কবরখানা

অভিরূপ সরকার

সকাল থেকে এলোমেলো হাওয়া৷ মেঘ৷ গতকাল রাত্তিরে দু’এক পশলা বৃষ্টি হয়েছিল৷ রাস্তা ভিজে রয়েছে৷ আবার বৃষ্টি নামবে মনে হয়৷ আদিত্য জানলা দিয়ে তাকিয়ে ছিল৷ মাস দুয়েক তার হাতে তেমন কাজ নেই৷ তবু রোজ আপিসে গিয়ে বসে৷ অনেকক্ষণ হল কেয়া স্কুলে বেরিয়ে গেছে৷

বৃষ্টি নামল৷ আদিত্য ভাবছিল এবার বেরোনোর জন্যে তৈরি হতে হবে, বৃষ্টি দেখে আবার বসে পড়ল৷ ভাবল, এক কাপ কফি খেয়ে বেরোবে৷ গ্যাস জ্বালিয়ে সবে কেটলিটা বসিয়েছে, পাশের ঘর থেকে মোবাইলটা বেজে উঠল৷

সাড়া দিতেই ওপার থেকে নারীকণ্ঠ৷ একটু কেটে কেটে কথাগুলো আসছে৷

‘আমি কি প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর আদিত্য মজুমদারের সঙ্গে কথা বলছি?’

‘হ্যাঁ, আমি আদিত্য মজুমদার বলছি৷ বলুন কী দরকার?’

‘আমি খুব বিপদের মধ্যে আছি......’

কথাগুলো কেটে গেল৷ ‘ঠিক শুনতে পাচ্ছি না৷’ আদিত্য গলাটা একটু তুলে বলল৷

‘আমার খুব বিপদ৷ ভীষণ বিপদ৷ আপনার সঙ্গে দেখা করতে পারি?’

‘অবশ্যই৷ কবে দেখা করতে চান?’

‘যত তাড়াতাড়ি সম্ভব৷ আপনার সময় হলে আজই৷ সময় হবে আপনার?’

‘ঠিক আছে৷ আমার অফিসে দুপুর আড়াইটে নাগাদ চলে আসুন৷’

‘কোথায়...’

কথার মাঝখানে ফোনটা কেটে গেল৷ মোবাইলের কানেকশনগুলো দিনে দিনে খারাপ হয়ে যাচ্ছে৷ বিরক্ত লাগে৷ আদিত্য ওই নম্বরটায় ফোন করতে যাচ্ছিল, ফোনটা নিজের থেকেই আবার বেজে উঠল৷ সেই নারীকণ্ঠ৷

‘ফোনটা কেটে গেল৷ আমি বলছিলাম, আপনার অফিসটা কোথায়? শুনতে পাচ্ছেন?’ এবার বেশ পরিষ্কার কথাগুলো আসছে৷

‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, এবার শুনতে পাচ্ছি৷ আমার অফিসটা বউবাজার স্ট্রিটে৷ মানে, এখন যার নাম বিপিনবিহারী গাঙ্গুলি স্ট্রিট৷ আপনি কোন দিক থেকে আসবেন?’

‘আমার বাড়ি নরেন্দ্রপুরে৷ রামকৃষ্ণ মিশন ছাড়িয়ে৷ আপনি একটু আপনার অফিসে যাবার ডিরেকশনটা দেবেন?’

‘আপনি বাইপাস দিয়ে এসে মা ফ্লাইওভারটা ধরার চেষ্টা করুন৷ তা হলে জ্যাম পাবেন না৷ ফ্লাইওভার থেকে নেমে রেস কোর্সের সামনের রাস্তাটা দিয়ে সোজা বিবাদী বাগ চলে আসুন৷ রাইটার্স বিল্ডিং-এর সামনে দিয়ে বউবাজারে ঢুকুন৷ ওদিক দিয়ে তখন ঢুকতে দেবে৷ মানে বউবাজারের ট্র্যাফিক ফ্লো-টা তখন পশ্চিম থেকে পুব দিকে৷ চিত্তরঞ্জন এভিনিউ ক্রসিং আসার ঠিক আগে বাঁ দিকে পড়বে বিনানি ম্যানসন৷ পাঁচতলা বাড়ি৷ ওই বাড়ির দোতলায় আমার অফিস৷ বাড়িতে ঢোকার মুখে দেখবেন একজন সিকিউরিটি বসে আছে৷ ওর নাম শ্যামল৷ ওকে আমার নাম বললেই অফিসটা দেখিয়ে দেবে৷ বোঝা গেছে?’

‘মোটামুটি বুঝতে পেরেছি৷ অসুবিধে হলে আপনাকে ফোন করে নেব৷ আপনি শুধু আপনার অফিসের ঠিকানাটা হোয়াটসঅ্যাপ করে দিন৷’

‘করে দিচ্ছি৷ তাহলে আড়াইটের সময় আপনি চলে আসছেন?’

‘আসছি৷ এসে সামনা-সামনি আমার প্রবলেমটা বলব৷ রাখছি তাহলে?’

ফোন রেখে আদিত্য দ্রুত দাড়ি কামাল৷ স্নান সারল৷ হাতে সময় আছে৷ তবু তাড়াতাড়ি পৌঁছে যাওয়া ভাল৷ ক্লায়েন্ট বলে কথা৷ মহার্ঘ্য বস্তু৷ তার বাড়ি থেকে শ্যামবাজার মেট্রো স্টেশন হেঁটে মিনিট সাতেক৷ সেন্ট্রাল স্টেশনে নেমে আপিস আরও মিনিট পাঁচেক৷ তবে মেট্রো আসতে কতক্ষণ লাগবে কেউ বলতে পারে না৷

‘আমি ভীষণ বিপদে পড়ে আপনার কাছে এসেছি৷’ ভদ্রমহিলার গলাটা বিপন্ন শোনাল৷

আদিত্য পূর্ণ দৃষ্টিতে মহিলার দিকে তাকিয়েছে৷ এই নিয়ে দ্বিতীয়বার৷ কোনও মহিলার দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে তার সংকোচ হয়৷ সে মহিলার ওপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে টেবিলের ওপর রাখল৷

‘কফি খাবেন?’ আদিত্য জিজ্ঞেস করল৷

‘কফি?’ ভদ্রমহিলা একটু হকচকিয়ে গেছেন৷ বোধহয় ভাবছেন আদিত্য তাঁকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে না৷’

‘মানে, বলছিলাম, কফি খেতে খেতে ভাল করে আপনার কথা শুনব৷ আপনি ভীষণ উত্তেজিত হয়ে আছেন৷ আগে ঠান্ডা হয়ে বসুন৷’

আদিত্য কফি করার জন্য উঠে দাঁড়াল৷ ‘আপনি কফিতে দুধ-চিনি খান?’

‘ব্ল্যাক কফি৷ দুধ-চিনি ছাড়া৷’ ভদ্রমহিলা একটু ইতস্তত করে বললেন৷

কফি করতে করতে আদিত্য ভদ্রমহিলাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিল৷ বয়েস কত হবে? পঁয়ত্রিশ-ছত্রিশ? নাকি আর একটু বেশি? অবশ্যই চল্লিশের নীচে৷ স্বাস্থ্যবতী তবে স্থুলাঙ্গী বোধহয় কেউ বলবে না৷ রং ঈষৎ চাপা৷ মুখশ্রীতে আকর্ষণ আছে৷ বড়-বড় চোখ৷ সরু করে আঁকা দুটি ভুরুর মাঝখানে বড় টিপ৷ মেয়েরা সাধারণত যত বড় টিপ পরে তার থেকে বড়৷ কানে ঝুমকো, নাকে নাকছাবি, ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক৷ ভদ্রমহিলার বিপন্নতার সঙ্গে সাজগোজটা ঠিক মানাচ্ছে না৷

‘এবার বলুন আপনার সমস্যাটা কী৷ সবার আগে আপনার নাম, পরিচয়৷’ আদিত্য দু’কাপ কফি হাতে নিয়ে টেবিলে ফিরে এসেছে৷

‘আমার নাম অর্পিতা, অর্পিতা লাহিড়ি৷ হোমমেকার৷ বাড়ি নরেন্দ্রপুরে৷ আমার সমস্যা হল, আমার স্বামী আমাকে খুন করার চেষ্টা করছে৷’ এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলে অর্পিতা লাহিড়ি দম নেবার জন্য থামলেন৷

‘আপনার স্বামী আপনাকে খুন করার চেষ্টা করছেন? কী করে বুঝলেন আপনার স্বামী আপনাকে খুন করার চেষ্টা করছেন?’ আদিত্য ঠান্ডা গলায় জিজ্ঞেস করল৷

‘আমরা নিজেরা পছন্দ করে বিয়ে করেছিলাম৷ সন্তান হয়নি৷ আমার স্বামী বুবাই আমাদের পাড়ারই ছেলে৷ ভাল নাম অরিজিৎ লাহিড়ি৷ আমারই বয়সি৷ আমরা আগে ভবানীপুরে থাকতাম৷ বছর খানেক হল আমাদের সম্পর্কটা একেবারে তলানিতে এসে ঠেকেছে৷ এতটাই যে, অরিজিৎ আজকাল আমাকে প্রায়ই ভয় দেখায়, সে আমাকে খুন করে নিজে সুইসাইড করবে৷ একটা পিস্তলের লাইসেন্স নিয়ে পিস্তল কিনেছে৷ আমার খুব ভয় করে৷’

‘কেন আপনাদের সম্পর্কটা তলানিতে ঠেকল? কিছু হয়েছিল?’

‘কিছুই হয়নি৷ সমস্যাটা বুবাইকে নিয়ে৷ ওর সন্দেহ বাতিক৷ যত বয়েস বাড়ছে তত বাতিকটা বাড়ছে৷ আমাকে সারাক্ষণ সন্দেহ করে৷ আমি কোথায় যাচ্ছি, কেন যাচ্ছি, কখন ফিরব এসব নিয়ে নানা প্রশ্ন৷ খিটিমিটি৷ মাঝে মাঝে আমারও রাগ হয়ে যায়৷ আমি উত্তর দিই না৷ তাতে বুবাই-এর সন্দেহ আরও বেড়ে যায়৷’

‘বিশেষ কোনও কারণে কি আপনার স্বামী আপনাকে সন্দেহ করে? বিশেষ কোনও ব্যক্তি কি এই ব্যাপারে ইনভলভড?’ আদিত্য একটু কুন্ঠিতভাবে প্রশ্ন করল৷ তারপর খানিকটা কৈফিয়ত দেবার ভঙ্গিতে বলল, ‘বুঝতেই পারছেন, এসব ক্ষেত্রে একজন তৃতীয় ব্যক্তি সাধারণত থাকে৷ আপনাকে সাহায্য করতে গেলে পুরো ছবিটা আমাকে স্পষ্টভাবে জানতে হবে৷’

অর্পিতা লাহিড়ি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল৷ তারপর আস্তে আস্তে বলল, ‘হ্যাঁ, পুরো ছবিটা তো আপনাকে জানতেই হবে৷ আমি বলছি৷ আমার একজন পুরোনো বন্ধু আছে৷ সে বুবাই-এরও পুরোনো বন্ধু৷ বুবাই যেমন আমার পাড়ার বন্ধু, এ-ও তাই৷ একে নিয়েই বুবাই আমাকে সন্দেহ করে৷ অথচ বিশ্বাস করুন আমাদের মধ্যে বন্ধুত্ব ছাড়া আর কিচ্ছু নেই৷ কোনও দিন ছিলও না৷ তাছাড়া আমার একটা এন জি ও আছে৷ আমরা আদিবাসীদের মধ্যে কাজ করি৷ ফলে আমাকে মাঝে মাঝে কলকাতার বাইরে রাত্তির কাটাতে হয়৷ সেটা নিয়েও বুবাই আমাকে সন্দেহ করে৷

‘আপনার বন্ধুর সঙ্গে কি আপনার এখনও নিয়মিত দেখা হয়? যদি হয়, তাহলে বলতে হবে আপনার স্বামীর সন্দেহের কিছু কারণ আছে৷’

‘আমার বন্ধু কাল্টুর কথা একটু বলি৷ কাল্টুর ভাল নাম শৌভিক গুপ্ত৷ কাল্টু ভাল চাকরি করে৷ কিন্তু ওর নেশা ওয়াইল্ড লাইফ ফোটোগ্রাফি৷ বিশেষ করে নানারকম পাখির ছবি তোলা ওর নেশা৷ বিয়ে করেনি৷ একটু ছুটিছাটা পেলেই ক্যামেরা নিয়ে সোজা কোনও জঙ্গলে পালিয়ে যায়৷ আগে ওর সঙ্গে অতটা দেখা হত না৷ তবে নিয়মিত টেলিফোনে কথা হত৷ এখন, যত বুবাই আমার থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, তত আমার একটা আশ্রয় দরকার হচ্ছে৷ আমি ততই কাল্টুর সঙ্গে মেলামেশা বাড়িয়ে যাচ্ছি৷ কিন্তু আবার বলছি, কাল্টুর সঙ্গে আমার প্রেমের কোনও সম্পর্ক নেই৷ কোনও দিন ছিলও না৷ আমরা খুব ভাল বন্ধু৷ কাল্টু এখনও আমাদের সেই পুরোনো পাড়াতেই থাকে৷ ওখানে গেলে আমার মন ভাল হয়ে যায়৷ তাছাড়া কাল্টু সঙ্গে থাকলে আমি খুব শান্তিতে থাকি৷’

‘আপনার দাম্পত্য সমস্যার কথা আপনি আপনার বন্ধুকে বলেছেন?’

‘একটু বলেছি৷ পুরোটা বলিনি৷ কাল্টু হয়তো কিছুটা আন্দাজ করতে পারে৷ আসলে এসব কথা বলতে আমার খুব সংকোচ হয়৷ কাল্টু জানে আমার স্বামী কাজ নিয়ে খুব ব্যস্ত থাকে বলে আমাকে সময় দিতে পারে না৷ আর তাই নিয়ে সমস্যা৷’

‘আপনার স্বামী কি সত্যিই খুব ব্যস্ত থাকেন? কী করেন আপনার স্বামী?’

‘আমার স্বামীর একটা ব্যবসা আছে৷ এটা ওর পৈত্রিক ব্যবসা৷ বুবাই ওর বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান৷ আমার শাশুড়ি অনেকদিন মারা গেছেন৷ শ্বশুরমশাই মারা গেছেন বছর পাঁচেক হল৷ এখন বুবাই-ই ব্যবসাটা দ্যাখে৷’

‘উনি কি ব্যবসা নিয়ে খুব ব্যস্ত থাকেন?’

‘কিছুটা ব্যস্ততা তো আছেই৷ আগে মাথার ওপর আমার শ্বশুর ছিলেন৷ তাই ওর দায়িত্বটা কম ছিল৷ এখন পুরোটাই ওর ঘাড়ে৷’

‘আপনার স্বামীর ব্যবসার অবস্থা কেমন? মানে, আপনার শ্বশুরমশাই মারা যাবার পর আপনার স্বামী কেমন চালাচ্ছেন?’

অর্পিতা লাহিড়ি কিছুক্ষণ চিন্তা করলেন৷ বোধহয় বুঝে উঠতে পারছেন না একজন বাইরের লোককে পারিবারিক ব্যবসার কথা কতটা বলা উচিত৷

তার মনের ভাবটা আন্দাজ করে আদিত্য বলল, ‘আমার কাছে প্লিজ কিছু লুকোবেন না৷ আপনাকে সাহায্য করতে গেলে আমার পুরোটা জানা দরকার৷ আর আমার ডিস্ক্রিশান-এর ব্যাপারে আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন৷’

‘আমার স্বামীর ব্যবসার অবস্থা ভাল নয়৷’ অর্পিতা লাহিড়ির গলায় অপার বিষণ্ণতা৷ ‘আমার শ্বশুরমশাই-এর বাবার ছিল প্লাইউডের কারখানা৷ একটা নরেন্দ্রপুরে, একটা নর্থ বেঙ্গলে, বালুরঘাটের কাছে৷ শ্বশুরমশাই যখন বেঁচে ছিলেন তখনও কারখানা দুটো খুব ভাল চলত৷ আমার স্বামীর হাতে আসার পর থেকে কারখানাগুলোর অবস্থা খারাপ হতে আরম্ভ করল৷ এখন বালুরঘাটের কারখানাটা বন্ধ হয়ে গেছে৷ নরেন্দ্রপুরেরটা কোনও রকমে টিকে আছে৷’

‘এটা কেন হল? আপনার স্বামীর কি ব্যবসায় মন নেই?’

‘না, না৷ মন খুবই আছে৷ একটু বেশি মাত্রাতেই আছে৷ বুবাই-এর সমস্যা হল ওর মেজাজ৷ রেগে গেলে ও মানুষকে মানুষ জ্ঞান করে না৷ আর খুব অল্পতে রেগেও যায়৷ এত মেজাজ দেখালে কি লেবারদের ম্যানেজ করা যায়? আমার শ্বশুরমশাইকে কখনও রাগতে দেখিনি৷ ঠান্ডা মেজাজে ইউনিয়নের নেতাদের উনি চমৎকার হ্যান্ডেল করতে পারতেন৷ আমার স্বামী প্রথমেই রেগে ওঠে৷ যত ওর ব্যবসার অবস্থা খারাপ হচ্ছে তত ওর রাগ বাড়ছে৷ লেবার ট্রাবল-এর ফলে বালুরঘাটের কারখানাটা বন্ধ হয়ে গেল৷ নরেন্দ্রপুরেও গোলমাল লেগে রয়েছে৷’

‘এই যে বলছেন আপনার স্বামীর ব্যবসা ভাল চলছে না, এর ফলে আপনাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার কি কোনও ব্যাঘাত ঘটেছে? মানে, আগের তুলনায় আপনাদের স্ট্যানডার্ড অফ লিভিং কি নেমে গেছে?’ আদিত্য সাবধানে জিজ্ঞেস করল৷ তারপর বলল, ‘আসলে সংসারে অভাব থাকলে অনেক সময় স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কটা খারাপ হয়ে যায়, তাই জিজ্ঞেস করছি৷’

‘আমাদের স্ট্যানডার্ড অফ লিভিং অনেকটাই নেমে গেছে৷ ভবানীপুরের অত বড় বাড়িটা বিক্রি হয়ে গেছে৷ আমার শ্বশুর-শাশুড়ি আমাকে অনেক গয়না দিয়েছিলেন৷ সেই গয়নাগুলো সবই গেছে৷ বুবাই এক-এক করে সেগুলো আমার কাছ থেকে নিয়ে, বাঁধা দিয়ে টাকা ধার করেছিল৷ না হলে নাকি ওয়ার্কারদের প্রভিডেন্ড ফান্ডের টাকা জমা দেওয়া যেত না৷ বুবাইকে জেলে যেতে হত৷ পরে আর গয়নাগুলো ছাড়ানো যায়নি৷ এখন আমরা নরেন্দ্রপুরে যে বাড়িটায় থাকি সেটা বুবাই-এর ঠাকুরদাদা করেছিলেন৷ বড় বাগানবাড়ি৷ সেটাও মর্টগেজ দিয়ে বুবাই ব্যাঙ্ক থেকে টাকা ধার করেছে৷ আমাদের আর কিছুই নেই৷ বিশেষ করে গয়নাগুলোর জন্যে খারাপ লাগে৷ অনেক পুরুষের গয়না৷ ফ্যামিলি এয়ারলুম৷ কয়েকটা প্রেশাস স্টোন ছিল, রুবি, এমারেল্ড, ডায়মন্ড— সেগুলো খুবই দামি৷’ বলতে বলতে অর্পিতা লাহিড়ির গলাটা ধরে এসেছে৷

আদিত্য কিছুক্ষণ চুপ করে রইল৷ ঠান্ডা হয়ে যাওয়া কফির শেষটুকু এক ঢোঁকে গলায় ঢেলে দিয়ে বলল, ‘আপনার কি মনে হয় ব্যবসা চলছে না বলে আপনার স্বামী আপনার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করছে? মানে, ব্যবসা না চলার স্ট্রেসটা আপনাদের সম্পর্কটাকে নষ্ট করে দিচ্ছে?’

‘আপনি একদম ঠিক জায়গাটা ধরতে পেরেছেন৷ আগে, যখন আমাদের আর্থিক অবস্থা খুব ভাল ছিল, তখন বুবাই বদারই করত না আমি কোথায় যাচ্ছি, কী করছি৷ যত ও প্রোফেশানালি আনসাকসেসফুল হচ্ছে তত আমার ব্যাপারে পজেসিভ হয়ে উঠছে৷ হয়তো ডিপ ইনসাইড ওর একটা ইনসিকিওরিটি কাজ করছে৷ হয়তো ভাবছে আমি ওকে অপদার্থ মনে করছি৷ ওকে অপদার্থ মনে করে অন্য পুরুষের দিকে ঝুঁকছি৷ এটা কিন্তু সম্পূর্ণ ওর মন গড়া৷’

‘আপনি আপনার স্বামীকে বোঝাবার চেষ্টা করেছেন?’

‘করিনি আবার? কত চেষ্টা করেছি, কত দিন ধরে চেষ্টা করেছি৷ চেষ্টা করে করে এখন আমি আশা ছেড়ে দিয়েছি৷ বুবাই যদি কোনও সাইকিয়েট্রিস্ট-এর সাহায্য নিত, ভাল হত৷ কিন্তু সেটা ও কিছুতেই করবে না৷ তাও ওর মেজাজ, খামখেয়ালিপনা সব আমি মেনে নিতাম, কিন্তু ইদানীং বুবাই ভীষণ ভায়োলেন্ট হয়ে যাচ্ছে৷’

‘ভায়োলেন্ট মানে? আপনার গায়ে হাত তুলছে?’

‘না৷ আমার গায়ে বুবাই এখন অবধি হাত তোলেনি৷ কিন্তু মাঝে মাঝেই ভয় দেখায় অ্যাসিড দিয়ে আমার মুখটা পুড়িয়ে দেবে৷ পেট্রল দিয়ে আমার শরীরটা জ্বালিয়ে দেবে৷ বলে, যে সুন্দর মুখটা দেখিয়ে তুমি তোমার বন্ধুকে অ্যাট্র্যাক্ট করছ, যে সুন্দর শরীরটা দিয়ে তুমি তোমার বন্ধুকে সিডিউস করছ, আমি সেই মুখটা পুড়িয়ে দেব, সেই শরীরটা জ্বালিয়ে দেব৷ এইসব কথা বলতে বলতে ওর মুখ-চোখের চেহারা বদলে যায়৷ মনে হয়, হয়তো সত্যি-সত্যি একদিন ও এসব ভয়ানক কাণ্ড করে বসতে পারে৷’

‘বন্ধু মানে কি আপনাদের সেই পুরোনো বন্ধু কাল্টু, মানে শৌভিক গুপ্ত?’

‘হ্যাঁ৷ ও ছাড়া আর কে হবে?’

‘আচ্ছা, আপনি বলছিলেন না আপনার স্বামী একটা পিস্তল কিনেছেন? সেটা কী কাজে লাগে?’

‘যখন লেবার ট্রাবল-এর ফলে বালুরঘাটের কারখানাটা বন্ধ হয়ে গেল তখন ইউনিয়নের লোকেরা বুবাইকে প্রায়ই ভয় দেখাত৷ বলত ওকে প্রাণে মেরে ফেলবে৷ সেই সময় বুবাই পিস্তলের লাইসেন্স নিয়ে পিস্তলটা কিনেছিল৷ এখন আর মনে হয় না কেউ বুবাইকে মেরে ফেলার ভয় দেখাচ্ছে৷ এখন ওই পিস্তলটা দিয়ে বুবাই আমাকে ভয় দেখায়৷’

‘কী বলে ভয় দেখায়? আপনাকে গুলি করবে?’

‘না, না৷ আমাকে গুলি করবে না৷ নিজেকে গুলি করবে৷ সুইসাইড করবে৷ আসলে আজকাল বুবাই খুব ডিপ্রেশনে ভোগে৷ খুব ড্রিঙ্কও করে৷ ড্রাঙ্ক অবস্থায় পিস্তলটা বার করে সামনে রাখে৷ বলে ওর মতো একজন অপদার্থ মানুষের বেঁচে থাকার কোনও অধিকার নেই৷ ওর মরে যাওয়াই উচিত৷ তবে মরে যাবার আগে ও আমার মুখটা অ্যাসিড দিয়ে পুড়িয়ে দিয়ে যাবে৷ বাড়িটাকে আমার একটা কবরখানা মনে হয়৷’

‘আপনাদের বাড়িতে কি অ্যাসিড বা ওই জাতীয় কিছু আছে?’

‘থাকলেও আমি জানি না কোথায় আছে৷’

আদিত্য ড্রয়ার থেকে সিগারেট-দেশলাই বার করল৷ বলল, ‘আমি একটা সিগারেট খেলে কি আপনার খুব অসুবিধে হবে?’

‘খান, খান৷ আমার কোনও অসুবিধে হবে না৷ আমার স্বামী একজন চেন স্মোকার৷ আমি সিগারেটের ধোঁয়ায় ইমিউনড হয়ে গেছি৷’

আদিত্য উঠে গিয়ে জানলাটা খুলে দিল৷ আকাশে ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘ৷ নীচে কর্মব্যস্ত বউবাজার স্ট্রিট৷ সার সার ফার্নিচারের দোকান৷ একটা-দুটো ঘড়ির দোকান৷ রেস্টোরেন্ট৷ মোগলাই পরোটা ভাজার গন্ধ ভেসে আসছে৷ আদিত্য টেবিলে ফিরে এসে সিগারেট ধরাল৷ ঘরের ভেতর কয়েক পাক পাইচারি করল৷ সে গভীরভাবে চিন্তা করছে৷

‘আপনি পুলিশের কাছে গিয়েছিলেন?’ আদিত্য চেয়ারে বসে প্রশ্ন করল৷

‘না যাইনি৷ কিন্তু গেলেই বা কী বলতাম৷ আমাকে বুবাই তো এখন অবধি কোনওরকম ফিজিকাল অ্যাসল্ট করেনি৷ ও যে আমাকে ভয় দেখায় তারও তো কোনও প্রমাণ নেই৷ পুলিশ বলবে সবই আমার কল্পনা৷ আমি পুলিশকে ভালমতো চিনি৷ ওরা সব সময় কাজ কমাতে চায়৷’

‘আপনি ঠিকই বলেছেন৷ পুলিশ আপনাকে এই স্টেজে খুব একটা সাহায্য করতে পারবে না৷ প্রোটেক্ট করতেও পারবে না৷ শুধু আপনার মুখের কথায় কেউ আপনার বাড়িতে পাহারা বসাবে না নিশ্চয়৷ কিন্তু আমিই বা আপনাকে কীভাবে প্রোটেক্ট করব? আমি তো আর আপনার বাড়িতে ঢুকে বসে থাকতে পারব না৷ আপনার স্বামীই আমাকে মেরে তাড়িয়ে দেবে৷ তা হলে আপনি আমাকে কী করতে বলছেন?’

‘আমি আপনার কাছে খুব স্পেসিফিক একটা রিকোয়েস্ট নিয়ে এসেছি৷’ অর্পিতা লাহিড়ির গলায় আর কোনও উত্তেজনা নেই৷ ‘আমি আর বুবাই-এর সঙ্গে থাকতে পারছি না৷ আমি ডিভোর্স চাই৷ কিন্তু বুবাই কিছুতেই আমাকে ডিভোর্স দিতে রাজি হবে না৷ আমার একমাত্র উপায় ওর বিরুদ্ধে হিউম্যান ক্রুয়েল্টির চার্জ প্রমাণ করা৷ কিন্তু শুধু আমার মুখের কথায় তো ক্রুয়েল্টি প্রমাণ হবে না৷ সলিড এভিডেন্স চাই৷ আপনি আমাকে সেই এভিডেন্স জোগাড় করে দেবেন৷ এর জন্যে যা ফি লাগে আমি আপনাকে দেব৷ বাপের বাড়ি থেকে কিছু টাকা আমি ইনহেরিট করেছি৷’

‘শুনুন, টাকার কথা পরে হবে৷ আপনি আগে আমাকে বলুন আপনি কী ধরনের এভিডেন্স চান? এবং সেটা কীভাবে আমাকে জোগাড় করতে বলছেন?’

‘দেখুন কী এভিডেন্স জোগাড় করবেন, কীভাবে জোগাড় করবেন সেসব আপনার ব্যাপার৷ আমি শুধু একটা সাজেশন দিতে পারি৷ আমাদের বাড়ির বাগান থেকে বসার ঘরটা পরিষ্কার দেখা যায়৷ কোনও কোনও সন্ধেবেলা বুবাই বসার ঘরে বসে ড্রিঙ্ক করে৷ করতে করতে ও মাত্রা ছাড়িয়ে যায়৷ তখন ও ভায়োলেন্ট হয়ে উঠে আমাকে অ্যাবিউস করে৷ ও ভায়োলেন্ট হয়ে উঠে আমাকে অ্যাবিউস করতে শুরু করলে আপনাকে তার একটা ভিডিও তুলতে হবে৷ বাগান থেকে বসার ঘরের ভিডিও তুলবেন৷ আমি জানলাটা খুলে রাখব যাতে অডিও নিতে অসুবিধে না হয়৷ আর যেদিন সন্ধেবেলা বুবাই ড্রিঙ্ক করতে বসবে আমি আপনাকে খবর দিয়ে দেব৷ আপনি ঘণ্টা খানেকের মধ্যে চলে এলেই হবে৷ নেশা চড়তে বুবাই-এর ঘণ্টা খানেক লেগে যায়৷ আবার এমন হতে পারে আপনি যেদিন এলেন সেদিন বুবাই-এর নেশা চড়লই না৷ ও ডিনার সেরে ঘুমিয়ে পড়ল৷ সেরকম হলে আপনাকে আরেক দিন আসতে হবে৷ কিংবা আরও এক দিন৷ তবে আমার ধারণা খুব বেশিবার আপনাকে আসতে হবে না৷’

আদিত্য হতভম্ব হয়ে গেছে৷ কী বলবে ভেবে পাচ্ছে না৷ এরকম লুকিয়ে-চুরিয়ে ফটো তোলার কাজ সে আগে কখনও করেনি৷ তাৎক্ষণিকভাবে আর কিছু বলার না পেয়ে সে বলল, ‘আমি কী করে ভিডিও তুলব? আমার তো ভাল ক্যামেরাই নেই৷’ কথাটা বলেই তার মনে হল এটা খুব বোকা বোকা কথা হয়ে গেল৷ আজকাল তো মোবাইলেই ভিডিও তোলা যায়৷

‘আপনাকে বিশ্বাস করে একটা ক্যামেরা আমি দেব৷ একটু পুরোনো, তবে কাজ চলে যাবে৷ কাজ হয়ে গেলে আপনি ফেরত দিয়ে দেবেন৷ ক্যামেরাটা আমি কারো হাত দিয়ে পাঠিয়ে দেব৷ আমার পক্ষে এখানে বারবার আসাটা বিপদজনক৷ বুবাই নানাভাবে আমার ওপর নজর রাখে৷ আমি একজন প্রাইভেট ডিটেকটিভের কাছে এসেছি জানতে পারলে আমাকে মেরেই ফেলবে৷’

আদিত্য ভাবছিল কাজটা নেবে কিনা৷ কাজটা ভাল নয়৷ কিন্তু এদিকে দু’মাস তার হাতে কোনও কাজ নেই৷ সঞ্চয় ফুরিয়ে আসছে৷ এবার কেয়ার কাছে হাত পাততে হবে৷ বসে না থেকে কিছু একটা করা দরকার৷ সে বলল, ‘ঠিক আছে৷ আপনার কাজটা আমি নিলাম৷ কিন্তু তার আগে আমার দুজনের ঠিকানা এবং ফোন নম্বর দরকার৷ এক, আপনার স্বামী অরিজিৎ লাহিড়ির৷ দুই, আপনার বন্ধু, শৌভিক গুপ্তর৷ এবং আপনাদের বালুরঘাট ও নরেন্দ্রপুরের কারখানার নাম ঠিকানা৷’

‘এসব ঠিকানা, ফোন নম্বর নিয়ে আপনি কী করবেন? এরা তো কেউ জানেই না আমি আপনার কাছে এসেছি৷ বুবাই জানতে পারলে তো অনর্থ করবে৷ আর কাল্টু এত অবাক হয়ে যাবে যে আমি নিজেই ভীষণ অপ্রস্তুত হয়ে পড়ব৷’

‘দেখুন, আপনার কাজটা করতে গেলে আমাকে কিছু খোঁজখবর নিতেই হবে৷ এটা ছাড়া আমি কাজটা করতে পারব না৷ হয়তো ইনভেস্টিগেট করতে গিয়ে আমি আপনার ফেভারে নতুন কোনও এভিডেন্সও পেয়ে যেতে পারি৷ তবে আপনাকে আমি গ্যারেন্টি দিচ্ছি আপনার স্বামী বা শৌভিকবাবু ঘূণাক্ষরেও টের পাবেন না আমি কে বা আসলে কী আমার উদ্দেশ্য৷ আপনি যদি আমার শর্তে রাজি থাকেন, তা হলেই আমি কাজটা নেব৷’ শেষের কথাগুলো আদিত্য বেশ জোর দিয়ে বলল৷

অর্পিতা লাহিড়ি অনেকক্ষণ ভাবলেন৷ তারপর বললেন, ‘ঠিক আছে আপনার শর্তে আমি রাজি৷ আপনার সঙ্গে আমি ল্যান্ডলাইনে যোগাযোগ রাখব৷ মোবাইলে নয়৷ আমার সন্দেহবাতিক স্বামী রেগুলার আমার মোবাইলটা চেক করে৷ এবং আমার পক্ষে ফিজিকালি এখানে আসা আর বোধহয় সম্ভব হবে না৷’

পরের একটা দিন আদিত্যর প্লাইউড কারখানা নিয়ে রিসার্চ করে কাটল৷ জানতে পারল, যমুনা নদীর ধারে হরিয়ানার যমুনানগরে প্লাইউড কারখানার সংখ্যা সব থেকে বেশি৷ কারণ নিকটবর্তী জঙ্গলগুলো থেকে এখানে কাঠের জোগান প্রচুর৷ আগে আসাম-মেঘালয়েও অনেক প্লাইউড কারখানা ছিল, সুপ্রিম কোর্টের একটা পরিবেশ সংক্রান্ত রায়ের ফলে তাদের অস্তিত্ব বিপন্ন৷ আরও জানতে পারল, প্লাইউড শিল্পে এখন টুঁটি-কাটা প্রতিযোগিতা চলছে৷ প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে বহু কারখানা উঠে যাচ্ছে, বিশেষ করে যাদের দূর থেকে কাঠ কিনে আনতে হয়৷

বিকেলে আদিত্য আপিসে বসে ইন্টারনেটে প্লাইউড উৎপাদনের খুঁটিনাটি দেখছে, একটা অল্পবয়সি ছেলে এসে একটা ব্যাগ দিয়ে গেল৷ বলল, অর্পিতা ম্যাডাম পাঠিয়েছেন৷ ছেলেটা চলে যেতে আদিত্য ব্যাগ খুলে দেখল একটা ক্যানন এস এল আর ক্যামেরা যার যৌবন চলে গেলেও আভিজাত্য চলে যায়নি৷ ক্যমেরার সঙ্গে একটা পুরোনো ইউজারস ম্যানুয়্যাল আর একটা মুখবন্ধ খাম৷ খামের মুখ খুলতে একটা নাম-ঠিকানা-ফোন নম্বর লেখা কাগজ বেরিয়ে পড়ল৷ বোঝাই যাচ্ছে, অর্পিতা লাহিড়ি মোবাইলে ওগুলো পাঠাতে চায়নি, পাছে ট্রেস থেকে যায়৷

সন্ধেবেলা বাড়ি ফিরে আদিত্য অরিজিৎ লাহিড়ির নম্বরটা লাগাল৷

‘হ্যালো৷’ ওপার থেকে বেশ জোরালো পুরুষকণ্ঠ৷

‘আমি কি অরিজিৎ লাহিড়ির সঙ্গে কথা বলছি?’

‘আমি অরিজিৎ লাহিড়ি৷ বলুন, কী দরকার৷’

‘আমার নাম আশিস মিত্র৷ আমি জানি বালুরঘাটে এস এল প্লাই-এর একটা কারখানা কিছুদিন বন্ধ হয়ে পড়ে রয়েছে৷’

‘হ্যাঁ, রয়েছে৷ কিন্তু তাতে আপনার কী?’ লোকটা যেন কোনও কারণে রেগে রয়েছে৷

‘আমি আপনার ওই কারখানাটা কিনতে চাই৷ আপনি কি ওটা বিক্রি করতে ইন্টারেস্টেড?’ আদিত্য কেজো গলায় বলল৷

‘আপনি বালুরঘাটের কারখানাটা কিনতে চান? কেন? ওটা তো কয়েক বছর বন্ধ হয়ে পড়ে আছে৷ যন্ত্রপাতিতে জং ধরে গেছে৷ তাছাড়া অনেক লায়েবিলিটি আছে যেগুলো না মেটালে আপনি কারখানাটা চালু করতে পারবেন না৷ তাও আপনি কারখানাটা কিনতে চান?’ বুবাই লাহিড়ি অবাক হয়ে গেছে৷

আদিত্যর মনে হল লোকটা বদমেজাজি হতে পারে, কিন্তু অসৎ নয়৷ না হলে কেউ নিজের কারখানার ওইভাবে নিন্দে করে না৷ বিশেষ করে খদ্দেরের কাছে৷ লোকটা কেন ব্যবসায় সুবিধে করতে পারেনি সেটা পরিষ্কার৷

আদিত্য কড়া গলায় বলল, ‘দেখুন আমার একটা বিজনেস প্ল্যান আছে যেটা আমি আপনার সঙ্গে আলোচনা করতে রাজি নই৷ আপনার সঙ্গে শুধু কারখানা বিক্রির শর্তগুলো অলোচনা করব৷ অবশ্য আপনি যদি কারখানা বিক্রি করতে রাজি থাকেন৷’

‘কারখানাটা আমার মাথার ওপর জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসে আছে৷ ওটাকে ঘাড় থেকে নামাতে পারলে বেঁচে যাব৷ কিন্তু মিথ্যে কথা বলে কারখানা বিক্রি করতে চাই না৷ তাই প্রথমেই সমস্যাগুলো বলে রাখলাম৷’ বুবাই লাহিড়ির গলার সুর কিছুটা নরম হয়েছে৷

‘কাল কি আপনার সময় হবে? তা হলে আপনার সঙ্গে দেখা করে ডিটেলগুলো আলোচনা করতে পারতাম৷ আমি হরিয়ানার যমুনানগরে থাকি৷ পরশু ফিরে যাব৷ কাল দেখা করতে পারলে ভাল হয়৷’

‘ঠিক আছে৷ আপনি কাল বারোটা নাগাদ আমার নরেন্দ্রপুরের কারখানায় চলে আসুন৷ সামনা-সামনি কথা হবে৷ আমি কারখানার ঠিকানাটা হোয়াটসঅ্যাপ করে দিচ্ছি৷ এটা কি আপনার হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর?’

‘হ্যাঁ, করে দিন৷ এটাই আমার হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর৷ ভাল হল৷ আপনার নরেন্দ্রপুরের কারখানাটা দেখা হয়ে যাবে৷ আপনার দুটো কারখানায় একই ধরনের মেশিনারি আছে কি?’

‘মোটামুটি একই ধরনের৷ বালুরঘাটের কারখানাটা আগে হয়েছে৷ তাই যন্ত্রপাতিগুলো আর একটু পুরোনো মডেলের, তবে একই টাইপ৷’

‘ওকে, তাহলে কাল দেখা হচ্ছে৷ নমস্কার৷’

‘আপনার নামটা আর একবার বলুন৷ গেটে বলে রাখব৷’

আদিত্যকে একটা গাড়ি ভাড়া করতে হল৷ হন্ডা সিটি৷ কারখানার ক্রেতা সাজতে গেলে কিছুটা ভড়ং তো দরকার৷ বারোটার একটু আগেই সে এস এল প্লাই-এর নরেন্দ্রপুরের কারখানায় পৌঁছে গেছে৷ পাঁচিল ঘেরা মস্ত বড় অঞ্চল৷ গেটে বলা ছিল৷ দরোয়ান জানাল, ভেতরে ঢুকে বাঁ দিকের রাস্তাটা ধরে কিছুটা এগোলেই কারখানা এবং অফিস৷ ডান দিকে গাছপালার মধ্যে একটা দোতলা বাড়ি চোখে পড়ল৷ আদিত্য জিজ্ঞেস করতে দরোয়ান বলল ওটা মালিকের বাংলো৷ আদিত্য ভাবল, ক্যামেরা নিয়ে যদি রাত্তিরের অন্ধকারে ঢুকতে হয় তা হলে পাঁচিল টপকাতে হবে৷ ব্যাপারটা বিশেষ সুখকর হবে না৷

দু’দিকে জঙ্গল হয়ে রয়েছে৷ জায়গাটা আর একটু যত্ন পেতে পারত৷ কারখানাটাও অনেক দিন রং করা হয়নি৷ তুলনায় আপিস বাড়িটা সামান্য ঝকঝকে৷

‘আপনি সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে যান৷ মিস্টার লাহিড়ি আপনার জন্যে অপেক্ষা করছেন৷’ রিসেপশনে বসে থাকা মেয়েটি বলল৷ কাছে-পিঠে আর কেউ নেই৷

সিঁড়ি দিয়ে উঠে একটা ভারী কাঠের দরজা৷ অনুমান করা যায় এক সময় পালিশ করা ছিল৷ এখন মলিন৷ দরজার ওপর ‘অরিজিৎ লাহিড়ি, সি ই ও’ কথাটা ইংরেজিতে লেখা আছে৷ ঘরটা বেশ বড়, সে তুলনায় আসবাব কম৷ তবে এক দিকে একপ্রস্ত সোফা-কাউচ আছে৷ অরিজিৎ লাহিড়ি আদিত্যকে দেখে উঠে দাঁড়াল৷ সুপুরুষ৷ বয়েস, মনে হয়, চল্লিশের কাছাকাছি৷ ইশারায় আদিত্যকে সোফায় বসতে বলল৷

মিনিট দশেক পরে, যখন টি পটে চা এসেছে, অরিজিৎ লাহিড়ি জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি পশ্চিমবঙ্গে ব্যবসা করতে চান কেন? আজকাল সকলেই তো পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে চলে যাচ্ছে৷’

‘আসলে কী জানেন, হরিয়ানায় যে কারখানাটা আমি চালাই সেটা আমার নিজের নয়৷ আমি ম্যানেজিং ডিরেক্টর, কিন্তু মালিক আলাদা৷ ছোটবেলা থেকেই এই লাইনে আছি৷ ভাবলাম, অভিজ্ঞতা তো কিছু হল, এবার নিজের ব্যবসা শুরু করার সময় হয়েছে৷ এখন, যমুনানগরে আপনি তো জানেন অনেকগুলো প্লাই ফ্যাক্টরি, প্রচণ্ড কমপিটিশন৷ বড় কোম্পানিগুলোর সঙ্গে আমি কমপিট করতেও পারব না৷ তাই ভাবলাম, নিজের দেশে ফিরে যাই৷ এখানকার লোকাল মার্কেটটা ধরবার চেষ্টা করি৷’

‘এখানেও কিন্তু কম্পিটিশন কম নয়৷ লোকাল ম্যানুফ্যাকচারার অনেক আছে৷’

‘আমার কিন্তু মনে হয় বালুরঘাট জায়গাটার কিছু অ্যাডভানটেজ আছে৷ ভিড়-ভাট্টা কম৷ কলকাতার তুলনায় ইউনিয়নবাজি কম৷ তাছাড়া নর্থ বেঙ্গল থেকে সহজে কাঠ পাওয়া যাবে৷ আপনি বালুরঘাটের কারখানাটা বন্ধ করে দিলেন কেন?’

বুবাই লাহিড়ি অনেকক্ষণ চুপ করে রইল৷ তারপর বলল, ‘আমার কপাল৷’

‘বুঝলাম না স্যার৷ কারখানাটা কিনতে গেলে আমাকে কিন্তু সব কিছু ভাল করে জানতে হবে৷’ আদিত্য বিরক্ত হবার ভান করল৷

‘আপনি ঠিকই বলেছেন৷ কারখানা বিক্রি করতে গেলে আমাকেও সব কথা খুলে বলতে হবে৷ আসল ব্যাপারটা হল, ব্যক্তিগত কারণে আমি কলকাতা ছেড়ে যেতে পারতাম না৷ একজনকে বিশ্বাস করে তার হাতে বালুরঘাটের কারখানার ভার দিয়ে এসেছিলাম৷ সে আমাকে ঠকিয়েছে৷ ঠকিয়েছে বললে কম বলা হবে, আমাকে সর্বস্বান্ত করে দিয়েছে৷ এমন কি এমপ্লয়িদের প্রভিডেন্ড ফান্ডের টাকাটাও জমা দেয়নি৷ সেই টাকাটা জোগাড় করতে গিয়ে আমাকে আমার ভবানীপুরের পৈত্রিক বাড়িটা পর্যন্ত বিক্রি করে দিতে হল৷’ অরিজিৎ লাহিড়িকে বিপর্যস্ত দেখাচ্ছে৷

‘মাফ করবেন যদি অতিরিক্ত কৌতূহল প্রকাশ করে ফেলি, কিন্তু আমি জিজ্ঞেস না করে পারছি না, কী এমন ব্যক্তিগত কারণ থাকতে পারে যাতে একটা পুরো ব্যবসা অন্য কারও হাতে ছেড়ে দিয়ে আপনি কলকাতায় বসে থাকবেন? আমি একটা ব্যবসা চালাই বলে জানি এটা জাস্ট করা যায় না৷ ব্যবসা লাইনে নিজের ভাইকেও কেউ পুরো বিশ্বাস করে না৷ এসব আপনিও নিশ্চয় জানেন৷ তাই আপনার কলকাতায় থাকার কমপালশানটা কী ছিল আমি সত্যিই বুঝতে পারছি না৷ আর সেটা বুঝতে না পারলে আপনার কারখানাটা আমি কেমন করে কিনব?’

অরিজিৎ লাহিড়ির চোয়াল শক্ত হল৷ মনে হয়, কী বলবে, কতটা বলবে এসব নিয়ে তার ভেতরে একটা তোলপাড় চলছে৷ কিছুক্ষণ নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করার পর সে বলল, ‘সমস্যাটা আমার স্ত্রীকে নিয়ে৷ আমার স্ত্রী ঠিক সুস্থ নয়৷ আমাকে তার কাছাকাছি থাকতে হয়৷ তাকে নজরে রাখতে হয়৷ এর বেশি আর কিছু বলা আমার পক্ষে সম্ভব নয়৷ আমার কারখানা আপনি কিনুন বা না কিনুন৷’

আদিত্য ইচ্ছে করে চুপ করে আছে৷ যেন কত চিন্তা করছে৷ শেষে সে বলল, ‘ঠিক আছে, আপনাকে আর ব্যক্তিগত প্রশ্ন করব না৷ আমি আপনার কারখানা কিনতে ইন্টারেস্টেড৷ কারখানার হিসেব-পত্তরগুলো দেখা যাবে? বিশেষ করে কত টাকা লায়েবিলিটি আছে সেটা জানতে চাই৷ আর মেশিন, বাড়ি এবং বিল্ডিং যা আছে তার ভ্যালুয়েশন৷’

‘আমি মোটামুটি একটা হিসেব তৈরি করে রেখেছি৷ আমার চিফ অ্যাকাউনটেন্টের সঙ্গে ঘণ্টাখানেক বসলে ও সবটা বুঝিয়ে দেবে৷’ অরিজিৎ লাহিড়ি টেবিলের ওপর রাখা বেলটা বাজাল৷

পরের একঘণ্টা আদিত্যর সংখ্যার গোলকধাঁধায় কাটল৷ হিসেব-পত্তর দেখা শেষ হলে সে আবার ফিরে এল অরিজিৎ লাহিড়ির ঘরে৷ ঘড়িতে তখন প্রায় দেড়টা৷

‘বালুরঘাট কারখানার হিসেব দেখলাম৷ কিছু কাগজ জেরক্স করে সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছি৷’ আদিত্য তার হাতের ফাইলটা দেখাল৷ ‘এটা আমার অ্যাকাউনটেন্টকে দেখাতে হবে৷ আমি ফিরে গিয়ে আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করব৷ পরের বার যখন আসব তখন বালুরঘাটে কারখানাটা দেখতে যাব৷ আজ তাহলে আসি৷’

‘না, না৷ এখনি কোথায় যাবেন? আমার বাড়িতে লাঞ্চের ব্যবস্থা করেছি৷ আপনি আজ দুপুরে আমাদের সঙ্গে লাঞ্চ খেলে খুব ভাল লাগবে৷ প্লিজ৷’

এভাবে বলার পর না বলার প্রশ্নই ওঠে না৷ তাছাড়া অর্পিতা লাহিড়ির বাড়িটাও দেখা হবে৷ অরিজিৎ লাহিড়ি লোকটাকে কিন্তু আদিত্যর মন্দ লাগছে না৷ শুধু একটা হালকা অস্বস্তি৷ অর্পিতা লাহিড়িকে তো বলা নেই সে এখানে আসছে৷ আদিত্যকে দেখলে অর্পিতা বেফাঁস কিছু করে বসবে না তো?

ক্রকারি, কাটলারি, শ্বেতপাথরের ডাইনিং টেবিল, ফুলদানিতে একটি হলদে গোলাপ এবং খাদ্যতালিকা সব কিছুতেই আভিজাত্যের ছাপ আছে, আধিক্য কোথাও নেই৷ আদিত্য মনে মনে লাহিড়ি পরিবারের রুচির প্রশংসা করছিল৷ তাকে দেখে গৃহকর্ত্রী ক্ষণেক চমকে উঠেছিল কি? উঠলেও প্রায় সঙ্গে সঙ্গে সামলে নিয়েছে৷ মানতেই হবে, অভিনয়টা অর্পিতা লাহিড়ির স্বাভাবিকভাবে আসে৷

‘এই ডালটা আমাদের বাড়ির স্পেশালিটি, হিং দিয়ে অড়হর ডাল৷ এটা মিনির নিজের রান্না৷ ডালটা মিস করবেন না৷ আর এই থোড়বাটাটাও স্পেশাল৷’ অরিজিৎ লাহিড়ি ভাতের বোলটা এগিয়ে দিতে দিতে বলল৷

মিনি লাহিড়ি, অর্থাৎ অর্পিতা, মৃদু গলায় বলল, ‘আমি প্রায় কিছুই ব্যবস্থা করতে পারিনি৷ আমার কর্তা আজ সকালে বললেন যে আপনি খাবেন৷ এই মফস্বলে চাইলেই তো সঙ্গে সঙ্গে সব কিছু পাওয়া যায় না৷ বাড়িতে যা ছিল তাই দিয়ে যেটুকু পেরেছি৷ তবে মাছটা খুব ফ্রেস৷ আমাদের পুকুরের৷ আজই ধরেছে৷’

রাইস বোলের ঢাকনা খুলতেই আশ্চর্য সুগন্ধে ঘরটা ভরে গেল৷ একেবারে প্রথম শ্রেণির বাসমতি৷ আদিত্য ভাবছিল, এরা কি রোজই এই রকম খায়? নাকি এসব কারখানার সম্ভাব্য ক্রেতার সম্মানার্থে? অর্পিতা লাহিড়ি বলেছিল তাদের জীবনযাত্রার মান পড়ে গেছে৷ এই যদি মান পড়ে যাবার নমুনা হয়, তা হলে আগে কী ছিল?

চমৎকার রান্না৷ আদিত্য খেতে খেতে অর্পিতার দিকে মুখ তুলে বলল, ‘এই সব রান্না কি আপনার?’

‘সব রান্না মিনি করেনি, তবে মিনির তদারকিতে হয়েছে৷ আমাদের একজন কুক আছে যাকে মিনি নিজের হাতে তৈরি করেছে৷ এখন তার মার্কেট ভ্যালু অনেক৷ তবে মিনির ব্যাপারে তার একটা বিরাট অ্যাট্যাচমেন্ট আছে বলে সে আমাদের ছেড়ে যায় না৷ মিনি শুধু নিজে ভাল রাঁধে তাই নয়, অন্যদেরও ভাল রাঁধার ব্যাপারে ইন্সপায়ার করতে পারে৷’ অর্পিতা লাহিড়ি উত্তর দেবার আগেই তার স্বামী বলল৷

‘তোমাকে তো এখনও রান্নায় ইন্সপায়ার করতে পারলাম না৷’ অর্পিতা লাহিড়ি তার স্বামীর দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল৷

‘মিনি ঠিক বলেছে৷ রান্না ব্যাপারটাতে আমি কোনও ইন্টারেস্ট পাই না৷ তবে খেতে খুব ভালবাসি৷’

আদিত্য ভাবছিল, এই দম্পতিকে তো আপাতদৃষ্টিতে স্বাভাবিকই লাগছে৷ তাহলে অর্পিতা বলল কেন তাদের সম্পর্কটা তলানিতে ঠেকেছে? হয়তো ওপর থেকে ঠিক বোঝা যায় না৷

মাছটা অসাধারণ৷ এত ফ্রেশ কাতলা মাছ আদিত্য বহুদিন খায়নি৷ চিকেনের প্রিপারেশনটাও অনবদ্য৷ আদিত্য ভাবছিল, আহা সে বা কেয়া যদি এরকম রাঁধতে পারত৷

‘আমাদের এখানে খুব টাটকা শাক-সব্জি পাওয়া যায়৷ মাছও ভালই পাওয়া যায়৷ শুধু মাটন কিনতে গেলে সেই কলকাতায় ছুটতে হয়৷ একটু রাইস বোলটা এগিয়ে দেবে?’ অভিজিত লাহিড়ির প্রথম কথাগুলো আদিত্যকে লক্ষ করে এবং শেষের কথাগুলো তার স্ত্রীর উদ্দেশে৷

আদিত্য খেতে খেতে ঘরটা দেখছিল৷ মস্ত বড় বসার ঘরের সংলগ্ন ঢাকা বারান্দায় খাবার ব্যবস্থা৷ সবুজ খসখস রোদ্দুরের হাত থেকে বারান্দাটাকে রক্ষা করছে৷ পায়ের তলায় পুরোনো আমলের কালো বর্ডার দেওয়া লাল মেঝে৷ এটা একতলা৷ বেডরুমগুলো নিশ্চয় দোতলায়৷

‘এই বাড়িটা কত পুরোনো?’ আদিত্য জিজ্ঞেস করল৷

‘তা প্রায় সত্তর বছর হবে৷ নরেন্দ্রপুরের ফ্যাকটারিটা তৈরি হয়েছিল নাইনটিন ফিফটি থ্রিতে৷ সেই সময় এই বাড়িটাও তৈরি হয়েছিল৷ ঠাকুরদা তৈরি করেছিলেন৷ বালুরঘাটের ফ্যাকটারির সঙ্গেও এরকম একটা বাড়ি আছে৷ সেটা অবশ্য অনেক দিন বন্ধ পড়ে রয়েছে৷ আপনি গেলে দেখতে পাবেন৷’

আদিত্য খেয়াল করছিল অর্পিতা লাহিড়ি কিছুক্ষণ ধরে অন্যমনস্ক হয়ে আছে৷ হঠাৎ সে বলে উঠল, ‘প্যান্থার কোথায়? প্যান্থারকে অনেকক্ষণ দেখতে পাচ্ছি না তো৷’

‘কোথায় আর যাবে? হয়তো বাগানে ঘুরছে৷’ অরিজিৎ লাহিড়ি হালকা গলায় বলল৷

‘না, না৷ এটা তো ওর খাবার সময়৷ ও তো এখন বাড়ির ভেতরেই থাকে৷ তোমরা খাও৷ আমি দেখি প্যান্থার কোথায় গেল৷’

‘মিনি, একজন অতিথি খাবার টেবিলে বসে আছেন৷ এই অবস্থায় তোমার উঠে যাওয়াটা ভাল দেখাচ্ছে না৷’ চাপা গলায় বললেও অরিজিৎ লাহিড়ির কথায় একটা ধমকের সুর ছিল৷

স্বামীর কথায় বিন্দুমাত্র কর্ণপাত না করে যে খাবার দিচ্ছিল তার দিকে তাকিয়ে অর্পিতা লাহিড়ি বলল, ‘এঁদের খাওয়া হয়ে গেলে টেবিল পরিষ্কার করে দেবে৷ আর ডেসার্টটা বসার ঘরে সার্ভ করবে৷’ তারপর একটু থেমে বলল, ‘প্যান্থার কোথায় গেল? প্যান্থারকে দেখেছ?’

‘মিনি, তুমি কিন্তু ভীষণ বাড়াবাড়ি করছ৷ ভীষণ বাড়াবাড়ি করছ৷’ অভিজিত লাহিড়ির গলা সপ্তমে৷

অর্পিতা লাহিড়ি ততক্ষণে ‘প্যান্থার, প্যান্থার’ বলে ডাকতে ডাকতে বাগানে বেরিয়ে গেছে৷

আবহাওয়া হঠাৎ ভারী হয়ে উঠেছে৷ আদিত্যর ভীষণ অস্বস্তি লাগছিল৷ সে বলল, ‘আমি আজ এগোব৷ কলকাতায় কয়েকটা কাজ বাকি আছে৷ ডেসার্টটা আর এক দিন হবে৷’

‘আই অ্যাম রিয়ালি সরি৷ বলেছিলাম না আমার স্ত্রী মানসিকভাবে একটু আনস্টেবল৷ না হলে কেউ একটা বেড়াল নিয়ে এত সিন ক্রিয়েট করে৷ ওয়াশরুমটা ডানদিকে৷’

আদিত্য হাতমুখ ধুয়ে বাথরুম থেকে বেরিয়ে দেখল অরিজিৎ লাহিড়ি বাইরেই অপেক্ষা করছে৷ আদিত্যর মনে হল অরিজিৎ লাহিড়িও চাইছে সে চলে যাক৷ স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের ফাটলটা কে-ই বা বাইরের লোকের সামনে দেখাতে চায়৷

‘আমি আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করব৷’ আদিত্য গাড়িতে উঠতে উঠতে বলল৷ অরিজিৎ লাহিড়ি উদ্বিগ্ন মুখে দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছে৷

বিকেল সাড়ে চারটে নাগাদ অর্পিতা লাহিড়ির ফোন এল৷ থমথমে গলা৷

‘আদিত্যবাবু আপনি ধরা পড়ে গেছেন৷ বুবাই বুঝতে পেরেছে আমি আপনাকে হায়ার করেছি৷ বুবাই-এর ব্যবসাবুদ্ধি না থাকতে পারে, কূটবুদ্ধির অভাব নেই৷ আমি ওকে আন্ডারএস্টিমেট করেছিলাম৷’

‘কী করে বুঝলেন আমি ধরা পড়ে গেছি?’ আদিত্য নিরীহ গলায় বলল৷

‘দেখুন আদিত্যবাবু, আমার তো সন্তান নেই৷ আমার পোষা বেড়াল প্যান্থার ছিল আমার কাছে সন্তানের মতো৷ আজ দুপুরে যখন দেখলাম প্যান্থার খেতে আসেনি তখনই আমার মনে কামড় দিচ্ছিল৷ বাড়িতে না থাকলে সাধারণত ও বাগানে ঘোরাঘুরি করে৷ আমি ডাকলে চলে আসে৷ আজ অনেকবার ডেকেও ওর সাড়া পেলাম না৷ একটু আগে আমাদের কাজের লোক একটা ঝোপের ভেতর ওর বডিটা খুঁজে পেয়েছে৷ শরীরে প্রাণ নেই৷ ওকে বিষ খাওয়ানো হয়েছে৷’ বলতে বলতে অর্পিতা লাহিড়ি কান্নায় ভেঙে পড়ল৷

আদিত্য বুঝতে পারছে না কী বলবে৷ সে চুপ করে আছে৷

‘আমি শিয়োর বুবাই প্যান্থারকে খুন করেছে৷ আমি বুবাই-এর কাজের ধরনটা জানি৷ প্যান্থারকে খুন করে ও আমাকে একটা ম্যাসেজ দিতে চাইছে৷ ও বলতে চাইছে, আদিত্য মজুমদারকে ডেকে এনে তুমি ভাল কাজ করনি৷ যদি এইভাবে চালিয়ে যাও তাহলে তোমার দশাও প্যান্থারের মতো হবে৷ বুবাই ছাড়া আর কেউ প্যান্থারকে মারতেই পারে না৷ আমাকে কষ্ট দেবার জন্যে ও-ই প্যান্থারকে মেরেছে৷ ওপর থেকে দেখলে বোঝা যায় না ভেতরে ভেতরে বুবাই কতটা নিষ্ঠুর হতে পারে৷ এখন বুবাই আবার অফিসে ফিরে গেছে৷ সেই ফাঁকে আপনাকে ফোন করছি৷ আমি বাঁচতে চাই, আদিত্যবাবু৷ আমাকে বাঁচান৷’ অর্পিতা লাহিড়ির গলাটা ডুবন্ত মানুষের মতো শোনাল৷

ফোনটা রেখে দেবার পর আদিত্য ভাবছিল, যদি অর্পিতাকে ভয় দেখানোর জন্য সত্যি সত্যি অরিজিৎ লাহিড়িই প্যান্থারকে বিষ খাইয়ে থাকে তা হলে কাজটা সে নিশ্চয় আদিত্যকে দেখার পর করেছে৷ কখন করল? সম্ভবত আদিত্য যখন অ্যাকাউনটেন্টের সঙ্গে ছিল, তখন৷

ভবানীপুর পাড়াটা আদিত্যর চমৎকার লাগে৷ ছোটবেলায় সে অষ্টমী বা নবমীর দিন দুপুরে বাবার সঙ্গে এখানে ঠাকুর দেখতে আসত৷ দুপুরে এলে ভিড় থাকে না৷ গাড়ি নিয়ে প্যাণ্ডেলের একেবারে সামনে চলে যাওয়া যায়৷ তিনটে ঠাকুর তার বাবার দেখা চাই-ই চাই৷ বকুলবাগান, গোলমাঠ আর ২২ পল্লী৷ আর ফেরার পথে ফরোয়ার্ড ক্লাব৷ বাড়ি ফিরতে ফিরতে বিকেল৷ তারপর আর বেরনো নয়৷ রাত্তির অবধি বাবার সঙ্গে বসে গান শোনা৷ এসব আদিত্যর ক্লাশ সিক্স-সেভেনের কথা৷ মা তখন আর নেই৷ অত বড় বাড়িটায় সে আর বাবা৷ আর গান৷ অন্য যাই শোনা হোক দুর্গা রাগটা শুনতেই হবে৷ দুর্গা পুজো বলে কথা৷ কত ওস্তাদ কত রকম ভাবে দুর্গা গেয়েছেন৷ বাবা বলত, এই যে বক্র হয়ে সুরটা নামছে, ষড়জ থেকে ধৈবত-পঞ্চম-মধ্যম হয়ে রেখাব ছুঁয়েই আবার উঠে যাচ্ছে পঞ্চমে, উঠে গিয়ে সেখানেই জিরিয়ে নিচ্ছে, এ যেন স্বয়ং মা গঙ্গা পাথরে ধাক্কা খেতে খেতে হিমালয় থেকে নেমে আসছেন৷

বাবা চলে যাবার পর যখন তাদের বাড়ি-ঘর সব বিক্রি হয়ে গেল, আদিত্যকে মেসবাড়িতে উঠে যেতে হল, তখনও, পুরোনো দিনের কথা মনে করে, সে দু’একবার পুজোর সময় এদিকে এসেছিল৷ ভাল লাগেনি৷ বাবার কথা খুব মনে পড়ছিল৷ তারপর পনেরো-কুড়ি বছর এসব পাড়ায় আর আসা হয়নি৷

যতীন দাস পার্ক মেট্রো স্টেশনে নেমে এস্ক্যালেটর দিয়ে ওপরে উঠতে উঠতে আদিত্যর এইসব পুরোনো কথা খুব মনে পড়ে যাচ্ছিল৷ শৌভিক গুপ্তর বাড়ি বকুলবাগান রোডে৷ এটা অর্পিতা-অভিজিতের পুরোনো পাড়াও বটে৷ আদিত্য হাজরা রোডে ঢুকে কিছুক্ষণ হাঁটার পর বাঁদিকে বেঁকল৷ ঠিকানা দেখে বাড়িটা বার করতে হবে৷ গুগল ম্যাপও দেখতে হবে৷ শৌভিক গুপ্ত সকাল সাড়ে এগারোটায় অ্যাপয়েন্টমেন্ট দিয়েছে৷ শনিবারে নিশ্চয় তার ছুটি থাকে৷

শৌভিক গুপ্তর বাড়িটা পুরোনো৷ বাড়ির সামনে লাল রোয়াক, দু’ধাপ সিঁড়ি দিয়ে উঠে সদর দরজা৷ কলিং বেল বাজাতে বাড়ির বয়সের সঙ্গে মানানসই এক পরিচারক দরজা খুলে দিল৷ দরজা দিয়ে ঢুকে ডান দিকে একটা বসার ঘর, খুব বড় নয়, তবে পুরোনো আসবাব দিয়ে পরিপাটি করে সাজানো৷

‘আপনিই আমায় ফোন করেছিলেন?’ গৃহকর্তা ঘরে ঢুকে বললেন৷ রোগা ছোটখাট চেহারা, ছটফটে হাবভাব৷

আদিত্য উঠে দাঁড়িয়ে দু’হাত জড়ো করে নমস্কার করল৷ ‘আমি উৎপল সরকার৷ আমিই আপনাকে ফোন করেছিলাম৷’

‘বসুন, বসুন৷ চা খাবেন তো? এই গিরিরাজ আমাদের চা দাও৷’ শৌভিক গুপ্ত একটা আরাম-চেয়ারে বসল৷ তার দেখাদেখি আদিত্যও বসে পড়ল৷

‘আপনি তো টেলিফোনে পুরোটা খুলে বললেন না৷ শুধু বললেন ওয়াইল্ড লাইফ ফোটোগ্রাফিতে আপনার উৎসাহ৷ সেই ব্যাপারে আমার সঙ্গে দেখা করতে চান৷ ব্যাপারটা ঠিক কী বলুন তো? আচ্ছা তার আগে বলুন, আপনি আমার সন্ধান পেলেন কী করে? আমি তো বিখ্যাত কেউ নই৷’

‘আমি আগে আমার ব্যাপারটা বলছি৷ তার পরে বলছি কী করে আপনার সন্ধান পেলাম৷ আমি ট্র্যাভেল-এর ওপর একটা ম্যাগাজিন বার করার কথা ভাবছি৷ বাংলায়৷ একজন পাবলিশারও পেয়ে গেছি৷ ন্যাশানাল জিওগ্রাফিক আমার আইডিয়াল৷ তবে অতটা তো পারব না৷ আমার সেই রিসোর্স নেই৷ তবু যতটা পারি৷ তা ম্যাগাজিন বার করতে হলে আমার রেগুলার বেসিসে কিছু লেখা দরকার, ছবি দরকার৷ আমাদের তো টাকা-পয়সা কম, আমাদের পক্ষে ট্রিপ স্পনসর করা শক্ত, তাই ভাবছিলাম এমন কাউকে যদি পাওয়া যায় যিনি নিজের নেশাতেই বনে-জঙ্গলে ঘুরে বেড়ান এবং ছবি তোলেন৷ তিনি যদি আমাদের কাগজে রেগুলার লেখেন তা হলে আমাদের ভীষণ সুবিধে হয়৷ ভাবতে ভাবতে, একটা অন লাইন ম্যাগাজিনে আপনার ওপর একটা লেখা পড়লাম৷ আপনার তোলা ছবিও দেখলাম৷ এক কথায় অপূর্ব৷ আপনি কি আমাদের ম্যাগাজিনে লিখতে রাজি হবেন? বাংলায় লিখতে হবে৷’

‘আমি কোনওদিন লিখিনি৷ কী করে লিখব? আমার মনে হয় না আমি লিখতে পারব৷’

‘আপনাকে নিজে লিখতে হবে না৷ আপনি মুখে বলে যাবেন, আমার কোনও স্টাফ লিখে নেবে৷ লিখে আপনাকে দেখিয়ে নেবে৷ আমাদের আসল দরকার আপনার ছবিগুলো৷ ওগুলো সত্যিই প্রেশাস৷ ওগুলোর একটা প্রচারও তো হওয়া দরকার৷’

যে প্রবীণ পরিচারক আদিত্যকে দরজা খুলে দিয়েছিল সে-ই চা নিয়ে ঘরে ঢুকল৷ বোঝা যাচ্ছে, এর নাম গিরিরাজ৷

চায়ে চুমুক দিয়ে শৌভিক গুপ্ত বলল, ‘দেখুন, আপনার প্রস্তাবটা খুবই লোভনীয়৷ কিন্তু আমার সমস্যা হল আমি একটা চাকরি করি৷ কর্পোরেট সেকটরের চাকরি, বেশ চাপ৷ এটা ঠিকই যে কাজের ফাঁকে সুযোগ পেলেই আমি ক্যামেরা নিয়ে বন-জঙ্গলে পালিয়ে যাই৷ কিন্তু কাজের ফাঁকটা কখন আসবে সেটা আমার আগে থেকে জানা থাকে না৷ ফলে আপনাদের কাগজে যদি রেগুলার বেসিসে লিখতে হয়, সেটা আমি পেরে উঠব না৷’

‘ঠিক আছে৷ আপনাকে নিয়মিত লিখতে হবে না৷ আপনি যখন পারবেন লিখবেন৷ আমাদের শুধু একটাই রিকোয়েস্ট৷ আপনার ছবিগুলো অন্য কাউকে দেবেন না৷ ওগুলো যেন এক্সক্লুসিভলি আমরাই ছাপতে পারি৷’

‘সেটা নিয়ে অসুবিধে হবে না৷ হাজারটা লোক এসে আমার ছবি ছাপতে চাইছে এমন তো নয়৷ ইন ফ্যাক্ট আপনারাই প্রথম আমার ছবি ছাপতে চাইলেন৷ ওই অন লাইন ম্যাগাজিনটা অবশ্য কিছু ছবি ছেপেছিল৷’

‘টাকা-পয়সার কথাটা বরং আর একদিন এসে বলব?’

‘হ্যাঁ, হ্যাঁ৷ ওটা কোনও ইস্যু হবে না৷ আমি তো প্রফেশানাল নই৷ পুরোপুরি অ্যামেচার৷’ শৌভিক গুপ্ত দরাজ গলায় বলল৷

‘আমার একটা আর্জি আছে স্যার৷ আপনার তোলা কিছু ছবি দেখা যাবে? মানে, যদি খুব অসুবিধে না হয়৷’

‘না, না৷ অসুবিধের কী আছে৷ আমার স্লাইডগুলো ল্যাপটপে আছে৷ আপনি ওখান থেকে দেখে নিন৷ ওগুলো স্ক্রিনের ওপর দেখাতে পারলে ভাল হত কিন্তু আমার প্রোজেক্টারটা খারাপ হয়ে গেছে৷ তাই আপনাকে ল্যাপটপেই দেখতে হবে৷’

‘নো প্রবলেম স্যার, নো প্রবলেম৷’ আদিত্য কৃতার্থ হয়ে যাবার স্বরে বলল৷

‘আপনি বসুন, আমি ল্যাপটপটা নিয়ে আসছি৷ অসংখ্য ছবি৷ দেখতে আপনার সময় লাগবে৷ আপনি সময় নিয়ে দেখুন, আমি এখানেই বসে কয়েকটা ফাইল দেখে নিই৷ আজকাল অফিসে যা চাপ, শনি-রবিবারও বাড়িতে বসে কাজ করতে হয়৷’ শৌভিক গুপ্ত ফাইল ও ল্যাপটপ আনতে বেরিয়ে গেল৷

আধঘণ্টা হয়ে গেছে আদিত্য মগ্ন হয়ে ছবি দেখছে৷ বেশিরভাগই পাখির ছবি৷ কয়েকটা বড় জন্তু-জানোয়ারের ছবিও আছে— হরিণ, বন শুয়োর, বুনো মোষ, চিতা৷ রয়েল বেঙ্গলও আছে, তবে মাত্রই তিন-চারটে৷ বোঝা যায়, ফোটোগ্রাফারের মন পাখিদের দিকে৷ জঙ্গলকে ভাল না বাসলে এরকম ছবি তোলা যায় না৷ কিন্তু আদিত্য যেটা খুঁজছে সেটা এখনও পায়নি৷ অবশ্য এই ছবিগুলোর মধ্যে সেটা পাওয়ার কথাও নয়৷ সে ল্যাপটপ থেকে মুখ তুলে দেখল শৌভিক গুপ্ত নিবিষ্ট হয়ে ফাইল দেখছে৷

‘স্যার একটা কথা ছিল৷’ আদিত্য গলা-খাঁকারি দিয়ে বলল৷

‘আমাকে স্যার বলবেন না প্লিজ৷ আমি কি আপনার বস?’ শৌভিক গুপ্ত মৃদু ধমক দিল৷ ‘বলুন কী বলবেন৷’

‘বলছি, আমাদের কখনও কখনও মানুষের ছবিও ছাপতে হতে পারে৷ মানে, ধরুন এই লোকাল লোক বা ট্রাইবালদের ছবি৷ আপনি কখনও মানুষের ছবি তোলেন না?’

‘খুব একটা তুলি না৷’

‘কখনও তোলেননি?’

‘ছোটবেলায় তুলেছি৷ আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধদের ছবি৷ আজকাল আর হয়ে ওঠে না৷’

‘একটু দেখাবেন? একটু দেখতাম আপনার পোর্ট্রেটগুলো কেমন৷’

‘সেগুলো তো আরেকটা ল্যাপটপে আছে৷ কিছু ছবি পুরোনো অ্যালবামেও সাঁটা আছে৷’

‘যদি একটু দেখাতেন, খুব ভাল হত৷’

‘ঠিক আছে, দেখছি৷’

আদিত্য যেটা খুঁজছিল এবার সেটা পেয়ে গেছে৷ ল্যাপটপ আর অ্যালবামের বারো আনা পোর্ট্রেট অর্পিতা লাহিড়ির৷ নানা বয়সের৷ নানা ভঙ্গির৷ পাখপাখালির ছবিগুলো দেখলে যেমন তাদের প্রতি ফোটোগ্রাফারের ভালবাসা টের পাওয়া যায়, এখানেও তেমন৷ অর্পিতা লাহিড়ির ছবিগুলো দেখতে দেখতে আদিত্যর মনে হচ্ছিল ছবিগুলো থেকে ভালবাসা ঝরে পড়ছে৷

‘আপনার ওয়াইল্ড লাইফের ছবিগুলোর মতো আপনার পোর্ট্রেটও অসাধারণ৷ বিশেষ করে এই ভদ্রমহিলার যে ছবিগুলো আপনি তুলেছেন সেগুলো তো কম্পিটিশনে দেবার মতো৷ ইনি কি আপনার কোনও আত্মীয়?’

‘না, না৷ ঠিক আত্মীয় নয়৷ আমার ছোটবেলার বন্ধু, এই পাড়াতেই এক সময় থাকত৷ এখন অন্য জায়গায় চলে গেছে৷’

‘এই যে গ্রুপ ফটোগুলো দেখছি, কয়েকটাতে আপনিও তো আছেন৷ এগুলো কার তোলা?’

‘যেগুলোতে আমি নেই সেগুলো আমার তোলা৷ অন্য কয়েকটা অটো মোডে তোলা৷’

‘আর এই যে চারজনের গ্রুপ ফটোটা? আপনাকে খুব ইয়াং দেখাচ্ছে৷’

‘ইয়াং তো দেখাবেই৷ অনেক দিন আগেকার ফটো৷ আমরা এই চারজন খুব বন্ধু ছিলাম৷ সবাই এই পাড়ার৷ এর মধ্যে যে মহিলার পোর্ট্রেটগুলো আপনার ভাল লাগল তিনি মাঝখানে রয়েছেন৷’ শৌভিক গুপ্ত স্মৃতির পুকুরে ডুব দিয়েছে৷ ওর গলাটা দূরের শোনাচ্ছে৷

‘হ্যাঁ, ওঁকে চিনতে পেরেছি৷ আপনাকেও৷ আর অন্য দুজন?’

‘মাঝখানে মিনি, মানে যার অন্য ছবিও আপনি দেখলেন৷ মিনির ডান দিকে বুবাই৷ মিনি বুবাইকে বিয়ে করেছে৷’ শৌভিক গুপ্তর গলাটা কি একটু কেঁপে গেল? আদিত্যর কল্পনাও হতে পারে৷

‘আর একেবারে ধারে যিনি রয়েছেন?’

‘ওর নাম মিঠু৷ আমার ঠিক উল্টোদিকের বাড়িটায় থাকত৷ খুব ভাল মেয়ে৷ এক সময় আমার খুব বন্ধু ছিল৷ বুবাই আর মিনিরও বন্ধু ছিল৷ মিঠু এই পাড়া থেকে চলে যাবার পর আর ওর সঙ্গে তেমন যোগাযোগ নেই৷’

আদিত্য মন দিয়ে ছবিটা দেখছিল৷ মিঠু নামধারী মহিলা মিনি লাহিড়ির মতো আকর্ষণীয়া নন৷ তবে মিনির মতোই লম্বা ও স্বাস্থ্যবতী৷

‘কিন্তু জানেন, শৌভিকবাবু, ছোটবেলার এই বন্ধুত্বগুলোই থেকে যায়৷ বড় বয়েসে আর নতুন বন্ধু হয় না৷’ ছবিটা দেখতে দেখতে আদিত্য দার্শনিকের ভঙ্গিতে বলল৷

‘ঠিকই বলেছেন৷’ শৌভিক গুপ্তর গলাটা ঈষৎ বিষণ্ণ৷

‘আচ্ছা শৌভিকবাবু আপনি কী ক্যামেরা ব্যবহার করেন?’ আদিত্য হঠাৎ প্রশ্ন করল৷ ‘মানে, একটা কৌতূহল আর কি৷’

‘আমার অনেকগুলো ক্যামেরা৷ সব ক’টাই ব্যবহার করি৷ ক্যামেরা দেখবেন?’ শৌভিক গুপ্ত উঠে গিয়ে একটা আলমারির দরজা খুলল৷

আদিত্য দেখল, তিনটে ক্যামেরা— দু’টো নাইকন একটা অলিম্পাস৷ সে বলল, ‘এ তো একেবারে স্টেট অফ দি আর্ট৷ বিশেষ করে এই নাইকন জেড সিক্স ওয়ান ওয়ান-টা৷’ নামটা একটু আগে সে ইন্টারনেটে দেখে এসেছে৷

‘হ্যাঁ ওটা দিয়ে সব থেকে ভাল ওয়াইল্ড লাইফ তোলা যায়৷’

‘দেখলাম আপনার সব ক’টা ছবির নীচে লেখা আছে কোনটা কোন ক্যামেরা দিয়ে তোলা৷ পুরোনো পোর্ট্রেটগুলোর নীচে লেখা ছিল ক্যানন৷ সেটা তো দেখছি না৷’

‘ও ক্যাননটা?’ শৌভিক গুপ্ত কি একটু চমকালো? ‘ওটা এখন আমার কাছে নেই৷ একজন ধার নিয়েছে৷ পোর্ট্রেট তোলার জন্যে ক্যাননটা বেস্ট৷ এমন কি আমাদের চারজনের যে ছবিটা দেখলেন সেটাও ওই ক্যাননে অটোমেটিক মোডে টাইমার দিয়ে তোলা৷’

একটা নাগাদ শৌভিক গুপ্তর বাড়ি থেকে বেরিয়ে আদিত্য তার হেল্পিং হ্যান্ড বিমলকে ফোন করল৷

‘একজন মহিলার খোঁজ করতে হবে৷ ডাকনাম মিঠু, ভাল নাম জানি না৷ এক সময় বকুলবাগান রোডে একটা বাড়িতে থাকত৷ সেই বাড়িটার ঠিকানা দিয়ে দিচ্ছি৷ সেখানে খোঁজ করে জানতে হবে ভদ্রমহিলা এখন কোথায় থাকেন৷’

বাড়ি ফিরে রাত্তির অবধি নানারকম চিন্তা করে চলে গেল৷ পরের দিনটা রবিবার৷ কেয়ার সঙ্গে কাটানোর দিন৷ কিন্তু আদিত্য তখনও চিন্তা করে যাচ্ছে৷ কেয়া কিছু জিজ্ঞেস করলে মোনোসিলেবেল-এ উত্তর দিচ্ছে৷ কেয়া খুব রেগে আছে৷

সন্ধে সাতটা নাগাদ বিমলের ফোন৷

‘খোঁজ পেয়েছি স্যার৷ ভদ্রমহিলার ডাকনাম মিঠু, ভাল নাম মধুমিতা রুদ্র৷ বাবা-মা মারা গিয়েছেন৷ একটাই ভাই অস্ট্রেলিয়ায় থাকে, খুব একটা দেশে আসে না৷ ভদ্রমহিলা কেষ্টপুরে একটা ফ্ল্যাটে একাই থাকেন৷ একটা স্কুলে পড়ান৷ আমি কেষ্টপুরের ফ্ল্যাটের ঠিকানাটা হোয়াটসঅ্যাপ করে দিচ্ছি৷’

এর পরের দু’ঘণ্টা শান্তি৷ কেয়ার সঙ্গে কিছুক্ষণ গল্প করল আদিত্য, ইউ টিউবে দু’জনে মিলে রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনল৷ চা খেল৷ তারপর ন’টা নাগাদ ভাবছে এবার ডিনার খাবে, হঠাৎ অর্পিতা লাহিড়ির ফোন৷ ফিসফিসে গলা৷

‘আপনাকে এখনই একবার আমাদের বাড়িতে আসতে হবে৷ মানে, যতটা তাড়াতাড়ি সম্ভব৷ অবশ্যই ক্যামেরাটা সঙ্গে নিয়ে আসবেন৷ মনে হচ্ছে এরকম সুযোগ আর পাওয়া যাবে না৷ আমি রাখছি৷ এর বেশি কথা বলা যাচ্ছে না৷ ও হ্যাঁ, আমাদের কম্পাউন্ডের পাঁচিলটা একটা জায়গায় ভেঙে গেছে৷ ঠিক আমাদের বাংলোর সামনে৷ ওখান দিয়ে সহজেই ঢুকে পড়তে পারবেন৷ পাঁচিল টপকাতে হবে না৷’ আদিত্যকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে অর্পিতা লাহিড়ি ফোনটা কেটে দিল৷

কী মুস্কিলেই যে পড়া গেল! একে রবিবার, তার ওপর রাত্তির ন’টা বেজে গেছে৷ এখন নরেন্দ্রপুর যাবার গাড়ি কোথায় পাবে? কিন্তু যেতে তো হবেই৷ অর্পিতা লাহিড়ির কাছ থেকে অ্যাডভান্স নিয়ে ফেলেছে, এখন পেছানো যায় না৷ এদিকে আদিত্য এই রাত্তিরবেলা বেরোবে শুনে কেয়া মুখ গোমড়া করে আছে৷ এসব সময় আদিত্যর মনে হয় সে-ও তো আর পাঁচজনের মতো কোনও আপিসে দশটা-পাঁচটার চাকরি করতে পারত, কিংবা কোনও ইস্কুল-কলেজে মাস্টারি৷

নেহাতই কপালজোরে খান্না সিনেমার কাছ থেকে একটা ট্যাক্সি পাওয়া গেল৷ শর্ত, মিটারে যা উঠবে তার তিনগুণ তাকে দিতে হবে৷ তাছাড়া মেন রাস্তার ওপর তাকে ছেড়ে দিতে হবে, ভেতরে সে ঢুকবে না৷ তার মানে ট্যাক্সি ছেড়ে দেবার পর আরও মিনিট সাত-আট হাঁটা৷ এই অন্যায় শর্ত মেনে নেওয়া ছাড়া আর কোনও উপায় নেই৷ ফেরার কথা পরে ভাবা যাবে৷

ট্যাক্সিটা যখন আদিত্যকে নামিয়ে দিয়ে ইউ-টার্ন নিয়ে ফিরে গেল তখন রাত্তির দশটা বেজে গেছে৷ নিঃঝুম রাস্তা৷ দূরে কোথাও শেয়াল ডাকছে৷ আদিত্য বড় রাস্তা থেকে ছোট রাস্তায় নামল৷ যত দূর মনে পড়ছে সেদিন এই রাস্তা দিয়েই তার গাড়িটা অরিজিৎ লাহিড়ির কারখানায় এসেছিল৷ দু’দিকে গাছপালা, ঝোপঝাড়৷ তাদের আড়ালে হয়তো দু’একটা বাড়ি-ঘরও আছে৷ কিন্তু এই মফস্বলে রাত দশটা মানে মধ্যরাত্রি৷ কোথাও আলো-টালো জ্বলছে না৷ রাস্তাতেও আলো নেই৷ আদিত্য ব্যাগ থেকে টর্চ বার করে জ্বালালো৷ লো বিম৷ যতটা গোপনীয়তা রক্ষা করা যায়৷ এবার কুকুর ডাকছে৷ খুব কাছে৷ মনে হয়, কারও বাড়ির কুকুর৷ আদিত্যর গায়ের গন্ধ পেয়েছে৷ আরও কয়েক মিনিট হাঁটার পর একটু দূরে কারখানার সাদা পাঁচিলটা দেখা গেল৷ আদিত্য টর্চটা নিভিয়ে দিল৷

কারখানার মেন গেটে একজন দরোয়ান বসে আছে৷ অন্ধকারে তার শরীরের অবয়বটা দেখা যাচ্ছে৷ এখন অবধি ফাটলটা আসেনি৷ গেট পেরিয়ে আরও খানিকটা এগোলে হয়ত পাঁচিলের ফাটলটা চোখে পড়বে৷ কিন্তু দরোয়ানের চোখ এড়িয়ে যাওয়া যায় কীভাবে? লোকটা কি জেগে আছে না বসে বসে ঘুমোচ্ছে? আদিত্য আরও এগিয়ে এসে একটা গাছের আড়াল থেকে কিছুক্ষণ লোকটাকে লক্ষ করল৷ না, লোকটা জেগে আছে৷ বসে বসে মোবাইলে কিছু একটা দেখছে৷ অর্থাৎ ওর সামনে দিয়ে যাওয়া যাবে না৷ আদিত্য ঠিক করল ঝোপঝাড়ের আড়াল দিয়ে জায়গাটা পেরিয়ে যাবে৷ একটু রিস্ক আছে৷ সাপখোপ থাকতে পারে, যাবার সময় শব্দ হতে পারে৷ ওটুকু রিস্ক নিতেই হবে৷

গেটের জায়গাটা পেরোনোর সময় একটু শব্দ নিশ্চয় হয়েছিল, কারণ লোকটা মুখ তুলে তাকিয়েছে৷ আদিত্য না দাঁড়িয়ে একটু শব্দ করেই জায়গাটা পেরিয়ে গেল৷ লোকটা ভাবুক না ঝোপের ভেতর দিয়ে শেয়াল-টেয়াল কিছু একটা যাচ্ছে৷ হয়তো সেরকমই সে ভেবে নিয়েছে কারণ তাকে খুব একটা বিচলিত মনে হচ্ছে না৷ সে আবার মোবাইল দেখায় মন দিয়েছে৷

আরও কিছুটা গিয়ে আদিত্য রাস্তায় উঠল৷ এখান থেকে পাঁচিলের ফাটলটা দেখা যাচ্ছে৷ বেশ বড় ফাটল, ওর ভেতর দিয়ে অনায়াসে গলে যাওয়া যাবে৷ পাঁচিলে যখন এত বড় ফাটল রয়েছে তখন মেন গেটে দরোয়ান বসিয়ে কী লাভ? দরোয়ান হয়তো মেন গেট থেকে কারখানার দিকটা নজর রাখে৷ বাংলোটা তার দরোয়ানির মধ্যে পড়ে না৷ আদিত্য সন্তর্পণে ফাটলের ভেতর দিয়ে বাংলোর চৌহদ্দির মধ্যে ঢুকে পড়ল৷

বাগানটা অযত্নলালিত৷ বিশেষ করে পাঁচিলের দিকটায় আগাছা, একহাঁটু ঘাস৷ কিন্তু একটা জায়গায় ঘাসগুলো দোমড়ানো৷ এখান দিয়ে আগে কি কেউ যাতায়াত করেছে? আদিত্য বাগানের একটা অপেক্ষাকৃত পরিষ্কার জায়গায় এসে দাঁড়াল৷ এখান থেকে বাংলো বাড়িটা দেখা যাচ্ছে৷ বাংলো থেকে একটা আলো এসে ঘাসের ওপর পড়েছে৷ আদিত্য খুব সাবধানে আলোর কাছে এগিয়ে গিয়ে দেখল আলোটা একটা খোলা জানলা দিয়ে আসছে৷ সে গুঁড়ি মেরে জানলা অবধি পৌঁছল৷ জানলাটা একটু উঁচুতে৷ সে যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেখান থেকে বসার ঘরের ওপর দিকটাই কেবল দেখা যাচ্ছে৷ একটা শেলফ-এর ওপর দিকটা, হেডরেস্ট সমেত একটা ফাঁকা চেয়ারের খানিকটা, দেয়ালে একটা ঘড়িতে দশটা পঁচিশ বেজেছে, একটা স্প্রিট এসিতে ২৪ সংখ্যাটা ফুটে রয়েছে, মানে এসিটা চলছে৷ এসিটা চলছে বলে জানলাটা বন্ধ৷ আলোটা আসছে বন্ধ কাচের শার্সির ভেতর দিয়ে৷ ঘরের ভেতর কোনও মানুষকে দেখা যাচ্ছে না৷ আদিত্য তার কাঁধের ব্যাগটা থেকে ক্যামেরাটা বার করল৷ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে রইল, যদি কেউ ঘরে এসে ঢোকে৷ মিনিট পাঁচেক কেটে গেল কেউ ঘরে ঢুকল না৷ আর একটু ভাল করে দেখার জন্যে আদিত্য জানলাটার প্রায় সামনে গিয়ে দাঁড়াল৷ ঘরের ভেতরটা যেন ধোঁয়া-ধোঁয়া৷ আদিত্য একটু পোড়া গন্ধও পেল৷ সে ক্যামেরাটা ব্যাগে রেখে হাতে ভর দিয়ে জানলার বাইরের প্যারাপেটে উঠে বসল৷ এখান থেকে ঘরের সবটা দেখা যাচ্ছে৷

ঘরে দুটো উল্টোনো চেয়ার, একটা হুমড়ি খেয়ে পড়া কাউচ আর তার সামনে মেঝের ওপর একটা মানুষের দেহ চিত হয়ে আছে৷ দেহটা সম্ভবত একজন মহিলার৷ তার সমস্ত শরীর পুড়ে কালো হয়ে গেছে, মুখটা এতটাই বিকৃত যে সেটা মানুষের মুখ বলে মনে হয় না৷ সন্দেহ নেই, অ্যাসিড দিয়ে তার মুখটা এরকম বিকৃত করে দেওয়া হয়েছে৷

আদিত্যর ভীষণ অসুস্থ লাগছিল৷ সে জানলার প্যারাপেট থেকে লাফ দিয়ে নেমে কিছুক্ষণ উবু হয়ে ঘাসের ওপর বসে রইল৷ তারপর উঠে পড়ে সদর দরজায় বেল বাজাল৷ কেউ খুলছে না৷ আদিত্য আবার বেল বাজাল৷ এবারেও কেউ সাড়া দিল না৷ ধরে নিতে হবে বাড়িতে কেউ নেই৷ টালমাটাল পায়ে হাঁটতে হাঁটতে আদিত্য মেন গেটের দিকে এগোল যেখানে দরোয়ান বসে আছে৷ যেতে যেতে সে পকেট থেকে মোবাইল বার করে তার বন্ধু অ্যাডিশানাল পুলিশ কমিশানার গৌতম দাশগুপ্তর নম্বরটা লাগাল৷ পুলিশ না এলে দরজা ভেঙে ঢোকা যাবে না৷

মিনিট পনেরো পরে যখন আদিত্য মেন গেটে দরোয়ানের পাশে বসে পুলিশ আসার অপেক্ষা করছিল তখন একটা সাদা এস ইউ ভি গেটের বাইরে এসে থামল৷ গেট খোলার জন্য দরোয়ান উঠে দাঁড়িয়েছে৷

‘কার গাড়ি?’ আদিত্য দরোয়ানকে জিজ্ঞেস করল৷

‘সাহেবের গাড়ি৷ সাহেব ফিরে এসেছেন৷’

নরেন্দ্রপুর থানার ওসি অশোক সামন্ত, যে অর্পিতা লাহিড়ির মামলাটার তদন্ত করছে, আদিত্যর চেনা লোক৷ বছর দুয়েক আগে একটা কেস-এ আলাপ হয়েছিল৷ তার ওপর অ্যাডিশানাল কমিশানার সাহেব আদিত্যর ছোটবেলার বন্ধু৷ তিনি বলে দিয়েছেন আদিত্যর সঙ্গে যেন সব রকম সহযোগিতা করা হয়৷ অতএব অশোক সামন্ত বেশ খাতির করেই আদিত্যকে বসাল৷ তিন-চারদিন অর্পিতা লাহিড়ির নৃশংস হত্যার বৃত্তান্ত নিয়ে মিডিয়া তোলপাড় হচ্ছিল৷ পুলিশ অর্পিতার স্বামী অরিজিৎ লাহিড়িকে গ্রেফতার করার পর থেকে উত্তেজনা কিছুটা স্তিমিত হয়েছে৷

আদিত্য মনোকষ্টে আছে৷ খানিকটা তার বয়ানের ওপর ভিত্তি করেই পুলিশ অরিজিৎ লাহিড়িকে গ্রেপ্তার করেছে৷ পুলিশের কাছে খুলে বলতেই হয়েছে কেন অর্পিতা লাহিড়ি তার কাছে এসেছিল৷ অর্পিতা লাহিড়ি যে বলেছিল তার স্বামী তাকে নিয়মিত অ্যাসিড এবং পেট্রল দিয়ে পুড়িয়ে মারার ভয় দেখাত, সেটাও পুলিশকে বলতে হয়েছে৷ এসব কাহিনি, বলাই বাহুল্য, অরিজিৎ লাহিড়ির পক্ষে যায়নি৷ কিন্তু অরিজিৎ লাহিড়িরও দোষ আছে৷ পুলিশের হাজার জেরা সত্ত্বেও সে কিছুতেই জানাল না খুনের সময় সে কোথায় ছিল৷ শুধু বলে গেল, ব্যক্তিগত কারণে সে এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারছে না৷ তাকে গ্রেফতার করা ছাড়া পুলিশের আর উপায় কী? পুলিশ-মহল বেশ খুশি৷ খুব তাড়াতাড়ি তারা একটা নৃশংস মামলার নিষ্পত্তি করে ফেলেছে৷ কিন্তু আদিত্য আদৌ খুশি নয়৷ এখনও তার কয়েকটা খটকা রয়ে আছে৷

অশোক সামন্তর সঙ্গে আদিত্যর আগেই টেলিফোনে কথা হয়ে গিয়েছিল৷ সেই কথা মতো অর্পিতা লাহিড়ি হত্যা মামলার ফাইলটা সে টেবিলেই বার করে রেখেছিল৷

‘আমি আপনাদের ফাইলটা থেকে কয়েকটা নোট নেব৷ আপত্তি নেই তো?’ আদিত্য ঈষৎ কুণ্ঠিত ভাবে বলল৷

‘না, না৷ আপত্তি কীসের? আমরা তো জানি আপনি পুলিশকে নানা ব্যাপারে হেল্প করেন৷ আমরা আপনাকে হেল্প করব না? তাছাড়া অ্যাডিশানাল কমিশানার সাহেব স্ট্রিক্ট নির্দেশ দিয়েছেন আপনার সঙ্গে কোঅপারেট করতে৷ আপনি ফাইলটা নিয়ে ওদিকের টেবিলটায় বসে শান্তিতে নোট নিন৷ এক্ষুনি চা আসছে৷’

ফাইলটা বেশ যত্ন করে বানানো৷ এখান থেকেই চার্জশিট তৈরি হবে৷ মৃতদেহ এতটাই মিউটিলেটেড ছিল যে সেটা দেখে মৃতার আইডেন্টিটি নির্ণয় করা অসম্ভব৷ কিন্তু ফরেনসিক এক্সপার্ট অর্পিতা-অভিজিতের বেডরুমের বালিশ থেকে যে লম্বা চুল উদ্ধার করেছে তার সঙ্গে মৃতার জিন মিলে যাচ্ছে৷ অতএব ধরে নেওয়া হচ্ছে মৃতা অর্পিতা লাহিড়ি৷

পুলিশ ডাক্তারের দেওয়া বয়ান অনুযায়ী খুনের সময় রাত্তির আটটা থেকে দশটার মধ্যে৷ কিন্তু আদিত্যর বয়ান অনুযায়ী অর্পিতা লাহিড়ি তাকে ন’টার একটু পরে ফোন করেছিল৷ শরীরের পোড়া দেখে অনুমান করা হচ্ছে ফোন ছাড়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে অর্পিতা খুন হয়৷

প্রশ্ন হল, অরিজিৎ লাহিড়ি তখন কোথায় ছিল? রবিবার দুজন সিকিউরিটি মেন গেট পাহারা দেয়৷ একজন সকাল দশটা থেকে রাত্তির দশটা৷ অন্যজন রাত্তির দশটা থেকে পরের দিন সকাল দশটা৷ গোলমেলে ব্যাপারটা হল যার রাত্তির দশটা অবধি পাহারা দেবার কথা সে সন্ধে সাড়ে-সাতটা নাগাদ একটা ফোন পায়৷ বলা হয় বাঙ্গুর হাসপাতাল থেকে ফোন করা হচ্ছে৷ তার স্ত্রীর একটা অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে৷ অবস্থা ভাল নয়৷ সে যেন এক্ষুনি বাঙ্গুর হাসপাতালের এমার্জেন্সিতে চলে আসে৷ ফোনটা পেয়ে সে অরিজিৎ লাহিড়ির কাছ থেকে ছুটি নিয়ে গেট ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে৷ অন্য সিকিউরিটি ডিউটি করতে আসে পৌনে দশটায়৷ ফলে পৌনে আটটা থেকে পৌনে দশটা অবধি গেটে কেউ ছিল না৷ প্রথম সিকিউরিটি যে ফোনটা পেয়েছিল সেটা ভুয়ো৷ রবিবারের সন্ধেবেলা গাড়ি-ঘোড়া পাওয়া যায়নি বলে বাঙ্গুর হাসপাতালে পৌঁছতে পৌঁছতে তার প্রায় সাড়ে নটা বেজে যায়৷ গিয়ে দ্যাখে সেখানে তার স্ত্রী ভর্তি নেই৷ তখন সে বাড়িতে ফোন করে জানতে পারে তার স্ত্রী বাড়িতে বহাল-তবিয়তে আছে৷ গেট ছেড়ে বেরোনোর আগে হয়তো তার বাড়িতে একবার ফোন করে দেখা উচিত ছিল৷ কিন্তু হাসপাতাল থেকে ফোন করছে শুনে সে এতটাই ঘাবড়ে গিয়েছিল যে বাড়িতে ফোন করার কথা তার মনেই হয়নি৷

পুলিশের অনুমান, অরিজিৎ লাহিড়িই ভুয়ো ফোনটা করে সিকিউরিটিকে সরিয়ে দিয়েছিল যাতে খুনের সময় অর্পিতার চিৎকার বা তাকে পোড়ানোর ধোঁয়া সিকিউরিটির দৃষ্টি আকর্ষণ না করে৷ অরিজিৎ অবশ্য বলছে সে সাড়ে আটটা নাগাদ গাড়ি নিয়ে কারখানা চত্বর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল৷ কিন্তু যেহেতু সেই সময় গেটে কেউ ছিল না, তাকে কেউ বেরোতে দ্যাখেনি৷ তবে দ্বিতীয় সিকিউরিটি এবং আদিত্য তাকে দশটা চল্লিশ নাগাদ ফিরে আসতে দেখেছে৷ সে কোথায় গিয়েছিল সেই ব্যাপারে অরিজিৎ লাহিড়ি কিছু বলছে না৷ শুধু বলছে, এটা আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার৷

পুলিশ অর্পিতা-অভিজিতের বন্ধু শৌভিক গুপ্তর সঙ্গেও কথা বলেছে৷ শৌভিক গুপ্ত বলছে খুনের সময় সে বাড়িতেই ছিল৷ পরের দিন সপ্তাহের শুরু বলে তার তাড়াতাড়ি অফিস যাবার ছিল৷ তাই সে সকাল সকাল ঘুমিয়ে পড়েছিল৷ তবে তার বাড়ি থাকার ব্যাপারে কোনও সাক্ষী নেই৷

আদিত্য খুব দ্রুত নোট নিচ্ছিল৷ খুনের জায়গা থেকে কী কী পাওয়া গেছে তার একটা তালিকা পুলিশের ফাইলে রয়েছে৷ বসার ঘরে ড্রয়ার থেকে অরিজিৎ লাহিড়ির লাইসেন্সড রিভলভারটা পাওয়া গেছে৷ শোবার ঘরের সেফ থেকে কিছু কাগজপত্র পাওয়া গেছে যার বেশিরভাগই ব্যাঙ্ক সংক্রান্ত৷ কিছু আবার বিভিন্ন আর্থিক বিনিয়োগের সার্টিফিকেট৷ কাগজপত্র দেখে মনে হয় অর্পিতা যতটা বলেছিল লাহিড়িদের আর্থিক অবস্থা মোটেই ততটা খারাপ নয়৷ রিভলভার ও কাগজপত্র ছাড়া একটা মোবাইলও পাওয়া গেছে৷ অরিজিৎ লাহিড়ি স্বীকার করে নিয়েছে এটা তার মোবাইল৷ কিন্তু সেই রাত্তিরে বাইরে বেরোনোর সময় মোবাইলটা সে কিছুতেই খুঁজে পায়নি৷ তাই সে মোবাইল ছাড়াই বেরিয়ে গিয়েছিল৷ মোবাইলটা পুলিশ অভিজিতের শোবার ঘরের খাটের তলা থেকে উদ্ধার করেছে৷ হয়তো ওটা খাট থেকে পড়ে গিয়ে খাটের তলায় ঢুকে গিয়েছিল৷

মোবাইলটা পরীক্ষা করে পুলিশ দেখেছে ওটা থেকে একটা বিশেষ নম্বরে বারবার ফোন করা হয়েছে৷ সেই বিশেষ নম্বরটা আবার অরিজিৎ লাহিড়িরই নামে রেজিস্টার্ড৷ মনে হয়, অরিজিৎ কাউকে এই নম্বরটা ব্যবহার করতে দিয়েছিল৷ কাকে সে নম্বরটা ব্যবহার করতে দিয়েছিল সে-ব্যাপারে অরিজিৎ কিছুতেই মুখ খুলছে না৷ বলছে এটা আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার৷ বিশেষ করে উল্লেখযোগ্য যে, খুনের রাত্তিরে আটটা থেকে ন’টার মধ্যে ওই নম্বরটা থেকে অরিজিৎ লাহিড়ির ফোনে অনেকগুলো মিসডকল এসেছিল৷ মোবাইল ফোনের রহস্য পুলিশ এখনও ভেদ করতে পারেনি৷

থানা থেকে বেরোতে বেরোতে আদিত্যর একটা বেজে গেল৷ ক’দিন বৃষ্টির পর আজ কড়া রোদ্দুর উঠেছে৷ বাতাসে আদ্রতাও আছে৷ আদিত্য ঘামতে ঘামতে অটো ধরে গড়িয়া মেট্রো স্টেশনে পৌঁছল, সেখান থেকে মেট্রোতে গিরিশ পার্ক৷ গিরিশ পার্ক থেকে ফের অটো, ঘাম, অবশেষে উল্টোডাঙার মোড়৷ একটা ট্যাক্সি অবশ্যই করা যেত, কিন্তু খরচটা তো মক্কেলের এক্সপেন্স অ্যাকাউন্টে দেওয়া যাবে না৷ মক্কেলই নেই, তার আবার এক্সপেন্স অ্যাকাউন্ট৷ কিন্তু আর পারা যাচ্ছে না৷ এবার একটা ট্যাক্সি নিতেই হবে৷ কেয়া আজকাল গাড়ি কেনার কথা বলছে৷ গরমে ঘামতে ঘামতে আদিত্য ভাবছিল আইডিয়াটা মন্দ নয়৷

আদিত্যর গন্তব্য ভি আই পি কেষ্টপুর৷ মিঠু ওরফে মধুমিতা রুদ্রর বাড়ি৷ বাড়িটা ভি আই পি রোড থেকে দু’মিনিট৷ মধ্যবিত্তদের ফ্ল্যাট বাড়ি৷ চারতলার ওপরে মধুমিতা রুদ্রর ফ্ল্যাট৷ লিফট নেই৷ সিঁড়িটাও খুব চওড়া নয়৷ ম্যাক্সিমাম জায়গা ফ্ল্যাটগুলোর মধ্যে খাইয়ে দেওয়া হয়েছে৷ চওড়া সিঁড়ির বিলাসিতা এই বাড়ির বাসিন্দাদের জন্যে নয়৷

চারতলায় তিনটে ফ্ল্যাট৷ মাঝেরটা মধুমিতা রুদ্রর৷ অনেক বার বেল বাজানোর পরেও যখন দরজা খুলল না, আদিত্য পাশের ফ্ল্যাটে বেল বাজাল৷ এক পক্ককেশ বৃদ্ধ দরজা খুললেন৷ চোখে জিজ্ঞাসা৷

‘আচ্ছা, পাশের ফ্ল্যাটের দিদিমণি কোথায় গেছে বলতে পারেন?’ আদিত্য একটু ইতস্তত করে বলল৷

‘কোথায় গেছে তো বলতে পারব না৷ তবে ইস্কুলে বোধহয় যায়নি৷ এই সেদিন বলছিল, ওদের ইস্কুলে গরমের ছুটি পড়ে গেছে৷’

‘হ্যাঁ, আমিও জানি, ইস্কুলে গ্রীষ্মের ছুটি পড়ে গেছে৷ কিন্তু অনেক দিদিমণি ছুটির মধ্যেও ইস্কুলে যান তো৷ আমি ইস্কুলেই বরং একবার দেখি৷’

‘না, ইস্কুলে ওকে পাবেন না৷ ও মনে হয় কলকাতার বাইরে কোথাও গেছে৷ কারণ রাত্তিরে ওর ফ্ল্যাটে আলো জ্বলতে দেখছি না৷’

‘কলকাতার বাইরে?’

‘তাই মনে হয়৷ ও একা একা খুব ঘুরে বেড়ায়৷ নাম না জানা সব জায়গায়৷ কাউকে কিছু না বলে হঠাৎ হঠাৎ চলে যায়৷ কিছুদিন পরে আবার ফিরে আসে৷ এবার একটু বেশিদিন হয়ে গেল ওকে দেখছি না৷ মেয়েটা খুব ভাল, কিন্তু একা থাকতে থাকতে কেমন যেন একটু খেপাটে হয়ে গেছে৷ ওর সঙ্গে আপনার কী দরকার?’

‘আমি বই বিক্রি করি৷ ইস্কুলে পড়ার বই৷ ওকে একটু দেখাতাম৷ যদি ওর ইস্কুলের জন্যে দু’একটা নেন৷’ আদিত্য তার কাঁধের ব্যাগটার দিকে বৃদ্ধের দৃষ্টি আকর্ষণ করল৷ যেন বলতে চাইল, এর মধ্যে বইগুলো আছে৷

‘আমি তো আপনাকে সাহায্য করতে পারব না৷ দেখুন নীচে দরোয়ানকে কিছু বলে গেছে কিনা৷’ বৃদ্ধ দরজা বন্ধ করে দেবার উপক্রম করলেন৷

‘আপনি শেষ কবে দিদিমণিকে দেখেছেন মনে আছে?’ আদিত্য মরিয়া হয়ে একটা শেষ চেষ্টা করল৷

‘আমার মনে নেই৷ আজকাল আমার কিছুই মনে থাকে না৷ বয়েস হচ্ছে তো৷ আপনি দরোয়ানকে জিজ্ঞেস করুন৷’ বৃদ্ধ দরজা বন্ধ করে দিলেন৷

দরোয়ান তেমন কিছু বলতে পারল না৷ শুধু বলল, ‘ম্যাডাম এখানে নেই সেটা জানি৷ কারণ ওকে না পেয়ে খবরকাগজওলা আমাদের কাছে কাগজগুলো দিয়ে যাচ্ছে৷ ম্যাডাম এলে আমরা দিয়ে দেব৷ এরকম আগেও অনেক বার হয়েছে৷’

‘কবে থেকে কাগজ জমছে একটু দেখে বলবেন?’

‘প্রায় তিন সপ্তাহ হয়ে গেল৷ আজ তো তেইশ তারিখ, এই মাসের চার তারিখ থেকে কাগজ জমছে৷’ দরোয়ান কাগজের বাণ্ডিল ঘাঁটতে ঘাঁটতে বলল৷

আদিত্য মনে মনে হিসেব করছিল৷ খুনটা হয়েছিল রবিবার, ৮ মে৷ তার মানে, খুন হবার চারদিন আগে থেকে মধুমিতা রুদ্র বাড়িতে নেই৷ খোঁজ নিতে হবে কবে থেকে ওর ইস্কুলে গরমের ছুটি পড়েছিল৷

আদিত্যর পরবর্তী গন্তব্যস্থল লালবাজার৷ লালবাজারের সেন্ট্রাল লক আপ-এ অরিজিৎ লাহিড়ি রয়েছে৷ তার সঙ্গে একবার কথা বলা বিশেষ দরকার৷ কিন্তু সবার আগে কিছু খেতে হবে৷ আদিত্য পকেট থেকে মোবাইল বার করে গৌতম দাশগুপ্তর নম্বরটা লাগাল৷

ভাগ্য ভাল, একবারের চেষ্টাতেই গৌতমকে পেয়ে গেল আদিত্য৷ সাধারণত এত সহজে ওকে পাওয়া যায় না৷

‘খুব ব্যস্ত আছিস?’ আদিত্য জিজ্ঞেস করল৷

‘মোটেই না, মোটেই না৷ বস দিল্লি গেছে৷ ফলে আমি রিল্যাক্সড হয়ে অফিসে বসে আছি৷’

‘যাব নাকি?’

‘আসবি? সে তো খুব ভাল কথা৷ এক্ষুনি চলে আয়৷ আমার এখনও লাঞ্চ খাওয়া হয়নি৷ তুই খেয়েছিস?’

‘না৷ খাইনি৷ খুব খিদে পেয়ে গেছে৷ সকাল থেকে ঘুরছি৷’

‘তা হলে আর দেরি না করে চলে আয়৷ রেজালা আর তন্দুরি রুটি খাওয়াব৷ আমাদের এখানে একটা নতুন দোকান হয়েছে৷’

‘তা খাওয়া, কিন্তু একটা কাজও করে দিতে হবে৷ অরিজিৎ লাহিড়ি, ওই অর্পিতা লাহিড়ি মার্ডার কেসের সাসপেক্ট, তোদের সেন্ট্রাল লকআপ-এ আছে৷ একটু কথা বলার সুযোগ করে দিতে হবে৷’

‘করে দেব৷ তুই তাড়াতাড়ি চলে আয়৷ রেজালার সঙ্গে দু’টো ফিরনিও বলে দিই৷ কী বলিস?’

‘আপনাকে ঠিক তিনটে প্রশ্ন করব৷ তার বেশি নয়৷ আর পুলিশকে যে প্রশ্নগুলোর উত্তর আপনি দেননি সে প্রশ্নগুলো আমি করব না৷ ঠিক আছে?’

অরিজিৎ লাহিড়ি উত্তর দিল না৷ খুনের রাত্তিরে আদিত্যর আসল পরিচয় জানার পর থেকে সে আদিত্যর সঙ্গে কথা বলছে না৷

‘আমার প্রথম প্রশ্ন, আপনার স্ত্রী আমাকে ফোন করে বলেছিলেন ওর বেড়াল প্যান্থারকে আপনিই বিষ খাইয়ে মেরেছেন৷ কী বলবেন?’

অরিজিৎ লাহিড়িকে ভীষণ উত্তেজিত দেখাল৷ এতটাই যে, সে তার মৌনতা ভেঙে চেঁচিয়ে উঠল৷

‘মিথ্যে কথা৷ ডাহা মিথ্যে কথা৷ দেখুন, বেড়াল নিয়ে আদিখ্যেতা করা আমার ধাতে নেই৷ কিন্তু তাই বলে একটা জ্বলজ্যান্ত প্রাণীকে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলব এরকম অসুস্থ লোক আমি নই৷’

আদিত্য বলল, ‘আপনার উত্তরটা আমার খুব কাজে লাগবে৷ এই রকম সোজাসাপটা উত্তর যদি আপনি পুলিশকেও দিতেন তাহলে পুলিশের তদন্তে খুব সুবিধে হত৷ যাই হোক, আমার দ্বিতীয় প্রশ্ন, আপনার স্ত্রী আমাকে বলেছিলেন ব্যবসার ধার মেটাতে গিয়ে আপনি তার সমস্ত গয়না বাঁধা দিতে বাধ্য হয়েছিলেন৷ গয়নাগুলো আর উদ্ধার করা যায়নি৷ কথাটা কি ঠিক?’

‘অর্ধেকটা ঠিক, অর্ধেকটা মিথ্যে৷’ অরিজিৎ লাহিড়িকে এখন আর ততটা উত্তেজিত দেখাচ্ছে না৷

‘কোনটা ঠিক আর কোনটা মিথ্যে?’

‘গয়নাগুলো বাঁধা দিতে হয়েছিল এটা ঠিক৷ কিন্তু পরে ওগুলো ছাড়িয়ে নিয়ে আমি আমার স্ত্রীকে ফেরত দিয়ে দিয়েছিলাম৷’

আদিত্যর মনে হল অরিজিৎ লাহিড়ি পুরো সত্যিটা বলছে না৷ কিন্তু সে আর কথা না বাড়িয়ে তার তৃতীয় প্রশ্নটা করল, ‘আপনার ছোটবেলার বন্ধু মিঠু, যার ভাল নাম মধুমিতা রুদ্র, তার সঙ্গে আপনার কি যোগাযোগ আছে?’

প্রশ্নটা শুনে অরিজিৎ লাহিড়ি কিছুক্ষণ আদিত্যর দিকে তাকিয়ে রইল৷ তারপর শান্তভাবে বলল, ‘আপনি যদি আমার পুরোনো পাড়ার বন্ধু মিঠুর কথা বলেন তা হলে জানাই দীর্ঘ দিন মিঠুর সঙ্গে আমার কোনও যোগাযোগ নেই৷’

‘শেষ কবে ওর সঙ্গে আপনার কথা হয়েছিল?’

‘মনে নেই কবে৷ বকুলবাগান ছেড়ে আসার পরে আর ওর সঙ্গে কখনও দেখাও হয়নি, কথাও হয়নি৷’

‘ঠিক আছে৷ আমার আর কোনও প্রশ্ন নেই৷ আমি আসছি৷ তবে যাবার আগে জানিয়ে যাই, মধুমিতা রুদ্র প্রায় তিন সপ্তাহ বাড়িতে নেই৷ কোথায় আছে কেউ বলতে পারছে না৷’

ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার আগে আদিত্য আড়চোখে দেখল অরিজিৎ লাহিড়ি কিছুটা হতভম্ভ হয়ে বসে আছে৷

আরও একটা সপ্তাহ কেটে গেল৷ মধুমিতা রুদ্র এখনও ফেরেনি৷ আদিত্যর অনুরোধে পুলিশ তার ফ্ল্যাট খুলে তল্লাশি চালিয়েছে৷ ইতিমধ্যে আদিত্যর হাতে একটা নতুন কাজ এসেছে৷ কাজটা মুম্বাইতে৷ একটা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কে বড় ফ্রড৷ সে ব্যাপারে মুম্বাই গিয়ে তদন্ত৷ প্রাথমিক কিছু কাজ কলকাতায় বসেই করা যায়, গত তিনদিন আদিত্য তাই করছিল৷ তার মধ্যেই একদিন সে সময় করে নরেন্দ্রপুরে গিয়েছিল৷ মুম্বাই যাবার আগে অর্পিতা লাহিড়ির ব্যাপারটা চুকিয়ে ফেলতে হবে৷

আজ শনিবার৷ আদিত্য ফোন করে জেনে নিয়েছে শৌভিক গুপ্ত বাড়িতে আছে৷ যতীন দাস পার্কে নেমে বকুলবাগানের দিকে হাঁটতে হাঁটতে আদিত্য ভাবছিল, কী বিচিত্র মানুষের চরিত্র৷ কী হিংস্র তার ভালবাসা৷ কী তীব্র তার ঘৃণা৷ অর্পিতা লাহিড়ির ব্যাপারটা তার মনের অ্যালবামে পাকাপাকি থেকে যাবে৷

‘কী ব্যাপার বলুন তো? একেবারে সাত সকালে ফোন৷ শনিবারটা আমি একটু বেলা করে উঠি৷ আজ আপনার ফোন পেয়ে তাড়াতাড়ি উঠে পড়তে হল৷’ শৌভিক গুপ্ত তার বিরক্তিটা গোপন করার খুব একটা চেষ্টা করল না৷ তাকে বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে৷

‘আপনাকে একটা ছুটির দিনে বিরক্ত করার জন্যে ক্ষমা চাইছি৷’ আদিত্য শুকনো গলায় বলল৷ তার স্বরে অবশ্য ক্ষমা চাওয়ার লেশমাত্র ছিল না৷ ‘আসলে আমি আগামী পরশু কয়েকদিনের জন্যে মুম্বাই যাচ্ছি৷ তাই ভাবলাম, মুম্বাই যাবার আগে কাজটা শেষ করে যাই৷’

‘কাজ? কোন কাজ?’

‘আপনার বন্ধু অর্পিতা লাহিড়ি খুনের রহস্য উদঘাটনের কাজটা৷’

‘অর্পিতা লাহিড়ি খুনের রহস্য উদঘাটনের কাজ? আপনার সঙ্গে তার কী সম্পর্ক?’

‘শৌভিকবাবু আপনি খুব ভালভাবেই জানেন সম্পর্কটা কী৷ আমার আসল পরিচয়টাও আপনি ভাল করেই জানেন৷ কারণ আপনার পরামর্শেই তো আপনার বান্ধবী আমার সাহায্য চাইতে এসেছিলেন৷’

‘আপনি কী বলছেন আমি কিছুই বুঝতে পারছি না৷ আপনার আসল পরিচয়টা কী তা-ও আমি জানি না৷ সত্যি বলতে কি, জানতেও চাই না৷ আমি শুধু একা থাকতে চাই৷ আপনি দয়া করে এখন চলে যান৷ পরে আসবেন৷’

‘শান্ত হোন, শৌভিকবাবু৷ আমার পরিচয়টা আপনি জানেন৷ তবু আর একবার বলছি৷ আমার নাম আদিত্য মজুমদার৷ পেশা গোয়েন্দাগিরি৷ আপনার পরামর্শে আপনার বন্ধু তার দাম্পত্য সমস্যা নিয়ে আমার কাছে এসেছিলেন৷’

‘আপনি যা বলছেন তার কোনও প্রমাণ আছে?’

‘আছে বইকি৷ এই ক্যামেরাটা আপনি অর্পিতাকে ধার দিয়েছিলেন৷’ আদিত্য ব্যাগ থেকে ক্যাননটা বার করে টেবিলে রাখল৷ ‘ধার দেবার উদ্দেশ্যটাও আপনার জানা ছিল নিশ্চয়৷ এই ক্যামেরাটা দিয়েই যে আপনার অ্যালবামের পোর্ট্রেটগুলো তোলা হয়েছে সেটা প্রমাণ করতে অসুবিধে হবে না৷ অর্থাৎ ক্যামেরাটা আপনার৷ কী উদ্দেশ্যে ওটা ব্যবহার করা হবে সেটা না জেনেই আপনি ক্যামেরাটা ধার দিয়েছিলেন এটা কেউ বিশ্বাস করবে না৷ অতএব দয়া করে কিছু না জানার ভান করবেন না৷ আমার হাতে সময় খুব কম৷’

শৌভিক গুপ্তকে বশে আনতে আরও পনেরো মিনিট লেগে গেল৷

‘মিনি আমার কাছে এসে দিনের পর দিন কান্নাকাটি করত৷ বলত, বুবাই ওকে অ্যাসিড দিয়ে পুড়িয়ে দেবার ভয় দেখায়৷ হয়তো সত্যি সত্যি একদিন পুড়িয়েও দেবে৷ ও বলত ও আর পারছে না৷ ডিভোর্স চায়৷ কিন্তু তার জন্যে ক্রুএলটির এভিডেন্স দরকার৷ মিনি আমাকে বলল বুবাই যখন ওকে অ্যাবিউস করবে তখনকার ভিডিও তুলে দিতে৷ আমি দেখলাম ওটা করতে যে নার্ভ এবং সাহস দরকার সেটা আমার নেই৷ আমি আমার ক্যানন ক্যামেরাটা ওকে দিয়ে বললাম ওটা যদি ও অটো মোডে দিয়ে ঘরের কোণে লুকিয়ে রাখে তাহলে যে ভিডিওটা ওর দরকার সেটা ও পেয়ে যাবে৷ মিনি ক্যামেরাটা নিয়ে চলে গেল৷ আমি সত্যিই জানতাম না ও আপনার কাছে ভিডিও তোলার রিকোয়েস্ট নিয়ে গেছে৷ বিশ্বাস করুন আমি সত্যিই জানতাম না৷ আপনার পরিচয়টাও আজকেই জানলাম৷ বিশ্বাস করুন৷’

‘বিশ্বাস করলাম৷ কিন্তু বলুন তো আপনি কি অর্পিতাকে ভালবাসতেন?’ আদিত্য হঠাৎ সরাসরি প্রশ্নটা করল৷

‘পাগলের মতো ভালবাসতাম, পাগলের মতো ভালবাসতাম৷ কিন্তু মিনি সেটা কোনও দিন জানতেই পারল না৷’ শৌভিক গুপ্ত ভেঙে পড়েছে৷

তাকে সামলে নেবার একটু সময় দিয়ে আদিত্য বলল, ‘শুনুন, আগামীকাল সকাল দশটায় আপনাকে একবার লালবাজারে অ্যাডিশানাল কমিশানার গৌতম দাশগুপ্তর ঘরে আসতে হবে৷ আপনার বন্ধু অরিজিৎ লাহিড়িও থাকবে৷ আপনাদের উপস্থিতিতে কাল অর্পিতা লাহিড়ি হত্যা রহস্যের যবনিকা উত্তোলিত হবে৷ আর হ্যাঁ৷ পালাবার চেষ্ট করবেন না৷ পুলিশ আপনার ওপর নজর রাখছে৷’

ঘরে চারজন শ্রোতা— অরিজিৎ লাহিড়ি এবং শৌভিক গুপ্ত ছাড়াও অ্যাডিশানাল কমিশানার গৌতম দাশগুপ্ত ও নরেন্দ্রপুর থানার ওসি অশোক সামন্ত৷ আদিত্য কথা বলছে৷

‘বর্তমান ঘটনার একটা ব্যাকগ্রাউন্ড আছে৷ আগে সেটা বলে নিলে আমার পরের কথাগুলো বোঝাতে সুবিধে হবে৷ বকুলবাগান রোডে চারজন কাছাকাছি বাড়িতে ছোটবেলা থেকে থাকত৷ মিনি অর্থাৎ অর্পিতা, মিঠু অর্থাৎ মধুমিতা, বুবাই অর্থাৎ অরিজিৎ আর কাল্টু অর্থাৎ শৌভিক৷ আমি এদের ডাকনামেই ডাকছি৷ চারজনে পাড়াতুতো ঘনিষ্ঠ বন্ধু৷ একটু বড় হয়ে তাদের মধ্যে নানারকম প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হয়৷ কিছুটা ওই পরশুরামের হারিত-লারিত-জারিতের মতো৷ তবে এক্ষেত্রে পরিণামটা মজার নয়, মর্মান্তিক৷ বুবাই আর মিনি যে পরস্পরের প্রতি আসক্ত হল, এটা নিয়ে কোনও জটিলতা নেই৷ কিন্তু সমস্যা, কাল্টু মিনির প্রেমে পাগল৷ অথচ মুখ ফুটে বলতে পারে না৷ বলবেই বা কী করে? মিনি আর বুবাই এক সঙ্গে ঘোরাঘুরি করে, কিছুদিন পরে তারা বিয়েও করবে৷ আরও সমস্যা, কাল্টু যেমন মিনির ব্যাপারে পাগল, তেমনি মিঠুও বুবাই-এর ব্যাপারে৷ এটাও নীরব প্রেম৷ দু’টি নীরব প্রেমই বেশ গভীর৷ কাল্টু বা মিঠু কেউই যে বিয়ে করেনি, সেটা হয়তো এই নীরব প্রেমের জন্যেই৷ এই হল বর্তমান কাহিনির ব্যাকগ্রাউন্ড৷’

আদিত্য দম নেবার জন্যে থামল৷ অরিজিৎ এবং শৌভিক দুজনেই মাথা নিচু করে আছে৷ থমথমে মুখ৷ গৌতম বলল, ‘গল্প জমে গেছে৷ বলে যা৷’ ইন্সপেক্টর সামন্ত স্থির হয়ে বসে চোখ পিটপিট করছে৷ এটা তার মুদ্রাদোষ৷

আদিত্য আবার বলতে শুরু করেছে৷

‘বর্তমানে আসি৷ অর্পিতা লাহিড়ি খুনের ঘটনাটার অনেক রকম ব্যাখ্যা হতে পারে৷ আমরা এক-একটা ব্যাখ্যা রিজেক্ট করতে করতে এগিয়ে আসল ব্যাখ্যাটায় পৌঁছব৷ ভারতীয় দর্শনে যেমন সত্যে পৌঁছনোর জন্য নেতি নেতি করে এগোতে বলে৷ প্রথম ব্যাখ্যাটা দিচ্ছে পুলিশ এবং সেটা অর্পিতা আমাকে যা বলেছিল তার ওপর ভিত্তি করে৷ ব্যাখ্যাটা এইরকম৷ বুবাই সন্দেহ করে তার বউ তার পুরোনো বন্ধু কাল্টুর সঙ্গে উদ্দাম প্রেম করে৷ বুবাই-এর আর্থিক অবস্থা যত খারাপ হচ্ছে, তার সন্দেহ বাতিক তত বাড়ছে৷ সে তার বউ মিনিকে রোজ ভয় দেখায় অ্যাসিড দিয়ে মুখ পুড়িয়ে দেবে৷ পেট্রল দিয়ে শরীর জ্বালিয়ে দেবে৷ মিনি আমার কাছে এল৷ বলল, বুবাই অ্যাবিউসিভ কথা বলছে, ভয় দেখাচ্ছে, এটার ভিডিও তুলে দিতে হবে৷ সেই ভিডিওর ভিত্তিতে মিনি বুবাই-এর বিরুদ্ধে ডিভোর্স কেস ফাইল করবে৷ আমি ভিডিও তুলতে গিয়ে দেখলাম মিনি খুন হয়েছে৷ তার শরীর ও মুখ এতটাই বিকৃত যে তাকে চেনা যায় না৷ বুবাই-এর বেডরুমে একটি চুল পাওয়া গেল যার সঙ্গে মৃতার চুলের ডিএনএ মিলে যাচ্ছে৷ ফলে পুলিশ ধরে নিল ওই মৃতদেহটা মিনির৷’

আদিত্য আবার থামল৷ গৌতমের দিকে তাকিয়ে বলল, আর একটু চা খাওয়াবি না?’

‘অবশ্যই খাওয়াব৷ তুই বলে যা৷’ গৌতম তার টেবিলের ওপর রাখা বেলটা বাজাল৷

‘পুলিশের ব্যাখ্যা মেনে নিলে কয়েকটা প্রশ্নের উত্তর পাচ্ছি না৷ বুবাই বাড়ি থেকে বেরোবার সময় কেন মোবাইল খুঁজে পেল না? নিয়মিত কে তার মোবাইলে ফোন করত যাকে বুবাই নিজেই তার একটা নম্বর ব্যবহার করতে দিয়েছিল? ঘটনার ঠিক আগে সেই ব্যক্তি কেন বারবার বুবাইকে ফোন করছিল? মিঠু কেন আজও বাড়ি ফিরল না? এসব কি সমাপতন নাকি এর আড়ালে অন্য কিছু আছে? তাছাড়া, কারখানার কাগজপত্র দেখে আমার একবারও মনে হয়নি বুবাই লাহিড়ির ব্যবসা খুব সঙ্কটের মধ্যে আছে৷ শোবার ঘরে পাওয়া ফিক্সড ডিপোজিট-এর সার্টিফিকেটগুলো দেখে পুলিশেরও একই ধারণা হয়েছিল৷ অর্থাৎ আর্থিক অনটনের কারণে বুবাই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিল এটা ঠিক নয়৷’

চা এসেছে৷ চমৎকার দার্জিলিং৷ চায়ে চুমুক দিয়ে আদিত্য আবার বলতে শুরু করল৷

‘এক কথায়, প্রথম ব্যাখ্যাটা আমার পছন্দ হল না৷ আমি অন্য কোনও ব্যাখ্যা খুঁজতে শুরু করলাম৷ দ্বিতীয় একটা ব্যাখ্যা এইরকম হতে পারে৷ বুবাই মিনিকে সত্যিই অ্যাসিড ছুঁড়বে বলে ভয় দেখাত৷ মিনি সে কথা কাল্টুকে জানায়৷ কাল্টু সুযোগ পেয়ে মিনিকে প্রেম নিবেদন করল যেটা সে আগে কখনও করতে পারেনি৷ মিনি বলল, কাল্টুকে সে বন্ধু হিসেবেই জানে, তার সঙ্গে কোনও প্রেমের সম্পর্ক সে ভাবতেই পারে না৷ প্রত্যাখ্যাত হয়ে কাল্টু ঠিক করল মিনিকে ঠিক সেইভাবে খুন করবে, যেভাবে বুবাই মিনিকে ভয় দেখায়৷ অতএব সেই খুনের দায় গিয়ে পড়বে বুবাই-এর ওপর৷ এক ঢিলে দুই পাখি মরবে৷ বুবাই-এর ওপরও তার রাগ ছিল৷’

‘আপনি কী সব যা তা বলছেন?’ শৌভিক গুপ্ত প্রতিবাদ করে উঠল৷

‘শান্ত হোন শৌভিকবাবু৷ আমি তো একবারও বলছি না এই রকমই হয়েছে৷ বরং আমি বলব এরকম হয়নি৷ কারণ এই সমাধানটা ধরে নিলে একাধিক জিনিস ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না৷ আমরা বুঝতে পারছি না কেন মিঠু এখনও ফিরল না৷ আমরা বুবাই-এর মোবাইল রহস্যেরও কোনও কিনারা করতে পারছি না৷’

‘তাহলে আসল ঘটনাটা কী?’ ইন্সপেক্টর সামন্ত আর ধৈর্য ধরতে পারছেন না৷

‘কাল্টুর জায়গায় মিঠুকে বসিয়ে দিলে আরেকটা সম্ভাবনা তৈরি হয়৷ ধরা যাক, কোনও কারণে মিনির সঙ্গে বুবাই-এর সম্পর্কটা খারাপ হয়ে গিয়েছিল৷ এতটাই যে বুবাই মিনিকে মেরে ফেলার ভয় দেখাত৷ একই সঙ্গে সে মিঠুর সঙ্গে একটা সম্পর্ক তৈরি করেছিল৷ বুবাই তার নিজের একটা মোবাইল মিঠুকে দিয়েছিল যার মাধ্যমে সে মিঠুর সঙ্গে যোগাযোগ রাখত৷ বুবাই একদিন মিঠুর কাছে গিয়ে বলল মিনির সঙ্গে সে আর থাকতে পারছে না৷ সে মিনিকে খুন করে মিঠুকে বিয়ে করবে৷ বলল বটে, কিন্তু কাজটা করা তার পক্ষে সম্ভব ছিল না৷ কারণ বুবাই সত্যিই মিনিকে ভালবাসত৷ কথার খেলাপ করাতে মিঠু বুবাই-এর ওপর রেগে গিয়েছিল৷ বুবাইকে কৌশলে বাড়ি থেকে সরিয়ে দিয়ে সে নরেন্দ্রপুরে গিয়ে মিনিকে খুন করল৷ তারপর নিজের কাজের বীভৎসতায় ভয় পেয়ে গিয়ে সে এখন গা ঢাকা দিয়ে বসে আছে৷’

‘এটাই কি তা হলে হয়েছে?’ শৌভিক গুপ্ত ব্যগ্রভাবে জিজ্ঞেস করল৷

‘এই গল্পটা আমি প্রায় বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলাম কারণ এটা দিয়ে মিঠুর অন্তর্ধান, এবং রহস্যময় মোবাইল নম্বর এই দুই-এরই ব্যাখ্যা পাচ্ছি৷ কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আরও কয়েকটা ঘটনার ব্যাখ্যা পাচ্ছি না৷ যেমন, বুবাই কেন বেরোবার আগে বাড়িতে মোবাইলটা ফেলে গেল? মিনির পোষা বেড়াল প্যান্থারকে কে বিষ দিয়ে মারল? কেন মারল? সব থেকে বড় কথা, মিনিকে অত বীভৎসভাবে মারা হল কেন? না মিঠু মিনিকে মারেনি৷’

‘তাহলে?’ অরিজিৎ লাহিড়ি এতক্ষণে কথা বলেছে৷

‘আসল ব্যাপারটা হল’ আদিত্য একবার সবার মুখের দিকে তাকিয়ে নিল৷ ‘আসল ব্যাপারটা হল, যে মৃতদেহটা আমরা দেখেছি সেটা মিনির নয়, মিঠুর৷’

‘আমি এইরকমই একটা কিছু সন্দেহ করেছিলাম৷’ অরিজিৎ লাহিড়ি আর্তনাদ করে উঠল৷

আদিত্য বলল, ‘আমি যে গল্পটা বলব সেটার মধ্যে কিছু কল্পনার মিশেল আছে, কিন্তু আমার বিশ্বাস এর বেশিরভাগটাই সত্যি৷ মিনি এবং মিঠু দুজনেই বুবাইকে ভালবাসত৷ মিনির ভালবাসায় প্রচণ্ড হিংস্রতা ছিল, মিঠুর ভালবাসায় স্নিগ্ধতা৷ প্রথম যৌবনে বুবাইকে মিনির হিংস্র ভালবাসা বেশি আকর্ষণ করেছিল৷ তারপর যত দিন যেতে লাগল বুবাই মিনির কাছ থেকে দূরে সরে যেতে লাগল৷ মূল সমস্যা, বুবাই-এর ব্যাপারে মিনি আশ্চর্য রকমের পজেসিভ এবং তার থেকে শুরু হয়েছে তার সন্দেহবাতিক৷ অর্থাৎ আমার কাছে বুবাইকে মিনি যেভাবে বর্ণনা করেছিল, সেটা ছিল আসলে তার নিজের চরিত্রের বর্ণনা৷ বুবাই যে বলেছিল তার স্ত্রী ঠিক সুস্থ নয়, কথাটা একশো ভাগ সত্যি৷

‘বুবাই যত মিনির কাছ থেকে দূরে সরে যেতে লাগল ততই সে মিঠুর কাছে আসতে লাগল৷ একটা মোবাইল সে মিঠুকে দিল যেটা দিয়ে সে মিঠুর সঙ্গে যোগাযোগ রাখত৷ মিঠুর নিজের নম্বর মিনির চেনা৷ সেটা বুবাই-এর মোবাইলে দেখলে মিনি অনর্থ করবে৷ মিনির একটা এনজিও ছিল৷ সেটার কাজে মিনিকে মাঝে মাঝে বাইরে যেতে হত৷ আমার ধারণা মিঠু সেই সময়টা বুবাই-এর সঙ্গে এসে থাকত৷ এই কারণে বুবাই-এর বেডরুমে মিঠুর চুল পুলিশ খুঁজে পায় এবং মৃতার চুলের সঙ্গে সেটা মিলে যাবার ফলে মনে করা হয় যে মৃতা অর্পিতা লাহিড়ি৷ সত্যটা এই যে গত দু-তিন বছর মিনি এবং বুবাই-এর বেডরুম আলাদা ছিল৷ কাজেই বুবাই-এর বেডরুমে মিনির চুল পাওয়া সম্ভব ছিল না৷ উল্টোদিকে মিঠুর ফ্ল্যাটে তল্লাশি চালিয়ে পুলিশ যে চুল পেয়েছে সেটাও মৃতার চুলের সঙ্গে মিলে গেছে৷’

‘মিঠু এখানে আসত অথচ কেউ তাকে দেখতে পেত না?’ শৌভিক প্রশ্ন করল৷

‘আমার বিশ্বাস, মিঠু রাত্তিরের অন্ধকারে আসত৷ পাঁচিলের ফাটল দিয়ে ঢুকে পড়ত৷ ফাটল অবধি পৌঁছনোর আর একটা রাস্তা আছে যেখান দিয়ে এলে দরোয়ানের চোখ এড়ানো যায়৷ পরে একদিন নরেন্দ্রপুরে গিয়ে আমি সেটা আবিষ্কার করেছি৷ যাই হোক, মিনি একদিন জানতে পারল বুবাই-এর সঙ্গে মিঠুর একটা অ্যাফেয়ার চলছে৷ সে ঠিক করল মিঠুকে খুন করবে এবং এমনভাবে খুন করবে যাতে পুরো সন্দেহটা বুবাই-এর ওপর গিয়ে পড়ে৷ সে প্রথমে কাল্টুকে বলল বুবাই তাকে অ্যাসিড ছুঁড়ে মারবে বলে ভয় দেখাচ্ছে৷ পরে একই গল্প সে আমার কাছে এসেও বলল৷ যাতে পুলিশ তদন্ত শুরু করলে আমারা দুজনেই বুবাই-এর বিরুদ্ধে সাক্ষী দিই৷ খুনটা তাকে অ্যাসিড মেরেই করতে হবে৷ এবং তারপরে বডিটা পোড়াতে হবে৷ যাতে মৃতার আইডেন্টিটিটা কেউ বুঝতে না পারে৷ আমি যেদিন নরেন্দ্রপুরের কারখানা দেখতে গেলাম, মিনি তার গল্পটাকে বিশ্বাসযোগ্য করার জন্য তার বেড়ালটাকে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলল৷ সম্ভবত বেড়ালটাকে মারবে সে আগেই ঠিক করে রেখেছিল৷ সেদিন আমি যখন খাবার আগে বুবাই-এর সঙ্গে বসার ঘরে বসে কথা বলছিলাম তখন এক ফাঁকে বেরিয়ে গিয়ে মিনি বেড়ালটাকে বিষ খাওয়ায়৷ এর থেকে বোঝা যায় মিনি মানসিকভাবে সুস্থ ছিল না৷

‘বুবাই আর মিঠুর একটা গোপন আস্তানা ছিল৷ মিনি কোনওভাবে জানতে পেরেছিল, রবিবার সন্ধেবেলা বুবাই মিঠুর সঙ্গে তাদের সেই গোপন মিলনকুঞ্জে দেখা করতে যাবে৷ মিঠু সেখানে আগেই চলে গিয়েছিল কারণ চার তারিখ থেকে সে বাড়ি ফেরেনি৷ মিনির মনে হল এটাই প্রকৃষ্ট সময়৷ বুবাই বেরোনোর আগে মিঠু তার মোবাইলটা লুকিয়ে রাখল৷ অতএব মোবাইল ছাড়াই বুবাইকে বেরোতে হল৷ বুবাই বেরিয়ে যাবার পর মিনি দুটো ফোন করল৷ একটা ফোন করে সিকিউরিটিকে সরিয়ে দিল৷ দু’নম্বর ফোনটা সে মিঠুকে করে বলল, বুবাই বন্দুক নিয়ে সুইসাইড করবে বলে ভয় দেখাচ্ছে৷ আমি সামলাতে পারছি না৷ তুই তাড়াতাড়ি চলে আয়৷ মিঠু ভয় পেয়ে মিলনকুঞ্জ থেকে রওয়ানা দিয়ে দিল৷ বুবাই তখনও সেখানে পৌঁছয়নি৷ পথে আসতে আসতে সে অনেকবার বুবাইকে ফোন করার চেষ্টা করল৷ বুবাই-এর ফোন সুইচড অফ৷ মিনি সেটাকে বন্ধ করে রেখেছে৷ মিঠু বাড়িতে ঢোকার পরে মিনি তাকে বসার ঘরে নিয়ে গিয়ে তার মুখে অ্যাসিড ছুঁড়ে মারল৷ বুবাই-এর বন্দুকটাও সে সঙ্গে রেখেছিল৷ যদি অ্যাসিডে কাজ না হয় তা হলে বন্দুকটা ব্যবহার করতে হবে৷ পুলিশের ডাক্তার বলছে অ্যাসিডের ফলেই মৃতার মৃত্যু হয়৷ তাই বন্দুকটা আর ব্যবহার করতে হয়নি৷ মিঠুকে খুন করে মিনি চম্পট দিল৷ এই হল আমার গল্প৷ কারও কোনও প্রশ্ন আছে?’

‘মিনি লাহিড়ি এখন কোথায়?’ ইন্সপেক্টার সামন্ত জিজ্ঞেস করল৷

‘সেটা পুলিশকে খুঁজে বার করতে হবে৷ মিনির ধারণা পুলিশ তাকে খুঁজবে না কারণ পুলিশ জানে সে মারা গেছে৷ এই ধারণার ফলে সে অসাবধান হয়ে পড়বে৷ তাকে খুঁজে বার করা শক্ত হবে না৷’

‘কিন্তু এই মহিলার হাতে তো টাকা-পয়সা নেই৷ তার চলবে কী করে?’ গৌতম জিজ্ঞেস করল৷

‘টাকা-পয়সা আছে তো৷ যে গয়নাগুলো বাঁধা রেখে বুবাই এক সময় টাকা ধার করেছিল সেগুলো তো সবই সে আবার উদ্ধার করে এনেছিল৷ বেশিরভাগটাই মিনির কাছে ফিরে গেছে৷ সেগুলো নিয়ে মিনি পালিয়েছে৷ কয়েকটা গয়না অবশ্য ফেরত যায়নি৷ সেগুলো বুবাই মিঠুকে গিফট করেছিল৷ ঠিক বলছি অরিজিৎবাবু?’

অরিজিৎ লাহিড়ি উত্তর দিল না৷ আদিত্য বলল, ‘আমাকে কিন্তু এবার উঠতেই হবে৷ কাল মুম্বাই চলে যাচ্ছি৷ আজকের দিনটা গিন্নির সঙ্গে না কাটালে অধর্ম হবে৷’

আগস্ট, ২০২২

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%