সম্পর্ক

জয়ন্তনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়

আজকে সকাল থেকে যে দু—জন ক্লায়েন্ট এলেন, দু—জনেরই ম্যাট্রিমোনিয়াল ডিসপিউট, মানে, বিবাহিত জীবন সংক্রান্ত সমস্যা। এক—একদিন এমনই যায়, যেদিন শুধু স্বামী—স্ত্রী—র সমস্যা নিয়েই ক্লায়েন্টরা আসেন। সেদিন হয়তো অন্য কেস আর এলই না। আবার এক—একদিন খুন, রেপ, ডাকাতির কেস নিয়েপর পর ক্লায়েন্টরা আসতে থাকলেন, সেদিন আবার হয়তো অন্য ধরনের মামলা আর এল না।

কিন্তু, এই স্বামী—স্ত্রী—র সমস্যা পর পর সামলানো খুব মুশকিলের মনে হয় কন্দর্পনারায়ণের। একটার পর একটা সম্পর্ক ভেঙে যাবার কাহিনি। সত্যি সত্যি মনের ওপর খুব চাপ পড়ে। বিশেষ করে, যে সংসারে বাচ্চা থাকে, সেই সংসার ভেঙে গেলে খুব কষ্ট হয়। এটা ঠিক যে, স্বামী—স্ত্রীর বনিবনা না হলে, মারপিট, খুনোখুনিতে না গিয়ে ডিভোর্স নিয়ে আলাদা হয়ে যাওয়া ভালো। ডিভোর্স নেবার পদ্ধতিও এখন আগের থেকে অনেক সহজ হয়েছে। কিন্তু, যেখানে বাচ্চা আছে? তাদের যে কী কষ্ট, তাদের কথা কে ভাবে? বাবা—মায়েরা তো নিজেদের শান্তির জন্য সংসার ভেঙে দিতেই পারেন, একটা বাচ্চার মনের কষ্ট কে বোঝে? বাচ্চারা তো বাবা—মা দু—জনকেই চায়। কিন্তু, আজকাল চারদিকে সংসার ভাঙার ছবি। কন্দর্পনারায়ণের কাছেও অনেকেই আসেন ডিভোর্সের মামলা নিয়ে। উনি প্রথমেই জিজ্ঞেস করেন, 'বাচ্চা আছে?' যদি উত্তর হয় 'হ্যাঁ', তাহলে উনি সেই ক্লায়েন্টকে ফিরিয়ে দেবেনই দেবেন। বার বার বোঝাবেন, ডিভোর্স করবার আগে বার বার ভাবতে বলবেন। অন্তত যদি বাচ্চার কথা বলেও ডিভোর্সটাকে আটকানো যায়। আগের দু—জন ক্লায়েন্টের সঙ্গে যখন কথা বলছিলেন, তখন থেকেই বসার ঘরে বসে থাকা একটা বাচ্চার দিকে চোখ যাচ্ছিল কন্দর্পনারায়ণের। মা আর দিদিমার সঙ্গে এসেছে বাচ্চাটা, ক—দিন আগেই দিদিমাটি এসেছিলেন তাঁর মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে, মানে, বাচ্চাটার মা—কে সঙ্গে নিয়ে। মেয়েটির বয়স কতই বা হবে? এই আটাশ—উনত্রিশ। আগের দিন চেম্বারে ঢুকেই দিদিমাটির প্রথম কথা ছিল—'আমি আমার মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে আপনার কাছে এসেছি, আপনার অনেক নাম শুনেছি, আমার মেয়ের ডিভোর্স করিয়ে দিতে হবে।'

কন্দর্পনারায়ণ অবাক হয়ে প্রশ্ন করেছিলেন, 'ডিভোর্স করাবেন? কেন? কারণ কী? স্বামী মারধর করে?' মেয়েটি কিছু বলবার আগেই মেয়েটির মা হাত নাড়তে নাড়তে উত্তেজিত স্বরে তাঁর জামাইয়ের নামে গালমন্দ করতে শুরু করলেন এবং সে যে কত খারাপ প্রকৃতির মানুষ, সেটা বলতে লাগলেন। কন্দর্পনারায়ণ তাঁকে থামিয়ে দিয়ে মেয়েকে জিজ্ঞাসা করলেন—'দিদিভাই, ডিভোর্স চান আপনি? স্বামী কি খুব অত্যাচার করেন?'

মেয়ে কিছু বলবার আগেই আবার তার মা হইহই করে জামাইয়ের নিন্দে শুরু করলেন। কন্দর্পনারায়ণ বুঝতে পারলেন, এই শাশুড়িটিই যত নষ্টের গোড়া। মেয়ের সংসার নষ্ট করতে উনিই উঠেপড়ে লেগেছেন। ফের উনি হাতের ইশারা করে ভদ্রমহিলাকে থামালেন। হতাশা প্রকাশ করে প্রশ্ন করলেন, 'আমার কাছে কার ডিভোর্সের মামলার জন্য এসেছেন?'

ভদ্রমহিলা যেন কিছুই বুঝতে পারছেন না, তিনিও চোখ বড় করে বলে উঠলেন, 'কেন? আমার মেয়ের?'

কন্দর্পনারায়ণ বললেন, 'তাহলে মেয়েকেই কথা বলতে দিন। মেয়ের সমস্যা শুনি, আপনি এত কথা না বলে বরং চুপ করে বসুন।' তারপর মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'স্বামীকে ডিভোর্স দিতে চান কেন? মারধর করে? অন্য মহিলার সঙ্গে সম্পর্ক রাখে?'

মেয়েটি মাথা নিচু করে বলল, 'না, তেমন নয়। আসলে মদ—টদ খায়—আমার সঙ্গে ঝগড়া করবার পর—তখন মা কিছু বলতে এলে মায়ের সঙ্গেও ঝগড়া করে।'

কন্দর্পনারায়ণ মাথা চুলকে বললেন, 'দিদিভাই, মদ তো আজকাল সব্বাই খায়। বড়লোক, গরিব লোক, ভালো ছেলে, মন্দ ছেলে। মেয়েরাও খাচ্ছে। মদের দোকানে মেয়েরাও লাইন দিচ্ছে—তা মদ খাওয়াটা আর আজকাল অন্যায় কিছু নয়। এই তো সামনেই বিশ্বকর্মাপুজো, বাঙালির মদ খাওয়া শুরু হবে। প্রথমে বিশ্বকর্মাপুজো, তারপর মহালয়া, তারপর দুর্গাপুজো, কালীপুজো, ভাসান, পঁচিশে ডিসেম্বর, একত্রিশে ডিসেম্বর, নিউ ইয়ার—পর পর চলতে থাকবে। মদ খাওয়াটা আজকাল আর খারাপ কোথায়? ঠিক আছে, তবুও মেনে নিলাম, যে স্বামী মদ খায়। তা রোজই কি মদ খায়?'

মেয়েটি ঘাড় নেড়ে বলল, 'না, আমার সঙ্গে ঝগড়া হলে, বাড়ি থেকে বেরিয়ে মদ খেয়ে আসে।'

কন্দর্পনারায়ণ বললেন, 'ওহো, রোজ মদ খেয়ে এসে ঝগড়া করে না, আপনার সঙ্গে ঝগড়া হলে মদ খায়? আচ্ছা, তা ঝগড়া হয় কেন আপনাদের?'

'ওই ছেলেকে পড়ানো নিয়ে। ছেলে খেলাধুলো করতে ভালোবাসে, তার বাবাও ছেলেকে নিয়ে এখানে—ওখানে খেলাতে নিয়ে যায়। সে—ও চায় ছেলে খেলাধুলো করুক। বিজয়গড় মাঠে ফুটবল ট্রেনিংয়ে নিয়ে যায়।'

'ইন্ডিয়ার ফুটবল ক্যাপ্টেন ছিলেন তুষার রক্ষিত। তাঁর কোচিং ক্যাম্পে নিয়ে যায়। তা পড়বে কখন? আমি সেই নিয়ে বলি, আমার মা—ও বলেন, তাতেই ও রেগেমেগে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়ে মদ খেয়ে আসে, আর তারপর আমাদের দু—জনের সঙ্গে ঝগড়া করে।'

কন্দর্পনারায়ণ গভীর মনোযোগের সঙ্গে শুনছিলেন। এবার প্রশ্ন করলেন 'কী পড়ে আপনার ছেলে? বয়স কত? তা ছাড়া আপনার মা কোথায় থাকেন? আপনার স্বামী কি রোজ আপনার বাপের বাড়ি যায় ঝগড়া করতে?'

'আমার ছেলের বয়স দশ বছর, বিজয়গড় বিদ্যাপীঠে ক্লাস ফোরে পড়ে। বাপের গায়ে গায়ে থাকতে ভালোবাসে। আসলে আমার সঙ্গে আমার হাজব্যান্ডের লাভ ম্যারেজ। আমার তো বাবা নেই, মা একা থাকেন। কাছাকাছি বাড়ি, তাই মা রোজ সন্ধেবেলায় আমাদের বাড়িতে চলে আসেন। আমি আর মা সায়া সেলাই করে বাইরে বিক্রি করি। আমার স্বামীর সাইকেল সারাইয়ের দোকান আছে। ও রাতে বাড়ি ফেরে, তখনই ছেলেকে পড়ানো নিয়ে ঝগড়া বাধে। মা—ও কিছু বললে, আমার স্বামী সহ্য করতে পারে না। ব্যাস, সবাই মিলে ঝগড়া বেধে যায়,' মেয়েটি বলল।

কন্দর্পনারায়ণ বললেন, 'আচ্ছা, আপনাদের ক—টা ঘর? ঘরে টিভি আছে?'

মেয়েটি আবার বলল, 'ওই টালির ঘর। দুটো। আর রান্নাঘর, বাথরুম। আমাদের শোবার ঘর একটাই, সন্ধেবেলা ছেলে সেখানে বসে পড়ে। মাস্টার আসে। আর টিভি—র ঘরে বসে আমি আর মা সায়া সেলাই করি, মা অর্ডার ধরে আনে। আমরা দু—জন মিলে সেলাই করি, দুটো পয়সা আসে।'

'আপনার স্বামীর মা—বাবা, মানে আপনার শ্বশুর—শাশুড়ি নেই?' —কন্দর্পনারায়ণ জিজ্ঞেস করলেন।

মেয়েটি মাথা নেড়ে বলল, 'না, আমার স্বামীর অল্প বয়সেই তাঁরা মারা গেছেন। আমার স্বামী একই ছেলে।' কন্দর্পনারায়ণ বুঝে গেলেন, এটা ডিভোর্সের কেস নয়। এই মেয়েটির ডিভোর্স হতে দেওয়া উচিত নয়। মেয়েটির মা এইসব আলোচনা চাইছিলেন না, তিনি বার বার কিছু বলবার জন্য প্রায় চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ছেন, আর প্রত্যেকবারই তাঁকে থামিয়ে দিচ্ছিলেন কন্দর্পনারায়ণ।

ঘরে পৌলোমী বসে ছিলেন। যখনই কোনও ক্লায়েন্টের সঙ্গে আলোচনা হয়, কোনও না কোনও জুনিয়র সেই আলোচনায় উপস্থিত থাকেন। নোট করেন। পৌলোমী বসে বসে ক্লায়েন্টের পার্টিকুলার্স, ক্লায়েন্ট কী চান, মূল পয়েন্টস—এ সবই নোট করছিলেন। কন্দর্পনারায়ণ এবার পৌলোমীর দিকে তাকিয়ে চোখাচোখি করলেন। ভাবখানা এমন যে, বুঝেছ তো? গোলমালের মূল কারণই হলেন মেয়েটির মা। মেয়ের সংসারে তাঁর নাক গলানোতেই এত গোলমাল। মেয়েকে কথা বলতেই দিতে চাইছেন না। ভাবখানা এমন, আমি মেয়েকে উকিলের কাছে নিয়ে এসেছি, উকিলকে পয়সা দেব, উকিল ডিভোর্স করিয়ে দেবে—ব্যস। আবার এত প্রশ্ন করা কেন বাপু? কিন্তু, যাঁরা কন্দর্পনারায়ণকে চেনেন, তাঁরা জানেন, মামলা অ্যাকসেপ্ট করবার আগে নিজে ভালো করে মামলা সম্পর্কে সমস্ত বৃত্তান্ত শুনবেন, নিজে স্যাটিসফায়েড হবেন, তারপর মামলা হাতে নেবেন। কোনও ক্লায়েন্ট এলেন, ফিস দিলেন, আর উনিও মামলা করতে দাঁড়িয়ে যাবেন—বাস্তবে উনি একেবারেই সেরকম নন। মামলার ক্ষেত্রে ভীষণ চুজি, পছন্দ না হলে মামলা হাতেই নেবেন না। আর ডিভোর্সের মামলার ক্ষেত্রে তো আরও সাবধানি। স্বামী—স্ত্রী—র সামান্য বনিবনা না—হবার কারণে ডিভোর্স করা তো একেবারেই পছন্দ নয়। আর পরিবারে যদি বাচ্চা থাকে, তাহলে তো ডিভোর্সের ঘোর বিরোধী।

বয়স্কা ভদ্রমহিলা, মানে মেয়েটির মা—র বোধহয় ধারণা ছিল যে, উকিলের কাছে আসবেন, পেমেন্ট করবেন, আর মেয়ের ডিভোর্স নিয়ে বেরিয়ে যাবেন, কিন্তু উকিলবাবু যে মেয়ের সংসার সম্পর্কে এত কিছু জানতে চাইবেন, এটা উনি ভাবতেও পারেননি। কন্দর্পনারায়ণ এবার মেয়েটির মা—র দিকে না তাকিয়ে সরাসরি ওঁর মেয়েকেই জিজ্ঞেস করলেন 'তা আপনি ডিভোর্স চাইছেন কেন? স্বামী ঝগড়া করে, মদ খেয়ে রাতে ঘরে আসে বুঝলাম, কিন্তু ঝগড়া করে, মদ খেয়ে, রাতে ঘরে ফিরে কি আপনাকে মারধর করে? নাকি অন্য মহিলার সঙ্গে সম্পর্ক আছে?'

এবারও মেয়েটির মা কিছু বলতে চাইছিলেন, কিন্তু তার আগেই অল্পবয়সি মেয়েটি জিভ কেটে বলল, 'এ মা—না না, ও কোনদিন আমার গায়ে হাত তোলেনি, ডিভোর্স করতে এসেছি বলে মিথ্যা কথা বলব কেন?' তারপর আড়চোখে মা—র দিকে তাকিয়ে বলল, 'আর তা ছাড়া ও অন্য মহিলার কাছেও যায় না। দোকান আর বাড়ি ছাড়া ওর অন্য কোনও জগৎ নেই। ছেলেকে ও খুব ভালোবাসে।'

কন্দর্পনারায়ণ এবার চেয়ারে হেলান দিয়ে শরীর এলিয়ে দিয়ে বললেন, 'তাহলে ডিভোর্স চাইছেন কেন দিদিভাই? ডিভোর্স চাইলেই কিন্তু আদালত ডিভোর্স দিয়ে দেন না। ডিভোর্সের কারণ দেখাতে হবে। কেন আপনি ডিভোর্স চাইছেন, আদালতে সেটা বোঝাতে হবে। আদালত যদি মনে করেন, এই পরিবারটিতে ডিভোর্স হবার কোনও কারণই নেই, তাহলে কিন্তু ডিভোর্স হবেই না। আপনাকে ডিভোর্স হবার উপযুক্ত কারণ দেখাতে হবে।'

এবার একটু থেমে, গলাখাঁকারি দিয়ে আবার বললেন, 'তা ছাড়া আপনাদের ছেলে আছে, তার দশ বছর বয়স। আমি তার সঙ্গেও কথা বলতে চাই। আপনি ডিভোর্স চাইছেন, ভালো। মনে রাখবেন, ডিভোর্স হয় স্বামী—স্ত্রী—র মধ্যে। কিন্তু বাচ্চাদের সঙ্গে তো আর ডিভোর্স হয় না। বাচ্চাটা বাবাকে আর মা—কে দু—জনকে কিন্তু একসঙ্গে আর পাবে না। সে তো সেটা না—ও চাইতে পারে। আপনি তো বলছেন, বাপের সঙ্গে ছেলের সম্পর্ক খুব ভালো, তাহলে আপনার সঙ্গে আপনার স্বামীর ডিভোর্স হলে বাচ্চাটা তো কষ্ট পাবে। আপনি কি বাচ্চাটাকে তার বাবাকে দিয়ে দেবেন?'

অল্পবয়সি মেয়েটি আঁতকে উঠে বলল, 'না না, ছেলেকে ছেড়ে আমি থাকতে পারব না। ও আমার কাছেই থাকবে।'

'বাঃ বাঃ, আপনার কাছে, আপনার মা থাকবেন, আপনার ছেলেও থাকবে? আর আপনার স্বামী যে এক্কেবারে একা হয়ে যাবেন? তার তো মা—বাবাও নেই। তার কথা একবারও ভেবেছেন? তা ছাড়া, এখানে তো আমি আপনাদের মধ্যে ডিভোর্সের জুতসই গ্রাউন্ডই খুঁজে পাচ্ছি না।'

অল্পবয়সি মেয়েটির মা অর্থাৎ বয়স্কা ভদ্রমহিলা উত্তেজনায় চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, 'না, স্যার, আপনার কাছে মেয়েকে নিয়ে এসেছি, মেয়ের ডিভোর্স করিয়েই দিতে হবে, ব্যাস। ওই ছেলের সঙ্গে আর আমার মেয়ে ঘর করবে না।'

কন্দর্পনারায়ণ চেয়ারে এলিয়ে থাকা অবস্থাতেই বললেন, 'ঠিক আছে, আমি আপনার মেয়ের কেসটা নিতে পারি, তবে একটা শর্ত, আপনি আপনার নাতিকে নিয়ে আমার কাছে আসুন, আমি নিজে আপনার নাতির সঙ্গে কথা বলব। তার এখন দশ বছর বয়স। তার মানে, সে এখন ভালোমন্দ বুঝতে শিখেছে। দেখি সে কী বলে। যদি সে বলে, সে তার বাবা—মা দু—জনকেই চায়, আর সে তার বাবাকে ছেড়ে থাকতে পারবে না, সে তার বাবাকে ভালোবাসে, তাহলে কিন্তু এই মামলা করব কি না আমাকে ভাবতে হবে।'

সেদিনের সেই বয়স্কা ভদ্রমহিলা আজ আবার এসেছেন মেয়েকে নিয়ে। সঙ্গে এনেছেন দশ বছরের নাতিকেও। আজকে যখন আগের ক্লায়েন্টদের সঙ্গে কথা বলছিলেন কন্দর্পনারায়ণ, ছেলেটা তখন পাশের ঘরে সোফায় বসে বসে সব আলোচনা শুনছিল। বাচ্চাটা যে সবার সঙ্গে আলোচনাগুলো শুনছে, সেটা কন্দর্পনারায়ণ বুঝতে পারছিলেন। দুটো ঘরের মাঝে পরদাটা দুলছিল, আর পরদার ফাঁক দিয়ে বাচ্চাটাকে দেখতে পাচ্ছিলেন। বাচ্চাটাও একদৃষ্টে, কান খাড়া করে এদিকেই তাকিয়ে বসে ছিল। কন্দর্পনারায়ণ বুঝতে পারছিলেন যে, বাচ্চাটা তাঁকেই জরিপ করছে। বোঝার চেষ্টা করছে যে, এই ঝোলা গোঁফওয়ালা উকিলবাবুটা ভালো? নাকি মন্দ লোক? সব কথা কি এঁকে বলা ঠিক হবে? কন্দর্পনারায়ণ জানেন, দশ বছরের একটা ছেলে তার মা—বাবার মধ্যে ঝগড়াঝাঁটি হলে সব বুঝতে পারে। ওরাও খুব কষ্ট পায়। আসলে ওরা তো মা—বাবা দু—জনকেই ভালোবাসে। কিন্তু যদি ওদের জিজ্ঞাসা করা হয়, তুমি মা কিংবা বাবা কার কাছে থাকবে, তাহলে ওরা সমস্যায় পড়ে যায়, কাকে ছেড়ে কার কথা বলবে। মা—কে চাইবে নাকি বাবাকে চাইবে? বাচ্চাদের যদি ভগবান এসে জিজ্ঞেস করেন যে, 'তুমি নির্ভয়ে বলো কাকে চাও, বাবাকে নাকি মা—কে?' তাহলে বাচ্চারা নিশ্চয়ই বলবে, 'আমরা দু—জনকেই চাই।' আজকে এই বাচ্চাটাও পাশের ঘরের আলোচনা শুনতে শুনতে নিশ্চয়ই ভাবছে, এই উকিলবাবুটাকে মনের সব কথা বলা কি ঠিক হবে? উনি কি পারবেন আমার মা—বাবার মধ্যে মিল করিয়ে দিতে?

কন্দর্পনারায়ণ এবার বয়স্কা ভদ্রমহিলাটিকে খুব সহজ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে ডাকলেন, 'দিদি, আসুন। কই, নাতিকে এনেছেন? দেখি আপনার নাতিকে?' কন্দর্পনারায়ণ ঘরের আবহাওয়া স্বাভাবিক করতে চাইলেন। বাচ্চাটা ঘরে ঢুকেই চারদিকের দেওয়ালে ঝোলানো র‍্যাকে সাজানো বইগুলোকে ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগল—আর বলতে লাগল 'অ্যাত্তো বই?—অ্যাত্তো বই?' তারপর ঘরের একদিকে সযত্নে রাখা রঙিন মাছগুলোর অ্যাকোয়ারিয়ামের সামনে গিয়ে দাঁড়াল—মনোযোগ দিয়ে মাছগুলোর খেলা করা দেখতে লাগল।

বয়স্কা ভদ্রমহিলা তাঁর মেয়েকে নিয়ে, অর্থাৎ বাচ্চাটির মা—কে নিয়ে কন্দর্পনারায়ণের সামনের চেয়ারে বসলেন।

কন্দর্পনারায়ণ বাচ্চাটার দিকে তাকিয়ে রইলেন, বাচ্চাটা সব ঘরে ঘুরে ঘুরে দেখছে। অন্য জুনিয়ররা, যারা অন্য ঘরে কাজ করছে, তাদের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। তারাও গোলগাল, ফরসা, মিষ্টি চেহারার একটা বাচ্চা ছেলেকে ঘরে ঘুরতে দেখে ওর গাল টিপে আদর করে দিল।

কন্দর্পনারায়ণ বাচ্চাটাকে সহজ হবার জন্য সময় দিলেন। এসবই তাঁর স্ট্র্যাটেজির অঙ্গ, বাচ্চাটিকে সময় না দিলে, বাচ্চাটা তাঁর সঙ্গে স্বাভাবিকও হতে পারবে না, মন খুলে কথাও বলবে না। ঘরে অ্যাকোয়ারিয়ামে মাছ রাখাও সেই কারণে। রঙিন মাছের নড়াচড়া দেখলে, অশান্ত, চঞ্চল মন ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে আসে।

খানিকক্ষণ পর বাচ্চাটা তার দিদিমা আর মা—র মাঝখানের চেয়ারটায় এসে বসল।

তার প্রথম কথাই হল—'সারা বাড়িতে অ্যাত্তো বই, সব বই তুমি পড়েছ?'

কন্দর্পনারায়ণ মিষ্টি হেসে বললেন, 'দেখ, তুই তো ছোট, ছোটদের মিথ্যে কথা বলতে নেই। তাই তোকে সত্যি কথাই বলব, সব বই পড়িনি ঠিকই, কিন্তু বেশির ভাগ বই পড়েছি। যদি না পড়ি তাহলে যাঁরা আমার কাছে দূর দূর থেকে আসেন, তাঁদের ঠিকঠাক পরামর্শ দেব কী করে বল? তা—ই না?'

বাচ্চাটা ঘাড় নাড়ল।

'এই যে দেখ—না তুই এসেছিস, তোর মা এসেছেন, তোর দিদা এসেছেন, তোদের বাড়ির একটা ব্যাপারে আলোচনা করতে, যদি ঠিকঠাক পরামর্শ না দিই, তাহলে তো মুশকিল হবে তা—ই না? সেইজন্যই আমাকে পড়তে হয়, অনেক পড়তে হয়, বুঝলি?' কন্দর্পনারায়ণ একটু থেমে আবার শুরু করলেন, 'তুই যেমন ভালো ফুটবল খেলিস, আমি আবার ফুটবলটা খেলতে পারি না। আমাকে ফুটবল খেলাটা শেখাস তো—'

বাচ্চাটা একটু উৎসাহ পেয়ে বলল, 'তোমাকে কে বলল যে আমি ফুটবল খেলি?'

'কেন, তোর মা আর দিদা। তোকে তো সবাইই ভালোবাসেন।'—কন্দর্পনারায়ণ ইচ্ছে করে 'সবাইই' শব্দটায় জোর দিলেন, যাতে ওর মা, দিদা, বাবা সব্বাইকে গুরুত্ব দিয়ে বোঝানো যায়।

'এবার বল, তুই সারাদিন কী কী করিস?'

বাচ্চাটা বলতে শুরু করল—ওর নাম অরিত্র। রোজ ভোরবেলায় বাবা ওকে ঘুম থেকে তুলে ফ্রেশ করে, ছোলা—বাদাম ভিজানো খেতে দেন। ছোলা—বাদামটা বাবাই রাত্রে একটা বাটিতে ভিজিয়ে রাখেন, তারপর ওকে জার্সি পরিয়ে বিজয়গড় মাঠে নিয়ে যান। সেখানে নিজে হাতে ফুটবল খেলার জুতো পরিয়ে দেন, ফিতে বেঁধে দেন, তারপর ও ফুটবলের কোচিংয়ে যায়। বাবারও ফুটবলার হবার ইচ্ছে ছিল। গরিবের ছেলে বলে খেলতে পারেননি। সাইকেল সারাইয়ের দোকানে কাজ নিতে হয়েছিল। বাবা চান, ও বড় হয়ে ফুটবলার হবে। ও স্কুলের জুনিয়র টিমে ফুটবল খেলে। ওকে মাঠে দিয়ে বাবা বাজার করেন, ততক্ষণে ওর খেলা হয়ে যায়। বাবা ওকে আবার মাঠ থেকে নিয়ে সাইকেলের সামনের রডে বসিয়ে বাড়িতে আসেন। মাঠ থেকে ফেরার সময় বাবা ওকে দেন দুটো কলা, ও সাইকেলে বসে কলা খেতে খেতে বাড়ি আসে। বাবা ওকে স্নান করিয়ে দেন। নিজে হাতে সাবান দিয়ে ওর হাতে—পায়ের কাদা তুলে দেন। তারপর বাবা আর ও একসঙ্গে ভাত খেয়ে নেয়। বাবা সাইকেলে বসিয়ে ওকে ইস্কুলে নামিয়ে দিয়ে দোকান চলে যান। বিকেলেও বাবা ওকে ইস্কুল থেকে এনে ঘরে রেখে আবার দোকানে যান। বাবা চান, বিকেলেও ও একটু পাড়ার মাঠে খেলুক, তারপর সন্ধেবেলা পড়া। সন্ধেবেলায় খানিকক্ষণ ও একা একা পড়ে। তারপর একজন স্যার আছেন, তিনি পড়াতে আসেন। রাত আটটা—সাড়ে আটটায় দোকান বন্ধ করে বাবা চলে আসেন। তখন বাবার কোলে বসে ও খানিকক্ষণ টিভি দেখে, তারপর ও খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।

কন্দর্পনারায়ণ মনোযোগ দিয়ে বাচ্চাটার কথা শুনছিলেন। এবার খুব কাছের একজন মানুষের মতো আন্তরিকভাবে জিজ্ঞেস করলেন, 'আচ্ছা অরিত্র, তুই আমাকে বল, মা—বাবা তাহলে ঝগড়া করেন কখন?'

অরিত্র উৎসাহ পেয়ে বলতে শুরু করল, 'ওই যে, বাবা চায় আমাকে বিদেশের ফুটবল খেলা দেখাতে, ওরা কীভাবে খেলে, কীভাবে ফ্রি কিক মারে, কর্নার কিক মারে। আমি তো স্ট্রাইকার, তাই আমাকে ওগুলো দেখাতে চায়, তা ছাড়া তুষারজেঠু বলেছেন, আমাকে বিদেশের খেলোয়াড়দের মতো চেহারা করতে হবে। বাবা তাই মাঝে মাঝে বিকেলে আমাকে পাড়ার মাঠে দৌড় করায়, গাছে দড়ি বেঁধে ঝোলায়, যাতে লম্বা হই।'

কন্দর্পনারায়ণ অরিত্রকে থামালেন, 'তুষারজেঠু কে রে?'

'ওই যে, ইন্ডিয়ার ফুটবল ক্যাপ্টেন ছিল না? তুষার রক্ষিত, তুষারজেঠু তো তোমাকেও চেনে।' অরিত্র যোগ করল।

সত্যি সত্যিই তুষার রক্ষিতের সঙ্গে কন্দর্পনারায়ণের পারিবারিক সম্পর্ক। তুষার রক্ষিতের স্ত্রী কাকলি কন্দর্পনারায়ণের সঙ্গে পড়তেন, কিন্তু সেকথা গোপন রেখে বললেন, 'তোর তুষারজেঠু আমাকে চেনে, তোকে কে বলল?'

'বাবাই বলছিল, তুষারজেঠুর একটা উকিল বন্ধু আছে, তার কাছেই মা এসেছে। বাবার সঙ্গে ছাড়াছাড়ি করবার জন্য।' অরিত্র এবার দু—হাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল—'বাবা বলছিল, আমাকে তুমি বাবার থেকে আলাদা করে দেবে। এবার থেকে বাবাকে একা একাই থাকতে হবে, আমাকে বাবা আর মাঠেও নিয়ে যাবে না, আর রাতে বিদেশের ফুটবলও দেখাতে পারবে না।'

কন্দর্পনারায়ণ আড়চোখে দেখলেন, অরিত্রকে কাঁদতে দেখে ওর মা—ও মুখটা ঘুরিয়ে রুমালে চোখটা মুছে নিল।

'একদম ভুল, তুই বাবাকে বলবি, আমি আলাদা করার উকিলই না। আমি বরং তোর বাবার আর মায়ের ঝগড়াটা ঠিক করে দেব।'

কন্দর্পনারায়ণেরও গলাটা ধরে এল। একটু কেশে গলাটা পরিষ্কার করে অরিত্রকে প্রশ্ন করলেন, 'আচ্ছা অরিত্র, তুই আমাকে দুটো প্রশ্নের উত্তর দে—এক, তোর মা—বাবার মধ্যে ঝগড়াটা হয় কখন? আর দুই, তুই তখন কী করিস? তুই তো বড় হয়েছিস, তুই মা—বাবাকে সামলাতে পারিস না?'

'বাবা দোকান থেকে ফিরে এলে পর মা আর দিদা টিভি—তে সিরিয়াল দেখে অনেক রাত পর্যন্ত। বাবা বলে, বাবা আমাকে বিদেশের খেলা দেখাবে। মা আর দিদা বলে, ও সারাদিন পড়াশোনা করে না, ও পড়ুক। তা—ই শুনে বাবা বলে, এইটুকু বয়সে আর পড়তে হবে না। এই নিয়ে ঝগড়া শুরু হয়ে যায়। বাবা দিদার কথা সহ্য করতে পারে না। দিদা কথা বললেই বাবা বলে, আপনি আমাদের ফ্যামিলির ব্যাপারে কথা বলবেন না। এইভাবে ঝগড়া হয় রোজ। তারপর বাবা রাগ করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। বাইরে গিয়ে ড্রিঙ্ক করে। রাতে ফিরে মা—র সঙ্গে আবার ঝগড়া হয়।'

'মা—বাবার ঝগড়ার সময় তুই কী করিস, বললি না তো?'

'সিরিয়াল দেখা নিয়ে, পড়া নিয়ে যখনই ঝগড়া শুরু হয়ে যায় তখন আমি ভয় পেয়ে যাই। ভয়ে খাটের তলায় লুকিয়ে পড়ি। তারপর বাবা যখন ড্রিঙ্ক করে রাত্রে ফিরে আসে, তখন আমি খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়ি। কিন্তু ঘুমোই না, চোখ বুঁজে চুপটি করে শুয়ে থাকি আর সবার সব কথা শুনি। অনেক রাতে বাবা আমাকে আদর করতে ঘরে ঢোকে। তখন আমি বাবার গলা জড়িয়ে ধরি। ঝগড়া হলে বাবা আর আমাদের সঙ্গে শোয় না। টিভি—র ঘরে মেঝেতে চাটাই পেতে শুয়ে থাকে।'

কন্দর্পনারায়ণ বললেন 'তা, তুই তো এখন বড় হয়েছিস, তুই বাবা—মা—কে থামাস না কেন?'

অরিত্র আড়চোখে দিদিমার দিকে তাকিয়ে মাথা নামিয়ে মেঝের দিকে তাকিয়ে বলল, 'দিদা মারবে।'

কন্দর্পনারায়ণ পাশে বসে থাকা পৌলোমীর দিকে তাকিয়ে হাল ছেড়ে দেবার ভঙ্গিতে বললেন, 'দেখলি তো? সব জায়গায় একেবারে মূল না হলেও অন্যতম গভীর সমস্যা হল আউটসাইড ইন্টারফেয়ারেন্স, হয় ছেলের মা—বাবা, না হয় মেয়ের মা—বাবা, ছেলে—মেয়ের সংসারে এত বেশি নাক গলান যে গণ্ডগোল শুরু হয়, তারপর সেই গণ্ডগোলের পরিসমাপ্তি হয় স্বামী—স্ত্রী—র ডিভোর্সে।'

তারপর স্বগতোক্তির ভঙ্গিতে নিজের মনেই বললেন, 'ছেলে—মেয়েদের নিজের মতো করে সংসার করতে না দিলে বিয়ে দেওয়া কেন কে জানে?'

এবার বয়স্কা ভদ্রমহিলার দিকে ফিরে বলা শুরু করলেন, 'দিদি, দু—দিন আগেই আপনি আপনার মেয়েকে নিয়ে এসেছিলেন আমার কাছে, মেয়ের ডিভোর্স করাবার জন্য। তখন আপনাদের কথা শুনতে শুনতে আমরা কিছু নোটিং করেছিলাম। দেখি পৌলোমী, ওঁর নোট শিটটা দে।' বলে হাত বাড়িয়ে পাশে বসে থাকা পৌলোমীর কাছ থেকে নোট শিটটা নিলেন। নোট শিটটাতে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে আবার বলা শুরু করলেন।

'প্রথম দিনই আমার মনে হয়েছিল, আপনার মেয়ের জীবনে ডিভোর্স করবার মতো গুরুতর কারণই কিছু নেই। হ্যাঁ, যদি এমন হত, আপনার জামাই মোদো—মাতাল, লম্পট, চরিত্রহীন, রোজ রাতে মদ খেয়ে বউকে মারে তাহলে আমি নিশ্চয়ই ডিভোর্স করাতাম। কিন্তু, এখানে সেরকম কারণ কিছুই পেলাম না।'

'দিদি, আপনাকে একটা গল্প বলি, একটু শুনুন, তাহলে বুঝবেন' কারা আমাদের কাছে আসেন ডিভোর্স করাতে, আপনার জামাই তো তাদের তুলনায় অনেক ভালো।'

'ক—দিন আগে আমার কাছে এক বয়স্ক দম্পতি এলেন, তাঁদের একমাত্র মেয়ের বিবাহিত জীবনের সমস্যা নিয়ে। তাঁরা এসে আপনারা যেখানে বসে আছেন, সেখানেই বসলেন। ভদ্রলোক বসেই আমাকে তাঁদের মেয়ের একটা ছবি দেখালেন। দেখিয়ে বললেন যে, এটি তাঁদের একমাত্র মেয়ের ছবি। আমি ছবিটি নিয়ে দেখলাম, পঁচিশ—ছাব্বিশ বছরের একটি পরমাসুন্দরী মেয়ে। ভদ্রলোক বললেন, মেয়েটি সুন্দরী বলে তার বহু বিয়ের সম্বন্ধ আসত। তাঁরা অনেক দেখেশুনে একটি ভালো ছেলে দেখে দু—বছর আগে মেয়ের বিয়ে দেন। জামাই ব্যাঙ্গালোরে একটি বড় কোম্পানিতে চাকরি করে, বিয়ের পর স্বামী—স্ত্রী সেখানেই চলে যায়। কয়েকদিন ধরেই মেয়ে ফোন করে জানাচ্ছিল যে, তার স্বামী তার উপর অত্যাচার করছে বিভিন্ন কারণে। তারপর গত মাসে খবর আসে যে, অত্যাচার এত চরমে উঠেছিল যে মেয়েটি আত্মহত্যা করতে গিয়েছিল। নিজের গায়েই কেরোসিন তেল ঢেলে আগুন ধরিয়ে সে আত্মহত্যা করতে যায়। কোনরকমে প্রাণে বেঁচেছে সে। ওই যে, সুন্দর মুখের ছবি আমাকে মেয়েটির মা—বাবা দেখিয়েছিলেন, পরের ছবিটা দেখালেন এক ভয়ংকর পুড়ে—যাওয়া মুখের, তার হিপ পোর্শন থেকে চামড়া তুলে এনে মুখে প্লাস্টিক সার্জারি করা হয়েছে, এটুকু খবর পেয়েছি।'

একটু দম নিলেন, তারপর আবার শুরু করলেন, 'ক—দিন আগে আর—একটি দম্পতি এলেন। তাঁদেরও একমাত্র মেয়ে। বিয়ের পর কিছুদিন ভালোই ছিল। তারপর শুরু হল অশান্তি। টাকার দাবিতে মেয়ের উপর অত্যাচার শুরু হল। মেয়ের বাবা টাকা দিতে অস্বীকার করায় একদিন মেয়েকে ধরে তার গালটা জোরে টিপে হাঁ করিয়ে মুখের মধ্যে হার্পিক ঢেলে দেয়। মেয়ে জ্ঞান হারাবার আগে কোনভাবে বাপের বাড়িতে ফোন করে। মেয়েটার বাবা—মা—মামা—তাঁরা পুলিশ নিয়ে শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে হাজির হয়ে মেয়েকে উদ্ধার করেন—এমন ঘটনাও আছে।'

'দিদি, আপনার মেয়ে তো ভালো আছে, স্বামী—স্ত্রী—তে কোনও গণ্ডগোল নেই। আপনার জামাই খারাপ ছেলে না, সে নিজে গরিবের ছেলে, তার নিজের ফুটবল খেলোয়াড় হবার স্বপ্ন পূরণ হয়নি। সে ছেলের মধ্যে দিয়ে নিজের স্বপ্ন পূরণ করবার স্বপ্ন দেখে। ছেলেই তার ধ্যানজ্ঞান। আপনার মেয়েকেও তো সে ভালোবাসে। রোজ রাত্রে ছেলের পড়াশোনার শেষে সে ছেলেকে কোলে বসিয়ে বিদেশের ফুটবল খেলা দেখাবে—এইটুকু তো তার দাবি। সে রোজ রাত্রে ঘরে এসে দেখে, আপনারা মা—মেয়েতে বসে বসে সিরিয়াল দেখছেন। তার আর ছেলের সঙ্গে সময় কাটানো হয় না। এই অত্যন্ত মাইনর ইশু্য, মানে সামান্য কারণে স্বামী—স্ত্রী—তে ঝগড়া শুরু হয়ে যায়। তা ছাড়া, সে মনে করে আপনি আপনার মেয়েকে কুবুদ্ধি দিচ্ছেন। তাই সে রোজ রাত্রে খাটাখাটনির পর ঘরে ঢুকে আপনাদের দু—জনকে একসঙ্গে দেখলেই চটে যায়। তার কাছে, সে, তার বউ আর ছেলে—এই তিনজনের সুখের সংসার, এখানে আপনার ইন্টারফেয়ারেন্সের জায়গা নেই দিদি। আমি বুঝতে পারছি, আপনারা দু—জনে অর্ডারি সায়া সেলাই করেন, দুটো পয়সাও রোজগার হয় তাতে। বরং আপনি আপনার ঘরে বসে সায়া সেলাই করুন, ওদেরকে ওদের মতো থাকতে দিন। না হলে সায়া সেলাই করে যে দুটো পয়সা আপনাদের লাভ হয়, সেই পয়সা কোর্টেই খরচ হয়ে যাবে। আমার উপর রাগ করবেন না। এটা ডিভোর্সের কেস নয়।'

এবারে আবার অরিত্রর দিকে তাকিয়ে বললেন, 'আচ্ছা, এবার তোকে একটা ফাইনাল প্রশ্ন করব, ভেবেচিন্তে, ঠিকঠাক উত্তর দিবি, ভয় পাস না, দিদা বা মা তোকে কিচ্ছু বলবে না, বললে আমায় বলবি।'

অরিত্র একবার দিদার দিকে, একবার মায়ের দিকে তাকিয়ে কন্দর্পনারায়ণের দিকে সোজাসুজি তাকাল। ও বুঝতে পারছে, এই উকিলবাবুটাকে সত্যি কথা বলা যায়। এই উকিলবাবুটা হয়তো ওর মা—বাবাকে আলাদা হয়ে যাওয়া থেকে বাঁচাতে পারবেন।

কন্দর্পনারায়ণ সামনের দিকে ঝুঁকে টেবিলে কনুই দুটো রেখে নিজের দু—হাতের তালুতে নিজের মুখটাকে রেখে, খুব নরম স্বরে জিজ্ঞেস করলেন, 'হ্যাঁরে, তুই তোর বাবাকে ভালোবাসিস?'

অরিত্রর ঘাড় সোজা হয়ে গেল। একবার ডানদিকে দিদার দিকে তাকাল, একবার বাঁদিকে ঘাড় ঘুরিয়ে মায়ের দিকে তাকাল।

কন্দর্পনারায়ণ বুঝতে পারলেন, যে ও নিজের মনে ক্যালকুলেট করছে। যদি ও একবার বলে, 'বাবাকে ভালোবাসে', তাহলে ও দিদা আর মায়ের কাছে ঝাড় খাবে। আবার যদি ঝাড় খাবার ভয়ে বলে যে, 'বাবাকে ভালোবাসে না' তাহলে সারাজীবনের মতো বাবাকে হারিয়ে ফেলবে।

কন্দর্পনারায়ণ সোজা তাকিয়ে, অরিত্রর প্রতিটি মুভমেন্ট লক্ষ করছিলেন, অরিত্রর ছোট্ট নরম মুখের প্রতিটি মাংসপেশির কাঁপন দেখছিলেন। অবশেষে, কন্দর্পনারায়ণের দিকে সোজা তাকিয়ে চোখে চোখ রেখে ঘাড়টা হালকা কাত করে জেদি স্বরে বলল, 'হ্যাঁ, ভালোবাসি। বাবাকে ছেড়ে থাকতে পারব না।'

কন্দর্পনারায়ণ বুঝলেন, অরিত্র সত্যি কথাটা বলবার রিস্কটা নিল। ও নিজের মনে মনে অনেকক্ষণ হিসাবনিকাশ করে বুঝল, এই ঝোলা গোঁফের উকিলবাবুটা তাদের সংসারটাকে বাঁচাতেও পারেন। এই মুহূর্তে এই উকিলবাবুটাকে বিশ্বাস না করে আর উপায়ও নেই। তাই, দিদা কিংবা মা—র কাছ থেকে খুব মার খাবার আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও সে রিস্কটা নিল এবং ঘাড়টাকে কাত করে তেরিয়া হয়ে, জোরের সঙ্গে 'হ্যাঁ' শব্দটা বলল।

কন্দর্পনারায়ণ মনে মনে ছেলেটার তারিফ করলেন। সাহস আছে বটে ছেলেটার।

অরিত্র, 'হ্যাঁ ভালোবাসি' বলার সঙ্গে সঙ্গে কন্দর্পনারায়ণ খুঁক খুঁক করে একটা শব্দ পেলেন। অরিত্রর মা—র দিকে তাকিয়ে দেখলেন, মুখটাকে আড়াল করে তিনি কাঁদছেন।

কন্দর্পনারায়ণ বুঝলেন, মোটের উপর তাঁর অ্যাসেসমেন্ট ঠিক। অরিত্রর মা—ও ডিভোর্স চান না। স্রেফ মা—র জোরাজুরিতেই তিনি ডিভোর্সে মত দিয়েছেন।

কন্দর্পনারায়ণ মাথাটাকে পেছনে হেলিয়ে দিয়ে, একটু রিল্যাক্সড ভঙ্গিতে বয়স্কা ভদ্রমহিলাকে অর্থাৎ অরিত্রর দিদাকে বোঝানোর ভঙ্গিতে বললেন, 'দিদি, কলকাতা শহরে উকিল অনেক আছে। আমার কথা পছন্দ না হলে আপনি নিশ্চয়ই মেয়ের ডিভোর্স করাবার জন্য সেখানে যেতে পারেন, কিন্তু দু—দিন ধরে আপনার মেয়ের জীবনটা স্টাডি করে আমার মনে হয়েছে, ওঁর ডিভোর্স হওয়া উচিত নয়। আপনার জামাই আপনার মেয়েকে, নাতিকে যেরকম ভালোবাসে, আপনার মেয়েও তেমনি আপনার জামাইকে ভালোবাসে। আপনার নাতি তো তার মা—বাবা দু—জনকেই ভালোবাসে। আসলে আমরা যখন হাজব্যান্ড—ওয়াইফের মধ্যে ডিভোর্স করাই, তখন তো আর বাচ্চার কথা ভাবি না। কিন্তু আগের দিন যখন আপনার মেয়ে বললেন যে, তাঁর একটি দশ বছরের ছেলে আছে, আর সে বাবার নেওটা, তখনই আমি ঠিক করেছিলাম যে, বাচ্চার সঙ্গে কথা বলব। আজ আপনার নাতির সঙ্গে কথা বলে পরিষ্কার হল—এক, এখানে ডিভোর্স হওয়া উচিত নয়, আর দুই, ডিভোর্স হলে, বাচ্চাটা খুউব, খুউব কষ্ট পাবে। তার চেয়ে আপনারা ফিরে যান, আপনার মেয়ে—জামাই—নাতিকে একসঙ্গে সংসার করতে দিন। ওরা ওদের মতো থাকুক।'

তারপর অরিত্রর দিকে ফিরে বললেন, 'অরিত্র, তোকে আমি আমার ফোন নম্বর দিয়ে দেব। এরপর থেকে যখন বাবা—মা ঝগড়া করবে, তখন আর খাটের তলায় লুকিয়ে পড়বি না। আমাকে ফোন করবি। আমি তোর মা—কে আর তোর বাবাকে বোঝাব, যাতে তারা আর ঝগড়া না করে। বুঝলি?'

আনন্দে অরিত্রর চোখ—মুখ জ্বলজ্বল করে উঠল। সে হাত বাড়িয়ে বলল, 'দাও, তোমার ফোন নম্বর দাও।'

কন্দর্পনারায়ণ টেবিলের ড্রয়ার থেকে একটা সুদৃশ্য রুপোর কার্ড রাখার বাক্স থেকে একটা ভিজিটিং কার্ড বের করে, অরিত্রকে দিয়ে বললেন,'কাছে আয়।'

অরিত্র চেয়ার ছেড়ে উঠে, কন্দর্পনারায়ণের চেয়ারের কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই তিনি স্নেহের সঙ্গে অরিত্রর পিঠে হাত রেখে বললেন, 'এই দেখ, এখানে আমার নাম, ফোন নম্বর সব দেওয়া আছে। দরকার হলেই ফোন করবি। বুঝলি?'

অরিত্র ঘাড় নাড়ল, 'আর শোন, আজকে আমি বুঝলাম, তোর খুব সাহস, তুই তো স্ট্রাইকার, না?'

অরিত্র আবার ঘাড় নাড়ল। 'পেনাল্টি বক্সের বাইরে থেকে ফ্রি কিক নিতে, বা বক্সে বল উড়ে এলে হেড করে বল গোলে ঢোকাতে ভয় পাস না। রিস্ক নিবি, আমি বুঝতে পেরেছি, আজকে তুই সত্যি কথাটা বলে অনেক বড় রিস্ক নিয়েছিস।'

এবার অরিত্রর দিদিমা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে, আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে বললেন, 'স্যার, মেয়ের সংসার ভাঙতে আমি চাই না, আপনি বললেন না, ইন্টারফেয়ার করি ওদের সংসারে—না স্যার, আমি ইন্টারফেয়ার করতে চাই না, ওরা দু—জনে ঝগড়া করে। আমি দু—জনকেই থামাতে গিয়ে জড়িয়ে পড়ি।'

কন্দর্পনারায়ণ হাতের ইশারায় ওঁকে বসতে বলে বললেন, 'হুঁ, আপনি আপনার দিক দিয়ে ঠিকই বলছেন। কিন্তু দিদি, মেয়েকে সংসারটা স্বাধীনভাবে করতে দিতেই হবে। ওদেরই তো সংসার, ওদের করতে দিন—না। হ্যাঁ, তবে নজর রাখুন, কোনও বড় গোলমাল না হয়। তখন নিশ্চয়ই ইন্টারফেয়ার করতে হবে। তা ছাড়া, মেয়ের ডিভোর্স করানোর পর পারবেন নাতিকে বড় করতে? তাকে সকালে খেলতে নিয়ে যেতে? স্নান করাবার সময় ঘষে ঘষে গায়ের কাদা তুলে দিতে? স্কুলে দিয়ে আসতে, নিয়ে আসতে? সবচেয়ে বড় কথা, বাবার অভাব পূরণ করতে?'

তারপর একটু থেমে, গলাটা খাদের কাছে নিয়ে বললেন, 'বাদ দিন, ওদেরকে ওদের মতো থাকতে দিন।'

অরিত্রর দিদিমা যাবার সময় আঁচলের খুঁট থেকে টাকা বের করে কন্দর্পনারায়ণকে বললেন, 'স্যার, আপনার ফিজ।'

কন্দর্পনারায়ণ হেসে, অরিত্রর চুলগুলোকে হাত দিয়ে এলোমেলো করে দিয়ে বললেন, 'ওই টাকাটা রেখে দিন, অরিত্রকে কয়েকদিন একটু চিকেন স্টু করে দেবেন। ভালো ফুটবলার হতে গেলে শরীর তৈরি করতে হবে। তারপর তুই যখন তুষারজেঠুর মতো ইন্ডিয়া টিমে খেলবি, আমাকে একদিন ইন্ডিয়া টিমের খেলা দেখাতে নিয়ে যাস।'

অরিত্রর মা বললেন, 'জেঠুকে প্রণাম করো।'

অরিত্রর মা, দিদিমা অরিত্রকে নিয়ে বেরিয়ে যেতেই, একজন সুপুরুষ ভদ্রলোক এসে ঢুকলেন, সঙ্গে আর—একজন বয়স্ক ভদ্রলোক। দু—জনেরই মুখের আদলটা অনেকটা একরকম। মুখের সাদৃশ্য দেখে মনে হয় বাবা—ছেলেই হবেন। অল্পবয়সি ভদ্রলোকের পরনে ফুলপ্যান্ট আর ফুলশার্ট, চোখে মোটা কালো ফ্রেমের চশমা, চশমার কাঁচটাও বেশ মোটা। নিখুঁতভাবে কামানো দাড়ি—গোঁফ, মাথাটি পরিপাটি করে আঁচড়ানো। বয়স আন্দাজ চল্লিশ বছর। সঙ্গের বয়স্ক ভদ্রলোকের বয়স আন্দাজ আটষট্টি—সত্তর। ইনিও সৌম্যদর্শন, ফরসা রং, চোখে চশমা, অসহায় চোখের দৃষ্টি।

কন্দর্পনারায়ণ সাধারণত কেউ চেম্বারে ঢুকলেই, তাঁকে বা তাঁদের দেখে তাঁদের সম্পর্কে একটা আন্দাজ করবার চেষ্টা করেন। এঁদের দু'জনকে দেখে, বাপ—ছেলে বলেই মনে হল।

'এই রে? আবার স্বামী—স্ত্রী—র সমস্যা নাকি?' ভাবতে ভাবতেই কন্দর্পনারায়ণের মোবাইল ফোনটা বেজে উঠল। ফোনটা ধরতেই ওপার থেকে পুরুষকণ্ঠ—'নমস্কার, আমার নাম সৌরভ মুখার্জি। আমি জার্মানিতে থাকি, আমি আপনার সঙ্গে একটা অনলাইন কনফারেন্স করতে চাই, ব্যাপারটা একটু আর্জেন্ট। আমি স্কাইপেতে আছি। আমি জার্মানি থেকে স্কাইপেতেই কথা বলব। আমি আপনার পারিশ্রমিকটা আপনার অ্যাকাউন্টে পাঠিয়ে দেব। আর্লিয়েস্ট, কবে টাইম দেবেন? প্লিজ, খুব আর্জেন্ট।' ভদ্রলোকের জোরাজুরিতে ঠিক হল, আগামীকাল ভারতীয় সময় রাত আটটায় কোর্ট থেকে ফিরে চেম্বারে বসে, ওই সময়টায় গুছিয়ে অনলাইনে ভিডিয়ো কনফারেন্স করা যাবে। সৌরভবাবুও রাজি হলেন। তার আগে, কাল সকালেই উনি কন্দর্পনারায়ণের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ফিজটা ট্রান্সফার করে দেবেন।

ফোনটা রেখে, কন্দর্পনারায়ণ সামনে বসে—থাকা ভদ্রলোক দু—জনের দিকে তাকালেন। তারপর একটু কৌতুক—মেশানো গলায় বললেন, 'আপনারা বাবা আর ছেলে? আমার ক্যালকুলেশন অনুযায়ী, আপনারাও স্বামী—স্ত্রী ডিসপিউট নিয়েই এসেছেন। তবে, আজ আমার ক্যালকুলেশন যেন ভুল হয়, আমি একনাগাড়ে স্বামী—স্ত্রীর সমস্যা আর শুনতে পারছি না, আসলে এই ধরনের মামলায় বড্ড চাপ পড়ে মনের ওপর।'

তারপর একটু হেসে বললেন, 'আচ্ছা, একটু বসুন, আমি আসছি।'

কন্দর্পনারায়ণ উঠে পাশের ঘরে গেলেন। পারমিতা, তনুশ্রী, নবনীতা, সবাই নিজের নিজের কাজ, পড়াশোনা, পরের দিনের মামলা রেডি করা—এসব নিয়েই ব্যস্ত ছিল।

কন্দর্পনারায়ণকে এ ঘরে ঢুকতে দেখে, তনুশ্রী বললেন, 'স্যার, কফি করব? খাবেন?'

'উফফ, তুমি আমাকে বাঁচালে, তনুশ্রী। একটু গুছিয়ে কফি করো তো। একনাগাড়ে স্বামী—স্ত্রী—র সমস্যা শুনতে শুনতে মাথাটা জ্যাম হয়ে যাচ্ছে।'

তনুশ্রী আর পারমিতা, দু—জনেই চেম্বার—লাগোয়া কিচেনে ঢুকে গেলেন। তনুশ্রী গরম গরম কফি দিলেন, আর পারমিতা মাইক্রোওয়েভ আভেনে ভেজে আনলেন পাঁপড়। সবাই মিলে পাঁচ মিনিটের একটা ব্রেক নিয়ে মাথাটা ছাড়িয়ে নেওয়া হল।

আসলে, ওকালতির কাজটা কিন্তু বেশ কঠিন লাগে একেক সময়ে, মাথায় এত চাপ পড়ে—তখন সবাই মিলে কফি খেতে খেতে চাপটা ছাড়িয়ে নেওয়া—এই আর কী।

কফি আর পাঁপড় ভাজা খেয়ে আবার এ ঘরে এসে বসলেন কন্দর্পনারায়ণ। প্রথমেই, চেম্বারে বসে—থাকা দুই ভদ্রলোকের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিলেন, 'মাফ করবেন, আমি আপনাদের বসিয়ে রেখেছি। আসলে একটা ছোট্ট ব্রেক না নিলে আমার মাথা কাজ করত না, আমি এক্সট্রিমলি সরি।'

'ভদ্রলোক দু'জনও হাতজোড় করে ভদ্রতা করে বললেন, 'না না, কোন ব্যাপার নয়।'

একটা বড় শ্বাস নিয়ে কন্দর্পনারায়ণ বললেন, 'হ্যাঁ, বলুন, আপনারা কোথা থেকে এসেছেন? কী নাম?'

অল্পবয়সি ভদ্রলোক হাতজোড় করে নমস্কার করে বললেন, 'আমার নাম রাজর্ষি রায়, ইনি আমার বাবা রাজেশ রায়। আমি একটা কলেজে পড়াই, এখন আমার বয়স ঠিক একচল্লিশ বছর। আজ থেকে এগারো বছর আগে আমার বিয়ে হয়। আমার একটি ছ—বছর বয়সের মেয়ে আছে। সে আমার প্রাণের চেয়ে বেশি প্রিয়। আমার স্ত্রী—ও খুব শিক্ষিতা, তিনিও আর—একটি কলেজে পড়ান। আমার বাবা একজন রিটায়ার্ড প্রিন্সিপাল। খবরের কাগজ দেখে বিয়ে হয়েছিল। দেখুন, আপাতদৃষ্টিতে আমাদের মধ্যে কোনও সমস্যা হবার কথাই নয়। আমি আমার বাবা—মায়ের একমাত্র সন্তান, আমার কর্তব্য আমার বাবা—মায়ের প্রতি দায়িত্বপালন। আমি তা করিও, আমি ছাড়া আমার বাবা—মায়ের আর কে আছে বলুন, এখানেই হল সমস্যা। বিয়ের পর আমি আমার স্ত্রী—কে নিয়ে পৈতৃক বাড়িতেই ছিলাম ভবানীপুরে। একতলায় বাবা—মা থাকেন, আমাদের রান্নাঘর, খাবার ঘরও নিচেই। আমি আর আমার স্ত্রী থাকতাম দোতলায়। তবে, আমরা চারজন খাওয়াদাওয়া করতাম একসঙ্গেই, নিচে। আমি আর আমার স্ত্রী দু—জনেই সকালবেলায় ন—টার মধ্যে কলেজে বেরিয়ে যেতাম, মা—ই ভোর থাকতে ঘুম থেকে উঠে রান্না করে দিতেন, আমাদের টিফিন গুছিয়ে দিতেন। আমরা দু—জনেই একসঙ্গে কলেজে বেরিয়ে যেতাম। তবে দু—জনের কলেজ সম্পূর্ণ বিপরীতে। আমার কলেজ হাওড়ায়, আমার স্ত্রী—র গড়িয়াতে। ন্যাচারালি আমাদের ফেরার সময়টা আলাদাই হত, ও এসে ওপরে, মানে দোতলায় উঠে যেত। আমি আবার কলেজ থেকে ফিরে নিচে মা—বাবার ঘরে খানিকক্ষণ সময় কাটিয়ে ওপরে উঠতাম। তারপর আবার নেমে আসতাম ডিনার করবার জন্য।'

কন্দর্পনারায়ণ এতক্ষণ মন দিয়ে শুনছিলেন, এইখানটায় রাজর্ষিবাবুকে থামিয়ে প্রশ্ন করলেন—'আপনি কলেজ থেকে ফিরে চা—কফি কিছু খেতেন না?'

রাজর্ষিবাবু চমকে উঠে কন্দর্পনারায়ণের—এর দিকে তাকিয়ে বললেন,'ঠিক ধরেছেন, এইখানটাতেই গোলমালের শুরু।' মা আমাকে বলতেন,'কলেজ থেকে ফিরেছিস, চা করে দিই। স্বর্ণাকেও ডাক' তারপর থেমে বললেন, 'আমার স্ত্রীর নাম স্বর্ণালি, ডাকনাম স্বর্ণা, মা ওকেও ডাকতে বলতেন। ও কিন্তু আর নামতে চাইত না। আমি বুঝতাম, যে ও এতটা জার্নি করে এসেছে—মা—কে বোঝাতাম, থাক, টায়ার্ড হয়ে রয়েছে, বাদ দাও। আমি নিচ থেকে চা খেয়ে মা—বাবার সঙ্গে একটু গল্প করে দোতলায় উঠতাম। উঠে দেখতাম, ও বিছানায় শুয়ে শুয়ে ওর মায়ের সঙ্গে কথা বলছে। আমি আর ওকে ডিস্টার্ব করতাম না। আমি নিজের মতোই ফ্রেশ হয়ে নিতাম।'

একটু থেমে ফের শুরু করলেন, 'আপনি ঠিক ধরেছেন। ওর প্রথম আপত্তি হল, কলেজ থেকে ফিরে মা—বাবার সঙ্গে সময় কাটানোতে আর চা খাওয়াতে। আমি বুঝতে পেরে নিচে চা খাওয়াটা বন্ধ করলাম। দোতলাতে একটা ছোট কিচেন করে নিলাম। ফ্রিজও আলাদা কিনে দোতলায় নিয়ে এলাম। এবার আমি কলেজ থেকে ফিরে নিচে চা না খেয়ে স্ত্রী—র সঙ্গে খাব বলে, ওপরে উঠে আসতে শুরু করলাম। কিন্তু, ওম্মা, তার তো কলেজ থেকে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে নিজের মা—র সঙ্গে কথা বলতে হয়। চা করার তো সময়ই হয় না। আমি অপেক্ষা করতে করতে ডিনারের সময় হয়ে যেত, কিন্তু ওর আর মা—র সঙ্গে কথা বলা শেষ হত না। এদিকে ও রাগ করবে ভেবে আমিও কিছু বলতে পারতাম না, তারপর ঠিক করলাম। দু—জনের চা—ই মা করে দেবেন, আমি আমাদের দু—জনের চা নিয়ে দোতলায় উঠে আসব, তারপর আমি আর আমার স্ত্রী একসঙ্গে খাব।'

কন্দর্পনারায়ণ চোখ বুজে শুনেই যাচ্ছেন, পাশে বসে আছেন দ্বৈপায়ন আর পারমিতা। এই কেসটায় পারমিতা নোট নিচ্ছেন। কন্দর্পনারায়ণের কোনও নড়াচড়া নেই, যেন রাজর্ষিবাবুদের জীবনের ঘটনাগুলো চোখে সামনে দেখতে পাচ্ছেন। রাজর্ষিবাবু একটু থামলেন। হয়তো ভাবছিলেন, কন্দর্পনারায়ণ ঘুমিয়ে পড়লেন কি না।

কন্দর্পনারায়ণ মনের কথাও বোধহয় পড়তে পারেন, তিনি চোখ বুজেই বললেন, 'তারপর বলুন।'

রাজর্ষিবাবু আবার শুরু করলেন, 'হ্যাঁ, যে কথা বলছিলাম। মা চা করে দিচ্ছেন দু—জনের, আমি ট্রে—তে করে দোতলায় নিয়ে আসছি, তাতেও সমস্যা, মা কেন চা করে দেবেন। আমি বললাম, তা, তুমি তো করছ না, আমি তো কলেজ থেকে ফিরে, তোমার সঙ্গে চা খাব বলে অপেক্ষা করছি। অপেক্ষা করতে করতে তো আমার আর চা খাওয়াই হচ্ছে না।'

'তখন আবার স্বর্ণার, মানে আমার স্ত্রী—র মনে হল, আমি তার মা—কে, মানে আমার শাশুড়িকে পছন্দ করি না, তাই তাঁর সঙ্গে স্বর্ণা ফোনে কথা বললে আমার রাগ। আমি তাকে বোঝালাম, কোথায় রাগ? তুমি তো বিয়ে হওয়া থেকেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলো, আমি তো কোনওদিন রাগ করিনি, উলটে আমি কলেজ থেকে ফিরে মা—বাবার ঘরে বসে গল্প করলে, চা খেলে, তোমার রাগ হয়, আবার তুমি আমার সঙ্গে গল্পও করবে না, চা—ও খাবে না, অথচ আমাকে তোমার মুখের দিকে তাকিয়ে বসে থাকতে হবে—কখন তোমার ফোনে কথা বলা শেষ হবে। আশ্চর্য!'

'এতদিন নিচে আমাদের একটাই টিভি ছিল। স্ত্রী মা—বাবার সঙ্গে টিভি দেখতে চাইত না। আমি স্ত্রী—র জন্য দোতলায় একটা নতুন বিরাট স্ক্রিনের স্মার্ট টিভি কিনলাম। মা—বাবা দুঃখ পেলেন। মা তো বলেই দিলেন, তুই ওপরে রান্নাঘর বানালি, ফ্রিজ আনলি, এখন টিভি—ও কিনলি, তুই কি আমাদের থেকে আলাদা হতে চাইছিস? আমি মা—কে বোঝালাম, না না, তা কেন? আমারও কলেজ থেকে ফিরে টায়ার্ড লাগে। নিচে এসে টিভি দেখতে ইচ্ছে করে না। তা ছাড়া বেশি রাতে আমি নিউজগুলো শুনব, নিচে টিভি দেখলে তোমাদের অসুবিধে হয়। মা সবই বুঝেছিলেন, বলেছিলেন, 'এতদিন তো এভাবেই চলছিল, বসার ঘরে টিভি, তুই ওখানে বসে টিভি দেখলে আর আমাদের কী অসুবিধে হত? যা—ই হোক, যা ভালো বুঝেছিস, করেছিস।'

কন্দর্পনারায়ণ রাজর্ষিবাবুকে থামালেন, 'আপনার স্ত্রী—র কি আপনার মায়ের সঙ্গে বনিবনা হচ্ছিল না?'

রাজর্ষিবাবু ঘাড় নেড়ে বললেন, 'একদম, কিন্তু কেন, তা জানি না। আমি ওকে বহুবার জিজ্ঞেস করেছি। আবার দেখুন, মা রান্না করে দিলে খাচ্ছে, টিফিন করে দিলে কলেজে ব্যাগ ভরে টিফিন নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু, মা—কে সে সহ্য করতে পারে না।'

'দুটো কথা জানার আছে—এক, ওঁর কি ধারণা যে আপনার মা আপনাকে কুবুদ্ধি দিচ্ছেন? বা আপনি আপনার মায়ের পরামর্শমতো চলেন? আর দুই, উনি কি মনে করেন, আপনার মা আপনার আর ওনার মধ্যে বন্ধুত্ব হতে দিচ্ছেন না?'

কন্দর্পনারায়ণ নিজের কপালটা দু—হাত ধরে টিপে ধরে বললেন।

'একদমই, এই যে আমি নিচে মা—বাবার সঙ্গে দেখা করে ওঁদের একটু খবর নিয়ে কেমন আছেন, শরীর—টরির সব ঠিক আছে কি না, জিজ্ঞাসা করে ওপরে উঠে এলাম, আমার স্ত্রী—র কিন্তু ধারণা হল যে, আমি বোধহয় মা—র কাছ থেকে দুর্বুদ্ধি নিয়ে ওপরে উঠে এলাম। নিজে সারাদিন নিজের বাবা—মায়ের খোঁজ নিচ্ছে, কিন্তু আমি আমার বাবা—মা—র খোঁজ খবর নিলেই দোষ। আচ্ছা, আমিও তো আমার মা—বাবার একমাত্র ছেলে, বলুন? আমি কখন ফিরছি, দেরি হচ্ছে কেন, রাস্তায় কোনও গোলমাল হচ্ছে কি না—দিবারাত্রি তাঁরাও তো এইসবই ভাবছেন। তা আমি তাঁদের সঙ্গ দেব না?'

শেষের কথাগুলো বলতে গিয়ে রাজর্ষিবাবুর গলা ধরে এল।

'কন্দর্পনারায়ণবাবু, এইটুকুতেই শেষ নয়, সারাদিন তো বাইরে থাকে, মা—বাবাকে সময় দিতেই হয় না। তারপর আছে মা—বাবার প্রতি রাগ, বিদ্বেষ। আমার সঙ্গে তো সারাদিন দেখা হত না, রাত্রে শোবার সময় শুরু হত গণ্ডগোল। সারারাত ধরে আমাদের মধ্যে গণ্ডগোল, ঝগড়া, এমনকী মারপিটও হত। তার মূল বক্তব্য হত, তোমার মা, আমার দিকে কড়া চোখে তাকিয়েছেন! তোমার মা আমাকে ওই কথাটা কেন বললেন? রাত্রে খাবার পর শুরু হত ঝগড়া। সারারাত চলত, সারারাত না ঘুমিয়ে সকালে ওই অবস্থায় ঝিমোতে ঝিমোতে কলেজ যেতাম। আমাদের মধ্যে কথা বন্ধ থাকত দিনের পর দিন। ও যে কী চাইত, সেটাই বুঝতাম না।'

ডান হাতের দুটো আঙুল দিয়ে নিজের কপালটা টিপে রাখা অবস্থাতেই কন্দর্পনারায়ণ প্রশ্ন করলেন, 'আপনার ছ—বছরের একটা মেয়ে আছে না? তা আপনাদের মধ্যে এতই যখন অসদ্ভাব, বনিবনার অভাব, তাহলে বিয়ের পর পাঁচ বছর আপনারা একসঙ্গে থাকলেন কী করে? আর পাঁচ বছর পর একটি মেয়ের জন্মই বা হল কী করে? এতই যখন গণ্ডগোল, তখনই তো ডিভোর্স করতে পারতেন।'

এতক্ষণে রাজর্ষিবাবুর বাবা, অর্থাৎ রাজেশ রায়, তিনি কথা বললেন। মুখটা দেখলেই বোঝা যায়, অত্যন্ত সজ্জন ব্যক্তি। সাতে—পাঁচে থাকতে চান না। এতক্ষণ তিনি চুপ করেই ছিলেন। বোঝাই যাচ্ছে, ছেলের পারিবারিক সমস্যা নিয়ে এসেছেন উকিলের কাছে—এই ব্যাপারটা তাঁকে বেশ মর্মাহত করে তুলেছে। তা ছাড়া, একমাত্র ছেলের বউ, যাঁকে তাঁরা বরণ করে ঘরে তুলেছিলেন, সে—ই যে তাঁকে আর তাঁর স্ত্রী—কে গণ্ডগোলের মূল কারণ হিসেবে ধরে দিবারাত্র ছেলের সঙ্গে ঝগড়া করবে, এটা তিনি মানতে পারছেন না। অবশ্য এটা তো স্বাভাবিক।

কন্দর্পনারায়ণ খুব নরম স্বরে রাজেশবাবুকে অভয় দিয়ে বললেন, 'নিশ্চয়ই, আমি সবার কথাই শুনব, বলুন—না, আপনিও বলুন। যা যা বলতে চান, সব কথা খুলে বলুন।'

রাজেশবাবু বুকভরে দম নিলেন। কন্দর্পনারায়ণ বুঝতে পারলেন, কিছু অপ্রিয় কথা আজ তিনি বলতে চান, অনেক দুঃখের কথা আজ তিনি বলবেন বলে এসেছেন, নিজেকে প্রস্তুত করে নিচ্ছেন।

'দেখুন, আমাদের মেয়ে নেই, পুত্রবধূকে আমরা মেয়ে হিসেবেই দেখতাম। রাজর্ষির মা তার কলেজে যাবার সময় টিফিন তৈরি করে দিত, আমি নিজের হাতে সেই টিফিন ওদের দু—জনের বক্সে ভরে ব্যাগে ঢুকিয়ে দিয়েছি দিনের পর দিন। ওর মা—ই বাড়িতে রান্নাবান্না করতেন। আমি রান্নায় ঝাল খেতে পারি না, কিন্তু ছেলের বউ রান্নায় ঝাল পছন্দ করত, তার জন্য ঝাল দিয়ে রান্না করত। স্বর্ণা কলেজ থেকে ফিরলে একসঙ্গে চা খাবে বলে বসে থাকত। আমার স্ত্রী প্রথম আঘাতটা পেল, যখন ও কলেজ থেকে ফিরে সরাসরি দোতলায় উঠে যেত, চা খাওয়া তো দূর, আমাদের সঙ্গে কথাও বলত না।'

'ঝগড়ার সময় আমার স্ত্রী—কে সম্বোধন করত 'ওই বুড়িটা' বলে, কুৎসিত কথাবার্তা বলত, এমনকী আমার স্ত্রী সম্বন্ধে এমন কদর্য কথাও বলেছে যে আমি মুখে আনতে পারব না। এখন আমি কী করব? নিজের স্ত্রী—কে তো ফেলে দিতে পারব না।' রাজেশবাবুর গলা ধরে এল।

কন্দর্পনারায়ণ খুব ভালো শ্রোতা, ক্লায়েন্টের যাবতীয় মনের কথা তিনি সবসময়ই মন দিয়ে শোনেন, এবার তিনি রাজেশবাবুকে প্রশ্ন করলেন 'আপনার সঙ্গে পুত্রবধূর সম্পর্ক কেমন ছিল?'

'আমি দু—পক্ষকেই বুঝিয়েসুঝিয়ে গণ্ডগোল মেটাবার চেষ্টা করতাম। কক্ষনো স্বর্ণাকে জোর গলায় কথাও বলিনি, কিন্তু ও আমাকেও রেয়াত করেনি। আমাদের শোবার ঘরের জানালা দিয়ে গলির শেষে বড়রাস্তার মুখটা দেখা যায়। গড়িয়া কলেজ থেকে স্বর্ণা মেট্রোতে করে নেতাজিভবন স্টেশনে নেমে ও বাকিটা পথ হেঁটেই আসত। সাধারণত কলেজ থেকে আসতে আসতে সাতটা বাজত। সাতটার বেশি দেরি হলেই আমরা চিন্তা করতাম। শোবার ঘরে গিয়ে জানালার পরদা তুলে দেখতাম, স্বর্ণা আসছে কি না।'

'বেশি রাত হলে, বা ঝড়বৃষ্টির রাত হলে আমি ছাতা মাথায় দিয়ে গলির মোড়ে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম, ওকে গলির মোড় থেকে নিয়ে আসব বলে। আমাদের গলিতে আবার অনেক সময় আলোও জ্বলে না, দিনকালও খারাপ। আচ্ছা, আপনি বলুন, আমি কি অন্যায় করতাম?'

কন্দর্পনারায়ণ একমনে রাজেশবাবুর দিকে সোজা তাকিয়ে তাঁর মুখের মাংসপেশিগুলো কথা বলতে বলতে কীরকম কুঁচকে যাচ্ছে—সেটাই দেখছিলেন। কথা বলতে বলতে কখনো উনি দুঃখের এক্সপ্রেশন দিচ্ছেন, কখনো হতাশার এক্সপ্রেশন ফুটিয়ে তুলছেন। সাধারণত কন্দর্পনারায়ণের কাছে যখন স্বামীরা আসেন, তখন মোটামুটি একই কথা বলেন, স্ত্রী—রা এলে তখন আবার আর—একরকম কথাই বলেন, শুনে শুনে মোটামুটি উনি বুঝতে পারেন যে, এরপর কে কী কথা বলবেন। ছেলেদের বাবা—মায়েদের বক্তব্যও একই রকম হয়। তবু উনি কখনো কাউকে থামান না। একজন 'ভালো উকিল' হবার অন্যতম প্রধান শর্তই হল 'ভালো শ্রোতা' হওয়া। দূর দূর থেকে মক্কেলরা আসেন তাঁদের মনের কথা বলবেন বলে। তাঁরা যদি তাঁদের সব কথা বলতে না পারেন, তাহলে তাঁরা খুশি হন না।

কন্দর্পনারায়ণ মাথা নেড়ে রাজেশবাবুর কোনও অন্যায় নেই বলতেই রাজেশবাবু আরও উৎসাহ পেয়ে বলতে শুরু করলেন, 'একদিন আমাকে কী বলল জানেন? বলল, আমি নাকি জানালার পরদা সরিয়ে গলির মুখে তাকিয়ে থাকি ওর প্রতি গোয়েন্দাগিরি করার জন্য, ও অন্য কারও সঙ্গে আসে কি না দেখি। ছি! ছি! কী কদর্য, কী নিম্নমানের চিন্তাধারা! আমি একজন অবসরপ্রাপ্ত প্রিন্সিপাল। পুত্রবধূ সময়মতো বাড়ি না ফিরলে আমার চিন্তা হয়, একজন বাবার যেরকম মেয়ে অফিস থেকে ফিরতে দেরি হলে চিন্তা হয় সেরকমই, আর বলে কিনা আমি ওর ওপর নজর রাখি, গোয়েন্দাগিরি করবার জন্য!!! ছি! ছি! কী লজ্জা—'

ভদ্রলোক দু—হাতে মুখ ঢাকলেন। খানিকটা থিতু হয়ে আবার বলা শুরু করলেন, 'একদিন ওরা সারারাত ঝগড়া মারপিট করেছে—'

'না না, আমি কখনোই ওকে মারিনি। ও—ই বরং রেগে গেলে ভায়োলেন্ট হয়ে যেত। ও আমাকে মারতে তেড়ে এলে আমি ওর হাত, দুটো মানে এই কনুইয়ের ওপরটা আমি চেপে ধরে থাকতাম। যাতে মারতে না পারে। ও ফরসা বলে ওর দু—হাতে, ওই কনুইয়ের ওপরটায় দাগ পড়ে যেত।'

রাজেশবাবুর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে রাজর্ষিবাবু অভিনয় করে দেখালেন, ওঁর স্ত্রী তেড়ে এলে উনি হাতের কোন জায়গাটা চেপে ধরতেন।

রাজেশবাবু আবার শুরু করলেন, 'যা—ই হোক, সকালে পুত্রবধূ নেমে এসেছে। আলুথালু পোশাক—আশাক, এলোমেলো চুল, সারারাত না—ঘুমোনোর চেহারা, ছেলেরও তাই। যদিও ওরা দোতলায় থাকে, কিন্তু সারারাত ঝগড়াঝাঁটি করছে, সেটা তো আমরাও বুঝি নিচে থেকেও। ওর মা তো একেক সময় উত্তেজিত হয়ে ওঠেন, যে, কী হচ্ছেটা কী? প্রতিবেশীরা শুনছে—সারারাত আমার ছেলেটাকে ঘুমোতে দেয় না—আর সহ্য করা যায় না—আমি সামলাতাম, তুমি যেয়ো না, ওরা নিজেরা ঝগড়া করছে, নিজেরাই সামলাবে। তা ছাড়া পুত্রবধূদের হাতে এখন অনেক ক্ষমতা। কেস—টেস করে দিলে বুড়ো বয়সে ঘানি টানতে হবে। হঠাৎ আমি দেখি, পুত্রবধূর হাতে, মানে কনুইয়ের ওপরটায় নীল নীল চাকা চাকা দাগ। কালশিটে পড়ে গেছে। আর স্বর্ণা খুব ফরসা, তো দাগগুলো বোঝা যাচ্ছে। আমি তো দেখেই চিৎকার করে উঠেছি, কী হয়েছে? হাতে দাগ কেন? বাবু রাতে মেরেছে নাকি? —কী বলে জানেন? বলে, আমি নাকি কুৎসিত ইঙ্গিত করছি ওর শরীরের দিকে তাকিয়ে।'

—বলে ভদ্রলোক রুমাল বের করে চোখ মুছতে থাকলেন।

কন্দর্পনারায়ণ হবাক হলেন না। উনি এরকম অনেক শুনেছেন, শ্বশুর, খুড়শ্বশুর, এমনকী দাদার শ্বশুরের বিরুদ্ধেও অনেক সময়ই পুত্রবধূরা মিথ্যে অভিযোগ এনে থাকেন। এটা সত্যি, 498A সেকশনটার দরকার ছিল। মেয়েরা সারা দেশে অত্যাচারিতা হতেন। এখন বরং ধারাটার অপব্যবহার বেশি হয়। বেশির ভাগ সময়েই মেয়েরা স্বামীর বাড়ির লোকজনদের টাইট দেবার জন্য ধারাটা ব্যবহার করছে। তবে এটাও ঠিক যে, সারা দেশে কোথাও কোথাও অবশ্যই মেয়েরা অত্যাচারিতা হচ্ছেন। আশ্চর্যের ব্যাপার হল, যাঁরা সত্যি অত্যাচারিতা হচ্ছেন, তাঁরা আইনের সুবিধা পান না। উলটে, শহর আর শহরতলিগুলোতে মেয়েরা এই আইনের অপব্যবহার করছেন বেশি। তারপর থানা—পুলিশের সঙ্গেও একটা সাঁট থাকে। ওরা স্বামী—স্ত্রী দু—পক্ষের থেকেই কামায়।

'তারপর?'—ছোট্ট প্রশ্ন করলেন কন্দর্পনারায়ণ।

আমি তৎক্ষণাৎ আমার ছেলেকে বললাম—'তোমাকে ডিভোর্স করতে বলতে পারি না—তুমি কী করবে, তোমার সিদ্ধান্ত, কিন্তু এই মুহূর্তে আমার বাড়ি থেকে বেরোও।'—ওদের বাড়ি থেকে বের করে দিলাম। আমার ছেলে যাদবপুরের দিকে একটা ফ্ল্যাট ভাড়া করে বউকে নিয়ে থাকতে শুরু করে। আমাদের সঙ্গে কোনও যোগাযোগই ছিল না। তারপর একদিন খবর পেলাম, স্বর্ণার বাচ্চা হবে। তখন আবার সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলাম,' বলেই বললেন, 'থুড়ি, যোগাযোগ রাখতাম, কিন্তু সম্পর্ক কোনওদিনই স্বাভাবিক হয়নি। আশ্চর্য ব্যাপার হল, ওরা আলাদা হবার সঙ্গে সঙ্গে স্বর্ণার মা সেই বাড়িতে যাতায়াত শুরু করে দিল। আমার ছেলে তখন বলল, তোমার মা যখন দু—বেলা এখানে আসছেন, তখন আমিও আমার মা—বাবার সঙ্গে যোগাযোগ রাখব, তো ও—ও নিয়মিত আমাদের ভবানীপুরের বাড়িতে আসা—যাওয়া করত।'

'বাবা দাঁড়াও, এবার আমি বলি।'—রাজর্ষিবাবু এবার বলা শুরু করলেন—'আপনি হয়তো বলবেন, আপনার বাবা—মা—কে অতবড় অপমান করা সত্ত্বেও স্বর্ণাকে ডিভোর্স করলেন না কেন? বিশ্বাস করুন, স্রেফ আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবের কথা ভেবে। সবার কাছে খুব ছোট হয়ে যেতাম। লোকজন জিজ্ঞেস করত—কী বলতাম বলুন? তা, আলাদা হয়ে ভাবলাম, গণ্ডগোল কমবে, তা—ও কমল। একসঙ্গে কাউন্সেলিংয়ে গেছি, সাইকোলজিস্টের কাছে গেছি। অনেক চেষ্টা করেছি সম্পর্কটা টিকিয়ে রাখতে। তারপর ভাবলাম, বাচ্চা হলে বোধহয় ওর রাগ কমবে। তা—ও কমল না। আমার মা যদি মাঝে মাঝে আমার ফ্ল্যাটে আসতেনও, তাহলেও মা—কে বাচ্চা নিতে দিত না। মা কাঁদতেন। একসময় মনে হত, ডিভোর্স দিয়ে দিই।'

'বাবা বলতেন—দেখ, তোকে ছেড়ে আমরা যেমন কষ্টে আছি, তুইও মেয়েকে ছেড়ে থাকতে হলে সেরকমই কষ্ট পাবি। বাচ্চা যখন হয়ে গেছে, আর ডিভোর্স করিস না। এখন মেয়ের বয়স ছ—বছর। আমাদের মধ্যে ঝগড়া হলে ভয়ে, ইনসিকিয়োরিটিতে সারা ফ্ল্যাট ছোট ছোট পায়ে দৌড়োয়, একবার আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদে, বলে, 'পাপা, ঝগড়া কোরো না, আমি গুড গার্ল হয়ে যাব, আর—একবার স্বর্ণাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদে, বলে, মাম্মা, ঝগড়া কোরো না, আমি গুড গার্ল হয়ে যাব, তুমি যা দেবে তা—ই খাব, আমি বায়না করব না, তোমার সব কথা শুনব।'

'বুঝলেন, তখন এত মায়া লাগে, আমরা দু—জনেই তখন কেঁদে ফেলি। তখন আবার আমাদের মধ্যে সম্পর্ক আমরা স্বাভাবিক করে ফেলি। ঘরে দু—জন মহিলা আছেন, তাঁরা সবসময় মেয়ের দেখভাল করেন। ওঁরা বলেন, মেয়ে স্কুল থেকে ফিরে ফ্ল্যাটের বারান্দায় ঠায় বসে থাকে, কখন আমরা আসব সেই অপেক্ষায়। ও দু—জনকেই ভালোবাসে। রাত্রে আমাদের মাঝখানে শোয়। একটা পা আমার গায়ে তুলে দেয়, আর—একটা পা মায়ের গায়ের ওপর রাখে। আজকাল আমরা ওর সামনে ঝগড়া করি না, ও রাতে ঘুমিয়ে পড়লে পাশের ঘরে চলে যাই। শোবার ঘরের দরজা বন্ধ করে দিই, যাতে ও শুনতে না পায়। তাতে আর—এক ঝামেলা হয়েছে। ও আজকাল মাঝরাত্রে ঘুম ভেঙে উঠে উঠে দেখে, আমরা পাশে আছি তো? রাত্রে ওকে একা রেখে পাশের ঘরে ঝগড়া করছি না তো? আমার মেয়েকে ছেড়ে আমি বাঁচব না।'

'কন্দর্পনারায়ণবাবু, আপনি আমাকে বলুন, আমরা ডিভোর্সের মামলা করলে মেয়েকে নিয়ে ও কি চলে যেতে পারে? আমি কি বাচ্চা পাবই না?'

কন্দর্পনারায়ণ এতক্ষণ একমনে শুনছিলেন। এবার টেবিলের ওপরে কনুই রেখে সামনের দিকে একটু ঝুঁকে প্রশ্ন করলেন, 'এখন কী অবস্থায় আছেন?'

রাজর্ষিবাবু হতাশ ভঙ্গিতে ঠোঁট উলটে বললেন, 'কোনও সম্পর্কই নেই। আমরা দীর্ঘদিন কথা বলি না। যদিও মেয়ের জন্য আমাদের এক খাটে শুতে হয়। একেক সময় মনে হয়, বোধহয় মেসে আছি। সুখে—দুঃখে কোনও কিছুতেই সে আমার পাশে নেই। আমি আমার আনন্দ যেমন শেয়ার করতে পারি না, দুঃখও শেয়ার করতে পারি না। কোনও বন্ধু নেই আমার। আমার স্ত্রী—র সঙ্গে কথা বলি না বহুদিন। স্ত্রী—র সঙ্গে এইরকম সম্পর্কের কথা বাবা—মা—কেও বলতে পারি না। তাহলে ওঁরা কান্নাকাটি করতে থাকেন। বাবা—মা আমার ফ্ল্যাটে খুব একটা আসেন না। এলেও বাইরের ঘরে অপরিচিত অতিথির মতো বসেন, নাতনিকে একটু আদর করেই চলে যান। আমার স্ত্রী মা—বাবার সামনেও আসে না, কথাও বলে না, কিন্তু তার মা প্রায়ই আসেন। আমার বেডরুমে বিছানায় শুয়ে শুয়ে মা—মেয়েতে গপ্প হয়। আমার সাফ কথা, আমার মা—বাবা যদি আমার ভেতরের ঘরে ঢুকতে না পারেন তাহলে ওর মা—বাবাকেও আমি আমার শোবার ঘরে অ্যালাউ করব না।'

'জানেন, আমার মা আমাদের ভবানীপুরের বাড়ির একটা ঘরে শুধু নাতনির ছবি টাঙিয়ে রেখেছেন, সেগুলো দেখেন, আর চোখের জল ফেলেন। আমি মা—কে বলেছি, সব ছবি খুলে ফেলো, কেন তুমি নাতনির জন্য কষ্ট পাও!! কন্দর্পনারায়ণবাবু, আমি আর এই সম্পর্ক টানতে পারছি না। আমি এবার এর শেষ চাই।' রাজর্ষিবাবুর শেষের কথা বলতে বলতে গলা কেঁপে গেল। রাজর্ষিবাবু উত্তেজনায় থরথর করে কাঁপছিলেন।

'দেখুন, একটা আশ্চর্য ব্যাপার হল, আপনি আপনার স্ত্রী—র বিরুদ্ধে অনেক আগেই ডিভোর্সের মামলা করতে পারতেন, যখন তিনি আপনার বাবা—মা—কে অপমান করেছিলেন। তা আপনি করেননি। এখন আপনার মেয়ে হয়েছে, তার বয়স ছ—বছর, সে নিজেও আপনাদের দু—জনকে ভালোবাসে। আপনিও তাকে ভালোবাসেন। মুশকিল কী জানেন, আপনাদের মধ্যের এই অশান্তির প্রভাব বাচ্চাদের উপর কী তীব্রভাবে পড়ে, আপনারা জানেন না। জানতে চেষ্টাও করেন না। ক—দিন আগেই ফিউচার ফাউন্ডেশন বলে যে নামকরা স্কুলটা রয়েছে, তার প্রিন্সিপাল, খুব নামকরা শিক্ষাবিদ মিস্টার রঞ্জন মিত্র কথায় কথায় আমাকে বলছিলেন যে, সমাজে ব্রোকেন ফ্যামিলি এখন এত বেড়ে গেছে, স্কুলে বাচ্চাদের দেখলেই তাদের মধ্যে ব্রোকেন ফ্যামিলির প্রভাব স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। ব্রোকেন ফ্যামিলির বাচ্চারা অন্য ফ্যামিলির বাচ্চাদের সঙ্গে মেশে না। তারা স্কুলের মধ্যেই অন্য ব্রোকেন ফ্যামিলির বাচ্চাই খুঁজে নেয়। একসঙ্গে খেলে, টিফিন খায়, পরস্পরকে জিজ্ঞেস করে, কী রে? কালকে তোদের বাড়িতে গণ্ডগোল হয়েছে? আমাদের বাড়িতে তো খুব গণ্ডগোল হয়েছে। রাত্রে বাবা—মা কেউ খায়নি। আমিও কিছু খাইনি, বা কালকে রাতে বাবা মা—কে মেরেছেন বা এইরকমই সব, আপনাদের ছোট্ট একটা গল্প বলি—

দশ বছর আগে আমি রাজর্ষিবাবুদের মতোই এক দম্পতির মিউচুয়াল ডিভোর্স করিয়ে দিয়েছিলাম। মিউচুয়াল ডিভোর্স মানে জানেন তো? যেখানে স্বামী—স্ত্রী উভয়েই ডিভোর্সে রাজি হয়ে যান, কেউ কারও বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগই আনেন না, তাঁদের মধ্যে সম্পর্ক এতটাই খারাপ পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, যে—কোন উপায়ে তাঁরা উভয়ে উভয়ের থেকে মুক্তি চাইছিলেন। তাঁদের একমাত্র ছেলের বয়স ছিল পাঁচ। কিন্তু কে আর তার কথা ভাবে! বাবা—মা দু—জনেই ডিভোর্সের নেশায় মত্ত। আমি সবাইকে যেমন বাচ্চা থাকলে ডিভোর্স করতে বারণ করি, ওঁদেরও বুঝিয়েছিলাম যে, ডিভোর্স করবেন না। অন্তত বাচ্চাটার কথা ভাবুন, কিন্তু আমার কথা ওঁরা শোনেননি। ডিভোর্স হয়ে যায়। মা বাচ্চাটাকে নিজের কাছেই রাখতে চেয়েছিলেন। বাবা ছেলের ওপর থেকে তাঁর অধিকার তুলে নেন। এমনকী ডিভোর্সের নেশায় তিনি এমন মত্ত, যে ছেলেকে দেখবার অধিকারও তিনি চাইলেন না। অবশ্য আমি কাউকেই দোষ দিই না। দীর্ঘদিন ওকালতি করতে করতে আমি এটুকু বুঝি যে, স্বামী—স্ত্রী—র সম্পর্ক যখন খারাপ হয়ে যায়, তখন একজন আর—একজনকে খুন পর্যন্ত করে ফেলতে পারেন, তার চেয়ে মিউচুয়াল ডিভোর্স ভালো। তা, স্বামী—স্ত্রী—র ডিভোর্স হয়ে গেল। বাচ্চা ছেলেটি মা—র সঙ্গে থাকতে শুরু করল। মা চাকরি করতেন, আলাদা ফ্ল্যাট ভাড়া করে থাকতে শুরু করলেন। বাচ্চাটিকে সকালে মা স্কুল বাসে তুলে দিয়ে অফিস যেতেন, বাচ্চাটি আগে আগেই স্কুল থেকে ফিরত। মা তো তখনও ফিরতেন না, তাই বাচ্চাটি স্কুল থেকে ফিরে এসে যখন দেখত ফ্ল্যাটের দরজায় তালা দেওয়া, সে ফ্ল্যাটের সিঁড়িতেই ঘুমিয়ে পড়ত—দিনের পর দিন। ভেবে দেখুন, ওই মশা, গরম, অন্ধকার—একটা পাঁচ বছরের বাচ্চা সিঁড়িতেই ঘুমোচ্ছে। আশপাশের অন্য ফ্ল্যাটওনাররা কখনো কখনো দয়াপরবশ হয়ে বাচ্চাটিকে তাঁদের ফ্ল্যাটে এনে রাখতে চাইতেন, কেউ জল খাওয়াতেন, কেউ বা খাবার দিতেন। কিন্তু সে তো মাঝে মাঝে, রোজ তো নয়। ভেবে দেখুন দৃশ্যটা। একটা পাঁচ বছরের কচি ছেলে, সে তার স্কুল ব্যাগ, টিফিন বক্স, জলের বোতল বুকের সঙ্গে আঁকড়ে সিঁড়িতে শুয়েই ঘুমিয়ে পড়ছে। সন্ধের পর মা অফিস থেকে ফিরলে তিনি ওই ঘুমন্ত শিশুটিকে কোলে তুলে ঘরে নিয়ে আসতেন। আপনি হয়তো বলবেন, একজন সবসময়ের কাজের লোক রাখলে হত, কিন্তু সেই আর্থিক সামর্থ্য ভদ্রমহিলার ছিল না। বাচ্চাটা একটু বড় হতে অবশ্য তাকে ফ্ল্যাটের ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে দেওয়া হত, সে স্কুল থেকে ফিরে নিজে নিজেই ফ্ল্যাটের তালা খুলে ঢুকত।

অল্পবয়সি মহিলা, কয়েক বছর বাদে আবার বিয়ে করলেন। নতুন বাবা, চেয়েছিলেন অবশ্য, বাচ্চাটিকে আপন করে নিতে। কিন্তু বাচ্চাটি তার আসল বাবাকে ভুলতে পারেনি। তাই নতুন বাবাকে মেনে নিতেও পারেনি। সত্যি কথা বলতে কী, একটা সাত বছরের ছেলে যখন দেখবে, তার মা কোনও আঙ্কলের সঙ্গে বেডরুমের দরজা বন্ধ করে দিচ্ছেন রাতে, আর সে অন্য ঘরে বা বসার ঘরে সোফাতে শুচ্ছে, তার পক্ষে ওই অপরিচিত লোকটাকে আপন করে নেওয়া বা তাকে বাবা বলে ডাকা বেশ কঠিন বই কী। আসলে সবই সাইকোলজি। বাচ্চারা যদি নতুন বাবা কিংবা মা—কে মেনে নিতে পারে তো ভালো, না হলেই কষ্ট পাবে।

দু—বছর আগে মায়ের ক্যান্সার ধরা পড়ল। কয়েক মাস আগে তিনি মারাও গেলেন। এবার বাচ্চাটার কথা ভাবুন, তার এখন বয়েস পনেরো। নতুন বাবাও তাকে আর রাখতে চাইছেন না। তিনিও হয়তো আবার সংসার পাততে চান। অনেক খুঁজে খুঁজে নম্বর পেয়ে সে তার আসল বাবাকে সেদিন ফোন করেছিল। তার আসল বাবা এতদিন তার কোনও খোঁজই করেননি। আপনাদের তাঁর গল্প তো বলিনি। তিনিও এদিকে আবার বিয়ে করেছিলেন। তাঁর এই স্ত্রী—র আবার একটি মেয়ে আছে। দশ বছর বয়স। আসল বাবাটি তো এতদিন নতুন স্ত্রী—র সঙ্গে সংসার করছিলেন। একটি মেয়ে সমেত এই স্ত্রী—কে বিয়ে করেছিলেন। সব ঠিকঠাকই ছিল। এখন, তাঁর আগের পক্ষের ছেলের ফোন পেয়ে তিনি আকাশ থেকে পড়লেন—ছেলে বলছে, তুমি আমাকে তোমার সঙ্গে রাখো। না হলে আমি কোথায় যাব?'

'এই বাবা কয়েকদিন আগে আবার আমাকে ফোন করলেন—দশ বছর পর। পুরো সিচুয়েশনটা বলে জিজ্ঞেস করলেন, কী করব?'

আমি বললাম, 'আপনার নিজের ছেলে, তাকে দেখাও তো আপনার কর্তব্য। ছেলে ঘরে নিন।'

'কিছুদিন পর আবার ফোন—এবার আমার কাছে অ্যাপয়েন্টমেন্ট চাইলেন—বললেন, সবাই মিলে আসতে চান। আমি বললাম, আসুন।

নির্দিষ্ট দিনে সবাই এলেন, সবাই মানে ওই ছেলেটির বাবা, মানে আমার পুরোনো মক্কেল, ওই পনেরো বছরের ছেলেটি আর আমার পুরোনো মক্কেলের বর্তমান স্ত্রী।

আমি দেখলাম, রোগাটে হিলহিলে চেহারার ছেলেটি আমার সামনে বসল। স্বাভাবিকভাবেই আমাকে সে বিশ্বাস করতে পারছিল না, অবিশ্বাসের চোখে আমাকে জরিপ করছিল। সে জানত, তার বাবা আর মা—র ডিভোর্স করিয়েছি আমি। তাদের সুখের সংসার আমি ভেঙেছি, কাজেই আমাকে তার বিশ্বাস না—হবারই কথা। আর তার বাবার বর্তমান স্ত্রী—রও বয়েস খুব বেশি নয়। এই—পঁয়ত্রিশ ধরুন। আমার পুরোনো মক্কেল আমাকে জানালেন, ছেলের সঙ্গে তাঁর বর্তমান স্ত্রী—র বা তাঁর মেয়ের বনিবনা হচ্ছে না একেবারেই। কী করবেন তিনি?

'আমি তাঁর বর্তমান স্ত্রী—কে প্রশ্ন করলাম, 'কেন? বনিবনা হচ্ছে না কেন? কারণ কী?' এবারে ওঁর স্ত্রী আমাকে কারণগুলো খুলে বললেন, যেগুলো আমার মনে হল খুব বাস্তবসম্মত—তিনি বললেন, 'আমাদের দেড় কামরার ফ্ল্যাট। একটাই শোবার ঘর। সেখানে তিনি, স্বামী আর মেয়ে শোন, ছেলের শোবার জায়গা হয় না। ছেলেটি সবসময় রেগে থাকে, বাড়িতে অশান্তি করে। সারাদিন বাইরে বাইরে ঘোরে, পড়াশোনা করে না। ছুটির দিনগুলোয় দুপুরে ভাত খেয়ে বেরিয়ে যায়। রাত এগারোটার পরে ঘরে ঢোকে। এই ছেলেকে সঙ্গে রাখলে মেয়েরও অসুবিধা হয়। তাই ছেলেকে সঙ্গে রাখা যাবে না। আবার ছেলেকে হস্টেলে রেখে পড়ানোর মতো আর্থিক ক্ষমতা তাঁদের নেই।'

'আমি ছেলেটির দিকে তাকালাম, সাধারণত পনেরো বছর বয়সি ছেলের মুখে একটা লাবণ্য থাকে। এর মুখে তা নেই। জেদি, একরোখা একটা মুখ। সারা শরীরে অযত্নের ছাপ স্পষ্ট। গোটা গালে ব্রণ। মাথায় বড় বড় চুল, ঢলঢলে টি—শার্ট আর নোংরা একটা জিনসের প্যান্ট পরা।

ছেলেটি পর পর আমাকে যা বোঝাল, তাতে আমার মুখে কোনও উত্তর ছিল না। ছেলেটি প্রথমেই আমাকে বলল, আমি যে দশ বছর আগে তার বাবা—মা—র মধ্যে মিউচুয়াল ডিভোর্স করিয়েছিলাম, সেই সময় কেন আমি তার কথা ভাবিনি। সে কোথায় থাকবে, তার খরচ কে দেবে—এই কথাগুলো কেন আমি কোথাও কোনও এগ্রিমেন্টে লিখিনি, তাহলে আজ তার এই অবস্থা হত না। দেড় কামরার ফ্ল্যাটে তার শোয়ার জায়গা তো দূরের কথা, তার বসার জায়গাও নেই। মা—র জীবনেও সে ছিল অবাঞ্ছিত, বাবার জীবনেও তা—ই। তার যদি প্রয়োজন ছিলই না, তাহলে তাকে পৃথিবীতে আনা হয়েছিল কেন? আর আনাই যদি হল, তাহলে পনেরো বছরে কেউ তার কথা ভাবল না কেন? বাড়িতে কেউ তাকে পছন্দ করে না, আন্টি, মানে বাবার নতুন স্ত্রী আর তার মেয়ে তো নয়ই। তার খিদে পায়, কিন্তু সে খাবে কি না, তা ও কেউ জিজ্ঞাসা করে না। তাই সে রাস্তায় রাস্তায় ঘোরে। তার চেয়ে বয়সে অনেক বড় ছেলেদের সঙ্গেই আড্ডা মারে। তারপর অনেক রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে সে ঘরে ঢোকে। তাকে যেমন কেউ কখনো ভালোবাসেনি, সে—ও কখনো কাউকে ভালোবাসবে না।'

'আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, এত নোংরা জামাকাপড় কেন তোর?' সে বলল, 'কোথায় কাচব? বাড়ির সবার জামাকাপড় ওয়াশিং মেশিনে কাচা হয়, কিন্তু তার জামাকাপড় ওয়াশিং মেশিনে দিলে আন্টি রাগ করে।'

আমি বললাম, 'এত বড় বড় চুল কেন তোর মাথায়? চুল কাটিস না?'

সে বলল, 'সেলুনে ষাট টাকা চায় চুল কাটতে, কোথায় পাব টাকা? বাবার কাছে চাইলে বাবা দিতে চায় না।'

'আমি তাকে সাহস জোগাতে চেয়ে বললাম, তোর এত সুন্দর ক্রিকেটারদের মতো চেহারা, তুই জিম কর, তোর চেহারাও সুন্দর হবে, মনটাও ভালো থাকবে।'

'সে বলল, জিমে গিয়েছিলাম, ইন্সট্রাক্টর বলেছিল রোজ একটা করে ডিম খেতে। কে দেবে আমাকে রোজ একটা করে ডিম?'

'আমি ফের জিজ্ঞাসা করলাম, বাড়িতে যে ছোটবোনটা আছে, তার সঙ্গে তোর রিলেশন কেমন? ওর সঙ্গে কথা বলিস?'

'ছেলেটা বলেছিল, বাড়িতে একমাত্র ওকেই তো ভালোবাসি। ও অবশ্য সেটা বোঝে না। ও আমার সঙ্গে কথাও বলে না। ভাবে, ওর সবকিছুতে বুঝি আমি ভাগ বসাতে এসেছি। তবে ওর ওপর আমার রাগ নেই, আমার মতোই তো ওর বাবাও ওকে ছেড়ে চলে গেছেন, ওর কথাও ভাবেননি। ওর কষ্টও আমি বুঝি। আমি যেমন আমার মা—র নতুন হাজব্যান্ডকে বাবা বলে মেনে নিতে পারিনি, ও—ও তেমনি আমার বাবাকে বাবা বলে মানতে পারে না, এটা আমি বুঝি।'

'আমি ওকে অন্য ঘরে বসতে বলে, আমার সেই পুরোনো মক্কেলকে আর তাঁর নতুন স্ত্রী—কে বোঝালাম—দেখুন, একটু কষ্ট করে মানিয়ে নিন, কোথায় যাবে বেচারি। আপনারা যদি ওকে আশ্রয় না দেন, সঠিকভাবে বেড়ে উঠতে না দেন, তাহলে ও একটা মানসিক রুগি হয়ে যাবে। তা ছাড়া লোকে তো দেড় কামরার ফ্ল্যাটে কুকুরও পোষে, আপনারা একটা ছেলেকে রাখতে পারছেন না? ছেলেটি কিন্তু খারাপ নয়, ওর মায়া, মমতা, ভালোবাসা—এই অনুভূতিগুলো এখনও হারিয়ে যায়নি।'

এই অবধি বলে কন্দর্পনারায়ণ থামলেন। রাজর্ষিবাবু আর রাজেশবাবু দু—জনেরই মুখের দিকে তাকালেন। পাশে রাখা জলের বোতল থেকে জল নিজের গলায় ঢেলে গলাটা ভিজিয়ে নিলেন। রাজর্ষিবাবু আর রাজেশবাবু দু—জনেই থম মেরে রয়েছেন।

কন্দর্পনারায়ণ আবার শুরু করলেন, 'আপনারা সেই গল্পটা জানেন তো, আমাদের উকিলদের মধ্যে খুব চালু রয়েছে, সেই যে—একটা তিনতলা ফ্ল্যাটের বারান্দা থেকে নিচে খেলার জায়গায় যেখানে তিনটে বাচ্চা একসঙ্গে খেলছে, সেদিকে তাকিয়ে হাজব্যান্ড ওয়াইফকে বলছেন, ইয়োর সন, মাই সন, প্লেয়িং উইথ আওয়ার সন।'

তারপর একটু হেসে রাজেশবাবুকে বললেন, 'মানেটা বুঝলেন? মানে হল, হাজব্যান্ড আর ওয়াইফের দু—জনেরই সেকেন্ড ম্যারেজ। নিচে যে বাচ্চারা একসঙ্গে খেলছে, সেখানে ওই হাজব্যান্ডটির আগের পক্ষের ছেলে, ওয়াইফটির আগের পক্ষের ছেলে, তাঁদের দু—জনের একসঙ্গে বিয়ের পর যে ছেলে হয়েছে, তার সঙ্গে খেলছে। ভালো করে কথাটা শুনুন, তাহলেই মজাটা ধরতে পারবেন—'ইয়োর সন' মানে তোমার নিজের ছেলে বা আগের পক্ষের ছেলে, 'মাই সন' মানে আমার নিজের বা আগের পক্ষের ছেলে, 'প্লেয়িং উইথ আওয়ার সন', অর্থাৎ আমাদের বিয়ের ফলে যে ছেলে হয়েছে, তার সঙ্গে খেলছে। বুঝলেন?'

রাজর্ষিবাবু আর রাজেশবাবু দু—জনেই ক্ষীণ হাসবার চেষ্টা করলেন।

কন্দর্পনারায়ণ এবার টেবিলের সামনের দিকে ঝুঁকে বলতে শুরু করলেন, 'বিয়ের পর থেকেই আপনি আপনার স্ত্রী—কে খুব বেশিই ভালোবাসতেন। তা না হলে, আপনার বাবা—মাকে অত অপমান করা সত্ত্বেও আপনি স্ত্রী—কে নিয়ে আলাদা হতেন না, চাইলে আপনি তখনই ডিভোর্স করতে পারতেন, আপনি করেননি, স্ত্রী—কে নিয়ে আলাদা হয়ে গিয়ে ভাবলেন, ভালো থাকবেন। এতদিন চেষ্টাও করেছেন। কিন্তু এটাও ভেবে দেখবেন, আপনি আপনার স্ত্রী—কন্যাকে ছেড়ে ভালো থাকবেন তো? দেখুন ডিভোর্স আমি করিয়ে দিতেই পারি। কিন্তু, আপনার ছ—বছরের মেয়েকে কিন্তু আপনি হারাবেন। বর্তমান আইন অনুযায়ী ছ—বছরের মেয়েটি আপাতত মায়ের তত্ত্বাবধানেই থাকবে। আপনি কিন্তু মাঝে মাঝে মেয়েকে দেখবার একটা রাইট পাবেন। কিন্তু, প্রবলেম হয়ে যায়, যে বাচ্চারা মায়ের কাছে থাকে, সাধারণত মায়েরা তাদের টিউটর করেন। আবার একইভাবে যে বাচ্চারা বাবার কাছে থাকে বাবারা তাদের টিউটর করতে থাকেন। আপনার ক্ষেত্রে যেটা হবে, কিছুদিন পর থেকেই আপনার সঙ্গে আর আপনার মেয়ে দেখা করতে চাইবে না। এই যে গল্পগুলো বললাম, তার কারণ হল, যাতে আপনি বুঝতে পারেন যে, আপনারা ডিভোর্স করে নিলে মেয়েটি ভালো থাকবে না। মেয়েটি আপনাদের দু—জনকেই চায়, রাতে সে মাঝখানে শুয়ে আপনার আর আপনার স্ত্রী—র গায়ে একটা করে পা তুলে দেয়, যাতে সে আপনাদের স্পর্শটুকু মিস না করে।'

'দেখুন, বিয়ের এগারো বছর পরে স্বামী—স্ত্রী—র মধ্যে শারীরিক সম্বন্ধটাই আর বড় হয়ে থাকে না, তখন থাকে সন্তানের প্রতি দায়বদ্ধতা, ভালোবাসা। স্ত্রী—র প্রতি দায়বদ্ধতা, ভালোবাসা, কর্তব্য। স্বামী—স্ত্রী তখন অনেকটাই বন্ধু হয়ে যান। দেখুন, আপনি আপনার স্ত্রী—কে বদলাতে পারবেন না। তিনি প্রথম থেকেই যেমন ছিলেন... আজও তেমন আছেন। এইরকমভাবেই আপনাকে চলতে হবে। আপনাদের দু—জনেরই বয়স কম। আপনারা নিশ্চয়ই আবার বিয়ে করবেন। সেখানেও সন্তানাদি হবে। এই মেয়েটির অবস্থা কিন্তু ওই যে ঘটনাটা বললাম, ওই ছেলেটির মতো হবে। তখন আপনি কষ্ট পাবেন।'

এই অবধি শুনে রাজর্ষিবাবু লাফ দিয়ে উঠে একহাত জিভ বের করে—'বাবাঃ, আবার বিয়ে? আমার খুব শিক্ষা হয়েছে,' বলে উঠলেন।

কন্দর্পনারায়ণ হাসলেন—'প্রতিটি ডিভোর্স মামলা দায়ের করবার আগে স্বামী বা স্ত্রী, যিনিই আমার কাছে আসেন, তাঁদের আমি একইভাবে বোঝাই, তাঁরা তখন একই রকমভাবে জিভ কেটে একই কথা বলেন। কিছুদিন যেতে না যেতেই তাঁরা বিয়ের আসরে ফের বসেন। এখন আমি পুনর্বিবাহের নেমন্তন্ন পাচ্ছি। তার কিছুদিন যেতে না যেতেই ওই পুনর্বিবাহের ফলে নতুন সন্তান আসছে, তাদেরও অন্নপ্রাশন খেতে যাচ্ছি, আমাকে ওসব বলে লাভ নেই। আমি কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, আপনার অন্তত মেয়ের মুখ চেয়ে ডিভোর্স করা উচিত নয়।'

রাজর্ষিবাবু হতাশ ভঙ্গি করে বাবার দিকে তাকালেন।

রাজেশবাবু হালকা হেসে বললেন, 'উনি যেভাবে তোমাকে বোঝাচ্ছেন, ডিভোর্স করতে বারণ করছেন, তাতে আমার মনে হচ্ছে, আমি ঠিক লোকের কাছে এসেছি। সত্যিই তো, তোমাকে ছেড়ে থাকতে আমার যেমন কষ্ট হবে, তোমারও তো একই রকম কষ্ট হবে তোমার মেয়েকে ছেড়ে থাকতে।'

কন্দর্পনারায়ণ আবার বললেন, 'বাবার দিকে তাকিয়ে লাভ নেই রাজর্ষিবাবু, আপনি ডিভোর্স করতে না চাইলে আপনার বাবা জোর করে ডিভোর্স করাবেন না। মনে রাখবেন, আপনার খুশিতে, আনন্দে উনি বা আপনার মা হাসবেন, খুশি হবেন, আর আপনার দুঃখে বা কষ্টে ওঁরা কষ্ট পাবেন, এটাই স্বাভাবিক।'

একটু পজ নিয়ে আবার বলতে শুরু করলেন, 'ডাক্তাররা যেরকম প্রেসক্রিপশন দেন, এক মাসের ওষুধ খেতে বলেন, আমিও তেমনি আপনাকে প্রেসক্রিপশন দেব। আপনি এক মাস ফলো করুন। যদি কাজ না হয়, আপনি আমার কাছে আসবেন। আমি ডিভোর্স করিয়ে দেব, আর আপনাকে বাধা দেব না।'

রাজর্ষিবাবু আর রাজেশবাবু দু—জনেই সমস্বরে বললেন, 'হ্যাঁ, আপনি প্রেসক্রিপশন দিন, আমরা ফলো করব।'

কন্দর্পনারায়ণ মাথা নেড়ে বললেন, 'ভেরি গুড, আমি একটা জিনিস বুঝতে পারলাম যে, আপনার স্ত্রী—র সঙ্গে আপনার বন্ধুত্বই হয়নি। এগারো বছরে আপনারা কিন্তু পরস্পরের কাছেই আসতে পারেননি। আপনাকে যদি জিজ্ঞাসা করি, আপনার স্ত্রী—র প্রিয় রং কী। আপনি বলতে পারবেন না, বা ওঁকেও যদি জিজ্ঞাসা করি, আপনার প্রিয় রং কী। উনিও বলতে পারবেন না। কাজেই আমি আগে আপনাদের বন্ধুত্ব করাবার চেষ্টা করব।

'এক নম্বর, আমার প্রিয় বন্ধু আর এক প্রিয় দিদি সিনেমা পরিচালনা করেন—আপনারা নিশ্চয়ই নাম শুনেছেন—শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় আর নন্দিতা রায়, ওঁরা দু—জনে অনেক সিনেমাই পরিচালনা করেছেন—সব ক—টা সুপার ডুপার হিট। তার মধ্যে দুটো সিনেমা আছে বাচ্চাদের নিয়ে—রামধনু আর পোস্ত।'

রাজর্ষিবাবু আর রাজেশবাবু দু—জনেই মাথা নেড়ে জানালেন যে, তাঁরা শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় আর নন্দিতা রায়ের নাম খুব জানেন, এবং তাঁদের পরিচালনার প্রায় সব সিনেমাই দেখেছেন।

কন্দর্পনারায়ণ বললেন, 'আপনি আজই ওই সিনেমা দুটোর সিডি জোগাড় করুন বা অনলাইন সিনেমা দুটো দেখবেন, একসঙ্গে তিনজন, আপনি, আপনার মেয়ে আর স্ত্রী, কিন্তু খুব সিরিয়াসলি। ওই সিনেমা দেখতে দেখতে চা খাচ্ছেন, ওভাবে নয়। যেভাবে সিনেমা হলে গিয়ে লোকে দেখে, সেইভাবে। পারলে রাতে খাওয়াদাওয়ার পর একসঙ্গে তিনজন মিলে দেখুন। কিন্তু একটা একটা করে, আজকে একটা, কালকে আর—একটা।'

'দুই বাড়িতে একটা রঙিন মাছের অ্যাকোয়ারিয়াম কিনে নিয়ে যান। আজই আপনার শোয়ার ঘরে রাখুন। আমরা মনে করি, অ্যাকোয়ারিয়ামে রঙিন মাছ চঞ্চল মনকে শান্ত করে। দেখবেন, ওই অ্যাকোয়ারিয়ামে রঙিন মাছের খেলা দেখতে দেখতে, আপনার আর আপনার স্ত্রী—র উভয়ের মনই শান্ত হবে।'

'তিন নম্বর, আপনার স্ত্রী গান ভালোবাসেন?'

রাজর্ষিবাবু বললেন, 'খুব।'

কন্দর্পনারায়ণ ড্রয়ার থেকে তিনটে কার্ড বের করে রাজর্ষিবাবুকে দিলেন—'এই কার্ডগুলো আমার তরফ থেকে আপনাদের উপহার। আগামী রবিবার কলামন্দিরে আমার আর—এক প্রিয় বন্ধু অনিন্দ্য, অনিন্দ্য বোস, ওর একক শো করবে। অনিন্দ্যর নাম শুনেছেন তো?'

রাজর্ষিবাবু মাথা নেড়ে বললেন, 'অনিন্দ্য—শহর তো? মানে শহর বলে যে ব্যান্ডটা আছে, সেই অনিন্দ্য বোস তো? হ্যাঁ, আমার খুব প্রিয় গায়ক, আমার স্ত্রী—রও।'

কন্দর্পনারায়ণ খুশি হলেন—'বাঃ, তাহলে তো ভালোই হল। ওই শো—এর তিনটে কার্ড দিলাম, আপনারা একসঙ্গে শো—টা দেখবেন। অনিন্দ্যকে আমি বলে রাখব। ও বিশেষ কয়েকটা গান অবশ্যই গাইবে, স্রেফ আপনাদের ফ্যামিলিটাকে রিইউনাইট করার জন্য। তারপর শো—এর শেষে, আপনি একটা তানপুরা কিনে স্ত্রী—কে দিয়ে বলবেন, আজ থেকে তুমি গান শিখবে। গান করবে। তুমি গান এত ভালোবাসো, তোমার গান করা উচিত। বুঝলেন, আপনাদের মিউজিক থেরাপিও দরকার।'

তারপর কী ভেবে আবার বললেন, 'আচ্ছা, আপনারা তিনজন একসঙ্গে বেড়াতে যান, লাস্ট কোথায় কোথায় গেছেন?'

রাজর্ষিবাবু হতাশ ভঙ্গিতে বললেন—'ধুর, আমাদের আবার বেড়াতে যাওয়া! একে দু—জনেরই কলেজের ব্যস্ততা—তায় আবার দিবারাত্র অশান্তি—'

কন্দর্পনারায়ণ বললেন, 'না, যেতেই হবে। এই সপ্তাহেই আপনি তিনটে টিকিট কাটবেন। পাহাড় নয়, মরুভূমি নয়, জঙ্গল নয়, সমুদ্রের ধারে যেকোনও জায়গায়। পুরী, পণ্ডিচেরি, ভাইজ্যাক, নিদেনপক্ষে দিঘা। বলা হয় যে, সমুদ্রের অবিরাম ঢেউ মনের উত্তেজনা প্রশমিত করে। মাথা ঠান্ডা করে দেয়।'

রাজর্ষিবাবু বললেন, 'অসম্ভব, ও যাবে না, ওকে আমি চিনি।'

কন্দর্পনারায়ণ জোরের সঙ্গে বললেন, 'আপনি, এই পুজো ভ্যাকেশনের জন্য টিকিট কাটুন, আমার ধারণা, উনি যাবেন। আপনি আগে থেকে কিচ্ছু বলবেন না, টিকিট কেটে ওঁকে সারপ্রাইজ দেবেন। যদি উনি না যান, তাহলে আমি আপনার টিকিটের টাকা ফেরত দেব।'

'নেক্সট হল, এই রবিবার আপনারা তিনজন সন্ধেবেলা বাড়ি থেকে বেরোবেন, তিনজনে ফাঁকা কোনও রাস্তায় সন্ধেবেলা হাঁটবেন, তারপর কাছাকাছি কোনও রেস্তরাঁয় ডিনার করে বাড়ি ফিরবেন।

লাস্টলি, আগামী এক মাস, আপনি রাত্রে শুয়ে খোলা মনে ভাববেন, কী চান? ডিভোর্স করে বউ—বাচ্চাকে ছেড়ে থাকতে পারবেন?

এক মাস পরে আপনি আসবেন, আমাকে আমার এক্সপেরিমেন্টের রেজাল্ট জানাবেন।' তারপর রাজর্ষিবাবুর বাবার দিকে তাকিয়ে বললেন, 'মাফ করবেন, আপনারা ডিভোর্স করাবার জন্যই এসেছিলেন, কিন্তু ছ—বছরের বাচ্চা মেয়েটার কথা শুনে আমি একটু শেকি হয়ে গেলাম। ঠিক আছে, আমাকে একটা মাস সময় দিন। তারপর যদি দেখি, আপনাদের বন্ধুত্ব হল না, তখন না হয়....'

রাজর্ষিবাবু আর তার বাবাকে অনেকটা স্যাটিসফায়েড মনে হল।

পারমিতা এতক্ষণ পাশে বসে পুরো আলোচনার নোট নিচ্ছিলেন। কন্দর্পনারায়ণ পারমিতার দিকে ঝুঁকে বললেন, 'ওঁদের এক মাস পরের একটা ডেট করে দাও। আর ওঁর জন্য একটা ফাইল তৈরি করে নোট শিটটা রেখে দাও। এক মাস পর ওঁরা যেদিন আসবেন, সেদিন লাগবে।'

রাজেশবাবু কন্দর্পনারায়ণের দু—হাত নিজের হাতে নিয়ে চেপে ধরলেন। 'আমি আপনার মতো উকিল আগে দেখিনি। একটা প্রায় ভেঙে—যাওয়া পরিবারকে বাঁচাবার যে চেষ্টা আপনি করছেন, তা সত্যি অসাধারণ, আমারা কৃতজ্ঞ।' সাধারণত প্রশংসা শুনলে কন্দর্পনারায়ণ কেমন যেন ঘাবড়ে যান, রাজেশবাবুর কাছ থেকে প্রশংসা শুনে উনি কেমন একটা ক্যাবলা—ক্যাবলা মুখ করে তাকিয়ে থাকলেন।

জার্মানি থেকে নতুন ক্লায়েন্টের ফোন করার কথা রাত আটটায়। ভিডিয়ো কনফারেন্সিংয়ে কথা হবে। কোর্ট থেকে ফিরে, ফ্রেশ হয়ে, চেম্বারে সাতটা নাগাদই বসে গেলেন কন্দর্পনারায়ণ। দ্বৈপায়ন, পারমিতা, নাজিরও এসে গিয়েছে। কন্দর্পনারায়ণ বলে দিলেন, 'তোমরা কালকের মামলাগুলো পড়ে—শুনে রেডি করে নাও। আমি আটটা থেকে ভিডিয়ো কনফারেন্সিংয়ে বসব, খানিকক্ষণ আমাকে পাবে না।' নাজিরকে বললেন, 'তুমি কালকে দেব সাহেবের ডিভিশন বেঞ্চে যে মার্ডার কেসের শুনানিটা আছে, ওটার জন্য নোট করে রাখো। রূপম আর স্বাগতা এখনও এসে পৌঁছোয়নি, ওরাও থাকবে মামলাটায়। আমি ততক্ষণ এদিকটা সামলাব।'

নাজির মাথা নেড়ে পাশের ঘরে চলে গেলেন। এর মধ্যেই মোবাইলটা অনেকক্ষণ ধরে বাজছিল।

কন্দর্পনারায়ণ কথা বললেন, 'হ্যালো।'

ওপার থেকে উত্তেজিত স্বর ভেসে এল—'দাদা, আমি রাজর্ষি রায় বলছি। আপনার কথামতো কালকেই শিবপ্রসাদ মুখার্জি—নন্দিতা রায়ের রামধনু সিনেমাটা আমরা তিনজন মিলে দেখেছি। প্রথমে ও দেখতে চাইছিল না, তারপর নিজে থেকেই এসে বসে। পুরোটা দেখেছে। কিন্তু, একটা ম্যাজিক হয়েছে আজকে দুপুরে। আমি ওকে রিকোয়েস্ট করেছিলাম আজকে কলেজ না যেতে, আমিও যাইনি। মেয়েকেও স্কুলে পাঠাইনি। দুপুরবেলা খাওয়াদাওয়া করে আমরা তিনজন একসঙ্গে ''পোস্ত'' সিনেমাটা দেখছিলাম। ওই যে, একটা সিন আছে না, যেখানে জজ সাহেব বাচ্চা ছেলেটাকে, মানে পোস্তকে ডেকে কথা বলবেন, আর জিজ্ঞাসা করবেন, কার সঙ্গে থাকতে চাও—ঠিক সেই সিনটা দেখে আমার মেয়ে আমাকে বলল, বাবা, তুমি মা—কে ডিভোর্স করে দাও। এ কথা শুনে তো, আমি আর আমার স্ত্রী জাস্ট চমকে উঠেছি, আমি তাড়াতাড়ি করে বলে উঠেছি—কেন মা? এ কথা বলছ কেন? ওরকম বলতে নেই, মাম্মাকে ডিভোর্স করব কেন? বিশ্বাস করুন কন্দর্পনারায়ণবাবু, মেয়ে কী বলল জানেন?'

'কী বলল?'

'বলল, জজদাদু যখন আমাকে জিজ্ঞাসা করবেন, আমি কার কাছে থাকতে চাই—তখন আমি বলে দেব, আমি দু—জনের কাছেই থাকতে চাই।—এ কথা শুনে আমি আর আমার স্ত্রী দুজনেই মেয়েকে জড়িয়ে ধরে খুব কেঁদেছি। থ্যাঙ্ক ইউ, স্যার, থ্যাঙ্ক ইউ। আমি আপনার কথা, আপনার পরামর্শের কথা সব আমার স্ত্রী—কে বলেছি। ও আপনার সঙ্গে একটু কথা বলবে। স্যার, একটু কথা বলুন।'

'হ্যাঁ, দিন।'

রাজর্ষিবাবু ফোনটা ওঁর স্ত্রী—কে দিলেন।

'স্যার, অশেষ ধন্যবাদ, রাজর্ষি আপনার সব পরামর্শের কথাই আমাকে বলেছে। আমি চেষ্টা করছি স্যার, আপনার পরামর্শ মেনে চলতে। আপনি ঠিকই বলেছেন স্যার, আমাদের মধ্যে কোনও বন্ধুত্বই হয়নি। আর আপনার মতো করে আমাদের কেউ বোঝায়নি স্যার। এক মাস পরে আমরা তিনজন একসঙ্গে আপনার সঙ্গে গিয়ে দেখা করে আসব, স্যার।'

'বাঃ, খুব ভালো খবর দিলেন, একটা পজিটিভ নিউজ পেলাম। আমার ফোন নম্বর থাকল আপনাদের কাছে, দরকার হলেই ফোন করবেন।' —কন্দর্পনারায়ণ ফোন রেখে দিলেন।

'বুঝলে পারমিতা, কাউন্সেলিংয়ে কাজ হয়েছে,' বলে 'পোস্ত' সিনেমাটা দেখে, রাজর্ষিবাবুর মেয়ের রিঅ্যাকশনের কথাটা সবাইকে বললেন।

পারমিতা বললেন, 'সত্যি একটা অ্যাচিভমেন্ট, স্যার। কনগ্র্যাচুলেশন।'

ঠিক আটটার সময় জার্মানির বার্লিন শহর থেকে স্কাইপেতে কল করলেন সৌরভ মুখার্জি। স্কাইপেতে যতটা বোঝা গেল, অত্যন্ত সুদর্শন, সুপুরুষ চেহারা। প্রথমে সৌরভবাবু নিজের সম্পর্কে জানালেন যে, তিনি বার্লিনে থাকেন এবং ওই শহরেই নামকরা কোম্পানি সিমেন্স—এ চাকরি করেন। একজন জার্মান মহিলাকেই বিয়ে করেছেন। এরপর তিনি যা বললেন, সেটা বেশ চমকপ্রদ বলতেই হবে।

সৌরভবাবুর বর্তমান বয়স আটাশ বছর। আঠারো বছর আগে সৌরভবাবু তাঁর মা—র সঙ্গে কন্দর্পনারায়ণের চেম্বারে এসেছিলেন। সৌরভবাবুর বাবা শুভংকর মুখার্জি ও মা কেয়া মুখার্জি। এই কেয়া মুখার্জি ছিলেন কন্দর্পনারায়ণের মক্কেল। সৌরভবাবুর বাবা আর মায়ের মধ্যে ছিল তীব্র গণ্ডগোল। অবশেষে, কেয়া মুখার্জি কন্দর্পনারায়ণের মাধ্যমে আলিপুর কোর্টে ডিভোর্স চেয়ে মামলা করেন। কিছুদিন মামলা চলবার পর উভয়ের মধ্যে মিউচুয়াল ডিভোর্স হয়ে যায়। আঠারো বছর আগে কন্দর্পনারায়ণ, বয়সে তখন একেবারেই তরুণ, তবুও বার বার কেয়া মুখার্জিকে ছেলের মুখ চেয়ে ডিভোর্স করতে বারণ করেছিলেন। এ কথা সেইসময়ে দশ বছরের সৌরভবাবুর দিব্যি মনে আছে। কন্দর্পনারায়ণের নামটা সৌরভবাবুর মনে ছিল, কিন্তু ফোন নম্বরটা তিনি জোগাড় করেছেন গুগল ঘেঁটে। বাবা—মা—র ডিভোর্স হবার সময় সৌরভবাবুর ভবিষ্যতে কী হবে, উনি কোথায় থাকবেন, উনি কার কাছে থাকতে চান, এগুলি নিয়ে কেউই ভাবেননি আর সৌরভবাবুকে কেউ কিছু জিজ্ঞেসও করেননি বা মতামতও চাননি। তীব্র মানসিক কষ্টে দশ বছরের বাচ্চা সৌরভ প্রায় পাগলের মতো হয়ে গিয়েছিল। সৌরভবাবুর বাবা এবং মা দু—জনেই আবার বিয়ে করে নিজের নিজের মতো করে সংসার পেতেছিলেন। সৌরভবাবু কিছুদিন মেদিনীপুরে (তখন মেদিনীপুর ভাগ হয়নি) বেলদা বলে একটা জায়গায় দিদিমার বাড়িতে ছিলেন, পরে তাঁকে হস্টেলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেখান থেকেই পড়াশুনো করে তিনি জার্মানি চলে যান। এখন সেখানেই সেটলড।

সৌরভবাবুর বাবা নাকি আঠারো বছর আগে যখন সৌরভবাবু কার কাছে থাকবেন, সেই প্রসঙ্গ ওঠে, তখন নাকি চিৎকার করে তিনি বলেছিলেন, 'ও আমার ছেলে নয়, আমি ওর কোনও দায়িত্ব নেব না।' এবং হয়েছিলও তা—ই। ডিভোর্সের মামলা চলাকালীন সৌরভবাবুর বাবা অর্থাৎ শুভংকর মুখার্জি সৌরভবাবুকে কাছে রাখতে চেয়ে বা সৌরভবাবুর কাস্টডি চেয়ে, কোনও মামলা তো ফাইল করেনইনি, ডিভোর্সের মামলা চলাকালীন সৌরভবাবুকে কোনওদিন দেখতেও চাননি। কিছুদিন ডিভোর্সের মামলা চলতে চলতেই ওঁদের মধ্যে মিউচুয়াল ডিভোর্স হয়ে যায়। সেইসময়ও সৌরভবাবু কার কাছে থাকবেন, সেই নিয়ে কোনও আলোচনাই হয়নি, কারণ সেই সময়ও শুভংকরবাবু সৌরভবাবুকে কাছে রাখতে তো চানইনি, উলটে তিনি সৌরভবাবুর পিতৃত্ব অস্বীকার করেন।

আজ আঠারো বছর বাদে, সৌরভবাবু নিজে যখন বাবা হতে চলেছেন, তখন অতীতের কথা তাঁর বার বার মনে পড়ে তাঁকে কষ্ট দিচ্ছে। এখন তাঁর মনে হচ্ছে, তাহলে কি শুভংকরবাবু তাঁর বাবা নন? অথবা যদি বাবা হন, তাহলে সর্বসমক্ষে অস্বীকার করেছিলেন কেন? গত আঠারো বছর ধরে প্রতিদিন, প্রতি মিনিট, প্রতি সেকেন্ড তিনি মানসিক যন্ত্রণাতে ভুগেছেন। হস্টেলে থাকতেন, কেউ কোনওদিন দেখা করতে যাননি। মাঝে মাঝে মা আর মামা ফোন করে খোঁজ নিতেন। যতদিন দিদিমা বেঁচে ছিলেন, খোঁজ নিয়েছেন। দশ বছর বয়স পর্যন্ত যে ছেলেটা কলকাতায় রীতিমতো সুখের জীবন কাটিয়েছে, মা—বাবার হাত ধরে একটু একটু করে বেড়ে উঠছিল, মা—বাবার ডিভোর্স হতেই তাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় গ্রামে, সেখানকার স্কুলের সঙ্গে মানিয়ে নিতেই সে সমস্যায় পড়েছে। দিনের পর দিন বালিশে মুখ গুঁজে কেঁদেছে, কেউ তাকে সান্ত্বনা দিতে আসেনি। হস্টেলে তিনি দুঃখ ভুলতে ড্রাগও নিতে শুরু করেছিলেন। তারপর স্রেফ নিজের মনের জোরে, তিনি সব বাধা কাটিয়ে জার্মানি চলে যান।

আজকে যখন তিনি বাবা হতে চলেছেন, তখন তাঁর মনে প্রশ্ন জেগেছে, তাঁর বাচ্চা যদি বড়ো হয়ে জিজ্ঞাসা করে যে, 'বাবা, তোমার বাবার নাম কী?' তিনি কী জবাব দেবেন? তাই সৌরভবাবু জীবনে একবার অন্তত শেষবারের মতো শুভংকরবাবুর মুখোমুখি দাঁড়াতে চান। কিন্তু সেটা ঘরের চার দেওয়ালের মধ্যে নয়, কোর্টে। যদিও আসলে আঠারো বছর আগে, শুভংকরবাবু আর তাঁর স্ত্রী অর্থাৎ কেয়া মুখার্জির বিচ্ছেদ হয়েছিল আদালতে, আসলে ওইদিন দশ বছর বয়সি সৌরভের সঙ্গেও বিচ্ছেদ হয়েছিল তাঁর বাবা শুভংকর মুখার্জির আর তার মা কেয়া মুখার্জির। তাই আজ সৌরভবাবু আদালতেই তাঁর বাবার পরিচয় জানতে চান। তিনি শুভংকর মুখার্জির ডি.এন.এ. টেস্টের মাধ্যমে নিজের ডি.এন.এ. টেস্ট করে, দুটোর ম্যাচিং করে দেখতে চান। যদি না মেলে তাহলে কেয়া মুখার্জিকে প্রশ্ন করবেন যে তাঁর বাবা কে? আর যদি দুটো ডি.এন.এ. প্রোফাইল মিলে যায় তাহলে শুভংকরবাবুর সামনে দাঁড়িয়ে বুক চিতিয়ে জানতে চাইবেন যে, কেন তিনি বলেছিলেন, 'ও আমার ছেলে নয়।' আঠারো বছর ধরে প্রতিমুহূর্তের অপমানের জবাব চান তিনি।

কন্দর্পনারায়ণ স্কাইপেতে সৌরভবাবুকে প্রশ্ন করলেন, 'কিন্তু, এখন তো শুভংকরবাবু ঘোর সংসারী। তিনি আবার বিয়ে করেছেন, হয়তো বা সন্তানাদিও হয়েছে। এইসময় এই ধরনের মামলা করলে সেই পরিবারটির ওপরও তো ঝড় বয়ে যাবে। তা ছাড়া শুভংকরবাবু বর্তমানে কোথায় থাকেন, জানেন তো? ওঁর বিরুদ্ধেই তো পেটারনিটি টেস্ট বা পিতৃত্বের প্রমাণ চেয়ে মামলা করতে হবে।'

সৌরভবাবুকে খুব ব্রুটাল শোনাল—'কন্দর্পনারায়ণবাবু, গত আঠারো—কুড়ি বছর ধরে আমার ওপর দিয়ে কত ঝড় বয়েছে বলুন তো? আমি ড্রাগ নিতে শুরু করেছিলাম, আমি আমার জীবনটাকে শেষ করে দিতে চেয়েছিলাম, জার্মানিতে এসে আমি বেঁচে যাই। এলা, মানে আমার স্ত্রী আমাকে বাঁচায়। কাজেই ওই লোকটা, মানে শুভংকর মুখার্জির বাড়িতে অশান্তি হবে, নাকি জীবনে ঝড় আসবে, তা নিয়ে আমি একটুও বদারড নই।'

কন্দর্পনারায়ণ বললেন, 'ঠিক আছে। আপনাকে কলকাতায় আসতে হবে। কয়েকটা দিন কলকাতায় থাকতেও হবে। আমি মামলা রেডি করছি।'

সৌরভবাবু ওদিক থেকে বললেন, 'আমি সামনের মাসেই আসছি। যদিও এলা এই সময়টায় প্রেগন্যান্ট, তবুও ও আমাকে একা ছাড়তে চাইছে না, ও—ও আসছে আমার সঙ্গে।'

কন্দর্পনারায়ণ ঘাড় নেড়ে 'হ্যাঁ' বললেন।

চেম্বারে ততক্ষণে রূপম, জয়শ্রী আর শ্রীপর্ণা ঢুকে এসেছেন, তাঁরাও স্কাইপেতে আলোচনাটা শুনছিলেন। রূপম বললেন, 'স্যার, কেসটা ইউনিক হতে চলেছে, সন্দেহ নেই।'

কন্দর্পনারায়ণ চিন্তিত মুখে পারমিতাকে বললেন, 'আঠারো বছর আগের একটা ডিভোর্সের মামলা—কেয়া মুখার্জি নাকি সৌরভবাবুকে নিয়ে আমার কাছেই এসেছিলেন সেইসময়। পারমিতা, সেইসময় কি মামলাটিতে তুমি ছিলে? অত আগের রেকর্ড কি কিছু পাওয়া যাবে? আমাদের পুরোনো কেস রেকর্ডগুলো যেখানে আছে, সেই র‍্যাকগুলো একবার দেখো তো?'

পারমিতা বললেন, 'দাদা, আমার তো এক্ষুনি মনে পড়ছে না, তবে আমাকে দু—দিন সময় দিন, আমাদের চেম্বারের রেকর্ড রুমটা একবার ঘেঁটে দেখছি।'

'দুটো ব্যাপার হতে পারে। এক, সত্যি সত্যি সৌরভবাবুর বাবা হয়তো তাঁর স্ত্রী—কে মানে কেয়া মুখার্জিকে সন্দেহ করতেন, হয়তো বা কেয়া মুখার্জির এক্সট্রা—ম্যারিটাল অ্যাফেয়ার ছিল, তিনি শুভংকরবাবুর কাছে ধরা পড়ে যান, তার জন্যই শুভংকরবাবু অত বড় কথা বলেছিলেন। দুই, দু—জনের মধ্যে পারিবারিক গণ্ডগোল এমন চরম সীমায় পৌঁছেছিল, যে স্রেফ নিষ্কৃতি পেতেই উনি কথার কথা হিসেবে মুখ ফসকে বলে ফেলেছিলেন যে, সৌরভবাবু ওঁর সন্তান নয়। সেই কথাগুলোই সোজা গিয়ে বিঁধেছিল সৌরভবাবুর বুকে। সারাজীবন সেই যন্ত্রণা বয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি। প্রসেনজিৎ ঘোষ বলে আমার ছোটবেলার বন্ধুর মামলাটার কথা মনে নেই? স্ত্রী—র সঙ্গে গণ্ডগোল এমন চরমে উঠেছিল যে, প্রসেনজিৎ পাঁচ বছরের বাচ্চা মেয়েটা কোথায় থাকবে, কার কাছে থাকবে ও আদৌ বাচ্চাকে দেখবার অধিকার পাবে কি—না এসব কিচ্ছু না ভেবেই স্ত্রী—র সঙ্গে মিউচুয়াল ডিভোর্সে সই করে দিয়েছিল। তারপর আর বাচ্চাকে দেখতে দিচ্ছিলেন না সদ্য প্রাক্তন হয়ে যাওয়া স্ত্রী। তারপরই তো আলিপুরে বাচ্চাকে দেখতে চেয়ে এবং বাচ্চার কাস্টডি চেয়ে মামলা করলাম। প্রসেনজিৎ ঘোষের স্ত্রী মিউচুয়াল ডিভোর্স হবার দু—বছরের মধ্যে ফের বিয়ে করে নেওয়ায় আমাদের সুবিধা হল। কোর্টে আমরা বললাম, প্রসেনজিৎ তো আর বিয়ে করেনি, বাচ্চার মা আবার বিয়ে করে নতুন সংসার পেতেছেন। তাই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বাচ্চার দায়িত্ব আমাদের দেওয়া হোক। কোর্ট আমাদের কথা মেনে নিয়েছিলেন।'

পারমিতা ঘাড় নাড়লেন—'হতে পারে, তেমন কিছু এখানেও হয়েছিল। কারণ, কেয়া মুখার্জি আমাদের দিয়েই ডিভোর্স ফাইল করেছিলেন। কিছুদিন পর ওই ডিভোর্স মামলা উইথড্র করে মিউচুয়াল ডিভোর্সের মামলা ফাইল হয়েছিল। হয়তো বা স্বামী—স্ত্রী—র গণ্ডগোল এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, দু—জনেই মুক্তি চাইছিলেন। তাই, ছেলে কার কাছে থাকবে, তার ভবিষ্যৎ কী হবে, সেটা নিয়ে কেউই মাথা ঘামাননি। ভেবেছিলেন পরে দেখা যাবে। কিন্তু, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দু—জনেই আলাদা সংসার পেতেছেন। এই ছেলেটির কথা আর কারওই মনে ছিল না।'

কন্দর্পনারায়ণ মাথা নাড়লেন—'হতে পারে, কিন্তু আর—একটা ব্যাপার আমাকে নাড়া দিচ্ছে। সৌরভবাবুকে হস্টেলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়, সেখানে তিনি নিশ্চয়ই উপযুক্ত এডুকেশন পেয়েছিলেন, সেই খরচাপাতি কে দিয়েছিলেন? উনি জার্মানি চলে গেলেন, কম কথা নয়। যদি ওঁর পড়াশোনার খরচ না জোগানো হত, তাহলে জার্মানিতে গিয়ে সিমেন্স—এর মতো নামকরা কোম্পানিতে চাকরি পাবার মতো যোগ্য হতেন না।'

'হ্যাঁ দাদা, ঠিক তা—ই। এইসব প্রশ্নের উত্তর চাই। আমি পুরোনো কেস রেকর্ডগুলো একবার চেক করি।'

পারমিতা উঠে পুরোনো কেসের ফাইলগুলো যে ঘরে থাকে, সেখানে গেলেন।

সৌরভ মুখার্জি জার্মানি থেকে আজই এসে পৌঁছেছেন। এয়ারপোর্ট থেকেই সরাসরি চেম্বারে এসে ঢুকেছেন। সঙ্গে জার্মান স্ত্রী এলা। প্রেগন্যান্ট। তা সত্ত্বেও স্বামীকে এত দূরে একা ছাড়েননি। সঙ্গে এসেছেন। এলা পরিষ্কার ইংরেজি উচ্চারণে বললেন, তাঁর সঙ্গে সৌরভবাবুর আলাপ বার্লিনেই, সিমেন্স—এ একসঙ্গে চাকরি করার সুবাদে। বয়সে এলাদেবী সৌরভবাবুর চেয়ে একটু বড় এবং উঁচু পদে চাকরি করেন। কিছুদিন আলাপ পর্ব চলার পর দু—জনের বিয়ে হয়েছে। সৌরভবাবু ছিলেন মনের দিক থেকে একজন ভেঙে—পড়া মানুষ। অফিসেও কারও সঙ্গে কথা বলতেন না। ডিপ্রেশনে ভুগতেন। এলাদেবীর সঙ্গে আলাপ হবার পর এলাদেবী বুঝতে পারেন যে, 'পরিবার' শব্দটাকেই সৌরভবাবু ঘেন্না করেন। সম্পর্কে জড়াতে ভয় পান। অথচ, 'এমপ্লয়ি' হিসেবে সৌরভবাবু যেকোনও অফিসে একজন 'অ্যাসেট', তুখোড় বুদ্ধিমান, বিচক্ষণ। আস্তে আস্তে এলাদেবী পছন্দ করতে শুরু করেন সৌরভবাবুকে। কিন্তু সৌরভবাবুর এক কথা—তিনি কোনও সম্পর্কে জড়াবেন না। নিজের বাবা—মা—র মধ্যের কুৎসিত সম্পর্ক তিনি কোনওদিনও ভুলতে পারবেন না। বাবার 'ও আমার ছেলে নয়'—এই কথাটা আজও সৌরভবাবুর বুকে বিঁধে রয়েছে। সৌরভবাবু কিছু গোপন করেননি এলাদেবীর কাছে। হস্টেলে থাকাকালীন তিনি যে মা—বাবার কাছ থেকে পাওয়া কষ্ট ভুলতে নিয়মিত ড্রাগ নিতেন, সেটাও জানিয়ে দেন এলাদেবীকে। হস্টেলে থাকতে থাকতে তিনি হয়ে ওঠেন একজন 'ফাদার হেটার' আর 'মাদার হেটার' দুটোই। দুটো সত্তাই তাঁর মধ্যে প্রবল। হস্টেলে যেসব ছেলের সঙ্গে ছুটিছাটার দিনগুলোয় বাবারা দেখা করতে আসত, সৌরভবাবু সেইসব ছেলেকে পরে খুঁজে খুঁজে বিনা কারণে মারধর করতেন, অত্যাচার করতেন, র‍্যাগিং করে সেইসব ছেলেকে কষ্ট দিয়ে আনন্দ পেতেন। আবার একইভাবে, যেসব ছেলেদের সঙ্গে তাদের মায়েরা দেখা করতে আসতেন, তাদেরও উনি মারধর করে আনন্দ পেতেন। বাবা—মায়েরা অন্য বাচ্চাদের যে খাবারদাবার দিয়ে যেতেন, সেইসব খাবার উনি খেয়ে ফেলতেন। খেতে না পারলে নষ্ট করে দিতেন। ছুটিতে অন্য ছেলেরা বাড়িতে চলে যেত, গোটা হস্টেলে তিনি একাই থাকতেন। তাঁর কোথাও যাবার জায়গা ছিল না। একজন মামা মাঝে মাঝে এসে তাঁর খোঁজখবর নিতেন। পরের দিকে তিনিও আসতেন না। কিন্তু পড়াশোনায় অসম্ভব ভালো ছিলেন। জীবনের সমস্ত পরীক্ষাতেই তাঁর রেজাল্ট অসম্ভব ভালো ছিল। ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে তিনি জার্মানি চলে যান।

এইরকম একটা ভাঙাচোরা অবস্থায় এলাদেবীর সঙ্গে তাঁর আলাপ হয়, সেখান থেকে বন্ধুত্ব। বন্ধুত্ব চলাকালীন, দিনের পর দিন কাউন্সেলিং করে, সৌরভবাবুর জীবনের প্রতি বিশ্বাস ফিরিয়ে এনেছেন এলাদেবী। তারপর বিয়ে এখন যখন সৌরভবাবু নিজে বাবা হতে চলেছেন, সেইসময় আবার নতুন করে মানসিক যন্ত্রণা পেতে শুরু করেছেন। তাঁর মনে এখন একটাই প্রশ্ন—তাঁর বাবা কে? সত্যিই কি তাঁর বাবা শুভংকরবাবু? ডি.এন.এ. টেস্ট করে আগে তিনি দেখতে চান, শুভংকরবাবুর সঙ্গে তাঁর ডি.এন. এ. প্রোফাইল ম্যাচ করছে কি না? যদি দেখা যায় শুভংকরবাবুর ডি.এন.এ.—র সঙ্গে তাঁর ডি.এন.এ. ম্যাচ করছে না, তাহলে আবার অন্য লড়াই। সেক্ষেত্রে কেয়া মুখার্জি অর্থাৎ সৌরভবাবুর মা—কেই চেপে ধরতে হবে সৌরভবাবুর পিতৃপরিচয় জানবার জন্য।

কন্দর্পনারায়ণ সব শুনে বললেন, 'কিন্তু, আমার মনে হয় বিষয়টি একেবারে ইগো প্রবলেম, আর এতটা না করলেও হত।'

এলাদেবী একমত হয়ে বললেন, 'হ্যাঁ, একেবারে সাইকোলজিক্যাল প্রবলেম।'

কিন্তু সৌরভবাবুর বক্তব্য, 'আমার সন্তান যখন বড় হয়ে আমাকে জিজ্ঞাসা করবে যে, বাবা, আমার বাবা তো তুমি, তোমার বাবা কে? তখন আমি কী জবাব দেব? আমার বাবা তো পরিষ্কার বলেছিলেন যে, আমি তাঁর সন্তান নই। কোর্টের মাধ্যমে ডি.এন.এ. ম্যাচ করিয়ে আমি রিপোর্টটা নিজের কাছে সারাজীবন রেখে দেব। আমার ছেলেকে দেখাব—এই দেখ, তোর যেমন বাবা আছে, আমারও বাবা আছে।'

ঠিক সময়ে মামলা দায়ের করা হল।

শুনানির দিনক্ষণও ধার্য হল। মামলার দিন আদালতে তিলধারণের জায়গা নেই। বিদেশ থেকে ছেলে ফিরে এসে আদালতের কাছে বাবার ডি.এন.এ. টেস্ট করাবার জন্য রক্ত পরীক্ষার অনুমতি চাইছেন—এমন মামলা খুব বেশি শোনা যায় না। তবে আগে এরকম কয়েকটা মামলা হয়েছে বটে।

কোর্টের কাছে কন্দর্পনারায়ণের আরজি হল—

এই মামলার শিকড় লুকিয়ে রয়েছে আঠারো/কুড়ি বছর আগের একটা ঘটনার মধ্যে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে, সৌরভ মুখার্জি, মানে আবেদনকারীর বাবা—মা—র মধ্যে বিচ্ছেদ হয়ে যায় আঠারো বছর আগে আদালতের নির্দেশে। কিন্তু আবেদনকারী বুঝতে পারেন যে, তিনি তাঁর বাবা—মা উভয়ের কাছেই অবাঞ্ছিত, অপ্রয়োজনীয়। কেউ তাঁকে চাইতেন না। বাবা—মা—র মধ্যে ঝগড়া যখন চরমে উঠত, তখনও বালক সৌরভ মুখার্জিকে নিয়ে কেউ ভাবেননি। তিনি কার কাছে থাকতে চান, সেকথাও কেউ জিজ্ঞাসা করেননি বা তাঁর বাবা—মা—র মধ্যে ডিভোর্স হয়ে গেলে বালক সৌরভ থাকবেন কোথায়, সেটাও কেউ তাঁকে বলেননি। একদিন বালক সৌরভের জীবনের সবচেয়ে বড় আঘাতটা এল তাঁর বাবা অর্থাৎ শুভংকর মুখার্জির কাছ থেকে। তিনি চিৎকার করে, সর্বসমক্ষে বলেন যে, সৌরভ তাঁর সন্তান নয়। সে অন্য কারও সন্তান। একটা ছুটে—আসা মিসাইলের মতো তীব্র গতিতে কথাগুলো আঘাত করে তাঁর বুকে, যে যন্ত্রণা তিনি আজও বয়ে বেড়াচ্ছেন। কিছুদিন গ্রামে মামাবাড়িতে থাকবার পর তাঁকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় হস্টেলে। দীর্ঘ জীবন তিনি সেখানে কাটিয়েছেন, সেখান থেকে তিনি চলে যান জার্মানিতে। আজ তিনি যখন বাবা হতে চলেছেন, তখন তাঁর মনে প্রশ্ন জেগেছে, প্রকৃতপক্ষে তিনি কার সন্তান, সারাজীবন তিনি কেন এইরকম অবহেলিত, বঞ্চিত?

বাবা—মায়েরা ডিভোর্স তো করে নেন, নতুন জীবনও শুরু করেন, কিন্তু তাঁদের বিচ্ছেদ সন্তানের জীবনে কী যন্ত্রণা বয়ে আনে, সেটা তাঁরা বুঝতেও পারেন না। সাপের খোলস বদলাবার মতো করে এক জীবন থেকে অন্য জীবনে প্রবেশ করেন তাঁরা। আবার বিয়ে করেন, নতুন সংসার হয়। কিন্তু ওই সন্তানটির কী হল, তাঁরা জানতেও চান না।

'মাই লর্ড, ঠিক এরকমই একটা মামলা হয়েছিল দিল্লি হাইকোর্টে ২০১০ সালের ২৩ ডিসেম্বর, সেই মামলার সঙ্গে অনেকটাই মিল রয়েছে আমাদের এই মামলার। রোহিত শেখর বলে এক ঝকঝকে তরুণ তাঁর পিতৃপরিচয় জানতে চেয়ে একটি মামলা করেন। আদালতে তিনি জানান যে, তাঁর মা দীর্ঘদিন দেশের একটি প্রথম সারির রাজনৈতিক দলের যুব সংগঠনের সদস্যা ছিলেন। সেই প্রথম সারির রাজনৈতিক দলটির দীর্ঘদিনের সাংসদ ছিলেন নারায়ণ দত্ত তিওয়ারি। রাজনীতি করবার সুবাদেই পরস্পর কাছাকাছি আসেন এবং যখন ওই রাজনৈতিক নেতার প্রায় ষাট বছর বয়স, সেইসময় রোহিত শেখরের মা একজন অল্পবয়সি তরুণী। তাঁরা পরস্পর ঘনিষ্ঠ হন এবং এই রোহিত শেখরের জন্ম হয়। যদিও দিল্লি হাইকোর্টে এই মামলা দায়ের করবার সময় নারায়ণ দত্ত তিওয়ারি অতিবৃদ্ধ, আশি অতিক্রান্ত, তবুও দিল্লি হাইকোর্ট রায় দেন যে, একজন সন্তানের তাঁর পিতৃপরিচয় জানবার অধিকার আছে। তাই, রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে ডি.এন.এ. টেস্ট করে দেখা যেতে পারে যে, রোহিত শেখরের রক্তের ডি.এন.এ.—র সঙ্গে নারায়ণ দত্ত তিওয়ারির রক্তের ডি.এন.এ. মিলছে কি না। ২০১০ সালের এস.সি.সি অনলাইনে এই যুগান্তকারী রায়টি প্রকাশিত হয়।'

অপলক কোর্টের মধ্যে রায়ের ফোটোকপি কন্দর্পনারায়ণকে এগিয়ে দিলেন। কন্দর্পনারায়ণ কোর্টে ফোটোকপিগুলো জমা দিলেন। জজ সাহেবরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা শুরু করলেন। এবারে তাঁরা জিজ্ঞাসা করলেন, মামলার বিরোধী পক্ষ অর্থাৎ শুভংকর মুখার্জির তরফে কোনও লইয়ার হাজির আছেন কি না। দেখা গেল, শুভংকর মুখার্জির তরফে কেউই হাজির নেই।

দু—দিন পরে আবার শুনানির দিন রাখা হল, ওইদিন শুভংকর মুখার্জির তরফে কোন ল'ইয়ার হাজির হয়ে তাঁদের বক্তব্য রাখবেন।

সেদিনই সন্ধেবেলায় চেম্বারে সৌরভবাবুর মামলা নিয়েই আলোচনা হচ্ছিল। কয়েকটি টিভি চ্যানেল থেকে সাংবাদিকরা এসেছেন। তাঁরা সৌরভবাবু আর এলাদেবীর ইন্টারভিউ নিচ্ছেন। এবিপি আনন্দ—এর সৌভিক, চব্বিশ ঘণ্টার শ্রাবন্তী, নিউজ এইট্টিন বাংলার অর্ণব, সবারই মূলপ্রশ্ন, আঠারো বছর পর এই মামলা কেন? সৌরভবাবুর ইন্টারভিউ দিতে দিতে চোখ ছলছল করে উঠছে। গলা ধরে আসছে। বোঝা যাচ্ছে, বাবা—মা—র বিচ্ছেদ কী ভীষণ প্রভাব ফেলেছে সৌরভবাবুর জীবনে। কত বাচ্চা এইভাবে বাবা—মা—র অভাব সহ্য করতে না পেরে মানসিক রুগি হয়ে যান, সৌরভবাবুও হয়েছিলেন। তিনিও নিয়মিত ড্রাগ নিতে শুরু করেছিলেন—দুঃখ, মানসিক অবসাদ ভুলবার জন্য।

কন্দর্পনারায়ণের মোবাইলটা অনেকক্ষণ ধরেই বাজছিল। কন্দর্পনারায়ণ হাত বাড়িয়ে ফোনটা ধরতেই, মেয়ের গলা।

'অ্যাডভোকেট কন্দর্পনারায়ণ বলছেন?'

'হ্যাঁ বলছি।'

'নমস্কার, নাম বললে আমাকে চিনবেন না, আমার নাম তনুকা মুখার্জি। আমার বাবার নাম শুভংকর মুখার্জি। আমার বাবা আপনার সঙ্গে একটু কথা বলতে চান, আপনি কি একটু কথা বলবেন?'

'ম্যাডাম, মনে হচ্ছে, আপনি সৌরভ মুখার্জির যে মামলাটা আজকে কোর্টে হয়েছে, সেই মামলারই বিপরীত পক্ষ। এথিক্যালি, মামলা চলাকালীন আমি বিপরীত পক্ষের সঙ্গে কথা বলতে পারি না। আমি সৌরভ মুখার্জির ল'ইয়ার। আমি যদি এখন মামলার বিপরীত পক্ষের সঙ্গে কথা বলি, সেটা আমার পক্ষে আনএথিক্যাল হবে। তা ছাড়া, আমার মক্কেলও আমাকে ভুল বুঝতে পারেন।'

'স্যার, আমাকে ম্যাডাম বলবেন না, আমি অনেক ছোট, আমার মাত্র পনেরো বছর বয়স। আমি খুব বিপদে পড়ে আপনাকে ফোন করছি। আসলে, আপনার ফোন নম্বরটাই আমি জোগাড় করেছি নেট ঘেঁটে। তবে যদি আমি সৌরভ মুখার্জি, মানে আমার দাদার সঙ্গে কথা বলতে পারতাম, আরও ভালো হত।'

'এক মিনিট, সৌরভবাবু আর তাঁর স্ত্রী এলা এখানে উপস্থিত আছেন, আমি ফোনটা ওঁদের দিচ্ছি, যদি ওঁরা কথা বলতে রাজি হন, আপনি কথা বলতে পারেন, আপনি এক মিনিট হোল্ড করুন।'

কন্দর্পনারায়ণ খুব সংক্ষেপে সৌরভবাবু আর এলাদেবীকে বিষয়টা বুঝিয়ে বললেন। সৌরভবাবু একবাক্যে 'না' বলে দিলেন, তিনি শুভংকরবাবুর সঙ্গে কথা বলতে চান না, যা হবে, আদালতেই হবে।

কন্দর্পনারায়ণ মাথা নেড়ে বললেন, 'বিষয়টা একটু অন্যভাবে ভাবুন সৌরভবাবু, আফটার অল পারিবারিক বিষয়। একবার কথা বলে দেখতে পারেন।' সৌরভবাবু গোঁ ধরে থাকলেও এলাদেবী কথা বলতে রাজি হলেন। তবে ঠিক হল, ফোনটা স্পিকারে দেওয়া হবে, এলাদেবী কথা বললেও, সৌরভবাবুও শুনবেন। ওদিক থেকে কী বলা হচ্ছে, প্রয়োজনে তিনিও মতামত দিতে পারবেন।

কন্দর্পনারায়ণ ফোনটা স্পিকারে দিলেন—একটা সুন্দর, মিষ্টি কিশোরী কণ্ঠ রিনরিন করে বেজে উঠল—'দাদা, তুমি আমাকে চিনবে না, আমি তনুকা, তোমার বোন। দু—মিনিট কথা বলব, প্লিজ, না বোলো না।'

কন্দর্পনারায়ণ সৌরভবাবুর দিকে তাকালেন—সৌরভবাবুর ভুরু দুটো কুঁচকে রয়েছে। কিন্তু, দাঁত দিয়ে নিচের ঠোঁটটা কামড়ে ধরে রয়েছেন, মনে হচ্ছে, আবেগটা প্রশমন করতে চেষ্টা করছেন।

ওপার থেকে রিনরিনে কণ্ঠ আবার শোনা গেল—'দাদা, ভেবো না, তুমি মামলা করেছ বলে বাবা তোমার সঙ্গে ভয় পেয়ে কথা বলতে চান, বরং তুমি মামলা করাতে বাবা খুশিই হয়েছেন—তোমার সঙ্গে যোগাযোগের একটা রাস্তা বেরিয়েছে। বাবা গত আঠারো বছর ধরে তোমাকে পাগলের মতো খুঁজে বেড়িয়েছেন। বাবা আজ অসুস্থ, তোমার সঙ্গে দেখা করতে চান। প্লিজ, তুমি যেখানে বলবে, আমরা সেখানেই চলে যাব। তুমি পাঁচটা মিনিট বাবাকে দাও। তারপর তুমি যা বলবে, তা—ই হবে। কথা দিলাম।'

সৌরভবাবু দেখা করতে চাইছিলেন না, এলাদেবীর জোরাজুরিতে রাজি হলেন। ঠিক হল, আগামীকাল কোর্টের পরে কন্দর্পনারায়ণের চেম্বারেই বসা হবে। শুভংকরবাবু, তাঁর বর্তমান স্ত্রী আর তাঁদের একমাত্র মেয়ে তনুকা, পনেরো বছর বয়স—এই তিনজন রাত আটটা নাগাদ কন্দর্পনারায়ণের চেম্বারে আসবেন। এইদিকে সৌরভবাবু আর তাঁর স্ত্রী এলা থাকবেন, একটা জয়েন্ট মিটিংয়ে বসা হবে। কন্দর্পনারায়ণ পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন, তিনি নিজে যেহেতু আলোচনাতে উপস্থিত থাকবেন, শুভংকরবাবু চাইলে তাঁর তরফেও কোনও ল'ইয়ার নিয়ে আসতে পারেন। শুভংকরবাবু ফোনেই জানিয়ে দিলেন যে, তিনি কোনও ল'ইয়ার নিয়ে আসবেন না। আর কোর্টেও তিনি কোন ল'ইয়ার এনগেজ করতে চান না। তিনি এটুকু বুঝতে পেরেছেন যে, সারাজীবন তিনি তাঁর ছেলে অর্থাৎ সৌরভবাবুর ওপর যথেষ্ট নির্যাতন করেছেন, এই প্রৌঢ় বয়সে ছেলের বিরুদ্ধে আর উকিল লাগাতে চান না।

বড় কনফারেন্স রুমটায় সবাই মিলে বসা হল। তার আগে বলা দরকার যে, সৌরভবাবু আর এলাদেবী আটটা বাজার আগেই চেম্বারে ঢুকে গিয়েছিলেন। আটটা পাঁচ নাগাদ শুভংকরবাবু, তাঁর বর্তমান স্ত্রী, যাঁর নাম দেবলীনা মুখার্জি, যিনিও বেশ সুন্দরী, আর তাঁদের একমাত্র মেয়ে তনুকা—তিনজন একসঙ্গে ঢুকলেন। শ্রীপর্ণা আর জয়শ্রী ওঁদের নিয়ে কনফারেন্স রুমে বসালেন। আলো, ফ্যান চালিয়ে দেওয়া হল। কন্দর্পনারায়ণ তখন অন্য একজন ক্লায়েন্টর সঙ্গে কথা বলছিলেন। শ্রীপর্ণা সবাইকে বসিয়ে বললেন, 'আপনারা বসুন, স্যার আসছেন।' হাতের কাজটা মিটিয়ে কন্দর্পনারায়ণও চলে এলেন। শ্রীপর্ণা, জয়শ্রী, স্বাগতাও এসে বসলেন, ওঁরা আজকের মিটিংয়ের প্রতিটা খুঁটিনাটি বিষয় নোট করবেন।

কন্দর্পনারায়ণ শুভংকরবাবুর দিকে তাকালেন। আঠারো বছর আগে আলিপুর কোর্টে দেখেছিলেন। ওঁর আর কেয়া মুখার্জির মধ্যে মামলা চলার সময়। এবার মনে পড়ল। সৌরভবাবু বাবার মতোই দেখতে। শুভংকরবাবুও দীর্ঘদেহী, ফরসা গায়ের রং, বেশ সুপুরুষ। কেয়া মুখার্জির সঙ্গে ডিভোর্স হবার পর বিয়ে করেছেন দেবলীনা দেবীকে। দেবলীনাদেবীরও বয়স হয়েছে, সুন্দরী। আশ্চর্য ব্যাপার হল তনুকার সঙ্গে শুভংকরবাবুর কোনো মিলই নেই। তনুকার সঙ্গে বরং দেবলীনা দেবীরই মিল রয়েছে। ছোট্টখাট্ট চেহারা, মুখখানি ভারী মিষ্টি। পনেরো বছর মাত্র বয়স, কিন্তু, সে—ই উদ্যোগ নিয়ে সবার সঙ্গে আলাপ—পরিচয় করছিল।

কন্দর্পনারায়ণ প্রথম পাঁচ মিনিট কোনও কথা বললেন না, সৌরভবাবু আর শুভংকরবাবুকে ধাতস্থ হতে সময় দিলেন। সৌরভবাবুর ফরসা মুখ রাগে লাল হয়ে গিয়েছে, তিনি অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে বসে রয়েছেন। শুভংকরবাবু একদৃষ্টে সৌরভবাবুকে দেখছিলেন, মুখখানি পরম মমতায় ভরা। তনুকা সবার সঙ্গেই কথা বলার চেষ্টা করছিল।

একটু কেশে নিয়ে কন্দর্পনারায়ণ শুরু করলেন, 'শুভংকরবাবু, আপনার এই উদ্যোগে আমি খুব খুশি হয়েছি। আপনি যে নিজে থেকে সৌরভবাবুর সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছেন, এটা খুবই ভালো প্রয়াস। সৌরভবাবুর কী বক্তব্য, আপনি তো জেনেই গিয়েছেন, আমরা মামলার যাবতীয় নথি আপনাকে পোস্টেই পাঠিয়েছি। আমি একটা কথা আপনার কাছে জানতে চাই যে, আপনি আঠারোটা বছর আপনার ছেলের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন না? তাকে একবার দেখতে গেলেন না? একটা দশ বছরের ছেলে, যে তার বাবাকে ছেড়ে এক মুহূর্তও থাকতে পারত না, তাকে ছুড়ে ফেলে দিলেন নিজেদের স্বার্থে? কলকাতা শহরে চূড়ান্ত বিলাসিতায় জীবনের প্রথম দশ বছর কাটাবার পর তাকে পাঠিয়ে দেওয়া হল মেদিনীপুরের এক অখ্যাত গ্রামে! তার বাবা তাকে অস্বীকার করলেন, মার পক্ষে চাকরি করে সন্তান সামলানো সম্ভব নয় বলে তিনি তাঁর গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দিলেন ছেলেকে। তিনি হয়তো যোগাযোগ রাখতেন, তারপর তিনিও নতুন সংসার পাতলেন। আস্তে আস্তে এই দশ বছরের ছেলেটি সবার চোখের আড়ালে চলে গেল। তাকে হস্টেলে পাঠিয়ে দেওয়া হল। কী প্যাথেটিক!'

সবাই মাথা নিচু করে বসে রইলেন। হঠাৎ তনুকা মুখ খুলল, 'মাফ করবেন, আমি হয়তো সবার ছোট, কিন্তু পাপা মুখ খোলার আগে আমি একটু ইনট্রো করে দিতে চাইছি। কিছুদিন আগেই পাপার বাইপাস সার্জারি হয়েছে। প্লিজ, কেউ এমন কিছু বলবেন না, যাতে পাপা উত্তেজিত হয়ে যান। পাপার কিছু হয়ে গেলে আমাদের কিন্তু পথে বসতে হবে, আমাদেরও কিন্তু কেউ নেই।'

শুভংকরবাবু কথা বলা শুরু করলেন, 'বুবুন যে আমারই ছেলে, সে নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। কেয়া, মানে বুবুনের মায়ের সঙ্গে সেই সময়টায় রোজ তুমুল ঝগড়া—অশান্তি হত। এই মুহূর্তে কেয়া এখানে নেই, ওর অ্যাবসেন্সে আমি ওর নিন্দা এত বছর বাদে আর করতে চাই না। কিন্তু গণ্ডগোল এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, আমরা দু—জনেই দু—জনের কাছ থেকে মুক্তি চাইছিলাম। কেয়া আমাকে ছেলেকে দিতে চাইছিল না, ছেলেকে ও ওর কাছে রাখতে চাইছিল। আমি জানতাম, বুবুনকে ও রাখতে পারবে না। আমাদের ডিভোর্সের আগেই ও একটা সম্পর্কে জড়িয়ে যায়। আমি জানতাম যে, সেই ভদ্রলোক বুবুনের দায়িত্ব নিতে চান না। আমাদের ডিভোর্স হবার আগেই কেয়ার আর সেই ভদ্রলোকের বিয়ের তারিখও ঠিক হয়ে যায়। একদিন রাত্রে কেয়াকে আমি বলি যে, তুমি তো তোমার বিয়ের তারিখও ঠিক করে ফেলেছ, বুবুনের দায়িত্ব তুমি আমাকে দাও। কেয়া তখন এতই ভায়োলেন্ট হয়ে যায়, আমাদের মধ্যে এতই গোলমাল শুরু হয়ে যায় যে তখন আমি বলে ফেলি, ঠিক আছে, বুবুনকে আমি নেব না। ও আমার ছেলে নয়, আমি ওর দায়িত্ব নেব না, তুমিই যা করার করো। আমাকে মুক্তি দাও।'

শুভংকরবাবুর চোখ দিয়ে জলের ধারা নেমে এল। তনুকা পাশেই ছিল, ও উঠে গিয়ে শুভংকরবাবুর চোখ মুছিয়ে দিল।

'হ্যাঁ, আমি ওই কথাগুলো বলেছিলাম, কিন্তু বাঁচতে বলেছিলাম। আমি প্ল্যান করেছিলাম যে, ডিভোর্স হয়ে গেলেই কেয়ার বিয়ের পর আমি বুবুনের কাস্টডি চাইব। এইজন্য আমি বুবুনের কাস্টডি চেয়ে আলিপুর কোর্টে মামলা করি। বার বার মামলার নোটিশ যায় কেয়ার অ্যাড্রেসে। কেয়া মামলাতে হাজির হয়নি। আমি কেয়ার বাপের বাড়িতে অর্থাৎ মেদিনীপুরের ঠিকানাতেও মামলার নোটিশ পাঠিয়েছিলাম। তাঁরা সমন রিসিভ করেননি। আলিপুর কোর্টে এই কাস্টডির মামলাটা পাঁচ বছর আমি চালাই। কেয়ার পুনর্বিবাহের ডকুমেন্ট আমি কোর্টে জমা দিয়ে বলি, বাচ্চার মা আবার বিয়ে করেছেন, কিন্তু বাচ্চা সেখানেও নেই, তাহলে বাচ্চা কোথায় গেল? তাকে কোথায় লুকিয়ে রাখা হয়েছে? বাচ্চার মা বিয়ে করেছেন—আমি তো করিনি। বাচ্চার সত্যিকারের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য বাচ্চার কাস্টডি আমাকে দিয়ে দেওয়া হোক। আমার কাছে থাকলেই বাচ্চার প্রপার গ্রোথ অ্যান্ড ওয়েলফেয়ার বলতে যা বোঝায়, তা—ই হবে। কোর্ট আমার কথা মেনে নিয়ে বাচ্চার কাস্টডি নেবার অর্ডার দেন। কিন্তু কোথায় বুবুন? তার খোঁজে আমি পাগল হয়ে যাই। তনুকা মা, কোর্টের কাগজগুলো বের করে দে তো!'

শুভংকরবাবুর কথামতো তনুকা একটা বড় আর মোটা ফাইল থেকে আলিপুর কোর্টে সৌরভবাবুর কাস্টডি চেয়ে করা মামলার যাবতীয় কাগজ বের করে কন্দর্পনারায়ণের দিকে বাড়িয়ে দিল।

কন্দর্পনারায়ণ আলিপুর কোর্টের রায়ের কপিটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলেন। সত্যিই তো, কী আশ্চর্য, আলিপুর কোর্টে পাঁচ বছর ধরে মামলা চালিয়েছেন শুভংকরবাবু, কেয়াদেবী একদিনও হাজির হননি। শেষে কোর্ট পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছেন বালক সৌরভকে খুঁজে বার করতে এবং কেয়া মুখার্জিকে অ্যারেস্ট করে আনতে।

কন্দর্পনারায়ণ অর্ডারের কপিগুলো সৌরভবাবুর দিকে বাড়িয়ে বললেন, 'তার মানে দাঁড়াচ্ছে যখন আপনি বেলদা বলে শহরটাতে একা একা বাবার জন্য রোজ বালিশে মুখ গুঁজে কাঁদছেন, তখন আপনার বাবা হন্যে হয়ে আপনাকে খুঁজে যাচ্ছেন! আপনার মা আপনাকে অত্যন্ত চালাকির সঙ্গে লুকিয়ে রেখেছিলেন!'

সৌরভবাবু হাঁ করে আছেন, শুভংকরবাবু আবার শুরু করলেন—

'বুবুন এবার বলতে পারে, বাবা তুমি তো জানতে মা—এর বাপের বাড়ি বেলদায়। তুমি সেখানে গেলে না কেন? বুবুনকে বলি, দিনের পর দিন আমি বেলদাতে ফোন করেছি। হয় ওর দিদা, না হয় ওর মামা আমাকে বলেছেন, বুবুন ওখানে নেই, কোথায় আছে তাঁরা জানেন না। অবশেষে আমি কোর্টের অর্ডারে পুলিশ নিয়ে বেলদা যাই। সেখানেও বুবুনকে পাইনি। এখন বুঝতে পারছি, আমি পুলিশ নিয়ে বুবুনকে খুঁজতে খুঁজতে বেলদা চলে যাব—আন্দাজ করেই বুবুনকে সরিয়ে নিয়ে গিয়ে হস্টেলে দিয়ে দেওয়া হয়েছিল।'

সৌরভবাবু এতক্ষণে দু—হাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করেছেন—'বাবা, বাবা, আমি যে তোমাকে ছেড়ে কী কষ্ট পেয়েছি, তোমাকে কী করে বোঝাব? বেলদাতে মামাবাড়িতে ফোন এলেই আমি ছুটে আসতাম, ভাবতাম তুমি বোধহয় ফোন করেছ। বাড়ির সামনে গাড়ির হর্ন শুনলেই ভাবতাম, তুমি বোধহয় নিতে এলে। রোজ সন্ধেবেলায় একটা মাঠের ধারে, পুকুরের পাড়ে বসে সূর্যাস্ত দেখতাম একা একা। রোজ অস্তগামী সূর্যের কাছে প্রার্থনা করেছি, আমার বাবা যেন কালকে আমাকে নিতে আসেন। গ্রামের ছেলেরা ফুটবল খেলত, আমি মাঠের ধারে বসে থাকতাম। আমার কোনও বন্ধু ছিল না, আমি ছিলাম নিঃসঙ্গ। একটা ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলে পড়া ছেলেকে গ্রামের পাঠশালাতে ভরতি করে দেওয়া হয়—আমি তাদের সঙ্গে মিশতে পারতাম না, আমাকে সবাই খেপাত। কী কষ্ট পেয়েছি বাবা—'

শুভংকরবাবুর চোখ দিয়েও জল গড়িয়ে পড়ছে—'আর—একটা অন্যায় আমার সঙ্গে করা হল, বুবুনের আসল নাম ছিল শুভব্রত, শুভংকরের সঙ্গে মিলিয়ে। কেয়া ডিভোর্স করবার পরই আমাকে না জানিয়ে শুভব্রত নাম বদলে করে দেয় সৌরভ। এই কারণেই আমি বুবুনকে খুঁজে পাইনি, আমি মেদিনীপুর শহরের সমস্ত স্কুলে গিয়ে শুভব্রত মুখার্জি নামে কোনও বাচ্চাকে ভরতি করা হয়েছে কি না খুঁজেছি, প্রতিটা স্কুলে গেছি। সব জায়গাতেই এক কথা—শুভব্রত মুখার্জি নামে কোনও ছেলে ভরতি হয়নি। একবার মনে হল, আমার থেকে দূরে রাখবে বলে যদি কার্শিয়াং—কালিম্পং—দার্জিলিঙের কোনও হস্টেলে দিয়ে দেয়? আমি সেখানকার সব হস্টেলেও খোঁজ নিতে যাই। সেখানেও শুভব্রত মুখার্জি নামের কোনও ছাত্রকে পাই না। পাব কী করে? আমি তো ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পরিনি যে, শুভব্রত নাম বদলে সৌরভ করে দেওয়া হয়েছে, শুধু আমাকে কষ্ট দেবে বলে। কিন্তু, কষ্ট শুধু আমি একা পাইনি, আমার আদরের বুবুনও পেয়েছে।'

'তবে, আমি কিন্তু নিয়মিত বুবুনের বড়মামার অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠিয়ে গেছি। যদিও আমি জানতাম না ও কোথায় আছে, কেমন আছে, কী পরছে, খাওয়াদাওয়াই বা কী করছে, ওষুধপত্র লাগছে কি না—কিচ্ছু কোনওদিনও আমাকে জানানো হয়নি। বুবুন বেঁচে আছে কি না, আমি তা—ও জানতাম না। তবু, আমি নিয়মিত টাকা পাঠিয়েছি। বুবুনের মামার অ্যাকাউন্টে সে টাকা নিয়মিত জমা পড়েছে। তনুকা, ব্যাঙ্কের ডকুমেন্টগুলো দে তো মা'। —তনুকা আবার ব্যাগের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে একতাড়া কাগজ বের করে কন্দর্পনারায়ণের সামনে টেবিলে রাখল।

কন্দর্পনারায়ণ শ্রীপর্ণা, স্বাগতা, জয়শ্রীর দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে বললেন, 'এই প্রশ্নটা আমাদের মনেও এসেছে, সৌরভবাবুর স্কুলের খরচ, হস্টেলের খরচ কে জোগাতেন? সৌরভবাবু মা—বাবার স্নেহ—ভালোবাসা পাননি ঠিকই, কিন্তু তাঁর টাকাপয়সার জন্য তাঁর পড়াশোনা থমকেও যায়নি।'

সৌরভবাবু আবার কাতরে উঠলেন, 'ইসস, আমি কিচ্ছু জানতাম না, আমাকে কিচ্ছু বলা হয়নি, উলটে জার্মানিতে গিয়ে আমি নিয়মিত মামাবাড়িতে আর মা—কে টাকা পাঠিয়েছি। আমি মামাদের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা জানিয়েছি।'

এলাদেবী এবার উঠে গিয়ে ভেঙে—পড়া সৌরভবাবুকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দিতে থাকলেন।

এবার অত্যন্ত ম্যাচিওরড ভঙ্গিতে তনুকা আবার কথা বলল, 'আজকের আলোচনার শুরুটা আমি করেছিলাম, শেষটাও আমি করব। এইসব কথা পাপা উকিলবাবুর মাধ্যমে কোর্টেও বলতে পারতেন। কিন্তু, আমি আর মা, পাপাকে বোঝাই যে, দাদার পক্ষে মামলা করাটা যুক্তিযুক্ত। দাদা তো আর জানেন না, যে তুমি দাদার জন্য কত কষ্ট পেয়েছ। দাদা তো জানেন, তুমি দাদাকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে নতুন সংসার পেতেছ। কাজেই, দাদা তোমার বিরুদ্ধে পিতৃত্বের প্রমাণ চেয়ে মামলা করে কোনও অন্যায় করেননি। তবে এইসব কথা কোর্টে না বলে কোথাও বসে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করলেই ভালো হয়। কন্দর্পনারায়ণবাবুকে কে না চেনে? তাই যখন জানলাম উনিই দাদার ল'ইয়ার, তখন আমরা ঠিক করলাম ওঁকেই ফোন করে কোর্টের বাইরে আলোচনার প্রস্তাব দেব। দাদা আগে সত্যি ঘটনাগুলো জানুন, তারপর না হয় উনিই ঠিক করবেন, উনি কী করবেন।'

'আর—একটা কথার ক্লারিফিকেশন প্রয়োজন। পাপার সঙ্গে আমার মায়ের কোনওরকম বিয়েই হয়নি। শুভংকরবাবুকে, অর্থাৎ আমার পাপাকে আমরা পাই একেবারে বিধ্বস্ত অবস্থায়। দীর্ঘদিন মামলা করে, ছেলের জন্য দৌড়োদৌড়ি করতে করতে উনি পাগলপ্রায়। ওঁর চাকরিটিও চলে যায়। আজ থেকে দশ বছর আগে উনি ওঁর পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে আমাদের বাড়িতে ছোট্ট একখানা ঘরে ভাড়াটে হিসেবে আসেন। ওঁরও ততদিনে মা—বাবা গত হয়েছেন। এই পৃথিবীতে উনি তখন একা। আমার স্পষ্ট মনে আছে, আমার তখন পাঁচ বছর বয়স। আমার বাবাও আমার মা—কে আর আমাকে ছেড়ে চলে গেছেন। চূড়ান্ত দারিদ্র্য, মা সংসার চালাবার জন্য ওই ঘরটা ভাড়া দিয়েছিলেন। আর নিজেই একটা কুরিয়ার সার্ভিসের ব্যবসা খুলেছিলেন। পাপা আমাদের বাড়িতে ভাড়াটে হিসেবে আসার পর দু—বার স্ট্রোক হয়। বিছানায় পড়ে ছিলেন, অসহায় এক মানুষ। তখন তাঁর প্রেশার, শুগার, থাইরয়েড, ইউরিক অ্যাসিড কিচ্ছু বাদ নেই। ওঁর অবস্থা দেখে মা ওঁর জন্য রান্না করে দিতেন আর আমি খাইয়ে আসতাম। আমাকে দেখে ওঁর নিজের ছেলের কথা মনে পড়ে যেত, আর উনি আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতেন, আস্তে আস্তে ওঁর ওপর আমাদের মায়া পড়ে যায়। উনিও আমাদের কাছ থেকে যত্ন পেয়ে সেরে উঠতে থাকেন। মায়ের কুরিয়ার বিজনেসের উনি এখন ম্যানেজার। মা ওঁকে একটা মাইনে দেন। আমি জানি, সেই টাকাটা উনি আপনার কথা ভেবেই জমিয়ে রাখেন। উনি তো আর জানতেন না, আপনি জার্মানিতে গিয়ে অনেক উন্নতি করেছেন।'

শুভংকরবাবু আবার কথা বললেন, 'আমি জানতাম, কোনও না কোনওদিন তোর সঙ্গে আমার দেখা হবে।'

তনুকা সৌরভের দিকে তাকিয়ে বলল, 'কিছুদিন আগে পাপার যখন বাইপাস সার্জারি হল, তার আগে পাপা একটা উইল করেন। সেখানে উনি ওঁর যা সামান্য কিছু জমানো টাকাপয়সা আছে, সবকিছুই দু—ভাগ করে দিয়েছেন, এক ভাগ আমাকে আর এক ভাগ আপনার জন্য। আমাকে উনি বলেছিলেন, যদি ওঁর কিছু হয়ে যায়, উনি আর বেঁচে না থাকেন, আর যদি আপনাকে কোনওদিন খুঁজে পাই, আপনার অংশটা যেন আমি আপনাকে দিয়ে দিই।'

'যদিও মা—র সঙ্গে পাপার আইনত বিয়ে হয়নি, তবুও আমরা সবাইকে বলি, পাপা আর মা বিয়ে করেছেন। না হলে বোঝেনই তো, সমাজ তো আর ছেড়ে কথা বলবে না। আর আমাকে ছাড়া পাপা বাঁচবেন না, পাপাকে ছাড়া আমি বাঁচব না।'

তনুকার কথাগুলো শুনতে শুনতে সবার অবাক লাগছিল, সত্যি! এইটুকু মেয়ের কী ম্যাচিয়োরিটি! তনুকার মা দেবলীনা মুখার্জি এতক্ষণ একটি কথাও বলেননি। তিনি পাথরের মতো স্থির হয়ে বসে ছিলেন। এতক্ষণে তিনি মুখ খুললেন, 'আমরা অনেকবারই ভেবেছি, রেজিস্ট্রি করে বিয়ে করব। পরে মনে হয়েছে, কী লাভ তাতে? বিবাহিতা স্ত্রীর ব্যবহার তো দেখতেই পাচ্ছি। আমরা যদি বিয়ে না—করা সত্ত্বেও তনুকা বাবার ভালোবাসা কারও কাছ থেকে পায়, আমরা যদি একটা পরিবারের মতো এক হয়ে থাকতে পারি, যদি উনি আমাকে বোঝেন, আমি ওঁকে বুঝি, তাহলে কাগুজে বিয়ের আর দরকার কী? তবে আমি ওঁর কথা মনে করেই সিঁথিতে সিঁদুর পরি, কারণ আমি ওঁকে বিশ্বাস করি।'

শুভংকরবাবু মুখ খুললেন, 'শোন, আমি তোর বাবা, এটা আমি কোনওদিনই অস্বীকার করিনি, বরং তোকে কাছে পেতেই চেয়েছিলাম,' তারপর একটু থেমে বললেন, 'এই কথাগুলো তোকে মৃত্যুর আগে অন্তত বলতে চেয়েছিলাম। কোর্টের অর্ডারের জন্য অপেক্ষা করার দরকার নেই। আমি ব্লাড স্যাম্পল দিতে রাজি আছি। কবে, কোথায় যেতে হবে বলিস।' শুভংকরবাবুর চোখ দিয়ে জলের ধারা নেমে এল।

সৌরভবাবু এবার চেয়ার ছেড়ে উঠে গেলেন শুভংকরবাবুর সামনে—'একবার জড়িয়ে ধরবে না বাবা?'

শুভংকরবাবু উঠে সৌরভবাবুকে জড়িয়ে ধরলেন। কান্নার দমকে দু—জনেরই শরীর কেঁপে কেঁপে উঠতে লাগল।

ম্যারেজ রেজিস্ট্রি অফিস থেকে বেরিয়ে এসে গাড়িতে উঠলেন কন্দর্পনারায়ণ। মনটা আজকে বেশ ভালো। সৌরভবাবু আর এলাদেবীর উদ্যোগে শুভংকরবাবু আর দেবলীনা মুখার্জির রেজিস্ট্রি ম্যারেজ হল এই একটু আগে। মূলত এলাদেবীই জোর করছিলেন, তিনিই সবাইকে বোঝান। দেবলীনা মুখার্জি না থাকলে শুভংকরবাবু বাঁচতেনই না। আজকে সৌরভবাবু যে তাঁর বাবাকে ফিরে পেলেন, তাঁর কৃতিত্ব অবশ্যই দেবলীনাদেবী আর তনুকার প্রাপ্য। দেবলীনাদেবীর জীবনও তো অত্যন্ত দুঃখের, বাকি জীবনটা ওঁরও সম্মানের সঙ্গে বাঁচা উচিত। প্রথম যখন সৌরভবাবু আর এলাদেবী শুভংকরবাবু আর দেবলীনা মুখার্জির বিয়ের কথা তোলেন, তখন দু—জনেই খুব আপত্তি করেছিলেন, পরে অবশ্য দু—জনেই রাজি হয়ে যান। আজকে দু—জনের রেজিস্ট্রি ম্যারেজে সাক্ষী হিসেবে সই করলেন কন্দর্পনারায়ণ আর সৌরভবাবু নিজে।

সৌরভবাবু আর এলাদেবী এবার ফিরে যাবেন জার্মানিতে। সঙ্গে আরও তিনটে টিকিট কাটা হয়েছে, শুভংকরবাবু, দেবলীনাদেবী আর তনুকার। এক মাস থেকে ওঁরা অবশ্য আবার ফিরে আসবেন। তনুকার যাবতীয় দায়ভার নিয়েছেন সৌরভবাবু। দাদা হিসেবে এটুকু তো তিনি করতেই পারেন।

আর হ্যাঁ, সৌরভবাবু কোর্টে শুভংকরবাবুর বিরুদ্ধে ডি.এন.এ. টেস্ট চেয়ে মামলাটা আর চালাননি। ওঁর অনুরোধমতো কন্দর্পনারায়ণ কোর্টে গিয়ে মামলাটা তুলে নেন।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%