৭২. হাজির

জগদীশচন্দ্র বসু

হঠাৎ চীৎকার করিয়া কেহ উত্তর দিল-‘হাজির’! কাহাকেও ডাকিতে শুনি নাই, তথাপি অতি করুণ ও ভক্তি-উচ্ছ্বসিত স্বরে উত্তর শুনিলাম- ‘কি আজ্ঞা প্রভু?’ কে তোমার প্রভু, কাহার হুকুমে এরূপ উদ্দীপ্ত হইলে?
কি আশ্চর্য! একটি কথাতেই জীবনের সমস্ত স্তরগুলি আলোড়িত হইল। সুপ্তস্মৃতি আজ জাগরিত- যাহা অশব্দ, আজ তাহা শব্দায়মান; যাহা বুদ্ধির অগম্য ছিল, আজ তাহা অর্থযুক্ত হইল। এখন বুঝিতে পারিতেছি, বাহির ছাড়া ভিতর হইতেও হুকুম আসিয়া থাকে। মনে করিতাম, আমার ইচ্ছাতেই সব হইয়াছে। আমি কি এক? একটু মন স্থির করিলেই দুই এর মধ্যে যে সর্বদা কথা চলিতেছে তাহা শুনিতে পাই। ইহারাই আমাকে চালাইতেছে। ইহাদের মধ্যে কুমতি তো আমি, সুমতি তবে কে?
এ সম্বন্ধে ২৭ বৎসর পূর্বের কয়েকটি ঘটনা মনে পড়িতেছে। কোনোদিনও লিখিতে শিখি নাই, কিন্তু ভিতর হইতে কে আমাকে লিখাইতে আরম্ভ করিল। তাহারই অজ্ঞাতে ‘আকাশ-স্পন্দন ও অদৃশ্য আলোক’ বিষয়ে লিখিলাম। পরে লিখাইল, ‘উদ্ভিদ-জীবন মানবীয় জীবনেরই ছায়া মাত্র’ জীবন সম্বন্ধে বেশী কিছুই জানিতাম না। কাহার আদেশে এরূপ লিখিলাম? লিখিয়াও নিষ্কৃতি পাইলাম না; ভিতর হইতে কে সমালোচক সাজিয়া বলিতে লাগিল-‘এত যে কথা রচনা করিলে, পরীক্ষা করিয়া দেখিয়াছ কি- ইহার কোনটা সত্য, কোন‌্‌টা মিথ্যা?’ জবাব দিলাম, ‘যেসব বিষয় অনুসন্ধান করিতে গিয়া বড়ো বড়ো পণ্ডিতেরা পরাস্ত হইয়াছেন, আমি সে সব কি করিয়া নির্ণয় করিব? তাহাদের অসংখ্য কল-কারখানা ও পরীক্ষাগার আছে, এখানে তাহার কিছুই নাই; অসম্ভবকে কি করিয়া সম্ভব করিব? ইহাতেও সমালোচকদের কথা থামিল না। অগত্যা ছুতার কামার দিয়া তিন মাসের মধ্যে একটা কল প্রস্তুত করিলাম। তাহা দিয়া যেসব অদ্ভুত তত্ত্ব আবিষ্কৃত হইল তাহা আমার কথা দূরে থাকুক, বিদেশী বৈজ্ঞানিকদিগকে পর্যন্ত বিস্মিত করিল।
অল্পদিনের মধ্যেই এ বিষয়ে অনেক সুখ্যাতি হইল এবং বিলাতের সংবর্ধনাসভায় নিমন্ত্রিত হইলাম। বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক উইলিয়াম রাম্‌সে বহু সাধুবাদ করিলেন; পরে বলিলেন, “কাহারও কাহারও মনে হইতে পারে যে, এখন হইতে ভারতে নূতন জ্ঞান-যুগ আরম্ভ হইল; কিন্তু একটি কোকিলের ধ্বনিতে বসন্তের আগমন মনে করা যুক্তিসংগত নহে।’ সেদিন বোধ হয় আমার উপর কুমতিরই প্রাদুর্ভাব হইয়া থাকিবে, কারণ স্পর্ধার সহিতই উত্তর দিয়াছিলাম। বলিয়াছিলাম, আপনাদের আশঙ্কা করিবার কোনো কারণ নাই, আমি নিশ্চয়ই বলিতেছি, শীঘ্রই ভারতের বিজ্ঞানক্ষেত্রে শত কোকিল বসন্তের আবির্ভাব ঘোষণা করিবে। এখন সেদিন আসিয়াছে; যাহা কুমতি বলিয়া ভয় করিয়াছিলাম, এখন দেখিতেছি তাহাই সুমতি। তখনকার শুভলগ্ন পাঁচ বৎসর পর্যন্ত অক্ষুণ্ণ ছিল। একদিনের পর আর-একদিন অধিকতর উজ্জ্বল হইতে লাগিল এবং সম্মুখের সমস্ত পথগুলিই খুলিয়া গেল।
এমন সময় যে হুকুম আসিল তাহাতে সোজা পথ ছাড়িয়া দুর্গম অনির্দিষ্ট পথ গ্রহণ করিতে হইল। তখন তারহীন যন্ত্র লইয়া পরীক্ষা করিতেছিলাম। দেখিতে পাইয়াছিলাম, কলের সাড়া প্রথম প্রথম বৃহৎ হইত, তাহার পর ক্ষীণ হইয়া লুপ্ত হইয়া যাইত। বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধে লিখিয়াছিলাম, দিবারন্তেই পরীক্ষণ শ্রেয়ঃ; কারণ সারাদিন পরীক্ষার পর কল ক্লান্ত হইয়া যায়। অমনি ভিতরকার সমালোচক বলিয়া উঠিল-‘কল কি মানুষ, যে ক্লান্ত হইবে?’
কলে কেন ক্লান্তি হয়? এই প্রশ্ন কিছুতেই এড়াইতে পারিলাম না। অনেকগুলি আবিষ্কার কেবল লিখিবার অপেক্ষায় ছিল। সে সব ছাড়িয়া দিয়া নূতন প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান করিতে হইল। ক্রমে দেখিতে পাইলাম, জীবনহীন ধাতুও উত্তেজিত এবং অবসাদগ্রস্ত হয়। উত্তেজনা স্থগিত রাখিলে স্বল্পাধিককালে ক্লান্তি দূর হয়। উদ্ভিদে এই সব প্রক্রিয়া অধিকতররূপে পরিস্ফুট দেখিলাম। এইরূপে বহুর মধ্যে একত্বের সন্ধান পাইয়াছিলাম।
জীবতত্ত্ববিদের হস্তে এই সব নূতন তত্ত্ব রাখিয়া পদার্থবিদ্যা বিষয়ে অনুসন্ধান করিবার জন্য ফিরিয়া আসিব, মনে করিয়াছিলাম; কিন্তু হিতে বিপরীত হইল। রয়্যাল সোসাইটিতে সব পরীক্ষা দেখাইয়াছিলাম। সর্বপ্রধান জীবতত্ত্ববিদ্ বার্ডন স্যাণ্ডারসন্ বলিলেন, ‘জীবনতত্ত্ব সম্বন্ধে আপনি যে পরীক্ষা করিয়াছেন সে সম্বন্ধে আমাদের চেষ্টা পূর্বে নিষ্ফল হইয়াছে; সুতরাং আপনার কথা অসম্ভব ও অগ্রাহ্য। আপনার সম্মুখে সেই প্রশস্ত পথে বহু কৃতিত্ব রহিয়াছে, আপনার অজ্ঞাত পথ হইতে নিবৃত্ত হউন।’ তখন কুমতির প্ররোচনায় বলিলাম, নিবৃত্ত হইব না, এই বন্ধুর পথই আমার। আজ হইতে সোজা পথ ছাড়িলাম। আজ যাহা প্রত্যাখ্যাত হইল তাহাই সত্য। ইচ্ছাতেই হউক অনিচ্ছাতেই হউক, তাহা সকলকে গ্রহণ করিতেই হইবে।
এই দুর্মতির ফল ফলিতে অধিক বিলম্ব হইল না। সব দিকের পথ একেবারে বন্ধ হইয়া গেল এবং সমস্ত আলো যেন অকস্মাৎ নিবিয়া গেল। কিন্তু ইহার পর হইতেই অন্তরের ক্ষীণ আলো অধিকতর পরিস্ফুট হইতে লাগিল। প্রখর আলোকে যাহা দেখিতে পাই নাই, এখন তাহা দেখিতে পাইলাম। আশা ও নিরাশার অতীত এই ভাবে বিশ বৎসর কাটিল।
এক বৎসর পূর্বে হঠাৎ যেন নির্দেশ শুনিতে পাইলাম, “বিদেশ যাও।” বিদেশযাত্রা! সেখানে কে আমার কথা শুনিবে? এবার কঠিন স্বর শুনিলাম, “আমার নাম হুকুম, তোমার নাম তামিল! লাভলাভ বলিবার তুমি কে?” আজ্ঞা শিরোধার্য করিয়া লইলাম।
তারপর সমস্ত দিকের রুদ্ধ দ্বার একেবারে খুলিয়া গেল। কাহার হুকুমে এরূপ হইল? একি স্বপ্ন? বিরোধী যাঁহারা ছিলেন, এখন তাঁহারাই পরম মিত্র হইলেন। যাহা প্রত্যাখ্যাত হইয়াছিল, এখন তাহা সর্বত্র গৃহীত হইল। বিশ বৎসর আগে যাহা কুমতি মনে করিয়াছিলাম, পুনরায় দেখিতে পাইলাম- তাহাই সুমতি।
সুতরাং কোন্‌টা সুমতি আর কোন্‌টা কুমতি জানি না। কোন্‌টা বড়ো আর কোন্‌টা ছোটো তাহাও মন বোঝে না। সুদিনের বৃহৎ সফলতা ভুলিয়া দুর্দিনের বিফলতার কথাই মনে পড়িতেছে। তখন সর্বত্রই পরিত্যক্ত হইয়াছিলাম, কেবল দুই-এক জনের অহেতুক স্নেহ আমাকে আগলাইয়া রাখিয়াছিল। আজ তাহারা অন্ধকার যবনিকার পরপারে। অস্ফুট ক্রন্দন কি সেথায় পৌঁছিয়া থাকে?
জীবনের যখন পূর্ণশক্তি তখন কোলাহলের মধ্যে তোমার নির্দেশ স্পষ্ট করিয়া শুনিতে পারিতাম না। এখন পারিতেছি; কিন্তু সব শক্তি নির্জীব হইয়া আসিতেছে। একদিন তোমার হুকুমে মাঝখানের যবনিকা ছিন্ন হইবে, মৃত্তিকা দিয়া যাহা গড়িয়াছিলে তাহা ধূলি হইয়া পড়িয়া রহিবে। কি লইয়া তখন সে তোমার নিকট উপস্থিত হইবে? অল্পই তাহার সুকৃতি, অসংখ্য তাহার দুষ্কৃতি। তবে বলিবার কি আছে? কোন্‌টা সুমতি আর কোন্‌টা দুর্মতি, এই ধন্ধাতেই জীবন কাটিয়াছে। সাফাই করিবার কথা যখন কিছুই নাই, তখন তোমার পদপ্রান্তে লুণ্ঠিত সে কেবল বলিবে- ‘আসামী হাজির!’

সকল অধ্যায়
১.
০১. কথারম্ভ
২.
০২. যুক্তকর
৩.
০৩. আকাশ-স্পন্দন ও আকাশ-সম্ভব জগৎ
৪.
০৪. উদ্ভিদের জন্ম ও মৃত্যু
৫.
০৫. মন্ত্রের সাধন
৬.
০৬. অদৃশ্য আলোক
৭.
০৭. আলোর সাধারণ প্রকৃতি
৮.
০৮. আলোর বিবিধ বর্ণ
৯.
০৯. মৃত্তিকা-বর্তুল ও কাচ-বর্তুল
১০.
১০. সর্বমুখী এবং একমুখী আলো
১১.
১১. বক-কচ্ছপ সংবাদ
১২.
১২. তারহীন সংবাদ
১৩.
১৩. পলাতক তুফান
১৪.
১৪. অগ্নি পরীক্ষা
১৫.
১৫. ভাগীরথীর উৎস-সন্ধানে
১৬.
১৬. বিজ্ঞানে সাহিত্য
১৭.
১৭. কবিতা ও বিজ্ঞান
১৮.
১৮. বিজ্ঞানে সাহিত্য – অদৃশ্য আলোক
১৯.
১৯. বৃক্ষজীবনের ইতিহাস
২০.
২০. বৃক্ষের দৈনন্দিন ইতিহাস
২১.
২১. ভারতে অনুসন্ধানের বাধা
২২.
২২. গাছের লেখা
২৩.
২৩. উপসংহার
২৪.
২৪. নির্বাক জীবন
২৫.
২৫. তরুলিপি
২৬.
২৬. গাছ লাজুক কি অ-লাজুক
২৭.
২৭. অনুভূতি কাল নিরূপণ
২৮.
২৮. সাড়ার মাত্রা
২৯.
২৯. বৃক্ষে উত্তেজনাপ্রবাহ
৩০.
৩০. স্বতঃস্পন্দন
৩১.
৩১. বনচাঁড়ালের নৃত্য
৩২.
৩২. মৃত্যুর সাড়া
৩৩.
৩৩. নবীন ও প্রবীণ
৩৪.
৩৪. দলাদলি
৩৫.
৩৫. পরিষদ-গৃহে বক্তৃতা
৩৬.
৩৬. বোধন
৩৭.
৩৭. জীবনসংগ্রাম
৩৮.
৩৮. লোকসেবা
৩৯.
৩৯. শিল্পোদ্ধার
৪০.
৪০. মানসিক শক্তির বিকাশ
৪১.
৪১. বিফলতা
৪২.
৪২. মনন ও করণ
৪৩.
৪৩. রানী-সন্দর্শন
৪৪.
৪৪. নিবেদন
৪৫.
৪৫. পরীক্ষা
৪৬.
৪৬. জয়-পরাজয়
৪৭.
৪৭. পৃথিবী পর্যটন
৪৮.
৪৮. বীরনীতি
৪৯.
৪৯. বিজ্ঞান-প্রচারে ভারতের দান
৫০.
৫০. আশা ও বিশ্বাস
৫১.
৫১. আবিষ্কার এবং প্রচার
৫২.
৫২. অর্ঘ্য
৫৩.
৫৩. দীক্ষা
৫৪.
৫৪. আহত উদ্ভিদ
৫৫.
৫৬. জীবনের মাপকাঠি
৫৬.
৫৭. গাছের উত্তেজনার কথা
৫৭.
৫৮. গাছের লিপিযন্ত্র
৫৮.
৫৯. গাছের লেখা হইতে তাহার ভিতরকার ইতিহাস উদ্ধার
৫৯.
৬০. পাত্রাধার তৈল
৬০.
৬১. আহতের সাড়া
৬১.
৬২. আঘাতে অনুভূতি-শক্তির বিলোপ
৬২.
৬৩. জন্মভূমি
৬৩.
৬৪. স্নায়ুসূত্রে উত্তেজনা-প্রবাহ
৬৪.
৬৫. স্বতঃস্পন্দন ও ভিতরের শক্তি
৬৫.
৬৬. ইন্দ্রিয়-অগ্রাহ্য কিরূপে ইন্দ্রিয়-গ্রাহ্য হইবে?
৬৬.
৬৭. বাহিরের শক্তির প্রতিরোধ
৬৭.
৬৮. বৃক্ষে স্নায়ুসূত্র
৬৮.
৬৯. আণবিক সন্নিবেশে উত্তেজনা-প্রবাহের হ্রাস-বৃদ্ধি
৬৯.
৭০. পরীক্ষা
৭০.
৭১. ভিতর ও বাহির
৭১.
৭২. হাজির
৭২.
৭৩. বৃক্ষের অঙ্গভঙ্গী
৭৩.
৭৪. সবিতার রথ
৭৪.
৭৫. ছাত্রসমাজের প্রতি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%