সেই ছেলেটা

দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য

Sei Cheleta1

১১৪৮ বঙ্গাব্দ, চিনাকুরি গ্রাম, বর্ধমান

“কেউ আসছে!” চৈত্রের রৌদ্র খর হয়ে উঠেছে। চিনকুরি গ্রামের শেষ থেকে শুরু হয়ে দক্ষিণ-পশ্চিমে বহুদূরে দামোদর অবধি ছড়িয়ে গেছে ধু-ধু গোপাট। তার বুকে গরম বাতাসের হিলহিলে ছায়া কাঁপে। দিগন্তে দামোদরের আবছায়া সরু রেখাটার ওধারে হঠাৎ ধুলোর কুণ্ডলী জেগে উঠেছে একটা।

“ঘোড়সওয়ারের দল মনে হয় যেন! কী বলেন পণ্ডিতমশাই?” মাচানের নিচে মাটিতে থেবড়ে বসে থাকা কিশোরটির চোখ উদগ্রীব হয়ে উঠেছে দিগন্তে ধুলোর কুণ্ডলীটার দিকে চোখ রেখে।

“কী যে বলিস রে মুখ্যু! বায়কুণ্ডুলি উঠছে, বায়ুকুণ্ডুলি...”

পণ্ডিত রঘুনাথ আকাশের দিকে বেয়ে উঠতে থাকা ধুলোর সুতোগুলোর দিকে তাকিয়ে কাঁপা-কাঁপা গলায় নিজেকেই সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন যেন। হে রাধামাধব, তা-ই যেন সত্যি হয়। বয়স তিন কুড়ি পার হল তাঁর। দুনিয়া কম দেখেননি এতগুলো বছরে। মাত্রই পনেরো বছর আগের সেই বিভীষিকার দিনগুলো এত তাড়াতাড়ি ভুলে যাবার উপায় নেই। শীতের আমেজ কাটতেই ভরা বসন্তে তখন এমনি করেই জাফর কুলি খাঁ-র ঘোড়সওয়ারের বাহিনী এসে ঝাঁপিয়ে পড়ত এ-দিগরের বর্ধিষ্ণু গ্রামগুলোতে। দিগন্তে ওই ধুলোর কুণ্ডলী দেখা দিলে গ্রামের ঘরগুলো ফাঁকা হয়ে যেত এক-নিমেষে। আর তারপর শুরু হত তাণ্ডব। দেশের রাজা হয়ে নিজের প্রজার ওপর এমন ভয়ঙ্কর অত্যাচার যে কোনও পাষণ্ড করতে পারে তা এ-দেশের মানুষ এর আগে কখনও কল্পনাও করেনি। লোকে তার নাম রেখেছিল কালাপাহাড়।

তারপর সময় বদলাল। সরফরাজ নবাবের আমলটা বড় শান্তিতে কেটেছে তাঁদের। কিন্তু শোনা যায় এবারে ফের মুর্শিদাবাদের তখ্‌ত্‌-এ বদল এসেছে। গদিতে বসেছেন আলিবর্দি নবাব। তা, নতুন নবাব আবার কোন মূর্তি ধরে কে জানে! একই রক্ত তো বইছে শিরায়! দিগন্তের গায়ে ওই ধুলোর দাগ তাই তাঁর মতো প্রাচীনদের বুকে অ-কারণেও কাঁপন ধরায়।

চারপাশে আশ্চর্য শান্তি নেমে এসেছে। নিঝুম দুপুরে মাথার ওপর ঝুঁকে থাকা প্রাচীন আমগাছটার ডালে একলা একটা দোয়েল শিস দিয়ে যায়। পায়ের কাছে বসে হরু ঢুলছে ফের। পণ্ডিতমশাইয়ের কথা তার কাছে বেদবাক্য। অতএব ওই ধুলোটুলো নিয়ে আর কোনও ভাবনাচিন্তা তার মাথায় নেই উপস্থিত।

খানিক বাদে হাতের হুঁকোটা নামিয়ে রেখে উঠে দাঁড়ালেন পণ্ডিত। বাড়ি ফিরতে হবে। রসুই শেষ হয়ে গেছে এতক্ষণে। গৃহিনীর স্নান সেরে ফেরবার সময়ও হয়ে এসেছে। এই তালে গিয়ে বাড়িতে ঢোকা প্রয়োজন। না-হলে তিনি এসে বাড়ি ফাঁকা দেখলে কপালে দুঃখ আছে।

আলপথ ধরে ফিরতে-ফিরতেই কী মনে করে ফের একবার দিগন্তের দিকে চোখ ফেললেন রঘুনাথ। তারপর স্থানু হয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন সেইখানেই। ধুলোর ফিতেগুলো অদৃশ্য হয়নি এতক্ষণেও! তার অর্থ একটাই। বায়ুকুণ্ডলী এ নয়। ও-জিনিস এত দীর্ঘস্থায়ী হয় না। মুখ্যু রাখালটা ভুল দেখেনি! তবে কি...

তাড়াতাড়ি ফের আমগাছতলাতেই ফিরে এলেন রঘুনাথ। হরু তখনও বসে-বসে ঢুলছিল সেখানে। কাছে এসে তার কানের কাছে মুখটা নিয়ে একটা হাঁক দিলেন বৃদ্ধ পণ্ডিত। হরুর কোনও হেলদোল ঘটল না। রাখালি করে খায়। উদয়াস্ত খাটে। দুপুরে গরুগুলোকে চরতে ছেড়ে এইখানে বসে একটু ঘুম। সামান্য পণ্ডিতি হাঁকে সে-ঘুম ভাঙবার নয়।

একটু এদিক-ওদিক তাকিয়ে নিলেন রঘুনাথ এইবার। একে গায়ে ধাক্কা দিয়ে জাগাতে হবে। সে-ও এক ঝক্কি। এই অবেলায় স্নান করতে হবে ফের। তবে এই গরমে তাতে খারাপ লাগবে না খুব একটা। উপরন্তু, সন্দেহটা যে-ভাবে মাথায় কুরে-কুরে খাচ্ছে তাতে সেইটির নিরসণ না করে বাড়ি ফিরলে মুখে অন্ন কতখানি রুচবে সে-বিষয়েও খানিক সন্দেহ আছে তাঁর।

নীচু হয়ে ছেলেটার পিঠে একটা সজোর থাবড়া বসিয়ে দিতে ধড়মড় করে উঠে বসল সে, “ক্বে ক্বে— কী...”

“ওরে গর্দভ, কখন থেকে ডাকছি কানে যায় না তোর? নে, এখন গাছের মাথায় গিয়ে একবার ওঠ দেখি।”

“গাছে চড়ব... আম তো এখনও কুসী পণ্ডিতমশাই...”

“ধুত্তোর আমের কুসী। গাছে উঠে গোপাটের ওদিকপানে দামোদরের দিকে একবার চোখ ফেলে দ্যাখ বাপ, ব্যাপারখানা কী?”

বলতে-বলতেই ফের একবার দিগন্তের দিকে চোখ চলে গেল তাঁর। ধুলোর ফিতেগুলো এখন একটু-একটু এলোমেলো নড়ছে। এখনও বহুদূরে রয়েছে তারা। নদীর ওধারে। কিন্তু সেই প্রায় অদৃশ্য, ঈষৎ সঞ্চরমাণ ধুলোর কুণ্ডলীগুলো কোনও ভয়-ধরানো বার্তা পৌঁছে দিচ্ছিল তাঁর মনে।

হরুও খেয়াল করেছিল বিষয়টা। মহা উত্তেজিত হয়ে সে বলে, “আমি আগেই বলেছিলাম পণ্ডিতমশাই। তখন তো আপনি...”

“নে নে। আর বেশি মুখ নাড়তে হবে না। এখন ওঠ দেখি চটপট করে...”

কথাটা শেষ করবার আগেই হরু এক লাফে গাছের নিচু একটা ডাল ধরে দোল খেয়ে তার ওপরে গিয়ে চড়েছে। তারপর বাঁদরের মতো তরতর করে তার মগডালে উঠে গিয়ে দিগন্তের দিকে চোখ কুঁচকে খানিক দেখেই ওপর থেকে তার উত্তেজিত চিৎকার ভেসে এল, “ঘোড়া... ঘোড়া পণ্ডিতমশাই। আমি ভুল বলি নাই। ওরে বাপ রে! সমুদ্দুরের মতো যে! কুলকিনারা নাই। হুই দামোদরের ওধারে থানা দিয়ে আছে...”

রঘুনাথের ক্ষুধাতৃষ্ণার চিন্তা এক নিমেষে ঘুচে গেল। কারা এল ওরা! কেন? এই বিজন গ্রামদেশে যখন কোনও ঘোড়সওয়ার বাহিনী আসে তখন বলাবাহুল্য শান্তির খোঁজে তারা আসবে না। কিন্তু...

কয়েক-মুহূর্ত ভেবে নিয়ে তিনি ফের হাঁক দিলেন, “নেবে আয় ছোঁড়া। তারপর জমিদারবাড়ি যা। এক ছুটে যাবি। থামবি না কোথাও। গিয়ে বলবি আমি আসছি। জরুরি কথা আছে। আমি বাড়িতে একটা পাক মেরেই ওদিকে যাব।”

গাছ থেকে নেমে এসে, দ্রুত গ্রামের দিকে এগিয়ে যাওয়া শীর্ণ শরীরটার দিকে চোখ রেখে হরু এক-মুহূর্ত কী ভেবে মাথা নাড়ল একটু। বড়মানুষের চালচলন বোঝাই দায়। এই থির হয়ে বসে ছিল, আর এই এমন হড়বড় করতে লেগেছে যেন আকাশটাই ভেঙে পড়েছে এসে মাথার ওপরে। তবে তাতে তার কাজ কী? বড়মানুষের ব্যাপার। তার কাজ হুকুম তামিল করা। অতএব এক-মুহূর্ত মাথা নেড়ে সে সটান দৌড় লাগাল উত্তর-পশ্চিম কোণ বরাবর। ওইদিকেই জমিদারবাড়ি। এমনিতে পেয়াদারা তার মতো মানুষকে ওর সিংদরোজার কাছ ঘেঁষতে দেয় না মোটে। আর আজ? হরুও দেখবে কেমন করে আটকায় তারা তাকে। সাক্ষাত রঘুনাথ তর্কচূড়ামণির সন্দেশ নিয়ে যাচ্ছে সে। তেনার সামনে পড়লে জমিদারবাবুও পায়ের ধুলো নিয়ে জিভে ঠেকায়।

“এসো বুলান। খবর বলো।”

সূর্য পশ্চিমে ঢলেছে। ঠাকুরদালানের বারান্দায় গাছপালার ছায়া লম্বা হয়ে উঠছিল ক্রমশ। সেদিক থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে সামনে এসে প্রণাম করে দাঁড়ানো বাগদি লেঠেলটির দিকে তাকালেন চিনাকুরির জমিদার দেবকীনন্দন।

দীর্ঘ রণ পা-দুটো দেয়ালের গায়ে হেলান দিয়ে গামছাটা খুলে কপালের ঘাম মুছল বুলান, “বিশ হাজার সেপাই। দামোদরের ওধারে থানা দিয়েছে।”

“থানা মানে, তাঁবু-টাবু খাটিয়েছে?

“আজ্ঞে না। কুচ করে সব। ঘোড়ার বাচ্চায় চেপে।”

“ঘোড়ার বাচ্চা! এ আবার কী বৃত্তান্ত হে?” বারান্দার অন্যপাশে বসা রঘুনাথ মুখ খুললেন এবারে।

ইশারায় তাঁকে থামিয়ে দিলেন দেবকীনন্দন। তাঁর চোখ-দুটো ঝলসে উঠেছে হঠাৎ। ছোট আকারের টাট্টুঘোড়ার চল এ-অঞ্চলে বেশি নেই। তাহলে কি...

“তোকে দেখতে পেয়েছে?”

“কী যে বলেন হুজুর!” বুলান ঝকঝকে দাঁত বের করে নিঃশব্দে হাসল একবার, “বাঘের বাচ্চা তুলে আনতে পারি হুকুম হলে বাঘিনির পাশ থেকে। টেরও পাবে না। আর এ তো...”

“কাজের কথা বল বুলান। ঝাণ্ডা দেখেছিস?”

“আজ্ঞে। গেরুয়া ঝাণ্ডা হুজুর। মাঝে ফালি করে চেরা।”

সহর্ষে হাত-দুটো ঘষে নিলেন দেবকীনন্দন। আর সন্দেহ নেই। তারপর রঘুনাথের দিকে ফিরে বললেন, “জগজ্জননী মুখ তুলে চেয়েছেন তর্কচূড়ামণিমশাই। এরা মারাঠা। হৈন্দভ ধর্মধারক শিবাজি মহারাজের বংশধর সাহুরাজার সৈন্য। বাংলার উদ্ধারে এসেছে। আগের বছরেও এসেছিল। আলিবর্দি তাদের উড়িষ্যা পেরিয়ে ঢুকতে দেয়নি। এবার তাহলে সেই বাধা পেরিয়ে...”

“ধর্মরাজ্য! জয় মা ভবানী।” তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়ালেন রঘুনাথ। সেই দুপুরবেলায় দেবকীনন্দনকে এসে খবরটা দেবার পর থেকে উত্তেজনায় খিদে তেষ্টার বোধ ছিল না তাঁর। এতক্ষণে শরীরের ক্লান্তিটা টের পাচ্ছেন তিনি।

“কাল সূর্যোদয়ের আগে যদি একবার এসে পৌঁছোতে পারেন পণ্ডিতমশাই তো বড় ভালো হয়।” তাঁর পেছন থেকে ডেকে বললেন দেবকীনন্দন, “কাল সকালে আমি নিজে পাঁচজন ব্রাহ্মণকে সঙ্গে করে নিয়ে যাব তাঁদের স্বাগত জানাতে।”

“নিশ্চিন্ত থাকুন।” মাথা নাড়লেন রঘুনাথ। এ তো আমাদের কর্তব্য। দীর্ঘ অন্ধকারের যুগ কেটে দেশে ফের ধর্ম প্রতিষ্ঠিত হবে...”

তাঁর চলে যাবার পথের দিকে দেখতে-দেখতে সজোরে দুবার তালি বাজালেন দেবকীনন্দন। দিনকাল ভালো নয়। সবসময় আত্মরক্ষার প্রস্তুত তাঁকে থাকতেই হয়। দুপুরে রঘুনাথ এসে খবরটা দেবার পর তাঁর ডাকে সমস্ত কাজ ফেলে প্রায় হাজার-দেড়েক লেঠেল এসে জড়ো হয়েছে জমিদারবাড়ির সামনের মাঠে। অন্ত্যজ শ্রেণীর সামান্য মানুষ তারা। জমিদারের খায়-পরে। বিপদ আপদে তাঁর হয়ে লাঠি ধরে। এবার তাদের ছুটি দিতে হবে। আত্মরক্ষার আর প্রয়োজন নেই। যাঁরা আসছেন তাঁরা ধর্মের রক্ষক। অতএব পরম বন্ধু।

“শুনছ? জাগো...”

“উঁ...” বলে একটা শব্দ করে ফের পাশ ফিরে শুল সুদর্শন। সারাটা দিন খেত-খামারে পরিশ্রমের পর রাতের এই ঘুমটুকু তার বড় আরামের।

কিন্তু সদু থামল না। ফের তার কাঁধ ধরে জোরে-জোরে ধাক্কা দেয় সে, “ওঠো ওঠো, চোখ খুলে চাও। জঙ্গলে দাবানল লেগেছে যে...”

এইবার ধড়মড় করে উঠে বসল সুদর্শন। কথাটা সদু মিথ্যে বলেনি। বাড়ির সীমানা পেরিয়ে ঘন জঙ্গল। তার ওপারে দামোদর। সেই ঘন জঙ্গলের ভেতর থেকে আগুনের হলকার মতোই একটা আভা ক্রমশ উজ্জ্বল হয়ে উঠছিল।

শুকনোর সময়। এ-সময় একবার দাবানল লাগলে তার ফুলকি ছড়িয়ে গোটা গ্রাম ছাই হয়ে যাবার ভয় থাকে। ফলে বর্ষা আসা অবধি সে-নিয়ে সতর্ক থাকে গ্রামের মানুষজন।

“শাঁখ বের কর্‌ সদু।” বলতে-বলতেই ধুতিটা মালকোঁচা মেরে হাঁটুর ওপর তুলে দরজা খুলে ফেলছিল সুদর্শন। সদু অবশ্য তার আদেশের জন্য অপেক্ষা করেনি। তার আগেই কুলুঙ্গি থেকে শাঁখটা বের করে নিয়ে তাতে সজোরে ফুঁ দিতে শুরু করে দিয়েছে সে।

কয়েক মুহূর্তের অপেক্ষা। আর তারপরেই তাদের বাড়িটার পেছনদিকে ছড়িয়ে থাকা বাগদিপল্লীর ঘরে-ঘরে শাঁখের শব্দের প্রতিধ্বনি বেজে উঠল। জেগে উঠছে গোটা পল্লী। গ্রীষ্মের করাল মৃত্যুদূতের এই হঠাৎ হানার সঙ্গে তারা সকলেই পরিচিত।

সেই শুনতে-শুনতেই হঠাৎ থমকে দাঁড়াল সুদর্শন। মিলিত সেই শঙ্খের শব্দের মধ্যে একটা শব্দ যেন বেসুরে বাজছে।

“শুনছিস সদু?”

“কী শুনব? শাঁখই তো বাজছে!”

“শাঁখ নয় সদু...” সুদর্শনের গলায় মৃদু কাঁপুনির ছোঁয়া, “অন্যরকম আওয়াজ! কান পেতে শোন! জঙ্গলের ভেতর থেকে আসছে...”

সদু কথাটা শুনে উৎকর্ণ হল। ওদিকে জনবসতি নেই। গভীর জঙ্গল সোজা গিয়ে শেষ হয়েছে দামোদরের পাড়ে। তার ভেতর থেকে...

শব্দটা স্পষ্ট হয়ে উঠছিল ক্রমশ। তারা সতর্ক হল। শঙ্খের শব্দ এ নয়। আরও ভারী। আরও গম্ভীর। আর তারপর একেবারে হঠাৎ করে সেই রামশিঙার গম্ভীর, খণ্ড-খণ্ড শব্দকে ছাপিয়ে উঠল সমুদ্রের গর্জনের মতো একটা কোলাহল। কুটিরের সামনে দাঁড়ানো তরুণ দম্পতিকে থমকে দিয়ে সেই জঙ্গলের ভেতর থেকে বের হয়ে আসছিল একঝাঁক অশ্বারোহী। বেঁটে-বেঁটে ঘোড়ার পিঠে বসা মানুষগুলোর শরীরে যোদ্ধার বর্ম। তাদের হাতের খোলা তলোয়ার অসংখ্য মশালের আলোয় ঝলসে উঠছিল...

মধ্যরাত্রি অনেকক্ষণ পার হয়ে গেছে। জমিদারবাড়ির প্রশস্ত উঠোনে ওরা দশজন। বাড়ির ভেতর থেকে খুঁজে-পেতে একটা উঁচু খাট বের করে এনে সেখানে পাতা হয়েছে। খাটের ওপর বসে থাকা মানুষটা তার ঠান্ডা চোখ-দুটো একপাশে এনে জমা করা জিনিসপত্রগুলোর ওপর বুলিয়ে নিল। কিছু মোহর। কিছু গয়নাগাঁটি।

স্তূপটার দিকে চোখ ফেলে মাথা নাড়লেন দস্যুদলের প্রধান। পরিমাণ বিশেষ কিছু নয়। বাংলার ধনরত্নের বিষয়ে অনেক শুনেছেন তিনি। উড়িষ্যার শাসক রুস্তম জং তাঁর বিস্তারিত বিবরণ দিয়েই রঘুজি ভোঁসলেকে এই হানায় সম্মত করিয়েছিলেন। গত বছরের উড়িষ্যা আক্রমণের সময় রঘুজি তার প্রমাণও পেয়েছেন যথেষ্ট।

এ-লোকটা জমিদার। প্রাসাদের মতো বাড়ি। এর আসল সোনাদানা অন্য কোথাও লুকোনো আছে নিশ্চয়। তবে শক্ত মানুষ। চেহারাটা বাঙালিসুলভ নরমসরম গোলগাল। কিন্তু জেদ আছে। প্রায় ঘণ্টাতিনেকের চেষ্টাতেও ওই সামান্য জিনিসপত্রের চেয়ে বেশি কিছু বেরোয়নি এর বাড়ি থেকে।

সামনে দড়ি বেঁধে ফেলে রাখা লোকটার দিকে একবার রাগত চোখে ঘুরে দেখলেন দস্যুসর্দার। মূল লুটেরা বাহিনীকে বর্ধমানের পথে রওনা করিয়ে দিয়ে নিজে এই এলাকাটা ঘুরে যাবার কথা ভেবেছিলেন কিছু অতিরিক্ত রোজগার যদি হয়ে যায় সেই আশায়। কিন্তু সে-আশায় ছাই দিয়েছে এ। সঙ্গে প্রায় চারশো বারগির নিয়ে এসেছিলেন এ-গ্রামে। রাজসরকার থেকে মাইনেপত্র তাঁর সেপাইরা বিশেষ কিছু পায় না। তারা আসে লুটপাটের আশায়। অথচ গ্রাম থেকে তো রোজগার বিশেষ কিছুই হল না। এবার এর কাছ থেকে যদি...

দেবকীনন্দনের স্তম্ভিত চোখের সামনে এক একে সাজিয়ে রাখা হচ্ছিল মৃতদেহগুলো। মাঝরাত্রে হঠাৎ করেই গ্রামের বিভিন্ন দিক থেকে ভেসে আসা রাঘোজি ভোঁসলের নামে জয়ধ্বনি, মানুষের আর্তনাদ আর ঘোড়ার ডাকের শব্দ একটা রূঢ় বাস্তবের মধ্যে জাগিয়ে তুলেছিল তাঁকে। কিন্তু প্রতিরোধের কোনও ব্যবস্থা নেবার আগেই মানুষটা এল। পাহারায় থাকা লেঠেল দু’জনকে বিনা প্রশ্নে তলোয়ারের আগায় গেঁথে ফেলে দশজনের দলটা যখন সিংদরজা ভেঙে উঠোনে ঢুকে এল, দেবকীনন্দন ততক্ষণে বুঝেছেন, বড় ভুল হয়ে গেছে হিসেবে।

কিন্তু তখন দেরি হয়ে গিয়েছিল। এরা মানুষ নয়। একপাল বুনো জন্তুর মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে লোকটার দলবল যখন তাঁর জীবনটাকে তছনছ করে দিচ্ছিল, ওদের সর্দার এই মানুষটা তখন উঠোনে খাট পেতে বসে নীরবে দেখছিল সবকিছু। অবশেষে তাঁকে তার সামনে বেঁধে নিয়ে আসা হল। তাঁর চোখের দিকে তাকিয়ে মানুষটা একটাই কথা বলেছিল শুধু, “রুপি লাও...রুপি...”

তাঁর স্ত্রী ও দু’টি তরুণ ছেলের মৃতদেহ এবার তাঁর সামনে এনে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। নিথর শরীরগুলোয় নৃশংস অত্যাচারের চিহ্ন। মানুষ বলে চেনা যায় না তাদের আর। ইঙ্গিতে সেই শরীরগুলোর দিকে দেখিয়ে মানুষটা ফের একবার তাঁকে বলল, “রুপি দ্যা... রুপি... অন্যথা...”

এবার হাউ-হাউ করে কেঁদে উঠলেন দেবকীনন্দন। প্রিয় মুখগুলো তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠছিল বারবার। কাঁদতে-কাঁদতেই অশ্রুবিকৃত গলায় বলে উঠলেন, “এবারে আমাকেও নাও পণ্ডিত। আমাকেও নাও...”

মানুষটার চোখের পাতাও কাঁপল না একবার। শুধু হাতের একটু ইশারা করলেন তিনি। প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই গরম ছাই ভরা একটা থলে এসে ঢেকে দিল দেবকীনন্দনের মাথাটা। তাঁর পিঠের ওপর তলোয়ারের ভোঁতা বাঁটগুলো আছড়ে পড়ছিল বারবার...

“রুপি দ্যা বাংগালি...রুপি...”

*

রাত কেটে সকাল হয়েছে। প্রথম সূর্যের আলোয় তখনও ধিকিধিকি জ্বলতে থাকা ঘরবাড়িগুলোর আগুন আর চোখে পড়ে না। শুধু ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠে যায় আকাশের দিকে। সেখানে শকুনের দল ডানা মেলেছে। ওরা জানে এখানে অনেক খাদ্য আছে। একবার সেদিকে তাকিয়ে দেখলেন ভাস্কর পণ্ডিত। তারপর তাঁর তুলে ধরা তলোয়ারটার একটা ইশারা করে কাঁটাওয়ালা জুতো দিয়ে ঘোড়ার পেটে একটা ঘা মেরে এগিয়ে গেলেন সামনে। মূল সেনাবাহিনী বেশিদূর এগিয়ে যেতে পারেনি নিশ্চয়। জায়গাটা ঘনবসতি। রোজগারের সুযোগ তারা ছাড়বে না। কোন পথে তারা গিয়েছে তা-ও বুঝে নেবার অসুবিধে নেই কোনও। ভাস্কর পণ্ডিতের বাহিনী পোড়া জমি আর মৃতদেহের স্তূপ দিয়ে পথের নিশানা রেখে যায়।

মথুরা বিল, চারাপোল, চব্বিশ পরগনা

দিগন্ত-বিস্তৃত ঝিলটার বুকে চাঁদের আলো হাজারো টুকরোয় ছড়িয়ে গিয়ে ঝিলমিল করছিল। বৈশাখের শেষ। তবু প্রখর গ্রীষ্মেও এই মধ্যরাতে ঝিলের বাতাসের হালকা ঠান্ডার আমেজ। তার দক্ষিণ পাশের ঘন জঙ্গলের পাতায় মৃদু হাওয়ার সরসর শব্দ হয়।

জঙ্গলের নরম মাটিতে মৃদু শব্দ তুলে কতগুলো ছায়া এগিয়ে চলেছিল। সাধারণ মানুষের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ লম্বা, ঝড়ের গতিতে এগিয়ে চলা শরীরগুলোকে এই আলো-আঁধারীতে একদল প্রেতের মতোই দেখায়।

এগিয়ে চলা দলটার সবার আগে থাকা মূর্তিটা হঠাৎ গতি কমিয়ে একজায়গায় স্থির হয়ে দাঁড়াল। প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই গোটা দলটাই থেমে গিয়েছে তার পেছনে। তবে স্থির হয়ে নেই তারা। এদিক-ওদিক মৃদু নড়চড়া করে যেন ভারসাম্য রেখে চলেছে অস্বাভাবিক লম্বা ও সরু শরীরগুলো।

কয়েক মুহূর্ত সব চুপচাপ। তারপর হঠাৎ তাদের দলনেতার গলা থেকে অবিকল একটা চিতার ডাক জেগে উঠল। কয়েক মুহূর্ত সব চুপচাপ। আর তারপর তাদের পাশের জঙ্গলের ভেতর থেকে সেই ডাকের জবাবে ভেসে এল আর একটা গর্জন। শব্দটা শেষ হবার আগেই দলনেতার চাপা গলায় ডাক উঠল, “ভুবন... মার…”

প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই দলের ভেতর থেকে একটা মূর্তি বিদ্যুতের মতো এগিয়ে গেল ডাকটাকে লক্ষ্য করে। তার হাত থেকে ঝিলিক দিয়ে উড়ান দিয়েছে রুপোলি বিদ্যুতের মতো একটা সড়কির তীক্ষ্ণ ফলা।

পরমুহূর্তে শ্বাপদের তীক্ষ্ণ গম্ভীর মরণ আর্তনাদ জেগে উঠে ছিঁড়ে-খুঁড়ে দিল রাত্রির নিস্তব্ধতাকে।

ঝোপের ভেতর উঠতে থাকা আছাড়ি-পিছাড়ির শব্দটা লক্ষ্য করে হত্যাকারী এগিয়ে যাচ্ছিল। দলনেতা তাকে বাধা দিলেন, “ছেড়ে দে। ও শয়তান আমাদের পিছু নিয়েছিল। তার শাস্তি ও পেয়েছে। এখন সময় নেই হাতে। বলদেব পণ্ডিত মন্দিরে অপেক্ষা করে আছেন।”

কথাগুলো বলতে-বলতেই ফের গতি বাড়ালেন দলনেতা। মৃত শিকারকে ফেলে রেখেই তাঁর পেছন-পেছন এগিয়ে গেল এবার গোটা দলটা।

সামনের জঙ্গল পাতলা হয়ে আসছিল। বাঁয়ে, অনেক দূরে ঘুমন্ত কাঞ্চনপল্লীর ঘরবাড়িগুলো আবছা নজরে পড়ে। প্রশস্ত মথুরা বিলের চাঁদের আলো-মাখা জল এইবার দেখা দিয়েছে দলটার সামনে।

জঙ্গলের প্রান্তে একটা ছোট, পরিত্যক্ত মন্দির। তার সামনে এসে রণ-পা থেকে নেমে দাঁড়াল পঁচিশজনের দলটা। তারপর একে-একে ঢুকে গেল মন্দিরের অন্ধকার গর্ভগৃহে।

মন্দিরের ভেতরে দেবতাহীন একটা বেদি রয়েছে শুধু। স্থানীয় মানুষজন কখনও-কখনও সেই বেদির ওপরেই এসে ফুল দিয়ে যায় একটি-দু’টি। সেই শুকনো ফুলগুলোকে সরিয়ে দলের কয়েকজন মানুষ বেদির পাটাতনটাকে পাশে ঠেলে দিল এবার। সেখানে সিঁড়ির কয়েকটা ধাপ দেখা দিয়েছে। পাঁচজন মানুষকে পেছনে রেখে গোটা দলটা এবার নেমে গেল সেই সিঁড়ি দিয়ে, তার তলায় ছড়ানো সুড়ঙ্গ বেয়ে।

অবশিষ্ট পাঁচজন এবার পাটাতনটাকে নিজের জায়গায় ফিরিয়ে দিয়ে বেরিয়ে এল বাইরে। তারপর নিঃশব্দে ছায়ার মতোই অরণ্যের ছায়ায় মিশে গেল তারা। যতক্ষণ রঘুনাথ আর তাঁর দল চারাপোলের এই ভূগর্ভস্থ গুহামন্দিরে থাকবেন, ততক্ষণ তার প্রবেশপথে অতন্দ্র নজর রাখবে তারা।

“আমায় ডেকে পাঠিয়েছিলেন গুরুদেব?”

“হ্যাঁ রঘুনাথ। এস কানাই। কিছু পরামর্শ আছে। এস। এইখানে বস।”

মথুরাবিলের পাড়ের এই ভূগর্ভস্থ গুহামন্দিরটির পূজারি বলদেব ভট্টাচার্য রঘুনাথের কুলগুরু। বংশানুক্রমে দক্ষিণের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ধনীদের ওপরে ডাকাতি করে সংগ্রহ করা ধনরত্নের একটা বড় অংশ এই গুহামন্দিরে এনে দান করেছেন রঘুনাথের পূর্বপুরুষরা। সেই সম্পদের তত্ত্বাবধানে থেকেছেন এই ভট্টাচার্য বংশ। তাঁরাই এই ধনরত্নের সুষ্ঠু বিতরণের বন্দোবস্ত করে দরিদ্রনারায়ণের সেবায় রঘুনাথের বংশকে পথ দেখিয়েছেন যুগ-যুগ ধরে। দুষ্টের দমন, শিষ্টের পালনের কাজে প্রয়োজনীয় পথনির্দেশ দিয়ে তাঁরাই এগিয়ে নিয়ে চলেছেন যজমান বংশকে।

ভবানীমূর্তির পায়ের কাছে একটা জলচৌকিতে বসেছেন বলদেব। তাঁর পায়ের কাছে মাটিতে রঘুনাথ ও কানাই নিচু হয়ে বসল।

একটুক্ষণ চুপ করে থেকে চিন্তাগুলো গুছিয়ে নিলেন বলদেব। তারপর বললেন, “বর্গীদের বিষয়ে তুমি কিছু শুনেছ?”

রঘুনাথ মাথা নাড়লেন, “দামোদর পার হয়ে ওই নামের কিছু পশ্চিমা দস্যু গঙ্গার পশ্চিমে হানা দিয়েছে শুনতে পাই। তবে তারা…”

“ভুল শুনেছ রঘুনাথ।” হঠাৎ তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল বলদেবের কণ্ঠস্বর, “দস্যু নয়। এরা শিবাজি মহারাজের সৈন্যদল। আমি সংবাদ নিয়েছি। বাংলার বুকে অধর্মের নাশ করে ফের ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে এদেশে এসেছে তারা। নবাবের সাহায্যকারী অত্যাচারী জমিদারদের উৎখাত করতে-করতে এগিয়ে চলেছে মুর্শিদাবাদের দিকে। তাদের নেতা ভাস্কর পণ্ডিতও তোমার মতোই ভবানীর উপাসক। দেবী আমাকে স্বপ্নাদেশ দিয়েছেন। সেই কারণেই তোমাদের খবর দেয়া।”

রঘুনাথের চোখগুলি উজ্জ্বল হয়ে উঠছিল বলদেবের কথা শুনতে-শুনতে। উত্তরে মথুরাবিল থেকে দক্ষিণে রায়মঙ্গল অবধি তাঁর কর্মক্ষেত্র। এর বাইরের জগত সম্পর্কে বিশেষ কোনও ধারণা নেই তাঁর। বলদেবের কথাগুলি তাঁর মনে একটা নতুন উত্তেজনা তৈরি করছিল।

“আদেশ করুন গুরুদেব।”

তোমার দল নিয়ে তুমি গঙ্গা পার হয়ে ভাস্কর পণ্ডিতের দলে যোগ দেবে। শুনেছি সে বীরের কদর করে। পশ্চিমের বহু রণদক্ষ বাঙালি তার দলে যোগও দিয়েছে ইতিমধ্যে। এই পুণ্যকাজে তাকে সাহায্য করা আমাদের কর্তব্য রঘুনাথ।”

“আর এতে আর্থিক লাভও কম হবে না আমাদের, রঘুনাথ।” এবার কানাই মণ্ডল মুখ খুললেন। কাঞ্চনপল্লীতে একটা ছোট সরাই আছে রঘুনাথের ডানহাত এই প্রৌঢ়ের। পৈত্রিক ব্যাবসা। সেখানকার মানুষ নিরীহদর্শন এই সরাইওয়ালার আসল পেশার খবর রাখে না।

তবে নিতান্ত সাধারণ ডাকাত তিনি নন। কলকাতায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দবদবা বাড়ছে এখন। ডাকাতিতে রঘুনাথের আয়ের একটা বড় অংশ তাদের ফ্যাক্টরিতে বেনামে খাটে। তার দেখাশোনার ভারও রয়েছে এই কানাই মণ্ডলের হাতে। সেই সূত্রে বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে তাঁর খানিক আলাপ রয়েছে।

“দামোদরের পূর্ব থেকে মুর্শিদাবাদ অবধি বিস্তীর্ণ এলাকা ভারতবর্ষের অন্যতম ধনী অঞ্চল, রঘুনাথ। এ-অঞ্চল থেকে ভাস্কর পণ্ডিতের লুঠের পরিমাণ বিষয়ে যা খবর পেয়েছি তা আমাদের স্বপ্নেরও অতীত।”

একটুক্ষণ নীরবে বসে রইল রঘুনাথ। তারপর বলদেবের পায়ে একটি প্রণাম করে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “তাই হবে। দলকে তৈরি হতে বলো কানাই। কাল সূর্য ওঠবার আগে রওনা হব আমরা।”

গ্রাম জটরাম, বর্ধমান

“ওই দ্যাখো। তুই আবার আঁশবঁটির ধারে এলি কেন মুখপুড়ি?”

“আমি মাছটা কাটব! ও কত্তামা...”

সুরমা মুচকি হাসলেন। বাড়ির একপাশে পুকুর। সেখানে থেকে রুই মাছটাকে তুলে নিয়ে আসছে বীরু আর কার্তিক মিলে। পাকা মাছ। বহুদিনের পুরোনো। লালচে রঙ ধরে গেছে গায়ে। জামাই আসবার সন্দেশ পেতে কর্তা ওই মাছটিকে আগেভাগেই জালে তুলে নোলক পরিয়ে খোঁটায় বেধে রেখেছিলেন জলের ভেতর। ছ’বছরের মেয়ে এখন সেই মাছকে আঁশবটিতে কাটবে বলে বায়না ধরেছে!

“সাহসের বলিহারি যাই মেয়ের। হ্যাঁ রে কঙ্কা, ও মাছ যে তোর চাইতেও লম্বা! বেড় দিয়ে ধরবি কী করে যে কাটবি?” বলতে-বলতেই অপেক্ষাকৃত কমবয়েসি একটি বউ এসে দাঁড়াল তার পাশে। ততক্ষণে মাছটাকে এনে ধপ করে বঁটির কাছে ফেলেছে দুই জোয়ান মিলে। রাজার মতো চেহারা। সেদিকে তাকিয়ে কঙ্কা ভুরু কুঁচকে একটুখানি ভাবল। মাছটার ড্যাবা-ড্যাবা চোখদুটো দেখে তার সাহস খানিক উবে গেছে। হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে সে তার মায়ের গায়ের সঙ্গে লেপটে দাঁড়াল এবার।

সেদিকে তাকিয়ে সুরমার চোখদু’টি হাসছিল। বড় মাছ তুলে আনবার পর এইবার পুকুরে জেলেরা নেমেছে। পুবের পুকুরের সব একহাতি বা তার চেয়ে বড় আকারের মাছ তুলে নেয়া হবে আজ। দুপুরে ভোজ হবে। জামাইয়ের সঙ্গে প্রায় আড়াইশো লেঠেল আসছে বলে খবর আছে। হরিদেব সামন্ত তাদের একজনকেও অভূক্ত অবস্থায় যেতে দেবেন না। এইবার সেদিকে ইশারা করে তিনি কঙ্কার মা-কে বললেন, “বারবাড়ির রান্নাশালে লেঠেলদের রান্নার দিকটা তুমি আর তোমার সই মিলে সামলে দিয়ো নিশা। আমি ভেতরবাড়িতে জামাইয়ের রান্না দেখছি। এ-মাছ নিয়ে আমি নিজেই বসব।”

“অতবড় মাছটা আপনি একলা...”

সুরমা ঠোঁট টিপে হাসলেন একটু, “তোমরা আজকালকার মেয়েরা মা অল্পেতে কাতর। পাকস্পর্শের দিন ঠাকুর যে মাছখানি আমায় কেটে রান্না করতে দিয়েছিলেন সেইটে যদি দেখতে...”

বলতে-বলতেই নিচু হয়ে বসে অতবড় মাছটিকে অবলীলায় দু’হাতে তুলে নিয়ে ধারালো বঁটিতে ছোঁয়ালেন সুরমা। কঙ্কা সেদিকে গুটি-গুটি এগিয়ে আসছিল ফের। সুরমা তাড়াতাড়ি মাছ নামিয়ে বঁটির মাথা দু’হাতে ঢেকে ধরে বললেন, “এই ছুঁড়ি। বঁটির মাথায় আসবি নে বলে দিচ্ছি। যা! পেছনের বাগানে ছিরু খেলছে। খেল গে যা ওর সঙ্গে।”

কথাটা কঙ্কার মনে ধরেছে দেখা গেল। বলে, “তাহলে আমি যাই। তুমি মাছটা ভালো করে কাটো কর্তামা।”

কচিগলায় গম্ভীরমুখে বলা কথাগুলো শুনে নিশা আর সুরমার খিলখিল হাসির শব্দ উঠল সকালবেলার বাতাস জুড়ে। কঙ্কা ততক্ষণে তার তিনহাতি শাড়িটি গাছকোমর করে জড়িয়ে নিয়ে ছুট দিয়েছে পেছনবাড়ির আমবাগানের দিকে।

“জামাই কি তোকে নিয়ে যেতে আসছে সই?”

বারবাড়ির রান্নাশালে দু’জন বৃদ্ধা বসে কুটনোর পাহাড় জমিয়ে তুলেছেন। সেইদিকে চোখ রেখে আস্তে-আস্তে মাথা নাড়ল রঞ্জাবতী। পশ্চিমে বর্গী না কীসের এক উৎপাত যেন শুরু হয়েছে। দিনপনেরো আগে সেই নিয়ে নবাবের তলব পেয়ে ভীম সামন্ত খুবই উতলা হয়ে উঠেছিলেন। গঙ্গার পুব পাড়ে নবহট্টের মিত্রপল্লীতে তাঁদের চকমেলানো বাড়ি। তার উঠোনে, এলাকার বাগদি লেঠেল সর্দারদের ডেকে নিয়ে ঘনঘন কথাবার্তা শুরু হয়েছিল।

তারপর একদিন রাত্রে তিনি তাকে ডেকে বললেন, “ছেলেকে নিয়ে তৈরি থেকো। কাল জটরাম যাওয়া হবে।”

শুনে রঞ্জাবতীর মনটা নেচে উঠেছিল। কতদিন বাপের বাড়ি যাননি। বলেছিলেন, “হ্যাঁ গো, ক’দিন থাকব তো? তুমিও নয় দিনদুই...”

ভীম সামন্ত গম্ভীরভাবে মাথা নেড়েছিলেন, “হ্যাঁ থাকবে ওখানেই ক’দিন। তবে রামা কপালি তোমাদের নিয়ে যাবে বউ। আমি যেতে পারব না এখন।”

তারপর তার মাথার চুলগুলো এলোমেলো করে দিয়ে বলেছিলেন, “ভেবো না। আমি ক’দিন বাদে দেখা করে যাব তোমার সঙ্গে। ওদিক দিয়েই যেতে হবে কিনা!”

“কোথায় যাবে তুমি?”

“বর্ধমান। নবাবের হুকুম। বর্গীরা এ’বছর উড়িষ্যার বদলে মেদিনীপুর হয়ে বাংলায় ঢুকেছে। নবাব তাই তড়িঘড়ি উড়িষ্যা থেকে ফিরছেন। গত হপ্তায় রাস্তা থেকেই থেকে এত্তালা পাঠিয়েছেন, হাজার লেঠেল নিয়ে গিয়ে বর্ধমান পৌঁছে থানা দিতে হবে।”

“কদ্দিনে ফিরবে তুমি?

“সে কেমন করে বলি বউ? তবে যদ্দিন না সে-সব মেটে, কাজ শেষ করে ফিরি, তদ্দিন এইখানে একলাটি না থেকে বাপের বাড়িতে গিয়েই থেকে এস। নবহট্ট জায়গা তো ভালো নয়!”

“তুমি যুদ্ধে যাবে? বর্গীদের সঙ্গে?” রঞ্জাবতীর মুখে দুশ্চিন্তার ছায়া নেমে এসেছিল।

শুনে মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়েছিলেন ভীম সামন্ত। ভাস্কর পণ্ডিতের নেতৃত্বে প্রায় বিশ হাজার বর্গী সেনা প্রবল ঝড়ের মতো সবকিছু ছারখার করে দিয়ে ধেয়ে আসছে মুর্শিদাবাদের দিকে। খবর পেয়ে উড়িষ্যা ছেড়ে দ্রুত মুর্শিদাবাদের দিকে ফিরছেন নবাব। কটক উদ্ধার করবার পরেই প্রধান সেনাদলকে ভাইপো সৌলত জং-এর নেতৃত্বে প্রধান বাহিনীকে মুর্শিদাবাদের দিকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। ফলে উপস্থিত পদাতিক ও ঘোড়সওয়ার মিলিয়ে আট-ন’হাজারের বেশি সেনা নেই তাঁর সঙ্গে। হিসেব-মতো বর্ধমানের কাছাকাছি দুই দলে দেখা হবার সম্ভাবনা। তাই সেইখানেই সেনা নিয়ে যোগ দেবার জন্য ডাক দিয়েছেন কাছাকাছি এলাকার বিশ্বস্ত সামন্তদের।

“ওগো, তুমি…”

জবাবে মৃদু হেসে তাঁর মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দিয়েছিলেন ভীম সামন্ত, “উগ্রক্ষত্রিয়ের মেয়ে তুমি। উগ্রক্ষত্রিয়ের বউ। তোমার ভয় পাওয়া সাজে? দেশের দুর্দিনে রাজার পাশে না দাঁড়ালে দূরের বিপদ যদি ঘরের পাশে এসে দাঁড়ায়? তখন?”

সে-যুক্তির বিরুদ্ধে কিছু বলবার ছিল না রঞ্জাবতীর।

“কী রে, কথা বলিস না যে?”

“না রে। এখন এইখানে কদ্দিন থাকব আমি। তিনি আসছেন একটিবার শুধু...” বলতে-বলতেই হঠাৎ চোখে আঁচল দিল সে, “আমার ভয় লাগে নিশা। তিনি যুদ্ধে চলেছেন। ”

নিশা উত্তর দিল না কোনও। পাশাপাশি বাড়ির মেয়ে তারা। জলচল পালটি ঘর। ফলে ছোটবেলা থেকে একসঙ্গে খাওয়া-শোয়া, ওঠা-বসায় বাধা ছিল না। একে অন্যের মন তারা বোঝে। খানিক বাদে সইয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে সে বলল, “কাঁদিস না বোন। উগ্রক্ষত্রিয়ের তো ওইতেই রুজিরুটি, বল? আমার মানুষটাও তো কোন বিদেশ-বিভুঁইতে একলাটি পড়ে থাকে নবাবের ফৌজে। দেখ দেখি, আমি কি কাঁদছি তাই বলে? ভগবান আছেন। তিনি ঠিক দেখবেন।” তার চোখদুটোও শুকনো ছিল না ততক্ষণে।

বেলা চড়ছিল। সময় কারও চোখের জলের জন্যে বসে থাকে না। কাজেই খানিক বাদে দুই সখী চোখ মুছে উঠে দাঁড়াল। বিরাট পেতলের ডেকচিতে মুসুর ডাল চড়েছে। উনোনে আগুন জ্বলেছে দাউ-দাউ।

খানিক বাদে ডালে কাঠি দিতে নিশা হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, “হ্যাঁ রে রঞ্জা, বর্গীরা কেমন মানুষ রে? জানিস?”

*

সেই একই প্রশ্নের প্রতিধ্বনি উঠছিল বাড়িটার পেছনে আমবাগানের ভেতর থেকে। গাছের গায়ে ঠেস দিয়ে কঙ্কা একটা পুতুলের মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে। আষাঢ়ের মেঘফাটা কড়া রোদ এসে পড়ে তার টুলটুলে মুখটাকে লাল করে তুলেছে। তার মাথায় একটা ছোট্ট মাটির সরা। হাতপাঁচেক দূরে দাঁড়িয়ে ছোট্ট একটা ধনুক নিয়ে সরাটা লক্ষ করে একের পর এক তির ছুড়ে যাচ্ছিল শ্রীমন্ত। তার বেশির ভাগই লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে কঙ্কার গায়ে এসে লাগে। পেছনে পালক লাগানো পাটকাঠির তির। তার ঘায়ে ব্যথা লাগে না।

কঙ্কা একটু বিরক্ত হচ্ছিল। একটানা এমন একঘেয়ে খেলা তার ভালো লাগে না মোটেই। সদ্য পাওয়া বন্ধুটিকে সে-কথা বলতে আবার সাহসও হয় না তার। বয়েসে সে তার চাইতে এক বছরের বড়। সেই সুবাদে কারণে-অকারণে দু’একটা কিলও পড়ে যে গায়ে। খানিক বাদে একটু সাহস সঞ্চয় করে সে বলল, “ছিরুদাদা, অন্য খেলা খেলবি?”

“উঁহু। জানিস না, দেশে বর্গী আসছে? আমি যুদ্ধে যাব যে! বাবা বলেছে তিরন্দাজি না শিখলে কক্ষনো বাবার মতো যুদ্ধে যেতে পারব না।”

“বর্গী! বর্গী কী রে ছিরুদাদা?”

এ-ব্যাপারে শ্রীমন্তরও ভাসা-ভাসা দু’একটা কথা জানা আছে কেবল। সঠিক কিছু জানে না। তবে সেটা একে প্রকাশ করে বলা যাবে না। খানিক ভুরু কুঁচকে সে বলল, “উঁহু বলব না। তুই ভয় খাবি।”

“জানিস না তাই বল।”

“ইঃ! জানি না মানে? শোন তবে। সাত পাহাড়, সাত তেপান্তর পেরিয়ে মারুট্টা নামে একটা দেশ আছে। সেখানে বর্গীরাক্ষসদের বাসা। দেশের সব মানুষ, জঙ্গলের পশুপাখি সব ধরে ধরে খেয়ে নিয়ে তাদের দেশ একদম খালি হয়ে গেছে। তাই খাবারের খোঁজে তারা আমাদের দেশে এসেছে পাহাড়, তেপান্তর পেরিয়ে। আমার বাবা আর নবাব মিলে তাদের মুন্ডু কেটে...”

“রাক্ষসগুলো ভারি বোকা কিন্তু।” কঙ্কা গম্ভীরভাবে মাথা নাড়ল হঠাৎ, “নদী-নালায় কত্তো মাছ। সে-সব খায় না কেন?”

শ্রীমন্তর মুখে একচিলতে হাসি ফুটল এবার। মেয়েটা কিচ্ছু জানে না। মাথা নেড়ে বলল, “দূর বোকা। ওদের দেশে নদীনালা মোটেই নেই তো। পাহাড়ি দেশ। বাবা বলেছে। জলে ওদের ভারী ভয়। খালি ঘোড়ার পিঠে চেপে ছুটে আসে... এই এমনি করে...”

হঠাৎ মাথাটি নিচু করে একটা পা খানিক উঁচু করে ঘোড়ার চাল ধরে কঙ্কাকে বেড় দিয়ে ছুটতে শুরু করল শ্রীমন্ত। ছোটে আর মুখে শব্দ তোলে, “হেট হেট হেট।” এই নতুন খেলাটা তার ভারি পছন্দ হয়েছে। কঙ্কা গম্ভীর মুখ করে নীচের ঠোঁটটা কামড়ে ধরে তার দিকে তাকিয়ে ছিল। কিছু একটা ভাবছে গভীরভাবে। খানিক বাদে হঠাৎ সে বলল, “এখেনে বর্গী এলে আমি কী করব তা জানিস?”

প্রশ্নটা শুনে একটু থমকে দাঁড়াল ছিরু। বেচারা কঙ্কা! তিরধনুকটাও ধরতে জানে না। একটু বাদে মাথা নেড়ে সে বলে, “তুই ঘরে লুকিয়ে থাকবি। আমি দোরের সামনে তিরধনুক নিয়ে এই এমনি করে...”

শুনে খিলখিল করে হেসে উঠল কঙ্কা। বলে, “উঁহু। আমি গিয়ে পুবের পুকুর সাঁতরে ওর মধ্যিখানে গিয়ে ডুব দিয়ে থাকব। বর্গীরা জলে ভয় পায় তো! তুই-ই তো বললি।”

জটিল সমস্যাটার এহেন সরল সমাধানে একটু হকচকিয়ে গিয়েছিল শ্রীমন্ত। বুদ্ধিটা ভালো। তবে সেটা স্বীকার করে নেয়া ঠিক হবে না। অতএব একটু গম্ভীর হয়ে সে বলল, “আমি সেটা আগেই ভেবেছিলাম, বুঝলি! তবে মুখে বলিনি। এ-সব হল গিয়ে...”

কথাটা শেষ করবার আগেই বাইরে শোরগোল উঠল একটা। বারবাড়ির দিক থেকে অনেক মানুষের পায়ের শব্দ উঠেছে। একমুহূর্ত সেদিকে কান পেতে শুনেই মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল শ্রীমন্তর।

“এই কঙ্কা। বাবা এসেছে লেঠেলের দল নিয়ে। চল যাই...”

“একটা রাত কাটিয়ে গেলে হত না বাবা?”

পাশাপাশি দু’টি পাত পড়েছে। কাঁসার থালায় চুড়ো করা ভাতের পাশে পঞ্চব্যাঞ্জন সাজানো। একপাশে বসে ঘোমটাটি টেনে দিয়ে পাখা নাড়তে নাড়তেই সুরমা কথাটা তুললেন। হরিদেব সামন্ত ভাত মাখতে মাখতেই জামাইয়ের দিকে নীরবে ফিরে দেখলেন একবার। অনুরোধটা তাঁরও।

ভীম সামন্ত কাঁসার বাটি উপচে পড়া বিশাল মাছের মুড়োটা টেনে নিলেন সামনে। তারপর আঙুলের চাপে সেটা ভাঙতে ভাঙতে বললেন, “এ-যাত্রায় তা সম্ভব হবে না। খবর এসেছে নবাব নিজে হিজলির পথে সাগরাই পৌঁছেছেন। কালকের মধ্যে সদর বর্ধমানে এসে উঠবেন। বর্ধমান হয়ে প্রাথমিক বন্দোবস্ত করেই এসেছি আমি আসবার পথে। এবারে ফের আজ রাত্রের মধ্যেই সেখানে পৌঁছোতে হবে আমাকে।”

“আর ভাস্কর পণ্ডিত?”

“মারাঠারা কাজোরা পেরিয়েছে গতকাল।” জবাব দিলেন ভীম, “সেখান থেকে আজ ভোর ভোর সড়ক-ই-আজম-এ পড়েছে দলবল নিয়ে। তবে বাঁচোয়া এই, বেশি জোরে এগোতে পারবে না। বর্ধমান সদর অবধি আঠাশ ক্রোশ পথ আসতে তিন-চারদিন লাগিয়ে দেবে।”

“ভুল করছ বাবাজীবন।” হঠাৎ উত্তেজনায় সামনের থালাটা ঠেলে সরিয়ে দিলেন হরিদেব, “এরা সব পাকা ঘোড়সওয়ার। আঠাশ ক্রোশ পথ চাইলে একবেলায় পাড়ি দিতে পারে। গত বছর উড়িষ্যা অভিযানের সময় এক একদিনে ওর চাইতেও বেশি পথ পেরিয়েছিল রাঘোজি ভোঁসলের বাহিনী।”

উত্তেজনায় চোখদু’টি যেন জ্বলে উঠছিল হরিদেব সামন্তের। যুদ্ধব্যাবসা তাঁর কাছেও নতুন নয়। যৌবন পেরিয়েছে অনেকদিন। তবু, এখনও সম্মুখযুদ্ধের নামে রক্তে দোলা লাগে তাঁর। তাই এই বৃদ্ধ বয়সেও দেশের যুদ্ধবিগ্রহের হাল হকিকত তাঁর নখদর্পনে থাকে।

“আপনি নির্ভুল বলেছেন।” মাথা নাড়লেন ভীম, “কিন্তু এদের সমস্যা অন্য জায়গায়। এই বছর মল্লভূম, বীরভূম এমনকি গঙ্গাপাড়ের নবহট্ট, গৌরিভা বা কাঞ্চনপল্লীর থেকেও বহু কুখ্যাত ডাকাত এসে এদের দলে ভিড় করেছে লুঠের আশায়। ভিনদেশে যুদ্ধে এসে স্থানীয় লোকজন দলে নিলে অনেক সুবিধে। কাজেই পণ্ডিত আপত্তি করেনি। কিন্তু ওতেই মুশকিলও হয়েছে তার। চোরডাকাতের দল, আর যাই হোক, পেশাদার সেপাই তো নয়। তাই, গতবারের মতো দরকার পড়লে চোখের পলকে মুল্লুক পেরোবার ভেলকি এবার আর মারাঠাদের থাকবে বলে বোধ হয় না।”

*

মৃদঙ্গ, ঝাঁঝর ও শিঙার শব্দ উঠেছে। ঘোড়সওয়ার বাহিনীর সামনে পাটকিলে রঙের একটা ঘোড়ার পিঠে সওয়ার একজন দৈত্যাকার মানুষ। তাঁর দিকে দূর থেকে আঙুল দিয়ে দেখাল একবার শ্রীমন্ত, “কঙ্কা ওই দ্যাখ, বাবা। সব্বার আগে আগে চলেছে। বর্গীদের এবার আর রক্ষা নেই। আমার বাবার সামনে যমও ভয়ে পালায় তা জানিস?”

“ইঃ! আমার বাবা নবাবের ফৌজে একশো ঘোড়সওয়ারের সর্দার তা জানিস? তোর বাবা যুদ্ধ করে তার সঙ্গে পারবেই না…”

পড়ন্ত বেলার আলো মেখে সুশৃঙ্খলভাবে বাগদি সৈন্যদল এগিয়ে চলে গ্রামের সীমানা ছেড়ে। প্রায় ক্রোশখানেক পশ্চিমে এগোবার পর তারা বাদশাহী সড়কে উঠে এল। সে-পথ উত্তরে কাটোয়ার কাছ ঘেঁষে মুর্শিদাবাদের দিকে এগিয়ে গিয়েছে। সেইদিকে পেছন ফিরে, ফের দক্ষিণমুখো বর্ধমান সদরের পথ ধরল তারা। সেখানে তার মূল লেঠেলবাহিনী অপেক্ষায় রয়েছে।

বর্ধমান ছেড়ে ভাস্কর পণ্ডিতের দল যদি মুর্শিদাবাদের পথ ধরে তাহলে এই বাদশাহী সড়ক বেয়েই এগোবে তারা। জটরাম এই সড়কের থেকে পুবে নিরাপদ দূরত্বেই রয়েছে যদিও, তবু সাবধানের মার নেই। জায়গাটার রক্ষণব্যবস্থা দৃঢ় করে রেখে যাবার জন্যই তাঁর সসৈন্যে এখানে এসে ঘুরে যাওয়া। একবার যুদ্ধ বাধলে তাঁর নিজের কোনও ঠিকঠিকানা থাকবে না। তাই সব দেখেশুনে একশোজন বাগদির একটা দলকে তিনি এখানে রেখে গিয়েছেন গ্রামের পাহারা দেবার জন্য। রঞ্জাবতী ও শ্রীমন্ত তাঁর নয়নের মণি যে!

তাদের বিদায় দিয়ে ছোট-ছোট ছেলে-মেয়েদু’টি কলকল করে কত কথাই বলতে-বলতে ঘরে ফিরে আসছিল। সন্ধ্যা নেমে আসছে তখন। ঘরে-ঘরে শাঁখ বেজে উঠেছে। সেই আবছায়া সন্ধ্যার আবডালে নিয়তি তাদের জন্য ঠিক কোন উপহার নিয়ে প্রস্তুত হচ্ছেন তার কোনও খবর তাদের কাছে তখন ছিল না।

“দীনদুনিয়ার মালিকের জন্য বান্দা কিছু কাহ্‌ভা-র বন্দোবস্ত করেছে। মালিক যদি ইচ্ছা করেন…”

বর্ধমান সদর থেকে সামান্যই দূরে এই হুচুকপাড়া গ্রামটি আজ সকালে সরগরম। গতরাত্রেই ভীম সামন্ত ও তাঁর বাহিনী এসে পৌঁছে গিয়েছিল বর্ধমান সদরে। সকালে নবাবের বাহিনী এসে পৌঁছোবার পর তিনি নিজেই এগিয়ে এসেছেন এইখানে তাঁকে অভ্যর্থনা করতে।

কথাগুলো শুনে খানিক অবাক হয়ে মানুষটির দিকে নবাব ঘুরে দেখলেন একবার। রাজধানীতে থাকলে দাক্ষিণাত্য থেকে আনানো সুগন্ধী এই উত্তেজক পানীয়টি দিয়ে তাঁর দিন শুরু হয়। যুদ্ধক্ষেত্রে বেশ কিছুকাল সেই সুখ তাঁর ভাগ্যে জোটেনি।

“কিন্তু কাহ্‌ভা... এখানে…”

“গুস্তাকি মাফ জনাব। হুজুরের প্রিয় বুরান পর্বতের কুর্গী কাহ্‌ভা সংগ্রহ করা বান্দার সাধ্য নয়। আংরেজ বানিয়াদের থেকে কিছু-কিছু দামাস্কাসের কাহ্‌ভা আনাই আমি কলকাতা থেকে। তাদের অশুদ্ধ উচ্চারণে একে কফি বলা হয়। এই পানীয় দিয়ে দিন শুরু করা আমারও অভ্যাস। এখন হুজুর অনুমতি দিলে...”

বলতে-বলতেই তাঁর নির্দেশে দু’জন মানুষ মিলে একটা পেতলের ছোট পাত্র এনে নামিয়ে রেখেছে তাঁবুর মেঝেতে। তার ভেতর থেকে বের হয়ে আসা পরিচিত সুগন্ধটি নাকে যেতে নবাবের মুখে হাসি ফুটল এবার।

“বর্বর আংরেজ এই বেহেস্তের পানীয়ের সন্ধান রাখে এ তো ভারি আশ্চর্যের সংবাদ হে।” বলতে-বলতেই তাঁর দিকে বাড়িয়ে ধরা গাঢ় খয়েরি বর্ণের ধূমায়িত তরলে ভরা স্ফটিকের পানপাত্রটি ভীমের হাত থেকে নিতে যাচ্ছিলেন আলিবর্দি খাঁ।

কিন্তু বাধা এল। পাশে বসে থাকা সেনাপতি মীর হাবিব ইস্পাহানি হঠাৎ হাত বাড়িয়ে আটকে দিয়েছেন দিয়েছেন ভীমকে। তারপর সসম্ভ্রমে বলে উঠেছেন, “এত সহজে এই কাফিরকে বিশ্বাস করা উচিত হবে না জনাব। মারাঠা দস্যু কোন পথে কী-ভাবে আক্রমণ শানাবে তা বোঝা সহজ নয়। বাঙালি গদ্দারের জাত। দুটো আশরফি হাতে পেলে...”

“মুখ সামলে সিপাহসালার মীর হাবিব। নয়তো...”

একটা চাবুকের মতো কথাগুলো আছড়ে পড়ে হঠাৎ শাহি তাঁবুর সব শব্দকে থামিয়ে দিয়ে গেল। সামনে দাঁড়ানো মানুষটার একটু আগের বিনীত ভঙ্গী এক-মুহূর্তে উধাও হয়ে গেছে। কফির পাত্রটা হাতে ধরে রেখেই সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছে সে মাথা উঁচু করে। ওদিকে ততক্ষণে তার গলায় এসে ঠেকেছে এক সিপাইয়ের তলোয়ারের তীক্ষ্ণ নখ।

মীর হাবিবের কুটিল চোখ-দুটো ঠান্ডা দৃষ্টিতে মেপে নিচ্ছিল বিরাটদেহ মানুষটাকে। কিন্তু তিনি কিছু বলবার আগেই হাত তুলে সিপাইকে তলোয়ার নামিয়ে নেবার হুকুম দিলেন নবাব। দুঃসাহসী মানুষটার বিষয়ে একটু কৌতুহল হচ্ছিল তাঁর। নিস্তব্ধতা ভেঙে এইবার তাঁর শান্ত গলা জেগে উঠল, “আমার দরবারে দাঁড়িয়ে আমারই সিপাহ্‌সালারকে অপমান করবার শাস্তি তুমি জানো সামন্ত?”

বড়-বড় শ্বাস পড়ছিল ভীম সামন্তের। কাঁপা গলায় বললেন, “জানি নবাব। প্রাণদণ্ড। আমি তার জন্য তৈরি। তবে সে-দণ্ড নেবার আগে, শুধু একটাই মেহেরবানি চাইব। দেশের রাজার প্রতি আমার আনুগত্যে প্রকাশ্যে সন্দেহ করবার শাস্তি এই ভিনদেশিকে দেয়া আমার কর্তব্য। তারপর আমার নবাব আমায় যা সাজা দেবেন, মাথা পেতে নেব।”

নবাব আলিবর্দি খাঁ একবার ঘুরে দেখলেন প্রিয় সেনাপতি মীর হাবিবের দিকে। মাথায় একসঙ্গে অনেকগুলো চিন্তা ভিড় করেছে তাঁর। অনেকগুলো অঙ্ক। উড়িষ্যা অভিযানের সময় সাম্রাজ্যের দুই প্রধান স্তম্ভ রায়দুর্লভ ও মীর জাফরের ভূমিকা নিয়ে কিছু সন্দেহজনক খবর তাঁর কাছে রয়েছে। এ-যাত্রা তিনি তাই প্রধান ভরসা রেখেছেন এই ইরানি ওমরাহের ওপরে। তুচ্ছ একটা কারণে তাঁকে অসন্তুষ্ট করতে তিনি রাজি নন এখন।

তবে তাঁর দুশ্চিন্তাকে মুছে দিয়ে গেল মীর হাবিবের কথাগুলো। উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে তিনি নবাবের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন, “আমি প্রস্তুত। এর যুদ্ধের সাধ আজ আমি মিটিয়ে দেব। সেইসঙ্গে, নবাবের সামনে বদ্‌তমিজির শাস্তি কী হয় তার একটা সবক্‌ও শিখিয়ে দেয়া যাবে এদের সকলকেই।”

শিবিরের সামনে খানিকটা জায়গা ফাঁকা করে দেয়া হয়েছে। একপাশে মখমলের চাদর বিছানো আসনে নবাব বসেছেন। তাঁর সামনে দু’টি একইরকম মাপের তলোয়ার এনে রাখা হয়েছে। মীর হাবিব নীচু হয়ে নবাবকে কুর্নিশ করলেন একবার। তারপর একটি তলোয়ার বেছে নিয়ে সেটা এগিয়ে ধরলেন ভীম সামন্তের দিকে। হাত পেতে তলোয়ারটা নিয়ে দেখে নিলেন ভীম একবার। গোড়ায় ইস্পাতের দস্তানা লাগানো লম্বা, হিলহিলে অস্ত্রটাকে ভালো করে দেখে মুখে একটু হাসি ফুটল তাঁর। দণ্ডপট। মুঘল থেকে মারাঠা, উত্তর থেকে দক্ষিণ সর্বত্রই মুখোমুখি লড়াইয়ের জনপ্রিয় অস্ত্র। লড়াইয়ে ওর ইস্পাতের দস্তানায় হাত বাঁচে। সহজে হাত থেকে খসে পড়ে না। তবে পুবের লাঠির সঙ্গে এ-অস্ত্রের আলাপ পরিচয় ঘটেনি এখনও।

কয়েক মুহূর্ত বাদে সেটাকে নামিয়ে রেখে, পাশে দাঁড়ানো যদু বাগদির হাত থেকে তিনি তুলে নিলেন তেলপাকানো একটা চারহাতি বাঁশের লাঠি।

“লাঠি? ওই নিয়ে তুই...”

শক্ত হাতে লাঠিটার একটা প্রান্ত চেপে ধরে নবাবের সামনে নিচু হয়ে একটা সেলাম করলেন ভীম। তারপর উদ্যত তরবারি মীর হাবিবের দিকে ঘুরে মৃদু হেসে বললেন, “তোমার দণ্ডপট সামাল দেবার জন্য বাঙালির এই লাঠিই যথেষ্ট মীর সাহেব।”

“সামাল...” হঠাৎ বাঘের মতো একটা গর্জন বের হয়ে এল মীর হাবিবের গলা থেকে। অপমানের কৌশলী খোঁচাটুকু তাঁকে রাগে দিগ্বিদিকশূন্য করে তুলবার জন্য যথেষ্ট ছিল। নিজের রক্ষণ ভুলে গিয়ে মাথার ওপর তলোয়ার তুলে নিয়ে তিনি তখন ঝাঁপ দিয়েছেন ভীম সামন্তের দিকে।

Sei Cheleta2

এবং লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছেন। নেমে আসা তলোয়ারটার মুখ থেকে যেন কোন জাদুতেই তার নিশানা অদৃশ্য হয়েছে। ভারসাম্য হারিয়ে সামনের দিকে উবু হয়ে পড়েছিলেন মীর হাবিব। তাঁর থেকে হাতদশেক দূরে দাঁড়ানো ভীম সামন্তের ঘুরন্ত লাঠি তখন ভোমরার মতো ডাক ছেড়েছে। অবোধ্য একটা গর্জন তুলে ফের তলোয়ার নিয়ে সেদিকে ধেয়ে গেলেন তিনি। তারপর আবার... আবার...

একটা অধরা আলেয়ার মতোই তাঁর চারপাশে নেচে বেড়াচ্ছিল ভীম সামন্তের শরীরটা। সম্মুখযুদ্ধের কোনও ব্যাকরণ সেই নাচের পদক্ষেপকে বশে আনতে পারে না। তার ঘুরন্ত লাঠির গায়ে ঘা খেয়ে বারংবার পিছলে যায় মীর হাবিবের হিলহিলে তলোয়ার।

সেই করতে করতেই হঠাৎ, বারংবার আক্রমণে ক্লান্ত মীর হাবিবের সামনে এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেলেন ভীম সামন্ত। থেমে গেছে হাতের লাঠির ঘূর্ণন। বড় বড় শ্বাস পড়ছিল মীর হাবিবের। শরীরের বর্ম যেন পাথরের মতো ভারী ঠেকছে তাঁর। তবু শেষ শক্তিটুকু সঞ্চয় করে ফের একবার ধেয়ে গেলেন তিনি ভীমের দিকে।

তীক্ষ্ণ চোখে তাঁর এগিয়ে আসবার প্রত্যেকটা মুহূর্তকে মেপে নিচ্ছিলেন ভীম। তারপর একেবারে সঠিক সময়ে উদ্যত তলোয়ারের থেকে হালকা পদক্ষেপে একপাশে সরে গিয়ে তাঁর লাঠি নেমে এল মীর হাবিবের কবজিকে নিশানা করে।

কবজির তীব্র যন্ত্রণাকে উপেক্ষা করেই আলগা হয়ে ঝুলে পড়া দণ্ডপটকে ফের চেপে ধরতে চাইছিলেন মীর হাবিব। কিন্তু তার আগেই লাঠির আরেকটা ঘায়ে হাত ছেড়ে ছিটকে উঠেছে তলোয়ারটা। লাফিয়ে উঠে বাঁ-হাতে সেটা লুফে নিয়েছেন ভীম চোখের পলকে। আর সেই সঙ্গে ডান হাতের লাঠির পরপর কয়েকটি সপাট আঘাত ধরাশায়ী করে দিয়েছে তার প্রতিপক্ষকে।

সেদিকে একবার তাকিয়ে দেখলেন ভীম। তারপর হাতের লাঠিটা ফেলে দিয়ে তলোয়ার হাতে মীর হাবিবের দিকে এগিয়ে গিয়ে, নিচু হয়ে বসে, তলোয়ারটা তাঁর হাতে ফিরিয়ে দিয়ে মাথা নোয়ালেন, “বাঙালি গদ্দার নয় জনাব। আমার কাজ শেষ। এবার আমার যা শাস্তি হয় তা দিন।”

আস্তে-আস্তে তলোয়ারটা মুঠোয় ধরে উঠে বসলেন মীর হাবিব। না। মৃত্যুর সময় এর এখনও আসেনি। নবাব বীরের সম্মান করেন। এই লড়াইয়ের পর একে খুন করলে অসন্তুষ্ট হতে পারেন তিনি। নাঃ! অপেক্ষা করতে হবে তাঁকে। ওপরওয়ালা চাইলে সুযোগ একদিন আসবেই। অপমানের বদলা নেবার জন্য কেয়ামতের দিন অবধি অপেক্ষা করতে পারেন মীর হাবিব।

মুখে অবশ্য সেই ভাবনার কোনও প্রকাশ হল না তাঁর। তলোয়ারটা নামিয়ে রেখে হাত বাড়িয়ে দিলেন তিনি ভীমের দিকে, “হাতটা ধরো বন্ধু। আজ থেকে আমরা একই যুদ্ধের সৈনিক।”

পাশাপাশি দুই বীর যোদ্ধা এসে নতজানু হয়েছেন নবাবের সামনে। আলিবর্দির মুখে প্রসন্নতার একটা আভা খেলা করে যাচ্ছিল।

“সাবাস সামন্ত। নিজের ইজ্জত রাখতে জানে এই বাঙালি শের। কত সৈনিক সঙ্গে নিয়ে এসেছ তুমি?”

“নবাবের যেমন আদেশ ছিল! এক হাজার।”

“ভালো। মীর সাহেব, ওইসঙ্গে আরও এক হাজার নবাবি সেনা আজ থেকে ভীম সামন্তের অধীনে কাজ করবে। আপনি ব্যবস্থা করুন।” বলতে-বলতে উঠে দাঁড়ালেন নবাব। তাঁর দুপুরের খাবার সময় হয়েছে।

রানিবাঁধ, ২ বৈশাখ, ১১৩৫ বঙ্গাব্দ

“এ-বিষয়ে আপনার পরামর্শ কী মীরসাহেব?”

চিঠিটা গুটিয়ে রেখে নবাব তাঁর তীক্ষ্ণ চোখদু’টি তুলে ধরলেন সামনে বসা মীর হাবিবের দিকে।

অবরোধের বয়স এখন সাত দিন। চালে একটু ভুল হয়ে গিয়েছিল নবাবের। হুচুকপাড়ায় এসে পৌঁছোবার পরেই খবর এসেছিল বর্গী বাহিনী তখনও পঁচিশ ক্রোশ দূরে লুঠতরাজে ব্যস্ত। সেই সুযোগে একটা রাত এইখানেই বিশ্রাম নেবার পরামর্শ দিয়েছিলেন মীর হাবিব তাঁকে। শহরের বাইরে রানিবাঁধের পাশে শিবির বসিয়েছিলেন তাই নবাব।

কিন্তু, ধূর্ত মারাঠা সেই এক রাত্রের মধ্যে নিঃশব্দে এতটা পথ পেরিয়ে আসবে তা তাঁর হিসেবের মধ্যে ছিল না। শেষরাত্রে শিবির জেগে উঠেছিল শহর থেকে ভেসে আসা বন্দুকের শব্দে। স্তম্ভিত হয়ে দেখেছিল, রাতের অন্ধকারে কখন যেন এসে শিবির ঘিরে থানা দিয়েছে মারাঠা দস্যুদল। তবে সরাসরি আক্রমণ করেনি। সেটা এই ডাকাতদলের স্বভাবও নয়।

এ-অবস্থায় জোর করে অবরোধ ভেঙে এগিয়ে যাবার ইচ্ছা ছিল নবাবের। কিন্তু মীর হাবিব সে-ইচ্ছেয় বাধা দিয়েছেন বারবার। শিবিরে খাদ্যাভাব দেখা দিয়েছে। খালি-পেটে আটক থেকে বর্ধমান শহরকে ছারখার হতে দেখে সেনাদের মনোবল তলানিতে ঠেকেছে এসে। কিন্তু মীর হাবিব অনড়। বারবার একটিই যুক্তি দিয়ে চলেছেন তিনি, নবাবি বাহিনীকে ঘিরে রাখা বিশ হাজার মারাঠি সেনার ব্যূহে কোনও দুর্বল জায়গা খুঁজে পাচ্ছে না তাঁর চরেরা।

“আমার মনে হয় জাঁহাপনা, এ-অবস্থায় দাবি মোতাবেক চাহিদামতো দশ লক্ষ সিক্কা দিয়ে সন্ধি করে নেয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। নইলে এই অবরোধ ভেঙে...”

“তা হয়তোো ঠিক। তবে, আপনি কি নিশ্চিত যে আপনার চরেরা সঠিক খবর আনছে?” হঠাৎ একটা হালকা বদল এসেছে যেন নবাবের গলার স্বরে।

মীর হাবিব সতর্ক হলেন, “আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন...”

“না সিপাহসালার। তা আমি পারি না।” বলতে-বলতেই হাতে তালি বাজিয়েছেন নবাব। তারপর ভেতরে এসে দাঁড়ানো পাহারাদারকে একটা ইশারা করে ফের চোখ ঘুরিয়ে ধরেছেন মীর হাবিবের দিকে, “অন্য কিছু খবর আমি লোকমুখে শুনেছি। এসো ভীম...”

মীর হাবিবের বিস্মিত চোখের সামনে তখন দশজন বাগদি অনুচরকে নিয়ে তাঁবুর ভেতর এসে কুর্নিশ জানাচ্ছিলেন ভীম সামন্ত।

তাদের দিকে চোখ ফেলে একটু অস্বস্তির ভাব যেন শরীরে জেগে উঠল মীর হাবিবের। কিন্তু মুহূর্তে তা সামলে নিয়ে তিনি ফের বললেন, “আপনি হুকুম দিলে আমি নিজে পণ্ডিতের সঙ্গে আলোচনায় বসে দাবির পরিমাণটা কমিয়ে আনতে পারি।”

“সে না-হয় করলেন মীরসাহেব? কিন্তু টাকা পাবার পর তারা যদি নিমকহারামি করে?”

“বান্দা জামিন রইল জাঁহাপনা।” মীর হাবিবের গলায় গভীর আত্মবিশ্বাসের সুর বাজছিল, “এ-ছাড়া আর কোনও পথও তো খোলা নেই আমাদের।”

“পথ আছে জাঁহাপনা। ওই মারাঠি কুকুরকে পুরস্কার দেয়া ছাড়াও অন্য একটা পথ আছে আমাদের।” হঠাৎ ভীমের গম্ভীর গলাটা জেগে উঠে ঢেকে দিল মীর হাবিবের গলাকে।

“যেমন?”

“আমার বাগদি বাহিনীর সেরা দশজনকে পাঠিয়েছিলাম আজ অবরোধের খবর সংগ্রহে...”

“কার হুকুমে তুমি চর পাঠিয়েছিলে ভীম?” হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে উঠে দাঁড়ালেন মীর হাবিব।

“আমার হুকুমে সিপাহসালার।” নবাব বলে উঠলেন হঠাৎ, “গত সাতদিন ধরে রক্তের বন্যা বইছে বর্ধমানের পথে-পথে। বিশ হাজার লুঠেরা যদি অনড় হয়ে কড়া পাহারাতেই থাকে, শহরের বুকে তাণ্ডব তাহলে করছে কারা? এখন ভীম সামন্ত যা খবর এনেছে সেটা শোনা যাক। বলো ভীম...”

“যা খবর পেয়েছি তাতে চোদ্দো হাজার বর্গী চারপাশে লুটপাট করবার জন্য ছড়িয়ে গেছে জাঁহাপনা।” বলতে-বলতেই সামনে ছড়িয়ে থাকা মানচিত্রটার ওপরে আঙুল রাখলেন ভীম সামন্ত, “আমি নিজে, উত্তরে মেহেদিবাগের দিকে গিয়েছিলাম। সেখানে এদের অবরোধ একেবারেই দুর্বল। আপনার হুকুম হলে এক হাজার বাগদি সৈন্য নিয়ে আমি নিজে সে-পথে এদের মহড়া নিতে পারি।”

একটা অসহায় রাগ যেন ফুটে বের হচ্ছিল মীর হাবিবের শরীর দিয়ে। বহু কষ্টে নিজের মুখের শান্ত ভাবটা ধরে রেখে তিনি একবার শেষ চেষ্টা করলেন, “ভুল খবর এনেছে এই গদ্দার জাঁহাপনা। ফাঁদ পেতেছে ভাস্কর পণ্ডিত। মেহেদিবাগ দিয়ে মুর্শিদাবাদে যাবার বাদশাহি পথ গিয়েছে। গোপনে অন্তত দশ হাজার সেনা সে মোতায়েন রেখেছে সেদিকে। আমার কাছে নির্দিষ্ট খবর আছে। সেই ফাঁদের দিকে আপনাকে ঠেলে দেবার জন্যই...”

মৃদু হাসলেন নবাব, “হয়তো তাই। তবু মীরসাহেব, আমি বলি কি, একটা চেষ্টা অন্তত করে দেখা যাক। সামান্য কয়েকশ মওলা ঘোড়সওয়ার নিয়ে শিবাজি মহারাজ অতবড় মোগল সম্রাটকে যদি কাবু করে ফেলতে পেরে থাকেন তাহলে আমাদেরও একবার চেষ্টাটা করতে দোষ কী? তাতে ব্যর্থ হলে তখন না হয় পণ্ডিতের চুক্তিপত্রে সই করে নেয়া যাবে!”

“তাহলে এই সভা থেকে আমাকে বিদায় নেবার আদেশ দিন জাঁহাপনা।” মীর হাবিবের গলায় গভীর অভিমানের সুর বাজছিল, “নবাবের বিশ্বাস হারিয়ে আমি...”

“বিদায় নয় সিপাহসালার। কাজ।” নবাবের গলার মৃদু স্বরে গোপন ইস্পাতের স্পর্শ ছিল, “আপনাদের মধ্যে কোনও একজনের আনা খবরে কিছু মিথ্যা তো আছেই। আজ রাত্রে মেহেদিবাগে তার যাচাই হবে। আপনারা তৈরি হোন। রাত্রি দ্বিতীয় প্রহরে আমরা রওনা হব। এখন আপনারা আসতে পারেন।”

তারা দু’জন বের হয়ে যেতে একটুক্ষণ নিঃশব্দে বসে রইলেন নবাব। দরবারের রাজনীতির পথ বড় জটিল। মীর হাবিবের কাছে গোপনে কিছু অপরিচিত মানুষের আসা যাওয়ার খবরটা সবে গতকালই তাঁকে এনে দিয়েছিলেন বিশ্বস্ত ফৌজদার গোলাম মুস্তাফা। তাতে সন্দেহ হওয়ায় ভীমকে দিয়ে আজকের অনুসন্ধানটা করিয়ে হাতে হাতেই তার প্রমাণ মিলেছে। আর সবচেয়ে বড় প্রমাণ ওই চিঠি। সরাসরি নবাবের বদলে মীর হাবিবের কাছে পণ্ডিতের চিঠি পৌঁছোল কেন? কেনই বা তিনি এ-ভাবে সেই নিয়ে সওয়াল করতে এলেন নবাবের কাছে?

ভীম সামন্ত দরবারের রাজনীতির চেয়ে অনেক দূরের মানুষ। দরবারি ষড়যন্ত্রে তার কোন অংশ থাকবার কথা নয়। তাছাড়া এই অঞ্চলে তার নাম বা মুখ পরিচিতও নয় একেবারে। গোলাম মুস্তাফার পরামর্শেই তাই তাকে তিনি গোপনে নিয়োগ করেছিলেন, মীর হাবিবের চরদের আনা খবরটা যাচাই করে নেবার জন্য। হয়তো তার আনা খবরটা সত্যি। কিন্তু তবু... সাবধান হতেই হবে তাঁকে। বিশ্বাস একজন নবাবের সবচেয়ে প্রধান শত্রু এ-কথা তাঁর মতো করে আর কে-ই বা জানে। এই অখণ্ড বিশ্বাসের সুযোগ নিয়েই তো তাঁর নিজেরও, সরফরাজ খাঁকে শেষ করে বাংলার তখ্‌ত-এ বসা।

খানিক বাদে তাঁবুর পেছনের দরজা দিয়ে একজন সাধারণ সৈনিকের পোশাক পরা আফগান ঢুকে এসে আভূমি কুর্নিশ করল তাঁকে।

“বলুন গোলাম মুস্তফা খান।”

“হুকম তামিল হয়েছে।”

“মীর হাবিব আর ভীম সামন্ত...”

“নিজের অজান্তে সতর্ক পাহারায় আছেন। আমার লোকের নজর এড়িয়ে অন্য কেউ ওঁদের কাছে ঘেঁষতে পারবে না।”

“সুক্রিয়া। আমাদের যাত্রার খবর যেন শিবির থেকে বাইরে না বের হয়।”

“জান কবুল জাঁহাপনা।”

ফের একবার সেলাম করে বের হয়ে গেলেন বিশ্বস্ত আফগান সৈনিকটি।

আকাশে চাঁদ ছিল না। আসন্ন বর্ষার মেঘেদের আনাগোনা সেখানে। সেই অন্ধকারের আবছায়ায় সারি-সারি সৈনিক নিঃশব্দে শিবির ছেড়ে হেঁটে যায়। শিবিরের দক্ষিণ সীমানায় কিছু অগ্নিকুণ্ড জ্বালানো হয়েছে। তাকে ঘিরে একদল মানুষ কোলাহল তুলেছে উঁচু স্বরে। তার আবডালে চলতে থাকা পশ্চাদপসরণের কোনও আভাস পাবে না দূরে পাহারায় থাকা বর্গীদের দল।

একসময় শেষ দলটাও রওনা হয়ে গেল। অগ্নিকুণ্ডগুলোর কাছে জড়ো হয়ে থাকা শ’চারেক বাগদি যোদ্ধার দলটা এইবার আগুন জ্বালিয়ে রেখেই নিঃশব্দে পিছিয়ে এল পরিত্যক্ত শিবিরের দিকে। রণ-পায়ে চড়ে শহর ছাড়িয়ে অরণ্যের ভেতরে মিলিয়ে গেল। সেখানে সড়ক-ই-আজম-এর দু’পাশের অরণ্য বেয়ে নিঃশব্দে তারা সেনাবাহিনীকে ছাড়িয়ে এগিয়ে চলল সামনের দিকে। তাদের লক্ষ্য মেহেদিবাগ-এর মারাঠা পাহারাদার চৌকি।

চলতে-চলতেই আকাশের দিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখছিলেন ভীম সামন্ত। বাতাসে বৃষ্টির ঘ্রাণ। দূরে কোথাও বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। সঙ্গে সঙ্গেই প্রায় নিঃশব্দে একটা বার্তা ছড়িয়ে গেল গোটা বাহিনীর ভেতরে। দ্রুত... আরও দ্রুত পেরিয়ে যেতে হবে বর্ধমানের সীমানা। বৃষ্টির জলে অগ্নিকুণ্ডগুলো নিভে গেলে, ফাঁকিটা ধরতে দেরি হবে না ভাস্কর পণ্ডিতের লুঠেরাদের।

বর্ধমানের সীমানা ছাড়িয়ে ক্রোশখানেক দূরে মেহেদিবাগ। সড়ক-ই-আজম থেকে এইখানটায় মুর্শিদাবাদের দিকে বেঁকে গেছে বাদশাহি সড়ক। জায়গাটার সামরিক গুরুত্ব অনুমান করেই এইখানে ত্রিশজন জুমালাদারের অধীনে প্রায় চার হাজার সৈনিক মোতায়েন করেছিলেন ভাস্কর পণ্ডিত।

জায়গাটায় এসে ঘাঁটি গাড়বার পর তাদের নেতা চিমনলাল থোরাট নিজেকে ভাগ্যবান ভেবেছিলেন। দু’টি প্রধান সড়কের সংযোগস্থলের বিস্তীর্ণ এলাকায় গ্রামগুলো স্বাভাবিকভাবেই অত্যন্ত সমৃদ্ধ। কৃষিকাজের পাশাপাশি গড়ে উঠেছে কিছু ব্যাবসাকেন্দ্রও। ফলে গোটা মারাঠাবাহিনীর মধ্যে গত সাতদিনে তাঁর দলেরই লাভ হয়েছে সবচেয়ে বেশি।

প্রথম তিনদিন প্রহরার সতর্কতা বজায় ছিল পুরোপুরি। কিন্তু তার পর থেকেই একটা আলস্যঘেরা নিশ্চিন্ততা ছেয়ে গিয়েছিল থোরাটের বাহিনীতে। দেশের নবাব লুকিয়ে রয়েছেন সেনাবাহিনী নিয়ে। ভাস্কর পণ্ডিতের সামনা করবার সামান্য চেষ্টাও করেনননি। গ্রামগুলোর বাসিন্দারা নরমসরম, অর্থবান। বারগিরের তলোয়ারের সামনে সহজেই মাথা পেতে দেয়। এদের প্রাণ নেয়া সহজ। ধনসম্পত্তি নেয়া আরও সহজ।

দিনতিনেক যাবার পর তাই পাহারার কড়াকড়ি কিছু শিথিল করেছিলেন চিমনলাল থোরাট। কুড়িজন জুমালাদারকে তাদের বাহিনী নিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন আরও উত্তরে বাদশাহী সড়কের দু’পাশের গ্রামগুলোর সন্ধানে। শর্ত একটাই, তাদের লুঠের মালের সমান বখরা পাবে শিবিরে পাহারায় থেকে যাওয়া সৈনিকের এক-হাজারি বাহিনী। নবাবি বাহিনী পুরোশক্তিতে হামলা করলে হয়তো তারা পথ আটকাতে পারবে না। কিন্তু ভীতু ইঁদুরটা ভাস্কর পণ্ডিতের ভয়ে যেভাবে গর্তে ঢুকে রয়েছে তাতে তাদের তরফ থেকে এ-রকম কোনও হানার আশঙ্কা তাঁর মনে ছিল না।

আকাশে মেঘ করেছিল। ঠান্ডা হাওয়া ছাড়ছে। অসহ্য এই দেশের ভ্যাপসা ভেজা গরমে দীর্ঘদিন কষ্ট পাবার পর একটু আরাম। কাছাকাছি গঞ্জ এলাকা থেকে নাচনীদের একটা দলকে ধরে আনা হয়েছিল শিবিরে। তাদের ঘুঙুরের বোল উঠেছে। আরামে চোখদু’টি বুঁজে আসছিল চিমনলাল থোরাটের।

ঠিক সেই সময় হঠাৎ করেই বাইরে শিঙার একটা শব্দ এসে তাঁর তন্দ্রাটা কাটিয়ে দিয়ে গেল। পরপর তিনটে ছোট-ছোট ধ্বনি। আক্রমণের সঙ্কেত!

তাড়াতাড়ি উঠে শিবিরের বাইরে এসে দাঁড়ালেন থোরাট। প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই ডানদিকের জঙ্গল থেকে শিসের শব্দ করে তাঁর মাথার ওপর দিয়ে উড়ে গিয়ে একটা তির তাঁবুর কাপড়ে গেঁথে গেল।

পরের তিরটা এল বাঁ-পাশের জঙ্গল থেকে। এবারে লক্ষ্যভ্রষ্ট হল না তা। এসে বিঁধে গেল চিমনলালের পাশে দাঁড়ানো দেহরক্ষির গায়ে।

একের পর এক তিরের ঝাঁক উড়ে আসছিল এবার শিবির লক্ষ করে। হঠাৎ যেন জেগে উঠেছে দু’পাশের অন্ধকার জঙ্গল। মাথার ওপর ঢাল তুলে ধরেছে ত্রস্ত বারগিররা। তিরের বৃষ্টির মধ্যেই শিবিরের সামনের খোলা ময়দানে একত্র হয়ে দাঁড়াচ্ছে তারা। দশজন সেরা যোদ্ধার একটা দল এর মধ্যেই চিমনলালকে ঘিরে একটা নিশ্ছিদ্র ব্যুহ গড়ে ফেলেছে। ঢালের আড়াল দিয়ে উড়ন্ত তিরের আক্রমণ থেকে তাঁকে বাঁচিয়ে রেখেছে তারা।

এদিক ওদিক মাটিতে ঢলে পড়তে থাকা বারগিরদের রক্তাক্ত শরীরগুলোর দিকে একমুহূর্ত তাকিয়ে নিয়েই কর্তব্য স্থির করে নিলেন চিমনলাল। এরা নবাবী সেনা হতে পারে না। তিনি কুচ করলে তাঁর কাছে খবর আসত। সম্ভবত স্থানীয় চাষাভুষোর কোনও দল বদলা নেবার জন্য এসে জড়ো হয়েছে জঙ্গলের আড়ালে। এই ঔদ্ধত্বের যোগ্য সাজা পাবে তারা আজ। আজকের যুদ্ধে বারগিররা কোনও বন্দি নিয়ে ফিরবে না।

তাঁর নির্দেশে সেনারা তিরধনুক রেখে দিয়ে তুলে নিয়েছে ঢাল ও তলোয়ার। কোমরে তীক্ষ্ণধার কুঠার ও ছোট নলের গাদাবন্দুক। গভীর ওই জঙ্গলে শত্রুর মুখোমুখি হতে গেলে তিরধনুক বা লম্বা বর্শা কাজে আসবে না।

তারপর হঠাৎ তাঁর একটা ইশারায় ‘হর হর মহাদেও’ গর্জনে রাত্রির আকাশ কাঁপিয়ে বারগিরদের দুটো দল ধেয়ে গেল শিবিরের দু’পাশের জঙ্গলের দিকে।

বারগিররা ছুট শুরু করবার সঙ্গে সঙ্গেই থেমে গিয়েছিল তিরের বৃষ্টি। তার বদলে জঙ্গল থেকে ভেসে এসেছিল কিছু ভীত, ত্রস্ত পায়ের আওয়াজ, লতাপাতার খসখস শব্দ। পালাচ্ছে এরা। দ্বিগুণ উৎসাহে শব্দগুলো লক্ষ্য করে ধাওয়া করল বারগিরের দল। রাগে দিগ্বিদিকশূন্য হয়ে ছুটছিল তারা। নিজেদেরই অজান্তে দূর থেকে আরও দূরে সরে যাচ্ছিল তাদের শিবিরের থেকে।

আর ঠিক সেই সময়, হঠাৎ শিঙার শব্দে কেঁপে উঠল রাত্রির আকাশ। চমকে উঠে সামনের পথের দিকে ফিরে তাকালেন চিমনলাল থোরাট। সেখানে তখন কালান্তক যমের মতোই ধেয়ে আসছিল বাগদি সৈন্যের একটা দল। সংখ্যায় তারা হাজার খানেকের কাছাকাছি। তাদের সামনে ভোমরার ডাক তুলে ঘুর্ণায়মান তিনশো লাঠির ব্যুহের নিরাপদ আড়াল থেকে ধেয়ে আসছিল ঝাঁক-ঝাঁক তির, সড়কি আর মাস্কেটের বুলেট।

মুহূর্তের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিলেন চিমনলাল থোরাট। সম্মুখযুদ্ধে বারগির দক্ষ নয়। চোরাগোপ্তা আক্রমণ কিংবা অসহায় নিরীহ মানুষকে লুটতেই তাদের দক্ষতা। অতএব চোখের পলকে ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হল অবশিষ্ট দলটা। তারপর বাতাসের বেগে ধেয়ে গিয়ে মিলিয়ে গেল ডাইনে বেঁকে যাওয়া সড়ক-এ-আজম ধরে।

“সড়ক সাফ জাঁহাপনা। থোরাটের দলের বেশির ভাগটাই জঙ্গলে ঢুকে ফাঁদে পা দিয়েছিল। তাদের একজনও জ্যান্ত ফিরবে না।”

মেহেদিবাগ থেকে আধমাইলটাক পেছনে নিঃশব্দে এগোতে থাকা মূল বাহিনীর সামনে, নবাবের ঘোড়ার কাছে এসে দাঁড়িয়েছেন ভীম সামন্ত ও গোলাম মুস্তাফা খান।

“আর থোরাট?”

এইবার ভীম সামন্ত কথা বললেন, “থোরাটের পেছনে ধনু লেঠেলের দল ঘোড়ায় চড়ে ধাওয়া করেছে। এ-দিগরের পথঘাট তার চেনা। ধনু বাগদির সামনে ওর ছোট দলটার কোনও আশা...”

“কতজন বারগির পাহারায় ছিল ওখানে গোলাম মুস্তাফা? মীর সাহেবের দশ হাজার বারগিরের কথা...”

কিন্তু সে জবাবটা দেবার আগেই অন্য একটা ঘটনা ঘটতে শুরু করেছে তখন সেখানে। হঠাৎ কোমর থেকে তলোয়ারটা খুলে হাতে তুলে উঁচিয়ে ধরেছেন খানিক দূরে ঘোড়ায় চেপে আসতে থাকা মীর হাবিব। তারপর, তাঁর ইশারায় মূল সেনাদল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আসা জনাদশেক সৈন্যের একটা দলকে সঙ্গে নিয়ে ঘোড়া ছুটিয়েছেন সোজা নবাবকে লক্ষ্য করে।

কিন্তু এমন কিছু একটার আশঙ্কায় আগে থেকেই সতর্ক ছিলেন গোলাম মুস্তাফা। চোখের পলকে নবাবকে ঘিরে একটা নিশ্ছিদ্র ব্যুহ গড়ে ফেলেছে তাঁর বিশ্বস্ত একদল সেপাই। অন্য একটা দল ঘোড়া ছুটিয়ে দিয়েছে মীর হাবিবকে লক্ষ্য করে।

মুখটা বিকৃত করে কিছু একটা বলে উঠলেন মীর হাবিব। তারপর প্রায় অলৌকিক দক্ষতায় ছুটন্ত ঘোড়ার রাশ টেনে ঘুরিয়ে নিজের দলটাকে নিয়ে ছুটে গেলেন পথের পাশের ঘন অরণ্যের ভেতরে।

“হুকুম দিন জাঁহাপনা। এই গদ্দারের মাথাটা...”

হাত বাড়িয়ে গোলাম মুস্তাফার কাঁধটা একবার ছুঁলেন নবাব, “যাও গোলাম মুস্তাফা। একশ সেপাই সঙ্গে নিয়ে যাবে। এর মাথা আমায় এনে দিতে পারলে পুরস্কার পাবে। আর তা না পারলেও অন্তত যত দূর সম্ভব একে সরিয়ে দিয়ে এসো। এই বাহিনীর সমস্ত খবর ওর জানা। কাল থেকে আমাদের পিছু নেবে ভাস্কর পণ্ডিতের সেনারা। তার আগে, অন্তত আমরা একটা নিরাপদ ঘাঁটি অবধি পৌঁছোনো অবধি, যেন এই গদ্দার কোনওমতেই তার দলে গিয়ে ভিড়তে না পারে।”

“যো হুকুম। ফের কোনখানে আপনার দেখা পাব জাঁহাপনা?”

অন্যমনস্কভাবে মাথা নাড়লেন নবাব আলিবর্দী, “সাতদিন বাদে কাটোয়ায় আমার দেখা পাবে। জায়গাটার তিনদিকে গঙ্গা আর অজয়ের বেষ্টনী রয়েছে। চোরাগোপ্তা আক্রমণ শানাতে পারবে না ওরা। সামনাসামনি যুদ্ধকে ভয় পায় এই মারাঠা ইঁদুরের দল। সেখানে ঘাঁটি করে শক্তি বাড়িয়ে নিয়ে তারপর... এই ডাকাতের দলকে একদিন এর দাম চুকোতে হবেই। ইনশাল্লা...”

“ইনশাল্লা...”

“কী ভাবছ?”

চিরসঙ্গী কানাই কখন যেন রঘুর পাশে এসে বসেছে। বৃষ্টি নেমেছে টিপটিপ করে। পেছনে, কিছুদূরে বর্ধমান শহরের জ্বলন্ত ঘরবাড়িগুলোর আগুনে সেই জল পড়ে ধোঁয়ার মেঘ বেয়ে উঠছিল আকাশে। সামনে, অনেকটা দূরে রানিবাঁধে নবাবের শিবির। তার সীমানায় মাঝরাত থেকে জ্বলতে থাকা আগুনের কুণ্ডগুলোও নিভে আসছে বৃষ্টির ছোঁয়ায়।

সেইদিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতে-থাকতেই রঘুনাথ আনমনে বলে উঠলেন, “ভাবছি কাজটা কি ঠিক হল? সেই মানকরে এসে এদের দলে জুটবার পর থেকে কেবল রক্ত আর আগুন দেখে দেখে... না কানাই, আমার ভালো লাগছে না আর।”

“বলদেব ভট্টাচার্যের কথাগুলো মনে করে দেখ রঘুনাথ। শিবাজি মহারাজের রাজত্বের সৈন্যদল এরা। বাংলার বুকে অধর্মের নাশ করে ফের ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠার জন্যই তাদের এ-দেশে আসা।”

কথাগুলো বলতে-বলতেই পিঠে বাঁধা পুঁটুলিটাতে একবার হাত বুলিয়ে নিলেন কানাই। তিনি ব্যবসায়ী মানুষ। মানকরে পৌঁছে ভাস্কর পণ্ডিতের দলে যোগ দেবার পর থেকে বর্ধমান পর্যন্ত পথ এগোতে গিয়ে যত অর্থ রোজগার হয়েছে তার পরিমাণটা নেহাত কম নয়।

“জানি। ভাস্কর পণ্ডিতও আমাদের জমায়েতে বারেবারেই তো সেই কথা বলে। পবিত্র ধর্মের শরীরে অনেক পাপ লেগেছে এই দেশে। সেই পাপের স্খালনের জন্য ভবানী রক্ত চান। একমাত্র এই পাপীদের রক্তেই...”

“এর নিরীহ মানুষগুলো পাপী? তাহলে, সাক্ষাত যমরাজের অবতার এই ভাস্কর পণ্ডিত পাপী নয়? বুড়োমানুষ, দুধের শিশু, স্ত্রীলোক কারও ক্ষমা নেই ওদের হাতে। শুধু একটাই বুলি লেগে আছে মুখে, ‘রুপি দ্যা বাংগালি।’ না কানাই। ডাকাতি আমার পেশা। কিন্তু আমার দলের মানুষ কখনও দুর্বলের গায়ে হাত ওঠায়নি। অথচ এদের সঙ্গে এসে জোটবার পর... এই হাতে কানাই... এই হাতে...”

বলতে-বলতেই চোখদুটো ভিজে উঠছিল রঘুনাথের। এদের সঙ্গে মিশে গিয়ে ক্ষণিকের উত্তেজনায় তাঁর হাতেও তো অনেক নিরীহের প্রাণ গেছে এই ক’দিনে! ধর্মের শত দোহাইতেও সেই অসহায় মুখগুলোকে তাঁর চোখের সামনে থেকে সরিয়ে দিতে পারে না।

“এই যদি ধর্ম হয় কানাই, তাহলে তার চাইতে আমাদের অধর্মের ডাকাতি অনেক ভালো।”

কথাগুলো শুনতে-শুনতে নিজের ভেতরেও কেমন যেন জোরের একটা অভাব বোধ করছিলেন কানাই। রোজগারের লোভকে ছাপিয়ে এ-প্রশ্নটা তাঁর মনেও জেগেছে। চোখের সামনে সোনার শহর বর্ধমান এদের আগুনে পুড়ে খাক হয়ে গেল। আর তার পর রঘুনাথের এই কথাগুলো...

“কী করতে চাও রঘুনাথ?”

একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন রঘুনাথ। তারপর আস্তে আস্তে বললেন, “ফিরে যাই চল।”

একটু শিউরে উঠে রঘুনাথের দিকে ফিরে তাকালেন কানাই, “দল ছেড়ে ভাগবার সাজা ও কেমন করে দেয় দেখোনি? গৌরীগঞ্জের সাতু খান আর তার তিন শাগরেদকে...”

ছবিটা রঘুনাথের চোখেও ভেসে উঠেছিল। খোঁটায় বাঁধা চারটে মানুষ। রক্তে ভাসছে মুখগুলো। নাক আর কান কেটে নেবার পর তাদের হাতের আঙুলগুলো এক এক করে কেটে ফেলা হয়েছিল। তারপর তাদের হাত আর পা-গুলো কেটে...

একটা ঝাঁকুনি দিয়ে নিজেকে সচেতন করল সে। সে স্বয়ং রঘুনাথ। এই ভয় তার সাজে না।

“সে ভার তুমি আমায় দাও কানাই। রঘুনাথকে ধরা অত সহজ নয়। আজ হোক বা কাল, সুযোগ আমি পাবই।”

“কিন্তু দলের লোকজন রাজি হবে না। তারা...”

“আর তুমি?”

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ালেন কানাই মণ্ডল, “এতকাল একসঙ্গে কাজ করবার পর এই প্রশ্নটা করবার কোনও অর্থ হয় রঘুনাথ? তুমি যেখানে, আমিও সেখানে। এখন...”

তাঁর কথাটা শেষ করবার আগেই একটা হো-হো শব্দ উঠল গোটা শিবির জুড়ে। ঘন-ঘন বেজে উঠছে সতর্কতাজ্ঞাপক শিঙার শব্দ।

“কী হল আবার?”

রঘুনাথের প্রশ্নের জবাবে রানিবাঁধের নবাবি শিবিরের দিকে ইশারায় দেখালেন কানাই। সিপাহিদের একটা বড় দল সেদিকে ঘোড়া ছুটিয়ে দিয়েছে।

গোটা শিবিরেই তোলপাড় পড়ে গেছে একটা। মূল তাঁবু থেকে ভাস্কর পণ্ডিত বের হয়ে এসেছেন বৃষ্টিকে উপেক্ষা করেই। তাঁকে ঘিরে রয়েছে প্রধান জুমলাদারের দলটা।

হঠাৎ শিঙার শব্দ বদলে গেল। যার যার জুমলাদারের অধীনে সার বাঁধবার নির্দেশ। নিজেদের অস্ত্রগুলো তুলে নিয়ে রণ পায় উঠে দাঁড়ালেন রঘুনাথ আর কানাই। কিছু একটা ঘটেছে। তাহলে কি শেষরাত্রের বৃষ্টির সুযোগে নবাবের শিবিরে হামলা চালাবার আদেশ দিল পণ্ডিত?

ভুলটা ভাঙতে অবশ্য দেরি হয়নি তাদের। রাত্রির অন্ধকারে বর্গীর চোখে ধুলো দিয়ে উধাও হয়েছেন নবাব। সঙ্গে নিয়ে গেছেন কেবল যুদ্ধের সরঞ্জাম আর সামান্য রসদ। তাঁর শিবির যেমন ছিল তেমনই পড়ে আছে।

পুবের আকাশ যখন মেঘের আড়ালে সামান্য ফর্সা হয়ে এসেছে ততক্ষণে বিশাল একটা দ্রুতগামী সাপের মতোই এঁকেবেঁকে সামনে এগোনো শুরু করল বর্গী সেনাবাহিনী। নবাব কোন পথে পালিয়েছেন সেটা বুঝে নেয়া কঠিন ছিল না। অজস্র চিহ্ন ছেড়ে গেছেন তিনি যাবার পথে। পলাতক শিকারের পেছনে উন্মত্ত দৌড় শুরু করেছে বর্গীর ঘোড়ার দল। তাদের দৃষ্টি সামনে মুর্শিদাবাদের দিকে এগিয়ে যাওয়া পথের দিকে আটকানো। দেখতে-দেখতে মেহেদিবাগ ছাড়িয়ে উত্তরে কাটোয়ার দিকে এগিয়ে যাওয়া বাদশাহী সড়ক ধরল তারা।

ছুটন্ত দলটার থেকে কখন যেন নিঃশব্দে পাশের জঙ্গলের গভীরে সরে এসেছিল দু’জন মানুষ। সদ্য ভোরের আলো-আঁধারিতে কেউ তাদের খেয়াল করেনি।

একটা গভীর ঝোপের ভেতরে নিঃশব্দে বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করবার পর নিস্তব্ধতা ফিরে এলে তাদের একজন মাথা তুলে একবার দেখে নিল চারপাশটাকে। তারপর ঝোপের ভেতর থেকে বের হয়ে এসে চাপা গলায় ডাকল, “বেরিয়ে এসো কানাই। এরা এগিয়ে গেছে।”

“কোনদিকে যাবে এবার?”

একটু হাসলেন রঘুনাথ, “ঘরে ফিরব। চলো। তবে কথা হল, নবাবের বিরুদ্ধে লড়াই দিয়েছি, আবার বর্গীর দল ছেড়ে পালিয়েছি। আমাদের তো এখন দু’দিকেই শত্রু। সঙ্গে লুঠের মাল রয়েছে। এলাকার কোন জমিদার নবাবের দিকে আর কে যে বর্গীর দিকে তা কে জানে! কাজেই গ্রামগঞ্জ পেরিয়ে সড়ক বেয়ে যাওয়া যাবে না।”

অতএব অরণ্যের আড়াল নিয়ে দুই পলাতক ফিরে চলে এবার। তাদের দু’চোখে ভেসে থাকে গত কয়েকদিন ধরে এ-দেশের বুকে পঙ্গপালের মতো ধেয়ে আসা এক বর্বর সৈন্যদলের অত্যাচারের ছবি। দুর্বার গতিতে সেই সেনাদল এখন ধেয়ে চলেছে পলাতক নবাবের বাহিনীকে অনুসরণ করে। সেই যাত্রাপথে আরও কত নিরীহ প্রাণ যে বলি হচ্ছে তাদের তলোয়ারের মুখে কে জানে!

এ-অঞ্চলের জঙ্গল তাদের পরিচিত সুন্দরবনের মতো ততটা দুর্গম নয়। বন্যজীব আছে বটে, কিন্তু তারা সুন্দরবন অঞ্চলের বাঘ বা কুমিরের মতো ভয়াবহ কিছু নয়। জঙ্গলের মাঝে-মাঝেই ছোট-ছোট জনপদ। তবে সে-সব গ্রামের ভেতর দিনের আলোয় বিশেষ পা দেয় না তারা। ক্বচিৎ রাতের দিকে সাবধানে কোনও গ্রামে ঢুকে পথঘাটের খবর নেয়, কদ্দূর পৌঁছুল তার সন্ধান করে। কিনে আনে চাল ডাল তেল নুন। কখনও-কখনও জঙ্গলের ভেতর কোনও মন্দির জুটে গেলে একটা রাত মাথার ওপর ছাদও মিলে যায় তাদের। এইভাবে ধীরে-ধীরে দক্ষিণমুখে চলেছে তারা। তাদের লক্ষ্য সুপ্রাচীন পথ সড়ক-এ আজম। তার কাছাকাছি পৌঁছে পুবমুখে রওনা দেবে তারা।

জটরাম

“এই কঙ্কা, জটেশ্বরীর মন্দিরের দিকে যাবি?”

কঙ্কা চোখদুটো ছোট-ছোট করে কী ভাবল একটু। তারপর বলল, “না।”

তাদের সামনে বিস্তীর্ণ চাষের ক্ষেত ছড়িয়ে আছে। সেখানে কিষাণরা কাজে ব্যস্ত। প্রথম বর্ষার জল পেয়ে মাটি নরম হয়েছে তার। জমিতে হাল পড়েছে। আজ তারা দু’জন মিলে তা-ই দেখতে এসেছিল।

এ-সময়টা গ্রামের ছেলেমেয়েদের কাছে ভারি আনন্দের। বর্ষার শুরুতে জমিতে হাল দেবার তোড়জোড় চলছে বাড়িতে-বাড়িতে। ছেলেপুলেদের দিকে নজর দেবার সময় কই এখন গৃহস্থের? আর তা-ছাড়াও এই জটরাম গ্রামের মানুষজন তো আরও নিশ্চিন্ত। তাদের গ্রাম ঘিরে পাহারায় থাকে গ্রামের জামাই ভীম সামন্তর রেখে যাওয়া একশো লেঠেলের দল। কে আর কী করতে পারে তাদের? তাদের দু-একজনকেও ক্ষেতের আশপাশে ঘোরাঘুরি করতে দেখা যাচ্ছিল।

সেদিকে একটুক্ষণ তাকিয়ে দেখে শ্রীমন্ত ফের বলল, “চল না!”

“ইঃ! তুই বললেই আমায় যেতে হবে নাকি?”

শ্রীমন্ত হাতের কঞ্চিটা এদিক ওদিক নাড়াতে নাড়াতে বলল, “ভালো। তবে তুই থাক এখানে। আমি যাই...জটেশ্বরীর পুজোর ভোগ খেতে যা ভালো...”

কথাটা কঙ্কার বিলক্ষণ জানা। সে ক্ষেত ছাড়িয়ে পুবমুখো জটেশ্বরীর জঙ্গলের ভেতর এগিয়ে যাওয়া শুঁড়িপথটার দিকে একবার লোভী চোখে তাকয়ে দেখল। রাস্তাটা তার চেনা। পুজো-পার্বণে মায়ের সঙ্গে সে-মন্দিরে গিয়ে জটেশ্বরীর প্রসাদ সে-ও খেয়েছে কতবার!

এবার দেখা গেল একটু দোনোমোনা করছে কঙ্কা। বলে, “মা যদি জানতে পায়?”

“পারবেই না! কিষাণদের দুপুরের খাবার রান্না হচ্ছে দেখ গে বাড়িতে। তোর মা আর আমার মা ওই নিয়ে পড়ে আছে তো!”

খানিক ইতস্তত করে রাজিই হয়ে গেল কঙ্কা। জটেশ্বরীর দুপুরের ভোগের খিচুড়ি আর পায়েসের লোভ ছাড়া কঠিন।

খাড়া রোদের মধ্যে পা ফেলে-ফেলে তারা এগিয়ে চলে আলপথ ধরে। আস্তে-আস্তে জঙ্গল এগিয়ে আসে সামনে। ওদিকে ঠিক তখন সেই ঘন অরণ্যের ভেতরে অন্য একটা নাটক হয়ে চলেছিল। তারা তার সন্ধান জানত না...

*

“কী মনে হয় রে?”

গাছের মাথা থেকে নিচুগলায় বলে উঠলেন রঘুনাথ। পাশের ডালটায় ঘন পাতার আড়াল থেকে জবাবে কানাইয়ের গলা ভেসে এল, “নবাবী ফৌজ সে তো বর্ম-চর্ম দেখেই বোঝা যাচ্ছে। অথচ মীর হাবিব তো সেই...”

খানিক আগেই পেছনের জঙ্গলে অনেক লোকজনের সাড়া পেয়ে সতর্ক হয়েছিল তারা। এই বিজন বনে একসঙ্গে এত মানুষের শব্দ কোনও ভালো লক্ষণ হতে পারে না। কাছাকাছি দুটো গাছের ডালে উঠে নজরে পড়েছিল নবাবি সেপাইয়ের একটা বড় দল এগিয়ে আসছে সেখান দিয়ে। দলে কম করে শ’খানেক হবে তারা।

খানিক বাদে তাদের গাছটার তলাতেই এসে দাঁড়িয়েছিল সেপাইদের দল। তারপর নিজেদের মধ্যে শলাপরামর্শ কিছু করে, এগিয়ে গিয়েছিল বেশ খানিক দূরে দাঁড়ানো একটা ছোট মন্দিরের দিকে।

সেখানে পূজারির সঙ্গে কিছু কথাবার্তা বলে তারা দল বেঁধে মন্দিরের পাশের শুঁড়িপথটা ধরে চলে গেল। ওদিকে সম্ভবত কোনও গ্রাম রয়েছে।

ওরই মধ্যে ওদের টুকরো-টাকরা দু’একটা কথা কানে গিয়েছিল তাদের,

“কাছাকাছিই কোথাও আছে শয়তানটা...”

“শয়তানই বটে! ইমান বলে কোনও শব্দ এর জানা নেই। নবাবের নুন খেয়ে তলে তলে... একে ছাড়া চলবে না। প্রাণে বেঁচে গেলে ভাস্কর পণ্ডিতের ডান হাত হয়ে উঠবে এ। চলো...”

*

“ব্যাপারটা কী হতে পারে বলো তো? কাকে খুঁজছে এরা? কে আবার গদ্দারি করল?”

জবাবে গাছ থেকে নেমে আসতে আসতে কানাই হঠাৎ মাথা নেড়ে হাসল একটু, “বর্গীদের কোনও দোস্ত হবে। জানি না।”

“বলছিল নবাবের নুন খেয়েছে! নবাবের দলের কেউ?”

“হতে পারে। মুর্শিদাবাদে তো বাঙালি, আফগান আর ইস্পাহানিতে মিলে রাজ্য করছে। তার সঙ্গে আবার এখন নতুন উৎপাত এসে জুটেছে সাগরপাড়ের ফিরঙ্গীর দল। এদের কে যে কখন কার বন্ধু হয় আর কার গলায় ছুরি ধরে তা খোদ ভগবানও বলতে পারবেন না। তবে সে-কথা থাক। এখন চলো দেখি! আপদ বিদেয় হয়েছে। পোঁটলা-পুঁটুলি অস্তর-শস্তর গাছের মাথাতেই লুকিয়ে রেখে...”

খানিক বাদে, জঙ্গলের ভেতর থেকে বের হয়ে আসা পথশ্রান্ত মানুষ দু’জনকে দেখে, খেতের কাজের সন্ধানে আসা দু’জন মজুর ছাড়া আর কিছু মনে করেননি মন্দিরের পূজারী বামুনঠাকুর। এ-এলাকায় হাল জোতবার সময় এমন অনেক দীন-দুঃখী মানুষই কিষাণের কাজ করে দু’টি খেতে পাবার লোভে এসে জোটে।

সে-কথা জিজ্ঞাসা করতে তারাও ঘাড় হেলিয়ে সম্মতি জানিয়েছিল তাতে। তারপর পুকুরে স্নান করে উঠে আসতে তাদের হাতে প্রসাদি ফলমূলের কয়েকটি টুকরো ধরিয়ে দিয়েছিলেন তিনি।

মন্দিরে মায়ের মধ্যাহ্নভোগ হয়। তার খানিক দেরি আছে এখনও। সেই দু’টি খেতে পাবার আশ্বাস পেয়ে তারা সেখানেই থেকে গেল। মন্দিরের পেছনদিকে বনের ধার ঘেঁষে একটা বড় আমগাছ। তার তলাটা পরিষ্কার করে নিকোনো। সেইখানটা তাদের দেখিয়ে দিয়ে ঠাকুরমশাই বললেন, “এইখানে শুয়ে ঘুমিয়ে নে খানিক তোরা। পুজো শেষ হলে খেতে পাবি’খন।”

*

“ঠাকুরমশাই?”

দীনদয়াল ভট্টাচার্যমশাই দেবীর ভোগের বন্দোবস্ত করছিলেন। সামান্যই আয়োজন। ছোট একটি পেতলের পাত্রে খিচুড়ি, সামান্য পায়েস। দু’টি মণ্ডা। জটরাম গ্রামের হরিদেব সামন্ত একটা বার্ষিক সিধের বন্দোবস্ত করে দিয়েছেন তাঁকে। সেই থেকেই এই নিত্য ভোগের আয়োজন হয়ে থাকে।

রিণরিণে গলাটা তাঁর চেনা। ভারী মিষ্টি মেয়েটি। ওর নাম কঙ্কা। মায়ের সঙ্গে মাঝে-মাঝেই এখানে আসে সে।

তাড়াতাড়ি খিচুড়ির হাঁড়িটি নামিয়ে রেখে বাইরে বের হয়ে এসে একটু অবাক হলেন দীনদয়াল।

“একলা-একলা এলি যে বড়? মা কোথা তোর?”

কঙ্কা হাসল, “মা তো রান্না করছে। আর একলা কোথা? এই ছিরুদাদা আছে যে সঙ্গে! ছিরুদাদা কিন্তু খুব বীর।”

তার সঙ্গে আসা ছেলেটার সুন্দর মুখটার দিকে তাকিয়ে মনটা প্রসন্ন হয়ে উঠল দীনদয়ালের। কাটাকাটা চোখমুখ। গরমে লাল হয়ে উঠেছে।

“তুমি কোন গ্রামের ছেলে বাবা?”

ছেলেটা তাড়াতাড়ি এগিয়ে এসে তাঁর পায়ের ধুলো নিল। বলল, “আমার নাম শ্রীমন্ত। হরিদেব সামন্ত...”

“হয়েছে হয়েছে। আর বলতে হবে না বাপধন।” দীনদয়াল পরম স্নেহে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। হরিদেব সামন্তের জামাই বাবাজীবন যে স্ত্রী-পুত্রকে শ্বশুরের কাছে জিম্মা রেখে, একশ বাগদির পাহারা বসিয়ে যুদ্ধে গেছেন সে-কাহিনি এ-দিগরে কারও জানতে বাকি নেই আর।

“এসো। বোসো দু’টিতে মিলে মন্দিরের দরজায়। আমি মাকে ভোগ চড়িয়ে নিই। তারপর ঠান্ডা হয়ে প্রসাদ পেয়ে বাড়ি যাবে। আমি লোক দিয়ে দেব সঙ্গে।”

*

দুপুরের নিস্তব্ধতা ভেঙে পুজোর মন্ত্রের শব্দ উঠছিল। মন্দিরের আবছায়া গর্ভগৃহে প্রদীপের আলো জ্বলছে। সেই আলোয় জটেশ্বরীর সোনার জিভটি ঝলমল করে ওঠে একেকবার।

আরতির শেষে ভোগ নিবেদন করতে গিয়ে বাধা এল। পুকুরের ধার দিয়ে হঠাৎ জনাদশেক মানুষের একটা দল উঠে এসেছে মন্দিরের একেবারে সামনে। আর তারপর কেউ কিছু বোঝবার আগেই তাদের সবার সামনে থাকা অসুরের মতো চেহারার মানুষটা ঘোড়া থেকে নেমে সটান এগিয়ে এল মন্দিরের দরজায়। তারপর সেখান থেকেই হেঁকে বলে উঠল, “এই বেরিয়ে আয় বাইরে।”

চমকে উঠে তার দিকে ঘুরে দেখলেন দীনদয়াল। মানুষটার শরীরে নবাবি উচ্চপদস্থ সৈনিকের পোশাক। কাঁধে বন্দুক। কোমরে তলোয়ার ঝুলছে।

পুজোর মন্দিরে এভাবে উঠে আসা তার উচিত হয়নি। তবু, মানুষটা অতিথি। ভিনধর্মের লোক। হয়তো কায়দাকানুন ততটা জানে না। সেটা ক্ষমার্হ।

হাতের প্রদীপটি নামিয়ে রেখে উঠে দাঁড়ালেন দীনদয়াল। তারপর আস্তে-আস্তে বের হয়ে এসে মানুষটার সামনে এসে দাঁড়িয়ে বললেন, “আপনি নীচে অপেক্ষা করুন। আমি দেবীর ভোগটুকু চড়িয়েই আপনাকে...”

কথাটা শেষ করবার আগেই তাঁর হাত ধরে একটা রূঢ় টানে তাঁকে নীচে নামিয়ে এনেছে মানুষটার দলের দু’জন লোক। তারপর তাঁর কাঁধ চেপে ধরে বলে, “খোদ সিপাহ্‌সালারের সামনে জবান চালাবার গুস্তাকির সাজা কী জানিস? ঠিক-ঠিক জবাব দে। নইলে...”

“ছেড়ে দাও ওঁকে তোমরা!”

হঠাৎ তীক্ষ্ণ একটা গলার স্বরে লোকগুলো মুখ উঁচিয়ে তাকাল দীনদয়ালের পেছনদিকে। সেখানে একটা ছোট ছেলে এসে দাঁড়িয়েছে। রাগে ফুঁসছে যেন সে।

রাগত চোখে তার দিকে একঝলক দেখেই হঠাৎ কেমন যেন স্থির হয়ে গেলেন মীর হাবিব। এ-মুখের আদল তাঁর চেনা! উত্তেজিত ছেলেটা তখন বলে চলেছে, “ছেড়ে দাও ওঁকে তুমি। নইলে বাবার লেঠেলদের ডেকে...”

হঠাৎ দীনদয়ালকে ধরে থাকা লোকদুটোকে ধাক্কা দিয়ে সামনে এগিয়ে এলেন মীর হাবিব। মুখে একটা বিচিত্র হাসি ফুটে উঠেছে তাঁর। পরক্ষণেই তাঁর হাতের ইশারায় পেছন থেকে একটা মাস্কেটের গুলি এসে বিঁধল দীনদয়ালের বুকে। একটা শব্দও না করে ঢলে পড়লেন মানুষটা।

তাঁর বুক থেকে ফিনকি দিয়ে বের হয়ে আসা রক্তের ধারা ছিটকে এসে লাগছিল ছেলেটার শরীরে। চোখদুটো বিস্ফারিত করে সে তাকিয়ে দেখছিল মাটিতে পড়ে থাকা নিস্পন্দ মানুষটার দিকে। জীবনে কখনও মৃত্যু দেখেনি সে এর আগে।

“বাপের নাম কী?”

এইবার ভয়ে যেন একটু কুঁকড়ে গেছে ছেলেটা। কাঁপা-কাঁপা গলায় প্রায় ফিসফিস করে জবাব দিল, “ভীম সামন্ত।”

গর্ভগৃহের চৌকাঠ ধরে দাঁড়ানো কঙ্কা হঠাৎ থরথর করে কেঁপে উঠল সেদিকে তাকিয়ে। কারণ প্রায় অস্ফুট কথাটা শ্রীমন্তর মুখ থেকে বের হতেই সামনে দাঁড়ানো লোকটার হাতে উঠে আসা চাবুকের লিকলিকে জিভ, একটা সাপের মতো এঁকেবেঁকে ছড়িয়ে গেছে শ্রীমন্তর পিঠে।

পিঠে রক্তমুখী লম্বা ক্ষত নিয়ে শ্রীমন্ত আছড়ে পড়েছিল লোকটার পায়ের ওপর।

“নে। এবার ডেকে আন তোর বাবাকে। পারলে এসে বাঁচাক তোকে। ওপরওয়ালা মেহেরবান। নইলে এইভাবে তার গুনাহ্‌র সাজা দেবার সুযোগ তিনি করে দেবেন কেন?” বলতে-বলতেই একটা লাথিতে ছোট্ট শরীরটাকে সে ছুঁড়ে দিল তার পেছনে দাঁড়ানো লোকগুলোর দিকে।

একপাল হিংস্র নেকড়ের মতো মানুষগুলো ছেলেটার ছটফট করতে থাকা শরীরটাকে বাতাসে ছুড়ে দিচ্ছিল বারবার। তাদের উল্লাসের চিৎকারে খান খান হয়ে যাচ্ছে তখন জঙ্গলের নিস্তব্ধ দুপুর। তাদের নিষ্ঠুর হাতগুলো বারবার ঘা মেরে যায় অসহায় ছোট্ট শরীরটার ওপরে।

শুধু, সেই উল্লাসের মুহূর্তে তারা খেয়াল করেনি, দরজায় বসে থাকা ছোট মেয়েটা কখন মন্দিরের ভেতরে ঢুকে গেছে। তারপর তার উত্তরের দরজা দিয়ে নিঃশব্দে বের হয়ে মিলিয়ে গেছে জঙ্গলের ভেতরে।

প্রাণপণে ছুটছিল কঙ্কা। ছোট-ছোট পা দু’টিতে উত্তপ্ত মাটি কামড় বসায় তার। তার চোখের সামনে বারবার ভেসে ওঠে তার বন্ধুর পিঠের দগদগে রক্তাক্ত ক্ষতচিহ্নটা। তবু, উগ্রক্ষত্রিয়ের মেয়ে সে। যুদ্ধ তার রক্তে মিশে আছে বহুপুরুষ ধরেই। সব ভয়, সব দুঃখকে পেরিয়ে শুধু একটাই কথা তখন বেজে চলেছে তার মাথার ভেতরে, “গ্রামে গিয়ে খবর দিতে হবে... ওরা ছিরুদাদাকে মেরে ফেলবার আগে...”

*

ফের সবকিছু নিস্তব্ধ হয়ে গেছে। দুপুরের ঝিমঝিমে রোদে মন্দিরের সামনের মাটিতে দুটো মানুষ পড়ে ছিল। তাদের রক্তমাখা শরীরে বিনবিন করছে মাছির দল। মাত্রই মিনিট কয়েক আগে ডাকাতের দলটা হঠাৎ করেই শরীরদুটোকে ছেড়ে উধাও হয়ছে কাছের জঙ্গল বেয়ে। তাদের নজরদার খবর এনেছিল, কাছাকাছি গ্রাম থেকে লেঠেল আর নবাবি ফৌজের একটা বড় দল ধেয়ে আসছে মন্দিরের দিকে।

তখন মন্দিরের পেছনের জঙ্গল থেকে দু’জন মানুষ বের হয়ে এল। শোরগোল শুরু হবার সঙ্গে সঙ্গেই তারা গাছতলা ছেড়ে গিয়ে লুকিয়েছিল পাশের জঙ্গলে।

বেরিয়ে এসে উঠোনে পড়ে থাকা শরীরদুটোর দিকে তাকিয়ে বোকার মতো মাথা নাড়ছিল তারা। সবকিছু কেমন যেন গুলিয়ে যাচ্ছে তাদের। নাঃ। যারা এসেছিল তারা নবাবের পক্ষের কেউ হতে পারে না। এদের আচরণে বর্গীর অযথা হিংস্রতারই ছাপ। অথচ, তাদের নেতাকে সিপাহ্‌সালার বলে সম্বোধন করছিল তার সঙ্গীরা! সে তো নবাবের দরবারেরই পদবি! তাহলে? আবার, তাদের ধরবার জন্য নবাবি ফৌজ জঙ্গল তোলপাড় করে ছুটে আসছে গত তিনদিন ধরে। কেন?

“রঘুনাথ! এদিকে...”

কানাইয়ের চাপা গলার ডাকটা পেয়ে হঠাৎ সচেতন হল রঘুনাথ। পুরোহিতের মৃতদেহের পাশে পড়ে থাকা নাম না জানা ছেলেটার পাশে দাঁড়িয়ে কানাই তাকে ডাকছিল।

“ছেলেটা বেঁচে আছে! শ্বাস চলছে।”

তাড়াতাড়ি নিচু হয়ে তার নাকের কাছে একবার হাতটা ধরলেন রঘুনাথ। থেকে থেকে মৃদু নিঃশ্বাস এখনও পড়ছে তার।

দূরে জঙ্গলের মধ্যে অনেক মানুষের পায়ের শব্দ উঠছিল। সেদিকে একনজর তাকিয়ে হঠাৎ ছেলেটার রক্তাক্ত শরীর বুকে জড়িয়ে ধরে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন তিনি।

“দৌড়োও কানাই! এরা এসে পড়বার আগে...”

গভীর জঙ্গলের ভেতর সেই গাছটার কাছে এসে থামল তারা দু’জন। গরমে এতটা দৌড়ে এসে বড় বড় শ্বাস পড়ছিল দু’জনেরই। জায়গাটা নিস্তব্ধ। মাত্রই কিছুটা দূরে চলতে থাকা শোরগোলের সামান্যতম আভাসও পাওয়া যায় না এখান থেকে।

ছেলেটার মুখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল রঘুনাথ। বড় মায়ায় তার মুখে লেগে থাকা রক্তের দাগগুলোকে মুছে দিচ্ছিল কর্কশ আঙুল দিয়ে। সংসার করবার অবসর জোটেনি তার। একটা আশ্চর্য মায়া ছড়িয়ে দিচ্ছিল তার ওপরে ওই নিষ্পাপ, অচেতন মুখটা।

“এ-ভাবে একে নিয়ে চলে আসাটা ভালো কাজ হল না হে!” কানাই মাথা নাড়ছিল, “একটা ছেলেকে এইভাবে...”

“না কানাই। আমি ভুল করিনি। বাপের কোন দোষে অবোধ শিশুটা এমন শাস্তি পায় তা আমি জানি না। কে তার শত্রু আর কে যে বন্ধু বুঝতে পারছি না কানাই। ওকে আমি ওখানে...”

“তোমার হঠাৎ হল কী রঘুনাথ!”

ছেলেটার অজ্ঞান শরীরটাকে যত্ন করে একটুকরো কাপড়ে মুড়ে তাকে পিঠে সঙ্গে বেঁধে নিয়ে, গাছের পাশের ছেড়ে যাওয়ায় রণ-পা দুটো হাতে তুলে নিলেন রঘুনাথ। কানাই-এর এই প্রশ্নের উত্তর তাঁর কাছে নেই। কেন যে হঠাৎ তাঁর মনে হচ্ছে, ওই ছোট শরীরটায় প্রাণের স্ফুলিঙ্গটুকু রক্ষা করবার জন্য তিনি হাসিমুখে নিজের প্রাণটাও দিয়ে দিতে পারেন তা তিনি নিজেও জানেন না।

খট্‌ খট্‌ খট্‌... দু’জোড়া রণ পা রাত্রির নিস্তব্ধ অরণ্য ভেদ করে ছুটে চলে বহু দক্ষিণে ভাগীরথীর অদেখা ধারার দিকে। তাদের একজনের পিঠে কাপড়ের দোলনায় দুলতে থাকা একটা শিশু রাত্রির ঠান্ডা হাওয়ায় চোখ খুলে হঠাৎ মাথায় তীব্র যন্ত্রণায় শিউরে ওঠে। কেন এত ব্য্যথা? সে জানে না। কী হয়েছিল? কোথা থেকে এসেছে সে, কোথায় সে যাচ্ছে তার কিছুই মনে পড়ে না তার। ঝাঁকুনি সইতে-সইতে বোবা একটা আকুতি নিয়ে মাথার একপাশে রক্তে জমাট হয়ে যাওয়া চুলগুলোর ওপরে হাত বোলায় সে একবার। তারপর ফের তাকে ছেয়ে আসে জ্ঞানহীন অন্ধকার...

চারাপোল, চব্বিশ পরগনা, ১৭৪৯

“জবাকুসুম সঙ্কাশং কাশ্যপেয়ম মহাদ্যুতিম...

“বলো ব্রহ্মানন্দ। আমার সঙ্গে সঙ্গে উচ্চারণ করো। তারপর, এইভাবে অঞ্জলীতে জল নিয়ে অর্ঘ্য দাও...”

ষোলো বছরের কিশোরটি একবুক জলে বলদেব ভট্টাচার্যের পাশে দাঁড়িয়ে অর্ঘ্য দিচ্ছিল। তার তরুণ মুখে পুব আকাশের প্রথম লাল আভা এসে পড়েছে। ভাঙা-ভাঙা গলায় অশুদ্ধ উচ্চারণে মন্ত্রের শব্দগুলো বলে চলেছে সে। হেমন্তের শীতে শরীরটা একটু একটু কাঁপছে তার।

“নিজেকে নিবিষ্ট করো ব্রহ্মানন্দ। স্থির হও। আজ তুমি শিকারে যাবে। জানবে একজন যোদ্ধার সবচেয়ে বড় সম্পদ হল চূড়ান্ত বিপদেও নিজেকে শান্ত রাখতে পারা। সম্মুখযুদ্ধে এর চাইতে বড় বর্ম আর কিছু হয় না...”

পাথরের মূর্তির মতো হাতদুটো জোড় করে স্থির হয়ে থাকা ছেলেটার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ বুকের ভেতর একটু স্নেহের প্রলেপ লাগল বলদেবের। নিয়তি! হয়তো এর নিয়তিই তাঁকে ভুল বুঝিয়েছিল একদিন মারাঠা দস্যুদের বিষয়ে। তা না-হলে রঘুনাথকে তিনি ভাস্কর পণ্ডিতের দলে যোগ দেবার জন্য পাঠাতেন না। তাহলে হয়তো মৃত্যুর মুখ থেকে উদ্ধার পেয়ে তাঁর আশ্রয়ে বেড়ে ওঠবার সুযোগ পেত না অনাথ ছেলেটা। রঘুনাথের কাছে যে বাপের স্নেহ সে পেয়েছে, সে স্নেহও হয়তো তার অজানাই থেকে যেত।

নিজের কোনও পরিচয় ও দিতে পারেনি আজও। বলদেবের দেয়া ব্রহ্মানন্দ নামটাকেই নিজের নাম করে নিয়েছে। তবে হ্যাঁ, সঠিক না জানলেও তার একটা পরিচয় আন্দাজ করতে পারেন বলদেব। কোনও যোদ্ধা পরিবারের ছেলে হবে এ। পুঁথিপত্রে মন নেই। সংস্কৃত ভাষার গোড়ার পাঠটুকুও অর্জন করতে পারল না গত সাত বছরে। ওদিকে কী তলোয়ারে, কী লাঠিতে, কি বন্দুকের নিশানাবাজিতে এরই মধ্যে তার দক্ষতা দেখবার মতো।

ওর সারা গায়ে ক্ষতচিহ্ন। পিঠে একটা লম্বা, আঁকাবাঁকা ক্ষতের শুকনো দাগ। সাত বছর আগের এক রাত্রে যখন রঘুনাথ ওর অচেতন শরীরটা কোলে করে এসে তাঁর মন্দিরের দরজায় দাঁড়িয়েছিল তখন ও-দাগটা একটা দগদগে ক্ষতচিহ্ন ছিল। তাঁর পায়ের কাছে ওকে নামিয়ে দিয়ে বলেছিল, “ধর্মের রক্ষক ভেবে যাদের ঠেঁয়ে পাঠিয়েছিলেন আমায় ঠাকুরমশাই, তাদের ধর্মরক্ষার একটা নমুনা দেখুন।”

কোনও জবাব না দিয়ে ছেলেটাকে পরম যত্নে কোলে তুলে নিয়েছিলেন বলদেব। সপ্তাহ-দুয়েক যমে-মানুষে টানাটানির পর সে যখন চোখ মেলল, ততদিনে নিজের সব পরিচয় হারিয়ে গিয়েছে তার।

তারপর, গত সাত বছরে গঙ্গা দিয়ে অনেক জল বয়ে গেছে। এর বছর-দুয়েক বাদে নবাবের হাতে ভাস্কর পণ্ডিতের মৃত্যুতে স্বস্তির শ্বাস ফেলেছিল বাংলা। কিন্তু তার পরের বছর ফের ফিরে এল তারা। নবাবের এককালের সিপাহসালার মীর হাবিব তখন তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ততদিনে তার বিশ্বাসঘাতকতার কথাও আর অজানা নেই কারও। অজানা নেই তাকে ধাওয়া করে আসা গোলাম মুস্তাফাকে ফাঁকি দিয়ে তার বর্গীদের দলে গিয়ে ভেড়বার কাহিনিও।

সন তারিখের হিসেব করে বলদেবের কাছে একটা বিষয় পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। জটেশ্বরীর মন্দিরের উঠোনে ব্রহ্মানন্দকে খুন করতে চেয়েছিল এই মীর হাবিবই। কিন্তু কেন? সে-প্রশ্নের জবাব তাঁকে দিতে পারেনি আত্মবিস্মৃত ছেলেটা।

তার হারানো স্মৃতি ফেরাবার চেষ্টায় কার্পণ্য করেননি বলদেব বা রঘুনাথ। কিন্তু, তাকে পরীক্ষা করে সব বৈদ্যই এক রায় দিয়েছেন। শারীরিক চোট নয়, চূড়ান্ত মানসিক আঘাতে স্মৃতি হারিয়েছে এ। মানুষের সাধ্য নয় তা ফিরিয়ে আনা। তবে হ্যাঁ, অনেক সময় কোনও চেনা মানুষের গলা, নিজের আসল নাম ধরে একটি ডাকও এই রোগীদের স্মৃতিকে ফিরিয়ে দিতে পারে। সে-সবই ভাগ্যের হাতে।

ঈশ্বরে গভীর বিশ্বাস করেন বলদেব। বিশ্বাস করেন নিয়তির অমোঘ গতিতে। গত কয়েক বছরে বাংলার বুকে মীর হাবিব আর তার দস্যুবাহিনীর অমানুষিক অত্যাচার তাঁকে বড় গভীর যন্ত্রণা দিয়েছে। আর সেই যন্ত্রণার মুহূর্তগুলোতে এই অবোধ শিশুটার মুখের দিকে চেয়ে তাঁর বারেবারেই মনে হয়েছে, ঈশ্বর একে বাঁচিয়ে রেখেছেন একটাই কারণে। হয়তো একদিন এর কাছে ঋণ চোকাবার জন্য আসতে হবে মীর হাবিবকে। ওই রাক্ষসদের হাতে প্রাণ দেয়া শত-শত মানুষের রক্তের বদলা নেবার জন্যই হয়তো অত ভয়ঙ্কর অত্যাচারেও প্রাণ যায়নি এর। কোনও অঙ্গহানিও ঘটেনি। আর সেই জন্যেই তিনি নিজে...

গঙ্গার পুবপারে একবারই পা রেখেছিল এর আগে বর্গীর দল। ব্রহ্মানন্দ তাঁর কাছে আসবার এক বছর বাদে। গঙ্গা পেরিয়ে নবহট্টের দক্ষিণ সীমায় মক্তবপুর খাল হয়ে বরতি বিলের দিকে গিয়েছিল তার অভিযান। বর্ধমানের পলাতক রানির ধনরত্নের খোঁজে। বেঁচে গিয়েছিল নবহট্ট। কিন্তু পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল বরতি বিলের পাশের কাউগাছি, পাকুরিয়া বা নীলগঞ্জের মতো সমৃদ্ধ জায়গাগুলো।

এর পরই সাবধান হয়ে যায় নবহট্ট। প্রথম বর্গী হানায় যুদ্ধে যাওয়া নবহট্টের ভীম সামন্ত গঙ্গার ধার ধরে-ধরে মথুরা বিল থেকে মক্তবপুর খাল অবধি লেঠেল আর নজরদারের নাকা বসালেন। নীরবে তার প্রস্তুতির ওপরে সতর্ক নজর রেখেছেন বলদেব। আর তাই তিনি জানেন, সত্যিকার আক্রমণ ঘটলে ভীমের সাধ্য হবে না তার থেকে এই শহরকে বাঁচাবার। আবার সেইসঙ্গেই একটা অদ্ভুত উল্লাসও জেগে থাকে তাঁর মনে। যদি তা ঘটে তবে সেদিন... হয়তো সেদিন সুযোগ আসবে ব্রহ্মানন্দের... সেদিন...

*

মন্দির চত্বর ছাড়িয়ে ঘন অরণ্য ছড়িয়ে আছে মথুরা বিল ঘিরে। এখনও সেখানে সূর্যের আলো ঢোকেনি। পায়ের তলায় উঁচু হয়ে থাকা ঝোপঝাড় ভেঙে সেই অরণ্যের ভেতরে সাবধানে পা ফেলে এগিয়ে যাচ্ছিল দু’জন মানুষ। বয়স্ক মানুষটি একেবারেই নিরস্ত্র। শরীরে পুজারীর রক্তাম্বর। তরুণটির কোমরে একটা ছুরি দুলছে কেবল। পরনে কৌপিন।

“দাদু, গাদাবন্দুক একটা নিয়ে এলেই তো...”

বলদেব মৃদু হাসলেন, “তাতে বরা তো মরতই ব্রহ্মানন্দ। শক্তি যার বেশি তার হাতে দুর্বলের মৃত্যু তো প্রকৃতির নিয়ম। কিন্তু যুদ্ধে জয় নিশ্চিত করতে গেলে, দুর্বল অবস্থায় শক্তিশালী শত্রুর মহড়া নিতে জানতে হয় যে দাদু!”

“আমি...”

“গলা নিচু করো ব্রহ্মানন্দ।” হঠাৎ কান খাড়া করে প্রায় অশ্রুত কোনও শব্দ শুনে নিলেন বলদেব, “কাছেই আছে জীবটা।”

গত দু’দিন ধরে বারংবার এই অরণ্যে ঘুরে-ঘুরে দক্ষিণের জঙ্গল থেকে পথ ভুলে চলে আসা এই বন্য শুয়োরটির গতিবিধি দেখেছেন তাঁরা। একাধিকবার ব্রহ্মানন্দ তাকে গুলি করে মারবার অনুমতি চেয়েছে। বলদেব অনুমতি দেননি। আজকের এই প্রশিক্ষণের জন্যই তিনি বাঁচিয়ে রেখেছিলেন তাকে।

ভোরে স্নানের পর আজ যখন তাকে নিয়ে বনে আসবার সময় বলদেব সঙ্গে বন্দুক নিতে নিষেধ করে একটা ছুরি নিতে বললেন, তখন ব্রহ্মানন্দ একটু অবাক হয়েছিল বটে, কিন্তু গত কয়েক বছরের শিক্ষায় সে জেনেছে, তার গুরুর কোনও আদেশ নিয়ে প্রশ্ন করা নিষিদ্ধ। শাস্তির বিষয়ে বলদেব বড় কঠিন মানুষ।

“কিন্তু শুধু এই ছুরি দিয়ে আমরা...”

“আমরা নয় ব্রহ্মানন্দ, বলো ‘আমি’। আজকের যুদ্ধে আমি দর্শক। শিকারটা করতে হবে তোমাকে। আজ তোমার শিক্ষার পরীক্ষা হবে। বলতে-বলতেই পিছু ফিরে হাঁটতে শুরু করেছিলেন বলদেব। একটু বাদে ঝোপঝাড়ের আড়ালে তাঁর শরীরটা মিলিয়ে যেতে ব্রহ্মানন্দ অনুভব করল এই অরণ্যে সে একেবারে একা। শুধু খানিক দূর থেকে ওঠা ঝোপঝার ভাঙবার শব্দ তাকে জানান দিচ্ছিল, তার শক্তিশালী প্রতিপক্ষ কাছেই রয়েছে।

স্থির হয়ে দাঁড়াল সে। গোটা পরিস্থিতিটাকে প্রথমে ভেবে নেয়া প্রয়োজন। একটা কথা ঠিক যে এই ছোট ছুরিটি সম্বল করে ওই জন্তুর মুখোমুখি হবার চেষ্টা করা মূর্খামি। দাদুও সেটা জানেন। তাহলে কেন তিনি...

গভীরভাবে ভাবতে-ভাবতেই হঠাৎ তার চোখদুটো চিকমিক করে উঠল। কৌশল! গত কয়েক বছরের শিক্ষার সময় বারে বারে বলদেব এই শব্দটা গেঁথে দিয়েছেন তার মস্তিষ্কে। হ্যাঁ। এই ছুরির ব্যবহার তাকে করতে হবে, তবে অন্য কৌশলে। সরাসরি নয়।

কাছাকাছি একটা জলাশয় রয়েছে। গত দু’দিন ধরে পর্যবেক্ষণে এর স্বভাব তার অজানা নেই। এখন তার জল খেতে আসবার সময়। আকাশের দিকে মাথা তুলে বেলার একটা আন্দাজ করে নিল ব্রহ্মানন্দ। এখনও খানিক সময় হাতে আছে।

দ্রুতপায়ে জলাশয়টার কাছে এগিয়ে গিয়ে তার কাছাকাছি একটা সুপুষ্ট কৃষ্ণচূড়ার গাছ বেছে নিল সে। এর ছাল শক্ত হয়। ছুরির দ্রুত আঁচড়ে তার ছাল কেটে নিয়ে সেগুলোকে পাকিয়ে লম্বা দড়িটা তৈরি করা শেষ করে যখন সে মুখ তুলল ততক্ষণে শরীর থেকে শীতের বোধটুকু উবে গিয়েছে তার।

জলাশয়ের অন্য পাশে একটা ঝোপের আড়াল থেকে তার দিকে নজর রাখছিলেন বলদেব। তাকে একলা ছেড়ে এসে খানিকটা ঘুরপথে আগে থেকেই সেখানে পৌঁছে গিয়েছিলেন তিনি। অনুমান করেছিলেন, তাঁর শিক্ষা সঠিক হলে এইখানেই ব্রহ্মানন্দ তার শিকারের মুখোমুখি হবে। সে-অনুমান নির্ভুল প্রমাণিত হয়েছে। নিজের লুকোবার জায়গাটা আগে থেকেই বেছে রেখে সেখানে একটা গাদাবন্দুক লুকিয়ে রেখে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ছেলেটার কাজ দেখে মৃদু হেসে সেটাকে সরিয়ে রাখলেন এবারে। যে কৌশল এ ভেবেছে তাতে সম্ভবত তাকে রক্ষা করবার জন্য বলদেবের প্রয়োজন হবে না আর।

দড়িটা তৈরি করে সাবধানে তাকে একবার টেনে পরীক্ষা করে নিল ব্রহ্মানন্দ। নরম অথচ কঠিন দড়ি। এ-গাছের ছাল সহজে ছেঁড়ে না। এবারে সাবধানে তার মাথায় একটা ফাঁস তৈরি করে নিয়ে জন্তুটার জল খেতে আসবার পথে সেটাকে বিছিয়ে দেবার পালা। তারপর শুকনো ঘাস দিয়ে সেটাকে ঢেকে দিয়ে তার অন্য প্রান্তটা নিয়ে কাছাকাছি একটা আমগাছের মাথায় গিয়ে উঠল সে। সেখানে, হাত-দশেক উঁচু একটা দোডালায় পাতার আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে রেখে এইবার অপেক্ষার পালা।

দূরে ঝোপঝাড় ভাঙবার একটা শব্দ এগিয়ে আসছিল এদিকে। প্রাণীটা আসছে। তাড়াতাড়ি দড়িটাকে শক্ত ডালটার ওপর দিয়ে একপাক ঘুরিয়ে এনে তার অন্য প্রান্তটা নিজের হাতের সঙ্গে জড়িয়ে নিল ব্রহ্মানন্দ। আসল সময়ে দড়ি হাত থেকে ছিটকে গেলে আর কোনও সুযোগ মিলবে না।

জঙ্গলে সাড়াশব্দ ছিল না কোনও। নিঃশঙ্কচিত্তে জলের দিকে এগিয়ে আসছিল জীবটা। সামনেই ঘাসের আড়ালে ছড়িয়ে থাকা মৃত্যুফাঁদের দিকে তার নজর পড়েনি।

তীক্ষ্ণ চোখে তার গতিপথের দিকে নজর রাখছিল ব্রহ্মানন্দ। একটু একটু করে পা’গুলো এগিয়ে আসছে ফাঁদটার দিকে... এইবার...

দড়ির অন্যপ্রান্তটা ধরে গাছের ডাল থেকে নীচে ঝাঁপ দিল ব্রহ্মানন্দ। একটা ঝাঁকুনি খেয়ে ওপর দিকে উঠে আসা ফাঁসটা জন্তুটার সামনের পাদুটোকে ঘিরে তার ঘাড়ের ওপর দিয়ে এঁটে বসেছে তার ওজনের টানে। বাতাসে অসহায় ভাবে পেছনের পা দুটো ছুড়ছিল সে। ততক্ষণে দড়ির অন্যপ্রান্তটা গাছের সঙ্গে শক্ত করে বেঁধে দিয়ে সেটার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে ব্রহ্মানন্দ। ছটফট করতে থাকা জন্তুটার অরক্ষিত বুক বারবার তার সামনে দুলে উঠছিল। তার তীক্ষ্ণ আর্তনাদ বনের নিস্তব্ধতাকে চিরে খান-খান করে দিচ্ছে তখন।

কোমর থেকে খুলে আনা ছুরিটা হাতে বের করে নিয়েও কী ভেবে হঠাৎ থমকে গেল সে। আর ঠিক তখনই তার পেছন থেকে ভেসে উঠল বলদেবের গলার স্বরটা, “সাবাশ। অস্ত্রশস্ত্রের শিক্ষা তোমার আগেই শেষ হয়েছে। এবার কৌশলের পরীক্ষাতেও উতরে গেলে ব্রহ্মানন্দ।”

এই দিনটার আশাতেই নিজের দীর্ঘকালের অনভ্যাস ঝেরে ফেলে, পূজার শঙ্খ ঘণ্টার পাশাপাশি বলদেব ফের একবার তুলে নিয়েছিলেন যুদ্ধের অস্ত্র। ছেলেটাকে বারো বছর বয়সে তলোয়ারের দিক্ষা দিয়েছিলেন। তারপর গত চার বছর ধরে তাকে গড়েছেন তিনি, যেমনভাবে একদিন গড়েছিলেন রঘুনাথকেও, অত্যাচারী শক্তিমান জমিদারদের থেকে অর্থ কেড়ে নিয়ে দরিদ্রনারায়ণের সেবার অস্ত্র হিসেবে।

“অপেক্ষা করছ কেন? শত্রুর শেষ রাখতে নেই। এর কষ্টের শেষ করো।”

হঠাৎ তাঁর দিকে ঘুরে দেখল ব্রহ্মানন্দ। তারপর মাথা নেড়ে ছুরিটাকে ফের কোমরে আটকে নিয়ে বলল, “না দাদু।”

তার গলায় হঠাৎ একটা অচেনা দৃঢ়তা ভর করেছে এসে। একটু অবাক হয়েই তার দিকে একবার দেখলেন বলদেব।

“কেন?”

“ও কোনও অন্যায় করেনি। আমার পরীক্ষার জন্য ওকে ব্যবহার করেছি শুধু। কোনও নির্দোষের প্রাণ নেবার জন্য তো আমি তোমার কাছে অস্ত্রশিক্ষা করিনি!”

চোখের শুকনো কোণদুটো জলে ভরে উঠল বলদেবের। ব্রাহ্মণের সন্তান হয়েও মুর্শিদকুলি খাঁর দৌরাত্ম্যে অধ্যয়ন অধ্যাপনার পেশা ছেড়ে মানুষকে বাঁচাবার জন্য একদিন অস্ত্র ধরতে হয়েছিল তাঁকে। শিখতে হয়েছিল মারো অথবা মরোর অমোঘ নীতি। অথচ এই ছেলেটা...

“এই দুর্বলতার জন্য একদিন তোমাকে প্রাণ দিতে হতে পারে। যে যুদ্ধের জন্য আমি তোমায়...”

মৃদু একটা হাসি ছড়িয়ে গেল ব্রহ্মানন্দের মুখে, “না ঠাকুর। ছেলেবেলা বাপকে খুইয়েছি, নিজের পরিচয় খুইয়েছি যার হাতে, তার মুখোমুখি হবার জন্যই তো আমায় গড়লে তুমি। তোমার একটা কথাও আমি ভুলিনি। যেদিন তার মুখোমুখি হব, সেদিন... তুমি দেখে নিয়ো...

“কিন্তু এখন এই বেচারাকে ছেড়ে দিতে অনুমতি দাও আমায় তুমি। আর তা না চাইলে তুমি নিজের হাতেই একে...”

“ঠাকুরমশাই...”

হঠাৎ জঙ্গলের ভেতর থেকে চেনা একটা গলার শব্দে চমক ভাঙল দু’জনেরই। রণ পায়ের ছুটে আসবার খট খট শব্দ উঠেছে। রঘুনাথের গলা! তার তো এখন কাউগাছির দিকে থাকবার কথা! এই অসময়ে...

ব্রহ্মানন্দর দিকে একটা ইশারা করে পালটা জবাব দিলেন বলদেব। তারপর ঝুলন্ত জন্তুটার থেকে নিরাপদ দূরত্বে গিয়ে দাঁড়াতে ছুরির একটা নিখুঁত কোপ-এ তার বাঁধন কেটে দিয়ে ব্রহ্মানন্দও তাড়াতাড়ি উল্টোদিকের একটা গাছে গিয়ে উঠেছে।

জন্তুটার অবশ্য আর তাকে তাড়া করবার কোনও ইচ্ছে অবশিষ্ট ছিল না। মুক্তির আনন্দে একটা তীক্ষ্ণ হাঁক দিয়ে সে ছুটল বিপরীত দিকের জঙ্গলের নিরাপদ আশ্রয়ে দিকে।

*

“কী ব্যাপার রঘুনাথ? এই অসময়ে...”

হাঁফাচ্ছিলেন রঘুনাথ। অনেকটা পথ ছুটে এসেছেন। এই ঠান্ডাতেও তাঁর কপালে ঘামের দাগ।

“মীর হাবিব...”

“কোথায়?”

“হুগলিতে।”

“অসম্ভব। কয়েকদিন আগেই মেদিনীপুরে আলিবর্দির হাতে মার খেয়ে জঙ্গলে পালিয়েছে সে। তোমার লোকজনই সে খবর...”

“তাতে ভুল ছিল না ঠাকুরমশাই। কিন্তু দিন-দুয়েক আমার নজরদার হুগলির এক মুসাফিরখানায় তার দেখা পেয়েছে।”

“তাহলে খবরটা পৌঁছোতে দু’দিন দেরি হল কেন?” হঠাৎ ব্রহ্মানন্দের গলাটা পেয়ে তার দিকে ঘুরে দেখলেন রঘুনাথ। ছেলেটা নেতৃত্ব দেবার জন্যই জন্মেছে। নিজের অজান্তেই তার গলায় সেই তখনও জন্ম না নেয়া কর্তৃত্বের ছাপ।

বলদেব একটু হাসলেন, “রঘুনাথ অকারণে দেরি করে না ব্রহ্মানন্দ। আগে ধৈর্য ধরে শোনো সে কী বলতে চায়।”

“দেখা পাবার পর আমার লোক গত দু’দিন ধরে খবরাখবর নিয়েছে হুগলিতে।” ফের কথা বললেন এইবার রঘুনাথ, “যেটুকু বোঝা যাচ্ছে, ছোট-ছোট দলে ভেঙে প্রায় শ’পাঁচেক বর্গীর একটা ফৌজ নিয়ে গোপনে হুগলি এসে পৌঁছেছে মীর হাবিব নিজে।”

“কিন্তু, এত ছোট একটা দল নিয়ে, মীর হাবিব নিজে হুগলিতে... হিসেব মিলছে না রঘুনাথ!

“আমিও সঠিক বুঝতে পারছি না গুরুদেব। এরপর আরও একটা খবর এসেছে আজ সকালে। কাল রাত্রে ষাঁড়েশ্বরতলা আর পিপ্পলের ঘাট দিয়ে তাদের মধ্যে কিছু লোক তিনটে নৌকো করে গঙ্গা পেরিয়ে এদিকে এসেছে। জায়গা-দুটো নির্জন। সাধু-সন্ন্যাসীর আখড়া। খেয়া পারাপার হয় না বিশেষ। কুঠির সাহেবদের নজরদারিও কম তাই। ওরা...”

ভ্রূ-দুটো কুঁচকে উঠছিল বলদেবের, প্রায় ফিসফিস করে, যেন নিজের মনেই বলছিলেন তিনি, “যে জায়গায় নদী পেরিয়েছে এরা তার উল্টোদিকে এ-পাড়ে মক্তবপুরের শ্মশান। ওর গা ঘেঁষে পুবে এগিয়ে যাওয়া মক্তবপুরের খাল ধরেই ক’বছর আগে বিশ হাজার বর্গীর দল কাউগাছির দিকে হানা দিয়েছিল বর্ধমান ছেড়ে পালানো রানির সন্ধানে। ফের সেদিকেই... অথচ এত ছোট একটা দল নিয়ে... কেন? মক্তবপুর থেকে মথুরাবিল অবধি বর্গীর ভয়ে সামন্তমশাই একশখানা চৌকি বসিয়ে রেখেছেন সে খবর ওরাও জানবে নিশ্চয়। একেকটা চৌকিতে বিশটা করে সেপাই দিনরাত বিশজোড়া চোখ মেলে নদীর দিকে নজর রাখছে। তাদের নজর এড়াবে না বিষয়টা। অথচ...”

নৈঃশব্দটা ভাঙল ব্রহ্মানন্দর গলার শব্দে, “তিনটে নৌকো। তার মানে খুব বেশি হলে দেড়শো জন। তাহলে, এদের বাকিদের নিয়ে মীর হাবিব কোথায় গেল?” বলতে-বলতেই হঠাৎ রঘুনাথের দিকে চোখ ফেলল সে, “এতে অন্য কোনও রহস্য আছে বাবা। এ-ভাবে বর্গী কোনও অভিযান করে না। তারা আসে বিরাট দল নিয়ে, পথের সবকিছু উড়িয়ে-পুড়িয়ে দিতে-দিতে। না বাবা। অভিযান নয়। অন্য কোনও কারণে নবহট্টে আসছে এরা। কেন?”

নিঃশব্দে মাথা নাড়লেন বলদেব। খবরটা তাঁকেও কিছুটা স্তম্ভিত করে দিয়েছে।

“তা এখানে কী মনে করে রঘুনাথ? শুনেছি পত্র দিয়ে ডাকাতি করা তোমার ব্যবসায়। কিন্তু ভীম সামন্তের বাড়িতে এভাবে ঢুকে আসবার দুঃসাহস...”

“সামন্তমশাই, আজ আমি আপনার কাছে কেবল আমার ছেলে এই ব্রহ্মানন্দকে নিয়ে নিরস্ত্র হয়ে এসেছি। ডাকাতির উদ্দেশ্য আমার নেই।”

মানুষটার দিকে স্থির চোখে একবার তাকিয়ে দেখলেন সামন্ত। সন্ধেবেলার দরবারে অনেক মানুষই দেখা করতে আসে তাঁর কাছে। বিভিন্ন কাজে। দরজা তাঁর সকলের জন্যই খোলা। তবে আজ তাঁর দরবার বসেনি। বড় ব্যস্ততা চলেছে আজ। গঙ্গাতীরে ছড়ানো পাহারা চৌকিগুলো থেকে ফেরত আনা শ’পাঁচেক সেপাইয়ের একটা দল এসে জড়ো হয়েছে বাড়ির সামনের প্রশস্ত মাঠে। তাদের হাঁকডাকে বাড়ি সরগরম।

তারই মধ্যে দরদালানের এক কোণে এই দু’জনকে অপেক্ষা করতে দেখে একজন সেপাই তাদের ধরে এনেছিল তাঁর কাছে। তাঁকে প্রণাম করে, তারপর সামন্তমশাইকে স্তম্ভিত করে তারা নিজের পরিচয় দিয়েছে। কিন্তু...

“বেশ। তা হঠাৎ আমার কেন?”

“এসেছি একটা খবর আর একটা অনুরোধ নিয়ে। মক্তবপুরের কাছে গঙ্গা পেরিয়ে মীর হাবিবের দলবল...”

হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিলেন সামন্ত, “গতকাল রাতে গঙ্গা পেরিয়ে মক্তবপুর খাল হয়ে শ-দুয়েক মতো মানুষ ঢুকছে রাতের অন্ধকারে। চৌকির সেপাইরা ধাওয়া করতে চারপাশে অন্ধকারে ছড়িয়ে গেছে সব। ধরা যায়নি। খবর পেয়ে আজ তার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও নিচ্ছি আমি। কিন্তু, এরা বর্গী সে-খবর তুমি কোথায় পেলে? তারা তো মেদিনীপুরের দিকে...”

“চর আমারও আছে সামন্তমশাই। আমার কাছে পাকা খবর আছে, মীর হাবিব নিজে একটা ছোট দল নিয়ে হুগলিতে এসে গোপনে থানা দিয়েছে। তাদেরই একটা দল...”

“অসম্ভব। এ-ভাবে চোরের মতো সে আসবে না। তা-ছাড়া এত ছোট দল নিয়ে...”

“তার কারণ আমিও জানি না সামন্তমশাই। যা জেনেছি তা আপনাকে জানালাম। এখন বিশ্বাস-অবিশ্বাস আপনার হাতে। আমি শুধু এসেছি একটা আর্জি নিয়ে। আমার দলে তিনশ লাঠিয়াল আছে। চল্লিশজন বন্দুকধারী। ঘোড়া আছে একশ। বাকি রণ-পা। দেউলগ্রামে তারা জমায়েত হয়েছে। যদি আপনার কোনও সাহায্যে আসতে পারি...”

স্থির দৃষ্টিতে লোকটার দিকে একবার তাকিয়ে দেখলেন ভীম সামন্ত। একসময় এ ভাস্কর পণ্ডিতের দলে যোগ দিয়েছিল বলে খবর আছে তাঁর কাছে। বর্গীর সঙ্গে হাত মেলানো একটা লোক হঠাৎ করে তাঁর সঙ্গে যোগ দিতে চাইবে কেন? দলে ঢুকে তারপর কোনও...

নাঃ! এই ডাকাতকে বিশ্বাস করা যায় না। হঠাৎ আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন তিনি। খোলা দরজার দিকে একটা আঙুল দেখিয়ে বললেন, “তোমার সাহসের প্রশংসা করতে হবে রঘুনাথ। তবে যে উদ্দেশ্যেই তুমি এখানে এসে থাক না কেন, নিরস্ত্র অতিথির গায়ে আমি হাত তুলি না। তুমি যেতে পার। কিন্তু জেনে রেখ, আমি নবহট্টের ফৌজদার। এরপর কখনও মুখোমুখি হলে একজন দেশদ্রোহী ডাকাতের যা সাজা প্রাপ্য হয় তা তুমি আমার কাছে পাবে।”

তারা যখন বের হয়ে যাচ্ছে ঠিক সেই সময় ভেতর থেকে বারবাড়িতে আসবার দরজার একটা পাল্লার আড়াল থেকে দুটো চোখ ব্রহ্মানন্দের দিকে তাকিয়ে জলে ভরে উঠছিল। বারবারই সে-চোখদের মালিকের বুকে কেমন একটা কাঁপুনি জাগছে ওর দিকে তাকিয়ে। বড় চেনা ঠেকে যে তার তাকে। কিন্তু... তা কী করে হবে! তা কী করে...

*

“ফের মায়ে-ঝিয়ে মিলে চোখের জল ফেলছিস? মুখপুড়ি, কী অভাব রেখেছি তোদের আমি যে থেকে থেকে চোখের জল ফেলবি?”

কঙ্কার মুখটা নিশার বুকে গোঁজা। থেকে থেকেই তার এমন হয়। তখন তাকে সান্ত্বনা দিতে বসে নিশারও সেই একই দশা হয় তখন।

এই চোখের জল একেবারে সয় না রঞ্জাবতীর। এগিয়ে এসে সে তাড়াতাড়ি কঙ্কাকে নিশার কাছ থেকে নিজের বুকে টেনে নিল। সাত বছর আগে, নবাবের বাহিনী নিরাপদে কাটোয়ায় পৌঁছোবার পর জটরামে যখন ফিরেছিলেন ভীম, তখন শ্রীমন্তকে হারিয়ে রঞ্জাবতীর উন্মাদিনীর দশা। অবস্থা দেখে নিশা তড়িঘড়ি কঙ্কাকে তার কোলে ঠেলে দিয়েছিল। সম্ভবত ওইতেই প্রাণটা কোনমতে ধরে রেখেছিল রঞ্জাবতীর। অবস্থা দেখে ভীম এক মুহূর্ত দেরি করেননি। রঞ্জাবতীকে নিয়ে ফিরে এসেছিলেন নবহট্টে। তারপর তাকে সেখানে রেখে দিয়ে ফের ফিরে গিয়েছিলেন বর্ধমানে।

দু’মাস পরে যখন তিনি নবহট্টে ফিরলেন তখন কেমন যেন বুড়িয়ে গেছেন মানুষটা। তোলপাড় করে খুঁজেও কোনও হদিশ পাননি তিনি শ্রীমন্তর। যেন হাওয়ায় উবে গেছে সে।

এর পরের বছর এক বর্ষার সকালে, কঙ্কাকে কোলে নিয়ে রঞ্জাবতীর সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল নিশা। জানিয়েছিল, দ্বিগুণ শক্তি নিয়ে ফিরে আসা মীর হাবিব আর তার বর্গীদলের হানায় ধুলোয় মিশে গেছে জটরাম গ্রাম। বিজাতীয় জিঘাংসায় তলোয়ারের ডগায় নিষ্ঠুরভাবে খুঁচিয়ে সুরমা ও হরিদেব সামন্তকে খুন করেছেন মীর হাবিব নিজে। তাঁদের একমাত্র অপরাধ তাঁরা ভীম সামন্তের আত্মীয়।

গঙ্গার পশ্চিমপাড় থেকে তার পুবপাড়ে নবহট্টের দিকে তখন উদ্বাস্তুর ঢল নেমেছে। এ-পাড়ে ভীম সামন্ত আর তার লেঠেলবাহিনীর সতর্ক পাহারায় কিছুটা নিরাপত্তার আশ্বাস পেয়েছে তারা। তাদেরই একটা দলে সঙ্গে, মেয়েকে নিয়ে কোনওমতে ছেলেবেলার সই রঞ্জাবতীর দরজায় এসে পৌঁছেছিল নিশা।

যেন অকূলে কূল পেয়েছিল রঞ্জাবতী তাদের পেয়ে। তার অপূর্ণ ভালোবাসার সবটুকু সে উজাড় করে দিয়েছিল ওই মেয়েটার ওপরে। কিন্তু তবু, গত সাত বছরেও তাদের চোখের জল শুকোয়নি। মেয়েটা এখনও মাঝে-মাঝে ঘুমের মধ্যে “ওরা ছিরুদাদাকে মেরে ফেলল...” বলে চিৎকার করে ওঠে। সে চিৎকারে বুকে যেন বল্লমের চোট লাগে এসে রঞ্জাবতীর। তবু, বুকে পাষাণ রেখে তিনি তখন ও-মেয়েকে কোলে তুলে নেন। দু’হাতে জড়িয়ে ধরে বলেন, “এই তো মা। আমি তো আছি! ভয় কী? আমার শ্রীমন্ত মরেনি মা। নইলে জটেশ্বরের মন্দিরতলায় তার শরীরটা কেউ খুঁজে পেল না কেন? দেখবি, একদিন না একদিন সে ঠিক...”

রঞ্জাবতীর গলা পেয়ে নিশা তাড়াতাড়ি চোখের জল মুছে ফেলে ঘুরে তাকাল। কঙ্কা তখনও তার বুক থেকে মুখ তোলেনি। সেদিকে ইশারায় দেখিয়ে বলল, “ঠাকুরের সঙ্গে দেখা করবার জন্য কারা যেন এসেছিল নীচে। মক্তবপুরের দিকে নৌকো করে কাল থেকে লোক ঢুকছে খবর পেয়ে ঠাকুর সেপাই ডেকেছেন আজ সে তো জানো! তা কঙ্কা আড়াল থেকে শুনে এসেছে তারা বলেছে নাকি মীর হাবিব নিজে হুগলিতে ঢুকে এদের এদিকে পাঠিয়েছে। সেই শুনে ইস্তক মেয়ে আমার...”

রঞ্জাবতীর মুখটা হঠাৎ দপ করে জ্বলে উঠল যেন। দৃঢ়পায়ে এগিয়ে গিয়ে কঙ্কাকে টান দিয়ে তার মায়ের কোল থেকে তুলতে তুলতে বললেন, “মুখপুড়ি। লজ্জা করে না তোর? যে তোর বাপকে খেল, তোর শ্রীমন্তকে চাবকে পিঠের ছাল উঠিয়ে দিল, সে আসছে শুনে মায়ের বুকে মুখ লুকিয়ে চোখের জল ফেলছিস, তুই না উগ্রক্ষত্রিয়ের মেয়ে? আমাকে দেখ। আমি কাঁদছি? কাঁদছি আমি? ওঠ তুই মুখপুড়ি! ওঠ বলছি! চোখের জল মোছ!”

তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়াল কঙ্কা। এই বড়মা’টিকে সে যত ভালোবাসে, ভয়ও করে তত। কিন্তু কান্নার আসল কারণটা সে মুখ ফুটে বলতে পারবে না তাঁকে। খানিক আগে বারবাড়ির দোরে উঁকি মেরে যে ছেলেটার মুখ দেখেছে সে এক ঝলকের জন্য, তাকে দেখে হঠাৎ করেই একটা প্রায় ভুলে যাওয়া মুখ মনে পড়ে যাচ্ছে যে তার! একটা হাসি হাসি মুখ... মীর হাবিবের চাবুকের সামনে দাঁড়ানো একটা অসহায়, ভয় পাওয়া মুখ...

কিন্তু তা কী করে হবে? মথুরা বিল থেকে রায়মঙ্গল অবধি পরগনার ত্রাস রঘু ডাকাত! ও যে তার ছেলে ব্রহ্মানন্দ! সে কেমন করে...

*

“উনি তোমাকে...”

খুঁটিঘাটের কাছেই ভীম সামন্তের চকমেলানো প্রাসাদ। ব্রহ্মময়ীর এই মন্দিরের চাতাল থেকে তা স্পষ্ট চোখে পড়ে। এখন একেবারে নিস্তব্ধ হয়ে গেছে বাড়িটা। রাত্রি দ্বিতীয় প্রহরে পাঁচশ সেপাইয়ের একটা দল নিয়ে সামন্ত বাড়ি ছেড়ে রওনা হয়ে গিয়েছেন মক্তবপুরের দিকে। জনাবিশেক সেপাই কেবল পাহারায় রয়েছে সেখানে।

সেদিকে তাকিয়ে অসহায়ভাবে মাথা নাড়লেন রঘুনাথ। খানিক আগে, ছেলের সামনে হওয়া অপমানের জ্বালাটা এখনও তাঁকে দগ্ধে মারছে।

“কী করব আর বল? ভুল সামন্তমশাই বলেননি কিছু। তুইই ভাব, ওঁর জায়গায় তুই হলে কী করতি? বিশ্বাস করতে পারতি আমায়? সত্যিই তো আমি একদিন...”

“বাবা!”

হঠাৎ চাপা গলায় ব্রহ্মানন্দর ডাকটা শুনে চুপ করে গেলেন রঘুনাথ। মাথা নিচু করে মন্দিরের চাতালে শুয়ে পড়েছে সে। তার চোখদুটো সামনে বয়ে যাওয়া গঙ্গার বুকের দিকে ধরা।

সেদিকে তাকিয়ে হঠাৎ বুকটা হিম হয়ে গেল রঘুনাথের। তারার আবছা আলোয় নদীর বুকে কখন যেন কয়েকটা অন্ধকার ফুটকি জেগে উঠেছে। নিঃশব্দে নদী পেরিয়ে খুঁটিঘাটের দিকে এগিয়ে আসছে তারা। আস্তে-আস্তে বড় হয়ে উঠে অন্ধকারের কতগুলো ড্যালার রূপ নিচ্ছিল ফুটকিগুলো।

“এক...দুই...তিন... দশটা নৌকো! তার মানে শ-তিনেক লোক হবে! ওরা...”

হঠাৎ সেদিন দুপুর থেকে পাওয়া সমস্ত খবরগুলো একটা নির্দিষ্ট নকশায় সেজে উঠল যেন রঘুনাথের চোখের সামনে। এই কথাটা কেন তার আগে মনে পড়েনি? ভীম সামন্ত! মীর হাবিবের মুখ থেকে একাধিকবার তার গ্রাস কেড়ে নেয়া ভীম সামন্ত। সে নিয়ে আলিবর্দি নবাব স্বয়ং তাকে পুরস্কার দিয়েছিলেন বর্ধমানের যুদ্ধের পর! তার সেই বীরত্বের কথা এখন এ-দিগরে লোকের মুখে মুখে ফেরে! ভীম সামন্তের বাড়িই ওর আসল লক্ষ্য ছিল তবে! মক্তবপুরের দিকে একটা ছোট দলের টোপ পাঠিয়ে তার দলবলকে এখান থেকে সরিয়ে নিয়ে গিয়ে...”

“ওরা সামন্তমশাইয়ের বাড়িতে চড়াও হতে আসছে ব্রহ্মা! তিনি এখন মক্তবপুরে। আমরা যদি গিয়ে খবরও দিই তা হলেও তো বিশ্বাস করবেন না। কোনও পথ নেই রে! হাত পা গুটিয়ে বসে দেখা ছাড়া আর কোনও...”

হঠাৎ তাঁর ডানহাতটা সজোরে চেপে ধরল ব্রহ্মানন্দ, “না বাবা। আজ সন্ধেয় যা হয়েছে, কিংবা এখন যা ঘটতে চলেছে, সে বোধ হয় ভবানীরই ইচ্ছে। তাই তিনি আমাদের এখানে এই সময়ে রেখে দেবার জন্য এই কৌশল করেছিলেন। পথ আছে। শোনো...”

দ্রুত বলে যাওয়া পরিকল্পনাটা শুনতে শুনতে একই সঙ্গে গর্ব আর ভয় পাকিয়ে উঠছিল রঘুনাথের মনে।

“কিন্তু তুই... এমন একটা ঝুঁকি নিয়ে... না ব্রহ্মা। আমি তা...”

কথাটা বলতে গিয়েও থেমে গেলেন রঘুনাথ। হঠাৎ করেই যেন তাঁর সামনে মাথা তুলে এসে দাঁড়িয়েছে কোনও বীর যোদ্ধা। এক সময় অসহায় শিশু ছিল এ। অত্যাচারিত হয়ে, সব খুইয়ে তাঁর আশ্রয়ে এসেছিল। তাকে তিনি নিজের সন্তান হিসেবেই দেখেছেন। বড় করেছেন। শিক্ষাও দিয়েছেন। আজ যদি সে অন্যায়ের বিরুদ্ধে তলোয়ার ধরতে চায়, তাহলে তুচ্ছ প্রাণের ভয়ে তাকে আটকাবার অধিকার তাঁর নেই। একজন যোদ্ধার জীবনে এর চেয়ে বড় কর্তব্য আর কিছু হয় না যে!

পাশে রাখা বন্দুক, বারুদ আর গুলির পুঁটুলিটা তুলে নিল ব্রহ্মানন্দ। কাপড়ে ভালো করে জড়িয়ে সেগুলোকে পিঠের সঙ্গে বাঁধতে-বাঁধতে চাপা গলায় বলল, “ভেবো না বাবা। সামন্তমশাইয়ের বাড়িটাকে আমি ভালো করে দেখেছি সন্ধেবেলা। আমি ঠিক পারব। কিন্তু এবার তুমি যাও। ওরা...”

তাদের পায়ের নীচে নদীর বুকে নৌকাগুলোর চেহারা তখন ক্রমশ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

হঠাৎ মুখ ঘুরিয়ে পালিত ছেলের মাথাটা দু’হাতে জড়িয়ে ধরলেন রঘুনাথ। অস্ফূট গলায় বললেন, “আশীর্বাদ করি, সফল হ। পারিস তো আমরা পৌঁছোনো অবধি রাক্ষসটাকে আটকাস। ঈশ্বর তোকে রক্ষা করুন বাবা। তোর হাত দিয়েই যেন ওই ইস্পাহানি রাক্ষসের অত্যাচারের শেষ হয়।”

তারপর নিজের ও ব্রহ্মানন্দের দু-জোড়া রণ-পা হতে ধরে, মন্দিরের চাতাল থেকে নেমে অন্ধকারে নিঃশব্দে মিলিয়ে গেলেন তিনি। সেদিকে চোখ রেখেই গঙ্গার জলের ভেতর নেমে যেতে-যেতে ফের একবার নিজের পরিকল্পনাটা মনে-মনে ঝালিয়ে নিল ব্রহ্মানন্দ। কৌশলটা কাজে লাগবে কি না, তা সে জানে না। কিন্তু এ-ছাড়া এই মুহূর্তে আর কোনও পথই খোলা নেই যে! আর ভাগ্য সহায় হলে... একটা বুলেট... সঠিক নিশানায় একটা বুলেটই এ-যুদ্ধকে শেষ করে দিতে পারে! সেই ছোটবেলা থেকে বারংবার রঘুনাথের মুখে মীর হাবিবের বর্ণনা শুনে মনে-মনে লোকটার একটা ছবি সে গড়ে তুলেছে। হাজার মানুষের মধ্যেও তাকে চিনে নিতে তার ভুল হবে না।

*

দশটা ছিপনৌকা বোঝাই তিনশো মারাঠি দস্যুর দলটা যখন খুঁটিঘাটে এসে নিঃশব্দে ভিড়ল, তখনও কিছু টের পায়নি সামন্তের বাড়ির চারধারে পাহারায় থাকা সেপাইদের ছোট দলটা। যখন টের পেল ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে।

হঠাৎ জলের কাছে দপ-দপ করে জ্বলে ওঠা অজস্র মশালের আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে দিয়ে গেল তাদের। চমকে উঠে তাদের একজন ছুটে গিয়েছিল ঘাটের দিকে। কিন্তু বাড়ির দরজা ছেড়ে কয়েক পা এগোতেই ঘাটের দিক থেকে একটা তির এসে তার বাঁ হাতে বেঁধে আর তার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই পাশের ঘন বনতুলসির ঝোপের ভেতর থেকে একটা হাত তাকে টেনে আনে ঝোপের ভেতর। দ্রুত হাতে তার ক্ষতটায় বাঁধন দিতে দিতে একটা গলা তার কানের কাছে ফিসফিস করে বলেছিল, “চোট গভীর নয়। রণ পা ধরতে পারবে আশা করি। ঝোপের ভেতর দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে ওপাশে বেরিয়ে সিধে মক্তবপুর গিয়ে সামন্তমশাইকে খবরটা দাও। এক মুহূর্ত দেরি না হয়।”

“আ-আপনি...”

বাক্যটা শেষ হবার আগেই তাকে টেনে আনা মানুষটা তখন দ্রুত হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে গেছে ঝোপের অন্যপ্রান্তে। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে সেখান থেকে খট খট শব্দ উঠে তা মিলিয়ে গেল দূরে। সেপাইটিও ততক্ষণে ঝোপের অন্যপ্রান্ত দিয়ে বের হয়ে এসে উঠে দাঁড়িয়েছে তার হাতে গুঁজে দিয়ে যাওয়া অন্য রণ-পা’জোড়ায়।

ততক্ষণে রক্তলোলুপ একদল রাক্ষসের মতোই নদীপথে আসা হানাদাররা ঝাঁপিয়ে পড়েছে অরক্ষিত বাড়িটার দরজায়। তাদের সবার সামনে দাঁড়ানো মানুষটার চোখে প্রতিহিংসার আগুন ছিল। তাঁর কৌশল কাজে লেগেছে আজ রাতে। আগের দিন মক্তবপুরের দিকে পাঠানো ছোট টোপটা টেনে নিয়ে গেছে ভীম সামন্তকে। যখন সে ফিরে আসবে ততক্ষণে তার সাজানো সংসার চূরমার করে দিয়ে যাবেন মীর হাবিব। এই তার যোগ্য সাজা হবে।

*

“সামন্তমশাই।”

ডাকটা শুনে ঘোড়ার পিঠ থেকেই পেছন ফিরে দেখলেন সামন্ত। ভট্টপল্লি ছাড়িয়ে মাইলদুয়েক পুবের এই ফিঙ্গাপাড়া জায়গাটা নির্জন। একটা বড় আয়তনের মাঠের মাঝখানে থেমেছেন তিনি। সঙ্গের সৈন্যদের বেশির ভাগটাই ছোট-ছোট দলে ভাগ হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে হানাদারদের সন্ধানে। তবে এখনও তাদের কোনও চিহ্ন পাওয়া যায়নি এই চত্বরে।

আহত মানুষটার বাঁ-হাতে বাঁধা কাপড়টা রক্তে লাল হয়ে উঠেছে। ওই যন্ত্রণা নিয়ে এতটা পথ রণপায়ে ছুটে এসে বড় ক্লান্ত হয়ে পড়েছে সে।

“ওরা... ওরা খুঁটিগাড়া ঘাটে উঠে এসে আপনার বাড়িতে...”

বলতে-বলতেই অচেতন হয়ে লুটিয়ে পড়ল সে তাঁর পায়ের কাছে। আতঙ্কের হিমশীতল একটা আঙুল যেন এসে হঠাৎ কাঁপুনি ছড়িয়ে দিল সামন্তের শরীরে। এই ‘ওরা’ যে কারা তা বুঝতে কোনও অসুবিধে হচ্ছে না তাঁর। মক্তবপুরের ব্যাপারটা তাহলে একটা ফাঁদ ছিল। আর তিনি... মূর্খের মতো...

চারপাশে একবার তাকিয়ে দেখলেন ভীম। বড়জোর শ’দুয়েক মানুষ রয়েছে এই মুহূর্তে তাঁর সঙ্গে। চল্লিশটা বন্দুক। বাকিরা দস্যুদের সন্ধানে ছড়িয়ে গিয়েছে চারদিকে। খুঁজে ফিরিয়ে আনতে সময় নেবে। অথচ ততক্ষণে হয়তো...

রঞ্জাবতীর মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠছিল তাঁর বারবার। কঙ্কা, নিশা... বাড়ি ভর্তি একদল অসহায় আশ্রিত আত্মীয় পরিজন...

মাথা ঠান্ডা রাখতে হবে এখন। হঠাৎ পাশে দাঁড়ানো রুপো বাগদির দিকে ঘুরে তাকালেন তিনি, “দশজনের একটা দল নিয়ে লেঠেলদের খুঁজে ফিরিয়ে আন রূপো। তারপর যত তাড়াতাড়ি পারিস ওদের নিয়ে বাড়িতে আয়। আমি ততক্ষণ বাকিদের নিয়ে এগোচ্ছি।”

“কিন্তু কর্তা, মাত্র এই ক’জনকে সেথো নিয়ে...”

“উপায় নেই রূপো। এতক্ষণে হয়তো...” বলতে-বলতেই ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছেন ভীম সামন্ত। তারপর সঙ্গের সৈনিকদের অনুসরণ করবার নির্দেশ দিয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে তিনি মিলিয়ে গেলেন উত্তর-পশ্চিম অভিমুখে।

*

নদীর গায়ে ভীম সামন্তের চকমেলানো বাড়িটা মশালের আলোয় ঝলমল করছিল। জলের ভেতর এগিয়ে আসা ঢোলকলমির ঝোপের ভেতর দিয়ে নিঃশব্দে ছায়ামূর্তিটা এগিয়ে যাচ্ছিল তার আকাশমুখো দেয়ালের পাশ ধরে ধরে। তার সতর্ক নজর দেয়ালের দিকে ধরা।

বেশিদূর তাকে যেতে হল না অবশ্য। খানিক বাদেই নির্দিষ্ট জায়গাটা তার চোখে পড়ল। বিকেলে বাড়িটায় বাবার সঙ্গে ঢোকবার আগেই এ-চত্বরটা একবার ঘুরে দেখে গিয়েছিল সে। কখন কী কাজে লেগে যায় এই ভেবে।

জল থেকে একটা সরু সিঁড়ি সটান উঠে গেছে সামন্তবাড়ির দিকে। অন্দরমহলে থেকে অন্যের নজর এড়িয়ে মেয়েদের স্নানে আসবার পথ।

জলের ভেতর হাতড়ে-হাতড়ে ভাঙা কলসির একটা টুকরো তুলে নিল সে হাতে। তারপর উঠে যাওয়া সিঁড়িটার দিকে সজোরে সেটা ছুঁড়ে দিকে ডুব দিল ঢোলকলমির ঝোপে।

কয়েক মুহূর্তের নিস্তব্ধতা। তারপর তার সতর্ক চোখে একটা মৃদু একটা নড়াচড়া চোখে পড়ল। সিঁড়িটার গোড়া থেকে একটা ছায়ামূর্তি হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়েছে। তার হাতে চকমকির মৃদু শব্দ উঠল দু-একবার। তবে ফুলকির ছোঁয়া মশালের গায়ে ঠেকাবার আগেই আলোর সেই বিন্দুগুলোকে লক্ষ করে অন্ধকার থেকে ছুটে আসা ছুরিটা মানুষটার গলায় গিয়ে বিঁধেছে। সামান্যতম শব্দ না করেই লুটিয়ে পড়ল পেছনদিকের সিঁড়ির পাহারায় থাকা বর্গী সেপাই। ততক্ষণে তার মৃতদেহের ওপর দিয়ে সিঁড়ির দিকে পিছলে এগিয়ে গেছে তার আততায়ীর হিলহিলে শরীর।

কয়েক ধাপ উঠে একটু থামল ব্রহ্মানন্দ। কাঁধ থেকে লম্বাটে পুঁটুলিটা নামিয়ে আনল সে এবার। তারপর কচুপাতা ও কাপড় দিয়ে শক্তপোক্ত করে মুড়ে রাখা বন্দুক আর গুলির পুঁটুলিটা সেখান থেকে বের করে নিয়ে শ্বাপদের মতো নিঃশব্দ পায়ে এগিয়ে গেল ওপরের দিকে। দেয়ালের ও’পিঠে বাড়ির উঠোন থেকে ভেসে আসা আলোর আভাস আর হইচইয়ের শব্দ বেড়ে উঠছিল ক্রমশ।

*

“তাহলে সামন্ত, ফের দেখা হল আমাদের!” একটা নিঃশব্দ হাসি ছড়িয়ে যাচ্ছিল মীর হাবিবের মুখে।

বাড়ির সিংদরজার সামনে অনেকগুলো খুঁটির গায়ে অসহায় কিছু মানুষকে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে। তাদের চারপাশে বড় বড় মশালগুলো দিনের মতো আলো করে রেখেছে চারপাশ।

বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছে দূর থেকেই সেদিকে চোখ পড়েছিল ভীমের। মানুষগুলোর মধ্যে রঞ্জাবতী আর নিশাও ছিল। কাজেই, হাতের অস্ত্র ফেলে দিয়ে তিনি মাথা নিচু করে এসে দাঁড়িয়েছিলেন মীর হাবিবের সামনে। কোনও বাধা দেননি। দেবার প্রশ্ন ছিল না।

তাঁকে বাঁধেনি মীর হাবিব। তার প্রয়োজনও ছিল না। কারণ রঞ্জাবতীর পাশে খোলা তলোয়ার নিয়ে দু’জন হানাদার পাহারায় ছিল।

সেদিকে ফের একবার ঘুরে দেখলেন ভীম। তারপর মীর হাবিবের দিকে ফিরে মাথা উঁচু করে বললেন, “শত্রুতা তোমার, আমার সঙ্গে। তার সাজা এদের কেন...”

“একে কেউ তমিজ শেখাও প্রথমে।” তাঁর কথার জবাব না দিয়ে মীর হাবিব বলে উঠলেন হঠাৎ। মুখে তাঁর একচিলতে হাসি ফুটে উঠেছে। ভারী উপভোগ করছেন তিনি গোটা দৃশ্যটা।

প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই দু’জোড়া কঠিন হাত এসে ভীমের ঘাড় ধরে চেপে মীর হাবিবের পায়ের সামনে বসিয়ে দিয়েছে।

“হ্যাঁ। এবার আমাদের হিসেব-কিতেবটা হয়ে যাক আগে। গত ক’বছর সময়-সুযোগ হয়নি! সুদে-আসলে পাওনা তোমার অনেক বেড়েছে আমার কাছে হে সামন্ত। মীর হাবিব কোনও হিসেব ভোলে না।”

কথা বলতে-বলতেই তাঁর ইশারায় ভীমের হাতদুটো বেঁধে মাথায় গরম ছাই ভরা একটা থলে পরিয়ে দেয়া হয়েছে। আছাড়ি-পিছাড়ি করতে থাকা শরীরটার ওপর ঘন-ঘন আছড়ে পড়ছিল চামড়ার ফিতের তৈরি একটা চাবুক...

*

সে-রাত্রে রঞ্জাবতীর কাছে শুয়েছিল কঙ্কা। অনেক রাত্রে তাঁর ঘন-ঘন ধাক্কায় হঠাৎ জেগে ওঠে সে। ঘুম-জড়ানো চোখে হঠাৎ উজ্জ্বল হয়ে ওঠা জানালাগুলোর দিকে বিমূঢ় দৃষ্টিতে তাকাতে রঞ্জাবতী ফিসফিস করে বললেন, “ওঠ শিগগির! বাড়িতে ডাকাত পড়েছে।”

বাইরে সিঁড়ির গায়ে ততক্ষণে ভারী পায়ের শব্দ উঠেছে। দ্রুত এই ঘরের দিকে এগিয়ে আসছিল শব্দগুলো। নীচের উঠোনে মানুষের চিৎকার, ঘোড়ার ডাক আর অস্ত্রের শব্দ উঠেছে।

এগিয়ে গিয়ে দেয়ালে টাঙানো বন্দুকটা নামিয়ে আনল কঙ্কা। উগ্রক্ষত্রিয়ের মেয়ে সে। দেশের দুর্দিনে অস্ত্র চালাবার বিদ্যে আয়ত্ব করতে হয়েছে তাকেও।

বন্দুকের নলে বারুদ পুরতে যাবে, তখন দূরে সিঁড়ির মুখে একসঙ্গে অনেকগুলো পায়ের আওয়াজ উঠল। চেঁচামেচি করে কিছু বলতে-বলতে একটা দল এগিয়ে আসছিল তাদের ঘরের দিকে।

কান পেতে কথাগুলো একবার শুনলেন রঞ্জাবতী। বিজাতীয় কোনও ভাষায় কথা বলছে এরা। স্থানীয় দস্যু নয়। তাহলে কি...

হঠাৎ, কঙ্কাকে টানতে-টানতে দেয়ালের কাছে এনে সেখানে টাঙানো ভারী আয়নাটাকে একপাশে ঠেলে দিয়ে রঞ্জাবতী বললেন, “এরা বর্গী রাক্ষসের দল রে মা। একটা গাদাবন্দুক নিয়ে অতজনের সঙ্গে লড়তে পারবি না তুই। তার চেয়ে পালা। সোজা গিয়ে একেবারে ঘাটের সিঁড়িঘরে পড়বি। সেদিক দিয়ে বেরিয়ে নদীতে নেমে বসে থাকগে মাথা ডুবিয়ে।”

“আর তুমি?”

ফ্যাকাশে মুখে মাথা নেড়েছিলেন রঞ্জাবতী, “আমি যাব না রে। দোর ভেঙে ঘরে ঢুকে কাউকে না পেলে ওরা সন্দেহ করবে। তাইতে খোঁজাখুঁজি করলে দরজাটা যদি খুঁজে পেয়ে যায় তো তুই আমি কেউ বাঁচব না যে। তুই যা মা। আমি ওদের সামলে রাখব’খন।”

সে যখন ঝাপসা চোখে সুরঙ্গের মধ্যে পা দিয়েছে তখন বন্দুকটা তার দিকে বাড়িয়ে ধরে রঞ্জাবতী বলেছিলেন, “এইটে নিয়ে যা। যদি নিরুপায় হোস তো উগ্রক্ষত্রিয়ের মেয়ে কেমন করে মরে তা দেখিয়ে দিস ওদের মা।” তাঁর ঘরের দরজা তখন ভারী মুগুরের ঘায়ে মড়মড় করে উঠেছে।

অন্ধকারে হাতড়ে-হাতড়ে চলতে-চলতে দিশা হারিয়ে ফেলেছিল কঙ্কা। কত সময় ধরে হেঁটে যাচ্ছে সে কে জানে! ওদিকে এতক্ষণে মা আর বড়মা...

কথাটা মনে আসতেই চোখদুটো জলে ভরে এল তার। আর ঠিক তখনই সামনে চৌকো একটা আবছা আলোর গর্তের মুখে হোঁচট খেয়ে বাইরের দিকে হুমড়ি খেয়ে পড়ল সে।

কিন্তু মাটিতে পড়বার আগেই দুটো শক্তপোক্ত হাত তাকে জড়িয়ে ধরে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে ফের। আতঙ্কে চিৎকার করে উঠতে গিয়েছিল কঙ্কা। হাতদুটো তার মুখটা শক্ত করে চেপে বসল তাতে। কানের কাছে একটা গলার শব্দ ফিসফিস করে বলে উঠেছে, “আমি বন্ধু। রঘুনাথের ছেলে ব্রহ্মানন্দ। তুমি কে?”

মানুষটার হাতে ছোট একটা টোকা দিল কঙ্কা। তাতে মুখের ওপর হাতের বাঁধনটা ঢিলে হতে অন্ধকারের মধ্যে মানুষটার মুখ দেখবার চেষ্টা করতে করতেই বলল, “আ-আমি কঙ্কা। ওরা বড়মা’কে...”

তার থর-থর করে কাঁপতে থাকা শরীরটাকে দু’হাতে একটুক্ষণ ধরে থেকে ব্রহ্মানন্দ ফের বলল, “এখন কাঁদবার সময় নয়। ওঁদের বাঁচাতে হবে। সঙ্গে বন্দুক আছে দেখছি। বারুদ ঠুসতে জানো?”

“হ্যাঁ। কিন্তু একটা গাদাবন্দুক দিয়ে...”

“পিঠ থেকে নিজের বন্দুকটা নামিয়ে এনে দাঁত চেপে হাসল ব্রহ্মানন্দ, “একটা নয়। বন্দুক আছে দুটো। আর ঠিক কৌশলে কাজে লাগালে এই দুই বন্দুকেই... এখন ভালো করে শোনো...”

*

গোটা বাড়িটাকে খালি করে তার সমস্ত মানুষজনকে নীচে নামিয়ে নিয়ে গিয়ে ওপরে যাবার দরজা-দুটো বন্ধ করে দিয়েছিল আক্রমণকারীরা। তাদের বাইরে পাহারায় থাকা সেপাইরা টের পেল না কখন ভেতর থেকে নিঃশব্দে তার ভারী খিল আটকা পড়ল দরজাতে। দু’জোড়া পা লঘুগতিতে ততক্ষণে গিয়ে উঠেছে বাড়ির বিশাল ছাদে। বাইরে থেকে ছাদের দেয়ালের গায়ে ঝুঁকে আসা গাছগুলোর আড়ালে লুকিয়ে বসে নীচের গোল উঠোনটার দিকে মুখ করল ব্রহ্মানন্দ। তারপর উঠোনের একপাশে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন দস্যুর একটা দলের দিকে লক্ষ্যস্থির করে ঘোড়া টিপে দিয়েই বন্দুকটা পেছনদিকে বাড়িয়ে ধরল। মুহূর্তের মধ্যে দ্বিতীয় গুলিভরা বন্দুকটা তার হাতে ধরিয়ে দিয়ে প্রথম বন্দুকের নলে বারুদ ভরতে শুরু করল কঙ্কা।

দ্বিতীয় গুলিটা চালিয়ে বন্দুকটা পেছনে ঘুরিয়ে ধরতেই ফের প্রথম বন্দুকটা তাকে দিয়ে একটু হাসল কঙ্কা, “তিনবার শ্বাস নেবার আগে একট বন্দুক ঠুসতে পারি আমি।” তার মৃদু নিঃশ্বাস এসে লাগছিল ব্রহ্মানন্দর গায়ে।

দু’বারে চারটে গুলি ছুড়ে হামাগুড়ি দিয়ে ডাইনে হাত-বিশেক ছিটকে গিয়ে ফের একবার গাছের আড়াল থেকে মুখ বের করল ব্রহ্মানন্দ। নতুন জায়গা থেকে ফের তার বন্দুক কথা বলে উঠেছে।

নীচের উঠোনে একটা শোরগোল পড়ে গেছে হঠাৎ। প্রথম গুলিগুলো যেখান থেকে এসেছিল সেদিকে লক্ষ্যস্থির করে গুলিবর্ষণ শুরু হয়েছে সেখান থেকে।

আবার... আবার...

কয়েক মুহূর্ত পরপর ছাদের একেকটা এলাকায় ঝুঁকে থাকা গাছগুলো থেকে গুলি ছুটে আসছিল উঠোনে জড়ো হওয়া দস্যুদের দিকে। বিমূঢ় মানুষগুলো থতমত খেয়ে গেছে আচমকা চারদিক থেকে ছুটে আসা আক্রমণের ধাক্কায়।

শুধু সেই অবস্থাতেও বুদ্ধি স্থির রেখেছিলেন মীর হাবিব। বাড়িটাকে তন্ন-তন্ন করে খোঁজা হয়েছে। একটা গোটা সৈন্যদল সেখানে লুকিয়ে থেকে তাঁর চোখ এড়িয়ে যেতে পারবে না। এর একটাই অর্থ হয়। গুলিগুলো আসছে ছাদের ওপর বাইরে থেকে ঝুঁকে থাকা গাছগুলোর আড়াল থেকে। বাড়ি ঘিরে গাছ বেয়ে আক্রমণ?”

মনস্থির করে নিলেন মীর হাবিব। তাঁর নির্দেশ পেয়ে তখন সেপাইদের একটা বড় অংশ মাথার ওপর ঢাল উঁচিয়ে ধরে ছুটে গিয়েছে ওপরতলায় ওঠবার প্রধান দরজাদুটোর দিকে। দ্বিতীয় একটা দল বাড়ির সিংদরজা দিয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে বের হয়ে গিয়ে ছড়িয়ে পড়ছিল তার সীমানা ঘিরে।

*

“ব্রহ্মানন্দ!”

চাপা গলার ডাকটা শুনে পেছন ঘুরে একবার দেখল সে। মেয়েটা তার ছোট হয়ে ওঠা বারুদের থলিটা তুলে ধরেছে ব্রহ্মানন্দের দিকে।

“আর আমার থলিতে?”

“সে আগেই শেষ। গুলি আছে অনেক। কিন্তু...”

নীচে থেকে দরজার মড়মড় শব্দের দিকে কান পেতে একবার শুনল ব্রহ্মানন্দ। হাতে সময় নেই বেশি। বাড়ির বাইরেও চারদিক থেকে এদের গলা উঠছে। এখান থেকে গাছ বেয়ে বাইরে পালাবার পথও বন্ধ করেছে ওই ধূর্ত মীর হাবিব।

“কী করবে এখন?”

তেতে ওঠা বন্দুকের নলটায় একটুকরো কাপড় জড়াতে জড়াতে ব্রহ্মানন্দ জিজ্ঞাসা করল, “কতটা বাকি আছে আর?”

“আর একবার বারুদ ভরা যাবে।”

অসহায়ভাবে অনেক নীচে একবার তাকিয়ে দেখল ব্রহ্মানন্দ। সেখানে জনাদশেক সেপাইয়ের হাতে ধরা ঢালের ঘেরাটোপ ঢেকে রেখেছে মীর হাবিবকে। উঠোনের মাঝখানে পড়ে থাকা ভীম সামন্তের দিকে এই মুহূর্তে আর তার নজর নেই।

বন্দুকে বারুদ পোরা শেষ করে সেটা নিঃশব্দে ব্রহ্মানন্দের দিকে বাড়িয়ে ধরল কঙ্কা। সেটা হাতে নিয়ে একনজর মেয়েটার মুখের দিকে চেয়ে দেখল সে। মাথা নেড়ে বলল, “তোমার মুখটা কেমন চেনা ঠেকছে আমার। ভেবেছিলাম পরে কখনও জিজ্ঞেস করে নেব। কিন্তু সে বোধ হয় হল না আর। এটা নাও।” বলতে-বলতে কোমর থেকে খুলে আনা ছুরিটা বাড়িয়ে ধরল সে মেয়েটার দিকে, “তবে একটা কথা, এ-ছুরিতে মরতে যদি হয়ই তবে নিজের গলায় বসাবার আগে অন্তত দু-একটা রাক্ষসকে শেষ করে যেয়ো যেন।”

জবাবে নিঃশব্দে একটু হাসল কঙ্কা। মানুষটাকে সেই একই কথা শুধোবার ইচ্ছে তারও ছিল। বড় চেনা-চেনা ঠেকে তাকে তার। তারপর নিঃশব্দে ছুরিটা সরিয়ে দিয়ে নিজের পোশাকের আড়াল থেকে অন্য একটা ছুরি বের করে আনল সে, “ও আমি সঙ্গে নিয়েই ঘুরি। ছোটবেলা থেকে বড়ই হয়েছি বর্গী হানার দুঃস্বপ্ন দেখে। তেমন দুর্গতি ঘটলে সে-সময়ের জন্যে এ-জিনিস আমার মা-ই নিজে হাতে করে আমায় দিয়ে রেখেছেন।”

সামনে বেঁকে যাওয়া ছাদটার দিকে একনজর তাকিয়ে দেখল ব্রহ্মানন্দ। হয়তো ও-পাশটায় যেতে পারলে নীচে মীর হবিবকে বন্দুকের নিশানায় ধরা যেতে পারে।

“তবে আসি। উল্টোপিঠের ছাদের আলসে দিয়ে নেমে ওর আড়ালে লুকিয়ে থেকো তুমি। তাহলে হয়তো...”

ছুরিটা ফের কোমরে গুঁজে উঠে দাঁড়িয়ে তার দিকে হাতটা বাড়িয়ে ধরল কঙ্কা, “উঁহু। লড়েছি একসঙ্গে যখন, তখন মরলেও একসঙ্গে লড়াই করে তবে মরব। চলো...”

আর, ঠিক তখনই পুবে আর দক্ষিণ-পুবে, অনেক দূর থেকে পরপর কয়েকটা বন্দুকের শব্দ ভেসে এল। চমকে উঠে সেদিকে ঘুরে দেখল একবার কঙ্কা। তারপর ফিসফিস করে বলল, “আরও আসছে...”

ব্রহ্মানন্দ সেদিকে চোখ রেখে কান পেতে কিছু শোনবার চেষ্টা করছিল। হঠাৎ মুখটা ঝলসে উঠল তার, “ঘোড়ার খুরের সঙ্গে রণ-পা’র শব্দও উঠছে। বর্গী নয় কঙ্কা! পুব থেকে বাবা আসছেন! আর দক্ষিণ পুব থেকে তোমাদের সেপাইয়ের দল! আর ভয় নেই! এবারে এই শেষ গুলিটাকে কাজে লাগাতে হবে। একটা সুযোগ...”

ছাদের দূরতম কোণে ঝুঁকে আসা একটা গাছের ডালে আশ্রয় নিয়ে তারা শুনছিল নীচে একটা দরজার ভেঙে পড়বার মড়মড় শব্দ। তারই মধ্যে ব্রহ্মানন্দের গুলি ভরা বন্দুকের নল একদৃষ্টে চেয়ে থাকে নীচে মীর হাবিবকে ঘিরে থাকা দলটার দিকে। একটা সুযোগ...

দূরে বন্দুকের শব্দ উঠতে সেদিকে ঘুরে তাকিয়েছিলেন মীর হাবিব। একটা আশা জেগে উঠছিল তাঁর মনে। মক্তবপুরের দিক থেকে তাঁর দলটা যদি...

কান পেতে শোনবার অপেক্ষায় ছিলেন তিনি পরিচিত সেই ‘হর হর মহাদেও’ ডাক। আর তারপর হঠাৎ তাঁকে চমকে দিয়ে দু-দিক থেকে ধেয়ে আসতে থাকা মশালের স্রোতদুটো একসঙ্গে মিশে গেল। তাদের সামনে তিরবেগে ছুটে আসতে থাকা রণ-পায়ের ভিড় থেকে ডাক উঠল ‘হা রে রে রে’।

অভিজ্ঞ যোদ্ধার কান সেই শব্দ থেকে ধেয়ে আসা বাহিনীর আয়তনের একটা ভালো আন্দাজ করতে পারছিল। একটা ছোট দল নিয়ে রাতের অন্ধকারে নদী পেরিয়ে এসে একটা পুরোনো প্রতিশোধ নিয়ে যাওয়াই তাঁর উদ্দেশ্য ছিল। সেটা এইভাবে গুঁড়িয়ে যাবে এই বাংগালিদের হাতে সে-কথা ভাবতেই শিরায় আগুন জ্বলে উঠছিল তাঁর।

“সিপাহিদের আদেশ দাও, এইখানে এসে কুচ করবে সবাই। ঘাটে নৌকা তৈয়ার করবার খবর পাঠাও। আমরা...” বলতে বলতেই হঠাৎ মাটিতে পড়ে থাকা ভীম সামন্তের দিকে চোখ পড়েছে তাঁর। হাতের ধাক্কায় তাঁকে ঘিরে থাকা সেপাইদের দলটাকে সরিয়ে দিয়ে সেদিকে এগিয়ে গেলেন মীর হাবিব। তারপর এক টানে ভীমের মাথা থেকে ছাইভরা থলেটা খুলে ফেলে দিয়ে তলোয়ার উঁচিয়ে ধরলেন তার মাথার ওপরে।

প্রায় সঙ্গেসঙ্গেই বেজে উঠেছে মারাঠার নির্দেশজ্ঞাপক শিঙার শব্দ। আক্রমণ ছেড়ে হুড়মুড় করে উঠোনের মাঝখানে এসে জড়ো হচ্ছিল সৈন্যের দল। এ-যাত্রা ফিরে যেতে হবে তাদের। ফিরে যেতে হবে লুটপাট আর ধ্বংসের লোভকে তৃপ্ত না করেই।

মীর হাবিবের মাথাটা লক্ষ্য করে বন্দুকের নলটা আস্তে আস্তে ঘোরাচ্ছিল ব্রহ্মানন্দ। মাটিতে পড়ে থাকা সামন্তমশাইয়ের ওপরে ঝুঁকে দাঁড়িয়েছে। মাথার ওপর উঁচু করে ধরেছে হাতের তলোয়ার। এইবার...

গুলিটা ছোটবার মুহূর্তে কিছু একটা ঘটে গেল নীচের উঠোনে। হঠাৎ হাত ও পা বাঁধা অবস্থাতেই মাটি থেকে ছিটকে উঠেছে সামন্তমশাইয়ের শরীরটা। তার প্রবল ধাক্কায় এক মুহূর্তের জন্য টলে গিয়ে নিজের ভারসাম্য ফিরে পাবার আগেই ছাদের একটা অন্ধকার কোণ থেকে বন্দুকের শব্দ বেজে উঠল একবার। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তীব্র একটা আগুণে যন্ত্রণা ছড়িয়ে গেল মীর হাবিবের কাঁধের কাছ থেকে। হাত থেকে তলোয়ার খসে পড়েছে তাঁর।

ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হওয়া ক্ষতটাকে এক হাতে চেপে ধরে কোণঠাসা হওয়া জন্তুর মতো একঝলক বাইরের দিকে তাকিয়ে দেখলেন তিনি। সেখানে তখন ঝড়ের মতো বাড়ির দিকে ধেয়ে আসছিল অসংখ্য মশালের আলো। তাদের মুখে ডাক উঠেছে হা রে রে রে...

আহত অবস্থাতেই মুহূর্তে ঘোড়ার পিঠে লাফিয়ে উঠলেন মীর হাবিব। এখনও বাড়ি থেকে খুঁটিঘাটের রাস্তা খোলা রয়েছে। আক্রমণকারী দলটা যেন তাঁর পরিকল্পনাটা টের পেয়েই একটা অর্ধচন্দ্রের মতো ছড়িয়ে গিয়েছে এবারে। তার একটা পাশ ছুটে আসছিল বাড়ি ও ঘাটের মধ্যের রাস্তাটাকে আটকে দেবার উদ্দেশ্যে।

“আবার ফিরে আসব আমি সামন্ত। এবার পুরো বাহিনী নিয়ে। নবহট্টের সমস্ত মানুষ তোর বে-আদবির জরিমানা গুনবে সেদিন...”

কর্কশ শব্দগুলো আস্তে-আস্তে মিলিয়ে যাচ্ছিল গঙ্গার দিকে। সেদিকে তাকিয়ে একটু হতাশ হয়েই মাথা নাড়ল ব্রহ্মানন্দ। শুধু একটুর জন্য। সামন্তমশাই যদি ঠিক ওই মুহূর্তটাতে মীর হাবিবকে ধাক্কাটা না দিতেন...

হঠাৎ একটা ঝটকা দিয়ে নিজেকে সচেতন করল ব্রহ্মানন্দ। কঙ্কা চুপ করে দাঁড়িয়ে রয়েছে তার পাশে।

“বিপদ কেটে গেছে কঙ্কা। অন্তত এখনকার মতো। আমি এবারে যাই।”

“উঁহু। আগে তুমি আমার বড়মার কাছে চলো। আজ তুমি না এসে পড়লে...”

মাথা নেড়ে হাসল ব্রহ্মানন্দ, “তা হয় না কঙ্কা। আমি ডাকাতের ছেলে। সামন্তমশাই এলাকার ফৌজদার। সন্ধেবেলা তিনি সে-কথা পরিষ্কার করে বাবাকে বলে দিয়েছেন যে! তুমি নীচে গিয়ে সামন্তমশাই, তোমার মা, বড়মা তাঁদের দেখ। বড় কষ্ট পেয়েছেন ওঁরা। আমার কাজ এখন ওইখানে...”

বাইরে রঘুনাথ আর ভীম সামন্তের মিলিত বাহিনী তখন দুটো ভাগে ভাগ হয়ে গিয়েছে। একদল নদীর ধারে ধারে ছুটেছে পলাতক দস্যুদের অনুসরণ করবার জন্য নৌকার খোঁজে আর অন্য দলটা ফিরে চলেছে ফের মক্তবপুরের উদ্দেশ্যে। সেখানে লুকিয়ে থাকা বর্গীদের অবশিষ্টাংশকে নির্মূল করা বাকি রয়ে গেছে এখনও।

সিঁড়ি দিয়ে নেমে এসে, সদ্য এসে পৌঁছোনো একজন বাগদি সেনার কাছ থেকে একজোড়া রণ-পা তুলে নিল ব্রহ্মানন্দ। তারপর তাতে চেপে তিরের মতো বের হয়ে গিয়ে মিলিয়ে গেল অন্ধকারে। সেদিকে তাকিয়ে একবার মাথা নাড়ল কঙ্কা। কে ও? দেবদূতের মতোই নদী থেকে উঠে এসে তার প্রাণ বাঁচিয়ে ফের মিলিয়ে গেল অন্ধকারে! এত চেনা ঠেকে কেন তার ওকে? ওর গলা, কথা বলবার ভঙ্গী সব যেন...

উদ্যোগ

“বড় মোক্ষম মার খেয়েছে মীর হাবিব। চোট বিষিয়ে উঠেছিল মণ্ডলমশাই। চুঁচড়ো আখনবাজারের সুলেমান হেকিমের আড্ডায় লুকিয়ে থেকে তার চিকিচ্ছে করেছে তিনদিন ধরে। তারপর ছোট-ছোট দল করে মেদিনীপুরের দিকে রওনা হয়ে গেছে। আমি বড় সড়কের খানিক অব্দি তার একটা দলের পেছু-পেছু গিয়ে নজর করে এসেছি।”

“কথাবার্তা কিছু কানে এল?”

“আজ্ঞা ওই টুকটাক। ভিকিরি সেজে গেছিলাম। কাছে তো আর ঘেঁষতে দিত না বিশেষ! তবে যা বুঝেছি, নবহট্টে হানাদারি-টারি কিছু নয়, সামন্তমশাইয়ের ওপরে বদলা নেবার জন্যই এসেছিল এ।”

কাঞ্চনপল্লীতে কানাই মণ্ডলের সরাইখানা এখন নিস্তব্ধ। সেখানে রাতের আশ্রয় নিতে আসা মুসাফিরের দল ঘুমিয়ে আছে। মাঝরাতের অন্ধকারের আড়ালে একে-একে এসে পৌঁছানো অতিথিদের খবর তারা জানতে পারেনি।

বলদেব ভট্টাচার্য নিস্তব্ধ হয়ে কথাগুলো শুনছিলেন। এবার চোখ খুলে কপালে দু-হাত ঠেকিয়ে বললেন, “ঈশ্বর রক্ষা করেছেন! ধূর্ত ইস্পাহানি যে-ভাবে ছক সাজিয়েছিল তাতে ব্রহ্মানন্দ ঠিক সময়ে বাধা দিয়ে সময় না কিনতে পারলে হয়তো...”

আক্রমণের পর প্রায় সাতদিন কেটে গেছে। পলাতক মীর হাবিবের পেছনে কানাই মন্ডলের পাঠানো চর দু’জন ফিরে সেদিন বিকেলে ফিরে আসবার পর চারাপোলে খবর দিয়েছিলেন মণ্ডল। তাতে রঘুনাথ ও ব্রহ্মানন্দর সঙ্গে খোদ বলদেবও এসে পৌঁছেছেন তার এই ডেরায়।

সামনে সাজিয়ে রাখা পানদান থেকে একটা পান তুলে মুখে পুরে কানাই মাথা নাড়লেন, “আজ্ঞে হ্যাঁ গুরুদেব। ভাগ্য সহায় ছিল। নইলে আজ সামন্তমশাইয়ের মতো বীর হয়তো আর...”

“একটা কথা বলি বাবা, উনি বীর হতে পারেন, কিন্তু কৌশলের অভাব আছে। তা নইলে ওই ক’জন সেপাই নিয়ে ও-ভাবে ছুটে এসে ফাঁদে পড়েন? সেদিন সামন্তমশাইয়ের মেয়ে এসে আমার পাশে না দাঁড়ালে...”

কথাটা কানে যেতে বলদেব একবার ঘুরে দেখলেন ব্রহ্মানন্দর দিকে। তার তরুণ মুখটা হঠাৎ একটু লাল হয়ে উঠেছে যেন। দেখে, মুখে হালকা একটা হাসির ছোঁয়া ফুটে উঠল তাঁর।

“সামন্তমশাইয়ের কোনও মেয়ে নেই ব্রহ্মানন্দ। একটাই ছেলে ছিল। সে ছোটবেলা হারিয়ে গেছে শুনেছি। ও-বাড়ির আশ্রিত কেউ হবে বোধ হয়। তবে হ্যাঁ, যা গল্প বলেছ তার তাতে এ-মেয়ে সাক্ষাত মা চণ্ডীর অংশ। কী যেন নাম তার?”

“কঙ্কা। ওর নাম কঙ্কা। জানো দাদু, কী সাংঘাতিক সাহসী সে! যখন বললাম লুকিয়ে থাক, তা আমায় বলে কিনা ‘একসঙ্গে লড়াই করে তবে মরব। চলো..’”

কথাটা বলতে-বলতেই চারপাশে চাপা একটা হাসির শব্দ পেয়ে একটু থতমত খেয়ে থেমে গেল ব্রহ্মানন্দ। তার লাল হয়ে ওঠা মুখটার দিকে তাকিয়ে, মুখে উঠে আসা হাসিটা চেপে প্রসঙ্গ ঘোরালেন বলদেব, “তবে সামন্তমশাইয়ের বিষয়ে কথাটা তুমি ঠিক বললে না ব্রহ্মানন্দ। এখনও সংসারী হওনি। হলে দেখবে, ও অবস্থায় পড়লে, সামন্তমশাইয়ের মতো তুমিও ওই একই পথ নেবে। নিজের পরিবার বিপদে পড়লে মানুষ অত ঠান্ডা মাথায় প্যাঁচ কষতে পারে না।”

তরুণ বয়সের অবুঝ জেদ নিয়ে ফের মাথা নাড়ল ব্রহ্মানন্দ, “আচ্ছা মানলাম। কিন্তু ও-ভাবে মাথা গরম করে, বাড়ি খালি রেখে সব সেপাই নিয়ে চলে যাওয়া...”

তার উত্তেজিত মুখটার দিকে তাকিয়ে ভ্রূ কুঁচকে কিছু একটা ভাবলেন বলদেব। তারপর গম্ভীর গলায় বললেন, “এ-কথাটা তুমি ঠিকই বলেছ ব্রহ্মানন্দ। মাথা ঠান্ডা রেখে চললে এ-যাত্রা হয়তো সামন্ত এই বিপদে পড়ত না। কিন্তু সামনে যে বিপদ আসতে চলেছে তখন, মাথা ঠান্ডা করে হাজার প্যাঁচ করষলেও নবহট্টকে বাঁচাতে পারবেন না সামন্ত। মীর হাবিব এ-যাত্রা এসে ঢুকেছিল কয়েক’শ মানুষ নিয়ে। চোরের মতো। যে-হুমকি সে দিয়ে গেছে তাতে এরপর যদি সে কয়েক হাজার সেপাই নিয়ে হামলা করে? তখন সামন্ত যত কৌশলই করুক, সে-যুদ্ধে জিততে গেলে তাকে এখন থেকে ফৌজ বাড়াবার চেষ্টা দেখতে হবে। কিন্তু সেই ট্যাঁকের জোর সামন্তর নেই।”

“আমরা চেষ্টা করলে হয় না? বাবা তো আছেন! এখান থেকে রায়মঙ্গল অবধি হাজারো মানুষ তাঁকে দেবতা বলে মানে। তিনি ডাক দিলে...”

সস্নেহে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন বলদেব, “সে হয় না রে! একে তো সামন্ত তোর বাপের সাহায্য নেবে না বলে দিয়েছে। তা-ছাড়া, যদি আমরা নিজে থেকেও এ-যুদ্ধে নামি, তা হলেও তুই যেমনটা ভাবছিস তেমনটা হবে না। তোর বাপকে যারা ভক্তিশ্রদ্ধা করে তারা তো সবাই গরিব মানুষ! ঘরে তাদের বসে খাবার জো নেই। তার ডাকে ঘর সংসার ফেলে তারা এসে লড়াই করতে জুটলে তাদের পরিবার খাবে কী? অত মানুষকে খাওয়াবার মতন টাকাপয়সা আমাদের নেই যে!”

কথাটা শুনে হঠাৎ উঠে দাঁড়ালেন রঘুনাথ। চোখদুটো হঠাৎ ঝলসে উঠেছে তাঁর। “আমি চেষ্টা করব গুরুদেব। যথাসাধ্য চেষ্টা করব আমি প্রয়োজনীয় অর্থের বন্দোবস্ত করবার।”

“কিন্তু বাবা! তাতেও তো...”

কোমল চোখে পালিত ছেলেটির দিকে তাকিয়ে দেখলেন একবার রঘুনাথ। তারপর তার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, “কী বলবি তুই তা আমি জানি। ডাকাতি করে বড় ফৌজ গড়ার মতো টাকা মেলে না, এই তো? তবু যতটা পারি, করে দেখতে দোষ কী বল? অন্তত একটা চেষ্টা করেছি এই সুখটা তো হবে!”

অন্যমনস্কভাবে কিছু একটা ভাবছিল ব্রহ্মানন্দ। তার সতের বছরের তরুণ কপালটা হঠাৎ কোন প্রৌঢ়ের মতোই কুঁচকে উঠেছে তখন। এরা কেবল মাইনে করা সৈন্যদলের কথা চিন্তা করছে। সেটাই দেখে এসেছে সবাই চিরটাকাল। কিন্তু অন্য কোনও পথে...

উত্তরে মথুরা বিল ও যমুনা নদী, দক্ষিণে মক্তবপুরের খাল। পূর্বে সুতির শীর্ণ ধারা। পশ্চিমে ধীরগামী প্রশস্ত গঙ্গা। এরই মধ্যে ছড়িয়ে থাকা বনময় নবহট্টে সদ্‌গোপ আর বাগদিদের অজস্র জনপদ। জলধারাগুলোর ধার ধরে-ধরে কৈবর্তদের বাস। তারা প্রত্যেকেই দুর্ধর্ষ জাতি। প্রকৃতি, বন্য পশু, অত্যাচারী জমিদার অথবা অন্ধকার থেকে ছুটে আসা ডাকাতের দল, এই সবার সঙ্গে যুদ্ধ করেই তাদের জীবন কাটে।

আজ কিছুদিন হল একটা সাড়া জেগেছে তাদের মধ্যে। কমবয়েসি একটা ছেলে। গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে চরকির মতোই ঘুরে চলেছে সে একা। তার মুখ দেবতার মতো সুন্দর। তার পিঠে একটা লম্বা ক্ষতের দাগ। যে-কোনও গ্রামে ঢুকে সে প্রথমে তার দেবস্থলে এসে দাঁড়ায়। কোমরের গেঁজে থেকে একখানা সোনার আশরফি বের করে দেখায় মানুষজনকে। তারপর মিষ্টি হেসে বলে, যে-কোন অস্ত্রে, যে-কোন কৌশলে লড়াই করে তাকে যে হারাতে পারবে, আশরফিটা তার।

না। এখন অবধি তাকে হারিয়ে কেউ সেই আশরফির দখল নিতে পারেনি। লাঠি, সড়কি বা তলোয়ার, তার হাতে সেই অস্ত্রেরা যেন কথা বলে। কেউ কেউ তার পাতলা শরীর দেখে তাকে মল্লযুদ্ধেও সামনা করতে বলেছে। কিন্তু সেখানেও, অদ্ভুত কৌশলে তার চেয়ে মাথায় দ্বিগুণ প্রতিপক্ষকেও অবহেলায় আছড়ে ফেলে সে।

আর তার পরেই সেই আশ্চর্য ঘটনাটা ঘটে। পরাজিত শত্রুকে পেছনে রেখে সে এগিয়ে যায় দেবতার মন্দিরের দিকে। সেখানে মূর্তির সামনে আশরফিটা রেখে একটা প্রণাম করে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলে, “এই সোনাটুকু এই গ্রামের জন্য দেবী ভবানীর উপহার।”

খুব স্বাভাবিকভাবেই ততক্ষণে গ্রামের সমস্ত মানুষের কৌতুহল চূড়ায় ওঠে এই আশ্চর্য যোদ্ধাকে নিয়ে। এরপর তাই যখন সে তাদের বলে, ভয়ঙ্কর হানাদার বর্গীদের ওপরে দেবী ভবানী অসন্তুষ্ট হয়েছেন; তাদের নাশ করবার জন্যই তিনি তাকে পাঠিয়েছেন গ্রামে-গ্রামে সৈন্যদল গড়ে তুলতে, তখন তার সুন্দর মুখ, মিষ্টি হাসি আর খানিক আগে দেখা অলৌকিক যুদ্ধ মিলিয়ে মানুষ তাকে বিশ্বাস করে। সে কে সেই প্রশ্ন তারা করে না। কিন্তু এর পর যে সময়টুকু সে সেই গ্রামে থাকে সে-সময়টুকু কার ঘরে সে অতিথি হবে সেই নিয়ে প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায় গোটা গ্রামে; তার সারাদিনের যুদ্ধ শিক্ষার আসরে গ্রামের কোনও সক্ষম মানুষ হাজিরা দিতে ভোলে না।

দিনদুয়েক বাদে প্রাথমিক শিক্ষাটুকু দিয়ে, তা অভ্যাস করবার পদ্ধতি তাদের দেখিয়ে দিয়ে বিদায় নেবার আগে সে গ্রামের প্রধানের কাছে যায়। তাঁর কাছে পরের গ্রামের হদিশ জোগাড় করে। প্রতিজ্ঞা করিয়ে যায়, কখনও দেবীর ডাক এলে প্রধানকে সে খবর পরের গ্রামে পৌঁছে দিতে হবে প্রথমে। তারপর তারা সকলে, যেখানে সে ডাক দেবে সেখানে এসে হাজির হবে অস্ত্র হাতে।

মাসের পর মাস কেটে চলে এইভাবে। ধীরে-ধীরে সবার চোখে আড়ালে গড়ে উঠছিল ব্রহ্মানন্দের সেনাবাহিনী।

না। বলদেব ভট্টাচার্যকে এ-বিষয়ে কিছু খুলে বলেনি ব্রহ্মানন্দ। যে-পথে কাজ করছে সে, তা তাঁর পরিচিত পথ নয়। হয়তো বাধা দেবেন তিনি। ব্রহ্মানন্দ তা চায় না। তাঁকে সে শুধু বলেছে, এই অঞ্চলকে ভালো করে দেখতে চায় সে। বুঝে নিতে চায় এখানকার মানুষজনকে।

বলদেব আপত্তি করেননি। অস্ত্রশিক্ষা শেষ হয়েছে এর। এবার জীবনের শিক্ষা যদি এইভাবেই সে নিতে চায় গ্রামে-গ্রামে ঘুরে, মানুষজনকে জেনে তাতে ক্ষতি কী? তাঁর গণনা তাঁকে জানিয়েছে, অনেক বড় ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে এই কিশোরের সামনে। হয়তো নিয়তিই তাকে তার জন্য এইভাবে তৈরি করে নিচ্ছে।

মাসের-পর-মাস কেটে চলে এইভাবে। একে-একে বর্ষা ও শরৎ বিদায় নিল। বাতাসের ফের হেমন্তের ছোঁয়া। দীর্ঘকাল হল রঘুনাথ পথে বের হয়েছেন। মাঝে-মাঝে তাঁর দূত এসে সংগ্রহ করা অর্থ বলদেব ভট্টাচার্যের কাছে পৌঁছে দিয়ে যায়। তা দিয়ে ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে ছোট একটা ফৌজও। বলদেব নিজেই তাদের শিক্ষার ভার নিয়েছেন। আর তার পাশাপাশি, বলদেবের অজান্তে, নবহট্টের দিকে দিকে একলা হেঁটে চলে এক কিশোর যোদ্ধা। আস্তে-আস্তে পরিক্রমা শেষ হয়ে আসছে তার এবারে।

তার মুখের কোমলতা কখন যেন ঘুচে গেছে। সেখানে অকালে ভেসে উঠেছে পরিণত যোদ্ধার মুখের দৃঢ় দাগ। তার চোখে দীর্ঘ অনিদ্রার ছাপ। আজকাল ভালো ঘুম আসে না তার। গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ছুটে চলবার পথে কোনও মন্দিরের দাওয়ায়, অথবা কোনও কুটিরের মাটির মেঝেতে শুয়ে চোখদু’টি বুজে এলেই একটা দুঃস্বপ্ন সেখানে ভেসে আসা শুরু করেছে।

স্বপ্নটা যেন তাড়া করে চলেছে তাকে। আজ, উত্তরে কাছাকাছি একটা অভিযানের শেষে চারাপোলের দিকে ফিরে আসতে-আসতে বড় ক্লান্ত হয়ে বনের ভেতরেই একটা খোলামতন জায়গায় গা এলিয়ে দিয়েছিল সে। স্বপ্নটা তখন ফের তাকে ছেয়ে এল...

*

...আগুন জ্বলেছে দাউ-দাউ। বাতাসের ধাক্কা খেয়ে তার উজ্জ্বল কমলা শিখাগুলো সাঁই-সাঁই শব্দ তোলে তার পেছনে। যেন হাজার ঘোড়ার খুরের আওয়াজ উঠেছে। আগুনের তাত-এ ফুটিফাটা হতে থাকা গাছপালাদের শব্দে যেন বন্দুকের গুলি ছোড়বার আওয়াজ!

ছুটছিল ব্রহ্মানন্দ। তার রণ পা কোথায় ছিটকে পড়েছে কে জানে। হাওয়ায় ভর করে পেছন থেকে ধেয়ে আসা দাবানলের মুখে, ঝোপঝাড়ে আছাড় খেতে খেতেই সে প্রাণপণ দৌড়োয় ঘন অন্ধকার ভেদ করে।

দৌড়োয় আর সতর্ক চোখে সামনের দিকে নজর রেখে চলে সে। ওইখানে ওকে দেখা যাবে এবারে। প্রতিবার স্বপ্নেই তাই ঘটে! আবছা অন্ধকারের ভেতরে ছোট একটা মেয়ে। গাছকোমর করে পরা শাড়িটির আভাস বোঝা যায় তার শুধু এখান থেকে। সামনে খানিক উঁচু হয়ে যাওয়া জমির মাথায় দাঁড়িয়ে যেন তাকিয়ে রয়েছে সে তারই দিকে। বড় চেনা ভঙ্গীটা তার। প্রতিবারই ব্রহ্মানন্দ তার কাছে পৌঁছোবার আগেই একটুকরো আলেয়ার আলোর মতো মিলিয়ে যায় সে। আর তারপর, সেই ধেয়ে আসা আগুনের বৃত্ত এসে গিলে নেয় ব্রহ্মানন্দকে। বড় যন্ত্রণা...

নাঃ! আজ ওকে পালাতে দেবে না সে। এই ঘন জঙ্গলে কে ও? এ-ভাবে দাঁড়িয়ে থাকে তার দিকে তাকিয়ে? জানতে হবে ব্রহ্মানন্দকে।

ওই তো! আজও সে দাঁড়িয়ে রয়েছে একইভাবে। হাতছানি দিয়ে যেন ডাকছে তাকে। পায়ের গতি বাড়িয়ে দিল ব্রহ্মানন্দ।

“ব্রহ্মা...”

পেছন থেকে কে যেন তার নাম ধরে ডেকে উঠল হঠাৎ। থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল ব্রহ্মানন্দ। বাবার গলা! বাবা! এই আগুনে...

“এই ব্রহ্মা। ওঠ! কী হল তোর? ফিরে দেখি তুই মন্দিরে নেই। খুঁজতে-খুঁজতে জঙ্গলে এসে দেখি পড়ে গোঁ গোঁ করছিস...”

রঘুনাথ কখন যেন তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। বিকেল হয়ে এসেছে। ঝিলের জলে অন্ধকার নামছিল একটু-একটু।

চোখ খুলে একটুক্ষণ চুপচাপ সেদিকে তাকিয়ে রইল ব্রহ্মানন্দ। তারপর আস্তে আস্তে বলল, “একটা বিশ্রী স্বপ্ন দেখছিলাম বাবা।”

রঘুনাথ একটু চিন্তিত হয়ে তাকিয়ে রইলেন পালিত পুত্রটির দিকে। মাত্রই দিন-দুয়েক আগে বলদেবের পাঠানো দ্রুতগামী দূত সুন্দরবনের কাছাকাছি সোনাবিল এলাকায় তাঁর নাগাল ধরে একটা দুঃসংবাদ দেয়। সেটি পেয়ে একটানা দু’টি দিন পথ চলে তিনি সদলবলে ফিরে এসেছেন চারাপোল-এ।

খবরটা নিঃসন্দেহে বিপজ্জনক। নবাবের নাতি সিরাজ বিদ্রোহ করে পাটনার দখল নিয়েছে কয়েকদিন আগে। আগের বছর বর্গীর হাত থেকে মেদিনীপুর উদ্ধার করবার পর নবাব মেদিনীপুরেই থানা দিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল বর্গী ফের এলে সেখানেই তাদের রুখে দেয়া। এই নতুন বিপদ আসতে মেদিনীপুর একরকম অরক্ষিত ছেড়ে নবাব সসৈন্যে পাটনা চলে গিয়েছেন। ফলে ফের একবার বাংলায় ঘনিয়ে আসছে বর্গীর আতঙ্ক। সেই ভয়ে, ফের একবার গঙ্গার পশ্চিম পাড় ছেড়ে শরণার্থী মানুষের ঢল নেমেছে নবহট্টে।

সেইসঙ্গে আরেকটা দুশ্চিন্তা-জাগানো খবরও দিয়েছিলেন তাঁকে বলদেব। সেটা ব্রহ্মানন্দকে নিয়ে। সম্প্রতি কিছু একটা হয়েছে তার। রাতে ঘুমের মধ্যে কোনও দুঃস্বপ্ন দেখে লাফিয়ে উঠছে সে আজকাল। দাবানলের স্বপ্ন। কোনও রহস্যময় এক মেয়ের স্বপ্ন।

হাকিনী, ডাকিনী, শঙ্খিনী জাতের প্রেতাত্মায় বলদেবের গভীর বিশ্বাস। এইসব অঞ্চলে তাদের প্রাদুর্ভাব আছে। রাতবিরেতে একলা-একলা বন-জঙ্গলে ঘুরে বেড়ায় ছেলেটা। বড় ভয়ানক অশরীরী এরা। কারও ওপরে প্রভাব ছড়ালে তার প্রাণ সংশয় হয়।

“কী স্বপ্ন দেখছিলি? আগুন?”

“ওহো। দাদু তোমায় এর মধ্যেই বলে দিয়েছে বুঝি?” বলতে-বলতে চোখ মুছে উঠে বসল ব্রহ্মানন্দ। মনটা হঠাৎ ফুরফুরে হয়ে উঠেছে তার। বাবা এসেছে। কতদিন বাদে। হঠাৎ ছেলেমানুষটির মতোই একগাল হেসে রঘুনাথের হাতটা এসে ধরল সে, “কালকে আমরা শিকারে যাব, হ্যাঁ বাবা? অনেকদিন হরিণের মাংস হয়নি। তুমি এলে। এবারে...”

“যাব। তবে তার আগে বল, এমন ভবঘুরে হয়ে গেছিস কেন তুই? যেখানে-সেখানে ঘুরে বেড়াস নাকি একলা-একলা? কোথায় কোন খারাপ হাওয়া-টাওয়া লেগে...”

বাপ-ছেলে মিলে এমনই নানা কথাবার্তা বলতে বলতে মন্দিরের পথ ধরল। সেখানে তখন একে-একে দলের প্রধান মানুষজন এসে জড়ো হচ্ছেন। রঘুনাথ ফেরবার পর বলদেবই খবর দিয়েছিলেন সকলকে।

“কত সেপাই জুটিয়েছে মীর হাবিব?”

“আজ্ঞা যা খবর মিলেছে তাতে কম করেও বিশ হাজার। হুগলির দিকে কুচ করছে তারা এই মুহূর্তে। বাধা দেবার কেউ নেই তাদের।”

“অসম্ভব।”

“না হুজুর। মেদিনীপুরে বসে মীর জাফর আর দুর্লভরাম ওর সঙ্গে তলে-তলে হাত মিলিয়েছে। ওইতেই তো...”

রাত গভীর হয়েছে। এখানে একত্র হওয়া মানুষগুলোর সেদিকে কোনও ভ্রূক্ষেপ নেই এই মুহূর্তে। পাটনার বিদ্রোহের খবর পাবার পরই পরবর্তী বিপদ কী হতে পারে তার একটা ধারণা করে নিয়েছিলেন বলদেব ভট্টাচার্য। মীর হাবিব হুমকি দিয়ে গিয়েছিল...

এরপর, তাঁর আদেশে সক্রিয় হয়ে উঠেছিলেন কাঞ্চনপল্লীর কানাই মণ্ডল। চর পাঠিয়েছিলেন রঘুনাথকে খবর দিতে। সেইসঙ্গে অন্যান্য এলাকাতেও লোক গিয়েছিল খবরাখবর জোগাড় করবার আশায়। আজ রঘুনাথ ফিরে আসবার পর সন্ধ্যাবেলা তাদের ডেকে পাঠিয়েছেন বলদেব।

বিশ হাজার! এই সংখ্যাটাই হঠাৎ করে আতঙ্কের একটা শিহরণ ছড়িয়ে দিয়ে যাচ্ছিল সেখানে হাজির প্রত্যেকটা মানুষের মধ্যে।

একটা অদ্ভুত নৈরাশ্য ছেয়ে ফেলছিল এক কোণে বসা ব্রহ্মানন্দকেও। মীর জাফর আর দুর্লভরামের মতো নবাবের দু’জন বিশ্বস্ত মানুষ এভাবে তাঁর শত্রুকে সাহায্য করতে পারে সেটা তার হিসাবে ছিল না। তা না হলে, হেরে যাবার এক বছরের ভেতর এত বড় একটা বাহিনী গড়ে তোলবার ক্ষমতা হত না মীর হাবিবের পক্ষে।

অন্যদিকে, খানিক শক্তি বাড়িয়েছেন ভীম সামন্তও। সংগ্রহ করে এনেছেন একটা কামান ও প্রশিক্ষিত গোলন্দাজ। নদীর পাড়ে তাঁর বাড়ির দেয়ালের গা থেকে তার সতর্ক নল অতন্দ্র পাহারায় থাকে নদীর দিকে চোখ রেখে। তবে এ-বাহিনী যতটা বড়, তাতে বলা বাহুল্য একটামাত্র কামান নদী বেয়ে তাদের অগ্রগতিকে সম্পূর্ণ রুখতে পারবে না।

বলদেব ও রঘুনাথ মিলে এতদিনের চেষ্টায় এক হাজারি একটা ফৌজ তৈরি করতে পেরেছেন। তবে প্রয়োজনের তুলনায় তা বড়ই কম। কিন্তু তা নিয়ে ব্রহ্মানন্দের চিন্তা ছিল না। এ-অঞ্চলের বিভিন্ন গ্রামে কম করে হাজার পাঁচেক যোদ্ধাকে সে তৈরি করে রেখেছে এই কয়েক মাসে। আশা ছিল, লড়াই হলে সামন্তের বাহিনীতে যোগ দিয়ে হয়তো একটা শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলা যাবে মীর হাবিবের হানাদারদের বিরুদ্ধে। কিন্তু এবার? বিশ হাজার দুর্ধর্ষ বর্গীর সামনে...

মাথাটা দপদপ করে উঠছিল তার! কোন পথে যাবে সে! কোন পথে গেলে...

*

“ব্রহ্মানন্দ!”

আজ আর তার সামনে থেকে আলেয়ার মতো মিলিয়ে যায়নি ছোট্ট মেয়েটা। স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে ব্রহ্মানন্দের দিকে ফিরে। ঢালু পাড়টা দিয়ে চার হাত-পায়ে তার দিকে বেয়ে উঠতে উঠতেই উত্তপ্ত হলকা এসে ঠেকছিল তার শরীরে। ধেয়ে আসা দাবানল তাকে ছুঁয়ে ফেলেছে প্রায়।

“কে?”

“আমি তো!” মেয়েটার মাথার ঘোমটার আড়াল থেকে কঙ্কার মুখখানা হাসছিল, “আগুনে ভয় পেয়েছ? আর, আগুন কাকে ভয় পায় জানো না? দেখ!”

হঠাৎ তাদের ঘিরে থাকা ধোঁয়া আর কুয়াশার ঢাকনাটা যেন কোনও জাদুতে সরে গেল। আকাশে চাঁদ হাসছে। সেই আলোয়, উঁচু পাড়টার অন্যপাশে চিকমিক করে ছুটে যাচ্ছিল গঙ্গার স্রোত।

প্রায় নিজের মনেই ফিসফিস করে বলে উঠল ব্রহ্মানন্দ, “জল!”

তাহলে ভয় কি? আগুন জলে ভয় পায় তো! তুমিই তো বললে। ঝাঁপ দাও ব্রহ্মানন্দ! ঝাঁপ দাও...”

তীব্র আগুনের হলকা তার দৃষ্টিকে ঝাপসা করে দিচ্ছিল। প্রায় অন্ধ চোখদুটো সামনে তুলে ধরে বুক ভরে নিঃশ্বাস নিল ব্রহ্মানন্দ। তারপর গভীর সেই স্রোতের বুকে...”

ঘন-ঘন জলের ঝাপটায় চোখদুটো খুলে উঠে বসল সে। কোথায় আগুন! পাতাল মন্দিরের মেঝেতে শুয়ে কখন যেন নিঃসাড়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল সে। তার দিকে উদ্বিগ্ন চোখে তাকিয়েছিলেন রঘুনাথ। মাঝরাত্রে হঠাৎ ছেলেটার গোঙানির শব্দ শুনে জেগে উঠে একটু ভয়ই পেয়েছিলেন তিনি। গুরুদেব বলছিলেন হাকিনি বা অন্য কোনও দুষ্ট আত্মা হয়তো এর শরীরকে...

হঠাৎ একটা হাসির শব্দে তাঁর চমক ভাঙল। হাসছে ব্রহ্মানন্দ। ঘুমের জড়তাকে ছিঁড়ে ফেলে সকালের আলোর মতো তার হাসি ছড়িয়ে দিচ্ছে অন্ধকার ঘরটাকে জুড়ে।

সে রাতে বাড়িতে ফেরেনি কেউ। মধ্যরাত্রি অবধি পরামর্শ সেরে মন্দিরের মেঝেতেই শুয়ে পড়েছিল বাকি রাতটুকু কাটিয়ে নেবার জন্য। হাসির শব্দটা একে-একে ঘুম ভাঙিয়ে দিচ্ছিল তাদের। একে-একে উঠে বসছিল তারা।

“কেউ আলো জ্বালান একটা।” হঠাৎ করেই কিশোরটির গলায় যেন কোনও প্রাচীন, কুশলী যোদ্ধার আত্মা এসে ভর করেছে। তার সদ্য ভারী হয়ে ওঠা গলার সেই আদেশ অমান্য করবার কথা কারও মাথায় এল না। খানিক বাদে চকমকির শব্দ ছড়িয়ে মন্দিরের প্রদীপ জ্বলে উঠল ফের।

আবছা আলোয় মানুষগুলোর ছায়ারা যেন জলের মতোই নড়েচড়ে বেড়ায় মন্দিরের দেয়ালে। সেদিকে চোখ রেখে ব্রহ্মানন্দ হঠাৎ বলল, “পথ পেয়েছি। বর্গী আগুনের জবাব দেবে গঙ্গার জল।”

“তার মানে?” বলদেবও কখন যেন উঠে এসে বসেছেন তাদের পাশে।

“বলছি। তার আগে বলি, আরও পাঁচ হাজার বাগদি ও কৈবর্ত সেনার জোগান দেব আমি। কাল সকালে উত্তরে হালুটি, পূর্বে দেবগ্রাম আর দক্ষিণে ভট্টপল্লীতে তিনজন দূত পাঠাবেন। গ্রামের প্রধানদের তারা শুধু এইটুকুই বলবে, গঙ্গা থেকে দু’ক্রোশ পূর্বে দেউলগ্রামে আমি, ভবানীপুত্র ব্রহ্মানন্দ, তাদের এলাকার সমস্ত গ্রামের যোদ্ধাদের ডাক দিয়েছি...”

১৭৪৯ সনের ডিসেম্বর মাস। দক্ষিণ বাংলার বুকে সে বড় দুঃসময় ছিল। পাটনায় সিরাজের বিদ্রোহ দমন করে গুরুতর অসুস্থ, পঁচাত্তর বছর বয়সী বৃদ্ধ আলিবর্দি সিরাজকে সঙ্গে করে ফিরে গিয়ছেন মুর্শিদাবাদে। সেই সুযোগে অরক্ষিত মেদিনীপুর মীর হাবিবের হাতে তুলে দিয়েছেন দুই বিশ্বাসঘাতক মীর জাফর ও দুর্লভরাম।

মেদিনীপুরের দখল পাবার পর আর এক মুহূর্ত সেখানে দেরি করেননি মীর হাবিব। কয়েকদিনের মধ্যেই বিরাট একটা বাহিনী নিয়ে তিনি রওনা হলেন হুগলির পথে। সেখানে পৌঁছে, তাঁর লক্ষ্য গঙ্গার পুবপাড়। সেখানে একটা ছোট্ট প্রতিশোধ নেবার পালা শেষ করে তিনি ছুটে যাবেন সেদিকের সমৃদ্ধ জনপদগুলোর দিকে।

তবে প্রথমে প্রতিশোধ। না। এইযাত্রা ভীম সামন্তকে অবজ্ঞা তিনি করবেন না। একটা ব্যাপারে নিঃসন্দেহ ছিলেন মীর হাবিব। অত সহজে নদী পেরিয়ে অতর্কিত আক্রমণ করবার সুযোগ তিনি পাবেন না এ-যাত্রা। চরেরা খবর এনেছে, এবারে কামান সংগ্রহ করেছে ভীম। তাঁর সেনাবাহিনী প্রধানত পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষ। জল তাদের বন্ধু নয় এখানকার মানুষজনের মতো। নদী পার হবার সময়ে কামানের আগুনে হানা ঘটলে বড় সেনাবাহিনীর কোনও সুবিধেই পাবেন না তিনি। মুহূর্তে ছারখার হয়ে যাবে সম্পূর্ণ স্বপ্নটা।

না! অন্য কোনও পথে। অন্য কোনও কৌশলে...

ছোট একটা দল তাই সবার অলক্ষ্যে তাঁর সৈন্যবাহিনী ছেড়ে এগিয়ে গিয়েছে নবহট্টের উল্টোদিকে চুঁচুড়া শহরের উদ্দেশ্যে। তাদের শরীরে সাধারণ মুসাফিরের পোশাক। কেউ দরবেশ, কেউ বা সামান্য ব্যবসায়ী, কেউ কেবলই ভাগ্যান্বেষী সেপাই যেন।

চুঁচুড়ায় এসে একসময় আলাদা আলাদাভাবে নদী পেরিয়ে তারা নবহট্টে পৌঁছে গেল। এদিক থেকে বর্গীর ভয়ে নবহট্টের দিকে পলাতক মানুষজনের ভিড়ে তাদের আলাদা করে চিনে নেবার উপায় ছিল না।

নবহট্টে পৌঁছে তারা সতর্ক নজর রেখে চলেছিল সামন্তর বাড়ির দিকে। নিশ্ছিদ্র পাহারায় মোড়া বাড়িটায় কারও অলক্ষ্যে কাকপক্ষিটিও পা দিতে পারে না এখন। তার সামনের প্রশস্ত মাঠ সারাদিন সেপাইদের কুচ-এর শব্দে গমগম করে।

তবে বাড়ির ভেতরে ঢোকবার কোন ইচ্ছাও তাদের ছিল না। খুঁটিগাড়া ঘাটে, তার পাশের ব্রহ্মময়ীর মন্দিরের চাতালে, ভিনদেশ থেকে আসা মানুষের বিস্ময় চোখে মেখে সামন্তর বিরাট বাড়িটার চারদিকে চেয়ে দেখে তারা। আর সেই দেখতে দেখতেই আন্দাজ করে নেয় তার মানুষজনের যাতায়াতের চরিত্রকে।

একজন বিশ্বাসঘাতক আরেকজন বিশ্বাসঘাতককে ঠিক চিনে নেয়। স্থানীয় জেলেদের মধ্যে তেমনই কিছু বিশ্বাসঘাতক মানুষকে চিনে নিতে, আর সামান্য কিছু সোনার বদলে তাদের সাহায্য নিশ্চিত করতেও বেশি বেগ পেতে হয়নি তাদের।

*

দুটো ভাগে ভাগ করা হয়েছে ব্রহ্মানন্দের সংগ্রহ করা গোটা দলটাকে। দু’হাজার বাগদি সেনা গিয়েছে রঘুনাথের অধীনে। তাঁর নিজের সংগ্রহ করা এক হাজার সৈন্যের সঙ্গে কুচ করছে তারা। দেউলগ্রামের উত্তরে নির্জন, অরণ্যঘেরা সুবিশাল বিল এই শীতে শুকিয়ে উঠেছে। জঙ্গলের আড়ালে তার নরম জমিতে সেখানে, স্বয়ং বলদেব ভট্টাচার্যের অধীনে তাদের অভ্যাস চলে রাতের অন্ধকারে। রণ-পায় দক্ষ তারা আগে থেকেই। দক্ষ হাতাহাতি যুদ্ধেও। মুর্শিদাবাদ থেকে নিয়ে আসা বন্দুক কারিগরদের পরিশ্রমে তাদের একটা বড় অংশের হাতেই এখন আগ্নেয়াস্ত্র উঠেছে। সম্মুখযুদ্ধের জন্য নয়। তাদের গড়ে তোলা হচ্ছে দ্রুত তাড়া করা ও ছুটন্ত অবস্থাতেই নিখুঁত লক্ষ্যে গুলি ছোঁড়বার কৌশলে। এ-বিষয়ে ব্রহ্মানন্দ তার গোটা পরিকল্পনাটা বুঝিয়ে বলবার পর বলদেব ও রঘুনাথও একমত হয়েছেন তার সঙ্গে।

ব্রহ্মানন্দের আসল মহড়া চলেছে এখন মথুরা বিল ও তার উত্তরে যমুনা নদীর বুকে। কাঞ্চনপল্লীর জনপদ থেকে বহু দূরে, ঝিল ও নদীর জনহীন এলাকায় দণ্ডী ও জালুয়া কৈবর্তের একটা বড় দল তার সঙ্গে রয়েছে। দিনেরবেলা অরণ্যেই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বিশ্রাম নেয় তারা। তারপর রাতের অন্ধকারে জলের বুকে তাদের কাজ শুরু হয়। মাছ ধরা ও নৌকা বাওয়া এই দুই শ্রেণীর কৈবর্তের প্রধান পেশা। জলের সঙ্গে তাদের সখ্য চিরকালের। ফলে ব্রহ্মানন্দের পরিকল্পনাটা বুঝে নিয়ে তাকে রপ্ত করে নিতে বেশি সময় নেয়নি তারা।

এছাড়া তার ডাকে সাড়া দিয়ে এসে পৌঁছানো পাটনি কৈবর্তের দলটাকে অন্য কাজে পাঠিয়েছে সে। প্রায় পাঁচশ মানুষের দলটা এখন সুতি, গঙ্গা, মক্তবপুরের খাল ও মথুরা বিলের আশপাশে তাদের গ্রামে ফিরে গেছে। সেখানে সারাদিন তারা নৌকাগুলোর প্রয়োজনীয় মেরামত চালায়। তারপর রাতের অন্ধকারে নৌকা ভাসিয়ে গঙ্গার বুকে দাঁড় বেয়ে আসে। নবহট্টের গঙ্গাতীর তার পশ্চিমপাড়ের মতো শহর হয়ে ওঠেনি এখনও। এখনও ঘন জঙ্গল ছেয়ে থাকে এখানে নদীর পাড় ঘেঁষে। তার আড়ালে নৌকাগুলোকে ঢুকিয়ে লতাপাতার আবরণে ঢেকে রেখে যায় তারা। দক্ষিণে মক্তবপুরের খাল থেকে উত্তরে হাবেলিশহর অবধি এইভাবে সবার নজরের আড়ালে সেজে উঠছিল দ্রুতগামী নৌকার একটা বহর। তার প্রতিটির অবস্থান তাদের মালিকদের নিখুঁতভাবে জানা।

*

প্রথম আঘাতটা এল খানিকটা আকস্মিকভাবেই। বাড়ির পেছনে মেয়েদের স্নানের ঘাটে পাহারা বসাবার বিষয়ে রঞ্জাবতীর ঘোর আপত্তি ছিল। সামনে প্রশস্ত নদী। পেছনে বাড়ির দেয়াল। সেখানে চোখ এড়িয়ে কারও আক্রমণের সম্ভাবনা কম। তা-ছাড়া খবর আছে বর্গীর দল এখনও অন্তত চার-পাঁচদিন দূরে রয়েছে। কাজেই সেদিন ভোরে সূর্যোদয়ের আগে কঙ্কাকে নিয়ে রোজকার মতো গঙ্গাস্নানে যাবার সময়ও বিশেষ দুশ্চিন্তা তিনি করেননি।

বুকজলে দাঁড়িয়ে একমনে পাড়ের দিকে মুখ করে সূর্য্যার্ঘ্য দিতে দিতেই হঠাৎ পেছন থেকে মৃদু একটা শব্দ পেয়ে ঘুরে যখন তিনি কঙ্কাকে সেখানে দেখতে পেলেন না, তখনও তাঁর মনে কোনও দুশ্চিন্তা জাগেনি। খানিক দূরে জেলেদের একটা নৌকা পাল খাটাচ্ছিল। সারারাত মাছ ধরবার পর এবার তাদের ঘরে ফেরবার পালা। সম্ভবত ওর ওপাশে সাঁতার দিতে গেছে সে। কমবয়েসি মেয়ে। এমন হতেই পারে।

কিন্তু তারপর হঠাৎ করেই হাওয়ায় ফেঁপে ওঠা পাল নিয়ে নৌকাটা উত্তরমুখো না গিয়ে তাঁর কাছ ঘেঁষে আসতে একটু বিরক্ত হয়ে সরে যাবার চেষ্টা করতে গেলেন রঞ্জাবতী। আর ঠিক তখনই একেবারে কাছে এসে পড়া নৌকোটার মধ্যে থেকে একটা হাত বের হয়ে এসে কাঠের একটা টুকরো দিয়ে সজোরে ঘা দিল তাঁর মাথায়।

ততক্ষণে তাঁর দুপাশে জলে ডুব দিয়ে থাকা দুটো কালো মূর্তি ভেসে উঠেছে। জ্ঞানহীন শরীরটাকে নিঃশব্দে নৌকার খোলে তুলে অন্য একটা নিশ্চল শরীরে পাশে শুইয়ে দিল তারা। তারপর দক্ষ হাতে তাঁদের ওপরে পরপর সাজিয়ে দিল পাটাতনের কাঠগুলো। অনুকূল হাওয়ায় নৌকা তখন জোয়ারের ধাক্কাকে সঙ্গী করে উড়াল দিয়েছে উত্তর-পশ্চিম কোণ করে নদীর অন্য পাড়ের দিকে। কয়েক-মুহূর্ত বাদে ছ’জোড়া দাঁড় সেইসঙ্গে যোগ দিল এসে। সারা রাত মাছ ধরে পাড়ে এসে একে-একে ভিড়তে থাকা জেলেদের নৌকোগুলো সন্দেহজনক কিছু দেখেনি। তাদেরই মতো আরও একটি নৌকোর ভেসে চলা কোনও সন্দেহ জাগায়নি তাদের মনেও।

খবরটা আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল চারপাশে। সূর্যোদয়ের আগে গঙ্গায় স্নান করতে নেমে সেখান থেকে আর উঠে আসেননি ভীম সামন্তের স্ত্রী আর তাঁর আশ্রিত কঙ্কা নামের মেয়েটি। নদীতে তখন কিছু জেলে নৌকা ছিল। না, সন্দেহজনক কিছু চোখে পড়েনি তাদেরও। সম্ভবত কোনও অসতর্ক মুহূর্তে নদীই টেনে নিয়ে গেছে মানুষদু’জনকে।

তবু, সেই মুহূর্তে সে নিয়ে দুঃখ করবার বিলাসীতা দেখাবার মতো অবসর ছিল না সামন্তের। বুকে পাথর বেঁধে তাদের ভুলে থেকেছেন তিনি। দিনের-পর-দিন জেলেরা জাল নিয়ে নদীর বিস্তীর্ণ এলাকা খুঁজে খালি হাতে যখন ফিরে এসেছে তখন সেদিকে তাকিয়ে চোখের জল মুছে ফের ফিরে গিয়েছেন শহর রক্ষার প্রস্তুতি দেখতে।

*

অবশেষে সেই দিনটি এল। নবহট্টের বিপরীত পাড়ে কালবৈশাখির মেঘের মতোই জমায়েত হয়েছে মীর হাবিবের বিপুল সেনাবাহিনী। অজস্র নৌকা সংগ্রহ করা হয়েছে পারাপারের জন্য।

আক্রমণ প্রতিরোধের ছকটা নিখুঁতভাবেই সাজিয়েছিলেন ভীম। প্রায় পঞ্চাশটা নৌকায় প্রস্তুত হয়ে আছে তাঁর সৈন্যদের একটা বড় অংশ। প্রথম কাজটা কামান করবে। তারপর এগিয়ে যাবে নৌকারোহী সৈন্যের দল।

কিন্তু কামানের বারুদে আর আগুন ধরানো হল না তাঁর। হঠাৎই উলটোদিক থেকে এগিয়ে আসা নৌকার বহরটা থেকে বের হয়ে একটা নৌকা খানিক এগিয়ে এসেছে। এ-নৌকাটার ছই নেই কোনও। তার লম্বা মাস্তুলের গায়ে পুতুলের মতো ছোট-ছোট দুটো মানুষের শরীর দেখা যায়।

ওদিক থেকে খানিক এগিয়ে এসে স্থির হল নৌকাটা। সেদিকে তাকিয়ে হঠাৎ মেরুদণ্ড দিয়ে একটা হিম স্রোত বয়ে গেল ভীম সামন্তর। এখনও ছোট খুব কিন্তু তবু তিনটে শরীর তার ওপরে পরিষ্কার নজরে আসে। মাস্তুলের সঙ্গে পিঠোপিঠি করে বাঁধা রঞ্জাবতী আর কঙ্কার সম্ভবত জ্ঞান নেই। তাদের সামনে খোলা তলোয়ার উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন স্বয়ং মীর হাবিব।

কোনও কথা বলবার প্রয়োজন ছিল না আর। ইঙ্গিতটা পরিষ্কার। মুখে একটা তিক্ত স্বাদ নিয়ে বাড়ির মাথায় একখণ্ড সাদা কাপড় উড়িয়ে দিলেন সামন্ত। যুদ্ধ শেষ। শুরু হবার আগেই।

*

আস্তে-আস্তে সেই নৌকাটাকে শীর্ষবিন্দুতে রেখে একটা বিরাট ত্রিভূজের মতো এগিয়ে আসছিল বর্গীদের গোটা বাহিনীটা। আর ঠিক তখনই উত্তরদিকে গৌরিভা অঞ্চলে নদীর বিশাল বাঁকটা থেকে হঠাৎ জলে ভেসে এল বেশ কিছু চ্যাপ্টা কলার ভেলা। তার বুকে অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর চিৎকারের শব্দ ক্ষীণভাবে ভেসে আসছিল আক্রমণকারী নৌবহরের দিকে।

ভাঁটার টানে দ্রুত এলোমেলোভাবে ভেসে আসছিল ভেলাগুলো। সেদিকে তাকিয়ে মুখে একটা মৃদু হাসি খেলে গেল মীর হাবিবের। বাংগালি কলার ভেলায় সেপাই পাঠিয়েছে মীর হাবিবের সঙ্গে লড়তে! হাঃ!

ভেলায় সওয়ার মানুষগুলোর হাতে ধান কাটবার কাস্তে আর লাঠি ছাড়া আর কোনও অস্ত্র নেই। এক এক ভেলায় বড়জোর আটদশটা করে মানুষ।

মীর হাবিবের নির্দেশে দ্রুত এগিয়ে আসতে থাকা ভেলাগুলোর সওয়ারদের লক্ষ করে অস্ত্র তুলে ধরল বন্দুকবাজের দল। যুদ্ধ না হোক খানিক মজা তো হবে!

গুলির প্রথম লহরটা ছুটে যেতেই দেখা গেল কলার ভেলার সেপাইদের সাহস উবে গেছে। আর্তনাদ করতে করতে ভেলা ছেড়ে অস্ত্র ফেলে জলে ঝাঁপ দিয়েছে তারা। সওয়ারবিহীন ভেলাগুলো নিজেরাই এলোমেলো ভাঁটার টানে ভাসতে ভাসতে এগিয়ে আসছিল তখন মীর হাবিবের নৌকোগুলোর দিকে।

সেদিকে আর নজর দিলেন না মীর হাবিব। সামন্তর এহেন স্পর্ধার জবাবে মাস্তুলে বাঁধা মেয়েদুটোকে জবাই করে ফেলাই উচিত ছিল হয়তো। কিন্তু এদের ওর বাড়িতে নিয়ে গিয়ে ওর সামনে শেষ করবার আনন্দটা তিনি নষ্ট করতে চান না।

*

নদীর ঠিক মাঝামাঝি এসে বিষয়টা প্রথম খেয়াল করেন জুমলাদার বীরেশ্বর রাও। স্রোতে নাচতে-নাচতে এগিয়ে আসতে থাকা সওয়ারিবিহীন ভেলাগুলো কখন যেন তাঁদের নৌকোর বহরটাকে ঘিরে ছড়িয়ে যাচ্ছে! একটা ভেলাও কেন অন্য কোনওদিকে যাচ্ছে না?

বিষয়টা নিয়ে পাশের নৌকায় দাঁড়ানো মীর হাবিবের দৃষ্টি আকর্ষণ করবার জন্য সেদিকে মুখ ঘুরিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু কথাটা আর বলা হল না তাঁর। হঠাৎ নৌকোর নীচে প্রচণ্ড একটা ধাক্কায় দুলে উঠল সেটা। সভয়ে পায়ের নীচে তাকিয়ে তিনি দেখলেন, সেখানে বড় গর্ত হয়ে গেছে, একটা। জলের তলা থেকে ধারালো কোনওকিছুর ঘায়ে ফুটো হয়ে গেছে তাঁর নৌকো।

গোটা বহরেই তখন একটা হইচই বেধে গেছে। কলার ভেলার তলায় তার ভাসমান কাণ্ডগুলোকে ধরে ডুবে থাকা অসংখ্য কৈবর্ত যোদ্ধার হাতের কুঠার একের-পর-এক নৌকার তলায় ঘা দিয়ে জলে ডুবিয়ে চলেছে তাদের। ছিটকে পড়া মারাঠি সেনারা প্রাণপণে হাত পা ছুড়ে জল কাটবার চেষ্টা করে। কিন্তু তাদের ঘিরে ডুব দিয়ে সাঁতরে চলা শত্রুর হাতের ছুরির একেকটা নিখুঁত টান তাদের সে চেষ্টাকে বেশিক্ষণ চালাতে দিচ্ছিল না।

মথুরা বিলের জলে অসংখ্যবার অভ্যাস করা রণকৌশল আর তার সঙ্গে জলের সঙ্গে আজন্ম সখ্য সেই কৈবর্তদের তখন অপরাজেয় করে তুলেছে। অবশিষ্ট নৌকাদের থেকে ছুটে আসা ঘন ঘন গুলির বৃষ্টি তাদের ছুঁতে পারে না। মাঝে মাঝে মাথা তুলে নিঃশ্বাস নেবার সময় তাদের দিকে লক্ষ্যস্থির করবার আগেই ফের তারা তলিয়ে সরে যায় অন্য নৌকার দিকে। বেছে নেয় নতুন শিকার।

স্তম্ভিত হয়ে জলের দিকে তাকিয়ে সমস্ত ব্যাপারটা দেখছিলেন মীর হাবিব। তারপর হঠাৎ সম্বিত ফিরতে খোলা তলোয়ার হাতে উন্মাদের মতো ধেয়ে গিয়েছিলেন মাস্তুলে বাঁধা মানুষদুটোর দিকে। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে নৌকার পাশ থেকে উঠে আসা একজোড়া হাত তাঁকে জলের মধ্যে টেনে নিল।

তবে মৃত্যুর সময় তখনো তাঁর হয়নি। তাঁকে জলে টেনে নেবার প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই সে নৌকায় খোলা তলোয়ার হাতে অন্য নৌকা থেকে লাফিয়ে এসেছিলেন জুমলাদার বীরেশ্বর রাও। সেদিকে তাকিয়ে মুহূর্তে কর্তব্য স্থির করে নিল ব্রহ্মানন্দ। মীর হাবিবের সঙ্গে বোঝাপড়া পরে হবে। জলের নীচে একবিন্দু বাতাসের জন্য ছটফট করতে থাকা শরীরটার গলা থেকে হাত সরিয়ে নিল সে। তারপর তাকে সেখানেই ছেড়ে দিয়ে নৌকার কানাটা ধরে এক লাফে উঠে এল তার ওপরে। প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই ঘুরে দাঁড়ানো বীরেশ্বরের তলোয়ারটা ভোমরার মতো গুঞ্জন করে ঘুরে এল তার মাথার ওপরে।

সময় ধীরে চলছিল যেন তার চোখের সামনে। তলোয়ারটার এগিয়ে আসবার প্রত্যেকটা খণ্ডমুহূর্তকে আলাদা আলাদাভাবে যেন দেখতে পাচ্ছে সে। ঘাড়ের কাছে তার ধারালো স্পর্শটা লাগবার ঠিক আগের মুহূর্তে নৌকার ওপর উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ল ব্রহ্মানন্দ।

সেদিকে চোখ রেখে পাথরের মতো তাকিয়ে ছিল কঙ্কা। এক চুলের জন্য বেঁচে যাওয়া ব্রহ্মানন্দের শরীরের ওপর ভারসাম্য হারিয়ে টলে উঠেছে বীরেশ্বর রাও। জলে আছড়ে পড়বার আগের মুহূর্তে ব্রহ্মানন্দের গায়ের পোশাকটাকেই শেষ অবলম্বন হিসেবে আঁকড়ে ধরেছিল সে। কিন্তু শেষরক্ষা হল না তাতে। চড়চড় করে ছিঁড়ে যাওয়া কাপড়ের টুকরোটাকে মুঠোয় ধরে নিয়ে ছিটকে পড়ল সে গভীর জলের বুকে।

সেই খোলা পিঠটার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ থরথর করে কেঁপে উঠল কঙ্কা। ওখানে ছড়িয়ে থাকা সাপের মতো আঁকাবাঁকা ক্ষতের দাগটা সে চেনে! এ আর কেউ হতে পারে না। চোখগুলো জুড়ে আসছিল তার। হঠাৎ তাকে ঘিরে ধূসর হয়ে আসছে যেন সকালের উজ্জ্বল আকাশ। টলে উঠেছে পায়ের নীচের দুনিয়া। জ্ঞান হারাতে হারাতে শেষ শক্তিটুকু দিয়ে প্রাণপণে সে ডাক দিয়ে উঠল, “শ্রীমন্ত... আমি কঙ্কা...”

সেদিকে তাকিয়ে হঠাৎ বজ্রাহতের মতো স্থির হয়ে গেল ব্রহ্মানন্দ। ডাকটা যেন একটা বাজের মতো গিয়ে ঘা মেরেছে তার মাথায়। হঠাৎ কতগুলো অচেনা স্মৃতির দরজা খুলে যাচ্ছে সেখানে। নবহট্টের বিরাট বাড়ি তাদের... ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে যুদ্ধে যাওয়া তার বাবা... জটরাম গাঁ... মা... কঙ্কা...

ততক্ষণে বর্গী দলের অবশিষ্ট সামান্য কিছু নৌকা ফের চুঁচুড়ার দিকে মুখ ঘুরিয়েছে। কোনমতে তাদের একটার কানা ধরে উঠে বসেছেন মীর হাবিবও। ছত্রখান হয়ে যাওয়া গোটা দলটার আতঙ্কিত চোখের সামনে তখন নদীর অন্যপার থেকে ঝোপঝাড়ের আড়াল ছেড়ে তিরবেগে ধেয়ে আসছিল একটা ছিপনৌকার বহর। তাদের সঙ্গে এবার যোগ দিয়েছে ভীম সামন্তর পঞ্চাশ নৌকার সৈন্যরাও। বহরের সামনে পাশাপাশি দুটো নৌকায় খোলা তলোয়ার আর উদ্যত বন্দুক হাতে ভীম ও রঘুনাথকে দেখা যাচ্ছিল। নৌকোগুলোর বুক থেকে উড়ে আসা ঘন ঘন বন্দুকের ধমক বুঝিয়ে দিচ্ছিল, আজকের দিনটা আর মীর হাবিবের নয়।

“কঙ্কা!”

“শ্রীমন্তদাদা! আমি ঠিক চিনেছিলাম তোকে। বারবার শুধু মনে হত...”

হঠাৎ তাকে ছেড়ে রঞ্জাবতীর দিকে এগিয়ে গেল শ্রীমন্ত।

“মা!”

ততক্ষণে আরও কয়েকজন কৈবর্ত যোদ্ধা সে নৌকায় উঠে এসেছে। তাদের দিকে ফিরে ব্রহ্মানন্দ ঠান্ডা গলায় বলল, “এঁদের যত্ন করে ফিরিয়ে নিয়ে যাও তোমরা। ওপাড়ে সবাই অপেক্ষায় আছে।”

“শ্রীমন্তদাদা, তুমি ফিরবে না?”

কঙ্কার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল সে। তার নৌবহর ততক্ষণে প্রায় কাছাকাছি এসে পৌঁছেছে। তাদের সামনে তিরবেগে চুঁচুড়ার দিকে ছুটছিল হেরে যাওয়া বর্গী সৈন্যদের অবশিষ্ট নৌকাগুলো।

ভীম ও রঘুনাথের নৌকাদুটো ততক্ষণে এই নৌকার গায়ে এসে ভিড়েছে। সেখান থেকে উঠে আসা ভীম ও রঘুনাথের দু’টি হাত দুই হাতে জড়িয়ে ধরে সে বলল, “আমি তোমার শ্রীমন্ত বাবা।” তারপর রঘুনাথের হঠাৎ মলিন হয়ে ওঠা মুখটার দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি তোমার ব্রহ্মানন্দও। চিরকাল তা-ই থাকব আমি তোমার কাছে। দেখে নিয়ো। তবে এখন আর সে-কথা নয়। একটু কাজ বাকি রয়ে গেছে। চিরটাকাল ওরা আক্রমণ করেছে। আমরা আত্মরক্ষা করেছি। আজ আমাদের আক্রমণের স্বাদ টের পাবে ওরা। চলো তোমরা। আজকের আক্রমণে আমি, আমাদের মিলিত বাহিনীর নেতৃত্ব দেব।”

উপসংহার

না। সে-যাত্রা মীর হাবিবের নাগাল তারা পায়নি। আলিবর্দীর চতুর চালে, মারাঠা প্রভুদেরই হাতে উড়িষ্যার মাটিতে তার ভয়াবহ মৃত্যু আসবার তখনও কিছু দেরি ছিল। এ-যাত্রা নদীর অন্য পাড়ে মাটিতে পা দেবার পর সৈন্যদের ভিড়ের আড়ালে নিজের বেশ বদল করে সেখান থেকে উধাও হয়ে গিয়েছিল সে। তার দলের একটা ছেঁড়াখোঁড়া অংশও শেষ অবধি পালাতে পেরেছিল তার সঙ্গে।

ইতিহাস বলে, এর পরের বছর, কিছুটা আকস্মিকভাবেই বৃদ্ধ ও অসুস্থ আলিবর্দির প্রস্তাবে সন্ধি মেনে নেয় মারাঠারা। যুদ্ধের সাধ তাদের ঘুচে গিয়েছিল চিরতরে। শেষ হয়েছিল বাংলার বুকে বর্গীর অত্যাচারের যুগ। আর তার মাত্রই কয়েক বছর বাদে আবার শতাব্দিব্যপী এক নতুন অত্যাচারের যুগ শুরু হয়েছিল এদেশের মাটিতে। এবার তা হয়েছিল সাগরপাড় থেকে আসা সাদা মানুষদের হাতে। আর সেখানেও একই রকমভাবে জন্মভূমিকে বিক্রি করেছিল সেই মীর জাফর আর দুর্লভরামের দল। ইতিহাস বদলায়। রাজা আসে, রাজা যায়। শুধু মীর জাফরের দল একই ভাবে থেকে যায়।

ব্রহ্মানন্দ তার বাপ-মায়ের কাছে ফিরে শ্রীমন্ত হয়েছিল ফের। কিন্তু পাশাপাশি রঘুনাথকেও সে চিরটাকাল নিজের বাপের মতোই সম্মান দিয়ে গেছে। এর বছরখানেক বাদে মহা সমারোহে শ্রীমন্ত আর কঙ্কার বিয়ে হয়েছিল। বলদেব ভট্টাচার্য পৌরহিত্য করেছিলেন সেই অনুষ্ঠানে। নবহট্ট এলাকার প্রায় সমস্ত গ্রামে উৎসব হয়েছিল সেই বিয়ে উপলক্ষে। ভীম সামন্তের ফিরে আসা ছেলে শ্রীমন্ত তখন তাদের নয়নের মণি যে! এর কিছুকাল বাদে যখন তার প্রথম পুত্রসন্তান জন্মাল তখন কঙ্কা তার নাম রেখেছিল ব্রহ্মানন্দ।

_

অধ্যায় ১ / ৩
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%