১২. তারহীন সংবাদ

জগদীশচন্দ্র বসু

অদৃশ্য আলোক ইট-পাটকেল, ঘর-বাড়ী ভেদ করিয়া অনায়াসেই চলিয়া যায়। সুতরাং ইহার সাহায্যে বিনা তারে সংবাদ প্রেরণ করা যাইতে পারে। ১৮৯৫ সালে কলিকাতা টাউনহলে এ সম্বন্ধে বিবিধ পরীক্ষা প্রদর্শন করিয়াছিলাম। বাংলার লেফ্‌টেন্যাণ্ট গবর্নর স্যার উইলিয়াম ম্যাকেঞ্জি উপস্থিত ছিলেন। বিদ্যুৎ-ঊর্মি তাঁহার বিশাল দেহ এবং আরও দুইটি রুদ্ধ কক্ষ ভেদ করিয়া তৃতীয় কক্ষে নানাপ্রকার তোলপাড় করিয়াছিল। একটা লোহার গোলা নিক্ষেপ করিল, পিস্তল আওয়াজ করিল এবং বারুদস্তূপ উড়াইয়া দিল। ১৯০৭ সালে মার্কনি তারহীন সংবাদ প্রেরণ করিবার পেটেন্ট গ্রহণ করেন। তাঁহার অত্যদ্ভুত অধ্যবসায় ও বিজ্ঞানের ব্যবহারিক উন্নতিসাধনে কৃতিত্বের দ্বারা পৃথিবীতে এক নূতন যুগ প্রবর্তিত হইয়াছে। পৃথিবীর ব্যবধান একেবারে ঘুচিয়াছে। পূর্বে দূর দেশে কেবল টেলিগ্রাফের সংবাদ প্রেরিত হইত, এখন বিনা তারে সর্বত্র সংবাদ পৌঁছিয়া থাকে।
কেবল তাহাই নহে। মনুষ্যের কণ্ঠস্বরও বিনা তারে আকাশতরঙ্গ সাহায্যে সুদুরে শ্রুত হইতেছে। সেই স্বর সকলে শুনিতে পায় না, শুনিতে হইলে কর্ণ আকাশের সুরের সহিত মিলাইয়া লইতে হয়। এইরূপে পৃথিবীর এক প্রান্ত হইতে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত অহোরাত্রি কথাবার্তা চলিতেছে। কান পাতিয়া তবে একবার শোনা। ‘কোথা হইতে খবর পাঠাইতেছে?’ উত্তর-‘সমুদ্র-গর্ভে, তিন শত হাত নীচে ডুবিয়া আছি। টর্পিডো দিয়া তিনখানা রণতরী ডুবাইয়াছি, আর দুইখানার প্রতীক্ষায় আছি।’ আবার এ কি? একেবারে লক্ষ লক্ষ কামানের গর্জন শোনা যাইতেছে, অগ্ন্যুৎপাতে যেন মেদিনী বিদীর্ণ হইল। পরে জানিলাম মহাসাম্রাজ্য চূর্ণ হইয়াছে, কল্য হইতে পৃথিবীর ইতিহাস অন্যরকম হইবে। এই ভীষণ নিনাদের মধ্যেও মনুষ্য-কণ্ঠের কত মর্মবেদনাধ্বনি, কত মিনতি, কত জিজ্ঞাসা ও কত রকমের উত্তর শোনা যায়। ইহার মধ্যে কে একজন অবুঝের মতো বার বার একই নাম ধরিয়া ডাকিতেছে– ‘কোথায় তুমি– কোথায় তুমি? কোনো উত্তর আসিল না-সে আর এই পৃথিবীতে নাই।
এইরূপ দূরদূরান্ত বাহিয়া আকাশের সুর ধ্বনিত হইতেছে। মনে কর, কোনো অদৃশ্য অঙ্গুলি বৈদ্যুতিক অর্গ্যানের বিবিধ স্টপ আঘাত করিতেছে। বাম দিকের স্টপে আঘাত করাতে এক সেকেণ্ডে একটি স্পন্দন হইল। অমনি শূন্যমার্গে বিদ্যুৎ-ঊর্মি ধাবিত হইল। কি প্রকাণ্ড সেই সহস্র ক্রোশব্যাপী ঢেউ! উহা অনায়াসে হিমাচল উল্লঙ্ঘন করিয়া এক সেকেণ্ডে পৃথিবী দশবার প্রদক্ষিণ করিল। এবার অদৃশ্য অঙ্গুলি দ্বিতীয় স্টপ আঘাত করিল। এইবার প্রতি সেকেণ্ডে আকাশ দশবার স্পন্দিত হইল। এইরূপে আকাশের সুর ঊর্ধ্ব হইতে ঊর্ধ্বতরে উঠিবে; স্পন্দনসংখ্যা এক হইতে দশ, শত, সহস্র, লক্ষ, কোটি গুণ বৃদ্ধি পাইবে। আকাশ-সাগরে নিমজ্জমান রহিয়া আমরা অগণিত ঊর্মি দ্বারা আহত হইব, কিন্তু ইহাতেও কোনো ইন্দ্রিয় জাগরিত হইবে না। আকাশ-স্পন্দন আরও ঊর্ধ্বে উঠুক তখন কিয়ৎক্ষণের জন্য তাপ অনুভূত হইবে। তাহার পর চক্ষু উত্তেজিত হইয়া রক্তিম, পীতাদি আলোক দেখিতে পাইবে। এই দৃশ্য আলোক এক সপ্তক গণ্ডীর মধ্যে আবদ্ধ। সুর আরও উচ্চে উঠিলে দৃষ্টিশক্তি পুনরায় পরাস্ত হইবে, অনুভূতি শক্তি আর জাগিবে না, ক্ষণিক আলোকের পরই অভেদ্য অন্ধকার।
তবে তো আমরা এই অসীমের মধ্যে একেবারে দিশাহারা, কতটুকুই বা দেখিতে পাই? একান্তই অকিঞ্চিৎকর! অসীম জ্যোতির মধ্যে অন্ধবৎ ঘুরিতেছি এবং ভগ্ন দিক্‌-শলাকা লইয়া পাহাড় লঙ্ঘন করিতে প্রয়াস পাইয়াছি। হে অনন্ত পথের যাত্রী, কি সম্বল তোমার?
সম্বল কিছুই নাই, আছে কেবল অন্ধ বিশ্বাস; যে বিশ্বাসবলে প্রবাল সমুদ্রগর্ভে দেহাস্থি দিয়া মহাদ্বীপ রচনা করিতেছে। জ্ঞান-সাম্রাজ্য এইরূপ অস্থিপাতে তিল তিল করিয়া বাড়িয়া উঠিতেছে। আঁধার লইয়া আরম্ভ, আঁধারেই শেষ, মাঝে দুই একটি ক্ষীণ আলো-রেখা দেখা যাইতেছে। মানুষের অধ্যবসায়-বলে ঘন কুয়াশা অপসারিত হইবে এবং একদিন বিশ্বজগৎ জ্যোতির্ময় হইয়া উঠিবে।

সকল অধ্যায়
১.
০১. কথারম্ভ
২.
০২. যুক্তকর
৩.
০৩. আকাশ-স্পন্দন ও আকাশ-সম্ভব জগৎ
৪.
০৪. উদ্ভিদের জন্ম ও মৃত্যু
৫.
০৫. মন্ত্রের সাধন
৬.
০৬. অদৃশ্য আলোক
৭.
০৭. আলোর সাধারণ প্রকৃতি
৮.
০৮. আলোর বিবিধ বর্ণ
৯.
০৯. মৃত্তিকা-বর্তুল ও কাচ-বর্তুল
১০.
১০. সর্বমুখী এবং একমুখী আলো
১১.
১১. বক-কচ্ছপ সংবাদ
১২.
১২. তারহীন সংবাদ
১৩.
১৩. পলাতক তুফান
১৪.
১৪. অগ্নি পরীক্ষা
১৫.
১৫. ভাগীরথীর উৎস-সন্ধানে
১৬.
১৬. বিজ্ঞানে সাহিত্য
১৭.
১৭. কবিতা ও বিজ্ঞান
১৮.
১৮. বিজ্ঞানে সাহিত্য – অদৃশ্য আলোক
১৯.
১৯. বৃক্ষজীবনের ইতিহাস
২০.
২০. বৃক্ষের দৈনন্দিন ইতিহাস
২১.
২১. ভারতে অনুসন্ধানের বাধা
২২.
২২. গাছের লেখা
২৩.
২৩. উপসংহার
২৪.
২৪. নির্বাক জীবন
২৫.
২৫. তরুলিপি
২৬.
২৬. গাছ লাজুক কি অ-লাজুক
২৭.
২৭. অনুভূতি কাল নিরূপণ
২৮.
২৮. সাড়ার মাত্রা
২৯.
২৯. বৃক্ষে উত্তেজনাপ্রবাহ
৩০.
৩০. স্বতঃস্পন্দন
৩১.
৩১. বনচাঁড়ালের নৃত্য
৩২.
৩২. মৃত্যুর সাড়া
৩৩.
৩৩. নবীন ও প্রবীণ
৩৪.
৩৪. দলাদলি
৩৫.
৩৫. পরিষদ-গৃহে বক্তৃতা
৩৬.
৩৬. বোধন
৩৭.
৩৭. জীবনসংগ্রাম
৩৮.
৩৮. লোকসেবা
৩৯.
৩৯. শিল্পোদ্ধার
৪০.
৪০. মানসিক শক্তির বিকাশ
৪১.
৪১. বিফলতা
৪২.
৪২. মনন ও করণ
৪৩.
৪৩. রানী-সন্দর্শন
৪৪.
৪৪. নিবেদন
৪৫.
৪৫. পরীক্ষা
৪৬.
৪৬. জয়-পরাজয়
৪৭.
৪৭. পৃথিবী পর্যটন
৪৮.
৪৮. বীরনীতি
৪৯.
৪৯. বিজ্ঞান-প্রচারে ভারতের দান
৫০.
৫০. আশা ও বিশ্বাস
৫১.
৫১. আবিষ্কার এবং প্রচার
৫২.
৫২. অর্ঘ্য
৫৩.
৫৩. দীক্ষা
৫৪.
৫৪. আহত উদ্ভিদ
৫৫.
৫৬. জীবনের মাপকাঠি
৫৬.
৫৭. গাছের উত্তেজনার কথা
৫৭.
৫৮. গাছের লিপিযন্ত্র
৫৮.
৫৯. গাছের লেখা হইতে তাহার ভিতরকার ইতিহাস উদ্ধার
৫৯.
৬০. পাত্রাধার তৈল
৬০.
৬১. আহতের সাড়া
৬১.
৬২. আঘাতে অনুভূতি-শক্তির বিলোপ
৬২.
৬৩. জন্মভূমি
৬৩.
৬৪. স্নায়ুসূত্রে উত্তেজনা-প্রবাহ
৬৪.
৬৫. স্বতঃস্পন্দন ও ভিতরের শক্তি
৬৫.
৬৬. ইন্দ্রিয়-অগ্রাহ্য কিরূপে ইন্দ্রিয়-গ্রাহ্য হইবে?
৬৬.
৬৭. বাহিরের শক্তির প্রতিরোধ
৬৭.
৬৮. বৃক্ষে স্নায়ুসূত্র
৬৮.
৬৯. আণবিক সন্নিবেশে উত্তেজনা-প্রবাহের হ্রাস-বৃদ্ধি
৬৯.
৭০. পরীক্ষা
৭০.
৭১. ভিতর ও বাহির
৭১.
৭২. হাজির
৭২.
৭৩. বৃক্ষের অঙ্গভঙ্গী
৭৩.
৭৪. সবিতার রথ
৭৪.
৭৫. ছাত্রসমাজের প্রতি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%