অভিরূপ সরকার
লোকটা জবুথবু হয়ে সিঁড়ির ওপর বসেছিল৷ পরনে আধময়লা পাজামা, গায়ে রঙচটা সবুজ র্যাপার৷ আদিত্য খুব একটা অবাক হল না৷ এই বাড়িটায় কয়েকটা ট্রান্সপোর্ট কোম্পানির আপিস আছে, তারই একটাতে হয়তো এসে থাকবে৷ হয়তো কোনও লরি বা ম্যাটাডোরের ড্রাইভার, সারা রাত্তির গাড়ি চালিয়ে এখন সিঁড়িতে বসে ঝিমোচ্ছে৷
লোকটাকে পেরিয়ে দোতলায় উঠে নিজের আপিসের দরজা খুলল আদিত্য৷ খুলেই মনে পড়ল গতকাল ইলেকট্রিক কেটলিটা খারাপ হয়ে গেছে, এখনও সারাতে দেওয়া হয়নি৷ তার মানে শ্যামলকে দিয়ে চা আনাতে হবে৷ সে মোবাইল বার করে শ্যামলকে ফোন করতে যাবে, তার আগেই দরজায় টোকা৷ শ্যামল৷ আর তার পেছনে, কী আশ্চর্য, সিঁড়িতে জবুথবু হয়ে বসে থাকা সেই লোকটা৷ দাঁড়ানো অবস্থায় লোকটাকে বেশ লম্বা দেখাচ্ছিল৷
‘এই লোকটা স্যার আপনার সঙ্গে দেখা করার জন্যে সকাল থেকে অপেক্ষা করছে৷ আমি সকাল আটটায় এসে মেন দরজাটা খুলেছি৷ তখন দেখি ও ফুটপাথে উবু হয়ে বসে আছে৷ আমাকে দেখে আপনার নাম করে জিজ্ঞেস করল আপনার আপিসটা এখানে কিনা, কখন আপনি আপিসে আসেন, এইসব৷ তা, আমি বললাম সাহেবের আসার কোনও ঠিক নেই৷ আজ আদৌ আসবেন কিনা তাও জানি না৷ ও বলল, আমি তাহলে এখানে বসে থাকি৷ অনেক দূর থেকে এসেছি৷ দেখা না করে ফিরে যাব না৷’
আদিত্য ভাল করে লোকটার দিকে তাকাল৷ মনে হয় গায়ের রঙ এক সময় পরিষ্কার ছিল৷ এখন রোদে পুড়ে গেছে৷ গালে কয়েক দিনের না-কামানো দাড়ি, কপালে বলিরেখা৷ র্যাপারের তলা দিয়ে একটা মলিন সোয়েটার বেরিয়ে পড়েছে৷ আদিত্য ভাবল, এই ডিসেম্বর মাসেও তো কলকাতায় ফ্যান চালাতে হচ্ছে৷ লোকটা তাহলে সত্যিই অনেক দূর থেকে আসছে যেখানে ইতিমধ্যে ঠান্ডা পড়ে গেছে৷ আদিত্য তার দিকে তাকাতেই লোকটা মাথা ঝুঁকিয়ে নমস্কার করল৷
‘ঠিক আছে৷ আমি এর সঙ্গে কথা বলছি, তুমি একটু চা নিয়ে এসো৷ আমার জল গরম করার কেটলিটা আবার খারাপ হয়ে গেছে৷’
‘এই তো সেদিন সারালেন, আবার খারাপ হয়ে গেল? তখনই বললাম একটা নতুন কিনুন৷ পয়সাটাই গেল৷ এবার একটা নতুন কিনে নিন৷ আর এটাকে সারাতে যাবেন না৷’ অযাচিত উপদেশ দেওয়া শ্যামলের স্বভাব, অনেক ধমক দিলেও ওটা বদলাবে না৷
আদিত্য শ্যামলের কথাগুলো উপেক্ষা করে বলল, ‘ফ্লাস্কটা ভরে আন৷ চার কাপ ধরে যাবে৷ আর দুটো প্রজাপতি বিস্কুট৷’ শ্যামলের দিকে একটা একশ’ টাকার নোট এগিয়ে দিল আদিত্য৷ ‘এতে হবে তো?’
‘হয়ে যাবে৷’ ফ্লাস্ক এবং টাকা নিয়ে শ্যামল চলে গেল৷ যাবার সময় দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে গেল৷
আদিত্য নিজের চেয়ারে বসে লোকটাকে বলল, ‘আপনি বসুন৷’
লোকটা বসল, তবে আদিত্যর উল্টোদিকের চেয়ারে নয়৷ মাটিতে উবু হয়ে বসল লোকটা৷
‘আরে আরে ওখানে কেন? আপনি চেয়ারে বসুন৷’
আদিত্যর কথায় লোকটা চেয়ারে এসে বসল বটে, কিন্তু তার শরীরের ভঙ্গি থেকে স্পষ্ট যে চেয়ারে বসে সে মোটেই স্বস্তিতে নেই৷ বিশেষ করে সে ভেবে পাচ্ছে না লম্বা পা দুটো নিয়ে কী করবে৷ একবার চেয়ারের ওপর তুলল, একবার নামাল৷ তারপর বলল, ‘আমি বরং মাটিতেই বসি৷’ এই কথা বলে আদিত্যর অনুমতির তোয়াক্কা না করেই সে ফের মাটিতে গিয়ে বসল৷ এবার আর উবু হয়ে নয়, পশ্চাত দেশ মেঝের সঙ্গে লাগিয়ে৷ পা দুটো ভাঁজ করে বুকের সঙ্গে জুড়ে রেখেছে৷ তাকে দেখে এখন মনে হচ্ছে স্বস্তিতেই আছে৷
‘বলুন, কী ব্যাপারে দেখা করতে চান আমার সঙ্গে৷ কিন্তু তার আগে নাম বলুন৷ বলুন কোথা থেকে আসছেন৷’
‘আমার নাম নকুল দাস, বর্ধমানের শ্যামসুন্দর থেকে আসছি৷’
‘শ্যামসুন্দর? সেটা বর্ধমানের কোন দিকে? দামোদরের দিকে?’
‘বর্ধমান শহর থেকে রায়নার হাট যাবার বাস ছাড়ে৷ ওই বাসটা ধরতে হয়৷ পথে দামোদরের ব্রিজ পেরোতে হবে৷ আগে যখন ব্রিজ হয়নি, তখন দামোদর অব্দি একটা বাস যেতো৷ তারপর ফেরি করে দামোদর পেরিয়ে আরেকটা বাস৷ অবশ্য শীতকালে দামোদরে যখন জল থাকত না তখন বাসটা বালির ওপর দিয়ে নদী পেরিয়ে রায়নার হাট পৌঁছে যেত৷ এখন ব্রিজ হবার পর শীত-বর্ষা একটাই বাস রায়নার হাট অবধি চলে যায়৷ রায়নার হাটের ঠিক আগে শ্যামসুন্দর৷’
শ্যামসুন্দর নামটা আদিত্যর একটু একটু মনে পড়েছে৷ সে বলল, ‘শ্যামসুন্দর মানে যেখানে একটা কলেজ আছে?’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ৷ ওই শ্যামসুন্দর৷ তবে আমাদের বাড়িটা ঠিক শ্যামসুন্দরে নয়৷ শ্যামসুন্দরে বাস থেকে নেমে আরও খানিকটা সাইকেল বা ভ্যান রিকশায় যেতে হয়৷ গ্রামের নাম মুক্তিপুর৷’
‘ওদিকে ট্রেন যায় না?’
‘মশাগ্রাম থেকে বাঁকুড়া যাবার একটা ট্রেন আছে৷ সেটা শ্যামসুন্দরে দাঁড়ায়৷ কিন্তু তাতে কলকাতা আসার কোনও সুবিধে হয় না৷’
‘বুঝতে পারছি৷ তা অত দূর থেকে এখানে আমার সঙ্গে দেখা করতে এলেন কেন?’
‘সাহেব, শ্যামসুন্দর থানার দারোগা সাহেব, সরোজ হালদার, আপনাকে চেনে৷ বলল, কলকাতায় আদিত্যসাহেব আছে তার কাছে যাও৷ উনি খুব ভাল লোক৷ তোমার কথা শুনবে৷ তোমার দুঃখ বুঝবে৷ সব দুঃখ মিটিয়ে দেবে৷ তিনিই আপনার ঠিকানা দিয়ে দিলেন৷’
আদিত্য মনে করার চেষ্টা করল সরোজ হালদার বলে কাউকে চেনে কিনা৷ ঠিক মনে পড়ল না৷ সে মুখে বলল, ‘দুঃখ? আপনার কীসের দুঃখ?’
‘সেই কথাটাই তো বলতে এসেছি সাহেব৷ আমার খুব দুঃখ৷ বুকটা যেন ফেটে যায়৷ আমার ছোট ছেলেটা কলকাতায় পড়তে এসেছিল৷ দু’মাস আগে খুন হয়ে গেছে৷ অমন ফুলের মতন ছেলেটাকে কে খুন করল? ওর তো কোনও রকম বদগুণ ছিল না৷ নেশা-ভাঙ কিচ্ছু করত না৷ খারাপ ছেলেদের সঙ্গে মিশত না৷ বড়দের মুখের ওপর কথা পর্যন্ত বলত না৷ এই রকম একটা ছেলেকে কে খুন করতে পারে সাহেব?’ নকুল দাস কান্নায় ভেঙে পড়েছে৷ তাকে থামানো যাচ্ছে না৷ নিজে থেকে কান্না না থামলে মনে হচ্ছে না কথা বলতে পারবে৷
আদিত্য জানলা দিয়ে বাইরে তাকাল৷ বেলা এগারোটার বউবাজার স্ট্রিট৷ ফার্নিচারের দোকানগুলো খুলছে৷ চারজন মিস্ত্রি একটা মস্ত প্লাইউড মাথায় নিয়ে পালকি বাহকদের গতি ও ছন্দে চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউ-এর দিকে হাঁটছে৷ তাদের পেরিয়ে একটা ফাঁকা ট্র্যাম চলে গেল৷ উল্টো ফুটপাথের কচুরির দোকানে স্তূপীকৃত আলু ছাড়াতে বসেছে একটা মোটা লোক৷
‘সাহেব, আপনাকে আমি পুরো কাহিনিটা গোড়া থেকে বলি৷ না হলে বোঝাতে পারব না৷ আমাকে একটু সময় দিতে হবে৷’ নকুল দাস আবার কথা বলতে শুরু করেছে৷
‘দেখুন, আপনাকে আমি ঘণ্টা খানেক সময় দিতে পারি৷ আমাকে তারপর একটু বেরোতে হবে৷’ সময়টা আদিত্য একটু কমিয়েই বলল৷ আসলে বিকেলের আগে তার বিশেষ কাজ নেই৷
‘আমি চাষবাস করে খাই৷ গ্রামে বাপ-পিতেমোর রেখে যাওয়া কিছু জায়গা-জমি আছে৷ এখনও সেগুলো নিজের হাতে চাষ করি৷ তবে একা পুরোটা পেরে উঠি না৷ ধান রুইবার সময়, তোলার সময় কয়েকটা মুনিষ লাগে৷ ছেলে দুটো যদি চাষের কাজটা দেখত, তা হলে লাগত না৷ আমিও একটু ভরসা পেতাম৷’
‘আপনার ছেলেমেয়ে ক’টা?’
‘দুই ছেলে, এক মেয়ে৷ মেয়ে বড়৷ অনেক দিন বিয়ে হয়ে গেছে৷ বাপের বাড়ির সঙ্গে খুব একটা সম্পর্ক রাখে না৷ বড় ছেলে বউ-বাচ্চা নিয়ে শ্যামসুন্দরে থাকে৷ লোহা-লক্কড়ের ব্যবসা করে৷ দোকান আছে৷ ওরা সকলেই খুব আসে, খোঁজ-খবর নেয়৷ তবে বড় ছেলে বলে দিয়েছে চাষবাস করবে না৷’
‘আর ছোট ছেলে?’
‘ছোটটার খুব মাথা ছিল৷ আমাদের মুক্তিপুর ইস্কুলে বরাবর ক্লাশে ফার্স্ট হত৷ ইস্কুল পাশ করার পর বলল ইঞ্জিনিয়ার হতে কলকাতা যাবে৷ যাবে তো বলল কিন্তু সে অনেকগুলো টাকার ব্যাপার৷ কলকাতায় থাকার খরচ, খাওয়ার খরচ, তার ওপর কলেজের মাইনে৷ আমি বললুম, অত টাকা পাব কোথায়? সে বলল, ধার করব৷ তা, ধার কি অমনি অমনি দেয়? একটা জমি ব্যাঙ্কের কাছে বাঁধা রাখতে হল৷ এখন ভাবি, যদি ওর কথায় সেদিন রাজি না হতুম তা হলে এই সবেবানাশটা আজ আমাকে দেখতে হত না৷’
‘আপনার ছেলেদের নাম কী?’ আদিত্য অভ্যাসবশত খাতায় নোট নিচ্ছিল৷
‘বড়টার নাম অনিল, ছোটটার নাম অমিত৷’
নকুল দাস আবার ফোঁপাচ্ছিল৷ আদিত্য বলল, ‘আপনার ছোট ছেলে কবে কলকাতায় পড়তে এসেছিল?’
‘তিন বছরের একটু বেশি হবে৷ ইঞ্জিনিয়ারিং-এর পড়া তো চার বছরের৷ তার মধ্যে তিন বছর পড়া হয়ে গিয়েছিল৷’
‘কোন কলেজে পড়ত?’
‘কলেজের নামটা তো ঠিক বলতে পারব না সাহেব৷ তবে জায়গাটা নরেন্দ্রপুর ছাড়িয়ে হরিনাভির দিকে যেতে পড়ে৷ বড় রাস্তা থেকে দেখা যায়৷ অনেকটা জায়গা নিয়ে কলেজটা৷ আমি দু’বার গেছি৷’
‘আপনার ছেলে কি কলেজের হস্টেলে থাকত?’
‘না৷ হস্টেলে থাকার অনেক খরচ৷ তাই কলেজের কাছেই ও একটা ঘর ভাড়া নিয়ে থাকত৷ সাইকেলে করে কলেজে আসত৷’
শ্যামল দরজায় টোকা দিচ্ছে৷ চা-বিস্কুট নিয়ে এসেছে৷
‘এত দেরি কেন গো?’
‘আর বলবেন না স্যার৷ সামনের চায়ের দোকানটা আজ খোলেনি৷ সেই মোড়ের মাথা থেকে আনতে হল৷’
শ্যামল ভাঁড় এনেছিল৷ ভাঁড়ে চা ঢেলে লোকটাকে দিল৷ সঙ্গে পাঁউরুটির কাগজে মোড়া দুটো প্রজাপতি বিস্কুট৷ আদিত্যর চা আদিত্যর কাপে৷ শ্যামল বুঝে গেছে নকুল দাসের জন্য ভাঁড়, পাঁউরুটির কাগজই যথেষ্ট৷
নকুল দাস লোভীর মতো বিস্কুটে কামড় বসিয়েছে৷ সশব্দে চায়ে চুমুক দিল৷ লোকটার নিশ্চয় খুব খিদে পেয়েছে৷ নিশ্চয় খুব সকালে বেরিয়েছে৷ আদিত্য সন্ত্রস্ত হয়ে লক্ষ করল নকুল দাস মাটিতে বসে বিস্কুট খেতে গিয়ে প্রচুর বিস্কুটের গুঁড়ো মাটিতে ফেলছে৷ আদিত্য তাকিয়ে আছে দেখে নকুল দাস লজ্জা পেয়েছে৷ র্যাপার দিয়ে বিস্কুটের গুঁড়োগুলো ঝাড়ার চেষ্টা করছে৷
‘ওগুলো থাক৷ পরে ঝাঁট দিয়ে দেবে৷ আপনি যেটা বলছিলেন বলুন৷’ আদিত্য চায়ের কাপে একটা চুমুক দিয়ে বলল৷
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ৷ যেটা বলছিলুম৷ পড়াশোনায় অমিতের খুব মন ছিল৷ প্রত্যেক পরীক্ষা ভাল করে পাস করে যাচ্ছিল৷ তবে প্রথম দিকে যেমন ছুটিছাটা পড়লেই বাড়ি চলে আসত, পরের দিকে আর তেমন আসত না৷ ফোন-টোনও কম করত৷ করলে ওর দাদাকেই করত৷ দাদা ওর থেকে দশ বছরের বড়৷ আমি তো মাঠের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকি৷ গিন্নি লেখাপড়া জানে না৷ ওর দাদাই ওকে মানুষ করেছে৷ পড়াশোনা শিখিয়েছে৷ তাই দাদাকে ও খুব ভক্তি করত৷ আবার ভয়ও পেত৷ আমার বড় ছেলে অনিল আমার মতো এত নরম-সরম নয়৷ একটু রগচটা আছে৷ মায়ের স্বভাব পেয়েছে৷’
‘আপনার বড় ছেলে কত দূর পড়াশোনা করেছে?’
‘মুক্তিপুর থেকে ইস্কুল পাশ করে কিছুদিন শ্যামসুন্দর কলেজে পড়েছিল৷ তবে বিএ পাশ করার আগেই পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছিল৷’
‘বেশ, বেশ৷ তা, আপনি কী যেন বলছিলেন? আপনার ছোট ছেলে পরের দিকে কম বাড়ি আসত?’
‘হ্যাঁ, খুব কম আসত৷ আমি বা ওর দাদা কয়েকবার ওর সঙ্গে কলকাতায় দেখা করতে গেছি৷ আস্তে আস্তে ও যেন দূরের হয়ে যাচ্ছিল৷ আসল কথাটা হল, ও একটা মেয়ের সঙ্গে লটঘট শুরু করেছিল৷ সেখান থেকেই যত সমস্যার শুরু৷ ওকে মরতেও হল ওই কারণে৷’
‘ওই কারণে মরতে হল? একটু খুলে বলুন৷’
‘আমি সাহেব খোলাখুলি বলছি৷ আমার ছেলে অমিত একটা মুসলমান মেয়ের সঙ্গে মেলামেশা শুরু করেছিল৷ মেয়েটা ওদের ক্লাসেই পড়ত৷ নাম আলিনা মাসুদ৷ মেয়েটার পরিবার ব্যাপারটা মোটেই ভাল চোখে দ্যাখেনি৷ বিশেষ করে আলিনার বাবা৷ আলিনারা সম্পন্ন শহুরে গেরস্থ, আমাদের মতো চাষাভুষো নয়৷ শুনেছি, ওদের অনেক পুরুষের চামড়ার ব্যবসা৷ তবে অনেকে বলে আলিনার বাবা ইব্রাহিম মাসুদ গণ্ডগোলের লোক৷ ওপর ওপর চামড়ার ব্যবসা থাকলেও তলায় তলায় নানারকম দু’নম্বরি কারবার করে৷ তার নাকি অনেকগুলো পোষা গুন্ডাও আছে৷ এটা সত্যি না মিথ্যে আমি জানি না৷ কিন্তু ওই এলাকায় কেউ ইব্রাহিম মাসুদকে চট করে ঘাঁটাতে চায় না৷’
‘ইব্রাহিম মাসুদ বা তার লোকজন কি আপনার ছেলেকে কখনও শাসিয়েছিল?’
‘এটা আমি ঠিক জানি না৷ আমার ছেলে অন্তত আমাকে কিছু বলেনি৷ তবে আমার ছেলে যা চাপা স্বভাবের, তেমন কিছু ঘটে থাকলেও আমাকে বলত না৷’
‘তা হলে আপনি জানলেন কী করে ইব্রাহিম মাসুদ চাইত না আপনার ছেলে তার মেয়ের সঙ্গে মেলামেশা করুক?’
‘কলেজে অমিতের এক বন্ধু ছিল, যাকে বলে প্রাণের বন্ধু৷ সেও মুসলমান, নাম সিরাজুল, ভারি ভাল ছেলে৷ অমিতের মতোই মফস্বলের ছেলে, তাই অত ভাব৷ সিরাজুলদের বাড়ি হুগলিতে৷ ওরা অবশ্য আমাদের মতো গরিব নয়৷ ওর বাবার ইটভাটা, রাইসমিল, কোল্ড স্টোর আরও কীসব যেন আছে৷ তা, সেই সিরাজুল আমাকে ইব্রাহিম মাসুদের কথা বলেছে৷ সিরাজুলকে নিশ্চয় অমিত গল্প করেছিল৷’
‘অমিত খুন হবার খবর পেয়ে আপনি সিরাজুলের সঙ্গে দেখা করেছিলেন?’
‘অমিতের খবরটা পাবার পর আমি পাগলের মতো হয়ে গিয়েছিলুম৷ ছুটে কলকাতায় এলুম৷ ওখানকার পুলিশের সঙ্গে কথা বললুম৷ কেউ কিচ্ছু বলতে পারল না৷ ওদের কলেজে জিজ্ঞেস করলুম৷ ওখানেও কেউ কিছু বলতে পারল না৷ যেন সকলেই একটা কিছু চাপা দেবার চেষ্টা করছে৷ কলেজ থেকে তো বলেই দিল তারা কিছু জানে না, তাই এসব নিয়ে কিছু বলবেও না৷ যা বলার পুলিশ বলবে৷ নরেন্দ্রপুর থানার দারোগাসাহেব তো দেখাই করতে চান না৷ দু’দিন গিয়ে বসে বসে ফিরে এলুম৷ তিনদিনের দিন অনেকক্ষণ বসিয়ে রেখে তারপর দেখা করল৷ কয়েক মিনিটের বেশি কথা বলল না৷ যা বলল, তার মোদ্দা কথাটা হল, পুলিশ ব্যাপারটা দেখছে৷ কিছু পাওয়া গেলে জানানো হবে৷ আমার মনে হল, পুলিশ ব্যাপারটা ধামা চাপা দিতে চাইছে৷’
‘সিরাজুলের সঙ্গে কবে দেখা হল?’
‘সিরাজুল যে বাড়িটাতে ভাড়া থাকত সেটা তো আমার চেনা৷ আমি আগে সেখানে গেছি৷ সেখানে গিয়ে সিরাজুলের সঙ্গে দেখা করলুম৷ ছেলেটা খুব ভেঙে পড়েছে দেখলুম৷ অমিতকে ও সত্যিই ভালবাসত৷ আমাকে বলল, কাকাবাবু, এই খুনটার পেছনে আলিনার বাবা ছাড়া আর কেউ থাকতেই পারে না৷ অমিতের মতো নিরীহ ছেলের তো আর কোনও শত্রু ছিল না৷ আলিনার সঙ্গে ভালবাসা হবার পর থেকে অমিত কেমন যেন অশান্তিতে থাকত৷ একটু যেন ভয়ে ভয়েও থাকত৷ অমিত খুব চাপা স্বভাবের ছেলে৷ সিরাজুলকেও সব কথা খুলে বলত না৷ কিন্তু ওর হাবভাব দেখে সিরাজুলের এইরকম মনে হয়েছিল৷ সিরাজুল আর একটা কথা বলেছিল৷ বলেছিল, দেখবেন অমিতের ব্যাপারটা নিয়ে কেউ বিশেষ মুখ খুলছে না৷ কোনও কারণে ভয় পাচ্ছে৷ ইব্রাহিম মাসুদ ছাড়া এই অঞ্চলে ভয় পাবার মতো আর কে আছে?’
‘সিরাজুলের কথা শুনে আপনি তা হলে নিশ্চিত যে ইব্রাহিম মাসুদই আপনার ছেলেকে খুন করিয়েছে?’
‘শুধু সিরাজুলের কথা শুনে নয়৷ সিরাজুল আমাকে বলল, কাকাবাবু আপনার সঙ্গে একজনের কথা বলিয়ে দেব৷ খুব গোপনে৷ দেখবেন কেউ যেন জানতে না পারে৷ সেদিন সন্ধের ঝোঁকে কলেজের পেছন দিকে একটা পুকুরের ধারে সিরাজুল আমার সঙ্গে আলিনার দেখা করিয়ে দিল৷ ফুলের মত সুন্দর একটা মেয়ে৷ কেঁদে কেঁদে চোখ দুটো ফুলে উঠেছে৷ মেয়েটাকে দেখে কী যে মায়া লাগল৷ আমিও হাউহাউ করে কেঁদে ফেললুম৷ আমাকে কাঁদতে দেখে আলিনাও ডুকরে কেঁদে উঠল৷ যাই হোক কান্নাকাটি থামার পর আলিনা বলল, অমিতকে যে তার বাবা ইব্রাহিম মাসুদই খুন করিয়েছে সে ব্যাপারে সন্দেহ নেই৷ ইব্রাহিম মাসুদ পুলিশকেও টাকা খাইয়ে রেখেছে যাতে পুরো ব্যাপারটা নিয়ে আর কোনও জল ঘোলা না হয়৷ নরেন্দ্রপুর থানার দারোগাসাহেবের ব্যবহারের সঙ্গে আলিনার কথাটা একেবারে মিলে গেল৷’
‘আপনার সমস্যাটা বুঝতে পারলাম৷ কিন্তু আপনি আমাকে ঠিক কী করতে বলছেন?’
‘সাহেব, আমরা অতি সাধারণ চাষাভুষো লোক৷ বড় মানুষদের সঙ্গে এঁটে উঠব কী করে? কিন্তু এই যে আমার নিরীহ ছেলেটাকে ওরা মেরে ফেলল, এত বড় অন্যায়ের একটা প্রতিকার হবে না? আমাকে আমাদের শ্যামসুন্দরের দারোগা সাহেব বললেন আপনার কাছে এলে আপনি ঠিক এই অন্যায়ের একটা বিহিত করে দেবেন৷ সাহেব, আমার ছেলে অমিতের খুনিকে আপনি ধরে দেন, তা সে যেই হোক৷ অমিতের খুনি যদি শাস্তি পায় আমার ভেতরের কষ্টটাও একটু কমবে৷’
আদিত্য ভাবছিল৷ গভীরভাবে ভাবছিল৷ প্রায় তিন মাস হতে চলল তার হাতে কোনও কাজ নেই৷ জমা টাকাগুলো ফুরিয়ে আসছে৷ কেয়া অবশ্য বলে টাকা-পয়সা নিয়ে একদম চিন্তা করবে না৷ আমি এত টাকা কেন রোজগার করছি? কেয়ার রমরমা টিউশানি৷ ভাল ফিজিক্স টিচারের চিরকালই খুব চাহিদা৷ কিন্তু বউএর টাকায় বসে বসে খেতে কোন পুরুষ মানুষের ভাল লাগে? আদিত্যর এখন টাকার খুব দরকার৷ আর এই নকুল দাস যে টাকা-পয়সা খুব একটা দিতে পারবে না সেটা পরিষ্কার৷ কিন্তু নকুল দাসকে দেখে আদিত্যর মন খারাপ হয়ে গেছে৷ সরল, সাদাসিদে লোকটা খুব কষ্ট পাচ্ছে৷ আদিত্য কি লোকটার জন্যে কিছুই করতে পারে না? তাছাড়া এখন তো আদিত্য চুপ করেই বসে আছে৷ এই সময়টা যদি সে নকুল দাসের ছেলের খুনটা ইনভেস্টিগেট করে, তাহলে ক্ষতি কী?
‘সাহেব, আর একটা কথা বলার ছিল৷’ আদিত্যকে চুপ করে থাকতে দেখে নকুল দাস কুণ্ঠিতভাবে বলল৷ ‘আমি তো সাহেব অতি সাধারণ লোক, তাই খুব বেশি টাকা আপনাকে দিতে পারব না৷ সব মিলিয়ে এই সাড়ে পাঁচ হাজার টাকার মতো জোগাড় করতে পেরেছি৷ এর বেশি দেবার ক্ষমতা আমার সত্যিই নেই সাহেব৷ এতে হয়তো আপনার যাতায়াতের খরচটুকু শুধু উঠবে৷ একজন দুঃখী বাপের মুখ চেয়ে আপনি এতেই রাজি হয়ে যান সাহেব৷’ নকুল দাস আকুল দৃষ্টিতে আদিত্যর দিকে চেয়ে আছে৷
আদিত্য মনস্থির করে ফেলেছে৷ সে বলল, ‘শুনুন৷ আপনার ছেলের খুনিকে আমি খুঁজে বার করার চেষ্টা করব৷ টাকা-পয়সা এখন কিছু দিতে হবে না৷ পরে যদি বড় কোনও খরচ হয় আপনাকে জানাব৷’
নকুল দাস র্যাপারের খুঁট দিয়ে চোখ মুছছে৷
যাবার আগে বলল, ‘দারোগা সাহেব ঠিকই বলেছিলেন৷ আপনার কাছে এলে একটা বিহিত নিশ্চয় হবে৷
অনেক ভেবেও কিন্তু আদিত্য মনে করতে পারছে না এই দারোগা সাহেবের সঙ্গে তার কোথায় আলাপ হয়েছিল৷
আদিত্যর ধারণা ছিল নরেন্দ্রপুর থানার ওসি তার চেনা৷ তাই সে খানিকটা নিশ্চিন্ত ছিল অমিত দাসের মার্ডার কেসটার ব্যাপারে পুলিশ যতটুকু জানতে পেরেছে অন্তত সেটুকু সহজেই জানা যাবে৷ তবে একটা ব্যাপারে তার খটকা লাগছিল৷ বছর কয়েক আগে একটা খুনের মামলার তদন্ত করতে গিয়ে নরেন্দ্রপুর থানার ওসি অশোক সামন্তর সঙ্গে আদিত্যর বেশ ভালই আলাপ-পরিচয় হয়েছিল৷ তখন অশোক সামন্তকে অমায়িক এবং সৎ অফিসার বলেই মনে হয়েছিল আদিত্যর৷ নকুল দাস নরেন্দ্রপুর থানার ওসির যে বর্ণনা দিল তার সঙ্গে আদিত্যর দেখা অশোক সামন্তকে ঠিক মেলান যাচ্ছে না৷ যে সম্ভবনাটা আদিত্যর মনের কোণে উঁকি দিচ্ছিল, নরেন্দ্রপুর থানায় পৌঁছে দেখা গেল সেটাই সত্যি৷ নরেন্দ্রপুর থানা থেকে অশোক সামন্ত বদলি হয়ে গেছে৷
সাধারণ মানুষের সুবিধের জন্য থানায় ঢোকবার মুখে একটা ফলকে থানার অফিসারদের নাম এবং নামের পাশে তাদের মোবাইল নম্বর লেখা রয়েছে৷ সেখান থেকে আদিত্য জানতে পারল নতুন বড়বাবুর নাম অবিনাশ নন্দ৷ ছোট একটা পার্টিশান বড়বাবুকে থানার অন্য অফিসারদের থেকে আলাদা করে রেখেছে৷ বছর খানেক আগে যখন আদিত্যকে এই থানায় কয়েকবার আসতে হয়েছিল তখন এই আড়ালটা ছিল না৷
‘আসতে পারি?’ ওসির টেবিলে বসা ভুঁড়িওলা কালো লোকটাকে আদিত্য বলল৷ লোকটা এতই মোটা যে ইউনিফর্ম থেকে তার শরীরটা ফেটে বেরোচ্ছে৷
‘কী ব্যাপার? এখানে কেন? কোনও দরকার থাকলে বাইরে ছোটবাবু, মেজবাবু আছে, তাদের সঙ্গে কথা বলুন৷’
‘আসলে দরকারটা আপনার সঙ্গে৷ আপনার আগে যিনি ওসি ছিলেন, অশোক সামন্ত, তাকে খুব ভাল চিনতাম৷ তিনি কয়েকটা ব্যাপারে খুব সাহায্য করেছিলেন৷ আপনিও যদি একটু সাহায্য করেন, ভাল হয়৷’
‘সাহায্য? কী ব্যাপারে?’
‘আপনাদের এলাকায় অমিত দাস বলে একটি ছাত্র খুন হয়েছে৷ অমিত এখানেই একটা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পড়ত৷ ওই কেসটার ব্যাপারে একটু জানতে চাইছিলাম৷ মানে, পুলিশ ইনভেস্টিগেট করে যতটুকু জানতে পেরেছে৷’
‘আপনি কে? আপনাকে পুলিশ ইনভেস্টিগেশনের ব্যাপারে জানাব কেন?’
‘ও হো, দেখেছেন, আমার পরিচয়টাই দেওয়া হয়নি৷ আমার নাম আদিত্য মজুমদার৷ আমি একজন বেসরকারি গোয়েন্দা৷ কলকাতা পুলিশের সঙ্গে আমার খুব ভাল সম্পর্ক৷ বহু ব্যাপারে আমি পুলিশকে সাহায্য করেছি৷ পুলিশও আমাকে সাহায্য করেছে৷ সেই সুবাদে জানতে চাইছিলাম৷’
ওসি অবিনাশ নন্দর মুখের ওপর নানা অভিব্যক্তি খেলে যাচ্ছে৷ মনে হচ্ছে, আদিত্য মজুমদার নামটা তার অজানা নয়৷ কিন্তু সেটা সে স্বীকার করবে কিনা বুঝতে পারছে না৷
‘শুনুন৷ ওসব বেসরকারি গোয়েন্দা-ফোয়েন্দাকে আমরা কোনও ইনফর্মেশন দিই না৷ এখানে আপনার কোনও সুবিধে হবে না৷ আপনি আসুন, আমি ব্যস্ত আছে৷’ কিছুক্ষণ ভেবে নিয়ে অবিনাশ নন্দ বলল৷
আদিত্য তবুও দাঁড়িয়েছিল৷ ভাবছিল এই লোকটাকে কোনওভাবে বোঝানো যায় কিনা৷
‘আপনি দাঁড়িয়ে আছেন কেন? আমার কথাটা কানে গেল না? যান এখান থেকে৷ আমার অনেক কাজ আছে৷’ অবিনাশ নন্দ কর্কশভাবে বলল৷
এরপর আর দাঁড়িয়ে থাকা চলে না৷ আদিত্য মাথা নিচু করে থানা থেকে বেরিয়ে আসতে আসতে ভাবছিল ব্যাপারটা তার বন্ধু কলকাতা পুলিশের অ্যাডিশানাল কমিশনার গৌতম দাশগুপ্তর কানে তুলবে কিনা৷ কিন্তু অবিনাশ নন্দ যেটা বলেছে সেটা তো ভুল নয়৷ পুলিশ ইনভেস্টিগেশনের গোপন রিপোর্ট কোনও বেসরকারি ব্যক্তিকে জানানোটা অবশ্যই বেআইনি৷ তাই অমিত দাস মার্ডার কেসটার ব্যাপারে পুলিশ যেটা জানতে পেরেছে সেটা আদিত্যর কাছে ডিসক্লোজ করার জন্য গৌতম কখনই সরকারিভাবে অবিনাশকে নির্দেশ দিতে পারে না৷ বড় জোর ইনফর্মালি রিকোয়েস্ট করতে পারে৷ কিন্তু এই অবিনাশ নন্দ যেরকম টেঁটিয়া লোক, গৌতম এই রকম কোনও রিকোয়েস্ট করলে ও গৌতমকে বিপদে ফেলে দিতে পারে৷ আদিত্য জানে, লালবাজারের মধ্যে গৌতমের শত্রুর অভাব নেই৷ বিশেষ করে কিছু বয়স্ক অপদার্থ আছে যাদের সুপারসিড করে গৌতম উন্নতি করেছে তারা গৌতমকে ঘোর অপছন্দ করে৷ তবে একটা ব্যাপারে আদিত্য নিশ্চিত৷ অমিত রায়ের কেসটাতে ওসি সাহেব টাকা খেয়েছে৷
‘আদিত্যদা, আদিত্যদা৷’ কেউ চাপা স্বরে আদিত্যকে ডাকছে৷
আদিত্য রাস্তায় বেরিয়ে এসেছিল৷ পেছন ফিরে দেখল পুলিশের পোশাক পরা ছিপছিপে লম্বা একটি যুবক তাকে ডাকছে৷
‘আমাকে চিনতে পারছেন? আমি এস আই গৌরাঙ্গ সাঁতরা৷’
আদিত্য অল্প অল্প চিনতে পারছে৷ পুরোনো ওসি অশোক সামন্তর আশেপাশে দেখেছিল৷ সে বলল, ‘অবশ্যই চিনতে পেরেছি৷ আমি এখানে এসেছিলাম আপনি খেয়াল করেছেন তা হলে৷’
‘খেয়াল করেছি মানে? আপনি কবে আসবেন সেই দিকে তাকিয়েই তো বসেছিলাম৷’
‘কবে আসব? আপনি জানতেন আমি আসব?’ আদিত্য হতভম্ভ৷
‘একেবারে নিশ্চিতভাবে জানতাম না৷ তবে খুব মনে হচ্ছিল আপনি নকুল দাসের অনুরোধ ফেলতে পারবেন না৷’
‘নকুল দাসের অনুরোধ! তার মানে আপনি জানেন কেন আমি এখানে এসেছিলাম?’
‘জানি না কী করে বলি? আমিই তো নকুল দাসকে আপনার কাছে পাঠিয়েছিলাম৷’
‘আপনি পাঠিয়েছিলেন?’
‘সরাসরি আমি পাঠাইনি৷ শ্যামসুন্দর থানার ওসি সরোজ হালদার অশোকদার, মানে আমাদের আগের ওসি অশোক সামন্তর বন্ধু৷ অশোকদাকে বললাম সরোজ হালদারকে বলুন নকুল দাসের সঙ্গে যোগাযোগ করতে৷ যোগাযোগ করে বলতে সে যেন আপনার সাহায্য চাইতে আসে৷ আপনি যদি সাহায্য করতে রাজি হয়ে যান একমাত্র তা হলেই অমিত দাসের খুনি ধরা পড়বে৷’
‘তার মানে আপনাদের এখনকার ওসি খুনি ধরার ব্যাপারে কিছুই করছে না৷’
‘কিছুই করছে না বললে ভুল বলা হয়৷ খুনটা ধামাচাপা দেবার জন্যে প্রমাণ লোপ থেকে আরম্ভ করে যা কিছু করা যায় সব করছে৷ এটা তো কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়৷ এরকম অসংখ্য ঘটনা আছে যেখানে টাকা খেয়ে এই লোকটা ক্রিমিনালদের আড়াল করে রাখছে৷ ফলে এই অঞ্চলটা ক্রাইমে ভরে গেছে৷ থানার মধ্যে আমরা দু’চারজন যারা সৎভাবে কাজ করতে চাই তারা আর এখানে টিকতে পারছি না৷ তাই কায়দা করে আপনাকে এখানে নিয়ে আসা৷ অমিত দাসের কেসটা আপনি সলভ করে দিলে মনে হয় অবিনাশ নন্দর মুখোশটাও খুলে যাবে৷ আমরাও তাহলে খানিকটা নিশ্বাস ফেলতে পারব৷’
‘একটা কোথাও বসে কথা বলা দরকার৷’ আদিত্য মাথা নিচু করে বলল৷ আসলে সে চিন্তা করছিল৷
‘আমার বাড়িতে যাবেন? বাইকে গেলে বেশিক্ষণ লাগবে না৷’
‘তাই যাওয়া যাক৷ কিন্তু আপনার বস যদি আমার সঙ্গে আপনাকে দেখে ফেলে, আপনার অসুবিধে হবে না?’
‘নতুন করে আর কোনও অসুবিধে হবে না৷ বড়বাবু জানেন আমি তার কাজের সমর্থন করি না৷ এর জন্য তিনি নানাভাবে আমাকে ফাঁসানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন৷ আমিও খুব সাবধানে থাকছি৷ আপনার সঙ্গে কথা বলাটা তো কোনও ক্রাইম হতে পারে না৷’
গৌরাঙ্গ সাঁতরার বাড়ি পৌঁছতে বাইকে মিনিট দশেক লাগল৷ একতলায় দেড় কামরার ফ্ল্যাট৷ একটা ঘরে শোবার এবং বসার ব্যবস্থা৷ একদিকে একটা তক্তপোষ, তার ওপর চায়ের দাগ ধরা বেডকভার, পুরোনো খবরের কাগজ, ম্যাগাজিন, গেরস্থালির আরও দু’একটা টুকিটাকি, লেখার টেবিল-চেয়ার৷ অন্যদিকে চারটে বেতের চেয়ার, একটা সেন্টার টেবিল৷ এছাড়া যে অন্য আধখানা ঘর আছে সেটা আসলে একটা ঢাকা বারান্দা৷ গৌরাঙ্গ সাঁতরা সেখানে রান্নাবান্নার ব্যবস্থা করে নিয়েছে৷
‘চা খাবেন তো আদিত্যদা৷’ আদিত্যর সম্মতির অপেক্ষা না করেই গৌরাঙ্গ চায়ের জল বসাতে রান্নাঘরে ঢুকল৷
আদিত্য ঘরটা ঘুরে ঘুরে দেখছিল৷ দেখা হয়ে যাবার পর একটা বেতের চেয়ারে বসল৷ গৌরাঙ্গ রান্নাঘরে খুটখাট করছে৷ একটু পরে দুটো প্লেটে দুটো অমলেট নিয়ে ফিরে এল৷
‘এসব আবার কেন?
‘প্রথম দিন এসেছেন৷ ঘরে একটু মিষ্টিও নেই৷ তাই অমলেট বানালাম৷’
‘আপনি এখানে একাই থাকেন মনে হচ্ছে৷’
‘হ্যাঁ, একাই থাকি৷ কিন্তু প্লিজ আদিত্যদা আমাকে আপনি বলবেন না৷ আমি আপনার থেকে অনেক ছোট৷’
‘ঠিক আছে, ঠিক আছে৷ তা তোমার পরিবারে কেউ নেই? মা, বাবা?
‘মা, বাবা দুজনেই মারা গেছে৷ দাদা বউ বাচ্চা নিয়ে বলাগড়ে মানে আমাদের দেশের বাড়িতে থাকে৷ দুই দিদির বিয়ে হয়ে গেছে৷ একজন থাকে পাটনায়, একজন নয়ডায়৷’
‘বুঝেছি৷ এবার অমিত দাসের কেসটা নিয়ে একটু জিজ্ঞেস করি৷’
‘এক মিনিট৷ চায়ের জলটা মনে হয় হয়ে গেছে৷ আমি চা-টা নিয়ে আসছি৷ আপনি চায়ে দুধ-চিনি খান?’
‘দুধও নয়, চিনিও নয়৷ স্রেফ লিকার৷’
‘বাঃ৷ আমিও তাই৷’
একটু পরে গৌরাঙ্গ টি-ব্যাগ ভেজানো দুটো চায়ের কাপ নিয়ে ফিরে এল৷ সঙ্গে একটা কৌটোয় থিন অ্যারারুট বিস্কুট৷ টেবিলের ওপরটা নড়বড় করছে৷ একটা পেরেক খুলে এসেছে৷ গৌরাঙ্গ চায়ের কাপ দুটো চেয়ারে রেখে একটা বড় হাতুড়ি নিয়ে এসেছে৷ পেরেকের ওপর কয়েকবার ঘা লাগাল৷ বলল, ‘সরি আদিত্যদা, এই আসবাবগুলো সবই রিটায়ারমেন্ট-এর বয়েস পেরিয়ে গেছে৷ কিন্তু এদের অবসর দেবার সামর্থ আমার নেই৷’
‘তোমার এখনও স্ট্যাম্প জমানোর শখ আছে? একটা স্ট্যাম্পের খাতা তোমার পড়ার টেবিলের ওপর দেখছিলাম৷’
‘ও হো আপনি দেখে ফেলেছেন৷’ বাচ্চারা দুষ্টুমি করে ধরে পড়ে গেলে যেমন মুখ করে গৌরাঙ্গ সেরকম একটা মুখ করল৷ ‘ছোটবেলার নেশা, এখনও ছাড়তে পারিনি৷’
‘একটা নেশা থাকা ভাল৷ সে যাক৷ তুমি এবার অমিত দাসের মার্ডার কেসটার কথা বল৷’
‘এক দিক থেকে দেখলে, আদিত্যদা, অমিত দাসের মার্ডারটা খুব সোজাসাপটা৷ প্রথম থেকে বললে আপনার বুঝতে সুবিধে হবে৷ এই অমিত দাস ছেলেটি লেখাপড়ায় বেশ ভাল ছিল৷ দেখতে টেখতেও বেশ সুন্দর৷ লাজুক, ওয়েল-বিহেভড বয়৷ ওর মাস্টার মশাইরা সকলেই তাই বলেছে৷ ও হ্যাঁ, বলতে ভুলে গেছি৷ এই কেসটা প্রথম দিকে আমিই ইনভেস্টিগেট করছিলাম৷ ভাগ্যক্রমে বড়বাবু তখন ছুটিতে ছিলেন৷ ফ্যামেলি নিয়ে ইয়োরোপ বেড়াতে গেছিলেন৷ পাপের টাকাগুলো খরচা করতে হবে তো৷ ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গে বড়বাবুর কাছে মাসুদ সাহেবের নির্দেশ পৌঁছল এই কেসটায় ঢিলে দিতে হবে৷ ফলে আমাকে এই কেসটা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়৷’
‘মাসুদ মানে ইব্রাহিম মাসুদ? আলিনার বাবা?’
‘হ্যাঁ৷ আপনাকে এদের কথা নকুল দাস নিশ্চয় বলেছে৷ তাই ধরে নিচ্ছি আপনি এই নামগুলোর সঙ্গে পরিচিত৷’
‘হ্যাঁ বলেছে৷ কিন্তু আপনি আপনার মতো করে বলুন৷’ আদিত্য মাঝে মাঝে গৌরাঙ্গকে আপনি বলে ফেলছে৷
‘যা বলছিলাম৷ যেহেতু প্রথম দিকে কেসটা আমি ইনভেস্টিগেট করেছিলাম, ব্যাপারটা মোটামুটি আমার জানা৷ প্রায় সিনেমার গল্পের মতো ঘটনা৷ সংক্ষেপে বলতে গেলে, গ্রামের লাজুক, সুদর্শন এবং মেধাবী ছেলে অমিত দাসের প্রেমে পড়েছিল আলিনা মাসুদ, স্থানীয় ডন ইব্রাহিম মাসুদের একমাত্র মেয়ে৷ ইব্রাহিম মাসুদ ব্যাপারটা পছন্দ করেনি৷ মাসুদের গুন্ডারা কয়েকবার অমিতকে শাসিয়েছিল৷ তা সত্ত্বেও যখন দেখা গেল অমিতের সঙ্গে আলিনার মেলামেশা কমছে না তখন মাসুদের গুন্ডারা একদিন অমিতকে ধরে বেধড়ক মারধোর করল৷’
‘মারধোর করল? কই মারধোর করার কথা তো নকুল দাস কিছু বলেনি!’
‘তার মানে অমিত তার বাবাকে জানাতে চায়নি যে সে মার খেয়েছে৷’
‘অমিতকে মাসুদের গুন্ডারা মারধোর করেছে এটা আপনি মানে তুমি জানলে কী করে?’
‘অমিতের বন্ধু সিরাজুল মণ্ডলের কাছ থেকে৷ নকুল দাস নিশ্চয় সিরাজুলের কথা আপনাকে বলেছে৷’
‘হ্যাঁ বলেছে৷ সিরাজুল এই মারধোরের ব্যাপারটার সম্বন্ধে ঠিক কী বলেছিল?’
‘সিরাজুল আর অমিত খুব বন্ধু ছিল৷ একেবারে প্রাণের বন্ধু৷ সিরাজুলকে অমিত সব কথাই বলত৷ বস্তুত, সিরাজুলই এক সময় আলিনার সঙ্গে অমিতের আলাপ করিয়ে দিয়েছিল৷ অমিত-আলিনার প্রেমপর্বের প্রত্যেক স্টেজে কী কী হয়েছিল সিরাজুল জানত৷ সিরাজুলই ছিল অমিতের পরামর্শদাতা৷ অমিতকে যে মাসুদের গুন্ডারা শাসাচ্ছে সেটা, বলাই বাহুল্য, সিরাজুল জানত৷ সিরাজুল অনেকবার অমিতকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল যে আলিনার সঙ্গে সম্পর্কটা থেকে বেরিয়ে আসাটাই অমিতের পক্ষে বুদ্ধির কাজ হবে৷ ওই অঞ্চলে ইব্রাহিম মাসুদ এতটাই ক্ষমতাসম্পন্ন যে তার বিরুদ্ধে গিয়ে তার মেয়ের সঙ্গে মেলামেশা করা আত্মহত্যা করার সামিল৷ অমিত সে সব কথা শোনেনি৷ বলত, সে আলিনাকে নিয়ে পালিয়ে যাবে৷ কিন্তু তার আগে তাকে ইঞ্জিনিয়ারিংটা পাশ করে একটা চাকরি পেতে হবে৷ এসব কথা আমি সিরাজুলের কাছ থেকে শুনেছি৷’
‘মারধোরের ব্যাপারটা কবে ঘটল?’
‘বলছি৷ আস্তে আস্তে সব বলছি৷ মাসুদের গুন্ডারা বডিগার্ড হয়ে আলিনাকে কলেজ গেট অবধি পৌঁছে দিত আবার কলেজ গেট থেকে নিয়ে আসত৷ কিন্তু কলেজের ভেতরে তাদের ঢোকা বারণ ছিল৷ ফলে অমিত আর আলিনা মূলত কলেজের মধ্যেই দেখাশোনা করত৷ কে সি এম ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ক্যাম্পাসটা দেখেছেন? বিরাট ক্যাম্পাস৷ প্রায় পঁচিশ একর এরিয়া৷ ওদের অ্যাগ্রিকালচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এর ছাত্রদের জন্য ভেতরে চাষবাষও হয়৷ ওই অত বড় ক্যাম্পাসে একটা গোপন জায়গা খুঁজে নিয়ে দেখা করা খুব শক্ত নয়৷ ইব্রাহিম মাসুদ যখন ব্যাপারটা বুঝতে পারল তখন সে মেয়ের কলেজ যাওয়াটাই বন্ধ করে দিল৷’
গৌরাঙ্গ একটু থেমে চায়ের কাপে চুমুক দিল৷ তারপর আবার বলতে শুরু করল৷
‘ঠিক এই সময় একদিন, অমিত যখন কলেজ থেকে সাইকেলে বাড়ি ফিরছিল, একটা নির্জন জায়গায় কিছু লোক তাকে আক্রমণ করে এবং বেধড়ক মারধোর দেয়৷ তারপর রাস্তার ধারে অমিতকে অজ্ঞান অবস্থায় ফেলে রেখে লোকগুলো পালিয়ে যায়৷ ওই অবস্থায় অমিত অনেকক্ষণ পড়েছিল৷ পরে মাঠ-ফেরত কিছু চাষি অমিতকে দেখতে পেয়ে হাসপাতালে নিয়ে যায়৷ সেখানে অমিতের জ্ঞান ফিরে আসার পর সে সিরাজুলকে ফোন করে৷ অমিতের কথা মতো সিরাজুল ওই নির্জন জায়গাটা থেকে অমিতের সাইকেলটা উদ্ধার করে এবং তার পরের দিন হাসপাতালে অমিতকে দেখতে আসে৷ লক্ষ করার ব্যাপার হল, কয়েকদিন পরে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে অমিত যখন পুলিশের কাছে এফ আই আর করতে যায় তখন পুলিশ খুব দায়সারা ভাবে একটা এফ আই আর নিয়েছিল বটে কিন্তু তার ভিত্তিতে কোনও অ্যাকশান নেয়নি৷ এটা অবশ্য আমি অনেক পরে জানতে পেরেছি৷’
‘এসব কতদিন আগেকার ঘটনা?’
‘আলিনার কলেজ যাওয়া ঠিক কবে থেকে বন্ধ হয়েছিল বলতে পারব না, তবে সিরাজুল বলেছিল অমিত দাস খুন হবার দু’আড়াই মাস আগে থেকে আলিনার কলেজ যাওয়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল৷ আবার হাসপাতালের রেকর্ড বলছে জুলাই মাসের শেষ দিকে অমিত দাস হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল৷
‘হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে অমিত আলিনার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেনি?’
‘কী করে যোগাযোগ করবে? আলিনা তো তখন বাড়ির ভেতর বন্দি৷ তবু অমিত ক্লাস কামাই করে আলিনার বাড়ির পেছন দিকে লুকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত৷ বাড়ির পেছন দিকটা উত্তর দিক৷ সেদিকটা ঝোপঝাড় জঙ্গলে ভর্তি৷ লুকিয়ে থাকলে কেউ দেখতে পাবে না৷ বাড়ির উত্তর দিকে একটা বারান্দা আছে৷ কখনও কখনও সুযোগ পেলে আলিনা উত্তরের বারান্দায় এসে দাঁড়াত৷ তখন নানারকম ইশারায় তাদের কথা হত৷ দিনে দু’তিনবার আলিনাকে দেখার জন্যে অমিত সারাদিন দাঁড়িয়ে থাকত৷ সিরাজুলকে সে এই রকমই বলেছিল৷ শুনে মনে হয় নিছক পাগলামি কিংবা রোমিও-জুলিয়েটের গল্প৷ গুরুত্বপূর্ণ কথাটা হল, অমিত দাসের মৃতদেহটা আলিনার বাড়ির উত্তর দিকের ওই ঝোপ-জঙ্গল থেকেই পাওয়া গিয়েছিল৷’
‘কী ভাবে মারা গিয়েছিল অমিত দাস?’
‘পেছন থেকে ওর মাথায় আঘাত করা হয়েছিল৷ মাথার পেছনে গভীর আঘাতের চিহ্ন ছিল৷ একটাই আঘাত৷ এতেই অমিত দাসের মৃত্যু হয়েছিল৷’
‘কী ধরনের জিনিস দিয়ে আঘাত করা হয়েছিল?’
‘ভোঁতা কিছু দিয়ে৷ লোহা বাঁধানো লাঠি হতে পারে৷ লোহার রড হতে পারে৷’
‘অমিত দাসের বডি কে প্রথম দেখেছিল?’
‘ভোরবেলা স্থানীয় লোকেরা ওই জঙ্গলে প্রাতঃক্রিয়াদি সারতে যায়৷ তাদেরই একজন বডিটা দেখতে পেয়ে পুলিশে খবর দিয়েছিল৷ ডাক্তার বলছে মৃত্যুর সময় তার আগের দিন সন্ধে সাতটা থেকে আটটার মধ্যে৷’
গৌরাঙ্গ সাঁতরা চুপ করল৷ মনে হচ্ছে তার যেটুকু বলার ছিল বলা হয়ে গেছে৷ আদিত্যও কথা বলছে না৷ কলকাতায় এখনও তেমন শীত না পড়লেও এই মফস্বল বেশ ঠান্ডা৷ বিশেষ করে এই ঘরটা একতলায় বলে সরাসরি রোদ্দুর পায় না৷ আদিত্যর শীত করছিল৷ সে ভাবল এবার উঠবে৷
‘ইব্রাহিম মাসুদের কার্যকলাপ নিয়ে কিছু বলবে?’ আদিত্য উঠতে উঠতে বলল৷
‘মাসুদ সাহেবের কার্যকলাপ নিয়ে বলতে গেলে সারা দিনটাই লেগে যাবে৷ এর লোক-দেখানো একটা চামড়ার ব্যবসা আছে৷ কিন্তু আসলে এর নানারকম বেআইনি কারবার৷ এই এলাকায় সাট্টা, মদ চোলাই, মেয়ে পাচার ইত্যাদি সম্প্রতি বেশ বেড়ে গেছে৷ এটা ওপেন সিকরেট যে এই ব্যবসাগুলো বকলমে মাসুদ সাহেবই চালান৷ কিন্তু এখন অব্দি তাঁর বিরুদ্ধে কিচ্ছু প্রমাণ করা যায়নি৷ কী করেই বা যাবে? কিছু প্রমাণ করতে গেলে তো তদন্ত করতে হয়৷ এই থানায় অবিনাশ নন্দ আসার পর থেকে মাসুদ সাহেবের বিরুদ্ধে সমস্ত তদন্ত বন্ধ হয়ে গেছে৷ এবং এই সময় থেকেই এই অঞ্চলে ক্রাইমের সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছে৷ এটা তো আর সমাপতন হতে পারে না৷ আমি অবশ্য আপনাকে এই সব ক্রাইমের সমাধান করতে বলছি না৷ আমি বলছি, আপনি যদি অমিত দাসের খুনি হিসেবে মাসুদকে ধরতে পারেন, তাহলেই আমাদের কাজ হয়ে যাবে৷ মাসুদ জেলে গেলে এই অঞ্চলটাও স্বাভাবিক হয়ে যাবে৷’
আদিত্য বেরোতে যাচ্ছে, গৌরাঙ্গ বলল, ‘একটা রিকোয়েস্ট আদিত্যদা৷ এই পুরো ব্যাপারটা অ্যাডিশনাল কমিশনার সাহেবকে যদি জানিয়ে রাখেন ভাল হয়৷ ঘটনাটা জানা থাকলে উনি হয়তো ইনসাবর্ডিনেশনের চার্জ থেকে আমাকে বাঁচাতে পারবেন৷’
অ্যাডিশনাল কমিশনার গৌতম দাশগুপ্তর ঘরে মিটিং চলছে৷ আদিত্যকে গৌতম মেসেজ করেছে, মিনিট পনেরো ভিজিটিং রুমে বোস৷ আমার হয়ে গেলেই তোকে ডেকে নিচ্ছি৷ পনেরো মিনিট অনেকক্ষণ হয়ে গেছে৷ প্রায় আধঘণ্টা হতে চলল, আদিত্য ভিজিটিং রুমে বসে আছে৷ ঘরে আর কেউ নেই, শুধু দেয়ালে কয়েকটা ছবি৷ একজন বেয়ারা এসে চা দিয়ে গেছে৷ আদিত্য চা খেতে খেতে ছবিগুলো দেখছিল৷ তার মধ্যে একটা ছবি বেশ ইন্টারেস্টিং৷ ঠিক ছবি নয়, ১৫ই আগস্ট, ১৯৪৭-এর স্টেটসম্যান-এর প্রথম পাতাটা বাঁধানো৷ হাতে চায়ের কাপ নিয়ে বাঁধানো কাগজটার সামনে দাঁড়িয়ে আদিত্য পড়ছিল স্বাধীনতা উপলক্ষে নেহরু কী বলছেন৷ বড় লাট কী বলছেন৷ পড়া শেষ হয়ে গেল, চা খাওয়াও শেষ৷ আদিত্য আর কী করবে, সোফায় বসে ঝিমোচ্ছে৷
ডাক এল আরও মিনিট পাঁচেক পরে৷ আদিত্য গৌতমের ঘরে ঢুকে দেখল ওর মিটিং করার বড় টেবিলটার ওপর কয়েকটা ব্যবহৃত চায়ের কাপ এখনও পড়ে রয়েছে৷ তিনটে প্লেটে কিছু না-খাওয়া বিস্কুট৷ দুজন বেয়ারা ঘরে ঢুকে চায়ের কাপ, বিস্কুটের প্লেটগুলো ট্রেতে তুলছিল৷
‘বোস৷ অনেকদিন তোর পাত্তা নেই৷ কেমন আছিস?’ গৌতম নিজের চেয়ারে বসতে বসতে বলল৷ ‘চা খেয়েছিস?’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ৷ চা দিয়েছিল৷ শোন, তুই খুব ব্যস্ত আছিস৷ আমি বেশি সময় নেব না৷ খুব অল্প কথায় কী কারণে এসেছি তোকে জানিয়ে রাখি৷’
আদিত্য সংক্ষেপে অমিত দাসের খুন হবার ঘটনাটা বলছিল৷ ওই অঞ্চলে ডন ইব্রাহিম মাসুদের প্রতিপত্তি, দুর্নীতিগ্রস্ত বড়বাবু অবিনাশ নন্দর অপদার্থতা, এস আই গৌরাঙ্গ সাঁতরার বৃত্তান্ত এই সব শুনতে শুনতে গৌতমের মুখটা ক্রমশ উজ্জ্বল হচ্ছিল৷
একেবারে শেষে আদিত্য বলল, ‘তোর কাছে এই মুহূর্তে কোনও সাহায্য চাইছি না৷ শুধু ব্যাপারটা তোকে জানিয়ে রাখলাম৷ অবিনাশ নন্দ যদি খুব ঝামেলা করে একটু সামলে দিস৷’
গৌতম আদিত্যর শেষদিকের কথাগুলো শুনছিল না৷ অন্য কথা ভাবছিল৷ আদিত্য চুপ করতে গৌতম বলল, ‘একটু ভাল করে বুঝে নিই৷ তুই কোন এরিয়ার কথা বলছিস?’
‘নরেন্দ্রপুর আর হরিনাভির মাঝখানে প্রায় পাঁচশো’ একর জায়গা নিয়ে কে সি এম ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ৷ তার আশেপাশে ঘটনাগুলো ঘটেছে৷’
‘তা হলে তো আমার সাহায্য তুই চাস বা না চাস, আমাকে তোর সাহায্য চাইতে হবে৷ তোকে ব্যাপারটা খুলে বলি৷ তুই এস টি এফ জানিস?’
‘হ্যাঁ, কিছুটা জানি৷ স্পেশাল টাস্ক ফোর্স৷ কোনও বিশেষ একটা অপরাধ বা অপরাধীকে ধরার জন্য রাজ্য পুলিশ একটা এস টি এফ তৈরি করতে পারে৷’
‘একদম ঠিক৷ যেমন চন্দন-দস্যু বীরাপ্পনকে ধরার জন্য তামিলনাডু এবং কর্নাটকের সরকার করেছিল৷ তা আমাদের এখানেও একটা এস টি এফ তৈরি হয়েছে৷ কিছুক্ষণ আগে তাদের সঙ্গেই মিটিং চলছিল৷ বুঝতেই পারছিস এটা টপ সিক্রেট৷’
আদিত্য চুপ করে শুনে যাচ্ছে৷ এখনও বুঝতে পারছে না গৌতম তাকে এসব কথা কেন বলছে৷
‘তুই তো জানিস এখন টেররিসম আমাদের দেশের একটা বড় সমস্যা৷ আরও সমস্যা হল, এই টেররিস্টরা দিল্লি-মুম্বাই-পুনেতে অপকর্ম করে কলকাতা এবং তার আশেপাশের অঞ্চলে এসে আশ্রয় নিচ্ছে৷ অর্থাৎ কলকাতা এবং তার আশেপাশের অঞ্চলগুলোকে তারা সেফ হাভেন মনে করছে৷ যে এস টি এফ-টা তৈরি হয়েছে তাদের মূল কাজ উগ্রপন্থীদের এই নিরাপদ আশ্রয়গুলো খুঁজে বের করা এবং তাদের গ্রেফতার করা৷ কিন্তু তার আগে আর একটা কাজ আছে৷ স্বাভাবিকভাবেই এই টেররিস্টদের লোকাল কোনও কনট্যাক্ট আছে যারা উগ্রপন্থীদের জন্যে নিরাপদ থাকার জায়গা ঠিক করে দিচ্ছে৷ আমাদের জানতে হবে কারা এই কনট্যাক্ট৷
‘কিন্তু আমি এর মধ্যে আসছি কেন?’
‘বলছি কেন আসছিস৷ আমাদের সোর্সগুলো জানাচ্ছে, নরেন্দ্রপুর থেকে হরিনাভির মধ্যে, অর্থাৎ ঠিক যে অঞ্চলটা তুই বললি সেখানে, কোথাও একটা টেররিস্টরা লুকিয়ে আছে৷ সম্ভবত তিনজন টেররিস্ট৷ কিছুদিন আগে দিল্লিতে যে বম্ব ব্লাস্ট হল, এই তিনজন সেটা ঘটিয়েছিল৷ আমার কথা হল, তুই যেহেতু ওই অঞ্চলটায় তদন্ত চালাচ্ছিস, হয়তো কোনও ইররেগুলারিটি বা অদ্ভুত কিছু তোর চোখে পড়তে পারে যেখান থেকে আমরা উগ্রপন্থীদের অথবা তাদের লোকাল কনট্যাক্টদের হদিশ পেতে পারি৷ আমার প্রস্তাব, তুই এই ব্যাপারে আমাদের সাহায্য কর৷ তোকে এমনি এমনি সাহায্য করতে হবে না৷ উগ্রপন্থীদের হদিশ দিতে পারলে একটা মোটা রিওয়ার্ড দেবে বলে সেন্ট্রাল গভরমেন্ট ঘোষণা করেছে৷ তুই এস টি এফ-এর বাইরে থেকে আমাদের শুধু ইনফর্মেশন দিবি৷’
‘রাজি আছি৷ শুধু একটা শর্ত৷ নরেন্দ্রপুর থানার এস আই গৌরাঙ্গ সাঁতরাকে একটু স্বাধীনতা দিতে হবে যাতে ও এবং ওর সঙ্গে আমি অমিত দাস মার্ডারের কেসটা ফ্রিলি তদন্ত করতে পারি৷’
গৌতম কিছুক্ষণ ভাবল৷ তারপর বলল, ‘সেটা করা যাবে৷ ইদানিং ওই অঞ্চলে সাট্টা-ড্রাগ-চোরাই মদ ইত্যাদির উপদ্রব খুব বেড়েছে৷ নিয়মিত খুন-জখম হচ্ছে৷ স্থানীয় থানায় নালিশ করে লাভ হয়নি তাই ওই অঞ্চলের অধিবাসীরা লালবাজারে কমপ্লেন করেছিল৷ আমরা সেই অনুযায়ী লালবাজার থেকে ইনভেস্টিগেশন শুরু করেছিলাম৷ কিন্তু লোকাল কোনও অফিসার ইনভেস্টিগেশনটা করলে আরও ভাল হয়৷ সেই হিসেবে কমপ্লেনটা ইনভেস্টিগেট করার ভার আমরা সরাসরি এস আই গৌরাঙ্গ সাঁতরাকে দিতেই পারি৷ লালবাজার থেকে নির্দেশ গেলে এই ব্যাপারে ওসির কিছু করার থাকবে না৷’
‘ওকে৷ থ্যাঙ্ক ইউ৷’
‘একটা দরকারি কথা৷ এই এস টি এফ-এর ব্যাপারটা কিন্তু টপ সিক্রেট৷ এটার কথা বা এটার উদ্দেশ্য কাউকে বলা যাবে না৷ গৌরাঙ্গ সাঁতরাকেও নয়৷’
‘নো প্রবলেম বস৷’
‘আর একটা খুব দরকারি কথা৷ আমার ধারণা পুলিশের মধ্যে কেউ কেউ আছে যারা আমাদের ভেতরের খবর এবং প্ল্যানগুলো টেররিস্টদের আগে আগে জানিয়ে দিচ্ছে৷ স্পাই-থ্রিলারে যাকে বলে মোল৷ সেরকম মোল হয়তো লালবাজারেও আছে৷ ফলে টেররিস্টদের ধরতে গেলে লাস্ট মোমেন্টে ওরা পালিয়ে যাচ্ছে৷ এরকম দু’তিনবার হয়েছে৷ তাই আমাদের খুব সাবধান থাকতে হবে৷ তোকে ব্যাপারটা জানিয়ে রাখলাম৷’
বাড়িটা দোতলা, সামনে ফুলের বাগান৷ বাগানের ভেতর দিয়ে বাঁধানো রাস্তা লোহার গেট থেকে শুরু হয়ে সদর দরজায় গিয়ে ঠেকেছে৷ গেটে তালা নেই৷ অর্গল খুলে যে কেউ ভেতরে চলে আসতে পারে৷ ভেতরে ঢুকে এক ঝলক দেখলেই বোঝা যায়, বাগানটা সযত্নলালিত৷ এই বাড়িতে গৌরাঙ্গ সাঁতরা আগে একবার এসেছিল৷ সে-ই আদিত্যকে পথ দেখিয়ে নিয়ে এসেছে৷ সদর দরজায় বেল বাজানোর আগে আদিত্য একবার বাগানটা ঘুরে দেখতে চাইছিল৷
আগের বার গৌরাঙ্গ বাড়ির পেছন দিকটা দেখেনি৷ এবার ওরা দুজনে বাড়িতে ঢোকার আগে বাড়ির চারপাশটা ঘুরে দেখছে৷ পেছনে টিনের ছাউনি দেওয়া দরোয়ানের ঘর৷ সব্জি-বাগান৷ পাতকুয়ো৷ একটা লোক আদুড় গায়ে কুয়োতলায় বসে তেল মাখছিল৷ বোঝাই যায় স্নানের প্রস্তুতি নিচ্ছে৷ আদিত্য এবং ইউনিফর্মহীন গৌরাঙ্গকে দেখে জিজ্ঞেস করল, ‘কাকে চাই?’
‘সিরাজুল মণ্ডলের সঙ্গে দেখা করব৷ তার আগে বাড়ির চারদিকটা ঘুরে দেখছি৷ আমরা পুলিশের লোক৷’ গৌরাঙ্গ গম্ভীরভাবে বলল৷
পুলিশের নাম শুনে স্নানার্থীকে কিঞ্চিত বিচলিত দেখাচ্ছে৷ ‘কী ব্যাপার স্যার? ছোটসাহেব বাড়িতেই আছেন৷ আমি খবর দেব?’ কথাগুলো বলে আর উত্তরের অপেক্ষা না করে লোকটা বাড়ির সদর দরজার দিকে দৌড় লাগাল৷
পুলিশ এসেছে শুনে সিরাজুল বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছে৷ গৌরাঙ্গকে দেখে হালকা হাসল৷ ‘ভাল আছেন স্যার?’
‘ভাল আছি সিরাজুল৷ তুমি কেমন আছ? আর একবার তোমার সঙ্গে কথা বলতে এলাম৷ ইনি আদিত্য মজুমদার, বিখ্যাত গোয়েন্দা৷ অমিতের বাবার অনুরোধে উনি অমিতের কেসটা নিয়ে তদন্ত করছেন৷ তোমার সঙ্গে কথা বলতে চান৷ তাই ওঁকে এখানে নিয়ে এলাম৷ তোমার এখন সময় আছে তো?’
‘একটা ক্লাস আছে, সেটাতে না গেলেও চলবে৷ আপনারা ভেতরে আসুন৷’
কালো, রোগা, লম্বা সিরাজুলের চেহারাটা আদিত্যর বেশ আকর্ষণীয় লাগল৷ এ যুগের ফ্যাশন অনুযায়ী গালে হালকা দাড়ি৷
বাড়িতে ঢুকে একটা প্যাসেজ, সেটা শেষ হয়েছে একটা বড় ঘরে৷ ওটাই বসার ঘর৷ একতলা দোতলা মিলিয়ে মনে হল আরও বেশ কয়েকটা ঘর আছে৷
‘এত বড় বাড়িতে তুমি একা থাক?’ আদিত্য বসার ঘরে ঢুকে একটা চেয়ারে বসতে বসতে জিজ্ঞেস করল৷
‘কিছুটা সময় একা থাকি৷ আবার কখনও কখনও ব্যবসার কাজে কলকাতায় এলে আমার আব্বাও এখানে থাকেন৷ শুধু আব্বা নন, আমাদের কোম্পানির অনেককেই কাজে কলকাতায় আসতে হয়৷ তাদেরও এখানে থাকার ব্যবস্থা৷ আব্বা এত বড় বাড়িটা ভাড়া করেছেন যাতে দেশ থেকে লোকে এলে এখানে থাকতে পারে৷ বলা যায় এটা আব্বার কোম্পানির গেস্ট হাউস৷’
‘এখন কি তুমি ছাড়া কেউ এখানে থাকছে?’ আদিত্য হালকা ভাবে জিজ্ঞেস করল৷
‘একজন থাকছেন৷ তবে এখন বেরিয়েছেন৷ আমাদের কোল্ড স্টোরেজের ম্যানেজার৷ পোস্তায় গেছেন৷ এবার আলুর ফলন খুব ভাল হয়েছে৷ স্টোর একদম ভর্তি৷ ম্যানেজার সাহেব পোস্তায় আলুর আড়তদারদের সঙ্গে কথা বলতে গেছেন৷ এছাড়া অবশ্য একজন রান্নার লোক আর একজন দরোয়ান সারা বছরই এখানে থাকে৷’
‘তুমি এখানে পড়তে আসার পরই কি বাড়িটা তোমার আব্বা ভাড়া করেছেন?’
‘হ্যাঁ৷ আগে খিদিরপুরে আমাদের একটা বাড়ি ভাড়া নেওয়া ছিল৷ বাড়িটা খুব পুরোনো৷ তার ওপর জায়গা কম৷ আমি যখন এখানে পড়তে এলাম আব্বা বলল তা হলে এই অঞ্চলেই একটা ভাল বাড়ি ভাড়া নেওয়া যাক৷ কম্পানির কাজও হবে আবার আমিও থাকতে পারব৷’
সিরাজুলের কাছ থেকে অমিত দাসের ব্যাপারে নতুন কিছু জানা গেল না৷ যে কথাগুলো সে নকুল দাস এবং গৌরাঙ্গ সাঁতরাকে বলেছিল মোটামুটি সেগুলোই আবার আদিত্যকে বলল৷
সিরাজুল বলছিল, ‘মাত্র একবার আমি আলিনার বাবাকে দেখেছি৷ আলিনার সঙ্গে যখন অমিতের খুব প্রেম চলছে তখন আলিনার বাবা ওদের বাড়িতে আমাকে ডেকে পাঠিয়েছিল৷ লোকটার কথাবার্তা গুন্ডাদের মতো৷ আমাকে বলল, তোমার বন্ধুকে বলে দিও আমার মেয়ের সঙ্গে যদি আর মেশার চেষ্টা করে তাহলে তার জীবনের দায়িত্ব আমি নিতে পারব না৷ কথাটা ওকে একবার বলা হয়েছে৷ ও শোনেনি৷ আমি কিন্তু বারবার এক কথা বলতে পারব না৷ ওর ভালর জন্যেই ওকে সাবধান করে দিও৷ আমি বলার চেষ্টা করলাম, অমিত কিন্তু খুব ভাল ছেলে৷ শুধু লেখাপড়ায় নয়, স্বভাবে, আচার-আচরণে৷ আলিনার বাবা বলল, তুমি একজন সাচ্চা মুসলমান হয়ে কী করে ভাবলে একটা হিন্দুর ছেলের সঙ্গে আমি মেয়ের বিয়ে দেব? এরপর তো আর কিছু বলার থাকে না৷ আমি ওদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে অমিতের সঙ্গে দেখা করলাম৷ ওকে হাতজোড় করে আলিনার সঙ্গে আর না মিশতে অনুরোধ করলাম৷ ও আমার সব কথা মাথা নিচু করে শুনল৷ কিন্তু ওর মুখ দেখেই বুঝতে পারছিলাম আমার অনুরোধ ও রাখবে না৷’
ওঠার আগে আদিত্য বলল, ‘সিরাজুল, আমার এক বন্ধু অর্থনীতি পড়ায়৷ পশ্চিমবঙ্গের আলুর বাজার নিয়ে গবেষণা করছে৷ বিশেষ করে কোল্ড স্টোরেজগুলো থেকে যে আলুর বন্ড ছাড়া হয় তার দামের ওঠাপড়া নিয়ে আমার বন্ধুর কাজ৷ তোমার আব্বার সঙ্গে যদি ও একটু কথা বলতে চায়, তোমার আব্বা কি রাজি হবেন?’
‘নিশ্চয় রাজি হবেন৷ কেন হবেন না? আমি আব্বার নাম, ঠিকানা আর ফোন নম্বরটা দিয়ে দিচ্ছি৷ আপনি আপনার বন্ধুকে ফোন করতে বলবেন৷ আমি আব্বাকে বলে রাখব৷’
আদিত্য যে মিথ্যে বলল তা নয়৷ আদিত্যর এক বন্ধু, অ্যামেরিকায় থাকে, গরিব দেশের অর্থনীতি নিয়ে গবেষণা করে, কিছুদিন আগে পশ্চিমবঙ্গের আলুর বাজার নিয়ে সার্ভে করতে কলকাতায় এসেছে৷ সে ক’দিন আগেই আদিত্যকে জিজ্ঞেস করছিল আদিত্য কোনও বড় আলুর ব্যবসায়ীকে চেনে কিনা৷
সিরাজুলের বাবার নাম রফিকুল মণ্ডল৷ তার কোল্ড স্টোরেজগুলো হুগলির ধনেখালি অঞ্চলে৷
‘অমিত দাস কম্পিউটার সায়েন্সে ওর ব্যাচের সেরা ছাত্র ছিল৷ শুধু কম্পিউটার সায়েন্স নয়, সমস্ত স্ট্রিম মিলিয়ে আমাদের যে বেস্ট স্টুডেন্ট অ্যাওয়ার্ড আছে, সেটাও ও গত বছর পেয়েছিল৷ অত্যন্ত ভদ্র, বিনয়ী, লাজুক একটা ছেলে৷ তার এই ভয়ঙ্কর পরিণতি আমরা এখনও ভাবতে পারছি না৷ সত্যি বলতে কি, স্টুডেন্ট-টিচার সকলেই হতভম্ভ৷’ কে সি এম কলেজের প্রিন্সিপাল কমলাক্ষ চক্রবর্তীকে বিপর্যস্ত দেখাল৷
আদিত্য আর গৌরাঙ্গ সাঁতরা চুপ করে আছে৷ মনে হচ্ছে প্রিন্সিপাল সাহেব আরও কিছু বলবেন৷
‘অমিতের মতো ছাত্র আমরা খুব একটা পাই না৷ ওর আই আই টি বা যাদবপুর-শিবপুরে পড়ার কথা৷ আই আই টির পরীক্ষা ও দেয়নি৷ ওর গ্রামের মাস্টারমশাইরা বুঝিয়ে ছিলেন ওটা খুব শক্ত পরীক্ষা৷ অনেকদিন ধরে কোনও নাম করা কোচিং-এ না পড়লে ওটা ক্র্যাক করা যায় না৷ খুব একটা ভুল বোঝাননি৷ আজকাল আই আই টি-র অ্যাডমিশনটা ওরকমই দাঁড়িয়ে গেছে৷ ওয়েস্ট বেঙ্গলের জয়েন্টটাও অমিত খুব একটা প্রিপেয়ার করে দেয়নি৷ ফলে র্যাঙ্কটা ভাল হয়নি৷ যাদবপুর বা শিবপুরে ও কম্পিউটার সায়েন্স পেত না৷ তাই আমাদের এখানে এসেছিল৷’
অমিত দাসের লেখাপড়া নিয়ে গৌরাঙ্গ সাঁতরার ততটা উৎসাহ নেই৷ সে কিছুটা অধৈর্য হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘লোকে বলছে, অমিত দাসের খুনের সঙ্গে আলিনা মাসুদের একটা যোগ আছে৷ বা বলা যায়, যোগটা আলিনার বাবার সঙ্গে৷ এ-ব্যাপারে আপনি কিছু বলবেন?’
‘না, না৷ এ-ব্যাপারে আমি কিচ্ছু বলব না৷ কী করে বলব? এ-ব্যাপারে আমি তো কিছু জানিই না৷’ গলার আওয়াজ শুনে মনে হল কমলাক্ষ চক্রবর্তী ভয় পেয়ে গেছেন৷
আদিত্য তার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে দেখে কমলাক্ষ চক্রবর্তী আবার বললেন, ‘দেখুন এ-ব্যাপারে আমি সত্যিই কিছু জানি না৷ এটা তো ছাত্রদের ব্যক্তিগত ব্যাপার৷ আমি কী করে জানব?’
‘এমন কোনও ছাত্রর কথা বলতে পারেন যার সঙ্গে আমরা এই ব্যাপারে কথা বলতে পারি?’ আদিত্য ঠান্ডা গলায় জিজ্ঞেস করল৷ ‘আপনার কোনও ভয় নেই৷ আমরা কথা দিচ্ছি, আপনার নাম কোনওভাবেই প্রকাশ পাবে না৷’
‘বুঝতেই তো পারছেন, আমাকে এত বড় একটা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ চালাতে হয়৷ ক্ষতি করার লোকের তো অভাব নেই৷ তাই সাবধানে থাকি৷’ মনে হল প্রারম্ভিক ভয়টা কমলাক্ষ চক্রবর্তী কিছুটা সামলে উঠেছেন৷
‘আপনার অবস্থাটা বুঝতে পারছি৷ আপনি শুধু আমাদের দু’একজন ছাত্রর নাম বলুন যারা এই ব্যাপারে কিছু বলতে পারবে৷ আপনি যে এই নামগুলো বলেছেন সেটা কেউ জানতে পারবে না৷’ আদিত্য আশ্বাস দেবার মতো করে বলল৷
‘ঠিক আছে৷ আপনারা ফোর্থ ইয়ারের সিরাজুল মণ্ডলের সঙ্গে কথা বলতে পারেন৷ ও আর অমিত খুব বন্ধু ছিল৷ অমিত দাসের ব্যাপারে ও-ই সব থেকে বেশি জানবে৷’
‘সিরাজুলের সঙ্গে আমরা কথা বলেছি৷ কিন্তু আর কারও নাম কি মনে পড়ছে?’
কমলাক্ষ চক্রবর্তী ভাবছেন৷ কিছুটা ভেবে বললেন, ‘দেখুন আমাদের এখানে কোনও স্টুডেন্টস ইউনিয়ন নেই৷ তার বদলে প্রত্যেক ইয়ারের জন্য একজন করে ইলেক্টেড স্টুডেন্টস রিপ্রেসেন্টেটিভ আছে৷ ফোর্থ ইয়ারের স্টুডেন্টস রিপ্রেসেন্টেটিভ শুভশ্রী সেন বলে একটি মেয়ে৷ সকলে শুভা বলে ডাকে৷ ভীষণ স্পিরিটেড মেয়ে৷ ওর সঙ্গে কথা বলে দেখতে পারেন৷ তবে প্লিজ, শুভা যেন ঘূণাক্ষরেও না জানতে পারে আমি আপনাদের পাঠিয়েছি৷ এখন তো টিফিন আওয়ার চলছে৷ মেয়েদের কমন রুম বা তার কাছাকাছি কোথাও শুভাকে পেয়ে যাবেন৷’
মেয়েদের কমন রুমে যে পুরুষদের প্রবেশ নিষেধ এটা আদিত্য তার ছাত্রজীবন থেকে জানত৷ কমন রুমটা মেন বিল্ডিং-এর তিনতলায়৷ সেখানে পৌঁছে দেখা গেল দুটি মেয়ে কমন রুম থেকে বেরোচ্ছে৷
‘আচ্ছা, শুভা মানে শুভশ্রী সেন ভেতরে আছে কিনা বলতে পারবেন?’ আদিত্য খানিক ভেবেচিন্তে মেয়ে দুটোকে ‘আপনি’ বলেই সম্বোধন করল যদিও এদের বয়েস আদিত্যর বয়েসের অর্ধেক৷
‘শুভা? একটু আগেই তো ভেতরে ছিল৷ এক্ষুনি বেরিয়ে গেল৷’ দুজনের মধ্যে অপেক্ষাকৃত রোগা মেয়েটি বলল৷
‘বেরিয়ে কোথায় যেতে পারে?’
বারান্দায় কয়েকটা মেয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলছিল৷ সেদিকে তাকিয়ে রোগা মেয়েটি বলল, ‘নাঃ, এখানে তো নেই৷’
‘হয়তো মাঠে রোদ্দুরে বসে গল্প করছে৷ আপনারা মাঠে দেখতে পারেন৷’ অন্য মেয়েটি এবার কথা বলছে৷
‘মাঠে? মানে সামনের মাঠে? আসলে এখানে চারদিকেই তো মাঠ তাই জিজ্ঞেস করছি৷’
‘সামনে নয়৷ আপনি এই বিল্ডিংটা থেকে বেরিয়ে পেছন দিকে চলে যাবেন৷ দেখবেন খুব সুন্দর একটা বাগান রয়েছে৷ তার সঙ্গে একটা লন৷ আমরা মাঠ বলতে ওই লনটাকে বোঝাই৷’ রোগা মেয়েটি বলল৷
‘আপনারা কি মিডিয়ার লোক?’ অন্য মেয়েটি জিজ্ঞেস করল৷
‘না, না৷ আমরা একটা ব্যক্তিগত ব্যাপারে শুভার সঙ্গে কথা বলতে চাই৷ অনেক ধন্যবাদ৷’ আদিত্য তাড়াতাড়ি গৌরাঙ্গকে নিয়ে সিঁড়ির দিকে হাঁটতে লাগল৷ মেয়ে দুটো আর যাতে প্রশ্ন করতে না পারে৷
এক দিকে উত্তর থেকে আসা হালকা হিমেল হাওয়া, অন্য দিকে অগ্রহায়ণের নরম রোদ্দুর৷ এই দুই বিপরীত মিলে কলেজের মাঠে একটা রমণীয় বাতাবরণ তৈরি করেছে৷ ছেলেমেয়েরা দলে দলে গোল হয়ে বসে আড্ডা মারছে৷ একটু খোঁজাখুঁজি করতেই একটা বৃত্তের মধ্যে শুভা সেনের সন্ধান পাওয়া গেল৷
‘একটু কথা বলা যাবে?’ আদিত্য শুভার দিকে তাকিয়ে বলল৷
‘আমার সঙ্গে কথা বলবেন?’ শুভা দাঁড়িয়ে উঠেছে৷
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ৷ আপনার সঙ্গে৷ আপনিই তো শুভশ্রী সেন?’ গৌরাঙ্গ বলল৷ ‘একটু আলাদা করে কথা বলতে চাই৷’
শুভা সেনের শ্যামলা রং, ছোটখাটো শরীর, বয়কাট চুল, উন্নত নাক, নাকে ওপর কালো ফ্রেমের চশমা৷ সপ্রতিভ কিন্তু প্রগলভ নয়৷ একবার গৌরাঙ্গর দিকে, আর একবার আদিত্যর দিকে তাকিয়ে সংক্ষেপে বলল, ‘চলুন৷’
শুভার বন্ধুরা, যাদের সঙ্গে সে এতক্ষণ কথা বলছিল, আদিত্যদের যাত্রাপথের দিকে তাকিয়ে আছে৷ আদিত্যরা তিনজন মেন বিল্ডিং ছাড়িয়ে হাঁটছিল৷
‘একটু নির্জনে বসে কথা বলা যায়?’ আদিত্য হাঁটতে হাঁটতে শুভাকে জিজ্ঞেস করল৷
‘চলুন নিয়ে যাচ্ছি৷’ শুভা আবার সংক্ষেপে উত্তর দিল৷
কলেজ ক্যাম্পাসের ভেতরে কিছু জায়গায় বাড়িঘর উঠে গেছে, কিছু জায়গায় উঠছে, আর একটা বিপুল অঞ্চল ফাঁকা পড়ে আছে৷ একটু হাঁটার পর একটা জলাশয় নজরে এল, তাকে পুকুর না বলে দিঘি বলাই শ্রেয়৷ আদিত্য খেয়াল করল বেশ কিছু পরিযায়ী পাখি দিঘিতে বেড়াতে এসেছে৷ দিঘির পেছনে বেশ ঘন জঙ্গল৷
দিঘির ধারে একটা কালো গ্যানাইটে বাঁধানো বসার জায়গা৷ আদিত্য বলল, ‘এখানে বসা যাক৷’
আদিত্য আর গৌরাঙ্গ সাঁতরা দু’দিকে বসেছে, তাদের মাঝখানে শুভা সেন৷ আদিত্য মেয়েটার কৌতূহলের অভাব দেখে অবাক হয়ে যাচ্ছে৷ এখন অব্দি জিজ্ঞেস করল না আদিত্যরা কে, কী উদ্দেশ্যে তার সঙ্গে কথা বলতে চায়৷ তাছাড়া মেয়েটার সাহসও আছে৷ দুটো অজানা পুরুষের সঙ্গে এইভাবে চলে এল!
‘প্রথমে আমাদের পরিচয়টা দিয়ে দিই৷ ইনি নরেন্দ্রপুর থানার সাব ইন্সপেকটার গৌরাঙ্গ সাঁতরা আর আমি আদিত্য মজুমদার, বেসরকারি গোয়েন্দা৷’
‘পরিচয় দেবার দরকার ছিল না৷ আপনাদের দু’জনকেই আমি চিনি৷ অমিত দাস খুনের ব্যাপারে গৌরাঙ্গবাবুকে ক্যাম্পাসে এসে ইনভেস্টিগেট করতে দেখেছি, যদিও উনি আমার সঙ্গে কথা বলেননি৷ আর আদিত্যবাবু, আপনি তো বিখ্যাত মানুষ৷ আপনার কথা একাধিকবার বড় করে খবর কাগজে বেরিয়েছে৷ আপনাকে অনেকেই চেনে৷ আপনারা কি অমিত দাসের কেসটা নিয়ে আমার সঙ্গে কথা বলতে এসেছেন? নাকি অন্য কোনও ব্যাপার?’
শুভা সেনের কথা শুনতে শুনতে আদিত্যর মনে হচ্ছিল ব্যক্তিত্বময়ী, বুদ্ধিমতী, সজাগ, আত্মবিশ্বাসী সব ক’টা বিশেষণই এই মেয়েটির পক্ষে লাগসই৷ সে মুখে বলল, ‘তুমি ঠিকই বলেছ৷ আমরা অমিত দাসের কেসটাই তদন্ত করতে এসেছি৷’
শুভার ব্যক্তিত্বকে কিছুটা বশে আনার জন্য আদিত্য ইচ্ছে করেই তাকে ‘তুমি’ সম্বোধন করল৷ শুভা চুপ করে প্রশ্নের অপেক্ষা করছে৷
‘অমিত দাসকে তুমি কতটা চিনতে?’ আদিত্য জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করল৷
‘মোটামুটি চিনতাম৷ অমিত আমাদের ইয়ারেই পড়ত, কিন্তু স্ট্রিম আলাদা৷ আমি আর্কিটেকচার পড়ি, অমিত পড়ত কম্পিউটার সায়েন্স৷ তবে অন্য স্ট্রিমের একটা ছেলেকে আমার যতটুকু চেনার কথা অমিতকে তার থেকে বেশিই চিনতাম৷ কারণ, ও খুব ভাল ছাত্র ছিল৷ সব স্ট্রিম মিলিয়ে বেস্ট স্টুডেন্ট হয়েছিল৷ তাছাড়া ফোর্থ ইয়ারের স্টুডেন্ট রিপ্রেসেন্টেটিভ হিসেবে আমি ওর জন্যে একটা স্টাইপেন্ড-এর চেষ্টা করেছিলাম৷ সেই সময়টা ওর সঙ্গে খানিকটা ইন্টার্যাকশান হয়েছিল৷’
‘অমিত পেয়েছিল স্টাইপেন্ডটা?’
‘যতটা পাওয়া যাবে ভেবেছিলাম ততটা পাওয়া যায়নি৷ আমাদের বেসরকারি কলেজে এই স্কলারশিপ-টিপের ব্যাপারগুলো ভীষণ আরবিট্রারি৷’
‘লেখাপড়ায় যে অমিত দাস ভাল ছিল সেটা তো প্রিন্সিপালও বললেন৷ কিন্তু মানুষ হিসেবে অমিত দাস কেমন ছিল? মানে আপনার ব্যক্তিগতভাবে কী মনে হয়?’ গৌরাঙ্গ জিজ্ঞেস করল৷
‘ও আপনারা প্রিন্সিপালের সঙ্গে কথা বলে এসেছেন? তার মানে নিশ্চয় উনিই আমার কাছে আপনাদের পাঠিয়েছেন৷ আমি ভাবছিলাম, কে আপনাদের আমার কাছে পাঠাল?’
উপযুক্ত জবাব খুঁজে না পেয়ে গৌরাঙ্গ আদিত্যর মুখের দিকে তাকাল৷ আদিত্য শুভা সেনের শেষের কথাগুলোকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে বলল, ‘হ্যাঁ,অমিত দাস সম্বন্ধে তোমার পারসোনাল ইম্প্রেশনটা আমরা জানতে চাইছি৷’
শুভা মাথা নিচু করে ভাবছে৷ খানিকক্ষণ ভেবে নিয়ে বলল, ‘অমিত লেখাপড়ায় ভাল ছিল ঠিকই, কিন্তু ব্যবহারিক জীবনে বেশ ক্লামজি ছিল৷ ওপরে ওপরে ভীষণ মুখচোরা, মেয়েদের সঙ্গে তো বটেই, এমনকি ক্লাসের ছেলেদের সঙ্গেও ভাল করে কথা বলতে পারত না৷ ভেতরে মারাত্মক ইমোশনাল, জেদি এবং নাইভ৷ সরল সাদাসিদে গ্রামের ছেলে৷ মনে কোনও প্যাঁচ নেই৷ কিন্তু যেটা করবে ঠিক করেছে সেটা করবেই৷’
‘তা, এরকম একটা গ্রাম্য ছেলের সঙ্গে আলিনার মতো মেয়ের প্রেম হল কী করে?’ আদিত্য সরলভাবে প্রশ্ন করল৷
শুভা সেনকে অবশ্য ধরাশায়ী করা শক্ত৷ সে শান্তভাবে বলল, ‘আলিনার প্রসঙ্গটা তুলে ভাল করলেন৷ আপনারা না তুললে প্রসঙ্গটা আমিই তুলতাম৷’ শুভা সেন এইটুকু বলে চুপ করে গেল৷ দিঘির দিকে তাকিয়ে নিজেকে গুছিয়ে নিচ্ছে৷ শুভা সেনের দৃষ্টি অনুসরণ করে আদিত্য দেখল মাঝ-দিঘিতে একটা সাইবেরিয়ান হাঁস মাছের খোঁজে টুপ করে মাথা ডুবিয়ে দিল৷ আড়চোখে ঘড়িতে দেখল দুটো বাজতে চলেছে৷ আদিত্যর খিদে পেয়ে যাচ্ছে৷
‘আলিনা মেয়েটাকে আমি ভাল বুঝতে পারি না৷ অথচ গত তিন বছর ওকে বেশ কাছ থেকেই দেখেছি৷ আলিনা আমার সঙ্গেই আর্কিটেকচার পড়ে৷ বড়লোকের মেয়ে৷ আমাদের মতো জয়েন্ট দিয়ে কলেজে ঢোকেনি৷ মোটা টাকা ডোনেশান দিয়ে প্রেসিডেন্টস কোটায় ঢুকেছে৷ পড়াশোনায় মাথাও নেই, মনও নেই৷ আমি ধরে নিচ্ছি আলিনাকে আপনারা এখনও দেখেননি৷ অবশ্য অমিত খুন হবার কিছুদিন পর থেকে আলিনা আবার কলেজে আসছে৷ এখন তাকে কলেজে দেখতে পাবেন৷ তার আগে বেশ কিছুদিন আসছিল না...৷’
‘অমিত দাস খুন হবার কতদিন আগে থেকে আলিনা কলেজে আসছিল না?’ গৌরাঙ্গ শুভা সেনকে মাঝপথে থামিয়ে জিজ্ঞেস করল৷
‘আমার যত দূর মনে পড়ছে অমিত খুন হবার কয়েক মাস আগে থেকে আসছিল না৷ ঠিক কত মাস আমি বলতে পারব না৷ এখন আবার আসতে শুরু করেছে৷’
‘ঠিক আছে৷ তুমি বল৷ তারপর?’ আদিত্য মূল গল্পে শুভাকে ফিরিয়ে আনতে চায়৷
‘যেটা বলছিলাম৷ আলিনা মাসুদ অসম্ভব সুন্দরী৷ কতটা সুন্দরী আপনারা দেখলে বুঝতে পারবেন৷ তার ওপর স্মার্ট, উন্নাসিক, অনর্গল ইংরেজি বলে৷ এই অপরূপা আলিনা কী করে গ্রামের ছেলে অমিত দাসের প্রেমে পড়ে গেল আমি বলতে পারব না৷ অমিতের অবশ্যই কিছু কোয়ালিটি ছিল৷ লেখাপড়ায় ভাল, দেখতেও বেশ ভাল, কিন্তু ওই যে বললাম ক্লামজি, লাজুক, গ্রাম্য৷ একটা কথা জোর দিয়ে বলতে পারি৷ প্রথমে কিন্তু আলিনাই অমিতের প্রেমে পড়েছিল৷ এবং শুরুর দিকে অমিত বেশ আড়ষ্ট ছিল৷ মানে আলিনার মতো একজন সুন্দরীর ইঙ্গিতে তার তেমন সাড়া ছিল না৷ এটা আমি খুব ভাল করে জানি, কারণ সেই সময় আলিনা আমাকে তার মনের কথা সব খুলে বলত৷
‘যাই হোক, শেষ পর্যন্ত সম্পর্কটা বেশ দাঁড়িয়ে গেল৷ তখন আমাদের সেকেন্ড ইয়ার চলছে৷ প্রথম প্রথম যা হয়, লুকিয়ে লুকিয়ে প্রেম৷ কিছুদিন পরে সাহস বাড়ে৷ তখন খোলাখুলি প্রেম৷ আলিনা-অমিতের প্রেমের কাহিনিটা সকলেই জেনে গেল এবং কিছুদিন পরে ব্যাপারটা আলিনার বাবাও জানতে পারে৷’
‘তারপর কী হল?’
‘তারপর যা হয়েছে সেটা সকলে যা জানে, মোটামুটি আমিও তাই জানি৷ আলিনার বাবা নাকি অমিতকে শাসিয়েছিল৷ কেউ কেউ বলে মারধোরও করেছিল৷ তাও নাকি অমিত শোনেনি৷ তার ফলে তাকে মরতে হল৷ এটাই সকলে বলছে৷ আর এটাও বলছে যে আলিনার বাবা পুলিশকে টাকা খাইয়ে ব্যাপারটা চাপা দেবার চেষ্টা করছে৷ কেসটা মোটামুটি ধামাচাপাই পড়ে গেছিল৷ এই আপনারা এসে আবার তদন্ত শুরু করলেন৷’
‘আচ্ছা আলিনার সঙ্গে অমিতের আলাপ হয়েছিল কীভাবে? ওদের তো একজন আর্কিটেকচার, আর একজন কম্পিউটার সায়েন্স৷’ আদিত্য প্রশ্ন করল৷
‘আপনারা সিরাজুল মণ্ডলের সঙ্গে কথা বলেছেন?’ শুভা সেন পালটা প্রশ্ন করল৷
‘হ্যাঁ, ওর সঙ্গে তো একাধিক বার কথা হয়েছে৷’
‘ও বলেনি কী ভাবে আলিনার সঙ্গে অমিতের আলাপ হয়েছিল?’
‘না, বলেনি তো৷ অবশ্য আমরা ওকে জিজ্ঞেসও করিনি৷ হয়তো করা উচিত ছিল৷’
‘জিজ্ঞেস করলেও ও বোধহয় পুরো সত্যিটা বলতে পারত না৷’
‘কেন?’
‘সত্যিটা অবশ্য অনেকেই জানে৷ সত্যিটা হল, সিরাজুলই আলিনার সঙ্গে অমিতের আলাপ করিয়ে দিয়েছিল৷ তার থেকেও বড় সত্যিটা হল, আলিনার ওপর সিরাজুলের বিশাল ক্রাশ ছিল৷ কলেজের ফার্স্ট ইয়ারে দুজনকে সর্বদা এক সঙ্গে দেখা যেত৷ আমরা ধরেই নিয়েছিলাম আলিনা আর সিরাজুলের মধ্যে একটা লং টার্ম সম্পর্ক হতে চলেছে৷ না হওয়ার তো কিছু ছিল না৷ দুজনেরই এক ধর্ম৷ তার ওপর দুজনের বাড়িই বেশ অবস্থাপন্ন৷ কিন্তু অমিতের সঙ্গে আলিনার আলাপ হবার পরে সব গণ্ডগোল হয়ে গেল৷ আলিনা কোনও অজ্ঞাত কারণে অমিতের প্রেমে পাগল হয়ে গেল৷’
‘এটা নিয়ে সিরাজুলের দুঃখ ছিল না?’
‘ছিল না আবার! অবশ্যই ছিল৷ মাস খানেক সিরাজুল ক্লাস কামাই করে দেশের বাড়িতে গিয়ে বসে রইল৷ সকলকে বলল তার শরীর ভাল নেই৷ তারপর যা হয়৷ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সব ক্ষতই সেরে যায়৷’
‘এটা নিয়ে অমিতের কোনও রিঅ্যাকশান ছিল না? মানে কোনও পাপবোধ বা ওইরকম কিছু?’
‘আশ্চর্য ব্যাপার হল এটা নিয়ে অমিতের বিন্দুমাত্র পাপবোধ ছিল না৷ যেন খুব স্বাভাবিক একটা ঘটনা ঘটেছে৷ অমিতের হাবভাব দেখলে সিরাজুলের জায়গায় যে কোনও সাধারণ মানুষের ভীষণ রাগ হয়ে যেত৷ কিন্তু সিরাজুল তো সাধারণ মানুষ নয়৷ ওর বেস্ট ফ্রেন্ডকে ও হারাতে চায়নি৷ সবটাই গ্রেসফুলি মেনে নিয়েছিল৷ সত্যি বলতে কি, সিরাজুল মণ্ডলের মতো উঁচু মনের মানুষ আমি খুব একটা দেখিনি৷’
শুভা সেন ঘড়ির দিকে তাকাল৷ বলল, ‘এখন আমার কিন্তু খুব দরকারি একটা ক্লাস আছে৷ আমাকে উঠতেই হবে৷ যেটুকু জানতাম আমি মোটামুটি বলে দিয়েছি৷’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ৷ অবশ্যই৷ তোমার সঙ্গে কথা বলে আমরা অনেক নতুন তথ্য পেলাম৷ থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ৷’ আদিত্যও উঠে দাঁড়িয়েছে৷
আদিত্যর খুব খিদে পেয়ে গেছে৷
‘কলেজ থেকে বেরিয়ে বাঁ হাতে একটা ভাতের হোটেল ছিল না?’ কলেজের গেটের দিকে হাঁটতে হাঁটতে আদিত্য গৌরাঙ্গ সাঁতরাকে জিজ্ঞেস করল৷
গৌরাঙ্গ উত্তর দিল না৷ যেন শুনতে পায়নি৷
‘আদিত্যদা, আমার একটা রিকোয়েস্ট আছে৷’ কলেজের গেট দিয়ে বেরিয়ে গৌরাঙ্গ সাঁতরা বলল৷ ‘আজ দুপুরে আমার বাড়িতে আপনি লাঞ্চটা খান৷ খুব বেশি কিছু খাওয়াতে পারব না৷ ওই বাড়িতে যা আছে৷ আসলে আমার বাড়ির এত কাছে এসে আপনি হোটেলে খাবেন এটা আমার ভাল লাগছে না৷ আমার বাড়িতে রান্নার মাসি সকালে এসে যা রান্না করে গেছে তা দিয়ে দুজনের পেট ভরে যাবে৷ পোলাও কালিয়া খাওয়াতে পারব না, সাধারণ ডাল-ভাতই খাওয়াব, কিন্তু ওই হোটেলটায় এত বেলায় যে খাবারটা আপনি পাবেন, আমার বাড়ির খাবার, গ্যারেন্টি দিচ্ছি, তার থেকে খারাপ হবে না৷ প্লিজ রাজি হয়ে যান, আদিত্যদা৷’
এত করে বললে কি আর না বলা যায়?
বাড়িতে ঢুকে আশ্চর্য ক্ষিপ্রতায় গৌরাঙ্গ মাইক্রোওয়েভে ভাত, ডাল, পালং শাকের ঘণ্ট, মাছের ঝোল গরম করে ফেলল৷ শসা, টমেটো কেটে স্যালাড বানাল৷ রান্নাঘরে যে খাবার টেবিলটা আছে সেটাকে সাজিয়ে ফেলল৷ ফ্রিজ থেকে আধখানা পাতিলেবু বার করে দু’ভাগ করে কেটে স্যালাডের প্লেটে রাখল৷ সেই সঙ্গে দুটি নবীন কাঁচা লঙ্কা৷ তারপর মাইক্রোওয়েভে দুটো পাঁপড় সেঁকে নিয়ে আদিত্যকে বলল, ‘আদিত্যদা, লাঞ্চ রেডি৷’
আদিত্য এতক্ষণ মুগ্ধ হয়ে গৌরাঙ্গর গার্হস্থ-নৈপুণ্য পর্যবেক্ষণ করছিল৷ কিন্তু তার মুগ্ধতার আরও অনেকটা বাকি ছিল৷ খাবার টেবিলে বসে আদিত্য বুঝতে পারল গৌরাঙ্গ সাঁতরার রান্নার মাসি একজন প্রকৃত শিল্পী৷ প্রত্যেকটি পদে সেই শিল্পীর হাতের স্পর্শ টের পাওয়া যায়৷ এত কম উপকরণ দিয়ে এত গভীর শিল্প রচনা করা মুখের কথা নয়৷ এরকম স্নিগ্ধ মুসুর ডাল, ছোট বড়ি দিয়ে মনোরম পালং শাকের ঘণ্ট, মায়াময় মাছের ঝোল আদিত্য অনেকদিন খায়নি৷
‘এ তো অসামান্য রান্না৷ তোমার রান্নার মাসিকে পেলে কোথায়?’
‘আপনার ভাল লেগেছে আদিত্যদা? বাঃ, শুনে খুব ভাল লাগল৷ আমারও মাসির রান্না খুব ভাল লাগে৷ কিন্তু আজকাল বেশিরভাগ লোকে এরকম রান্না পছন্দ করে না৷ যেসব রান্না লোকে পছন্দ করে, মানে ওই বিরিয়ানি, মাংসের কোরমা, ফিস ফ্রাই, মশলা চিকেন, সেসব মাসি রাঁধতে পারে না৷ তাই রাঁধুনি হিসেবে মাসির তেমন কদর নেই৷’
‘কী আর করবে বল? প্রকৃত শিল্পীর কদর কবেই বা কে দিয়েছে?’ আদিত্য দার্শনিক ভঙ্গীতে বলল৷
এত তৃপ্তি করে আদিত্য অনেকদিন খায়নি৷ খাবার পর গৌরাঙ্গ বলল, ‘আদিত্যদা, আপনি এই চেয়ারটায় বসে একটু বিশ্রাম করে নিতে পারেন৷ আমার একটা রিপোর্ট লেখা বাকি আছে৷ আমি ততক্ষণ খাবার টেবিলে বসে সেটা লিখে ফেলি৷’
চেয়ারে বসে আদিত্যর চোখ বন্ধ হয়ে এসেছিল, মিনিট পনেরো সে ঘুমিয়েও নিয়েছিল, গৌরাঙ্গর গলার আওয়াজে যখন ঘুম ভাঙল তখন শীতের বেলা পড়ে আসছে৷
‘আমরা আজ আর কোথায় কোথায় যাব?’ গৌরাঙ্গ জিজ্ঞেস করছে, ঘুমের মধ্যে আদিত্য শুনতে পেল৷
‘দুটো জায়গায় যাওয়া বাকি আছে৷’ আদিত্য কিছুটা ঘুম-জড়ানো গলায় বলল৷ ‘অমিত দাস যেখানে থাকত সেই ঘরটা একবার দেখতে হবে৷ আর আলিনা মাসুদের বাড়ির পেছন দিকটা, যেখানে অমিত খুন হয়েছিল, সেই জায়গাটায় একবার যাব৷’
‘অমিত দাসের ঘরটা আমরা সিল করে দিয়েছিলাম, কেউ খেয়াল করেনি চাবিটা আমার কাছেই রয়ে গেছে৷ ঘরটা দেখতে অসুবিধে হবে না৷ আর আলিনার বাড়ির পেছন দিকটা তো পাবলিক রাস্তা, যে কেউ যেতে পারে৷ তবে আমাদের তাড়াতাড়ি বেরোতে হবে৷ একটু পরেই অন্ধকার হয়ে যাবে৷’
‘এক্ষুনি চলো তা হলে৷ আদিত্য আলসেমি ঝেড়ে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়েছে৷
অমিত দাসের বাসস্থানটা গৌরাঙ্গর বাড়ির খুব কাছে৷ তাই স্থির হল প্রথমে সেখানেই যাওয়া হবে৷
একতলা একটা বাড়ি৷ আড়াইখানা ঘর, পাকা দেয়াল, টালির ছাদ৷ বাড়ির উঠোনে পাতকুয়ো, কলঘর৷ মালিক ছিল রেলের পয়েন্টসম্যান, মারা গেছে৷ রিটায়ার করে এখানে একফালি জমি কিনেছিল৷ ইচ্ছে ছিল পাকাপোক্ত একটা বাড়ি বানিয়ে থাকবে৷ ছেলেরা দূরে থাকে, খোঁজ নেয় না৷ বুড়ো-বুড়িকে একাই থাকতে হবে৷ বাড়ি তৈরির আগেই বুড়ি অসুখে পড়ল, চিকিৎসায় বুড়োর পুঁজি শেষ৷ ছাদটা আর পাকা করা হল না৷ বুড়ি মারা যাবার পর বুড়ো খুব বিপদে পড়ল৷ শরীরে জোর নেই৷ টাকারও দরকার৷ এই সময়ে বুড়ো অমিত দাসকে বাড়ির ছোট ঘরটা ভাড়া দেয়৷ ঘর না বলে ওটাকে গুদোম ঘর বলাই ভাল৷ তবে ভাড়া খুবই কম৷ ভাড়া দেওয়ার শর্ত, বিপদে আপদে অমিত বুড়োকে দেখবে৷ দরকার হলে ডাক্তার ডাকবে, ওষুধ নিয়ে আসবে৷ বুড়ো বিছানা ছেড়ে উঠতে না পারলে বাজার-দোকান করে দেবে৷ অমিত সেই শর্তে রাজি হয়েছিল৷ এত কম ভাড়ায় আস্ত একটা ঘর, যত ছোটই হোক, সে কোথায় পাবে? বছর খানেক পরে বুড়ো মারা গেল৷ দুই ছেলে এসে অমিতকে বলল ঘর ছেড়ে দিতে হবে৷ অমিত বলল, তার পড়াশোনা শেষ হবার আগে সে ঘর ছাড়তে পারবে না৷ পড়শিরা সকলে অমিতের পাশে৷ তারা তো দেখেছে, বুড়োর শরীর খারাপের সময় অমিত কতটা সেবা করেছে৷ তখন ছেলেরা কোথায় ছিল? বেগতিক দেখে বাকি দু’খানা ঘর বন্ধ করে ছেলেরা কেটে পড়ল৷ যাবার আগে বলে গেল, আদালতের হুকুমনামা নিয়ে ফিরে আসবে৷ ছেলেরা আর ফিরে আসেনি৷ হয়তো পরে ভেবে দেখেছিল এক চিলতে এই সম্পত্তিটার জন্যে এতটা ঝামেলা করা পোষাবে না৷ হয়তো তাদের নিজেদের মধ্যে সম্পর্ক ভাল ছিল না৷ কিংবা হয়তো অমিতের সঙ্গে পরে তাদের কোনও একটা বোঝাপড়া হয়েছিল৷ যেটাই হোক, মোদ্দা কথাটা হল, গত দুবছর অমিত এই বাড়িটার ছোট ঘরটাতে একাই থাকত আর অন্য ঘরদুটো তালাবন্ধ পড়ে থাকত৷ পড়শিদের কাছ থেকে গৌরাঙ্গ যেটুকু জানতে পেরেছিল আসার পথে আদিত্যকে জানাল৷
ছোট ঘরটা মূল বাড়িটা থেকে আলাদা৷ কী উদ্দেশ্যে ওটা তৈরি হয়েছিল আন্দাজ করা শক্ত৷ হয়তো বুড়ো ভেবেছিল ছেলেরা এসে এখানে থাকলে ওটা গ্যারেজ ঘর হবে৷ কিংবা নিছক লাম্বাররুম, বাতিল মালপত্র রাখার জায়গা৷ চাবি খুলে ঘরে ঢুকতেই একটা ভ্যাপসা গন্ধ নাকে এল৷ বহুদিন দরজা-জানলা বন্ধ থাকলে যেমন হয়৷ এই ঘরে অবশ্য কোনও জানলা নেই৷ শুধু একটা দরজা আছে৷ ঘরে একটা চৌকি, তার ওপর পাতলা তোষক৷ একপ্রস্ত কেরোসিন কাঠের নড়বড়ে টেবিল-চেয়ার, রথের মেলায় যেরকম কিনতে পাওয়া যায়৷ অনুমান করা যায়, পড়াশোনার জন্যে চেয়ার-টেবিল অমিত দাসই কিনেছিল৷ কাপড় জামা রাখার জন্যে ঘরের মধ্যে একটা দড়ি টাঙানো রয়েছে৷ আপাতত সেটা খালি৷
গৌরাঙ্গ বলল, ‘অমিত দাসের একটা সুটকেস ছিল৷ তার সমস্ত জামাকাপড় সেই সুটকেসে ভরে নকুল দাস নিয়ে গেছে৷’
‘বইপত্র ছিল না?’
‘না৷ বই-টই তেমন ছিল না৷ একটা হাতঘড়ি ছিল আর নগদ কিছু টাকা৷ সেসবও নকুল দাস নিয়ে গেছে৷ একটা ল্যাপটপ, ল্যাপটপের ব্যাটারিটা চার্জ দেবার জন্য একটা পাওয়ার ব্যাঙ্ক আর একটা মোবাইল ছিল৷ সেগুলো পুলিশ রেখে দিয়েছে৷ যদি ওগুলো থেকে কোনও তথ্য পাওয়া যায়৷’
‘কিছু পাওয়া গেছে?’
‘মোবাইলের কল লিস্ট থেকে অন্তত তেমন সারপ্রাইজিং কিছু পাওয়া যায়নি৷ যাদের ও কল করেছে কিংবা যাদের থেকে কল রিসিভ করেছে তারা সকলেই ওর বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন৷ তবে কল লিস্টটা আর একটু ভাল করে দেখতে হবে৷ আগে আলিনার সঙ্গে অমিত দাসের ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা হত৷ ইদানীং সেটা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল৷ সেটা স্বাভাবিক৷ একটা সময় আলিনার বাইরে বেরোনো বন্ধ হয়ে গিয়েছিল৷ সম্ভবত আলিনার বাবা তার মোবাইলটাও তখন বাজেয়াপ্ত করে রেখেছিল৷’
‘মেসেজ? হোয়াটসঅ্যাপ?’
‘প্রায় কিছুই নেই৷ মনে হয় অমিত দাস কোনও মেসেজ করার পর বা মেসেজ রিসিভ করার পর মুছে দিত৷ হয়তো বাড়তি সাবধানতা৷’
‘ল্যাপটপ থেকে কিছু পাওয়া গেছে?’
‘ল্যাপটপটা পাসওয়ার্ড প্রোটেক্টেড৷ ওটা খোলাই যায়নি৷ আমাদের থানায় ওটা খোলার মতো এক্সপার্টিজ নেই৷ ওটাকে লালবাজারের সাইবার সেলে পাঠানো দরকার৷ কিন্তু সেটা তো বড়বাবুর ইচ্ছে ছাড়া হবে না৷’
‘পাওয়ার ব্যাঙ্কটা কেন? ল্যাপটপটা তো বাড়িতে বা কলেজে চার্জ দেওয়া যেত?’ আদিত্য নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করল৷
টেবিলের ওপরটা একেবারে ফাঁকা৷ বইখাতা পেন-পেন্সিল কিচ্ছু নেই৷
‘অমিত দাসের খাতা-টাতা কিছু পাওয়া যায়নি?’
‘পাওয়া গিয়েছিল৷ সবই ক্লাসনোটের খাতা৷ ওগুলো এক সঙ্গে দড়ি বেঁধে একটা ঝোলার ভেতর পুরে চৌকির তলায় রাখা আছে৷ নকুল দাস ওগুলো নিয়ে যেতে চায়নি৷’
আদিত্য নিচু হয়ে চৌকির তলা থেকে খাতাসুদ্ধু ঝোলাটা বার করল৷ সব মিলিয়ে গোটা কুড়ি খাতা৷
‘খাতাগুলো আমি একটু দেখতে পারি? সঙ্গে নিয়ে যেতে পারলে সব থেকে ভাল হয়৷ এখানে বসে তো এতগুলো খাতা খুঁটিয়ে দেখতে পারব না৷’
গৌরাঙ্গ একটু ভাবল৷ তারপর বলল, ‘ঠিক আছে নিয়ে যান৷ এদের দাবিদার তো আপাতত কেউ নেই৷ পুলিশও খাতাগুলোর ব্যাপারে উদাসীন৷ আপনি নিয়ে যান৷ যদি কেউ কোনও প্রশ্ন করে আমি সামলে দেব৷
আদিত্য খাতাসুদ্ধু ব্যাগটা কাঁধে নিল৷ ভারী আছে৷ তবে বহন করা অসম্ভব নয়৷
‘আমার এখানে যা দেখার দেখা হয়ে গেছে৷ এই খাতাগুলো আপাতত তোমার বাড়িতেই রেখে দিই৷ বাড়ি ফেরার সময় নিয়ে নেব৷’
অমিত দাসের বাড়ির উল্টোদিকে একটা মুদির দোকান৷ আদিত্য জিজ্ঞেস করল, ‘এর সঙ্গে কথা বলেছিলে?’
‘না৷ আমি এখানে দু’বার এসেছি৷ দু’বারই ঝাঁপ বন্ধ ছিল৷’
‘এখন তো দোকান খোলা৷ চল একটু কথা বলে দেখি৷’
দোকানের নাম কমলা ভাণ্ডার৷ দোকানিটি অমায়িক, পুলিশের সঙ্গে সহযোগিতা করতে তার আপত্তি নেই৷ সে জানাল, তার ছেলে চেন্নাইএ চাকরি করে৷ গত দু’মাস সে আর তার পরিবার চেন্নাইএ ছিল৷
‘তার মানে, আপনি কি অমিত দাস খুন হবার আগেই চেন্নাই চলে গিয়েছিলেন?’ গৌরাঙ্গ জিজ্ঞেস করল৷
‘ঠিক তিন দিন আগে৷ এই গত সপ্তাহে ফিরেছি৷ এসে শুনি এই কাণ্ড৷’
‘আপনি তা হলে অমিত দাসকে ভালই চিনতেন?’
‘খুব ভাল চিনতাম৷ আগে বুড়ো বেঁচে থাকতে তো দিনে তিন-চারবার আসত আমার দোকানে৷ বুড়োই পাঠাত৷ বুড়ো মরে যাবার পর আসাটা কমে গিয়েছিল৷ তবে হপ্তায় চার-পাঁচবার ওকে আমার দোকানে আসতে দেখতাম৷ তাছাড়াও পথে ঘাটে দেখা হত৷’
‘কেমন ছেলে ছিল অমিত দাস?’
‘চমৎকার ছেলে ছিল৷ ভদ্র, বিনয়ী, মুখ তুলে কথা বলত না৷ আর ওর দাদাটা ছিল ঠিক উল্টো৷ রগচটা, ঝগড়াটে৷’
‘অমিতের দাদা? সে কি এখানে আসত নাকি?’
‘মাঝে মাঝেই আসত৷ এসে ভাইএর কাছে থেকে যেত৷ তখন আমার দোকানে এলে ওজন নিয়ে ঝগড়া করত৷ দাম নিয়ে খ্যাচখ্যাচ করত৷ খিটকেল লোক একটা৷ ভাইএর ঠিক উল্টো৷’
‘শেষ কবে এসেছিল অমিতের দাদা?’ আদিত্য জিজ্ঞেস করল৷
‘আমরা যেদিন চেন্নাই চলে গেলাম তার আগের রাত্তিরেও তো অমিতের দাদার গলা শুনেছি৷ এত জোরে চেঁচাচ্ছিল যে এখানে বসে আমি শুনতে পাচ্ছিলাম৷ ভাইএর ওপর খুব চোটপাট করছিল৷’
‘কী নিয়ে চোটপাট করছিল?’
‘ওই মুসলমানের মেয়ে বিয়ে করা নিয়ে৷ ভাই মুসলমানের মেয়ে বিয়ে করে এটা দাদার খুব অপছন্দ ছিল৷ আমি শুনলাম দাদা বলছে, তুই যদি মুসলমানের মেয়েকে ঘরে আনিস তা হলে আমি তোকে খুন করে ফেলব৷ তার জন্য যদি আমার ফাঁসি হয়, হবে৷’
‘অমিত খুন হবার সময় অমিতের দাদা কি এখানেই ছিল?’
‘সেটা তো আমি বলতে পারব না৷ আমরা তো পরের দিনই চেন্নাই চলে গেলাম৷’
মুদির দোকান থেকে বেরিয়ে ইব্রাহিম মাসুদের বাড়ি পৌঁছনোর জন্য মিনিট কুড়ি হাঁটতে হল৷ আসার সময় খাতা ভর্তি ব্যাগটা গৌরাঙ্গর বাড়িতে রেখে আসা হয়েছে৷ পৌঁছতে পৌঁছতে প্রায় সন্ধে হয়ে গেল৷ রাস্তার আলোগুলো জ্বলে উঠেছে৷ তবে পশ্চিম আকাশে এখনও একটা গোলাপি আভা৷ পাড়াটা নতুন৷ বড় রাস্তা থেকে একটা ছোট রাস্তা বাঁ দিকে ঢুকে গিয়ে ক্রমশ নির্জন হতে হতে ঝোপ-জঙ্গলে মিলিয়ে গেছে৷ রাস্তার শেষভাগে ইব্রাহিম মাসুদের তিনতলা বাড়ি৷ আয়তনের দিক থেকে প্রাসাদ বলা যায়, আকৃতির দিক থেকে দুর্গ৷ ইব্রাহিম মাসুদের বাড়ির ঠিক পাশে একটা আটতলা এজমালি ফ্ল্যাটবাড়ি৷ একটু দূরে আরও দু-একটা নতুন হাইরাইজ উঠছে৷
‘প্রথমে সেই জায়গাটা দেখা যাক যেখানে অমিত দাসের মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছিল৷’ আদিত্য গৌরাঙ্গকে বলল৷
পাকা রাস্তা যেখানে শেষ হয়েছে সেখানে একটা পায়ে চলা রাস্তার শুরু৷ সেই রাস্তায় নেমে আদিত্য দেখল পায়ে চলা রাস্তাটা খানিক দূর গিয়ে দু’ভাগে ভাগ হয়ে গেছে৷ একটা রাস্তা জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে পড়েছে৷ অন্যটা তিনশো ষাট ডিগ্রি বেঁকে গিয়ে পাকা রাস্তাটার সমান্তরাল হয়ে বাড়িগুলোর পেছন দিক দিয়ে যেতে যেতে আবার বড় রাস্তায় গিয়ে ঠেকেছে৷ এই দ্বিতীয় রাস্তাটা ধরে কিছুটা এগোলেই ইব্রাহিম মাসুদের বাড়ির পেছন দিক৷ দুর্গের মতো বাড়িটার পেছন দিকের দোতলা ও তিনতলায় একটা করে বারান্দা৷ কেউ বারান্দায় এসে দাঁড়ালে পেছনের ঝোপ-জঙ্গল থেকে তাকে স্পষ্ট দেখা যাবে৷
জঙ্গলের খানিকটা জায়গা এক সময় পরিষ্কার করা হয়েছিল, এখন আবার সেখানে আগাছা গজাতে শুরু করেছে৷ বোঝা যায়, এখানেই অমিত দাস তার প্রিয়তমার দেখা পাবার আশায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকত৷
‘পাওয়ার ব্যাঙ্কের রহস্যটা বুঝতে পারলে?’ আদিত্য গৌরাঙ্গর দিকে তাকিয়ে বলল৷ ‘আলিনার জন্যে অপেক্ষা করতে করতে অমিত দাস এখানে বসে লেখাপড়াও করত৷ আজকাল সবই তো ল্যাপটপে৷ কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যাটারিতে চার্জ না দিলে ল্যাপটপ বন্ধ হয়ে যাবে৷ তাই পাওয়ার ব্যাঙ্কের ব্যবস্থা৷ নইলে অমিত দাসের মতো অভাবী ছেলে খামোকা পাওয়ার ব্যাঙ্ক কিনতে যাবে কেন?’
গৌরাঙ্গ ঘাড় নাড়ল৷ বলল, ‘অমিত দাসের মৃতদেহটাও কিন্তু এখানে পাওয়া গিয়েছিল৷ ফরেনসিক বলছে আততায়ী যখন আঘাত করেছিল তখন অমিত দাঁড়ানো অবস্থায় ছিল৷ আততায়ী ছিল তার পেছনে৷ মনে হয় অতর্কিতে আঘাতটা এসেছে৷ আঘাতটা ছিল অমিতের মাথার পেছন দিকে খানিকটা মাঝখান ঘেঁসে৷ তার মানে আততায়ী বেশ লম্বা, কারণ অমিত নিজেও বেশ লম্বা ছিল৷ তার মাথার মাঝখানে আঘাত করার জন্য আততায়ীকে লম্বা হতেই হবে৷ আততায়ীর সঙ্গে কেউ ছিল কিনা বলা শক্ত৷’
‘ল্যাপটপটা কি এখানেই পাওয়া গিয়েছিল?’
‘হ্যাঁ, পাওয়ার ব্যাঙ্ক সমেত ল্যাপটপটা শাট ডাউন অবস্থায় ল্যাপটপের ব্যাগের মধ্যে ছিল৷ ব্যাগটা মৃতদেহের পাশ থেকে পাওয়া গিয়েছিল৷’
‘তার মানে সম্ভবত সেই রাত্তিরের মতো অভিসার শেষ করে অমিত দাস বাড়ি ফেরার তোড়জোড় করছিল৷ সেই সময় আততায়ী এসে পড়ে৷ কিন্তু প্রশ্ন হল, কোন দিক থেকে আততায়ী এসেছিল?’ আদিত্য বিড়বিড় করছে৷
‘দু’দিক থেকে আসা সম্ভব৷ এক, বড় রাস্তা থেকে পায়ে চলা রাস্তাটা ধরে এখানে চলে আসতে পারে৷ অথবা বড় রাস্তা থেকে বেরোনো ছোট বাঁধানো রাস্তাটা ধরে এসে, পায়ে চলা রাস্তাটায় পড়ে এই অব্দি আসা যায়, আমরা যেভাবে এলাম৷’ গৌরাঙ্গ সাঁতরা চিন্তা করতে করতে বলল৷
‘এই দুটো রাস্তার একটা দিয়ে এলে কিন্তু অমিত টের পেত কেউ আসছে৷ সেটাই যদি হয় তাহলে ধরে নিতে হবে আততায়ী অমিতের চেনা৷ কোনও অচেনা লোককে ওইভাবে আসতে দেখলে অমিত সতর্ক হয়ে যেত, হয়তো পালাবারও চেষ্টা করত৷ কারণ তার ওপর একবার হামলা হয়ে গেছে৷ তবে এই দুটো রাস্তা ছাড়াও এখানে পৌঁছবার উপায় আছে৷ একটা উপায় পেছনের ঝোপ-জঙ্গলে গা-ঢাকা দিয়ে এখানে আসা৷ কিন্তু তা হলেও অমিত টের পেত কেউ আসছে৷ কারণ পেছনের জঙ্গলটা বেশ ঘন৷ ওটা ভেদ করে আসতে গেলে গাছপালায় শব্দ হবেই৷ আর একটা উপায়, ইব্রাহিম মাসুদের বাড়ির ভেতর থেকে পাঁচিল টপকে সটান এখানে চলে আসা৷ অমিত যেখানে বসে থাকত তার সামনে দিয়ে পাঁচিলটা গেছে৷ বাড়ির ভেতর থেকে পাঁচিল টপকে হঠাৎ অমিতের সামনে এসে দাঁড়ালে অমিত পালাবার সময় পেত না৷ যদি এইভাবে খুনটা হয়ে থাকে তা হলে ধরে নিতে হবে ইব্রাহিম মাসুদের কোনও ভাড়া করা গুন্ডাই কাজটা করেছে৷’
‘ইব্রাহিম মাসুদই যে খুনটা করিয়েছে এ-ব্যাপারে কি আপনার কোনও সন্দেহ আছে?’
‘এই স্টেজে আমি কোনও কিছুই স্বতঃসিদ্ধ বলে ধরে নিচ্ছি না৷ একটা জিনিস লক্ষ করেছ? এই জায়গাটায় বসে যেমন আলিনার বারান্দাটা দেখা যায় তেমনি পাশে যে আটতলা বাড়িটা আছে সেটার ওপরেও বেশ নজর রাখা যায়৷ ওই বাড়িটার প্রত্যেক তলায় লিফট-এর সামনে একটা করে করিডোর আছে যার উত্তর দিকটা খোলা৷ তার মানে এখানে বসে ওই করিডোর দিয়ে কারা আসছে যাচ্ছে সব স্পষ্টভাবে দেখা যায়৷’
‘কিন্তু সেটা দেখে অমিতের কী লাভ?’ গৌরাঙ্গকে বিভ্রান্ত দেখাল৷
‘কোনও লাভ নেই৷ কোনওই লাভ নেই৷ যাই হোক, এখানে যা দেখার দেখে নিয়েছি৷ এবার বাড়ির সামনে যাওয়া যাক৷’
ইব্রাহিম মাসুদের বাড়ির উল্টোদিকে যে একটা টালির ছাউনি দেওয়া চায়ের দোকান আছে সেটা আদিত্য আসার সময় লক্ষ করেছিল৷ সে গৌরাঙ্গকে বলল, ‘চল, একটু চা খাওয়া যাক৷ আমার আবার সন্ধেবেলা একটু চা না খেলে মাথা ধরে যায়৷’
দোকানের সামনে পাতা বেঞ্চি প্রায় ফাঁকা৷ শুধু এক কোণে একটা লোক ঘুগনি-পাঁউরুটি খাচ্ছে৷ ভেতরের টেবিলগুলোতেও লোক নেই৷
‘দুটো চা দিও৷ আর দুটো করে বিস্কুট৷ ওই গোল বিস্কুটটা দাও৷ হ্যাঁ, হ্যাঁ, ওই ওপরের বিস্কুটটা৷ আদিত্যদা আর কিছু খাবেন? এই টোস্ট-অমলেট বা ডিম-পাঁউরুটি?’
‘না, না৷ কিচ্ছু খাব না৷ স্রেফ চা৷ আর আমাকে একটা বিস্কুট দিও, দুটো খেতে পারব না৷’
গৌরাঙ্গ সাঁতরা এবার দোকানির দিকে মন দিল৷ ‘শোনো ভাই৷ আমরা পুলিশের লোক৷ তুমি নিশ্চয় জান এখানে কিছুদিন আগে একটা মার্ডার হয়ে গেছে৷ ওই বাড়িগুলোর পেছন দিকের জঙ্গলে৷ আমরা সেই ব্যাপারে খোঁজখবর নিতে এসেছি৷’
পুলিশ শুনে দোকানিকে কিছুটা উদ্বিগ্ন দেখাল৷ সে বলল, ‘আপনি তো স্যার আগেও একবার এসেছিলেন৷ আমার মনে আছে৷’
‘এসেছিলাম, কিন্তু তখন সব প্রশ্ন ভাল করে করা হয়নি৷ আচ্ছা দেখ তো একে চিনতে পার কিনা৷’ গৌরাঙ্গ পকেট থেকে অমিত দাসের একটা ছবি বার করে দোকানিকে দেখাল৷
‘হ্যাঁ স্যার৷ ইনি তো একটা সময় রোজ আমার দোকানে আসতেন৷ দুপুরে পাঁউরুটি-ঘুগনি বা পাঁউরুটি-আলুর দম খেতেন৷ মানে, যেদিন যেটা হত সেটা খেতেন৷ আবার মাঝে মাঝে চা খেতে আসতেন৷ ইনিই তো খুন হয়েছেন, না স্যার?’
দোকানির কথার সরাসরি উত্তর না দিয়ে গৌরাঙ্গ বলল, ‘তা রোজ যে লোকটা তোমার দোকানে খেতে আসছে, তোমার মনে হয়নি লোকটা কেন এদিকে রোজ আসে?’
‘মনে হয়েছিল স্যার৷ জিজ্ঞেসও করেছিলাম, ভাই, আপনাকে রোজ এদিকে দেখি, এদিকে তো আপিস কাছারি কিছু নেই, এদিকে আপনার কী কাজ?’
‘লোকটা কী বলেছিল?’
‘বলেছিল, সে একজন ঠিকেদার৷ ওই দূরের একটা বাড়িতে তার মিস্ত্রিরা খাটছে৷ ওদিকটায় খাবার দোকান নেই৷ তাই এত দূর খেতে আসতে হয়৷’
‘তুমি জানলে কী করে এই লোকটাই খুন হয়েছে?’
‘যেদিন লোকটা খুন হল সেদিন ভবতোষ আমাকে এসে বলল জানো তো পেছনের জঙ্গলে একটা খুন হয়েছে৷ দেখতে যাবে? ভবতোষের সবেতেই খুব হুজুগ৷’
‘ভবতোষ আবার কে?’
‘উল্টোদিকের ওই আটতলা বাড়িটা আছে না? ভবতোষ হল ওখানকার সিকিউরিটি গার্ড৷ আমার এখানে রোজ চা খেতে আসে৷’
‘তা তুমি ভবতোষকে কী বললে?’
‘আমি বললুম দোকানদারি করব, না লাশ দেখতে যাব? তোমার কাজ নেই? গেট খোলা রেখে যাচ্ছ? ভবতোষ বলল, আরে একদিন চলই না, ব্যাপারটা কী হয়েছে দেখে আসি৷ এক্ষুনি চলে আসব৷ ভবতোষ এত জোরাজোরি করল যে ওর সঙ্গে চলে গেলুম৷’
‘গিয়ে কী দেখলে?’
‘গিয়ে দেখলুম তখনও পুলিশ আসেনি৷ যাচ্ছেতাই ব্যাপার৷ লোকটা চিৎ হয়ে পড়ে আছে৷ মাথায় রক্ত জমাট বাঁধা৷ মাটিতে রক্ত৷ ভবতোষ বলল, আরে এই লোকটা তোমার দোকানে চা খেতে আসত না? আমি দেখলুম, তাই তো৷ এ তো সেই ঠিকেদারটা৷ কে ওকে খুন করল?’
‘তারপর?’
‘তারপর আর কিছু না৷ আমরা চলে এলুম৷ বেশিক্ষণ তো আর দোকান ফাঁকা ফেলে রাখতে পারি না৷ ভবতোষেরও গেটে ডিউটি আছে৷ সে নেই দেখলে বাবুরা রাগ করবে৷ একটু পরে পুলিশ এসে লাশ নিয়ে চলে গেল৷’
‘তুমি পুলিশকে বললে না লোকটা তোমার দোকনে চা খেতে আসত?’
‘জিজ্ঞেস করলে তো বলব৷ এই প্রথম আপনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন৷’
আদিত্য এতক্ষণ চুপ করে গৌরাঙ্গর সঙ্গে দোকানির কথোপকথন শুনছিল৷ এবার সে চায়ের ফাঁকা কাপটা বেঞ্চির ওপর নামিয়ে রেখে বলল, ‘আচ্ছা ভাই, আপনার দোকানের উল্টোদিকে যে বাড়িটা রয়েছে সেখানে কি বাইরে থেকে অনেক লোকজন আসে?’
‘উল্টোদিকের বাড়ি?’ দোকানির মুখে আঁধার ঘনিয়ে এসেছে৷ ‘আমি ঠিক বলতে পারব না স্যার৷ আমি দোকান নিয়ে এত ব্যস্ত থাকি যে কোনওদিকে তাকাবার ফুরসুত পাই না৷ একা হাতে খাবার তৈরি করতে হয়, খাবার দিতে হয়, বাসন ধুতে হয়৷ বুঝতে পারছেন তো, খুব চাপ৷’
‘আপনার দোকান রাত্তিরে ক’টা অবধি খোলা থাকে?’
‘রাত্তির ন’টা-দশটা অবধি খোলা থাকে স্যার৷ ওই যে বাড়িগুলো উঠছে, মিস্তিরিরা রাত্তিরে ওখানেই থাকে৷ ওদের তো খাবার জায়গা নেই, আমার এখানেই রাত্তিরে ওরা রুটি তরকারি খায়৷ ওদের খাওয়া শেষ না হলে তো দোকান বন্ধ করতে পারি না৷’
‘বেশ৷ তা রাত্তিরের দিকে ওই উল্টোদিকের বাড়িটাতে গাড়ি বা লরি কিছু ঢুকতে দেখেন?’
‘আমি কোনওদিকে তাকাবার সময় পাই না স্যার৷ বলতে পারব না৷’
বোঝাই যাচ্ছে ইব্রাহিম মাসুদের সম্বন্ধে কিছু বলতে এই দোকানি একান্তই নারাজ৷
‘তুমি বলতে না পার, তোমার বন্ধু ভবতোষ নিশ্চয় বলতে পারবে৷ সে তো গেটের সামনে চুপ করে বসে থাকে৷’
‘ভবতোষ বলতে পারবে কিনা ভবতোষই জানে৷ আমি সে ব্যাপারে কিছু বলতে পারব না৷ তবে ভবতোষকে তো আর এখানে পাবেন না৷ তার কোম্পানি তাকে অন্য বিল্ডিং-এ বদলি করে দিয়েছে৷’
আটতলা বাড়ির গেটে খোঁজ নিয়ে জানা গেল ভবতোষ এখন কাছেই সাউথভিল বলে একটা হাইরাইজে ডিউটি করছে৷
কেয়া তার ইস্কুলের অন্য দিদিমণিদের সঙ্গে মান্দারমণি বেড়াতে গেছে, কাল ফিরবে৷ আজ রবিবার, আদিত্য একা৷ রান্নার মাসি সকালে রান্না করে দিয়ে চলে গেল৷ আদিত্য ভাবছে, কী করে দিনটা কাটাবে? কেয়া না থাকলে বাড়িটা খুব ফাঁকা লাগে৷ চারদিকে কেয়ার জিনিসপত্র ছড়িয়ে আছে৷ শাড়ি-জামা, না-দেখা পরীক্ষার খাতা, ক্রিম-পাউডার-লিপসটিক, বিছানার ওপর তাড়াহুড়োয় ফেলে যাওয়া বক্ষবন্ধনী৷
আদিত্য ভাবল, কিছুক্ষণ গান শোনা যেতেই পারে৷ আজকাল সে মাঝে মাঝে রেডিও শোনে৷ নিউজঅনএয়ার বলে একটা অ্যাপ হয়েছে, সেটা মোবাইলে ডাউনলোড করে নিলে ভারতের সমস্ত রেডিও-স্টেশন পাওয়া যায়৷ আদিত্যর অবশ্য রাগম বলে একটা স্টেশনই মূলত শোনা হয়৷ এটা ব্যাঙ্গালোরের একটা স্টেশন যেখানে চব্বিশ ঘণ্টা দক্ষিণ এবং উত্তর ভারতীয় মার্গ সঙ্গীত চলে, উত্তর ভারতের থেকে দক্ষিণ ভারতই বেশি৷ তাতে আদিত্যর আপত্তি নেই৷ এই স্টেশনটার জন্যে আজকাল প্রচুর কর্নাটকি ক্ল্যাসিকাল শোনা হচ্ছে৷ ভালই লাগছে৷ তবে একটা অস্বস্তি৷ দক্ষিণ ভারতীয়রা রাগের সময় বিভাগ মানে না৷ বেলা দশটায় বেহাগ চালিয়ে দেয়, ভর দুপুরে মালকোষ, যার দক্ষিণী নাম অবশ্য হিন্দোলম৷ আর একটা স্টেশন আছে, নাম গীতাঞ্জলী, কলকাতার স্টেশন, এটা আগে কলকাতা ক ছিল৷ পুরোনো দিনের কথা মনে করে, সেটাও মাঝে মাঝে চালিয়ে দেয় আদিত্য, স্থানীয় সংবাদ শোনে, কখনও বা দুপুরবেলার রবীন্দ্রসঙ্গীত৷
কিছুক্ষণ গান শুনল আদিত্য৷ ব্যাঙ্গালোরের ওই রাগম স্টেশনে আলি আকবর খাঁ সাহেবের বাগেশ্রী চলছিল৷ খাঁ সাহেব আর্লি সেভেনটিজে পুনে রেডিওতে বাজিয়েছিলেন৷ আদিত্য ভাবছিল, অল ইণ্ডিয়া রেডিয়োর আর্কাইভে যেসব মণিমুক্ত আছে সেগুলোর ভাল সংরক্ষণ নেই৷ থাকলে আদিত্যর মতো সঙ্গীত-কাতর মানুষজনের অশেষ উপকার হতো৷
একটা কাজ বাকি আছে৷ অমিত দাসের ঘর থেকে যে খাতাগুলো নিয়ে আসা হয়েছিল সেগুলো এখনও দেখা হয়নি৷ দেখে রাখা দরকার ছিল, কারণ পুলিশ যে কোনও দিন খাতাগুলো ফেরত চাইতে পারে৷ কিন্তু খাতাগুলো অফিসে রয়ে গেছে৷ আদিত্য ঠিক করল তাড়াতাড়ি লাঞ্চ খেয়ে আপিস চলে যাবে৷ রবিবার সে সচরাচর অফিস যায় না৷ কিন্তু আজ তো কেয়াই বাড়িতে নেই, বাড়িতে থাকার কী দরকার৷
আকাশে মেঘ আছে৷ আবহাওয়া আপিস পূর্বাভাস দিয়েছে বিকেলের দিকে বৃষ্টি নামতে পারে৷ কিছুক্ষণ ইতস্তত করার পর আদিত্য ছাতাটা নিয়েই বেরল৷ ছাতা সঙ্গে থাকলে দুটো সুবিধে, এক, বৃষ্টি আসার সম্ভাবনা কমে যায় এবং দুই, ছাতাটাকে লাঠির মতো ব্যবহার করে পথ চলা সম্ভব৷ ট্র্যাম ধরবে বলে আদিত্য যখন হাতিবাগানের মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে তখন কপালে-কপোলে দু’এক ফোঁটা বৃষ্টির স্পর্শ টের পেল৷
ভাগ্য ভাল, ট্র্যামের জন্যে বেশি দাঁড়াতে হয়নি, কারণ ট্র্যামে ওঠার কয়েক মিনিটের মধ্যেই ঝেঁপে বৃষ্টি নামল৷ একে রবিবার, তায় বৃষ্টি, রাস্তায় তেমন লোক নেই, ট্র্যামের ভেতরটাও ফাঁকা৷ জানলার ধারে একটা খালি সিট পেয়ে গিয়ে নিজেকে রাজার মতো মনে হচ্ছিল আদিত্যর৷ গায়ে একটু-আধটু বৃষ্টির ছাঁট আসছে, আসুক৷ আদিত্য দেখতে দেখতে যাচ্ছিল দু-একটা ওষুধের দোকান ছাড়া বিধান সরণীর দোকানগুলো সবই বন্ধ৷ খদ্দের হবে না ধরে নিয়ে ফুটপাতের হকাররাও ছুটি নিয়েছে৷ একটা গাড়িবারান্দার নীচে তাস খেলা চলছে, চারজন খেলছে, আরও অন্তত ছ’সাতজন তাদের পেছনে দাঁড়িয়ে উপদেশ দিচ্ছে৷ বৃষ্টি বুঝি আরও বাড়ল৷
অমিয় চক্রবর্তীর সেই পুরোনো কবিতার লাইনটা ‘কেঁদেও পাবে না তাকে বর্ষার অজস্র জলধারে’ যেই আদিত্যর মনে উঁকি দিয়েছে অমনি তার মনে পড়ে গেল কেয়ার কথা৷ কেয়া এখন কী করছে? সমুদ্রের ধারে বেড়াচ্ছে? নাকি হোটেলের ঘরে বসে বন্ধুদের সঙ্গে গুলতানি করছে? মান্দারমণিতেও কি বৃষ্টি নেমেছে? একটা ফোন করে দেখবে? নাঃ৷ এখন থাক৷ সকাল থেকে তিনবার ফোন করা হয়ে গেছে৷ কেয়া বলেছিল, বারবার অত ফোন করবে না, বন্ধুরা আওয়াজ দেয়৷
আদিত্যর ভাগ্য আজকে সত্যিই ভাল৷ অগ্রহায়ণের বৃষ্টি, বেশিক্ষণ চলল না৷ আদিত্য তার গন্তব্যে পৌঁছনোর আগেই একেবারে থেমে গেল৷ ফলে ট্র্যাম থেকে নেমে ছাতাটা না খুলে সেটাকে লাঠির মতো ব্যবহার করতে করতে নিজের আপিসে পৌঁছে গেল আদিত্য৷ ইলেকট্রিক কেটলিতে কফির জল চাপিয়ে অমিত দাসের খাতাগুলো নিয়ে বসল৷ কেটলিটা আবার সারানো হয়েছে৷
মূলত ক্লাসনোটের খাতা৷ কিন্তু যত দেখছে তত আদিত্যর মুগ্ধতা বাড়ছে৷ প্রথমত, মুক্তোর মতো হাতের লেখা৷ চাষির ঘরে এত সুন্দর হাতের লেখা হল কী করে? দ্বিতীয়ত, ভীষণ মেথডিকালি ক্লাসনোটগুলো নেওয়া৷ পরে যখন সেগুলো অমিত দাস পড়েছে, পাশে খুদে খুদে অক্ষরে নোটের ব্যাখ্যা কিংবা অন্য কোনও জায়গা থেকে আহরণ করা বাড়তি কিছু পয়েন্ট লিপিবদ্ধ করে রেখেছে৷ এত নিয়মনিষ্ঠভাবে পড়াশোনা করলে ক্লাসে ফার্স্ট তো হবেই৷ কিছু আছে অঙ্কের খাতা৷ তাড়া তাড়া কাগজে পাতার পর পাতা অঙ্ক প্যাকটিস করেছিল অমিত দাস৷ পরে পরীক্ষার আগে চোখ বোলাবে বলে সুতো দিয়ে পাতাগুলো বাঁধাই করে খাতা বানিয়ে রেখেছিল৷ তবু যতই নয়নাভিরাম হোক, এসব থেকে অমিত দাস হত্যা রহস্যের কোনও ইঙ্গিত আদৌ পাওয়া গেল না৷
আদিত্য আরও দু’বার চা খেল, একবার কফি৷ জানলা দিয়ে তন্ময় হয়ে আবার ঝেঁপে আসা বৃষ্টি দেখল কিছুক্ষণ৷ তারপর হঠাৎ খাতাগুলো ঘাঁটতে ঘাঁটতে একটা জায়গায় আটকে গেল৷ আদিত্য লক্ষ করেছিল প্রত্যেক সিমেস্টারে কোনও একটা খাতায়, হয়তো পরীক্ষার কিছু আগে, অমিত দাস নিজের জন্যে একটা রুটিন বানাত৷ কবে কী পড়বে তার রুটিন৷ কী কী পড়তে হবে তার তালিকা এবং তালিকায় প্রত্যেকটি বিষয়ের পাশে সেই বিষয়ের জন্য বরাদ্দ তারিখ ও সময়৷ আদিত্য দেখতে পেল জুলাই মাসে পরপর তিনটে তারিখ, ২৫, ২৬ এবং ২৭ জুলাই, এদের জন্যে বরাদ্দ বিষয়গুলোর পাশে ক্রস চিহ্ন দেওয়া এবং তার পাশে লেখা হসপিটাল৷ যে বিষয়গুলোর পাশে ক্রস চিহ্ন দেওয়া সেগুলো নতুন করে আবার তালিকার একেবারে শেষদিকে জায়গা পেয়েছে৷ তাদের পাশে নতুন তারিখ, নতুন সময়৷
মানেটা সম্ভবত এই যে, জুলাই মাসে ইব্রাহিম মাসুদের গুন্ডাদের হাতে মার খেয়ে অমিত দাস তিন দিন হাসপাতালে ভর্তি ছিল৷ সেই তিনদিন সে রুটিন মাফিক পড়াশোনা করতে পারেনি৷ ফলে ওই তিন দিন যে বিষয়গুলো তার পড়ার কথা ছিল সেগুলো পরে সে অন্য দিনের রুটিনে ঢোকাতে বাধ্য হয়েছিল৷ এই অব্দি ব্যাপারটা বুঝতে অসুবিধে হয় না৷
কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার হল, জুলাই মাসের ওই তিনটে তারিখের পাশে যেমন ক্রশ চিহ্ন দিয়ে হসপিটাল কথাটা লেখা, তেমনি জুলাই মাসের ২২ তারিখের পাশেও ক্রশ চিহ্ন দিয়ে হসপিটাল কথাটা লেখা৷ এই তারিখের বিষয়গুলোও নতুন তারিখ এবং নতুন সময় সমেত তালিকার শেষ দিকে আবার জায়গা পেয়েছে৷ তাহলে কি অমিত দাস দু’বার হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল? একবার ২২ জুলাই, আর একবার ২৫ থেকে ২৭ জুলাই?
ওই খাতারই একেবারে শেষ পাতায় দুজন ডাক্তারের নাম এবং মোবাইল নম্বর লেখা আছে৷ ডাঃ অম্লান হাজরা এবং ডা. শিবানী মল্লিক৷
আদিত্য গৌরাঙ্গ সাঁতরার ফোনটা লাগাল৷
‘বলুন দাদা৷’ ওপার থেকে গৌরাঙ্গর গলা৷
‘ছুটির দিনে একটু বিরক্ত করছি৷ একটা তথ্য দরকার৷ গুন্ডাদের হাতে মার খেয়ে অমিত দাস ঠিক কত তারিখে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল, এটা জানাতে পারবে?’
‘এক্ষুনি জানিয়ে দিচ্ছি৷ ও যে এফ আই আর-টা করেছিল সেটা দেখলেই জানা যাবে৷ আমি থানাতেই আছি৷ দেখে বলে দিচ্ছি৷ একটু ধরবেন?’
আদিত্য ধরে আছে৷ মোবাইলটা হাতে ধরে জানলা দিয়ে রাস্তা দেখছে৷ বৃষ্টি আর পড়ছে না৷ তবে রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা কম৷ একটা ফাঁকা হলদে ট্যাক্সি সোয়ারির আশায় শম্বুক গতিতে ফুটপাত ঘেঁষে এগোচ্ছে৷
‘আদিত্যদা নোট করে নিন৷ এফ আই আর-এ অমিত দাসের বয়ান অনুযায়ী গুন্ডাদের হাতে মার খেয়ে ও ২৫, ২৬ এবং ২৭ জুলাই হাসপাতালে ভর্তি ছিল৷ ২৮ তারিখ সকালে ওকে ছেড়ে দেওয়া হয়৷’
‘থ্যাঙ্ক ইউ গৌরাঙ্গ৷ তোমার ওদিকে কেমন চলছে? বড়বাবু কী বলছেন?’
‘লালবাজার থেকে চিঠি আসার পর বড়বাবু একেবারে চুপ মেরে গেছেন৷ হয়তো মনে মনে কিছু একটা ফন্দি আঁটছেন৷ কিন্তু আমাকে আর ঘাঁটাচ্ছেন না৷’
‘ঠিক আছে৷ দ্যাখো উনি কত দিন শান্তি বজায় রাখেন৷ আজ রাখছি গো৷ পরে কথা হবে৷’
মোবাইল বন্ধ করে আদিত্য গভীরভাবে ভাবছে৷ ২২শে জুলাই হাসপাতালে যাবার ব্যাপারটা তাহলে কী?’
অঘ্রানের মেঘাবৃত বিকেল, প্রায় অন্ধকার নেমে এসেছে৷ রবিবার বলে আপিসবাড়ির প্রায় পুরোটাই বন্ধ, শ্যামলেরও ছুটি৷ শুনশান বৌবাজার স্ট্রিট৷ এমন অবস্থায় আপিসে বসে থাকতে কার ভাল লাগে? আদিত্য একবার ঠিক করল উঠে পড়বে৷ তারপর ভাবল এত তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরেই বা কী করবে? দুটো ফোন করা বাকি আছে৷ আদিত্য ফোন দুটো সেরে নিল৷ তারপর ফোন করা শেষ হয়ে গেলে অমিত দাসের কেসটা নিয়ে ভাবতে ভাবতে আদিত্য চেয়ারে বসেই একটু ঘুমিয়ে পড়েছিল৷ কলিং বেলের শব্দে ঘুমটা ভেঙে গেল৷ কেউ এসেছে৷
এই অসময়ে কে আসবে? রবিবারে সে আপিসে এসেছে এটা তো কারও জানার কথা নয়৷ আদিত্য একটু চিন্তিত হল৷ চেয়ার থেকে উঠে দরজায় বসানো উঁকি মারার ফুটোটা দিয়ে দেখল বাইরে অচেনা দুটো লোক দাঁড়িয়ে আছে৷ চেহারা এবং পোশাক দেখে মনে হয় দুজনেই পেশীজীবী৷ দরজা খোলাটা কি ঠিক হবে? পুরো আপিসবাড়িটায় আজ জনমানব নেই৷ আদিত্যকে এরা খুন করে গেলেও কেউ কিছু টের পাবে না৷ লোক দুটোর সঙ্গে অস্ত্র থাকতে পারে, আদিত্যর কাছে একটা পেপারকাটার পর্যন্ত নেই৷ গৌতম অনেক বার বলেছে একটা রিভলভার কিনে রাখ, আমি লাইসেন্স-এর ব্যবস্থা করে দেব৷ তোর যা প্রোফেশন তাতে এটা দরকার৷ আদিত্য শোনেনি৷ ঠিক শোনেনি তা নয়, গড়িমসি করেছে৷ এখন এই ষণ্ডামার্কা লোক দুটোকে কী করে সামলাবে?
আবার কলিং বেলের শব্দ৷ বেলটা নতুন লাগানো হয়েছে৷ শব্দটা আর একটু মিঠে হলে ভাল হত৷ আদিত্য দরজার ফুটো দিয়ে দেখল, লোকগুলো অধৈর্য হয়ে উঠেছে৷ একজন খড়কে কাঠি দিয়ে দাঁত খোঁচাচ্ছে৷ দেখে মনে হয় দাঁত খ্যাঁচাচ্ছে৷ অন্যজন হালকা হাতে দরজার ওপর তবলা বাজাচ্ছে৷ দরজার তলা দিয়ে বেরোনো আলো দেখে লোক দুটো নিশ্চয় বুঝতে পারছে আদিত্য ঘরের ভেতর আছে৷ আদিত্য যদি দরজা না খোলে তা হলে কি ওরা দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকবে?
হঠাৎ আদিত্যর খুব হাসি পেয়ে গেল৷ সে নিশ্চিত লোক দুটো তার কোনও ক্ষতি করতে আসেনি৷ ক্ষতি করার হলে এর মধ্যেই দরজার লকটা খুলে ঢুকে পড়ত৷ কোনও পেশাদারের কাছে লকটা খোলা কয়েক মিনিটের ব্যাপার৷ নিজের ওপরেও বেশ রাগ হল তার৷ কেন সে মিথ্যে মিথ্যে ভয় পাচ্ছিল? তার বুদ্ধিসুদ্ধি কি লোপ পেয়ে যাচ্ছে? নাকি ঘুমের জড়তায় তার মাথাটা কাজ করছিল না?
আদিত্য দরজাটা খুলে দিল৷ খুলে দিয়ে একটা আড়মোড়া ভেঙে বলল, ‘আপনারা কি অনেকক্ষণ বেল বাজাচ্ছেন? আমি আসলে একটু ঘুমিয়ে পড়েছিলাম৷ ভেতরে আসুন৷’
এবার লোক দুটোকে ভাল করে দেখবার সুযোগ পেল আদিত্য৷ একজন বেশ লম্বা, অন্যজনকেও কেউ বেঁটে বলবে না৷ খুব লম্বার বয়েস তিরিশ-পঁয়ত্রিশ, অন্যজন পঞ্চাশের নীচে৷ দুজনেরই পেটা স্বাস্থ্য৷ দুজনেই জিনস টি-শার্ট পরেছে৷ ভাল করে লক্ষ করলে বোঝা যাবে, লম্বা লোকটার কোমরের কাছে টি-শার্টটা ফুলে আছে৷ একই ভাবে ফুলে আছে অন্যজনের বগলের নীচের অংশটা৷ আদিত্যর অভিজ্ঞ চোখ বলে দিচ্ছে দুজনের কাছেই অস্ত্র আছে৷
‘বলুন কী ব্যাপার?’ আদিত্য দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই বলল৷
‘মালিক আপনাকে ডেকে পাঠিয়েছে৷ আপনাকে আমাদের সঙ্গে যেতে হবে৷’ লম্বা লোকটা বলল৷
‘কোথায় যেতে হবে? কে আপনাদের মালিক?’
‘মাসুদ সাহেব আপনার সঙ্গে কথা বলতে চান৷ ইব্রাহিম মাসুদ৷ আপনাকে তার বাড়িতে যেতে হবে৷ বাড়িটা কোথায় আপনি তো জানেন৷’ লম্বাটাই কথা বলছে৷ অন্যজন চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে৷
‘আমি যদি যেতে না চাই?’
‘যদি যেতে না চান তা হলে জোর করে নিয়ে যেতে হবে৷ কিন্তু মালিক বলে দিয়েছে আপনার কোনও ভয় নেই৷ কেউ আপনাকে কিছু করবে না৷ মালিকের কথার খেলাপ হয় না৷’
আদিত্য ঘড়ি দেখল৷ পাঁচটা বাজতে পাঁচ৷ বাইরেটা একেবারে অন্ধকার হয়ে গেছে৷ আপাতত হাতে তেমন কাজ নেই৷ ইব্রাহিম মাসুদের সঙ্গে একবার দেখা করে আসাই যায়৷
‘চলুন ঘুরে আসি৷ আপনারা এলেন ভালই হল৷ আমি নিজেই ভেবেছিলাম মাসুদ সাহেবের সঙ্গে দেখা করব৷ আমাকে শুধু দু’মিনিট সময় দিন৷’ আদিত্য বাথরুমের দরজাটা ইশারায় দেখাল৷
কয়েক মিনিট পরে বাথরুম থেকে বেরিয়ে আদিত্য বলল, ‘এবার চলুন৷’
একটা মানুষ সম্বন্ধে শুধু গল্প শুনলে তার একটা ছবি আপনা থেকেই মনের মধ্যে তৈরি হয়ে যায়৷ কিন্তু অনেক সময় দেখা যায় আসল মানুষটার সঙ্গে সেই ছবিটার কোনও মিল নেই৷ ইব্রাহিম মাসুদের গল্প শুনে আদিত্যর মনে একটা লম্বা-চওড়া পাঠান পুরুষের ছবি তৈরি হয়েছিল৷ বাস্তবে দেখা গেল ইব্রাহিম মাসুদ লোকটা নাতিদীর্ঘ, ক্ষীণকায়, মৃদুভাষী৷ তার ওপর তার টকটকে ফরসা মুখে টানা টানা চোখ, টিকোলো নাক, পাতলা ঠোঁট তাকে নারীসুলভ কোমলতা দিয়েছে৷ ভাবতে অসুবিধে হয়, এই রকম রমণীকোমল শরীরের অন্তরে একটা হিংস্র অপরাধী বাস করছে৷
‘আসুন আদিত্যবাবু৷ আপনি যে এক কথায় আমার সঙ্গে দেখা করতে চলে এসেছেন তার জন্য আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ৷ চা-কফি কিছু খাবেন?’
‘চা খাব৷ দুধ-চিনি ছাড়া৷’ আদিত্য সহজ গলায় বলল৷
‘আমিও তাহলে আপনার সঙ্গে একটু চা খাব৷ সরি, আপনাকে কোনও হার্ড ড্রিঙ্ক অফার করতে পারছি না৷ আমার বাড়িতে হার্ড ড্রিঙ্ক ঢোকে না৷’
‘আমি হার্ড ড্রিঙ্ক খুব একটা খাই না৷ ওই বছরে হয়তো এক দু’বার সোশাল ড্রিঙ্কিং৷ আমার চা হলেই চলবে৷’
‘আমি হার্ড ড্রিঙ্কের কথাটা কেন তুললাম, বলছি৷ আমি একজন ধর্মভীরু মুসলমান৷ কোরানে যা যা বারণ আছে সেগুলো আমার জন্যেও বারণ৷ কোরানে মদ খাওয়া বারণ৷ আমি তাই মদ ছুঁয়েও দেখি না৷ একই কারণে একজন হিন্দু ছেলের সঙ্গে আমার মেয়ের বিয়ে দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না৷’
মাসুদ সাহেবের গভীর বিষণ্ণতা আদিত্যকে স্পর্শ করল৷
‘আলিনার আম্মা ওর ছোটবেলায় মারা গেছে৷ আমি আর শাদি করিনি৷ আলিনাকে আমি একাই বড় করেছি৷ ও ছাড়া আমার আর কেউ নেই৷ কিন্তু এমনকি ওর জন্যেও আমি আমার ধর্ম ছাড়তে পারব না৷ আমি আলিনাকে অনেক বুঝিয়েছিলাম, ও বুঝল না৷ আগে সিরাজুল বলে আলিনার একজন বয়ফ্রেন্ড ছিল৷ আমার খুব পছন্দ ছিল ছেলেটাকে৷ আমি সিরাজুলকে বললাম আলিনাকে বোঝাতে৷ অমিতকে বোঝাতে৷ অমিত তো সিরাজুলের বন্ধু ছিল৷ সিরাজুল কাউকেই বোঝাতে পারল না৷ অমিতকে আমি চিনি না, কিন্তু আলিনাকে তো ছোট থেকে চিনি৷ আলিনার মাথায় শয়তান ভর করেছিল৷ ও আমাদের কথা শুনবে কেন?’
ইব্রাহিম মাসুদের মধ্যে আদিত্য কেবল একজন অসহায় পিতাকে দেখতে পাচ্ছিল৷ সে বলল, ‘কিন্তু আমাকে আপনি ডেকেছেন কেন?’
‘আমি আপনাকে একটা রিকোয়েস্ট করার জন্য ডেকেছি৷ আমি আর আলিনা দুজনেই খুব কষ্ট পেয়েছি৷ সিরাজুলও কম কষ্ট পায়নি৷ ও এখনও আলিনাকে খুব ভালবাসে৷ আমি হাত জোড় করে রিকোয়েস্ট করছি, আপনি এই তদন্তটা ছেড়ে দিন৷ যে চলে গেছে সে তো আর ফিরে আসবে না৷ মাঝখান থেকে আরও জল ঘোলা হবে৷ এসব নিয়ে কাটাছেঁড়া হবে৷ খবর কাগজে বেরোবে, লোক জানাজানি হবে৷ আলিনা আরও কষ্ট পাবে, আমি আরও কষ্ট পাব, সিরাজুলও আরও কষ্ট পাবে৷ আমরা তো অনেক কষ্ট পেয়েছি৷ আমাদের আর কষ্ট দেবেন না৷ যা হয়ে গেছে সেটা আমরা ভুলে যেতে চাই৷’ ইব্রাহিম মাসুদের গলাটা একান্তই কাতর শোনাল৷
আদিত্য কী বলবে ভাবছে৷ ইতিমধ্যে চা এসে গেছে৷ আদিত্যর আন্দাজে চা-টা কড়া৷ আগে জানলে দুধ-চিনি দিতে বলত৷
‘দেখুন, মাসুদ সাহেব, আমি আপনাদের কষ্টটা বুঝতে পারছি৷ কিন্তু কষ্ট তো আপনারা একা পাননি৷ অমিত দাসের বাবার কথাটা ভাবুন৷ তিনি আপনার তুলনায় নেহাতই ছাপোষা মানুষ৷ কিন্তু ন্যায় বিচার পাবার অধিকার তারও তো আছে৷ সব থেকে বড় কথা, এখানে আমরা একটা খুনের কথা বলছি৷ একটি বাইশ-তেইশ বছরের ছেলে খুন হয়েছে৷ এর থেকে ভয়ঙ্কর এবং মর্মান্তিক আর কী হতে পারে? সেই খুনের কিনারা তো আমাকে করতেই হবে৷’
‘আমি অমিত দাসকে খুন করাইনি৷ এটা আমি আপনাকে বলে দিচ্ছি৷ আমার কথাটা আপনাকে বিশ্বাস করতে হবে৷’
আদিত্য টের পেল ইব্রাহিম মাসুদের গলার স্বরটা হঠাৎ কঠিন হয়ে আসছে৷
‘ধরা যাক, আপনার কথাটা সত্যি৷ আপনি অমিত দাসকে খুন করাননি৷ কিন্তু তা হলেও তো প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, কে অমিত দাসকে খুন করল? আমি অমিত দাসের বাবাকে কথা দিয়েছি তার ছেলের খুনের যথাসাধ্য তদন্ত করব৷ আমি তো এখন সেই কথা থেকে সরে আসতে পারি না৷’
‘অমিত দাসকে কে খুন করেছে জেনে লাভ কী? অমিত দাস তো আর ফিরে আসবে না৷ অমিত দাসের বাবার যে ক্ষতি হয়েছে তার জন্যে আমি ভাল করে তাকে ফিনানশিয়ালি কমপেনসেট করে দেব৷ আপনি ওকে জিজ্ঞেস করবেন উনি আমার প্রস্তাবে রাজি আছেন কিনা৷ আর আপনি যে পরিশ্রমটা করেছেন তার জন্যেও আমি আপনাকে কমপেনসেট করে দেব৷ শুধু একটাই কনডিশান৷ এই ইনভেস্টিগেশানটা আপনি ছেড়ে দিন৷’
মাসুদের গলায় আর অনুরোধ নেই৷ কেবল আদেশ আছে৷ আদিত্য রেগে যাচ্ছে৷ সে বলল, ‘আমি ঘুষ নিই না মাসুদ সাহেব৷ কাউকে ঘুষ নেবার জন্যে দালালিও করি না৷ আপনার যেমন ধর্ম আছে, আমারও একটা ধর্ম আছে৷ তদন্ত আমাকে চালাতেই হবে৷ যদি আপনি অমিত দাসের বাবাকে কিনেও নেন, তাও আমি তদন্ত চালিয়ে যাব৷’
ইব্রাহিম মাসুদের রমণীকোমল মুখটা দ্রুত বদলে যাচ্ছে৷ একটা সুন্দর মুখকে এত তাড়াতাড়ি এত কুৎসিত হয়ে যেতে আদিত্য আগে দেখেনি৷ মাসুদ যখন কথা বলতে শুরু করল তখন উত্তেজনায় তার দু’দিকের কষে ফেনা জমেছে৷
‘আরে আদিত্যবাবু৷ আপনি তো দু’পয়সার টিকটিকি৷ আপনাকে যদি এখানে মেরে কোনও বিলের জলে ভাসিয়ে দিই কেউ টেরও পাবে না৷ আর আপনি মরে গেলে তদন্তও বন্ধ হয়ে যাবে৷ আপনাকে আমি বাঁচার একটা সুযোগ দিয়েছিলাম৷ আপনি সেটা নিলেন না৷ ঠিক আছে৷ আপনার মর্জি৷ হীরালাল, পরেশ৷’ শেষের কথাগুলো, বলাই বাহুল্য, অন্তরীক্ষে অপেক্ষমাণ অনুচরদের উদ্দেশে৷
যে দুজন আদিত্যকে এখানে নিয়ে এসেছে তারা ঘরে ঢুকল৷
‘আমি আপনাকে আর একবার বাঁচার সুযোগ দিচ্ছি৷ আপনি বাড়ি চলে যান, আর কখনও এদিকে আসবেন না৷ আপনার বাড়িতে পে-প্যাকেট পৌঁছে যাবে৷ ভেবে দেখুন৷’
‘আমার ভাবার কিছু নেই মাসুদ সাহেব৷ আপনার বরং একটা জিনিস জানা দরকার৷ এখানে আসার আগে আমি একবার আমার আপিসের বাথরুমে ঢুকে ছিলাম৷ বিশ্বাস না হয় এই হীরালাল আর পরেশকে জিজ্ঞেস করে দেখুন৷ বাথরুমে ঢুকে আমি আমার বন্ধু অ্যাডিশনাল কমিশনার গৌতম দাশগুপ্তকে একটা মেসেজ করে জানিয়ে দিয়েছি যে আমি আপনার এখানে আসছি৷ আমার জন্যে যেন পুলিশ প্রোটেকশনের ব্যবস্থা করা হয়৷ আমার ধারণা পুলিশ বাইরে থেকে আপনার বাড়ির ওপর নজর রাখছে৷ আপনার সাগরেদরা এই ঘরে আমাকে খুন করতে পারে, কিন্তু বডি নিয়ে বেরোতে পারবে না৷ আর এই বাড়ির ভেতরে আমার বডিটা লুকিয়ে রাখা আপনার পক্ষে একটু রিস্কি হয়ে যাবে, তাই না? আমার মোবাইলটা এই বাড়িতে ঢোকার সময় আপনার সিকিউরিটি জমা রেখেছে৷ ওটা আনিয়ে নিলে আমার করা মেসেজটা দেখতে পাবেন৷ তাছাড়া ওটাকে ফলো করে পুলিশ তো জানতেই পেরেছে আমি কোথায় আছি৷ অতএব ভেবে দেখুন, আমাকে মারা বা বাঁচানোটা আপনার হাতে সত্যিই নেই৷’
‘একে আসার আগে বাথরুমে ঢুকতে দিয়েছিলে?’ ইব্রাহিম মাসুদ আগুন-চোখে সাগরেদদের জিজ্ঞেস করল৷
‘ভুল হয়ে গেছে মালিক৷ খুব ভুল হয়ে গেছে৷’ এখানেও লম্বা লোকটাই কথা বলছে৷ তার গলায় আতঙ্ক৷
‘আমি আর আপনাদের ভুল বোঝাবুঝির মধ্যে থাকতে চাই না৷ আমি উঠছি৷ আমাকে বাড়ি পৌঁছে দিতে হবে না৷ আমার মনে হয়, বাড়ি পৌঁছে দেবার জন্যে একটা পুলিশের গাড়ি বাইরে আমার জন্যে অপেক্ষা করছে৷’
আদিত্য উঠে দাঁড়িয়েছে৷
আদিত্য আগের দিন খেয়াল করেনি, ইব্রাহিম মাসুদের বাড়ির পাশে যে আটতলা বাড়িটা আছে তার নাম ত্রিবর্ণা৷ সিকিউরিটিদের ডিউটি বারো ঘণ্টা৷ রাত্তিরের সিকিউরিটি সন্ধে আটটায় এসে সকাল আটটা অব্দি কাজ করে, দিনের সিকিউরিটি কাজ করে সকাল আটটা থেকে সন্ধে আটটা৷ সকালের সিকিউরিটির সঙ্গে আগের দিনই কথা হয়েছিল, রাত্তিরের লোকটাকে ধরতে গেলে হয় রাত্তির আটটার পরে আসতে হবে, আর না হয় সকাল আটটার আগে৷ আদিত্য যখন ত্রিবর্ণায় পৌঁছল তখনও সকাল আটটা বাজতে মিনিট পাঁচেক বাকি আছে৷ ভাগ্যিস কেয়ার গাড়িটা পাওয়া গিয়েছিল, না হলে আদিত্য এত তাড়াতাড়ি পৌঁছতে পারত না৷ গাড়ি আদিত্যকে নামিয়ে দিয়ে চলে গেল৷ কেয়াকে স্কুলে যেতে হবে৷
উল্টোদিকের সেই চায়ের দোকানটা খুলে গেছে৷ গৌরাঙ্গ বাইরের বেঞ্চিতে বসে চা খাচ্ছিল৷ আদিত্যকে দেখে আরেকটা চায়ের অর্ডার দিল৷
‘সিকিউরিটি ছেলেটাকে বলে এসেছি ডিউটি অফ হলে এখানে চলে আসতে৷ এখানেই ইন্টারোগেশনটা সেরে নিতে পারি৷’ চায়ের ভাঁড়ে চুমুক দিয়ে গৌরাঙ্গ জানাল৷
‘মাসুদ সাহেবের সঙ্গে আমার মোলাকাতের গল্পটা তোমাকে ভাল করে বলা হয়নি৷ তোমার সঙ্গে তো দেখাই হয়নি তার পরে৷ এসব রসাল গল্প কি আর টেলিফোনে বলা যায়?’
‘ভাল করে শুনব আদিত্যদা৷ ইতিমধ্যে আপনার কথা মতো আমি সেই শুভা মেয়েটির সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলাম৷ ও বলেছে আলিনা মাসুদের সঙ্গে আমাদের কথা বলিয়ে দেবে৷ আলিনা আমাদের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হয়েছে৷ ক্যাম্পাসের মধ্যেই মিটিংটা হবে৷ তা হলে আলিনার বাবা টের পাবে না৷ কাল ওদের টিফিন আওয়ার, মানে দেড়টা থেকে দুটোর মধ্যে আপনার সুবিধে হবে?’
দু-একটা কাজ ছিল, কিন্তু সেগুলো তেমন জরুরি নয়৷ আমি চলে আসব৷ কিন্তু কোথায় আসব বলত? থানায় আসতে চাই না৷ ওখানে আমাকে দেখলে তোমাদের বড়বাবুর পিত্ত কুপিত হতে পারে৷’
‘সকালে লালবাজারে আমার একটা কাজ আছে৷ বাইক নিয়ে যাব৷ আপনার যদি বাইক চড়তে আপত্তি না থাকে, আপনাকে নিয়ে আসতে পারি৷ যদি এক সঙ্গে আসি, তা হলে সোজা কে সি এম কলেজে চলে যাব৷’
বাইকে গৌরাঙ্গর পেছনে বসে অতটা রাস্তা আসার ব্যাপারটা আদিত্যর খুব একটা সুখদায়ক মনে হচ্ছে না৷ কিন্তু বিকল্পটাও ভাল নয়৷ গড়িয়া অব্দি মেট্রো, তারপর অটোতে অটোতে৷ অনেকটা সময় লেগে যাবে৷ রোজ রোজ তো আর কেয়ার কাছে গাড়ি চাওয়া যায় না৷
‘ঠিক আছে৷ আমাকে আমার আপিস থেকে তুলে নিও৷’ আদিত্য ব্যাজার গলায় বলল৷
সিকিউরিটির পোশাক পরা একটা লোক চায়ের দোকানের দিকে এগিয়ে আসছে৷ এ ত্রিবর্ণা হাউসিং-এর সিকিউরিটি না হয়ে যায় না৷
‘স্যার, আপনি আমার সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলেন?’ লোকটা গৌরাঙ্গর দিকে তাকিয়ে বলল৷
‘হ্যাঁ৷ তোমার নাম কী?’
‘শ্রীশম্ভু বাগ স্যার৷’
‘এই বাড়িতে কতদিন ডিউটি করছ?’
‘তা প্রায় দু’মাস হয়ে গেল৷’
‘এর আগে কোথায় ছিলে?’
‘এই কোম্পানিতেই ছিলাম৷ অন্য বাড়িতে ডিউটি করতাম৷’
‘তোমাকে সেখান থেকে সরাল কেন?’
‘কেন সরাল তো বলতে পারব না স্যার৷ মালিকের মর্জি৷’
‘মালিকের নাম কী?’
‘মালিকের নাম কিছু একটা মুখার্জি হবে স্যার, ঠিক মনে পড়ছে না৷ আমরা মুখার্জিবাবু বলি৷ ও হ্যাঁ, মনে পড়েছে৷ শান্তি মুখার্জি৷’
‘আর কোম্পানির নাম?’
‘শিল্ড সিকিউরিটি কম্পানি৷’
‘কত বড় কোম্পানি তোমাদের?’
‘ছোট কোম্পানি স্যার৷ বাঙালির ছোট কোম্পানি৷ ছ’সাতটা বাড়িতে সিকিউরিটি দেয় আর কয়েকটা ঘেরা জমি আছে সেখানে পাহারার জন্য লোক দেয়৷ সবই এই অঞ্চলে৷ মুখার্জিবাবু আগে মিলিটারিতে কাজ করত৷ রিটায়ার করে এই ব্যবসাটা শুরু করেছে৷’
‘তুমি তো রাত্তিরে ডিউটি কর৷ আচ্ছা, এই যে দু’মাস তুমি এখানে কাজ করছ, তুমি কি পাশের বাড়িতে রাত্তিরবেলা, ধর অনেক রাত্তিরে, লোকজন আসতে দেখেছ? বা ধর মালপত্র নিয়ে লরি বা ম্যাটাডোর?’ গৌরাঙ্গ লাইন বদলে হঠাৎ প্রশ্ন করল৷
শম্ভু বাগ অবাক হয়নি৷ এই রকম একটা প্রশ্ন যে আসবে সেটা সে মনে হয় আশঙ্কা করছিল৷ খানিকটা চুপ করে থেকে সে বলল, ‘না স্যার, আমি কিচ্ছু দেখিনি৷’
‘কিচ্ছু দেখেনি? নাকি দেখেছ কিন্তু বলতে চাইছ না? শোনো, তোমার কোনও ভয় নেই৷ যদি কিছু সন্দেহজনক দেখে থাক আমাদের বল৷ পুলিশ তোমাকে প্রোটেকশান দেবে৷’
‘আমি কিচ্ছু দেখিনি স্যার৷’ শম্ভু বাগ কাঁদোকাঁদো৷ ‘আমি তো রাত্তিরে গেটের পাশে বিছানা করে ঘুমোই৷ কোনও বাবু রাত্তির করে এসে হর্ন বাজালে, আমি উঠে গেট খুলে দিই৷ হর্ন না বাজলে আমার ঘুমই ভাঙে না৷ পাশের বাড়িতে কে আসছে যাচ্ছে আমি কী করে দেখব?’
‘আমি আর একবার প্রশ্নটা করছি৷ লোকে বলে, পাশের বাড়ির মালিক ইব্রাহিম মাসুদের নানারকম দু’নম্বরি ব্যবসা আছে৷ তুমি এ-ব্যাপারে কিছু শুনেছ বা দেখেছ?’
‘না স্যার৷ আমি কিচ্ছু শুনিনি বা দেখিনি৷ আমি গরিব মানুষ স্যার৷ নিজের কাজ করি, বাড়ি চলে যাই৷ এসব ব্যাপারে আমি কিচ্ছু জানি না৷’ শম্ভু বাগ এবার মনে হচ্ছে কেঁদেই ফেলবে৷
‘ঠিক আছে৷ আমি একটু অন্য ধরনের প্রশ্ন করি৷’ আদিত্য এতক্ষণে মুখ খুলেছে৷ ‘আপনাদের এই বাড়িটার কি সব ফ্ল্যাট ভর্তি, নাকি কিছু কিছু ফাঁকাও আছে?’
একেবারে অন্য ধরনের প্রশ্নে শম্ভু বাগ একটু অবাক হয়ে গেছে৷ আগের প্রশ্নটার ধকল খানিকটা সামলে নিয়ে সে বলল, ‘বেশিরভাগ ফ্ল্যাটই তো ফাঁকা পড়ে আছে৷ এখানে চল্লিশটা ফ্ল্যাট৷ তার মধ্যে মোটামুটি ষোলো-সতেরোটাতে লোক আছে৷ বাকিগুলো সব ফাঁকা৷ মালিকরা সব বিলেত-অ্যামেরিকায় থাকে৷ কেউ কেউ দিল্লি-ব্যাঙ্গালোরেও থাকে৷’
‘কেউ ফ্ল্যাট ভাড়া দেয় না?’
‘ফ্ল্যাট ভাড়া খুব বেশি কেউ দিতে চায় না৷ একবার ভাড়াটে বসালে তোলা যায় না নাকি৷ তাছাড়া এই ফ্ল্যাটগুলো তো দামি ফ্ল্যাট৷ এর ভাড়াও বেশি হবে৷ অত টাকা দিয়ে এত দূরে কেউ মনে হয় থাকতে চায় না৷’
‘একটা ফ্ল্যাটেও ভাড়াটে নেই?’
‘আছে৷ এখন, দাঁড়ান ভেবে দেখছি......চারটে, হ্যাঁ, চারটে ফ্ল্যাটে ভাড়াটে আছে৷’
‘এরা কি সবাই ফ্যামেলি নাকি অনেকে মিলে ভাড়া থাকে?’
‘সবাই ফ্যামেলি৷ তার মধ্যে তিনটে ফ্ল্যাটে স্বামী-স্ত্রী দুজনেই চাকরি করতে বেরিয়ে যায়৷ অল্প বয়েস, বাচ্চা-কাচ্চা নেই৷ আর একটা ফ্ল্যাটে বুড়ো-বুড়ি থাকে৷ তাদের ফ্ল্যাট সারানো হচ্ছে৷ এই কাছেই তাদের ফ্ল্যাট৷ যতদিন না ফ্ল্যাট সারানো শেষ হচ্ছে ততদিন এখানে থাকবে৷ আর একটা ফ্ল্যাটে দুটো অল্প-বয়সী মেয়ে ভাড়া থাকত৷ বোধহয় একই অফিসে কাজ করত৷ এখন আর নেই৷ আমি এদের কথা শুনেছি, চোখে দেখিনি৷ আমি এখানে আসার কয়েকদিন আগে ফ্ল্যাট ছেড়ে চলে গেছে৷’
‘কেন? চলে গেল কেন?’
‘আমি এই বাড়িতে আসার ঠিক আগে এখানে একটা খুন হয়েছিল, জানেন তো৷ খুন-টুন দেখে মেয়ে দুটো খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিল৷ মেয়েরা এত ভিতু হয়! অবশ্য আইবুড়ো দুটো মেয়ে, একা একা থাকে, বাড়িতে কোনও পুরুষ নেই, ভয় তো পাবেই৷ এতই ভয় পেয়ে গেল যে তাড়াতাড়ি অন্য বাড়ি দেখে চলে গেল৷ এসব অবশ্য আমার শোনা কথা৷ আমাদের লিফটম্যান হেমন্ত আর ইলেকট্রিশিয়ান জয়দেব এটা নিয়ে এখনও গল্প করে৷’
গৌরাঙ্গ ঠিক বুঝতে পারছিল না, জিজ্ঞাসাবাদ কোন পথে এগোচ্ছে৷ একটু অধৈর্য হয়ে সে বলল, ‘তোমার ঠিক আগে যে এখানে কাজ করত সে তো এখানে অনেকদিন ছিল, সে হয়তো পাশের বাড়িতে কিছু একটা দেখে থাকতে পারে৷ ভবতোষ না কী যেন নাম?’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ৷ ভবতোষ৷ ভবতোষ ধাড়া৷ খুব ভাল ছেলে৷ এখন সাউথভিল-এ ডিউটি করছে৷’
‘সেটা কতদূরে?’
‘খুব দূরে নয়৷ বড়রাস্তায় পৌঁছে বাঁদিকে বেঁকবেন৷ মিনিট পনেরো সোজা হাঁটলে ডান হাতে একটা বিল পড়বে৷ নাম ডাকুর বিল৷ তার ঠিক উল্টোদিক দিয়ে একটা ছোট রাস্তা ভেতরে ঢুকে গেছে৷ ওই রাস্তাতেই বাড়িটা৷ ওটা সাততলা বাড়ি৷ আমিও ওখানে কিছুদিন ডিউটি করেছি৷’
‘ঠিক আছে৷ তুমি এখন যেতে পার৷ কিছু জানতে পারলে আমাকে জানাবে৷ এটা আমার নম্বর৷’ গৌরাঙ্গ একটা চিরকুটে নিজের নম্বরটা লিখে শম্ভু বাগের হাতে দিল৷ ‘আদিত্যদা আর কিছু জিজ্ঞেস করবেন?’
‘নাঃ৷ আমার আর কিছু জিজ্ঞেস করার নেই৷’ আদিত্য একটা লম্বা হাই তুলল৷
ভবতোষ ধাড়া লোকটা বেঁটেখাটো, গোলগাল, হাসিখুশি৷ আদিত্য ভাবছিল সিকিউরিটি গার্ডের মাইনে পেয়ে লোকটা এত নধর শরীর ধরে রাখে কী করে? আর মনেই বা এত ফুর্তি পায় কোথা থেকে?
‘মইদুল আপনাদের কথা আমাকে বলেছে৷ মইদুল মানে বুঝতে পারছেন তো? ত্রিবর্ণার ডে শিফট-এর সিকিউরিটি৷ মইদুল বলেছে আপনারা আমার সঙ্গে কথা বলতে আসবেন৷ আপনারা নাকি ওকে আমার কথা জিজ্ঞেস করেছিলেন৷ ও তো তাই বলল৷’ ভবতোষ অনর্গল কথা বলে৷
ত্রিবর্ণা হাউসিং-এর গেটে একটাই সিকিউরিটি গার্ড ডিউটিতে থাকে, সাউথভিল-এর গেটে থাকে এক সঙ্গে দুজন৷ ভবতোষ তার পার্টনারকে বলল, ‘তুই কিছুক্ষণ গেটটা সামলে রাখ৷ এই দুজন সার্জেন্ট এসেছে, আমি ওদের সঙ্গে কথা বলে আসছি৷ জানিস তো কিছুদিন আগে ত্রিবর্ণার পেছন দিকে একটা খুন হয়েছিল৷ আমি তো তখন ওখানে ডিউটি করতাম৷ মনে হয় সেসব নিয়ে জিজ্ঞেস করতে এসেছে৷ চলুন স্যার৷’ শেষ কথাগুলো আদিত্যদের উদ্দেশে৷
ত্রিবর্ণা বাড়িটার উল্টোদিকে একটা চায়ের দোকান ছিল যেখানে বসে কথা বলা যেত৷ এখানে তেমন কিছু নেই৷ ভবতোষ বলল, ‘এই বাড়ির একটা কমিউনিটি হল আছে স্যার৷ ওখানে বসে কথা বলা যেতে পারে৷’
কমিউনিটি হলের একেবারে শেষপ্রান্তে একটা বেদি মতন করা আছে, বাকি অংশ একেবারে ফাঁকা৷ হলটাতে একটা চেয়ার পর্যন্ত নেই৷ মনে হয় হলটা ব্যবহারের সময় চেয়ার ভাড়া করা হয়৷ আদিত্য দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছিল কোথায় বসবে, হঠাৎ দেখে ভবতোষ তিনখানা ফোল্ডিং চেয়ার জোগাড় করে এনেছে৷ চেয়ারগুলোকে আরামদায়ক বলা যাবে না, তবে আপাতত কাজ চলে যাবে৷
‘ত্রিবর্ণা হাউসিং-এ তুমি কতদিন কাজ করেছ?’ গৌরাঙ্গ প্রশ্ন শুরু করল৷
‘টানা তিন বছর কাজ করেছি স্যার৷ তিন বছরের একটু বেশি৷ বাড়িটার ওপরে মায়া পড়ে গেছিল৷ ছেড়ে আসার সময় মন খারাপ লাগছিল৷ কিন্তু স্যার ওটা তো আমার বাড়ি নয়৷ ছেড়ে তো আসতেই হবে৷’
‘শোনো, তোমাকে যেটা জিজ্ঞেস করছি শুধু সেটার উত্তর দেবে৷ বাড়তি কথা একেবারে নয়৷ বুঝেছ?’ গৌরাঙ্গ কড়া গলায় বলল৷
‘হ্যাঁ স্যার৷ বুঝতে পেরেছি৷ আমার ওই এক বেশি কথা বলার দোষ৷ বউ তাই খুব বকে৷’
‘আবার বাজে বকছ?’ গৌরাঙ্গ এবার রীতিমতো ধমক লাগাল৷
‘আর অন্য কথা বলব না স্যার৷ আপনি যা জিজ্ঞেস করবেন শুধু তার উত্তর দেব৷’
‘যে লোকটা ত্রিবর্ণা হাউসিং-এর পেছনে খুন হয়েছিল তাকে তুমি চিনতে?’
‘মুখ চিনতাম স্যার৷ সুকুমারের চায়ের দোকানে চা খেতে আসত৷ দুপুরে ঘুগনি-পাঁউরুটিও খেত৷ কয়েকবার কথাও বলেছি৷ তবে ছেলেটা খুব গম্ভীর স্যার৷ বেশি কথা বলতে চাইত না৷ আমার তো জানেন বেশি কথা বলার অসুখ৷ আমিই খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে জিজ্ঞেস করতাম, কী করে, কোথায় থাকে, এইসব৷ তা বলেছিল ওর দেশ বর্ধমানে৷ এখানে ঠিকেদারি করে৷ বেশি ঝাল খেতে পারত না৷ তবে এটাও ঠিক সুকুমার ঘুগনিতে খুব ঝাল দেয়৷ আমার অবশ্য ভালই লাগে৷ আমরা মেদিনীপুরের লোকেরা একটু ঝাল পছন্দ করি স্যার৷’
ভবতোষ হয়তো আরও কিছু বলত, গৌরাঙ্গ কড়া চোখে তাকাতে থেমে গেল৷ কথা বলতে শুরু করলে লোকটা নিজেকে সামলাতে পারে না৷
‘তুমি ছেলেটাকে কোন সময় চায়ের দোকানে দেখতে?’
‘নানা সময় দেখতাম৷ কখনও সকালে, কখনও দুপুরে, এমনকি সন্ধের পরেও অনেক দিন দেখেছি বসে বসে চা খাচ্ছে৷ আমি সুকুমারদাকে বললাম এর একটা মাসকাবারি অ্যাকাউন্ট করে দাও৷ লোকটা চলে যেতে সুকুমারদা আমাকে প্রচণ্ড ঝাড়ল৷ বলল, ওই সব মাসকাবারি অ্যাকাউন্ট-ফ্যাকাউন্টের কথা একদম বলবি না৷ কাউকে ধারে খাওয়ানো আমার পক্ষে সম্ভব নয়৷ আমি তো লোকটার বাড়িটাও চিনি না৷ টাকা মেরে পালিয়ে গেলে টাকাটা কি তোর বাবা দিয়ে দেবে? সুকুমারদার সব ভাল কিন্তু মুখটা বড় খারাপ৷ কথায় কথায় বাবা-মা তোলে৷ তো যাই হোক আমার তো স্যার কৌতূহলটা একটু বেশি৷ একদিন লোকটার পেছন পেছন গেলাম৷ ভাবলাম, দেখি ও কোথায় যায়৷ লোকটা, বলব কী স্যার, পেছনের জঙ্গলটায় ঢুকে অদৃশ্য হয়ে গেল৷’
‘তা, এতই যখন তোমার কৌতূহল, তুমি নিশ্চয় খেয়াল করেছ ত্রিবর্ণার পাশের বাড়িটায় কারা আসছে যাচ্ছে?’
‘কোন পাশের বাড়ি স্যার?’
‘ত্রিবর্ণার একপাশে তো ফাঁকা জমি৷ অন্য পাশে যে বাড়িটা আছে তার কথা বলছি৷ মানে আমি বলতে চাইছি, ইব্রাহিম মাসুদের বাড়ি কারা কখন আসত যেত, তুমি কিছু দেখেছ?’
ভবতোষ ধাড়ার হাসি হাসি মুখটা নিমেষে বদলে গেল৷ বলা যায়, আঁধার হয়ে গেল৷ আদিত্য ভাবল, এও কি তা হলে কিছু বলবে না? মুখ টিপে থাকবে?
‘ইব্রাহিম মাসুদের বাড়িতে কারা যাওয়া-আসা করত আমি সব জানি৷ ইব্রাহিম মাসুদ কীসের কারবার করে তাও আমি জানি৷ শুধু জানি তাই নয়৷ আমার কাছে ওর পাপ কাজের অনেক প্রমাণ আছে৷ কিন্তু আপনারা কি সেসব জানতে চাইবেন?’
‘কেন জানতে চাইব না? আমরা তো জানতেই এসেছি৷ আপনার কেন মনে হল আমরা জানতে চাইব না?’ আদিত্য এতক্ষণে মুখ খুলেছে৷
‘স্যার, আমি একটু খুলে বললে সব বুঝতে পারবেন৷ যেটা বলব সেটা আমার খুব কষ্টের জায়গা৷ আমি হাসিখুশি থাকার চেষ্টা করি কিন্তু আমারও কিছু কষ্টের জায়গা আছে স্যার৷’
আদিত্য ঠিক বুঝতে পারছে না ভবতোষ কী বলার চেষ্টা করছে৷ সে বলল, ‘আপনি সব কিছু খুলে বলুন৷ আমরা শুনছি৷’
‘আমরা স্যার এই অঞ্চলেরই লোক৷ আমাদের দেশের বাড়ি তমলুকের কাছে৷ ওখান থেকে এসে আমার বাবা এই অঞ্চলে বাসা নিয়েছিল৷ বাবা রান্নার কাজ করত৷ প্রথম দিকে ভাতের হোটেলে কাজ করেছে, পরে একটা কেটারিং-এ৷ আমরা দুই ভাই৷ আমি বড়৷ আমার ভাই সন্তাোষ আমার থেকে দু’বছরের ছোট৷ ভাই-এর সঙ্গে আমার যেমন ভাব, তেমনি ঝগড়া৷ আমাদের মা মারা গেলেন, আমার তখন বারো, সন্তাোষের দশ৷ মা মারা যাবার পর আমাদের আর তেমন লেখাপড়া হল না৷ কী করে হবে৷ সকালে বাবা কাজে বেরিয়ে গেলে আমরা ছাড়া গোরু৷ আমার যখন পনেরো বছর বয়েস তখন বাবা অসুখে পড়ল৷ আর কাজে যেতে পারে না৷ বাড়িতে টাকা-পয়সার খুব অভাব৷ আমি কাজ নিলাম৷ প্রথমে একটা সাইকেল সারাই-এর দোকানে, তারপর একটা মিষ্টির দোকানে, শেষে এই সিকিউরিটি কোম্পানিতে৷ আমার ভাই সন্তাোষ একেবারে বখে গেল৷’
‘তুমি তো তোমার জীবনের গল্প ফেঁদেছ৷ ওসব জেনে আমাদের কী হবে?’ গৌরাঙ্গ অধৈর্য হয়ে বলল৷
‘আপনারা যেটা জানতে চান তার সঙ্গে আমার জীবনের গল্পটা জড়িয়ে আছে স্যার৷’
‘না, না, তুমি ভাল করে বল৷’ আদিত্য অভয় দিল৷
‘যা বলছিলাম স্যার, আমার ভাইটা একেবারে বখে গেল৷ মদ ধরল৷ মদের পয়সা জোগাড় করার জন্য তোলাবাজি শুরু করল৷ ওর শরীরটা চিরকালই বেশ তাগড়া৷ গুন্ডাবাজি, মারপিট ভালই করতে পারত৷ কিছুদিন পরেই ও ইব্রাহিম মাসুদের গ্যাং-এ যোগ দেয়৷ ইব্রাহিম মাসুদই এই অঞ্চলের সব থেকে বড় মাফিয়া৷ ইব্রাহিম নিজের হাতে কিছু করে না৷ কিন্তু এই অঞ্চলে চোলাই মদ, মেয়ে পাচার এবং সাট্টা এই তিনটে ওর একচেটিয়া ব্যবসা৷ টাকা সবটাই ওর৷ ব্যবসা চালানোর জন্যে একটা বড় গ্যাং ওকে পুষতে হয়৷ আমার ভাইটা সেখানে যোগ দিল৷’
‘ইতিমধ্যে বাবা মারা গেছে৷ বাড়িতে আমি আর ভাই৷ ভাইকে রোজ বোঝাই, এই রাস্তা তুই ছেড়ে দে৷ ও শোনে না৷ তারপর একদিন বাড়ি আসাই ছেড়ে দিল৷ শুনলাম কাছেই একটা ঘর ভাড়া নিয়ে একটা বাজারের মেয়েছেলের সঙ্গে থাকে৷ ওই মেয়েছেলেটাই ওকে ডোবাল৷’
আদিত্য অবাক হয়ে লক্ষ করছিল ভবতোষ ধাড়ার চরিত্রটাই পালটে গেছে৷
‘গড়িয়া অঞ্চলে সীতারাম সাহুর একটা একই রকম গ্যাং আছে৷ ওই মেয়েছেলেটা স্যার আসলে সীতারাম সাহুর গ্যাং-এর৷ দুটো গ্যাং-এর মধ্যে মারাত্মক ঝামেলা৷ দুজনেই অন্যজনের এলাকা দখল করতে চায়৷ ইব্রাহিমের গ্যাংটা যে চালায় তার নাম হীরালাল৷ ভয়ঙ্কর লোক৷ এই হীরালাল আমার ভাই সন্তাোষকে খুব বিশ্বাস করত৷ বিশ্বাস করে অনেক কথা বলত৷ আমার বোকা ভাইটা আবার সেসব কথা ওই মেয়েছেলেটাকে বলে দিত৷ ফলে মাসুদের গ্যাং-এর অনেক ক্ষতি হয়ে যায়৷’
‘আপনি এত কথা জানলেন কী করে?’ আদিত্য জিজ্ঞেস করল৷
‘এরকম গদ্দারি তো বেশি দিন চলতে পারে না৷ মেয়েটা ধরা পড়ে গেল৷ হীরালালের লোকেরা মেয়েটাকে খুন করে কোথায় যে লোপাট করে দিল আজও কেউ জানে না৷ বিপদ বুঝে সন্তাোষ পালিয়ে যায়৷ ছ’সাত দিন পালিয়ে পালিয়ে ছিল তারপর একদিন রাত্তিরে হঠাৎ সন্তাোষ আমার বাড়িতে এসে হাজির৷ ভয়ে কাঁপছে৷ বলল, হীরালালের লোক ওর পেছনে লেগে আছে৷ তখনই পুরো গল্পটা ওর কাছ থেকে জানতে পারলাম৷’
ভবতোষ জিরিয়ে নেবার জন্যে একটু থামল৷ বলল, ‘গলাটা শুকিয়ে গেছে৷ একটু জল খেয়ে আসছি স্যার৷’ একটু পরে একটা নোংরা বহুব্যবহৃত জলভর্তি প্লাস্টিকের বোতল নিয়ে ফিরে এল৷ গলায় এক ঢোঁক জল ঢেলে আবার বলতে শুরু করল৷
‘সন্তাোষ আমাকে একটা ব্যাগ দিয়ে বলল, ওর যদি কিছু একটা হয়ে যায় এই ব্যাগটা পুলিশের হাতে তুলে দিতে৷ এর মধ্যে কিছু ছবি, ঠিকানা, ভিডিও আছে যা দিয়ে মাসুদ সুদ্ধু ওদের দলের সবাইকে জেলে পোরা যাবে৷ আমি জিজ্ঞেস করলাম এটা পেলি কোথায়? ও বলল এই জিনিসগুলো ওই মেয়েটা একটু একটু করে জোগাড় করেছিল৷ কিন্তু শেষরক্ষা হল না৷ প্রমাণগুলো নিজের দলের হাতে তুলে দেবার আগেই ও ধরা পড়ে গেল৷ ওর জিনিসপত্র থেকে এই ব্যাগটা সন্তাোষ খুঁজে পেয়েছে৷’
‘তারপর?’ গৌরাঙ্গ মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনছে৷
‘ব্যাগটা আমার হাতে দিয়ে সন্তাোষ চলে গেল৷ তারপর আর কখনও ওকে দেখিনি৷ আমার বিশ্বাস ওকেও খুন করে বডি লোপাট করে দেওয়া হয়েছে৷ আমি কিছুদিন পরে এখানকার থানায় ডায়েরি করতে গেলাম৷ এই বড়বাবু তখন সবে এসেছে৷ আমাকে তাড়িয়ে দিল৷ বলল, ওরকম অনেকে বাড়ি ছেড়ে চলে যায়৷ অন্য রাজ্যে গিয়ে কাজ করে৷ এসব নিয়ে পুলিশের ভাবার সময় নেই৷ আমার মনে হল, বড়বাবুর হাতে ব্যাগটা না দেওয়াই ভাল৷ আমার ভাইএর বডির মতো ওটাও তা হলে লোপাট হয়ে যাবে৷ কিন্তু আপনারা ধৈর্য ধরে আমার কথা শুনছেন৷ তাই মনে হচ্ছে ব্যাগটা আপনাদের হাতে তুলে দেওয়া যায়৷’
‘ব্যাগটা এখন কোথায়?’ গৌরাঙ্গ জিজ্ঞেস করল৷
‘আমার বাড়িতে আছে স্যার৷ রাত্তির আটটা অব্দি আমার ডিউটি৷ তারপর যদি আমার সঙ্গে আমার বাড়িতে আসেন আমি ব্যাগটা আপনার হাতে দিয়ে দেব৷ ব্যাগটা আপনাকে দিয়ে দিতে পারলে আমি শান্তি পাব৷ সন্তাোষের আত্মাও শান্তি পাবে৷’
ঠিক হল গৌরাঙ্গ রাত আটটার পর এখানে আবার আসবে৷ এসে ভবতোষকে নিয়ে তার বাড়ি যাবে৷ আরও দু-একটা কথা বলে গৌরাঙ্গ উঠে পড়ছিল, আদিত্য বলল, ‘আমার একটা প্রশ্ন আছে৷’
ভবতোষ আবার এক ঢোঁক জল খেয়ে বলল, ‘বলুন স্যার৷’
‘ত্রিবর্ণাতে সিসি টিভি আছে?’
‘আছে স্যার৷’
‘ঠিক আছে৷ আমার আর কিছু জিজ্ঞেস করার নেই৷’
ফেরার পথে আদিত্য গৌরাঙ্গকে বলল, ‘তুমি তো লটারি পেয়ে গেলে গো৷ আমাকে কিন্তু এখনও অনেক দূর যেতে হবে৷ আমার একটা কাজ তুমি করে না দিলে এগোতে পারব না৷ ত্রিবর্ণা থেকে পুরোনো সিসি টিভির ফুটেজ জোগাড় করে দিতে হবে৷ সিসি টিভি সাধারণত বাড়ির পেছন দিকটাও কভার করে৷ হয়তো খুনের সময় সিসি টিভিতে কিছু একটা ধরা পড়েছিল৷ হয়তো খুনের আগে এবং পরে খুনি খুনের জায়গায় এসেছিল৷ এলে সিসি টিভিতে ধরা পড়বে৷ তুমি একটু খোঁজ নাও৷ আর ভবতোষ ধাড়ার ব্যাগে কী পেলে সেটাও একটু জানিও৷ এভিডেন্সটা সলিড হলে সরাসরি গৌতমের হাতে জমা দিয়ে দেব৷’
আলিনা মাসুদ যে সুন্দরী এটা নিয়ে দ্বিমত পোষণ করা অসম্ভব৷ তবে সুন্দরী বলতে লোকে সাধারণত যেরকম বোঝে, আলিনার চেহারাটা ঠিক সেরকম নয়৷ ইব্রাহিম মাসুদকে দেখে আদিত্য ধরে নিয়েছিল আলিনা মাসুদেরও গায়ের রং ফরসা হবে, নাক তীক্ষ্ণ হবে, ঠোঁট পাতলা হবে৷ বাবার ধাত পেলে হয়তো সে কিছুটা খর্বকায়ও হতে পারে৷ কার্যত দেখা গেল আদিত্যর পূর্ব-কল্পনাগুলো প্রতিটি ক্ষেত্রে ভুল৷ বাস্তবের আলিনা মাথায় বেশ লম্বা, গায়ের রং শ্যামলা, নাক চাপা, ঠোঁট ঈষৎ পুরু৷ কালো দিঘির মতো একজোড়া চোখে অতলস্পর্শী বিষণ্ণতা৷ সব মিলিয়ে তার চেহারার একটা অনিবার্য আকর্ষণ আছে৷ মনে হয়, আলিনা তার মায়ের রূপ পেয়েছে৷
‘আব্বা আমাকে আপনাদের সঙ্গে কথা বলতে বারবার বারণ করে দিয়েছে৷ তবু আপনাদের সঙ্গে দেখা করলাম৷ আব্বা যদি জানতে পারে আমাকে আবার বাড়িতে বন্ধ করে রাখবে৷ কলেজে আসতে দেবে না৷ কলেজের গেটে আব্বার গুন্ডারা সারাক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে৷ নজর রাখে কারা ঢুকছে-বেরোচ্ছে৷ তবে ওরা ভেতরে ঢুকতে পারে না৷’
‘তুমি চিন্তা কোরো না৷ তোমার আব্বার লোকেরা গেটের ওপর নজর রাখতে পারে বলে আমরা পেছনের রাস্তা দিয়ে কলেজে ঢুকেছি৷ এই জঙ্গলটা পেরিয়ে আরও অনেকটা হাঁটলে কলেজের শেষ সীমান্তে পৌঁছে যাওয়া যায়৷ সেখানে পাঁচিল দেওয়া আছে৷ সেই পাঁচিল টপকে আমরা ঢুকেছি৷ আমার মনে হয় না আমাদের কেউ দেখতে পেয়েছে৷’ আদিত্য মৃদু গলায় বলল৷
‘আমি তাহলে আসছি৷ আপনারা কথা বলুন৷’ শুভা সেন বলল৷
‘তুই পনেরো-কুড়ি মিনিট বাদে ঘুরে আয়৷ আমি এই জায়গাটা ভাল চিনি না৷ তুই না এলে মেন বিল্ডিং-এ ফিরতে পারব না৷’ আলিনা শুভাকে বলল৷
‘ঠিক আছে, আমি ঘুরে আসছি৷’ শুভা জঙ্গলের মধ্যে হারিয়ে গেল৷
জঙ্গলের মধ্যে একটা ভাঙা মন্দির আছে৷ পুজো-টুজো হয় না, বেদির ওপর কোনও বিগ্রহও নেই৷ ভেতরে নিশ্চয় সাপ-খোপের আড়ত, ঢুকতে ভয় লাগে৷ ওরা তিনজন মন্দিরের চাতালে বসেছে৷ একটা কুবো পাখি কুব কুব করে ডেকেই চলেছে৷
‘আমার নাম আদিত্য মজুমদার৷ আমি একজন বেসরকারি গোয়েন্দা৷ ইনি গৌরাঙ্গ সাঁতরা, নরেন্দ্রপুর থানার সাব-ইন্সপেক্টার৷ আমরা অমিত দাসের খুনের তদন্ত করছি৷ এই তদন্তটা মাস দুয়েক আগে শুরু হওয়া উচিত ছিল৷ নানা কারণে হয়নি৷’
‘নানা কারণ তো নয়৷ একটাই কারণ৷ আমার আব্বা ইনফ্লুয়েন্স খাটিয়ে এটাকে বন্ধ রেখেছিল৷ আমি জানি না আব্বার ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়ে আপনারা কীভাবে আবার তদন্ত শুরু করলেন৷’
আলিনার শেষ কথাটার ভিতরে একটা প্রশ্ন লুকিয়ে ছিল৷ আদিত্য সেই প্রশ্নটা এড়িয়ে গিয়ে বলল, ‘তোমার আব্বা যে তদন্তটা চাইছে না সেটা পরিষ্কার৷ আমাকেও তোমার আব্বা এই তদন্তটা বন্ধ করে দিতে বলেছে৷ প্রথমে রিকোয়েস্ট করল, তারপর ভয় দেখাল৷ সে যাই হোক, আমার প্রশ্ন হল, কেন তোমার আব্বা তদন্তটা বন্ধ করে দিতে চাইছে?’
‘উত্তরটা তো পরিষ্কার৷ অমিতকে খুনের পেছনে আব্বার হাত আছে৷ আব্বা কখনোই চায়নি অমিতের সঙ্গে আমার বিয়ে হোক৷ আব্বা মুখে বলছে, খাঁটি মুসলমান হয়ে হিন্দু ছেলের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দেওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়৷ কোরানে এর বারণ আছে৷ কিন্তু আমি জানি আব্বা ধর্ম-টর্ম নিয়ে মোটেই মাথা ঘামায় না৷ আসল কারণটা অন্য৷ দেখুন আব্বার যে বেআইনি ব্যবসাগুলো আছে সেগুলো টাকার অঙ্কে বিপুল৷ সব মিলিয়ে একশো কোটি ছাড়িয়ে যাবে৷ এই ব্যবসাগুলো আব্বা কাকে দিয়ে যাবে? নিশ্চয় যাকে তাকে নয়, খুব কাছের কাউকে৷ আব্বার সব থেকে কাছের মানুষ তো আমি৷ কিন্তু আমি তো আর ওই সব নোংরা ব্যবসা চালাতে পারব না৷ চালাতে চাইবও না৷ সেক্ষেত্রে পছন্দের কারও সঙ্গে যদি আব্বা আমার বিয়ে দিতে পারে, যে আব্বার বিপুল বেআইনি সাম্রাজ্যটা চালাতে পারবে, তা হলে সব দিক রক্ষে হয়৷ আব্বা আমার জন্যে দলের ভেতর থেকেই একজনকে বেছে রেখেছে৷ যাকে বেছে রেখেছে সে একজন ঠান্ডা মাথার খুনি৷ আমি তাকে ঘেন্না করি৷ ভয়ও পাই৷ আমি তাকে কোনওদিন বিয়ে করতে চাইনি৷ অমিত এসে আমাকে একটা মুক্তির রাস্তা দেখাল৷ ওই জেলখানা থেকে আমার আম্মা কখনও বেরোতে পারেনি৷ অমিতের সঙ্গে সম্পর্ক হবার পর আমি ওই জাহান্নম থেকে বেরোবার স্বপ্ন দেখতে শুরু করলাম৷’
‘কিন্তু তোমার আব্বা যে বলল সিরাজুলের সঙ্গে তোমার একটা সম্পর্ক ছিল এবং তুমি সিরাজুলকে বিয়ে করলে তোমার আব্বা খুশি হত৷ এটা কি সত্যি নয়?’ আদিত্য জিজ্ঞেস করল৷
‘সিরাজুলের সঙ্গে আমার একটা সম্পর্ক হয়েছিল এটা সত্যি৷ কিন্তু আমি সিরাজুলকে বিয়ে করলে আব্বা খুশি হতো এটা পুরো মিথ্যে৷ আব্বা সিরাজুলকে ব্যবহার করেছিল৷ তাকে দিয়ে অমিতকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল৷ ভয় দেখানোর চেষ্টা করেছিল৷ সেই জন্যে সিরাজুলকে অত খাতির৷’
‘তোমার সঙ্গে সিরাজুলের সম্পর্কটা ভেঙে গেল কেন? সিরাজুল ছেলেটা কি ভাল নয়?’
‘ঠিক উল্টো৷ সিরাজুলের মতো ভাল ছেলে আমি আর দেখিনি৷ ওরকম উদার মন হয় না৷ কিন্তু অমিতের মতো সিরাজুল মানসিকভাবে শক্ত নয়৷ সিরাজুলকে দিয়ে আমার কাজ হত না৷ মানে, আমার আব্বার সঙ্গে লড়াই করতে গেলে যে মনের জোরটা দরকার সেটা অমিতের ছিল, কিন্তু সিরাজুলের ছিল না৷ তাই আমি সিরাজুলের সঙ্গে সম্পর্কটা ভেঙে দিয়ে অমিতের ওপর ভরসা করেছিলাম৷ সিরাজুল সেটা মেনেও নিয়েছিল৷ আমাকে নিয়ে পালিয়ে যাবার সাহস সিরাজুলের ছিল না৷ অমিতের ছিল৷’
‘তুমি তাহলে নিশ্চিত যে তোমার আব্বাই অমিতকে খুন করিয়েছে৷’ আদিত্য একেবারে সরাসরি প্রশ্নটা করল৷
‘আমার অন্তত এ-নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই৷’ আলিনার উত্তর দ্বিধাহীন৷
‘কিন্তু ভেবে দেখ, তোমার আব্বা তো তোমাকে বাড়িতেই আটকে রেখেছিল৷ তারপর একদিন যদি চেনাশোনা কোনও কাজি ধরে এনে বাড়ির ভেতরেই জোর করে তোমার বিয়ে দিয়ে দিত তুমি কিছুই করতে পারতে না৷ তা হলে অমিত দাসকে খুন করার প্রয়োজন হচ্ছে কেন?’
‘আব্বা আমাকে জোর করে বিয়ে দিতে পারত না৷’
‘কেন?’
‘কারণ অমিত আর আমি আগেই রেজিস্ট্রি করে বিয়ে করে নিয়েছিলাম৷ আব্বা যদি জোর করে আবার আমার বিয়ে দিত তা হলে সেই বিয়েটা আইনের চোখে দাঁড়াত না৷’
আলিনা আর অমিতের রেজিস্ট্রি করে বিয়ে হয়ে গিয়েছিল! তথ্যটা হজম করতে আদিত্যর দু’এক মিনিট সময় লাগল৷ খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে সে বলল, ‘তোমার আব্বা কি জানত তুমি অমিতকে বিয়ে করে নিয়েছ?’
‘প্রথমে জানত না৷ পরে জেনেছিল৷’
‘তার মানে তোমার আব্বা এটাও বুঝতে পেরেছিল যে অমিত বেঁচে থাকলে তার পছন্দের ছেলের সঙ্গে তোমার বিয়ে হতে পারবে না৷’ গৌরাঙ্গ থেমে থেমে বলল৷
‘আপনি একেবারে ঠিক জায়গাটা ধরেছেন৷ এখন আপনারা নিশ্চয় বুঝতে পারছেন অমিতকে খুন করে আব্বার লাভটা কোথায়?’
কেউ কোনও কথা বলছে না৷ চাতালফোঁড় একটা অশথগাছ থেকে কয়েকটা শুকনো পাতা ঝরে পড়ল৷ উত্তরের হাওয়া৷ দাঁত আছে৷ আদিত্য স্তব্ধতা ভেঙে বলল, ‘অমিতকে খুন করে যে তোমার আব্বার লাভ আছে এটা তোমরা বুঝতে পারনি?’
‘পেরেছিলাম৷ পেরেছিলাম বলেই আমরা প্ল্যান করছিলাম পালিয়ে যাব৷ আসলে পালিয়ে যাবার দুটো সমস্যা ছিল৷ অমিতের পরীক্ষা শেষ হবার কথা ছিল আগামী মে মাসে৷ তার আগে পড়াশোনা ছেড়ে দিলে অমিতের ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রিটা কমপ্লিট হত না৷ আর ডিগ্রি না থাকলে ভাল চাকরিও পাওয়া যেত না৷ তাই আমাদের মে মাস অবধি অপেক্ষা করতেই হত৷’
আলিনা থামল৷ একটু চুপ করে থেকে বলল, ‘দ্বিতীয় সমস্যাটা আরও অনেক গভীর৷ আমার বাড়ি থেকে বেরোনো বন্ধ হয়ে যাবার পর অমিতের সঙ্গে যোগাযোগ করতে খুব অসুবিধে হচ্ছিল৷ আমার মোবাইল তো আব্বার কাছে, বাড়িতে কোনও ল্যান্ডফোনও নেই৷ এই সময় আম্মি আমাকে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে আসে৷ আম্মি আমার আয়া, আমার মায়ের মতন, আমাকে ছোট থেকে মানুষ করেছে, আমাদের বাড়িতেই থাকত৷ দরকারি কথাগুলো আম্মির মোবাইলে অমিত মেসেজ করত৷ আমি আম্মিকে বলে দিতাম কী উত্তর দিতে হবে৷ এইভাবে আমাদের যোগাযোগ চলত৷ কিন্তু অমিতের সঙ্গে কখনও সরাসরি কথা বলতাম না, পাছে কেউ শুনে ফেলে৷ তারপর তো অমিত আমাদের বাড়ির পেছনে জঙ্গলের মধ্যে ওই জায়গাটা আবিষ্কার করল যেখান থেকে উত্তরের বারান্দাটা পরিষ্কার দেখা যায়৷ দিনে বেশ কয়েকবার ওকে দেখতে পেতাম৷ ও আমাকে দেখতে পেত৷ আব্বা ভাবতেই পারেনি আম্মি আমাকে এভাবে সাহায্য করবে৷’
‘তারপর?’ গৌরাঙ্গ রুদ্ধশ্বাস হয়ে গল্প শুনছে৷
‘তারপর একদিন আম্মি ধরা পড়ে গেল৷ যে লোকটার সঙ্গে আব্বা আমার বিয়ে ঠিক করেছিল সে-ই ধরে ফেলল৷ আমার সামনেই নির্দয়ভাবে মারা হল আম্মিকে৷ একজন বয়স্ক মহিলাকে যে ওইভাবে মারা যায় সেটা না দেখলে বিশ্বাস হতো না৷ আধমরা আম্মিকে মাঠের মধ্যে ফেলে দিয়ে ওরা চলে এল৷ কপালে মরণ ছিল না বলে আম্মি বেঁচে গেল৷ আম্মির মোবাইলটা আব্বার হাতে পড়ল৷ মোবাইলের মেসেজ থেকে আব্বা আমাদের পালিয়ে যাবার প্ল্যানটা জানতে পারল৷ এর কিছুদিন পরে অমিত খুন হয়৷’
গাছপালার ভেতর দিয়ে শুভাকে দেখা যাচ্ছে৷ ‘তোর কথা হয়ে গেছে? এবার যাবি?’ শুভা এসে দাঁড়িয়েছে৷
‘আমার যা বলার মোটামুটি বলা হয়ে গেছে৷ আমি তোর সঙ্গে যাব৷’ আলিনা উঠে দাঁড়াল৷
‘এক মিনিট৷ আর দুটো জিনিস জানার আছে৷’ আদিত্য বলল৷
‘বলুন?’
‘আম্মি এখন কোথায় থাকে?’
‘এখান থেকে খুব দূরে নয়৷ কলেজের মেন গেট দিয়ে বেরিয়ে ডান দিকে মিনিট দশেক হাঁটলে চকবাজার বলে একটা জায়গা পড়বে৷ ওখানে আক্রম টেলার্স বলে একটা দর্জির দোকান আছে৷ ওই দোকানে আম্মি কাজ করে৷ দোকানের ওপরে একটা ঘরে থাকে৷ আম্মির নাম রোশেনারা খাতুন৷ নাম বললে লোকে দেখিয়ে দেবে৷ আর কী জানার আছে?’
‘যে লোকটার সঙ্গে তোমার আব্বা তোমার বিয়ে দিতে চায় তার নাম কী?’
‘তার নাম হীরালাল রাঠোর৷ হিন্দু৷ বিহারী রাজপুত৷ বলছিলাম না, ধর্ম নিয়ে আব্বার কোনও মাথা ব্যথা নেই৷’
আদিত্যরা পাঁচিল টপকে কলেজের পেছন দিক দিয়েই বেরোল৷ যদিও গৌরাঙ্গ ইউনিফর্ম পরে আসেনি তাও সাবধানের মার নেই৷ পেছনের রাস্তাটা অনেকটা এঁকেবেঁকে সেই কলেজের সামনের বড় রাস্তাটাতেই গিয়ে পড়েছে৷ বড় রাস্তায় পড়ে গৌরাঙ্গ বলল, ‘আমরা কিন্তু চকবাজারের বেশ কাছে চলে এসেছি৷ আলিনার আম্মির সঙ্গে দেখা করে যাবেন নাকি?’
‘অবশ্যই যাব৷ তবে তার আগে কিছু খেতে হবে৷ সেই কোন সকালে বেরিয়েছি৷ কিন্তু আজ আর তোমার বাড়িতে খাব না৷ এদিকে কোনও হোটেল-টোটেল আছে?’
‘আমার বাড়িতে খেতেই পারেন৷ তবে আমার বাড়িটা একেবারে উল্টোদিকে পড়বে৷ ওদিকে এখন যেতে গেলে অনেক দেরি হয়ে যাবে৷ তার থেকে রাস্তায় কোথাও খেয়ে নেওয়াই ভাল৷ চকবাজারেই একটা ভাল ভাতের হোটেল আছে৷ কলেজের কাছে যে হোটেলটা আছে তার থেকে অনেক ভাল৷ অতটা সাজানো-টাজানো নয়৷ তবে রান্নাটা করে দারুণ, আর খেলে শরীর খারাপ হবে না৷’
‘সে তো অতি উত্তম কথা৷ তাহলে ওখানেই যাওয়া যাক৷’ আদিত্য বেজায় খুশি৷ তার যা খিদে পেয়েছে তাতে আস্ত একটা মনুমেন্ট খেয়ে ফেলতে পারে৷
সাইন বোর্ডে বড় বড় বাংলা অক্ষরে লেখা কালীমাতা ভোজনালয়৷ তার নীচে ছোট ছোট অক্ষরে হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট৷ এটাও বাংলায়৷ গৌরাঙ্গ মানেটা বুঝিয়ে দিল৷ দুপুরে আর রাত্তিরে ভাত খাবার সময় এখানে ভাত-ডাল-ভাজা, মাছ-মাংস-ডিম ইত্যাদি পাওয়া যায়৷ অন্য সময় পাওয়া যাবে চপ-কাটলেট-মোগলাই, রোল-চাউমিন৷ অর্থাৎ দুপুর সাড়ে বারোটা থেকে তিনটে এবং রাত্তির সাড়ে আটটা থেকে এগারোটা এটা হোটেল৷ অন্য সময় রেস্টুরেন্ট৷ ভোজনালয়ের ভেতরে চেয়ার-টেবিল এবং বাইরে বেঞ্চি পাতা আছে৷ ভাত খাবার টাইমে ভেতরে চা দেওয়া হয় না, তবে বাইরের বেঞ্চিতে বসে চা খেতে চাইলে তার ব্যবস্থা আছে৷
আদিত্য ঘড়ি দেখল৷ আড়াইটে বাজে৷ ভোজনালয়ের দেয়ালে টাঙানো ব্ল্যাক বোর্ডের খাদ্যতালিকায় অধিকাংশ আইটেমের পাশে ঢ্যাঁড়া পড়ে গেছে৷ আসার সময় গৌরাঙ্গ বলছিল এই হোটেলের পাবদা, পারশে এবং চিতলের প্রভূত খ্যাতি আছে৷ আদিত্য খুব আশা করেছিল এই তিনটের একটা অন্তত পাওয়া যাবে৷ তিনটেই ফুরিয়ে গেছে৷
হাফ-প্যান্ট পরা পরিচারক জানাল তাদের দু’বেলাই নতুন করে রান্না হয়৷ দুপুরের মাছ তারা রাত্তিরে চালায় না৷ তাই রান্নার পরিমাণটা কম রাখা হয়৷ ইত্যাদি, ইত্যাদি৷ তার লম্বা বক্তৃতা আদিত্যর অসহ্য লাগছিল৷ সে বলল, ‘এখন কী কী পাওয়া যাবে তাই বল৷’
‘ভাত, ডাল, আলু-উচ্ছে ভাজা, ফুলকপির তরকারি পাওয়া যাবে৷ মাছ সবই ফুরিয়ে গেছে৷’
‘আমিষ কিচ্ছু হবে না?’ আদিত্য প্রায় আর্তনাদ করে উঠল৷
‘হবে৷ হাঁসের ডিমের ডালনা হবে৷ আর দু’প্লেট খাসির মাংস হয়ে যেতেও পারে৷ দেখে এসে বলছি৷’
লোকটা একটা দরজা দিয়ে ভেতরে অদৃশ্য হয়ে গেল৷ ফিরে এসে বলল, ‘খাসির মাংস এক প্লেট হবে৷’
‘তাই দাও৷ দুটো প্লেটে ভাগ করে দিও৷ আর ডিমের ডালনা দু’প্লেট৷ ভাত, ডাল আলু-উচ্ছে ভাজা তো দেবেই৷’
‘ফুলকপির তরকারি দেব না?’
‘নাঃ থাক৷ তুমি খাবারটা তাড়াতাড়ি দাও৷’
লোকটা আবার সেই দরজাটা দিয়ে ভেতরে অদৃশ্য হয়ে গেল৷ আদিত্য গৌরাঙ্গর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আজ কিন্তু আমি খাওয়াচ্ছি৷’
গৌরাঙ্গ আপত্তি করতে গিয়ে থেমে গেল৷ হেসে বলল, ‘ঠিক আছে আদিত্যদা৷’
রান্না ভালই৷ বিশেষ করে হাঁসের ডিমের ডালনাটা আদিত্যর পছন্দ হয়েছে৷ মাংসটাও ভাল, তবে রসুন একটু কম দিলে আরও ভাল হত৷ লোকটা যখন মৌরির প্লেট আর চিরকুটে লেখা বিলটা টেবিলে রাখছে আদিত্য জিজ্ঞেস করল, ‘এখানে আক্রম টেলার্স কোথায় আছে জান?’
‘আক্রম টেলার্স? ওই তো রাস্তার ওপারে৷’ লোকটা তর্জনী দিয়ে রাস্তার ওপারটা দেখাল৷
খাওয়ার পর বাইরে বেরিয়ে আক্রম টেলার্স দোকানটা খুঁজে পেতে অসুবিধে হল না৷ কিন্তু দোকানের ঝাঁপ বন্ধ৷ এই ভর দুপুরে সেটাই স্বাভাবিক৷ আলিনা মোটামুটি ঠিকই বলেছিল৷ দোকানের ওপরে আরও দুটো তলা আছে৷ দোকানের মালিক সম্ভবত ওখানেই কোথাও থাকে৷ দোকানের পাশ দিয়ে একটা সরু কানা গলি ভেতরে ঢুকে গেছে৷
গৌরাঙ্গ বলল, ‘আদিত্যদা, মনে হচ্ছে এই গলিটার ভেতরে ওপরে ওঠার সিঁড়ি আছে৷’
গৌরাঙ্গর অনুমান যথার্থ৷ গলিটার মাঝামাঝি জায়গায় বাঁ দিকে একটা দরজা খোলা৷ খোলা দরজা দিয়ে দেখা যাচ্ছে একপ্রস্থ অন্ধকার সিঁড়ি ওপরে উঠে গেছে৷ গলির ভেতরে ভাঙা ড্রেনপাইপ থেকে নর্দমার জল চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ছে৷ যথেষ্ট সাবধানতা অবলম্বন করা সত্ত্বেও দু’এক ফোঁটা আদিত্যর গায়ে পড়ল৷ নোংরা জলের বাধা পেরিয়ে কয়েক পা হাঁটলেই খোলা দরজা ও সিঁড়ি৷
আদিত্যদের ভাগ্য ভাল, নইলে কতক্ষণ খুঁজতে হত কে জানে, একটা ছেলে দরজা দিয়ে বেরোচ্ছিল৷ তাকে গৌরাঙ্গ জিজ্ঞেস করল, ‘রোশেনারা খাতুন কোন তলায় থাকেন?’
‘কেন? আপনার তাকে কী দরকার?’ ছেলেটা কর্কশভাবে বলল৷
‘আমরা পুলিশ৷ নরেন্দ্রপুর থানা থেকে আসছি৷ দরকারটা তাকেই বলব৷’ গৌরাঙ্গর গলায় পুলিশি গাম্ভীর্য৷
‘পুলিশ? ও আচ্ছা৷ আমি বুঝতে পারিনি স্যার৷’ ছেলেটার সুর নরম হয়ে গেছে৷ ‘দোতলায় উঠে বাঁ দিকের দরজা৷ ওখানে রোশেনারা মাসির ভাইয়ের বাড়ি৷ ওখানেই উনি থাকেন৷’
দোতলায় উঠে কিছুক্ষণ ধাক্কা দেবার পর দরজাটা খুলে গেল৷ লুঙ্গি-গেঞ্জি পরা অল্পবয়সী একটা ছেলে দরজা খুলে দিয়ে চোখ রগড়াচ্ছে৷ লুঙ্গির কষিটা বিপজ্জনকভাবে শিথিল৷ আদিত্যদের দেখে ছেলেটা হাঁ করে দাঁড়িয়ে আছে, কথা বলছে না৷ তার ঘুমের ঘোর এখনও কাটেনি৷
‘রোশেনারা খাতুন এখানে থাকেন?’ গৌরাঙ্গ জিজ্ঞেস করল৷
‘ও ফুফি, তোমাকে কারা ডাকছে দ্যাখো৷’ এইটুকু বলেই ছেলেটা, সদর দরজাটা খোলা রেখেই, বাড়ির ভেতরে অদৃশ্য হয়ে গেল৷ সম্ভবত দিবানিদ্রার বাকি অংশটা শেষ করার উদ্দেশ্যে৷ আদিত্যরা দাঁড়িয়ে আছে তো দাঁড়িয়েই আছে৷
গৌরাঙ্গ যখন দরজায় আর একবার এবং এবার আরও জোরে করাঘাত করে ফেলেছে তার কিছু পরে সাদা শাড়ি পরা এক সৌম্যদর্শন বৃদ্ধা দেখা দিলেন৷
‘আপনিই কি রোশেনারা খাতুন, আলিনার আম্মি?’ আদিত্য মিষ্টি করে বলল৷
‘হ্যাঁ৷ ভেতরে আসুন৷ বলুন কী দরকার৷’
ঘরটা ছোট৷ একটা তক্তোপোষ ঘরের বারো আনা জুড়ে রেখেছে৷ আদিত্যরা দুজন তক্তোপোষের ওপরে বসল৷ রোশেনারা বসলেন একটা টুলের ওপর৷
‘আপনারা তো পুলিশের লোক৷’ রোশেনারা সহজ গলায় বললেন৷
‘আপনি জানলেন কী করে?’ গৌরাঙ্গ অবাক৷
‘যার সঙ্গে আমাদের নীচে দেখা হয়েছিল সে নিশ্চয় আপনাকে ফোন করে দিয়েছে৷’ আদিত্য আন্দাজে বলল৷ তবে সুচিন্তিত আন্দাজ৷
‘হ্যাঁ৷ ও আমাদের পাশের বাড়িতে থাকে৷ আমার ভাইপোর বন্ধু৷ ওই ফোন করেছিল৷’
‘আমরা অমিত দাসের খুনের তদন্ত করছি৷ আপনাকে বেশিক্ষণ বিরক্ত করব না৷ শুধু দুটো-তিনটে প্রশ্ন করব৷’
‘করুন৷’
‘আমরা জানি গত ২২শে জুলাই আলিনা একদিনের জন্যে কোনও একটা নার্সিং হোমে ভর্তি হয়েছিল৷ সেটা কোন নার্সিং হোম?’
‘আমি বলতে পারব না৷’ রোশেনারার চোয়াল শক্ত হয়ে গেছে৷
‘নার্সিং হোমের নামটা আপনি না বললেও আমরা ওটা ঠিক বার করে নেব৷ আলিনা নার্সিং হোমে ভর্তি হয়েছিল এটা তো ঠিক?’
‘আমি বলতে পারব না৷’ রোশেনারা খাতুন ডান হাতের মুঠোটা খোলা-বন্ধ করছে৷
‘এটাও আপনি বলতে পারবেন না? ঠিক আছে৷ তা হলে বলুন, আলিনার বাবা আলিনার কলেজ যাওয়া বন্ধ করে দিল কেন? কলেজ রেজিস্টার থেকে জানতে পারছি আলিনা ২৩শে জুলাই থেকে কলেজ যাচ্ছিল না৷’
‘ওই ছেলেটার সঙ্গে আলিনাকে মিশতে দেবে না বলে আলিনার বাবা আলিনার কলেজ যাওয়া বন্ধ করে দিল৷’
‘অমিত দাসের সঙ্গে আলিনা তো অনেক দিন ধরেই মিশছিল৷ হঠাৎ এমন কী হল যে ২৩শে জুলাই থেকে আলিনার কলেজ যাওয়াই বন্ধ হয়ে গেল?’
‘আমি ঠিক বলতে পারব না৷ আলিনার কলেজ যাওয়া বন্ধ করাটা মাসুদ সাহেবের কথায় হয়েছিল৷ একজন সাধারণ আয়াকে উনি কি বলবেন কেন উনি ওঁর মেয়ের কলেজ যাওয়া বন্ধ করলেন?’
‘আপনি যে সাধারণ আয়া ছিলেন না সেটা আপনিও জানেন আমরাও জানি৷ আলিনা তার জীবনের সমস্ত সমস্যার কথা আপনাকে বলত৷ সেই জন্য আপনাকে প্রশ্নগুলো করছিলাম৷ আপনি যদি ঠিকমতো উত্তর দিতেন আমাদের অনেকটা সময় বেঁচে যেত৷ অমিত দাসের খুনিকে আমরা আরও তাড়াতাড়ি ধরতে পারতাম৷ আলিনাও তাতে খুশি হত৷ কিন্তু আপনি তো ঠিক করে ফেলেছেন আমাদের কোনও কথার উত্তর দেবেন না৷ আপনি কি চান না অমিত দাসের খুনি তাড়াতাড়ি ধরা পড়ুক?’
রোশেনারা খাতুন শাড়ির খুঁটটা নিজের তর্জনীতে জড়াচ্ছে, খুলে ফেলছে৷ আবার জড়াচ্ছে, খুলে ফেলছে৷ বোঝা যায় তার মনের মধ্যে তোলপাড় চলছে৷
‘আমরা উঠব৷ কিন্তু তার আগে বলে যাই ঘটনাটা কী হয়েছিল আমরা মোটামুটি জানতে পেরেছি৷ ২২শে জুলাই আলিনা ডাঃ শিবানী মল্লিকের আনডারে সোনারপুরের ক্রেসেন্ট নার্সিং হোমে ভর্তি হয়েছিল৷ সকালে ভর্তি হয়ে বিকেলে ছাড়া পেয়েছিল৷ ডাঃ শিবানী মল্লিকের সঙ্গে কথা বলে আমরা জানতে পেরেছি ওই দিন আলিনার একটা অ্যাবরশান হয়েছিল৷ আলিনার প্রেগনেন্সি যেহেতু দশ সপ্তাহের বেশি হয়ে গিয়েছিল, ওষুধ খেয়ে মেডিকাল টার্মিনেশন অফ প্রেগনেন্সি সম্ভব ছিল না৷ ওটা সার্জিকালি করতে হয়েছিল৷ প্রসিডিয়োরটা হয়ে যাবার কয়েক ঘন্টা পরে আলিনাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল৷ আলিনার সঙ্গে ছিল তার স্বামী অমিত দাস৷ অমিত সারাক্ষণ নার্সিং হোমেই বসেছিল৷ এই তথ্যগুলো আপনি জানতেন না?’
রোশেনারা খাতুন কথা বলছে না৷ মাথা নিচু করে বসে আছে৷
আদিত্য আবার বলল, ‘জানতেন না আপনি এই তথ্যগুলো?’
এতক্ষণে রোশেনারা মুখ খুলেছে৷ নিচু গলায় বলল, ‘জানতাম৷ সবই জানতাম৷ আলিনা আমাকে সব কথাই বলত৷’
‘তাহলে এবার বলুন, আলিনার প্রেগনেন্সি এবং অ্যাবরশানের কথা আলিনার বাবা কবে এবং কী করে জানতে পারল?’
‘মাসুদ সাহেবের লোক সারাক্ষণ আলিনাকে চোখে চোখে রাখত৷ সে-ই আলিনাকে নার্সিং হোম থেকে অমিতের সঙ্গে ঢুকতে বা বেরোতে দেখে৷ পরে নার্সিং হোমে খোঁজ নিয়ে সে জানতে পারে আলিনা কেন ভর্তি হয়েছিল৷ এমনিতে নার্সিং হোমের জানানোর কথা নয়, কিন্তু এই অঞ্চলে মাসুদ সাহেবকে সবাই ভয় পায়৷ তাই নার্সিং হোম বলে দিয়েছিল কী হয়েছে৷ সেই লোক মাসুদ সাহেবকে এসে সব বলে দেয়৷’
‘২২শে জুলাই আলিনা নার্সিং হোমে গিয়েছিল৷ ধরে নেওয়া যায়, ২৩শে জুলাই আলিনার বাবা সব কিছু জানতে পারল৷ জানতে পেরে আলিনার কলেজ যাওয়া বন্ধ করে দিল৷ আর ২৪শে জুলাই লোক পাঠিয়ে অমিত দাসকে প্রচণ্ড মারধোর করল৷ এই রকমই কি ঘটেছিল?’
‘মোটামুটি এই রকম৷ তবে ২২ তারিখ রাত্তির বেলাতেই মাসুদ সাহেব পুরো ব্যাপারটা জানতে পারেন৷ তারপরে আপনি যেরকম বললেন ঠিক সেই রকমই হয়েছিল৷’
‘মাসুদ সাহেব, ওই লোকটি আর আপনি, এই তিনজন ছাড়া ব্যাপারটা আর কে কে জানত?’
‘আমার মনে হয় আর কেউ জানত না৷ মাসুদ সাহেব ওই লোকটাকে বারবার সাবধান করে দিয়েছিলেন খবরটা যেন আর কেউ জানতে না পারে৷ এখন ওই লোকটা আর কাউকে খবরটা দিয়েছিল কিনা আমি বলতে পারব না৷’
আদিত্যর মনে হল রোশেনারা সত্যি কথাই বলছে৷ সে দু’হাত জড়ো করে বলল, ‘নমস্কার৷ আমাদের আপাতত যা জানার ছিল জানা হয়ে গেছে৷ আজ উঠছি৷’
পুরো সময়টা ধরে গৌরাঙ্গ চুপ করে ছিল৷ অপ্রত্যাশিত খবরের ধাক্কায় সে কিছুটা স্তম্ভিত হয়ে গেছে৷
ত্রিবর্ণা হাউসিং-এর ম্যানেজার সুনীল আইচের মুখের চামড়া কুঁচকে গেছে, কিন্তু মাথার চুল অস্বাভাবিক কালো৷ এক ঝলক দেখলেই বোঝা যায় কলপ করা চুল এবং কলপটা নিচু মানের৷ রোগা ক্ষয়াটে চেহারা, নাকের নীচে হিটলারি গোঁফ৷ হাউসিং-এর আপিস ঘরে বসে ঘুঁষি পাকিয়ে সিগারেটে টান দিচ্ছিল৷ পুলিশ শুনে অনিচ্ছায় সিগারেট ফেলে দিয়ে উঠে দাঁড়াল৷
‘আপনি নিশ্চয় জানেন মাস দুয়েক আগে আপনাদের হাউসিং-এর পেছনে একটা খুন হয়েছিল৷ আমরা সেই খুনের তদন্ত করছি৷ আপনাকে কয়েকটা প্রশ্ন করব৷’ গৌরাঙ্গ জিজ্ঞেস করল৷
সুনীল আইচ জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে আছে৷ চোখে খানিকটা উদ্বেগ৷
‘আপনাদের এখানে সিসি টিভি নেই?’
‘আছে স্যার৷’
‘পুরোনো ফুটেজগুলো কোথায় থাকে?’
‘পুরোনো, নতুন সব ফুটেজই সিকিউরিটি কোম্পানির কাছে থাকে৷ ওরাই সিসি টিভি বসিয়েছে, ওরাই চালায়, ওরাই দেখাশোনা করে৷ সিসি টিভির ব্যাপারে আমি কিছু বলতে পারব না৷’
‘হুঁ৷ তাহলে পুরোনো সিসি টিভির ফুটেজ পেতে গেলে সিকিউরিটি কোম্পানিকেই জিজ্ঞেস করতে হবে?’
‘হ্যাঁ স্যার৷ শিল্ড সিকিউরিটি কোম্পানি৷ কাছেই ওদের অফিস৷’
‘আচ্ছা, আপনার মনে আছে এখানে দুটো মেয়ে থাকত যারা খুনটা হবার পরের দিনই ফ্ল্যাট ছেড়ে চলে গিয়েছিল?’ এবার আদিত্যর প্রশ্ন৷
‘দুটো মেয়ে?’ সুনীল আইচ ভুরু কুঁচকে ভাবছে৷ একটু পরে বলল, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, মনে পড়েছে৷ দুটো মেয়ে ৫০৪ নম্বর অ্যাপার্টমেন্টে ভাড়া থাকত৷ হঠাৎ ফ্ল্যাট ছেড়ে চলে গেল৷ তবে সেটা খুন হবার আগে না পরে, মনে পড়ছে না৷’
‘৫০৪-এর মালিক কে? মানে কার কাছ থেকে ওরা ভাড়া নিয়েছিল?’
‘৫০৪-এর মালিক তো স্যার দুবাইএ থাকে৷ কিছু একটা কাপুর৷ পাঞ্জাবি৷ ওখান থেকে পুরো এক বছরের মেনটেনেনস এক সঙ্গে পাঠিয়ে দেয়৷ খুব একটা আসে না৷ আমি অন্তত কখনও মালিককে দেখিনি৷’
‘তা হলে মেয়ে দুটো বাড়িটা ভাড়া নিল কী করে? মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ হল কী ভাবে?’
‘সেটা তো স্যার আমি বলতে পারব না৷ হয়তো কোনও এজেন্টের মাধ্যমে হয়েছিল৷’
‘মালিকের ঠিকানাটা দিতে পারবেন?’
‘ঠিকানাটা নেই স্যার৷ একটা ইমেল আছে আর ব্যাঙ্কএর ডিটেল৷ ব্যাঙ্কটা কিন্তু এখানকার৷’
আধঘণ্টা পরে ভবতোষকে নিয়ে আদিত্য আর গৌরাঙ্গ শিল্ড সিকিউরিটি কোম্পানির অফিসে পৌঁছল৷ জায়গাটাকে অফিস না বলে গুদোমঘর বলাই সমীচীন৷ গ্যারেজের ওপর ম্যাজেনাইন ফ্লোরে খানিকটা জায়গা৷ একদিকে মালিক শান্তিলাল মুখার্জির টেবিল৷ বাকি জায়গাটায় নানা কিছু ডাঁই করা রয়েছে, সিকিউরিটি গার্ডদের ইউনিফর্ম, ফাইলপত্তর, টর্চ-লাঠি, কোনও ছিরি-ছাঁদ নেই, যা হোক তা হোক করে রাখা৷
‘ত্রিবর্ণা হাউসিং-এর ম্যানেজার আপনার কাছে পাঠাল৷ বলল, হাউসিং-এর সিসি টিভিটা আপনারাই দেখাশোনা করেন৷’ গৌরাঙ্গ কেজো গলায় বলল৷
শিল্ড সিকিউরিটি কোম্পানির মালিক মুখার্জিবাবুকে কিছুটা বিভ্রান্ত দেখাচ্ছে৷ ইউনিফর্ম পরা গৌরাঙ্গকে দেখে কিছুটা সন্ত্রস্তও বটে৷ ‘আমি ব্যাপারটা ভাল বুঝতে পারছি না৷ আপনারা ঠিক কী চাইছেন একটু পরিষ্কার করে বলবেন?’
‘আমি গৌরাঙ্গ সাঁতরা, নরেন্দ্রপুর থানার এস আই৷ ইনি আদিত্য মজুমদার, প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর৷ ত্রিবর্ণা হাউসিং-এর পেছনে যে খুনটা হয়েছিল আমরা তার তদন্ত করছি৷ আমরা দেখতে চাই খুনের সময়ের বা তার আগে-পরের কোনও ঘটনা সিসি টিভিতে ধরা পড়েছিল কিনা৷ আপনার কাছে গত অক্টোবর মাসের সিসি টিভির ফুটেজগুলো পাওয়া যাবে?’
‘অক্টোবর? সে তো দু’মাস আগেকার ফুটেজ৷ ওটা তো পাওয়া যাবে না৷’
‘কেন? পাওয়া যাবে না কেন?’
‘দেখুন, ফুটেজগুলো একটা হার্ড ডিস্কে জমা হয়৷ জমা হতে হতে হার্ড ডিস্কটা ভর্তি হয়ে গেলে পুরোনো ছবিগুলোর ওপর নতুন ছবিগুলো অটোম্যাটিকালি ওভাররাইট হয়ে যায়৷ তখন পুরোনো ছবিগুলো মুছে গিয়ে নতুন ছবিগুলো স্টোরড হয়৷ মানে, একটা টেপ করা গানের ওপর যদি আরেকটা গান রেকর্ড করা হয় তা হলে যেমন পুরোনো গানটা মুছে গিয়ে নতুনটা থেকে যায়, এটাও সেই রকম৷ এই ওভাররাইটিংটা সমানেই হয়ে যাচ্ছে৷ রোজই হচ্ছে৷ এবং যে কোনও একটা দিনে সে দিন স্টোরেজে থাকা যেটা সব থেকে পুরোনো ছবি সেটার অপর ওভাররাইটিংটা হচ্ছে৷ আমি কি ঠিক বুঝিয়ে বলতে পারলাম?’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ৷ খুব সুন্দর বুঝিয়েছেন৷ কথা হচ্ছে, কতদিন একটা ফুটেজ হার্ড ডিস্কে স্টোরড থাকে?’
‘কনটিনুয়াস ওভাররাইটিং-এর ফলে এক মাসের বেশি কোনও ফুটেজ হার্ড ডিস্কে থাকে না৷ তাই অক্টোবর, মানে দু’মাসের পুরোনো ফুটেজ থাকার কোনও সম্ভাবনাই নেই৷’
গৌরাঙ্গ চুপ করে রইল৷ আদিত্যও কী বলবে ভেবে পাচ্ছে না৷ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আদিত্য বলল, ‘একটা অন্য প্রশ্ন করি তা হলে৷ আপনি কি এর আগে আর্মিতে ছিলেন?’
‘হ্যাঁ৷ কী করে জানলেন? ও বুঝেছি৷ ভবতোষ বলেছে৷’
‘না, না৷ আমি কিছু বলিনি৷ অন্য কেউ বলেছে৷’ ভবতোষ প্রতিবাদ করে উঠল৷ ‘আমি ভাল মানুষ বলে আপনি সব ব্যাপারে আমাকে দোষ দেন৷ সেদিন কে যেন এখানে পাখা চালিয়ে চলে গেছিল৷ আপনি বললেন এটা নিশ্চয় ভবতোষের কাজ৷ অথচ সেদিন আমি ডিউটি সেরে সোজা বাড়ি ফিরে গেছিলাম৷ এদিকে আসিইনি৷ আপনাদের হল যত গ্যাঁড়া ভবতোষ ধ্যাড়া৷’
আদিত্য ভাবল, মিলের খাতিরে ধাড়াটাকে ধ্যাড়া বানিয়ে দেওয়া কি উচিত হল? তার থেকে যত দোষ, ভবতোষ বললেই তো হত৷ সে মুখে গাম্বীর্য এনে মুখার্জিবাবুর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আর্মিতে আপনি কী পজিশনে ছিলেন?’
‘আমি নন-কমব্যাট পজিশনে ছিলাম৷ আর্মিতে একটা পোস্টাল সারভিস আছে৷ আমি ওখানে ক্লার্ক ছিলাম৷’ মুখার্জিবাবুর গলাটা নিরীহ শোনাল৷
‘তার মানে আপনি যুদ্ধ করতেন না?’ বন্দুক চালাতেন না?’ ভবতোষ প্রচণ্ড আশাহত হয়েছে৷ আমি তো ভাবতাম আপনি বন্দুক নিয়ে পাকিস্তান বা চিনের সঙ্গে যুদ্ধ করছেন৷’
‘আমি আবার কবে বললাম আমি যুদ্ধ করেছি? কবে বললাম আমি বন্দুক চালিয়েছি? তোমার সব সময় বাজে কথা৷’
‘বলেননি৷ কিন্তু আমি ধরে নিয়েছিলাম৷ যারা আর্মিতে থাকে তারা তো যুদ্ধই করে৷’ ভবতোষ তার হতাশা গোপন রাখতে পারছে না৷
‘ঠিক আছে৷ আমরা তাহলে উঠছি৷ গৌরাঙ্গ, উঠবে নাকি?’ আদিত্য উঠে দাঁড়াল৷
রাস্তায় বেরিয়ে গৌরাঙ্গ বলল, ‘এবার কোন দিকে যাবেন?’
মাঠের মধ্যে দিয়ে রাস্তা৷ শীতের বেলা দ্রুত পড়ে আসছে৷ নাবাল মাঠের ওপর জমা হচ্ছে কুয়াশা৷ কলকাতায় এখনও ততটা ঠান্ডা পড়েনি, কিন্তু এদিকটায় কিছুটা পড়েছে৷ পাতলা একটা সোয়েটার পরে আদিত্যর শীত করছিল৷ বাঁশবনের ভেতর দিয়ে সড়সড় করে কী যেন চলে গেল৷ মেঠো ইঁদুর হতে পারে৷ সাপ হওয়াও আশ্চর্য নয়৷
‘হীরালাল রাঠোর সম্বন্ধে তোমাদের কোনও ইনফরমেশান আছে?’ প্রশ্নের উত্তরে আদিত্য প্রশ্ন করল৷
‘কিছুটা আছে৷ খুব বেশি নয়৷ আমাদের আগের বড়বাবু অশোক সামন্ত কিছু ইনফরমেশান জোগাড় করেছিলেন৷ আমিও কিছু জোগাড় করেছিলাম৷ তাই দিয়ে মনে হয় না হীরালালকে ফাঁসানো যেত৷ এই ভবতোষ আমাদের বেশ সুবিধে করে দিয়েছে৷’
‘হীরালাল থাকে কোথায়? মানে কোথায় গেলে ওকে পাওয়া যাবে?’
‘হীরালালের সঙ্গে দেখা করতে চান?’
‘হ্যাঁ, ভাবছিলাম, একবার দেখা করলে হত৷’
‘হীরালাল এই অঞ্চলেই থাকে৷ আমি চিনি ওর বাড়ি৷ আমার বাড়ি থেকে খুব দূরে নয়৷ তবে এই সময় সম্ভবত ও মার্শাল আর্ট শেখাচ্ছে৷ কারাটে, কুং ফু, এইসব৷ কাছেই একটা ক্লাব আছে, ওখানে বিকেলবেলা ও ওইসব শেখায়৷ যাবেন সেখানে?’
‘গিয়ে দেখি না, যদি হীরালালের দেখা পাওয়া যায়৷’
ক্লাব বলতে একটা পাঁচিল আর তার ভেতরে একটা আখড়া৷ বাইরে একখানা সাইন বোর্ডও আছে৷ আখড়ার একদিকে কয়েকটা বেঞ্চি পাতা৷ সেখানে বসে মার্শাল আর্ট বিদ্যার্থীদের কেউ কেউ অনুশীলনের ফাঁকে জিরিয়ে নিচ্ছে৷ গৌরাঙ্গ আদিত্যকে নিয়ে একটা ফাঁকা বেঞ্চি দেখে বসল৷ আখড়ার ভেতরে হীরালালকে দেখা যাচ্ছে৷
‘আরে, আদিত্যবাবু যে৷ কী খবর? মার্শাল আর্ট শিখবেন নাকি?’ আদিত্যকে দেখে হীরালাল এগিয়ে এসেছে৷ মনিবের অনুপস্থিতিতে তাকে কিঞ্চিৎ প্রগলভ দেখাচ্ছে৷
‘আপনার সঙ্গে কথা বলতে এসেছি৷ আপনি কাজ সেরে নিন, আমরা বসছি৷’
‘আমার সঙ্গে কথা বলবেন? ঠিক আছে৷ একটু বসুন৷ চা খান৷ এই পচা এখানে দুটো চা দে৷ আমি এই লেশনটা দিয়ে আসছি৷’
হীরালাল আবার আখড়ায় ফিরে গিয়ে হাঃ হুঃ ইত্যাদি নানারকম হুংকার সহ জনা দশেক বিদ্যার্থীকে কসরত শেখাতে শুরু করল৷
চা এসেছে৷ আদা দেওয়া৷ শীতের বিকেলে চা-টা চমৎকার লাগছে৷
‘অমিত দাস বলে কে সি এম কলেজের একটি ছাত্র গত ২৩শে অক্টোবর ইব্রাহিম মাসুদের বাড়ির পেছনে খুন হয়৷ আমরা সেই খুনের তদন্ত করছি৷ সেই ব্যাপারে আপনাকে দু-একটা প্রশ্ন করব৷’
‘মাসুদ সাহেব যে সেদিন আপনাকে তদন্ত চালিয়ে যেতে বারণ করলেন৷ তাও তদন্ত করছেন? আপনার কি ভয়-ডর নেই?’ হীরালাল হালকা হেসে বলল৷ কেউ ভাবতেই পারে সে মজা করছে৷
আদিত্য সেদিন খেয়াল করেনি, আজ করল হীরালালের বাংলাটা বাঙালিদের মতোই৷ হীরালালের কথাগুলো উপেক্ষা করে সে বলল, ‘আমার প্রথম প্রশ্ন, খুনের দিন, অর্থাৎ গত ২৩শে অক্টোবর, আপনি কোথায় ছিলেন?’
‘যদি আপনার প্রশ্নের উত্তর না দিই, তাহলে আপনি কী করবেন?’ হীরালাল আবার হালকা হেসে বলল৷
‘যদি উত্তর না দেন তা হলে পুলিশ আপনাকে সন্দেহ করবে৷ এই অঞ্চলে জোর গুজব যে ইব্রাহিম মাসুদ নিজের হাতে খুন জখম করে না৷ আপনিই নাকি তার খুন জখম করার হাত৷’
‘না, না৷ মিছিমিছি পুলিশ আমাকে সন্দেহ করুক আমি চাই না৷ বলছি কোথায় ছিলাম৷ খুনের চারদিন আগে আমি বিহারে আমার দেশের বাড়িতে গিয়েছিলাম৷ ফিরেছি খুন হবার দু’দিন পরে৷ খুনের দিন আমি কাটিহারে মায়ের কাছে ছিলাম৷ অন্তত চারজন সাক্ষী দেবে যে ওই দিন আমি ওখানেই ছিলাম৷ আমি আমার মায়ের ঠিকানা দিয়ে দিচ্ছি৷ আপনারা চেক করতে পারেন৷’ হীরালালকে প্রবল আত্মবিশ্বাসী শোনাল৷
‘আচ্ছা, আপনার কি মনে হয় অমিত দাস খুন হবার পেছনে মাসুদ সাহেবের হাত থাকতে পারে?’ গৌরাঙ্গ প্রশ্নটা করে নিজেই বুঝতে পারছে ওইভাবে সরাসরি প্রশ্নটা করা উচিত হয়নি৷
হীরালাল মিটিমিটি হাসছে৷ ‘কী করে জানব? আমি তো মানুষের মনের মধ্যে ঢুকতে পারি না৷ মাসুদ সাহেব অন্তত আমাকে এই বিষয়ে কিছু বলেননি৷’
‘কিন্তু মাসুদ সাহেব তো আপনাকে অনেক কথাই বলতেন৷ না হলে নিজের মেয়ের সঙ্গে আপনার বিয়ে দিতে চাইবেন কেন?’ আদিত্য অতর্কিতে প্রশ্নটা করেছে৷
হীরালালের মুখের চেহারা হঠাৎ বদলে যাচ্ছে৷ আত্মবিশ্বাসী, ঈষৎ ব্যাঙ্গাত্মক একটা মুখ ধীরে ধীরে বদলে গিয়ে জায়গা করে নিচ্ছে বিষণ্ণতা, সংশয়, ঘৃণা, ক্রোধ৷
‘বিয়ে? বিয়ে দিতে চাইলেই করতে হবে? মাসুদ সাহেব যদি ভেবে থাকেন ওই এঁটো মেয়েকে আমি বিয়ে করব, তা হলে তিনি ভুল ভেবেছেন৷’
কথাগুলো হীরালাল ঝোঁকের মাথায় বলে ফেলেছে৷ এবং বলেই তার মনে হচ্ছে কথাগুলো বলাটা ঠিক হয়নি৷ সে অনর্থক রূঢ়ভাবে বলল, ‘আদিত্যবাবু এবার আপনারা আসুন৷ আমার অন্য কাজ আছে৷ আর মাসুদ সাহেবের কথাটা মনে রাখবেন৷ আপনি তদন্ত চালিয়ে গেলে আপনার জীবনের দায়িত্ব কিন্তু আমরা নিতে পারব না৷’
অন্ধকার নেমে গেছে৷ উপুড়-চুপুড় ফুলকপি নিয়ে একটা ভ্যানরিক্সা আদিত্যদের পাশ কাটিয়ে চলে গেল৷
‘এবার বাড়ি ফিরব৷’ আদিত্য বলল৷
‘এখন না, দাদা৷ আমার বাড়িতে একটু চা খেতে হবে৷’
‘ঠিক আছে৷ চা খেতে খেতে কেসটা নিয়ে কথা বলা যাবে৷ তবে আমার কি মনে হয় জান? হীরালাল গভীরভাবে আলিনার প্রেমে পড়ে গিয়েছিল৷ না হলে অতটা রিঅ্যাক্ট করত না৷ হীরালাল ধরেই নিয়েছিল আলিনার সঙ্গে ওর বিয়ে হবে৷ তারপর সম্ভবত আলিনার নার্সিং হোম যাবার ঘটনাটা ও জানতে পারে৷’
আর কিছুক্ষণ হাঁটলেই গৌরাঙ্গর বাড়ি৷ পথে সিরাজুল মণ্ডলের বাড়িটা পড়ল৷ অনেকগুলো আলো জ্বলছে৷ লোকজনের কথা ভেসে আসছে৷ আদিত্য বলল, ‘চল একবার দেখা করে আসি৷’
সিরাজুল বাগানেই রয়েছে৷ দুজনের সঙ্গে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলছে৷ আদিত্যদের দেখে এগিয়ে এল৷
‘কেমন আছেন?’ সিরাজুলের মুখে বিষণ্ণতা রয়েছে৷
‘তুমি কেমন আছ? তোমার বাড়িতে তো দেখছি অনেক লোক এসেছেন৷’
‘হ্যাঁ৷ বাড়ি ভর্তি লোক৷ কাল সরকারের সঙ্গে বড় আলু ব্যবসায়ীদের মিটিং আছে৷ আমাদের অঞ্চলের যত বড় ব্যবসায়ী আছে সবাই এসেছে৷ এখানে রাত্তিরে থাকবে৷ তারপর কাল মিটিং করে ফিরে যাবে৷ এত লোক আমার ভাল লাগে না৷ জোর করে কথা বলতে হয়৷’
‘তোমার বাবা আসেননি?’
‘আসবেন৷ একটু রাত্তিরের দিকে৷ আরও দু’একজন রাত্তিরে আসবে৷’
‘আলিনার সঙ্গে কথা হয়?’ আদিত্য মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করল৷
‘আলিনা পাগল হয়ে গেছে৷ বলছে, আমিই নাকি অমিতকে খুন করেছি৷’ সিরাজুলকে উদভ্রান্ত, অসহায় দেখাল৷
‘সময়, একমাত্র সময়ই পারে সব ক্ষতের ওপর প্রলেপ লাগাতে৷ আজ এগোই, পরে আবার দেখা হবে৷’
গৌরাঙ্গ সাঁতরার বাড়ির রাস্তাটা অন্ধকার৷ ‘তোমাদের রাস্তায় আলো নেই কেন গো?’ আদিত্য জিজ্ঞেস করল৷
‘আলোগুলো কিছুদিন হল খারাপ হয়ে গেছে৷ আর সারাচ্ছে না৷ আসলে এই রাস্তাটা নতুন৷ এখনও খুব বেশি বাড়ি হয়নি৷ বেশি লোক থাকে না বলে মিউনিসিপ্যালিটিরও আলো সারাবার ইচ্ছে নেই৷’ গৌরাঙ্গ পকেট থেকে মোবাইল বার করে টর্চ জ্বালাল৷ আকাশে কিছুটা চাঁদের আলো আছে, কিন্তু চাবির ফুটোটা দেখার পক্ষে সেটা যথেষ্ট নয়৷
‘আমার নির্জনতা ভাল লাগে, তাই এখানে বাড়ি ভাড়া করেছি৷ বাড়িওলা এখানে থাকে না, সেটাও একটা সুবিধে৷’ গৌরাঙ্গ চাবি ঘুরিয়ে সদর দরজা খুলল৷
আদিত্য ঘরে ঢুকে জানলার ধারে একটা চেয়ারে বসল৷ বাইরের অন্ধকারটা চোখ-সওয়া হয়ে এলে বোঝা যায় বাড়ির উল্টোদিকে অনেকটা ফাঁকা জমি পড়ে আছে৷ দূরের কয়েকটা জমিতে বাড়ির ভিত বসেছে, তবে কাঠামো-তৈরি এখনও বাকি৷ পাড়াটা সত্যিই নির্জন৷
‘এত লোকের সঙ্গে কথা বলে আপনি কী সিদ্ধান্তে এলেন? মাসুদই খুনটা করিয়েছে? নাকি অন্য কিছু ঘটেছে?’ গৌরাঙ্গ দু’কাপ চা নিয়ে এসেছে৷ সঙ্গে দু’প্লেট চিঁড়ে ভাজা৷ ‘এই চিঁড়েভাজাগুলো আজকাল প্যাকেটেই পাওয়া যায়৷ তেল নেই৷ বেশ ভাল৷’ গৌরাঙ্গ চা-চিঁড়ে ভাজার ট্রে-টা টেবিলে রাখল৷
‘মাসুদই হয়তো খুনটা করিয়েছে৷ কিন্তু আমার এখনও দু’একটা খটকা আছে৷ তাই নিশ্চিত হয়ে কিছু বলতে পারছি না৷’ কথাগুলো বলতে বলতে আদিত্য চোখের কোনা দিয়ে দেখল অন্ধকারের মধ্যে একটা সাদা এস ইউ ভি গৌরাঙ্গর বাড়ির সামনে এসে দাঁড়িয়েছে৷ হেডলাইট নেভানো৷ জানলার কালো কাচগুলো তোলা৷ ভেতরটা দেখা যায় না৷ এই রাস্তায় হঠাৎ গাড়ি এল কেন? এখানে তো কেউ থাকে না৷ কেন গাড়ির হেডলাইট জ্বলছে না? আদিত্য বিপদের গন্ধ পাচ্ছে৷
‘তোমার সারভিস রিভলভারটা কোথায়?’ আদিত্য চাপা গলায় বলল৷
‘কেন? ওই তো৷ হোলস্টার সুদ্ধু টেবিলের ওপর রয়েছে৷’ গৌরাঙ্গ বেশ অবাক হয়েছে৷
‘ওটা সঙ্গে রাখ৷ আর মাটিতে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়৷’
কথাগুলো শেষ হতে না হতে আদিত্য লক্ষ করল গাড়ির কালো কাচ কয়েক ইঞ্চি নেমে গিয়ে একটা কালাশনিকভের নল বেরিয়ে পড়েছে৷ তার পরের কয়েক মিনিট ফোয়ারার মতো গুলি ছুটে এল৷ আদিত্য এবং গৌরাঙ্গ উপুড় হয়ে মাটির সঙ্গে মিশে আছে৷
গুলিতে ঘরের ইলেকট্রিক বালবগুলো চুরমার হয়ে গেছে, ঘরটা সম্পূর্ণ অন্ধকার৷ আদিত্য ফিসফিস করে বলল, ‘বুকে হেঁটে গিয়ে রিভলভারটা নিয়ে এস৷ ওটা লোডেড তো?’
গৌরাঙ্গ ইঞ্চি কয়েক এগোতে না এগোতেই আবার গাড়ি থেকে গুলিবর্ষণ গুরু হল৷ যখন থামল তখন গৌরাঙ্গর ঘরটা একটা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে৷ গৌরাঙ্গ এতক্ষণে রিভলভারটা হাতে পেয়েছে, এক বাক্স কার্তুজও৷
‘বুকে হেঁটে বাথরুমের দিকে চলুন আদিত্যদা৷ বাথরুমটাই সব থেকে সেফ জায়গা৷’ গৌরাঙ্গ হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে বলল৷
বাথরুম পৌঁছতে প্রায় মিনিট পাঁচেক লেগে গেল৷ চারদিকে ভাঙা কাঁচ ছড়িয়ে আছে৷ অন্ধকারে কিছু দেখাও যায় না৷ উপুড় হয়ে হাতে ভর দিয়ে এগোতে গিয়ে দুজনেরই হাত ভাঙা কাঁচের টুকরোতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেছে৷ আদিত্য টের পেল তার কবজি দিয়েও অনর্গল রক্ত পড়ছে৷ হয়তো কোনও শিরা কেটে গেছে৷
দুজনে হামাগুড়ি দিয়ে বাথরুমে ঢোকার পর গৌরাঙ্গ বাথরুমের দরজাটা বন্ধ করে দিল৷ বাথরুমের জানলা দিয়ে দেখা যাচ্ছে সাদা গাড়িটা একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে৷ জানলার কালো কাচ তোলা৷
‘গাড়িটাতে ফায়ার করব? আমার কাছে দশ রাউন্ড অ্যামিউনিশন আছে৷’
‘না, কোরো না৷ করে কোনও লাভ হবে না৷ আমি শিয়োর গাড়িটা বুলেট প্রুফ৷ যতক্ষণ না কেউ গাড়ি থেকে নামছে আমাদের দিক থেকে ফায়ার করে লাভ নেই৷ তবে আমার ধারণা ওরা যতক্ষণ না নিশ্চিত হচ্ছে আমরা দুজনেই মরে গেছি বা একেবারে মরোমরো হয়ে গেছি ততক্ষণ ওরা গাড়ি থেকে নামবে না৷ কারণ ওরা জানে আমাদের কাছে ফায়ার আর্মস আছে৷ এবং গাড়ি থেকে নামলেই ওরা এক্সপোজড হয়ে যাবে৷’
অন্ধকারের মধ্যে গৌরাঙ্গর মোবাইলটা বাজছে৷ বাথরুমের বাইরে, ঘরের মধ্যে কোথাও একটা৷
‘তোমার মোবাইলটা কোথায়?’
‘ওই ঘরে কোথাও আছে৷ আনার চেষ্টা করব?’
‘না, না৷ একদম নয়৷ কোনও দরকার নেই৷’
আদিত্যর কথা শেষ হতে না হতে গাড়ির কাচ আবার নীচে নেমে গেছে৷ জানলা দিয়ে একটা হাত বেরিয়ে এসে গৌরাঙ্গর বাড়ির দিকে কী একটা ছুঁড়ে দিল৷ শার্সি ভাঙা জানলা দিয়ে জিনিসটা কয়েকটা ড্রপ খেয়ে ঘরের ভেতর এসে পড়েছে৷ আর তার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে কান ফাটানো আওয়াজে সারা বাড়ি কেঁপে উঠল৷ হ্যান্ড গ্রেনেড!
ঘর এবং রান্নাঘর একেবারে তছনছ হয়ে গেলেও বাথরুমটা মোটামুটি অক্ষতই আছে৷ বিশেষ করে বাথরুমের দরজাটা বন্ধ ছিল বলে কোনও স্প্রিন্টার বা বোমার টুকরো ঢুকতে পারেনি৷
‘বাথরুমে ঢুকলাম বলে বেঁচে গেলাম আদিত্যদা৷ ঘরে থাকলে আমরা কেউই বাঁচতাম না৷ কী বলে যে ভগবানকে ধন্যবাদ দেব জানি না৷’
‘আরে দাঁড়াও, দাঁড়াও৷ এখনও ধন্যবাদ দেবার সময় আসেনি৷ বিপদ এখনও কাটেনি মোটেই৷ সাদা গাড়িটা তো এখনও দাঁড়িয়েই রয়েছে৷’
‘আমরা তাহলে এখন কী করব?’
‘বাথরুমে বসে বসে ধৈর্যের পরীক্ষা দেব আর সাদা গাড়ির ওপর নজর রাখব৷ ওরাও সম্ভবত ধৈর্যের পরীক্ষা দিয়ে গাড়ির ভেতরে অপেক্ষা করবে৷ যদি আমরা এর মধ্যে বেরোবার চেষ্টা করি আমাদের গুলিতে ঝাঁজরা করে দেবে৷ তারপর হয়তো এক সময় ওরা গাড়ি থেকে বেরিয়ে বাড়িতে ঢুকে দেখতে চাইবে আমরা মরেছি কিনা৷ যতক্ষণ না ওরা গাড়ি থেকে নামছে, আমরা ততক্ষণ অপেক্ষা করব৷ আর গাড়ি থেকে নামলেই গুলি চালাব৷ তুমি রিভলভার নিয়ে রেডি থাক৷’
ঘরের ভেতরে কুপকুপে অন্ধকার৷ শুক্লপক্ষের চাঁদ এতক্ষণে মধ্যগগনে উঠেছে৷ চাঁদের আলোয় বাইরেটা আংশিক আলোকিত৷ বাড়ির উল্টোদিকের মাঠে ঝিঁঝিঁ ডাকছে৷ আরও দূরে শেয়াল ডাকছে৷ এছাড়া আর কোনও শব্দ নেই৷ বাথরুমের ভেতর মশাদের প্রবল উপদ্রব৷ কিন্তু তাদের মারার উপায় নেই৷ মশা মারার শব্দ গাড়ি অবধি পৌঁছে যেতে পারে৷
এবার আদিত্যর মোবাইলটা বাজছে৷ ভাগ্যিস আদিত্য ওটা টেবিলের ওপর রেখে এসেছে৷ বাথরুমে মোবাইল বাজলে গাড়ির লোকগুলো টের পেয়ে যেত ওরা বাথরুমে লুকিয়ে আছে৷ মোবাইলটা থেমে গিয়ে আবার বাজছে৷ তিনবার এইভাবে বাজল৷ নিশ্চয় কেয়া ফোন করছে৷ জানতে চাইছে আদিত্য এখন কোথায়৷ এক-একটা মুহূর্ত মনে হচ্ছে এক-এক ঘণ্টা৷
‘বসে বসে ঘুম পেয়ে যাচ্ছে আদিত্যদা৷’ গৌরাঙ্গ হালকা হাই তুলল৷
‘গায়ে চিমটি কেটে জেগে থাক৷ আর রিভলভারটা তৈরি রাখ৷ মনে রাখবে, যতক্ষণ গাড়িটা ওখানে দাঁড়িয়ে থাকছে ততক্ষণ আমাদের অপেক্ষা করতে হবে৷ বেরোবার চেষ্টা করলে অবধারিত মৃত্যু৷’
মিনিট পাঁচেক এইভাবে কেটে গেল৷ এর মধ্যে আদিত্যর মোবাইলটা আরও কয়েকবার বেজে বেজে থেমে গেছে৷ আদিত্য ভাবছিল হামাগুড়ি দিয়ে ঘরে ঢুকে মোবাইলটা নিয়ে আসবে কিনা৷ সাহস পেল না৷ হয়তো জানলাটা পুরো উড়ে গেছে, ফলে গাড়িতে বসে ঘরের ভেতরটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে৷ আদিত্য মোবাইল নিতে গেলে হয়তো ওরা দেখে ফেলবে৷
আদিত্য যেরকম ভেবেছিল সেরকম কিন্তু ঠিক হল না৷ মিনিট পাঁচেক পরে গাড়িটা থেকে স্টার্ট নেবার শব্দ শোনা গেল৷ ইউ টার্ন করে গাড়িটা বড় রাস্তার দিকে চলে গেল৷ কেউ বাড়ির ভেতর ঢোকার চেষ্টা করল না৷
গৌরাঙ্গ উঠে দাঁড়াল৷ আস্তে আস্তে বাথরুম থেকে বেরিয়ে পড়ল৷ আদিত্য তার পেছন পেছন৷ আদিত্য বলল, ‘এক্ষুনি বাড়ি থেকে বেরিও না৷ একটু অপেক্ষা কর৷ গাড়িটা হয়তো গলির মোড়ে দাঁড়িয়ে এই বাড়ির ওপর নজর রাখছে৷ তোমার বাইকটা কোথায়?’
‘মেন এন্ট্রান্সের পাশে একটা ছোট গলির মতো আছে৷ সেইখানে বাইকটা থাকে৷ এইসব গোলাগুলির পরে জানি না বাইকটা কী অবস্থায় আছে৷’
‘আচ্ছা, বড়রাস্তা দিয়ে না বেরিয়ে অন্য কোনও রাস্তা দিয়ে বেরোনো যায়?’
‘না৷ বড়রাস্তা দিয়ে বেরোনো ছাড়া আর কোনও উপায় নেই৷’
‘তা হলে ঝুঁকি নিয়ে লাভ নেই৷ আমি গৌতমকে ফোন করে পুলিশ এসকর্ট আনিয়ে নিচ্ছি৷ যতক্ষণ না পুলিশ আসছে, আমরা এখানেই থাকি৷’
সাদা গাড়িটা নিশ্চয় আগেই চলে গিয়েছিল, কারণ ঘণ্টাখানেক পরে যখন আদিত্যরা পুলিশের গাড়িতে উঠে রাস্তায় বেরোল তখন সেটা ত্রিসীমানায় ছিল না৷
‘এখানে আগে একটা খাল ছিল৷ আগে মানে অনেক দিন আগে৷ ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকেও ছিল খালটা৷ তবে প্রায় শুকিয়ে এসেছিল৷ সাহেব গেজেটিয়ারদের লেখায় খালটার উল্লেখ আছে৷ খাল না বলে শাখানদীও বলা যায়৷ সাহেবরা বলত ক্রিক৷ ক্রিকটা ছিল পিয়ালির শাখানদী৷ শাখানদীর নামটাও সুন্দর৷ গুণবতী৷ এই বিলটা থেকে শুরু করে গুণবতী পিয়ালি নদী অবধি বয়ে যেত৷ বয়ে গিয়ে পিয়ালির শরীরে নিজের শরীর মিশিয়ে দিত৷ ধীরে ধীরে পিয়ালি তার গতিপথ পাল্টাল৷ যেন মুখ ঘুরিয়ে নিল গুণবতীর থেকে৷ আর গুণবতীও একটু একটু করে শুকিয়ে যেতে লাগল৷ আমার ঠাকুর্দার কাছে গুণবতী নদীর গল্প শুনতাম৷ ঠাকুর্দা বলত গুণবতী শুকিয়ে যাবার পর বেশ কিছুদিন মজা নদী থেকে বালি তোলা হতো৷ বস্তা বস্তা বালি গোরুর গাড়ি করে জয়নগর, মজিলপুর, বারুইপুরের দিকে চলে যেত৷ শেষে আর বালিও রইল না৷ শুধু মাটি আর কাদা৷ তারপর কাদাও শুকিয়ে গেল৷ শুকনো মাটির ওপর বসতি হল৷ এখন সেই বসতি ভেঙে হাইরাইজ উঠছে৷’ বৃদ্ধের গলায় কিছুটা হাহাকার ছিল৷
‘এই বিলটা তো শুকিয়ে যায়নি৷’ আদিত্য চায়ের ভাঁড়ে চুমুক লাগাল৷
‘শুকোয়নি, তবে জায়গায় জায়গায় জল খুব কমে গেছে৷ দেখবেন কোথাও কোথাও চড়াও পড়ে গেছে৷ আগে ডিঙি করে জেলেরা মাছ ধরত৷ এখন বড় মাছ তেমন নেই৷ তাই জেলেরাও আসে না৷ তাদের মজুরি পোষায় না৷ ভালোই হয়েছে৷ তারা এলে পাখিরা ভয় পেয়ে পালাত৷ কিছু চুনো মাছ আছে৷ তার লোভে পাখিরা আসে৷ মাছরাঙা, বক৷ শীতকালে পরিযায়ী সাইবেরিয়ান হাঁস৷’
বৃদ্ধ মানুষটার সঙ্গে কথা বলতে আদিত্যর ভাল লাগছে৷ সে সকাল সকাল ভবতোষের খোঁজে এসেছিল৷ একাই এসেছিল৷ গৌরাঙ্গ তার বাড়িটাকে আবার বাসযোগ্য করে তোলার চেষ্টায় মিস্তিরিদের খোঁজে গেছে৷ আদিত্য জানত না, ভবতোষের আজ অফ ডে৷ জানলে এদিকে আসত না৷ কিন্তু এখন মনে হচ্ছে সকাল সকাল এসে লাভ হয়েছে৷ তার কোনও ধারণাই ছিল না ডাকুর বিলে এত রকমের পাখি আসে৷ বিলের সামনে খাপরার ছাউনি দেওয়া চায়ের দোকান৷ দোকানের বাইরের বেঞ্চিতে বসে চমৎকার পাখি দেখা যায়৷ বেঞ্চিতে বসে চা খেতে খেতে বৃদ্ধের সঙ্গে আলাপ৷ বৃদ্ধ মানুষটি নিজের নাম বললেন ললিতমোহন ভট্টাচার্য৷ যে সাততলা বাড়িটায় ভবতোষ ডিউটি করে সেই বাড়িটার দোতলার একটা ফ্ল্যাটে ভদ্রলোক থাকেন৷ আসলে ললিতমোহনের পৈত্রিক বসতবাড়ি ভেঙেই সাততলা বাড়িটা উঠেছে৷ সেটা বিক্রি করার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে ললিতমোহনের ছিল না৷ কিন্তু বসতবাড়ি বিক্রি করার ব্যাপারে ছেলেদের চাপ ছিল৷ যতদিন স্ত্রী বেঁচেছিলেন ততদিন সব চাপ সহ্য করে ললিতমোহন ভিটে কামড়ে পড়েছিলেন৷ স্ত্রী মারা যাবার পর তাঁর মনের ইচ্ছে-অনিচ্ছেগুলো চলে গেল৷ তার সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত প্রতিরোধ৷ এখন প্রোমোটারের দেওয়া সাততলার একটা ছোট্ট ফ্ল্যাটে একাই থাকেন৷ ছেলেরা তাদের ভাগের টাকা নিয়ে চলে গেছে৷ কালেভদ্রে আসে৷
আদিত্য ভাবছিল বুড়ো মানুষটা কি তাকে বেশি পছন্দ করে ফেলেছে? না হলে প্রথম আলাপেই এত কথা বলছে কেন? আদিত্য মিথ্যে করে বলেছিল সে পাখি দেখতে ডাকুর বিলে এসেছে৷ হয়তো সে কারণেই আদিত্যকে বুড়োর মনে ধরেছে৷ কিংবা হয়তো বুড়ো কথা বলার লোক পায় না, তাই কাউকে পেয়ে গেলে সহজে ছাড়তে চায় না৷ আদিত্যর মন বলছে দ্বিতীয়টা হবার সম্ভাবনা ক্ষীণ৷ ললিতমোহন মানুষটাকে বেশ অভিজাত মনে হচ্ছে৷ যার তার সঙ্গে কথা বলার লোক নন৷
‘ডাকুর বিল নামটা কোথা থেকে এল? এই অঞ্চলে ডাকাতের উপদ্রব ছিল?’ আদিত্য জিজ্ঞেস করল৷
‘তা তো ছিলই৷ সারা বাংলাতেই তো ছিল৷ ঠগী, ঠ্যাঙাড়ে, রঘু ডাকাত, বিশু ডাকাত, মনোহর ডাকাত, আরও কত কী৷ তা এ তল্লাটে ছিল গোবিন্দ ডাকাত৷ অঞ্চলের ত্রাস৷ পিয়ালি নদী থেকে গুণবতী বেয়ে যেসব নৌকো যাত্রী নিয়ে, মালপত্তর নিয়ে এদিকে আসত গোবিন্দ ডাকাত সেইসব নৌকোয় লুটতরাজ চালাত৷ ঠাকুর্দার কাছে শুনেছি ভীষণ নিষ্ঠুর ছিল গোবিন্দ ডাকাত৷ ডাকাতি করার সময় নৌকোর মাঝিমাল্লা সমেত সমস্ত যাত্রীকে নির্বিচারে মেরে ফেলত, যাতে কেউ তাকে পরে চিনতে না পারে৷ দিনের বেলায় সে নিরীহ মানুষ সেজে সবার সামনে ঘুরে বেড়াত৷ কেউ তাকে চিনতে পারত না৷ গোবিন্দ ছিল যেমন নিষ্ঠুর তেমনি সেয়ানা৷ মাঝিমাল্লা আর যাত্রীদের মৃতদেহগুলো সে কখনও গুণবতীর জলে ফেলতে দিত না৷ পাছে গুণবতী মজে যায়৷ গুণবতী মজে গেলে যে তার ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে৷ তাই লাশগুলো নিয়ে এসে বিলের জলে ফেলা হত৷ সেই থেকে নাম ডাকুর বিল৷ অনেক চেষ্টার পর ম্যাকডারমট বলে কলকাতার এক ডাকসাইটে আইরিশ পুলিশ কর্তা গোবিন্দকে ধরে ফেলে৷ গোবিন্দর ফাঁসি হল৷ গুণবতী নিরাপদ হল৷ শোনা যায়, এলাকাটা শান্ত হয়ে যাবার পরেও অনেক দিন অবধি ডুবসাঁতার দিয়ে ডাকুর বিলের তলা অবধি পৌঁছলে সুঁদুরি গাছের গোড়া আর নরকঙ্কাল দেখতে পাওয়া যেত৷ সুঁদুরি গাছের গোড়া থেকে বোঝা যায় জায়গাটা এক সময় সুন্দরবনের অংশ ছিল৷’
আদিত্য মুগ্ধ হয়ে শুনছিল, দেখছিল৷ বহুদূর অবধি ঈষৎ ঘোলাটে জলের বিস্তার৷ চড়ায় এক পায়ে দাঁড়িয়ে মাছের তপস্যা করছে বক৷ আশেপাশে কয়েকটা সারস৷ একটা নীল-সাদা মাছরাঙা জল থেকে শিকার তুলে নিয়ে গাছের ডালে গিয়ে বসল৷ চড়ার বারো আনা পরিযায়ী হাঁসেরা দখল করে রেখেছে৷ বাতাসে হালকা আঁসটে গন্ধ৷ কলকাতার এত কাছে যে এত সুন্দর একটা জায়গা আছে ঘটনাচক্রে এখানে এসে না পড়লে আদিত্যর জানাই হত না৷
‘সময় কাটে কী করে আপনার?’ আদিত্য হালকা গলায় জিজ্ঞেস করল৷
‘সময় কাটানোটা একটা সমস্যা বটে৷ কলেজে দর্শন পড়াতাম৷ রিটায়ার করেছি তাও প্রায় বছর কুড়ি হতে চলল৷ টিভি দেখতে কোনও কালেই ভাল লাগত না৷ গিন্নি চলে যাবার পর বই পড়ে সময় কাটানোর চেষ্টা করতাম৷ আস্তে আস্তে চোখটা খারাপ হয়ে গেল৷ আর বই পড়তে পারি না৷ এখন রেডিও শুনি৷ গান, নাটক, খবর, কৃষক ভাইদের জন্য বার্তা যা পাই তাই শুনি৷ মাঝে মাঝে রেডিও শুনতেও ভাল লাগে না৷ তখন এই চায়ের দোকানে এসে বসি৷ রাস্তার মানুষজন দেখি৷ আর কিছু দেখার না থাকলে ডাকুর বিলটার দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে সময় কেটে যায়৷’
‘চমৎকার৷’ আদিত্যর মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল৷
‘না, না৷ চমৎকার মোটেই নয়৷ সারাদিন নিজের সঙ্গে থাকা৷ নিজেকে সারাদিন সহ্য করা৷ সহজ কাজ নাকি? তবে এখন অভ্যেস হয়ে গেছে৷ এমনকি মাঝে মাঝে বেশ ভালই লাগে৷ আবার মাঝে মাঝে অন্য কারও সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করে৷ কিন্তু তেমন লোক পাচ্ছি কোথায়?’
‘আপনার পড়শি কেউ নেই যার সঙ্গে কথা বলতে পারেন?’
‘এমনিতেই পড়শি খুব কম৷ এই বাড়ির ফ্ল্যাটগুলো বেশিরভাগই এনআরআইদের কেনা৷ তাদের কেউ এখানে থাকে না৷ অনেক ফ্ল্যাট ফাঁকা পড়ে আছে৷ কেউ কেউ ভাড়া দিয়েছে৷ যারা ভাড়া নিয়েছে তারা অল্প-বয়সী৷ সকাল সকাল কাজে বেরিয়ে যায়৷ ফেরে রাত্তির করে৷ শুক্র-শনিবার তাদের বাড়িগুলোয় পার্টি হয়৷ প্রবল জোরে জগঝম্প বাজে৷ শব্দে ঘুমোতে পারি না৷ প্রতিবাদ করেও লাভ নেই৷ কেউ শুনবে না৷ আমি এদের মুখের বা শরীরের কোনও ভাষাই বুঝি না৷ কার সঙ্গে কথা বলব?’
‘কিন্তু বিপদ-আপদ অসুখবিসুখ তো আছে? হঠাৎ শরীর খারাপ হলে মানুষকে তো পড়শিদের ওপরেই ভরসা করতে হয়৷’
‘আমার পাশের ফ্ল্যাটে দুটো মেয়ে থাকে৷ কিছুদিন আগে এসেছে৷ সাততলার বাকি ফ্ল্যাটগুলো ফাঁকা পড়ে আছে৷ মেয়ে দুটোর সঙ্গে আলাপ করতে গেলাম৷ ভারি অদ্ভুত৷ ভাল করে কথাই বলল না৷ ফ্ল্যাটের ভেতরেও আসতে বলল না৷ সদর দরজা থেকেই ফিরিয়ে দিল৷ আমি যেন চোর-ডাকাত, খুনি৷ এসব পড়শির ওপর ভরসা করা যায়?’
‘আপনাকে চোর-ডাকাত ভাবল? সত্যিই অদ্ভুত৷’
‘মনে হয় মেয়ে দুটো খুব ভিতু৷ আগে কাছেই অন্য একটা ফ্ল্যাটবাড়িতে থাকত৷ সেই ফ্ল্যাটবাড়িটার পেছন দিকে একটা খুন হয়৷ তাতেই মেয়ে দু’টো ভয় পেয়ে ওই বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে এই বাড়িতে চলে এসেছে৷ আমাদের সিকিউরিটি তাই বলল৷ বলল, গ্রাম থেকে এসেছে৷ একা একা থাকে৷ বাড়িতে কোনও পুরুষ মানুষ নেই৷ তাই একটুতেই ভয় পেয়ে যায়৷’
‘রাস্তায় ঘাটে মেয়ে দুটোর সঙ্গে দেখা হয় না?’ আদিত্য ঈষৎ উত্তেজিত৷
‘হয়৷ এখানে একটা, ওই কী যেন বলে, সুপার মার্কেট হয়েছে৷ শনিবার সন্ধেবেলা আমি আমার পরিচারককে নিয়ে সেখানে সারা সপ্তাহের বাজার করতে যাই৷ সেখানে মাঝে মাঝে মেয়ে দুটোর সঙ্গে দেখা হয়ে যায়৷ কিন্তু দেখা হলে কী হবে? ওরা তো আমাকে চিনতেই চায় না৷ তবে ওরা যে পরিমাণ জিনিস কেনে সেটা দেখলে তাক লেগে যায়৷ দুটো মানুষ, তার ওপর পুরুষ নয় মহিলা, কী করে যে অত খেতে পারে বুঝতে পারি না৷ গ্রামের লোকেরা শহরের মানুষদের তুলনায় বেশি খায় শুনেছি, কিন্তু তা বলে অত বেশি?’
‘বুঝলাম আপনার পড়শিদের ওপর আপনি ভরসা করতে পারেন না৷ তা হলে শরীর খারাপ হলে কী করেন?’
‘খুব সহজ৷ আজকাল অনেক কেয়ার গিভার কোম্পানি হয়েছে৷ তাদের একটার সঙ্গে বন্দোবস্ত করেছি৷ তারা লোক পাঠিয়েছে৷ যাকে পাঠিয়েছে সে আমার সারাক্ষণের সঙ্গী৷ খবর কাগজ পড়ে দেয়৷ আমার সঙ্গে বাজার-দোকানে যায়৷ চা করে দেয়৷ আমাকে ডিনার খাইয়ে রাত্তির রাত সাড়ে আটটা ন’টায় বাড়ি ফেরে৷ আবার পরের দিন আটটার মধ্যে চলে আসে৷ টাকাটা একটু বেশি নেয় বটে কিন্তু ওর কাজে আমি সন্তুষ্ট৷’
রোদ্দুরের তেজ বাড়ছে৷ আদিত্য ঘড়ির দিকে তাকাল৷ দশটা বেজে গেছে৷ ভবতোষের সঙ্গে যখন দেখা হল না, তখন অন্য যে দু’একটা কাজ বাকি আছে সেগুলো করে ফেলা যেতে পারে৷
আদিত্য উঠে দাঁড়াল৷ নমস্কারের ভঙ্গিতে দুই হাত জড়ো করে বলল, ‘আপনার সঙ্গে কথা বলে যে কী ভাল লাগল কী বলব৷ অনেক শিখলাম৷ অনেক জানলাম৷ আবার কখনও হয়তো এদিকে পাখি দেখতে আসব৷ তখন নিশ্চয় দেখা করব৷ বাড়িটা তো জেনেই নিলাম৷ আজ আসি৷’
কবি সুভাষ স্টেশন থেকে মেট্রো ধরেছিল আদিত্য৷ স্টেশনগুলোর এমন সব নাম দিয়েছে— কবি সুভাষ, শহিদ ক্ষুদিরাম, কবি নজরুল, গীতাঞ্জলি, মাস্টারদা সূর্য সেন, নেতাজী— স্টেশনের নাম থেকে জায়গার নাম বোঝা অসম্ভব৷ নিত্যযাত্রীরা নিশ্চয় জানে, কিন্তু আদিত্যর এদিকটায় খুব বেশি আসা হয় না, তাই সে বুঝতে পারছিল না ট্রেনটা কতদূর পৌঁছল৷ মহানায়ক উত্তমকুমার নামক স্টেশনে পৌঁছে মনে হল এটা টালিগঞ্জ না হয়ে যায় না৷ অনেক লোক উঠল সেখান থেকে৷ কামরায় তিল ধারণের জায়গা নেই৷ আদিত্য অবশ্য বসার জায়গা পেয়েছে৷ কিন্তু ভিড় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনজনের সিটে চারজন গাদাগাদি করে বসতে হয়েছে৷
কালীঘাট স্টেশন থেকে ট্রেনটা বেরোবার মুখে আদিত্যর মোবাইলটা বেজে উঠল৷ গৌতম ফোন করছে৷ ধরতে ধরতে কেটে গেল ফোনটা৷ মেট্রোর টানেলে সিগনাল পাওয়া যায় না, একমাত্র স্টেশনগুলোতে যায়৷ কিন্তু স্টেশনে কতটুকু সময় থাকছে ট্রেনটা? আদিত্য একটা ম্যাসেজ করল— মেট্রোতে৷ সেন্ট্রাল-এ নেমে ফোন করছি৷ যতীন দাস পার্ক স্টেশনে পৌঁছে ম্যাসেজটা চলে গেল৷ রবীন্দ্র সদন পৌঁছে আদিত্য দেখল গৌতম লিখেছে— ওকে৷
ময়দান থেকে কামরা ফাঁকা হতে শুরু করেছে৷ সেন্ট্রাল পৌঁছে একেবারে ফাঁকা৷ আদিত্য আপিস যাবে৷ কিন্তু তার আগে গৌতমকে একটা ফোন করা দরকার৷ ওপরে উঠে গৌতমের নম্বরটা লাগাল৷ যাত্রীদের আসা-যাওয়া এড়িয়ে সে একপাশে দাঁড়িয়েছে৷
‘বল৷’ ওদিক থেকে সাড়া পাওয়ার পর আদিত্য বলল৷
‘টেলিফোনে কিছু বলব না৷ তুই আমার অফিসে চলে আয়৷’
‘এখনই আসব?’
‘খুব জরুরি কাজ না থাকলে এখনই চলে আয়৷ লাঞ্চ খাবি তো?’
‘ঠিক আছে, আসছি৷ অবশ্যই লাঞ্চ খাব৷ প্রায় কিছু না খেয়ে সেই সকালে বেরিয়েছি৷ বেশ খিদে পেয়ে গেছে৷’
আদিত্য যখন লালবাজারে পৌঁছল তখন প্রায় বারোটা বাজে৷ গৌতমের খাস বেয়ারা আদিত্যকে চেনে৷ বলল, সাহেব কমিশনর সাহেবের ঘরে গেছেন৷ আপনাকে বসতে বলেছেন৷ আদিত্য গৌতমের ঘরে ঢুকে সোফায় বসল৷ লালবাজারে এসে গৌতমের সঙ্গে দেখা করার এটাই অসুবিধে৷ সব সময় এত ব্যস্ত থাকে৷ আদিত্য পকেট থেকে ফোন বার করে বিমলের নম্বরটা লাগাল৷ বিমলকে দিয়ে একটা কাজ করাতে হবে৷
‘কেমন আছেন স্যার?’ ওদিক থেকে বিমলের গলা৷
‘আমি তো ভালই আছি৷’
‘আর ম্যাডাম?’
‘ম্যাডামও ভাল আছে৷ তোমরা কেমন আছ?’
‘আমরা খুব একটা ভাল নেই স্যার৷ মাঝে আমার চাকরিটা যেতে বসেছিল৷ যে বাড়িটায় আমি সিকিউরিটি গার্ডের চাকরি করি সেখানে একটা চুরি হয়ে গেছে৷ দুপুরে চুরিটা হয়েছে৷ আমি তখন ডিউটিতেই ছিলাম না৷ আমার তো নাইট ডিউটি৷ যে ডিউটিতে ছিল তার তো চাকরিটা গেল, আমার চাকরি নিয়েও টানাটানি৷ বলছে, আমি নাকি চোরেদের খবর দিয়েছি৷ এরকম একটা অদ্ভুত কথা বললে উত্তরে কী বলা যায়? কী করে প্রমাণ করব আমি চোরেদের খবর দিইনি? অনেক কাকুতি মিনতি করে চাকরিটা বাঁচানো গেছে৷ আমাদের সিকিউরিটি কোম্পানির কর্তা আমার হয়ে খুব বলেছে৷ তাই হয়তো চাকরিটা বেঁচে গেল৷’
‘চাকরি তো যায়নি৷ তা হলে তো এখন ভালই আছ৷’
‘ভাল থাকার উপায় আছে স্যার? এক মাস ধরে গিন্নির শরীর খারাপ৷ রান্নাবান্না, বাড়ির অন্য কাজ কিচ্ছু করতে পারে না৷ সারাদিন শুয়ে থাকে৷’
‘ডাক্তার দেখিয়েছ?’
‘নীলরতনের আউটডোরে দেখিয়েছি স্যার৷ মেয়েলি অসুখ৷ বলছে অপারেশন করতে হবে৷ ওরা যখন ডেট দেবে তখন অপারেশন হবে৷ এখনও ডেট দেয়নি৷ সামনের সোমবার খোঁজ নিতে বলেছে৷’
গৌতম ঘরে ঢুকেছে৷ ‘কীরে, কতক্ষণ বসে আছিস?’ টেবিলের ওপর রাখা একটা ফাইলের দিকে তাকিয়ে গৌতম বলল৷
‘ফোনটা দু’মিনিটে সেরে নিয়ে তোর সঙ্গে কথা বলছি৷’ আদিত্য মোবাইল থেকে মুখ সরিয়ে নিয়ে বলল৷ তারপর মোবাইলে মুখ লাগিয়ে বলল, ‘শোনো, তোমাকে আমার একটা কাজ করে দিতে হবে৷ একটা ঠিকানা দিচ্ছি৷ লিখে নাও৷ হাতের কাছে কাগজ পেন আছে?’
‘লিখতে হবে না স্যার৷ আপনি বলুন৷ আমি ঠিকানা চট করে ভুলি না৷’
আদিত্য বিমলকে যখন বুঝিয়ে দিচ্ছে কী করতে হবে তার মধ্যে গৌতমের বেয়ারা জিজ্ঞেস করতে ঘরে ঢুকেছে লাঞ্চের জন্যে কী আনতে হবে৷
‘আমি দুটো কথা বলার জন্যে তোকে আসতে বললাম৷ খুব কনফিডেন্সিয়াল কথা৷ ফোনে বলা যাবে না৷’ কথাগুলো বলে গৌতম ইডলির একটা খণ্ড চাটনিতে ডুবিয়ে মুখে পুরল৷
‘এই ইডলিগুলো কিন্তু দারুণ৷ ধোসাটা এখনও খাইনি৷ মনে হচ্ছে ভালই হবে৷ এটা কি নতুন কোনও দোকান?’ আদিত্যর মন খাবারে৷
‘নতুন দোকান৷ রাধাবাজার-চিৎপুরের মোড়ে মাস দুয়েক হল হয়েছে৷ আগে খেয়ে নিই৷ তারপর তোকে দরকারি কথাগুলো বলছি৷’
খাওয়া শেষ হবার পর গৌতম বেল বাজিয়ে বেয়ারাকে ডাকল৷ বলল, ‘কফি দাও৷’
বেয়ারা বেরিয়ে যেতে আদিত্যর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কফিটাও ফ্লাস্কে করে ওই দোকানটা থেকে আনিয়েছি৷ ইডলি-ধোসার পর মাদ্রাজি কফি না হলে জমে?’
‘এবার আসল কথাটা শোন৷’ মিনিট কয়েক পরে কফির কাপে চুমুক দিয়ে গৌতম বলল৷ ‘দুটো ব্যাপার৷ প্রথম কথা, আমাদের কাছে পাকা খবর এসেছে টেররিস্টরা গড়িয়া-নরেন্দ্রপুরের ওই অঞ্চলটাতেই লুকিয়ে আছে৷ সংখ্যায় তিন-চারজন৷ ওরা আগামী ২৬শে জানুয়ারি একটা বড় ব্লাস্টের প্ল্যান করছে৷ ব্লাস্টটা সম্ভবত কলকাতায় হবে না৷ কিন্তু আমাদের ইনফর্মার বলছে জানুয়ারির মিডল অবধি ওরা কলকাতাতেই লুকিয়ে থাকবে৷ অতএব বুঝতেই পারছিস যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ওদের খুঁজে বার করে অ্যারেস্ট করা দরকার৷ তুই তো ওই অঞ্চলটাতে ঘুরছিস৷ লোকজনের সঙ্গে কথা বলছিস৷ তোর কি কোনও ধারণা হয়েছে ওই লোকগুলো কোথায় লুকিয়ে থাকতে পারে?’
‘একটা ভাসা ভাসা ধারণা হয়েছে৷ আমার ধারণাটা ঠিক কিনা দু-চারদিনের মধ্যে কনফার্ম করতে পারব৷ কনফার্মড হলে তোকে সঙ্গে সঙ্গে জানাব৷’
‘বাঃ, বাঃ, বাঃ, বাঃ, বাঃ৷’ গৌতমের উচ্ছ্বাস আর শেষ হয় না৷
‘আরে, তুই তো রেকারিং ডেসিমিলের মতো বাঃ বাঃ বলে যাচ্ছিস৷ আগে দেখি যেটা সন্দেহ করছি সেটা ঠিক কিনা৷’
‘তুই যখন সন্দেহ করছিস, তখন কিছু ব্যাপার নিশ্চয় আছে৷’
‘ঠিক আছে, দেখা যাক৷ তুই দ্বিতীয় কথাটা বল৷’
‘হ্যাঁ, দ্বিতীয় কথা হল, নরেন্দ্রপুর থানার ওসি অবিনাশ নন্দর ওপরে আমাদের বিশেষ নজর আছে৷ আমাদের সোর্স বলছে, ওই লুকিয়ে থাকা টেররিস্টরা লোকাল পুলিশের কাছ থেকে সাহায্য পাচ্ছে৷ তার মানে, অবিনাশ নন্দ শুধু যে ইব্রাহিম মাসুদকে প্রোটেকশান দিচ্ছে তাই নয়, টেররিস্টদেরও আগলে রাখছে৷ লোকটার গুণের শেষ নেই৷’
‘আমাকে এ ব্যাপারে কী করতে বলছিস? তোরাই তো অবিনাশ নন্দর ওপরে নজর রাখছিস৷’
‘তা তো রাখছি৷ কিন্তু তুই যেহেতু ওই অঞ্চলে অনেকটা সময় কাটাচ্ছিস অবিনাশ নন্দ সংক্রান্ত এমন কিছু তোর চোখে পড়তে পারে যেটা হয়তো আমাদের চোখ এড়িয়ে যাচ্ছে৷ তাই অবিনাশ নন্দর নামটা তোর মাথায় দিয়ে রাখলাম৷’
‘বেশ৷ আমি মনে রাখব৷’
‘আর একটা কথা৷ আজ আমি তোকে যে কথাগুলো বললাম সেগুলো ভীষণ কনফিডেন্সিয়াল৷ এই কথাগুলো তুই কারও সঙ্গে শেয়ার করতে পারবি না৷ ওকে?’
‘অবশ্যই৷ সব কথা আমার ভেতরেই থাকবে৷ বেরোবে না৷ তুই নিশ্চিন্ত থাক৷’
আদিত্য যখন বাড়ি ফিরল তখন শীতের হ্রস্ব দিন শেষ হয়ে সন্ধে নেমেছে৷ রাস্তা থেকে দেখল দোতলায় তাদের ফ্ল্যাটে আলো জ্বলছে৷ কেয়া ফিরে এসেছে তা হলে৷
কৃষ্ণেন্দু বলে আদিত্যর এক বন্ধু এম এস সি পাস করার পরে কিছুদিন শ্যামসুন্দর কলেজে পড়িয়েছিল৷ শ্যামসুন্দর নামটা তার কাছেই প্রথম শোনা৷ শ্যামসুন্দরে কৃষ্ণেন্দু একা একটা বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকত৷ আদিত্যকে বারবার আসতে বলত৷ যাব যাব করে আদিত্যর যাওয়া হয়নি৷ বহুদিন হল কৃষ্ণেন্দু অধ্যাপনা ছেড়ে ব্যাঙ্কে চাকরি করছে৷ আদিত্যর সঙ্গে তেমন যোগাযোগও আর নেই৷ আজ শ্যামসুন্দরের পথে যেতে যেতে কৃষ্ণেন্দুর কথা মনে পড়ে গেল৷
সকাল দশটা দশের হাওড়া-শান্তিনিকেতন এক্সপ্রেস কোথাও না থেমে এগারোটা কুড়ির মধ্যে বর্ধমান পৌঁছে দেবে৷ সেখান থেকে শ্যামসুন্দরের দূরত্ব আঠেরো কিলোমিটার৷ একটা গাড়ি ভাড়া করে নিলে আধঘণ্টা কি বড়জোর পঁয়তাল্লিশ মিনিটে শ্যামসুন্দর৷ চেষ্টা করলে লালবাজার থেকে হয়তো একটা গাড়ি পাওয়া যেত৷ কিন্তু আদিত্য ভেবে দেখল ট্রেন ধরলে অনেক আরামে যাওয়া যাবে৷ গৌরাঙ্গ একমত৷
আদিত্য এখন ট্রেনের জানলায়৷ একা৷ সবুজের স্বরগ্রাম পৌষ মাসের রোদ্দুরে ঝলমল করছে৷ কত রকমের সবুজ৷ কোথাও কচুরিপানার হালকা সবুজ, কোথাও বনস্পতির কালচে সবুজ, কোথাও কলাগাছে কচি কলাপাতা৷ কখনও কখনও আবার মাইলের পর মাইল কোনও সবুজ নেই৷ ধান কেটে নেওয়া মাঠে হলুদ খড়, স্তূপাকার সোনালি ধান, দিঘির জলে নির্মেঘ নীল আকাশের ছায়া৷ লাল-ডুরে শাড়ি পরা বউ স্বামীর সঙ্গে আলপথ ধরে হেঁটে যাচ্ছে৷ এত রকম রং প্রকৃতির সৃষ্টিকর্তা ঢেলে দিয়েছেন, জানলার ফ্রেমে সেসব দেখতে দেখতে আদিত্য তন্ময় হয়ে পড়েছিল৷
পাশে বসে গৌরাঙ্গ অনেকক্ষণ নাক ডাকাচ্ছে৷ গৌতম ওর জন্যে পুলিশ কোয়ার্টারে একটা সাময়িক থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছে৷ কিন্তু মনে হয় নতুন জায়গায় গৌরাঙ্গ এখনও ধাতস্থ হতে পারেনি৷ তাই রাত্তিরে ভাল ঘুম হচ্ছে না৷
ঠিক এগারোটা আঠেরোয় বর্ধমান পৌঁছে গেল শান্তিনিকেতন এক্সপ্রেস৷ স্টেশন চত্বর থেকে দরদাম করে একটা গাড়ি ভাড়া করতে আরও মিনিট কুড়ি লেগে গেল৷
‘সকালে তেমন কিছু খেয়ে বেরুতে পারিনি, আদিত্যদা৷ একটু কিছু খেয়ে নিলে হত না?’ গাড়িতে উঠে গৌরাঙ্গ কিঞ্চিৎ কুণ্ঠিতভাবে বলল৷
‘আপনারা শ্যামসুন্দর যাবেন তো? পথে দামোদরের ব্রিজ পড়বে৷ ব্রিজে ওঠার ঠিক আগে একটা কচুরির দোকান আছে৷ ওখানে খেয়ে নেবেন৷ দেখবেন কত লোক গাড়ি দাঁড় করিয়ে খাচ্ছে৷’ শকটচালক জানাল৷
দামোদরে জল নেই৷ বালি ধুধু করছে৷ অনেকেই হেঁটে পার হয়ে যাচ্ছে, নদীর ওপর এক জায়গায় ছেলেরা ক্রিকেট খেলছে৷ ড্রাইভার বলল, ‘এই নদী যদি বর্ষাকালে দেখতেন, ভয় পেয়ে যেতেন৷’
কচুরিগুলো হাতে গরম৷ হিঙের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে৷ সঙ্গী আলুর তরকারি অতি সুস্বাদু৷ কচুরির পর রাজভোগ৷ অমন পেল্লায় রাজভোগ আদিত্য আগে খেয়েছে বলে মনে করতে পারল না৷ সলিড ছানা৷ কলকাতায় যেমন স্পঞ্জ রাজভোগ পাওয়া যায় তেমন নয়৷ গৌরাঙ্গ মহাখুশি৷ গাড়িতে উঠে গুনগুন করে কী যেন একটা সুর ভাঁজতে লাগল, আদিত্য ঠিক ধরতে পারল না৷ গাড়ি যখন অনিল দাসের দোকানের সামনে থামল তখন একটা বাজতে সামান্য বাকি৷
দোকানের নাম মহামায়া স্টোর্স৷ সাইন বোর্ডে দোকানের নামের নীচে লেখা এখানে পেরেক, স্ক্রু, হাতুড়ি, ছেনি, বেলচা, কোদাল, আলকাতরা, তার্পিন তেল, সিরিশ কাগজ ইত্যাদি যাবতীয় লোহার জিনিস পাওয়া যায়৷
বিজ্ঞাপিত সব ক’টি জিনিসই লোহনির্মিত কিনা এই সংশয় মনে নিয়ে দোকানের ভিতর ঢুকতেই এক লম্বা-চওড়া ব্যক্তির মুখোমুখি হল আদিত্য৷
‘আপনারাই কি ফোন করেছিলেন? কলকাতা পুলিশ?’ লোকটা স্মিত হাসল৷ ‘আমিই অনিল দাস৷’ লোকটাকে দেখে মনে হল আদিত্যদের জন্য অপেক্ষা করছিল৷
‘হ্যাঁ, আমরা কলকাতা পুলিশ৷ আপনার ভাই অমিত দাসের খুনের তদন্ত করছি৷ আপনাকে দু’একটা প্রশ্ন করব৷’
‘ঠিক আছে৷ আসুন৷’ দোকানের শেষ প্রান্তে একটা গদি৷ কুলুঙ্গিতে গণেশ৷ রাম-সীতা-হনুমান৷ লোকটা আদিত্যদের নিয়ে সেখানে বসাল৷ নিজে আদিত্যদের মখোমুখি বসল৷ দূরবর্তী কারও উদ্দেশে হাত নেড়ে বলল, ‘দুটো চা৷’ তারপর আদিত্যদের দিকে ফিরে বলল, ‘বলুন কী জানতে চান৷’
‘আপনার ভাই অমিত আপনার থেকে কত ছোট ছিল?’ আদিত্য শুরু করল৷
‘অমিত, ওর ডাকনাম বুবু, আমার থেকে প্রায় দশ বছরের ছোট ছিল৷’
‘কেমন সম্পর্ক ছিল আপনার সঙ্গে?’
‘সম্পর্ক? বলতে পারেন আমিই ওকে বড় করেছিলাম৷ বাবা তো সারাদিন মাঠের কাজে ব্যস্ত থাকত৷ মা অবশ্য বাড়িতেই থাকত৷ কিন্তু আমিই ছিলাম ওর সঙ্গী৷ গাছে উঠে আম পাড়া, পুকুরে সাঁতার, সারা দুপুর বিলের ধারে বসে মাছ ধরা, সব ব্যাপারে বুবু আমার সঙ্গে সঙ্গে থাকত৷ আমার খুব নেওটা ছিল বুবু৷’ অনিল দাসের গলাটা ভিজে ভিজে৷ দৃষ্টিটা অনেক দূরের কোনও অতীতে৷
‘আপনার ভাই কলকাতা চলে যাবার পরও কি আপনার সঙ্গে অতটা ঘনিষ্ঠতা ছিল?’
‘আমরা কেউই চাইনি বুবু আমাদের ছেড়ে কলকাতা চলে যাক৷ আমি চাইনি৷ বাবাও চায়নি৷ এক তো টাকা-পয়সার ব্যাপার ছিল৷ আমাদের অবস্থা তো খুব ভাল নয়৷ চাষবাস করে ক’টা টাকা হয়? আর আমার ব্যবসাও তেমন কিছু চলে না৷ যাই হোক, সেটা ছাড়াও ও দূরে চলে যাক এটা আমরা চাইনি৷ ও জেদাজেদি করে চলে গেল৷ লেখাপড়ায় অবশ্য ও ভীষণ ভাল ছিল৷ কখনও বলতে হত না পড়তে বোসো৷ না গেলে এই অবস্থা হত না৷ আমাদের কপাল৷’ অনিল দাস একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল৷
‘আপনি কি মাঝে মাঝে কলকাতায় গিয়ে ভাই-এর সঙ্গে দেখা করতেন?’
‘ব্যবসার কাজে মালপত্র কিনতে আমাকে দু’তিন মাসে একবার কলকাতা যেতে হয়৷ কলকাতা গেলে বুবুর সঙ্গে একটা-দুটো রাত্তির থেকে আসতাম৷’
‘যে রাত্তিরে অমিত দাস খুন হন সেই রাত্তিরে আপনি কোথায় ছিলেন?’
‘দেখুন, যে রাত্তিরে ঘটনাটা ঘটে তার কয়েক দিন আগে আমি বুবুর কাছে গিয়েছিলাম৷ রাত্তিরটা ওখানেই ছিলাম৷ ভেবেছিলাম পরের দিন মালপত্তর কিনে বাড়ি ফিরব৷ কিন্তু আপনাদের খোলাখুলি বলছি, সেই রাত্তিরে বুবুর সঙ্গে আমার ফাটাফাটি ঝগড়া হয়৷ কথাবার্তা বন্ধ হয়ে যায়৷ আমি পরের দিন ভোরবেলা ওর বাড়ি থেকে বেরিয়ে সোজা শ্যামসুন্দর ফিরে আসি৷ মন-মেজাজ এতই খারাপ ছিল যে মালপত্তরও কেনা হয়নি৷’
‘বুঝলাম৷ কিন্তু ঘটনার রাত্তিরে আপনি কোথায় ছিলেন?’
অনিল দাস খানিকটা থতমত খেয়ে গেছে৷ কিছুক্ষণ ইতস্তত করার পর সে বলল, ‘মালপত্তর কিনতে আমাকে আবার কলকাতায় যেতে হয়েছিল৷ কেনাকাটা করতে দেরি হয়ে গেল৷ কিন্তু বুবুর সঙ্গে ঝগড়া চলছিল৷ তাই এবার আর বুবুর কাছে রাত্তিরে উঠিনি৷ বড়বাজারে একজন চেনা লোকের গদিতে রাত্তিরটা ছিলাম৷’
‘তার মানে যে সন্ধেবেলা আপনার ভাই খুন হয়, সেই সন্ধেবেলা আপনি কলকাতাতেই ছিলেন?’
‘আজ্ঞে হ্যাঁ৷ ওই সন্ধেবেলা আমি বড়বাজারে কেনাকাটা করছিলাম৷’
‘বড়বাজারে আপনি যার গদিতে রাত্তিরটা ছিলেন তার নাম ঠিকানাটা আমরা জানতে চাইব৷’
‘আমি লিখে দিচ্ছি৷’
‘আচ্ছা, আপনার ভাইএর সঙ্গে আপনার কী নিয়ে ঝগড়া হয়?’
‘কী নিয়ে আবার? ওর ওই মুসলমান মেয়েটাকে বিয়ে করা নিয়ে৷ আমরা গরিব হতে পারি, কিন্তু বেহায়া নই৷ গ্রামে নিষ্ঠাবান হিন্দু বলে আমাদের একটা মর্যাদা আছে৷ আমার ভাই এইভাবে আমাদের বংশের নাম ডোবাবে আমি ভাবতেই পারিনি৷’
‘আপনার ভাই যে একটি মুসলমান মেয়ের সঙ্গে প্রেম করছে সেটা আপনি আগে জানতেন না?’
‘জানতাম৷ এবং যখনই কলকাতায় আসতাম বুবুকে বোঝাবার চেষ্টা করতাম৷ ও কিছু বলত না, চুপ করে থাকত৷ সেদিন রাত্তিরবেলা বুবু আমাকে জানাল ও রেজিস্ট্রি করে মেয়েটাকে বিয়ে করে ফেলেছে৷ আমি আর মাথা ঠিক রাখতে পারলাম না৷ ওকে যা নয় তাই শুনিয়ে দিলাম৷ পরদিন ভোর হতেই ওর বাড়ি ছেড়ে চলে আসি৷ আর কখনও ওর সঙ্গে দেখা হয়নি৷’
‘আপনার ভাই-এর বাড়ির উল্টোদিকে যে মুদির দোকানটা আছে সেই দোকানের মালিক শুনেছে আপনি আপনার ভাইকে বলছেন, তোকে খুন করে আমি নিজে ফাঁসিকাঠে চড়ব৷ কথাটা কি সত্যিই আপনি বলেছিলেন?’
‘হয়তো রাগের মাথায় বলেছিলাম৷’
‘বংশমর্যাদা রক্ষা করার জন্যে আপনি কি আপনার ভাইকে সত্যিই খুন করতে পারতেন?’
অনিল দাস উত্তর দিল না৷ অনেকক্ষণ চুপ করে রইল৷ তারপর বলল, ‘আপনাদের চা এসে গেছে৷ চা খেয়ে নিন৷’
পরের তিনটে দিন শুয়ে বসে কাটিয়ে দিল আদিত্য৷ মাঝে মাঝে টেলিফোনে গৌরাঙ্গর সঙ্গে কথা হচ্ছিল৷ দু’একবার বিমলের সঙ্গে৷ কিন্তু তার বেশি আর কিছু নয়৷ আসলে আদিত্য কাজ করছিল৷ কাজ করছিল মানে, নিবিড়ভাবে চিন্তা করছিল৷ টুকরো টুকরো যে ভাবনাগুলো তার মাথায় দানা বেঁধেছিল তাদের একত্র করে একটা সম্পূর্ণ ছবি তৈরি করার চেষ্টা করছিল৷
তৃতীয় দিন বিকেল নাগাদ গৌতমকে ফোন করল আদিত্য৷
‘তুই বাড়ি ফিরিস ক’টায়?’ আদিত্য জিজ্ঞেস করল৷
‘সাড়ে-সাতটা, বড় জোর আটটা৷ আসবি নাকি?’
‘ভাবছিলাম যাব৷ কেয়াকে নিয়ে যাব৷ মালিনী অনেক করে তোদের নতুন বাড়িতে যেতে বলেছিল৷ যাওয়া হয়নি৷’
‘আজকেই চলে আয়৷ আমি মালিনীকে ফোন করে তাড়াতাড়ি চলে আসতে বলছি৷ কাল তো ছুটি৷’ আড্ডার সম্ভাবনায় গৌতম উত্তেজিত৷ ‘আর শোন৷ রাত্তিরে অবশ্যই খেয়ে যাবি৷’
‘সে তো খাবই৷ তোর বাড়ি যাব আর খাব না, এটা কি হতে পারে?’
‘শর্ট নোটিসে বাড়িতে তো রান্না হবে না৷ বাইরে থেকে আনাব৷ কি খাবি? চিনে? মোগলাই? পাঞ্জাবি? সাহেবি?’
‘সে তুই যেটা ইচ্ছে হয় আনাস৷ আমরা আটটার মধ্যে পৌঁছে যাচ্ছি৷’
ফোনটা কেটে দিয়ে আদিত্য আবার একটা নম্বর ডায়াল করল৷ কেয়াকে৷
‘ক্লাস শেষ হল?’
‘এই তো শেষ হল৷ এখন স্টাফরুমে বসে এক কাপ চা খেয়ে বাড়ি ফিরব৷’
‘হ্যাঁ৷ আজ তো তোমার টিউশানি নেই৷ উইকএন্ড৷’
‘হ্যাঁ৷ তুমি কি বাড়িতে? ভাবছিলাম সন্ধেবেলা কোথাও গেলে হয়৷’
‘আমি বাড়িতে৷ আর শোনো, আজ রাত্তিরে গৌতম আমাদের নেমন্তন্ন করেছে৷ যাবে তো?’
‘গৌতম?’ কেয়ার গলাটা নিরুৎসাহ শোনাল৷ ‘আমি ভাবছিলাম আমরা দুজনে বাইরে কোথাও খেতে যাব৷’
‘সেটা বরং কাল রাত্তিরে যাব৷ আজ গৌতমদের বাড়ি চল না৷ এত করে বলছে৷’
‘ঠিক আছে, যাব৷ আগে বললে শ্যাম্পু করতাম৷ চুলের যা অবস্থা৷’
‘এখন রাখছি৷’ আদিত্য শ্যাম্পু করা না-করার মতো জটিল বিষয়ে না ঢুকে ফোনটা রেখে দিল৷
সন্ধেবেলা কিছুক্ষণ আড্ডার পর আদিত্য গৌতমকে বলল, ‘কেয়া আর মালিনী এই ঘরে বসে গল্প করুক৷ আমরা তোর পড়ার ঘরে গিয়ে দু’একটা দরকারি কথা সেরে নেব৷’
‘তুই যে দরকারি কথা বলতে এসেছিস সেটা আমি বুঝতে পেরেছি৷ কারণ ছাড়া আদিত্য মজুমদার যেচে নেমন্তন্ন নেবার লোক তো নয়৷’
‘আসলে, তুই যে বলেছিলি, লালবাজারে পুলিশের মধ্যে কিছু মোল আছে যারা টেররিস্টদের কাছে পুলিশের ভেতরের খবর পৌঁছে দিচ্ছে, তাই এই প্রিকশানটা নিলাম৷ যদি কেউ আমাকে ফলো করে, সে দেখবে আমি তোর বাড়িতে সোশাল ভিজিটে এসেছি৷ চল, তোর পড়ার ঘরে গিয়ে কথাগুলো বলে নিই৷’
এর পরের আধঘণ্টা গৌতমের সঙ্গে আদিত্যর কিছু কথাবার্তা হল৷ কিছু অ্যাকশান প্ল্যানও ঠিক হল৷ হয়তো কথাবার্তা আরও কিছুক্ষণ চলত৷ মালিনী এসে বলল, ‘তোমরা খাবে না? অনেকক্ষণ খাবার দিয়ে গেছে৷ ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে৷’
পরের দিন দুপুরের দিকে গৌতমের ফোন এল৷ ‘হীরালাল রাঠোরকে অ্যারেস্ট করে লালবাজারে আনা হয়েছে৷ তুই যদি ওর ইন্টারোগেশনের সময় থাকতে চাস, চটপট চলে আয়৷’
পরের দু’দিন ঘটনাবিহীন ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে কেটে গেল৷ সন্ধেবেলা গৌতমের মেসেজ এল৷ তারপরেই আদিত্য মোবাইলে গৌরাঙ্গর নম্বরটা লাগাল৷
‘কী খবর আদিত্যদা? আপনি তো এদিকে আসা ছেড়েই দিলেন৷ কেসটা তো ঝুলেই রইল৷’
‘আমি তোমাদের ওদিকে যাইনি বটে কিন্তু কাজ করছিলাম৷ মেনলি চিন্তা করছিলাম৷ যা দেখেছি, শুনেছি সেগুলো মেলাবার চেষ্টা করছিলাম৷ আর লালবাজারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিলাম৷ কেস মোটামুটি সলভড হয়ে গেছে৷ শোনো, তোমাকে দু’একটা খবর দেবার আছে৷ লালবাজারের পুলিশ দু’দিন আগে হীরালালকে অ্যারেস্ট করেছে৷ ওকে ইন্টারোগেট করার সময় আমি ছিলাম৷ হীরালাল রাজসাক্ষী হতে রাজি হয়েছে৷ ভবতোষের দেওয়া এভিডেন্সগুলো ছাড়া এটা সম্ভব হত না৷ আজ রাত্তিরে লালবাজার থেকে বিরাট পুলিশ ফোর্স গিয়ে ইব্রাহিম মাসুদকে অ্যারেস্ট করবে৷’
‘বলেন কী আদিত্যদা! এ তো দারুণ খবর! আমাদের এলাকায় অ্যান্টিসোশালদের উৎপাত আর থাকবে না৷ আমি ভাবতে পারছি না৷ এবার ওই অবিনাশ নন্দকে ট্রান্সফার করে দিতে পারলেই এলাকার সব সমস্যা মিটে যাবে৷’
‘আরও খবর আছে৷ একটু আগে সিরাজুল মণ্ডল আর তার বাবা রফিকুল মণ্ডলকে এস টি এফ গ্রেপ্তার করেছে৷ ওরা ওদের নরেন্দ্রপুরের বাড়িতে টেররিস্টদের আশ্রয় দিত৷ এটা কিন্তু টপ সিক্রেট একটা খবর৷ তোমাকে বলার কথা নয়, তবু বললাম কারণ সিরাজুলকে তুমি ভাল করে চিনতে৷ এই খবরটা তুমি কোথাও লিক কোরো না৷ অবশ্য সিরাজুল গ্রেপ্তার হবার খবরটা আস্তে আস্তে এলাকায় সকলেই জেনে যাবে৷’
গৌরাঙ্গ অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ‘আমি ভাবতে পারছি না, আদিত্যদা৷ সিরাজুল! এত ভাল একটা ছেলে! টেররিস্টদের সঙ্গে?’
‘আসলে কি জান? এগুলো মানুষ একটা বিশ্বাস থেকে করে৷ বিশ্বাসটা ভুল হতে পারে, কিন্তু দেখবে যে মানুষটা বিশ্বাসটাকে ধরে আছে তার ইনটিগ্রিটি একেবারে অটুট৷ যাকে আমরা উগ্রপন্থী বলছি তাকেই হয়তো কেউ কেউ শহীদ বলবে৷ ব্যাপারটা বেশ গোলমেলে৷’
‘কিন্তু তাই বলে শ’য়ে শ’য়ে নিরীহ মানুষ মারাটা তো সমর্থন করা যায় না, আদিত্যদা৷’
‘ওরা বলবে বৃহত্তর স্বার্থের জন্যে এটা করতে হচ্ছে৷ স্বাধীনতার আগে আমাদের স্বদেশি টেররিস্টরা কি দু’চারটে নিরীহ ইংরেজ মারেনি?’
‘কিন্তু আসল কাজটাই তো হল না৷ অমিত দাসের খুনিটাই তো ধরা পড়ল না৷’
‘না, সেটাও ধরা পড়েছে৷ কাল রাত্তিরে কলকাতার পুলিশ শ্যামসুন্দরে গিয়ে অনিল দাসকে গ্রেপ্তার করেছে৷ তার ভাই অমিত দাসকে খুন করার চার্জে৷’
‘অনিল দাস! তার ভাইকে খুন করেছে! অনিল দাস কেন তার ভাইকে খুন করবে?’
‘অনার কিলিং৷ আজকাল খুব হচ্ছে৷ কমিউনাল হারমনি যত কমছে, এই ধরনের ঘটনা তত বাড়ছে৷’
‘আমার মাথাটা ঠিক কাজ করছে না আদিত্যদা৷ ঠিক কী হয়েছে আমাকে একটু বুঝিয়ে বলবেন?’
‘অবশ্যই বলব৷ দু’একদিনের মধ্যে তোমার সঙ্গে দেখা হবে৷ তখন সব খুলে বলব৷ আজ রাখছি৷’
ফোনটা নামিয়ে রেখে আদিত্য ভাবল এখনও কাজ বাকি আছে৷ সবার আগে উগ্রপন্থীরা কোথায় লুকিয়ে আছে সেটা বার করতে হবে৷
গৌতম বলেছিল খুব ভোরবেলা এসে তুলে নেবে৷ টেনশনে আদিত্য ভোর তিনটে থেকে জেগে বসে আছে৷ চারটের সময় গৌতমের হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ এল, নীচে নেমে আয়৷ কেয়াকে জাগাবে না বলে আদিত্য ঘরের মধ্যে পা টিপে টিপে হাঁটছিল৷ হঠাৎ খেয়াল করল কেয়া চোখ চেয়ে আছে৷
‘এদিকে এস৷ ঠাকুরের ফুল ছোঁয়াব৷ একটা বড় বিপদের মধ্যে যাচ্ছ৷’
আদিত্যকে নিয়ে গৌতমের গাড়িটা বড়রাস্তায় পড়তেই আদিত্য দেখতে পেল স্পেশাল ফোর্সের কম্যান্ডোদের দুটো ট্রাক ওদের জন্যে অপেক্ষা করছে৷ দুটো ট্রাক মিলিয়ে অন্তত জনা কুড়ি কম্যান্ডো৷ আর একটা ভ্যান৷ সেটাতে দলের কম্যান্ডার৷
‘দে আর অল আর্মড টু দ্য টিথ৷ টেররিস্টদের এগেন্সটে কোনও রকম রিস্ক নেওয়া যায় না৷’ গৌতম চাপা গলায় বলল৷
ভোরের আলো ফুটতে এখনও দেরি আছে৷ রাস্তার আলোই ভরসা৷ ভ্যান এবং দুটো ট্রাক প্রায় নিঃশব্দে গৌতমের গাড়িটাকে ফলো করছে৷ অরবিন্দ সেতু পার হয়ে ওরা উল্টোডাঙা থেকে বাইপাস ধরল৷ আদিত্যই ওদের পথপ্রদর্শক কারণ আদিত্যই জানে কোথায় যেতে হবে৷ দেখতে দেখতে কনভয় মা ফ্লাইওভার শেষ করে গড়িয়ার রাস্তা ধরল৷ উল্টোদিক থেকে ক্কচিৎ-কখনও তরকারির গাড়ি আসছে৷ খুব মাঝে মাঝে একটা-দুটো উবার৷ হয়তো কাউকে খুব ভোরে ফ্লাইট ধরতে হবে৷ হয়তো কেউ নাইট ডিউটি সেরে বাড়ি ফিরছে৷
কনভয় যখন গড়িয়া ছাড়িয়ে কামাল গাজি পৌঁছেচে তখন আদিত্য লক্ষ করল রাস্তার পাশ দিয়ে কৃষক দম্পতি ফুলকপির চুবড়ি মাথায় যাচ্ছে৷ শাক-সব্জী নিয়ে একটা রিকশা ভ্যান রাস্তা পেরোবে বলে দাঁড়িয়ে আছে৷ পুব আকাশে একটু একটু আলো ফুটছে৷ আদিত্য অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিল৷
‘শোন, আমরা কিন্তু বাড়ির বাইরে এই গাড়িতেই বসে থাকব৷ ওদের ক্যাপচার করার সময় ওরা গুলি-টুলি চালাতে পারে৷ তার মধ্যে যাওয়ার দরকার নেই৷ ওটা আমাদের কাজই নয়৷ তুই শুধু বাড়িটা চিনিয়ে দিবি৷ আর যে লোকটা ওদের থাকার জায়গা জোগাড় করে দিচ্ছে তাকে দেখিয়ে দিবি৷ ব্যাস, তোর কাজ শেষ৷’ গৌতমের কথায় আদিত্য বাস্তবে ফিরে এসেছে৷
আরও কিছুক্ষণ পরে কনভয় সাউথভিল হাউসিং-এর সামনে এসে দাঁড়াল৷ স্পেশাল ফোর্সের কম্যান্ডোরা নিঃশব্দে নিমেষের মধ্যে বাড়িটা ঘিরে ফেলেছে৷ মেন গেটটা বন্ধ৷ গেটের মুখে একজন সিকিউরিটি মাটিতে বিছানা করে ঘুমোচ্ছিল৷ এখন উঠে বসেছে৷ ভবতোষ ধাড়া৷ ঘুমচোখে বোঝার চেষ্টা করছে কী হচ্ছে৷
আদিত্য স্পেশাল ফোর্সের কম্যান্ডারকে বলল, ‘এই লোকটা৷’
দুজন কম্যান্ডো গেট টপকে ভিতরে ঢুকে পড়েছে৷ ভবতোষ বালিশের তলা থেকে পিস্তল বার করেছে৷ সেটা চালাবার আগেই একজন কম্যান্ডো পেছন থেকে ভবতোষকে জাপটে ধরল৷ আরও দুজন কম্যান্ডো এখন বাড়ির ভেতরে৷ দুজন ভবতোষকে ধরে রেখেছে৷ অন্য দুজনের একজন তার মুখে কিছু একটা গুঁজে প্লাস্টার দিয়ে আটকে দিল, যাতে সে চিৎকার করে উগ্রপন্থীদের সতর্ক করে দিতে না পারে৷ অন্যজন ভবতোষের দুটো হাত পিছনে নিয়ে গিয়ে তাতে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে দিল৷
চারদিকটা এখনও অন্ধকার৷ সারা কলকাতা শহরের মতো এই বাড়িটাও ঘুমিয়ে রয়েছে৷
‘ফ্ল্যাট সেভেন এ, টপ ফ্লোর৷’ আদিত্য চাপা স্বরে বলল৷
‘উই নো, উই নো৷’ কম্যান্ডার আদিত্যদের গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে ওপর দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করল৷
কয়েকজন কম্যান্ডো ছাত থেকে দড়ি বেয়ে ফ্ল্যাট সেভেন এ-র বারান্দায় নেমে পড়েছে৷
আধঘণ্টা পরে যখন লুঙ্গি-গেঞ্জি পরা ভবতোষ ধাড়া, হাফপ্যান্ট-টি শার্ট পরা তিনটি উগ্রপন্থী এবং রাত-পোশাক পরা দুটি মেয়ে এই সবাইকে নিয়ে কনভয় ফিরে যাচ্ছিল তখন দৃশ্যটা আদিত্যর প্রায় হাসির লাগছিল৷
গৌতমকে সে কথা বলাতে গৌতম বলল, ‘হাসির কী রে৷ আমরা প্রচণ্ড লাকি যে একফোঁটা ব্লাডশেড না করে তিনটি মাচ ওয়ান্টেড টেররিস্টকে ধরতে পারলাম৷ তার সঙ্গে যারা ওদের শেলটারের ব্যবস্থা করছিল সেই নেটওয়ার্কটাকেও ধরতে পেরেছি৷ ব্যাপারটা বেজায় সিরিয়াস৷’
‘একটা কাজ কিন্তু বাকি আছে৷’ আদিত্য গম্ভীর গলায় বলল৷
‘কী কাজ? শিল্ড সিকিউরিটিজের মালিক শান্তি মুখার্জিকেও একটু আগে অ্যারেস্ট করা হয়েছে৷ এই মাত্র ম্যাসেজ পেলাম৷ আর কী কাজ?’
‘চল, দেখবি কী কাজ৷’
আদিত্যর পথনির্দেশে গৌতমের গাড়ি ঠিক পঁয়ত্রিশ মিনিট পরে তারাতলা পুলিশ কোয়ার্টারে পৌঁছল৷
‘কোথায় যাচ্ছিস? এ তো পুলিশ কোয়ার্টার৷’ গৌতমের গলায় দ্বিধা৷
‘তিনতলায় যাব৷ চল আমার সঙ্গে৷ আর তোর বডিগার্ড দুটোকেও সঙ্গে নে৷ কিছুই বলা যায় না৷ দিনকাল খারাপ৷’
তিনতলায় উঠে একটা দরজাতে নক করল আদিত্য৷ দরজা খুলছে না দেখে আবার নক করল৷ এবার দরজা খুলেছে৷
‘এ কী আদিত্যদা? এত সকালে?’ গৌরাঙ্গ অবাক হয়ে গেছে৷
‘অ্যাডিশনাল কমিশনার সাহেব তোমাকে নিতে এসেছেন৷ না, না৷ ঘরের মধ্যে ঢুকে যাবার চেষ্টা কোরো না৷ আমাদের সঙ্গে দুজন আর্মড পুলিশ আছে৷ গৌরাঙ্গ সাঁতরা ইউ আর আন্ডার অ্যারেস্ট৷’
‘আমাকে অ্যারেস্ট করবেন? কেন? আমার এগেন্সটে চার্জটা কী?’ গৌরাঙ্গ সাঁতরা আকাশ থেকে পড়েছে৷
‘দুটো চার্জ৷ এক, উগ্রপন্থীদের সাহায্য করা৷ দুই, অমিত দাসকে খুন করা৷’
গৌতম চোখের ইশারা করাতে গৌতমের দুজন বডিগার্ড দু’দিক থেকে এগিয়ে এসে গৌরাঙ্গর দুটো হাত চেপে ধরল৷
সিরাজুল আর তার বাবা রফিকুল মণ্ডলকে সসম্মানে মুক্তি দেওয়া হয়েছে৷ গৌতম দাশগুপ্ত নিজে তাদের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিয়ে বলেছে, একটা ভুল খবরের ভিত্তিতে পুলিশ তাদের ধরেছিল৷ অমিত দাসের দাদা অনিল দাসকেও পুলিশের গাড়ি শ্যামসুন্দর পৌঁছে দিয়েছে৷ তার কাছেও ক্ষমা চাওয়া হয়েছিল, কিন্তু তার মেজাজ এখনও সপ্তমে চড়ে আছে৷ বলছে, পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা করবে৷
গৌতমের কনফারেন্স রুমে এখন আদিত্য কথা বলছে৷ শ্রোতা গৌতম দাশগুপ্ত সহ এস টি এফ-এর কয়েকজন কর্তা৷ সৌভাগ্যবশত সকলেই বাংলা বোঝে তাই চোয়াল ব্যথা করে আদিত্যকে ইংরেজি বলতে হচ্ছে না৷
‘অমিত দাসের বাবা নকুল দাস যখন তার ছেলের খুনের কিনারা করার জন্য আমার কাছে আসে তখন আমি ধরেই নিয়েছিলাম এটার মধ্যে কোনও রহস্য নেই, এটা একটা সহজ খুনের ঘটনা যেখানে হিন্দু ছেলের সঙ্গে তার মেয়ে আলিনার বিয়ে দেবে না বলে ইব্রাহিম মাসুদ অমিত দাসকে খুন করিয়েছে৷ কাজটা মাসুদের পক্ষে শক্ত নয়৷ মাসুদ এলাকার টেরর৷ চোরা কারবার করে, ফলে তাকে গুন্ডা পুষতে হয়৷ সেই গুন্ডা দিয়ে একটা নিরীহ একুশ-বাইশ বছরের ছেলেকে খুন করানো মাসুদের পক্ষে খুবই সহজ কাজ৷ নকুল দাস জানাল, অমিতের বন্ধু সিরাজুল এবং আলিনা দুজনেই মনে করে ইব্রাহিম মাসুদই খুনটা করিয়েছে৷ কাজেই আমি বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলাম এটার মধ্যে আর কিছু নেই৷
‘তবু দুটো জিনিস নিয়ে খটকা লাগল৷ এক, ঠিক ওই সময়েই খুনটা হতে গেল কেন? আগেও তো হতে পারত, পরেও হতে পারত৷ আলিনা আর অমিত তো অনেকদিন ধরেই মিশছিল৷ অক্টোবর মাসে হঠাৎ কী এমন ঘটল যাতে অমিতকে খুন করতে হল? দু’নম্বর খটকা, নকুল দাস আমার ঠিকানা যোগাড় করল কী করে? নকুল দাস বলল, শ্যামসুন্দর থানার ওসি সরোজ হালদার তাকে আমার ঠিকানা দিয়ে আমার কাছে পাঠিয়েছে৷ কিন্তু সরোজ হালদার বলে আমি কাউকে চিনি বলে মনে করতে পারলাম না৷ আমার স্মৃতিশক্তি তো এত খারাপ নয়৷’
সুদৃশ্য টিপটে চা এসেছে৷ সঙ্গে ফাইন চায়নার কাপ ও সসার৷ সব থেকে বড় কথা চা-টি অতীব সুস্বাদু৷ খাঁটি দার্জিলিং৷ গৌতম আদিত্যর পছন্দ জানে৷ আদিত্য চায়ের কাপে একটা চুমুক দিয়ে আবার শুরু করল৷
‘নরেন্দ্রপুর থানায় গিয়ে দেখলাম বড়বাবু অবিনাশ নন্দ মাসুদকে পরিষ্কার প্রোটেকশান দিচ্ছে৷ পরে গৌতম বলল, লোকাল পুলিশ টেররিস্টদেরও সাহায্য করছে৷ গৌতমরা ধরেই নিয়েছিল, লোকাল পুলিশ মানে নরেন্দ্রপুর থানার ওসি অবিনাশ নন্দ৷ গৌরাঙ্গর কথা কারও মাথাতেই আসেনি৷
‘অবিনাশ নন্দ আমাকে দূর দূর করে তাড়িয়ে দিল৷ থানা থেকে বেরিয়ে ভাবছি কী করব এমন সময় গৌরাঙ্গ সাঁতরা এসে আলাপ জমাল৷ ওকে আমি আগে দেখেছি তবে খুব ভাল চিনতাম না৷ যাই হোক, গৌরাঙ্গ বলল ও-ই কায়দা করে নকুল দাসকে আমার কাছে পাঠিয়েছিল৷ আমি আমার দ্বিতীয় খটকার একটা ওপর ওপর উত্তর পেলাম, কিন্তু পুরোপুরি সন্তুষ্ট হলাম না৷ ওসি অবিনাশ নন্দকে সরানো যদি গৌরাঙ্গর উদ্দেশ্য হয় তাহলে অত ঝামেলা করে আমাকে ওখানে নিয়ে আসার বদলে সে সরাসরি অফিশিয়াল চ্যানেলে লালবাজারে কমপ্লেন করল না কেন? পরে বুঝতে পেরেছিলাম, অফিশিয়াল চ্যানেলে কমপ্লেন করলে লালবাজার থেকে লোক এসে ইনভেস্টিগেট করত৷ সেটা গৌরাঙ্গ চায়নি৷ কারণ এই অঞ্চলে পুলিশের অ্যাক্টিভিটি বাড়লে উগ্রপন্থীদের গোপন ডেরা পুলিশের নজরে আসার সম্ভাবনা বাড়ে৷
‘বস্তুত, ইব্রাহিম মাসুদের কার্যকলাপ নিয়ে কিংবা সেটাকে অবিনাশ নন্দর প্রোটেকশন দেওয়া নিয়ে গৌরাঙ্গর ততক্ষণ কোনও মাথাব্যথা ছিল না যতক্ষণ ওই এলাকায় পুলিশের আনাগোনা যৎসামান্য ছিল৷ কিন্তু মাসুদ ক্রমশ তার কার্যকলাপ বাড়াচ্ছিল, ফলে এলাকায় অশান্তিও বাড়ছিল৷ এলাকার বাসিন্দারা আর টিকতে না পেরে লালবাজারে কমপ্লেন করে৷ লালবাজার থেকে প্রাথমিকভাবে এলাকা পরিদর্শন করার জন্য লোক পাঠানো হল৷ তারা মাসুদের সঙ্গে কথাও বলল৷ গৌরাঙ্গ বিপদের গন্ধ পেল৷ মাসুদের পাশের বাড়িটাতেই যে তিন টেররিস্ট আশ্রয় নিয়েছে!’
‘কিন্তু তোকে দিয়ে অমিত দাসের কেসটা তদন্ত করালে গৌরাঙ্গর কী লাভ?’ গৌতম কিছুটা বিভ্রান্ত৷
‘দুটো লাভ৷ প্রথম লাভ, আমি তদন্ত করে মাসুদকে দোষী প্রমাণ করতে পারলে সরাসরি লালবাজারে গৌতম দাশগুপ্তর কাছে খবর যাবে, এবং তখন অবিনাশ নন্দ আর মাসুদকে প্রোটেক্ট করতে পারবে না৷ মাসুদ জেলে গেলে ওই এলাকায় চোরাকারবারিদের অ্যাক্টিভিটিও কমে যাবে, সঙ্গে সঙ্গে পুলিশের যাতায়াতও৷ ফলে টেররিস্টরা শান্তিতে লুকিয়ে থাকতে পারবে৷’
‘কিন্তু সেটা তো লালবাজারের ইনডিপেনডেন্ট টিম ইনভেস্টিগেট করলেও হতে পারত৷ নাকি লালবাজারের টিমের ওপর গৌরাঙ্গর তেমন ভরসা ছিল না?’ গৌতম কিছুটা ব্যাঙ্গের সুরে বলল৷
‘না, না৷ তা নয়৷ লালবাজারের টিম তদন্ত করলে দ্বিতীয় সুবিধেটা পাওয়া যেত না৷ লালবাজারের টিম নিজেদের মতো করে তদন্ত করত৷ তারা কখন কোথায় যাচ্ছে গৌরাঙ্গ জানতেও পারত না৷ ফলে গৌরাঙ্গর অজান্তেই উগ্রপন্থীদের গোপন ডেরা আবিষ্কৃত হবার একটা সম্ভাবনা ছিল৷ কিন্তু আমি তদন্ত করার মূল সুবিধে হচ্ছে গৌরাঙ্গ আমার সঙ্গে সঙ্গে থাকতে পারছে৷ যদি ঘটনাচক্রে আমি টেররিস্টদের গোপন ডেরার কাছাকাছি চলে আসি, গৌরাঙ্গ তাদের সাবধান করে দিতে পারছে৷ আমার ধারণা, আমি যেদিন গৌরাঙ্গকে নিয়ে ভবতোষের সঙ্গে কথা বলতে গেলাম সেদিন গৌরাঙ্গ আগে থেকেই টেররিস্টদের রেড এলার্ট মেসেজ পাঠিয়ে দিয়েছিল৷ আমি যদি কোনও কারণে টেররিস্টদের কাছাকাছি পৌঁছে যেতাম, তারা তাদের গুলি-বন্দুক নিয়ে আমাকে সসম্মানে স্বাগত জানাত৷ তবে গৌরাঙ্গ জানতই না যে আসলে আমি টেররিস্টদের সন্ধান করছি৷ এটা আমার মস্ত বড় সুবিধে ছিল৷’
‘আচ্ছা, এই ভবতোষ ধাড়ার ব্যাপারটা একটু খুলে বল তো৷ একে তোর কেন সন্দেহ হল?’
‘প্রথম দিন থেকেই ভবতোষ ধাড়াকে একটু বানানো চরিত্র মনে হচ্ছিল৷ মানে, এই ইচ্ছে করে বেশি বেশি কথা বলা৷ বোকা বোকা কথা বলা, সবটাই কেমন যেন সিনেমার চরিত্রের মতো লাগছিল৷ আমি ভাবছিলাম, বাস্তবে এরকম হয় নাকি? তারপর হঠাৎ ভবতোষ তার ভাইয়ের গল্প বলতে গিয়ে খুব সিরিয়াস হয়ে গেল৷ সেটাও আমার বেশ নাটকীয় মনে হয়েছিল৷ ভাবলাম এই লোকটার ব্যাপারে খোঁজ নিতে হবে৷ খোঁজ নিয়ে জানলাম তারাগেঁড়িয়া গ্রামে কোনও ধাড়া পরিবার থাকে না৷ মনে হয়, গুগল ম্যাপ দেখে তারাগেঁড়িয়া নামটা ভবতোষ সিলেক্ট করেছিল৷’
‘ইব্রাহিম মাসুদের সম্বন্ধে ভবতোষ ধাড়ার দেওয়া তথ্যগুলো কিন্তু জেনুইন৷’ এস টি এফ-এর এক কর্তা বললেন৷
‘সে তো বটেই৷ গৌরাঙ্গর মতোই ভবতোষও চাইছিল এই অঞ্চলে মাসুদের ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাক৷ সেটাই স্বাভাবিক কারণ গৌরাঙ্গ এবং ভবতোষ একই দলের লোক৷ তাই মাসুদকে ডোবানোর জন্যে ভবতোষ জেনুইন তথ্য তো দেবেই৷ কিন্তু প্রশ্ন হল, এত জেনুইন তথ্য ভবতোষ পেল কোথায়? বস্তুত, ভবতোষ যখন মাসুদের ব্যাপারে এত বিস্তারিত তথ্য আমাদের দিল, তখনই তাকে আমার সন্দেহ হয়েছিল৷ একজন সাধারণ সিকিউরিটি গার্ডের কাছে এত তথ্য আসার কথা নয়৷ অবশ্য জিনিসটাকে বিশ্বাসযোগ্য করার জন্য ভবতোষ একটা গল্প ফেঁদেছিল যেটা আমি পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারিনি৷’
‘আমার একটা প্রশ্ন আছে৷’ গৌতম বলল৷
‘আমারও একটা প্রশ্ন আছে৷’ এস টি এস-এর সেই কর্তা বললেন৷
আবার চা এসেছে৷ সেই পটে করে দার্জিলিং চা৷ ভবতোষের দেওয়া তথ্যের মতোই জেনুইন৷ সঙ্গে ক্রিম ক্র্যাকার৷ চা ঢালাঢালি করতে কিছু সময় ব্যয় হল৷ দু’জন বেয়ারা চা দিয়ে চলে যাবার পর আদিত্য বলল, ‘এবার প্রশ্নগুলো শুনি৷ সাধ্যমতো উত্তর দেবার চেষ্টা করছি৷’
‘আমার প্রশ্ন, ভবতোষ এই তথ্যগুলো পেল কোথায়?’ এস টি এফ-এর কর্তাটি জিজ্ঞেস করলেন৷
‘সঙ্গত প্রশ্ন৷ আপনারা তো জানেন হীরালাল রাজসাক্ষী হতে রাজি হয়েছে৷ হীরালালের প্রসঙ্গে ডিটেলে পরে আসব৷ আপাতত বলি, হীরালালের কাছ থেকে জানা গেছে, ভবতোষের গল্পটা পুরোপুরি মিথ্যে নয়৷ কিছু বছর আগে রাইভাল গ্যাং-এর একটি মেয়ে মাসুদের গ্যাং-এর একটি ছেলের সঙ্গে ভাব জমিয়ে মাসুদদের অনেক তথ্য জোগাড় করেছিল৷ তথ্যগুলো রাইভাল গ্যাং-এর মাফিয়া বস সীতারাম সাহুর কাছে পাচারও হয়ে গিয়েছিল৷ কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি৷ মেয়েটি এবং তার প্রেমিক দুজনেই ধরা পড়ে যায় এবং মাসুদের লোক তাদের খুন করে লাশ গায়েব করে দেয়৷ তবে খুন হয়ে যাওয়া প্রেমিক ভবতোষের কেউ ছিল না৷ গল্পটা ভবতোষ সীতারামের কাছ থেকে শুনেছিল৷ সীতারাম যখন ভাবছিল ওই তথ্যগুলো কেমন করে পুলিশের কাছে পৌঁছে দেবে, তখন ভবতোষ তার কাছে গিয়ে বলে সে ওই তথ্যগুলো কিনে নিতে চায়৷ তার সঙ্গে মাসুদের পুরোনো দুশমনি আছে৷ সে নিজে তথ্যগুলো পুলিশের হাতে তুলে দেবে৷ এইভাবে এভিডেন্সগুলো ভবতোষের হাতে পৌঁছে যায়৷’
আদিত্য থামল৷ গৌতমের দিকে তাকাল৷ গৌতম বলল, ‘আমার প্রশ্ন হল, ভবতোষ কেন সরাসরি তথ্যগুলো গৌরাঙ্গর হাতে তুলে দিল না? গৌরাঙ্গ তথ্যগুলো পেলে লালবাজারে পৌঁছে দিতে পারত৷’
‘এটার কারণ, লালবাজারে গৌরাঙ্গর ততটা জানাশোনা ছিল না৷ তবে এটা সে জানত যে লালবাজারে ইব্রাহিম সাহেবেরও লোক আছে৷ ফলে যার-তার হাতে তুলে দিলে তথ্যগুলো ভুল লোকের কাছে চলে যাবার সম্ভাবনা৷ তার থেকে অনেক নিরাপদ আদিত্য মজুমদারের মাধ্যমে ইনফর্মেশনগুলো গৌতম দাশগুপ্তর হাতে তুলে দেওয়া৷’
‘আমারও একটা প্রশ্ন আছে৷’ এক অবাঙালি এস টি এফ কর্তার গলা শোনা গেল যিনি মোটামুটি বাঙলা বলতে পারেন এবং এতক্ষণ যিনি চুপ করে ছিলেন৷ ‘শুনেছিলাম লালবাজারের ভেতর একজন মোল আছে যে টেররিস্টদের সাহায্য করছে৷ তাই যদি হয় তাহলে গৌরাঙ্গ ইনফর্মেশনটা সরাসরি তার হাতে তুলে দিল না কেন?’
‘এটা নিয়ে আমিও ভেবেছি৷ উত্তরটা সম্ভবত এই যে মোলটা ঠিক কে সেটা গৌরাঙ্গর জানা ছিল না৷ এটা ছিল টপ সিক্রেট৷ টেররিস্ট দলের একেবারে উচ্চতম দু’একজন কর্তা লালবাজারের সেই ব্যক্তিটির পরিচয় জানত যাদের গৌরাঙ্গ চিনত না৷ তাছাড়া সম্ভবত খুব দরকার ছাড়া এই মোলটির সঙ্গে যোগাযোগ করা নিষিদ্ধ ছিল৷’
‘তোর কাছে সব কিছুরই উত্তর আছে৷’ গৌতম মুচকি হাসল৷
চায়ের কাপে শেষ চুমুকটা দিয়ে আদিত্য আবার বলতে শুরু করল৷
‘ভবতোষ ধাড়ার ব্যাপারটা ভাল করে বলি৷ ভবতোষ ধাড়ার আসল নাম সম্ভবত অন্য কিছু৷ ভবিষ্যতে নিশ্চয় তার আসল নাম জানা যাবে৷ আমরা তাকে ভবতোষ ধাড়া বলেই রেফার করব৷ মুখার্জিবাবু, মানে শান্তি মুখার্জি, মিলিটারি থেকে রিটায়ার করার পর একটা সিকিউরিটি কোম্পানি খুলেছিল৷ আমার অনুমান, কোম্পানিটা একেবারেই চলত না৷ কোনও এক সময় ভবতোষ ধাড়ার সঙ্গে তার পরিচয় ঘটে৷ ভবতোষ তাকে বলে, যদি মুখার্জিবাবুর কোম্পানি টেররিস্টদের সামান্য সাহায্য করতে রাজি হয় তা হলে তার আর টাকা-পয়সার চিন্তা থাকবে না৷ মুখার্জিবাবু রাজি হয়ে যায়৷’
‘কী ধরনের সাহায্য?’ বাঙালি এস টি এফ কর্তার গলা৷
‘সাহায্য মানে কয়েকটা কাজ করে দেওয়া৷ মুখার্জিবাবুর শিল্ড সিকিউরিটিজ যেসব বাড়িতে সিকিউরিটি সাপ্লাই দেয় সেসব জায়গায় বিক্রির জন্য ফ্ল্যাট পাওয়া যাচ্ছে কিনা সেটা জানতে এবং জানাতে হবে৷ যেসব হাইরাইজগুলোতে বিক্রির জন্য ফ্ল্যাট পাওয়া যাচ্ছে সেগুলোতে একটা করে ফ্ল্যাট কিনবে দুবাই বসবাসকারি এক ভদ্রলোক৷ এই কেনাবেচার ব্যাপারে মুখার্জিবাবুর কোম্পানি মধ্যস্থতা করবে৷ ফ্ল্যাটগুলি কেনা হয়ে গেলে তার একটিতে টেররিস্টরা থাকবে, অন্যগুলি ফাঁকা পড়ে থাকবে৷ যেটাতে টেররিস্টরা রয়েছে সেটি পাহারা দেবে সিকিউরিটির ছদ্মবেশে ভবতোষ ধাড়া৷ কোনও গড়বড় দেখলে সে টেররিস্টদের সাবধান করে দেবে৷ একই সঙ্গে সাবধান করে দেবে গৌরাঙ্গকে যার কাজ উগ্রপন্থীদের স্থানীয় পুলিশের দৃষ্টি থেকে আড়াল করে রাখা৷
‘আমরা খোঁজ নিয়ে জেনেছি সব সুদ্ধু চারটে ফ্ল্যাট কিনে রেখেছিল ওই দুবাইবাসী৷ তার মধ্যে ত্রিবর্ণা এবং সাউথভিল হাউসিং-এ কোনও না কোনও সময় টেররিস্টরা থাকত৷ যেখানে টেররিস্টরা থাকত সেখানকার গেটে ডিউটি করত ভবতোষ ধাড়া৷ টেররিস্টরা ফ্ল্যাটের বাইরে বেরোত না৷ ফ্ল্যাটটা ভাড়া নিত দুটি মেয়ে৷ ভাড়াটে হিসেবে লোকে তাদেরই চিনত৷’ গৌতম তার সহকর্মীদের জানাল৷
‘নেহাত কপাল জোরে মেয়ে দুটির পাশের ফ্ল্যাটের বাসিন্দা লোলিতমোহন ভট্টাচার্যর সঙ্গে আমার আলাপ হয়ে যায়৷ তাঁর কথা থেকে আমার মেয়ে দুটির ব্যাপারে সন্দেহ হয়৷ মেয়ে দুটি কারও সঙ্গে মেশে না কেন? তারা অত বেশি বাজার করে কার জন্যে? মেয়ে দুটির পেছনে আমি আমার প্রাইভেট আই বিমলকে লাগিয়ে দিই৷ বিমলও আশেপাশের বাজারে খোঁজ নিয়ে জানতে পারে দুজন মেয়ের আন্দাজে মেয়ে দুটি শাক-সব্জি, মাছ-মাংস কিনত অনেক বেশি৷’ আদিত্য আবার বলতে শুরু করেছে৷
‘ভবতোষের ওপর কেন সন্দেহ হল আগেই বলেছি৷ এবার বলি গৌরাঙ্গকে কেন সন্দেহ করতে শুরু করলাম৷ যেদিন প্রথম গৌরাঙ্গর বাড়ি গেলাম, দেখলাম গৌরাঙ্গর বাড়িটা খুবই সাদামাটা, একটা দেড় কামরার ফ্ল্যাট, একজন সৎ সাব-ইন্সপেক্টারের বাড়ি যেরকম হওয়া উচিত৷ কিন্তু ওর টেবিলের ওপরে একটা পুরোনো স্ট্যাম্পের খাতা দেখে চোখ কপালে উঠে গেল৷ যারা জানে না, তারা বুঝতে পারবে না, কিন্তু গৌরাঙ্গর দুর্ভাগ্য, ছোটবেলায় আমিও ওর মতো স্ট্যাম্প-পাগল ছিলাম৷ বয়েস বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমার পাগলামিটা অবশ্য অনেকটাই চলে গেছে, কিন্তু স্ট্যাম্প বাজারের খবর এখনও কিছুটা রাখি৷ আমি দেখলাম, স্ট্যাম্পের খাতাটা দেখতে পুরোনো হলেও তাতে বেশ কয়েকটা অতি দুষ্প্রাপ্য স্ট্যাম্প রয়েছে৷ তার মধ্যে রয়েছে ১৯৪৮ সালের ভুলক্রমে ‘সারভিস’ লেখা মহাত্মা গান্ধির স্ট্যাম্প, যা বাজারে একশটার বেশি নেই, যার প্রত্যেকটার দাম ছ’সাত কোটি টাকা৷ এছাড়া রয়েছে ভারত তথা এশিয়ার প্রথম স্ট্যাম্প যা সিন্ধু প্রদেশ থেকে ১৮৫২ সালে প্রকাশিত হয়েছিল, যাতে সাহেবি বানানে লেখা আছে Shinde Dawk অর্থাৎ সিন্ধু প্রদেশের ডাক৷ এই আধ আনা স্ট্যাম্পের এখন বাজারদর ষাট-সত্তর লাখের কম হবে না৷ আছে ১৯২৬ সালের পঞ্চম জর্জের ডাক টিকিট যাতে ছাপাখানার ভূতের দৌরাত্মে পঞ্চম জর্জের ছবিটাই উধাও হয়ে গিয়েছিল৷ এটার দামও কুড়ি-পঁচিশ লাখ হবে৷ এক ঝলক দেখে মনে হল, স্ট্যাম্প খাতাটার দাম সব মিলিয়ে দশ কোটির কম হবে না৷ একজন সাব-ইন্সপেক্টারের সংগ্রহে দশ কোটি টাকার স্ট্যাম্প! আমি খুবই অবাক হয়ে গেলাম কিন্তু মনের বিস্ময় মনের মধ্যেই লুকিয়ে রাখলাম৷ দ্বিতীয় দিন গৌরাঙ্গর বাড়ি গিয়ে দেখলাম স্ট্যাম্প খাতাটা আর টেবিলের ওপর নেই৷’
‘কিন্তু আপনি আর গৌরাঙ্গ তো একসঙ্গে অ্যাট্যাকড হয়েছিলেন৷ এটা কি টেররিস্টরা করেনি?’ বাঙালি এস টি এফ জিজ্ঞেস করলেন৷
‘টেররিস্টরাই করেছিল৷ এবং পুরোটাই সাজানো৷ কেন বলছি৷ গুলিগুলো জানলার কাচ ভেঙে ওপরদিকে চলে যাচ্ছিল, একবারও নীচের দিকে নামছিল না৷ গ্রেনেড ফাটার আগে গৌরাঙ্গই বলল বাথরুমে আশ্রয় নিতে কারণ ও জানত গ্রেনেডের স্প্রিনটার বাথরুমে পৌঁছবে না৷ গ্রেনেড ফাটার কিছু আগে গৌরাঙ্গর মোবাইলটা বেজে উঠেছিল৷ ওটা একটা সিগনাল৷ ওটা বার্তা দিল যে এবার গ্রেনেড ফাটবে৷ নিরাপদ আশ্রয়ে যাও৷ আরও আছে৷ গ্রেনেড ফাটার পর আমরা যখন বাথরুমে অপেক্ষা করছিলাম তখন গৌরাঙ্গর ঘুম পাচ্ছিল৷ গৌরাঙ্গ হাই তুলছিল৷ এটা একেবারেই স্বাভাবিক নয়৷ তাছাড়া যে কোনও প্রোফেশানাল এই ধরনের অপারেশনের পরে নিজের চোখে দেখে নিতে চায় ভিকটিমরা মরল কিনা৷ সেই হিসেব করে আমি ধরে নিয়েছিলাম লোকগুলো কিছুক্ষণ পরে গৌরাঙ্গর বাড়িতে ঢুকবে৷ সেটা না করে পাঁচ মিনিটের মধ্যে গাড়িটা ফিরে গেল৷ যেন আমাদের শুধু ভয় দেখাতে এসেছিল৷ সব থেকে বড় কথা, আমরা যখন পুলিশ এসকর্টে গৌরাঙ্গর বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসছি, আমি লক্ষ করলাম গৌরাঙ্গ একবারও ওর স্ট্যাম্প খাতাটা খোঁজার চেষ্টা করল না৷ তার মানে ওটা ও আগে থেকেই অন্য কোথাও সরিয়ে রেখেছিল৷’
‘কিন্তু এই রকম একটা ফেক অ্যাট্যাক থেকে গৌরাঙ্গ বা ওর অ্যাসোসিয়েটসদের লাভটা কী হল?’ গৌতম বিভ্রান্ত৷
‘স্ট্যাম্প খাতাটা দেখার পর আমি যে গৌরাঙ্গকে সন্দেহ করতে পারি এটা ও আশঙ্কা করেছিল৷ তাই ফেক অ্যাট্যাক দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা যে ওর সঙ্গে টেররিস্টদের কোনও সম্পর্ক নেই৷ সেদিন অসাবধানবশত স্ট্যাম্প খাতাটা টেবিলের ওপর ফেলে রাখাটা গৌরাঙ্গর বড় একটা ভুল৷ আসলে গৌরাঙ্গ ওর পাপার্জিত সম্পত্তি ব্যাঙ্কে না রেখে কিংবা জমি-বাড়ি না কিনে দামি স্ট্যাম্পের মাধ্যমে রেখে দিয়েছিল৷ যাতে চট করে কেউ ওকে সন্দেহ করতে না পারে৷ তারপর গৌতম সেদিন বলল, ওদের কাছে খবর আছে লোকাল পুলিশের কেউ টেররিস্টদের সাহায্য করছে৷ লালবাজার ধরেই নিয়েছিল লোকটা অবিনাশ নন্দ, যেহেতু লোকাল মাফিয়াদের সাহায্য করার ব্যাপারে অবিনাশ নন্দের বদনাম ছিল৷ আমি কিন্তু একেবারে নিঃসন্দেহ হয়ে গেলাম এই লোকটা গৌরাঙ্গ ছাড়া আর কেউ হতেই পারে না৷’
‘বুঝলাম৷ কিন্তু আমরা এখনও তো অমিত দাসের খুন হওয়ার ব্যাপারটা বুঝতে পারলাম না৷ অমিত দাসের খুন হবার সঙ্গে গৌরাঙ্গ বা টেররিস্টদের যোগটাই বা কী?’ গৌতমের গলা শুনে মনে হয় সে এখনও বিভ্রান্ত৷
‘হ্যাঁ হ্যাঁ৷ সেই প্রসঙ্গে এবার আসি৷ আলিনা মাসুদ অমিত দাসের প্রেমে পড়েছিল৷ অমিত দেখতে ভাল, লেখাপড়ায় ভাল, কিন্তু তার প্রতি আলিনার টানের আসল কারণটা ছিল আলাদা৷ আলিনার বাবার ইচ্ছে ছিল দলের সেনাপতি হীরালাল রাঠোরের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দিয়ে হীরালালের হাতে দলের ভার তুলে দেবে৷ হীরালালের সঙ্গে সারা জীবন কাটানোটা আলিনার কাছে ছিল জেলখানার মতো৷ আলিনা ভেবেছিল অমিত ওকে সেই জেলখানা থেকে বার করে নিয়ে যেতে পারবে৷ অমিতের আগে আলিনার সঙ্গে সম্পর্ক ছিল সিরাজুলের৷ কিন্তু আলিনা বুঝতে পেরেছিল ইব্রাহিম মাসুদের বিরুদ্ধে যাবার মতো দম সিরাজুলের নেই৷ তাই সে সিরাজুলকে পরিত্যাগ করেছিল৷ এটা নিয়ে সিরাজুলের চাপা ক্ষোভ ছিল৷ আবার ভাই মুসলমান মেয়ে বিয়ে করেছে বলে দাদা অনিল দাসেরও কম রাগ ছিল না৷ সিরাজুল বা অনিল দাসও অমিতকে খুন করতে পারত৷ দুজনেই বেশ লম্বা৷ আর খুনি যে লম্বা সেটা অমিতের মাথার ওপরের ক্ষতটা দেখেই বোঝা গিয়েছিল৷ তবে সবাই যেন ধরেই নিয়েছিল অমিত দাসকে খুন করিয়েছে ইব্রাহিম মাসুদ৷’
‘তোর কেন মনে হল ইব্রাহিম মাসুদ অমিত দাসকে খুন করায়নি?’ গৌতম জিজ্ঞেস করল৷
‘আমি ভেবে দেখলাম আলিনাকে তার বাবা তো বাড়িতেই আটকে রেখেছিল৷ তা হলে অমিতকে খুন করার কী দরকার? অবশ্য আলিনা এবং অমিত পালিয়ে যাবার প্ল্যান করেছিল৷ কিন্তু সেই প্ল্যান তো আলিনার বাবা জানতে পেরেছিল৷ প্ল্যান ভেস্তে দেবার জন্যে আলিনার ওপর নজরদারিটা বাড়ানোই যথেষ্ট ছিল, অমিত দাসকে খুন করানোর প্রয়োজন ছিল না৷ ইব্রাহিমের গুন্ডারা একবার অমিতকে খুব মেরেছিল৷ কিন্তু সেটার কারণ ছিল আলাদা৷ আসলে ঘটনাগুলো কালানুক্রমিকভাবে বললে ব্যাপারটা বুঝতে সুবিধে হবে৷ ঘটনাগুলো যেমন ঘটেছিল আমি পরপর বলে যাচ্ছি৷
‘কলেজের ফার্স্ট ইয়ারে আলিনার সঙ্গে সিরাজুলের ভাব হল৷ সেকেন্ড ইয়ারে সেই সম্পর্কটা ভেঙে গিয়ে সিরাজুলের জায়গা নিল অমিত দাস৷ আলিনা আর অমিতের সম্পর্কটা ক্রমশ গভীর হতে লাগল, এতটাই যে একটা সময় তারা রেজিস্ট্রি করে বিয়েটা সেরে নেয়৷ এর কিছুদিন পরে আলিনা প্রেগনেন্ট হয়ে পড়ে এবং দুজনে আলোচনা করে ঠিক করে বাচ্চাটা তারা অ্যাবর্ট করবে৷ সেই অনুযায়ী একদিন সকালে আলিনা গোপনভাবে নার্সিং হোমে ভর্তি হয় এবং অ্যাবরশান করিয়ে বিকেলে বাড়ি ফিরে আসে৷ তার সঙ্গে ছিল শুধুমাত্র তার স্বামী অমিত দাস৷ কিন্তু গোপনীয়তা রক্ষা করার জন্য যতই সাবধান তারা হোক না কেন ব্যাপারটা আলিনার বাবা জানতে পেরে যায়৷ সেই রাত্তির থেকে আলিনার বাড়ির বাইরে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেল৷ এবং এর দু’এক দিন পরে ইব্রাহিমের গুন্ডারা গিয়ে অমিতকে প্রচণ্ড মারধোর করল৷ এই মারধোরটা বলা যেতে পারে ইব্রাহিম মাসুদের রাগের বহিঃপ্রকাশ৷’
‘ইব্রাহিম মাসুদ কি অমিতকে একেবারে মেরে ফেলতে চেয়েছিল?’ গৌতমের প্রশ্ন৷
‘আমার মনে হয় না৷ অমিতকে মারার হলে খুব সহজেই মেরে ফেলা যেত৷ এমনকি কষ্ট দিয়ে মারার হলেও তার জন্যে আলাদা ব্যবস্থা নেওয়া যেত৷ এগুলোর কোনওটাই হয়নি৷ আসলে ইব্রাহিমের একটা আশঙ্কা ছিল তার মেয়ের কেচ্ছাটা হয়তো হীরালালের কানে উঠবে৷ তখন হীরালাল আলিনাকে বিয়ে করার ব্যাপারে বেঁকে বসতে পারে৷ সেরকম ঘটলে শেষ পর্যন্ত হয়তো অমিত দাসের হাতেই আলিনাকে তুলে দিতে হবে৷ তাই ইব্রাহিম অমিতকে মারেনি৷
‘কার্যত সেটাই হল৷ আলিনার ব্যাপারটা হীরালাল জানতে পারল৷ যে লোকটা আলিনার ওপর নজর রাখত, সে-ই আলিনার নার্সিং হোমে ভর্তি হয়ে অ্যাবরশান করানোর খবরটা এনেছিল৷ সে-ই আবার খবরটা হীরালালকে দিয়েছিল৷ এর পরে হীরালালের সঙ্গে ইব্রাহিমের সম্পর্কে চিড় ধরে৷ হীরালাল আলিনার প্রেমে পড়ে গিয়েছিল৷ খবরটা পাবার পর তার মোহভঙ্গ হল৷ তার মনে হল ইব্রাহিম তার দাগি মেয়েটাকে গছাতে চাইছে৷ হীরালাল এবং ইব্রাহিমের মধ্যে সম্পর্ক খারাপ হবার হয়তো অন্য কারণও ছিল৷ যাই হোক, হীরালালকে যখন বলা হল তার এবং তার বসের বিরুদ্ধে পুলিশের হাতে প্রচুর এভিডেন্স আছে, যেগুলো ভবতোষের কাছ থেকে পুলিশ পেয়েছিল, তখন হীরালাল সহজেই রাজসাক্ষী হতে রাজি হয়ে যায়৷’
‘এবার খুনটার কথা বল৷’ গৌতম অধৈর্য হয়ে উঠেছে৷
‘আমি সম্ভাব্য তালিকা থেকে সিরাজুল এবং অনিলকে বাদ দিতে পারছিলাম না৷ দুজনেরই মোটিভ ছিল৷ অমিত সিরাজুলের কাছ থেকে আলিনাকে ছিনিয়ে নিয়ে গিয়েছিল, আর অনিল দাসের ছিল ধর্মীয় উন্মাদনা৷ প্রথম জন চাপা স্বভাবের, দ্বিতীয় জনের উগ্র স্বভাব৷ কিন্তু তীব্র আবেগের বশবর্তী হয়ে খুন, যাকে ফরাসীরা বলে ক্রাইম অফ প্যাশান, দুজনের কারও পক্ষেই অসম্ভব ছিল না৷ তবে এই দুজনের একজন খুনি হলে ধরে নিতে হতো টেররিস্টদের সঙ্গে খুনের কোনও সম্পর্ক নেই৷ অনিলের সঙ্গে টেররিস্টদের যোগাযোগ অসম্ভব আর সিরাজুলদের বাড়িটা এতটাই খোলামেলা যে ওখানে টেররিস্টদের পক্ষে লুকিয়ে থাকা সম্ভব নয়৷
‘তারপর তদন্ত করতে গিয়ে নেহাতই ভাগ্যক্রমে জানতে পারলাম দুটি মেয়ে খুনের ঘটনার ঠিক পরে পরেই ত্রিবর্ণা থেকে উধাও হয়ে গেছে৷ এটা কাকতালীয় হতে পারে না৷ আজকালকার মেয়েরা, বিশেষ করে যারা চাকরি করতে বাইরে বেরোচ্ছে, তারা অত ভিতু নয়৷ তাছাড়া ইচ্ছে করলেই রাতারাতি অরেকটা জায়গায় বাড়ি ভাড়া পাওয়া যায় না৷ মনে হল, মেয়ে দুটির কভারে টেররিস্টরাই এখানে লুকিয়েছিল৷ খুন হবার পর এখানে পুলিশ আসবে, নানা রকম তদন্ত হবে, তাই এখানে থাকাটা নিরাপদ নয়, এইসব ভেবে মেয়ে দুটি এবং তাদের সঙ্গে সঙ্গে টেররিস্ট তিনজন রাতের অন্ধকারে পালিয়ে গেল৷ লোলিতমোহনবাবুর সঙ্গে কথা বলে আমার সন্দেহ গাঢ় হল৷
‘তার মানে ত্রিবর্ণাতে টেররিস্টরা থাকত এবং সম্ভবত অমিত দাস তাদের দেখে ফেলেছিল৷
‘আলিনা গৃহবন্দী হয়ে যাবার পর থেকে, আলিনা কখন বারান্দায় এসে দাঁড়াবে এই আশায়, অমিত আলিনাদের বাড়ির পেছনের জঙ্গলে সারাদিন বসে থাকত৷ কিন্তু জঙ্গলের ওই জায়গাটা থেকে শুধু যে আলিনাদের বারান্দাটা দেখা যেত তাই নয়, পাশের বাড়ির করিডোরটাও দেখা যেত যে বাড়িতে তখন তিনজন টেররিস্ট লুকিয়ে ছিল৷ চায়ের দোকানে রোজ অমিতকে দেখে ভবতোষের আগেই সন্দেহ হয়েছিল৷ একদিন অমিতকে ফলো করে ভবতোষ অমিতের গোপন আস্তানায় পৌঁছে গিয়ে দেখে ওখান থেকে টেররিস্টদের ফ্ল্যাটের মেন এন্ট্রান্সটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে৷ অমিত ঠিক কী দেখেছিল বা যা দেখেছিল তার কী অর্থ করেছিল আমরা কোনও দিনই জানতে পারব না৷ কিন্তু ভবতোষ ভাবল, হয়তো টেররিস্টদের ওপর নজর রাখার জন্যে অমিত ওখানে বসে থাকে৷ হয়তো অমিত ওই ফ্ল্যাটটাতে টেররিস্টদের দেখেছে৷ হয়তো ভবতোষকেও অনেকবার ওই ফ্ল্যাটে ঢুকতে দেখেছে৷ কিংবা টেররিস্টদের দলের কাউকে কাউকে দেখেছে যারা রাত্তিরের দিকে ওই ফ্ল্যাটটাতে আসত৷ ভবতোষ ঠিক করল, অমিতকে খুন করতে হবে৷ অমিত লম্বা-চওড়া জোয়ান৷ তাকে একা কব্জা করা ভবতোষের পক্ষে শক্ত৷ তাই কাজটা সে গৌরাঙ্গকে করতে বলে৷’
‘তুই এতটা শিয়োর হলি কী করে যে গৌরাঙ্গই খুনটা করেছে?’
‘প্রথমত আমি ভাগ্যক্রমে মার্ডার ওয়েপনটা গৌরাঙ্গর ফ্ল্যাটে দেখতে পাই৷ একটা হাতুড়ি যা দিয়ে গৌরাঙ্গ টেবিলের পেরেক ঠুকছিল৷ আমার স্থির বিশ্বাস, ওটাকে ফরেনসিক করলে অমিত দাসের রক্তের ট্রেস পাওয়া যাবে৷ কিন্তু এটা আসল এভিডেন্স নয়৷ আসল এভিডেন্স হল একটা সিসি ক্যামেরার ফুটেজ৷ ক্যামেরাটা ইব্রাহিম মাসুদের বাড়ির পাঁচিলে লাগানো ছিল৷ ওটা দেখাশোনা করত হীরালাল৷ খুনের সময় বেশ কয়েকটা দিন হীরালাল কলকাতায় ছিল না৷ ফিরে এসে পুরোনো ফুটেজটা আর তার দেখা হয়নি৷ নিরাপত্তার কারণে, পুরোনো ফুটেজগুলো এক্সটারনাল হার্ড ডিস্কে সেভ করা থাকত৷ আমাদের কথায় মাসুদের বাড়ি থেকে সে ওই দিনের ফুটেজটা নিয়ে আসে৷ তাতে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে গৌরাঙ্গ পেছন থেকে এসে অমিতের মাথায় হাতুড়ি মারছে৷ এরপর আর কোনও এভিডেন্স-এর দরকার নেই৷’
‘আর একটা প্রশ্ন৷’ গৌতম বলল৷ ‘ইব্রাহিম মাসুদ অবিনাশ নন্দকে দিয়ে অমিত দাসের কেসটা ধামাচাপা দিতে চাইছিল কেন?’ তোকেও তো কেসটা থেকে সরে যেতে বলেছিল৷’
‘একটাই কারণ৷ মাসুদ ভয় পেয়েছিল কেসটা ইনভেস্টিগেটেড হলে তার মেয়ের প্রেগনেন্ট হওয়া এবং অ্যাবরশান করানোর কেচ্ছা সকলে জেনে যাবে৷ এইসব পারিবারিক কলঙ্ক সবাই জানুক এটা মাসুদ একেবারেই চায়নি৷’
গৌতম খনিকক্ষণ চুপ করে রইল৷ তারপর বলল, ‘আমার সব প্রশ্নেরই উত্তর পেয়ে গেলাম৷ এটাও নিশ্চয় পরিষ্কার যে, গৌরাঙ্গ যাতে সাবধান না হয়ে যায় তার জন্য ফলস অ্যারেস্টগুলো করে সেই খবর তাকে দেওয়া হয়েছিল৷ অ্যারেস্টগুলো আরও করতে হয়েছিল যাতে লালবাজারে কোনও মোল থাকলে সেও বিভ্রান্ত হয়৷ অনার কিলিং-এর গল্পটা তুই-ই গৌরাঙ্গের মাথায় ঢুকিয়েছিলি৷ আমার একটাই কথা বলার আছে৷ ব্রাভো, আদিত্য মজুমদার ব্রাভো৷’
গৌতমকে খুশি-খুশি দেখাচ্ছে৷ সে একগাল হেসে বলল, ‘সেন্ট্রাল গভরমেন্ট তাদের ওই রিওয়ার্ডটা তোকে না দিয়ে পারবে না রে৷’
আটমাস পরে, শ্রাবণ মাসের এক বৃষ্টি-ভেজা রবিবারের সন্ধেবেলায়, আদিত্যর সদর দরজার কলিং বেলটা বেজে উঠল৷ রান্নার মাসি দরজা খুলেছে৷
‘দাদার সঙ্গে কারা সব দেখা করতে এয়েচে৷’ রান্নার মাসি হাঁক পেড়ে রান্নাঘরে ফিরে গেল৷
শোবার ঘর থেকে আদিত্য বেরিয়ে এসে দ্যাখে সিরাজুল, সঙ্গে ইলিনা৷ কী সুন্দর দেখাচ্ছে ইলিনাকে৷ সিরাজুলকেও খুব ঝলমলে আর হাসিখুশি দেখাচ্ছে৷ কেয়াকে ডেকে তার সঙ্গে সিরাজুল আর ইলিনার আলাপ করিয়ে দিল আদিত্য৷
একটু পরে সিরাজুল লাজুক গলায় বলল, ‘আগামী ২২শে আগস্ট আমরা বিয়ে করছি আদিত্যবাবু৷ সকালে বিয়ে, রাত্তিরে সামান্য খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা৷ আমাদের নরেন্দ্রপুরের বাড়িতে৷ বউদিকে নিয়ে আসতেই হবে৷’ পাশ-ব্যাগ থেকে একটা নিমন্ত্রণ-পত্র বার করে সিরাজুল টেবিলের ওপর রাখল৷ ‘আমি হয়ত একাই আসতাম৷ ইলিনা বলল আমার সঙ্গে আসবে৷’
ইলিনা মুখ তুলেছে৷ কিছু বলবে৷
‘আপনার কাছে আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই৷ এই কথাটা জানানোর জন্যে এলাম৷ আপনার জন্যে আবার নতুন করে বাঁচতে পারছি৷’ কথাগুলো বলে ইলিনা মাথা নিচু করল৷ যেন ওই কয়েকটা কথা বলার পরিশ্রমে সে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে৷
সিরাজুল-ইলিনা চলে যাবার পর অমিত দাসের কথা আদিত্যর বারবার মনে হচ্ছিল৷
মার্চ-এপ্রিল, ২০২৩
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন