৬১. আহতের সাড়া

জগদীশচন্দ্র বসু

এক্ষণে দেখা যাউক, কি কি বিভিন্নরূপে আহত বৃক্ষ তাহার ক্লিষ্টতা বাহিরে জ্ঞাপন করে। আমি এ সম্বন্ধে বৃক্ষের দুই প্রকার সাড়া বিবৃত করিব। প্রথমতঃ বর্ধনশীল গাছে ছুরি বসাইলে বৃদ্ধির মাত্রা বাড়ে কি কমে, সে বিষয় জ্ঞাপন করিব। দ্বিতীয়তঃ গাছের পাতা কাটিয়া ফেলিলে সেই অস্ত্রাঘাতে গাছ এবং বৃক্ষবিচ্যুত পাতা কিরূপ অনুভব করিবে তাহা দেখাইব।
গাছ স্বভাবতঃ কতখানি করিয়া বাড়ে তাহা জানিতে হইলে অনেক সময় লাগে। শম্বুকের গতি হইতেও গাছের বৃদ্ধিগতি ছয় সহস্র গুণ ক্ষীণ; এজন্য আমাকে এক নূতন কল আবিষ্কার করিতে হইয়াছে, তাহার নাম, ক্রেস্কোগ্রাফ। তাহা দ্বারা বৃদ্ধিমাত্রা কোটি গুণ বাড়াইয়া লিপিবদ্ধ হয়। যেখানে অণুবীক্ষণ পরাস্ত, তাহার পরও ক্রেস্কোগ্রাফের কৃতিত্ব লক্ষগুণ বেশী। কোটি গুণ বৃদ্ধি আপনারা মনে ধারণা করিতে পারিবেন না; এজন্য গল্পচ্ছলে উদাহরণ দিতেছি। একবার বাংলা-নাগপুর এবং ইস্ট ইণ্ডিয়া রেলের গাড়ির দৌড় হইয়াছিল- কে আগে যাইতে পারে। এমন সময় এক শম্বুক তাহা দেখিয়া হাস্য সংবরণ করিতে পারিল না। অমনি সে ক্রেস্কোগ্রাফের উপর আরোহণ করিল। খানিক পরে ঘাড় ফিরাইয়া দেখিতে পাইল, গাড়ি বহু পশ্চাতে পড়িয়া রহিয়াছে।
ইচ্ছা ছিল কলের নাম ক্রেস্কোগ্রাফ না রাখিয়া ‘বৃদ্ধিমান’ রাখি। কিন্তু হইয়া উঠিল না। আমি প্রথম প্রথম আমার নূতন কলগুলির সংস্কৃত নাম দিয়াছিলাম; যেমন ‘কুঞ্চনমান’ এবং ‘শোষণমান’। স্বদেশী প্রচার করিতে যাইয়া অতিশয় বিপন্ন হইতে হইয়াছে। প্রথমতঃ, এই সকল নাম কিম্ভুতকিমাকার হইয়াছে বলিয়া বিলাতি কাগজ উপহাস করিলেন। কেবল বোস্টনের প্রধান পত্রিকা অনেকদিন আমার পক্ষ সমর্থন করিয়াছিলেন। সম্পাদক লেখেন, ‘যে আবিষ্কার করে, তাহারই নামকরণের প্রথম অধিকার। তাহার পর নূতন কলের নাম পুরাতন ভাষা লাটিন ও গ্রীক হইতেই হইয়া থাকে। তাহা যদি হয় তবে অতি পুরাতন অথচ জীবন্ত সংস্কৃত হইতে কেন হইবে না?’ বলপূর্বক যেন নাম চালাইলাম, কিন্তু ফল হইল অন্যরূপ। গতবারে আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়ের বক্তৃতার সময় তথাকার বিখ্যাত অধ্যাপক আমার কল ‘কাঞ্চনম্যান’ সম্বন্ধে ব্যাখ্যা করিবার জন্য অনুরোধ করিলেন। প্রথমে বুঝিতে পারি নাই, শেষে বুঝিলাম ;কুঞ্চনমান’ ‘কাঞ্চনম্যানে’ রূপান্তরিত হইয়াছে। হাণ্টার সাহেবের প্রণালী মতে কুঞ্চন বানান করিয়াছিলাম, হইয়া উঠিল কাঞ্চন। রোমক অক্ষরমালার বিশেষ গুণ এই যে, ইহার কোনো- একটা স্বরকে অ হইতে ঔ পর্যন্ত যথেচ্ছরূপে উচ্চারণ করা হইতে পারে; কেবল হয় না, ঋ ও ৯। তাহাও উপরে কিংবা নীচে দুই-একটা ফোঁটা দিলে হইতে পারে।
সে যাহা হউক, বুঝিতে পারিলাম-হিরণ্যকশিপুকে দিয়া বরং হরিনাম উচ্চারণ করানো যাইতে পারে, কিন্তু ইংরেজকে বাংলা কিংবা সংস্কৃত বলানো একেবারেই অসম্ভব। এজন্যই আমাদের হরিকে হ্যারী হইতে হয়। এই সকল দেখিয়া কলের ‘বৃদ্ধিমান’ নামকরণের ইচ্ছা একেবারে চলিয়া গিয়াছে। বৃদ্ধিমান- হইতে বার্‌ডোয়ান হইত। তার চেয়ে বরং ক্রেস্কোগ্রাফই ভালো।
বাড়ন্ত গাছ প্রতি সেকেণ্ডে কতটুকু বৃদ্ধি পায় তাহা পর্যন্ত এই কল লিখিয়া দেয়। ইহাতে জানা যায় যে, এই গাছটি এক মিনিটে এক ইঞ্চির লক্ষ ভাগের ৪২ ভাগ করিয়া বাড়িতেছিল। গাছটিকে তখন একখানা বেত দিয়া সামান্য রকমে আঘাত করিলাম। অমনি গাছের বৃদ্ধি একেবারে কমিয়া গেল। সে আঘাত ভুলিয়া গাছের আধ ঘণ্টার অধিক সময় লাগিয়াছিল। তাহার পর অতি সন্তর্পণে সে পুনরায় বাড়িতে আরম্ভ করিল। হে বেত্রপাণি স্কুল মাস্টার, তোমার কানমলা খাইয়া কেহ কেহ যে হাইকোর্টের জজ পর্যন্ত হইয়াছেন, তাহাতে কোনো সন্দেহ নাই। কিন্তু ছেলেরা তোমার হাতে বেত খাইয়া যে হঠাৎ লম্বায় বাড়িয়া উঠিবে, এ সম্বন্ধে গুরুতর সন্দেহ আছে। সর্বপ্রকার আঘাতেই বৃদ্ধি করিয়া যায়। সূঁচ দিয়া বিঁধিয়াছিলাম, তাহাতে গাছের বৃদ্ধি কমিয়া এক-চতুর্থ হইয়া গেল। এক ঘণ্টা পরেও সে আঘাত সামলাইয়া উঠিতে পারে নাই, তখনও বৃদ্ধি গতি অর্ধেকেরও অধিক হইতে পারে নাই। ছুরি দিয়া লম্বাভাবে চিরিলে আঘাত আরও গুরুতর হয়। তাহাতে বৃদ্ধি অনেক সময় পর্যন্ত থামিয়া যায়। কিন্তু লম্বা চেরার চেয়ে এপাশে ওপাশ করিয়া কাটা আরও নিদারুণ। কই-মাছ কাটিবার সময় এই কথাটি যেন গৃহলক্ষ্মীরা মনে রাখেন।

সকল অধ্যায়
১.
০১. কথারম্ভ
২.
০২. যুক্তকর
৩.
০৩. আকাশ-স্পন্দন ও আকাশ-সম্ভব জগৎ
৪.
০৪. উদ্ভিদের জন্ম ও মৃত্যু
৫.
০৫. মন্ত্রের সাধন
৬.
০৬. অদৃশ্য আলোক
৭.
০৭. আলোর সাধারণ প্রকৃতি
৮.
০৮. আলোর বিবিধ বর্ণ
৯.
০৯. মৃত্তিকা-বর্তুল ও কাচ-বর্তুল
১০.
১০. সর্বমুখী এবং একমুখী আলো
১১.
১১. বক-কচ্ছপ সংবাদ
১২.
১২. তারহীন সংবাদ
১৩.
১৩. পলাতক তুফান
১৪.
১৪. অগ্নি পরীক্ষা
১৫.
১৫. ভাগীরথীর উৎস-সন্ধানে
১৬.
১৬. বিজ্ঞানে সাহিত্য
১৭.
১৭. কবিতা ও বিজ্ঞান
১৮.
১৮. বিজ্ঞানে সাহিত্য – অদৃশ্য আলোক
১৯.
১৯. বৃক্ষজীবনের ইতিহাস
২০.
২০. বৃক্ষের দৈনন্দিন ইতিহাস
২১.
২১. ভারতে অনুসন্ধানের বাধা
২২.
২২. গাছের লেখা
২৩.
২৩. উপসংহার
২৪.
২৪. নির্বাক জীবন
২৫.
২৫. তরুলিপি
২৬.
২৬. গাছ লাজুক কি অ-লাজুক
২৭.
২৭. অনুভূতি কাল নিরূপণ
২৮.
২৮. সাড়ার মাত্রা
২৯.
২৯. বৃক্ষে উত্তেজনাপ্রবাহ
৩০.
৩০. স্বতঃস্পন্দন
৩১.
৩১. বনচাঁড়ালের নৃত্য
৩২.
৩২. মৃত্যুর সাড়া
৩৩.
৩৩. নবীন ও প্রবীণ
৩৪.
৩৪. দলাদলি
৩৫.
৩৫. পরিষদ-গৃহে বক্তৃতা
৩৬.
৩৬. বোধন
৩৭.
৩৭. জীবনসংগ্রাম
৩৮.
৩৮. লোকসেবা
৩৯.
৩৯. শিল্পোদ্ধার
৪০.
৪০. মানসিক শক্তির বিকাশ
৪১.
৪১. বিফলতা
৪২.
৪২. মনন ও করণ
৪৩.
৪৩. রানী-সন্দর্শন
৪৪.
৪৪. নিবেদন
৪৫.
৪৫. পরীক্ষা
৪৬.
৪৬. জয়-পরাজয়
৪৭.
৪৭. পৃথিবী পর্যটন
৪৮.
৪৮. বীরনীতি
৪৯.
৪৯. বিজ্ঞান-প্রচারে ভারতের দান
৫০.
৫০. আশা ও বিশ্বাস
৫১.
৫১. আবিষ্কার এবং প্রচার
৫২.
৫২. অর্ঘ্য
৫৩.
৫৩. দীক্ষা
৫৪.
৫৪. আহত উদ্ভিদ
৫৫.
৫৬. জীবনের মাপকাঠি
৫৬.
৫৭. গাছের উত্তেজনার কথা
৫৭.
৫৮. গাছের লিপিযন্ত্র
৫৮.
৫৯. গাছের লেখা হইতে তাহার ভিতরকার ইতিহাস উদ্ধার
৫৯.
৬০. পাত্রাধার তৈল
৬০.
৬১. আহতের সাড়া
৬১.
৬২. আঘাতে অনুভূতি-শক্তির বিলোপ
৬২.
৬৩. জন্মভূমি
৬৩.
৬৪. স্নায়ুসূত্রে উত্তেজনা-প্রবাহ
৬৪.
৬৫. স্বতঃস্পন্দন ও ভিতরের শক্তি
৬৫.
৬৬. ইন্দ্রিয়-অগ্রাহ্য কিরূপে ইন্দ্রিয়-গ্রাহ্য হইবে?
৬৬.
৬৭. বাহিরের শক্তির প্রতিরোধ
৬৭.
৬৮. বৃক্ষে স্নায়ুসূত্র
৬৮.
৬৯. আণবিক সন্নিবেশে উত্তেজনা-প্রবাহের হ্রাস-বৃদ্ধি
৬৯.
৭০. পরীক্ষা
৭০.
৭১. ভিতর ও বাহির
৭১.
৭২. হাজির
৭২.
৭৩. বৃক্ষের অঙ্গভঙ্গী
৭৩.
৭৪. সবিতার রথ
৭৪.
৭৫. ছাত্রসমাজের প্রতি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%