হেমাঙ্গিনী

দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য

Hem New

“আর একটু ভাত নিবি?”

“উঁহু, বাকিটা তুই খেয়ে নে।” বলতে-বলতে হরিশ থালা থেকে হাত ওঠাতে যাচ্ছিল, কিন্তু পারলে তো! বাঁ-হাত দিয়ে হেমাঙ্গিনী তার হাতটা টেনে ধরেছে, “ইঃ! উঠলেই হল? রেঁধে-বেড়ে ভরদুপ্পুরের রোদ মাথায় করে নিয়ে এলাম আর উনি অর্ধেক খেয়ে...”

জেদ করে লাভ নেই কোনও। হরিশ ফের বসে পড়ল। বড্ড একগুঁয়ে মেয়ে। ধরেছে যখন, তখন ছাড়বে না কিছুতেই।

তার সামনে ছড়ানো রুখু জমির বুকে লাঙলের ফালের দাগ। রোদের তাতে শক্ত মাটি। তরুণ চাষির শক্ত হাতে ধরা লাঙলের কামড়ে বড় বড় ড্যালা হয়ে ভেঙে ছড়িয়ে গিয়েছে সারা সকাল। তবু এখনও বেশ খানিকটা বাকি। হরিশের মন এখন পড়ে আছে ওইদিকেই।

“হুম! দে, দে, চটপট দে। বেলা যে ঢলে যায়! এখনও কতটা কাজ বাকি তাকিয়ে দেখেছিস?”

“যাক গে বেলা ঢলে। কত কষ্ট করে খালে নেমে সারা সকাল তোর জন্যে মাছ ধরেছি তুই জানিস? কুঁচোমাছ তুই ভালোবাসিস বলে...”

কথা না বাড়িয়ে থালাটা ফের সামনে টেনে নিল হরিশ। তার পাশে বসে হেমাঙ্গিনী নিজের থালায় ভাত মেখে নিচ্ছিল। হাত নাড়বার তালে-তালে তার হাতের রুপোর কাঁকন রিনিঠিনি শব্দ তোলে। দিনের-পর-দিন হরিশের কাছে ব্যাগেত্তা করে ওই গয়না আদায় করে ছেড়েছে মেয়ে গত পুজোয়। এখনও তার ধার শুধছে হরিশ।

তবে সে হোক গে। একটাই তো বোন! সেদিকে তাকিয়ে মনটা ভারি নরম হয়ে আসছিল হরিশের। বাপ-মা মরা বোনটা তাকে ছেড়ে একলা কখনও ভাত খায়নি। দুপুরবেলাটাও দু’জনের খাবার নিয়ে মাঠে এসে একসঙ্গে খেতে হবে তাকে।

আধচষা ক্ষেতের পাশে বসে দুই ভাইবোন দুপুরের খাবার খায়। তাদের মাথার ওপরে ছায়া দিয়ে দাঁড়ানো পুরোনো বটগাছের পাতায় ঝরঝর করে হাওয়া বয়ে যায়। চষা জমির বুকে শুয়ে থাকা লাঙলের পাশে বলদ-দুটো আলস্যে ঝিমোয়।

গোগ্রাসে দলাগুলো গিলছিল হরিশ। তার হাত নিশপিশ করে উঠেছে মাটির বুকে ফের লাঙলের ফলা গেঁথে দেবার জন্য। সুধন্য ঘোষের মুহুরি, রিচার্ড সাহেবের হুকুম জানিয়ে ঢোল দিয়ে গেছে দু’দিন আগে। কিন্তু অন্ন জোগানো ক্ষেতের কাজ ফেলে সে-কাজে হাত দেয়া...

নাঃ। বিশ্বনাথ ভুল কিছু বলেনি। আগে পেটের ভাতের বন্দোবস্ত। তার পরে সাহেবের দাদনের নীলচাষ। তবু, বুকের ভেতর কোথায় যেন একটু কাঁপুনি উঠে আসছিল তার। রিচার্ড সাহেবের চাবুকের স্বাদ পায়নি এমন মানুষ বেশি নেই এ-তল্লাটে।

*

“জলুট গ্রামে এবার কত জমির দাদন দিয়েছ হে সুধন্য?”

বেলা দুই প্রহর পার হয়েছে। বাড়িতে মেয়েজামাই দ্বিরাগমনে এসেছে। এইবারে গিয়ে না পড়লে তাদেরও খাওয়া-দাওয়ার দেরি হয়ে যাবে। সুধন্য তাই তাড়াতাড়ি এ-বেলার মতন দপ্তর গোটাচ্ছিল। সামনে এসে দাঁড়ানো বুটপরা পা’দুটো দেখে সে কাজ ছেড়ে ফের দাদনের খাতাটা খুলে ফেলল। অবশ্য হিসেব সবই তার মুখে-মুখে জানা। খাতার দিকে তাকিয়ে খানিক সময় নেয়া শুধু। কিন্তু, সাহেব হঠাৎ সব ছেড়ে অসময়ে দাদনের হিসেব নিয়ে পড়ল যে বড়? ব্যাপারখানা কী?

“কই হে গোমস্তা। জবাব দাও...”

সুধন্য থতমত খেয়ে খাতার পাতায় আঙুল দিয়ে বলল, “আজ্ঞে বিশঘর রায়ত, মাথাপেছু ছ’বিঘেতে নীলের দাদন ধরলে একুনে হল একশ’ বিশ বিঘে।”

“জমি তোয়ের হয়েছে?”

দশ বচ্ছর এদেশে থেকে সায়েবের বাংলাটা একেবারে এখানকার লোকের মতোই হয়ে গেছে। তবে সেদিকে সুধন্য ঘোষের মন ছিল না। দুপুরের খাবার খেতে যাবে, আর ঠিক সেই সময়ে সাহেবের হিসেব নেবার কথা মনে পড়ল? আর পড়বি তো পড় লিস্টিতে প্রথমেই জলুট গ্রামের নাম। বড় রাগ হচ্ছিল তার বিশ্বনাথ বিশ্বাসের ওপরে। দাদনের জমিতে লাঙল দেবার ব্যাপারে সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে জলুট। এইবার যে সাহেব ফেটে পড়ে তাঁকে ন ভূতো ন ভবিষ্যতি গাল পাড়বে তার জন্য ও-গ্রামের ওই বিশে বদমাশটা দায়ী। লোকজনকে ফুসলে-ফুসলে...

“আজ্ঞে ছায়েব...”

“ড্যাম ইয়োর ‘আজ্ঞে সাহেব’। ইয়েস অর নো?”

লাল মুখটা আরও লাল হয়ে উঠেছে। রিচার্ড সাহেবের বদমেজাজের কথা এলাকায় কারও অজানা নেই। টেবিলের পাশে রাখা চামড়ার চাবুকটার হাতলে হাতের মুঠোটা এক-একবার চেপে বসছে তাঁর। ও চাবুকে ছ’খানা চামড়ার ফিতে।

“আজ্ঞে ছায়েব... নো ছায়েব...”

“হোয়াই?”

“আজ্ঞে মহালের আর সব গাঁয়ে সবাই হুজুরের হুকুম মোতাবেক...”

“দ্যাট আই নো।” বাঘের মতো গর্জে উঠেছে রিচার্ডের গলা, “তুমি জলুটের কথা বল। সেখানে জমি তোয়ের হয়নি কেন?”

“তার মানে আগে-ভাগে খবর জোগাড় করেই আমার হেনস্থায় নাবা হয়েছে! নইলে, নীলের দাদন নেয়া পঁচিশটা গ্রামের মধ্যে চব্বিশটা গাঁয়ে জমি তোয়ের করে বীজ বোনা শেষ, সেই সব ছেড়ে প্রথমেই জলুটের কথা তুলবে কেন?”

কথাগুলো ভাবতে-ভাবতেই মনে-মনে বেনাগ্রাম নীলকুঠির সব-ক’জন কর্মচারীর মুখ একবার ঝালিয়ে নিল সুধন্য। এদের মধ্যে কেউ একজন সায়েবের হয়ে গোয়েন্দাগিরি চালাচ্ছে। কে সেটা, সে-খবর বের করে নিতে সুধন্যর অসুবিধে হবে না। তারপর...

মুখে অবশ্য সে-সব কিছু বুঝতে না দিয়ে সে বলল, “আজ্ঞে বিশে। বিশ্বনাথ বিশ্বেস...”

হঠাৎ গলাটা ভারি শান্ত হয়ে গেল রিচার্ডের, “হু’জ দ্যাট?”

“জলুটের রসিক বিশ্বেসের ছোঁড়া। গাঁয়ের লোকজন নিয়ে ঘোঁট পাকিয়ে তুলেছে। দিন-কয়েক আগেই মুহুরিবাবুকে ঢোল দিতে পাঠিয়েছিলাম, যে নীলের জমিতে লাঙল দেয়া শেষ না করে কেউ ধানজমিতে হাতটি দিতে পাবে না। সঙ্গে পাইক ছিল দু’জন। তা ছোঁড়া তাদের পরোয়া না করে, দল পাকিয়ে মুহুরির মুখের ওপর বলে দিয়েছে, আগে ধানের জমিতে লাঙল দিয়ে তারপর তারা নীলের জমি ধরবে...”

সাহেব লম্বায় হাত-পাঁচেক হবে বোধায়। দত্যি-দানোর মতো চেহারা। পাহাড়ের মতো উজিয়ে দাঁড়িয়েছে এসে সামনে। গনগনে চোখ-দুটো সুধন্যর দিকে ধরা।

সুধন্য মাথাটা নিচু করে রেখে, হাতজোড় করে চোখ পিটপিট করছিল। দু’এক ঘা পড়বে বোধ হয় আজ। অবশ্য সময়-সময় সাহেবের শ্রীহস্তের অমন প্রসাদে তাদের সবারই এক-আধটু অভ্যাস আছে এ-কুঠিতে। গোমস্তা হোক কি পাইক, রাগের মাথায় রিচার্ড সাহেবের সামনে সব সমান।

তবে আজ তার কপালটা ভালো যাচ্ছে। চাবুক ধরা হাতটা একবার উঁচোতে গিয়েও সাহেব হঠাৎ কী ভেবে সেটা নামিয়ে নিয়ে হো-হো করে হেসে উঠল। হাসে আর বলে, “রিচার্ডের তালুকে রিভোল্ট? আহা কী সৌভাগ্য! লেটস হ্যাভ সাম ফান টুনাইট এহ্‌...? ওর সঙ্গে আর কে নেতা আছে ওখানে?”

নীরবে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল সুধন্য। সাহেব একবার হেসেছে যখন তখন আর ভয় নেই। উলটে, প্রশ্নটা শুনে মাথায় একটা ফন্দি গজিয়ে উঠছিল তার। মেয়ের বিয়ে দিয়েছে সম্প্রতি। বেহাই মশাইয়ের অঢেল জমিজিরেত। জলুটেও বেশ কয়েক বিঘে জমি আছে। আগের দিন রাতে জামাই কথায়-কথায় বলছিল বটে, তাদের জলুটের জমির ধার ঘেঁষে ও-গাঁয়েরই হরিশ নামে এক ছোকরার বিঘে-দশেক সরেস জমি আছে। ধান ফলে যেন সোনা। জমিটার দিকে জামাইয়ের চোখ পড়েছে। কাজেই সেইটে এই তালে হাতিয়ে নিয়ে জামাইয়ের নামে লিখে দিতে পারলে বেহাইবাড়িতে খানিক মান-ইজ্জত বাড়বে। এই তালে সেইটে করে নেয়া যায়।

“কী হল? জবাব দিচ্ছ না যে!” সাহেবের হাত ফের একবার উঁচুর দিকে উঠছিল। সুধন্য দু’হাতে মাথাটা ঢেকে তাড়াতাড়ি বলল, “আজ্ঞে ওর সঙ্গে তাল দেয় আরেক বদমাশ। হরিশ। হরিশ সাহা। শ্যামলাল সা-র ছেলে। হুকুম হয় তো সেইটেকেও একই সঙ্গে...”

“ব্রিং বোথ অব দেম টু মি... হাত পা বেঁধে...”

মনে-মনে একবার মা বনলক্ষ্মীর মুখটা ভেবে নিল সুধন্য। জোর বাঁচা বাঁচিয়েছেন তিনি আজ সাহেবের মতি ঘুরিয়ে দিয়ে। সেই-সঙ্গে ভালো একটা দাঁও মারবারও সুযোগ করে দিয়েছেন এই তালে। আহা কার মুখ যে দেখে উঠেছিল সে আজকে!

*

গ্রাম ছাড়িয়ে বাঁধ। আরুধি নদীর ধার ঘেঁষে যাওয়া সেই বাঁধ বেয়ে আরও কিছুদূর গেলে আন্ধেরিয়ার মাঠ। এমনিতে সন্ধেবেলা এ-জায়গায় বাঘের ভয়ে জনমনিষ্যির আভাস মেলে না। তবে আজ তার রূপ আলাদা। ইতিউতি মশালের আলো জ্বলেছে সেখানে। মাঠের একপাশে জোড়া বটগাছের তলায় হোগলার ঝোপের পাশে তালপাতায় ছাওয়া নারায়ণীর মন্দিরে আজ পুজো। সারা গ্রাম এসে আজ সেখানে জড়ো হয়েছে তাই।

অবশ্য সারা গ্রাম বলতে আর কতটুক? বিশঘর রায়তের বাচ্চা-বুড়ো মিলে জোর শ’খানেক মানুষ। আজ ঘরে রান্না হবে না কারও। জঙ্গলের কাঠকুটো কুড়িয়ে তাই দিয়ে মাঠেই চালেডালে রান্না, তারপর তারই ভোগ চড়িয়ে প্রসাদ পেয়ে ঘরে ফেরা। এ-পুজোর রাতে হেঁশেলে আগুন জ্বালা মানা।

পাড়ার সব মেয়েরা স্নান করে এলোচুলে গিঁট দিয়ে এসে বসেছে নারায়ণীর পুজোর জোগাড় করতে। ফলফুলুরি কাটা, মালা গাঁথা, শিন্নি ঘোঁটা... কাজ কি একটা!

“কই রে হেম, হল?” সুরভিকাকি ওপাশ থেকে ডাক পাড়ছিল।

“হয়েছে।” কাটা শশার টুকরোগুলো তুলে নিয়ে হেম সুরভির দিকে এগিয়ে দিতে-দিতেই গজগজ করছিল, “তবে কাটা ফলফুলুরি রাখবেটা কোথা? এখনও কলাপাতার খবর নেই যে! বিশেদাদা কী যে করে? সেই কখন গিয়েছে কলাগাছের জোগাড় করতে আর এখনও তার...”

“এসে গেছে, এসে গেছে, একটুকু সবুর রে ভাই...” পেছন থেকে খুশিয়াল গলার একটা শব্দ উঠল হঠাৎ। তারপর সবাইকে চমকে দিয়ে একটা আখাম্বা কলাগাছ এসে পড়েছে মেয়ের দলের পাশে। দা হাতে দাঁড়িয়ে কপালের ঘাম মুছছিল বিশ্বনাথ, “নে, এখন কত কলাপাতা আর কলার খোল লাগবে নিয়ে নে। আমি ওদিকে গিয়ে একবার...”

“এই ছোঁড়া, থাম। চুপটি করে দাঁড়াবি ওখানটা। দৌড়ুবি না একদম।” সুরভিকাকি তার ছেলেকে ধমক দিয়ে উঠল ওপাশ থেকে হঠাৎ। তারপর গলা নরম করে বলে, “গাছটা ক’টা ডুমো করে দিয়ে যা বাবা। নইলে কলার খোল বের করব কী করে?”

“আর কাউকে বলো গে তুমি মা।” দা ফেলে দিয়ে হাঁটা লাগাল বিশ্বনাথ, “সব তো গায়ে ফুঁ দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ওদিকে হরিশ একা-একা উনোন পাতছে দেখে এলাম। এতজনের রান্না!”

“কাউকে লাগবে না কাকি।” হেমাঙ্গিনী হঠাৎ আঁচলটা কোমরে জড়িয়ে উঠে দা-টা কুড়িয়ে নিল, “ও আমিই কেটে নিতে পারব।”

“এই দ্যাখ মেয়ের কাণ্ড! অতবড় গাছটা! কোপাতে গিয়ে হাতের দা ছিটকে এলে শেষে এক চিত্তির।”

উঁচিয়ে ধরা দা-টার ফলায় মশালের আলো ঠিকরে আসছিল। সেটা তুলে ধরে রেখেই হেমাঙ্গিনী হাসল একটু, “ভেবো না কাকি। চাইলে বাঘের মুণ্ডু নামিয়ে দিতে পারি এক কোপে। আর এ তো একটা...”

কথাটা শেষ হল না তার। মাঠের অন্যপাশ থেকে হঠাৎ গোলযোগের শব্দ উঠল একটা। হইচই ছাপিয়ে হরিশের রাগী গলাটা জেগে উঠছিল সেখান থেকে, “পুজোগণ্ডার দিনে গায়ে হাত দেবেন না বলে দিচ্ছি গোমস্তাবাবু! যা বলবার তা পুজোর শেষে...”

কথাটা হঠাৎ মাঝপথেই থেমে গেল হরিশের। হঠাৎ গলাটা স্বরটা একটা দীর্ঘ ব্যথার আওয়াজে বদলে গেছে।

চমকে উঠে চিৎকারটার দিকে একবার ঘুরে দেখল হেমাঙ্গিনী। দাদার গলার শব্দটা একটা চাবুকের ঘায়ের মতো কানে আছড়ে পড়ে তার সব মনোযোগ ঘুরিয়ে দিয়েছে মাঠের ওদিকে জড়ো হওয়া ভিড়ের দিকে।

ততক্ষণে, বিদ্যুতের ঝলকের একটা দৌড়ে, গোলযোগের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে বিশ্বনাথ। উৎসবের শতেক মানুষজন তখন মুছে গেছে তার চোখের সামনে থেকে। সেখানে ভেসে থাকে শুধু একটাই ছবি। হরিশ! তার চুলের মুঠো ধরে দাঁড় করিয়ে রেখে পিছমোড়া করে বাঁধছে দু’জন অন্ধকার মানুষ।

আর তারপর, ভিড়টার কাছে এসে পৌঁছোতে হঠাৎ পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেল তার। পিঠের ওপর একটা কঠিন আঘাত ফুসফুস থেকে তার সবটা বাতাসকে বের করে নিল এক নিমেষে।

মাটিতে ঢলে পড়বার আগেই সাঁড়াশির মতো একজোড়া কঠিন হাত ধরে নিল তার শরীরটাকে। কাঁধদুটো চেপে ধরে তুলে দাঁড় করিয়ে রেখেছে তাকে হাতদুটো। তার মুখের ওপর আছড়ে পড়ছিল কোড়ার ঘা। ঠোঁটে নোনতা স্বাদ পাচ্ছিল সে।

“দাদা-আ-আ রে... বিশুদাদা রে-এ-এ...”

হঠাৎ তীক্ষ্ণ চিৎকারটা শুনে চোখ তুলে তাকাতে এক-মুহূর্তের জন্যে চোখে কেমন যেন ধাঁধা লেগে গেল সুধন্যর। দেবীর থান থেকে চুল উড়িয়ে হাতে চকচকে দা উঁচিয়ে... ও কে!

পরক্ষণেই সম্বিত ফিরে পেয়ে একটা বাঁকা হাসি ফুটে উঠল তার মুখে। শ্যামলালের ছুকরি মেয়েটা। ছোঃ!

রাধু লেঠেল বিশ্বনাথকে ছেড়ে দিয়ে ছুটে আসা মেয়েটার দিকে তাক করে সড়কি উঁচিয়ে ধরেছিল। সেদিকে চোখ পড়তে তাড়াতাড়ি হরিশের চুলের মুঠি ছেড়ে দিল সুধন্য। একে বিশ্বাস নেই। মাথা গরম মানুষ। কথায়-কথায় জান নিয়ে নেবার দোষ ওর রক্তে।

“বেঁধে ফ্যাল বাবারা। বদমাশদুটোকে ভালো করে বাঁধ। পালায় না যেন দেখিস। সায়েব তাহলে আজ আর রক্ষে রাখবে না।” সঙ্গে আসা পাইকদের দিকে ফিরে কথাগুলো বলে নিয়েই, এগিয়ে গিয়ে রাধুর কাঁধে হাত রাখলেন সুধন্য, “সড়কি সামলা রাধু। পুজোর মাঠে ও-সব মেয়েমানুষ খুনোখুনি একদম করবিনি বাবা। দেবীর থান। সেখানে পুজোগণ্ডার রাতে তেনার জাতের কারও প্রাণ গেলে যদি রুষ্ট হন তখন কে বাঁচাবে বল? এখন শুধু আটকে দে। উপস্থিত ছোঁড়াদুটোকে নিয়ে মানে-মানে এখান থেকে যেতে পারলে রক্ষে!”

রাধু মুচকি হাসল। তারপর সড়কিটাকে উল্টো করে ধরে, ছুটে আসতে থাকা মেয়েটার পায়ের দিকে চালিয়ে দিল একবার। হুমড়ি খেয়ে পড়েছে মেয়েটা। হাতের দা’টা ছিটকে পড়েছে একপাশে। তার পিঠের ওপর ভারী একটা পা চাপিয়ে দিয়ে রাধু ঠান্ডা গলায় বলল, “যা করবার তাড়াতাড়ি করেন গোমস্তামশায়। দুটো ছোঁড়াকে ধরতে এসে রাত কাবার হলে রাধু লেঠেলের ইজ্জত নিয়ে টানাটানি পড়বে যে!”

তার সঙ্গী চারজন পাইক ততক্ষণে হরিশ আর বিশ্বনাথকে মাটিতে ফেলে পিছমোড়া করে বেঁধে ফেলেছে। ছ’জন পাইকের বাকি দলটার উঁচিয়ে ধরা বর্শায় ইতিউতি জ্বলন্ত মশালের আলো ঝিকমিক করছিল। মাঠে হাজির লোকজন সভয়ে পিছু হঠে গেছে। রাধুর দল সড়কির মুখে মানুষে-পশুতে তফাৎ করে না।

*

রাত বেড়ে ওঠে। একে একে সবাই ফিরে গেছে যার-যার ঘরে। শুধু ফেরেনি হেমাঙ্গিনী, আর বিশ্বনাথের মা সুরভি। পুজো ভেঙে গেছে। নির্জন রাতে বনের পাশের সেই মাঠে নারায়ণীর মূর্তির সামনে উপুড় হয়ে পড়ে হাউহাউ করে কেবল কেঁদে যায় সুরভিকাকি। আর, তার পিঠে হাত রেখে পাথরের মতো বসে থাকে হেমাঙ্গিনী। চোখের জল শুকিয়ে গেছে তার। সেখানে কোনও অজানা আগুন ধিকিধিকি করে জ্বলে।

প্রহরের পর প্রহর বয়ে যায়। শেষরাতের ঠান্ডা হাওয়া ছাড়ে। নদীতে জল খেতে আসা বন্য জীবের দল উঁকি মেরে দেখে যায় দুঃখী মানুষ-দু’জনকে। সব দুঃখ-ভোলানো ঘুম এখন তাদের চোখে ছেয়ে গিয়েছে। তাদের চোখের জলে ভাসা মুখ-দুটোর ওপর শেষরাত্রের চাঁদ আলো ফেলে...

*

“নামিয়ে আন ওটাকে।”

বাইরে তৃতীয় প্রহরের শেয়াল ডাকছিল। কোঁতঘরের এক কোণে চুপচাপ বসে ছিল হরিশ। নিয়ে আসবার পর একচোট মারধোরের শেষে সাহেব তাকে ছেড়ে বিশ্বনাথকে নিয়েই পড়েছিল এতক্ষণ। কড়িকাঠ থেকে দড়ি দিয়ে বেঁধে উল্টো করে ঝোলানো বিশ্বনাথের মুখ থেকে হালকা গোঙানির শব্দ বেরিয়ে আসছে শুধু।

“কী রে কেলে ভূত, কথা কানে গেল না?”

পিঠের ওপর বুটপরা পায়ের লাথি পড়েছে একটা। আচ্ছন্নের মতো টলতে-টলতে উঠে দাঁড়াল হরিশ। তাকে ঘিরে আবছায়া মুখগুলো রাক্ষসের মতন হাসছে, রঙ্গ-রসিকতা করে চলেছে।

মাঝে-মাঝেই গায়ে-মাথায় ঝরে পড়া কিল-চড়গুলোয় আর তেমন সাড় জাগছিল না তার। টানতে-টানতে তাকে নিয়ে গিয়ে বিশ্বনাথের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে কারা যেন। যন্ত্রের মতো তার দুটো হাত বিশ্বনাথকে বেঁধে রাখা দড়িটার গিঁটে টান দিল একটা।

ধপ করে শরীরটা মাটির ওপরে এসে পড়েছে। ঘামে, রক্তে, মাটিতে মাখামাখি চেহারাটাকে বিশে বলে চেনা যায় না আর।

“আদর একটু বেশিই হয়ে গেছে বোধায় ছায়েব। শ্বাস চলছে, তবে এ বোধ হয় আর বেশিক্ষণ...”

“ও নো নো সুধন্য। এদের জান বহোত কড়া।” বলতে-বলতে রিচার্ড এগিয়ে এসে বিশ্বনাথকে ধাক্কা দিয়ে উলটে দিল। একতাল মাটির মতোই গড়িয়ে গেল তার শরীরটা।

খানিকক্ষণ তার গায়ে মুখে হাত চালিয়ে সাহেব যখন উঠে দাঁড়াল তখন তার মুখে খানিক দুশ্চিন্তার ছায়া নেমেছে। মাথা নেড়ে বলে, “কথাটা ভুল বলনি হে। লক্ষণ সুবিধের বলে মনে তো হচ্ছে না। এটাকে গায়েব করে দিতে হবে হে গোমস্তা।”

মৃদু হেসে সুধন্য মাথা নাড়ল, “এ আর এমন কী কথা ছায়েব। ও গায়েব করার কায়দা আমি আগেই ভেবে রেখিছি। সব বন্দোবস্ত হয়ে যাবে। আপনি ভাববেন না। তা এবারে এই দু-নম্বরটিকে সিংহাসনে চাপাই? রাত তো কাবার হয়ে এল প্রায়!”

কথাগুলো তার মুখ থেকে বের হতে না হতেই বিশ্বনাথের শরীর থেকে খুলে নেয়া দড়িগাছা নিয়ে হরিশের দিকে এগিয়ে এসেছিল অসমঞ্জ পেয়াদা। তাকে হাত নেড়ে নিষেধ করল রিচার্ড। এদেশি লোকগুলো নিজের জাতের রক্তের গন্ধ পেলে উলসে ওঠে। কাণ্ডজ্ঞান থাকে না। কিন্তু তাকে অনেক হিসেব করে চলতে হয়। খুলনা সদরে নয়া বাঙালি ডেপুটি এসেছে। পান থেকে চুন খসলেই সুন্দরবন এলাকার তাবৎ নীলকুঠির হাড় জ্বালিয়ে ছাড়ছে। এই অবস্থায় দলের পাণ্ডাটাকে যে সরানো গেছে সেটুকুই যথেষ্ট। অন্যটাকে একই রাস্তায় পাঠালে সামলানো দায় হয়ে উঠতে পারে। এর অন্য বন্দোবস্ত করতে হবে। অন্য কিছু...

ভাবতে-ভাবতে নিঃশব্দ একটা হাসি ছেয়ে যাচ্ছিল তার মুখে। সেই ভালো। এই হরিশটাকে দিয়ে গোটা গ্রামটাকে একটা শিক্ষা দিতে পারলে...

“এটার মাথার চুল চেঁছে ফ্যাল। খানিক মাটি আর গোটাকতক নীলের চারা জোগাড় করে আন। তারপর দেখছি।” বলে হরিশের দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে সুধন্যর দিকে ফিরল রিচার্ড, “গায়েব-টায়েব যা করবার সাবধানে সেরো সুধন্য। বঙ্কিম চাটুজ্জে টহলে বেরিয়েছে জানো তো? বাগেরহাট পুলিশচৌকিতে থানা দিয়েছে এসে। এখান থেকে দশ মাইলও না। টের পেলে...”

দু’জন পাইক মিলে একটা বড়সড়, খালি বেতের প্যাঁটরা বয়ে আনছিল ঘরের মধ্যে। সেইটার দিকে দেখিয়ে নিঃশব্দে হাসল সুধন্য, “কিচ্ছু ভাববেন না ছায়েব। প্যাঁটরায় ভরে বজরায় তোলার বন্দোবস্ত করে দিচ্ছি। ওখানে দিনের বেলাটা পড়ে থাক। তারপর রাতের বেলা মাঝনদীতে নিয়ে গিয়ে ফেলে দিয়ে এলেই হল। কাকপক্ষীতে টের পাবে না। ও আমি ব্যবস্থা করে দিচ্ছি...”

*

ডুম... ডুম... ডুম...

ঢাকের বাদ্যি ভেসে আসছিল কোথা থেকে। আর তারপরই সে শব্দকে ছাপিয়ে উঠল একটা তীক্ষ্ণ গলার আওয়াজ, “ওরে আমার বিশে রে... কোথা গেলি বাপধন আমার? ও বাবা হরিশ, সত্যি করে বলো বাবা! শেষ তারে দেখলে যখন, শ্বাস চলছিল? কোথায় নিয়ে গেল ওরে? কথা বলো বাবা...”

চিৎকারটা কানে যেতে ধড়মড় করে উঠে বসল হেমাঙ্গিনী। সকাল হয়ে গেছে কখন যেন। খানিক দূরে, কাল যেখানে ভাত রাঁধবার উনুন খোঁড়া হচ্ছিল সেখানে বিরাট একটা জটলা। ওর মধ্যে থেকে সুরভিকাকির আছাড়ি-পিছাড়ি কান্নার শব্দ ভেসে আসছিল।

হঠাৎ গতরাত্রের সবটা স্মৃতি ফিরে আসতে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে সিধে হয়ে বসল সে। দাদা! দাদা ফিরে এসেছে! আর বিশেদাদা...?

ভিড়ের মাঝখানে হরিশ চুপ করে দাঁড়িয়েছিল। সারা শরীরে মারের দাগগুলো সোঁটা-সোঁটা হয়ে ফুলে উঠেছে তার। তাকে দু’দিক থেকে ধরে দুটো পাইক পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে। মাথার কাঁধ অবধি নামা কোঁকড়া চুলের রাশ মুড়িয়ে কেটে দিয়েছে। সেখানে একতাল মাটি চাপিয়ে একটা ময়লা ন্যাকড়া দিয়ে ঠেসে বাঁধা। তার মধ্যে মাথা উঁচিয়ে আছে দু’টি নীলের চারা।

ঢোলওয়ালা ফের ঢোলে ঘা দিল।

ডুম... ডুম... ডুম...

“শোনো শোনো গ্রামবাসীগণ! রিচার্ড সাহেবের হুকুম, নিজ-নিজ ধানজমি চষিবার আগে দাদন নেওয়া নীলের জমিতে লাঙল দিতে হইবে-এ-এ-এ-ক। হুকুম অমান্য করিলে সাহেব নিজ হাতে তাহার শাস্তিবিধান করিবে-এ-এ-ন...”

হরিশের কাছে ঘেঁষতে যেতে একটা পাইক তাকে আটকাবার চেষ্টা করেছিল। হেমাঙ্গিনীর গায়ে তখন অসুরের শক্তি ভর করেছে। পাইকটাকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিয়ে সে গিয়ে জড়িয়ে ধরেছে তার দাদাকে। বুকে মুখ গুঁজে দিয়ে দু’চোখের জলে ভাসিয়ে দিচ্ছে তার শরীর। তার পিঠের ওপর বৃষ্টির মতো লাঠির ঘা পড়ছিল। কিন্তু সে’সব কিছু তখন আর টের পাচ্ছিল না হেমাঙ্গিনী।

“হেম...”

ফিসফিসে গলার ডাকটা শুনে মুখ তুলে দাদার দিকে তাকাল হেমাঙ্গিনী। মাথা থেকে মাটিগোলা জলের স্রোত নেমে এসে সারা মুখে মাখামাখি হয়ে গেছে দাদার।

পেছন থেকে দু’জোড়া হাত তাকে প্রাণপণে টেনে ছিঁড়ে নিয়ে যেতে চাইছিল। হরিশের শরীরটাকে আঁকড়ে ধরে সে-টানের সঙ্গে যুঝতে-যুঝতেই সে বলল, “কী দাদা? আমায় বল...”

“বা... বাগেরহাট থানা... আঃ... চাটুজ্জে হাকিম... তাঁর কাছে যাস...”

হঠাৎ একটা হ্যাঁচকা টান তাকে ছিটকে ফেলে দিল দাদার থেকে অনেকটা দূরে। মাটিতে আছড়ে পড়ে, ঝাপসা চোখে সে দেখছিল, দড়ি বাঁধা হরিশকে টানতে-টানতে নিয়ে চলেছে পেয়াদার দল। গ্রামের পথে-পথে তাকে নিয়ে ঢোল দিতে-দিতে দেখিয়ে চলেছে রিচার্ড সাহেবের হুকুম না-মানবার ফল। আর, তাদের পেছনে আছাড়ি-পিছাড়ি কাঁদতে-কাঁদতে চলেছেন বৃদ্ধা সুরভি। তাঁর ছেলেটা হরিশের সঙ্গে ফিরে আসেনি।

সে-দিকে তাকিয়ে প্রাণপণে ঠোঁটদুটো কামড়ে ধরে চোখের জল আটকাল হেমাঙ্গিনী। শাড়ির কাদা-মাখা আঁচলে চোখ-দুটো মুছে নিয়েছে সে। কাঁদবার সময় এ নয়। একটা কাজ দিয়েছে তাকে তার দাদা। এক-চিলতে আশার আলো। হয়তো তাতে কাজ হবে কোনও। হয়তো...

গোটা গ্রাম একত্র হয়ে চলেছে পেয়াদাদের পিছু-পিছু। হেমাঙ্গিনীর দিকে কারও নজর ছিল না সেই মুহূর্তে। সবার নজরের আড়ালে আস্তে-আস্তে মাঠ ছেড়ে নদীর বাঁধে গিয়ে উঠল হেমাঙ্গিনী। ওপাশে ছিটে জঙ্গলের ঝোপের মধ্যে দিয়ে খাড়া পাড় নদীর বুকে ঘাটের কাছে গিয়ে নেমেছে। ঝোপঝাড়ের আড়ালে গুটি-দুয়েক শালতি দেখা যায় সেখানে।

সাবধানে পাড় বেয়ে নেমে একটা শালতির দড়ি খুলে দিল সে। তারপর দু’হাতে দুটো বৈঠা নিয়ে ভেসে পড়ল আরুধি নদীর অথই জলে। বাদার দেশের মেয়ে। নদীকে সে ভয় করে না। ভাঁটা চলছে এখন। স্রোতে ভেসে বাগেরহাট বেশি দূরের পথ হবে না।

তেইশ-চব্বিশ বছরের মানুষটা বয়েসের তুলনায় গম্ভীর। এই মুহূর্তে পুলিশ চৌকির সবচেয়ে বড় ঘরটায় রাইটিং ডেস্কের সামনে বসে তাঁর আপাত শান্ত দুটো চোখে তখন বিদ্যুৎ খেলে যাচ্ছে। সামনে খানিক লিখে সরিয়ে রাখা পাণ্ডুলিপিটার পাতা হাওয়ায় ফরফর করে উড়ছিল। সেদিকে তখন তাঁর নজর নেই। গল্প লেখবার সময় এ নয়। মেঝেয় বসে মাথা নিচু করে ফোঁপাচ্ছিল মেয়েটা। সেদিকে একনজর তাকিয়ে নিয়ে সদ্য লেখা চিঠিটা হাতে করে গম্ভীর গলায় মানুষটা হাঁক দিলেন, “অবিনাশ!”

লম্বামতো একজন উর্দিপরা মানুষ এসে হাতজোড় করে দাঁড়ালেন। বয়সে তিনি হাকিমের দ্বিগুণেরও বেশি হবেন। কিন্তু চাটজ্জে হাকিমের সামনে চোখ তুলে তাকায় এতবড় বুকের পাটা এ-অঞ্চলে খুব বেশি মানুষের নেই। এমনকি সে-মানুষ বাগেরহাট থানার জাঁদরেল দারোগা অবিনাশ গুপ্ত হলেও নয়।

“এই চিঠি মহকুমা সদরে ম্যাকওয়ার্থসের কাছে পাঠাবার বন্দোবস্ত করো। চিঠি পাওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে চল্লিশজন সোলজার যেন রওনা হয়ে যায় জলুটের দিকে।”

হাতে করে চিঠিটা নিয়ে বেরিয়ে যাবার উদ্যোগ করছিলেন অবিনাশ, তখন তিনি ফের তাকে ডাকলেন পেছন থেকে, “সেপাই ক’জন আছে থানায়?”

“আজ্ঞে বারোজন।”

“বন্দুক?”

“দু’খান।”

“তৈরি হও। দুটো ছিপনৌকার বন্দোবস্ত কর। কাল ভোর হবার সঙ্গে-সঙ্গে আমরা জলুট যাব।”

“হুজুর ফৌজ আসবার জন্য অপেক্ষা করলে...”

“ভয় পাচ্ছ অবিনাশ?” হঠাৎ মানুষটার গলায় যেন গুরুগুরু বাজ ডেকে উঠল, “এই মেয়েটার দিকে দেখ। ওর ভাইকে যা করেছে রিচার্ড তা তো নিজের কানেই শুনলে! পাশাপাশি, ওর গ্রামেরই আরেকটা ছেলেকে মেরে তার লাশ গুম করে দিয়েছে। তোমার দেশের একটা গোটা গ্রামের ওপর পশুর মতো অত্যাচার করছে একটা ভিনদেশি লোক, আর তুমি এ-দেশের মানুষ হয়ে...”

মানুষটার রুষ্ট মুখের দিকে তাকিয়ে একটু থতমত খেয়ে গেলেন অবিনাশ। তারপর সামলে নিয়ে বললেন, “ভুল হয়ে গেছে। আমি এদিকের সব বন্দোবস্ত দেখছি হুজুর...”

বলতে-বলতে তটস্থ হয়ে বের হয়ে গেলেন অবিনাশ দারোগা। পাগলা হাকিম যে এক্ষুনিই বেরিয়ে পড়বে বলেনি সেইটুকু রক্ষে। তাহলে আর কিছুই বাঁচানো যেত না! রাতটুকু সময় পাওয়া গেছে। রিচার্ড সাহেবকে একটা খবর অন্তত পাঠিয়ে দেয়া যাবে আগে-ভাগে। চাঁপাখালি থানায় পোস্টিং-এর সময় থেকে আলাপ। অনেক নুন খেয়েছেন তিনি রিচার্ডের।

সে চলে যেতে মেয়েটার দিকে ঘুরলেন ডেপুটি চাটুজ্জে। বাদাবনের গহনের কোনও আবাদ থেকে উঠে আসা এই দুঃসাহসী মেয়েটাকে দেখে এত চিন্তার মধ্যেও বিচিত্র একটা গল্পের ভাবনা তাঁর মাথায় আসছে... অরণ্য-ছাওয়া নির্জন কোনও দ্বীপে একলাটি বড় হয়ে ওঠা কোনও মেয়ে...

একটা ঝাঁকুনি দিয়ে মাথা থেকে চিন্তাটা সরিয়ে দিলেন তিনি। এখন কল্পনাবিলাসের সময় নয়। সামনে অনেক কাজ। মেয়েটার দিকে তাকিয়ে কোমল গলায় তিনি বললেন, “ওঠো মা। আমার জন্য যা রাতের রান্না হয়েছে তাই থেকে আমি পেয়াদা দিয়ে দু’টি ডালভাত আনিয়ে দিচ্ছি। ইচ্ছে হোক কি না হোক, খেয়ে নাও। গায়ে শক্তি আনো মা। সামনে এখন অনেক লড়াই আছে যে আমাদের! এখন কান্নার সময় নয়।”

*

সন্ধের মুখমুখ। দূরে কুঠির উঠোনে ধিকি-ধিকি মশালের আলো চোখে পড়ে। হাঁক-ডাক উঠছে সেদিকে। সুধন্য ওদিকেই ব্যস্ত আছে। লোকটা বিপদের সময়ে সামাল দিতে ওস্তাদ। অবিনাশ গুপ্তর লোক চাটুজ্জে ডেপুটির মতলবের খবরটা নিয়ে আসবার সঙ্গে-সঙ্গেই কাজে লেগে পড়েছে। সেদিক থেকে চোখ ফিরিয়ে নিল রিচার্ড। ওরা কাজ করুক, তাকে ততক্ষণে এপাশের অ্যালিবাইটা সাজিয়ে নিতে হবে। ভাবনা-চিন্তাগুলোকে একটু গুছিয়ে নিয়ে বাইরের দিকে মুখ ঘুরিয়ে ডাক দিল সে, “বেটেল কোম্পানির চিঠিটা হল সুধীশ?”

“আজ্ঞে।” রোগাভোগা ছেলেটা একটা কাগজ নিয়ে সেরেস্তা ছেড়ে ভেতরে ঢুকে এসে দাঁড়িয়েছে। কাগজটায় দস্তখত করতে-করতে খোলা দরজা দিয়ে বাইরে দফতরের অন্য লোকজনের দিকে একবার তাকিয়ে নিল রিচার্ড। তারপর গলা তুলে বলল, “শোনো হে। আমি গোমস্তাকে নিয়ে কাল ভোরবেলা ক’দিনের জন্য একটু শিকারে বেরোচ্ছি। সোমবার ফিরব। এর মধ্যে যা চিঠিপত্র আসবে...”

“সে আপনি ভাববেন না হুজুর। আমরা এদিকে সামলে-সুমলে রাখব সব।”

“গুড। বাইরে অপেক্ষা কর। সুধন্যর সঙ্গে কথা বলে তারপর বাড়ি ফিরবে।”

ছেলেটা সরে যেতে সামনে হাতজোড় করে বসে থাকা লোকটাকে রিচার্ড নিচুগলায় জিজ্ঞাসা করল, “সকালে হাকিম রওনা কখন হবে?”

“আজ্ঞে সাহেব, উজানে আসতে হবে। সাতটার জোয়ারের আগে পারবে না।”

“তার মানে এখানে পৌঁছুতে-পৌঁছুতে এগারোটা বাজবে। ফোর্টিন আওয়ার্স। অনলি ফোর্টিন আওয়ার্স...” অস্থিরভাবে হাত ঘসছিল কুঠিয়াল রিচার্ড। হরিশের শয়তান বোনটা কোন ফাঁকে যে পালিয়ে গিয়ে...

তবে, সব প্রমাণ ধুয়ে-মুছে দেবার বন্দোবস্তই করেছে সে এবারে। ডেস্পারেট সিচ্যুয়েশন্‌স নিড ডেস্পারেট মেজার্স।

“ছায়েব।” দরজার কাছে সুধন্য এসে দাঁড়িয়েছে, “বজরা তৈরি। এখন হুকুম হলে...”

হাতের ইশারায় তাকে দরজাটা বন্ধ করতে বলল রিচার্ড। তারপর নিচুগলায় প্রশ্ন করল, “এদিকে সব তৈরি?”

“আজ্ঞে বড় নৌকা ছ’টা জোটানো গেছে। কুলিয়ে যাবে। রাত দু’প্রহরের বাদ রাধু দলবল নিয়ে জলুটে গিয়ে যা করবার করে নেবে। তারপর সবগুলোকে নৌকোয় তুলে বাঁকির খালের মুখে গিয়ে আমাদের জন্য অপেক্ষা করবে।”

“আই উইটনেস ওই হরিশ ছোকরাকে যেন...”

সুধন্য অস্থিরভাবে মাথা ঝাঁকালেন, “সে-সব বন্দোবস্ত করে রাখা আছে হুজুর। যাবার আগে রাধু লটকে দিয়ে যাবে ওটাকে। কিন্তু এখন এইখানে আর দেরি করবেন না। সেরেস্তার কেরানিদের বসিয়ে রেখেছি। নারান মুহুরিকে বলা আছে। পুরোনো লোক। সে তাদের শিখিয়ে-পড়িয়ে নেবে। আমরা বরং এইবারে এগিয়ে যাই। বজরায় বিশে-র শরীরটা তোলা আছে। কপাল ভালো এখনও প্রাণটা যায়নি ছোকরার। নইলে সারাদিনে পচে গন্ধ উঠে লোক জানাজানি হয়ে যেত। সিঁদুরখালি পৌঁছে, এর একটা হিল্লে করে কাল ভোর-ভোর বাঁকির খালের মুখে গিয়ে রাধুর দলের সঙ্গে মিলব একেবারে...”

“হুম। কড়া জান। কিন্তু সিঁদুরখালি কেন? বলছিলে তো মাঝনদীতে গিয়ে...”

“আজ্ঞে সে ঠিক। তবে ভাবছিলাম কী, উপায় থাকতে নিজে-হাতে মানুষ মেরে কাজ কী হুজুর!” সুধন্য হাত কচলাল, “তা-ছাড়া বলা যায় না, জলে ভেসে শরীরটা যদি কোনওক্রমে পাড়ে গিয়ে লাগে তাহলে জানাজানি হবার ভয় থাকবে একটা। তার চেয়ে ও-ভারটা বাবা দক্ষিণরায়ের হাতে ছেড়ে দেয়াই ভালো। সিঁদুরখালিতে তেনার সাক্ষাত অধিষ্ঠান। দু-ঘড়ি যেতে-না-যেতে হাড়মাসের চিহ্নও রাখবেন না কোনও। আমাদেরও পাপ অর্শাল না। কাজও উদ্ধার হল। এখন হুজুর যা হুকুম করেন...”

আসলে মনশ্চক্ষে সিঁদুরখালির জঙ্গলে বাঘের মুখে পড়ে ছোকরার দশাটা ভেবে ভারি উত্তেজিত বোধ করছিল সুধন্য। সড়কির খোঁচায় মারলে তো মজাটা এক কথায় শেষই হয়ে গেল।

সাহেবেরও বোধ হয় ব্যাপারটা মনে ধরেছে। হেসে তার পিঠে একটা চাপড় দিয়ে বলে, “ইউ ডেভিল। কথাটা ভালো ভেবেছ। চলো...”

*

সেই কালরাত্রিতে আরুধির অকূল স্রোত পেরিয়ে সাহেবের আলো-নেভানো বজরা যখন উল্টোদিকের সিঁদুরখালির জঙ্গলের দিকে এগিয়ে চলেছে, ঠিক তখন ঘুমন্ত জলুট গ্রামের ধারে এসে থেমেছিল ছ’টা বড়-বড় নৌকা। তার থেকে নেমে আসা যমদূতের দল কালো কাপড়ে মুখ ঢেকে, সড়কির ডগায় গ্রামটার সমস্ত বাসিন্দাকে একত্র করে এনে ভরে দিয়েছিল ছ’খানা বিশাল নৌকার খোলে। তারপর নদীতে ভাঁটির টান লাগতে যখন তারা নৌকো খুলে দিয়েছে দক্ষিণের অকূল দরিয়ার পথে বাঁকির খালের দিকে, তখন জনহীন গ্রামটার পূজাস্থলের বিরাট গাছটার ডালে অন্ধকারে একটা নিরীহ মানুষের শরীর দুলছিল। রিচার্ডের অপরাধের সাক্ষ্য দেবার জন্য আর কোনওদিন মুখ খুলবে না হরিশ।

*

আবাদ ছেড়ে বাদা। বড় নদীদের অজস্র নোনতা শেকড়-বাকড় বাইরের দুনিয়া থেকে এসে সেঁধিয়ে গেছে আর সর্বাঙ্গে। তার দু’পাশে ঝুঁকে থাকা ঘন সবুজ অরণ্যে, হোগলার হলদে-কালো ঝোপে, গোলপাতার ঝাড়ের আড়ালে পদে-পদে মৃত্যুর ছায়া। সেই মৃত্যুভূমির মধ্যে দিয়ে ভাঁটার টানে কলকল করে বয়ে চলা তেমনই এক খালের একধারে কাদায় গেঁথে পড়ে ছিল বেতের বাক্সটা। তার মধ্যে শোয়া নিশ্চল শরীরটার গায়ে হালকা পলির আস্তর জমছে।

অন্ধকারের মধ্যে আর কেউ তার খবর না-পেলেও জঙ্গলের রক্তচোষা কীটপতঙ্গের দল কিন্তু তার উপস্থিতি ঠিকই টের পেয়েছিল। সারা শরীরে তীব্র জ্বলুনি একসময় তাকে জাগিয়ে তুলল দীর্ঘ ঘুমের থেকে।

চোখ চেয়ে মাথার ওপর ফিকে হয়ে আসতে থাকা আকাশটার দিকে খানিকক্ষণ চোখ পিটপিট করে দেখল সে। আর তারপরই হঠাৎ তার শরীর জুড়ে ফিরে এল অনেক অত্যাচারের যন্ত্রণা। কিন্তু... এখানে সে...

তীব্র তেষ্টায় তার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে উঠেছে তখন। সাবধানে... খুব আস্তে-আস্তে বাক্সটা থেকে বের হয়ে এসে খালের জলের মধ্যে মুখ গুঁজরে পড়ল সে। কষাটে নোনতা জল। তবু তা-ই যেন তখন তার কাছে অমৃত।

আস্তে-আস্তে, খুব হালকাভাবে তার মনে পড়ে যাচ্ছিল সব কিছু। কোঁতঘরের সেই নিদারুণ মার! তারপর, দীর্ঘক্ষণ বাদে আধো-চেতনায় একটা বজরার খোলে একটা বাক্সের মধ্যে তার খানিক সাড় ফেরা। তারপর মাঝরাত্রে একদল হাতের টানে বাক্সটা বাতাসে উঠে ছিটকে এসে পড়ল এই জলের ভেতর। তারপর আর কিছু মনে নেই তার।

এক নিঃশ্বাসে অনেকটা জল খেয়ে নিয়ে মাথা তুলে চারপাশে দেখে নিল সে। বাদাবন তার হাতের তেলোর মতন চেনা। সিঁদুরখালির জঙ্গল এ। মরা ভেবেই তাকে ফেলে গেছে ওরা এখানে। বনের পশুর খাদ্য হবার জন্য!

আস্তে-আস্তে হাঁটুজলের মধ্যে উঠে দাঁড়াল বিশ্বনাথ। না। এত সহজে মরবে না সে। সকাল হয়ে আসছে। তার মানে, গোটা রাতটাই তার কেটে গেছে এইখানে অজ্ঞান হয়ে। তবু যখন কোনও ক্ষতি করেনি তার কেউ, তার মানে বনবিবির ইচ্ছে নয় সে মরে। কথাটা মনে হতে একবার হাতদুটো কপালে ঠেকিয়ে নিল সে। জয় মা বনবিবি। জয় বাবা দক্ষিণরায়।

মনটা তার জলুটের দিকে টানছিল। কিন্তু এ-অবস্থায় খাল বেয়ে গিয়ে, আরুধি পেরিয়ে পেরিয়ে সেখানে গিয়ে ওঠবার চেষ্টা করা আর মরণকে নেমন্তন্ন দিয়ে ডেকে আনা একই কথা। বনের ধারে বসত করা মানুষের সহজাত বুদ্ধি তাকে বলে দিচ্ছিল, সেখানে ফিরে যাবার আগে প্রথমে এখানে একটা নিরাপদ, গোপন আস্তানা দরকার তার। আর দরকার মিষ্টি জল। কিছু খাবার।

মাথা ঠান্ডা করে কিছুক্ষণ ভাবল বিশ্বনাথ। আলো ফুটছে আস্তে-আস্তে। গাছে-গাছে পাখির ঝাঁক দেখা যায়। সেই কোন কিশোরবেলা থেকে মধুর খোঁজে, গোলপাতার সন্ধানে এ-বনের অলিগলিতে তার যাতায়াত। সে জানে, এই খাল ধরে ধরে এগোলে আরুধির ধারা পাওয়া যাবে। সিঁদুরখালির বেশ খানিক দক্ষিণে আরুধির বুকে চারামারির চর জেগেছে। সে-চরের থেকে খানিক ভাঁটিতে একবার মধুর খোঁজে এসে জঙ্গলের ভেতর পুরোনোকালের ভাঙা ঘরদোর দেখেছিল তারা। বাউলে তাদের সেখানে নামতে দেয়নি। জলও নিতে দেয়নি এলাকার মাঝখানের মিঠে জলের আধমজা পুকুর থেকে। নাকি জিন-পরির দোষ আছে ও জায়গায়। তাদেরই শাপে নাকি এ-জায়গা শহর থেকে জঙ্গল হয়ে গিয়েছিল এককালে।

কথাটা মনে হতে, খালের ধার ধরে হাঁটতে-হাঁটতেই একটু হাসল বিশ্বনাথ। জলুটের লোকজন, কিংবা খোদ রিচার্ড সাহেবও তাকে এখন দেখলে তো ওই জিন-পরিই ভাবত। নিজেই তো সে এক বেঁচে-ওঠা মড়া। তবে আর তার ভয়টা কাকে?

দূরে, জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে আরুধির ধারা দেখা যাচ্ছিল। নদীর পাশে কেওরা গাছের দল খাড়া মাথা উঁচিয়েছে আকাশের দিকে। সেদিকে তাকিয়ে খিদেটা হঠাৎ মাথা-চাড়া দিয়ে উঠল বিশ্বনাথের। কেওরার ফলগুলো টোকো, কিন্তু তবু, পেটে তো কিছু পড়বে! তা-ছাড়া উঁচু থেকে অনেকটা দূর অবধি নজর চালিয়ে চরের সন্ধানটাও সহজেই মিলে যেতে পারে।

তা সে-সন্ধান পেল বিশ্বনাথ। দক্ষিণে। কয়েক ক্রোশ দূরে। তারপর সেখানে পৌঁছোবার রাস্তার মোটামুটি একটা আন্দাজ করে, কোঁচড়-ভরা কাঁচা-পাকা কেওরার রাশ নিয়ে নীচের দিকে নামতে যাবে তখন হঠাৎ নদীর বুকে একটা ব্যাপার দেখে এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয় গেল সে। বহুদূর দক্ষিণে ছ’টা বিশাল বিশাল নৌকা পাল উড়িয়ে ধীরগতিতে ভেসে চলেছে সমুদ্রের দিকে। তাদের আগে-আগে ভেসে চলা নীল রঙের ফোঁটাটাকে সে চেনে। রিচার্ডের বজরা!

*

“ওগো তোমরা আমায় আটকিও না। আমি যাই গো...” নৌকোটা ঘাটের কাছে লাগতে-না-লাগতে কাঁদতে-কাঁদতেই নীচের থকথকে কাদার ওপর লাফ দিয়ে পড়েছে মেয়েটা। তারপর কাদা ভেঙে উঠে ছুট দিয়েছে তার গ্রামের দিকে।

আর তাকে কেউ বাধা দিল না। দূর থেকে যখন প্রথম বাঁকের মুখে জলুটের ঘাট দেখা দিয়েছিল, তখন তার পেছন থেকে আকাশের দিকে পাকিয়ে ওঠা ধোঁয়া দেখে গহীন গাঙেই ঝাঁপ খেতে চেয়েছিল মেয়েটা। নৌকার ধীরগতি তার অসহ্য হয়ে উঠেছিল। অনেক কষ্টে তাকে নৌকো পাড়ে ভেড়া অবধি আটকে রাখা গেছে।

সেপাইরা নীচে নেমে এসে হাকিমের নামবার জন্য কাঠের একটা তক্তা বিছিয়ে দিয়েছে কাদার ওপর দিয়ে। শরীরের ভারসাম্য রেখে সেই বেয়ে এগিয়ে শক্ত মাটিতে পা দিতে-না-দিতেই একটা তীক্ষ্ণ চিৎকারে শান্ত নদীর পাড়টা খানখান হয়ে গেল, “ওরে দাদা-আ-আ-আ, দাদা-আ-আ রে...”

নৌকো পাড়ে বেঁধে রেখে সেপাইয়ের দল ছুটেছে আগে-আগে। হাকিমসুলভ গাম্ভীর্য ভুলে তাদের পেছন-পেছন ছুটে গেলেন তিনি নিজেও। আর তারপর সামনে খুলে যাওয়া দৃশ্যটা দেখে তাঁর কঠোর চোখদুটোও ভিজে উঠল।

অরণ্য-ছড়ানো মাঠগুলোর মাঝখানে এক-জায়গায় জড়ো হয়ে থাকা ঘরগুলোর ছাই থেকে তখনও ধোঁয়ার ফিতে উঠে যাচ্ছে মেঘহীন আকাশের দিকে। নদীর ধারে বড়-সড় একটা মাঠের প্রান্তে একটা জোড়া-বটগাছ। তার নীচে দাঁড়ানো ছোট্টো মন্দিরটার পাশে বটগাছের ডাল থেকে ঝুলতে থাকা একটা শরীরের পা-দুটো হাতে আঁকড়ে ধরে প্রাণপণে চিৎকার করে চলেছে মেয়েটা। দু’হাত ভরা রুপোর কাঁকন, তার দাদার ভালোবাসার দান, সে-কাঁকন কপালে মেরে রক্তগঙ্গা বইয়ে চলেছে...

*

“আজ্ঞে আমি কিছু জানি না হুজুর।”

রিচার্ডের নীলকুঠির বারান্দায় হাকিমের এজলাশ বসেছে। কুঠির এদিক-ওদিক খানিক তল্লাশি নেয়া শেষ হতে এইবার ডাক পড়েছে তাঁর। বৃদ্ধ মুহুরি নারানবাবু হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে কাঁপছিলেন। আগের রাতে যা-যা ঘটেছে তার খানিক খবর কেরানি অনন্তর কাছে তিনি সকালবেলা কাজে এসেই পেয়েছেন। আর তারপরেই লালপাগড়ি সঙ্গে নিয়ে স্বয়ং হাকিমের আবির্ভাব।

“মিছে কথা বলবেন না। জলুট গ্রামে কী ঘটেছে আপনি জানেন না?”

“আজ্ঞে আমি হুকুমের চাকর হুজুর। ভোর-ভোর কাজে আসি সেই মেন্দি থেকে চারক্রোশ পথ উজিয়ে। বিকেল চারটে অবধি মাথা গুঁজে কাজ করে ঘরে যাই। কালকেও তেমনই কাজ সেরে ঘরে গেছি। আর আজ এসে...”

“তোমার কুঠিয়াল কোথা?”

“এজ্ঞে, সেই কথাই বলতে যাচ্ছিলাম হুজুর। সক্কাল-সক্কাল দপ্তরে এসে দেখি বন্দুক-বান্দাক টোপা-টাপা পরে সাহেব তৈরি। সঙ্গে পেয়ারের কুকুরটাকেও নিয়েছেন। বুঝলাম শিকার খেলতে যাবার শখ হয়েছে। মাঝে-মধ্যেই হয়। তখন বজরা নিয়ে বাদাবনের আঁদাড়ে-পাঁদাড়ে গিয়ে ঘুরেফিরে আসেন। মাঝে-মধ্যে হরিণ-টরিনও মেরে আনেন। একবার হুজুর একটা কেঁদো বাঘও মেরে এনেছিলেন।”

“কোনদিকে গেছেন?”

“সে কি আর আমাদের মতন সাধারণ মনিষ্যিকে বলে যাবেন হুজুর? বললেন, দিন-তিনেক পরে ফিরবেন। গোমস্তামশাইও সঙ্গে গেছেন।”

মুখটা গম্ভীর হয়ে উঠছিল হাকিমসাহেবের। খানিক দূরে অবিনাশ দারোগা বিনয়ে অবনত হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। লোকটাকে তিনি বিশ্বাস করেন না। বুঝতে পারছিলেন, গত-রাত্রেই কোনওভাবে খবরটা পৌঁছে দিয়েছিল এ রিচার্ডের কাছে। তারপর, কুঠির লোকগুলোকে শিখিয়ে-পড়িয়ে নিজের জন্য নিখুঁত অ্যালিবাই তৈরি করে সব প্রমাণ লোপাট করে দিয়ে গেছে রিচার্ড। কিন্তু...

হঠাৎ অবিনাশের দিকে ঘুরে তাকালেন তিনি, “পোড়া ঘরবাড়িগুলোর মধ্যে কোনও মানুষজনের চিহ্ন...”

“আঁতিপাতি করে খোঁজা হয়েছে হুজুর, আঁতিপাতি করে। কিন্তু কী যে জাদুর খেলা হয়েছে এখানে... একটাও মানুষের পোড়া এক-টুকরো হাড়েরও চিহ্ন মেলেনি এখনও।”

*

রোদ চড়ে উঠেছে। বাড়িগুলোর পোড়া স্তূপে এখনও ধিকিধিকি আগুন জ্বলে। তল্লাশি শেষ করে পুলিশের দল কুঠির দিকে ফিরে গেছে অনেকক্ষণ আগে। হাকিমের এজলাশ চলছে এখনও সেখানে। সেখানে কী হয়-না-হয় তাতে আর কোনও আগ্রহ নেই তার। একলা মেয়েটা পাগলের মতো শুধু সেই পোড়া ছাই হাঁটকে ফেরে। কেউ নেই! কোনও জাদুতে গ্রামের সবক’টা মানুষকে একেবারে লোপাট করে দিল ওরা? এই গ্রামে তার জন্ম। এর প্রতিটা ঘরের প্রত্যেক মানুষের সঙ্গে তার নাড়ীর টান। সেই প্রিয় ঘরগুলোর ছাই উড়িয়ে সে হাপুস চোখে কাঁদছিল আর চিৎকার করে ডেকে চলেছিল একেকজনের নাম ধরে।

কোথায় যায় এখন হেমাঙ্গিনী? কী করবে সে? বেঁচে থেকে আর লাভ কী রইল তবে? ছাই হাতড়াতে-হাতড়াতে তার হাতে এসে ঠেকেছিল আগুনে পোড়া দা একখানা। একসময় খোঁজা শেষ করে সেইখানা হাতে করে আরুধির দিকে ফিরে চলল সে। আজ গলায় দা দিয়ে মা আরুধির জলেই তবে...

কিন্তু মরা আর তার হল না। সুঁদুরিগাছের শুলো টপকে কাদা মাড়িয়ে আঘাটা দিয়ে কোমর জলে গিয়ে দাঁড়িয়ে গলায় দা তুলতে গিয়েই হঠাৎ তার চোখ পড়েছে দূরে ঘাটে বাঁধা হাকিমের নৌকার দিকে। ফাঁকা নৌকোর মাথায় একটা সেপাই! কাঁধে বন্দুক নিয়ে পাহারা দিচ্ছে একলা-একলা। হঠাৎ মাথার মধ্যে যেন হাজারটা গলা ধমক দিয়ে উঠল হেমাঙ্গিনীর। ওই অস্ত্রটা তার চাই! একদিন ওই অস্ত্রটা নিয়ে সে রিচার্ডের সামনে গিয়ে দাঁড়াবে! দাঁড়াবেই...

দা দিয়ে গাছ থেকে শক্তপোক্ত একটা বাঁকামাথা ডাল কেটে নিল সে। তারপর কোমরে দা’টা গুঁজে নিয়ে ডাল হাতে করে জলে ঝাঁপ দিল। ভাঁটা শুরু হয়েছে। কাদাগোলা জলের তীব্র টান তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় নৌকার দিকে...

তার দিকে পেছন করে গ্রামের দিকে তাকিয়ে থাকা সেপাইটা টেরও পেল না কখন জল থেকে নিঃশব্দে ভেসে ওঠা ডালের বাঁকা মাথাটা তার পায়ের দিকে এগিয়ে এসেছে! একটা হ্যাঁচকা টান! তারপর জলের মধ্যে আছড়ে পরে ভেসে যেতে-যেতে সে হঠাৎ খেয়াল করেছিল তার পাশে সকালে নৌকোয় করে আসা সেই মেয়েটার মুখ। একটা হ্যাঁচকা টানে তার বন্দুকটা ছিনিয়ে নিয়ে মেয়েটা ভেসে চলে গেল অন্যদিকে। তাকে আটকাতে পারেনি সে। নদীয়া জেলার মানুষ। পেটের দায়ে বনবাদারে চাকরি করতে এলেও সুন্দরবনের নদী তার চেনা জায়গা নয় এখনও। কোনওমতে প্রাণটা বাঁচিয়ে খানিক বাদে হাঁচোড়-পাঁচোড় করে যখন পাড়ে উঠে এল সে, ততক্ষণে স্রোতের সঙ্গে যুঝতে-যুঝতে আরুধির মাঝখানে পৌঁছে গিয়েছে হেমাঙ্গিনী। তার লক্ষ্য উল্টোদিকের গহীন সিঁদুরখালির জঙ্গল।

জল! শুধু জল চারদিকে। বাংলার মাটি ধুয়ে অজস্র নদী আর তাদের শেকড়-বাকড়েরা গভীর অরণ্য পেরিয়ে এইখানে এসে নিজেদের মিশিয়ে দিচ্ছে সমুদ্রের জলে। বইতে-না-পারা পলির ভার জমে এখানে দেখতে-দেখতে গজিয়ে ওঠে কত নাম-না-জানা দ্বীপ। কত দ্বীপ আবার নদীদের খামখেয়ালিপনায় ভেঙেচুরে মিশে যায় নদীরই জলে। সেই ভাঙাগড়ার খেলা এখানে হয়ে চলেছে চিরটাকাল ধরে।

তেমনই একটা সদ্য গড়ে ওঠা দ্বীপ একলা-একলা জেগেছিল আরুধির মোহনা থেকে খানিক দূরে। এখনও তার বুকে জঙ্গল তার সম্পূর্ণ রাজত্ব ছড়ায়নি। সুঁদুরি, গরান, গেঁওয়ার জঙ্গলের ফাঁকে-ফাঁকে এখনও এখানে খানিক-খানিক বালিয়াড়ি বেঁচে আছে।

তবে বেশিদিন আর এ-দ্বীপ এমন নির্জন থাকবে না। সভ্য দুনিয়ার নাগালের অনেক বাইরে গজিয়ে ওঠা এই জমিটার দিকেও নজর ঠিকই পড়েছে মানুষের। দ্বীপের উল্টোদিকটায়, বনের গা ঘেঁষে বয়ে চলা খালের ধারে সবার চোখের আড়ালে কয়েকটা চালা তুলে আশ্রয় নিয়েছে কয়েক ঘর জেলে। নদীর মাছ, বনের ফল আর ক্বচিত কখনও শিকার করা শজারু কি খরগোশ তাদের খিদের খাবার জোটায় এখন। তবে হ্যাঁ, সঙ্গে নিয়ে আসা বীজধান ছড়াবার জন্য খানিক জমি তারা পরিষ্কার করে রেখেছে জঙ্গলের মধ্যে। বর্ষা নামলে পরে উর্বর নতুন মাটিতে ছড়িয়ে দেয়া সে বীজ হয়ত খুব শিগগিরই তাদের একবেলা ভাতের আস্বাদও দেবে।

আজ তাদের বসতিতে একটাও আলো জ্বলেনি। দ্বীপের উল্টো ধারে সমুদ্রের দিক থেকে সন্ধের মুখমুখ কয়েকটা বড় নৌকো এসে ভিড়েছে বলে খবর এনেছিল তাদের একজন। এই এলাকার এমন সব দ্বীপে মাঝে-মধ্যেই জলদস্যুরা ঘাঁটি গাড়ে। কাজেই ভয় পেয়েছে তারা। ঝটপট ভেঙে ফেলেছে সরু-সরু ডালের মাথায় চাপানো হোগলার ছাউনি। তারপর বালির ওপর অস্থায়ী সংসারের সব চিহ্ন মুছে দিয়ে, সঞ্চয়ের শুকনো মাছ, ফলফুলুরি যা আছে সব বালির তলায় পুঁতে রেখে জঙ্গলে আশ্রয় নিয়েছে গিয়ে।

সেখান থেকে এগিয়ে গিয়ে তাদের খোঁজারুরা দেখতে পেল, হাতে সড়কি উঁচিয়ে ধরা পাইকদের পাহারায় নৌকাগুলো থেকে একদল মানুষ নেমে এল বালির বুকে। তারপর তাদের সেইখানে রেখে অনুকূল হাওয়ায় পাল উড়িয়ে পাড় ছেড়ে গভীর জলের দিকে সরে গেল নৌকাগুলো।

অসহায় মানুষগুলো হাউমাউ করে চিৎকার করছে। বাচ্চাদের কান্না, জলের পাড়ে দাঁড়িয়ে বড়দের অসহায় অভিসম্পাতে নির্জন দ্বীপ যেন জেগে উঠেছে হঠাৎ।

জেলের দল বুঝল আর বিপদের ভয় নেই কোনও। জলদস্যু নয়, কিছু অসহায় মানুষ কোনও অত্যাচারের শিকার হয়ে এই দ্বীপে এসে উঠেছে।

ঠিক কী হয়েছে মানুষগুলোকে নিয়ে তা তারা জানে না। তবে এ-দেশে দুঃখী মানুষের গল্প তো নতুন কিছু হয় না! সে না-হয় পরে জানা যাবে। এখন প্রথমে এদের সান্ত্বনা দেয়া দরকার। আর, দেয়া দরকার কিছু খাবার। তেষ্টার মুখে জল।

তাদের সর্দারের আদেশে দলের লোকজন জোরপায়ে হেঁটে চলে গেল যেখানটায় বালির নীচে তারা লুকিয়ে রেখেছে তাদের সঞ্চিত খাবার আর মিষ্টি জলের কলসিগুলো। তাদের রওনা করিয়ে দিয়ে সর্দার তার দু’জন বিশ্বস্ত সেথোকে নিয়ে এগিয়ে গেল বালির ওপরে জমা হওয়া হতভম্ব মানুষগুলোর দিকে...

*

হেমাঙ্গিনী হেঁটে যায়। এ-জঙ্গলের কিচ্ছু চেনে না সে। দাদা বড় আদরে মানুষ করেছিল তাকে। মা বাপের অভাব বুঝতে দেয়নি কখনও। পথঘাটের সে আর জানবেই বা কী? আজ দু’-দুটো দিন হয়ে গেল জঙ্গলের কিনারা দিয়ে নদীর ধার ধরে ঘুরে চলেছে সে। নিজেরই অলক্ষ্যে ক্রমাগত এগিয়ে চলেছে দক্ষিণের দিকে। রাত কাটিয়েছে গাছের ডালে বসে। খিদের মুখে গুগলি কাঁকড়া যা জুটেছে কাঁচাই খেয়ে পেটের জ্বালা জুড়িয়েছে।

বন্দুকটা বড্ডো ভারী। আর তা বইতে পারে না হেমাঙ্গিনী। জ্বর এসেছে আগের দিন রাত থেকে। গা পুড়ে যায় তার জ্বরের তাড়সে। তবু, প্রাণে ধরে অস্ত্রটাকে সে ছাড়তে পারে না। গুলিবারুদ কিছু নেই ওতে। কেমন করে ও জিনিস চালাতে হয় তাও সে জানে না। তবু একদিন ও যন্ত্র হতে নিয়ে সে ফিরে যাবেই। গাছের ডালে দুলতে থাকা দাদার মার খাওয়া শরীরটার ছবি তাকে ভূতের মতো তাড়া করে বেড়ায়। দাঁতে শুকনো ঠোঁট কামড়ে সে পাগলের মতো বিড়বিড় করে চলে শুধু, “একদিন...সাহেব...একদিন ঠিক আমি...”

রোদ ঝাঁ-ঝাঁ করছে মাথার ওপরে। হাতের বাঁয়ে হাঁ করে আছে গহীন বন। আহা কী ঠান্ডা ওর ছায়া!

জ্বরের কষ্টে তখন সে ভুলে গিয়েছে, কেন সে এই দু’দিন এড়িয়ে গেছে ওই জঙ্গলকে। ওর ভেতরে পায়ে-পায়ে মৃত্যু ওত পেতে থাকে। সেই ভয়কে ভুলিয়ে দিয়ে সেই জঙ্গল তখন তার ছায়া-ভরা সবুজ আঁচল মেলে তাকে ডাকছিল।

অবশেষে একসময় সেই ডাক আর এড়াতে পারল না হেমাঙ্গিনী। বন্দুকটাকে দু’হাতে ধরে টলতে-টলতে নদীর পাড় ছেড়ে সে এগিয়ে চলল বনের গভীরে। চলতে-চলতে, তার প্রায় হারিয়ে যেতে বসা চেতনা খেয়াল করল না, কখন যেন তাকে ঘিরে থাকা জঙ্গল হালকা হয়ে এল আস্তে-আস্তে। এদিক-ওদিক ছিটে জঙ্গলের ভেতরে এক-আধটা ইটের পাঁজা দেখা যায় যেন। সেগুলোকে ঘিরে লকলকিয়ে উঠেছে ঝোপঝাড়ের দল। মাটি চুঁইয়ে ওঠা জল ধ্বসিয়ে দিচ্ছে তাদের ভিৎ। পুরোনোকালে বন কেটে গড়ে উঠেছিল এই বসত। তারপর একদিন তার বাসিন্দারা তাকে চিরতরে ছেড়ে যাবার পর, জঙ্গল এবারে তার জমিতে সেই দখলদারির শেষ চিহ্নটুকুকে চেটেপুটে মুছে দিচ্ছে।

তবে একেবারে একলা সে ছিল না সেই অজগর জঙ্গলে। তার অলক্ষ্যে সেই ইটের পাঁজাগুলোর আড়ালে তখন আরও একজন তাকে অনুসরণ করছিল। বিরাট শরীরটা নিঃশব্দ লাফের-পর-লাফে এগিয়ে আসে, আর ধীরে-ধীরে ব্যবধান কমিয়ে আনে তার শিকারের সঙ্গে। তারপর, হঠাৎ বিনামেঘে বজ্রপাতের মতো একটা হাঁকার ছেড়ে, হলদে কালো বিদ্যুতের মতো তার দিকে ছুটে এল সুন্দরবনের রাজা...

ডাকটা শুনে চমকে উঠে একটা ইটের পাঁজায় হোঁচট খেয়ে ছিটকে পড়েছিল হেমাঙ্গিনী। কী ঘটছে তা বুঝে নিতে একবিন্দু সময় লাগেনি বাদাবনের মেয়ের। কিন্তু না। ছুটে পালাবার কোনও চেষ্টাই সে করল না। পালাবার জায়গা কোথায় তার এই গহীন জঙ্গলে?

আর কোনও ছটফটানি নয়। লাভ কী তাতে? আশ্চর্য একটা শান্তি ছড়িয়ে আসছিল হঠাৎ হেমাঙ্গিনীকে ঘিরে। আসুক দক্ষিণরায়। আর কোনও বাধা দেবে না সে তাকে।

কিন্তু এ-ভাবে মরণ লেখা ছিল না হেমাঙ্গিনীর কপালে। বাঘ তখন তার ওপর লাফ দিয়ে পড়বার জন্য তৈরি হয়েছে। থাবায় চাপ দিয়ে নিচু হয়ে লেজ আছড়ে চলেছে ক্রমাগত। ঠিক সেই মুহূর্তে, শুয়ে থাকা মানুষটার পেছনের জঙ্গল থেকে একটা অমানুষিক চিৎকার ভেসে এল জঙ্গলের নিস্তব্ধতাকে ভেঙে।

মনোযোগ ভেঙে গেল পশুরাজের। শিকারের দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে পেছনে তাকিয়ে সে দেখল, চিৎকার করতে করতে সেখান থেকে বের হয়ে আসছে আর একটা মানুষ!

সতর্ক হল বনের রাজা। থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে তার শিকারের থেকে খানিক দূরেই। কারণ, নতুন আসা মানুষটার হাতের অস্ত্রটা তার চেনা। দূর থেকে আগুন মুখে করে এসে মরণকামড় দেয় ওই জিনিসটা।

ওঁত পেতে বসে লেজ আছড়ায় আর চোখ পিটপিট করে সে দেখে তার নতুন শত্রুর দিকে। ছুটে এসে, মাটিতে পড়ে থাকা শিকারকে আড়াল করে তার মুখোমুখি হয়ে দাঁড়িয়েছে সে এবার। তার দিকে তাক করে ধরে আছে অস্ত্রটা। মুখে তীক্ষ্ণ গালাগালের খই ফুটছে যেন। অস্ত্রটা ধরে রেখে, চিৎকার করতে-করতেই একেকবার এক-এক-পা করে এগিয়ে আসে সে বাঘের দিকে।

ভয় পেয়েছে এবারে বাঘ। ভীত, অন্যমনস্ক শিকারকে পেছন থেকে আক্রমণ করে শেষ করে দিতে একমুহূর্ত লাগে না তার। কিন্তু ভয় না-পেয়ে যদি কেউ তার দিকে এগিয়ে আসে, তেমন অস্ত্রধারী দোপেয়েকে সমীহ করতে শিখেছে সে বহু প্রজন্মের অভ্যাসে।

অতএব খানিক তর্জন-গর্জন করে কোনও ফল না হওয়াতে একসময় আস্তে-আস্তে পিছু হটল সে। তারপর হঠাৎ একটা হাঁকার দিয়ে, যেন মুখের গ্রাস থেকে বঞ্চিত হবার প্রতিবাদ জানিয়েই, মিলিয়ে গেল সে পেছনের গহন জঙ্গলে।

*

“হেম... আর ভয় নেই রে। চোখ খুলে দ্যাখ! আমি রে, আমি তোর বিশেদাদা তো!”

আস্তে-আস্তে চোখ খুলল হেমাঙ্গিনী। বাইরে ঝলমলে রোদ উঠেছে। তার কপাল থেকে ভেজা ন্যাকড়ার ফালিটা তুলে পাশের মাটির সরায় রাখতে-রাখতে একটু হাসল বিশ্বনাথ, “বাব্বাঃ! যা ভয় দেখিয়ে দিয়েছিলি তুই! তিনদিন তিনরাত জ্বরের ঘোরে কেবল ভুল বকিস। একেকবার মনে হচ্ছিল আর বুঝি ফিরে এলি না। শেষে আজ জ্বর ছেড়েছে।”

“এটা কোথায় বিশেদাদা? ওরা যদি এখানেও এসে...”

“সে কী রে? পুলিশের হাত থেকে বন্দুক চুরি করে পালানো মেয়ে, তার আবার ভয় কীসে? অ্যাঁ?” বিশ্বনাথের চোখদুটো হাসছিল, “ভয় নেই হেম। এখানে আমাদের খুঁজে পাবে এমন লোক এ-তল্লাটে নেই।”

“কিন্তু আমি পুলিশের বন্দুক কেড়ে নিয়ে... তুমি তা জানলে কেমন করে?”

বলতে-বলতেই খানিক দূরে দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়-করানো বন্দুকটার দিকে চোখ গেল তার। একটা নয়। পাশাপাশি দুটো বন্দুক সেখানে।

“বলছি শোন। কয়েকদিন ধরেই এইখানে এসে গা-ঢাকা দিয়ে আছি। আসবার দিন-দুই বাদে একবার রাতে সাঁতরে নদী পেরিয়ে ওপাড়ে উঠে গ্রামের দিকে গেছিলাম। গিয়ে দেখি...”

“বোলো না, বোলো না...” হঠাৎ ফের ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল হেমাঙ্গিনী, “আমার দাদা...”

“এই চুপ... চুপ। কাঁদবি না একদম। একদম কাঁদবি না তুই।” বিশ্বনাথের পাথরের মতো মুখে চোখ-দুটো ছুরির মতো ঝলসাচ্ছিল, “জানিস, লোকে কী বলছে ও-চত্বরে তোকে নিয়ে? জলুট থেকে মহেন্দ্রগঞ্জের হাট অবধি হাজারো লোক বলছে তুই মানুষ নোস। ছদ্মবেশী নারায়ণী। রিচার্ডের যম। নইলে পুলিশের হাত থেকে বন্দুক ছিনিয়ে নিয়ে আরুধি সাঁতরে পেরোনো যার-তার কাজ না। বলছে একদিন তুই ফিরে এসে রিচার্ডকে তার পাপের শাস্তি দিবি। কান্না তোকে সাজে না হেম।

“সেই থেকে ফিরে এসে শতচক্ষু হয়ে তোকে খুঁজে বেড়াচ্ছিলাম। নদী যখন পেরিয়েছিস তখন ঠিক জানতাম এদিকেই কোথাও আছিস। আর তারপর খুঁজে যখন পেলাম তখন...”

চুপ করে কথাগুলো শুনছিল হেমাঙ্গিনী। চোখের জল শুকিয়ে গিয়েছে তার এবারে। না। আর কখনও কাঁদবে না সে। আগে রিচার্ড। তারপর, যদি প্রাণে বাঁচে তাহলে সারাটা জীবনই তো রইল তার কান্নার জন্য। আস্তে-আস্তে উঠে গিয়ে নিজের বন্দুকটাকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরল সে।

“শুধু বন্দুক দিয়ে কাজ হবে নাকি রে?” বলতে-বলতে বিশ্বনাথ একটা বড়সড়ো পুঁটুলি বের করে এনেছে কোথা থেকে, “এতে কী আছে বল তো? ঠাসবার বারুদ, চকমকি আর জালকাঠির ছররা।”

হঠাৎ চোখদুটো ঝকমক করে উঠল হেমাঙ্গিনীর, “কোত্থেকে পেলে বিশেদাদা?”

“সে অনেক গল্প। সেপাইদের মারপিটের পর থেকে সাহেবরা কাউকে বন্দুক রাখতে দেয় না সে তো জানিস। খবর পেলেই মালিকশুদ্ধু ধরে নিয়ে গিয়ে কোঁতঘরে আটকায়। গেঁওহাটির সনাতন বিশ্বেস তাই তার গুলিবন্দুক জঙ্গলেই লুকিয়ে রাখে হরিণ মারবার জন্য। গেলবার বিশ্বেসবাবুর নৌকোয় কাজ করেছিলাম মধুর সময়ে। জঙ্গলের মধ্যে তার গুলিবন্দুক লুকোবার জায়গাটা আমার চেনা।”

নিজের বন্দুকটাকে বুকে ধরে উদাস হয়ে বসেছিল হেমাঙ্গিনী। হঠাৎ বিশ্বনাথের কথার মধ্যে বাধা দিয়ে সে বলে, “লোকগুলোর কী হল বল তো বিশেদাদা? কোথায় যে চলে গেল সব...”

চিন্তিতমুখে মাথা নাড়ল বিশ্বনাথ। নদী পেরিয়ে গ্রামে গিয়ে সব দেখে-শুনে, আশপাশে খবরাখবর করে প্রথমে সে-ও অবাক হয়েছিল বইকি। তারপর হঠাৎ করেই তার খেয়াল পড়েছিল, গাছের মাথা থেকে দেখা, নৌকার বহর নিয়ে রিচার্ডের বজরার সেই দক্ষিণমুখো ভেসে যাবার ছবিটা। বাদাবনের ভাটির দেশ চষে-খাওয়া ছেলে সে। দুটোকে মিলিয়ে নিয়ে তার বুঝতে অসুবিধে হয়নি ওই দক্ষিণের দিকে কোনও জায়গায় হয়ত লোকগুলোকে ছেড়ে দিয়ে এসেছে রিচার্ড। তবে লোকালয়ে নয়। তাতে ধরা পড়বার ভয় আছে। তার বাইরে কোনও ফাঁকা জায়গায়।

অথবা, হয়ত রাতের অন্ধকারে লোকগুলোকে পাইক দিয়ে নদীর জলে...একবার শিউরে উঠল সে। এরা সব পারে। তবে তার সম্ভাবনা কম। রিচার্ড বহাল তবিয়তে ফিরে এসেছে তার কুঠিতে। সামান্য কয়েকটা পাইকের ভরসায় জলজঙ্গলের এতগুলো মানুষকে, তাদের নিজের এলাকায় দাঁড়িয়ে নিকেশ করবার চেষ্টা করলে এ-ভাবে সুস্থ শরীরে ফিরে আসতে পারত না সে। নিজের লোকেদের বিশ্বনাথ চেনে। শত অত্যাচারেও সহজে জেগে ওঠে না তারা। কিন্তু একেবারে খাদের কিনারে এনে ফেললে এই মানুষগুলোরই যে কত ভয়ংকর রূপ ধরতে পারে তা বিশ্বনাথ জানে।

“কী হল? কিছু বলছ না যে!” হেমাঙ্গিনীর গলায় ফের ভয়ের ছোঁয়াটা ফিরে আসছিল।

নিজেকে শান্ত করল বিশ্বনাথ। তারপর ঠান্ডা গলায় বলল, “তারা বেঁচে আছে হেম। রিচার্ডের শাস্তি লেখা আছে ওদের হাতে। এখন শুধু তাদের খুঁজে বের করার পালা। একা-একা ভরসা পাচ্ছিলাম না। এবার তুই এলি। এবারে দু’জনে মিলে...

“তবে তার আগে একটা কাজ বাকি রয়ে গেছে। জরুরি কাজ। তৈরি হতে হবে তোকে প্রথমে। কাল সক্কাল-সক্কাল উঠে প্রথমে বন্দুকে হাতেখড়ি দেব তোর। তারপর একে একে লাঠি, সড়কি, সব শিখবি। তারপর...”

*

১৮৬০। আগুন জ্বলে উঠেছে বাংলার বুকে। শত বছরের ক্রমাগত অত্যাচার মুখ বুজে সয়ে অবশেষে বাংলার চাষীরা বিদ্রোহ করেছে অত্যাচারী নীলকরের বিরুদ্ধে। দীর্ঘদিন ধরেই ধিকিধিকি জ্বলতে থাকা আগুন এবারে দাবানল হয়ে জ্বলে উঠেছে রাজসাহী, নদীয়া, যশোর, খুলনা, পাবনা জেলার মাঠে-মাঠে। তিন বছর আগে ঘটে যাওয়া সিপাহি বিদ্রোহের তীব্রতাও হার মানে তার কাছে। হাজারে-হাজারে চাষী প্রাণ দিচ্ছে। তার বদলা নিতে আবার কোথাও কোথাও পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে অত্যাচারের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা নীলকুঠিগুলো।

আর এরই মধ্যে সুন্দরবন সন্নিহিত এলাকাগুলোতে গড়ে উঠছিল বনচারী দুই দেবদেবীর গল্প। আটেশ্বর ও নারায়ণী। লোকে বলাবলি করে, প্রজাদের দুঃখ দেখে স্বয়ং বনবিবি তাঁর দুই সহচরকে পাঠিয়ে দিয়েছেন তাদের উদ্ধারের জন্য। গভীর অরণ্যে কোথায় যে তাঁদের বাস কেউ জানে না। শুধু, নীলকরের অত্যাচারে জর্জরিত কোনও কোনও গ্রামের বুকে হঠাৎ কোনও রাত্রে জঙ্গল থেকে বের হয়ে আবির্ভূত হন তাঁরা। গ্রামের মাঝখানে গভীর রাতে জেগে ওঠে দেবি নারায়ণীর ডাক, “এসো আমার সঙ্গে। ভয় নেই...”

সে-ডাকের কাটান নেই। ছেলেবুড়ো, বাচ্চা কেউ তাকে অস্বীকার করতে পারে না। হাতের কাছে লাঠি-সোঁটা, কোঁচ, বল্লম, যা পায় তাই নিয়ে এসে দাঁড়িয়ে পড়ে তাঁদের পেছনে। স্বয়ং আটেশ্বর আর নারায়ণীর জোড়া বন্দুক সঙ্গে থাকলে নীলকর দূরে থাক স্বয়ং যমকেও ভয় করে না তারা। স্থানীয় নীলকুঠির ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়া সেই জনস্রোতের পেছনে সতর্ক পাহারা দেয় দেবতা আর দেবীর জোড়া বন্দুক। কাপড়ে ঢাকা মুখ তাঁদের কেউ কখনও দেখেনি। কিন্তু এটা সবাই দেখেছে, তাঁদের জোড়া-বন্দুকের একটা গুলিও বৃথা যায় না।

এরই মধ্যে সুরতখালি নদীর পাশের কামাগঞ্জ গ্রামের লড়াইয়ের গল্প মানুষের মুখে-মুখে ছড়িয়ে পড়েছে দৈবী লীলার প্রমাণ হিসেবে। সে-যুদ্ধে ডেভিড সাহেবের কুঠিতে প্রায় পঁচিশজন বন্দুকধারী সেপাইয়ের মোকাবেলা করেছিল কামাগঞ্জের লোকজন। কাটা কলাগাছের মতো মানুষ পড়ছিল। আর তাদের মধ্যে বিদ্যুতের মতো ঘুরতে-ঘুরতে নিখুঁত নিশানায় ও-তরফের একের-পর-এক বন্দুকবাজকে জমি নেয়াচ্ছিলেন আটেশ্বর আর নারায়ণী।

তারপর হঠাৎ করে তাঁদের বন্দুকের ধমক বন্ধ হয়ে এল। গুলির ভাঁড়ার ফুরিয়েছে তাঁদের এই ভেবে সাহেবের দলে বেজায় আনন্দের রব উঠেছে সবে, ঠিক তখনই চাঁদের উজ্জ্বল আলোয় সবাই তাকিয়ে দেখেছিল, নারায়ণী তাঁর হাতের রুপোর বালাগুলো খুলে এনেছেন। চাঁদের আলোয় ঝিকিয়ে উঠেছে তাঁর হাতের দা। তার কোপের পর কোপে হাতের একগুচ্ছ বালা খণ্ড-খণ্ড করে আটেশ্বরের হাতে তুলে দিয়ে ফের বন্দুক হাতে তুলে নিয়ে হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন দেবী।

তারপর, দেবীর গয়নার টুকরোকে ছর্‌রা গুলি বানিয়ে ফের জেগে উঠেছিল নারায়ণী আর আটেশ্বরের বন্দুক। তবে সে-রাত্রে তাঁদের জোড়া-বন্দুককে আর বেশি আগুন ওগরাতে হয়নি। চাঁদের আলোয় দেবীর গয়না কাটবার সেই দৃশ্য দেখে গায়ে হাজার হাতির বল এসেছিল কামাগঞ্জের প্রজাদের। আর কুঠির দিশি সেপাইরা ওই দেখে বন্দুক সড়কি ফেলে পালিয়ে গিয়েছিল কুঠির দরজা খোলা রেখে।

একের-পর-এক গ্রামকে এইভাবে নীল বাঁদরের অত্যাচার থেকে মুক্ত করতে-করতে আরুধির ধারা ধরে-ধরে ক্রমশ দক্ষিণ থেকে আরও দক্ষিণের দিকের গ্রামগুলোতে আবির্ভূত হচ্ছিলেন তাঁরা। ইংরেজ কোম্পানি অবশ্য দেব-দেবতায় বিশ্বাস করে না। রহস্যময় এই দুই শত্রুকে ধরবার কম চেষ্টা তারা করেনি। পুরস্কার ঘোষণা করেছে বারংবার। বাদা আর আবাদ এলাকার প্রত্যেক জনবসতি, হাটে-বাজারে ছড়িয়ে দিয়েছে গুপ্তচরের জাল। কিন্তু অরণ্যের দুই দেব-দেবীর কোনও সন্ধান তারা পায়নি।

অথচ বারংবার দিনের আলোতেই নিজেদের অজান্তে তারা তাঁদের দেখা পেয়েছে বারংবার। গভীর দক্ষিণের কোনও গঞ্জের হাটে এসে সদ্য নামা পুলিশের চরটি নৌকোর যে আরোহী-দু’জনের কাছে বাজারদরের খবর নিয়েছিল, সেই সাধারণ চাষীদম্পতিকে দেখলে কারও মনে তাঁদের আসল পরিচয় নিয়ে কোনও সন্দেহ জাগবে না। হাটে আসা আর দশটা মানুষের মতোই তাঁরা বাজারহাট সারেন, আর সতর্ক চোখে নজর রেখে চলেন সেখানকার মানুষজনের দিকে। হয়ত কোনও চেনা মুখের সন্ধানে, অথবা কোনও এক গোপন খবরের ইঙ্গিত পাবার আশায়।

কখনও আরুধির মোহনার কাছাকাছি এলাকায় তার অথবা তার শাখানদীর বিস্তীর্ণ বুকে গজিয়ে ওঠা কোনও চরের পাশ দিয়ে যেতে যেতে হঠাৎ করেই কোনও মাঝির নজরে পড়েছে বালিয়ারির মাথায় দাঁড়িয়ে থাকা দুই দেবদেবীর দিকে। এই নির্জন অরণ্যে এ-ভাবে কোনও সাধারণ মানুষের আসবার কথা নয়। আটেশ্বর আর নারায়ণীর ক্রমশ ছড়িয়ে পড়া প্রবাদের কথা স্মরণ করে মাঝি সভয়ে নমস্কার করেছে তাঁদের। চোখ বুঁজে মঙ্গলকামনা করেছে নিজের প্রিয়জনের। তারপর চোখ খুলতে দেখেছে কখন যেন অদৃশ্য হয়েছেন দুই দেবতা...

*

“নাঃ। এখানেও কোনও চিহ্ন তো নেই। একটা বছর কেটে গেল বিশেদাদা। আজও ওদের কোনও...”

কান্নায় গলাটা আটকে আসছিল হেমাঙ্গিনীর। এই এক বছরে অনেকটা লম্বা হয়েছে সে মাথায়। চেহারায় সেই আগের লালিত্যের ছিটেফোঁটাও অবশিষ্ট নেই। তার কঠোর গাল বেয়ে টপটপ করে ঝরে পড়ছিল জলের ফোঁটাগুলো। তার সামনে আরুধির অকূল পাথার এগিয়ে গিয়ে মিশে গেছে কিছুদূরে সমুদ্রের সীমাহীন জলরাশিতে।

“গোটা নদীটাই তো শেষ হয়ে গেল খুঁজে-খুঁজে। ওদের কি তাহলে আর...”

“এখনও খোঁজ আমাদের শেষ হয়নি হেম।” বালিয়ারির নীচে দাঁড়িয়ে মাথা নাড়ছিল বিশ্বনাথ, “নদী মানেই বসতি রে। নদী মানেই জল বেয়ে লোকের গতায়াত। এখানে কোথাও ওদের লুকিয়ে রাখলে এতদিনে কোনও-না-কোনও গঞ্জের হাটে-বাজারে ওদের একটা খবর আমরা পেতাম।”

“তাহলে?”

ইঙ্গিতে ডাইনে ছড়ানো বারদরিয়ার দিকে দেখাল একবার বিশ্বনাথ, “ওইখানে যেতে হবে আমাদের। তারপর পাড় ঘেঁষে-ঘেঁষে খুঁজব। সাগরপাড়ে হাজারো চর। দরকার হলে সারাজীবন ধরে, সমস্ত জায়গায় তাদের খুঁজে দেখতে হবে আমাদের। একদিন-না-একদিন আমরা ঠিক খুঁজে বের করব ওদের! তুই দেখে নিস...”

খানিক দূরে বাঁধা নৌকাটা ছলছল করে লাফিয়ে উঠে যেন সম্মতি দিল তার কথায়। জোয়ার শেষে ভাঁটার টান লেগেছে নদীর জলে। সেইদিকে তাকিয়ে হেমাঙ্গিনী আপনমনেই বলল, “এতটুক নৌকো নিয়ে...”

“ভয় কী রে পাগলি? জলের দেশে জন্ম, জলের বুকে বাস। আমাদের বন্ধু বল বাপ মা বল সবই তো ওই জল। হালে বসব আমি। তোর জন্যে একজোড়া বৈঠা আছে। মাস্তুলে পাল আছে। আর তবে চাই কী? ঠিক পারব আমরা। তুই দেখে নিস। নে চল এবারে। আর দেরি নয়।”

তখন ভাঁটার টানে সেই নৌকাখানা ভেসে যায় নদীর সীমানা ছেড়ে অকূল দরিয়ার বুকে। তার হালে বিশ্বনাথের শক্ত হাতের নির্ভুল নির্দেশ তাকে নদীর মুখ পেরিয়ে বাঁক খাইয়ে নিয়ে চলে সাগরের কূলে কূলে ছড়িয়ে থাকা বনভূমির পাশ দিয়ে দিয়ে নতুন কোনও অজানা দ্বীপের খোঁজে...

*

গ্রীষ্মের প্রথম মাস। রোদের তেজ বেড়ে উঠেছে। সারাটা দিন সূর্যের আগুনে পুড়ে নৌকো বাইতে-বাইতে বড় ক্লান্ত ঠেকছিল তাদের দু’জনের। এইবারে অবশেষে রোদ খানিক পড়ে আসছে। আর সেই পড়ন্ত রোদের সঙ্গে পাল্লা দিয়েই যেন, ধীরে-ধীরে পড়ে আসছিল হাওয়ার বেগ। পাল ঝুলে পড়েছে নৌকার। আস্তে-আস্তে জলের বুকে স্থির হয়ে আসছিল তার গতি।

ক্লান্ত হাত-দুটো তার যন্ত্রের মতো দাঁড় টেনে চলে। সেই করতে-করতেই আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল হেমাঙ্গিনী। সমুদ্র আশ্চর্য রকম শান্ত হয়ে আসছে হঠাৎ। হাতের বাঁয়ে কিছুদূরে জেগে থাকা দ্বীপরেখার গায়ে গাছগুলোও একেবারে নিশ্চুপ।

হঠাৎ সেই শান্ত জল আর আকাশের বুকে, কী যেন দেখে একটু চমকে উঠল হেমাঙ্গিনী।

“আকাশের দিকে চেয়ে দেখ বিশেদাদা একবার...” হঠাৎ সতর্ক গলায় হেঁকে উঠল সে। বিকেলের রোদে ফটফট করছে নীল আকাশ। সেখানে, আকাশের নীল চাঁদোয়ার গায়ে কাজলের টিপের মতো একটুকরো মেঘ দেখা দিয়েছে হঠাৎ। পুবের দিকে। বহুদূরে। একেবারে দিগন্তরেখার গায়ে।

হেমাঙ্গিনীর কথা শুনে, সেদিকে একটুক্ষণ নজর চালিয়েই সতর্ক হয়ে উঠল বিশ্বনাথ। তারা হালে যায়, জালে যায়। আকাশের মতিগতি চেনার শিক্ষা তাদের রক্তে আছে। বৈশাখের বিকেলে এ-মেঘের গতিক সুবিধের হতে পারে না।

পাড়ের ঢেউ-ভরা এলাকা ছাড়িয়ে খানিক গভীরে বারসাগরের শান্ত জলে দাঁড় বেয়ে চলেছিল তারা। খানিক এদিক-ওদিকে দেখে নিয়ে, হাতের বাঁয়ে বেশ খানিক দূরে জলের বুকে জেগে থাকা সবুজের টুকরোটার দিকে আঙুল দেখাল বিশ্বনাথ, “তাড়াতাড়ি নৌকা ওদিকে নিয়ে চল হেম। গতিক সুবিধের নয়।”

কথাটা সে ভুল বলেনি। বাতাস থেমে গেছে একেবারে। দুরুদুরু বুকে হাল চেপে ধরে নৌকোর মুখ এবারে সে ঘুরিয়ে দিল সেই সবুজ ফোঁটাটার দিকে। হেম-এর শক্তিশালী দুটো হাত খানিক আগের ক্লান্তিকে ভুলে গেছে। দাঁড়-দুটো প্রাণপণে জল কেটে সেদিকে নৌকোকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে তখন।

কিন্তু শেষরক্ষা হল না। তাদের নৌকোর গতিকে তুচ্ছ করে ক্রমশই বড় হয়ে আকাশ ঢেকে ফেলছিল মেঘের টুকরোটা। তারপর, হঠাৎ দামামার ধ্বনির মতোই দ্রিমি-দ্রিমি শব্দ উঠল সমুদ্রের বুকে। হঠাৎ খেপে-ওঠা ছুটন্ত বাতাসের ধাক্কা খেয়ে গম্ভীর শব্দ করে করে ফুলে উঠল অতল জলরাশি। তারপর, সমুদ্রকে সঙ্গে নিয়ে ধেয়ে-আসা ঝড় হঠাৎ যেন ঝাঁপ দিয়ে পড়ল তাদের নৌকার গায়ে...

*

উথাল-পাথাল দরিয়া নৌকাটাকে নিয়ে মোচার খোলার মতন দোলায়। ঘন কালো মেঘে আকাশ ঢেকে গিয়ে অকাল-সন্ধ্যার অন্ধকার নেমেছে তাদের ঘিরে। জলের ছাটে ভিজে সপসপ করছে মানুষ দু’জন।

অমানুষিক শক্তিতে বারবার তাদের বারসমুদ্রের দিকে টেনে নিয়ে যেতে চায় ক্ষ্যাপা হাওয়া আর সমুদ্র মিলে। বিশ্বনাথের শক্ত হাতে চেপে ধরা হাল তার মোকাবিলা করে নৌকোর মুখ ঘুরিয়ে রাখে। হেমাঙ্গিনীর ক্লান্তিহীন দুটো হাতের দাঁড়ের ধাক্কা ছুটন্ত সাগরকে উপেক্ষা করে তাকে এগিয়ে নিতে চায় তখনও খানিক দূরে অন্ধকারে ডুবে যাওয়া সেই অচেনা ডাঙার দিকে!

সেই টানাপোড়েন চলতে-চলতে, হঠাৎ হাওয়া আর ঢেউয়ের গোঁ-গোঁ শব্দকে ছাপিয়ে বিশ্বনাথের ভীত গলাটা ভেসে উঠল অন্ধকারের মধ্যে, “দাঁড় ফেলে দে হেম, উঠে দাঁড়াবি না। হামাগুড়ি দিয়ে আমার কাছে আয়! যে-ভাবে পারিস! শিগগির! পেছনে তাকিয়ে দেখ...”

বিদ্যুতের ঝলকে হালে বসা বিশ্বনাথ যেন পাথরে কোঁদা মূর্তি একটা। একটুকরো কাছি দড়ি কোমরের সঙ্গে পেঁচিয়ে নিজেকে নৌকার সঙ্গে আটকে নিয়েছে সে। হালের কাঠ অমানুষিক শক্তিতে চেপে ধরে নৌকোকে কোনওমতে সোজা রেখেছে। জলের তীব্র টানের মোকাবিলায় ফুলে ফুলে উঠেছে তার শরীরের পেশিগুলো...

সেদিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে, এক-ঝলক পেছনে তাকিয়ে বুকটা পাথর হয়ে গেল হেমাঙ্গিনীর। আকাশ, বাতাস মুছে দিয়ে সেখানে জেগে উঠেছে আকাশছোঁয়া একটা তরল পাহাড় যেন। মসৃণগতিতে তা এগিয়ে আসছিল তাদের নৌকোটার দিকে।

মুহূর্তে দাঁড়দুটো জলে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বিশ্বনাথের দিকে ঝাঁপ দিল হেমাঙ্গিনী। এক হাতে হালের মুঠ চেপে ধরে রেখে অন্য-হাতে তাকে ঘিরে নিজের কোমরের দড়িটা ঘুরিয়ে আনছে যখন বিশ্বনাথ, ঠিক তখন তার সব চেষ্টাকে বিফল করে দিয়ে নৌকাটাকে মাথার ওপর তুলে নিয়ে উঁচু হয়ে উঠল যেন গোটা সমুদ্রটাই। অতিকায় সেই ঢেউ তাদের নিয়ে তখন ছুটে চলেছে কাছেই জেগে থাকা দ্বীপটার বেলাভূমির দিকে।

“শক্ত করে ধরে থাক আমাকে হেম। ছাড়িস না...” বলতে-বলতে হালের মুঠ ছেড়ে দিয়ে এইবার নোঙরটা হাতে তুলে নিল বিশ্বনাথ। আকাশ, সমুদ্র, নৌকা, হেমাঙ্গিনী, সব কিছু মুছে গিয়ে তার চোখের সামনে জেগে আছে শুধু দ্রুত এগিয়ে আসতে থাকা পাড়ের এদিক-সেদিক গজিয়ে ওঠা গাছগুলো...

বিদ্যুতের ঝলকে ওর মধ্যে থেকে একটা বড় গাছকে বেছে নিয়ে নিশানা করল বিশ্বনাথ। ঢেউয়ের মাথায় চেপে সেদিকেই এগিয়ে যাচ্ছে নৌকোটা তাদের। একটাই সুযোগ মিলবে। একটাই...

“হে বাবা দক্ষিণরায়... রক্ষা করো বাবা...”

মৃদু গলায় প্রার্থনামন্ত্রটা জপ করতে-করতেই আছড়ে পড়ার মুহূর্তে কাছি বাঁধা নোঙরটাকে বিশ্বনাথ ছুড়ে দিল গাছ লক্ষ্য করে। প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই সজোরে বালির গায়ে আছাড় খেল নৌকাটা। তাদের চারপাশে অথই জলের স্তূপ এবারে সমুদ্রে ফিরে যাবার পথে বজ্রটান দিয়েছে নৌকার গায়ে।

মাথায় সজোরে ধাক্কা খেয়েছিল বিশ্বনাথ। জ্ঞান হারাতে-হারাতে তার একটা হাত গাছের গায়ে আটকা নোঙরের সঙ্গে বাঁধা টানটান কাছিটাকে ছুঁয়ে দেখে নিল। আর অন্য হাতটা বড় মমতায় ছুঁয়ে গেল গায়ের সঙ্গে বাঁধা হেমাঙ্গিনীর মাথাটাকে। তারপর, বড় তৃপ্তিতে চোখ-দুটো বুজে এল তার। মাথার তীব্র যন্ত্রণাও আর তাকে জাগিয়ে রাখতে পারল না।

*

স্বপ্ন দেখছিল বিশ্বনাথ। সেই ছোটবেলার স্বপ্ন। কার্তিক মাসের ভোর। গায়ে কাঁথা জড়িয়ে শুয়ে আছে সে। তার মাথায় হাত দিয়ে মা ডাকছিল, “বিশে, ওঠ বাবা, চোখ খোল! দ্যাখ একবার এদিকে...”

ঘুমের মধ্যেই মাথায় এসে বসা হাতটাকে জড়িয়ে ধরল বিশ্বনাথ। কিন্তু, সে হাত তো মায়ের হাতের মতো নরম নয়, কোঁচকানো চামড়া আর হাড়সর্বস্ব একটা হাত... কে ও?

“কে...”

চোখ খুলে ধড়মড় করে উঠে বসতে যাচ্ছিল সে। বয়স্ক হাত-দুটো ফের তাকে চেপে ধরে শুইয়ে দিয়েছে পাতা-লতার শুকনো বিছানায়। তার মুখের ওপর ঝুঁকে থাকা মুখটার ওপর থেকে আবছা কুয়াশার একটা পর্দা সরে যাচ্ছিল যেন। বয়েসের ভারে জীর্ণ একটা মুখ... মা...

“তুমি?”

একটা উজ্জ্বল হাসি ছড়িয়ে গেল মুখটায় এবারে। দরজার দিকে মুখ ঘুরিয়ে তিনি ডাক দিলেন, “ও সুরথ, ও বেচু, আয় তোরা সব। চোখ খুলেছে রে! হেম মা, কোথা গেলি? দুধ জোগাড় করে এনেছিল যে একটুক সেইটে গরম কর মা...”

উঠতে গিয়ে মাথাটা দপদপ করে উঠেছিল তার। থেঁতো করা লতাপাতার একটা পুলটিশ ন্যাকড়া দিয়ে বাঁধা রয়েছে সেখানে। তাকে ঘিরে এসেছে একরাশ চেনা-জানা মুখ। হেম, ছোটবেলার বন্ধু সুরথ, আরও-আরও কতজন! তার মুখের সামনে দুটো হাত একটা মাটির পাত্র তুলে ধরেছে। ফোটানো দুধের সুগন্ধ লেগে আছে তাতে।

“জ্ঞান যখন ফিরেছে তখন আর ভয় নাই। জয় মা বিশালাক্ষী, জয় মা নারায়ণী।” দরজার পাশ থেকে গম্ভীর গলায় কেউ একজন বলে উঠল। পরিচিত গলা।

দুধটুকু খেয়ে এবারে পরম নিশ্চিন্তে ফের চোখ বুজে ফেলল বিশ্বনাথ। স্বপ্ন সফল হয়েছে তার। যে মানুষদের গত এক বছরের চেষ্টায় সে খুঁজে পায়নি, আজ সমুদ্রের ঝড় মৃত্যুর রূপ ধরে এলেও, তাকে ফের একবার পৌঁছে দিয়ে গেছে সেই মানুষজনের কাছেই...

“তিরন্দাজ, গুলতিবাজ... তৈরি হও...”

মুখোমুখি দুটো দল তৈরি হয়ে দাঁড়িয়েছে সমুদ্রের ধারের বালুচরের বুকে। প্রখর রোদের আলোয় তাদের ছায়াগুলো ছোট-ছোট হয়ে পায়ের কাছে লুটিয়ে থাকে। এক-এক দিকে আগে-পিছে পাঁচটা করে সারিতে সেজে দাঁড়ানো দলদুটোর একটার নেতৃত্বে আছে হেমাঙ্গিনী আর অন্যটার নেতৃত্বে বিশ্বনাথ। বসতির সক্ষম সমস্ত নারীপুরুষ এসে ভিড়েছে এই দলে।

যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলা দেখতে বসতির কচিকাঁচাদের দল এসে জড়ো হয়েছে সমুদ্রের ধারে। তাদের হইচইয়ের শব্দে যেন কোনও উৎসব শুরু হয়ে গেছে সেই বিজন চরের বুকে।

কাঠের একটা উঁচু পাটাতনের ওপর নিজের বন্দুকটা কাঁধে নিয়ে দাঁড়িয়েছিল হেমাঙ্গিনী। তার মুখ থেকে হুকুমটা বের হবার সঙ্গে-সঙ্গে তার দলের সবার পেছনে দাঁড়ানো সারিটার হাতে উঠে এসেছে গরানের ডাল কেটে তৈরি বড়-বড় গুলতি। তার সামনের সারির দলটা তুলে ধরেছে নমনীয় বেতের তৈরি ধনুক। জবাবে, উল্টোদিকে বেশ খানিক দূরে দাঁড়ানো বিশ্বনাথের হাতের ইশারায় তার দলের লোকজনের হাতে উঠে এসেছে মাথা বাঁচাবার জন্য ছোট ছোট কাঠের চাকতি কতকগুলো।

একনজর সেদিকে তাকিয়ে দেখে নিয়ে হেমাঙ্গিনী হাঁক দিল, “এক...”

তার দলের গুলতিবাজরা পেছনদিকে কোমর হেলিয়ে সজোরে ছুড়ে মারল তাদের পোড়ামাটির গুলিগুলো। আর সঙ্গে-সঙ্গেই নীচু হয়ে যখন তারা পরের হামলার জন্য গুলি তুলে নিচ্ছে, ততক্ষণে হেমাঙ্গিনীর হাঁকে ছুটে গেছে তিরন্দাজদের তির।

“এক- দুই- এক- দুই- সামনে বাড়ো...”

শ্রাবণের বৃষ্টিধারার মতো পোড়ামাটির শক্ত গুলি আর আগুনে পুড়িয়ে লোহার মতো শক্ত মাথাওয়ালা তিরের ঝাঁক ঝরে পড়ে উল্টোদিকের বিশ্বনাথের বাহিনীর ওপরে। একের-পর-এক আদেশ মেনে হেমাঙ্গিনীর পঞ্চাশ সৈন্যের দল তখন এগিয়ে চলেছে তাদের প্রতিপক্ষের দিকে।

খানিক কাছে এগিয়ে এসে গুলতিবাজদের সামনের সারির দলটা হাতে তুলে নিয়েছে কাঁচা বেল। বেল, তির আর মাটির গোলার অবিশ্রান্ত আক্রমণে শত্রুপক্ষের হতভম্ব অবস্থাটার সুযোগ নিয়ে ততক্ষণে দলের সবার সামনে থাকা দলদুটো ছুটে গিয়ে পৌঁছে গেছে বিপক্ষের কাছাকাছি। তার ছেলেদের হাতে ধরা লাঠি মৌমাছির মতো ডাক তোলে, তার মেয়েদের হাতে তুলে ধরা কাঁসার থালাগুলো মৃত্যুমুখী চক্রের মতোই ঝিকমিক করে বিপক্ষের প্রাণ নেবার জন্য...

শ্রাবণ পেরিয়ে ভাদ্র চলছে এখন। বৃষ্টির তেজও কমে আসছে আস্তে-আস্তে। চড়া রোদকে উপেক্ষা করেই প্রতিদিনের মতো আজও সমুদ্রের ধারে ভিড় করেছে সোনার চরের বাসিন্দারা। এই নামটাতেই তারা ডাকে তাদের নতুন বসতিকে। বচ্ছরকালেরও বেশি আগে এক অন্ধকার রাত্রে যখন এ-দ্বীপে তাদের নামিয়ে দিয়ে চলে গিয়েছিল রিচার্ডের বহর, তখন তারা একে নরক ভেবেছিল। কিন্তু আজ এক বছরের কঠিন চেষ্টায় এ-দ্বীপের বুকে তারা সোনা ফলায়। যে জেলেরা তাদের সেই শুরুর কষ্টের দিনগুলোয় ঠাঁই দিয়েছিল, তারাও এখন একেবারে মিলেমিশে গেছে তাদের সঙ্গে।

গোটা বর্ষার দিনগুলো, চাষের কাজের ফাঁকে-ফাঁকেই তাদের প্রস্তুতি চলছিল। বিশ্বনাথ সেরে ওঠবার দিনগুলোতেই সোনাচরের বাসিন্দারা জেনে গিয়েছিল, গোটা বাদা অঞ্চলে যে আটেশ্বর আর নারায়ণীর অবতারের কাহিনি ঘুরে বেড়াচ্ছে, তারা তাদের আসলে তাদেরই বিশ্বনাথ আর হেমাঙ্গিনী। সে সেরে ওঠবার পর তাই তাদের একত্র করে এই সৈন্যদল গড়ে তুলতে বিশেষ বেগ পেতে হয়নি বিশ্বনাথ আর হেমাঙ্গিনীকে। জেলের দলও খুশি হয়েই যোগ দিয়েছে তাদের দলে। নীল বাঁদরের অত্যাচার তারাও তো কম দেখেনি জীবনে!

তারপর বৃষ্টির তেজ কমতেই শুরু হয়েছে তাদের প্রস্তুতি। খেতে ধান রোয়ার কাজ শেষ। সকাল-সকাল সেখানে দৈনন্দিন কাজগুলো সেরে ফেলে চাষিরা। মেছুরের দল মাছ ধরার কাজ সেরে আসে রাতের অন্ধকারে। তারপর ঘরকন্নার কাজকর্ম সেরে রেখে দুপুর হতেই তারা সকলে এসে জড়ো হয় সমুদ্রের ধারে চরার বুকে। বিশ্বনাথ আর হেমাঙ্গিনীর শিক্ষায় নিজেরদের একটা সৈন্যদল হিসেবে গড়ে তুলছে তারা এখন। তাদের চোখে আগুন। বুকে দৃঢ় সঙ্কল্প। নীল বাঁদরের অত্যাচারকে তারা মুছে দেবে বাংলার বুক থেকে।

“থামো।”

হাঁকটা আসবার সঙ্গে-সঙ্গেই দু’দল চুপচাপ দাঁড়িয়ে পড়েছে। গাছকোমর করে বাঁধা আঁচলটা খুলে কপালের ঘাম মুছে নিল হেমাঙ্গিনী। বিশ্বনাথ এগিয়ে এসেছে ওপাশ থেকে।

“কম করে পঁচিশটা ছেলেমেয়ের দেখলাম এখনও তালে-তালে কাজ হচ্ছে না হেম। ওদের আরও কয়েকবার একটু আলাদা করে ধরতে হবে যে।”

মুখোমুখি লড়াইয়ের পালা শেষ হতে মাঠ জুড়ে মানুষগুলো ছোট-ছোট দলে ভেঙে নিবিড় অনুশীলনে ব্যস্ত এখন। চলছে হাতাহাতি যুদ্ধের অভ্যাস। সেদিকে একনজর দেখে মাথা নাড়ল হেমাঙ্গিনী। তারপর নিজের বন্দুকটার গায়ে আনমনে হাত বোলাতে-বোলাতে বলল, “হয়ে যাবে। কিন্তু রওনার দিন আমি আর পেছোতে রাজি নই বিশেদাদা। তর সইছে না যে আমার...”

মৃদু হেসে মাথা নাড়ল বিশ্বনাথ, “পাগলি একটা। এ-সব কাজে মাথা ঠান্ডা করে এগোতে হয় এতদিনে তাও শিখলি না?”

“সে মাথা ঠান্ডা যা করার তুমি কোরো। আমি শুধু ওই রিচার্ডকে...”

“হবে, হবে। ওকে কেউ ছোঁব না আমরা। ও তোর শিকার। হল তো! এখন যা। ছেলেমেয়েগুলোকে নিয়ে কাজে লাগ। আমার ওদিকে অনেক কাজ বাকি পড়ে আছে যে!”

কথাগুলো বলে, হেমাঙ্গিনীকে সেখানে রেখে বড়-বড় পদক্ষেপে যুদ্ধখেলার মাঠ ছেড়ে রওনা দিল বিশ্বনাথ। তার গন্তব্য দ্বীপের উল্টোদিকের খালের ধারটা। সেখানে গ্রামের বয়স্ক মানুষের দলটার হাতে সেজে উঠছে জেলেদের নৌকোগুলো। বসেছে মাটি পোড়াবার ভাঁটা, জড়ো করা হচ্ছে বুনো বেলের স্তূপ, ধারালো দায়ে চেঁছে তৈরি হওয়া তিরের বোঝার মাথা পুড়িয়ে শক্ত করে তোলা হচ্ছে কোথাও।

একটা মসৃণ যন্ত্রের মতো কাজ করে চলেছিল মানুষগুলো। তাদের মুখ কঠিন, তাদের চোখের সামনে বারবার ভেসে ওঠে রিচার্ড কুঠিওয়ালা আর তার সাঙ্গোপাঙ্গদের অজস্র অত্যাচারের স্মৃতি। তারা তাদের ছাড়বে না...

*

অঘ্রাণের শেষ। সমুদ্রগামী জলুটের বুকে ঘন কুয়াশার আস্তর ছেয়ে ছিল। জোয়ার চলছে। সমুদ্র থেকে ধেয়ে আসা নোনা জলের স্রোত কলকল করে ছুটে চলেছে উজানের পথে। সেই স্রোতে ভর করে কুয়াশার আড়াল নিয়ে মোহানার দিক থেকে উজান পথে ছুটে আসছিল জেলেনৌকার একটা ঝাঁক। বহরের সামনে পেছনে কুড়িটা নৌকার প্রত্যেকটাতে দশজন করে জোয়ান। তাদের সতর্ক পাহারায় মাঝখানের নৌকোগুলোয় শিশু আর বুড়োমানুষদের দলটা নিশ্চিন্তে ঘুমোয়। আর তাদের কোনও ভয় নেই। তারা জানে এই দলের সামনে রয়েছেন স্বয়ং আটেশ্বর, আর পেছনে বন্দুক হাতে জেগে আছেন নারায়ণী নিজে। হ্যাঁ, নিজেদের গ্রামের দুই ছেলেমেয়েকে তারা এখন মনে-প্রাণে এই দুই দেবতার অবতার হিসেবেই মেনে নিয়েছে। গোটা দলটার বুকে অটল ভরসা। এইবার তারা জিতবেই। এইবার তারা নিজেদের মাটির অধিকার কেড়ে নেবেই ওই রিচার্ড আর তার দলবলের হাত থেকে।

“হুঁশিয়ার! বাঁয়ে রাখো ভাই…”

বহরের একেবারে সামনের দিকের কুয়াশার অন্ধকার থেকে হঠাৎ ভেসে এল বিশ্বনাথের গলা। কূল দেখা গেছে অবশেষে। গভীর রাত্রির তন্দ্রাচ্ছন্নতা ছেড়ে বহরের প্রতিটি মানুষ সতর্ক হয়ে উঠে বসেছে এবার নৌকার খোলে। ছ’ছটা রাত। দিনের বেলায় নদীর ধারের জঙ্গলে নৌকা লুকিয়ে বিশ্রাম আর রাতের অন্ধকারে, কখনও জোয়ারের ধাক্কায়, কখনও নিরলস দাঁড়ের ধাক্কায় ক্রমাগত উত্তরমুখে ছুটে চলা। যাত্রার প্রত্যেকটা মুহূর্ত তাদের কেটে গেছে অধীর অপেক্ষায়। ফের একবার নিজেদের গ্রামের স্পর্শ পাবার স্বপ্নে বিভোর দলটা যেন এই মুহূর্তটার অপেক্ষাতেই ছিল দীর্ঘ এই সময়টা।

মৃদু খসখস শব্দ তুলে কাদার বুকে এসে আটকে যাচ্ছিল একেকটা নৌকার মাথা। শিক্ষিত সৈন্যদলের মতোই তার যাত্রীরা সুশৃঙ্খলভাবে নেমে আসছিল কাদার বুকে। তারপর আগে থেকে ঠিক করে রাখা নিয়ম মেনে একেকটা দলে ভাগ হয়ে গিয়ে নৌকা থেকে নামিয়ে আনছিল তাদের সংসারের জিনিসপত্র, অস্ত্রশস্ত্রের বোঝা, শিশু আর বৃদ্ধদের।

সামনে, ঢালু হয়ে উঠে যাওয়া পাড়ের ওধারে অন্ধকারের বড়-বড় ড্যালার মতো ছড়িয়ে আছে তাদের পোড়া গ্রামের ধ্বংসস্তূপ। সার বেঁধে তারা এগিয়ে চলে সেইদিকে। দীর্ঘ যাত্রায় তাদের শরীরে ক্লান্তির ছোঁয়া লেগেছে। কিন্তু বিশ্রামের অবসর নেই এখন। সকলের মাথা গোঁজবার মতো ঠাঁই গড়ে নিতে হবে সবার প্রথমে। আর তারপর…

“ইমপসিবল।”

জবাবে সুধন্য মাথা নাড়ল শুধু। সেজবাতির নরম আলোয় সাহেবের পশুর মতন মুখটায় হঠাৎ একটা ভয়ের ছোঁয়া দেখে অদ্ভুত একটা আনন্দই হচ্ছে তার।

“নিজের চোখে দেখে এসেছি ছায়েব। দিনদুই আগে মাঝরাত্তিরে বিশ-পঁচিশটা ডিঙিনৌকো বোঝাই হয়ে ওরা এসে নেবেছে জলুটের ঘাটে। রাতারাতি ঘরবাড়ি তোলাও শুরু করে দিয়েছে সবাই মিলে। এবারে ভাবেন কী করবেন? আমি বলি কি, ডাকাতের দল জলুটে থানা দিয়েছে এই বলে সদর থেকে খানিক গোরা পল্টন এনে যদি এক দু’দিনের মধ্যে সব...”

“শাট আপ!” গর্জন করে উঠল রিচার্ড। সদরে পল্টন চেয়ে চিঠি পাঠালে জলুটের বাসিন্দাদের খবর চাটুজ্জে হাকিমের কাছেও চাপা থাকবে না। আর সেটা ঘটলে তার ভাগ্যে কী অপেক্ষা করে আছে তার পরিষ্কার আন্দাজ আছে রিচার্ডের। খোলা আদালতে শতাধিক লোক সাক্ষী দেবে। চাটুজ্জে তাকে ছেড়ে দেবে না। একটাই পথ তার সামনে এখন...

“টু ডেজ ওয়েস্টেড। কতটা ক্ষতি অলরেডি হয়ে গেছে কে জানে!” বলতে-বলতে ফুঁসছিল রিচার্ড। তারপর সুধন্যর দিকে আঙুল তুলে বলে, “অকর্মার ধাড়ি কোথাকার। এত ডেঞ্জারাস একটা ব্যাপার, আর তুমি এতটা টাইম ওয়েস্ট করে তারপর...”

ধমকটা খেয়ে কেমন কুঁকড়ে গেল সুধন্য, “আমার কী দোষ ছায়েব! আমি কি হাত গুনতে জানি? ওই পোড়ো গাঁয়ের দিকে এখন ভূতের ভয়ে লোক পা দেয় না। নেহাত নিতাই পাইক ওদিকে আচমকা গিয়ে পড়েছিল, তাই না জানতে পারলাম! আমি আপনার মোস্ট ফেইথফুল...”

“এনাফ অব দিস।” অধৈর্য গলায় তাকে ধমকে উঠল রিচার্ড। আগে ক্রাইসিসটাকে সামলানো দরকার। তারপর এই অকম্মা নায়েবের বন্দোবস্ত করা যাবে’খন।

“নাউ গো। গেট দ্য পাইক্‌স্‌ রেডি। আর শোনো। হাকিমপুর কুঠিতে জনসনকে খবর দাও। সেখান থেকে অন্তত আরও পঞ্চাশজন এক্সট্রা পাইক চাই আমার। আজ রাতেই এদের...”

ঠান্ডা গলায় কথাগুলো বলতে-বলতেই দেয়ালে ঝোলানো বিশ্বস্ত বন্দুকটাকে নামিয়ে আনছিল রিচার্ড।

*

ছোট্ট ছিপনৌকাটা জলের ওপর দিয়ে যেন উড়ে যাচ্ছিল। জলুট পৌঁছোবার পর খানিক থিতু হতে, তারপর চাটুজ্জে হাকিমের সন্ধান পেতে দু-দুটো দিন কেটে গেছে। এক জায়গায় মোটে বসে থাকেন না মানুষটা। শেষে আজ দুপুরবেলা খবর মিলল, সন্ধে অবধি আতাখালি থানায় টহলে আছেন তিনি। তারপর ফের অন্য কোথা যাবেন। ভাঁটার দিকে আতাখালি কম করে চার-চারটি ঘণ্টার পথ। অতএব নৌকার দুই দাঁড়ি ভাটার টানের সঙ্গে-সঙ্গে মিলিয়ে দিচ্ছিল চার-হাতের দাঁড়ের ধাক্কাকেও। হাকিমের কাছে পৌঁছে, হেমাঙ্গিনীর নাম করে, তার বলে-দেয়া খবরটকু নিবেদন করতে হবে তাঁর কাছে। বিশ্বনাথের এমনই নির্দেশ।

অথচ, তাদের শত চেষ্টাকে উপেক্ষা করে আকাশ অন্ধকার হয়ে আসে। কুয়াশা মোড়া সন্ধে তার অন্ধকার ডানা ছড়িয়ে নেমে আসছে নদীর বিস্তীর্ণ বুকে। আতাখালি আর দূর নয়। বাঁকের মুখে তার আলো দেখা যায় ওই...

“আরে সামাল সামাল...”

সামনের আধো অন্ধকার থেকে হঠাৎ একটা চিৎকার ভেসে আসতে সচেতন হয়ে উঠল তারা। কুয়াশার মধ্যে সেখানে হঠাৎ ফুটে উঠছে একটা বড়সড় বজরার অবয়ব। তাড়াতাড়ি উল্টো দাঁড়ে নৌকার গতি কমিয়ে প্রাণপণে তাকে পাশ কাটিয়ে যাবে, ঠিক সেই সময় বজরা থেকে ভেসে আসা ধমকটা শুনে হঠাৎ একেবারে স্থির হয়ে গেল তারা। রাগী গলাটা তখন বলে চলেছে, “চোখের মাথা খেয়েছ নাকি হে মাঝির পো? একেবারে সাক্ষাত হাকিমের বজরায় চোট করতে আরেকটু হলে। বলি শ্রীঘরে পচবার সাধ হয়েছে? আরে আরে এ কী? পাগল নাকি? করো কী? করো...”

কথাটা শেষ হল না তার। হঠাৎ ছিপনৌকা তার মুখ ঘুরিয়ে সটান এসে বজরার গায়ে ধাক্কা দিয়েছে। আর প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই তার দুই ছোকরা মাঝির চিৎকার উঠেছে আকাশ-চেরা, “হাকিমের বজরা! জয় বাবা দক্ষিণরায়! প্রণাম হই গো হেকিমছায়েব। আমরা জলুট গ্রামের হেমাঙ্গিনীর কাছ থেকে সন্দেশ নিয়ে আসতেছি গো...”

বজরার সেপাইদের দল লাঠি-সোঁটা নিয়ে এগিয়ে আসছিল দুর্বিনীত মাঝি দু’জনকে শায়েস্তা করতে, কিন্তু হঠাৎ ভেতর থেকে একটা গম্ভীর গলা তাদের বাধা দিল, “ওদের আসতে দাও পালান। এ-নাম আমার চেনা।”

*

ছেলেদের কথা খানিক আগে শেষ হয়েছে। তাদের মুখে, প্রমাণ লোপের জন্য রিচার্ডের হাতে জলুট গ্রাম উজাড় হবার গল্প নিঃশব্দে শুনেছেন তিনি। হেমাঙ্গিনী ও বিশ্বনাথের অনুমান, তাদের ফিরে আসবার খবর পেয়ে আজ-কালের মধ্যেই ফের হামলা করবে সে। কথাটায় যুক্তি আছে। রিচার্ডের মতো নরপশুরা নিজেদের চামড়া বাঁচাবার জন্য সব কিছু করতে পারে।

নিঃশব্দে চিঠিটা লেখা শেষ করলেন হাকিমসাহেব। বেনাগ্রামের নীলকুঠিতে সদর থেকে এক কম্পানি সৈন্য পাঠাবার আদেশ। আর রিচার্ডের গ্রেফতারি পরওয়ানা... সে তিনি নিজেই বানিয়ে সঙ্গে করে নিয়ে যাবেন।

চিঠিটাকে লেফাফাবন্দি করে সামনে বসা ছেলেদুটোর দিকে ঘুরে তাকালেন তিনি, “এ-চিঠি নিয়ে খুলনা সদরে সেনাছাউনিতে ম্যাকফার্সনের কাছে কাল ভোরের মধ্যে পৌঁছে দিতে হবে।”

“নিশ্চিন্ত থাকেন কর্তা। সমুদ্দুরে নাও বাই। ভোর নয়, শেষরাত্তিরের আগে এ-চিঠি পৌঁছে যাবে।” একসঙ্গে মাথা নাড়ল ছেলে-দুটো।

“বেশ বেশ। এখন গিয়ে কিছু খেয়ে নাও আগে। তবে তাড়াতাড়ি...”

চিঠি হাতে উঠে দাঁড়াতে-দাঁড়াতে মাথা নাড়ল তারা, “আগে হেমদিদির কাজ কর্তা। খাওয়া-দাওয়া তার পরে হবে। আমরা যাই।”

“এসো।” বলে বড়-বড় পায়ে বজরার সারেঙের ঘরের দিকে চললেন বঙ্কিম। মেয়েটা মরেও মরেনি! ফিরে এসেছে ফের নতুন শক্তি নিয়ে। এ-অঞ্চলে আটেশ্বর আর নারায়ণীর প্রবাদের কথা তাঁরও কানে এসেছে। এরাই যে সেই দুই অবতার সে-খবরটাও আজ তাঁকে দিয়েছে এই দুই তরুণ। নারায়ণীর সঙ্গী এই আটেশ্বরটিকেও একবার দেখবার বড় ইচ্ছে হচ্ছিল তাঁর। এরই মধ্যে তাঁর আদেশে বজরা মুখ ঘুরিয়ে যেন ডানা মেলে উড়াল দিয়েছে জলুট গ্রামের দিকে। অনুকূল হাওয়ায় উজান ঠেলে ছুটছে তরতরিয়ে। ভোরের আগে সেখানে পৌঁছোনো যাবে কি?

*

রাত গভীর হয়েছে। নিঃশব্দ মেঠো পথ বেয়ে এগিয়ে চলে হাতিয়ারবন্দ পাইকের দল। তাদের লক্ষ্য দু’ক্রোশ দূরের জলুট গ্রাম। সাহেবের হুকুম পরিষ্কার। একজনকেও জ্যান্ত ছাড়া হবে না আজকের যুদ্ধে। সবক’টা লাশ রাত ভোর হবার আগেই আরুধির জলে বিসর্জন দিয়ে মুছে দিতে হবে তার অপরাধের সব প্রমাণকে।

বেনাগ্রাম ছেড়ে বাঘমারি। সে ছাড়িয়ে আরও এক ক্রোশ গিয়ে আরুধির কাঁচা বাঁধের রাস্তায় পড়তে একটা বাধা এল। পাশের ছিটে জঙ্গল থেকে হঠাই আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে ভেসে উঠেছে বাঘের গম্ভীর গর্জন। গোটা দলটা থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল সে-ডাক শুনে।

জঙ্গলের দিকে সাবধানে নজর চালাতে-চালাতেই রিচার্ডের হাতে উঠে আসছিল এ-দেশে সদ্য এসে পৌঁছোনো এনফিল্ড রাইফেলটা। এতে বারুদ ঠুসতে হয় না। সটান গুলি পুরে ট্রিগার টানলেই কাজ হয়ে যাবে।

পাইকরা ভয় পাচ্ছে। সারি ভেঙে একসঙ্গে জড়ো-সড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে সব। অন্ধকারে নিঃশব্দে যাওয়া আর সম্ভব হবে না এবারে। একরকম বাধ্য হয়েই মশাল জ্বালাবার নির্দেশ দিল রিচার্ড। সুন্দরবনের বাঘ সাদাকালো চামড়ায় তফাৎ করে না। অতএব লুকোছাপার উপায় নেই আর।

এক হাতে রাইফেলটা ধরে অন্য হাতে একটা মশাল তুলে নিয়ে সামনের দিকে ঘোড়া ছুটিয়ে দিল সে। তার পেছনে ছুটতে থাকা মশালের আলোগুলোর নীচ থেকে হো-হো আওয়াজ উঠেছে এইবার।

*

ওদিকে আরুধির পাশে জলুট গ্রামের ধ্বংসস্তূপে তখন ব্যস্ততা তুঙ্গে উঠেছে। মাইলখানেক দূরে বাঁধের রাস্তায় ওঠার মুখে গাছের মাথায় লুকিয়ে থাকা নজরদারের বাঘের ডাকের ফল, বিশ্বনাথ যেমনটি চেয়েছিল ঠিক তেমনটি হয়েছে। মশাল জ্বলে হইচই করে এগোতে বাধ্য করেছে সাহেবকে তা। লুকিয়ে এসে হামলা করার জো রাখেনি আর।

আলোর প্রয়োজন হচ্ছিল না অন্ধকারে অভ্যস্ত মানুষগুলোর। নিঃশব্দে সার বেঁধে-বেঁধে বসে পড়েছে তারা নিজের-নিজের জায়গায়। মাথার ওপর ছড়িয়ে রাখা বুনো গাছের ডালপালার স্তূপের আড়ালে যন্ত্রচালিতের মতোই হাতে তুলে নিচ্ছে যার-যার অস্ত্র। সবার পেছনে তিরন্দাজ আর গুলতিবাজ ছেলেগুলো হাতে অস্ত্র ধরে পাথরের মতো স্থির। কাঁচা বেলের স্তূপ, ভাত খাবার কাঁসার থালা আর পোড়ামাটির ঢ্যালা নিয়ে তাদের খানিক সামনে বসে থাকা নারীবাহিনীর মুখে ভয়ের চিহ্নমাত্র নেই। সবার সামনে, বর্শার ফলার মতো ব্যূহ তৈরি করে সার-বেঁধে মাটির বুকে শুয়ে অপেক্ষায় আছে বিশ্বনাথের সবচেয়ে প্রিয় শিষ্যেরা, তার লেঠেল ছেলে-ছোকরার দল।

দূরে, এগিয়ে আসতে থাকা মশালের আলোগুলো ক্রমশ উজ্জ্বল হয়ে উঠছিল। লড়ুয়েদের অবস্থানগুলোয় শেষবারের মতো একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে বিশ্বনাথ নিচুগলায় বলল, “চল হেম...”

একশো হাত তফাতে দাঁড়ানো দুটো কেওরা গাছের মাথায় তরতর করে উঠে যাচ্ছিল তারা। ওর ওপরে দুপুরবেলাতেই মাচান বেঁধে রাখা হয়েছে। সেখানে গিয়ে বন্দুকের নলদুটো সামনের দিকে তাক করে নিঃশব্দে বসে পড়ল ওরা দুজন।

মশালের আলো এগিয়ে এসেছে কাছাকাছি। পশুর গর্জনের মতো পাইকদের হাঁকের শব্দ কানে এসে পৌঁছোয়। তারপর, হঠাৎ অন্ধকার থেকে বের হয়ে এল রিচার্ডের সাদা ঘোড়াটা। টগবগিয়ে ছুটে আসছে তা। তার টুপিওয়ালা মাথাটার দিকে নিশানা স্থির করে বারুদঠাসা গাদাবন্দুকের মাছিতে চোখ দিয়ে বসেছিল হেমাঙ্গিনী। আর একটু...চকমকি পাথরদুটো বারুদের পলতের কাছে এগিয়ে আনল সে...

আর তারপর একটা লম্বা শ্বাস ফেলে ফের সরিয়ে নিল তা। গ্রামের চৌহদ্দির ওপারে, বন্দুকের পাল্লার খানিক বাইরে এসে থেমে গেছে রিচার্ডের ঘোড়া।

*

“সুধন্য।” পেছনে পাইকের দলটাকে ইশারায় থামিয়ে দিয়ে চাপা গলায় ডাকল রিচার্ড। অন্ধকারে নিঃশব্দে পড়ে থাকা ধ্বংসস্তূপটার বুকে ইতিউতি গজিয়ে ওঠা কুঁড়েগুলোর মধ্যে প্রাণের কোনও সাড়া নেই। খোলা ময়দানটার বুকে ছড়িয়ে থাকা জঙ্গুলে গাছের কাটা ডালপালার স্তূপগুলো নিঃসাড়।

“আজ্ঞে হুজুর খবরে ভুল নাই। আমি একটু এগিয়ে...”

বলতে-বলতেই কয়েক-পা এগিয়ে গেল সুধন্য। আর তার সঙ্গে-সঙ্গেই হঠাৎ রাতের নৈঃশব্দকে খানখান করে অন্ধকার একটা গাছের মাথা থেকে একটা বুলেট ছুটে এসে তার পায়ের ঠিক সামনে খানিক ধুলো উড়িয়ে দিল।

“মাই গড! ইট্‌স্‌ আ ট্র্যাপ!” বলতে-বলতেই ঘোড়া নিয়ে খানিক পিছিয়ে গেল রিচার্ড। ততক্ষণে অন্য একটা গাছের মাথা থেকে বেজে উঠেছে হেমাঙ্গিনীর শাঁখ। দীর্ঘ একটা শব্দ। প্রথম আক্রমণের সঙ্কেত।

হঠাৎ যেন একটা সাড়া পড়ে গেছে মাঠ জুড়ে ছড়িয়ে থাকা পাতালতার স্তূপগুলোর মধ্যে। তাদের আড়াল থেকে মাটির ওপরে জাদুমন্ত্রের মতো উঠে দাঁড়াচ্ছিল সারিবদ্ধ সুশৃঙ্খল মানুষের একটা দল। পেছনে লুকিয়ে পড়া রিচার্ডকে ছাড়িয়ে এগিয়ে চলা পাইকের দলের মাথায় বৃষ্টির মতো অবিশ্রান্ত তির আর পোড়ামাটির গোলা এসে পড়ছিল সেই দলটার দিক থেকে। সে-আক্রমণের হাত থেকে নিজেদের বাঁচাতে ব্যস্ত পাইকের দলের দিকে তখন দৃঢ়পায়ে এগিয়ে আসছে সারবাঁধা মেয়ের দল।

এদিক-ওদিক মশাল জ্বলে উঠেছে অসংখ্য। সেই আলোয় মেয়েদের হাতে ধরে রাখা কাঁসার থালাগুলো ঝিকমিক করে ওঠে, তারপর নিখুঁত লক্ষ্যে সাক্ষাত মৃত্যুর মতো উড়ে আসে পাইকদের শরীর লক্ষ করে। উড়ে আসছিল অসংখ্য কাঁচা বেল, পোড়ামাটির শক্ত দলাও। আর তারই মাঝে-মাঝে অন্ধকার থেকে জেগে ওঠে জোড়া বন্দুকের ধমক। সঙ্গে-সঙ্গে মাটি নেয় দু’জন করে পাইক।

“ডরপুকের দল, রাধু পাইকের চ্যালা হয়ে মেয়েদের হাতে মার খেয়ে পালাচ্ছিস লজ্জা নেই?” ছত্রভঙ্গ হয়ে এলোমেলো ছুটতে থাকা পাইকের দল হঠাৎ থমকে দাঁড়াল ভারী গলার শব্দটা পেয়ে। রাধুর বিরাট চেহারাটা তাদের সামনে এসে পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়েছে।

পাইকের দলটাকে ঠিক মাঝখানে রেখে একটা মালার মতোই তাদের ঘিরে তখন ছড়িয়ে যাচ্ছে গ্রামবাসীদের মশালের আলো।

“সামনে এগো... সোজা। এদের বাঁধন ভেঙে...”

ঘুরে দাঁড়িয়েছে পাইকের দল। একদল জন্তুর মতোই গর্জন করতে-করতে আক্রমণকে তুচ্ছ করে তারা ছুটে যেতে চায় সামনের দিকে। তাদের মাঝখানে এলোমেলো ছুটে ফেরে রিচার্ডের খালি ঘোড়াটা। বন্দুকের গুলির সহজ নিশানা হতে সে চায় না। কাজেই ঘোড়া ছেড়ে সে সরে গেছে পেছনদিকের অন্ধকারে।

হঠাৎ দ্বিতীয় একটা শাঁখের আওয়াজ ভেসে এল তাদের একেবারে কাছ থেকে। সঙ্গেসঙ্গে স্থির হয়ে গিয়েছে তাদের ঘিরে ছোট হয়ে আসতে থাকা আলোর মালাটা। অস্ত্রের বৃষ্টি থেমে গেছে যেন কোনও জাদুতে। রাধুর পাইকের দলের সামনে তখন অন্ধকার মাটি থেকে উঠে দাঁড়িয়ে এগিয়ে আসছিল লাঠি হাতে তরুণদের একটা দল। একেকজনের বিরুদ্ধে উঁচিয়ে উঠছিল পাঁচ-ছটা সুশিক্ষিত লাঠি।

দেখতে-দেখতে লাঠির ঘায়ে মাটি নেয়া পাইকের দলটার মধ্যে একলা দাঁড়িয়ে রইল রাধুর বিরাট শরীরটা। তাকে ঘিরে ধরা দলটার দিকে একটা হিংস্র জন্তুর মতো চেয়ে-চেয়ে দেখে সে শুধু। এতগুলো লাঠির বিরুদ্ধে একলা কিছু করবার সাধ্য তার নেই।

“চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলি যে বড়? বাপের ব্যাটা হলে রাধু পাইকের সঙ্গে একজন একজন করে লাঠি ধর শেয়ালের দল।” দাঁতগুলো বের করে বারবার হিংস্রভাবে হাঁক দিয়ে উঠছিল রাধু। এইভাবে কয়েকটা ছেলেছোকরার কাছে অপদস্থ হয়ে গালাগাল আর অভিশাপের খই ফুটছে এখন তার মুখে।

তাকে ঘিরে থাকা ছেলের দল অশান্তভাবে দুলে উঠছিল একবার। তারপর ফের নিজেদের সংযত করছিল। এর গায়ে হাত ছোঁয়ানো তাদের মানা।

রাধুর ছুড়ে দেয়া যুদ্ধের আহ্বান, বাঘের গর্জনের মতোই ভেসে যাচ্ছিল নিঃশব্দ রাতের আকাশ বেয়ে। “বন্দুকটা ধর হেম।” গাছ থেকে নেমে এসে তার পাশাপাশি দাঁড়ানো হেমাঙ্গিনীর দিকে তাকিয়ে বিশ্বনাথ বলে উঠল, “রাধুর শখটা মিটিয়ে দিয়ে আসি।”

“না। আমার বন্দুকটা তুমি বরং ধরো বিশেদাদা।” ঘামে ভেজা চুলগুলো কপাল থেকে সরিয়ে দিতে-দিতে হাসল হেমাঙ্গিনী, “আমার পিঠে পা তুলেছিল ও। তার শাস্তি পেতে হবে না? দেখি, পা দুটো দেখি তোমার...”

“আরে... আরে... কী করছিস কী পাগলি?” বিশ্বনাথ তাড়াতাড়ি সরে যাচ্ছিল। ততক্ষণে তার পায়ে হাত ছুঁইয়ে মাথায় ঠেকিয়েছে হেমাঙ্গিনী, “লাঠি বল কি বন্দুক, গুরু তো তুমি। আজ শিষ্যের পরীক্ষা যে! পায়ের ধুলো নেব না?”

তার মাথায় বড় ভালোবাসায় একবার হাত বুলিয়ে দিল বিশ্বনাথ। তারপর বলল, “তাই হোক তবে। রাধুকে তুই দ্যাখ। আমি রিচার্ডকে...”

“না!” হঠাৎ থমকে গেল হেমাঙ্গিনী, “ও আমার!”

বিশ্বনাথ হাসল, “হ্যাঁ রে হেম। আমি তো শুধু ওটাকে ধরে এনে তোর পায়ের সামনে...”

Hemangini2

রাধুকে ঘিরে থাকা দলটার মধ্যে দিয়ে লাঠি হাতে ছুটে আসতে থাকা মেয়েটার দিকে তাকিয়ে নিজের চোখকে বিশ্বাস হচ্ছিল না রিচার্ডের। রাধুকে ঘিরে ভোমরার ডাকের মতো গুঞ্জন তুলেছে তার লাঠি। হরিশের বোন! কিন্তু এতদিন নিখোঁজ থেকে হেমাঙ্গিনী এখানে ফের...

নিরাপদ দূরত্বে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে যুদ্ধটা দেখেছে সে। দেখেছে কেমন করে তার হেরে যাওয়া দলটাকে ঘিরে ফেলে পাহারায় রয়েছে গ্রামের লোকজন। মাঝখানের ময়দানে লাঠির যুদ্ধের নীরব দর্শক তারা। কিন্তু রিচার্ড জানে, বিপদের বিন্দুমাত্র আন্দাজ পেলে চারদিক থেকেই উড়ে আসবে প্রাণঘাতী তির, গুলতি বা থালাবাসনের ঝাঁক। ফাঁদে পড়া জন্তুর মতোই অস্থিরভাবে পায়চারি করছিল সে। উল্টোদিক থেকে তখন বারেবারে জিগির উঠেছে, “জয় মা নারায়ণী, জয় আটেশ্বর...”

আঘাতে-প্রত্যাঘাতে জমে ওঠা সেই খেলার মধ্যে থেকে রিচার্ডের বন্দুকের নল কেবল হেমাঙ্গিনীকে অনুসরণ করে চলেছিল। একটাই উপায় আছে এখন। এই মেয়েটাকে শেষ করতে পারলে এদের মনোবল ভেঙে দেয়া যাবে। তারপর সেই সুযোগে...

কাঁধের ঝোলানো বুলেটের মালা থেকে দাঁতে কামড়ে একটা বুলেট বের করে এনে নলে ঢোকাতে যাবে সে এমন সময় তার পিঠে একটা শক্ত কিছু ঠেকল। অন্ধকারের মধ্যে থেকে হিসহিসিয়ে উঠেছে একটা গলা, “চিনতে পারো সাহেব?”

*

সাপের ছোবলের মতো লিকলিকে লাঠিটা তার রক্ষণকে ভেঙে ঢুকে এসে বুকের ওপর একটা লাল দাগ দিয়ে দিতে একমুহূর্তের জন্য থমকে গেছিল রাধু। সামনের মেয়েটা অসম্ভব ক্ষিপ্র। হালকা শরীরটা বাতাসে ভাসিয়ে তুলছে বারবার। রাধুর লাঠি এখনও তার শরীরকে খুঁজে পায়নি। এ-ভাবে হবে না। হঠাৎ একটা লম্বা লাফে মেয়েটার নাগাল থেকে ছিটকে সরে গেল সে। হাতের লাঠিটা ছুড়ে ফেলে দিয়ে কোমর থেকে খুলে এনেছে ঝিকিয়ে ওঠা হিলহিলে তলোয়ারটা...

“শ্যামলালের ঘরের কালনাগিনী, এইবার তোকে কে বাঁচাবে রে?” একটা হিংস্র হাসি ফুটিয়ে মাথার ওপর তলোয়ারটা তুলে ধরে এইবার সে ছুটে আসছিল হেমাঙ্গিনীর দিকে। নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে বাঁ-দিকে হাত বাড়াল মেয়েটা। হাতের খাটো লাঠিটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে সে-ও। তার অন্য হাতে কেউ একজন ধরিয়ে দিয়েছে পাঁচহাতি একটা লম্বা লাঠি।

শান্ত হয়ে অপেক্ষা করছিল হেমাঙ্গিনী। হঠাৎ করে সবকিছু যেন বড় ধীরে ঘটতে শুরু করেছে তার সামনে। ছুটে আসা রাধুর প্রত্যেকটা পদক্ষেপ আলাদা-আলাদা করে দেখতে পাচ্ছিল সে... আর একটু কাছে... আর একটু...

হঠাৎ একটা বিদ্যুৎ খেলে গেল মেয়েটার শরীরে। কালনাগিনীর মতো ক্ষিপ্রতায় হিলহিলে শরীরটা মাটির ওপর ছড়িয়ে দিয়ে লাঠিটাকে সে বাড়িয়ে ধরেছে ছুটে আসা রাধুর পায়ের ফাঁকে। তারপর তাতে দক্ষ হাতের একটা মোচড়ে রাধুকে বেসামাল করে দিয়ে দু’পাক গড়িয়ে গিয়েই একটা স্প্রিঙের মতো বাতাসে ফের যখন লাফ দিয়ে উঠল সে, তখন রাধুর শরীরটা তার পায়ের নীচে।

তার ঘাড়ে একটা পায়ের চাপ দিয়ে মাথার ওপরে লাঠিটা তুলে ধরল হেমাঙ্গিনী, “এইবার রাধু পাইক? পিঠে পায়ের গুঁতো কেমন লাগে?”

দমবন্ধ হয়ে আসছিল রাধুর। মুখ ঘুরিয়ে বড়বড় চোখে সে তাকিয়ে দেখে মাথার ওপরে এলোচুল ওড়ানো সাক্ষাত রূদ্ররূপিণী নারায়ণীর মতন সেই মেয়েটাকে। সেদিকে চোখ ধরে রেখেই আস্তে-আস্তে তার ডানহাতটা এগিয়ে যাচ্ছিল নাগালের ভেতর পড়ে থাকা তলোয়ারটার দিকে...

“অস্তোর ছুঁবি না রাধু। নইলে আজ তোদের সাহেবকে...”

হঠাৎ যুদ্ধ থামিয়ে ঘুরে তাকাল দু’পক্ষই। আকাশে হাত তুলে এগিয়ে আসছে দোর্দণ্ডপ্রতাপ রিচার্ডসাহেব। তার পিঠে বন্দুকের নল ঠেকিয়ে ধরে রেখেই বিশ্বনাথ চাপা গলায় আদেশ দিল এবার, “পাইকগুলোর লাঠি-সড়কি বন্দুক কেড়ে নিয়ে দড়ি বেঁধে ফেলে রাখ এখানে। না-হোক যেন কোনও প্রাণ না যায়। তারপর রাধু আর রিচার্ডকে সঙ্গে নিয়ে, আন্ধেরিয়ার মাঠে মা নারায়ণীর থানে চল সব। ওখানেই আজ এদের সাজা হবে।”

*

সকাল হয়ে এসেছে। আন্ধেরিয়ার মাঠে আজ ফের একবার জড়ো হয়েছে গোটা জলুট গ্রাম। জোড়া বটগাছের নীচে হাত বাঁধা রিচার্ড আর রাধুর সামনে দাঁড়িয়েছিল হেমাঙ্গিনী। গাছটার দিকে বারবার ফিরে ফিরে তাকায় সে, আর নিজের মনেই বিড়বিড় করে বলে, “দ্যাখ দাদা। চেয়ে চেয়ে দ্যাখ। এই গাছে একদিন তোকে ওরা...

“...আজ এই গাছই তার শোধ নেবে।”

গাছের ডাল বেয়ে ওঠা ছেলের দল একগাছা দড়ি ঝুলিয়ে দিয়েছে সেখান থেকে। সে দড়ি রাধুর জন্য। রিচার্ডকে সে-পথে পাঠাতে রাজি হয়নি হেমাঙ্গিনী। এতদিন ধরে সযত্নে লালন করে রাখা বন্দুকটার গায়ে আনমনেই হাত বোলায় সে। হাতের ছোট পুঁটুলিটা থেকে বারুদ বের করে ঠেসে ঠেসে দেয় তার নলে। কামাগঞ্জের যুদ্ধের পর হাতের বালার কাটা একটা টুকরো যত্ন করে রেখে দিয়েছিল সে কাছে। আঁচলের গেরো খুলে সেটা বের করে এনে সে এইবার তুলে ধরল রিচার্ডের চোখের সামনে, “দেখো সাহেব। দেখতে পাও? এতে তোমার নাম লেখা আছে গো...”

বারুদঠাসা নলটার মধ্যে রুপোর টুকরোটা সাবধানে গুঁজে দিচ্ছিল সে। চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে এসেছে। একটা কাকপক্ষীরও সাড়া ওঠে না। সেই নৈঃশব্দের মধ্যেই আস্তে-আস্তে বন্দুকটা তুলে ধরে নিশানা নিল হেমাঙ্গিনী। তার হাতে উঠে এসেছে অগ্নিমুখী চকমকির দুটো টুকরো...”

“থামো মা! একটু সময় দাও আমাকে।”

পেছন থেকে হঠাৎ ভেসে আসা গম্ভীর গলাটা হেমাঙ্গিনীর চেনা। চমকে উঠে চকমকি-দুটোকে সরিয়ে নিল সে গাদাবন্দুকের পলতের কাছ থেকে। খুলনার হাকিমসাহেব কখন যেন এসে দাঁড়িয়েছেন তার পাশে।

“অ্যারেস্ট দেম হাকিম। দে অ্যাটাকড মাই কুঠি...”

হঠাৎ গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠেছে রিচার্ড। তার চোখের অসহায় ভাব কেটে গিয়ে ফের ফিরে আসছে দুর্বিনীত নীলকরের চাউনি।

হাকিম মাথা নাড়লেন, “মিথ্যে কথা সাহেব। আমি চোখের সামনে দেখছি তোমার লেঠেলের দল এ-গ্রামে এসে হামলা করেছে। এরা নিজেদের বাঁচিয়েছে তার হাত থেকে...”

বলতে-বলতে হেমাঙ্গিনীর দিকে ঘুরে দাঁড়ালেন তিনি, “অপরাধের সাজা দেবার দায়িত্ব হাকিমের মা। সে-কাজ তোমার নয়।”

হাতের বন্দুকটা চেপে ধরে দু-পা পিছিয়ে গেল হেমাঙ্গিনী। বুক কাঁপিয়ে উঠে আসা কান্নার দলাটাকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে রেখে শান্ত কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল, “তা হয় না। আজ একে আমি নিজের হাতে...”

“আমি জানি। অনেক দুঃখ সয়েছ তুমি। কিন্তু দেশের আইনের শক্তি যে অনেক বেশি মা। এ-গ্রামকে কেমন করে শক্তি দিয়ে তুমি নতুন জীবন দিয়েছ তার সব কথা আমি শুনেছি। বয়সে ছোট না হলে হয়ত তোমাকে একটা প্রণাম করতাম আমি এইখানে দাঁড়িয়ে। কিন্তু আজ এই নরপশুর প্রাণ নিজে হাতে নিলে আইন যে তোমাকেও এদের থেকে দূরে সরিয়ে দেবে। তুমি না থাকলে, যে মানুষগুলোর জীবন তুমি এমনভাবে ফিরিয়ে দিলে তারা যে মাতৃহীন হবে। তাদের এগিয়ে চলবার পথ দেখাবে কে? নিজের প্রতিশোধ নেয়া কি তার চেয়ে বড় হল তোমার কাছে?”

বলতে-বলতেই বড় আদরে হেমাঙ্গিনীর হাত থেকে বন্দুকটা সরিয়ে নিলেন তিনি, “এ হাত গড়বার হাত মা। প্রাণ নেবার জন্য এ-হাত তো নয়! এদের অপরাধের শাস্তি দেবার দায়িত্ব তুমি আমাকে দাও। কথা দিচ্ছি, আইন মোতাবেক যত কঠিন শাস্তি এদের পাবার কথা তা এরা পাবে। আমায় বিশ্বাস কর তুমি।”

চোখের সামনে সবকিছু বড় ঝাপসা হয়ে আসছিল হেমাঙ্গিনীর। আশ্চর্য বিশ্বাস জাগায় মানুষটার শান্ত, গম্ভীর গলা। সাধারণ ঘরের বড় সাধারণ মেয়ে সে। সে তো কখনও যুদ্ধ করবে বলে ভাবেনি! তবু, একটা অন্যায়ের সুবিচার যখন কেউ তাকে দিতে পারল না, তখন নিজে হাতে তা করবার দায় মাথায় নিয়ে সমাজ সংসার সব ছেড়েছিল সে। বুকে পাথর বেঁধে হেমাঙ্গিনী থেকে নারায়ণী হয়ে হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছিল বিশ্বনাথের পাশে দাঁড়িয়ে। আজ, এতদিন পরে এই প্রথম সেই সুবিচার অন্য কেউ দিতে পারেন বলে তাকে ভরসা দিয়েছে ওই গলার স্বর।

হঠাৎ দু’হাতে মুখ ঢেকে মাটির ওপর বসে পড়ল হেমাঙ্গিনী। আর সে পারে না যে! দু-চোখের জলে তার বুক ভেসে যায় শুধু। শরীরটা ফুলে-ফুলে ওঠে কান্নার দমকে। আজ এতদিন পরে, তার পাষাণবাঁধা বুকের ভেতর জমিয়ে রাখা সব দুঃখের বাঁধ ভেঙেছে নতুন করে।

তখন একটা শক্তপোক্ত হাত এসে তার কাঁধে ঠেকল। বড় যত্নে মাটি থেকে তুলে তাকে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছিল সে। তার গুরু, তার বন্ধুর বিশ্বস্ত হাত। বিশ্বনাথের সেই বাড়িয়ে দেয়া হাতটাকে প্রাণপণে চেপে ধরল হেমাঙ্গিনী। তারপর তাতে ভর করে আস্তে-আস্তে এগিয়ে এল মাঠ ছাড়িয়ে...

সেদিকে তাকিয়ে তরুণ হাকিম মাথা নাড়লেন একবার। এমন মেয়ে যেদিন বাংলার ঘরে-ঘরে জন্মাবে সেদিন এ-দেশের কোনও দুঃখ থাকবে না আর। দেবী নারায়ণী! যথার্থ নাম। হ্যাঁ। একদিন, কলমে যখন আরও শক্তি আসবে তাঁর, তখন ওর কথা লিখবেন তিনি। না। নির্জন বনে একাকী বড় হয়ে ওঠা মেয়ের গল্প নয়। ওকে নিয়ে তিনি লিখবেন, একজন সাধারণ মেয়ের নিজের শক্তিতে উঠে দাঁড়িয়ে মানুষ থেকে দুষ্টের দমন করা এক দেবীতে বদলে যাবার গল্প।

সে গল্পের বীজ তখন ধীরে-ধীরে অঙ্কুরিত হচ্ছিল কালজয়ী সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মনে।

_

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%