হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

‘ওই হল সঙ্গম বা প্রয়াগ। গোমুখ থেকে ভাগীরথী আর সতপন্থ থেকে অলকনন্দা এসে মিলেছে এখানে। তারপর 'গঙ্গা' নাম নিয়ে নেমে গিয়েছে মর্তভূমির দিকে।' বাস রাস্তা থেকে নীচে সঙ্গমের দিকে তাকিয়ে পটাইকে বলল শুভ্রদা।
পটাই চায়ের গ্লাসে চুমুক দিয়ে বলল, 'কোনটা অলকনন্দা আর কোনটা ভাগীরথী?'
শুভ্রদা তার হাতের গ্লাসটা চা-গুমটির কাঠের বেঞ্চের ওপর রেখে পকেট থেকে খুচরো পয়সা বের করে বলল, 'আমরা বাসরাস্তা ধরে যেদিকে যাব সেদিক থেকে আসা নদীটা হল অলকনন্দা, আর অন্যটা ভাগীরথী।'
পটাই বেঞ্চ ছেড়ে উঠে পকেট থেকে ছোট্ট ডিজিটাল ক্যামেরাটা নিয়ে গিয়ে দাঁড়াল খাদের ধারে। নীচে দেবপ্রয়াগ, পাহাড় থেকে নেমে আসা দুই স্রোতস্বিনী মিলেছে এখানে। তাদের মিলিত কলতান এত ওপর থেকেও কানে আসছে পটাইয়ের। সঙ্গমের গায়ে দেবপ্রয়াগ মন্দির, বাঁধানো স্নানের ঘাট। ঠিক যেন এক টুকরো পিকচার পোস্টকার্ড। পটাই একটা ফোটো তুলল, তারপর পিছন ফিরে শুভ্রদাকে জিগ্যেস করল, 'রুদ্রপ্রয়াগ পৌঁছোতে কত সময় লাগবে?'
শুভ্রদা গুমটি ছেড়ে বাইরে এসে বলল, 'এখান থেকে রুদ্রপ্রয়াগ উনসত্তর কিলোমিটার। অর্থাৎ হৃষীকেশ থেকে যতটা পথ এসেছি, আর ঠিক ততটা বাকি। ড্রাইভার বলছিল, বিকেল পাঁচটা হবে।'
পটাইদের বাসটা কিছু দূরে রাস্তার একপাশে দাঁড়িয়েছিল, সেটা এবার হর্ন বাজাল। চায়ের গুমটিতে বাসের যে ক'জন প্যাসেঞ্জার বসেছিল, তারা উঠে দাঁড়াল। শুভ্রদা রিস্টওয়াচের দিকে তাকিয়ে বলল, 'দশ মিনিট হয়ে গিয়েছে। চল, এবার বাস ছাড়বে।'
পটাইরা বাসে ওঠার কয়েক মিনিটের মধ্যেই বাস ছেড়ে দিল। পটাই বসেছে জানলার ধারে, তার পাশে শুভ্রদা। পায়ের সামনে রাখা কিটব্যাগ থেকে গাইড বইটা বের করে শুভ্রদা বলল, 'এখন রুদ্রপ্রয়াগ পর্যন্ত অলকনন্দা আমাদের সঙ্গে চলবে। দেখবি, আরও ওপরে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে দুপাশের প্রকৃতি কেমন বদলে যায়। গাছপালা, পাহাড়, নদীর রং, আকাশের রং সবকিছু কেমন বদলে যায়।'
পটাই বলল, 'তুমি এর আগে এদিকে এসেছ কখনও?'
শুভ্রদা বলল, 'হ্যাঁ, দু'বার। তবে রুদ্রপ্রয়াগের ওপর দিয়ে গেলেও কোনওবারই থাকা হয়নি ওখানে। ছেলেবেলায় জিম করবেটের শিকারকাহিনি পড়েছিলাম, বড় হয়েও পড়েছি। সে কারণেই মনে হয়, রুদ্রপ্রয়াগ নামটা আমাকে খুব টানে। দু'দিন থেকে ভালো করে ঘুরে দেখতে হবে জায়গাটা।'
পটাই জিগ্যেস করল, 'তারপর আমরা কোথায় যাব?'
বইয়ের পাতা ওলটাতে-ওলটাতে শুভ্রদা বলল, 'সেরকম নির্দিষ্টভাবে এখনও কিছু ভাবিনি। আজ সতেরো তারিখ, হরিদ্বার থেকে কলকাতায় ফেরার জন্য দুন এক্সপ্রেসে রিজার্ভেশন সাতাশ তারিখ। পাক্কা দশদিন হাতে। রুদ্রপ্রয়াগ থেকে যাওয়া যেতে পারে কেদারনাথ বা বদ্রীনাথের দিকে। তা ছাড়া আমরা যেদিকে যাচ্ছি সেদিকে ছোট-ছোট বেশ কিছু ছবির মতো সুন্দর শহর আছে। উখিমঠ, যোশীমঠ, গুপ্তকাশী, গরুড়গঙ্গা, শোনপ্রয়াগ, চামেলি, হেলং এসব। এই জায়গাগুলো ঘুরে দেখা যেতে পারে।' এই বলে শুভ্রদা বইয়ের পাতায় মুখ গুঁজল।
পটাই জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইল। মসৃণ পিচঢালা রাস্তা ক্রমশ এঁকে-বেঁকে ওপরের দিকে উঠেছে। পথের এক দিকে পাহাড়, অন্য দিকে খাদ। নিচ দিয়ে বয়ে চলেছে কল্লোলিনী অলকনন্দা। এসব দৃশ্য দেখতে দেখতে একটা হাই তুলল পটাই। সেটা খেয়াল করে শুভ্রদা বলল, 'ঘুম পেলে এখনই ঘুমিয়ে নে। এখন বারোটা বাজে, শ্রীনগর পৌঁছোতে দুটো বাজবে। ওখানে খেয়ে নেব আমরা। কিন্তু, তারপর চোখ বুজলে খুব মিস করবি। শ্রীনগর ছাড়লে আসল গাড়োয়ালে ঢুকব আমরা।'
পটাই বলল, 'তা হলে এখনই ঘুমিয়ে নিই? এই বলে সে আর-একটা হাই তুলে, চোখ বুজে মাথা এলিয়ে দিল, আর শুভ্রদা মন দিল বইয়ের পাতায়।
পটাই শুভ্রদার সঙ্গে গতকাল পৌঁছেছে হরিদ্বারে। গঙ্গার ধারে মিশ্রজির ধর্মশালায় উঠেছিল তারা। দুপুরে দুজনে স্নান সারল গঙ্গায়। সন্ধ্যায় 'হর-কে-পৌড়ি' ঘাটে সন্ধ্যারতি দেখেছে। আর আজ সকালে বাসের মাথায় লাগেজ উঠিয়ে রওনা হয়েছে রুদ্রপ্রয়াগের উদ্দেশে। শুভ্রদাকে পটাই 'দাদা' বলে ডাকলেও আসলে সে পটাইয়ের জামাইবাবু, চন্দনাদির বর। পটাই বাবা-মা'র এক ছেলে। চন্দনাদি পটাইয়ের জ্যাঠতুতো দিদি। পটাইদের বাড়ি শ্যামবাজারের কাছে গনেন্দ্র মিত্র লেনে। আর শুভদ্রা-চন্দনাদি থাকে বরানগরে শুভ্রদাদের পৈতৃক বাড়িতে। চন্দনাদির ওপরে আরও দুই দিদি, মানে পটাইয়ের আরও দুই দিদি আর দুই জামাইবাবু আছেন। তাঁরাও কলকাতাতেই থাকেন। তিন দিদি-জামাইবাবুই পটাইদের বাড়িতে আসা-যাওয়া করেন, তাঁরা সবাই তাকে খুব ভালোবাসেন। কিন্তু শুভ্রদার সঙ্গেই পটাইয়ের বেশি বন্ধুত্ব। ঠিক যেন দাদা-ভাইয়ের সম্পর্ক। অন্য জামাইবাবুদের চেয়ে শুভ্রদাকে আলাদা বলে মনে হয় পটাইয়ের। শুভ্রদা শুধু চাকরি আর সংসার নিয়েই থাকে না। বরং গত পাঁচ বছরে পাঁচটা চাকরি ধরেছে আর ছেড়েছে। সংসারের খুঁটিনাটি ব্যাপারে তার মন নেই বলে চন্দনাদি প্রায়ই বকাবকি করে। শুভ্রদার নেশা নানা ধরনের বই পড়া, আর এখানে-সেখানে হুটহাট ঘুরে বেড়ানো। তার বরানগরের বাড়ির দোতলায় একটা ঘর আছে, যেখানে বাড়ির অন্য সবাই ও আত্বীয়স্বজনের প্রবেশ নিষেধ। শুভ্রদা নিজে ছাড়া একমাত্র পটাইয়ের সে ঘরে প্রবেশাধিকার আছে। সেটা শুভ্রদার পড়ার ঘর-কাম-কাজের ঘর। কী নেই সে ঘরে! রাশি-রাশি বই থেকে শুরু করে ঘরের কোনায় দাঁড় করিয়ে রাখা একটা মানুষের স্কেলিটন, চিনা লণ্ঠন, তিব্বতি মুখোশ, নেপালি, কুকরি, স্ফটিকের গণেশ মূর্তি, ডাকটিকিট জমানোর গাবদা খাতা, এসব নানা অদ্ভুত জিনিসে ভরতি সে ঘর।
আরও একটা জিনিস অবশ্য সে-ঘরে শুভ্রদার বসার টেবিলের ড্রয়ারে চাবি দেওয়া অবস্থায় রাখা থাকে। সে জিনিসটার ব্যাপারে অন্য কেউ কিছু না জানলেও শুভ্রদাই পটাইকে দেখিয়েছে সেটা। একটা পিস্তল! নাম নাকি 'মাউজার।' জিনিসটা অবশ্য এককালে শুভ্রদার বাবার ছিল। তিনি ছিলেন একটা কোম্পানির ম্যানেজার। অনেক সময় কাঁচা টাকাপয়সা তাঁকে এনে রাখতে হত বাড়িতে। তাই তিনি সরকারের থেকে লাইসেন্স নিয়ে জিনিসটা কিনেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর সে লাইসেন্সটা তার নামে টান্সফার হয়েছে, সেকথা শুভ্রদাই বলেছে। শুভ্রদার আর-একটা ব্যাপার হল, নানা বিষয়ে অসাধারণ জ্ঞান আর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা। কাউকে একবার দেখে তার সম্পর্কে বেশ কিছু তথ্য বলতে পারে। এহেন শুভ্রদা যখন দিন পনেরো আগে পটাইয়ের বাড়িতে গিয়ে বলল, 'আমি গাড়োয়াল যাচ্ছি, আমার সঙ্গে যাবি নাকি?'
তখন এ সুযোগ হাতছাড়া করতে রাজি হয়নি পটাই। মা অবশ্য একটু গররাজি ছিলেন। বলেছিলেন, 'এবার তোর মাধ্যমিক পরীক্ষা, তোর কি যাওয়া ঠিক হবে পটাই?'
বাবা অবশ্য ব্যাপারটাকে এনকারেজ করে বলেছিলেন, 'ও যখন যেতে চাইছে তখন যাক না। প্রকৃতির শিক্ষাও তো প্রয়োজন। তারপর ওখান থেকে ফ্রেশ এয়ারে বেড়িয়ে এসে নতুন উদ্যমে পড়াশোনা শুরু করলেই হল।'
বাবা একথা বলার পর সেদিনই পটাইয়ের বেড়াতে আসার ব্যাপারটা ফাইনাল হয়ে গিয়েছিল। তবে শুভ্রদার সঙ্গে বারতিনেক কলকাতার কাছেপিঠে পটাই এর আগে বেড়াতে গেলেও তার সঙ্গে এত দূর বেড়াতে আসা এই প্রথম।
দুটো নয়, শ্রীনগর পৌঁছোতে প্রায় আড়াইটে বেজে গেল। শ্রীনগরে ঢোকার মিনিট দশেক আগেই অবশ্য ঘুম ভেঙে গিয়েছিল পটাইয়ের। বেশ জমজমাট শহর শ্রীনগর। বাস যেখানে দাঁড়াল সেখানেই কাছাকাছি একটা হোটেলে খেতে ঢুকল পটাইরা। খাওয়া সেরে মিনিট দশেকের মধ্যেই আবার রাস্তায় এসে দাঁড়াল তারা। শুভ্রদা একটা সিগারেট ধরিয়ে বলল, 'রুদ্রপ্রয়াগ পৌঁছোতে আমাদের আরও ঘণ্টা দু-আড়াই সময় লাগবে।'
পটাই জিগ্যেস করল, 'ওখানে কোথায় থাকব আমরা?'
শুভ্রদা জবাব দিল, 'কালীকমলি ধর্মশালায়। কলকাতা থেকে বুকিং করেছি।' এরপর একটু থেমে সে বলল, 'এদিকে যেখানেই যাবি, সেখানেই একটা করে কালীকমলি ধর্মশালা পাবি।'
'কালীকমলি কার নাম?' পটাই জিগ্যেস করল।
শুভ্রদা বলল, 'কালীকমলি কারও নাম নয়। এক সময় এ-অঞ্চলে এক সম্প্রদায়ের সাধুরা থাকতেন। যাঁরা কালো কম্বল গায়ে ঘুরে বেড়াতেন। গাড়োয়ালের গরিব মানুষ ও তীর্থযাত্রীদের জন্য বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আশ্রম, ধর্মশালা প্রতিষ্ঠা করেন তাঁরা। কালো কম্বল গায়ে থাকত বলে স্থানীয় মানুষ তাঁদের বলত 'কালীকমলিওলা।' 'কমলি' অথাৎ কম্বল। তাঁদের নামেই এসব ধর্মশালা।'
পটাই চারপাশ দেখতে লাগল। রাস্তার দু'পাশে সার সার ঘর-বাড়ি, দোকানপাট আর তার কিছু পিছনে ছোট ছোট পাহাড়ের সারি। রাস্তায় যেসব লোকজন চোখে পড়ছে, তাদের মধ্যে বেশিরভাগই তীর্থযাত্রী আর সাধু-সন্ন্যাসী সম্প্রদায়ের মানুষ। একদল পাগড়িধারী, কোমরে কৃপাণ গোঁজা শিখও চোখে পড়ল পটাইয়ের।
শুভ্রদা বলল, 'এঁরা কোথায় যাচ্ছেন জানিস? এঁরা যাচ্ছেন 'হেমকুণ্ড সাহিব'। ও জায়গাটা বদ্রীনাথের দিকে। শিখদের পবিত্র তীর্থস্থান। একটা লেক আছে ওখানে।'
হঠাৎ আকাশ থেকে একটা ধাতব শব্দ শুনে পটাই আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখতে পেল, কিছু দূরে দুটো পাহাড়ের ফাঁক দিয়ে একটা হেলিকপ্টার এগিয়ে আসছে। সে যেন আসছে পটাইদের দিকেই।
শুভ্রদা কপ্টারটার দিকে তাকিয়ে বলল, 'গাইড বইয়ে লেখা আছে দেখলাম, এখান থেকে কপ্টারে কেদারনাথ-বদ্রীনাথ দর্শন করার ব্যবস্থা আছে। তবে এটা আসছে হরিদ্বারের দিক থেকে।' কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই কপ্টারটা একদম নীচে পটাইদের মাথার ওপর চলে এল। এত নীচে যে, রাস্তায় দাঁড়িয়ে পাইলটের মুখটা পর্যন্ত চোখে পড়ল পটাইয়ের। বাজারের মাথার ওপর একবার পাক খেয়ে একটা সাদা রঙের দোতলা বাড়ির পিছনে নেমে পড়ল। শুভ্রদা বলল, 'ও হেলিপ্যাডটা তা হলে এখানেই।'
রাস্তায় কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর পটাইরা আবার বাসে গিয়ে বসল। ড্রাইভারও হর্ন বাজিয়ে প্যাসেঞ্জারদের ডাকতে লাগল। যারা নীচে ছিল তারা একে-একে হর্ন শুনে ওপরে উঠে এল। তারপর বাসটা যখন নড়ে উঠল, ঠিক সেই সময় দৌড়োতে দৌড়োতে বাসে এসে উঠল একজন নতুন প্যাসেঞ্জার। তার পরনে ধূসর রঙের সাফারি, চোখে কালো রঙের সানগ্লাস, হাতে একটা ব্রিফকেস, লোকটি শুভ্রদার মতোই ছ'ফুট লম্বা হবে। ফরসা চেহারা, সুন্দর করে কামানো মুখ, বয়স মনে হয় শুভ্রদার চেয়ে একটু বেশি হবে। লোকটা বাসে উঠে বাসের হেল্পারকে জিগ্যেস করল, 'ইয়ে বাস রুদ্রপ্রয়াগ তক যায়েগি?'
হেল্পার বলল, 'জি সাব!'
তার উত্তর শুনে লোকটি আর কোনও কথা না বলে এগিয়ে এসে বসল প্যাসেঞ্জারের ওপাশে পটাইদের লাইনেই একটা ফাঁকা সিটে। তারপর ব্রিফকেসটা পায়ের কাছে রেখে জানলার বাইরে তাকিয়ে রইল। কয়েক মুহূর্ত লোকটির দিকে তাকিয়ে শুভ্রদা চাপা স্বরে পটাইকে বলল, 'লোকটি মনে হয় আমাদের দেখা কপ্টার থেকে নামল।'
পটাই বলল, 'কীভাবে বুঝলে তুমি?'
শুভ্রদা বলল, 'দ্যাখ, লোকটির ব্রিফকেসের হাতলে একটা ট্যাগ আছে। সেই ট্যাগে একটা অ্যাভিয়েশন কোম্পানির পরিচিত লোগো দেখতে পাচ্ছি। তা ছাড়া কপ্টার থেকে নামার পর বাস ধরার তাড়ায় কান থেকে 'কটনবল' খুলে ফেলে দিতে ভুলে গিয়েছে। ও যে সদ্য কপ্টার থেকে নেমেছে এগুলো তার প্রমাণ।'
পটাই শুভ্রদার কথা শুনে একবার তার মুখের দিকে তাকাল, তারপর বাইরে চোখ ফেরাল।
পটাইদের বাস শহর ছেড়ে রুদ্রপ্রয়াগের রাস্তা ধরল আবার। ক্রমশ আরও ওপরে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই মুছে যেতে শুরু করল নগরজীবনের সব চিহ্ন। পাঁচটা নাগাদ বাস এসে পৌঁছোল পাহাড়ের ঢালে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট জনপদ রুদ্রপ্রয়াগে।
একটা ছোট বাজারের মতো জায়গায় বাস থেকে নামল পটাইরা। বাসের মাথা থেকে লাগেজ নামিয়ে নেওয়ার পর শুভ্রদা বলল, 'এবার ধর্মশালাটা খুঁজে বের করতে হবে।'
কাছেই একটা চায়ের দোকানে গিয়ে শুভ্রদা দোকানদারকে জিগ্যেস করতে সে বলে দিল। এই বাসরাস্তা ধরে মিনিটতিনেক সামনের দিকে হাঁটলে অলকনন্দার ওপর কংক্রিটের যে ব্রিজ আছে, তার একটু আগে একটা সরু রাস্তা পথের বাঁ-পাশ থেকে নেমে গিয়েছে নদীর দিকে। সেই সরু রাস্তায় ঢোকার মুখে বড় রাস্তার ওপর এসপি অফিস। ওই অফিসকে ডান হাতে রেখে ছোট্ট রাস্তা দিয়ে কয়েক পা হাঁটলেই বাঁ-পাশে রয়েছে ধর্মশালা।
লোকটার কথামতো শুভ্রদা আর পটাই বাসরাস্তা ধরে উত্তর দিকে হাঁটতে শুরু করল। কয়েক পা হাঁটার পরই তারা দেখল, বাসের সাফারি-পরা লোকটি তাদের কিছুটা আগে হেঁটে যাচ্ছে। মিনিটতিনেক পর লোকটি পথের বাঁ-পাশে একটা গলিতে ঢুকে পড়ল। পটাইরা সেই গলির কাছে এসে হাজির হতেই তার ডান পাশে বড় রাস্তার ওপর একটা ছোট একতলা বাড়ির গায়ে ঝোলানো সাইনবোর্ড চোখে পড়ল। তাতে হিন্দিতে লেখা, 'পুলিশ সুপার কা কার্যালয়, ডিস্ট্রিক্ট টাউন, রুদপ্রয়াগ, উত্তরাঞ্চল'। দোকানদারের কথামতো পটাইরা সেই সরু গলি-রাস্তার ভিতরে ঢোকার পর বাঁ-পাশে চোখে পড়ল পাহাড়ের ঢালে পিলারের উপর দাঁড়িয়ে থাকা টানা বারান্দাওলা একটা দোতলা বাড়ি। তার দেওয়ালের বড়-বড় করে লেখা, 'কালীকমলি ধরমশালা, রুদ্রপ্রয়াগ'।
সিঁড়ি দিয়ে ওপরে ওঠার পর সামনেই একটা ঘরের মাথায় কার্যালয় লেখা দেখতে পেয়ে পটাইরা ঢুকল সেই ঘরের ভিতর। ঘরের ঠিক মাঝখানে একটা কাঠের টেবিলের ওপাশের চেয়ারে একজন লোক বসে কথা বলছে টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বাসের সেই ধূসর সাফারি পরা লোকটির সঙ্গে। পটাইরা ঘরে ঢুকতেই চেয়ারে বসা লোকটা তাকাল তাদের দিকে। শুভ্রদা টেবিলের সামনে গিয়ে বুকিং স্প্রিপটা এগিয়ে দিল। লোকটা স্প্রিপটা দেখার পর টেবিলের ওপর খোলা রেজিস্টার খাতাটা ঠেলে দিল শুভ্রদার দিকে। শুভ্রদা পকেট থেকে পেন বের করে খাতাটার ঘরগুলো ভরতে শুরু করল। নাম, ঠিকানা লেখার পর যখন শুভ্রদা রুম নাম্বারটা বসাতে যাচ্ছে, তখন চেয়ারে বসা লোকটা ইশারায় তাকে থামতে বলে ধূসর সাফারিকে হিন্দিতে বলল, 'আপনার বুকিং সাত-এ, আর এঁদের আট-এ। কিন্তু আটের একটা খাট আপনার বেডরুমে রাখা আছে। আপনার তো সিঙ্গল বেডরুম, আপনি যদি এঁদের সঙ্গে রুমটা বদল করে নেন তা হলে ভালো হয়। খাটটা আর বের করতে হয় না। আপনার কোনও অসুবিধে হবে না, দুটো ঘরই পাশাপাশি, আর একইরকম।'
সাফারি-পরা লোকটি তার কথা শুনে কয়েক মুহূর্ত কী ভেবে নিয়ে বলল, 'ঠিক হ্যায় হামে আট নম্বর দে দিজিয়ে।'
চেয়ারে বসা লোকটা ড্রয়ার থেকে একগোছা চাবি বের করে সাফারি পরা লোকটির হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, 'দোতলায় চলে যান।'
চাবিটা নিয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল লোকটি। এর পর শুভ্রদা চেয়ারে বসা লোকটির কথামতো রেজিস্টারের বাকি ঘরগুলোয় লেখা শেষ করার পর তাদেরকেও একটা চাবি দিল লোকটা।
পটাই আর শুভ্রদা চাবি নিয়ে দোতলায় উঠে সাত নম্বর ঘরের কাছে এসে দাঁড়াল। আট নম্বর ঘরের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ। সেই লোকটি তার ঘরে ঢুকে পড়েছে। তালা খুলে নিজেদের ঘরে ঢুকল পটাইরা। বেশ বড় ঘর। পাশাপাশি দুটো খাটে ধবধবে সাদা বিছানা পাতা। বালিশ কম্বলও রাখা আছে। অ্যাটাচড বাথটাও বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। ঘরের ওপাশে আর-একটা দরজা আছে। সেটা খুলে পটাই ওদিকের বারান্দায় দাঁড়িয়ে নীচের দিকে তাকিয়েই শুভ্রদাকে বলল, 'এদিকে দেখবে এসো।'
শুভ্রদাও বারান্দায় গেল। তারপর বলল, 'অপূর্ব!'
ধর্মশালার ঠিক পিছনেই প্রায় তিনশো ফুট খাড়াই খাদ, তারপর বোল্ডার আর নুড়ি বিছানো কিছুটা অঞ্চল, আর তার পরই প্রয়াগ। দু'দিক থেকে দুটো নদী এসে মিলেছে এখানে।
শুভ্রদা বলল, 'যে নদীর রংটা সবুজ দেখছিস সেটা হল মন্দাকিনী, কেদারের দিক থেকে এসে মিশে গিয়েছে অলকনন্দার সঙ্গে। অলকনন্দা আসছে বদ্রীনাথের থেকে।'
ধর্মশালার পিছন থেকেও একটা সিঁড়ি নেমে গিয়েছে সঙ্গমের দিকে। পটাই বলল, 'আমরা ওখানে যাব না?'
শুভ্রদা বলল, 'মুখ হাত ধুয়ে নিয়ে ওখানে নামব চল। ঘরে বসে থেকে কী করব?'
কিছুক্ষণের মধ্যেই ফ্রেশ হয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল তারা। তারপর নীচে নেমে ধর্মশালার পিছন দিকে এসে সিঁড়ি বেয়ে নামতে শুরু করল। নীচে ছড়িয়ে আছে নুড়ি-পাথর। তার ওপর পা রেখে-রেখে সাবধানে হাঁটতে হাঁটতে পটাইরা পৌঁছে গেল সঙ্গমের কাছে। নদীর কলরবে মুখরিত চারদিক।
আশপাশে কোথাও লোকজন নেই। নির্জন পরিবেশ। নদীর তীরে বিরাট বড় একটা পাথরের ওপর দুজনে বসল। কয়েক হাত দূর দিয়ে তীব্রগতিতে ছুটে চলেছে ঘূর্ণায়মান জলরাশি। সঙ্গমের দু'দিকে অনেকটা দূর পর্যন্ত, পটাইরা যেখানে বসে আছে সেখান থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। সঙ্গমের ঠিক মাঝখানে নদীর বুক থেকে এক শিলাখণ্ড জেগে আছে। শুভ্রদা পটাইকে বলল, 'ওই শিলাখণ্ডটার নাম হল 'নারদশিলা।' মহর্ষি নারদ নদীর বুকে ওই শিলাখণ্ডে বসে সঙ্গীত সাধনা করতেন।'
পটাই বলল, 'আচ্ছা শুভ্রদা, এখানে কী-কী দেখার জায়গা?'
শুভ্রদা বলল, 'এই সঙ্গম, ওই রুদ্রপ্রয়াগ মন্দির, কোটেশ্বর গুহা, পাহাড়ি গ্রাম, আর সেই জায়গা, যেখানে জিম করবেট আশি বছর আগে শিকার করেছিলেন পৃথিবীবিখ্যাত সেই চিতাবাঘটাকে! কাল সকালে ওখানেই আমরা প্রথমে যাব।'
নদীর কলতান শুনতে-শুনতে আর গল্প করতে-করতে কীভাবে যে অনেকটা সময় কেটে গেল তা বুঝতে পারল না পটাইরা। এক সময় নদীর ওপাশে পাহাড়ের মাথায় জঙ্গলের আড়ালে সূর্য হারিয়ে গেল। অন্ধকার নামতে শুরু করল নদীর বুকে। ঠিক তখন পটাইরা ফেরার পথ ধরল। অনেকটা সময় লাগল আবার ধর্মশালার কাছে উঠে আসতে।
শুভ্রদা বলল, 'এখন ঘরে যাব না। সামনের বাজারটায় যাব। রাতের খাওয়া সেরে একেবারে ঘরে ফিরব।' ঠান্ডা পড়তে শুরু করেছে, পটাই জ্যাকেটের ভিতর থেকে টুপি বের করে মাথা ঢেকে নিল।
পটাইরা যখন নদীর ওপরের সেই কংক্রিটের ব্রিজের কাছে বাজারে হাজির হল, তখন দোকানগুলোয় আলো জ্বলে গিয়েছে। ছোট্ট বাজার। ছোট-ছোট দোকান, তবে আনাজ থেকে শুরু করে শীতবস্ত্র, সবই পাওয়া যায় সেখানে। তারা প্রথমে একটা চায়ের দোকানে চা খেল, তারপর সময় কাটাবার জন্য ঘণ্টাখানেক ইতস্তত ঘোরাফেরা করল বাজারের মধ্যে। শেষে রাত আটটা নাগাদ একটা হোটেলে রাতের খাওয়া সেরে ফিরে এল ধর্মশালায়। নিজের ঘরে ঢুকে বাতি জ্বালাল পটাই। কিন্তু আলোয় কোনও জোর নেই। ঘষা কাচের মতো আলো। ঘরের দরজা বন্ধ করে পটাইরা গিয়ে দাঁড়াল ভিতর দিকের সেই বারান্দায়। চাঁদের আলোয় অপূর্ব লাগছে সঙ্গমের জলরাশি। ঠিক যেন গলিত রুপো! নদীর পাড়ে পড়ে থাকা সাদা পাথরগুলো আর নদীর বুকের সেই নারদশিলা দুধের মতো সাদা দেখাচ্ছে জ্যোৎস্নায়। পটাইরা তন্ময় হয়ে তাকিয়ে রইল সেদিকে।
মিনিট পনেরো পর দরজায় টোকা দেওয়ার শব্দ শুনে শুভ্রদা দরজা খুলে দেখতে পেল, একটা চাদর মুড়ি দেওয়া লোক বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। নিজেকে সে নাইট গার্ড পরিচয় দিয়ে বলল, রাতে সে নীচে থাকে। কোনও অসুবিধে হলে যেন তাকে খোঁজ করা হয়। সব শেষে বলল, 'রাত মে ঘরসে নিকলকর নিচ মে নদীকে পাশ মত যানা। চিতা নিকালতা হ্যায়।'
শুভ্রদা অবাক হয়ে তাকে জিগ্যেস করল, 'এখনও এখানে চিতা আছে নাকি?'
লোকটা বলল, 'হ্যাঁ।' তারপর অন্য দিকে চলে গেল। শুভ্রদা আবার দরজা বন্ধ করার পর কিছুক্ষণের মধ্যেই বাতি নিভিয়ে শুয়ে পড়ল পটাইরা।
রাতে বেশ ঠান্ডা পড়েছিল। জুন মাসে এখানে কলকাতার ডিসেম্বরের চেয়েও ঠান্ডা। ঘুমটা হয়েছে জব্বর। শুভ্রদা যখন পটাইকে ডেকে তুলল তখন ঘড়িতে ছ'টা বাজতে দশ। পটাই বুঝতে পারল তার আগেই শুভ্রদার প্রাণায়াম সারা হয়ে গিয়েছে। শুভ্রদা জামা-প্যান্ট পরতে-পরতে বলল, 'চটপট তৈরি হয়ে নে। আর মাফলার নিস, বাইরে কিন্তু খুব ঠান্ডা আছে।'
বিছানা ছেড়ে উঠে পটাই বাথরুমে ঢুকল। বেসিনের কল খুলে জলে হাত দিতেই দেখল, জল বরফের মতো ঠান্ডা। মিনিট দশেকের মধ্যেই তৈরি হয়ে নিল পটাই। গায়ে জ্যাকেট চড়িয়ে কান মাফলারে ঢেকে ঘরের বাইরে বেরিয়ে পড়ল। শুভ্রদা পাজামা-পাঞ্জাবির ওপর বেশ সুন্দর কাজ-করা একটা সাদা শাল চাপিয়েছে। সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামার পর শাল দিয়ে মাথা ঢাকতে-ঢাকতে বলল, 'এখানে এ সময় এত ঠান্ডা জানতাম না। ভেবেছিলাম শীতের জিনিসগুলো এখানে কাজে আসবে না।'
পটাইরা হেঁটে গিয়ে দাঁড়াল পিচরাস্তার মোড়ে। এত সকালে রাস্তায় কোনও গাড়িঘোড়া নেই। লোকজনও চলাচল শুরু করেনি। পটাই জিগ্যেস করল, 'আমরা এখন কোথায় যাব, জিম করবেট যেখানে সেই ভয়ংকর চিতাবাঘটাকে মেরে ছিলেন, সেখানে?'
শুভ্রদা বলল, 'হ্যাঁ। জায়গাটার নাম গুলাবরাই। তবে কোন দিকে জেনে নিতে হবে।'
কিন্তু দূরে রাস্তার উলটো দিকের ফুটপাতে একটা চায়ের দোকান খুলছে চোখে পড়ল পটাইদের। শুভ্রদা বলল, 'চল, ওখানে গিয়ে আগে চা খেয়ে নেওয়া যাক। দোকানির কাছ থেকে গুলাবরাই কোথায় সেটাও জেনে নেওয়া যাবে।'
পটাই আর শুভ্রদা দোকানটায় গিয়ে হাজির হল। ছোট্ট দোকান। স্টোভের ওপর কেটলিতে জল ফুটছে। একটা টেবিলের দুপাশে দুটো কেঠো বেঞ্চ। তার একটায় বসে আছেন গায়ে সোয়েটার মাথায় টুপি ও হাতে লাঠি ধরা একজন বৃদ্ধ। দেখে মনে হয়, সম্ভব সকালে হাঁটতে বেরোন। আর গুমটির ভিতর বসে আছে দোকানি। তারা দুজন নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলছিল। শুভ্রদা দু-কাপ চা দিতে বলে বেঞ্চে বসল। পটাই বসল তার পাশে। দূরের পাহাড়ের মাথায় জঙ্গলগুলো এখনও কুয়াশায় ঢেকে আছে। কুয়াশামাখা সেদিকে তাকিয়ে পটাই শুভ্রদাকে জিগ্যেস করল, 'কাল যে কেয়ারটেকার বলল, এখানে এখনও চিতা আছে, সেকথা কি সত্যি?'
শুভদ্রা বলল, 'ঠিক জানি না, সত্যি হতে পারে। হয়তো যাতে অত নীচে নদীর পারে নেমে অন্য কোনও বিপদে পড়ি, তাই সে চিতাবাঘের কথা বলে ভয় দেখিয়েছে।'
দোকানদার চা দিল। চায়ের গ্লাসে চুমুক দিয়ে শুভ্রদা দোকানদারের কাছে জানতে চাইল, গুলাবরাই জায়গাটা কোথায়? তার প্রশ্ন শুনে দোকানি কিছু বলার আগেই পটাইদের টেবিলের ওপাশে বসা বৃদ্ধ পটাইদের জিগ্যেস করলেন, 'আপনারা কি টুরিস্ট?'
শুভ্রদা বলল, 'হ্যাঁ।'
বৃদ্ধ এবার হেসে বললেন, 'ও, আপনারা কি দেখতে চাইছেন তা আমি জানি।' এই বলে বৃদ্ধ হাতের লাঠিটা তুলে পটাইরা কাল বাসে করে যেদিক থেকে এসেছে, সেদিকটা দেখিয়ে দিয়ে বললেন, 'বাসরাস্তা বরাবর সোজা এক কিলোমিটার গেলে ডান পাশে একটা ছোট মাঠ পড়বে। তারপর একটু এগোলেই রাস্তার ধারে সেই আমগাছটা আছে। যার ডালে বসে করবেটসাহেব ম্যানইটারটাকে খতম করেছিলেন।'
বৃদ্ধের কথা শুনে শুভ্রদা হেসে বলল, 'থ্যাঙ্ক ইউ। আমরা ওই জায়গাটাই খুঁজছিলাম।'
এর পর শুভ্রদা সৌজন্য দেখিয়ে তাঁকে বলল, 'আপনি নিশ্চয়ই এখানে থাকেন, তাই না?'
বৃদ্ধ বললেন, 'হ্যাঁ এখানেই। আগে ছিলাম গাড়োয়াল রেজিমেন্টে, এখন বাড়িতে বসে পেনশন খাচ্ছি আর নাতিপুতিদের দেখভাল করছি।'
তাঁর কথা শোনার পর পটাই জিগ্যেস করল, 'এখানে এখনও চিতাবাঘ আছে?'
বৃদ্ধ বললেন, 'হ্যাঁ আছে। তবে মানুষের ওপর সাধারণত হামলা করে না। পাহাড়ের ওপর যেসব ছোট গ্রাম আছে, সেখান থেকে মাঝে-মাঝে মুরগি, ভেড়া টেনে নিয়ে যায়, আর কুকুর মারে।' এই বলে বৃদ্ধ দোকানদারের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'গত বর্ষায় আমি এরকম একটা দৃশ্য দেখেছিলাম। আগের রাতে খুব বৃষ্টি হয়েছিল। পরদিন ভোরে রোজকার মতো হাঁটতে-হাঁটতে আমি যেই আর্মিব্যারাকের কাছে পৌঁছেছি, তখন হঠাৎ দেখি, একটা লেপার্ড লাফিয়ে বাসরাস্তায় নামল, তারপর তাড়া করল কুকুরকে। আমি তো তখনই দাঁড়িয়ে পড়লাম। কুকুরটা কোনওরকমে পালিয়ে ব্যারাকের ভিতর ঢুকে পড়ল। এর পরই কিছু দূরে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা আমাকে দেখতে পেল প্রাণীটা। আর সঙ্গে সঙ্গে একলাফে খাদের দিকে অদৃশ্য হয়ে গেল।'
শুভ্রদা উঠে দাঁড়িয়ে পকেট থেকে পয়সা বের করে দোকানির দিকে এগিয়ে দিল দাম মেটাবার জন্য। দোকানদার পয়সাটা হাতে নিতে নিতে বৃদ্ধকে বলল, 'হাবিলদারসাব, ''দেও'' আর চিতাটাকে নাকি আবার দেখা যাচ্ছে, সে কথাটা কি সত্যি? আমার পরিবার তো সুরজ ডোবার পর ঘরের বাইরে লকড়ি আনতে যেতে চাইছে না।'
তার কথা শুনে বৃদ্ধ দোকানদারকে মৃদু ধমকের সুরে বললেন, 'সব মিথ্যে। তোরা এসব কথা বিশ্বাস করিস কেন? দেও কোথায় মারা গিয়েছিল জানিস? আফ্রিকা মুলুকে। পুরন্দোয়ার মাথা খারাপ, নেশা করে ও ভুলভাল দেখে। ওর কথা যে বিশ্বাস করে সেও পাগল।'
শুভ্রদা এরপর একবার তাকাল বৃদ্ধের দিকে, তারপর তাঁকে ধন্যবাদ জানিয়ে বাসরাস্তা ধরে হাঁটতে শুরু করল।
হাঁটতে হাঁটতে শুভ্রদা বলল, 'আমরা যে রাস্তায় হাঁটছি তা কমপক্ষে তিন-চারশো বছরের পুরোনো। যুগ-যুগ ধরে তীর্থযাত্রীরা এই পথ দিয়ে কেদারনাথ দর্শন করতে এসেছে। আজ না হয় এখানে পিচরাস্তা হয়েছে, বাস চলাচল করছে, দোকান, ধর্মশালা হয়েছে, কিন্তু সেদিনের কথা তুই ভাব! যেদিন শ্বাপদসঙ্কুল পথ ধরে অরণ্যের মধ্য দিয়ে এই পাহাড়ি পথ বেয়ে তীর্থযাত্রীদের যেতে হত? ঝড়ঝঞ্ঝা তো ছিলই, তার সঙ্গে ছিল বাঘ আর কালাজ্বরের ভয়। এসবের হাত থেকে রক্ষা পেয়ে খুব অল্পসংখ্যক তীর্থযাত্রী সমতলে নিজেদের ঘরে ফিরতে পারত।'
পটাই বলল, 'জিম করবেটের বইয়ে যে পণ্ডিতজির চটির কথা লেখা আছে, সেটা তো গুলাবরাইতেই, তাই না?'
শুভ্রদা বলল, 'হ্যাঁ ওখানেই। এখনও তা টিকে আছে কিনা জানি না! আজ থেকে সত্তর-আশি বছর আগে ওই চটি বা সরাইখানাটাই ছিল এ-অঞ্চলে তীর্থযাত্রীদের মাথা গোঁজার একমাত্র আশ্রয়। আর তুই যে পণ্ডিতজির কথা বলছিস, তিনিই ছিলেন একমাত্র মানুষ, যিনি চিতার দাঁত থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পেরেছিলেন।'
পটাই বলল, 'হ্যাঁ জানি। জিম করবেটের 'রুদ্রপ্রয়াগের নরখাদক চিতা' শিকারকাহিনিটা বেশ কয়েকবার আমি পড়েছি। তবে সেটা অবশ্য বাংলা অনুবাদ।'
তার কথা শুনে শুভ্রদা বলল, 'করবেটসাহেবের ইংরেজি বই দুটো 'দ্য ম্যানইটার্স অফ কুমায়ুন' ও 'ম্যানইটিং লেপার্ড অফ রুদ্রপ্রয়াগ' আমার কালেকশনে আছে। ফিরে গিয়ে নিস।' এরপর শুভ্রদা বলল, 'আসলে আমরা এখানে যাকে ''চিতা'' বলছি সেগুলো আসলে হচ্ছে লেপার্ড। চিতার জাতভাই। চিতা আছে আফ্রিকায়। ভারতবর্ষ থেকে গত শতাব্দীর প্রথম দিকেই তারা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। ভারতবর্ষের শেষ চিতাশাবক দুটি শিকার করেছিলেন মেওয়ারের মহারাজ, স্বাধীনতারও অনেক আগে।'
পটাই বলল, 'তা হলে চিতা আর চিতাবাঘ ঠিক এক নয়?'
শুভ্রদা বলল, 'না। চিতার ইংরেজি হল ''চিতা''। আর চিতাবাঘের ইংরেজি হল ''লেপার্ড''। যে কারণে করবেটসাহেব তাঁর ইংরেজি বইয়ে লেপার্ড শব্দটা ব্যবহার করেন।'
কথা বলতে বলতে রাস্তা ধরে এগিয়ে চলল পটাইরা। বেশ কিছুটা এগোবার পর বাঁক নিতে পথের পাশে একটা আর্মিব্যারাক দেখতে পেল তারা। সেটা দেখে শুভ্রদা বলল, 'চায়ের দোকানের বৃদ্ধ মনে হল এখানেই চিতাবাঘ দেখে ছিলেন।'
ব্যারাক ছাড়িয়ে বেশ কিছুটা রাস্তা এগোবার পর তাদের দূর থেকে চোখে পড়ল একটা মাঠ। এক সময় তারা পৌঁছে গেল সেই মাঠের কাছে। পথের বাঁ-পাশে পাহাড়, আর ডান পাশে মাঠটা। মাঠের শেষ প্রান্তে খাদ। তার নীচে বয়ে চলেছে অলকনন্দা। মাঠটা ডান দিকে ঢালু হয়ে নেমেছে খাদের দিকে। মাঠের যেখানে শেষ হয়েছে ঠিক সেখানেই বাসরাস্তার গায়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে একটা আমগাছ। গাছটা দেখতে পেয়েই শুভ্রদা বলল, 'নিশ্চয়ই এটাই হবে!'
পটাইরা গিয়ে দাঁড়াল গাছটার নীচে। ঠিক তার ডান দিকে নিচু পাঁচিল-ঘেরা জায়গা। গাছের ডালপালা ছায়া দিচ্ছে সেই জায়গাটাকে। ঘেরা জায়গাটার মাঝখানে পচা পাতার স্তুূপের ভিতর থেকে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে ফুটচারেক উঁচু একটা স্মারক। আমগাছের ডালের ফাঁক গলে ভোরের আলো এসে পড়েছে শ্বেতপাথরের ফলকে। তাতে লেখা 'ইন দিস ভেরি স্পট ওয়াজ কিলড দ্য ম্যানইটিং লেপার্ড অফ রুদ্রপ্রয়াগ বাই জিম করবেট অন সেকেন্ড মে ১৯২৬।' শুভ্রদা বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল স্মৃতিফলকটার দিকে, তারপর বলল, 'এই জায়গাটার কথা কত পড়েছি করবেটের লেখায়। আজ এখানে এসে দাঁড়িয়ে বুকের ভিতর কেমন যেন রোমাঞ্চ হচ্ছে। একদিন এই জায়গাটা, বিশেষত, এই আমগাছটা তামাম গাড়োয়ালের মানুষকে এক ভয়ংকর অভিশাপ থেকে মুক্তি দিয়েছিল। সাগরপারে 'দ্য পাইওনিয়ার'-এর মতো বড় বড় কাগজেও ফলাও করে ছাপা হয়েছিল এই গাছটার কথা।'
তবে পাঁচিল-ঘেরা জায়গাটা আর গাছটায় অযত্নের ছাপ স্পষ্ট। কারা যেন গাছটার ডালে সম্ভবত পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য একটা মাচান বেঁধে রেখেছিল। উই ধরে আর জলে ভিজে নষ্ট হয়ে গিয়েছে সেটা। ভাঙা মাচা থেকে ঘুন-ধরা কাঠের পাটাতন ঝুলেছে নীচের দিকে। গাছের ডালপালা ফুঁড়ে চলে গিয়েছে একঝাঁক বিদ্যুতের তার। গাছের গায়ে পেরেক ঠুকে টিনের ফলকে পানমশলার বিজ্ঞাপন লটকানো। গাছটার দিকে তাকিয়ে শুভ্রদা বলল, 'গাছটার কী হাল দেখেছিস? এখানে করবেটের নামে হোটেল আছে, করবেট এক্সপ্রেস নামে বাস চলছে, করবেটের নামে ন্যাশনাল পার্ক আছে, অথচ আসল জিনিসটার কী অবস্থা! গাছটার একটা ভালো ফোটো তুলে রাখ। পাঁচ-দশ বছর পর এখানে এসে হয়তো তুই গাছটাকেই খুঁজে পেলি না, রাস্তা চওড়া করার জন্য হয়তো গাছটাকে কেটে হাওয়া করে দিল কেউ!'
পটাই বেশ কয়েকটা ফোটো তুলল গাছ আর স্মারকের, তারপর জিগ্যেস করল, 'আচ্ছা করবেটসাহেব মারা যান কবে?'
শুভ্রদা বলল, 'উনিশশো পঞ্চান্ন সালে। তবে তারিখটা ঠিক খেয়াল নেই।'
'তারিখটা হল উনিশ এপ্রিল। তাঁর শেষ বই 'টি টপস' লেখার তেরো দিন পর মারা যান তিনি।'
পরিষ্কার বাংলায় একটা অপিরিচিত কণ্ঠস্বর শুনে ফিরে তাকাল পটাই আর শুভ্রদা। তাদের পিছনে কখন যেন এসে দাঁড়িয়েছেন এক মধ্যবয়সি ভদ্রলোক। তাঁর পরনে চামড়ার জ্যাকেট, সাদা রঙের ট্রাউজার, পায়ে হাই হিল বুট, হাতে একটা ছড়িও আছে। ফরসা চেহারার ভদ্রলোকের মাথায় চুল পাতলা হয়ে এলেও শরীরে বেশ একটা শক্তপোক্ত ভাব আছে। পটাইরা ফিরে তাকাতেই ভদ্রলোক মৃদু হেসে বললেন, 'মাফ করবেন, আপনারা বাঙালি দেখে বাংলায় কথা বলার লোভ সামলাতে পারলাম না। তাই আপনাদের কথার মাঝে কথা বলে ফেললাম।'
তাঁর কথা শুনে শুভ্রদা বলল, 'না, না, আমরা কিছু মনে করিনি। আপনি বরং কথাটা বলেই ভালো করলেন।'
ভদ্রলোক বললেন, 'আপনারা নিশ্চয়ই টুরিস্ট?'
শুভ্রদা বলল, 'হ্যাঁ, আমরা কলকাতা থেকে এখানে বেড়াতে এসেছি। আপনি কি এখানেই থাকেন?'
তিনি বললেন, 'হ্যাঁ, আমি এখানেই থাকি। মানে, অলকনন্দার ওপারে ওই যে পাহাড়টা দেখছেন, ওখানেই আমার বাড়ি।' এরপর ভদ্রলোক লাঠিসমেত হাত দুটো বুকের কাছে তুলে ধরে নমস্কারের ভঙ্গিতে বললেন, 'আমার নাম আদিত্য সিংহ। আপনাদের নাম যদি অনুগ্রহ করে বলেন।'
শুভ্রদা প্রতিনমস্কার জানিয়ে বলল, 'আমার নাম শুভ্র মজুমদার, আর এ হল আমার ব্রাদার-ইন-পল্লব রায়।'
'তা আপনারা দুজনে আসেননি নিশ্চয়ই? সঙ্গে আরও লোকজন আছে?' তিনি জিগ্যেস করলেন।
শুভ্রদা বলল, 'আমরা দুজনেই এসেছি। আমাদের সঙ্গে কোনও লোকজন নেই।'
'তা হলে আমি আমার ব্যাপারটা সংক্ষেপে একটু বলি, আমার তিনকুলে কেউ নেই। বিয়ে-থাও করিনি। আমার কর্মজীবন কেটেছে এক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। চাকরি সূত্রে সারা ভারতবর্ষের বিভিন্ন কোনায় ঘুরে বেড়াতে হয়েছে আমাকে। কিন্তু তারপর হঠাৎ একদিন আমার মনে হল, কী হবে কাজকর্ম করে? কার জন্য এই পরিশ্রম? আমার তো কোনও আপনার জন নেই, যে আমার পরিশ্রমের টাকা ভোগ করবে? তাই ঠিক করলাম, আর চাকরি নয়, বাকি জীবনটা শহর-নগরের হই-হট্টগোল থেকে দূরে কোনও শান্ত, নির্জন পরিবেশে কাটিয়ে দেব। যেরকম জায়গায় আমি থাকতে চাই মনে মনে তার একটা ছবি কল্পনা করেছিলাম। তা হল, ছোট্ট পাহাড়ি জনপদ, চারপাশে সবুজ পাহাড়, মাথার ওপর নীল আকাশ, নিচ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে খরোস্রোতা। চিন্তামাফিক বাংলার ভিতর ও বাইরে এ ধরনের বেশ কয়েকটা জায়গা দেখলাম। তবে শেষ পর্যন্ত আমার এক বন্ধুর পরামর্শে এ জায়গাটা দেখতে এসে ভারি ভালো লেগে গেল আমার। আর তারপরই চাকরি ছেড়ে, জীবনে একটু-আধটু যা সঞ্চয় করেছিলাম, তাই নিয়ে এখানে চলে এলাম।' টানা কথাগুলো বলার পর একটু থামলেন ভদ্রলোক। তারপর বললেন, 'এ অঞ্চলের পুরোনো বাসিন্দা বলতে যা বোঝায়, আমি ঠিক তা নই। মাত্র বছর দুই হল আমি রুদ্রপ্রয়াগে এসেছি। স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে ঠিক যতটুকু প্রয়োজন, তার চেয়ে বেশি সম্পর্ক আমার এখনও গড়ে ওঠেনি।'
শুভ্রদা তাঁর কথা শুনে বলল, 'আপনার কথা শুনে মনে হল, আপনি কর্মব্যস্ত মানুষ ছিলেন। তা এখন আপনার সময় কাটে কীভাবে?'
তিনি বললেন, 'বই পড়ে আর ঘুরে বেড়িয়ে। পাহাড়-জঙ্গলে হাঁটতে হাঁটতে ঘুরে বেড়াই আমি। কখনও বা অলকনন্দা-মন্দাকিনীর তীরে বসে নদীর স্রোতের দিকে তাকিয়ে থাকি। এভাবেই সময় কেটে যায়।'
ভদ্রলোক এখানকার পাহাড়-জঙ্গলে ঘুরে বেড়ান শুনে পটাই হঠাৎ তাঁকে জিগ্যেস করল, 'আপনি এখানে কখনও চিতাবাঘ দেখেছেন?'
পটাইয়ের কথা শুনে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন ভদ্রলোক। তারপর বললেন, 'হ্যাঁ, বেশ কয়েকবার দেখেছি। ওই যে অলকনন্দার ওপারে পাহাড়ের মাথার জঙ্গলে, ওটা করবেট ন্যাশানাল পার্কের একটা রেঞ্জ। ওখানে চিতাবাঘ আছে। মাঝে মাঝে নীচে নেমে আসে।' এরপর তিনি শুভ্রদার দিকে তাকিয়ে বললেন, 'চিতাবাঘ অনেক সুন্দর চিতার চেয়ে। আফ্রিকার চিতা যদি দেখেন, তবে দেখবেন, তার পিঠের লোমগুলো খাড়া-খাড়া। তাদের শরীরে কেমন একটা রুক্ষ ভাব, কোনও লালিমা নেই। তাদের তুলনায় চিতাবাঘের চেহারা, হাঁটা-চলা, অনেক বেশি রাজকীয়।'
শুভ্রদা বলল, 'হ্যাঁ, প্রাণীটার মধ্যে দীপ্ত ভঙ্গি আছে। কিন্তু রাজা-মহারাজা আর সাহেবরা তো চিতার মতো চিতাবাঘের বংশও লোপ পাইয়ে দিতে বসেছিলেন। দেশ আর দশটা বছর পর স্বাধীন হলে আর-একটি চিতাবাঘও পাওয়া যেত না।'
আদিত্যবাবু বললেন, 'ঠিক তাই। তবে করবেটসাহেব শিকারি হলেও পশুদের প্রতি তাঁর আশ্চর্য মমত্ব ছিল। যে ভয়ংকর প্রাণীটি একশো পঁচিশটা মানুষ খেয়েছিল, তাকে এখানে মারার পর করবেট দুঃখ করে বলেছিলেন, 'ও প্রকৃতির নিয়ম ভাঙেনি, ওকে মরতে হল ও মানুষের নিয়ম ভেঙেছে বলে। গাড়োয়ালে ও বছরের পর-বছর ধরে যে সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে ছিল, তা মানুষকে ভয় দেখাবার জন্য নয়, কাজটা তাকে করতে হয়েছে নিজের বেঁচে থাকার তাগিদে।'
শুভ্রদা বলল, 'তাঁর লেখায় আমি এ কথাটা পড়েছি।' এরপর শুভ্রদা অন্য প্রসঙ্গে চলে গেল। আদিত্যবাবুকে বলল, 'এখানে দিন দু-তিন থাকার ইচ্ছে আছে আমাদের। এখানে কী-কী দেখার জিনিস আছে বলুন তো?'
তিনি বললেন, 'কাছাকাছি দেখার মধ্যে আছে প্রয়াগের রুদ্রনাথের মন্দির আর কোটেশ্বর গুহা।'
শুভ্রদা শুনে বলল, 'ও-দুটোর কথা তো জানা আছে। আর কিছু?'
ভদ্রলোক কয়েক মুহূর্ত চিন্তা করার পর বললেন, 'আর একটা জায়গার কথা আমি বলতে পারি। সেখানে অবশ্য টুরিস্ট যায় না। রাস্তাটা আমার বাড়ি যাওয়ার পথে পড়ে। দক্ষিণে এই রাস্তা ধরে এগোলে ডান পাশে কিছুটা নামলেই চোখে পড়বে অলকনন্দার ওপর রোপব্রিজ। যার কথা করবেটসাহেবের বইয়েও আছে। ওই রোপব্রিজ ওপারে ঠিক যেখানে শেষ হচ্ছে, সেখানেই একটা শুঁড়িপথ নেমেছে খাতের দিকে। ওই পথ ধরে নদীর দিকে নামলেই চোখে পড়বে একটা গুহা। তার ভিতরটা ঠিক কোটেশ্বরের গুহার মতো। ওই গুহার ভিতর বাস করেন এক দৃষ্টিহীন সাধু। তাঁর অনেক বয়স। গুহার মধ্যে তাঁর কাছে অষ্টধাতুর রুদ্রনাথের অদ্ভুত সুন্দর এক মূর্তি আছে, মহিষরূপী রুদ্রনাথ। তার লাল চোখ দুটো অন্ধকারের মধ্যেও জ্বলে। ওখানে একবার যেতে পারেন আপনারা। সাধুবাবাও খুব সজ্জন মানুষ। তাঁর সঙ্গে কথা বললে ভালো লাগবে আপনাদের।' এরপর একটু থেমে তিনি বললেন, 'আমার একটা অনুরোধ আছে, রাখবেন?'
শুভ্রদা বলল, 'কী?'
ভদ্রলোক বললেন, 'আজ বিকেলে বেড়াতে-বেড়াতে একবার আমার বাড়িতে আসুন না। একটু চা খেয়ে যাবেন, আর-একটু গল্প করা যাবে। বেলাবেলি যদি আসেন তা হলে ওই গুহাটা আমি আপনাদের দেখাতে নিয়ে যেতে পারি। আপনাদের হাতে তো সময় আছে। কি, আসবেন তো?'
ভদ্রলোক এমনভাবে কথাগুলো বললেন, যে শুভ্রদাকে বাধ্য হয়ে বলতে হল, 'ঠিক আছে, আসব।'
আদিত্যবাবু বললেন, 'রোপব্রিজ পার হয়ে যে রাস্তাটা অলকনন্দার পার বরাবর দক্ষিণ দিকে চলে গিয়েছে, সে রাস্তা ধরে মিনিট পাঁচেক এগোলেই ডান দিকে বাঁক নিয়েছে। ওই বাঁকের মুখে দাঁড়িয়ে মুখ তুলে তাকালেই পাহাড়ের ঢালে দেখতে পাবেন আমার বাড়িটা। একটাই বাড়ি ওখানে চিনতে কোনও অসুবিধে হবে না।' ঠিকানাটা বলার পর আবার একটা নমস্কার জানিয়ে আদিত্যবাবু বললেন, 'তা হলে আমি আসি! আমি আপনাদের প্রতীক্ষায় থাকব কিন্তু!' হাতের লাঠিটা কাঁধের ওপর ছাতার মতো ফেলে পিছন ফিরে এরপর ধীরে-ধীরে হাঁটতে শুরু করলেন তিনি।
শুভ্রদা বলল, 'চল পটাই, আমাদেরও এবার ফিরতে হবে।'
পটাইরা যখন ধর্মশালায় ফিরে এল তখন প্রায় আটটা বাজে। শুভ্রদা বলল, 'তাড়াতাড়ি স্নান সেরে বেরিয়ে পড়তে হবে। তারপর টিফিন সারতে হবে। হেঁটে এসে বেশ খিদে খিদে পাচ্ছে।'
পটাই বলল, 'আমরা এর পর কোথায় যাব?'
শুভ্রদা বলল, 'কোটেশ্বরে, তারপর ওখান থেকে ফেরার পথে রুদ্রনাথের মন্দির দেখে একেবারে খাওয়া সেরে ঘরে ফিরব।' এর পরেই শুভ্রদা হঠাৎ বলল, 'আচ্ছা আদিত্য সিংহ লোকটাকে তোর কেমন মনে হল?'
পটাই বলল, 'কেন, ভালো বলেই তো মনে হল!'
শুভ্রদা জামার বোতাম খুলতে খুলতে বলল, 'তবে এখানে এসে তাঁর ডেরা বাঁধার গল্পটা আমার কেমন যেন লাগল! আমি ভদ্রলোকের কথা অবিশ্বাস করছি না, কিন্তু বিনা কারণে শুধুমাত্র একটা সুন্দর জায়গায় জীবন কাটাবেন বলে নগরজীবন ছেড়ে, চেনা-পরিচিতদের ছেড়ে তাঁর এখানে চলে আসাটা একটু অদ্ভুত ব্যাপার। বানপ্রস্থে আসার মতো বয়স এখনও তাঁর ঠিক হয়নি।'
পটাই জিগ্যেস করল, 'তাঁকে দেখে আর কী মনে হল তোমার?'
শুভ্রদা বলল, 'তুই হয়তো খেয়াল করিসনি, ভদ্রলোক কথা বলতে-বলতে তাঁর হাই-হিল বুটটা মাটিতে ঠুকছিলেন। তুই তো জানিস যে, বডি ল্যাঙ্গোয়েজ বলে একটা ব্যাপার আছে। ও নিয়ে কিঞ্চিৎ পড়াশোনাও করেছি। ভদ্রলোকের ওই হাই-হিল বুট, তাঁর মাটিতে পা ঠোকার ধরন, আর তাঁর লাঠিটা যেভাবে কাঁধের ওপর রাখলেন, এসব দেখে আমার অনুমান হচ্ছে ভদ্রলোকের মধ্যে একটা কমান্ডিং ভাব আছে। তবে সেটা সযত্নে লুকিয়ে রেখেছে। হয়তো তিনি এমন কোনও পেশায় যুক্ত ছিলেন যেখানে তাঁর কমান্ডের প্রয়োজন ছিল।'
শুভ্রদা এর পর বাথরুমে ঢুকল। আর পটাই গিয়ে দাঁড়াল বারান্দায়। সূর্যের আলোয় নদীতট আর পশ্চিমের পাহাড়টা ঝলমল করছে। নদীর ওপরে রুদ্রনাথের মন্দিরটা ঠিক ধর্মশালার উলটো দিকেই। সেখান থেকে ভেসে আসছে ঘণ্টার ধ্বনি। ওপারের ঘাটে কয়েকজন লোক স্নান করতে নেমেছে। এত ওপর থেকে তাদের ঠিক মনে হচ্ছে পুতুল, আর মন্দাকিনীর কংক্রিটের ব্রিজের ওপর দিয়ে যাওয়া গাড়িগুলোকে মনে হচ্ছে, খেলনা গাড়ি। বাঁ-দিকে অনেক দূরে নদীর উপর রোপব্রিজটাও চোখে পড়ছে পটাইয়ের। সেদিকে তাকিয়ে পটাইয়ের মনে পড়ে গেল আদিত্যবাবুর কথা। ভদ্রলোকের বাড়িও ব্রিজ পার হয়েই যেতে হয়। কিছুক্ষণ বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকার পর ঘরের ভিতর থেকে বাথরুমের দরজা খোলার শব্দ শুনতে পেল। শুভ্রদার হয়ে গিয়েছে। স্নান সেরে নেওয়ার জন্য ঘরের ভিতর ঢুকল পটাই।
কিছুক্ষণের মধ্যে স্নান সারা হয়ে গেল। বাথরুম থেকে বাইরে বেরিয়ে পটাই দেখল, জিন্স আর টি-শার্ট পরে শুভ্রদা একদম রেডি। পটাই ব্যাগ থেকে জামা-প্যান্ট বের করার সময় শুভ্রদা বলল, 'তোর বাইনোকুলারটা সঙ্গে নিস। পাহাড়ের মাথায় কুয়াশা এখন কেটে গিয়েছে। ওটা দিয়ে ওপরের জঙ্গলের ভিউ পাবি।'
পটাইয়ের তৈরি হতে মিনিট দশেক সময় লাগল। তারপর গলায় বাইনোকুলার ঝুলিয়ে পকেট-ক্যামেরা নিয়ে শুভ্রদার সঙ্গে বেরিয়ে পড়ল।
বাসরাস্তায় পৌঁছে শুভ্রদা বলল, 'গাইড বইয়ে যা দেখলাম তাতে মন্দাকিনীর কংক্রিটের সেতু পার হয়ে ওপারে কোটেশ্বরের দিকে যেতে হবে। ওদিকে হাঁটি। আর বাজারে টিফিনটাও সেরে নেওয়া যাবে।'
তারা হাঁটতে শুরু করল সেদিকে। রাস্তায় এখন বেশ লোকজন। মাঝে মাঝে নানারঙের ঝান্ডা-ফেস্টুন লাগানো তীর্থযাত্রী বোঝাই বাস হুস হুস করে বেরিয়ে যাচ্ছে তাদের পাশ দিয়ে। পটাইরা বাজারে এসে হাজির হল। বাজারে বেশ ভিড়। কয়েকটা বাস দাঁড়িয়ে আছে সেখানে। টুরিস্টরা সেখানে নেমে খাওয়াদাওয়া করছে। পটাইরা গিয়ে ঢুকল একটা খাবারের দোকানে। তীর্থযাত্রীদের ভিড় সেখানেও। বিরাট কড়াইয়ে লুচি ভাজা হচ্ছে। শো-কেসে রাখা আছে শুকনো মিষ্টি। দোকানের ভিতর একদম কোনার দিকে দুটো চেয়ার ফাঁকা দেখে সেখানে গিয়ে বসল পটাইরা। শুভ্রদা খাবার অর্ডার দেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই পুরি-সবজি আর মিষ্টি চলে এল। বেশ তৃপ্তি করেই খেল ওরা। খাওয়ার পর দোকানের ক্যাশ কাউন্টারে বসা লোকটাকে পয়সা দেওয়ার সময় শুভ্রদা কোটেশ্বর কীভাবে যেতে হবে জিগ্যেস করায় সে বলল, 'বিজ্রের ওপর থেকে কোটেশ্বর যাওয়ার জন্য ট্রেকার ছাড়ছে। ওতে চলে যান। হেঁটে যেতে পারেন। ব্রিজ পার হয়ে ডান দিকের রাস্তা ধরে নদীর ধার বরাবর কিলোমিটার খানেক গেলে কোটেশ্বর। ব্রিজের ওপাশ থেকে বাসও যায় সেদিকে।'
দাম মিটিয়ে কথা শুনে নেওয়ার পর পটাইরা দোকানের বাইরে এসে দাঁড়াল। শুভ্রদা পকেট থেকে সিগারেট-লাইটার বের করে বলল, 'ব্রিজের ওপর থেকে তা হলে ট্রেকার ধরে নিই। রোদ চড়ছে, শুধু-শুধু হেঁটে লাভ নেই।'
পটাই তাকিয়ে ছিল রাস্তার দিকে। হঠাৎ সে দেখতে পেল, ধর্মশালায় তাদের পাশের ঘরে থাকা সেই লোকটিকে। ব্রিফকেসটা অবশ্য তার সঙ্গে নেই। সে রাস্তা পার হয়ে এদিকের ফুটপাতে এসে কাছেই একটা দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে পকেটে হাত ঢোকাল, মনে হয় কিছু কেনার জন্য। ধর্মশালায় লোকটিকে আর চোখে পড়েনি পটাইয়ের। তার ঘরের দরজা সব সময় ভিতর থেকে বন্ধই দেখেছে।
শুভ্রদা দাঁড়িয়ে পড়ে সিগারেট ধরাবার পর পটাই বলল, 'ওই দেখো আমাদের পাশের ঘরের লোকটি, যে আমাদের সঙ্গে বাসে এসেছিল।'
শুভ্রদা বলল, 'কই?'
পটাই আঙুল তুলে দেখিয়ে দিল। লোকটি সম্ভবত একটা সিগারেটের প্যাকেট কিনল, তারপর একটা সিগারেট জ্বালিয়ে প্যাকেট, লাইটার পকেটে ঢুকিয়ে সোজা ব্রিজের দিকে হাঁটতে শুরু করল। শুভ্রদা আর পটাইরা এর পর তার পিছন-পিছন ব্রিজের দিকে হাঁটতে লাগল ট্রেকার ধরার জন্য।
পটাইদের চেয়ে বেশ কিছুটা এগিয়ে চলেছে লোকটি। শুভ্রদা মন্তব্য করল, 'লোকটি মনে হয় ব্যবসায়ী। দেখছিস, আমাদের মতো রাস্তার দু'পাশের লোকজন দোকানপাট দেখতে-দেখতে হাঁটছে না। নিজের মতো কোনও দিকে না তাকিয়ে সোজা হেঁটে যাচ্ছে। সম্ভবত রাস্তাটা ওর পরিচিত, এখানে আসা-যাওয়া আছে ওর।'
ব্রিজের কাছাকাছি যখন তারা পৌঁছে গিয়েছে, ঠিক তখন তাদের আগে-আগে হাঁটতে থাকা লোকটি প্যান্টের পকেট থেকে একটা রুমাল বের করল। পটাইয়ের মনে হল, লোকটি পকেট থেকে রুমাল বের করার সময় তার পকেট থেকে কী যেন একটা ছোট্ট জিনিস রাস্তায় পড়ল। লোকটি খেয়াল করেনি ব্যাপারটা, রুমাল দিয়ে ঘাড় মুছতে মুছতে সে হাঁটতে লাগল। শুভ্রদারও চোখ এড়ায়নি ব্যাপারটা। সে বলল, 'লোকটির পকেট থেকে কী একটা পড়ল না?'
পটাই বলল, 'হ্যাঁ, তাই তো মনে হল।'
পটাই কিছুটা এগিয়ে ঠিক সেই জায়গায় হাজির হতেই দেখতে পেল, রাস্তার ওপর সাদামতো একটা কাগজের টুকরো পড়ে আছে। শুভ্রদা কাগজের টুকরোটা কুড়িয়ে নিয়ে দেখল, সেটা একটা দোকানের কার্ড। তাতে ইংরেজিতে লেখা, 'রুদ্রনাথ এম্পোরিয়াম, রুদ্রাক্ষ অ্যান্ড কিউরিও শপ, রিভার সাইড রোড, নিয়ার প্রয়াগ টেম্পেল, রুদ্রপ্রয়াগ।' তারপর দেওয়া আছে দোকানের টেলিফোন নাম্বারটাও। কার্ডটা উলটে ধরতেই সেখানে আর-একটা লেখা দেখতে পেল পটাইরা। তবে সেটা ছাপানো নয়। সবুজ কালি দিয়ে হিন্দিতে বড় বড় হরফে লেখা, 'কোটেশ্বর মে মিলনা'। লেখাটা পড়ার পর শুভ্রদা বলল, 'লোকটিকে ডেকে কার্ডটা দিয়ে দিই। হয়তো ওর কাছে এটা কাজের জিনিস।'
লোকটি বেশ কিছুটা এগিয়ে গিয়েছে। পটাইরা দ্রুত হাঁটতে লাগল লোকটিকে দাঁড় করাবার জন্য।
লোকটির কাছাকাছি পৌঁছোবার পর শুভ্রদা তার উদ্দেশে বলল, 'এক্সকিউজ মি!' বলার পর কথাটা কানে গেল লোকটির।
ঘুরে দাঁড়িয়ে সে পটাইদের উদ্দেশে বলল, 'ইয়েস!'
শুভ্রদা আর পটাই লোকটির সামনে গিয়ে দাঁড়াবার পর শুভ্রদা তাকে ইংরেজিতে বলল, 'এই কার্ডটা মনে হয় আপনার পকেট থেকে রাস্তায় পড়ে গিয়েছে।'
লোকটি কার্ডটা হাতে নিয়ে দেখল, তারপর শুধু বলল, 'নো থ্যাঙ্কস!' কার্ডটা আবার শুভ্রদার হাতে ধরিয়ে দিয়ে ব্রিজের দিকে হাঁটতে শুরু করল।
শুভ্রদা পটাইকে বলল, 'আশ্চর্য তো! আমরা দুজনে কি একসঙ্গে ভুল দেখলাম?'
শুভ্রদা কার্ডটা আর-একবার ভালো করে দেখে বুকপকেটে রাখল। তারপর হাঁটতে শুরু করল। কিছুটা এগিয়ে তারা পৌঁছে গেল ব্রিজের মুখে। জায়গাটায় বেশ ভিড় আছে। লোকজন ট্রেকার-বাসে ঠেসাঠেসি সেখানে। সাফারি আর সানগ্লাস পরা লোকটি ব্রিজে উঠে সেই ভিড়ের মধ্যে কোথায় যেন হারিয়ে গেল। ব্রিজের ওপর উঠে ট্রেকার পেতে অসুবিধে হল না পটাইদের। তাতে চেপে বসল তারা।
জনাবারো লোক নিয়ে ট্রেকার ছাড়ল। পটাইয়ের মুখোমুখি আসনে বসে আছেন এক সাধু। গেরুয়া বসন, এক হাতে একটা কমণ্ডলু। আর তাঁর গলায় জড়ানো আছে ময়াল সাপের বাচ্চা। সাপটা মাঝে-মাঝে পটাইয়ের দিকে মাথা তুলে দেখছে। পটাইয়ের একবার মনে হল সাপটা যদি তাকে কামড়ে দেয়! তার মনের কথা মনে হয় বুঝতে পারলেন সাধুবাবা। দাড়ি-গোঁফের ফাঁক দিয়ে হেসে তিনি বললেন, 'ডরো মত বেটা! ইয়ে শিবজি হ্যায়। কাটেগা নেহি।'
শুভ্রদাও পাশ থেকে বলল, 'হ্যাঁ ময়াল সাপ কামড়ায় না।' শুভ্রদা এর পর সাধুবাবাকে হিন্দিতে বলল, 'ওটা আমার হাতে একটু দেবেন?'
সাধুবাবা বললেন, 'কিঁউ নেহি। শিবজিকো ছুনেসে সব তকলিফ দূর হো জায়েগি।' এর পর তিনি তাঁর গলা থেকে সাপটা খুলে তুলে দিলেন শুভ্রদার হাতে। শুভ্রদা সাপটাকে হাতে দিয়ে দেখল। তার ডান হাত বেয়ে গলার দিকে ওঠার চেষ্টা করতে লাগল ময়ালের বাচ্চাটা। এর পর শুভ্রদা হঠাৎ সাপটা নিয়ে জড়িয়ে দিল পটাইয়ের গলায়। কিছু হবে না বুঝতে পারলেও তার শীতল স্পর্শে গা'টা কেমন শিরশির করে উঠল পটাইয়ের। শুভ্রদার কাণ্ড দেখে হেসে ফেললেন সাধুবাবা। কয়েকমুহূর্ত পরে শিবজিকে পটাইয়ের গলা থেকে খুলে নিজের গলায় ধারণ করে নিলেন। খাবার দোকানের লোকটার কথামতো ব্রিজ পেরিয়ে মন্দাকিনীকে ডান হাতে রেখে এগোতে লাগল ট্রেকার। যাত্রাপথে বারচারেক স্টপ দিল গাড়িটা। দু-তিনজন করে প্যাসেঞ্জার নামা-ওঠা করল স্টপে। সাধুবাবাও নেমে গেলেন। মিনিট কুড়ির মধ্যেই পটাইরা পৌঁছে গেল কোটেশ্বরে।
কোটেশ্বর গুহায় যাওয়ার রাস্তা বাসরাস্তা থেকে নেমে গিয়েছে নীচের দিকে। পাথরের ধাপ বেয়ে নীচে নামতে-নামতে শুভ্রদা বলল, 'গুহার নাম কোটেশ্বর কেন জানিস? প্রকৃতির খেয়ালে এই গুহার ভিতর গড়ে উঠেছে অসংখ্য শিবলিঙ্গ। তার সংখ্যা নাকি কোটি ছাড়িয়ে গিয়েছে। তাই এই গুহার নাম 'কোটি-ঈশ্বর' বা 'কোটেশ্বর'। বেশ কিছুটা নামার পর তারা এসে দাঁড়াল একটা চাতালমতো জায়গায়। সেখানে জুতো ছেড়ে নীচে নামতে হল তাদের। বাঁ-দিকে একটা সংকীর্ণ পথ একশো ফুট এগিয়ে শেষ হয়েছে গুহার মুখে। সিঁড়ি কিন্তু আরও অনেক নীচে গিয়ে শেষ হয়েছে। দুটো বিরাট পাথরের দেওয়ালের মধ্যে দিয়ে এসে মন্দাকিনী সেখানে একটা কুণ্ড তৈরি করেছে। সেদিকে তাকিয়ে শুভ্রদা বলল, 'আগে গুহাটা দেখে আসি। তারপর নীচে নামব।'
সংকীর্ণ পথটার এক দিকে পাথরের দেওয়াল, অন্য পাশে লোহার রেলিং। অসাবধান হলে রেলিং টপকে নীচে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। পাথরের দেওয়াল বেয়ে জল চুঁইয়ে পড়ছে, পথটা বেশ পিছল। পটাইরা সাবধানে গিয়ে দাঁড়াল গুহার মুখে। গুহার ছাদটা বেশ নিচু, ভিতরে আধো অন্ধকার। একটা পিতলের ঘণ্টা ঝুলছে গুহার প্রবেশমুখে। মাথা বাঁচিয়ে শুভ্রদা আর পটাই ভিতরে ঢুকল। বেশ কয়েকজন মানুষ রয়েছে গুহার মধ্যে। তাদের কয়েকজন পটাইদের মতো টুরিস্ট, কয়েকজন স্থানীয় মহিলা, আর রয়েছেন একজন পূজারি ব্রাহ্মণ। প্রদীপ জ্বলছে গুহার ভিতরে। প্রকৃতির খেয়ালে ছোট-বড় নানা আকারের অসংখ্য শিবলিঙ্গ তৈরি হয়েছে মেঝে আর দেওয়ালের গায়ে। গুহাটা বাঁয়ে বেঁকে আরও কিছুটা এগিয়েছে। কিন্তু সেখানে যাওয়ার উপায় নেই। বাঁকের মুখেই মাটিতে গজিয়ে ওঠা শিবলিঙ্গগুলোকে দেবতা রূপে পুজো করা হয়। সেই শিবলিঙ্গগুলোর গায়ে ঘি-এর প্রলেপ, ফুল আর বেলপাতার স্তূপ। ঘি আর ধূপের গন্ধে ম-ম করছে জায়গাটা। কোটেশ্বর গুহার ভিতরে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর পটাইরা বাইরে এসে দাঁড়াল। বাইরে বের হওয়ার সময় পটাই একবার হাত দিয়ে ঘণ্টাটা বাজাল। তার শব্দ প্রতিধ্বনিত হতে লাগল বাইরের চারপাশের পাথুরে দেওয়ালে।
শুভ্রদা বলল, 'এবার নীচে নামা যাক।'
পটাইরা একদম নীচে নেমে কুণ্ডের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। জায়গাটা বেশ ঠান্ডা। পটাই জলে হাত দিয়ে দেখল, জল একদম যেন বরফ। সংকীর্ণ খাদের মধ্যে দিয়ে জল এসে জমা হচ্ছে সেখানে। খাদের দু'পাশে উঁচু পাথরের দেওয়াল। তার ফাঁক দিয়ে চুলের মতো এঁকেবেঁকে আসছে মন্দাকিনীর সবুজ জলধারা। পটাইরা যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে কুণ্ডকে বেষ্টন করে তিন দিকেই পাথরের দেওয়াল আকাশের দিকে উঠে গিয়েছে।
শুভ্রদা বলল, 'জব্বলপুরে মার্বেল রকে নামলে অনেকটা এরকম লাগে।'
জলধারা যেদিক থেকে আসছে সেই দুই পাথুরে দেওয়ালের ফাঁক দিয়ে অনেকটা দূরে একটা ঝুলা বা দড়ি আর কাঠের তৈরি ছোট্ট সাঁকো দেখতে পেল পটাই। সে শুভ্রদাকে বলল, 'ওই দ্যাখো, একটা ছোট্ট ব্রিজ। কী সুন্দর লাগছে এখান থেকে। ঠিক যেন মনে হচ্ছে, ক্যালেন্ডারের পাতার ছবি!'
শুভ্রদা তাকাল সেদিকে। সত্যিই খুব সুন্দর। সাঁকোর ওপর দুজন লোক দাঁড়িয়ে আছে। স্থানীয় মানুষ হবে হয়তো। এত দূর থেকে শুধু তাদের অবয়বটুকুই বোঝা যাচ্ছে। সাঁকোটা ভালো করে দেখার জন্য এরপর পটাই তার গলায় ঝোলানো বাইনোকুলারটা চোখে লাগাল। আর তার কয়েক মুহূর্ত পরই বলে উঠল, 'শুভ্রদা দ্যাখো, আমাদের পাশের ঘরের সেই লোকটি, আর-একটা লোক দাঁড়িয়ে আছে ব্রিজের ওপর!'
শুভ্রদা বলল, 'কই দেখি!'
পটাইয়ের গলা থেকে বাইনোকুলারটা নিয়ে সাঁকোটার দিকে তাকাল। 'হ্যাঁ সেই লোকটিই! আর-একটা লোকের অবশ্য মুখ বোঝা যাচ্ছে না। একটা লাল রঙের ক্যাপ তার মাথায়। গায়ের জামা বা সোয়েটারের রং বোধ হয় সবুজ।'
শুভ্রদা বাইনোকুলারটায় চোখ রেখে তাকিয়ে রইল সাঁকোর দিকে। লোক দুজন হাত নেড়ে নিজেদের মধ্যে কী কথা বলছে। মিনিট দু-এক তারা দাঁড়িয়ে কথাবার্তা বলল। তারপর দুজন সাঁকোর দুদিকে হেঁটে অদৃশ্য হয়ে গেল। শুভ্রদা চোখ থেকে বাইনোকুলারটা নামিয়ে পটাইয়ের হাতে দিয়ে বলল, 'ওরা দুজন ওই নির্জন সাঁকোয় দাঁড়িয়ে কী করছিল?'
পটাইরা যখন কোটেশ্বরের নীচ থেকে বাসরাস্তার ওপর উঠে এল, তখন তাদের ঘড়িতে এগারোটা বাজে। রাস্তায় একটা লোকাল বাস দাঁড়িয়ে আছে। তার কন্ডাক্টর হাঁকছে, 'রুদ্রনাথজি কা মন্দির যানা হ্যায়? জলদি, জলদি!'
শুভ্রদা বলল, 'এটাতেই উঠে পড়ি। তা হলে ঠিক মন্দিরের কাছে নামতে পারব।'
পটাইরা চড়ে বসল বাসে। কিছুক্ষণের মধ্যেই বাস চলতে শুরু করল। পটাই জানলা থেকে নিচ দিয়ে বয়ে চলা মন্দাকিনীকে দেখতে লাগল, আর শুভ্রদা কী যেন চিন্তা করতে লাগল। চলতে-চলতে, থামতে-থামতে বাস এক সময় পৌঁছে গেল মন্দাকিনীর ব্রিজের কাছে, যেখান থেকে ট্রেকারে চেপেছিল পটাইরা। তারপর ব্রিজকে বাঁ-হাতে রেখে আর-একটু এগিয়েই থেমে গেল।
পটাইরা নেমে পড়ল বাস থেকে। সামনে রাস্তার দু'পাশে সারসার দোকান, আর তার মধ্যে দিয়ে রাস্তা গিয়েছে প্রয়াগের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা রুদ্রনাথ মন্দিরের দিকে। বাস থেকে নামার পর শুভ্রদা নদীর ওপারে তাকিয়ে একটু কোনাকুনিভাবে আঙুল তুলে দেখিয়ে বলল, 'ওই দ্যাখ পটাই আমাদের ধর্মশালাটা দেখা যাচ্ছে!'
পটাই দেখতে পেল, নদীর ওপারে উঁচুতে খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে থাকা লাল রঙের দোতলা ধর্মশালাটা। তাদের বারান্দাটাও চোখে পড়ল। পটাই সেদিকে তাকিয়ে শুভ্রদাকে বলল, 'হ্যাঁ, তাই তো! ওই তো বারান্দায় তোমার নীল জিন্সটা মেলা, সেটাও চোখে পড়ছে!'
তারা হাঁটতে শুরু করল মন্দিরের দিকে। পথের দু'পাশের দোকানগুলো অধিকাংশই পুজো সামগ্রী, বাসনপত্র আর রুদ্রাক্ষের দোকান। দু'পাশ দেখতে দেখতে হঠাৎ থমকে শুভ্রদা রাস্তার উলটো দিকের একটা দোকানের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। তার দৃষ্টি অনুসরণ করে পটাই দেখতে পেল, একটা দোকানের সাইনবোর্ডে বড় বড় করে লেখা আছে, 'রুদ্রনাথ এম্পোরিয়াম, রুদ্রাক্ষ অ্যান্ড কিউরিও শপ।' দোকানের বাইরের দিকটা কাচের শো-কেস দিয়ে ঢাকা। তার ভিতর সাজানো রয়েছে পাথর ও পিতলের তৈরি নানা ধরনের মূর্তি, জিনিসপত্র আর রুদ্রাক্ষের মালা। শুভ্রদা দাঁড়িয়ে পড়ে পকেট থেকে রাস্তায় কুড়িয়ে পাওয়া সেই কার্ডটা বের করে একবার চোখ বুলিয়ে বলল, 'হ্যাঁ, এই দোকানটাই।' তারপর কার্ডটা যথাস্থানে রেখে আবার মন্দিরের দিকে হাঁটতে শুরু করল।
সঙ্গমের ঠিক ওপরেই দাঁড়িয়ে আছে মন্দির। তাতে আছে কষ্টিপাথরের রুদ্রনাথ আর তাঁর পত্নী ভগবতীর বিগ্রহ। বিধিমতে নিত্যপুজো পান তাঁরা। মন্দির ও মন্দির সংলগ্ন চত্বরে জটাজুটধারী সাধুবাবাদের ভিড়। তাঁদের একজন চেঁচিয়ে বলল, 'জয় রুদ্রনাথ! জয় কেদারনাথ!'
মন্দির চত্বর থেকে সিঁড়ি নেমে গিয়েছে প্রয়াগের দিকে। বিগ্রহ দর্শনের পর পটাইরা সেই সিঁড়ি বেয়ে একদম নীচে এসে দাঁড়াল। তাদের সামনের জায়গাটা রেলিং দিয়ে ঘেরা। কয়েক হাত দূরেই দুই নদী মন্দাকিনী আর অলকনন্দা এসে মিলেছে। প্রচণ্ড শব্দ করে ঘুরপাক খাচ্ছে সেখানে, তারপর এগিয়ে চলেছে দক্ষিণে। এখানে কেউ স্নান করতে নামলে দুর্ঘটনা ঘটা অনিবার্য। রেলিং ধরে তাই একজন পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে। অবশ্য এখানকার জলে স্নান করার জন্য দড়ি বাঁধা বালতি নীচে ছুড়ে জল তোলার ব্যবস্থা আছে। কয়েকজন লোক সেভাবেই স্নান সেরে নিচ্ছে। প্রয়াগের ঠিক উলটো পারেই পটাইদের ধর্মশালাটা। তাদের বারান্দাটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে এখান থেকে। ধর্মশালা থেকে নদীর পাড়ে নামার সিঁড়ির ধাপগুলোও একদম স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ওই সিঁড়ি বেয়েই গতকাল বিকেলে নদীর পাড়ে নেমেছিল পটাইরা। যেখানে তারা বসে ছিল সে জায়গাটাও এপার থেকে চিনতে পারল পটাই। রেলিং-এর ধারে দাঁড়িয়ে প্রয়াগের জলরাশি যেদিকে ভেসে যাচ্ছে, সেদিকে তাকালে চোখে পড়ে অলকনন্দার ওপরে সেই রোপব্রিজটা। বাইনোকুলারটা চোখে দিয়ে অনেকক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে রইল পটাই। কিন্তু ব্রিজের ওপর কোনও লোকজনের আসা-যাওয়া চোখ পড়ল না। ওদিকটা তার জনশূন্যই মনে হল। আধঘণ্টাটাক রেলিং-এর ধারে দাঁড়িয়ে প্রয়াগের সৌন্দর্য একদম কাছ থেকে উপভোগ করার পর পটাই আর শুভ্রদা ওপরে উঠতে শুরু করল।
প্রয়াগ মন্দির থেকে বেরিয়ে খাওয়া সেরে ধর্মশালায় ফিরতে একটা বেজে গিয়েছিল পটাইদের। তারপর ঘণ্টাদুই বিছানায় গড়িয়ে নিয়ে আবার উঠে পড়ল তারা। আদিত্যবাবুর আমন্ত্রণ রক্ষার জন্য তারা যখন বাইরে পা রাখল, তখন পটাই একবার তাকাল পাশের ঘরের দরজার দিকে। সেটা ভিতর থেকে বন্ধ। অর্থাৎ সেই লোকটি ঘরের ভিতর আছে। পটাইরা দুপুরবেলায় ধর্মশালায় ফিরে আসার আগেই সে ফিরে এসেছিল। ঘরে ঢোকার সময়ও দরজাটা একইরকম বন্ধ দেখেছিল তারা।
সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামতে-নামতে শুভ্রদা বলল, 'আমাদের হেঁটে যেতে হলে বেশ অনেকটা হাঁটতে হবে। তারপর আবার ফেরার ব্যাপারটাও আছে। দেখা যাক গুলাবরাই পর্যন্ত যাওয়ার জন্য কোনও গাড়ি পাওয়া যায় কিনা!'
কপালটা ভালোই বলতে হবে পটাইদের। বড় রাস্তায় গিয়ে দাঁড়াবার কয়েক মিনিটের মধ্যেই একটা ফাঁকা বাস পেয়ে গেল তারা। রুদ্রপ্রয়াগে যাত্রী নামিয়ে বাসটা ফিরছে শ্রীনগরের দিকে। দুজনকে উঠিয়ে নিল বাসে, তারপর মিনিট দশেকের মধ্যেই দুজনকে নামিয়ে দিল গুলাবরাইতে। সেই আমগাছটার কাছে দুটো জিপ দাঁড়িয়ে আছে। বেশ কয়েকজন টুরিস্ট গাছটার কাছে দাঁড়িয়ে তার ফোটো তুলছে। সেদিকে একবার তাকিয়ে সোজা রাস্তা ধরে হাঁটতে শুরু করল। কিছু দূর এগোবার পর চোখে পড়ল রাস্তার বাঁ-ধারে পাহাড়ের ঢালে কাঠের তৈরি একটা দোতলা বাড়ি। তার নীচের অংশে একটা হোটেলমতো দোকান। কয়েকজন লোক বসে চা খাচ্ছে সেখানে। বাড়িটার ঠিক উলটো দিকে রাস্তার ওপারে দাঁড়িয়ে আছে একটা একতলা পাথুরে বাড়ির ধ্বংসাবশেষ। তার ছাদ খসে পড়েছে, শুধু দেওয়ালগুলো কোনও রকমে এখনও দাঁড়িয়ে আছে। সেই দেওয়ালের গায়ে একটা সাইনবোর্ড লটকানো আছে, তাতে অস্পষ্টভাবে লেখা 'গুলাবরাই চটি'। বাড়িটার সামনে নেমে এসে ওই লেখাটা দেখে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল শুভ্রদা। কয়েক মুহূর্ত পর সে পটাইকে বলল, 'এই গুলাবরাই চটির কথা আমি অনেক বইয়ে পড়েছি।'
করবেটসাহেবের বইয়েও বারবার এর উল্লেখ আছে। আজ থেকে আশি-নব্বই বছর আগে যেসব তীর্থযাত্রী এ পথ বেয়ে তীর্থযাত্রা করতেন, তাঁদের কাছে এ-বাড়িটাই ছিল এ-তল্লাটে মাথা গোঁজার একমাত্র আশ্রয়স্থল। এক অর্থে বলতে পারিস, কেদার যাত্রাপথে আজ যত হোটেল-ধর্মশালা আছে, এ ভাঙা বাড়িটা হল তাদের প্রপিতামহ। তবে এখন তীর্থযাত্রীরা আশ্রয়স্থলে যেসব সুযোগ-সুবিধে পায়, সে সময় এখানে তা পাওয়া যেত না। এই বাড়িতে একই ছাদের তলায় ছাগল-ভেড়ার সঙ্গে গা ঘেঁষাঘেষি করে খড়ের বিছানায় রাত কাটাতে হত পদব্রজে আসা তীর্থযাত্রীদের। প্রকৃতির ডাক এলেও রাতে বাঘের ভয়ে সে কাজও ঘরের ভিতর সারতে হত তাঁদের। পটাই একটা ফোটো তুলল চটির, তারপর আবার দুজনে হাঁটতে লাগল।
পথের ডান দিক থেকে ছোট্ট একটা রাস্তা নেমে গিয়েছে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নদীখাদের দিকে। বাসরাস্তা থেকে সেই শুঁড়িপথ বেয়ে অনেকটা নীচে নামার পর এক সময় পটাইরা হাজির হল রোপব্রিজের সামনে। জায়গাটা বেশ নির্জন। ব্রিজের আশপাশে কোনও বাড়িঘর, লোকজন নেই। ওপরের বাসরাস্তাটা আর নিচ থেকে চোখে পড়ছে না, হারিয়ে গিয়েছে পাহাড়ের ঢালে দাঁড়িয়ে থাকা গাছগুলোর আড়ালে। অলকনন্দার ওপাশেও পাহাড়ের ঢালে জঙ্গল। সে জঙ্গল আরও গভীর। ওপাশে পাহাড়গুলোও অনেক উঁচু। ধাপে-ধাপে তারা ক্রমশ আকাশের দিকে উঠে গিয়েছে। নির্জনতা-ঘেরা জায়গাটায় একলা দাঁড়িয়ে আছে শতাব্দীপ্রাচীন রোপব্রিজ। অলকনন্দার দু'পাশে দুই টাওয়ার থেকে নেমে আসা ইস্পাতের দড়ি ধরে রেখেছে তাকে। ওপারের পাহাড়ের মাথা থেকে পশ্চিমের আলো এসে পড়েছে ব্রিজের ওপর। তার নিচ দিয়ে বয়ে চলেছে অলকনন্দার জলরাশি। শব্দ বলতে এখানে শুধু নদীর কলরব আর জঙ্গল থেকে ভেসে আসা ঝিঁঝির ডাক।
ব্রিজে ওঠার মুখে দাঁড়িয়ে পড়ল শুভ্রদা, তারপর পটাইকে বলল, 'এক সময় অলকনন্দা পারাপার হওয়ার এটাই ছিল একমাত্র রাস্তা। এই যে কংক্রিটের টাওয়ার দেখছিস, এর মাথায় চড়ে রাতের পর-রাত সেই চিতার প্রতীক্ষায় বন্দুক হাতে বসে থাকতেন করবেট। এই সাঁকো দিয়েই চিতাটা অলকনন্দার ওপাশ থেকে এদিকে আসত। এখানে একবার তাকে বাগে পেয়েও সুযোগ হারান করবেট। লক্ষ্যভ্রষ্ট হন তিনি।'
পটাই পকেট থেকে ক্যামেরা বের করল ব্রিজের ফোটো তোলার জন্য, আর শুভ্রদা পকেট থেকে বের করল সিগারেটের প্যাকেট। পটাই একটা ফোটো নিল ব্রিজটার। শুভ্রদা সিগারেট জ্বালিয়ে যখন প্যাকেটটা পকেটে রাখতে যাচ্ছে, ঠিক তখন ভেসে এল একটা শব্দ। খুব কাছ থেকে শুভ্রদার উদ্দেশে হিন্দিতে কে যেন বলল, 'আমাকে একটা সিগারেট দেবেন?'
শুভ্রদা আর পটাই ব্রিজে ওঠার মুখে দাঁড়িয়ে চারপাশে তাকাল, কিন্তু কাউকে দেখতে পেল না। তা হলে কে বলল কথাটা? তারপর মুহূর্তেই টাওয়ারের আড়াল থেকে একটা লোক বেরিয়ে এসে দাঁড়াল পটাইদের সামনে। লোকটার পরনে ছেঁড়াখোঁড়া পোশাক, একমুখ দাঁড়ি-গোঁফ, একটা মাদুর জাতীয় জিনিস আর একটা কম্বল সে বগলে চেপে ধরে রেখেছে। লোকটাকে দেখে মনে হল, সে একজন আধপাগলা গোছের কেউ হবে। পটাইয়ের সামনে এসে দাঁড়াবার পর সে আবার শুভ্রদাকে বলল, 'একটা সিগারেট দেবেন?'
শুভ্রদা কয়েক মুহূর্ত তাকে ভালো করে দেখার পর পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে এগিয়ে দিল তার দিকে। সিগারেটটা হাতে নেওয়ার পর সে গম্ভীরভাবে বলল, 'লাইটার?'
শুভ্রদা লাইটার জ্বেলে ধরল লোকটার মুখের কাছে। সে সিগারেটটা জ্বালিয়ে নিয়ে একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে ব্রিজের ওপারটা দেখিয়ে বলল, 'সাহেবরা ওদিকে যাচ্ছেন?'
শুভ্রদা বলল, 'হ্যাঁ।'
লোকটা এরপর শুভ্রদাকে বলল, 'ওদিকে যাবেন না, ওদিকে বাঘ আছে, সিংহ আছে।'
শুভ্রদা হেসে বলল, 'তুমি দেখেছ নাকি?'
সে গম্ভীরভাবে বলল, 'হ্যাঁ।'
শুভ্রদা জিগ্যেস করল, 'তুমি কি এখানেই থাকো নাকি?'
লোকটা বলল, 'হ্যাঁ, দিনেরবেলা রাস্তায়-বাজারে ঘুরে বেড়াই, লোকের কাজকর্ম করে দিই, আর রাতে ওই ওখানে শুয়ে থাকি।' এই বলে লোকটা টাওয়ারের নীচের দিকের একটা অংশ আঙুল তুলে দেখাল। সে জায়গাটা একটা ফোকরওয়ালা ঘরের মতো, সেখানে ঢুকলে ঝড়-বৃষ্টির হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। এর পর লোকটা নিজে-নিজেই বলল, 'তবে এখানে আর শান্তিতে থাকা যাবে না। অন্য জায়গা খুঁজতে হবে।'
'কেন?' আবার জিগ্যেস করল শুভ্রদা।
'রাতে দেও আর সেই চিতাবাঘটা ঘোরাফেরা করে এখানে।' বলল লোকটা।
'তুমি সত্যি তাদের দেখেছ নাকি?' অবাক হয়ে বলল শুভ্রদা।
লোকটা সিগারেটে একটা লম্বা টান দিয়ে বলল, 'এই পুরন্দোয়া নেশা করে বটে, কিন্তু মিথ্যে কথা বলে না। প্রথমবার রাতে তাদের দেখেছিলাম অনেক দূর থেকে। আর তিনদিন আগে মাঝরাতে দেখলাম কাছ থেকে। ওই যে পুলের মাঝখানে যেখানে রেলিং একটু ভাঙা আছে, ওপার থেকে পুলে উঠে ঠিক ওই পর্যন্ত এল তারা। আগে বাঘটা, আর তার পিছন পিছন টুপি মাথায় বন্দুক কাঁধে দেও। তারপর আবার তারা ওইদিকেই ফিরে গেল।' এর পর সে একটু আক্ষেপের সুরে বলল, 'কতজনকে একথা বললাম, কিন্তু কেউ আমার কথা বিশ্বাস করছে না। পুলিশসাহেবকে বললাম। সে আমাকে বলল, 'বেশি নেশা করলে একদম ফাটকে পুরে দেব।' শুধু অন্ধবাবা আমার কথা বিশ্বাস করেছে। তবে অন্যরাও বিশ্বাস করবে একদিন, যেদিন ওই দানবটা আবার মানুষ মারতে শুরু করবে!' এই বলে চুপ করে গেল সে।
শুভ্রদা আর পটাই বুঝতে পারল, এই সেই পুরন্দোয়া, যার কথা সকালে চায়ের দোকানে আলোচনা হচ্ছিল। শুভ্রদা তার কথা শুনে বলল, 'তার মানে দেও আর বাঘটাকে তুমি একই সঙ্গে ঘুরে বেড়াতে দেখেছ? তা হলে তারা কেউ কাউকে মারছে না কেন?'
শুভ্রদার কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে হেসে উঠে লোকটা বলল, 'মারবে কেন? তারা তো দুজনেই মরে গিয়েছে। তারা এখন দোস্ত।'
শুভ্রদা বুঝতে পারল, অকাট্য যুক্তি পুরন্দোয়ার। একবার শুভ্রদা ঘড়ির দিকে তাকাল। চারটে বেজে গিয়েছে।
আদিত্যবাবু নিশ্চয়ই তাদের জন্য অপেক্ষা করছেন। শুভ্রদা এরপর হেসে পুরন্দোয়াকে বলল, 'আমি কিন্তু তোমার সব কথা বিশ্বাস করলাম। তবে এখন আমাদের যেতে হবে। ওপারে আমাদের একটা কাজ আছে।'
পুরন্দোয়া বলল, 'যাচ্ছেন যান, তবে সন্ধের আগে ফিরে আসবেন।'
শুভ্রদা বলল, 'আচ্ছা।'
তারপর পটাইকে নিয়ে উঠে পড়ল ব্রিজের ওপর। হাঁটতে হাঁটতে শুভ্রদা বলল, 'পুরন্দোয়া ''দেও'' বলতে কাকে বোঝাল, বুঝলি?'
পটাই একটু আভাস পেলেও চুপ করে ছিল। শুভ্রদা বলল, 'করবেটসাহেবকে গাড়োয়ালের মানুষরা ''দেও'' অর্থাৎ দেবতা বা ভগবান বলে সম্বোধন করত, ও তাঁর কথাই বলল।'
পটাই বলল, 'তার মানে ও ভূত দেখেছে। তা কী করে সম্ভব?'
শুভ্রদা বলল, 'না, তা সম্ভব নয়, তবে সম্ভবত ও কিছু একটা দেখেছে। লোকটা সম্পূর্ণ মিথ্যে বলছে না। রাতে অনেক সময় মানুষের দৃষ্টিবিভ্রম হয়। একটা জিনিসকে অন্য জিনিস ভেবে ভুল হয়।'
ব্রিজ পার হয়ে ওপাশে পৌঁছে গেল তারা। ব্রিজ যেখানে শেষ হয়েছে ঠিক সেখানে বাঁ-দিকে একটা শুঁড়িপথ এঁকে-বেঁকে নেমে গিয়েছে খাদের দিকে, আর-একটা রাস্তা বাঁ-দিকে নীচে অলকনন্দা ও ডান পাশে পাহাড়কে রেখে চলে গিয়েছে দক্ষিণ দিকে। শুঁড়িপথটা দেখিয়ে শুভ্রদা পটাইকে বলল, 'সম্ভবত এটাই দৃষ্টিহীন সাধুর গুহায় যাওয়ার রাস্তা।'
আদিত্যবাবুর দেওয়া পথনির্দেশ অনুযায়ী তাঁর বাড়ি যাওয়ার জন্য দক্ষিণের পথটা ধরল পটাইরা। রাস্তাটা ছায়ামাখা। সূর্য এখন পশ্চিমে বলে তার আলো রাস্তায় এসে পড়ছে না। পাহাড়ের ঢালে জঙ্গলও বেশ ঘন। পচা পাতার রাশি ছড়িয়ে আছে নীচে। জঙ্গল থেকে ভেসে আসছে ঝিঁঝিঁপোকার ডাক। বেশ একটা গা ছমছমে পরিবেশ চারদিকে।
হাঁটতে হাঁটতে শুভ্রদা পটাইকে জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে জিগ্যেস করল, 'ধর, যদি সত্যি-সত্যি একটা চিতাবাঘ ওই জঙ্গল থেকে নেমে এসে এখন আমাদের সামনে দাঁড়ায় তা হলে কী করবি?'
'কী আর করব? দৌড়ে পালাবার চেষ্টা করব।'
শুভ্রদা বলল, 'ওর সঙ্গে দৌড়ে তো পারবি না। চিতাবাঘ আর স্প্রিংবক হরিণ হল পৃথিবীর সবচেয়ে দ্রুতগতির প্রাণী।'
পটাই বলল, 'তা হলে কী করব? ওর পেটে যাব।' এরপর পটাই তাকে জিগ্যেস করল, 'তুমি কী করবে?'
শুভ্রদা বলল, 'পালিয়ে তো বাঁচতে পারব না, বরং লড়াই করার চেষ্টা করব।'
পটাই বলল, 'বাঘ তো আর মানুষ নয় যে তুমি খালি হাতে লড়বে? কীভাবে লড়বে তুমি?'
শুভ্রদা মৃদু হেসে বলল, 'না খালি হাতে নয়।'
এই বলে শুভ্রদা জ্যাকেটটা তুলে কোমরের কাছটা পটাইকে দেখাল। পটাই অবাক হয়ে বলল, 'ওটা তুমি সঙ্গে এনেছ?'
শুভ্রদা বলল, 'জিনিসটা তো বাড়িতেই পড়ে থাকে। কোনওদিন সঙ্গে নেওয়ার দরকার হয়নি। খবরের কাগজে ইদানীং পরপর ট্রেনে ডাকাতির বেশ কয়েকটা ঘটনা পড়লাম। তাই মনে হল, জিনিসটা সঙ্গে নিয়ে নিই। বলতে পারিস, অনেকটা খেয়ালের বশেই এটা সঙ্গে এনেছি।'
মিনিট পাঁচেক এগোবার পর পটাইরা এসে দাঁড়াল একটা বাঁকের মুখে। রাস্তা সেখানে ডান দিকে বাঁক নিয়ে জঙ্গলে হারিয়ে গিয়েছে। সেই বাঁকের মুখে দাঁড়িয়ে ওপর দিকে তাকাতেই পটাইদের চোখে পড়ল, রাস্তা থেকে অনেকটা ওপরে পাহাড়ের ঢালে দাঁড়িয়ে থাকা ঢালু ছাদওয়ালা একটা বাড়ি। তার চারপাশে খুঁটি পুঁতে কাঁটাতার দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। রাস্তা থেকে পাথরের ধাপ ঢাল বেয়ে উঠে শেষ হয়েছে বাড়িটায়। ওটাই যে আদিত্যবাবুর বাড়ি তা বুঝতে কোনও অসুবিধে হল না। রাস্তার প্রান্ত থেকে পাথরের ধাপ বেয়ে পটাইরা এসে দাঁড়াল বাড়িটার সামনে। কাঠের তৈরি বাংলো প্যাটার্নের ছিমছাম একতলা বাড়ি। বাড়ির চারপাশে কাঠের খুঁটির গায়ে একমানুষ সমান জাল দিয়ে ঘেরা, ভিতরে ঢোকার কাঠের গেটের মুখে একটা টিনের ফলকে লেখা, বি ওয়ার অফ ডগ।' বাড়ির সদর দরজা বন্ধ দেখা যাচ্ছে। জানলাগুলোও বন্ধ। গেটের সামনে দাঁড়িয়ে শুভ্রদা হাঁক দিল, 'আদিত্যবাবু আছেন নাকি?'
প্রথমবার সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না। দ্বিতীয়বার আবার হাঁক দিল শুভ্রদা। এবার বাড়ির সদর দরজা খুলে গেল। বেরিয়ে এলেন আদিত্যবাবু। পরনে তাঁর সাদা শার্ট, সাদা গেঞ্জি, পায়ে কেডস। পটাইদের দেখে সঙ্গে-সঙ্গে এগিয়ে এলেন গেটের কাছে। তারপর গেট খুলতে-খুলতে হেসে বললেন, 'আসুন, আসুন, সাড়ে চারটে বেজে গেল! আমি তো ভাবলাম আপনারা আর এলেনই না!'
শুভ্রদা বলল, 'রাস্তায় একজনের সঙ্গে কথা বলছিলাম, তাই আসতে একটু দেরি হয়ে গেল।'
পটাইরা ঢুকল বাড়ির চৌহদ্দিতে। বাড়ির সদর দরজা পর্যন্ত পাথর পাতা। সে পথ দিয়ে আদিত্যবাবুর পিছন-পিছন গিয়ে বাড়ির ভিতরে ঢুকল। পটাই ভিতরে ঢুকে জুতো খুলতে যাচ্ছিল দেখে আদিত্যবাবু বললেন, 'না, না, জুতো খোলার দরকার নেই। আমিও তো জুতো পরে আছি।'
বাড়িতে ঢোকার পর আদিত্যবাবু যে-ঘরে নিয়ে গিয়ে তাদের বসালেন, সেটা সম্ভবত তাঁর ড্রয়িংরুম। মাঝারি আকৃতির ঘর। কাঠের মেঝের ওপর ঘরের ঠিক মাঝখানে একটা নিচু টেবিলের দু'পাশে দুটো সোফা রাখা আছে। তারই একটায় বসল পটাইরা। আদিত্যবাবু ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার পর পটাইরা তাকাল ঘরের চারপাশে। ঘরে আর কোনও আসবাবপত্র নেই। শুধু দেওয়ালে টাঙানো আছে চারটে ফোটো। সিংহ, বাঘ, চিতা বাঘ আর হাতির। সাদা-কালো ফোটো, তবে কাগজে ছাপানো ফোটো নয়, অরিজিনাল ফোটোগ্রাফ ফ্রেমে বাঁধিয়ে রাখা আছে। ফোটোগুলো দেখে শুভ্রদা চাপাস্বরে বলল, 'ভদ্রলোক নিশ্চয়ই পশুপ্রেমী, এই ফোটোগুলো আর বাড়ির গেটের লেখাটা দেখে তাই মনে হচ্ছে।'
সোফা ছেড়ে উঠে শুভ্রদা দেওয়ালের কাছে গিয়ে ফোটোগুলো খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। মিনিট তিনেকের মধ্যেই ড্রেস চেঞ্জ করে ঘরে ঢুকলেন আদিত্যবাবু। একটা কালো ট্রাউজার আর ধূসর রঙের হাফশার্ট এখন তাঁর পরনে। শার্ট গুঁজে পরা কোমরে একটা চওড়া বেল্ট। মনে হয় একেবারে তৈরি হয়ে এলেন। তাঁর শার্টের রং দেখে পটাইয়ের মুহূর্তের জন্য মনে পড়ে গেল সেই ধূসর সাফারির কথা! আদিত্যবাবু ঘরে ঢুকতেই শুভ্রদা বলল, 'এই ফোটোগুলো বেশ সুন্দর, কার তোলা?'
আদিত্যবাবু হেসে বললেন, 'আমার এক পশুপ্রেমী বন্ধু ওয়াইল্ড লাইফ ফোটোগ্রাফি করত, অনেকদিন আগে আমাকে ওর তোলা এই ফোটোগুলো প্রেজেন্ট করেছিল।'
শুভ্রদা বলল, 'আপনি নিজেও তো একজন পশুপ্রেমী। গেটে লেখা আছে দেখলাম, কুকুর আছে।'
তিনি বললেন, 'হ্যাঁ, আছে। একটা ''জার্মান শেফার্ড ডগ'' মানে চলতি কথায় যাকে বলে, আ্যলসেশিয়ান।' এরপর একটু থেমে তিনি বললেন, 'তবে ওর শরীরের অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। বয়স হয়েছে। অসুখে ভুগছে।'
তাঁর কথা শুনে শুভ্রদা একটু সমবেদনা প্রকাশ করে বলল, 'ও!'
আদিত্যবাবু এরপর বললেন, 'সকালে আপনাদের সঙ্গে অত কথা হল, কিন্তু এখানে কোথায় আপনারা উঠেছেন সেটাই জিগ্যেস করতে ভুলে গিয়েছি।'
শুভ্রদা বলল, 'আমরা উঠেছি কালীকমলি ধর্মশালায়।'
আদিত্যবাবু তার কথা শোনার পর বললেন, 'কিছু মনে করবেন না, আরও দুটো জিনিস আমার এখনও জানা হয়নি। আপনি কলকাতায় কোথায় থাকেন? আর আপনি কী করেন?'
শুভ্রদা একটু লজ্জা পেয়ে বলল, 'একথা আমার আগে বলা উচিত ছিল। আমি থাকি কলকাতার কাছেই বরানগরে, আর ও শ্যামবাজারে থাকে, মানে নর্থ কলকাতায়। আমি কলকাতাতেই চাকরি করি।'
আদিত্যবাবু পটাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'তুমি শ্যামবাজারে থাকো? ওখানে আমি একবার একটা কাজে গিয়েছিলাম। তবে কলকাতা শহরের মধ্যে পার্ক সার্কাস অঞ্চলটা আমার সবচেয়ে বেশি চেনা। ওখানে আমি বেশ কয়েকবার গিয়েছি।'
শুভ্রদা এবার যেন কী একটা কথা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু দরজার পরদাটা হঠাৎ সরে গেল। একটা ট্রে হাতে ঘরে ঢুকল একজন। প্রথমে পটাই তাকে একটা বাচ্চা ছেলে ভেবেছিল, কিন্তু পরমুহূর্তে সে ভুল তার ভেঙে গেল। যে ঘরে ঢুকেছে সে একজন বামন। তার উচ্চতা খুব বেশি হলে সাড়ে তিন ফুট হবে। গোঁফ-দাড়ি কামানো আর তার পরনে হাফপ্যান্ট, তাই তাকে প্রথম দর্শনে মুহূর্তের জন্য বাচ্চা ছেলে বলে ভুল হয়েছিল পটাইয়ের। লোকটা পটাইদের কাছে এসে টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখল ট্রে-টা। তাতে আছে দু-কাপ চা, আর-একটা বড় প্লেটে কিছু শুকনো মিষ্টি, বিস্কুট। লোকটা ট্রে-টা নামিয়ে রেখে ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর আদিত্যবাবু প্লেট সমেত কাপ উঠিয়ে নিয়ে এগিয়ে দিলেন শুভ্রদার দিকে। সে সেটা হাতে নেওয়ার পর তিনি আর-একটা কাপ-প্লেট তুলে দিলেন পটাইয়ের হাতে। তাঁর হাত থেকে চা-টা নিতে গিয়ে একটা জিনিস চোখে পড়ল পটাইয়ের। ভদ্রলোকের ডান হাতের একপাশে কবজি থেকে কনুই পর্যন্ত একটা কাটা দাগের চিহ্ন রয়েছে। মনে হয় গভীরভাবে হাতটার ওই অংশ চিরে গিয়েছিল।
শুভ্রদা চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলল, 'আপনার বাড়ির চারপাশটা খুব নিস্তব্ধ। শান্তিতে থাকার পক্ষে একদম আদর্শ জায়গা।'
আদিত্যবাবু বললেন, 'নিস্তব্ধ ঠিকই। কিন্তু মাঝে-মাঝে বাড়ির পিছনের জঙ্গল থেকে বাঘের ডাক ভেসে আসে। ওপরের পাহাড় থেকে বাঘ মাঝে-মাঝে নীচে নেমে আসে।'
'বাঘ মানে তো লেপার্ড, তাই তো?' জিগ্যেস করল শুভ্রদা।
তিনি বললেন, 'হ্যাঁ লেপার্ড। আর টাইগার বলতে যা বোঝায় তা বহুদিন আগেই লুপ্ত হয়ে গিয়েছে এ-তল্লাট থেকে। কুমায়ুণ রেঞ্জে কয়েকটা এখনও টিকে আছে বলে শুনেছি।' আদিত্যবাবু এরপর মিষ্টির প্লেটটা পটাইদের দিকে ঠেলে দিয়ে বললেন, 'নিন, এখানে কাছাকাছি তো কোনও বাজার নেই, তাই এর বেশি কিছু আর ব্যবস্থা করতে পারিনি।'
শুভ্রদা বলল, 'না, না, এর বেশি আর দরকার নেই। এই যথেষ্ট!'
পটাইরা চা-মিষ্টি খেতে-খেতে রুদ্রপ্রয়াগের নানা বিষয় নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ গল্প করল আদিত্যবাবুর সঙ্গে। তারপর একসময় শুভ্রদা রিস্টওয়াচের দিকে তাকিয়ে বলল, 'এবার তা হলে চলুন, সাধুবাবার ওখানে যাই। আমাদের তো আবার ফিরতে হবে।'
আদিত্যবাবু বললেন, 'হ্যাঁ, চলুন।'
শুভ্রদা আর পটাই সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। আদিত্যবাবু একটু ইতস্তত করে শুভ্রদাকে বললেন, 'আপনাকে একটা কথা বলব ভাবছি, কিন্তু বুঝতে পারছি না, বলা ঠিক হবে কিনা! কারণ, আপনি হয়তো ভাবতে পারেন যে, এই কথাটা বলার জন্যই আমি আপনাদের আমার বাড়িতে আমন্ত্রণ জানিয়েছি।'
এ কথা শুনে শুভ্রদা তাঁর দিকে তাকিয়ে বলল, 'কী কথা?'
ভদ্রলোক বললেন, 'কথাটা মানে একটা অনুরোধ। আপনারা তো কলকাতায় থাকেন, আমার একটা বিশেষ ওষুধের দরকার। এখানে সেটা পাওয়া যায় না। ওষুধটা কলকাতায় পাওয়া যায়। আমি আপনাকে অগ্রিম টাকা দিয়ে দেব। কলকাতায় ফিরে গিয়ে যদি সেটা আমায় পাঠিয়ে দেন, তা হলে কৃতজ্ঞ থাকি।'
'কীসের ওষুধ?' জিগ্যেস করল শুভ্রদা।
আদিত্যবাবু আবার একটু ইতস্তত করে বললেন, 'মানে, ওষুধটা ঠিক আমার জন্য নয় আমার পোষ্যটার জন্য। ও ফুসফুসে সংক্রমণজনিত একটা অসুখে ভুগছে। এখানে কোনও পশুহাসপাতাল নেই। ওষুধটা কলকাতা থেকেই আমি আনাই।'
শুভ্রদা বলল, 'ওষুধটা কি খুব দামি? কলকাতা ছাড়া অন্য কোথাও পাওয়া যায় না?
আদিত্যবাবু বললেন, 'না, তেমন বেশি দামি নয়। শ'পাঁচেক টাকা মাত্র। অন্য বড় শহরেও নিশ্চয়ই পাওয়া যায়। আসলে কলকাতায় যে দোকানে পাওয়া যায়, তার ঠিকানাটা আমি জানি। তাই ওখান থেকেই সেটা আনাই।'
তাঁর কথা শুনে কয়েক মুহূর্ত ভাবার পর শুভ্রদা বলল, 'ঠিক আছে, আপনি দোকানের ঠিকানা, ওষুধের নাম আর আপনার ঠিকানা একটা কাগজে লিখে দিন। টাকা এখন দেওয়ার দরকার নেই। আমি কুরিয়ারে পাঠিয়ে দিলে টাকা দিয়ে আপনি সেটা ছাড়িয়ে নেবেন। তবে কলকাতায় ফিরতে কিন্তু আমাদের প্রায় সপ্তাহ দু-এক সময় লাগবে।'
শুভ্রদার কথা শুনে ভদ্রলোক বললেন, 'আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। এক মিনিট অপেক্ষা করুন, আমি লিখে নিয়ে আসি।'
ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন আদিত্যবাবু। শুভ্রদা আবার দেওয়ালের কাছে গিয়ে ফোটোগুলো দেখতে লাগল। দেখতে-দেখতে শুভ্রদা হঠাৎ বলল, 'বুঝলি পটাই, প্রাণীগুলোর ফোটোর মধ্যে একটা বৈশিষ্ট্য আছে।'
পটাই বলল, 'কী?'
শুভ্রদা কী একটা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই একটা চিরকুট হাতে ঘরে ঢুকলেন আদিত্যবাবু। তিনি চিরকুটটা শুভ্রদার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, 'এতে সব লেখা আছে। চলুন, এবার তা হলে বেরিয়ে পড়ি।'
দরজার দিকে পা বাড়াতে-বাড়াতে শুভ্রদা হঠাৎ আদিত্যবাবুকে জিগ্যেস করল, 'আচ্ছা আপনার বন্ধু এই প্রাণীগুলোর ফোটোগুলো কোথা থেকে তুলেছিলেন?'
শুভ্রদার প্রশ্ন শুনে দরজার কাছে এসে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়লেন আদিত্যবাবু। তারপর শুভ্রদার দিকে তাকিয়ে বললেন, 'কেন বলুন তো?'
শুভ্রদা হেসে বলল, 'কোনও কারণে নয়, আসলে ফোটোগুলো এত সুন্দর তোলা, তাই জিগ্যেস করলাম।'
ভদ্রলোক বললেন, 'ও আমার ফোটোগ্রাফার বন্ধু বিভিন্ন জঙ্গলে ঘুরে বেড়াত। সেসব জায়গা থেকেই তোলা। কোন ফোটো কোথাকার আমাকে সে বলেছিল বটে, কিন্তু এতদিন পর সেকথা আর আমার মনে নেই।'
ঘরের বাইরে পা রাখতেই পটাই দেখতে পেল সেই বামন লোকটা আদিত্যবাবুর লাঠিটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। লাঠিটা সে আদিত্যবাবুর হাতে তুলে দিয়ে হিন্দিতে বলল, 'মাস্টার, তুমি কখন ফিরবে?'
আদিত্যবাবুও হিন্দিতে বললেন, 'একঘণ্টা পর ফিরব।'
লোকটা ঘাড় নাড়ল তাঁর কথা শুনে। পটাইরা এরপর সদর দরজা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল। বামন লোকটা ভিতর থেকে দরজাটা বন্ধ করে দিল। বাইরে গেটের দিকে হাঁটতে হাঁটতে আদিত্যবাবু শুভ্রদাকে বললেন, 'যে লোকটা দেখলেন, সে এখানকারই লোক। পাহাড়ের ওপর একটা গ্রামে ওর বাড়ি। ও আমার আশ্রয়েই থাকে।'
শুভ্রদা জিগ্যেস করল, 'কীভাবে ওকে জোগাড় করলেন?'
আদিত্যবাবু বললেন, 'আকৃতির জন্য ওর গ্রামের লোকরা ওকে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করত। হতাশায় একদিন ও অলকনন্দা সেতু থেকে ঝাঁপ দিতে যাচ্ছিল। আমি ওকে বাঁচাই। তারপর থেকে ও আমার কাছেই থেকে গিয়েছে। বাড়ি ফিরতে চায়নি। ও-ই এখন আমার বাড়ির সব কাজকর্ম করে।'
পটাইরা এরপর আদিত্যবাবুর বাড়ির সীমানার বাইরে বেরিয়ে নামতে শুরু করল রাস্তার দিকে। সূর্য তখন পশ্চিমে অনেকটাই ঢলে পড়েছে।
আদিত্যবাবুর বাড়ি থেকে বেরোবার পর কথাবার্তা বলতে বলতে পটাইরা ফিরে এল অলকনন্দা ব্রিজের কাছে। পশ্চিমে পাহাড়ের মাথার ওপর আকাশটা এখন লালবর্ণ ধারণ করেছে। অলকনন্দা ব্রিজের টাওয়ারে একঝাঁক টিয়াপাখি বসে আছে। কী সুন্দর দেখতে লাগছে তাদের! আদিত্যবাবু ব্রিজের কাছে এসে সেই শুঁড়িপথটা ধরলেন। তাঁকে অনুসরণ করল পটাইরা। শুভ্রদা আদিত্যবাবুকে জিগ্যেস করল, 'সাধুবাবা কি এখানে একাই থাকেন?'
তিনি বললেন, 'হ্যাঁ।'
পটাইরা ঢালু শুঁড়িপথ বেয়ে নদীখাদের দিকে কিছুটা এগোবার পর ঢালের গায়ে একটা গুহামুখ দেখতে পেল। সেই গুহামুখের ঠিক সামনে ত্রিশূল হাতে দাঁড়িয়ে আছে গেরুয়াবসন গায়ে জটাজুটধারী এক সন্ন্যাসী। পটাইদের দিকে পিছন ফিরে দাঁড়িয়ে আছেন। দেখে মনে হচ্ছে, তিনি দীর্ঘকায় পুরুষ। তাঁকে দেখতে পেয়ে আদিত্যবাবু বললেন, 'ওই তো অন্ধবাবা দাঁড়িয়ে আছেন। ওঁকে সবাই এখানে এই নামেই ডাকে। খুব ভদ্র মানুষ উনি, সবার সঙ্গে খুব ভালো ব্যবহার করেন।'
শুভ্রদা জিগ্যেস করল, 'উনি এখানে কতদিন আছেন?'
আদিত্যবাবু বললেন, 'তা ঠিক বলতে পারব না। তবে একদিন তিনি বলছিলেন যে, তিনি যখন আসেন তখন রুদ্রপ্রয়াগ শহর হয়ে ওঠেনি। তার মানে কয়েক যুগ হবে।'
পটাইরা এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াল গুহার সামনে সাধুবাবার কাছে। তাদের পায়ের শব্দ পেয়েই মনে হয় ঘুরে দাঁড়ালেন তিনি। তাঁর চোখের দিকে তাকাতেই তিনি যে দৃষ্টিহীন তা বুঝতে অসুবিধে হল না পটাইদের। আদিত্যবাবু সাধুবাবার উদ্দেশে কী যেন বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু তার আগেই সাধুবাবা হিন্দিতে চিৎকার করে উঠলেন, 'আবার ফিরে এলে তোমরা? চলে যাও বলছি! এখনই এ জায়গা ছেড়ে চলে যাও।'
আদিত্যবাবু একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন তাঁর চিৎকার শুনে। এর পরেই সাধুবাবা একটা ভয়ংকর কাণ্ড করলেন, 'তোরা তা হলে যাবি না?'
এই বলে চিৎকার করে হাতের ত্রিশূলটা ছুড়ে মারলেন সামনের দিকে। আর-একটু হলেই সেটা গিয়ে লাগত আদিত্যবাবুর গায়ে। তিনি দ্রুত সরে গিয়ে বাঁচিয়ে নিলেন নিজেকে। ত্রিশূলটা একটু দূরে একটা পাথরের গায়ে লেগে ছিটকে পড়ল মাটিতে। আদিত্যবাবু এবার সাধুবাবাকে বললেন, 'আমি আদিত্য, আদিত্য সিংহ। আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছি।'
সাধুবাবা আদিত্যবাবুর গলার শব্দ শুনে যেন কিছুটা শান্ত হয়ে বললেন, 'ও, কিন্তু আরও পায়ের শব্দ শুনলাম।'
আদিত্যবাবু বললেন, 'হ্যাঁ, আমার সঙ্গে একজন বাঙালি ভদ্রলোক আর-একটি বাচ্চা ছেলে আছেন। ওঁরা টুরিস্ট, কলকাতা থেকে এসেছেন। আপনার রুদ্রনাথ দর্শন করাতে এখানে এনেছি ওঁদের।'
আদিত্যবাবুর কথা শুনে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকার পর সাধুবাবা তার বুকের কাছে হাতটা জোড় করে বললেন, 'আমাকে ক্ষমা করবেন। আমি দৃষ্টিহীন তো, অন্য লোক ভেবে আমি আপনাদের ভুল করেছিলাম। আপনার কোনও চোট লাগেনি তো?' কথাগুলো পটাই আর শুভ্রদার উদ্দেশেই বললেন তিনি। তাঁদের হয়ে আদিত্যবাবুই বললেন, 'না, না, আমাদের কোনও ক্ষতি হয়নি।'
সাধুবাবা যেন একটু আশ্বস্ত হলেন, 'আমার ত্রিশূলটা যদি খুঁজে দেন।'
শুভ্রদার ইঙ্গিতে পটাই ত্রিশুলটা তাঁর হাতে দিল। তার হাতের স্পর্শে তিনি বুঝতে পারলেন পটাইয়ের বয়স বেশি নয়। ত্রিশূলটা হাতে নিয়ে সস্নেহে পটাইয়ের মাথায় হাত দিয়ে বললেন, 'তোমার নাম কী?'
পটাই নাম বলল।
তিনি জিগ্যেস করলেন, 'লেখাপড়া করো?'
পটাই বলল, 'হ্যাঁ।'
তিনি বললেন, 'বাঃ ভালো।'
এরপর তিনি শুভ্রদার নাম জিগ্যেস করলেন। শুভ্রদার নাম জানার পর তিনি গুহার দিকে পা বাড়িয়ে বললেন, 'চলুন, ভিতরে চলুন। রুদ্রনাথ দর্শন করবেন। ক্রোধের বশে ভুল করে কী কাণ্ড করে ফেলেছিলাম! আমার রুদ্রনাথই আমাকে রক্ষা করলেন।'
সাধুবাবার পিছন-পিছন পটাইরা ঢুকল গুহার ভিতর। গুহামুখ প্রশস্ত হলেও ভিতরটা বেশ সংকীর্ণ। ছাদও নিচু। শুভ্রদা সাধুবাবার মতো লম্বা। ভিতরে ঢুকেই তাঁদের মাথা নীচু করতে হল। নানা আকৃতির কিছু পাথর দেওয়ালের গা আর মেঝে থেকে প্রকৃতির খেয়ালে বেরিয়ে আছে। অনেকটা ঠিক কোটেশ্বরের মতোই। তার মধ্যে যে পাথরগুলো শিবলিঙ্গের আকৃতির, তার চারপাশে ফুল-বেলপাতা ছড়িয়ে আছে। ধূপের ছাইও পড়ে আছে। বোঝা যায় ওই পাথরগুলো দেবতাজ্ঞানে পুজো পায়। ফুট তিরিশেক এগিয়ে বাঁক নিয়ে একটা ছোট্ট ঘরের মতো জায়গায় এসে দাঁড়াল পটাইরা। ছাদটা উঁচু সেখানে। দেওয়ালের একটা ফাটল বেয়ে বাইরে থেকে একটা ক্ষীণ আলো ঢুকছে। ধূপের মিষ্টি গন্ধ ছড়িয়ে আছে জায়গাটায়। সেখানে পটাইরা গিয়ে দাঁড়াবার পর সাধুবাবা পাথুরে দেওয়ালের একপাশে আঙুল নির্দেশ করে বললেন, 'আমার রুদ্রনাথ ওখানে বসে আছেন।'
পটাইরা তাকাল সেদিকে। মাটি থেকে হাতখানেক ওপরে দেওয়ালের গায়ে একটা খাঁজের মতো জায়গা। তারা দেখল, সেখানে বসে আছেন কষ্টিপাথরের মহিষরূপী রুদ্রনাথ। মূর্তিটা বেশি বড় নয়, ফুট দেড়েক হবে ধৈর্ঘ্য। তবে তার গড়ন একদম নিখুঁত। মূর্তিটা যেখানে রাখা, তার কাছেই একটা প্রদীপ জ্বলছে। সেই আলোয় জ্বলছে রুদ্রনাথের চোখ দুটো। সত্যিই যেন তাঁর রুদ্রতেজ বেরিয়ে আসছে সেই দুটো চোখ থেকে। অপূর্ব মূর্তি। তাঁর পায়ের নীচে জমা হয়ে আছে ফুল-বেলপাতার রাশি। ভালো করে দেখার পর হাত জোড় করে পটাই প্রণাম জানাল। সাধুবাবা বললেন, 'মহাদেব মহিষরূপ ধারণ করেছিলেন কেন জানেন?'
শুভ্রদা বলল, 'না।'
তিনি বললেন, 'এ অঞ্চলকে বলা হয় দেবভূমি। এক সময় মহাদেব ও অন্য দেবতারা এই নদীতটে বাস করতেন। মহাভারতের যুদ্ধে ভ্রাতৃহত্যার পাপ বর্ষিত হয়েছিল পঞ্চপাণ্ডবের ওপরে। তাঁরা দৈববাণী শুনতে পান যে, মহাদেব বা রুদ্রনাথের স্পর্শ পেলে তাঁদের পাপমুক্তি হবে। মহাপ্রস্থানের পথে যখন পাণ্ডবরা এই পথ দিয়ে যাত্রা শুরু করেন, তখন রুদ্রনাথ এখানেই অবস্থান করেছিলেন।'
কৃতকর্মের ফল মানুষকে ভোগ করতেই হবে। তাই তাঁদের সেই পাপমুক্তি ঘটাতে অনিচ্ছুক মহাদেব মহিষরূপ ধারণ করেন, যাতে পঞ্চপাণ্ডব তাঁকে চিনতে না পারেন। শেষপর্যন্ত অবশ্য তাঁকে চিনতে পেরে তাঁর পিছু ধাওয়া করেন দ্বিতীয় পাণ্ডব। তখন মহিষরূপ ধারণ করে পাতালে প্রবেশ করেন তিনি।' গল্পটা বলে চুপ করলেন সাধুবাবা।
শুভ্রদা তাঁর কথা শোনার পর বলল, 'আপনার রুদ্রনাথ কি এই গুহার মধ্যেই ছিলেন?'
সাধুবাবা বললেন, 'না আজ থেকে প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে ওঁকে আমি কুড়িয়ে পেয়েছিলাম অলকনন্দার সঙ্গম তটে। আমিই ওঁকে এই গুহায় এনে রাখি। তারপর আমরা দুজনেই এই গুহায় একসঙ্গেই থাকি।' এ কথাগুলো বলার পর তিনি একটু দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, 'তবে উনি আর কত দিন আমার সঙ্গে থাকবেন তা আমি জানি না।'
তাঁর শেষের কথাগুলো শুনে আদিত্যবাবু জিগ্যেস করলেন, 'কেন? আপনি একথা বলছেন কেন?'
প্রশ্ন শুনে কয়েক মুহূর্ত চুপ থাকার পর তিনি বললেন, 'আপনারা বসুন। আমি সব কথা বলছি।'
পটাইরা মাটিতে বসল। সাধুবাবাও বসলেন, তারপর বলতে শুরু করলেন, 'আপনি তো জানেনই আমি এখানে রুদ্রনাথের সঙ্গে একাই থাকি। আমার কোনও শিষ্য নেই। কারণ, শিষ্যকে দেওয়ার মতো দৈব্যজ্ঞান আমার নেই। আমি রুদ্রনাথের একজন নগণ্য উপাসক মাত্র। তবুও আমার রুদ্রনাথ ও গুহা দর্শন করার জন্যই আপনাদের মতো কয়েকজন মানুষ মাঝেমধ্যে এখানে আসেন। আমি সকলের সঙ্গেই কথা বলি, সাধ্যমতো প্রত্যেককে সৎ পরামর্শ দেওয়ার চেষ্টা করি। আমি আজ পর্যন্ত কারও কাছে হাত না পাতলেও তাঁরা মাঝেমধ্যে এটা-সেটা দিয়ে যান রুদ্রনাথ বা আমার উদ্দেশে। তবে আমি কোনওদিন টাকাকড়ি স্পর্শ করিনি। তাঁরা দিয়ে যান বলতে, ফল-মূল, খাদ্যদ্রব্য, এ-জাতীয় জিনিস। রুদ্রনাথ দর্শনে আসা প্রত্যেক মানুষকেই আমি সহজ-সরল মনে আমার এখানে প্রবেশ করতে দিই। তাদের সঙ্গে কথাবার্তাও বলি। মাস তিনেক আগে আমার এখানে পবন প্রসাদ বলে একজন লোক রুদ্রনাথ দর্শন করতে আসে। আপনাদের মতো তাকেও আমি রুদ্রনাথ দর্শন করাই। এরপর সে ঘন ঘন আমার কাছে আসতে শুরু করে। সাদা মন নিয়ে আমি তার সঙ্গে কথাবার্তা বলতাম। একদিন সে আমাকে বলল যে, আমি মিছিমিছি এখানে কৃচ্ছ্রসাধন করছি কেন? আমি চাইলেই নাকি একটা বিরাট মঠের মালিক হতে পারি! অনেক শিষ্য পরিবৃত হয়ে বাকি জীবনটা আরামে কাটাতে পারি! যদিও এসব ব্যাপারে আমার কোনও আগ্রহ নেই, তবুও তার কথা শুনে একদিন বললাম, তা কী করে সম্ভব? মঠ তৈরি বা বিদেশে যাওয়ার জন্য তো বহু অর্থের প্রয়োজন, তা তো আমার নেই? আমার কথা শুনে সে বলল, অর্থ না থাকলেও আমার কাছে রুদ্রনাথ আছে। এই মূর্তিটার নাকি অনেক দাম। আমি হেসে বললাম যে, রুদ্রনাথই যদি আমার কাছে না থাকেন, তা হলে আমার জীবনই অর্থহীন। কিন্তু তারপর থেকে যখনই সে আসে, তখনই নানাভাবে ওই একই কথা বারবার তুলতে থাকে। আজ আবার আপনাদের আসার ঘণ্টা কয়েক আগে সে এসেছিল। তাকে বললাম, সে কেন আবার আমার এখানে এসেছে? সে বলল যে, সে তার ভুল বুঝতে পেরেছে, তাই ক্ষমা চাইতে এসেছেন। আমি সরল মনে তার সব কথা অবলীলায় বিশ্বাস করে নিলাম। আমি মনে-মনে তার হয়ে রুদ্রনাথের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে তার সঙ্গে কথা বলতে শুরু করলাম।'
সাধুবাবা একটু থামলেন। তারপর শুরু করলেন, 'জানেন তো যারা দৃষ্টিহীন, প্রকৃতির নিয়মে তাদের অন্য ইন্দ্রিয়গুলো সাধারণের চেয়ে বেশি সজাগ। আমি ঠিক এখানেই বসে তার সঙ্গে কথা বলছিলাম। সে বসে ছিল, আপনারা যেখানে বসে আছেন, সেখানে। গল্প করতে-করতে মনে হল, একটা অস্পষ্ট শব্দ যেন এগিয়ে যাচ্ছে রুদ্রনাথের দিকে। আপনারা শুনতেই পেতেন না, এত মৃদু সেই শব্দ। কিন্তু আমি শুনলাম। কয়েক মুহূর্তে সব স্পষ্ট হয়ে গেল। এখানে আরও একজন আছে, আর সে নিশ্চয়ই পবনের সঙ্গে এসেছে। বুঝতে পারলাম, তাদের উদ্দেশ্য মহৎ নয়! নইলে দ্বিতীয় লোকটা সাড়া দেয়নি কেন? ভয় পেলাম, ত্রিশূলটা চারপাশে চালাতে লাগলাম। ভয় পেল ওরা। বেরিয়ে গেল গুহা থেকে। আমিও পিছু ধাওয়া করে গুহার বাইরে গিয়ে দাঁড়ালাম। পবন আর তার সঙ্গী গুহার বাইরে বেরিয়ে আমার থেকে নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলে চলে গেল। আপনারা কিছুক্ষণ পর যখন এলেন, পায়ের শব্দ শুনে তারা আবার ফিরে এসেছে ভেবেছিলাম, তাই এ কাণ্ড করে বসেছিলাম। ব্যাপারটা বুঝতে পারছেন?' কথা শেষ করলেন।
সকলে চুপ করে থাকলেন। তারপর আদিত্যবাবু বললেন, 'আপনি একা এখানে থাকেন। কখন কী বিপদ ঘটে? ব্যাপারটা ভালো লাগছে না। তেমন মনে হলে পুলিশকে সব কথা জানিয়ে রাখতে পারেন।'
সাধুবাবা বললেন, 'স্বয়ং রুদ্রনাথই সব জানেন। তাঁর চেয়ে বড় রক্ষা কর্তা কেউ নেই। পুলিশের কাছে যাব না, রক্ষা করার হলে তিনিই করবেন।'
শুভ্রদা হঠাৎ তাঁকে জিগ্যেস করল, 'পবন প্রসাদ সম্পর্কে আর কিছু জানেন?'
'আমি তার সম্বন্ধে কিছু জানি না। নিজের সম্বন্ধে তেমন কিছু কোনও দিন বলেনি। আমিও জানার দরকারও মনে করিনি। আমি তার সঙ্গে ধর্মীয় ব্যাপার বা শহরের নানা ঘটনা নিয়ে আলোচনা করতাম। আজ যেমন বাঘ নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল।'
শুভ্রদা জিগ্যেস করল, 'কী আলোচনা?'
'অলকনন্দার পুলে পুরন্দোয়া নামে একটা পাগলাটে লোক কিছুদিন ধরে রাত কাটায়। সে নাকি পুলে একটা বাঘ আর মানুষকে ঘুরে বেড়াতে দেখেছে রাতে। তার ধারণা, তারা করবেটসাহেব আর সেই নরখাদক চিতাবাঘের প্রেতাত্মা। এ কথা সে অনেক জায়গায় বলে বেড়িয়েছে। সেই নিয়েই আজ কথা হচ্ছিল।'
সাধুবাবার কথা শোনার পর আদিত্যবাবু বললেন, 'লোকটা পাগল। হয়তো কোনও স্বপ্ন বা অন্য কিছু দেখেছে।'
শুভ্রদা বলল, 'আমারও তাই মনে হয়।'
আদিত্যবাবু ও শুভ্রদার মন্তব্য শোনার পর চুপ করে রইলেন সাধুবাবা। তারপর বললেন, 'তবে একটা বাঘ সত্যিই এ-তল্লাটে রাতে কিছুদিন ঘুরে বেড়াচ্ছে। তার গায়ের গন্ধ পেয়েছি। কাছ থেকে কাশির শব্দও পেয়েছি একদিন।'
'কোথায়?' জানতে চাইল শুভ্রদা।
সাধুবাবা বললেন, 'গুহার বাইরে যে চাতালটা আছে, ওখানে রাতে মাঝে-মাঝে বসি। ওখানেই শুনেছি, মনে হল, কাশতে-কাশতে খাদের দিকে নেমে গেল প্রাণীটি।'
আদিত্যবাবু বললেন, 'আপনার ধারণা যদি সত্যি হয়, তা হলে রাতে বাইরে না যাওয়াই ভালো। সাবধানে থাকবেন।'
সাধুবাবা বললেন, 'রুদ্রনাথ যা কপালে লিখেছেন তাই হবে।'
আদিত্যবাবু হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে ওঠার জন্য ইশারা করলেন শুভ্রদাকে। সাধুবাবাকে বললেন, 'আমরা যাই? অন্ধকার নেমে যাবে। ওঁদের ফিরতে হবে।'
সাধুবাবা বললেন, 'হ্যাঁ, যান।' হাত জোড় করে প্রণাম জানিয়ে বললেন, 'রুদ্রনাথ মঙ্গল করুন।'
ঝোপের ধারে কী একটা পড়ে থাকতে দেখে দাঁড়িয়ে পড়ল শুভ্রদা। জিনিসটা হাতে নিল। একটা আধপোড়া সিগারেটের টুকরো। ফিল্টারের কাগজটা ব্রাউন রঙের। ভালো করে দেখে বলল, 'কিং সাইজ। মাইল্ড সিগারেট।' তারপর টুকরোটা ফেলে হাঁটতে শুরু করল।
আদিত্যবাবু জিগ্যেস করলেন, 'কাল তো নিশ্চয়ই আপনারা এখানে আছেন? বেড়াবার প্ল্যান কী?'
শুভ্রদা বলল, 'হ্যাঁ, আছি। তবে কোথায় বেড়াব বুঝতে পারছি না। প্রায় সবই তো দেখা হবে গেল।'
আদিত্যবাবু বললেন, 'কাছেই একটা ট্রাইবাল ভিলেজ আছে। আপনারা যদি বলেন তবে আমি কাল ভোরে ধর্মশালায় গিয়ে সেখান থেকে আপনাদের ওই গ্রামে নিয়ে যেতে পারি।'
শুভ্রদা বলল, 'বাঃ, বেশ ভালোই হয়!'
আদিত্যবাবু বললেন, 'ঠিক আছে, কাল সাতটার মধ্যে পৌঁছে যাব।'
পটাইরা ফিরে এল রোপব্রিজের কাছে। আদিত্যবাবু পরদিন আসবেন বলে নিজের বাড়ির রাস্তায় হাঁটতে শুরু করলেন, আর পটাইরা ব্রিজের ওপর উঠে পড়ল। হাঁটতে-হাঁটতে শুভ্রদা বলল, 'সাধুবাবার কথা শুনে মনে হচ্ছে, তাঁর বিপদ ঘনিয়ে আসছে।'
পটাই বলল, 'ওই মূর্তিটার জন্য?'
শুভ্রদা বলল, 'হ্যাঁ, ওটা যে খুব ভ্যালুয়েবল, সন্দেহ নেই। আমার ধারণা, ওর চোখ দুটো চুনির। এ জাতীয় মূর্তি বিদেশে অনেক দামে বিক্রি হয়। যারা মূর্তিটা হাতাতে চাইছে, তারা যদি শয়তান হয়, তা হলে...!'
কথাটা শেষ করল না শুভ্রদা। কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা বড় রাস্তার ওপরে উঠে হাঁটতে শুরু করল ধর্মশালায় ফেরার জন্য। পটাই একবার তাকাল পাশের ঘরের দরজার দিকে। সেটা বন্ধ। ঘরে ঢুকে আলো জ্বালাবার পর ফ্ল্যাট হয়ে শুয়ে পড়ল পটাই।
শুভ্রদা বলল, 'ঘুমিয়ে পড়িস না, আটটা নাগাদ খেতে যাব। ফিরে এসে শুয়ে পড়ব। কাল ভোরে আবার আদিত্যবাবু আসবেন।'
ভোরে যখন পটাইয়ের ঘুম ভাঙল তখন ছ'টা বাজে। তার আগেই ঘুম ভেঙে উঠে পড়েছে শুভ্রদা। পটাই ঘুম ভেঙে বিছানায় বসতেই শুভ্রদা জিগ্যেস করল, 'কী ঘুম কেমন হল?'
আড়মোড়া ভাঙতে-ভাঙতে পটাই বলল, 'ফাইন। এক ঘুমে রাত কাবার হয়ে গেল।'
গায়ে একটা চাদর জড়িয়ে পটাই দাঁড়াল বারান্দায়। নীচে অলকনন্দার সঙ্গম, পশ্চিমের পাহাড়ে এসে পড়েছে নতুন সূর্যের আলো। পাহাড়ের মাথায় কুয়াশা কেটে যাচ্ছে। ডান দিকের কংক্রিটের ব্রিজের ওপর গাড়ি চলাচল শুরু হয়নি। বাঁ-দিকের অনেক দূরে দেখা যাচ্ছে সেই রোপব্রিজ। পটাই হঠাৎ খেয়াল করল, পাশের ঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে সেই ধূসর সাফারি। এখন তার গায়ে নীল রঙের টি-শার্ট। রেলিং-এর ওপর ঝুঁকে তাকিয়ে আছে অলকনন্দার রোপব্রিজের দিকে। পাশের বারান্দায় পটাই এসে দাঁড়িয়েছে, তা সম্ভবত খেয়াল করেনি লোকটি। গতকাল রাতে বাইরে থেকে খেয়ে ফিরতে ন'টা বেজে গিয়েছিল পটাইদের। তারা যখন ধর্মশালায় ফিরল তখন লোডশেডিং। সে সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামছিল। ধাক্কা লাগার পর লোকটি 'সরি' বলে তাদের পাশ কাটিয়ে চলে গিয়েছিল।
দোতলায় ওঠার পর পটাইরা দেখতে পেল, ধর্মশালা থেকে বেরিয়ে গেল লোকটি। পটাই দেখল লোকটিকে। সে গভীর মনোযোগে তাকিয়ে আছে রোপব্রিজের দিকে।
শুভ্রদা পটাইকে বলল, 'তুই ব্রাশ করে নে। তারপর আমি বাথরুমে যাব।'
শুভ্রদার কথাটা মনে হয় কানে গেল পাশের বারান্দার লোকটির। সে চোখ ফিরিয়ে তাকাল পটাইদের বারান্দার দিকে। ওদের সঙ্গে চোখাচোখি হয়ে গেল তার। লোকটি এরপর আর সেখানে দাঁড়াল না। বারান্দা থেকে ঘরের ভিতর ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল।
পটাই ঘরে ঢুকে শুভ্রদাকে বলল, 'পাশের ঘরের লোকটি বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। আমাকে দেখে আবার ঘরের ভিতর চলে গেল।'
শুভ্রদা বলল, 'লোকটির গতিবিধি সন্দেহজনক। আজ কখন ঘরে ঢুকল? ভোর পাঁচটার সময়। মনে হয়, কাল সারারাত বাইরেই কাটিয়েছে। কিছু আগে ঘুম ভেঙে গিয়েছিল আমার। বাইরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। লোকটি আমার সামনে দিয়ে ঘরে ঢুকল। ওর জামা-জুতো দেখে বুঝলাম, অনেকটা সময় ও বাইরে কাটিয়ে এল।' শুভ্রদা বলল, 'লোকটির সম্বন্ধে ধর্মশালার অফিস থেকে খবর নিতে হবে।'
পটাই বলল, 'ও।'
শুভ্রদা বলল, 'নে তাড়াতাড়ি। আদিত্যবাবুর সাতটায় আসার কথা। তার আগে আমাদের নিচ থেকে ঘুরে আসতে হবে। কাল অনেক হাঁটাহাঁটি হয়েছে। একটা গাড়ির ব্যবস্থা করা যায় কি না খোঁজ নিতে হবে।'
সাড়ে ছ'টা নাগাদ পটাইরা ধর্মশালার অফিসঘরের সামনে এসে দেখল, প্রথম দিনের মাঝবয়সি লোকটা স্নান সেরে দেওয়ালে টাঙানো রুদ্রনাথের ফোটোয় ধূপ দিচ্ছে। পটাইদের ইশারায় ঘরে বসতে বলল। মিনিটখানেকের মধ্যেই লোকটা ধূপ দেওয়া শেষ করে শুভ্রদাকে জিগ্যেস করল, 'ঘর ছাড়তে এসেছেন?'
শুভ্রদা বলল, 'না, আজ আছি। হয়তো কালকেও থাকব। এসেছি অন্য কারণে। কাছেপিঠে ঘুরে বেড়ানোর জন্য একটা গাড়ি পাওয়া যাবে?'
লোকটা কয়েক মুহূর্ত চিন্তা করে বলল, 'জিপসি হলে চলবে?'
শুভ্রদা বলল, 'হ্যাঁ।'
লোকটা টেবিলের ড্রয়ার খুলে টেলিফোন বের করে ডায়াল করল। কয়েক মুহূর্ত পর যে টেলিফোন ধরল, তাকে গাড়ির প্রয়োজনের কথাটা বলল। লোকটা মনে হয় রাজি হল। ধর্মশালার লোকটা টেলিফোন ধরে শুভ্রদাকে জিগ্যেস করল, 'কখন আসতে বলব?'
শুভ্রদা বলল, 'আমাদের সাতটায় বেরোনোর কথা।'
লোকটা গাড়িওয়ালাকে জানিয়ে দিল শুভ্রদার কথা। তারপর রিসিভার নামিয়ে রাখতে-রাখতে বলল, 'ও আসছে। টাকার ব্যাপারে কথা বলে নেবেন।'
ধন্যবাদ জানিয়ে শুভ্রদা বলল, 'আপনার কাছে আর একটা জিনিস জানার আছে।'
লোকটা বলল, 'কী?'
শুভ্রদা বলল, 'আমাদের পাশের ঘরে যিনি আছেন, তিনি কি কানপুরে ডাক্তারি করেন?'
শুভ্রদার প্রশ্ন শুনে লোকটা অবাক হয়ে প্রশ্ন করল, 'কেন বলুন তো?'
শুভ্রদা বলল, 'বছর পাঁচেক আগে কানপুরে বেড়াতে গিয়ে ওঁর মতো দেখতে এক ডাক্তার ভদ্রলোকের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল। এতদিন পর বুঝতে পারছি না, উনি তিনি কি না?'
শুভ্রদা যে লোকটার পরিচয় জানার জন্য এসব বানিয়ে বলল, তা বুঝতে অসুবিধে হল না পটাইয়ের।
ভদ্রলোক হেসে বলল, 'না, উনি ডাক্তার নন, রুদ্রাক্ষের ব্যবসায়ী। দিল্লিতে থাকেন। নাম, সুরজমল বাজোরিয়া। আমাদের ধর্মশালায় মাঝে-মাঝে আসেন। এখানে রুদ্রাক্ষের একটা পাইকারি মার্কেট আছে। সেখান থেকে রুদ্রাক্ষ কিনে নিয়ে যান।'
তার কথা শেষ হতে শুভ্রদা কাঁচুমাচু মুখে বলল, 'ও, আমারই ভুল।' তারপর উঠে দাঁড়াল।
ধর্মশালার লোকটা এরপর টেলিফোনটা ড্রয়ারে রাখতে যাচ্ছিল, কিন্তু সেটা আবার বেজে উঠল। লোকটা কথা বলার জন্য রিসিভারটা তুলে নিল, আর পটাইরা পা বাড়াল ঘরের বাইরে যাওয়ার জন্য। পটাইরা যখন দরজার বাইরে পা রেখেছে, তখনই লোকটা বলল, 'এখানে আসুন। আপনাদের ফোন।'
তার কথা শুনে ফিরে দাঁড়াল পটাই আর শুভ্রদা। এখানে কে টেলিফোন করবে তাদের? শুভ্রদা লোকটার দিকে তাকিয়ে বলল, 'আমাদের টেলিফোন?'
লোকটা বলল, 'হ্যাঁ, আপনাদেরই।'
ঘরে ঢুকে লোকটার হাত থেকে রিসিভার নিয়ে শুভ্রদা বলল, 'হ্যালো?'
ওপাশ থেকে আদিত্যবাবুর কণ্ঠ ভেসে এল, 'হ্যালো, মিস্টার মজুমদার বলছেন?'
শুভ্রদা বলল, 'হ্যাঁ বলছি।'
তিনি বললেন, 'আমি গুলাবরাইয়ের একটা পাবলিক বুথ থেকে বলছি। এখান থেকেই ধর্মশালার নম্বরটা পেয়েছি।
আমার তো আপনাদের ওখানে যাওয়ার কথা, কিন্তু এদিকে একটা কাণ্ড ঘটে গিয়েছে।'
শুভ্রদা বলল, 'কী?'
ওপাশ থেকে জবাব এল, 'সাধুবাবা মারা গিয়েছেন।'
শুভ্রদা চমকে উঠে বলল, 'কীভাবে?'
তিনি বললেন, 'অপঘাতে। তবে ঠিক কীভাবে বোঝা যাচ্ছে না। তাঁর গলাটা নাকি ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছে। কেউ বলছে ছুরির আঘাতে...কেউ বলছে...।' এই বলে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন।
শুভ্রদা বলল, 'হ্যাঁ বলুন।'
তিনি বললেন, 'ওটা বাঘের কামড়।'
শুভ্রদা জিগ্যেস করল, 'দেখেছেন বডিটা? আপনি কী করে খবর পেলেন?'
আদিত্যবাবু বললেন, 'আমি স্পটে যাইনি। ব্রিজের কাছে একজনের মুখে ঘটনাটা প্রথম জানতে পারি। সে ঘটনাটা শোনে অন্য একজনের মুখ থেকে। ভোর ছ'টা নাগাদ দুজন স্থানীয় বৃদ্ধ মানুষ সাধুদর্শনের আশায় গিয়েছিলেন ওখানে। একটা বিশ্বাস প্রচলিত আছে, ভোরবেলা সাধুদর্শন করলে দিন ভালো কাটে। তাই তাঁরা ওখানে যান ও সেই ভয়ংকর দৃশ্যটা দেখেন। এর পর খবরটা চাউর হয়।'
শুভ্রদা শুনে বলল, 'ও!' তারপর কয়েক মুহূর্ত কী চিন্তা করার পর বলল, 'আদিত্যবাবু শুনুন, আমি একবার ওখানে যেতে চাই। আপনি ওখানে অপেক্ষা করুন। কিছুক্ষণের মধ্যেই ওখানে পৌঁছোচ্ছি।'
ওদিক থেকে তিনি বললেন, 'ঠিক আছে। আমি গুলাবরাইয়ের আমগাছটার সামনে দাঁড়িয়ে আছি।'
ফোনটা নামিয়ে রাখল শুভ্রদা। তারপর দ্রুতপায়ে ঘরের বাইরে বেরিয়ে এসে পটাইকে বলল, 'কুইক! আমাদের গুলাবরাইয়ে যেতে হবে। আদিত্যবাবু আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন।'
টেলিফোনটা যে আদিত্যবাবুর তা শুভ্রদার কথা শুনে বুঝতে পেরেছিল পটাই। ওপাশের কথাগুলো শুনতে পায়নি। তাই জিগ্যেস করল, 'কী বললেন তিনি?'
সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে-উঠতে চাপাস্বরে শুভ্রদা বলল, 'তিনি জানালেন অপঘাতে সাধুবাবা মারা গিয়েছেন।' ঘরে ঢুকে শুভ্রদা পটাইকে বলল, 'তুই আমাকে বলেছিলি না আমি গোয়েন্দাগিরি করব নাকি? এখন মনে হয় সেটা আমাকে করতে হবে। চুপচাপ বসে থাকতে বিবেক ঠিক সায় দিচ্ছে না।'
পটাইদের তৈরি হয়ে নীচে নামতে মিনিটদশেক সময় লাগল। ধর্মশালার গেটে একটা জিপসি গাড়ি এল। চালকের আসনে বছর পঁয়ত্রিশের একটি লোক। শুভ্রদা এগিয়ে গেল ড্রাইভারের সঙ্গে কথা বলার জন্য। এর কয়েক মিনিটের মধ্যেই পটাইদের নিয়ে গাড়ি ছুটল গুলাবরাইয়ের দিকে। পটাইরা দেখতে পেল আমগাছটার তলায় আদিত্যবাবু দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর কাছে গাড়ি দাঁড়াবার পর শুভ্রদা বলল, 'নিন, উঠে পড়ুন।'
ভদ্রলোক গাড়িতে উঠে বললেন, 'গাড়ির মুখ ঘুরিয়ে নিতে হবে। আমরা যে গ্রামে যাব তার জন্য আর্মি ব্যারাকের ডান পাশের রাস্তা ধরতে হবে।'
শুভ্রদা বলল, 'না, আমরা এখন যাব সাধুবাবার ওখানে।'
আদিত্যবাবু বললেন, 'সে কী! ওখানে যেতে চাইছেন কেন? এখন ওখানে নিশ্চয়ই পুলিশ এসে গিয়েছে! আসলে যেহেতু আমি আপনাদের ওখানে নিয়ে গিয়েছিলাম, তাই খবরটা শোনার পর উত্তেজনার বশে আপনাদের জানিয়েছি। এসব ব্যাপারে আপনাদের জড়াবার কোনও ইচ্ছে নেই।'
শুভ্রদা বলল, 'আপনার বিব্রত হওয়ার কোনও কারণ নেই। আমি তো নিজের ইচ্ছেতেই ওখানে যাচ্ছি। কাল এখানে কয়েকটা ব্যাপার দেখেশুনে আর আজ সকালে আপনার মুখ থেকে সাধুবাবার মৃত্যুসংবাদ পেয়ে আমার মনে একটা প্রশ্ন উদয় হয়েছে। বলতে পারেন, তার উত্তর খোঁজার জন্যই আমি ওখানে যাচ্ছি।'
শুভ্রদার কথা শুনে আদিত্যবাবু কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বললেন, 'ঠিক আছে, চলুন তা হলে!'
গাড়ি এগিয়ে চলল সামনের দিকে। গুলাবরাই চটি পিছনে ফেলে আরও এগিয়ে শুভ্রদার নির্দেশে গাড়ি থেকে সকলে নামার পর দেখতে পেলাম, ঢালের মুখে একটা পুলিশের জিপ আর একটা সাদা রঙের অ্যাম্বাসাডার দাঁড়িয়ে আছে। তার গায়ে স্টিকার মারা আছে 'পুলিশ'। গাড়িটা দেখে আদিত্যবাবু বললেন, 'ওটা এসপি সাহেবের গাড়ি। আপনাদের ধর্মশালায় যাওয়ার মুখেই ওঁর অফিস। দেখেছেন নিশ্চয়ই?'
শুভ্রদা বলল, 'হ্যাঁ।'
আদিত্যবাবু বললেন, 'ভদ্রলোকের সঙ্গে আমার কিঞ্চিৎ পরিচয় আছে। উনিও মাঝে-মাঝে মর্নিংওয়াকে আসেন।'
তাঁর কথা শুনে শুভ্রদা বলল, 'বাঃ তা হলে ভালোই হল!'
ঢাল বেয়ে ব্রিজের কাছে আসতেই পটাইদের মনে হল, নদীর ওপাশের ঢাল দিয়ে একদল লোক ব্রিজের ওপরে উঠছে। আর তাদের পিছনে দুজন লোক বাঁশ বা ওই জাতীয় কিছু ঘাড়ে নিয়ে আসছে। সেই বাঁশের গায়ে ঝুলছে কী একটা কাপড় জড়ানো জিনিস। অন্ধবাবার বডিটা মনে হয় উঠিয়ে আনা হচ্ছে। অন্ধবাবার গুহাটা না দেখা গেলেও তাঁর গুহার সামনের চাতালটাও চোখে পড়ছে দূর থেকে। সেখানে কয়েকজন ইউনিফর্ম পরা পুলিশকর্মী দাঁড়িয়ে আছে। ব্রিজে ওঠার মুখে পটাই একবার তাকাল পিলারের নীচে সেই খোপের দিকে। শুভ্রদাও তাকাল সেদিকে। না, সেখানে এখন পুরন্দোয়া নেই। পটাইরা যখন ব্রিজের মাঝামাঝি পৌঁছোল তখন উলটো দিক থেকে মৃতদেহ বহনকারী সেই মিছিলটাও উঠে এল ব্রিজের ওপর। কয়েক পা এগিয়ে পটাইরা ব্রিজের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে পড়ল উলটো দিকের লোকগুলোকে পথ ছেড়ে দেওয়ার জন্য। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই লোকগুলো তাদের সামনে চলে এল। সব শেষে কাপড় দিয়ে ভালো করে মোড়া বাঁশের সঙ্গে ঝুলতে থাকা অন্ধবাবার মৃতদেহ। শুধু তাঁর পায়ের পাতা দুটো কাপড়ের বাইরে বেরিয়ে আছে। মৃতদেহটা পটাইদের সামনে দিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় আদিত্যবাবু হাত জোড় করে মৃতদেহের উদ্দেশে নমস্কার জানালেন। পটাইও নমস্কার করল। শুভ্রদা বলল, 'নিশ্চয়ই পোস্টমর্টেমের জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।'
মৃতদেহটা নিয়ে লোকগুলো এগিয়ে যাওয়ার পর শুভ্রদা আবার হাঁটতে শুরু করল। আদিত্যবাবু বললেন, 'মৃতদেহ তো নিয়ে গেল, ওখানে আর যাবেন নাকি?'
শুভ্রদা বলল, 'হ্যাঁ যাব।'
ব্রিজের ওপারে পৌঁছে পটাইরা অন্ধবাবার গুহার রাস্তা ধরল।
গুহার সামনের চাতালে জনাপাঁচেক পুলিশকর্মীর সঙ্গে সাদা শার্ট-প্যান্ট পরা সুঠাম চেহারার একজন মধ্যবয়সি ভদ্রলোক দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি কী যেন নির্দেশ দিচ্ছিলেন উপস্থিত পুলিশকর্মীদের। পটাইরা সেখানে গিয়ে হাজির হতেই ভদ্রলোক কথা থামিয়ে তাকালেন তাঁদের দিকে। তারপর আদিত্যবাবুকে দেখে হিন্দিতে বললেন, 'আমি ভাবছিলাম আপনাকে এখানে দেখলাম না কেন? দুর্ঘটনাটা আপনার বাড়ির এত কাছে ঘটল অথচ আপনি এখানে নেই কেন?'
তাঁর কথা শুনে আদিত্যবাবু শুভ্রদাকে দেখিয়ে বললেন, 'ওঁকে নিয়ে আমার এক জায়গায় যাওয়ার কথা ছিল, তাই আমি গুলাবরাইয়ে অপেক্ষা করছিলাম। ওঁরা আসার পর যেখানে যাওয়ার কথা সেখানে না গিয়ে এখানে এলাম।'
তাঁর কথা শুনে ভদ্রলোক শুভ্রদার দিকে তাকিয়ে আদিত্যবাবুকে জিগ্যেস করলেন, 'ওঁরা?'
আদিত্যবাবু বললেন, 'ওঁরা টুরিস্ট, কলকাতা থেকে দুদিন হল এখানে বেড়াতে এসেছেন। আপনার অফিসের পাশেই কালীকমলি ধর্মশালায় উঠেছেন।'
আদিত্যবাবুর কথা শুনে এই ভদ্রলোকই যে এখানকার এসপি বুঝতে অসুবিধে হল না পটাইদের। শুভ্রদা নিজেই নিজের পরিচয় দিল। এসপি সাহেব বললেন, 'আমি এখানকার এসপি আনন্দ পাওয়ার।'
নাম শুনে শুভ্রদা সাবলীলভাবে তাঁকে জিগ্যেস করল, 'আপনি কি মহারাষ্ট্রের লোক?'
প্রশ্ন শুনে পাওয়ারসাহেব একটু মৃদু হেসে বললেন, 'পাওয়ার সারনেম শুনে লোকেরা অনেক সময় এই ভুলটা করে। গাড়োয়ালেও ''পাওয়ার'' সারনেমের লোক বাস করে। আমি গাড়োয়ালেরই মানুষ।' পাওয়ারসাহেব এরপর আদিত্যবাবুকে বললেন, 'খুব স্যাড ব্যাপার। সাধুবাবা খুব সরল সাধারণ মানুষ ছিলেন। ওঁর কে এমন শত্রু ছিল যার জন্য ওঁকে খুন হতে হল? অবশ্য ইনজুরিটা এমন যে এটা ঠিক খুন কিনা বুঝতে পারছি না। কণ্ঠনালীটা একদম ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছে, ঘাড়ের কাছে একটা ফুটোও দেখলাম। কিছুদিন ধরেই একটা বাঘ নাকি এদিকে ঘোরাফেরা করছে বলে গুজবও ছড়িয়েছে। নদীর ওপারের কয়েকজন নাকি কাল মাঝরাতে বাঘের ডাকও শুনেছে।' এরপর তিনি একটু থেমে আদিত্যবাবুকে বললেন, 'আপনি তো এদিকে থাকেন, নিশ্চয়ই আপনার সঙ্গে ওঁর পরিচয় ছিল। কোনও দিন উনি ওঁর শত্রু-টত্রু আছে কিনা বলেছিলেন কিছু?'
আদিত্যবাবু বললেন, 'না, মানে তেমন কিছু...।' আদিত্যবাবু সম্ভবত আগের দিনের কথা বলতে গিয়েও চুপ করে গেলেন।
পাওয়ারসাহেব আবার তাঁকে জিগ্যেস করলেন, 'আচ্ছা, কালরাতে আপনি কোনও বাঘের ডাক শুনেছিলেন?'
আদিত্যবাবু বেশ জোরের সঙ্গে বললেন, 'না, কালরাতে কোনও বাঘের ডাক শুনিনি। মাঝে-মাঝে পাহাড়ের ওপরের জঙ্গলে বাঘ ডাকে বটে, কিন্তু কাল সে শব্দ আমি পাইনি। আমার পেটে একটা ব্যথা হচ্ছিল, তাই কাল রাতে ঘুম হয়নি আমার।'
পাওয়ারসাহেব বললেন, 'ও! বাঘের ডাক তা হলে বানানো গল্প। অন্ধবাবা অবশ্য বাঘের আক্রমণে মারা গিয়েছেন কি না তা আজ রাতেই জানতে পারব। বডিটা পোস্টমর্টেমের জন্য পাঠাচ্ছি। আশা করছি রিপোর্টটা ভার্বালি রাতেই জানতে পারব।'
একজন পুলিশকর্মী এবার পাশ থেকে পাওয়ারসাহেবকে জিগ্যেস করলেন, 'স্যার, রক্তটা কি ধুয়ে দেব?'
তাঁর কথা শুনে পাওয়ারসাহেব পিছন ফিরে কয়েক হাত দূরে চাতালের মাটির দিকে তাকালেন। পাথুরে মাটিতে বেশ খানিকটা কালচে রক্ত ছড়িয়ে আছে। তার চারদিক দিয়ে গোল দাগ কাটা। সেদিকে তাকিয়ে পাওয়ারসাহেব বললেন, 'ঠিক আছে, ধুয়ে দাও।'
শুভ্রদা হঠাৎ পাওয়ারসাহেবকে বলল, 'আচ্ছা, সাধুবাবার গুহা থেকে কিছু হারিয়েছে কি না বলতে পারেন?'
তিনি বললেন, 'কীভাবে বলব? তাঁর কী-কী জিনিস ছিল না ছিল, তা তো আমার জানা নেই। এখানে আসার পর একবার ঢুকেছিলাম গুহায়। কোনও কিছু লন্ডভন্ড হয়ে আছে বলে আমার মনে হল না।'
শুভ্রদা জিগ্যেস করল, 'রুদ্রনাথের মূর্তিটা দেখেছেন আপনি?'
তিনি বললেন, 'দেখলাম বলে মনে হল যে। ফুল-বেলপাতা চাপা দেওয়া আছে।'
শুভ্রদা বলল, 'একবার গুহার ভিতর যাওয়া যাবে?'
পাওয়ারসাহেব কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইলেন শুভ্রদার মুখের দিকে তারপর বললেন, 'চলুন।'
পাওয়ারসাহেব পটাইদের সঙ্গে নিয়ে হাজির হলেন গুহার ভিতর অন্ধবাবার আস্তানায়। বাইরের আলো দেওয়ালের ফাটল বেয়ে এসে পড়েছে। গুহার চারদিক বেশ স্পষ্টই দেখা যাচ্ছে। শুভ্রদা তাকাল কুলুঙ্গির মতো জায়গাটার দিকে। রুদ্রনাথের মূর্তিটা সেখানে আছে, তবে মাথার দিকটা ফুল বেলপাতায় ঢাকা। কয়েক মুহূর্ত মূর্তিটার দিকে তাকিয়ে শুভ্রদা জুতো খুলে ধীরে-ধীরে এগিয়ে গেল সেদিকে। হাত দিয়ে মূর্তিটার ওপর থেকে শুকনো ফুল-বেলপাতাগুলো সরিয়ে দিয়ে ভালো করে সেটার দিকে তাকিয়ে বলল, 'এটা নকল মূর্তি।'
তার কথা শুনে পাওয়ারসাহেব অবাক হয়ে বললেন, 'মানে?'
শুভ্রদা বলল, 'মানে হল, এখানে যে মূর্তিটা রাখা আছে, এটা কালো রং করা একটা সাধারণ পাথরের মূর্তি। এর চোখে কোনও দামি পাথর বসানো নেই। আর এ ব্যাপারটা যাতে চট করে ধরা না পড়ে, তার জন্যই মূর্তির মাথার দিকটা ফুলটুল দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। আমার ধারণা, যারা সাধুবাবাকে খুন করেছে, তারাই আসল মূর্তিটা হাতিয়ে নিয়েছে।'
শুভ্রদার কথা শুনে পাওয়ারসাহেব অবাক হয়ে বললেন, 'আপনি কীভাবে আগাম অনুমান করলেন মূর্তির ব্যাপারটা? এত কিছু বলছেনই বা কীভাবে? আপনি তো একজন টুরিস্ট?'
শুভ্রদা বলল, 'হ্যাঁ, আমি টুরিস্ট। তবে আমি কাল বিকেলে আদিত্যবাবুর সঙ্গে সাধুবাবার দর্শনে এসেছিলাম।' এরপর শুভ্রদা গতকাল সাধুবাবার মুখ থেকে কী-কী শুনেছে তা বলতে শুরু করল।
মিনিটপাঁচেক সব কথা মন দিয়ে শুনে বললেন, 'এবার কেসটার মোটিভ ক্লিয়ার হয়ে গেল। কিছুদিন ধরে একটা মূর্তি পাচারকারী দল সক্রিয় হয়েছে। অসংখ্য মন্দির, দুর্মূল্য মূর্তি আছে এখানে। সব জায়গায় তো পুলিশের ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়। সে সুযোগই কাজে লাগাচ্ছে ওরা। কিছুদিন আগে এখানকার ভাণ্ডার মহল্লা থেকে একটা অষ্টধাতুর শিবমূর্তি খোয়া গিয়েছে। সাধুবাবার কাছে যে লোকটা আসত, তার নামটা কী যেন বললেন?'
শুভ্রদা বলল, 'পবন প্রসাদ।'
'খোঁজ নিয়ে দেখছি ও নামে কেউ আছে নাকি?'
শুভ্রদা বলল, 'নামটা জালও হতে পারে।'
ঘাড় নাড়লেন এসপি সাহেব। শুভ্রদা বলল, 'আচ্ছা, আমি যদি এই কেসটায় আপনার পাশাপাশি ইনভেস্টিগেট করি, তা হলে আপত্তি আছে?'
এসপি সাহেব বললেন, 'আপনি প্রাইভেট ডিটেকটিভ নাকি?'
'ইনভেস্টিগেশনের কথা বলছেন? সেরকম কেউ নই। আসলে একজন নিরীহ মানুষ মারা গেলেন, যদি এটা খুন হয়, তা হলে দোষীদের নিশ্চয়ই শাস্তি পাওয়া উচিত। এ কাজে আমার মতো করে আপনাদের সাহায্য করতে চাই।'
পাওয়ারসাহেব বললেন, 'তবে পুলিশকে না জানিয়ে কোনও কিছু করতে যাবেন না। আইনের ক্ষমতা আর পাবলিকের ক্ষমতা এক নয়।'
শুভ্রদা মৃদু হেসে বলল, 'নিশ্চিন্ত থাকুন। আপনার টেলিফোন নম্বর?' তারপর আদিত্যবাবুকে বলল, 'এবার ফেরা যাক।'
পটাইরা ব্রিজের দিকে ফিরতে শুরু করল।
হাঁটতে-হাঁটতে আদিত্যবাবু বললেন, 'এসপি সাহেবকে এত কথা বলে কি ঠিক করলেন? ওঁরা পুলিশের লোক। কখন উধোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপিয়ে দেবে তার ঠিক নেই! আমি তো ইচ্ছে করেই বললাম না কথাগুলো।'
শুভ্রদা চুপচাপ হাঁটতে লাগল। ব্রিজের কাছে এসে আদিত্যবাবু বললেন, 'যেখানে আপনাদের নিয়ে যাওয়ার কথা, সে প্রোগ্রাম ক্যানসেল?'
শুভ্রদা বলল, 'আজ যেতে ভালো লাগছে না। কালও থাকব। কাল আপনাকে নিয়ে যাব বাড়ি থেকে। যদি কিছু চোখে পড়ে, জানাবেন।'
আদিত্যবাবু বললেন, 'আচ্ছা।'
শুভ্রদা ব্রিজের দিকে উঠতে-উঠতে বলল, 'আমরা যখনই রুদ্রপ্রয়াগ ছাড়ি না কেন, আপনার সঙ্গে দেখা করে যাব।'
আদিত্যবাবু বললেন, 'ধন্যবাদ!'
পটাইরা এল রাস্তায়। আদিত্যবাবু নিজের পথ ধরলেন, পটাইরা হাঁটতে লাগল ব্রিজ দিয়ে। এপারে পৌঁছেই পটাইরা দেখল, পুরন্দোয়া পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে আসছে। দাঁড়িয়ে পড়ল শুভ্রদা। পুরন্দোয়াও সামনে এসে বলল, 'আবার পোলের ওপারে গিয়েছিলেন নাকি? জায়গাটা খুব খারাপ।' তারপর শুভ্রদাকে বলল, 'একটা সিগারেট?'
শুভ্রদা সিগারেটের প্যাকেটটা দিয়ে বলল, 'এটা তুমি রাখো।'
সে খুশিতে বলল, 'পুরোটা?'
শুভ্রদা বলল, 'হ্যাঁ।' তারপর জিগ্যেস করল, 'এত কাণ্ড হল, সাধুবাবা মারা গেলেন। তুমি কোথায় ছিলে?'
সে বলল, 'অন্ধবাবা মারা গিয়েছেন? আমি তো কিছু জানি না।'
শুভ্রদা বলল, 'হ্যাঁ, কাল রাতে খুন হয়েছেন।'
পুরন্দোয়া বলল, 'কাল রাতে কিছু যে একটা হয়েছে তা মনে হচ্ছিল।'
তার কাঁধে হাত রাখল শুভ্রদা। তারপর একটা বড় পাথরের চাঁই দেখিয়ে বলল, 'চলো, ওখানে বসে কথা বলি।'
পাথরের ওপর বসার পর পুরন্দোয়া বিষণ্ণ গলায় বলল, 'ভালোমানুষ ছিলেন অন্ধবাবা। আমাকে প্রসাদ দিতেন। সবাই আমাকে পাগল বলে, কিন্তু উনি আমার মাথায় হাত রেখে কথা বলতেন। তাঁকে কে মেরেছে জানেন?'
শুভ্রদা বলল, 'না, তাকে শাস্তি দেওয়ার জন্য খুঁজছি। তুমি সাহায্য করবে?'
পুরন্দোয়া বলল, 'কী করতে হবে?'
শুভ্রদা বলল, 'কয়েকটা প্রশ্নের জবাব দেবে।'
পুরন্দোয়া সম্মতি জানাল। শুভ্রদা জিগ্যেস করল, 'কাল রাতে একটা কিছু হয়েছে তা কেন মনে হচ্ছিল?'
পুরন্দোয়া বলল, 'কাল বিকেলে আপনাদের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর গিয়েছিলাম কেদার মহল্লায় এক সাধুর ডেরায়। যখন ফিরি তখন অন্ধকার হয়ে গিয়েছে। এসে আমার জায়গায় শুয়ে পড়েছিলাম। মাঝরাতে খুব খিদে পেল। আমার কাছে আধখানা পাউরুটি ছিল, সেটা খেয়ে মনে হল, যদি নদী থেকে চোখে-মুখে একটু জল দিয়ে এসে শুই, তাতে ঘুমটা ভালো হবে। ঢাল বেয়ে নদীর দিকে নামতে যাব, তখনই অন্ধবাবার গুহার দিক থেকে বাঘ ডেকে উঠল। প্রথমে একবার, তারপর আর-একবার!
'বাঘটা যদি আমার দিকে আসে তা হলে কী করব? ভয় পেয়ে যখন খোপের ভিতর ঢুকতে যাচ্ছি তখনই ব্রিজের দিক থেকে ছুটতে-ছুটতে দুটো লোক আমার সামনে দিয়েই বাসরাস্তায় উঠে গেল। এরপর সারারাত জেগে কাটিয়েছি। ভোরবেলা বাজারের দিকে লোক দুটোকে দেখে মনে হল, ওপারে কোনও ঘটনা ঘটেছে।' এই বলে থামল পুরন্দোয়া।
শুভ্রদা জিগ্যেস করল, 'লোক দুটোর হাতে কি কিছু ছিল?'
পুরন্দোয়া বলল, 'না, কিছু ছিল না।'
'ঠিক ভেবে বলছ তো?'
'ঠিক বলছি। লোক দুটো আমার এক হাত দূর দিয়ে দৌড়ে গেল। ওদের হাত খালি ছিল।'
'ওদের চেনো?'
'একজনকে চেনা মনে হল, কিন্তু কোথায় দেখেছি মনে নেই।'
এর পর শুভ্রদা জিগ্যেস করল, 'তুমি যে চিতা আর করবেটসাহেবের ভূত দেখেছ বলো, সেটাও সত্যি?'
পুরন্দোয়া বলল, 'হ্যাঁ স্পষ্ট দেখেছি। কেউ আমার কথা বিশ্বাস করছে না।'
শুভ্রদা বলল, 'আমি কিন্তু বিশ্বাস করলাম।' মানিব্যাগ থেকে একটা পঞ্চাশ টাকার নোট বের করে পুরন্দোয়াকে দিয়ে বলল, 'খাবার কিনে খেও। আর জায়গাটার ওপর একটু নজর রেখো, কাল রাতের লোক দুটো এদিকে আসছে কিনা।'
পুরন্দোয়া বলল, 'ঠিক আছে, আজ কোথাও যাচ্ছি না। নজর রাখছি।'
শুভ্রদা এবং পটাই ঢাল বেয়ে বাসরাস্তায় উঠে গাড়ির দিকে এগোতে-এগোতে বলল, 'একটা ব্যাপারে খটকা লাগছে রে!'
'কী?'
'পাওয়ারসাহেব বললেন, এদিকের লোকজন নাকি বাঘের ডাক শুনেছে। পুরন্দোয়াও বলল সে দুবার বাঘের ডাক শুনেছে, কিন্তু আদিত্যবাবু জেগে থেকেও বাঘের ডাক শুনতে পেলেন না কেন? তিনি তো জোরের সঙ্গেই বললেন, বাঘের ডাক শোনেননি। সাধুবাবার গুহা থেকে মাপলে রাস্তার ওপর পাহাড়ের ঢালে আদিত্যবাবুর বাড়ির দূরত্ব কিন্তু বেশি নয়।'
পটাই বলল, 'তুমি কি আদিত্যবাবুকেও সন্দেহের তালিকায় ফেললে?'
শুভ্রদা বলল, 'সন্দেহের ঊর্ধ্বে নন! মূর্তিটা হস্তগত করার সুযোগ তাঁরও পুরোমাত্রায় আছে। হয়তো সেটা কাজে লাগিয়েছেন!'
পটাইরা হাজির হল গাড়ির কাছে। শুভ্রদা ড্রাইভারকে বলল, 'রুদ্রনাথের মন্দিরে যাব। তার আগে বাজারে টিফিন সেরে নেব।'
'জি হাঁ,' বলে ড্রাইভার গাড়ি ঘুরিয়ে ছুটল রুদ্রপ্রয়াগের দিকে।
শুভ্রদা বলল, 'রুদ্রপ্রয়াগ কিন্তু বিরাট ডিস্ট্রিক্ট, কেদারনাথও পরে।'
কথা বলতে-বলতে ওরা প্রথমে গুলাবরাই তারপর ধর্মশালার গলি, এসপি অফিসকে পিছনে ফেলে বাজারে হাজির হল। গতকাল যে দোকানে টিফিন সেরেছিল, সেই দেকানের সামনে গাড়ি থামাতে বলল শুভ্রদা। টিফিন সারতে মিনিট কুড়ি লাগল। বাইরে এস বলল, 'সিগারেট কিনতে হবে।'
কাছেই একটা পান-সিগারেটের দোকান দেখা যাচ্ছে। শুভ্রদা জিগ্যেস করল, 'পাশের ঘরের লোকটি কাল কোন দোকানে দাঁড়িয়েছিল রে?'
পটাই ফুটপাতের গায়ে একটা দোকান দেখিয়ে বলল, 'মনে হয় ওই দোকানটা।'
শুভ্রদা বলল, 'তা হলে ওখানে যাই।'
ওরা সেই দোকানে ঢুকল। এক মাঝবয়সি বিক্রেতা বসে আছে। দোকানটায় সিগারেট, বিস্কুট, লজেন্স, চিপসের প্যাকেট, কোল্ড ড্রিঙ্কস জাতীয় সবকিছুই পাওয়া যায়। শুভ্রদা জিগ্যেস করল, 'আপনার দোকানে লোটাস ব্র্যান্ডের কিংসাইজ মাইল্ড সিগারেট আছে?'
দোকানি বলল, 'ছিল, কিন্তু কাল সকালেই শেষ হয়ে গিয়েছে।'
শুভ্রদা জিগ্যেস করল, 'লোটাস ব্র্যান্ড কি খুব চালু এখানে? অন্য দোকানে পাওয়া যাবে?'
দোকানদার বলল, 'না, না, চালু নয়। এখানে অন্য কোনও দোকানে ও সিগারেট পাবেন না। খুব কস্টলি বিদেশি সিগারেট, এখানে ফরেনাররা আসা-যাওয়া করে বলে আমি মাঝে-মাঝে দিল্লি থেকে আনাই।'
শুভ্রদা আর কিছু বলল না। রাস্তা ক্রস করার সময় পটাই জিগ্যেস করল, 'হঠাৎ লোটাস ব্র্যান্ডের খোঁজ করলে কেন? ওটা তো তোমার ব্র্যান্ড নয়?'
শুভ্রদা বলল, 'ওটা আমার ব্র্যান্ড নয়। ইনফ্যাক্ট এই ব্র্যান্ডের সিগারেটের নাম কালই প্রথম জানলাম।'
'কীভাবে?'
'কাল বিকেলে সাধুবাবার ওখান থেকে ফেরার সময় আধপোড়া সিগারেটের টুকরোটা পেয়েছিলাম, তার গায়ে ওই নামটা লেখা ছিল।'
এ-পাড়ে এসে পটাইরা গাড়িতে উঠল। মিনিট দশেক পর ওরা পৌঁছোল রুদ্রপ্রয়াগ মন্দিরে। গাড়ি থেকে নেমে শুভ্রদা বলল, 'চল, রাস্তার ওপারে।' ওরা গিয়ে দাঁড়াল সেই দোকানটার সামনে। যার মাথার ওপর সাইনবোর্ডে লেখা আছে 'রুদ্রনাথ এম্পোরিয়াম।' একটা শোকেসের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল শুভ্রদা। তারপর একটা ইঞ্চি চারেক লম্বা ধাতুর তৈরি রুদ্রনাথের মূর্তি দেখিয়ে কাউন্টারের লোকটাকে বলল, 'এটার দাম কত?'
'থ্রি হান্ড্রেড অ্যান্ড ফিফটি।'
শুভ্রদা বলল, 'এটা দিয়ে দিন।'
শুভ্রদা সাড়ে তিনশো টাকা দিল। লোকটা শুভ্রদার দিকে তাকাল। শুভ্রদা বলল, 'মানি রিসিট?'
শুভ্রদার কথা শুনে সে বিল তৈরি করতে লাগল। শুভ্রদা ইশারায় দেওয়ালের গায়ে ঝোলানো লাল রঙের টুপি দেখাল পটাইকে। কাউন্টারের লোকটি বিল শুভ্রদার হাতে দিতে ওরা দরজার দিকে পা বাড়াল।
ওরা হাঁটতে লাগল মন্দিরের দিকে। শুভ্রদা বলল, 'মানি রিসিটের কালির রং আর যে কার্ডটা কুড়িয়ে পেয়েছিলাম তার কালির রং একইরকম সবুজ। লাল টুপিটাও দেখতে পেলাম। এর অর্থ আমাদের পাশের ঘরের রুদ্রাক্ষ কারবারির সঙ্গে এই লোকটার যোগাযোগ আছে। এই লোকটার সঙ্গেই সে কাল কোটেশ্বরে নির্জন রোপব্রিজের ওপর দাঁড়িয়েছিল। প্রশ্ন হল, এরা দুজনই গতকাল অন্ধবাবার গুহায় গিয়েছিল কিনা? দোকানের লোকটা রসিদের নীচে 'এস নন্দা বলে সই করেছে। হয়তো সে অন্ধবাবার কাছে নিজেকে 'পবন প্রসাদ' বলে পরিচয় দিয়েছিল। মাত্র দশটা বাজে। চল, একটু মন্দিরে গিয়ে বসি। তারপর বাড়ি ফেরা যাবে।'
পটাইরা হাঁটতে-হাঁটতে মন্দির চত্বরে ঢুকল। সঙ্গমের দিকে তাকিয়ে শুভ্রদা বলল, 'কী সুন্দর জায়গা! অথচ এখানেও খুনোখুনির মতো ব্যাপার ঘটে।'
কিছুক্ষণ পর পটাই তাকাল ধর্মশালার দিকে। দেখল, পাশের ঘরের লোকটি কখন বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছে। পটাই বলল, 'ওই দেখো, ধর্মশালার বারান্দায় সেই লোকটি দাঁড়িয়ে আছে।'
শুভ্রদা বলল, 'লোকটি মনে হচ্ছে সিগারেট টানছে।'
পটাই বলল, 'ও কি আমাদের দেখতে পাচ্ছে?'
শুভ্রদা বলল, 'দেখতে নিশ্চয়ই পাচ্ছে, তবে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে বলে ওকে যত সহজে আমরা চিনতে পারছি, ওর পক্ষে এত লোকের ভিড়ে আমাদের চিনে নেওয়া কষ্টকর।'
কয়েক মিনিট পর লোকটি ঘরে ঢুকে গেল। শুভ্রদা বলল, 'মনে হল লোকটি ঘরে ঢোকার আগে হাতের সিগারেটটা বারান্দা থেকে নীচে ছুড়ে ফেলল।'
পটাই বলল, 'আমারও তাই মনে হল।'
শুভ্রদা বলল, 'তা হলে এখানে দাঁড়িয়ে কাজ নেই। ধর্মশালায় এখনই ফিরতে হবে। দেখতে হবে লোকটি সত্যিই লোটাস ব্র্যান্ডের সিগারেট খায় কি না।'
ধর্মশালায় ফিরে শুভ্রদা ড্রাইভারের মোবাইল নম্বর লিখে নিয়ে বলল যে, ইচ্ছে হলে সে অন্য কোথাও ঘণ্টাদেড়েক ঘুরে আসতে পারে।
ড্রাইভার বলল, তা হলে সে বাড়ি থেকে স্নান-খাওয়া সেরে সাড়ে বারোটা নাগাদ ফিরে আসবে।
ওরা ধর্মশালার সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে শুরু করল। তাদের পাশের ঘরের দরজাটা একই রকম বন্ধ আছে। ওরা ঘরে ঢোকার পর শুভ্রদা বলল, 'তুই নিশ্চয়ই ভাবছিস, কেন সিগারেটের টুকরোটা দেখতে গেলাম না। কারণ যদি ও বারান্দায় হঠাৎ এসে দাঁড়ায়, কী কারণে আমরা বারান্দার নীচে ঘুরঘুর করছি, সন্দেহ হতে পারে। আমি ওখানে যাব ঠিকই, তার আগে তুই গামছাটা বাথরুম থেকে ভিজিয়ে এনে রেলিংয়ে মেলবার অছিলায় নীচে ফেলে দে। তারপর গামছাটা আনতে যাব। যাতে আমাকে দেখলেও ওর মনে সন্দেহ না হয়।'
মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই ভেজা গামছাটা নিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়াল পটাই। চারপাশ ভালো করে দেখে গামছাটা নীচে ফেলে দিল। শুভ্রদা গামছা কুড়োতে নীচে চলে গেল। গামছা হাতে ঘরে ফিরতে পটাই জিগ্যেস করল, 'কিছু পেলে?'
শুভ্রদা বলল, 'পেয়েছি, লোটাস ব্র্যান্ডের আধপোড়া সিগারেট। জানিস আমি একটা ইংরেজি বইয়ে পড়েছি যে, সিগারেটের ব্র্যান্ড ব্যবহার এবং সিগারেট টানার ধরন দেখে কোনও মানুষের মানসিক অবস্থার কথা আন্দাজ করা যায়।'
পটাই বলল, 'ব্যাপারটা কেমন?'
শুভ্রদা বলল, 'এই ধর, লোটাস ব্র্যান্ডের মাইল্ড বা হালকা তামাক তার চলত না। দ্বিতীয়ত ধর, দুটো সিগারেটের টুকরো আধপোড়া অবস্থায় পেলাম, অর্থাৎ পুরো সিগারেট খাওয়ার ইচ্ছে বা ধৈর্য তার নেই। সম্ভবত সে কোনও গভীর চিন্তার মধ্যে আছে। তা হালকা করার জন্যই সে মাঝে-মাঝে সিগারেট টানছে। আমাকে এখন পাওয়ারসাহেবের অফিসে যেতে হবে। কলকাতায় একজনকে টেলিফোন করতে হবে। ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই ফিরে আসব। গাড়ি এলে বাজারে খাওয়ার জন্য যাব। পাশের ঘরটার দিকে লক্ষ রাখিস।'
শুভ্রদা বেরিয়ে গেল। পটাই শুভ্রদার গাইড বইটার পাতা ওলটাতে লাগল।
শুভ্রদা ফিরে এলে পটাই জিগ্যেস করল, 'কাজ হল?'
শুভ্রদা বলল, 'হ্যাঁ, পাওয়ারসাহেব ইতিমধ্যেই জেনেছেন যে, পবন প্রসাদ নামে কোনও দোকানদার প্রয়াগ মন্দিরের আশপাশে নেই। নীচে অফিসে জানলাম, পাশের ঘরের লোকটির আজকেই চলে যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু একটা দিন সে বুকিং এক্সটেন্ড করেছে। মনে হয় মূর্তিটা নেওয়ার জন্য যদি ও এখানে এসে থাকে, তা হলে এখনও সেটা হস্তগত করতে পারেনি। পারলে নিশ্চয়ই এখানে থাকার রিস্ক নিত না।'
পটাই বলল, 'যদি পাশের ঘরে এবং রুদ্রাক্ষ এম্পোরিয়ামের লোকটার দোকান আর বাড়িতে পুলিশ সার্চ করে, তা হলেই তো বোঝা যেতে পারে মূর্তিটা ওদের কাছে আছে কি না?'
শুভ্রদা বলল, 'হ্যাঁ পারে। যদি ওরা অন্য কোথাও লুকিয়ে রাখে। ওদের বিরুদ্ধে কোনও প্রমাণ নেই। সুতরাং জিনিসসমেত না ধরতে পারলে কাজ হবে না। উলটে ওরা সতর্ক হয়ে যাবে। একটু ফ্রেশ হয়ে আসি। গাড়ি কিছুক্ষণের মধ্যে চলে আসবে। খেতে যেতে হবে।'
একটায় গাড়ি এল। ওরা খাওয়ার জন্য রওনা হয়ে গেল বাজারের দিকে। খাবার সময় নিজে থেকে একটাও কথা বলল না শুভ্রদা। পটাই একবার শুধু জিগ্যেস করল, 'কলকাতায় কাকে ফোন করলে?'
শুভ্রদা বলল, 'আমার পরিচিত এক ডাক্তারকে।' বলে আবার চিন্তায় ডুবে গেল।
খাওয়া সেরে গাড়িতে উঠে বসল ওরা। ড্রাইভার জিগ্যেস করল, 'এখন কোথায় যাব?'
শুভ্রদা বলল, 'ধর্মশালায়।'
ধর্মশালার কাছাকাছি পৌঁছে শুভ্রদা ড্রাইভারকে জিগ্যেস করল, 'গুলাবরাইয়ের দিক দিয়ে না গিয়ে অলকনন্দার রোপব্রিজের ওপারে পৌঁছোনোর অন্য কোনও রাস্তা আছে?'
ড্রাইভার বলল, 'হ্যাঁ, আছে, তবে গাড়ি যায় না, পায়ে হেঁটে যেতে হবে।'
পটাইদের ধর্মশালার গলির কাছে গাড়ি থেমে গেল। গাড়ি থেকে নেমে শুভ্রদা ড্রাইভারকে বলল, 'আপনি বিকেলে আসবেন।'
লোকটা গাড়ি ঘুরিয়ে চলে গেল।
ধর্মশালায় ঢোকার মুখে পটাই দেখল, একটা ভিখিরি লাঠি হাতে প্রাচীরের গায়ে হেলান দিয়ে বসে আছে। এই ভিখিরিটাকে পটাই আগে দেখেনি। ওরা ভিতরে ঢোকার সময় সে হাসল শুভ্রদার উদ্দেশে। শুভ্রদা চাপা গলায় বলল, 'ও পুলিশের লোক। সুরজমলের ওপর নজরদারি করার জন্য বসানো হয়েছে।'
ধর্মশালায় নিজেদের ঘরে ঢুকে দরজা দিয়ে শুভ্রদা বলল, 'পাঁচটা পর্যন্ত টানা ঘুমিয়ে নে পটাই। আজ সারারাত জেগে কাটাতে হবে।'
পটাই বলল, 'কেন?'
উত্তর না দিয়ে বিছানায় শুয়ে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবতে লাগল শুভ্রদা।
বিকেলে ধর্মশালা থেকে বেরিয়ে পড়ল পটাইরা। গাড়ি যখন ওদের রুদ্রপ্রয়াগ মন্দিরের সামনে নামিয়ে দিল, তখন সাড়ে পাঁচটা বাজে। মন্দির চত্বর ফাঁকা হতে শুরু করেছে। নীচে নেমে পটাইরা দাঁড়াল প্রয়াগের সামনে রেলিংয়ের ধারে। সোজা তাকালে নদীর ওপারে কালীকমলি ধর্মশালা। আর ডান দিকে দাঁড়িয়ে আছে অলকনন্দার রোপব্রিজ। পটাইরা অবশ্য জ্যাকেট, গ্লাভস, টুপিতে তৈরি হয়েই বেরিয়েছে। শুভ্রদা বলেছে, আজ সারারাত বাইরে কাটাতে হতে পারে। পটাইরা যখন রাস্তায় এসে দাঁড়াল, ততক্ষণে দোকানগুলোয় বাতি জ্বলতে শুরু করেছে। শুভ্রদা একবার তাকাল রাস্তার ওপারে রুদ্রাক্ষ এম্পোরিয়ামের দিকে। পটাইরা যখন এখানে নেমেছিল, দোকানটা খোলাই ছিল। এখন শাটার নামানো। শুভ্রদা পটাইকে নিয়ে ঢুকে পড়ল দক্ষিণ দিকের সরু গলিটায়। মিনিট তিনেক হাঁটার পর গলিটা যেখানে শেষ হয়েছে, সেখান থেকে একটা শুঁড়িপথ নেমেছে নদীর খাদের দিকে। পটাইরা নেমে পড়ল সে পথে। কিছুটা নামার পর সে পথ নদীখাদের ঢাল বরাবর ঝোপ-জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে চলে গিয়েছে দক্ষিণ দিকে।
অন্ধকার নেমে গিয়েছে। আকাশে ক্ষীণ চাঁদ, তার আলো ছড়াতে এখনও অনেক দেরি। ওরা এগোতে লাগল। মিনিট কুড়ি চলার পর শুভ্রদা পটাইকে বলল, 'এবার একটু সাবধানে চলতে হবে।'
শুভ্রদা দাঁড়িয়ে ভালো করে দেখে নিল ব্রিজটা। না, কেউ কোথাও নেই। শুঁড়িপথটা চলে গিয়েছে ব্রিজের নিচ দিয়ে। ওরা তার নিচ দিয়ে পৌঁছে গেল ওপাশে। ওদের চোখে পড়ল ঢালের একটু ওপর দিকে অন্ধবাবার গুহায় যাওয়ার পথ। তবে আদিত্যবাবুর বাড়ি যাওয়ার রাস্তা অন্ধকারে হারিয়ে গিয়েছে। শেষে শুভ্রদা যেখানে দাঁড়াল, সেখানে কয়েকটা বড় পাথরের চাঁই পড়ে আছে। জায়গাটার ওপর-নীচে ঝোপঝাড়। এ জায়গাটা সম্ভবত সাধুবাবার গুহার একটু নীচে হবে। শুভ্রদা বলল, 'এখানে অপেক্ষা করতে হবে।'
শুভ্রদা টর্চ জ্বেলে পাথরগুলোর ফোকরে কোনও সাপ আছে কি না দেখে বিরাট একটা পাথরের চাঁইয়ের আড়ালে বসল। চারপাশটা যেন বড় বেশি অন্ধকার। পটাইয়ের মনে পড়ল করবেটসাহেব আর চিতার প্রেতাত্মার কথা। ব্যাপারটা কি সত্যি? পুরন্দোয়া বলেছিল, সে নাকি নিজের চোখে দেখেছে। শুভ্রদা নিশ্চুপ, অন্ধকারে ঠিকমতো তার মুখ দেখা যাচ্ছে না। একসময় ধীরে ধীরে পাহাড়ের মাথার ওপর গোল চাঁদ উঠল। আর সঙ্গে-সঙ্গেই স্পষ্ট হয়ে উঠল চারপাশ। পটাই জিগ্যেস করল, 'আমাদের কতক্ষণ বসে থাকতে হবে?'
শুভ্রদা বলল, 'তা ঠিক জানি না। তবে আমার বিশ্বাস, তারা এখানে আসবে। পুরন্দোয়া লোক দুজনকে যখন ব্রিজের ওপর দিয়ে পালাতে দেখেছিল, তখন তাদের হাতে কিছু ছিল না। তা হলে রুদ্রনাথ কোথায়? নিশ্চয়ই ধারে কাছে কোথাও আছেন। তাঁকে নিয়ে যেতেই আসবে তারা।'
পটাই ব্রিজের দিকে তাকিয়ে বলল, 'পুরন্দোয়াকেও তো দেখা যাচ্ছে না ব্রিজে!'
শুভ্রদা বলল, 'মনে হয় সে নিজের ফোকরের মধ্যে বসে আছে অথবা চলে গিয়েছে।'
সঙ্গের কিটব্যাগ থেকে বিস্কুট আর জল নিয়ে খেল পটাইরা। ঠান্ডাও বাড়ছে। হাত-পা কনকন করতে লাগল। ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে চলছে। ঠান্ডার মধ্যে বসে থাকতে ভালো লাগছে না পটাইয়ের। কয়েকবার হাই উঠল। মনে হল, বিছানায় শুয়ে থাকতে পারলে ভালো হত! শুভ্রদা আঁচ করতে পারল পটাইয়ের অবস্থা। বলল, 'আমি যদি কোনওদিন গোয়েন্দা হই, তা হলে তোকে আমার অ্যাসিস্ট্যান্ট করব কি না, সেটা আজ তোর ধৈর্যের ওপর নির্ভর করছে। করবেটসাহেব চিতাবাঘটার অপেক্ষায় রাতের পর রাত জেগে কাটাতেন রোপব্রিজের টাওয়ারে বসে।'
শুভ্রদার কথায় পটাই সোজা হয়ে বসল। ঘুমোলে চলবে না। রাত বারোটা। চাঁদ মাথার ওপর। নদীখাদে জেগে থাকা বিরাট পাথরের চাঁইগুলো দুধের মতো সাদা। এক মায়াবী পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে নদীখাদে। হঠাৎ শুভ্রদা পিঠে খোঁচা দিয়ে আঙুল তুলে দেখাল ব্রিজের দিকে। সেদিকে তাকিয়ে পটাই কিছু দেখতে পেল না। বলল, 'কী?'
শুভ্রদা বলল, 'ওরা এসেছে, ব্রিজে ওঠার মুখে টাওয়ারটার দিকে তাকা।'
পটাই দেখল, দুজন লোক টাওয়ারের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে। একটু পরে ব্রিজে উঠে ধীরে-ধীরে হাঁটতে শুরু করল। মাঝে-মাঝে পিছন ফিরে তাকাচ্ছে। লোক দুটো যখন ব্রিজের ঠিক মাঝামাঝি পৌঁছল, তখন চাঁদের আলোয় তাদের স্পষ্ট দেখতে পেল পটাইরা। দুজনের একজন যে পটাইদের পাশের ঘরের সুরজমল, তা বুঝতে অসুবিধে হল না। সঙ্গের লোকটা চাদরমুড়ি দিয়ে আছে। সম্ভবত সে রুদ্রাক্ষ এম্পোরিয়ামের লোক। ব্রিজের মাঝখানে এসে কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইল তারা। ভালো করে দেখে নিল অন্ধবাবার গুহার দিকে কেউ আছে কিনা। তারপর দ্রুত ব্রিজটার এপাশে এসে অন্ধবাবার গুহায় যাওয়ার শুঁড়িপথে নামল। পটাইরা যেখানে বসে আছে সেদিকেই আসছে।
শুভ্রদা বলল, 'একদম নার্ভাস হবি না, শব্দও করবি না, পাথরের বাইরে মাথা বের করবি না।'
ক্রমশ এগিয়ে আসতে লাগল লোক দুটো। উত্তেজনায় পটাইয়ের মনে হল, সে যেন নিজের বুকের ঢিপঢিপ শব্দ শুনতে পাচ্ছে!
অন্ধবাবার গুহার কিছু দূরে দাঁড়িয়ে পড়ল লোক দুটো। চাদরমুড়ি দেওয়া লোকটা চাদর সরাল মুখ থেকে। হ্যাঁ, এ সেই রুদ্রাক্ষ এম্পোরিয়ামের লোক। তারা গুহার দিকে গেল না। নদীখাদের দিকে তাকিয়ে কয়েক মিনিট চাপাস্বরে কী আলোচনা করল। তারপর জঙ্গল আর পাথরের ঢাল বেয়ে নীচের দিকে নামল। পাথরের আড়ালে বসে তাদের লক্ষ করল পটাইরা। লোক দুজন পৌঁছে গেল নদীখাদের ধারে। একজন টর্চ জ্বালাল। তারপর কী যেন খুঁজতে লাগল ঝোপঝাড়ের মধ্যে। কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজির পর সেটা তারা পেয়েও গেল। জিনিসটা হাতে নিয়ে নদীখাদ বরাবর ব্রিজের দিকে হাঁটতে শুরু করল। শুভ্রদা বলল, 'দেখে মনে হচ্ছে ওরা ব্রিজের কাছে পৌঁছে ঢাল বেয়ে ওপরে উঠবে। চল, আমরা ওপর দিয়ে ব্রিজের মুখে পৌঁছে যাই। ওরা পালাতে পারবে না, পাওয়ারসাহেব সম্ভবত ফোর্স নিয়ে ব্রিজের ওপারে অপেক্ষা করছেন।'
পটাইরা শুঁড়িপথ দিয়ে এগোতে লাগল। নিচ দিয়ে চলেছে লোক দুটো ধীরগতিতে। সম্ভবত তাদের একজন ভারী কিছু বয়ে নিয়ে চলেছে। ঝোপঝাড়ের আড়াল দিয়ে পটাইরা তাদের অনেক আগেই ব্রিজের মুখে পৌঁছে গেল। তারপর পাহাড়ের ঢালে পাথরের আড়ালে বসে পড়ল। নীচে লোক দুটোকে আর দেখতে পাচ্ছে না, কিন্তু তারা এমন জায়গায় বসে আছে যে, কয়েক হাত দূর দিয়েই দুজনকে ব্রিজের ওপরে উঠতে হবে। পাথরের আড়ালে শুভ্রদা আর পটাই অপেক্ষা করতে লাগল।
কয়েক মিনিট কেটে গেল। হঠাৎ কাছ থেকে একটা অস্পষ্ট শব্দ কানে এল পটাইদের। পাশ ফিরে তাকাল পটাই। তার মনে হল, হাত দশেক দূরে শুঁড়িপথের ওপর পাহাড়ের ঢালে একটা ঝোপ যেন হঠাৎ দুলে উঠল। তার পরেই সে যা দেখল, তার হৃৎস্পন্দন যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। ঝোপ থেকে বেরিয়ে শুঁড়িপথের উপর দাঁড়াল একটা পূর্ণবয়স্ক চিতাবাঘ! চোখ দুটো জ্বলছে, লেজ নড়ছে। একবার সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে তাকাল পটাইরা যে পাথরের আড়ালে বসে আছে, সেদিকে। তারপর একটা ছোট লাফ দিয়ে নীচে নামতে শুরু করল। ওই পথেই তো লোক দুটো নিশ্চয়ই উঠে আসছে ওপরে। অর্থাৎ চিতাটার সঙ্গে তাদের মুখোমুখি দেখা হবেই! কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই ভয়ংকর কিছু ঘটতে চলেছে। শুভ্রদা উঠে কোমর থেকে বের করল রিভলভার। উঠে দাঁড়াল পটাইও। তখনই সে আরও একজনকে দেখতে পেল। চিতাটা যেখান দিয়ে নীচে নামছে, সেই শুঁড়িপথের ওপর কোত্থেকে যেন হাজির হল লাঠি হাতে পুরন্দোয়া। সম্ভবত সে চিতাটাকে দেখেনি। তা হলে ওখানে ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকত না। মুহূর্তের মধ্যেই একটা কাণ্ড ঘটল। সম্ভবত নিচ থেকে উঠে আসা লোক দুটোকে দেখতে পেয়েই লাফ দিয়ে চিতাটা ওপরে উঠে এল। সে পড়ে গেল পুরন্দোয়ার মুখোমুখি। তাকে সামনে দেখে আতঙ্কে একটা চিৎকার বের হল পুরন্দোয়ার গলা দিয়ে। সে বাঘটাকে লক্ষ্য করে চালিয়ে দিল হাতের লাঠিটা। পুরন্দোয়াকে দেখতে পেয়ে বাঘটাও যেন মুহূর্তের জন্য হকচকিয়ে গেল। কিন্তু পুরন্দোয়া লাঠিটা চালাবার সঙ্গে-সঙ্গেই চাপা গর্জন করে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল চিতাটা। পুরন্দোয়া পড়ে গেল মাটিতে, বাঘটা তার ঘাড়ের ওপর, শুরু হল ধস্তাধস্তি। ঠিক সেই সময় লোক দুটোও খাদ থেকে ওপরে উঠে এল। তখন তাদের দিকে শুভ্রদা বা পটাই কারওরই খেয়াল নেই। লোক দুটোও হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। তারাও লক্ষ্য করল না পটাইদের। সবারই দৃষ্টি তখন সামনের দিকে। পুরন্দোয়া আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে নিজেকে মুক্ত করার, আর চিতাটা কামড় বসাচ্ছে তার শরীরে। চলছে তুমুল ধস্তাধস্তি। আর দেরি হলে লোকটাকে বাঁচানো যাবে না! শুভ্রদা রিভলভারটা মাথার ওপরে তুলে টিগার টিপল। কান ফাটানো শব্দ কানে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই চিতাটা পুরন্দোয়াকে ছেড়ে দিয়ে উঠে দাঁড়াল। ফের গুলি চালাল শুভ্রদা। তবে এটা আর শূন্যে নয়। গুলিটা চালাল চিতাটাকে লক্ষ্য করে। গুলিটা তার গায়ে লাগল কি না বুঝতে পারল না পটাই। তবে সে প্রচণ্ড গর্জন করে লাফ দিয়ে বিদ্যুৎগতিতে আরও ওপরে উঠে হারিয়ে গেল। লোক দুটো পুরন্দোয়াকে টপকে তিরগতিতে ব্রিজের ওপর ছুটতে শুরু করল। ততক্ষণে ব্রিজের ওপাশ থেকে টর্চের আলো ছুটে আসছে। ব্রিজের মাঝামাঝি রুদ্রনাথের মূর্তিসহ লোক দুজনকে ঘিরে ফেললেন পাওয়ারসাহেব।
পটাইরা কিন্তু লোক দুটোর পিছু ধাওয়া করেনি। বাঘটা অদৃশ্য হতেই পুরন্দোয়া যেখানে পড়ে আছে সেখানে টর্চের আলো ফেলল শুভ্রদা। এখন আর সে নড়ছে না। শুভ্রদা নিচু হয়ে বসে তার নাকের কাছে আঙুল রেখে পটাইকে বলল, 'এখনও বেঁচে আছে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। ভাগ্য ভালো, চিতাটা ওর গলায় কামড় বসাতে পারেনি। তুই পাওয়ারসাহেবকে খবর দে।'
পাওয়ারসাহেবকে খবর দিতে হল না। লোক দুটোকে রুদ্রনাথের মূর্তি সমেত পাকড়াও করে অন্য পুলিশদের জিম্মায় রেখে তিনি ছুটতে শুরু করলেন পটাইদের কাছে আসার জন্য। এর মিনিট দশেকের মধ্যেই পাওয়ারসাহেব, শুভ্রদা, পটাই ও অন্য পুলিশ কর্মীরা, দুজন আসামি আর অচৈতন্য পুরন্দোয়াকে নিয়ে পুলিশের গাড়িতে রওনা হল রুদ্রপ্রয়াগ শহরের দিকে। সেইসঙ্গে পটাইয়ের কোলে চেপে চললেন মহিষরূপী রুদ্রনাথ।
পরদিন বেলা দশটা নাগাদ কালীকমলিতে নিজেদের ঘরে শুয়ে ছিল শুভ্রদা আর পটাই। বেলা একটা নাগাদ রওনা হবে গৌরীকুণ্ডের দিকে। সেখান থেকে কেদারনাথ। পুরন্দোয়াকে গতকাল রাতেই ভরতি করা হয়েছে রুদ্রপ্রয়াগ আর্মি হসপিটালে। সকালের খবর, তার জ্ঞান ফিরেছে, এখন সংকটমুক্ত। আর আসামি দুজনকে আজই কোর্টে তোলা হবে। অন্ধবাবাকে খুন করার রহস্য সমাধানের ব্যাপারে পাওয়ারসাহেব আশাবাদী। কিছুক্ষণ আগে পাওয়ারসাহেবের অফিস থেকে ফিরেছে পটাইরা। সেখানে একটা ছোটখাটো সাংবাদিক সম্মেলনও হয়েছে। কীভাবে পাওয়ারসাহেব ও তাঁর পুলিশবিভাগ চব্বিশঘণ্টার মধ্যেই অন্ধবাবার খুনিদের অপহৃত মূর্তিসমেত গ্রেপ্তার করেছে সে ব্যাপারে পাওয়ারসাহেব সংবাদমাধ্যমকে বিবৃতি দিয়েছেন এবং এ-কাজে শুভ্রদা তাঁকে কিঞ্চিৎ সাহায্য করেছেন, তাও সাংবাদিকদের বলেছেন! তবে পটাইদের একটা উপকারও করেছেন তিনি। কেদারনাথে একদিন রাত্রিবাস করার জন্য সরকারি অতিথি নিবাসের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।
শুভ্রদা বিছানায় শুয়ে ছিল। পটাই বলল, 'আমরা তো আজ চলে যাচ্ছি, যাওয়ার আগে আদিত্যবাবুর সঙ্গে দেখা করবে না?' শুভ্রদা কোনও উত্তর দিল না। কিছুক্ষণ পর পটাই আবার জিগ্যেস করল, 'চিতাটার কী হল? তার তো খোঁজ মিলল না?'
শুভ্রদা বলল, 'পাওয়ারসাহেব এখানকার ডিএফও সাহেবকে চিতার ব্যাপারটা টেলিফোনে জানিয়েছেন। ডিএফও সাহেব বলেছেন, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বনকর্মীরা চিতার খোঁজ শুরু করবে।' একথা বলার পর শুভ্রদা হঠাৎ পটাইকে বলল, 'আচ্ছা, আদিত্যবাবুর সেই বামন কাজের লোকটা তাঁকে ''মাস্টার'' বলে সম্বোধন করেছিল তাই না?'
একটু চিন্তা করে পটাই বলল, 'হ্যাঁ, তাতে কী হয়েছে?'
শুভ্রদা বলল, 'না, কিছু হয়নি। আচ্ছা পটাই ''মাস্টার'' কথাটা কোন-কোন শব্দের সঙ্গে ব্যবহার হয় বল তো?'
পটাই বলল, 'যেমন, পোস্টমাস্টার, স্টেশনমাস্টার, ডান্সমাস্টার, প্ল্যানমাস্টার।' এই বলে থেমে গেল।
শুভ্রদা বলল, 'আর? আর?'
পটাই একটু ভেবে বলল, 'ব্যান্ডমাস্টার, গ্র্যান্ডমাস্টার...।'
শুভ্রদা বিছানায় বসে বলল, 'একটা টেলিফোন করা দরকার, সেটা নিচ থেকে করে আসছি। তুই এর মধ্যে জামাকাপড় বাইরে যা আছে সুটকেসে ভরে ফেল। ঠিক একটায় আমরা বেরিয়ে পড়ব।'
মিনিট পনেরো পর শুভ্রদা যখন ফিরল ততক্ষণে পটাই তার কাজ সেরে ফেলেছে। শুভ্রদা ঘরে ঢুকতেই সে জিগ্যেস করল, 'কাকে ফোন করলে?'
শুভ্রদা বলল, 'কলকাতায় আমার এক চিকিৎসক বন্ধুকে, আর-একটা করলাম সংবাদপত্র অফিসে। তুই আদিত্যবাবুর সঙ্গে দেখা করার কথা বলছিলি তো? চল, যাওয়ার আগে তাঁর সঙ্গে দেখা করে আসি। তবে এখনই বেরোতে হবে, নইলে ফিরতে দেরি হয়ে যাবে।'
পটাই বলল, 'তা হলে চলো।'
মিনিট পাঁচেকের মধ্যে ধর্মশালা থেকে বেরিয়ে রাস্তায় একটা চলন্ত জিপ ধরে প্রথমে হাজির হল রোপব্রিজের ওপরের রাস্তায়। তারপর হেঁটে ব্রিজ পেরিয়ে ওপারের রাস্তা ধরে শেষ পর্যন্ত তারা যখন আদিত্যবাবুর বাড়ির দরজায় পৌঁছোল, তখন প্রায় সাড়ে এগারোটা। শুভ্রদা বাইরে থেকে তাঁর নাম ধরে ডাকতেই তিনিই দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন। তিনি গেটের কাছে আসতেই শুভ্রদা বলল, 'আজ আমরা চলে যাচ্ছি, তাই আপনার সঙ্গে দেখা করতে এলাম।'
আদিত্যবাবু কেমন বিমর্ষ হেসে গেট খুলতে-খুলতে বললেন, 'হ্যাঁ, হ্যাঁ, আসুন, আসুন।'
তারপর পটাইরা তাঁর পিছন-পিছন বাড়ির ভিতর ঢুকে আগের দিনের সেই ঘরে বসল। আদিত্যবাবুর মুখোমুখি বসার পর শুভ্রদা বলল, 'কাল রাতে সাধুবাবার খুনিরা ধরা পড়েছে। আর মূর্তিটা উদ্ধার হয়েছে, এ খবর শুনেছেন নিশ্চয়ই?'
আদিত্যবাবু নিরুৎসাহের গলায় বললেন, 'না শুনিনি। আমার শরীরটা খারাপ, আজ বাড়ির বাইরে যাইনি।'
শুভ্রদা বলল, 'ও।' তারপর সোফা ছেড়ে দেওয়ালের দিকে এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াল একটা সিংহের ফোটোর সামনে। ফোটোটা খুঁটিয়ে দেখতে-দেখতে বলল, 'এই ফোটোগুলো আপনার বন্ধু বনজঙ্গল ঘুরে তুলেছেন বলে আপনি বলেছিলেন, তাই না?'
আদিত্যবাবু বললেন, 'হ্যাঁ, কেন?'
শুভ্রদা এ প্রশ্নের কোনও জবাব না দিয়ে তাঁকে অন্য প্রশ্ন করল, 'আপনার কুকুরটা এখন কেমন আছে?'
আদিত্যবাবু বিমর্ষভাবে বললেন, 'আরও খারাপ। সম্ভবত ওষুধটার আর কোনও দরকার হবে না।
শুভ্রদা বলল, 'আই অ্যাম সরি। আপনার কাছে একটা অনুরোধ আছে, কুকুরটাকে আমি একবার দেখতে চাই।'
তার কথা শুনে হঠাৎ চমকে উঠে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে বললেন, 'না, না, তাকে দেখা আর সম্ভব নয়, আজ সকালেই সে মারা গিয়েছে।'
শুভ্রদা বলল, 'একটু আগেই তো বললেন, তার অবস্থা খারাপ। আর এখন মারা গিয়েছে বলছেন কী করে?' তারপর মৃদু হেসে বলল, 'আপনার দেওয়ালে টাঙানো ফোটোগুলোয় পশুদের বসে থাকার কৃত্রিম ভঙ্গিমা, বাড়িতে বামন কাজের লোকের উপস্থিতি, আপনাকে তার ''মাস্টার'' বলে সম্বোধন, আপনার পরিচয় সম্বন্ধে কিন্তু অন্য একটা ইঙ্গিত দিচ্ছে আদিত্যবাবু! যে ওষুধটা আমাকে আনতে বলেছেন, তা কী কারণে কোন-কোন প্রাণীর ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়, সে খোঁজও আমি নিয়ে নিয়েছি। তা ছাড়া...!'
পটাই লক্ষ করল, শুভ্রদার কথা শুনতে শুনতে আদিত্যবাবুর মুখ কেমন ফ্যাকাসে হয়ে গিয়েছে। তিনি জিগ্যেস করলেন, 'তা ছাড়া কী?'
শুভ্রদা বলল, 'গ্রেট ডায়মন্ড সার্কাসের রিংমাস্টার বছর দু-এক আগে সার্কাসেরই একটা প্রাণীকে নিয়ে হঠাৎই নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিল সে খবরটা আমি খবরের কাগজে পড়েছিলাম আদিত্যবাবু। সেই রিংমাস্টার ছিল একজন বাঙালি, নাম অর্জুন সিংহ। অর্জুন সিংহ আর আদিত্য সিংহ, এই নাম দুটোর মধ্যে বেশ একটা মিল আছে।'
এবার আর নিজেকে সামলে রাখতে পারলেন না আদিত্যবাবু, ছোট ছেলের মতো ফুঁপিয়ে উঠে বললেন, 'আমার কোনও উপায় ছিল না শুভ্রবাবু। সার্কাসে বাঘ-সিংহের খেলা নিষিদ্ধ হয়ে গেল। সরকার বলল সব পশু নিয়ে নেবে। একদম ছোট থেকে ওকে মানুষ করেছি। ওকে ছাড়া আমার থাকা সম্ভব ছিল না। এমনিতেই ও বুড়ো হয়ে গিয়েছে, আর ক'দিনই বা বাঁচবে? ওকে নিয়ে তাই এখানে চলে এসেছিলাম।'
শুভ্রদা বলল, 'কিন্তু এ ধরনের প্রাণী যে-কোনও মুহূর্তে মানুষের মৃত্যুর কারণ হতে পারে?'
আদিত্যবাবু বললেন, 'না, না, ও কোনওদিন কোনও মানুষের ক্ষতি করেনি। দু'দিন রাতের ঘটনাই আমি ওপরের রাস্তা থেকে দেখেছি। সাধুবাবা ওর কামড়ে মরেননি। সেই লোক দুজনের একজন সাধুবাবার ত্রিশূলটা কেড়ে নিয়ে সেটাই বসিয়ে দিয়েছিল তাঁর গলায়। তারপর সেটা নদীতে ফেলে দেয়। তারপর আমার চিতাটা হাজির হয়েছিল সেখানে। কাল রাতে পুরন্দোয়া তাকে যদি লাঠি দিয়ে আঘাত না করত তা হলে সে পুরন্দোয়াকে কখনই আক্রমণ করত না।' শুভ্রদা তাঁর কথা শুনে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
কিছুক্ষণ পর আদিত্যবাবু তাদের নিয়ে হাজির হলেন বাড়ির পিছন দিকে একটা ঘরের বন্ধ দরজার সামনে। দরজা খুলে পটাইদের নিয়ে ঢুকলেন ভিতরে। ঘরের একটা অংশ মোটা জাল দিয়ে ঘেরা, কোনও জানলা নেই। খোলা দরজা দিয়ে কিছুটা আলো এসে পড়ল ঘরের ভিতর। সেই আলোয় পটাইরা দেখল, জালে ঘেরা জায়গাটার ভিতর ঘরের মেঝেয় শুয়ে আছে একটা চিতাবাঘ! চোখ বন্ধ করে আছে। হাড়-পাঁজর যেন বেরিয়ে এসেছে, অতি কষ্টে শ্বাস নিচ্ছে। গতকাল রাতে আচমকা দেখা প্রাণীটার সঙ্গে পটাইদের সামনে পড়ে থাকা প্রাণীটার যেন বিস্তর ফারাক! বেশ কিছু জমাটবাঁধা রক্ত ছড়িয়ে আছে তার গায়ে এবং মেঝের চারপাশে। তা দেখে শুভ্রদা জিগ্যেস করল, 'কীসের রক্ত ওটা?'
আদিত্যবাবু বললেন, 'আপনার গুলিটা ওর শিরদাঁড়ায় বিঁধে আছে। আপনাকে একটা অনুরোধ করছি, ও আর মাত্র দিনচারেক বাঁচবে। এ-ক'টা দিন ওকে আমার কাছেই থাকতে দিন। দয়া করে আপনি পুলিশকে খবর দেবেন না।' এই বলে তিনি মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে রইলেন। তাঁর চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়তে লাগল।
কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকার পর শুভ্রদা বলল, 'ঠিক আছে, পুলিশ কিছু জানবে না।' কথাটা শোনার সঙ্গে-সঙ্গেই তার হাত দুটো জড়িয়ে ধরলেন আদিত্যবাবু।
আদিত্যবাবুর বাড়ি থেকে ফেরার পথে রোপব্রিজের ওপর কিছুক্ষণের জন্য দাঁড়াল পটাইরা। শুভ্রদা একটা সিগারেট ধরিয়ে তাকিয়ে ছিল নিচ দিয়ে বয়ে চলা অলকনন্দার দিকে। একমনে কী যেন ভাবছিল। পটাই জিগ্যেস করল, 'আদিত্যবাবুর চিতার ব্যাপারটা তুমি পুলিশকে জানাবে না কেন?'
নদীর দিকে তাকিয়ে শুভ্রদা বলল, 'আর যাই হোক, ভদ্রলোক সত্যিই পশুপ্রেমী। চিতাটাকে উনি সত্যিই খুব ভালোবাসেন। নইলে সবকিছু ছেড়ে, আইন ভঙ্গ করে প্রাণীটার জন্য প্রায় পাণ্ডববর্জিত জায়গায় জীবন কাটাতেন না। আইনের চোখে তিনি হয়তো অপরাধী কিন্তু আমার চোখে নন।' এই বলে শুভ্রদা হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, 'চল, এবার আমাদের ফিরতে হবে।'
পটাইরা ফিরে চলল বাসরাস্তার দিকে।
দিন সাতেক পর গাড়োয়াল ভ্রমণ শেষ করে পটাইরা সেদিন ফিরছে হরিদ্বারের দিকে। বেলা দশটা নাগাদ রুদ্রপ্রয়াগের গুলাবরাই চটির কাছে বাস দাঁড়াল যাত্রীদের চা খাওয়ার জন্য। বাস থেকে পটাইরা নামার পর কিছু দূরে রাস্তার পাশে ভিড় দেখতে পেল। একটা মৃত চিতা নাকি পাওয়া গিয়েছে অলকনন্দার খাদে। তাকে সেখান থেকে তুলে ওখানে এনে রেখেছে স্থানীয় লোকজন। তাই ভিড়! কথাটা শুনে পটাইরা এগিয়ে গেল সেখানে। মাটিতে পড়ে আছে চিতার মৃতদেহটা। তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে লোকজন। চিতাটাকে চিনতে কোনও অসুবিধে হল না পটাইদের। হঠাৎ পটাই দেখতে পেল, ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছেন আদিত্যবাবু। একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন মাটিতে পড়ে থাকা চিতাটার দিকে। পটাই তাকিয়ে রইল আদিত্যবাবুর দিকে। কয়েক মুহূর্ত পর পটাইয়ের সঙ্গে চোখাচোখি হতে তিনি একবার বিষণ্ণ ভাবে হাসলেন। শেষবারের মতো চিতাটার দিকে একবার তাকালেন। তারপর নিঃসঙ্গ আদিত্য সিংহ ওরফে রিংমাস্টার অর্জুন সিংহ অলকনন্দার রোপব্রিজের দিকে হাঁটতে শুরু করলেন।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন