কৃষ্ণলামার গুম্ফা

হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

চকোলেটে একটা কামড় বসিয়ে শুভম বলল, 'আচ্ছা নীলাঞ্জনকাকু, ওগুলো কী?'

শুভমের ঠিক পাশে বসে একটা গাইড বুকের পাতা উলটে যাচ্ছিল নীলাঞ্জন। মাথা তুলে বাইরের দিকে তাকিয়ে সে জিগ্যেস করল, 'কোনটা?'

শুভম বলল, 'ওই যে রাস্তার বাঁকে, লম্বা-লম্বা বাঁশের গায়ে কাপড় টাঙানো আছে।'

নীলাঞ্জন উত্তর দিল, 'ওগুলোকে বলে, 'লুংদার'। এখানকার পাহাড়ি মানুষরা ভূত-প্রেত-অপদেবতা বিশ্বাস করে। তাদের দূরে সরিয়ে রাখতে স্থানীয় মানুষরা পথের বাঁকে বা নির্জন স্থানে এই পতাকাগুলো টাঙিয়ে রাখে। কাছে গেলে দেখতে পাবে, ওগুলোর গায়ে তিব্বতি হরফে মন্ত্র লেখা আছে।'

শুভম বলল, 'আমি যখন বাবার সঙ্গে ভুটানে বেড়াতে গিয়েছিলাম, তখনও এরকম অনেক পতাকা দেখেছিলাম। এখন বুঝতে পারছি, এগুলো আসলে ভূত তাড়ানোর পতাকা।'

শুভমের কথা শুনে এবার হেসে ফেলল নীলাঞ্জন। তারপর বলল, 'হ্যাঁ, অনেকটা ওরকমই।'

সূর্য ঢলে পড়েছে পশ্চিমে। আকাশের গায়ে ছড়িয়ে আছে তার লাল আভাটুকু। পাহাড়ের বুকে সন্ধ্যা নামছে। চারপাশের পাহাড়ের চূড়োগুলো ঢেকে যাচ্ছে ঘন কুয়াশায়। ধীরে-ধীরে গাড়িটা নামছে নীচের দিকে। বাইরে থেকে ভেসে আসছে ঠান্ডা বাতাস। নীলাঞ্জন বলল, 'শুভমবাবু, এইবার কাচটা উঠিয়ে দাও, নইলে ঠান্ডা লেগে যাবে।'

চকোলেটটা খাওয়া হয়ে গিয়েছিল শুভমের। তার মোড়কটা হাত বাড়িয়ে বাইরে ফেলে জানলার কাচটা তুলে দিল। তারপর সিটে গা এলিয়ে দিয়ে জিগ্যেস করল, 'গ্যাংটক পৌঁছতে আর কতক্ষণ লাগবে?'

নীলাঞ্জন বলল, 'আরও ঘণ্টাখানেক।'

শুভমের প্রশ্নের কারণটা মনে-মনে ধরতে পারল নীলাঞ্জন। গত কালই তারা কলকাতা থেকে গ্যাংটক এসেছেন। আর আজ ভোরবেলা তারা বেরিয়ে পড়েছে ফুদুং মনাস্ট্রি দেখবে বলে। সারাদিন সেখানে কাটিয়ে এখন তারা ফিরছে। গত কাল সন্ধ্যায় নীলাঞ্জন গ্যাংটকে হোটেলের বাইরে বাজারে একটু ঘুরতে বেরিয়েছিল। গ্যাংটকের রাস্তায় বেশ কয়েকটা কিউরিও শপ আছে। ফুটপাত দিয়ে হাঁটতে-হাঁটতে তারই একটায় শুভমকে নিয়ে ঢুকেছিল নীলাঞ্জন।

সেখানে নানা জিনিসের সঙ্গে কাচের শোকেসের মধ্যে রাখা ছিল বেশ কয়েকটা জপযন্ত্র। জপযন্ত্র হল একটা কাঠের দণ্ডের মাথায় লাগানো ঢাকনা দেওয়া কৌটোর মতো একটা জিনিস। তার গায়ে তিব্বতি ভাষায় মন্ত্র খোদাই করা থাকে। আর কৌটোটার সঙ্গে সুতো বা ধাতব চেন দিয়ে একটা পাথর বা ধাতুর ছোট টুকরো ঝোলানো থাকে। দণ্ডটা হাতে নিয়ে নাড়ালে ধাতুর টুকরোটা ঘুরতে থাকে আর তার সঙ্গে দণ্ডের ওপর লাগানো কৌটোটাও ঘুরতে থাকে। বৌদ্ধ ভিক্ষুরা ওই যন্ত্র হাতে ঘোরাতে ঘোরাতে 'ওঁ মণি পদ্মে হুঁ'—এই মন্ত্র উচ্চারণ করেন। ওরকম একটা যন্ত্র কাল কিউরিও শপ থেকে কেনার ইচ্ছে হয়েছিল শুভমের। কিন্তু সম্ভবত নীলাঞ্জনের কাছে আবদার করতে সঙ্কোচ হয়েছিল তার। আজ ফুদুং মনাস্ট্রিতে ছোট-ছোট ছেলের হাতে জপযন্ত্র দেখে কথাটা শেষ পর্যন্ত সে বলেই ফেলেছে নীলাঞ্জনকে। নীলাঞ্জন তাকে বলেছে, সন্ধেবেলা গ্যাংটকে ফিরে তাকে একটা জপযন্ত্র কিনে দেবে। তারপর থেকে শুভম অন্তত চারবার তাকে প্রশ্ন করেছে, গ্যাংটকে ফিরতে তাদের কতক্ষণ লাগবে।

অন্ধকার আস্তে-আস্তে গাঢ় হচ্ছে। ড্রাইভার গাড়ির হেডলাইট জ্বালিয়ে দিল। নীলাঞ্জন সিটের ওপর গা এলিয়ে চোখ বুজে ভাবতে লাগল শুভমের বাবা-মায়ের কথা। আমেরিকায় এখন সবে সকাল হয়েছে। হয়তো ঘুম থেকে উঠে তারা তৈরি হচ্ছে বাইরে যাওয়ার জন্য। শুভমের বাবা-মা দুজনেই বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। শুভমের বাবা ডঃ অনিরুদ্ধ সান্যালের কাছেই বৌদ্ধ-ধর্মাবলম্বীদের শিল্পচর্চা নিয়ে গবেষণার কাজ করছে নীলাঞ্জন পাঁচ বছর ধরে। আর সেই গবেষণার প্রয়োজনেই দিন সাতেকের জন্য সিকিমে এসেছে সে।

সিকিমের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে আছে প্রায় একশোটি গুম্ফা বা মনাস্ট্রি। ওগুলোর মধ্যে বেশ কয়েকটি মনাস্ট্রি তিন-চারশো বছরেরও বেশি প্রাচীন। আর এই মনাস্ট্রিতে ছড়িয়ে আছে বিভিন্ন হস্তশিল্প ও দেওয়ালচিত্রের অমূল্য নিদর্শন। ওই সব নিদর্শন সম্বন্ধে জানতে আর প্রয়োজনমতো সেগুলো ক্যামেরাবন্দি করতেই নীলাঞ্জনের এখানে আসা। শুভম তার সঙ্গে এখানে এসেছে ঘটনাচক্রে।

শুভমের এখনও দশ বছরে পা দেওয়া হয়নি। ওদের বাড়িতে যাতায়াতের সূত্রে নীলাঞ্জনের সঙ্গে খুব ভাব শুভমের। নীলাঞ্জনকেও ছোট ভাইয়ের মতো স্নেহ করেন ওর বাবা-মা। দিনদশেক আগে হঠাৎই ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একটা সেমিনারে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণপত্র এসে পৌঁছয় শুভমের বাবার কাছে। হাতে মাত্র সাত দিন সময়। শুভমের বাবা-মা'র পাসপোর্ট থাকলেও শুভমের পাসপোর্ট এখনও করানো হয়নি। শুভমের বাবা আর নীলাঞ্জন দিনদু'য়েক ছোটাছুটিও করেছিলেন তার পাসপোর্টের জন্য। কিন্তু তাঁরা অবশেষে বুঝতে পারলেন, সরকারি লাল ফিতের ফাঁস গলে এত তাড়াতাড়ি পাসপোর্ট করা সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয় এদেশে। তারপর আছে ভিসার ব্যাপার। নিজেদের যাওয়াটা প্রায় বাতিলই করে দিচ্ছিলেন ডঃ সান্যাল। কারণ, কার কাছে তাঁরা রেখে যাবেন শুভমকে?

আত্মীয়স্বজন সকলেই প্রায় কলকাতার বাইরে থাকেন কাজের সূত্রে। আর, বাড়িতে লোক বলতে তো মাত্র তিন জন—স্বামী, স্ত্রী আর ছেলে। কাজেই যাওয়াটা বাতিল করা ছাড়া আর কোনও উপায় ছিল না তখন ডঃ সান্যালের সামনে। বলতে গেলে, শেষ পর্যন্ত শুভমই সমাধান করেছিল সমস্যার। দিনছয়েক আগে সন্ধেবেলায় এসব নিয়েই কথা হচ্ছিল শুভমদের বাড়িতে। নীলাঞ্জনও উপস্থিত ছিল সেখানে। কথা প্রসঙ্গে উঠে এসেছিল নীলাঞ্জনের সিকিমে আসার ব্যাপারটাও। ডঃ সান্যালও তাকে বোঝাচ্ছিলেন, এখানে কী কী কাজ তাকে করতে হবে।

শুভমও ঘরের মধ্যে বসে শুনছিল সব কথা। তার বিদেশে বেড়াতে যাওয়ার সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে বলে মনমরা হয়ে বসেছিল সে। আরও কষ্ট পাচ্ছিল। কারণ, সে বুঝতে পারছিল তার জন্যই তার বাবা-মাও যেতে পারছেন না। নীলাঞ্জনের সিকিমে আসার ব্যাপারটা কয়েক মাস আগেই ঠিক হয়ে গিয়েছিল। সেদিন সন্ধেবেলায় সিকিমের ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা শুনতে-শুনতে হঠাৎই একটা আশ্চর্য প্রস্তাব দিয়েছিল সে, 'আচ্ছা বাবা, আমি নয় নীলাঞ্জনকাকুর সঙ্গে গ্যাংটক বেড়িয়ে আসি। আর তোমরা আমেরিকা যাও।'

নীলাঞ্জনের দায়িত্বজ্ঞান নিয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই ডঃ সান্যালের আর তাঁর স্ত্রীর মনে। আর, শুভম নীলাঞ্জনকে খুব ভালোবাসে। কাজেই পরদিনই ফাইনাল হয়ে গিয়েছিল ব্যাপারটা। তিনদিন আগে শুভমের বাবা-মা আমেরিকা যাওয়ার জন্য মুম্বইয়ের ফ্লাইট ধরেছিলেন। আর তার পরদিন সন্ধেবেলায় শুভম দার্জিলিং মেলে চেপে বসল নীলাঞ্জনের সঙ্গে।

চোখ বন্ধ করেই নীলাঞ্জন প্রশ্ন করল, 'শুভম, বাবা-মা'র জন্য তোমার মন খারাপ করছে না?'

শুভম বলল, 'একটু একটু করছে ঠিকই, তবে এখানে এসে লাগছেও দারুণ।'

নীলাঞ্জন আবার তাকে জিগ্যেস করল, 'আজ সারা দিনে কোন জিনিসটা তোমার সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে?'

শুভম তার উত্তর না দিয়ে হঠাৎ চিৎকার করে উঠল। আর সঙ্গে-সঙ্গে একটা জোরে ঝাঁকুনি দিয়ে থেমে গেল গাড়িটা। আচমকা গাড়িটা ব্রেক কষায় নীলাঞ্জন হুমড়ি খেয়ে পড়ল ড্রাইভারের সিটের পিছনে। কপালটা খুব জোরে ঠুকে গেল সিটের সঙ্গে। গাড়ির হেড লাইট অন্ধকারের বুক চিরে সামনের দিকে পড়েছে। সেই আলোয় নীলাঞ্জন দেখতে পেল, একটা ছোট ছেলে গাড়ির ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে কী যেন বলছে আর আঙুল দিয়ে রাস্তার পাশে কী দেখাচ্ছে। ছেলেটি লম্বায় ঠিক শুভমের মতোই হবে, হয়তো বা বয়সেও সেইরকমই হবে। ওর নেড়া মাথা, গায়ে একটা হাতকাটা জোব্বা।

নীলাঞ্জন একবার তাকিয়ে দেখল শুভমের দিকে। সে ঠিকই আছে, একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গিয়েছে মাত্র। নীলাঞ্জন শুভমকে জিগ্যেস করল, 'তোমার লাগেনি তো!'

শুভম উত্তর দিল, 'না।'

ইতিমধ্যে ড্রাইভার দরজা খুলে নীচে নেমে পড়েছে। ছেলেটা যেদিকে আঙুল তুলে দেখাচ্ছিল, সেদিকে একবার তাকাল সে, তারপর ইশারায় নীলাঞ্জনকেও নামতে বলল। নীলাঞ্জন গাড়ি থেকে নেমে পড়ল। তার সঙ্গে-সঙ্গে শুভমও। ততক্ষণে ড্রাইভার সেই ছোট ছেলেটার সঙ্গে গিয়ে দাঁড়িয়েছে রাস্তার পাশে পাহাড়ের ঢালের কাছে। নীলাঞ্জন সেদিকে এগিয়ে গেল, আর শুভম দাঁড়িয়ে রইল গাড়ির পাশে। ড্রাইভার আর ছেলেটির কাছে গিয়ে চমকে গেল নীলাঞ্জন। অন্ধকারের মধ্যে একটা মানুষ শুয়ে আছে আর তার মুখ দিয়ে গোঙানির মতো একটা শব্দ বের হচ্ছে। অন্ধকারের জন্য ভালো করে বোঝা যাচ্ছে না লোকটিকে। নীলাঞ্জন পকেট থেকে লাইটারটা বের করে জ্বালাল। একটু আলো হল জায়গাটায়। সেই ক্ষীণ আলোয় সে দেখল, একজন বৃদ্ধ লামা শুয়ে আছেন সেখানে, প্রায় অচৈতন্য অবস্থায়। মাথাটা তিনি মাঝে-মাঝে একটু নাড়ছেন আর গোঙাচ্ছেন। নীলাঞ্জন নীচু হয়ে লাইটারটা আরও কাছে নিয়ে যেতেই দেখতে পেল, লোকটির ঠিক ঊরুর কাছে একটা মারাত্মক আঘাতের চিহ্ন। আর, সেখান থেকে রক্ত ঝরছে। সম্ভবত এই কারণেই গোঙাচ্ছেন মানুষটি। নেড়া মাথা ছোট ছেলেটি এবার দুর্বোধ ভাষায় কী সব বলতে শুরু করল। নীলাঞ্জন ড্রাইভারকে জিগ্যেস করল, 'ছেলেটি কী বলছে?'

ড্রাইভার লোকটি নেপালি। সে জানাল, সেও ছোট ছেলেটির কোনও কথা বুঝতে পারছে না। ছেলেটি সম্ভবত তিব্বতি ভাষায় কথা বলছে। কারণ, গ্যাংটকের রাস্তায় তিব্বতি লামাদের সে এই ধরনের ভাষায় কথা বলতে শুনেছে। চেহারা দেখে মনে হচ্ছে, লামাটি তো বটেই, বাচ্চা ছেলেটিও সম্ভবত তিব্বতি। ছেলেটিও বোধ হয় বুঝতে পেরেছিল, তার ভাষা অন্য কেউ বুঝছে না। তাই সে এবার লামার দিকে একবার আঙুল দেখাল, তারপর আঙুল দেখাল বেশ কিছুটা নীচে গ্যাংটক শহরের দিকে। এবার তার কথা বুঝতে পারল নীলাঞ্জন। সে আহত লামাকে নীচে নামিয়ে নিয়ে যেতে বলছে। এখন কী করা যায়? নীচে নিয়ে যেতে তো অসুবিধে নেই! কিন্তু অন্য কোনও হাঙ্গামায় না পড়তে হয়। একমাত্র গ্যাংটকের যে হোটেলে নীলাঞ্জনরা উঠেছে, সেই হোটেলের বাঙালি ম্যানেজার ভদ্রলোক ছাড়া কারও সঙ্গেই নীলাঞ্জনের পরিচয় নেই গ্যাংটকে। কাজেই লামাকে নিয়ে কোনও বিপদে পড়লে নীলাঞ্জনকে সাহায্য করার মতো কেউ নেই। অথচ তাঁকে আর ছোট ছেলেটিকে এখানে এই অবস্থায় অন্ধকারের মধ্যে ফেলে যেতেও মানবিকতায় বাধছে নীলাঞ্জনের।

সে শুভমকে গাড়ির মধ্যে উঠে বসতে বলে কী করা যায় তা আলোচনা করতে লাগল। ড্রাইভার লোকটি ভালো বলেই মনে হয়। সেও বুঝে উঠতে পারছিল না, এখন কী করা উচিত! হঠাৎ সেই ছোট ছেলেটি একটা কাণ্ড করে বসল। সে দৌড়ে গিয়ে শুয়ে পড়ল গাড়ির চাকার ঠিক সামনে, আর উত্তেজিতভাবে কী যেন সব চিৎকার করে বলতে লাগল। ইতিমধ্যে এসব দেখে ভয় পেয়ে গাড়ি থেকে নীচে নেমে পড়েছে শুভম। সে এসে দাঁড়াল নীলাঞ্জনের পাশে।

নীলাঞ্জনরা বুঝতে পারল, এখন লামা আর ছোট ছেলেটিকে তাদের সঙ্গে নেওয়া ছাড়া কোনও উপায় নেই। নইলে ছেলেটি উঠবে না গাড়ির সামনে থেকে। তাই ড্রাইভার প্রথমে গাড়ি থেকে লম্বা একটা কাপড় এনে লামাটির ক্ষতস্থানের ওপর বেঁধে দিল। তারপর সে আর নীলাঞ্জন মিলে ধরাধরি করে কোনওরকমে রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে বসিয়ে দিল গাড়ির পিছনের সিটে। লামাটির পাশে পড়েছিল একটা ছোট কাপড়ের পুঁটলি। ছোট ছেলেটি রাস্তা থেকে উঠে সেই কাপড়ের পুঁটলিটা তুলে নিয়ে গিয়ে বসল লামাটির পাশে।

শুভম খেয়াল করল, পুঁটলির ভিতর থেকে বেরিয়ে আছে একটা জপযন্ত্র। এর পর নীলাঞ্জন শুভমকে নিয়ে উঠে বসল ড্রাইভারের পাশের সিটে। গাড়ি আবার নামতে শুরু করল নীচের দিকে। এখন ওপর থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে গ্যাংটক শহরের আলোগুলো। গাড়ি পাহাড়ি পথে এক-একটা বাঁক নেওয়ার সঙ্গে-সঙ্গেই আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠছে সেই আলো। শুভমের খুব ভালো লাগছিল নীচের দিকে তাকিয়ে থাকতে। পকেট হাতড়ে আর-একটা চকোলেট বের করল শুভম। তার মোড়কটা খুলে মুখে দেওয়ার আগে সে পিছনে তাকাল একবার। গাড়ির মধ্যে একটা হালকা নীল আলো জ্বলছে। সেই আলোয় শুভম দেখল, ছোট ছেলেটি বৃদ্ধ লামাকে জড়িয়ে ধরে বসে জুলজুল চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে। হঠাৎ কী মনে হওয়ায় শুভম হাতের চকোলেট বারটা এগিয়ে দিল তার দিকে। ছেলেটি একটু ইতস্তত করার পর হাত বাড়িয়ে নিল সেটা, তারপর নাকের কাছে এনে একবার শুঁকল। গন্ধটা মনে হয় ভালো লাগল। তার মুখে ফুটে উঠল একটা ক্ষীণ হাসির রেখা। চকোলেটটা আস্তে-আস্তে খেতে শুরু করল ছেলেটি। কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা পৌঁছে গেল আলো ঝলমলে গ্যাংটক শহরে।

গ্যাংটকে পৌঁছে ড্রাইভার প্রথমে তাদের নিয়ে গেল একটা হাসপাতালে। শুভম দেখল, হাসপাতালের মাথার ওপর নিয়ন বোর্ডে জ্বলজ্বল করছে লেখা—'সিকিম স্টেট জেনারেল হসপিটাল'। বৃদ্ধ লামাকে ধরাধরি করে গাড়ি থেকে নামিয়ে ভিতরে নিয়ে গেল নীলাঞ্জন ও গাড়ির ড্রাইভার। ছেলেটিও পুঁটলিটা সঙ্গে নিয়ে গাড়ি থেকে নামল। তারপর একবার শুভমের দিকে তাকিয়ে হেসে ঢুকে গেল হাসপাতালের ভিতর। শুভম একলা বসে রইল গাড়ির মধ্যে। মিনিট কুড়ি পর নীলাঞ্জন আর ড্রাইভার হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে এসে চেপে বসল গাড়িতে। আহত লামাকে হাসপাতালে ভর্তি করে নিয়েছে কর্ত,পক্ষ। নীলাঞ্জনের কাছ থেকে একথা জানতে পারল শুভম।

গাড়ি এবার ছুটে চলল হোটেলের দিকে। মিনিটপাঁচেকের মধ্যেই হোটেলের সামনে পৌঁছে গেল তারা। গাড়ির ভাড়া মিটিয়ে কাঠের সিঁড়ি বেয়ে যখন শুভমরা হোটেলের ভিতরে ঢুকল, তখন নীলাঞ্জনের ঘড়িতে ঠিক কাঁটায়-কাঁটায় আটটা বাজে। দোতলায় নিজেদের ঘরে ঢুকে বিছানায় শুয়ে পড়ল দুজনেই। আর বাইরে যেতে ইচ্ছে হল না কারও। রাত ন'টা নাগাদ রুম সার্ভিস খাবার দিয়ে গেল। গরম-গরম মুরগির মাংস আর ভাত খেয়ে সেদিনের মতো লেপমুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ল দুজনে। নীলাঞ্জন বেড সুইচ টিপে ঘরের বাতিটা নিভিয়ে দিল। অন্ধকার ঘরে লেপের আরামে কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুম নেমে এল দুজনের চোখে।

ভোরবেলা দরজায় টোকা দেওয়ার শব্দে ঘুম ভেঙে গেল নীলাঞ্জনের। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সে দেখল, ঠিক সাতটা বাজে। কাল রাতে সে বেয়ারাকে বলে রেখেছিল, সাতটার সময় তাকে ডেকে দেওয়ার জন্য। নিশ্চয় সে-ই ডাকতে এসেছে। খাট থেকে নেমে দরজা খুলতেই নীলাঞ্জন দেখল, তার অনুমানই সত্যি। বেয়ারা তাকে দেখে বলল, 'গুড মর্নিং স্যার।'

নীলাঞ্জন বলল, 'মর্নিং।' এর পর বেয়ারাটা অন্য দিকে চলে গেল। নীলাঞ্জন দরজাটা বন্ধ করে কাচের জানলার সামনে গিয়ে ভারী পরদাটা সরিয়ে দিল। সকালের নরম আলোয় ভরে গেল গোটা ঘর। পাইন বনের মাথার ওপর দিয়ে দূরে দেখা যাচ্ছে তুষারাবৃত হিমালয় পর্বতমালা। তার উঁচু চূড়াগুলো যেন ছুঁতে চাইছে মাথার ওপরের ঘন নীল আকাশ। ঠিক যেন এক টুকরো পিকচার পোস্ট কার্ড ভেসে উঠছে নীলাঞ্জনের চোখের সামনে। মিনিটদশেক সেই দৃশ্য উপভোগ করার পর নীলাঞ্জন ডাক দিল শুভমকে। লেপটা সরিয়ে চোখ ডলতে-ডলতে খাটের ওপর উঠে বসল শুভম। নীলাঞ্জন বলল, 'তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নিতে হবে শুভমবাবু, আটটার মধ্যে আমরা বেরিয়ে পড়ব।'

খাট থেকে নামতে-নামতে শুভম প্রশ্ন করল, 'আজ আমরা কোথায় যাব নীলাঞ্জনকাকু?'

নীলাঞ্জন বলল, 'আজ আমরা প্রথমে যাব রুমটেক গুম্ফা বা মনাস্ট্রি দেখতে। তারপর আবার দুপুরে হোটেলে ফিরে খাওয়া সেরে বেরিয়ে পড়ব পাহাড়ের মাথার উপর এনচে গুম্ফা দেখতে।'

আধ ঘণ্টার মধ্যেই স্নান সেরে গরম জামাকাপড় গায়ে দিয়ে তৈরি হয়ে নিল দুজনে। নীলাঞ্জন টেবিলের ওপর রাখা তার ক্যামেরাটা কাঁধে ঝুলিয়ে নিল। তারপর জ্যাকেটের ঢাউস পকেটে টেবিল থেকে নোটবুকটা নিয়ে ঢোকাতে যেতেই একটা কথা মনে পড়ে গেল তার। কাল রাতে গাড়ি থেকে নামার সময় নিজের ছোট কিট ব্যাগটা আর গাড়ি থেকে নামানো হয়নি। ভাগ্য ভালো, ক্যামেরা ও নোটবুকটা তার সঙ্গেই ছিল, আর দামি কোনও জিনিস ছিল না তার মধ্যে। থাকার মধ্যে ছিল গোটাকতক বিস্কুটের প্যাকেট, দুটো মিনারেল ওয়াটারের বোতল আর গাইড বুকটা। গাইড বুকটা নীলাঞ্জন হোটেলের সামনের বুক স্টল থেকে কিনেছিল, দরকার হলে সেখান থেকে আর-এক কপি কিনে নিতে পারবে সে। কিন্তু ক্যামেরা আর নোটবুকটা চলে গেলে সত্যিই তার বড় ক্ষতি হয়ে যেত।

ঘরের দরজায় তালা বন্ধ করে কাঠের সিঁড়ি বেয়ে এক তলায় নেমে এল নীলাঞ্জনরা। সিঁড়ির পাশেই ডাইনিং রুম। কাচের দরজা ঠেলে ডাইনিং রুমের ভিতরে ঢুকে একটা টেবিলের দু'পাশে মুখোমুখি বসল নীলাঞ্জন আর শুভম। মিনিট তিনেকের মধ্যেই টেবিলে এসে গেল প্লেটভরতি বাটার টোস্ট, চারটে করে হাফ-বয়েল ডিম, নীলাঞ্জনের জন্য এক কাপ চা আর শুভমের জন্য বড় এক গ্লাস দুধ। মিনিট পনেরো লাগল তাদের ব্রেকফাস্ট শেষ হতে। তার পর হাত-মুখ ধুয়ে বাইরে যাওয়ার জন্য রিসেপশনের পাশ দিয়ে যেতেই হঠাৎ ম্যানেজারবাবু হাঁক দিলেন, 'ও মশাই, শুনছেন?'

নীলাঞ্জন ঘুরে দাঁড়াল তার দিকে। ম্যানেজারবাবু বললেন, 'কাল গাড়িতে আপনি কিট ব্যাগটা ফেলে এসেছিলেন। রাত দশটা নাগাদ ড্রাইভার এসে ব্যাগটা ফেরত দিয়ে গিয়েছে। আপনারা ঘুমিয়ে পড়েছেন বলে তখন আর আপনাদের বিরক্ত করিনি। এই নিন আপনার ব্যাগ।' বলে নীল রঙের কিট ব্যাগটা কাউন্টার থেকে তিনি বাড়িয়ে দিলেন নীলাঞ্জনের দিকে। নীলাঞ্জন ব্যাগটা নিয়ে ধন্যবাদ জানাল তাঁকে। তারপর সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে হোটেলের বাইরে রাস্তায় এসে দাঁড়াল।

নীলাঞ্জনদের হোটেল থেকে বেশ কিছুটা নীচে ট্যাক্সিস্ট্যান্ড। এখানে ট্যাক্সি বলতে মারুতি ভ্যানকে বোঝায়। ঢালু পথ বেয়ে শুভমকে নিয়ে নীচের দিকে নামতে শুরু করল নীলাঞ্জন। সে মনে-মনে ভাবল, ট্যাক্সিস্ট্যান্ডে যদি কালকের গাড়িটাকে পাওয়া যায়, তা হলে ভালো হবে। কালকের ড্রাইভার খুব ভালো লোক ছিল। নইলে কষ্ট করে লামা আর ছেলেটিকে হাসপাতালে নিয়ে যেত না। আর, তার ব্যাগটাও হোটেলে ফেরত দিতে আসত না। কিন্তু কাল নীলাঞ্জন স্ট্যান্ড থেকে তার গাড়ি ভাড়া করেনি। চলন্ত গাড়িকে রাস্তায় হাঁক দিয়ে থামিয়েছিল। কাজেই তাকে স্ট্যান্ডে পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে নীলাঞ্জনের মনে সন্দেহ ছিল। কিন্তু শুভম আর নীলাঞ্জন ট্যাক্সিস্ট্যান্ডে পৌঁছতেই কালকের মাঝবয়সি ড্রাইভার তাদের দেখেই এগিয়ে এল। তারপর মিনিটখানেকের মধ্যেই তারা রওনা হল রুমটেক গুম্ফার দিকে।

গাড়িতে উঠবার কিছুক্ষণ পর একটা সিগারেট ধরিয়ে কিট ব্যাগের চেনটা খুলল নীলাঞ্জন। হ্যাঁ, ভিতরের সবকিছু ঠিকঠাকই আছে। কিন্তু এটা কী? এটা তো তার নয়! জিনিসটা ব্যাগের বাইরে বের করল নীলাঞ্জন। একটা জপযন্ত্র! ড্রাইভারকে নীলাঞ্জন জিগ্যেস করল, জপযন্ত্রটা সে ব্যাগের মধ্যে ঢুকিয়েছে কি না। সে জানাল, সে-ই ব্যাগের মধ্যে ঢুকিয়েছে সেটা। নীলাঞ্জনদের গাড়ি থেকে নামিয়ে দেওয়ার ঘণ্টাখানেক পর সে দেখতে পায়, গাড়ির পিছনের সিটে নীলাঞ্জনদের ব্যাগটা রয়ে গিয়েছে। আর ব্যাগটার পাশে সিটের ওপর পড়ে আছে জপযন্ত্রটাও। তাই সে সেটা নীলাঞ্জনদেরই মনে করে কিট ব্যাগের ভিতর ঢুকিয়ে ব্যাগটা হোটেলে দিয়ে এসেছিল।

জপযন্ত্রটা হাতে নিয়ে ভালো করে একবার দেখল নীলাঞ্জন। জিনিসটা যে বেশ পুরোনো, সে-বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। দৈর্ঘ্যে ইঞ্চি পনেরো হবে। কাঠের হাতলের মাথার ওপর বসানো গোল কৌটোটা সম্ভবত রুপোর বলেই মনে হল নীলাঞ্জনের। কৌটোর গায়ে নানা ধরনের নকশা আঁকা, আর তার মাঝে-মাঝে ছোট-ছোট সবুজ পাথর বসানো। জিনিসটার বেশ দাম হবে, মনে-মনে ভাবল নীলাঞ্জন। শুভম পাশে বসে দেখছিল নীলাঞ্জনের হাতের জপযন্ত্রটা। সে এবার বলল, 'নীলাঞ্জনকাকু, আমার হাতে একটু দাও না জিনিসটা!'

নীলাঞ্জন তার হাতে দিল জিনিসটা। সঙ্গে-সঙ্গে তার মনে পড়ল, কাল শুভমকে একটা জপযন্ত্র কিনে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ফেরার পথে ওই ঝামেলাটায় জড়িয়ে যাওয়ার জন্য আর কিনে দেওয়া হয়নি।

শুভম কয়েকবার ঘুরিয়ে দেখল জপযন্ত্রটা। যন্ত্রটা ঘোরালেই একটা মৃদু রিনিরিনি শব্দ বের হচ্ছে যন্ত্রটার ভিতর থেকে। জপযন্ত্রটা দেখতে-দেখতে শুভম বলল, 'জানো নীলাঞ্জনকাকু, কাল ছেলেটার হাতে যে পুঁটলিটা ছিল, তার মধ্যে একটা জপযন্ত্র ছিল।'

শুভমের কথা শুনে এবার ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে গেল নীলাঞ্জনের কাছে। কাল তা হলে নিশ্চয়ই ওই পুঁটলি থেকে সিটের মধ্যে পড়ে গিয়েছিল জপযন্ত্রটা। সঙ্গে-সঙ্গে সে গাড়ির মুখ হাসপাতালের দিকে ঘোরাতে বলল ড্রাইভারকে। নীলাঞ্জনের কথা শুনে ড্রাইভার একবার ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল নীলাঞ্জনের দিকে। হয়তো মনে-মনে সে ভাবল, ঝামেলাটা তো কালকেই মিটে গিয়েছে। তা হলে আজ আবার হাসপাতালে যাওয়া কেন! নীলাঞ্জনের কথা শুনে এর পর ড্রাইভার হাসপাতালের রাস্তা ধরল, আর মিনিটদশেক পরই নীলাঞ্জনরা এসে পৌঁছে গেল হাসপাতালের গেটের সামনে। শুভমের হাত থেকে জপযন্ত্রটা নিয়ে গাড়ি থেকে নামল নীলাঞ্জন। আর তার পিছনে-পিছনে নামল শুভম।

নীলাঞ্জন হাঁটতে লাগল হাসপাতালের গেটের দিকে। হাসপাতাল চত্বর বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। চারপাশে সুন্দর করে সাজিয়ে তোলা ফুলের বাগান। চারদিক এতটা সুন্দর যে, কাল রাতে বুঝতে পারেনি নীলাঞ্জন। তা ছাড়া কাল রাতে গাড়ি এসে থেমেছিল একেবারে হাসপাতালের দরজার সামনে। নীলাঞ্জনরা হাসপাতালের দরজার প্রায় কাছাকাছি চলে এসেছে, ঠিক এমন সময় গলায় স্টেথো ঝোলানো, সাদা অ্যাপ্রন গায়ে একজন ভিতর থেকে বেরিয়ে এলেন। নীলাঞ্জন তাঁকে চিনতে পারল। ভদ্রলোকের নাম ডাক্তার চৌধুরী। প্রায় কুড়ি বছর সিকিমে আছেন। কাল যখন তারা বৃদ্ধ লামাকে হাসপাতালে নিয়ে এসেছিল, তখন এই ডাক্তার চৌধুরীই ছিলেন আউটডোরের দায়িত্বে। সেই সূত্রে কাল মিনিটদশেক এই ভদ্রলোকের সঙ্গে কথাবার্তা হয়েছিল নীলাঞ্জনের। ভদ্রলোক বাঙালি বলে সামান্য পরিচয় বিনিময়ও হয়েছিল দুজনের মধ্যে। সম্ভবত, ভদ্রলোক নাইট ডিউটি সেরে বাইরে এলেন। চোখেমুখে কেমন একটা ক্লান্তির ছাপ। ভদ্রলোকের সঙ্গে চোখাচোখি হতেই নীলাঞ্জন বলল, 'গুড মর্নিং ডাক্তার চৌধুরী।'

ডাক্তার চৌধুরী দাঁড়িয়ে পড়লেন।

নীলাঞ্জন বলল, 'কালকের সেই লামার সঙ্গে আমি কি একটু দেখা করতে পারি?'

ডাঃ চৌধুরীর মুখের ভাব দেখে মনে হল, তিনি ধরতে পারলেন না নীলাঞ্জনের কথাটা। অবশ্য কয়েক মুহূর্ত পরই তিনি বুঝতে পারলেন নীলাঞ্জন কী বলছে। তিনি এবার বললেন, 'ও, আপনিই তো কাল রাতে নিয়ে এসেছিলেন লামা আর ছোট ছেলেটিকে। কিন্তু তাঁরা তো নেই, চলে গিয়েছেন।'

নীলাঞ্জন বলল, 'চলে গিয়েছেন!'

ডাঃ চৌধুরী বললেন, 'হ্যাঁ, চলে গিয়েছেন। বারোটা সেলাই হয়েছে পায়ে। আমরা রাখতে চেয়েছিলাম, তিনি থাকতে চাইলেন না। অসম্ভব মনের জোর মানুষটির।'

নীলাঞ্জন বলল, 'কিন্তু আমরা যখন তাঁকে আনলাম, তখন তিনি তো কোনও কথাই বলতে পারছিলেন না। প্রায় অচৈতন্য অবস্থায় ছিলেন!'

ডাঃ চৌধুরী বললেন, 'আপনারা রেখে যাওয়ার পর ওঁকে কয়েকটা ইনজেকশন দিই, সেলাইও করি। ঘণ্টাদুয়েকের মধ্যেই বেশ কিছুটা সুস্থ হয়ে ওঠেন। ওঁর ক্ষতটা প্রাথমিক অবস্থায় যতটা গুরুতর মনে হয়েছিল, ঠিক ততটা আসলে নয়। যদিও বারোটা সেলাই কম কথা নয়, তবে আঘাতটা প্রাণঘাতী ছিল না। আর পাহাড়ি মানুষদের সহ্যক্ষমতা এমনিতেই একটু বেশি হয়। জ্ঞান ফেরার পরই মানুষটি আর এক মুহূর্ত এখানে থাকতে চাইছিলেন না। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে-সঙ্গেই খোঁড়াতে-খোঁড়াতে চলে গেলেন।'

নীলাঞ্জন এবার প্রশ্ন করল, 'আচ্ছা, কোথায় গেলেন বলতে পারেন?'

ডাঃ চৌধুরী বললেন, 'তা বলতে পারব না। এখানে দীর্ঘদিন থাকার ফলে তিব্বতি ভাষাটা আমি কিছুটা বুঝি। কারণ, অনেক সময় স্থানীয় মনাস্ট্রি থেকে লামারা এখানে আসেন চিকিৎসা করাতে। লামা আর ছেলেটির কথাবার্তা শুনে মনে হল, তাঁরা তিব্বত থেকে এসেছেন। কারণ, ছেলেটিকে লামাটি একবার বলছিলেন, 'এখানে থেকে সময় নষ্ট করা যাবে না, কাজ শেষ করে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নিজেদের দেশে ফিরে যেতে হবে।' নিজেদের দেশ বলতে সাধারণত লামারা তিব্বতকেই বোঝান। আর-একটা কথা, ছেলেটিকে একবার আমি তার পরিচয় জিগ্যেস করেছিলাম। তাতে সে বলেছিল, সে নাকি স্রোঙচেন বংশের সন্তান। আরও কী একটা সে বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু বৃদ্ধটি তাকে ইশারায় থামিয়ে দেন। দেখুন, তাঁরা হয়তো তিব্বতের দিকে যাত্রা শুরু করেছেন। আচ্ছা আমি এখন চলি, নমস্কার।' এই বলে হাসতে-হাসতে, ঘাড় নাড়তে-নাড়তে ডাঃ চৌধুরী আবার হাঁটতে শুরু করলেন।

ডাঃ চৌধুরীর কথা শোনার পর অগত্যা গাড়িতে ফিরে এল নীলাঞ্জন আর শুভম। গাড়ি এবার চলতে শুরু করল রুমটেক মনাস্ট্রির দিকে। শুভম এবার নীলাঞ্জনকে প্রশ্ন করল, 'ডাক্তারবাবু যে স্রোঙচেন বংশের কথা বললেন, সেটা কী?'

নিজের গবেষণার কাজের সুবাদে এ-ব্যাপারে কিছুটা জানা আছে নীলাঞ্জনের। সে বলল, 'অনেক বছর আগে তিব্বতে এক রাজা রাজত্ব করতেন। তাঁর নাম ছিল স্রোঙচেন-সগেম-পো। ওই রাজার বংশধররা পরবর্তীকালে তাঁর নাম অনুসারে স্রোঙচেন বংশ বলে পরিচিত হয়েছিলেন। আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর আগে রাজা স্রোঙচেন-এর হাত ধরেই তিব্বতে বৌদ্ধ ধর্মের প্রসার হয়েছিল।'

নীলাঞ্জনের কথা শুনে শুভম চোখ বড়-বড় করে বলল, 'সে কী! দেড় হাজার বছর আগের সেই রাজবংশের ছেলেরা এখনও বেঁচে আছে!'

শুভমের কথা শুনে নীলাঞ্জন হেসে ফেলে বলল, 'দেড় হাজার বছর পর কোনও রাজার বংশধরদের বেঁচে থাকা অসম্ভব নয়, কিন্তু বংশপরিচয় প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব। হয়তো ছেলেটা কোনও প্রাচীন প্রবাদ শুনে থাকবে, তাই ওভাবে নিজের পরিচয় দিয়েছে।'

শুভম আবার প্রশ্ন করল, 'বংশপরিচয় প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয় কেন?'

নীলাঞ্জন তার উত্তরে ব্যাপারটা সহজ ভাষায় তাকে বোঝাতে লাগল। নানা কথা বলতে-বলতে এক সময় এসে উপস্থিত হল রুমটেক মনাস্ট্রির সামনে।

রুমটেক মনাস্ট্রি গ্যাংটকের সবচেয়ে বড় মনাস্ট্রি। ধর্মগুরু গিয়ালোয়া লাসান চেনপো এই মনাস্ট্রি নির্মাণ করেছিলেন তিব্বতে অবস্থিত কাগ্যেয়ু বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের সদর দপ্তরের অনুকরণে। রংচঙে এই মনাস্ট্রির ঠিক পিছনে সবুজ পাহাড়ের গা বেয়ে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে শ্রীনালন্দা ইনস্টিটিউট। নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুকরণে তৈরি এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সারা পৃথিবী থেকে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা আসেন অধ্যয়ন করতে। ওখানেই এক 'গে-শো' অর্থাৎ লেকচারারের সঙ্গে দেখা করার কথা নীলাঞ্জনের। তাঁর জন্য যে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে নীলাঞ্জন গবেষণার কাজ করছে, সেখানকার বিভাগীয় প্রধানের একটা চিঠিও এনেছে সঙ্গে করে। গে-শো'র সঙ্গে নীলাঞ্জনের পরিচয় না থাকলেও পত্রদাতার যোগাযোগ আছে। নীলাঞ্জনকে গে-শো'র বৌদ্ধ শিল্পকলার বিষয়ে কয়েকটি বই ও ফোটোকপি দেওয়ার কথা। এ-বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগীয় প্রধানের সঙ্গে ইতিপূর্বেই নীলাঞ্জনদের চিঠি মারফত কথাবার্তা পাকা হয়ে গিয়েছে। গে-শো'র দেওয়া কাগজপত্র নীলাঞ্জনের গবেষণার কাজে লাগবে।

গাড়ি থেকে শুভমকে নিয়ে নীলাঞ্জন যখন মনাস্ট্রির প্রবেশ দ্বারের সামনে নামল, তখনও জপযন্ত্রটা নীলাঞ্জনের হাতে। গাড়ি থেকে নেমেই শুভম বলল, 'নীলাঞ্জনকাকা, জপযন্ত্রটা আমার হাতে দাও না!'

নীলাঞ্জন জপযন্ত্রটা শুভমের হাতে দিয়ে বলল, 'সাবধানে রেখে দাও জিনিসটা, আমরা সিকিমে আরও চারদিন থাকব। যদি লামা আর ছোট ছেলেটির সঙ্গে রাস্তায় দেখা হয়ে যায়, তা হলে জিনিসটা ফেরত দিতে হবে। তোমাকে তো একটা জপযন্ত্র কিনেই দেব বলেছি।'

নীলাঞ্জন মনে-মনে ভেবে নিল, আগে মনাস্ট্রির ভিতরটা শুভমকে নিয়ে দেখে তারপর সে দেখা করতে যাবে গে-শো'র সঙ্গে। তাই শুভমকে নিয়ে সে ঢুকল মনাস্ট্রির সামনের পাথর বাঁধানো বিশাল চত্বরে। চত্বরের দু'পাশে লামাদের থাকার জন্য সার-সার ঘর। সকালের নরম আলো এসে পড়েছে চত্বরে। অনেক ছোট-ছোট শিক্ষার্থী লামা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসে আছে এখানে-ওখানে। আর কয়েকজন বয়স্ক লামা কাঠের বালতিতে জল নিয়ে পরিষ্কার করছে চারপাশ। চত্বরের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে একটা পাথরের স্তম্ভ। শুভম সেটা দেখে প্রশ্ন করল, 'ওটা কী?'

নীলাঞ্জন বলল, 'একে বলে 'চোর্তেন'। এর গায়ে মঠের স্থপতির নাম লেখা আছে।'

চত্বর পেরিয়ে শুভমরা প্রবেশ করল মনাস্ট্রির মধ্যে। বিশাল প্রার্থনাকক্ষে রাখা আছে শাক্যমুনি বুদ্ধের বিশাল মূর্তি। আর তার দু'পাশে রয়েছে সারিপুত্র ও মঙ্গলপুত্রের মূর্তি। এ ছাড়া সারা দেওয়াল জুড়ে রয়েছে এক হাজার ছোট-ছোট বুদ্ধমূর্তি। প্রার্থনাকক্ষের থাম আর সিলিং অপূর্ব কারুকার্যমণ্ডিত। সিলিং থেকে নীচের দিকে ঝুলছে সোনা-রুপো দিয়ে নকশা আঁকা নানারঙের কাপড় বা থাংকা। বুদ্ধমূর্তির সামনে জ্বলছে সার-সার ঘিয়ের প্রদীপ। মূর্তির সামনে একটা কাঠের স্তম্ভের গায়ে লম্বা হলুদ কাপড়ের ফালি বাঁধছে লামারা। নীলাঞ্জন শুভমকে বুঝিয়ে দিল, 'ওগুলোকে বলে 'ধাগা'। আমরা যেমন মন্দিরে মালা দিই, তেমনই ওরাও মূর্তির সামনে ধাগা চড়ায়।'

সবকিছু অবাক হয়ে দেখতে লাগল শুভম। এরপর ওরা উঠে গেল দোতলায়। সেখানে একই ঘরে রাখা আছে এই মঠের ষোলোজন প্রয়াত প্রধান বা কর্মপা'র কালো টুপি। নীলাঞ্জন একটা বইয়ে পড়েছে যে, বৌদ্ধরা বিশ্বাস করেন, এই টুপিগুলো দেখলে তাঁদের নাকি আর পুনর্জন্ম হয় না।

মনাস্ট্রি দেখতে-দেখতে প্রায় ঘণ্টাদেড়েক কেটে গেল। নীলাঞ্জন এর মধ্যে বেশ কিছু ছবি তুলল আর নোট নিল নিজের ডায়েরিতে। তারপর চলল শ্রীনালন্দা ইনস্টিটিউটে গে-শো'র সঙ্গে দেখা করতে। গে-শো'র নাম ডাবডি লামা। নালন্দা ইনস্টিটিউটের শিক্ষাব্যবস্থা আবাসিক। ইনস্টিটিউটের ঠিক সামনেই একদল লামা দাঁড়িয়ে ছিল। বয়সে তারা যুবক। হয়তো এখানকারই ছাত্র হবে। নীলাঞ্জন তাদের 'ডাবডি লামার সঙ্গে দেখা করতে চাই,' বলতেই তাদেরই একজন নীলাঞ্জনদের ইনস্টিটিউটের দোতলায় ডাবডি লামার ঘর পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে গেল। ডাবডি লামার বয়স বছর ষাটেক হবে। চোখে মোটা কাচের চশমা। একটা চেয়ারে বসে সামনের টেবিলে রাখা পুঁথির পাতা উলটে যাচ্ছিলেন তিনি। নীলাঞ্জনকে দেখে প্রথমে একটু আশ্চর্য হলেন। নীলাঞ্জন তার পরিচয় আর চিঠিটা দেওয়ার পর ইশারায় সামনে রাখা একটা চেয়ারে নীলাঞ্জনকে বসতে বললেন তিনি।

ভদ্রলোক খুব কম কথা বলেন। চিঠিটা পড়ার পর তিনি মিনিট তিনেক সৌজন্যমূলক কিছু কথা বললেন নীলাঞ্জনের সঙ্গে। তারপর টেবিল ছেড়ে উঠে গিয়ে ঘরের কোনায় রাখা একটা আলমারির ভিতর থেকে কাগজে মোড়া কিছু বইপত্র এনে নীলাঞ্জনের হাতে দিয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে বিদায় জানালেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই নীলাঞ্জন আর শুভম গাড়িতে চেপে বসল হোটেলে ফেরার জন্য।

দুপুরে খেয়েদেয়ে একটু বিশ্রাম করে বিকেলে নীলাঞ্জন আবার তৈরি হল বেরিয়ে পড়ার জন্য। নিজের গ্লাভস আর মাফলার কিট ব্যাগে ঢোকাতে-ঢোকাতে শুভমকে সে বলল, 'শুভম, তোমার গ্লাভসজোড়া সঙ্গে নাও, আর পশমের কানঢাকা টুপিটাও এই ব্যাগের মধ্যে ঢুকিয়ে নাও। সন্ধে নামলেই বাইরে খুব ঠান্ডা পড়বে।'

জানুয়ারি মাসের শেষ দিক। বেশ ঠান্ডা এখন এখানে। গত কাল রাতে হোটেলে ফেরার সময় বেশ শীত করছিল নীলাঞ্জনের। শুভম নীলাঞ্জনের কথামতো তার গ্লাভসজোড়া ঢুকিয়ে দিল ব্যাগে। খাটের ওপর পড়ে ছিল জপযন্ত্রটা। শুভম বলল, 'এটা আমি সঙ্গে নেব নীলাঞ্জনকাকু?'

নীলাঞ্জন বলল, 'নাও।'

হোটেলের ঘরে তালা দিয়ে এর পর নীচে নেমে এল শুভমরা। হোটেলের বাইরে বেরিয়ে শুভম দেখল, তাদের লাল রঙের মারুতিটা রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে। রুমটেক থেকে ফেরার সময় নীলাঞ্জনের সঙ্গে ড্রাইভারের কথা হয়ে গিয়েছে। গ্যাংটকে যে ক'টা দিন তারা থাকবে, সেই ক'দিন তারা এই গাড়িতেই বেড়াবে। শুভমকে দেখেই হাসল ড্রাইভার। শুভম এর মধ্যেই তার নাম জেনে গিয়েছে, বীরবাহাদুর ছেত্রী। শুভমদের হোটেলের ঠিক পিছন থেকে একটা সবুজ পাহাড় উঠেছে আকাশের দিকে। নীচ থেকে পাহাড়ের মাথার ওপরে একটা টাওয়ার দেখা যাচ্ছে। নীলাঞ্জন শুভমকে টাওয়ারটা দেখিয়ে বলল, 'ওই টেলিফোন টাওয়ারের ওখানে আমাদের এখন যেতে হবে। পাহাড়ের ওপর ওই টাওয়ারের কাছেই রয়েছে এনচে মনাস্ট্রি।'

গাড়ির সামনে এসে শুভম বলল, 'আমি সামনে বসব।'

নীলাঞ্জন বলল 'বসে পড়ো।'

গাড়ি তাদের নিয়ে পাকদণ্ডী বেয়ে ওপর দিকে উঠতে শুরু করল। আস্তে-আস্তে যত ওপরে উঠতে লাগল তারা, ততই ঘন হয়ে উঠতে লাগল রাস্তার পাশের মেপল আর পাইন গাছের জঙ্গল। রাস্তায় কোনও লোকজন নেই। মাঝে-মাঝে এক-একটা গাড়ি ওপর থেকে নেমে এসে শুভমদের গাড়ির পাশ দিয়ে আরও নীচের দিকে নেমে যাচ্ছে। গাড়িগুলোয় যারা বসে আছে, দেখেই বোঝা যাচ্ছে তারা টুরিস্ট। মনাস্ট্রি দেখে গ্যাংটক শহরের দিকে ফিরছে তারা। সেই গাড়ির মধ্যে বসে ছোট-ছোট ছেলেমেয়ে মাঝে-মাঝে হাত নাড়াচ্ছে শুভমকে দেখে। শুভমও হাত নাড়ছে। মিনিট কুড়ি পর এক সময় শুভমদের গাড়ি উঠে এল পাহাড়ের মাথায়। ড্রাইভার তাদের টেলিফোন টাওয়ারের সামনে এক জায়গায় নামিয়ে দিল। জায়গাটায় আরও গোটা দুই গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। এর পর আর গাড়ি যাওয়ার অনুমতি নেই। সেখান থেকে একটা পথ সামনের দিকে চলে গিয়েছে। আর, সেই পথের মুখে একটা গাছের গায়ে একটা সাইনবোর্ডে তীরচিহ্ন দিয়ে দিকনির্দেশ করে লেখা আছে, 'এনচে মনাস্ট্রি'।

নীলাঞ্জন শুভমকে নিয়ে সেই পথ ধরে হাঁটতে শুরু করল। দু'পাশে বড়-বড় গাছের জঙ্গল, তার মধ্য দিয়ে পায়ে-চলা রাস্তা আস্তে-আস্তে ওপর দিকে উঠে গিয়েছে। মিনিটদশেক সেই পথ ধরে চলার পর জঙ্গল এক সময় পাতলা হয়ে এল। তারপর নীলাঞ্জনরা উপস্থিত হল একটা খোলা জায়গায়। এবার তাদের চোখে পড়ল কিছুটা দূরে একটা উঁচুমতো জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে এনচে মনাস্ট্রি। তার চারদিকে বিরাট-বিরাট বাঁশের মাথায় উড়ছে নানারঙের লুংদার। মনাস্ট্রির এক দিকে পাইনের ঘন জঙ্গল, আর-এক দিকে অতলান্ত খাদ। যেদিকে খাদ, তার পাশ দিয়ে একটা পাথুরে রাস্তা গিয়ে উঠেছে মনাস্ট্রিতে। রাস্তার পাশে খাদের দিকটায় একটা ছোট প্রাচীরের গায়ে সার-সার হলুদ বর্ণের প্রার্থনাচক্র লাগানো আছে। হাত দিয়ে সেই প্রার্থনাচক্রগুলো ঘোরাতে-ঘোরাতে শুভমরা উঠে এল মনাস্ট্রির সামনের শানবাঁধানো প্রাঙ্গণে। সেখান থেকে চারদিক পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। কিছু দূরেই দাঁড়িয়ে আছে হিমালয় পর্বতশৃঙ্গ তার আপন গাম্ভীর্য নিয়ে। যেদিকেই চোখ যায়, শুধু পাহাড় আর পাহাড়। অনেক নীচে গ্যাংটক শহরের ঘরবাড়িগুলোকে দেখতে লাগছে ঠিক দেশলাই বাকসের মতো। চারপাশ নিস্তব্ধ, আর তারই মাঝে দাঁড়িয়ে প্যাগোডা আকৃতির এনচে মনাস্ট্রি। রুমটেক মনাস্ট্রির মতো এই মনাস্ট্রির চোখ ধাঁধানো জলুস নেই, তার পরিবর্তে আছে প্রাচীনত্বের গন্ধ।

নীলাঞ্জন শুভমকে বলল, 'এই এনচে গুম্ফা হল সিকিমের অন্যতম প্রাচীন গুম্ফা। এর বয়স দু'শো বছরেরও বেশি। নিয়েগমাপা সম্প্রদায়ের এক লামা, নাম দ্রুপ্তব কারপো এই গুম্ফা নির্মাণ করেছিলেন। কথা বলতে-বলতে শুভম আর নীলাঞ্জন ঢুকল মনাস্ট্রির ভিতরে। ভিতরটা বেশ অন্ধকার। বুদ্ধমূর্তির সামনে জ্বলছে সার-সার প্রদীপ। কয়েকজন লামা ধ্যানস্থ অবস্থায় বসে আছেন ঘরের এক কোনায়, অন্ধকারের মধ্যে। আর গোটাদশেক ছোট ছেলে নীচু গলায় একসঙ্গে সুর করে কী বলে চলেছে, আর মাথা ঝাঁকাচ্ছে। বুদ্ধমূর্তি ছাড়াও ঘরের মধ্যে রয়েছে ভয়ংকর দেখতে সব মূর্তি। দেখতে অনেকটা রাক্ষসের মতো। তাদের দিকে তাকিয়ে বেশ ভয় করছিল শুভমের। আছে বেশ কিছু হিন্দু দেবদেবীর মূর্তিও। একটা মূর্তি দেখে শুভম চিনতে পারল, সেটি ছিন্নমস্তার। বইয়ের পাতায় এর ছবি দেখেছে শুভম। নীলাঞ্জন শুভমকে নিয়ে প্রার্থনাকক্ষের চারদিকে ঘুরে-ঘুরে দেখতে লাগল। চারপাশে ছড়িয়ে আছে অদ্ভুত সব হস্তশিল্পের নিদর্শন। ছবি তুলতে পারলে ভালো হত। কিন্তু নীলাঞ্জন জানে, প্রার্থনাকক্ষের ভিতরে এই মঠগুলোয় কোনও কিছুর ছবি তোলা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। কিছুক্ষণ প্রার্থনাকক্ষের ভিতরে থাকার পর বাইরে বেরিয়ে এল নীলাঞ্জন। মঠের বাইরে এক জায়গায়, দেওয়ালের গায়ে বেশ কিছু রংচঙে ছবি আছে। ছবিগুলো জাতক কাহিনির। বৌদ্ধ শিল্পরীতিতে আঁকা। সেই দেওয়ালচিত্রগুলোর বেশ কিছু ছবি নিল সে। শুভম তার হাতের জপযন্ত্রটা ঘোরাতে-ঘোরাতে চার দিকের সবকিছু দেখতে লাগল। মনাস্ট্রির এক পাশে ছোট-ছোট নীচু ছাদওলা বেশ কয়েকটা কাঠের ঘর। তার সামনে কয়েকটি ছোট ছেলে পায়রাদের গম খাওয়াচ্ছে। শুভম তাদের দেখে নীলাঞ্জনকে প্রশ্ন করল, 'ওদের বাবা-মা নেই?'

নীলাঞ্জন উত্তর দিল, 'আছে। ওদের বাবা-মায়েরা ওদের এখানে রেখে গিয়েছেন ধর্মশিক্ষার জন্য।' নীলাঞ্জন একটা বইয়ে পড়েছে যে, অনেক বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী তাঁদের ছেলেদের শৈশবে এই এনচে মনাস্ট্রিতে পাঠান তন্ত্রশিক্ষার প্রাথমিক পাঠ নেওয়ার জন্য। বিশেষত, নিয়েগমাপা বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের কাছে এই এনচে মঠ তন্ত্রসাধনার অন্যতম পীঠস্থান বলে বিবেচিত হয়। নীলাঞ্জন আর শুভম ঘুরতে-ঘুরতে মনাস্ট্রির পিছন দিকে চলে এল। কয়েক হাত দূরেই শুরু হয়েছে দেবদারু আর পাইনের ঘন জঙ্গল। চারদিক অসম্ভব নিস্তব্ধ। মাঝে-মাঝে বাতাসে মড়মড় শব্দ উঠছে জঙ্গল থেকে।

জঙ্গল আর মনাস্ট্রির ঠিক মাঝখানে একফালি ফাঁকা জমির মধ্যে একটা বসবার পাথরের বেদি রয়েছে। নীলাঞ্জন শুভমকে নিয়ে বসল সেই বেদির ওপর। বেলা আস্তে-আস্তে পড়ে আসছে। মনাস্ট্রির মাথার ওপর আকাশের বুকে জেগে থাকা শৃঙ্গগুলো আস্তে-আস্তে লাল হতে শুরু করেছে। সেদিকে তাকিয়ে শুভম বলল, 'দ্যাখো, কী সুন্দর!'

নীলাঞ্জন বলল, 'হ্যাঁ, সত্যিই অপূর্ব!' তারপর শুভমকে প্রশ্ন করল, 'আচ্ছা, তোমার ওই পাহাড়ে উঠতে ইচ্ছে করে না?'

শুভম উত্তর দিল, 'করে। আমি যখন বড় হব, তখন ওই পাহাড়ে উঠব। তুমি ওই পাহাড়ের মাথায় উঠতে পারবে?'

নীলাঞ্জন বলল, 'না, ওর জন্য আলাদা ট্রেনিং নিতে হয়। অনেক মনের জোর আর সাহসের প্রয়োজন হয়।'

শুভম এবার জিগ্যেস করল, 'আচ্ছা, যাঁরা এখানে থাকেন, তাঁরা ওখানে ওঠেন?'

নীলাঞ্জন বলল, 'এ-ব্যাপারে তোমাকে একটা মজার কথা শোনাই। অধিকাংশ সিকিমের মানুষই কিন্তু পাহাড়ের মাথায় পা রাখেন না। কারণ, তাঁরা বিশ্বাস করেন, পাহাড়ের মাথায় অপদেবতারা বাস করে। পাহাড়ে উঠলে সেই সব অপদেবতার ঘুম ভেঙে যায়। তখন তারা রেগে গিয়ে বন্যা-ঝড়-বৃষ্টি-মহামারী ইত্যাদি দুর্যোগ নামিয়ে আনে। সাধারণত এই ভয়েই পাহাড়ের মাথায় সিকিমিজরা পা রাখেন না।'

একটু থামল নীলাঞ্জন, তারপর শুভমকে বলল, 'আর-একটা কথা বলি তোমাকে, এই এনচে মনাস্ট্রি যিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সেই লামা দ্রুপ্তব কারপো নাকি একজন বড় তান্ত্রিক ছিলেন। শোনা যায়, তিনি নাকি আকাশে উড়তে পারতেন। এখানকার লামারা বলেন যে, দ্রুপ্তব কারপো নাকি এখান থেকে উড়ে যেতেন ওই সব পর্বত শৃঙ্গের মাথায়।'

শুভম বলল, 'সত্যি-সত্যি তিনি উড়তে পারতেন?'

নীলাঞ্জন বলল, 'এখানকার লামারা অন্তত তাই বিশ্বাস করেন। চলো, এবার উঠি। একটু পরেই আস্তে-আস্তে সন্ধে নামতে শুরু করবে। এখন বেশ ঠান্ডা পড়তে শুরু করেছে।'

শুভম বলল, 'হ্যাঁ চলো।'

নীলাঞ্জন আর শুভম উঠে দাঁড়াল ফিরে যাওয়ার জন্য। ঠিক তখনই তাদের পিছন থেকে একটা প্রশ্ন ভেসে এল ইংরেজিতে, 'আপনারা কি টুরিস্ট?'

কথাটা কানে যেতেই চমকে পিছনে ফিরে তাকাল নীলাঞ্জন আর শুভম। তারা দেখল, তাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন মধ্যবয়সি মুণ্ডিতমস্তক এক লামা। গায়ে তাঁর লাল রঙের হাতকাটা একটা ছোট জামা। হাঁটুর কিছুটা নীচ পর্যন্ত ঢাকা লাল লুঙ্গির মতো পোশাক 'সারং'। পায়ে, গোড়ালির বেশ খানিকটা ওপর পর্যন্ত ওঠা চামড়ার কালো জুতো। সবচেয়ে বিস্ময়কর তাঁর গায়ের রং। একদম কালো, যা লামাদের মধ্যে দেখা যায় না। নীলাঞ্জন অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তাঁর দিকে। সেই লামা আবার প্রশ্ন করলেন, 'আপনারা কি টুরিস্ট?'

প্রাথমিক বিস্ময় কাটিয়ে উঠে নীলাঞ্জন এবার বলল, 'হ্যাঁ।'

লামা স্মিত হেসে বললেন, 'কিন্তু যেভাবে খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে আপনি মনাস্ট্রি দেখে বেড়াচ্ছেন, তাতে ঠিক সাধারণ টুরিস্ট বলে মনে হয় না আপনাকে! সাধারণ টুরিস্টরা রুমটেক, আর বড়জোর এই এনচে গুম্ফা দেখতে আসে। কিন্তু কাল আপনাকে আমি ফুদুং মনাস্ট্রিতে দেখেছি।'

নীলাঞ্জন তাঁর কথা শুনে বুঝল, তার উত্তরটা সম্পূর্ণ বিশ্বাস করেননি লামা। তাই সে এবার তার এখানে আসার উদ্দেশ্যটা খুলে বলল লামাকে, 'আসলে বৌদ্ধ শিল্পকলা নিয়ে আমি একটা গবেষণা করছি। আর সেই সূত্রেই মনাস্ট্রিগুলো দেখতে এসেছি আমি।'

নীলাঞ্জন তাঁকে এবার জিগ্যেস করল, 'আপনি কি এনচে গুম্ফাতেই থাকেন?'

লামা জবাব দিলেন, 'না। গ্যাংটক শহর থেকে উত্তর-পশ্চিম দিকে এগিয়ে গেলে 'কবি' নামে একটা জায়গা আছে। কবি থেকে আরও দশ মাইল উত্তরে এক গুম্ফায় আমি থাকি। লোকে আমাকে ডাকে 'কৃষ্ণলামা' বলে। সেটা অবশ্য আমার গায়ের রঙের জন্য। আসলে আমার জন্ম হয়েছিল সিংহলের এক বৌদ্ধ পরিবারে। তাই আমার গায়ের রং অন্য লামাদের মতো পীত বর্ণের নয়, ঘোর কৃষ্ণ বর্ণের।'

একথা বলার পর কৃষ্ণলামা নীলাঞ্জনকে প্রশ্ন করলেন, 'আপনি এখানে আর ক'দিন থাকবেন?'

নীলাঞ্জন জবাব দিল, 'দিনতিনেক। ফেনসং আর পেমিয়াংশি মনাস্ট্রিটাও দেখে যাওয়ার ইচ্ছে আছে। শুনেছি, ওই দুটো গুম্ফায় অসাধারণ কিছু দেওয়ালচিত্র আছে।'

শুভম এতক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে দুজনের কথাবার্তা শুনছিল। তার হাতে ধরা ছিল জপযন্ত্রটা। কৃষ্ণলামার উপস্থিতির কারণেই হোক, আর মনের খেয়ালেই হোক, সে ঘোরাতে লাগল জপযন্ত্রটা। লামা এবার তাকালেন তার দিকে। হঠাৎই যেন কৃষ্ণলামার চোখ কয়েক মুহূর্তের জন্য আটকে গেল শুভমের হাতে ধরা জপযন্ত্রের ওপর। কৃষ্ণলামা নীলাঞ্জনের দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে বললেন, 'যদি কিছু মনে না করেন, তা হলে আপনার খুদে সঙ্গীর হাতের জপযন্ত্রটা আমি কি একবার দেখতে পারি?'

নীলাঞ্জন বলল, 'অবশ্যই।'

শুভমের হাত থেকে জিনিসটা নিয়ে কৃষ্ণলামা বেশ কিছুক্ষণ মনোযোগ দিয়ে কী দেখলেন, তারপর আবার সেটা শুভমকে ফিরিয়ে দিলেন।

সন্ধে নামতে আর বেশি দেরি নেই, তাই নীলাঞ্জন কৃষ্ণলামার উদ্দেশে বলল, 'আমরা তা হলে চলি। আমাদের জন্য গাড়ি অপেক্ষা করে আছে। আপনার সঙ্গে পরিচিত হয়ে ভালো লাগল।'

কথাটা বলে নীলাঞ্জন হাতজোড় করে কৃষ্ণলামাকে নমস্কার করতে যাচ্ছিল, কিন্তু কৃষ্ণলামা তাকে কিছুটা অবাক করে দিয়ে বললেন, 'একটু দাঁড়ান, আপনার কাছে আমার একটা প্রস্তাব আছে।'

নীলাঞ্জন একটু থমকে গিয়ে বলল, 'কী প্রস্তাব?'

লামা এবার বললেন, 'আপনি এসেছেন বৌদ্ধ শিল্পকলা সম্বন্ধে জানতে। কিন্তু আমি জানি, আপনি এখনও পর্যন্ত মনাস্ট্রিগুলোয় যা দেখেছেন বা ভবিষ্যতে দেখবেন, তা বৌদ্ধ শিল্পকলার অতি সাধারণ নিদর্শন ছাড়া আর কিছুই নয়। আপনি নিশ্চয়ই জানেন যে, বৌদ্ধ শিল্পকলার মূল ভিত্তি হল নালন্দা ও বিক্রমশীলা মহাবিহারের শিল্পরীতি। ওই দুই জায়গা থেকেই তিব্বত ও অন্যান্য স্থানে ছড়িয়ে পড়েছিল বৌদ্ধ শিল্পকলা। পরবর্তীকালে অবশ্য বৌদ্ধ শিল্পকলা তার স্বাতন্ত্র্য হারায়। নষ্ট হয়ে যায় তার মৌলিকত্ব। কিছু-কিছু মনাস্ট্রিতে এখনও অবশ্য বৌদ্ধ শিল্পকলার গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের কিছু নিদর্শন রক্ষিত আছে। কিন্তু সেসব নিদর্শন মনাস্ট্রিগুলো চুরি যাওয়ার ভয়ে লোকচক্ষুর আড়ালে লুকিয়ে রাখে। কারণ, ওইসব অতি প্রাচীন বস্তুর দাম আন্তর্জাতিক বাজারে কোটি-কোটি টাকা। তাই লোকচক্ষুর সামনে এসব জিনিস বের করা হয় না। আমি যে মঠের মঠাধ্যক্ষ, সেই মঠেও বেশ কিছু প্রাচীন শিল্পকলার নিদর্শন আছে। আগামী পরশু তিব্বতি ক্যালেন্ডার বা লুনার ক্যালেন্ডারের দশম মাসের ঊনত্রিশতম দিন। ওই দিনে আমাদের মনাস্ট্রিতে ধর্মীয় উৎসব 'ছাম' বা মুখোশ নৃত্যের অনুষ্ঠান হয়। ওই দিন প্রতি বছর সকালে মাত্র এক দিনের জন্য মনাস্ট্রিতে রক্ষিত দুর্মূল্য সামগ্রীগুলো আমরা বাইরে বের করি কিছু সময়ের জন্য। আপনি যদি দু'দিনের জন্য আমার এখানে অতিথি হন, তা হলে ওসব সামগ্রী আমি আপনাকে দেখানোর ব্যবস্থা করে দিতে পারি। এমনকী, তাদের ছবিও আপনি তুলতে পারেন।'

কৃষ্ণলামার প্রস্তাব শুনে অবাক হয়ে গেল নীলাঞ্জন। প্রস্তাবটা যে নীলাঞ্জনের পক্ষে লোভনীয়, এ-বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু লামাই বা হঠাৎ নীলাঞ্জনকে এই সুযোগ করে দিতে চাইছেন কেন! নীলাঞ্জন সরাসরি প্রশ্ন করল লামাকে, 'একজন অপরিচিতকে আপনি সেসব দেখাবেন কেন?'

কৃষ্ণলামা হেসে বললেন, 'প্রথমত, আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে, আপনার দিক থেকে আমাদের মনাস্ট্রির ক্ষতির কোনও কারণ নেই, অর্থাৎ আপনি নিশ্চয়ই ওই দুর্মূল্য বস্তুগুলো চুরি করার চেষ্টা করবেন না। দ্বিতীয়ত, আপনি বৌদ্ধ শিল্পকলার বিষয়ে গবেষণা করছেন, এটা একজন বৌদ্ধ হিসেবে অত্যন্ত আনন্দের বিষয়। আর তৃতীয়ত, আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে, আপনি নিশ্চয়ই বাঙালি। বাঙালিদের আমি শ্রদ্ধা করি। কারণ, তিব্বতে বৌদ্ধধর্মের বিকাশের ক্ষেত্রে অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান যেমন বড় ভূমিকা পালন করেছিলেন, তেমনই বৌদ্ধধর্মে তন্ত্রের অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছিলেন একজন বাঙালি। তাঁর নাম, লামা-তারানাথ বা তারানাথ তান্ত্রিক। আপনি নিশ্চয়ই শুনেছেন তাঁর নাম। আজ থেকে বহু বছর আগে সাধনার উচ্চমার্গে পৌঁছনোর যে পথ লামা-তারানাথ দেখিয়েছিলেন, আমরা আজও সেই পথ অনুসরণ করি। তাই বাঙালিদের আমি শ্রদ্ধার চোখে দেখি।'

লামার কথা শোনার পর নীলাঞ্জন শেষ পর্যন্ত মত দিল তাঁর প্রস্তাবে। কারণ, তাতে নীলাঞ্জনের লাভই হবে কাজের ক্ষেত্রে। লামার চেহারাটা একটু অন্যরকম হলেও তাঁকে খারাপ লোক বলে মনে হচ্ছে না। কীভাবে কৃষ্ণলামার গুম্ফায় যেতে হবে, তা লামার কাছ থেকে বুঝে নিল নীলাঞ্জন। ঠিক হল, কাল দুপুরবেলা কবি ছাড়িয়ে একটা জায়গায় থাকবে নীলাঞ্জনরা। সেখানে কৃষ্ণলামা তাদের জন্য অপেক্ষা করবেন। সেখান থেকে কৃষ্ণলামা তাদের নিয়ে যাবেন তাঁর গুম্ফায়। সেখানে দু'রাত কাটিয়ে নীলাঞ্জনরা ফিরে আসবে গ্যাংটকে। অবশ্য তার পরের দিনই নিউ জলপাইগুড়ি হয়ে সন্ধেবেলায় কলকাতা ফেরার ট্রেন ধরতে হবে।

কৃষ্ণলামার সঙ্গে কথা বলতে-বলতে বেশ কিছুটা সময় লাগল। সন্ধে প্রায় হয়ে এসেছে। নীলাঞ্জন কৃষ্ণলামাকে তার গাড়িতে গ্যাংটক শহর অবধি পৌঁছে দেওয়ার কথা বলল। কিন্তু তার প্রস্তাবে রাজি হলেন না লামা। নীলাঞ্জনদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে তিনি অন্ধকার জঙ্গলের দিকে এগিয়ে গেলেন। হয়তো তার ভিতর দিয়ে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নীচে নামার কোনও রাস্তা আছে। আর, নীলাঞ্জনরা যে রাস্তা দিয়ে এসেছিল সেই রাস্তাতেই ফিরে চলল গাড়ির দিকে।

গ্যাংটক থেকে কবির উদ্দেশ্যে নীলাঞ্জনরা যখন রওনা হল, তখন বেলা একটা বাজে। শুভম বসেছে ড্রাইভারের পাশে, আর নীলাঞ্জন বসেছে পিছনের সিটে। শুভম তার হাতের জপযন্ত্রটা ঘোরাতে-ঘোরাতে চার পাশ দেখতে-দেখতে চলেছে। নীলাঞ্জন একটা জিনিস লক্ষ করছে, জপযন্ত্রটা হাতে পাওয়ার পর থেকে শুভম কিছুতেই আর সেটাকে হাতছাড়া করছে না। কিন্তু জিনিসটা তো আসলে অন্যের, তাই মনের মধ্যে কেমন একটা সঙ্কোচ বোধ হচ্ছে নীলাঞ্জনের। হয়তো লামা আর সেই ছেলেটি ওই জপযন্ত্রটার জন্য তাদের খুঁজে বেড়াচ্ছেন। গাড়ির ড্রাইভার কাল একটা অদ্ভুত কথা বলছিল এই জপযন্ত্রটার ব্যাপারে। সে বলছিল, নীলাঞ্জনদের নাকি ফেলে দেওয়া উচিত জিনিসটা। কারণ, এই সব জপযন্ত্রে নাকি লামারা তুকতাক করে রাখেন। কাজেই এই জপযন্ত্র অন্য কেউ সঙ্গে রাখলে নাকি তার ক্ষতি হতে পারে। শুভমকে জপযন্ত্রটা ঘোরাতে দেখে হঠাৎ কালকের ড্রাইভারের কথাটা মনে পড়ে গেল নীলাঞ্জনের। অবশ্য নীলাঞ্জন কথাটা বিশ্বাস করেনি। কারণ, পাহাড়ি লোকদের মনে নানা ধরনের কুসংস্কার কাজ করে।

গ্যাংটক শহর ছাড়িয়ে আস্তে-আস্তে ওপর দিকে উঠতে শুরু করল নীলাঞ্জনদের গাড়ি। শুভম হঠাৎ প্রশ্ন করল, 'আচ্ছা, কবিতে দেখার কিছু নেই?'

নীলাঞ্জন বলল, 'আছে, তবে তা দেখতে হলে আমাদের দেরি হয়ে যাবে। তাই কবিতে আমরা দাঁড়াব না।'

শুভম আবার প্রশ্ন করল, 'কবিতে কী আছে?'

নীলাঞ্জনের গাইড বুকের এক জায়গায় কবি সম্বন্ধে কিছু উল্লেখ আছে। নীলাঞ্জন পড়েছে সেটা। সে শুভমকে বলল, 'কবি একটা ঐতিহাসিক স্থান। আজ থেকে দু'শো বছর আগে কবিতে লেপচা প্রধান তে-কুং-তেক ও ভুটান রাজ খে-বুম-সার-এর মধ্যে দীর্ঘ লড়াইয়ের শেষে সন্ধিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। গভীর জঙ্গলের মধ্যে এক পাথরের গায়ে সেই সন্ধিচুক্তি খোদাই করা আছে। অনেকে ট্রেকিং করে সেই জায়গাটা দেখতে যায়।'

গ্যাংটক থেকে কবি বেশি দূরে নয়। এক ঘণ্টার মধ্যেই নীলাঞ্জনরা পৌঁছে গেল কবিতে। নীলাঞ্জন বুঝতে পারল, গ্যাংটক ছাড়িয়ে বেশ খানিকটা ওপরে উঠে এসেছে তারা। যে রাস্তা দিয়ে তারা এতক্ষণ ওপর দিকে উঠে এল, অনেক নীচে সেই রাস্তারই বাঁকগুলোকে ওপর থেকে এখন দেখতে পাচ্ছে তারা। নীলাঞ্জনদের চারপাশে শুধু পাহাড় আর পাহাড়। আর, সেই পাহাড়ের গায়ে ওক, পাইন, রডোডেনড্রনের জঙ্গল। জায়গাটা খুব ঠান্ডাও। একটা বাঁকের কাছে এসে ড্রাইভার গাড়িটা থামিয়ে দিল। রাস্তা এবার দু'দিকে ভাগ হয়ে গিয়েছে। পিচের রাস্তা সোজা চলে গিয়েছে ফেনসং-এর দিকে। আর-একটা সরু পাথুরে রাস্তা ডানদিক দিয়ে নেমে গিয়েছে নীচের দিকে। কোনওমতে একটা গাড়ি যেতে পারে সেই রাস্তা দিয়ে। সম্ভবত, সেটা পায়ে চলারই রাস্তা। গাড়িটা থামিয়ে ড্রাইভার পিছনে বসে থাকা নীলাঞ্জনের দিকে তাকাল। নীলাঞ্জন তাকে ডান দিকের রাস্তাটা ধরতে বলল।

ড্রাইভার ধীরে-ধীরে সেই রাস্তা ধরে নীচের দিকে নামতে শুরু করল। রাস্তার এক দিকে পাহাড়, আর-এক দিকে গভীর খাদ। মিনিটদশেক চলার পর তারা আবার ওপর দিকে উঠতে শুরু করল। নীলাঞ্জন মনে-মনে ভাবছিল, এখন যদি উলটো দিক থেকে একটা গাড়ি আসে, তা হলে কী হবে! রাস্তা এত সঙ্কীর্ণ, যে-কোনও একটা গাড়িকে পিছু হঠতে হবে। অবশ্য সে সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। কারণ, এই রাস্তায় গাড়ি তো দূরের কথা, একটা মানুষ পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না। আরও প্রায় আধঘণ্টা চলার পর নীলাঞ্জনরা উঠে এল উঁচুমতো একটা ফাঁকা জায়গায়। সেখান থেকে একটা সুঁড়িপথ নেমে গিয়েছে জঙ্গলের মধ্যে। তবে সেই রাস্তায় গাড়ি থাকে না। কৃষ্ণলামার এখানেই নীলাঞ্জনদের নিতে আসার কথা। ড্রাইভার এখানটায় এসে আগে গাড়ির মুখটা ঘুরিয়ে নিল।

গাড়ি থামতেই নীচে নামল নীলাঞ্জন। বাইরেটা খুব ঠান্ডা। গাড়ির কাচ বন্ধ থাকায় এতক্ষণ তা বুঝতে পারেনি নীলাঞ্জন। মাফলারটা দিয়ে কানের কাছটা ভালো করে ঢেকে নিল সে। শুভম আর ড্রাইভারও নীচে নামল। শুভম এসে দাঁড়াল নীলাঞ্জনের পাশে। জায়গাটার চারপাশ ভালো করে দেখতে লাগল নীলাঞ্জন। আশপাশে কেউ কোথাও নেই। জঙ্গলের দিক থেকে শুধু ঝিঁঝিপোকার একটানা শব্দ ভেসে আসছে। আর, মাঝে-মাঝে ঠান্ডা বাতাসের ঝাপটা হাড় পর্যন্ত কাঁপুনি ধরিয়ে দিচ্ছে। সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে-থাকতে মিনিটদশেক কেটে গেল, কিন্তু কৃষ্ণলামার দেখা নেই! নীলাঞ্জন ভাবল, লোকটা ভাঁওতা দেয়নি তো তাকে! আবার তার পরমুহূর্তেই তার মনে হল, তাকে ভাঁওতা দিয়ে কী লাভ কৃষ্ণলামার? দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে এসব কথা চিন্তা করতে লাগল নীলাঞ্জন। ড্রাইভার ততক্ষণে গাড়ি থেকে নেমে গাড়ির পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল। এবার সে এসে দাঁড়াল নীলাঞ্জনের সামনে। তারপর নীলাঞ্জনকে হিন্দিতে বলল, 'আপনার লোক তো কোথাও দেখতে পাচ্ছি না! যার নিতে আসার কথা তার নাম কী?'

নীলাঞ্জন উত্তর দিল, 'তাঁর নাম কৃষ্ণলামা।'

কথাটা শুনে বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল ড্রাইভার। তারপর নীলাঞ্জনকে বলল, 'একটা কথা বলি, আপনি বরং ফিরে চলুন। এ জায়গাটা ভালো নয়। তা ছাড়া...।'

সে কথাটা শেষ না করায় নীলাঞ্জন বলল, 'তা ছাড়া কী?'

লোকটা কী যেন উত্তর দিতে যাচ্ছিল, কিন্তু হঠাৎ নীলাঞ্জনের পিছন দিকে তাকিয়ে লোকটার মুখ কেমন ফ্যাকাসে হয়ে গেল। তার দৃষ্টি অনুসরণ করে নীলাঞ্জন দেখল, যে জায়গাটা দিয়ে সুঁড়িপথ নেমে গিয়েছে জঙ্গলের ভিতর, ঠিক তার মুখে দাঁড়িয়ে আছেন কৃষ্ণলামা। নীলাঞ্জনের সঙ্গে চোখাচোখি হতেই তিনি এগিয়ে এলেন তার সামনে। তারপর ইংরাজিতে বললেন, 'আমি দুঃখিত, আমার আসতে একটু দেরি হয়ে গেল। আপনাদের জিনিসপত্র কোথায়?'

নীলাঞ্জন ড্রাইভারকে ইশারা করল ডিকি থেকে জিনিসপত্র নামানোর জন্য। ড্রাইভার যেন তার নির্দেশের প্রতীক্ষাতেই ছিল। সে দ্রুত গাড়ির ডিকি খুলে নীলাঞ্জনদের সুটকেস দুটো নামিয়ে দিল। তারপর এক লাফে ড্রাইভারের সিটে বসে এমনভাবে গাড়িটা স্টার্ট দিয়ে বেরিয়ে গেল যে, নীলাঞ্জনের মনে হল, কৃষ্ণলামা উপস্থিত হওয়ার পর তার আর এখানে এক মুহূর্ত থাকার ইচ্ছে ছিল না। সে যেন পালিয়ে গেল। গাড়িটা বেরিয়ে যাওয়ার পর কৃষ্ণলামা বললেন, 'তা হলে এবার যাওয়ার ব্যবস্থা করা যাক।'

কথাটা বলে তিনি মুখ দিয়ে একটা শব্দ করলেন আর তার সঙ্গে-সঙ্গে সেই সুঁড়িপথ বেয়ে জঙ্গলের আড়াল থেকে ওপরে উঠে এলেন খচ্চরের পিঠে বসা একজন লামা ও তাঁর পিছন-পিছন গোটাচারেক খচ্চর। তাঁরা এসে দাঁড়ালেন নীলাঞ্জনদের সামনে। কাছে আসার পর নীলাঞ্জন বুঝতে পারল, লামাটি একজন বামন অবতার বিশেষ। আর তাঁকে জড়িয়ে খচ্চরের পিঠে বসে আছে একটা লালমুখো হৃষ্টপুষ্ট পাহাড়ি বাঁদর। শুভম আর নীলাঞ্জন দুজনেই অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল সেই অদ্ভুতদর্শন লামা আর তাঁর পোষা প্রাণীটির দিকে। তাঁরা এসে নীলাঞ্জনদের কাছে দাঁড়ানোর পর কৃষ্ণলামা দুর্বোধ ভাষায় কী একটা বললেন বামনলামাকে। সঙ্গে-সঙ্গে তিনি বাঁদরটাকে কাঁধে নিয়ে তড়াক করে লাফিয়ে নামলেন খচ্চরের পিঠ থেকে। তারপর নীলাঞ্জনদের সুটকেস দুটো নিয়ে একটা খচ্চরের পিঠের দু'পাশে দড়ি বেঁধে ঝুলিয়ে দিলেন। নীলাঞ্জন কৃষ্ণলামাকে প্রশ্ন করল, 'আমাদেরও খচ্চরের পিঠে বসে যেতে হবে না কি?'

কৃষ্ণলামা বললেন, 'হ্যাঁ, আমরা এবার যে পথে যাব, সেই পথে বাহন বলতে এই প্রাণীগুলোই। পায়ে হেঁটে হয়তো সেখানে যাওয়া যায়, কিন্তু আপনারা সেই পথে চড়াই-উতরাই ভেঙে হাঁটতে পারবেন না। তাই এই ব্যবস্থা।'

শুভমের কথাটা শুনে দারুণ লাগল। এর আগে সে একবার বাবার সঙ্গে ফোর্ট উইলিয়ামের সামনের মাঠে ঘোড়ার পিঠে চেপেছে। গাধার চেয়ে একটু বড় আর ঘোড়ার চেয়ে ছোট এই প্রাণীগুলোর পিঠে সে কোনওদিন চাপেনি। ফিরে গিয়ে সে এবার তার বন্ধুদের এই আজব প্রাণীর পিঠে চাপার গল্প করতে পারবে। বামনলামা এবার দুটো খচ্চরের গলার দড়ি ধরে এসে দাঁড়ালেন নীলাঞ্জনদের সামনে। কৃষ্ণলামা এবার নীলাঞ্জনকে বললেন, 'উঠে পড়ুন, ভয়ের কিছু নেই। শুধু দড়িটা শক্ত করে ধরে থাকবেন।'

খচ্চরগুলোর পিঠে একটা করে কাপড়ের গদি ঝোলানো আছে। কৃষ্ণলামা প্রথমে শুভমকে মাটি থেকে দু'হাত দিয়ে তুলে বসিয়ে দিলেন একটা প্রাণীর পিঠে। নীলাঞ্জনও চড়ে বসল একটার পিঠে। তারা দুজন চড়ে বসার পর কৃষ্ণলামা আর বামনলামাও চড়ে বসলেন দুটো খচ্চরের পিঠে। নীলাঞ্জন দেখল কৃষ্ণলামা এত লম্বা যে, তাঁর পা মাটিতে ঠেকে যাচ্ছে। জঙ্গলের মধ্যে সুঁড়িপথ বেয়ে প্রথমে নামতে শুরু করলেন তাঁরা। প্রথমে চলেছেন কৃষ্ণলামা, তারপর শুভম, তারপর নীলাঞ্জন। নীলাঞ্জনের ঠিক পিছনেই ভারবাহী খচ্চরটা, আর সব শেষে সেই বামনলামা আর তাঁর বাঁদরটা। কখনও উঁচু, কখনও নীচু পথ বেয়ে এঁকেবেঁকে চলতে লাগলেন তাঁরা। পথ খুব সঙ্কীর্ণ, পথের একপাশে খাদ, আর মাঝে-মাঝে ঘন বাঁশের জঙ্গল। আর, সারা পথ জুড়ে ঝিঁঝিপোকার অবিশ্রান্ত ডাক। পৃথিবীর সব ঝিঁঝিপোকা যেন আশ্রয় নিয়েছে পথের এই ঝোপঝাড়ে। শুভম মনের আনন্দে তার হাতের জপযন্ত্রটা ঘোরাতে-ঘোরাতে দু'পাশ দেখতে-দেখতে চলেছে। হঠাৎ শুভম বলে উঠল, 'কাকু, ওই দ্যাখো!'

নীলাঞ্জন তাকিয়ে দেখল, খাদের ওপাশের পাহাড়টার গা বেয়ে নীচের দিকে নেমে চলেছে একটা ঝরনা। সেটা এত সুন্দর যে, মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতে হয় তার দিকে। নীলাঞ্জন মনে-মনে ভাবল যে, এই পথে না এলে কোনও দিন দেখা হত না এই আশ্চর্য সুন্দর জিনিসটা। নীলাঞ্জনরা যাতে ঝরনাটা ভালো করে দেখতে পারে, তার জন্য দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন কৃষ্ণলামা। সেখানে মিনিটতিনেক দাঁড়ানোর পর তিনি আবার চলতে শুরু করলেন। প্রায় এক ঘণ্টা চলার পর হঠাৎ একটা গুমগুম শব্দ শুনতে পেল নীলাঞ্জনরা।

কৃষ্ণলামা এবার ঘাড় ঘুরিয়ে নীলাঞ্জনের উদ্দেশে বললেন, 'আমরা গুম্ফার কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছি।'

একটু এগিয়েই নীলাঞ্জনরা একটা খাড়া পথ বেয়ে ওপর দিকে উঠতে শুরু করল। সেই পথ বেয়ে বেশ অনেকটা ওপরে উঠে এক সময় তাঁরা পৌঁছে গেলেন তিন দিক খোলা একটা বিরাট চত্বরে। তার এক দিকে পাহাড়ের ঢালের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে প্যাগোডা ধাঁচের বিরাট এক দ্বিতল গুম্ফা। গুম্ফার দু'পাশে খাদের ধার ঘেঁষে সার-সার কাঠের ঘর। আর সেগুলোর মাথার ওপর লম্বা-লম্বা বাঁশের মাথায় উড়ছে বিবর্ণ হয়ে যাওয়া লুংদার। কাঠের ঘরগুলোর সামনে বসেছিলেন একদল নানাবয়সি লামা।

নীলাঞ্জনরা মনাস্ট্রির সামনের চত্বরে উপস্থিত হতেই তাঁরা যে যেখানে ছিলেন, উঠে দাঁড়ালেন। তারপর সার বেঁধে দাঁড়িয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে অভিবাদন জানালেন কৃষ্ণলামার উদ্দেশে। তাঁদের দিকে তাকিয়ে একবার মাথা ঝুঁকিয়ে নীলাঞ্জনদের নিয়ে কৃষ্ণলামা আর-একটু এগিয়ে গিয়ে থামলেন একেবারে গুম্ফার প্রবেশদ্বারের সামনে। প্রথমে কৃষ্ণলামা নামলেন খচ্চরের পিঠ থেকে। তারপর একে-একে নামল শুভম আর নীলাঞ্জন। নীলাঞ্জন একবার ভালো করে তাকাল মনাস্ট্রির দিকে। মনাস্ট্রিটা যে অনেক দিন আগে তৈরি হয়েছিল, তা বুঝতে কোনও অসুবিধে হল না নীলাঞ্জনের। তার দেওয়ালে আঁকা ছবিগুলো সব ঝাপসা হয়ে গিয়েছে। প্রবেশদ্বারের মাথার ওপর লাগানো অপদেবতাদের ভয়ংকর মুখগুলো ভেঙে ঝুলে পড়েছে নীচের দিকে। চারদিকে কেমন যেন একটা গা ছমছমে পরিবেশ।

কৃষ্ণলামা এবার নীলাঞ্জনের সামনে এসে দাঁড়ালেন, তারপর মাথা ঝুঁকিয়ে অভিবাদন জানিয়ে বললেন, 'কৃষ্ণলামা তার গুম্ফায় আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছে।' তারপর তাঁর পিছন-পিছন আসার জন্য ইশারা করলেন। গুম্ফাটাকে বেড় দিয়ে তিনি নীলাঞ্জনদের নিয়ে উপস্থিত হলেন গুম্ফার ঠিক পিছনের লাগোয়া একটা ঘরের সামনে। ঘরের দরজাটা ভেজানোই ছিল, কৃষ্ণলামার সঙ্গে নীলাঞ্জনরা ঘরের ভিতরে ঢুকল। ঘরটা বেশ বড়। মেঝে আর দেওয়ালগুলো কাঠের। ঘরের ঠিক পিছন দিকে নেমে গিয়েছে অতল খাদ, আর তার ঢালে পাইন গাছের জঙ্গল। ঘরের এদিকটায় একটা জানলা আছে, তবে তার কোনও গরাদ নেই। হয়তো খাদের দিক থেকে কেউ ঘরে ঢুকতে পারবে না, তাই গরাদের কোনও প্রয়োজন নেই। ঘরের ঠিক মাঝখানে রয়েছে শাল কাঠের গুঁড়ি দিয়ে তৈরি বিশাল একটা খাট, তার ওপর সুন্দর বিছানা পাতা।

কৃষ্ণলামা বললেন, 'আপাতত আপনারা এখানে একটু বিশ্রাম নিন। একটু পরে আমি আপনাদের প্রার্থনাকক্ষের ভিতরে নিয়ে যাব।'

নীলাঞ্জন বলল, 'আচ্ছা।'

কৃষ্ণলামা এবার দরজা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেলেন। নীলাঞ্জন দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে খাটের ওপর সটান শুয়ে পড়ল, আর শুভম জপযন্ত্রটা হাতে নিয়ে গিয়ে দাঁড়াল খোলা জানলার সামনে। তারপর নীচের দিকে তাকিয়ে দেখতে লাগল। মিনিটপাঁচেক পর দরজায় ঠকঠক শব্দ হতেই নীলাঞ্জন আবার উঠে বসল খাটের ওপর। তারপর দরজাটা ফাঁক হয়ে গেল। দুজন লামা ঢুকলেন ঘরের ভিতর। তাঁদের এক জনের হাতে নীলাঞ্জনদের সুটকেস দুটো, আর-এক জনের হাতে বিরাট একটা বারকোশের উপর রাখা বড়-বড় চারটে কাঠের বাটি, তার মধ্যে থেকে ধোঁয়া উঠছে। সুটকেস দুটো ঘরের কোণায় আর বারকোশটা খাটের ওপর রেখে লামা দুজন আবার দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে চলে গেলেন। নীলাঞ্জন দেখল, বারকোশের ওপর দুটো বাটিতে রাখা আছে জল। আর দুটোয় রাখা আছে সুজির মণ্ডর মতো কী খাবার। বারকোশের ওপর দুটো চামচও রাখা ছিল। তা দিয়ে সেই গরম মণ্ডটা মুখে দিয়ে নীলাঞ্জন দেখল, স্বাদটা অনেকটা মাখনের মতো। শুভমও এসে খাবারটা মুখে দিয়ে দেখল, খেতে মন্দ লাগল না। নীলাঞ্জন আর শুভম দুজনেই খাবারটা খেয়ে শেষ করল। শুভম জিগ্যেস করল, 'কাকু, এই খাবারটার নাম কী?'

নীলাঞ্জন বলল, 'সম্ভবত এই খাবারটাকে তিব্বতিরা বলে 'চম্বা'। গম, যব ইত্যাদি পিষে তার সঙ্গে মাখন মিশিয়ে এই খাবার তৈরি করা হয়। ঠান্ডার দেশে এই চম্বা শরীর গরম রাখে।'

শুভম কথাটা মনে রাখার জন্য দু'বার মনে-মনে বলল, চম্বা...চম্বা...। খাওয়া শেষ হওয়ার একটু পরেই নীলাঞ্জনদের ঘরে উপস্থিত হলেন কৃষ্ণলামা। নীলাঞ্জন শুভমকে বলল, 'চলো শুভম, প্রার্থনাকক্ষটা দেখে আসি।'

শুভম বলল, 'তুমি যাও নীলাঞ্জনকাকু, আমার পা ব্যথা করছে। আমি এখানে শুয়ে থাকি।'

নীলাঞ্জন তাকাল শুভমের দিকে। নীলাঞ্জন আর শুভমের কথা বুঝতে না পারলেও মনে হয়, ব্যাপারটা আঁচ করতে পারলেন কৃষ্ণলামা। তিনি নীলাঞ্জনকে বললেন, 'ও মনে হয় যেতে চাইছে না, তাই না? ও যদি যেতে না চায়, তা হলে ভয়ের কোনও কারণ নেই। ওকে আপনি নিশ্চিন্তে এখানে রেখে যেতে পারেন। এই ঘরে কেউ আসবে না।'

কৃষ্ণলামার কথা শুনে নীলাঞ্জন শুভমের দিকে তাকিয়ে বলল, 'ঠিক আছে, তা হলে তুমি বিছানায় শুয়ে থাকো। আমি একটু পরেই আসছি।'

নীলাঞ্জন দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে কৃষ্ণলামার সঙ্গে প্রার্থনাকক্ষ দেখতে চলল।

নীলাঞ্জনরা ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর জুতো খুলে বেশ কিছুক্ষণ খাটের ওপর শুয়ে রইল শুভম। হঠাৎ কাঠের মেঝেয় ঠক করে একটা শব্দ হল। শুভম উঠে বসল খাটের ওপর। সে দেখল, মেঝেয় একটা খুব ছোট পাথরের টুকরো পড়ে আছে। কিন্তু সেটা এল কোথা থেকে! নিশ্চয়ই জানলা দিয়ে। এই ভেবে সে জানলাটার দিকে তাকাল। ঠিক সেই মুহূর্তেই জানলা দিয়ে আর-একটা পাথরের টুকরো এসে পড়ল ঘরের ভিতর। শুভম খাট থেকে নেমে ধীরে-ধীরে এসে দাঁড়াল জানলার সামনে। বাইরে তখন সন্ধে নেমে আসছে। আস্তে-আস্তে অন্ধকার নেমে আসছে খাদের ঢাল বেয়ে নেমে যাওয়া পাইনের জঙ্গলে। শুভম জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকাল। প্রথমে সে কিছুই দেখতে পেল না।

তারপর যেন নীচ থেকে হাততালি দেওয়ার একটা মৃদু শব্দ সে শুনতে পেল। শুভম তার শরীরটাকে জানলার বাইরে আর-একটু বের করে দিয়ে নীচের দিকে তাকাল। এবার সে দেখতে পেল তাকে। শুভম যে ঘরে আছে, ঠিক তার গা বেয়ে নীচের দিকে নেমে গিয়েছে জঙ্গলে ঢাকা খাদ। শুভমদের ঘর থেকে হাতপঁচিশেক নীচে খাদের গা থেকে একটা পাথর ঝুলন্ত টেবিলের মতো বাইরের দিকে বেরিয়ে আছে। তার ওপর দাঁড়িয়ে ছোট্ট একজন লামা তাকিয়ে আছে শুভমের দিকে।

শুভমের সঙ্গে তার চোখাচোখি হতেই সে হাত নেড়ে ইশারায় কী বলতে শুরু করল, আর মাঝে-মাঝে একটা হাত মাথার ওপর ঘোরাতে লাগল। শুভম বোঝার চেষ্টা করতে লাগল, তার বয়সি এই ছোট্ট লামাটি কী বলার চেষ্টা করছে! তার মনে হতে লাগল, সে যেন শুভমের কাছে কিছু চাইছে। আর এর পর হঠাৎই শুভম চিনে ফেলল তাকে। আরে, এ তো সেই ছেলেটি! এই ছেলেটিকে আর বৃদ্ধ লামাটিকে শুভমরা পৌঁছে দিয়েছিল হাসপাতালে! আর তার জপযন্ত্রটা রয়েছে শুভমের কাছে! মুহূর্তের মধ্যেই ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে গেল শুভমের কাছে। মাথার ওপর হাত ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে সে জপযন্ত্রটার কথাই বোঝানোর চেষ্টা করছে শুভমকে। সে সেটা ফেরত চাইছে শুভমের কাছ থেকে। খাটের ওপর পড়েছিল জপযন্ত্রটা। জানলা ছেড়ে শুভম এগিয়ে গেল খাটের ওপর থেকে জপযন্ত্রটা নেওয়ার জন্য। খাট থেকে জপযন্ত্রটা হাতে নেওয়ার সঙ্গে-সঙ্গেই ঘরের দরজাটা খুলে গেল। ঘরে ঢুকলেন কৃষ্ণলামা আর নীলাঞ্জন।

শুভম একটু থতোমতো খেয়ে তাঁদের দেখে দাঁড়িয়ে পড়ল খাটের পাশে। কী করবে বুঝতে না পেরে একবার জানলার দিকে তাকাল, আর-একবার তাকাল কৃষ্ণলামার দিকে। ভাবল, ব্যাপারটা সে এখনই বলে দেবে কি না নীলাঞ্জনকাকুকে। কারণ, নীলাঞ্জনকাকু বলেছে, সেই ছেলেটি আর বৃদ্ধটির সঙ্গে দেখা হলে জপযন্ত্রটা ফেরত দিয়ে দেবে তাঁদের। কিন্তু ঘরের মধ্যে কৃষ্ণলামার উপস্থিতির জন্য ছেলেটির কথাটা সে বলতে গিয়েও বলতে পারল না নীলাঞ্জনকে। শুভমকে জপযন্ত্রটা হাতে নিয়ে খাটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে নীলাঞ্জন বলল, 'কী, একলা ঘরে থাকতে ভয় করছিল না কি? এভাবে দাঁড়িয়ে আছ?'

শুভম ঘাড় নেড়ে উত্তর দিল, 'না।'

কৃষ্ণলামাও তাকিয়ে ছিলেন শুভমের দিকে, হঠাৎ তাঁর নজর পড়ল মেঝের ওপর পড়ে থাকা পাথরের টুকরো দুটোর ওপর। কৃষ্ণলামা মেঝের ওপর ঝুঁকে কুড়িয়ে নিলেন সে দুটো। শুভম দেখল, তাঁর ভুরু দুটো যেন হঠাৎ কুঁচকে গেল। পাথর দুটো কুড়িয়ে নিয়ে কৃষ্ণলামা গিয়ে দাঁড়ালেন জানলার কাছে, তারপর ভালো করে নীচের দিকে তাকিয়ে দেখতে লাগলেন। শুভমের মনে হল, কৃষ্ণলামা কিছু একটা সন্দেহ করেছেন। নীলাঞ্জন বসে পড়ল খাটের ওপর, আর শুভম তাকিয়ে রইল কৃষ্ণলামার দিকে। এই সময় ঘরে ঢুকল বামনাকৃতি সেই লামাটি। তাঁর হাতে বিরাট একটা জ্বলন্ত প্রদীপ। লামাটি ঘরে ঢোকার সঙ্গে-সঙ্গেই একটা অন্যরকম গন্ধে ভরে গেল ঘরটা।

শুভমের মনে পড়ল ফুদুং মনাস্ট্রির প্রার্থনাকক্ষের ভিতরেও এই গন্ধটা ছিল। সেখানেও এই রকম অনেক প্রদীপ জ্বলছিল। নীলাঞ্জনকাকু শুভমকে বলেছে যে, এই প্রদীপগুলোয় ঘিয়ের বদলে চর্বি ব্যবহার করা হয় বলে এরকম গন্ধ বের হয়। বামনলামা ঘরের এক কোনায় প্রদীপটা নামিয়ে রেখে যাওয়ার পর কৃষ্ণলামা জানলাটা আস্তে-আস্তে বন্ধ করে দিলেন। তারপর নীলাঞ্জনের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'ঠান্ডা পড়তে শুরু করবে এবার, তাই জানলাটা বন্ধ করে দিলাম। এখন আমি যাই, অনেক কাজ পড়ে আছে। ঠিক সময়ে আমার লোক এসে আপনাদের ডেকে নিয়ে যাবে।' এই বলে কৃষ্ণলামা ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন।

কৃষ্ণলামা যাওয়ার পর শুভম প্রথমে দরজাটা বন্ধ করে দিল। তারপর জানলার কাছে গিয়ে সেটা খুলে ফেলল। পাহাড়ের বুকে ঝপ করে সন্ধে নামে। শুভম জানলা দিয়ে নীচের দিকে তাকিয়ে দেখল, সেখানে আর কিছু দেখা যাচ্ছে না। অন্ধকার গ্রাস করে নিয়েছে সেই জায়গাটা। জানলা বন্ধ করে দিয়ে খাটের ওপর নীলাঞ্জনের পাশে গিয়ে বসে পড়ল শুভম। খাটের একপাশে একটা বিরাট পালকের তৈরি লেপ ভাঁজ করে রাখা ছিল। নীলাঞ্জন ততক্ষণে সেই লেপটা খুলে নিয়ে মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়েছে। শুভমও ঢুকে পড়ল তার ভিতর। তারপর বলল, 'জানো নীলাঞ্জনকাকু, সেই ছেলেটি না এসেছিল!'

নীলাঞ্জন শুভমের দিকে পাশ ফিরে শুয়ে বলল, 'কোন ছেলেটি?'

শুভম জবাব দিল, 'যে ছেলেটি সেদিন সেই বৃদ্ধ লামাটির সঙ্গে ছিল, যাঁদের জপযন্ত্রটা আমাদের কাছে আছে!'

শুভমের কথা শুনে নীলাঞ্জন অবাক হয়ে জিগ্যেস করল, 'কোথায়? কখন?'

শুভম এবার সব খুলে বলল নীলাঞ্জনকে। নীলাঞ্জন সব শুনে বলল, 'যাক, ভালোই হল। লামা আর ছেলেটি নিশ্চয়ই এখানেই থাকেন। জপযন্ত্রটা ফিরিয়ে দেওয়া যাবে তাঁদের। হয়তো তাঁরাও ওই জপযন্ত্রটার জন্য আমাদের খুঁজে বেড়াচ্ছিলেন। এখান থেকে গ্যাংটক ফিরে তোমাকে আমি আর-একটা জপযন্ত্র কিনে দেব।'

এরপর নীলাঞ্জন আর কিছু বলল না। শুভম লেপটা নিজের মাথা পর্যন্ত টেনে দিল। লেপটা হালকা হলেও খুব গরম। লেপের ভিতর খুব আরাম লাগল শুভমের। কিছুক্ষণের মধ্যেই শুভম ঘুমিয়ে পড়ল।

রাত আটটা নাগাদ দরজায় শব্দ পেয়ে ঘুম ভেঙে গেল নীলাঞ্জনের। ঘরের ভিতর প্রায় অন্ধকার বললেই চলে। চর্বির প্রদীপটার আয়ু শেষ হয়ে এসেছে। শুধু একটা ক্ষীণ শিখা তিরতির করে কাঁপতে-কাঁপতে মৃদু আলো ছড়াচ্ছে। নীলাঞ্জন দরজা খুলে দেখল, বামনলামা দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি ইশারায় নীলাঞ্জনকে জানালেন, কৃষ্ণলামা তাদের ডাকছেন। নীলাঞ্জন এবার ডেকে তুলল শুভমকে। তারপর মিনিটপাঁচেকের মধ্যেই জুতো পরে, কানে ভালো করে মাফলার জড়িয়ে নীলাঞ্জন আর শুভম ঘরের বাইরে বেরিয়ে এল।

বাইরে প্রচণ্ড ঠান্ডা পড়েছে, একদম হাড় পর্যন্ত কনকন করছে। বামনলামার পিছন-পিছন শুভম আর নীলাঞ্জন এসে ঢুকল গুম্ফার ভিতর। তাঁর বিশাল প্রার্থনাকক্ষের মধ্যে বেশ কয়েকটা প্রদীপ জ্বলছে। তার আভা ছড়িয়ে পড়েছে প্রার্থনাকক্ষের স্তম্ভগুলোর গায়ে খোদাই করা ভয়ংকর মূর্তিগুলোর ওপর। আলো ছায়ায় একটা থমথমে ভৌতিক পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে গুম্ফার মধ্যে। নীলাঞ্জন আর শুভম প্রার্থনাকক্ষের সামনে কয়েক মুহূর্ত দাঁড়াল মাত্র, তারপর বামনলামার সঙ্গে ঢুকল প্রার্থনাকক্ষের লাগোয়া একটা ঘরের মধ্যে। ঘরটা একেবারে অন্ধকার, কিছুই দেখা যাচ্ছে না।

ঘরের ভিতর ঢুকেই দাঁড়িয়ে পড়ল শুভম আর নীলাঞ্জন। একটা মৃদু শব্দ শুনতে পেল নীলাঞ্জন, তারপরই একটা হালকা আলোয় ভরে উঠল ঘরটা। দু'জনে দেখল বামনলামা একটা প্রদীপ জ্বালিয়ে ফেলেছেন। প্রদীপটা হাতে নিয়ে বামনলামা সেই ঘর পেরিয়ে ঢুকলেন আর-একটা ঘরের মধ্যে। নীলাঞ্জনরা সেখানে ঢুকে দেখল, সেই ঘরের এক পাশে একটা সিঁড়ি উঠে গিয়েছে ওপরের দিকে। বামনলামার সঙ্গে সিঁড়ি বেয়ে নীলাঞ্জনরা উঠে এল দোতলায়। নীলাঞ্জনের চোখে পড়ল একটা অন্ধকার করিডোর চলে গিয়েছে সামনের দিকে। আর তার শেষপ্রান্তে একটা ঘরের ভিতর থেকে উজ্জ্বল আলো দরজা দিয়ে বাইরে এসে পড়েছে। সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠবার পর বামনলামা কিন্তু আর এগোলেন না। তিনি ইশারায় সেই ঘরটার দিকে নীলাঞ্জনদের যেতে বললেন, তারপর সিঁড়ি দিয়ে নামতে শুরু করলেন।

শুভমকে নিয়ে নীলাঞ্জন গিয়ে দাঁড়াল ঘরটার সামনে। দরজায় একটা পরদা ঝুলছিল, সেটা এবার সরে গেল। কৃষ্ণলামা ঘরের ভিতর ঢোকার জন্য নীলাঞ্জনদের আমন্ত্রণ জানালেন। ঘরের ভিতর জ্বলছে একটা পেটোম্যাক্স, তার আলো ছড়িয়ে আছে পুরো ঘর জুড়ে। ঘরের ভিতর ঢুকেই চমকে গেল নীলাঞ্জন। তার মনে হল, সে যেন একটা কিউরিও শপের ভিতরে ঢুকল! বিরাট ঘরটার দেওয়াল আর মেঝের কার্পেটের ওপর সাজিয়ে রাখা আছে নানা ধরনের আশ্চর্য সব জিনিস। কাঠের তৈরি ভয়ংকর সব মুখোশ, নানা ধরনের ছোট-বড় পাথরের মূর্তি, জপযন্ত্র, দেওয়ালে ঝুলিয়ে রাখা রেশমের ওপর সূক্ষ্ম কাজ করা প্রাচীন থাংকা, বাদ্যযন্ত্র, কী নেই সেই ঘরটার মধ্যে। নীলাঞ্জন আপন মনেই বলে উঠল, 'ওয়ান্ডারফুল।'

কথাটা মনে হয় কানে গিয়েছিল কৃষ্ণলামার। তিনি বললেন, 'ঘরের ভিতর যেসব জিনিস আপনারা দেখতে পাচ্ছেন, তা দুর্মূল্য হলেও দুষ্প্রাপ্য নয়। কিন্তু আমি আপনাদের এর চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান জিনিস দেখাব, যা দেখার সৌভাগ্য খুব কম মানুষের জীবনেই ঘটে।'

নীলাঞ্জন তাঁর কথা শুনে বলল, 'হ্যাঁ, সেসব আপনি দেখাবেন, সেই আশাতেই তো আমাদের এখানে আসা।'

কৃষ্ণলামা মৃদু হাসলেন নীলাঞ্জনের কথা শুনে। তারপর ঘরের এক কোণে আঙুল তুলে দেখালেন। সেখানে একটা টেবিল ঘিরে গোটাচারেক চেয়ার রাখা আছে। একটা চেয়ার অন্যগুলোর থেকে আলাদা। সেটা যে কৃষ্ণলামার নিজের জন্যে, তা বুঝতে অসুবিধে হয় না। সেটা ছেড়ে পাশাপাশি অন্য দুটো চেয়ারে গিয়ে বসল নীলাঞ্জন ও শুভম। নীলাঞ্জনরা যেখানে গিয়ে বসেছে, তার চেয়ে একটু দূরে, দেওয়ালের গা ঘেঁষে রাখা আছে বিরাট একটা কাঠের সিন্দুক। সিন্দুকটা লম্বা-লম্বা লোহার পাত দিয়ে মোড়া, আর তার গায়ে একটা ভারী তালা ঝুলছে।

কৃষ্ণলামা তাঁর কোমর থেকে একটা চাবি বের করে সেই তালাটা খুলে ফেললেন। তারপর তার মধ্যে ঝুঁকে পড়ে বেশ বড় একটা কাপড়ের পোটলা বের করে এনে টেবিলের ওপর রাখলেন। সেটা টেবিলের ওপর রাখার পর কৃষ্ণলামা নীলাঞ্জনদের মুখোমুখি নিজের আসনে গিয়ে বসে পোঁটলাটা খুলতে লাগলেন। তা থেকে বেরিয়ে এল রেশমের কাপড় জড়ানো বেশ কয়েকটা জিনিস। তার মধ্যে একটা টেবিলের একপাশে সরিয়ে রেখে অন্যগুলোর আবরণ খুলে ফেললেন লামা। বের হল চারটে বাটির মতো পাত্র। সেগুলো যে সোনার, তা দেখেই বুঝতে পারল নীলাঞ্জন। প্রত্যেকটার গায়ে নানারকমের নকশা কাটা, আর ছোট-ছোট রঙিন পাথর বসানো। নীলাঞ্জন একটা পাত্র টেবিলের ওপর থেকে তুলে নিয়ে ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে দেখতে লাগল। কৃষ্ণলামা আবার প্রশ্ন করলেন, 'জিনিসগুলো ঠিক কত পুরোনো, সে সম্বন্ধে আপনার কী ধারণা?'

নীলাঞ্জন জবাব দিল, 'যদিও এই জিনিস আমি আগে দেখিনি, তবে জিনিসগুলো যে অন্তত চার-পাঁচশো বছরের পুরোনো, সে-বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই।'

নীলাঞ্জনের কথা শুনে কৃষ্ণলামা আর-একটা প্রশ্ন করলেন তাকে, 'আপনি কি বলতে পারবেন সম্রাট কালাশোকের রাজত্বকাল বৌদ্ধধর্মের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ কেন?'

নীলাঞ্জন জবাব দিল, 'কারণ, তাঁর আমলেই বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের দ্বিতীয় মহাধর্ম সম্মেলন বা বৌদ্ধ সংগীতি অনুষ্ঠিত হয়েছিল বৈশালী নগরে। সময়টা ৩৮৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দ।'

নীলাঞ্জনের কথা শুনে উজ্জ্বল হয়ে উঠল কৃষ্ণলামার চোখ। নীলাঞ্জন যে তাঁর প্রশ্নের এত ভালো উত্তর দেবে, তা হয়তো ধারণা ছিল না লামার। এর পর কয়েক মুহূর্ত নীলাঞ্জনের দিকে তাকিয়ে থাকলেন কৃষ্ণলামা। তারপর এমন একটা কথা বললেন যে, চমকে গেল নীলাঞ্জন।

তিনি বললেন, 'আপনি এতটা যখন জানেন, তখন এও নিশ্চয়ই জানেন যে, ওই মহাধর্ম সম্মেলনে পৌরোহিত্য করেছিলেন ধর্মগুরু সভাকামী। আপনার সামনে যে পাত্রগুলো রাখা আছে, তা ওই সম্মেলনের সময় সম্রাট কালাশোক তুলে দিয়েছিলেন সভাকামীর হাতে।'

অন্য কোথাও অন্য কেউ একথা বললে হাসতে শুরু করত নীলাঞ্জন। কিন্তু কৃষ্ণলামার কণ্ঠস্বর শুনে সে বুঝতে পারল, তিনি যা বললেন তা দৃঢ়ভাবেই বললেন। নীলাঞ্জন বিস্ময়ে হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইল পাত্রগুলোর দিকে। কৃষ্ণলামার কথা সত্যি বলে ধরে নিলে এগুলোর বয়স প্রায় চব্বিশশো বছর! পাত্রগুলোর দিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর মুখ তুলে সে তাকাল লামার দিকে।

লামা বললেন, 'এবার আরও একটা জিনিস দেখাই আপনাকে।' বলে তিনি টেবিলের এক পাশে কাপড় জড়িয়ে রাখা জিনিসটা খুলে ফেললেন। আর তার ভিতর থেকে বেরিয়ে এল একটা জপযন্ত্র, সেটা হুবহু দেখতে শুভমের কাছে থাকা জপযন্ত্রটার মতো!

জিনিসটা বের করার পর কৃষ্ণলামা বললেন, 'এই জিনিসটা টেবিলের অন্য জিনিসগুলোর মতো এত পুরোনো নয় ঠিকই, কিন্তু এটা আমার কাছে টেবিলে রাখা ওই পাত্রগুলোর চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান। কারণ, এটা আমার তান্ত্রিক গুরু মিনড্রোল তারলিং-এর মন্ত্রপূত জপযন্ত্রের একটা। আর-একটা এখন রয়েছে আপনাদের কাছে।'

নীলাঞ্জন বিস্ময়ে বলে উঠল, 'মানে?'

কৃষ্ণলামা বললেন, 'মানে, আপনাদের কাছে যে জপযন্ত্রটা রয়েছে, সেটা এরই জোড়া। আর, সেটাই আমার চাই।'

নীলাঞ্জন লামাটির কথা শুনে উত্তর দিতে যাচ্ছিল কিন্তু তার আগেই তাকে থামিয়ে দিয়ে লামাটি বললেন, 'আপনি কী বলবেন, তা আমি জানি। আপনি বলবেন যে, জিনিসটা আপনার নয়। আপনার হাতে জিনিসটা কীভাবে এসেছে, সে সম্বন্ধে আমার একটা ধারণা আছে। তবে একটা কথা বলি, আপনি যদি আমাকে জপযন্ত্রটা দিয়ে দেন, তা হলে পরে সেটা অন্য কেউ আপনার থেকে দাবি করবে না, এই ব্যাপারে আমি আপনাকে আশ্বস্ত করতে পারি।'

এ কথা বলার পর কৃষ্ণলামা একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন নীলাঞ্জনের দিকে। নীলাঞ্জন এবার কৃষ্ণলামাকে প্রশ্ন করল, 'আপনি কেন বলছেন যে, কেউ আর আমাদের কাছে সেটা ফেরত চাইতে আসবে না?'

কৃষ্ণলামা নীলাঞ্জনের কথা শুনে শীতল কণ্ঠে বললেন, 'আসবে না, কারণ, কালকের পর তা আর সম্ভব নয়।'

নীলাঞ্জন কৃষ্ণলামার কথা না বুঝতে পেরে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইল। কৃষ্ণলামা বললেন, 'বেশ রাত হয়েছে, আপনারা এবার উঠে পড়ুন। ঘরে ফিরে খাওয়াদাওয়া সেরে শুয়ে পড়ুন। সারাদিন আপনাদের ওপর দিয়ে অনেক ধকল গিয়েছে।'

লামার কথা শেষ হওয়ার পর নীলাঞ্জন চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ল। তার দেখাদেখি শুভমও উঠে দাঁড়াল। কৃষ্ণলামা তাঁর জিনিসগুলোর ওপর আবার কাপড় জড়াতে-জড়াতে বললেন, 'আমার অনুরোধটা নিশ্চয়ই আপনি মনে রাখবেন। আশা করি কাল জপযন্ত্রটা আমার হাতে তুলে দেবেন।'

নীলাঞ্জনের মনে হল, কৃষ্ণলামা যেন অনেকটা আদেশের সুরেই এই কথাগুলো বললেন। নীলাঞ্জন কিছু উত্তর না দিয়ে শুভমকে নিয়ে দরজার দিকে পা বাড়াল। ঘরের বাইরে এসে নীলাঞ্জনরা দেখল, অন্ধকার করিডোরের শেষ মাথায় সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামার মুখটায় প্রদীপ হাতে তাদের ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে রয়েছেন বামনলামা। তাঁর পিছন-পিছন নীলাঞ্জন আর শুভম ফিরে চলল ঘরের দিকে। নীলাঞ্জনের মনে শুধু ঘুরতে লাগল কৃষ্ণলামার কথাগুলো। তার মনে হতে লাগল, এভাবে অপরিচিত জায়গায় শুভমকে নিয়ে চলে আসা কখনওই ঠিক হয়নি।

নীলাঞ্জনরা ঘরে ফিরে আসার কিছুক্ষণ পর দুজন লামা এসে তাদের খাওয়ার জন্য এক ধরনের মিষ্টি রুটি আর দুধ দিয়ে গেলেন। একটু পরে আর-একজন এসে একটা প্রদীপ জ্বেলে দিয়ে গেলেন। খাওয়ার পর শুভমকে পাশে নিয়ে শুয়ে কৃষ্ণলামার কথা ভাবতে-ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ল নীলাঞ্জন।

মাঝরাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল শুভমের। তার মনে হল, কেউ যেন এসে দাঁড়িয়েছে খাটের পাশে। আস্তে-আস্তে লেপের বাইরে মাথা বের করল শুভম। সারা ঘর প্রায় অন্ধকার। তারা শোওয়ার আগে একজন এসে একটা প্রদীপ রেখে গিয়েছিল। সেটা প্রায় নিভে এসেছে। শুধু তার একটা ম্লান আভা ছড়িয়ে আছে ঘরে। শুভম প্রথমে সেই অন্ধকার ঘরে কিছু দেখতে পেল না। তারপর আস্তে-আস্তে তার চোখের সামনে স্পষ্ট হতে লাগল খাটের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একজন ছোট্ট মানুষের অবয়ব। শুভমের মনে হল, লোকটা নিশ্চয়ই বামনলামা। ভয় পেয়ে গেল শুভম। সে পাশে শুয়ে থাকা নীলাঞ্জনকাকুকে ধাক্কা দিয়ে জাগাতে যাবে, ঠিক সেই সময় প্রদীপের আলোটা হঠাৎ দপদপ করতে লাগল। আর সেই আলোয় শুভম দেখতে পেল, ঘরের ভিতর যে এসে দাঁড়িয়েছে সে বামনলামা নয়, সে হল সেই ছোট লামাটি, যার জপযন্ত্রটা রয়েছে তার কাছে।

কেন যেন শুভমের ভয়টা আস্তে-আস্তে কেটে যেতে লাগল। নীলাঞ্জনকে সে আর ডাকল না। ধীরে-ধীরে খাটের ওপর উঠে বসে শুভম তাকিয়ে রইল তার দিকে। কিছুক্ষণ কেটে যাওয়ার পর শুভম বুঝতে পারল, সে যেন ইশারায় তাকে কিছু বলার চেষ্টা করছে। কিন্তু সে কী বলতে চাইছে, বুঝতে পারছিল না শুভম। হঠাৎ সে একটা হাত বাড়িয়ে দিল শুভমের দিকে, আর সঙ্গে-সঙ্গেই সে কী বলতে চাইছে তা স্পষ্ট হয়ে গেল শুভমের কাছে। শুভম হাতড়ে-হাতড়ে লেপের ভিতর থেকে জপযন্ত্রটা বের করে আনল। তারপর সেটা বাড়িয়ে দিল ছেলেটির দিকে। ছেলেটি নিয়ে নিল সেটা। পরমুহূর্তেই প্রদীপটা নিভে গিয়ে সারাঘর অন্ধকার হয়ে গেল। শুভম আর কিছু দেখতে পেল না। বেশ কিছুক্ষণ একইভাবে খাটের ওপর বসে রইল শুভম। তারপর আবার তার চোখে ঘুম নেমে এল। লেপের মধ্যে মাথা ঢুকিয়ে শুয়ে পড়ল সে।

ভোরবেলা ঢাকের শব্দে ঘুম ভেঙে গেল নীলাঞ্জনের। বালিশের পাশে রাখা হাতঘড়িটা নিয়ে সে দেখল, সকাল সাতটা বেজে গিয়েছে। শুভমের ঘুম এখনও ভাঙেনি। লেপটা গায়ে জড়িয়ে বিছানার ওপর উঠে বসল সে। জানলার পাল্লা দুটোর ফাঁক দিয়ে একচিলতে আলো এসে পড়েছে ঘরের ভিতর। মিনিটপাঁচেক খাটের ওপর বসে থাকার পর নীচে নেমে জানলার কাছে এগিয়ে গিয়ে ভেজানো পাল্লা দুটো খুলে ফেলল নীলাঞ্জন। সঙ্গে-সঙ্গে আলোয় ভরে গেল সারা ঘর। নীলাঞ্জন বাইরের দিকে তাকাল খোলা জানলা দিয়ে।

কী অপূর্ব লাগছে চারদিক! সকালের নরম আলো ছড়িয়ে পড়েছে খাদের ঢাল বেয়ে নেমে যাওয়া সবুজ জঙ্গলে। দূরে, আকাশের বুকে মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তুষারাবৃত পর্বতমালা। তাদের শিখরগুলো যেন ক্রিস্টালের মতো জ্বলছে। হঠাৎ নীলাঞ্জনের চোখ পড়ল জানলার হাত দুই নীচে, বাইরের দিকে বেরিয়ে থাকা একটা কাঠের টুকরোর দিকে। তার গা থেকে নীচের দিকে লম্বা একটা দড়ি ঝুলছে। দড়িটা গিয়ে শেষ হয়েছে হাত পঁচিশেক নীচে, খাদের গায়ে ঝুলন্ত একটা পাথরের চাতালের ওপর। দড়িটা এখানে এমনভাবে ঝোলানো রয়েছে কেন, ভাবতে লাগল সে। নীচ থেকে যদি এই পাথরের চাতাল পর্যন্ত কেউ পৌঁছতে পারে, তা হলে এই দড়ি বেয়ে অনায়াসেই জানলার কাছে পৌঁছতে পারে।

নীলাঞ্জন এবার দরজায় টোকা দেওয়ার শব্দ শুনল। সে জানলা ছেড়ে গিয়ে দরজাটা খুলল। বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন তিন জন লামা। তাঁদের মধ্যে দু'জনের হাতে কাঠের বারকোশের ওপর কাপড় ঢাকা দেওয়া বেশ কয়েকটা পাত্র। আর-একজনের হাতে একটা বিরাট কেটলি। তার মুখ থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছে। নীলাঞ্জন দরজার পাশ থেকে সরে দাঁড়াল। তাঁরা ভিতরে ঢুকে জিনিসগুলোকে নীচে নামিয়ে রাখলেন। তারপর তাঁদের একজন নীলাঞ্জনকে ঘরের বাইরে আসতে ইশারা করলেন। নীলাঞ্জন বাইরে আসতে তিনি নীলাঞ্জনদের ঘরের পাশে কাঠের তক্তা দিয়ে তৈরি ঢালু ছাদওলা একটা ছোট ঘরের দিকে আঙুল তুলে দেখালেন। নীলাঞ্জন সেই ঘরের দরজা দিয়ে ভিতরে তাকিয়ে বুঝতে পারল, সেটা আসলে বাথরুম।

লামারা চলে যাওয়ার পর ঘরে ফিরে এসে নীলাঞ্জন দেখল, শুভমের ঘুম ভেঙে গিয়েছে। বাইরে ঢাকের শব্দ শুনে শুভম বলল, 'বাইরে কীসের শব্দ শোনা যাচ্ছে?'

নীলাঞ্জন বলল, 'ওটা ঢাকের শব্দ। আজ এখানে ছাম উৎসব তো, তাই মনে হয় ঢাক বাজানো হচ্ছে।'

কেটলিতে রাখা গরম জল দিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে নিল নীলাঞ্জন আর শুভম। তারপর খাবার খেয়ে নিল। খাবার বলতে অনেকটা মিষ্টি সুজির মতো একটা জিনিস, আর চায়ের মতো একটি পানীয়। তার মধ্যে আবার একদলা মাখন ফেলা। স্বাদটা কিছুটা নোনতা হলেও সেটা খেতে মন্দ লাগল না শুভমের। খাওয়া শেষ করার কিছুক্ষণের মধ্যেই তৈরি হয়ে ঘরের বাইরে বেরিয়ে পড়ল দুজনে। মনাস্ট্রিকে বেড় দিয়ে সামনে আসতেই তারা চমকে গেল। সেখানে নানাবয়সি লামার ভিড়। একপাশে রাখা আছে বিরাট একটা ঢাক। একজন বৃদ্ধ লামা বাজিয়ে চলেছেন ঢাকটা। তার শব্দ পাহাড় থেকে পাহাড়ে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে আসছে আবার। নীলাঞ্জন দেখল, ঢাকটা যা দিয়ে বাজানো হচ্ছে, সেটা সম্ভবত মানুষের ঊরুর হাড়। নীলাঞ্জনদের দেখে সেই ভিড়ের মধ্যে থেকে এগিয়ে এলেন কৃষ্ণলামা। তারপর বললেন, 'আশা করি রাতে আপনাদের কোনও অসুবিধে হয়নি। আর কিছুক্ষণ পরেই উৎসব শুরু হবে। এই উৎসবে আজ আপনারা আমাদের অতিথি।'

লামার কথা শেষ হলে নীলাঞ্জন বলল, 'কাল যখন এলাম তখন এত লোক দেখিনি তো! এঁরা কী সকলে এখানেই থাকেন?'

কৃষ্ণলামা বললেন, 'না, এত লোক এখানে থাকে না। এই পাহাড়ি জঙ্গলে অনেক ছোট-ছোট গুম্ফা আছে, যার খোঁজ বাইরের কেউ রাখে না। কাল সারারাত ধরে ওরা সেইসব জায়গা থেকে এখানে এসে জড়ো হয়েছে। আজ উৎসব শেষ হলেই সকলে যে যার জায়গায় ফিরে যাবে।'

এরপর নীলাঞ্জনদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে কৃষ্ণলামা গুম্ফার ভিতর চলে গেলেন। নীলাঞ্জন আর শুভম ঘুরে-ঘুরে দেখতে লাগল চারদিক।

আধ ঘণ্টা সময় কেটে গেল। ভিড়ও কিছুটা বাড়ল। শেষে এক সময় ঢাকটা দ্রুত বাজতে শুরু করল। আর সঙ্গে-সঙ্গে সকলে মনাস্ট্রির সামনের চত্বরের চার দিকে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন। মনাস্ট্রির ভিতর থেকে ছ'জন লোক কাঁধে করে বয়ে নিয়ে এলেন অন্তত পঁচিশ ফুট লম্বা একটা বিশাল সানাই। আর তাঁদের পিছন-পিছন বেরিয়ে এলেন ভয়ংকর মুখোশপরা জনা কুড়ি লোক। গায়ে তাঁদের রংচঙে পোশাক, কোমরে তরবারি। আর সকলের পিছনে বের হলেন ঝলমলে পোশাক ও শিরস্ত্রাণের মতো উজ্জ্বল হলুদ রঙের টুপি পরা কৃষ্ণলামা। তিনি বাইরে বেরিয়ে আসার সঙ্গে-সঙ্গে সমবেত লামারা মাথা ঝুঁকিয়ে দুর্বোধ্য ভাষায় চিৎকার করে উঠলেন।

কৃষ্ণলামা এসে দাঁড়ালেন বৃত্তের ঠিক মাঝখানে। বামনলামা এগিয়ে এসে কৃষ্ণলামার হাতে জলভরা একটা পাত্র তুলে দিলেন। কৃষ্ণলামা পাত্র থেকে চারদিকে জল ছেটাতে-ছেটাতে তিব্বতি ভাষায় মন্ত্রোচ্চারণ করতে লাগলেন। মন্ত্রপাঠ শেষ হওয়ার পর আবার সকলে মাথা ঝুঁকিয়ে চিৎকার করে উঠলেন। কৃষ্ণলামা এবার কয়েক পা পিছু হটে কী একটা ইঙ্গিত করলেন। সঙ্গে-সঙ্গে সেই বিরাট সানাইটা তিনবার বেজে উঠল। শুরু হল ছাম উৎসব। দ্রুত ঢাকের বাজনার সঙ্গে-সঙ্গে কোমরের তরবারি খুলে নিয়ে নৃত্যযুদ্ধ শুরু করলেন ভয়ংকর মুখোশপরা লামারা। শুভম অবাক চোখে সবকিছু দেখতে লাগল। নীলাঞ্জনও কম অবাক হয়নি। সে ক্যামেরা দিয়ে ছবির পর ছবি তুলে যেতে লাগল।

বেলা যত বাড়তে থাকল, ততই জমে উঠতে লাগল অনুষ্ঠান। কখনও সমবেত নৃত্য, আবার কখনও বা ডুগডুগি বাজিয়ে একক নৃত্য। একের পর-এক চলতেই লাগল। নীলাঞ্জন আর শুভমদের ঠিক উলটো দিকেই বসেছিল জনাপঞ্চাশেক ছোট ছেলে। মাঝে-মাঝেই তারা হাততালি দিয়ে নিজেদের ভাষায় চিৎকার করে উঠছিল। শুভমের হঠাৎ মনে হল, ছেলেদের সেই ভিড়ের মধ্য থেকে তার দিকে তাকিয়ে একটা ছেলে যেন হাসছে। ভালো করে তাকাতেই তাকে চিনতে পারল সে। এ হল সেই ছোট লামাটি। আর তাকে দেখার সঙ্গে-সঙ্গেই গত কাল রাতের ঘটনাটা মনে পড়ে গেল। ঘুম থেকে ওঠার পর সে সত্যি-সত্যিই একদম ভুলে গিয়েছিল ব্যাপারটা। নীলাঞ্জনকে শুভম তার পাশে বসা ছেলেটিকে দেখাতে যাবে, ঠিক সেই মুহূর্তেই ভিড়ের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল ছেলেটি। এর পর আর শুভমের নাচের দিকে মন বসল না। তার দৃষ্টি বারবার চলে গেল সেই ছোট লামাদের দঙ্গলের ওপর। কিন্তু সে আর দেখতে পেল না সেই ছেলেটিকে। শুভম ভাবল, ঘরে ফিরে কাল রাতের ঘটনাটা সে খুলে বলবে নীলাঞ্জনকাকুকে।

নাচ যখন শেষ হল, সূর্য তখন প্রায় মাথার ওপর। শুভমকে নিয়ে নীলাঞ্জন ফিরে চলল মনাস্ট্রির পিছন দিকে, নিজেদের ঘরে। মনাস্ট্রির পাশের একটা ছোট গলিপথ দিয়ে তারা যখন নিজেদের ঘরের কাছে চলে এসেছে প্রায়, এমন সময় নীলাঞ্জনের কাঁধে ঝুলিয়ে রাখা ক্যামেরার লেন্স-কভারটা মাটিতে পড়ে গেল। শুভম সেটা মাটি থেকে কুড়িয়ে নেওয়ার জন্য একটু নীচু হতেই একটা পাথরের টুকরো তার মাথার ওপর দিয়ে উড়ে গিয়ে ঠক করে দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে পড়ল। শুভম মাথাটা হঠাৎ না ঝোঁকালে পাথরের টুকরোটা নির্ঘাত তার কপালে এসে লাগত। চমকে উঠে সামনের দিকে তাকাতেই নীলাঞ্জন দেখতে পেল, একটা ছোট ছেলে দৌড়ে পাহাড়ের ঢালে জঙ্গলের দিকে নেমে গেল। ঢাল বেয়ে নামার সময় একবার মাত্র কয়েক মুহূর্তের জন্য পিছনে তাকিয়েছিল সে, আর তাতেই তাকে চিনতে পেরে গেল শুভম। সে বলে উঠল, 'ছেলেটি তো খুব দুষ্টু, কাল ওর জিনিসটা ওকে ফিরিয়ে দিলাম, তবুও ও পাথর ছুড়ে মারল!'

শুভমের কথাটা বুঝতে না পেরে নীলাঞ্জন জিগ্যেস করল, 'মানে?'

একটু ভয়ে-ভয়ে শুভম কাল রাতের সমস্ত ঘটনাটা খুলে বলল তাকে।

ঘরে ঢুকে নীলাঞ্জন খাটের ওপর চুপচাপ বসেছিল। গত কাল রাতে কৃষ্ণলামার জপযন্ত্রটা চাওয়া, রাতে ঘরে ঢুকে ছেলেটির চুপিচুপি জপযন্ত্রটা নিয়ে যাওয়া, একটু আগে ছেলেটির পাথর ছুড়ে মারা, সমস্ত ব্যাপারটা তার কাছে কেমন গোলমেলে মনে হতে লাগল। শুভম জানলার সামনে দাঁড়িয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে ছিল। সে নীলাঞ্জনকে চুপচাপ বসে থাকতে দেখে বলল, 'নীলাঞ্জনকাকু, তুমি কি আমার ওপর রাগ করেছ?'

নীলাঞ্জন বলল, 'না, তবে বাইরে বেড়াতে এসে কোনও কিছু করার আগে বড়দের জিগ্যেস করা উচিত।'

নীলাঞ্জনের কথা শেষ হওয়ার প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই ঘরে ঢুকলেন কৃষ্ণলামা। নীলাঞ্জন বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে তাঁকে বসার জন্য অনুরোধ জানাল। লামা কিন্তু বসলেন না, নীলাঞ্জনকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বললেন, 'আশা করি আমাদের মুখোশ নাচের উৎসব আপনাদের আনন্দ দিতে পেরেছে। রাতে আমার আর-একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান আছে। তার প্রস্তুতির জন্য আমাকে এখন ব্যস্ত থাকতে হবে। হয়তো কাল সকালে আপনাদের বিদায় দেওয়ার সময় ছাড়া আর আমাদের সাক্ষাৎ হবে না। আপনাকে আমি কথা দিয়েছিলাম, বৌদ্ধ শিল্পকলার দুষ্প্রাপ্য কিছু নিদর্শন আমি আপনাকে দেখাব। একটু পরে আমার একজন লোক এসে গুম্ফার ভিতর সেসব আপনাকে দেখাতে নিয়ে যাবে। তবে জিনিসগুলো সম্পর্কে বুঝতে কোনও অসুবিধে হবে না। কারণ, সেগুলোর সঙ্গে ইংরেজিতে লেখা চিরকুট সুতো দিয়ে আটকানো আছে। তা থেকেই যা জানার তা আপনি জানতে পারবেন।'

একটানা এই কথাগুলো বলার পর কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন লামা। তারপর নীলাঞ্জনের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, 'আমার কালকের অনুরোধটা নিশ্চয়ই মনে আছে আপনার? এবার আমাকে আপনাদের কাছে রাখা জপযন্ত্রটা দিয়ে দিন।'

নীলাঞ্জন কী উত্তর দেবে বুঝতে পারল না। তাকে উত্তর না দিতে দেখে লামা এবার বলে উঠলেন, 'আপনি মনে হয় ওটা এই ছোট ছেলেটির খেলনা বলে দিতে ইতস্তত করছেন। ওর জন্য আমি আর-একটা জপযন্ত্র এনেছি।' বলে তিনি তাঁর পোশাকের ভিতর থেকে আর-একটা সুন্দর দেখতে জপযন্ত্র বের করলেন। জিনিসটা যে রুপোর তৈরি এবং বেশ দামি, তা দেখেই বুঝতে পারল নীলাঞ্জন। তার গায়ে বেশ কয়েকটা ছোট-ছোট লাল পাথর বসানো আছে।

লামা সেই পাথরগুলোকে দেখিয়ে বললেন, 'এই পাথরগুলো হল চুনি। এই মূল্যবান জিনিসটা আমি এই ছেলেটিকে উপহার দিচ্ছি।' বলে তিনি জানলার দিকে এগিয়ে গিয়ে সেটা শুভমের দিকে বাড়িয়ে দিলেন।

শুভম কিন্তু সেটা নিল না। কী করবে তা বুঝতে না পেরে সে নীলাঞ্জনের দিকে তাকাল। নীলাঞ্জন প্রথমে ভাবল, সত্যি কথাটাই লামাকে বলা ভালো। তাই বলল, 'জিনিসটা আপনার হাতে তুলে দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ, জিনিসটা যার, সে সেটা ফেরত নিয়ে গিয়েছে।'

নীলাঞ্জনের কথা শোনামাত্র কৃষ্ণলামা শুভমের দিক থেকে তার দিকে ঘুরে দাঁড়ালেন। তারপর চিৎকার করে বলে উঠলেন, 'মিথ্যেবাদী, আপনি কি আমাকে ছোট ছেলে পেয়েছেন? জপযন্ত্রটা যার, তার পক্ষে এখানে আসা কোনওমতেই সম্ভব নয়। আপনি নিজেই জানেন না, আপনি কত বড় মিথ্যে কথা বলার চেষ্টা করছেন।'

নীলাঞ্জনকে বিনা কারণে মুখের ওপর মিথ্যেবাদী বলায় সে এবার কিছুটা উত্তেজিত হয়ে বলল, 'জপযন্ত্রটা যখন আপনার নয়, তখন আপনিই বা জিনিসটা নেওয়ার জন্য এত আগ্রহী কেন? আমাকেই বা শুধু-শুধু মিথ্যেবাদী বলছেন কেন?'

কৃষ্ণলামা তাঁর রাগ এবার যেন কিছুটা সামলে নিয়ে বললেন, 'শুনুন তা হলে। আজ থেকে প্রায় চল্লিশ বছর আগের কথা। তখন এই মঠের অধ্যক্ষ ছিলেন আমাদের তান্ত্রিক গুরু লামা ডে-ছেন-পো। একদিন তিনি তাঁর শিষ্যদের ডেকে জানালেন যে, তাঁর উত্তরাধিকারী নির্বাচন করা প্রয়োজন। কারণ, এই পৃথিবীতে তাঁর কাজ প্রায় ফুরিয়ে এসেছে। কিন্তু কে হবেন পরবর্তী মঠাধ্যক্ষ? স্রোঙচেন রাজবংশের এক বংশধর তখন এই গুম্ফায় বাস করতেন। তাঁর নাম ছিল স্রোঙচেন পাউ। তিনি এবং আমি দুজনেই তখন যুবক এবং দুজনেই সেই সময় ছিলাম এই মঠের উপাধ্যক্ষ। কাজেই পরবর্তী অধ্যক্ষ নির্বাচন করতে হলে আমাদের দুজনের মধ্যেই কাউকে বেছে নিতে হয়। শুরুতে ডে-ছেন-পো'র ইচ্ছে ছিল পাউকেই করা হোক পরবর্তী মঠাধ্যক্ষ। কারণ, তাঁর নাকি শাস্ত্রজ্ঞান আমার চেয়ে বেশি ছিল! কিন্তু আমিই বা এই সুযোগ ছেড়ে দেব কেন? তার চেয়ে আমি কম কীসে? কাজেই এই নিয়ে চূড়ান্ত দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হল নিজেদের মধ্যে।

অবশেষে গুরু ডে-ছেন-পো'ই একটা সমাধানের রাস্তা বের করলেন। ঠিক হল, আমাদের মধ্যে যে-কোনও একজন লামা ডে-ছেন-পো'র মৃত্যুর পর মঠাধ্যক্ষের দায়িত্ব গ্রহণ করবে এবং তিন যুগ পর সেই দায়িত্ব সে তুলে দেবে তার অন্য কোনও বংশধরের হাতে। যদি দ্বিতীয়জন বা তার কোনও বংশধর এই সময়কালের মধ্যে জীবিত না থাকে বা যেদিন তিন যুগ পূর্ণ হচ্ছে সেদিন এখানে উপস্থিত না হতে পারে, তা হলে মঠের কর্তৃত্ব চিরদিনের জন্য চলে যাবে প্রথমজনের হাতে। কিন্তু আবার এক সমস্যা, কে প্রথমে পালন করবে মঠাধ্যক্ষের দায়িত্ব? এরও সমাধান করলেন লামা ডে। আমাকে আর পাউকে পাশাপাশি দাঁড় করিয়ে তিনি এক তৃণখণ্ড ছুড়ে দিলেন আকাশের দিকে। সেটা বাতাসে ভাসতে-ভাসতে এসে পড়ল আমার মাথায়। প্রথম মঠাধ্যক্ষ নির্বাচিত হলাম আমি।'

এই পর্যন্ত বলে লামা একটু চুপ করে রইলেন। তারপর আবার বলতে শুরু করলেন, 'আমাদের গুরু ছিলেন তন্ত্রবিদ্যায় পারদর্শী। তাঁর কাছে ছিল দুটো মন্ত্রপুত জপযন্ত্র। সেই দু'টো হাতে নিয়ে তিনি মুহূর্তের মধ্যে উড়ে যেতে পারতেন এক পাহাড় থেকে আর-এক পাহাড়ে। জপযন্ত্র দিয়ে তিনি অপদেবতাদের বশ মানাতে পারতেন। যদিও পরবর্তী মঠাধ্যক্ষ হিসেবে সেই দুটো আমারই প্রাপ্য ছিল, কিন্তু গুরু ডে-ছেন-পো তার একটা দিলেন আমাকে। আর-একটা দিলেন পাউকে। ঠিক হয়েছিল পাউ বা পাউয়ের কোনও বংশধর যেদিন দায়িত্ব বুঝে নেওয়ার জন্য এখানে আসবে, সেদিন সঙ্গে করে ওই জপযন্ত্রটা আনতে হবে। না হলে এই মঠে তার প্রবেশাধিকার থাকবে না।

এইসব ঘটনার কয়েক বছরের মধ্যেই গুরু লামা ডে দেহরক্ষা করেন ও পূর্বনির্ধারিত ব্যবস্থামতো আমিও মঠাধ্যক্ষের দায়িত্ব গ্রহণ করি। পাউ কিন্তু আর এখানে থাকেনি। সেই দিনই সে গুরু ডে-ছেন-পো'র দেওয়া জপযন্ত্রটা সঙ্গে নিয়ে পাড়ি জমায় তিব্বতে। সেদিনও ছিল ছাম উৎসব। আজ থেকে ঠিক তিন যুগ আগে। তিব্বতে গিয়ে সে বসবাস করতে শুরু করল লাসাতে। সেখানে সে সংসারও পাতে। বছরদশেক আগে তার নাকি এক সন্তানও জন্মেছিল। কিন্তু তার কয়েক দিনের মধ্যেই অজ্ঞাতপরিচয় আততায়ীর হাতে খুন হয় পাউ ও তার স্ত্রী। আততায়ীর হাত থেকে পাউয়ের নবজাতককে বাঁচানোর জন্য পাউয়ের সহযোগী একজন লামা শিশুটিকে নিয়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর আর কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি। সম্ভবত তিনিও আর জীবিত নেই। কারণ, মা ছাড়া ওইটুকু শিশুর বরফের দেশে বাঁচা প্রায় অসম্ভব বললেই চলে।'

নীলাঞ্জনের মনে হল, এই শেষ কথাগুলো বলার সময় লামার চোখ দুটো যেন জ্বলজ্বল করে উঠল। কৃষ্ণলামা এর পর বললেন, 'এবার আসি আসল কথায়। এবার নিশ্চয়ই আপনি বুঝতে পারছেন, কেন আমি আপনার মিথ্যে কথাটা ধরে ফেলতে পারলাম। আমার ধারণা পাউয়ের জপযন্ত্রটা কোনওভাবে কিউরিও ব্যবসায়ীদের হাত ঘুরতে-ঘুরতে তিব্বত থেকে চলে এসেছিল গ্যাংটকের কোনও দোকানে, আর সেখান থেকেই ওটা আপনি সংগ্রহ করেছেন। কিন্তু যেহেতু ওই জপযন্ত্রটা এখানকার সম্পত্তি, তাই আমি সেটা আপনার কাছ থেকে দাবি করতেই পারি। এর জন্য উপযুক্ত মূল্য দিতেও আমি প্রস্তুত।' এই বলে কৃষ্ণলামা স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন নীলাঞ্জনের দিকে।

কয়েক মুহূর্ত পর নীলাঞ্জন লামার দিকে তাকিয়ে বলল, 'এমনও তো হতে পারে যে, লামা পাউয়ের ছেলে জীবিত আছে, তার কাছ থেকেই আমরা জপযন্ত্রটা পেয়েছিলাম, আবার সে-ই এসে তার জিনিসটা ফেরত নিয়ে গিয়েছে?'

কৃষ্ণলামা গম্ভীর স্বরে এবার বললেন, 'মিথ্যে কেন কথা বাড়াচ্ছেন আপনি? সেই ছেলে যদি জীবিতও থাকে, তা হলে তার পক্ষে দুর্গম পাহাড় ডিঙিয়ে এত দূর আসা সম্ভব নয়। আর, আমার লোকজনের চোখ এড়িয়ে এই মঠে প্রবেশ করা তার পক্ষে দুঃসাধ্য।' এর পর লামা কিছুটা নির্দেশের সুরেই বললেন, 'জিনিসটা এবার আমাকে দিয়ে দিন। আজ রাতে আমি তন্ত্রবিদ্যার এক গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান করতে চলেছি। তার কিছু আয়োজন এখনও বাকি আছে। আমি আর অপেক্ষা করতে পারব না,' এই বলে কৃষ্ণলামা হাতটা বাড়িয়ে দিলেন নীলাঞ্জনের দিকে।

নীলাঞ্জন এবার কৃষ্ণলামার চোখে চোখ রেখে বলল, 'আমি তো আপনাকে বলেইছি যে, জিনিসটা আমার কাছে নেই, যার জিনিস সে নিয়ে গিয়েছে।'

নীলাঞ্জনের কথা শুনে দপ করে জ্বলে উঠল কৃষ্ণলামার চোখ। দাঁতে দাঁত চেপে তিনি বললেন, 'তা হলে এত অনুরোধ সত্ত্বেও জিনিসটা আপনি দিলেন না?' নীলাঞ্জন আর শুভমের দিকে জ্বলন্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে ঝড়ের বেগে কৃষ্ণলামা বেরিয়ে গেলেন ঘর ছেড়ে।

কৃষ্ণলামা চলে যাওয়ার পর বেশ কিছুক্ষণ খাটের ওপর চুপ করে বসে রইল নীলাঞ্জন। তার এখন কী করা উচিত, কিছুই বুঝতে পারছিল না সে। একবার তার মনে হল, কৃষ্ণলামার কাছে গিয়ে ব্যাপারটা ভালো করে বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করা উচিত। পরক্ষণেই মনে হল, কৃষ্ণলামা কিছুতেই তার কথা বিশ্বাস করবেন না। সবচেয়ে ভালো হত, যদি সে এই মুহূর্তে মনাস্ট্রি ছেড়ে চলে যেতে পারত। কিন্তু তা সম্ভব নয় তার পক্ষে। পাহাড়ি রাস্তায় পথ চেনা সম্ভব নয়। আর, কৃষ্ণলামাও নিশ্চয়ই তার কাছে জপযন্ত্রটা যে নেই, সে বিষয়ে নিশ্চিত না হয়ে এত সহজে তাকে ছেড়ে আসতে রাজি হবেন না। এমনকী, আরও কয়েক দিন তাদের এখানে আটকে রাখতেও পারেন। যদি এমন হয়, তা হলে আর দুর্গতির শেষ থাকবে না নীলাঞ্জনদের। আসলে, একজন অপরিচিত লোকের কথায় বিশ্বাস করে এরকম অজানা জায়গায় যে আসা ঠিক হয়নি, এবার তা ভালোভাবে বুঝতে পারল সে। বিশেষত, যখন তার সঙ্গে একটা ছোট ছেলে রয়েছে।

এই সব চিন্তা করে নীলাঞ্জনের মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করতে লাগল। একটা সিগারেট খাওয়ার জন্য নীলাঞ্জন খাট থেকে উঠে ঘরের বাইরে গিয়ে দাঁড়াল। কিছু একটা যে হয়েছে এবং সেটা যে ওই জপযন্ত্রটা নিয়ে, সেটা লামা ও নীলাঞ্জনের উত্তেজিত কথাবার্তা থেকে স্পষ্ট বুঝতে পারছিল শুভম। সে এতক্ষণ চুপচাপ জানলার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। এসব দেখে তারও কেমন ভয়-ভয় করছিল। নীলাঞ্জন বাইরে এসে দাঁড়ানোর সঙ্গে-সঙ্গেই সে ঘরের বাইরে এসে নীলাঞ্জনের পিছনে দাঁড়াল। কয়েক পা হেঁটে নীলাঞ্জন হাজির হল সেই কাঠের বাথরুমের পাশে খাদের ধারে। শুভম তার পিছু-পিছু গিয়ে দাঁড়াল একটা পাথরের ওপর।

চারপাশ এখন নিস্তব্ধ। মনাস্ট্রির কোলাহলও থেমে গিয়েছে অনেকক্ষণ আগেই। নীচের জঙ্গল থেকে মাঝে-মাঝে শুধু ভেসে আসছে ঝিঁঝিপোকার ডাক, আর বাতাস বয়ে যাওয়ার শব্দ। মাঝে-মাঝে ঠান্ডা বাতাস এসে বিঁধছে চোখে-মুখে। পাথরের ওপর দাঁড়িয়ে শুভম তাকাল নীচের দিকে। নীলাঞ্জন পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে তার থেকে একটা নিয়ে ঠোঁটে দিল। সিগারেটের প্যাকেটটা পকেটে রেখে নীলাঞ্জন লাইটারটা অন্য পকেট থেকে বের করে সিগারেটটা জ্বালাতে যেতেই শুভম পাথরটা থেকে নেমে এসে খামচে ধরল তার হাত। নীলাঞ্জন ফিরে তাকাল তার দিকে। নীলাঞ্জনকে ইশারায় চুপ করতে বলে শুভম তার হাত ধরে টেনে এনে দাঁড় করিয়ে দিল পাথরটার ওপর, তারপর আঙুল দিয়ে নীচের দিকে দেখাল।

নীচে তাকিয়ে নীলাঞ্জন প্রথমে কিছু বুঝতে পারল না। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নীচের দিকে নেমে গিয়েছে পাইন, দেবদারু আর বাঁশের ঘন জঙ্গল। কিন্তু ভালো করে লক্ষ করে দেখতে পেল, সে যেখানে দাঁড়িয়ে আছে তার বেশ খানিকটা নীচে জঙ্গলের আড়ালে দাঁড়িয়ে রয়েছে ঢালু ছাদওলা একটা কাঠের বাড়ি। বাড়িটার গায়ের রং সবুজ, তাই হঠাৎ নীচের দিকে তাকালে তার অস্তিত্ব ধরা পড়ে না। বাড়িটা দেখার পর আরও একটা অদ্ভুত জিনিস চোখে পড়ল তার। সেই ছোট ছেলেটা সন্তর্পণে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে আস্তে-আস্তে এগিয়ে চলেছে জঙ্গলের আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা বাড়িটার দিকে। নীলাঞ্জন বুঝতে পারল, নিশ্চয়ই ব্যাপারটার মধ্যে কোনও রহস্য আছে। আরও একটা ব্যাপার সঙ্গে-সঙ্গে মাথায় এল তার। এই ছেলেটিকে যদি কৃষ্ণলামার কাছে হাজির করা যায়, তা হলে নীলাঞ্জনদের সমস্যার সমাধান হবে।

কিন্তু পরক্ষণেই তার মনে হল, এই ছেলেটি যদি সত্যি-সত্যিই স্রোঙচেন রাজবংশের অর্থাৎ লামা পাউয়ের সন্তান হয়ে থাকে এবং যদি সে তার অধিকার ফিরে পাওয়ার জন্য এসে থাকে, তা হলে কৃষ্ণলামা কি জীবিত রাখবেন তাকে? লামা পাউয়ের হত্যার ঘটনাটা বলার সময় কৃষ্ণলামার চোখ দুটো কেমন জ্বলজ্বল করে উঠেছিল, সেটা হঠাৎ মনে পড়ে গেল নীলাঞ্জনের। হয়তো বা এই মঠের ওপর তার অধিকার চিরদিনের মতো প্রতিষ্ঠা করার জন্য কৃষ্ণলামাই তাকে সরিয়ে দিয়েছিলেন পৃথিবী থেকে।

নীলাঞ্জন দেখল, ছেলেটি কিন্তু একবারও পিছনের দিকে তাকাচ্ছে না। তার দৃষ্টি শুধু জঙ্গলের আড়ালে বাড়িটার দিকে নিবদ্ধ। হয়তো বাড়িটার ভিতর থেকে কেউ তাকে দেখে ফেলতে পারে, এই ভয় করছে সে। কারণ, ঢাল বেয়ে কিছুটা নামার পরই মাঝে-মাঝে থেমে গিয়ে বাড়িটার দিকে তাকিয়ে থাকছে সে। একটা অদম্য কৌতূহল পেয়ে বসল নীলাঞ্জনকে। শুভমকে সেখানেই দাঁড়াতে বলে নীলাঞ্জনও খাদের ঢাল বেয়ে নীচের দিকে নামতে শুরু করল।

কিছুক্ষণের মধ্যেই সে অনেকটা নীচে নেমে গেল। ততক্ষণে ছোট লামাটি পৌঁছে গিয়েছে বাড়িটার কাছাকাছি। বাড়িটার কাছে এসে একটা মোটা দেবদারু গাছের আড়ালে বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে বাড়িটাকে ভালো করে লক্ষ করতে লাগল ছেলেটি। নীলাঞ্জনও তার হাতবিশেক পিছনে একটা গাছের আড়ালে এসে দাঁড়াল। বাড়ির এক পাশের প্রায় গোটাটাই এবার দেখতে পেল নীলাঞ্জন। প্যাগোডা ধাঁচের এই বাড়িটাও যে বেশ পুরোনো, তা বুঝতে পারল নীলাঞ্জন। বাড়িটার দরজাজানলা সব বন্ধ। বড় কয়েকটা গাছ ঘিরে আছে। ছেলেটি মিনিটদশেক গাছটার আড়ালে দাঁড়িয়ে ভালো করে বাড়িটাকে দেখে নিল। তারপর গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে বাড়িটার কাছে গিয়ে তার পিছনে অদৃশ্য হল।

নীলাঞ্জনও এবার গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে বাড়িটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। বাড়িটায় কেউ থাকে বলে মনে হল না তার। বাড়িটার ঢালু ছাদ আর জানলার কার্নিসে পুরু হয়ে জমে রয়েছে পচা পাতার রাশি। সরাসরি এখানে সূর্যের আলো এসে পড়ে না বলে জায়গাটাও কেমন স্যাঁতসেঁতে। ছেলেটি যেদিকে গিয়েছে, বাড়িটাকে বেড় দিয়ে নীলাঞ্জনও এগিয়ে গেল সেদিকে। প্যাগোডা ধাঁচের হলেও বাড়িটার একটা অংশ এল-এর মতো। বাড়িটার পিছন দিকে যেতেই নীলাঞ্জন দেখতে পেল, সেই এলের মতো অংশের বন্ধ দরজার গায়ে কান লাগিয়ে কী একটা শোনার চেষ্টা করছে ছেলেটি। দরজাটা তো বাইরে থেকে একটা আড়াআড়ি কাঠ দিয়ে পেরেক ঠুকে বন্ধ করা। তা হলে ঘরের ভিতর ছেলেটি কীসের শব্দ শোনার চেষ্টা করছে? কাউকে ঘরের ভিতর রেখে কি দরজাটা বাইরে থেকে বন্ধ করে রাখা হয়েছে। ব্যাপারটা কিছুই বুঝে উঠতে পারল না নীলাঞ্জন।

বাড়ির এদিকের অংশের ছাদটা লম্বা-লম্বা কাঠের থাম দিয়ে ধরে রাখা হয়েছে। ছেলেটি যাতে তাকে দেখতে না পায়, তাই নীলাঞ্জন একটা থামের আড়াল থেকে লক্ষ করতে লাগল ছেলেটিকে। বেশ কিছুক্ষণ দরজার গায়ে কান লাগিয়ে রাখার পর তার মুখে যেন ক্ষীণ হাসির রেখা ফুটে উঠল। দরজা থেকে এবার সরে এসে চার পাশের মাটিতে সে কী যেন একটা খুঁজতে শুরু করল। কিছু দূরে মাটির ওপর পড়েছিল হাতচারেক লম্বা একটা শক্ত গাছের ডাল। তার ওপর চোখ পড়তেই ছেলেটি গিয়ে সেটা কুড়িয়ে নিল। তারপর ফিরে এসে ডালের ছুঁচলো দিকটা দিয়ে দরজার গায়ে আটকানো কাঠের তক্তার নীচে ধীরে-ধীরে চাড় দিতে লাগল। নীলাঞ্জন বুঝল, ছেলেটি তক্তাটা খোলার চেষ্টা করছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই উদ্দেশ্য সফল হল ছেলেটির। তক্তার একটা দিক পেরেক থেকে আলগা হয়ে গেল। ছেলেটি এরপর টান মেরে দরজা থেকে তক্তাটা উপড়ে ফেলল। খুলে গেল দরজাটা। চারপাশে ভালো করে তাকিয়ে ছেলেটি ঘরের ভিতর ঢুকে পাল্লা দুটো আবার ভেজিয়ে দিল।

কয়েক মিনিট কেটে যাওয়ার পর নীলাঞ্জন এসে দাঁড়াল দরজাটার সামনে। তারপর পাল্লার ফাঁক দিয়ে ঘরের ভিতরে চোখ রাখল। ঘরের ভিতরে গাঢ় অন্ধকার, কিছুই দেখতে পাচ্ছে না সে। শুধু ভিতর থেকে গোঙানির একটা অস্পষ্ট শব্দ শোনা যাচ্ছে। হঠাৎ ঘরের ভিতর সে একটা খুট করে শব্দ শুনল, আর তারপরই বাইরের আলোয় ঘরের অন্ধকার কেটে গেল। নীলাঞ্জন দেখল, ঘরের ভিতরের একটা নীচুমতো জানলা খুলে ফেলেছে ছোট ছেলেটি। জানলাটা খোলার পর ছেলেটি এগিয়ে গেল লম্বা ঘরটার একটা কোণার দিকে। সন্তর্পণে দরজার পাল্লাটা ফাঁক করে নীলাঞ্জন তাকাল সেই দিকে। দেখল, ঘরের এক কোনায় কাঠের মেঝের ওপর হাত-মুখ বাঁধা অবস্থায় পড়ে রয়েছে একটি ছেলে। গোঙানির শব্দটা ভেসে আসছে তার কাছ থেকেই।

নীলাঞ্জন বুঝতে পারল যে, একটু আগে দরজার গায়ে কান পেতে এই শব্দটাই শোনার চেষ্টা করছিল ছোট লামাটি। মাটিতে যে ছেলেটি শুয়ে আছে, তার মুখের আদল তিব্বতিদের মতো হলেও পোশাক দেখে তাকে গুম্ফায় থাকা ছোট লামাদের মতো মনে হল না নীলাঞ্জনের। মাথাও তার কামানো নয়। শতছিন্ন জামাপ্যান্ট পরা যেসব তিব্বতি ছেলেকে অনেক সময় গ্যাংটকের রাস্তায় ভিক্ষে করতে দেখা যায়, এ ছেলেটাকে দেখে সেরকমই মনে হল নীলাঞ্জনের। ছোট লামাটি ছেলেটির মুখের বাঁধনটা খুলে দিতেই গোঙানি বন্ধ করে আস্তে-আস্তে দেওয়ালে ঠেস দিয়ে উঠে বসল সে। এরপর নীচু গলায় দুজনে কথা বলতে শুরু করল।

নীলাঞ্জনের মনে হল, ছোট লামাটি যেন তাকে প্রশ্ন করছে, আর ছেলেটি তার উত্তর দিচ্ছে। দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে তারা কী কথা বলছে, তা শুনতে পাচ্ছিল না নীলাঞ্জন। অবশ্য শুনতে পেলেও তার কোনও লাভ হত না। কারণ, তারা যে ভাষায় কথা বলছে, তা জানা নেই নীলাঞ্জনের। কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলার পর ছোট লামাটি উঠে দাঁড়াল। তারপর কোমরের নীচ থেকে টেনে বের করল সেই জপযন্ত্রটা। নীলাঞ্জন দেখল, জপযন্ত্রটা বের করার সঙ্গে-সঙ্গেই বসে থাকা ছেলেটি চোখ বন্ধ করে ফেলল। জপযন্ত্রটা হাতে ধরে ছোট লামাটি কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।

তারপর সে একটা অদ্ভুত কাণ্ড করল। জপযন্ত্রটা দিয়ে সজোরে আঘাত করল ছেলেটির কপালে। একটা মৃদু আর্তনাদ করে ছেলেটি মাথাটা ঝুঁকিয়ে দু'হাত দিয়ে কপালটা চেপে ধরল। ছোট লামাটি এবার জপযন্ত্রটা কোমরে গুঁজে বসে পড়ল ছেলেটির পাশে। তারপর তার মাথায় হাত বোলাতে লাগল। কিছুক্ষণ পর ছেলেটি মাথা তুলল। নীলাঞ্জন দেখতে পেল, তার কপাল বেয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। আস্তে-আস্তে ছেলেটি হাত সরিয়ে নিল কপাল থেকে। জপযন্ত্রটার আঘাতে তার কপালের একপাশে একটা ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে। নীলাঞ্জনের কেন যেন মনে হল, ছোট লামাটিকে সে ইচ্ছে করেই আঘাত করতে দিয়েছে। ছেলেটি এবার ছোট লামাটির দিকে তাকিয়ে হাসল। আর, সে পরম মমতায় হাত বোলাতে লাগল ছেলেটির ক্ষতস্থানের চারপাশে। নীলাঞ্জন বুঝতে পারছিল না, এখন তার কী করা উচিত। হঠাৎই নীলাঞ্জনের হাতের চাপে ক্যাঁচ করে একটা শব্দ হয়ে পাল্লাটা ফাঁক হয়ে গেল। শব্দটা শুনতে পেয়েই চমকে উঠে ছেলে দুটো দরজার দিকে তাকিয়ে নীলাঞ্জনকে দেখতে পেয়ে গেল। আর সঙ্গে-সঙ্গেই তড়াক করে উঠে দাঁড়াল ছোট লামাটি।

তারপর বিদ্যুৎগতিতে ছুটে গিয়ে খোলা জানলা দিয়ে বাইরে লাফিয়ে পড়ল। নীলাঞ্জন দেখল, মাটিতে বসে থাকা ছেলেটি ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে। নীলাঞ্জন এবার দরজা দিয়ে ঘরের ভিতর ঢুকতে যাবে, ঠিক সেই সময় পিছনে একটা খসখস শব্দ শুনতে পেল সে। ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকাতেই মাথায় কীসের একটা প্রচণ্ড আঘাত পেয়ে মাটিতে পড়ে গেল নীলাঞ্জন। মাটিতে পড়ে যাওয়ার পর তার চোখের সামনে ভেসে উঠল কৃষ্ণলামার মুখ। মুহূর্তেই জ্ঞান হারাল নীলাঞ্জন।

পাহাড়ের ঢাল দিয়ে নীচে নামার পর এক সময় শুভমের চোখের সামনে থেকে গাছে ঢাকা বাড়িটার আড়ালে হারিয়ে গেল নীলাঞ্জন। শুভম দাঁড়িয়ে রইল পাথরটার ওপর। আধ ঘণ্টা কেটে যাওয়ার পরও যখন নীলাঞ্জনকাকু ফিরে এল না, তখন তার কেমন ভয়-ভয় করতে লাগল। কী করবে সে বুঝে উঠতে পারছিল না। আরও কিছুক্ষণ পর শুভম দেখল, কৃষ্ণলামা আর তাঁর সঙ্গী বামনলামা সেই গাছে ঢাকা বাড়িটা থেকে বেরিয়ে এসে ওপর দিকে উঠতে শুরু করলেন। তাঁরা শুভমকে দেখার আগেই শুভম পাথরটা থেকে চট করে নেমে ঘরে গিয়ে দরজা ভেজিয়ে খাটের ওপর শুয়ে পড়ল।

আধ ঘণ্টা কেটে গেল, নীলাঞ্জন কিন্তু ফিরল না। বিছানায় শুয়ে শুভম ভাবতে লাগল, সে এখন কী করবে। হঠাৎ দরজার বাইরে পায়ের শব্দ পেয়ে বিছানার ওপর উঠে বসল শুভম। দরজাটা খুলে গেল, ঘরের ভিতর বামনলামাকে নিয়ে ঢুকলেন কৃষ্ণলামা। বামনলামার কাঁধে তাঁর পোষা সেই বাঁদরটা, আর হাতে একটা গোলমতো পাত্র। বামনলামা ঘরে ঢোকার পর কী যেন একটা বললেন, আর বাঁদরটাও তাঁর কাঁধ থেকে নেমে এক লাফে খাটের ওপর শুভমের কাছ থেকে একটু দূরে বসল। বামনলামা এবার তাঁর হাতের পাত্রটা নিয়ে এগিয়ে এলেন শুভমের দিকে। পাত্রটার মধ্যে দুধের মতো দেখতে একটা তরল পদার্থ রয়েছে। তবে, সেটা যে দুধ নয়, পাত্রটা কাছে আনার পর তার উৎকট গন্ধেই তা বুঝতে পারল শুভম।

কৃষ্ণলামা এবার শুভমের দিকে তাকিয়ে সেটা খেয়ে নেওয়ার জন্য ইশারা করলেন। বামনলামা পাত্রটা তুলে ধরলেন শুভমের মুখের কাছে। শুভম বামনলামার হাতটা পাত্রসুদ্ধ ঝটকা মেরে সরিয়ে দিল। পাত্রের তরলের কিছুটা চলকে পড়ল বিছানায় আর মেঝেয়। বামনলামা এবার খাটে বসা বাঁদরটার উদ্দেশে কী একটা উচ্চারণ করলেন, আর সঙ্গে-সঙ্গে সে শুভমের আর-একটু কাছে চার পায়ে ভর দিয়ে এসে দাঁত খিঁচোতে শুরু করল। বাঁদরটাকে দেখে ভয় পেয়ে গেল শুভম। সে বুঝতে পারল, জিনিসটা না খেলে তাঁরা হয়তো বাঁদরটাকে তার ওপর লেলিয়ে দেবেন। তাই বামনলামা পাত্রটা আর-একবার তার মুখের কাছে আনতেই সে এক চুমুকে সেই বিস্বাদ তরলটা খেয়ে নিল। সেটা খাওয়ার পরই শুভমের মাথার ভিতরটা কেমন যেন করতে লাগল। সংজ্ঞাহীন না হলেও সে কেমন যেন একটা ঘোরের মধ্যে আচ্ছন্ন হয়ে গেল। শুয়ে পড়ল খাটের ওপর।

এক সময় বাইরে অন্ধকার নেমে এল। তারপর কারা যেন তাকে বাইরে নিয়ে গিয়ে স্নান করিয়ে, লামাদের মতো পোশাক পরিয়ে, সারা মুখে ঘিয়ের মতো কীসব মাখিয়ে দিল। তারপর তার গলায় অদ্ভুত ধরনের একটা মালা পরিয়ে, বেশ কিছুটা হাঁটিয়ে তাকে একটা ঘরের ভিতর ঢুকিয়ে উঁচুমতো একটা জায়গায় বসিয়ে দেওয়া হল। ঘরটা ধোঁয়ায় ভরতি। এসব ব্যাপার স্বপ্ন না সত্যি, ঘোরের মধ্যে বুঝতে পারল না শুভম। সে বসে-বসে ঢুলতে লাগল। কানে বাজতে লাগল শুধু ডুগ ডুগ ডুগ ডুগ শব্দ।

মাটিতে পড়ে যাওয়ার পর কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার জ্ঞান ফিরে এল নীলাঞ্জনের। চোখ খুলে সে দেখল, তার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন কৃষ্ণলামা আর বামনলামা। বামনলামার হাতে একটা সরু লিকলিকে চামড়ার চাবুক। তার মাথায় আবার একটা ধাতুর ডেলা বাঁধা। নীলাঞ্জনের দিকে জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে কৃষ্ণলামা বললেন, 'শেষবারের মতো বলছি, জপযন্ত্রটা আমাকে দিয়ে দিন।'

নীলাঞ্জন অতি কষ্টে উত্তর দিল, 'বলছি তো, সেটা আমার কাছে নেই।'

কৃষ্ণলামা এবার চিবিয়ে-চিবিয়ে বললেন, 'জিনিসটা যে আপনার কাছে নেই, তা আমি জানি। আপনি যখন উৎসব দেখছিলেন, তখন আমার লোক সেটা খুঁজতে আপনার ঘরে গিয়েছিল। কিন্তু তারা সেটা পায়নি। জিনিসটা কোথায় লুকিয়েছেন, সেটাই আমি জানতে চাইছি।'

নীলাঞ্জন উত্তর দিল, 'আপনাকে আমি সত্যি কথাই বলছি। যার জিনিস, সেটা সে এসে নিয়ে গিয়েছে।'

কৃষ্ণলামা এবার চিৎকার করে উঠলেন, 'আবার মিথ্যে কথা। শুনে রাখুন, যতক্ষণ না ওটা দিচ্ছেন, ততক্ষণ এখানেই থাকতে হবে আপনাকে।'

এর পর কৃষ্ণলামা কী একটা বললেন বামনলামাকে। নীলাঞ্জন শুধু দেখল, বামনলামার চাবুকসমেত হাতটা একবার মাথার ওপর উঠল। পরমুহূর্তেই মাথায় একটা প্রচণ্ড আঘাত পেয়ে জ্ঞান হারাল নীলাঞ্জন।

যখন নীলাঞ্জনের জ্ঞান ফিরে এল, তখন প্রথমে কিছুই মনে করতে পারল না সে। তার চারপাশে শুধুই অন্ধকার। ডান চোখের ওপরে প্রচণ্ড যন্ত্রণা হচ্ছে তার। আস্তে-আস্তে একটা হাত সে মুখের কাছে নিয়ে এল। সারা মুখ তার চটচট করছে। একটু পরেই নীলাঞ্জন বুঝতে পারল, সেটা রক্ত। কিন্তু অন্ধকার ঘরে সে এই অবস্থায় শুয়ে আছে কেন? শুয়ে-শুয়ে এটাই সে মনে করার চেষ্টা করতে লাগল।

বেশ কিছুক্ষণ পর একটা অস্পষ্ট শব্দ শুনতে পেল নীলাঞ্জন। কিন্তু অন্ধকার ঘরের কোন দিক থেকে শব্দটা হল, বুঝতে পারল না সে। হঠাৎ একটা ক্ষীণ আলো ফুটে উঠল ঘরের মধ্যে। নীলাঞ্জন দেখল, একটা আলোর শিখা কাঁপতে-কাঁপতে এগিয়ে আসছে তার দিকে। আলোটা একটু কাছে এসেই থেমে গেল। বেশ কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থাকার পর নীলাঞ্জন বুঝতে পারল, সেটা একটা প্রদীপ। আস্তে-আস্তে নীলাঞ্জনের চোখের সামনে ফুটে উঠল প্রদীপ হাতে দাঁড়িয়ে থাকা একজন বৃদ্ধ লামার মুখ। তিনি ঠোঁটের ওপর আঙুল তুলে নীলাঞ্জনকে চুপ করে থাকতে ইশারা করলেন। তারপর এগিয়ে এলেন নীলাঞ্জনের আরও কাছে।

নীলাঞ্জন এবার উঠে বসার চেষ্টা করল। কিন্তু পারল না। মাথাটা তার পাথরের মতো ভারী মনে হতে লাগল। বৃদ্ধ লামাটি প্রদীপটি মাটিতে নামিয়ে রেখে তার পাশে বসলেন। বেশ কিছুক্ষণ তাঁরা পরস্পরের দিকে তাকিয়ে রইলেন। নীলাঞ্জনের মনে হল, সে লোকটিকে আগে কোথায় যেন দেখেছে। কিন্তু কোথায় দেখেছে, তা কিছুতেই মনে করতে পারল না। লোকটি নীলাঞ্জনকে তুলে ধরে দেওয়ালের গায়ে ঠেস দিয়ে বসিয়ে দিলেন, তারপর তাঁর পোশাকের ভিতর থেকে একটা পাত্র বের করে ঠান্ডা জল ঢেলে দিলেন নীলাঞ্জনের মুখে। জলটা খাওয়ার পর নীলাঞ্জন যেন একটু ধাতস্থ হল। সে বারবার মনে করার চেষ্টা করতে লাগল, সে এখন কোথায়!

বৃদ্ধ লামা প্রদীপটা মাটি থেকে তুলে নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন, তারপর নীলাঞ্জনকেও উঠে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত করলেন। প্রচণ্ড কষ্ট হলেও নীলাঞ্জন দেওয়ালের গায়ে ভর দিয়ে এক সময় উঠে দাঁড়াল। একটু চেষ্টার পর সে হাঁটতেও পারল। নীলাঞ্জন তাঁর পিছন-পিছন গিয়ে দাঁড়াল ঘরের এক কোনায়। লামা এবার প্রদীপটা হাতে নিয়ে একটু নীচু হলেন। নীলাঞ্জন দেখতে পেল, কাঠের দেওয়ালের নীচের দিকের এক জায়গায় কয়েক হাত কাঠের পাটাতন কে যেন সরিয়ে ফেলেছে। অনায়াসেই ওই জায়গা দিয়ে ঘরের বাইরে বেরিয়ে যাওয়া যায়।

কিছুক্ষণের মধ্যেই সেখান দিয়ে বাইরে বেরিয়ে সে খোলা আকাশের নীচে এসে দাঁড়াল। বাইরে ফটফট করছে জ্যোৎস্না। সেই আলোয় আকাশের বুকে মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা পর্বতশৃঙ্গগুলো দুধের মতো সাদা দেখাচ্ছে। মাথার ওপর বিরাট রুপোর থালার মতো চাঁদের দিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল নীলাঞ্জন। এত বড় চাঁদ এর আগে কোনওদিন দেখেনি সে। তার দিকে তাকিয়ে থাকতে-থাকতে হঠাৎই নীলাঞ্জনের মনে পড়ে গেল সবকিছু। বুঝতে পারল যে, সে দাঁড়িয়ে আছে গাছে ঘেরা বাড়িটার সামনে। সামনের ছোট পাহাড়টার মাথার ওপর মনাস্ট্রির চূড়াটাও চাঁদের আলোয় স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে সে।

বাইরে বেরিয়ে আসার পর প্রদীপটা নিভিয়ে ফেলেছিলেন বৃদ্ধ লামা। কারণ, তার আর কোনও দরকার ছিল না। নীলাঞ্জনকে নিয়ে সন্তর্পণে সামনের পাহাড় ভেঙে মনাস্ট্রির দিকে উঠতে শুরু করলেন তিনি। নীলাঞ্জন ততক্ষণে চিনে ফেলেছে এই লামাটিকে। এঁকেই নীলাঞ্জনরা আহত অবস্থায় রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে পৌঁছে দিয়েছিল গ্যাংটকের হাসপাতালে। তার পর থেকেই সব ঘটনার শুরু।

এক সময় নীলাঞ্জনরা উঠে এলেন সেই পাথরটার কাছে, যেখানে শুভমকে দাঁড় করিয়ে রেখে নীচে নেমেছিল নীলাঞ্জন। শুভমের যদি ওঁরা কোনও ক্ষতি করে থাকেন, তা হলে ওর বাবা-মা'র সামনে গিয়ে নীলাঞ্জন দাঁড়াবে কীভাবে! এই কথাটা মনে হতেই শরীরের সব কষ্ট ভুলে গেল নীলাঞ্জন। শুধু একটা অব্যক্ত যন্ত্রণা পাক খেতে লাগল তার মনের মধ্যে।

ওপরে উঠে আসার পর নীলাঞ্জন চারপাশে কাউকে দেখতে পেল না। শুধু শুনতে পেল মনাস্ট্রির ভিতর থেকে ভেসে আসছে ডুগডুগির ডুগ ডুগ ডুগ ডুগ শব্দ। পাথরটার সামনে বেশ কয়েক মিনিট দাঁড়ালেন নীলাঞ্জনরা। নীলাঞ্জনের মনে হল, বৃদ্ধ লামা যেন বোঝার চেষ্টা করছেন শব্দটা মনাস্ট্রির কোন দিক থেকে ভেসে আসছে।

তারপর তিনি তাঁর জুতোর ভিতর থেকে একটা ছুরির মতো জিনিস টেনে বের করলেন। এই অস্ত্রটা একটু অদ্ভুত ধরনের, এর কোনও হাতল নেই। দু'দিকেই ফলা। চাঁদের আলোয় জিনিসটা ঝকঝক করে উঠল। অস্ত্রটা বের করার পর লামা এবার নীলাঞ্জনকে তাঁর সঙ্গে আসতে ইশারা করে এগিয়ে চললেন মনাস্ট্রির দিকে। বাইরে থেকে মনাস্ট্রির ভিতর কোনও আলো দেখা যাচ্ছে না, শুধু সেই ডুগডুগির শব্দ ক্রমশই বেড়ে চলেছে। মনাস্ট্রির দেওয়ালের গা ঘেঁষে লামার পিছন-পিছন সন্তর্পণে নীলাঞ্জন হাজির হল মনাস্ট্রির সদর দরজার সামনে। সেটা খোলা রয়েছে। চারপাশ ভালো করে একবার তাকিয়ে নীলাঞ্জনকে নিয়ে লামা ঢুকলেন তার ভিতরে।

মনাস্ট্রির ভিতরটাও অন্ধকার। নীলাঞ্জন বুঝতে পারল, ডুগডুগির শব্দটা ভেসে আসছে প্রার্থনাকক্ষের পিছন দিকের কোনও ঘর থেকে। প্রার্থনাকক্ষের মধ্যে কেউ নেই। শুধু বুদ্ধমূর্তির সামনে একটা প্রদীপ নিভুনিভু অবস্থায় জ্বলছে। নীলাঞ্জন লামার পিছু-পিছু ঢুকল একটা ঘরের মধ্যে। তার ভিতরে জমাটবাঁধা অন্ধকার। কোনও কিছু দেখা যাচ্ছে না। আন্দাজের ওপর নির্ভর করে লামার মৃদু পায়ের শব্দ শুনে তাঁকে অনুসরণ করে চলল সে। বেশ কয়েকটা ঘর পার হয়ে লামা এসে দাঁড়ালেন একটা ঘরের দরজার পাশে। ঘরের ভিতরে ভীষণ জোরে একসঙ্গে এত ডুগডুগি বাজছে যে, কানে তালা ধরে যাওয়ার উপক্রম। আস্তে-আস্তে নীলাঞ্জন উঁকি দিল ভিতরে। সেখানে আলো থাকলেও সারাঘর ধোঁয়ায় ভরতি। তার মধ্য দিয়ে কিছুই দেখতে পেল না সে। নীলাঞ্জন একবার তাকাল বৃদ্ধ লামার মুখের দিকে। তিনি তাকে ইশারায় দরজার পাল্লার আড়ালে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতে বললেন। মিনিটপাঁচেক পর কমে আসতে লাগল ডুগডুগির শব্দ। নীলাঞ্জন এবার শুনতে পেল, কে যেন ভারী গলায় অদ্ভুত সুর করে দুর্বোধ্য ভাষায় একটানা কীসব বলে চলেছেন। সম্ভবত কেউ মন্ত্রোচ্চারণ করছেন। মনোযোগ দিয়ে শোনার পর নীলাঞ্জন বুঝতে পারল, গলাটা কৃষ্ণলামার।

মিনিট দুয়েক পরে ডুগডুগির শব্দ একদম থেমে গেল। শুধুই চলতে লাগল মন্ত্রোচ্চারণ। নীলাঞ্জন আর-একবার সাবধানে উঁকি মারল ঘরের ভিতর। ধোঁয়া এবার অনেকটাই কমে এসেছে। সে দেখতে পেল, একটা লম্বা ঘরের শেষপ্রান্তে উঁচু বেদির ওপর বসানো আছে ভয়ালদর্শন পাথরের বিরাট মূর্তি। তার বড়-বড় দাঁত বের করা মুখের ভিতর থেকে সাপের মতো চেরা লম্বা জিভ নেমে এসেছে বুকের নীচ পর্যন্ত। লম্বা নখওলা দু-হাত থেকে ঝুলছে নরমুণ্ড। কৃষ্ণলামা সেই বিকটদর্শন মূর্তির দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে দু-হাত নাড়িয়ে মন্ত্রোচ্চারণ করে চলেছেন। তাঁর এক হাতে ধরা একটা লম্বা হাড়, আর-এক হাতে ধরা সেই জপযন্ত্র দুটোর একটা। ঘরের দুপাশে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে আছেন জনাকুড়ি নানাবয়সি লামা। তার মধ্যে বামনলামাও আছেন। তাঁদের প্রত্যেকের হাতে একটা করে ডুগডুগি, আর বাটির মতো ছোট পাত্র। দরজার দিকে পিছন ফিরে তাঁরা এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন সেই ভয়ংকর মূর্তি, আর কৃষ্ণলামার দিকে।

ভালো করে ঘরের ভিতর চারদিকে তাকাতেই নীলাঞ্জন হঠাৎ দেখতে পেয়ে গেল শুভমকে। ঘরের কোনায় একটা ছোট্ট বেদির ওপর সে বসে-বসে ঢুলছে। তাকে পরিয়ে দেওয়া হয়েছে কালো রঙের ঢিলে পোশাক। তবে তার হাত-পা খোলা। নীলাঞ্জনের মনে হল, সে যেন তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় আছে। তার কোনও হুঁশ নেই। কৃষ্ণলামার মন্ত্রোচ্চারণ শেষ হল এক সময়। একটু পাশ ফিরে বামনলামাটির দিকে তাকিয়ে তিনি কী একটা ইঙ্গিত করলেন। সঙ্গে-সঙ্গে অন্য লামারা দুর্বোধ্য ভাষায় চিৎকার করে একসঙ্গে কী যেন বলে উঠলেন বেশ কয়েকবার। তারপর সকলে হাতের পাত্রে একটা চুমুক দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। বামনলামা তাঁর হাতের পাত্রটি মাটিতে নামিয়ে রেখে ঘরের কোনায় শুভমের কাছে হেঁটে গেলেন। শুভমের একটা হাত ধরে মাটির ওপর তাকে দাঁড় করিয়ে দিলেন তিনি। তারপর তাকে ধীরে-ধীরে হাঁটিয়ে নিয়ে যেতে লাগলেন সেই ভয়ংকর মূর্তির বেদির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কৃষ্ণলামার দিকে।

শুভমকে এনে দাঁড় করানো হল কৃষ্ণলামার কাছে। কৃষ্ণলামা এবার বেদির সামনে থেকে একটু সরে দাঁড়ালেন, আর সঙ্গে-সঙ্গে চমকে উঠল নীলাঞ্জন। বেদির ঠিক নীচে মেঝের ওপর একটা হাড়িকাঠ রয়েছে, আর তার পাশেই শোয়ানো আছে একটা বিরাট ভোজালি। কৃষ্ণলামার শরীরের আড়ালে জিনিস দুটো এতক্ষণ ঢাকা ছিল। শুভমকে হাঁটু মুড়িয়ে বসিয়ে দেওয়া হল হাড়িকাঠের সামনে। শুভম তাঁকে কোনও বাধা দিল না। ব্যাপারটা কী হতে চলেছে বুঝতে বিন্দুমাত্র অসুবিধে হল না নীলাঞ্জনের। শুভমকে ওরা এই অপদেবতার মূর্তির সামনে বলি দেবে। সঙ্গে-সঙ্গে সে ঘরের মধ্যে ঢোকার জন্য পা বাড়াল। কিন্তু বৃদ্ধ লামা এক হাতে তার গলা জড়িয়ে ধরে আটকে দিলেন তাকে। লামার অস্ত্র ধরা অন্য হাতটা ওপর দিকে উঠল এবার। আর তার পরই অস্ত্রটা ছুটে গেল সামনের দিকে। বামনলামা একটু ঝুঁকতে যাচ্ছিলেন, সম্ভবত শুভমের গলাটা হাড়িকাঠের ভিতরে ঢুকিয়ে দেওয়ার জন্য। কিন্তু তা আর হল না।

বৃদ্ধ লামার ছুরিটা বাতাসের মধ্যে পাক খেয়ে আমূল গেঁথে গেল বামনলামার বুকে। বামনলামার পাশে একটা কাঠের স্ট্যান্ডের মাথায় বসানো ছিল একটা বড় জ্বলন্ত প্রদীপ। বিকট চিৎকার করে সেটাকে জড়িয়ে ধরে বামনলামা পড়ে গেলেন মেঝের ওপর। নীলাঞ্জনের গলা থেকেও একটা চিৎকার বেরিয়ে এল নিজের অজান্তে। সেটা শুনতে পেয়েই মনে হয় শুভম মাথা একটু উঁচু করে তাকাল সামনের দিকে। সে দেখতে পেল দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা নীলাঞ্জনকে। সঙ্গে-সঙ্গে যেন তার ঘোর কেটে গেল। সে দাঁড়িয়ে উঠে লামাদের সারির ফাঁক দিয়ে বিদ্যুৎগতিতে ছুটে গেল নীলাঞ্জনের দিকে। শুভম তার কাছে পৌঁছনোমাত্র তার হাত ধরে নীলাঞ্জন আর বৃদ্ধ লামা অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে ছুটতে শুরু করলেন মনাস্ট্রির বাইরে বের হওয়ার জন্য। এসব ঘটনা এত দ্রুত ঘটে গেল যে, তা বুঝতে আরও কয়েক মুহূর্ত সময় লেগে গেল কৃষ্ণলামা ও তাঁর সঙ্গীদের। আর তার পরেই তাঁরা পিছু ধাওয়া করলেন নীলাঞ্জনদের।

অন্ধকার ঘরগুলো কোনওরকমে পেরিয়ে মনাস্ট্রির বাইরে এল নীলাঞ্জন। কিন্তু বাইরে আসার সঙ্গে-সঙ্গেই তাদের সঙ্গী বৃদ্ধ লামা যেন ভোজবাজির মতো কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেলেন। নীলাঞ্জন শুনতে পেল, মনাস্ট্রির ভিতর থেকে দুমদাম শব্দে ছুটে আসছে অনেক পায়ের শব্দ। কোন দিকে গেলে তারা প্রাণে বাঁচবে, বুঝতে না পেরে শুভমকে নিয়ে নীলাঞ্জন দৌড়োল সেই খাদের দিকটায়, যেখান দিয়ে সে বৃদ্ধ লামার সঙ্গে ওপরে উঠে এসেছিল। তারা দৌড় শুরু করার প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই কৃষ্ণলামা ও তাঁর অনুচররা বাইরে বেরিয়ে এলেন। তারপর নীলাঞ্জনদের দেখতে পেয়ে তাদের পিছু ধাওয়া করলেন। খাদের কাছে এসে লামাদের দল যখন নীলাঞ্জনদের প্রায় ধরে ফেলেছেন, ঠিক তখনই নীলাঞ্জনের মনে হল, তার পিছনে পায়ের শব্দ হঠাৎই যেন থেমে গেল। নীলাঞ্জন পিছনে তাকিয়ে দেখল, কৃষ্ণলামা আর তাঁর সঙ্গী লামারা পাথরের মতো স্থির হয়ে তাদের চেয়ে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে পড়েছেন। আর তাঁদের দৃষ্টি নীলাঞ্জনদের দিকে নয়, তাঁরা কোনাকুনিভাবে তাকিয়ে আছেন খাদের দিকে।

তাঁদের দৃষ্টি অনুসরণ করে নীলাঞ্জন দেখল, সেদিক থেকে এগিয়ে আসছেন দুজন মানুষ। তাঁরা এগিয়ে এসে দাঁড়িয়ে পড়লেন কৃষ্ণলামার দলবল আর নীলাঞ্জনদের মাঝখানের ফাঁকা জায়গাটায়। দুজনের মধ্যে যে মানুষটি বেশি লম্বা তাঁর হাতে একটা মশাল জ্বলছে। তারই আলোয় দুজনকেই চিনতে পারল নীলাঞ্জন। লম্বা মানুষটি হলেন সেই বৃদ্ধ লামা, আর-একজন হলেন তাঁর সঙ্গী সেই ছোট লামাটি। কিন্তু এখন তার গায়ে পা পর্যন্ত ঢাকা ঝলমলে পোশাক, মাথায় হলুদ রঙের অদ্ভুত দেখতে কান-উঁচু টুপি, হাতে ধরা আছে জপযন্ত্রটা। এই পোশাকে তাকে এর আগে দেখেনি নীলাঞ্জনরা। সারা শরীর তার মশালের আলোয় ঝকমক করছে। তারা এসে দাঁড়ানোর পর বৃদ্ধ লামা মশালটা একটু ওপরে তুলে ধরলেন, আর সঙ্গে-সঙ্গে ছোট লামাটিও তার হাতের জপযন্ত্রটা মশালের কাছে নিয়ে গিয়ে, সেটা কৃষ্ণলামার সঙ্গীদের দেখিয়ে কী যেন বলল। তারপর জপযন্ত্রটা মাথার ওপর তুলে ঘোরাতে শুরু করল। নীলাঞ্জন দেখল, কৃষ্ণলামার সঙ্গীদের চোখ-মুখের ভাবের পরিবর্তন হতে শুরু করেছে। তাঁদের চোখের আগুন নিভে আসছে, ধারালো অস্ত্রধরা হাতগুলো আস্তে-আস্তে শিথিল হয়ে নেমে আসছে নীচের দিকে।

তারপর হঠাৎই তাঁরা একসঙ্গে হাঁটু মুড়ে বসে পড়লেন ঝলমলে পোশাক পরা ছোট লামাটির সামনে। কৃষ্ণলামা শুধু বসলেন না। জপযন্ত্রটা হাতে ধরে বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলেন ছেলেটির দিকে। এসব দেখার পর নীলাঞ্জনও ভুলে গেল পালানোর কথা। শুভমকে নিয়ে সে-ও দেখতে লাগল ঘটনাটা। লামার দল মাথা ঝুঁকিয়ে বসে রইলেন আর ছেলেটি জপযন্ত্রটা ঘুরিয়ে চলল। হঠাৎ সে জপযন্ত্রটা ঘোরানো বন্ধ করে উচ্চৈঃস্বরে কী একটা নির্দেশ দিল। আর সঙ্গে-সঙ্গে তার সামনে নতজানু হয়ে বসে থাকা লামার দল অস্ত্র হাতে উঠে ঘুরে দাঁড়িয়ে এগোতে থাকলেন কৃষ্ণলামার দিকে।

কৃষ্ণলামা এবার তাঁর হাতের জপযন্ত্রটা উঁচিয়ে ধরে চিৎকার করে কী যেন বললেন তাদের উদ্দেশে। কিন্তু তাতে তাঁরা থামলেন না। প্রথমে কৃষ্ণলামা দু-পা পিছিয়ে গেলেন, তারপর উলটো দিকে ঘুরে মনাস্ট্রির উদ্দেশে দৌড়তে শুরু করলেন। আর তাঁকে তাড়া করতে শুরু করলেন লামার দল। তাঁদের পিছন-পিছন চললেন বৃদ্ধ লামা, আর তাঁর সঙ্গী ছোট লামাটিও। নীলাঞ্জনের ভয় ততক্ষণে অনেকটাই কেটে গিয়েছে। সে বুঝতে পারল, কৃষ্ণলামার কথা তা হলে কিছুটা হলেও সত্যি ছিল। বৃদ্ধ লামার সঙ্গী ছেলেটি হল স্রোঙচেন পাউয়ের ছেলে। সে এসেছে এই মঠের ওপর নিজের অধিকার ফিরে পেতে। কৃষ্ণলামা নন, এই ছোট ছেলেটিই আজ থেকে এখানকার মঠাধ্যক্ষ। আর সেটা বুঝতে পেরেই লামার দল কৃষ্ণলামার পরিবর্তে তার নির্দেশ মানতে শুরু করেছেন।

মনাস্ট্রির কাছে পৌঁছে ভিতরে ঢোকার আগে হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন কৃষ্ণলামা। হয়তো তিনি ভাবলেন, মনাস্ট্রির ভিতর ঢুকলে তাঁর পক্ষে বাঁচা আরও কঠিন হবে। কিন্তু কোন দিকে পালাবেন তিনি? চারদিক থেকে ততক্ষণে তাঁর কাছাকাছি চিৎকার করতে-করতে ছুটে আসছেন অস্ত্র হাতে লামার দল। হঠাৎ তাঁর চোখ পড়ল মনাস্ট্রির ছাদের দিকে। প্রবেশতোরণের ঠিক মাথার ওপর বামনলামার পোষা বাঁদরটা এতক্ষণ বসে-বসে সব দেখছিল। কিন্তু চারপাশে লোকজনকে ছুটে আসতে দেখে সে বেচারা ভয় পেয়ে তখন ওপর দিকে উঠতে শুরু করেছে। তাকে দেখার সঙ্গে-সঙ্গে অন্য একটা বুদ্ধি খেলে গেল কৃষ্ণলামার মাথায়। তিনিও মুহূর্তের মধ্যে তাঁর হাতের জপযন্ত্রটা দাঁতে চেপে ধরে তরতর করে কাঠের স্তম্ভ বেয়ে ওপর দিকে উঠতে শুরু করলেন।

লামার দল ততক্ষণে পৌঁছে গিয়েছেন মনাস্ট্রির সামনে। কিন্তু তাঁরা এবার কী করবেন বুঝতে না পেরে তাকিয়ে রইলেন ওপর দিকে। আর কৃষ্ণলামা অসাধারণ দক্ষতায় উঠে যেতে লাগলেন এক ছাদ থেকে আর-এক ছাদে, আরও ওপরের দিকে। হঠাৎ ছোট লামাটিও তার জপযন্ত্রটা কোমরে গুঁজে নিয়ে থাম বেয়ে ছাদের দিকে উঠতে শুরু করল। শুভমকে নিয়ে নীলাঞ্জনও পৌঁছে গিয়েছে সেখানে। রুদ্ধশ্বাসে তারা দেখতে লাগল ঘটনাটা।

প্যাগোডা আকৃতির মনাস্ট্রির ছাদ ধাপে-ধাপে উঠে গিয়েছে ওপর দিকে। কৃষ্ণলামা এক সময় পৌঁছে গেলেন তার চূড়োয়। সে জায়গাটা প্রায় পাঁচ তলা বাড়ির মতো উঁচু হবে। কিছুক্ষণের মধ্যে ছেলেটিও পৌঁছে গেল কৃষ্ণলামা যেখানে দাঁড়িয়ে আছেন, তার ঠিক নীচের ধাপটায়। ঢালু ছাদ বেয়ে ছেলেটি কৃষ্ণলামার কাছে যাওয়ার চেষ্টা করতেই তিনি ওপর থেকে ছাদের আলগা হয়ে যাওয়া কাঠের টুকরোগুলো ছুড়ে মারতে লাগলেন। ছেলেটা কোনওরকমে এড়িয়ে যেতে লাগল আঘাতগুলো। এমনিতেই ঢালু ছাদের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা প্রায় অসম্ভব। নীলাঞ্জনের মনে হতে লাগল, এই বুঝি সে ওপর থেকে গড়িয়ে নীচে পড়ে যাবে। তা হলে আর সে বাঁচবে না।

শেষ পর্যন্ত হয়তো কৃষ্ণলামার আক্রমণের হাত থেকে বাঁচার জন্যই একটা শেষ চেষ্টা করল ছেলেটি। সে কোমর থেকে তার জপযন্ত্রটা খুলে নিয়ে সজোরে ছুড়ে মারল কৃষ্ণলামার দিকে। কিন্তু কৃষ্ণলামা অদ্ভুত কৌশলে ধরে ফেললেন সেটা। তারপর দু-হাতে দুটো জপযন্ত্র নিয়ে অট্টহাস্য করে উঠলেন। তাঁর সেই ভয়ংকর হাসি প্রতিধ্বনিত হতে লাগল পাহাড় থেকে পাহাড়ে। জপযন্ত্র দুটো মাথার ওপরে ঘোরাতে-ঘোরাতে কী যেন বলতে লাগলেন।

নীলাঞ্জন দেখল, লামার দল অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন কৃষ্ণলামার দিকে। এমনকী, ছোট ছেলেটিও ছাদের ওপর স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে কৃষ্ণলামার দিকে তাকিয়ে। হঠাৎই নীলাঞ্জনের মনে পড়ে গেল কৃষ্ণলামার সেই কথাটা। তার তান্ত্রিক গুরু এই মন্ত্রপূত জপযন্ত্রটা হাতে ধরে নাকি উড়ে বেড়াতেন আকাশে। তা হলে কৃষ্ণলামাও কি এবার আকাশে উড়ে যাবেন নাকি!

কথাটা ভাবার প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই নীলাঞ্জন চাঁদের আলোয় দেখতে পেল, কৃষ্ণলামা তাঁর জপযন্ত্র ধরা হাত দু'টোকে দুপাশে মেলে দিলেন পাখির ডানার মতো। তারপর যেন ওপর দিকে একটু লাফিয়ে উঠলেন। কিন্তু তিনি আর ওপর দিকে উঠতে পারলেন না, শূন্যে একটা পাক খেয়ে নীলাঞ্জনদের মাথার ওপর দিয়ে নেমে এসে দড়াম করে আছড়ে পড়লেন মনাস্ট্রির সামনের পাথুরে মাটিতে। মুহূর্তের জন্য একবার কেঁপে উঠল তাঁর শরীরটা, তারপর চিরদিনের মতো স্থির হয়ে গেল। জপযন্ত্র দুটো কিন্তু তাঁর দু'হাতে তখনও শক্ত করে ধরা।

কৃষ্ণলামার দেহ যেখানে পড়েছিল, তার চারপাশ ভেসে যাচ্ছিল রক্তে। ছাদ থেকে নীচে নেমে আসার পর ছেলেটি ধীরে-ধীরে এগিয়ে গেল সেদিকে। তারপর কৃষ্ণলামার হাত থেকে খুলে নিল জপযন্ত্র দুটো। লামাদের সঙ্গে-সঙ্গে নীলাঞ্জন আর শুভমও গিয়ে দাঁড়াল তার কাছাকাছি। লামাদের উদ্দেশে ছেলেটি তাদের নিজস্ব ভাষায় কী যেন বলতে শুরু করল। আর, লামারা তাকে গোল হয়ে ঘিরে ধরে শুনতে লাগলেন তার কথা। এক সময় তার বলা শেষ হল। লামাদের দল মাথা নীচু করে অভিবাদন জানালেন তাকে। ছেলেটি এবার নীলাঞ্জনদের তার সঙ্গে আসার জন্য ইশারা করে হাঁটতে শুরু করল মনাস্ট্রির চত্বরের বাইরের দিকে।

সেই বৃদ্ধ লামাও মশাল হাতে চলতে লাগলেন তার পাশাপাশি। নীলাঞ্জন শুভমকে নিয়ে তাদের অনুসরণ করল। চাঁদের আলোয় পাহাড়ি পথ ভেঙে আস্তে-আস্তে তাঁরা মনাস্ট্রি থেকে দূরে চলে যেতে লাগলেন। বেশ কিছুক্ষণ পথ চলার পর হঠাৎ তাঁরা দেখলেন, আকাশের একটা দিক হঠাৎ লাল হয়ে গিয়েছে। আর, ওই দিকেই মনাস্ট্রি। সেদিকে তাকিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন সকলে। নীলাঞ্জন বুঝতে পারল, মনাস্ট্রিতে আগুন ধরে গিয়েছে। হয়তো বামনলামা যে প্রদীপটা ফেলে দিয়েছিলেন মেঝেয়, তা থেকেই লেগেছে আগুনটা। অথবা অন্য কোনও ভাবেও লাগতে পারে। বৃদ্ধ লামার হাতের মশালটা তখনও জ্বলছিল। সেই আলোয় নীলাঞ্জন দেখল, লাল হয়ে যাওয়া আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা ছোট লামাটির চোখের নীচে টলটল করছে জল।

কিছুক্ষণ পর আবার তারা চলতে শুরু করল। অনেকটা পথ চড়াই-উতরাই ভেঙে এক সময় নীলাঞ্জনরা এসে পৌঁছল সেই জায়গাটায়, যেখানে গাড়ি তাদের নামিয়ে দিয়ে গিয়েছিল। সেখানে পৌঁছনোর পর ছোট লামাটি ঘুরে দাঁড়াল নীলাঞ্জনদের দিকে। শুভমের কাছে এসে তাকে জড়িয়ে ধরে বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর শুভমের হাতে একখানা জপযন্ত্র তুলে দিল সে। শুভমের মুখে অনেকক্ষণ পর হাসি ফুটে উঠল। একটা বিষণ্ণ হাসি ফুটে উঠল ছোট লামার মুখেও। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁদের মশালের আলো হারিয়ে গেল পাহাড়ি রাস্তার আড়ালে। তখন ভোর হয়ে আসছে।

ড্রাইভার তার কথা রেখেছিল। সে সেখানে পৌঁছে গেল ঠিক সময় মতোই। যদিও নীলাঞ্জনদের সে আবার দেখতে পাবে কি না, তা নিয়ে তার ঘোর সন্দেহ ছিল। কারণ, কৃষ্ণলামা সম্বন্ধে নানা কথা শোনা যায়। আগে জানলে নীলাঞ্জনদের সে কখনওই এখানে আসতে দিত না। নীলাঞ্জনদের দেখতে পেয়ে সে এত খুশি হল যে, গাড়ি থেকে নেমে দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরল নীলাঞ্জন আর শুভমকে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই সে তাদের নিয়ে চলতে শুরু করল গ্যাংটকের দিকে।

শুভম গাড়িতে ওঠার পর হঠাৎ জিগ্যেস করল, 'আচ্ছা নীলাঞ্জনকাকু, ছোট লামাটি আমাকে পাথর ছুড়েছিল কেন?'

সঙ্গে-সঙ্গে নীলাঞ্জনের মনে পড়ল খাদের নীচে সেই বাড়িটায় হাত-পা বাঁধা ছোট ছেলেটির মাথা ফাটানোর ঘটনাটাও। সে উত্তর দিল, 'জানো তো, কারও শরীরে কোনও খুঁত থাকলে তাকে বলি দেওয়া যায় না। তোমার মাথা ফাটিয়ে কৃষ্ণলামার হাত থেকে তোমাকে বাঁচাতে চেয়েছিল ছোট লামাটি।'

শুভম শুধু বলল, 'হুঁ।' তারপর সে হাতের জপযন্ত্রটা ঘোরাতে শুরু করল। বেশ কিছুক্ষণ চলার পর গাড়ি একটা বাঁক নিতেই নীলাঞ্জন দেখতে পেল, নীচে ভোরের আলোয় ঝলমল করছে গ্যাংটক শহর।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%