতুলের মনে হল তবে কি এটা কোনো রাজার বাড়ি! অনেক অনেক কালের! ভাঙা পড়ে আছে! রাজার মুক্তা মানিক পান্না চুনির ধনদৌলত লুকানো এখানে! হবে হয়তো! কিন্তু মিতুলেরই বা কী হবে এত সব দামি দামি জিনিস নিয়ে? ও তো পুতুল! পুতুলের তো আর এসবের দরকার নেই! পুতুলের টাকাও চাই না। দামি দামি জিনিসও চাই না, খাওয়াও চাই না। কিচ্ছু না। শুধু আদর পেলেই হল। একটু একটু মিষ্টি মিষ্টি আদর, এখন তাদের কেউ আর আদর করবার নেই। কেউ না।
সত্যি সত্যি, তার বোনটি কোথায় গেল? রাজকন্যা পুতুলটি? আর কী কোনোদিন দেখা পাবে না তার মিতুল?
কীসের যেন একটা শব্দ এল! খস খস! কারা যেন আসছে! ফিসফিস! কারা যেন কথা বলছে! কান পেতে রইল মিতুল! হ্যাঁ তো রে! ঝন ঝন ঝন! বাইরের দরজাটা নড়ে উঠল। কী হবে এখন! কী করবে মিতুল? পালাবে?
ঘরের দরজা খুলে গেল। হুট করে। মিতুল চট করে লুকোতেও পারল না। পালাতেও পারল না। চুপটি করে বসে রইল মেঝের ওপর। এক কোণে। চারিদিকে ছড়ানো শুধু মানিক আর মানিক। মুক্তা আর সোনা।
তিনটে লোক ঢুকল! থমকে দাঁড়াল লোক তিনটে। হকচকিয়ে। তাড়াতাড়ি ঘরের আলো জ্বেলে দিল। মিতুলের চোখ ঝলসে গেল। কতক্ষণ আলো দেখেনি মিতুল! ভালো করে চেয়ে দেখতেই মিতুল আর মিতুল নেই। পিলে শুকিয়ে গেছে। আরে বাবা! কী ভয়ানক দেখতে তিনজনকে! মাথায় কালো-কালো ফেট্টি। মুখে কালো কাপড়। এমন করে বাঁধা, চোখ দুটি ছাড়া কিচ্ছু দেখা যায় না। গায়ে কালো কুচকুচে জামা। একেবারে হাঁটু পর্যন্ত। কোমরে একটা করে ছোরা! পিঠে মস্ত মস্ত বোঝা।
ব্যস্ত হয়ে উঠল লোক তিনজন। এসব ছড়াল কে ঘরে? মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে। ঘরের এদিকে চোখ ঘুরছে। ওদিকে চাইছে। কী ব্যাপার!
'ওই জানলাটা ঠেলে দেখ!' একজন আর আর একজনকে ফিসফিস করে বলল।
'জানলা বন্ধ।' উত্তর এল।
'দেরাজের পিছনটা টান।'
'পিছন খালি।'
'খাটের নীচটা?'
'উঁহুঁ, কেউ নেই!'
কেউ নেই তো পোঁটলা খুলল কেমন করে? এ কী ভেলকিবাজি! ভালো করে দেখা দরকার। এটা ঠেলে, ওটা টেনে একেবারে তছনছ করে ফেলল তিনজনে সারা ঘরটা। কিন্তু মিতুলকে কেউ দেখতেই পেল না।
একজন বলল, 'দেরাজ খুলে দেখ, সব ঠিক আছে কিনা!'
দেরাজ খুলে গেল।
আরে বাবা! দেরাজে ঠাসা ঠাসা কী ওসব? কত গয়না! হীরে জহরত! কী করে লোকগুলো এসব নিয়ে? কোথায় পেল এত সব!
না, ঠিক আছে। দেরাজ ভরতি আছে।
দেরাজ বন্ধ হয়ে গেল।
ভাবতে বসল তিনজনে। আচ্ছা মজা! ঘরের দরজা বন্ধ, দেরাজে চাবি বন্ধ অথচ ঘরে এসব ছড়াল কী করে? 'নিশ্চয়ই কেউ ঢুকেছিল।' একজন বলল। 'ঢুকেছিল তো কেউ কিছু নিল না! ধুৎ! ইঁদুর-টিদুরের কাণ্ড!'
পিঠের বোঝা খুলে ফেলল তিনজনে। একটি একটি করে তুলে ফেলল সেই মানিক-চুনি, হিরা-পান্না ঘরে ছড়ানো।
ঠিক তখুনি মিতুলের যেন মনে হল পাখি ডাকছে বাইরে। ভোর হয়ে আসছে হয়ত! ঘরের ভিতর থেকে তো আর বোঝা যায় না বাইরে আলো, না অন্ধকার!
এখন কী করবে মিতুল? কোথায় যাবে? যেমন করে এসেছিল ওই নর্দমার ফাঁক দিয়ে, তেমনি করে বেরিয়ে যাবে নাকি? না, দেখতে ইচ্ছে করছে মিতুলের। দেখতে ইচ্ছে করছে লোকগুলোর ব্যাপার-স্যাপার! দেখাই যাক না!
আলো নিভিয়ে দিল। কালো কাপড় সরিয়ে নিল মুখ থেকে। কালো ফেট্টি খুলে ফেলল মাথা থেকে। জামা খুলে শুয়ে পড়ল লোক তিনজন। তর সইল না। সঙ্গে সঙ্গে নাক ডাকতে শুরু করে দিল। কী রাক্ষুসে ঘুম রে বাবা!
মিতুলেরও যেন ঘুম-ঘুম পাচ্ছে। কিন্তু ভয়-ভয়ও করছে ঘুমোতে। যদি ঘুমিয়ে পড়ে অঘোরে? ঘুম না ভাঙে ঠিক সময়ে! তবে? না বাবা, দরকার নেই। তার চেয়ে জেগে বসে থাকাই ভালো ঘরের কোণে।
অবিশ্যি এখন আর তেমন অন্ধকার নেই। জানলার ফাঁক দিয়ে আলো এসে পড়ছে একটু একটু। সকালের মিষ্টি আলো।
ইচ্ছে হল একবার বাইরে ছুটে যায় মিতুল। সকালের আলোয় একবার ছুটে আসে। হয়তো শিশিরে টলমল করছে গাছের পাতা। ঝলমল নাচছে। টুপটাপ পড়ছে মাটিতে। ভেজা মাটির গন্ধ মিষ্টি লাগে? ভাবে মিতুল।
না বাবা, গিয়ে কাজ নেই। আবার যদি দেখতে পায় নেকড়েটা! তেড়ে আসে!
তাই গুঁডিশুঁড়ি মেরে আবার নর্দমায় ঢুকে পড়ল মিতুল। ওই নর্দমাটার ভিতর দিয়েই তো মিতুল এই ঘরে ঢুকেছে। লুকিয়ে, শুয়ে শুয়ে দেখতে লাগল বাইরেটা।
এখান থেকে বেশ দেখা যায়। আঃ, সকালের সূর্যি কোথায় উঠে গেছে! গাছের পাতায়-পাতায় একটি-একটি মানিক যেন দোল খাচ্ছে। কত বড়ো একটা প্রজাপতি! রং-মিষ্টি। পাখা দুটো দেখলেই পিঠে বসতে ইচ্ছে করে। মনে পড়ে মিতুলের সেই গল্পটা। প্রজাপতির সেই গল্প। কতদিন পুতুল নাচে এই গল্পটা দেখিয়েছে তারা। মনে পড়ে মিতুলের।
হাজার হাজার দস্যু এসেছে রাজবাড়ি লুঠ করতে। তারা রাজকন্যাকে চুরি করে নিয়ে যাবে। রাজকন্যা পাতালপুরীর স্বপ্নপুরীতে লুকিয়েছিল। লুকিয়ে থাকলে কী হয়? দস্যুদের যে সর্দার সে পাতালপুরীর সিংদরজা ভেঙে ফেলল। আটশো সিপাই তাকে রুখতে পারল না। মারতে পারল না। মারবে কেমন করে? তার সারা গায়ে লোহার বর্ম। হাতে তরোয়াল। মন্ত্র পড়া। যার গায়ে লাগবে নির্ঘাত মরণ।
দস্যুসর্দার পাতালে ঢুকে পড়ল। স্বপ্নপুরীর গোপন ঘরে ধাওয়া করল। আর তখন রাজকন্যা? দস্যুকে দেখতে পেয়ে 'মাগো' বলে মাটিতে আছাড় খেয়ে পড়ল। ঠিক তখুনি কোথায় ছিল রাজকন্যার ঘোড়া! রাজকন্যাকে পিঠে নিয়ে ছুট দিল। দস্যুসর্দার সে-ও ছুটল। হলে কী হবে? ঘোড়া ছোটে তিরের মতো। তাকে ধরতে পারবে কেন দস্যুসর্দার? ঘোড়ার সঙ্গে কে ছুটবে? দস্যুসর্দার তখন করল কী নিজের মন্ত্রপড়া সেই তরোয়ালটা মাটিতে খুব জোরে ঠুকে দিল। মাটি চৌচির। সঙ্গে সঙ্গে পাঁচটা ঘোড়া মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে এল। একটার জিন টেনে ধরল দস্যুসর্দার। পিছু নিল রাজকন্যার। ছুটতে ছুটতে ছুটতে কত বন পেরিয়ে গেল। কত পাহাড়। কত নদী। কত নগর, কত শহর। রাজকন্যাকে ধরতেই পারে না দস্যুসর্দার। থামল হঠাৎ দস্যুসর্দার। নামল ঘোড়ার পিঠ থেকে। মন্ত্র পড়া তরোয়াল দিয়ে নিজের ঘোড়ার গলাটা খান খান করে কেটে ফেলল। আর বলব কী, ঘোড়ার গলা দিয়ে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরোয় আর শয়ে শয়ে, হাজারে হাজারে সেনা বেরিয়ে আসে রক্তের সঙ্গে সঙ্গে। দস্যুসর্দার হুকুম দিল সেনাদের, 'ঘিরে ফেল রাজকন্যাকে।' অমনি হাজারে হাজারে সেনা ছুট দিল রাজকন্যাকে ধরবার জন্যে।
কত নগর ভেঙে চুর-চুর হয়ে গেল। কত বন মাটির সঙ্গে মিশে ধুলোধুলো হয়ে গেল। কত মানুষ মরল হাজারে হাজারে, লাখে লাখে। পুব কাঁপল। পশ্চিম কাঁপল। দক্ষিণ গমগম। উত্তর টলমল।
ঘিরে ফেলল তারা রাজকন্যাকে। আর নিস্তার নেই। কোথায় লুকাবে? কোথায় পালাবে?
ছুটতে ছুটতে রাজকন্যার ঘোড়া পথ হারাল। একেবারে দস্যুসেনার মুখোমুখি! হা-রে-রে-রে করে ছুটে আসছে তারা! এবার কী হবে?
ঠিক তক্ষুনি আকাশ ভরে গেল রঙে রঙে। কত রং। এত প্রজাপতি এল কোথা থেকে? সূর্যের আলোয়, আকাশের নীলে আর প্রজাপতির রঙে ঢেউ জাগাল। অবাক হল দস্যুর সেনারা! ছুটতে ছুটতে থমকে দাঁড়াল তারা। চমকে চাইল আকাশে। দেখল সবচেয়ে বড়ো যে প্রজাপতি, তার পাখায় চেপে রাজকন্যা উড়ে যাচ্ছে। হাজার হাজার প্রজাপতি তাদের রঙিন পাখার ছায়া মেলে রাজকন্যাকে আগলে আছে।
দস্যুসর্দার চেঁচিয়ে উঠল পাগলের মতো, 'পাকড়াও!'
তখন প্রজাপতিরা গান ধরল। আকাশের আলোয়। সামনে পাহাড়। ছুটল দস্যুসর্দার রাজকন্যাকে ধরতে। পাহাড়ের পাথর কেঁপে উঠল। প্রজাপতিরা নেচে উঠল। দুহাত ছুড়ে পাহাড়ের চূড়ার ওপর লাফিয়ে উঠল দস্যুসর্দার। গর্জন করে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে পা ফসকে গেল। গড়াতে গড়াতে একেবারে মস্ত খাদে। সেখানে গর্জন নেই। সেখানে চিৎকার নেই। সব নিশ্চুপ।
আকাশে খালি গান। প্রজাপতির গান। প্রজাপতির গান। প্রজাপতির গান শুনতে শুনতে রাজকন্যা ভেসে চলল হাওয়ায়-হাওয়ায়। যেতে যেতে হারিয়ে গেল রং। প্রজাপতির গান। হারিয়ে গেল রাজকন্যা। কোথায়? কেউ জানে না।
কেন জানি গল্পটা বেশ লাগে মিতুলের। ভালো লাগে একা-একা বসে বসে ভাবতে। মনটা নেচে ওঠে। কত ছবি! কত আলো! কত রং! সত্যি দস্যুকে জব্দ করতে ভারি মজা। একটা তরোয়াল নিয়ে বীরের মতো বুকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ো। তারপর লাগাও লড়াই। ভাবতেই মনটা শিউরে ওঠে।
শিউরে ওঠে মিতুল। হঠাৎ মনে হয় লোকগুলো দস্যু নয় তো! ওই তিনটে লোক। এতক্ষণ ভুলেই গেছিল মিতুল লোক তিনটের কথা। এক্কেবারে ভুলে গেছিল গল্পটা ভাবতে ভাবতে!
হ্যাঁ, হতে পারে দস্যু। তা না হলে এখানে লুকিয়ে থাকার কী মানে? এই নির্জন বনে, এই ভাঙা বাড়িতে? হয়তো সারারাত লুঠতরাজ করবে আর দিনের বেলা ঘুমোবে! দস্যু যদি না হবে তো, এত সোনা-রুপো এল কোথা থেকে এদের কাছে?
ঠিক কথা। ঠিক ভেবেছে মিতুল। ঘুম-চুপ-চুপ রাতে সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ে, ওরা তখন জাগে। অন্ধকার রাতে ওরা দরজা ভেঙে ঘরে ঢোকে। অন্যের জিনিস কেড়ে নেয়। কেউ যদি রুখতে আসে, কোমরের ছোরা দিয়ে তার বুকের রক্ত বার করে নেয়। ওদের দয়াও নেই, মায়াও নেই।
লোকগুলো এখনও ঘুমুচ্ছে। এখনও নাক ডাকাচ্ছে। নর্দমার ভিতর লুকিয়ে লুকিয়ে মিতুল স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে। একটা বুদ্ধি এল মিতুলের মাথায়। নর্দমা থেকে বেরিয়ে এল। মিতুল আবার ঘরে। একটা পোঁটলার মধ্যে হাত গলিয়ে দিল। এক মুঠো সোনায় বসানো পাথর নিজের পকেটে পুরে নিল। জানালার পাশেই একটা দেরাজ। দেরাজের পাশেই খাট। জানালার ওপরে উঠতে মিতুলের কষ্ট হল না। জানালায় উঠে দেরাজটা ধরে ফেলল। দেরাজের পিছন দিকটা মিতুলের পা রাখার মতো বেশ খাঁজ কাটা-কাটা। খাঁজে খাঁজে পা রেখে মাথায় উঠে পড়ল মিতুল। দেরাজের মাথায় বসে উঁকি মারতে লাগল ওই তিনটে লোকের দিকে।
তারপর?
'টকাস!' পকেট থেকে একটা পাথর বার করে একজনের মাথায় ছুড়ে দিয়েছে মিতুল।
'উঃ!' মুখে আওয়াজ করে লোকটা এপাশ থেকে ওপাশে ঘুরে শুল।
আবার একটু পরে 'টকাস!' আবার মেরেছে মিতুল।
'উঃ উঃ উঃ!' না, ঘুম ভাঙল না। আবার নাক ডাকাতে শুরু করে দিল।
'টকাস!' এবার একটা বড়ো পাথর ছুড়েছে মিতুল। পড়েছে মাথায়। ঝনঝন করে উঠল লোকটার মাথা। এক ঠেলা মারল পাশের লোকটাকে, 'এই।'
পাশের লোকটা তড়বড়িয়ে উঠল, 'কী রে?'
'মারছিস কেন?'
'কে মারছে?'
'তুই তো!'
'আমি? কেন মারব?'
'মারলি না?'
'স্বপ্ন দেখছিস। আমি ঘুমোচ্ছি দেখতে পেলি না?'
'স্বপ্ন দেখছিলুম! টকাস টকাস করে মারলি তুই। স্বপ্ন দেখলে কারো লাগে নাকি!'
'আচ্ছা নে বাবা! আর চেঁচাস না। ঘুমো।'
আবার দুজনে ঘুমিয়ে পড়ল।
হাসি পেয়ে গেল মিতুলের। একটু হলেই খিলখিল করে হেসে উঠত খুব রক্ষে! সামলে নিল। হাসির আর দোষ কী! যা করে ঘুমোচ্ছে লোক তিনটে। একজন চিত হয়ে পড়ে আছে। মুখখানা হাঁ করে। একজন আবার চোখ চেয়ে চেয়ে নাক ডাকাচ্ছে। আর একজনের পেট নাচছে।
আবার ছুড়ল মিতুল। এবার একটা পাথর। বেশ বড়ো। এই রে যা! হাঁ করা লোকটার মুখের ভিতর ঢুকে গেছে।
'খক খক খক!' ঘুম ভেঙে গেছে। কাশতে কাশতে দম আটকাবার জোগাড়!
আর দুজনেরও ঘুম মাথায় উঠে গেল। চমকে ধড়ফড়িয়ে উঠতে যাবে, আর 'ধাঁই।' কাশতে কাশতে লোকটা মেরেছে এক বিরাশি সিক্কার ঘুসি একজনের পিঠে।
'এই মারলি কেন?' যাকে মারল সে তেড়ে উঠেছে।
'আমার গালে তুই পাথর পুরে দিবি কেন?' রেগে লোকটার চোখ মুখ লাল।
'না জেনেশুনে যার তার নামে দোষ!' বলে সে-ও এক থাপ্পড় কষিয়ে দিল লোকটাকে। তারপর লেগে গেল ঝটাপটি। জাপটাজাপটি। কোস্তাকুস্তি। ঘরের ভিতর হুলস্থূল কাণ্ড!
দুজন লড়ছে, একজন থামাচ্ছে। ছাড়িয়ে দিচ্ছে। কে কার কথা শোনে! ঘরের মধ্যে তুলকালাম! দুজনের গায়ে কী জোর! ও ফেলছে একবার। এ উঠছে একবার। ও মারছে ঢুঁ। এ মারছে গোঁত্তা!
দেখেশুনে মিতুলের চক্ষু চড়কগাছ। কী হবে? লড়াই থামবে না তো! এই রে বোধ হয় দুটো লোকই মরবে! মুখ ফসকে গেল মিতুলের। ওই দেরাজের মাথার ওপরে বসে চেঁচিয়ে ফেলল, 'ও মশাই। থামুন, থামুন!'
কথা বলেই জিভ কেটেছে মিতুল। সববনাশ! কী হবে এখন?
আর হবে! কোথায় লড়াই, আর কোথায় কী! চমকে গেল তিনজনে। মুখ শুকিয়ে আমসি! ফ্যালফ্যাল করে চয়ে রইল এ ওর মুখের দিকে।
'কে কথা বলে?' একজন চাপা গলায় জিজ্ঞেস করল।
চটপট ছোরা তিনটে হাতে নিল তিনজনে। একজন দেরাজের পিছনটা উঁকি মারল।
'পিছনে নয়। ওপরে।' আর একজন বলল।
বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল মিতুলের। এইরে! মিতুল তো ওপরেই বসে আছে। যদি দেখে লোকগুলো।
দেখল ওপরে। কিন্তু মিতুলকে দেখতেই পেল না। দেরাজটা নিয়ে টানাহ্যাঁচড়া লাগিয়ে দিল। মিতুল আর একটু হলেই পড়ে গেছিল বেটক্কা। মাথায় একটা বুদ্ধি এসে গেল মিতুলের। চেঁচিয়ে উঠল, 'দেরাজ টানলে কী হবে? আমি বাইরে।'
মিতুলের তো সরু গলা। কথা শুনলে কে বলবে বাইরে না ভিতরে? লোক তিনটে থতমত খেয়ে থমকে দাঁড়াল। একজন তাড়াতাড়ি দরজাটা খুলতে গেল। আর একজন ধাঁ করে চেপে ধরল তাকে। ইশারা করল, 'খুলিস না।'
'কেন?'
'ভালো করে দেখ আগে।'
'আমার হাতে ছোরা আছে তো!'
'কজন আছে না দেখলে বিপদ হবে!'
'তাই দেখ তবে।'
কথাগুলো মিতুলের কানে ফিস ফিস করে পৌঁছে গেল। একটা লোক দরজা খুলল। আস্তে আস্তে। খুব আস্তে। যেন শব্দ না হয় একটুও। একটু ফাঁক করল দরজাটা। আর একটু। উঁকি মারল। দরজার ফাঁক দিয়ে বাইরে। ঠিক তখনি মিতুল সাড়া দিল, 'টুকি!'
'দড়াম।' কী জোর দরজাটা বন্ধ করল লোকটা ভয়েময়ে। ধড়াস ধড়াস করে বুক উঠছে নামছে। ঠকঠক করে কাঁপছে। খিল এঁটে দিল।
'একজনকে দেখলি?' আর একজন জিজ্ঞেস করল।
'একজনকেও না।'
'তবে দরজাটা না খুলে জানলাটা ফাঁক করে দেখ।'
জানলাটা খুলল। একটুখানি। আরও একটু। সবটা। যাঃ চলে! কেউ কোত্থাও নেই।
'কইরে! কেউ তো নেই!'
'তবে চ দেখি বাইরেটা! দরজা খোল।'
'খুলবি?'
দরজা খুলে গেল।
একটুখানি উঁকি। তারপর এক পা। তারপর পা পা। তারপর একেবারে বাইরে।
এই তাল। সঙ্গে সঙ্গে মিতুল লাফিয়ে পড়ল দেরাজের মাথা থেকে। একেবারে বিছানায়। সামনেই কালো কালো জামাগুলো ঝুলছে। লম্বা। হাত দিয়ে ধরে ফেলল মিতুল একটা জামা। তারপর জামা ধরে ঝুলে পড়ল। তালগাছে ওঠার মতো ওপরে উঠতে উঠতে একটা জামার পকেটে ঢুকে পড়ল। উরিববাস! কত বড়ো পকেট। গা-হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়া যায়। নাচানাচিও করা যায়। না বাবা, নাচানাচি করে কাজ নেই! চুপটি করে বসে রইল মিতুল। বসে থাকতে থাকতে ঘুম ঘুম আসছে মিতুলের। হাই উঠছে। ঘুমিয়ে পড়ল মিতুল পকেটের মধ্যে। তারপর আর কিচ্ছু জানে না।
অনেকক্ষণ মিতুল ঘুমিয়ে ছিল। কতক্ষণ আর জানবে কেমন করে? জানবে কেমন করে দিনের আলো চুপি চুপি কখন ঘরে চলে গেছে।
ঘুম ভাঙতেই আবার উঁকি মারল মিতুল পকেটের ফাঁক দিয়ে। আলো জ্বলছে ঘরে। মোমের আলো। আলো ছড়িয়ে পড়েছে সারা ঘরে। কিন্তু ঘরে তো কেউ নেই। কাউকে দেখতে পাচ্ছে না মিতুল। কোথায় গেল লোক তিনটে। পকেটের ভিতর থেকেই মুখ উঁচিয়ে দেখল মিতুল। বেরুতে সাহস হচ্ছে না। যদি কেউ থাকে! দেখতে পায়!
কেউ আছে নিশ্চয়ই। নইলে আলো জ্বলছে কেন? ঘরের বিছানাগুলো এলোমেলো ছড়ানো। দরজাটাও ভিতর থেকে খিল আঁটা। দেরাজগুলোও তেমনি তালা বন্ধ। একটা দেরাজের ঠিক পাশে কুলুঙ্গি। কী সব সাত সতেরো জিনিস ভরতি রয়েছে কুলুঙ্গিতে ঠাসা ঠাসা। কুলুঙ্গির ঠিক ধার ঘেঁষে একটা সিন্দুক।
আরে! চমকে উঠল মিতুল। সিন্দুকের মাথার ওপর ওটা কী? তাইতো!
ওমা! একটা লোক! লোকটা সিন্দুকের মাথার ওপর বসে দিব্যি ঘুম দিচ্ছে! কী ব্যাপার! বিছানা থাকতে সিন্দুকের মাথায় কেন? পাগল নাকি?
পাগল নয়। মিতুল তো জানে না। আজ ও ঘরের পাহারাদার, দুজন গেছে বাইরে। লুঠপাট করতে। বসিয়ে রেখে গেছে ওই লোকটাকে। সকালে যা কাণ্ড হয়ে গেল! তারপর কেউ ঘর খালি রেখে যায়!
কিন্তু খুব পাহারাদার! বেমক্কা ঘুমোচ্ছে! একেবারে সিন্দুকের মাথায়! ঘুমোবার আর জায়গা নেই?
এবার আস্তে আস্তে বেরিয়ে পড়ল মিতুল পকেট থেকে। টুক করে নীচে লাফিয়ে পড়ল। মাথায় একটা বুদ্ধি এসেছে মিতুলের। একটা ছোট্ট কাঠি খুঁজে নিল মিতুল। সিন্দুকটা তো অনেক নীচু, উঠতে একদম কষ্ট হল না। চুপি চুপি লোকটার পাশে গিয়ে বসল। খুব সাবধানে কাঠিটা নিয়ে একেবারে লোকটার নাকের ভিতর গুঁজে দিল।
'হ্যাঁচ্চো-ও-ও-ও!' আরে বাবা! কী বাজখাঁই হাঁচি! পিলে ফেটে যাবার গোত্তর! হাঁচির ধাক্কায় সিন্দুকের ওপর থেকে ডিগবাজি মারল মিতুল! লোকটা কেমন চাইল বোকাবোকা! একবার এদিকে দেখল। একবার ওদিক। মিতুলকে এবারও দেখতে পেল না। ঘুম-চোখ যে! আবার ঘুমোবার জন্যে চোখ বুজল।
মিতুল সামলে নিল নিজেকে। উঠে দাঁড়াল। একটা বেশ লম্বা সুতো বার করল খুঁজে খুঁজে। এবার আর সিন্দুকের মাথায় উঠল না। সুতোটা নিয়ে লোকটার কাপড়ের খুঁটের সঙ্গে বাঁধল। নীচে সিন্দুকের পিছনে লুকিয়ে পড়ল। লুকিয়ে লুকিয়ে সুতোয় টান দিল টুক টুক। ছেলের সাহস দেখো।
লোকটা প্রথমে বুঝতে পারেনি। ঘুমোচ্ছে তো! একটু পরে সুড়সুড়ি লেগেছে। ঝট করে ঘুম ভেঙে গেল। ভাবল আরশোলা নাকি! ঘুম-চোখে হাত বাড়াল। ধরবে আরশোলা। আর ধরবে! দেখে তো চক্ষু ছানাবড়া! আরে ব্যাস! কাপড়টা যে তালে তালে নাচছে! কোথায় ঘুম আর কোথায় কী! 'ওরে বাপরে' বলে সিন্দুকের ওপর থেকে মারল এক লাফ! হুড়মুড়, দুড়মুড়, দুদ্দাড় করে ছুট। বেসামাল! মোমবাতিটায় পা লেগে গেল। ব্যস! দপ! নিভে গেল মোমবাতিটা। লোকটা অমনি 'ওরে বাবারে, মরে গেলুমরে' বলে মরণকান্না শুরু করে দিল। কী চিৎকার! কান ফেটে যাবার গোত্তর! কাছেপিঠে তো জন-মনিষ্যি নেই, কে শুনবে? বাবা! এত বড়ো একটা ধুমসো লোকের কী ভয়! ভেবেই অবাক মিতুল। মিতুলের তো ভয় করছে না।
লোকটা ঘরের দরজা খুলতে গেল চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে। মিতুল সিন্দুকের আড়াল থেকে দেখে ফেলেছে! মিতুল লুকিয়ে লুকিয়ে, সিন্দুকের আড়াল থেকেই অমনি ধমকে উঠল 'এই ঘরের দরজা খুলছিস কেন?'
মিতুলের গলা শুনে লোকটার বুকের ধুকধুকি থেমে যায়-যায়! ভয়ে!
মিতুল আবার বলল, 'দরজা খুলবি না। আমি তোকে খেতে এসেছি!'
গলা ফাটিয়ে চিৎকার শুরু করে দিল লোকটা।
মিতুল এবার আরও জোরে ধমকে উঠল, ' চেঁচাবি তো গলায় বাঁশ পুরে দেব! থাম!'
লোকটার চেঁচানি থামল। কাঁদুনি থামল না। ঠকঠক করে কাঁপতে লাগল দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে।
'তোর নাম কী?' গম্ভীর হয়ে জিজ্ঞেস করল মিতুল।
'হরিহর।'
'তোর বাবার নাম কী?'
'বাসুদেব।'
'আর দুটো লোক তোর কে হয়?'
'কেউ না।'
'কেউ না? মিথ্যে বলছিস! এত সোনা-রুপো, চুনি-পান্না কোত্থেকে এল? কার এসব?'
'আমার।'
'ঠিক করে বল!'
'আজ্ঞে সক্কলের।'
'সক্কলের! আমার সঙ্গে ঠাট্টা হচ্ছে! ঠিক করে বল, নইলে গলা কেটে দেব।'
গলা কাটার নাম শুনে লোকটা চিতপটাং। মাটিতে শুয়ে পড়ল। কাঁদতে কাঁদতে বললে, 'আজ্ঞে গলাটা কাটবেন না। আমি সব বলছি। এসব জিনিস আমরা চুরি করে এনেছি।'
'চুরি করেছিস! কার জিনিস?'
'আজ্ঞে অনেকের।'
'সিন্দুকের চাবি কোথায়?'
চুপ করে রইল লোকটা।
মিতুল আবার জিজ্ঞেস করল, 'চুপ করে কেন? সিন্দুকের চাবি কই?'
'আজ্ঞে আমার কাছে তা নেই।'
'ফের মিথ্যে বলছিস' বল কোথায়? নইলে হাতুড়ি মেরে মাথা ছেঁচে দেব!'
লোকটা আবার চেঁচিয়ে উঠল। 'না না, হাতুড়ি মারবেন না। চাবি আমার কাছে।'
'সিন্দুকের মাথায় চাবিটা রাখ।' হুকুম করল মিতুল।
লোকটা ঝোলানো কালো জামাটার পকেট থেকে এত্তবড়ো একটা চাবি বার করল। সিন্দুকের মাথায় রাখল।
মিতুল এবার জিজ্ঞেস করল, 'মরবি? না বাঁচবি!'
লোকটা দুহাত জোর করে বলল, 'আজ্ঞে মরবো না, মরবো না। আমি বাঁচবো। আমাকে বাঁচান।'
'ঠিক আছে। তবে দেওয়ালের দিকে মুখ করে দাঁড়া।'
লোকটা দেওয়ালের দিকে মুখ ফিরিয়ে দাঁড়াল।
'আমি যতক্ষণ না বলব, ততক্ষণ নড়বি না।'
চুপটি করে দাঁড়িয়ে রইল লোকটা।
মিতুল ঝট করে বেরিয়ে এল সিন্দুকের পিছন থেকে। চট করে চাবিটা নিয়ে নিজের কোমরে গুঁজে ফেলল। তারপর ওই কালো জামাটার পকেটে ঢুকে পড়ল। ঠিক আগের মতন। তারপর জামার পকেট থেকে গলা বাড়িয়ে বলল, 'যা এবার।'
পড়ি-মরি করে লোকটা পালাতে গেছে। মিতুল আবার চেঁচিয়ে ডাকল, 'এই জামাটা পরলি না যে! পর জামা।'
কাঁপতে কাঁপতে জামা পরল লোকটা। ঘরের দরজা খুলল। তারপর মার ছুট। জানতেও পারল না, তার পকেটে, মিতুল নামে একটা ছোট্ট পুতুলও সঙ্গে সঙ্গে ছুটছে। এত বুদ্ধি মিতুলের! মিতুলের পেটে পেটে এত ছিল!
ছুটছে লোকটা বনে বনে। থামে না। দুলছে মিতুল তার পকেটে। যেন এক্কাগাড়ি চেপেছে মিতুল। যা হাসি পাচ্ছে! কী ঠকান ঠকিয়েছে লোকটাকে! কী বোকা! রাম ভীতু! ভয়ে একেবারে ভিরমি খাবার জোগাড়!
মিতুলের একটুও ভয় নেই। ভয় কীসের? ও কী কোনো অন্যায় করেছে যে ভয় পাবে? যে অন্যায় করে তারই ভয়! কোমরের চাবিটা এবার বেশ আঁটসাঁট করে জড়িয়ে রাখল মিতুল। পকেটের মধ্যে আবার নড়াচড়া করা বিপদ। যদি টের পেয়ে যায়, না, পাবে না। জামাটা বেশ লম্বা। পকেটটাও বেশ ঢাপ্পুস। তার ওপর লোকটা ছুটছে। টের পাবে কেমন করে? তাই উঁকি মারল মিতুল পকেটের ভিতর থেকে।
ওমা! আর তো বন নেই। বন পেরিয়ে গেছে। আকাশটা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে মিতুল। রাতের আকাশ। চাঁদ নেই বলে মিতুল বুঝতে পারল না, ও গ্রামের মাঠে পড়েছে।
দুটো লোক আসছে ছুটতে ছুটতে। সামনে।
দেখতে পেয়েই মিতুল চুপ করে ঢুকে গেল পকেটের মধ্যে। ওমা! এ যে সেই দুজন লোক। মিতুল যার পকেটে বসে আছে তারই বন্ধু দুজন।
ছুটতে ছুটতে জড়িয়ে ধরল।
'কী রে? কী হয়েছে?'
'ঘরে কে ঢুকেছে! সব জানতে পেরে গেছে! আমি প্রাণে বেঁচে গেছি। পালিয়ে এসেছি।' হাঁপাতে হাঁপাতে বলে গেল লোকটা। এক নিশ্বাসে।
'কে ঢুকেছে?' আর দুজন জিজ্ঞেস করল।
'কী জানি! বাঁচতে যদি চাও তো পালাই চলো।' বলে লোকটা আবার ছুট দিল, বন্ধু দুজন তাই না দেখে দে-ছুট। তার পিছনে। ভয়ে-ভয়ে!
এবার মিতুল সত্যি সত্যি হেসে ফেলল। লোকগুলো বোকার ধাড়ি। আচ্ছা ঠকান ঠকিয়েছে মিতুল। চাবিটাও পেয়ে গেছে। কিন্তু পেলেই বা কী হবে? যাদের জিনিস তাদের তো পৌঁছে দিতে পারবে না মিতুল! কেমন করে দেবে? কে জানে কোথায় তাদের ঘর! আর জানলেই বা কী! ওর কথা বিশ্বাস করবে কেউ? ও যে পুতুল। আহা-রে! যদি শাস্তি পায় ওই লোক তিনটে! তাহলে খুব খুশি হয় মিতুল।
তিনটে লোকই ছুটতে ছুটতে থামল। পা চালিয়ে হাঁটল। মিতুল পকেটের মধ্যে বসে বসেই বুঝতে পারল। 'দেখি তো', বলে আর একবার উঁকি দিল পকেট থেকে। বাইরে। ওমা রাতের অন্ধকার তো আর নেই। ভোরের আলো ফুটছে। গাছের সবুজ পাতা ধুয়ে গেছে শিশিরের জলে। যেন কার কান্নার জল। গড়িয়ে পড়ছে। আকাশ কি কেঁদেছে সারারাত! সেদিন মিতুলের গলাটি জড়িয়ে এমনি করেই কেঁদেছিল তার বোনটি!
এতক্ষণ ভুলেই ছিল মিতুল। ভুলে ছিল তার বোনটির কথা। রাজকন্যার কথা! ভুলবে না? যা এতক্ষণ হল!
কিন্তু তার বোনটিকে এখন সে কোথায় খুঁজে পাবে? পথঘাট কিচ্ছু জানে না। জানলেই বা কী! এত বড়ো পৃথিবী? সে তো ছোট্ট পুতুল! কেমন করে খুঁজে পাবে আর একজন ছোট্ট পুতুলকে। তা ছাড়া দুপা অন্তর বিপদ! পৃথিবীতে কেউ যেন শান্তিতে থাকতে চায় না। সবাই সবাইকে ঠকাচ্ছে! বিচ্ছিরি!
রোদ উঠেছে। এতক্ষণ সামনেটা কুয়াশায় ঢাকা ছিল। রোদের ছোঁয়া লেগেছে কুয়াশার গায়ে! এখন ঘরে যাবার পালা। কুয়াশার ছুটি আজকের মতো।
সামনে কী? উরি বাবা! কত বড়ো একটা পাহাড়! এক্কেবারে আকাশ ফুঁড়ে যেন চলে গেছে। কত উঁচু! একটা নদী নেমেছে পাহাড় থেকে নীচে। পাহাড়তলির গ্রাম দিয়ে বয়ে যাচ্ছে। লোকগুলো তো পাহাড়ের দিকেই যাচ্ছে। মিতুল তো কোনোদিন পাহাড়ে চড়েনি! তাই ভারি মজা লাগছিল তার। পাহাড়ে চড়বে মিতুল। ভাবতেই মজা।
আর যেন হাঁটতে পারছে না দস্যুগুলো। কতক্ষণ ধরে হাঁটছে। বাববা হাঁটুক না। যত পারে হাঁটুক। মিতুলের তো কোনো কষ্ট হচ্ছে না। মজাই। কেমন পকেটের মধ্যে বসে আছে।
'একটু বসলে হয় না?' হঠাৎ একজন দস্যু বলল। চমকে উঠল মিতুল। কথা শুনে।
'হ্যাঁ, তাই বস। হাঁটতে হাঁটতে পা ব্যথা করছে।' আর একজন উত্তর দিল।
শেষ জন বলল, 'খিদে পাচ্ছে। চ না কিছু খেয়ে জিরনো যাবে। সামনেই তো বাজার।'
'তাই ভালো।' বলে হাঁটল বাজারের দিকে তিনজনে।
এতক্ষণ পরে একটি একটি মানুষ নজরে পড়ল মিতুলের। গ্রামের মানুষ এরা! কোনোদিন মিতুল এমনি করে গ্রাম দেখেনি। গ্রামের মানুষও দেখেনি। সকালে দোকান-হাটে যাচ্ছে কেউ কেউ। কাজে যাচ্ছে অনেকে। নদীর জল আনছে মেয়েরা। কলসি মাথায়। পায়ে মল ঝুমঝুম। দেখতে বেশ লাগছে। পাহাড়। তার নীচে ছায়া। তার পাশে নদী। নদীর কোলে গ্রাম। চোখ ভরে যায় মিতুলের। মন বলে, আহা-রে! কত আলো এখানে!
হাটে কত লোক! গিসগিস করছে। কত দোকান। কোনোটা কাপড়ের। কোনোটা কাচের। কোনোটা বাসনের। একটা না দুটো খেলনার দোকান। কত পুতুল। সাজানো-সাজানো। একটা শোলার টিয়া দাঁড়ে বসে আছে। চোখ টিপল মিতুলের দিকে চেয়ে। ডাকল বোধ হয়। কেউ দেখতে পেল না। মিতুল কিন্তু ঠিক দেখেছে। দেখলে কী হবে? যাবার তো উপায় নেই।
একটা জিলিপির দোকানের সামনে দাঁড়াল দস্যু তিনজন। কড়া ভরতি জিলিপি! উনুনের ওপর ভাজছে দোকানদার। আওয়াজ বেরুচ্ছে বেশ, 'ছিলিকিলি ছিলিকিলি!' পাশে আর একটা রস ভরতি গামলা। গামলায় দোল খাচ্ছে অগুনতি পানতুয়া। একটা পেলে মন্দ হয় না!
'এই দোকানি, আধ সের জিলিপি দাও তো।' একজন দস্যু চাইল।
টুপ করে পকেটের মধ্যে ঢুকে গেল মিতুল।
কেন?
লোকটা পকেটের মধ্যে যেন হাত গলাচ্ছে। হ্যাঁ তো রে! এই সেরেছে, মিতুলের বুঝি এই শেষ। না। খুব রক্ষে! মোটা মোটা আঙুল। পকেটে ঢুকেই আবার বেরিয়ে এল। মিতুল কোনো রকমে ঘার গুঁজে বেঁচে গেছে। ধরা পড়ে গেছিল আর একটু হলেই। কাঁপছে মিতুল ভয়ে। লোকটার হাত যে পকেটে ঢুকতে পারে, একথা ভাবেনি মিতুল। তাই তো! কী করবে এখন সে!
না, আর পকেটে থাকা নয়। এবার পালাতেই হবে মিতুলকে পকেট থেকে। কিন্তু কেমন করে পালাবে? কেমন করে পকেট থেকে বেরুবে? এত লোক! এত চোখ সবাইকে কি ফাঁকি দেওয়া যায়! ভাবতে লাগল মিতুল। চেয়ে চেয়ে দেখতে লাগল মাথাটা তুলে পকেটের মধ্যে! তৈরি থাকাই ভালো। আবার যদি ঢোকে হাতটা!
না, এখন আর হাত ঢুকবে না। এখন জিলিপি খাচ্ছে লোকগুলো।
কিচ্ছু উপায় নেই। যতই ভাবুক মিতুল, বেরুতে আর হচ্ছে না!
এখন তো খাওয়া হয়ে গেছে। জিলিপি খাওয়া। নদীর পাড়ে এসে দাঁড়াল তিনজনে। জল খাবে। চুপিসাড়ে আর একবার উঁকি দিল মিতুল। বসল লোক তিনটে। হাত বাড়িয়ে নদীর জলে আঁজলা করল। এই সুযোগ! ভাবল মিতুল! পকেট থেকে বেরিয়ে পড়তে পারলে আর কী! মাথাটা বার করল। খুব সাবধানে। লাফ দিল বলে!
'এই, তোর পকেটে ওটা কী রে?'
বুকটা থমকে গেল মিতুলের। ফসকে গেল হাতটা।
'কই?' লোকটা পকেটে হাত ভরে দিল। মিতুলের পেটটা চিপটে× ধরল। টেনে বার করল মিতুলকে।
'আরে একটা পুতুল!' অবাক হল তিনজনে।
'কোত্থেকে এল?'
'কে জানে!'
'দিনের দিন তুই কচি খোকা হচ্ছিস নাকি! পুতুল নিয়ে পকেটে পুরেছিস। খেলা ধরেছিস। ফেলে দে।'
ফেলে দিল মিতুলকে। ছুড়ে দিল নদীর জলে। মাঝদরিয়ায়। টুপ! ডুবে গেল মিতুল!
হয়তো ডুবে যেত মিতুল একেবারে। হয়তো ডুবতে ডুবতে ও কোথায় তলিয়ে যেত! আর কোনোদিন ওকে কেউ দেখতে পেত না। কেউ ওর কথা মনে রাখত না।
না, ভেসে উঠল মিতুল।
নদী নামছে পাহাড় থেকে। তার কী স্রোত! জলের স্রোতে ভেসে চলেছে মিতুল! কোথায় চলেছে? কেউ জানে না। কোন দেশে? তাও জানে না। কেমন করে ও নদীর জল থেকে পাড়ে উঠবে? তাই বা কে বলবে! হয়তো এমনি করে নদীর জলে ভাসতে ভাসতে একদিন সব ফুরিয়ে যাবে! মিতুল হারিয়ে যাবে চিরদিনের মতো!
ভাবতে পারছিল না মিতুল। সামনে একটা কুটোও নেই যে আঁকড়ে ধরে। চারিদিকে শুধু জল আর জল। ভেসে চলেছে মিতুল। কেউ কী দেখবে না তার দিকে একবার? কেউ কি তাকে বাঁচাবে না?
কে আসবে? কে দেখবে? এমন তো কত কী নদীর জলে ভেসে যায়! কার দেখতে বয়ে গেছে! সে নিয়ে ভাবতে কারই বা মাথাব্যথা পড়েছে। তা ছাড়া ও তো একটা পুতুল। ফেলে দেওয়া পুতুল। ও আর কী কাজে আসবে? যতদিন সুন্দর ছিল, মিষ্টি মুখে হাসি ছিল, তখন ওর আদর ছিল। সবাই ভালোবেসেছে। সবাই তার নাচ দেখে বাহবা দিয়েছে। পুতুলওয়ালা কত বড়ো লোক এখন! কত পয়সা! কত দেমাক! সে তো মিতুলেরই জন্যে! আর আজ? আজ তারা কোথায়? কেউ নেই!
চেঁচিয়ে ডাকতে ইচ্ছে করল মিতুলের, ' তোমরা আমায় বাঁচাও।' কে শুনবে? কেঁদে ফেলল মিতুল হাউ-হাউ করে। এমন করে সে তো কোনোদিন কাঁদেনি! মিতুলের চোখের জল নদীর জলে মিশে গেল। ভেসে গেল। ঠিক তক্ষুনি মনে পড়ে গেল বোনটির কথা। তার সঙ্গে মিতুলের আর কোনোদিন দেখা হবে না। কোনোদিনই না। 'না হোক।' ভাবে মিতুল, 'সে যেন ভালো থাকে। ভালো থাকে! যেখানেই যাক সে যেন কাঁদে না কোনোদিন। আমার জন্যে। তার ভাইটির জন্যে।'
ভেসেই চলেছে মিতুল। কতক্ষণ, কতদিন কিচ্ছু জানে না। নদীর দু-পাশে সবুজ সবুজ গাছের সারি। দূরে দূরে। নীল নীল আকাশে ঝলমল আলো আর চারিদিকে জল থই থই। হঠাৎ আকাশের নীলের সঙ্গে সবুজ ডানার পাখনা মেলে পাখি উড়ে এল। নদীর বুকে। উড়তে উড়তে মিতুলের মাথার ওপর ঘুরতে লাগল।
চমকে চাইল মিতুল আকাশে। পাখি! মনটা দুলে উঠল মিতুলের। আশায়। চেয়ে রইল মিতুল একদৃষ্টে। হাতছানি দিল। নাম জানে না মিতুল পাখির। ডাক দিল, 'ও পাখিভাই, ও পাখিভাই, সবুজ সবুজ পাখি, আমায় তুমি বাঁচাবে?'
পাখি বলল, 'ওমা! ওমা! কে তুমি?'
মিতুল বলল, 'আমি পুতুল, নাম মিতুল।'
পাখি বলল, 'পুতুল-পুতুল মিতুল তুমি?'
মিতুল উত্তর দিল, 'হ্যাঁ ভাই, সবুজ-সবুজ পাখি।'
পাখি বলল, 'মিতুল-মিতুল পুতুল, আহা-রে কেমন করে জলে ভাসলে?'
মিতুল উত্তর দিতে পারল না। চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। পাখি মিতুলের চোখের জল স্পষ্ট দেখতে পেল।
পাখি ডাকল, 'রুপালি-রুপালি মাছ। রুপালি-রুপালি মাছ।' ডাকতে ডাকতে ঘুরপাক খেতে লাগল আকাশে। জলের ওপর।
অমনি নদীর জলে হাজার হাজার রুপালি মাছ ভেসে উঠেছে। ঝিকিমিকি। ঝিকিমিকি।
সবুজ-সবুজ পাখি বলল, 'রুপালি-রুপালি মাছ, মিতুল পুতুল নদীর জলে ভাসছে। তাকে বাঁচাও।'
সঙ্গে সঙ্গে নদীর জলে লাফিয়ে উঠল রুপালি মাছের সর্দার। মিতুলকে পিঠে তুলে নিল। মিতুল ভাসছিল চিত হয়ে। মাছের পিঠে বসল এবার। সর্দার মাছ পাখনা দুলিয়ে মিতুলকে পিঠে নিয়ে সাঁতার দিল জলের ওপর। হাজার হাজার রুপো-ঝিকমিক মাছের দল এগিয়ে চলল। চলল সর্দারের সঙ্গে নেচে নেচে।
আকাশের সবুজ পাখি বলল, 'মিতুল-মিতুল ছোট্ট পুতুল, তুমি কোথায় যাবে?'
মিতুল বলল, 'জানি না তো! আমার তো ঘরও নেই, বাড়িও নেই। আমার এখন কেউ নেই।'
সবুজ পাখি জিজ্ঞেস করল, 'মিতুল, তুমি আমাদের কাছে থাকবে?'
মিতুল বলল, ' তোমরা কত সুন্দর! কত ভালো!'
আকাশ ভরে গেল। কত পাখি নদীর বুকে। ডানা মেলে উড়ছে। রঙিন ছায়া ঢেউ-এ ঢেউ-এ দুলছে নদীর জলে। তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে লাগল মিতুল। দেখতে লাগল জলের নীচে। রুপালি মাছের দিকে। আকাশে সবুজ পাখির দিকে।
সবুজ পাখি উড়তে উড়তে রুপালি মাছকে বলল, 'রুপালি মাছের সর্দার, আমি নামছি।'
সবুজ পাখি আকাশ থেকে রুপালি মাছের দিকে নামতে নামতে বলল, 'মিতুল-পুতুল হাত বাড়াও। আমার পা ধরো।'
মিতুল হাত বাড়াল সর্দার মাছের পিঠে বসে। সবুজ পাখি একেবারে মিতুলের মাথার ওপর উড়ে এল। মিতুল হাত দিয়ে সবুজ পাখির পা দুটি জড়িয়ে ধরল। ঝুলে পড়ল। ঝুলে ঝুলে নদীর জল ছেড়ে, মাছের পিঠ ছেড়ে, আকাশে উড়ে চলল।
মিতুল ঝুলতে ঝুলতে বলল, 'সবুজ-সবুজ পাখি, আমার ভয়-ভয় করছে। হাত ফসকে যদি আবার পড়ে যাই জলে!'
পাখি বলল, 'মিতুল আমার পিঠের ওপর উঠে এসো।'
মিতুল সবুজ পাখির পা ছেড়ে, আস্তে আস্তে গলা জড়িয়ে একেবারে পিঠের ওপর চড়ে বসল।
না, আর ভয় করছে না। আঃ নরম তুলোর মতো পাখির পিঠ! কী আরাম!
নীচের দিকে তাকাল মিতুল। রুপালি মাছেরা নাচছে জলের নীচে। খুশিতে। মিতুলের দিকে চেয়ে চেয়ে।
আকাশে চাইল মিতুল। সবুজ-রঙিন পাখিরা গান গাইছে। পাখির ডানায় হাওয়ার ঝুনঝুনি বাজছে।
একটু একটু করে চলে গেল নদীর জল চোখের আড়ালে। একটি একটি করে হারিয়ে গেল রুপালি মাছ নদীর জলে। উড়ে চলেছে মিতুল। মনটা যেন কেমন-কেমন করে উঠল মিতুলের। মাছের জন্যে। ওই রুপালি মাছ ঝিকমিক! আর কি কোনোদিন ওদের সঙ্গে দেখা হবে মিতুলের!
অনেকক্ষণ পর একটি গাছে বসল সবুজ পাখি। মিতুল সবুজ পাখির পিঠ থেকে নামল। গাছের ডালে সবুজ পাতার ওপর বসে রইল।
সবুজ পাখি জিজ্ঞেস করল, 'মিতুল, গাছের ওপর বসতে তোমার ভয় করছে?'
মিতুল বলল, 'ভালো লাগছে।'
অমনি গাছের ডালে দোল দিয়ে দিয়ে হাওয়া বইল। হাজার হাজার প্রজাপতি উড়ে এল। মিতুলের চোখে তারা কাজল পরিয়ে দিল। মিতুলের ছেঁড়া জামায় রং ছড়িয়ে দিল। রঙের রেণু উড়তে উড়তে ছড়িয়ে গেল সবুজ সবুজ গাছে। রঙিন রঙিন ফুলে। মৌমাছিরা গুন গুন করে গান ধরল। মিতুলের কাজল পরা চোখ দুটি নাচতে লাগল। হাসিতে-খুশিতে। মিতুলের ছোট্ট ঠোঁট দুটি কাঁপতে লাগল। গানেতে-সুরেতে। যেন সকালবেলার লাল গোলাপের পাপড়ি!
মিতুল বলল, 'রঙিন-রঙিন প্রজাপতি, আমিও খেলতে পারি।'
প্রজাপতিরা বললে, 'এস না!'
অমনি মিতুল উঠে দাঁড়াল গাছের ডালে। প্রজাপতি আর মৌমাছিদের সঙ্গে লুকোচুরি খেলা শুরু করে দিল। সবুজ সবুজ পাখি তাই দেখে হেসে কুটোকুটি। লুটোপুটি।
কী সুন্দর দেখতে লাগছে মিতুলকে! খেলছে! কত রং, কত আলো মিতুলের সারা গায়ে! কী সুন্দর সাজিয়ে দিয়েছে মৌমাছিরা, প্রজাপতিরা! মিতুল যেন আর সে-মিতুল নেই! এক্কেবারে একটি নতুন পুতুল। আগের চেয়েও ভালো। অনেক ভালো।
খেলতে খেলতে হঠাৎ কী হল? সবুজ পাখিরা ফুড়ুৎ করে উড়ে গেল কেন সক্কলে? প্রজাপতি পাতায় পাতায় লুকিয়ে গেল কেন ঝুপঝাপ? মৌমাছিরা ফুলের ডালে ঘাপটি মেরে বসে রইল কেন চুপচাপ? ব্যাপার কী?
মিতুল ডাকল, 'সবুজ পাখি!'
কেউ সাড়া দিল না।
আবার ডাকল, 'প্রজাপতি রঙিন-পাখা!'
কেউ দেখা দিল না।
মিতুল অবাক হল। এদিক-ওদিক খুঁজতে লাগল। দেখতে লাগল!
গাছের তলায় ও কে দাঁড়িয়ে? চোখ পড়তেই চমকে গেল মিতুল।
একটা ছেলে। গাছের দিকে তাকিয়ে। ছেঁড়া-ময়লা কাপড়। যেন সাত জন্মে কাচা হয়নি। উসকো-খুসকো চুল। যেন কত কাল তেল দেয়নি। রোগা প্যাঁক-প্যাঁকে চেহারা। যেন কোনো জন্মে খেতে পায়নি। লম্বা একটি লাঠি কাঁধে। ড্যাং-ড্যাং করে চলছিল। চলতে চলতে থামল। চাইল গাছের দিকে।
মিতুলের খুব ভয় হয়ে গেছে। কী করবে এবার? গাছ থেকে নামবে, তারও উপায় নেই। এত বড়ো, এত উঁচু গাছ থেকে কি মিতুল নামতে পারে? তা ছাড়া ছেলেটা যে-রকম চেয়ে আছে প্যাট-প্যাট করে! এক্ষুনি দেখে ফেলবে! তাই সুট করে পাতার আড়ালে লুকিয়ে পড়ল মিতুল। গুঁড়িগুঁড়ি মেরে বসে রইল। লুকিয়ে!
ছেলেটা তো ছেলেটা! ভেল ভেলেটা! চোখ দুটোতে দুষ্টুদুষ্ট চাউনি। দাঁত বের করে মুচকি মুচকি হাসছে। পেটে পেটে বুদ্ধি ছেলের! পিঠে একটা পুঁটলি বেঁধে কেমন তাকাচ্ছে দেখো না! গা জ্বলে যায়! মিতুল ভাবল, 'দেখি না ছেলেটা কী করে?'
আরি ব্যস! গাঁক গাঁক করে চেঁচাতে শুরু করে দিল ছেলেটা। কেন রে বাবা! চেঁচানি কেন? গান গাইছে নাকি! গান গাইছে, না গোরু তাড়াচ্ছে! থাম না বাপু!
থামল। পিঠের পুঁটলিটা খুলল। গাছের নীচে রাখল। হাতের লাঠিটা নিয়ে ছুড়ে দিল পাঁই। গাছের ওপরে। পাখির বাসায়। ঘেঁচু! পাখি থাকলে তবে তো! পাখিও নেই। পাখির ছানাও নেই। আবার ছুড়ল! এই সেরেছে! মিতুলের যদি লেগে যায়! মিতুল পেটের মধ্যে হাত পা সেঁধিয়ে বসে রইল।
আর একবার ছুড়ল! হুস। যা ভাবা ঠিক তাই। লাগল না মিতুলের গায়ে। একেবারে নাকের পাশ দিয়ে উড়ে গেল লাঠিটা। যাঃ! হাত ফসকে গেছে মিতুলের। মার ডিগবাজি। একটা, দুটো, তিনটে, চারটে! ব্যস একেবারে ছেলেটার কাঁধে। দুটি পা কাঁধের ওপর ঝুলিয়ে গলাটি জড়িয়ে ধরল মিতুল।
ছেলেটা তো অবাক! 'যাঃ বাবা! ইনি কিনি?' বলে মিতুলের ঠ্যাং ধরে চোখের সামনে আনল। দেখতে লাগল। 'আরে! একটা পুতুল!' নিজের মনেই চেঁচিয়ে উঠল। মাথা চুলকে গাছের দিকে তাকাল। মিতুলের দিকে চাইল। ভাবল, 'তাইতো! গাছে পুতুল এল কোত্থেকে! কোথায় পাখির ছানা খুঁজছি, না গাছ থেকে পুতুল পড়ছে! দূর ছাই, পুতুল কী হবে!' বলে খুব জোরে আবার ছুড়ে দিল মিতুলকে গাছের ওপর। না, গাছে আটকাল না মিতুল। ডিগবাজি খেতে খেতে পড়বে তো পড় ছেলেটার মাথায়, টকাস!
ছেলেটা বলল 'ভালোরে ভালো! জ্বালাতন করলে তো! দূর তোর--' বলে আবার ছুড়তে গেল। থমকে গেল হাতটা। মিতুলের চোখ দুটি যেন ওর দিকে তাকিয়ে আছে! ভালো করে দেখল। কিছু বলবে নাকি পুতুলটা! তাই আবার হয়! পুতুল কোন কালে কথা বলে! তবু চোখ দুটি ভালো লাগছে দেখতে! পুতুলের চোখ! ভালো লাগছে মুখখানি। না, আর ছুড়তে ইচ্ছে হল না। বলল, 'না, তোকে ফেলব না। চ আমার সঙ্গে। শহরে গিয়ে বেচে দেব। যা পাওয়া যায়!' বলে মিতুলকে কাঁধে বসাল। পিঠে পোঁটলা বাঁধল। চেঁচিয়ে গান ধরল। হাঁটা দিল। মিতুল গান শুনতে শুনতে কোথায় চলল আবার? কে জানে!
গাইতে গাইতে হাঁটতে লাগল ছেলেটা। কাঁধের ওপর দুলতে লাগল মিতুল। দেখতে লাগল সামনেটা। কেউ নেই। সবুজ পাখি, প্রজাপতি, মৌমাছি! একটি কথা কার সঙ্গে সে বলতে পারল না। যারা তার প্রাণ বাঁচাল তাদের জন্যে সে কী করল! মনটা ভার হয়ে যায় মিতুলের! বেশ তো মজা! নদীর জলে ভাসছিল মিতুল একটু আগে! রুপালি মাছ, সবুজ পাখি তাকে বাঁচাল। রং-ঝরানো প্রজাপতি, ফুল-ফোটানো মৌমাছি তাকে সাজাল। তার সঙ্গে খেলা করল। আর এখন? সে নাম-না-জানা একটা ছেলের কাঁধে চেপে কোথায় চলেছে?
চলেছে সামনে পাহাড় তার ওপরে।
ছেলেটার ভয়ডর নেই। কেমন দেখো নাচতে নাচতে চলেছে! গাইতে গাইতে দুলছে! কোথায় যাবে পাহাড় পেরিয়ে?
পড়ে গেল মিতুল ছেলেটার কাঁধ থেকে। হঠাৎ। যা ঝাঁকুনি। কতক্ষণ কাঁধে থাকবে? গড়িয়ে গেল পাথরের ওপর।
'কীরে পড়িস কেন?' ছেলেটা ঘুরে দাঁড়াল। তুলে নিল মিতুলকে। জামাটা ঝেড়ে দিল মিতুলের। আর একবার চোখ দুটির দিকে তাকাল। কাজলপরা দুটি চোখ মিতুলের। দেখতে দেখতে আপন মনেই বলল, 'ভারি মিষ্টি তো চোখ দুটি তোর! নে চ। এখন ঘরে চ।' বলে আবার কাঁধে তুলে নিল মিতুলকে। আবার দুলতে লাগল। আবার গাইতে লাগল।
এখন তো বিকেল-বিকেল। পাহাড়ের ওপর বিকেলের রোদ বেশ লাগে। আর একটু পরে সূর্যিমামা ঘরে চলে যাবে। একটু একটু অন্ধকার নেমে আসবে তারপর। তখন কী হবে? তখনও যদি ছেলেটা ঘরে না পৌঁছায়! ভয় করবে না? ঘেঁচু, ভয় না আরও কিছু। ঘর থাকলে তবে তো! দিন নেই, রাত নেই, ও শুধু হাঁটছে। পথেই বসে পড়ল। পথেই শুয়ে রইল। আর কেউ নেই, তার আবার ভাবনা কীসের? চলো, শুধু চলো। এক পাহাড় থেকে আর এক পাহাড়। এক দেশ থেকে আর এক দেশ।
হাঁটতে-হাঁটতে এ কোথায় এল? কী সুন্দর! অবাক হয়ে গেল মিতুল! কী সুন্দর দেখতে ওই পাহাড়ের নীচটা! ছোট্ট ছোট্ট পাথর সাজানো ঘর। ঘরের মাথায় পাতার ছাউনি। পাথর ছড়ানো রাস্তা। সবুজ-সবুজ বাগান। একটা ছোট্ট ঝরনা টুং টাং নাচতে নাচতে নেমে আসছে। মিতুল ভাবল, ছেলেটার বাড়ি হয়তো এখানে। এখানে থাকতে হবে তাকে! তা হলে তো বেশ হয়! দেখতে বেশ লাগছে মিতুলের। ভাবতে আরও ভালো লাগছে।
ওই দিকেই ছুট দিল ছেলেটা। ঝরনার দিকে।
কারা যেন খেলা করছে! হ্যাঁ তো রে। ঘাগরা পরা ছোট্ট মেয়ে। কত দেখো! পাগড়ি মাথায় ছোট্ট ছেলে। অনেক অনেক। ছেলেটার গান শুনে ওরাও এদিকেই ছুটে আসছে। ছুটছে আর চেচাঁচ্ছে .
কটকটি কটকটি
ল্যাক প্যাকে সিং।
হাড়গিলে বক যেন,
টিং টিং টিং!
চেঁচাতে চেঁচাতে একেবারে ওর সামনে। আর কী হুল্লোড় লাগিয়ে দিল! ওকে বক দেখাতে লাগল। জিভ ভেঙাল। চেঁচামেচি। হুড়োহুড়ি।
ছেলেটা গান থামাল। আচমকা মুখটা যেন শুকিয়ে গেল। একজন একটা ঢিল ছুড়ে দিল। টং! একেবারে ওর মাথায়। ঘুরে দাঁড়াল। ঘুরলে কী হবে? আর একটা ঢিল। টং! একজন লাঠিটা ছিনিয়ে নিল। পিঠে এক কিল বসিয়ে দিল। তেড়ে গেল ওর দিকে।
'আবার এসেছিস এখানে?' একজন চেঁচিয়ে উঠল।
ছেলেটা রেগে আরও জোরে চেঁচিয়ে উত্তর দিল, 'বেশ করছি।'
'বেশ করছিস! আয় তোর ঠ্যাং ভেঙে দিই।' সবাই লাফিয়ে উঠল।
একজন বলল, 'আরে! আরে! একটা পুতুল রে, কাঁধের ওপর।'
অমনি ছেঁকে ধরল সবাই মিলে। ছেলেটাও পাঁই পাঁই মারল ছুট। মিতুলকে কাঁধ থেকে নামিয়ে নিল। বুকে জড়িয়ে ধরল। ওরাও ছুটল পিছু পিছু। ধরে ফেলল ওকে সবাই মিলে।
'দে পুতুলটা!'
'না, দেব না।'
'চুরি করেছিস?'
'বেশ করেছি।'
সবাই মিলে ঠেলে দিল ছেলেটাকে। পড়ে গেল পাথরের ওপর। মাথাটা কেটে গেল! রক্ত বেরিয়ে এল। কেউ এল না কাছে। উঠে দাঁড়াল ছেলেটা। আবার ছুট দিল মিতুলকে বুকে নিয়ে। ওরা আর ছুটল না। পারল না ধরতে।
ছুটতে ছুটতে অনেক দূরে চলে এসেছে! আর পারছে না ছুটতে। হাঁটছে।
হাঁটতেও পারছে না। একটু বসল। একটা গাছের নীচে। পাথরের ওপর। সন্ধে হয়ে আসছে। আরও নীচে পাহাড়তলি। ছোট্ট ছোট্ট ঘর দেখা যাচ্ছে। আলো জ্বলছে। শুয়ে পড়ল। পাথরটার ওপর। মিতুলের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। মিতুল স্পষ্ট দেখল ওর চোখ দুটি ছলছল করছে। মিতুলের কপালে একটা চুমু খেল। গালটা টিপে দিল আলতো আলতো। বলল, 'কী দেখছিস? আমাকে? কেউ নেই রে আমার।' চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল ছেলেটার। আবার বলল, 'তা বলে লাগেনি আমার। একটুও না।'
মিতুলের মনটা কেমন-কেমন করে উঠল। ছিঃ ছিঃ তার জন্যেই তো এমন হল! ইচ্ছে হল তার চোখের জল মুছিয়ে দেয়। কপালে হাত বুলিয়ে দেয়। এখনও রক্ত লেগে রয়েছে! কিন্তু কেমন করে দেবে?
'আমার কাছে থাকবি তুই? আমার কাছে?' মিতুলের মুখের দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করল ছেলেটা। 'আমার সঙ্গে থাকবি? আমার সঙ্গে বেড়াবি? আমি গান শোনাব। কেউ আমার গান শোনে না রে।'
মিতুলের এত দুঃখেও কেমন যেন হাসি পেল। মনে মনে ভাবল, 'আহা! তুমি যা গান গাও!'
উঠে বসল। মিতুলের জামার দিকে তাকিয়ে রইল অবাক হয়ে। বলল, 'বাঃ তোর জামাটা তো বেশ। এতক্ষণ দেখিনি তো! এত রং দিয়ে সাজাল কে? কার পুতুল তুই? কোথায় ছিলি?'
মিতুল চেয়েই রইল ফ্যালফ্যাল করে!
'আমার যদি পয়সা থাকত তোর জন্যে একটা টুপি কিনে দিতুম। একটা তাল পাতার বাঁশি কিনে দিতুম। দূর বাঁশি! খেতেই পাই না!'
মিতুলের বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল। ভাবল, ' খেতে পায় না!'
আবার বলল ছেলেটা, 'কে খেতে দেবে? আমায় তো সবাই পাগল বলে। পাগলের আবার খিদে পায় নাকি! পাগলের খিদে পায় না। ঘুম পায় না। কিচ্ছু না। আমারও ঘুম পায় না। সারারাত জেগে থাকি। জেগে জেগে ভাবি। কত কী! ভাবি আমার যদি একটা ফুলপাড় কাপড় থাকত, ছেঁড়া কাপড়ের বদলে। একটা খুব সুন্দর রেশমি জামা। পায়ে শুঁড় তোলা নাগরা। মাথায় একটা পাগড়ি। আর যদি থাকত একটা খুব সুন্দর নাম, কাঞ্চন। আমায় সাবাই ডাকে কটকটি বলে। তা বলে আমার নাম কটকটি নয়! রাগায়! আমার নাম ডুংরি। ডুংরি নামটাও আমার ভালো লাগে না। কে যে রেখেছিল!'
আর একটু হলেই মিতুল খিলখিল করে হেসে উঠেছিল। কটকটি! কটকটি আবার নাম হয় নাকি! কটকটি তো লোকে খায়। কিনতে পাওয়া যায় ময়রার দোকানে!
পাহাড়তলির পথের পর সানাই শোনা গেল। চকিতে উঠে দাঁড়াল ছেলেটা। ডুংরি। চনমন করে তাকাল পাহাড়তলির রাস্তার দিকে। শুধু কি সানাই? আরে বাবা, কত লোক! আরও কত বাজনা! কত পতাকা! সানাই বাজছে প্যাঁ পোঁ। বাদ্যি বাজছে ডিম ডিম। ডুম ডুম। পতাকা উড়ছে পত পত পত। লোক চলেছে ঘোড়ার পিঠে। কেউ যাচ্ছে এক্কা চড়ে। কেউ কেউ যায় পায়ে হেঁটে। মধ্যিখানে একটা কী সুন্দর পালকি। বেহারা ছুটছে পালকি কাঁধে, 'হুঁ হুঁ ন্না, হুঁ ন্না!'
ডুংরি চেঁচিয়ে উঠল সেই দিকে চেয়ে 'এই, বর-কনে যাচ্ছে।' মিতুলকে নিয়ে ছুটল পাহাড়ের ওপর। ছুটতে ছুটতে নীচে। পাহাড়তলির রাস্তায়। পালকির পাশে পাশে হাঁটতে লাগল। বাজনা শুনতে শুনতে। কেমন গাল ফুলিয়ে ফুলিয়ে ওই লোকটা সানাই বাজাচ্ছে! হেসে ফেলল ডুংরি। দুহাত দিয়ে আকাশে তুলে নাচালো মিতুলকে। খুশিতে। বলল, 'আজ আর খাবার ভাবনা নেই। চ, নেমন্তন্ন খেয়ে আসি।'
কেমন যেন থতমত খেয়ে গেল ডুংরি হঠাৎ! হাঁটতে হাঁটতে থামল।
মিতুলের দিকে চেয়ে চেয়ে দেখতে লাগল। কী হল? হঠাৎ চমক লাগে কেন?
আবার একবার নাচালো মিতুলকে। হ্যাঁ, এবারেও অবাক হয়ে গেল ডুংরি। পুতুলটা নাচছে যেন আপনা-আপনি! সে কি ভুল দেখছে? আবার নাচালো।
আবার!
আবার!
আবার!
মনে মনে হাসল মিতুল। ডুংরি লাফিয়ে উঠল মিতুলকে বুকে নিয়ে। চেঁচিয়ে উঠল আকাশের দিকে চেয়ে। কিন্তু কেউ শুনতে পেল না সে চিৎকার! কে শুনবে? সানাই বাজছে যে! বর যাচ্ছে, কনে যাচ্ছে পালকি চেপে হুঁ হুঁ ন্না! চেঁচিয়েই ছুট দিল ডুংরি একেবারে অন্য দিকে। নিজঝুম জায়গাটায়। পাহাড়ের একটু ওপরে। যেখানে সেই ছোট্ট ঝরনাটা নাচছে। পাথরের ওপর ঝুন ঝুন ঝুন। না, কেউ নেই এখানে! আর একবার দেখলে হয় না! আর একবার নাচালো ডুংরি মিতুলকে। আহা! সানাই-এর সুরটা কী মিষ্টি লাগছে মিতুলের। সেই সুরে সুরে মিতুলেরও পা দুটি নেচে নেচে উঠল।
হাত কাঁপছে ডুংরির। থামে না মিতুল। নাচে আর নাচে। অবাক হয়ে দেখে ডুংরি। অনেকটা খুশিতে। খানিকটা ভয়েতে! এমন তো কোনোদিন সে দেখেনি!
সেই নিজঝুম জায়গাটায় জেগে রইল সে। ঘুম এল না। তবু শুয়ে পড়ল। পাথরটার ওপর। মিতুলকে বুকে জড়িয়ে। চেয়ে রইল আকাশের দিকে। তারপর কখন ঘুমিয়ে পড়ল। ঘুমিয়ে পড়ল মিতুলও। ডুংরির গলা জড়িয়ে।
ভোরের প্রথম পাখিটা ডাকল, পাহাড়ের সবচেয়ে উঁচু গাছটায়। তার ডাকে মিতুলের ঘুম ভাঙল। প্রথম আলোর রং ছড়িয়ে গেল ডুংরির চোখ দুটিতে। সে ছোঁয়ায় ডুংরির ঘুম ভাঙল।
কাল রাতে স্বপ্ন দেখেছে কি ডুংরি? মিতুলের স্বপ্ন। হয়তো দেখেছে। তা না হলে সাত সকালে উঠেই ও ছুটল কোথায়? মিতুলকে নিয়ে? কী ভেবেছে?
ছুটেছে ডুংরি পাহাড়তলির গ্রামে গ্রামে। ডাক দিয়েছে সক্কলকে। নাচ দেখিয়েছে মিতুলের। পুতুলনাচ।
নাচ দেখেছে দলে দলে। ছেলে দেখেছে। মেয়ে দেখেছে। বুড়ো দেখেছে। বুড়ি দেখেছে। মা দেখেছে। বাবা দেখেছে। মাসি দেখেছে। মেসো দেখেছে। অবাক সবাই! বেবাক সবাই! এমন নাচ তো তারা কোনোদিন দেখেনি।
এক গ্রাম থেকে আর এক গ্রাম। ডুংরি ছোটে। মিতুল নাচে। পয়সা পায়।
এক হাট থেকে আর এক হাট। ডুংরি হাঁটে। মিতুল নাচে। টাকা পায়।
এক দেশ থেকে আর এক দেশ। ডুংরি চলে। সোনা পায়।
তারপর ডুংরি একদিন পাহাড় ডিঙাল। নদীতে পাড়ি দিল। নদী পেরিয়ে সমুদ্দুরের জলে ময়ূরপঙ্খি নায়ে পাল তুলে দিল।
মিতুলকে নিয়ে চলেছে ডুংরি সমুদ্দুরের ওপারে আর এক দেশে। সে দেশে মেলা বসেছে। মেলাতে নাচ দেখাবে।
এখন সত্যি-সত্যি রেশমি জামা পরে ডুংরি। পায়ে নাগরা পরে। মাথায় পাগড়ি বাঁধে। পরবে না! এখন তার কত পয়সা!
আর মিতুল? তার সাজ হয়েছে একশো রকম। একশো রকম পোশাক তাতে হাজার রকম ফুল। রং তুল তুল তুল।
উরি ব্যস! কত লোক মেলায়! ভিড়ে ভিড়! কত দোকান! কত বাহার! কত হাসি! কত মজা! এত জায়গায় ঘুরেছে মিতুল কিন্তু এমন মেলা কক্ষনো দেখেনি।
তাঁবু পড়ল মেলায়। মস্ত তাঁবু।
ঢ্যাঁড়া পড়ল।
বাজনা বাজল। নাচ শুরু হয়ে গেল মিতুলের।
সানাই প্যাঁ পোঁ বাজে,
মিতুল সোনা নাচে।
দেখতে দেখতে ভিড়ে ভিড়! কী ভিড়! কী ভিড়! নাচ দেখবে কী তারা! মিতুলের নাচ দেখে নিজেরাই নাচতে শুরু করে দিল।
পুতুল নাচে, মিতুল নাচে
তাই না দেখে ধাড়ি নাচে, ধেড়ে নাচে
ছোটকা নাচে, ছুটকি নাচে
বাচ্চা নাচে, কাচ্চা নাচে
হই হই কাণ্ড!
মিতুলের নাচের কথা এ-কান থেকে ও-কান গেল। এমুখ থেকে ওমুখ গেল। এ-গ্রাম থেকে ও-গ্রাম গেল।
কেউ আসছে পায়ে হেঁটে
কেউ চলেছে হাতির পিঠে
টগ বগ টগ ছুটছে ঘোড়া
ছুটছে ঘোড়া এক্কাগাড়ি
ক্যাঁচ ক্যাঁচ ক্যাঁচ গোরুর গাড়ি!
অবাক! সক্কলে অবাক! এমন নাচ হয় না তো!
একবার দেখল। মন ভরল না।
দুবার দেখল। চোখ মানল না।
তিনবারের বার, আশ মিটল না।
তাই বার বার দেখল। বার বার ছুটল। রাত্তিরে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে পুতুল নাচের স্বপ্ন দেখল!
কথাটা পৌঁছে গেল রাজবাড়িতে। পুতুল নাচের কথা।
প্রথমে পৌঁছল দ্বারীর কানে।
দ্বারী বলল সিপাইকে।
সিপাই শোনাল মাহুতকে।
মাহুত থেকে বামুনঠাকুর।
বামুন থেকে ঝিয়ের কানে।
ঝি বললে রানিমাকে।
রানি তুলল রাজার কানে।
রাজা বললেন, 'তাই নাকি? তবে তো দেখতে হয় পুতুলনাচ।'
অমনি সাজ সাজ রব পড়ল। রাজা মেলায় চললেন। পুতুলের নাচ দেখতে।
নাচ দেখলেন। অবাক চোখে চেয়ে রইলেন। বললেন, 'ডাক তো ছেলেটাকে।'
ডুংরির ডাক পড়ল।
'তোমার পুতুল তো বেশ নাচে!' রাজা বললেন।
ডুংরি মাথা হেঁট করল।
'আমারও একটি পুতুল আছে। সেও নাচতে জানে। তার সঙ্গে তোমার পুতুল নাচতে পারবে? নাচে তাকে হারাতে পারবে!' রাজা জিজ্ঞেস করলেন।
ডুংরি এবার মাথা তুলল। বুক ফুলিয়ে বলল, 'নিশ্চয়ই!'
'যদি তোমার পুতুল আমার পুতুলকে হারায়, তবে তোমায় রাজ্য দেব। যদি তোমার পুতুল হারে, তবে তোমার পুতুল নেব।' রাজা বললেন।
ডুংরি বলল, 'আমার পুতুল কোনোদিন হারে না। রাজামশাই, মিথ্যে আপনার বাজি। আমি নাচ লড়তে রাজি।'
রাজা বললেন, 'বেশ।' বলে গোঁফে হাত বুলালেন।
মিতুল মুচকি হাসল। রাজার গোঁফ দেখে।
তারপর?
ড্যাম কুড় কুড় বাদ্যি বাজে।
পিউ পিউ পিউ বাঁশি।
তাক দুমা দুম ঢোলক বাজে।
কাঁই না না না কাঁসি।
হই হই পড়ে গেল। কাতারে কাতারে লোক জমেছে। ছাতের ওপর গাছের ডালে। পথের ধারে রথের চূড়ায়। ঘোড়ার পিঠে। হাতির মাথায়।
মেলার মাঠে দুই ধারে দুই মঞ্চ হল।
এক মঞ্চে মিতুল দাঁড়াল। আর এক মঞ্চে রাজার পুতুল ছোট্ট মেয়ে!
কী সুন্দর সেজেছে রাজার পুতুল ছোট্ট মেয়ে। রেশমি শাড়ি। রংবাহারি। গোলাপ-গোলাপ ঠোঁট। সারা অঙ্গে মুক্তা-হিরা, পান্না-চুনি। ঝিলিক ঝিলিক।
আর তেমনি সেজেছে মিতুল। যেন রাজপুত্তুর! মাথায় মুকুট। যেমনি জামা তেমনি কাপড়। আলোয়-আলোয় ঝলমল। সোনায়-সোনায় টলমল।
বাজনা বাজল। মিতুল নাচ ধরল।
রাজপুত্তুর শিকারে যাচ্ছে। হাতে তার তিরধনুক। সামনে সোনার হরিণ। হরিণ ছোটে, মিতুল ছোটে। হরিণ নাচে, মিতুল নাচে। নাচতে নাচতে মিতুলের তির ছুটল। হরিণ অমনি টুপ করে লুকিয়ে পড়ল। অমনি একটা বাঘ! 'গাঁক' করে মিতুলের সামনে লাফিয়ে পড়েছে। পড়েই ঝাঁপিয়ে পড়ল।
বাঘ লাফিয়ে ডাইনে ছোটে। মিতুল ছোটে বাঁয়ে।
বাঘ যদি যায় বাঁদিকে তো মিতুল ছোটে সামনে।
বাঘে মিতুলে লড়াই লেগে গেল। সে কী কাণ্ড! একবার তিরের ফলা বাঘের চোখে যায়-যায়! আর একবার বাঘবাবাজি মিতুলকে খায়-খায়!
'মিতুল!' কে যেন চেঁচিয়ে ডাকল আঁতকে উঠে!
কে চেঁচাল তো কে চেঁচাল! কে শুনবে কার কথা! যা লড়াই চলছে। সবাই তটস্থ। ভয়ে আড়ষ্ট।
'মিতুল!' আবার কে ডাকল।
'মিতুল!' জোরে ডাকল।
'মিতুল!' আরও জোরে।
'মিতুল!' খুব জোরে।
ওমা! কে ডাকছে? রাজার পুতুল-মেয়ে না?
মেয়ে ডাকছে? মিতুলের নাম জানল কেমন করে? ভালো করে দেখি তো!
আরে! আরে! এ যে সেই রাজকন্যা! মিতুলের বোনটি! এ কী কাণ্ড! কেমন করে রাজবাড়ি গেল? কেমন করে চিনল মিতুলকে?
মিতুল তার বোনটিকে দেখেওনি। চিনতেও পারেনি। ডাক শুনতেও পায়নি। শুনবে কী! এখন লড়াই বাঘের সঙ্গে। বাঘের সঙ্গে লড়তে গেলে অন্য কথা কানে নেয়!
দেখতে দেখতে সাঁই-ইই তির ছুটল মিতুলের হাত থেকে। লাগল বাঘের চোখে। আর একটা তির সাঁই-ই লাগল গিয়ে বাঘের আর এক চোখে। ঝরঝর করে রক্ত পড়তে লাগল। বাঘের চোখ অন্ধ। ল্যাজ গোটানো। মারল ছুট। আর এমনি গাছের ডাল ভেঙে পড়ল। হাতির শুঁড় নেচে উঠল। লক্ষ লোক 'সাবাস সাবাস' করে চেচিয়ে উঠল। মিতুলের নাচ শেষ হল! লক্ষ লোকের মাঝ থেকে তার বোনটিও খুশিতে চেঁচিয়ে উঠল। আবার ডাকল, 'মিতুল আমি বোনটি। আবার ডাকল, 'মিতুল। আমি তোমার বোনটি। আমার দিকে চাও।' মিতুল শুনতেই পেল না। যা হই হই!
এবার রাজার পুতুল-মেয়ের পালা।
আবার বাজনা বাজল। সুর উঠল। গাছে গাছে ফুল। গোলাপ, টগর, জুঁই। ফুলে ফুলে রং। হাওয়া দোদুল দোলা।
কিন্তু পুতুল-মেয়ে যেন কেমন কেমন নাচছে! নাচতে নাচতে থামছে। মিতুলের দিকে চাইছে। থামছে। আবার নাচছে। বাঁশিতে সুর কাটছে। নূপুরে তাল পড়ে না। নাচতে যেন মন সরে না। হাজার হাজার লোক ছি ছি করে চেঁচিয়ে ওঠে। হি হি করে হেসে ওঠে। ছ্যাঁ ছ্যাঁ করে পালিয়ে যায়।
মেয়ে আর নাচে না। সবাই চেঁচিয়ে উঠল, 'হেরে গেছে, হেরে গেছে।' লজ্জায় রাজার মুখ লাল হয়ে গেল।
ডুংরি মিতুলকে বুকে নিয়ে লাফিয়ে উঠল। জয়ের আনন্দে। হাজার হাজার লোক জয়ের মালা পরিয়ে দিল ডুংরির গলায়। উৎসব লেগে গেল ডুংরিকে নিয়ে, মিতুলকে নিয়ে। রাজার পুতুল মেয়ের দিকে কেউ ফিরেও তাকাল না।
মিতুলও এতক্ষণ দেখেনি রাজার মেয়ে-পুতুলকে। এবার ঘুরে দাঁড়াল মিতুল। বুক ফুলিয়ে চাইল তার দিকে। থমকে গেল। চমকে উঠল। মুখখানি তার চেনা-চেনা লাগছে যেন!
আরও ভালো করে দেখল মিতুল।
চোখ দুটি তার জানা-জানা লাগছে যেন! মেয়েটি কাঁদছে কেন? মিতুল চিনতে পেরেছে!
লাফিয়ে উঠল মিতুল। চেঁচিয়ে উঠল, 'বোনটি!'
সাড়া দিল বোনটি, 'মিতুল!'
সে-ডাক কেউ শুনতে পেল না। খালি শুনল মিতুল আর তার বোনটি। শুনল, কিন্তু কেউ তো কারো কাছে যেতে পারল না। পারল না তো বোনটি মিতুলের গলা জড়িয়ে খুশিতে কেঁদে উঠতে। কেমন করে পারবে? ওরা যে পুতুল! ওদের মনের কথা কে জানে! কেউ না। একজনও না।
অপমানে লজ্জায় উঠে দাঁড়াল রাজা। বলল, 'চলো।'
রাজার পুতুল-মেয়ে রাজার সঙ্গে রথে চেপে চলে গেল। আর মিতুল ডুংরির কোলে চেপে ডুকরে ডুকরে কাঁদতে লাগল। এত আনন্দেও তার মন একটুও মানছে না। এত কাছে পেয়েও সে বোনটিকে খুঁজে পেল না মিতুলের মনে হচ্ছে, বার বার মনে হচ্ছে, সে জেতেনি, সে জেতেনি, সে হেরে গেছে। কেঁদে ফেলল মিতুল। কোথায় গেলে পাবে তার বোনটিকে? কোথায়? কোথায়?
কাঁদতে কাঁদতে রাত এসে গেল। ঘুম-ঘুম রাত।
রাত এল। মেলার আলো নিভল। দোকানপাট বন্ধ হল। সব নিজঝুম। চুপচাপ। কেমন নিঃসাড়ে আসে রাত? কেমন সবাইকে ঘুম পাড়িয়ে দেয়!
ঘুম এল না মিতুলের। উঠে দাঁড়াল মিতুল। দেখল ডুংরির দুটি চোখের দিকে। কী ঘুম ঘুমোচ্ছে সে! বেরিয়ে পড়ল তাঁবুর পর্দা ঠেলে রাস্তায়! চুপিচুপি। কেউ না দেখতে পায়! সে রাজার বাড়ি যাবে। যাবে সে বোনটির কাছে! কিন্তু যাবে কেমন করে? সে তো রাজার বাড়ির রাস্তা জানে না!
রথের দাগ রয়েছে রাস্তায় এখনও। রাজার রথের দাগ। মিতুল অন্ধকারেও স্পষ্ট দেখতে পেল। মনে হল মিতুলের, দাগ দেখে দেখে তো চলা যায়! চলল মিতুল। চলল ওই রথের চাকার দাগের ওপর পা ফেলে ফেলে। ছোট্ট ছোট্ট পা।
অনেকক্ষণ হেঁটেছে মিতুল। ছোট্ট পা দুটি ব্যথা-ব্যথা করছে হাঁটতে হাঁটতে। তবুও যেতে হবে মিতুলকে। বোনটিকে তার খুঁজে পেতে হবে। যেমন করে হোক।
আলো দেখা গেল। একটু দূরে। আলোর দিকে চেয়ে চেয়ে এগিয়ে গেল মিতুল। ক- পা যেতে একটা আকাশ-ছোঁয়া দরজা। মিতুলের নজরে পড়ল। আরও ক-পা যেতে মিতুল স্পষ্ট দেখল রথের চাকার দাগ আকাশ ছোঁয়া দরজা দিয়ে ভিতরে চলে গেছে। তবে কি এটা রাজবাড়ি?
আরও এগিয়ে গেল মিতুল। উঁকি মারল দরজার আড়াল থেকে। দরজার দুপাশে দুজন লোক বসে আছে। বসে বসে ঢুলছে। কোমরে তাদের তরোয়াল। হাতে বর্শা। মিতুল চুপিসাড়ে টুক করে ভিতরে ঢুকে গেল। দেখতেই পেল না লোক দুটো। ঢুললে কি দেখা যায়! অত বড়ো বাড়িতে এখন বোধ হয় সববাই ঘুমোচ্ছে। জেগে আছে মস্ত মস্ত সেজবাতি! দেওয়ালের ওপর। বাবা! দালান তো নয়! এদিক থেকে ওদিক দেখাই যায় না। ঝকঝকে, তকতকে! শ্বেত পাথরের চক মেলানো। হাঁটতে হাঁটতে পা পিছলে যায়! দেওয়ালের কোণ ঘেঁষে ঘেঁষে হাঁটছে মিতুল। খুব সাবধানে। তবু দুবার পড়ে গেল।
কিন্তু এই এত বড়ো রাজবাড়িতে কোথায় খুঁজবে সে বোনটিকে? কোন দিকে যাবে? কেউ যদি দেখে ফেলে মিতুলকে!
তুব সে হাঁটল এঘর-ওঘর দেখতে দেখতে। এমহল-ওমহল ঘুরতে ঘুরতে। একটা সিড়ির সামনে দাঁড়াল মিতুল। ওপরে উঠতে পারলে হয়! কিন্তু উঠবে কেমন করে? সিধে ওপরে যাওয়া কী চারটিখানি ব্যাপার! ভাবতে ভাবতে চমকে উঠল। 'খট, খট, খট!' পায়ে চলার শব্দ যেন! হ্যাঁ, ঠিক তাই। কে যেন হাঁটতে হাঁটতে এদিকেই আসছে! কী করবে মিতুল?
'এই হো হো হো,' লোকটা কী বিকট চেঁচিয়ে উঠল। দেখতে পেল নাকি! পিলে চমকে গেল মিতুলের! আগুপিছু কিচ্ছু না ভেবে, ' দে ছুট, দে ছুট।' মিতুল ছুট দিল সিঁড়ির ওপর। টপাস টপাস করে ছোট্ট ছোট্ট পা ফেলে এক্কেবারে ওপরে। ছুটতে ছুটতে ডানদিক গেল। ডানদিক থেকে বঁদিকে গেল। সামনে ঘর। পিছনে ঘর। এধার আলো। ওধার কালো। কালো দেখে, কালো কালো অন্ধকারে চুপটি করে লুকিয়ে পড়ল। লুকিয়ে ঘাপটি মেরে বসে রইল।
একটু পরে যখন সব চুপচাপ, কোনো হাঁকডাক নেই, নিঃসাড়, তখন মিতুল ওধারের আলোর দিকে ছুটে গেল। আলোর সামনে ঘর। ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ল মিতুল। ঢুকেই সামনে পালঙ্ক। পালঙ্কের নীচে চুপটি করে বসে রইল।
একটুক্ষণ বসে রইল। আর কোনো সাড়া নেই। কোনো শব্দ নেই। মিতুল উঁকি মারল পালঙ্কের নীচ থেকে। উঁকি মারল, তারপর পা বাড়াল। বাইরে এল। আহা! ঘরটি কী সুন্দর! দেওয়ালে দেওয়ালে আঁকা রং সাজানো ছবি। মাথার ওপর ফুল! একটা ফুল খুব বড়ো। পাশে ছোটো ছোটো অনেক আরও! নীল আলো ছড়িয়ে আছে সারা ঘরে! একটা দোলনা। দুলছে দুল দুল। হাওয়াতে। চোখ জুড়িয়ে গেল মিতুলের। ছোট্ট পালঙ্ক। ঝকঝকে বিছানা পাতা। কিন্তু কেউ তো শুয়ে নেই পালঙ্কে। কাউকে তো দেখতে পাচ্ছে না মিতুল!
হঠাৎ বুকটা ধক করে কেঁপে উঠল মিতুলের। জানলার ধারে যেন কে বসে আছে! গালে হাত দিয়ে। কে ও?
বোনটি! ডেকে উঠল মিতুল পিছন থেকে আচমকা!
ওমা! সত্যিই তো মিতুলের বোনটি বসে আছে!
চমকে উঠল মিতুলের বোনটি। লাফিয়ে দাঁড়াল। ছুট্টে এল। গলাটি জড়িয়ে ধরল মিতুলের। চোখে চোখে জল ভরে গেল। উপছে গেল।
'কোথায় ছিলে এতদিন আমার ভাইটি?'
মিতুল বলল, 'লুকিয়ে লুকিয়ে!'
বোনটি ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করল, 'কেউ দেখতে পায়নি তো?'
মিতুল ঘাড় নাড়ল, 'না।' বোনটির চোখের জল মুছিয়ে দিল মিতুল।
'চোখ কেন কাঁদে মিতুল?' জিজ্ঞেস করল বোনটি। 'চোখ যদি না থাকত?'
মিতুল বলল, 'আমি তোমায় কোনোদিন দেখতে পেতুম না।'
'আমিও তোমায় কোনোদিন দেখতে পেতুম না। বসে বসে তোমার কথা ভেবেছি কত দিন, কত রাত!'
মিতুলও বলল, 'আমিও তোমায় খুঁজেছি কত দিন, কত রাত! কেমন করে রাজবাড়িতে এলে?'
'সে তো অনেক গল্প!'
মিতুল বলল, 'আজ সারা রাত শুধু গল্প করব। বলো তুমি সে গল্প!'
বোনটি বলল, 'সেই যে ঠাকুরদাপেঁচা আমায় পিঠে নিয়ে উড়ল, আর থামল না। উড়তে উড়তে কত নদী পেরিয়েছি, কত বন পেরিয়েছি, কত পাহাড় পেরিয়েছি। ঠাকুরদাপেঁচাকে জিজ্ঞেস করেছি, 'আমার ভাইকে কি খুঁজে পাব না?'
ঠাকুরদা বলল, 'এই তো এত খুঁজছি, পাচ্ছি কই?'
'তবে? কী হবে আমার?' জিজ্ঞেস করেছি আমি ঠাকুরদাপেঁচাকে।
ঠাকুরদা বলল, 'তাই তো!' তারপর বলল, 'আমার কাছেই বা থাকবি কী করে? আমার বাসা গাছে। তার চেয়ে চ, তোকে রাজবাড়িতে পৌঁছে দিই। সুখে থাকবি।'
'ঠাকুরদাপেঁচা আমায় রাজবাড়ির ছাদের ওপর নামিয়ে দিয়ে চলে গেল। রাজা একদিন ছাদে হাওয়া খেতে উঠলেন। আমায় দেখতে পেলেন। আমায় আদর করে ঘরে তুললেন। আমি নাচলুম। তারপর থেকে আমি এখানেই আছি। একদিন রাজা খুব ধুমধাম করে ভোজ দিলেন। দূর দূর দেশ থেকে রাজকন্যা এল। কত রাজপুত্তুর। কত রাজরানি। কত বড়ো বড়ো রাজা। রাজা তাঁদের বললেন, 'এইটি আমার পুতুলমেয়ে। আপনাদের নাচ দেখাবে।'
'আমি তাঁদের নাচ দেখালাম। আমার নাচ দেখে সবাই অবাক হয়ে গেল। ধন্যি ধন্যি পড়ে গেল। সবাই ভাবল পুতুল আবার এমনি করে নাচতে পারে! তারপর থেকে আমি রাজাকে রোজ নাচ দেখাই। সেই থেকে আমি রাজার পুতুলমেয়ে।'
মিতুল বলল, 'আর আমি--'
ঘন্টা বাজল। নিজের গল্প বলতে গিয়ে থমকে গেল মিতুল। ভোরের ঘন্টা। এক্ষুনি ঘুম ভেঙে যাবে সক্কলের। কেউ যদি মিতুলকে দেখতে পায়? কী হবে তখন?
বোনটি ব্যস্ত হল। বলল, 'মিতুল তুমি লুকিয়ে পড়ো।'
মিতুল ভয়ে ভয়ে বলল, ' কোথায়?'
'আমার ওই গয়না রাখার বাক্সটার পাশে।'
'কতক্ষণ লুকিয়ে থাকব?' জিজ্ঞেস করল মিতুল।
'রাত আসুক। রাত্তির এলে সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়বে, আমরা তখন এখান থেকে চলে যাব। রাজবাড়িতে রাজার পুতুলমেয়ে সেজে আর থাকতে ইচ্ছে করছে না।'
মিতুল বলল, 'সেই ভালো।' বলে গয়না রাখার বাক্সের পাশে লুকিয়ে পড়ল।
সেদিন সারারাত জেগে কেটেছে রাজার। ঘুম এল না চোখের পাতায়। লজ্জায়। অপমানে। রাগে। কী না একটা বাচ্চা ছেলে তার পুতুলকে হারিয়ে দিল! ছিঃ ছিঃ ছিঃ! সকালবেলা ডাক পড়ল মন্ত্রীর।
রাজা হুকুম করলেন, 'আমার ওই পুতুলটা চাই। ওই ছেলেটার পুতুল।'
একশো সিপাই সাজল। ছুটল তারা ডুংরির পুতুল কেড়ে আনতে। জানতেও পারল না সে-পুতুল যে রাজবাড়িতেই লুকিয়ে আছে। রাজার মেয়ে-পুতুলের কাছে!
ডুংরির তাঁবু তছনছ করে ফেলল সিপাইরা।
পুতুল পাওয়া গেল না।
ডুংরিকে তারা মেরে অজ্ঞান করে দিল।
ডুংরি কিছুতেই বলতে পারল না। ডুংরি বলবে কেমন করে? সে নিজেও জানে না। সে নিজেও অবাক! কোথায় গেল তার পুতুল?
সিপাইরা ডুংরিকে বন্দী করে নিয়ে চলল রাজার কাছে।
মিতুলের বোনটি দাঁড়িয়ে ছিল ঘরের জানলায় একা। মিতুল ঘুমিয়ে পড়েছিল বাক্সের পাশে। লুকিয়ে লুকিয়ে। জানলায় চোখ মেলে দেখছিল বোনটি। বাইরে। এখান থেকে স্পষ্ট দেখা যায় রাজবাড়ির সিংদরজাটা। সিংদরজার ওপর দিয়ে, আরও দূরে ছবির মতো শহর। রোজ দেখে বোনটি। রাস্তার ওপর দিয়ে উট চলেছে হেঁটে হেঁটে, দুলে দুলে। বেশ লাগে দেখতে।
মিতুলের ঘুম ভেঙে গেল। বাক্সের পাশটা যা ঘুপটি! আরাম করে ঘুমোনো যায়! মিতুল উঁকি মারল। তার বোনটিকে দেখতে পেল না। তাই আর একবার উঁকি মারল। বারে! বেশ তো আরাম করে বসে আছে জানলার ধারে বোনটি। আলতো আলতো পা ফেলে বেরিয়ে এল মিতুল। পিছন থেকে ঝুপ করে চোখ দুটি চেপে ধরল।
'এ কী বেরিয়ে এলে যে!' থতমত খেয়ে জিজ্ঞেস করল বোনটি!
উঃ! ওই অন্ধকারে ঘাপটি মেরে পড়ে থাকতে ভালো লাগে? তুমি তো বেশ হাওয়ায় বসে আছ!' বলল মিতুল। হঠাৎ নজর গেল বাইরে, ' দেখো, দেখো বোনটি, কেমন উট হাঁটছে!'
চোখ মেলে চাইল বোনটি। বলল, ' দেখো, দেখো, কেমন হাতি যাচ্ছে!'
দুজনে চোখ মেলে তাকিয়ে ছিল উট আর হাতির দিকে। হঠাৎ বোনটি সিংদরজার দিকে তাকাল। বলল, 'মিতুল, মিতুল, রাজার সিপাইরা কাকে বেঁধে আনছে দেখো!'
মিতুল চেয়ে দেখল। চমকে উঠল। বলল, 'আরে! আরে এ যে ডুংরি!'
'সে কে?' জিজ্ঞেস করল বোনটি।
মিতুল বলল, 'ওই তো আমার বন্ধু। ওর কাছেই তো আমি এতদিন ছিলুম। ওকে ধরল কেন সিপাই?' ব্যস্ত হয়ে উঠল মিতুল।
বোনটি বলল, 'আমি যে হেরে গেছি তোমার কাছে, তাই। রাগ হবে না রাজার? লক্ষ লক্ষ লোক দেখল, কী অপমান বল তো!'
'তার জন্যে ডুংরির কী দোষ? ও তো কিছু অন্যায় করেনি। ওকে কেন বেঁধে আনবে?' জিজ্ঞেস করল মিতুল।
'রাজা হয়তো শাস্তি দেবে।'
'না, না', ব্যাকুল হয়ে তার বোনটির হাত দুটি জড়িয়ে ধরল মিতুল। বলল, 'না, না, তা হতে দেব না। কিছুতেই না। ডুংরির জন্যেই যে তোমাকে আমি খুঁজে পেয়েছি।'
বোনটি এবারে ব্যস্ত হয়ে বলল, 'তুমি আবার লুকিয়ে পড়ো। নইলে তোমাকেও ধরে নিয়ে যাবে। যা হবার সেই রাত্তিরে। সববাই যখন ঘুমিয়ে পড়বে।'
মিতুল আবার লুকিয়ে পড়ল বাক্সটার আড়ালে। লুকিয়ে লুকিয়ে ডাকল, ' বোনটি!'
'কেন?'
'আমায় একটু কাগজ আর দোয়াত-কলম দেবে?'
'কী করবে?'
'দাও না। পরে বলব।'
কাগজ আর দোয়াত-কলম এগিয়ে দিল।
মিতুল লিখতে বসল বাক্সের আড়ালে।
আজ ভারি খুশি। ভারি খুশি রাজকন্যা পুতুলটি। দোলনায় দোল খেতে লাগল রাজকন্যা। আজ যে সে মিতুলকে ফিরে পেয়েছে। দোল খাচ্ছে আর ভাবছে, 'কী লিখছে মিতুল?'
মিতুল চিঠি লিখছে ডুংরিকে।
রাত্তির হয়ে গেছে অনেকক্ষণ। মস্ত রাজবাড়িটা ঘুমে নিজঝুম। ঘুমিয়ে পড়েছে সক্কলে। ঘুমায়নি মিতুল আর তার বোনটি। দুজনেই তৈরি এখন। সময় গুনছে। আজ চলে যাবে তারা। তার আগে শেষবারের মতো মিতুল দেখে যাবে ডুংরিকে। রাজবাড়ির কয়েদখানায় সে যে বন্দী আছে!
ঘন্টা বাজল ঢং ঢং। অন্ধকার নিস্তব্ধ রাত্তিরে কত দূরে মিলিয়ে যাচ্ছে ঘন্টার সুর। সময় হল। এগিয়ে এল বোনটি। বলল, 'চলো মিতুল, যাই।'
মিতুল ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল, 'কোন দিকে?'
বোনটি বলল, 'আমার হাত ধরো।'
মিতুল বোনটির হাত ধরে বেরিয়ে পড়ল।
খুব সাবধানে যেতে হবে। সারারাত জেগে থাকে সান্ত্রিরা। সিঁড়ি দিয়ে নামতে হবে নীচে। একটু ইদিক-উদিক হলে আর রক্ষে নেই। নির্ঘাৎ বিপদ।
সিঁড়ি দিয়ে নামা, সেকি সহজ কাজ!
সিঁড়ির সামনে এসে দাঁড়াল দুজনে। মিতুল কানে কানে জিজ্ঞেস করল বোনটিকে, 'পারবে তো?'
'তুমি?'
মিতুল বলল, 'আমি উঠতে পেরেছি। নামতেও পারব।'
বোনটি বলল, 'আমি তো কোনোদিন নিজে নিজে উঠিনি। যদি পা ফসকে পড়ে যাই!'
মিতুল সঙ্গে সঙ্গে উপুড় হয়ে বসে পড়ল। বলল, 'আমার পিঠে চাপো।'
'পারবে তো?'
'এখন ভয় পেলে চলে!' উত্তর দিল মিতুল।
বোনটি মিতুলের পিঠে চাপল। মিতুল একটি একটি পা ফেলল। একটি একটি সিঁড়ি টপকাল। খুব সাবধানে।
'লাগছে মিতুল?' বোনটি জিজ্ঞেস করল।
মিতুল বলল, 'এখন কথা বলো না। লক্ষ রাখো কেউ আসছে কিনা!''
বাহাদুর ছেলে মিতুল। অত উঁচু সিঁড়ি। ঠিক নেমে এল বোনটিকে পিঠে নিয়ে। কেউ দেখতেও পেল না। কেউ জানতেও পারল না। কিন্তু এতখানি নামতে যা কষ্ট হয়েছে তা মিতুলই জানে। তবু তার মুখে হাসি। বোনটিকে পিঠ থেকে নামিয়ে ধরল। এগিয়ে চলল সামনে। এখন আর কথা নয়। একদম নয়।
আশ্চর্য! এত বড়ো রাজবাড়িতে একটিও মানুষের টিকি নেই। রাত্তিরে কেউ পাহারায় নেই! কী রে বাবা! সবাই একসঙ্গে ঘুমিয়ে পড়ল নাকি!
তাড়াতাড়ি চলল। এগিয়ে।
তারা তো জানে না কয়েদখানা কোনদিকে। দেখেওনি কোনোদিন। তবু সামনের দিকেই চলল। আঁকাবাঁকা পথে না হাঁটাই ভালো।
থমকে দাঁড়াল বোনটি। কী দেখল? মিতুলের হাত চেপে ধরল। একটা ফটক। সামনে দ্বারী। নিঃসাড় চুপচাপ দাঁড়িয়ে।
মিতুল বোনটির কানের কাছে মুখ এনে জিজ্ঞেস করল, 'কী করা যায়? সামনে দ্বারী দাঁড়িয়ে!'
বোনটি বলল, 'পিছন দিকে চলা যায় না?'
মিতুল বলল, 'পিছনে ফেরার আগে সামনেটা একবার ভালো করে দেখি দাঁড়াও।'
দেখল মিতুল এগিয়ে গিয়ে।
লোকটা নড়ে না।
আরও এগিয়ে গেল। হাঁটি হাঁটি পা পা।
তবু লোকটা সরে না।
কেমন যেন সাহস হয়ে গেল মিতুলের। হাতছানি দিয়ে ডাকল। হাত ধরল বোনটির। লোকটার পায়ের ফাঁক দিয়ে গলে গেল। একেবারে সামনে। ওমা! লোকটা ঘুমোচ্ছে বেমালুম! কী ঘুম-রে বাবা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে! ছুট দিল মিতুল বোনটির হাত ধরে ফটকের ভিতরে! বুঝতেই পারল না।
ছুটতে ছুটতে থামে কেন মিতুল? থেমে সামনে দেখে কেন? কী দেখে?
এই-রে! মিতুল আর রাজকন্যা রাজবাড়ির হাতিশালে ঢুকে পড়েছে যে! অজানতে। একেবারে হাতির পায়ের নীচে দাঁড়িয়ে তারা! কত হাতি রে বাবা! শুঁড় তুলছে। দোল খাচ্ছে। ঝিম মারছে। ঘুম দিচ্ছে। দিল ছুট। অমনি সব চেয়ে ছোটো হাতিটা দেখতে পেয়েছে। চেঁচিয়ে উঠল।
ছোটোকে দেখে বড়ো চেঁচাল। বড়ো চেঁচাল, ধেড়ে চেঁচাল। ধেড়ে চেঁচাল, ধাড়ি চেঁচাল। বেঁটে চেঁচাল ঢ্যাঙা চেঁচাল।
হাতিদের সে কী চেঁচানি। পাঁই পাঁই ছুট দিলে মিতুল আর রাজকন্যা সেখান থেকে। চোখ কান বুজে ছুটল। আর দেখতে! বেটক্কা ঢুকে পড়েছে ঘোড়াশালে।
ঘোড়াশালে হাজার হাজার ঘোড়া। লাল ঘোড়া, নীল ঘোড়া। সাদা ঘোড়া। হাঁদা ঘোড়া। কালো ঘোড়া। ভালো ঘোড়া। চিঁ হিঁ হিঁ! চিঁ হিঁ হিঁ! সব এক সঙ্গে চেঁচিয়ে উঠল। চার-পা তুলে নেচে উঠল। উরি ব্যস! পিলে চমকে যায়। কী করবে তারা? নির্ঘাৎ ধরা পড়ল বলে। সেখান থেকে ভোঁ কাট্টা!
সামনে পাখির ঘর। মারলে ধাক্কা মিতুল পাখির খাঁচায় অন্ধকারে। অমনি ডেকে উঠল খাঁচার পাখি কিচির-মিচির। চেঁচামেচি। এক ঝাঁক লালমন।
লালমন ডাকল। কাকাতুয়া হাঁকল। টিয়াপাখি রাগল। কিঁচকিঁচ! মিঁচমিঁচ! ক্যাঁকক্যাঁ! কোঁককোক। কান ঝালাপালা।
পালা, পালা। আর পালা! হাতি হাঁকছে। ঘোড়া নাচছে। পাখি ডাকছে। ভয় লাগছে। সে কী বিকট চিৎকার! গোটা রাজবাড়িটা যেন কেঁপে উঠল।
মিতুল দেখল ভারি বিপদ। বোনটির হাত ধরে তড়িঘড়ি ছুট দিল। দে ছুট, দে ছুট! আগুপিছু কিচ্ছু দেখল না। দেখবার উপায় আছে?
হঠাৎ থমকে দাঁড়াল মিতুল। কী যেন নজরে পড়ল! কে যেন শুয়ে আছে!
'ডুংরি!' চেঁচিয়ে উঠল মিতুল। 'ডুংরি ওই তো!'
বোনটি হাত দিয়ে মুখটি চেপে ধরল মিতুলের। মিতুল জিব কাটল। বলল, 'চেঁচিয়ে ফেলেছি!'
মিতুল জানে না ছুটতে ছুটতে কয়েদখানার দিকেই চলে এসেছে। ওই তো সামনে কয়েদখানার ভিতরে ঘুমোচ্ছে ডুংরি। মাটিতে পড়ে পড়ে। তাড়াতাড়ি ঢুকে পড়ল কয়েদখানার ভিতরে। গরাদ ডিঙিয়ে। ওরা তো পুতুল। একটুও কষ্ট হল না মাথা গলিয়ে ঢুকে পড়তে! ডুংরিকে সামনাসামনি দেখে ছ্যাঁৎ করে উঠল মিতুলের বুকটা। চটপট জামার পকেট থেকে চিঠিটা বার করল। আর বার করল সেই চাবিটা। দস্যুদের কাছ থেকে এই চাবিটাই তো মিতুল চালাকি করে কেড়ে নিয়েছিল। এতদিন কাছে কাছে রেখেছে লুকিয়ে। আজ আর কোনো দরকার নেই চাবির। দিয়ে দেবে মিতুল ডুংরিকে। তাই চিঠির সঙ্গে চাবিটা বেশ করে মুড়ল মিতুল। ছুড়ে দিল ডুংরির দিকে। তাড়াতাড়িতে টাল সামলাতে পারল না। হাত ফসকে গেল। চাবিটা ঠক করে গিয়ে পড়ল ডুংরির মাথায়। ইস! ঘুম ভেঙে গেল ডুংরির। চমকে উঠল। ঘুমচোখে চেয়ে দেখল সামনেটা। একী! এ যে তার পুতুল! আঁকপাকিয়ে হাত বাড়াল ডুংরি মিতুলকে ধরবার জন্যে। বোনটির হাত ধরে মিতুল ছুটল সঙ্গে সঙ্গে। চেঁচিয়ে উঠল ডুংরি, 'আমার পুতুল আমার পুতুল।' সে চিৎকার পৌঁছে গেল সকলের কানে।
ঘুম ভেঙে গেল সক্কলের। ভাঙবে না? কী চিৎকার! কী হইচই!
সিপাই এল ছুটতে ছুটতে। সান্ত্রি এল পড়তে পড়তে। মন্ত্রী এলেন। পাত্র এলেন। রাজা এলেন। রানি এলেন। ব্যাপার কী! চেঁচায় কেন হাতি-ঘোড়া, উট-ভেড়া! চেঁচায় কেন বন্দী ছেলেটা?
আর চেঁচায় কেন! একেবারে মাথা ঘুরে গেল সক্কলের! আরে বাবা! ওকী দেখেন? কী দেখেন? দেখেন, রাজার পুতুলমেয়ে, সেই ছেলে-পুতুলটার হাত ধরে ছুটছে! বাপরে বাপ! এ কোন দেশের পুতুল! মানুষের মতো ছোটে! ধর। ধর। ধর।
ছুট দিল রাজা পাঁই পাঁই পুতুল দুটোর পিছনে।
রাজাকে ছুটতে দেখে রানিও ছুটলেন।
রানিকে দেখে মন্ত্রি ছোটেন।
মন্ত্রী দেখে সান্ত্রী ছোটে।
সিপাই ছোটে, পেয়াদা ছোটে।
মাথায় টিকি, পুরুত ছোটে।
দাসী ছোটে, মাসি ছোটে।
মাসির পিছে মাহুত ছোটে।
মাহুত দেখে হাতি ছোটে।
হাতি ছোটে, ঘোড়া ছোটে।
ছাগল ছোটে, বাঁদর ছোটে।
সবশেষে একটা কুকুরছানা।
কিন্তু কী জোর ছুটছে মিতুল আর বোনটি! কেউ ধরতেই পারছে না। পুতুল অত জোরে ছোটে কেমন করে? ভেলকি নাকি!
ছুটতে ছুটতে অন্দরমহল পড়ে থাকল। ধরা গেল না।
মাঝের মহল পিছিয়ে রইল। নাগাল পেল না।
বারমহলও ছাড়িয়ে গেল। তবুও না। তবুও না।
ছুটতে ছুটতে রাজবাড়ি শেষ। সিংদরজাও পার। তারপর রাজপথ।
ওমা! রাজপথেও যে রাজা থামেন না! রাজাও থামেন না, রানিও দাঁড়ান না। হাতিও থামে না, ঘোড়াও রোখে না। ছুটছে। ছুটছে। ছুটছে।
মিতুল ছোটে, বোনটি ছোটে
ছুটতে ছুটতে বাড়ি গেল।
বাড়ি গেল, রাস্তা এল।
রাস্তা পারে দোকান পসার।
দোকান ফেলেই বাজার এল।
বাজার শেষে ঠাকুরবাড়ি।
আমের বাগান, জামের বাগান।
লিচুর বাগান, পান সুপারি।
বাগান পাশেই দীঘির হাট।
হাটের গায়ে মস্ত দীঘি।
থমকে দাঁড়াল মিতুল বোনটির হাত ধরে! এই সেরেছে! কেমন করে পেরুবে এই দীঘিটা। এখুনি পেরুতে হবে! ওই তো রাজা এসে গেল ছুটতে ছুটতে।
চুপ! চুপ! পদ্মপাতায় লাফিয়ে পড়ল মিতুল আর বোনটি।
লুকিয়ে পড়ল পাতার আড়ালে।
ধাঁধা লেগে গেল রাজার চোখে! কোথায় গেল পুতুল দুটো?
এদিক দেখেন, ওদিক দেখেন। সামনে ছোটেন, পিছনে ফেরেন। কই পুতুল?
চোখে ঝাপসা লাগল। মনে হল রাস্তা ধরে সামনে দিকে ছুটছে পুতুল!
আবার ছুট। ছুট। ছুট। গোটা রাজবাড়িটা ছুটে চলেছে যেন রাস্তা দিয়ে রাজার সঙ্গে!
কোথায় গেল সত্যিই তো! কোথায় লুকাল মিতুল আর রাজকন্যা?
হাঁপাচ্ছে মিতুল লুকিয়ে লুকিয়ে পদ্মপাতায়। কাঁপছে রাজকন্যা পাতার আড়ালে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। পারবে কেন এত সইতে! এত ছুটতে! ছোট্ট ছোট্ট পা-গুলি আর পারছে না। পারছে না দাঁড়াতে। পারছে না বসে থাকতে। শুয়ে পড়ল মিতুল আর রাজকন্যা পাতার ওপর। আর তো ভয় নেই তাদের কিচ্ছু। খুঁজে পেয়েছে যে ভাইটি তার বোনকে। না, আর তারা কোনোদিন যাবে না এখান থেকে বাইরে। না, রাখবে না চোখের আড়ালে বোনটিকে তার ভাইটি। না, না। মিতুল আর সাজবে না। মাথায় টুপি পরবে না। রাজকন্যা নাচবে না। পায়ে নূপুর বাজবে না। কোনোদিন না। ঘুমিয়ে পড়ল নিশ্চিন্তে রাজকন্যা আর মিতুল পাতার দোলনায়। ওরা ঘুমোবে এখন। কেউ ডেকো না যেন!
সূর্যি উঠছে। পাপড়ি ফুটছে। পদ্মের পাপড়ি। একটু একটু রং লাগছে। একটু একটু নীল। একটু একটু লাল। মৌমাছিরা গুনগুনিয়ে গান গাইছে। হাওয়া-ঝুরঝুর ঢেউ দিচ্ছে দীঘির জলে।
দেখো দেখো ফুল দুটি! চেনা চেনা লাগছে যেন! হ্যাঁ তো! ওই তো মিতুল, নাচন-পুতুল নীল ফুলটি। ওই তো পুতুল রাজকন্যা, লাল ফুলটি! নীল পদ্ম দুলে দুলে হাসছে। লাল পদ্ম জলের ঢেউ-এ নাচছে। আহা!
তবু রাজা ছুটছে। এখনও ছুটছে।
আর ডুংরি?
মিতুলের কথা ভাবছে আর মিতুলের চিঠি পড়ছে। মিতুল লিখেছে .
ভাই ডুংরি,
তুমি আমার জন্যে যা করেছ, ভুলব না কোনোদিন। তুমি জানো না, আমার বোনকে খুঁজেছি কত দিন। কত রাত। সে হারিয়ে গেছিল। তাকে খুঁজে পেয়েছি। তাই আজ তোমার কাছে ছুটি আমার। চিঠির সঙ্গে যে চাবিটা দেখছ, আমি দস্যুদের কাছ থেকে কেড়ে এনেছি। তোমায় দিলুম। একটা খুব গভীর বনে তাদের গুপ্তধন লুকানো আছে। সেখানে কত যে মণি-রত্ন, হিরা-পান্না আছে বলে শেষ করা যায় না। আমি ঠিক রাস্তা জানি না। তাই বলতেও পারছি না। পারলে খুঁজে নিও। তোমার জন্যে আমার অনেক ভালোবাসা রইল। তুমি ভুলে যেও আমায়। বিদায়।
মিতুল।
ডুংরি সে চিঠি পড়ছে এখনও। এখনও রাজা পুতুলের পিছু ছুটছে। আর নীল পদ্ম, লাল পদ্ম দীঘির জলে এখনও দোল খাচ্ছে। আর হাসছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন