জয়ন্তনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
রোজ জগিং করে ফিরে এসে, চার—পাঁচটা খবরের কাগজের ওপর ঝুঁকে পড়েন কন্দর্পনারায়ণ। চেম্বারে এইসময়টায় কেউ থাকে না। এই সময়টায় খবরের কাগজগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়েন। অবশ্য সব ধরনের খবরে ওঁর কোনও ইন্টারেস্টই নেই, বিশেষত রাজনীতির খবরে। ক্রাইম নিউজগুলো শুধু মনোযোগ দিয়ে পড়েনই না, কিছু কিছু খবর তো আবার কেটে কেটে রেখে দেন। নিজের মতো করে বিশ্লেষণ করে দেখেন যে অপরাধী কে হতে পারে। বেশির ভাগ সময়েই অবশ্য পুলিশের তদন্তের সঙ্গে ওঁর বিশ্লেষণের রেজাল্ট মেলে না। পুলিশ তো বেশির ভাগ সময়েই দায় এড়ানোর মতো তদন্ত করে। আজকাল পুলিশ একটা শর্টকাট থিয়োরি অ্যাপ্লাই করছে। স্বামীর অস্বাভাবিক মৃত্যু হলে স্ত্রী—কে ওই মৃত্যুতে জড়িত থাকার সন্দেহে অ্যারেস্ট করছে, স্ত্রীর অস্বাভাবিক মৃত্যু হলে অবশ্যই স্বামী, শ্বশুরবাড়ির লোকেদের অ্যারেস্ট করছে আর কোনো বন্ধুর অস্বাভাবিক মৃত্যু হলে, অন্য বন্ধুদের অ্যারেস্ট করছে। একটা তদন্তেও ইনটেলিজেন্সের ছাপ নেই। নিত্যনৈমিত্তিক, গতানুগতিক তদন্ত। আসলে ভালো ছেলেরা তো আর পুলিশে আসেন না। ভালো ভালো ছেলেমেয়ে পুলিশ সার্ভিসে না এলে, তদন্তেই বা বুদ্ধিমত্তার ছাপ থাকবে কী করে? ফলে যা হবার তা—ই হচ্ছে, উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে গিয়ে চাপছে। বেশির ভাগ সময়েই আসল অপরাধীরা বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছে, আর নিরপরাধ লোকগুলোকে অন্যায়ভাবে ফাঁসিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
আসলে পুলিশের ওপর চাপ প্রচণ্ড। একই অফিসারকে দিয়ে ভি.আই.পি. ডিউটি করানো হবে, ল অ্যান্ড অর্ডার ডিউটি দেওয়ানো হবে, আবার সেই লোকটাই একটা খুন বা ডাকাতি বা রেপ—এর ঘটনার নিখুঁত তদন্ত করে আসল অপরাধীকে ধরবে, এটা হয় না। সেদিনই একটা সেমিনারে গিয়ে এ কথাই বললেন কন্দর্পনারায়ণ যে, ইনভেস্টিগেশন উইং বা যাঁরা তদন্তকারী অফিসার হবেন, তাঁদের একদম আলাদা করে দিতে হবে। প্রতিটি থানাতে তদন্ত করবার জন্য আলাদা অফিসার নিয়োগ করতে হবে। যিনি রাস্তার ধারে ভি.আই.পি. দের স্যালুট করার জন্য দাঁড়াবেন না বা লাঠি হাতে ল অ্যান্ড অর্ডার সামলাবেন না। কারণ, এটা বাস্তব যে, সারারাত কোথাও গণ্ডগোল সামলে, সেই অফিসারের পক্ষে আবার থানায় এসে বা কোনও ঘটনা ঘটলে, সেই স্পটে গিয়ে নিখুঁত তদন্ত করে আসল অপরাধীকে ধরা অসম্ভব। সেইজন্য নিখুঁত তদন্ত পেতে গেলে, তদন্তকারী অফিসারদের দিয়ে থানার অন্য কাজ করানো যাবে না।
গত সাত দিনে কলকাতায় চারটে খুনের ঘটনা ঘটেছে, সেগুলি সম্পর্কে পুলিশ একেবারে অন্ধকারে। খুনখারাপির ঘটনা তো রোজই ঘটে। তাতে অবাক হবার কিছু নেই। কিন্তু গত সাত দিনের মধ্যে এই চারটে খুনের ঘটনায় একটু অভিনবত্ব আছে বই কী। প্রথম দুটো খুনের ঘটনার খবর যখন উনি কাগজে পড়েন, তখন বৈশিষ্ট্যগুলো নজরে পড়েনি, বা উনি খেয়াল করতে পারেননি। কিন্তু আজকে পেপার কাটিং জমিয়ে রাখার ফাইলটা বের করে, আগের তিনটে খুনের খবর মিলিয়ে দেখে কন্দর্পনারায়ণ একেবারে নিশ্চিত হয়েছেন, যে গত সাত দিনে এই চারটে খুনের ঘটনায় অদ্ভুত মিল আছে। এই মিলটা পুলিশের চোখে পড়েছে কি না জানা নেই, কিন্তু যেহেতু কন্দর্পনারায়ণের একটা নেশা হল, ক্রাইম নিউজগুলো খুঁটিয়ে পড়া, ওঁর চোখে কিন্তু মিলটা ধরা পড়ে গিয়েছে।
প্রথম ঘটনাটা ঘটে গত বুধবার, এগারোই মার্চ। চব্বিশ বছর বয়সি হায়দার কাশিমের মৃতদেহ পাওয়া যায় ধাপার ধারে, একটা নয়ানজুলিতে। কাছেই একটা চামড়ার কারখানায় কাজ করতেন। রোজ ভোরবেলা অন্ধকার থাকতে তিনি কারখানার উদ্দেশে মোটর সাইকেলে রওনা হতেন। তাঁর বাড়ি যেহেতু বাইপাসের ধারে মুকুন্দপুর এলাকায়, সেখান থেকে মোটর সাইকেলে করে তিনি রোজ যাতায়াত করতেন। খুনটা ভোরবেলাতে হয়েছে।
দ্বিতীয় ঘটনাটা ঘটে শুক্রবার। সোদপুর স্টেশন থেকে রেললাইন ধরে পাঁচ মিনিট হাঁটলে একটা সরু গলি পড়ে। সেইখান থেকে গলিতে উঠে বড়ো রাস্তার দিকে এগোলে একটা অটো স্ট্যান্ড পড়ে। ওই স্ট্যান্ডের অটোগুলো পূর্বপল্লির দিকে যায়। ওই সরু গলির মুখে গোবিন্দ ধর বলে বাইশ বছর বয়সি একজনের মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখা যায়। খুনটা কখন হয়েছে বলা না গেলেও ধরে নেওয়া হচ্ছে, খুনটা রাতেই হয়েছে। গোবিন্দ ধর বলে ভদ্রলোক সোদপুর স্টেশনে নেমে অটো ধরবেন বলে রেললাইন ধরে হেঁটে যাচ্ছিলেন। একটা নির্জন জায়গায় খুনটা হয়।
তৃতীয় ঘটনাটা ঘটে রবিবার। ডায়মন্ডহারবার রোডের ওপর পৈলান আর খড়িবেড়িয়ার মাঝখানে রাস্তার ধারে রাজকুমার পাল নামে বাইশ বছরের এক যুবকের দেহ পড়ে থাকতে দেখা যায়।
চতুর্থ ঘটনাটা মঙ্গলবার, অর্থাৎ গত পরশু গড়িয়া ঢালাই ব্রিজের কাছে বারুইপুর বাইপাসে যাবার পথে, একটা গ্যারাজের সামনে সামসুল বলে একজন একুশ বছর বয়সি যুবকের দেহ মুখ থুবড়ে পড়ে থাকতে দেখা যায়।
তিন আর চার নম্বর খুনের ক্ষেত্রেও পুলিশের ধারণা, হয় গভীর রাতে অথবা ভোরবেলায় খুন দুটো হয়েছে।
আলাদা আলাদা চারটে খুনের ঘটনা, খুব উত্তেজক বা মিডিয়া হাইলাইটেড কেসও নয়। বরং চারটে ঘটনাই খবরের কাগজের ভেতরের পাতার ছোটো খবর। কোনও নেতা বা ভি.আই.পি. কেউ খুনও হননি। এরকম ঘটনা প্রায় রোজই হচ্ছে। প্রতিটি খবরের শেষে লেখা হয়েছে, 'পুলিশ তদন্ত করছে।' এই কথাগুলোতে হাসি পায়। নিরপেক্ষ, সৎ, সুষ্ঠু তদন্ত ক—টা হয়? গতানুগতিক, নিয়মমাফিক, গেঁতো, দায়সারা তদন্ত দেখতেই ভারতবাসী অভ্যস্ত। হাইকোর্টে একবার একটা মার্ডার কেসের মামলা করতে গিয়ে আলাপ হয়েছিল এমনই এক তদন্তকারী অফিসারের সঙ্গে। রোগা ডিগডিগে, তার মধ্যে একটা বড় ভুঁড়ি, রিটায়ারমেন্টের মুখে প্রায়, কনস্টেবল থেকে প্রোমোশন পেয়ে অ্যাসিস্ট্যান্ট সাব—ইন্সপেক্টর হয়ে একেবারে শেষের দিকে সাব—ইন্সপেক্টর হয়েছেন। জেলার এক প্রান্ত থেকে এসেছিলেন। তাঁর মধ্যে না ছিল বুদ্ধির ছাপ, না কিছু করে দেখানোর আগ্রহ। ফলে যা হবার তা—ই হয়েছিল। খুনের অপরাধে ভুল লোককে অ্যারেস্ট করে রেখে দিয়েছিলেন। আর তদন্তের নামে প্রহসন হয়েছিল। হাইকোর্ট খুব কড়া ভাষায় শাসন করেছিলেন। আর রাজ্য পুলিশের ডি.জি.—কে বলেছিলেন, এই ধরনের ক্যালাস, দায়িত্বজ্ঞানহীন লোককে দিয়ে ভবিষ্যতে খুনের ঘটনার তদন্ত না করাতে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটা লাইন চারটে ঘটনাতেই উঠে এসেছে, সেটা হল, প্রতিটা খুনের ক্ষেত্রেই 'ছুরি দিয়ে খুন করে ক্ষতস্থান খুঁচিয়ে ঘেঁটে দেওয়া হয়েছে।' এই লাইনটাই কন্দর্পনারায়ণের সবচেয়ে স্ট্রাইকিং লাগল। কন্দর্পনারায়ণ চারটে খবরকে পাশাপাশি রেখে, ডায়েরিতে কিছু নোট নিলেন।
চারটি ঘটনা চার জায়গায়, চারটি ভিন্ন ভিন্ন দিনে। অকুস্থল আলাদা, আপাতদৃষ্টিতে চারটে আলাদা ঘটনা, কিন্তু একটা অদ্ভুত মিলই চারটে ঘটনাকে এক সুতোয় গেঁথে দিচ্ছে। হতে পারে, চারটে খুন আলাদা আলাদা আততায়ীর ঘটানো। কিন্তু এটাও ঠিক যে, চারটে খুনের ঘটনাতে খুনের ধরনটা এক। একটা সিগনেচার ব্র্যান্ডের মতো। তা ছাড়া, কোথাও পুলিশকে চ্যালেঞ্জ জানাবার একটা ভঙ্গিও লুকিয়ে রয়েছে। যেন আমি প্রতিটি খুন করেই আমার সিগনেচার রেখে যাচ্ছি—পারো তো আমাকে ধরো।
চারটি ঘটনা—
প্রথম ঘটনা—বুধবার এগারোই মার্চের। খুন হন হায়দার কাশিম। চব্বিশ বছর বয়স। ধাপার কাছেই চামড়ার কারখানায় কাজ করতেন। কাছেই নয়ানজুলিতে মৃতদেহ পাওয়া যায়। খুনের সময় ভোরবেলা। সারা গায়ে ছুরির আঘাত। কিন্তু বুকের মূল ক্ষতস্থান বা আইনি পরিভাষায় যাকে বলে 'মার্ডারাস অ্যাসল্ট' সেই জায়গাটা খুঁচিয়ে ঘেঁটে দেওয়া হয়েছে। জেলা কলকাতা।
দ্বিতীয় ঘটনা—তেরোই মার্চ, শুক্রবারের। খুন হন গোবিন্দ ধর। বাইশ বছর বয়স। সোদপুর স্টেশনের কাছে রেললাইনের ধারের ঘটনা। খুনের সময় আনুমানিক রাতের দিকে। একটু নির্জন স্থানে, রেললাইনের ধারে। উত্তর চব্বিশ পরগণা জেলা।
তৃতীয় ঘটনা—রবিবার পনেরোই মার্চের। রাজকুমার পাল খুন হন, বাইশ বছর বয়স। পৈলান আর খড়িবেড়িয়ার মাঝখানে রাস্তার ধারে মৃতদেহ পাওয়া যায়। দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলা।
চতুর্থ ঘটনা—মঙ্গলবার সতেরোই মার্চ সামসুল খুন হন। একুশ বছর বয়স। গড়িয়া ঢালাই ব্রিজের কাছে, রাস্তার ধারে মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখা যায়। এটিও দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার ঘটনা।
কয়েকটা মিল পাওয়া গিয়েছে, সেগুলোকে ডায়েরিতে নোট নিলেন কন্দর্পনারায়ণ।
প্রথম মিল—মৃত চারজনের বয়স একুশ থেকে চব্বিশ বছর। অর্থাৎ কাছাকাছি বয়স।
দ্বিতীয় মিল—চারটে খুনই হয়েছে গভীর রাতে অথবা ভোরের দিকে।
তৃতীয় মিল—চারটে খুনের সময়ই ভিকটিমরা অর্থাৎ মৃত ব্যক্তিরা একা ছিল। অর্থাৎ হয় একা একা কাজে যাচ্ছিল, না হয় কাজের থেকে ফিরছিল। হতে পারে, আততায়ী বা আততায়ীরা ভিকটিমদের যাওয়া—আসা স্টাডি করে রেখেছিল। তারপর সুযোগ বুঝে আক্রমণ করে। যদি আততায়ী একা হয়, সে যথেষ্ট শক্তিশালী ও বুদ্ধিমান। ভিকটিমরা প্রত্যেকেই যুবা বয়সের। যদিও কন্দর্পনারায়ণ মৃত ব্যক্তিদের দেখেননি। তবুও ধরে নিচ্ছেন, খুব একটা দুর্বল তারা ছিল না। আততায়ী একা হলে, সে প্রতিটি ভিকটিমের গতিবিধি নজরে রেখে, যখন যখন তারা একা একা ঘরে ফিরছে অথবা কাজে যাচ্ছে, সেইসময় বেছে বেছে তাদের খুন করেছে। একাধিক আততায়ী হলে আততায়ীদের কনফিডেন্স বেশি হয়ে যায়। তারা লোকজনের মধ্যেও খুন করবার সাহস রাখে। কিন্ত এখানে আততায়ী সুযোগের অপেক্ষা করেছে। নির্জন জায়গায় ভিকটিমকে একা পেয়ে আক্রমণ করেছে।
চতুর্থ এবং সবচেয়ে ভাইটাল মিল—খুনের ধরন। একাধিক আঘাত এবং মূল আঘাতটা ছুরি দিয়ে ঘেঁটে দেওয়া। যেন খুন করে ইচ্ছা করেই কোনও ছাপ ছেড়ে যাওয়া। অর্থাৎ পুলিশকে যেন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছে—'আয়, পারিস তো ধর।'
এসবই অবশ্য কন্দর্পনারায়ণের ধারণা। হতে পারে, যে এইসব চিন্তার কোনও প্রয়োজন নেই। ওই চারটে খুনই চারটে বিচ্ছিন্ন ঘটনা, কোনও মিল নেই। আসলে কন্দর্পনারায়ণ খবরের কাগজের খবরগুলো দেখে নিজে নিজে রিসার্চ করতে ভালোবাসেন। কখনো কখনো পুলিশের তদন্তের সঙ্গে মিলেও যায়, আবার বেশির ভাগ সময় মেলেও না। তবে ক্রিমিনাল সাইকোলজি নিয়ে এই ধরনের রিসার্চ ওঁর খুব পছন্দের বিষয়। তাতে একটা লাভ অবশ্যই হয়। বিভিন্ন ধরনের ক্রিমিনাল সাইকোলজির বিষয় নিয়ে পড়াশোনাটা হয়।
বেশ কিছু ইনফর্মেশন দরকার। আবার পুলিশকে গিয়ে তাঁর এই সন্দেহের কথা বললে, পুলিশ পাত্তাও দেবে না। ইনফর্মেশনও দেবে না। তবে, বন্ধুবান্ধব যাঁরা পুলিশে আছেন, তাঁদের কথা আলাদা। কলকাতার বেশ কয়েকটা বড় বড় ক্রাইম সলভ করার ক্ষেত্রে কন্দর্পনারায়ণের পরামর্শ তাঁরা নিয়েছিলেন। কন্দর্পনারায়ণও একইভাবে যখনই প্রয়োজন, তখনই পুলিশের সাহায্য পেয়েছেন। এই চারটে খুনের ঘটনা অবশ্য চারটি ভিন্ন থানার। ধাপার ধারের খুনটা অর্থাৎ প্রথম খুনটা কলকাতা পুলিশ তদন্ত করছে, বাকি তিনটে খুনের মধ্যে দুটো দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলা পুলিশ আর একটা উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলা পুলিশ। প্রথম খুনটার ক্ষেত্রে না হয় কলকাতা পুলিশের হোমিসাইড ডিপার্টমেন্টকে কন্দর্পনারায়ণ—এর এই সন্দেহের কথা বলা যায়, যাতে তদন্তটা তাঁরা ওই অ্যাঙ্গলে করেন। ওখানকার এ.সি.পি. অতনু ব্যানার্জি, দুঁদে গোয়েন্দা। কন্দর্পনারায়ণের সঙ্গে বহুদিনের পরিচয়, ওঁর স্ত্রী আবার কন্দর্পনারায়ণেরই ব্যাচমেট। সেই সুবাদে অতনুদাকে সব খুলে বলা যেতেই পারে। অতনুদা হয়তো শুনবেনও কিন্তু বাকি খুনগুলো তো আলাদা জুরিসডিকশনে ঘটেছে। সবচেয়ে ভালো হত, যদি একই ইনভেস্টগেশন এজেন্সিকে দিয়ে তদন্ত করানো যেত। আলাদা আলাদা চারটে খুন, চারটে জায়গায়। আলাদা আলাদা চারটে থানার আন্ডারে। একই এজেন্সির পক্ষে চারটের ইনভেস্টিগেশন করা অসম্ভব। সি.আই.ডি.—র ডি.আই.জি.—র সঙ্গেও কন্দর্পনারায়ণের খুব ভালো পরিচয়। ওঁকেও কন্দর্পনারায়ণের এই সন্দেহের কথা বলা যেতেই পারে।
চেম্বারের দেওয়ালে টাঙানো বহুদিনের পুরোনো সুইস ক্লকটা জানান দিল, বেলা ন—টা বাজে। 'নাঃ, আজ আর সময় নেই। পরে আবার এই মার্ডারগুলো নিয়ে ভাবব। না হলে কোর্টে দেরি হয়ে যাবে।' ফাইল, ডায়েরি গুছিয়ে কন্দর্পনারায়ণ উঠে পড়লেন।
কোর্টে সারাদিন মাথার মধ্যে একটা খচখচানি থেকে গেল। চারটে মার্ডার করার ভঙ্গি এক বা খুন করার স্টাইল অদ্ভুত। ছুরি দিয়ে ক্ষতস্থানটা ঘেঁটে দেওয়া। কোথায় যেন এরকম একজন খুনির কথা পড়েছিলেন, কিছুতেই মনে আসছে না।
কোর্ট থেকে ফিরে চেম্বারে বসেও বারে বারে মনের মধ্যে ফিরে আসছে চারটে খুনের মধ্যে অদ্ভুত সাদৃশ্যের কথা। চারটে খুনের ক্ষেত্রেই যদি মৃত ব্যক্তিদের পোস্টমর্টেম রিপোর্টগুলো পাশাপাশি ফেলে দেখা যেত, তাহলে খুব ভালো হত। তা ছাড়া, আরও খুঁটিনাটি যদি কিছু প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যেত—যেমন চারজন মৃত ব্যক্তি কি পরস্পরের চেনা? বা কখনো পরিচয় হয়েছিল? এমন নয় তো, ওই চারজনের কোনও কমন শত্রু ছিল? সেই কমন শত্রুই কি খুঁজে খুঁজে চারজনকে খুন করল?
রাত্রে খাওয়াদাওয়ার পর স্ত্রী—কে বললেন, 'তুমি শুয়ে পড়ো। আমাকে একটু পড়াশোনা করতে হবে।'
কন্দর্পনারায়ণ এসে ঢুকলেন তাঁর প্রিয় লাইব্রেরি কাম রেকর্ড রুমে। কুড়ি—বাইশ বছর ধরে ওকালতি করছেন। তারও আগে থেকে, অর্থাৎ ওকালতি পাশ করার আগে থেকেই তাঁর বিভিন্ন ইন্টারেস্টিং ক্রাইম নিউজের পেপার কাটিং জমানো তাঁর নেশা। বলতে গেলে, ক্রাইম নিউজের প্রতি অদম্য আকর্ষণই তাঁকে ওকালতি পড়বার প্রতি আগ্রহ জুগিয়েছে। এমন নয় যে, অন্য কিছু হতে হতে তিনি উকিল হয়ে গিয়েছেন। ছোটবেলায় যখন তাঁকে কেউ জিজ্ঞাসা করতেন, 'তুমি বড় হয়ে কী হবে?' উনি বলতেন, 'ক্রিমিনাল ল'ইয়ার হব', আবার অনেকে জিজ্ঞাসা করতেন, 'ধরো তুমি ল'ইয়ার হলে না, তোমার দ্বিতীয় পছন্দ কী?' —উনি জোর দিয়ে বলতেন, 'আমি ক্রিমিনাল ল'ইয়ার হব, আমি ক্রিমিনাল ল'ইয়ারই হব।'
লাইব্রেরি ঘরে প্রায় তিরিশ বছরের সব পুরোনো পেপার কাটিংও রাখা আছে। এই ধরনের খুন করার ধরন কার যেন ছিল—উনি কাগজে পড়েছিলেন। তিরিশ বছরের পুরোনো সব পেপার কাটিংয়ের ফাইল তিনি ঘাঁটতে লাগলেন। তিরিশ বছর ধরে জমিয়ে রাখা পেপার কাটিং!!
চারদিক নিস্তব্ধ হয়ে গিয়েছে, গোটা পাড়াই ঘুমিয়ে পড়েছে। কন্দর্পনারায়ণের লাইব্রেরি ঘরে আলো জ্বলছে। তিনি মেঝেতে একটার পর একটা ফাইল বের করে ছড়িয়ে রেখে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছেন। এক ধরনের পাগলামিতে পেয়ে বসেছে। বহু বছর আগে এই ধরনের একটার পর একটা খুন কলকাতাকে চমকে দিয়েছিল। অবশেষে পুলিশের জালে ধরা পড়ে অপরাধী। সেইসময় অবশ্য কলকাতা পুলিশের রহস্যভেদ করবার ক্ষমতা অন্য মানের ছিল।
মাঝখানে উঠে গিয়ে একবার বেসিন থেকে চোখে, মুখে, ঘাড়ে জল দিয়ে এলেন। ঘাড়, পিঠ টনটন করছে। যা খুঁজছেন তা না পেলে আজ রাতে আর ঘুম হবে না।
প্রায় ভোরের দিকে তিনি খুঁজে পেলেন। উনিশশো নিরানব্বই—দু—হাজার সাল নাগাদ পরপর কতগুলো খুনের ঘটনায় কলকাতা কেঁপে উঠেছিল। এক সিরিয়াল কিলার কলকাতার মানুষের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল। তার খুনের ধরনটা ছিল অদ্ভূত। ছোট ধারালো ছুরি খুনের জন্য ব্যবহার করত। মৃত ব্যক্তির শরীরে ধারালো ছুরি দিয়ে আঁকিবুকি করে দিত। তারপর বুকে ছুরিটা গেঁথে দিত। মূল ক্ষতস্থানটা ওই ছুরি দিয়েই ঘেঁটে দিত। অদ্ভুত একটা সিগনেচার ব্র্যান্ড তৈরি করেছিল এই সিরিয়াল কিলার। কলকাতা ও তার আশপাশে প্রায় ন—টা খুন করেছিল। অবশেষে দু—হাজার সালে কলকাতা পুলিশের জালে সে ধরা পড়ে। লোকটার নাম ছিল মার্শাল। মার্শাল নাম শুনলে হয়তো ওয়েস্ট ইন্ডিজের ফাস্ট বোলার ম্যালকম মার্শালের নাম আর চেহারা মনে পড়ে যাবে, কিন্তু আসলে এই মার্শাল লোকটা ছিল অত্যন্ত রোগাপটকা আর ক্ষিপ্র। ধূর্ত বুদ্ধির সঙ্গে সে মিশিয়ে দিয়েছিল ক্ষিপ্রতা। কলকাতা পুলিশের স্পেশাল একটা ফোর্স শুধু ওকে ধরবার জন্যই তৈরি হয়েছিল। পরে ওকে জেরা করার সময় ও বলেছিল যে ও একজন শিল্পী। খুন করাটাকে ও একটা শিল্পকর্ম মনে করে। গ্রেপ্তার হবার পর ওর মামলা চলাকালীন দু—হাজার পাঁচ সালে জেলের মধ্যেই অসুস্থ হয়ে মারা যায়।
কন্দর্পনারায়ণের মনের মধ্যের খচখচানিটা দূর হয়েছে। তাহলে, এই চারটে খুনের সঙ্গে মার্শাল যে স্টাইলে খুন করত, সেই স্টাইলের মিল রয়েছে! প্রশ্ন হল, এই মিলটা কী করে হল? চারটে ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় খুনের মধ্যে মিল থাকাটা সম্ভব? যদি মিল থেকে যায়, মিলটা এল কী করে? ওই চারটে লোকের খুনি কি মার্শালকে চিনত? মার্শালেরই শিষ্য? অথবা চারটে খুনের মধ্যে কোনও মিল বা সম্পর্কই নেই, খুনের ধরনের মধ্যে মিল থাকাটা নিতান্তই কাকতালীয় ঘটনা?
প্রায় ভোর হয়ে আসছে। কন্দর্পনারায়ণ বিছানায় শুয়ে শুয়ে চারটে খুন নিয়েই ভাবছিলেন। কাকেই বা বলবেন মনের এই খচখচানির কথা? কন্দর্পনারায়ণ যখন পেশায় আসেন, প্রচুর ভালো ভালো পুলিশ অফিসারের সান্নিধ্য পেয়েছিলেন। তাঁদের সঙ্গে কন্দর্পনারায়ণের সম্পর্ক ছিল ভালো। তাঁরা এখন চাকরিতে থাকলে, তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করা যেত। কন্দর্পনারায়ণও তাঁর সন্দেহের কথা শেয়ার করতে পারতেন। সন্ধি মুখোপাধ্যায়, বাণীব্রত বসুর মতো অফিসাররা হয় রিটায়ার করেছেন, না হয় কন্দর্পনারায়ণের সঙ্গে আর যোগাযোগ নেই। তবুও বিভিন্ন ঘটনার সমাধান করার চেষ্টা করাটা তাঁর কাছে একটা খেলা—ধাঁধার সমাধান করার মতো চ্যালেঞ্জিং।
নাঃ, আর ঘুম হবে না। সত্যি সত্যি যদি মার্শালের খুন করার স্টাইলটা ফলো করে এই লোকটা বা লোকগুলো খুন করে, তাহলে তাকে বা তাদের ধরাটা নিশ্চয়ই চ্যালেঞ্জিং হয়ে যাবে! উত্তেজনায় থরথর করে কেঁপে উঠলেন। বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লেন। তার চেয়ে বরং খোলা হাওয়ায় ঘুরে আসা যাক। টি—শার্ট, ট্র্যাক স্যুট আর স্নিকারটা পরে নিলেন। মা, স্ত্রী, ছেলে সবাই ঘুমোচ্ছেন। আজকে না হয় একটু আগে আগেই জগিংয়ে বেরোবেন। ডলার পায়ের শব্দে মাথা তুলে দেখল। বিরাট চেহারাটা নিয়ে ঘরের মাঝখানে শুয়ে আছে। কন্দর্পনারায়ণ রোজই বেরোন দৌড়োতে। আজ বরং অন্ধকার থাকতে থাকতে বেরোচ্ছেন। ডলারও একটু অবাক। ভুরুটা কুঁচকে বোধহয় সেটাই ভাবছে।
গল্ফগ্রিনের রাস্তায় পড়েই রীতিমতো ছুটতে শুরু করলেন। আজকে উনি দৌড়োবেন। একটা আনন্দ খুঁজে পাচ্ছেন। ভোর হয়ে আসছে। রাস্তার আলোগুলো এখনও নেভেনি। একটা—দুটো এ.সি. ট্যাক্সি ছুটে যাচ্ছে। পরিবেশটা দারুণ ভালো লাগছে। ফাঁকা রাস্তা। একজন প্রফেশনাল রানারের মতো দৌড়ে যাচ্ছেন। দূরদর্শন কেন্দ্রটা ছাড়িয়ে আরও স্পিড তুললেন। বেশ মজা লাগছে। মামলা করতে গেলে একটা টেনশন থাকে। জজ সাহেবদের স্যাটিসফাই করো, ক্লায়েন্টকে স্যাটিসফাই করো। ফিজ নিয়ে কাজ করতে হয়। কাজেই ল'ইয়ারদের দায়িত্ববোধ থাকে অনেক বেশি। বরং নিজের খেয়ালখুশিমতো কেস সলভ করার ক্ষেত্রে কোনও চাপ নেই। মনের আনন্দে এগিয়ে চলা। মার্শালের খবরের পেপার কাটিংগুলো খুঁজে পাওয়ায় অদ্ভুত শান্তি লাগছে। সাধারণ ঘরের ছেলে কন্দর্পনারায়ণ নিজের উদ্যমে নিজের যোগ্যতায় এত দূর এগিয়েছেন। কারও কাছে নিজেকে বিক্রি করে দেননি। মাথা উঁচু করে থেকেছেন। হাইকোর্টের প্রবীন আইনজীবী আশিস সান্যাল একবার ওঁকে ডেকে বলেছিলেন, 'কন্দর্পনারায়ণ, এরকমই মেরুদণ্ড সোজা রেখো, চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারবে।' 'ইয়েস স্যার। মেরুদণ্ড আমি সোজা রাখব।' দৌড়ের স্পিড অনেকটা বাড়িয়ে দিলেন কন্দর্পনারায়ণ, টি—শার্ট ঘামে জবজবে। হাপরের মতো উঠছে—নামছে বুক। কেন যেন দৌড়োতে খুব ভালো লাগছে। থামতে আর ইচ্ছেই করছে না।
হাইকোর্টের একতলার প্রেস কর্নারে একটা জরুরি মিটিং। ঋজু বসু, মেহবুব কাদের চৌধুরি আর অমিত চক্রবর্তী। তিনজনই কাগজের নামকরা রিপোর্টার। অমিত প্রেস কর্নারেই ইলেকট্রিক কেটলে জল গরম করে চা করলেন। সবাইকে কাপে ঢেলে দিতে দিতে বললেন, 'দাদা বলো, জরুরি মিটিং কেন?' তিনজনই কন্দর্পনারায়ণে থেকে বয়সে ছোট। পেশাগত কারণে আলাপ হলেও এখন একেবারে আন্তরিক সম্পর্ক। আত্মীয়ের বেশি।
গরম চায়ে চুমুক দিতে দিতে কন্দর্পনারায়ণ পুরো ঘটনাটা খুলে বললেন, 'এগারো, তেরো, পনেরো, সতেরো। মার্চ মাসের এই চারটে দিনে চারটে খুন। চারটে জায়গায়, চারটে আলাদা থানার অধীনে। কিন্তু খুনের ধরনে অদ্ভুত মিল। যে মিল দেখা গেছে উনিশশো নিরানব্বই—দু—হাজার সালের সিরিয়াল কিলার মার্শালের খুনের ভঙ্গির বা ধরনের সঙ্গে।
কন্দর্পনারায়ণ পুরোনো পেপার কাটিংগুলো সবার সামনে মেলে ধরলেন।
'হুঁ! বলো, আমাদের কাছ থেকে কী কী সাহায্য চাও।'—ঋজু মুখ খুললেন।
কন্দর্পনারায়ণ অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে চায়ে চুমুক দিতে দিতে বললেন,'দেখো, হতে পারে, আমার এই সন্দেহের কোনও ভিত্তি নেই। প্রথমত আমি চাইছিলাম আমার সন্দেহের কথা কারও সঙ্গে শেয়ার করতে। তোমাদের ধন্যবাদ। দ্বিতীয়ত, আমি এই তদন্তটা একা করতেই পারব না। তোমাদের সাহায্য ছাড়া।'
'কী সাহায্য চাইছ?' —অমিত বললেন।
'এক নম্বর, চারটে খুনের পোস্টমর্টেম রিপোর্ট লাগবে। আমি মিলিয়ে দেখব, মৃতদের শরীরে ছোট ছুরির আঁকিবুকি আছে কি না? চারটে খুনেরই মৃতদের শরীরের ইনজুরি রিপোর্টগুলো পরীক্ষা করে দেখব।
'দুই, চারজনের মধ্যে কোনও সম্পর্ক আছে নাকি, বা বন্ধুত্ব অথবা অন্য কোনওরকম সম্পর্ক। হতে পারে, ওরা একই কলেজে পড়ত অথবা কোনও কমন এনিমি? যে সম্ভাবনা খুব বেশি।
'তিন নম্বর, খুনগুলোর জন্য কোনও অভিযুক্তকে আজ অবধি পুলিশ অ্যারেস্ট করেছে কি না? যদি কেউ অ্যারেস্ট হয়ে থাকে, তারা কারা? তোমরা সবাই সিনিয়র রিপোর্টার, তোমরা পুলিশের কাছে তদন্ত কতটা এগিয়েছে জিজ্ঞেস করলে, পুলিশ তোমাদের বলবেই। আমাকে বলবে না।'
মেহবুব এতক্ষণ চুপ করেই ছিলেন। মুখ খুললেন, 'দাদা, তুমি আচ্ছা পাগল! কী যে তোমার রহস্য সমাধানের নেশা! তবে তোমাকে হ্যাটস অফ। আমরা সবাই তোমার সঙ্গে আছি।'
ঋজু বললেন, 'দাদা। আর বসব না। আমার অন্য অ্যাসাইনমেন্ট আছে। কালকে বিকেল চারটেয় আবার এখানে এসে বসছি। দেখি, তোমার জন্য কী করা যায়।'
কন্দর্পনারায়ণ পিছু ডাকলেন—'এক মিনিট, তোমরা নামকরা কাগজের সিনিয়র রিপোর্টার। আমার লজ্জা করছে, তোমাদের আমি কষ্ট দিচ্ছি। আসলে আমি জাস্ট দেখতে চাই, আমি ঠিক না ভুল।'
সন্ধের মধ্যেই পর পর তিনটে ফোন। চারটে খুনের ঘটনারই মৃত ব্যক্তিদের পোস্টমর্টেম রিপোর্ট পাওয়া গিয়েছে। কন্দর্পনারায়ণের সন্দেহই ঠিক। মৃত ব্যক্তিদের সারা শরীরে ছুরির আঁকিবুঁকি। সবশেষে, মোক্ষম আঘাত বুকের বাঁদিকে। চার ইঞ্চি গভীরে ছুরি ঢুকিয়ে ক্ষতস্থান ঘেঁটে দেওয়া হয়েছে।
ইলেকট্রিক কেটলে গরম জলে চা—পাতা ছাড়তে ছাড়তে অমিত বললেন, 'কন্দর্পনারায়ণদা, তোমার কথা মানতে গেলে তো এটাও মানতে হবে যে, মার্শাল আবার ফিরে এসেছে।'
কন্দর্পনারায়ণ টেবিলে তবলা বাজানোর ভঙ্গিতে বললেন, 'অথবা মার্শালের কোনও শিষ্য যদি হয়?''
ঋজু বললেন, ''আমিও এটাই ভাবছিলাম। মনে রেখো, মার্শাল যখন জেলের ভেতরেই অসুস্থ হয়ে মারা যায়, সেটা দু—হাজার পাঁচ সাল। সেই সময় ওই লোকগুলো, যারা খুন হয়েছে, তাদের বয়স ছিল—পাঁচ, ছয় বা সাত বছর। তার মানে, মার্শালের সঙ্গে ওদের কোনও সম্পর্ক না—থাকারই কথা। মার্শাল তো জেলেই ঢুকেছে দু—হাজার দুই সাল নাগাদ। অর্থাৎ আঠারো—উনিশ বছর আগে। বরং এই লোকটা, যাকে আমরা বলছি মার্শালের শিষ্য, সে হয়তো স্টাইল নিয়েছে মার্শালের, কিন্তু সে খুনগুলো করছে পারসোনাল শত্রুতা থেকেই।' সবাই একমত হলেন।
কন্দর্পনারায়ণ প্রশ্ন করলেন, 'আচ্ছা, যে লোকগুলো খুন হয়েছে, তাদের নিজেদের মধ্যে কোনও সম্পর্ক পেলে? বয়স দেখে মনে হচ্ছে ওরা কাছাকাছি বয়সের। পরস্পর পরিচিত হলেও হতে পারে।'
মেহবুব বললেন, 'আলাদা আলাদা থানার পুলিশ তদন্ত করছে। ওদের এই ব্যাপারটা মাথাতেই আসেনি। আমিও পুলিশকে কিছু বলিনি। তবে এটা ঠিক, যে পুলিশ ক্লুলেস। কাউকে ধরতেই পারেনি। হাসির ব্যাপার হল, চারজন মৃত ব্যক্তির চতুর্থজন, সামসুল, যার ডেডবডি পাওয়া গেছে গড়িয়া ঢালাই ব্রিজের কাছে, একুশ বছর ওর বয়স। ওই কেসের ইনভেস্টিগেটিং অফিসার বললেন, ওর মায়ের নাকি একটা এক্সট্রা—ম্যারাইটাল অ্যাফেয়ার থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। একটু ওয়েট করে ওর মা—কে অ্যারেস্ট করে নেবে, প্রেমিকের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে ছেলেকে মারার অপরাধে। সামসুল নাকি ওর মায়ের এই অ্যাফেয়ারটার কথা জেনে গিয়েছিল।'
কন্দর্পনারায়ণ অস্ফুটে বললেন, 'বোঝো। এই তো তদন্তের হাল!'
মেহবুব আবার শুরু করলেন, 'ওদিকে চারটে খুনের মধ্যে আমাদের হিসেব অনুযায়ী প্রথম খুন হয় ধাপার ধারে, হায়দার কাশিম, পুলিশ তার নিজের ভাইকে তুলে নিয়েছে। কয়েকদিন আগে নাকি ভাইয়ে ভাইয়ে ঝগড়া হয়েছিল। পাড়া—প্রতিবেশীরা পুলিশকে জানিয়েছে।'
কন্দর্পনারায়ণ আবার বললেন, 'যাব্বাবা। তার মানে দাঁড়াচ্ছে, আমরা নিজেরা তদন্ত করে আসল খুনিকে না ধরলে এই নির্দোষ লোকগুলো বেঘোরে মরবে।'
কন্দর্পনারায়ণ গতকালই সন্ধেবেলাতেই ঋজু, অমিত আর মেহবুবকে জানিয়ে দিয়েছিলেন, আজকে সাড়ে দশটায় আলিপুরে প্রেসিডেন্সি সংশোধনাগার বা প্রেসিডেন্সি জেলে একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট করা হয়েছে। দীপ্ত ঘোড়ই, প্রেসিডেন্সি জেলের সুপারের সঙ্গে কন্দর্পনারায়ণের অনেকদিনের বন্ধুত্ব। গতকাল সকালে কন্দর্পনারায়ণ ফোন করেন দীপ্তবাবুকে। সংক্ষেপে, কলকাতায় ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক পর পর চারটে খুনের ঘটনা, সেই খুনগুলোর ক্ষেত্রে খুনির রেখে যাওয়া 'সিগনেচার স্টাইল'—এর এবং কন্দর্পনারায়ণের সন্দেহ অনুযায়ী বহু আগের কুখ্যাত সিরিয়াল কিলার মার্শালের সিগনেচার স্টাইলের মিলে যাওয়ার একটা সম্ভাবনার কথাও জানান। কন্দর্পনারায়ণ জানতে পেরেছেন, মৃত্যু পর্যন্ত মার্শাল প্রেসিডেন্সি জেলেই ছিলেন। কাজেই মার্শাল সংক্রান্ত যাবতীয় রেকর্ড নিশ্চয় প্রেসিডেন্সি জেলেই পাওয়া যাবে। পুরো ঘটনাটা দীপ্তবাবুকে জানিয়ে কন্দর্পনারায়ণ বলেছিলেন যে, তিনি দীপ্তবাবুর সাহায্য চান। দীপ্তবাবুও একজন ইয়াং এবং এনার্জেটিক অফিসার। কারারক্ষী বিভাগে এই অল্প বয়সেই তিনি বেশ সুনাম অর্জন করেছেন। দীপ্তবাবু একটু ভেবে নিয়ে বলেছিলেন, 'ব্যাপারটা বেশ ইন্টারেস্টিং লাগছে।' আর তিনি যেকোনওরকম সাহায্য করতে তৈরি।
কন্দর্পনারায়ণ বলেছিলেন, 'মার্শাল কতদিন জেলে ছিল এবং মার্শালের খুব কাছাকাছি যে কয়েদিরা এসেছিল বা যারা মার্শালকে গুরু বলে মানত, তাদের একটা লিস্ট দরকার। মার্শালের কাছাকাছি এসেছিল, এমন কয়েদিদের ক—জন এখন বেঁচে আছে? তারা এখন কোথায়? কেউ কি জেলের বাইরে আছে?'
দীপ্তবাবু বলেছিলেন, 'এটা বেশ একটা রিসার্চের ব্যাপার। অফিসিয়ালি জানতে হলে, জেল সুপারের উদ্দেশে একটা অ্যাপ্লিকেশন করতে হবে। ওই অ্যাপ্লিকেশন করবার কারণ জানাতে হবে। মার্শাল সংক্রান্ত যাবতীয় রেকর্ড, রেকর্ড রুম থেকে বের করাতে হবে এবং তার জন্য বেশ সময় লাগবে। অন্তত পনেরো দিন তো বটেই।'
কন্দর্পনারায়ণ একটু হতাশ সুরে বলেছিলেন, 'আর যদি অফিসিয়ালি না যাই? আমার আনঅফিসিয়াল কিছু খবর হলেই চলবে। মূল প্রশ্ন হল, মার্শালের খুব কাছের কয়েদি কারা ছিল আর তাদের মধ্যে ক—জন এখন বেঁচে আছে আর তারা কোথায় আছে? কেউ কি জেল থেকে ছাড়া পেয়ে বাইরে বেরিয়েছে?'
দীপ্তবাবু জানিয়েছিলেন, 'দাদা, অ্যাকচুয়ালি রেকর্ড রুম থেকে রেকর্ডগুলো বার করতে হবে। ওই ধুলোময়লা ঘাঁটতে হবে। এখন আমাদের স্টাফও কম। তবে আমি দেখছি কী করা যায়। আমি আপনাকে আনঅফিসিয়ালি কতটা সাহায্য করতে পারি দেখছি।'
কন্দর্পনারায়ণ শুনতে শুনতে নিচের ঠোঁটটা কামড়ে খানিকক্ষণ ভাবলেন, তারপর বললেন, 'আচ্ছা, খাটাখাটনি করার লোক যদি আমি আপনাকে দিই? তাহলে হবে তো? রেকর্ড রুম থেকে রেকর্ড বার করার জন্য যাবতীয় খাটাখাটনি যদি তারাই করে দেয়?'
দীপ্তবাবু জোরে জোরে হেসে বললেন, 'আপনি কি জেলের মধ্যে আপনার চেলাদের কথা বলছেন? ঠিক বলেছেন, আপনার কাজ শুনলেই ওরা করে দেবে।'
জেলের মধ্যে অনেক কয়েদিই কন্দর্পনারায়ণের মক্কেল। শুধু তা—ই নয়, কন্দর্পনারায়ণকে তাঁরা যথেষ্টা শ্রদ্ধা, সম্মানও করেন। জেলের মধ্যে যাঁরা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আসামি বা চলতি কথায় 'লাইফার', তাঁরাই মোটামুটি জেলের ভেতরটা চালান। জেলের অফিস, ক্যান্টিন, জেলের ভেতরের হাসপাতাল, সবকিছুর দায়িত্বে থাকেন তাঁরাই। কন্দর্পনারায়ণের এরকম অনেক মক্কেলই রয়েছেন, যাঁরা জেলের ভেতরে থেকে জেলের অফিস, ক্যান্টিন, হাসপাতাল—এসবের দায়িত্বে আছেন। ওঁদের বললে ওঁরা নিশ্চয়ই সাহায্য করবেন। উনি বললেন, 'ওখানে বলরাম, ইমরান, বিনোদ, হারাধন—ওরা আছে কি না দেখুন। ওরা তো মাঝে মাঝে জেল থেকে ফোন করে। শুনেছি, ওরাই এখন আপনাদের অফিস সামলাচ্ছে। ওদের বললে, ওরা নিশ্চয়ই সাহায্য করবে।' আর হয়েছিলও তা—ই। দীপ্তবাবু ফোন রেখে অফিসের বাইরে বেরিয়েই দেখলেন, বলরাম, বিনোদ আর হারাধন অফিসের দিকেই আসছে।
দীপ্তবাবু হাতের মোবাইলটা তুলে বললেন, 'তোমাদের অ্যাডভোকেট, কন্দর্পনারায়ণবাবু ফোন করেছিলেন। রেকর্ড রুম থেকে একটা পুরোনো রেকর্ড বের করতে হবে। আর্জেন্ট, করে দেবে?'
বলরাম প্রায় বারো বছর ধরে এই জেলেই আছে। বউ মার্ডার কেসে। বিনোদ শার্প শুটার। চারটে খুন আর প্রায় দশটা জখম করার মামলা ঝুলছে ওর বিরুদ্ধে। হারাধন বেআইনি আর্মসের ডিলার ছিল। সবারই যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে। আর এখন হাইকোর্টে ওদের প্রত্যেকের মামলাই করছেন কন্দর্পনারায়ণ। তিনজনই এককথায় রাজি। 'আমাদের স্যারের কাজ—আর আমরা করব না?' 'কী করতে হবে বলুন?' দীপ্তবাবু বুঝিয়ে বলে দিলেন, 'মার্শালের কথা মনে আছে? কলকাতার সিরিয়াল কিলার? এই জেলেই ছিল।' বিনোদের বয়স তিনজনের মধ্যে একটু বেশি। সে উৎফুল্ল হয়ে উঠল—'মার্শালকে মনে থাকবে না স্যার? আমাদের লাইনের গুরু। তবে কোনদিন বন্দুক—পিস্তল ধরেনি। ও ছিল আমাদের লাইনের শিল্পী লোক। স্রেফ ছুরি দিয়ে মানুষের শরীরে ছবি এঁকে দিত। তারপর মূল আঘাতের জায়গাটা ছুরি ঢুকিয়ে খুঁচিয়ে ঘেঁটে দিত। যাকে মারা হত, সে খুব কষ্ট পেত। খুব নৃশংস লোক ছিল, স্যার। যতটা মনে পড়ছে, দু—হাজার চার—পাঁচ নাগাদ এই জেলেই অসুস্থ হয়ে মারা যায়। তবে তখন আমরা কেউই জেলে ঢুকিনি। লাইনে নেমে গেছি। কিন্তু ধরা পড়িনি আর কী। হিঃ হিঃ।' এবড়োখেবড়ো, কালচে হয়ে যাওয়া দাঁত বের করে হাসল বিনোদ।
বলরাম সব শুনে অবাক হয়ে বলল, 'এতদিন বাদে মার্শালের খোঁজ কেন স্যার?'
দীপ্তবাবু ওদের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'তোদের স্যার, তোরাই জিজ্ঞেস করে নিস। আর হ্যাঁ, যদি রেকর্ড ঘেঁটে ফাইলটা বের করতে পারিস, তাহলে কালকেই ওঁকে এখানে ডেকে নেব, তখন জেনে নিস।'
এবার তিনজনের মুখেই আলোর রেখা খেলে গেল—'কী বলছেন স্যার? উনি নিজে প্রেসিডেন্সি জেলে আসবেন? খুব ভালো হবে। আমরাও আমাদের কেসগুলোর ব্যাপারে একটু কথা বলে নেব,' হারাধন বলল।
চারটে নাগাদই দীপ্তবাবুর ফোন এল—'আপনার স্ট্র্যাটেজি খেটে গেছে, দাদা। আপনার নাম শুনে পনেরো দিনের কাজ কয়েক ঘণ্টায় করে দিয়েছে আপনার চেলারা। কালই চলে আসুন। একটু সকাল সকাল এলে আড্ডাও হবে।'
কন্দর্পনারায়ণ খুশিতে প্রায় নেচে উঠলেন—'দ্যাট'স গ্রেট। আচ্ছা, আমার সঙ্গে আমার তিনজন ভাইকে আনতে চাই। অসুবিধা নেই তো?'
দীপ্তবাবু কী ভেবে বললেন, 'চারজনকে ভেতরে ঢুকতে গেলে একটা স্পেশাল পারমিশন করতে হয়। আচ্ছা, ঠিক আছে। সে না হয় আমি ব্যবস্থা করব। আর তা ছাড়া স্বয়ং আই. জি. প্রিজন সাহেবই তো আপনার বন্ধুলোক। আপনাকে আর আপনার ভাইদের ভেতরে ঢুকতে কে বাধা দেবে? আসুন, চলে আসুন।'
দীপ্তবাবুর সঙ্গে কথা বলে কন্দর্পনারায়ণ পর পর তিনটে ফোন করলেন—ঋজু, অমিত আর মেহবুবকে। সব কথা জানিয়ে বললেন—'রহস্যের পরদা ওঠাতে হবে। কাল সাড়ে দশটায় প্রেসিডেন্সি জেল।' তিনজনেই এক—পায়ে খাড়া। মার্শালের রেকর্ড দেখা তো হবে। সঙ্গে উপরি পাওনা প্রেসিডেন্সি জেলটাও ঘুরে দেখা হবে।
ঋজু বললেন—'আমি প্রেসিডেন্সি জেলের ওপর অনেক স্টোরি করেছি। কিন্তু রেকর্ড রুমে কখনো ঢুকিনি। চলো, তোমার সঙ্গে রেকর্ড রুমটাও দেখে নেব।'
কন্দর্পনারায়ণ আগেই পৌঁছে গিয়েছিলেন প্রেসিডেন্সি জেলের বাইরের বড় গেটের সামনে। ঋজু, অমিত আর মেহবুবও চলে এলেন। দীপ্তবাবু জেলের সিকিয়োরিটি—ইন—চার্জকে কন্দর্পনারায়ণদের আসার ব্যাপারে বলে রেখেছিলেন। তাই ভেতরে ঢুকতে অসুবিধা হল না। সিকিয়োরিটি ইন—চার্জ তাঁর ঘরেই ছিলেন, কন্দর্পনারায়ণকে আসতে দেখে নিজেই বেরিয়ে এলেন, নিজের পরিচয় দিয়ে হ্যান্ডশেক করে বললেন, 'আমার ছেলেকে ল পড়াচ্ছি। আপনিই ওর আইডল। পাশ করলেই কিন্তু কাজ শেখবার জন্য আপনার কাছে পাঠাব, আপনি প্লিজ না বলবেন না।' কন্দর্পনারায়ণ হেসে ঘাড় হেলালেন।
জেলের ভেতরের বড় গরাদ দেওয়া গেট খুলতেই কন্দর্পনারায়ণ দেখলেন, বলরাম, বিনোদ, ইমরান, হারাধন ছাড়াও আরও অনেকে দাঁড়িয়ে রয়েছেন কন্দর্পনারায়ণের সঙ্গে কথা বলবার জন্য। বলরাম তো চিৎকার করে 'আমার স্যার এসে গেছেন,' বলে কন্দর্পনারায়ণের পায়ে শুয়ে পড়লেন। কন্দর্পনারায়ণ অস্বস্তিতে পড়লেন—'হেই, এরকম কোরো না। শোনো, আমি এখানে কাজে এসেছি। তোমরা আমার সঙ্গে রেকর্ড রুমে চলো। আগের হাতের কাজটা সেরে নিই। তারপর না হয় দীপ্তবাবুর অফিসে বসে কথা বলব।' সবাই রাজি হলেন।
অমিত কন্দর্পনারায়ণকে গুঁতো মেরে বললেন, 'দাদা তুমি হিরো, রিয়েল লাইফ হিরো।' ঋজু আর মেহবুব অমিতের কথা বলার ভঙ্গি দেখে হাসতে শুরু করল।
কন্দর্পনারায়ণ মাথা নেড়ে বললেন, 'আমি আদৌ হিরো—টিরো নই। খুব সাধারণ ঘরের ছেলে, মন দিয়ে ওকালতিটা করতে চাই, ব্যাস। তবে, এই যে দেখো আজকে আমরা চারজন আমাদের প্রত্যেকের নিজস্ব কাজ বাদ দিয়ে এখানে এসে হাজির হয়েছি। বলতে পারো কীসের জন্য?'
একটু থেমেই নিজে বললেন 'যে কাজটা নিয়ে আমরা এসেছি, সেটা প্রফেশনের সঙ্গে বা ওকালতির সঙ্গে যুক্ত কাজ নয়। আমরা কেউ এখান থেকে টাকাপয়সাও পাব না। কিন্তু মনের আনন্দ পাব। আমি তোমাদের আমার সন্দেহের কথা বলেছি, তোমরাও একমত হয়েছ। তোমরা তোমাদের কাগজের সিনিয়র রিপোর্টার, কিন্তু সব কাজ ফেলে আমার সঙ্গে আসতে রাজি হয়েছ। দীপ্তবাবু সরকারি উচ্চপদস্থ চাকুরে, উনি আমাকে সাহায্য করতে রাজি হয়েছে। এতজন যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আসামি, যাঁরা একসময় লোকের মনে ভয় জাগিয়ে তুলেছিলেন, তাঁরা আমাকে সাহায্য করতে রাজি হয়ে গেলেন, কেন? কারণ তোমরা আমাকে ভালোবাসো। আমি উকিল বলে নয়, নাম করেছি বলেও নয়, তোমাদের সবার সঙ্গেই আমার সম্পর্ক—দাদা আর ভাইয়ের সম্পর্ক বলে।'
মেহবুব বললেন, 'ঠিক, তোমার মেলামেশাটা দাদা অন্যরকম। তুমি কিছু বললে আমরা না বলতে পারি না। বলো, কোনওদিন না বলেছি তোমার কোনও কাজে?'
ঋজু বললেন, 'আমি কিন্তু রহস্যের গন্ধে তোমার পেছন পেছন ঘুরি। কাগজে বড় করে লিখব—সিরিয়াল কিলারের পরদা ফাঁস, অথবা —অবশেষে ধরা পড়ল শিল্পী খুনি। হাঃ হাঃ হাঃ।'
কন্দর্পনারায়ণ এবার দীপ্তবাবুকে বললেন, 'যারা আমার সঙ্গে রেকর্ড রুমে আসবে, তারা আসুক। বাকি সবাই আপনার অফিসে ওয়েট করুক। আমি যাবার সময় সব্বার সঙ্গে কথা বলে যাব।'
রেকর্ড রুমটা মূল অফিস থেকে একটু দূরে, হেঁটে যেতে হয় এইসময়টায়। কয়েদিরা সবাই বাইরে কেউ উবু হয়ে বসে বাগানের কাজ করছে, কেউ বা নিজেরা জটলা পাকিয়ে গল্প করছে। দীপ্তবাবু দেখাতে দেখাতে নিয়ে চললেন—'ওই যে, ওইটা হল ক্যান্টিন। পয়সা দিয়ে খাবার কেনা যায় ওখান থেকে। কয়েদিরা জেলের মধ্যে কাজ করে রোজগার করেন। সেই টাকা জমা থাকে একটা খাতায়, আমরা বলি লাল খাতা। সেই লাল খাতা থেকে কয়েদিরা টাকা তুলে খরচ করতে পারেন। তাঁরা তাঁদের উকিলের খরচও চাইলে মেটাতে পারেন ওই খাতা থেকে। আবার অনেকে খরচও করেন না। জেল থেকে বেরিয়ে যাবার সময় হিসেব করে কয়েদিরা তাঁদের লাল খাতায় জমানো টাকা তুলে নেন। সেই টাকায় অনেকেই ব্যবসা করেন, বা নতুন জীবন শুরু করবার চেষ্টা করেন।
'ওই দেখুন, ওই ঘরটাতে ক্যারম বোর্ড রাখা আছে। কয়েদিরা ক্যারম খেলতে পারেন। আসলে দিনের পর দিন মানুষ এই চারদিকে উঁচু পাঁচিল—ঘেরা জায়গাটায় থাকতে থাকতে পাগল হয়ে যায়। তাই কয়েদিদেরও রিক্রিয়েশন চাই। না হলে ওরা নিজেদের মধ্যে মারপিট শুরু করে দেবে। তাই ওদের মন ভালো রাখা জরুরি।'
কন্দর্পনারায়ণ মাথা নেড়ে বললেন, 'ঠিক, আমি শুনেছি। এখানেও নিজেদের মধ্যে গ্রুপিজম আছে। লবিবাজি আছে। একজন আর—একজনকে মারবে বলে ইট ঘষে ঘষে ছুঁচোলো করে রাখে। পায়খানায় ব্যবহার করবার বড় লোহার মগ কেটে ছুরি বানিয়ে পকেটে রাখে।'
দীপ্তবাবু হেসে বললেন, 'তা—ই তো, আপনি ইমরানকেই ধরুন—না। ওরই কোমরে নাকি গোঁজা থাকত পায়খানার লোহার মগ কেটে বানানো ছুরি। ওর তো এখানে অনেক শত্রু। তবে আমি এসে এগুলোকে কন্ট্রোল করবার চেষ্টা করেছি।'
বলেই ডানদিকে একটা বড় মাঠ দেখিয়ে বললেন, 'ওইটা হচ্ছে ফুটবল গ্রাউন্ড। এখন তো রোজ প্র্যাকটিস হয়। সামনে সারা পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত কারেকশনাল হোম বা সংশোধনাগারের আবাসিকদের নিয়ে ফুটবল টুর্নামেন্ট শুরু হচ্ছে। আমি শুনেছি, যে কারেকশনাল হোমের টিম চ্যাম্পিয়ন হবে, তারা নাকি কলকাতা ফুটবল লিগে খেলবার চান্স পাবে।'
তারপর একটু দাঁড়িয়ে ফুটবল মাঠের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'ওই দেখুন, যারা ফুটবল টিমে চান্স পেয়েছে। তারা এই সাতসকালেই মাঠে এসে গেছে। ওরাই মাঠে জল দেবে, কাঁকর পরিষ্কার করবে। আসলে ওরা এতই দুঃখী, ফুটবল নিয়ে দুঃখ ভুলে থাকতে চায়।'
অমিত বাঁদিকের টানা ব্যারাকের মতো বাড়িগুলো দেখিয়ে বললেন,'ওই বাড়িগুলোতে কী আছে?'
দীপ্তবাবু জবাব দিলেন, 'ওইগুলো তো কয়েদিদের থাকার জায়গা। এখানে দু—ধরনের আবাসিক থাকেন। যাদের কোর্টে বিচার চলছে, তাদের বলে আন্ডার ট্রায়াল প্রিজনার বা ইউ.টি.পি. আর যাদের সাজা হয়ে গেছে, তাদের বলে কনভিক্ট। ইউ.টি.পি. আর কনভিক্টদের আলাদা থাকার ব্যবস্থা।'
এরই মধ্যে দীপ্তবাবুকে দেখে একজন আবাসিক এগিয়ে এলেন কথা বলতে। দীপ্তবাবু তার সঙ্গে কথা বলতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। কন্দর্পনারায়ণ, ঋজু, অমিত আর মেহবুব এগিয়ে যাচ্ছিলেন। বলরাম, বিনোদ, ইমরানরা সঙ্গে ছিলেন। তখন হঠাৎ লাফ দিয়ে সামনে এসে পড়ল একটা অল্পবয়সি ছেলে। সুঠাম চেহারা, কাঁধ—ছাপানো চুল, কানে হীরের দুল ঝকঝক করছে। কন্দর্পনারায়ণ ভেবেছিলেন, ওঁরই কোনও মক্কেল বোধহয় জেলের মধ্যে কন্দর্পনারায়ণকে দেখে কথা বলতে এগিয়ে এসেছেন। কিন্তু ভুল ভাঙল ছেলেটার কথা শুনে—'আপনার জন্য আমি জেলে। আপনাকে কিন্তু আমি ছাড়ব না। কতদিন আমাকে জেলে রাখবেন? কতদিন? আজ হোক, কাল হোক আমি বেরোবই। আপনাকে, আপনার ফ্যামিলিকে আমি দেখে নেব।' বলেই সিনেমার কায়দায় ডান হাতের তরজমা আর মধ্যমা দুটো দিয়ে গুলি করবার ভঙ্গিতে দেখাল যে, গুলি করে দেওয়া হবে। কথা বলতে বলতে ছেলেটার চোখে যেন আগুন উঠল।
বলরাম, ইমরান, বিনোদও ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল। তারাও থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে। ছেলেটা কথা বলেই ঘাড় ঘুরিয়ে চলে যাচ্ছিল। কন্দর্পনারায়ণ পেছন থেকে ডাকলেন, 'এই শোন', জীবনে কোনও দিন কাউকে অকারণে গাল দেন না। আজকে একটা হিসহিসে স্বরে বললেন, 'কী ভেবেছিস আমাকে? তুই তো সেই শুয়োরের বাচ্চা, যে প্রেমিকার মুখে অ্যাসিড মেরেছিস। আমি কেন উকিল হয়েছি জানিস? সারাজীবন তোদের মতো জানোয়ারদের ন্যাংটো করে আমার সামনে দাঁড় করিয়ে রাখব বলে, আর তুই কী গুলি করবি? আমাকে বা আমার ফ্যামিলির এক মাইলের মধ্যে যদি কোনওদিন আসিস, তোর কপালে গুলি করব আমি, আমার পিস্তলের লাইসেন্স আছে। আর শোন, আমি চাইলে, এই জেলের মধ্যে তোকে নিজে পেটাতে পারি, নিজে না মারলে, আমার ছেলেদের দিয়ে মার খাওয়াতে পারি। আই.জি.—কে বলে সারাজীবন তুই যাতে জেল থেকে না বেরোতে পারিস, সেই ব্যবস্থাও করতে পারি। কিন্তু আমি সেসব কিছুই করব না। তোর সঙ্গে আমার কোর্টেই দেখা হবে। তোর তো মামলা চলছে। সারাজীবন যাতে না বেরোস, সেই ব্যবস্থা আমি করব।'
মুখটা বিকৃত করে কেটে কেটে বললেন, 'আগে জেল থেকে বেরো। তারপর তো আমাকে আর আমার ফ্যামিলিকে মারবি। আর উকিলকে হুমকি দিলি? তোকে শেষ করব তো আমি।'
ইমরান, বলরামরা উত্তেজিত হয়ে পড়েছিল, কন্দর্পনারায়ণ ওদের নিরস্ত করলেন, 'তোমরা ওকে কেউ কিছুই বলবে না। ওর মামলাটা চলছে। ওকে দেখে নেব আমি।'
এই কথায় ম্যাজিকের মতো কাজ হল। ছেলেটা ধপ করে কন্দর্পনারায়ণের পায়ের কাছে বসে পড়ল—'স্যার, আমায় মাফ করে দিন। আসলে আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি।'
কন্দর্পনারায়ণ এক—পা পিছিয়ে গিয়ে বললেন, 'তোর নাম তো হাফিজ। তুই তোর প্রেমিকা নীলিমা হায়দারের মুখে অ্যাসিড মেরেছিলি। হ্যাঁ, ঠিক বলেছিস। তুই দু—বছর ফেরার ছিলি, তোকে ধরবার জন্য আমি হাইকোর্টে মামলা করি। জাস্টিস বসুর বেঞ্চে, উনি সব শুনে প্রচণ্ড রেগে গিয়ে ডি.জি.—কে নির্দেশ দেন, পনেরো দিনের মধ্যে তোকে অ্যারেস্ট করতে হবে। তুই জয়নগরে আত্মীয়ের বাড়িতে লুকিয়ে ছিলি। সেখান থেকে তোকে অ্যারেস্ট করা হয়। আমি প্রতিজ্ঞা করছি, তোকে আমি জেল থেকে বেরোতে দেব না, সারাজীবন। পনেরো দিনে পাগল হয়ে যাচ্ছিস? সারাজীবন তোকে এখানেই থাকতে হবে। ভেবে দেখ। তোর প্রেমিকার কী কষ্ট! তার—একটা চোখ গলে গেছে। আর একটা চোখ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। মুখের চামড়া গলে গলে গেছে।'
ছেলেটা মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে থাকা অবস্থাতেই দু—হাতে মুখ ঢাকল—'আমায় মাফ করুন স্যার।'
দীপ্তবাবু এতসব কিছুই খেয়াল করেননি। উনি একটু পেছনে একজনের সঙ্গে কথা বলেছিলেন, উনি এগিয়ে এসে কন্দর্পনারায়ণকে ঘিরে একটা ভিড় দেখে, আর হাঁটু গেড়ে মুখ ঢেকে হাফিজকে বসে থাকতে দেখে অবাক হয়ে কন্দপয়নারায়ণকে জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনার ক্লায়েন্ট নাকি?'
কন্দর্পনারায়ণ যেন কিছুই ঘটেনি, এমন একটা ভাব দেখিয়ে এড়িয়ে গিয়ে বললেন, 'ওই আর কী।'
অমিত অস্ফুটে বললেন, 'তোমার স্ট্রং নার্ভ!'
দীপ্তবাবু সামনেই একটা বড় বাড়ি দেখিয়ে বললেন, 'ওই যে আমাদের রেকর্ড রুম।'
একটা পুরোনো বড় বাড়ি। ভেতরের অফিসঘরটা এ. সি. করা। বলরাম একটা ফাইল এনে টেবিলে রাখল। বিনোদ একটা কাপড় দিয়ে ফাইলটা যত্ন করে ঝেড়ে কন্দর্পনারায়ণের দিকে এগিয়ে দিল—সবাই ঝুঁকে পড়লেন ফাইলটার ওপর।
কন্দর্পনারায়ণ একটা কাগজে নোট করতে লাগলেন—দু—হাজার দুই সালে কলকাতা পুলিশের পাতা ফাঁদে ধরা পড়ে মার্শাল। সেইসময় কলকাতা পুলিশের হোমিসাইড শাখার দুঁদে অফিসার অতনু ব্যানার্জি আর লালবাজারের গোয়েন্দা শাখার অফিসার সুমন মুখোপাধ্যায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মার্শালকে ধরেছিলেন। কন্দর্পনারায়ণ অবশ্য দু—জন অফিসারকেই খুব ভালো চেনেন। দু—জনের সঙ্গেই কন্দর্পনারায়ণের পারিবারিক সম্পর্ক। অতনুদা ওরফে অতনু ব্যানার্জি এখন ওই হোমিসাইড শাখার অ্যাসিস্ট্যান্ট পুলিশ কমিশনার। ওইরকম বুদ্ধিমান অফিসার কন্দর্পনারায়ণ কমই দেখেছেন। আর সুমন মুখোপাধ্যায় এখন জোড়াসাঁকো থানাতেই ও.সি. হিসেবে আছেন। কলকাতা পুলিশের গর্ব দু—জনেই।
দু—হাজার দুই থেকে দু—হাজার পাঁচ—এই তিন বছর প্রেসিডেন্সি জেলে কাটিয়েছে মার্শাল। তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা চালু হয়। দু—হাজার পাঁচ সালের শুরুতেই মার্শালের ক্যান্সার ধরে পড়ে। বছরের মাঝামাঝি সে জেল হাসপাতালেই মারা যায়। এই তিন বছরে জেলের মধ্যে মার্শালের গুণমুগ্ধ তৈরি হয়েছিল অনেকেই। তারা মোটামুটি মার্শালকে ঘিরে রাখত। জেলের মধ্যে মার্শালের সুবিধা—অসুবিধা দেখত তারাই। কন্দর্পনারায়ণ মোটামুটি পাঁচজনের নাম পেলেন, যারা মার্শালের শেষদিন অবধি মার্শালের পাশেই ছিল—সরফরাজ, চার্লস, দীনবন্ধু, রামেশ্বর আর মনোহর। কন্দর্পনারায়ণের সন্দেহ ঠিক হলে এদের মধ্যেই কেউ একজন মার্শালের খুন করার স্টাইল কপি করেছে।
দীপ্তবাবু বললেন, 'যতটা মনে করতে পারছি, এই চার্লসকে আমি চিনতাম। অনেক বছর আগে সে জেলের মধ্যেই মারা যায়। স্বাভাবিক মৃত্যু। সরফরাজ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড খাটছিল, হাইকোর্টেও ওর সাজা বহাল ছিল, অর্থাৎ হাইকোর্টও ওকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডই দিয়েছিল। পরে অবশ্য সুপ্রিম কোর্টে ও মামলা করে। সুপ্রিম কোর্ট থেকে ও ছাড়া পায়। বেঁচে থাকলে ওর বয়স এখন পঞ্চাশ—পঞ্চান্ন। রামেশ্বরকেও আমি চিনতাম, ও আমার অফিসে কম্পিউটারের কাজ করত। ও এখন খালাস হয়ে জেলের বাইরে। জেলের জমানো টাকা দিয়ে ট্যাক্সি কিনেছে। নিজেই চালায়। কয়েকদিন আগে শিয়ালদা থেকে ট্যাক্সিতে উঠেছি। দেখি, ও গাড়ি চালাচ্ছে। আমাকে ট্যাক্সিতে তুলে বলল, চিনতে পারছেন স্যার? ওকে দেখে আমি খুব খুশি হলাম। বললাম, তুই তো সংশোধনাগারের নাম রাখলি রে? খুবই শক্তপোক্ত চেহারা। বয়স ওই পঞ্চাশের আশপাশে। আর দীনবন্ধু হাইকোর্টে আপিল মামলা করেছিল। হাইকোর্ট ওর সাজা বহাল করে দিয়েছিল। ও আর সুপ্রিম কোর্টে যায়নি। ও এই জেলেই আছে।'
বলেই ঘাড় ঘুরিয়ে একজন কয়েদিকে ডেকে বললেন, 'এই, দীনবন্ধুকে ডেকে আনতো, বল, হাইকোর্ট থেকে উকিলবাবু এসেছেন, কথা বলতে চান।'
বলতে বলতে দীপ্তবাবুর মোবাইল ফোন বেজে উঠল—উনি কথা বলতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। তারপর ফোন রেখে বললেন, 'আই. জি. সাহেব। ফোন করে আপনাদের খোঁজ নিচ্ছিলেন। বললেন, আপনাদের যাতে কোনও অসুবিধা না হয়।'
কন্দর্পনারায়ণ এতক্ষণ নোট নেওয়ায় মগ্ন ছিলেন, হেসে বললেন, 'হ্যাঁ আমিই জানিয়েছিলাম। চারজন জেলের ভেতরে ঢুকছি তো—কে আবার কী বলে! তাই ওঁকে একটা অ্যাপ্লিকেশন মেইল করেই রেখেছিলাম।'
ঋজু বললেন, 'আর মনোহর? ও এখন কোথায়?'
'এদের মধ্যে সবচেয়ে কমবয়সি ছিল মনোহর। দু—হাজার পাঁচ সালে ওর বয়স ছিল কুড়ি বছর। সেই অনুযায়ী আজ দু—হাজার কুড়িতে ওর বয়স হচ্ছে পঁয়ত্রিশ বছর। সবচেয়ে অ্যাকটিভ। প্রেসিডেন্সি কারেকশনাল হোমের ফুটবল টিমের ক্যাপ্টেন ছিল। ভালো খবর হল, ছ—মাস আগে কোর্টের অর্ডারে ও এখান থেকে ছাড়া পেয়েছে' দীপ্তবাবু রেকর্ড দেখতে দেখতে বললেন।
কন্দর্পনারায়ণ নোট নিতে নিতে বললেন, 'সরফরাজ, রামেশ্বর আর মনোহর—এই তিনজনের বর্তমান ঠিকানা পাওয়া যাবে?'
দীপ্তবাবু বললেন, 'জেলে যে ঠিকানা দেওয়া আছে, সেই ঠিকানা আমি আপনাকে প্রোভাইড করতে পারি।'
বলতে বলতে দীনবন্ধু এসে হাজির হল। বেশ বয়স হয়েছে, শুকনো দড়ি—পাকানো চেহারা, সামনে ঝুঁকে গিয়েছে। মাথার সব চুল সাদা।
দীপ্তবাবু আলাপ করিয়ে দিয়ে বললেন, 'আমাদের এখানে আছে বহুদিন ধরে। এখন শরীর ভেঙে গেছে। একসময় গায়ে খুব জোর ছিল। আর হ্যাঁ, দীনবন্ধুর অনেক গুণ, ভালো গান গায়। বিশেষত পল্লিগীতি। আর কাঠের কাজ করে দারুণ। একসময় ও কাঠের মিস্ত্রিই ছিল। জেলের মধ্যে ওর কাঠের কাজের দারুণ প্রশংসা। ওর কাজ বাইরেও বিক্রি হয়েছে।'
দীনবন্ধুর হাতে একটা ছোট কাঠের মূর্তি ছিল। সেইটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল, 'ইমরান আমাকে বলল, হাইকোর্ট থেকে একজন নামকরা উকিলবাবু এসেছেন, আমার সঙ্গে আলাপ করবেন। আমি তাড়াতাড়ি সেল থেকে বেরিয়ে এলাম। সেলে বসে এই মূর্তিটাই বানাচ্ছিলাম। আপনাকে দেবার মতো আর তো কিছুই নেই স্যার আমার কাছে।'
কন্দর্পনারায়ণ দীনবন্ধুর আন্তরিকতায় মুগ্ধ হয়ে গেলেন। তিনি দু—হাত বাড়িয়ে মূর্তিটা নিলেন। ভালো করে তাকিয়ে দেখলেন, কী অপূর্ব সৃষ্টি! একজন বাউল একতারা বাজাচ্ছে। একদমই কাঁচা কাঠের ওপর খোদাই করে বানানো হয়েছে। উচ্চতায় এক ফুট মতো হবে। কিন্তু খুব ভারী।
কাজ সেরে জেল থেকে বেরোতে বেরোতে আরও খানিকটা সময় গেল। অনেক কয়েদিই কন্দর্পনারায়ণকে চিনতে পেরে কথা বলতে চাইছিল। ওদের মামলার শুনানি কবে হবে, কবে ওরা জেল থেকে বেরোতে পারবে—এইসবই আর কী।
চিড়িয়াখানার চারটে টিকিট কেটে চারজন চিড়িয়াখানায় ঢুকলেন। প্রেসিডেন্সি জেলের গেট থেকে বাইরে বেরিয়ে চারজনেই চুপ। গাড়িতে উঠতে ইচ্ছেই করছিল না। হাঁটতে ইচ্ছে করছিল। আজ মেঘলা আকাশ। রোদের তেজ নেই। প্রেসিডেন্সি জেল চত্বর থেকে হাঁটতে হাঁটতে ওঁরা পৌঁছে গিয়েছেন চিড়িয়াখানায়। কন্দর্পনারায়ণই সবাইকে প্রস্তাব দিলেন, 'চলো, চিড়িয়াখানায় ঢুকি। বহুদিন আসিনি। আমার ছেলে যখন খুব ছোটো, ওকে নিয়ে একবার—দু—বার আমি আর তোমাদের বউদি চিড়িয়াখানায় এসেছিলাম। সে—ও অনেক বছর হল।'
অমিত বললেন, 'আমার বহুদিনের শখ, চিড়িয়াখানার ওপর একটা স্টোরি করব।'
ঋজু, মেহবুব দু—জনেই চুপ। ঘুরতে ঘুরতে চারজনেই পৌঁছোলেন সাপের ঘরের সামনে। কাচের ছোট ছোট ঘর। সামনে রেলিং দেওয়া। কন্দর্পনারায়ণ রেলিংয়ে ভর দিয়ে সামনে ঝুঁকে দাঁড়ালেন। কী যেন ভাবছেন। ঋজু, অমিত, মেহবুব পাশাপাশি এসে রেলিংয়ে ঝুঁকে দাঁড়ালেন। সামনে গোখরোর ঘর। একটা ছোট গুহামতো করা। সাপটা বোধহয় ভেতরে। বাইরে অনেকগুলো আরশোলা জাতীয় পোকা ঘুরছে। একটু আগেই বোধহয় চিড়িয়াখানার কোনও কর্মী সাপগুলোকে খেতে দিয়ে গিয়েছেন।
গোখরোর খাঁচার সামনে দাঁড়িয়ে ততক্ষণ কেটে গিয়েছে খেয়াল নেই।
গোখরোর খাঁচার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে অমিত মুখ খুললেন, 'দাদা, তোমার ক্যালকুলেশনে তিনজনের মধ্যে একজন প্রোব্যাবল কিলার তো? সরফরাজ, রামেশ্বর আর মনোহর।'
মেহবুব বললেন, 'ন্যাচারালি। তবে সরফরাজ আর রামেশ্বর দু—জনেরই বয়স পঞ্চাশের আশপাশে। আর বেশ শক্তপোক্ত চেহারা। ওদের পক্ষে ক্রাইম করা সহজ। রামেশ্বর ট্যাক্সি চালায়। কাজেই ধাপার ধারে হোক, বা গড়িয়া ঢালাই ব্রিজ বা সোদপুর বা ডায়মন্ড হারবার রোড, ওর পক্ষে গাড়ি নিয়ে কভার করা সহজ।'
ঋজু বললেন, 'একটা প্রশ্ন জাগছে, কেউ নিজের ট্যাক্সি নিয়ে ঘুরে ঘুরে খুন করে বেড়াবে কি? মনে রাখতে হবে, এরা কিন্তু এক্সপিরিয়েন্সড ক্রিমিনাল। জেল থেকে বেরিয়ে, জেলে খাটনির টাকায় কেনা ট্যাক্সি নিয়ে ঘুরে ঘুরে খুন করবে বলে মনে হয় না। তাহলে তো ধরা পড়ে যাবে। আমি সন্দেহ করছি—মনোহর। সে মার্শালের ছায়াসঙ্গী ছিল, এমনকী এটাও শুনছিলাম, মানে বলরাম—ইমরানরা বলছিল যে, মার্শাল যখন শেষদিকে বিছানায় পায়খানা—পেচ্ছাব করত, তখন ওই ইয়াং মনোহরই সেগুলো পরিষ্কার করত।'
কন্দর্পনারায়ণ একমনে গোখরোর কাচের কেসটার দিকে তাকিয়ে ছিলেন—বিড়বিড় করে অনেকটা হেঁয়ালি করার মতো করে বললেন,'সে লুকিয়ে আছে ওই ছোট গুহাটায়। তাকে আমরা দেখতে পাচ্ছি না, তবে বেরোবে, সে বেরোবে।'
মেহবুব আবদারের সুরে বললেন, 'এ তো পাকা ফেলুদা—ব্যোমকেশ কিরীটীর ঢঙে কথা বলছ গো দাদা—'
কন্দর্পনারায়ণ হেসে ফেললেন—'আরেঃ না না, ওঁরা সব নমস্য ব্যক্তি। আমি সাধারণ উকিল, তোমাদের পাশে পেয়ে একটু হেঁয়ালি করার সাধ জাগল, এই আর কী।' তারপরই খুব সিরিয়াস মুখ—চোখ করে বললেন, 'কিন্তু একটা জিনিস আমরা ভুলে যাচ্ছি। চারটে খুনের মধ্যে লিঙ্ক কোথায়? আদৌ কোনও লিঙ্ক বা যোগসূত্র আছে কি? নাকি আমরা শুধুই অন্ধকারে ঢিল মারছি? সেইজন্যই সেদিন আমি বলছিলাম যে, ওই চারজন কি পরস্পর পরিচিত? ওদের মধ্যে কোনও সম্পর্ক আছে?'
তারপর একটু চুপ করে চিন্তিত মুখে বললেন, 'সরফরাজ হোক, রামেশ্বর বা মনোহর, একটা কারণ তো থাকবেই। চারজনকে একই স্টাইলে মারবে কেন? চারজনের ওপরই এত রাগ কেন?'
ঋজু মাথা নেড়ে বললেন, 'খোঁজ নিচ্ছি। তুমি ঠিকই বলছ, যদি চারজনকে একই লোক খুন করে থাকে, তাহলে চারজনের নিজেদের মধ্যে কোন সম্পর্ক থাকতে বাধ্য।'
কন্দর্পনারায়ণ আবার মাথা নেড়ে বললেন, 'ঠিক। তবে আর—একটা ব্যাপার আমাকে হন্ট করছে। যে—ই মেরে থাকুক—না কেন, চারজনকেই নৃশংসভাবে মারবার কারণ কী? যদি ওরা কোনও অন্যায়ও করে থাকে, তাহলে যার ওপর অন্যায় হয়েছে, সে থানায় যেতে পারত, কমপ্লেইন্ট করতে পারত, কোর্টে যেতে পারত, তা না করে নিজেই কেন সাজা দিচ্ছে?'
অমিত বললেন, 'এই পয়েন্টটা আমাকেও ভাবাচ্ছে। এটা ডাকাতি করতে গিয়ে খুন করে ফেলা নয়, যে, ডাকাতরা ডাকাতি করতে গিয়েছিল, বাড়ির মালিক দেখে ফেলল, তাকেও মেরে ফেলল অথবা রেপ করে মার্ডার। যাতে কে রেপ করেছে, বাইরে সেটা লিকড না হয়। চারটে খুনই হয় অন্ধকারে এবং নির্জনে। লোকচক্ষুর আড়ালে। যেন খুনি সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। সুযোগ এসেছে, ব্যস, সারা শরীরে শিল্পীর মতো শিল্প তৈরি করে খুন করে হাওয়া।'
কন্দর্পনারায়ণ একদৃষ্টে দীনবন্ধুর দেওয়া মূর্তিটা দেখছেন। তারপর অস্ফুটে বললেন, 'বড় ভালো কথা বললে হে, খুনি সুযোগের অপেক্ষায় ছিল—সুযোগ এসেছে, ব্যস, সারা শরীরে শিল্পীর মতো শিল্প তৈরি করে হাওয়া।'
মেহবুব ফিসফিস করে বলে উঠলেন, 'ওই যে বেরিয়েছে। বেরিয়েছে।'
কন্দর্পনারায়ণ যেন একদৃষ্টে দীনবন্ধুর দেওয়া মূর্তিতে কী খুঁজছিলেন—মেহবুবের ফিসফিসানিতে চমকে সামনে তাকালেন। সাপের খাঁচাতে কয়েকটা পোকামাকড় খাবার হিসেবে দেওয়া হয়েছিল। এতক্ষণ তারা খুব তিড়িংবিড়িং করে লাফাচ্ছিল। তারপর তারা এখানে—ওখানে গিয়ে বসে ছিল। গোখরো তার গুহাতে বসে সব নজর রাখছিল। পোকামাকড়গুলো বসতেই, চুপিচুপি বেরিয়ে এসেছে গুহা থেকে। চকচকে শরীরটা আলপনার মতো, এঁকেবেঁকে এগিয়ে চলেছে আর সরু লিকলিকে চেরা জিভটা ছুড়ে ছুড়ে একের পর এক পোকামাকড় সে ধরছে আর পেটে চালান করছে।
কন্দর্পনারায়ণের চোখ চকচক করছে—'বললাম না—বেরোবে, সে বেরোবে।'
চিড়িয়াখানা থেকে বেরিয়ে কন্দর্পনারায়ণ বললেন, 'তোমাদের একটা উপকার করতে হবে। যে চারটে খুন হয়েছে, সেই চারজনের মৃতদেহের ছবি পাওয়া যাবে? পুলিশ ফোটোগ্রাফার নিশ্চয়ই মৃতদেহগুলোর ছবি তুলেছে। ছবি জোগাড় করতে হবে। প্লিজ প্লিজ। হার্ডকপি না হলেও হবে। ওই কেসগুলোর ইনভেস্টিগেটিং অফিসারদের ধরে যদি হোয়াটসঅ্যাপেও ছবিগুলো কালেক্ট করা যায়—'
'ওকে, হয়ে যাবে,' তিনজনই কথা দিলেন।
'আর—একটা কাজ, সরফরাজ, রামেশ্বর আর মনোহর এখন কোথায় থাকে, জানতে হবে। রামেশ্বর তো ট্যাক্সি চালাচ্ছে, কিন্তু ও কোথায় থাকে আর আর্থিক কন্ডিশন কেমন জানা দরকার। সরফরাজ আর মনোহরকেও ট্র্যাক করতে হবে,' কন্দর্পনারায়ণ বললেন।
অমিত বললেন, 'জেল থেকে প্রত্যেকের অ্যাড্রেস পেয়েই গেছি। ওইসব জায়গায় আমাদের লোকাল রিপোর্টাররা আছেন। কুষ্ঠি—ঠিকুজি বের করে নেব দাদা। ডোন্ট ওরি।'
কন্দর্পনারায়ণ বললেন, 'আমাদের নিজেদের একবার ওদের সঙ্গে দেখা করা উচিত। সামনাসামনি কথা না বললে, বা ওদের একেবারে সামনাসামনি না দেখলে ওদের সম্পর্কে অ্যাকচুয়াল আইডিয়া করা যাবে না।'
কন্দর্পনারায়ণ বিশ্বাস করেন, সামনাসামনি কথা বলবার সময় অনেক লোকেরই মুখের মাসলের একটা কাঁপন বা কুঞ্চন দেখা যায়, যেটা ফোনে কথা বলেও বোঝা যায় না। ধরুন আপনি কাউকে একটা প্রশ্ন করলেন, সে যদি মিথ্যা কথা বলে বা বলবার চেষ্টা করে, তাহলে অবশ্যই তার চোখের চারপাশের মাসল হালকা তিরতির করে কাঁপতে থাকবে। অনেক চেষ্টা করেও সে সেই কাঁপন রোধ করতে পারবে না। চেম্বারে বসে, মক্কেলদের সঙ্গে কথা বলবার সময় কন্দর্পনারায়ণ অনেক সময়ই বুঝতে পারেন, মক্কেল সত্যি কথা বলছে, নাকি মিথ্যা কথা বলছে। সেই কারণেই উনি সরফরাজ, রামেশ্বর আর মনোহরের সঙ্গে সামনাসামনি কথা বলতে চাইলেন।
ঠিক হল, কাল একদম সকাল সকাল বেরিয়ে গিয়ে ওদের সঙ্গে কথা বলা হবে। ঋজু আর অমিতের কাল সকালেই ওদের পেপারের অফিসে বিশেষ কাজ আছে, ওরা যেতে পারবে না—জানিয়ে দিল। তবে মেহবুব যাবে কন্দর্পনারায়ণের সঙ্গে।
আর আজ রাত্রেই, চারটে খুনেরই তদন্তকারী অফিসারদের সঙ্গে কথা বলে মৃতদেহের ছবিগুলো হোয়াটসঅ্যাপ করে কন্দর্পনারায়ণকে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।
চেম্বারে কাজ করতে করতেই, কন্দর্পনারায়ণ হোয়াটসঅ্যাপ খুলে দেখে নিলেন যে, চারটে ডেডবডির ছবি এসে গিয়েছে। কিন্তু সেই মুহূর্তে সামনে ক্লায়েন্টরা রয়েছেন, জুনিয়ররা কাজ করছে, তিনি নিজেও একটা মামলা রেডি করছেন। স্টেনোগ্রাফার ডিকটেশন নিচ্ছে, তাই আর ছবিগুলো দেখলেন না। রাত্রে খাওয়াদাওয়ার পর বরং ঠান্ডা মাথায় ওগুলো দেখা যাবে।
দীপাঞ্জন কন্দর্পনারায়ণের অনেকদিনের জুনিয়র, এখন নিজেই যথেষ্ট ভালো মামলা করছেন। আলিপুর কোর্টে কন্দর্পনারায়ণের সিভিল মামলাগুলি উনিই দেখাশোনা করেন। দীপাঞ্জন পাশের ঘর থেকে কন্দর্পনারায়ণের ঘরে এলেন। হাতে প্রেসিডেন্সি জেল থেকে আনা, দীনবন্ধুর দেওয়া কাঠের মূর্তিটি—'দাদা, মূর্তিটা বেশ সুন্দর তো? তোমায় কেউ দিয়েছে?'
কন্দর্পনারায়ণ মূর্তিটির কথা ভুলেই গিয়েছিলেন। সন্ধেবেলায় কোর্ট থেকে ফিরেই বসে গিয়েছেন চেম্বারে। তা ছাড়া ক্লায়েন্টরা এসেছেন। সব মিলিয়ে চেম্বারে ঢুকেই চূড়ান্ত ব্যস্ততার মধ্যে ডুবে গিয়েছিলেন।
কয়েক সেকেন্ড মূর্তিটির দিকে তাকিয়ে বললেন, 'ওহো, হ্যাঁ হ্যাঁ, আজকে প্রেসিডেন্সি জেলে গিয়েছিলাম একটা কাজে। ওখানকার একজন কয়েদি মূর্তিটা আমাকে দিয়েছে। লোকটার বয়স হয়েছে অনেক। কিন্তু নিজে হাতে মূর্তিটা গড়েছে।'
আজ রবিবার সকাল সকালই কন্দর্পনারায়ণ বেরিয়ে পড়লেন। ড্রাইভার এসে পড়েছিল আগেই। কন্দর্পনারায়ণ রেডি হতে যা সময় নিলেন। স্নান সেরে একবারে বেরিয়ে পড়তে হল। প্রথমে সরফরাজের সঙ্গে দেখা করতে হবে। ও থাকে কন্দর্পনারায়ণের বাড়ির সবচেয়ে কাছে। আনোয়ার শাহ রোডের কাছে একটা বস্তিতে। অ্যাড্রেস তো কালই দীপ্তবাবু দিয়ে দিয়েছিলেন।
লর্ডস বেকারির মোড়ে মেহবুব অপেক্ষা করছিলেন। কন্দর্পনারায়ণ গাড়িতে তুলে নিলেন।
যেতে যেতে কন্দর্পনারায়ণ বললেন, 'মেহবুব, আমাদের মোট সাসপেক্ট ছিল পাঁচজন—তার মধ্যে চার্লস জেলের মধ্যেই মারা গেছে। দীনবন্ধু সবচেয়ে বয়স্ক। জেলেই আছে। রইল বাকি তিনজন। সরফরাজ, রামেশ্বর আর মনোহর।
'আমার নোট অনুযায়ী সরফরাজের বয়স এখন পঞ্চাশ—পঞ্চান্ন। দু—হাজার পাঁচ সালে মার্শাল মারা যায়। আরও দশ বছর সরফরাজ জেলে ছিল। ও সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে খালাস হয় দু—হাজার পনেরো সালে।'
মেহবুব বললেন, 'জেল থেকে বেরিয়ে ফের ও কোনও অপরাধ করেছে, এতদিনে আমরা অন্তত শুনিনি। তোমার কথামতো লোকাল থানা থেকে আমি খোঁজ নিয়েছি। লাস্ট পাঁচ/সাড়ে পাঁচ বছরে ওর রেকর্ড কিন্তু ভালো। তা ছাড়া পঞ্চাশ পঞ্চান্ন বছরের একটা লোক কয়েকটা বাইশ—চব্বিশ বছরের ছেলেকে মারবে কেন? এটাও তো ভাবতে হবে।'
সরফরাজের বাড়ি খুঁজে পেতে অসুবিধে হল না। বস্তির মধ্যে টালির চাল দেওয়া বাড়ি। সাতসকালে দু—জন অপরিচিত লোককে সরফরাজকে খুঁজতে দেখে ওর বাড়ির লোক অবাকই হল। একজন মোটামতো মাঝবয়সি মহিলা চিৎকার করে বেরিয়ে এলেন—'আবার ও কোনও গোলমাল পাকাল নাকি? হে আল্লা, আমি এত বছর এত কষ্ট করে সংসার চালিয়েছি, কেসের খরচ জুটিয়েছি, ছেলে—মেয়েদের বড়ো করেছি। যা—ও বা ওকে জেল থেকে বার করলাম, আবার গোলমাল পাকাল?'
কন্দর্পনারায়ণ হাতজোড় করে নমস্কার করে বললেন, 'না না, একদমই সেরকম কিছু নয়। আমরা দু—জনই খবরের কাগজ থেকে এসেছি। জেল থেকে বেরিয়ে কয়েদিরা নতুন জীবনে ফিরে কে কেমন আছেন, সরকার কোনও সাহায্য করছেন কি না, এসবই জানবার জন্য।'
কন্দর্পনারায়ণ এই সাজিয়ে বলবার প্ল্যানটা করেই এসেছিলেন, বলা তো যায় না, সত্যি কথা বললে যদি সাহায্য না পাওয়া যায়! মেহবুব বুদ্ধি করে ওর 'প্রেস' কার্ডটা পকেট থেকে বের করে দেখিয়ে দিলেন। নামী কাগজের রিপোর্টার জেনে ভদ্রমহিলা আর কিছু বললেন না। কিন্তু হাবেভাবে বুঝিয়ে দিলেন, সরফরাজ কাগজের লোকদের সঙ্গে কথা বলুন, তিনি চান না।
কন্দর্পনারায়ণ একটু খাতির করার চেষ্টা করে বললেন, 'কেন দিদি? সরকার থেকে কোনও সাহায্য পাননি? সরকার যে একটা স্কিম করেছে, যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আসামিরা খালাস হলে তাদের একটা ভাতা দেবে?' নিষ্পাপ, ভালোমানুষের মতো মুখ করে ভাব জমাবার চেষ্টা করলেন। এতে কাজ হল, সঙ্গে সঙ্গে ভদ্রমহিলা অনেকটা নরম হয়ে বললেন, 'তা—ই নাকি? এমন তো শুনিনি। তবে, এত বছর মামলা চালিয়ে যা ছিল, সর্বস্ব শেষ। ছেলে—মেয়েরা বড় হয়েছে। তারাই সংসার চালায়। সরফরাজ তো রাত হলেই বাংলা মদ খেয়ে চুর হয়ে থাকে। তখন ওকে ধরে ধরে ঘরে আনতে হয়। রোজকার এক সমস্যা। জেল থেকে বেরিয়ে সেই যে পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল—ব্যাস, আবার সেই পুরোনো নেশা। এখন প্রতিরাতে বাংলা মদ না হলে ওর চলে না। আর মদ খেয়ে একে গালাগালি করে, ওকে তেড়ে যায়।'
বলতে বলতে সরফরাজ ঘর থেকে বেরিয়ে এল। বিরাট চেহারা। এলোমেলো উশকোখুশকো চুল, বোঝা গেল, তখনও ঘুমোচ্ছিল, বিরাট ভুঁড়ি, ভুঁড়ির নিচে গিঁট দিয়ে পরা লুঙ্গি আর স্যান্ডো গেঞ্জি, বাংলা মদের গন্ধ বেরোচ্ছে মুখ দিয়ে। টকটকে লাল চোখ দিয়ে কন্দর্পনারায়ণ আর মেহবুবকে খানিকক্ষণ জরিপ করল। বোঝাই গেল, ঘুম থেকে উঠে আসতে বেশ বিরক্ত হয়েছে। তবে কাগজের লোক জেনে একটু শান্ত হল। মাঝবয়সি ভদ্রমহিলা, সরফরাজের স্ত্রী, ঘরের বাইরেই গলির ওপরে তিনটে টুল পেতে দিলেন। বোঝা গেল, ঘরের ভিতরে জায়গা নেই বলে, বাইরে গলিতেই টুল পেতে দিলেন।
সরফরাজ বেশ ভদ্রভাবেই বলল, 'সারাজীবন খুব কষ্ট পেয়েছি। বউ—বাচ্চাদেরও সুখী করতে পারিনি, স্যার। আমাকে ছাড়াই ওরা বড় হয়েছে। বউ এক—একেকবার জেলে দেখা করতে আসত আর কাঁদত, বলত, বাচ্চারা খিদের জ্বালায় কাঁদে। বউ বলত, সবাইকে নিয়ে বিষ খেয়ে মরবে। ছেলে—মেয়েরা বড় হয়ে আমার জন্য খরচাপাতি করে ভালো উকিল লাগিয়ে আমাকে সুপ্রিম কোর্ট থেকে ছাড়িয়ে এনেছে। পার্ক সার্কাসে আমার বড় বাড়ি ছিল। সব খুইয়ে আজ আমি বস্তিতে থাকি। ছেলে—মেয়েরা আমার জন্য সব করছে। আমি লজ্জায় মুখ দেখাতে পারি না। সন্ধে হলেই ওই লেকের ধারে বাংলা মদের ঠেকে গিয়ে বসি। আমি দুঃখ, লজ্জা ভুলতে মদ খাই, স্যার,' বলে দু—হাতে মুখ ঢাকল।
কন্দর্পনারায়ণ খেয়াল করলেন সরফরাজ যখন ডান হাতটা তুলে লেকের দিকটা দেখাল, তখন ওর ডান হাতটা কাঁপছে। কন্দর্পনারায়ণ প্রশ্ন করলেন, 'তোমার হাত কাঁপে? ডাক্তার দেখিয়েছ?'
সরফরাজ ভেজা চোখ তুলে বলল, 'নার্ভের রোগ ধরে গেছে, স্যার। সবসময়ই হাত—পা কাঁপে।'
আর খানিকক্ষণ কথা বলে দু—জনেই উঠে পড়লেন। গাড়িতে উঠে মেহবুব বললেন, 'রোজ রাতে বাংলা মদ না খেলে হয় না। বাড়িতে আপত্তি সত্ত্বেও। হাতগুলো কাঁপে, বশে নেই। তা ছাড়া মোটকা থলথলে চেহারা—তোমার শিল্পী খুনির প্রোব্যাবল লিস্ট থেকে একে বাদ দিতে পারো দাদা।'
কন্দর্পনারায়ণ নিজের নোট খাতার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বললেন, 'আমিও তা—ই ভাবছি। ছিপছিপে চেহারার চারটে ছেলেকে মারা এর পক্ষে সম্ভব নয় বলেই মনে হচ্ছে। কাল রাতে তোমাদের পাঠানো হোয়াটসঅ্যাপের ছবিগুলো দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল, যে মেরেছে, তার হাতে বেশ জোর আর ছুরির নিখুঁত স্ট্রোকে শরীরে আঁকিবুকি করে দিয়েছে। এর দ্বারা সেটা সম্ভব নয়, যদি না লোকটা পাক্কা অভিনেতা হয়।'
ভবানীপুরে কাঁসারিপাড়া লেনের একটা তস্য গলিতে রামেশ্বর থাকে। কন্দর্পনারায়ণ আর মেহবুব যখন পৌঁছোলেন, তখন রামেশ্বর ঘরে নেই। ভোরবেলা রিকশা ভ্যান চালিয়ে পাড়ার বাচ্চাদের ইস্কুল পৌঁছে দেয়। গলির মুখে একটা চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে দুটো লিকার চায়ে—র অর্ডার দিয়ে কন্দর্পনারায়ণ সরাসরি দোকানদারকেই রামেশ্বর সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। দোকানদার বয়স্ক লোক। রামেশ্বরকে দিব্যি চেনে। বলল, 'অনেকদিন আগে বউ মার্ডার কেসে রামেশ্বর জেলে গিয়েছিল। আসলে রামেশ্বর বউটাকে মারতে চায়নি। বউটার চালচলন ভালো ছিল না। রাত করে ঘরে ঢুকত। কার কার সঙ্গে কোথায় কোথায় চলে যেত। এ নিয়ে রামেশ্বর আর ওর বউয়ের মধ্যে ঝামেলা লেগেই থাকত। আমরা পাড়ার লোকেরা গিয়ে মিটমাট করে দিয়ে আসতাম। তারপর আবার সেই ঝামেলা। একদিন বউ আর রাত্রে ফিরল না। আমরা সবাই রামেশ্বরকে নিয়ে থানায় জানিয়ে এলাম। অনেক খোঁজাখুঁজি করলাম। দু—দিন পরে গঙ্গায় একটা ডেডবডি ভাসতে দেখা যায়। পরে জানা গেল ওটা রামেশ্বরের বউ। রামেশ্বর বউটাকে খুব ভলোবাসত, স্যার, বউকে ও মারেনি। ও তো বাড়িতেই ছিল। আমরা জানি। বউ নিখোঁজ হবার পর ও পুরো পাগল হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু পুলিশ ওকে ধরে নিয়ে যায়। পরে ওর সাজা লেগে যায়। এই তো কয়েক বছর আগে ও খালাস হয়ে বাইরে এল। এখন ও ট্যাক্সি বের করেছে—ট্যাক্সি চালায়।'
মেহবুব বললেন, 'তাহলে এই যে শুনলাম, ও রিকশা ভ্যান নিয়ে বেরিয়েছে। পাড়ার বাচ্চাদের ইস্কুলে দিতে গেছে। ও কি রিকশা ভ্যানও চালায় নাকি?'
দোকানদার বলল, 'বাবু, রামেশ্বর তো আর বিয়ে—শাদি করেনি। ও একাই থাকে। কয়েকদিন আগে ওর বুড়োমতন বন্ধু এসেছিল। সে বাচ্চাদের খুব ভালোবাসত। পাড়ার সব বাচ্চাকে, ফুটপাতে থাকে যে বাচ্চারা, তাদের নতুন জামাকাপড় দিয়েছে। সেই লোকটা রামেশ্বরকে একটা রিকশা ভ্যান কিনে দিয়েছে। বলে গেছে, পাড়ার সব বাচ্চাকে যেন রামেশ্বর ইস্কুলে দিয়ে আসে। আবার ছুটির সময় গিয়ে নিয়ে আসে। রামেশ্বর তাই রোজ ভোরবেলা পাড়ার সব বাচ্চাকে ওর রিকশা ভ্যানে বসিয়ে দিয়ে আসে, আবার ছুটির সময় নিয়ে আসে। এক পয়সাও নেয় না। রামেশ্বর আর ওর বুডঢা বন্ধু দু—জনেই দিলওয়ালা আছে, স্যার।'
বলতে বলতে রিকশাভ্যান চালিয়ে রামেশ্বর গলির মুখটায় এল। দোকানদার রামেশ্বরকে দেখিয়ে বলল, 'ওই যে, রামেশ্বর এসে গেছে।' বলেই হাঁক দিল, 'এ রামেশ্বরভাইয়া ইধার আ। এ বাবুলোগ আয়ে হ্যায়। তুঝসে মিলনে।'
কন্দর্পনারায়ণ চোখ তুলে তাকিয়ে দেখলেন, ট্যাক্সিচালকদের মতো মোটা নীলচে ফেড হয়ে যাওয়া জামা আর হাঁটু অবধি গোটানো প্যান্ট পরা, বেঁটে, কালো, টাকমাথা একটা লোক, রিকশা ভ্যানটা গলির মুখে সাইড করে রাখল। রিকশা ভ্যানটার গায়ে বড় বড় করে রং দিয়ে লেখা আছে 'চন্দনা'। রামেশ্বরের মোটা কাচের চশমা চোখে। কাঁধ থেকে একটা গামছা বের করে টাকের, মুখের ঘাম মুছে বলল, 'নমস্কার বাবু। আপনাদের তো চিনলাম না।'
মেহবুব গলায় ঝোলানো প্রেস কার্ডটা তুলে দেখিয়ে বললেন, 'আমি কাগজের লোক। জেল থেকে বেরিয়ে এই যে আপনি নতুন জীবনে ঢুকেছেন, মানুষের জন্য ভালো কাজ করছেন, পাড়ার বাচ্চাদের ইস্কুলে দিয়ে আসছেন, নিয়ে আসছেন—আপনার ওপরে একটা লেখা বের করব। এ—এ—ই সরকার সাহায্য—টাহায্য দিচ্ছে কি না, এইসব আর কী?'
সরকারি সাহায্যের কথা শুনে রামেশ্বর মুখ বাঁকাল। তারপর চায়ের দোকানদারের দিকে তাকিয়ে বলল, 'বাবুদের চা দে।'
কন্দর্পনারায়ণ হাতজোড় করে নমস্কার করে বললেন, 'না না, আমরা চা খেয়েছি।'
রামেশ্বর গামছা দিয়ে আবার মুখ মুছে বলল, 'খান—না আবার। আমার মতো গরিবের কাছে এসেছেন। আমার সৌভাগ্য। তা আমার কথা জানলেন কী করে? আমি তো জেল—খাটা আসামি।' মোটা কাচের চশমার ফাঁক দিয়ে রামেশ্বরের চোখ দুটো যেন কন্দর্পনারায়ণ আর মেহবুব দু—জনকেই জরিপ করেছিল। কন্দর্পনারায়ণ বুঝলেন, সরফরাজ যেমন খোলামেলা মনের লোক ছিল, এ সেরকম নয়। কন্দর্পনারায়ণ এবার প্রেসিডেন্সি জেলের দীপ্তবাবুর নাম নিলেন। দীপ্তবাবুর নাম শুনে রামেশ্বরের চোখের সন্দিগ্ধ দৃষ্টি অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে এল।
রামেশ্বরের সঙ্গে টুকটাক কথাবার্তা চলতে লাগল। যেমন বউ ওর সঙ্গে বেইমানি করেছে। তারপর নিজেই নিজের পাপের ফল ভোগ করেছে। কিন্তু রামেশ্বর বেকার 'ঝুঠ মুঠ কা কেসে' ফেঁসে নিজের জীবনের বেশির ভাগ সময়টাই জেলে কাটিয়েছে। এখন আর জীবনের কী—ই বা বাকি আছে। তবে, ও বার বার বলছিল যে, বউকে ও খুব ভালোবাসত, সেই বউই ওকে বিপদে ফেলে দিল।
কন্দর্পনারায়ণ হঠাৎ ওকে জিজ্ঞ্যেস করলেন, 'তুমি ট্যাক্সি চালাবার পাশাপাশি রিকশা ভ্যানও চালাও দেখছি।' রামেশ্বর বলল, যে তার এক বহু পুরোনো জিগরি দোস্ত আছে। খুব দুঃখী মানুষ। ক—দিন সে রামেশ্বরের কাছেই ছিল। সে বাচ্চাদের খুব ভালোবাসে। পাড়ার বাচ্চারা যাতে একটু আরামে পড়াশোনা করতে পারে, সেইজন্যই সে রিকসা ভ্যানটা রামেশ্বরকে দিয়ে গিয়েছে। বন্ধুর কথামতো রামেশ্বর বাচ্চাদের ভ্যান রিকসায় তুলে নিয়ে ইস্কুলে নিয়ে যায়, আবার ছুটির সময় নিয়ে আসে।
কথা বলতে বলতে কন্দর্পনারায়ণ প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন, 'চন্দনা কার নাম?'
চকিতে রামেশ্বর কন্দর্পনারায়ণের মুখের দিকে তাকাল, মুখের মাংসপেশি কঠিন হয়েই নরম হয়ে এল। তারপর চোখ নামিয়ে বলল, 'আমার জিগরি দোস্ত কি বেটি। আমার ভ্যানের গায়ে ওর নামটা দেখে জিজ্ঞ্যেস করছেন তো? আমার দোস্ত কি বেটি, মতলব মেরি ভি বেটি। পচ্চিশ সাল কি উমরমে বহোত বুঢ়ি, তরহাসে উনকো মার দিয়া গয়া। পুলিশ কুছ নেহি কিয়া। উস বেটি কি ইয়াদমে মেরা দোস্ত ভি জি রহা হ্যায়। ঔর ম্যায় ভি জি রহা হুঁ। উনকি ইয়াদমে। ম্যায় অওর মেরা দোস্ত মহল্লা কি সভি বচ্চোকো নয়া কপড়া দিয়া।'
'তুমহারা দোস্ত কাঁহা,' কন্দর্পনারায়ণ সহানুভূতির সুরে বললেন।
'খো গয়া অন্ধেরে মে,' উদাস ভঙ্গিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল।
'তার মানে? মারা গেছে?' কন্দর্পনারায়ণ উৎসুক হয়ে উঠলেন।
আচমকা যেন ঘোর কাটল রামেশ্বরের। সংবিৎ ফিরে পাওয়ার মতো করে চমকে উঠে বলল, 'নেহি নেহি। চলা গয়া। চলা গয়া,' বলতে বলতে উঠে পড়ল। হাবেভাবে বুঝিয়ে দিল, আর কিছু বলার নেই, এবার আসুন।
গাড়িতে উঠে দু—জনেই চুপ। মেহবুব নীরবতা ভঙ্গ করে বললেন, 'দাদা, এবার তাহলে অপারেশন মনোহর?'
কন্দর্পনারায়ণ বললেন, 'হু।'
হাওড়ার সাঁত্রাগাছি এলাকায় মনোহরের পৈতৃক বাড়ি। আজকে আগে যে দু—জনের বাড়িতে যাওয়া হয়েছিল, দু—জনেই দরিদ্র। কিন্তু মনোহর বনেদি বাড়ির ছেলে, একদম অল্প বয়সে, কলেজে পড়তে পড়তে কুসঙ্গে পড়ে অপরাধ করে জেলে যায়। মাত্র উনিশ—কুড়ি বছর বয়সেই প্রেসিডেন্সি জেলে ঢোকে। অল্পদিনেই মার্শালের নয়নের মণি হয়ে ওঠে। কন্দর্পনারায়ণের নোট অনুযায়ী ওর বর্তমান বয়স পঁয়ত্রিশ—ছত্রিশ।
ঠিকানা খুঁজে খুঁজে একটা বিরাট পাঁচিল—দেওয়া গাছগাছালি—ঘেরা বাড়ির সামনে এসে গাড়ি দাঁড়াল। বেলা তখন প্রায় বারোটা বাজে। দু—জনেই গাড়ি থেকে নেমে এলেন। বোঝা যাচ্ছে, বনেদি বাড়ির ছেলে মনোহর। বাড়ির বাইরের দেওয়ালে নেমপ্লেটে লেখা আছে—ডক্টর মৃন্ময় দাস, এম.ডি., অর্থাৎ এই বাড়ির মালিক একজন ডাক্তার এবং এই বাড়ির ছেলেই হল মনোহর। গেটের বাইরে থেকে কলিং বেল বাজাতেই দারোয়ান এসে দরজা খুলে দিল। কন্দর্পনারায়ণ আর মেহবুব দু—জনেই বাইরের বসার ঘরে এসে বসলেন। ডক্টর মৃন্ময় দাস, বোঝা গেল—নামকরা ডাক্তার। এলাকার অনেক মানুষই তাঁর কাছে আসেন, এবং আজকেও রবিবারে চেম্বারে বেশ ভিড়।
কন্দর্পনারায়ণ দারোয়ানকে বললেন যে, তাঁরা ডক্টর দাসের কাছে আসেননি। এসেছেন মনোহর দাসের সঙ্গে দেখা করতে। দারোয়ান শুনে একটু অবাক হল। বোঝা গেল, মনোহরের সঙ্গে দেখা করতে কেউ আসে না। দারোয়ান কোনও কথা না বলে, ডক্টর দাসের চেম্বারেই ঢুকে গেল। পাঁচ মিনিট পর ভেতর থেকে ডাক এল।
কন্দর্পনারায়ণ আর মেহবুব দু—জনেই ডক্টর মৃন্ময় দাসের চেম্বারে ঢুকলেন। বেশ বড় চেম্বার। একদিকে পরদা—দেওয়া বেডের ব্যবস্থা আর একদিকে বড় টেবিলের ওপারে ভারিক্কি, সৌম্য চেহারার এক ভদ্রলোক বসে। বোঝা গেল, ইনিই ডক্টর দাস। কন্দর্পনারায়ণ আর মেহবুব এতটা ভাবতেও পারেননি। এই বাড়ির ছেলে মনোহর? কন্দর্পনারায়ণ আর মেহবুব হাতজোড় করে নমস্কার করলেন। মেহবুব বললেন, তিনি খবরের কাগজ থেকে আসছেন। জেল থেকে বেরিয়ে অভিযুক্তরা কেমন আছেন, সেই নিয়ে একটা স্টোরি করতে চান। ডক্টর দাস একজন লোককে ডেকে চা আনতে বলে, সব শুনে বললেন, 'দেখুন, আপনারা এসেছেন, ভালো কথা। কিন্তু আমি আমার ছেলের কথা কাগজে বেরোক, চাই না। এলাকায় আমার সুনাম আছে। এটা ঠিক, যে আমার ছেলে কুসঙ্গে পড়ে গোল্লায় গিয়েছিল। কিন্তু অনেক কষ্টে ওকে আমি জেল থেকে বের করেছি। এখন ওকে সবসময় নজরে নজরে রাখি। কাউকে সরাসরি ওর কাছেও ঘেঁষতে দিই না। ভয় হয়, আবার যদি অপরাধের জালে জড়িয়ে যায়—তাই আপনারা এসেছেন জেনে, আগে আমি ডেকে পাঠালাম।'
কন্দর্পনারায়ণ বলে উঠলেন, 'ঠিকই তো। এই বাড়ির ছেলে, এতদিন জেলে কাটাল! আপনি চোখে চোখে রেখে ঠিকই করেন। তা মনোহর কি এখন আর বাইরেই বেরোয় না?'
ডক্টর দাস বললেন, 'বেরোয়। ও প্রেসিডেন্সি জেলে ফুটবল টিমের ক্যাপ্টেন ছিল। খেলাধুলো ভালোবাসে। ওকে আমি জিমে ভরতি করে দিয়েছি। ও জিমে যায়। তবে একা বাইরে ছাড়ি না। আমি ওর সঙ্গে সবসময় লোক দিই। তারা ছায়ার মতো ওর সঙ্গে সেঁটে থাকে।' তারপর চোখ নামিয়ে বললেন, 'একবার ওকে আমি ছেড়ে যে ভুল করেছি, সেই ভুল আর করতে চাই না। তবে সন্ধে ছ—টার মধ্যেই ওকে ঘরে ঢুকতে হয়। আমি বা ওর মা সবসময় ওর সঙ্গে সঙ্গে থাকি। ছ—টার পর আমিও আর চেম্বার করি না। ওকে সঙ্গ দিই, ওর সঙ্গে টিভি দেখি, গল্প করি। আমি, মনোহর আর ওর মা, তিনজনে মিলে মাঝে মাঝে কলকাতায় ক্লাবে যাই, আমি বিভিন্ন ক্লাবের মেম্বার। মানে ওর মনটা ভালো রাখার চেষ্টা করি। যা আমাদের অনেক আগে করা উচিত ছিল তা—ই এখন করি। তখন ওকে সময় দিতে পারিনি। তখন আমিও নাম করছি। ছেলেকে সময় দিলে হয়তো আজকে এদিন দেখতে হত না।'
বলতে বলতে চা—বিস্কুট এসে গেল। ডক্টর দাস লোকটিকে বললেন, 'যা তো, দাদাকে ডেকে আন, বলবি, খবরের কাগজের লোক এসেছেন আর নামকরা একজন ল'ইয়ার এসেছেন।'
কন্দর্পনারায়ণ চমকে উঠলেন। মেহবুবের সঙ্গে চোখ চাওয়াচাওয়ি করে মৃদু হেসে বললেন, 'হ্যাঁ, আপনি ঠিকই বুঝেছেন। আসলে ও আমার ভাইয়ের মতো। যখন শুনলাম, ও মনোহরের কাছে আসছে, তখন আমিও চলে এলাম।'
ডক্টর দাসও হাসতে হাসতে বললেন, 'আপনাকে আমি টিভি—তে দেখেছি। ছেলে যখন জেলে ছিল, তখন অনেকবারই ভেবেছি, আপনার কাছে যাব। যা—ই হোক, আজকে আপনাকে দেখেই চিনেছি। তারপর দেখলাম, কোনও এক অজ্ঞাত কারণে আপনি পরিচয় দিচ্ছেন না।'
কন্দর্পনারায়ণ লজ্জা পাওয়ার ভঙ্গিতে হাসলেন—'না না, তা নয়। মনোহরের কথা আমি পড়েছিলাম কাগজে। ও প্রেসিডেন্সির জেলের ফুটবল টিমকে চ্যাম্পিয়ন করে। একবার টিম নিয়ে ও মুম্বইতেও খেলতে গিয়েছিল। সেবার প্রেসিডেন্সি জেল মুম্বইয়ের টিমকে হারিয়ে দেয়। খেলার ফল ছিল ১—০। একমাত্র গোলটা মনোহরই করে।'
ঘরের পরদা সরিয়ে মনোহর ঢুকল। তাকিয়ে থাকবার মতো চেহারা। প্রায় ছ—ফুট হাইট, পেশিবহুল চেহারা, টিকালো নাক, কায়দা করে ছাঁটা চুল, ধবধবে ফরসা গায়ের রং। কন্দর্পনারায়ণ ডক্টর দাসকে খুশি করার জন্য বললেন, 'আরিব্বাস! আপনার ছেলের তো নায়কের মতো চেহারা এইরকম একটা চেহারা। জেলের মধ্যে পড়ে ছিল?' তারপর মনোহরের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'ভাই, আপনার কিন্তু সিনেমায় নামা উচিত।'
ডক্টর দাস সলজ্জ ভঙ্গিতে বললেন, 'আপনাদের আমি এতক্ষণ বলিনি, ও কিন্তু অলরেডি একটা ফিলমের কাজ শুরু করেছে। শুটিংও শুরু হয়েছে। ওই যেমন বললাম—সঙ্গে লোক যায়, বসে থাকে। শুটিং শেষ হলে আবার নিয়ে আসে। আমি একটা গাড়ি ছেড়ে দিয়েছি ওর জন্য।' তারপরই ডক্টর দাস মনোহরকে কন্দর্পনারায়ণের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিলেন। মনোহর সঙ্গে সঙ্গে কন্দর্পনারায়ণকে চিনতে পারল, এবং বলল, 'স্যার আপনার নাম অনেক শুনেছি। জেলের থেকে অনেককেই আপনি বের করেছেন। বলরামদা, ইমরান সবাই তো আপনার মক্কেল। তা—ই না?'
কন্দর্পনারায়ণ আর বেশি সময় নিলেন না। তবে মেহবুব, ডক্টর দাসকে কথা দিলেন যে, মনোহরকে নিয়ে কোনও স্টোরি আপাতত কাগজে বেরোবে না। তবে ওর সিনেমা রিলিজ করলে, মেহবুব তখন একটা বড় করে স্টোরি করবে। আসলে স্টোরি আর এখন করছেই বা কে? খুনিদের সন্ধানে তো এখানে আসা। খবরের কাগজের স্টোরি করতে চাওয়া তো একটা স্ট্র্যাটেজি মাত্র। তবে ডক্টর দাস কিন্তু কন্দর্পনারায়ণকে চিনে ফেলেছেন। ডক্টর দাস মনোহরকে বললেন, 'যাও, গেট অবধি এগিয়ে দিয়ে এসো।'
এতক্ষণ এই সুযোগটাই চাইছিলেন কন্দর্পনারায়ণ। মনোহরের সঙ্গে একটু একা কথা বলার সুযোগ। গেটের দিকে আসতে আসতে মনোহরকে কন্দর্পনারায়ণ জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনি তো জিমে যান। সুন্দর চেহারা আপনার। জেলে কি ব্যায়াম করতেন?'
মনোহর বলল, 'নিশ্চয়ই। তবে জেলের ভেতরে হালকা এক্সারসাইজ করতাম, দৌড়োতাম, দিনে হাজার—দু—হাজার স্কিপিং করতাম। ফুটবল—ক্রিকেট খেলতাম।'
কন্দর্পনারায়ণ এবারই মোক্ষম তিরটা ছুড়লেন। গাড়ির দরজা খুলতে খুলতে খুব ক্যাজুয়ালি প্রশ্ন করলেন, 'আচ্ছা, শুনেছি মার্শালের খুব কাছের লোক ছিলেন আপনি?'
মনোহর বোঝা গেল পরিষ্কার মনের ছেলে। খানিকক্ষণ হাঁ করে কন্দর্পনারায়ণ মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, 'মার্শাল আমাকে খুব ভালোবাসত। জেলে তখন আমিই সবচেয়ে ছোট। যদিও আমি একটা অপরাধ করে জেলে ঢুকেছিলাম। তবে সবাই জানত, আমি বড় বাড়ির ছেলে। কলেজে পড়তে পড়তে একটা ভুল করে ফেলি। কিন্তু ছুরি, পিস্তল আমার কাছে তেমন পরিচিত নয়। মার্শাল আমাকে ছুরি ধরা শিখিয়েছিল।'
মেহবুব প্রশ্ন করলেন, 'জেলের মধ্যে ছুরি পেতেন কোথায়?'
মনোহর একটু হেসে প্রশ্নটা এড়িয়ে গেল। 'তবে ওর শিষ্য বলতে যা বোঝায়, তা আমি ছিলাম না। ওর শিষ্য ছিল দীনবন্ধু।'
কন্দর্পনারায়ণ অন্ধকারে ঢিল ছুড়লেন—'দীনবন্ধু? হ্যাঁ হ্যাঁ। গতকালই তো আমরা প্রেসিডেন্সি জেলে গিয়েছিলাম। ওর সঙ্গে দেখা হল। আমাকে ওর নিজের হাতে বানানো একটা কাঠের মূর্তি দিল।'
মনোহর ভুরু কুঁচকে তাকাল—'ওকে প্রেসিডেন্সি জেলে দেখলেন? ও আবার ঢুকে গেছে?'
কন্দর্পনারায়ণ আর মেহবুব একসঙ্গে বলে উঠলেন, 'ঢুকে গেছে মানে? ও কি বেরিয়েছিল নাকি?'
মনোহর উদাস ভঙ্গিতে বলল, 'খুব ভালো লোক দিনুদা। তবে খুব চাপা স্বভাবের আর খুব জেদি। নিজের সম্পর্কে কিছুতেই বলতে চাইত না। বছরখানেক আগে দীনুদার ফ্যামিলিতে খুব খারাপ কিছু হয়েছিল। কিন্তু কী হয়েছিল, আমি জানি না। দিনুদা জেলের কাউকে বলেনি, আমি নিজে দিনুদাকে একা একা হাউ হাউ করে কাঁদতে দেখেছি। সেলে যখন কেউ থাকত না, তখন দিনুদা মাটিতে লুটিয়ে পড়ে কাঁদত, কিন্তু কেন কাঁদছে জিজ্ঞেস করলেই দিনুদা চুপ।'
কন্দর্পনারায়ণ চিন্তিত মুখে জিজ্ঞেস করলেন, 'একটু ভেবে দেখুন তো, দীনবন্ধুর মেয়ের সঙ্গে কোনও ঘটনা বা দুর্ঘটনা ঘটেছিল কি?
মনোহর ঠোঁট কামড়ে একটু চিন্তা করে বলল, 'বলতে পারব না। বললাম না, দিনুদা খুব চাপা। তবে জেলে দিনুদার সঙ্গে একজনই নিয়মিত দেখা করতে আসত, সে হল রামেশ্বরদা। রামেশ্বরদাকে চেনেন? জেলে দিনুদার সবচেয়ে কাছের বন্ধু ছিল। রামেশ্বরদা জেল থেকে বেরিয়ে যাবার পর দীনুদা ভীষণ একা হয়ে যায়। রামেশ্বরদা প্রায় দিনুদার কাছে আসত। ফিসফিস করে কথা বলত। বারকয়েক 'দিঘা' শব্দটা দিনুদার মুখে শুনেছিলাম।'
তারপর একটু থেমে আবার বলল, 'দিনুদার সঙ্গে রাস্তায় দেখা হওয়াটা অ্যাক্সিডেন্ট বলতে পারেন। গত রবিবার ডায়মন্ড হারবারে আমার ফিলমের শুটিং সেরে ফিরছিলাম। বেশ খানিকটা রাত হয়েছে। ডায়মন্ড হারবার রোডের ওপর পৈলানের কাছে একটা ফাঁকামতো জায়গায় একটা ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে ছিল। আমাদের গাড়ির হেডলাইট সরাসরি সেই গাড়িটায় পড়েছিল। পরিষ্কার দেখেছি, ট্যাক্সির ফ্রন্ট সিটে দিনুদা আর রামেশ্বরদা বসে আছে। ওরা অবশ্য আমাকে দেখেনি। আমাদের গাড়ির হেডলাইটটা চোখে এসে পড়ায় দিনুদা বাঁ হাতটা তুলে, চোখটা আড়াল করছিল। আপনি যখন বললেন গতকাল আপনারা প্রেসিডেন্সি জেলে গিয়েছিলেন, আর দিনুদার সঙ্গে আপনাদের দেখা হয়েছিল, তখন বুঝলাম, দিনুদা প্যারোলে বেরিয়েছিল। আবার ঢুকে গেছে।'
গাড়িতে উঠেই কন্দর্পনারায়ণ ড্রাইভারকে বললেন, 'জলদি চলুন। প্রেস ক্লাব। মেহবুব, ঋজু আর অমিতকেও ডেকে নাও। আলোচনা আছে।'
মোবাইল ফোনে হোয়াটসঅ্যাপ খুলে, চারটে মৃতদেহের ছবি খুব মনোযোগ দিয়ে দেখতে লাগলেন। চারটে ছবিতেই বোঝা যাচ্ছে, যাদের মারা হয়েছে, তাদের শরীরের ঊর্ধ্বাঙ্গে দ্রুত আর নিপুণ হাতে ছুরি দিয়ে আঁকিবুকি চালানো হয়েছে। তারপর প্রতিটি দেহের বুকের বাঁদিকে গভীর ক্ষত তৈরি করা হয়েছে। একটা জিনিস স্পষ্ট, খুনি প্রচণ্ড আক্রোশ থেকে এইরকম আঘাত করেছে।
মেহবুব বলে উঠলেন, 'দাদা, তাহলে কি রামেশ্বর আর দীনবন্ধু?'
'যদি তা—ই হয়ও, কিন্তু কেন? রামেশ্বর আর দীনবন্ধুর ওই ছেলেগুলোর ওপর তীব্র আক্রোশ কেন? বেছে বেছে ওই চারজনকে মারা হল কেন? ওই চারজনের নিজেদের মধ্যে কী সম্পর্ক, সেটা কিন্তু এখন ক্লিয়ার হয়নি। দীনবন্ধু আর রামেশ্বর যদি চারটে খুন করেও থাকে, কেন করেছে, সেটাও জানা দরকার। খুনের মোটিভটা স্পষ্ট হতে হবে।' তারপর একটু থেমে, কন্দর্পনারায়ণ মেহবুবকে আবার বললেন, 'তোমাদের পেপারের দিঘার লোকাল রিপোর্টারকে একটু ধরতে পারবে ফোনে?'
মেহবুব দিঘার লোকাল রিপোর্টারকে ফোনে ধরে, ফোনটা কন্দর্পনারায়ণকে দিলেন।
কন্দর্পনারায়ণ ফিসফিস করে কিছু ইনস্ট্রাকশন দিলেন। গাড়ির হর্নের আওয়াজে শোনা গেল না।
পরের ফোনটা করলেন দীপ্তবাবুকে—'একটা খবর দিতে হবে, আর্জেন্ট।' তারপর লজ্জিত ভঙ্গিতে বললেন, 'আমি বার বার আপনাকে বিরক্ত করি। সরি।'
ওপার থেকে দীপ্তবাবু বললেন, 'বলুন—না, কোনও অসুবিধে নেই। আমি অফিসেই আছি।'
'আপনার জেলের দীনবন্ধু কি প্যারোলে বাইরে বেরিয়েছিল? যদি তা—ই হয় তাহলে কবে থেকে ও বাইরে ছিল আর ওর প্যারোল শেষ হয় কবে?'
দীপ্তবাবু বললেন, 'হ্যাঁ, দীনবন্ধু প্যারোলে বাইরে বেরিয়েছিল। কিন্তু কবে থেকে ওর প্যারোল স্যাংশন হয়েছিল, রেকর্ড দেখে বলছি।'
রবিবারের প্রেস ক্লাব। বেলা প্রায় পাঁচটা বাজে। বাইরের লনে চারটে চেয়ার পেতে বসা হল। ঋজু আর অমিত ফোন পেয়েই ইন্টারেস্টিং কিছু ঘটেছে আন্দাজ করে অফিস থেকে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে সোজা প্রেস ক্লাবে চলে এলেন। মেহবুব খাবারের অর্ডার দিয়ে রেখেছিলেন। প্রত্যেকেরই প্রচণ্ড খিদে পেয়েছে। কন্দর্পনারায়ণ আর মেহবুব তো আজকে লাঞ্চও করেননি। কন্দর্পনারায়ণ কফির কথা বলে রেখেছিলেন। প্রত্যেকের জন্য কফিও চলে এল।
কন্দর্পনারায়ণ কফিতে চুমুক দিয়ে অত্যন্ত তৃপ্তির সঙ্গে একটা আওয়াজ করলেন, 'আঃ'।
'কালকে তোমরা যে মৃতদেহগুলোর শরীরের ছবি পাঠিয়েছিলে, সেগুলো দেখতে দেখতেই আমি বুঝতে পেরেছিলাম, খুনি প্রচণ্ড আক্রোশে খুনগুলো করেছে। দেখো, আমরা সাধারণত খুন বলতেই বুঝি পিস্তলের গুলিতে বা ছুরির একটা বা দুটো আঘাতে খুন। কোথাও কোথাও অবশ্য কুপিয়ে খুন করার ঘটনাও পাই। এখানে খুনি যেন চারজনকে শিকার হিসেবে বেছে নিয়েছিল। তারপর সুযোগের অপেক্ষায় থেকেছে। নিরালা নির্জনে শিকারকে পেয়ে শুধু খুনই করেনি, নিজের গায়ের ঝালও মিটিয়েছে। কাল অনেক রাতে যখন হোয়াটসঅ্যাপে মৃতদেহগুলোর ছবি খুঁটিয়ে দেখছি, তখন আমার চোখের সামনে টেবিলের ওপরেই রাখা ছিল দীনবন্ধুর দেওয়া কাঠের ওপর খোদাই করা বাউলের মূর্তিটা। ছবিগুলো দেখতে দেখতে কাকতালীয়ভাবেই আমার চোখ পড়ে মূর্তিটার গঠনশৈলীর দিকে। মৃতদেহগুলোর শরীরে ছুরির স্ট্রোক আর কাঠের বাউলমূর্তির শরীরে ছেনির স্ট্রোক যেন একই লোকের। আমার কাল রাতেই মনে হচ্ছিল, দীনবন্ধু নয় তো? কিন্তু দীনবন্ধু তো জেলে, ওর পক্ষে কীভাবে সম্ভব?'
আবার কফিতে লম্বা চুমুক দিয়ে সামনে রাখা ফিশ কাটলেটের থেকে একটা অংশ ভেঙে মুখে দিয়ে চিবোতে চিবোতে বললেন, 'আজ সরফরাজকে দেখে ওকে আমি হিসেব থেকে বাদ দিয়ে দিই। ওরকম থলথলে মোটাসোটা চেহারা নিয়ে কাঁপা কাঁপা হাতে হয়তো ছুরি চালাতেও পারে, কিন্তু এরকম নিখুঁত ছুরির কাজ করা সম্ভব নয়। আবার বলছি, যদি আমাদের সামনে করা ওর আচরণ অভিনয় না হয়। তাহলে ওকে স্যালুট করতে হত। মানতে হত, মার্শাল শুধু একদল ছুরি চালানোয় দক্ষ লোকই তৈরি করেনি, ভালো অভিনেতাও তৈরি করেছে।'
'রামেশ্বরকে দেখে মনে হয়েছে শক্তপোক্ত চেহারা, ধূর্ত দৃষ্টি। কিন্তু ও কেন অতগুলো খুন করবে? ওর ওখানে গিয়ে ওর জিগরি দোস্তের কথা জানতে পারলাম, যে বাচ্চাদের ভালোবাসে। বাচ্চাদের নিয়ে ইস্কুলে যাওয়া—আসা করার জন্য রিকসা ভ্যান দিয়েছে। বাচ্চাদের নতুন জামাকাপড় দিয়েছে। আমার রামেশ্বরকে সন্দেহটা প্রথম হয়, যখন ওকে আমি রিকসা ভ্যান চালিয়ে আসতে দেখি। রিকসা ভ্যানটার গায়ে রং দিয়ে লেখা 'চন্দনা'। তখন আমার প্রথম খটকাটা লাগে। রামেশ্বর বিহারি হিন্দিতে কথা বলে। ওর ভ্যান রিকসায় বিশুদ্ধ বাংলায় চন্দনা লেখা কেন? চন্দনা কার নাম? তারপর দ্বিতীয় খটকা, ওর জিগরি দোস্তের কথা, যে কয়েকদিন আগেও ওর সঙ্গে ছিল, এখন আর নেই। কিন্তু তার কথা উঠতেই, ও উঠে পড়ল। বুঝলাম, ও কিছু গোপন করতে চাইছে।'
'মনোহরকেও প্রথমে সন্দেহের তালিকায় রেখেছিলাম, কিন্তু পরে দেখলাম মনোহর বিরাট বড়লোকের ছেলে, ওর বাবা এখন ওকে চোখে চোখে রেখেছেন। তা ছাড়া ওর সামনে সুন্দর ভবিষ্যৎ। কিন্তু আমার চোখ খুলে দিল মনোহর। ও জানাল, গত পনেরোই মার্চ, রবিবার জোকার কাছে একটা নিরিবিলি জায়গায় ও দীনবন্ধুকে দেখেছে। হতে পারে কাকতালীয় ব্যাপার। কিন্তু আমাদের রহস্য উদঘাটনে দারুণ সাহায্য করল। আমি আমার নোট খাতা মিলিয়ে দেখলাম। গত পনেরোই মার্চ রবিবার রাত্রেই কাজ থেকে বাড়ি ফেরার সময় বাইশ বছরের রাজকুমার পাল খুন হয়। পৈলান আর খড়িবেড়িয়ার মাঝে ওর মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখা যায়। পর পর চারটে খুনের মধ্যে তৃতীয় খুন ছিল সেটা। আর—একটা কথা, ট্যাক্সিতে দীনবন্ধুর সঙ্গে বসে ছিল রামেশ্বর।'
সবাই একমনে শুনেছিলেন। মেহবুব বললেন, 'তা ছাড়া জেলের মধ্যে রামেশ্বরই ছিল দীনবন্ধুর সবচেয়ে কাছের লোক। জেল থেকে বেরোবার পরও রামেশ্বর অনেকবারই জেলে গিয়ে দীনবন্ধুর সঙ্গে দেখা করেছে। মনোহর আরও বলে যে, দীনবন্ধু খুব চাপা স্বভাবের আর খুব দুঃখী। মনোহর জেল থেকে বেরোবার আগে নোটিশ করেছে যে, মাঝে মাঝেই দীনবন্ধু হাউ হাউ করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে কাঁদছে। কিন্তু জিজ্ঞেস করলে দীনবন্ধু কোনও উত্তর দেয় না।'
কন্দর্পনারায়ণ আবার বলা শুরু করলেন, 'মনোহরের বাড়ি থেকে বেরিয়েই গাড়িতে আমি দীপ্তবাবুকে ফোন করি, দীনবন্ধু প্যারোলে জেল থেকে বেরিয়েছিল কি না জানবার জন্য। দীপ্তবাবু আমাকে জানিয়েছেন, ফোর্থ মার্চ দীনবন্ধুর স্ত্রী মারা যান। রামেশ্বরই জেলে খবর দেয়। ফিফথ মার্চ দীনবন্ধুর চোদ্দো দিনের জন্য প্যারোল মঞ্জুর হয়। উনিশ তারিখ ওর প্যারোল শেষ হবার কথা, কিন্তু আঠারো তারিখ সকালেই দীনবন্ধু জেলে ফিরে আসে।'
'মাই গড! তার মানে দীনবন্ধুই'—একসঙ্গে ঋজু আর অমিত বলে ওঠেন।
'দাঁড়াচ্ছে তা—ই। কিন্তু দীনবন্ধু মেরেছে বললেই তো আর হবে না। দীনবন্ধু চারটে বাচ্চা ছেলেকে খুঁজে খুঁজে মারবে কেন? মনোহরের কথা থেকে আর—একটা ক্লু পাই। মনোহর যখন জেলে ছিল, তখন রামেশ্বর দেখা করতে এলে, দিঘা শব্দটা ওদের মধ্যে বলতে শুনেছে। আমি তোমাদের দিঘার লোকাল রিপোর্টারকে খোঁজ নিতে বলি, এক বছর—দেড় বছরের মধ্যে চন্দনা বলে কোনও মেয়েকে নিয়ে দিঘায় কোনও ইনসিডেন্ট হয়েছে কি না? তোমাদের দিঘার লোকাল রিপোর্টার এই একটু আগে ফোন করে জানাল, ঠিক এক বছর আগে ফোর্থ মার্চ তারিখে কয়েকটি মেয়ে দিঘায় একসঙ্গে বেড়াতে এসেছিল। হোটেল দিঘাতেই তারা ওঠে। ওই হোটেলে চারটে ছেলে এসে কয়েকদিন ধরে থাকছিল। তারা চন্দনাদের গ্রুপটার সঙ্গে বন্ধুত্ব করে। তারপরই চন্দনা বলে মেয়েটি মিসিং হয়ে যায়। দু—দিন পরে সমুদ্রের ধারের ঝাউবন থেকে চন্দনার ক্ষতবিক্ষত মৃতদেহ পাওয়া যায়। রেপড অ্যান্ড মার্ডারড।'
'সে কী?'—সবাই সমস্বরে বলে ওঠেন।
'ইয়েস। আমার কাছেও দুয়ে দুয়ে চার হল। তোমাদের লোকাল রিপোর্টার আরও জানায় যে, কেস চালু হয়, চারজনের বিরুদ্ধে। চারজন বন্ধুরই কাছাকাছি বয়স। নাম শুনলে অবাক হোয়ো না—হায়দার কাশিম, গোবিন্দ ধর, রাজকুমার পাল এবং সামসুল। ঋজু এতক্ষণ নোট খাতা খুলেই বসে ছিলেন—নোট দেখে বললেন, 'এগারোই মার্চ, বুধবার খুন হয় হায়দার কাশিম, ধাপার ধারে। তেরোই মার্চ, শুক্রবার খুন হয় গোবিন্দ ধর, সোদপুর স্টেশনের কাছে। পনেরোই মার্চ, রবিবার খুন হয় রাজকুমার পাল, ডায়মন্ড হারবার রোডের ওপর খড়িবেড়িয়ার কাছে। এই খুনটার আগেই মনোহর দেখে ফেলে দীনবন্ধু আর রামেশ্বরকে। আর চতুর্থ খুনটা মঙ্গলবার, সতেরোই মার্চ, গড়িয়া ঢালাই ব্রিজের কাছে। সামসুল খুন হয়ে যায়।'
'তার মানে দাঁড়াচ্ছে, এই ছেলেগুলো চন্দনাকে তুলে নিয়ে যায়, রেপ করে মার্ডার করে, বডি সমুদ্রের ধারে ঝাউবনে ছুড়ে ফেলে দেয়। পুলিশ কেস চালু করে, ওদের অ্যারেস্টও করে, কিন্তু প্রমাণের অভাবে চারজনই ছাড়া পেয়ে যায়। দীনবন্ধু তার প্রিয় বন্ধু রামেশ্বরের সঙ্গে প্ল্যান করতে থাকে। ফোর্থ মার্চ দীনবন্ধুর স্ত্রী মারা যান। দীনবন্ধু প্যারোলে বেরিয়ে আসে। রামেশ্বরের সঙ্গে প্ল্যান করে, আইন যাদের সাজা দিতে পারেনি, তাদের নিজের হাতে সাজা দেয় এবং চরম আক্রোশে, মার্শালের শেখানো স্টাইলে, অপরাধীদের সারা শরীরে ছুরি দিয়ে কারুকার্য করে দেয়।'
কন্দর্পনারায়ণ থামতেই অমিত বললেন, 'আর রামেশ্বরের ভূমিকা?' 'রামেশ্বর আসছে, ওর মুখ থেকেই শুনে নাও।' —কন্দর্পনারায়ণ মিটিমিটি হাসছেন।
'রামেশ্বর আসছে? এখানে? ও জানে যে, আমরা সব জেনে গেছি?' অমিত উৎসুক হয়ে প্রশ্ন করলেন।
'এখানে বসে বসেই আমি রামেশ্বরকে ফোন করি। আজকে সকালে রামেশ্বরের বাড়ি খুঁজতে গিয়ে গলির মুখের চায়ের দোকানদার, যে রামেশ্বরের বহুদিনের চেনা, চা খেতে খেতে ওকে জিজ্ঞাসা করে, রামেশ্বরের ফোন নম্বর নিয়ে নিয়েছিলাম। রামেশ্বরকে ফোন করতেই সে বলে, যে নিউ মার্কেটের সামনে প্যাসেঞ্জার নামাচ্ছে। আসতে পারবে না। আমি তখন চাপ দিলাম, বললাম, যে সে কী চায়? আধ ঘণ্টার মধ্যে প্রেস ক্লাবে না এলে, রাত্রে বাড়িতে পুলিশ যাবে। ওকে তো তুলবেই, ওর সাধের চন্দনা লেখা রিকসা ভ্যানটাকে ভেঙে দেওয়া হবে। কারণ ওটা একটা খুনির টাকায় কেনা, যে পর পর চারটে খুন করেছে। আর এক্ষুনি এলে আমরা ওদের বাঁচিয়ে দিতে চেষ্টা করব। তাতেই কাজ হয়েছে, ও আসছে।'
কন্দর্পনারায়ণের কথা শেষ হতে না হতেই প্রেস ক্লাবের বাইরে রামেশ্বরের ট্যাক্সি এসে দাঁড়াল। দরজা খুলে রামেশ্বর ক্লাবের লনে ওদের সামনে এসে দাঁড়াল।
কন্দর্পনারায়ণ বললেন, 'ওখানে চেয়ার রাখা আছে। একটা চেয়ার টেনে এনে বোসো। কথা আছে।'
রামেশ্বর বসল, জেদি একরোখা মূর্তি। এই মূর্তি সকালে ছিল না। রামেশ্বর ধরা পড়ে গিয়েছে, বুঝেও এসেছে। কম বুকের পাটা নয়।
কন্দর্পনারায়ণ বললেন, 'রামেশ্বর, যা যা হয়েছে, সব বলো।'
রামেশ্বর বলতে শুরু করল, 'একটাই মেয়ে ছিল দিনুদার। দিনুদা যখন জেলে ঢোকে, তখন কয়েক মাস বয়স। ওই মেয়েই টিউশন করে করে পয়সা জমিয়ে মামলা চালিয়ে দিনুদাকে জেল থেকে বের করার চেষ্টা করছিল। আমরা সবাই বেরিয়ে এলাম, দীনুদা জেলে একলা হয়ে যাচ্ছিল। গত বছর, চৌঠা মার্চ দিনুদার মেয়ে কলেজের বন্ধুদের সঙ্গে দিঘা বেড়াতে গিয়েছিল, সেখানে চারটে ছেলে ওদের পিছু নেয়। চন্দনাবেটিকে টার্গেট করে মারুতি ভ্যানে তুলে নিয়ে গিয়ে রেপ করে মার্ডার করে। খুব কষ্ট দিয়ে মেরেছে, স্যার। খুব কষ্ট দিয়েছে।'
রামেশ্বর কাঁধের ঘেমো গামছা দিয়ে চোখ মুছে আবার বলতে শুরু করল, 'পুলিশ কেস চালু করল। ওই চারজনকে তুলেও নিল। কিন্তু চন্দনাবেটির কলেজের বন্ধুরা কোনও হেল্প করল না। ওরা ভয় পেয়ে গেল। ওই চারটে ছেলে বেরিয়ে গেল। পুলিশ, কোর্ট কিছু করতে পারল না। আমি ওই চারটে ছেলে কোথায় থাকে, কোথায় যায়, সব খুঁজে খুঁজে বের করলাম। আমার সুবিধা ছিল, আমি ট্যাক্সি নিয়ে নিয়ে ঘুরি। আমার পক্ষে, ওদের বাড়ি কোথায়, কোথায় কাজ করে, কোন রাস্তা দিয়ে ফেরে, সব জানা কোনও ব্যাপার ছিল না। চন্দনাবেটির খবর পেয়ে দিনুদা খুব কাঁদত, কিন্তু কাউকে কিছু বলত না। বাড়িতে ভাবিজি একা থাকতেন। বেটিকে হারিয়ে উনিও পাগল হয়ে গিয়েছিলেন। আমি ভাবিজির খোঁজখবর রাখতাম। ভাবিজিকে খাবার দিয়ে আসতাম। ভাবিজিকে পুরোনো বাড়ি থেকে নিয়ে এসে আমার কাছেই জগুবাজারে একটা ঘর ভাড়া করে দিই, যাতে রোজ দেখভাল করতে পারি। কিন্তু এই বছর চৌঠা মার্চ একই দিনে ভাবিজিও গলায় দড়ি দিয়ে সুইসাইড করে নেয়। স্যার, আমি আমার কাছাকাছি ভাবিজিকে নিয়ে এসেও বাঁচাতে পারিনি।'—হাউ হাউ করে কান্নায় ভেঙে পড়ল রামেশ্বর।
একটু থিতু হয়ে আবার শুরু করল, 'দিনুদা চোদ্দো দিনের প্যারোলে বেরিয়ে এল। ভাবিজিকে দাহ করে, আমরা বদলা নিতে কাজে লাগলাম। পাঁচই মার্চ রাত থেকে আমরা ট্যাক্সি নিয়ে বেরোতে লাগলাম। আমি ছেলেগুলোর বাড়ি, আসা—যাওয়ার রাস্তা, সব দিনুদাকে দেখিয়ে দিলাম। আমরা প্ল্যান করতে শুরু করলাম। কে কোন রাস্তা দিয়ে ফেরে, কখন একা থাকে। আসা—যাওয়ার পথে কোন জায়গাটা অন্ধকার, কোথায় মেরে কোন রাস্তায় পালানো যাবে সব।—পাঁচই মার্চ থেকে এগারোই মার্চ আমরা রেইকি করলাম। তারপর এক—এক করে মার্ডার শুরু করলাম। বিশ্বাস করুন স্যার, ওই ছেলেগুলো খুব খারাপ ছেলে। আমরা খোঁজ নিয়ে জানি, ওরা আগেও এরকম করেছে, অনেকবার। অনেকগুলো মেয়েকে ওরা রেপ করে খুন করেছে। পুলিশ কিছু করতে পারেনি। ওদের মেরে আমাদের কোন দুঃখ নেই। হাম দোনো মিলকে সুইপার কা কাম কিয়া। সমাজ কি গন্দগি কো সফায়া কিয়া। তবে খুন আমি একটিও করিনি। দিনুদার হাতে অনেকদিন পরে ছুরিতে কথা বলেছে, স্যার। আপনি ঠিক ধরেছেন। দিনুদা যখন ওদের শরীরে ছুরি চালাত, দিনুদার চোখ আনন্দে ঝকঝক করত। ছুরি চালাতে চালাতে কাঁদত আর বলত, আমার মেয়েকে ফিরিয়ে দে, আমার বউকে ফিরিয়ে দে। বলত, তোর যেমন কষ্ট হচ্ছে, আমার মেয়েরও ওরকম কষ্ট হয়েছে। সে—ও তো তোদের পা ধরে কেঁদেছে।'
সবাই চুপ, প্রেস ক্লাবে অন্ধকার নামছে। ব্যাকগ্রাউন্ডে শুধুই পাখির ডাক। পাখির ডাক যেন সবার মাথার মধ্যেও। মাঝে মাঝে রামেশ্বরের ফোঁপানির আওয়াজ কানে আসছে। 'চন্দনা তো আমারও বেটি ছিল। ওকে যারা কষ্ট দিয়ে মেরেছে, তাদের মেরে আমাদের কোনও আপশোস নেই, স্যার। দিনুদা তো এমনিই লাইফার, আমিও না হয় ঢুকে যাব। আপনারা আমাকেও ধরিয়ে দিতে পারেন, স্যার। ভালোই হবে, জেলে ঢুকে দিনুদার খেয়াল রাখতে পারব। লোকটা বড্ড একা।'
রামেশ্বর চেয়ার ছেড়ে উঠে ধীরপায়ে হেঁটে লনের বাইরে বেরিয়ে গেল। মাথাটা যেন বুকের ওপরে ঝুঁকে পড়েছে। কারও শরীরেই যেন জোর নেই। রামেশ্বরের কান্না যেন সবারই কানে বাজছে।
কন্দর্পনারায়ণ নোট খাতা থেকে কয়েকটা পাতা ছিঁড়ে কুচিকুচি করে ফেলে দিলেন। ঋজু রুমাল বের করে চোখ মুছলেন। অমিত আর মেহবুব ফিসফিস করে বললেন, 'এটা খবর করতে পারব না, এটা খবর করতে পারব না।'
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন