অপূর্ণ প্রেম

জয়ন্তনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়

কাজের দিন হোক বা ছুটির দিন, ভোর ছটায় ঘুম ভাঙবেই। টি—শার্ট, ট্র্যাক স্যুট পরে, স্নিকারটা পায়ে গলিয়ে রাস্তায় বেরোতে বেরোতে আরও দশ মিনিট। ছ—টা দশে সমাজগড় থেকে বেরিয়ে গল্ফগ্রিনের রাস্তায় পড়তে পড়তে আরও পাঁচ মিনিট। গল্ফগ্রিন থেকে জগিং শুরু করে, সেন্ট্রাল পার্কটাকে দু—পাক ঘুরে সোজা লর্ডস বেকারি, সেখান থেকে আবার ফিরে আসা। বাড়িতে ঢুকতে ঢুকতে আরও পঁয়তাল্লিশ মিনিট। মানে কাঁটায় কাঁটায় সাতটা।

আজ গল্ফগ্রিনের রাস্তায় পড়েই মনটা খারাপ হয়ে গেল কন্দর্পনারায়ণের। গল্ফগ্রিনের রাস্তার দু—দিকে গাছের ডাল কেটে ডাঁই করে রাখা আছে। এই ব্যাপারটা ওঁর একদম পছন্দ নয়। এই পুজোর মুখটায় গাছের ডাল কাটা বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিতেও উচিত নয়। অবশ্য বিজ্ঞানীরা বা পরিবেশকর্মীরা গাছ বা গাছের ডাল কাটার সবসময় বিরোধী। আগে রাস্তার দু—দিক থেকে গাছের ডাল এমনভাবে রাস্তার ওপর ঝুঁকে থাকত যে সুন্দর ছাতার মতো লাগত। তারপর এই সময়টা তো গল্ফগ্রিনের রাস্তার দু—ধারের সব গাছে ফুলের সমারোহ। আজকাল অবশ্য মিউনিসিপ্যালিটির গাছ কাটার কোনও সময় নেই। রাস্তার ধারের গাছগুলোকে তো বড় হতেই দেওয়া হয় না। বহু বছর ধরে কন্দর্পনারায়ণ টিভি—তে 'আইন আপনার বন্ধু' বলে একটা আইনি শো পরিচালনা করে আসছেন। বহু বিশিষ্ট লইয়ার, পরিবেশবিদ, সমাজকর্মী শো—টায় এসেছেন। প্রাক্তন বিচারপতি ভগবতীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়ও গত হবার আগে বহুবার শো—টায় এসেছেন বিশেষজ্ঞ বক্তা হিসেবে। তিনি বলতেন, পুজোর আগে আগে এই সময়টায় বহু ছোট্ট ছোট্ট পোকামাকড় এসে বাসা বাঁধে গাছের ছোট ছোট ডালে। ওই ছোট্ট পোকামাকড়গুলো মানুষের উপকারী বন্ধু। ওরা অন্য ছোট ছোট মশা বা ওই জাতীয় বিভিন্ন রোগবহনকারী পোকামাকড়কে খেয়ে ফেলে। আজকাল আমরা বর্ষার পর থেকে এত গাছপালা কাটতে শুরু করি যে, আর ওই উপকারী বন্ধু পোকামাকড়গুলি বাঁচে না। ফলে, যে পোকামাকড় আমাদের জন্য ক্ষতিকারক, এখন তাদেরই রমরমা। তার ফলেই তো প্রত্যেক বছর পুজোর আগে থেকে আমাদের সমাজে এত রোগের আক্রমণ।

সত্যি!! গাছ যে আমাদের এত উপকারী বান্ধব, এটা আর আমরা কবে বুঝব?

আজকে একবার হেমেনদাকে, মানে এখানকার যিনি কাউন্সিলর, সেই হেমেন দাশগুপ্তদাকে ফোন করতে হবে। ওঁকে বুঝিয়ে বলা দরকার যে, এই সময় গাছ বা গাছের ডাল কাটা অত্যন্ত ক্ষতিকারক। হেমেনদা প্রবীণ মানুষ। এই গোটা এলাকাটাকে উনি সাজিয়ে—গুছিয়ে রেখেছেন। কন্দর্পনারায়ণের সঙ্গে অত্যন্ত বন্ধুত্বের সম্পর্ক। ওঁকে বললে, উনি নিশ্চয়ই বুঝবেন।

আজকে জগিং করে ফিরতে ফিরতে একটু দেরি হয়ে গেল। সামনেই পুজো। গল্ফগ্রিনে প্যান্ডেল করা শুরু হয়ে গিয়েছে। গল্ফগ্রিনে তিনটে পুজো হয়। তিনটে পুজোরই প্যান্ডেল বাঁধার কাজ চলছে। কন্দর্পনারায়ণের নিজের একটা ফ্ল্যাট আছে ফেজ টু—তে। তাই ফেজ—টু—র পুজো প্যান্ডেলটা নিয়ে ওঁর একটু বিশেষ আগ্রহ থাকে। আজও দৌড়োতে দৌড়োতে ফেজ—টু—র পুজো প্যান্ডেলের সামনে এসে দাঁড়িয়ে একটু দম নিলেন। ভালো করে দেখতে শুরু করলেন প্যান্ডেলটা। কাজ এখনও অনেক বাকি। তবে মনে হচ্ছে, কোনও পুরোনো মন্দিরের আদলেই এবারের প্যান্ডেলটা হবে। খানিকক্ষণ প্যান্ডেলের সামনে দাঁড়িয়ে আবার দৌড় শুরু করলেন। পঁয়তাল্লিশ বছর বয়স হল, কন্দর্পনারায়ণের কিন্তু দুর্গাপুজোর প্রতি পাগলামোটা আর গেল না। এখনও নতুন বছরের ক্যালেন্ডার হাতে এলেই আগে দেখে নেন, এবার দুর্গাপুজো কবে পড়েছে। পুজো আসবার আগে থেকেই বাচ্চাদের মতো দিন গোনা শুরু হয়ে যায়। ওঁর তো মনে হয় পুজোর ছুটি হওয়া উচিত পুজোর আগের দিনগুলোয়। এই সময়টায় আনন্দে বুকের মধ্যেটা কেমন গুড়গুড় করতে থাকে। আকাশটা কী সুন্দর—নির্মল নীল হয়ে যায়। রোদের রং হয়ে যায় হলুদ। প্যান্ডেল তৈরি হবে, প্রথমে ঠেলায় করে বাঁশ আসবে, প্যান্ডেল বাঁধা শুরু হবে। এখন তো খুঁটিপুজোও খুব রমরমিয়ে সারা হয়। তারপর প্যান্ডেলে কাপড় চড়ানো হবে, রাত জেগে প্যান্ডেল তৈরি হবে। তারপর মা আসবেন। মফসসলে বা গ্রামগুলোতে শরৎকাল আরও সুন্দরভাবে বোঝা যায়। হাওয়ায় কাশফুল মাথা দোলায়, বাতাসে পুজো—পুজো গন্ধ। কিন্তু, দুঃখ হয় বাচ্চাদের জন্য। এই আনন্দটা তো ওদেরই উপভোগ করার কথা। কিন্তু, ওরা এই সময়টায় ব্যস্ত থাকে পরীক্ষা—পড়াশোনা নিয়ে। কন্দর্পনারায়ণ যদি কোনদিন রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী হতেন তো, পুজোর ছুটি দিতেন পুজোর আগের সময়টায়। পুজো হয়ে যাবার পর পুজোর ছুটি দিয়ে কী হয়? তখন তো মা—ও চলে যান, ফাঁকা প্যান্ডেলের দিকে তাকালে বুকের মধ্যে ছ্যাঁত করে ওঠে। আর প্যান্ডেল খোলার সময় তো তাকানো যায় না। বুকের মধ্যে মুচড়ে ওঠে। ছোটবেলা থেকেই কন্দর্পনারায়ণের এরকমই মনে হয়। আজও তিনি বদলাননি।

ফেজ—টু—র প্যান্ডেলের সামনে দাঁড়িয়ে একটু সময় গেল। প্যান্ডেলের পেছনেই ওঁর ফ্ল্যাট। মনে মনে ঠিক করে নিলেন, এবার পুজোর সময় অন্তত দুটো দিন সবাই মিলে গল্ফগ্রিনেই ফ্ল্যাটে থাকবেন। রাতে ভালো কালচারাল অনুষ্ঠান হয়। অনুষ্ঠান দেখে ফ্ল্যাটেই থেকে যাবেন। আবার সমাজগড়ের বাড়িটা ওঁর পৈতৃক বাড়ি, ঠাকুরদার আমলের। ওই বাড়িটাও ছেড়ে পুজোর সময় বাইরে থাকতে মন চায় না। খালি মনে হয়, পূর্বপুরুষরা বুঝি ওঁর দিকে তাকিয়ে বসে আছেন। কখন উনি বাড়ি ফিরবেন, সন্ধেবেলা ধূপ জ্বালানো হবে, ঘরে ঘরে আলো জ্বলে উঠবে, স্বর্গে বসে ওঁরাও খুশি হবেন।

সেন্ট্রাল পার্কে দৌড়োতে দৌড়োতে কয়েকজনের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। কালকে টিভি—তে একটা আলোচনাতে উনি লইয়ার হিসেবে অংশ নিয়েছিলেন—গত কয়েকদিনে রাজ্যে মেয়েদের ওপর ঘটে যাওয়া কয়েকটা অত্যাচারের ঘটনা নিয়ে। তার মধ্যে একটি হাসপাতালে একজন নার্সের উপর অত্যাচারের ঘটনা সবচেয়ে নারকীয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত অন্য বিশিষ্ট মানুষরা বলছিলেন, যে আইনের আরও পরিবর্তন দরকার, আরও কড়া আইন প্রয়োজন। একমাত্র কন্দর্পনারায়ণ বললেন যে, আইন যথেষ্টই রয়েছে, এবং তা বেশ কড়া। এখন প্রয়োজন আইনের সঠিক প্রয়োগের, পুলিশকে সঠিক তদন্ত করতে হবে। অনেক সময়ই দেখা যায় সমাজের উচ্চবিত্ত শ্রেণির লোক অপরাধ করে, স্রেফ টাকার জোরে প্রভাব খাটিয়ে পার পেয়ে যায়।

সেন্ট্রাল পার্কে যাঁদের সঙ্গে দেখা হল, তাঁরা সবাই কন্দর্পনারায়ণের ধারালো যুক্তির প্রশংসা করলেন।

এইসব সামলে, বাড়ি ফিরতে ফিরতে সওয়া সাতটা। এইবার বাড়ি ফিরে স্নান করে, সাদা পাজামা—পাঞ্জাবি পরে নেমে এলেন চেম্বারে। ডাইনিং রুমে গিয়ে ব্রেকফাস্ট সেরে নিলেন দশ মিনিটে। তারপর গুছিয়ে চেম্বারে বসে খবরের কাগজগুলো খুঁটিয়ে পড়তে শুরু করলেন। চারটে নামী খবরের কাগজ আসে। দুটো বাংলা, দুটো ইংরেজি। অবশ্য খবরের কাগজের রাজনীতির খবরে ভরা পাতাগুলো ওঁকে কোনওদিনই আকর্ষণ করে না। উনি খোঁজেন, রাজ্যে কোথায় কী ক্রাইম ঘটল, সেই খবরগুলো। কোথায় খুন হয়েছে? কোথায়ই বা রেপের ঘটনা ঘটেছে? কোথায় বা লুঠ, ডাকাতি, রাহাজানি হয়েছে? একদম শেষে উনি দেখবেন খেলার পাতা। নিজে ইস্ট বেঙ্গলের সাপোর্টার। খেলার পাতাতেও নির্দিষ্ট কিছু ধরনের খবর—যেমন, কোন খেলাতে ইস্ট বেঙ্গল জিতল কি না? ক—টা গোল করল? এ ছাড়া, সৌরভ গাঙ্গুলি আর লিয়েন্ডার পেজের খবর। এই দু—জনের খবর থাকলে পড়েন, না থাকলে, খেলার পাতাও খোলেন না। ইস্ট বেঙ্গল কোনও খেলায় হেরে গেলে, তিনি আড়চোখে খবরটা একঝলক দেখে ওই পাতাটা আর খুলবেনই না। সৌরভ আর লিয়েন্ডার খেলা ছেড়ে দেবার পর, খেলার পাতার প্রতিও আগ্রহ কমে গিয়েছে।

ইস্ট বেঙ্গল, সৌরভ আর লিয়েন্ডার—এই তিনটে নামই ওঁর কাছে মোটিভেশনাল। কন্দর্পনারায়ণের পরিবার বাঙাল পরিবার। দেশভাগের আগেই তাঁরা চলে আসেন কলকাতায়, পিতামহ ছিলেন উত্তর কলকাতার টাউন স্কুলের শিক্ষক। পরে ভবানীপুরে মিত্র ইনস্টিটিউশনে শিক্ষকতা করতেন। পূর্ববঙ্গ থেকে মানুষ কীভাবে, কী কষ্ট করে এ দেশে রাতারাতি পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছে, ছোটবেলায় মা—মাসিদের কাছে সে গল্প শুনে কত রাত উনি কেঁদেছেন, অথচ এই লোকগুলোর তো নিজেদের কোনও দোষ ছিল না। রাজনীতির শিকার তাঁরা। কিছু অবিবেচক মানুষ আগুপিছু কিছু না ভেবে, দেশ ভাগ করে দিয়েছেন, আর তাঁর ফল ভুগেছেন লক্ষ লক্ষ মানুষ। সব ছেড়ে প্রাণ হাতে করে পালিয়ে আসতে হয়েছে আশ্রয়ের সন্ধানে। ভাবা যায় না। যাঁদের সব ছিল, তাঁরা হয়েছেন পথের ভিখারি। কন্দর্পনারায়ণ শুনেছেন, তাঁর সম্পর্কিত একজন দিদা নাকি বাংলাদেশ থেকে পালাবার সময়, বাচ্চাকে কোলে নিয়ে প্রাণভয়ে দৌড়েছেন সারারাত, ভোরবেলায় একটা গাছের নিচে একটু দম নেবার জন্য বসে, বাচ্চাকে দুধ খাওয়াতে গিয়ে দেখেন, কখন যেন কোলের মধ্যেই বাচ্চা মারা গেছে, তিনি টেরই পাননি। তারপর মৃত বাচ্চাকে সেই গাছের তলাতেই কবর দিয়ে আবার দৌড় শুরু করেছেন। কাঁদবারও সময় পাননি। পূর্ববঙ্গ থেকে পালিয়ে এসে তাঁর আর—এক দিদা নাকি হোগলা—পাতার ছাউনি দিয়ে ঘর তৈরি করে বাচ্চাদের নিয়ে থাকতেন। ঝড় উঠলে ভয় পেতেন—এই বুঝি ঘর উড়ে যায়। দিদা নিজে আর বাচ্চারা ঘরের ছাউনি ধরে ঝুলে থাকতেন। এইসব কথা ভাবলেই কন্দর্পনারায়ণের ইস্ট বেঙ্গল সত্তাটা জেগে ওঠে। গায়ের রক্ত টগবগ করে ফুটতে থাকে।

আর ওদিকে সৌরভ আর লিয়েন্ডার, দু—জনের আগ্রাসী মনোভাব, কাউকে জমি না—ছাড়ার দৃঢ় মানসিকতা আর হেরেও না—হারার সংকল্প কন্দর্পনারায়ণ নিজের মধ্যেও আনবার চেষ্টা করেছেন।

সৌরভ আর লিয়েন্ডার খেলা ছেড়ে দেবার পর, খেলার পাতাগুলোও কন্দর্পনারায়ণের কাছে আকর্ষণ হারিয়েছে।

আজ খবরের কাগজের ওপর ঝুঁকে পড়ে ক্রাইম নিউজগুলো পড়তে শুরু করলেন, কয়েকটা খবরকে লাল পেন দিয়ে মার্কও করলেন—'বৃদ্ধ খুনে ধৃত এক, কারণ নিয়ে ধোঁয়াশা', 'মা—মেয়ের দগ্ধ দেহ উদ্ধারে গ্রেপ্তার দুই', 'জঙ্গিপুরে একই পরিবারের তিনজনের মৃতদেহ উদ্ধার, পুলিশ অন্ধকারে।' প্রায় একুশ বছর ওকালতি হল কন্দর্পনারায়ণের। প্রত্যেকদিন এইভাবেই ক্রাইম নিউজগুলো মনোযোগ দিয়ে খুঁটিয়ে পড়েন তিনি। শুধু পড়েনই না, মনের মতো খবরগুলো নিজের মতো করে বিশ্লেষণ করে ভাবার চেষ্টা করেন। খুনি কে? বা অপরাধী কে? পুলিশই বা কাকে ধরল? ঠিক অপরাধীটাকে ধরতে পারল? নাকি একটা দায়সারা তদন্ত করে উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপাল—মানে, ঠিক যে অপরাধ করেছে তাকে না ধরে, একটা হাঘরে লোককে ধরে এনে হাজির করল। এই ধরনের খেতে না—পাওয়া লোককে ধরলে সুবিধা একটাই, যে, সে ভালো উকিলও দিতে পারবে না, তার হয়ে বলার কেউও থাকবে না, আবার লোকটার সাজাও হয়ে যাবে। অর্থাৎ, আসল দুষ্কৃতীকে না ধরতে পারার জন্য পুলিশকে কেউ বদনামও দেবে না, আবার এই না খেতে পাওয়া লোকটার হয়ে বলার লোকও থাকবে না। মাঝে মাঝেই কন্দর্পনারায়ণ তাঁর পুলিশ বন্ধুদের সঙ্গে ঘটে—যাওয়া ঘটনাগুলোকে নিয়ে আলোচনাও করেন। পুলিশমহলে অনেকেই তাঁর বন্ধুবান্ধব আছেন। অনেকেই ফোন করে কন্দর্পনারায়ণের মতামত চান।

এই তো সেদিন সল্ট লেক এলাকায় এক বৃদ্ধ দম্পতি খুনের ঘটনায় পুলিশ একজন রং মিস্ত্রিকে ধরেছিল। তারপর ওই থানার ও. সি. সাহেব, যিনি ঘটনাচক্রে কন্দর্পনারায়ণের বন্ধু, তিনি একটা কারণে ফোন করায় কন্দর্পনারায়ণ তাঁকে বললেন, 'খবরের কাগজের খবর পড়ে বা তোমার সঙ্গে আলোচনা করে আমার ধারণা, খুব পরিচিত এবং খুব কাছের লোকই খুনটা করেছে। তুমি ভালো করে খোঁজ নাও।' সত্যি সত্যি—। কিছুদিন পর ওই ও. সি. সাহেব ফোন করে বলেছিলেন, 'তুমি ঠিকই বলেছ, তোমার দেখানো রাস্তায় তদন্ত করে দেখলাম, ওই বৃদ্ধ দম্পতির একজন নিকটাত্মীয়, সম্পর্কে ভাইপো, তিনি খুন দুটি করিয়েছিলেন, সম্পত্তির লোভে।'

মনের মতো কোনও ক্রাইম নিউজ থাকলে, তিনি হাত জোড় করে মনে মনে ঠাকুরকে বলেন, 'ভগবান, এই কেসটা যেন আমার কাছেই আসে। এই কেসটা আমাকে পাঠিয়ে দাও ঠাকুর।' ওই যে কথায় আছে না? কেউ যদি একমনে কিছু প্রার্থনা করেন তাহলে ঈশ্বর তাঁর ডাকে সাড়া দেন। সেইরকমই, কাকতালীয়ভাবেই হোক, আর যেভাবেই হোক, সারা পশ্চিমবঙ্গে ঘটে—যাওয়া অনেক বড় বড় অপরাধের ঘটনাই চলে আসে কন্দর্পনারায়ণের কাছে।

আজও সেইরকম কয়েকটা ঘটনা 'মার্ক' করে ঈশ্বরের কাছে মনে মনে প্রার্থনা করলেন কন্দর্পনারায়ণ, 'ঠাকুর, এই মামলাগুলো আমার কাছে পাঠিয়ে দাও।'

'টিং টং,' চেম্বারের কলিং বেলটা বেজে উঠল। কন্দর্পনারায়ণের চিন্তার জালটা ছিঁড়ে গেল। সবে সকাল ন—টা, আজ রবিবার, রবিবার চেম্বার শুরু হয় দশটা থেকে। দশটা থেকে জুনিয়র ছেলে—মেয়েরা, ইন্টার্নরা আসতে শুরু করেন। গোটা একতলা জুড়েই চেম্বার। গোটা একতলাটা প্রায় দু—হাজার স্কোয়্যার ফুট। কন্দর্পনারায়ণের নিজের বসার ঘর। জুনিয়ররা বসেন দুটো ঘরে। ক্লায়েন্টদের বসার ঘর, কনফারেন্সের ঘর। দুটো বাথরুম। সব মিলিয়ে ছ—টা ঘর জুড়ে চেম্বার। রবিবার সারাদিন চেম্বার চলে, সকাল দশটা থেকে একেবারে রাত অবধি। সকলে মিলে খাওয়াদাওয়াটা চেম্বারেই সারেন। শনি—রবি আর ছুটির দিনগুলোতে রুটিন একই। ক্লায়েন্টদের ভিড়ও এইদিনগুলোতেই বেশি হয়। কিন্তু, এই সময় কে এল? বীরেনবাবু বয়স্ক লোক। চেম্বারে কেউ এলে উনি দরজা খুলে বসতে দেন। উনি গ্রিলের ফাঁক দিয়ে দেখে এসে বললেন 'একটি অল্পবয়সি মেয়ে এসেছেন। আপনার সঙ্গে দেখা করতে চান। বলছেন খুব দরকার।'

'আপনি জিজ্ঞেস করেছেন অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে কি না? অ্যাপয়েন্টমেন্ট না থাকলে বলুন, একটা সময় নিয়ে অন্যদিন আসতে।' কন্দর্পনারায়ণ খবরের কাগজের থেকে মুখ না তুলেই বললেন।

'বলেছি স্যার, মেয়েটি বাইরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কান্নাকাটি করছেন। বলছেন খুব বিপদ।'

'যান, দরজা খুলে দিন, ভেতরে আসতে বলুন'।

বীরেনবাবু দরজা খুলে মেয়েটিকে নিয়ে কন্দর্পনারায়ণের ঘরে এলেন।

কন্দর্পনারায়ণ খবরের কাগজগুলো একপাশে সরিয়ে সোজা হয়ে বসে মেয়েটির দিকে তাকালেন—

বছর কুড়ি—বাইশ হবে, শ্যামলা রং, কিন্তু দেখতে সুন্দরী। সাধারণ চুড়িদার পরা। অনেকক্ষণ ধরেই কান্নাকাটি করছেন বোঝা গেল। কারণ চোখের কাজল লেপটে চোখের তলার অংশে লেগে রয়েছে। সামান্য সাজগোজও করেননি। কাজলটাও বোধহয় গতকাল পরেছিলেন। সাধারণত এই বয়সের মেয়েরা বাইরে বেরোবার সময় সামান্য হলেও সাজগোজ করে নেয়। মেয়েটি এখানে আসবার সময় সেটুকুও করেননি, মানে বেশ বিপদে পড়েছেন।

মেয়েটি কন্দর্পনারায়ণের সামনের চেয়ারে বসে হাতজোড় করে নমস্কার করলেন। কন্দর্পনারায়ণ নজর করলেন, মেয়েটির ডান হাতে ঘড়ির ব্যান্ডের গোল দাগ, কিন্তু হাতে ঘড়ি নেই। বোঝা গেল, মেয়েটি ঘড়ি পরেন, কিন্তু আজ ঘড়ি পরেননি। অর্থাৎ মেয়েটি ভালোরকম বিপদে পড়েছেন, তাই ঘড়ি পরবার সুযোগ হয়নি বা ভুলে গিয়েছেন। মাথার চুলটাও এলোমেলো, বেরোবার সময় মাথায় চিরুনিও দেননি।

মেয়েটির কাঁধে একটা ব্যাগ। মেয়েটি ব্যাগের মধ্য থেকে একটা মোবাইল বের করে, একটু সংকুচিত ভঙ্গিতে বললেন, 'আচ্ছা নমস্কার, আমার নাম শ্রাবণী রায়, আমি যাদবপুর ইউনিভার্সিটিতে ইংলিশ নিয়ে গ্র্যাজুয়েশন করছি। আমি স্যার, খুব বিপদে পড়েছি। কিন্তু সব কথা বলবার আগে একটা কথা বলতে চাই। আমি জানি, আপনার সঙ্গে কথা বলতে গেলে, বা পরামর্শ নিতে গেলে, আপনাকে একটা ফি দিতে হবে, কিন্তু আমি এতটাই বিপদে পড়েছি যে, বেরোবার সময় আমার মাথার ঠিক ছিল না, আর আমি ফি—টাও নিয়ে বেরোইনি। আপনি আমায় আপনার অ্যাকাউন্ট ডিটেলটা দিন। আমি এক্ষুনি, এখানে বসেই মোবাইল থেকে আপনার অ্যাকাউন্টে ফিজটা পাঠিয়ে দিচ্ছি, তারপর না হয়, আপনি আমাকে পরামর্শ দিন।'

কন্দর্পনারায়ণের মেয়েটিকে বিপর্যস্ত অবস্থায় দেখে একটু মায়া হল, তিনি ওঁর চেম্বারের মুহুরি রবিকে ডেকে বললেন, 'দিদিমণিকে জল দে। ম্যাডাম, আপনি শান্ত হয়ে বসুন। আগে জল খান, তারপর সব কথা খুলে বলুন। বিপদে যে পড়েছেন, তা তো বুঝতেই পারছি। না হলে আর এই সাতসকালে আমার কাছে ছুটে আসবেন কেন! ফিজটা বড় কথা নয়, ফিজ না হয় আপনি আমাকে পরেও দিতে পারবেন।'

মেয়েটি জল খেয়ে, খুব নিশ্চিন্ত স্বরে বললেন, 'স্যার, আপনাকে আমি অনেকদিন ধরেই চিনি, টিভি—তে দেখি। আপনার কথাগুলোও খুব যুক্তিযুক্ত আর সাহসী মনে হয়। কাগজে আপনার করা বিভিন্ন মামলার খবরও দেখি। আপনি অসহায় মেয়েদের পাশে এসে দাঁড়ান, তাদের সাহায্য করেন। কাজেই, আমি বিপদে পড়ায় আপনার কথাই মনে হল, আপনিই সাহায্য করতে পারবেন। গুগল থেকেই আপনার ফোন নম্বর, ঠিকানা আর লোকেশন পেয়ে গেলাম। তাই আপনাকে ফোন না করে সকালেই চলে এলাম—আমার খুব বিপদ, স্যার, আপনি যদি না বাঁচান, তাহলে আমাকে সুইসাইড করতে হবে,' এই বলে মেয়েটি আবার কাঁদতে শুরু করলেন।

কন্দর্পনারায়ণ মেয়েটিকে বললেন 'আগে আপনার সমস্যাটা তো শুনি তবে। আপনাকে দেখে আর এখন অবধি আপনি যা বললেন, তাতে আমার ধারণা, আপনি আপনার বয়ফ্রেন্ডের কাছ থেকে প্রতারিত হয়েছেন। হয় আপনি অবিবাহিতা, কিন্তু আপনি প্রেগন্যান্ট হয়েছেন। অথবা আপনার বয়ফ্রেন্ডের কাছে আপনার ব্যক্তিগত কিছু ছবি আছে, ও আপনাকে ব্ল্যাকমেইল করছে। আমি জানি না আপনি কী বলবেন, তবে আপনার বিধ্বস্ত অবস্থা দেখে তা—ই মনে হচ্ছে।'

মেয়েটি যেন সজোরে চাবুকের বাড়ি খেলেন। চমকে গিয়ে মুখ তুলে বললেন 'কী করে বুঝলেন স্যার—আমি আপনাকে এখনও কিছুই বলিনি।' কন্দর্পনারায়ণ স্বগতোক্তির মতো ভঙ্গিমায় বিড়বিড় করে বললেন 'অ্যাসেসমেন্ট, সিম্পল হিসেব, আপনি কাল রাতেও সাজগোজ করেছিলেন, কাজল পরেছিলেন, লিপস্টিকও লাগিয়েছিলেন। তার মানে কাল রাতেও আপনার মন ভালো ছিল, আপনার বিপদটা হয় বেশি রাতে, না হয়, আজকে সকালে হয়েছে। তা ছাড়া, কাল রাতেও যদি আপনার বিপদ হত, আপনি আমাকে ফোন করে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করতেন। আপনি নিজেই বললেন, গুগল থেকেই আমার ফোন নম্বর, ঠিকানা, লোকেশন, সবই আপনি পেয়েছেন, তার মানে বিপদটা আপনার হয় বেশি রাতে, না হয় আজকে সকালে হয়েছে। আপনার কপালের টিপটা উঠে গিয়ে আপনার কপালের চুলের সঙ্গে আটকে রয়েছে, চোখের কাজল লেপটে রয়েছে, তার মানে, আপনি বাড়ি থেকে বেরোবার সময় আয়নাতেও মুখ দেখেননি। হাতে লেদার ব্যান্ডের ঘড়ি পরা আপনার অনেকদিনের অভ্যেস। আপনি ঘড়ি পরতে ভুলে গেছেন। সঙ্গে টাকাপয়সাও আনেননি। আপনি যখন আত্মহত্যার কথা বললেন, তখন বুঝলাম, আপনার সমস্যাটা এমন, যে আপনি মনে করছেন, আপনি লোকসমাজে মুখ দেখাতে পারবেন না। মেয়েরা তখনই লোকসমাজে মুখ দেখাতে পারবে না মনে করে, যখন তাদের আবরুর প্রশ্ন আসে। আপনার বয়স কম, এই ধরনের সমস্যায় বেশি জড়াবার সম্ভাবনা—এবার আপনি প্রথম থেকে বলুন।'

মেয়েটি এতক্ষণ হাঁ করে সব কথা শুনছিলেন, এবার পারলে কন্দর্পনারায়ণের পায়ে পড়ে যান এমন অবস্থা হল। প্রায় ফুঁপিয়ে উঠে বললেন, 'স্যার, আমার বাড়ির লোক কিচ্ছু জানে না, আমি মা—বাবার একমাত্র মেয়ে, বহরমপুরে বাড়ি। যাদবপুর ইউনিভার্সিটিতে পড়ি বলে, যাদবপুরেই একটি ঘর ভাড়া নিয়ে থাকতাম। আমার সঙ্গে একটি ছেলের আলাপ হয়। আমার থেকে দশ বছরের বড়। মানে ওর এখন বত্রিশ। আই. টি. সেক্টরে কাজ করে। ফেসবুক থেকে বন্ধুত্ব হয়। আমরা বার বার দেখাও করতে থাকি। ক্রমে বন্ধুত্ব বাড়ে। একদিন ও আমাকে ওর ফ্ল্যাটে ডাকে। ও ওখানে একাই থাকে। সন্তোষপুর সার্ভে পার্কে। আমি ওখানে যাই। আমরা ঘনিষ্ঠ হই। আমি জানতাম না, ঘরে ও ক্যামেরা ফিট করে রেখেছে। আমাদের ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের ছবি ও ভিডিয়ো করে নেয়। তারপর ও আমাকে প্রোপোজাল দেয়, আলাদা বাড়ি ভাড়া নিয়ে কী হবে? ও আমার সঙ্গেই থাকবে একসঙ্গে। আমরা লিভ টুগেদার শুরু করি। বাড়িতে অবশ্য কিছুই জানত না। ও আমাদের ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের ছবিগুলো যে লুকিয়ে ভিডিয়ো করছে, আমি জানতাম না। পরে আমি জানতে পারি যে, ও বিবাহিত। বিহারে ওর ছেলে বউ আছে। আর ওর যে বত্রিশ বছর বয়স, সেটাও লুকিয়েছিল। ও বলেছিল ওর বয়স ছাব্বিশ। এখন ও আমাকে ব্ল্যাকমেইল করছে। বলছে, ওর এক্ষুনি তিন লাখ টাকার দরকার। ও বিহারে ফিরে যাবে। ব্যবসা করবে। আমি যদি টাকা না দিই, তাহলে আমার সমস্ত ছবি বিভিন্ন পর্নোগ্রাফিক সাইটে আপলোড করে দেবে। স্যার, কাল রাতে আমাকে এই কথাটা বলে। আজ বিকেল ৪ টেতে ওর বিহারে যাবার ট্রেন। একটার মধ্যে ওকে টাকা দিয়ে আসতে হবে। না হলে, আমার ছবি স্যার, দুনিয়া দেখবে। আমি সারারাত ওকে অনেক বোঝাবার চেষ্টা করেছি, ও শোনেনি, তাই আমি আপনার কাছে ছুটে এলাম। আপনি বাঁচান।'

'তা আপনি পুলিশকে জানিয়েছেন? ওকে তো এক্ষুনি অ্যারেস্ট করতে হবে। আমার কাছে এলেন কেন? আগে পুলিশকে জানান। আমি একটা কমপ্লেইন্ট লিখে দিচ্ছি, এক্ষুনি থানায় জমা দিন। ও পালাবার আগে ওকে অ্যারেস্ট করা দরকার।' কন্দর্পনারায়ণ উত্তেজিত হয়ে পড়লেন।

'না স্যার, আমি কেস করতে চাই না। জানাজানি হয়ে গেলে বিপদ। পুলিশে কেস করেছি জানলেই ও সব ছবি আপলোড করে দেবে। আর ও পালিয়ে যাবে।' মেয়েটি কাঁদতে শুরু করলেন, কন্দর্পনারায়ণ বিরক্ত হলেন। এইসব আজকাল এক ঝামেলা হয়েছে—অল্পবয়সি সব ছেলে—মেয়ে, ফেসবুক থেকে বন্ধুত্ব, তারপর শারীরিক সম্পর্ক, লুকিয়ে লুকিয়ে ছবি তুলে রাখা, ব্ল্যাকমেইল—শেষ পরিণতি, কোথাও আত্মহত্যা, কোথাও খুনোখুনি। মেয়েটি সামনে বসে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল।

কন্দর্পনারায়ণ টেবিলের ড্রয়ার থেকে একটা মুখশুদ্ধির কৌটো খুলে দুটো মুখশুদ্ধি বের করে মুখে দিলেন। কী করা যায়... কী করা যায়... কিছু করতেই হবে। এই মেয়েটার সঙ্গে কার যেন মুখের মিল আছে—কে যেন? কে যেন?

ও হ্যাঁ! মনে পড়েছে—সেই যে মেয়েটা, গত বছর এসেছিল—গড়িয়া থেকে, কী যেন নাম ছিল—মৌপিয়া চক্রবর্তী, সে ঘটনায় একরকম হার হয়েছিল কন্দর্পনারায়ণের।...

সেদিনও ছিল রবিবার, এইরকমই চেম্বারে বসে কাজ করছিলেন, ক্লায়েন্ট, জুনিয়র, গমগম করছিল চেম্বার। আগের ক্লায়েন্ট চলে যাবার পর তনুশ্রী এসে বললেন, 'স্যার, পরের ক্লায়েন্টকে পাঠাব? গড়িয়া থেকে মৃগাঙ্ক চক্রবর্তী এসেছেন মেয়েকে নিয়ে। বলছেন, প্রাইভেট কথা আছে। আলাদা বলবেন।'

কন্দর্পনারায়ণ তনুশ্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন, 'তুমি আমার বহুদিনের জুনিয়র, তুমি তো জানো, আমার কাছে প্রাইভেট বলে কোনও আলোচনা হয় না, আর আমার সব কনফারেন্সেই তোমরা থাকবে। তোমরাও আলোচনা শুনবে, ক্লায়েন্টদের প্রবলেম কীরকম, কী মামলা করতে হবে। যাও, ডেকে আনো।'

তনুশ্রী জুনিয়র লইয়ার। তনুশ্রীর মতোই আরও অনেকে আছেন এই চেম্বারে, তাঁরাও জুনিয়র লইয়ার হিসেবে কাজ শিখছেন। মৃগাঙ্কবাবু এসে ঢুকলেন কন্দর্পনারায়ণ যে ঘরে বসে আছেন, সেই ঘরে, সঙ্গে তাঁর মেয়ে মৌপিয়া।

এমনিতে উকিলের চেম্বার যেরকম হয়, সেইরকমই চেম্বার। দেওয়াল জুড়ে র‍্যাক, র‍্যাকে ঠাসা বই। একটি দেওয়ালে
র‍্যাকে সাজানো বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পাওয়া স্মারক, রঙিন মাছের অ্যাকোয়ারিয়াম। চেম্বারে অ্যাকোয়ারিয়াম রাখা যে শুধু কন্দর্পনারায়ণের শখ তা—ই নয়, এর একটা মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যাও রয়েছে।

বেশির ভাগ মানুষই ওঁর কাছে আসেন বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে, বিভিন্ন মামলা—মকদ্দমার বিষয় আলোচনা করতে, মনের দিক থেকে তাঁরা খুবই বিধ্বস্ত আর বিষণ্ণ থাকেন। অ্যাকোয়ারিয়ামের রঙিন মাছগুলোর ঘোরাফেরা, খেলে বেড়ানো দেখে তাঁরা একটু মনের দিক থেকে শান্তি পাবেন—এইটাই ধারণা কন্দর্পনারায়ণের।

মৃগাঙ্কবাবু মেয়েকে নিয়ে ঘরে ঢুকে কন্দর্পনারায়ণকে হাত জোড় করে নমস্কার করলেন। কন্দর্পনারায়ণও হাত জোড় করে প্রতিনমস্কার করে, সামনে সাজিয়ে—রাখা চেয়ারগুলি দেখিয়ে বললেন, 'বসুন।' কন্দর্পনারায়ণ নিজে বসেছেন একটি উঁচু কাঠের চেয়ারে। সামনে বড় কাচ—পাতা টেবিল। টেবিলে প্রচুর বই, ব্রিফের বান্ডিল, ফাইল, টেবিলের ডানদিকে তনুশ্রী বসলেন। আর—একটি মেয়ে ঘরের একদিকে রাখা কম্পিউটারে কিছু টাইপ করছেন, পরে অবশ্য ওঁর সঙ্গেও মৃগাঙ্কবাবুর আলাপ হয়ে যায়। উনি পারমিতা, এই চেম্বারেই ল'ইয়ার হিসেবে কাজ করেন।

মৃগাঙ্কবাবু বলা শুরু করলেন, পাশে বসে—থাকা মেয়েকে দেখিয়ে বললেন, 'আমার মেয়ে, মৌপিয়া।' কন্দর্পনারায়ণ তাকিয়ে দেখলেন, বাইশ—তেইশ বছর বয়স হবে। শ্যামলা গায়ের রং, কিন্তু অত্যন্ত সুন্দরী, বড় বড় চোখ, টিকোলো নাক। কিন্তু মেয়েটি দুঃখী—দুঃখী মুখ করে বসে আছে, অ্যাকোয়ারিয়ামের রঙিন মাছগুলোর দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবছে। চুড়িদার পরা, গলায় জড়ানো ওড়নার একটা কোণ অন্যমনস্কভাবে আঙুলে জড়াচ্ছে।

মৃগাঙ্কবাবু বলে চললেন, 'গড়িয়া স্টেশন থেকে আরও ভেতরে দু—বিঘা জায়গার উপর পাঁচিল—ঘেরা আমার বাড়ি, ছোট পুকুর আছে, প্রচুর গাছ। মৌপিয়া গড়িয়া কলেজে ইতিহাসে অনার্স নিয়ে পড়ছে। আমার একটি ছেলে আছে। উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দেবে সামনের বছর।

'সমস্যাটা হল আমার এই মেয়েকে নিয়েই। আমাদের বাড়ি থেকে কিছুটা হেঁটে বড়রাস্তায় উঠতে হয়। সেখান থেকেই আমরা অটো, রিকশা ইত্যাদি পাই। মেয়ে রোজ কলেজ যাবার সময় অতটা রাস্তা হেঁটেই যায়। তারপর ওখান থেকে অটো ধরে। বড়রাস্তায় উঠতেই একটা ক্লাব আছে। সেই ক্লাবটায় সারাদিন ছেলেরা আড্ডা মারে, আর যখনই অল্পবয়সি মেয়েরা ক্লাবের সামনে দিয়ে যায়, তখনই তাদের উদ্দেশ্য করে কুৎসিত কথাবার্তা ছুড়ে দেয়, অঙ্গভঙ্গি করে আর সন্ধের পর যা হয়, তা তো আর বলার কথা নয়। ক্লাবের সামনে মদ—গাঁজার আড্ডা বসে যায়। মেয়েরা গেলে, মেয়েদের হাত ধরে টানা, ওড়না ধরে টানার মতো ঘটনাও রোজই ঘটে। তা, আমার মেয়েও ওখান দিয়ে রোজই যায়, আর রোজই ওকে এই ধরনের অসভ্যতার মুখোমুখি হতে হয়। কিন্তু, ও আবার একটু প্রতিবাদী, ওকে কুৎসিত কথাবার্তা বলাতে ও বেশ কয়েকবার প্রতিবাদ করেছে। ওরা আরও খেপে গেছে। তা ছাড়া, ওদের পেছনে কিছু রাজনৈতিক নেতারও হাত আছে শুনেছি। কারণ ভোটের সময় নেতাদের ওদেরই তো প্রয়োজন। ভোট এলে, বাইক, মিছিল, দেওয়ালে পোস্টার সাঁটানো, মিটিং—মিছিলে ভিড় বাড়ানো—এসব তো ওরাই করবে। আমার মেয়েকে তো আর ভোটের সময় ওরা পাবে না—' এই অবধি বলে মৃগাঙ্কবাবু একটু দম নিলেন।

একটু থেমে আবার শুরু করলেন 'গতকাল সন্ধেবেলায় মেয়ে যখন কলেজ থেকে ফিরছিল, ওরা তখন মেয়ের রাস্তা আটকে দাঁড়ায়, কুৎসিত অঙ্গভঙ্গি করে। মেয়ে আর সহ্য করতে না পেরে, ওদের একজনকে একটা থাপ্পড় মারে, তারপরই ওরা আমার মেয়েকে টেনে রাস্তায় ফেলে দেয়। অশ্লীল আচরণ করে, এমনকী আমার মেয়ে যখন রাস্তায় পড়ে যায়, তখন ওরা আমার মেয়ের পেটে লাথি মারে। মেয়ে অত মার খেয়ে বেশ কিছুক্ষণ রাস্তায় পড়ে ছিল, পথচলতি অনেক মানুষই ব্যাপারটা দেখেছে, কিন্তু কেউই সাহায্য করতে এগিয়ে আসেনি। খবর পেয়ে আমি দৌড়ে যাই। ওরা আমাকেও হুমকি দেয়। বলে, আমার ছেলেকে কিডন্যাপ করবে, আমার মেয়ের মুখে অ্যাসিড মারবে।'

মৃগাঙ্কবাবুর কথা শুনতে শুনতে গোটা ঘটনাটা কন্দর্পনারায়ণের চোখের সামনে সিনেমার মতো ভেসে উঠছিল। তিনিও যেন দেখতে পাচ্ছিলেন, একটি বাইশ—তেইশ বছরের মেয়েকে কিছু ছেলে ঘিরে ধরেছে, অশালীন আচরণ করছে। মেয়েটি চিৎকার করছে, কাঁদছে, সাহায্য চাইছে। কিন্তু আশপাশের দোকানদার, পাশ দিয়ে হেঁটে—যাওয়া লোকজন, কেউই সাহায্য করতে এগিয়ে আসছে না। অবশেষে, মেয়েটি জ্ঞান হারিয়ে রাস্তায় লুটিয়ে পড়ল, একটি ছেলে মেয়েটির পেটে পা তুলে দিল।

কন্দর্পনারায়ণের মাথার মধ্যেটা রাগে ঝনঝন করছিল, শিরায় শিরায় রক্তের ফ্লো যেন বেড়ে গিয়েছিল। কানটা গরম হয়ে লাল হয়ে গেল।

মেরুদণ্ড সোজা করে বসে তিনি বললেন, 'থানায় গিয়েছেন? মেয়ের ইনজুরি রিপোর্ট আছে? হাসপাতালে গিয়েছিলেন?' মেয়েটির দিকে তিনি তাকালেন, ভালো করে দেখতেই নজরে পড়ল, মেয়েটিকে মারধরের দাগ স্পষ্ট। মেয়েটির ডান চোখের নিচে কালচে দাগ। কানের নিচে আঁচড়ের দাগ। গলাতেও কালশিটে। এতক্ষণ গলায় ওড়না জড়ানো ছিল বলে বোঝা যায়নি। মৃগাঙ্কবাবু মৌপিয়ার হাত দুটো ধরে একটু তুলে দেখালেন, হাত দুটোতে বিভিন্ন জায়গায় কালশিটে, রক্ত জমাট বেঁধে রয়েছে। কথা বলতে বলতে মৃগাঙ্কবাবুর চোখে জল চলে এলেও মেয়েটি নিষ্পলক দৃষ্টিতে নিচের দিকে তাকিয়ে আছে। তার যেন কিছুতেই মন নেই। গতকাল রাতের ঘটনা ওকে দুঃখকষ্টের ঊর্ধ্বে নিয়ে গিয়েছে।

পারমিতা মুখ খুললেন, 'বীভৎস অত্যাচার, সহ্য করা যাচ্ছে না।'

তনুশ্রী মেয়েটির হাত দুটো ধরে, কালশিটের দাগগুলো দেখতে দেখতে বললেন, 'বিভিন্ন জায়গায় রক্ত জমাট বাঁধা। বিশ্বাস হচ্ছে না, কলকাতার এত কাছে, গড়িয়ার মতো জায়গায়, এই ঘটনা ঘটতে পারে। গ্রামেগঞ্জে এরকম হয় জানতাম, কলকাতায় তা—ই বলে?'

মৃগাঙ্কবাবু আবার মুখ খুললেন 'সরকারি হাসপাতাল থেকে মেডিক্যাল কাল রাতেই করিয়েছি। হ্যাঁ, এবার থানায় যেতে চাই, আপনি ব্যবস্থা করে দিন। আমার মেয়ের গায়ে যারা হাত দিয়েছে, তাদের আমি ছাড়ব না।' বলতে বলতে তিনি ফুঁপিয়ে উঠলেন।

'কালই থানায় ফোন করে জানিয়েছি—বলে কিনা, কেস করে কোনও লাভ নেই, বছরের পর বছর মামলা চলবে, তার থেকে থানায় আসুন, সেটল করে দিচ্ছি। আর যারা মেরেছে, তারাও পাড়ারই ছেলে, ওদের বিরুদ্ধে মামলা করলে পাড়ায় টিকতেই পারবেন না। তাই আমি আপনার কাছে এলাম। আপনার কথা অনেক শুনেছি, আপনি প্লিজ কিছু করুন।'

মৃগাঙ্কবাবু কাতর ভঙ্গিতে টেবিলের ওপর দিয়ে কন্দর্পনারায়ণের হাত দুটো চেপে ধরলেন। কন্দর্পনারায়ণের শরীরটা শিরশিরিয়ে উঠল। গায়ে যেন কাঁটা দিল। তিনি চোখের সামনে দেখতে পেলেন, মৃগাঙ্কবাবু খবর পেয়ে বাড়ির দরজা খুলে দৌড়োতে দৌড়োতে যাচ্ছেন ঘটনাস্থলে, গিয়ে দেখলেন, তাঁর নিজের মেয়ে মাটিতে পড়ে আছে, জ্ঞানহীন। মৃগাঙ্কবাবু কাঁদছেন, চিৎকার করছেন, আশপাশের লোকের সাহায্য চাইছেন। কিন্তু, ক্লাবের ছেলেদের বিরুদ্ধে কে যাবে? ইচ্ছে থাকলেও, কেউই আসতে সাহস করছে না। অবশেষে দু—একজন প্রবীণ মানুষ এগিয়ে এলেন, মৃগাঙ্কবাবুর মেয়েকে রাস্তা থেকে তুলতে সাহায্য করলেন। কেউ একটা জলের বোতল এগিয়ে দিলেন, মৃগাঙ্কবাবু সেখান থেকে জল নিয়ে মেয়েটির মাথায় ছিটিয়ে দিলেন, মেয়ের জ্ঞান ফিরল। উপস্থিত মানুষদের মধ্যেই কেউ একজন একটা অটো ডেকে দিলেন। মৃগাঙ্কবাবু মেয়েকে ধরে ধরে অটোতে তুললেন, অটো ছুটল হাসপাতালের উদ্দেশে।

'স্যার, প্লিজ কিছু করুন, ওদের অ্যারেস্ট করান, ওদের শাস্তি চাই।' মৃগাঙ্কবাবুর আর্তিতে সংবিৎ ফিরল কন্দর্পনারায়ণের। আনমনা হয়ে বললেন, 'একটা কথা কিন্তু ঠিক। আমি কমপ্লেইন্ট করছি থানায়। ওখানকার থানার ও. সি. আমার বন্ধু, আমি আপনাকে কমপ্লেইন্টটা রেডি করে দিচ্ছি। আপনি এক্ষুনি থানায় যান মেয়েকে নিয়ে। ও. সি. কে আমি ফোনে বলেও দিচ্ছি। ওরা অ্যারেস্ট হয়ে যাবে, কিন্তু কতদিন ওরা জেলে থাকবে? কিছুদিন পরই ওরা জামিন পাবে। জামিন পেয়েই কিন্তু ওরা আপনাদের আবার অ্যাটাক করবে। সামলাতে হবে কিন্তু। ভয় পেলে চলবে না। আমি আছি আপনাদের সঙ্গে। কিন্তু মুশকিল হল, ওরা জামিনে বেরিয়ে যদি ফের অ্যাটাক করে... সঙ্গে সঙ্গে থানায় ফোন করবেন... আর... আমি বরং, হাইকোর্টে একটা মামলা করে, আপনাদের পুলিশ প্রোটেকশনের ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।'

কী যেন একটু চিন্তা করে আবার বললেন, 'ভারতবর্ষের দুর্ভাগ্য যে, আইন যাঁরা তৈরি করেছেন, তাঁরা এমন একটা ভাব দেখান যে, মেয়েদের প্রোটেকশনের জন্য অনেক আইন আছে, আর ভারতবর্ষে মেয়েরা প্রোটেক্টেড। আসলে ব্যাপারটা উলটো। আইন হয়তো মেয়েদের জন্য কিছু আছে, বেশির ভাগ মেয়েই তার সুবিধা পায় না, ভারতবর্ষের ভিকটিমের প্রোটেকশর জন্য বা উইটনেস অর্থাৎ সাক্ষীর প্রোটেকশনের জন্য কোনও ব্যবস্থাই নেই। একটা মেয়ে অত্যাচারিতা হলে, সেই মেয়েটি যদি বা খুব সাহস নিয়ে থানায় গিয়ে অভিযোগ করেও, তার পক্ষে সম্ভব হয় না দিনের পর দিন কোর্টে গিয়ে মামলা লড়া। কে তাকে সুরক্ষা দেবে? কোর্টে মামলা লড়ার জন্য রাস্তায় বেরোলে, রাস্তা থেকে তাকে কিডন্যাপ করে তুলে নিয়ে আবার রেপ করে দেবে। সেইজন্যই তো অপরাধীদের সাজা পাবার হার এত কম। প্রত্যন্ত এক—একটা গ্রামের মেয়েরা রোজ অত্যাচারিতা হয়। তারপর তারা ঘরের কোণে মুখ লুকিয়ে কাঁদে, থানায় যাবার সাহস পায় না। ভয় পায়, আবার যদি তুলে নিয়ে গিয়ে অত্যাচার করে? আপনার মেয়ের জন্য আমি লড়ব, আমি ওর জন্য সর্বক্ষণের পুলিশি পাহারার ব্যবস্থা করব। আপনারা কিন্তু ভয় পাবেন না। প্লিজ, নার্ভ ফেল করবেন না।'

তারপর পারমিতাকে বললেন, 'পারমিতা, তোমাকে একটা ডিকটেশন দিচ্ছি, কড়া করে একটা কমপ্লেইন্ট রেডি করো।' বলে, একটা কড়া কমপ্লেইন্ট রেডি করে দিলেন, মানে উনি বললেন, আর পারমিতা, কম্পিউটারে বসে টাইপ করে, প্রিন্ট রেডি করে মৃগাঙ্কবাবুর হাতে দিলেন। কন্দর্পনারায়ণ মোবাইল ফোনটা হাতে নিয়ে থানার ও.সি.—কে ফোন করে বললেন, 'তোমার কাছে এক ভদ্রলোককে পাঠাচ্ছি। উনি ওনার মেয়েকে নিয়ে যাচ্ছেন এক্ষুনি। গতকাল সন্ধেবেলায় মেয়েটি যখন কলেজ থেকে ফিরছিল, স্থানীয় ক্লাবের ছেলেরা ওকে কুৎসিত অঙ্গভঙ্গি করে ও অশ্লীল কথাবার্তা বলে। ও প্রতিবাদ করতেই, ওকে মাটিতে ফেলে ওরা মারে। সারা গায়ে ইনজুরি রয়েছে। আমি কমপ্লেইন রেডি করে দিয়েছি। ওঁরা যাচ্ছেন। আর হ্যাঁ, আমি আমার একটি জুনিয়র ছেলেকে সঙ্গে পাঠাচ্ছি, যাতে ওঁরাও একটু সাহস পান। তুমি এক্ষুনি কেস চালু করো, ওদের অ্যারেস্ট করো। আর আমি ভয় পাচ্ছি, ওরা জামিন পেয়ে বেরিয়ে এঁদের বেঁচে থাকা কঠিন করে দেবে। আমি হাইকোর্ট থেকে ওঁদের জন্য একটা পুলিশ প্রোটেকশন চেয়ে মামলা করে অর্ডার বের করে দিচ্ছি। ততদিন তুমি ওঁদের দেখো।'

ফোনে কথা বলা শেষ করে পারমিতাকে বললেন, 'পারমিতা, সুদীপ্তকে ডাকো তো। সুদীপ্ত যাক ওঁদের সঙ্গে।'

পারমিতা, সুদীপ্ত বলে আর—একজন জুনিয়র লইয়ারকে অন্য একটি ঘর থেকে ডেকে আনলেন। মৃগাঙ্কবাবুর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়ে বললেন, 'মৃগাঙ্কবাবু, ইনি একজন লইয়ার। সুদীপ্ত সেনগুপ্ত। আমারই জুনিয়র, উনি আপনাদের নিয়ে থানায় যাবেন। আপনারাও সাহস পাবেন। এক্ষুনি কেস চালু করে আসামিদের অ্যারেস্ট করতে হবে।' তারপর সুদীপ্তবাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন 'সুদীপ্ত, তুমি ওঁদের সঙ্গে যাও, কেসটা একেবারে স্টার্ট করিয়ে দিয়ে আসবে। আজ দুপুরের মধ্যেই আসামিদের তুলতে হবে। ওরা যদি জানতে পারে যে, ওদের বিরুদ্ধে কেস হয়েছে, তাহলে ওরা পালিয়ে যাবে। এক্ষুনি বেরিয়ে পড়ো।'

মৃগাঙ্কবাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন, 'মৃগাঙ্কবাবু, এটা ঠিক যে, আপনি বিপদে পড়ে আমার কাছে এসেছেন, আপনাকে বলতেও খারাপ লাগছে। কিন্তু না বলেও উপায় নেই, এই সবকিছুর জন্য আমার একটা ফীজ হবে, সেটা আপনাকে দিতে হবে। তনুশ্রী আপনাকে সব বলে দেবে।' বলে তনুশ্রীকে বললেন, 'তনুশ্রী, তুমি ওঁদের নিয়ে পাশের ঘরে যাও। আর ফিজের ব্যাপারে সব বলে দাও।' তনুশ্রী, মৃগাঙ্কবাবু আর মৌপিয়াকে নিয়ে পাশের ঘরে গেলেন।

কন্দর্পনারায়ণ, সুদীপ্ত আর পারমিতার দিকে তাকিয়ে বললেন, 'কেস তো চালু হবেই, আসামিরা ধরাও পড়বে। কিন্তু জামিনে বাইরে বেরিয়ে ওঁদের ভয় দেখাবে। তখনই হবে আসল সমস্যা। পারমিতা, আমরা হাইকোর্টে ওঁদের জন্য পুলিশ প্রোটেকশন চেয়ে মামলা করব, একটা মামলা রেডি করো।'

সত্যি সত্যিই আসামিরা সেদিনই অ্যারেস্ট হল, প্রায় কুড়ি দিন মতো হাজতেও ছিল। কিন্তু, কুড়ি দিন পর আসামিরা জামিন পেয়ে বেরিয়ে আসে। তারপর, আর কী হয়েছে—কন্দর্পনারায়ণ জানেন না। মৃগাঙ্কবাবু আর মৌপিয়া কেউই আর যোগাযোগ করেননি। মাঝে মাঝেই মৃগাঙ্কবাবুর কথা মনে হত কন্দর্পনারায়ণের—'ওঁরা তো আর ফোন করলেন না, ওঁদের কী হল?' কিন্তু, অন্য আরও বিভিন্ন মামলার চাপে মৃগাঙ্কবাবুদের ঘটনাটা মন থেকে হারিয়ে গিয়েছিল।

প্রায় ছ—সাত মাস পরে হঠাৎ একদিন মৃগাঙ্কবাবুর ফোন—অ্যাপয়েন্টমেন্ট চেয়ে। কন্দর্পনারায়ণ অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন? 'কী ব্যাপার, মৃগাঙ্কবাবু, আপনাদের জন্য অত করা হল—ও.সি.—কে বলে আসামিদের অ্যারেস্ট করা হল, তারপর আপনারা তো আর যোগাযোগই করলেন না। কিচ্ছু জানালেন না, ব্যাপারটা কী?'

মৃগাঙ্কবাবু শুধু বলেছিলেন, 'একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট দিন স্যার। এসে বলছি।'

মৃগাঙ্কবাবু এসেছিলেন। সঙ্গে মৌপিয়া। দু—জনেই রোগা হয়ে গিয়েছেন, মৌপিয়ার চেহারায় সেই জৌলুসও আর নেই। দু—জনেই যেন শরীরটা টেনে টেনে চেম্বারে ঢুকে বসলেন। মৃগাঙ্কবাবু সেদিন যা বলেছিলেন, তার সারমর্ম হল এই—'আসামিরা অ্যারেস্ট হয়েছিল। তারপর আলিপুর জজকোর্টে ওদের টি. আই. প্যারেডের অর্থাৎ শনাক্তকরণের দিন ঠিক হয়। ওইদিন সকাল এগারোটায় মৌপিয়া আর মৃগাঙ্কবাবুর আলিপুর কোর্টে যাবার কথা। সকালবেলায় গ্যাস দিতে আসে যে লোকটা, সে কাঁধে করে একটা সিলিন্ডার নিয়ে এসে হাজির। মৃগাঙ্কবাবুর স্ত্রী অত সকালে গ্যাসের সিলিন্ডার নিয়ে আসতে দেখে অবাক—তিনি বললেন, 'আমরা তো গ্যাস বুক করিনি, তুমি গ্যাসের সিলিন্ডার নিয়ে এলে যে,' লোকটা ধপ করে গ্যাসের সিলিন্ডারটা ঘরের মেঝেতে রেখে বলল, 'কাকিমা, কাকু কি দিদিকে নিয়ে কোর্টে যাচ্ছেন? আসামিদের চেনাতে?' তারপর মাথা চুলকে গম্ভীর গলায় বলল, 'না গেলেই ভালো, মাটিতে ফেলে মারাতেই কত যন্ত্রণা। অ্যাসিড মারলে শুনেছি যন্ত্রণা অনেক বেশি।' এই বলে গ্যাসের সিলিন্ডারটা আবার কাঁধে করে ঘর থেকে দুমদাম করে পা ফেলে বেরিয়ে গেল। কথাগুলো শুনে, মৃগাঙ্কবাবুর স্ত্রী—র শরীরটা ভয়ে ঠান্ডা হয়ে গেল। যে লোকটা খবরের কাগজ দিতে আসে, সে—ও কেমন গম্ভীর মুখে বলল, 'কাকিমা, দিদি ভালো আছেন তো? তা আজকে দিদি কি কোর্টে যাবেন নাকি? খবরের কাগজে অন্যের খবর পড়তে ভালো, নিজেরাই যদি খবর হয়ে যান?'—এই বলে, কাগজের বান্ডিলটা ঘরের মধ্যে ছুড়ে দিয়েই, সাইকেলে জোরে জোরে প্যাডেল করে চলে গেল।

মৃগাঙ্কবাবুর স্ত্রী সব ঘটনা মৃগাঙ্কবাবুকে জানাবার পর, মৃগাঙ্কবাবু চাইছিলেন কন্দর্পনারায়ণকে ফোন করে সব জানাতে। সেইসময়ই, ছেলে বাইরে বেরিয়েছিল, সে ঘরে এসে খবর দেয়, যে একটা লোক নাকি ভোরবেলা থেকেই সদর দরজার বাইরে বসে ছিল। মৃগাঙ্কবাবুর ছেলে ভেবেছিল, কোনও ভবঘুরে হয়তো দরজার পাশে বসে আছে। সে হঠাৎ মৃগাঙ্কবাবুর ছেলেকে দেখে মাটি থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলে, 'থানায় ফোন করলে বা হাইকোর্টের উকিলবাবুকে ফোন করলে বিপদ হবে। সব ক—টা ফোন হ্যাকড'—ছেলের কাছ থেকে এ কথা শোনার পর ওঁরা আলিপুর কোর্টে আসামিদের শনাক্ত করতে আর যাননি।

তবুও, প্রায় কুড়ি দিন জেলে থাকার পর আসামিরা জামিন পেয়ে যায়। জামিন পেয়েই মৃগাঙ্কবাবুদের বেঁচে থাকা দুর্বিষহ করে তোলে। বাড়ির দরজায় পায়খানা করে যাওয়া, বোতলের মধ্যে প্রস্রাব করে বাড়ির মধ্যে প্রস্রাব ভরা বোতল ছোড়া—এগুলো তো কিছুই নয়। মৃগাঙ্কবাবুর ছেলে একদিন যখন স্কুল থেকে ফিরছিল, তাকে তুলে নিয়ে ক্লাবে আধ ঘণ্টা আটকে রেখেছিল। ছেড়ে দেবার সময় বলেছিল, 'তোর চোখ দুটো শিক গরম করে গেলে দেব। আর নায়িকাকে, মানে তোর দিদির মুখে অ্যাসিড ঢেলে দেব—এ পাড়া ছেড়ে চলে যা, তোদের বাড়িটা বাবাকে বিক্রি করে দিতে বল, আমাদের কেনার লোক আছে, আমরা কিনে নেব। আর শোন, এসব কথা যদি তোদের হাইকোর্টের উকিল বা থানার ও.সি. জানতে পারে, তাহলে তোর দিদিকে গায়েব করে দেব।'

মৃগাঙ্কবাবু আর সহ্য করতে পারেননি। দু—মাসের মধ্যে বাড়ি বিক্রি করে অন্য জায়গায় উঠে যান। মৃগাঙ্কবাবুর শেষ কথাগুলো আজও কানে বাজে—হাউ হাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলেন, 'কন্দর্পনারায়ণবাবু, আমার দু—বিঘা জমির ওপর বাড়ি ছিল, কত গাছ, পাখির ডাকে ঘুম ভাঙত, এখন আমরা ছোট্ট তিনটে ঘরের ফ্ল্যাটে থাকি। আপনি ঠিকই বলেছিলেন যে, আমরা লড়তে পারব তো? আমি লড়তে পারিনি—আমি আমার বাড়ি বেচে পালিয়ে গেছি। মেয়েটাকে আর ছেলেটাকে তো বাঁচিয়ে রেখেছি, বলুন?'

কন্দর্পনারায়ণ অন্যদিকে তাকিয়ে বসে ছিলেন। মৃগাঙ্কবাবু আর মৌপিয়ার চোখের দিকে তাকাতে কেমন লজ্জা করছিল। হার, হার হয়েছিল সেদিন, চোখ জ্বালা করছিল, গলায় কী যেন একটা আটকে ছিল।

আজ যে মেয়েটা টেবিলের সামনে বসে আছে, সে—ও তো অনেকটা মৌপিয়ার মতোই দেখতে, বয়সও ওইরকমই, কীভাবে সাহায্য করবেন মেয়েটিকে? থানায় পাঠালে কেস করতে হবে। বেশির ভাগ মেয়ের পক্ষে কেস চালিয়ে নিয়ে যাওয়াই সম্ভব হয় না! বুদ্ধিজীবীদের যত্তসব বড় বড় কথা। কোর্টে মামলা ঝুলে থাকে, মেয়েদের বিরুদ্ধে ঘটে যাওয়া সব অপরাধের সাজা হয় না। পুলিশ খারাপ, উকিল খারাপ। হুঁঃ, আরে বাবা, মেয়েগুলোকে নিরাপত্তা দাও—না দেখি! দেশে না আছে নির্যাতিতা একটি মেয়ের সুরক্ষা, না আছে মেয়েটির হয়ে যারা সাক্ষী দেবে, তাদের সুরক্ষা। মেয়েরা আজকাল থানায় যেতে ভয় পায়, কোর্টে যেতে ভয় পায়। একটা মেয়ে রেপড হলে তখন সব নায়িকা বেরিয়ে পড়বেন চোখে সানগ্লাস এঁটে মোমবাতি মিছিল করতে। আয় বাবা, এই অসহায় মেয়েদের পাশে দাঁড়িয়ে সাহায্য কর, দেখব কত মুরোদ।

এই মেয়েটিও তো চেয়েছিল কাউকে ভালোবাসতে, তাকে বিশ্বাস করেছিল। এখন মেয়েটাকে সাহায্য করব কীভাবে? কেস করা যাবে না। প্রথমত মেয়েটি নিজেই থানায় যেতে চাইছে না। কেস করলে বিষয়টা জানাজানি হয়ে যেতে পারে। মেয়েটি তার বাবা—মা—কে জানাতে চায় না। তা ছাড়া মেয়েটি থানায় গিয়েছে বা কেস হয়েছে, জানাজানি হলেই, লোকটা মেয়েটির যাবতীয় প্রাইভেট ছবি সোশ্যাল সাইটগুলোয় আপলোড করে দেবে। আবার থানা—পুলিশের চক্করে ছেলেটা পালিয়েও যেতে পারে। একবার যদি কলকাতা থেকে পালিয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের ভিড়ে হারিয়ে যায়, ছেলেটাকে ধরাই মুশকিল হয়ে যাবে। মেয়েটার দিকে তাকিয়ে এবার মায়া হতে লাগল কন্দর্পনারায়ণের। বাবা—মা কত সাধ করে কলকাতায় পড়তে পাঠিয়েছেন। আহা রে, তাঁরা হয়তো ভাবছেন, মেয়ে কলকাতায় আছে—ভালোই আছে, পড়াশোনা করছে। আর মেয়ে তো এদিকে একটা বদ লোকের পাল্লায় পড়ে ইজ্জত—আবরু সব খুইয়ে বসে আছে। একটা বিবাহিত লোকের পাল্লায় পড়েছে। লোকটার হাতে এখন মেয়েটির প্রাইভেট ছবি। আর লোকটা এখন ভয় দেখাচ্ছে, 'হয় টাকা দাও, নইলে ছবিগুলো আপলোড করে দেব'।

ছি ছি, এমন বোকামিও করে—কী করে বাঁচানো যায় এই মেয়েটিকে—মেয়েটি অসহায় হয়ে কন্দর্পনারায়ণের মুখের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন। কন্দর্পনারায়ণের মাথার মধ্যে ঝনঝন করছে, যেন কেউ কাচের বাসন ভাঙছে। মনশ্চক্ষে তিনি দেখতে পেলেন, ব্যাট হাতে সৌরভ গাঙ্গুলি, গাঢ় সবুজ পিচ, বল করছেন গ্লেন ম্যাকগ্রা, অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে খেলা, হাতে বল বেশি বাকি নেই, রান অনেক। দৌড় শুরু করেছেন ম্যাকগ্রা, কী করবেন সৌরভ?

উফ! কী করি? সময় গড়িয়ে যাচ্ছে—

সংবিৎ ফিরল কন্দর্পনারায়ণের—'আচ্ছা, লোকটা কোন থানা এলাকায় থাকে?' 'সার্ভে পার্ক স্যার,' শ্রাবণী উত্তর দিলেন। 'বাড়ির ঠিকানা মনে আছে?' 'হ্যাঁ স্যার।' 'গুড'—হাত বাড়িয়ে তিনি মোবাইল ফোনটা তুলে নিলেন। সার্ভে পার্ক থানার অফিসার—ইনচার্জ বিশখ মুখার্জি কন্দর্পনারায়ণের বহুদিনের বন্ধু। ফোন করলেন। বিশখ ফোন ধরলেন। তরুণ, সুদর্শন পুলিশ অফিসার। সবসময় ভালো কোনও কাজ, নতুন কোনও কাজ করবার জন্য ছটফট করছেন। 'আরে সুপ্রভাত, সুপ্রভাত। বলো সাহেব, হঠাৎ সক্কালবেলায় আমাকে মনে পড়ল।' ওপার থেকে বিশখের উচ্ছ্বসিত গলার স্বর শ্রাবণীও শুনতে পেলেন। 'বিশখ, লাইনে থাকো, আমি অভিষেককেও কনফারেন্স লাইনে নিচ্ছি। আর্জেন্ট দরকার। একটি অল্পবয়সি, যাদবপুর ইউনিভার্সিটির ছাত্রীর জীবন—মরণের প্রশ্ন।' কন্দর্পনারায়ণ এবার ফোন করলেন ওঁর আর—এক পুরোনো বন্ধু অভিষেককে, অভিষেক দাস। সন্তোষপুর, সার্ভে পার্ক, মুকুন্দপুর, পূর্ব যাদবপুর এলাকায় নামকরা প্রোমোটার—কাম—ব্যবসায়ী, অল্প বয়সেই অত্যন্ত নাম করেছেন, বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা রয়েছে। এ ছাড়াও এলাকায় সমাজসেবামূলক বিভিন্ন কাজ করেন। মহালয়ার দিন নিজে একা দাঁড়িয়ে আড়াই—তিন হাজার দুঃস্থ মানুষ, পথশিশুকে জামাকাপড় বিলি করেন। এলাকায় ভালো কাজের জন্য সুনাম তো রয়েছেই, তা ছাড়া মানুষের বিপদে—আপদে পাশে এসে দাঁড়ানোয় জুড়ি নেই। কে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, কে খেতে পাচ্ছেন না, অভিষেক জানতে পারলেই হল—ঠিক পাশে গিয়ে দাঁড়াবেন। এই তো করোনার জন্য লকডাউনের সময় হাজার হাজার মানুষকে খাবার, ওষুধ বিলি করেছেন। যেমন রোজগার, বিলিয়ে দিতেও তেমনি দরাজ।

অভিষেকও সক্কালবেলায় কন্দর্পনারায়ণের ফোন পেয়ে অবাক। কন্দর্পনারায়ণ অভিষেককে বললেন, 'শোনো, গুড মর্নিং জানাবারও সময় নেই। কনফারেন্সে বিশখও রয়েছেন। আমি দু—জনেরই সাহায্য চাই,' বলে, সংক্ষেপে পুরো ঘটনাটা বললেন।

বিশখ বললেন, 'তুমি কী চাইছ শুনি, স্ট্র্যাটেজি বলো।'

'আমি চাই, তুমি লোকটিকে এক্ষুনি পুলিশ পাঠিয়ে তোলো, ওকে থানায় নিয়ে এসো, চমকাও, কিন্তু মেরো না। মোবাইল থেকে সব ডিলিট করাও, ভয় দেখাও। যদি ছবি বাইরে আপলোড হয়, তাহলে এই মেয়েটির বিপদ। আমি শ্রাবণীকে দিয়ে কোনও কমপ্লেইন্ট করাতে চাইছি না। কারণ, কমপ্লেইন্ট করলে, তোমাকে কেস চালু করতেই হবে, আর কেস চালু করা মানে লোকটাকে ধরতে হবে, কোর্টে প্রোডিউস করতে হবে, ওর টি. আই. প্যারেড, বা শনাক্তকরণ করতে হবে। কিন্তু, মেয়েটি কলকাতায় এক্কেবারে একা। ওঁর বাবা—মা কিচ্ছু জানেন না, তাঁদের জানানোও যাবে না। কিন্তু, কেস—কাছারি হলে বাবা—মা—র জেনে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তা ছাড়া, আমরা জানি না, আর কাউকে লোকটা ছবিগুলো ফরওয়ার্ড করে রেখেছে কি না। এমনও তো হতে পারে, এই লোকটাকে আমরা অ্যারেস্ট করলাম, আর সেটা জানতে পেরে, ওর কোনও বন্ধু ছবিগুলো আপলোড করে দিল। সেইজন্য কোনও রিস্কই নেওয়া যাবে না।'

বিশখ কিছু ভেবে ওপার থেকে বললেন, 'কন্দর্প, আমার একটু প্রবলেম হবে। তুমি জানও, আজকাল হিউম্যান রাইটস অর্গানাইজেশনগুলো কী অ্যাকটিভ। একদম কোনও কমপ্লেইন্ট ছাড়া কাউকে থানায় আনা রিস্ক হয়ে যাবে। তা ছাড়া, আমাদের এদিককার অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার, ডেপুটি কমিশনাররাও যখন—তখন থানা ভিজিটে চলে আসতে পারেন। আমি চাই, তুমি মেয়েটির মোবাইল থেকে আমার মেইল আই. ডি.—তে একটা কমপ্লেইন্ট ফরওয়ার্ড করে রাখো, জাস্ট ফর মাই প্রোটেকশন। আমি লোকটাকে তুলে নিচ্ছি।'

কন্দর্পনারায়ণ একটু ভেবে বললেন, 'আচ্ছা, এদিককার এ. সি. পি. যেন কে?'

বিশখ বললেন, 'মি. অরিজিৎ বাসু।'

'ওহ হো, অরিজিৎদা। ওঁর ছেলে তো ল পড়ে। আমার কাছেই ট্রেনি ছিল। আচ্ছা, লাইনে থাকো, আমি অরিজিৎদাকেও কনফারেন্সে নিচ্ছি,' বলেই এ.সি.পি. মি. অরিজিৎ বাসুকে ফোন করলেন, সংক্ষেপে সব বুঝিয়ে বললেন, 'একটি মেয়ের জীবন—মরণের প্রশ্ন, আমাদের একটু মানবিক হতে হবে, টেকনিক্যাল দিকগুলো বাদ দিয়ে একটা বদমাশ লোকের হাত থেকে একটা বাচ্চা মেয়েকে বাঁচাতেই হবে। অরিজিৎদা, আপনি আগামী এক ঘণ্টা ফোনটা এরোপ্লেন মোডে রাখুন, সার্ভে পার্ক থানার দিকে যাবেন না, কেউ যেন আপনাকে ফোনে না পায়। আমি, বিশখআর অভিষেক যা করার করছি। তবে আপনাকে এমব্যারাস করব না। মেয়েটাকে বাঁচানোই আমাদের লক্ষ্য।'

অরিজিৎবাবুও একমত হলেন, শুধু বললেন, 'বিশখের মেল—এ একটা কমপ্লেইন্ট করা থাক। তেমন দরকার হলে ওটা থেকে কেস চালু করা হবে, না হলে দরকার নেই। আমি আবার ঘুমোতে চলে গেলাম। আমার যেন কোনও ঝামেলা না হয়, তোমরা সামলাও।' স্ট্র্যাটেজি ঠিক হয়ে গেল, অভিষেক ওর কয়েকটা টেনিয়াকে, মানে ওর কয়েকটা ছেলেকে দিয়ে ওই বিহারি লোকটার ফ্ল্যাটটা ঘিরে রাখবে। বিশখ কনস্টেবল পাঠিয়ে, লোকটার ল্যাপটপ, ফোন সব তুলে নেবে। থানায় সামনে বসিয়ে সব ছবি ল্যাপটপ থেকে আর ফোন থেকে ডিলিট করবে। তারপর থানার বাইরে বেরোলেই, অভিষেকের টেনিয়ারা ওকে হুমকি দিয়ে পাড়াছাড়া করবে।

আর হলও তা—ই। পরবর্তী আধ ঘণ্টা খুব ঘটনাবহুল হল। শ্রাবণী কন্দর্পনারায়ণের সামনে বসেই, নিজের মোবাইল থেকে একটা মেল পাঠালেন বিশখের মেল—এ, বিশখ মেল পাওয়ামাত্র একটা গাড়িতে কয়েকজন আর্মড কনস্টেবল দিয়ে বিহারি লোকটার ফ্ল্যাটে রেইড করতে পাঠিয়ে দিলেন। অভিষেকের ছেলেরা আগেই গোটা ফ্ল্যাটটা ঘিরে রেখেছিল, যাতে কেউ বেরোতে না পারে, বা ঢুকতেও না পারে।

পুলিশ গিয়ে প্রথমে ফ্ল্যাটের দরজায় টোকা দেয়। দরজা খোলামাত্র পুলিশ হুড়মুড়িয়ে ঘরে ঢোকে। লোকটা একটা হাফপ্যান্ট আর স্যান্ডো গেঞ্জি পরে ল্যাপটপে কিছু কাজ করছিল। কোনও কথা বলার সুযোগ না দিয়ে, ঘাড়ধাক্কা দিতে দিতে তাকে গাড়িতে তোলে। শুধু ফ্ল্যাট থেকে বেরোবার সময় একটা হ্যান্ডব্যাগে জামাকাপড় আর বিহারে ফিরে যাবার ট্রেনের টিকিট, পার্স, ল্যাপটপ নিতে অ্যালাউ করা হয়। কনস্টেবলরা লোকটার মোবাইল ফোন নিয়ে নেন নিজেদের দখলে। অভিষেকের ছেলেরা ফ্ল্যাট—এ তালাচাবি দিয়ে দেয়। পুলিশ জিপে বসিয়ে ওকে থানায় আনা হয়। প্রথমে লোকটা খুব তম্বি করছিল, 'আমাকে কেন অ্যারেস্ট করা হচ্ছে? আমি আমার লইয়ারের সঙ্গে কথা বলব। আমার মোবাইল ফোন দেওয়া হোক, দেশে আইনকানুন কিছু নেই নাকি? আমি হিউম্যান রাইটসে জানাব।'

থানায় একটা চেয়ারে হাফপ্যান্ট আর স্যান্ডো গেঞ্জি পরিহিত অবস্থায় ওকে বসিয়ে, ওর চুলের মুঠি ধরে বিশখ বলেন, 'লইয়ারের সঙ্গে কথা বলবি? তোর বাবাই এখানে লইয়ার, আর হিউম্যান রাইটস দেখাচ্ছিস? একটা বাচ্চা মেয়ের সঙ্গে পরিচয় লুকিয়ে ফস্টিনস্টি করার সময় মনে ছিল না? তার প্রাইভেট লাইফের ছবি আপলোড করবি? তিন লাখ টাকা চাই?' বলেই সপাটে একটা চড়। লোকটা চেয়ার থেকে পড়ে যায়। থানা থেকেই ভিডিও কল করেন বিশখ। কন্দর্পনারায়ণের চেম্বার থেকে, শ্রাবণী ভিডিয়ো কলে লোকটাকে দেখে আইডেন্টিফাই করেন। এবার বিশখ লোকটির কাছ থেকে ফোন নিয়ে ভিডিয়ো কল করেন বিহারে, লোকটির বাড়িতে। হুমকির সুরে লোকটিকে বলেন, 'দে, ফোন দে, তোর বউকে সব জানাবো। বিহারে বউ—বাচ্চা রেখে এখানে কচি সেজে একটা বাচ্চা মেয়ের জীবন নষ্ট করা? বউকে ফোনে ধর, আমি কথা বলব।' লোকটা বিশখের পায়ে পড়ে যায়। 'স্যার, বাড়িতে জানাবেন না, যা বলবেন, তা—ই করব।' বিশখ বলেন, 'সব ছবি ডিলিট কর। কোথায় কোথায় ছবি রেখেছিস? মোবাইলে? ল্যাপটপে? কোনও বন্ধুকে ফরওয়ার্ড করেছিস?'

বিশখ থানার একজন কম্পিউটার এক্সপার্টকে আগেই বলে রেখেছিলেন, কারণ অনেক সময় মোবাইল থেকে ডিলিট করলেও ফোনে বা রিসাইকল বিন—এ ছবিগুলো থেকে যেতে পারে, সেগুলো পরে রিট্রিভ করা যায়, কোনও রিস্ক নেওয়াই যাবে না। লোকটা হাতজোড় করে বলল, 'স্যার, কাউকে ফরওয়ার্ড করিনি। হ্যাঁ, আমার ব্যবসার জন্য টাকার দরকার ছিল, তাই ওকে চাপ দিয়ে টাকা আদায়ের চেষ্টা করছিলাম। বাড়িতে বলবেন না।'

অভিষেক নিজে থানায় বসে লোকটার সব কথা মোবাইলে ভিডিয়ো রেকর্ডিং করে নিলেন। বলা যায় না, পরে লোকটা পুলিশকেই বিপদে ফেলবার চেষ্টা করতে পারে। অভিষেক বললেন, 'তোর বিহারের অ্যাড্রেস বল, এখান থেকে বেরিয়ে যদি চালাকি করিস, বিহারে পুলিশ পৌঁছে যাবে।' লোকটা থানায় বসে একটা একটা করে ছবি ডিলিট করল।

বিশখ ওর ঘাড় ধরে, ওকে থানার দরজায় এনে পেছন ফিরে দাঁড় করালেন, তারপর পেছন থেকে ওর পাছায় একটা লাথি মেরে বললেন 'আর যেন কোনওদিন পশ্চিমবাংলায় না দেখি।'

লোকটা লাথি খেয়ে সামনে হুমড়ি খেয়ে পড়ল। তারপর থানার সামনের রাস্তায় বেরোতেই, অভিষেকের টেনিয়ারা ওকে ঘিরে ধরল, প্রত্যেকে মোটরবাইকে, মাথায় হেলমেট। ওকে ঘিরে ঘুরতে ঘুরতে বলল, 'দেখ, তোকে আমরা বিশ্বাস করতে পারছি না, সব কাজ থানা করতে পারে না, আমরা পারি। বল, আর কোথায় কোথায় ছবিগুলো সেভ করেছিস?

লোকটা হাতজোড় করে কাঁদতে কাঁদতে বলল, 'দাদা, আর কোথাও ছবি নেই, বিশ্বাস করুন।' অভিষেকের টেনিয়াদের একজন ওকে বাইকের পেছনে বসিয়ে একটা পুকুরের ধারে নিয়ে গেল। দেখ, তোর মোবাইল, ল্যাপটপে আমরা হাত দেব না, পরে বলবি, আমরা চুরি করেছি। তুই তোর মোবাইল, ল্যাপটপ ইট দিয়ে ঠুকে ঠুকে ভাঙ। ভেঙে পুকুরে ছুড়ে ফেল। লোকটা এতই ভয় পেয়ে গিয়েছিল পরপর সব ঘটনায়, যে বাধ্য ছেলের মতোই তা—ই করল। মোবাইল, ল্যাপটপ ভেঙে পুকুরে ছুড়ে ফেলল। পুরো ঘটনাটা ভিডিয়ো করে নেওয়া হল। এই ভিডিয়োগুলোই প্রমাণ হিসেবে থাকবে। লোকটা পরে অভিযোগ করতে পারে যে, ওর ল্যাপটপ, মোবাইল ডাকাতি হয়েছে। তা যাতে বলতে না পারে, অভিষেকের বা অভিষেকের ছেলেদের বিরুদ্ধে যাতে কোনও অভিযোগ না ওঠে, তাই ওকে নিজেকে দিয়েই ওগুলো ভাঙিয়ে পুকুরে ছুড়ে ফেলা হল। এবারে লোকটার হ্যান্ডব্যাগ আর পার্সটা লোকটার হাতে দিয়ে বলা হল—'এবার দৌড়োতে শুরু কর। বড়রাস্তা থেকে ট্যাক্সি নিয়ে সোজা হাওড়া স্টেশনে যাবি। আর কোনওদিন যেন আমাদের বাংলায় না দেখি।'

লোকটা বাধ্য ছেলের মতো হ্যান্ডব্যাগ, পার্স হাতে নিয়ে, হাফপ্যান্ট আর গেঞ্জি পরে রাস্তা দিয়ে দৌড়োতে শুরু করল।

এতক্ষণ গোটা ব্যাপারটা ভিডিয়ো কলে চেম্বারে বসে কন্দর্পনারায়ণ আর শ্রাবণী দেখছিলেন, শ্রাবণী এবার সোজা চেয়ার থেকে উঠে এসে কন্দর্পনারায়ণকে প্রণাম করে কাঁদতে কাঁদতে বললেন, 'স্যার, আপনি আমাকে বাঁচিয়েছেন। না হলে, আমার আত্মহত্যা করা ছাড়া উপায় ছিল না।' তারপর একটু ধাতস্থ হয়ে রুমালে মুখ মুছে বললেন, 'স্যার, আপনার ফিজ? কত দেব স্যার, আমি জানি, আপনি আমার জন্য যা করলেন, কোনও ফিজ—ই যথেষ্ট নয়।'

কন্দর্পনারায়ণ শ্রাবণীর মুখের ওপর থেকে নজর সরিয়ে, ডানদিকের টেবিলে রাখা অ্যাকোয়ারিয়ামের রঙিন মাছগুলোর খেলা দেখতে দেখতে আপন মনে স্বগতোক্তির ভঙ্গিতে বললেন, 'আচ্ছা, আপনাকে তুই করে বলতে পারি? আমার ছোটোবোন থাকলে হয়তো আপনার বয়সিই হতে পারত। তা ছাড়া আমার কোনও নিকটাত্মীয়ও আপনার মতো বিপদে পড়তেই পারত। কেন যেন, আপনাকে আমার তুই বলে ডাকতে ইচ্ছে করছে।'

শ্রাবণী অবাক হয়ে কন্দর্পনারায়ণের মুখের দিকে তাকিয়ে আছেন। কন্দর্পনারায়ণের মুখের মধ্যে ফুটে উঠছে আন্তরিকতা। এতক্ষণ কন্দর্পনারায়ণের মুখের মধ্যে ছিল রাগ আর উত্তেজনার ছাপ। আস্তে আস্তে তা বদলে যাচ্ছে। একটা নরম, ভাবুক ছবি ফুটে উঠছে। ফরসা মুখে একটা ঝোলা গোঁফ ওঁর বৈশিষ্ট্য। গোঁফে আঙুল বোলাতে বোলাতে তিনি বলে চললেন, 'তোর মামলায়, দেখ, টাকাপয়সা আমার খরচ হয়নি, আমার স্টেনোগ্রাফারের, টাইপিস্টের বিল দিতে হয়নি, জেরক্স করতে, বা কোর্টে মামলা দায়ের করতেও খরচ হয়নি। আমার কিছু ভালো বন্ধু, তাঁরা তোকে বাঁচতে সাহায্য করেছেন নিঃস্বার্থভাবে, উলটে, নিজেদের অনেক বিপদের আশঙ্কা সত্ত্বেও। আমি নিজে মাঝে মাঝেই পুলিশের কাজের সমালোচনা করি। পুলিশকে জড়িয়ে, পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা করি। কিন্তু, আজকে তোকে বাঁচালেন একজন ইয়াং পুলিশ অফিসার। পুলিশের একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার সব জেনে এগিয়ে যেতে পারমিশন দিলেন। আজকে কেস করে, ওকে অ্যারেস্ট করে থানায় আনতে গেলে অনেক দেরি হত, তুই বিপদে পড়তিস। ঘটনার গুরুত্ব বুঝে, এই সরকারি লোকগুলি নিজেদের চাকরির রিস্ক নিয়েও তোকে বাঁচাতে এগিয়ে এলেন। অভিষেক আমার ভালো বন্ধু। কত বড় বিপদ মাথায় নিয়েও ও, ওর দলবল নিয়ে এগিয়ে এল। এটাই হল মনুষ্যত্ব। আমাদের হয়তো কোনও টাকাপয়সা খরচ হয়নি। আমরা তবুও নিজেদের বিপদে পড়বার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও, মানবিকতার স্বার্থে আমরা এত বড় রিস্ক নিয়েছি। এটা ঠিক যে, আমাদের টাকাপয়সা কারওই কিছু খরচ হয়নি। তাই তোর কাছ থেকে আমি কিছুই নেব না। আমার বন্ধুদের আর অ্যাসিস্ট্যান্ট পুলিশ কমিশনার সাহেবের ফোন নম্বর তোকে দিয়ে দিচ্ছি। তুই ওদের সঙ্গে একবার দেখা করে ধন্যবাদ দিয়ে আসিস। ওঁরাও খুশি হবেন।'

'আর—একটা কথা বলি, রাগ করিস না। আজকালকার দিনের মেয়ে তুই, জীবনটা কীভাবে কাটাচ্ছিস? বাবা—মা, বহু দূরে এই আশায় বেঁচে আছেন যে, মেয়ে কলকাতায় পড়তে গেছে। পড়াশোনা করে সে বড় হবে। আর মেয়ে এদিকে অচেনা—অজানা একটা লোকের সঙ্গে লিভ—টুগেদার করছে! অনেক সময়তো আমরা দেখি, স্বেচ্ছায় তারা তাদের ব্যক্তিগত সম্পর্কের ছবি মোবাইলের ক্যামেরায় তোলে। কী দরকার? আজকাল মোবাইল হ্যাক হয়ে যায়। ছবিগুলি লিক হয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় আপলোড হয়ে যেতে পারে। কী সর্বনাশই না হবে! কাজেই স্বাধীনতার নামে, ফ্রী মিক্সিংয়ের নামে নিজেদের এত বড় বিপদ ডেকে আনবার দরকারটা কী? ভাবিস, আমার কথাগুলো ভেবে দেখিস।' কন্দর্পনারায়ণ চুপ করে গালে হাত দিয়ে অন্যমনস্ক হয়ে বসে রইলেন।

শ্রাবণী চেয়ার ছেড়ে উঠে কন্দর্পনারায়ণকে আর একবার প্রণাম করে ধীরে ধীরে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন।

রোগাটে ছিপছিপে একজন ভদ্রলোক অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছিলেন। গালে হালকা দাড়ি, জিনসের প্যান্টের ওপর হলুদ রঙের পাঞ্জাবি পরা, কাঁধে শান্তিনিকেতনি ব্যাগ।

কন্দর্পনারায়ণের ঘর একটু ফাঁকা হতেই, ভদ্রলোক দরজার বাইরে থেকে জিজ্ঞেস করলেন, 'আসব?'

'হ্যাঁ, হ্যাঁ, আসুন, কী নাম আপনার? কোথা থেকে এসেছেন?'

ভদ্রলোক হাতজোড় করে নমস্কার করে বললেন, 'আমি কুন্তল ঘোষাল, চেতলায় থাকি। অ্যাপয়েন্টমেন্ট করা আছে আপনার সঙ্গে।'

'বসুন।'

কুন্তলবাবু কন্দর্পনারায়ণের সোজাসুজি একটা চেয়ার টেনে বসলেন। খানিকক্ষণ মাথা নিচু করে চুপ করে বসে রইলেন। উলটোদিকে বসে কন্দর্পনারায়ণ একদৃষ্টে ছেলেটিকে জরিপ করতে লাগলেন। কত বয়স হবে? খুব বেশি হলে তিরিশ। জিনসের ওপর পাঞ্জাবি, কাঁধে শান্তিনিকেতনি ব্যাগ, মাথায় ঝাঁকড়া চুল, লম্বাটে হাতের আঙুল। চাকরিবাকরি করা, পালিশ করা চেহারা নয়, বরং নিজের ইচ্ছাতে চলা, স্বাধীন জীবনযাপন করা কোনও মানুষ। গান করেন, বাজনা বাজান, কবি—এইরকম কেউ মনে হয়। ভদ্রলোক নিজেই নীরবতা ভাঙলেন, 'আমি অদ্ভুত এক সমস্যা নিয়ে এসেছি। আমার সমস্যাটা আগে শুনুন, শুনে বিরক্ত হবেন না, রাগও করবেন না, হাসবেনও না। হতে পারে, হয়তো দেখা গেল, এটা কোনও বড় সমস্যা হল না। তাহলে পৃথিবীতে আমি সবচেয়ে খুশি হব। আর যদি সমস্যা দেখা দেয়, আমি সবচেয়ে কষ্ট পাব।'

কন্দর্পনারায়ণ বললেন, 'বলুন।'

ভদ্রলোক বলতে শুরু করলেন, 'তিরিশের বেশি আমার বয়স, চাকরিবাকরি বলতে যা বোঝায়, আমি তা করি না, তবু আমি ভালোই আছি। আমি কবিতা লিখি, আমার কবিতার বই বেরোয়, আমার কবিতা বিভিন্ন ম্যাগাজিনে বেরোয়। ছোটবেলা থেকেই আমি খুব আনস্মার্ট ছিলাম। আমি ছিলাম আমার মতো। গান গাইতাম, গান বাঁধতাম, কবিতা লিখতাম, কবিতা বলতাম। আশুতোষ কলেজে ইতিহাসে অনার্স নিয়ে ভরতি হই। আমার জীবন ভালোই কাটছিল। আশুতোষ কলেজেই আমার ক্লাসে পড়ত একটি মেয়ে, সুজাতা রায়, দেখতে সুন্দরী। আমি পছন্দ করতাম। কিন্তু, আমাকে পছন্দ করার কিসসু ছিল না। সারাজীবন সেই অর্থে আমি কিসসু করতেও পারিনি। আই মিন, মেয়েরা যেসব জিনিস পছন্দ করে। আমি গরিব বাপের ছেলে। সেইসময় বান্ধবীকে নিয়ে বড় রেস্তরাঁয় খাওয়াবার কথা চিন্তাও করতে পারিনি। তবে, খাওয়াতাম। আমি বাদাম খাইয়েছি, ফুচকা খাইয়েছি। আমি প্রচুর ছাত্র পড়াতাম। ছাত্র পড়িয়ে যা রোজগার করতাম, তা—ই দিয়ে কলেজে পড়েছি। আমাকে সবাই বলত, আমি নাকি একটা 'জিরো'। অবশ্য তাতে আমার কোনও রাগ নেই কারও ওপর। ওই যে বললাম, আমি আমার মতো, জীবন যেভাবে আমার কাছে এসেছে, আমি দু—হাত পেতে জীবনকে সেইভাবেই গ্রহণ করেছি। আমি ব্যর্থ হয়েছি বহুবার, আবার উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করেছি। আমি আপনাকে বলছি প্রায় দশ বছর আগের কথা। আসলে আমি সেই অর্থে অ্যাম্বিশাসও ছিলাম না। ইতিহাসে অনার্স নিয়ে পাশ করবার পর, আমি আর সুজাতা একসঙ্গে এম. এ. পড়তে ভরতি হই ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটিতে। সেইসময়টা খুব ভালো কেটেছিল বুঝলেন, আমাদের ক্লাস হত হাজরা ক্যাম্পাসে। ল'কলেজের পাশে। সুজাতার বাড়ি রাসবিহারী অ্যাভিনিউতে। আমরা এম. এ.—র ক্লাস করে বহুদিন হাঁটতে হাঁটতে বাড়িও ফিরেছি। সুজাতা বুঝত, আমি ওকে পছন্দ করি। আমিও বুঝতাম, ও আমাকে পছন্দ করে। দু—জনে দু—জনকে ঠারেঠোরে বুঝিয়েছিও বহুবার।'

'তবে, ও পরে বুঝতে পেরেছিল যে, আমাকে বিয়ে করা যায় না। আমার মধ্যে বড় হবার আগ্রহটাই নেই। মেয়েরা আমাকে বিয়ে করতে যাবে কেন? ঠিক আছে, বিয়ে তো পরের কথা, অপেক্ষাই বা করবে কেন? আর হলও তা—ই। এম. এ.—র ফাইনাল ইয়ারে একদিন যখন আমরা হেঁটে হেঁটে বাড়ি ফিরছি, ও আমাকে জানাল, ওর বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। মাস দুয়েক পরেই। খুব আঘাত পেয়েছিলাম। ও আমাকে কোনওদিন বলেওনি, যে ছেলেপক্ষ ওকে দিনের পর দিন দেখে গেছে। ও সেজেগুজে তাদের সামনে বসেছে। এমনকী হবু বরের সঙ্গে বাইরে অনেকবার দেখাও করেছে। আমি আকাশ থেকে পড়ি। আমার মনে আছে, আমি শুধু ওকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, আমার জন্য অপেক্ষা কি করা যেত না?

সেই শেষ। ওর সঙ্গে তেমন কথা আর হয়নি। আমি খবর পেয়েছিলাম যে, ওর নিউ আলিপুরে বিয়ে হয়েছে। গড়িয়াহাটে, সাউথ সিটিতে শপিং মলে কয়েকবার দেখা হয়েছে, কিন্তু কথা হয়নি। আমি আর বিয়ে করিনি, করবও না। বাড়িতে বাবা—মা বেঁচে আছেন। বাবার পেনশনের টাকা, আমার রোজগারের টাকায় আমাদের চলে যায়। কবি হিসেবে এখন আমার মোটামুটি নাম হয়েছে। আমি আমেরিকার অনেক জায়গা—ইংল্যান্ড, ফ্রান্সে নিজের কবিতা পড়ার জন্য গিয়েছি, অনেক সম্মানও পেয়েছি। তবে হ্যাঁ, চাকরির ইন্টারভিউ আমি জীবনে দিইনি, চাকরি করাকে আমি হেট করি, চাকরি করতাম না বলে আমার ভালোবাসার পাত্রী আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। চাকরি আমি আর করবই না। তবে, আমার এখন বান্ধবী আছে অনেক। কিন্তু কারও প্রেমে আমি আর পড়িনি, আমি জীবনে ভালোবেসেছি একজনকেই।'

'গত বৃহস্পতিবার দুপুরে আমি একটা পাবলিশিং হাউসে গিয়েছিলাম। দুপুরবেলায় মেট্রোতে করে ফেরার সময় সুজাতাকে দেখলাম, আমার উলটোদিকে বসে আছে। আমি না—দেখার ভান করে অন্যদিকে তাকিয়ে ছিলাম। হঠাৎই ও আমার পাশে এসে বসে। অনেক কথা বলতে থাকে। আমার খুব লজ্জা করছিল। জানেন, ওর চোখে তো আমি ফেকলু, ও তো আমাকে বিয়ের উপযুক্ত মনে করেনি। আর আমি তো এখনও সেরকমই আছি। আমার তো উন্নতি কিছু হয়নি। আমার গাড়ি নেই, আমি বড় চাকরি করি না।'

'ও কিন্তু অন্য কথা বলল। ও বলল, তাড়াহুড়ো করে ও খুব ভুল করেছে। আমি তখন কেন জোর করে ওকে আটকালাম না। ও আরও অনেক কথা বলতে চাইছিল, কিন্তু ও নেমে গেল যতীন দাস পার্ক স্টেশনে। আমার ফোন নম্বর নিল, বলল, অনেক কথা আছে। একদিন আবার আমরা দু—জন বেরোব, ও সব বলবে। ও আমাকে ফেসবুকে রিকোয়েস্ট পাঠাল। আমি অ্যাকসেপ্ট করে নিলাম।' এতক্ষণে ভদ্রলোক থামলেন।

কন্দর্পনারায়ণের কুন্তলবাবুকে বেশ ভালোই লাগছিল। নিজের তরুণ বয়সের সঙ্গে যেন কোথাও মিল পাচ্ছিলেন। কন্দর্পনারায়ণও তো তরুণ বয়সে এমনই ছিলেন। নিজের মতো থাকতেন। ল কলেজে পড়ার সময় চুপ করে পেছনের সারিতেই বসে থাকতেন। সেইসময়টায় টিউশন করে হাত খরচ তুলতেন। বাবা চাকরি থেকে রিটায়ার করেছিলেন। রীতিমতো দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করেছেন, লোকের চোখে 'হিরো' হতে পারেননি কোনওদিন। তবে মাটি কামড়ে লড়ে যাবার ইচ্ছেটা ছিল চিরকালই। তাই, কুন্তলবাবু যতক্ষণ বলছিলেন, একবারের জন্যও থামাননি।

কুন্তলবাবু ঝোলা ব্যাগ থেকে জলের বোতল বের করে গলায় ঢাললেন, দু—ঢোঁক জল খেয়ে আবার শুরু করলেন 'বৃহস্পতিবার, সুজাতার সঙ্গে হোয়্যাটসঅ্যাপে কথা হয় রাত সাড়ে বারোটা পর্যন্ত। আমার কাছে সব রেকর্ড আছে। ও ফেসবুকে লাস্ট আপডেট দিয়েছে রাত বারোটা পঁয়তাল্লিশে। লিখেছে—জীবনের কিছু ভুল কোনদিন শোধরানো যায় না। আমি বুঝলাম, ও ওর বিয়ে নিয়ে আনহ্যাপিনেস—এর কথা বলেছে। ওর বাচ্চা হয়নি, সেটাও ওর ডিপ্রেশনের একটা কারণ হতে পারে।'

'যা—ই হোক, যেটা বলছিলাম, তার মানে, রাত পৌনে একটা অবধি ওর ফোন অন ছিল। তারপরে অফ হয়ে যায়। শুক্রবার, শনিবার দু—দিন ওর ফোন আর অন হয়নি। আমি বহুবার ফোন করেছি। ফোনে আর পাইনি। গতকাল বিকেলে আমি উপায় না দেখে রাসবিহারীতে ওর বাপের বাড়ি যাই। বাড়িটা আমি আগেই চিনতাম। বেশ কয়েকবার ওর বাড়ি গিয়েছিলামও ছাত্রজীবনে। বহু বছর পর খুঁজে খুঁজে আবার ওর বাড়িতে যাই। ওর বাবা—মা—র সঙ্গে দেখাও হয়, তাঁরা আমাকে চিনতে পারেননি স্বাভাবিকভাবেই। আমিও পরিচয় দিইনি। বাড়িতে ওর বোন ছিল। তারও এখন বিয়ে হয়ে গেছে। কিন্তু, সে কোনও কারণে এই বাড়িতে ছিল। তার সঙ্গে দেখা হয়। সে আমাকে চিনে ফেলে। সে আমার ফোন নম্বর নেয়। এবং আমাকে রাতে ফোন করে বলে, যে সুজাতার স্বামী ধনী হলেও অত্যন্ত খারাপ চরিত্রের মানুষ। সুজাতাকে মারধর, বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিতে চাওয়া, কিছুই বাদ নেই। তাই, ওরাও সুজাতাকে ফোনে না পেয়ে খুব দুশ্চিন্তায় আছে। শুক্রবার সকাল থেকে সুজাতাকে বার বার ফোন করেও ফোনে না পেয়ে, সুজাতার বাবা সুজাতার হাজব্যান্ডকে ফোন করায় তিনি বলেন, শুক্রবার বিকেলে সুজাতা তার সঙ্গে ঝগড়া করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছে। তাঁর ধারণা ছিল, সুজাতা বোধহয় বাপের বাড়িতেই গেছে। বৃহস্পতিবার রাত থেকে সুজাতার ফোন অফ হয়ে যাওয়ায় ওঁরাও বুঝতে পারছেন না কী করবেন।'

'এবারে আমি আপনাকে বলি, আমি কী চাই। আমি সুজাতার খবর চাই। আপনি হয়তো বলবেন, এটা আপনার কাজ নয়। আমাকে থানায় যেতে বলবেন, আমি থানায় যেতে চাই না। আমি সুজাতার কে? আসলে, সুজাতাকে ভুলেই গিয়েছিলাম, অনেকদিন পরে ওর সঙ্গে কথা বলে ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরির জেগে ওঠার মতো আমার অনুভূতিগুলিও জেগে উঠেছে। ও আমাকে বলল, ও আমার সঙ্গে দেখা করবে, অনেক কথা আছে, সব বলবে, তারপরই আবার ওর ফোন সুইচড অফ! ওর বাড়ির লোকও ওর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না। এর মানে কী? ওর হাজব্যান্ড বলছেন, সুজাতা রাগ করে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে গেছে। অথচ সে বাপের বাড়ি আসেনি। তো গেল কোথায়? ঠিক আছে, হতে পারে, সে ঝগড়া করে বাড়ি থেকে বেরিয়েছে। ফোন কেন সুইচড অফ?'

'আমি যখন আপনার চেম্বারে বাইরের ঘরে বসে ছিলাম, তখনই সুজাতার বোন আমাকে ফোন করে। ও আর সুজাতার বাবা দু—জনেই একসঙ্গে আজ নিউ আলিপুর থানায় গিয়েছিলেন ডায়েরি করতে। গিয়ে জানতে পারেন, গতকাল, অর্থাৎ শনিবার বিকেলে সুজাতার হাজব্যান্ড নিউ আলিপুর থানায় গিয়ে সুজাতার নামে মিসিং ডায়েরি করে এসেছেন। আমি তো তাজ্জব। স্ত্রী—র নামে মিসিং ডায়েরি করে এলেন, অথচ সুজাতার বাড়ির লোককে জানালেন না? আমি খারাপ কিছু আঁচ করছি, স্যার। কিছু করুন। সুজাতার বাবা—মা—র বয়স হয়েছে। বোনেরও সংসার আছে। আমার কিন্তু কোনও পিছুটান নেই। আমি সুজাতার খবর পেতে চাই। সুজাতা ভালো থাকলে তো ভালোই, কিন্তু আমার মনটা কু—ডাক ডাকছে। আমি চাই, পুলিশ সুজাতাকে খুঁজুক। শুধু মিসিং ডায়েরি করে লাভ নেই।'

কুন্তলবাবুর কথায় কাতর আর্তি ঝরে পড়ছিল। কন্দর্পনারায়ণ সাধারণত কাউকে ফেরান না। যতটুকু সাহায্য করা সম্ভব, করার চেষ্টা করেন। তিনি হাত বাড়িয়ে কুন্তলবাবুকে বললেন, 'সুজাতার ফেসবুক প্রোফাইলটা বের করে দিন তো?'

কুন্তলবাবু পকেট থেকে মোবাইল ফোন বের করে, সেখান থেকে সুজাতার ফেসবুক প্রোফাইলটা বের করে দিলেন।

কন্দর্পনারায়ণ মোবাইলটা হাতে নিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সুজাতার ফেসবুক প্রোফাইলটা দেখতে লাগলেন। একটা আপডেটে উনি থমকে দাঁড়ালেন। একদিন রাত দেড়টায় পোস্ট করা হয়েছে। লেখা আছে 'যন্ত্রণা'। ওই আপডেটটা দেখে অনেকেই কমেন্ট করেছেন, 'কী রে, কেমন আছিস?' 'বরের সঙ্গে গোলমাল কি আবার বেড়েছে?' 'একজন আবার লিখেছেন—'এত রাতে গোলমাল? তুই একটা স্টেপ নে।' তার উত্তরে সুজাতা আবার লিখেছেন—'হ্যাঁ, এবার ভাবছি, কিছু একটা করতে হবে।' —এইরকমই আর কী।

কন্দর্পনারায়ণ মোবাইলটা কুন্তলবাবুকে আবার ফেরত দিয়ে বললেন, 'আমি আপনার দুশ্চিন্তার কারণ বুঝতে পারছি। একটা কথা পরিষ্কার যে, সুজাতাদেবী ব্যক্তিগত জীবনে সুখী ছিলেন না। ছেলে—মেয়ে হয়নি, সেটা একটা কারণ হতেই পারে। কিন্তু এটাও ঠিক যে, স্বামীর সঙ্গে তাঁর বনিবনা ছিল না। এবং গণ্ডগোল ছিল চূড়ান্ত পর্যায়ে। বৃহস্পতিবার বিকেলে আপনার সঙ্গে দেখা হল। ওইদিন, অনেক রাত অবধি উনি মোবাইল খুলে রেখেছিলেন, ফেসবুকে উনি আপডেট দিয়েছেন, তারপর ফোন 'অফ' হয়ে যায়। আর ফোন চালু হয়নি। ওঁর হাজব্যান্ড নিজে থেকে সুজাতাদেবীর বাপের বাড়িকে কিছু জানাননি। শুক্রবার, শনিবার দু—দিন গেল। রবিবার, অর্থাৎ আজ সকালে, সুজাতাদেবীর বাবা আর বোন থানায় অভিযোগ জানাতে গিয়ে জানতে পারেন যে, গতকাল অর্থাৎ শনিবার সুজাতাদেবীর হাজব্যান্ড নিউ আলিপুর থানায় মিসিং ডায়েরি করেছেন। বলতে দ্বিধা নেই যে, সুজাতাদেবীর হাজব্যান্ডের আচরণ সন্দেহজনক। সত্যিই যদি স্ত্রী স্বামীর সঙ্গে ঝগড়া করে বাড়ি ছেড়ে চলে যান, তাহলে স্বামী তো সঙ্গে সঙ্গে স্ত্রী—র বাপের বাড়িতে ফোন করে জানাবেন যে, দেখুন, আপনাদের মেয়ে ঝগড়া করে বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে। আপনারা কিছু করুন, অথবা উনি থানায় যাবেন, ডায়েরি করে রাখবেন যে, স্ত্রী ঝগড়া করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছে। সেক্ষেত্রে উনি শুক্রবার সকালেই থানায় জানিয়ে রাখতে পারতেন—সেটাই স্বাভাবিক। তা না করে উনি শ্বশুরবাড়ি থেকে আসা ফোন ধরছেন না, উলটে তাঁদের না জানিয়ে থানায় মিসিং ডায়েরি করে এলেন, এই ব্যাপারটা ভাবাচ্ছে।'

'কুন্তলবাবু, আমি আপনার ভালোবাসাকে সম্মান জানাচ্ছি। আপনি যেভাবে আপনার ভালোবাসার পাত্রী, যিনি অনেক আগে আপনাকে ছেড়ে চলে গেছেন, তার জন্য দুশ্চিন্তায় আমার কাছে ছুটে এসেছেন, সত্যি আমার ভালো লাগছে। আপনার জন্য কিছু করতে পারলে আমারও ভালো লাগবে।'

'বাই দ্য ওয়ে, আপনার শ্বশুরবাড়ির ঠিকানাটা বলুন তো? কোন থানার আন্ডারে যেন? নিউ আলিপুর না?'

এবারে নিজেই নিজের মোবাইল থেকে নম্বর খুঁজে নিউ আলিপুর থানার ও.সি. অমিতশংকরকে ফোন করলেন। অমিতশংকরবাবু কন্দর্পনারায়ণের বহুদিনের বন্ধু। দু—জনেরই বয়স প্রায় কাছাকাছি। অমিতশংকরবাবুর চাকরিতে জয়েনিং আর কন্দর্পনারায়ণের প্র্যাকটিস শুরু প্রায় একই সময়। কাজের সূত্রে আলাপ থেকে এখন পুরোপুরি বন্ধুত্ব। অত্যন্ত সুপুরুষ ও সুদর্শন এই অমিতশংকরবাবু।

সংক্ষেপে পুরো ঘটনাটা বললেন কন্দর্পনারায়ণ। শনিবার বিকেলে সুজাতাদেবীর হাজব্যান্ড একটা মিসিং ডায়েরি করিয়েছেন, আর আজ সকালে সুজাতাদেবীর বাবা আর বোন থানায় গিয়ে আর—একটা মিসিং ডায়েরি করেছেন—সেটা বলতেও ভুললেন না। তারপর বললেন, 'পুরো ঘটনাটা অ্যানালিসিস করে আমার ভালো ঠেকছে না। তুমি এখনই কিছু কোরো না। সুজাতাদেবীর হাজব্যান্ডকে কিছু বুঝতেও দিয়ো না। তবে আমি কিন্তু খারাপ কিছু আশঙ্কা করছি। তুমি তোমার টিমের কোনও একজনকে ওই বাড়িটা ওয়াচ করতে লাগিয়ে দাও, যে কেউ বাড়িতে ঢুকলে বা বেরোলে যেন আমাদের জানায়। এক্ষুনি, এক্ষুনি বাড়ির সামনে কাউকে বসিয়ে দাও।'

ওদিক থেকে অমিতশংকর উত্তর দিলেন, 'আমি আমার একটা সিভিক ভলান্টিয়ারকে বাড়ির সামনে জুতো পালিশওয়ালা হিসেবে বসিয়ে দিচ্ছি। কে ঢুকছে, কে বেরোচ্ছে, ও আমাদের ইনফর্ম করবে। পাড়ার মোড়ে পান—বিড়ি—সিগারেট আর চায়ের দোকানগুলোতে আমার আরও ছেলে বসিয়ে দিচ্ছি। ওরা ওই জুতো পালিশওয়ালার বেশে থাকা সিভিক ভলান্টিয়ারকে কভার আপ করবে। প্রতি এক ঘণ্টা অন্তর তোমাকে ইনফর্ম করছি।' ফোনটা রেখে কন্দর্পনারায়ণ বললেন, 'ভাই, আমি কিন্তু খারাপ কিছুর ভয় পাচ্ছি। সুজাতাদেবী নিজে বাড়ি ছেড়ে চলে গেলে, তিনি বাইরে থেকে বাড়িতে ফোন করে জানাতেন যে, তিনি স্বামীর ঘর ছেড়ে চলে গেছেন। তিনি তিন দিন ধরে ফোন বন্ধ রাখবেন কেন? আবার যদি এমন হত যে, সুজাতাদেবী বাইরে কোনও অ্যাফেয়ারে জড়িয়েছেন, তাহলেও অন্তত তার রিফ্লেকশন থাকত ফেসবুকের প্রোফাইলে। যা—ই হোক, আপনি বাড়িতে যান, আমি কোনও খবর পেলে জানাব।'

কুন্তলবাবুর চোখ ছলছল করে উঠল।

প্রায় বিকেলবেলা নাগাদ অমিতশংকর খবর দিলেন, শুক্রবার সকাল থেকে সুজাতাদেবীর হাজব্যান্ড একবারই বেরিয়েছিলেন, সেটা শনিবার। ওইদিন নিউ আলিপুর থানায় এসে একটা মিসিং ডায়েরি করে গিয়েছেন, কিন্তু নিউ আলিপুরে ঢোকবার সময়, একটা দোকান থেকে উনি রুম ফ্রেশনার কিনেছেন। কন্দর্পনারায়ণ জবাব দিলেন, 'অমিত, আমি যা আশঙ্কা করছি তা সত্যি হলে, উনি আজ রাত্তিরের মধ্যে বাড়ি থেকে বেরোবেন। তোমার লোকজন রেডি ডো?'

অমিতশংকরবাবু বললেন, 'আমিও একই জিনিস ভাবছি। কিন্তু, আর—একটু দেখি। তেমন হলে, আজ রাতেই রেইড করব।'

রাত আটটা নাগাদ আবার ফোন। অমিতশংকর জানালেন, সুজাতাদেবীর হাজব্যান্ড নিউ আলিপুর থেকে নিজের গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে আসেন সাউথ সিটি শপিং মলে। সেখান থেকে একটা বেশ বড় স্যুটকেস নিয়ে বাড়িতে ঢুকেছেন। কন্দর্পনারায়ণ বললেন, 'তুমি আজ রাতেই রেইড করো। আমি তোমার কাছে সুজাতাদেবীর বাড়ির লোককে পাঠাচ্ছি। রেইডের সময় ওঁরাও থাকুন।' ফোনটা কেটে এবার কন্দর্পনারায়ণ ফোন করলেন কুন্তলবাবুকে, 'আপনি এক্ষুনি সুজাতাদেবীর বাড়িতে যান। ওঁর বাবা আর বোনকে নিয়ে নিউ আলিপুর থানায় আসুন। ও.সি. সাহেবের সঙ্গে দেখা করুন। আজ রাতেই সুজাতাদেবীর হাজব্যান্ডের বাড়ি রেইড হবে। আপনারা সঙ্গে থাকুন। আমিও আসছি।'

কন্দর্পনারায়ণ পরিষ্কার ফোনের ওপার থেকে একটা গুমরে গুমরে কান্না শুনতে পেলেন। কন্দর্পনারায়ণও আর কথা বলতে পারলেন না, তাঁরও গলাটা ধরে গেল। তিনি ফোনটা কেটে দিলেন।

রাত দশটা নাগাদ কন্দর্পনারায়ণ তাঁর জুনিয়র দ্বৈপায়নের বাইকে চড়ে, কুন্তলবাবুর দেওয়া ঠিকানা অনুযায়ী, সুজাতাদেবীর স্বামীর বাড়ির সামনে চলে এলেন। পাড়ার বাইরে একটা পানের দোকান থেকে একটা মশলা জোয়ানের প্যাকেট কিনলেন, প্যাকেটটা দেবার সময় দোকানদার ইশারা করলেন সামনে ডানদিকে দোতলা বাড়িটার দিকে। কন্দর্পনারায়ণ জানতেন, এই দোকানেও অমিতশংকর নিজের টেনিয়া বসিয়ে দিয়েছেন। জোয়ানের প্যাকেটটা ছিঁড়তে ছিঁড়তে অল্পবয়সি তাগড়াই চেহারার টেনিয়াকে জিজ্ঞেস করলেন, 'বাড়িতে বোধহয় আর কেউ থাকে না, তা—ই না?' ছেলেটি বিড়বিড় করে উত্তর দিল, 'না স্যার, লোকটা দুই ভাই। বড়ভাই আমেরিকায় থাকেন। ওঁর বয়স্ক বাবা—মা—ও সেখানেই থাকেন। এই বাড়িতে স্বামী—স্ত্রী দু—জন।' বলতে বলতে, অমিতশংকর দুটো বোলেরো গাড়ি ভরতি পুলিশ নিয়ে চলে এলেন। আশপাশের দোকানে, এদিকে—ওদিকে বেশ কয়েকজন সিভিল ড্রেসে পুলিশ ছড়িয়ে—ছিটিয়ে ছিলেন, কন্দর্পনারায়ণ বুঝতে পারেননি। গাড়িতে সুজাতাদেবীর বাবা আর বোনকে বসিয়ে রাখা হল, দরকারে ভেতরে ডাকা হবে। সুজাতাদেবীর বাবা বার বার নার্ভ ফেল করছেন। সুজাতাদেবীর বোন বাবাকে জড়িয়ে ধরে বসে রইলেন।

কন্দর্পনারায়ণের খুব খারাপ লাগছিল। বয়স্ক মানুষটা গোঙানোর মতো করে বার বার কেঁদে উঠছেন।

অমিতশংকর পুলিশি স্মার্টনেসে একদল পুলিশ অফিসার নিয়ে প্রথমে বাড়িটা ঘিরে ফেললেন। একজন পাঁচিল ডিঙিয়ে ভেতরে গিয়ে, মোটা লোহার গেটটা খুলে দিলেন। গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকে তবে মোটা কাঠের দরজা। অমিতশংকর বেল বাজালেন। বেশ খানিকক্ষণ বেল বাজানোর পর এক ভদ্রলোক ভেতর থেকে চেঁচিয়ে বললেন, 'কে?'

অমিতশংকর উত্তর দিলেন, 'পুজোর চাঁদা, ক্লাবের ছেলে।' ততক্ষণে আশপাশের বাড়িগুলো থেকে লোক বেরিয়ে দূরে দূরে জমতে শুরু করেছে, কেউ কেউ জানলা থেকে মুখ বের করে দেখছেন।

ভেতর থেকে উত্তর এল—'কালকে আসুন।'

অমিতশংকর বললেন, 'বিলটা রেখেই চলে যাব, চাঁদাটা পরে কালেক্ট করব।'

ভেতর থেকে ক্রুদ্ধ স্বরে উত্তর এল, 'বললাম না? কালকে আসুন।'

এবার অমিতশংকর একটা গাল দিয়ে বললেন, 'আমরা পুলিশ, এক্ষুনি দরজা খুলুন, না হলে দরজা ভাঙব।'

এবার ভেতর থেকে দরজা খোলার শব্দ পাওয়া গেল। এক মাঝবয়সি ভদ্রলোক দরজা খুললেন। মোটাসোটা চেহারা, হাফপ্যান্ট, খালি গা, ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি, কাঁচাপাকা ব্যাকব্রাশ করা চুল। পরিষ্কার বিধ্বস্ত চেহারা। দরজা খুলে সরে দাঁড়ালেন।

অমিতশংকর ভদ্রলোকের ঘাড়ে একটা রদ্দা মেরে বললেন, 'দেরি হল কেন রে?'

কন্দর্পনারায়ণ বললেন, 'ঘরে পচা গন্ধ বেরোচ্ছে। রুম ফ্রেশনার ছড়ানো হয়েছে। বেডরুমটা দেখো।' অন্য পুলিশ অফিসাররা সব ঘরে ছড়িয়ে গেলেন।

বসার ঘরে বড় একটা সুটকেস খোলা। কন্দর্পনারায়ণ আবার চিৎকার করে উঠলেন, 'এই তো বড় স্যুটকেস। বডি গায়েব করার জন্য।'

কুন্তলবাবু মাথায় হাত দিয়ে বসার ঘরে সোফার উপর ধপ করে বসে পড়লেন। সুজাতাদেবীর স্বামী পুলিশের কবজায়, তাঁকে মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসিয়ে রাখা হয়েছে।

অমিতশংকর বেডরুম থেকে ঘুরে এসে বললেন, 'তন্ন তন্ন করে বেডরুমটা খুঁজলাম। বেডরুমে কিচ্ছু নেই।'

অন্য অফিসাররাও ফিরে এলেন, ছাদ, জলের রিজার্ভার, পায়খানার ট্যাঙ্ক, সব খোঁজা হয়েছে। কোথাও কিচ্ছু নেই। কন্দর্পনারায়ণ চুপ করে দাঁড়িয়ে ডান হাতের একটা আঙুল ঠোঁটের উপর রেখে কী যেন ভাবছেন। হঠাৎ অনুভব করলেন, খুব শীত করছে। ওঃ হোঃ, বসার ঘরে তো পুরো মাত্রায় এ.সি. চলছে!!

কন্দর্পনারায়ণের চোখ ঘুরতে লাগল—কোথায়, কোথায়?

'দেখি কুন্তলবাবু, সোফা থেকে উঠুন তো? এই তো, এখান থেকে গন্ধ বেরোচ্ছে।'

অমিতশংকর একজন কনস্টেবলকে বললেন, 'সোফার কভারটা তোলো—'

সুজাতাদেবীর বাবা আর বোনকে ডাকা হল, মৃতদেহ শনাক্ত করার জন্য। সুজাতাদেবীর বাবাকে ধরে ধরে আনা হল, তিনি ঘরে ঢুকেই জ্ঞান হারালেন।

জেরায় সুজাতা দেবীর স্বামী স্বীকার করে নেন যে, শুক্রবার ভোরবেলায় সুজাতাদেবী যখন ঘুমোচ্ছিলেন, তখনই মোবাইলের চার্জারের তার গলায় জড়িয়ে সুজাতাদেবীকে শ্বাসরোধ করে মারেন।

দু—দিন পর সন্ধেবেলায় কন্দর্পনারায়ণ তাঁর জুনিয়র লইয়ারদের সঙ্গে চেম্বারে বসে কাজ করছেন। এমন সময় কুন্তলবাবু ধীরগতিতে চেম্বারে এসে ঢুকলেন। দু—দিনে সেই ঝকঝকে চেহারাটা যেন অনেক ঝরে গিয়েছে। মাথার ঝাঁকড়া চুলগুলোও এলোমেলো। মনে হয়, চিরুনি পড়েনি। কন্দর্পনারায়ণের দিকে হাত জোড় করে চেয়ারে বসলেন। খানিকক্ষণ চুপ করে বসে ছিলেন। কোনও কথা না বলে, চেম্বারে রাখা রঙিন মাছের অ্যাকোয়ারিয়ামটার দিকে তাকিয়ে থাকলেন। কন্দর্পনারায়ণও কোনও কথা বললেন না। তিনিও চুপ করে বসে কুন্তলবাবুর দিকে তাকিয়ে রইলেন। কেন যেন কুন্তলবাবুকে কন্দর্পনারায়ণের ভালো লেগে গিয়েছে। কুন্তলবাবুর মধ্যে নিজের উনত্রিশ—ত্রিশ বছর বয়সের জীবনটা দেখতে পাচ্ছেন। তখনও তাঁর এতটা পসার হয়নি। তরুণ কন্দর্পনারায়ণ, সমাজগড় থেকে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে গল্ফগ্রিনের দিকে যাচ্ছেন, পরনে জিনসের ওপর পাঞ্জাবি, হাওয়ায় চুল উড়ছে, গালে হালকা ট্রিম করা দাড়ি। গল্ফগ্রিনের রাস্তায় আশপাশের কৃষ্ণচূড়া—রাধাচূড়া গাছগুলো থেকে ফুল ঝরে পড়ে রাস্তাটা রঙিন হয়ে আছে। কন্দর্পনারায়ণ হাঁটছেন আর হাঁটছেন।

কুন্তলবাবু নীরবতা ভঙ্গ করে বললেন, 'আপনার ক্যালকুলেশন নিখুঁত ছিল, স্যার।'

কন্দর্পনারায়ণের সংবিৎ ফিরল। বিড়বিড় করে বললেন, 'আমার হিসেবে ভুল হলে আমিই সবচেয়ে খুশি হতাম, ব্রাদার! আপনার কথা শুনে এবং সুজাতাদেবীর প্রোফাইল খুঁটিয়ে দেখে বুঝতে পেরেছিলাম, কিছু একটা গোলমাল হয়েছে। আমাদের আইনের ভাষায় একটা কথা আছে—কনডাক্ট অফ দি অ্যাকিউজড, অর্থাৎ আসামির আচরণ, ব্যবহার থেকে আসামির সম্পর্কে আন্দাজ করা যায়। এখানে, সুজাতাদেবীর স্বামী প্রথমে শ্বশুরের বা শালির ফোন ধরছিলেন না। যেহেতু তিনি পোড়খাওয়া আসামি নন, তখনও পর্যন্ত তিনি দিশেহারা ছিলেন, যে তিনি ওঁদের কী বলবেন! খুনটা হয়েছে শুক্রবার ভোরের দিকে। পোস্টমর্টেমেও তা—ই বলেছে। ডিকম্পোজড বডি, অর্থাৎ, বডি পচতে শুরু করেছিল। যদিও উনি ঘরে এ.সি. চালিয়ে রেখেছিলেন পুরোমাত্রায়। শুক্রবার সারাদিন ধরে উনি ভাবলেন, বডি পাচার করবেন কীভাবে। আসলে, বডিটা তো ঘর থেকে নিয়ে বেরোতে হবে। শনিবার বিকেলে উনি নিউ আলিপুর থানায় মিসিং ডায়েরি করলেন। রবিবার আপনি আমার কাছে এলেন। রবিবারই সন্ধে নাগাদ সুজাতাদেবীর স্বামী বাইরে বেরিয়ে সাউথ সিটি মল থেকে সবচেয়ে বড় সাইজের স্যুটকেস কিনলেন। ওঁর মতলব ছিল, রবিবারই রাতের অন্ধকারে স্যুটকেসে ভরে উনি বডি পাচার করবেন।'

'বাড়ির সামনে ওয়াচম্যান বসিয়ে দেওয়াটা খুব কাজের হয়েছিল। পুলিশের লোক আশপাশের পান—বিড়ি—সিগারেটের দোকান আর চায়ের দোকানগুলোর দখল নিয়ে নেন। ওঁরা কনস্ট্যান্ট ও.সি. অমিতশংকরবাবুকে রিপোর্ট করছিলেন। অমিতশংকরবাবু আমাকে ফোন করে সব জানাচ্ছিলেন। যেইমাত্র খবর পাওয়া গেল, সুজাতাদেবীর স্বামী রুম ফ্রেশনার কিনে ঘরে ঢুকেছেন, সঙ্গে সঙ্গে আমি নিশ্চিত হলাম, যে খুনটাও ঘরেই হয়েছে, আর বডিও ঘরেই আছে। অমিতশংকরের সঙ্গে আমি প্ল্যান ঠিক করে নিই যে, বেশি রাত হবার আগেই রেইড করতে হবে। না হলে, ও বডি গায়েব করে দেবার চেষ্টা করবে। আমরা যে রাতেই পুলিশ নিয়ে বাড়িতে হাজির হব, এটা ওই লোকটা ভাবতেই পারেনি।'

'আমি বসার ঘরে ঢুকে প্রথমে বুঝতেই পারিনি যে, সুজাতাদেবীকে মেরে ও সোফার মধ্যে ঢুকিয়ে রেখেছে। আর আপনি তো ওই সোফার ওপরেই বসে পড়লেন।'

কুন্তলবাবুর চোখ দিয়ে ঝরঝর করে জল ঝরে পড়ছিল। 'স্যার, গত রবিবার আপনার কাছে এসে বলছিলাম না, সুজাতা আমার ভালোবাসা ছিল, ও বিয়ে করে চলে যাবার পর আমি আর কাউকে বিয়েও করিনি। আজকে আমি আপনার জন্য সেই সময়ের লেখা কিছু কবিতা নিয়ে ছাপা একটা বই নিয়ে এসেছি। এই নিন।'

কাঁধের ঝোলা থেকে একটা বই বের করে, কুন্তলবাবু কন্দর্পনারায়ণের দিকে বাড়িয়ে ধরলেন। কন্দর্পনারায়ণ দু—হাত বাড়িয়ে পরম মমতার সঙ্গে বইটা নিলেন—বইটার নাম 'অপূর্ণ প্রেম', পাতা উলটে দেখলেন প্রথম কবিতাটার নাম 'সুজাতা'।

অধ্যায় ১ / ৩
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%