হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

রং চটা কিট ব্যাগটা কাঁধে ফেলে দরজা ধরে দাঁড়িয়ে থাকা পুঁটির দিকে তাকিয়ে শিমুল বলল, 'সাবধানে থাকিস। আর মা-র দিকে লক্ষ্য রাখিস।' শিমুল দেখল পুঁটির চোখ দুটো ছলছল করছে। এরপর সে পুঁটিকে জিগ্যেস করল, 'তোর স্কুলের টাকাটা কবের মধ্যে জমা দিতে হবে রে?'
পুঁটি উত্তর দিল, 'সাত তারিখের মধ্যে।'
শিমুল বলল, 'আমি ছয় তারিখ ফিরব। সাত তারিখ তুই টাকাটা জমা দিয়ে দিস।'
পুঁটি ঘাড় নেড়ে জানাল, 'আচ্ছা'
শিমুল এরপর আর দাঁড়াল না, পুঁটির মাথায় একবার হাত বুলিয়ে গলির দিকে হাঁটতে শুরু করল। ঘিঞ্জি গলির দু'পাশে ছোট ছোট বাড়ি-ঘর ঠেসাঠেসি করে দাঁড়িয়ে আছে। কলকাতার এ অঞ্চলটায় নিম্নবিত্ত আর গরিব মানুষের বাস। গলি, তস্য গলি। টানা রিকশা ছাড়া অন্য কোনও গাড়িঘোড়া ঢোকে না এখানে। তবে তার বিশেষ দরকারও নেই। কারণ, শিমুলদের পাড়ায় যারা বাস করে তাদের গাড়ি চড়ার মতো আর্থিক সামর্থ্য নেই। এ গলি সে গলি দিয়ে শিমুল এসে উপস্থিত হল তাদের পাড়ার ছোট্ট মোড়টাতে। ডান পাশে কর্পোরেশনের টাইম কল। তার সামনে নানা বয়েসি পুরুষ-মহিলা হাতে পাত্র নিয়ে জল ধরার জন্য দাঁড়িয়ে আছে। এবং জল ধরা নিয়ে নিত্যদিনের মতো তারা নিজেদের মধ্যে ঝগড়াও শুরু করেছে। জলের লাইনের একদম শেষে এক হাতে নিমদাঁতন আর অন্য হাতে বালতি নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন মধুময়বাবু। বৃদ্ধ মানুষ, শিমুলদের গলিতেই থাকেন। শিমুল রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় তিনি তাকে দেখতে পেয়ে বললেন, 'কি হে বক্সার, সাতসকালে ব্যাগ ট্যাগ নিয়ে চললে কোথায়! খেলা আছে নাকি?'
শিমুল দাঁড়িয়ে পড়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে এমনভাবে হাসল যে তাঁর প্রশ্নের উত্তরটা 'হ্যাঁ'ও হতে পারে আবার 'না'ও হতে পারে। মধুময়বাবু কী বুঝলেন কে জানে, এরপর বললেন, 'যেদিন তোমার ছবি খাঁদুর চায়ের দোকানে খবরের কাগজে দেখেছিলাম, সেদিন খুব আনন্দ হয়েছিল। আমি অনেককে বলি, তুমি একদিন এ পাড়ার গর্ব হবে। চালিয়ে যাও, চালিয়ে যাও।
শিমুল একবার বলতে যাচ্ছিল, 'আমি বক্সিং রিং-এ নামা ছেড়ে দিয়েছি।' কিন্তু কথাটা বলতে গিয়েও সে আর বলল না। কথায় কথা বাড়তে পারে, তার হাতে সময় নেই। তাই সে আর একবার হেসে 'আসছি' বলে আবার হাঁটতে শুরু করল।
মিনিট দশেক হাঁটার পর শিমুল এসে উপস্থিত হল বড় রাস্তার মোড়ে। তারপর রাস্তা পার হয়ে ঢুকে পড়ল অত্রু«র দত্ত লেনে। এঁকেবেঁকে আরও কিছুটা এগোবার পর শিমুল এসে দাঁড়াল পলেস্তরা খসা পুরোনো বাড়ির সামনে। বাড়ির নড়বড়ে দরজাটাতে দু'বার মৃদু টোকা দেওয়ার পর বাড়ির ভিতর থেকে বিশুদার গলা শোনা গেল, 'কে! আসছি।' একটু পরেই দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন বিশুদা। পরনে হাত কাটা গেঞ্জি আর লুঙ্গি। শিমুলকে দেখেই তিনি হেসে বললেন, 'আমি জানতাম, যাওয়ার আগে তুই একবার দেখা করতে আসবি। আয় আয় ভিতরে আয়।'
শিমুল বলল, 'না, এখন আর ভিতরে যাব না। গণপতিবাবু সাড়ে আটটার মধ্যে তাঁর বাড়ি পৌঁছতে বলেছেন।'
তার কথা শুনে বিশুদা বললেন, 'ও, তাহলে তুই এক মিনিট দাঁড়া। আমি তোর জন্য একটা জিনিস নিয়ে আসছি।' এই বলে তিনি ঘরের ভিতর ঢুকে মিনিট খানেকের মধ্যেই একটা কাপড়ের দোকানের প্যাকেট এনে শিমুলের হাতে দিলেন।
সে প্যাকেটটা খুলে দেখল, তার মধ্যে একটা লাল রঙের সুন্দর জ্যাকেট রয়েছে। শিমুল তাকাল বিশুদার মুখের দিকে। তিনি বললেন, 'মাস তিনেক আগে তোর জন্যেই কিনে রেখেছিলাম। ভেবেছিলাম জানুয়ারিতে তুই দিল্লিতে ন্যাশনাল খেলতে গেলে তখন তোকে এটা দেব। কিন্তু তা তো আর হবে না।' এই বলে একটু চুপ করে রইলেন তিনি। শিমুল স্পষ্ট বুঝতে পারল একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল বিশুদার বুক থেকে। এরপর তিনি বললেন, 'তোর একটা কাজ জোটাতে পারলাম এটাই যা সান্ত্বনা। লোকটার কথাবার্তা ভালো নয় তা জানি। কিন্তু ওর অনেক ক্ষমতা, যদি ওর সঙ্গে মানিয়ে চলতে পারিস তাহলে তোর একটা ভবিষ্যৎ হতে পারে।'
শিমুল বলল, 'আমি সেই চেষ্টাই করছি বিশুদা। আচ্ছা আমি এখন যাই, তুমি পারলে একটু মা-র খোঁজ রেখো। মার শরীরটা ক'দিন হল একটু বেশি খারাপ হয়েছে।'
ওর কথা শুনে বিশুদা বলল, 'ও নিয়ে তুই চিন্তা করিস না। রিং ফেরতা সন্ধেবেলা এ ক'টা দিন নয় আমি তোর বাড়ি একবার করে যাবখন।'
প্যাকেটটা তার ব্যাগের ভেতর ঢুকিয়ে নিয়ে বিশুদাকে 'আসছি' বলে আবার বড় রাস্তায় যাওয়ার জন্য হাঁটতে লাগল সে।
শিমুল যখন রাস্তার মোড়ে এসে পৌঁছল তখন তার হাতের ঘড়িতে পৌনে আটটা বাজে। সে হিসাব করে দেখল, এখন বাস পেলে সাড়ে আটটার মধ্যে সে পৌঁছে যেতে পারবে সল্টলেকে গণপতিবাবুর বাড়িতে। মিনিট তিনেক পরেই ওদিকে যাওয়ার একটা বাস পেয়ে তাতে চড়ে বসল শিমুল।
শিমুলের হিসেব কিন্তু মিলল না। সাত সকালেই কোনও একজন ভি আই পি ফ্লাইট ধরতে যাবেন বলে ফুলবাগানের ক্রসিংয়ে ট্রাফিক আটকে দিয়েছে পুলিশ। তাঁর কনভয় চলে না যাওয়া পর্যন্ত পাক্কা চল্লিশ মিনিট দাঁড়িয়ে রইল শিমুলের বাস। অবশেষে সল্টলেকের করুণাময়ীর সামনে যখন সে বাস থেকে নামল, তখন আটটা চল্লিশ বাজে। দেরি হওয়ার জন্য গণপতিবাবু নির্ঘাত দু-কথা শোনাবেন তাকে, মনে মনে ভাবল শিমুল। রাস্তা পার হয়ে সে তাড়াতাড়ি পা চালাল গণপতিবাবুর বাড়ির উদ্দেশ্যে। পাঁচ মিনিট পর শিমুল এসে দাঁড়াল বিরাট বড় সাদা রঙের একটা দোতলা বাড়ির সামনে। এ বাড়ির সামনে যে কোনও লোক এসে দাঁড়ালেই সে বাড়িটার কলেবর আর তার কম্পাউন্ডের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা ঝাঁ চকচকে গাড়িটা দেখে এই বাড়ির মালিকের আর্থিক অবস্থা সহজেই অনুমান করে নিতে পারে। বাড়ির প্রবেশ তোরণের এক পাশে রাস্তার দিকে প্রাচীরের গায়ে পিতলের নেমপ্লেটে বড় বড় ইংরেজি হরফে লেখা 'মিঃ গণপতি হাজরা, বক্সার এক্স ন্যাশানাল চম্পিয়ন।'
শিমুল গ্রিলের বিরাট গেটটা খুলে কম্পাউন্ডে প্রবেশ করতেই বাড়ির দোতলা থেকে একটা অ্যালসেশিয়ান গম্ভীর স্বরে ডাকতে শুরু করল আগন্তুক সম্পর্কে বাড়ির মালিককে জানিয়ে দেওয়ার জন্য। ভিতরে ঢোকার পর গেটটা বন্ধ করে ঘুরে দাঁড়াতেই শিমুল দেখল দোতলার ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ালেন গণপতিবাবু। তাকে দেখতে পেয়ে গম্ভীর স্বরে বললেন, 'দরজা খোলা আছে, ওপরে উঠে এসো।' শিমুল পা বাড়াল সদর দরজার দিকে।
দোতলায় উঠে এসে শিমুল প্রবেশ করল একটা বিরাট বড় ঘরে। ঘরটা গণপতিবাবুর ড্রইংরুম কাম অফিসরুম। ঘরের ঠিক মাঝখানে গণপতিবাবুর গদি আঁটা রিভলবিং চেয়ারের সামনে দামি কাঠের তৈরি একটা কাঁচ ঢাকা বড় টেবিল ও তাকে ঘিরে কতগুলো সুদৃশ্য চেয়ার রাখা আছে। আর আছে দেওয়াল আলমারি ও দেওয়াল জুড়ে অসংখ্য ট্রফি আর বাঁধানো 'ফটোগ্রাফ'। ঘরের এক কোনাতে একটা ছোট টেবিল আর একটা চেয়ারও রাখা আছে। ওই টেবিল চেয়ারটা শিমুলের জন্য নির্দিষ্ট। ঘরে ঢোকার পর তার ব্যাগটা নিয়ে গিয়ে বসল ঘরের এক কোনায় রাখা সেই চেয়ারটাতে। মিনিট তিনেক পর ড্রেসিং গ্রাউনের ফিতে বাঁধতে বাঁধতে ঘরে প্রবেশ করলেন গণপতিবাবু। তাঁর চেহারাটা দানবাকৃতি। লম্বায় ছ' ফুটেরও বেশি, সেই অনুযায়ী প্রস্থও। মাথার চুল ব্যাক ব্রাশ করা, গায়ের রঙ কৃষ্ণবর্ণ। তিনি ঘরে ঢুকতেই শিমুল চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। গণপতিবাবু ঘরের মাঝখানে এসে দাঁড়িয়ে একবার নিজের রিস্টওয়াচের দিকে তাকিয়ে নিয়ে শিমুলের উদ্দেশে বললেন, 'সবে কুড়ি দিন হল কাজে ঢুকেছ, আর তার মধ্যেই মা-র অসুখের অজুহাতে দু'দিন কামাই, আর আজকে নিয়ে দুদিন লেট।'
শিমুল মাথা নীচু করে তার কথা শুনে বলল, 'স্যার বাসটা রাস্তায় হঠাৎ আটকে গেল তাই...।'
শিমুলের কথা শেষ হওয়ার আগেই তিনি বললেন, 'অজুহাত আমাকে দেখিও না। আসলে তোমার মধ্যে নিয়মানুবর্তিতা, সময়জ্ঞান, এসব নেই। এই তুমিই নাকি আবার বক্সার হতে চেয়েছিলে! জানো একজন বক্সার হতে গেলে কত সময়জ্ঞান প্রয়োজন? এই জন্য তোমার মতো বাঙালির ছেলেদের কিসসু হয় না! নেহাত বিশু আমাকে অত করে ধরল তাই, নইলে দু'হাজার টাকায় তোমার বদলে আমি দু-দুজন লোক রাখতে পারতাম।' একটানা কথাগুলো বলে থামলেন গণপতিবাবু। শিমুল মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে শুনল তাঁর কথাগুলো। গণপতিবাবু এরপর বললেন, 'আলমারি থেকে আমার ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশিপের মেডেলটা বার করো, আর সেটা মুছে একটু পরিষ্কার করো। তবে, একটু সাবধানে। ওর কেসটা মনে হয় একটু ভেঙে গেছে। মেডেলটা আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে যেতে হবে।'
শিমুল বলল, 'আচ্ছা স্যার।'
কথাগুলো বলার পর আর তিনি দাঁড়ালেন না, বাড়ির ভেতর যেতে যেতে তিনি শুধু বলে গেলেন, 'আমাদের ট্রেন এগারোটা পঁয়তাল্লিশে। সাড়ে দশটায় বাড়ি থেকে বেরব আমরা।'
গণপতিবাবু ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার পর কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল শিমুল। সকালবেলাতেই গণপতিবাবুর তীর্যক কথাগুলো শুনে মনটা খারাপ হয়ে গেল তার। এরপর সে ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াল একটা কাঁচের পাল্লা দেওয়া দেওয়াল আলমারির সামনে। নানা ধরনের মেডেল-মানপত্র রাখা আছে তার ভেতর। এসব জিনিস গণপতিবাবুর যৌবনের সফলতার সাক্ষী। আলমারির পাল্লা খুলে সেখান থেকে একটা নীল ভেলভেটের বাক্স বার করে আনল শিমুল। বাক্সর ঠিক মাঝখানে একটা খোপের মধ্যে রাখা আছে বেশ বড় গোলাকার একটা সোনার চাকতি, ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশিপের মেডেল। আজ থেকে তিরিশ বছর আগে এই মেডেলটা একদিন গলায় ঝুলেছিল গণপতিবাবুর। গণপতিবাবুর আজ যে নাম অর্থ প্রতিপত্তি তার সব কিছুর মূলে এই মেডেলটা। মেডেলটার গায়ে একটা লাল রঙের রিবন লাগানো আছে। মেডেল শুদ্ধু বাক্সটা নিয়ে ঘরের মাঝখানের টেবিলের কাছে এল শিমুল। বাক্সটাকে টেবিলে রেখে খুব সাবধানে মেডেলটাকে খোপের থেকে বার করে আনল। এর আগে মেডেলটাকে কাঁচের পাল্লার বাইরে থেকেই দেখেছে সে, হাতে নিয়ে দেখার সাহস হয়নি। আজ জিনিসটা হাতে নিয়ে বুকের ভেতর একটা রোমাঞ্চ অনুভব হল শিমুলের। ন্যাশনালের মেডেল বলে কথা! এ কি কম জিনিস! শিমুল কতদিন স্বপ্ন দেখেছে এ রকম একটা মেডেল তার গলায় ঝুলছে। সত্যি কথা বলতে কি, মাস তিনেক আগেও, এ-রকম একটা মেডেল গলায় ঝোলাবার স্বপ্ন জাগরণেও সে দেখত। শুধু যে সে এই স্বপ্ন দেখত তা নয়, তার কোচ বিশু পালিতও দেখত। এই সেদিনও বিশুদা বলত, 'দেখবি তুই ঠিক একদিন ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়ন হবি।' কিন্তু হঠাৎই সব কিছু কেমন যেন ওলট-পালট হয়ে গেল। মেডেলটা হাতে নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখল শিমুল। জিনিসটা অনেকদিনের বলে তার চকচকে ভাবটা একটু কমে গেছে। শিমুল ভাবল, কী দিয়ে সে পরিষ্কার করবে জিনিসটা? কোনও কিছু তেমন হাতের কাছে না পেয়ে সে পকেট থেকে পরিষ্কার রুমালটা বার করে যত্ন নিয়ে মেডেলটা মুছল, তারপর বড় টেবিলের ওপর থেকে খবরের কাগজটা তুলে নিয়ে নিজের টেবিলে বসে তার পাতা ওল্টাতে লাগল।
গণপতিবাবু যখন আবার সেই ঘরে প্রবেশ করলেন তখন দেওয়াল ঘড়িতে ঠিক দশটা কুড়ি বাজে। তাঁর পিছনে একটা মাঝারি সাইজের দামি চামড়ার ব্যাগ আর একটা বড় ব্রিফকেস হাতে নিয়ে ঘরে ঢুকল তাঁর বাড়ির কুক-কাম-কেয়ারটেকার মাঝবয়সী রামপিয়ারি। গণপতিবাবুকে দেখেই শিমুল বুঝতে পারল, তিনি বাইরে যাওয়ার জন্য একদম রেডি। তাঁর পরনে চকোলেট রঙের সাফারি স্যুট, হাতে দামি সোনার ঘড়ি, পায়ে পালিশ করা শু। ঘরে ঢুকে তিনি শিমুলের দিকে এগিয়ে এসে বললেন, 'কী করেছ?' শিমুল বাক্সশুদ্ধু মেডেলটা গণপতিবাবুর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, 'এই যে স্যার করেছি। তবে একটু জল দিয়ে মুছতে পারলে মনে হয় ভালো হত।' গণপতিবাবু তার কথার কোনও জবাব না দিয়ে বাক্সটা হাতে নিয়ে মেডেলটা ভালো করে কিছুক্ষণ দেখলেন। তারপর বাক্সটা বন্ধ করে রামপিয়ারির হাত থেকে চামড়ার ব্যাগটা নিয়ে ব্যাগের মধ্যে মেডেলের বাক্সটা রাখতে রাখতে শিমুলের উদ্দেশ্যে বলনে, 'এ জিনিসটা আমি কোনও দিন বাড়ির বাইরে নিয়ে যাই না। নেহাৎ শুটিংয়ের কাজে লাগবে বলে নিয়ে যেতে হচ্ছে। এটা এই ব্যাগের মধ্যে রইল। এ ব্যাগটার দিকে সবসময় নজর রাখবে তুমি। বলতে গেলে এ করণেই তোমাকে সঙ্গে করে লক্ষ্নৌ নিয়ে যাচ্ছি আমি। কোনও ভাবেই এ জিনিস যেন খোয়া না যায়।'
তাঁর কথা শুনে শিমুল বলল, 'আচ্ছা স্যার।'
এর কিছুক্ষণের মধ্যেই গণপতিবাবু শিমুলকে নিয়ে নীচে নেমে এলেন। গণপতিবাবুর ড্রাইভার অপেক্ষা করছিল তাদের জন্য। লাগেজ নিয়ে তার গাড়িতে গণপতিবাবুর সঙ্গে শিমুল উঠে বসার পর, গণপতিবাবুর নির্দেশে ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ল শিয়ালদা স্টেশনের উদ্দেশ্যে।
তারা যখন শিয়ালদা প্ল্যাটফর্মে পৌঁছল তখন সওয়া দশটা বাজে। যে প্ল্যাটফর্ম থেকে জম্মু তাওয়াই ছাড়বে শিমুলরা পা বাড়াল সেদিকে। সেখানে পৌঁছে তারা দেখল ইতিমধ্যে ট্রেন প্ল্যাটফর্মে লেগে গেছে। গণপতিবাবুর রিজার্ভেশন এসি টু-টায়ারে আর শিমুলের থ্রি-টায়ার স্লিপারে। অবশ্য যে কোম্পানি গণপতিবাবুকে লক্ষ্নৌ নিয়ে যাচ্ছে, তারা অবশ্য গণপতিবাবুর কম্পিনিয়নের জন্যও এসি-র টিকিট দেবে বলেছিল। যেদিন কোম্পানির লোক গণপতিবাবুর সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা বলতে এসেছিল, সেদিন শিমুলও উপস্থিত ছিল সেখানে। কিন্তু গণপতিবাবুই কোম্পানির লোককে শিমুলের টিকিটটা এসি-র পরিবর্তে নন এসি থ্রি-টায়ারে করতে বলেন। সামান্য একজন কর্মচারীর সঙ্গে গণপতিবাবুর মতো বিখ্যাত লোকের একই বগিতে ও একই ক্লাসে যে যাওয়ার ইচ্ছা নেই তা এ ঘটনায় স্পষ্ট বুঝতে পেরেছিল শিমুল। এসি টু-টায়ার কম্পার্টমেন্টটা খুঁজে পেতে অসুবিধা হল না। সে লাগেজ সমেত গণপতিবাবুকে বসিয়ে দিল তার জায়গাতে। গণপতিবাবু শিমুলকে বললেন, 'তুমি এবার নিজের কম্পার্টমেন্টে যাও। বড় বড় স্টেশন এলে আমার খোঁজ নিয়ে যাবে। প্ল্যাটফর্ম থেকে কোনও কিছু কেনার প্রয়োজন হলে তা তোমাকে এনে দিতে হবে।'
শিমুল 'আচ্ছা' বলে এরপর গণপতিবাবুর কম্পার্টমেন্ট ছেড়ে নেমে নিজের কম্পার্টমেন্ট খোঁজার জন্য পা বাড়াল।
শিমুলের বার্থটা উপরে। সে সেখানে উঠে বসার কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা ঝাঁকুনি দিয়ে ট্রেন চলতে শুরু করল। শিমুল দেখল তার হাতের ঘড়িতে ঠিক সাড়ে দশটা বাজে। গাড়ি যদি ঠিকমতো চলে তাহলে পরদিন খুব ভোরেই শিমুলদের লক্ষ্নৌ পৌঁছে যাওয়ার কথা। আসলে একটা বিশেষ কাজে লক্ষ্নৌ যাচ্ছেন গণপতিবাবু। লক্ষ্নৌর একটা ফুড প্রোডাক্ট কোম্পানি তাদের একটা বিজ্ঞাপন করাতে চান। বিখ্যাত বক্সার গণপতিবাবুকে দিয়ে। অ্যাডের শুটিংও হবে লক্ষ্নৌতেই। এ কারণেই গণপতিবাবুর লক্ষ্নৌ যাত্রা। এ কাজে বেশ মোটা রকমের অর্থ লাভ হতে চলেছে গণপতিবাবুর। ইতিমধ্যে অগ্রিম হিসেবে যার কিছুটা হাতেও পেয়ে গেছেন তিনি। এছাড়া গণপতিবাবু সেখানে যাচ্ছেন শুনে লক্ষ্নৌর বেঙ্গলি ক্লাব তাঁর একটা সংবর্ধনার আয়োজন করেছে। যেটা গণপতিবাবুর একটা বাড়তি পাওনা।
ট্রেন চলতে শুরু করার পর কিছুক্ষণ শিমুল তার বাড়ির কথা ভাবতে লাগল। মা-র শরীরটা এখন কেমন আছে? পুঁটি কি আজ স্কুল যেতে পারল? নাকি সে এখন মা-র পাশেই বসে আছে? আজকাল প্রায়ই স্কুল কামাই করতে হচ্ছে তাকে। দিদিমণিরা বকাবকি করছেন তাকে। ফিজ দিতে না পারায় লজ্জায় গত মাস থেকে প্রাইভেট টিউশন নেওয়া বন্ধ করেছে সে। সামনে মাধ্যমিক। কী হবে ওর? এসব কথা ভাবতে ভাবতে মনটা খারাপ হয়ে গেল শিমুলের। তার কূপের অন্য বার্থগুলো দখল করে বসে আছে একটা সাউথ ইন্ডিয়ান ফ্যামিলি। নিজেদের মধ্যে তারা অনর্গল কথা বলে চলেছে। মনটাকে অন্যদিকে সরাবার জন্য তাদের প্রতি এবার দৃষ্টি দিল সে। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও তাদের কথাবার্তার বিন্দুবিসর্গই বুঝতে পারল না শিমুল। এরপর তার একটা হাই উঠল। ব্যাগ থেকে চাদর বার করে সেটা স্লিপারে বিছিয়ে শুয়ে পড়ল শিমুল।
ট্রেনে সারাদিন বলতে গেলে ঘুমিয়েই কাটাতে হল শিমুলকে। তিনবার সে নেমেছিল বার্থ থেকে। একবার খাওয়া আর বাথরুমে যাওয়ার জন্য। আর অন্য দুবার সে গিয়েছিল এসি কম্পার্টমেন্টে গণপতিবাবুর খোঁজ নেওয়ার জন্য। সে সময় একবার গণপতিবাবুর জন্য প্লাটফর্ম থেকে মিনারেল ওয়াটার কিনে দেওয়া ছাড়া অন্য কোনও কাজ করতে হল না তাকে। দ্বিতীয়বার যখন সে তাঁর কাছে গিয়েছিল তখন তিনি বলে দিলেন যে, ওর আর সেখানে যাওয়ার দরকার নেই। তবে সে যেন এ ব্যাপারে সজাগ থাকে যে খুব ভোরেই তাদের লক্ষ্নৌ নামতে হবে। ভোরবেলা প্ল্যাটফর্মে নেমেই এসি কম্পার্টমেন্টের সামনে চলে আসতে কোনও গাফিলতি যেন সে না করে।
রাতে আর খাবার জন্য বার্থ ছেড়ে নীচে নামতে ইচ্ছা করল না শিমুলের। রাত সাড়ে আটটা নাগাদ সঙ্গে থাকা বোতলের জল আর চারটে বিস্কুট খেয়ে রাতের মতো শুয়ে পড়ল সে।
পরদিন সকাল আটটায় লক্ষ্নৌ পৌঁছল ট্রেন। ভোর সাড়ে চারটে থেকেই নামার জন্য তৈরি হয়ে বসেছিল শিমুল। ঘণ্টা তিনেক লেট রান করেছে ট্রেন। প্ল্যাটফর্মে নামার পর ভালো করে একবার চারপাশে তাকিয়ে দেখল শিমুল। লক্ষ্নৌতে এর আগে কোনও দিন না এলেও এক সময় এটা যে নবাবদের শহর ছিল তা সে জানে। প্ল্যাটফর্মের একটা অংশে নবাবি আমলের স্থাপত্যের স্পষ্ট ছাপ। অনেক কিছু দেখার জিনিস আছে এই শহরে। সুযোগ পেলে একবার সে সব দেখে নেবে বলে মনে মনে ভেবে রেখেছে। শিমুল কুলিদের ভিড় এড়িয়ে হাঁটতে শুরু করল এ সি কম্পার্টমেন্টের দিকে। যখন সেখানে গিয়ে পৌঁছল সে ততক্ষণে গণপতিবাবু তাঁর লাগেজ নিয়ে প্ল্যাটফর্মে নেমে পড়েছেন। শিমুলকে দেখতে পেয়েই তিনি বললেন, 'তাড়াতাড়ি মালপত্রগুলো উঠাও। প্ল্যাটফর্মের বাইরে মিস্টার সিংভি-র আমাকে রিসিভ করতে আসার কথা, ওই হল কোম্পানির মালিক।'
শিমুল লাগেজগুলো তুলে নিল, তারপর গণপতিবাবুর পিছন পিছন হাঁটতে লাগল প্ল্যাটফর্মের বাইরে যাওয়ার জন্য। হাঁটতে হাঁটতে গণপতিবাবু বললেন, 'ট্রেনটা তো অনেকখানি লেটে ঢুকল, কে জানে লোকটা আবার ফিরে চলে গেছে কিনা! সে রকম হলে প্ল্যাটফর্মের বাইরে বেরিয়ে একটা টেলিফোন করতে হবে তাঁকে।' এরপর একটু থেমে তিনি আবার বললেন, 'সিংভির সঙ্গে আমার কোনও দিন সাক্ষাৎ হয়নি, তিনি আমাকে কীভাবে চিনবেন এটাও একটা সমস্যা।'
যে জায়গাটা দিয়ে লোকজন প্ল্যাটফর্মের বাইরে যাচ্ছে সেখানে বেশ ভিড়। অনেক যাত্রী নেমেছে ট্রেন থেকে। লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে টিকিট কালেক্টরকে টিকিট দেখিয়ে বাইরে যেতে হচ্ছে লোকজনকে। সে লাইনে গিয়ে দাঁড়াবার পর টিকিট দেখিয়ে এক সময় প্ল্যাটফর্মের বাইরে এসে উপস্থিত হল ওরা।
বাইরেটা বেশ জমজমাট। পার্কিং লটে নানা ধরনের গাড়ি ট্যাক্সি যেমন দাঁড়িয়ে আছে তেমন তার পাশাপাশি দাঁড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য টাঙ্গা। ঘোড়ার গলায় বাঁধা ঘণ্টার শব্দে, গাড়ির হর্নের শব্দে, অজস্র লোকজনের চিৎকার চেঁচামেচিতে কান পাতা দায়। শিমুলরা প্ল্যাটফর্মের বাইরে পা রাখতেই একদল টাঙ্গাওয়ালা আর হোটেলের লোক চারপাশ থেকে ছেঁকে ধরল ওদের। গণপতিবাবু তাদের উদ্দেশ্যে এমনভাবে 'নেহি চাহিয়ে' বললেন যে তাঁর কণ্ঠস্বর আর বাচনভঙ্গি দেখে তাঁকে আর কেউ ঘাটাতে সাহস করল না। অন্য খদ্দের ধরার জন্য চলে গেল তারা। শিমুলরা এরপর এগিয়ে দাঁড়াল একটা ফাঁকা মতো জায়গাতে। সেখানে দাঁড়িয়ে চারপাশে তাকাতে লাগলেন গণপতিবাবু। মিনিট পাঁচেক সেখানে দাঁড়িয়ে থাকার পর গণপতিবাবু বিরক্ত হয়ে বললেন, 'না, এখানে বোকার মতো দাঁড়িয়ে থেকে কোনও লাভ নেই। আমার কাছে সিংভির মোবাইল নম্বর আছে। দেখি, এখানে কোথায় পাবলিক বুথ আছে!'
তার কথা শুনে শিমুল বলল, 'আপনি এখানে দাঁড়ান স্যার। আমি দেখে আসি কোথায় টেলিফোন বুথ আছে। আর যদি আপনি আমাকে ওর নম্বরটা দেন স্যার, তাহলে...।'
শিমুলকে কথা শেষ করতে না দিয়েই রুক্ষ স্বরে গণপতিবাবু বলে উঠলেন, 'তাহলে, তাহলে কী? তুমিই ফোন করবে তাঁকে! উনি কি তোমার বিশুদা, নাকি তোমার ইয়ারদোস্ত? এ সব হাই প্রোফাইলের বিজনেসম্যানের সঙ্গে কোনও দিন কথা বলেছ তুমি? যা বলার আমি বলব। তুমি বুথটা কোথায় দেখ। আর চামড়ার ব্যাগটা আমাকে দিয়ে যাও।'
শিমুল ধমক খেয়ে গণপতিবাবুর চামড়ার ব্যাগটা কাঁধ থেকে নামিয়ে এগিয়ে দিল তাঁর দিকে। তিনি ব্যাগটা হাতে নিয়ে বললেন, 'তাড়াতাড়ি যাবে আর আসবে।'
শিমুল ঘাড় নেড়ে এরপর বুথ খোঁজার জন্য পা বাড়াতে যাচ্ছিল, কিন্তু হঠাৎ দেখে একজন ভদ্রলোক তাদের লক্ষ্য করে সোজা এগিয়ে আসছেন। ভদ্রলোকের চাপ দাড়ি, চোখে রিমলেস চশমা, পরনে ধবধবে সাদা জামাপ্যান্ট, পায়ে সাদা স্পোর্টস শু। ভদ্রলোক এসে দাঁড়ালেন শিমুলদের সামনে। তিনি বেশ লম্বাও। শিমুলের মনে হল, তাঁর উচ্চতা অন্তত ছ'ফুট হবে, আর বয়সের দিক থেকে তিনি গণপতিবাবুর সমান হবেন। ভদ্রলোক শিমুলদের কাছে এসে দাঁড়াবার পর কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইলেন গণপতিবাবুর দিকে। তারপর তাঁর ডান হাতটা গণপতিবাবুর দিকে করমর্দনের জন্য বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, 'ওয়েলকাম টু লক্ষ্নৌ মিস্টার হাজরা। আই এম অর্জুন সিংভি।'
গণপতিবাবু তার সঙ্গে করমর্দন করে বললেন, 'গ্ল্যাড টু মিট ইউ।'
ভদ্রলোক এরপর শিমুলের দিকে তাকিয়ে গণপতিবাবুকে প্রশ্ন করলেন, 'ইওর অ্যাসিসটেন্ট?'
গণপতিবাবু মনে হয় কী উত্তর দেবেন ঠিক বুঝতে পারলেন না, তিনি শুধু মৃদু হাসলেন। অর্জুন সিংভি এরপর তাঁর হাতটা বাড়িয়ে দিলেন শিমুলের দিকে। শিমুল তাকাল ভদ্রলোকের চোখের দিকে। ভদ্রলোকের চোখের রঙ উজ্জ্বল নীল, ঠিক যেন সাহেবদের মতো। শিমুল তার হাতে হাত মিলিয়ে বলল, 'আই এম শিমুল।'
ভদ্রলোক হেসে বললেন, 'ব্রাইট ইয়ং বয়।' অর্জুন সিংভি এরপর গণপতিবাবুর দিকে তাকিয়ে শিমুল আর গণপতিবাবুকে অবাক করে দিয়ে বাংলাতে বললেন, 'আমি কিন্তু বাংলা জানি। এক সময় কুড়ি বছর কলকাতায় কাটিয়েছি আমি।'
ভদ্রলোকের কথায় একটু হিন্দি টান থাকলেও মোটামুটি পরিষ্কার ভাবেই কথাগুলো বললেন তিনি। শিমুলের মনে হল তাঁর কথা শুনে একটু যেন স্বস্তি পেলেন গণপতিবাবু। ইংরেজিতে কথাবলাটা যে তাঁর খুব ভালো আসে না তা তার কুড়ি দিনের চাকরিতে কয়েকটা ব্যাপারে প্রত্যক্ষ করেছে শিমুল। অর্জুন সিংভির কথা শুনে গণপতিবাবু বললেন, 'তাহলে আপনার সঙ্গে আমি বাংলায় কথা বলতে পারি তো?'
ভদ্রলোক আবার হেসে বাংলায় বললেন, 'হ্যাঁ পারেন।' এরপর তিনি বিনীতভাবে বললেন 'আপনি আমাকে ক্ষমা করবেন। আপনার মতো একজন বিখ্যাত মানুষকে আমার জন্য এখানে দাঁড়িয়ে থাকতে হল। আসলে ভোরবেলাতে প্ল্যাটফর্মে এসে শুনলাম গাড়ি তিন ঘণ্টা লেট রান করছে। তাই আমি একটা কাজে চলে গেছিলাম। ফেরার পথে একটা জ্যামে আটকে লেট হয়ে গেল।'
তার কথা শুনে সৌজন্য দেখিয়ে গণপতিবাবু বললেন, 'আমার তেমন অসুবিধা হয়নি।'
অর্জুন সিংভি বললেন, 'এবার তাহলে চলুন, আমার গাড়ি কম্পাউন্ডের বাইরে রাখা আছে। পার্কিং লটে গাড়ি বার করতে দেরি হয় বলে তা ওখানে রাখিনি। বাইরে পর্যন্ত একটু হাঁটতে হবে আপনাদের।'
গণপতিবাবু বললেন, 'হ্যাঁ চলুন।'
শিমুলরা এরপর টাঙ্গা আর লোকজনের ভিড়ের মাঝখান দিয়ে অর্জুন সিংভির সঙ্গে হাঁটতে শুরু করল স্টেশন কম্পাউন্ডের বাইরে যাওয়ার জন্য।
হাঁটতে হাঁটতে গণপতিবাবু অর্জুন সিংভিকে প্রশ্ন করলেন, 'আপনি আমাকে দেখে চিনতে পারলেন কীভাবে?'
তিনি বললেন, 'আপনি বিখ্যাত মানুষ। আপনার ছবি আমি টেলিভিশন আর খবরের কাগজে দেখেছি। তাছাড়া আপনি ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর কলকাতার লোকজন আপনাকে যে সংবর্ধনা দিয়েছিল সেখানে আপনাকে দেখতে আমি হাজির ছিলাম।
তার কথা শুনে গণপতিবাবু একবার তাকালেন শিমুলের দিকে। তাঁর চোখের ভাষা যেন পড়তে পারল শিমুল। তিনি যেন শিমুলের উদ্দেশ্যে বললেন, বুঝতে পারছ, তোমার মতো তুচ্ছ ছেলে কত বিরাট মানুষের সঙ্গে ঘুরে বেড়াচ্ছে! মিনিট তিনেকের মধ্যে শিমুলরা এসে দাঁড়াল কম্পাউন্ডের বাইরে। সামনেই বিরাট চওড়া রাস্তা। অনেক লোকজন, গাড়ি, টাঙ্গা চলছে রাস্তাতে। যেখানে শিমুলরা দাঁড়িয়ে আছে তার উল্টো দিকে ফুটপাথের গায়ে বেশ কয়েকটা বড় বড় হোটেল, আর সার সার দোকানপাট। তাদের পিছনে মাথার ওপর দিয়ে একটা মসজিদের গম্বুজ দেখা যাচ্ছে। শিমুলদের থেকে একটু দূরে ফুটপাথের একদম গা ঘেঁষে কালো রঙের একটা স্করপিও গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে গাড়িটা একদম নতুন। তার সাদা নম্বর প্লেটে টেম্পরারি নম্বর লেখা আছে। সিংভি সেই গাড়িটা দেখিয়ে গণপতিবাবুকে বললেন, 'ওই যে আমার গাড়ি, চলুন।'
শিমুলরা গাড়ির কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই তার ভিতর থেকে সাদা জামাপ্যান্ট আর সাদা টুপি পরা ড্রাইভার নেমে এসে একটা সেলুট করল সিংভি সাহেবকে। তিনি তার উদ্দেশ্যে বললেন, 'সামান অন্দর রাখখো।' তার কথা শুনে ড্রাইভার গাড়ির পিছনের দিকের দরজা খুলে প্রথমে গণপতিবাবুর বড় সুটকেসটা গাড়ির ভিতর তুলে দিল। তারপর সে গণপতিবাবুর চামড়ার ব্যাগটা চাইতেই তিনি বললেন, 'না, এটা আমার কাছেই থাক।' শিমুল তার কিট ব্যাগটাও দিয়ে দিল ড্রাইভারের হাতে। এরপর সকলে গাড়িতে উঠে বসার পর চলতে শুরু করল গাড়ি।
স্টেশন থেকে বেরিয়ে এই রাস্তাটা বড় ঘিঞ্জি। বিশেষত টাঙ্গার ভিড়ে অন্য যানবাহনের এগোনো খুব দুষ্কর। হর্ন বাজাতে বাজাতে ধীরে ধীরে কিছুটা পথ এগোবার পর একটা মোড় ঘুরে মোটামুটি একটা ভালো রাস্তা পেল শিমুলদের গাড়ি। ড্রাইভারের ঠিক পিছনের সিটে বসেছেন অর্জুন সিংভি। তার পাশে গণপতিবাবু। আর তাদের পিছনের সিটে শিমুল। গাড়িতে যেতে যেতে অর্জুন সিংভি বললেন, 'আপনাদের থাকার জায়গা ঠিক করেছি 'দ্য রেসিডেন্সি'র ওদিকে। আপনি নিশ্চয়ই এর আগে লক্ষ্নৌ এসেছেন, আর 'দ্য রেসিডেন্সি' দেখেছেন?'
গণপতিবাবু শুধু জবাব দিলেন, 'হ্যাঁ।'
সিংভি এরপর বললেন, 'যে জায়গাতে আপনাদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে, সে-জায়গাটা শহরের একটু বাইরের দিকে। আসলে আপনাকে নিয়ে প্রথম শুটিংটা ওখানেই হবে। তাই ভিড় এড়িয়ে কাজে সুবিধের জন্য একটু ফাঁকা জায়গা বাছতে হয়েছে আমাদের। তবে তাতে আপনাদের কোনও অসুবিধা হবে না। বিরাট বড় বাড়ি, একটা গাড়ি আপনাদের জন্য সব সময় থাকবে ওখানে। ইচ্ছা হলে যে কোনও জায়গাতে যেতে পারবেন আপনারা।'
শিমুলদের চার দিন থাকার কথা লক্ষ্নৌতে। তার পর কলকাতায় ফিরবে তারা। গণপতিবাবু তাঁকে প্রশ্ন করলেন, 'শুটিং কি রোজই হবে? আসলে এ কাজের ব্যাপারে আমার ঠিক অভিজ্ঞতা নেই। একবার অবশ্য একটা ফিল্ম কোম্পানি বক্সিং নিয়ে একটা ছবি করবে বলে আমার সঙ্গে কথাবার্তা বলেছিল। কিন্তু তাদের দেওয়া কন্ডিশনগুলো আমার ঠিক পছন্দ না হওয়াতে শেষ পর্যন্ত সে ব্যাপারটা ম্যাচিওর করেনি।'
অর্জুন সিংভি বললেন, 'প্রথম দফার শুটিং হবে আগামীকাল সকালে আপনারা যে বাড়িতে থাকছেন সে বাড়ির কম্পাউন্ডেই। আর শেষ দফাটা হবে একদিন বাদ দিয়ে। তবে সেটা কোথায় হবে সেটা আপনাকে এখন ঠিক বলতে পারছি না। লোকেশন এখনও ঠিক হয়নি।'
গণপতিবাবু এরপর বললেন, 'ক্যামেরার সামনে আমাকে ঠিক কী করতে হবে? নাচতে-টাচতে হবে না তো! ও-সব কিন্তু আমার দ্বারা হবে না।'
সিংভি হেসে বললেন, 'না-না, ওসব করতে হবে না। পুরো ব্যাপারটা আমাদের অ্যাড ডিরেক্টর আপনাকে বুঝিয়ে দেবে।' এরপর একটু থেমে তিনি বললেন, 'আমাদের তো ফুড প্রোডাক্ট কোম্পানি, আমি একটা চবনপ্রাশ মার্কেটে ছাড়তে চলেছি। তারই অ্যাড করবেন আপনি। এখন অ্যাডের যুগ। কোম্পানির প্রোডাক্ট যত ভালোই হোক না কেন, কোনও বিখ্যাত লোককে দিয়ে তার বিজ্ঞাপন না করালে পাবলিক প্রোডাক্ট কিনতে ঠিক ভরসা পাবে না।'
তার কথা শুনে গণপতিবাবু বললেন, 'তা তো বটেই। কারণ বিখ্যাত লোকদের একটা রেসপনসিবিলিটি থাকে, যা পাবলিকের আস্থা জোগায়।'
শিমুল গণপতিবাবুদের বাক্যালাপ শুনতে শুনতে বাইরের দিকে তাকিয়ে দেখছিল। রাস্তার দু'পাশে নতুন আর পুরোনো দিনের বাড়িঘর মিলেমিশে দাঁড়িয়ে আছে। আধুনিক শপিং-কমপ্লেক্স যেমন চোখে পড়ছে, তেমনই চোখে পড়ছে নবাবি আমলের তৈরি গম্বুজখিলান স্তম্ভওয়ালা বাড়ি ঘর মসজিদ। মিনিট দশেক চলার পর দূর থেকে নবাবি আমলের বিরাট বড় এক স্থাপত্য চোখে পড়ল শিমুলের। খুব সুন্দর দেখতে সেটা। অর্জুন সিংভি হঠাৎ পিছনে তাকিয়ে শিমুলকে উদ্দেশ্য করে প্রশ্ন করলেন, 'আপনি এখানে আগে কোনও দিন এসেছেন?'
শিমুল বলল, 'না।'
এরপর তিনি আবার প্রশ্ন করলেন, 'এ শহর সম্বন্ধে জানেন কিছু?'
শিমুল একটু কুণ্ঠিতভাবে বলল, 'না, তেমন কিছু জানি না, তবে ''দ্য রেসিডেন্সি''র কথা একটা বইতে পড়েছি। ওখানে সিপাহি বিদ্রোহ হয়েছিল।'
সিংভি বললেন, 'হ্যাঁ।'
কিছু দূরের বিরাট সভ্যতার দিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে শিমুল তাঁকে প্রশ্ন করল, 'ওটা কী?'
তিনি বললেন, 'ওটা হল, ''শাহ নফজ ইমামবাড়া'' ওর গা বেয়েই বয়ে চলেছে গোমতী নদী। নদীর এপারে পুরোনো শহর আর ওপারে নতুন শহর।' এর পর সম্ভবত তিনি শিমুলকে জানানোর জন্যই বললেন, 'লক্ষ্নৌ অনেক পুরোনো শহর। নবাব সুজা-উদ-দৌলা ও নবাব অসফ-উধ-দৌলা গড়ে তুলেছিলেন এই শহর। এখানে যত বড় বড় প্রাচীন ইমারত চোখে পড়বে, তা সবই প্রায় তাঁদের আমলে তৈরি। তবে ঐতিহাসিক কারণে নবাব ওয়াজেদ আলি শা-র আমলে এ শহর বেশি খ্যাতি লাভ করে। সংস্কৃতিরও সে সময় বিকাশ ঘটে। এ শহরে বহু কিছু দেখার জিনিস আছে। রুমি দরওয়াজা, বড়া ইমামবাড়া, ছোটা ইমামবাড়া, ক্লক টাওয়ার, ছাত্তার মঞ্জিল, দ্য রেসিডেন্সি, কাইজারবাগ প্যালেস কমপ্লেক্স, ওই যে দেখছেন শাহ নজফ ইমামবাড়া—এরকম আরও অনেক কিছু। গাড়ি তো থাকবে, সব কিছু বেড়িয়ে নেবেন। আর একটা কথা বলে রাখি, এখানকার ''কাবাব'' আর ''আতর'' এ দুটোর থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখলে কিন্তু ঠকে যাবেন।'
তাঁর শেষ কথাটা শুনে মনে মনে হাসল শিমুল। তাঁর পকেটে সাকুল্যে একশো টাকার মতো আছে। কলকাতায় ফেরার আগে তাঁকে গণপতিবাবু একটা টাকাও দেবেন বলে মনে হয় না। পুঁটি স্কুলে কোন বন্ধুর কাছে শুনেছে যে, লক্ষ্নৌতে নাকি ভালো কাঁচের চুড়ি পাওয়া যায়। সম্ভব হলে তার টাকা থেকে পুঁটির জন্য ক'টা চুড়ি কিনবে শিমুল। আতর মাখা বা কাবাব চাখার মতো বিলাসিতা করার ক্ষমতা নেই শিমুলের। তাঁর কর্মচারীর সঙ্গে সিংভি এত কথা বলছেন, এটা মনে হয় ঠিক ভালো লাগল না গণপতিবাবুর। অর্জুন সিংভি আরও কী একটা শিমুলকে বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু একটু কেশে গণপতিবাবু সিংভিকে বললেন, 'একটা কাজের কথা জিগ্যেস করি আপনাকে। আচ্ছা, এখানে হোটেল সেলিমটা কোথায়? আমার এখানে এক পরিচিত ভদ্রলোক আছেন, নাম ''হরিনাথ পাকড়াশি।'' ও এখানকার ''বেঙ্গলি ক্লাবের'' প্রেসিডেন্ট। এখানে যে আসছি সেটা ওকে ওভারটেলিফোন জানিয়েছিলাম। তাই শুনে ও বেঙ্গলি ক্লাবের পক্ষ থেকে আগামীকাল সন্ধ্যায় ''হোটেল সেলিম''-এ আমাকে একটা সংবর্ধনা দেবে ঠিক করেছে। এখানে পৌঁছে ওকে আমার ফোন করার কথা।' তার কথা শুনে অর্জুন সিংভি বললেন, ''হোটেল সেলিম জনপথবাজারে। বেশ বড় হোটেল ওটা।' এর পর কয়েক মুহূর্ত কি যেন চিন্তা করে সিংভি গণপতিবাবুকে জিগ্যেস করলেন, 'আপনি কোন কোম্পানির অ্যাড করতে এখানে আসছেন, তা ওই ভদ্রলোক জানেন?'
গণপতিবাবু বললেন, 'না, কোম্পানির নামটা ওকে বলিনি। ওকে শুধু বলেছি, একটা বিশেষ কাজে চার দিনের জন্য আমি লক্ষ্নৌ আসছি।'
তাঁর কথা শুনে সিংভি যেন খুশি হয়ে বললেন, 'কাজটা ভালো করেছেন আপনি। আসলে আমার কোম্পানি, সিংভি ফুড প্রোডাক্টস-এর সঙ্গে হায়দার অ্যান্ড কোং নামের একটা কোম্পানির ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতা আছে। আমি চাই না আমার প্রোডাক্টটা মার্কেটে নামার আগে তার খবর বা আপনার বিজ্ঞাপন করার খবর ওদের কানে যাক। আমার কাছে খবর আছে, ওরাও কি একটা নতুন ফুড প্রোডাক্ট ছাড়ছে বাজারে। ''অজয় চৌহান'' নামে এক হকি প্লেয়ার নাকি তার অ্যাড করছে।'
গণপতিবাবু বললেন, 'ও সেই গোলকিপার অজয় চৌহান! ও একবার অলিম্পিকে গিয়েছিল বটে, কিন্তু স্কটল্যান্ড না পাকিস্তানের কাছে পাঁচ গোল খেয়েছিল। আর একবার ন্যাশনাল গেমসে সব চেয়ে বেশি গোল খেয়ে রেকর্ড করেছিল। ও আবার একটা প্লেয়ার হল! কোথায় আমি, আর কোথায় ও!'
গণপতিবাবুর কথা শুনে অর্জুন সিংভি হেসে বললেন, 'হ্যাঁ, তাই তো। আর সে জন্যই তো আপনাকে দিয়ে অ্যাড করাচ্ছি আমরা।' এর পর একটু থেমে তিনি বললেন, 'আপনার কাছে আমার আরও একটা রিকোয়েস্ট আছে। আপনি ওই পাকড়াশি বলে ভদ্রলোককে বা বেঙ্গলি ক্লাবের কাউকে আপনি, এখানে কোথায় থাকছেন তা দয়া করে জানাবেন না। আপনি নামজাদা বক্সার ছিলেন, তার ওপর শুনেছি যে আপনি বক্সিং ফেডারেশনের কর্মকর্তা'...।
'হ্যাঁ, ভাইস প্রেসিডেন্ট' সিংভির কথার মাঝখানে তার পদমর্যাদা গম্ভীরভাবে জানিয়ে দিলেন গণপতিবাবু।
সিংভি বলে চললেন, '...সাংবাদিকরা আপনার নাম জানে। কাজেই আপনার সংবর্ধনার পর আপনার ইন্টারভিউ নেওয়ার জন্য মিডিয়ার লোকরা আপনার আস্তানার খোঁজ করে সেখানে চলে আসতে পারে। তখন আপনার এখানে আসার কারণটা জানাজানি হওয়ার একটা সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।'
তাঁর কথা শুনে গণপতিবাবু বললেন, 'ঠিক আছে, বুঝেছি। ঠিকানাটা আমি কাউকে বলব না।'
অর্জুন সিংভি বললেন, 'থ্যাঙ্ক ইউ মিঃ হাজরা।'
শিমুল আবার মন দিয়েছিল বাইরের দৃশ্যের দিকে। শাহ নজাফ ইমামবাড়াকে পিছনে একপাশে ফেলে আরও কিলোমিটার-দুই এগোবার পরই রাস্তার একদম পাশেই এক বিরাট আকারের, ছড়ানো ছিটানো বাড়ির ধ্বংসাবশেষ দেখতে পেল শিমুল। তাঁর দোতলায় স্তম্ভ অলিন্দগুলো যেন কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ব্যারাকের মতো বাড়িটার বিরাট চত্বরটা এক সময় মনে হয় প্রকাণ্ড প্রাচীর দিয়ে ঘেরা ছিল। রাস্তার পাশে এখনও তার ধ্বংসাবশেষ চোখে পড়ছে। বাড়িটার সামনে লোকজন, টাঙা, আর বেশ কয়েকটা ট্যুরিস্ট বাস দাঁড়িয়ে আছে। অর্জুন সিংভি শিমুলকে বললেন, 'এই হল বিখ্যাত ''দ্য রেসিডিন্সি''। নবাব সাহাদাত আলি খান তার দরবারের ইংরেজ দূতের জন্য এই বিশাল বাড়ি নির্মাণ করান। পরবর্তীকালে রেসিডেন্সি ইংরেজ রাজ কর্মচারীদের থাকার জায়গা হয়ে ওঠে। ১৮৫৭-র সিপাহি বিদ্রোহের সময় বহু ইংরেজ তাঁদের স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে এখানে আশ্রয় নেন ও বিদ্রোহী সিপাহিদের বিরুদ্ধে এখান থেকে লড়াই চালাতে থাকে। বিদ্রোহীরা ৮৭ দিন ধরে রেসিডেন্সি অবরোধ করার পর আগুন লাগিয়ে দেয় বাড়িটাতে। বহু-নিরপরাধ ইংরেজ মহিলা ও শিশু নিহত হন তাতে। আগুন আর যুদ্ধের সময় কামানের গোলাতে ধ্বংস হয়ে যায় রেসিডেন্সি।' এরপর তিনি বললেন, 'বাড়িটার কাছে গেলে এখনও ওর দেওয়ালে গুলির দাগ দেখতে পাবেন। বিকাল পাঁচটা পর্যন্ত এটা খোলা থাকে। ইচ্ছা হলে আজ বিকেলেই এসে এখানে ঘুরে যেতে পারেন।'
শিমুল কোনও কথা বলল না। দেখার ইচ্ছা তার অবশ্যই আছে। কিন্তু তার চলা-ফেরা, দেখা না-দেখা,—এ সব কিছুই নির্ভর করে আছে গণপতিবাবুর ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর। তাই চলন্ত গাড়িতে বসেই 'দ্য রেসিডেন্সির' সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় বাইরে থেকে যতটুকু দেখা যায় দেখে নিল সে। গাড়ি এগিয়ে চলল। এরপর হঠাৎ অর্জুন সিংভি গণপতিবাবুর উদ্দেশে বললেন, 'আপনাকে একটা কথা জিগ্যেস করছি কিছু মনে করবেন না, আমার যে লোক কলকাতায় আপনার সঙ্গে কথাবার্তা বলতে গিয়েছিল, সে নিশ্চয়ই আপনাকে সঙ্গে করে আপনার ''ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়ন''-এর মেডেলটা আনতে বলেছিল। সেটা এনেছেন তো?'
গণপতিবাবু প্রশ্ন শুনে তাঁর মুখের দিকে তাকালেন। তারপর বললেন, 'হ্যাঁ এনেছি। এটা অমূল্য জিনিস। আমি জিনিসটা বাড়ির বাইরে কোনওদিন বার করি না। নেহাৎ আপনার লোক বার বার করে অনুরোধ করল তাই আপনাদের কথা ফেলতে পারলাম না।'
অর্জুন সিংভি গণপতিবাবুর কথা শুনে আশ্বস্ত হয়ে বললেন, 'এর জন্য অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। আসলে শুটিংয়ের সময় জিনিসটা কাজে লাগবে।'
গণপতিবাবু এ প্রসঙ্গে আর কোনও কথা বললেন না। তিনি মুখ ফিরিয়ে বাইরের দিকে তাকালেন। রেসিডেন্সি ছাড়িয়ে কিছুটা পথ এগোবার পর অন্য একটা রাস্তা ধরল গাড়ি। এ রাস্তায় অন্য কোনও গাড়ি-ঘোড়া নেই। দু-একটা লোক ছাড়া রাস্তায় তেমন কোনও লোকজন নেই। রাস্তার দু'পাশে বড় বড় গাছ আর বেশ অনেকটা তফাতে তফাতে রাস্তার ডানপাশে দাঁড়িয়ে আছে, নবাবি আমলের বিরাট বিরাট সব বাড়ি। তাদের চারদিকে অনেকটা করে জায়গা উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। এ সব বাড়িতে কোনও লোকজন থাকে কিনা ঠিক বুঝতে পারল না শিমুল। এক সময় এ রকমই একটা প্রাচীর ঘেরা দোতলা বাড়ির বিরাট লোহার ফটকের সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল অর্জুন সিংভির স্করপিও। তিনি বললেন, 'আমরা এসে গেছি।' ড্রাইভার দু'বার গাড়ির হর্ন বাজাতেই একজন সাদা উর্দি পরা লোক এসে দরজা খুলে দিল। গাড়ি কাম্পাউন্ডের ভিতরে প্রবেশ করল। শিমুল দেখতে পেল কম্পাউন্ডের ভেতর একপাশে একটা সাদা রঙের অ্যাম্বাসাডর গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। ভিতরে ঢুকে শিমুলদের গাড়ি বাড়িটার গায়ে গিয়ে থামল। গাড়ির দরজা খুলতে খুলতে সিংভি বললেন, 'নেমে পড়ুন। আপনাদের এখানে আসতেও অনেক কষ্ট হল।'
বাড়িটার একতলার বারান্দায় দুটো বেতের চেয়ারে মুখোমুখি বসে কথাবার্তা বলছিলেন গণপতিবাবু আর অর্জুন সিংভি। তাঁদের কয়েক হাত দূরে আর একটা চেয়ারে বসে বাগানের দিকে তাকিয়ে ছিল শিমুল। বাড়িটার পরিবেশ বেশ খোলামেলা। বড় বড় দরজা-জানলা দিয়ে প্রচুর আলো-বাতাস খেলা করে। একতলাতে পাশাপাশি দুটো বড় ঘরে গণপতিবাবু আর শিমুলের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ঘর, বিছানাপত্তরও খুব ভালো। শিমুলরা আসার পরই, ডিম, দুধ, পুরি, মিষ্টি দিয়ে তাদের টিফিন করিয়েছেন সিংভি সাহেব। তবে এই বাড়িতে একজন মাত্র বৃদ্ধ লোক, যে শিমুলদের খাবার দিল, তাকে ছাড়া অন্য কাউকে আর চোখে পড়েনি শিমুলের। আর যে লোকটা প্রথমে ফটক খুলে দিয়েছিল, সে আসলে হল, যে অ্যাম্বাসাডর গাড়িটা কম্পাউন্ডের ভিতর দাঁড়িয়ে আছে তার চালক। শিমুল বারান্দায় বসে দেখতে পাচ্ছে সে লোকটা এখন গাড়িটার ভিতর বসে আছে। শিমুলের কানে এল, কথাপ্রসঙ্গে গণপতিবাবু অর্জুন সিংভিকে জিগ্যেস করছে, 'এ বাড়িটা কার?'
সিংভি বললেন, 'এ বাড়িটা আমি লিজ নিয়েছি। এ অঞ্চলে যে সব বাড়ি-ঘর আছে সে সব বাড়ি-ঘরে পঞ্চাশ-ষাট বছর আগেও মুসলমান পরিবাররা বসবাস করতেন। তাঁদের মধ্যে এমন অনেকে ছিলেন যাঁরা ছিলেন যাকে বলে, ''ক্রিম অফ দি সোসাইটি''। এখন সময় বদলে গেছে, এসব বাড়ির যাঁরা উত্তরাধিকারি বিভিন্ন কারণে তাঁরা বিভিন্ন জায়গায় চলে গেছেন, কেউ কেউ আধুনিক ফ্ল্যাটে উঠে গেছেন। এ সব সাবেকি আমলের বাড়ি-ঘর তাদের পক্ষে ঠিকভাবে সংরক্ষণ করাও অনেক সময় অসুবিধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তাই কেউ কেউ এই বাড়ি-ঘরগুলো বেচে দিচ্ছেন বা অন্যকে লিজ দিয়ে দিচ্ছেন। সে রকমই একজনের কাছ থেকে এ বাড়িটা লিজ নিয়েছি আমি। এ বাড়িতে যে লোকটাকে আপনারা খাবার দিতে দেখলেন, তার নাম ইসমাইল। ওই ইসমাইলই এ বাড়িটার দেখাশোনা করে। ইসমাইলের কথা শেষ হতে না হতেই শিমুল দেখতে পেল লম্বা বারান্দার শেষ প্রান্ত থেকে ইসমাইল একটা ট্রে হাতে ধীরে ধীরে তাদের দিকে এগিয়ে আসছে। ট্রে-তে কাপ-প্লেট সাজানো আছে। সম্ভবত তাদের জন্য চা বা ওই জাতীয় কিছু নিয়ে আসছে সে। লোকটার পরনে চোস্তা পাজামা-পাঞ্জাবির ওপর হাতকাটা ঢিলা কাপড়ের তৈরি একটা পোশাক চাপানো আছে। তাঁর চোখে গোল ফ্রেমের ঘষা কাঁচের চশমা। সম্ভবত বয়সের ভারেই ইসমাইল একটু কুঁজো হয়ে হাঁটে। কাছে এসে ইসমাইল প্রথমে দুটো কাপ, প্লেট নামিয়ে রাখল গণপতিবাবুদের পাশে রাখা একটা ছোট টেবিলের ওপর। তারপর ট্রে হাতে এসে দাঁড়াল শিমুলের সামনে। শিমুল তার হাতের ট্রে থেকে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপটা হাতে তুলে নেওয়ার পরই হঠাৎ তার দৃষ্টি পড়ল লোকটার পায়ের দিকে। লোকটার পায়ে চপ্পল পরা আছে ঠিকই, কিন্তু তার ডান পায়ের পাতার দিকে তাকিয়ে শিমুল বুঝতে পারল তার ডান পা কাঠের তৈরি। তার রঙ লোকটার গায়ের রঙের সঙ্গে এত সুন্দর মিলেছে যে ভালো করে না দেখলে এ ব্যাপারটা ঠিক ধরা পড়ে না। লোকটার কুঁজো হয়ে চলার এটাও একটা কারণ হতে পারে, মনে মনে ভাবল শিমুল। চা দিয়ে বুড়ো ইসমাইল ট্রে হাতে আবার ধীরে ধীরে হেঁটে চলে গেল সে যেদিক থেকে এসেছিল সেদিকে।
মিনিট পাঁচেকে সবার চা খাওয়া হয়ে যাওয়ার পর অর্জুন সিংভি গণপতিবাবুকে বললেন, 'এবার আমাকে উঠতে হবে। কাল শুটিংয়ের ব্যাপারে বেশ কিছু কাজ বাকি পড়ে আছে আমার। আপনারা অনেক পথ ট্রেন জার্নি করেছেন। এখন আপনারা বিশ্রাম নিন। আর একটা গাড়ি এখানে রইল, যদি দুপুরে কোথাও যেতে চান, তাহলে যেতে পারেন। ড্রাইভারকে বলা আছে।' গণপতিবাবু বললেন, 'না আমার দুপুরে কোথাও যাওয়ার ইচ্ছে নেই। কাল রাতে ট্রেনে ঘুম হয়নি। আমাকে ঘুমোতে হবে।' এরপর কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকার পর গণপতিবাবু আবার বললেন, 'আচ্ছা এ বাড়িতে টেলিফোন আছে? আমার পাকড়াশিকে এখানে পৌঁছনোর খবরটা জানানোর ব্যাপার ছিল।'
অর্জুন সিংভি বললেন, 'দুঃখিত, টেলিফোন কানেকশনের জন্য অ্যাপ্লাই করা সত্ত্বেও এখনও তারা এখানে সেটা বসিয়ে দিয়ে যায়নি। আর আমার মোবাইলটাও আমি ভুল করে আজ আমার বাড়িতে ফেলে এসেছি। তবে আপনি যদি মিঃ পাকড়াশির টেলিফোন নম্বরটা আমাকে দেন, তাহলে আমি তাকে খবরটা দিয়ে দিতে পারি।'
সিংভির কথা শুনে একটু ইতস্তত করার পর গণপতিবাবু তার বুক পকেট থেকে টেলিফোন ডায়েরি বার করে বললেন, 'ঠিক আছে, আপনি তাহলে টেলিফোনে খবরটা জানিয়ে দেবেন ওকে। আর সংবর্ধনার টাইমটাও আমার নাম করে ওর থেকে আর একবার জেনে নেবেন। কোনও অনুষ্ঠানে আগে গিয়ে বসে থাকতে আমার ভালো লাগে না।'
তিনি জবাব দিলেন, 'আচ্ছা।'
এরপর গণপতিবাবু তাঁর ডায়েরি দেখে পাকড়াশির টেলিফোন নম্বরটা বললেন। অর্জুন সিংভি নম্বরটা একটা কাগজে টুকে নিলেন। তারপর তিনি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, 'তাহলে আমি আসছি। ইসমাইল রইল, আশা করি আপনাদের কোনও অসুবিধা হবে না। আমি আমার কাজ শেষ করে বিকেলের দিকে একবার আসব।'
গণপতিবাবুকে এই কথা বলে শিমুলের দিকে একবার তাকিয়ে হেসে বারান্দা ছেড়ে নিজের কাজে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালেন তিনি। কয়েক মিনিটের মধ্যেই তার কালো স্করপিও বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল।
অর্জুন সিংভির গাড়ি ফটকের বাইরে মিলিয়ে যাওয়ার পর গণপতিবাবু শিমুলকে বললেন, 'তোমাকে কতগুলো কথা বলছি। কথাগুলো মনে রাখার চেষ্টা করবে। প্রথমত, আমি যখন বাইরে যাব, তখন সবসময় আমার পাশে পাশে থাকবে। কখনও যেন তোমাকে খুঁজতে না হয়। দ্বিতীয়ত, আমার অনুমতি ছাড়া আমাকে এ বাড়িতে রেখে কোথাও যাবে না তুমি। কখন তোমাকে আমার দরকার হয় তা বলা যায় না। আর তৃতীয় ব্যাপারটাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমি চাই না যে, মিস্টার সিংভি বা এখানকার অন্য কোনও লোকের সঙ্গে তুমি বেশি কথাবার্তা বল। ঠিক যতটুকু প্রয়োজন ঠিক ততটুকু কথাই বলবে। সবসময় মাথায় রাখবে যে, তুমি আমার কর্মচারী। তুমি আমার সঙ্গে এখানে এসেছ। কলকাতায় ফেরার পর তোমার চাকরি থাকা না থাকাটা এখানে তোমার চলা-ফেরার ওপর নির্ভর করছে।' একটানা কথাগুলো বলার পর এবার শিমুলের দিকে তাকিয়ে গণপতিবাবু বললেন, 'কী কথাগুলো কানে ঢুকল তো?'
শিমুল মাথা নীচু করে জাবাব দিল, 'হ্যাঁ, স্যার।'
তিনি এরপর নিজের ঘরের দিকে পা বাড়াতে বাড়াতে বললেন, 'আমি এখন বিশ্রাম নেব। অনেক ধকল গেছে। ফ্লাইটে এলে ভালো হত। আমি না ডাকলে তুমি আমাকে ডিস্টার্ব করবে না।' এই বলে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলেন গণপতিবাবু।
শিমুল একলা চুপ করে বসে রইল বারান্দাতে। বেশ শান্ত জায়গা। কোনও চিৎকার-চেঁচামেচি নেই। শুধু দোতলার কার্নিশ থেকে পায়রার 'বকমবকম-বকমবকম' ডাক কানে আসছে। ওপরটায় মনে হয় ওদেরই রাজত্ব। শিমুল বসে বসে নিজের কথা চিন্তা করতে লাগল। দু-মাসের মধ্যেই হঠাৎ শিমুলের জীবনের সব কিছু কেমন যেন ওলটপালট হয়ে গেল। ওরা আগে থাকত আর্মহার্স্ট স্ট্রিটের একটা ভাড়া বাড়িতে। বাবা কাজ করতেন কলেজ স্ট্রিটের এক নামী প্রকাশনা সংস্থায়। তিনি যা বেতন পেতেন তাতে টাকা জমাতে না পারলেও মোটুমুটিভাবে তাঁর সংসার চলে যেত। বিলাসিতা না থাকলেও সে সময় শিমুলদের সংসারে খাবার-দাবারের অভাব হয়নি।
বক্সিয়ের পাশাপাশি সিটি কলেজ থেকে বি এ পাশ করিয়েছিলেন তিনি শিমুলকে। সুখে-দুঃখে তাদের ভালোই চলে যাচ্ছিল সে সময়। শিমুলের বাবা ছিলেন ফুটবলপ্রেমী মানুষ। তিনি চেয়েছিলেন শিমুল ফুটবলার হোক। কিন্তু শিমুলের মন টানল বক্সিংয়ের দিকে। তাতে অবশ্য তিনি বাধা দেননি। বরং বছর তিনেক আগে যখন একবার কালীঘাট বক্সিং রিংয়ে ইলিয়াসের ঘুসিতে নাক ভেঙে শিমুল হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল তখন তিনি দু'বেলা হাসপাতালে গিয়ে শিমুলকে তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে আবার রিং-এ ফেরার জন্য উৎসাহ দিতেন। ছেলে তাঁর ইচ্ছা পূরণ করেনি বলে তিনি কোনওদিন তাকে নিরুৎসাহ করেননি। শিমুলের বাবার নেশা ছিল ফুটবল ম্যাচ দেখতে যাওয়া। প্রচণ্ড নেশা। হাজারও সমস্যার মধ্যেও এই অভ্যাস তিনি কোনওদিন পরিত্যাগ করতে পারেননি। শেষপর্যন্ত এই নেশাই তাঁর জীবন নিল। মাস-দুয়েক আগে সেদিন গড়ের মাঠে দুটো বড় দলের লিগের খেলা ছিল। যথারীতি শিমুলের বাবাও সেদিন হাজিরও ছিলেন মাঠে। রেফারির কী একটা ডিসিশন নিয়ে গণ্ডগোল লাগল দু'দলের সমর্থকদের মধ্যে। সে অর্থে তিনি কোনও দলের সমর্থক ছিলেন না। ভালো খেলা দেখতেই মাঠে গিয়েছিলেন। কিন্তু গন্ডগোলের মধ্যে থেকে যেন একটা বড় ইটের টুকরো উড়ে এসে পড়েছিল তাঁর মাথায়। শিমুলের মনে আছে, সে দিনটা ছিল শনিবার। বিকেলে রিং-এ নামার আগে শিমুল জগিং করছিল। হঠাৎ বিশুদা ছুটতে ছুটতে এসে বলল, 'তোকে রিং-এ নামতে হবে না। এখনই হাসপাতালে যেতে হবে।'
বিশুদাকে নিয়ে শিমুল যখন হাসপাতালে পৌঁছল, তখন সব কিছু শেষ হয়ে গেছে। হাসপাতালের করিডোরে ট্রলির ওপর শোয়ানো ছিল সাদা চাদর ঢাকা শিমুলের বাবার নিথর দেহ।
বাবা চলে যাওয়ার পর শিমুল সংসারের প্রকৃত অর্থ বুঝতে পারল। তিনি বেঁচে থাকতে বক্সিংয়ের বাইরে সংসারের প্রতি কোনও মনোযোগ দিতে হয়নি শিমুলকে। তার একমাত্র লক্ষ্য ছিল সফল বক্সার হওয়া। রিং-এর ভিতর লড়াইটা সে ভালোই করে। ট্রেনার বিশুদা বলত, সে নাকি একদিন ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়ন হবে। বাবা মারা যাওয়ার পরও বিশুদার অনুরোধে রিং-এ নেমে মাস তিনেক আগেও মিডিল ওয়েটে ক্যালকাটা চ্যাম্পিয়ন হয়েছে সে। যাকে সে হারিয়েছে, সে বেঙ্গল চ্যাম্পিয়ন। খবরের কাগজে শিমুলের ছবি ছাপা হয়েছিল। কিন্তু রিং-এর ভিতর লড়াইয়ের থেকে বাইরের সংসারের লড়াইটা যে অনেক বেশি কঠিন তা বাবা মারা যাওয়ার পরই দু-মাসের মধ্যে বুঝে গেছে শিমুল। তাঁর মৃত্যুর পর মাত্র কয়েক হাজার টাকা মায়ের হাতে ধরিয়ে দিয়েছিল প্রকাশক কোম্পানি। বাবার কোনও জমানো টাকা ছিল না। শ্রাদ্ধ-শান্তি মিটতে না মিটতেই তাদের হাতে উচ্ছেদের নোটিস ধরিয়ে দিল আর্মহার্স্ট স্ট্রিটের বাড়িওয়ালা। পুরোনো বাড়ি ভেঙে সেখানে সে ফ্ল্যাট করবে। কেউ কেউ অবশ্য বাড়িওয়ালার বিরুদ্ধে শিমুলদের কোর্টে যেতে বলেছিল। কিন্তু তার জন্য পয়সা কোথায়? অগত্যা শিমুলদের উঠে আসতে হল একটা আধা-বস্তি অঞ্চলে। বাবা মারা যাওয়ার পরও একমাস রিং-এ নেমে প্র্যাকটিস চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল। বিশুদা বলেছিলেন, 'আর ছ'টা মাস কষ্ট করে প্র্যাকটিস চালিয়ে যা, দেখবি ন্যাশনালের পর তোর ভাগ্য খুলে যাবে।'
কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর পারল না শিমুল। ঘরে খাবার নেই, মা-র ওষুধ, পুঁটির পড়াশোনা। বাড়ি ভাড়া। শেষপর্যন্ত সে একদিন বিশুদাকে বলেই ফেলল, 'আমি ন্যাশনাল যেতে চাই না বিশুদা। তুমি বরং আমাকে একটা চাকরি জোগাড় করে দাও।' বিশুদা শিমুলের কথায় কষ্ট পেয়েছিলেন। তবু তিনি একবার বলার চেষ্টা করেছিলেন, 'আর তো মাত্র ক-একটা মাস ন্যাশনাল হতে বাকি। দেখ না, এ-ক'টা মাস যদি নুন-ভাত খেয়ে চালিয়ে নিতে পারিস। আমি নয় তোকে মাসে মাসে কিছু...।
তাঁর কথা শেষ হওয়ার আগেই শিমুল বলেছিল, 'না, তা হয় না বিশুদা। তোমার সামান্য আয়ে তুমি মা-বাবা-ছেলেমেয়ে নিয়ে কত বড় সংসার চালাও। আমাকে সাহায্য করতে গিয়ে শেষমেষ তোমাকে আর বউদিকে হয়তো না খেয়ে কাটাতে হবে। এভাবে কিছু হয় না বিশুদা। তুমি দেখো, কাউকে বলে কয়ে আমার একটা কাজের ব্যবস্থা করতে পারো কিনা।' বিশুদা এরপর আর কোনও কথা বলেননি। তারই মাস-দুই চেষ্টাতে দিন-কুড়ি হল গণপতিবাবুর কাছে তার কাজটা যে কী, তা এই দিন কুড়ির চেষ্টাতেও ঠিক বুঝে উঠতে পারেনি শিমুল। কোনও দিন তিনি তাকে অফিসঘরে শুধু বসিয়ে রাখেন, কোনওদিন গ্যারেজে গাড়ি সারাবার জন্য ড্রাইভারের সঙ্গে পাঠান, কোনওদিন আবার বাজার করার সময় তাকে সঙ্গে নিয়ে যান।—এ সব মামুলি কাজ তো তাঁর অন্য কর্মচারীরাও করতে পারত। এর জন্য তাঁর নতুন লোক রাখার কী দরকার ছিল? স্পোর্টস গুডস সংক্রান্ত যে ব্যবসা আছে তার কাগজপত্র নিজেই দেখাশোনা করেন গণপতিবাবু। তিনি শিমুলকে স্পষ্ট বলে দিয়েছেন, ও-সব কাগজপত্র সে যেন না ছোঁয়। তা হলে শিমুলের কাজটা কী? তবে অবশ্য শিমুল যেদিন প্রথম কাজে যোগ দিয়েছিল, সেদিন তিনি একটা অদ্ভুত কথা বলেছিলেন শিমুলকে। বলেছিলেন, তাঁর বাড়ির আশপাশে বা তাঁর সঙ্গে রাস্তাতে চলার সময়, একটা কান নেই এমন কোনও লোক যদি শিমুলের চোখে পড়ে, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে শিমুল যেন ব্যাপারটা তাঁকে জানায়। এর কারণটা অবশ্য তিনি বলেননি শিমুলকে। শিমুলও ভয়ে জিগ্যেস করেনি কারণটা।
গণপতিবাবুকে এই কুড়ি দিনে যতটুকু দেখেছে শিমুল, তাতে তার মনে হয়েছে, গণপতি হাজরা শুধু যে প্রচণ্ড দাম্ভিক তাই নন, মানুষকে তিনি মানুষ বলে মনে করেন না। সম্মান অর্থে যারা তাঁর থেকে পিছনে, তাদের তিনি কারণে-অকারণে অপমান করে তৃপ্ত হন। বিশুদা তাঁর কাছে শিমুলের চাকরির জন্য দরবার করলেও মন থেকে তাঁকে যে একদম পছন্দ করে না তা জানে শিমুল। বিশুদা অনেকদিন আগে কী একটা প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে একবার বলেছিলেন যে, 'কলকাতার বক্সিং-মহল আসলে গণপতিবাবুকে শ্রদ্ধা করে না। ভয় করে। ওঁর অনেক ক্ষমতা। মন্ত্রী পুলিশ সব ওঁর হাতের মুঠোয়। আমাদের সময় খেলাধুলার জগৎ চালাতেন বড় বড় প্রাক্তন খেলোয়াড়রা বা খেলা অন্তপ্রাণ মানুষেরা। আর এখন ক্রিকেট থেকে কবাডি সর্বত্রই নেতা-পুলিশের দাপট। গণপতি হাজরার মতো মানুষ, যাদের সঙ্গে এঁদের দহরম-মহরম। তাই গণপতি হাজরাদের সন্তুষ্ট না করতে পারলে যে কোনও ক্লাবের তাঁবু গুটিয়ে যেতে পারে। মুহূর্তের মধ্যেই ডুম হয়ে যেতে পারে যে কোনও প্লেয়ারের কেরিয়ার। কাজেই গণপতিবাবুদেরকে আমাদের মানতেই হয়।' শিমুলের বাবা শিমুলকে বলতেন, বড় খেলোয়াড় হতে গেলে আগে নাকি 'বড় মাপের' অর্থাৎ 'বড় মনের' মানুষ হতে হয়। শিমুলও এতদিন এ কথাটা বিশ্বাস করত। কিন্তু 'ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়ন' গণপতি হাজরাকে দেখে ধারণাটা পাল্টে যাচ্ছে শিমুলের। গণপতিবাবুর ক্ষেত্রে ব্যাপারটা একদম উল্টো।
বারান্দায় বসে এ-সব কথা বেশ অনেকক্ষণ ধরে ভাবল শিমুল। তারপর একসময় বারান্দা ছেড়ে উঠে নিজের ঘরে গিয়ে ঢুকল। ঘরের সঙ্গেই বাথরুম। কিছুক্ষণের মধ্যেই স্নান সেরে বিছানাতে শুয়ে পড়ল সে। বেলা একটা নাগাদ দরজার টোকা শুনে দরজা খুলে দেখল, একটা ট্রে হাতে ইসমাইল দাঁড়িয়ে আছে। ট্রেতে বেশ বড় বড় কয়েকটা চিনামাটির পাত্র। সুন্দর গন্ধ ছড়াচ্ছে। দুপুরের খাবার এনেছে ইসমাইল। ঘরে ঢুকে কোনও কথা না বলে খাবার রেখে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা শিমুলের পাশ দিয়ে ঘর ছেড়ে চলে গেল ইসমাইল। দরজা বন্ধ করার আগে শিমুল একবার তাকাল গণপতিবাবুর ঘরের দিকে। তাঁর দরজা বন্ধ। শিমুল নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে দিয়ে বসল টেবিলে রাখা খাবারের সামনে। ভাত-ডাল আর ধোঁয়া ওঠা মুরগির মাংস রেখে গেছে ইসমাইল। কী সরু সরু চালের সুন্দর ভাত। কী তার সুবাস। ভাতের প্লেটটা টানতেই শিমুলের হঠাৎ মনে পড়ে গেল মা আর পুঁটির কথা। তার দুজনে আজ কী খাচ্ছে? নিশ্চয়ই আলু সিদ্ধ আর মোটা চালের ভাত। হঠাৎ মনটা খারাপ হয়ে গেল শিমুলের, সে কোনওরকমে খেয়ে শুয়ে পড়ল বিছানাতে। তারপর বাড়ির কথা ভাবতে ভাবতে কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ল।
শিমুলের যখন ঘুম ভাঙল তখন বিকাল চারটে বাজে। ঘুম ভেঙে কিছুক্ষণ চুপচাপ বিছানাতে শুয়ে রইল সে। তারপর বিছানা ছেড়ে উঠে বাথরুমে ঢুকে চোখেমুখে জল দিয়ে দরজা খুলে বারান্দায় বেরিয়ে এল। শুনশান বারান্দা, কেউ কোথাও নেই। গেটের পাশে গাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে ঠিকই কিন্তু তার ড্রাইভারকে দেখতে পেল না। পায়রাগুলোর বকবকমও আর শোনা যাচ্ছে না। তবে কোথা থেকে যেন একটা পাখির সুরেলা ডাক শোনা যাচ্ছে। শিমুলের মনে হল ডাকটা আসছে বাড়ির পিছন দিক থেকে। গণপতিবাবুর ঘরের দরজা বন্ধ। শিমুল ধীর পায়ে গিয়ে দাঁড়াল সেই দরজার সামনে। তারপর সেই ঘরের দরজাতে কান পাততেই ঘরের ভিতর গণপতিবাবুর নাক ডাকার শব্দ শুনতে পেল। অর্থাৎ এখনও নিদ্রাভঙ্গ হয়নি। রোদ অনেকটা পড়ে এসেছে। শিমুল ভাবল, বারান্দা থেকে নেমে একবার বাগানের চারপাশে হেঁটে আসা যাক। গণপতিবাবু যেভাবে নাক ডাকছেন তাতে মনে হয় তাঁর ঘুম ভাঙতে বেশ দেরি আছে। বারান্দা থেকে বাগানে নেমে পড়ল শিমুল। দোতলার কার্নিসের দিকে শিমুল তাকিয়ে দেখল পায়ারাগুলো আর সেখানে নেই। হয়তো তারা দল বেঁধে কোথাও উড়তে গেছে। শিমুল বাগানে হাঁটতে শুরু করল। ধীরে ধীরে বাড়িটাকে বেড় দিয়ে সে উপস্থিত হল বাড়ির পিছন দিকে। পিছনে প্রাচীর ঘেরা অনেকটা জমি। অন্তত বিঘে দুয়েক হবে। প্রাচীরের ধার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে বিরাট বিরাট সব গাছ। তাদের গুঁড়িগুলো দেখলেই বোঝা যায় তাদের অনেক বয়েস। শিমুল বাড়ির পিছনে গিয়ে দাঁড়াতেই পাখির ডাকটা হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল। আর কাছেই একটা গাছের ডাল থেকে হলুদ রঙের একটা পাখি উড়ে গেল চোখের আড়ালে। আর তারপরই কিছুদূরে বাগানের ভিতর একটা আশ্চর্য জিনিস চোখে পড়ল তার। একটা বিরাট ময়ূর প্রাচীরের ধারে গাছের নীচে মাটি থেকে কী যেন খুটে খুটে খাচ্ছে। গাছের ফাঁক দিয়ে বিকালের সূর্যের আলো এসে পড়েছে তার গায়ে। সেই আলোতে তার ঝালরের মতো লম্বা লেজ আর গলার নীল রং ঝলমল করছে। ময়ূরটা মনে হয় খেয়াল করেনি শিমুলকে। একমনে সে খুটে চলেছে।
'ময়ূরটা কি সিংভি সাহেবের পোষা?' মনে মনে ভাবল শিমুল। আরও কাছ থেকে তাকে দেখার জন্য সন্তর্পণে এগোল তার দিকে। যখন সে প্রায় পাখিটার কাছে চলে এসেছে, ঠিক তখনই ঘাড় তুলে পাখিটা তার দিকে তাকাল। আর পরমুহূর্তেই কর্কশ ডাক ছেড়ে ডানা ঝটপটিয়ে এক লাফে বেশ উঁচু প্রাচীরের ওপর চড়ে বসল। ঠিক সেই মুহূর্তেই পিছন থেকে শিমুলের উদ্দেশে একটা গলার শব্দ ভেসে এল, 'হাই ইয়ং-ম্যান ওখানে কী করছেন?'
শিমুল ঘুরে দেখল কিছুদূরে অর্জুন সিংভি এসে দাঁড়িয়েছেন। পোশাক পাল্টে এসেছেন তিনি। তার পরনে এখন নেভি ব্লু জিনস আর গোলাপি টি-শার্ট। চোখে কালো সানগ্লাস। শিমুল এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াল তার সামনে। বলল, 'ময়ুর দেখছিলাম স্যার। ওটা কি আপনার পোষা?'
অর্জুন সিংভি বললেন, 'না, পোষা নয়। আসলে এক সময় লক্ষ্নৌ তো নবাবদের শহর ছিল। তাঁদের অনেক শখশৌখিনতা ছিল। প্রাসাদে তাঁদের ময়ূর ঘুরে বেড়াত। সে সব ময়ুরেরই বংশধরেরা এখনও একটু-আধটু টিঁকে আছে। তবে সংখ্যাতে অনেক কম। এক সময় চারবাগ, মানে ওই রেল স্টেশনের দিকটাতে ওদের দেখা মিলত।' কথাগুলো বলার পর অর্জুন সিংভি প্রশ্ন করলেন, 'দুপুরবেলা আপনাদের খাওয়া-দাওয়ার কোনও অসুবিধা হয়নি তো?'
শিমুল বলল, 'না, স্যার হয়নি।'
ভদ্রলোক শিমুলকে 'আপনি' বলে সম্বোধন করতে শিমুলের কেমন যেন অস্বস্তি হচ্ছিল। শিমুলের বয়স মাত্র ছব্বিশ, আর সিংভির বয়স ওর দ্বিগুনেরও বেশি হবে। তাই কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল, 'আপনি আমাকে ''আপনি'' করে বলবেন না স্যার। বয়সে আপনি অনেক বড়। আপনি আমাকে ''তুমি'' বলবেন।'
অজুন সিংভি তার কথা শুনে মৃদু হেসে বললেন, 'যে কোনও প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকেই ''আপনি'' সম্বোধন করা উচিত। এ শহরে যেমন ''জনাব'' বলে একে অপরকে সম্বোধন করাই হল কেতা। তা তুমি যখন বলছ তখন না হয় ''তুমি'' বলেই ডাকব। তা এখানে তো ক'দিন থাকবে তোমরা! আমার সঙ্গে দু'বেলা দেখা সাক্ষাৎও হবে তোমার। আমাকে কী বলে ডাকবে তুমি?'
শিমুল কয়েক মুহূর্ত চিন্তা করে একটু ইতস্ততভাবে বলল, 'সিংভি সাহেব?'
উত্তর শুনে তিনি হেসে বললেন, 'সাহেব শব্দের মানে জানো তুমি? আসল শব্দটা হল, ''সাহিব।'' আরবিতে এর অর্থ হল ''সম্ভ্রান্ত'' বা ''অভিজাত'' ব্যক্তি। আমি অবশ্য এ দুয়ের কোনওটাই নই। সামান্য ব্যবসা-বাণিজ্য করি। ''সাহেব'' হলেন মিস্টার হাজরার মতো লোকেরা। যাদের সারা দেশে নাম, খ্যাতি আছে। ঠিক আছে, তুমি যখন ''সাহেব'' বলে ডাকতে চাইছ, তবে তাই ডেকো।'
কথাগুলো বলে বেশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে সিংভি সাহেব শিমুলকে বললেন, 'তোমাকে একটা কথা জিগ্যেস করছি কিছু মনে কোরো না। আচ্ছা, তুমি কি মিস্টার হাজরার সিকিওরিটি? আই মিন, বডিগার্ড?'
সিংভি সাহব তাকে কেন এরকম এই প্রশ্ন করলেন তা বুঝতে না পেরে সে চুপ করে রইল।
তাকে চুপ করে থাকতে দেখে সিংভি সাহেব বললেন, 'তা হলে তুমি কি ওঁর পি এ?'
সিংভি সাহেবের প্রশ্নের উত্তর শিমুলেরও সঠিক জানা নেই। তাই সে এবার সত্যি কথাই বলল, 'আমি মাত্র দিন কুড়ি হল স্যারের কাজে ঢুকেছি। আমি ঠিক জানি না আমার কী কাজ। স্যার যা বলেন তাই করি।'
সিংভি সাহেব বললেন, 'ও। তা বাড়িতে তোমার কে কে আছেন? স্যারের কাছে চাকরির আগে কী করতে তুমি? পড়াশোনা, নাকি অন্য কোনও চাকরি?'
তাঁর প্রশ্নের জবাব দেওয়ার সময় ইচ্ছা করেই তার বক্সিংয়ের ব্যাপারটা এড়িয়ে গেল শিমুল। কী হবে আর সে কথা উত্থাপন করে। শিমুল জবাব দিল, 'না, চাকরি করতাম না। আমি বি এ পর্যন্ত পড়েছি। মাস দুয়েক আগে একটা অ্যাক্সিডেন্টে বাবা হঠাৎ মারা গেলেন। বাড়িতে মা আর ছোট বোন আছে। তাই স্যারের কাছে কাজে ঢুকতে হয়েছে।'
শিমুলের কথা শুনে সিংভি সাহেব মন্তব্য করলেন, 'ভেরি স্যাড। বুঝেছি। তোমাকে দেখেই কেন জানি আমার মনে হয়েছিল যে তুমি শিক্ষিত ছেলে। আর তোমার চেহারাটাও বেশ সুন্দর। তবে তোমাকে দেখে আমার আরও একটা জিনিস মনে হচ্ছে।'
'কী?' প্রশ্ন করল শিমুল।
কিন্তু তিনি এ প্রশ্নের কোনও জবাব দিলেন না।
শিমুলের এবার হঠাৎ খেয়াল হল সাড়ে চারটে বাজতে চলেছে। বেশ কিছুক্ষণ কথা বলছে তারা। গণপতিবাবু ঘুম ভেঙে বাইরে এসে শিমুলকে দেখতে না পেলে, বিশেষত সিংভি সাহেবের সঙ্গে কথা বলতে দেখলে তাকে ধমকাতে শুরু করবেন। এমনিতেই শিমুল যাতে এখানে কারও সঙ্গে কথাবার্তা না বলে সে ব্যাপারে তিনি আগাম সতর্ক করে দিয়েছেন। কথাটা মনে আসতেই শিমুল সিংভি সাহেবকে বলল, 'আমি এখন যাই। হয়তো স্যার ঘুম থেকে উঠে পড়েছেন।'
সিংভি সাহেব বললেন, 'আচ্ছা।' তারপর তিনি শিমুলের সঙ্গে কয়েক পা বাড়ির দিকে হাঁটতে হাঁটতে বললেন, 'তোমার লক্ষ্নৌ দেখার ইচ্ছা আছে নিশ্চয়ই?'
শিমুল বলল, 'হ্যাঁ। স্যার নিয়ে গেলে বা আমাকে বাইরে যাওয়ার পারমিশন দিলে শহরটা দেখব। আচ্ছা, লক্ষ্নৌ শহরের বড় বড় জায়গাগুলো পায়ে হেঁটে দেখতে কত সময় লাগে?'
'পায়ে হেঁটে কেন?' অবাক হয়ে প্রশ্নটা করলেন সিংভি সাহেব। তারপর মনে হয় কিছু একটা অনুমান করে নিয়ে বললেন, 'তোমার যাতে পায়ে হেঁটে বেড়াতে না হয় সে ব্যবস্থা আমি করব। ওভাবে হেঁটে দেখতে হলে তোমার তিন দিন লেগে যাবে।' শিমুল আর কোনও কথা বলল না। সিংভি সাহেব দাঁড়িয়ে পড়ে বললেন, 'তুমি এগোও। আমি আসছি।'
শিমুল বারান্দাতে ফিরে প্রথমে তাকাল গণপতিবাবুর ঘরের দিকে। ঘরের দরজা আগের মতোই বন্ধ। শিমুল বেঁচে গেছে। সম্ভবত তিনি এখনও ওঠেননি। শিমুল বারান্দা থেকে কম্পাউন্ডের প্রবেশপথের দিকে তাকাল। সেই অ্যাম্বাসাডরটার পাশে স্করপিওটাও দাঁড়িয়ে আছে। গাড়ির ড্রাইভার দু'জন স্করপিওর বনেটের সামনে দাঁড়িয়ে কী যেন কথাবার্তা বলছে।
বেলা পাঁচটা নাগাদ পাশের ঘরে দরজা খোলার শব্দ পেল শিমুল। আর তারপরই শোনা গেল গণপতিবাবুর গলা—'শিমুল! শিমুল—!'
খাট থেকে নেমে সঙ্গে সঙ্গে শিমুল বাইরে বেরিয়ে এল। নিজের ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন গণপতিবাবু। পরনে চেক কাটা লুঙ্গি আর সাদা স্যান্ডো গেঞ্জি। পায়ে স্লিপার। তাঁর ফোলা ফোলা চোখমুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে এই মাত্র ঘুম ভেঙেছে।
শিমুলের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, 'বিকাল তো গড়িয়ে যাচ্ছে। এতক্ষণ ভোঁস ভোঁস করে ঘুমোচ্ছিলে নাকি? পাঁচটা বেজে গেল, এখনও চা দিয়ে গেল না। একটু নড়েচড়ে দেখো; ওই বুড়ো চাপরাশিটা কোথায়? যত্ত সব!'
শিমুল বলল, 'দেখছি স্যার।'
গণপতিবাবু বাগানের দিকে তাকিয়ে স্করপিওটা দেখে বললেন, 'মিস্টার সিংভিও তো ফিরে এসেছে মনে হয়। কে জানে পাকড়াশির কাছে খবরটা পৌঁছল কিনা?'—এই বলে তিনি যখন আবার ঘরের ভিতর ঢুকতে যাচ্ছেন আর শিমুল চায়ের খোঁজে এগোতে যাচ্ছে, ঠিক তখনই দেখতে পেল, বারান্দার অপর প্রান্ত থেকে চায়ের ট্রে হাতে ইসমাইল আসছে। তাকে দেখে শিমুল গণপতিবাবুকে বলল, 'স্যার, চা এসে গেছে।'
শিমুলের দৃষ্টি অনুসরণ করে ইসমাইলের দিকে তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে একবার তাকিয়ে তিনি শিমুলকে বললেন, 'চা-টা ওকে বারান্দাতেই রাখতে বলো। আমি বাথরুম থেকে আসছি।' গণপতিবাবু ঘরে ঢুকে গেলেন।
মিনিট তিনেক বাদে গণপতিবাবু গায়ে একটা শার্ট চাপিয়ে যখন বাইরে এলেন, তখন বারান্দায় টেবিলের ওপর ট্রে নামিয়ে ইসমাইল দাঁড়িয়ে আছে। তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে শিমুল। শার্টের বোতাম আটকাতে আটকাতে গণপতিবাবু এসে বসলেন টেবিলের চারপাশে সাজিয়ে রাখা বেতের চেয়ারগুলোর একটাতে। ইসমাইল পট থেকে যখন তাঁর কাপে চা ঢালছে তখন তিনি তার উদ্দেশ্যে বললেন, 'তোমার মালিক ফিরেছেন মনে হচ্ছে।'
ইসমাইল লোকটা সম্ভবত স্বল্পভাষী। চা ঢালতে ঢালতে মাথা নেড়ে সে শুধু বুঝিয়ে দিল হ্যাঁ।
গণপতিবাবু প্রশ্ন করলেন, 'তা তিনি কোথায়?'
ইসমাইলের আর তাঁর কথার জবাব দেওয়ার দরকার হল না। তার আগেই শিমুলদের পিছন দিক থেকে সিংভি সাহেবের কণ্ঠস্বর শোনা গেল—'গুড ইভনিং মিস্টার হাজরা।' সিংভি সাহেব শিমুলদের কাছে এসে একটা চেয়ার টেনে নিয়ে গণপতিবাবুর মুখোমুখি বসতে বসতে বললেন, 'কালকের ব্যাপারে যে কাজগুলো বাকি ছিল সে সব সেরে একটু আগেই ফিরলাম। তা আপনার কোনও অসুবিধা হচ্ছে না তো?'
চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে গম্ভীরভাবে বললেন, 'না, তেমন কিছু নয়। তবে বিকেলের চা আমি সাড়ে চারটেতে খাই। একদম বাঁধা অভ্যাস।'
সিংভি সাহেব তাঁর কথা শুনে হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন, 'সরি। ব্যাপারটা আমার জানা ছিল না।'
সিংভি সাহেবকে গণপতিবাবু বললেন, 'আরও দুটো দিন তো আছি। ব্যাপারটা আপনার লোককে বলে দেবেন।'
সিংভি সাহেব ইসমাইলের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'ইয়ে বাত খেয়াল রাখনা।' ঘাড় নাড়ল ইসমাইল।
শিমুল একটা চেয়ার টেনে নিয়ে তাদের থেকে একটু দূরে বসল চা নিয়ে। ইসমাইল ধীরে ধীরে চলে যাওয়ার পর সিংভি সাহেব গণপতিবাবুকে বললেন, 'আপনার বেঙ্গলি ক্লাবের মিস্টার পাকড়াশিবাবুকে টেলিফোন করে দিয়েছি। আমি বলেছি, আপনি লক্ষ্নৌ পৌঁছে গেছেন। আগামীকাল ঠিক সময় ওদের ওখানে সংবর্ধনা নিতে পৌঁছে যাবেন।'
পাকড়াশি খবর পেয়েছে শুনে গণপতিবাবু বললেন, 'থ্যাঙ্ক য়ু। তা পাকড়াশি কি আর কোনও কথা বলল?'
সিংভি সাহেব জবাব দিলেন, 'ও আপনাকে জানিয়ে দিতে বলেছে যে সংবর্ধনার সব আয়োজন কমপ্লিট। কাল সন্ধ্যায় আপনার সংবর্ধনা সভাতে লক্ষ্নৌর খ্যাতনামা বাঙালিদের মধ্যে অনেকেই নাকি উপস্থিত থাকবেন শুনলাম। তবে আপনি কোথায় উঠেছেন তা-ও জানতে চেয়েছিল। আমি বলিনি।'
চায়ের সঙ্গে বিস্কুটও টেবিলে রেখে গিয়েছিল ইসমাইল। প্লেট থেকে একটা বিস্কুট তুলে নিয়ে গণপতিবাবু সিংভি সাহেবকে প্রশ্ন করলেন, 'কাল শুটিংয়ের ব্যাপারটা শেষ হতে আপনার কত সময় লাগবে?'
সিংভি সাহেব জবাব দিলেন, 'ঘণ্টা তিনেকের ভিতরই সব হয়ে যাবে। একজন অ্যাকট্রেসও কিন্তু আপনার সঙ্গে কাজ করবেন। তিনি কাল সকালে আসবেন।' এই বলে সিংভি সাহেব একটু থামলেন।
অ্যাকট্রেসের কথা শুনে গণপতিবাবু বললেন, 'তিনি কে? তাঁর কথা আগে বলেননি তো? মুম্বইয়ের কেউ নাকি?'
সিংভি সাহেব আবার হেসে বললেন, 'তিনি কে তা এখন বলব না। এই সারপ্রাইজটা কাল পর্যন্ত তোলা থাক।' এই বলে একটু থেমে তিনি বললেন, 'কাল কিন্তু আপনাকে গ্লাভস পরে ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতে হবে। ডিরেক্টরের কথামতো আপনার জন্য বক্সিং গ্লাভস কিনে রেখেছি আমি। শর্টস আর গেঞ্জিও কিনেছি।'
গণপতিবাবু প্রশ্ন করলেন, 'গ্লাভসের রং কী?'
অর্জুন সিংভি জবাব দিলেন, 'লাল। ডিরেক্টর বলেছেন ওই রঙটাই বেশি ফটোজনিক হবে। তাই আমি পুরো সেটটাই লাল রঙের কিনেছি।'
বিস্কুটে একটা কামড় বসাতে গিয়েও সেটা মুখ থেকে সরিয়ে নিয়ে সোজা হয়ে বসলেন গণপতি হাজরা। সিংভি সাহেবের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, 'সেটটা আপনাকে পালটে আনতে হবে। আমার পছন্দ হল 'ব্লু কর্ণার'। আমি যেবার খেতাব পেলাম সেবার আমি ছিলাম 'ব্লু কর্নার'-এ। আর প্রতিপক্ষ ছিল 'রেড কর্নারে'। 'ব্লু' রঙ হল আভিজাত্যের প্রতীক। কথায় আছে না—'ব্লু ব্লাড'। এ ব্যাপারে কোনও আপস কিন্তু আমি করতে পারব না। তার জন্য যদি আপনার শুটিং...।'
গণপতিবাবুর কথা শুনে তার দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইলেন অর্জুন সিংভি। গণপতিবাবুর অসমাপ্ত বাক্যটা বুঝতে অসুবিধা হল না তাঁর।
সিংভি সাহেব বললেন, 'ঠিক আছে তাই হবে। আপনার জন্য নীল গ্লাভস আর কস্টিউমের ব্যবস্থা করছি আমি। কিন্তু আমাকে তাহলে এবার উঠতে হবে। কাল সকালে সময় পাওয়া যাবে না। জিনিসটা তাই আজই জোগাড় করতে হবে।'
এরপর গণপতিবাবুর সঙ্গে কয়েকটা মামুলি কথা বলে চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লেন সিংভি সাহেব। যাবার আগে তিনি বলে গেলেন, রাতে আর আসবেন না। সকালে আবার তার সঙ্গে দেখা হবে। সকাল সাতটার মধ্যেই তিনি চলে আসবেন। আটটা-সাড়ে আটটা নাগাদ শুটিংয়ের কাজ শুরু হবে।
সিংভি সাহেবের গাড়ি বাড়ির কম্পাউন্ড ছেড়ে যাওয়ার পর গণপতিবাবু চেয়ার থেকে উঠে পড়লেন। শিমুলও উঠে দাঁড়াল। তিনি শিমুলকে বললেন, 'আমি ঘরে যাচ্ছি। তুমি এই বারান্দা আর তোমার ঘর ছেড়ে কোথাও যাবে না। এ বাড়িতে একজন বুড়ো চাপরাশি ছাড়া তো আর অন্য কাউকে চোখে পড়ল না। তাকে ডাকলে পাওয়া যাবে কি না কে জানে? কাজেই যখন তখন তোমাকে আমার দরকার হতে পারে।'
শিমুল জবাব দিল, 'আচ্ছা, স্যার।' নিজের ঘরে গিয়ে এরপর দরজা দিলেন গণপতিবাবু।'
সন্ধে পর্যন্ত বারান্দাতে বসেই শিমুল কাটিয়ে দিল। অন্ধকার নামার সঙ্গে সঙ্গেই বেশ শীত শীত করতে লাগল শিমুলের। কলকাতায় এখনও ঠান্ডা না পড়লেও এদিকে বেশ ঠান্ডা পড়তে শুরু করেছে। বিশুদার জ্যাকেটটা মনে হয় কাজে দেবে। শিমুল ঘরে ঢুকে বাতি জ্বালাল। কিন্তু এখন সে কী করবে? এখন ঘুমোবার অভ্যাস তো তার নেই। হঠাৎ তার খেয়াল হল সঙ্গে করে সে একটা বই এনেছে। 'শারদীয়া খেলা' বইটা আসলে বিশুদার ছেলের। ক'দিন আগে বইটা সে বাড়ি এনেছিল। সময় কাটাতে কাজে লাগবে বলে, আর বইটাতে খেলা সংক্রান্ত নানা খবর আছে বলে সে সেটা সঙ্গে এনেছে। ব্যাগ থেকে বই বার করে বিছানাতে শুয়ে সে কিছুক্ষণের মধ্যেই বইয়ে ডুবে গেল। রাত নটা নাগাদ দরজাতে টোকা দেওয়ার শব্দে বই রেখে বিছানা ছেড়ে উঠে দরজা খুলে সে দেখল, ইসমাইল খাবার নিয়ে এসেছে। টেবিলে খাবার রেখে দুপুরের মতোই নিঃশব্দে ঘর থেকে ইসমাইল বেরিয়ে গেল। খাওয়া সেরে বাথরুমে মুখ হাত ধুয়ে শিমুল যখন আবার বিছানাতে এসে বসল, তখন সাড়ে নটা বাজে। শিমুল গণপতিবাবুর আর কোনও সাড়াশব্দ পায়নি। মনে হয় আর তিনি তাঁর ঘরের বাইরে আসেননি। একবার খোঁজ নেব নাকি?—মনে মনে ভাবল সে। ঠিক তখনই বারান্দা থেকে গণপতিবাবুর ডাক ভেসে এল, 'শিমুল, শিমুল—।'
শিমুল ঘর থেকে সঙ্গে সঙ্গে সাড়া দিল, 'আসছি স্যার।'
তাড়াতাড়ি চটিতে পা গলিয়ে ঘরের বাইরে আসতেই গণপতিবাবু বললেন, 'সন্ধে থেকে ঘরের দরজা বন্ধ করে বসে না থেকে আমার কোনও অসুবিধা হচ্ছে কি না, তা একবার খোঁজ নিলেও তো পারতে?'
শিমুল বলল, 'আপনার দরজা বন্ধ দেখে ভেবেছি, আপনি যদি ডাকলে বিরক্ত হন।'
তিনি বললেন, 'থাক আর ছেঁদো অজুহাত খাড়া করতে হবে না। আমার টিউবলাইটটা দপ-দপ করছে। দেখো ঘুরিয়ে-টুরিয়ে ঠিক করতে পারো কি না।'
শিমুল জবাব দিল, 'আচ্ছা স্যার। দেখছি।'
গণপতিবাবুর সঙ্গে তার ঘরে ঢুকল শিমুল। খাটের একপাশে দেওয়ালের মাথার দিকে টিউবটা লাগানো। সেটা জ্বলছে-নিভছে। গণপতিবাবুর অনুমতি নিয়ে টেবিল থেকে তাঁর এঁটো বাসন নামিয়ে টেবিলটাকে শিমুল দেওয়ালের কাছে নিয়ে গেল। তারপর টেবিলে উঠে দাঁড়িয়ে টিউবটাকে হাত দিয়ে কয়েকবার ঘোরাতেই সেটা ঠিক হয়ে গেল। মনে হয় লাইটের ফিটিংস কোনও কারণে লুজ ছিল বলে ওরকম হচ্ছিল। শিমুল টেবল থেকে নেমে এরপর যখন সেটাকে আগের জায়গাতে রাখতে যাচ্ছে, ঠিক তখনই হঠাৎ গণপতিবাবুর খাটের ওপর নজর যেতেই দাঁড়িয়ে পড়ল সে। গণপতিবাবুর বালিশের পাশে রাখা আছে একটা রিভলবার!! গণপতিবাবু বাচ্চা ছেলে নন যে তিনি খেলনা রিভলবার নিয়ে ঘুরবেন। তাই ওটা যে আসল তা বুঝতে অসুবিধা হল না শিমুলের। সে তাকাল গণপতিবাবুর দিকে। জিনিসটাকে শিমুলের চোখে পড়েছে তিনি তা বুঝতে পারলেন। শিমুলের মনে হল, কয়েক মুহূর্তের জন্য যেন একটা অপ্রস্তুত ভাব ফুটে উঠল গণপতিবাবুর চোখে মুখে। তারপরই তিনি রিভলবারটা হাতে নিয়ে বললেন, 'ওটা দেখে আমার দিকে তাকাবার কিছু নেই। এটার লাইসেন্স আছে। দিনকাল ভালো নয়, তাই এটা সঙ্গে এনেছি। টেবিলটা ঠিক জায়গাতে রেখে তাড়াতাড়ি বাইরে যাও। আমি এখনই শুয়ে পড়ব।'
শিমুল তার কথামতো কাজ সেরে ঘর থেকে বেরিয়ে নিজের ঘরে ঢুকল। গণপতিবাবু দরজা বন্ধ করে দিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যে শিমুলও দরজা বন্ধ করে বাতি নিভিয়ে শুয়ে পড়ল।
সকাল সাড়ে ছ'টা নাগাদ ঘুম ভেঙে গেল শিমুলের। ঘড়ির দিকে তাকিয়েই সে ধড়মড় করে উঠে বসল। কে জানে গণপতিবাবুর ঘুম ভেঙে গেছে কিনা? তিনি শিমুলকে হাঁকডাক করেছেন কিনা! তা হলে সাত সকালেই কপালে দুঃখ লেখা আছে। বাড়ির পিছন দিক থেকে বেশ কিছু শব্দ ভেসে আসছে। লোকজনের চিৎকার চেঁচামেচির অস্পষ্ট আওয়াজও যেন কানে আসছে। খাট থেকে নেমে তাড়াতাড়ি দরজা খুলে বারান্দায় এসে দাঁড়াল শিমুল। প্রথমেই সে তাকাল গণপতিবাবুর ঘরের দিকে। দরজা ভিতর থেকে বন্ধ। তাহলে মনে হয় তিনি এখনও ঘুমচ্ছেন। একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল সে। এরপর দেখল বাগানের দিকে। প্রবেশপথের লোহার গেটটা হাট করে খোলা। গোটা পাঁচেক ছোট বড় গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে বাগানের ভিতর। আর বেশ কয়েকজন নতুন লোককেও সে দেখল বাগানের মধ্যে দাঁড়িয়ে কথাবার্তা বলতে। বাড়ির পেছন থেকে আরও নানারকম অস্পষ্ট শব্দ শোনা যাচ্ছে এখন। তার মানে শুটিংয়ের লোকজন সব চলে আসতে শুরু করেছে। আর সিংভি সাহেবের গাড়িটাও দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ তিনিও চলে এসেছেন। তার মনে পড়ল, গতকাল সিংভি সাহেব গণপতিবাবুকে বলছিলেন যে একজন অ্যাকট্রেসেরও আজ এখানে আসার কথা। তিনি কখন আসবেন? নাকি তিনি এসে গেছেন? শিমুল কোনও দিন সিনেমার অ্যাক্টর-অ্যাকস্ট্রেসকে সামনে থেকে দেখেনি। তাঁর সঙ্গে একটা ছবি তোলার সুযোগ হলে পুঁটিকে চমকে দেওয়া যেত। তবে তাঁকে এই সুযোগে শিমুলের দেখা হয়ে যাবে। এরপর সে আর সময় নষ্ট করল না। ঘরে ঢুকে বাথরুমে ফ্রেস হয়ে, দ্রুত পোশাক পাল্টে নিল। তারপর একদম রেডি হয়ে আবার বারান্দায় এসে দাঁড়াল।
ওর বারান্দায় দাঁড়ানোর মিনিট দুইয়ের মধ্যেই গণপতিবাবুর ঘরের দরজা খুলে গেল। তিনি বাইরে এসে দাঁড়ালেন। তাঁর হাতে ধরা দাঁত মাজার ব্রাশ।
শিমুল বলল, 'গুড মর্নিং স্যার।'
গণপতিবাবু ঘাড়টা একটু নাড়লেন। ব্রাশ মুখে দিয়ে বাগানের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'সিংভি তো এসে পড়েছে মনে হয়। কাকভোর থেকেই বাড়ির পিছনে দুমদাম শব্দ হচ্ছে। ভালো করে ঘুমই হল না। তুমি এখানে দাঁড়িয়ে থাক, আমি ঘরে যাচ্ছি। আমার আরও আধঘণ্টা সময় লাগবে। সিংভি খুঁজতে এলে কথাটা ওকে বল। আর 'চা' এলে ঘরে পাঠিয়ে দিও।'
শিমুল বলল, 'ঠিক আছে স্যার।'
ব্রাশ করতে করতে ঘরে ঢুকে গেলেন গণপতিবাবু।
একটু পরেই ইসমাইল চা আর ব্রেকফাস্ট নিয়ে উপস্থিত হল।
গণপতিবাবুর ঘরে চা-ব্রেকফাস্ট পৌঁছে দেওয়ার পর তার থেকে শিমুল নিজেরটা নিয়ে বারান্দায় রাখা চেয়ারে বসে খেতে শুরু করল। তার খাওয়া শেষ হওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বাড়ির পিছন থেকে এসে বারান্দাতে উঠলেন সিংভি সাহেব সঙ্গে একজন ভদ্রলোক। তাদের দেখে শিমুল চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। সিংভি সাহেব এগিয়ে এসে শিমুলের সামনে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে বললেন, 'গুডমর্নিং। তোমার স্যার উঠেছেন?'
শিমুল তাঁকে গুডমর্নিং জানিয়ে জবাব দিল, 'হ্যাঁ, উঠেছেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই উনি রেডি হয়ে যাবেন।'
সিংভি সাহেব এরপর তাঁর সঙ্গের ভদ্রলোককে দেখিয়ে বললেন, 'ইনি হলেন আমাদের অ্যাড ফিল্মের ডিরেক্টর, মিস্টার হমুন্ত রাও।'
ডিরেক্টর সাহেবের উচ্চতা মাঝারি, গড়ন রোগাটে। এক মুখ খোঁচা খোঁচা দাড়ি। কালো প্যান্ট সাদা জামার ওপর অনেকগুলো পকেটওয়ালা নীল রঙের একটা জ্যাকেট পরেছেন ভদ্রলোক। গলা থেকে সরু ফিতে বাঁধা পেন ঝুলছে। হাতে রয়েছে ক্লিপবোর্ডে আটকানো একতাড়া কাগজ। ভদ্রলোক শিমুলের দিকে তাকিয়ে হাসলেন। তারপর সিংভি সাহেব আর তিনি গিয়ে বসলেন একটু দূরে টেবিলের পাশে রাখা চেয়ারে। আর দশ মিনিটের মধ্যেই তৈরি হয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন গণপতিবাবু। শিমুল দেখল, তার হাতে ধরা আছে মেডেলের বাক্সটা। তাঁকে দেখতে পেয়ে সিংভি সাহেব চেয়ার ছেড়ে উঠে গণপতিবাবুর দিকে এগিয়ে এলেন। ডিরেক্টর সাহেবও তার সঙ্গে এসে গণপতিবাবুর সামনে দাঁড়ালেন। সিংভি সাহেব গণপতিবাবুকে গুডমর্নিং জানিয়ে তাঁর কোনও অসুবিধা হয়েছে কিনা জেনে নিয়ে ডিরেক্টর সাহেবের সঙ্গে তাঁর পরিচয় করিয়ে দিলেন। হনুমন্ত রাওয়ের সঙ্গে গণপতিবাবুর করকর্মন পর্ব শেষ হলে সিংভি সাহেব গণপতিবাবুকে বললেন, 'মিঃ রাও কিন্তু একদম রেডি। উনি আপনার জন্যই অপেক্ষা করছেন।'
গণপতিবাবু বললেন, 'আমিও রেডি। তা আপনাদের অ্যাকট্রেসও এসে গেছেন নাকি?'
সিংভি সাহেব বললেন, 'হ্যাঁ, এসে গেছেন। ভিড় রাস্তায় ওঁকে আনার সমস্যা। জ্যাম হয়ে যেতে পারে। তাই ভোর পাঁচটাতেই উনি এখানে চলে এসেছেন।'
তাঁর কথা শুনে গণপতিবাবু বললেন, 'ও বুঝেছি বড় অ্যাকট্রেস। আমাদের মতো সেলিব্রিটিদের এ সব সমস্যা হয়েই থাকে। তবে আমাদের দেশে ক্রিকেটার আর ফিল্ম লাইনের লোকদের ক্ষেত্রে এ সমস্যা একটু বেশি। তা উনি কোথায়?'
সিংভি সাহেব বললেন, 'উনি শুটিং স্পট মানে বাড়ির পিছন দিকে আছেন। চলুন এবার তাহলে ওখানে যাওয়া যাক।'
'হ্যাঁ, চলুন।' বলে পা বাড়াতে গিয়েও এরপর হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে গণপতিবাবু তাঁর হাতের বাক্সটা সিংভি সাহেবকে দেখিয়ে জিগ্যেস করলেন, 'এটা কি এখনই সঙ্গে নিয়ে যেতে হবে?'
সিংভি সাহেব বললেন, 'কী ওটা?'
গণপতিবাবু গম্ভীরভাবে জবাব দিলেন, 'ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নের সোনার মেডেল।'
সিংভি সাহেব সঙ্গে সঙ্গে বললেন, 'হ্যাঁ হ্যাঁ, ওটা তো লাগবেই। ওটা হল শুটিংয়ের একটা ইম্পর্ট্যান্ট থিংস। কি তাই তো মিঃ রাও?' এই বলে তিনি তাকালেন ডিরেক্টর সাহেবের দিকে।
ডিরেক্টর সাহেব বাংলা জানেন কিনা শিমুলের জানা নেই, তবে সিংভি সাহেবের কথা শুনে তিনি ঘাড় বেঁকিয়ে বললেন, 'ও, ইয়েস, ইয়েস।' সিংভি সাহেব এরপর গণপতিবাবুকে বললেন, 'চলুন, তা হলে আমরা স্পটের দিকে যাই। ওখানে যাওয়ার পর আপনাকে কী করতে হবে ডিরেক্টর সাহেব সব বুঝিয়ে দেবেন।'
গণপতিবাবু বললেন, 'হ্যাঁ চলুন।'
গণপতিবাবু, সিংভি সাহেব আর ডিরেক্টর সাহেবের পিছন পিছন শিমুলও গিয়ে উপস্থিত হল বাড়ির পিছন দিকে শুটিং স্পটে। ক্যামেরা, ট্রলিং ক্রেন, রিফ্লেক্টর ইত্যাদি নানা জিনিস বসানো হয়েছে সেখানে। জনা দশেক লোক সে সব জিনিস নিয়ে কাজে ব্যস্ত। একপাশে দুটো বড় রঙিন ছাতার নীচে বেশ কয়েকটা চেয়ার পাতা ছিল। শিমুলরা সেখানে গিয়ে বসল। বসার পর গণপতিবাবু একবার চারপাশে দেখে নিয়ে বললেন, 'কই, আপনাদের অ্যকট্রেস ভদ্রমহিলা কোথায়? তিনি তো এখানে নেই।'
তাঁর কথা শুনে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন সিংভি সাহেব। তারপর কিছুদূরে আঙুল দেখিয়ে বললেন, 'ওই যে আপনার অ্যাকট্রেস। ওর সঙ্গেই আপনার শুটিং করতে হবে।'
সিংভি সাহেব যে দিকে আঙুল তুলে দেখালেন সেদিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেল শিমুল। ওই দিকটা সে খেয়াল করেনি। সেখানে প্রাচীরের গা ঘেঁষে একটা বড় গাছের নীচে দাঁড়িয়ে কান নাড়াচ্ছে একটা মাঝারি সাইজের হাতি। গণপতিবাবুও দেখতে পেলেন তাঁকে। সিংভি সাহেব এবার বেশ শব্দ করে হেসে উঠলেন। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে শিমুলও প্রায় হেসে ফেলতে যাচ্ছিল। কিন্তু গণপতিবাবু এমন কটমট করে শিমুলের দিকে তাকালেন যে তার আর হাসবার সাহস হল না। গণপতিবাবু গম্ভীর স্বরে এরপর সিংভি সাহেবকে বললেন, 'আমি কিন্তু ব্যাপারটা এখনও ঠিক বুঝতে পারলাম না!'
সিংভি সাহেব হাসি থামিয়ে বললেন, 'ক্ষমা করবেন। ওই হাতিটাকে অ্যাকট্রেস বলে আমি আপনার সঙ্গে একটু জোক করলাম। ওই হাতিটার সঙ্গে সত্যিই কিন্তু আপনার শুটিং হবে। ওর নাম আয়েষা। ওকে আমাদের এখানের ''প্রিন্স অব ওয়েলস জুলজিকাল গার্ডেন'' অর্থাৎ ''লক্ষ্নৌ চিড়িয়াখানা'' থেকে আনা হয়েছে। প্রাণীটা খুব ট্রেইন্ড। ওর সঙ্গে আপনাকে কী করতে হবে তা ডিরেক্টর সাহেব এখন আপনাকে বলবেন।'
তাঁর কথা শুনে গণপতিবাবু 'হুম' বলে শব্দ করে ডিরেক্টর সাহেবের দিকে তাকালেন।
ডিরেক্টর সাহেব এরপর বেশ কিছুক্ষণ ধরে হিন্দি, ইংরেজি মিশিয়ে গণপতিবাবুকে যা বোঝালেন তা হল, 'ছবিতে দেখা যাবে যে একটা পাগলা হাতি তেড়ে এল গণপতিবাবুর দিকে। তিনি ঘুষি ছুঁড়লেন তার দিকে এবং সেই ঘুষি খেয়ে পড়ে গেল হাতিটা। গণপতিবাবু এরপর তাঁর ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নের মেডেলটা গলায় ঝুলিয়ে হাতির গায়ে পা তুলে বলবেন, 'আমার শক্তির উৎস, ''সিংভি ফুড প্রোডাক্টস''-এর চ্যবনপ্রাশ। এই চ্যাবনপ্রাশ খাও আর চ্যাম্পিয়ন হও।'—বাংলা, হিন্দি, ইংরেজি—তিন ভাষাতেই তিনি কথাগুলো বলবেন। গণপতিবাবুকে অবশ্য সত্যি হাতির গায়ে ঘুষি মারতে হবে না। তার কাছাকাছি গিয়ে তিনি শুধু বাতাসে ঘুষি ছুঁড়বেন। ক্যামেরাতে সেটা এমনভাবে দেখানো হবে যে, দর্শকদের মনে হবে যেন, সত্যিই তার ঘুষিতেই পড়ে গেল অত বড় প্রাণীটা। আজকের শুটিংয়ের ব্যাপারটা এ পর্যন্তই। অ্যাড ফিল্মে অবশ্য বক্সিং রিংয়ে একটা ফাইটিংয়ের দৃশ্য থাকছে। তার শুটিং হবে অন্য দিন, অন্য জায়গাতে।
ডিরেক্টর সাহেবের মুখ থেকে ব্যাপারটা প্রাথমিকভাবে শোনার পর গণপতিবাবু গম্ভীরভাবে তাকে জিগ্যেস করলেন, 'প্রাণীটার সঙ্গে শুটিংয়ের ব্যাপারে কোনও রিক্স নেই। আয়েষা অত্যন্ত টেইন্ড হাতি। শুটিং চলার সময় মাহুত তার পাশেই থাকবে। তবে বলাই বাহুল্য যে ছবিতে সে ধরা পড়বে না।'
গণপতিবাবু শুটিংয়ের সময় তাঁর নিরাপত্তার ব্যাপারে ডিরেক্টর সাহেবের কাছ থেকে আশ্বাস পেয়ে বললেন, 'ঠিক আছে আমি রেডি। আপনি কাজ শুরু করতে পারেন।'
ডিরেক্টর সাহেব বললেন, 'তার আগে আপনাকে কস্টিউম চেঞ্জ করতে হবে। বক্সারের পোশাক-গ্লাভস সব পরতে হবে।'
সিংভি সাহেব এতক্ষণ চুপ করেছিলেন, তিনি এবার বললেন, 'আপনার কস্টিউম রেডি আছে। আর আপনার কথামতো আমি পুরো সেটটাই নীল রঙের এনেছি।' এই বলে কাছেই দাঁড়িয়ে থাকা একটা লোককে ইশারা করতেই সে একটা বিরাট প্যাকেট এনে সিংভি সাহেবের হাতে ধরিয়ে দিল।
প্যাকেটটা তিনি গণপতিবাবুর হাতে দিতেই তিনি সেটা শিমুলের হাতে তুলে দিয়ে ডিরেক্টর সাহেবকে বললেন, 'ঠিক আছে, আমি ঘরে গিয়ে চেঞ্জ করে আসছি।' এই বলে তিনি চেয়ার ছেড়ে উঠে শিমুলকে নিয়ে তাঁর ঘরের দিকে চললেন।
মিনিট পাঁচেক সময় লাগল গণপতিবাবুর পোশাক পাল্টাতে। তিনি যখন ঘর থেকে বাইরে এসে দাঁড়ালেন তখন তাকে দেখে শিমুলের মনে হল সত্যি সত্যি তিনি যেন রিংয়ে নামবেন। তাঁর পরনে নীল গেঞ্জি, নীল শর্টস, হাতে নীল গ্লাভস। কেবল জুতোর রঙটাই সাদা। তাঁর এক হাতে ধরা ছিল মেডেলের বাক্স। সেটা তিনি শিমুলের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, 'খুব সাবধানে তোমার কাছে রাখবে এটা। কারও হাতে দেবে না। এমনকি সিংভি সাহেব চাইলেও নয়। আর শুটিংয়ের সময় অন্য কোথাও যাবে না। সব সময় কাছাকাছি থাকবে।' শিমুল বলল, 'আচ্ছা স্যার।'
শিমুলরা যখন আবার শুটিং স্পটে ফিরে এল ততক্ষণে হাতিটাকে কাছাকাছি নিয়ে আসা হয়েছে। হাতিটা চারপাশে তাকিয়ে কান নাড়াচ্ছে। মাহুত তার সামনে দাঁড়িয়ে শুঁড়ে হাত বোলাচ্ছে। প্রাণীটার কলেবর বিরাট হলেও তাকে বেশ শান্তশিষ্ট বলেই মনে হল শিমুলের। হাতিটাকে নিয়ে তার মাহুত এরপর এগোল বাগানের মাঝখানে ফাঁকা জায়গার দিকে। তাদের পেছনে গণপতিবাবুকে নিয়ে মিস্টার রাও এগোলেন। আর সিংভি সাহেবের সঙ্গে শিমুল বসল ছাতার নীচে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই শুটিং শুরু হল। দুজন ক্যামেরাম্যানের একজন বসেছেন বেশ উঁচুতে একটা ক্রেনের মাথায়। অন্যজন অন্যদিকে একটা ট্রলিতে। গণপতিবাবুকে কোথায় কীভাবে দাঁড়াতে হবে সব দেখিয়েছেন ডিরেক্টর সাহেব। কখন কীভাবে তিনি ঘুষি ছুঁড়বেন তা-ও তিনি বলে দিলেন। গণপতিবাবু হাতিটার দিকে মুখ করে দাঁড়ানোর পর মাহুত তার হাতিকে নিয়ে বেশ কিছুটা পিছিয়ে দাঁড়াল। মিস্টার রাও হাতে একটা টিনের চোঙ নিয়ে ট্রলিতে রাখা ক্যামেরার পেছনে এসে দাঁড়ালেন। সব একদম রেডি হওয়ার পর একজন লোক ক্যামেরার সামনে এসে ক্ল্যাপস্টিক বাজিয়ে বলল, 'শট ওয়ান, টেক ওয়ান—'। লোকটা বেশ দ্রুত কথাগুলো বলেই চট করে সরে গেল ক্যামেরার সামনে থেকে। আর তারপরই ডিরেক্টর সাহেব চোঙটা মুখের কাছে ধরে চিৎকার করে বললেন, 'সাইলেন্স...ক্যামেরা... অ্যাকশন...।'
ওমনি মাহুতের ইঙ্গিতে হাতিটা আর তার পাশে পাশে মাহুত ছুটতে শুরু করল গণপতিবাবুর দিকে। গণপতিবাবুর হাত পনেরো দূরত্বে পৌঁছে মাহুতটা যেন কী একটা বলল হাতিটাকে। সঙ্গে সঙ্গে হাতিটা মড়ার মতো মাটিতে শুয়ে পড়ল, পরমুহূর্তেই ডিরেক্টর সাহেবের চিৎকার শোনা গেল, 'কাট! কাট!'
গণপতিবাবু ফিরে তাকালেন মিস্টার রাওয়ের দিকে। ব্যাপারটা কী? আসলে গণপতিবাবু, মাটিতে হাতিটা পড়ার সময় ঘুষি ছুঁড়তেই ভুলে গেছেন। মিস্টার রাও এগিয়ে এসে গণপতিবাবুকে ব্যাপারটা ধরিয়ে দিতেই গণপতিবাবু একটু অপ্রস্তুতভাবে বললেন, 'আই অ্যাম সরি। আসল ব্যাপারটাই খেয়াল ছিল না।'
ডিরেক্টর সাহেব হেসে বললেন, 'আপনি টেনশন করবেন না। বড় বড় অভিনেতাদেরও অনেক সময় এই ভুল হয়। আমরা প্রথম থেকে আবার শুরু করব।'
মাহুত ডিরেক্টর সাহেবের ইঙ্গিতে তার হাতিটাকে উঠিয়ে আবার ফিরে গেল আগের জায়গাতে। ডিরেক্টর সাহেব গিয়ে দাঁড়ালেন ক্যামেরার পেছনে।
শিমুল ভেবেছিল দ্বিতীয়বার নিশ্চয়ই সব ঠিকঠাক হয়ে যাবে। কিন্তু তা হল না। পর পর পাঁচবার শট ওকে হল না। কোনওবার হাতিটা ঠিকমতো দৌড়তে পারল না, কোনওবার আবার গণপতিবাবুর ঘুষি ছোঁড়ার সঙ্গে হাতির পড়ে যাওয়ার টাইমিংস ঠিক হল না। তাই বাতিল হল শট। অবশেষে ষষ্ঠবারের চেষ্টায় যখন সব কিছু ঠিকমতো হল ততক্ষণে এক ঘণ্টারও বেশি সময় কেটে গেছে।
মাঠের থেকে ফিরে এসে ছাতার তলায় বসলেন গণপতিবাবু। তারপর তোয়ালে দিয়ে ঘাম মুছতে মুছতে সিংভি সাহেবকে বললেন, 'শুটিংয়ের যে এত ঝক্কি তা জানা ছিল না!'
সিংভি সাহেব জবাব দিলেন, 'সত্যিই ব্যাপারটা খুব কষ্টকর। আর মিস্টার রাও তাঁর কাজের ব্যাপারে খুব খুঁতখুঁতে। অন্য কেউ হলে ম্যাক্সিমাম তিনটে শট নিতেন, আর ছোটখাটো ত্রুটি থাকলে সেটা কম্পিউটারে ম্যানেজ করে নিতেন।'
গণপতিবাবু বললেন, 'আবার তো আমাকে উঠতে হবে!'
মিস্টার রাও বললেন, 'মিনিট পনেরো পর হাতির গায়ে পা রাখার সিনটা টেক করবেন। এর জন্য আবার কত সময় লাগবে কে জানে!'
একজন লোক এসে বেশ কয়েকটা কোল্ড ড্রিঙ্কসের বোতল এনে দাঁড়াল শিমুলদের সামনে। গণপতিবাবু গ্লাভস খুলে একটা বোতল নিয়ে স্ট্রতে ঠোঁট ছোঁয়ালেন।
বোতলটা খালি করার পর তিনি তাঁর পেছনে চেয়ারে বসা শিমুলকে বললেন, 'আমার মেডেলটা দাও। ওটা আবার এখন গলায় ঝোলাতে হবে।' শিমুল বাক্সটা এগিয়ে দিল তার দিকে।
বাক্সটা নিয়ে তার ভেতর থেকে মেডেল বার করে বাক্সটা আবার তিনি ফিরিয়ে দিলেন শিমুলের হাতে। সূর্যের আলোতে ঝলমল করে উঠল গণপতিবাবুর হাতের তালুতে রাখা মেডেলটা। কয়েক মুহূর্ত মেডেলটার দিকে তাকিয়ে থেকে সিংভি সাহেব বললেন, 'জিনিসটা সোনার তৈরি তাই না?'
গণপতিবাবু মেডেল গলায় ঝুলিয়ে গম্ভীরভাবে বললেন, 'হ্যাঁ, সোনার মেডেল! এ এক অমূল্য জিনিস! তবে তা সোনার তৈরি বলে নয়। যে কোনও পয়সাওয়ালা লোক হয়তো এরকম দশটা সোনার মেডেল তৈরি করে গলায় ঝোলাতে পারে। কিন্তু সম্মান বলে যে ব্যাপারটা এই মেডেলের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সেটা অর্জন করা সহজ নয়। তার জন্য চাই আমার মতো কঠিন পরিশ্রম, অধ্যাবসায় আর সর্বোপরি ট্যালেন্ট।'
তাঁর কথা শুনে শিমুলের মনে হল, 'পয়সাওয়ালা লোকের' কথা উল্লেখ করে গণপতিবাবু যেন মৃদু খোঁচা দিলেন সিংভি সাহেবকে।
কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে সিংভি সাহেবও তাঁকে সমর্থন করে বললেন, 'একদম ঠিক বলেছেন। পয়সা দিয়ে সব কেনা যায়। কিন্তু সম্মান কেনা যায় না।'
বেলা এগারোটা বেজে গেল শুটিংয়ের কাজ শেষ হতে। বাগান থেকে ফিরে বারান্দায় এসে বসলেন গণপতিবাবু আর সিংভি সাহেব। শিমুলও যথারীতি একটা চেয়ার নিয়ে তাদের কিছুটা তফাতে বসল। গণপতিবাবু সিংভি সাহেবকে বললেন, 'বিকেলে, বেঙ্গলিক্লাবে সংবর্ধনার ব্যাপারটা নিশ্চয়ই আপনার মাথায় আছে? ঠিক সময়মতো আমাকে সেখানে পৌঁছবার ব্যবস্থা করবেন।'
সিংভি সাহেব বললেন, 'ও নিয়ে আপনি ভাববেন না। ড্রাইভারকে বলে দিয়েছি। ও আপনাকে বিকেলে জনপথ বাজারে হোটেল সেলিম-এ পৌঁছে দেবে। আপনি বিকেল সাড়ে পাঁচটার মধ্যে রেডি হয়ে ওকে হাঁক দেবেন। ও গেটের কাছেই থাকবে।'
সামান্য থেমে সিংভি সাহেব একটু যেন ইতস্তত করে গণপতিবাবুকে বললেন, 'আপনার কাছে আমার একটা রিকোয়েস্ট আছে।'
'কী রিকোয়েস্ট?' জানতে চাইলেন গণপতিবাবু।
সিংভি সাহেব বললেন, 'আপনি যদি অনুমতি দেন তবে আপনার সঙ্গী এই ছেলেটাকে ঘণ্টা তিনেকের জন্য আমার সঙ্গে নিয়ে যেতে চাই আজ আমার ড্রাইভার আসেনি। নিজেই ড্রাইভ করে এসেছি। একটা বিশেষ কাজে যাওয়ার জন্য আমার একজন সঙ্গীর প্রয়োজন।'
সিংভি সাহেবের কথা শুনে একটু আশ্চর্য হল শিমুল। গণপতিবাবু সোজা হয়ে বসে কয়েক মুহূর্ত স্থির দৃষ্টিতে সিংভি সাহেবের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে বললেন, 'সরি, ওকে আমি ছাড়তে পারব না। আমার সব সময় একজন নিজস্ব লোকের দরকার হয়। ড্রাইভার না থাকলেও এখানে তো আপনার আরও লোকজন আছে তাদের না নিয়ে হঠাৎ ওকে নিয়ে যাওয়ার কথা কেন বলছেন আপনি?' স্পষ্ট একটা সন্দেহের সুর যেন ফুটে উঠল গণপতিবাবুর কণ্ঠস্বরে।
ব্যাপারটা সিংভি সাহেব ধরতে পারলেন। তিনি একটু অপ্রস্তুতভাবে বললেন, 'ঠিক আছে, ঠিক আছে। ওকে যেতে হবে না। আসলে আপনার বাদবাকি পেমেন্টটা ব্যাঙ্ক থেকে তুলে আজ মিটিয়ে দেব ভেবেছিলাম। কাল থেকে এখানে নাকি ব্যাঙ্ক স্ট্রাইক হতে পারে বলে খবরের কাগজে লিখেছে। আপনার পেমেন্ট ছাড়াও আরও কিছু টাকা তোলারও আমার দরকার। সব মিলিয়ে বেশ মোটা টাকার ব্যাপার। এ সব টাকা-পয়সা তোলার সময় আমি আমার ড্রাইভার ছাড়া অন্য কাউকে নিয়ে যেতে ঠিক ভরসা পাই না। বোঝেনই তো আজকাল দিনকাল খুব খারাপ। আপনার মতো হাই প্রোফাইল লোকের সঙ্গে যে ঘোরে সে নিশ্চয়ই বিশ্বস্ত। তাই ওকে আমার সঙ্গে নিয়ে যেতে চেয়েছিলাম, এই আর কি!
কথাগুলো বলে কিছুক্ষণ যেন ভেবে নিয়ে সিংভি সাহেব বললেন, 'ব্যাঙ্ক স্ট্রাইক হলে কী আর করা যাবে! তেমন হলে আজ টাকা না তোলা গেলে আপনাকে চেক লিখে দেব, কলকাতায় গিয়ে ভাঙিয়ে নেবেন।'
গণপতিবাবু এবার ধন্ধে পড়ে গেলেন। কলকাতাতে লক্ষ্নৌ-র চেক ক্যাশ করা মানে তো প্রায় এক মাসের ধাক্কা! তরে ওপর কমিশনও কাটবে! অর্জুন সিংভি সম্ভবত চলে যাওয়ার জন্য চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াতেই গণপতি হাজরা মত পরিবর্তন করে বললেন, 'ঠিক আছে ব্যাপারটা যখন এত গুরুত্বপূর্ণ তখন আপনি ওকে নিয়ে যান। এতগুলো টাকা একলা তুলতে যাওয়া ঠিক নয়। তবে তাড়াতাড়ি ফেরার চেষ্টা করবেন।'
সিংভি সাহেব শুনে হেসে বললেন, 'মেনি মেনি থ্যাঙ্কস, মিস্টার হাজরা। আমি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ফিরে আসার চেষ্টা করব। আর একজন লোককে আপনার ঘরের বাইরে রেখে যাচ্ছি আমি। কোনও প্রয়োজন হলে তাকে বলবেন, আশা করি আপনার তাতে কোনও অসুবিধে হবে না।'
মিনিট পনেরোর মধ্যেই সিংভি সাহেবের গাড়িতে বেরিয়ে পড়ল শিমুল। ড্রাইভ করছেন সিংভি সাহেব, আর তার পাশের আসনে শিমুল। বাড়ি ছেড়ে কিছুদূর এগোবার পর সিংভি সাহেব বললেন, 'তোমাকে আমি প্রথম নিয়ে যাব ''টার্কিশ গেটের'' কাছে। ওখান থেকে আমি তোমাকে লক্ষ্নৌ দেখানো শুরু করব। তবে ঘণ্টা তিনিকের মধ্যে কয়েকটা প্রধান জায়গা ছাড়া অন্য কিছু তোমাকে দেখানো যাবে না।'
তাঁর কথা শুনে শিমুল অবাক হয়ে বলল, 'আপনি ব্যাঙ্কে যাবেন না?'
সিংভি সাহেব উইন্ড স্ক্রিনে চোখ রেখে বললেন, 'না যাব না। গতকাল বিকেলে তোমার সঙ্গে কথা বলে বুঝেছি যে তোমার লক্ষ্নৌ দেখার খুব শখ। আর তার সঙ্গে এ-ও বুঝেছি যে তোমার স্যার তোমাকে বেড়াবার অনুমতি দেবেন বলে মনে হয় না। কাজেই তোমাকে লক্ষ্নৌ দেখনোর জন্য ব্যাঙ্কে টাকা তোলার গল্প ওঁর কাছে বানিয়ে বলতে হল।'
সিংভি সাহেবের কথা শুনে আশ্চর্য হয়ে গেল শিমুল। কী বলবে সে ঠিক বুঝতে পারলর না। সিংভি সাহেবও আর কোনও কথা না বলে গাড়ি চালাতে লাগলেন।
সিংভি সাহেবের গাড়ি এসে প্রথমে থামল নবাবি আমলের বিশালাকার এক তোরণের সামনে। লোকজনের ভিড়ে জায়গাটা জমজমাট। তোরণকে কেন্দ্র করে অনেক দোকান-বাজার চারপাশে। গাড়ি থেকে নেমে সিংভি সাহেব বললেন, 'এই হল টার্কিশ গেট। আর ডান দিকে ওই যে বিরাট স্থাপত্য দেখতে পাচ্ছ তা হল লক্ষ্নৌর বিখ্যাত বড়া ইমামবাড়া।'
গাড়ি থেকে নেমে শিমুল বেশ কিছুক্ষণ অবাক হয়ে মুগ্ধদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল বিশালাকৃতি, অসাধারণ কারুকাজ করা টার্কিশ গেটের দিকে। সিংভি সাহেব শিমুলকে বললেন, 'এ সব জায়গাতে আমি এত বার এসেছি যে আমাদের আর গাইড লাগবে না। তোমাকে আমি সব ঘুরিয়ে দেখাতে পারব। আর এখানকার ইতিহাসও আমি মোটামুটি জানি।' এরপর তিনি বললেন, 'এই যে গেটটা দেখছ, এর উচ্চতা হল ষাট ফুট। নবাব আসফ-উদ-দৌলা, রোমের কনস্টানটিনোপলের অনুকরণে এটি বানিয়েছিলেন। স্থানীয় লোকেরা একে বলে, ''রুমি দরওয়াজা''। ইদুজ্জোহা ও ইদলফিতরের সময় এখানে প্রচুর লোক সমাগম হয়।'
রুমি দরজা অতিক্রম করে সিংভি সাহেব এরপর শিমুলকে নিয়ে হাঁটতে শুরু করলেন বড়া ইমামবড়ার দিকে। যেতে যেতে তিনি বললেন, ' ''বড়া ইমামবড়া''-র মাথাতেই রয়েছে বিখ্যাত ভুলভুলাইয়া। দেখবে সেটা কী আশ্চর্য জায়গা!'
শিমুল বলল, 'ভুলভুলাইয়ার কথা আমি শুনেছি। ওখানে নবাব বেগমরা লুকোচুরি খেলতেন।'
সিংভি সাহেব হেসে বললেন, 'ওটা একটা প্রচলিত ধারণা মাত্র। আসলে নিরাপত্তার কারণেই ভুলভুলাইয়া তৈরি করা হয়েছিল। ওখানে বসে নবাব ও অভিজাত ব্যক্তিরা গোপন শলাপরামর্শ করতেন। বাইরের কোনও লোক বা গুপ্তচর গোপনে সেখানে প্রবেশ করলে, আর যাতে বাইরে বেরিয়ে না আসতে পারে সেজন্য ভুলভুলাইয়া স্থাপত্য তৈরি করা হয়েছিল।'
কথা বলতে বলতে একসময় শিমুলরা এসে দাঁড়াল বিশাল 'বড়া ইমামবাড়া'-র সামনে। প্রাসাদের বাইরে থেকে একটা সিঁড়ি সোজা ওপরে উঠে গেছে চারতলা ভুলভুলাইয়ের দিকে। শিমুলকে দাঁড় করিয়ে প্রাসাদে ঢোকার দুটো টিকিট কেটে আনলেন সিংভি সাহেব। তারপর তিনি বললেন, 'চলো, তোমাকে আগে এক তলার দরবার কক্ষ দেখাই, ওটা দেখে উপরে উঠব।'
শিমুলরা প্রাসাদে প্রবেশ করে উপস্থিত হল দরবার কক্ষে। দেখে হাঁ হয়ে গেল সে। হলঘর যে এত বিশাল হতে পারে তা ধারণা ছিল না তার। সিংভি সাহেব বললেন, 'এই হলঘর হল পৃথিবীর বৃহত্তম কড়িবরগাহীন ঘর। এ ঘরের বিশেষত্ব হল যে, এ ঘরের কোথাও শব্দ হলে তা সর্বত্র শোনা যাবে।'
বাক্যের শেষ শব্দগুলো সামান্য জোরে বললেন সিংভি সাহেব। শিমুল খেয়াল করল, সত্যি সেই শব্দগুলো অনুরণিত হল বিশাল হলঘরের প্রতি কোনায়।
হলঘর দেখা শেষ হলে শিমুলরা বাইরে এসে ওপরে উঠতে শুরু করল। তারপর এক সময় পৌঁছে গেল ভুলভুলাইয়ার সামনে। প্রবেশ মুখে একদল গাইড দাঁড়িয়ে আছে। তারা বলছে গাইড ছাড়া ভেতরে ঢুকলে আর বাইরে বেরোনো যাবে না। সিংভি সাহেব বললেন, 'আমাদের এখানেও গাইড লাগবে না। এখানেও আমি অনেকবার এসেছি। তবে বেশি ভেতরে যাব না, হাতে সময় কম।'
তাঁর পেছন পেছন শিমুল প্রবেশ করল ভুলভুলাইয়াতে। এ এক আশ্চর্য গোলকধাঁধা। ছোট ছোট ঘর, পিলারের পর পিলার, আলো-ছায়া মাখা অলিন্দ। কেমন যেন গা-ছমছমে পরিবেশ! ভেতরে ঢোকা-বেরবার পথ সব কিছু যেন গুলিয়ে যায়। গাইডের পেছন পেছন তাঁর গায়ের সঙ্গে লেপ্টে ঘুরে বেড়াচ্ছে ছোট-বড় টুরিস্ট দল। গাইডরা তাঁদের সাবধান করে দিচ্ছে যে টুরিস্টরা কেউ যদি সাহস দেখিয়ে কাছছাড়া হয় তা হালে তাঁকে ঘুরে ঘুরে এই ভুলভুলাইয়ার মধ্যেই মরতে হবে।
শিমুল সিংভি সাহেবকে জিগ্যেস করল, 'ভুলভুলাইয়ার স্থাপতি কে ছিলেন? তিনি জবাব দিলেন, খিফায়াতুল্লা নামের একজন ইরানি।'
বেশ কিছুক্ষণ ধরে গোলকধাঁধায় ঘোরার পর বাইরে বেরিয়ে এল তারা। বড়া ইমামবড়ার ওপর থেকে লক্ষ্নৌ শহরকে পাখির চোখে দেখতে পাচ্ছে শিমুল। কিছুদূরে আরও একটা নবাবি স্থাপত্য চোখে পড়ল তার। সিংভি সাহেব বললেন, 'ওটা হল, ছোটা ইমামবড়া।' আর ওই যে আরও দূরে যে টাওয়ার দেখা যাচ্ছে, ওটা লক্ষ্নৌর বিখ্যাত ''ক্লক টাওয়ার''। ওর পাশ দিয়ে যাব আমরা। তবে হাতে সময় কম। সব কিছু তোমাকে দেখানো যাবে না। রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় দূর থেকে সেগুলো দেখতে হবে। এখান থেকে বেরিয়ে এরপর ''মর্টার মেমোরিয়াল'' আর ''রেসিডেন্সি''-এই দুটো জায়গারই শুধু ভিতরে ঢুকব।'
বড়া ইমামবড়া দেখে যখন আবার গাড়িতে উঠে বসল, তখন শিমুল হিসেব করে দেখল, বাড়ি থেকে বেরবার পর এক ঘণ্টা কেটে গেছে। সিংভি সাহেব গাড়ি স্টার্ট করে জিগ্যেস করলেন, 'তুমি ''আতর'' বা ''চিকন জরদৌসি'' কিনবে নাকি? লক্ষ্নৌর এ সব জিনিস খুব বিখ্যাত।'
শিমুল একটু ইতস্তত করে বলল, 'বোনের জন্য শুধু চুড়ি কেনার ইচ্ছা আছে।'
সিংভি সাহেব বললেন, 'হ্যাঁ, এখানকার চুড়িও বিখ্যাত। আমাদের যাওয়ার পথে ক্লক টাওয়ারের কাছে চুড়ির দোকান আছে। ঠিক আছে ওখানে থামব।'
সিংভি সাহেবের কথা শুনে আনন্দে মনটা ভরে গেল শিমুলের। লোকটা সত্যি খুব ভালো বলে মনে হল তার। আর তার পাশাপাশি শিমুলের মনে হল গণপতিবাবুর কথাও। দু'জন মানুষের ব্যবহারে কী আশ্চর্য পার্থক্য। সিংভি সাহেব ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়ন না হলেও, তিনি খুব ছোট মাপের মানুষ নন। একটা বড় ব্যবসা চালান তিনি। অন্তত এ রকম একটা মানুষের কাছেও যদি কাজ জুটত, তা হলেও তার দুঃখ অনেক কম হত। মনে মনে ভাবল শিমুল।
রাস্তা থেকেই ছোটা ইমামবড়া দেখে এক সময় শিমুলরা পৌঁছে গেল ক্লক টাওয়ারের কাছে। এ জায়গা অনেকটা বাজারের মতো। অনেক দোকানপাট চারপাশে। আর তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে 'ঘড়ি মিনার'। মিনারের মাথায় বসানো আছে এক অতিকায় ঘড়ি। শিমুল সিংভি সাহেবের কাছে শুনল, নবাব নাসির-উদ-দিন হায়দার ১৮৮৭ খ্রিস্টাব্দে ৭০ মিটার উঁচু এই ক্লক টাওয়ার তৈরি করান। এ জায়গা লক্ষ্নৌ নগরীর একদম কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত। এর ঘণ্টাধ্বনি বহু দূর থেকে শুনতে পাওয়া যায়। গাড়ি থেকে নেমে শিমুল কিছুক্ষণ দেখল টাওয়ারটা। তারপর সিংভি সাহেব তাকে নিয়ে রাস্তা পেরিয়ে উপস্থিত হলেন উল্টোদিকের ফুটপাতে সেখানে পরপর বেশ কয়েকটি চুড়ির দোকান। শিমুলরা একটা দোকানে ঢুকল। তার ভিতরটা উজ্জ্বল আলোয় আলোকিত। কাঁচের শো-রুমে ঝলমল করছে নানারঙের চুড়ি। মধ্যবয়সি দোকানদার ভদ্রলোকের চোখে সুর্মা, ঠোঁটের কোণে পানের রঙিন আভা, মাথায় ফেজ টুপি। কুর্তার ওপর জরির কাজ করা ঝলমলে মেরুন জ্যাকেট। শিমুলরা দোকানে পা রাখতেই সে কুর্নিশ করে বলল, 'জনাব, ফরমাইশ কি জিয়ে।'
তার সামনে গিয়ে তারা তাকে চুড়ি দেখাতে বলল। লোকটা বাক্স বার করে চুড়ি দেখাতে শুরু করল। কিছুক্ষণ দেখার পর একটা চুড়ির গোছা পছন্দ হল শিমুলের। সে দাম জিগ্যেস করতেই দোকানদার বলল, 'দুশো টাকা ডজন।' চমকে উঠল শিমুল। এত টাকা দিয়ে চুড়ি কেনার ক্ষমতা তার নেই। সে ম্রিয়মান হয়ে বলল, 'না, তা হলে এটা থাক এর চেয়ে কম দামের কিছু দেখান।'
দোকানি তার কথার জবাবে কী যেন বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই সিংভি সাহেব শিমুলকে প্রশ্ন করলেন, 'তোমার এটা পছন্দ হয়েছে?'
শিমুল একটু ইতস্তত করে বলল, 'হ্যাঁ, হয়েছিল। কিন্তু...।'
তার কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি দোকানদারকে বললেন, 'ইয়েওলা প্যাক কর দিজিয়ে—।'
শিমুল বলল, 'না, আমি এটা নেব না। আমার কাছে অল্প ক'টা টাকা আছে।'
সিংভি সাহেব এরপর পকেট থেকে একটা পাঁচশো টাকার বান্ডিল বার করে তার থেকে দুটো কড়কড়ে নতুন নোট নিয়ে শিমুলকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, 'এটা তুমি রাখ।'
শিমুল বলল, 'না, না, এ কী করছেন আপনি? আপনি কেন টাকা দেবেন? এ টাকা নিতে পারব না আমি!'
সিংভি সাহেব বললেন, 'গণপতিবাবুর সঙ্গে তুমিও তো এসেছ তাঁকে যেমন আমি অনারিয়ম দিচ্ছি, তেমন এটা তোমার অনারিয়ম।'
শিমুল বলল, 'তা হয় না। আমি তো স্যারের কর্মচারী হিসাবে এসেছি।'
কিন্তু শেষ পর্যন্ত সিংভি সাহেব কোনও ওজর-আপত্তি না-শুনে টাকাটা গুঁজে দিলেন শিমুলের পকেটে।
এরপর মিনিট তিনেকের মধ্যে চুড়ি কিনে বেরিয়ে এসে শিমুলরা মর্টার মেমোরিয়ালের দিকে রওনা দিল।
শিমুলদের বেশ খানিকটা সময় লাগল শহরের কেন্দ্রস্থল থেকে দূরে গোমতী নদীর গায়ে মর্টার মেমোরিয়ালে পৌঁছতে। জায়গাটা বেশ নির্জন। একটা স্মৃতিস্তম্ভ রয়েছে সেখানে। তবে এ জায়গার তেমন কোনও যত্ন নেওয়া হয় বলে মনে হয় না। ঝোপঝাড়ের মধ্যে একটা ফাঁকা জায়গাতে নিতান্ত অনাদরে দাঁড়িয়ে আছে স্মৃতিস্তম্ভ। আশপাশে কোনও লোকজনও চোখে পড়ল না শিমুলের। গাড়ি থেকে নেমে ঝোপ-জঙ্গল অতিক্রম করে শিমুলরা স্তম্ভর সামনে এসে দাঁড়াল। সেখানে দাঁড়িয়ে সিংভি সাহেব বললেন, 'এক সময় এ জায়গা ছিল সিপাহীবিদ্রোহের অন্যতম কেন্দ্র। তার শতবর্ষ পূর্তিতে ১৯৫৭ সালে বিদ্রোহী শহিদ সেনাদের স্মৃতিতে এই স্তম্ভ নির্মাণ করা হয়। অথচ, দেখ মাত্র পঞ্চাশ বছরেই এর কী করুণ পরিণতি। অনাদর-অযত্নের ছাপ স্পষ্ট। গাইডরা তো টুরিস্টদের আর এখানে আনতেই চায় না ইতিহাসের কী করুণ পরিণতি!'
কয়েক মুহূর্ত সিংভি সাহেব স্তম্ভর সামনে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলেন। শিমুলের মনে হল ওভাবে দাঁড়িয়ে তিনি সিপাহী বিদ্রোহের বীর সেনানীদের অন্তরের শ্রদ্ধা নিবেদন করলেন। এরপর তিনি রিস্টওয়াচের দিকে তাকিয়ে নিয়ে বললেন, 'এ জায়গাটা আমার খুব প্রিয়। হাতে কিছুটা সময় আছে, চল নদীর পাড় পর্যন্ত ঘুরে আসি।' কথাগুলো বলে তিনি ঝোপঝাড়ের মধ্যে দিয়ে একটা নুড়িপথ ধরে শিমুলকে নিয়ে এগোলেন নদীর দিকে।
তারা দু'জনে তখন নদীর দিকে বেশ কিছুটা এগিয়ে গেছে, ঠিক এমন সময় এক অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটল। প্রথমে কোথা থেকে যেন একটা চাপা কথাবার্তা কানে এল। আর তারপরই রাস্তার পাশে একটা ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়ে শিমুলের পথ আটকে দাঁড়াল তিন জন যুবক। তাদের প্রত্যেকেরই বেশ মজবুত চেহারা। শিমুলের তাদের মুখ-চোখ দেখে মনে হল সম্ভবত তারা নেশাগ্রস্ত। শিমুলদের দেখে নিয়ে তাদের মধ্যে একজন জামার নীচ থেকে বড় একটা ছুরি বার করে সিংভি সাহেবের কিছুটা তফাতে দাঁড়িয়ে কর্কশ কণ্ঠে হিন্দিতে বলল, 'টাকা পয়সা আংটি ঘড়ি যা আছে সব বার কর।'
ব্যাপারটা কী ঘটতে চলেছে তা বুঝতে পারল শিমুলরা। সিংভি সাহেব তাদের বললেন, 'আমাদের কাছে টাকা-পয়সা নেই, আমাদের যেতে দাও।'
ছুরি হাতে লোকটা তা শুনে দাঁত বার করে হেসে বলল, 'যা বলছি তাই কর। নইলে দু'জনকেই মেরে গোমতীতে ভাসিয়ে দেব।' কথাটা বলেই সে তার সঙ্গীদের ইশারা করতেই তারা এগোল শিমুলদের দিকে। সিংভি সাহেব আগে, তার পিছনে শিমুল। একটা লোক সিংভি সাহেবের কাছে আসতেই সিংভি সাহেব তাকে দূরে সরাবার জন্য একটা ধাক্কা দিলেন। সে লোকটা একটা টাল খেয়ে পাল্টা ধাক্কা মারল সিংভি সাহেবকে। ব্যালেন্স না রাখতে পেরে তিনি মাটিতে পড়ে গেলেন। নিজের অজান্তেই মনে হয় জামার হাতা গোটাতে শুরু করেছিল শিমুল। তাই দেখে অন্য একজন এগিয়ে এসে একটা ঘুষি ছুঁড়ল শিমুলকে লক্ষ্য করে। বিদ্যুৎগতিতে সরে আঘাতটা এড়িয়ে লোকটার চোয়ালে প্রচণ্ড জোরে ঘুষি মারল শিমুল। ছুরি হাতে লোকটাও ততক্ষণে এগিয়ে এসেছে। ঘুষি খাওয়া লোকটা ছিটকে পড়ল ছুরি ধরা লোকটার গায়ে। তার হাত থেকে ছুরি ছিটকে গেল ঝোপের মধ্যে। মুহূর্তের জন্য যেন হতভম্ব হয়ে গেল লোকগুলো, আর তার পরই তিন জন একযোগে ঝাঁপাল শিমুলের দিকে। শিমুলও তাদের লক্ষ্য করে ঘুষি চালাতে লাগল। লড়াই খুব বেশি হলে চলল মিনিট তিনেক। শিমুলের প্রচণ্ড ঘুষিতে একজনের দাঁত খসে গেল, অন্য একজনের নাক ভেঙে গলগল করে রক্ত ঝরতে লাগল। রণে ভঙ্গ দিল তারা। বেগতিক দেখে তিনজনই পালাল ঝোপঝাড় ভেঙে বেশ অনেকক্ষণ ধরে তাদের পায়ের শব্দ শুনতে পেল শিমুল। সিংভি সাহেব ততক্ষণে উঠে দাঁড়িয়েছেন।
শিমুল তাকে বলল, 'আপনার চোট লাগেনি তো?' সিংভি সাহেব জামাপ্যান্টের ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে বললেন, 'না, লাগেনি। তুমি ছিলে তাই বেঁচে গেলাম। পকেটে অনেক টাকা ছিল!'
এরপর তিনি বললেন, 'ছাড়ো, এখন আর নদীর দিকে যাব না। রেসিডেন্সি দেখে বাড়ি ফিরে যাই।'
শিমুলরা ফিরে এসে গাড়িতে উঠে বসল। গাড়ি চলতে শুরু করার পর বেশ কিছু সময় কেমন যেন চুপ মেরে থেকে সিংভি সাহেব হঠাৎ শিমুলকে বললেন, 'তোমাকে আবারও একবার একটা প্রশ্ন করছি, কিছু মনে করো না। তুমি কি গণপতি হাজরার বডিগার্ড বা সিকিউরিটি পার্সন?'
শিমুল বলল, 'না, আপনাকে আমি মিথ্যা বলিনি। আমি দিন কুড়ি হল কাজে লেগেছি। আমাকে কাজে নেওয়ার সময় আমাকে ঠিক তার কী কাজে প্রয়োজন তা তিনি বলেননি আমাকে। আর আপনাকে নিজের যে পরিচয় আমি দিয়েছি, তার মধ্যে কোনও মিথ্যা নেই।'
তার কথা শুনে সিংভি সাহেব মৃদু হেসে বললেন, 'তুমি আমাকে মিথ্যা পরিচয় দাওনি ঠিকই, কিন্তু আমার মনে হয় তোমার আরও একটা পরিচয় আছে।'
'কী পরিচয়?' শিমুল অবাক হয়ে বলল।
কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে তিনি বললেন, 'ছিনতাইবাজদের সঙ্গে তোমার লড়াই আমি দেখছিলাম। যেভাবে তুমি একটা লেফট হুক, আর একটা লাইট আপার কাটে দুটো লোককে মাটিতে ফেললে তা ঘুসি মারার অভ্যাস না থাকলে হয় না। একদম নিখুঁত মার। তাছাড়া, এই সাধারণ মারপিটের সময়েও তুমি একবারও ওদের কারও পেটের নীচে অথবা ঘাড়ের পিছনে মারোনি। অর্থাৎ বক্সিংয়ের পরিভাষায় যাকে ফাউল পাঞ্চ বলে তা করোনি। তোমার ফুট স্টেপিংও অসাধারণ!' কথাগুলো বলে ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটিয়ে সিংভি সাহেব বললেন, 'আমি কী বলতে চাইছি, এবার নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ তুমি?'
শিমুল বুঝতে পারল সে ধরা পড়ে গেছে। জানলার বাইরে তাকিয়ে সে একটু ইতস্তত করে লজ্জিত স্বরে বলল, 'হ্যাঁ, আমি বক্সিং লড়তাম। কলকাতা চ্যাম্পিয়ানও হয়েছিলাম এ বছর। কাগজে ছবিও ছাপা হয়েছিল মাস তিনেক আগে ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশিপের জন্য প্রস্তুতিও নিচ্ছিলাম। কিন্তু এক মাস হল আমি আর রিংয়ে যাই না। বক্সিং ছেড়ে দিয়েছি আমি।'
'কেন?' প্রশ্ন করলেন সিংভি সাহেব।
শিমুল জবাব দিল, 'বাবা মারা গেছেন। সংসার চলছে না। তাই বক্সিংয়ের চেয়ে এ কাজটার আমার বেশি দরকার ছিল।'
সিংভি সাহেব গাড়ির স্টিয়ারিং ঘোরাতে ঘোরাতে আক্ষেপের সুরে বললেন, 'টাকা-পয়সার অভাবে আমাদের দেশে কত প্রতিভা যে নষ্ট হয়ে যায় তার কোনও হিসেব নেই! তোমার পাঞ্চ দেখে আমার মনে হয়েছে, জাত বক্সার তুমি। প্রত্যেকটা পাঞ্চ, ফুট স্টেপিং যেন নিখুঁতভাবে মাপা! আমি নিজে কোনও দিন বক্সিং না করলেও এই খেলা দেখতে আমার ভালো লাগে। আগে সুযোগ পেলেই দেখতে যেতাম। এখন কাজের চাপে যেতে না পারলেও টেলিভিশনে দেখার চেষ্টা করি। এই খেলাটা আমি কিছুটা বুঝি। তাই চট করে ধরে নিতে পারলাম তুমি বক্সার।'
সিংভি সাহেবের প্রশংসা শুনে উৎসাহিত হয়ে শিমুল বলল, 'আমার ট্রেনার বিশুদা কী বলে জানেন? ঠিকমতো প্র্যাকটিস করলে নাকি এবার আমার ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়ান হওয়ার একটা চান্স ছিল! আর ক'টা মাস মাত্র বাকি ছিল ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশিপের। কিন্তু আমার কিছু করার নেই, প্র্যাকটিস ছেড়ে দিতে হল।'
এরপর একটু থেমে সে বলল, 'বিদেশে শুনেছি বড় বড় কোম্পানি খেলোয়াড়দের স্পনসর করে, তাঁদের আর্থিক দায়িত্ব নেয়। আমি যদি তেমন কোনও কোম্পানির স্পনসরশিপ পেতাম তাহলে হয়তো কিছু করে দেখাতাম।'
তার কথা শুনে ঘাড় নাড়লেন সিংভি সাহেব। তারপর বললেন, 'আমাদের দেশে পপুলার স্পোর্টস বলতে তো এখন বোঝায় ক্রিকেট। তার গ্ল্যামারটাকে ব্যবহার করার জন্য সবাই তাকেই প্রমোট করে। অবশ্য কিছু কিছু সংস্থা ইদানীং বড় বড় ফুটবল ক্লাবকেও প্রমোট করছে। অথচ মজার ব্যাপার হল, অলিম্পিকে যে খেলাগুলো পদক আনছে, যেমন বক্সিং, রেসলিং, শুটিং—তাদের প্রমোট করার মতো কেউ নেই। দৈবাৎ প্রায় ব্যক্তিগত চেষ্টায় এসব খেলাতে যখন কেউ পদক আনে, তখন তাদের নিয়ে কিছুদিন হইচই হয়। খবরে কাগজ, ম্যাগাজিনের কভার পেজে তাদের ছবি ছাপা হয়, তারপর সব চুপ মেরে যায়।'
কথাগুলো বলে, একটু থেমে সিংভি সাহেব এরপর একটা অদ্ভুত প্রশ্ন করলেন, 'আচ্ছা, মানুষ হিসেবে তোমার স্যারকে ঠিক কেমন বলে মনে হয়?'
শিমুল এখন হাজার হোক গণপতিবাবুর কর্মচারী, তাঁর সঙ্গে সে এসেছে। সিংভি সাহেব লোক ভালো হলেও নিয়োগকর্তার সম্বন্ধে কোনও বিরূপ মন্তব্য করাটা সমীচীন বলে মনে হল না তার। তাতে সিংভি সাহেবেরও শিমুল সম্পর্কে বিরূপ ধারণা হতে পারে। কাজেই সে প্রশ্নটা এড়িয়ে গিয়ে শুধু বলল, 'ওই একরকম।'
সিংভি সাহেব আর কোনও কথা না বলে নিজের মনে ড্রাইভ করতে লাগলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা পৌঁছে গেল 'দ্য রেসিডেন্সি'তে।
মিনিট পনেরোর মধ্যে রেসিডেন্সি দেখে নিল তারা। সময়াভাবে বেশিক্ষণ থাকা গেল না সেখানে। সেখান থেকে যখন তারা বাড়ি ফিরে এল তখন প্রায় দুটো বাজে। গাড়ি বাইরে রেখেই কম্পাউন্ডে প্রবেশ করল ওরা। বারান্দায় উঠে তারা উপস্থিত হল গণপতিবাবুর ঘরের দরজায়। দরজা খোলাই আছে। দরজার বাইরে যে লোকটাকে গণপতিবাবুর খিদমতের জন্য রেখে যাওয়া হয়েছিল তাকে ইশারায় চলে যেতে বলে শিমুলকে নিয়ে সে ঘরে প্রবেশ করলেন সিংভি সাহেব। খাটের ওপর আধশোয়া অবস্থায় ছিলেন গণপতি হাজরা। শিমুলরা ঘরে পা রাখতেই শব্দ শুনে বালিশের তলায় হাত ঢোকালেন তিনি। ব্যাপারটা শিমুলের নজর এড়াল না। বালিশের নীচে কী আছে তা সিংভি সাহেব না বুঝলেও শিমুলের বুঝতে কষ্ট হল না। শিমুলদের দেখার পর গণপতিবাবু বালিশের নীচে থেকে হাত সরিয়ে নিয়ে উঠে বসে বললেন, 'ও আপনারা এসে গেছেন তাহলে।'
সিংভি সাহেব জবাব দিলেন, 'হ্যাঁ, এই ফিরলাম। আপনার কোনও অসুবিধা হয়নি তো?'
গণপতিবাবু কোনও জবাব না দিয়ে একবার জরিপ করলেন শিমুলকে। সিংভি সাহেব বললেন, 'আপনার বাকি পেমেন্টটা দিতে এলাম। এটা আপনাকে দিয়ে আমি এখন চলে যাব। সম্ভবত আপনার সঙ্গে আজ আর আমার দেখা হবে না। শুটিংয়ের বাকি অংশের লোকেশনের ব্যাপারে কথা বলতে যাব।' এই বলে পেমেন্ট দেওয়ার জন্য তিনি পকেটে হাত ঢোকালেন।
শিমুলের সামনেই সিংভি সাহেব টাকাটা তাঁকে দিক তা মনে হয় চাইলেন না গণপতিবাবু। তিনি লুঙ্গি বাঁধতে বাঁধতে খাট থেকে নেমে শিমুলকে বললেন, 'তুমি এখন তোমার ঘরে যাও। দরকার হলে তোমাকে ডাকব।'
শিমুল নিজের ঘরে ফিরে এল। একটু পরই সে বাইরে সিংভি সাহেবের চলে যাওয়ার শব্দ শুনতে পেল। গণপতিবাবুর দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দও কানে এল। কিছুক্ষণের মধ্যেই ইসমাইল খাবার দিয়ে গেল। খাওয়া সেরে বিছানায় শুয়ে সিংভি সাহেবের কথা ভাবতে লাগল সে। সিংভি সাহেবের প্রতি কৃতজ্ঞতায় মন ভরে উঠল তার। সিংভি সাহেবের কথা ভাবতে ভাবতেই ঘুমিয়ে পড়ল শিমুল।
পাঁচটার সময় দরজায় ধাক্কার শব্দে ঘুম ভেঙে গেল শিমুলের। গণপতিবাবু ডাকছেন নাকি? বিছানা ছেড়ে তাড়াতাড়ি উঠে দরজা খুলে সে দেখল চায়ের ট্রে হাতে ইসমাইল দাঁড়িয়ে। শিমুল তাকে ট্রে-টা ঘরে রাখতে বলে রিস্টওয়াচের দিকে তাকিয়েই মুখে চোখে জল দিতে বাথরুমের দিকে ছুটল। সাড়ে পাঁচটাতে তাদের বাইরে যাওয়ার কথা। তার মধ্যে রেডি না হলে গণপতিবাবু তাকে আর আস্ত রাখবেন না। ভাগ্যিস লোকটা চা দিতে এল, নইলে একটা কেলেঙ্কারি কাণ্ড হত! মনে মনে ভাবল শিমুল।
বাথরুম থেকে ফিরে মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই চা আর স্ন্যাক্স খেয়ে নিল সে। তারপর পোশাক পাল্টানোর জন্য ব্যাগ খুলতেই বিশুদার দেওয়া প্যাকেটটা চোখে পড়ল। রাতে এখানে বেশ ঠান্ডা পড়ে। জামাপ্যান্ট চেঞ্জ করে প্যাকেট থেকে জ্যাকেটটা বার করে সেটা গায়ে দিয়ে ঘরের এক কোণে আয়নার সামনে গিয়ে সে দাঁড়াল। লালরঙের জ্যাকেটটা খুব সুন্দর। বুকের কাছে আবার বক্সিং গ্লাভসের ছবি আঁকা। জ্যাকেট গায়ে নিজেকে বেশ সুন্দর মনে হল তার। গায়ের জ্যাকেটটার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ জ্যাকেটটা দেওয়ার সময় বিশুদার বলা সেই কথাগুলো মনে পড়ে গেল শিমুলের। 'ভেবেছিলাম জানুয়ারিতে তুই দিল্লিতে ন্যাশনাল খেলতে গেলে তখন তোকে এটা দেব। কিন্তু তা তো আর হবে না...।' কথাগুলো মনে হতেই মন খারাপ হয়ে গেল। একদম রেডি হয়ে সে যখন বাইরে এসে দাঁড়াল তখন পাঁচটা কুড়ি বাজে। বাইরে কোনও লোকজন নেই। শুধু যে গাড়িতে গণপতিবাবু যাবেন তার ড্রাইভার গেটের পাশে তার গাড়ির বনেটে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে। শিমুল গণপতিবাবুর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে তার বাইরে বেরবার প্রতীক্ষা করতে লাগল।
মিনিট পাঁচেক পরই দরজা খুলে বাইরে এলেন গণপতিবাবু। তার পরনে সাদা জামা-প্যান্ট। গায়ে একটা নীল ব্লেজার চাপানো। তাঁর ব্লেজারটা একটু পুরোনো হলেও সেটার যে একটা আভিজাত্য আছে তা ব্লেজারের বুকে সাঁটা এমব্লেম দেখেই বুঝতে পারল শিমুল। এটা ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশিপের ব্লেজার! নতুন পুরোনো দেখে এর মূল্য নির্ধারণ করা যায় না। লাখে এক জনের সৌভাগ্য হয় এ জিনিস গায়ে চাপাবার। গণপতিবাবুর কাঁধে একটা চামড়ার ব্যাগও ঝুলছে।
গণপতিবাবু একবার ভালো করে দেখলেন শিমুলকে। তাঁর গায়ের জ্যাকেটটা লক্ষ্য করে তিনি তাচ্ছিল্যের সুরে বললেন, 'জ্যাকেটটা আবার কোথায় পেলে? কারও কাছ থেকে ধার করে এনেছ নাকি?'
শিমুল মাথা নীচু করে জবাব দিল, 'এটা আমাকে একজন উপহার দিয়েছে স্যার।'
তার কথা শুনে পিছন ফিরে ঘরের দরজাতে তালা দিতে দিতে তিনি মন্তব্য করলেন, 'যে উপহার দিয়েছে তার রুচির তারিফ করতে হয়। কী ক্যাটক্যাটে লাল রঙ! এ সব রঙ ভদ্রলোকদের জন্য নয়। তোমাদের জন্য।'
শিমুল তাঁর কথা শুনে চুপ করে রইল।
তালা দেওয়া হয়ে গেলে তিনি বাগানে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন, 'ওটাই তো আমাদের নিয়ে যাবে। চলো এবার।'
গাড়ির দিকে এগোতে এগোতে গণপতিবাবু বললেন, 'ওখানে যাওয়ার পর আমার এই ব্যাগ তোমার কাছে দেব। কখনও ব্যাগটা হাতছাড়া করবে না। ব্যাগটা বাড়িতে রেখে যেতে ভরসা পাচ্ছি না। আর একটা কথা, ওখানে গিয়ে বাঙালি লোকজন দেখে বেশি কথা বলতে যেও না। যাঁরা ওখানে থাকবেন তাঁরা সব লক্ষ্নৌর নামজাদা লোক। তোমার মতো হেঁজিপেঁজি নয়। তুমি কী বলতে কী বলে ফেলবে, শেষে আমাকে লজ্জায় পড়তে হবে!'
শিমুল বলল, 'ঠিক আছে স্যার।'
ঠিক সাড়ে পাঁচটাতেই জনপথ বাজারে পৌঁছবার জন্য রওনা হল শিমুলরা। জনপথ বাজারে 'হোটেল সেলিমে'-র সামনে যখন গাড়ি উপস্থিত হল তখন প্রায় ছ'টা বাজে। হোটেল সেলিম ফাইভস্টার না হলেও বেশ বড় হোটেল। সাদা ধবধবে পাঁচতলা বিল্ডিং। তার সামনে কয়েকটা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। হোটেলের চারপাশে আরও বেশ কিছু বড় বিল্ডিং, আলো ঝলমল দোকানপাট, শপিং মল। জায়গাটা যে অভিজাত অঞ্চল চারদিকে তাকিয়ে তা বুঝতে পারল শিমুল।
হোটেলের গেটের ঠিক মুখে দাঁড়াল গাড়ি। তার থেকে নেমে কাঁধের ব্যাগটা শিমুলের হাতে চালান করে গণপতিবাবু বললেন, 'খুব সাবধান, মনে থাকে যেন!'
হোটেলের প্রবেশপথে দুজন মধ্যবয়সী লোক দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁদের একজন বেশ লম্বা, পরনে ধুতি-পাঞ্জাবি, চোখে রিমলেস চশমা। অন্যজন বেঁটে, মাথায় টাক, কোট-প্যান্ট পরা। গণপতিবাবু গাড়ি থেকে নেমে এক-পা এগোতেই সেই লোক দুজন, 'আসুন' বলে ব্যস্ত হয়ে হাতজোড় করে এগিয়ে এলেন। গণপতিবাবু ধুতি-পাঞ্জাবি পরা লোকটার উদ্দেশ্যে বললেন, 'কী পাকড়াশি, ঠিক সময় এসেছি তো?' শিমুল বুঝল, এই লোকটাই তাহলে সেই পাকড়াশি, যার আমন্ত্রণে গণপতিবাবু সংবর্ধনা নিতে এসেছেন।
পাকড়াশি বিগলিত গলায় হেসে বললেন, 'হ্যাঁ দাদা একদম ঠিক সময় এসে গেছেন। লোকজনও সব চলে এসেছে। সবাই আপনার জন্যই অপেক্ষা করছে। তা আপনি এখন কোথা থেকে এলেন? যিনি টেলিফোন করে গতকাল আপনার আসার খবর দিলেন, তিনি তো আপনার ঠিকানাটা কিছুতেই বলতে চাইলেন না। ঠিকানা জানলে আমি নিজে আপনাকে আনতে যেতাম।'
গণপতি হাজরা তার কথা শুনে বললেন, 'সেলিব্রিটি হওয়ার যে কী জ্বালা, তা তুমি ঠিক বুঝবে না। যেখানেই যাই লোক হাজির হয়ে যায়। বাধ্য হয়েই কিছু গোপনীয়তা রক্ষা করে চলতে হয় আমাদের। ইচ্ছা করেই আমি ঠিকানা জানাইনি।'
পাকড়াশি শুনে বললেন, 'ঠিক আছে ঠিক আছে দাদা।' এই বলে তিনি তাঁর সঙ্গের টেকো ভদ্রলোকের পরিচয় দিয়ে বললেন, 'ইনি সঞ্জীবন শাসমল। আমাদের ভাইস প্রেসিডেন্ট। অধ্যাপনা করেন। শাসমল আরও একবার নমস্কার জানালেন গণপতি হাজরাকে।
পাকড়াশির এবার চোখ পড়ল শিমুলের ওপর। তিনি একটু ইতস্তত করে গণপতিবাবুকে জিগ্যেস করলেন, 'ইনি?'
গণপতিবাবু সংক্ষিপ্ত জবাব দিলেন, 'ও আমার সঙ্গে এসেছে।'
পাকড়াশি কী বুঝলেন কে জানে, তিনি এরপর ব্যস্ত-সমস্ত হয়ে বললেন, 'চলুন, চলুন, আপনারা ভিতরে চলুন।'
ভিতরে ঢুকে পাকড়াশি তাদের নিয়ে উপস্থিত হলেন একটা বড় হলঘরে।
হোটেলের কনফারেন্স রুম। জনা ষাট-সত্তর নানা বয়সী মহিলা-পুরুষ বসে আছে সেখানে তাদের সঙ্গে বাচ্চা-কাচ্চাও আছে। গণপতি হাজরা ঘরে ঢুকতেই সমবেত জনতার মধ্যে একটা মৃদু গুঞ্জন উঠল, 'এসে গেছেন! এসে গেছেন!'
কয়েকজন বয়স্ক লোক এগিয়ে এসে ঘিরে দাঁড়াল গণপতিবাবুকে। পাকড়াশি তাঁদের সঙ্গে গণপতি হাজরার পরিচয় করিয়ে দিতে লাগলেন, 'ইনি জয়গোপাল সাধুখাঁ-ব্যবসায়ী, বরেন মিত্তির--প্রিন্সিপাল, নীলমণি ঘোষাল বার-অ্যাট-ল, কাশীনাথ বিশ্বাস-হোমিওপ্যাথ।' আরও বেশ কয়েকজনের সঙ্গে পরিচয়পর্ব শেষ হলে পাকড়াশি ফুল দিয়ে সাজানো একটা মঞ্চ মতো জায়গা দেখিয়ে গণপতিবাবুকে বললেন, 'চলুন ওখানে বসবেন।'
'চলো' বলে সেখানে যাবার আগে গণপতিবাবু একবার তাকালেন শিমুলের কাঁধে তার ব্যাগটার দিকে, আর তার পর শিমুলের দিকে। তাঁর চোখের ভাষা বুঝতে অসুবিধা হল না শিমুলের। অর্থাৎ 'ব্যাগটা সাবধানে রাখবে।'
পাকড়াশি আর একদল লোকের সঙ্গে এগিয়ে গণপতি হাজরা মঞ্চে উঠে চেয়ারে বসলেন। মঞ্চের সামনে আসনগুলো সব ভর্তি দেখে শিমুল গিয়ে বসল দর্শক আসনের একটু পিছন দিকে। সেখানটাতে বসে আছে ছেলে ছোকরাদের দল। তারা নিজেদের মধ্যে ঠাট্টা-ইয়ার্কি করছে। তারা প্রথমে সম্ভবত ঠিক খেয়াল করল না শিমুলকে। সংবর্ধনা টংবর্ধনার ব্যাপারে তাদের খুব একটা যে আগ্রহ আছে তা মনে হল না শিমুলের। সে শুনতে পেল একটা ছেলে তার সঙ্গীদের বলল, 'দূর, এ লোকটাকে এরা কোথা থেকে ধরে আনল কে জানে। এর না আছে গ্ল্যামার, না আছে অন্য কিছু। এর চেয়ে কোনও ফিল্ম অ্যাক্টর বা ক্রিকেটারকে আনতে পারল না?'
তার কথা শুনে অন্য একজন বলল, 'তাদের আসতে বয়ে গেছে। হরিনাথ পাকড়াশির দৌড় আমার জানা আছে। খালি, মুখেই মারিতং জগৎ। এবার দুর্গাপুজোর আগে বলল, বিপাশা বসু নাকি পুজো উদ্বোধন করতে আসছে, শেষে ধরে আনলেন বগলাচরণ বলে এক লেখককে। নন-বেঙ্গলি যে বন্ধুদের প্যান্ডেলে ইনভাইট করেছিলাম, তাদের কাছে একদম প্রেস্টিজ পাংচার!'
তৃতীয় একটা ছেলে বলল, 'এসব আলোচনা বাদ দে। খবর পেলাম বিরিয়ানির প্যাকেট দেওয়া হবে। সাধুখাঁ জেঠু বলল, একদম কনফার্মড নিউজ। প্যাকেট দিলেই কেটে পড়ব।'
শিমুল মনে মনে হাসছিল তাদের কথা শুনে। কিন্তু হঠাৎ এবার তাদের চোখ পড়ল শিমুলের ওপর। সঙ্গে সঙ্গে তারা প্রসঙ্গ পাল্টে ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট ম্যাচ নিয়ে আলোচনা করতে শুরু করল। শিমুলও ওদের দিক থেকে মঞ্চের দিকে চোখ ফেরাল।
ইতিমধ্যে মঞ্চে গণপতিবাবুর পাশের চেয়ারগুলোতে পাকড়াশির বেশ কয়েকজন লোক বসেছেন। হারমোনিয়াম তবলাও মঞ্চে উঠে গেছে। একজন সুবেশি তরুণী মঞ্চে উঠে গণপতিবাবুকে ব্যাজ পরিয়ে দিল। তারপর ছোট্ট খাতায় অটোগ্রাফ নিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই অনুষ্ঠান শুরু হল। একটা বাচ্চা মেয়ে হারমোনিয়াম বাজিয়ে রিনি রিনি স্বরে গান ধরল, 'হে ক্ষণিকের অতিথি, এলে প্রভাতে...।' ভালোই গাইছিল মেয়েটা, কিন্তু তবলচি এত জোরে তবলায় চাঁটি মারতে লাগলেন যে তবলার শব্দই শুধু কানে আসতে লাগল শ্রোতাদের। যাই হোক গান শেষ করে গণপতিবাবুর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে মঞ্চ ছেড়ে নেমে গেল মেয়েটা। এরপর সভার কাজ শুরু হল। পাকড়াশি অনুষ্ঠানের সভাপতি হিসেবে রিটায়ার্ড জজ শূলপানি মজুমদারের নাম প্রস্তাব করলেন। তিনি থুত্থুরে বুড়ো মানুষ, চোখে মোটা কাচের চশমা। সব চুল সাদা। ধুতি-পাঞ্জাবি পরে তিনি বসেছিলেন গণপতিবাবুর পাশের চেয়ারে। সভাপতি হিসাবে নাম ঘোষণা হওয়ার পর একজন তাঁকে গিয়ে কী বলাতে তিনি অতিকষ্টে চেয়ার থেকে উঠে গিয়ে মাইকের সামনে খুনখুনে গলায় বললেন, 'উপস্থিত ভদ্রমণ্ডলী। আজকের সভায় আমাকে সভাপতি করার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ জানাই। কৃতজ্ঞতা জানাই আজকের সভায় উপস্থিত বিখ্যাত মুষ্টিযোদ্ধা শ্রীগজানন হালদারকে। তাঁর নাম আমি অনেক শুনেছি।
সভাপতি মশাই গণপতিবাবুর নাম ভুল বলছেন দেখে তাঁর পিছনে দাঁড়ানো পাকড়াশি তাঁকে কী যেন বললেন। সভাপতি মশাই কানে খাটো মানুষ। পাকড়াশির কথা শুনতে না পেয়ে তার দিকে ফিরে তিনি বললেন, 'অ্যাঁ, কিছু বললে আমাকে?'
এবার মাইক্রোফোনে ধরা পড়ে গেল পাকড়াশির গলা! 'গজানন হালদার নয়, বলুন গণপতি হাজরা।
সভাপতি মশাই এবার নিজেকে সংশোধিত করে বললেন, 'ও হ্যাঁ, গজানন হালদার নন, ইয়ে মানে গণপতি হাজরার নাম ইতিপূর্বে অনেক শুনেছি।' তাঁর কথা শুনে একটা মৃদু হাসির রোল উঠল শিমুলের কাছাকাছি বসে থাকা ছেলেদের মধ্যে।
সভাপতি বলে চললেন, যাই হোক, হাজরামশাই খেলাধূলা জগতের লোক। এ জগৎ সম্বন্ধে আমি তেমন কিছু জানি না। না, ঠিক কিছুই জানি না তা নয়, নাইন্টিন ফিফটি ওয়ানে একবার আমার এজলাসে খেলার মাঠে ঢিল ছোঁড়ার একটা কেস উঠেছিল। যতদূর মনে আছে, আমি দুজন আসামিকে পাঁচ-টাকা করে জরিমানা করেছিলুম। যাই হোক আমি আর কিছু বলব না। এরপর বলবেন আমাদের সম্পাদক পাকড়াশি। আমার হয়ে ও-ই সভা পরিচালনা করবে। ধন্যবাদ, নমস্কার।' এই বলে দর্শকদের, বিশেষত ছেলে-ছোকরাদের তুমুল করতালির মধ্যে নিজের চেয়ারে গিয়ে বসলেন সভাপতি।
এরপর পাকড়াশির পালা। গণপতি হাজরা যে কত বড় বক্সার ছিলেন, সে বিষয়ে তিনি দীর্ঘ বত্তৃ«তা শুরু করলেন। গণপতিবাবু গম্ভীরভাবে মঞ্চে বসে শুনতে লাগলেন পাকড়াশির মুখনিঃসৃত প্রশস্তি। পাকড়াশি মাঝে মাঝেই তাঁর বত্তৃ«তায়, বাঙালির গর্ব, জাতীয় গর্ব, মহান ইত্যাদি প্রশংসাসূচক শব্দ ব্যবহার করেছিলেন গণপতিবাবুর সম্বন্ধে। ঝাড়া চল্লিশ মিনিট পর পাকড়াশির বত্তৃ«তা শেষ হল। একটা হাততালির ঝড় উঠল। শিমুলের মনে হল তালির শব্দ যেন একটু দীর্ঘক্ষণ ধরেই হল। সেটা পাকড়াশির বত্তৃ«তা ভালো লেগেছে বলে, নাকি অবশেষে তিনি বত্তৃ«তা শেষ করলেন বলে, তা ঠিক বুঝতে পারল না শিমুল।
পাকড়াশির পর আর একজন বক্তা, তারপর আর একজন, শুরু হল বত্তৃ«তামালা। তাঁরা সবাই পাকড়াশির কথাগুলোই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বললেন। ভালো না লাগলেও একঘেয়ে বত্তৃ«তা শুনতে লাগল শিমুল। সময় এগিয়ে চলতে লাগল। শিমুলের মনে হল সভাপতি মশাই নিজেই ঘুমিয়ে পড়েছেন। মাথাটা বুকের কাছে ঢলে পড়েছে তাঁর।
'একটা অটোগ্রাফ দেবেন?' পাশ থেকে কথাটা শুনে শিমুল তাকিয়ে দেখল, বছর দশেকের ফুটফুটে একটা বাচ্চা মেয়ে ছোট্ট একটা খাতা আর পেন হাতে নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে। বাচ্চাটার পিছনে ফিটফাট পোশাকের চশমা পরা মাঝবয়সী এক ভদ্রলোক। তিনিও তাকিয়ে আছেন শিমুলের দিকে। বাচ্চা মেয়েটা মিষ্টি গলায় আবার বলল, 'একটা অটোগ্রাফ দেবেন?'
শিমুলকে বাচ্চাটা কোনও সেলিব্রিটি ভেবে ভুল করেছে মনে করে সে তাকে হেসে বলল, 'আমি বিখ্যাত কোনও লোক নই। গণপতিবাবুর সঙ্গে শুধু এসেছি। তুমি মনে হয় ভুল করেছ।'
তার কথা শুনে ভদ্রলোক বললেন, 'না, আমার মেয়ে ভুল করেনি। আমরা যখন কলকাতাতে ওর মামার বাড়ি গিয়েছিলাম তখন আপনার 'কলকাতা চ্যাম্পিয়নশিপের' লড়াইটা দেখেছিলাম। আমার মেয়েও আমার সঙ্গে গিয়েছিল চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনাল দেখতে। যে বক্সিং রিংয়ে আপনি লড়াই করেছিলেন তার খুব কাছেই ওর মামার বাড়ি। ওখানে লোকজন বলাবলি করেছিল, আপনি নাকি হবু ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়ন।'
শিমুল কিছুটা চমকে উঠে বুঝতে পারল, তারা তাকে ঠিকই চিনেছে। তবে তার অটোগ্রাফ দেওয়ার যোগ্যতা সম্বন্ধে সন্দিহান হয়ে সে তাকিয়েই রইল মেয়েটার দিকে। শিমুল চুপ করে আছে দেখে ভদ্রলোক বললেন, 'দিন না একটা অটোগ্রাফ। ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়ন হলে আপনাকে তখন তো এত সহজে কাছে পাব না।' ভদ্রলোকের কথাগুলো এবার মনে হয় কানে গেল শিমুলের কাছাকাছি বসে থাকা সেই ছেলেগুলোর। ওরা ফিরে তাকাল তার দিকে। অস্বস্তিতে পড়ে গেল সে। মেয়েটার হাত থেকে খাতা-পেন নিয়ে তাড়াতাড়ি নাম সই করে সেটা আবার তাকে ফেরত দিয়ে দিল। শিমুলকে 'থ্যাঙ্ক য়ু' জানিয়ে চলে গেল মেয়েটা আর তার বাবা। জীবনে প্রথম অটোগ্রাফ দিয়ে কয়েক মুহূর্তের জন্য একটা আনন্দ হল শিমুলের মনে। কিন্তু তারপরই তার মনে হল, আমি বাচ্চা মেয়েটাকে ঠকালাম না তো? যার অটোগ্রাফ ও নিল সে তো কোনও দিন ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়ন হওয়ার জন্য লড়াইতে নামবে না। বক্সিং জীবন শুরুতেই শেষ হয়ে গেছে তার। কথাটা মনে হতেই মন ভার হয়ে গেল তার।
মেয়েটা চলে যাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই মঞ্চে যিনি বলছিলেন তাঁর বত্তৃ«তা শেষ হল। তারপর শুরু হল গণপতি হাজরার সংবর্ধনা পর্ব। নীলমণি ঘোষাল তাঁর হাতে পুষ্পস্তবক তুলে দিলেন, বরেন মিত্তির গলায় পরিয়ে দিলেন উত্তরীয়, একজন ভদ্রমহিলা সুদৃশ্য সোনালি ফ্রেমে বাঁধানো মানপত্র পাঠ করার পর সেটা গণপতি হাজরার হাতে তুলে দিলেন পাকড়াশি। বেশ কয়েকবার ক্যামেরার ফ্ল্যাশ ঝলসে উঠল। পাকড়াশিকে পাশে নিয়ে মানপত্র ধরে হাসি হাসি মুখে ছবির জন্য পোজ দিলেন গণপতি হাজরা। মানপত্র প্রদান অনুষ্ঠান মিটে গেলে, পাকড়াশি ঘোষণা করলেন, 'এবার আমরা আমাদের পরম শ্রদ্ধেয়, বাঙালির গর্ব বিখ্যাত বক্সার শ্রীগণপতি হাজরাকে কিছু বলার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছি।'
গণপতিবাবু মাইকের সামনে এসে দাঁড়ালেন। একটু কেশে নিয়ে গণপতি হাজরা গম্ভীরভাবে বত্তৃ«তা শুরু করলেন—'বন্ধুগণ, আপনারা যে আমাকে সংবর্ধনা দিলেন তার জন্য কৃতজ্ঞতা জানাই। আমি ভালো বক্তা নই। বত্তৃ«তা-টত্তৃ«তা আমার ঠিক ভালো আসে না। জীবনের বেশিরভাগ সময় বক্সিং রিঙে সময় কাটিয়েছি। বক্সিং-ই ছিল আমার ধ্যান জ্ঞান, জীবনের একমাত্র সাধনা। কাজেই বত্তৃ«তা দেওয়া বা অন্য কিছু শেখার সুযোগ আমি পাইনি। যাই হোক, সারা জীবনে সংবর্ধনা আমি অনেক পেয়েছি। সত্যি কথা বলতে কি, প্রায়ই সংবর্ধনা নেওয়ার জন্য বিভিন্ন সংগঠন, বিভিন্ন জায়গা থেকে আমন্ত্রণ আসে। আমি আজকাল আর সব জায়গাতে যাই না। কিন্তু আপনাদের ব্যাপারটা আলাদা। কলকাতার এত দূরে বসেও যখন আপনারা আমার কথা ভেবেছেন তখন আমার এখানে আসা কর্তব্যের মধ্যে ছিল। তাই পাকড়াশি যখন আপনাদের অনুষ্ঠানে আসার জন্য অনুরোধ করল, তখন আমি তাকে 'না' বলতে পারলাম না। আমি আগেই বললাম, আমি ভালো বক্তা নই, তবে আমি আপনাদের বিশেষত যাঁরা খেলাধূলা করেন, তাঁদের উদ্দেশে গুটিকয় কথা বলছি—সাফল্য পেতে হলে পরিশ্রম ও সাধনার কোনও বিকল্প নেই। বিশেষ করে খেলাধুলার জগতে কঠিন পরিশ্রমই হল সাফল্যের চাবিকাঠি। চ্যাম্পিয়ন হওয়ার জন্য শর্টকাট কোনও রাস্তা নেই। যারা সে পথ খুঁজতে যায়, তারা হয় হারিয়ে যায় নয়তো কলঙ্কিত হয়। এসব ঘটনা আমি আমার খেলোয়াড় জীবনে অনেক দেখেছি। তার একটা বিশেষ ঘটনা আপনাদের বলছি। এখানে যাঁরা প্রবীণ মানুষ আছেন, তাঁদের কারও হয়তো স্মরণে থাকতে পারে সে কথা। আমি যে-বার ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়ন হই, সেবার আমার সঙ্গে চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে যে লড়তে নেমেছিল, সেও একজন বাঙালি। তার নাম ছিল—'সূ—।' না, সে কলঙ্কিত নাম এতদিন পর আর উচ্চারণ করতে চাই না। আমার ভাবতে আজও কষ্ট হয়, সে-ও একজন বাঙালি ছিল। যা-ই হোক, খুব সাধারণ মানের বক্সার ছিল ছেলেটা। বক্সিং রিংয়ে আমার সামনে দাঁড়াবার যোগ্যতা ছিল না। কিন্তু কীভাবে যেন সে ফাইনালে উঠে গিয়েছিল। নিজের যোগ্যতা অপেক্ষা উচ্চাকাঙ্ক্ষা বেশি ছিল তার, যা তার জীবনে বিপদ ডেকে আনল। চ্যাম্পিয়ন-শিপের ফাইনালে সকলের প্রত্যাশামতোই আমার ঘুষিতে নক-আউট হল সে। জ্ঞান হারাল বক্সিং রিংয়ে। তাকে পাঠানো হল হাসপাতালে। তারপরই ধরা পড়ল ব্যাপারটা। আমাকে হারাতে নিষিদ্ধ মাদক ওষুধ সেবন করে সে লড়তে নেমেছিল। এ খবর জানাজানি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার রানার্স পদক তো গেলই আর তার সঙ্গে সঙ্গে সারা জীবনের জন্য বক্সিং রিং থেকে সে বহিষ্কৃত হল। হারিয়ে গেল সে।' এই বলে একটু থেমে গণপতিবাবু বললেন, 'তাই এ প্রজন্মের খেলোয়াড়দের বলি, সাফল্য পাওয়ার লোভে, সেলিব্রিটি হওয়ার লোভে, এসব কোনও দিন করতে যাবেন না। শুধু পরিশ্রম করে যান, পরিশ্রম। তা করতে পারলে আপনিও একদিন আমার মতো সেলিব্রিটি হবেন। আর বিশেষ কিছু আমি বলব না। এই সংবর্ধনা সভার উদ্যোক্তাদের আমার ধন্যবাদ জানিয়ে আমি আমার বক্তব্য শেষ করছি।'
গণপতিবাবুর বক্তব্য শুনে একটু আশ্চর্য হল শিমুল। চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে গণপতিবাবুর প্রতিদ্বন্দ্বী যে ডোপিংয়ের দায়ে অভিযুক্ত হয়েছিল আর সে-ও যে একজন বাঙালি ছিল তা শিমুলের জানা ছিল না। বত্তৃ«তার পর নিজের আসনে বসে দর্শকাসনের দিকে তাকিয়ে কাকে যেন খুঁজতে লাগলেন গণপতিবাবু। অনুষ্ঠান সম্ভবত শেষ। সভাপতি মশাই ঘুম ভেঙে নড়েচড়ে বসেছেন। অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করার জন্য। গণপতিবাবুকে দেখে শিমুলের মনে হল তিনি তাকেই খুঁজছেন। শিমুল চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল মঞ্চের কাছে যাওয়ার জন্য। ঠিক সেই সময় তার হঠাৎ নজর গেল হলঘরের প্রবেশ মুখের দরজার দিকে। সেখানে বেশ কয়েকজন লোক দাঁড়িয়ে আছে। আর তাদের পিছনে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে সম্ভবত মঞ্চের দিকে তাকিয়ে আছে বেশ লম্বা, চাদরদমুড়ি দেওয়া একজন লোক। মুহূর্তের জন্য একবার পাশ ফিরল লোকটা। চাদরমুড়ি দেওয়া থাকলেও তাকে দেখে শিমুলের মনে হল লোকটা সম্ভবত সিংভি সাহেব। কিন্তু তিনি এখানে কেন? তিনি কি গণপতিবাবুকে নিতে এসেছেন। শিমুল ভাবল, সে একবার লোকটার কাছে গিয়ে দেখে যে সে সত্যিই সিংভি সাহেব কি না? কিন্তু শিমুল সেদিকে এগোবার আগেই লোকটা হঠাৎই মিলিয়ে গেল সে জায়গা থেকে।
ইতিমধ্যে সভাপতিমশাই এগিয়ে গেছেন মাইকের দিকে। তার পাশে পাকড়াশিও। গণপতিবাবু চেয়ার ছেড়ে উঠি উঠি করছেন। সভা শেষ হবে।
শিমুল সারবাঁধা চেয়ারের ফাঁক দিয়ে এগোল মঞ্চের দিকে। গণপতিবাবুর জিনিসগুলো তাকে নিয়ে গাড়িতে তুলতে হবে।
মাইক কিন্তু সভাপতি সাহেব ধরলেন না। ধরলেন পাকড়াশি। তিনি বললেন, 'আমাদের সভার কাজ এখনই শেষ হবে। কিন্তু আরও একটা বিশেষ কাজ আমাদের বাকি আছে। বলতে পারেন, এটা একটা বাড়তি চমক।...'
শিমুল মঞ্চের দিকে বেশ কিছুটা এগিয়ে গিয়েছিল। পাকড়াশি এরপর যা বললেন, তা শুনে শিমুলের মনে হল, কেউ যেন মেঝের সঙ্গে তার পা দুটোকে আটকে দিল। দাঁড়িয়ে পড়ল সে। পাকড়াশি বললেন, 'আমাদের শ্রদ্ধেয় অতিথি গণপতিবাবু আমাদের না জানালেও একটা বিশেষ খবর আমরা জানতে পেরেছি। গণপতিবাবুর সঙ্গী হিসাবে যিনি এসেছেন, তিনিও কিন্তু খুব একটা সাধারণ মানুষ নন। আমাদের খুদে এক সঙ্গী তাঁকে ঠিক চিনে ফেলেছে। তিনি বক্সিং-এ এবারের কলকাতা চ্যাম্পিয়ন!' আমরা তাঁকেও পুষ্পস্তবক দিয়ে সংবর্ধনা জানাতে চাই। মাননীয় শিমুলবাবু দয়া করে আপনি একবার মঞ্চে আসুন।'
ব্যাপারটাতে গণপতিবাবুর প্রতিক্রিয়া কী হবে তা অনুমান করে আতঙ্কে যেন পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যেতে লাগল শিমুলের। মুহূর্তের মধ্যেই সে ভেবে নিল, সে হলঘরের বাইরে চলে যাবে। কিন্তু সেদিকে যাওয়া হল না। পাকড়াশি দেখে ফেলেছেন তাকে। পাকড়াশি তার উদ্দেশে বললেন, 'দাঁড়ালেন কেন, এগিয়ে আসুন, এগিয়ে আসুন—।' পাকড়াশির দৃষ্টি অনুসরণ করে সবাই এবার তাকাল শিমুলের দিকে। কেউ কেউ আবার হাততালিও দিতে শুরু করল। আর বাইরে পালাবার উপায় নেই তার। কোনওরকমে মঞ্চে গিয়ে উঠে মাথা নীচু করে দাঁড়াল সে। তার কয়েক হাত পিছনেই গণপতিবাবু বসে আছেন। দম বন্ধ হয়ে আসতে লাগল। কে একজন তার হাতে একটা পুষ্পস্তবক ধরিয়ে দিল। তাঁর মুখটা পর্যন্ত খেয়াল করতে পারল না শিমুল। আবার একটা হাততালির ঝড় উঠল হলে। সে শব্দ অবশ্য তার কানে গেল না। সে স্পষ্ট বুঝতে পারল, কলকাতায় ফেরার পর তার চাকরিটা আর থাকছে না। পুষ্পস্তবক নিয়ে উপস্থিত লোকজনের উদ্দেশ্যে প্রণাম জানিয়ে মুহূর্তের জন্য শিমুল আড়চোখে তাকাল গণপতিবাবুর দিকে। সে দেখল গণপতিবাবু চোয়াল শক্ত করে ছাদের দিকে তাকিয়ে আছেন। কাছেই দাঁড়ানো একজন লোকের হাতে পুষ্পস্তবকটা ধরিয়ে দিয়ে শিমুল মঞ্চ থেকে নেমে এক কোনায় গিয়ে দাঁড়াল।
সভাপতি উপস্থিত সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে সভা শেষ ঘোষণা করলেন। গণপতিবাবু মঞ্চ থেকে গম্ভীর মুখে নীচে নামলেন।
পাকড়াশি তাঁকে বললেন, 'এবার আপনাকে একটু অন্য ঘরে যেতে হবে। সামান্য কিছু জলযোগের ব্যবস্থা করেছি আপনাদের জন্য।'
গণপতিবাবু গম্ভীর মুখে বললেন, 'না, আমার হাতে আর সময় নেই। আমি আর এখানে এক মুহূর্ত দাঁড়াব না। কিছু দেবার থাকলে তা গাড়িতে উঠিয়ে দাও। না দিলেও ক্ষতি নেই। আর একটা কথা, ক্রীড়া দপ্তরে বক্সিং গ্লাভস সরবরাহের যে বরাতটা তোমার পাবার কথা ছিল, সেটা তুমি আর পাচ্ছ না। দিল্লি আমাকে জানিয়ে দিয়েছে তোমার মালের কোয়ালিটি খারাপ। এ ব্যাপার নিয়ে টেলিফোনে আমাকে তুমি আর বিরক্ত কোরো না। বেশ রুঢ়ভাবে গণপতিবাবু শেষের কথাগুলো বললেন। শিমুল এবার এগোল গণপতিবাবুর দিকে। পাকড়াশি পাংশুমুখে কী যেন বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু তার আর কোনও কথা বলা হল না। শিমুলকে দেখতে পেয়ে তার থেকে ছোঁ মেরে ব্যাগটা ছিনিয়ে নিলেন তিনি। তারপর হাঁটা দিলেন ঘর ছেড়ে বাইরে যাবার জন্য। একদল ছেলেমেয়ে একবার তার পথ আটকালো অটোগ্রাফ নেওয়ার জন্য। গণপতিবাবু 'নো অটোগ্রাফ, নো অটোগ্রাফ' বলে তাদের সরিয়ে দরজার দিকে এগোলেন। শিমুল তাঁকে অনুসরণ করল।
গণপতিবাবু হল ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এলেন। তাঁর পিছনে শিমুল। পাকড়াশি ও আরও কয়েকজন লোক গণপতিবাবুকে দেওয়া মানপত্র, পুষ্পস্তবক, মিষ্টির প্যাকেট ইত্যাদি তাঁর গাড়িতে তুলে দিয়ে এলেন। গাড়ির কাছে পৌঁছে গণপতিবাবু নিজেই দরজা খুলে ড্রাইভারের পাশের আসনে বসলেন। পাকড়াশি শিমুলের হাতে গণপতিবাবুর জিনিসগুলো ধরিয়ে দেওয়ার পর, সে গাড়িতে উঠে বসল। গণপতিবাবু তাঁর দরজা বন্ধ করে গাড়ির কাঁচ ওঠাতে যেতেই পাকড়াশি গাড়ির জানলায় মুখ বাড়িয়ে অপরাধীর মতো বললেন, আমার কোনো অপরাধ হলে তা অজান্তে হয়েছে। দয়া করে ক্ষমা করে দেবেন। আমার বরাতের ব্যাপারটা একটু দেখবেন। আপনার হাতেই তো সব। নইলে অনেক ক্ষতি হয়ে যাবে আমার।'
গণপতিবাবু শুধু তাঁর উদ্দেশ্যে বললেন, 'তোমার বোঝা উচিত ছিল, রেসের ঘোড়া আর মোট বওয়া গাথা এক গামলায় জল খায় না।'
এ কথার মাধ্যমে গণপতিবাবু কী বললেন তা শিমুলের বুঝতে অসুবিধা হল না গাড়ির কাচ উঠিয়ে দিলেন গণপতিবাবু। কয়েক মিনিটের মধ্যেই বড় রাস্তা ধরে বাড়ি ফেরার জন্য গাড়ি ছুটতে শুরু করল।
সারা পথ গাড়িতে একটাও কথা বললেন না গণপতিবাবু। শিমুলরা বাড়িটাতে ফিরে যখন গাড়ি থেকে নামল তখন সাড়ে আটটা বাজে। বারান্দায় উঠে ব্লেজারের পকেট থেকে চাবি বার করে তালা খুলে নিজের ঘরে ঢুকলেন গণপতিবাবু। তাঁর ঘরে আলো জ্বালিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। শিমুল গণপতিবাবুর জিনিসপত্র হাতে নিয়ে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে একটু ভয় ভয় গলায় বলল, 'স্যার এগুলো কোথায় রাখব?' গণপতিবাবু দরজার সামনে এগিয়ে এসে তার হাত থেকে জিনিসগুলো নিয়ে গম্ভীরভাবে বললেন, চাপরাশিটা এলে বলে দিও, আমি আজ রাতের খাবার খাব না। ও যেন অযথা আমার দরজায় টোকা দিয়ে আমাকে বিরক্ত না করে।' এই বলে শিমুলের মুখের ওপর বেশ জোরে শব্দ করে দরজা বন্ধ করে দিলেন তিনি। শিমুল নিজের ঘরে না ঢুকে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ইসমাইলের প্রতীক্ষা করতে লাগল।
সকাল আটটা নাগাদ বারান্দাতে গম্ভীরমুখে বসেছিলেন গণপতিবাবু। শিমুলদের চা-জলখাবার সারা হয়ে গেছে। গণপতিবাবু একটু আগেই বারান্দাতে এসে বসেছেন। এখনও পর্যন্ত তিনি শিমুলের সঙ্গে কোনও কথা বলেননি। শিমুল ভেবেছিল, গতকাল গাড়িতে ফেরার সময় বা এখানে ফিরে গণপতিবাবুর বাক্যবাণে জর্জরিত হতে হবে। কিন্তু গণপতিবাবু তাকে কিছু না বলায় বেশ একটু আশ্চর্য হয়েছে সে। শিমুল বারান্দায় দাঁড়িয়ে মাঝে মাঝে আড়চোখে তাকাচ্ছিল চেয়ারে বসা গণপতিবাবুর দিকে। বাগানের দিকে তাকিয়ে কী যেন গম্ভীরভাবে ভাবছেন গণপতিবাবু। বেশ কিছুক্ষণ ধরে বাগানে চোখ রাখার পর হঠাৎ শিমুলের দিকে তাকালেন তিনি। শিমুলের সঙ্গে তাঁর চোখাচোখি হতেই তিনি ইশারাতে তাকে কাছে ডাকলেন। শিমুল ভাবল, তাহলে এবার শুরু হবে। সে তাঁর কাছে গিয়ে মাথা নীচু করে দাঁড়াল। কিন্তু, গণপতিবাবু গতকালের প্রসঙ্গ উত্থাপন করলেন না। গলা খাদে নামিয়ে গম্ভীরভাবে তিনি তাকে বললেন, 'এ বাড়িতে যে কেঠো পা-অলা চাপরাশিটা থাকে তার চালচলন বেশ সন্দেহজনক। ও যখনই আমার ঘরে ঢোকে তখনই লক্ষ্য করার চেষ্টা করে যে আমি কী করছি। তাছাড়া আমি বারান্দাতে বসলেও মাঝে মাঝে বারান্দার শেষ মাথার ওই থামের আড়াল থেকে উঁকি মারে। আমার ঘরে অনেক দামি জিনিস আছে। গতকাল আমি ঘরে তালা দিয়ে গিয়েছিলাম ঠিকই, কিন্তু আমার কেন যেন মনে হচ্ছে, আমার অবর্তমানে ঘরে কেউ ঢুকেছিল। যদিও ব্যাপারটা আমার মনের ভুলও হতে পারে, তবুও আমার ঘর আর ওই লোকটার ওপর নজর রাখো।' একটানা কথাগুলো বলে থামলেন তিনি।
শিমুল তাঁর কথা শুনে একটু আশ্চর্য হয়ে বলল, 'ঠিক আছে স্যার, খেয়াল রাখব।'
গণপতিবাবু এবার যেন নিজের মনেই বললেন, 'এ লোকটাকে কি আমি আগে কোথাও...।' বাক্যটা আর শেষ করলেন না তিনি। গেটের মুখে গাড়ির শব্দ পেয়ে কথা থামিয়ে সেদিকে তাকালেন। শিমুল সেদিকে তাকিয়ে দেখল সিংভি সাহেবের গাড়ি কম্পাউন্ডে প্রবেশ করছে। গণপতিবাবু শিমুলকে এরপর শুধু বললেন, 'কথাটা মনে থাকে যেন!' তারপর হাত নেড়ে তাঁর কাছ থেকে সরে যেতে বললেন।
সিংভি সাহেব গাড়ি থেকে নেমে সোজা বারান্দায় উঠে এসে গণপতিবাবুর কাছে এগিয়ে গিয়ে বললেন, 'গুডমর্নিং মিস্টার হাজরা।'
গণপতিবাবুও প্রতিসম্ভাষণ জানালেন। একটা চেয়ার টেনে গণপতিবাবুর মুখোমুখি বসে সিংভি সাহেব বললেন, 'কাল আপনার সংবর্ধনা সভা কেমন হল?'
গণপতিবাবু এ প্রশ্নের জবাব না দিয়ে প্রশ্ন করলেন, 'শুটিংয়ের অংশটা কবে হবে বলুন তো? কলকাতায় অনেক জরুরি কাজ ফেলে এসেছি। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমার ফেরা দরকার।'
সিংভি সাহেব চোখের সানগ্লাসটা একটু ঠিক করে নিয়ে বললেন, 'হ্যাঁ, সে কথাই আপনাকে বলতে এলাম। সব ঠিক হয়ে গেছে। আজ সন্ধ্যায় আমরা বাই কার, এখান থেকে অযোধ্যা যাব। ওখানে একটা বক্সি রিংয়ে শুটিং হবে। কাল সকালেই কাজ শেষ হয়ে যাবে। ইচ্ছা করলে কাল রাতের ট্রেন ধরতে পারবেন আপনি। আমি টিকিটের ব্যবস্থা করে দেব।'
গণপতিবাবু শুনে বললেন, 'কেন, অযোধ্যা কেন? এখানেও তো নিশ্চয়ই বক্সিং রিং আছে?' সিংভি জবাব দিলেন, 'তা আছে। কিন্তু সেসবই পাবলিকপ্লেসে। এখানে শুটিং করলে আমার ভাইরাল কোম্পানির কাছে সে খবর পৌঁছে যাবে। কাজেই সেটা করা যাবে না।'
গণপতিবাবু তাঁর কথায় বললেন, 'ঠিক আছে তাহলে সে ব্যবস্থাই করুন। আর কাল রাতে কলকাতার ট্রেনের টিকিটের ব্যবস্থাও করবেন।'
সিংভি সাহেব ঘাড় নেড়ে বললেন, 'চিন্তা করবেন না হয়ে যাবে।'
এরপর কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে গণপতিবাবু সিংভি সাহেবকে হঠাৎ প্রশ্ন করলেন, 'আচ্ছা, আপনার এ বাড়িতে যে চাপরাশিটা থাকে, সে কি বরাবর এখানেই থাকে?'
সিংভি সাহেব প্রশ্ন শুনে কিছুটা যেন অবাক হয়ে বললেন, 'কেন বলুন তো?'
গণপতিবাবু জবাব দিলেন, 'না, মানে, ওকে যেন আগে কোথাও দেখেছি বলে মনে হয়!'
সিংভি সাহেব এবার হেসে বললেন, 'না, ওকে আগে আপনার পক্ষে অন্য কোথাও দেখা সম্ভব নয়। আমার পদবি তো সিংভি, আমি আদতে গুজরাটের বাসিন্দা ছিলাম। গুজরাটে আমার গ্রামের কাছেই ওর বাড়ি। আমি এ বাড়ির লিজ নেওয়ার পর কিছুদিন হল ও সেখান থেকে এখানে এসেছে। আমি ওকে আনিয়েছি। ও এখানে আসার আগে কোনওদিন গ্রামের বাইরে পা রাখেনি। লক্ষ্নৌও এখনও চিনে ওঠেনি ও।' কথাগুলো বলার পর সিংভি সাহেব চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, 'ওর প্রসঙ্গ তুলে ভালো করেছেন। রাতের খাবারটা ওকে প্যাক করে সন্ধ্যায় রেডি রাখতে হবে। কথাটা ওকে বলে আসি। অযোধ্যা এখান থেকে ঘণ্টা তিনেকের রাস্তা। ছ-টায় রওনা দিলে অন রোড ন-টায় পৌঁছে যাব সেখানে। তারপর ডিনার করব।' কথাগুলো বলে ইসমাইলের খোঁজে বারান্দার অন্যপ্রান্তে পা বাড়ালেন সিংভি সাহেব।
সিংভি সাহেব চলে যাওয়ার পর মিনিট পাঁচেক চেয়ারে বসে রইলেন গণপতিবাবু। তারপর নিজের ঘরে ঢুকে দরজা দিলেন। শিমুল বারান্দায় দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগল, গণপতিবাবুর হঠাৎ ইসমাইলের ওপর সন্দেহ জাগল কেন? সত্যিই কি সে গণপতিবাবুর ওপর নজর রাখছে? গণপতিবাবু ব্যাপারটা সিরিয়াসলি ভাবছেন, নইলে তিনি সিংভি সাহেবকে ইসমাইলের সম্বন্ধে জিগ্যেস করতেন না। ইসমাইলের আচরণে তেমন কোনও অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করেনি শিমুল। লোকটা এমনিতে কোনও কথা বলে না এই যা! সে তো অনেকেই অপ্রয়োজনে কথা বলে না। এ সব কথা শিমুল বারান্দায় দাঁড়িয়ে চিন্তা করছিল, এমন সময় গণপতিবাবুর দরজাটা আবার একটু ফাঁক হল। ভিতর থেকে গলা বাড়িয়ে গণপতিবাবু বললেন, 'দেখো, গরমজলের ব্যবস্থা হয় কি না? ঠান্ডা জলে দাড়ি কামাতে অসুবিধা হচ্ছে।'
শিমুল বলল, 'দেখছি স্যার।'
শিমুল রান্না ঘরের দিকে যায়নি। ইসমাইল বারান্দায় যে প্রান্ত থেকে খাবার নিয়ে আসে ও ঘরটা সেদিকে হবে অনুমান করে এগোল সেদিকে। বারান্দার শেষপ্রান্তে উপস্থিত হয়ে বাড়ির পিছন দিকে বাঁক নিতেই চোখে পড়ল একটা ঘর। তার দরজার পাল্লা ভিতর থেকে বন্ধ। শিমুল সেই দরজার কাছে দাঁড়াতেই ভিতর থেকে কথা-বার্তার শব্দ শোনা গেল। একজন হিন্দিতে বলল, 'এ দিনটার জন্য আমি বহুদিন অপেক্ষা করে আছি।' অপর জন তার কথায় সায় দিয়ে বলল, 'হ্যাঁ, আমিও অপেক্ষায় আছি।' কণ্ঠস্বর দুটো শিমুলের অপরিচিত। সম্ভবত ইসমাইলের সঙ্গে অন্য কারও কথা হচ্ছে। আড়ি পেতে অন্য লোকেদের আলোচনা শোনার অভ্যাস নেই শিমুলের। সে দরজায় টোকা দিল। সঙ্গে সঙ্গে ভিতরের কথাবার্তা বন্ধ হয়ে গেল। আর তার পরই দরজা খুলে দাঁড়ালেন সিংভি সাহেব। তাহলে তিনিও ছিলেন। একটু অবাক হল শিমুল। সে সিংভি সাহেবকে বললেন, 'স্যারের দাড়ি কামাবার গরমজল লাগবে। কথাটা আপনার লোককে বলতে এলাম।'
সিংভি সাহেব মৃদু হেসে বললেন, 'ঠিক আছে তুমি যাও। আমি পাঠিয়ে দিচ্ছি।'
মিনিট পাঁচেক পর ইসমাইল যখন জল নিয়ে এল তখন শিমুল বারান্দায় দাঁড়িয়ে। গণপতিবাবুর ঘরে জল দিয়ে যাওয়ার সময় শিমুল ভালো করে লক্ষ্য করল ইসমাইলকে। কিন্তু তার হাবভাবে সন্দেহজনক কিছু চোখে পড়ল না শিমুলের। গণপতিবাবু সম্ভবত তাকে মিছিমিছি সন্দেহ করছেন। কিছুক্ষণের মধ্যে সিংভি আবার বারান্দায় এলেন। তিনি শিমুলকে বললেন, 'আমি এখন বাইরে যাচ্ছি। শুটিং ইউনিটের অন্য লোকজন দুপুরবেলায়ই অযোধ্যা রওনা হচ্ছে। সে কাজেই যেতে হবে।'
এর কিছুক্ষণের মধ্যেই সিংভি সাহেব তাঁর গাড়িতে উঠে বেরিয়ে গেল। তিনি চলে যাওয়ার পর বাড়িটা কেমন যেন নিঝুম হয়ে গেল। গণপতিবাবুও আর দরজা খুললেন না। দুপুর পর্যন্ত শিমুল কখনও বা ঘরে শুয়ে বসে, কখনও বা বারান্দায় দাঁড়িয়ে সময় কাটিয়ে দিল। স্নান সারার পর ইসমাইল এল খাবার দিতে। খাওয়া সেরে বেলা একটা নাগাদ শিমুল শুয়ে পড়ল।
সাড়ে তিনটেতে ঘুম ভাঙল শিমুলের। ঘুম ভেঙে বিছানাতে আর শুয়ে থাকতে ইচ্ছা হল না। বারান্দাতে এসে দাঁড়াল সে। গণপতিবাবুর দরজা আগের মতোই বন্ধ। বাগানে সিংভি সাহেবের গাড়ি দাঁড়িয়ে। অর্থাৎ তিনি ফিরে এসেছেন। হঠাৎ বাড়ির পিছন দিকে একটা পাখির কর্কশ ডাক বেশ কয়েকবার কানে এল। ডাকটা চিনতে পারল শিমুল—'ময়ূরের!' তাকে দেখার জন্য শিমুল বারান্দা থেকে এগোল বাড়ির পিছন দিকে। কিন্তু সেখানে গিয়ে বাগানের দিকে তাকিয়ে পাখিটাকে দেখতে পেল না সে। ফিরে আসতে যাচ্ছিল সে। কিন্তু সিংভি সাহেবের গলা কানে এল—'তুমি যাকে খুঁজছ সে, তুমি এখানে এসে দাঁড়াবার ঠিক আগের মুহূর্তে প্রাচীর টপকে বাইরে চলে গেল।' তাঁর গলা শুনে তাকাতেই শিমুল দেখতে পেল বাড়ির পিছন অংশে দোতলার বারান্দা মতো একটা জায়গাতে দাঁড়িয়ে আছেন সিংভি সাহেব।
শিমুল তাঁর দিকে তাকাতেই তিনি প্রশ্ন করলেন, 'তোমার স্যার কি ঘুমোচ্ছেন?'
শিমুল জবাব দিল, 'হ্যাঁ, তাই মনে হয়। দরজা তো বন্ধ দেখে এলাম।'
সিংভি সাহেব এরপর বললেন, 'তোমার ডান পাশে লোহার ঘোরানো যে সিঁড়িটা আছে, ওটা দিয়ে ওপরে এসো। তোমার সঙ্গে কথা বলব।'
শিমুল সম্মতিসূচক ঘাড় নেড়ে এগোল সিঁড়ির দিকে। সিংভি সাহেব বারান্দা ছেড়ে দোতলার ভিতর অদৃশ্য হয়ে গেলেন।
শিমুল দোতলায় উঠে এল। তাকে দেখে একঝাঁক পায়রা ভয় পেয়ে ডানা ঝাপটে উড়ে গেল। দোতলাটা অপরিচ্ছন্ন। সারাজায়গায় পায়রার পালক, বিষ্ঠা আর পালকে ভর্তি। ছাদের কড়ি-বরগা, ফাঁকফোকরে বসে আছে পায়রার ঝাঁক। বোঝা যাচ্ছে দোতলাতে তাদের একচেটিয়া আধিপত্য। দোতলার লম্বা বারান্দায় এক পাশে সার সার তালা বন্ধ ঘর। সে সব ঘরে বহুদিন কেউ থাকে বলে মনে হয় না। মাকড়সা জাল বুনেছে দরজা জানলায়। বারান্দার শেষপ্রান্তে একটা ঘরের ভিতর থেকে মাথা বাড়িয়ে সিংভি সাহেব বললেন, 'এ ঘরে চলে এসো—।'
শিমুল ধুলোবালি মাড়িয়ে বারান্দার শেষ প্রান্তে সেই ঘরে গিয়ে ঢুকল। তবে ঘরটা পরিষ্কার। বেশ লম্বা ঘরে একটা খাট আর গোটা দুই চেয়ার ছাড়া তেমন আসবাবপত্র নেই।
একটা চেয়ারে বসে ছিলেন সিংভি সাহেব। তাঁর অনুরোধে শিমুল মুখোমুখি একটা চেয়ারে বসার পর তিনি বললেন, 'তোমাকে একটা কথা বলব ভাবছি। কিন্তু বলাটা উচিত হবে কিনা তা ঠিক বুঝতে পারছি না!'
শিমুল অবাক হয়ে বলল, 'কী কথা?'
সিংভি সাহেব একটু ইতস্তত করে বললেন, 'তোমাকে আমি যদি একটা চাকরি দিই, তুমি করবে সেটা? না, তোমাকে আমার পিছন পিছন ঘুরে বেড়াতে হবে না। আসলে কলকাতায় ব্যবসা ছড়াতে চাই আমি। তার জন্য বিশ্বস্ত লোকের প্রয়োজন। তোমাকে ভালো লেগেছে আমার। না, তেমন কিছু চাপ পড়বে না তোমার। তবে তোমাকে এটুকু বলি যে কাজটা করে সংসার চালিয়ে আবার বক্সিং রিংয়ে নামতে পারবে তুমি।'
শিমুল বেশ আশ্চর্য হল সিংভিসাহেবের কথা শুনে।
তিনি এরপর বললেন, 'যদিও তুমি এখন গণপতিবাবুর কর্মচারী। অন্যের কর্মচারীকে ভাঙিয়ে নেওয়া কতটা নীতিসম্মত তা আমার জানা নেই। তবে আমাদের ব্যবসায়ী মহলে এ ঘটনা কিন্তু হামেশাই ঘটে। তুমি চাকরিটা নিলে সম্ভবত দুজনেই উপকৃত হব। এ বছর হয়তো হবে না, কিন্তু চেষ্টা করলে সামনের বছর ন্যাশনালের লড়াইতে নিশ্চয়ই তুমি নামতে পারবে।' একটানা কথাগুলো বলে শিমুলের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন সিংভি সাহেব। তাঁর প্রস্তাব শুনে কী বলা উচিত তা ঠিক বুঝে উঠতে পারল না শিমুল। যদিও সংবর্ধনা সভা থেকে ফেরার পর গণপতিবাবু শিমুলকে গালমন্দ করেনি, তবুও কলকাতায় ফিরে তিনি তাকে চাকরিতে রাখবেন কিনা, সে বিষয়ে তার যথেষ্ট সন্দেহ আছে।
শিমুলের নিজের কোনও টেলিফোন নেই। সে বিশুদার মোবাইল নম্বর আর নিজের ঠিকানাটা বলল সিংভি সাহেবকে। তিনি তাঁর পকেটবুকে লিখে নিলেন সেগুলো। সিংভি সাহেবের ঘরের দেওয়ালে দুটো বাঁধানো ফোটোগ্রাফ ঝুলছে। শিমুলের হঠাৎই এরপর চোখ গেল সেদিকে। বেশ কিছুটা দূর থেকে দেখলেও তার মধ্যে একটা ছবির মানুষটাকে যেন চেনা বলে মনে হল শিমুলের। চেয়ার থেকে উঠে কৌতূহলবশত সে গিয়ে দাঁড়াল ছবির সামনে। সেই ছবিটা বেশ পুরোনো। ছবির মানুষটাকে সত্যি চিনতে পারল সে। আর তার সঙ্গে সঙ্গে সিংভি সাহেবের ঘরে এই ছবি দেখে বেশ কিছুটা অবাকও হল। সিংভি সাহেবও উঠে এসে শিমুলের পাশে দাঁড়ালেন। শিমুল তাঁর দিকে তাকাতেই তিনি প্রশ্ন করলেন, 'এ ছবি কার তুমি বলতে পারবে?'
শিমুল বলল, 'হ্যাঁ, পারব। ওনার ছবি আমি দেখেছি। উনি হলেন, পি এল রায়। যাঁকে বলা হয়—ফাউন্ডার অফ ইন্ডিয়ান বক্সিং।
কিন্তু ওনার ছবি এখানে?
শিমুলের প্রশ্ন শুনে সিংভি সাহেব হেসে বললেন, 'আমি যখন রিংয়ে বক্সিং দেখতে যেতাম তখন আমাকে এ ছবি একজন প্রেজেন্ট করেছিল। প্রিন্টেড নয়, অরিজিনাল ফোটোগ্রাফ। আমার ফ্ল্যাটে বহু বছর টাঙানো ছিল। এ ঘরে আমি মাঝে মাঝে এসে ইদানীং থাকি। তাই এখন এখানে এনে রেখেছি!'
এরপর একটু থেমে সিংভি সাহেব মৃদু হেসে বললেন, 'ভাবছি এ ছবিটা তোমার স্যারকে প্রেজেন্ট করব। তাঁর মতো ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নের ড্রইংরুমে এ ছবি বেশি ভালো মানাবে।'
শিমুল সিংভি সাহেবের কথায় কোনও মন্তব্য করল না। এরপর তার চোখ গেল তার পাশের ছবির মানুষটার দিকে। তাকে চিনতে না পেরে শিমুল বলল, 'ইনি কে?'
সিংভি সাহেব যেন সামান্য একটু ভেবে নিয়ে জবাব দিলেন, 'ওনাকে তোমার চেনার কথা নয়। উনি সে অর্থে কোনও বিখ্যাত লোক না হলেও আমার কাছে দেবতার মতো ছিলেন। একদিন যখন আমি দেশ ছেড়ে এসে সহায়-সম্বলহীনভাবে, না খেয়ে লক্ষ্নৌর রাস্তায় রাস্তায় ভিখারির মতো ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম, তখন উনি আমাকে রাস্তা থেকে তুলে এনে নিজের বাড়িতে আশ্রয় দেন। আজ আমি যতটুকু হতে পেরেছি তা বলতে পারো সবই ওঁর দয়ায়।'
শিমুল প্রশ্ন করল, 'আপনি দেশ ছেড়ে লক্ষ্নৌ এসেছিলেন কেন?'
শিমুলের প্রশ্নের উত্তরে কিছু যেন বলতে গিয়েও চুপ করে গেলেন সিংভি সাহেব। তারপর রিস্টওয়াচের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'চলো এবার নীচে যাওয়া যাক। আমাকে এখন বাইরে গিয়ে কাজ সেরে আসতে হবে। ঠিক ছ-টায় অযোধ্যা যাওয়ার জন্য বেরব আমরা।'
শিমুলরা নীচে নেমে এল। শিমুল এগোল তার ঘরের দিকে, আর সিংভি সাহেব তাঁর গাড়ির দিকে। কম্পাউন্ড ছেড়ে বেরিয়ে গেল সিংভি সাহেবের ব্ল্যাক স্করপিও।
ঠিক সন্ধে ছ'টাতেই সিংভি সাহেবের গাড়িতে বাড়ি ছেড়ে বেরল শিমুলরা। ড্রাইভারের পিছনের সিটে পাশাপাশি গণপতিবাবু আর সিংভি সাহেব। তাদের পিছনে শিমুল। শিমুলদের গাড়ি কিছু সময়ের মধ্যেই লক্ষ্নৌ শহরের সীমানা অতিক্রম করে একটা হাইওয়ে ধরল। আলোকোজ্জ্বল লক্ষ্নৌ শহরের আলোকমালা বিন্দুর মতো হতে হতে এক সময় মিলিয়ে গেল। চারপাশে অন্ধকার, গাড়ির জানলা দিয়ে ঠান্ডা বাতাস ঢুকছে। হেডলাইটের আলোয় অন্ধকার ভেদ করে এগিয়ে চলল গাড়ি।
শিমুলের আজ সকাল থেকেই কেমন যেন চিন্তিত মনে হয়েছে গণপতিবাবুকে। সারা দিন তিনি ঘরের বাইরে আসেননি। ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গাড়িতে ওঠার সময় বিশেষ কথাটাও বলেননি। বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইলেন তিনি। এক সময় সিংভি সাহেব বললেন, 'বেশ ঠান্ডা ঢুকছে, কাচ উঠিয়ে দিচ্ছি।'
গণপতিবাবু কোনও মন্তব্য করলেন না, শুধু তার কনুইটা জানালা থেকে নামিয়ে নিলেন। কালো কাঁচ উঠিয়ে নিতেই গাড়ির ভেতর অন্ধকার নেমে এল। ফাঁকা হাইওয়ে দিয়ে ছুটে চলেছে গাড়ি। মাঝে মাঝে শুধু উল্টোদিক থেকে লরির হেডলাইটের আলো ছুটে এসে পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। সে সময় ক্ষণিকের জন্য আলোকিত হচ্ছে শিমুলদের গাড়ির ভিতরটাও। সেই আলোতে শিমুলের মনে হল গণপতিবাবু আর সিংভি সাহেব দুজনেই যেন গভীর চিন্তামগ্ন। কেউ কোনও কথা বলছে না। ড্রাইভার শক্ত হাতে স্টিয়ারিং ধরে তাকিয়ে আছে সামনের দিকে। চুপচাপ বসে থাকতে থাকতে শিমুলের এক সময় হাই উঠল। তারপর আস্তে আস্তে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়ল সে। সারাটা পথে একবার মাত্র শিমুলের ঘুম ভাঙল কয়েক মিনিটের জন্য। সে সময় গাড়ির হেডলাইটে রাস্তার পাশে মুহূর্তের জন্য একটা মাইলস্টোন চোখে পড়ল তার। তাতে লেখা 'কানপুর ৪০ কিমি।' অযোধ্যা কি কানপুরের পথে? এ অঞ্চলের ভূগোলটা ঠিক জানা নেই শিমুলের। হেসে একবার তাকাল সামনের সিটের দিকে। গণপতিবাবুর মাথাটা বুকের কাছে ঝোঁকা। তবে তিনি ঘুমিয়ে পড়েছেন কিনা তা ঠিক বুঝতে পারল না শিমুল। তবে সিংভি সাহেব ঘাড় সোজা করে সামনের দিকে তাকিয়ে আছেন। এরপর শিমুল আবার ঘুমিয়ে পড়ল।
ড্রাইভারের মৃদু ধাক্কাতে যখন ঘুম ভাঙল শিমুলের, তখন বুঝতে পারল গাড়ি থেমে গেছে। দরজা খুলে সিংভি সাহেব নীচে নামছেন। ঘড়ির কাঁটা ন'টা ছুঁই ছুঁই! রিস্টওয়াচের দিকে তাকিয়ে শিমুল বুঝতে পারল, সম্ভবত তারা পৌঁছে গেছে! গাড়ির কালো কাচের ভিতর দিয়ে বাইরে কিছু দেখা যাচ্ছে না। সিংভি সাহেবের পর কাঁধে চামড়ার ব্যাগ নিয়ে গণপতিবাবু নামলেন।
শিমুল এরপর মালপত্র নিয়ে দরজা খুলে নীচে নেমে পড়ল। চারপাশে তাকাল শিমুল। কম্পাউন্ডহীন একটা পুরোনো দোতলা বাড়ির সামনে গাড়িটা দাঁড়িয়েছে। বাড়ির এক পাশে একটা ফাঁকা মাঠ। তার অপর প্রান্তে চাঁদের আলোতে দাঁড়িয়ে আছে উঁচু দেওয়ালের মাথায় লম্বা টিনের শেডওয়ালা একটা বাড়ি। দূর থেকে কেমন যেন ভৌতিক লাগছে তাকে! শিমুলের মনে হল, ওটা কোনও পরিত্যক্ত কারখানা বা গোডাউন গোছের কিছু হবে। গাড়ি থেকে সকলে নামার পর গণপতিবাবু সিংভি সাহেবকে বললেন, 'এ কোথায় আনলেন আপনি? এ জায়গাতে কোনও লোকজন আছে বলে তো মনে হচ্ছে না! শেষে কোনও গুন্ডা-বদমাইশের পাল্লায় পড়ব না তো? এমনিতেই তো কাগজে যা পড়ি তাতে বহুদিন ধরে অযোধ্যা গণ্ডগোলের জায়গা ধর্মটর্ম নিয়ে গণ্ডগোল লেগে থাকে!'
সিংভি সাহেব বললেন, 'না, না, এ সব ব্যাপার নিয়ে চিন্তা করবেন না। এ জায়গাটা শহরের একটু বাইরের দিকে। তাই এমন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে।' গণপতিবাবু প্রশ্ন করলেন, 'তা, এখানে বক্সিং রিং কোথায়?'
সিংভি সাহেব এরপর গণপতিবাবুকে বললেন, 'চলুন এবার বাড়িতে ঢোকা যাক।' ইতিমধ্যে দোতলা বাড়ির দরজা খুলে বাইরে এসে দাঁড়িয়েছে কেয়ারটেকার গোছের একজন লোক। সিংভি সাহেবের পিছন পিছন গণপতিবাবু আর শিমুল পা বাড়াল বাড়ির ভিতরে যাওয়ার জন্য। বিরাট বাড়ি, তবে বেশ পুরোনো। বড় বড় গোল থামগুলো কড়ি-বরগার ছাদকে ধরে রেখেছে। দেওয়াল ও থামের জায়গায় জায়গায় পলেস্তরা খসে ইট বেরিয়ে পড়েছে। বাড়িতে ইলেকট্রিসিটি থাকলেও বাতিগুলো কেমন যেন ঘোলাটে নিষ্প্রভ। ভিতরে ঢোকার পর গণপতিবাবু সিংভি সাহেবকে প্রশ্ন করলেন, 'এ বাড়িও কি আপনি লিজ নিয়েছেন?'
সিংভি সাহেব জবাব দিলেন, 'না, লিজ নিইনি। আজ রাতে মাথা গোজার জন্য ভাড়া নিয়েছি। কাল শুটিং শেষ হলে বাড়ি ছেড়ে চলে যাব।'
এরপর একটু থেমে তিনি বললেন, 'কাল লক্ষ্নৌ থেকে রাতের ট্রেনে আপনাদের রিজার্ভেশন করেছি। এখান থেকে ফিরে রাতের ট্রেন ধীরেসুস্থে ধরতে পারবেন।'
গণপতিবাবু বললেন, 'থ্যাঙ্ক য়ু, আমার কলকাতায় ফেরার তাড়া আছে।' সিংভি সাহেব শুনে মৃদু হাসলেন, তারপর সেই কেয়ারটেকার গোছের লোকটাকে বললেন—'চলো, ঘরগুলো এবার দেখিয়ে দাও আমাদের।'
লোকটা বলল, 'আইয়ে সাব।'
পাশাপাশি যে দুটো ঘর গণপতিবাবু আর শিমুলের থাকার ব্যবস্থা হল, ঘরগুলো ভালোই। বেশ বড় বড় ঘর, ধবধবে সাদা বিছানা, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, অ্যাটাচড বাথ। তাদের দরজা পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে সিংভি সাহেব বললেন, 'আপনারা ফ্রেশ হয়ে নিন। খাবার ঘরেই পৌঁছে যাবে। আমি একটু অডিটোরিয়ামের ওখান থেকে ঘুরে আসি।' সিংভি সাহেব কেয়ারটেকারকে নিয়ে চলে গেলেন। তিনি যাওয়ার পর গণপতিবাবু তাঁর ঘরে ঢুকলেন। শিমুল তাঁর পিছনে ঘরে ঢুকে গণপতিবাবুর লাগেজ ঘরে রাখার পর গণপতিবাবু তাকে বললেন, 'অচেনা জায়গা, চোখ-কান খোলা রাখবে সব সময়। রাতে ডাকলে সঙ্গে সঙ্গে যেন সাড়া পাই। সারা রাস্তা তো ঘুমিয়ে এলে। রাতে না ঘুমলেও চলবে। লক্ষ্নৌ থেকে এরা আমাকে অযোধ্যায় টেনে আনবে জানলে আমি লক্ষ্নৌতে আসতাম না।
এরপর খাটে বসে ব্যাগ খুলে রিভলভার বার করে বালিশের তলায় রেখে তিনি শিমুলকে বললেন, 'ঠিক আছে তুমি এখন যাও।'
সে ঘর থেকে নিজের ঘরে ঢোকার পরই গণপতিবাবুর দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ শুনল শিমুল।
বাথরুমে ঢুকে হাতমুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে নিল শিমুল। লাল জ্যাকেটটা সে গায়ে চাপিয়েই এসেছিল। এখানে যেন একটু বেশি ঠান্ডা মনে হল তার। জ্যাকেটটা না খুলেই সে বিছানায় টান-টান হয়ে শুয়ে পড়ল। ঘণ্টাখানেক বাদে সিংভি সাহেবের ড্রাইভার এসে খাবারের প্যাকেট দিয়ে গেল। চিকেন বিরিয়ানি। একটু খিদে পেয়েছিল শিমুলের। সে খেতে শুরু করল। খাওয়া শেষ করে হাতমুখ ধুয়ে শিমুল যখন ঘরের সামনে বারান্দাতে এসে দাঁড়াল তখন সাড়ে ন'টা বাজে। বারান্দায় আসতেই সে দেখতে পেল সিংভি সাহেব আসছেন। তিনি আরও কাছে এসে বললেন, 'তোমার খাওয়া হয়েছে?'
শিমুল জবাব দিল, 'হ্যাঁ।'
এরপর তিনি গণপতিবাবুর দরজার দিকে তাকিয়ে বললেন, 'তোমার স্যার কি ঘুমিয়ে পড়লেন?' শিমুল সিংভি সাহেবের প্রশ্নের জবাব দেওয়ার আগেই ক্যাঁচ করে শব্দ তুলে তার ঘরের দরজা খুলে গেল গণপতিবাবু বেরিয়ে এলেন তিনি তখনও পোশাক পাল্টাননি। তাঁকে দেখে সিংভি সাহেব বললেন, 'কি খাবার খেয়েছেন তো?'
গণপতিবাবু গম্ভীরভাবে বললেন, 'হুঁ। তবে খাবার ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল।' সিংভি সাহেব বললেন, 'ও। আই অ্যাম সরি। এখানে কুকের অ্যারেজমেন্ট করতে পারলে ভালো হত। ইসমাইলকে একবার আসতে বলেছিলাম, কিন্তু সে আসতে চাইল না।'
ইসমাইল সঙ্গে আসেনি বলে সম্ভবত খুশিই হয়েছেন গণপতিবাবু। তবে তার প্রতি গণপতিবাবুর সন্দেহের কারণ এখনও বোধগম্য হয়নি শিমুলের।
গণপতিবাবু বললেন, 'ঠিক আছে। কালই তো আমরা যাচ্ছি। সে না আসায় তেমন অসুবিধে হবে না।'
সিংভি সাহেব এরপর গণপতিবাবুকে বললেন, 'আপনার এতটা পথ আসতে কষ্ট হয়েছে জানি, কিন্তু এখন আরও একটু কষ্ট করতে হবে আপনাকে। একটু শুটিং স্পটে যেতে হবে।'
গণপতিবাবু কথাটা শুনেই ভ্রু কুঁচকে বললেন, 'কেন। এত রাতে ওখানে কেন?'
সিংভি সাহেব জবাব দিলেন, 'ইনডোর শুটিং বলে এখানে লাইট-ফাইট বসিয়েছেন ডিরেক্টর সাহেব। মিনিট পাঁচেকের জন্য আপনাকে ওখানে যেতে বলেছেন ডিরেক্টর। লাইট সেটিংয়ে কী সব মেজারমেন্ট করবেন আপনাকে দাঁড় করিয়ে। টেকনিক্যাল ব্যাপার তো, ডিরেক্টর সাহেব থাকলে ব্যাপারটা ভালো করে বুঝিয়ে বলতে পারতেন। আজ তিনি লাইট-ক্যামেরা রেডি করে রাখবেন যাতে কাল দেরি না হয়। আর হ্যাঁ, আপনার মেডেলটাও উনি সঙ্গে নিতে বলেছেন।'
'কেন, মেডেল কেন?' বেশ একটু অবাক হয়ে জানতে চাইলেন গণপতিবাবু।
সিংভি সাহেব বললেন, 'কী একটা লাইট রিফ্লেকশনের ব্যাপার আছে। বললাম না, ডিরেক্টর সাহেব এ সব ব্যাপারে আপনাকে ভালো বলতে পারবেন।' গণপতিবাবু এবার স্পষ্ট অসন্তোষের স্বরে বললেন, 'ডিরেক্টর সাহেব যখন ডাকবেন তখনই কি আমাকে যেতে হবে?'
সিংভি সাহেব অসহায়ভাবে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললেন, 'আপনার কষ্ট আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু শুটিংয়ের ব্যাপারে আমি মিস্টার রাওয়ের ওপর কথা বলতে পারি না, কারণ ও ব্যাপারে তিনিই ভালো বোঝেন।'
এরপর একটু থেমে তিনি বললেন, 'তবে আপনার কষ্ট আমি পুষিয়ে দেব। আপনার তো শুধু লক্ষ্নৌতে আসার কথা ছিল। এখানে আসার জন্য আপনাকে আলাদা অনারিয়াম দেব।'
অনারিয়ামের কথা শুনে মনে হল একটু নরম হলেন গণপতিবাবু। তিনি বললেন, 'ঠিক আছে।' সিংভি সাহেব রিস্টওয়াচ দেখে বললেন, 'দশটা নাগাদ ওখানে যেতে বলেছেন ডিরেক্টর সাহেব। হাতে একটু সময় আছে। আপনি সদ্য খেয়ে উঠেছেন। আসুন, মিনিট পনেরো সোফায় বসা যাক।'
বারান্দায় একটা পুরোনো সোফা ছিল। এরপর দুজনে গিয়ে তাতে বসলেন। আলোচনা শুরু করলেন অযোধ্যার ব্যাপার-স্যাপার নিয়ে। শিমুল তার ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে রইল।
একসময় কোথায় যেন পেটা ঘড়িতে রাত দশটার শব্দ শুরু হল। সেটা শুনে সোফা ছেড়ে উঠে পড়লেন সিংভি সাহেব। গণপতিবাবুও উঠে দাঁড়ালেন, তারপর সিংভি সাহেবের উদ্দেশ্যে বললেন, 'আপনি একটু দাঁড়ান, মেডেলটা ঘর থেকে নিয়ে আসি। নেহাত আপনি রিকোয়েস্ট করছেন তাই, নইলে এই অন্ধকারে বাইরে যাওয়ার কোনও ইচ্ছা ছিল না আমার। তাছাড়া বাইরেটা কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা।'
গণপতিবাবুর কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বেশ শব্দ করে হেসে উঠলেন সিংভি সাহেব।
তাই দেখে গণপতিবাবু বলে উঠলেন, 'আপনি হাসছেন কেন?'
হাসি থামিয়ে সিংভি সাহেব বললেন, 'আপনারা বক্সার জাতটাই মনে হয় ভিতু হয়। লোকে ঠিকই বলে।'
সিংভি সাহেব জাত তুলে কথা বলায় সেটা শুনতে শিমুলেরও বেশ খারাপ লাগল। গণপতিবাবু সিংভি সাহেবকে বেশ অসন্তুষ্ট হয়ে বললেন, 'আমি যে ভিতু তা আপনি বুঝলেন কী করে?'
সিংভি সাহেব আবার হেসে বললেন, 'এই যে আপনি রাতে বাইরে যেতে চাইছেন না তাই বুঝতে পারছি। চলুন, আপনার ভয়ের কারণ নেই। তাছাড়া, আপনার বডিগার্ড তো আছেই।' এই বলে ঘরের দরজায় দাঁড়ানো শিমুলের দিকে তাকিয়ে তিনি যোগ করলেন, 'আপনি বুড়ো হয়ে গেলেও আপনার বডিগার্ড বেশ জোয়ান আছে। আশা করি ও ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নকে বাঁচাতে পারবে।'—কথাগুলো বেশ শ্লেষের সঙ্গে বললেন তিনি।
এবার আর যেন ধৈর্য ঠিক রাখা সম্ভব হল না গণপতিবাবুর। তিনি চিৎকার করে উঠলেন, 'কে বলেছে আমি ভিতু? বুড়ো হয়ে গেছি। আমাকে রক্ষা করার জন্য বডিগার্ড লাগে? ও আমার বডিগার্ড নয়, আমার ফাইফরমাশ খাটতে এসেছে। ভুলে যাবেন না গণপতি হাজরা ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়ন বক্সার। ভবিষ্যতে এ সব ব্যাপারে সমঝে কথা বলবেন।'
গণপতিবাবু উত্তেজিত হয়ে উঠেছেন দেখে সিংভি সাহেব বলে উঠলেন, 'আরে। আপনি আমার কথা সিরিয়াসলি নিলেন নাকি? আমি তো জোক করছিলাম। ঠিক আছে, মাপ করবেন আমাকে। এখন চলুন, ডিরেক্টর সাহেব ওদিকে অপেক্ষা করছেন।'
গণপতিবাবু বললেন, 'এ জাতীয় ইয়ার্কি আমি পছন্দ করি না।' তারপর অসন্তুষ্ট ভঙ্গিতে সিংভি সাহেবের দিকে তাকিয়ে নিজের ঘরে গিয়ে ঢুকলেন মেডেল নেওয়ার জন্য।
শিমুল আর গণপতিবাবুর দরজা দুটো পাশাপাশি। শিমুল নিজের ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল গণপতিবাবুর ঘরের ভেতরটা। সে দেখতে পেল গণপতিবাবু ঘরে ঢুকে প্রথমে তাঁর ব্যাগ থেকে মেডেলের বাক্সটা নিলেন, তারপর বালিশের তলা থেকে রিভলবার বার করে জামার নীচে কোমরে গুজলেন।
গণপতিবাবু ঘরের বাইরে এসে সিংভি সাহেবকে বললেন, 'এবার চলুন।' সিংভি সাহেব বললেন, 'হ্যাঁ, চলুন।'
তাঁরা পা বাড়াতেই শিমুলও তাঁদের পেছনে এগোতে যাচ্ছিল, কিন্তু সেটা বুঝতে পেরে গণপতিবাবু হঠাৎ তার দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে বললেন, 'না, তুমি এখানেই থাক। নইলে মিস্টার সিংভি আবার আমাকে ভিতু মানুষ ভাববেন।'
গণপতিবাবুর কথা শুনে আবার হেসে ফেললেন সিংভি সাহেব। গণপতিবাবু তাই দেখে একবার কটমট করে সিংভি সাহেবের দিকে তাকালেন, তারপর নিজেই হাঁটতে শুরু করলেন। বারান্দা ছেড়ে চলে গেলেন সিংভি সাহেব আর গণপতিবাবু।
তাঁরা চলে যাওয়ার পর গুটি গুটি পায়ে শিমুলও বারান্দা দিয়ে এগিয়ে সদর দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। বাইরে বেশ কুয়াশা নেমেছে। কুয়াশা মাখা চাঁদের আলোতে মাঠের শেষে দাঁড়িয়ে আছে ভুতুড়ে অডিটোরিয়ামটা। শিমুল দেখল তাঁরা দুজনে মাঠের মধ্যে দিয়ে হেঁটে চলেছেন সেদিকে। একসময় কুয়াশার চাদরের আড়ালে হারিয়ে গেলেন গণপতিবাবু আর সিংভি সাহেব।
তাঁরা অদৃশ্য হওয়ার পর শিমুলের হঠাৎ মনে হল, সিংভি সাহেব কি ইচ্ছাকৃত গণপতিবাবুকে উত্তেজিত করছেন, যাতে শিমুলকে তিনি সঙ্গে না নেন! নইলে হঠাৎ তিনি গণপতিবাবুকে ভিতু বলে ব্যঙ্গ করলেন কেন! সিংভি সাহেবের ব্যবহার যথেষ্ট মার্জিত ও রুচিসম্পন্ন। তিনি হঠাৎ ওসব বললেন কেন? তাঁকে অডিটোরিয়ামে নিয়ে যাওয়ার পেছনে সিংভি সাহেবের অন্য কোনও অভিসন্ধি নেই তো? এরপরই শিমুলের মনে হল, গণপতিবাবু যে বাইরে যেতে চাইছিলেন না তার পেছনে কি কোনও কারণ আছে! কীসের আশঙ্কায় গণপতিবাবু সঙ্গে রিভলভার এনেছেন? শিমুলকেই বা চোখ-কান কেন খোলা রাখতে বলেছেন তিনি! তার কীসেরই বা সন্দেহ ইসমাইলকে। তা হলে লক্ষ্নৌ আসার পর কী কোনও কারণে সত্যি ভয় পাচ্ছেন তিনি? কিছুক্ষণ এসব প্রশ্ন ভাবার পর শিমুলের মনে হল তার গণপতিবাবুর সঙ্গে যাওয়া উচিত ছিল। শিমুল গণপতিবাবুর বডিগার্ড না ওয়াচম্যান তা তার জানা নেই। গণপতিবাবু দুর্ব্যবহার করলেও শিমুল যেহেতু তাঁর সঙ্গে এসেছে তাই তাঁর ভালোমন্দের দায়িত্ব শিমুলের ওপরও বর্তায়। অন্তত কলকাতায় ফেরার আগে পর্যন্ত যতক্ষণ সে তাঁর চাকরিতে বহাল আছে। কথাগুলো মনে হতেই কয়েক মুহূর্তের মধ্যে সে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল, সে অডিটোরিয়ামে যাবে। একবার আড়াল থেকে দেখে আসবে তাঁরা সেখানে কী করছেন? শিমুল বাড়ি ছেড়ে মাঠে নেমে কুয়াশার মধ্যে দিয়ে হাঁটতে শুরু করল অডিটোরিয়ামের দিকে। মাঠ পেরিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই অডিটোরিয়ামের কাছে পৌঁছে গেল শিমুল। অডিটোরিয়ামটা যে অনেক পুরোনো দেখেই বোঝা যাচ্ছে। দেওয়ালের গা ঘেঁষে ঝোপ-জঙ্গল। প্রবেশ মুখে লোহার গেটটা হাঁ করে খোলা। তার পাল্লার একটা অংশ মরচে ধরে খসে পড়েছে। সম্ভবত অডিটোরিয়ামটা বর্তমানে পরিত্যক্ত। ভেতর থেকে কোনও আলো ভেসে আসছে না। শিমুলের একবার মনে হল, তাঁরা ঠিক এখানে এসেছেন তো। সামান্য একটু থমকে দাঁড়াবার পর খোলা গেট দিয়ে সে ভেতরে প্রবেশ করল। ভেতরটা অন্ধকার। কোন দিকে সে যাবে? সামনে একটা প্যাসেজ দেখে হাতড়ে হাতড়ে সে এগোল প্যাসেজ ধরে। সেই প্যাসেজ এঁকেবেঁকে এগিয়ে তাকে পৌঁছে দিল বিরাট বড় একটা হলঘরে। এবার সে দেখতে পেল দুজনকে। বিশাল হলঘরের শেষ প্রান্তে মাথার ওপর থেকে নেমে আসা একটা উজ্জ্বল আলোকবৃত্তের নীচে একটা বক্সিং রিংয়ের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন তাঁরা। কিন্তু অন্য কেউ নেই সেখানে। রিংয়ের সামনে একটু ফাঁকা জায়গা বাদ দিয়ে তার তিন দিকে ডাই করা আছে মানুষ সমান ভাঙা চেয়ার-টেবিলের স্তূপ। মাথার ওপর থেকে নেমে আসা আলোকবৃত্তটা শুধু বক্সিং রিং-কে কেন্দ্র করেই। ঘরের বাকি অংশে বিরাজ করছে জমাট বাঁধা অন্ধকার। কীসের একটা আকর্ষণে যেন শিমুল নিজের অজান্তেই অন্ধকারের মধ্যে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলল বক্সিং রিংয়ের দিকে।
সে এসে দাঁড়াল বক্সিং রিংয়ের কাছাকাছি ভাঙা চেয়ার-টেবলের পিছনে। সে যেখানে দাঁড়াল তার ওপাশে হাত পনেরো দূরেই রিং। তাঁদের দুজন ছাড়া অন্য কেউ না থাকলেও স্ট্যান্ডে বসানো একটা ক্যামেরা অবশ্য সেখানে রয়েছে। শিমুল আলোকবৃত্তর বাইরে আছে বলে তাকে দেখতে পাচ্ছেন না গণপতিবাবুরা। কিন্তু শিমুল সব কিছুই স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে, তাঁদের কথাও শুনতে পাচ্ছে।
শিমুল শুনল, গণপতিবাবু সিংভি সাহেবকে বললেন, 'ক্যামেরা তো দেখছি, কিন্তু আপনার ডিরেক্টর সাহেব কোথায় গেলেন?'
সিংভি সাহেব জবাব দিলেন, 'কোথায় গেলেন কে জানে।'
এরপর সিংভি সাহেব বক্সিং রিংটার দিকে তাকিয়ে বললেন, 'এই রিংটা কি আপনার চেনা মনে হচ্ছে মিস্টার হাজরা?'
গণপতিবাবু তাকালেন রিংয়ের দিকে। শিমুলও আড়াল থেকে তাকাল সেদিকে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে অনেক পুরোনো রিং। বেশ কয়েকটা রোপ ছিঁড়ে গেছে। ফ্লোরের পলেস্তারা খসা। ধুলোর পুরু আবরণ জমেছে তার সর্বত্র। বহুদিন সম্ভবত এই রিং ব্যবহার করা হয়নি। গণপতিবাবু রিংয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'চেনা লাগছে কেন? এখানে আমি কোনওদিন আসিনি। অযোধ্যাতে যে কোনও রিং আছে, তা-ই আমার জানা ছিল না। তবে এ যা নোংরা তাতে এখানে শুটিং করবেন কীভাবে?'
অর্জুন সিংভি তাঁর প্রশ্নের জবাব না দিয়ে মৃদু হেসে বললেন, 'দেখুন, দেখুন, ভালো করে তাকিয়ে দেখুন। যে রিংয়ে আপনি একদিন ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নের লড়াই করতে নেমেছিলেন, সে রিংয়ে দাঁড়িয়ে গলায় সোনার মেডেল ঝুলিয়ে ছিলেন, সে রিংটাকেই আজ চিনতে পারছেন না আপনি!'
শিমুল বেশ অবাক হল তাঁর কথা শুনে। অবাক হলেন গণপতিবাবুও। তিনি সিংভি সাহেবকে বললেন, 'কী উল্টোপাল্টা কথা বলছেন? সে লড়াই কানপুরে হয়েছিল, অযোধ্যাতে নয়।'
শিমুল স্পষ্ট দেখতে পেল, এবার একটা বাঁকা হাসি ফুটে উঠল অর্জুন সিংভির ঠোঁটের কোণে। তিনি বললেন, 'ঠিক কথা, তবে এটা অযোধ্যা নয়, কানপুর। কানপুরেই আপনাকে এনেছি আমি। লক্ষ্নৌ থেকে কানপুর আর অযোধ্যার দূরত্ব প্রায় একই। অন্ধকার হাইওয়ে, গাড়ির কালো কাঁচও ওঠানো ছিল, শহরেও ঢুকিনি আমরা, তাই ব্যাপারটা ধরতে পারেননি আপনি।
তার কথা শুনে চমকে উঠলেন গণপতিবাবু। বেশ অবাক হল শিমুলও। সে এবার বুঝতে পারল, কেন সে ঘুমচোখে গাড়ি থেকে একবার রাস্তায় মাইলস্টোনে 'কানপুর ৪০ কিমি' দেখেছিল।
কয়েক মুহূর্তের নিস্তব্ধতা। তারপর গণপতি হাজরা চিৎকার করে উঠলেন, 'এ সবের মনে কি? কেন আপনি মিথ্যা কথা বলে এখানে টেনে আনলেন?'
তারপর যে ঘটনা ঘটল তাতে শিমুলের মনে হল সে নাটকের কোনও দৃশ্য দেখছে। গণপতি হাজরার চিৎকার শোনার পর কয়েক মুহূর্ত সিংভি সাহেব তাকিয়ে রইলেন তাঁর দিকে। তারপর একটানে খুলে ফেললেন নিজের দাঁড়িগোঁফ। চোখের মণি দুটো থেকেও কী যেন বার করে হাতে নিলেন। শিমুল বুঝতে পারল সেটা সম্ভবত কনট্যাক্ট লেন্স কারণ সিংভি সাহেবের চোখের মণি আর নীল দেখাচ্ছে না। গোঁফ-দাঁড়ি-চশমা খুলে সেগুলো মাটিতে ছুঁড়ে ফেলে তিনি মুখোমুখি দাঁড়ালেন গণপতিবাবুর। তারপর বললেন, 'আমাকে এবার তুমি চিনতে পারছ গণপতি?'
শিমুল চমকে উঠল সে কণ্ঠস্বর শুনে। সম্পূর্ণ অন্য কণ্ঠস্বর। এ গলা সে শুনেছিল ইসমাইলের ঘরে। তার মানে, ভদ্রলোক নিজেকে এতদিন সম্পূর্ণ লুকিয়ে রেখেছিলেন।
শিমুল দেখল ছদ্মবেশহীন লোকটার দিকে কাঠের পুতুলের মতো কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বিস্মিত কণ্ঠে গণপতিবাবু বললেন, 'সূর্যশেখর তুমি!'
শ্লেষ মাখানো হাসি হেসে সূর্যশেখর ওরফে অর্জুন সিংভি বললেন, 'হ্যাঁ আমি। তা হলে তুমি আমাকে শেষ পর্যন্ত চিনতে পারলে।'
গণপতি হাজরা আর সূর্যশেখর স্থির দৃষ্টিতে পরস্পরের দিকে তাকিয়ে রইলেন। বিস্মিত শিমুল ঠিক বুঝতে পারল না সে আড়াল থেকে বেরিয়ে আসবে কিনা? সে দেখতে লাগল সব কিছু।
মৌনতা ভঙ্গ করে এরপর গণপতিবাবু বেশ শান্ত স্বরে সূর্যশেখরকে বললেন, 'আমাকে এভাবে এখানে টেনে আনলে কেন সূর্যশেখর? তোমার সঙ্গে আমার লড়াই তো তিরিশ বছর আগে ওই রিং-এ শেষ হয়ে গেছে।
সূর্যশেখর বললেন, 'না, সে লড়াই শেষ হয়নি। শেষটা বাকি রয়ে গেছে। আর তার জন্যই তোমাকে এখানে টেনে এনেছি।'
গণপতিবাবু এবার মৃদু ঝাঁঝের সঙ্গে বললেন, 'কী বলছ তুমি! তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। লড়াই সেদিন শেষ হয়েছিল। তোমাকে নকআউট করে ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নের সোনার মেডেল গলায় ঝুলিয়েছিলাম আমি। আর পরদিন দেশের সব ক'টা লিডিং নিউজ পেপারে আমার ছবি সহ ছাপা হয়েছিল সে খবর। রেকর্ড বুকেও তাই লেখা আছে।'
সূর্যশেখর বেশ শান্ত স্বরে উত্তর দিলেন, 'তা লেখা আছে ঠিকই। কিন্তু কাগজওয়ালাদের আসল খবর জানা ছিল না। থাকলে তোমার ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়ন হওয়া হত না।'
'কী সেই খবর?' প্রশ্ন করলেন গণপতিবাবু।
উত্তরদাতা বললেন, 'তাদের জানা ছিল না যে ফাইনালের আগের রাতে আমার ঘরে এসে তুমি আমাকে কুড়ি হাজার টাকা অফার করেছিলে, আমি যাতে হেরে যাই তার জন্য।'
গণপতিবাবু বললেন, 'তাতে কী হয়েছিল। তুমি তো টাকা নাওনি। লড়াইটা তো সত্যি ছিল। আর তাতে তুমি হেরে গিয়েছিলে।'
সূর্যশেখরের গলার স্বর এবার যেন বেশ কঠিন হয়ে উঠল। তিনি বললেন, 'গণপতি হাজরা মিথ্যা কথা বোল না। সেদিন লড়াইয়ের প্রথম দুটো রাউন্ড সত্যি ছিল। ফাইনাল রাউন্ড ছিল মিথ্যা। সেটা লোকের চোখে ধরা পড়েনি। ঠিক আছে, তোমার পাপকাহিনি তোমাকেই আমি মনে করিয়ে দিচ্ছি।'
সূর্যশেখর বলতে লাগলেন, 'আমি গরিব বাঙালি ছেলে ছিলাম। তুমি পয়সাওয়ালা মানুষ। তুমি ভেবেছিলে পয়সা দিয়ে আমাকে কিনে নেবে। ঠিক যেভাবে তার অভাবের সুযোগ নিয়ে সেমিফাইনালে পাতিয়ালার দরবেশ সিংকে কিনেছিলে তুমি। নইলে ফাইনালে লড়াইটা তার আর আমার মধ্যেই হত। বোনের বিয়ের জন্য টাকা নিতে বাধ্য হয়েছিল দরবেশ। বিয়ের পরদিনই সে আত্মহত্যা করে। তার কথা থাক, এবার বলি আমার কথা। যখন তুমি আমাকে পয়সা দিয়ে কিনতে পারলে না, তখন আরও ঘৃণ্য পথ নিলে তুমি। আমার খাবার জলে নেশার ওষুধ গোপনে মিশিয়ে দিলে। প্রথম রাউন্ডে তুমি আমার সামনে দাঁড়াতেই পারলে না। সবাই ধরে নিয়েছিল তৃতীয় রাউন্ডে আমি তোমাকে নকআউট করে দেব। কিন্তু দ্বিতীয় রাউন্ড শেষে জল খেতেই আমি ঝাপসা দেখতে লাগলাম সব কিছু। ঢং করে রাউন্ড শুরু হওয়ার ঘণ্টা বাজল। আমি কোনও রকমে রিং-এ উঠে দাঁড়ালাম। আমি রেড কর্নার, তুমি ব্লু কর্নারে। রেফারি যখন লড়াই শুরুর ইঙ্গিত দিয়ে একপাশে সরে গেল তখন আমার পা থরথর করে কাঁপছে, মাথা আর হাত দুটো জগদ্দল পাথরের মতো ভারী লাগছে, চোখের পাতা বুজে আসছে। ঠিক বুঝতে পারছিলাম না কী হয়েছে আমার। কোনওরকমে রোপের ওপর ভর দিয়ে দাঁড়ালাম আমি। লড়াই শুরুর আগে উত্তেজনায় দর্শকরা তখন স্তব্ধ। আমি ঝাপসা চোখে দেখলাম তুমি আমার দিকে এগিয়ে এলে। আর এরপরই সবাইকে অবাক করে দিয়ে আমাকে তুমি নকআউট করে দিলে। পরে অবশ্য এক প্রত্যক্ষদর্শীর মুখে আমি শুনেছিলাম যে আমি অচৈতন্য হয়ে যাওয়ার পরও বার কয়েক তুমি আমার মাথায় ঘুষি চালিয়েছিলে। সম্ভবত তুমি সেটা তোমার টাকা রিফিউজড করার আক্রোশেই করেছিলে। তখন তো আর হেড গার্ডের চল ছিল না। ও কাজটা অন্তত তুমি না করলে আমার কানটা বেঁচে যেত...।'
শিমুলের হঠাৎ এবার 'কানের' কথা শুনে মনে হল, গণপতিবাবু কোনও কান কাটা লোক দেখলেই তাঁকে খবর দিতে বলেছিলেন।
সূর্যশেখর আরও কী বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু গণপতি হাজরা চিৎকার করে বলে উঠলেন, 'সব মিথ্যা কথা। সব মিথ্যা কথা। তুমি পাগল হয়ে গেছ! এ সবের কোনও প্রমাণ আছে তোমার কাছে?'
সূর্যশেখর শান্ত স্বরে প্রথমে বললেন, 'হ্যাঁ, আছে।' তারপর কার উদ্দেশ্যে যেন বললেন, 'ইয়ার বক্স বেরিয়ে এসো।'
শিমুল দেখল ওপাশের অন্ধকার থেকে একটা লোক খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে বেরিয়ে এসে দাঁড়াল আলোকবৃত্তের মধ্যে। লোকটাকে চিনতে পারল শিমুল, 'ইসমাইল!'
লোকটাকে দেখিয়ে সূর্যশেখর গণপতিবাবুকে বললেন, 'ওকে দেখে তোমার কেন চেনা মনে হচ্ছিল তা বলি। তিরিশ বছর আগে ইয়ার বক্স এই অডিটোরিয়ামে ঝাড়ুদারের কাজ করত। তোমার ভাড়া করা লোক যখন আমার জলে ওষুধ মেশাচ্ছিল তখন দুর্ভাগ্যবশত সেটা চোখে পড়ে গিয়েছিল ওর। তুমি ওকে টাকা দিয়ে মুখ বন্ধ করতে চেয়েছিলে কিন্তু ওর বিবেক তাতে সায় দিল না। কাজেই একটা পাপ ঢাকতে আরও একটা অন্যায় কাজ করলে তুমি। পরদিন ও যখন ব্যাপারটা জানাবার জন্য বক্সিং ফেডারেশনের অফিসে রওনা হল তখন একটা গাড়ি এসে ধাক্কা মারল ওকে। তবে রাস্তায় পড়ে জ্ঞান হারাবার আগে ও গাড়ির ড্রাইভারের মুখ মুহূর্তের জন্য দেখেছিল। আর সেটা ছিল তোমার মুখ। নেহাতই দৈবকৃপায় প্রাণে বেঁচেছিল ইয়ার বক্স। তবে ওর একটা পা বাদ গেল। সুস্থ হতে ওর প্রায় এক বছর সময় লেগেছিল। ততদিনে তুমি সেলিব্রিটি বনে গেছ। কাজেই ইয়ার বক্সের কথা কেউ পাত্তা দিল না। কি গল্পটা ঠিক বললাম তো?' এই বলে তিনি তাকালেন ইয়ার বক্সের দিকে।
ইয়ার বক্স ঘাড় নেড়ে বলল, 'হ্যাঁ, বাবু সাব।'
শিমুল লক্ষ্য করল গণপতিবাবুর মুখ কেমন যেন ফ্যাকাসে হয়ে গেছে আর এরপরই হঠাৎ গণপতিবাবু তাঁর কোমর থেকে রিভলভার বার করে চিৎকার করে উঠলেন, 'আমাকে তোমরা যেতে দাও। নইলে দুজনকেই গুলি করে মারব।'
উদ্যত রিভালবার দেখেও ঘাবড়ালেন না সূর্যশেখর। তিনি শান্ত ভঙ্গিতে হেসে বললেন, 'তোমার রিভলভারের গুলি আগে সরিয়ে ফেলেছে ইয়ার বক্স। ওটা খালি, তবে আমারটাতে সত্যিই গুলি ভরা আছে।' এই বলে পকেট থেকে একটা ছোট্ট রিভলভার বার করে সেটা গণপতি হাজরার দিকে তাক করলেন সূর্যশেখর।
গণপতিবাবু হতভম্বের মতো রিভলভার খুলে একবার ফাঁকা চেম্বারগুলো দেখলেন, তারপর বললেন, 'বলো, কত টাকা চাও তুমি?'
সূর্যশেখর বললেন, 'অর্জুন সিংভির আজ আর টাকার প্রয়োজন নেই। তবে তিরিশ বছর আগেকার সূর্যশেখরের তোমার কাছে কিছু পাওনা আছে। সেটা তোমাকে আজ দিতে হবে।'
'সে কী চায়? কত টাকা?' কাঁপা কাঁপা গলায় জানতে চাইলেন গণপতি হাজরা।
টাকা নয়, সে চায় তার কানের বদলে তোমার একটা কান, ইয়ার বক্সের একটা পা-এর বদলে তোমার এক পা।' বলে সূর্যশেখর তাঁর নিজের ডান কান ধরে একটা টান মেরে সেটা ছুঁড়ে ফেললেন মাটিতে। শিমুল দেখল তাঁর ডান কান নেই। গণপতিবাবু কেন কানহীন লোক দেখলে তাঁকে খবর দিতে বলেছিলেন তা এবার শিমুলের কাছে স্পষ্ট হয়ে গেল। শিমুল এরপর হঠাৎই লক্ষ্য করল ইয়ার বক্সের হাতে কখন যেন একটা লম্বা ছুরি উঠে এসেছে। গণপতি হাজরা তাকিয়ে আছেন সূর্যশেখরের দিকে, আর ইয়ার বক্স এক-পা এক-পা করে ছুরি হাতে এগোচ্ছে গণপতি হাজরার দিকে। এবার আর আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা শিমুলের পক্ষে সম্ভব হল না। এতক্ষণ শিমুল যা শুনল, তাতে গণপতি হাজরার ওপর তাঁর বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা অবশিষ্ট না থাকলেও একটা মানুষকে বাঁচাবার জন্য তাকে বেরিয়ে আসতেই হল।
তাকে দেখার সঙ্গে সঙ্গেই ইশারায় ইয়ার বক্সকে থামাতে বলে সূর্যশেখর বললেন, 'তুমি চলে যাও এখান থেকে, ওর আজ কোনও ক্ষমা নেই।'
শিমুল বলল, 'আমি আপনাদের সব কথাই এতক্ষণ আড়াল থেকে শুনেছি। কিন্তু এভাবে...।'
তাকে কথা শেষ করতে না দিয়ে সূর্যশেখর বললেন, 'তুমি জানো না ওর জন্য কত যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়েছে আমাকে! ওর জন্যই বক্সিং রিং-এ আর কোনও দিন আমি নামতে পারলাম না ডোপিং-এর দাগা লেগে গেল আমার নামে, আমার একটা কান খোয়া গেল। হাসপাতাল ছেড়ে কলকাতার বাড়ি ফিরে সেখানে টিকতে পারলাম না আমি। একে ডোপিংয়ের কলঙ্ক, সবাই কথা বন্ধ করল আমার সঙ্গে, তার ওপর আমি রাস্তায় বার হলেই বাচ্চা ছেলের দল 'কান কাটা বক্সার' বলে আমার পিছনে ছুটত। আমাকে ঢিল মারত! ওঃ, সে কী লাঞ্ছনা, সে কী অপমান! ওর জন্যই একদিন কলকাতা থেকে লক্ষ্নৌ পালিয়ে এসে আমাকে পথে পথে ভিক্ষা করতে হয়েছিল। অপমানের শোধ আজ আমি নেব। তুমি চলে যাও।' একটানা কথাগুলো বলে থামলেন সূর্যশেখর। শিমুল দেখল, সূর্যশেখরের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠেছে। আগুন ঝরা চোখে তিনি দেখছেন গণপতিবাবুকে। আর গণপতিবাবু যেন একদম পাথরের মূর্তি বনে গেছেন।
শিমুল বুঝতে পারল, নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে আছেন গণপতি হাজরা। তাঁর দীর্ঘদিনের অন্যায়ের প্রতিশোধ নিতে চলেছেন সূর্যশেখর। গণপতিবাবুকে যদি বাঁচাতে হয় তা হলে শিমুলকে মাথা ঠান্ডা করে কথা বলতে হবে শিমুল সূর্যশেখরকে বলল, 'আচ্ছা, আপনাকে একটা অনুরোধ করব? বক্সিং রিং-এ সেদিনের অসম্পূর্ণ লড়াইটা আজ আবার এই বক্সিং রিং-এ নেমে মিটিয়ে ফেললে হয় না?'
সূর্যশেখর বেশ উত্তেজিতভাবে বললেন, 'না, হয় না, হয় না! রিং-এর মর্যাদা এই শয়তানটা রাখেনি ও স্পোর্টসম্যান নয়, খুনি আমার কানের বদলা, ইয়ার বক্সের পায়ের বদলা, অসহায় দরবেশের আত্মহত্যার বদলা, এ সব কিছুর শোধ আমি আজ নেব। তোমার কোনও ক্ষতি হবে না, তুমি চলে যাও এখান থেকে।
শিমুল বুঝতে পারল, এভাবে আর নিরস্ত করা যাবে না সূর্যশেখরকে। শিমুল এবার তার শেষ অস্ত্র প্রয়োগ করল। সে বলল, 'তা হলে কি আমি ধরে নেব ওর সঙ্গে রিং-এ নামতে আপনি ভয় পাচ্ছেন? ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নের লড়াইতে সেদিন সত্যি হেরে গিয়েছিলেন আপনি। আর এত বছর পর সেই পরাজয়ের গ্লানি ঢাকতে নিরীহ স্পোর্টসম্যানকে আপনি ফাঁদে ফেলে খুন করতে যাচ্ছেন? আপনি এতক্ষণ যা বললেন তা সব কিছুই সাজানো গল্প?'
শিমুলের কথা শুনে প্রথমে দপ করে জ্বলে উঠল সূর্যশেখরের চোখ কিন্তু তারপর কেন জানি তার চোখের দৃষ্টি অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে এল। বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে কী যেন ভাবলেন তিনি। তারপর ঘৃণাভরে গণপতি হাজরার দিকে তাকিয়ে শিমুলকে বললেন, 'ঠিক আছে তাই হবে। কিন্তু রেফারি থাকতে হবে তোমাকে। ও অন্য কোনও চালাকির চেষ্টা করলেই আমি কিন্তু ওর খুলি উড়িয়ে দেব।'
শিমুল বলল, 'আচ্ছা।'
কয়েক মিনিটের মধ্যে সূর্যশেখরের নির্দেশে কোথা থেকে যেন দু'জোড়া গ্লাভস জোগাড় করে আনল ইয়ার বক্স। সূর্যশেখর তার হাতে রিভলভারটা দিয়ে লাল গ্লাভস জোড়া নিলেন। তারপর ইয়ার বক্স গণপতিবাবুর কাছে গিয়ে তাঁর কাছ থেকে মেডেলের বাক্স আর ফাঁকা রিভলভারটা ছিনিয়ে নিয়ে তাঁর হাতে ধরিয়ে দিল নীল গ্লাভস। গণপতিবাবু চুপচাপ পরে নিলেন গ্লাভস জোড়া। গ্লাভস পরে রিং-এ ঢুকে মুখোমুখি দুই কর্নারে দাঁড়ালেন দুজনে। গণপতি হাজরা ব্লু কর্নার, সূর্যশেখর রেড কর্নার ঠিক তিরিশ বছর আগে ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনাল রাউন্ডে যেমন মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিলেন তাঁরা। শিমুলও ঢুকল রিং-এর ভিতর। রেফারির কাজটা তাকেই করতে হবে। যে রিং-এ ঢোকার পর দুজনে দু'পাশের থেকে কিছুটা কাছাকাছি এগিয়ে এলেন। তাদের মাঝে দাঁড়িয়ে ঘড়ি দেখল শিমুল। মুহূর্তখানেকের মধ্যেই সময় দেখে লড়াই শুরুর ইঙ্গিত দিয়ে শিমুল এক পাশে সরে গেল।
লড়াই শুরু হল। তাঁরা দুজনেই বাঘের মতো দৃষ্টিতে পরস্পরের দিকে তাকিয়ে রিং-এর মাঝখানে গোল হয়ে ঘুরতে শুরু করলেন। মাঝে মাঝেই একে অন্যকে লক্ষ্য করে ঘুষি ছুঁড়লেন, কিন্তু অন্য জন দ্রুত সরে যাচ্ছেন। হাওয়া কেটে বেরিয়ে যাচ্ছে তাঁদের বিষাক্ত ছোবলগুলো। এরপর সম্ভবত এক সময় তাঁরা অধৈর্য হয়েই পরস্পরের খুব কাছাকাছি চলে এসে একে অপরের মাথা, বুক-পাঁজর লক্ষ্য করে এলোপাথাড়ি পাগলের মতো ঘুসি চালাতে শুরু করলেন। তাঁদের দুজনের চোখেই ফুটে উঠেছে জিঘাংসা। দুজনেই ফাউল পাঞ্চ করছে দেখে শিমুল একবার দুজনকে ছাড়িয়ে দিল। তারপর আবার শুরু হল লড়াই। শিমুলের এক সময় যেন মনে হল গণপতি হাজরাই যেন ভালো লড়ছেন সূর্যশেখরের থেকে। প্রথম রাউন্ড শেষ হল। কিন্তু লড়াইয়ের নিষ্পত্তি হল না।
সময় নষ্ট করতে কেউ আগ্রহী নন। তাই এক মিনিটের ব্যবধানেই শুরু হল দ্বিতীয় রাউন্ড। সেই রাউন্ডের শুরুতেই গণপতিবাবু হঠাৎ বিদ্যুৎগতিতে এগিয়ে একটা আপার কাট করলেন সূর্যশেখরের চোয়ালে। ঘুসিটা খেয়ে ব্যালেন্স হারিয়ে ফেললেন সূর্যশেখর। তার স্টেপিং ভুল হল। আর সেই সুযোগটাই কাজে লাগালেন ধূর্ত গণপতি হাজরা। মুহূর্তের মধ্যেই তিনি একটা রাইট হুক করলেন সূর্যশেখরের চোয়ালে। প্রচণ্ড জোরে! যেটা হজম করা সত্যিই কঠিন কাজ। সেটা খেয়েই সূর্যশেখর দুম করে মেঝেতে পড়ে একদম স্থির হয়ে গেছেন। তাই দেখে গণপতিবাবু উল্লাসে ঊর্ধ্ববাহু করে চেঁচিয়ে উঠলেন, 'আমি জিতে গেছি। আমি জিতে গেছি! আমাকে আজও হারাতে পারলে না সূর্যশেখর!' শিমুল অবাক হয়ে তাকাল গণপতি হাজরার দিকে। সে ভাবল, 'সত্যি কি...'। কিন্তু এরপরই এক অদ্ভুত কাণ্ড ঘটল। সূর্যশেখর হঠাৎ মাটি থেকে স্প্রিংয়ের মতো লাফিয়ে উঠে দাঁড়ালেন গণপতি হাজরার সামনে। তারপর তাঁকে হাত নামাবার সুযোগ না দিয়ে সজোরে একটা ঘুসি মারলেন তাঁর মুখ লক্ষ্য করে। শিমুলের মনে হল, সে ঘুষি খেয়ে গণপতি হাজরা যেন একদম উড়ে গিয়ে পড়লেন রিং-এর কোণে। তাঁর কাছে গিয়ে শিমুল ঝুঁকে পড়ে কাউন্ট শুরু করল, 'এক...দুই...তিন...।' পাঁচ পর্যন্ত কাউন্ট করার পর অবশ্য টলতে টলতে কোনওরকমে উঠে দাঁড়ালেন গণপতি হাজরা। তাঁর নাক দিয়ে তখন গলগল করে রক্তপাত হতে শুরু করেছে। গণপতি হাজরা উঠে দাঁড়িয়ে সূর্যশেখরের দিকে কয়েক পা এগিয়ে শেষ একটা ঘুঁষি ছুঁড়লেন। কিন্তু অতি দুর্বল। সূর্যশেখর সহজেই সেটা এগিয়ে গিয়ে একটা মারাত্মক পাঞ্চ করলেন গণপতি হাজরার বুকে। কাটা কলা গাছের মতো গণপতি হাজরার বিপুল দেহ দড়াম করে আছড়ে পড়ল রিং-এর মাঝখানে। শিমুল নিয়মমাফিক দশ পর্যন্ত কাউন্ট করল। কিন্তু তিনি আর উঠলেন না। শিমুল বুঝল জ্ঞান হারিয়েছেন তিনি। ফাইনাল রাউন্ড ইজ ওভার। জিতে গেছেন সূর্যশেখর। মিনিট দশেক পর জ্ঞান ফিরল গণপতি হাজরার। তিনি উঠে বসার একবার চেষ্টা করলেন, কিন্তু পারলেন না। তাঁর শরীর মনের সব শক্তি তখন শেষ হয়ে গেছে। শুয়ে শুয়ে তিনি ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে আছেন। রিং-এর মাঝে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলেন সূর্যশেখর। গণপতিবাবুর উঠে দাঁড়াবার ব্যর্থ চেষ্টার পর সূর্যশেখর শিমুলকে বললেন, 'তোমার কিন্তু এখনও একটা কাজ বাকি আছে।'
শিমুল একটু অবাক হয়ে বলল, 'কী কাজ?'
সূর্যশেখর ইশারা করলেন ইয়ার বক্সকে। তার চোখে ঝরে পড়ছে খুশির ঝলক। সে রিং-এর বাইরে থেকে শিমুলের দিকে এগিয়ে দিল মেডেলের বাক্সটা। এবার তার অসম্পূর্ণ কাজটা বোধগম্য হল শিমুলের। সূর্যশেখরের একটা হাত সে প্রথমে মাথার ওপর তুলে ধরে তাঁকে বিজয়ী ঘোষণা করল। তারপর বাক্স থেকে মেডেলটা নিয়ে ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নের সোনার মেডেল পরিয়ে দিল তাঁর গলায়।
শিমুল মেডেলটা তার গলায় ঝোলানোর পর সূর্যশেখর প্রথমে একবার হাত দিয়ে পরম মমতায় স্পর্শ করল মেডেলটা। শিমুল স্পষ্ট দেখতে পেল সূর্যশেখরের চোখের কোণে জল চিকচিক করছে। এরপর তিনি রিং-এর কোণে পড়ে থাকা গণপতি হাজরার সামনে গিয়ে গলার মেডেলটা হাতে নিয়ে তুলে ধরে গণপতিবাবুকে বললেন, 'তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম আমি। আমার এ জিনিসটা তোমার কাছে গত তিরিশ বছর ধরে অন্যায়ভাবে রাখা ছিল। আজ আমি শুধু এটা নিয়ে গেলাম।'
তাঁর কথা শুনে গণপতি হাজরা কেঁদে উঠে বললেন, 'ওটা তুমি নিও না সূর্যশেখর। আমাকে তুমি দয়া করো...।'
তাঁর কথায় কান দিলেন না সূর্যশেখর, গলায় মেডেল ঝুলিয়ে বিজয়ীর ভঙ্গিতে রিং-এর বাইরে নামলেন তিনি। রিং-এর বাইরে মাটিতে পড়ে থাকা কানটা কুড়িয়ে নিয়ে শিমুলের দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন, 'আবার দেখা হবে আমাদের।' এই বলে তিনি বাইরে যাবার জন্য পা বাড়ালেন। ইয়ার বক্স অনুসরণ করল তাঁকে। রিং-এর ভিতর ধুলো-মাটি মেখে পড়ে রইলেন গণপতি হাজরা।
পুনশ্চ: ছ'মাস কেটে গেছে। শিমুল গণপতিবাবুকে নিয়ে কলকাতায় ফিরে এসেছিল ঠিকই কিন্তু তাঁর চাকরি শিমুল ছেড়ে দিয়েছে। সে এখন 'সিংভি ফুড প্রোডাক্টস' নামে নতুন একটা কোম্পানিতে কাজ করে। নামমাত্র কাজ। সবচেয়ে বড় কথা সে আবার বক্সিং রিং-এ বিশুদার কাছে প্র্যাকটিসে নেমেছে। এ বছর হল না ঠিকই, কিন্তু আগামী বছর ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশিপের লড়াইতে সে নামবেই। একদিন বিকেলে হঠাৎ এক দীর্ঘদেহী ভদ্রলোক শিমুলের প্র্যাকটিস দেখতে এসেছিলেন। তাঁর চাপ দাড়ি, চোখের মণির রং ঘন নীল। একটা তেরছা টুপিতে কান ঢাকা ছিল তার। বিশুদা সেই অচেনা ভদ্রলোকের পরিচয় জিগ্যেস করায় শিমুল শুধু জবাব দিয়েছিল, 'উনি আমার কোম্পানির মালিক। শুনেছি, উনিও এককালে বক্সার ছিলেন।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন