আদিপর্ব

অভীক সরকার

৭৪৮ খ্রিস্টাব্দ৷ ইয়েদং উপত্যকা, দক্ষিণ তিব্বত৷

প্রবল তুষারঝড় চলছিল ইয়েদং উপত্যকা জুড়ে৷ তারই মধ্যে একটি মোটা কাপড়ে নিজেকে আষ্টেপৃষ্ঠে ঢেকে বরফে ঢাকা পাহাড়ি পথ পেরোবার চেষ্টা করছিলেন এক বৌদ্ধ শ্রমণ। সামনেই শিগাৎসে গ্রাম, রাত হওয়ার আগেই সেখানে পৌঁছতে হবে তাঁদের৷ তাঁদের বলতে তিনি, কামরূপ থেকে আসা গুপ্তপুরুষটি, আর একান্ত অনুগত শিষ্য সাংতোই নংগুয়াল কাগয়ু—নামান্তরে ‘কমলবুদ্ধি।’

কমলবুদ্ধির ওপর অগাধ আস্থা বৌদ্ধ শ্রমণের। এই অঞ্চলে এমন ধীমান এবং অনুগত শিষ্য পাওয়া বড়ই কঠিন৷ তাঁর প্রিয়তম ছাত্রদের মধ্যে অন্যতম এই যুবক ইতিমধ্যেই নাগার্জুনের মূলমাধ্যমকারিকা থেকে শুরু করে শ্রুতমুচ্চয় অবধি কণ্ঠস্থ করে ফেলেছে৷ প্রতীত্যসমুৎপাদ নিয়ে এই তরুণ যুবকের আলোচনা শুনে সম্রাট মে অগছোম-এর রাজসভার অনেক চৈনিক পণ্ডিতের মুখ শুকিয়ে যেতে দেখেছেন তিনি। কিশোর রাজপুত্র ঠ্রিসং দেচেন সবার আড়ালে তাঁকে জানিয়েছেন—কমলবুদ্ধিকে নিয়ে অনেক আশা তাঁর।

চলতে চলতে ক্ষণিক থেমে গিয়ে পরম কারুণিক তথাগতের উদ্দেশে প্রণাম জানান তিনি। এই রুক্ষ পাহাড়ি দেশে আরও অনেক কমলবুদ্ধিকে চাই তাঁর। এদের মতো তথাগতপ্রাণ যুবকদের জন্যেই একদিন এই তিব্বতদেশে সদ্ধর্মের পতাকা উড়বেই উড়বে। আর কয়েক বছরের মধ্যেই আচার্য শান্তরক্ষিত এই দেশে উপস্থিত হবেন, সেইরকমই কথা হয়ে আছে। একবার আসুন আচার্য, তারপর চীনাগত কুলাঙ্গার বৌদ্ধপণ্ডিতদের দেখে নেবেন! এই স্বপ্ন বুকে নিয়েই এই দেশে এসেছেন এই বৌদ্ধ শ্রমণ৷ মহাযানপন্থার জয় হোক। গৌড়বঙ্গের জয় হোক। তিব্বতে ছড়িয়ে পড়ুক নালন্দার জ্ঞান, মেধা ও করুণার আনন্দরশ্মি।

গৌড়বঙ্গের কথা মনে পড়তেই তাঁর বক্ষের বামদিকটা সামান্য চিনচিন করে উঠল৷ তাঁর শৈশবের সুজলা সুফলা শস্যশ্যামলা বঙ্গদেশ, কৈশোরের শুভ্রজ্যোৎস্নাপুলকিত বঙ্গভূমি, তাঁর প্রথম যৌবনের ফুল্লকুসুমিত স্বদেশ। আজও, পরবাসে এতগুলো বছর কাটাবার পরেও, সেই কয়েকশো ক্রোশ দূরের শ্যামলবরণী কন্যাটির জন্যে তাঁর বড় মন কেমন করে।

আবার হাঁটা শুরু করার আগে পিছন ফিরে দেখে নিলেন তিনি৷ ওরা কেউ পিছু নেয়নি তো? একবার যদি ধরা পড়ে যান, তাহলে সমূহ সর্বনাশ হয়ে যাবে৷

দীর্ঘশ্বাস ফেললেন শ্রমণ। ভালো নেই তাঁর দেশ। আচার্য শান্তরক্ষিতের আদেশে যখন চলে আসেন এই প্রবাসে, তখনই তিনি দেখে এসেছেন—তীব্র অরাজকতা আর অপশাসনের কালো ছায়া ঘিরে ধরেছে তাঁর জন্মভূমিকে। এক উন্মাদ কামুক রানির অপশাসনে ছারেখারে গেছে সোনার বঙ্গদেশ৷ সর্বত্র ছোট ছোট ভূস্বামীরা নিজেরাই রাজা হয়ে বসেছেন, ন্যায়বিচার বলে আর কিছুই নেই দেশে৷ যে অঞ্চলে যার প্রতাপ বেশি, সে-ই রাজা৷ ব্রাহ্মণ থেকে শূদ্র, শ্রমণ থেকে গৃহী, কৃষক থেকে কুম্ভকার, তন্তুবায় থেকে জালিক, এই অরাজকতার করাল গ্রাস থেকে কেউ অব্যাহতি পায়নি৷ সামন্ত ও ভূস্বামীদের অত্যাচারে আর দরিদ্রের হাহাকারে আজ হিমালয়ের পাদদেশ থেকে পূর্ব-সমুদ্রের সুনীল জলধি অবধি প্রতিটি ভূমিকণা কম্পমান৷

হায় শশাঙ্ক, মহাসামন্ত শশাঙ্ক! পথ চলতে চলতে থেমে গিয়ে নিজের অজান্তেই একটি দীর্ঘনিশ্বাস ফেলেন শ্রমণ—যতদিন আপনি জীবিত ছিলেন—কোনও লুব্ধ কুলাঙ্গারের স্পর্ধা হয়নি এই সুরম্য স্বর্ণপ্রসূ দেশের দিকে লোলুপ দৃষ্টিতে তাকাবার। আপনি শৈব ছিলেন সত্য, বৌদ্ধদের প্রতি রাজনৈতিক কারণে বিদ্বিষ্ট ছিলেন—সে-কথাও মিথ্যা নয়। কিন্তু দেশে সুখ ছিল, সমৃদ্ধি ছিল, ন্যায়বিচার ছিল৷ এইরকম সর্বগ্রাসী, সর্বভুক, সর্ববিধ্বংসী অনাচার আর অরাজক অন্যায় নেমে আসেনি কারও ওপরেই।

যেদিন মহাবল শশাঙ্ক ত্যাগ করলেন তাঁর শেষ নিঃশ্বাস, সেইদিন থেকে গৌড়বঙ্গের পরিস্থিতি গভীর অরণ্যের মধ্যে বেপথুমতী অসহায়া কূলবধুর মতো৷ কখনও কনৌজপতি যশোবর্মা, কখনও কাশ্মীররাজ ললিতাদিত্য, কখনও কামরূপনরেশ ভাস্কর বর্মা—যে নৃশংসতার সঙ্গে এঁরা শোষণ ও লুণ্ঠন চালিয়ে গেছেন এই বঙ্গভূমে, তার কোনও তুলনাই হয় না৷

চলতে চলতে ক্ষণেক তিনি তাকালেন সামনের দিকে। তুষারঝড় ক্রমেই বেড়ে চলেছে, চতুর্দিকে দামাল হাওয়ার অবিরল মাতামাতি, শোঁ-শোঁ শব্দে কান পাতা দায়। এমন ঝড়ে এখানকার অধিবাসীরাও সচরাচর বাইরে বের হয় না। একদিক দিয়ে ভালোই, মনে মনে ভাবলেন তিনি। যে নিভৃত গোপন কাজে চলেছেন তিনি, তার জন্যে এইরকম ভীষণ প্রকৃতিই তাঁর চাই৷

চলতে চলতে ভাবছিলেন বৌদ্ধ শ্রমণটি। এখন এই দেশের রাজপ্রাসাদের মধ্যে যে ঝঞ্ঝা চলছে, সেও কি এই তুষারঝড়ের মতোই তীব্র নয়? যে লড়াই আসলে ছিল রাজসিংহাসনের অধিকার নিয়ে দুই রাজমহিষীর মধ্যে পারিবারিক বিবাদ, ধীরে ধীরে রাজনীতির জটিল আবর্তে জড়িয়ে তাই-ই এখন হয়ে দাঁড়িয়েছে চৈনিক বৌদ্ধ বা ‘তোনমুনপা’ আর ভারতীয় বৌদ্ধ বা ‘শ্চেনমিনপা’-র মধ্যে প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। দু’পক্ষই শ্বাস বন্ধ করে, দাঁতে দাঁত চেপে দেখে যাচ্ছে—শেষ পর্যন্ত কে জেতে৷ শেষ পর্যন্ত কার স্বার্থ দেখবেন সম্রাট—মহাচীনের, নাকি লিচ্ছবী তথা ভারতভূমির?

সদ্ধর্মের আগমনের পূর্বে এই দেশের ধর্ম ছিল পোন ধর্ম। অবাধ যৌনাচার, নরবলি, অসভ্য ও কুৎসিত নাচগান—এই ছিল এদের ধর্মকৃত্য। আজ থেকে প্রায় একশো বছর আগে এদেশের সম্রাট মহামতি স্রোংচান গাম্পো সদ্ধর্মের সংস্পর্শে আসেন, বুদ্ধচরণে তাঁর মতি হয়। তাঁর দুই মহিষী, একজন মহাচীনের তাং রাজবংশের কন্যা রাজকুমারী ওয়েনচেং, আরেকজন লিচ্ছবী রাজদুহিতা রাজকন্যা ভ্রুকুটি৷ তাঁরাই বৌদ্ধধর্মকে ছড়িয়ে দেন এদেশের জনসাধারণের মধ্যে। তার কিছুদিন পর থেকেই দুই মহিষীর মধ্যে শুরু হয় অলক্ষ্য সংঘর্ষ। সেই সংঘাত একশো বছর পর এখন দুই পক্ষের মধ্যে প্রায় গৃহযুদ্ধের রূপ নিয়েছে।

এই ধর্মীয় বিরোধ নিয়ে বিশেষ চিন্তিত ছিলেন না শ্রমণ। তাঁর মেধা ও পাণ্ডিত্যের প্রতি সম্রাট এবং যুবরাজ—দুজনেই যথেষ্ট শ্রদ্ধাশীল। যুবরাজের সঙ্গেই তাঁর অধিকতর সখ্য যদিও, বোধহয় বয়সের ব্যবধান অনেকটা কম হওয়ার কারণেই। দিনের বেশ কিছুটা সময় একসঙ্গে কাটান তাঁরা, আলোচনা হয় বিভিন্ন দার্শনিক তত্ত্ব নিয়ে। যুবরাজের ইচ্ছা—এই দেশে নালন্দার আদলে একটি বৌদ্ধবিহার গড়ে তুলবেন৷ সেখানে বৌদ্ধশাস্ত্রগুলির যথাযথ অনুবাদের এবং সেই নিয়ে অধ্যয়ন ও আলোচনার সুব্যবস্থা থাকবে। তাঁরা দুজনে মিলে সেই পরিকল্পনার পথে অনেক এগিয়েও গিয়েছেন৷ যুবরাজের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা শত্রুপক্ষের চোখ এড়িয়ে যাবে, এতটা ভাবার কোনও কারণই নেই। জাল ছড়াচ্ছে তারা, গোপন সূত্রে এ খবরও তাঁর কাছে পৌঁছে গেছে। তবে তা নিয়ে বিশেষ ভাবেন না তিনি। তাঁর চিন্তা অন্য দিক থেকে।

কালই তাঁর কাছে খবর এসেছে যে, পোন ধর্মের মুখ্যপুরুষ প্রধানমন্ত্রী মাশাং—তাঁর কাছে পৌঁছে গেছে পোন গুপ্তবাহিনীর গোপন গুহায় চুরি হওয়ার খবর৷ ক্ষ্যাপা কুকুরের মতো তাঁকে খুঁজে বেড়াচ্ছে ওরা৷ তাঁদের বেরোনোর কথা ছিল সন্ধের মুখে৷ কিন্তু এই খবর শোনামাত্র আর দেরি করেননি শ্রমণ, কমলবুদ্ধিকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়েছেন তিনি৷

সর্বপ্রকার কদর্য আর বীভৎস কাজে সিদ্ধহস্ত এই পোন ধর্মের পুরোহিতরা৷ নরবলি, প্রকাশ্যে অবাধ যৌনতা, মাংসভক্ষণ ও মদ্যপান, এদের মুখ্য পূজার্চনা৷ শুধু তাই নয়, এদের আরাধ্য দেবদেবীদের মূর্তিও অতি ভয়ঙ্কর ও বীভৎস, পৃথিবীর যাবতীয় যক্ষ রক্ষ ভূত প্রেত এদের উপাস্য৷ যাদুবিদ্যা, অভিচার ক্রিয়া, প্রেত আরাধনা—এসব নিয়েই তৈরি এদের ধর্মাচরণ৷

জাদুবিদ্যায় এদের পারদর্শী হওয়ার কারণও আছে৷ বহু বছর ধরে এই দেশের বিচিত্র অস্ত্রশস্ত্র আর ওষধির ভাণ্ডার বানিয়েছে তারা৷ সেসবের কার্যকলাপ দেখলে কোনও জাদুকরের রচিত ইন্দ্রজাল বলে ভ্রম হওয়া বিচিত্র নয়৷ হিমালয়ের গোপন গিরিকন্দর, গহীন অরণ্য আর অন্ধকার উপত্যকা থেকে তিলে তিলে তারা সংগ্রহ করেছে অতি আশ্চর্যজনক ও বিরলচরিত্রের বস্তু৷ লোকে বলে যে, এদের গোপন সংগ্রহে আছে গরলভৈরবের বীজ যা নাকি পৃথিবীর তীব্রতম বিষের থেকেও ভয়ঙ্কর, আছে নিষেকবজ্রের লতা, যা থেকে নাকি প্রস্তুত করা যায় অমৃততুল্য সঞ্জীবনী ঔষধ। আছে কৃষ্ণকন্টকের বাকল, যার অতি সামান্য অংশও মুখে রাখলে শীত বা গ্রীষ্মের বোধ লুপ্ত হয়। আর আছে এক অত্যাশ্চর্য মৃগনাভির সম্ভার, যার গন্ধে নিতান্ত মরণাপন্ন রোগীর দেহেও প্রাণসঞ্চার করা সম্ভব।

আর আছে চণ্ডবজ্র। পোনপুরোহিতদের গোপনতম, ভয়ঙ্করতম, অব্যর্থতম অস্ত্র। সাক্ষাৎ মৃত্যু।

তাই-ই চাই শ্রমণের৷ যে মৃত্যুবিষ একদিন এই তিব্বত থেকে পাড়ি দিয়ে ছারখার করে দিয়েছে তাঁর জন্মভূমি, তারই প্রতিষেধক নিয়ে আজ দেশে ফিরে যাচ্ছেন তিনি৷ তাঁর মুখ চেয়ে অপেক্ষা করছেন আচার্য শান্তরক্ষিত, অপেক্ষা করছেন তাঁদের সঙ্গীরা, অপেক্ষা করছেন লোকেশ্বর স্বয়ং! দেশের খবর অতি গোপনে নিয়মিতই পৌঁছে দেওয়া হয় তাঁর কাছে৷ পৌঁছে যায় আচার্যের আদেশও৷

হাত দিয়ে একবার দেহের অংশটা দেখে নিলেন৷ নাহ, বটুয়াটি ঠিক জায়গাতেই আছে।

রাজকুমার ঠ্রিসং দেৎসেন তাঁকে একটি দীর্ঘ পত্রও দিয়েছেন। বলেছেন এটি লোকেশ্বর ব্যতীত আর কারও হাতে না দিতে। অবশ্য এই সতর্কতার প্রয়োজন ছিল না। এই কাজের জন্য প্রয়োজনীয় মন্ত্রগুপ্তির ব্যাপারে সম্যক অবগত আছেন কমলশীল।

ফের হাঁটতে থাকেন দুজনে। চারিদিক প্রায় অদৃশ্য। অবিরল তুষারপাতে তাঁদের চারপাশে নেমে এসেছে সাদা পর্দার মতো এক পুরু আবরণ, তার বাইরে দৃষ্টি চলে না। প্রতিটি পদক্ষেপ অতি কষ্টে ফেলতে হচ্ছে। সূচীমুখ তুষারকণাগুলি এসে শরীরের অনাবৃত অংশে তীরের মতো বিঁধছে। হাত দুটি তুলে একবার দেখলেন তিনি, নীল হয়ে এসেছে আঙুলগুলি। ক্রমশই বাতাসে নিঃশ্বাস নেওয়াও কঠিন হয়ে উঠছে৷

একবার থেমে গিয়ে পেছনে তাকান তিনি, ‘কমলবুদ্ধি, আর কতদূরে আছেন তোমার সেই গুপ্তপুরুষ?’

‘আর বেশি দূরে নয়, ভন্তে। সামনের গিরিখাতটি পেরিয়ে বামদিকে একটি বাঁক আছে। সেই পথে কিছুটা নীচে নামলেই একটি গোপন গুহা, সেখানেই তাঁর অপেক্ষা করার কথা।’

‘এ বিষয়ে স্থিরনিশ্চিত তুমি? সংবাদ যা পেয়েছ সব ঠিকঠাক? কোথাও আমাদের কোনও ত্রুটি হচ্ছে না তো?’

‘না ভন্তে। আমরা সর্বোচ্চ পর্যায়ের সাবধানতা নিয়েছি। প্রধানমন্ত্রী মাশাং এ ব্যাপারে একেবারেই কিছু জানেন না। স্বয়ং সম্রাট আমাদের সহায়, তিনিই গোপনে চর পাঠিয়েছিলেন নালন্দা আর কামরূপে। আপনি তো জানেন, তিনিও যে-কোনও মূল্যে এই মন্ত্রী মাশাং আর পোন ধর্মের সামন্তদের দমন করতে চান৷’

‘তাঁর শাসন নিষ্কন্টক করতে গেলে এ ছাড়া আর উপায় কী কমলবুদ্ধি? আশা করি দ্রুত এ কাজে সফল হবেন তিনি৷ কিন্তু এই কাজে কারা কারা আছে, কোন কোন গুপ্তচরদের পাঠিয়েছি, সেসব গোপন করার ব্যবস্থা করেছ কি?’

অবশ্যই ভন্তে৷ আমি আর সম্রাট ছাড়া এঁদের পরিচয় আর কারও জানা নেই। আজকে যিনি এসেছেন আপনাকে নিরাপদে আপনার দেশে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে, তিনি অতি বিশ্বস্ত পুরুষ৷ আচার্য শান্তরক্ষিত স্বয়ং তাঁকে এই কাজটির দায়িত্ব দিয়েছেন।’

‘কে ইনি? কিছু জানো তুমি কমলবুদ্ধি?’

‘শুনেছি কামরূপের ওড্ডীয়ান নগরের যুবরাজ। আপনি ওড্ডীয়ানের নাম শুনেছেন ভন্তে?’

শুনেছেন বইকি। এখানকার উচ্চারণে ওড্ডীয়ান হলেও এই রাজ্যের আসল নাম উদীয়ান। উদীয়ান হচ্ছে কামরূপের শ্রেষ্ঠতম তন্ত্রবেত্তা ইন্দ্রভূতির রাজ্য। যোগাচারবিজ্ঞানের অতুল বৈভব ধীরে ধীরে বিকশিত হচ্ছে সেখানে। মাথা তুলছে মহাযান বৌদ্ধধর্মের আরও একটি শাখা, মন্ত্রযান। রাজা ইন্দ্রভূতির সহোদরা লক্ষ্মীঙ্করা এবিষয়ে বিশেষ সিদ্ধি লাভ করেছেন বলে দেশে থাকতে থাকতেই সংবাদ পেয়েছিলেন তিনি। আচার্য শান্তরক্ষিত নিজে এবং তাঁর প্রিয় শিষ্যরাও এই নতুন সাধনপদ্ধতি নিয়ে খুবই উৎসাহী।

নালন্দার সহপাঠীদের কথা মনে পড়তে বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠল শ্রমণের। হরিভদ্র, শাক্যভদ্র, জ্ঞানপ্রভ...আহা—না জানি কেমন আছে তাঁর সতীর্থরা?

কমলবুদ্ধি তার এই শিক্ষকের মানসিক অবস্থা বুঝে উঠতে পারল না। সে বলে চলল, ‘শুনেছি ইনি নাকি অতুল যোগশক্তির অধিকারী। শিশুবয়স থেকেই অনেক আশ্চর্য কাহিনি ঘুরে বেড়ায় এঁকে নিয়ে। ইনি নাকি অযোনিজ স্বয়ম্ভূ পুরুষ, রাজা ইন্দ্রভূতির সামনে এক পদ্মের ওপর আবির্ভূত হয়েছিলেন। ইনি ধনুর্বাণে গাণ্ডীবধন্বা অর্জুনের সমকক্ষ, মল্লযুদ্ধে স্বয়ং বলরাম৷’

‘বলো কী হে?’

‘আজ্ঞে ভন্তে৷ তেরো বছর বয়স থেকেই ইনি তাঁর পিতাকেও রাজকার্যে সহায়তা করছেন। রাজা ইন্দ্রভূতি কোনও বিষয়ে যুবরাজের পরামর্শ ছাড়া সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন না। লোকে তো এমনকি এও বলে যে, ইনি একবারমাত্র শ্বাস নিয়ে তিনবার পুরো ওড্ডীয়ান ঘুরে আসতে পারেন, ভূমিতে স্থির দাঁড়িয়ে থেকে হঠাৎ লাফিয়ে রাজপ্রাসাদের প্রাচীরের ওপরে উঠতে পারেন। দর্শন, শব্দবিদ্যা, ব্যাকরণাদি শাস্ত্র—সবই তাঁর অধিগত। এমনকী চিকিৎসাবিদ্যাতেও ইনি নাকি সাক্ষাৎ ধন্বন্তরী!’

শুনে চমৎকৃত হলেন শ্রমণ। যাক, উপযুক্ত লোকই বেছে নিয়েছেন আচার্য। তবুও আবছা সন্দেহ থেকে যায়!

‘ইনি যে অদ্ভুতকর্মা সে বুঝলাম৷ কিন্তু, ইনি বিশ্বস্ত তো? আমার দেশের ভবিষ্যৎ কিন্তু আজকে আমাদের হাতেই কমলবুদ্ধি৷ এই বটুয়াটির মধ্যেই আমাদের গোপন অভ্যুত্থানের প্রাণভোমরা লুকিয়ে আছে৷ আমার ফিরে যাওয়ার ওপরেই নির্ভর করছে তার সাফল্য৷’

‘হ্যাঁ ভন্তে। আপনি সর্বাংশে নিশ্চিন্ত থাকুন। আমি জানি সেই উন্মাদ কামুক রানির হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য...আঃ...’

কথা শেষ হওয়ার আগেই শ্রমণের কানের কাছে যেন একটি ছোটখাটো বিস্ফোরণ হল আর সামনে হুমড়ি খেয়ে পড়ল কমলবুদ্ধি। সেই শুনে পিছনে তাকাতেই পিছনের অবিরাম তুষারপাতের মধ্যে কয়েকটা ছায়া দেখতে পেলেন সেই বৌদ্ধ শ্রমণ৷ আতঙ্কের একটা ভয়াল স্রোত তাঁর শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে গেল।

তিনি জানেন ওরা কারা৷ তিনি জানেন ওরা কেন এসেছে৷

ওরা মাশাং-এর লোক!

৭০০ খ্রিস্টাব্দ৷ কর্মান্তবাসক, বঙ্গদেশ৷

রাত্রি তৃতীয় প্রহরের শেষ। শরতের নির্মেঘ আকাশে নিঃসঙ্গ পথিকের মতো চেয়ে আছে ধ্রুবতারা। নিজের ভদ্রাসনের আঙিনায় দাঁড়িয়ে সেইদিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিলেন এক মধ্যবয়সি পুরুষ। শীতল বাতাস বয়ে যাচ্ছে তাঁর সুঠাম শরীরটি ঘিরে। তাঁর ব্যক্তিত্বে প্রখর দৃঢ়তার ছাপ৷

চিন্তিত মুখে উত্তরদিকে চেয়েছিলেন তিনি। তাঁর ভাবনায় ধরা পড়ছিল আসন্ন ঝড়ের পূর্বাভাস। তিনি এও জানেন—উত্তরাকাশে যে মেঘ ঘনিয়ে এসেছে, যে-কোনওদিন সেই মেঘ সর্বধ্বংসী কালবৈশাখীর রূপ নিতে পারে। এই মহা-সর্বনাশের উৎস উত্তরের কামরূপ নয়, কাশ্মীর নয়, এই বিপদের উৎস আরও উত্তরে, তার কেন্দ্রবিন্দু আরেক মহাশক্তি৷

তিব্বত।

খানিকক্ষণের জন্যে চক্ষু বন্ধ করলেন তিনি। সেই তীব্র ঝড় কী করে সামলাবে ছিন্ন, দীর্ণ এই বঙ্গভূমি?

সহসা ম্লান হাসি খেলে গেল তাঁর ওষ্ঠে৷ সত্যই কি ভালো আছে তাঁর স্বদেশ? মহাবলী শশাঙ্কের মৃত্যুর পর থেকেই কি বার বার বহিঃশত্রুর আক্রমণে নির্জীব ও দুর্বল হয়ে পড়েনি বঙ্গভূমি?

তাঁর চোখদুটি জলে ভরে এল৷ গতকাল সন্ধ্যায় তিনি সংবাদ পেয়েছেন, তাঁর আশৈশব বন্ধু এবং একান্ত অনুরাগী সুবুদ্ধি আত্মঘাতী হয়েছে। একা নয়, যুবতী স্ত্রী আর দুটি দুগ্ধপোষ্য শিশুসহ সপরিবারে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে সে। তার দোষ নেই; সুবুদ্ধির গ্রামপ্রধানটি জোর করে কেড়ে নিয়েছিলেন তার চার কুল্যব্যাপ পরিমাণ ভূমি, সঙ্গে তার সমৎস্য দিঘিটি। তা দান করা হয়েছিল স্থানীয় বৌদ্ধবিহারটিতে, ভূস্বামীটির ধর্মানুগত্যের একনিষ্ঠ প্রমাণ হিসেবে। ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছিল, সম্পন্ন কৃষক সহসা পরিণত হয়েছিল পথের ভিক্ষুকে।

সেই সদ্য দুধের দাঁত ওঠা শিশুদুটির অমলিন হাসির স্মৃতি যেন মধ্যবয়সি পুরুষটির বুকে জ্বলন্ত শূল গেঁথে দিল। আহা রে, ক্ষুধার্ত হওয়া ছাড়া আর কীই বা অপরাধ ছিল ওই নিষ্পাপ শিশুদুটির? হায় তথাগত, তুমি নাকি করুণানিধান? তুমি নাকি বহুজনহিতায়, বহুজনসুখায় প্রবর্তন করেছিলে সদ্ধর্ম চক্র? সত্য বলো প্রভু—এই অবোধ শিশুদুটি ছাড়া আর কোনও অর্ঘ্যই কি তোমার পূজার যোগ্য ছিল না?

আকাশের দিকে অশ্রুভরা চক্ষুদুটি তুলে যেন সেই উত্তরই খুঁজতে লাগলেন তিনি। বোঝাও প্রভু, এই শরণাগতকে বুঝিয়ে দাও—কাকে বলে ধর্ম? দরিদ্রের মুখের গ্রাস কেড়ে নেওয়ার থেকে বড় অধর্ম আর কী? নিঃসহায়, নিরাশ্রয় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর থেকেও বড় পুণ্য আর কীসে হয় নাথ? দেশমাতৃকার থেকে বড় মা কে? দেশের মানুষের থেকে বড় ঈশ্বর কে?

সহসা তাঁর পিঠে নেমে এল একটি শীতল হাতের ছোঁয়া৷ তাঁর চমকে যাওয়ার কথা, অথচ চুপ করে রইলেন। কারণ এই হাতটি বড় চেনা। এ তাঁর গৃহিণী—ভদ্রকল্যাণীদেবীর স্পর্শ৷ এই স্পর্শ তাঁর কাছে দৈব ঔষধের কাজ করে। তাঁর স্নায়ুগুলি শান্ত হয়ে এল।

আজ কি আপনি কোনও কারণবশত বিশেষ উত্তেজিত, স্বামী?’

ম্লান হাসলেন পুরুষটি, ‘হ্যাঁ, প্রিয়ে। আজ আমি মানসিকভাবে কিঞ্চিত বিপর্যস্ত। সান্ধ্যাহ্নিকের সময় তোমার প্রতি অকারণে কিছু রূঢ় বাক্য ব্যবহার করে ফেলেছি। আমি ক্ষমাপ্রার্থী৷’

শ্যামাঙ্গী নারীটি তাঁর কোমল মুখখানি স্থাপন করলেন স্বামীর প্রশস্ত পিঠে। তারপর সেখানে একটি সপ্রেম ও সস্নেহ চুম্বন এঁকে দিলেন। দুই হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরলেন তাঁর একান্ত মানুষটির বুকখানি।

এইভাবে কিছুক্ষণ কেটে গেল। হঠাৎ ভদ্রকল্যাণী অনুভব করলেন, তাঁর হাতের ওপর ঝরে পড়ল কয়েকটি জলের ফোঁটা।

শুধু জল নয়৷ চোখের জল৷ অশ্রুবিন্দু!

খুবই আশ্চর্য হলেন ভদ্রকল্যাণী। স্বামীকে কঠিন ব্যক্তিত্বের মানুষ বলেই চেনেন তিনি। স্নেহশীল কিন্তু কঠোর নীতিবাদী মানুষটিকে তিনি সাক্ষাৎ দেবতাজ্ঞানে পূজা করেন। তাঁর স্বামীর পাণ্ডিত্য তথা ন্যায়শাস্ত্রজ্ঞানের খ্যাতি বহুধাবিস্তৃত। শুধু সম্রাটই নন, রাজ্যের অন্যান্য বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর স্বামীর কাছে পরামর্শ নিতে আসেন। সেই দৃঢ়চরিত্র মানুষটির চক্ষে আজ পর্যন্ত কখনও জল দেখেননি তিনি!

‘স্বামী, আপনি কাঁদছেন? কী হয়েছে আপনার? আপনাকে তো এর আগে কখনও কাঁদতে দেখেছি বলে মনে পড়ে না। এমন কী ঘটেছে, যা আপনার মতো মানুষকেও বিচলিত করেছে?’

‘সুবুদ্ধিকে মনে পড়ে কল্যাণী? তার সেই শিশুকন্যাদুটি?’ বলতে বলতে চোখের জল সামলাতে পারলেন না সেই প্রশস্তহৃদয় মানুষটি।

মুহূর্তে ম্লান হয়ে গেল ভদ্রকল্যাণীর মুখখানি। সুবুদ্ধি তাঁর স্বামীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। স্বামীর থেকে বয়সে অনেকখানিই ছোট, প্রায় তাঁরই সমবয়সি এই মানুষটিকে তিনি নিজের দেবর জ্ঞান করতেন। সুবুদ্ধির স্ত্রী কাঞ্চনা তাঁর বোনের মতো ছিল, তাঁদের শিশুকন্যাদুটিকে ভদ্রকল্যাণী নিজের সন্তানের মতো স্নেহ করতেন৷

সুবুদ্ধির সপরিবারে আত্মহত্যার সংবাদ গতকাল রাতেই এসে পৌঁছেছে। তাঁর স্বামী তাঁকে জানাননি, তিনি জেনেছেন অন্য সূত্রে। শিশুদুটির ক্ষুধার্ত মুখ মনে পড়লেই অসহ্য জ্বালায় জ্বলে যাচ্ছে তাঁর অন্তর।

কাঁদতে কাঁদতে স্বামীকে আরও নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরলেন তিনি। তিনি জানেন—কেন এই মৃত্যু এতটা বিচলিত করেছে এই মানুষটিকে। তিনি জানেন যে, এই দেশের বুকে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলী নিয়ে ঠিক কতটা উদ্বিগ্ন তাঁর স্বামী।

অনেক অশ্রু বয়ে যাওয়ার পর দুজনেই একটু স্থির হলেন। ধরা গলায় প্রশ্ন করলেন ভদ্রকল্যাণী, ‘শুনেছি স্বামী। আপনার নিষেধ সত্ত্বেও কেউই আমার কাছে গোপন করতে পারেনি৷ কাঞ্চনা তাদেরও বড় প্রিয়পাত্রী ছিল! আজ সারাদিন ধরে শুধু তাদের কথাই মনে পড়েছে। সেই হতভাগী তো একবার আমার কাছে এসে দাঁড়াতে পারত। সুবুদ্ধি তো পারত আপনার কাছে আশ্রয় চাইতে৷’

‘না কল্যাণী, পারত না। সুবুদ্ধিকে আমি আজন্ম চিনি। তার আত্মসম্মানবোধ ছিল অত্যন্ত প্রখর। কারও কাছে সাহায্যভিক্ষা করার মতো মানুষই ছিল না সে। তার এই গভীর মর্যাদাবোধই আমাদের কাছাকাছি এনেছিল। নইলে কে কবে দেখেছে ব্রাহ্মণ আর কৃষকসন্তানের মধ্যে এমন গভীর বন্ধুত্ব?’

মুহূর্তে উদগত অশ্রু আবার ঝাঁপিয়ে এল ভদ্রকল্যাণীর গাল বেয়ে, ‘আমাদের কি কিছুই করার ছিল না, নাথ?’

‘চারিদিকে তাকিয়ে দেখো কল্যাণী! কত সহস্র সুবুদ্ধিকে বাঁচাবে তুমি? কত কাঞ্চনার মুখে তুলে দেবে করুণার অন্ন? গ্রামে গ্রামে, পল্লীতে পল্লীতে প্রতিদিন ঘটে চলেছে এই ঘোর অন্যায়। সর্বাণীদেবীর মন্দিরে পুজো দিতে যাওয়ার পথে দেখোনি কল্যাণী—কীভাবে দিনের পর দিন বেড়ে চলেছে ভিক্ষুকের দল? ভেবে দেখেছ—এরা কারা?’

ভদ্রকল্যাণী কিছু বলতে পারলেন না, মাথা নাড়লেন৷

‘এরা সব বঙ্গদেশের ভূমিহীন কৃষক কল্যাণী, সব-খোয়ানো হতভাগ্যের দল। কঙ্কালসার দেহ একটুকরো ছেঁড়া কাপড়ে ঢেকে দু-চোখ ভরা খিদে নিয়ে কী অসহায় দৃষ্টিতে আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকে তারা! একদিন যে শক্ত হাতে লাঙল ধরে তারা আমাদের জন্য ফসল ফলিয়েছে, দেখো—আজ সেই হাতই কত লজ্জায় আমাদের সামনে পেতেছে তারা! অপেক্ষা করছে—কখন কোন পুণ্যার্থী সামান্য করুণা করবে তাদের৷ দুধের বাছাদের দেখেছি পথের ধারে ফেলে দেওয়া উচ্ছিষ্ট থেকে খাবার খুঁটে খেতে৷ যে কৃষক-বউটি জীবনে শুধুমাত্র একটি ছোট সংসার ছাড়া আর কিছুই চায়নি, তাকে দেখেছি সামান্য কাপড়ে কোনওমতে লজ্জা ঢেকে ক্ষুধার্ত সন্তানের জন্যে গৃহস্থের দরজায় দরজায় দু’মুঠো অন্ন ভিক্ষা করতে। আমার দুচোখ জ্বলে যায় কল্যাণী, এ যে আমি আর দেখতে পারি না! হা ঈশ্বর, আপনি আমাকে অন্ধ করে দেন না কেন?’

বাঁধভঙা অশ্রু ভিজিয়ে দিচ্ছিল ভদ্রকল্যাণীদেবীর বুক। স্খলিতস্বরে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘সম্রাট কিছু করেন না কেন স্বামী? এসব তো তাঁর অগোচরে থাকার কথা নয়৷’

বড় কষ্টে ম্লান হাসলেন পুরুষটি, ‘আমরা সম্মান দেখাতে সম্রাট বলি বটে, কিন্তু ভেবে বলো তো কল্যাণী, কত বড় এই রাজত্ব? কতটুকু প্রভাবশালী এই রাজবংশ? আসলে এঁরা একটি বৃহৎ ভূখণ্ডের ভূস্বামী ব্যতীত আর কিছু নন। এত বড় সামাজিক পরিবর্তন আনা কি ছোট ছোট রাজাদের কাজ!’

‘তাহলে কে করবে, স্বামী?’

‘এই কাজ একমাত্র একজন রাজচক্রবর্তী সম্রাটই পারেন৷ এমন সম্রাট, যিনি লৌহিত্যদেশ থেকে দণ্ডভুক্তি, অঙ্গ থেকে হরিকেল অবধি সসাগরা গৌড়বঙ্গের সার্বভৌম অধীশ্বর হবেন। শক্ত হাতে ন্যায়ের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত করবেন। যিনি প্রভাবে আর প্রতিপত্তিতে দ্বিতীয় শশাঙ্ক হবেন। শশাঙ্কের পর দেশে আর সম্রাট কই? টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে গেছে আমাদের মাতৃভূমি৷ প্রতিটি ভূস্বামী নিজেরাই রাজা হয়ে বসেছেন। কে বাঁধবেন এঁদের ঐক্যসূত্রে? এমন প্রবল পরাক্রান্ত পুরুষ কই?’

‘কিন্তু স্বামী, ইনি তো এই বঙ্গভূমির সার্বভৌম সম্রাট৷ অন্ততপক্ষে তাঁর রাজ্যে তো...’

‘সার্বভৌম বড় কঠিন শব্দ, কল্যাণী৷ রাজা রাজাসনে বসেন বটে, কিন্তু রাজ্য চলে অনন্তসামন্তচক্রের ওপর নির্ভর করে৷ সেই চন্দ্রগুপ্ত আর সমুদ্রগুপ্তের সময় আর নেই কল্যাণী। এখন যিনি যত বড় সম্রাটই হোন না কেন, তাঁকে এই সামন্তদের ওপর নির্ভর করেই রাজ্যশাসন করতে হয়৷ এই সামন্তচক্রের প্রতাপ বিপুল, এরা রাজস্ব দেয় বলে রাজত্ব চলে, এরাই সৈন্যের যোগান দেয় বলে রাজা যুদ্ধ করেন। আমাদের রাষ্ট্রনীতিবিদ অনেক আছেন কল্যাণী, কিন্তু আমাদের রাষ্ট্রনায়ক কই?’

কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন ভদ্রকল্যাণী৷ তারপর প্রশ্ন করলেন, ‘স্বামী, কাল আমাদের নবীন সম্রাটের অভিষেক, এক পক্ষকাল পরে প্রথম অধিবেশন। আপনার কী মনে হয়, ইনি পারবেন এই যুক্তগৌড়বঙ্গের অধীশ্বর হতে?’

কিছু সময় নীরব রইলেন সেই পুরুষটি৷ তারপর বললেন, ‘আমার মনে হয় না, কল্যাণী। অসীমসাহসী কর্মের জন্যে প্রয়োজন উদ্যমী পুরুষসিংহের, মহৎ উদ্দেশ্য সফল করার জন্যে চাই মহত্তর হৃদয়। ধৈর্য, স্থৈর্য, বিনয়, ধী এবং করুণা—এই হল মহৎ ও বিক্রমশালী পুরুষের পাঁচটি লক্ষণ৷ নতুন সম্রাটকে তুমি আর আমি, দুজনেই শিশুবয়স থেকে চিনি। যত বয়স বাড়ছে, ততই ইনি হিংস্র, অহংকারী এবং উদ্ধত হয়ে উঠছেন। ওনার ব্যবহারও ইদানীং বড় অদ্ভুত লাগে আমার৷’

‘কেন স্বামী?’

‘তোমাকে আজ অবধি বলিনি কল্যাণী৷ কিন্তু আজ বোধহয় বলার সময় এসেছে৷ আমাদের রাজপুত্রকে আজকাল ঠিক প্রকৃতিস্থ লাগে না, জানো? মাঝে মাঝেই ইনি উন্মাদের মতো অত্যন্ত অসংলগ্ন আচরণ করতে থাকেন৷ যাকে তাকে ইতরভাষায় অপমান করে বসেন৷ তখন তাঁর মুখের নীচ ও কুৎসিত ভাষা শুনলে আমার বমি পায় কল্যাণী৷ সম্রাট বড়ই দুশ্চিন্তায় ছিলেন রাজকুমারকে নিয়ে, সেই শোকেই বোধহয় বেশিদিন বেঁচে রইলেন না৷ আমার আশঙ্কা এই নতুন সম্রাট বঙ্গদেশে নিয়ে আসবেন আরও গভীর অরাজকতা। আকাশের নক্ষত্রমণ্ডলীতে সেই লেখাই পড়ছিলাম কল্যাণী৷’

‘কিন্তু কেন প্রভু?’ ব্যাকুল হলেন ভদ্রকল্যাণী, ‘ইনি তো সম্রাট রাজভটের সন্তান বটে। সম্রাট বঙ্গদেশের উন্নতির জন্য...’

‘ভুল করলে প্রিয়ে৷ এঁর পিতৃপরিচয়টুকুই দেখলে, মাতুলবংশ দেখলে না?’

‘তাতে কী অসুবিধা নাথ?’

ঘুরে দাঁড়ালেন সেই ব্রাহ্মণ। তাঁর প্রশস্ত বুক ছুঁয়ে গেল কল্যাণীদেবীর কমনীয় মুখ। অপলক চোখে স্বামীর উজ্জ্বল চক্ষের দিকে তাকালেন কল্যাণী।

‘শোনো কল্যাণী। আজ তোমাকে এক গভীর আর গোপন ষড়যন্ত্রের কথা জানাই। বহুদিন ধরে অতি গোপনে, প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে অনেক চাঞ্চল্যকর সংবাদ জোগাড় করেছি৷ জানতে পেরেছি এই রাজবংশের বিরুদ্ধে, এই দেশের বিরুদ্ধে সক্রিয় হয়েছে কে বা কারা৷ আজ সেই ষড়যন্ত্রের কথা সবিস্তারে জানাব তোমাকে৷ প্রতিজ্ঞা করো, তুমি ষড়যন্ত্রের গোপনীয়তা রক্ষা করবে?’

মাথা একপাশে হেলালেন ভদ্রকল্যাণী, বুকখানি দুরুদুরু করছিল তাঁর৷ অস্ফূটে বললেন, ‘হ্যাঁ স্বামী৷’

‘তাহলে শোনো৷’ এই বলে আরও ঘন হয়ে এলেন সেই বিশালদেহী ব্রাহ্মণ।

৭৪৮ খ্রিস্টাব্দ৷ ইয়েদং উপত্যকা, দক্ষিণ তিব্বত৷

হাড়-হিম-করা আতঙ্কে পটে আঁকা ছবিটির মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন যুবক শ্রমণটি৷ সেই বিস্ফোরণের শব্দ তাঁর যাবতীয় ইন্দ্রিয়গুলোকে অসাড় করে দিয়েছিল৷ চারিদিকে তুষারঝড়ের দাপট বেড়ে উঠেছে আরও৷ তার মধ্যেই তিনি দেখলেন যে, তাঁর পায়ের কাছে পড়ে আছে কমলবুদ্ধির নিথর দেহ৷

বিস্ফারিত চক্ষে সেদিকেই তাকিয়ে ছিলেন তিনি৷ কমলবুদ্ধির মাথা যেন অজানা কীসের আঘাতে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেছে৷ মনে হচ্ছে যেন একটুকরো সূঁচালো পাথর কমলবুদ্ধির মাথার একদিক দিয়ে ঢুকে বেরিয়ে গেছে অন্যদিক দিয়ে৷ অথচ আশেপাশে সেই পাথরটির চিহ্নমাত্র নেই! কমলবুদ্ধির রক্তে আর মাথার খুলির ভাঙা অংশে ছেয়ে ছিল শ্রমণের পায়ের কাছের তুষারস্তূপ৷ আর তারই মধ্যে রক্তাক্ত গেরুয়া বস্ত্রটি সর্বাঙ্গে জড়িয়ে শুয়ে ছিল কমলবুদ্ধি, যেন সমস্তদিন কঠোর পরিশ্রমের পর এই মাত্র ঘুমিয়েছে সে৷

জীবনে অনেক ভয় পেয়েছেন শ্রমণ, কিন্তু এমন তীব্র মৃত্যুভয় এই প্রথম৷ থরথর কাঁপতে থাকলেন তিনি৷

‘বাহ বাহ, নির্জীব বাঙালি পণ্ডিতটা ভয়ে কেমন কাঁপছে দেখেছিস, জনছুব?’ প্রশ্ন করে প্রথম ছায়াটি৷

‘তাই তো দেখছি প্রভু মাশাং৷ ব্যাটার মগজটাই বড়, গায়ে জোরটোর কিছু আছে বলে মনে হয় না৷ এটাকে ধরে নিয়ে গিয়ে দেবী একজটার সামনে উৎসর্গ করলে হয় না প্রভু?’ বলে ওঠে দ্বিতীয় ছায়াটি৷

‘তোর মনে হয় এই বাঙালি শ্চেনমিনপা’টাকে দেবী একজটা বলি হিসেবে স্বীকার করবেন?’ চিন্তিত স্বর শোনা যায় এক অস্বাভাবিক বিশালদেহী ছায়ার থেকে, ‘আপনি কী মনে করেন প্রভু মাশাং? তার থেকে এটিকে উলঙ্গ করে চোমোলাংমার চূড়ায় বেঁধে রেখে এলে হয় না?’

খলখল হাসি শোনা যায় প্রথম ছায়াটির কাছ থেকে৷ সেই হাসি শুনে বুকের রক্ত শুকিয়ে গেল শ্রমণের৷ এরই মধ্যে বিরক্ত কণ্ঠস্বর শোনা যায় দ্বিতীয় ছায়াটির, ‘তোর কবে বুদ্ধি হবে রে ছুলঠিম? এই মর্কটটার জন্যে অত কষ্ট কে করবে শুনি? তুই?’

দুজনের মধ্যে একটা ঝগড়া বেঁধে উঠতে যাচ্ছিল৷ থামিয়ে দিয়ে প্রথম ছায়াটি বলে ওঠে, ‘না রে জনছুব, এত সহজে এটাকে মরতে দিচ্ছি না আমি৷ এখন বাঁধ এটাকে, বেঁধে নিয়ে চল রাজদরবারে৷ বলব—আমাদের গুহ্যধ্যানচক্রের পুঁথি চুরি করে নিয়ে পালাচ্ছিল লোকটা৷ তোরা তো জানিস, একবার চোর বলে প্রমাণ করলে ওই মূর্খ সম্রাটের আর কিছুই করার থাকবে না৷’

‘বাঃ বাঃ! বেশ বেশ৷ তারপর প্রভু?’ প্রশ্ন করে তৃতীয় ছায়াটি৷

‘তারপর চোরের মার মারব এটাকে৷ এদিকে তোরা রটিয়ে দিস যে, গত সপ্তাহে রাজপ্রাসাদে যে আগুন লেগেছিল, আর রাজার সেরা ঘোড়াটা হঠাৎ করে মরে গেল, সেসব এর জন্যেই৷ কী রে, পারবি না?’

‘বিলক্ষণ পারব প্রভু৷’ বাকিরা সোৎসাহে বলে ওঠে৷

‘তারপর আর কী, আমি বলে দেব যে, আদিদেব নাংওয়া ওদেন ক্রুদ্ধ হবেন যদি একে চিরাগ নাগপোর সামনে বলি না-দেওয়া হয়৷ এইটুকুও যদি না পারি, তাহলে আর মন্ত্রী হলাম কেন, তোরাই বল৷’

‘সে তো বটেই, সে তো বটেই!’ বোঝার ভঙ্গিতে মাথা নাড়ে ওরা৷

‘শোন বোকারা, একটা জিনিস শেখাই তোদের৷ কাউকে এমনি এমনি মেরে দিলে সে হঠাৎ করে মস্ত বড় বীর হয়ে যায়, বুঝলি৷ লোকে চুকচুক করতে করতে বলে, ‘আহা রে, লোকটা কত ভালো ছিল৷’

‘তাই নাকি প্রভু!’ অবাক কণ্ঠস্বর শোনা যায় একজনের, ‘তাহলে সেক্ষেত্রে কী করা উচিত?’

‘মারতে হলে আগে তার নামে অপবাদ দিতে হয় বুঝলি৷ জনসমক্ষে ভদ্রতার পোশাকটা খুলে নিতে হয়৷ নইলে আর খুন করে কীসের মজা বল দেখি? কোমরে দড়ি বেঁধে রাজপথ দিয়ে চুলের মুঠি ধরে উলঙ্গ করে হাঁটিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে যাব, লোকে হাততালি দেবে, থুতু দেবে, পাথর ছুঁড়বে—তাতে মজা বেশি না? গালি দেবে ওর নামে, ওর মা’কে বলবে বেশ্যা, ওর পিতাকে বলবে গর্ভস্রাব, তাতে তোরা বেশি আনন্দ পাবি না?’

হাত-পা অবশ হয়ে আসে বৌদ্ধ শ্রমণটির৷ কী ভয়ানক! প্রবল ভয়ে আর আতঙ্কে নিশ্চল হয়ে থাকেন তিনি৷

‘হে হে হে, সে বেশ মজা হবে কিন্তু৷ আমি নিয়ে যাব প্রভু, আমি নিয়ে যাব এটাকে...’ আবদার করে একজন৷

‘আঃ, চুপ কর জনছুব, গোল করিস না! একটা গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হচ্ছে, তার মধ্যে...ইয়ে তারপর এটাকে নিয়ে কী করবেন প্রভু?’ অনুসন্ধিৎসু হয়ে ওঠে ছুলঠিম নামের সেই বিশালদেহী পর্বতনন্দন৷

‘এটাকে সর্বসমক্ষে ছাং আর চমরী গাইয়ের মাংস খাওয়াব ভাবছি রে ছুলঠিম৷ খি খি খি, কেমন মজা হবে বলত তোরা?’

‘বেশ হবে প্রভু৷ অতি চমৎকার হবে৷ কিন্তু তারপর কী হবে প্রভু মাশাং?’ বাকিরা বেশ উৎসাহিত৷

‘তারপর এটাকে এক যুবতী বেশ্যার সঙ্গে সর্বসমক্ষে যৌনসঙ্গম করতে বাধ্য করলে কেমন হয়?’ মতামত চাইলেন মাশাং৷ তিব্বত রাজদরবারের প্রধানমন্ত্রী, পোন ধর্মের প্রধানতম পৃষ্ঠপোষক মাশাং৷

ঘৃণা আর বিবমিষায় প্রায় অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছিলেন শ্রমণ৷ প্রাণপণে তিনি প্রার্থনা করছিলেন, তাঁর সঙ্গে এসব ঘটার আগেই যেন ধর্মপাল যম স্বয়ং মৃত্যু হিসেবে নেমে আসেন৷

‘চিরাগ নাগপো’র সামনে উৎসর্গ করার সময় পাথর দিয়ে এক এক করে এই বাঙালিটার হাত পা ভাঙা হবে না, প্রভু মাশাং?’ উৎসাহিত হয়ে পড়ে চতুর্থ ছায়াটি৷

‘হবে রে রিনছেন, হবে৷ এত উত্তেজিত হচ্ছিস কেন?’ বলতে বলতে তুষারকুহেলি সরিয়ে সেই শ্রমণের সামনে এসে দাঁড়ালেন চারজনেই৷ প্রত্যেকের পরনে পোন-পুরোহিতদের চিরপরিচিত নীল আর কালো রঙের পোশাক৷ তাদের চোখে ক্ষিপ্ত ক্ষুধার্ত দৃষ্টি, অধরে তাচ্ছিল্যের উগ্র হাসি৷

পেছনের তিনজনের হাতে ধরা ছিল তিব্বতের ক্ষুরধার অসি দ’পদম, এক কোপে শত্রুর মুণ্ডু উড়িয়ে দিতে যার বিশেষ খ্যাতি আছে৷ শুধু সামনের মানুষটির হাতে ধরা ছিল অন্য একটি অস্ত্র, যা দেখে দুঃসহ আতঙ্কের মধ্যেও ঘেমে উঠলেন শ্রমণ৷

চণ্ডবজ্র৷ অব্যর্থ মৃত্যুর যমদূত৷ এই তাহলে কেড়ে নিয়েছে কমলবুদ্ধির প্রাণ!

‘কী রে বাঙালি, তুই আর এই চমরী গাইয়ের অণ্ডকোষ, তোরা ভেবেছিলিটা কী? দুজনে মিলে আমাদের গোপন গুহা থেকে চণ্ডবজ্র আর যমান্তকের লতাচূর্ণ চুরি করে নিয়ে যাবি, আর আমরা কিছু টের পাব না?’

বিকট সুরে হেসে উঠলেন সর্বাগ্রবর্তী পুরুষটি৷ বাকিরা তাতে যোগ্য সঙ্গত দিল৷

‘আমি কিন্তু ওর হাত দুটো মুচড়ে মুচড়ে ভাঙতে চাই প্রভু, অনুমতি পাব আশা করি৷’ সামান্য আদুরে স্বরে অনুরোধ করে জনছুব৷

‘পাবি রে জনছুব পাবি৷’

‘পা দু-টো ভাঙার দায়িত্ব তাহলে এই অধমকে দেওয়া হোক প্রভু মাশাং৷’ কাতর স্বর শোনা যায় রিনছেনের৷

‘আচ্ছা, পা-দুটোর দায়িত্ব তাহলে তুই-ই নিস৷’ যেন নিজের সম্পত্তি বিলিয়ে দিচ্ছেন, এই ভঙ্গিতে বললেন মাশাং৷

‘আমার জন্য তাহলে আর কী রইলটা কী? যা, সব তোরাই নিয়ে নে, যা৷’ অভিমানী কণ্ঠ শোনা যায় ছুলঠিমের৷

আতঙ্কে কণ্ঠ রুদ্ধ হয়েছিল বৌদ্ধ শ্রমণটির৷ কিন্তু তিনি কিছু বলার চেষ্টা করার আগেই...

‘তোমার জন্যে তো আমি রইলাম ছুলঠিম৷ দেখো তো পছন্দ হয় কী না৷’ কোথা থেকে যেন ভেসে এল শান্ত এক কণ্ঠস্বর৷

শ্রমণ দাঁড়িয়েছিলেন এক তুষারপ্রাচীরের দিকে পিঠ ফিরিয়ে৷ প্রাচীরটি উচ্চতায় তিন-চার মানুষের সমান৷ যেখানে প্রাচীর শেষ হচ্ছে, সেখান থেকে একটি সমতলভূমি শুরু৷ কথাটি ভেসে এল যেন সেখান থেকেই৷

পাঁচ জোড়া চোখ চলে গেল উপরে৷

সেখানে এসে দাঁড়িয়েছেন এক দীর্ঘদেহী পুরুষ৷ চারিদিকের শুভ্র তুষারপাতের মধ্যে আঁটোসাটো কালো রঙের পোশাকে তাঁকে দেখাচ্ছে স্থির বিদ্যুতের মতো৷ শুধুমাত্র চোখ আর ঠোঁট বাদ দিয়ে তাঁর পুরো মুখ ঢাকা৷ অনিন্দ্যসুন্দর সুঠাম দেহ৷

ঘোর আতঙ্কের মধ্যেও বৌদ্ধ শ্রমণটির দেহে শিহরণ জাগল! উদীয়ানের যুবরাজ৷ আচার্য শান্তরক্ষিতের প্রেরিত অতি বিশ্বস্ত গুপ্তপুরুষ৷

বামহাতে একটি অদ্ভুত দেখতে খর্বকায় ধনু ধরে আছেন সেই আগন্তুক। শিথিল জ্যা-তে একটি শর আরোপিত৷ পিঠে একটি তূণীর, এখান থেকে তার মাথাটি দেখা যাচ্ছে শুধু৷ সেই ধনুটি দেখামাত্র রোমাঞ্চিত হলেন শ্রমণ৷ আর কেউ না জানুক, তিনি জানেন ওই খর্বকায় অথচ মহাশক্তিশালী ধনুটির মাহাত্ম্য। তিনি এও জানেন—কোন তীব্র বিষে নিষিক্ত ওই ছোট ছোট তীরগুলি৷ কামরূপের পূর্বতম প্রান্তের অরণ্যবেষ্টিত পার্বত্য অঞ্চলের নাম নাগাঞ্চিভূমি৷ সেখানকার দুর্ধর্ষ উপজাতীয় যোদ্ধারা ব্যবহার করে এই ধনু৷

‘এই অদ্ভুতদর্শন জীবটা কে, প্রভু মাশাং?’ উত্তেজিত স্বরে প্রশ্ন করে রিনছেন৷ মাশাং-এর অনুগামীদের মধ্যে সে অপেক্ষাকৃত বুদ্ধিমান৷ মানুষটির আবির্ভাব তার ঠিক ভালো ঠেকছিল না৷

‘বঙ্গভূমির এক নির্জীব বাঙালি বললে কি তোমাদের পোষাবে রিনছেন?’ সামান্য চিন্তিত শোনায় আগন্তুকের কণ্ঠস্বর, ‘নাকি আবার নামটাও বলতে হবে তার সঙ্গে? নাম না বললে তোমরা কি খুব অসন্তুষ্ট হবে ভাই?’

‘কে তুই?’ চিৎকার করে ওঠে জনছুব৷

‘আমি কে? সে কথা এত সহজে কী করে বলি বলো তো ভাই জনছুব? সে কথা বলা ভারি পরিশ্রমের কাজ, বুঝলে হে! আমাদের শাস্ত্রে বলেছে ‘আত্মানং বিদ্ধি,’ মানে নিজেকে বিদ্ধ করলেই আত্মা ভারি খুশি হন, ঠিক বলেছি কি না? তুমি অবশ্য বুদ্ধিমান মানুষ জনছুব, তুমি বুঝবে, এ বিশ্বাস আমার আছে।’

নির্বোধের মতো মাথা হেলায় জনছুব৷

‘নাম বল শয়তান, একবার তোর নামটা বল শুধু৷ তারপর তোর মস্তিষ্কের ঘিলু দিয়ে মেখে মন্ত্রশোধিত অন্ন যদি গ্রহণ না করেছি...’ প্রবল ক্রোধে থরথর কেঁপে ওঠেন মহামন্ত্রী মাশাং৷

‘নাম? নাম জানতে চাইছ তুমি? আমার নামধাম সবই তোমাকে বলতে হবে মাশাং? তবে তাই নাহয় বলছি তোমাকে৷ কিন্তু বলছিলাম যে, শুধু নিজের পরিচয় দিলেই হবে তো? নাকি আবার আমার পিতৃদেবের নাম, মাতুলবংশের কুলপঞ্জী—এসবও সবিস্তারে বলতে হবে? এসব না বললে কি খুবই অভিমান করবে ভাই মাশাং?’

‘শয়তান, তুই এখানে এলি কী করে?’ ছুলঠিম ক্রোধে উন্মাদ হয়ে যাচ্ছে৷

‘আরে আর বলো না রে ভাই, সে অতি দীর্ঘ পথ৷ প্রথমে নালন্দা থেকে কজঙ্গল এলাম ঘোড়ার গাড়ি চড়ে। সে আবার ভয়ানক বেতো ঘোড়া বুঝলে! তারপর সেখান থেকে কামরূপ অবধি এলাম একটি পণ্যবোঝাই নৌকায়৷ ঝড়জলের মধ্য দিয়ে সে অতি বিশ্রী যাত্রা৷ মধ্যবারেন্দ্রীতে তো একবার ঝড়ের মধ্যে পড়ে ডুবতেই চলেছিলাম প্রায়৷ তারপর কামরূপ থেকে একটি অশ্বতরের পিঠে চড়ে পাহাড়ি পথে এই এখানে৷ সেও পাক্কা তিনদিনের রাস্তা৷ ওওওহহ্! পিঠের হাড়গুলো গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে গেছে হে ছুলঠিম৷ আচ্ছা, তোমাদের এখানে ভালো বৈদ্য আছে কেউ, অ্যাঁ?’

‘তুই...তুই...ঠাট্টা করছিস আমাদের সঙ্গে?’ জনছুব হিংস্র ভাবে হাতের দ’পদমটা আন্দোলিত করে৷

‘ঠাট্টা? বলি এই পার্বত্যপথে এতখানি আসা কী ঠাট্টা মনে হল তোমাদের? ছিঃ ছিঃ, এটাকে পথ বলো তোমরা? বলি আমাদের কামরূপের অরণ্যপথও এর থেকে ঢের ভালো, বুঝলে?

‘তোর...তোর এত বড় সাহস...’ প্রচণ্ড ক্রোধে কথা হারিয়ে ফেলে রিনছেন৷

‘আচ্ছা ভাই মাশাং একটা কথা বলো তো, তুমি কি মদ্যপান আর নারীসংসর্গে এত ব্যস্ত থাকো যে, দেশের পথঘাটের অবস্থা নিয়ে চিন্তাভাবনা করার কোনও সময়ই পাও না?

‘বেশ্যার বাচ্চা, তোর এত সাহস যে...’ উন্মত্ত ক্রোধে বক্তব্য শেষ করতে পারেন না মাশাং৷

‘রাগ করলে নাকি মাশাং?’ প্রশ্ন করেন সেই অজানা আগন্তুক, তারপর বোধহয় সামান্য লজ্জা পেলেন তিনি। বললেন, ‘এখানে এসে তোমাদের বিরক্ত করলাম না তো? মনে তো হচ্ছে নিতান্ত অনিচ্ছাতেই তোমাদের কাজকর্মে কিছু বাধা দিয়ে ফেলেছি মাশাং৷ এ হে হে, কিছু ভুল করে ফেললাম নাকি?’

দাঁত কিড়মিড় করেন মহামন্ত্রী মাশাং, এই উৎপাত আশা করেননি তিনি৷ সজোরে চিৎকার করে উঠলেন, ‘জনছুব, ছুলঠিম, রিনছেন, হাঁ করে তাকিয়ে দেখছিস কী? এই শয়তানটাকেও বন্দি করে নিয়ে আয়৷ এ অবশ্যই মায়াজাদুকর৷ নইলে এখানে এই সময়েই উপস্থিত হল কী করে?’

সেই অদ্ভুত দর্শনধারী মানুষটি এরপর যা করলেন তাকে ইন্দ্রজাল বললেও কম বলা হয়!

প্রায় তিন থেকে চার মানুষ-সমান উচ্চতা থেকেই লাফ দিলেন নীচের দিকে৷ না, দেহভঙ্গিতে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন হল না তাঁর৷ দৃঢ় ও ঋজু ভাবে নেমে আসতে আসতেই শরসন্ধান করলেন তিনি, টানটান হল জ্যা’খানি আর অব্যর্থ মৃত্যুর ঠিকানা নিয়ে একটি শর উৎক্ষিপ্ত হল সামনের দিকে৷

যতক্ষণে সেই মৃত্যুদূত খুঁজে নিয়েছে তার আশ্রয়, ততক্ষণে তিনি নেমে এলেন শ্রমণের ঠিক পাশে৷ নেমে এলেন এমন অনায়াসে, দেখে মনে হল যেন বাতাস কেটে মোনাল পাখির একটি পালক নেমে এল মাটিতে৷ তখন তাঁদের সামনে শায়িত দুটি দেহ৷

একটি কমলবুদ্ধির৷

আরেকটি বিশালদেহী ছুলঠিমের৷

একটি খর্বকায় শর প্রায় পুরোপুরি গেঁথে আছে ছুলঠিমের বুকের বাঁদিকে৷ বোঝাই যায় যে প্রবল শক্তিতে সরাসরি হৃৎপিণ্ডে বিদ্ধ হয়েছে সেটি৷ ছুলঠিমের মুখে অবশ্য সামান্য বিস্ময়বোধ ছাড়া মৃত্যুর আর কোনও চিহ্নই নেই৷ মহান মৃত্যুবিহঙ্গ খ্যুং গনপো যে এইভাবে হঠাৎ ডানা মেলে নেমে আসতে পারেন তার ওপর, সেটি বোধহয় সে স্বপ্নেও ভাবেনি!

বিস্ফারিত চোখে ছুলঠিমের দেহের দিকে তাকিয়েছিল তিনটি তিব্বতী, নিজেদের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না তারা৷ উড়ন্ত অবস্থা থেকে এত ক্ষিপ্রতায় ও এমন নিপুণ নিশানায় তীর ছুঁড়তে আজ অবধি আর কাউকে দেখেনি এই তিন তিব্বতনন্দন৷

তারপর যেভাবে বন্য নেকড়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে তার শিকারের ওপর, ঠিক সেভাবেই উন্মুক্ত দ’পদম হাতে দৌড়ে এল ওরা৷

উদীয়ানের রাজপুত্র তখন ফেলে দিয়েছেন তার ধনুটি৷ তাঁর হাতে উঠে এসেছে একটি অতি ভীষণদর্শন বিশালকায় খড়্গ, যার মাথার দিকটা চাঁদের মতো বাঁকানো৷

এ অস্ত্রও চেনেন শ্রমণ৷ কজঙ্গলের শবর জনজাতির বড় প্রিয় এই খড়্গ৷ এই দিয়ে দেবী পর্ণশবরীর সামনে বন্য মহিষ উৎসর্গ করে তারা৷

তাদের ভাষায় এর নাম দা’ বা দাও!

৭০০ খ্রিস্টাব্দ। রাজপ্রাসাদ, কর্মান্তবাসক, বঙ্গদেশ।

সেই একই রাত্রি৷ নিদ্রাহীন রাত জাগছেন আরও তিনজন মানুষ।

স্পষ্ট ও উজ্জ্বল আকাশ জুড়ে অজস্র প্রশ্নের মতো নেমে আসছে তরল অন্ধকারের স্রোত৷ একটি কালপেঁচা তীক্ষ্ণস্বরে ডাকতে ডাকতে উড়ে গেল উত্তরদিকে; তারপর চতুর্দিক জুড়ে ছায়ার মতো, রাতের কুয়াশার মতো নেমে এল অনন্ত নৈঃশব্দ্য৷ চারিদিকে জনপ্রাণীর শব্দমাত্র নেই৷ বাতাসে অল্প শীতের আভাস। বনে-বনান্তরে গাছের পাতায় ক্লান্ত মর্মরধ্বনি৷ দূরে দিগন্তে যেখানে ঘননীল আকাশ মিশেছে কৃষ্ণচরাচরে, সেইখানে একটি বড় হ্রদ৷ হ্রদের জলে ছোট ছোট ঢেউয়ের মাথায় ভেসে যাচ্ছে খণ্ড খণ্ড চন্দ্রজোছনা৷ তার একপাশে বিস্তীর্ণ প্রান্তর, আরেকপাশে একটি রাজপ্রাসাদ৷

সেই রাজপ্রাসাদের দ্বিতলে তিনজন বসে আছেন পাথরের মূর্তির মতো৷ অন্ধকার প্রাসাদের একটি জানালা প্রদীপের আলোয় উদ্ভাসিত। তারই মধ্যে তিনটি দীর্ঘ ছায়া থেকে থেকে কেঁপে উঠছে।

এঁদের মধ্যে যাঁর বয়স অপেক্ষাকৃত কম, তিনি বসে আছেন একটি রাজসিক আসনে৷ তাঁর প্রশস্ত বুকে শোভা পাচ্ছে বহুমূল্য রত্নহার, দুইহাতে মাণিক্যখচিত অঙ্গদ, দুই কানের কুণ্ডলে ঠিকরে উঠছে স্বর্ণদ্যুতির অহঙ্কার৷ দেহটি সুঠাম হলে কী হবে, এই অল্প বয়সেই সুদর্শন যুবকটির চোখের নীচে গাঢ় কালির চিহ্ন, অবয়ব জুড়ে অতিরিক্ত ইন্দ্রিয়াসক্তির সাক্ষ্য স্পষ্ট।

বাকি দুজনও বসে আছেন তাঁর কাছেই। তাঁদের বসার ভঙ্গিতে বোঝা যায় যে তাঁরা এই নবীন যুবার বিশেষ আস্থার পাত্র। তাই তাঁদের আচরণে বিনয় আছে, ভয় নেই। শ্রদ্ধা আছে, আশঙ্কা নেই।

স্তব্ধতা ভঙ্গ করলেন খর্বনাসা গৌরবর্ণ পুরুষটি। তাঁর উচ্চারণে স্পষ্ট বোঝা যায় যে এই দেশের ভাষা তাঁর মাতৃভাষা নয়, এই ভাষা তিনি আয়ত্ত করেছেন।

‘আমাদের সমস্ত পরিকল্পনা কালই বাস্তব রূপ পাচ্ছে তো ভাগিনেয়? সব কিছু ঠিকঠাক তো?’

যুবক প্রথমেই উত্তর করলেন না৷ একবার তাকালেন বক্তার দিকে, তারপর অন্যমনষ্কভাবে বললেন, ‘এখনও স্থির করতে করতে পারিনি মাতুল চারুদত্ত। আমার মনে হয় এই মুহূর্তে এত তাড়াহুড়ো করার প্রয়োজন নেই, এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আমাদের সাবধানী পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত।’

ভ্রু কুঞ্চিত করেই মুখে কৃত্রিম মিষ্টি হাসি ফিরিয়ে আনলেন সেই বিদেশি পুরুষ, ‘আমার কথা যদি শোনো ভাগিনেয়, শাস্ত্রে বলে শুভস্য শীঘ্রম, অশুভস্য কাল হরণম্। ভালো কাজে দেরি হওয়া ঠিক নয়৷ আর তাছাড়া আগামীকাল তোমার অভিষেক, এই বঙ্গভূমির সম্রাট হবে তুমি। এখন এত ভাবাভাবির মধ্যে গেলে তোমার চলবে?’

‘কিন্তু মাতুল, অভিষেকের দিনেই এত বড় একটি সিদ্ধান্ত কী করে নিই? তাও অমাত্যদের সঙ্গে এ বিষয়ে কিছুমাত্র আলোচনা না করে?’

‘এ ব্যতীত তিব্বতরাজের নিঃশর্ত সমর্থন পাওয়ার আর কি কোনও উপায় তোমার জানা আছে ভাগিনেয়?’ চারুদত্ত প্রতিপ্রশ্ন করেন৷

‘কিন্তু...কিন্তু মাতুল...এর ফলাফল হিসেবে রাজকোষের ওপর যে বিপুল চাপ পড়বে...’

‘এ আলোচনা আমরা আগেই করিনি কি ভাগিনেয়?’ সামান্য অধীরতাই বোধহয় প্রকাশ পায় বক্তার স্বরে, ‘আমাদের তো কথাই হয়েছিল যে, তোমার রাজ্যপ্রাপ্তির পরেই তিব্বতরাজের সহায়তায় আমরা দিগ্বিজয়ে বার হব৷ আমাদের জয়ধ্বজা উড়বে গুর্জরদেশ থেকে যবদ্বীপ অবধি৷ পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়বে সমগ্র উত্তরাবর্ত৷ বিজিত দেশগুলি থেকে লুণ্ঠন করে আনব বিপুল ধনসম্পদ৷ এ সব তো স্থির হয়েই আছে! আর এই বিপুল সাহায্যের প্রতিদানে যে সামান্য সুবিধা তিব্বত-নরেশ চেয়েছেন, তা খুব অযৌক্তিক নয়!’

ইতস্তত করেন নবীন যুবক৷ সেই দোলাচল প্রকাশ পায় তাঁর কণ্ঠস্বরেও, ‘আমার আশঙ্কা অন্যখানে, মাতুল চারুদত্ত৷ আমার আশঙ্কা আমাদের এই পরিকল্পনা কতখানি বাস্তব সেই নিয়ে৷ আমাদের পরিকল্পনা কি একটু বেশি উচ্চাকাঙ্ক্ষী নয়? অঙ্গ, পুন্ড্রবর্ধন, মগধ, লিচ্ছবী, মালব, কান্যকুব্জ...এইসব বিচিত্র ভাষাভাষী, বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষকে একসূত্রে গেঁথে একটি স্বতন্ত্র, সার্বভৌম সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার কল্পনা স্বপ্নমাত্র নয় তো?’

আলোছায়ার মধ্যেই চারুদত্তের মুখে অদ্ভুত মরিয়া এক আতঙ্কের ভাব খেলে গেল, যা বাকি দুজনের কেউই লক্ষ করলেন না।

তিব্বত থেকে গত মাসেই প্রধানমন্ত্রী গার তিরিলিং-এর গোপন আদেশ এসেছে চারুদত্তের কাছে, সে আদেশ সংক্ষিপ্ত, নির্দিষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন৷ কাল রাজসভার অধিবেশন শেষ হওয়ার আগে যদি সেই আদেশের পালন না হয়, তাহলে পরের দিন ভোর হওয়ার আগেই চারুদত্তের একগাছি চুলও আর খুঁজে পাওয়া যাবে না৷

সেই থেকে চারুদত্তের চোখে ঘুম নেই, প্রাণে স্বস্তি নেই, মনে আনন্দ নেই৷

মনের ভাব গোপন করে বললেন চারুদত্ত, ‘এখন এই প্রশ্ন ওঠার কারণ কী ভাগিনেয়? তোমার মনে তো এমন ছোটখাটো সংশয় আসার কথা নয়! বীরত্বে তুমি গৌড়পতি শশাঙ্কের সমতুল্য, করুণায় স্বয়ং সম্রাট হর্ষ৷ আমি তো প্রায়ই বলি—প্রতাপে, মেধায়, করুণায় আমার ভাগিনেয় সাক্ষাৎ অমিতাভর অবতার৷’

এই পর্যন্ত বলে সরু চোখে একবার ভাগিনেয়র দিকে তাকালেন তিনি৷ তারপর যোগ করলেন, ‘তিব্বতাধিপতির সঙ্গে আমাদের এই চুক্তিই একদিন তোমার পুণ্য নিয়তি হয়ে দেখা দেবে ভাগিনেয়, আর একদিন এই নিয়তির নির্দেশে তুমি ভারতবর্ষের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্রাট হবে৷ তুমি কি নিজেকে সাধারণ পুরুষ ভাবো? রাজচক্রবর্তী সম্রাটের ভাগ্যলিখন নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছ, সম্রাট সমুদ্রগুপ্তের পরে তুমিই হবে ভারতভূমির শ্রেষ্ঠতম নৃপতি৷ আজ তোমার নিয়তি তোমাকে আহ্বান করছে ভাগিনেয়! ওঠো, জাগো...রাজলক্ষ্মীর বরমাল্য আজ তোমার কণ্ঠদেশে...’

তৃতীয় পুরুষটি যেখানে বসেছিলেন সেখানে আলোয় ছায়ায় আঁধারে তৈরি হয়েছিল এক অপার্থিব মায়াবিভ্রম৷ তাঁর মুখের নীচের অংশটুকু দেখা যাচ্ছিল৷ সেই অন্ধকারের ছায়ায় ফুটে ছিল একটি দৃঢ় চিবুক এবং বাঁকা ঠোঁট৷ কালো কাপড়ে সমস্ত শরীর ঢেকে বসেছিলেন মানুষটি৷ তাঁর বসে থাকার ঋজু ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছিল যেন একটি উন্মুক্ত তরবারি নিষ্কম্প দীপশিখার মতো ধ্যানমগ্ন হয়ে আছে৷

শান্ত চোখে এই নাটক দেখে যাচ্ছিলেন সেই অজ্ঞাতপরিচয় পুরুষ৷ তাঁর মনে হচ্ছিল যেন এক কুশলী ব্যাধ ফাঁদ পেতেছে নির্বোধ ছাগশিশু ধরবার জন্যে৷ সেই পুরোনো খেলা, শুধু কুশীলবেরা নতুন, এই যা৷ তবে কি না এক্ষেত্রে এই নাটকের অধিকারী তিনিই৷ ছাগশিশুও তাঁর, ব্যাধও তাঁর, ফাঁদও তাঁরই৷ কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার শাস্ত্রে তিনি বিশেষ পণ্ডিত৷ তারপর দুটি কাঁটাকেই কী করে ছুঁড়ে ফেলতে হয়, সেও তাঁর ভালোই জানা৷ তবে আজকের রাত অতি গুরুত্বপূর্ণ, আজই অতি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তদুটি এই মূর্খ অর্বাচীনটিকে দিয়ে অনুমোদিত করিয়ে নিতে হবে৷ এর থেকে ভালো সময় আর হয় না৷

তিনি পাথরের মূর্তির মতো নির্বাক থেকে সবকিছু শান্তভাবে দেখে যাচ্ছেন৷ মহাচীন থেকে কম অর্থ নিয়ে আসেননি তিনি৷ একবার শুধু রাজসভায় জায়গা পাওয়ার অপেক্ষা, ব্যস, তারপরেই রাজসিংহাসন তাঁর হাতের মুঠোয়৷ উৎকোচে বশীভূত হয় না এমন রাজপুরুষ হয় নাকি?

তবে একজন, শুধু একজনকেই তাঁর ভয়৷

বাতায়নের বাইরে অন্ধকার রাত্রির দিকে চক্ষু মেলে দেখছিলেন সদ্য কৈশোরোত্তীর্ণ নবীন যুবক, অশান্ত ও দীর্ণ বঙ্গভূমির নতুন শাসক৷ শান্ত নীল আকাশ থেকে কি কোনও মহাজাগতিক সংকেতধ্বনি শুনতে চাইছিলেন ভাবী সম্রাট? পেতে চাইছিলেন কোনও অতিলৌকিক ইঙ্গিত?

দেশের অবস্থা এমনিতেই খুব একটা ভালো নয়৷ সম্রাট শশাঙ্কের মৃত্যুর পর থেকেই ভারতবর্ষের পূর্বভাগ জুড়ে যে অরাজক বিশৃঙ্খলা চলছে, তার থেকে মুক্তি পাওয়ার কোনও আশু লক্ষণ নেই৷ সম্রাট রাজভট অতি দৃঢ়ভাবে এতদিন রাজ্যশাসন করে এসেছেন৷ তাই অন্তত এখানে বহু চেষ্টাতেও কোনও রাষ্ট্রবিরোধী শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারেনি৷

তাঁর আকস্মিক প্রয়াণে মানুষের মধ্যে বিপুল অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে৷ রাজ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছে রাজ্যের আপামর জনসাধারণ৷

কিন্তু তিনি নিজে?

এক আচ্ছন্ন ঔদাসীন্য যেন এই সবকিছু থেকে সম্পূর্ণভাবে সরিয়ে রেখেছে তাঁকে৷ সেই নির্মোহ নিরাসক্তির আবরণ পেরিয়ে এত কথাবার্তা, আলোচনা, পরিকল্পনা, মন্ত্রণা, ষড়যন্ত্র—এসব কিছুই তাঁর মনে আজকাল কোনও ছাপই ফেলে না৷ প্রতিটি সংবাদ যেন তাঁর চৈতন্যে একবার আঘাত করেই চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে মহাশূন্যে মিলিয়ে যায়, তার কোনও অবশেষই থেকে যায় না৷

এমনকী আজকাল কোনও বিষয় নিয়ে বেশি ভাবতেও পারেন না তিনি৷ মাঝে মাঝেই মাথার ভিতরটা শূন্য হয়ে যায়৷ তারপরেই তীব্র যন্ত্রণায় উন্মাদপ্রায় হয়ে যান তিনি, এই অবস্থা চলে যতক্ষণ না মাতুল এসে সেই বিশেষ ওষুধটি তাঁর হাতে তুলে দিচ্ছেন৷

মাথার যন্ত্রণাটা আসবে আসবে করছিল৷ তবুও ভ্রূক্ষেপ করলেন না নতুন সম্রাট৷ মাতুলের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘অভিজ্ঞ অমাত্যদের পরামর্শ আমি উপেক্ষাও করতে পারি মাতুল৷ সে অধিকার আমার আছে৷ কিন্তু তাই বলে তাঁদের পরামর্শ না শোনার কথা বলি কী করে?’

প্রমাদ গুনলেন চারুদত্ত৷ হাতে সময় বড়ই কম, এই সময়ে হঠাৎ এই অপোগণ্ডটির বুদ্ধি গজিয়ে ওঠা বড়ই বিপদের কথা! লক্ষণ ভালো নয়!

‘আমার মতে তাঁদের পরামর্শ শোনার কোনও প্রয়োজনই নেই ভাগিনেয়৷ রাজসভার ওই বৃদ্ধ পরগাছাগুলোর কাজই হচ্ছে সমস্ত শুভকর্মে বাধা দিয়ে সেইটি পণ্ড করা৷’

উদ্ভ্রান্ত চোখ তুলে তাকালেন নবীন যুবক। দুজনের দিকে পর্যায়ক্রমে দেখলেন। তারপর স্খলিতস্বরে বললেন, ‘আমি জানি না মাতুল—কী ঘটতে চলেছে; কিন্তু আমি এই প্রস্তাবে অত্যন্ত অস্বস্তি বোধ করছি। আমার মন বলছে যে, এই বিষয়ে উচ্চপদস্থ অমাত্যদের মতামত নেওয়াও অত্যন্ত আবশ্যক। তাঁরা যে শুধু অভিজ্ঞই নন, রাজ্যের হিতাকাঙ্ক্ষীও বটে। পিতাকেও দেখেছি অত্যন্ত ছোটখাটো বিষয় হলেও এঁদের মতামত নিতে। আর আজ এত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত তাঁদের পরামর্শ ছাড়াই...’

‘তুমি বৃথাই চিন্তিত হচ্ছ, ভাগিনেয়৷ মহাবলশালী তিব্বত-নরেশ ঠিদু স্রোংচান স্বয়ং যখন তোমার সহায়, তখন এত চিন্তা আর উদ্বেগের তো কোন কারণই নেই৷ আমাদের এই মিত্র তো প্রধানমন্ত্রী তিরিলিং-এর স্বাক্ষরিত চুক্তিপত্র নিয়েই এসেছেন৷’ এই বলে সেই তৃতীয় পুরুষটির দিকে ইঙ্গিত করলেন চারুদত্ত৷ সম্মতির ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন সেই রহস্যময় পুরুষ৷

‘কিন্তু মাতুল, সে চুক্তিতে তো কোথাও সম্রাটের স্বাক্ষরচিহ্ন নেই৷’

‘আহা, যেখানে প্রধানমন্ত্রী নিজে সম্মতি দিয়েছেন সেখানে আবার সম্রাটের আলাদা করে অনুমতি দেওয়ার কী প্রয়োজন? আর আমি ওখানকারই লোক, আমি এসব নিয়মটিয়ম খুব ভালো করে জানি ভাগিনেয়৷ তুমি এ বিষয়ে একদম নিশ্চিন্ত থাকতে পারো৷’ ভাগিনেয়কে ভরসা দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন চারুদত্ত৷ এই বলে সেই রহস্যময় তৃতীয় পুরুষটির দিকে আড়চোখে তাকালেন তিনি, তারপর বললেন, ‘তার উপর তুমি নিজেও মহাশক্তিশালী যোদ্ধা৷ ছোটখাটো সামন্ত আর রাজাদের জন্য তো তুমি একাই যথেষ্ট৷ তোমার দরকার কি এইসব সামান্য বেতনভুক কর্মচারীদের পরামর্শ নেওয়ার?’ নবীন সম্রাটকে উত্তেজিত করার প্রবল চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন চারুদত্ত৷

এইবার মহাস্ত্র প্রয়োগের সময় এসেছে! নিজেই নিজেকে বললেন তিনি৷

ঘরের কোনায় রাখা স্বর্ণকলসটির দিকে এগিয়ে গেলেন তিনি, কুলুঙ্গি থেকে দুটি পানপাত্র নামিয়ে আনলেন নিজের হাতেই৷ তারপর জিগ্যেস করলেন, ‘আজ মনে হয় ভাগিনেয়র মস্তিষ্ক চঞ্চল হয়ে আছে, তাই না? নইলে এমন জলবত্তরলং বিষয় নিয়ে এত প্রশ্ন ওঠার কথাই না৷ তবে ভাগিনেয়র আর দোষ কী? কয়েকদিন ধরে তার ওপর যে ঝড় বয়ে যাচ্ছে, দেখে তো আমারই শরীরটা কেমন যেন...’, বলতে বলতে দুটি পানপাত্র পূর্ণ করার উদ্যোগ নিলেন৷ তারপর প্রশ্ন করলেন, ‘আজ সম্রাটের কোন পানীয় সেবনের ইচ্ছা শুনি? উৎকৃষ্ট গৌড়ী আছে, মাধ্বী আছে, মৈরেয়ও আছে৷ এমনকী দণ্ডভুক্তি থেকে আনা উত্তম পৈষ্ঠীও আছে কিছু...’

লক্ষণ একটুও ভালো লাগছিল না চারুদত্তের৷ এই যুবকের বয়ঃসন্ধিকাল থেকে তাকে অল্প অল্প করে নিজের হাতের মুঠোয় এনেছেন তিনি৷ তার জন্যে বিপুল পরিশ্রম গেছে তাঁর৷ ভাগিনেয়কে নারী ও সুরায় আসক্ত করিয়েছেন যৌবনের শুরুর দিনগুলি থেকেই৷ দেশবিদেশ থেকে অতি গোপনে আনিয়েছেন বিচিত্র সব নেশাবস্তু৷ বিভিন্ন মদ্য থেকে শুরু করে প্রবরদেশের গঞ্জিকা, তিব্বতীয় নীলকৃষ্ণপুষ্প থেকে শুরু করে চের দেশের নারিকেলজাত ক্বাত্থ, প্রাণীজ থেকে উদ্ভিজ্জ, সমস্ত ধরনের নেশাদ্রব্য ব্যবহারে অভ্যস্ত তাঁর আদরের ভাগিনেয়৷

তবে ইনি সবচেয়ে বেশি পছন্দ করেন যে বস্তুটি, সেটির জন্মস্থান সুদূর গান্ধারভূমিতে৷ অহিফেনকে বিশেষ উপায়ে পাতিত ও শোধিত করে প্রস্তুত করা হয় শুভ্রবর্ণ ভস্ম৷ শিকারকে আচ্ছন্নতায় বশীভূত করে ফেলতে এর জুড়ি নেই৷

বুকের কাছে হাত দিলেন৷ বটুয়াটি সঙ্গে আছে তো?

আপাতত এই দিয়েই ভাগিনেয়কে নিয়ন্ত্রণ করেন চারুদত্ত৷ এমনই তীব্র আকর্ষণ সেই শুভ্রবর্ণ ভস্মটির, যে প্রয়োজনের সময়ে সেটি হাতের কাছে না পেলে উন্মত্ত হয়ে ওঠে যুবক৷

আর পেলে? তখন তো অতি উত্তম৷ অসংলগ্ন আচরণ, উদ্ধত ও ইতরজনের মতো ব্যবহার, অনর্থক হিংস্রতা—সব মিলিয়ে এই মানুষটিকে তখন নিয়ন্ত্রণ করাই কঠিন হয়ে পড়ে৷

রাজপরিবারে এই নিয়ে অনেক অশান্তি হয়েছে৷ কোনও বৈদ্যই এই রোগ নিরাময় করতে পারেননি৷ সন্তানের এই দুরারোগ্য অসুখ দেখে জীবনের প্রতি তীব্র বিতৃষ্ণায় শয্যা নিয়েছেন চারুদত্তের ভগিনী, রানি চন্দ্রাবতী৷ জাগতিক কোনও ব্যাপারেই আর তাঁর আসক্তি নেই৷ সম্রাট রাজভট নিজেও শেষ জীবন বড় কষ্টে কাটাননি কি? শেষাবধি সেই যন্ত্রণা থেকে তাঁকে মুক্তি দিতেই তো চারুদত্তকে বাধ্য হয়েই সেই রাতে...

মুহূর্তের জন্যে তীব্র অনুশোচনা গ্রাস করতে চাইছিল চারুদত্তকে৷ কিন্তু আসন্ন কর্তব্যের কথা ভেবে নিজেকে ফের স্বাভাবিক করলেন৷ অর্থের সামনে কে কার ভগিনী, কে কার মাতুল? বিশেষত যাঁর মাথার ওপর উদ্যত হয়ে আছে মৃত্যুভয়ের মহাখড়্গ?

অভ্যস্ত হাতে একটি সুরাপাত্রে পরিমাণ মতো মাধ্বী ঢাললেন তিনি৷ তারপর ডান হাতটি ঢুকিয়ে দিলেন ঊর্ধ্বাঙ্গের অঙ্গবস্ত্রটির ভেতরে৷ সেখান থেকে অতি সন্তর্পণে বের করে আনলেন একটি ছোট চামড়ার বটুয়া৷ তার ভিতর থেকে অতি সন্তর্পণে তুলে আনলেন কিছু সাদা রঙের গুঁড়ো, মিশিয়ে দিলেন সেই পানীয়তে৷ তারপর অতি স্নেহের সঙ্গে সেটি তুলে দিলেন যুবকটির হাতে৷

মাতুলের উত্তেজক ভাষণে বিহ্বল হয়ে পড়েছিলেন যুবক৷ এমনিতেই বেশি চিন্তাভাবনা সহ্য হয় না তাঁর৷ তার ওপর মাথার যন্ত্রণা ফিরে আসছিল৷ একমুহূর্তে পানীয় নিঃশেষ করলেন সেই নবীন যুবক৷

তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে ভাগিনেয়র দিকে লক্ষ রাখছিলেন চারুদত্ত৷ এসব কাজের মূল্য কি শুধু অর্থ দিয়ে হয়? নিজের পানপাত্রে দীর্ঘ চুমুক দিতে দিতে নিজেকে বলছিলেন তিনি৷ এর জন্যে চাই ধৈর্য, সাহস আর বুদ্ধি৷ সাধে কী আর চারুদত্তকে অত চিন্তাভাবনার পর পাঠানো হয়েছিল এই দেশে?

‘এখন কি কিঞ্চিৎ সুস্থির বোধ করছ ভাগিনেয়?’

এতক্ষণ চোখ বুজে ছিলেন নবীন সম্রাট৷ এইবার চোখ খুললেন তিনি৷ ইতিমধ্যেই চক্ষু লাল হয়ে গেছে তাঁর৷ সামান্য বাঁকা সুরে বললেন, ‘কী যেন বলছিলেন মাতুল? তাহলে চুক্তিতে প্রধানমন্ত্রী তিরিলিং এর অভিজ্ঞানই যথেষ্ট?’

‘নিশ্চয়৷’ স্বস্তির শ্বাস ফেললেন চারুদত্ত৷ ভাগিনেয়র এই লক্ষণ খুবই ভালোভাবে চেনেন তিনি, তবুও সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিত হওয়া উচিত হবে কি?

এই দেশের রক্তে অবাধ্যতা আর বিদ্রোহের বীজ খেলা করে বেড়ায়৷ সহজে কি এই রাত এসেছে তাঁর কাছে? সম্রাট রাজভট বেঁচে থাকলে কি আর এসব সম্ভব হতো?

অনেকদিন হয়ে গেল এই দেশে এসেছেন চারুদত্ত, এখনও এই দেশের মায়েদের দুধের জাদু বুঝে উঠতে পারলেন না তিনি৷ একটিমাত্র কৈবর্ত নারীর দুধের ঋণ যে তাঁর ইচ্ছাপূরণের পথে এত বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে, কেই বা ভেবেছিল?

খড়্গবংশের প্রতিষ্ঠার পেছনে হাত ছিল তিব্বত-নরেশ স্রোংচান গাম্পোর৷ ভারতের পূর্বভাগ জয় করে দেশে ফিরে যাওয়ার আগে এই রাজবংশের প্রতিষ্ঠা করে যান তিনি৷ এঁদের প্রথম তিন নৃপতি খড়্গোদ্যম, জাতখড়্গ, এবং দেবখড়্গ—তিনজনেরই দেহে ছিল তিব্বতের রক্ত এবং তিনজনেই ছিলেন পরম বৌদ্ধ। এমনকী খড়্গোদ্যম এবং জাতখড়্গের দুই রাজ্ঞীও ছিলেন তিব্বতদেশীয়।

কিন্তু ‘ক্ষিতিপতি’ দেবখড়্গ তাঁদের পারিবারিক রীতি অগ্রাহ্য করে বিয়ে করেন এক এদেশীয় নারীকে। মহারানি প্রভাবতী৷

প্রভাবতী ছিলেন বরেন্দ্রীর মেয়ে, কৈবর্তরাজকন্যা। সম্রাট রাজভট তাঁরই গর্ভজাত সন্তান। নিজের মা’কে প্রাণাধিক ভালোবাসতেন রাজভট, এই দেশকে তারও বেশি৷

উদার হেসে বললেন চারুদত্ত, ‘এই তো, ভাগিনেয়র মনটা এবার একটু প্রফুল্ল হয়েছে মনে হচ্ছে! বাহ বাহ, বেশ ভালো৷ তা ভাগিনেয়র মনে আছে নিশ্চয়ই, কী কী করতে হবে আমাদের?’

‘আছে বইকি! সামান্য ঘড়ঘড়ে গলায় বললেন নবনিযুক্ত সম্রাট। কণ্ঠস্বরে ঝলসে উঠছিল অপরিসীম ঔদ্ধত্য, ‘একদিন এই বিশাল ভারতভূমি আমার পদানত হবে৷ সম্রাট সমুদ্রগুপ্তের পর একমাত্র রাজচক্রবর্তী সম্রাট হব আমি৷ তাই না মাতুল?’

‘বটেই তো ভাগিনেয়৷’ আরও উৎসাহ দেন চারুদত্ত৷

‘কলিঙ্গ থেকে কাশ্মীর আমার পায়ের নীচে আসবে, কামরূপ নরেশ নিজে এসে আমার পা ধুইয়ে দেবেন’ চক্ষু দুটি আরও লাল হয়ে উঠছিল যুবকের, ‘গৌড়বঙ্গের এই অপোগণ্ড সামন্তগুলোকে নিয়ে কী করা যায় মাতুল?’

‘রাজপ্রাসাদ নিয়মিত পরিষ্কার করার কাজে লাগিয়ে দিলে কেমন হয় ভাগিনেয়?’

এতক্ষণ ঘরে উপস্থিত তৃতীয় পুরুষটি কোনও কথা বলেননি৷ এইবার তিনি একটু মৃদু শব্দ করলেন৷ ঈঙ্গিত বুঝতে দেরি হল না চারুদত্তের৷ বাজে কথা অনেক হয়েছে, এইবার আসল কাজ৷

‘কিন্তু তুমি তো জানো ভাগিনেয়, সমস্ত ভালো কাজে বাধা দেওয়াই এদেশের মানুষের একমাত্র স্বভাব৷ তোমাকে কিন্তু সেই নিয়ে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে৷ আমার চিন্তা হচ্ছে ওরা আবার আমাদের সমস্ত পরিকল্পনা পণ্ড না করে দেয়৷ কণ্ঠে আশঙ্কা ফুটিয়ে তুললেন চারুদত্ত৷

‘তারা কারা? রাজার ইচ্ছেয় বাধা দেয়, কাদের এত স্পর্ধা?’

চাপা উল্লাসের ভাব খেলে গেল বাকি দুজনের মুখে৷ ওষুধ ধরেছে৷ এইবার, অতি ধীরে, খেলিয়ে তুলতে হবে৷

‘কারা আবার? তোমার বৃদ্ধ অমাত্যরা৷’ মুখ ভার করলেন চারুদত্ত, ‘প্রতিটি কাজে প্রশ্ন তোলাই যাদের কাজ—তারা! আমার কথা যদি শোনো ভাগিনেয়, এই বৃদ্ধদের অনুমতি নিয়ে চলতে গেলে তোমার স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে৷’

‘এত স্পর্ধা ওদের হবেই না৷ কালই আপনার ইচ্ছাপূরণ হবে৷’

যুদ্ধজয়ের হাসি ফুটে ওঠে তৃতীয় পুরুষটির মুখে৷ যাক, ভাগ্যের চাকা অবশেষে তাঁর পক্ষে ঘুরতে শুরু করেছে৷ একবার শুধু রাজসভায় স্থান পাওয়ার অপেক্ষা৷ তারপর তিনি জানেন কীভাবে কাঁটা দিয়ে কাঁটা তুলতে হয়৷ কাজ হয়ে যাওয়ার পর এই দুজনকেই ছেঁড়া ন্যাকড়ার মতো ফেলে দিতে তাঁর একমুহূর্ত সময় লাগবে না৷

স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন চারুদত্তও৷ এতদিন পর, অবশেষে৷ সেই বহু ঈপ্সিত ক্ষণটি আজ তাঁর হাতের মুঠোয়৷ চাপ ক্রমশই বাড়ছিল চারুদত্তের উপর। সেই চাপ আর নিতে পারছিলেন না তিনি৷

তিব্বতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ক্ষমতার পাল্লা ক্রমেই ঝুঁকে পড়ছিল ভারতীয়দের দিকে। শক্তিশালী সামন্তদের বশ করতে গিয়ে তিব্বতসম্রাট ক্রমেই আরও বেশি আঁকড়ে ধরছিলেন বৌদ্ধধর্ম, আরও স্পষ্ট করে বলতে গেলে ভারতীয় বৌদ্ধধর্ম৷ সামন্তদের বেশিরভাগই আবার তিব্বতের প্রাচীন পোন ধর্মের অনুসারী৷ এদের নেতৃত্বে আছেন মহা কূটবুদ্ধি মন্ত্রী, গার সামন্ত বংশের সন্তান তিরিলিং।

ওদিকে মহাশক্তিশালী তিব্বত ক্রমেই ব্যতিব্যস্ত করে তুলছিল প্রতিবেশী রাষ্ট্র চীনকে৷ ফলে চীনের তাং রাজবংশও চাইছিল তিব্বত সম্রাটকে নিয়ন্ত্রণ করতে৷ তাং রাজবংশের রাজপুরুষরা তখন চৈনিক বৌদ্ধদের সাহায্যে মদত দিতে থাকলেন তিব্বতের প্রভাবশালী সামন্তদের, উদ্দেশ্য তিব্বতসম্রাটকে নিয়ন্ত্রণ করা৷ মহামন্ত্রী তিরিলিং অতি সহজে যুক্ত হয়ে গেলেন তাদের দলে৷

তিব্বতের সামন্তরা জানতেন যে, সম্রাটকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে গেলে ভারতীয় বৌদ্ধদের শাসনে রাখতে হবে৷ কারণ তাঁরাই ধর্মীয় এবং নৈতিক শক্তি যোগাচ্ছেন সম্রাটকে৷ তাঁদের জন্যেই আজ তিব্বতে পোন ধর্ম বিপদের মুখে৷ সামন্তদের ক্ষমতা প্রশ্নের সামনে৷ তাঁদেরই চরবৃত্তি নিয়ে এদেশে আসেন চারুদত্ত৷

কিন্তু এতদিন ধরে সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থই হয়েছে তাঁর৷ রাজসচিব তিনি, রাজসভায় যথেষ্ট উচ্চপদে আসীন৷ রাজ্যের বহু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মতামত দেওয়ার অধিকার পেয়েছেন, কিন্তু কোনও কাজের কাজ করাতে পারেননি সম্রাটকে দিয়ে।

‘তাহলে শেষ পর্যন্ত কী ঠিক হল?’ গম্ভীর গলায় বলে উঠলেন তৃতীয় পুরুষটি৷ তাঁর স্বরের গাম্ভীর্যে বোঝা যায় যে তিনি কোনও সামান্য পুরুষ নন৷ নবীন যুবক চোখ মেলে তাকালেন তাঁর দিকে৷ তাঁর নেশাগ্রস্ত চোখে ধরা পড়ে পুরুষটির স্থির এবং শীতল দৃষ্টি৷ ইতিমধ্যেই চারুদত্তের দেওয়া চতুর্থ পাত্র শেষ করেছেন৷ এই জ্বলন্ত দৃষ্টির সামনে সহসা শীত করে ওঠে সম্রাটের!

‘তাহলে কি এই ঠিক হল যে, আমাদের এই বন্ধুটিকে কালকেই নিয়োগ করা হবে দ্বিতীয় রাজসচিব রূপে?’ উদগ্র আগ্রহে ভাগিনেয়র দিকে তাকালেন চারুদত্ত৷

অস্ফূটে বললেন নবীন সম্রাট, ‘হ্যাঁ মাতুল, তাই হবে৷’

‘আর পূর্বসমুদ্রের বাণিজ্যপথে তিব্বতদেশের নিঃশুল্ক বাণিজ্যের অধিকার?’

‘সে অনুমতিও কালই দিচ্ছি৷’

আনন্দে চারুদত্তের চোখে জল চলে আসছিল৷ তিব্বতের বহির্বাণিজ্যের রাশ এখনও মন্ত্রী তিরিলিং-এর হাতেই৷ পূর্বসমুদ্রপথে তিব্বতীয় বণিকদের জন্য নিঃশুল্ক বাণিজ্যের অধিকার আদায় করা মানে তিব্বতের রাজসভায় মন্ত্রীমশাইয়ের প্রভাব প্রতিপত্তি দ্বিগুণ চতুর্গুণ হয়ে যাওয়া৷ আর প্রতিশ্রুতিমতো বাড়তি লভ্যাংশের এক দশমাংশ তো চারুদত্ত পাচ্ছেনই৷

হে ঈশ্বর, এত সুখ লেখা ছিল চারুদত্তের কপালে? সে যে অনেক মুদ্রা!

‘আর যদি অন্যান্য অমাত্যরা আপত্তি তোলেন?’ অজ্ঞাতপরিচয় পুরুষটির কণ্ঠস্বরে এমন মসৃণ শীতলতা আছে যে, এই স্বর শুনলেই শ্রোতার মনে অপার্থিব ভয় জেগে ওঠে৷

‘কে আপত্তি তুলবে? কার ঘাড়ে কটা মাথা যে আমার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলবে?’ ক্রুদ্ধ স্বরে প্রশ্ন করেন নবীন সম্রাট৷

‘সাহস অনেকেরই আছে রাজন৷’ স্থির নিরাসক্ত কণ্ঠে জানান সেই অজ্ঞাত পুরুষটি৷

নবীন সম্রাটকে দেখে মনে হল এখনই বিপুল আক্রোশে ফেটে পড়বেন৷ সজোরে নিজের আসনের হাতলে ঘুঁষি মারলেন তিনি। তারপরে উন্মত্তস্বরে চিৎকার করে উঠলেন, ‘কার এত বড় স্পর্ধা—আমি জানতে চাই মাতুল! আমি জানতে চাই—কার এত সাহস যে আমাকে সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলার কথা ভাবে?’

‘অনেকেই আছেন রাজন, তবে ভয় একজনকেই।’ এই বলে উঠে দাঁড়ান অজ্ঞাতনামা তৃতীয় পুরুষ৷ বাঘের মতো নিঃশব্দ দ্রুত পায়ে সম্রাটের কাছে চলে আসেন তিনি, কাঁধে হাত রেখে বলেন, ‘তাঁকে এই রাজসভা থেকে সরাতে পারলেই আমাদের কার্যসিদ্ধির পথে আর বাধা থাকে না, রাজন।’

নবীন যুবক রাজবংশের সন্তান। নিজেও কম শক্তি ধরেন না৷ তবু তিনিও স্তম্ভিত হয়ে গেলেন এই মানুষটির দানবীয় শক্তিতে৷ এঁর ব্যাপারে আগেই অনেক কিছু শুনেছিলেন তিনি, এখন অনুভব করলেন যে ইনি সামান্য কেউ নন!

‘কে সেই অমাত্য? আপনি চেনেন তাঁকে? মাতুল চারুদত্ত, আপনি জানেন কার কথা ইনি বলছেন?’ সন্দিগ্ধস্বরে প্রশ্ন করলেন নবীন সম্রাট৷

‘জানি ভাগিনেয়।’ ভাগিনেয়র হাতে পঞ্চম পাত্র তুলে দিতে দিতে অকম্পিত স্বরে বললেন চারুদত্ত৷

‘কে সেই বিশ্বাসঘাতক?’

‘রাজপণ্ডিত দয়িতবিষ্ণু।’

৭৪৯ খ্রিস্টাব্দ| চম্পানগরী, মগধ|

বর্ষার শেষ৷ আকাশে শরতের প্রসন্ন রোদ৷ তার নীচে দিগন্ত অবধি ছেয়ে আছে সবুজ শালিধানের খেত৷ দুটি খেতের মধ্যবর্তী আলপথ ধরে তিনি হেঁটে আসছিলেন৷

তাঁর দীর্ঘ নির্মেদ শরীর দেখে বরেন্দ্রীর সুপুষ্ট ইক্ষুর কথা মনে পড়ে৷ তেমনই পুষ্ট অথচ মেদবর্জিত সুঠাম ঋজু দেহ৷ তিনি বিশালদেহী নন, তবুও শরীরে বিপুল শক্তির আভাস স্পষ্ট৷ নবদুর্বাদলশ্যাম মানুষটির মুখে সবসময়ই এমন একটি প্রসন্ন হাসি, যা দেখলেই মানুষের মন ভালো হয়ে যায়৷ পদ্মের পাপড়ির মতো তাঁর চোখদুটি স্নেহে ও প্রেমে সিক্ত৷

বরেন্দ্রীর আখের সঙ্গে নিজের দেহের তুলনা তিনি আগেও শুনেছেন৷ আগে শুনলে বিস্মিত হতেন, আজকাল কৌতুক অনুভব করেন৷ হতেও পারে, বরেন্দ্রভূমির মাটি দিয়ে গড়া তাঁর শরীর, বরেন্দ্রীর বায়ু তাঁর শ্বাস-প্রশ্বাসে, তাঁর প্রতিটি রক্তের ফোঁটায় করতোয়ার জলের শব্দ৷ তিনি বরেন্দ্রীর ঘরের ছেলে, বারেন্দ্রীর মহাবলী কেবট্ট, অর্থাৎ কৈবর্ত সমাজের প্রধানপুরুষ, এ নিয়ে চাপা গর্ব আছে তাঁর!

কৈবর্ত? সত্যিই কি তিনি কৈবর্ত?

মৃদু হাসলেন তিনি৷ নাহ, কারও প্রতি তাঁর কোনও অভিযোগ নেই৷ শাস্ত্রে বলে নিয়তিঃ কেন বাধ্যতে৷ বিধাতাপুরুষের বিধান ভাগ্যে নিয়েই প্রতিটি শিশু জন্মগ্রহণ করে, এ কথা তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন৷ না হলে তাঁর সঙ্গেই বা এমন কেন হবে?

জন্মসূত্রে ব্রাহ্মণ তিনি, মহাপণ্ডিতবংশে তাঁর জন্ম৷ পূজাপাঠ ও অধ্যাপনায় জীবন কাটানোর কথা তাঁর, অথচ ভাগ্যের কী ফের! গণ্ডযোগে জাত বলে ব্রাহ্মণ পিতামাতা জন্মাবার পরেই ত্যাগ করেন তাঁকে৷ তাঁর কেবট্টজাতীয় ধাইকে আদেশ দেন দুধের পুত্তলিটিকে করতোয়ার খরস্রোতে ফেলে আসার জন্যে৷ গণ্ডযোগ জ্যোতিষমতে ভারি অশুভ যোগ কিনা!

মনে মনেই তিনি নিজের কৈবর্তমায়ের চরণবন্দনা করেন। দুধের পুত্তলিটির ওপর সেই ধাইমায়ের করুণা না-জন্মালে আজ তিনি বেঁচে থাকতেন না৷ সেই স্নেহদুগ্ধের ঋণ তাঁকে যে মায়ার রশিতে বেঁধে রেখেছে, তার থেকে মুক্তির কোনও ইচ্ছা তাঁর নেই৷ তিনি সিদ্ধ, তিনি জ্ঞানী, তিনি মুক্তপুরুষ৷ কিন্তু তিনি এই নশ্বর পৃথিবীর রূপ, রস, গন্ধ, বর্ণ, স্পর্শের মধ্যেই নিজের মোক্ষ খুঁজে ফেরেন, তিনি জানেন যে বৈরাগ্যসাধনে মুক্তির পথ তাঁর নয়৷ এই দেশ, দেশের মাটি, দেশের মানুষ—এসবই বড় প্রিয় তাঁর৷ দেশকে আরও ভালোভাবে জানবেন বলেই এই বিশাল ভারতদেশ তিনি পায়ে হেঁটে ঘুরেছেন৷ রাজপদপোজীবি থেকে নাগরিক সমাজ, আজীবিক থেকে তীর্থিক, যুদ্ধব্যবসায়ী থেকে বৌদ্ধ শ্রমণ—সমস্ত মতের, সমস্ত স্তরের মানুষ তাঁকে শ্রদ্ধা করেন৷ তবে তাঁর প্রকৃত অনুরাগী হচ্ছে দেশের নিম্নশ্রেণীর ব্রাত্য, অন্ত্যজ, শূদ্রজনেরা৷ শবর, হাড়ি, ডোম, ব্যাধ, পুলিন্দ—এদের কাছে তিনি সাক্ষাৎ মহাদেবের অবতার৷ এরাই তাঁর প্রকৃত আত্মজন৷ তাঁর কথায় এরা পারে না হেন কাজ নেই৷ তাঁদের কাছে তিনি বহু বিচিত্র নামে পরিচিত; গৌড়ীশদেব, শ্রী পিম্বলীদেব, শ্রী ভৈরবানন্দ, শ্রী ইন্দ্রানন্দদেব, আরও কত কী! তবে যে নামে তিনি সর্বত্র পরিচিত সেটি হচ্ছে...

অকস্মাৎ দূর থেকে ভেসে-আসা অস্পষ্ট কোলাহলের শব্দ! মাথা তুলে দূরে তাকালেন তিনি৷ দেখলেন—ঘন ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাকিয়ে পাকিয়ে উঠছে আকাশে। নির্ঘাৎ আগুন লেগেছে নিকটবর্তী গ্রামে৷

মুহূর্তে আলপথ ভেঙে শালিধানের চারাগুলির মধ্যে নেমে গেলেন। সর্পিলগতিতে দ্রুত এগিয়ে যেতে থাকলেন হতভাগ্য গ্রামটির দিকে৷

৭০০ খ্রিস্টাব্দ| রাজসভা, কর্মান্তবাসক, বঙ্গদেশ|

প্রকাশ্য রাজসভায় দাঁড়িয়ে ক্রোধে ক্ষোভে অপমানে থরথর করে কাঁপছিলেন মধ্যবয়সি ব্রাহ্মণপণ্ডিত। দরদর ঘামে ভেসে যাচ্ছিল উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ দেহটি, মুখখানি অপমানে টকটকে লাল হয়ে আছে।

শুধু বঙ্গদেশ কেন, হরিকেল থেকে বারেন্দ্রী অবধি তাঁর পাণ্ডিত্যের খ্যাতিতে পরিপূর্ণ। তাঁর প্রজ্ঞা, শীল এবং বিনয়ে মুগ্ধ হয়ে সম্রাট রাজভট নিজে তাঁকে নিয়োগ করেছিলেন রাজপণ্ডিত হিসেবে। সেই থেকে ধীরে ধীরে নিজের জ্ঞানে ও গুণে সর্বজনশ্রদ্ধেয় হয়ে উঠেছেন তিনি। তাঁর পরামর্শ নিতে আসেন মহামাত্য থেকে শুরু করে মহাসান্ধিবিগ্রহিক, দণ্ডপাশিক থেকে শুরু করে মহামাণ্ডলিক, কে নয়? আচরণে, জ্ঞানে, গরিমায়, প্রভাবে তিনি সর্ববিদ্যাবিশুদ্ধ রাজপণ্ডিত দয়িতবিষ্ণু। তাঁকেই প্রকাশ্য সভায় অসতীভর্তা বলে অপমান করলেন সম্রাট?

রাজসভা স্তব্ধ। প্রধান সেনাপতি প্রৌঢ় আনন্দদত্ত স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে আছেন এই উদ্ধত সম্রাটের দিকে। বৃদ্ধ মহামাত্য বুদ্ধদাসের দুই চোখ বন্ধ৷ দণ্ডনায়ক বিশালকীর্তি বয়সে নবীন, দয়িতবিষ্ণুর প্রিয় ছাত্রদের মধ্যে একজন সে৷ স্থির চোখে সেও দেখে যাচ্ছে এই উদ্ধত রাজার অসভ্যতা।

সপ্তাহ তিনেক হয়েছে, বঙ্গাধিপতি খড়্গরাজ রাজভটের দেহাবসান হয়েছে, তুষিতস্বর্গে স্থান পেয়েছেন তিনি৷ এই ইন্দ্রপতনে প্রায় একপক্ষকাল ধরে শোকপালন হয়েছে এই রাজ্যে৷ শ্রাদ্ধাদি সংস্কারের পর আজই রাজসভার প্রথম অধিবেশন।

সিংহাসনে বসেছেন নতুন সম্রাট, রাজভটপুত্র বলভট৷ প্রয়াত সম্রাটের আত্মার মঙ্গলকামনাসূচক অনুষ্ঠান শেষ হয়েছে। সামন্ত, অমাত্য ও রাজকর্মচারীরা সবে আসন গ্রহণ করেছেন, এমন সময় সম্রাট জানান যে তাঁর কিছু বলার আছে৷ তাতে কেউই আশ্চর্য হয়নি, কারণ এটাই প্রথা৷ এই সময় সম্রাট সদ্ধর্মের প্রতি অনুরাগ ও ত্রিরত্নের প্রতি আনুগত্যের কথা উচ্চারণ করেন। প্রবীণ রাজসভাসদ ও কর্মচারীদের সাহায্য প্রার্থনা করেন৷ ফলে সকলে উদগ্রীব হয়ে রইলেন সম্রাট কী বলেন তা শোনার জন্যে৷

সম্রাট প্রথমেই প্রথানুযায়ী ভগবান তথাগতে অবিচল আস্থার কথা জানালেন৷ পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা জানালেন৷ সভাসদদের আহ্বান জানালেন তাঁকে রাজ্যশাসনে সহায়তা করার জন্যে৷ আর তারপরেই হল সেই বিস্ফোরক ঘোষণা৷

‘আমার মনে হয় যে,’ গম্ভীরস্বরে বললেন তিনি, ‘বৈদেশিক শক্তিগুলির সঙ্গে আমাদের আরও যোগাযোগ বাড়ানো দরকার৷ যা পরিস্থিতি, তাতে অবশ্যই আমাদের এমন শক্তিশালী মিত্র প্রয়োজন, যিনি আমাদের ওপর শত্রুর আক্রমণ হলে সাহায্য করতে এগিয়ে আসতে পারেন।’ এই বলে তিনি উদগ্রীব মুখগুলির ওপর একবার চোখ বুলিয়ে নিলেন৷ তারপর বললেন, ‘আপনারা সকলেই জানেন যে তিব্বতের সঙ্গে আমাদের সুসম্পর্ক অনেক দিনের৷ আমার মনে হয় তিব্বতই আমাদের সেই মিত্রশক্তি হওয়ার পক্ষে সবচেয়ে উত্তম পক্ষ৷ তাই আমি স্থির করেছি যে তিব্বতের সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করব, এবং তার পরিবর্তে আমি তিব্বতীয় বণিকদের পূর্ব সমুদ্রপথে নিঃশুল্ক বাণিজ্যের অধিকার দেব।’

সভা মুহূর্ত হতবাক হয়ে পড়ল৷ নবীনসম্রাট এতবড় একটি সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন কোনও সামন্ত, অমাত্য, বিষয়পতি—কারও সঙ্গে আলোচনা না করেই? আর এর ফলে রাজস্বের যে বিপুল পরিমাণ ক্ষতি হবে তার পূরণ হবে কী করে? ভূম্যধিকারীদের ওপর আরও করভার চাপিয়ে? রাজসভা গুঞ্জনে ভরে উঠল।

তবে গুঞ্জন অবশ্য উঠেই থেমে গেল! কারণ রাজা পুনরায় বলতে শুরু করেছেন, ‘আমি এও স্থির করেছি যে, তিব্বতের সঙ্গে বৈদেশিক সম্পর্ক উন্নত করার জন্যে আমি আমার এক অতি বিশ্বাসভাজন সামন্তকে দ্বিতীয় রাজসচিব হিসেবে নিয়োগ করব।’

সভায় প্রবল বিস্ময় ও উত্তেজনার ঢেউ বয়ে গেল৷ মহামাত্য আছেন, মহাসান্ধিবিগ্রহিক আছেন, রাজপণ্ডিত আছেন। এঁদের অগ্রাহ্য করে, অন্যান্য সামন্তদের সঙ্গে আলোচনা না-করে রাজসচিব নিয়োগ পুরোপুরিভাবে প্রথাবিরুদ্ধ কাজ। রাজসচিব প্রায় রাজার কাছাকাছি মর্যাদা পেয়ে থাকেন। সেই পদে রাজবংশের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং বিশ্বাসভাজন কোনও রাজপুরুষকে নিয়োগ করাই প্রথা। নইলে রাজ্যের বিভিন্ন গোপন সংবাদ শত্রুদের হাতে চলে যাওয়া বিচিত্র কিছু নয়। আর এখন গৌড় বা বঙ্গভূমির যা অবস্থা, সেখানে এমন গুরুত্বপূর্ণ পদে কাউকে অধিষ্ঠিত করার আগে দু’বার ভাবতে হয় বইকি!

প্রয়াত সম্রাট রাজভটের রাজসচিব ছিলেন তাঁর শ্যালক৷ ইনি জীবনের অনেকটা সময় মহাচীনে কাটিয়েছেন। রাজপুরুষদের মধ্যে কানাঘুষো আছে যে, ইনি মহাচীনের তাং শাসকবংশের, তথা তিব্বতের রাজসভার শক্তিশালী সামন্তচক্রের বিশেষ আস্থাভাজন৷ রাজসভার অধিকাংশ অমাত্যই এই মানুষটিকে অবিশ্বাসের চোখে দেখেন৷ কথাটা সম্রাট রাজভটের কানে উঠতে দেরি হয়নি৷ রাজভট বিচক্ষণ রাজা ছিলেন, তাই শ্যালকমশাইটি রাজকার্যে অনেক অনৈতিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করলেও সম্রাট রাজভট তাঁকে বিশেষ গুরুত্ব দিতেন না৷

আজ উলটে গেছে পাশার দান, পালটে গেছে ক্ষমতার সমীকরণ৷ নবীন সম্রাটের ডানদিকে, সগৌরবে বসে আছেন বর্তমান সম্রাটের বিদেশীয় মাতুল, সম্রাট রাজভট যাঁর এদেশীয় নাম দিয়েছিলেন চারুদত্ত।

‘আমি স্থির করেছি,’ গম্ভীরস্বরে বলছিলেন সম্রাট, ‘মাতুল শ্রীচারুদত্তকে এই তিব্বত দেশ সম্পর্কিত কাজে সাহায্য করার জন্যে আমাদেরই এক সামন্তকে দ্বিতীয় রাজসচিব হিসেবে নিযুক্ত করা হবে।’

সভার সবার মনের কথা অনুমান করে সেনাপতি আনন্দদত্ত উঠে দাঁড়াতেই, সেদিকে তাকালেন সম্রাট, ‘সেনাপ্রধান কিছু বলবেন মনে হচ্ছে।’

‘সম্রাট, আমার মনে হয় এই সিদ্ধান্তদুটি গ্রহণ করার আগে আপনার একবার গুরুত্বপূর্ণ অমাত্যদের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত।’

‘কিন্তু কেন?’

‘কারণ সেটাই প্রথা, রাজন। আপনার পিতা, প্রয়াত সম্রাটও সভাসদদের পরামর্শ ছাড়া কোনও সিদ্ধান্ত...’

‘আপনি কী বলতে চাইছেন আনন্দদত্ত? রাজার নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোনও ক্ষমতা নেই? নিজের পছন্দের কাউকে কোনও রাজপদে নিয়োগ করার অধিকার নেই?’

কোনও সম্মানসূচক সম্বোধন ছাড়াই রাজার মুখে ‘আনন্দদত্ত’ শুনে একবার দাঁতে দাঁত ঘষলেন সেনাপতি। ছেলের বয়সি এই যুবরাজকে তিনি নিজে ছোটবেলা থেকে অস্ত্রশিক্ষা দিয়েছেন। নিজের হাতে ধনুর্বিদ্যা শিখিয়েছেন, শিখিয়েছেন তরবারি-চালনা, শিখিয়েছেন নারাচ ও ভল্লের ব্যবহার। এমনকি যুবরাজের প্রাথমিক রাজনীতির পাঠও তাঁরই হাতে। আজ সেই নবীন তরুণ প্রকাশ্য রাজসভায় তাঁকে নাম ধরে সম্বোধন করছে? রাজা হয়েই ধরাকে সরাজ্ঞান করে সে, এতদূর স্পর্ধা?

গোপনে তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। কে জানে, হয়তো তাঁরই শিক্ষাদানে কিছু ভুল রয়ে গিয়ে থাকবে। ধীরে ধীরে পিছু হঠে নিজের আসনে বসলেন আনন্দদত্ত।

উঠে দাঁড়ালেন বৃদ্ধ মহামাত্য বুদ্ধদাস। ইনি শুধু সম্রাট রাজভট নন, বর্তমান সম্রাটের পিতামহ দেবখড়্গের সময় থেকে এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন।

‘রাজন, এই বৃদ্ধ অমাত্যের অভিবাদন গ্রহণ করুন। আপনার বক্তব্য যথার্থ, রাজ্যের বিষয়ে রাজার ইচ্ছেই শেষ কথা। তবুও...’ এইপর্যন্ত বলে একটুখানির জন্য চুপ রইলেন সেই অমাত্য।

‘তবুও কী, মহামাত্য বুদ্ধদাস?’ অসহিষ্ণুস্বরে প্রশ্ন করলেন সম্রাট।

‘রাজন, আপনি বয়সে নবীন, আজই আপনার অভিষেক ঘটেছে। আশা করি পরম কারুণিক তথাগতের ইচ্ছায় আপনি নিশ্চয়ই একদিন রাজচক্রবর্তী হবেন, সসাগরা ধরিত্রীর অধিপতি হবেন। কিন্তু এই পৃথিবীতে সময় বড়ই বলবান। আমি অনুরোধ করব, উপযুক্ত সময় না-আসা অবধি সম্রাট তাঁর বৃদ্ধ অমাত্যদের বিপুল অভিজ্ঞতার সদ্ব্যবহার করবেন। প্রয়াত সম্রাটও কিন্তু আমাদের অভিজ্ঞতা তথা আনুগত্যের...’

‘আনুগত্য? হা হা হা, পথের কুকুরকে একের পর এক মাংসের টুকরো ছুঁড়ে দিতে থাকলে তারও আনুগত্য কিনে নেওয়া সম্ভব মহামাত্য। এতে আর আশ্চর্য কী? আনুগত্য দিয়ে কী প্রমাণ হয়?’ অসংলগ্ন স্বরে হেসে উঠলেন বলভট৷

এই ইতর অপমানে নীল হয়ে গেলেন মহামাত্য বুদ্ধদাস। স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন৷ সভায় ক্ষুব্ধ গুঞ্জন ঝড়ের মতো বেড়ে উঠল৷ প্রবীণ অমাত্যদের সঙ্গে এ কেমন ব্যবহার সম্রাটের? এঁরা তো ভুল কিছু বলেননি৷ সম্রাট কি উন্মাদ হয়ে গেছেন?

তবে আবারও তাড়াতাড়িই থেমে গেল সেই গুঞ্জন। কারণ উঠে দাঁড়িয়েছেন রাজপণ্ডিত দয়িতবিষ্ণু।

‘রাজাজ্ঞা শিরোধার্য বটে।’ গমগম করে উঠল সেই গম্ভীর কণ্ঠস্বর, ‘কিন্তু মহারাজ, বলতে বাধ্য হচ্ছি যে আপনার ব্যবহার অত্যন্ত আপত্তিকর। আমরা আপনার অন্নদাস বটে, ক্রীতদাস নই। আপনি আমাদের অনুরোধ বা পরামর্শ উপেক্ষা করতে পারেন, কিন্তু এইভাবে অপমান করতে পারেন না।’ বলতে বলতে দয়িতবিষ্ণু লক্ষ করছিলেন যে সম্রাটের চোখ অস্বাভাবিক রকমের লাল, সামান্য টলছেন।’

‘তাই নাকি রাজপণ্ডিত?’ গরগর করে উঠলেন বলভট৷

‘আমি সম্রাটকে অনুরোধ করব, গুরুত্বপূর্ণ অমাত্যদের প্রকাশ্যে অপমান করার আগে তিনি যেন একবার রাষ্ট্রনীতি এবং কূটনীতির মূলমন্ত্রগুলি স্মরণ করেন। মহামতি চাণক্য বলেছেন যে মুখ্য রাজপুরুষদের অসন্তুষ্ট করে কোনও শাসকই...’

‘আপনি কি আমাকে ভয় দেখাচ্ছেন?’ রাগে থমথম করছে সম্রাটের মুখ৷ দয়িতবিষ্ণুর সন্দেহ হয় যে ইনি প্রকৃতিস্থ নন৷

‘না রাজন। শুধুমাত্র রাজ্যশাসনের নীতিগুলি আপনাকে মনে করিয়ে দিচ্ছি। সম্রাট কী জানেন পূর্বসমুদ্রপথে তিব্বতীয় বা অন্য বিদেশীয় বণিকদের নিঃশুল্ক বাণিজ্যের অধিকার দেওয়ার অর্থ কী?’

‘তুমিই বলো হে দয়িতবিষ্ণু, আমরা শুনি৷’ খানিকটা উপহাসই ছুঁড়ে দিলেন চারুদত্ত৷

চারুদত্তকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করলেন দয়িতবিষ্ণু৷ সম্রাটের দিকে তাকিয়ে বলতে লাগলেন, ‘এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার পূর্বে একবার শৌল্কিক তথা বিষয়পতিদের সঙ্গে আলাপ করার প্রয়োজন বোধ করেছিলেন আপনি? এর ফলে দেশের রাজস্বসংগ্রহ কী বিপুল পরিমাণে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, সে বিষয়ে কোনও ধারণা কি শ্রদ্ধেয় রাজসচিব চারুদত্ত আপনাকে দিয়েছেন?’

‘দেখো পণ্ডিত, নিজেকে বেশি চালাক মনে করো না।’ চারুদত্ত, তপ্তস্বরে বলে উঠলেন, ‘তুমি যদি মনে করো যে বিদেশনীতি আর বাণিজ্যের তুমিই সব বোঝ...’

হাত তুলে চারুদত্তকে নিরস্ত করলেন দয়িতবিষ্ণু, ‘সম্রাট কী লক্ষ করেছেন যে, গত বেশ কয়েক দশক ধরে রাজকোষে বাণিজ্যিক করের পরিমাণ কী ভাবে কমে এসেছে? নব্যাবকাশিকানগর, কোটিবর্ষ, একের পর এক জলবন্দর বন্ধ হয়ে গেছে নাব্যতার অভাবে৷ তাম্রলিপ্তর মতো বিখ্যাত বন্দর ধুঁকছে৷ তার ওপর সুদূর প্রতীচ্যে যেখানে আমাদের বণিকরা বাণিজ্য করতে যেত, সেই সুবিশাল রোমক সাম্রাজ্যের আজ চিহ্নমাত্র নেই৷ কী হতে চলেছে ভবিষ্যত?’ একটানে এতটা বলে হাঁপাচ্ছিলেন দয়িতবিষ্ণু৷

‘তাতে কী হয়েছে? আমাদের রাজস্বের পরিমাণ তো কমেনি,’ বললেন সম্রাট বলভট৷

মৃদু হাসলেন দয়িতবিষ্ণু, ‘কেন কমেনি সে কথাটাও কি ভেবে দেখেছেন রাজন? আমাদের সদ্যপ্রয়াত সম্রাটও তো তিব্বতের প্রতি বিশেষ মৈত্রীভাবাপন্ন ছিলেন, তবুও তিনি কেন তিব্বতীয় বণিকদের এই বিশেষ সুবিধা দান করেননি? কী তার কারণ?’

‘বাজে কথা কম বলো হে পণ্ডিত! তুমি কী মনে করো, সম্রাটের থেকে তুমি বেশি বোঝ?’ ভেতরে ভেতরে ঘাবড়ে যাচ্ছিলেন চারুদত্ত৷

চারুদত্তকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করলেন দয়িতবিষ্ণু৷ তিনি বুঝতে পারছিলেন, কাল রাত্রেই যে গভীর ষড়যন্ত্রের কথা বলছিলেন নিজের স্ত্রীকে, তা শিকড় ছড়াতে শুরু করেছে৷ এসব তারই লক্ষণ৷ তবে সে এত দ্রুত শুরু করবে, ভাবেননি তিনি৷

এই যুদ্ধ আজ জিততে হবে তাঁকে, যে কোনও মূল্যে৷ নইলে দেশের সামনে সমূহ বিপদ৷ চোয়াল শক্ত করলেন দয়িতবিষ্ণু৷

রাজন, আপনার প্রশ্নেরই উত্তর দিই আগে৷ বাণিজ্যিক করের পরিমাণ প্রভূত পরিমাণে কমে এলেও রাজস্বের পরিমাণ না কমার কারণ কি জানেন? কারণ এই ঘাটতি পূরণ করা হচ্ছে ভূমিজ রাজস্ব থেকে৷ ক্রমেই আমরা ভূমির ওপর করের বোঝা বাড়িয়ে চলেছি৷ আর তার ফলে নাভিশ্বাস উঠছে দেশের কৃষক ও ভূমিদাসদের৷ ফলে দিকে দিকে বেড়ে উঠছে প্রবল অসন্তোষ...’

‘তার সঙ্গে তিব্বতীয় বণিকদের পূর্ব সমুদ্রে নিঃশুল্ক বাণিজ্যের অধিকার দিতে তোমার আপত্তির কারণ কি জানতে পারি, অ্যাঁ?’ তড়বড় করে উঠলেন চারুদত্ত, ‘সম্রাট চাইছেন তিব্বতের সঙ্গে মিত্রতা বাড়াতে, ব্যস৷ রাজার ইচ্ছেই শেষ কথা! এখানে ওইসব ছোটলোক কৃষকদের কথা টেনে আনছ কেন?’

‘সে তো বটেই, সে তো বটেই।’ মুখে কৃত্রিম আক্ষেপের চুকচুক আওয়াজ করলেন দয়িতবিষ্ণু৷ ‘তিব্বতের লোক আপনি, বঙ্গভূমির কৃষকদের জন্যে আপনার কীসের চিন্তা চারুদত্ত? হাজার হোক, এ তো আর আপনার নিজের দেশ তিব্বত নয়!’

‘না না, কথাটা আমি ওভাবে বলতে চাইনি, হেঁ-হেঁ৷’ প্রগলভ হাসি দিয়ে পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা করছিলেন রাজসচিব৷

‘তা আমাকে একটা কথা বলুন তো চারুদত্ত! তিব্বতের সঙ্গে মিত্রতা বাড়াবার জন্যে তো আপনিই যথেষ্ঠ ছিলেন৷ একে আপনি ওই দেশের লোক, তার ওপর প্রয়াত সম্রাটের শ্যালক, বর্তমান সম্রাটের মাতুল৷ আপনি থাকতে হঠাৎ অন্য লোক কেন? তিব্বতের মহামন্ত্রী তিরিলিং কি আপনার ওপর আর আস্থা রাখতে পারছেন না?’

ছিলে ছেঁড়া ধনুকের মতো ছিটকে উঠলেন চারুদত্ত৷ তাঁকে দেখলে মনে হচ্ছিল রাজসভা না-হলে বোধহয় এখানেই দাঁত নখ বার করে দয়িতবিষ্ণুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তেন তিনি৷ তাঁর হাত ধরে ফেললেন সম্রাট বলভট৷

‘তা এখন কি আমরা আপনার প্রস্তাবিত রাজসচিবের পরিচয় জানতে পারি রাজন?’ সামান্য লঘুস্বরেই প্রশ্ন করলেন দয়িতবিষ্ণু৷

‘হ্যাঁ, অতি অবশ্যই পারেন। আমি চন্দ্রবংশের প্রকাশচন্দ্রকে এই পদে নিয়োগ করতে চাই।’ যন্ত্রের মতো বললেন বলভট৷

নামটি শোনামাত্র রাজসভায় আবার বিপুল গুঞ্জন উঠল। এবার তা দ্বিগুণ উচ্চকিত৷

চন্দ্রবংশ হরিকেলের এক অত্যন্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও প্রতাপশালী সামন্তবংশ৷ এমন দুর্দ্ধর্ষ সামন্তবংশকে বশে রাখতে সম্রাট রাজভটকেও যথেষ্ট বেগ পেতে হতো৷ তাদেরই একজনকে, সভার বিনা অনুমোদনে এমন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ করছেন নবীন সম্রাট? এতে খড়্গবংশের সার্বভৌমত্বের ওপর কী কঠিন আঘাত আসতে পারে, সে বিষয়ে এই অনভিজ্ঞ সম্রাটের কোনও ধারণা আছে? তার ওপর প্রকাশচন্দ্র? যাঁর অতিপ্রাকৃত ক্ষমতার ব্যাপারে সত্যিমিথ্যে অনেক রটনা ভেসে বেড়ায় এই দেশের বাতাসে?

‘প্রকাশচন্দ্র!’ রাজপণ্ডিত দয়িতবিষ্ণুর স্বরে ফুটে ওঠে বিহ্বলতা৷ তিনি জানতেন যে অপরপক্ষ অতি যত্নে সাজাচ্ছে তাদের ঘুঁটি৷ অনুমান করেছিলেন যে এই পাশাখেলায় একটা অভাবনীয় দান আসতে চলেছে তাঁদের সামনে৷ কিন্তু শত্রুপক্ষ যে হঠাৎ করে এই চাল চালবে সেটা স্বপ্নেও ভাবেননি৷

‘আমাদের রাজপণ্ডিতের মনে হচ্ছে সামন্ত প্রকাশচন্দ্রকে নিয়ে কোনও আপত্তি আছে?’ সম্রাটের সুরে ব্যঙ্গের ছাপ স্পষ্ট৷

‘হ্যাঁ সম্রাট, আছে৷’ বিহ্বল ভাব ঝেড়ে স্বাভাবিক হলেন দয়িতবিষ্ণু৷

‘আছে? বাঃ-বাঃ৷ রাজপণ্ডিত তাহলে কূটনীতিও বুঝছেন আজকাল?’

আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছিলেন দয়িতবিষ্ণু৷ কতই বা বয়েস এই যুবকের? এই তো সেদিনও তাঁর কাছে বসে বিদ্যালাভ করেছে এই কুমার৷ তখনও কিন্তু তার ব্যবহারে এই উগ্রতা, এই অশালীন আচরণ এত প্রকট হয়ে ওঠেনি৷ তখন তো এই কিশোরকে নিয়ে অনেক আশাও পোষণ করতেন তিনি৷ ভাবতেন যে এই যুবক একদিন বিদ্যায়, বুদ্ধিতে, শৌর্যে বিশালকীর্তি হবে৷ এমনকী এই গোপন আকাঙ্ক্ষাও তাঁর মনের মধ্যে ছিল যে, তাঁকে রাজপথে যেতে দেখে রাজ্যের বাসিন্দারা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করবে—ওই দেখো, ওই যে প্রৌঢ়কে দেখছ পায়ে হেঁটে সর্বাণীদেবীর মন্দিরে পুজো দিতে যেতে, তিনিই মহান সম্রাট বলভটের শিক্ষাগুরু আচার্য দয়িতবিষ্ণু!

কিন্তু সেই শিশুটি যতই বড় হতে থাকল, ততই যেন তাঁর আয়ত্তের বাইরে চলে যেতে থাকল সে৷ ধীরে ধীরে দেখতে পেলেন দয়িতবিষ্ণু, কোনও এক অজ্ঞাত কারণে বদলে যাচ্ছে সেই বুদ্ধিমান, বিনয়ী কিশোরটি৷ সারাদিন সে ব্যস্ত থাকে অবিরাম মদ্যপানে। রাতদিন আমোদ-প্রমোদ ছাড়া মন ওঠে না তার৷ রাজনর্তকী আর নগরনটী ছাড়া দিনই কাটে না! তার সাম্প্রতিক অসুস্থতার কথাও জানেন তিনি৷ হাতে-গোনা যে কয়েকজনের কাছে সম্রাট রাজভট মনের দুঃখের কথা খুলে বলতেন, তিনি তাঁদের মধ্যে একজন৷ সেই সময়ে এই চারুদত্তকে দেখেছেন রাজকুমারকে সবসময় আগলে আগলে রাখতে৷

‘সম্রাটের বেতনভুক কর্মচারী আমি, তাই তাঁর প্রশ্নের উত্তর দিতে আমি বাধ্য৷ সবিনয়ে জানাই যে বর্তমান সম্রাটের ভূতপূর্ব এই শিক্ষক রাষ্ট্রনীতি তথা কূটনীতিতেও সামান্য কিছু জ্ঞানের অধিকারী৷ শুধু প্রয়াত সম্রাট কেন, রাজ্যের মহামাত্য, মহামাণ্ডলিক, দণ্ডনায়ক, এমনকী বিশিষ্ট ভুক্তিপতিরাও এই ব্রাহ্মণের মতামতে বিশেষ আস্থা রেখে থাকেন৷ তাই কূটনীতি বুঝি না বলাটা চরম ধৃষ্টতা হয়ে যাবে যে সম্রাট৷’

‘বটে? তা আপনার আপত্তির কারণগুলি জানাতে আপত্তি আছে নাকি?’

অসম্মানটা গায়ে মাখলেন না দয়িতবিষ্ণু৷ মুখে স্মিত হাসিটি টেনে বললেন, ‘আপত্তির প্রশ্নই ওঠে না সম্রাট! আপনাকে সঠিক পরামর্শ দেওয়াই তো আমাদের পবিত্র কর্তব্য...’

‘আঃ, বড় বাজে বকছ হে ব্রাহ্মণ! কাজের কথাটা ঝটপট বলে ফেলো তো দেখি!’ রাজসচিব চারুদত্ত বললেন৷

অতি কষ্টে নিজের রাগ সামলালেন দয়িতবিষ্ণু৷ এককালে এই দ্বিপদ প্রাণীটিকে তিনি ও অন্যান্য অমাত্যরা উপেক্ষাই করতেন৷ আজ ক্ষমতার পটপরিবর্তন হয়েছে, আজ এর দাপট সইতেই হবে!

‘তার কারণ সামন্ত প্রকাশচন্দ্রের এই দেশ তথা খড়্গবংশের প্রতি আনুগত্য নিয়ে আমার মনে সন্দেহ আছে রাজন৷ ভাবার যথেষ্ট কারণ আছে যে, ইনি এই রাজ্যে চন্দ্রবংশের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চান৷ কথাগুলো গোপন সভাতেই আলোচনা করা উচিত ছিল, কিন্তু মহারাজ আমাকে বাধ্য করলেন প্রকাশ্য সভায় এই বক্তব্য রাখতে৷’

ভ্রূকুঞ্চন করলেন সম্রাট বলভট, ‘আপনার এই অযথা অভিযোগের স্বপক্ষে কোনও প্রমাণ আছে?’

‘আছে সম্রাট৷ আপনি কি জানেন প্রকাশচন্দ্র প্রথম জীবনে কোথায় ছিলেন? কী করছিলেন?’

‘সে কাহিনি বোধহয় অনেকেই জানি পণ্ডিত। তোমাকে আবার ব্যাখ্যা করে বলতে হবে নাকি?’

ব্যঙ্গের হাসি খেলে গেল দয়িতবিষ্ণুর মুখে, ‘বেশ বেশ৷ রাজসচিব যখন বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা চাইছেন না তাহলে বর্তমানকালেই ফিরে আসা যাক। মহামান্য সম্রাট কি জানেন বিগত কয়েক বছর প্রকাশচন্দ্র কোথায় ছিলেন? আরও স্পষ্ট করে বলতে গেলে হরিকেলে ফিরে আসার ঠিক পূর্বে কোথায় ছিলেন তিনি?’

‘কোনও এক মহাবিহারে ছিলেন বলে জানি, অধ্যাপনা অথবা...’—মনে করার চেষ্টা করতে থাকেন সম্রাট বলভট৷

‘কোন মহাবিহার? নালন্দা নয়, রক্তমৃত্তিকা নয়, এমনকী ভাসু বিহারও নয়৷ কোন মহাবিহারে অধ্যাপনা করছিলেন প্রকাশচন্দ্র?’

সম্রাট চুপ করে থাকেন৷ চারুদত্তের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে থাকে৷

দয়িতবিষ্ণুর কণ্ঠ আরও খর হয়ে ওঠে, ‘দীর্ঘদিন অদর্শনের পর প্রকাশচন্দ্র যে বিজাতীয় নারীটিকে নিয়ে ফিরেছেন তিনি কোন দেশের বা কোন জাতির, অথবা তাঁর বংশপরিচয় কী, এসব জানেন রাজন?’

‘অন্যের পরিবার নিয়ে প্রকাশ্য আলোচনা আমি রুচিবিকারের লক্ষণ বলে মনে করি৷’ গম্ভীরস্বরে বললেন সম্রাট।

‘প্রকাশচন্দ্র সাধারণ কেউ হলে এই প্রশ্ন উঠত না রাজন। কিন্তু যিনি মহারাজসচিবের মতো একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদে নিযুক্ত হতে চলেছেন, তাঁর কাজকর্ম, কথাবার্তা, চালচলন, ইতিহাস, সবকিছুই পূঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিচার করে দেখা উচিত৷ নইলে দেশের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায় সম্রাট,’ বলতে থাকলেন দয়িতবিষ্ণু, ‘কে এই বিদেশীয় নারী? কী তার ইতিহাস? প্রকাশচন্দ্রের সঙ্গে তাঁর উদ্বাহসংস্কারহীন কীসের সম্পর্ক?’

‘শুনেছি ইনি প্রকাশচন্দ্রের সাধনসঙ্গিনী!’ চারুদত্তর স্বরে স্পষ্টতই অস্বস্তি।

‘সাধনসঙ্গিনী!’ ব্যঙ্গের হাসি চওড়া হল দয়িতবিষ্ণুর মুখে, ‘কীসের সাধন রাজসচিব?’

ঘামতে থাকেন চারুদত্ত। হা ঈশ্বর, লভ্যাংশের এক দশমাংশ... এত কাছে এসেও অধরা থেকে যাবে?

‘রাজসচিবের নীরবতাই আমাদের অনেক প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দিয়েছে!’ বলতে থাকেন দয়িতবিষ্ণু, ‘আপাতত আমার মূল বক্তব্যে ফিরি। শুনুন রাজন, আমার কাছে নিশ্চিত প্রমাণ আছে যে ইনি সেই সময়ে তিব্বতে অবস্থান করছিলেন৷’

‘তাতে কী প্রমাণ হয় পণ্ডিত? তিব্বতে যাওয়া বা থাকা পাপ? নাকি বঙ্গবাসীদের পক্ষে তিব্বতযাত্রা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে?’

‘না রাজন৷ তিব্বতের সঙ্গে আমাদের এতদিনের সুসম্পর্ক, আমাদের মিত্ররাজ্য তিব্বত, সেখানে যাওয়া নিষিদ্ধ হবে কেন? তা এমন মিত্ররাজ্যে এঁকে এত গোপনে কেন যেতে হয়েছিল, সেই নিয়ে কিছু বলবেন নাকি মিত্র চারুদত্ত? তার ওপর সেক্ষেত্রে মহাবিহারে অধ্যয়ন করার মিথ্যা কাহিনিটিই বা প্রচার করতে হল কেন? প্রশ্ন আরও আছে সম্রাট৷ আপনি কি জানেন যে ইনি তিব্বতে কোথায় অবস্থান করছিলেন?’

‘তার সঙ্গে প্রকাশচন্দ্রের রাজসচিব হিসেবে নিয়োগের কী সম্পর্ক?’

‘অবশ্যই সম্পর্ক আছে রাজন! আমাদের কাছে নিশ্চিত সংবাদ আছে যে, ইনি গোপনে তিব্বতের মহামন্ত্রী তিরিলিং-এর বাড়িতে আতিথ্যগ্রহণ করেছিলেন৷’

‘তাতে আপত্তির কী আছে? বঙ্গদেশের অন্যতম প্রভাবশালী সামন্তকে তিব্বতের মহামন্ত্রী আতিথ্য দিয়েছেন, এ তো ভালো কথা৷’ সতর্কস্বরে কথা ঘোরাবার চেষ্টা করেন চারুদত্ত৷

‘বটেই তো।’ শত্রুকে বাগে পেয়েছেন দয়িতবিষ্ণু, ‘তা অমন প্রভাবশালী সামন্তবংশের উত্তরাধিকারী তিব্বতে গেছেন, সে দেশের প্রধানমন্ত্রীর বাড়িতে অবস্থান করেছেন, অথচ সে ব্যাপারে তিব্বতনৃপতি ঠিদু স্রোংচান কিছু জানেন না কেন—সে বিষয়ে কিছু আলোকপাত করবেন নাকি চারুদত্ত?’

‘আপনার কথা ক্রমশই অবোধ্য হয়ে উঠছে, পণ্ডিত৷ প্রকাশচন্দ্র কোথায় যাবেন আর যাবেন না, কোথায় থাকবেন আর থাকবেন না—সে ব্যাপারে আপনার এত কৌতূহল কেন?’ বিরক্তস্বরে প্রশ্ন করেন সম্রাট বলভট৷

‘তিব্বতের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কী চলছে, সে কথা আপনার জানা থাকলে আজ এই প্রশ্ন তুলতেন না সম্রাট৷’ উত্তেজিত হয়ে বলতে থাকেন দয়িতবিষ্ণু, ‘তিব্বতের মহামন্ত্রী তিরিলিং আসলে গার পরিবারের মহাসামন্ত৷ এই গার পরিবার তিব্বতের রাজনীতিতে অতি ক্ষমতাশালী পরিবার, একসময়ে তাদের হাতেই ছিল তিব্বতের প্রকৃত শাসনক্ষমতা৷’

‘তাহলে তো সামন্ত প্রকাশচন্দ্রের সঙ্গে মন্ত্রী তিরিলিং-এর সুসম্পর্ক আমাদের জন্যে আরও সুখবর, পণ্ডিত!’ বিস্মিত স্বরে প্রশ্ন করেন সম্রাট বলভট৷

‘আজ্ঞে না সম্রাট! ওই জন্যেই বলেছিলাম—তিব্বতের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি জানলে আপনি এই মন্তব্য করতেন না। বুঝতে পারতেন, প্রকাশচন্দ্রকে রাজসচিব পদে নিয়োগ করার তাৎপর্য কী৷ এখন যিনি তিব্বতনরেশ, সেই ঠিদু স্রোংচান মহা শক্তিশালী পুরুষ, মহাচীন অবধি কাঁপছে তাঁর ভয়ে৷ তিনি চান তিব্বতের যাবতীয় কর্তৃত্ব নিজের হাতে নিতে৷ তাঁর সঙ্গে তিব্বতের সামন্তশ্রেণী এবং তাদের অধিনায়ক মন্ত্রী তিরিলিং-এর প্রত্যক্ষ সংঘর্ষ এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা৷’

‘তাতে আমাদের অসুবিধা বা আপত্তির কারণ কী পণ্ডিত?’ স্খলিতস্বরে প্রশ্ন করতে করতে চারুদত্তের বাড়িয়ে দেওয়া চামড়ার বটুয়ার মধ্যে হাত ঢুকিয়ে দুই আঙুলে সাদা রঙের গুঁড়ো চিমটি-ভর তুলে নিজের মুখের মধ্যে ফেললেন সম্রাট বলভট৷

সেই বটুয়াটির দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন দয়িতবিষ্ণু। এরই কথা রাজবৈদ্য চন্দ্রসার তাঁকে বলছিলেন বটে! তিনি একবার চারুদত্তকে দেখে ফেলেছিলেন অতি গোপনে এই বটুয়া রাজকুমারের হাতে তুলে দিতে৷ তারপরেই নাকি রাজকুমার হঠাৎ অত্যন্ত উগ্র হয়ে ওঠেন৷ পরে চারুদত্তকে এই নিয়ে প্রশ্ন করাতে মহাক্রুদ্ধ হন চারুদত্ত৷

কী আছে ওই বটুয়াতে? কীসের ভস্ম ওটা?

‘তাতে আমাদের আপত্তির কারণ একটাই সম্রাট৷ সম্রাট ঠিদু স্রোংচান সদ্ধর্মের অনুগামী, আর মন্ত্রী তিরিলিং তিব্বতীয় পোন ধর্মের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক৷ একে তিনি তীব্র বৌদ্ধবিদ্বেষী মানুষ, তার ওপর একই কারণে তিনি ভারতবিরোধীও বটে৷ এমন শত্রুপক্ষের বাড়িতে আমাদের নবনিযুক্ত রাজসচিব টানা এক বছরের জন্যে গোপনে আতিথ্য নিলে তা আমাদের পক্ষে চিন্তার কার বইকি!’

‘সর্ববিদ্যাবিশুদ্ধ রাজপণ্ডিত দয়িতবিষ্ণু আমার ব্যাপারে এত সংবাদ রাখেন জেনে অত্যন্ত প্রীত বোধ করছি, এ আমার পরম সৌভাগ্য!’

প্রত্যেকের দৃষ্টি চলে যায় রাজসভার প্রবেশপথের দিকে৷ সেখানে এসে দাঁড়িয়েছেন এক দীর্ঘদেহী পুরুষ৷

প্রকাশচন্দ্র!

সভায় মুহূর্তের মধ্যে অত্যন্ত টানটান পরিস্থিতি তৈরি হল৷ সভার প্রত্যেকে তাকিয়ে রইলেন এই বিশালদেহী ও বলশালী পুরুষটির দিকে৷ তাঁর উঁচু কপাল আর চওড়া কাঁধে ব্যক্তিত্বের ছাপ স্পষ্ট৷ তবে মানুষটির আসল বৈশিষ্ট্য তাঁর চোখ দুটিতে৷ সেই চোখ দুটির দিকে তাকালেই মনে হয়—এত স্থির, এত ক্রূর, এত হিমায়িত দৃষ্টি পার্থিব জগতে খুব কম দেখা যায়৷

দ্রুত ও দীর্ঘ পদক্ষেপে সভার দরজা থেকে সিংহাসন অবধি পথটি অতিক্রম করলেন প্রকাশচন্দ্র৷ নত হয়ে অভিবাদন করলেন সম্রাট বলভটকে৷ সম্রাট বলভট তাঁকে নিজের পাশের আসনে বসতে ইঙ্গিত করলে আসন গ্রহণ করলেন প্রকাশচন্দ্র৷ তারপর স্মিতহাস্যে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘বলুন দয়িতবিষ্ণু, আমার বিরুদ্ধে কী কী অভিযোগ উত্থাপিত করছিলেন যেন?’

এতক্ষণ অবধি এই দ্বৈরথসমরে জিতে যাওয়ার আশা করছিলেন দয়িতবিষ্ণু৷ কিন্তু নাহ, আর বোধহয় শেষরক্ষা হল না৷ এই প্রথম তিনি উপলব্ধি করলেন যে ভাগ্যের চাকা তাঁর বিপক্ষে গড়াতে শুরু করেছে৷ বিজয়লক্ষ্মী ছেড়ে যাচ্ছেন তাঁর পক্ষ৷

দুচোখ বন্ধ করে মনে মনে স্বস্তিবচন উচ্চারণ করলেন তিনি, ‘মঙ্গলম্ ভগবান বিষ্ণু, মঙ্গলম্ গড়ুরধ্বজ, মঙ্গলম্ পুণ্ডরীকাক্ষ, মঙ্গলায় তনো হরিঃ৷’

সমস্ত স্নায়ু সংহত করে এবার প্রত্যক্ষ সংঘর্ষের জন্যে প্রস্তুত হলেন তিনি৷

‘প্রকাশচন্দ্র, আপনি কি জানাবেন যে, তিব্বতে মন্ত্রী তিরিলিং-এর আতিথ্য উপভোগ করার সময় পোন ধর্মের ঠিক কোন কোন প্রেতসাধনা আর জাদুবিদ্যা শিখেছেন?’ প্রথম আঘাত তিনিই শুরু করলেন। শাস্ত্রে বলে—আক্রমণই প্রতিরক্ষার শ্রেষ্ঠতম উপায়৷

মৃদু হাসলেন প্রকাশচন্দ্র, ‘যদি করেই থাকি, তাতে আপনার উষ্মার কারণ কী দয়িতবিষ্ণু?’

‘উষ্মার কারণ আছে প্রকাশচন্দ্র৷ কারণ আমাদের কাছে সংবাদ আছে যে পোন ধর্মের সমস্ত বিকৃত, ঘৃণ্য, অশ্লীল প্রথাগুলিকে আপনি সদ্ধর্মের মূল আচারগুলির সঙ্গে সুকৌশলে মিশ্রিত করে তন্ত্রের নামে এক কুৎসিত সাধনপদ্ধতির সৃষ্টি করছেন৷ আপনি আসার পর থেকে হরিকেলের বিপুল অঞ্চলে আজ অবাধে মদ্যপান, যৌথ যৌনসঙ্গম, নরবলির মতো অসভ্য ও নৃশংস আচার ধর্মের নামে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে৷ পোন পুরোহিতদের পূজ্য বন্য, অসভ্য এবং বীভৎস মূর্তিগুলি এনে আপনি...’

‘চুপ করো পণ্ডিত, তোমার এতদূর সাহস যে আমাদের পোন ধর্মের দেবদেবীদের গালি দাও? তোমার ওই নোংরা জিভ একটানে ছিঁড়ে ফেলব আমি।’ ক্রোধে কাঁপছিলেন চারুদত্ত৷

ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি খেলে যায় দয়িতবিষ্ণুর, ‘যাক, রাজসচিব চারুদত্ত শেষ পর্যন্ত তাহলে স্বীকার করলেন যে উনি বৌদ্ধ নন, উনি আসলে পোন ধর্মের অনুসারী! বাঃ বাঃ! এতদিন ধরে অনেক কষ্টে বৌদ্ধ হওয়ার অভিনয় করেছেন আপনি হে রাজসচিব৷ আপনার এই অবিশ্বাস্য অভিনয় প্রতিভা আমার সশ্রদ্ধ সম্মান দাবি করে!’ এই বলে আভূমি প্রণত হওয়ার ভান করলেন দয়িতবিষ্ণু৷

সমগ্র রাজসভা পটে আঁকা ছবিটির মতো স্থির হয়ে আছে৷ এতবছর ধরে এতবড় মিথ্যাচার করে এসেছেন রাজসচিব? তিনি বৌদ্ধ নন? এই অপরাধে তো শিরচ্ছেদ হওয়া উচিত৷

কিন্তু সে দায়িত্ব নেবে কে? সম্রাট বলভটের চোখ আরও ঘোলাটে হয়ে আসছে, চারুদত্তের মুখে আতঙ্কের আর অপ্রস্তুত হওয়ার ছাপ স্পষ্ট৷ এই সময় হাল ধরলেন প্রকাশচন্দ্র৷

‘আপনি সনাতন ধর্মাবলম্বী, পণ্ডিত৷ আপনাদের সনাতন ধর্মে যেমন সৌর, গাণপত্য, শৈব ইত্যকার বিভেদ আছে, তেমন আমাদের সদ্ধর্মেও বিভিন্ন ধর্মমত আছে পণ্ডিত৷ মহাচার্য অসঙ্গ ও বসুবন্ধুর যোগাচারবিজ্ঞান অনুযায়ী...’

‘পাপ মুখে ও-দুটি নাম উচ্চারণ করবেন না প্রকাশচন্দ্র’, ক্রুদ্ধ সিংহের মতো রুষে উঠলেন দয়িতবিষ্ণু, ‘আপনি ও আপনার সাঙ্গোপাঙ্গদের প্রচারিত পাপাচারগুলোকে আপনারা যোগাচারবিজ্ঞান বলতে চান? বৌদ্ধ দর্শনের এই বিকৃতি ঘটাবেন বলেই তিব্বত থেকে প্রেতসাধনা শিখে এসেছেন আপনি? দশকুশলের পরিবর্তে অপরিমিত মদ্যপান? প্রজ্ঞা ও উপায়ের নামে অন্যের কুলবধূ নিয়ে উদ্দাম যৌনচক্র? নির্বাণের পরিবর্তে নরবলি?’

‘আহ, পণ্ডিত, চুপ করো!’ চারুদত্তের এগিয়ে দেওয়া বটুয়া থেকে আরও এক চিমটি সাদা গুঁড়ো মুখে ফেলে গর্জে ওঠেন সম্রাট৷ আপনি-টাপনি নয়, এবার সরাসরি তুমিতে নেমে এসেছেন৷

সমস্ত রাজসভায় যেন একটি পালক পড়লেও শব্দ শোনা যাবে এমন স্তব্ধতা৷ এ কী অভিযোগ তুললেন দয়িতবিষ্ণু?

‘ধর্মের কথা থাক পণ্ডিত, সে বিচার রাজা করবেন৷ আর আপনি তো ধর্মে বৈষ্ণব, সনাতনপন্থী৷ সদ্ধর্মের গতি নিয়ে আপনি এত চিন্তিত কেন?’ চারুদত্ত প্রশ্ন করলেন৷ একটু, আর একটুখানি৷ জয়ের গন্ধ পেতে শুরু করেছেন৷

‘কারণ ধর্মই শাসনক্ষমতা অধিকারের অন্যতম অস্ত্র৷ আমি মনে করি এই দেশে তন্ত্রের নামে পোন ধর্মের যাবতীয় পাপাচার আর বীভৎস দেবদেবীর মূর্তিপূজা প্রচলন করে প্রকাশচন্দ্র আসলে চান সদ্ধর্মের সর্বনাশ করতে, চান এই দেশের রাজসিংহাসন দখল করতে৷ তাঁকে সম্পূর্ণভাবে মদত দিচ্ছেন তিব্বতের সামন্তপ্রভুরা আর চৈনিক বৌদ্ধরা৷ তাঁরা চান বঙ্গদেশ দুর্বল হোক, তিব্বতে ভারতীয় বৌদ্ধধর্মের প্রভাব খর্ব হোক৷’

‘তাই নাকি পণ্ডিত? এটাই কারণ? নাকি এই দেশের রাজসিংহাসন আপনিই দখল করতে চান বলে এসব গালগল্প শোনাচ্ছেন আমাদের?’ শান্ত ও শীতলস্বরে প্রশ্ন করেন প্রকাশচন্দ্র৷

হঠাৎ যেন একটা ধাক্কা খেয়ে থেমে যান দয়িতবিষ্ণু। আকস্মিক এই অভিযোগের কারণ? এই আক্রমণের উৎস অনুমান করতে পারছিলেন। কিন্তু...কিন্তু সেসব তো এদের জানার কথা নয়!

‘এর মানে কী প্রকাশচন্দ্র?’

‘বটে? এর কারণ কী—সেটা বুঝতে পারছ না তুমি?’ দাঁতে দাঁত ঘষলেন সম্রাট বলভট, ‘ও হে অসতীভর্তা, তোমার নিজের পত্নী অন্যের অঙ্কশায়িনী হওয়ার সময়ে তুমি সেটা বুঝতে পারো তো?’

উজ্জ্বল রাজসভায় যেন হঠাৎই বিস্ফোরিত হল একরাশ গাঢ় অন্ধকার৷ এক ফেনিল অন্ধ আবর্তে, গহীন নিঃসীমতার মধ্যে, অনন্ত হাহাকারের মধ্যে তলিয়ে যেতে লাগল সব৷ তার আদি নেই, অন্ত নেই, ঊর্ধ্ব নেই, অধঃ নেই৷

‘কী হে পণ্ডিত, চুপ করে আছ কেন? নাকি তোমার স্ত্রী তোমার অনুমতি নিয়েই আমার পিতার শয্যার শোভা বাড়াতে গেছিলেন?’

‘রাজন, স্তব্ধ হন! এই কুবাক্য আপনার মুখে শোভা পায় না। মনে রাখবেন আপনি খড়্গবংশের মহান নৃপতি রাজভটের সন্তান। আমি শুধু রাজপণ্ডিতই নই, আপনার পিতার প্রিয় বয়স্যও বটে। আমার প্রতি এমন গর্হিত আচরণ...’

‘থামো হে কুচক্রী ব্রাহ্মণ, নপুংসক বিট। নিজের স্ত্রীকে উপহার দিয়ে যে নিজের প্রভুর প্রিয় হতে চায়, তার সঙ্গে কার তুলনা চলে জানো? দেহোপজীবিনীর দ্বাররক্ষীর!’ হিসহিস করে উঠল বলভটের বেপথু কণ্ঠস্বর৷

মুহূর্তের জন্যে মাথা নীচু করলেন দয়িতবিষ্ণু৷ শেষ পর্যন্ত হেরেই গেলেন তিনি, এই বিন্দু থেকে আর ফেরত যাওয়ার উপায় নেই৷ আপাতত নিয়তির হাতেই ছেড়ে দিতে হবে এই দেশের ভবিষ্যৎ৷ আরও কত মুহূর্ত যে এই মুহূর্তটির কাছে ঋণী হয়ে রইল, সে কথা একদিন ইতিহাস বলবে৷

‘এই অভিযোগের কারণ জানতে পারি সম্রাট?’ নির্লিপ্ত অবসাদে আশ্চর্য শীতল ও ধারালো শোনাল সর্বজনশ্রদ্ধেয় রাজপণ্ডিতের কণ্ঠস্বর৷

সম্রাটের হয়ে জবাব দিলেন প্রকাশচন্দ্র৷ মসৃণ স্বরে একইসঙ্গে তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ আর বিপুল অপমান মিশিয়ে বললেন, ‘রাজপণ্ডিতের শাস্ত্রজ্ঞান অগাধ হলে কী হবে, কাণ্ডজ্ঞানের বড়ই অভাব দেখা যাচ্ছে৷ মনে হয় উনি বোধহয় ভাবেন যে, রাজ্যের লোকজন সব নির্বোধ, কেউই কিছু বোঝে না৷’

‘অনর্থক বাচালতা বন্ধ করুন প্রকাশচন্দ্র।’ সেই একই স্বরে উত্তর দিলেন দয়িতবিষ্ণু, ‘যা বলতে চান সরাসরি বলুন৷’

ধ্বক করে জ্বলে উঠল প্রকাশচন্দ্রের চোখদুটি, যেমন রাজগোক্ষুরোর মাথায় জ্বলে ওঠে দুটি রক্তমাণিক৷ দুজনেই দুজনের দিকে নির্নিমেষে তাকিয়ে রইলেন খানিকক্ষণ৷

‘দয়া করে তাহলে কি রাজসভাকে জানাবেন পণ্ডিত দয়িতবিষ্ণু, আপনার পুত্রসন্তানটির প্রকৃত পিতা কে?’ চিবিয়ে চিবিয়ে প্রশ্ন করলেন প্রকাশচন্দ্র, ‘কেন বয়ঃপ্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে তার মুখে ফুটে উঠছে সম্রাট রাজভটের ছাপ? কোন জাদুবিদ্যায় দশ বছর বয়সি ব্রাহ্মণসন্তান তরবারি চালনায়, অশ্বচালনায় আর ধনুর্বিদ্যায় রাজ্যের শ্রেষ্ঠ যোদ্ধাদের সমকক্ষ হওয়ার শক্তি রাখে?’ একের পর এক বিস্ফোরণ ঘটাতে লাগলেন তিনি, ‘উত্তর দিন পণ্ডিত৷ নিশ্চুপ থাকবেন না৷ আমাদের সন্দেহ যে, আপনি ও আপনার দুশ্চরিত্রা গৃহিণী মিলে খড়্গরাজসিংহাসন হস্তগত করার এক ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র রচনা করেছেন৷ রাজরক্তের উত্তরাধিকারের দোহাই দিয়ে বর্তমান সম্রাটের এক প্রতিস্পর্ধী...’

সভার মধ্যে প্রচণ্ড হট্টগোল শুরু হল৷ বিস্ময়ে, ক্রোধে, ক্ষোভে উঠে দাঁড়ালেন সভাসদেরা৷ আনন্দদত্ত কোষমুক্ত করলেন তাঁর তরবারি, বিশালকীর্তি তাঁর হাত ধরে আটকালেন তাঁকে৷ স্থিরবুদ্ধি বুদ্ধদাস অবধি উত্তেজিত হয়ে তথাগত’র নামে অভিশাপ দিতে উদ্যত হলেন প্রকাশচন্দ্রকে৷ মহাক্রুদ্ধ হয়ে উঠে দাঁড়ালেন মহাসামন্ত লোকনাথ৷ সমতটের রাতবংশ মহাপ্রতাপশালী সামন্তবংশ, তাঁরা দয়িতবিষ্ণুকে রাজগুরুতুল্য সম্মান দেন৷ তাঁদের যুবরাজ বলধারণ রাত প্রবল রাগে চিৎকার করে গালিগালাজ করতে লাগলেন৷ মহামাণ্ডলিক আর অন্যান্য অমাত্য সামন্তরা হতবুদ্ধি হয় ইতিউতি চাইতে লাগলেন৷ মহাপ্রতীহার বজ্রপাণি অত্যন্ত সতর্ক পুরুষ, তাঁর ইঙ্গিতে কয়েকজন দেহরক্ষী খোলা তরবারি হাতে সম্রাটকে ঘিরে দাঁড়াল৷

আর এইসবের মধ্যে দয়িতবিষ্ণু আর প্রকাশচন্দ্র দুই যুদ্ধরত সিংহের মতো পরস্পরের দিকে তাকিয়ে রইলেন৷ চারপাশের এই বিক্ষুব্ধ পরিবেশ তাঁদের বিন্দুমাত্র বিচলিত করতে পারল না৷

একবার হাত তুলে সভার কোলাহল শান্ত করলেন দয়িতবিষ্ণু, তারপর মৃদু হেসে সম্রাটকে বললেন, ‘সম্রাট যখন আমার ও আমার পরিবারের নামে এত বড় অভিযোগ তুলেছেন, তখন এই রাজসভায় আমার আর না থাকাই উচিত৷ তাই এই মুহূর্তেই আমি আমার যাবতীয় দায়িত্বভার ত্যাগ করছি৷ আশা করি সম্রাট তার অনুমতি দিতে দ্বিধা করবেন না৷’

‘আচ্ছা৷ তাই হবে পণ্ডিত৷ তোমার ইচ্ছাই মেনে নিলাম৷ এই রাজ্য থেকে এখনই দূর হয়ে যাও৷’ জড়িতস্বরে বললেন সম্রাট বলভট৷

‘শিরোধার্য৷ কাল ভোর হওয়ার আগেই আমি সপরিবারে এই রাজ্য ছেড়ে আমার জন্মভূমি বরেন্দ্রীর উদ্দেশে যাত্রা শুরু করব৷ আশা করব খড়্গবংশের প্রতি আমার এতদিনের সেবা ও আনুগত্যের পুরস্কার হিসেবে সম্রাট আমাকে নিরুপদ্রবে ও নিঃশঙ্কচিত্তে দেশত্যাগের অনুমতি দেবেন৷ আমি এও অনুরোধ করব, অগ্রজতুল্য আনন্দদত্তকে যেন আমাকে সপরিবারে বঙ্গভূমির সীমানা অবধি ছেড়ে দিয়ে আসার আদেশ দেওয়া হয়৷’

চারুদত্ত ও প্রকাশচন্দ্র আপত্তি করে ওঠার আগেই সম্রাট গম্ভীরমুখে বললেন, ‘তথাস্তু৷’

গোপনে অনেকেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। বুদ্ধিমান পণ্ডিত সঠিক অনুমান করেছেন যে, যাত্রাপথেই গুপ্তঘাতকের হাতে সপরিবারে নিহত হতে পারেন তিনি৷ তাই আনন্দদত্তকে সঙ্গী হিসেবে চাইলেন৷ ওদিকে চারুদত্ত আর প্রকাশচন্দ্রের মুখে স্পষ্টই হতাশার ছায়া৷ লোকটাকে কারাগারে বদ্ধ করে গুপ্তহত্যার পরিকল্পনা যে এইভাবে বানচাল হয়ে যাবে—তা ভাবতেও পারেননি তাঁরা৷ তাঁদের মুখের দিকে একবার তাকিয়ে সামান্য হাসলেন আনন্দদত্ত। তিনি সঙ্গে থাকতে দয়িতবিষ্ণুর কেশাগ্র স্পর্শ করে—এমন সাহস এই রাজ্যে কারও নেই৷ তার পরেই একবার গভীর বেদনায় চোখ বুজলেন তিনি৷ অনুজপ্রতিম এই পণ্ডিতকে বড় ভালোবাসেন আনন্দদত্ত৷

‘আরও শুনুন সম্রাট৷ আপনি কথা দিয়েছেন যে, আমাকে বিনা উপদ্রবে সপরিবারে রাজ্যের সীমানা অতিক্রম করতে দেবেন৷ প্রতিশ্রুতিভঙ্গের মতো গর্হিত কাজ যে সম্রাট রাজভটের পুত্র করবেন না—সে বিশ্বাস আমার আছে৷ তাই সেই বিশ্বাসে ভর হয়েই একটি সত্য আপনাদের জানিয়ে যাই৷’

প্রত্যেকে নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে রইলেন দয়িতবিষ্ণুর দিকে৷ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইলেন প্রকাশচন্দ্রও৷

‘পরম মিত্র প্রকাশচন্দ্র যা বলেছেন তা সত্য বটে...’

সমস্ত সভা মূক ও উদগ্রীব!

‘কিন্তু অর্ধসত্য!’

সভাস্থ প্রতিটি সভ্যকে দেখে মনে হল যেন কৌতূহল আর বিস্ময়ের শেষ সীমানায় পৌঁছে গেছেন তাঁরা৷ প্রত্যেকের মুখে হতভম্ব অবিশ্বাসের ছাপ৷

‘আমার পুত্র আমার ঔরসজাত নয় এ কথা সত্য৷ এই বালকের দেহে বইছে প্রয়াত সম্রাট রাজভটের রক্ত, তাও সত্য৷’

রাজসভা স্তব্ধ, হতবুদ্ধি। এ কী স্বীকারোক্তি করছেন রাজপণ্ডিত?

‘কিন্তু সম্রাট,’ একটু থেমে মৃদু হেসে বললেন দয়িতবিষ্ণু, ‘এই বালক যেমন আমার ঔরসজাত নয়, তেমন আমার স্ত্রীর গর্ভজাতও নয়!’

৭৪৯ খ্রিস্টাব্দ৷ চম্পানগরী, মগধ৷

বিশেষ কিছু শারীরিক ব্যায়াম আর শ্বাসবায়ুর নিয়ন্ত্রণ রোজই অভ্যাস করেন মানুষটি৷ এ সব তাঁর গুরুরই শিক্ষা৷ নিজ প্রতিভাবলে সেসব গূঢ় সাধনা আরও তীক্ষ্ণ, আরও গভীর, আরও অন্তর্গূঢ় করেছেন তিনি৷ এখন একান্ত নির্জনে যখন সাধনপীঠে বসেন, তখন কখনও কখনও নিজের মেরুদণ্ডের মধ্য দিয়ে এক অলৌকিক দ্যুতির চলাচল বুঝতে পারেন৷ লিঙ্গমূল হতে ব্রহ্মতালু অবধি সেই অপার্থিব দ্যুতি সাপের মতো খেলে বেড়ায়৷

দূর থেকে দেখে মনে হচ্ছিল যেন বাতাসে সাঁতার কেটে প্রায় উড়ে যাচ্ছেন তিনি, এতই দ্রুত ছিল তাঁর হাঁটার বেগ৷ তাঁর উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলছিল আকাশে সেই ধোঁয়ার কুণ্ডলীর আরও ঘন হয়ে ওঠা৷ তাঁর মন বলছিল, আবারও সর্বনাশ নেমে এসেছে বঙ্গদেশের কোনও অভাগা পল্লীর ওপরে৷

কিছুক্ষণের মধ্যে সেই গ্রামটিতে পৌঁছে গেলেন তিনি৷ কান্না আর আর্তনাদের রোল তাঁর কানে আসতেই তিনি বুঝলেন যে, তাঁর আশঙ্কাই সত্যি হয়েছে৷

গ্রামের শেষে একটি ভাঙা কুটিরের আড়ালে থেকে নির্নিমেষ এক নৃশংস নরমেধযজ্ঞ দেখে যেতে থাকলেন সেই মানুষটি৷

একদল সশস্ত্র লোক তাণ্ডবনৃত্য শুরু করেছে সেই গ্রামটিতে৷ আগুন লাগাচ্ছে একের পর এক কুটীরে, বাইরে ছুঁড়ে ফেলছে দরিদ্র গ্রামবাসীর সংসারের সর্বস্ব৷ ভয়ে আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে এদিক-ওদিক পালাচ্ছে বাসিন্দারা; আর তাদের হাহাকার আর কান্নার শব্দে যেন আরও দাউদাউ করে জ্বলে উঠছে আগুনের লেলিহান শিখা৷

দৈত্যাকার লোকগুলির ভাবলেশহীন মুখ আর হাতের অস্ত্র দেখে দেখেই বোঝা যায়—কোনও এক ভূস্বামীর পোষা সৈন্যদল তারা৷ গ্রামের মধ্যে একটি উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে হাসিমুখে সেই দক্ষযজ্ঞ পর্যবেক্ষণ করছেন এক বিশালাকার মানুষ৷ তাঁর পরনের দামি কাপড়ে আর অলঙ্কারে বোঝা যায় যে—ইনিই সেই ভূস্বামী৷

পালাতে গিয়ে ধরা পড়ে গিয়েছিলেন গ্রামের বৃদ্ধ মণ্ডলপতি; মুহূর্তে তাঁর চুলের মুঠি ধরে সামন্তপ্রভুটির সামনে উপস্থিত করলো এক সৈন্য৷

‘দয়া—প্রভু, দয়া করুন৷ আপনি আমাদের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা৷ আপনি বিরূপ হলে আমরা কোথায় যাই? দয়া করুন প্রভু, আপনার দুটি পায়ে পড়ি, আমাদের আশ্রয় এভাবে কেড়ে নেবেন না৷’ বলতে বলতে চোখের জলে ভেসে যায় সেই বৃদ্ধের রুক্ষশুষ্ক বুকখানি৷

মুখ দিয়ে চুকচুক আওয়াজ করেন সেই অসুরাকৃতি পুরুষটি, ‘আহারে, বড় কষ্ট হচ্ছে তোদের তাই না রে? আমারও যে দুঃখু হচ্ছে, সে তোদের কী করে বোঝাই? বড় দুঃখ রে বুড়ো, আমার প্রাণেও বড়ই দুঃখ৷’

‘প্রভু, আপনি অন্নদাতা, মাতা-পিতার সমান৷ দরিদ্রের এত বড় সর্বনাশ করবেন না প্রভু!’

সামান্য নীচু হয়ে নিজের মুখটা সেই বৃদ্ধের মুখের কাছে নিয়ে আসেন ভূস্বামীটি। তারপর বলেন ‘আমারও কি এসব করতে ইচ্ছা করে রে দ্বিজদাস? কিন্তু না করে উপায় কী বল? কোনও উপায় কি আর তোরা রেখেছিস রে? কত মাসের কর বাকি রেখেছিস—সে কথা খেয়াল আছে?’

‘প্রভু...প্রভু...’ কান্না থামতে চায় না বৃদ্ধের৷

‘প্রভু প্রভু করে এত কান্নাকাটি করছিস তো বটে৷ কিন্তু তোরা এরকম করলে তোদের প্রভুরই বা কী করে চলবে—সেটা নিয়ে ভেবেছিস কিছু? আমার মেয়ের বিবাহদায় শিয়রে উপস্থিত, আবার ভুক্তিপতি আমার কাছে পত্র পাঠিয়েছেন বাকি থাকা সমস্ত কর দ্রুত মিটিয়ে দেওয়ার জন্যে৷ আমি কোথায় যাই বল তো দেখি?’

‘প্রভু, দরিদ্রের সব কিছু কেড়ে নেবেন না, ঈশ্বরের দোহাই৷’ উত্তেজনায় কাঁপতে থাকে বৃদ্ধের গলা, ‘পথের ভিখারী করে দেবেন না প্রভু৷ সবার ঘরেই ছোট ছোট শিশুরা আছে, তারাও আমাদের মতই আধপেটা খেয়ে আছে বহুদিন৷ আপনার ঘরেও তো একটি কন্যা আছে প্রভু, তার মুখের দিকে চেয়ে...’

দড়াম! বৃদ্ধের মুখে সজোরে একটি লাথি এসে পড়ল। ওঁক শব্দ তুলে সামান্য দূরে ছিটকে পড়লেন বৃদ্ধ৷ হিসহিস করে ওঠেন সেই ভূস্বামী, ‘শোন বুড়ো, তোরা আধপেটা খেয়ে থাকবি নাকি না-খেয়ে থাকবি—সেসব দেখার প্রয়োজন বোধ করি না৷ যদি সমস্ত বকেয়া কর মিটিয়ে দিস তো ভালো৷ নইলে তোদের সবকটা জোয়ান ছেলে আর মেয়েকে প্রকাশ্য রাস্তায় উলঙ্গ করে হাঁটিয়ে হাঁটিয়ে নগরে নিয়ে গিয়ে দাস হিসেবে বিক্রি করে দেব৷ বকেয়া কর আমার চাই৷’

ধীরে ধীরে উঠে বসেন সেই বৃদ্ধ৷ রক্তমাখা থুতু ফেলেন। তারপর মাথা তুলে তাকান ভূস্বামীটির দিকে৷ বলে ওঠেন, ‘ছিঃ প্রভু, আপনি আমাদের মানুষ বলে মনে করেন না?’

‘মানুষ? ওরে—মান আর হুঁশ থাকলে কি আর কর ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করতিস তোরা? সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে অপোগণ্ডের দল রাজকর দিতে অস্বীকার করে তাদের আমি পথের কুকুর মনে করি৷ তাদের আবার সম্মান অসম্মান কী?’

‘কুকুর?’ ধ্বক করে দুচোখ জ্বলে ওঠে সেই বৃদ্ধের, ‘আপনার জিভে ওকথা এল কী করে প্রভু? আমরা নিজেদের পরিশ্রমের অন্নে নিজেদের পেট ভরাই৷ আমাদের কুকুর বলার আগে আপনার বিবেকে একবারও বাধল না?’

‘বিবেক! বটে? মুখে খুব বুলি ফুটেছে দেখছি! বলি এতই যখন বিবেক-টিবেক আছে তোদের, তখন রাজকর বাকি রাখিস কোন বিবেকে?’

‘ইচ্ছে করে বাকি রাখিনি প্রভু! কোনওদিন কি জানতে চেয়েছেন—কেন কর দিতে পারছি না আমরা? একবারও ভেবে দেখেছেন প্রভু?’

‘ভেবে দেখব? বলিস কি রে! তোদের কথা আজকাল ভেবেও দেখতে হবে!’ চক্ষু বড় করে বলেন ভূস্বামী ভদ্রবাহু৷

‘হ্যাঁ প্রভু, দেখতে হবে বইকি! প্রজারা কি কেবলমাত্র করদান করার যন্ত্র? তাদের ভালোমন্দ দেখার দায় নেই আপনার?’

‘দায়? তোর আস্পর্দা যে মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে।’

‘না প্রভু। যা সত্যি সেটাই বলছি। ভেবে দেখেছেন কি, বছরের পর বছর কীভাবে করের হার বাড়িয়ে চলেছেন আপনি? সামান্য যেটুকু ফসল ফলাই আমরা, আগে তার ছয়ভাগের একভাগ দিতে হতো, এখন তার তিনভাগের দুইভাগ আপনি দখল করেন৷ আপনার বাড়ির বিভিন্ন উৎসব উপলক্ষ্যে পার্বণী আদায় করেন৷ তারও ওপর যখন ইচ্ছে আমাদের দিয়ে বিনা পারিশ্রমিকে খাটিয়ে নেন৷ এর পরেও আমাদের কুকুর বলছেন? পরের শ্রমের অন্নে ভাগ বসাতে আপনার সংকোচ হয় না প্রভু?’

বিস্ময়ে আর ক্রোধে প্রথমে বাকস্ফূর্তি হয় না ভূস্বামীর৷ তারপর হুঙ্কার দিয়ে ওঠেন তিনি, ‘বটে? নীচুজাতের মুখে এত বড় কথা? এতবড় সাহস? প্রাণের ভয় নেই তোর?’

ধীরে উঠে বসেন সেই বৃদ্ধ; ঠোঁটের প্রান্ত থেকে গড়িয়ে পড়ে রক্ত, চোখের প্রান্ত থেকে অশ্রু৷

‘ভয়? আজ আমাদের পেটে ভাত নেই, পরনের কাপড় নেই, ঘরের ছেলেমেয়েদের দাস হিসেবে বিক্রি করে দেওয়ার ভয় দেখাচ্ছেন৷ এর পরেও আর কীসের ভয় বাকি থাকে প্রভু ভদ্রবাহু?’

‘বটে? তোর আর কোনও ভয় নেই বলছিস? তা বেশ,’ শয়তানি হাসি খেলে যায় ভদ্রবাহুর মুখে, ‘তোর মেয়ে শুনলাম কালই বাপের বাড়িতে এসেছে? আর তোর নাতনীটি নাকি বড়ই মনোলোভা হয়েছে? আহা রে, ভাবছি আজ একইসঙ্গে মা মেয়েকে দিয়ে আমার শয্যার শোভা বাড়াব৷ ওরে কে কোথায় আছিস? মেয়ে আর নাতনীর সঙ্গে এই বাচাল বুড়োকেও বেঁধে নিয়ে চল৷ আজ আমরা সবাই মিলে সারা রাত ধরে মা-মেয়ের শরীরের আনন্দ নেব ভাবছি৷ তোরা দেখিস—সেই সময় যেন এই বৃদ্ধ আমাদের চামর দুলিয়ে হাওয়া করতে ব্যস্ত থাকে’, এই বলে অশ্লীল ও অসভ্য আনন্দে শরীর দুলিয়ে হাসতে থাকেন ভদ্রবাহু আর তাঁর সঙ্গীসাথীরা৷

কুটিরের আড়ালে লুকিয়ে থাকা যোগীবরের সমস্ত শরীর তীব্র ক্রোধে দাউদাউ জ্বলতে থাকে৷ অতি কষ্টে নিজেকে স্থির রাখেন তিনি৷

একদিন সময় আসবে৷ এই অসহ্য অত্যাচারের প্রতিটি মুহূর্তের প্রতিশোধ নেওয়া হবে৷ কিন্তু আজ সেই সময় নয়৷ আজ সেই দিন নয়৷ নিজেকে বোঝান তিনি৷

প্রবল ঘৃণায় আর রাগে বিকৃত হয়ে যায় দ্বিজদাসের মুখখানি৷ বলে ওঠেন তিনি, ‘শোনো হে ভদ্রবাহু, শোনো হে অত্যাচারী ভূস্বামীদের দল, তোমাদের দিন শেষ হয়ে এসেছে৷ তোমাদের ওই কামলোলুপা রানি, আর তার ওই বেতালসিদ্ধ প্রকাশচন্দ্র, তারা কেউ তোমাদের বাঁচাতে পারবে না৷’

‘তাই নাকি রে? কী করবি তুই, শুনি?’

‘আমি? হা হা হা...’ অপ্রকৃতিস্থ স্বরে হেসে ওঠেন দ্বিজদাস, ‘আমি নয়, আমরা৷ শুনে রাখো ভদ্রবাহু, তিনি আসছেন, সবাইকে নিয়ে আসছেন৷’

‘কে আসছেন? কার কথা বলছিস তুই?’

‘তিনি আমাদের ঈশ্বর৷ স্বয়ং আদিনাথের ত্রিশূল হাতে আসছেন তিনি৷ দিকে দিকে তাঁর ভৈরব বাহিনী প্রস্তুত হচ্ছে৷ তোমাদের অশুভ রক্তের একটি ফোঁটাও এই দেশের মাটিতে পড়তে দেব না হে, তোমাদের প্রতিটি অত্যাচারের ঋণ কড়ায় গণ্ডায় শোধ করে দেব৷’ এই বলে পাগলের মতো করে হেসে ওঠেন সেই বৃদ্ধ৷

আর সহ্য হয় না ভদ্রবাহুর, পাশের সৈন্যটির হাত থেকে ছিনিয়ে নেন ভল্ল! সজোরে গেঁথে দেন বৃদ্ধের বুকে৷

একবার ঘোলাটে চোখ তুলে চারিদিকে তাকান সেই বৃদ্ধ৷ তারপর একবার তাকালেন আকাশের দিকে৷ যেন শেষবারের মতো দেখে নিতে চাইলেন বড় সাধের, বড় মায়ার, বড় ভালোবাসার এই মাটি, এই আকাশ৷

তারপর ফের বিড়বিড় করলেন তিনি, ‘আসছেন, তিনি আসছেন৷ ওঁরা আসছেন৷’

৭৪৯ খ্রিস্টাব্দ ৷ নালন্দা মহাবিহার, পাটলিপুত্র, মগধ৷

শরৎকাল। সন্ধ্যা শেষ হয়েছে৷ অন্ধকারে অদূরের মহাবিহারটির দিকে তাকিয়ে ছিলেন অশ্বারোহী পুরুষটি৷

নালন্দা মহাবিহার৷

গত দুশো বছরেরও বেশি সময় ধরে অর্ধেক পৃথিবী জুড়ে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিয়েছে এই বিহার৷ ভারতবর্ষের অহঙ্কার শুধু তার রাজচক্রবর্তী সম্রাটদের বিজয়গাথার মধ্যে নয়, সেই অহঙ্কারের অনেকখানি মিশে আছে তার বৌদ্ধিক ও সাংস্কৃতিক অবদানের মধ্যেও৷

ভারতের এই সারস্বত ঐতিহ্যের মধ্যে গরিমায়, প্রভাবে ও উৎকর্ষে উজ্জ্বলতম জ্যোতিষ্ক এই নালন্দা৷ ভারতের সবচেয়ে শ্রদ্ধেয় ও বিদগ্ধ পুরুষেরা অধ্যয়ন বা অধ্যাপনা করেছেন এই মহাবিহারে৷ মহাযান বৌদ্ধধর্মের সম্পূর্ণ দার্শনিক ভিত্তিই তো এই মহাবিহারের মাটি দিয়ে তৈরি৷ আচার্য আর্যদেব, আচার্য দিঙনাগ, আচার্য ধর্মকীর্তি, আচার্য শান্তিদেব—ভারতভূমিকে একের পর এক মহান বৌদ্ধাচার্য উপহার দিয়েছে নালন্দা মহাবিহার৷

তিব্বত থেকে মহাচীন, দ্বারাবতী থেকে সিংহলভূমি, গান্ধার থেকে বালিদ্বীপ, বিভিন্ন দেশ থেকে আসা শিক্ষার্থীরা আসেন এখানে৷ অধ্যয়ন করেন ষড়দর্শন, শব্দবিদ্যা, জ্যোতির্বিদ্যা, ব্যাকরণ এমনকি চিকিৎসাশাস্ত্রও৷

বাতাসে সামান্য শীতের আমেজ৷ বিহারের উত্তর দিকের দরজার প্রহরী দরজার এক কোণে গুটিসুটি মেরে দিব্যি নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছিল৷ গ্রাম থেকে তার সম্বন্ধী এসেছিল আজ৷ একে তো তার সঙ্গে বসে চমৎকার কাঞ্জিক মদ্যপান হয়েছে, তার ওপর রাত্রের খাবারটি আজ বড় মনমতো হয়েছ তার৷ ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে কোনও স্বপ্ন দেখে খিল খিল করে হাসছিল সে৷

সহসা কাঁধে টোকা পড়তে ধড়ফড় করে উঠে পড়ে রক্ষী৷ চোখ কচলে দেখে সামনে এক দীর্ঘদেহী পুরুষ৷ তাঁর সমস্ত দেহ কালো কাপড়ে ঢাকা, বাঁহাতে একটি ঘোড়ার লাগাম ধরে আছেন৷ ঘোড়াটি পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে৷

‘ক্কী ক্কী,...ক্কাকে চাই শুনি, অ্যাঁ?’ ধমকে উঠলেও প্রহরীটি, বোঝা যায় যে বিলক্ষণ ভয় পেয়েছে৷

‘একে বর্ষার রাত, তার ওপর মুখে ভুরভুর করে করছে মদের গন্ধ! না হে বাপু, ঘুমিয়ে পড়ার জন্যে তোমাকে মোটেও দোষ দিতে পারলাম না৷’ কৌতুকস্বর শোনা যায় আগন্তুকের৷

‘এত রাতে, কী ব্যাপার? যা বলার চটপট বলে ফেলো৷’ প্রহরী সামলে ওঠার চেষ্টা করে৷

‘আমারই কী ইচ্ছে করে হে এই এত রাতে এখানে আসতে? তবে না এসে উপায় কী বলো? স্বয়ং আচার্য শান্তরক্ষিত যদি আমাকে ডেকে থাকেন, না এসে আমার উপায় আছে? অমন মস্ত পণ্ডিত লোক...’

‘আচার্য তোমাকে ডেকেছেন? আমার সঙ্গে ঠাট্টা করছ তুমি, অ্যাঁ? ঠাট্টা? বলি যাঁর নাম করলে তিনি কে জানো? মা সরস্বতীর সাক্ষাৎ বরপুত্র তিনি, চীন থেকে বাহ্লীকদেশ অবধি পণ্ডিতরা যাঁর নাম শুনলে মাথা নীচু করেন, সেই পণ্ডিতশিরোমণি শান্তরক্ষিত তোমাকে ডেকেছেন আলাপ করার জন্যে?’

‘ডাকেননি বলছ? আমার তাহলে ভুলই হল নাকি?’

‘আমাকে দেখে কী তোমার মূর্খ মনে হচ্ছে? শোনো হে আগন্তুক, আমার নাম মল্ল সিংহোদর, একটি চাপড়ে তোমার মাথাটি গুঁড়োগুঁড়ো করে দিতে আমার মুহূর্তের বেশি সময় লাগবে না৷

‘সিংহোদর? তা সিংহোদর কবে থেকে এমন ভুঁড়ো শেয়াল হয়ে গেল বলো তো?’ বলতে বলতে সামান্য নত হয়ে ডানহাতের তর্জনী দিয়ে সিংহোদরের পেটে একটি খোঁচা দেন সেই আগন্তুক৷

মুহূর্তে প্রহরীর মনে হয় কে যেন একটি জ্বলন্ত লোহার শিক সজোরে তার পেটের মধ্যে ঢুকিয়ে দিল৷ প্রবল শ্বাসকষ্টে হাঁপ টানতে টানতে ক্রমশ বেঁকে যেতে থাকে সে, চারিদিক অন্ধকার হয়ে আসে তার৷

বাঁ-হাতের উলটো দিক দিয়ে সিংহোদরের পিঠে হালকা করে একটি চাপড় দেন সেই আগন্তুক, পরক্ষণেই প্রবল কাশির দমকে ফেটে পড়ে মল্লবীর সিংহোদর৷ শ্বাসকষ্ট কেটে গেছে তার৷ কাশি কিছুটা কমলে কাঁপা কাঁপা গলায় বলে, ‘আপনি কে প্রভু?’

‘আহা, আমাকে আবার খামোখা আপনি টাপনি কেন? তুমিটাই তো দিব্যি শোনাচ্ছিল হে৷’ হাঁ-হাঁ করে ওঠেন আগন্তুক, ‘আর ওসব মল্লযুদ্ধের ছোটখাট দু-একটা কৌশল হে, এমন কোনও বড় ব্যাপার নয়৷’

‘অধীনকে আর লজ্জা দেবেন না প্রভু৷ আপনার কী সেবা করতে পারি বলুন?’

‘অতি সামান্য কাজ৷ চট করে আচার্যকে আমার আসার সংবাদটা দিয়ে এসো৷ আর হ্যাঁ, যাওয়ার আগে তোমার ওই কাঞ্জিকের হাঁড়িটা দিয়ে যেও বাপু৷’

কোনও কথা না বলে কাঞ্জিক মদের বিশাল জালাটি আগন্তুকের দিকে এগিয়ে দেয় সিংহোদর৷ হাতে পাওয়া মাত্র আগন্তুক আর দেরি করেন না, দুহাতে জালাটি তোলেন আর হাঁ করে মুখের মধ্যে ঢালতে থাকেন মাগধী সুরা৷

সে দিকে চক্ষু বিস্ফারিত করে তাকিয়ে থাকে সিংহোদর৷ অমন বিশাল পানীয়ের জালা এত অবলীলায় দুহাতে তুলে সেখান থেকে সরাসরি পান করার লোক এই বিশ্বচরাচরে কেউ আছে বলে তার ধারণা ছিল না৷ তবে তখনও তার অবাক হওয়ার বাকি ছিল৷

তার চোখের সামনে দেখতে দেখতে খালি হয়ে গেল সেই বিশাল মাটির জালা৷ শেষ বিন্দুটুকু অবধি গলায় ঢেলে জালাটি দূরে ছুঁড়ে দেন আগন্তুক৷

তৃপ্তির ঢেকুর তুলে আগন্তুক বলেন, ‘বাহ, বাহ, বড় ভালো জিনিস হে৷ যেমন স্বাদ তেমনই তীব্রতা৷ আমাদের ওদিকে বুঝলে কি না, কাঞ্জিকটা না ঠিক তেমন ভালো বানায় না৷ তবে হ্যাঁ, নারকেল ফুল পচিয়ে, বুঝলে কিনা, একধরনের আরক বানাই আমরা৷ সেও ভারি মধুর খেতে হে৷ আমার সঙ্গে আমাদের দেশে একবার যাবে নাকি ভাই চক্রধর?’

‘চক্রধর না প্রভু, ইয়ে আমার নাম সিংহোদর৷ আচার্যকে সংবাদ দিই প্রভু?’

‘দেবে? না-দিলেই নয়? আচ্ছা তবে তাই দাও হে৷ আর যাওয়ার আগে যদি আরেকটি কাঞ্জিকের হাঁড়ি দিয়ে যাও বৃষস্কন্ধ...’

‘আজ্ঞে আমার নাম বৃষস্কন্ধও নয় প্রভু, আমার নাম চক্র...ইয়ে...সিংহোদর৷ অনুগ্রহ করে যদি আপনার নামটি বলতেন৷’

‘নাম?’ এই বলে হাসি হাসি মুখে সিংহোদরের দিকে চোখ তুলে তাকান সেই আগন্তুক, সেই হাসিতে মিশে আছে কিছু নির্দোষ কৌতুক, ‘নাম জিগ্যেস করছ চক্রসম্বর? বলি আমার নাম যদি সরোরুহবজ্র হয়, তাহলে কি চিনতে কিছু সুবিধা হবে? বা যদি বলি রাহুলভদ্র? চিনতে কি পারবেন আচার্য?’

শুনে খানিকক্ষণ হাঁ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে সিংহোদর৷ ঠকঠক করে কাঁপতে থাকে সিংহোদরের হাত-পা৷ ইনিই তাহলে সেই রূপকথার রাজপুত্র? ইনিই তিনি?

খুঁজেপেতে নিজেই আরেকটি মদের জালা বের করেন আগন্তুক, তারপর সেটি দুহাতে তুলে গলায় ঢালার আগে একটু থামেন; বলেন, ‘যাওয়ার আগে আমার ঘোড়াটিকে কিছু খেতে দিও তো সামন্তভদ্র, বেচারী অনেকক্ষণ ধরে কিছু খায়নি৷ আর হ্যাঁ, আমার আসল নামটাই আচার্যকে জানিও৷ তাঁকে বোলো যে রাজা ইন্দ্রভূতির সন্তান তাঁর আদেশ পালন করে তিব্বত থেকে ফিরে এসেছে৷’ এই বলে সামান্য থামেন তিনি, তারপর বলেন, ‘বলো যে—রাজপুত্র পদ্মসম্ভব এসেছেন৷’

৭৪৯ খ্রিস্টাব্দ| পার্বত্য কজঙ্গল|

গহীন অরণ্যের মধ্যে ছোট পাহাড়৷ তার চূড়ায় একটি বড় নিমগাছ৷ নিমগাছের নীচে মাটি আর পাথরের মন্দির, ঘন ছায়াবৃত৷

মন্দিরের মধ্যে এক বৌদ্ধ শ্রমণ এবং আর এক শবর যুবক নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলছিলেন৷

বৌদ্ধ শ্রমণ বয়সে তরুণ৷ অপার বিস্ময়ে তিনি দেখছিলেন মন্দিরের মূর্তিটি৷ নালন্দায় নিত্যপূজা হয় এমন মূর্তির সংখ্যা নেহাত অল্প নয়৷ শ্রমণ নিজেও নিয়মিত অবলোকিতেশ্বরের পূজা করেন৷ দীর্ঘ তিব্বতপ্রবাসেও বহু বিচিত্র মূর্তি কম দেখেননি। কিন্তু এমন মূর্তি আজ অবধি তাঁর চোখে পড়েনি৷

প্রতিমাটি পাথরের৷ একটি বড় পাথর কুঁদে কুঁদে কোনও অখ্যাত শবরশিল্পী রূপদান করেছে এই মন্দিরের অধিষ্ঠাত্রী দেবীর৷ দেবী অতি ভীষণদর্শনা, অতিবিস্তারবদনা, লোলজিহ্ব৷ পীনোন্নতপয়োধরা দেবীর ঊর্ধ্বাঙ্গ অনাবৃত, নিম্নাঙ্গে গাছের পাতা ও বাকলের আচ্ছাদন৷ দ্বিভূজা দেবীর দক্ষিণহস্তটি বরাভয় ভঙ্গিতে ঊর্ধে উত্থিত, বামহস্তটি বরদমুদ্রায় অগ্রবর্তী৷

‘ইনি কোন দেবী, মিত্র শবর?’ বিহ্বলস্বরে বললেন শ্রমণ৷

‘ইনি আমাদের একজন ভারি জাগ্রত দেবী।’ ফিসফিস করে বললেন শবর যুবক। রোগ বালাই হলে আমরা এখানেই হত্যে দিই৷ আর বড় কোনও মড়ক লাগলে তো কথাই নেই, তখন মহা ধূমধাম করে এঁর পূজা হয়৷’ এই বলে থামলেন তিনি৷ তারপর বললেন, ‘দেবী ঠাকুরানি আবার যেমন রাগী, তেমনই উঁচু নজর তাঁর! বুনো মোষের মাংস আর ভালো মহুয়ার মদ না পেলে ওঁর মন ওঠে না৷’

কী আশ্চর্য রূপ মাতৃমূর্তির৷ কী ভয়ঙ্কর অথচ কী মানুষী, কী ক্রুদ্ধ অথচ কী স্নেহময়ী এই দেবী৷ যেন এক সামান্য শবরকন্যার সমস্ত লালিত্য, সমস্ত উগ্রতা, সমস্ত স্নেহ, সমস্ত ক্রোধ একত্রে রূপ নিয়েছে এই দেবীমূর্তিতে৷ তিব্বতে প্রবাসকালে পোন ধর্মের ভীষণদর্শন দেবদেবীদের মূর্তি কম দেখেননি শ্রমণ৷ সেসব মূর্তি দেখে ঘৃণায় বমি উঠে আসত তাঁর৷ কিন্তু, কই, এই করালবদনা দেবীমূর্তি দেখে তাঁর মনে ভয়ের পরিবর্তে ভক্তিভাব জেগে উঠছে কেন?

ভক্তি? শুধুই ভক্তি? তাহলে তরুণ সন্ন্যাসীর হঠাৎ করে কেন মনে পড়ে যাবে তাঁর গর্ভধারিণীর স্নেহঢলঢল মুখখানি?

দীর্ঘ প্রবাসের পর সবে দেশে ফিরেছেন শ্রমণ৷ আচার্য শান্তরক্ষিতের আদেশে একটি অতি গোপন কাজে তিব্বতে গিয়েছিলেন তিনি৷ বহু কষ্টে, প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে সেই জটিল কাজ শেষ করে সদ্য দেশে ফিরেছেন তিনি৷ দুটি গোপন বস্তু আর একটি পত্র চুরি করে এনেছেন, সঙ্গী রাজপুত্রটির হাত দিয়ে তা পাঠিয়ে দিয়েছেন আচার্যর কাছে৷ তিনি রয়ে গেছেন একটি বিশেষ কারণে৷

তাঁর পূর্বাশ্রমের ঘরখানি, এখান থেকে কয়েক ক্রোশ পশ্চিমে৷ ইচ্ছা আছে, নালন্দা যাওয়ার আগে একবার মায়ের সঙ্গে দেখা করে যাবেন শ্রমণ৷ আহা, কতদিন দেখেননি মাকে৷

দু’চোখ বন্ধ করলেন তিনি৷ বহুদিন পূর্বে ছেড়ে আসা বাস্তুভিটার জন্যে, আম আর কাঁঠাল গাছে ছায়াময় গ্রামটির জন্যে, মাতৃদেবী ভগবতীর করুণ মুখখানির কথা মনে পড়ে সহসা তাঁর চক্ষু সজল হয়ে উঠল৷

‘তবে রাগী হলে কী হবে, দেবীকে কিন্তু আমরা বড় ভালোবাসি ভায়া,’ উৎসাহিত হয়ে ওঠেন শবর যুবকটি৷ অসভ্য আরণ্যক আদিবাসীকূলে জন্মগ্রহণ করেও দৈববলে আশ্চর্য সাধনসিদ্ধি প্রাপ্ত হয়েছেন তিনি৷ লোকে বলে, আর্য অবলোকিতেশ্বর স্বয়ং নাকি এক ব্যাধের রূপ ধরে এসে এঁকে দশকুশল দান করেন৷ লোকায়ত সহজ সাধনার যে নতুন সিদ্ধিমার্গ উন্মোচিত হয়েছে, তাতে বিশেষ শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয় এঁর নাম৷ ময়ূরবসন, গিরিনাথ—নানান নামে এঁর পরিচিতি৷ সাধারণ মানুষ অবশ্য অন্য নামেই চেনে বেশি এঁকে, শবরবজ্র৷

তিনি বলতে থাকেন, ‘ঘরের মেয়ের মতই ভালোবাসি৷ নইলে কথায় কথায় এত রাগ কে-ই বা সহ্য করবে হে? নিজের মেয়ে বলেই না সহ্য করি এত! তবে মেয়ে আমাদের ভারি সোহাগীও বটে, তেমন দয়াবতীও৷ বিপদে আপদে এই মেয়েই আমাদের রক্ষা করে৷ অবরে-সবরে মেয়ের সঙ্গে আমরা সুখদুঃখের দুটো কথাও বলি৷’

‘তাই নাকি? ইনি তাহলে দেবী নন? আপনাদের ঘরের মেয়ে, মিত্র?’

‘বটেই তো।’ বেশ উৎসাহিত হয়ে উঠলেন শবরবজ্র, ‘মেয়ে তো বটেই! দেবীও বটে, আবার ঘরের মেয়েও বটে৷ নিত্যি পূজা তো আছেই, তার ওপর বর্ষার সময় শেষ হলে আকাশ যখন বেশ পরিষ্কার হয়ে আসে, তখন একদিন দিনক্ষণ দেখে আমরা এই দস্যি মেয়েটার মহাধূমধামে পূজা করি, বুঝলে ভায়া৷’

‘তাই নাকি?’ মনের মেঘ কেটে যাচ্ছিল শ্রমণের৷

‘তখন তো হরিণ, মোষ, বুনো বরা আর অঢেল মহুয়া না পেলে শুধু এই বেটি কেন, আমাদের সমাজের লোকজনও ভারি রাগ করে ভাই৷ পাঁচদিন ধরে কজঙ্গল থেকে বিন্ধ্যাচল অবধি সে এক মোচ্ছব চলে হে৷ ও, তুমি তো আবার দুধ আর ফল ছাড়া কিছুই খাও না৷ তবে দেবীর সামনে আমাদের ছেলেমেয়েরা সুন্দর নাচ-গানের অনুষ্ঠান করে, দেখলে তোমার ভালো লাগবেই৷ গত কয়েক বছর ধরে আমরা বুদ্ধনাটকও শুরু করেছি, বুঝলে হে৷’

ধীরে ধীরে মন প্রসন্ন হয়ে উঠছিল শ্রমণের৷ এই সহজ মানুষটিকে, এই সহজ ভূমিকে, এই জনজাতিকে, এই সহজ পূজোপচারকে ক্রমেই ভালোবেসে ফেলছিলেন৷ দেবীর মধ্যে নিজের মায়ের মুখখানি খুঁজে পাচ্ছিলেন৷

‘এই দেবীর নাম কী মিত্র?’

‘নাম? কোনও নাম তো দিইনি ভাই!’ উত্তর করেন সেই শবর যুবক, ‘নাম দেওয়ার কথা মনেই আসেনি৷’

‘মিত্র, অনুমতি দিন,’ গলা বুজে আসে শ্রমণের৷ সেই কোন শৈশবে সাধের ঘর ছেড়ে, ঘরের আঙিনা ছেড়ে, গ্রামের ছোট্ট শান্ত নদীটি ছেড়ে, বন্ধুবান্ধবদের ছেড়ে, মায়ের স্নেহের আঁচলটি ছেড়ে শ্রমণ হয়েছিলেন তিনি৷ তারপর পতিতোদ্ধারিনী গঙ্গা দিয়ে বয়ে গেছে কত না জল৷ নালন্দা, কামরূপ, তিব্বত, ষড়যন্ত্রে দীর্ণ রাজপরিবার, অরাজকতায় ক্ষিণ্ণক্ষিপ্ত বঙ্গভূমি, আর সেই বঙ্গভূমির উদ্ধারকল্পে আচার্য শান্তরক্ষিত আর লোকেশ্বরের মিলিত বিশাল পরিকল্পনা—এই বিপুল কর্মস্রোতে কবেই ভুলে গেছেন সেই স্নেহের ছায়া-সুনিবিড়, সন্ধ্যাপ্রদীপ জ্বলা শান্ত কুটিরটি৷

মনে মনে দেবীর কাছে প্রার্থনা করলেন তিনি৷ সবকিছু ছেড়ে যে কাজে ব্রতী হয়েছেন তিনি, তা যেন জয়যুক্ত হয়৷ যেন এই দেশের ঘরে ঘরে প্রদীপের মঙ্গলশিখা আর শঙ্খধ্বনির কোমল শান্ত সন্ধ্যাটি ফিরে আসে৷ এছাড়া ইহজীবনে আর কিছুই চাই না তাঁর৷

‘অনুমতি দিন মিত্র,’ গভীর আবেগে স্বর কাঁপতে থাকে সেই শ্রমণের, ‘আমি শবরদেশের এই পর্ণ-বল্কল-পরিহিতা দেবীর নাম দিলাম দেবী পর্ণশবরী৷ এঁকে দেখে আমার গর্ভধারিণী ভগবতী দেবীর কথা মনে পড়ে যাচ্ছে মিত্র৷ অনুমতি দিন, আমি জনসাধারণ্যে দেবী সর্বশবরনাম ভগবতীর পূজা প্রচার করতে চাই৷’

শোনামাত্র প্রথমে বাকরুদ্ধ হয়ে ছিলেন সেই সহজস্বভাব শবরটি, কয়েকমুহূর্ত পরে আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে উঠলন, ‘বলো কী ভাই কমলশীল? আমাদের মেয়ে তোমাদের মতো ভদ্রজনের পূজাও পাবে? সে তো বড় আনন্দের কথা৷’

‘অবশ্যই মিত্র৷ ইনি সাক্ষাৎ শক্তি, দৈত্যদর্পনিসূদিনী দেবী চণ্ডী৷ আজ বঙ্গভূমির ভাগ্যে যে কালরাত্রি নেমে এসেছে, তা দূর করতে হলে এই বনভূমির, এই পার্বত্যদেশের, এই অরণ্যের আশীর্বাদ চাই৷’ আবেগাপ্লুত স্বরে বলছিলেন কমলশীল, আচার্য শান্তরক্ষিতের প্রিয়তম শিষ্য কমলশীল৷ ‘সেইদিন আর বেশি দূরে নেই বন্ধু, যেদিন এই দেশের সাধারণ মানুষের বিদ্রোহে উৎখাত হবে এই অত্যাচারী, কামলোলুপা, উন্মাদবুদ্ধি রানির রাজত্ব৷ সেইদিন শবরদেশের এই করালবদনা শক্তিদায়িনী মেয়েটিকে আমাদের বড় প্রয়োজন হবে৷ আপনার অনুমতি আছে তো?’

কিছুক্ষণ অভিভূতের মতো দাঁড়িয়ে রইলেন সিদ্ধাচার্য শবরবজ্র৷ তারপর কমলশীলকে ভীম আলিঙ্গনে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘শবর জনজাতি তোমাদের সঙ্গে আছে ভাই৷ প্রয়োজনে খবর দিও৷ এই দেশের নামে, আমাদের এই মেয়ের নামে আমাদের প্রতিটি রক্তবিন্দু উৎসর্গ করলাম৷’

৭৪৯ খ্রিস্টাব্দ৷ নালন্দা মহাবিহার, পাটলিপুত্র, মগধ৷

পদ্মসম্ভব যখন সভায় প্রবেশ করলেন, সেই গভীর রাতেও অনেক লোক উপস্থিত৷ তাঁদের মধ্যে কয়েকজনের গেরুয়া পোশাক, মস্তক মুণ্ডিত৷ বোঝাই যায়—এঁরা নালন্দার ভন্তে বা অধ্যাপক৷

বাকিদের দেখলে অবশ্য শ্রদ্ধা হওয়া মুশকিল৷ তাঁদের ময়লা পোশাক আর নোংরা দাড়িগোঁফ দেখলে বোঝা যায়, সমাজের নিম্নশ্রেণীতে এঁদের বাস৷ তাঁদের বসে থাকার ভঙ্গিতে কিন্তু কোনও হীনমন্যতা নেই৷ আশ্চর্য আর সহজ প্রশান্তি ছড়িয়ে আছে প্রত্যেকের শরীরে৷ উপস্থিত আছেন একজন নারীও৷ এই অঞ্চলের বৌদ্ধ ভিক্ষুণীদের মধ্যে প্রজ্ঞায় ও শীলে এই বিদুষী তরুণীটি অত্যন্ত সম্মানের পাত্রী৷

তবে সকলের মধ্যে প্রথমেই দর্শকের মনোযোগ কেড়ে নেন যে দুজন, তাঁদের ব্যক্তিত্বের মধ্যে ঝলসে উঠছে শান্ত গাম্ভীর্য৷ তাঁদের একজন অপেক্ষাকৃত তরুণ, তিনি পরেছেন বৌদ্ধশ্রমণদের গেরুয়া পোশাক৷ মধ্য তিরিশের এই যুবকটির উজ্জ্বল চক্ষু দুটিতে গভীর প্রজ্ঞা ও অসামান্য মেধার চিহ্ন জ্বলজ্বল করছে৷ অন্যজনকে দেখলেই বোঝা যায় ইনি জাতিতে ক্ষত্রিয়৷ বয়সে প্রৌঢ় হলে কী হবে; বলিষ্ঠ শরীর, বিপুল পেশী এবং কঠিন দৃষ্টিতে সেটা পরিস্ফূট।

পদ্মসম্ভবকে সভায় ঢুকতে দেখে অনেকের মুখেই সসম্ভ্রম বিস্ময়ের ছায়া খেলে গেল৷ উদীয়ানের রাজকুমারের অবিশ্বাস্য কীর্তিকলাপের বিবরণ এখনই প্রায় অলৌকিক কাহিনির স্থান নিয়েছে৷ লোকে তো এমনও বলে যে, ইনি নাকি জন্মগতভাবেই গুহ্যজ্ঞানসিদ্ধ, অমিত ঐন্দ্রজালিক ক্ষমতার অধিকারী৷ উদীয়ান ও লিচ্ছবীর জনসাধারণের কাছে ইনি স্বয়ং দ্বিতীয় অমিতাভ; কেউ কেউ এমনও বলে যে ইনি নিজেই অবলোকিতেশ্বর৷

পদ্মসম্ভবের দিকে অনিমেষে তাকিয়ে ছিলেন প্রৌঢ় ক্ষত্রিয়পুরুষটি৷ আহা, কী মনোহর রূপই না ঈশ্বর দিয়েছেন এই যুবককে৷ গাত্রবর্ণ ঘোর তাম্রাভ, টানাটানা চক্ষে যেন স্বয়ং ব্রজের বংশীধারী শ্রীকৃষ্ণ৷ ঘন কুঞ্চিত চুল, নাক সামান্য চাপা, দুই বাহু আজানুলম্বিত৷

পদ্মসম্ভব ঢুকেই প্রণত হলেন শ্রমণের সামনে, শ্রদ্ধাভরে বললেন, ‘মাতা সরস্বতীর সাক্ষাৎ বরপুত্র, ভারতভূমির শ্রেষ্ঠতম পণ্ডিত আচার্য শান্তরক্ষিতকে আমার প্রণাম৷’

আসন হতে দ্রুত উঠে এসে পদ্মসম্ভবকে গভীর আলিঙ্গনে বুকে টেনে নিলেন শান্তরক্ষিত৷ তিনি বড় স্নেহ করেন অমিত শক্তিধর এই রাজকুমারকে৷ শুধু স্নেহ নয়, অনেকখানি শ্রদ্ধাও তার সঙ্গে মিশে থাকে৷ সস্নেহে প্রশ্ন করলেন, ‘সব কুশল তো রাজকুমার? যে কঠিন কাজের জন্য আপনাকে তিব্বতে পাঠানো হয়েছিল, তা সুসম্পন্ন হয়েছে? আমার প্রিয় শিষ্য কমলশীল সুস্থ দেহে ফিরে এসেছে?’

‘তা আর পুরোপুরি সম্পন্ন হল কই? যে বটুয়াটির জন্য যাওয়া, সেটি হাতে পেয়েছি বটে, সঙ্গে একটি পত্রও ছিল। কিন্তু রাস্তায় আবার তিন অপোগণ্ডের সঙ্গে দেখা৷ ঠাণ্ডা মাথায় তাদের দুটো ভালো কথা বলতে গেলাম, অসভ্যের মতো দাঁতমুখ খিঁচিয়ে তেড়ে এল! কী সমস্যা বলুন দেখি৷’

‘সে কী! তারা কারা?’

‘কীসব উদ্ভট নাম, মনে নেই৷ পালের গোদাটির নাম বোধহয় মাশাং৷’

‘মাশাং? তিব্বতের মহামন্ত্রী মাশাং? আপনি ঠিক শুনেছেন রাজকুমার? তিনি নিজে এসেছিলেন আপনাদের বাধা দিতে?’ শিহরিত স্বরে প্রশ্ন করেন অন্যতম শিষ্য হরিভদ্র৷

‘হ্যাঁ তিনিই।’ বলেন পদ্মসম্ভব, ‘লোকটা যেমন মর্কট, তেমনই শুয়োরের মতো ঘোঁতঘোঁত করে৷ মাথায় খুব আলতো করে সামান্য একটা চাঁটি মেরেছি কি মারিনি, হাঁউমাউ করে সে কী চিৎকার৷’

‘তারপর?’ প্রশ্ন করেন সেই ক্ষত্রিয় পুরুষ৷ পদ্মসম্ভবের কথা শুনে বেশ আমোদ বোধ করছিলেন তিনি৷

‘তারপর? হুমম...’ ভুরু কুঁচকে মনে করার চেষ্টা করেন পদ্মসম্ভব, ‘দুটোর মুণ্ডু ওড়ালাম, আর একটার সঙ্গে কী করেছি মনে নেই৷ তবে দুঃখের কথা, পালের গোদা হাত ছেড়ে পালিয়ে গেল।’

‘মাশাং-এর ব্যবস্থা পরে করা যাবে, আর্য৷ কিন্তু আমার শিষ্য কমলশীল কোথায়? কেমন আছে সে?’ আচার্য শান্তরক্ষিত দৃশ্যতই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।

‘তাঁকে আর এত অবধি আনা গেল না আচার্য৷ তিনি বড় কাহিল হয়ে পড়েছেন৷ তাঁকে কজঙ্গলে রেখে এসেছি, সিদ্ধাচার্য শবরবজ্রের কাছে৷’

‘কেমন আছে কমলশীল? তার কোনও ক্ষতি হয়নি তো?’

‘না, না, তিনি শারীরিকভাবে ঠিকই আছেন, মানসিকভাবে একটু...আসলে মাশাং তাঁকে বিশেষভাবে আপ্যায়নের ব্যবস্থা করছিলেন কিনা, তার বিবরণ শুনেই তিনি মানসিকভাবে একটু, মানে ইয়ে আর কী...সামান্য আহত হয়েছেন৷ অথচ বিচলিত হওয়ার কোনও কারণই ছিল না আচার্য৷ আমি তো সেই আপ্যায়নের বিবরণ শুনে বেশ আনন্দিত হই৷ কিন্তু আপনার শিষ্যটি এতই দুর্বলচিত্তের যে...’

‘আপ্যায়নের বিবরণ শুনতে পারি কি?’ সভ্যদের মধ্যে একজন বলেন৷

‘আরে সেসব শুনে তো আমারই ইচ্ছে করছিল ওদের হাতে বন্দি হতে, বুঝলেন মিত্র ঢেণ্ঢন৷ ছাং নামের তিব্বতী সুরা আর চমরী গাইয়ের মাংস দিয়ে আপ্যায়নের শুরু, বুঝলেন তো? অতঃপর এক সুন্দরী বারবণিতার সঙ্গে কিছু উত্তেজক মুহূর্ত কাটানোর সুযোগ...’

শুনেই বৌদ্ধ শ্রমণেরা সমবেতভাবে শিহরিত হলেন, ছিছিক্কারের শব্দে ভরে গেল সেই সভা৷ তথাগতের নামে স্বস্তিবাচন উচ্চারণ করলেন আচার্য শান্তরক্ষিত৷ মুচকি হাসলেন প্রৌঢ় ক্ষত্রিয়।

কলরব থেমে যাওয়ার পর সভায় উপস্থিত একমাত্র ভিক্ষুণীর শান্ত কণ্ঠস্বর শোনা গেল, ‘আর্য পদ্মসম্ভব দেখছি সুন্দরী বারবণিতার সঙ্গে উত্তেজক মুহূর্ত কাটানোর ব্যাপারে বড়োই ব্যগ্র হয়ে পড়েছেন!’

পদ্মসম্ভব প্রথমে লক্ষ করেননি ভিক্ষুণীটিকে৷ এবারে খুবই লজ্জিত হলেন তিনি, জিভ কেটে বললেন, ‘প্রব্রাজিকা মন্দর্ভাও উপস্থিত দেখছি৷ এহে। আমি অত্যন্ত লজ্জিত ও ক্ষমাপ্রার্থী আর্যা। প্রগলভতা মার্জনা করবেন৷’

মন্দর্ভার কমনীয় মুখখানি কিঞ্চিত রক্তবর্ণ হল৷ সেটা রাজকুমার পদ্মসম্ভবের সঙ্গে লক্ষ করলেন আরেকজনও৷

আচার্য শান্তরক্ষিত৷ রক্তের সম্পর্কে ভিক্ষুণী মন্দর্ভার জ্যেষ্ঠভ্রাতা তিনি!

আজ থেকে বেশ কয়েকমাস আগে এই রাজকুমারকে প্রথমবারের জন্য দেখেছেন মন্দর্ভা৷ নালন্দা মহাবিহারের বাইরে, গভীর অরণ্যের মধ্যে এক গোপন কুটীরে আয়োজন করা হয়েছিল এক মন্ত্রণাসভার৷ সেই সভায় রাজকুমার পদ্মসম্ভব এবং আচার্য শান্তরক্ষিতের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন তিনিও৷

সেই সভাতেই আচার্য শান্তরক্ষিত জানান যে, পোন পুরোহিতদের গোপন ভাণ্ডার থেকে দুটি অমূল্য সম্পদ চুরি করে আনার জন্যেই কমলশীলকে তিব্বত পাঠিয়েছেন তিনি৷ কমলশীল জানিয়েছেন যে তিনি সফল হলেও, তিব্বত থেকে পালিয়ে আসাটা খুবই বিপজ্জনক৷ চুরি টের পাওয়া মাত্র মাশাং এবং তার অনুগামী সামন্তরা খ্যাপা নেকড়ের মতো খুঁজে বেড়াবে তাঁকে৷ এখনও অবধি তিব্বতের সর্বত্র সম্রাটের শাসন চলে না, রাজধানীর বাইরে বেশিরভাগ অঞ্চলই সামন্তদের অধীনে৷ তাদের অনেকেই আবার পোন ধর্মের পুরোহিত, মাশাং-এর কাছের লোক৷ ফলে বাইরের সাহায্য ছাড়া এই জিনিস তিব্বতের বাইরে নিয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব৷ অথচ সে সাহায্য এত গোপনে হতে হবে যে, কেউ যেন এই অভিযোগ না তোলে—গৌড় বা বঙ্গের বৌদ্ধরা তিব্বতের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে নাক গলাচ্ছে৷

বিপদ বুঝে গোপনে পত্র পাঠিয়েছেন কমলশীল। জানিয়েছেন যে—সেই দৈবী অস্ত্রদুটি যদি তিব্বতের বাইরে বার করে নিয়ে যেতে হয়, তাহলে অন্য কোনও কৌশল অবলম্বন করতে হবে আচার্য শান্তরক্ষিতকে৷ সঙ্গে এ-ও জানিয়েছেন যে দৈবগতিতে তাঁর হাতে একটি আশ্চর্য পত্র এসে পৌঁছেছে। আচার্য শান্তরক্ষিতের সেই পত্রটি পাঠ করা আশু প্রয়োজন।

সেই সভাতেই আচার্য শান্তরক্ষিত রাজকুমার পদ্মসম্ভবকে অনুরোধ করেন এই কাজের দায়িত্ব নিতে৷ প্রস্তাব শোনামাত্র সহর্ষে সম্মত হন পদ্মসম্ভব। সব রকম ঝুঁকিপূর্ণ কাজে তাঁর বরাবরই প্রবল উৎসাহ৷

সেইদিন থেকে এই যুবককে দেখে নিজের সদ্য কৈশোর পেরোনো দেহে ও মনে এক আশ্চর্য চাঞ্চল্য অনুভব করেছেন মন্দর্ভা৷ গোপন মন্ত্রণাসভাটির পর থেকেই তাঁর নিভৃত স্বপ্নে বারবার হানা দিয়েছে এই আশ্চর্যবুদ্ধি পরিহাসপ্রিয় রাজপুত্র৷ সেই কিশোরীসুলভ চাঞ্চল্যের লক্ষণগুলিকে চিনে নিতে ভুল হয়নি তাঁর৷

ছিঃ ছিঃ ছিঃ, বৌদ্ধসঙ্ঘের ভিক্ষুণী তিনি৷ তাঁর কী এমন চাপল্য শোভা পায়?

তার পর থেকেই লজ্জায় ও পাপবোধে বেশ কিছুদিন আক্রান্ত ছিলেন মন্দর্ভা৷ নিজেকে বহুবার শাসন করেছেন তিনি, কঠোর সাধনায় ডুবিয়ে দিয়েছেন৷ নিজেকে বলেছেন তাঁর পক্ষে এমন জাগতিক বাসনায় অভিভূত হওয়া ঘোরতর পাপ৷

কিন্তু তবুও, তবুও যাবতীয় ঔচিত্যের কঠিন বাঁধন ভেঙে এই অনিন্দ্যসুন্দর রাজকুমারকে দেখামাত্র তাঁর তরুণী হৃদয় প্রদীপের মতো পুড়তে শুরু করে কেন? কেনই বা এঁর মুখে অন্য রমণীর কথা শুনে তাঁর হৃদয় সহসা ঈর্ষাজর্জর হয়ে পড়ে?

নিজেকে সংযত করলেন।

ইতিমধ্যে আচার্য শান্তরক্ষিত পদ্মসম্ভবকে তাঁর পাশেই যত্ন করে বসিয়েছেন৷ তারপর আচার্য প্রৌঢ় ক্ষত্রিয়পুরুষটির সঙ্গে পরিচয় করাচ্ছিলেন রাজপুত্র পদ্মসম্ভবকে৷

এই সময় সহসা খুলে গেল সভাগৃহের দরজা৷ ঝড়ের মতো সেখানে এসে দাঁড়ালেন এক দীপ্যমান পুরুষ৷ নবদুর্বাদলশ্যাম সেই পুরুষটি তাঁর আজানুচুম্বিত বাহুতে আর মায়া-ঢলোঢলো আয়ত চক্ষু দুটিতে যেন মর্ত্যধামে দ্বিতীয় বিষ্ণু৷ তাঁকে দেখেই সশ্রদ্ধায় উঠে দাঁড়ালেন সভায় উপস্থিত সকল সভ্য৷ আচার্য শান্তরক্ষিত কৃতাঞ্জলিপুটে প্রণত অভিবাদন জানালেন তাঁকে৷ উপস্থিত প্রত্যেকে করজোড়ে, অনিমেষ নয়নে দেখতে থাকলেন এই ঈশ্বরোপম মানুষটিকে৷

যদিও তিনি সেসব নিয়ে বিন্দুমাত্র ব্যগ্র ছিলেন না৷ সাগ্রহে প্রশ্ন করলে, ‘ফিরেছে কমলশীল? পেরেছে সে? তিব্বত থেকে সেই অতি প্রয়োজনীয় অস্ত্র দুটি নিয়ে আসতে পেরেছে? তাহলে কি চূড়ান্ত সংগ্রামের সময় এসে গেছে শান্তরক্ষিত?’

সশ্রদ্ধ ভঙ্গিতে উত্তর দিলেন আচার্য, ‘হ্যাঁ লোকেশ্বর, আপনার আশীর্বাদে সবই নির্বিঘ্নে সুসম্পন্ন হয়েছে৷ অনুগ্রহ করে আসন গ্রহণ করুন, প্রভু৷ আজকে আমাদের অভ্যুত্থানের শেষ পর্যায়টির পরিকল্পনার দিন৷ আমরা আজকের সভা সেই কারণেই আহ্বান করেছি৷’

তারপর সভার দিকে ফিরে আচার্য শান্তরক্ষিত শান্তকণ্ঠে বললেন, ‘যাঁর জন্যে আমরা উদগ্রীব হয়ে প্রতীক্ষা আগ্রহে অপেক্ষা করছিলাম, অবশেষে তিনি আমাদের মধ্যে উপস্থিত হয়েছেন৷ তাঁরই আদেশে, তাঁরই প্রদর্শিত পথে আমরা অত্যাচারী শাসকদের হাত থেকে আমাদের মাতৃভূমিকে স্বাধীন করার লক্ষ্যে ব্রতী হয়েছি৷’ এই বলে তিনি ফিরে তাকালেন সেই মহাপুরুষটির দিকে, তারপর ভক্তিনম্রস্বরে বললেন, ‘হে প্রভু মহাযোগী লোকেশ্বর মৎস্যেন্দ্রনাথ! আমাদের মতো অভাজনদের আপনিই পথ দেখান৷’

৭৪৯ খ্রিস্টাব্দ৷ নালন্দা মহাবিহার, পাটলিপুত্র, মগধ৷

‘এই ভাবে চলতে পারে না৷ আর কতদিন, আর কতদিন আমাদের এই অত্যাচার সহ্য করে যেতে হবে লোকেশ্বর মৎস্যেন্দ্র?’ ক্রুদ্ধস্বরে প্রশ্ন করলেন মহাযোগী কাহ্ন৷

কয়েকদিন আগে নিজের চোখে যে ধ্বংসলীলাটি দেখে এসেছেন, এইমাত্র সবার সামনে সে কাহিনি বলেছেন মৎস্যেন্দ্রনাথ৷ সভার পরিবেশ এখন অগ্নিগর্ভ৷ ক্ষোভে ও ক্রোধে ফুঁসছেন প্রতিটি সভ্য৷ স্থির বসে আছেন আচার্য শান্তরক্ষিত৷ সচরাচর যিনি সামান্য লঘু মেজাজে থাকেন সেই পদ্মসম্ভবও চুপচাপ৷ প্রৌঢ় ক্ষত্রিয় মেরুদণ্ড সোজা করে বসে আছেন, যেন আদেশমাত্রে যুদ্ধক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়তে প্রস্তুত৷

উঠে দাঁড়ালেন ভিক্ষুণী মন্দর্ভা! উত্তেজনায় সর্বাঙ্গ কাঁপছে তাঁর, ‘আচার্য, আপনি এখনও শান্ত হয়ে বসে আছেন? আপনি এখনও বলবেন অপেক্ষা করতে? এখনও বলবেন উপযুক্ত সময় আসেনি? এখনও বলবেন যে, হঠকারিতার ফল ভালো হয় না? অনুমতি দিন আচার্য, দীর্ঘদিন ধরে প্রান্তিক মানুষজনের মধ্যে, দেশের প্রাকৃতজনের মধ্যে আমরা গোপনে যে সংগঠন গড়ে তুলেছি তাদের বলি অস্ত্রধারণ করতে৷ ভেসে যাক, পুড়ে যাক, জ্বলে ছাই হয়ে যাক এই মৃত্যুভূমি৷’ জোরে জোরে শ্বাস ফেলছিলেন৷

উঠে দাঁড়ালেন অনেকেই, প্রত্যেকেই উত্তেজিত ও ক্রুদ্ধ৷ কোলাহলে কারও কথাই স্পষ্ট করে শোনা যাচ্ছিল না৷ এবার উঠে দাঁড়ালেন আচার্য শান্তরক্ষিত। দুহাত তুলে প্রত্যেককে শান্ত হতে বললেন৷

‘না, ভিক্ষুণী মন্দর্ভা!’ সহোদরাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘অপেক্ষার কাল শেষ হয়েছে, সেই জন্যেই এই সভা আহ্বান৷ যে উদ্দেশে আমি আমার প্রিয়শিষ্য কমলশীলকে সুদূর তিব্বতে পাঠিয়েছিলাম, তা সফল হয়েছে৷ চূড়ান্ত আঘাত হানবার এবার সময় এসেছে৷ আমাদের প্রস্তুত হতে হবে৷’

‘আচার্য, কোন উদ্দেশে কমলশীলকে তিব্বতে পাঠিয়েছিলেন—জানতে পারি?’ এই প্রথম কথা বললেন সেই ক্ষত্রিয়পুরুষ৷

কিছুক্ষণ মৌন থাকলেন আচার্য শান্তরক্ষিত৷ তারপর মুখ তুলে বললেন, ‘খুলেই বলি তাহলে৷

‘আপনারা জানেন যে, এই মুহূর্তে বঙ্গদেশের সিংহাসনে আসীন এক উন্মাদ ও কামলোলুপা রানি৷ যদিও প্রকৃতপক্ষে আসল ক্ষমতা প্রকাশচন্দ্র নামের সেই ঐন্দ্রজালিকটির হাতে৷ নির্বোধ রানিকে হাতের পুতুল সাজিয়ে এই রাজত্ব তিনিই ভোগ করছেন৷

এই প্রকাশচন্দ্র প্রেতসিদ্ধ পুরুষ৷ তিব্বতী পোন ধর্মের পুরোহিতদের কাছ থেকে জটিল সব পিশাচসাধনা শিখে এসেছেন তিনি৷

শোনা যায় মহাচীনের কোনও এক মন্ত্রসিদ্ধা রাজ্ঞীর কাছে বহুবিধ অলৌকিক শক্তি প্রাপ্ত হয়েছেন তিনি। এছাড়াও তাঁর কিছু নিজস্ব জন্মলব্ধ অতিপ্রাকৃত ক্ষমতাও আছে।

তিব্বতের রাজদরবারের সামন্তদের যে অংশটি তীব্রভাবে ভারত তথা বৌদ্ধ বিরোধী, তাদের সঙ্গে প্রকাশচন্দ্রের গোপন ষড় আছে৷ আজ থেকে নয়, প্রায় পঞ্চাশ-ষাট বছর ধরে৷’

‘পঞ্চাশ ষাট বছর ধরে?’ অত্যন্ত বিস্মিত হলেন সিদ্ধাচার্য ঢেণ্ঢন, ‘তাহলে তাঁর বয়স কত? তাঁকে দেখলে তো বৃদ্ধ বলে মনে হয় না!’

‘সেটাই তো আশ্চর্যের কথা মিত্র ঢেণ্ঢন! গণনা করে দেখলে আজ প্রকাশচন্দ্রের বয়স হওয়া উচিত একশোর কাছাকাছি৷ অথচ তাঁকে দেখলে তাঁর বয়স চল্লিশ বা পঞ্চাশ মনে হয়৷’

‘তোমরা যত সাধারণ ভাবছ, ইনি তত সাধারণ মানুষ নন৷’ গম্ভীরমুখে বললেন মৎস্যেন্দ্রনাথ৷ ‘শুধুমাত্র প্রেতসাধনায় এই ক্ষমতা জন্মায় না৷ অষ্ট-মহাসিদ্ধি ভিন্ন এই শক্তি অর্জনের ক্ষমতা কারও নেই৷ তার উপর ইনি দশ উপসিদ্ধিতে মহারথী৷ কোনো এক অজানা পৈশাচী প্রকরণে ইনি নিজের আয়ুবন্ধন করে রেখেছেন৷ জৈবিক নিয়মে এঁর বয়সও বাড়বে না আর অপঘাত মৃত্যু ব্যতীত এঁর মৃত্যুও হবে না৷’

সবাই চুপ করে রইলেন৷ পুনরায় বলতে শুরু করলেন মহাযোগী মৎস্যেন্দ্রনাথ, ‘যে রানিকে প্রকাশচন্দ্র রাজাসনে বসিয়েছেন, ইনিও কোনও সামান্য নারী নন৷ বেতালসিদ্ধ প্রকাশচন্দ্রের ভৈরবী ইনি, তাঁর পিশাচসাধনার সঙ্গিনী৷ এঁরও সাধনলব্ধ ক্ষমতা কম নয়৷

এই রানি যে শুধু অত্যন্ত কামলোলুপা তাই নয়৷ প্রতি পূর্ণিমা এবং অমাবস্যায় এই পিশাচীর একটি করে নতুন যুবক চাই, চাই তার রাতের কামতৃষ্ণা মেটাতে৷ আর তারপর যা হওয়ার তাই হয়৷’

‘কী হয়?’ প্রশ্ন করলেন পদ্মসম্ভব৷ ভ্রুকুটি করে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলেন মন্দর্ভা৷

ম্লান হাসলেন আচার্য, ‘পরের দিন সকালে সেই হতভাগ্যের মৃতদেহ পাওয়া যায় রাজপ্রাসাদের প্রাচীরের বাইরে৷’

কিন্তু—, প্রশ্ন করলেন পদ্মসম্ভব, ‘কিন্তু সব জেনেশুনেও যুবকরা বারবার কেন যায়?’

‘যায় রাজা হওয়ার লোভে৷’ তিক্তস্বরে বললেন ক্ষত্রিয় পুরুষটি, ‘রাজ্যে ঘোষণা করে দেওয়া হয়েছে, যে যুবক একটি পূর্ণ রাত্রি এই নারীকে রতিরমণে তৃপ্ত করে পরদিন প্রভাত অবধি জীবিত থাকবে, সেই হবে বঙ্গদেশের পরবর্তী সম্রাট। রানি আর রাজত্ব একসঙ্গে পাওয়ার লোভে কত শত যুবকের যে প্রাণ গেছে—তার কোনও ইয়ত্তা নেই৷

‘এই প্রকাশচন্দ্র দুটি ভয়াবহ সর্বনাশ করেছেন দেশের৷ প্রথমটি তো আপনারা দেখতেই পাচ্ছেন৷ দেশের এই অরাজক অবস্থাই তার প্রমাণ৷ ন্যায়ের শাসন বলে কোথাও আর কিছুই অবশিষ্ট নেই৷ বিশেষত দরিদ্র কৃষক এবং অন্ত্যজদের তো কথাই নেই৷ প্রায় না-খেয়ে বেঁচে আছে তারা৷ অপেক্ষাকৃত ধনী যারা, তাদের অবস্থাও সুবিধার নয়৷ গায়ের জোরই এখন ক্ষমতার উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে৷ যে যখন পারছে অন্যের সম্পত্তি গ্রাস করে নিচ্ছে৷’ বলতে থাকেন শান্তরক্ষিত, ‘আর দ্বিতীয়টি আরও সাঙ্ঘাতিক৷

‘পোন ধর্মের যাবতীয় ঘৃণ্য উপচার আর সাধনপদ্ধতি তিনি সদ্ধর্মের নামে, বিজ্ঞানবাদের নামে বৌদ্ধতন্ত্র বলে চালাচ্ছেন৷ এমন অদ্ভুত সব শাস্ত্র লিখেছেন যার বহিরঙ্গে মহাযানপন্থার কথা, অথচ আদতে সেগুলি পোন ধর্মের অশ্লীল সাধনপদ্ধতির আচারসংহিতা৷ এখন এমন হয়েছে যে, বঙ্গভূমির বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে তন্ত্রসাধনার নামে অসভ্য আর ইতর কাজকর্মের বাড়বাড়ন্ত৷ আশ্চর্য ধূর্ততার সঙ্গে পোন ধর্মের মূল সূত্রগুলিকে এদেশের তান্ত্রিক আচার বলে চালিয়ে দিয়েছে প্রকাশচন্দ্র ও তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গরা৷’

‘কিন্তু তাতে লাভ কী?’ বিস্মিত স্বরে প্রশ্ন করেন ভন্তে প্রজ্ঞারশ্মি৷

‘সদ্ধর্মকে দুর্বল করা, আবার কী!’ উত্তর দেন শান্তরক্ষিত৷

‘কিন্তু তাতেই বা প্রকাশচন্দ্রের সুবিধা কীসের?’ সংশয় যায় না প্রজ্ঞারশ্মির৷

‘ভুলে যেও না প্রজ্ঞারশ্মি, প্রকাশচন্দ্রকে এই দেশের রাজত্ব পাইয়ে দেওয়ার ব্যাপারে কিন্তু তিব্বতের সামন্তচক্রের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল৷ তখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন গার বংশের তিরিলিং৷ গত পঞ্চাশ ষাট বছর ধরেই তিব্বতে সম্রাট আর সামন্তদের মধ্যে ক্ষমতাদখলের বিবাদ চলছে৷ যেহেতু সামন্তচক্রের বেশিরভাগই পোন ধর্মাবলম্বী, তাই তিব্বতের সম্রাটরা আঁকড়ে ধরেছেন বৌদ্ধধর্ম৷ আরও ভালো করে বলতে গেলে— ভারতীয় বৌদ্ধধর্ম৷ এই সংগ্রাম যতটা ধর্মীয়, ততটাই রাজনৈতিকও বটে৷ এদেশের বৌদ্ধরা, বৌদ্ধপণ্ডিতরা চিরকালই তিব্বতের সম্রাটদের নৈতিক শক্তি যুগিয়ে এসেছেন৷ তাই বঙ্গভূমিতে সদ্ধর্মীদের নিয়ন্ত্রণ করা না-গেলে তিব্বতে সম্রাটদের দুর্বল করা যাচ্ছিল না৷’ একটানে এত কথা বলে চুপ করলেন শান্তরক্ষিত৷

‘তবে এই অরাজক অবস্থা আর বেশিদিন নেই৷ আমাদের অভ্যুত্থান এবার শেষ পর্যায়ের জন্য প্রস্তুত, বন্ধুরা৷ শুধুমাত্র দুটি জিনিসের অভাবে আমরা চূড়ান্ত সংগ্রামে নামতে পারছিলাম না, আদিনাথের অসীম অনুগ্রহে আজ সেই দুটিই আমাদের হাতে৷’ প্রসন্নস্বরে বললেন মৎস্যেন্দ্রনাথ৷

‘সে দুটি কোন বস্তু, লোকনাথ?’ প্রশ্ন করলেন মন্দর্ভা৷

‘তিব্বত থেকে যে দুটি বস্তু এত যত্ন করে নিয়ে এলাম তাদের কথাই বলছেন নিশ্চয়ই?’ বলতে বলতে পরনের অঙ্গবস্ত্রটির মধ্যে হাত ঢুকিয়ে একটি বড় চামড়ার বটুয়া বের করে এনে আচার্য শান্তরক্ষিতের হাতে দিলেন পদ্মসম্ভব৷ তারপর বললেন, ‘ভ্রাতা কমলশীল একটি পত্রও পাঠিয়েছেন আপনার উদ্দেশে। পত্রটি চৈনিক ভাষায় লিখিত। তবে তার তিব্বতীয় অনুবাদও আছে। রাজপুত্র ঠ্রিসং দেচেন স্বয়ং নিজের হাতে অনুবাদ করেছেন।’

ভ্রুকুঞ্চন করলেন শান্তরক্ষিত। এমন কী গোপনীয় পত্র যা কী না স্বয়ং রাজকুমারকে অনুবাদ করতে হয়, অন্য কাউকে দিয়ে করানো যায় না?

তিব্বতী লিপি স্বচ্ছন্দে পড়তে পারেন শান্তরক্ষিত। তিনি পত্রটি নিয়ে পোশাকের মধ্যে রাখলেন। তারপর বললেন, ‘হ্যাঁ, রাজকুমার৷ এই দুটি দৈবী অস্ত্র ছাড়া প্রাসাদের মধ্যে ঢুকে সেই রানিকে হত্যা করা অসম্ভব৷ তাঁকে ঘিরে থাকে বেতালসিদ্ধ প্রকাশচন্দ্র আর তার ঘনিষ্ট বৃত্ত৷ রানি নিজেও বিষশাস্ত্রে মহাকুশল৷’

‘বিষশাস্ত্রে মহাকুশল মানে? ইনি কি বিষ খাইয়ে মারেন নাকি?’ প্রশ্ন করেন পদ্মসম্ভব৷

কিছুক্ষণ চুপ থাকেন মৎস্যেন্দ্রনাথ৷ তারপর ধীরে ধীরে বলেন, ‘হ্যাঁ রাজপুত্র, চুম্বনবিষ৷ সে বিষের কোনও প্রতিষেধক আমাদের জানা নেই৷ আর সেই বিষকন্যার হাতছানি এড়ায় এমন পুরুষ এ জগৎসংসারে নেই৷’

সবাই চুপ করে গেল৷ ফিসফিসিয়ে প্রশ্ন করলেন পদ্মসম্ভব, ‘কেন প্রভু?’

‘কারণ তিনি মানুষ নন, আর্য৷ তিনি বেতালসিদ্ধ প্রকাশচন্দ্রের নিজের হাতে গড়া এক প্রেতিনীবিশেষ৷ অতি দুর্লভ বিষপিশাচ সাধনায় এই নাগিনীকে তিলে তিলে প্রস্তুত করেছেন প্রকাশচন্দ্র৷ চৌষট্টি কামকলায় মহাসিদ্ধা তিনি৷ অজগর যেমন অনায়াসে নির্বোধ ছাগশিশু উদরসাৎ করে, তেমন ভাবেই হতভাগ্য লোভী যুবকদের গ্রাস করেন এই রানি৷ রাত্রিভর নিরবচ্ছিন্ন কামকেলির পর হতভাগ্য যুবক যখন ভাবে—এই তো, আর তো কয়েকটি মুহূর্তমাত্র, তারপরেই সে বঙ্গদেশের একচ্ছত্রাধিপতি সম্রাট৷ আর ঠিক তখনই সেই রানি আবার কণ্ঠলগ্না হন তাঁর, দয়িতকে নিবিড় আলিঙ্গনে জড়িয়ে ধরেন...আর তারপর...’

‘তারপর কী, লোকেশ্বর?’ শ্বাস বন্ধ করে প্রশ্ন করেন পদ্মসম্ভব৷

‘তারপর সেই নাগিনী চুম্বনের ছলে শরীরে জমে থাকা সমস্ত পাপ, সমস্ত হিংসা, সমস্ত ক্রোধ সেই হতভাগ্যের শরীরে ঢেলে দেন৷’

নিস্তব্ধ সভা, সূঁচ পড়া নৈঃশব্দ্য৷

‘কিন্তু এই প্রকাশচন্দ্র যখন রাজত্ব দখলে চেষ্টা করছিলেন, তখন তাঁকে আটকাবার চেষ্টা করেনি কেউ?’ প্রশ্ন করলেন একজন গৌরবর্ণ তরুণ৷

‘হ্যাঁ মিত্র গোরক্ষ, করেছিলেন অনেকেই৷’ গম্ভীরমুখে বললেন আচার্য শান্তরক্ষিত,’ তবে তাঁদের মধ্যে একজনই সোচ্চার প্রতিবাদের মুখ হয়ে উঠেছিলেন৷ তিনি ছিলেন সেই সভার রাজপণ্ডিত এবং তৎকালীন বঙ্গসম্রাট রাজভটের ঘনিষ্ট বয়স্য৷ প্রখর জ্ঞানের অধিকারী সেই মানুষটি প্রাণপণ চেষ্টা করেছিলেন এই সর্বনাশ আটকানোর৷ তিনি অবশ্য শেষ পর্যন্ত সফল হননি।

তবে আমি মনে করি, যিনি এই বিষয়ে সবচেয়ে ভালো বলতে পারবেন তাঁকেই অনুরোধ করছি বিস্তারিতভাবে বলবার জন্য।’ এই পর্যন্ত বলে ক্ষত্রিয় পুরুষটির দিকে ফিরলেন আচার্য শান্তরক্ষিত, ‘আর্য বপ্যট, আপনিই এ ব্যাপারে যা বলার বলুন৷’

নামটি শোনামাত্র সভায় উপস্থিত সভ্যদের মধ্যে কৌতূহলের ঢেউ খেলে গেল৷ প্রতিটি মানুষ উদগ্রীব হয়ে চেয়ে রইলেন এই প্রৌঢ়ের দিকে৷

উঠে দাঁড়ালেন সেই মহাবলশালী প্রৌঢ় ক্ষত্রিয়৷ নম্রসুরে বললেন, ‘আচার্য আমার থেকে বয়সে ছোট হলে কী হবে, জ্ঞানে বয়োবৃদ্ধ বটে৷ ফলে তাঁর আদেশ শিরোধার্য৷ তবে যে কাহিনির কথা তিনি বলতে চেয়েছেন সে অনেকাল আগের কথা৷ আমি নিজে তখন দশ বছর বয়সি এক বালক মাত্র৷ তবে সেইদিন থেকে যে অপমানের বোঝা আমাকে সারা জীবন বয়ে চলতে হয়েছে তার তুলনা নেই৷’

‘আপনি কে?’ সটান প্রশ্ন করলেন পদ্মসম্ভব৷

এইবার ভিক্ষুণী মন্দর্ভার রাগত চক্ষু দেখে মনে হল যেন এই প্রগলভ রাজপুত্রকে এখনই চুলের মুঠি ধরে টেনে নিয়ে গিয়ে সুরধুনী গঙ্গায় বেশ ভালো করে চুবিয়ে আনতেন৷

‘আমি কে?’ কৌতুকস্বরে প্রতিপ্রশ্ন করলেন সেই ক্ষত্রিয়টি, ‘তাহলে শুনুন রাজকুমার, আমার নাম বপ্যট৷ আমি একজন যুদ্ধব্যবসায়ী৷ আমার পিতার নাম আচার্য দয়িতবিষ্ণু৷’

সভাস্থল স্তব্ধ৷ যোগী ঢেণ্ঢন বিস্মিতস্বরে প্রশ্ন করলেন, ‘দয়িতবিষ্ণু? মানে পণ্ডিতপ্রবর দয়িতবিষ্ণু? সর্ববিদ্যাবিশুদ্ধ দয়িতবিষ্ণু? খড়্গসম্রাট রাজভটের সেই কূটবুদ্ধি ব্রাহ্মণপুরুষ?’

‘হ্যাঁ মিত্র, তিনিই৷’ স্মিতহাস্যে উত্তর করলেন বপ্যট৷

‘কিন্তু তিনি...তিনি তো শাস্ত্রাধ্যায়ী ব্রাহ্মণ ছিলেন, আচার্য ছিলেন!’ উত্তেজনায় উঠে দাঁড়ান গোরক্ষ নামের গৌরবর্ণ তরুণটি, ‘তাঁর সন্তান কী করে ক্ষত্রিয় যুদ্ধব্যবসায়ী হয়?’

‘সেই কাহিনিটি খুলে বলার জন্যেই তো আমাকে এখানে ডাকা হয়েছে, মিত্র গোরক্ষ।’ বপ্যটের কণ্ঠ বড়ই শান্ত, ‘আজ থেকে প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে সম্রাট বলভটের রাজসভায় যে রহস্যসূত্র আমার পিতৃদেব বিছিয়ে দিয়ে এসেছিলেন, আজ আমি সেই সুতোগুলি যথাযথভাবে গুটিয়ে রাখতে এসেছি৷’

মহর্ষি মৎস্যেন্দ্রনাথের প্রিয়তম শিষ্য গোরক্ষনাথ বিভ্রান্তমুখে নিজের আসনে বসে পড়লেন৷ উৎসুক হয়ে রইলেন বাকি সভ্যরা৷

‘সম্রাট বলভটের সেই সভায় কী হয়েছিল, তার প্রতিটি খুঁটিনাটি আপনারা প্রত্যেকে জানেন৷ সভার সেই কাহিনি পল্লবিত হতে হতে এখন প্রায় রূপকথা হয়ে দাঁড়িয়েছে৷ আপনারাও জানেন—কোন অপবাদের বোঝা মাথায় দিয়ে আমার পিতৃদেবকে সেই রাজসভা থেকে বিতাড়িত করা হয়৷’

‘শুধু পণ্ডিত দয়িতবিষ্ণু কেন? সেই সভার পরপরই বিতাড়িত হন মহামাত্য বুদ্ধকীর্তি, তাঁকে নির্বাসিত করা হয় বঙ্গদেশের একদম দক্ষিণে, এক অস্বাস্থ্যকর পল্লীতে৷ পণ্ডিত দয়িতবিষ্ণুকে নিরাপদে বঙ্গদেশের সীমান্ত পার করে দিয়ে ফেরত আসার পথে গুপ্তঘাতকের হাতে নিহত হন সৈন্যাধ্যক্ষ আনন্দদত্ত৷ দণ্ডনায়ক বিশালকীর্তির প্রকাশ্যে মুণ্ডচ্ছেদ করা করা হয় দেশদ্রোহিতার অপরাধে৷’ বলতে বলতে কণ্ঠরোধ হয়ে গেল মহর্ষি মৎসেন্দ্রনাথের৷

সমগ্র সভাস্থল প্রস্তরস্তব্ধ৷

‘আপনারা এ-ও জানেন যে সেই সভায় আমার মা, পুণ্যশ্লোকা ভদ্রকল্যাণীদেবীর নামে খুবই অশ্লীল অভিযোগ তোলা হয়৷ বলা হয় যে, তিনি নাকি আমার পিতৃদেবের প্ররোচনায় সম্রাট রাজভটের অঙ্কশায়িনী হন৷ আমি সেই অবৈধ মিলনের ফল৷’

এ কথা বলার সময়েও কোনও অস্থিরতা প্রৌঢ় যোদ্ধাটির কণ্ঠে ফুটে ওঠে না। বোধহয় সারা জীবন ধরে প্রকাশ্যে বা ইঙ্গিতে এইসব কথা শুনতে তাঁকে আজ আর গ্লানি স্পর্শ করে না।

‘সে কাহিনিও তো আমাদের জানা, ক্ষত্রশ্রেষ্ঠ বপ্যট৷ আমরা এও জানি, যে আর্যা ভদ্রকল্যাণী আপনার গর্ভধারিণী নন৷ ফলে অসতীত্বের পাপ তাঁর ওপর অর্শায় না৷ তবে কে আপনার মাতা, ক্ষত্রশ্রেষ্ঠ বপ্যট? দয়া করে সে বিষয়ে কিছু আলোকপাত করুন।’ অনুরোধ আসে এক অত্যন্ত শান্ত ও ধীরস্বভাব সভ্যের কাছ হতে৷ হরিদ্রাভবর্ণ পুরুষটির নাম জালন্ধর৷

‘বলছি, মিত্র জালন্ধর৷ আজই এই রহস্যের উন্মোচনের হবে৷ অনেক লম্বা কাহিনি, আমি সংক্ষেপে বলছি৷’

‘আমার মা যখন গর্ভবতী হন, তার কিছুকাল আগে সম্রাট রাজভট বরেন্দ্রীতে আসেন৷ আপনারা নিশ্চয়ই জানেন যে রাজমাতা প্রভাবতীদেবী কৈবর্ত-প্রধানের মেয়ে ছিলেন৷ যদিও বরেন্দ্রী সম্রাটের রাজ্যের মধ্যে পড়ত না, তবুও তিনি কোনও এক বিশেষ রাজনৈতিক কারণে এসেছিলেন৷ সেই কারণ এতদিন পর জানবার আর কোনও উপায়ই নেই৷

‘সেখানে এক কৈবর্তকন্যার সঙ্গে সম্রাটের প্রণয় হয়৷ প্রায় মাসখানেক ধরে সেই ঘোর প্রণয়পর্ব পার করে সম্রাট রাজভট তাঁর রাজ্যে ফিরে যান, প্রতিশ্রুতি দিয়ে যান—শীঘ্রই তিনি ফিরে এসে সেই মেয়েটিকে স্ত্রীর মর্যাদা দিয়ে নিয়ে যাবেন রাজ-অন্তঃপুরে৷

‘সম্রাট রাজভট তখনই বিবাহিত, অসামান্য সুন্দরী তিব্বতরাজকান্তা তাঁর ঘরণী৷ বিবাহের পর শ্যালক চারুদত্তকে তিনি রাজসচিব পদে নিয়োগ করেছেন৷ স্ত্রী ও শ্যালকের প্রবল চাপে সম্রাট রাজভট পিছিয়ে এলেন তাঁর প্রতিশ্রুতি থেকে৷ দূত পাঠিয়ে তিনি সেই অভাগা কৈবর্তকন্যাকে জানিয়ে দিলেন যে, তিনি তাঁকে বিবাহ করতে পারছেন না৷’

সভার সবার ওপর একবার চোখ বুলিয়ে নিলেন বপ্যট, তারপর বলতে লাগলেন, ‘সম্রাটের দূত যখন বরেন্দ্রী পৌঁছয়, তখন সেই কৈবর্তকন্যা গর্ভবতী৷ কৈবর্তসমাজে এ নিয়ে বিপুল ক্ষোভ ও বিদ্রোহ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে৷ সে সংবাদ সম্রাটের কাছে পৌঁছতে দেরি হয়নি৷ তখন ত্রাতা হয়ে দাঁড়ান আমার পিতৃদেব৷ তাঁরই বুদ্ধিতে তখনকার মতো পরিস্থিতি সামলানো সম্ভব হয়৷’

‘কীভাবে?’ উদগ্রীব হয়ে প্রশ্ন করেন ভন্তে সিংহহনু৷

‘আমার মা ভদ্রকল্যাণীদেবীর পিতৃগৃহ ছিল বঙ্গভূমি আর বরেন্দ্রীর সীমান্তে, কুমারহট্ট বলে একটি বর্ধিষ্ণু গ্রামে৷ প্রসবের সময় আমার মা সেখানেই ছিলেন৷ অতি গোপনে সেই কৈবর্তকন্যাকে বরেন্দ্রী থেকে আমার মামার বাড়িতে আনা হয় এবং সেখানেই তাঁর সেবাযত্ন হয়৷

‘দৈবী অনুগ্রহে আমার মা এবং সেই অনামা কৈবর্ত রমণী একই দিনে সন্তান প্রসব করেন৷ ভাগ্যদোষে আমার মায়ের একটি মৃতসন্তান জন্মায়৷ আর কৈবর্ত রমণীটি একটি অতি সুস্থ ও সবল পুত্রসন্তানের জন্ম দেন৷’

‘কে সেই পুত্রসন্তান?’ রুদ্ধশ্বাসে প্রশ্ন করলেন ভিক্ষুণী মন্দর্ভা৷

‘সে আজ আপনাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে, আর্যা৷’ ম্লান হেসে জানালেন বপ্যট, ‘আমিই সেদিনের সেই বেঁচে থাকা শিশু৷ সম্রাট রাজভটের সন্তান আমি৷ তাঁরই ঔরসে, এই দেশের এক সাধারণ রমণীর গর্ভে আমার জন্ম৷’

সমস্ত সভাগৃহে অস্বাভাবিক নীরবতা৷ একমাত্র মৎস্যেন্দ্রনাথ ছাড়া বাকিরা প্রত্যেকে প্রায় নিঃশ্বাস বন্ধ করে কাহিনিটি পরিপাক করার চেষ্টা করছেন৷

‘আর্য বপ্যট, আপনার কাহিনিটি শুনলাম,’ অত্যন্ত গম্ভীরমুখে প্রশ্ন করেন পদ্মসম্ভব, যা একেবারেই তাঁর স্বভাববিরুদ্ধ, ‘শুধু একটি মাত্র প্রশ্নের উত্তর দিন আমাকে। আপনি তো সম্রাট রাজভটের সন্তান৷ তবুও বার বার আপনি আচার্য দয়িতবিষ্ণু এবং আর্যা ভদ্রকল্যাণীকেই নিজের পিতামাতা বলে উল্লেখ করছেন কেন?’

‘কারণ আমি মনে করি আমার আসল পিতা আচার্য দয়িতবিষ্ণু এবং মাতা আর্যা ভদ্রকল্যাণী, যাঁরা আমাকে অপার স্নেহ এবং ভালোবাসা দিয়ে মানুষ করেছেন৷ সম্রাট রাজভট কোনওদিন আমাকে তাঁর সন্তান হিসাবে স্বীকৃতি দেননি, আর আমার গর্ভধারিণীকে তো কোনওদিন চোখেই দেখলাম না৷ দয়িতবিষ্ণু বা ভদ্রকল্যাণী, কেউই কোনওদিন আমাকে অন্যের সন্তান বলে ভেদবিচার করেননি, নিজের সন্তানের মতো মানুষ করেছেন৷ তাঁদের আমার পিতামাতার সম্মান না দিলে যে মহাপাতকী হব!’

‘আপনি ধন্য, আর্য বপ্যট,’ সহর্ষে বলে উঠলেন পদ্মসম্ভব, ‘সেই গর্ভ ধন্য—যা আপনাকে নয়টি দীর্ঘ মাস ধারণ করেছিল; সেই স্তন্যসুধা ধন্য—যা আপনাকে জীবনদান করেছে৷ একজন নয়, দুই-দুইজন বঙ্গমায়ের কোল আলো করেছেন আপনি৷ আপনার মতো সৌভাগ্যবান আর কে আছেন, আর্য বপ্যট?’

‘সেই কৈবর্তকন্যার কী হল? কোথায় গেলেন তিনি?’ স্তব্ধতা ভঙ্গ করে প্রশ্ন করেন মন্দর্ভা৷

দীর্ঘশ্বাস ফেলেন বপ্যট, ‘জানি নে ভদ্রে৷ তাঁকে আমি কোনওদিনও দেখিনি৷ আমার জন্ম দিয়ে তিনি নিঃশব্দে মিশে গেছিলেন তাঁর সমাজে, লোকলজ্জার থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্যই নিশ্চয়ই৷ পিতা দয়িতবিষ্ণু যখন খড়্গ রাজসভা থেকে বিতাড়িত হয়ে বরেন্দ্রীতে ফিরে আসেন, তখন গোপনে অনেক বার তাঁর খোঁজ করেছিলেন৷ কিন্তু তখন তিনি মিলিয়ে গেছেন বিস্মৃতির অতলে৷ কেউই তাঁর সংবাদ দিতে পারেনি৷ শুধু এইটুকু জেনেছি যে, তাঁর নাম ছিল যশোধরা৷’

‘মিত্র বপ্যট, আপনার কি এখনও কৌতূহল আছে জানার জন্যে যে তিনি কোথায় আছেন? কী করছেন?’ প্রশ্ন করলেন মৎস্যেন্দ্রনাথ৷

‘নেই বললে মিথ্যা বলা হবে প্রভু৷ এককালে ছিল না৷ কিন্তু এখন এই প্রৌঢ়ত্বের দরজায় এসে মনে হচ্ছে—একবার যদি আমার গর্ভধারিণীর দেখা পেতাম, তাহলে বড় ভালো হতো৷ কৈশোরে বা যৌবনে ভারি অভিমান ছিল তাঁর ওপর৷ এখন আমার বয়স হয়েছে, আজ বুঝি, কোন পরিস্থিতিতে আমাকে ত্যাগ করতে তিনি বাধ্য হয়েছিলেন৷’

‘আজ আমি যদি আপনার গর্ভধারিণীর সঙ্গে আপনার দেখা করিয়ে দিই ক্ষত্রশ্রেষ্ঠ বপ্যট, তাহলে বিনিময়ে কী পুরস্কার আশা করতে পারি?’ সহাস্যে ও সকৌতুকে প্রশ্ন করলেন মৎস্যেন্দ্রনাথ৷

মুহূর্তে বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো কেঁপে উঠলেন বপ্যট৷ তাঁর কঠোর চোখ দুটিতে আশ্চর্য ব্যাকুলতা৷ রুদ্ধ স্বরে তিনি বলে উঠলেন, ‘কী বললেন লোকেশ্বর? অনুগ্রহ করে আবার বলুন! আপনি চেনেন আমার গর্ভধারিণীকে? তিনি বেঁচে আছেন? আপনি জানেন—তিনি কোথায় আছেন? কীভাবে আছেন?’

‘জানি আর্য বপ্যট৷ আমার থেকে ভালোভাবে আর কেউ জানে না৷’ স্থিরোদাত্ত স্বরে উত্তর করলেন মৎস্যেন্দ্রনাথ৷

‘আপনারা তো জানেন আমার জন্মবৃত্তান্ত৷’ শান্তস্বরে বলতে শুরু করেন মৎস্যেন্দ্রনাথ, ‘জন্মমুহূর্তেই পিতামাতা ত্যাগ করেন আমাকে৷ আমার কৈবর্ত ধাইমা’টি আমাকে লুকিয়ে নিয়ে পালিয়ে আসেন তাঁর নিজের গ্রামে৷ সেখানেই তিনি আমাকে সস্নেহে লালপালন করেন৷ আমার কাহিনিইও আপনার মতোই, মিত্র বপ্যট৷ আজ আমি যে শরীর নিয়ে আপনাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছি, সে শরীরের জন্ম দিয়েছেন একজন, কিন্তু মাতৃস্নেহধারায় পুষ্ট করেছেন অন্য কেউ৷ তাঁকে আমি আমার ঈশ্বরী জ্ঞান করি৷ শুনুন আর্য, আপনি যে হতভাগিনীর স্নেহচ্ছায়া থেকে জন্মাবধি বঞ্চিত, আদিনাথের অসীম অনুগ্রহে তিনিই আমার মাতা৷ আপনাকে হারিয়ে যে আক্ষেপ ছিল তাঁর, সেই দুঃখ ভুলতে আজীবন তাঁর বুভুক্ষু হৃদয়ের সমস্ত স্নেহ ও ভালোবাসা আমার ওপর ঢেলে দিয়েছেন তিনি৷ যে স্নেহসুধাধারা ন্যায্যত আপনার প্রাপ্য ছিল, আজীবন আমিই সেই ঝরনাধারায় স্নান করে এসেছি—হে ক্ষত্রপতি! আমরা একই মায়ের সন্তান!’ ধীর স্বরে বলছিলেন মৎস্যেন্দ্রনাথ, আবেগে তাঁর চোখ সজল হয়ে উঠেছিল৷

সভায় যেন একটা বিস্ময়, আনন্দ আর উল্লাসের বিস্ফোরণ ঘটে গেল৷ স্তম্ভিত ও বিহ্বলিত হয়ে উঠে দাঁড়ালেন অনেকেই৷ দুহাতে মুখখানি চাপা দিলেন ভিক্ষুণী মন্দর্ভা, মুক্তাবিন্দুর মতো দুফোঁটা অশ্রু ঝরে পড়ল তাঁর অনিন্দ্যসুন্দর আঁখিদুটি থেকে৷ দুই হাত মুষ্টিবদ্ধ করে নিজের মাথায় আঘাত করলেন পদ্মসম্ভব, আনন্দে, বিস্ময়ে জালন্ধরনাথের হাত চেপে ধরলেন ভন্তে সিংহরশ্মি৷ প্রায় উচ্চস্বরে চিৎকার করে উঠলেন কাহ্ন, ‘কী আশ্চর্য, কী আশ্চর্য! এ আমি কী শুনলাম! হা ঈশ্বর! এ কী লীলা তোমার৷’ সিদ্ধাচার্য ঢেণ্ঢন দু’হাত মাথার ওপর তুলে আনন্দে নাচতে লাগলেন৷ বিস্ময়বিমূঢ় শাক্যভদ্র বললেন, ‘ধন্য হল এই সঙ্ঘারাম, ধন্য হল এই মহাবিহারের পুণ্যমৃত্তিকা৷ ধন্য হলাম আমরা৷ এবার বুঝলাম যে তথাগত আমাদের সহায়, এই সংগ্রামে আমাদের জয় নিশ্চিত৷’

কোলাহল সামান্য কমে এলে আবার বলতে শুরু করলেন মৎস্যেন্দ্রনাথ, ‘এখন অনেক বয়স হয়েছে আমার মায়ের৷ প্রবল অসুস্থ তিনি, মৃত্যুশয্যায় শায়িত৷ আর খুব বেশিদিন তিনি বেঁচে থাকবেন না৷’ এই পর্যন্ত বলে থামলেন তিনি, তারপর আবার বলতে লাগলেন, ‘কয়েকদিন আগেই আমার মা তাঁর কাছে ডাকেন আমাকে৷ তিনি জানান যে ডাক এসেছে তাঁর, আর হয়তো কয়েকটা মাত্র দিনের অপেক্ষা৷ জীবনে যা পেয়েছেন আর যা পাননি—তা নিয়ে তাঁর মনে কোনও ক্ষোভ বা বেদনা নেই আর৷ নশ্বর জীবনের যাবতীয় চাওয়া-পাওয়ার ওপারে চলে গেছেন তিনি৷

‘শুধু একটি মাত্র অপূর্ণ ইচ্ছা রয়ে গেছে তাঁর জীবনে৷ সেটি পূর্ণ হলেই শান্তিতে চোখ বুজতে পারেন তিনি৷’

‘কী সেই ইচ্ছা, প্রভু?’ প্রশ্ন করলেন আচার্য শান্তরক্ষিত৷

‘সেই দিনই তিনি আমাকে জানান তাঁর প্রথম যৌবনের কাহিনি; জানান সম্রাট রাজভটের সঙ্গে তাঁর প্রণয়ের গল্প৷ আর্য বপ্যট, তিনি এখনও ভোলেননি তাঁর নাড়ীছেঁড়া রক্তপুত্তলিটিকে, তাঁর প্রথম সন্তানকে৷ তিনি এখনও মনে রেখেছেন আপনাকে৷ তিনি চান মৃত্যুর পূর্বে একবার তাঁর প্রথম সন্তানের মুখদর্শন করতে৷ এবার আপনি বলুন আর্য, আপনি কি সত্যই চান আপনার গর্ভধারিনীর সঙ্গে দেখা করতে?’

কোনও উত্তর করলেন না বপ্যট৷ তাঁর চক্ষু বেয়ে বন্যার মতো নেমে আসছিল চোখের জল৷ ভিজে যাচ্ছিল তাঁর কপাটবক্ষ।

‘তাহলে কথা দিন আর্য, যে মহা-অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা আমরা করেছি আপনি তার নেতৃত্বের দায়িত্ব নেবেন? আপনার শরীরে রয়েছে এই দেশের মাটি ও জলের ঘ্রাণ, রয়েছে এক মহান দেশপ্রেমিক রাজার জন্মবীজ৷ আপনার দেহ, মন, চৈতন্য পুষ্ট হয়েছে সর্ববিদ্যাবিশুদ্ধ পণ্ডিত দয়িতবিষ্ণুর ঘরে৷ আপনি নিজে স্বয়ং এই দেশের শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা, খণ্ডিতারাতি বপ্যট৷ হে বপ্যট, রাজভটবংশাদিপতিত সিংহবিক্রম বপ্যট, আমার অনুরোধ—এই অভিযানের নেতৃত্ব স্বীকার করুন৷ আপনিই বঙ্গভূমির যোগ্যতম সম্রাট৷’ বললেন মৎস্যেন্দ্রনাথ৷

সমগ্র সভা উৎকর্ণ হয়ে রইল৷ স্পষ্ট হয়ে গেল, লোকেশ্বর মৎস্যেন্দ্রনাথ কূটনীতির যে চালটি চেলেছেন—তার মার নেই৷ সেইজন্যেই বপ্যটকে এই সভায় ডেকে এনেছেন তিনি৷ অনেক যুদ্ধে সৈন্যদলের নেতৃত্ব করেছেন বপ্যট, এই দেশের সবচেয়ে কুশলী যুদ্ধব্যবসায়ী তিনি৷ তার ওপর তাঁর রক্তে সম্রাটের উত্তরাধিকার বইছে৷ এমন একজনকে প্রজারা পরবর্তী সম্রাট বলে যত সহজে মেনে নেবে, অন্য কাউকে তত সহজে মেনে নেবে না৷ বর্তমান শাসককে উৎখাত করা যত সহজ, ততটাই কঠিন এমন একজন পরবর্তী শাসককে নির্বাচিত করা, যিনি যোগ্য এবং যাঁর রাজসিংহাসনের ওপর নৈতিক অধিকার আছে৷

চারিদিকে একবার তাকিয়ে নিলেন বপ্যট৷ অভিজ্ঞ যুদ্ধব্যবসায়ী তিনি, তিনিও বুঝলেন যে এই আহ্বান এড়াবার উপায় তাঁর নেই৷ তাঁর জননী আর জন্মভূমি, দুজনেই আজ একই সঙ্গে তাঁর মুখের দিকে চেয়ে আছেন৷ কী করবেন বপ্যট?

চোখ বুজলেন তিনি৷ পিতা দয়িতবিষ্ণু বলে গিয়েছিলেন এই দিনটির কথা; সেই ক্রান্তদর্শী মানুষটি জানতেন যে, এইদিন আসবে, আসবেই৷

‘সেদিন তুমি কী সিদ্ধান্ত নেবে পুত্র?’ শেষশয্যায় শুয়ে যুবক পুত্রকে এই প্রশ্ন করেছিলেন তিনি, ‘দেশের সেবায় সবকিছু উৎসর্গ করবে, নাকি সমস্ত বিপদ থেকে গা বাঁচিয়ে নিরাপদে কাটিয়ে দেবে তোমার জীবন?’

কীই বা আর নিরাপদ আছে এ দেশে? আর অন্য কোন বিকল্প পথই বা থেকে গেছে তাঁর সামনে?

চোখ খুললেন বপ্যট, ধীরস্বরে বললেন, ‘লোকেশ্বর মৎস্যেন্দ্রনাথের অনুরোধ উপেক্ষা করব—এমন সাহস আমার নেই৷ আমার এই সামান্য জীবন যদি দেশের মানুষের সেবায় লাগে, তবে তার থেকে আনন্দের আর কীই বা হতে পারে৷ আমি এই অভ্যুত্থানের সমস্ত পরিকল্পনা ও চূড়ান্ত আঘাতের প্রস্তুতি নিজের হাতে সাজিয়ে দেব৷ রণাঙ্গনে সবার প্রথমে আমিই অধিষ্ঠিত থাকব৷ কিন্তু প্রত্যক্ষ সংগ্রামে ওই বেতালসিদ্ধ প্রকাশচন্দ্র আর কামুক রানিটিকে পরাস্ত করার মতো শারীরিক সামর্থ্য আমার শরীরে আর অবশিষ্ট নেই, হে নাথ৷ তবে তার জন্যে একজন উপযুক্ত অধিকারী প্রস্তুত আছে৷ বঙ্গদেশের সিংহাসনের ওপর তাঁর দাবি আমার থেকে কম কিছু নয়৷ আপনিও তাকে ভালোই চেনেন লোকেশ্বর৷’

মাথা নীচু করে কিছুক্ষণ কী যেন ভাবলেন মৎস্যেন্দ্রনাথ৷ তারপর বললেন, ‘বুঝতে পেরেছি বপ্যট, আপনি কার কথা বলছেন৷ তবে তাই হোক৷’

‘তিনি কে আর্য বপ্যট?’ বিস্মিতস্বরে প্রশ্ন করলেন পদ্মসম্ভব৷

‘তিনি কে?’ মৃদু হাসলেন মৎস্যেন্দ্রনাথ, ‘আসুন রাজকুমার, আমার সঙ্গে আসুন৷ তাঁর সঙ্গে আপনার পরিচয় করিয়ে দিই৷’ এই বলে বাকিদের উদ্দেশে তিনি বললেন, ‘তাহলে আপনারা এখানেই থাকুন৷ চূড়ান্ত সংগ্রামের রূপরেখা তৈরী হোক ভ্রাতঃ বপ্যটের নেতৃত্বে৷ রাজপুত্র, আপনি আমাকে অনুসরণ করুন৷’ এই বলে সভা থেকে অন্য পথে বেরিয়ে গেলেন দুজনে৷

৭৪৯ খ্রিস্টাব্দ| পাটলিপুত্রের নিকটবর্তী অরণ্য, মগধ|

রাত্রি শেষ হয়ে এসেছে প্রায়৷ গভীর অরণ্যের মধ্যে একটি সংকীর্ণ বনপথ ধরে হেঁটে যাচ্ছিলেন দুজনে৷

দক্ষিণ-পশ্চিম আকাশে পাণ্ডুর হয়ে এসেছে নবমীর চাঁদ৷ চারিদিকে ঝিঁঝি পোকার শব্দে কান পাতা দায়৷ থেকে থেকে রাতচরা পাখিদের তীক্ষ্ণ ডাক ভেসে আসছে৷ বাতাসের অনর্গল স্রোত গাছের গুঁড়িতে আর লতাপাতায় আটকে ঝিরিঝিরি আওয়াজ তুলছে৷ গাছের ফাঁকে ফাঁকে দেখা যাচ্ছে—এক আশ্চর্য মায়াবী নীলাভ আলো ঘিরে ধরেছে সারা আকাশ৷ আর আকাশ থেকে সেই আদিম নীলাভ অন্ধকার বুড়ো বুড়ো গাছেদের শরীর বেয়ে, পাতার ডগা থেকে টুপটুপ করে অবিরাম ঝরে পড়ছে ভিজে মাটিতে৷

সামনের মানুষটির স্বচ্ছন্দ হাঁটাচলা দেখে বোঝা যাচ্ছিল যে, এই অরণ্যপথে যাতায়াতের অভ্যাস আছে তাঁর৷ চুপচাপ প্রায় নিঃশব্দে হাঁটছিলেন তিনি৷ পেছনের যুবকটির আবার বেশিক্ষণ চুপ করে থাকার অভ্যেস নেই৷ তিনি ক্রমাগত উসখুস করছিলেন৷ শেষমেশ আর থাকতে না পেরে প্রশ্ন করলেন, ‘প্রভু, ভন্তে কমলশীলের কাছ থেকে যে দুটি জিনিস আপনাদের এনে দিলাম—ওগুলো কী?’

‘বিষ আছে হে, বিষ!’ সকৌতুকে উত্তর দিলেন মৎস্যেন্দ্রনাথ৷

‘বিষ? আমি কি ঠিক শুনলাম? বিষ? বিষ আনতে এত কষ্ট করলাম আমরা? দেশে বিষাক্ত উদ্ভিদ-লতা কি কম পড়েছে? নাকি বিষাক্ত সাপেরা সব দেশ ছেড়ে পালিয়েছে?’ বিস্মিতস্বরে প্রশ্ন করলেন পদ্মসম্ভব৷

একটু ভাবলেন মৎস্যেন্দ্রনাথ৷ তারপর যখন কথা বলতে শুরু করলেন, তখন পরিহাসের তরল চিহ্ন তাঁর কণ্ঠস্বর থেকে উধাও।

‘আজ আপনাকে একটি গূঢ় সংবাদ জানাই রাজকুমার। যে বিশাল পরিকল্পনা আমরা করেছি, আপনি তার অপরিহার্য অঙ্গ। তাই এই তথ্য জানা আপনার সবিশেষ প্রয়োজন।

‘এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এই প্রকাশচন্দ্র এবং পিশাচী রানি—দুজনেই অমিত ক্ষমতার অধিকারী। শুধু এদেশের নয়, তিব্বত থেকে শুরু করে এদিকে যবদ্বীপ আর ওদিকে সুদূর মরুপ্রতীচ্য অবধি প্রচলিত যাবতীয় মারণতন্ত্রে এই দুজন মহাসিদ্ধিলাভ করেছেন। তা নাহলে এক বিশাল জনজাতিকে এভাবে এতদিন ধরে একইসঙ্গে ভীত, সন্ত্রস্ত আর মোহগ্রস্ত করে রাখা সম্ভব নয়। অতি প্রাচীন, অতি তীব্র, আমাদের অজানা কোনও এক মারীকৌশল এই দুজনের আয়ত্তাধীন। সে কৌশল এতই বিচিত্র আর এতই অদ্ভুত যে, তার স্বরূপ আমারও বিশেষভাবে জানা নেই। শুধু এই দুজনই নয়, এদের ঘিরে থাকে যে বিশেষ ছয় জন মন্ত্রী, তারা প্রত্যেকেই কূটবুদ্ধিতে, যুদ্ধশাস্ত্রে আর পৈশাচীতন্ত্রে বিশেষ পারঙ্গম। এই ছয় জনকে সম্মুখসমরে পরাস্ত করা তাও সম্ভব রাজকুমার। কিন্তু প্রকাশচন্দ্র আর রানির জন্য প্রয়োজন এক বিশেষ দৈবী অস্ত্রের।’

‘এতে কি তাই-ই আছে লোকেশ্বর?’ ফিসফিস করে প্রশ্ন করলেন পদ্মসম্ভব।

‘হ্যাঁ আর্য। এতে দুটি বস্তু আছে। প্রথমটি এমন এক অব্যর্থ মারণাস্ত্র, যার কোনও রোধক বা বর্ম সমগ্র ভারতভূমিতে নেই। এর উৎস সেই সুদূর মহাচীনে। চীনদেশীয় বৌদ্ধ পণ্ডিতেরা এই অস্ত্র তুলে দিয়েছিলেন তিব্বতের পোন পুরোহিতদের হাতে। এর তুল্য মহাস্ত্র মানুষের ইতিহাসে আজ অবধি নির্মিত হয়নি।’

চুপ করে রইলেন পদ্মসম্ভব।

আবার বলতে থাকলেন মৎস্যেন্দ্রনাথ, ‘কিন্তু শুধু আক্রমণ নয়, প্রতি আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায়ও একইরকম প্রয়োজনীয়। এই নারীর বিশেষত্ব বিষপ্রয়োগে। এই বিষয়ে স্বয়ং প্রকাশচন্দ্রও এঁর কাছে শিশু। ভারতের ইতিহাসে এমন বিষকন্যা আর কখনও আসেনি, আর কখনও আসবেও না। এঁর প্রতি নিঃশ্বাসে বিষ, এঁর প্রতিটি রক্তবিন্দু কালকূটতুল্য মহাগরল। এমনকি এর স্পর্শমাত্রেই ক্ষুদ্র ইতর প্রাণীরা ইহলীলা সংবরণ করে, এত বিষ এই রানির শরীরে। একটি সবল পূর্ণবয়স্ক পুরুষকে হত্যা করতে এঁর একটিমাত্র প্রেমপূর্ণ চুম্বনই যথেষ্ট।’

‘সেই বিষের প্রতিষেধক কী আচার্য?’

‘আছে আর্য, আছে।’ ধীরে ধীরে বললেন মৎস্যেন্দ্রনাথ। আশ্চর্য মায়াবী আলো তাঁর দুচোখে৷ ‘এই তীব্র বিষের একটিমাত্র প্রতিষেধকই আছে এই মরজগতে।’

‘সেটি কী, লোকেশ্বর?’

‘নগাধিরাজ হিমালয়ের যে সর্বোচ্চ চূড়া, যাকে তিব্বতীয়রা সসাগরা ধরিত্রীর পর্বতমাতা বলে পূজা করে, তার কাছাকাছি এক অতি গোপন গুহা আছে। সাধারণের অতি অগম্য সেই স্থান, কেবলমাত্র একটি তিব্বতী পরিবারই বংশপরম্পরায় সেখানে পৌঁছবার পথ জানে। সেই গুহার মধ্যে আর কিছু নেই, শুধুমাত্র একটি অতিক্ষুদ্র তুষারস্তূপ আছে। প্রতি দশ বৎসর অন্তর বৈশাখী পূর্ণিমার মধ্যরাত্রে সেই স্তূপ থেকে একটিমাত্র লোহিতবর্ণ পুষ্পশোভিত লতা জন্মায়। এই লতার আশ্চর্য গুণ এই যে, পৃথিবীর যাবতীয় দৈবী বা ভৌতিক বিষ প্রতিরোধ করার আশ্চর্য ক্ষমতা আছে তার।’ এই বলে চুপ করেন মৎস্যেন্দ্রনাথ। তারপর ধীরস্বরে বলেন, ‘তবে সেই লতা আহরণ করার অসুবিধা একটিই।’

চুপ করে চেয়ে আছেন পদ্মসম্ভব।

‘যদি সেই অবস্থাতেই, মানে লতাটি সেই স্তূপে জায়মান থাকতে থাকতেই রাত্রি প্রভাত হয়, তবে লতাটির বিষনাশক ক্ষমতার লয় ঘটে। তবে যদি রাত্রের মধ্যেই লতাটিকে উৎপাটিত করে যথাবিহিত ভাবে সংরক্ষণ করা যায় তবে তার তুল্য বিষহর ক্ষমতা আর কোনও পার্থিব বস্তুর নেই।’

‘আমার আনা দ্বিতীয় বস্তুটি কি সেই বিষহর লতা?’ প্রশ্ন করলেন পদ্মসম্ভব।

উত্তর দিলেন না মৎস্যেন্দ্রনাথ, শুধু মৃদু হাসলেন। চুপ করে গেলেন পদ্মসম্ভব৷

সময় বহে যায়...। তারপর আবার প্রশ্ন করলেন পদ্মসম্ভব, ‘আরও একটি কথা ছিল প্রভু৷’

‘বলুন রাজকুমার৷’

‘আপনি তো শৈব, আদিনাথ মহাদেবের শিষ্য, কুলাগম শাস্ত্রের উদগাতা৷ আপনার শিষ্য এবং অনুগামীরাও হঠযোগসিদ্ধ, আগমপন্থী৷ এই বৌদ্ধ বজ্রযানী আচার্যদের সঙ্গে আপনাদের মতবিরোধ নেই?’

হেসে ফেললেন মৎস্যেন্দ্রনাথ, তারপর বললেন, ‘গীতায় শ্রীকৃষ্ণ কী বলেছেন রাজকুমার? “যে যথা মাং প্রপদ্যন্তে তাংস্তথৈব ভজাম্যহম৷” যে ব্যক্তি ঈশ্বরের যেভাবে উপাসনা করে, সে তাঁকে সেইভাবেই পায়৷ আমি কৌলমার্গ অনুসরণ করি, ওঁরা শূন্যতা ও উপায়ের উপাসক৷ মার্গ বহুতর হতে পারে, উপাস্য তো একই, রাজকুমার? তাছাড়া দেশের এই দুঃসময়ে এখন কী উপাসনাপদ্ধতি, ধর্মকৃত্য—এসব নিয়ে বাদানুবাদ করার সময়?’

‘তাই যদি হয়,’ প্রশ্ন শেষ হয় না পদ্মসম্ভবের, ‘আপনারা তো সাধক, যাবতীয় সাংসারিক মোহমায়ার ওপরে কেবলমাত্র ঈশ্বরচিন্তায় দিন কাটানোর কথা আপনাদের৷ তবে এই অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা, সংগঠন, নেতৃত্ব—এইসব কাজে নামার কী প্রয়োজন নাথ?’

দপ করে জ্বলে ওঠে মৎস্যেন্দ্রনাথের চোখদুটি, ‘কী বলছেন কী রাজকুমার! দেশ ছাড়া, দেশের মানুষের কল্যাণ ছাড়া ধর্ম বলে কিছু হয় নাকি? মানুষের চেয়ে বড় ঈশ্বর কে? দেশের থেকে বড় মন্দির কী? মানুষের চোখের জল মুছিয়ে দেওয়ার থেকে বড় পুণ্য আর কীসে হয়?’

চুপ করে রইলেন পদ্মসম্ভব। তাঁর চৈতন্যের ওপর থেকে ধীরে ধীরে একটি পর্দা উঠে যাচ্ছিল৷ উপলব্ধির এক নতুন স্তরে উপনীত হচ্ছিলেন তিনি৷

বলতেই থাকলেন মৎস্যেন্দ্রনাথ, ‘ধর্ম কী, রাজকুমার? যা ধারণ করে, স্থিতি আনে—তাই ধর্ম৷ এই দেশে যখনই সাধারণ মানুষ অত্যাচারিত হয়েছে, তখনই ধর্ম স্বয়ং আবির্ভূত হয়েছেন তাদের উদ্ধার করতে৷ আমার চারপাশের মানুষ অভুক্ত, অত্যাচারিত, নিপীড়িত, আর আমি পর্বতের গুহায় বসে খেচরীমুদ্রায় দিনাতিপাত করব? উষ্ণীষকমল প্রাপ্তির সাধনা করব? যে পারমার্থিক মোক্ষ একটি ক্ষুধার্ত শিশুরও পেট ভরাতে অক্ষম, সেই মোক্ষ নিয়ে আমি কী করব রাজকুমার? শুনুন রাজকুমার, আজ আপনাকে ধর্মের সারসত্য বলে দিই৷ জেনে রাখুন, দেশ ব্যতীত ধর্ম নেই, দেশের মাটি ব্যতীত মন্দির নেই, দেশের মানুষ ব্যতীত ঈশ্বর নেই৷’

অভিভূত হয়ে পড়ছিলেন পদ্মসম্ভব, ধর্ম আর স্বদেশ নিয়ে এভাবে কোনওদিনও ভাবেননি তিনি৷ শুধু জানেন যে, এই মানুষটি একজন শিবকল্প মহাযোগী, ত্রিকাণ্ড কুলাগমের প্রণেতা৷ ঈশ্বরকোটির এই মানুষটি দেশে বিদেশে অখণ্ড শ্রদ্ধার অধিকারী৷ তিনিও দেশের নিপীড়িত, দলিত মানুষদের নিয়ে এত ভাবেন? বুকের ভেতরটা তাঁর আর্দ্র হয়ে আসছিল৷

‘আপনি কখনও ঈশ্বরকে দেখেছেন, লোকেশ্বর?’ আচ্ছন্নস্বরে বললেন পদ্মসম্ভব৷

অকস্মাৎ ঘুরে দাঁড়ালেন মৎস্যেন্দ্রনাথ৷ স্থির চোখে চেয়ে রইলেন পদ্মসম্ভবের দিকে৷ থমকে গেলেন পদ্মসম্ভবও!

সেই গাঢ় আরণ্যক অন্ধকারে, সেই নীলজোছনার আলোয়, আকাশ থেকে গাছের পাতা বেয়ে নেমে আসা নক্ষত্রআলোকে, ঐশীস্বরে বলে উঠলেন মহাযোগী মৎস্যেন্দ্রনাথ, ‘হ্যাঁ রাজপুত্র, আমি ঈশ্বরকে দেখেছি৷ যেমন এই মুহূর্তে আপনাকে দেখছি, তেমনই৷ আপনি দেখতে চান?’

সারা গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল পদ্মসম্ভবের, মুখে কথা জোগাল না তাঁর৷

কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে সহসা ঘুরে দাঁড়িয়ে পথ চলতে লাগলেন মৎস্যেন্দ্রনাথ। আবার তাঁকে অনুসরণ করতে থাকলেন পদ্মসম্ভব৷ কিছুক্ষণ পর প্রশ্ন করলেন তিনি, ‘আর কতদূর, প্রভু?’

‘এই তো এসে গেছি।’ বনপথের শেষে একটুকরো পরিষ্কার জায়গায় এসে বললেন মৎস্যেন্দ্রনাথ৷

চারিদিকে তাকালেন পদ্মসম্ভব। বোঝাই যাচ্ছিল যে, অনেক চেষ্টায় অরণ্যের মধ্যে এই অংশটির সংস্কার করা হয়েছে৷ চতুর্দিকে গহীন বনাঞ্চল, আকাশে নবমীর চাঁদ। নির্মল আকাশ জুড়ে নেমে আসছে নীল জোছনা৷ সেই জায়গাটির একদম শেষে একটি মাটি ও পাথরের মন্দির৷ দূর হতেও স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে, সেই মন্দিরে প্রদীপের আলোয় আর গুগ্গলের ধোঁয়ায় আরতি চলছে৷ বেশ কয়েকজনের ছায়ার নড়াচড়াও লক্ষ করলেন পদ্মসম্ভব৷ লম্বা লম্বা পা ফেলে সেদিকেই যেতে থাকলেন মৎস্যেন্দ্র৷ দেখাদেখি তাঁকে অনুসরণ করলেন পদ্মসম্ভবও৷

কাছে গিয়ে পদ্মসম্ভব দেখলেন, মন্দিরের বাইরে গেরুয়া কাপড় পরিহিত এক সৌম্যমূর্তি বৌদ্ধ সন্ন্যাসী দাঁড়িয়ে, আর তাঁর পাশে একজন অতি বিশাল শরীরের পুরুষ৷ দেখামাত্র দুজনকে চিনলেন তিনি, একজন ভন্তে কমলশীল, আরেকজন পদ্মসম্ভবের অনেকদিনের পুরোনো বন্ধু, কজঙ্গলের শবরজাতির অধিনায়ক—সিদ্ধ শবরবজ্র৷

লোকেশ্বর মৎস্যেন্দ্রনাথকে দেখামাত্র শবরবজ্র এবং কমলশীল দুজনেই হাত জোড় করে প্রণাম করলেন৷ মৎস্যেন্দ্রনাথ আশীর্বাদ করার পর শবরবজ্র এগিয়ে এসে সজোরে আলিঙ্গন করলেন পদ্মসম্ভবকে, ‘সেই যে গেলে, তারপর থেকে তো তোমার দেখাই নেই হে! বলি আছ কেমন ভায়া?’

এই মানুষটিকে অত্যন্ত ভালোবাসেন পদ্মসম্ভব৷ সহজ মানুষ এবং সহজপথ তাঁর কাছে চিরকালই অতি প্রিয়৷ তিনিও গভীর শ্বাস নিয়ে কিছু বলতে যাবেন, এমন সময় সেই মন্দিরটির ভেতরের দিকে চোখ গেল পদ্মসম্ভবের৷ আবিষ্টের মতো সেদিকে এগিয়ে গেলেন তিনি৷

মন্দিরের ভেতরে কয়েকটি বিশাল আকারের মাটির প্রদীপ জ্বলছে, তাতেই সমস্ত মন্দির আলোকিত৷ অগুরু, গুগ্গল ও চন্দনের গন্ধে ভরে আছে পুরো মন্দির৷ সামনে দাউ দাউ করে জ্বলছে এক বিশাল যজ্ঞকুণ্ডের আগুন৷

মন্দিরের ভেতরে এক দেবীমূর্তি৷ তার সামনে কুশাসনে বসে রয়েছেন কয়েকজন ব্রাহ্মণ পুরোহিত৷ তাঁরা যজ্ঞকুণ্ডে আহুতি দিচ্ছেন, আর সেই যজ্ঞকুণ্ডের সামনে, দেবীমূর্তির দিকে মুখ করে, তাঁদের দিকে পিছন ফিরে বসে আছেন এক তরুণ৷

পদ্মসম্ভবের চোখ গেল সেই তরুণটির দিকে৷ তাঁর সরু কোমর, চওড়া কাঁধ এবং সুগঠিত পেশীর অহঙ্কারে স্পষ্ট যে, ইনি এক সিংহবিক্রম যোদ্ধৃপুরুষ৷ তাঁর ঘন ও কোঁকড়ানো চুলের ভার নেমে এসেছে কাঁধ অবধি৷ প্রদীপ ও যজ্ঞের আগুনের আলো ঠিকরে যাচ্ছিল তাঁর সুগঠিত দেহখানি থেকে৷ সুললিত এবং সুগম্ভীর স্বরে স্তব আবৃত্তি করছিলেন তিনি৷

পদ্মসম্ভবের দৃষ্টি গেল দেবীমূর্তির প্রতি৷ মুহূর্তে বিস্মিত হলেন। ‘প্রভু, ইনি কোন দেবী?’ তিনি প্রশ্ন করলেন মৎস্যেন্দ্রনাথকে, ‘এই দেবীর মূর্তি তো এই অঞ্চলে কখনও দেখিনি৷’

‘রাজপুত্র, ইনি দেবী চুন্দা৷ আমি ডাকি চণ্ডী নামে, দেবী গৌড়চণ্ডী৷ ইনি আদিশক্তি, সকল জগতের বীজধাত্রী, সকল লোকের ঈশ্বরী৷’

পদ্মসম্ভব কিছু উত্তর দেওয়ার আগেই সেই মহাবল তরুণটির গম্ভীর কণ্ঠে উচ্চারিত স্তবগান ভেসে আসে, ‘মধুকৈটভবিধ্বংসি বিধাতৃ-বরদে নমঃ...’

তারই মধ্যে আবিষ্টস্বরে বলতে থাকলেন মৎস্যেন্দ্রনাথ, ‘হে রাজকুমার, উত্তর গান্ধারের পার্বত্য অঞ্চলে পূজিতা এই দেবীকে আমি এই দেশে নিয়ে এসেছি৷ ইনি অতি রণদুর্মদ, ভীষণদর্শনা৷ কুমার, দেশের এই ক্রান্তিকালে এই দেবীর আশীর্বাদ আমাদের প্রয়োজন, ভীষণ প্রয়োজন৷’

আবার ভেসে এল সেই উদাত্ত প্রার্থনা,

‘ধুম্রনেত্রবধে দেবী সর্বকামার্থদায়িনী...’

সেই স্বরে বিন্দুমাত্র বিচলিত হলেন না মৎস্যেন্দ্রনাথ৷ তদগত চিত্তে তিনি বলে যেতে থাকলেন, ‘ইনি একাদশ রুদ্রকে ধারণ করেছেন, ধারণ করেছেন অষ্টবসু ও দ্বাদশ আদিত্যকে৷ ইনি স্বয়ং রুদ্রের ধনুতে জ্যা আরোপিত করেন...’

‘নিশুম্ভশুম্ভনির্ণাশি ত্রৈলোক্যশুভদে নমঃ...’

‘ইনি দেবতাদের শত্রুনাশ করেন৷ যজ্ঞের সকল হবি এঁর উদ্দেশেই অর্পিত হয়৷ ইনি সকল লোকের ঈশ্বরী, ধনদা, সুখদা, বরাভয়প্রদায়িনী৷’

‘স্তবদ্ভ্যো ভক্তিপূর্বং ত্বং চণ্ডিকে ব্যাধিনাশিনী...’

‘এই দেবীর শক্তিতেই জগৎসংসারের সকল প্রাণী দর্শন, শ্রবণ ও জীবনধারণ করে থাকে৷ অনুগত ভক্তকে ইনি ব্রহ্মজ্ঞান অর্পণ করেন৷’

‘চণ্ডিকে সততং যুদ্ধে, জয়ন্তি পাপনাশিনী...’

‘হে রাজপুত্র, আশ্রিতদের রক্ষা করার জন্যে ইনি সদাসর্বদা সংগ্রাম করেন৷ স্বর্গে ও মর্ত্যে ইনিই অন্তর্যামিনীরূপে পরিব্যাপ্তা...’

‘দেবী প্রচণ্ডদোর্দণ্ড দৈত্যদর্পনিসূদিনী...’

‘কিন্তু লোকনাথ, দেবীর বাহন এই পশু কেন? এই ভীষণ প্রাণীটিকে তো এই অঞ্চলে দেখা যায় না!’ বিস্মিতস্বরে প্রশ্ন করলেন পদ্মসম্ভব৷’

‘কৃষ্ণেন সংস্তুতে দেবী শশদ্ভক্ত্যা সদাম্বিকে...’

‘কারণ ইনি পার্বত্য দেবী, পর্বতদুহিতা৷ উত্তর হিমালয়ের সিংহবিক্রম পার্বত্য জনজাতির অধিষ্ঠাত্রী দেবী ইনি৷ তাই দেবীর বাহন এই পশুরাজ৷’

এক অদ্ভুত ভক্তিভাবে অন্তর পরিপূর্ণ হয়ে উঠছিল পদ্মসম্ভবের৷ আশ্চর্য ঐশ্বরিক শক্তিতে বলীয়ান তিনি৷ তবু তাঁর মাথা নত হয়ে আসছে এই বহুভুজা দেবীটির সামনে৷ দেবীর বিশাল দুই আয়তনয়ান দেখে তাঁর হৃদয়ে ভক্তি ও শ্রদ্ধা মিশিয়ে এক আশ্চর্য ভাবের উদয় হল৷ রুদ্ধস্বরে প্রশ্ন করলেন তিনি, ‘কে প্রভু, কে এই দেবী?’

দুই হাত জড়ো করে দেবীর উদ্দেশে তখন প্রণাম করছিলেন সেই বলশালী যুবকটি৷ পুজা শেষ হয়ে আসছিল তাঁর, ‘তারিণি দুর্গসংসার সাগরস্যাচলোদ্ভবে/ রূপং দেহি জয়ং দেহি যশো দেহি দ্বিষো জহি...’

‘আর্য পদ্মসম্ভব,’ উচ্চকিত আবেগে কণ্ঠস্বর কেঁপে কেঁপে যাচ্ছিল লোকেশ্বরের, ‘আমি মৎস্যেন্দ্রনাথ, আদিনাথ মহাদেবের পদাম্বুজ নিজবক্ষে ধারণ করে ঘোষণা করছি যে, আজ হতে ইনি গৌড়বঙ্গের অধিষ্ঠাত্রী দেবী৷ এই দেবী একদিন বঙ্গভূমির ঘরে ঘরে পূজিতা হবেন, এই দেশের সমস্ত দুঃখ, সমস্ত বেদনা, সমস্ত দুর্গতি নাশ করবেন ইনি৷ আজ আমি এই সিংহবাহিনী দেবীর নাম দিলাম...’

‘ইদং স্তোত্রং পঠিত্বা তু মহাস্তোত্রং পঠেন্নরঃ,

সপ্তশতীং সমারাধ্য বরমাপ্নোতি দুর্লভং৷৷’

‘দেবী দুর্গা!’

পূজা শেষ করে সেই যুবকটি তাঁদের দিকে ফিরলেন৷ তারপর মৎস্যেন্দ্রনাথকে দেখে দ্রুত নেমে এলেন তাঁদের কাছে, প্রণত হয়ে বিনীতভাবে বললেন ‘প্রণাম লোকনাথ৷’

‘আসুন রাজকুমার পদ্মসম্ভব’ উদাত্তস্বরে বললেন মৎস্যেন্দ্রনাথ, ‘আপনাকে বঙ্গভূমির ভাবী সম্রাটের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই, ‘এই বলে থামলেন তিনি। তারপর গভীর শ্বাস নিয়ে বললেন, ‘ইনিই সর্ববিদ্যাবিশুদ্ধ দয়িতবিষ্ণুর পৌত্র, খণ্ডিতারাতি বপ্যটের পুত্র, রাজভটবংশাদিপতিত মহাবীর গোপালদেব৷’

পূর্বদিগন্তে লালের ফোঁটা স্পষ্ট হচ্ছিল। কিছুপরেই সূর্যের প্রথম আলো এসে পড়ল মন্দিরের চৌকাঠে। হুঙ্কার দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন পুরোহিতের দল! পূজা সমাপ্ত হয়েছে তাঁদের। প্রধান পুরোহিত নেমে এলেন, যজ্ঞভস্ম আর রক্তচন্দনের টীকা পরিয়ে দিলেন প্রত্যেককে।

যুক্তকরে প্রশ্ন করলেন গোপালদেব, ‘অধীনের প্রতি এখন কী আদেশ, প্রভু?’

নবোদিত সূর্যের দিকে তাকিয়ে ছিলেন মৎস্যেন্দ্রনাথ। সূর্যের আলো তাঁর কপালের মধ্যভাগে জ্বলজ্বল করছিল রাজটীকার মতো। সেইদিকে তাকিয়ে চোখ বন্ধ করলেন তিনি, অস্ফুটে কিছু শুভ মন্ত্রোচ্চারণ করলেন। তারপর ধীরে ফিরলেন গোপালদেবের দিকে।

‘বৎস, চূড়ান্ত সংগ্রামের ক্ষেত্র প্রস্তুত। আজ, এই মুহূর্ত থেকে আমাদের যুদ্ধ শুরু হল। তুমি পূর্বদিকে যাত্রা করো। আজ হতে একপক্ষকাল পর তুমি কর্মান্তবাসকের উপকণ্ঠে পৌঁছবে। সেখানে কান্তিপ্রভ নামক এক ব্রাহ্মণের বাড়িতে আতিথ্য নিও। তিনি আমাদের গুপ্ত সহযোগী, এ ব্যাপারে আমাদের সাহায্য করতে অঙ্গীকারবদ্ধ। পরবর্তী আদেশ সেখানেই পাবে। ইতোমধ্যে আমরাও পৌঁছে যাব সেখানে। পরবর্তী কর্মপন্থা সেখানেই জানানো হবে তোমাকে।’

আভূমি প্রণত হতে যাচ্ছিলেন গোপালদেব, তাঁকে আটকালেন লোকেশ্বর মৎস্যেন্দ্রনাথ। জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘সাবধানে যাবে গোপালদেব৷ আর আমরা সবাই তাকিয়ে আছি তোমার দিকে। সদা সতর্ক থাকবে, নিজের ওপর বিশ্বাস রেখো। যে কঠিন কর্মভার তোমার ওপর ন্যস্ত হয়েছে, তার তুল্য গুরুদায়িত্ব খুব কম লোকই বহন করতে পারে। এককালে এই কঠিন কর্তব্য পালন করেছিলেন মহাবল শশাঙ্ক। তাঁর শাসনদণ্ডের নীচে বঙ্গভূমি প্রথমবারের জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। আজ এই ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন লাঞ্ছিত নিপীড়িত অহল্যাভূমি আবার একজন শশাঙ্কতুল্য মহাপরাক্রমশালী রাজার জন্য প্রতীক্ষা করছে। আজ বঙ্গদেশের রাজলক্ষ্মী সেই শাসনদণ্ড তোমার হাতে তুলে দিতে চান। দেশের আপামর জনসাধারণ তোমার সঙ্গে আছে গোপালদেব। মনে রেখো—তুমিই আমাদের শেষ এবং একমাত্র ভরসা।’

কৃতাঞ্জলিপুটে প্রণাম জানিয়ে মন্দিরের অন্যপ্রান্তে রাখা গোরুর গাড়িটির দিকে এগিয়ে গেলেন গোপালদেব। এখান থেকে কর্মান্তবাসক দীর্ঘ দুই সপ্তাহের যাত্রা। ধীরে ধীরে মৃদুমন্দ চালে বনের মধ্যে মিলিয়ে গেল গাড়িটি। সেদিকে তাকিয়ে রইলেন বাকিরা। তাঁদের শক্ত হয়ে আসা চোয়ালে, মুষ্টিবদ্ধ হাতে আর দু’চোখের তারায় ঝলসে উঠছিল মুক্তির আশা আর স্বাধীনতার সংকল্প।

এবার সময় শুরু প্রত্যক্ষ সংগ্রাম।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%