অভীক সরকার

আগন্তুকের দিকে তাকিয়ে ভ্রুকুঞ্চিত হল প্রহরীর৷ আসার কথা তো ঘনরাম আর তার ছোট ভাইয়ের। এই কুটিরটি তারাই পরিষ্কার করে দিয়ে যায় প্রতি সপ্তাহে একবার। তাদের বদলে এরা কারা? এদের তো কখনও দেখা যায়নি।
হরিকেলের এই নিরালা অরণ্যের মধ্যে মানুষের চলাচল এমনিতেই কম। একদিকে পূর্বসমুদ্র, আরেকদিকে ঘন তালতমাল-বনরাজিনীলা। অরণ্যের এই অংশে সাধারণ মানুষের চলাচলের ওপর কঠিন নিষেধাজ্ঞা আছে৷ কমন্তিবাসকের বিশেষ অনুমতিপত্র ছাড়া এখানে কারও আসা নিষিদ্ধ।
তার কারণ এখানে একটি পর্ণকুটিরে কঠিন প্রহরায় থাকেন বঙ্গদেশের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বন্দি।
আজ থেকে নয়, প্রায় অর্ধশতাব্দী আগে থেকে।
অরণ্য শেষ হলে বালুরাশি। তারপরে সমুদ্র। পূর্বসমুদ্রের লবণাক্ত বাতাস সদা সর্বদাই বয়ে যায় অরণ্যের মধ্য দিয়ে। স্থানটি অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর। শীতকাল ছাড়া স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়া। গ্রীষ্মকালে তো সাক্ষাৎ নরক। রোগব্যাধি লেগেই আছে।
এই অঞ্চলেই রয়েছে এক প্রশস্ত পর্ণকুটির। সেখানে থাকেন একজন নবতিপর বৃদ্ধ। শীর্ণ, শুষ্ক, এবং লোলঅস্থিচর্মসার এই মানুষটিকে দেখে বোঝা অসম্ভব যে আজ থেকে প্রায় অর্ধশতক পূর্বে এঁর অঙ্গুলিহেলনেই বঙ্গদেশের ভাগ্য নিয়ন্ত্রিত হতো।
রক্ষীটি গম্ভীরস্বরে প্রশ্ন করে, ‘কে তোমরা?’
আগন্তুক দুজনের কটিদেশে ছিন্ন অধোবাস, ঊর্ধ্বাঙ্গ অনাবৃত। ধূলিধূসরিত অঙ্গে, পিঙ্গল জটাজূটকেশে ক্লিষ্ট মুখায়বে দারিদ্র্যের ছাপ স্পষ্ট। প্রথমে যে দাঁড়িয়ে আছে তার শরীরখানি সবল এবং ঋজু। দ্বিতীয়জন অপেক্ষাকৃত খর্ব এবং দুর্বল। তার হাতে একটি বড় মাটির কলস।
প্রথমজন সঙ্কুচিত হয়ে বলল, ‘ক্ষমা করবেন আজ্ঞে, আজ আমাদের ঘর পরিষ্কার করার দিন কি না তাই এসেছি। ভিতরে যাওয়ার অনুমতি দিন প্রভু।’
রক্ষীটি একবার সতর্ক চোখে চারিদিক দেখে নিল। সমুদ্রের দিকে প্রহরা কিঞ্চিৎ শিথিল। স্বাভাবিক। গত অর্ধশতক ধরে ওই পথে কেউ এসে নামেনি এই হতভাগ্য বৃদ্ধকে উদ্ধার করার জন্য। সেইদিকের প্রহরীরা বালুতটে বিশ্রাম নিচ্ছে। অন্যদিকেও দূরে দূরে প্রহরারত বাকি প্রহরীরা মাটিতে বসে সামান্য ঝিমিয়ে নিচ্ছে। এতদিনের অনভ্যাস সবার আচরণেই শৈথিল্য এনে দিয়েছে।
‘সে তো ঘনরাম আর তার ভাই এসে করে দিয়ে যায়। তোরা কে?’
‘আজ্ঞে আমার নাম ঠগন, আর আমার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার নাম কাহ্ন।’
‘সে তো বুঝলাম। কিন্তু তোদের তো আসার কথা নয়।’
দুজনের মধ্যে যে অপেক্ষাকৃত বয়স্ক, সে কম্পিতহস্তে বলল, ‘আমরা ঘনরামের আত্মীয় আজ্ঞে। ওদের মা মরে গেল তো দুদিন আগে৷ তাই ঘনরাম বলল, ‘ওরে কাহ্ন, দেশের বাড়ি যেতে হবে। এই কাজটা করে দিস বাপধন।’
রক্ষীটি হুঙ্কার দিয়ে ওঠে, ‘রসিকতা হচ্ছে আমার সঙ্গে? এ কী সাধারণ ভদ্রাসন যে অমুকের পরিবর্তে তমুক কাজ করে দিয়ে যাবে? কোথায় এসেছিস জানিস তোরা?’
আগন্তুক দুজনে হতভম্বের মতো একে অন্যের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে।
‘তোদের এতদূর আসতে দিল কে? অরণ্যের বাইরে তো প্রহরীদল রয়েছে। তারা আটকায়নি তোদের?’
‘আটকেছিল প্রভু৷ তবে আদেশপত্র দেখে ছেড়ে দিল।’
‘আদেশপত্র দেখা।’
বয়স্কব্যক্তিটি নোংরা ধূলিধূসরিত অধোবাসের ভিতর থেকে একটি আদেশনামা বার করে দিল। রক্ষীটি সেটি পড়তে শুরু করলেন।
যতক্ষণ রক্ষীটি সেই আদেশনামা পড়ছিলেন, ততক্ষণ যদি কেউ দুই আগন্তুকের মুখের ভাব লক্ষ করত তাহলে দেখতে পেত অন্য চিত্র।
রক্ষীটি অত্যন্ত সতর্কচোখে আদেশপত্রটি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করছিল। তাদের ওপর আদেশ এসেছে প্রহরা আরও কঠিন করার জন্য। সারা দেশে নাকি রাজদ্রোহের প্রচেষ্টা চলছে। কাণাঘুষোয় শোনা যাচ্ছে এর পেছনে নাকি প্রশাসনের কয়েকজন পাকা মাথার লোক আছে।
আদেশপত্রটি ভালো করে পরীক্ষা করার পর নিশ্চিত হল রক্ষী। উচ্চৈঃস্বরে ডাকল, ‘কেতকদাস, এদের ভেতরে নিয়ে যাও।’
এক রক্ষী বাইরে বেরিয়ে এল। নিদ্রাতুর স্বরে বলল, ‘এরা আবার কারা?’
‘এরা কুটির পরিষ্কার করতে এসেছে।
‘সে তো ঘনরাম আর তার ভাই আসে। এরা কারা?’
প্রথম রক্ষীটি বিরক্তস্বরে বলল, ‘এরা ঘনরাম আর তার ভাইয়ের পরিবর্তে এসেছে। সঙ্গে প্রতীহারের স্বাক্ষরিত আদেশপত্রও এনেছে৷ অনর্থক প্রশ্ন না করে এদের ভেতরে নিয়ে যাও।’
কেতকদাস বিরস বদনে বলল, ‘চল রে, তোদের ঘরগুলো দেখিয়ে দিই। নাম কী তোদের?’
খর্বকায় আগন্তুক জড়োসড়ো হয়ে বলল, ‘আজ্ঞে আমার নাম ঠগন, আর ওর নাম কাহ্ন।’
এমন অদ্ভুত নাম শুনে কেতকদাস হো হো করে হেসে উঠল। ব্যঙ্গ করে বলল, ‘পিতামাতা নাম রেখেছিলেন বটে একখানা। তা ঠগন মহাশয়, হাতের ওই কলসটা নামিয়ে রেখে স্থির হয়ে দাঁড়ান তো। আপনাদের শারীরিক পরীক্ষাটুকু হয়ে যাক।’
দুজনের শরীরের বিভিন্ন স্থানে হাত দিয়ে যখন লুকোনো অস্ত্র বা আপত্তিকর কিছুই পাওয়া গেল না তখন কেতকদাসের নজর গেল কলসটার দিকে।
‘কী আছে ওতে?’
‘আজ্ঞে কিঞ্চিৎ মৈরেয় আছে। ঘর পরিষ্কার অত্যন্ত পরিশ্রমের কাজ কি না। তাই ভাবছিলাম কাজ শেষ হলে দুই ভাই মিলে একটু মৈরেয় পান করব। এই আর কি?’
রক্ষীদুজনের চোখে চোখে কথা হয়ে গেল। কেতকদাস গম্ভীরস্বরে বলল, ‘তোরা জানিস, এখানে সুরা নিয়ে আসা কত গর্হিত অপরাধ?’
‘না তো প্রভু।’
অন্য রক্ষীটি বলল, ‘জানিস, এর জন্য তোদের কারাবাস হতে পারে?’
‘অথবা সপরিবারে নির্বাসন।’
‘এমনকী প্রাণদণ্ড হওয়াও বিচিত্র নয়!’
আগন্তুক দুজনের চোখেমুখে বিচিত্র ছায়া খেলে গেল। কাহ্ন বলল, ‘ভুল হয়ে গেছে প্রভু। অপরাধ মার্জনা করে দিন।’
‘ভুল?’ দুই রক্ষী একত্রে গর্জে ওঠে, ‘এই গর্হিত অপরাধের মার্জনা? ওসব ভুলে যা পামর। বরং মুণ্ডচ্ছেদ বা শূলারোহন, কোনটা তোদের পছন্দ সেটা বেছে নে।’
হাউ-হাউ করে কেঁদে ওঠে ঠগন, ‘হায়-হায়, না জেনে কী ভুল করে ফেললাম। ক্ষমা করুন প্রভু, ক্ষমা৷ এই কলস আমি এই মুহূর্তেই ভেঙে ফেলছি।’
প্রথম রক্ষী হাঁ-হাঁ করে ওঠে, ‘আরে না না, একদম না। ওসব ভেঙে ফেলার চিন্তা মাথাতেও যেন না আসে। ব্যাপারটা বিস্তারিত ভাবে পর্যালোচনা করে দেখার জন্য ওটা আমাদের নিয়ে নিতে হবে যে। নইলে তোদের অপরাধ প্রমাণ করব কী করে?
‘দয়া করুন প্রভু। কিছু একটা উপায় বার করুন৷ যাতে গরিবের প্রাণ রক্ষা হয়।’
‘আহ, গোল করিসনি। ব্যাপারটা ভেবে দেখতে দে। ভায়া কেতকদাস, দুখানি পাত্র জোগাড় করে আনো দেখি। আমার কেমন যেন মনে পড়ছে, সুরার স্বাদ তেমন উৎকৃষ্ট হলে অল্প শাস্তির ওপর দিয়ে নিষ্কৃতি পাওয়ার একটা উপায় বোধহয় আছে।’
ইতস্তত করে কাহ্ন নামের লোকটি, ‘আপনারা কি এখন এই মদিরা পান করবেন প্রভু?’
‘আহা, ওকে পান করা বলে না। বলে পর্যালোচনা। বুঝেছিস?’
‘বুঝেছি প্রভু।’
‘কী বুঝলি?’
‘আজ্ঞে...’
‘পর্যালোচনা। এই তো ঠিক ঠিক বুঝে ফেলেছিস।’
‘তা, বলছিলাম কি প্রভু, এই পর্যালোচনা না কী একটা বললেন, তারপর কি কিছু আশা থাকলেও থাকতে পারে?’
‘সেটা অবশ্য নির্ভর করছে সুরার উৎকৃষ্টতার উপর।’
‘মানে দেশের বিধান বাঁচিয়ে...’
‘আহা, বিধান থাকলে তার প্র, পরা, অপ, সম, উপ, এসবও তো আছে। মেলা গোল করিসনি, ব্যাপারটা আমাদের ভেবে দেখতে দে।’
ঠগন ভয়ে ভয়ে বলল, ‘আরও একটি কলসি সঙ্গে রয়েছে প্রভু। কিছু দূরে রেখে এসেছি। আপনারা অনুমতি করলে বিস্তারিত পর্যালোচনার জন্য সেটাও নিয়ে আসতে পারি।’
প্রথম রক্ষী চাপা উল্লাসের সঙ্গে বলল, ‘বটে? নিয়ে আয় দেখি। এক কলসির বদলে দু’কলসি উৎকৃষ্ট সুরায় অপরাধ অর্ধেক হয়ে যায় বলেই তো মনে হচ্ছে?’
কেতকদাস বলল, ‘সে তো বটেই।’
ঠগন ভয়ে ভয়ে বলল, ‘আর আরও চার কলসি সুরায়?’
রক্ষী দুইজন স্থির চোখে তাকিয়ে রইল।
কাহ্ন ইতস্তত করে বলল, ‘অরণ্যের বাইরে আমাদের গরুর গাড়িটি রেখে এসেছি প্রভু। ভেবেছিলাম কাজ শেষ হলে বস্তিতে ফিরে বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে বসে একটু, ওই আর কি...পর্যালোচনা।’
প্রথম রক্ষী গম্ভীরস্বরে বলল, ‘ভাই কেতকদাস।’
‘বলো ভাই।’
‘আরও চার কলসি সুরায়?’
‘অপরাধ সম্পূর্ণ রূপে নির্মূল হয়।’
‘তাহলে আপাতত কিংকর্তব্যম?’
কেতকদাস তার হাতের ভল্ল দিয়ে ঠগনের পেটে একটি খোঁচা মেরে বলল, ‘গাড়িটা আমরাই এখানে নিয়ে আসছি, বুঝলি। আর তুই আপাতত আমাদের এই সুরা পর্যালোচনার কাজে একটু সাহায্য কর। এই কাহ্ন না কে, সেই বরং ঘর পরিষ্কারের পুরো কাজটা করুক। আমরা বাকি রক্ষীদের ডেকে আনি। পর্যালোচনা কি আর যেমন তেমন ব্যাপার রে?’
দুজনেই শশব্যস্ত হয়ে বেরিয়ে গেল বাকিদের ডেকে আনার জন্য। চারিদিক ফাঁকা দেখে সিদ্ধ ঠগনপা নিম্নস্বরে প্রশ্ন করলেন, ‘লোকেশ্বর মিথ্যা আদেশপত্রটি কোথা থেকে পেলেন? আশ্চর্য কাণ্ড? এমন চমৎকার নকল তো আমিও করতে পারি না।’
আচার্য কাহ্নপা চাপাস্বরে বললেন, ‘মিথ্যা কেন হবে ভাই? এই আদেশনামা সর্বাংশে সত্য।’
ঠগনপা সপ্রশ্নচোখে তাকালেন। কাহ্নপা একচোখ টিপে বললেন, ‘হরিকেলের মহামাত্য জয়নাথ আমাদের সহায়, আগেও একবার বলেছি তোমাকে। তোমার বোধহয় স্মরণে নেই।’
‘কিন্তু এই বৃদ্ধ’র কাছে এত ঝুঁকি নিয়ে আসার কারণ কী ভ্রাতা?’
‘আছে আছে। কাজ শেষ হোক। যেতে যেতে বলব। জানো তো চূড়ান্ত আঘাতের আগে শত্রুর গোপন, দুর্বলতম স্থানগুলির ব্যাপারে সব তথ্য একত্র করতে হয়।’
‘কিন্তু ইনি তো...’
‘শত্রুর শত্রু আমার বন্ধু, এই আপ্তবাক্যে বিশ্বাস রাখো তো ভায়া! আরও জেনে রাখো, যদি ঘনিষ্ঠতম বন্ধু, পাপের ভাগীদার, শত্রু হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে তার মতো ক্ষতি আর কেউ করতে পারে না।’
‘কিন্তু ইনি যে আমাদের সহায়তা করবেন তার নিশ্চয়তা কী?’
‘নেই। কোনও নিশ্চয়তা নেই। সেই জন্যেই তো লোকেশ্বর তোমাকে আমাকে পাঠিয়েছেন এই কাজে। আমাদের সাফল্যের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে ভাই। দেখো যেন কোনও ভুলচুক না হয়।’
ততক্ষণে উৎসাহী রক্ষীদের একাংশ এগিয়ে এসেছে। তাদের দুজন ঠগনপা’কে নিয়ে বেরিয়ে গেল মৈরেয়কলসপূর্ণ গরুর গাড়ির সন্ধানে। কেতকদাস কাহ্নকে ভেতরে নিয়ে গেলেন।
অন্ধকার ঘর। ঘরের ঠিক মধ্যস্থানে একটি ত্রিপদী। তার ওপর একটি দীপ জ্বলছে। দীপটিকে ঘিরে বেশ কয়েকজন পুরুষ বসে আছেন। তাদের কারও মুখ স্পষ্ট দেখা না গেলেও পোশাকে, অলঙ্কারে এবং ব্যক্তিত্বে বোঝা যায় যে এঁরা কেউ সাধারণ নন।
স্থানটি জাহোরের এক পরিত্যক্ত প্রাসাদ। এককালে এখানে এক সম্পন্ন ভূস্বামী বাস করতেন। পার্শ্ববর্তী রাজ্য সমতটের মহাপ্রতাপশালী সামন্ত অনন্তঘোষের আক্রমণে তাঁর রাজত্ব ছারেখারে যায়। ভূস্বামীটি সপুত্র নিহত হন। তাঁর স্ত্রী এবং পুত্রবধূ নিরুদ্দেশ হয়ে যান। প্রাসাদটি অগ্নিসংযোগে ধ্বংস করা হয়।
সেই পরিত্যক্ত, ভগ্নস্তূপ প্রাসাদে বহুদিন পরে আবার দীপালোক জ্বলে উঠেছে। তবে সেই দীপালোক গৃহস্থালীর আনন্দের নয়, বরং গুপ্ত ষড়যন্ত্রের।
ঘরটির গবাক্ষ অস্থায়ী বস্ত্রে ঢাকা। প্রাসাদের বিভিন্ন স্থানে সতর্ক প্রহরা। অচেনা কাউকে এদিকে আসতে দেখলেই পাখির শিসের শব্দে জানান দেওয়া হবে।
প্রথমে কথা বললেন এক প্রৌঢ় পুরুষ, ‘মহর্ষি, উপস্থিত অভ্যাগতদের আজকের এই সভার আহ্বানের উদ্দেশ্য জানানো হোক।’
উঠে দাঁড়ালেন মৎস্যেন্দ্রনাথ, ‘উপস্থিত মহামান্য সামন্তবর্গ এবং গৌড়নরেশ জয়ন্তকে ধন্যবাদ জানাই এই সভায় উপস্থিত হওয়ার জন্য। আপনারা প্রত্যেকেই শক্তিশালী, প্রভাবশালী এবং কৃতবিদ্যপুরুষ। প্রত্যেকেই স্বরাজ্যে সম্রাট। আপনাদের মধ্যে যে কেউ এই সভার আহ্বায়ক হতে পারতেন। তা সত্বেও এই পরিত্যক্ত প্রাসাদে এই সভা আহ্বান করার পেছনে তিনটি প্রধান উদ্দেশ্য আছে। প্রথমত, আমরা যে মহতী ধর্মযুদ্ধে ব্রতী হতে চলেছি, নিরপেক্ষতা তার প্রধান স্তম্ভ। এই যুদ্ধ কোনও একক ভূস্বামীর, কোনও একক সামন্তের যুদ্ধ নয়। এই যুদ্ধের উদ্দেশ্য রাজ্যলিপ্সা নয়, পরস্বাপহরণ নয়, পররাজ্যগ্রাস নয়। আমাদের মাতৃভূমি আজ যে কুৎসিত অপশাসনের করালগ্রাসে পতিত হয়েছে তার থেকে উদ্ধার পাওয়াই এই ধর্মযুদ্ধের উদ্দেশ্য। এ কারও একক প্রচেষ্টায় সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন প্রত্যেকের সম্মিলিত অংশগ্রহণ। তাই এই পরিত্যক্ত প্রাসাদটি নির্বাচিত করা হয়েছে, যা এখানে উপস্থিত সামন্ত ভূস্বামীদের কারও একক অধীনস্থ নয়।
দ্বিতীয়ত, গোপনীয়তা। ব্যক্তিগতভাবে আমরা সবাই প্রকাশচন্দ্র এবং তাঁর ছয় সহযোগীর বিচিত্র সব কূটকৌশলের ব্যাপারে সম্যকরূপে জানি। আপনাদের ব্যাপারে সম্পূর্ণ নিঃসন্দেহ হয়েই এখানে আপনাদের আহ্বান করা হয়েছে। কিন্তু আপনাদের প্রাসাদের বা সভার কারা কারা যে চন্দ্রবংশের গুপ্তচর সে বোঝা অসাধ্য। তাই আপনাদের কোনও পূর্বাভাস না দিয়ে এখানে আহ্বান করেছি। জানবেন, এই মুহূর্তে আপনাদের প্রাসাদের প্রতিটি প্রাচীরও কর্ণময়।
তৃতীয়ত, এই পরিত্যক্ত প্রাসাদ প্রতিমুহূর্তে আমাদের মনে করিয়ে দেবে সমগ্র বঙ্গদেশ জুড়ে এই শতবৎসরব্যাপী মাৎস্যন্যায় কী অবিশ্বাস্য অরাজকতার জন্ম দিয়েছে। মনে রাখবেন, আজ যদি আমরা একত্র হয়ে এই অত্যাচারী রানির শাসন উৎখাত না করি, কাল এই অবস্থা আপনাদেরও হতে পারে।’
মৎস্যেন্দ্রনাথ চুপ করলেন। অন্য এক সামন্ত প্রশ্ন করলেন, ‘আমাদের উদ্দেশ্য এক বটে। তবে আমার কিছু জিজ্ঞাস্য আছে।’
‘বলুন মহাসামন্ত ধর্মসেন।’
‘মহর্ষি, আপনাকে আমরা একজন ধর্মপুরুষ বলে শ্রদ্ধা করি। কিন্তু রাজনীতির অঙ্গনে আপনি এলেন কেন?’
‘কারণ ধর্মই জাতির মেরুদণ্ড, তাই। আর জাতির স্বার্থদর্শনের নামই তো রাজনীতি। তাই আজ যখন বাঙালি জাতি এই কুশাসনের সম্মুখীন হয়ে বিলুপ্তপ্রায়, তখন অধিকারভেদে আমাদের প্রত্যেককে একত্রিত হতেই হবে। যদি দেশই না থাকে, জাতিই না থাকে, তাহলে ধর্ম নিয়ে করব কী?’
‘আপনি কী বলতে চাইছেন লোকেশ্বর? এই সময়ে আমাদের ধর্মাশ্রয়ী হওয়া উচিত? যখন প্রকাশচন্দ্র আরও একটি বহুল জনপ্রিয় ধর্মের অবতারণা করেছেন এই বঙ্গে, তার জনপ্রিয়তা ক্রমেই ঊর্ধ্বমুখী। আপনি কি ধর্মে ধর্মে বিভেদ চাইছেন?’
অন্ধকারের মধ্যেও মৎস্যেন্দ্রনাথের চক্ষুদুটি জ্বলন্ত অঙ্গারের মতো জ্বলে উঠল। ‘ধর্মে ধর্মে বিভেদ বলবেন না মহামাত্য জয়নাথ। বিভেদ ধর্মে ধর্মে হয় না, ধর্মে অধর্মে হয়। ধর্মের নামে অনিয়ন্ত্রিত মদ্যপান, উন্মত্ত উচ্ছৃঙ্খলতা, অবাধ যৌনসম্ভোগ, পরনারীহরণ, বলাৎকার, এ কী ধর্ম?’
‘আপনি কি ধর্মের সঙ্গে নীতিবোধকে যুক্ত করতে চাইছেন লোকেশ্বর?’
‘অবশ্যই! নীতিবোধ বাদ দিয়ে সমাজ সংস্থিতির থাকে কী সামন্ত সীতাপতি? আর সমাজ সংস্থিতি বাদ দিলে ধর্মেরই বা কী থাকে?’
‘কিন্তু আপনার ধর্মবোধ কি মানুষের ইচ্ছার স্বাধীনতার বিপক্ষে নয়?’ প্রশ্ন করলেন একজন প্রৌঢ়।
‘হাসালেন আচার্য!’ ব্যঙ্গস্বরে বললেন মৎস্যেন্দ্রনাথ, ‘মানুষের ইচ্ছার স্বাধীনতার ধুয়ো তুলে যারা সমাজ সংস্থিতি বিনষ্ট করতে চায়, জানবেন তারাই মানুষের স্বাধীনতার সবচেয়ে বড় শত্রু। আপনিও তো একজন শ্রদ্ধেয় ধর্মবেত্তা। আপনিই বলুন না, বঙ্গদেশে অবাধ নীতিবোধহীন উচ্ছৃঙ্খলতার যে প্রাপ্ত স্বাধীনতা আছে, প্রকাশচন্দ্র আর রানির অপশাসনের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য সমালোচনার সেই স্বাধীনতা আছে তো?’
বৃদ্ধ আচার্য চুপ করে গেলেন। বর্তমানে বঙ্গদেশে শাসকের বিরুদ্ধে সমালোচনার শাস্তি বড় ভয়ানক।
‘কিন্তু আচার্য, আপনার কথামতো যদি মেনেও নিই যে প্রকাশচন্দ্রের প্রবর্তিত ধর্ম ভ্রান্ত ও ভ্রষ্ট, তার বিপরীতে আপনার ধর্ম যে অভ্রান্ত তার প্রমাণ কী?’
‘হা ঈশ্বর, এতদিন যে দেশের জলবায়ুতে আপনার দেহ মন পুষ্ট হল, তার নিজস্ব, ভূমিজ ধর্মকে আপনি এখনও চিনতে পারেননি সামন্ত অধিরথ?’ উত্তেজিত হয়ে উঠছিলেন মৎস্যেন্দ্রনাথ, ‘একটি সম্পূর্ণ বিজাতীয়, বিদেশীয় অসভ্য অনৈতিক মতবাদকে এদেশের ধর্ম বলে মেনে নিতে আপনাদের লজ্জাবোধ হয় না? নীতিবোধের বিচ্যুতিগুলিকেও ধর্ম বলে মেনে নিতে আপনার গ্লানিবোধ হয় না? নাকি তার জন্যেও প্রকাশচন্দ্রের অধ্যাদেশ প্রয়োজন?’
সহসা নীরবতা নেমে এল সবার মধ্যে। মৎস্যেন্দ্রনাথ বুঝতে পারলেন উত্তেজিত হয়ে কিছু কঠোর কটূক্তি করে ফেলেছেন। কিঞ্চিৎ নরম সুরে বললেন, ‘উত্তেজনা ক্ষমা করবেন আর্য। কিন্তু আমি মনে করি এই কুশাসনের অন্যতম স্তম্ভ যে অশ্লীল ধর্ম, তার উৎপাটন আশু প্রয়োজনীয়।’
‘কিন্তু আচার্য,’ এতক্ষণে প্রশ্ন করলেন গৌড়েশ্বর জয়ন্ত, ‘আপনি নাহয় মহাযোগী। সর্বত্যাগী সন্ন্যাসী৷ কিন্তু, সাধারণ নরনারীর জীবনে সঙ্গম তো জাগতিক প্রয়োজন। আপনি কি কামপ্রবৃত্তিকে গর্হিত বলে মনে করেন?’
‘না গৌড়েশ্বর। কাম সৃষ্টির মূলবিন্দু। বিশ্বসংসারে পুরুষ-প্রকৃতির প্রেরণায় সৃষ্টির বিকাশ হয়। পুরুষ ও প্রকৃতির মিলনের ফলে বিন্দুর সৃষ্টি বা পতন, আর সেই বিন্দুর মধ্যে সৃষ্টিপ্রক্রিয়ার অনন্তলীলা নিত্য বহমান। এই বিন্দুতে লীলাময়ী মহামায়া সৃষ্টি ঘটিয়ে থাকেন বলেই তো তিনি বিন্দুবিলাসিনী।
সন্তানোৎপাদনের উদ্দেশে অথবা প্রেমাষ্পদের সঙ্গে সঙ্গমবাসনায় কৃতসঙ্কল্প নর-নারীর মিলনকে তো নিন্দা করি না। আমিও নিজেও তো সেই সৃষ্টিসঙ্গমেরই ফল। কিন্তু শাস্ত্রের দোহাই দিয়ে স্বেচ্ছাচারী অবাধ যৌনকর্ম, অন্ত্যজ জাতিদের কূলস্ত্রী এবং রজস্বলা কন্যাদের বলপ্রয়োগে সেই যৌনকর্মে অংশগ্রহণে বাধ্য করা, এও কি ধর্মের অনুষঙ্গ গৌড়েশ্বর? শাস্ত্রে বলে স্ত্রীয়ঃ সমস্তা সকলা জগৎসু, নারীশক্তি হতেই জগতের উৎপত্তি। ধর্মের দোহাই দিয়ে সেই নারীশক্তির এহেন অবমাননা কি সহনীয়?
‘আর অবাধ মদ্যপান? তাকিয়ে দেখুন, বঙ্গদেশের প্রতিটি গ্রামে, প্রতিটি নগরে, প্রতিটি পল্লীতে, প্রতিটি পণ্যবিথীতে কত না শৌণ্ডিকালয়। কর্মহীন, অর্থহীন এই জাতিকে মদিরার মৌতাতে ডুবিয়ে নির্বীর্য করে রাখার কী সযত্ন প্রয়াস! অন্নসংস্থানের উপায় নেই, কর্মোদ্যোগের পরিকল্পনা নেই, রয়েছে শুধু ধর্মের নামে অবাধ, উচ্ছৃঙ্খল মদ্যপানের বিধান।
‘মদ্যপান দোষের নয় গৌড়েশ্বর। পরিমিত কিছুই দোষের নয়। কিন্তু কোনও বিষয়ের আতিশয্যই গর্হিত বা অহিতকর। যেমন অতিভোজন দোষের। তেমন অতিকামুকতাও দোষের। তখন তাকে লাম্পট্য বলে। আর সেই লাম্পট্যে যখন দেশের শাসকগোষ্ঠী সবিস্তারে উৎসাহ দেয়, তখন বুঝতে হবে যে দেশের বড়ই দুর্দিন।’
‘কিন্তু আচার্য, ‘একজন বলে ওঠেন, ‘আপনি তো নিজেও তন্ত্রশাস্ত্রের বিষয়ে একজন পণ্ডিত। পঞ্চ ম’কারের বিধান তো এই শাস্ত্রেই রয়েছে।’
‘আছে সামন্ত অধিরথ। সেখানেই তো সুচতুর চালটি চেলেছেন প্রকাশচন্দ্র। বৌদ্ধতন্ত্রের যাবতীয় গূঢ়বিদ্যাকে নামিয়ে এনেছেন হট্টমেলার মধ্যে। যে শাস্ত্রকে বলা হয়েছে স্বীয় মাতার চরিত্রস্খলনের মতো গোপন রাখতে, তাকে সাধারণ্যে উন্মুক্ত করেন দেওয়া হয়েছে অধিকারী অনধিকারী ভেদ না রেখে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তিব্বতীয় পোন ধর্মের যাবতীয় অশ্লীল অসভ্য উপচার। বিজাতীয় ইতর ধর্মকৃত্যকে কেবলমাত্র অর্থান্তরিত করে ভারতীয় তন্ত্রধর্মের মধ্যে সুচতুর কৌশলে প্রবিষ্ট করিয়ে দেওয়া হয়েছে।’
‘আপনার বক্তব্যটি প্রণিধান হল লোকেশ্বর। যদিও সামন্ত অধিরথের পঞ্চ ম’কারের প্রশ্নটি...’
সামান্য অসহিষ্ণু হয়ে উঠলেন মৎস্যেন্দ্রনাথ। ‘আজ এই নিয়ে কূট আলোচনার দিন নয় মহাসামন্ত ধর্মসেন। একদিন নাহয় এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। আজ বরং যেজন্য একত্রিত হয়েছি সেই বিষয়ে মনোযোগ দেওয়া যাক।’
নবতিপর বৃদ্ধ মানুষটি বাতায়নের পাশে বসে স্থির অচঞ্চল চোখে সাগরদর্শন করছিলেন। মনে হচ্ছিল যেন কত শত সহস্র বৎসর ধরে উনি ঠিক ওইভাবেই ওখানে বসে আছেন। যেন এই অকূল জলরাশির চঞ্চললীলা দর্শনে তিনি কখনও ক্লান্ত হন না।
কাহ্ন একবার ঘরে ঢুকে অস্পষ্ট শব্দ করলেন। বৃদ্ধ এদিকে তাকালেন না। শুধু অস্ফুটস্বরে প্রশ্ন করলেন, ‘এসেছ ঘনরাম?’
কাহ্ন উত্তর দিলেন না। বৃদ্ধ আপনমনে বলতে লাগলেন, ‘জানো ঘনরাম, শৈশবে বড় শখ ছিল সমুদ্র দেখার। পার্বত্য দেশের মানুষ আমি, পাহাড়ি ঝরনা আর নদী ছাড়া কিছুই দেখিনি। তাও সেই শীর্ণকায়া নদীর সঙ্গে এই দেশের বিশালকায়া বেগবতী নদীদের কোনও মিলই নেই। এদেশে এসে মেঘান্দ আর লৌহিত্যের বিপুল তরঙ্গ দেখে আমি বিস্ময়ে স্তব্ধ। জলরাশি এত বিপুল, বিশাল, প্রচণ্ড হয়? এত উন্মত্ত, এত প্রলয়ঙ্কর হয়?
‘সেইদিন শুনেছিলাম পূর্বসমুদ্রের জলরাশি নাকি এর চেয়েও প্রকাণ্ড। বিরাট। বিশাল। সেই থেকে বড় বাসনা ছিল, পূর্বসমুদ্র দেখব।
আজ দেখো, নিয়তির কী আশ্চর্য বিধান। গত অর্ধশতক ধরে শুধু এই জলরাশিই দেখে যাচ্ছি। তার আর বিরাম নেই।’
কাহ্ন শান্তস্বরে বললেন, ‘আপনি তো অনেক আগেই দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন আর্য। এখনও জলরাশি দেখতে পান?’
বৃদ্ধ থমকে গেলেন। ধীরে, অতি ধীরে এদিকে ঘুরে বললেন, ‘কে তুমি? এ তো ঘনরামের স্বর নয়।’
কাহ্ন দ্রুত এসে বৃদ্ধের হাত ধরলেন, ‘আমি আপনার একজন শুভাকাঙ্ক্ষী আর্য চারুদত্ত।’
বৃদ্ধ কিছুক্ষণ কাহ্ন’র হাতদুটি ধরে রইলেন। তারপর অকস্মাৎ ডানহাতে কাহ্ন’র গলা টিপে ধরলেন।
কাহ্ন বলশালী পুরুষ। তিনি ধীরে ধীরে বৃদ্ধের দৃঢ়মুষ্ঠি থেকে নিজেকে মুক্ত করলেন। তারপর বললেন, ‘আমি আপনার শত্রু নই আর্য।’
বৃদ্ধ খলখল স্বরে হেসে উঠলেন, ‘মিত্র? এই শত্রুপুরীতে কোন মিত্র এলি রে? কেন এসেছিস? আমাকে সর্বনাশের পথে আরেকটু এগিয়ে দিতে?’
কাহ্ন বললেন, ‘আমি সত্যিই আপনার মিত্র আর্য চারুদত্ত। আপনার অনেক দিনের গোপন বাসনা পূরণ করতে এসেছি।’
বৃদ্ধ আরও উচ্চৈঃস্বরে হেসে উঠলেন, ‘গোপন বাসনা? বাহ বাহ। তা কী এনেছিস আমার জন্য? উত্তম সুরা? সুপক্ব মৃগমাংস? সুন্দরী নারী?’
কাহ্ন শান্তস্বরে বললেন, ‘না আর্য, আমি এসব কিছুই আনিনি। আপনার হৃদয়ে প্রতিশোধের যে আগুন অর্ধশতাব্দী ধরে প্রজ্জ্বলিত, তাকে নির্বাপিত করতে এসেছি।’
বৃদ্ধ আবার হেসে উঠলেন। বললেন, ‘বাহ বাহ! এটা কি প্রকাশচন্দ্র’র নতুন চাল? আমাকে পরীক্ষা করে দেখা কোনও ষড়যন্ত্রে আমি জড়িত কি না? শোন রে চন্দ্রবংশের ক্রীতদাস, তোর ওই বিশ্বাসঘাতক প্রভুকে গিয়ে বলে দিস, উপায় থাকলে আমি তার দুই চোখ উপড়ে সেখানে জ্বলন্ত অঙ্গার ঢেলে দিতাম। আমার সে উপায় নেই, আজ আমি চলচ্ছক্তিহীন বৃদ্ধ। কিন্তু আমার অভিশাপ সর্বদা তার পিছু পিছু ফিরবে। তাকে এক মুহূর্ত শান্তি দেবে না। ওর সর্বনাশ হবে, মহাসর্বনাশ হবে...’
কাহ্ন দ্রুত হাত চেপে ধরলেন বৃদ্ধের, ‘সেই জন্যই তো আপনার কাছে আসা, আর্য চারুদত্ত। আপনার অতৃপ্ত প্রতিশোধের বাসনা পূরণ করতে এসেছি আমি। প্রকাশচন্দ্রের মহা সর্বনাশ হবে, চন্দ্রবংশ ধ্বংস হবে। সেই মহাযজ্ঞে আপনার অর্ঘ্য চাই আর্য চারুদত্ত।’
চারুদত্ত ঘড়ঘড়ে স্বরে বললেন, ‘কে তুই? আমাকে মিথ্যে আশা দিচ্ছিস কেন?’
‘আমার নাম কাহ্ন, আর্য চারুদত্ত। চন্দ্রবংশের কুশাসন থেকে বঙ্গভূমিকে উদ্ধার করার জন্য যে মহাযজ্ঞ চলছে, তার এক সামান্য সেনানী।’
চারুদত্ত ঘোলাটে, প্রায় অন্ধ চোখদুটি দিয়ে চেয়ে রইলেন কাহ্নপা’র দিকে।
চারুদত্ত’র কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে কাহ্নপা বললেন, ‘গত সপ্তাহে ঘনরাম আপনাকে কিছু বলে গেছিল?’
চারুদত্ত অস্ফূটে বললেন, ‘হ্যাঁ। সে বলেছিল পরের সপ্তাহে তার বদলে অন্য কেউ আসবে। সে নাকি আমার জন্য কিছু উপহার আনবে।’
‘আর কিছু?’
চারুদত্ত ফিসফিস করে বললেন, ‘আর বলেছিল তাকে একটি সংকেতবাক্য’র অর্ধাংশ বলতে। সে যদি বাকি অর্ধাংশ না বলতে পারে, তাহলে আমি যেন তাকে বিশ্বাস না করি।’
কাহ্নপা চুপ করে তাকিয়ে রইলেন। চারুদত্ত ধীরে ধীরে উচ্চারণ করলেন, ‘সুজ লাউ সসি লাগেলি তান্তী।’
কাহ্ন বললেন, ‘অণাহা দাণ্ডী বাকি কিঅ অবধূতী।’
চারুদত্ত কাহ্নপার হাত চেপে ধরলেন।
‘কিন্তু মহর্ষি, আপনি যা করতে বলছেন সে তো প্রায় অসম্ভব। সর্বস্তরে স্থানীয় সমিতির জাল বিছিয়ে রেখেছেন প্রকাশচন্দ্র আর তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গরা। তারা প্রতিনিয়ত রাজ্যের কোথায় কী হচ্ছে তার সংবাদ পৌঁছে দেয় কর্মান্তবাসকে। সর্বত্র কঠিন প্রহরা। তার ওপর চন্দ্রবংশের সুশিক্ষিত সৈন্যদল৷ সর্বোপরি প্রকাশচন্দ্রের নিজস্ব ভৈরববাহিনী আছে, রাজসেবকদল। তাদের পরাস্ত করে আপনি কর্মান্তবাসক অধিকার করার স্বপ্ন দেখছেন? বাতুলের প্রলাপ নয় কি?’
‘আপনার কথা সত্য জয়নাগ। কিন্তু আমরা একা নই। আমাদের সঙ্গে গৌড়বঙ্গের কয়েকজন কৃতবিদ্য পুরুষ আছেন। আপনারা আছেন।’
‘আমরা কয়েকজন সামন্ত আপনাদের সঙ্গে আছি বটে। কিন্তু এ কথা ভুললে চলবে না সামন্তদের অধিকাংশই প্রকাশচন্দ্রের পক্ষে।’
‘যুদ্ধ কখনও সংখ্যাধিক্যের জোরে জেতা যায় না মহাসামন্ত ধর্মসেন। যুদ্ধ জেতা হয় রণকৌশল, বুদ্ধিমত্তা আর সাহসের জোরে। নইলে মহাভারতের যুদ্ধে পাণ্ডবদের সাত অক্ষৌহিণী সেনা কৌরবদের একাদশ অক্ষৌহিণী সেনার বিরুদ্ধে জয়লাভ করতে পারত না।’
‘কিন্তু লোকেশ্বর, এ কথা ভুললে চলবে না যে পাণ্ডবদের সঙ্গে স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ ছিলেন।’
‘শ্রীকৃষ্ণ নন আচার্য, বলুন ধর্ম। স্বয়ং ধর্ম পাণ্ডবদের পক্ষাবলম্বন করেছিলেন। ন্যায়, সত্য, আর ধর্ম, এই তিনটি যার পক্ষে তার বিজয় অনিবার্য।’
সভায় নীরবতা নেমে এল। ইত্যবসরে মুখ খুললেন সামন্ত বলভদ্র। এতক্ষণ চুপ করেছিলেন তিনি। নীরবতা ভেঙে তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘মহর্ষি, ধরে নিলাম এই সংগ্রামে আমাদের জয় অনিবার্য। কিন্তু তারপর? প্রকাশচন্দ্র’র পর কে হবেন বঙ্গভূমির সম্রাট? তিনি কি আমাদের মধ্যেই কেউ? তাহলে কে তিনি?’
সবাই জানতেন এই প্রশ্ন উত্থাপিত হবে। এবং এই প্রশ্নটির নিষ্পত্তির ওপরেই নির্ভর করছে আজকের সভার সাফল্য।
থেমে থেমে প্রতিটি শব্দের উপর জোর দিয়ে উচ্চারণ করলেন মৎস্যেন্দ্রনাথ, ‘এই প্রশ্নটি উত্থাপন করার জন্য অনেক ধন্যবাদ সামন্ত বলভদ্র। স্পষ্ট জানাচ্ছি যে এখানে উপস্থিত সামন্তদের কাউকেই সেই পদের জন্য আমি মনোনীত করিনি।’
‘কেন লোকেশ্বর? আমরা কি অযোগ্য?’
‘প্রশ্নটি যোগ্যতার নয় সামন্ত বলভদ্র, প্রশ্নটি কূটনীতির।’
মহাসামন্ত ধর্মসেন স্থির এবং শান্তস্বরে প্রশ্ন করলেন, ‘যদি আমাদের কিছু প্রাপ্তির আশাই না থাকে, তাহলে আমরা এখানে ঠিক কী জন্য এসেছি সেটা কি আমাদের জানাবেন লোকেশ্বর?’
মৎস্যেন্দ্রনাথ ধীরস্থিরস্বরে বললেন, ‘প্রাপ্তি কি কিছুই নেই মহাসামন্ত ধর্মসেন? আমাদের প্রাথমিক উদ্দেশ্য তো এই অরাজক মাৎসন্যায় থেকে উদ্ধার পাওয়া। আজ আপনি আপনার স্বক্ষেত্রে সম্রাট, মহাসামন্ত। কিন্তু কাল যে অন্য কোনও অধিকতর ক্ষমতাশালী ভূস্বামী আপনার ভুক্তিটি অপহরণ করবেন না তার নিশ্চয়তা কী? এই রাক্ষসশাসন, সর্বক্ষণের অনিশ্চয়তা, ধনে প্রাণে নিশ্চিহ্ন হওয়ার আতঙ্ক, তার থেকে মুক্তি পাওয়াও কি একটি প্রাপ্তি নয়?’
‘আপনার কথা সত্য লোকেশ্বর। কিন্তু আমরা যোদ্ধৃবর্গ। প্রয়োজন হলে আত্মরক্ষার জন্য যুদ্ধ করতে পারি। শত্রুপাত করতে পারি৷ শত্রু প্রবল হলে বীরগতিও প্রাপ্ত হতে পারি। কিন্তু প্রকাশচন্দ্রের মতো শত্রুর সঙ্গে আগ বাড়িয়ে যুদ্ধঘোষণার জন্য তো কিছু না কিছু কারণ প্রয়োজন।’
‘আপনার বক্তব্য বুঝলাম না সামন্ত বলভদ্র। ঘরে আগুন লাগলে তবেই কি কুয়ো খোঁড়ার উদ্যোগ নেবেন? বিশেষ করে সেই আগুন যখন পাশের পল্লীটি লেলিহান শিখায় দগ্ধ করছে? আমি কি তখনও এই ভেবে ঘুমিয়ে রইব যে যেখানে যাই হোক না কেন, আমার ঘরটি তো নিরাপদ! শত্রু দুয়ারে উপস্থিত, প্রতিবেশীর ঘর জ্বলছে, তার ধনসম্পদ লুন্ঠিত, তার নারী ও কন্যারা অপহৃতা-ধর্ষিতা, তখনও আপনি অপেক্ষা করে থাকবেন কবে সেই অগ্নিস্ফুলিঙ্গ আপনার ঘরের দুয়ার স্পর্শ করবে?’
সভাস্থলের বিভিন্ন দিক থেকে কিছু অস্বস্তিকর শব্দ ভেসে এল।
‘আজ আর সেই সময় নেই মহামান্য সামন্তবর্গ। আজ সর্বনাশের আগুন আমাদের দরজায় উপস্থিত। আমাদের মান-সম্মান-ধন-সম্পদ-নারীদের সতীত্ব সবই এখন শত্রুদের আক্রমণের লক্ষ্য। এই চন্দ্রবংশীয় বর্বরের দল আজ আমাদের জাতিসত্বা-ধর্ম-সমাজ-আদর্শ-অস্তিত্ব সবকিছুর সমূল বিনাশের উদ্দেশে খড়্গহস্ত। আজ যদি আমরা এই নৃশংস বর্বরদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ না করি তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে উত্তর দিতে পারব না৷ আজ থেকে শতবর্ষ পর যখন আকাশপ্রদীপের আলোরেখা ধরে নেমে আসব, তখন তাদের মুখোমুখি দাঁড়াতে পারব না।’
সভাস্থলে অখণ্ড নৈঃশব্দ্য।
কিছুক্ষণ পর এক বৃদ্ধ মানুষ প্রশ্ন করলেন, ‘আমার মনে হয় আপনার বক্তব্য আমাদের সবার কাছেই গৃহীত হয়েছে মহর্ষি। এবার আপনি বলুন এই বিপ্লবোত্তর কালে কাকে আপনি বঙ্গদেশের শাসকরূপে দেখতে চাইছেন?’
আধো অন্ধকারের মধ্যেই সবার দিকে একবার চক্ষু ঘুরিয়ে নিলেন মৎস্যেন্দ্রনাথ। তারপর শান্তস্বরে বললেন, ‘আচার্য দয়িতবিষ্ণুর পৌত্র, খণ্ডিতারাতি বপ্যটের পুত্র, রাজভটবংশাদিপতিত মহাবীর শ্রীগোপালদেব।’
‘পাপ মিত্র, পাপ। বিশ্বাসঘাতকতার পাপ, স্বজনহত্যার পাপ, স্বার্থের বশে বহুতর নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করানোর পাপ। সেই পাপে আজ আমার এই অবস্থা।’
‘দুঃখ করবেন না আর্য চারুদত্ত। ঈশ্বর আজ সেই পাপস্খালনের সুযোগ এনে দিয়েছেন আপনার সামনে।’
‘সব পাপের কি স্খালন হয় কাহ্ন? জ্যেষ্ঠার সঙ্গে যখন এই দেশে আসি, তখন কতই বা বয়স আমার। ষোড়শবর্ষীয় কিশোর আমি। সম্রাট রাজভট এই নবীন কিশোরকে শ্যালক নয়, নিজের সহোদরজ্ঞানে স্নেহ করতেন৷ কী পাইনি তাঁর কাছ থেকে? অপরিমিত স্নেহ, অবাধ প্রশ্রয়, যথেচ্ছ স্বাধীনতা, যখন যা চেয়েছি তাই পেয়েছি। ধীরে ধীরে তাঁর স্নেহাস্পদ বয়স্য হয়ে উঠছিলাম। জ্যেষ্ঠার অনুরোধে সচিব পদমর্যাদা পেলাম। কিন্তু সেই তাঁকেই...’
‘তাঁকেই কী, আর্য চারুদত্ত?’
প্রায় অন্ধ হয়ে যাওয়া চক্ষুদুটি মেলে সমুদ্রের দিকে চেয়ে রইলেন চারুদত্ত। সমুদ্রের লবণাক্ত আর্দ্র বাতাস ধেয়ে আসছিল ঘরের মধ্যে। তার প্রবল গর্জনে কান পাতা দায়। যদিও একটু মনোযোগ দিলে বাইরে সৈন্যদের মত্ত আলোচনার স্বরও কানে আসে।
‘তাকেই হত্যা করলাম মিত্র কাহ্ন। আমি বিশ্বাসঘাতক চারুদত্ত, কৃতঘ্ন চারুদত্ত, এক অন্ধকার রাত্রে আমি আমার স্নেহশীল অগ্রজাভর্তা, প্রতিপালক প্রভু, বঙ্গদেশের সম্রাট রাজভটকে তিব্বতীয় মহাকূটবিষপ্রয়োগে হত্যা করলাম।’
কাহ্ন স্থাণু হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। এই সংবাদ মৎস্যেন্দ্রনাথ জানতেন, বলা ভালো অনুমান করেছিলেন। আজ সেটা মিলে গেল৷
‘কিন্তু কেন?’
ধীরে ধীরে ঘাড় ঘুরিয়ে এদিকে তাকালেন চারুদত্ত।
‘আপনি নিয়তি মানেন মিত্র কাহ্ন?’
‘মানি আর্য চারুদত্ত।’
‘সেই নিয়তিই এর কারণ। নিজের উপরই বিতৃষ্ণা হয় কাহ্ন৷ বিধাতাপুরুষ বোধহয় আমার জন্মলগ্নেই কপালে পাপনিয়তি বলে লিখে দিয়েছিলেন। নইলে এত স্নেহচ্ছায়ায় পালিত হওয়ার পরেও আমার মনে বিদ্বেষবিষ প্রবেশ করবে কেন?
‘সচিব হওয়ার পর ধীরে ধীরে লক্ষ করলাম যে অন্যান্য সভাসদরা প্রকাশ্যে সচিবের উপযুক্ত সম্মান দেখাচ্ছেন বটে, কিন্তু তাঁদের আচার আচরণে প্রকাশ পেতে থাকে যে আমার পদটি সর্বার্থেই আলঙ্কারিক। রাজার শ্যালক বলে ওই আসনে বসার অধিকার পেয়েছি মাত্র৷ শাসনব্যবস্থায় মতামতদানের কোনও ক্ষমতাই আমার নেই।
‘ধীরে ধীরে এই ভাবনা আমার মনের মধ্যে স্থায়ী হয়ে বসল৷ এই চিন্তা আমাকে কুরে কুরে খেতে লাগল। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সঙ্কটের সময় দেখতাম যে সম্রাট তাঁর প্রধানতম মন্ত্রণাদাতাদের নিয়ে আলোচনায় বসেছেন। কে কে আছেন সেই সভায়? পণ্ডিত দয়িতবিষ্ণু, মহামাত্য বুদ্ধদাস, এবং সেনাপ্রধান আনন্দদত্ত৷ আর আমি চারুদত্ত, রাজসচিব চারুদত্ত, যার কিনা প্রকৃতপক্ষে সম্রাটের প্রতিভূ হওয়ার কথা, সেই আলোচনায় তার কোনও প্রবেশাধিকারই নেই।
‘ঈর্ষার তীব্র বিষ ক্রমেই আমার চেতনাকে আচ্ছন্ন করে তুলছিল। আর সেই অন্ধ ঈর্ষাবিদ্বেষ প্রতিশোধের আগুন জ্বালিয়ে তুলছিল আমার মনে।
‘সেই সময়ে কিছু দৌত্যের কাজ নিয়ে একবার আমার মাতৃভূমি দর্শনে যাই। সম্রাটই পাঠিয়েছিলেন।
সেইখানেই এক সন্ধ্যায় কিছু পরিচিত বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে মদ্যপানের আসরে আমি বলে ফেলি এই ক্ষোভের কথা, অপমানের কথা।
‘জানি না কী করে এই কথা পৌঁছে গেল তিব্বতের মহাসামন্ত, তথা মহামাত্য গার তিরিলিং-এর কানে। সেইদিনই বিধাতাপুরুষ সর্বনাশের পথটি আমার জন্য নির্দিষ্ট করে দিলেন।
‘পরদিনই মহামাত্য’র প্রাসাদে এক গুপ্তসভায় যোগদানের আমন্ত্রণ পেলাম। সেখানে তিনি ছাড়াও তিব্বতী রাজসভার কয়েকজন প্রভাবশালী সামন্ত উপস্থিত ছিলেন। আর ছিলেন কয়েকজন চৈনিক রাজপুরুষ। তাঁরা তাং বংশের প্রেরিত গুপ্তচর।
‘সেইদিনই রূপরেখা রচিত হয় এক মহাষড়যন্ত্রের। বঙ্গভূমির সমূহ সর্বনাশের, সমূলে উৎপাটনের ষড়যন্ত্র। মূল ষড়যন্ত্রকর্তা তাং বংশের মহাপ্রতাপশালী সম্রাট তাইজং আর তাঁর প্রিয়তমা রক্ষিতা য়ু জেতিয়ান। আর তার রূপায়ণে তিব্বতের পোন ধর্মাবলম্বী সামন্তগোষ্ঠী, আমারই স্বধর্মী স্বজাতি।
‘সেই রাতেই এক পোন ধর্মচক্রের অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়। সেখানে আমার সঙ্গে আলাপ হয়েছিল এক সুঠামদেহী বঙ্গদেশীয় যুবাপুরুষ আর এক সুন্দরী নারীর সঙ্গে।’
এই পর্যন্ত বলে চুপ করলেন চারুদত্ত। কাহ্ন একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘বাকি ঘটনা আমরা জানি আর্য চারুদত্ত। কার্যসিদ্ধির পর কীভাবে আপনাকে গজভুক্তকপিত্থের মতো পরিত্যাগ করা হয়, এই অস্বাস্থ্যকর প্রদেশে নির্বাসন দেওয়া হয় তাও জানি।’
কপালে করাঘাত করলেন চারুদত্ত, ‘পাপ কাহ্ন পাপ। মহাপাপে পাপী আমি। স্বার্থে অন্ধ হয়ে একজন প্রজাপালক রাজাকে হত্যা করেছি। এক ক্রূরমতি পাপকর্মা পুরুষ আর এক কামুক নাগিনীকে দেশের শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করেছি। এই বিস্তীর্ণ ভূমিকে রাহুর করালগ্রাসে পতিত করেছি। আমার উদ্ধার নেই, মুক্তি নেই, পরিত্রাণ নেই।’
বৃদ্ধের হাত থরথর করে কাঁপছিল। কাহ্নপা দ্রুতহাতে হাতদুটি ধরে বললেন, ‘কে বলল মুক্তি নেই? গত অর্ধশতাব্দী ধরে এই যে নির্বাসনদণ্ড ভোগ করছেন, তাতে কি পাপের ক্ষয় হয়নি?’
‘হয়েছে কাহ্ন?’ সাগ্রহে কাহ্নপা’র হাত দুখানি ধরে প্রশ্ন করলেন চারুদত্ত।
‘হয়েছে আর্য, অবশ্যই হয়েছে। আর আপনার নির্বাসনের কালও শেষ হয়ে এসেছে আর্য চারুদত্ত। আজ চন্দ্রবংশের কুশাসনের বিরুদ্ধে দিকে দিকে বিপ্লবের আগুন জ্বলে উঠেছে। মহাবিদ্রোহ আজ সমাগতপ্রায়। আর সেই মহাযজ্ঞের আগুনে কিছু সমিধ আহরণের জন্যই আজ আমরা আপনার কাছে এসেছি। ঘনরাম আপনাকে পুরস্কারের কথা বলেছিল না? এই সেই পুরস্কার।’
কথাগুলি বোধহয় চারুদত্ত’র হৃদয়ঙ্গম হতে কিছু সময় নিল। তারপরেই চিৎকার করে উঠলেন তিনি, ‘হবে কাহ্ন, সত্যি বলো হবে? এই পাপাচারী নারকী রানির রাজত্ব ধ্বংস হবে? ওই ঐন্দ্রজালিক কাপালিকটার হাত থেকে মুক্তি পাব আমরা?’
কাহ্ন দ্রুত চারুদত্ত’র মুখে হাত চাপা দিলেন। কেউ শুনে ফেললেই সর্বনাশ। ইঙ্গিতে চুপ করতে বললেন চারুদত্তকে। তারপর লঘু পদক্ষেপে দেখতে গেলেন, বাইরে প্রহরীরা কী অবস্থায় আছে।
সভাস্থলে একটি বিস্ময়ের গুঞ্জন উঠেই মিলিয়ে গেল। গৌড়েশ্বর জয়ন্ত সন্দিগ্ধস্বরে প্রশ্ন করলেন, ‘কে এই গোপালদেব? কী পরিচয় এঁর? আর এঁকে রাজভটবংশাদিপতিতই বা বলছেন কেন?’
মৎস্যেন্দ্রনাথের পাশ থেকে এক বিশালদেহী পুরুষ উঠে দাঁড়ালেন৷ উপস্থিত প্রত্যেককে প্রণাম করে বললেন, ‘উপস্থিত অভ্যাগতদের সাদর প্রণাম। অধমের নাম বপ্যট।’
উপস্থিত সামন্ত’রা বপ্যটকে ভালোভাবে নিরীক্ষণ করতে লাগলেন। যুদ্ধব্যবসায়ী বপ্যটের বলবীর্যের খ্যাতি গৌড়বঙ্গের সর্বত্র পরিব্যপ্ত। তবে অনেকেই তাঁকে ইতিপূর্বে চাক্ষুষ দেখেননি।
বপ্যট চারিদিকে একবার তাকিয়ে বললেন, ‘আমি একজন যুদ্ধব্যবসায়ী। অর্থের বিনিময়ে বিভিন্ন সামন্তবর্গের অধীনে যুদ্ধ করাই আমার পেশা। তবে আমার আরও একটি পরিচয় আছে,’ বলে একটু থামলেন বপ্যট৷ তারপর অত্যন্ত নিস্পৃহস্বরে যোগ করলেন, ‘আমি সম্রাট রাজভটের ঔরসজাত পুত্র।’
সভার মধ্যে যেন বিস্ময়ের বিস্ফোরণ ঘটে গেল। উপস্থিত অভ্যাগতবর্গ স্তম্ভিত হয়ে বসে রইলেন।
প্রথম কথা বললেন সামন্ত অধিরথ। তিনি চাপা উত্তেজিতস্বরে বললেন, ‘আপনি জানেন কী বলছেন?’
মহাসামন্ত ধর্মসেন আশ্চর্যান্বিত স্বরে বলে উঠলেন, ‘সম্রাট রাজভটের তো একটিই সন্তান ছিল বলে জানতাম, বলভট। আপনার উল্লেখ তো কখনও কোথাও পাইনি!’
উপস্থিত বৃদ্ধ আচার্যটি স্থিরস্বরে বললেন, ‘বলভট ব্যতিরেকে সম্রাট রাজভটের যে একটি অন্য পুত্র ছিল তার উল্লেখ আমি অত্যন্ত গোপনসূত্রে আগেও পেয়েছি। তবে ইনিই যে সেই পুত্র তার সত্যতা নিরূপণ করে নেওয়াই শ্রেয়।’
‘পিতৃপরিচিতি নিয়ে কেউ মিথ্যে কথা বলে না আচার্য। আমি সত্য কথাই বলছি। এবং সেই সূত্রে আরও জানাই যে শ্রীগোপালদেব আমার পুত্র। তার শরীরে সম্রাট রাজভটের রক্তের উত্তরাধিকার বইছে। সেই জন্যেই লোকেশ্বর তাকে সিংহাসনের উত্তরাধিকারী নির্বাচিত করেছেন। আমার মনে হয় এই বিষয়ে বরং উনিই বিশদে বলতে পারবেন।’
মৎস্যেন্দ্রনাথ উঠে দাঁড়ালেন। আর তারপর সমবেত সামন্তদের সামনে এক অজানা ইতিহাসের অধ্যায় ধীরে ধীরে উন্মোচিত হতে লাগল।
কাহ্নপা দেখলেন কুটিরের দ্বারে মহোৎসব চলছে। ছয়টি মদ্যকলস ঘিরে অন্তত বিশজন প্রহরী বৃত্তাকারে বসে আছে। বেচারি ঠগন তাদের আদেশ পালন করার জন্য উদ্ভ্রান্তের মতো ইতিউতি ধাবমান। কেউ হাসছে, কেউ কাঁদছে, কেউ বা একটি শূন্য কলসীকে জড়িয়ে প্রেমপূর্বক চুম্বনে মত্ত। কেতকদাসকে দেখা গেল অধোবাসের প্রান্তটি অনাবৃত ঊর্ধ্বাঙ্গে জড়িয়ে, সেটি লাজুক ভাবে দাঁতে কেটে ললিতলবঙ্গলতারূপে বাকি রক্ষীদের মনোরঞ্জন করছে। দু-একজন রক্ষী চিৎকার করে অশ্রাব্যগীতি গাইছে। জনাচারেক রক্ষী নিশ্চিন্তে নিদ্রামগ্ন। প্রথম রক্ষীটি রাজাসনে বসে দু-চারজন মনোযোগী শ্রোতাকে তার বিভিন্ন বীরত্বের গাথা শোনাতে ব্যস্ত।
সন্তর্পণে ভেতরে ফিরে এলেন কাহ্নপা। ছয়টি কলসীতেই মদিরার সঙ্গে অতি অল্প পরিমাণে ধুতুরাবীজ মেশানো ছিল। যাতে এরা আবেশে উন্মত্ত হয়ে যায়, কিন্তু প্রাণহানি না ঘটে।
কাহ্নপা ফিরে এসে দেখলেন চারুদত্ত স্থির হয়ে বসে আছেন। পায়ের শব্দ পেয়ে বললেন, ‘বলো কাহ্ন, কী জানতে চাও?’
কাহ্ন প্রশ্ন করলেন, ‘প্রকাশচন্দ্র আর এই রানিকে হত্যার উপায় জানতে চাই। চাই আরও কিছু তথ্য, যা আপনি মনে করেন আমাদের জানা উচিত।’
চারুদত্ত কিছুক্ষণ চুপ হয়ে বসে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে বলতে লাগলেন, ‘এই নারী কে সে আশা করি এতদিনে আপনারা জানেন৷ কিন্তু যা জানেন না সে অত্যন্ত গভীর এবং গোপন সংবাদ। আমি আর প্রকাশচন্দ্র ছাড়া আর কেউ জানেন না।’
কাহ্নপা’র শরীর শক্ত হয়ে এল। পদ্মসম্ভবের তিব্বত থেকে আনা গোপন পত্রটি পাঠ করেছেন আচার্য শান্তরক্ষিত৷ সেখানে উপস্থিত ছিলেন আর মাত্র দুজন, মৎস্যেন্দ্রনাথ আর তিনি নিজে। তিনি বুঝতে পারলেন কোন গূঢ় সংবাদের দিকে ইঙ্গিত করছেন চারুদত্ত। মনের ভাব মনেই চেপে তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘কী সেই সংবাদ, আর্য?’
‘এই নারী চৈনিক হলে কী হবে, এঁর দেহে বইছে ভারতীয় রক্ত। আপনাদেরই ভূমির বহু প্রাচীন পাপ আজ নাগরূপ ধারণ করে আপনাদেরই দংশন করতে উদ্যত।
আপনাদের পুরাণে অষ্টনাগের উল্লেখ আছে। সাধারণ লোক নাগ বলতে সাপ বোঝে। কিন্তু নাগ একটি বিশিষ্ট জনজাতি। ভারতবর্ষের ইতিহাসে এঁদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে৷
অষ্টনাগ প্রকৃতপক্ষে নাগ জনজাতির আটটি মুখ্য প্রবর বা গোত্র৷ তার একটি হচ্ছে কর্কটনাগ। এঁরা প্রকৃতপক্ষে পূর্বভারতের ভূমিজ সন্তান ছিলেন।
কৃষ্ণার্জুন যখন খাণ্ডব বন ধ্বংস করেন, তখন সেখানে কর্কটনাগ জাতির একটি শাখার বসতি ছিল। সেই মারণযজ্ঞ থেকে নিষ্কৃতি পেতে তাঁরা পালিয়ে যান প্রথমে ত্রিগর্ত, তারপর সেখান থেকে কেকয় হয়ে গান্ধার।
পৈশাচী বিষবিদ্যায় কর্কটনাগ গোষ্ঠীর বিশেষ ব্যূৎপত্তি ছিল। তাঁরা গান্ধারের রাজধানী পুষ্কলাবতীতে বিষবৈদ্য হিসেবে জীবিকা নির্বাহ শুরু করেন। ধীরে ধীরে নাগরিক সমাজে তো বটেই, পুষ্কলাবতীর রাজসভাতেও তাঁরা বিশেষ স্থান অধিকার করে নেন। তার কতটা ভয়ে আর কতটা সম্মানে সে বলা অসম্ভব।
এই কর্কটনাগ গোষ্ঠীর মুখ্য পুরুষ ছিলেন দিব্যনাগ। তাঁর একটি সর্বসুলক্ষণা কন্যা ছিলেন, নাম পদ্মাবতী। ইনি বিষবিদ্যায় আশ্চর্য ব্যূৎপত্তি নিয়ে জন্মগ্রহণ করেন। লোকে বলত স্বয়ং নাগমাতা অদিতি দিব্যনাগের ঘরে জন্মগ্রহণ করেছেন।
কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পর উত্তর-পশ্চিম ভারত ধীরে ধীরে মহান নাগরাজ তক্ষকের অধিকারে যায়। তিনি রাজধানী স্থাপন করেন তাঁরই নামাঙ্কিত নগরীতে, তক্ষশীলায়।
খাণ্ডব দাহনের পর থেকেই নাগজাতির সঙ্গে কুরুবংশের বিরোধ চলছিল। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পর সেই বিরোধ চরমে ওঠে। এরই চূড়ান্ত পর্যায়ে নাগরাজ তক্ষকের প্রেরিত কশ্যপ নামের এক গুপ্তঘাতকের হাতে নিহত হন কুরুরাজ পরীক্ষিত।
পরীক্ষিতের পুত্র জন্মেজয় সিংহাসনে আসীন হয়েই নাগজাতির বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ ঘোষণা করেন। তক্ষশীলা অবরোধ করা হয়। নাগসৈন্য প্রবল বিক্রমের সঙ্গে সংগ্রাম করতে থাকে।
অবশেষে এক শ্রাবণী অমাবস্যার রাতে কুরুসেনা ধর্মযুদ্ধের নিয়মভঙ্গ করে তক্ষশীলায় প্রবেশ করে। নগরীতে অগ্নিসংযোগ করা হয়। প্রতিটি পুরুষ, নারী, বৃদ্ধ ও শিশুকে জীবন্ত দগ্ধ করা শুরু হয়। জন্মেজয় এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের নাম দেন সর্পযজ্ঞ।
জন্মেজয় হয়তো সমগ্র নগরীটিই ধ্বংস করতেন। কিন্তু বাধ সাধলেন পদ্মাবতীপুত্র আস্তিক।
তক্ষশীলা তখন থেকেই অধ্যয়নকেন্দ্র হিসেবে সুনাম করতে শুরু করেছে। সেখানে ছোটবড় মিলিয়ে বেশ কিছু গুরুকুল ছিল, নাগরাজ তাদের ভরণপোষণ করতেন। পদ্মাবতীপুত্র আস্তিক সেখানে কোনও একটি গুরুকুলে শাস্ত্রাদি অধ্যয়ন উপলক্ষে উপস্থিত ছিলেন। উপস্থিত ছিলেন তাঁর পিতাও।
ন্যায় এবং স্মৃতিতে আস্তিকের বিশেষ অধিকার ছিল। তিনি সেই হত্যাযজ্ঞ শুরু হওয়ার পাঁচদিন পর কোনও কৌশলে কুরুরাজ জন্মেজয়ের রাজস্কন্ধাবারে উপস্থিত হন। সেখানে তিনি নিজের ওজস্বী ভাষণ ও বাকচাতুর্যে জন্মেজয়কে এই সর্পযজ্ঞ থেকে নিবৃত্ত করেন। তক্ষশীলা সম্পূর্ণ ধ্বংস হওয়া থেকে রক্ষা পেল। নাগজাতি সমূলে উৎপাটিত হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পেল।
কিন্তু দিব্যনাগ জানতেন এই শান্তি সাময়িক। কুরুবংশের প্রতিশোধের আগুন আবার জ্বলে উঠবে একদিন, ছারখার করে দেবে নাগজাতিকে।
তাই একদিন তিনি কন্যা পদ্মাবতী আর পৌত্র আস্তিককে নিয়ে অনির্দেশের পথে যাত্রা করেন। আস্তিক যে গুরুকুলের শিক্ষার্থী ছিলেন, সেখানে তাঁর এক চৈনিকদেশাগত সতীর্থ ছিলেন। তিনিই তাঁদের নিজের দেশে আমন্ত্রণ জানান।
বড় দুঃখে, বড় শোকে পদ্মাবতী আর আস্তিক এই ভারতভূমি ত্যাগ করেন। তার একটি কারণ যদি হয় দেশত্যাগে বাধ্য হওয়া, তবে দ্বিতীয়টি হচ্ছে যে আস্তিকের পিতা, তথা পদ্মাবতীর স্বামী জরুৎকারু সেই জন্মেজয়’র সর্পযজ্ঞে নিহত হন।
পদ্মাবতী অভিশাপ দিয়ে যান, তাঁর বংশের কোনও এক নারী একদিন নাগকন্যা হয়ে এই দেশে ফিরে আসবে। ফিরে আসবে মূর্তিমান অভিশাপ হয়ে, সর্বগ্রাসী ধ্বংস হয়ে।’
‘কিন্তু এর সঙ্গে আমাদের বর্তমান পরিস্থিতির কী সম্পর্ক, আর্য চারুদত্ত?’
‘সম্পর্ক আছে মিত্র কাহ্ন!’ দন্তহীন মুখে হাসলেন চারুদত্ত। তারপর সামান্য কৌতুক আর অনেকখানি রহস্য মিশিয়ে বললেন, ‘বঙ্গদেশের বর্তমান রানি হচ্ছেন সেই কর্কটনাগকন্যা পদ্মাবতীর সাক্ষাৎ উত্তরাধিকারী।’
মৎস্যেন্দ্রনাথের কথা শেষ হলে প্রত্যেক নির্বাক হয়ে বসে রইলেন। মহাসামন্ত ধর্মসেন অভিভূতস্বরে বললেন, ‘এ যে আমাদের স্বপ্নেরও অগোচর। সম্রাট রাজভটের বৈধ উত্তরাধিকারী আবার তাঁর প্রাপ্য সিংহাসন ফিরে পাবেন, এই দীর্ণ ভূমিতে শান্তি এবং সুশাসন ফিরে আসবে, এর থেকে আনন্দের বিষয় আর কী হতে পারে?’
সামন্ত অধিরথ বলে উঠলেন, ‘কিছু মুহূর্ত পূর্বাবধি আমার মনে সংশয় ছিল বটে। স্বীকার করতে বাধা নেই, এখন আমি সম্পূর্ণ নিঃসংশয়।’
উপস্থিত অন্যান্য সামন্তরা হর্ষধ্বনি করে উঠলেন। পরিত্যক্ত প্রাসাদের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে যেন নতুন করে আশার উজ্জ্বল জ্যোতি জেগে উঠল।
গৌড়েশ্বর জয়ন্ত প্রৌঢ় হয়েছেন। তবুও তিনি যখন পরের প্রশ্নটি করলেন, তাঁর স্বরের মধ্যে নবযৌবনের উত্তেজনার আভাস পাওয়া গেল, ‘তাহলে, এবার আমাদের কী কর্তব্য লোকেশ্বর?’
মৎস্যেন্দ্রনাথ বললেন, ‘আমরা ইতিমধ্যেই বঙ্গদেশের রাজপদোপজীবিদের মধ্যে বেশ কয়েকজনকে স্বপক্ষে আনতে পেরেছি। তাঁরা নিয়মিত আমাদের সংবাদ দিয়ে চলেছেন। প্রকাশচন্দ্র এবং তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গরা ভালোই বুঝেছেন যে মহাবিদ্রোহ আসন্নপ্রায়। কর্মান্তবাসকের সর্বত্র নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে চতুর্গুণ। সৈন্যবাহিনীকে সদাপ্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে। রাজসেবক বাহিনীকে বিশেষ আদেশ দেওয়া হয়েছে প্রতিটি গ্রাম, পল্লী, পণ্যবিথী এবং মন্দিরে সতর্ক থাকার জন্য।
‘আমরা সরাসরি আক্রমণ করে কর্মান্তবাসক পদানত করতে পারব না। সংখ্যায় এবং রণকুশলতায় শত্রুপক্ষ আমাদের থেকে অনেকটাই এগিয়ে। আমাদের পথ হবে অন্তর্ঘাতের পথ। ক্ষণিক এবং ঝটিকা আক্রমণের পথ। শত্রুকে স্তম্ভিত করে দিতে হবে৷ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অসংখ্য যুদ্ধক্ষেত্র প্রস্তুত করতে হবে৷ প্রকাশ্য এবং অপ্রকাশ্য সমস্ত উপায়ে শাসনব্যবস্থাকে উত্যক্ত করে যেতে হবে।’
‘যেমন?’
‘আপনারা কর দেওয়া বন্ধ করে দিন। বা বিলম্বিত করুন। বলুন, প্রজারা অবাধ্য হয়েছে, তারা কর দিতে চাইছে না।’
‘এই যুক্তি প্রকাশচন্দ্রের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না যোগীবর। তিনি প্রশ্ন করবেন সামন্তসৈন্যরা আছে কী করতে? তাদের প্রয়োগ করুন।’
‘সঠিক বলেছেন সামন্ত অধিরথ। সেই নির্দেশ এলে আপনাদের অধীনস্থ সৈন্যপ্রধানদের বলুন বিদ্রোহের নাটক করতে। তারা যেন আপনাদের রাজসভার কোনও মুখ্য রাজকর্মকর্তাকে বন্দি করে। তিনি মহামাত্য হতে পারেন, মহাপ্রতীহার হতে পারেন, অথবা আবস্থিক, মহাসান্ধিবিগ্রহিক, ঔদ্রঙ্গিক, বাহনায়ক, বিষয়পতি যে কেউ হতে পারেন।’
‘বিষয়টি কি এতই সরল?’ সন্দেহের সুরে প্রশ্ন করেন একজন।
‘অবশ্যই নয় সামন্ত,’ গম্ভীরস্বরে বললেন বপ্যট, ‘আপনাদের সম্মতি পেলে সমগ্র পরিকল্পনাটি বিশদে বলতে পারি।’
‘বলুন আর্য বপ্যট।’
‘শাস্ত্রে বলে নৃপঃ কর্ণেন পশ্যতি। চন্দ্রবংশের দ্বারা নিযুক্ত হলেও, মহারানির তৎপাদপরিগৃহীত হলেও আপনারা বহুলাংশে স্বাধীন নরপতি। অবশ্যই আপনাদের প্রত্যেকের নিজস্ব গুপ্তচরবাহিনী আছে।’
উপস্থিত সামন্তরা স্মিত হাসলেন। কিছু বললেন না।
‘আপাতত আপনারা আপনাদের গুপ্তচরবাহিনীকে পরস্পরের বিরুদ্ধে নিযুক্ত করে রেখেছেন। তাই তো?’
মুহূর্তে সামন্তরাজারা গম্ভীর হয়ে গেলেন৷
‘আমার অনুরোধ, অনতিবিলম্বে আপনাদের গুপ্তচরবাহিনীকে রাজ্যের মধ্যে ফিরিয়ে আনুন। তারপর আপনার একান্ত অনুগত এবং বিশ্বস্ত গুপ্তচরদের নিযুক্ত করুন আপনার রাজসভার সদস্যদের জন্য। তাঁরা কী করেন, কোথায় যান, কার সঙ্গে দেখা করেন, কাদের ওপর নির্ভর করেন, তাঁদের অভ্যাস কী, দুর্বলতা কোথায়, সমস্ত সংবাদ সংগ্রহ করুন। এই মুহূর্তে আপনার অমাত্যদের মধ্যে কারা কারা চন্দ্রবংশের একান্ত অনুগত তার সন্ধান পাওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন।’
‘তারপর?’ প্রশ্ন করলেন গৌড়েশ্বর জয়ন্ত।
‘হ্যাঁ, পরের অংশটিই অতীব গুরুত্বপূর্ণ,’ আলোচনার রাশ নিজের হাতে তুলে নিলেন মৎস্যেন্দ্রনাথ, ‘আপনারা নিশ্চয়ই স্বীকার করবেন যে সৈন্যপ্রধান, মহাপ্রতীহার এবং বিষয়পতি, এই তিন পদাধিকারী সম্পূর্ণভাবে আপনার বিশ্বস্ত হওয়া উচিত। সৈন্য এবং অর্থ, এই হচ্ছে রাজ্যশাসনের অস্থি এবং মজ্জা। এই দুটি বিষয় যেন নিঃসংশয়ে আপনাদের করতলগত হয়।
‘প্রথমেই এই তিনটি অধিকরণে নিজের অধিকার স্থাপন করুন। তারপর অনুগত সৈন্যপ্রধানের দ্বারা মিথ্যা সেনাবিদ্রোহের আয়োজন করুন। বিদ্রোহী সেনারা যেন সেইসব রাজকর্মচারীদেরই বন্দি করে যারা গোপনে চন্দ্রবংশের প্রতি অনুগত।’
এতক্ষণে বিষয়টি বুঝলেন রাজারা৷ নড়েচড়ে বসলেন।
‘বন্দি রাজকর্মচারীদের কাছে কৌশলে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করুন যেন তাঁরা সৈন্যবিদ্রোহ এবং নিজেদের বন্দি হওয়ার সংবাদ নিজস্ব সূত্রে কর্মান্তবাসকে পাঠাতে পারেন। শান্তঘোষ এবং আনন্দগুপ্ত কিছুতেই যেন বিশ্বস্ত সূত্রের সংবাদ উপেক্ষা করতে না পারেন।’
মাথা নাড়লেন উপস্থিত সামন্তরা। গৌড়েশ্বর বললেন, ‘এতদ্বারা বোঝানো যাবে যে বঙ্গদেশের বিভিন্নস্থানে সেনাবিদ্রোহের আগুন জ্বলে উঠেছে। তাই তো?’
‘ঠিক তাই। আপনারা মহারানির কাছে আবেদন জানাবেন যেন কর্মান্তবাসক থেকে সৈন্য পাঠানো হয়। আপনাদের সাহায্যের আশু প্রয়োজন। প্রয়োজন হলে যেন অন্যান্য সামন্তদের অনুরোধ করা হয় সৈন্য পাঠিয়ে আপনাদের সাহায্য করার জন্য।’
‘কিন্তু অন্যান্য সামন্তরা এই প্রস্তাবে আপত্তি জানাবেন না?’
‘না, জানাবেন না৷’ বললেন গৌড়েশ্বর জয়ন্ত, ‘তাঁরা বরং চাইবেন এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে। সমগ্র বঙ্গদেশ জুড়ে এখন ঘোর মাৎস্যন্যায়। আপনার পার্শ্ববর্তী সামন্ত মহোদয় আপনার শাসনভূমিটি হস্তগত করার এমন সুবর্ণসুযোগ কোনওমতেই ছাড়বেন না। তিনি প্রবল উৎসাহে নিজের সৈন্য পাঠাবেন। এমনকী কর্মান্তবাসক থেকে আদেশ আসার আগেই যদি সৈন্যবাহিনী পাঠিয়ে দেন তাহলে আশ্চর্য হব না। এই সুযোগে তিনি আপনার ভূম্যধিকার, সম্পদ, নারী সব কিছু উদরসাৎ করবেন। আর এই অনাচারের পরিবর্তে না হয় কিছু মূল্য ধরে দেবেন। অর্থাৎ কিছু অতিরিক্ত কর উপঢৌকন পাঠিয়ে দেবেন কর্মান্তবাসকে। তাহলেই সব শান্তিকল্যাণ।’
সভাস্থলে উপস্থিত সামন্তরা মৌন রইলেন। এই বক্তব্যের রূঢ় সত্যতা তাঁদের থেকে বেশি আর কে জানে!
বপ্যট বলতে শুরু করলেন, ‘এই পরিস্থিতিতেই চতুরঙ্গ ক্রীড়ার মোক্ষম চাল আমাদের দিতে হবে। যেই মুহূর্তে কর্মান্তবাসক বা অন্যান্য সামন্তবর্গের সৈন্যদল আপনাদের ভূম্যধিকারে প্রবেশ করবে, তখন থেকে আপনাদের অনুগত কর্মচারী সাহায্য করার নাম করে তাদের বিভ্রান্ত করবে। তাদের কর্তব্য সম্পাদনের পথে বাধা সৃষ্টি করবে। আপনার গুপ্তবাহিনীর সাধারণ নাগরিকের ছদ্মবেশে তাদের গুপ্ত আক্রমণ করবে, উত্যক্ত করবে।’
‘কিন্তু এমন করে কী সুবিধা হবে? মানে আমাদের মূল উদ্দেশ্য কী?’ হরিকেলের জয়নাথের প্রশ্ন শুনে বোঝা গেল যে পরিকল্পনাটি এখনও সবার সম্যকরূপে প্রণিধান হয়নি।
‘আগামী কার্তিকী অমাবস্যার দিন কর্মান্তবাসকে দেবী বজ্রযোগিনীর মহাপূজা। তার আগেই আমাদের মধ্যে যাঁরা এই বিদ্রোহের মূল উদ্যোক্তা, তাঁরা পৌঁছে যাবেন কর্মান্তবাসকে। ওই দিন প্রকাশচন্দ্র এবং অন্য ছয় মুখ্য রাজন্যদের সঙ্গে রাজ্ঞী স্বয়ং মন্দিরে আসেন পূজার্চনার জন্য। আমাদের প্রথম আঘাত হানা হবে সেইদিন। সেইদিন যা আলোড়ন সৃষ্টি হবে তার অভিঘাত আপনারা চিন্তাও করতে পারছেন না। শাসকের বুকে ভয় ধরিয়ে দেওয়ার জন্য যা যথেষ্ট।
তারপর থেকেই নিশ্চিতভাবে সমগ্র কর্মান্তবাসকে বিদ্রোহীদের সন্ধান চলবে। আমরা এমন কূটকৌশল করেছি যেন আমাদের গুপ্তগৃহের সন্ধান আনন্দগুপ্ত’র কাছে পৌঁছয়। সেটিও প্রকৃতপক্ষে একটি ফাঁদ। শত্রুর প্রথম আঘাতের ক্ষত নিরাময় হওয়ার আগেই সেটি হবে আমাদের দ্বিতীয় আঘাত। তারপরেই আমরা হানব আমাদের চূড়ান্ত আক্রমণ।
আপনাদের যে পরিকল্পনার কথা বলা হল তার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে আমাদের আক্রমণের সময় চন্দ্রবংশের এবং তাদের অনুগত সামন্তসৈন্যদের একটি বৃহৎ অংশকে ব্যতিব্যস্ত রাখা, অবরুদ্ধ করে রাখা। অন্তত একমাস, ন্যূনপক্ষে একপক্ষকাল আপনাদের এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে হবে। এই সময়ে বিভিন্ন সূত্রে ক্রমাগত কর্মান্তবাসকে সংবাদ পাঠাতে হবে যে আপনারা প্রত্যেকে বিদ্রোহী সৈন্যদের সঙ্গে মরণাপন্ন যুদ্ধে রত।’
উপস্থিত সামন্তরা নিজেদের মধ্যে নিভৃত আলোচনায় রত হলেন। মৎস্যেন্দ্রনাথ, বপ্যট আর গৌড়েশ্বর জয়ন্ত চুপ রইলেন। তিনজনের মনেই প্রবল উৎকণ্ঠা। তাঁরাই এই পরিকল্পনার প্রধান রূপকার। এই সভার সাফল্যের ওপর নির্ভর করছে এই মহাবিদ্রোহের ভবিষ্যত।
কিছুক্ষণ পর গুঞ্জন বন্ধ হল। সামন্তবর্গকে দেখে দেখে মনে হল পরিকল্পনাটি তাঁদের মনঃপূত হয়েছে। মহাসামন্ত ধর্মসেন বললেন, ‘আমরা আপনাদের সঙ্গে সহমত হলাম যোগীবর। আমাদের ওপর যে দায়িত্ব ন্যস্ত করেছেন, তার যথাযথ পালনের জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ রইলাম। কিন্তু ওই রাজ্ঞী আর প্রকাশচন্দ্রকে হত্যা না করতে পারলে এই বিদ্রোহে জয়লাভের সম্ভাবনা সুদূর পরাহত। আর দুজনেই বিভিন্ন ঐশী শক্তির অধিকারী বলে প্রকাশ। সে বিষয়ে আপনাদের পরিকল্পনা কী?’
প্রদীপের শিখাটি যেন অকস্মাৎ স্থির হয়ে গেল। সবার দৃষ্টি ন্যস্ত হল মৎস্যেন্দ্রনাথের ওপর। তিনি প্রথমে স্মিত হাসলেন। তারপর গম্ভীর হয়ে বললেন, ‘ক্ষমা করবেন আর্য। সে বিষয়ে আমাদের পরিকল্পনা এতই গোপন যে প্রকাশ্যে বলা সমীচীন মনে করছি না।
‘তার মানে এই নয় যে আপনাদের অবিশ্বাস করছি। এইটুকু আপনাদের আশ্বাস দিতে পারি যে এই দুজনের মৃত্যুবাণ আমাদের হাতে। কিন্তু চূড়ান্ত আক্রমণের পূর্বে আমাদের কিছু নির্দিষ্ট সংবাদ প্রয়োজন। প্রাসাদে প্রবেশ করার জন্য কিছু কূটকৌশল প্রয়োজন। আমাদের সহযোগীরা এই মুহূর্তে সেইসব কর্মে ব্যপৃত। তবে আমাদের ওপর বিশ্বাস রাখুন, আদিনাথের কৃপায়, জগদীশ্বরী মহামায়ার কৃপায় আমরা অবশ্যই জয়যুক্ত হব।’
গৌড়েশ্বর জয়ন্ত সামান্য ইতস্তত করে বললেন, ‘আমার জন্য কোনও আদেশ লোকেশ্বর?’
মৎস্যেন্দ্রনাথ হেসে বললেন, ‘আপনার জামাতাকে আমাদের সহায়তা করতে বলে ইতিমধ্যেই আপনার কর্ম সম্পাদন করেছেন মহারাজ। আপনার জন্য আর একটিই কর্ম নির্দিষ্ট আছে৷ আমার ভ্রাতৃপ্রতিম শবরবজ্র তাঁর কিছু সঙ্গীসাথী নিয়ে কজঙ্গল থেকে কর্মান্তবাসকের দিক যাত্রা করেছেন। তাঁদের জন্য কিছু দ্রুতগামী বাহন, আর কয়েকদিনের পাথেয়’র ব্যবস্থা করে দিলে বাধিত হই।’
গৌড়েশ্বর উঠে দাঁড়িয়ে যুক্তকরে বললেন, ‘যথা আজ্ঞা।’
‘এই নারী বিষবিদ্যায় মহাকুশল, সে নিশ্চয়ই আপনাদের অজানা নয়। তাই এঁকে হত্যা করার আগে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে সর্বাংশে নিশ্চিত হতে হবে।’
‘তার ব্যবস্থা করা হয়েছে আর্য চারুদত্ত।’
‘আর প্রকাশচন্দ্রের ঐশী শক্তির সম্মুখীন হওয়ার জন্য প্রয়োজন তন্ত্রবিদ্যায় সমান শক্তিশালী একজন কোনও সাধকের।’
মৃদু হাসলেন কাহ্নপা, ‘সে ব্যবস্থাও রয়েছে আর্য চারুদত্ত। যোগীশ্বর মৎস্যেন্দ্রনাথ স্বয়ং যাদের সহায়, তাদের আবার ভয় কী?’
‘কিন্তু, আর একটি তথ্য আপনাদের জানতে হবে কাহ্ন। এই নারীকে হত্যার জন্য সেটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেটি কী সে ব্যাপারে আমি সম্পূর্ণ অন্ধকারে৷’
‘কিছু আলোকপাত করতে পারবেন?’
‘শুনেছি এই নারীকে হত্যার একটি বিশেষ উপায় আছে। ব্যস, এই পর্যন্ত জানি। কী সেই উপায় বলতে পারব না।’
‘কে বলতে পারবেন আপনার কোনও ধারণা?’
চোখ বন্ধ করে ভাবতে লাগলেন চারুদত্ত। সেই অজস্র বলিরেখাঙ্কিত মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন কাহ্নপা। কে বলবে, এই মানুষটি এককালে বঙ্গদেশের শাসনক্ষমতার অন্যতম স্তম্ভ ছিলেন। নিজের হাতে সম্রাট রাজভটকে হত্যা করেছেন, বলভটকে পুত্তলিকা বানিয়ে শাসনক্ষমতা কুক্ষিগত করেছেন, প্রকাশচন্দ্রকে সেই পাপের ভাগীদার করেছেন। অবশেষে ধূর্ত প্রকাশচন্দ্র শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েই এঁকে বন্দি করেছেন। আজ ইনি দীনহীন সহায়সম্বলহীন অবস্থায় এই অস্বাস্থ্যকর দেশে এসে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষারত।
এঁর সংবাদ দিয়েছিলেন জয়নাথ, ইনি হরিকেলের সামন্ত হরিদত্ত’র অমাত্য। হরিদত্ত প্রকাশচন্দ্রের আত্মীয়, বিশেষ অনুগৃহীতও বটে। ক্রূরতায়, ধূর্ততায়, নৃশংসতায় ইনি দ্বিতীয় প্রকাশচন্দ্র।
তবে হরিদত্তর একটি বিশেষ দুর্বলতা আছে। হরিদত্ত অত্যন্ত নারীলোলুপ। নিয়মিত গণিকাসম্ভোগ তো বটেই, পরস্ত্রী হরণেও ইনি বিশেষ সিদ্ধিলাভ করেছেন। এঁর একটি বিশিষ্ট বাহিনী আছে, সুন্দরী যুবতী কন্যা বা স্ত্রী হরণ করাই যাদের একমাত্র কাজ।
আর সেই রন্ধ্রপথেই এঁর সর্বনাশের পথ উন্মুক্ত হয়।
অমাত্য জয়নাথের একটি পঞ্চদশবর্ষীয়া পরমাসুন্দরী ভাগিনেয়ী ছিল। অপুত্রক জয়নাথ তাকে নিজের কন্যার মতো স্নেহ করতেন। তার জন্য উপযুক্ত পাত্রও দেখেছিলেন। কিন্তু শেষরক্ষা হল না।
বিবাহের রাত্রে হরিদত্ত’র ভৈরববাহিনী বিবাহমণ্ডল থেকে মেয়েটিকে উঠিয়ে নিয়ে যায়। বাধা দিতে গিয়ে জয়নাথের রক্ষীরা এবং পাত্রটি নিহত হয়। মেয়েটির আর কোনও সংবাদ পাওয়া যায়নি।
ঘটনার সময় জয়নাথ অকুস্থলে ছিলেন না। সংবাদ পেয়ে তিনি ছুটতে ছুটতে এসে দেখেন সর্বনাশ হয়ে গেছে। সেই রাতেই তিনি উন্মাদের মতো ছুটে যান হরিদত্ত’র প্রাসাদে, যদি প্রাণপ্রিয় ভাগিনেয়ীকে উদ্ধার করা যায়।
কিন্তু হরিদত্ত তাঁর প্রাসাদে মেয়েটির থাকার কথা সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন। এমনকী অস্বীকার করেন এই দুষ্কর্মে তাঁর বাহিনীর কারও লিপ্ত থাকার কথাও। তবে আশ্বাস দেন যে এই ব্যাপারে তিনি একটি তথ্যানুসন্ধানী সমিতি গঠন করবেন। তারা কন্যাটিকে উদ্ধার করার ব্যাপারে সম্পূর্ণ সহায়তা করবে।
আর সেই সমিতির সর্বময় কর্মকর্তা কাকে নিযুক্ত করা হল? হরিদত্ত’র ভৈরববাহিনীর প্রধান গিরিকিশোরকে!
বলা বাহুল্য মেয়েটির আর সন্ধান পাওয়া যায়নি। অনেক পরে জয়নাথ অত্যন্ত গোপনসূত্রে জেনেছিলেন সেই রাতে কর্মান্তবাসকের গূঢ়পুরুষপ্রধান আনন্দদত্ত হরিকেলনরেশের আতিথ্য স্বীকার করেছিলেন। মেয়েটিকে এনে তাঁকে উপঢৌকন দেওয়া হয়৷ সেই হতভাগিনীকে একাধিকবার ভোগ করার পর তার অচৈতন্য দেহটি গোপনে মেঘনার জলে ভাসিয়ে দেওয়া হয়।
সেই থেকে জয়নাথ পুরোপুরি চুপ হয়ে যান। পদত্যাগ করার উপায় তাঁর ছিল না৷ সেক্ষেত্রে হরিদত্ত কিছুতেই এমন প্রভাবশালী শত্রুকে বেঁচে থাকতে দিতেন না। তিনি সু্যোগ খুঁজছিলেন প্রতিশোধ নেওয়ার।
আর সেই প্রতিশোধের সুবর্ণ সুযোগ এখন জয়নাথের সামনে এসেছে।
‘একজন আছেন যিনি বলতে পারেন৷’ স্তব্ধতা ভেঙে বলে উঠলেন চারুদত্ত, ‘কিন্তু তাঁর কাছে পৌঁছনো অসম্ভব।’
‘কে তিনি?’
‘সম্রাট বলভটের মৃত্যুর পর কে বঙ্গদেশের সম্রাট হন মনে আছে?’
‘মহারাজ ধর্মচন্দ্র।’
‘মহারাজ ধর্মচন্দ্রের কীভাবে মৃত্যু হয় জানেন?’
‘শুনেছি। বাকিটা অনুমান করতে পারি।’
‘মহারাজ ধর্মচন্দ্রের প্রথমা মহিষীর নাম কাঞ্চনাদেবী। তিনি স্বচক্ষে মহারাজের হত্যা দেখে ফেলেছিলেন। সেই ভয়ঙ্কর দৃশ্য দেখে তিনি পাগলিনী হয়ে যান।’
‘তাঁর তো কোনও সন্ধান নেই জানি। তিনি জীবিত না মৃত...’
‘তিনি বেঁচে আছেন কাহ্ন,’ সাগ্রহে এগিয়ে এলেন চারুদত্ত, ‘প্রকাশচন্দ্রের গুপ্ত কারাগারের নাম শুনেছ?’
‘শুনেছি আর্য। সে নাকি নরকবিশেষ।’
‘সম্পূর্ণ নির্ভুল শুনেছ। কাঞ্চনাদেবী সেই কারাগারে বন্দি আছেন বহুকাল। বাইরে কেতকদাস নামের যে রক্ষীটিকে দেখলে, এখানে আসার পূর্বে সেইই ছিল ওই কারাগারের রক্ষী। তার মুখে শুনেছি। এখনও বেঁচে আছেন সেই হতভাগিনী নারী। একবার যদি তাঁর কাছে পৌঁছতে পার, তবে সমস্ত প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবে। আমি নিশ্চিত, একমাত্র তিনিই অব্যর্থভাবে সন্ধান দিতে পারেন রাজ্ঞী এবং প্রকাশচন্দ্রের মৃত্যু উপায়ের।’
নিমেষে কাহ্নপা শিহরিত, ‘আপনি ঠিক বলছেন আর্য?’
‘অবশ্যই। মহারাজ ধর্মচন্দ্র’র মৃত্যুর পর উন্মাদবৎ কাঞ্চনাদেবীকে প্রথমে তাঁর কক্ষে অবরূদ্ধ রাখা হয়। কিন্তু সেখানে তিনি রাতদিন বিচিত্র এবং অসংলগ্ন কথা বলতেন। তার কিছু কিছু খুব কৌতূহলপ্রদ। যেমন, ‘আমি জানি ওই রাক্ষসী মরবে কী করে।’ অথবা, ‘নিজের ভাইকে মেরে পার পাবেন না প্রকাশচন্দ্র, আপনার মৃত্যুবাণ কোথায় রাখা আছে জানি।’
কাহ্নপা স্থিরনেত্রে তাকিয়ে রইলেন বৃদ্ধের দিকে।
‘এইভাবে চলতে চলতে একদিন কাঞ্চনাদেবী কক্ষের বাইরে বেরিয়ে এসে প্রকাশচন্দ্র আর রাজ্ঞীর উদ্দেশে উচ্চৈঃস্বরে গালমন্দ করতে থাকেন। সেইদিনই কাঞ্চনাদেবীকে কারাগারে বন্দি করা হয়। তবে জানি না তিনি এখনও জীবিত আছেন কি না।’
‘হুম। সেই কারাগারের অভ্যন্তরে প্রবেশ করা কঠিন হবে না। আমাদের মধ্যে কেউ স্বেচ্ছায় ধরা দিলেই তাকে মহাসমাদরে সেখানে নিয়ে যাওয়া হবে। কিন্তু সেখান থেকে বেরিয়ে আসা...’
‘কেউ আছে তোমাদের মধ্যে যিনি পারবেন এই কাজ? যিনি ওই নরকের ভেতরে প্রবেশ করতে পারবেন? কাঞ্চনাদেবীর কাছে পৌঁছতে পারবেন? যদি পৌঁছতে পারেন, তাহলে সেখান থেকে পালানোর উপায় আমি বলে দেব।’
বিস্মিত হলেন কাহ্ন, ‘কীরকম?’
‘ওই কারাগারের মধ্যে একটি অত্যন্ত গোপন সুড়ঙ্গ আছে, যার সন্ধান কেউ জানে না। কারণ যারা এই সুড়ঙ্গ বানিয়েছিল, তাদের কাউকেই আর বাঁচিয়ে রাখা হয়নি।’
উত্তরোত্তর আশ্চর্য হচ্ছিলেন কাহ্নপা। তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘কিন্ত সেই সুড়ঙ্গের সংবাদ আপনি জানলেন কী করে?
একটা কৌতুকের হাসি ছড়িয়ে পড়ল নবতিপর বৃদ্ধের মুখে, ‘কারণ ওই কারাগার সম্পূর্ণভাবে আমারই পরিকল্পনায় তৈরি।’
কমলাঙ্ক। কর্মান্তবাসকের পূর্ব উপকণ্ঠ।
ব্রাহ্মণবটুটি উদগ্রীব হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন গ্রামের সীমানায়। সীমানা বলতে ধানের খেত এবং গ্রামের প্রান্তবর্তী অরণ্যটির মধ্যবর্তী একটি সরু আল। অরণ্য বিশেষ সুবিধার নয়। বুনো মোষ ও শুকর তো আছেই, তার সঙ্গে আছে শিয়াল আর জংলী কুকুর। মাঝে মাঝে বাঘেরও দেখা পাওয়া যায়। প্রায়শই খাদ্যের সন্ধানে তারা হানা দেয় গ্রামের মধ্যে। দরিদ্র গ্রামবাসীর গোয়াল থেকে টেনে নিয়ে যায় গবাদি পশু৷ গ্রামের শেষে বাস করে দুর্ধর্ষ কিরাতজাতি৷ তারা ছাড়া এর অভ্যন্তরে প্রবেশ করার সাহস কারও নেই৷ গ্রামবাসীরা সভয়ে এবং সযত্নে এড়িয়ে চলে এই বনভূমিকে৷
অথচ তাঁকে এই মুহূর্তে এখানেই অপেক্ষা করতে হবে। কারণ লোকেশ্বর মৎস্যেন্দ্রনাথ চরমুখে সংবাদ পাঠিয়েছেন যে, তিনি আসছেন এই পথেই৷
সন্ধ্যা নেমে আসছে৷ গোধূলির স্বর্ণাভ আভায় পশ্চিমদিগন্ত রক্তমলিন। নীড়ে ফেরা পাখিদের কলকাকলিতে চারিদিক মুখরিত। এখন শরৎকাল। বাতাসে হিমের ভাব৷ ইতিমধ্যেই চারিদিকে নেমে এসেছে কুয়াশার আচ্ছাদন। ব্রাহ্মণ যেখানে দাঁড়িয়ে আছেন, তার থেকে বেশ কিছু দূরে অরণ্যের অন্যধারে অস্পৃশ্য কিরাতজাতির বাস। তারা বোধহয় আগুন জ্বালিয়ে আজকের শিকারলব্ধ পশুটির সৎকারে ব্যস্ত। সেই ধোঁয়ার রাশি বাতাসে ভর করে এদিকে ভেসে এসে কুহেলিজাল আরও ঘন করে তুলেছে। ইতিমধ্যেই গুল্মলতারাজির মধ্যে জ্বলে উঠতে শুরু করেছে জুনিপোকার দল। ঝিল্লীরবের সমবেত ঐকতান শুরু হতে চলেছে।
একটু চঞ্চল হয়ে উঠলেন ব্রাহ্মণ। কেউ যদি দেখে ফেলে, এই সময়ে তিনি এখানে দাঁড়িয়ে আছেন—তাহলে সর্বনাশ। সময় ভালো না। প্রকাশচন্দ্রের চরেরা ঘুরে বেড়াচ্ছে সর্বত্র। চারিদিকে অবিশ্বাসের বাতাবরণ। কে কখন কার নাম স্থানীয় মাণ্ডলিক বা ভুক্তিপতির কানে তুলে দেবে, বলা দুষ্কর। প্রবাদে বলে ‘নৃপ কর্ণেন পশ্যতি,’—রাজা কান দিয়ে দেখেন। এখন বঙ্গদেশের ক্ষুদ্র থেকে বৃহৎ প্রতিটি ভূম্যধিকারী স্বক্ষেত্রে রাজা হয়ে বসেছেন। এবং তাঁরা আর কোনও রাজসুলভ গুণ আয়ত্ত করুন না করুন, এই ‘কানে দেখা’-র অভ্যাসটি সযত্নে আত্মীকৃত করেছেন। তাঁরা কিছু তলিয়ে ভাবেন না, অভিযোগের সম্ভাব্যতা-অসম্ভাব্যতা বিচার করেন না, সংবাদ শোনামাত্র ‘দোষী’র শাস্তিবিধান করেন।
ব্রাহ্মণটি তার উত্তরীয় অঙ্গে জড়িয়ে একটি শিমূলবৃক্ষের তলায় অন্ধকারে মিশে গেলেন।
সারা দেশে এখন ভয় এবং আতঙ্কের পরিস্থিতি। ঘরে ঘরে ধূমায়িত হচ্ছে তীব্র অসন্তোষ। দারিদ্র্যের জালে, করভারে নিষ্পেষিত সাধারণ মানুষ মাঝে মধ্যেই বিদ্রোহ এবং বিক্ষোভের পথ বেছে নিচ্ছেন। মাঝেমধ্যেই এখান ওখান থেকে রাজদ্রোহের সংবাদ পাওয়া যায়। প্রকাশচন্দ্রের সৈন্যসামন্তের দল সেগুলি নির্মমভাব দমন করে৷ যদি দণ্ডনায়কের কানে আসে, কোনও গ্রামে রাজদ্রোহের স্ফুলিঙ্গমাত্র দেখা দিয়েছে—তাহলে আর রক্ষা নেই। প্রকাশচন্দ্রের ঘাতকের দল ভীমবেগে ঝাঁপিয়ে পড়ে সেই গ্রামের নিরন্ন, অর্ধমৃত মানুষের উপর।
ইতিমধ্যেই সংবাদ এসেছে সমতটের তিনখানি গ্রাম, বজ্রিণীসার, মঠবাড়ি এবং জম্বুসর সম্পূর্ণরূপে ভস্মীভূত। হরিকেলের ধীবররা একবার বিদ্রোহী হয়েছিল। তাদের প্রত্যেকটি পুরুষকে হত্যা করা হয়েছে। নারী ও শিশুদের দাসী হিসেবে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে বিদেশী বণিকদের কাছে। হরিকেলের সমুদ্রোপকূলে এখন শ্মশানের স্তব্ধতা।
তবে এত করেও কি সব ক্ষোভ আর বিদ্রোহের আগুন নেভাতে পেরেছেন প্রকাশচন্দ্র? রাজক্ষমতার অপ্রতিহত প্রতাপ কি তাঁর শাসনকে নিরঙ্কুশ করতে পেরেছে? পারেনি।
বেশ কয়েক বছর ধরেই বাংলার সামাজিক ও ধর্মীয় জগতে এক নিঃশব্দ পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছিল৷ মহাযানপন্থার দিন বহুদিন আগেই গত। এখন সর্বত্র বজ্রযানের জয়জয়কার। নিরাকার বুদ্ধোপাসনার স্থান নিয়েছে আদিবুদ্ধ তথা পঞ্চস্কন্ধাধিপতি পঞ্চধ্যানীবুদ্ধের বিভিন্ন মূর্তিপূজা। ভিক্ষুর বদলে এখন গৃহী বৌদ্ধরা দলে ভারী।
তাদের বৌদ্ধশাস্ত্রপাঠে রুচি নেই, তার বদলে ধারণী ও মন্ত্রোচ্চারণে মুক্তির উপায় খোঁজে। শূন্যতা ও উপায়ের মিলনে নির্বাণ বোঝে না, মৈথুনক্রিয়ায় রত হয়ে যৌনসুখানুভূতিকেই নির্বাণসুখ বলে মনে করে। বিহারের বজ্রযানী অধ্যক্ষরা এখন গুরুর পদ অলঙ্কৃত করেছেন। গুরুর আদেশই এখন বৌদ্ধদের কাছে ধর্ম। তত্ত্বালোচনা নয়, দশকুশল নয়, পারমিতা নয়, শীল ও বিনয় পালন নয়; তাঁদের ধর্মাচরণের মূল সাধনা এখন হঠযোগ।
অধুনা বজ্রযানের বদলে বঙ্গদেশের বুকে মাথা তুলছে এক নবীন ধর্মমত। সহজযান। আশ্চর্যের বিষয় হল, এই মতের যাঁরা সিদ্ধপুরুষ বা আচার্য, তাঁরা কেউ কোনও বৌদ্ধ বিহারের ভিক্ষু বা সন্ন্যাসী নন। অন্ত্যজ শ্রেণীর মানুষ। কেউ কেউ আবার স্বেচ্ছায় রাজগৃহ বা উচ্চবিত্ত জীবন ছেড়ে মুক্তির খোঁজে নেমে এসেছেন পথের ধুলায়। এঁদের মধ্যে কেউ কৈবর্ত জালিক, কেউ বা ব্যাধ, কেউ আবার বারবণিতাগৃহের দ্বারপাল। এঁদের মধ্যে ভিক্ষুক আছেন, আছেন রজক, কৃষিজীবী, তন্তুবায়-কুবিন্দক, অথবা চর্মকার। এমনকি একজন ঠগও আছেন, সিদ্ধিলাভ করার আগে মানুষকে প্রবঞ্চনা করাই ছিল যাঁর পেশা!
অথচ এই সিদ্ধদের জনপ্রিয়তা অতি দ্রুত ক্রমবর্ধমান। এঁদের আচার-আচরণ অন্ত্যজ শ্রেণীর সমাজবিধির অনুকূল। মদ্য-মাংস-মৈথুন—কিছুতেই এঁদের বিরাগ নেই। ভদ্রসমাজের বাইরে ছায়ার মতো এঁদের গতিবিধি। এঁদের হদিশ পাওয়া দুষ্কর। মাছ যেমন জলের মধ্যে স্বচ্ছন্দ থাকে, এঁরাও সেভাবে মিশে থাকেন জনসাধারণের মধ্যে। প্রকাশচন্দ্রের চরেরা সংবাদ এনেছে—এঁরাই গোপনে গোপনে জনসাধারণকে উত্তেজিত করছেন, মন্ত্রণা দিচ্ছেন, সংগঠিত করছেন। আর তাঁদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন একজন শৈবযোগী। লোকেশ্বর মৎস্যেন্দ্রনাথ।
বিশ্বস্ত ঘাতকদের দিয়ে একটি বিশেষ বাহিনী নির্মাণ করেছেন প্রকাশচন্দ্র। এই বাহিনীর নাম ‘রাজসেবক।’ এদের একমাত্র কাজ হচ্ছে রাজদ্রোহীদের সন্ধান করে বেড়ানো। এদের অসাধ্য কিছু নেই। গুপ্তহত্যা থেকে শুরু করে অপহরণ, বিনা বিচারে কাউকে আটক করে রাখা, বন্দিদের ওপর অকথ্য, অবর্ণনীয় অত্যাচার করা, রাতের অন্ধকারে হানা দিয়ে গ্রামের পর গ্রাম ভস্মীভূত করা—এসবই এদের কাছে অতি-সাধারণ ব্যাপার। রাজসেবকবাহিনীর নাম শুনলেই সাধারণ বঙ্গবাসী ভয়ে থরথর কাঁপতে থাকে।
এত করেও নিশ্চিন্তে বসে নেই প্রকাশচন্দ্র ও তাঁর সঙ্গীসাথীরা। সম্পূর্ণ কর্মান্তবাসক মুড়ে ফেলা হয়েছে নিরাপত্তার নিশ্ছিদ্র আবরণে। নগরের সমস্ত বাণিজ্যকেন্দ্রগুলিতে কড়া প্রহরা। মন্দির থেকে শৌণ্ডিকালয়, বন্দর থেকে বারবধূগৃহ, সর্বত্র।
শিমূল গাছটির গায়ে হাত বোলালেন ব্রাহ্মণ। এই গাছটি তাঁর প্রায় সমবয়সি। এবার ধীরে ধীরে পরপারে যাওয়ার সময় এসেছে৷ মৃত্যুকে তিনি ভয় পান না। কিন্তু অসতর্কতার জন্য ধরা পড়ে গুপ্তঘাতকের হাতে নিহত হওয়াতে তাঁর আপত্তি আছে৷ পরমব্রহ্মে লীন হওয়ার আগে তাঁর কিছু কর্মের ঋণ রয়ে গেছে৷ সেটি শেষ না করে তিনি শান্তিতে মরতেও পারবেন না।
অরণ্য প্রান্ত থেকে কিছু ক্ষীণ শব্দ ভেসে এল। ব্রাহ্মণ সতর্কচোখে চারিদিক একবার দেখে নিয়ে দ্রুত এগোলেন শব্দের উৎসের দিকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই অরণ্যের ভেতর থেকে দুজন মানুষের অবয়ব স্পষ্ট হল৷ একজন মানুষ অন্য আরেকজনের ওপর ভর দিয়ে অতি কষ্টে হেঁটে আসছেন। প্রথম মানুষটি আহত, বিব্রতও বটে। তিনি বারবার ক্ষমা চাইছেন তাঁকে বয়ে-আনা দ্বিতীয় মানুষটির কাছে। কাতরস্বরে বলছেন, ‘আমি অত্যন্ত লজ্জিত, ভদ্র গোপালদেব। যদি না দেখতাম লক্ষ্মী অরণ্যের গভীরে পালিয়ে যাচ্ছে, তাহলে হয়তো আমি এইভাবে আহত হতাম না। এই অঞ্চল আমার মাতৃভূমি। আমার ডানহাতের রেখার মতই চেনা। সারাজীবন আমি এই অঞ্চলে গোরুর গাড়ি চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে এসেছি। লোকেশ্বর সেই জন্যই আমাকে নির্বাচিত করেছিলেন এই কাজের জন্য। অথচ আমি এতই অপদার্থ যে এই সামান্য কাজটুকুও নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে পারলাম না...’
দ্বিতীয় পুরুষটি এসব প্রলাপে বিন্দুমাত্র বিচলিত হচ্ছিলেন না। দৃঢ় পদক্ষেপে বয়ে আনছিলেন প্রথমজনকে। আরও কাছাকাছি আসার পর দুজনকে ভালোভাবে দেখতে পেলেন ব্রাহ্মণ। আহত মানুষটি কিঞ্চিৎ স্থূলবপু। পরনে একটি হ্রস্ব অধোবাস, মালকোঁচাটি আঁটো করে কোমরে জড়ানো। অনাবৃত ঊর্ধ্বাঙ্গে কয়েকটি গভীর ক্ষত। সেখান থেকে নেমে এসেছে দরদর রক্তের ধারা। থরথর করে কাঁপছেন মানুষটি। কোনওমতে টেনে আনছেন তাঁর ডান পা’টি। সেটি সম্পূর্ণভাবে ক্ষতবিক্ষত৷ বোঝাই যাচ্ছে যে, কোনও এক বন্য জন্তুর আক্রমণে ভয়ানকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সেটি।
তবে ব্রাহ্মণের মনোযোগ অন্য মানুষটি।
ইনি উচ্চতায় প্রথমজনের তুলনায় অনেকখানি দীঘল। টানটান নির্মেদ শরীর। বক্ষটি বটবৃক্ষের মতো প্রশস্ত ও সবল। দুই বাহুতে অমিত বলের আভাস। কুঞ্চিত কেশদাম নেমে এসেছে ঘাড় পর্যন্ত। শান্ত ও গভীর চক্ষু। তিনি শান্তস্বরে প্রবোধ দিচ্ছিলেন আহত সঙ্গীকে, ‘আপনার বিব্রত হওয়ার কোনও কারণ নেই ভাই সুদাস। আমরা তো জেনেশুনেই এই শ্বাপদসঙ্কুল অরন্যের পথ বেছে নিয়েছিলাম, যাতে শত্রুপক্ষের চোখ এড়ানো যায়৷ আমরা তো এও জানতাম যে এ পথে হিংস্র বন্যজন্তুদের আক্রমণের আশঙ্কা আছে। আপনি নিজেকে দোষী ভাবছেন কেন?’
আহত মানুষটি কাতরে উঠলেন, ‘আপনার যদি কিছু হয়ে যেত আর্য? আমি লোকেশ্বরকে মুখ দেখাতাম কী করে?’
‘কিছু হলে হতো৷ আমরা যেদিন এই পথ বেছে নিয়েছি, সেদিনই তো আমাদের ভাগ্য স্থির হয়ে গেছে সুদাস। আমরা তো জানি যে পদে পদে বিপদের আশঙ্কা নিয়েই আমাদের চলতে হবে৷ আপনি এত বিচলিত হবেন না। যেটুকু দুর্ভোগ ভাগ্যে লেখা ছিল, তাই হয়েছে। আমরা তো দেবী চণ্ডীর আশীর্বাদে জীবিত রয়েছি। আমরা তো শেষ পর্যন্ত সক্ষম হয়েছি এই অরণ্য অতিক্রম করতে।’
‘আমার গাই দুটি...ও হো হো হো...তাদের আমি নিজের সন্তানের মতো দেখতাম যে আর্য। ওরে ধবলী, ওরে লক্ষ্মী...’ চাপাস্বরে ডুকরে উঠলেন আহত মানুষটি। স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে যে তিনি এখনও অপ্রকৃতিস্থ৷
এইবার ব্রাহ্মণ এগিয়ে এসে তাঁদের গতিরোধ করে দাঁড়ালেন। প্রথম পুরুষটি থমকালেন মুহূর্তের জন্য। তারপরেই কোন এক অলৌকিক উপায়ে তাঁর হাতে উঠে এল একটি মস্ত খড়গ। হিসহিসে স্বরে প্রশ্ন করলেন সেই বলশালী পুরুষ, ‘কে আপনি? পরিচয় দিন।’
ব্রাহ্মণ শান্তস্বরে বললেন, ‘অধমের নাম কান্তিপ্রভ।’
প্রথম পুরুষটি বললেন, ‘সূত্র উচ্চারণ করুন।’
ব্রাহ্মণ উচ্চারণ করলেন, ‘কাআ তরুবর পঞ্চ বি ডাল।’
পুরুষটি প্রত্যুত্তর করলেন, ‘চঞ্চল চীএ পইঠো কাল।’ বলে খড়্গটি নামিয়ে রাখলেন। তাঁর পথশ্রমে ক্লান্ত মুখখানিতে জ্বলে উঠল আনন্দের আলো। হাসিমুখে বললেন, ‘প্রণাম ব্রাহ্মণদেব। আমি ব্যপটপুত্র গোপাল। অস্ত্রচালনার জন্য মার্জনা করবেন।’
কান্তিপ্রভ স্মিতহাস্যে বললেন, ‘মার্জনাভিক্ষার প্রয়োজন নেই। এই সামান্য সতর্কতাটুকু না নিলে তো লোকেশ্বর-প্রেরিত নায়কের বোধ বিবেচনার প্রতি আমার বিশ্বাস টলে যেত মশাই।’
‘লোকেশ্বরের প্রেরিত নায়কের ওপর বিপুল আস্থা রেখেছেন দেখছি।’
‘তিনি মহাযোগী। স্বয়ং আদিদেব শিবের অবতার। নায়ক নির্বাচনে তাঁর ভুল হতে পারে না।’
‘লোকেশ্বরও কিন্তু আপনার ওপর অনেক ভরসা করেন, আর্য। আপনার ব্যাপারে তিনি অনেক কিছুই বলেছেন আমাকে।’
কান্তিপ্রভ সহাস্যে বললেন, ‘আশা করি কটু কিছু বলেননি।’
হাসলেন গোপাল, ‘কটু বলে কটু? সেসব ভয়ানক বাক্য শুনলে যে লজ্জায় আপনার কর্ণমূল রক্তবর্ণ ধারণ করবে।’
‘বুঝেছি!’—ছদ্মদুঃখে মুখখানি করুণ করলেন কান্তিপ্রভ,’ লোকমুখে এও শুনেছি তিনি আমাকে শ্যালক বলে সম্বোধন করেন। দুঃখের বিষয় মহাযোগীর কোনও গৃহিনীও নেই যে নিজেকে সেই মহিয়সীর সহোদর কল্পনা করে আহ্লাদিত বোধ করব।’
হাসতে লাগলেন গোপাল, ‘পিতা এবং লোকেশ্বর আপনার পরিহাসপ্রিয়তার কথা বলেছিলেন বটে। আপনার সঙ্গে আলাপিত হয়ে সুখী বোধ করছি আর্য কান্তিপ্রভ।’
‘সে তো বুঝলাম। কিন্তু আপনার সঙ্গীটি কে? ইনি এমন ভয়ানক আহত হলেন কী করে?’
আহত ব্যক্তিটি কোনওমতে হাত দুখানি জড়ো করে অভিবাদন করলেন। ক্লিষ্টস্বরে বললেন, ‘অধমের নাম সুদাস, জাতিতে গোয়ালা। পেশা গরুর গাড়ি চালানো।’
ভ্রুকুঞ্চিত করলেন কান্তিপ্রভ, ‘কোন গ্রাম?’
‘আজ্ঞে অধমের নিবাস তারাপুকুর গ্রামে।’
‘বুঝলাম। এই অবস্থা হল কী করে?’
সুদাস এবং গোপাল দুজনেই তাঁদের যাত্রার কাহিনি বিবৃত করলেন।
লোকেশ্বরের পরিকল্পনা অনুযায়ী আসন্ন অভ্যুত্থানের নায়কেরা বিভিন্ন দিক থেকে কর্মান্তবাসকে প্রবেশ করা শুরু করেছেন। শাক্যপ্রভ, হরিপ্রভ এবং ঢেণ্ঢনপা প্রবেশ করবেন হরিকেলের প্রান্ত থেকে। বঙ্গভূমির মতো হরিকেলও এখন চন্দ্রবংশের পদানত। সেখানকার সামন্ত নৃশংস, লম্পট হরিদত্ত। হরিদত্তর মহামাত্য জয়নাথ গোপনে গোপনে বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। তিনিই স্বীকৃত হয়েছেন এই গোপনকর্মে সহায়তা করতে। কম্বলপা এবং জলন্ধরনাথ বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর বেশে প্রবেশ করবেন কর্মান্তবাসকে। পদ্মসম্ভব এবং ভিক্ষুণী মন্দর্ভা সর্বাণীমন্দিরের তীর্থিক সেজে প্রবেশ করবেন উত্তর দিক থেকে, সুবর্ণগ্রাম হয়ে বিক্রমপুরের পথে। আর পূর্বদিক থেকে প্রবেশ করবেন গোপালদেব। অভ্যুত্থানের প্রধান দুই কুশীলব, আচার্য মৎস্যেন্দ্রনাথ আর বপ্যট কোথা থেকে কীভাবে কর্মান্তবাসকে আসবেন সে তথ্য কারো কাছে নেই। সমগ্র পরিকল্পনা গোপনীয়তার আবরণে গুপ্ত। কেউ জানেন না অন্য দল কী করবে। শুধুমাত্র মৎস্যেন্দ্রনাথ জানেন কখন কোথায় কীভাবে কী হবে। তাঁর গোপন চরেরা সংবাদ পৌঁছে দেয় এখান থেকে ওখানে।
কর্ণসুবর্ণ অবধি পৌঁছতে তাঁদের বিশেষ কষ্ট করতে হয়নি। সেখান থেকে তাঁরা বণিকের বেশে ত্রিবেণী হয়ে আসেন জাহোরের অরণ্য অবধি। এরপর থেকেই চন্দ্রবংশের শাসন শুরু৷ এই অরণ্য অতিক্রম করা তাঁদের পরিকল্পনার মধ্যেই ছিল। তার কারণ দুটি। প্রথম কারণ যদি হয় প্রকাশচন্দ্রের সৈন্যদের দৃষ্টি এড়ানো, তবে দ্বিতীয় কারণ এই যে, অরণ্যের মধ্যবর্তী পথটি অন্য পথের তুলনায় দুর্গম হলেও সংক্ষিপ্ত। সুদাস একদা এই অঞ্চলের সবচাইতে দক্ষ গোশকট-চালক ছিল। সেইজন্যই তাকে নির্বাচন করা।
দেড়দিনের যাত্রাপথের প্রথমদিন নির্বিঘ্নেই কেটে যায়। বিপদ হয় দ্বিতীয় দিনে এসে। দুজনে যখন কমলাঙ্ক থেকে কয়েক যোজন দূরে, তখন অতর্কিতে তাঁদের ওপর আক্রমণ করে একটি বাঘ। সমুদ্রতীরবর্তী উপবঙ্গের বনাঞ্চল এখান থেকে বেশি দূরে নয়। সেখান থেকে দক্ষিণবঙ্গের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বাঘেদের উপদ্রব আছেই। কিন্তু সচরাচর তারা মানুষ এড়িয়ে চলে। এই শার্দূল মহাশয় বোধহয় বৃদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন। তাই দুটি নধর গাভী এবং মনুষ্যসন্তান দেখে লোভ সংবরণ করতে পারেননি।
কান্তিপ্রভ শিহরিত হলেন, ‘হা ঈশ্বর! তারপর? তারপর কী হল?’
চুপ করে রইলেন গোপাল। সুদাস যুক্তকর মাথায় ঠেকালেন। ‘দীর্ঘদিন ধরে কমলাঙ্ক গ্রামের দণ্ডনায়ক দিবোদাসের গোয়ালে কাজ করেছি। বীর কিছু কম দেখিনি। কিন্তু বপ্যটপুত্র গোপালদেবের মতো বীর আর কাউকে দেখিনি আজ অবধি।
বাঘটি ধবলীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে আমরা গাড়ি থেকে ছিটকে পড়ে যাই। উঠতে আমাদের একটু সময় লাগে। উঠে দেখি তার মধ্যেই ধবলীর ঘাড় ভেঙে তাকে জঙ্গলের মধ্যে টেনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে বিশালদেহী জন্তুটা। তার মস্ত হাঁড়ির মতো মুখ, বন কাঁপানো হুঙ্কার আর উৎকট গন্ধে আমি প্রায় মূর্ছা যাই আর কি। কিন্তু গোপালদেব তার মধ্যেই কোমর থেকে একটি আধ হাত লম্বা ছুরি বার করে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন সেই বুড়ো বাঘটির ওপর।’
মুখখানি হাঁ হয়ে গেল কান্তিপ্রভর। শুধু ছুরি হাতে ক্ষুধার্ত বাঘের মুখে এইভাবে রুখে দাঁড়ানো সম্ভব?
‘তখন আমিও সাহস করে উঠে একটি কুড়াল নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লাম জন্তুটার ওপর। ইতিমধ্যে লক্ষ্মীও মুক্ত হয়েছে তার বাঁধন থেকে। ভয় পেয়ে সে পালিয়ে গেল অরণ্যের আরও গভীরে। আমি সেদিকে যাওয়ার চেষ্টা করতেই বাঘটা ঝাঁপিয়ে পড়ল আমার ওপর। প্রথমেই থাবা বসাল আমার ডান পায়ের ওপর। আমি কিন্তু তখনও লড়ে যাচ্ছি। গোপালদেব বাঘটার পিঠের ওপর বসে একের পর এক ছুরিকাঘাত করে যাচ্ছেন তার গলায় এবং মুখে। শেষে একটি মোক্ষম আঘাতে ছুরিটি ঢুকে যায় বাঘটির চোখে। তারপরেই সে ভীষণ আর্তনাদে আমাকে ছেড়ে অরণ্যের মধ্যে ছুটে পালায়।’
‘গোপালদেবই আমাকে উদ্ধার করেন। তখনও একটু দূর থেকে বাঘের মরণ-আর্তনাদ শোনা যাচ্ছে। কিছুক্ষণ বাদে আমি সামান্য সুস্থ হলে দুজনে গিয়ে দেখি—একটি অশ্বত্থ গাছের নীচে সেই বুড়ো বাঘের মৃতদেহ পড়ে আছে।’
স্খলিতস্বরে কান্তিপ্রভ বললেন, ‘অবিশ্বাস্য! সামান্য ছুরি হাতে বাঘ শিকার?’
সুদাস ওই অবস্থাতেই বিচলিত এবং গদগদসুরে বললেন, ‘আজ্ঞে হ্যাঁ। বীর গোপালদেব কেবলমাত্র একটি ছুরি হাতে পূর্ণবয়স্ক বাঘকে শিকার করেছেন, এই অবিশ্বাস্য অকল্পনীয় বীরগাথা আমি ভুলব না।’
অভিভূত হলেন কান্তিপ্রভ। প্রশ্ন করলেন, ‘আর্য গোপালদেব, একটি কথা বলুন। আপনি তো জানতেন যে আপনি একটি মহৎ কর্মের জন্য উদ্দিষ্ট। যদি দুটি গাভী আর একটি মানুষকে হিংস্র বন্য জন্তুর আক্রমণ থেকে বাঁচাতে গিয়ে আপনি মৃত্যুবরণ করতেন? তাহলে কী হতো?’
গোপালদেবের শান্ত চক্ষুদুখানি ধ্বক জ্বলে উঠল। বললেন, ‘এর উত্তর আমার সাধ্যের বাইরে আর্য কান্তিপ্রভ। আপনি বরং এই প্রশ্নের উত্তর দিন, বাহিনীর সেরা নায়ক কি শুধুমাত্র চূড়ান্ত যুদ্ধের জন্যই নির্দিষ্ট? এ কী চতুরঙ্গ ক্রীড়া যে রাজা ও রানিকে সবচেয়ে সুরক্ষিত রাখা হবে শেষ যুদ্ধকৌশলের জন্য? রাজা কি নায়কের ভূমিকা পালন করেন শুধুমাত্র রাজাসনে বসার জন্য? যে নায়ক সামান্য বন্য জন্তুর থেকে তাঁর অনুগত প্রজাদের রক্ষা করতে পারেন না, তিনি কীসের রাজা? তিনি কীসের নায়ক? যে রাজা তাঁর দরিদ্রতম, নির্বলতম, অসহায়তম প্রজার জীবনরক্ষার্থে নিজের জীবন বাজি রাখতে পারেন না, তিনি কীসের প্রজাপালক? আমি মরলে মরব, এক গোপালের বদলে সহস্র গোপাল আসবে। মৎস্যেন্দ্রনাথ আমার মতো সহস্র গোপালদেব সৃষ্টি করতে পারেন। কিন্তু আজ আমি যদি প্রাণভয়ে কর্তব্যপালনে বিমুখ হই, তাহলে বলতে হয়—মহর্ষি মৎস্যেন্দ্রনাথ ভুল মানুষে আস্থা রেখেছেন। তাঁর সামনে দাঁড়াব কোন মুখে?’
কান্তিপ্রভ এর উত্তরে কিছু বলতে যাচ্ছিলেন। তার আগেই কিরাত জনবসতি থেকে মহা হট্টগোলের শব্দ ভেসে এলো। সকলে সচকিতে হয়ে সেদিকে তাকালেন। ইতিমধ্যেই সেদিকে সন্ধ্যার অন্ধকার আকাশ ছেয়ে ফেলেছে আগুনের লেলিহান শিখা আর কালো ধোঁয়া। ভেসে আসছে মানুষের আর্তনাদ।
কান্তিপ্রভ দাঁতে দাঁত ঘষলেন, ‘গর্ভস্রাবের দল কি এই হতদরিদ্র কিরাতদেরও রেহাই দেবে না?’
শাস্ত্রাধ্যায়ী ব্রাহ্মণের মুখে অশ্লীল কুবাক্য শুনে সামান্য থমকে গেলেন গোপালদেব। উদ্বিগ্নস্বরে প্রশ্ন করলেন, ‘কী হয়েছে আর্য?’
কান্তিপ্রভ চাপা অথচ উত্তেজিত স্বরে বললেন, ‘খুব সম্ভবত প্রকাশচন্দ্রের অনুগত রাজসেবকবাহিনী এসেছে। এই আর্তনাদ তাদেরই জয়নির্ঘোষ, গোপাল।’
‘সে কী? হঠাৎ অসহায় বনচারী কিরাতদের ওপর আক্রমণের কারণ? এদের তো না আছে ধনসম্পদ, না আছে কর্ষণযোগ্য ভূমি।’
‘আর কিছু না থাক, নারীসম্পদ তো আছে।’
‘নারী? কিরাত-নারী লুণ্ঠনের উদ্দেশে এই অভিযান? কিন্তু কেন?’
‘আহুতির জন্য আর্য গোপাল। প্রকাশচন্দ্রের প্রবর্তিত নতুন ধর্মটির জন্য প্রয়োজন নিত্য আহুতি। এই আর্তনাদ সেই যজ্ঞের আহুতি।’
‘নতুন ধর্ম? যজ্ঞ? আহুতি? এসব কী বলছেন আর্য কান্তিপ্রভ?’ বিস্মিতস্বরে প্রশ্ন করলেন গোপালদেব।
তীব্র ঘৃণা মিশিয়ে উচ্চারণ করলেন কান্তিপ্রভ, ‘তিব্বতীয় পোন ধর্মের কড়াইতে আদিম লৌকিক ধর্ম আর নবোত্থিত বজ্রযানী বৌদ্ধধর্ম মিশ্রিত করে এক অপূর্ব ধর্ম প্রস্তুত করেছেন প্রকাশচন্দ্র। তার নাম নাকি নব্য তন্ত্রধর্ম। অধুনা আবিষ্কৃত ক্রিয়াটির তারা নাম রেখেছে স্বয়ং মহামায়া’র নামে, ভৈরবীচক্র। এই চক্রে বহু নারী-পুরুষ একত্রিত হয়ে মদ্য মাংস মৎস্য আহার করে, তারপর বিচিত্র মন্ত্র উচ্চারণ করতে করতে একটি ভয়ঙ্কর কর্মে লিপ্ত হয়।’
‘কী সেটি?’
‘যৌথযৌনসঙ্গম।’
স্তম্ভিত হলেন গোপালদেব, ‘বলেন কী আর্য কান্তিপ্রভ!’
‘হ্যাঁ৷ শুধু তাই নয়, চক্রপ্রবর্তকদের মতে, বলতেও ঘৃণাবোধ হয়, এই চক্রে নাকি মাতা বা ভগিনীর সঙ্গে যৌনসঙ্গমও স্বীকৃত!’
অসহ্য! সর্বাঙ্গ কেঁপে উঠল গোপালদেবের।
‘শুধু তাই? চক্রমধ্যে পুরুষ মাত্রেই নাকি স্বয়ং দেবাদিদেব শিবশম্ভু, নারীমাত্রেই নাকি স্বয়ং ভগবতী। তাই এই চক্রে জাতিবিচার নেই। এই যৌথযৌনচক্রে সবাই ব্রাহ্মণজাতি। এই পাপকর্মে যুক্ত হওয়ার জন্য প্রকাশচন্দ্র বহুবিধ বিট নিয়োগ করেছেন। তাদের কাজই হচ্ছে কুমারী কন্যা বা কূলবধূদের এই পথে টেনে আনা।’
‘কিন্তু কুমারী কন্যা বা কূলবধূরা এই অশ্লীল প্রস্তাবে সম্মত হয় বা কেন?’
ক্লান্ত হাসি খেলে গেল কান্তিপ্রভর মুখে, ‘কারণ স্বয়ং রাজা যে প্রথাকে আচরণীয় ধর্ম বলে ঘোষণা করেন, প্রজারাও সেই ধর্মেরই অনুশাসন মেনে চলে৷ প্রকাশচন্দ্র ঘোষণা করেছেন—মদ্যমাংস আহারই শীল৷ মৈথুনেই মোক্ষ। লাম্পট্যই পরমার্থ। এই নবোদিত তন্ত্রধর্মে ক্রিয়াকর্মে নিজের গৃহলক্ষ্মীদের উৎসর্গ করা নাকি মহাপুণ্যকর্ম। কুমারী কন্যা হলে তো কথাই নেই।’
আশ্চর্য হলেন গোপালদেব, ‘রাজা ভ্রান্ত হতে পারেন, ধর্মনীতি ভ্রান্ত হতে পারে। কিন্তু মানুষের নীতিবোধ? সাধারণের ঔচিত্য-অনৌচিত্যবোধও কি বিলুপ্ত?’
‘নীতি? অনুশাসন? শৃঙ্খলা? ঔচিত্যবোধ? সেসব অনেকদিন আগেই বঙ্গভূমি ত্যাগ করেছে আর্য গোপালদেব৷’
তবুও সংশয় যায় না গোপালদেবের, ‘কিন্তু বঙ্গদেশের মায়েরা, বধূরা এই অনাচার সহ্য করছেন?’
‘অন্ন আর্য, অন্ন। অন্নচিন্তা চমৎকারা। অন্নই সেই মহতী আকর্ষণ, যার জন্য সদ্বংশের রমণীরাও আজ এই পাপপথে পা বাড়াতে বাধ্য হচ্ছেন। অন্নাভাবে ক্লিষ্ট বঙ্গজনকে দেখুন। মা হয়ে এক নারী কীভাবে চোখের সামনে নিজের সন্তানকে অনাহারে মরতে দিতে পারে? কীভাবে পারে তার পিতা, তার মাতা, তার সহোদরকে ক্ষুধার জ্বালায় ছটফট করতে দেখতে? আর যাঁরা এখনও সে পাপকর্মে লিপ্ত হননি, তাঁদের জন্য রয়েছে ওই ওরা, চন্দ্ররাজের পালিত সারমেয় শাবকদের দল।’
গোপাল একবার স্থিরচোখে তাকালেন কান্তিপ্রভ’র দিকে, আরেকবার কিরাতপল্লীর দিকে। তারপর সুদাসকে সেই শিমূলবৃক্ষতলে সযত্নে স্থাপন করে বললেন, ‘সুদাস, কিঞ্চিৎ বিশ্রাম নিন। মনে হচ্ছে সারমেয় বিতাড়নে না নামলেই নয়।’
রাজপ্রাসাদের পূর্ব ও দক্ষিণ প্রান্ত জুড়ে অবস্থিত এই ঘরটি রানির শয়নকক্ষ। আকারে এবং সাজসজ্জায় এটিই রাজপ্রাসাদের উৎকৃষ্টতম ঘর। কক্ষের দেওয়াল জুড়ে কয়েকটি বড় বড় বাতায়ন৷ সেই পথে ভেসে-আসা বাতাসে আন্দোলিত হচ্ছে উজ্জ্বল রঙের দুর্মূল্য চীনাংশুকের পর্দা।
ঘরের চারকোণে চারটি কাঠের ত্রিপদী৷ তাদের উপর কাঁসার জলাধার৷ সেই জলে ভাসছে কিছু আধফোটা পদ্মকুঁড়ি। জলাধারের জলে মিশ্রিত কর্পূর ও চন্দনের সুগন্ধ ঘরটিকে মোহময় আবেশে পূর্ণ করে রেখেছে।
ঘরের ভূমিটি মৃগচর্মের চিত্রকম্বলে আবৃত। তার ওপর পা ফেলামাত্র গোড়ালি অবধি ডুবে যায়, এমনই নরম। দেওয়ালগুলি বিভিন্ন লতাপাতা, ফুল, পশুপ্রাণী এবং মানুষ মানুষীর চিত্রে সজ্জিত। চিত্রগুলি ভালো করে দেখলে বোঝা যায়, তার অধিকাংশই কামকলা বিষয়ক।
ঘরের মধ্যে আলোর উৎস হচ্ছে ঘরের চার কোণে রাখা চারটি বড় দীপদান। তার ওপর সোনার প্রদীপ জ্বলছে। প্রদীপের ঘিয়ের মধ্যে ডুবিয়ে রাখা আছে কিছু শুষ্ক গুল্মলতা। মিষ্ট ও স্নিগ্ধ আঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ছে ঘরটির বাতাসে।
উত্তর পশ্চিম কোণে একটি অলিন্দ। তার ছাদ থেকে ঝুলছে একটি সোনার খাঁচা। খাঁচাটি আপাতত শূন্য। মৃদুমন্দ হাওয়ায় সেটি দুলছে। সেই শূন্য সোনার খাঁচাটি ঘিরে, অলিন্দটি ঘিরে, ঘরের সুমিষ্ট বাতাস মথিত করে স্তব্ধ চরাচর ভেসে যাচ্ছে আজ রাত্রের এই অবারিত পূর্ণিমা জোৎস্নায়।
সময় রাত্রির তৃতীয় প্রহর। ঘরটির ঠিক মধ্যস্থানে অতি মহার্ঘ চন্দনপালঙ্ক পাতা। তার উপরে আরামপ্রদ সুখশয্যা। সেই সুখশয্যার উপর দুখানি নগ্ন শরীর পরস্পরকে জড়িয়ে রয়েছে। তাদের তীব্র আশ্লেষবন্ধনে বিচিত্র শব্দ ভেসে আসছে। চুম্বন ও শীৎকারের শব্দে ঘরের বাতাস মদমত্ত। পালঙ্কের দুপাশে দুজন কিঙ্করী বিশাল চামর হাতে ব্যজনে ব্যাপৃত।
যিনি নারী, তাঁর অঙ্গসৌষ্ঠব অতুলনীয়। গাত্রবর্ণ তপ্তকাঞ্চনতুল্য। গ্রীবাদেশ অতি মনোহর। স্তন পীনোন্নত৷ ঝরনার মতো কেশদাম তাঁর ক্ষীণকটি অবধি বিস্তৃত। সামান্য তির্যক চক্ষু দুখানি বড়ই চঞ্চল, কটাক্ষমাত্রে শিকারের প্রতি কামশর নিক্ষিপ্ত হয়। নাসিকাটি ইষৎ খর্ব। পত্রল ওষ্ঠ দুটি রক্তরাগরঞ্জিত। বাম অধরোষ্ঠে একটি ক্ষুদ্র তিল।
পুরুষটির গায়ের রঙ ঘোর কৃষ্ণ। পেশিবহুল দেহ৷ চোখদুটি স্থূল এবং কামাতুর। পুরুষটি তাঁর স্থূল ওষ্ঠ দিয়ে নারীটির কোমল গ্রীবাদেশ চুম্বনরত। তাঁর বলিষ্ঠ বাহুদুটি নারীটির দেবভোগ্য দেহখানি সবলে আলিঙ্গন করে আছে।
রানি ঈষৎ স্খলিতস্বরে বললেন, ‘অতি উত্তম। আশা করি আপনিই আমাকে যথাযথ তৃপ্তি দিতে পারবেন। কী বলেন, নাগর?’
পুরুষটি অপরিমিত পৈষ্ঠীপানে কিঞ্চিৎ বেপথু ছিলেন। তিনি তাঁর বামহাত দিয়ে নারীটির গণ্ডদেশ দৃঢ়ভাবে ধারণ করে বললেন, ‘পারব বইকি, রানি! আপনাকে তৃপ্ত করা কি যে সে পুরুষের কর্ম? আমি পৌণ্ড্রের বণিজপ্রধান বিমানবিহারীর পুত্র অনঙ্গমিত্র৷ আমি পারব না তো কে পারবে?’
নারীটির তির্যক চক্ষুদুটি সামান্য বক্র হল। পুরুষটি সেটি লক্ষ করলেন না। তিনি একজন দাসীকে ইঙ্গিত করলেন ঘরের এককোণে রাখা সুগন্ধী তাম্বুলকলঞ্জটি এনে দিতে। তারপর তাম্বুলকলঞ্জ হাতে পরম সুখাবেশে শয্যায় লম্বমান হলেন। সুগন্ধী তাম্বুলে ঘরের বাতাস আর্দ্র হয়ে উঠল। আরেক দাসী পানীয়ের পাত্র রানির হাতে এনে দিল।
রানি পানীয় এক গণ্ডূষে নিঃশেষ করে কিছুক্ষণ মুখখানি বিকৃত করে রইলেন। কিছু পরে অন্ধকারের মধ্যেও তাঁর চক্ষুদুটি জ্বলে উঠল। সামান্য মদানসস্বরে বললেন, ‘সে না হয় বুঝলাম৷ কিন্তু মহাশয়ের পৌরুষ এখনও এত শিথিল কেন?’
দাসীদুটি যান্ত্রিকস্বরে হেসে উঠল। সেই হাসি শুনে পুরুষটির অভিমান আহত হল। তিনি নারীর কেশ আকর্ষণ করে তাঁর ওষ্ঠদ্বয় নিজের ওষ্ঠপ্রান্তে নিয়ে এলেন৷ তারপর রানির ওষ্ঠচুম্বন করতে করতে কামতাড়িত স্বরে বললেন,’ ‘চুম্বন করতে থাক রে বহুগামী রণ্ডা। চুম্বনস্পর্শ ব্যতীত কি পৌরুষ জাগে রে? আজ ভালো আমায় তৃপ্ত কর৷ কাল প্রত্যুষে আমি বঙ্গদেশের সম্রাট হব। তুই হবি আমার সাম্রাজ্ঞী, বঙ্গবিজেতা অনঙ্গমিত্রর প্রধানা মহিষী।’
মুহূর্তের মধ্যে জ্বলে উঠল নারীটির চোখ। তবে সে মুহূর্তের জন্যই। অনঙ্গ খেয়াল করলেন না৷
চুম্বনের সময় পুরুষটির সামান্য অস্বস্তি হতে লাগল। তবে তার কারণটি তিনি ঠিক অনুধাবন করতে পারলেন না। একবার তাঁর মনে হল—একটি নয়, দুই জিহ্বা তাঁর ওষ্ঠ লেহন করছে৷ তিনি নেশাতুরস্বরে বললেন, ‘জানি তুই অনেক পুরুষের অঙ্কশায়িনী হয়েছিস৷ কিন্তু আজ থেকে সেসব বন্ধ করতে হবে৷ আর হ্যাঁ, অভিষেকের সময় আমার পিতা-পিতৃব্যরা উপস্থিত থাকবেন৷’
রানি সর্পিল গতিতে উঠে এলেন পুরুষটির ওপর। তারপর নিজের মধ্যে অনঙ্গের পৌরুষ প্রোথিত করে স্খলিত কণ্ঠে বললেন, ‘অবশ্যই আর্য। আপনি আমার প্রভু, আমি আপনার দাসী। এই নারী, এই রাজপ্রাসাদ, অগণিত দাসদাসী, এই বিস্তীর্ণ বঙ্গদেশ আপনার ভোগ্য। আসুন প্রভু, আমাকে গ্রহণ করুন।’
নারীটি কয়েকবার নিতম্ব চালনা করতেই পুরুষটির কামাগ্নি আগ্নেয়গিরির মতো বিস্ফোরিত হল।
পরম আবেশে কিছুক্ষণ তীব্র অনঙ্গসুখ উপভোগ করেছিলেন অনঙ্গ। আঃ, এই তো পরম সুখ৷
নাহ্, এইবার আসন পরিবর্তন করা উচিত। মহর্ষি বাৎস্যায়ন তো অনেক আসনেরই সন্ধান দিয়ে গেছেন।
অনঙ্গমিত্র দুই হাত দিয়ে রানির নিতম্ব নিষ্পেষণ করতে গেলেন। কিন্তু তার আগেই নারীর পদ্মের ডাঁটার মতো বাম হাতটি তাঁর দুই বলিষ্ঠ বাহু ধরে ফেলল।
নিজের দুই হাত মুক্ত করতে গিয়ে অনঙ্গমিত্র আশ্চর্যের সঙ্গে আবিষ্কার করলেন যে, তিনি হাত নাড়াতে পারছেন না। আবার চেষ্টা করলেন৷ পারলেন না।
আশ্চর্য হলেন অনঙ্গমিত্র। তিনি কম বলশালী নন। নিয়মিত দৈহিক অনুশীলন করে থাকেন। সন্তরণে, নৌচালনায়, মল্লযুদ্ধে সত্যব্রতর সমকক্ষ যুবক পুণ্ড্রবর্ধনে কমই আছেন। তবুও এই মদালসা রমণী একটিমাত্র হাতে তাঁর দুটি বলশালী বাহু এমন ভাবে ধরে রেখেছে যে, তিনি তাঁর হাত দুটি মুক্ত করতে পারছেন না? এত শক্তি ধরে এই নারী?
সহসা তিনি এক ঝটকায় নিজেকে মুক্ত করে উঠে বসতে গেলেন। কিন্তু সবিস্ময়ে আবিষ্কার করলেন যে তিনি তাও পারছেন না। তাঁর দেহের নিম্নাংশ এখন সেই লৌহকঠিন উরুস্তম্ভের মধ্যে বদ্ধ! তাহলে কি বিশাখসেনের কথাই সত্য? এ কি ইন্দ্রজাল? না মায়া?
বিমানবিহারীর বয়স হয়েছে অনেক। তাঁর বাণিজ্যের অধিকাংশ দায়িত্ব এখন জ্যেষ্ঠপুত্র অনঙ্গমিত্রর উপর ন্যস্ত। সেই সূত্রেই তিনি এসেছিলেন কর্মান্তবাসকে। অধিকাংশ শ্রেষ্ঠীদের মতো এই দেশের শৌল্কিক, গৌল্মিক, মহামাণ্ডলিক, ভুক্তিপতি আদি সমস্ত প্রধান রাজকর্মচারীদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক অতি সুমধুর। কর্মান্তবাসকের বর্তমান ভুক্তিপতি হচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী অমিতাভভট্ট। কর্মান্তবাসকে চিরকাল প্রধানমন্ত্রীই পদাধিকার বলে রাজধানীর ভুক্তিপতি হয়ে এসেছেন৷ ইনি স্বভাবে নাট্যমোদী এবং কাব্যপ্রেমী। অনঙ্গমিত্রকে সেইজন্য অশ্বঘোষ, কালিদাস, বাণভট্ট, ভাস, ভারবী থেকে শুরু করে বিশাখদত্তর কাব্য অবধি কণ্ঠস্থ করতে হয়েছে। কী আর করা যাবে, যে পূজার যা উপচার! বঙ্গীয় রাজপদোপজীবিদের অধিকাংশই সরাসরি উৎকোচ গ্রহণ করেন, মুদ্রায় অথবা দ্রব্যে। তবে অমিতাভট্টর মতো কিছু রাজন্যকে সংস্কৃতিশাস্ত্রে পূজা করতে হয়। তবেই তাঁরা প্রসন্ন হন।
অমিতাভভট্টর হিরণ্যসামুদায়িক হচ্ছেন বিশাখসেন। ইনি একাধারে কর্মান্তবাসকের বাণিজ্য এবং কৃষিকর সংগ্রাহক। মদ্যপ্রেমী এবং নারীসংসর্গলোলুপ এই মানুষটি অনঙ্গমিত্রর সবচেয়ে প্রিয় বান্ধবও। তাঁর মুখেই এই আশ্চর্য কথা শুনেছিলেন অনঙ্গমিত্র।
বঙ্গদেশের রানি নাকি এক অদ্ভুত প্রতিজ্ঞা করেছেন। যে যুবা তাঁকে কোনও এক পূর্ণিমা বা অমাবস্যার রাতে রতিক্রিয়ায় সম্পূর্ণ তৃপ্ত করতে পারবে, তাকেই তিনি বিবাহ করবেন। সেই যুবক হবেন দেশের সার্বভৌম সম্রাট।
শুনেই উত্তেজিত হয়ে উঠেছিলেন অনঙ্গমিত্র। কাম্বোজ থেকে বৎস, উত্তরকুরু থেকে চেরদেশ, এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বাণিজ্যসংসাধনে গতায়াত আছে পুণ্ড্রবর্ধনের উদীয়মান শ্রেষ্ঠীসম্রাট অনঙ্গমিত্রর। কার্যব্যপদেশে ভিন্নরাজ্যে অবস্থিতিকালে সেখানকার নারীরত্নদের সঙ্গসুখ উপভোগ না-করাকে পাপকর্ম বলে বিবেচনা করেন তিনি।
তাই এই প্রতিজ্ঞা শোনা মাত্র তিনি বিশাখসেনকে পীড়াপীড়ি করতে থাকেন—যাতে অন্তত একবার তাঁকে ভাগ্যপরীক্ষার সুযোগ দেওয়া হয়।
শুনে ইতস্তত করছিলেন বিশাখসেন। স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছিল যে, তাঁর বিলক্ষণ আপত্তি আছে। সেই দ্বিধাদ্বন্দ্ব দেখে আশ্চর্য হচ্ছিলেন অনঙ্গমিত্র। এমন দ্বিধার কারণ কী?
কর্মান্তবাসকের শ্রেষ্ঠ শৌণ্ডিকালয়টির অধিকারী হচ্ছেন জনৈক ভাঁড়ুদত্ত। ভাঁড়ুদত্ত নিজে তো বটেই, তাঁর শৌণ্ডিকালয়টিও কম প্রাচীন নয়। নিয়মিত এখানে আসেন, এমন রাজকর্মচারীদের সংখ্যাও কম নয়। লোকে জানে এবং স্বীকার করে বঙ্গদেশের রাজনীতিস্রোতে মাঝে মাঝেই যেসব কূটঘূর্ণি দেখা যায়, তার অধিকাংশই ভাঁড়ুদত্তের বারুণীবক্ষে সৃষ্ট । দুই বন্ধুতে এই আলোচনাটিও সেখানেই ঘটছিল।
অনঙ্গমিত্র এক নিঃশ্বাসে একপাত্র অত্যুৎকৃষ্ট মদ্য শেষ করে পানপাত্র সশব্দে নামিয়ে রেখেছিলেন। তারপর উন্মত্ত আরক্তচক্ষে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘তুমি কি আমার পৌরুষের প্রতি সন্দেহ পোষণ করছ, মিত্র?’
অরিষ্টর ষষ্ঠ পাত্র নিঃশেষ করে বিশাখসেন বললেন, ‘কর্মটি বড় সহজ নয় হে মিত্র। তোমার কি মনে হয়, বঙ্গদেশে পুরুষের অভাব আছে? বিষয়টি এত সহজ হলে কি আর এই দেশের পুরুষকূল নিশ্চেষ্ট হয়ে থাকত?’
এক কথায় বিশাখসেনের বক্তব্যটি নস্যাৎ করে দিয়েছিলেন অনঙ্গমিত্র, ‘কিছু মনে করো না ভ্রাত, সবাই জানে যে তোমাদের বঙ্গদেশের যুবাদের পৌরুষ ক্ষমতা পুণ্ড্রবর্ধনের যুবকদের তুলনায় অতি ক্ষীণ। একবার সুযোগ দিয়েই দেখো না। যদি এই দেশের আধিপত্য একবার আমার হাতে আসে মিত্র, তবে প্রধানমন্ত্রী পদের জন্য তোমার থেকে যোগ্য আর কাউকে দেখি না।’
এত বড় আশ্বাসেও বিন্দুমাত্র বিচলিত হননি বিশাখসেন। চাপাস্বরে বলেছিলেন, ‘কথা তা নয় মিত্র। আমি ভীত অন্য কারণে।’
‘কী?’
‘এই প্রকল্পটি চলছে কম দিন নয়। যে-কোনও সমর্থ এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষী পুরুষের কাছে কতটা আকর্ষণীয়— বুঝতেই পারছ। আজ অবধি অন্তত শতাধিক পুরুষ এই কর্মে উদ্যোগী হয়েছে। কিন্তু...’
‘কিন্তু?’
কণ্ঠস্বর একেবারে উদারায় নামিয়ে বলেছিলেন বিশাখসেন, ‘আজ অবধি কেউ সফলকাম হয়নি। কালরাত্রি প্রভাত হলে দেখা যায়—প্রাসাদের প্রধান দ্বারের সামনে তার মৃতদেহখানি পড়ে আছে।’
‘বটে?’ ভ্রুকুঞ্চন করেছিলেন অনঙ্গমিত্র।
‘শুধু তাই নয় বন্ধু। সেই শরীর বিষের প্রভাবে এমনই কৃষ্ণনীল হয়ে থাকে যে দেখলে ভয় করে। মনে হয় যেন বজ্রপাতে নিহত হয়েছে মানুষটি।’
অনঙ্গমিত্র হা-হা করে হেসে উঠে বলেছিলেন, ‘তোমরা কি নিয়মিত গঞ্জিকাসেবনের অভ্যাস করছ আজকাল?’
‘বিশ্বাস করা না করা তোমার ইচ্ছা বন্ধু৷ ‘কিন্তু, স্বচক্ষে দেখা এ ঘটনা কী করে অস্বীকার করি বন্ধু?’
পুনরায় সশব্দে হেসে উঠেছিলেন অনঙ্গমিত্র, ‘আমাকে নিয়ে দুশ্চিন্তা কোরো না মিত্র। শুধু রানির শয়নকক্ষ অবধি আমাকে এগিয়ে দাও। আর হ্যাঁ, প্রধানমন্ত্রী পদে অভিষেক অনুষ্ঠানের জন্য একটি ভালো দেখে রেশমবস্ত্র পছন্দ করে রেখো।’
মদ্যাসক্তি বোধহয় মানুষের বোধশক্তিকে কিঞ্চিৎ শিথিল করে দেয়। বিশাখসেন কথা বাড়াননি। বন্ধুর অনুরোধ রেখেছিলেন।
কথাগুলি মনে পড়তেই ঘামতে শুরু করছেন অনঙ্গমিত্র৷ তিনি বুঝতে পারলেন—ইতিমধ্যেই নিভিয়ে দেওয়া হয়েছে ঘরের সব প্রদীপ। আলো বলতে জানালা দিয়ে আসা জোৎস্না৷ অপার্থিব জ্যোৎস্নায় অনঙ্গমিত্র দেখলেন, দাসীদুটি অন্তর্হিত। এই অন্ধকারে শুধুমাত্র তিনি আর রানি৷
নারী স্থির হলেন। শীতল স্বরে বললেন, ‘কী নাগর, ভোগ করবে না আমাকে? তৃপ্ত করবে না আমার বাসনা। এসো পুরুষ, আমাকে তৃপ্ত করো, আমাকে মুক্ত করো, আমাকে পূর্ণ করো...’
বহুকষ্টে চক্ষু উন্মীলিত করলেন অনঙ্গমিত্র। উদভ্রান্ত হয়ে পড়লেন। দেখলেন উলঙ্গিনী নারীর কুঞ্চিত কেশদাম বাতাসে উড়ছে সর্পিণীদলের মতো। স্তনদুটি অস্বাভাবিক স্ফীত। আর পদ্মের পাপড়ির মতো আঁখি দুটি...
পদ্মের পাপড়ি? নাকি নরকের অঙ্গার? ওই জ্বলন্ত অক্ষিদুখানি কার? ওই শীতল, ক্রুর, উদগ্র, হিংস্র দৃষ্টি কার? ও কি পাতালের গহীন অন্ধকার থেকে উঠে আসা মূর্তিমতী অভিশাপ?
এই অপার্থিব দৃশ্য দেখে অন্তরাত্মা অবধি কেঁপে উঠছে অনঙ্গমিত্রর। জীবনে এত তীব্র ভয় তিনি পাননি। আর্তনাদ করে উঠতে চাইলে, কিন্তু কণ্ঠ দিয়ে স্বর ফুটল না।
নারীটি ঝুঁকে এলেন অনঙ্গমিত্রর উপর৷ হিসহিস করে বললেন, ‘কী নাগর? তৃপ্ত করবে না আমাকে? রাজা হবে না তুমি? রাজা হবে না এই দেশের? উঁ?’
অনঙ্গমিত্রর সর্বাঙ্গ থরথর কাঁপছিল, স্বেদস্রোত বইছিল জলের মতো৷ বললেন, ‘আমাকে ছেড়ে দিন।...অধমের অপরাধ ..ক্ষমা করুন।’
‘ক্ষমা! আপনি!’ উচ্চৈঃস্বরে হেসে উঠলেন সেই নারী, ‘এ কী কথা গো নাগর? তুমি না পুরুষ? এই না কিছু পূর্বেই আমাকে রণ্ডা, বারবণিতা বলে সম্বোধন করছিলে? আর এই কয়েকমুহূর্তেই ‘আপনি?’ এ তো ভারি মজার কথা।’
‘ক্ষমা রানি...ক্ষমা।’
উন্মাদের মতো হেসে উঠলেন সেই নারী। অন্ধকার প্রকোষ্ঠে, জোৎস্নাময় অলিন্দে, উতল বাতাসে ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হয়ে ফেরে সেই হাসি। অজানা আতঙ্কে শিউরে উঠল নিস্তব্ধ রাত্রি। হাসি থামলে রানি বললে, ‘ছিঃ স্বামী, ওকথা বলতে হয়? আপনি না আমার আমার প্রভু? আসুন স্বামী, আপনাকে ভালোবাসায় সোহাগে ভরিয়ে দিই।’
অনঙ্গমিত্র কিছু বলার আগেই রানি ঝুঁকে এলেন তাঁর মুখের ওপর। চুম্বনের ভঙ্গিতে অধর সামান্য উন্মুক্ত হল৷ তখনই অনঙ্গমিত্র দেখলেন যে নারীটির শ্বদন্তদুটি প্রায় দ্বিগুণ হয়ে উঠেছে। হয়ে উঠেছে আরও বক্র, আরও তীক্ষ্ণ।
আর জিহ্বা? সাক্ষাৎ মৃত্যুর সম্মুখীন হয়ে অনঙ্গমিত্র দেখলেন এই রমণীর জিহ্বা মধ্য হতে দুইভাগে বিভক্ত। ঠিক যেমন সাপের হয়!
পরমুহূর্তে দুখানি তীক্ষ্ম, উগ্র বিষদন্ত নেমে এল অনঙ্গর গণ্ডদেশে।
কর্মান্তবাসকের প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র নগরের প্রাণস্বরূপ। বিভিন্ন দেশ থেকে আসা বণিকদল এবং ক্রেতাদের সমাগমে প্রতিদিনই লোকারণ্য হয়ে থাকে। পশ্চিমের বজ্রভূমি থেকে হীরকব্যবসায়ীরা আসেন। কজঙ্গলের খনিতে এক বিশেষ ধরণের খনিজ রৌপ্য পাওয়া যায়, তার রং অগুরুপুষ্পের মতো, নাম গৌড়িক। তার সম্ভার নিয়ে আসেন রাঢ়ের বণিকদল। কামরূপ এবং প্রাগজ্যোতিষপুরের বণিকেরা নিয়ে আসেন কাঞ্চনবর্ণের দুকূল এবং কাষায় বস্ত্র। কাশী এবং মধুরা থেকে আসে অতি উত্তম কার্পাসবস্ত্র, যদিও তার সূক্ষ্মতা বঙ্গদেশের কার্পাস বা রেশমবস্ত্রের তুলনায় নিকৃষ্ট।
এছাড়াও ভোটদেশ থেকে আসে অত্যুত্তম পিপ্পলী। এই পিপ্পলীর বড় সুনাম, বঙ্গ হতে সেই পিপ্পলী যায় সুদূর পূর্বে—রোমক দেশ অবধি। দণ্ডভুক্তি এবং অঙ্গদেশ থেকে আসে বিশেষ প্রণালীতে প্রস্তুত দ্বিমুখী তরবারি। গত বেশ কয়েকবছর ধরে আরবদেশে এই তরবারির চাহিদা ঊর্ধ্বমুখী। হরিকেলের সমুদ্র বন্দর থেকে আসে মালয় দেশের উত্তম মুক্তা এবং সামুদ্রিক লবণ। আর সমুদ্র বন্দরের উদ্দেশে যাত্রা করে গুবাক এবং অগুরু। হরিকেল এবং তাম্রলিপ্তির ব্যবসায়ীদের সমুদ্রবাণিজ্যে বিশেষ খ্যাতি আছে। যদিও অতীতের সেই গৌরব এখন অনেক অস্তমিত, তবুও নেই নেই করেও যা আছে, তা কম নয়।
এই সদাব্যস্ত এবং অতিবৃহৎ পণ্যকেন্দ্রটি গড়ে উঠেছে এক বৃহৎ মন্দিরকে ঘিরে। মন্দিরের উপাস্য দেবী বজ্রযোগিনী। তিনি দেব হেরুকের সঙ্গে যুগনদ্ধ মূর্তিতে অধিষ্ঠিতা।
মন্দিরের প্রধান পুরোহিত ভন্তে বুদ্ধগুপ্ত। সাধনায় ও শীলে তাঁর তুল্য বৌদ্ধাচার্য্য সমগ্র কর্মান্তবাসকে বিরল।
কর্মান্তবাসকের উপান্তে লালিম্ববন পাহাড়। পাহাড়ের সানুদেশে অবস্থিত বিখ্যাত বৌদ্ধশাস্ত্রচর্চা কেন্দ্র শালিবন বিহার। সমগ্র বঙ্গদেশে বজ্রযানশিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে শালিবনবিহারের বড়ই সুনাম। বুদ্ধগুপ্ত এই শালিবনবিহারের উপাধিবারিক৷
বজ্রযোগিনীপূজায় ও মন্দিরের অপরাপর কর্মকাণ্ডে আচার্য বুদ্ধগুপ্তকে সাহায্য করেন আরও চারজন শ্রমণ। এঁরা প্রত্যেকেই যুবক, শালিবনবিহারের ছাত্র এবং বুদ্ধগুপ্ত’র শিষ্যও বটে। তবে ভন্তে বুদ্ধগুপ্ত গৈরিক কাষায় ধারণ করেন, এঁরা পরেন শুভ্রবস্ত্র।
আজ কার্তিকী চতুর্দশী, মহাপুণ্য দিন। কাল কার্তিকী অমাবস্যা, দেবী বজ্রযোগিনীর উপাসনার প্রকৃষ্টতম তিথি। এই তিথিতেই নাকি দেবী বজ্রযোগিনী নিজহস্তে নিজের মস্তক ছেদন করে দেবী ছিন্নমুণ্ডা হয়েছিলেন। সেই উপলক্ষ্যে এই বিস্তীর্ণ গৌড়বঙ্গের শতসহস্র বজ্রযোগীরা উপস্থিত হয়েছেন কর্মান্তবাসকে। তাঁদের উলঙ্গ ও ভস্মাচ্ছাদিত দেহের বাহারে, ‘জ্জয়জ্জয়বজ্রযোগিনী’ হুঙ্কারে, খর্পর ও খট্বাঙ্গের আস্ফালনে, কণ্ঠে প্রলম্বিত নরকরোটিমালার বীভৎস প্রদর্শনে সমগ্র কর্মান্তবাসক উচ্চকিত।
প্রথা অনুসারে কাল ব্রাহ্মমুহূর্তে মেঘান্দনদীতে মহাস্নান হবে। তখন এই খর্পরখট্বাঙ্গধারী মহাবজ্রযোগীদের সঙ্গে অগণিত পুণ্যার্থীও নদীতে অবগাহন করে নিজের অন্তরাত্মাকে পরিশুদ্ধ করবেন। তারপর দিনভর নগরীতে উৎসব। ভোর হতে বিভিন্ন দেশ থেকে আগত ভক্তের দল কাঁসা অথবা রূপোর থালায় নানা অর্ঘ্য-উপাচার সাজিয়ে আসবেন দেবী বজ্রযোগিনীর মন্দিরে। কামনা করবেন অবিরল ধর্ম, অর্থ, কাম এবং মোক্ষসুখের। এই পূজার্চনা চলবে দ্বিপ্রহর অবধি। অতঃপর স্বয়ং রানি এবং প্রকাশচন্দ্র মন্দিরে আসবেন সপারিষদ। তাঁদের উপস্থিতিতে মন্দিরসম্মুখে একশো আটখানি মহিষ বলি হবে। দেবী বজ্রযোগিনী সেই বলির রক্তে তৃপ্ত হয়ে অক্ষয় রাজশৌর্যের টীকা পরিয়ে দেবেন এই বঙ্গদেশের রানি এবং তাঁর একান্ত সহায়ক প্রকাশচন্দ্রের ললাটে।
এখন অপরাহ্নবেলা। বাণিজ্যকেন্দ্র আপাতত কিঞ্চিৎ জনহীন। ভিনদেশীয় বণিকেরা তাঁদের পান্থশালায় বিশ্রাম নিতে ফিরে গেছেন। দেশীয় বাণিজ্যরথীরা সুখীগৃহকোণে ফিরে এসেছেন। বিপণিগুলি শূন্য পড়ে রয়েছে।
একজন মলিনবেশ যুবক অতি দীনহীন ভাবে মন্দিরের মধ্যে এককোণে সসঙ্কোচে দাঁড়িয়ে চারিদিক তাকিয়ে দেখছিল।
দেবী বজ্রযোগিনীর সমগ্র মন্দিরটি এখন ধৌত এবং পরিষ্কৃত। মন্দিরের প্রাচীর ঘিরে সারিবদ্ধ সুসজ্জিত বংশদণ্ড। বংশদণ্ডগুলির মাথায় রঙিন বস্ত্রের দিকমালা ও কিঙ্কিণীমালা; তারা মৃদুমন্দ হাওয়ায় উড়ন্ত। কিঙ্কিণীমালায় ছোট ছোট ঘুঙুর লাগানো। বাতাস বইলেই সেখান হতে টুংটাং শব্দ আসছে। এছাড়াও মন্দিরের মধ্যে গর্ভগৃহ ঘিরে বিভিন্ন রঙিন কাপাসবস্ত্রের ধ্বজপতাকা উড়ছে। সেগুলি বেশ বাহারি, চারিপাশে ঝালর দেওয়া, মধ্যভাগে রেশমি সুতোর কারুকাজ।
মন্দিরপ্রাঙ্গণের ঠিক মধ্যস্থানে, গর্ভগৃহের সামনে একটি মাটির তৈরি ধর্মস্তূপ। তার উপর একটি বৃহৎ চন্দ্রাতপছত্র। ছত্রটির সারা গায়ে অভ্রের অপরূপ কারুকার্য, স্তূপ ঘিরে মাটিতে প্রচুর ছোট ছোট কাঠের মূর্তি রাখা। সেসব মূর্তির কিছু বিভিন্ন পশুপাখির, কিছু বিভিন্ন যাত্রীশকটের, কিছু বিভিন্ন আকার ও প্রকারের নৌকার। বঙ্গজন বড়ই নদী, নৌকা এবং নৌবাণিজ্যপ্রিয় জাতি। এ সব তারই চিহ্ন।
মন্দিরের প্রধান দ্বারের দুপাশে দু’খানি তাম্রকলস রাখা। কলসের ওপর আম্রশাখ, তার ওপর ডাব। কলসে, আম্রপত্রে এবং ডাবে চন্দন এবং কাঁচা হলুদ দিয়ে মঙ্গলচিহ্ন অঙ্কিত। কলসে ধর্ম, আম্রপল্লবে সঙ্ঘ এবং ডাবে বুদ্ধ চিহ্নিত হন।
মঙ্গলকলসের সামনে দুখানি মস্তবড় দীপবৃক্ষ৷ পিত্তলের প্রতি দীপবৃক্ষে একশো আটটি করে দীপদান, প্রতিটি দীপদান সর্ষের তেলে পরিপূর্ণ, তার মধ্যে কাপাসের শিখা। আজ সন্ধ্যা হতে দু’দিন ব্যাপী এই দীপবৃক্ষের প্রতিটি প্রদীপ জ্বালানো থাকবে। কাল ব্রাহ্মমুহূর্ত থেকে দেবী বজ্রযোগিনীর মন্দিরে উৎসব। সমগ্র প্রাঙ্গণ দীপের আলোয় উজ্জ্বল হয়ে থাকবে।
যুবকটি যে কতক্ষণ ধরে এই অপরূপ মন্দিরসজ্জা নিরীক্ষণ করত, সে বলা কঠিন। সূর্য অস্তাচলগামী। সেই আলোয় মন্দির যেন ব্রীড়াবনতা নববধূর মতো লজ্জারুণ। যুবকটি তদগতচিত্তে এই সৌন্দর্যসুধা পান করছিল।
পিঠে একটি স্পর্শ পেয়ে ত্বরিতে ঘুরে দাঁড়াল সে। দেখল, একজন ভন্তে। তাঁর হাতে একটি ছোট থালা, তাতে কিছু ফল সাজানো। সামান্য নীচুস্বরে তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘তুমি কে, পথিক?’
পথিক বিনম্রস্বরে বলল, ‘আমি এক অতি দরিদ্র সামান্য গৌড়বাসী, ভন্তে।’
‘এখানে কী চাই?’
পথিক আবৃত্তি করল, ‘সোনে ভরিলী করুণা নাবী। রূপা থোই নাহিক ঠাবী।’
বৌদ্ধ আচার্য উঠে দাঁড়ালেন। ইশারায় সেই যুবককে বললেন তাঁকে অনুসরণ করতে।
গ্রামরক্ষীদলের প্রধান যখন থরথর কম্পিত দেহে রাজসভায় উপস্থিত হল, তখন সবে প্রভাত হয়েছে। রাজসভায় দুইখানি সিংহাসনই শূন্য৷ সভাসদেরা এখনও সবাই এসে উপস্থিত হননি। কেবল মহাসন্ধিবিগ্রহিক অগ্নিমিত্র এবং গুপ্তচরবাহিনীর প্রধান আনন্দগুপ্ত উপস্থিত।
অগ্নিমিত্র এবং আনন্দগুপ্ত দুজনের মুখমণ্ডল গম্ভীর। তাঁরা মহারানিকে অনুরোধ করে আজ বিশেষ কয়েকজন সভাসদ ছাড়া বাকিদের রাজসভায় উপস্থিতির ওপর নিষেধাজ্ঞা বলবৎ করেছেন৷ সংবাদ অতি গুরুতর, এবং এর ফল যে সুদূরপ্রসারী—সে বিষয়ে তাঁরা নিঃসন্দেহ। এত সতর্কতা সেইজন্যেই।
এই রাজসভাটি প্রকৃতপক্ষে একটি পরিবর্তিত জয়স্কন্ধাবার৷ খড়্গবংশের নৃপতিদের প্রথমে কোনও স্থায়ী রাজপ্রাসাদ বা রাজসভা ছিল না৷ ভ্রাম্যমাণ জয়স্কন্ধাবার থেকে তাঁরা রাজ্যশাসন করতেন। খুব সম্ভবত তিব্বতের যে রাজবংশ এই খড়্গবংশের প্রতিষ্ঠাতা, সেই যাযাবর উপজাতীয় রাজাদের অনুকরণে এই প্রথার সূচনা৷
এই প্রথার অবসান ঘটান সম্রাট দেবখড়্গ৷ এই প্রাসাদ এবং সভার নির্মাণকার্যের সূচনা তাঁর হাতেই, আর শেষ হয় সম্রাট রাজভটের সময়। পূর্বসূরিদের ভ্রাম্যমাণ রাজসভার অনুসরণে এই জয়স্কন্ধাবারটিকে স্থায়ী সভাগৃহের রূপ দেওয়া হয়।
রক্ষীপ্রধানের মুখে স্পষ্টতই ভয় এবং আতঙ্কের ভাব। তার পিছনে তিনজন ভল্লধারী রাজসেবকসৈন্য ভাবলেশহীন মুখে দণ্ডায়মান৷
কিছু পরেই সভায় উপস্থিত হলেন মহাদণ্ডনায়ক জিতসেন এবং মহাপ্রতিহার শান্তঘোষ। দুজনে সংবাদ পাওয়ামাত্র উপস্থিত হয়েছেন, আলঙ্করিক বেশভূষা পরিধানের সময় পাননি। জিতসেন এসেই উদ্বিগ্নস্বরে বললেন, ‘কী হয়েছে আনন্দগুপ্ত? কেন হঠাৎ এই আহ্বান? আবার কি বহির্শত্রুর আক্রমণের সংবাদ? নাকি কোনও সামন্তরাজা বিদ্রোহী?’
উত্তর দিলেন অগ্নিমিত্র। শীতল এবং সামান্য সানুনাসিক স্বরে বললেন, ‘তার থেকেও ভয়াবহ কিছু ঘটতে চলেছে ভ্রাতা জিতসেন। মহারানি আর রাজসচিব আসুন। সব বিস্তারিত বলছি।’
শান্তঘোষ সার্থকনামা। তাঁকে কেউ বিচলিত বা ক্রুদ্ধ হতে দেখেনি। তিনি বললেন, ‘আচার্যদেব কোথায়? আর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী?’
বলতে-বলতেই রাজপরিবারের কুলগুরু আচার্য বিশুদ্ধকীর্তি এবং প্রধানমন্ত্রী অমিতাভভট্ট প্রবেশ করলেন সভামধ্যে। উপস্থিত চারজন আভূমি নত হয়ে প্রণাম করলেন কুলগুরুকে। তারপর সামান্য মাথা নত করে প্রধানমন্ত্রীকে অভিবাদন জানালেন। বিশুদ্ধকীর্তি স্বস্তিবাচন উচ্চারণ করে বললেন, ‘কী হয়েছে অগ্নিমিত্র? এই অতর্কিত ঝটিকাসভা আহ্বানের কারণ? আর এই কাপুরুষ গ্রামরক্ষকটিকেই বা এখানে আনা হয়েছে কী করতে?’
ছয় জন মহাপ্রতাপশালী রাজন্য নিজ নিজ আসন গ্রহণ করলেন। রক্ষীবাহিনীর প্রধানটি ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। তার হাত-পা অবশ হয়ে আসছিল।
আনন্দগুপ্ত বলতে লাগলেন, ‘আপনারা জানেন যে আজকের রাত্রি শেষে কাল থেকে কর্মান্তবাসকে বাৎসরিক মহোৎসব শুরু। সেই মহোৎসবে অংশ নিতে নানা দেশ থেকে অনেক পুণ্যার্থীরা এসেছেন। এসেছেন অনেকানেক পূজ্যপাদ বজ্রযোগীরা। কাল মহাস্নানের অব্যবহিত পরে দেবী বজ্রযোগিনীর মহাপূজা শুরু।
‘প্রতিবারের মতো এইবারেও আমরা কাল রাত্রে মেঘান্দ নদীতীরের মহাশ্মশানে ভৈরবীচক্রের আয়োজন করেছি। আমরা ছয় জন এবং মহারাজসচিব প্রকাশচন্দ্র সেই ভৈরবীচক্রে উপস্থিত থাকবেন। চক্রানুষ্ঠানের জন্য যা যা প্রয়োজন সেসবের ব্যবস্থা করা হয়েছে৷ মদ্যের মধ্যে উত্তম গৌড়ী, পৈষ্টী এবং মাধ্বী থাকছে। থাকছে ভর্জিত শাল, পাঠীন এবং রোহিত মৎস্যের স্তূপ। তার সঙ্গে যাতে বরাহ, শল্যক, মৃগ ইত্যাদি পশুমাংসের অভাব না-হয়, সে দিকেও দৃষ্টি রাখা হচ্ছে।
‘প্রতিবারের ন্যায় হিরণ্যসামুদায়িক বিশাখসেন এই সমস্ত অনুষ্ঠানের ভার নিয়েছেন। এইবারের ভৈরবীচক্র আয়োজিত হবে দেবী কুরুকুল্লার অর্চনার অঙ্গ হিসেবে। ইনি বড় জাগ্রত দেবী। দেবীমূর্তি সন্ধ্যার মধ্যে প্রস্তুত করে, রাত্রিতে পূজাপাঠ সমাপন করে পরদিন ব্রাহ্মমুহূর্তের পূর্বে বিসর্জন দিতে হয়।’
আচার্য বিশুদ্ধকীর্তি মাথা নাড়লেন। এই বৎসরের ভৈরবীচক্রে কুরুকুল্লা আরাধনার পরিকল্পনা তাঁরই। এত অনুপুঙ্খ বর্ণনাও মুখ্যত তাঁকে অবগত করার জন্যই।
‘এই ভৈরবীচক্র, আপনারা জানেনই, সাধনসঙ্গিনী বিনা অসম্ভব। প্রতি বৎসরই আমরা শাস্ত্রের নির্দেশে অন্ত্যজ জাতি থেকে সাধনসঙ্গিনী নির্বাচিত করে থাকি। বিশেষ করে ডোম্বিনী, রজকিনী, চণ্ডালিনী, শবরী—এই অন্ত্যজ নারীদের যদি চক্রে সাধনসঙ্গিনী রূপে বরণ করা যায়, তাহলে ফল শুভ হয়।’
সভাস্থ সবার মনেই গত ভৈরবীচক্রের স্মৃতি ভেসে উঠলো। জিতসেনের ভাগ্যে একটি উদ্ভিন্নযৌবনা ডোম্বিনী জুটেছিল। তার সেই কৃষ্ণশঙ্খসদৃশ স্তনদ্বয়, আয়ত মৃগলোচন, সেই অনাঘ্রাত যৌবন, সেই উদগ্র যৌনপ্রহার, সেই শীৎকার...
জিতসেনের পৌরুষ উত্তেজিত হয়ে উঠছিল। কোলের ওপর একটি উপাধান টেনে নিলেন তিনি।
বিশুদ্ধকীর্তির শ্মশ্রুগুম্ফশোভিত ওষ্ঠে একটি স্মিত হাসি খেলে যায়। গত ভৈরবীচক্রের মালিনীটি আপাতত তাঁর উদ্যানের শোভাবর্ধনের কার্যে নিযুক্ত। সেই থেকে ভন্তে বিশুদ্ধকীর্তির প্রতিটি রাত্রিই চক্ররাত্রি। মালিনীর বাস ছিল বারবণিতা পল্লির ভাঙা পর্ণকুটিরে। এখন তার মাটির বাড়ি, বাঁশের ছাউনি, মনোহারি সাজসজ্জা। তার কানে রূপার ঝুমকো দোলে, পায়ে নতুন মল উঠেছে। বিশুদ্ধকীর্তি তাঁর একটি আদুরে নাম দিয়েছেন, নন্দিনী।
অমিতাভভট্ট রাজনীতিজ্ঞ হলে কী হবে, প্রকৃতপক্ষে তিনি একজন নাট্যকার ও কবি। সেই কারণে তিনি সংস্কৃতিমোদী মানুষের কাছে জনপ্রিয়ও বটে। কাব্য ও নাটিকা গৌড়বঙ্গের আপামর জনসাধারণের প্রাণের আরাম। বঙ্গজনবাসীর উদরে খাদ্য জুটুক না জুটুক, হৃদয়টি কাব্যরসে টইটম্বুর হওয়া চাইই চাই। অমিতাভভট্ট তার সার্থক প্রতিভূ। গত ভৈরবীচক্রে তাঁর ভাগ্যে একটি মধ্যবয়সি চণ্ডালীর প্রাপ্তিযোগ হয়েছিল। চৌষট্টি কামকলায় সেই চণ্ডালীর সিদ্ধি মহারথীতুল্য। ভাস ও ভারবি থেকে শুরু করে মহাকবি কালিদাসের নাট্যরসাস্বাদনে তার অধিকার যে কোনও ব্যাকরণতীর্থ-কাব্যচঞ্চুর তুলনায় কম কিছু নয়।
গোপনে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন অমিতাভভট্ট। তাঁর অকলঙ্কিত শুভ্রপট্টবাসে এই অতি তুচ্ছ, অতি নগণ্য চারিত্রিক স্খলন দগদগে ক্ষতর মতো চিহ্নিত। তিনি কিছুতেই সেই স্মৃতি মুছে ফেলতে পারেন না।
শুধুমাত্র শান্তঘোষের মুখমণ্ডল অবিকৃত থাকে। বাকিরা শান্তঘোষের অশান্ত কামোন্মত্ততার ব্যাপারে সম্যক অবগত। প্রতিটি ভৈরবীচক্রে শান্তঘোষের একটি করে অনাঘ্রাতা এবং সদ্য রজঃস্বলা কুমারীকন্যা প্রয়োজন হয়। আচার্য বিশুদ্ধকীর্তি বলেছেন যে, বজ্রসাধনায় কুমারী-রজ-রক্ততুল্য মহাপবিত্র বস্তু আর কিছু নেই। তবে শান্তঘোষ ভৈরবীচক্র চলাকালীন কুমারী রজরক্ত ও কুমারীরক্তের মধ্যে বিশেষ পার্থক্য করেন না।
আনন্দগুপ্ত পুনরায় বলতে শুরু করলেন, ‘আপনারা এও জানেন যে গত কয়েক বছর ধরে কর্মান্তবাসক তথা বঙ্গদেশে বিশুদ্ধ ধর্মচেতনার প্রভাব ক্রমেই কমে আসছে। আজকাল ভৈরবীচক্র সহ বিভিন্ন গূহ্যসাধনার জন্য প্রাপ্তব্য শক্তির সংখ্যা ক্রমেই অপ্রতুল হয়ে উঠছে। পূর্বে বঙ্গজ গৃহস্থরা যতটা সোৎসাহে বজ্রসাধনার জন্য পরিবারস্থ নারীদের উৎসর্গ করতেন, অধুনা তার অধোগতি লক্ষনীয়। আজকাল বলপ্রয়োগ ছাড়া সাধনসঙ্গিনী জোগাড় করা অসাধ্য হয়ে উঠেছে।’
‘বলপ্রয়োগের ব্যাপারে কিছু সংবাদ আমার কর্ণগোচর হয়েছে আনন্দগুপ্ত।’ বলে উঠলেন বিশুদ্ধকীর্তি, ‘তার সবই যে প্রীতিবর্ধক, তা নয়।’
‘রাজগুরু নিশ্চয়ই ভালোভাবেই জানেন যে, এই দেশের জনগণ বড়ই অবোধ এবং অর্বাচীন। কোন পথে যে তাদের আত্মিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতি সম্ভব, কীসে যে তাদের বোধিচিত্তের সম্যক উদ্বোধন ঘটবে, সেই বিষয়ে তারা সম্পূর্ণভাবে অজ্ঞ। নিজেদের শ্রেয় সম্পর্কে তাদের কোনও ধারণাই নেই।
‘কিন্তু রোগী যদি তার নিজের রোগের উপশম না চায়, তাহলে তাকে বলপূর্বক তিক্ত ঔষধ সেবনে বাধ্য করার নিদান শাস্ত্রেই রয়েছে। তাই নেহাত নিরূপায় হয়েই আমাদের কিছু আপাত-অপ্রীতিকর পন্থা গ্রহণ করতে হয়েছে। শাস্ত্রের নিদান অনুসারে আমরা, বঙ্গজাতির এই সপ্ত-অভিভাবক, চক্রসাধনার জন্য শক্তিসংগ্রহ প্রয়োজনে বলপ্রয়োগ বাধ্যতামূলক করেছি।’
এই পর্যন্ত বলে কিছুক্ষণ নির্বাক রইলেন আনন্দগুপ্ত। তারপর পুনরায় বলতে শুরু করলেন। ‘গতকাল সেই মহতী উদ্দেশেই কমলাঙ্ক গ্রামের সন্নিহিত অরণ্যে আমাদের সৈন্যবাহিনী সদস্যরা অভিযান চালিয়েছিল। জঙ্গলটি অতি ভয়াবহ। দুর্ধর্ষ কিরাতজাতির বাস৷ আপনারা তো জানেনই যে চক্রসাধনায়...’
‘অন্ত্যজ কিরাতরমণীদের স্থান বিশেষ শীর্ষে, তাই তো?’
সকলে সচকিত হয়ে দেখলেন, সভাস্থলে প্রবেশ করেছেন মহারাজসচিব প্রকাশচন্দ্র এবং বঙ্গদেশের একচ্ছত্রাধিপ রানি—সম্রাজ্ঞী স্বয়ং।
মধ্যবয়সি ভন্তে এবং সেই ভবঘুরে যুবকটি যখন মন্দিরচত্বর ছাড়িয়ে নগরের পশ্চিমপ্রান্তে প্রবেশ করলেন, তখন বিকেল শেষ হয়ে সন্ধ্যা হয় হয়। অস্তাচলগামী সূর্যের রক্তাভ স্বর্ণকিরণে ধুইয়ে দিচ্ছে কর্মান্তবাসকের আকাশ, মাটি ও দিগন্ত৷
এখন বেশভূষা দেখে অবশ্য এই দুজনকে সন্ন্যাসী এবং ভবঘুরে বলে চেনা দুষ্কর। বৌদ্ধ আচার্যের পরনে এখন রাজকীয় পরিধান। তাঁকে দেখে উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী বলে মনে হয়। তাঁর মুণ্ডিতমস্তকে একটি বহুমূল্য রেশমী উষ্ণীষ। ভবঘুরে যুবকটির সুগৌর ঊর্ধ্বাঙ্গ সূক্ষ্ম কাপাস বস্ত্রে আবৃত। নিম্নাঙ্গে একটি কচ্ছযুক্ত কাষায় অধোবদন। তার যৌবনপ্রফুল্ল মুখ হতে শ্মশ্রুগুম্ফ অন্তর্হিত। সদ্যস্নাত তৈলসিক্ত চুল থেকে চুঁইয়ে পড়ছে জলবিন্দু। আপাতনিরীহ যুবকটির চোখের মধ্যে তীক্ষ্ম ঔজ্জ্বল্য আছে।
দুজনে ক্রমে মেঘান্দ নদীতীরের একটি বিশেষ অঞ্চলে এসে উপস্থিত হলেন। সাধারণ কর্মান্তকবাসীদের এখানে বিশেষ দেখা যায় না বটে, কিন্তু বহির্দেশাগত বণিক, উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী এবং অন্যান্য ধনীব্যক্তিদের মধ্যে স্থানটি অত্যন্ত জনপ্রিয়। এখানে শৌণ্ডিকালয়, বারবণিতাগৃহ-সহ নানাবিধ মনোরঞ্জনের বিবিধ উত্তেজক উপকরণ উপলব্ধ। এই অঞ্চলে ধনবান পুরুষেরা আমোদকাতর হয়ে অকাতরে ব্যয় করে থাকেন। সেই সূত্রে বঙ্গদেশের কিঞ্চিৎ বৈদেশিক স্বর্ণমুদ্রা আয় হয়।
বর্তমানে বঙ্গীয় রাজকোষে স্বর্ণের অভাব হিরণ্যসামুদায়িকদের অশেষ শিরঃপীড়ার কারণ। বস্তুতপক্ষে মহাবল শশাঙ্কের সময় হতেই বঙ্গীয় মুদ্রায় স্বর্ণের পরিমাণ ক্ষীণ হতে হতে এখন সম্পূর্ণ বিলীন। এর কারণ সমুদ্রবাণিজ্যর সর্বগ্রাসী অবক্ষয়। পূর্বে সমুদ্রবাণিজ্যপথে বঙ্গদেশে যে পরিমাণ স্বর্ণদিনার এবং রৌপ্যদ্রহ্মের আগমন ঘটত, এখন তার এক-দশমাংশও আয় হয় না। সরস্বতী তথা অন্যান্য সমুদ্রাভিমুখী নদীগুলির নাব্যতাহ্রাসের কারণে বঙ্গের বহু বন্দরনগরী এখন পরিত্যক্ত। স্বর্ণাভাবে এখন বঙ্গদেশে মুদ্রা হিসেবে প্রচলিত হয়েছে কড়ি এবং কপর্দক। কর্মান্তবাসকের রাজকোষে স্বর্ণমুদ্রার আয়ের জন্য তাই এই ব্যবস্থা।
দুজনে একটি মাটির তৈরি দ্বিতল শৌণ্ডিকালয়ে এসে উপস্থিত হলেন। তার সামনের উদ্যান বড়ই মনোহর। সেখানে নানা দেশ থেকে আনা ফুলের সমাহার। উদ্যানের সীমানা জুড়ে নিয়মিত ব্যবধানে তাল ও তমাল প্রোথিত। সামান্য দূরে মেঘান্দ নদীর ফেনিল স্রোত বহমান। মৃদুমন্দ পবন সঞ্চালনে, উদ্যানের শেফালি ও রজনীগন্ধার সুগন্ধে অপরাহ্নটি বড় মধুর হয়ে উঠেছে।
শৌণ্ডিকালয়টির সামনে এখনই মধুলোভী রসিকজন একে একে সমবেত হতে শুরু করেছেন। এক বিপুলোদর ব্যক্তি সহাস্যমুখে সমবেত ভদ্রজনদের অভ্যর্থনাকর্মে ব্যস্ত। বিশিষ্ট অভিজাতবর্গ ব্যতীত এই পানশালায় বিশেষ কেউ আসেন না। তাই শৌণ্ডিকালয়ের অধিকর্তা প্রত্যহ স্বয়ং উপস্থিত থাকেন অতিথিসম্ভাষণের জন্য। সুডৌল বক্ষিনী, শঙ্খিনী সুন্দরীরা অতিথিদের ভিতরে নিয়ে যাচ্ছে।
একটু লক্ষ করলে বোঝা যায় যে, এই জনারণ্যেও এমন দু-চারজন আছে—যারা ঠিক মধুলোভী সাধারণ মানুষ নয়। তাদের শ্যেনদৃষ্টি চতুর্দিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বলিষ্ঠ দেহ এবং কটিদেশে কোষবদ্ধ তরবারি অন্যকিছুর ইঙ্গিত দেয়।
যুবকটি নীচু স্বরে প্রশ্ন করলেন, ‘এই কি সেই ভাঁড়ুদত্তের প্রসিদ্ধ মধুশালা?’
আচার্য মাথা নাড়লেন। তারপর মৃদুস্বরে বললেন, ‘হ্যাঁ আর্য, এই-ই সেই ভাঁড়ুদত্তের প্রসিদ্ধ আসবালয়; চিরবসন্তের আসক্তিনিকেতন। ওই যে স্থূলকায় বৃদ্ধ মহিষটিকে দেখছ, তিনিই স্বয়ং ভাঁড়ুদত্ত। ভালো কথা, নগরে প্রবেশকালে দ্বারপাল যে অভিজ্ঞানটি দিয়েছেন, সেটি সঙ্গে আছে তো?’
যুবকটি কটিদেশ থেকে একটি নামাঙ্কিত চতুষ্কী বার করে আচার্যর হাতে দিলেন। আচার্য সেটি নিয়ে ভাঁড়ুদত্তের দিকে অগ্রসর হতেই ভাঁড়ুদত্তের দৃষ্টি এল এইদিকে।
তিনি অভ্যস্ত সম্ভাষণ করে বললেন, ‘আসুন আর্য, ভাঁড়ুদত্তের মদিরালয়ে আপনাদের স্বাগত।’
আচার্য ভাঁড়ুদত্তের কানে কানে কিছু বলামাত্র ভাঁড়ুদত্তের চোখমুখের ভাব বদলে গেল। আচার্যকে দ্রুত অন্যদিকে টেনে নিয়ে চারিদিক একবার দেখে নিলেন। তারপর রুদ্ধস্বরে বললেন, ‘এ কী ভন্তে, আপনি এখানে? এরকম অসময়ে? আপনি কি জানেন না এখন কী চলছে? জানেন না, রাজার আদেশে চারিদিকে গুপ্তচর এবং গুপ্তরক্ষীদল ঘুরে বেড়াচ্ছে?’
আচার্য নীচুস্বরে বললেন, ‘জানি। আজ এক বিশেষ অতিথি এসেছেন। তাঁর সঙ্গে কিছু একান্ত আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে মিত্র। তাই এখানে আসা।’
‘কিন্তু আচার্য, সে আলোচনা তো শালিবনবিহারে আপনার প্রকোষ্ঠেও হতে পারত!’
‘না, মিত্র ভাঁড়ুদত্ত। এখন অচেনা অজানা কাউকে নিয়ে বিহারের আবাসে প্রবেশ করা যায় না। ভন্তে বিশুদ্ধকীর্তির নিষেধাজ্ঞা আছে। তাছাড়া এই মুহূর্তে বিহারের কে যে শত্রুপক্ষে, আর কে যে মিত্রপক্ষে—সে বোঝা দুষ্কর। বঙ্গদেশে এখন মদিরালয়ই একমাত্র স্থান, যেখানে যে কাউকে নিয়ে নিঃসঙ্কোচে প্রবেশ করা যায়।’
দূরে দাঁড়ানো যুবকটির দিকে ইঙ্গিত করলেন ভাঁড়ুদত্ত, ‘ইনি কে আচার্য?’
চতুষ্কীটি ভাঁড়ুদত্তের হাতে তুলে দিয়ে চাপাস্বরে কিছু বললেন আচার্য বুদ্ধগুপ্ত। শোনামাত্র ভাঁড়ুদত্তের চোখদুটি বড় বড় হয়ে উঠল। তিনি ব্যগ্রভাবে বললেন, ‘আসমুদ্রহিমাচলজয়ী কাশ্মীরনরেশ ললিতাদিত্য মুক্তাপীড়ের পৌত্র, গৌড়নরেশ জয়ন্তর জামাতা, বীর শ্রীবিনয়াদিত্য জয়াপীড়কে অধমের পর্ণকুটিরে স্বাগত।’ তারপর একটি সুতন্বী কিঙ্কিণীকে ডেকে বললেন, ‘মায়া, এঁরা আমার বিশেষ অতিথি, এঁদের উত্তর-পূর্বের কক্ষটিতে নিয়ে যাও।’
মদিরালয়ের উত্তর-পূর্বের ঘরটি অন্য ঘরগুলির থেকে একটু আলাদা। ঘরের ঠিক মধ্যস্থানে উপাধানযুক্ত আরামপ্রদ আসনের ব্যবস্থা। আসনের সামনে একটি কাঠের নীচু চতুর্পদী। তার ওপর তামার জলপাত্র। কক্ষটির চারটি দেওয়াল বিভিন্ন ভঙ্গিতে নৃত্যরত নরনারী মূর্তিতে শোভিত। ছাদ থেকে চারখানি দীপদান নেমে এসেছে অনেকখানি। সেখান হতে উত্থিত অগুরু এবং কর্পূরের উগ্র গন্ধে কক্ষটি পরিপূর্ণ।
যুবক এবং আচার্য সেখানে প্রবেশ করে দেখলেন, কক্ষটিতে একটিও জানালা নেই। শুধু তাই নয়, ঘরের তিনপাশে আর অন্য কোনও ঘর নেই। আসনটিও এমনভাবে অবস্থিত যে, যিনি তাতে বসবেন তাঁর মুখ সবসময়ই দরজার দিকেই থাকবে।
মায়া নামক কিঙ্করী সামান্য ঝুঁকে বললেন, ‘দ্বার বন্ধ করে দিই আর্য? আপনাদের এই কক্ষে কেউ বিব্রত করবে না৷’
আচার্য নিরাসক্তসুরে বললেন, ‘তার প্রয়োজন নেই কন্যা। দ্বার উন্মুক্তই থাকুক। কেউ যেন আপাতত আমাদের বিরক্ত না করে, সেইটি দেখবেন।’
গমনোদ্যত কিঙ্করীর নিতম্বের দিকে তাকিয়ে যুবকটি বললেন, ‘কিঙ্করীর অঙ্গসৌষ্ঠব কিন্তু বড়ই উত্তেজক, ভন্তে। লক্ষ করেছেন কি?’
বিরক্ত হলেন আচার্য, ‘না হে ভ্রাত জয়াপীড়৷ আমি সর্বত্যাগী সন্ন্যাসী। কামিনীকাঞ্চনে আসক্তি বাল্যেই ত্যাগ করেছি।’
মৃদু হেসে জয়াপীড় বললেন, ‘কাঞ্চনে অবশ্য আমারও তেমন আসক্তি নেই আচার্য। নইলে বিশ্বাসঘাতক জজ্জ যেদিন কাশ্মীরের সিংহাসন দখল করলেন, তারপর থেকে তো বলতে গেলে কপর্দকহীন সন্ন্যাসীই হয়ে গেছিলাম একপ্রকার। কিন্তু কামিনী? না আচার্য, ওই আসক্তিটি বোধহয় ইহজীবনে ছাড়তে পারব না। দেখুন না, বহুকষ্টে গৌড়ে এসে পৌঁছলাম; ভাবলাম—বাকি জীবনটা সন্ন্যাসীর মতো নিরাসক্তভাবে কাটিয়ে দেব। অথচ বিধাতা বিমুখ হলেন। এখন আমার অবস্থা দেখুন, একদিকে নর্তকী কমলা, আরেকদিকে রাজকন্যা কল্যাণী।’
কঠিনস্বরে আচার্য বুদ্ধগুপ্ত প্রশ্ন করলেন, ‘সেই জন্যেই কি নারী দেখলেই অসভ্যের মতো তার অঙ্গসৌষ্ঠব অবলোকন করে থাকেন আপনি?’
জয়াপীড়ের ওষ্ঠে সামান্য হাসি ফুটে উঠল, ‘কিছু মনে করবেন না আচার্য। আপনি সর্বত্যাগী সন্ন্যাসী হতে পারেন, কিন্তু আমি একজন গৃহী যুবক। জীবনের রূপ-রস-গন্ধ-বর্ণ-স্পর্শ ইত্যাদির প্রতি আমার আসক্তি বড়ই তীব্র৷ তার মধ্যে উত্তম সুরা এবং উত্তম নারী, দুটি আমার প্রধান দুর্বলতা। তাছাড়া কে না জানে— শৌণ্ডিকালয়ের কিঙ্করী মাত্রেই সহজলভ্যা ও উন্মুক্তা।’
আচার্যর কণ্ঠ কঠিন হল, ‘ভ্রাত জয়াপীড়! নারী বিষয়ক কথা ত্যাগ করে কি আমরা আমাদের মূল আলোচনায় প্রবেশ করতে পারি?’
‘আহা, তা নয়! আমি বলতে চাইছিলাম যে কিঙ্করীটি যেমন রূপসী, তেমনই উদারহৃদয়।’
‘একবার দেখেই যে কোনও নারীর ঔদার্য বুঝে ফেলা বড়ই কৃতিত্বের কাজ ভ্রাতা, স্বীকার করছি। আপনার চরিত্রটি যে স্বর্ণমণ্ডিত সে ব্যাপারেও সম্যক অবগত হওয়া গেল। আশা করছি আমাদের অভিযান সফল হলে বঙ্গরাজসভায় উচ্চপদই পাবেন। আপাতত ওইটিই এ দেশের রাজন্যবর্গের মধ্যে স্থান পাওয়ার সর্বোৎকৃষ্ট লক্ষণ কী না।’
এই সময় মায়া নামের কিঙ্করীটি অরিষ্ট এবং মৈরেয়পূর্ণ দু’খানি কলস রেখে গেলেন। যাওয়ার সময় একটি মোহিনী কটাক্ষ করে গেলেন জয়াপীড়ের দিকে। আচার্য বিরক্ত হলেন। জয়াপীড় দ্রুত বিষয়ান্তরে গিয়ে বললেন, ‘ও সব ছাড়ুন। এখানকার সংবাদ কী? গৌড়নরেশ আদেশ দিয়েছেন—আমি যেন সর্বোতভাবে আপনাদের সাহায্য করি।’
আচার্য একটি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। বললেন, ‘সংবাদ ভালো নয়, ভ্রাতা।’
‘সে তো বুঝতেই পারছি। কিন্তু কেন?’
‘বঙ্গদেশ আজ এক অভূতপূর্ব বিপর্যয়ের সম্মুখীন। চারিদিকে সর্বব্যাপী অরাজকতা। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, বঙ্গরাজ্ঞীর কঠিন শাসন৷’
‘শাসন তো কঠিন হওয়াই বাঞ্ছনীয়, আচার্য। শাসনদণ্ড কোমল ও পেলব হলে তো শাসন করাই দুঃসাধ্য হয়ে ওঠে৷ শাসকবর্গের অস্তিত্ব সম্পর্কে সন্দেহ জাগ্রত হয়।’
একটি পাত্র মৈরেয়পূর্ণ করতে করতে মাথা নাড়লেন আচার্য। বললেন, ‘ঠিকই বলেছেন বটে। দেশের শাসনরজ্জুটি যে একটু সবল হওয়া প্রয়োজন, সে কথা অনস্বীকার্য। কিন্তু সেই রজ্জু যদি ক্রমেই ফাঁস হয়ে দেশের কণ্ঠদেশে চেপে বসে তবে তো দেশের প্রাণসংশয় উপস্থিত হয়। শাসন শুধু কঠিন হলে তো কথা ছিল না, কিন্তু সেই সঙ্গে বড় নৃশংসও যে।’
‘শাসন যদি নৃশংসই হবে, তাহলে রাজ্য অরাজক হয় কী করে? একমাত্র একজন শক্তিশালী ও সবল রাজাই তো নৃশংস শাসন চালাতে সক্ষম।’
ম্লান হাসলেন আচার্য, ‘নৃশংস হওয়ার সঙ্গে শক্তিশালী হওয়ার কোনও সম্পর্ক নেই ভ্রাতা। দয়া ও করুণা সবলের লক্ষণ। নৃশংসতা ভীরু কাপুরুষের চিহ্ন। অত্যাচারী মাত্রেই জানবেন দুর্বল ও অক্ষম, সদাসর্বদা প্রাণভয়ে ভীত। আর আপনার কথা যদি মেনেও নিই, তবুও জেনে রাখুন—রাজা শক্তিশালী হওয়ার সঙ্গে রাজ্য সুশাসিত হওয়ার কোনও সম্পর্ক নেই। রাজা যদি চান তিনি রাজদণ্ড চালনা করবেন কেবলমাত্র ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য, তাহলে তিনি যতই সবল আর সক্ষম হোন না কেন, শাসন যতই কঠিন হোক না কেন—রাজ্য কুশাসনের গ্রাসে পড়তে বাধ্য৷’
‘হুম। একটু বিশদে জানালে ভালো হয়।’ পানপাত্র হাতে তুলে নিলেন জয়াপীড়।
‘কী আর বলব। যত দিন যাচ্ছে, ততই এই উন্মাদ রানির রাজত্ব সহ্য করা আরও কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে ভ্রাতা। শাস্ত্রে বলে রাজনিন্দা মহাপাপ। অনুমান করি রাজ্ঞীনিন্দার পাপও তার কাছাকাছিই হবে। কিন্তু এমন কামুক, উন্মার্গগামী, উন্মাদচরিত্র নারী যে দেশের সিংহাসনে আসীন, তার দুর্ভাগ্যের কথা আর কী বলব। সেই দেশের জন্য স্বয়ং ঈশ্বরের করুণাও বড় অল্প মনে হয়।’ মৈরেয়পূর্ণ পাত্রে চুমুক দিলেন আচার্য।
খুক খুক করে হাসলেন জয়াপীড়, ‘কিন্তু আচার্য, শ্বশুরমশাই যে আমাকে বলেছেন কয়েক বৎসর পূর্বে নাকি আপনারাই, এই বৌদ্ধ ধর্মগুরুরাই উঠে পড়ে লেগেছিলেন প্রকাশচন্দ্রকে বঙ্গদেশের শাসনক্ষমতায় আসীন করতে? তখন তো কত গোপন সভা, কত গোপন ষড়, কত গুপ্তহত্যার পরিকল্পনা। সব বিস্মরণ হয়েছেন নাকি? নাকি এই কয়েক বৎসরেই মোহভঙ্গ হল?’
দীর্ঘশ্বাস ফেললেন আচার্য, ‘কথাটা সম্পূর্ণ সত্য নয় আর্য, আবার মিথ্যাও নয়। বলতে পারেন অর্ধসত্য। প্রকাশচন্দ্র রাজক্ষমতা অধিগত করেন সম্রাট রাজভটের তিব্বতীয় রাজ্ঞীর ভ্রাতা, রাজশ্যালক চারুদত্তকে বিভিন্ন উপায়ে বশীভূত করে। তবে আমরা, বৌদ্ধ আচার্যরা যে বিভিন্ন প্রকাশ্য এবং অপ্রকাশ্য কারণে সেই সময় প্রকাশচন্দ্রকে প্রতিপোষণা করেছি—সে কথা অস্বীকার করা অসম্ভব।’
‘তাহলে এখন এই আক্ষেপের কারণ? এই বিরুদ্ধ ষড়ের আয়োজন?’
স্তিমিতস্বরে আচার্য বললেন, ‘বড় ভুল হয়ে গেছে ভ্রাতা জয়াপীড়, বড় ভুল হয়ে গেছে। আমরা বুঝিনি যে, দেশজুড়ে অসংখ্য বিহার ও সদ্ধর্মস্তূপনির্মাণ, বৌদ্ধসংঘারামগুলিতে অপরিমিত দানধ্যান আসলে একটি মস্ত বড় কূট চাল ছিল। আমরা বুঝিনি যে, সেই কূট চালে মোহাবিষ্ট হয়ে, কত বড় সর্বনাশ ডেকে এনেছি নিজেদের। তাই তো পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে আপনাকে ডেকে আনা।’
‘সর্বনাশ বলছেন কেন?’
‘বঙ্গদেশের কোনও সংবাদই কি গৌড়ে পৌঁছয় না?’ ক্ষুণ্ণ হলেন আচার্য, ‘কী বিপুল অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে, অসীম দৈন্যের মধ্য দিয়ে, অরাজক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে দিনাতিপাত করছে এই দেশের মানুষ, তার কোনও সন্দেশই কি আপনারা রাখেন না?’
‘কিছু কিছু কানে এসেছে আচার্য। কিন্তু পরিস্থিতি যে এতটা ভয়াবহ, কল্পনা করতে পারিনি। কিন্তু এই অবস্থা তো একদিনে হয়নি। পরিস্থিতির এত অবনতি হল কী করে?’
দীর্ঘশ্বাস প্রথমে চাপলেন আচার্য। তারপর ধীরে ধীরে সেটি ত্যাগ করে বললেন, ‘সে অনেক দীর্ঘ কাহিনি। সংক্ষেপে বলছি শুনুন।
‘সম্রাট বলভটের সিংহাসনে আরোহণের দিন রাজসভায় ঘটে যাওয়া সেই মহাআলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনার কথা তো সবই জানেন। বস্তুতপক্ষে সেইদিন থেকেই বঙ্গদেশের রাজত্বের ভার এই মহাকূট, মহাধূর্ত, মহাখল মহাসামন্ত প্রকাশচন্দ্রের হস্তগত।
‘প্রকাশচন্দ্র প্রথমেই সম্রাট রাজভটের অনুগামীদের এক এক করে নিশ্চিহ্ন করলেন। সম্রাট রাজভটের তিব্বতী মহিষী অকস্মাৎ আত্মঘাতী হলেন। প্রকাশচন্দ্রের পাপকাজের প্রধান অবলম্বন, সম্রাট রাজভটের শ্যালক চারুদত্ত একদিন উধাও হয়ে গেলেন, তাঁর কোনো সংবাদই পাওয়া গেল না।’
তারপর প্রকাশচন্দ্র উৎকোচে বশীভূত করলেন শীর্ষস্থানীয় বৌদ্ধ আচার্যদের। নিজের বশংবদ অনুগামীদের অধিষ্ঠিত করলেন সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ পদে।
‘রাজপ্রাসাদের চারদিকে নেমে এল লৌহকঠিন যবনিকা। রাজপ্রাসাদের অভ্যন্তরে কী হচ্ছে না-হচ্ছে সেই সংবাদ বাইরে আসা একেবারেই বন্ধ হয়ে গেল।
‘কিন্তু বাঙালি অত্যন্ত সংবাদ-উৎসুক জাতি। ভেসে আসতে লাগল, নানা কথা। প্রকাশচন্দ্র আর তাঁর সঙ্গীসাথীরা নাকি রাজপ্রাসাদের মধ্যে ভয়াবহ ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করা শুরু করেছেন। সেইসব অদ্ভুত এবং ভয়াবহ ধর্মকৃত্যের বর্ণনা যেমন বিভীষিকাময়, তেমনই আতঙ্কজনক। তার মধ্যে নরবলি থেকে শুরু করে সর্বাঙ্গে নররক্ত লেপন করে যৌনক্রিয়া, শিশুকাম থেকে শুরু করে সদ্যরজঃস্বলা কিশোরীদের রজরক্ত নিয়ে অদ্ভুত পূজা, অম্বুবাচীর রাত্রে বিধবা নারীদের নিয়ে গণসম্ভোগ...সবকিছুই আছে।
‘শুধু কি তাই? মাঝেমধ্যেই নাকি গভীর রাত্রে নারকীয় আর্তনাদ ভেসে আসে প্রাসাদ থেকে। সেই মর্মান্তিক আর্তনাদ শুনলে বুকের রক্ত হিম হয়ে যায়। কেউ কেউ নাকি দেখেছে, অমাবস্যার মধ্যরাতে অশরীরী ছায়ামূর্তিরা দলে দলে নেমে আসছে রাজপ্রাসাদের ছাদে। আবার কেউ দেখেছে প্রবল ঝঞ্ঝাবাত্যার দিনে প্রকাশচন্দ্র নাকি রাজপ্রাসাদের শীর্ষদেশে দাঁড়িয়ে আকাশ থেকে বিদ্যুৎ আকর্ষণ করে নিজবক্ষে ধারণ করছেন।’
অবিশ্বাসের সুরে জয়াপীড় বললেন, ‘এসব গল্পকথা প্রকাশচন্দ্র নিজেই তাঁর অনুগত ভৃত্যদের দিয়ে রটনা করাননি তো?’
‘হতে পারে। এসবই শ্রুত, প্রত্যক্ষ নয়। কিন্তু যদি ধরেও নিই এসব রটনা, অন্তত একটি ঘটনা আমরা নিশ্চিত সত্য বলেই জানি। অবিশ্বাস করার কোনও কারণ নেই।’
‘কী সেই সত্য?’
প্রৌঢ় আচার্য ক্ষণেক স্তব্ধ হয়ে রইলেন। শেষে মৈরেয় পাত্র নিঃশেষিত করে বললেন, ‘যবে থেকে এই নারী রাজপ্রাসাদে এসেছেন, প্রাসাদের অভ্যন্তরে কোনও পশু বা পাখি প্রবেশ করে না। এমনকী প্রাসাদের ওপর দিয়ে কোনও পাখি ওড়ে না। প্রাসাদের ছায়া যেখানে পড়ে, সেখানেও কোনও পশুপাখি বসে না।’
আশ্চর্য হলেন জয়াপীড়, ‘আমাদের কাশ্মীর দেশেও অনেকানেক অদ্ভুত লোকশ্রুতি শুনতে পাওয়া যায়। কিন্তু এমন বিচিত্র কথা কখনও শুনিনি আচার্য।’
দীর্ঘশ্বাস ফেললেন আচার্য, ‘স্বচক্ষে দেখা সত্যকে অস্বীকার করি কী করে? অভিশাপ...আর্য জয়াপীড়, অভিশাপ। এই নারীর বেশে এক নারকীয় অভিশাপ নেমে এসেছে এই বঙ্গদেশের বুকে। তাই তো আজ বড় কষ্টে, বড় দুঃখে প্রতিবেশী রাজশক্তির কাছে সাহায্যের ভিক্ষা চাইতে হচ্ছে।’
‘হুম, অবগত হলাম। কিন্তু আচার্য, কে এই নারী? ইনি বঙ্গদেশে এলেন কোথা থেকে? আর আপনারাই বা এঁকে পেলেন কোথায়?’
‘আমরা আনিনি, ভ্রাত জয়াপীড়। ইনি নিজে এসেছেন এই দেশে, ঘোর নিয়তি যেমন নেমে আসে শাপগ্রস্ত ভূমির ওপর। এঁকে রাজসান্নিধ্যে এনেছেন প্রকাশচন্দ্র। সেসব অনেক গূঢ় কথা, এখন সেসব প্রকাশের সময় নয়৷ শুধু জেনে রাখুন—ইনি প্রকাশচন্দ্রের শুধু শিষ্যা নন, স্বয়ং শক্তি, আত্মার আত্মীয়, সাধনসঙ্গিনী। প্রকাশচন্দ্র এঁকে কোথা থেকে পেলেন, বা ইনি কোন বংশের, কোন জাতির, কোন দেশের নারী—সে বিষয়ে আমরা সম্পূর্ণরূপে অজ্ঞাত।’
‘কিন্তু এই সামান্যা নারী সমগ্র বঙ্গদেশের রানি হয়ে উঠলেন কীভাবে?’
‘সে এই দীর্ঘ কাহিনির অন্য অর্ধাংশ। কিঞ্চিৎ মনযোগ দিয়ে শুনুন ভ্রাত।
‘সম্রাট হওয়ার পর কুমার বলভট বাঁচেননি বেশীদিন। বঙ্গজনের বিশ্বাস, কোনও এক জটিল বিষপ্রয়োগে হত্যা করা হয়েছিল তাঁকে। তারপর সম্রাট বলভটের শিশুপুত্র, উদীর্ণখড়্গের যে কী হল—সে সংবাদ পাওয়াই গেল না। লোকশ্রুতি, শিশুটিকে মেঘান্দ নদীর জলে ডুবিয়ে হত্যা করেন প্রকাশচন্দ্র স্বয়ং। বলভটের পত্নী, সম্রাজ্ঞী ঊর্মিমালা শোকে দুঃখে আত্মঘাতী হলেন। কেউ কেউ আবার বলেন, তাঁকে হত্যা করা হয়।
‘রাজপুত্র উদীর্ণখড়্গের পর বঙ্গদেশের সম্রাট হন প্রকাশচন্দ্রের জ্ঞাতিভ্রাতা ধর্মচন্দ্র। তখনই এই রানির আবির্ভাব। প্রকাশচন্দ্র এঁর সঙ্গে ভ্রাতা ধর্মচন্দ্রের বিবাহ দেন। যদিও ধর্মচন্দ্রের এক গৃহিণী পূর্বেই বিদ্যমান ছিলেন।’
‘সে কী? এই যে বললেন ইনি প্রকাশচন্দ্রের...’
ম্লান হাসলেন আচার্য বুদ্ধগুপ্ত, ‘চতুরঙ্গ বোঝেন—আর্য জয়াপীড়? এই চতুরঙ্গ ক্রীড়ায় কেবলমাত্র একজনই রাজা আর একজনই রানি। প্রকাশচন্দ্র আর এই নারী। বাকি সবাই ক্রীড়নক। ধর্মচন্দ্র নামেই সম্রাট ছিলেন। রানি এবং প্রকাশচন্দ্রের অঙ্গুলিসংকেতে উঠতেন, এবং বসতেন।
‘কিন্তু ধর্মচন্দ্রের কপালে রাজভোগ বেশিদিন সহ্য হল না। একদিন হঠাৎ আমরা তাঁর অস্বাভাবিক মৃত্যুর সংবাদ পেলাম। রাজপ্রাসাদসূত্রে জানানো হল যে উদ্যানে ভ্রমণকালে তিনি সর্পদংশনে প্রাণত্যাগ করেন। কিন্তু...’
‘কিন্তু কী?’
‘বিশ্বস্ত সূত্রে জানতে পারলাম যে সংবাদটি সম্পূর্ণ ভুল।’
‘কেন? আর এই বিশ্বস্ত সূত্রই কে বা কারা?’
‘ততদিনে আমরা, বৌদ্ধ আচার্যরা বুঝতে আরম্ভ করেছি যে কোন মহাপাপ বঙ্গদেশ গ্রাস করতে উদ্যত৷ আমরা ভিতরে ভিতরে সংগঠিত হচ্ছি। কয়েকজন সামন্ত ও মহাসামন্ত, যাঁরা খড়্গবংশের প্রতি অনুরক্ত ছিলেন, তাঁরা গোপনে গোপনে আমাদের সহায়তা দানে প্রতিশ্রুত হয়েছেন। রাজপ্রাসাদের কিছু নিম্নস্তরের
কর্মচারীকে আমরা স্বর্ণদিনারে বশীভূত করলাম। তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন রাজবৈদ্য কুল্লুকভট্টর শিষ্য ও সহায়কসচিব। তাঁর মাধ্যমে যে সংবাদ পাওয়া গেল তা অত্যন্ত চমকপ্রদ।
‘জানা গেল যে, মহারাজ ধর্মচন্দ্রের সঙ্গে তাঁর দ্বিতীয়া স্ত্রীর কোনও স্বাভাবিক সম্পর্ক ছিল না। মহারাজ এই নারীকে কিছুটা ভয়ই পেতেন। তিনি সচরাচর তাঁর প্রথমা স্ত্রী’র কক্ষেই রাত্রিযাপন করতেন। আর যখন দ্বিতীয়া স্ত্রী’র কক্ষে রাত্রিবাসে যেতেন, তখন নিজের ইচ্ছানুসারে যেতেন না। যেতেন সেই নারীর দ্বারা আদিষ্ট হয়ে।’
‘সে কী? মহারাজ নিজ ইচ্ছায় তাঁর ধর্মপত্নীতে উপগত হতে পারতেন না?’
‘না। এই নারী মহা-স্বৈরিণী। নিজ কামাগ্নি প্রশমনের প্রয়োজন হলে তবেই ধর্মচন্দ্রকে আদেশ করতেন তাঁর কক্ষে রাত্রিবাস করতে। সেই আদেশ উপেক্ষা করার সাহস মহারাজের ছিল না। তবে এই ঘটনা তখনই ঘটত, যখন প্রকাশচন্দ্র প্রাসাদে অনুপস্থিত থাকতেন।
‘এখানে একটি সত্য রাখা প্রয়োজন। ধর্মচন্দ্রের দ্বিতীয়া স্ত্রীর কক্ষে প্রকাশচন্দ্রের অবাধ যাতায়াত ছিল ও আছে—এই সত্যটি সর্বজনবিদিত। দুজনে নাকি প্রায়শই অর্গলবদ্ধ কক্ষে রাত্রিভর কীসব গুপ্ত অনুষ্ঠান করেন। তখনও করতেন, এখনও করেন।
‘রাজপ্রাসাদের কর্মচারীরা এবিষয়ে মুখে কুলুপ এঁটে রাখতেন। এখানে উল্লেখ করে রাখা ভালো যে সেই বিশেষ গোপন অনুষ্ঠানের সময় কারও, এমনকী স্বয়ং মহারাজেরও নিজের ধর্মপত্নীর সঙ্গে দেখা করার অনুমতি ছিল না।
‘কিন্তু যেদিন মহারাজ ধর্মচন্দ্রের মৃতদেহ আবিষ্কৃত হয়, তার ঠিক আগের রাত্রে এই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটেছিল। সেদিন কোনও কারণে মহারাজ কিছু উত্তেজিত ছিলেন। সেইরাত্রে তিনি রাজসচিব প্রকাশচন্দ্রের ভবনে বিশেষ দূত পাঠান তাঁকে তাঁর সামনে সেই দণ্ডেই উপস্থিত হওয়ার আদেশ জানিয়ে। দূত ফিরে এসে জানায় যে রাজসচিব এখন তাঁর সাধনসঙ্গিনীর সঙ্গে বিশেষ ধর্মীয় আচারে লিপ্ত, এই মুহূর্তে তাঁর পক্ষে রাজসকাশে উপস্থিত হওয়া অসম্ভব।
‘শেষবার ধর্মচন্দ্রকে দেখা যায় উন্মুক্ত তরবারি হস্তে তাঁর দ্বিতীয়া স্ত্রীর শয়নকক্ষের দিকে উন্মাদের মতো ধেয়ে যেতে।’
‘হুম। পুরুষের যৌনঈর্ষার মতো অন্ধ আবেগ আর হয় না। আর সেই অন্ধ ক্রোধ যদি কোনও ক্ষমতাবান পুরুষের হয়—তবে তো কথাই নেই!’
আচার্য যেন শুনেও শুনলেন না। বলে যেতে লাগলেন, ‘পরদিন প্রভাতে মহারাজ ধর্মচন্দ্রের শয্যায় তাঁর প্রাণহীন দেহ পাওয়া যায়। তাঁর প্রথমা স্ত্রী সংজ্ঞাহীন অবস্থায় তাঁর পাশেই শায়িত ছিলেন।
‘পরিচারকেরা লক্ষ করে যে, মহারাজের কণ্ঠদেশে দুটি বিষদন্তের গভীর ক্ষত। সেই ক্ষতদুটির মধ্যেকার দূরত্ব অস্বাভাবিক রকমের বড়। কোনও বিষধর সর্পের মুখব্যাদান অত বিস্তৃত হওয়া অসম্ভব। শুধু তাই নয়, ক্ষতদুটিও অস্বাভাবিক গভীর। অমন গভীর দংশন শুধু সর্প কেন, পৃথিবীর কোনও সরীসৃপ বা প্রাণীর পক্ষে সম্ভবই নয়।’
জয়াপীড় তৃতীয় পাত্র শেষ করতে গিয়েও থেমে গেলেন, ‘এর অর্থ?’
‘সেই অর্থটাই তো আমরা সবাই খুঁজছি ভ্রাত জয়াপীড়। তবে আপনার আশ্চর্য হওয়ার মতো কারণ এখনও রয়ে গেছে।’
‘কী আচার্য?’
‘ধর্মচন্দ্রের সমস্ত দেহ নাকি বিষের প্রভাবে ঘোর কৃষ্ণবর্ণ ধারণ করেছিল।’
ভ্রুকুঞ্চিত হল জয়াপীড়ের, ‘তীব্র বিষপ্রয়োগে দেহ নীলবর্ণ হয় বলে শুনেছি। কৃষ্ণবর্ণ তো কখনও শুনিনি!’
‘হ্যাঁ৷ শুধু তাই নয়। শোনা যায়, মৃতদেহটি দেখে মনে হচ্ছিল যে, মহারাজ বজ্রাঘাতে দেহত্যাগ করেছেন—এতটাই ঘোর কৃষ্ণবর্ণ হয়েছিল তার দেহ। রাজবৈদ্য কুল্লুকভট্ট নিজেও নাকি মৃতদেহ দেখে এমন আতঙ্কিত হয়েছিলেন যে, মৃতদেহ নিজে স্পর্শ করতে অস্বীকার করেন, অন্য কাউকেও স্পর্শ করতে নিষেধ করে দেন। শেষে ধর্মচন্দ্রের দুই বিশ্বস্ত দেহরক্ষী বাঁশের মাচায় মহারাজের মৃতদেহটি কোনওমতে তুলে নিয়ে গিয়ে মহাশ্মশানে দাহকার্য সমাধা করে। সেই সময় শ্মশানে অন্য কারও উপস্থিত থাকার অনুমতি দেননি প্রকাশচন্দ্র।’
‘কিমাশ্চর্যম! রাজার মৃতদেহের সৎকার হচ্ছে এইভাবে!’
‘শুধু তাই নয় ভ্রাত! তদ্যবধি মহারাজ ধর্মচন্দ্রের প্রথমা স্ত্রী কাঞ্চনাদেবীর কোনও সংবাদ নেই।’
‘অর্থাৎ?’ চমকিত হন জয়াপীড়।
‘এই প্রশ্নের উত্তর মাসাধিককাল পূর্বাবধি শুধু আমি কেন, আমাদের কারও কাছেই ছিল না, তবে এখন আছে। সে যাই হোক, শেষাংশ শুনুন আপাতত।
‘ধর্মচন্দ্রের পর রাজা হন তাঁর প্রথম স্ত্রীর পুত্র, সদ্যযুবা আনন্দচন্দ্র। অবস্থাটি অনুধাবন করুন একবার। মহারাজ ধর্মচন্দ্রের মৃত্যুরহস্য নিয়ে প্রাসাদের অভ্যন্তরে উথালপাথাল চলছে। আনন্দচন্দ্রের মাতৃদেবী উন্মাদপ্রায়৷ যদিও সেইসবের বিবরণ জনারণ্যে প্রকাশিত হচ্ছে না। বঙ্গজন এক অনভিজ্ঞ সদ্যযুবাকে রাজা বলে স্বীকার করে নেবে কী না সে নিয়েও রাজন্যবর্গ যথেষ্ট সন্দিহান।
‘এমন অনিশ্চয় অবস্থার মধ্যেই প্রকাশচন্দ্র বঙ্গরাজনীতির চতুরঙ্গ ক্রীড়াঙ্গনে তাঁর পরের দান নিক্ষেপ করলেন। তিনি ধর্মচন্দ্রের দ্বিতীয় স্ত্রী তথা নিজের সাধনসঙ্গিনীর সঙ্গে আনন্দচন্দ্রের বিবাহ দিলেন।’
‘সে কী!’ ঘৃণায় চোখমুখ বিকৃত করলেন জয়াপীড়, ‘ছিঃ ছিঃ ছিঃ। এই অজাচার আপনারা সহ্য করলেন কী ভাবে? এদেশ থেকে কি সদ্ধর্মের শেষ চিহ্নটুকুও লুপ্ত হয়েছে? বিমাতার সঙ্গে সন্তানের বিবাহ!’
ম্লান হাসলেন বৌদ্ধাচার্য, ‘আগেই বলেছিলাম ভ্রাতা, ভঙ্গ বঙ্গদেশের এই চতুরঙ্গ ক্রীড়ায় কেবলমাত্র একজনই রাজা আর একজনই রানি, বাকি সবাই ক্রীড়নক।’
জয়াপীড়ের চক্ষু ক্রমেই আরক্ত হয়ে উঠছিল৷ তিনি স্খলিতস্বরে বললেন, ‘তারপর? আনন্দচন্দ্রের কী হল?’
‘ছয়টি মাস। মাত্র ছয়টিমাস বেঁচে ছিল সেই কিশোর। তারপরেই একদিন তার মৃতদেহ আবিষ্কৃত হয় তার ধর্মমহিষীর কক্ষদ্বারের ঠিক বাইরে। কণ্ঠে সেই একই বিষদন্ত লক্ষণ। মৃতদেহ সেই একইভাবে ঘোর কৃষ্ণবর্ণ৷ একই ভাবে মার্জার-সারমেয়বৎ দাহসংস্কার।’
উত্তেজিত জয়াপীড় সম্মুখস্থ চতুর্পদীটির ওপর সজোরে মুষ্ট্যাঘাত করে বললেন, ‘অসম্ভব ভন্তে, এ অসম্ভব।’
‘সেই অসম্ভবই সম্ভব হয়েছে ভ্রাতা।’
‘কে এই নারী, ভন্তে? এত ক্ষমতা ইনি পেলেন কোথা থেকে?’
‘কে এই নারী—সে সংবাদ ধীরে ধীরে আমাদের সামনে উন্মোচিত হচ্ছে ভ্রাতা। এ মানুষী-নারী নয়, সাক্ষাৎ কালপিশাচী। প্রকাশচন্দ্র তাঁর নারকী সাধনার বিন্দু বিন্দু দিয়ে এই মহা অনিষ্টকারী রমণী সৃষ্টি করেছেন। প্রকাশচন্দ্র যেমন চিরযুবক, ইনিও তেমনই চিরযৌবনা। প্রকাশচন্দ্রের মতো ইনিও অদ্ভুত এবং আশ্চর্য অতিপ্রাকৃত শক্তির অধিকারিনী। ইনি প্রকাশচন্দ্রের সর্বোত্তম আয়ুধ, ভয়ঙ্করতম খড়্গ, তীক্ষ্ণতম ভল্ল।’
‘কিন্তু এসব করে প্রকাশচন্দ্রের লাভ কী? তিনি কী চান?’
‘তিনি যে কী চান, এই প্রশ্নের উত্তর আমরাও সন্ধান করে ফিরছি৷ তা না হলে এই পাপ থেকে বঙ্গভূমিকে মুক্ত করা অসম্ভব। আর শুধু প্রকাশচন্দ্র কেন, তাঁর সঙ্গে আরও ছয় জন উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী রয়েছেন। মহারানি এই সপ্তরথীবেষ্টিত হয়ে দোর্দণ্ড প্রতাপে বঙ্গভূমি শাসন করছেন। সেই শাসনযন্ত্রের নিপীড়নে দেশের চারিদিকে এখন ত্রাহি ত্রাহি আর্তনাদ।’
‘আমাকে কী করতে আদেশ করেন ভন্তে?’
জয়াপীড়ের দক্ষিণ হস্ত ধরে ফেললেন আচার্য। ‘আপনার বহুবিচিত্র কর্মকাণ্ডের কথা শুনেছি, মহাবীর জয়াপীড়। যিনি সামান্য ছুরিকাহস্তে একাকী পূর্ণবয়স্ক সিংহশিকারে সমর্থ হন, তাঁর মতো এক দুঃসাহসী এবং বীর যুবাপুরুষ আমাদের প্রয়োজন। আমরা আজ পঞ্চগৌড়েশ্বর মহারাজ জয়ন্তর জামাতা, আসমুদ্রহিমাচলজয়ী মহাবীর ললিতাদিত্য মুক্তাপীড়ের পৌত্র, বিনয়াদিত্য জয়াপীড়ের কাছে সেই সাহায্য ভিক্ষা করছি।’
‘কিন্তু আমি আর আপনি—দুজনে একত্র হয়ে এই অতিবৃহৎ কর্ম সম্পাদনে সমর্থ হব?’
‘আমরা একা নই ভ্রাত জয়াপীড়। বঙ্গভূমিকে অপশাসন থেকে মুক্ত করার এই মহতী যজ্ঞে আরও অনেকে আমাদের সঙ্গী হয়েছেন।’
‘তাঁরা কে বা কারা?’
‘সহজিয়া সিদ্ধ সাধকরা। তাঁরা জনগণের নাড়ীনক্ষত্র বোঝেন। অন্ত্যজ, দলিত, নিপীড়িত জনজাতির মধ্যে তাঁদের প্রভাব অসীম। গৌড়বঙ্গের সহজিয়া সিদ্ধরা একত্র হচ্ছেন। দিকে দিকে তাঁদের আহ্বানে একত্রিত হচ্ছে বিদ্রোহী জনসাধারণ। তারা ক্ষোভে, ক্রোধে ফুঁসছে। সংগ্রামের চূড়ান্ত পর্যায় সমাগত। আজ কালের মধ্যেই তাঁরা ঝাঁপিয়ে পড়বেন তাঁদের সংগঠন শক্তি নিয়ে। আর তাঁদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন দুই মহাবলশালী পুরুষ সিংহ।’
জয়াপীড় কিছু বললেন না। নির্নিমেষে তাকিয়ে রইলেন আচার্যর দিকে।
‘সর্ববিদ্যাবিশুদ্ধ আচার্য দয়িতবিষ্ণুর পুত্র খণ্ডিতারাতি বপ্যট এবং তপশ্চর্যায় যিনি আদিদেব মহেশ্বরের সমতুল্য, সেই মহাযোগী লোকেশ্বর মৎস্যেন্দ্রনাথ।’
স্থির দৃষ্টিতে আচার্যের দিকে ক্ষণকাল চেয়ে রইলেন জয়াপীড়। তারপর মৃদুস্বরে বললেন, ‘পিতামহ ললিতাদিত্য মুক্তাপীড় মহাবীর ছিলেন। স্বীয় বাহুবলে অর্ধেক পৃথিবী জয় করেছিলেন। তাঁর সৈন্যদলের পদভারে মেদিনী কম্পিত হতো। কিন্তু তাঁর জীবনকৃত্যে দুটি অনপনেয় কলঙ্ক ছিল।’
‘জানি জয়াপীড়। তার মধ্যে একটি হচ্ছে মদ্যপ অবস্থায় অগ্নিসংযোগে প্রবরদেশ ধ্বংস করা।’
‘ঠিক।’ সম্মতি জানালেন জয়াপীড়, ‘এবং দ্বিতীয়টি বহুদিন যাবৎ আপামর বঙ্গজনের হৃদয়ের রক্তক্ষরণের কারণ৷ গৃহদেবতা পরিহাসকেশবের নামে শপথ করে তিনি ভীত ও সন্ত্রস্ত বঙ্গাধিপকে কাশ্মীরে আমন্ত্রণ করেন, এবং গুপ্তঘাতকের দ্বারা তাঁকে ত্রিগ্রামীতে হত্যা করান। এই পাপের ক্ষমা নেই আচার্য। আমার পিতামহ যে একজন ক্রূরকর্মা বিশ্বাসঘাতক, এই চিন্তা আমাকে জন্মাবধি কুরে কুরে খেয়েছে।
‘কিন্তু ঈশ্বরের কী অসীম অনুগ্রহ! আজ ললিতাদিত্য মুক্তাপীড়ের পৌত্র জয়াপীড়ের সামনে সুযোগ এসেছে সেই কলঙ্ক অপনোদনের। এ আনন্দ আমি রাখি কোথায়? আমার রক্তে প্রবাহিত বিশ্বাসঘাতকতার দোষ শুদ্ধ হোক। বঙ্গজনের দুঃখ ঘুচে যাক। রামস্বামীর মন্দিরে প্রভুর সম্মানরক্ষার্থে নিহত গৌড়বীরদের আত্মা শান্তি পাক। আচার্য বুদ্ধগুপ্ত, আমি এই সংগ্রামের অংশ হতে পারলে সৌভাগ্যবান মনে করব।’
উঠে দাঁড়ালেন শালিবন বিহারের উপাধিবারিক, বজ্রযোগিনী মন্দিরের প্রধান পুরোহিত ভন্তে বুদ্ধগুপ্ত। তারপর স্মিত হাস্যে বললেন, ‘তাহলে এসো জয়াপীড়। তোমাকে এই যজ্ঞের ঋত্বিক এবং যজ্ঞযন্ত্রের বাকি অধ্বর্যুদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই।’
রাজ্ঞী আসন গ্রহণ করলে বাকিরা নিজ নিজ আসনে উপবেশন করলেন। মহারাজসচিব প্রকাশচন্দ্র অত্যন্ত শীতলকণ্ঠে বললেন, ‘কাহিনির মূল অংশটি না হয় এই রক্ষীপ্রধানটির থেকেই শোনা যাক, কী বলেন মাননীয় অমিতাভভট্ট?’
প্রধানমন্ত্রী অমিতাভভট্ট সম্মত হতেই সবার দৃষ্টি ন্যস্ত হল অভাগা মানুষটির ওপর।
রক্ষীপ্রধান তার শুষ্ক ওষ্ঠ দুটি লেহন করে নিল প্রথমে। তারপর কম্পিত ও স্তিমিতস্বরে বলা শুরু করল।
‘মহাপ্রতীহার আর্য শান্তঘোষের আদেশক্রমে আমরা সসৈন্যে উপস্থিত হয়েছিলাম কমলাঙ্ক গ্রামে। গ্রামটির সন্নিহিত অরণ্যের পাশে বর্বর কিরাতজাতির বাস। তারা যে শুধু বর্বর তা নয়, অত্যন্ত দুর্বিনীত এবং অবাধ্যও বটে। সেই জংলী ইতর প্রাণীগুলি যদি বিনা বাধায় আমাদের কাজ করতে দিত, তাহলে এই দুর্ঘটনা ঘটতই না।’
বাকিরা নড়েচড়ে বসলেন।
‘প্রথমে অনেক ধৈর্যের সঙ্গে তাদের বোঝাবার চেষ্টা করলাম আমাদের আগমনের উদ্দেশ্য কী, আমরা কেন এসেছি। দেশের সর্বাঙ্গীণ মঙ্গলের জন্যই যে এই ভৈরবীচক্রের আয়োজন, আর সেই চক্রানুষ্ঠানের জন্যই তাদের কন্যা, মাতা ও ভগিনীদের আশু প্রয়োজন—সে কথাটাও বিভিন্নভাবে বুঝিয়ে বলা হয়। এমনকী ভৈরবীচক্রের পর যে সমস্ত নারীরত্নদের বিপুল কপর্দকরাশি এবং অন্যান্য উপহারসম্ভারের সঙ্গে সসম্মানে প্রত্যর্পণ করা হবে, সে কথাটাও বেশ স্পষ্টভাবেই ব্যক্ত করা হয়েছিল।
‘কিন্তু বিধি বাম, চোরা না শোনে ধর্মের কাহিনি। তারা অত্যন্ত উগ্র এবং অসভ্যভাবে আমাদের অপমান করতে থাকে। তার মধ্যে বিবিধ অশ্রাব্য গালি তো ছিলই, তার সঙ্গে ছিল অত্যন্ত অশ্লীল অঙ্গভঙ্গী, আমাদের পরিবারের নারীদের চরিত্র নিয়ে উচ্চারিত কুবাক্য, এমনকী কেউ কেউ বড় বড় পাথরের টুকরো এবং গাছের ডাল হাতে আমাদের হুমকি দিতে থাকে। শুধু কি তাই? দু-একজন অতি অবাধ্য কিরাত আমাদের সঙ্গীদের ওপর থুতু ছিটোতে থাকে, এমনকী কয়েকজন তো আমাদের সঙ্গীদের দাড়ি গোঁফ ছিঁড়ে নেবে বলে তর্জন করতে থাকে।
‘অতএব নিতান্ত বাধ্য হয়েই আমাদের মৃদু বলপ্রয়োগ করতে হয়। মৃদু বলতে খুবই মৃদু। ওই অতি সামান্য বলপ্রয়োগে মনুষ্যশরীরে সাধারণ ক্ষতসৃষ্টি ছাড়া আর অন্য কোনও ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনাই নেই।’
এই পর্যন্ত বলে অপরাধী দৃষ্টিতে চারিদিক একবার দেখে নিল গ্রামরক্ষী। প্রধানমন্ত্রী অমিতাভভট্ট সামান্য অস্বস্তির সঙ্গে প্রশ্ন করলেন, ‘তারপর?’
‘কিন্তু ওই দুর্বিনীত কিরাতদের কথা কী বলব প্রভু, তাদের বিবেচনাবোধ বলতে কিছুই নেই? আমরা যথেষ্ট সতর্কতার সঙ্গে সামান্য ভল্ল এবং তরবারি চালনা শুরু করেছি কী করিনি, ওদের ওই গোষ্ঠীপ্রধান বৃদ্ধ অলম্বুষটিকে নিতান্ত অবিবেচকের মতো এর মধ্যে পড়ে নিহত হতেই হল? নিহত হওয়ার একটা পূর্বাপর বোধ নেই? সময় অসময় জ্ঞান নেই? এমনকী তার সঙ্গে তার শিশু পৌত্রটিও যে নিহত হবে...’
‘কীরকম? বৃদ্ধটি যে দেহত্যাগ করল—সে না হয় বোধগম্য হল। কিন্তু শিশুটি কী করে...’ জিতসেনের প্রশ্নটি অর্ধোক্তই রয়ে গেল।
‘দৈব প্রভু, দৈবই প্রবল সর্বত্র।’ গভীর আক্ষেপের সঙ্গে মাথা নাড়ল গ্রামরক্ষকটি, ‘এক্ষেত্রেও শিশুটির দৈবই তাকে আকর্ষণ করে এনেছিল তার মৃত্যুর দিকে। যখন আমাদের রক্ষীদলের কুমার যোগেন্দ্র ক্রোধবশত তার ভল্লটি গ্রামপ্রধান বৃদ্ধের বক্ষের দিকে চালনা করে, তখন সেই বৃদ্ধ নিতান্ত মূর্খের মতো তার শিশুপৌত্রকে নিজবক্ষে ধারণ করে ছিল। ফলে ভল্লটি প্রথমে সেই শিশু...এবং তারপর বৃদ্ধটির...’
ভ্রূকুঞ্চন করলেন অগ্নিমিত্র, ‘বৃদ্ধটি তার শিশুপৌত্রকে বক্ষে ধারণ করে এই দ্বন্দ্বে অবতীর্ণ হয়েছিল? আমাদের তাই বিশ্বাস করতে হবে?’
সামান্য ইতস্তত করল রক্ষীপ্রধান৷ তারপর বলল, ‘না, ঠিক তা ঘটেনি। বৃদ্ধ যে দ্বন্দ্বে অবতীর্ণ হয়নি, সে কথা সত্য। এমনকি সে যে অসুস্থ অবস্থায় কুটিরের অভ্যন্তরে নিজের পৌত্র ও পৌত্রীদের রক্ষণাবেক্ষণ করছিল— সেও সত্য। মহাবীর, মহাবলশালী কুমার যোগেন্দ্র নিতান্তই যৌবনমদমত্ত হয়ে সেই কুটিরে প্রবেশ করে...’
‘শিশুপরিবেষ্টিত বৃদ্ধটিকে হত্যা করে, তাই তো?’
রক্ষীপ্রধানের অস্বস্তি চতুর্গুণ বেড়ে যায়। সে ধীরে ধীরে বলে, ‘বলপ্রয়োগের সময় সর্বদা লক্ষ থাকে না যে...’
‘বল কোথায় প্রয়োগ করা হচ্ছে, মহামান্য রক্ষীপ্রধান?’ সামান্য ব্যঙ্গাত্মক সুরে প্রশ্ন করেন আনন্দগুপ্ত।
মরিয়া হয়ে ওঠে রক্ষীপ্রধান, ‘কিরাতদল এমনই অসভ্যতা করছিল প্রভু—যে কী বলব! আর গালিবর্ষণের তো ইয়ত্তা ছিল না, সেসব অশ্লীল কুবাক্য আমি আপনাদের সামনে উচ্চারণও করতে পারব না। নেহাত বাধ্য হয়েই...অর্থাৎ কি না সামান্য উত্তেজিত হয়েই মহাবীর যোগেন্দ্র...’
‘এই কর্মটি ঘটিয়ে ফেলেছে, তাই তো?’
দ্রুত সম্মতিসূচক মাথা নাড়ে রক্ষীপ্রধান।
‘তারপর? তারপর কী হল?’ সামান্য ঝুঁকে শীতলস্বরে প্রশ্ন করলেন প্রকাশচন্দ্র। সেই স্বর শুনে রক্ষীপ্রধানের অস্বস্তি বহুগুণ বর্ধিত হয়। সে জানে না এই স্বরের মধ্যে কী আছে, কিন্তু শুনলেই এক অপার্থিব ভয়ের অনুভূতি আচ্ছন্ন করে শ্রোতাকে।
‘তারপর প্রভু আমরা যখন আপনার আদেশানুসারে কয়েকজন যুবতী ও কিশোরীকে কেশাকর্ষণ করে নিয়ে আসছি, ঠিক তখনই...
গোপালদেব অকুস্থলে পৌঁছতেই এক অভূতপূর্ব নারকীয় দৃশ্যের সম্মুখীন হলেন।
কিরাতদের বসতির সামনে রীতিমতো খণ্ডযুদ্ধ চলছে। যুদ্ধ বলা ভুল, অস্ত্রেশস্ত্রে সজ্জিত সৈন্যদল ভীম আক্রোশে ছারখার করে দিচ্ছে কিরাতদের ক্ষুদ্র বসতিটি। কিরাতপুরুষেরা বলশালী বটে, কিন্তু তাদের অন্ধ ক্রোধের উদ্গিরণ এবং সুশিক্ষিত সৈন্যবাহিনীর আক্রমণের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। তাই তারা ছত্রভঙ্গ, প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টায় ব্যর্থ। ওদিকে একটি অপেক্ষাকৃত বড় পর্ণকুটিরের সামনে থেকে হাহাকার এবং কান্নার আর্তনাদ ভেসে আসছে৷ কুটিরের সামনে দুটি মৃতদেহ শায়িত, একটি এক বৃদ্ধের, অন্যটি এক শিশুর।
গোপালদেব শান্তচোখে একবার বামদিকে আর একবার ডানদিকে তাকালেন। তারপরেই তাঁর চোখে পড়ল যে সৈন্যদের একটি ছোট অংশ কয়েকজন কিরাতরমণীকে বলপূর্বক আকর্ষণ করে নিয়ে যাচ্ছে।
গোপালদেব চিরকালই লক্ষ করে এসেছেন যে সংগ্রামে অবতীর্ণ হওয়ার ঠিক পূর্বমুহূর্তে দেহে মনে এক আশ্চর্য প্রশান্তি অনুভব করেন তিনি। তাঁর স্নায়ু শান্ত ও ধীর হয়ে আসে, হাত এবং পায়ের পেশি লঘু অথচ শক্ত হয়ে ওঠে। আর আর হাতের খড়্গটিকে দেহের অংশ বলেই মনে হয়। মনে হয় যেন তারও প্রাণ আছে, আর সেই প্রাণবন্ত খড়্গ তার প্রভুর জন্য স্বয়ং ঈশ্বরের রক্তপানেও পশ্চাৎপদ হবে না।
গোপালদেব তাঁর মহাখড়্গ কোষমুক্ত করলেন।
তাঁর একটু সামনে এক সৈন্য একটি কিশোরীকে চুল ধরে টেনে নিয়ে আসছিল। কিশোরীটির আর্তনাদ আর বুকফাটা কান্নায় কর্ণপাত করার কেউ নেই। তার ঊর্ধ্বাঙ্গ অনাবৃত, নিম্নাঙ্গের বল্কলটিও প্রায় যায় যায়। কিশোরীটি একহাতে তার লজ্জাস্থান রক্ষার চেষ্টায় রত, আরেক হাত দিয়ে সেই সৈনিকের হাত থেকে নিজেকে মুক্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা করছে সৈনিকটি ঈষৎ মদমত্ত তো ছিলই। দুর্বলের ওপর অত্যাচারের মধ্যেও উত্তেজক আনন্দও আছে। সে পৌরুষকণ্ঠে কিশোরীর অবশ্যম্ভাবী ভবিতব্য নিয়ে ক্রমাগত অশ্লীল কুবাক্য উচ্চারণ করে যাচ্ছিল। বোধকরি সেই আক্রোশই তাকে অন্ধ করে দিয়েছিল। তাই সে যখন দেখল তার পথরোধ করে দাঁড়িয়ে এক বলশালী যুবক, আর তার হাতে এক ভীমদর্শন খড়্গ, তখনও সে নিজের আশু সর্বনাশকে চিনে নিতে পারেনি। হুঙ্কার দিয়ে সে বলল, ‘কে রে তুই? কোন সাহসে চন্দ্রসৈন্যের পথরোধ করিস?’
যুবক শান্তস্বরে বললেন, ‘মেয়েটাকে ছেড়ে দে।’
সৈন্যটি উচ্চৈঃস্বরে হেসে বলল, ‘বাহবা, বাঃ! বড়ই মজার কথা। আর যদি ছেড়ে না দিই?’
যুবকটি শান্তস্বরে বলল, ‘তোর পক্ষে ভালো না-ও হতে পারে।’
দাঁতে দাঁত ঘষল উন্মত্ত সৈনিক। ‘যদি এই মেয়েটিকে ছেড়ে দিই, তাহলে ভৈরবীচক্রের অগ্নিকুণ্ডটা জ্বালানো হবে কোথায়? তোর মাতৃদেবীর যোনিদেশে?’
যুবকটির চক্ষুদুটি সামান্য জ্বলে উঠেই শান্ত হল। তারপর বলল, ‘কথাটা ভেবে বলিস। আমার মাতৃদেবী কিন্তু বয়সে তোরও মাতৃদেবীর মতোই হবেন।’
রাক্ষসের মতো হেসে সৈন্যটি বলল, ‘হা হা হা। আমার মায়ের মতন? শোন রে রণ্ডাপুত্র, তোদের মা আর আমাদের মা আর এক নয়। তোদের ধর্ম আর আমাদের ধর্ম এক নয়। তোদের রক্ত আর আমাদের রক্ত এক নয়। নিজেদের অপবিত্র রক্তকে আমাদের রক্তের সঙ্গে তুলনা করিস না, ফল ভালো হবে না।’
যুবকটি শান্তস্বরে প্রশ্ন করল, ‘কী রকম?’
‘আমরা, প্রকাশচন্দ্রের অনুগামী রাজসেবকরা প্রভুর চরণকমলে নিজেদের উৎসর্গ করে দীক্ষিত হয়েছি, নিজেদের পাপজন্ম শুদ্ধ করেছি। আমরাই এই পৃথিবীর একমাত্র শুদ্ধতম জাতি, ঈশ্বরের অনুপ্রেরিত বিশেষ গোষ্ঠী। আমাদের পাঠানো হয়েছে বঙ্গদেশ শাসনের জন্য। আমাদের রক্ত পুণ্য, আমাদের উদ্দেশ্য পুণ্য, আমাদের তরবারি পুণ্য। সর্বোপরি—আমাদের সঙ্গে আছেন সর্বশক্তিমান পরমেশ্বর শ্রীপ্রকাশচন্দ্র। তিনি ঈশ্বরের আশীর্বাদধন্য বিশেষ পুরুষ।’
‘আর যারা তোদের বিরুদ্ধে?’ খড়্গখানি দৃঢ়ভাবে ধরে প্রশ্ন করলেন গোপালদেব।
‘আমরা তাদের মানুষ বলে মনে করি নাকি?’ ঘৃণায় নাসিকাকুঞ্চন করল সেই রক্ষী, ‘যারা আমাদের পক্ষে থাকে, একমাত্র তাদেরই আমরা মানুষ বলে মানি। আর যারা আমাদের বিরুদ্ধপক্ষ—তাদের প্রত্যেকে আমাদের শত্রু। তাদের আমরা কীটপতঙ্গের বেশি মনে করি না। তাদের পুরুষেরা অবশ্যবধ্য, তাদের নারীরা আমাদের যৌনদাসী হওয়ার জন্যেই জন্মেছে। তাদের শিশুরা জন্ম হতেই আমাদের দাস হওয়ার জন্য বলিপ্রদত্ত। তুইও তাদের মধ্যে একজন রে মূর্খ। তোদের নারীরা জন্মমাত্রেই আমাদের ভোগ্য। তাই তোর অপবিত্র বংশজাত বেশ্যাটিকে মা বলে মানতে...’
মুহূর্তের ভগ্নাংশে গোপালদেবের হাতে উত্তোলিত হল তাঁর মহাভৈরব খড়্গ।
রক্ষীপ্রধানটি বসতির মধ্যস্থলে দাঁড়িয়ে ধ্বংসযজ্ঞটি উপভোগ করছিল। আহা, আজকের অভিযানটি সম্পূর্ণভাবে সাফল্যমণ্ডিত হয়েছে। আশা করা যায়, প্রভু পরমেশ্বর প্রকাশচন্দ্র নিশ্চয়ই প্রীত হবেন। আর লুণ্ঠিত নারীদের কিছু অংশ কি সে নিজেও পাবে না? লুণ্ঠনের অংশ গ্রহণ করা তো প্রভু প্রকাশচন্দ্রের অনুমত্যাদেশের মধ্যেই রয়েছে।
রক্ষীপ্রধান সহসা লক্ষ করল একটি যুবতী নারী প্রাণভয়ে তার পর্ণকুটিরের মায়া ত্যাগ করে অরণ্যের দিকে ধাবমান। হাতের ভল্লটি তুলে সে অনুগত একজন রক্ষীকে সেদিকে নির্দেশ করতেই কী যেন একটি গোলাকার বস্তু আকাশপথে উড়ে এসে তাঁর পায়ের কাছে পড়ল।
মাথা নীচু করল রক্ষীপ্রধান। তার পায়ের কাছে একটি বাদ্যছিন্ন নরমুণ্ড! আর সেই মুণ্ড আর কারও নয়, তারই বাহিনীর এক রক্ষীর।
প্রথমে হতভম্ব হয়ে গেল রক্ষীপ্রধান। তারপরেই সে দুরন্ত ক্রোধে চিৎকার করে উঠল, ‘কার এই দুঃসাহস? কে হাত তুলেছে চন্দ্রসৈন্যের ওপর? কার ঘাড়ে একটার বেশি মাথা?’
সামান্য দূর থেকে ভেসে এল, ‘যুদ্ধ তো সমানে সমানে হয় শুনেছিলাম রে নপুংসক। নাকি চন্দ্রবংশের সৈন্যদল এতই ক্লীব যে, বৃদ্ধ আর নারী ছাড়া আর কারও সঙ্গে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হওয়ার মতো যোগ্যতা নেই তাদের?’
রক্ষীপ্রধান সবিস্ময়ে তাকিয়ে দেখল অনতিদূরে এক মহাবল পুরুষ দাঁড়িয়ে। তাঁর হাতে ধরা মহাখড়্গটি থেকে তখনও চুঁইয়ে পড়ছে রক্ত, আর পায়ের কাছে একটি মুণ্ডহীন দেহ।
উন্মত্ত ক্রোধে রক্ষীপ্রধানের দেহে বিদ্যুৎপ্রবাহ বয়ে গেল। তারপরেই সে সরোষে চিৎকার করে উঠল, ‘ওরে! কে কোথায় আছিস? এই রণ্ডাপুত্রটার ঘাড় ধরে আমার সামনে নিয়ে আয়! এর বীর হওয়ার ইচ্ছেটা জন্মের মতো ঘুচিয়ে দিই। শয়তানটার এত স্পর্ধা যে, চন্দ্রসৈন্যদের দ্বন্দ্বযুদ্ধে আহ্বান করে?’
গোপালদেবের সবচেয়ে কাছে থাকা রক্ষীসৈন্যটি ভল্লহাতে ধাবিত হল তাঁর দিকে। গোপালদেব স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন, খড়্গটি তুলে অবধি ধরলেন না। তারপর যে মুহূর্তে সৈন্যটি তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল, তিনি তড়িৎগতিতে সরে গিয়ে সৈন্যটির ভল্ল বাঁহাতে ধরে আশ্চর্য কৌশলে সেই ভল্লটিরই অগ্রভাগ সম্পূর্ণরূপে গেঁথে দিলেন সৈন্যটির কণ্ঠদেশে।
বাকি রক্ষীসৈন্যরা অবিশ্বাসের চোখে সম্পূর্ণ ঘটনাটি দেখল। তারপর হিংস্র জংলি কুকুরের দল যেভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে ক্রুদ্ধ সিংহের উপর, সেইভাবেই উন্মুক্ত তরবারি এবং ভল্ল হাতে তারা ধেয়ে গেল গোপালদেবের দিকে।
গোপালদেব খড়্গটি তুলে রণহুংকার দিলেন, ‘জয় গৌড়, জয় বঙ্গ, জয় শশাঙ্ক।’
তারপর যেভাবে সর্বগ্রাসী হুতাশন শুষ্ক তৃণভূমি দগ্ধ করে, সেভাবেই তিনি ঝাঁপিয়ে পড়লেন সৈন্যদলের উপর।
‘একাই তিনি সমগ্র রক্ষীদলকে ধ্বংস করলেন?’ আচার্য বিশুদ্ধকীর্তি বললেন, ‘এ যে অবিশ্বাস্য!’
‘সেই অবিশ্বাস্য কাণ্ডটিই তো নিজের চোখের সামনে হতে দেখলাম ভন্তে। সে কোনও সাধারণ যুবক নয়। যেমন অদ্ভুত তার অস্ত্রচালনা, তেমনই আশ্চর্য তার যুদ্ধকৌশল। শুধু তাই নয় প্রভু, তার দুই বাহুতে যেন অযুত মত্তহস্তীর বল, আর ক্ষিপ্রতায় সে মহানাগ, মহাকালসর্প। দেখে মনে হচ্ছিল—যেন স্বয়ং পরশুরাম অবতীর্ণ হলেন।’
‘কে এই যুবক?’ প্রশ্ন করলেন জিতসেন।
‘জানি না প্রভু৷’
‘কিন্তু সে তোমাকেই বা ছেড়ে দিল কেন রক্ষী?’ এই প্রথম কথা বলে উঠলেন রাজ্ঞী। তাঁর কণ্ঠ সুমিষ্ট, অথচ কঠিন৷ চক্ষুদুটি সুন্দর, কিন্তু পলকহীন৷ তাঁর দিকে অধিক সময় চেয়ে থাকা যায় না। রক্ষীটি একবার রানির দিকে তাকিয়েই মাথা নত করে ফেলল।
‘আর তুমিই বা কোন মুখে লগুড়াহত সারমেয়র মতো ফিরে এলে? তোমার শাস্তির ভয় নেই?’ হিসহিস করে উঠলেন রানি।
‘আমি আমার সর্বশক্তি দিয়ে যুদ্ধ করেছিলাম দেবী।’—রক্ষীর স্বর কম্পিত হচ্ছিল, ‘কিন্তু, সেই যুবকের অতিলৌকিক যুদ্ধপ্রতিভার কাছে পরাস্ত হতে বাধ্য হই। বিশ্বাস করুন দেবী, আমাদের সব কৌশল, সমস্ত পরাক্রম, সেই মহাবলীর কাছে ব্যর্থ হয়ে গেছে।’
‘সত্য বলো রক্ষী, তোমার সঙ্গে তার কোনও ষড় নেই তো? রাজদ্রোহের শাস্তি জানো তো?’ বিষাক্ত মসৃণ স্বরে প্রশ্ন করলেন রানি।
বঙ্গদেশে রাজদ্রোহিতার শাস্তি অতি ভয়ঙ্কর। কর্মান্তবাসকের পশ্চিমপ্রান্তে একটি মস্ত বড় অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ আছে। তার সঙ্গে দুটি ছোট খাঁড়ি বরাবর মেঘান্দর যোগ রয়েছে। সেখানে প্রকাশচন্দ্র তাঁর অত্যন্ত পছন্দের একটি জলচর প্রাণী পোষেন, কুমির। বঙ্গদেশে রাজদ্রোহিতার একটাই শাস্তি, অপরাধীকে সেই হ্রদে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় ফেলে দেওয়া। প্রকাশচন্দ্র চান—মানুষ মনে রাখুক, রাজদণ্ড কতটা নির্মম হতে পারে।
‘সত্যি কথা বলো রক্ষী। তুমি জানো না—কে এই যুবক?’
‘জানি না দেবী। আমার প্রয়াত মাতার নামে শপথ করে বলছি। অবশ্য...অবশ্য...আমি সংজ্ঞাহীন হওয়ার পূর্বে একটি কথা শুনেছিলাম।’
‘কী? কী শুনেছিলে?’
‘সেই যুবক যোগেন্দ্রর মুণ্ডু একটি ভল্লের আগায় গেঁথে আমার সামনে এনে বলেছিল, ‘শোন রে মূর্খ, তোকে জীবন দিলাম একটিই কারণে। যাতে তুই ফিরে গিয়ে তোর প্রভুকে বলতে পারিস—বপ্যটপুত্র গোপালদেব এসেছেন!’
ঘর্ঘরধ্বনিতে চতুর্দিক মুখরিত করে সুসজ্জিত রথখানি কর্মান্তবাসকের উত্তরদ্বারে এসে পৌঁছতেই বেশ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হল। নগরীতে প্রবেশের জন্য অপেক্ষমান জনতার অনেকেই ফিরে দেখতে থাকলেন।
বহুমূল্য রথখানি বিচিত্র সজ্জায় সজ্জিত। দুখানি স্বাস্থ্যবান কৃষ্ণবর্ণ অশ্ব তার বাহন। এই প্রাণীটি বঙ্গদেশে একেবারে অদৃষ্টপূর্ব না হলেও অনেকের কাছেই কৌতূহলের বিষয়।
তবে সমবেত জনতা অধিক মনোযোগী ছিল রথারূঢ় যুগলের প্রতি। সুঠামদেহী তাম্রবর্ণ পুরুষটি পরেছেন অতি দুর্মূল্য চীনাংশুক। নাসিকা সামান্য খর্ব, আয়ত নয়ন ভারি মনোহর৷ আজানুলম্বিত বাহু। ঈষৎ কুঞ্চিত কেশদাম।
নারীও অপরূপ সুন্দরী। তাঁর গাত্রবর্ণ উজ্জ্বল গৌর। নাসা সুউন্নত। আঁখি গভীর ও শান্ত। সর্বাঙ্গে কমনীয়তা স্নিগ্ধ জ্যোতির মতো জড়িয়ে রয়েছে। সমবেত জনতা তাঁকে দেখেই যুক্তকরে প্রণাম জানাচ্ছে, মৃদু গুঞ্জন উঠে আসছে, ‘ইনি নিশ্চয়ই কোনও উচ্চবংশের মহিয়সী। আহা, কী অসামান্য রূপমাধুরী, কী স্নিগ্ধ লাবণ্য! এমন দেবীদর্শনেও অশেষ পুণ্য।’
পুরুষটি মহিলার কানে কানে কৌতুকস্বরে বললেন, ‘আর্যা মন্দার্ভা, শিশুকালে শুনেছিলাম সুন্দর মুখের জয় সর্বত্র। আজ তার চাক্ষুষ প্রমাণ পেলাম। আপনার একবার শুধু যোদ্ধৃবেশ ধারণ করে উন্মুক্ত খড়্গহস্তে রণভূমিতে আবির্ভূত হওয়ার অপেক্ষা৷ জনগণ ‘জয় দেবী চামুণ্ডা’ বলে আপনার পদতলে লুটিয়ে পড়বেই।’
নারী স্মিতহাস্য ওষ্ঠে ধরে রেখে বললেন, ‘বাচালতা করবেন না, আর্য পদ্মসম্ভব। লোকেশ্বর যা আদেশ দিয়েছেন, যথাযথ পালনের ব্যবস্থা করুন। আর হ্যাঁ, অভিনয়ের প্রয়োজনে যতটা কাছে আসা প্রয়োজন ঠিক ততটাই আসবেন, তার বেশি নয়।’
পুরুষটি কপট হতাশার ভঙ্গি করলেন। ততক্ষণে রথ দ্বারপালের সামনে এসে পৌঁছেছে৷
স্থূলোদর দ্বারপাল অতি মনোযোগ সহকারে চন্দ্রবংশের চিহ্নলাঞ্ছিত চতুষ্কী প্রস্তুত করছিল। শকট সামনে এসে দাঁড়াতে সে অলসভাবে জিজ্ঞেস করল, ‘মহাশয়ের পরিচয়?’
পদ্মসম্ভব গম্ভীরভাবে বললেন, ‘উড্ডীয়ানের শ্রেষ্ঠী আর্য কমলরক্ষিত এবং তাঁর সহধর্মিণী শ্রীমতী পদ্মাবতী।’
‘এখানে আগমনের উদ্দেশ্য?’
‘বাণিজ্য। এই অপরূপ বঙ্গদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপরি প্রাপ্তি৷ আসলে...’ বলতে বলতে মন্দর্ভাকে কিছু কাছে টেনে নিলেন পদ্মসম্ভব, ‘আর্যা সদ্য গর্ভবতী হয়েছেন। তাই তাঁকেও নিয়ে এসেছি।’
মন্দর্ভা দ্বারপালের দিকে একটি সলজ্জ হাস্য উপহার দিলেন। তারপর অপাঙ্গে যে দৃষ্টিতে পদ্মসম্ভবের দিকে তাকালেন, তাতে সত্যযুগ হলে সেই মুহূর্তেই পদ্মসম্ভবের দেহভস্ম বাতাসে বিলীন হয়ে যাওয়ার কথা।
দ্বারপাল বলল, ‘কামরূপে আজকাল এরকম তেজিয়ান অশ্ব পাওয়া যাচ্ছে নাকি?’
পদ্মসম্ভবের হাসি বিস্তৃত হল। বললেন, ‘কামরূপের অনেককিছুই তো বঙ্গদেশের আপাত অজানা।’
দ্বারপাল এতক্ষণ মাথা নীচু করে ছিল। মুখ তুলেই চমকিত হয়ে লাফিয়ে উঠল ‘আপনি? এখানে? আর্যা মন্দর্ভা? আপনিও?’
মন্দর্ভা হতচকিত। মুহূর্তমাত্র দৃষ্টিপাত করেই পদ্মসম্ভব রথ থেকে লাফিয়ে নামলেন। দ্বারপালের গলা জড়িয়ে বললেন, ‘মিত্র মল্ল সিংহোদর! তুমি এখানেও!’
তারপর মন্দর্ভার উদ্দেশে উচ্চস্বরে বললেন, ‘কী সৌভাগ্য প্রিয়ে, প্রাক্তন মিত্র সিংহোদরকে যে ফিরে পাব স্বপ্নেও ভাবিনি। নালন্দায় পঠনপাঠনের দিনগুলিতে ওর সঙ্গে কতই না সুমধুর দিন কাটিয়েছি। মনে পড়লেই চোখদুটি ভিজে উঠছে। তাই না ভাই সিংহোদর?’
সিংহোদর বলল, ‘সে আর বলতে?’ তারপর বলল, ‘আপনি এখানে কী মনে করে প্রভু?’
‘ধরে নাও যা বললাম তাই৷ এই দেশের সৌন্দর্য অবলোকন।’
একবার চারিপাশ দেখল সিংহোদর৷ তারপর চাপাস্বরে বলল, ‘আপনারা একাই? না কি আচার্য শান্তরক্ষিতও এসেছেন?’
‘গুরু বিনা কি শিষ্যের ভ্রমণ সফল হয়?’
‘কোথায় তিনি?’
পদ্মসম্ভব স্মিত হাসলেন৷
মল্ল সিংহোদর কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর বলল, ‘দিনকাল ভালো নয় আর্য। এইসময়ে আর্যাকে নিয়ে বঙ্গদেশ ভ্রমণে এসে ভালো করেননি।’
‘ভালো নয়? কীরকম?’
সিংহোদর অস্ফুটে বলে, ‘এ দেশের অবস্থার ব্যাপারে কি কিছুই শোনেননি?’
‘শুনেছি বইকি। সেই জন্যই তো আসা।’
সিংহোদর কয়েক মুহূর্ত চুপ৷ তারপরেই তার চোখেমুখে অস্থির উত্তেজনা ফুটে উঠল। ‘আশা কি আছে প্রভু? এই পাপিষ্ঠার কবল থেকে উদ্ধার পাওয়া সম্ভব?’
পদ্মসম্ভব গভীর চোখে মল্ল সিংহোদরের দিকে চাইলেন৷ ডান হাতটি তার কাঁধের ওপর রেখে বললেন, ‘আমার ওপর বিশ্বাস আছে ভাই সিংহোদর?’
‘আছে প্রভু।’
‘তাহলে শোনো। পৃথিবীতে আজ অবধি এমন কোনও শৃঙ্খল নির্মিত হয়নি—মানুষ যা ছিঁড়তে পারে না। এমন কোনও কারাগার প্রস্তুত হয়নি—মানুষ যা ভাঙতে পারে না। এমন কোনও অত্যাচারী জন্ম নেয়নি—মানুষ যাকে নিশ্চিহ্ন করতে পারে না।’
মল্ল সিংহোদর জ্বলজ্বলে চোখে তাকিয়ে থাকে পদ্মসম্ভবের দিকে।
‘সঙ্গে আছ, মল্ল সিংহোদর?’
‘আছি প্রভু৷’
পদ্মসম্ভব তাঁর কানে কানে কিছু একটা বললেন। শুনতে শুনতে চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল মল্ল সিংহোদরের।
রাত্রির তৃতীয় যাম। রাজপ্রাসাদ অন্ধকার। আকাশে মেঘ৷ তমসাবৃত চরাচর। শুধু মৃদুমন্দ হাওয়ায় অলিন্দের শূন্য পিঞ্জর থেকে টুংটাং ধ্বনি ভেসে আসছে।
চন্দনপালঙ্কে রতিক্লান্ত দুই নরনারী৷ পুরুষের বুকে মাথা রেখে নারীটি চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছেন৷ একসময় অস্ফুটস্বরে বললেন, ‘আপনাকে এত বিক্ষিপ্ত লাগছে কেন প্রভু?’
প্রকাশচন্দ্র রানির চুলে হাত বোলাতে বোলাতে বললেন, ‘আমি অত্যন্ত চিন্তিত৷’
‘কারণ জানতে পারি প্রভু?’
অন্ধকারেই ম্লান হাসলেন প্রকাশচন্দ্র। এই নারী তাঁর আত্মার অংশ৷ যেদিন এই কন্যাকে তিনি নিজের জীবনে গ্রহণ করেছিলেন, সে বড় পুণ্যের দিন ছিল। সেইদিন থেকে তাঁর জীবনে একের পর এক সাফল্য করায়ত্ত হয়েছে অনায়াসে। তন্ত্র ও মন্ত্রের জগতে এমন কোনও বিদ্যা নেই—যা তাঁর অধিগম্য নয়। এই নারীকে তিনি নিজের সৌভাগ্যের চিহ্ন বলে সঙ্গে সঙ্গে রেখেছেন। মুহূর্তমাত্র নিজের থেকে আলাদা হতে দেননি।
ডান বাহু ললাটে রাখলেন প্রকাশচন্দ্র, আজকাল প্রায়শই কারণে অকারণে স্মৃতিকাতর হয়ে পড়ছেন তিনি৷ এ কি বার্ধক্যের লক্ষণ?
তাং সম্রাট গাওজং এর প্রিয়তমা রক্ষিতা, চীন সাম্রাজ্যের শ্রেষ্ঠতম তন্ত্রবেত্তা য়ু জেতিয়ান ছিলেন তাঁর গুরুমাতা। তাঁর আশীর্বাদে আজ তিনি প্রলম্বিত যৌবনের অধিকারী। একমাত্র অপঘাত বা দুর্ঘটনা ব্যতীত তাঁর মৃত্যু নেই, গুরু য়ু জেতিয়ান এই বরও দিয়েছেন তাঁকে। তবুও এক অচেনা দুর্লক্ষণ ক্রমেই শঙ্কিত করে তুলছে মহাতান্ত্রিক প্রকাশচন্দ্রকে।
তাঁর জন্ম বঙ্গদেশের এক কায়স্থ পরিবারে। পিতা দিবানাথ ছিলেন চন্দ্রবংশের অধীনস্থ এক ক্ষুদ্র ভূম্যধিকারী। চন্দ্রবংশ তখন খড়্গরাজের অধীনস্থ এক সামন্তবংশ। দিবানাথ এক গ্রাম্য শৈবসাধক ছিলেন। বিবিধ শৈব সাধনায় তাঁর সিদ্ধাই ছিল। কিছুটা তার জোরে, এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞায় ভর করে তিনি চন্দ্রবংশের সিংহাসন দখল করেন। তবে শাসক হিসেবে অযোগ্য ছিলেন না৷ লোকে বলে দিবানাথ ন্যায়পরায়ণ এবং সুশাসক ছিলেন।
কিন্তু বহুদিন অপুত্রক ছিলেন দিবানাথ। উত্তরাধিকারীর অভাবে তাঁর রাজত্ব কে দেখবে—সেই নিয়ে সর্বদাই চিন্তিত থাকতেন তিনি। তারপর একদিন এক অঘোরী সিদ্ধপুরুষ তাঁর রাজ্যে আসেন৷ তাঁকে সেবায় তুষ্ট করলে তাঁর যোগমন্ত্রে দিবানাথের মহিষী গর্ভবতী হন। দিবানাথ আনন্দের বশে রাজ্যে তিন দিনের উৎসব ঘোষণা করেন।
এত কিছুর পরেও দিবানাথের আনন্দ স্থায়ী হয়নি।
নবজাতক যখন জন্মায় তখন পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ চলছিল। প্রকাশচন্দ্র ভূমিষ্ঠ হওয়ার ঠিক পূর্বমুহূর্তে রাজপ্রাসাদের মাথার ওপর উড়তে দেখা যায় শ্যেন ও গৃধ্র, শোনা যায় রাসভ ও শৃগালের সমবেত উল্লাসধ্বনি।
এতগুলি অমঙ্গল চিহ্ন দেখে রাজ্যের মানুষ শঙ্কিত হয়ে ওঠে। রাজজ্যোতিষী ঘোষণা করেন যে এই শিশু অত্যন্ত অশুভ, চন্দ্রবংশ ও দেশের অশেষ দুঃখের কারণ হবে। সভাসদ এবং অন্যান্য ভূম্যধিকারীরা দিবানাথের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে থাকেন শিশুটিকে ত্যাগ করার জন্য।
অবশেষে দিবানাথ নবজাতক শিশুপুত্রকে ত্যাগ করেন। তাঁর এক আত্মীয় অনন্তচন্দ্র ছিলেন হরিকেলের সম্পন্ন ব্যবসায়ী। অনন্তচন্দ্র ও তাঁর স্ত্রীর কোনও সন্তান ছিল না। দিবানাথ তাঁর সদ্যোজাত পুত্রসন্তানটিকে তুলে দেন তাঁদের হাতে৷ জীবনে তিনি তাঁর পুত্রের মুখদর্শন করেননি।
অল্প বয়স থেকেই প্রকাশচন্দ্র আশ্চর্য এবং অদ্ভুত সব ক্ষমতার পরিচয় দিতে থাকেন। বোঝা যায় যে, তিনি কোনও সাধারণ শিশু নন।
প্রকাশচন্দ্রের পালক মাতা কামিনীদেবী ছিলেন একজন ডাকসিদ্ধা যোগিনী। তিনি শিশুবয়সেই প্রকাশচন্দ্রকে তন্ত্রবিদ্যায় দীক্ষিত করেন। তিনি জানতেন, এই শিশুর শরীরে রাজলক্ষ্মণ আছে৷
প্রকাশচন্দ্র যখন পঞ্চদশবর্ষীয় কিশোর, তখন অনন্তচন্দ্র যবদ্বীপে বাণিজ্য করতে যাবেন বলে সপ্তডিঙা নৌবহর সাজান। প্রকাশচন্দ্র পালকপিতাকে অনুরোধ করলেন তাঁকেও সঙ্গে নেওয়ার জন্য। অনন্তচন্দ্র সম্মত হলেন৷
নৌযাত্রা যখন প্রায় শেষের পথে, সহসা দেখা দিল প্রবল ঘূর্ণিঝড়। শান্ত ধীর সমুদ্র ফুঁসে উঠল সহস্রশীর্ষ অজগরের মতো। সেই প্রবল বিপর্যয়ে অনন্ত সওদাগরের নৌকাগুলি যে কোথায় কোনদিকে ছিটকে পড়ল, কে জানে। জ্ঞান ফিরতে প্রকাশচন্দ্র দেখলেন তিনি সমুদ্রতীরে শুয়ে আছেন। একা। আশেপাশে আর কেউ নেই।
মনে নেই সেই কবে, কত হাত আর কত দেশ ঘুরে তিনি পৌঁছে যান এক আশ্চর্য দেশে। সুপ্রাচীন সভ্যতার চিন দেশ৷ ততদিনে হয়তো নিজের অধীত ভৌমবিদ্যার বলে নিজেকে মুক্ত করে দেশে ফিরে আসতে পারতেন প্রকাশচন্দ্র। কিন্তু অজানাকে জানার দুর্নিবার আকাঙ্ক্ষা তাঁকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছিল।
চীনে পৌঁছে বিস্মিত হতবাক প্রকাশচন্দ্র৷ বঙ্গদেশের থেকেও বহুগুণে বিচিত্র এবং সমৃদ্ধ এদের সমাজ, সংস্কৃতি ও ধর্ম। তখন তিনি ক্রীতদাস৷
ক্রীতদাস প্রকাশচন্দ্র রাজ পরিবারের পরিচারক হিসেবে নিযুক্ত হন। তারপর নিজগুণে তাং বংশের সম্রাট গাওজং-এর প্রিয়তম উপপত্নী য়ু জেতিয়ানের নজরে পড়েন তিনি। বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে তাঁর বঙ্গজ সৌকুমার্যও যথেষ্ট সহায় হয়েছিল। মহান সম্রাজ্ঞী য়ু জেতিয়ান, চীন দেশের প্রথম নারী শাসক য়ু জেতিয়ান, সমগ্র চীনদেশের শ্রেষ্ঠ তন্ত্রবিদ য়ু জেতিয়ান তাঁর সবটুকু ছিলেন। তাঁর মাতা, তাঁর প্রভু, তাঁর আত্মার আত্মীয়, এমনকী তাঁর প্রেমিকাও। য়ু জেতিয়ান তাঁকে নিজের সবটুকু উজাড় করে দিয়েছিলেন৷
‘কী ভাবছেন প্রভু?’ প্রশ্ন করলেন রানি।
‘কিছু একটা ঘটতে চলেছে প্রিয়ে। খুব বড় একটা কিছু!’
‘কেন প্রভু? এরকম মনে হচ্ছে কেন?’
‘আমার ষষ্ঠেন্দ্রিয় প্রিয়ে৷ সে কখনও মিথ্যা বলে না।
‘যেমন?’
‘কাল মধ্যরাত্রে পঞ্চমুণ্ডির আসনে দেবী বজ্রচর্চিকার ধ্যানে রত ছিলাম। তুমি তো জানো, দেবী বড়ই জাগ্রত, সাধকের ধ্যানে বিন্দুমাত্র বিঘ্ন সহ্য করেন না তিনি।’
‘জানি নাথ।’
‘কাল অনেক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও মনকে একাগ্র ও তন্ময় করে তুলতে পারছিলাম না। কী যেন একটা বাধা বার বার চিত্তকে বিক্ষিপ্ত করে তুলছিল। শেষে আসন প্রত্যাহার করে উঠে আসব, এমন সময় একটি দৃশ্য দেখে বিহ্বল হয়ে গেলাম।’
রানি সপ্রশ্নচোখে চেয়ে রইলেন৷
‘দেখলাম পঞ্চমুণ্ডির নরমুণ্ডটির মুখগহ্বর থেকে একটি বৃহৎ কালকেউটে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসছে।’
পালঙ্কের ওপর দ্রুত উঠে বসলেন রানি। ‘এর অর্থ কী নাথ?’
‘জানি না প্রিয়ে। কিন্ত মনে হচ্ছে ঝড় বোধহয় আসন্ন।’
‘আজ প্রভাতে রাজসভায় যে কাহিনিটি বলল প্রহরী, তার সঙ্গে কি এর কোনও সম্পর্ক আছে প্রভু?’
‘আছে প্রিয়ে৷’ উঠে বসলেন প্রকাশচন্দ্র, ‘পরিস্থিতি খুবই সঙ্গীন। যে কূট পরিকল্পনার বীজ বহুদিন আগেই আমরা উপ্ত করেছি এই দেশের ভূমিতে, তাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি পরিণতির দিকে, তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে একদল প্রতিস্পর্ধী মানুষ। তারা সাধারণ মানুষ নয়।
‘আমার চরেরা সংবাদ আনছে যে, বঙ্গদেশের চারিদিকে যে বিক্ষোভের আগুন জ্বলছে, তাতে ইন্ধন যোগাচ্ছে এই মানুষেরা। এই দেশের সঙ্গে তাদের নাড়ির টান অনেক গভীর। আমাদের পরিকল্পনা তারা বুঝে ফেলেছে৷ তারা ঐক্যবদ্ধ করছে আপামর জনতাকে।’
‘এরা কারা?’
‘একদল শৈব আর সহজিয়া সন্ন্যাসী। মানুষ তাদের শ্রদ্ধার চোখে দেখে। সাধারণ মানুষের মধ্যে তাদের প্রভাব বিপুল। তারাই আজ সাধনার আসন ছেড়ে অস্ত্র ধরেছে আমাদের বিরুদ্ধে।’
‘কিন্তু কেন? ধর্মের সাধক রাজনীতির অঙ্গনে কেন?’
‘ধর্ম রানি, ধর্ম। ধর্মের ক্ষয়ই তাদের এই পথে টেনে এনেছে।’
‘কিন্তু এরা কী করে রোধ করবে আমাদের পরিকল্পনার গতি?’
‘এরা একদল প্রতিস্পর্ধী মানুষ, আমাদের উৎখাত করতে চায় রানি। বিদ্রোহের পথে, গণ-অভ্যুত্থানের পথে। এরা চায় চীন সম্রাট গাওজং আর গুরু য়ু জেতিয়ান-এর বঙ্গদেশ ধ্বংস করার স্বপ্নকে আবর্জনার স্তূপে নিক্ষেপ করতে।’
রানির চোখ দুটো অন্ধকারে ধ্বক করে জ্বলে উঠল, ‘অসম্ভব! আমাদের পরিকল্পনা পূর্ণ হবে, আরব্ধ কর্ম অবশ্যই সম্পন্ন হবে। এই দেশ একদিন ধর্ম আর নীতিবোধ জলাঞ্জলি দেবে, ক্ষুধার জ্বালায় ছটফট করে মরবে, ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধে উৎসন্নে যাবে, বেশ্যা আর ভিক্ষুকের দেশ হবে। হবে, হবে, হবেই।’
ভোর। হেমন্তের হিমেল ভোর।
ব্রাহ্মমুহূর্তের প্রথম সূর্যকিরণ মেঘান্দ নদীর জল স্পর্শ করতেই শত সহস্র উলঙ্গ সন্ন্যাসীর দল ‘জয় বজ্রযোগিনীর জয়’ বলে নদীর জলে ঝাঁপ দিয়ে পড়লেন। তার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ভাববিহ্বল ভক্তের দলও পুণ্য-অবগাহনের উদ্দেশে নদীতে নেমে পড়লেন। মেঘান্দ’র বুকে আলোড়ন উঠল।
মাস দুই বর্ষা শেষ হয়েছে। মেঘান্দ এখন যুবতী নারীর মতো উচ্ছ্বল। এখান থেকে নদীপথে পূর্বসাগরের মোহনা একদিনের যাত্রা। সমুদ্রগামী নৌকাগুলি যতই সাগরের নিকটবর্তী হয়, মেঘান্দ ততই উদ্দাম ও চঞ্চল হয়ে ওঠে।
মেঘান্দ’র অন্য পাড়ে একটি বিস্তীর্ণ প্রান্তর, সেই প্রান্তর শেষ হলে লালিম্ববন পাহাড়শ্রেণী৷ তার পাদদেশে সুবিশাল শালিবন বৌদ্ধবিহার। এই বিহার সমতটের দেববংশের অর্থানুকূল্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তবে আপাতত তার ভরণপোষণের দায়িত্ব চন্দ্রবংশের। প্রকাশচন্দ্রের আদেশই এখানে শেষ কথা।
অবগাহনের পর পুণ্যার্থীরা উঠে এসে সূর্যপ্রণাম করতে লাগলেন। ভক্তিমতী পুরুষ ও রমণীরা সিদ্ধাচার্যদের প্রণাম করে আশীর্বাদ নিতে লাগলেন। থেকে থেকে দেবী বজ্রযোগিনীর নামে গর্জন উঠতে লাগল।
জনারণ্য থেকে কিছু দূরে দুই নবীন যুবক সমগ্র কর্মকাণ্ড অবলোকন করছিলেন। তাঁরাও একটু আগে স্নান সেরে উঠেছেন৷ ঊর্ধ্বাঙ্গে উত্তরীয়, অধোমাঙ্গে খাটো অধোবাস। চুলগুলি অবিন্যস্ত। সরস ও প্রসন্ন মুখমণ্ডল, সর্বদাই কৌতুকে ঝলোমলো।
প্রথমজন বললেন, ‘নাটকের কুশীলবরা তো সবাই প্রস্তুত। কিন্তু প্রধান সূত্রধর মহাশয়ের কী সংবাদ?’
দ্বিতীয়জন বললেন, ‘আজই তো তাঁর রঙ্গস্থলে উপস্থিত হওয়ার কথা। কিন্তু তিনি আবার বড়ই লাজুক। কোথা থেকে কীভাবে তাঁর আবির্ভাব ঘটবে—সে বলা ভারি মুশকিল।’
‘রঙ্গমঞ্চের পর্দা উঠবে কখন?’
‘আগে তথাগতর নামে, ধর্মের নামে, সঙ্ঘের নামে কিছু পূজাপাঠ হোক, তারপর নাহয় নাটক শুরু হবে। বুদ্ধনাটক কি অতই সহজ বস্তু ভায়া?’
‘আমাদের এখন কাজ কী?’
‘কিছুই না। শুধু দেখে যাও। শোনো ভায়া, শাস্ত্রে বলেছে—দেশকে যদি ভালোভাবে জানতে চাও, তাহলে দু’খানি স্থান অতীব প্রশস্ত। এক তীর্থস্থান, দুই শৌণ্ডিকালয়।
প্রথমজন কৌতুক অনুভব করলেন, স্মিতহাস্যে প্রশ্ন করলেন, ‘কীরকম?’
‘তাহলে শোনো। ওই যে বিপুলোদর সন্ন্যাসীটিকে দেখছ, ওঁর নাম যোগী উড়ুম্বর। ইনি অতি বিখ্যাত মন্ত্রযানী বৌদ্ধ আচার্য। নর্মদাতীরে এঁর ধর্মস্থান বড়ই প্রসিদ্ধ, শিষ্য সংখ্যা কম করে হলেও দ্বিসহস্রাধিক। অর্থগৌরবে ইনি বড় বড় শ্রেষ্ঠীকে লজ্জা দিতে পারেন।
‘ওই যে চর্মটিকাসদৃশ প্রৌঢ়কে দেখছ ধ্যানমুদ্রায় বসে থাকতে, উনি কর্মান্তবাসকের বিশিষ্টতম শ্রেষ্ঠী দিবোদাস। আর যে কন্যাটিকে দেখছ তাঁর গাত্রমার্জনা করে দিতে, উনি দিবোদাসের বিধবা পুত্রবধূ। প্রৌঢ়া দিবোদাস তাঁর সুন্দরী বিধবা পুত্রবধূটিকে বড়ই স্নেহ করেন, এমনকী বিদেশে গেলেও তাঁকে সঙ্গী করেন। এক্ষেত্রে স্নেহের গতি কিঞ্চিৎ কুটিল।
‘ওদিকে যে সৌম্যদর্শন তরুণ স্নান সেরে উঠে আসছেন, তাঁর উজ্জ্বল ও মেধাবী মুখখানি ভালো করে লক্ষ করো। উনি শালিবন বিহারের অত্যুজ্বলতম রত্ন, কুমার সিদ্ধার্থশর্মা। বিশুদ্ধসিদ্ধান্তকারিকা এবং শব্দার্থমঞ্জরী নামের দু’খানি অত্যুত্তম গ্রন্থের রচয়িতা। আচার্য বিশুদ্ধকীর্তির পর ভন্তে বুদ্ধগুপ্ত, তারপরে ইনি।
‘ওই যে লোলচর্ম বৃদ্ধাকে দেখছ পূর্বাস্য হয়ে সূর্যপ্রণাম করতে, উনি কর্মান্তবাসকের বৃহত্তম গণিকালয়টির অধিষ্ঠাত্রী দেবী, নাম মঞ্জরী। ইনি চৌষট্টিকলায় মহা পারঙ্গম। কর্মান্তবাসকের যাবতীয় রাজন্য এবং বণিককন্যাদের নৃত্যগীত পটিয়সী করে তোলা, কলাবিদ্যা থেকে শুরু করে সীবনশিক্ষা, রন্ধনশিল্প থেকে শুরু করে উদ্যানবিদ্যায় পারদর্শী করে তোলার গুরুদায়িত্ব আপাতত এঁর বৃষস্কন্ধেই ন্যস্ত।
‘ওই যে উলঙ্গ সন্ন্যাসীদের দেখছ তাদের দীর্ঘ লিঙ্গগুলি পুণ্যলোভাতুর শিষ্যশিষ্যাদের মস্তকে স্পর্শ করে আশীর্বাদ দিতে, ওঁরা এক বিশেষ সহজিয়া সন্ন্যাসী সম্প্রদায়, নাম সহজলিঙ্গ। এঁরা উলঙ্গ থাকেন, ভিক্ষা করে খান, খাদ্যাখাদ্যের বাছবিচার নেই। তবে স্বভাবে বড়ই উগ্র। সামান্য অশ্রদ্ধাজ্ঞানে খর্পর ও ত্রিশূল হস্তে রুদ্ররূপ ধারণ করেন।
‘ওই যে দেখছ সুন্দরী পৃথুলা রমণীর দল উঠে আসছেন স্নান করে, ওঁরা কর্মান্তবাসকের বিভিন্ন বণিক, ব্রাহ্মণ, এবং রাজপদাধিকারীদের স্ত্রী ও বধূদের দল। ব্যস্ত গৃহস্বামীদের থেকে এঁরা না-পেয়েছেন প্রেম, না সময়। স্বামীদের অগোচরে এঁরা গৃহভৃত্য বা দেবরদের বিশেষ অনুগ্রহ করে থাকেন। অনেকে আবার গৃহদেবতার সেবায় নিজেদের তনুমন সমর্পণ করেছেন।
‘ওই দেখো, চটুল চপল কিশোরের দল একপ্রান্তে সমবেত হয়ে সিক্তবসনা রমণী দেখতে ব্যস্ত। তাদের চোখে দুরন্ত কৌতূহল৷ নারীশরীরের অপার রহস্য তাদের কাছে এখনও অধরা৷
‘ওই দেখ, বঙ্গদেশের বিশিষ্ট রাজন্যকদল স্নান সেরে উঠে আসছেন। সর্বাগ্রে আছেন রাজগুরু বিশুদ্ধকীর্তি। মহাপণ্ডিত হলে কী হবে, এই বয়সেও বৃদ্ধের নারীলিপ্সার অন্ত নেই।
‘বিশুদ্ধকীর্তির দক্ষিণপার্শ্বে আছেন প্রধানমন্ত্রী অমিতাভভট্ট। স্বভাবে বাতুল এবং কিঞ্চিৎ কোমল। কাব্য ও নাট্যপ্রেমী বলে বিখ্যাত। সরল ও কূটগরলবিহীন বলে জনমানসে শ্রদ্ধা পেয়ে থাকেন।
‘বিশুদ্ধকীর্তির বামপার্শ্বে আছেন মহাদণ্ডনায়ক জিতসেন। ঈষৎ স্থূল বুদ্ধি হলে কী হবে, ইনি সেই ত্রুটিটুকু পূরণ করেছেন সিংহাসনের প্রতি তাঁর প্রশ্নহীন আনুগত্য এবং সীমাহীন নৃশংসতা দিয়ে। তরবারি ছাড়া অন্য কিছুর ভাষা বোঝেন না।
সামান্য পশ্চাতে রয়েছেন মহাসান্ধিবিগ্রহিক অগ্নিমিত্র। মহাধূরন্ধর। এঁর মুদ্রার লোভ অপরিমেয়। সামান্য কয়েকটি স্বর্ণদিনারের লোভে ইনি নরকের পথেও যাত্রা করতে পারেন।
‘পেছনে রয়েছেন রাজবৈদ্য কুল্লুকভট্ট। প্রবীণ রাজবৈদ্য চিকিৎসাশাস্ত্রে সাক্ষাৎ ধন্বন্তরি। বৃদ্ধের পুরুষাকারও বড়ই প্রবল, প্রয়োজন হলে রানি বা প্রকাশচন্দ্র, কাউকেই উচিত কথা বলতে ছাড়েন না। ভয়ে হোক বা ভক্তিতে, এঁকে কেউ বিশেষ ঘাঁটান না।
‘কুল্লুকভট্টের ঠিক পাশে আছেন রাজসেবকবাহিনী প্রধান গিরিকিশোর। লাম্পট্য, ক্রূরতা, নৃশংসতায় তুলনাহীন৷ এর মুখখানি যেমন শুকরতুল্য, স্বভাবটিও তেমন। জন্ম বারবণিতা গৃহে। পিতৃদেব ছিলেন জনৈক শৌণ্ডিক। এঁর নারীলিপ্সার কাহিনি বঙ্গদেশে প্রবাদপ্রায়। মাতৃ-মাতৃষ্বসা জ্ঞান নেই, কন্যা-কন্যাসমা জ্ঞান নেই, রজস্বলা নারী হলেই হল৷ অনেকেই অপেক্ষা করে আছেন যে, অভ্যুত্থান সফল হলে এই লম্পটপ্রবরের পুরুষাঙ্গ কর্তন করে শিবাভোগ দেওয়া হবে।
‘সবার শেষে যিনি ধীর পদক্ষেপে উঠে আসছেন, ওঁকে বিশেষ করে লক্ষ করুন। উনি মহাপ্রতীহার শান্তঘোষ। কূটবুদ্ধি, ধূর্ততা এবং নিঃশব্দ নির্মমতায় বঙ্গদেশে এঁর তুল্য আর একজনই আছেন, স্বয়ং প্রকাশচন্দ্র। সর্বদিকে এঁর দৃষ্টি শকুনির মতো। মনে রেখো ভায়া, বঙ্গদেশের গূঢ়পুরুষবাহিনীর নেতৃত্বে আনন্দগুপ্তর মতো একজন মানুষ রয়েছেন। সেই ধুরন্ধর ব্যক্তি শান্তঘোষের মতামত ছাড়া চলেন না।’
‘আনন্দগুপ্ত! তিনি কোথায়?’
‘তিনি আপাতত দেবী বজ্রযোগিনীর মন্দিরে নিরাপত্তার ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছেন। প্রতি বছরেই থাকেন৷ আজ অবধি তাঁকে কেউ এই পুণ্যস্নানে অংশগ্রহণ করতে দেখেনি।’
‘প্রকাশচন্দ্র এবং রানি?’
‘তাঁদের স্নান ব্রাহ্মমুহূর্তের পূর্বেই সম্পন্ন হয়েছে। তবে এখানে নয়, রাজপ্রাসাদে। মেঘান্দের জল কলসি করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে স্নানের জন্য। তাঁরা তাঁদের পুণ্যস্নান সেখানেই সম্পন্ন করেছেন।’
‘সে কী? আমি যে শুনেছিলাম রানি আর প্রকাশচন্দ্রের স্নানের পর এই মহাস্নান শুরু হয়?’
‘গত বৎসর অবধি তাই-ই হতো ভায়া। কিন্তু অজ্ঞাত কারণবশত এইবার তার পরিবর্তন হয়েছে।’
‘কারণ?’
‘কারণ? বলা ভারি সমস্যা। তবে তুমি যদি খুব অনুরোধ করো, সূত্র দিতে পারি।’
‘কী?’
অস্ফূটে দ্বিতীয় বক্তা বললেন, ‘ওঁরা জানেন! ওঁরা জানেন যে আমরা জানি।’
‘একটি কথা মানতেই হবে, মিত্র পদ্মসম্ভব,’ বিস্মিত কণ্ঠে বললেন প্রথম যুবক, ‘আমি আর তুমি বোধহয় একই সময়ে এই অঞ্চলে একত্র হয়েছি। কিন্তু বঙ্গদেশের যাবতীয় সংবাদ যে দ্রুততার সঙ্গে তুমি সংগ্রহ করেছ—যেমন আশ্চর্যজনক, তেমনই বিচিত্র।’
পদ্মসম্ভব চাপাস্বরে হাসতে হাসতে বললেন, ‘ওহে শ্রীমান জয়াপীড়, তুমি ভাগ্যদোষে কাশ্মীর প্রদেশ ছেড়ে এখানে এসেছ। আর আমি পূর্বদেশের ভূমিজ সন্তান। কামরূপ থেকে শুরু করে তাম্রলিপ্ত, বজ্জি থেকে শুরু করে হরিকেলের তটভূমি, কান্যকুব্জ থেকে শুরু করে তিব্বত, অর্ধেক ভারতবর্ষ আমি নিজের হাতের মতো চিনি। এতক্ষণ ধরে যে সংবাদ তোমাকে জানলাম, সে আমার অনেকদিনের পরিশ্রমের ফসল।’
জয়াপীড় বললেন, ‘ও, সেইজন্যই লোকেশ্বর তোমাকেই বেশি বিশ্বাস করেন, তাই না?’
অট্টহাস্য করতে গিয়েও নিজেকে সামলে নিলেন পদ্মসম্ভব, ‘নেহাত চারিদিকে লোকসমাগম, নইলে এই দণ্ডেই তোমার গালে স্নেহচুম্বন উপহার করতাম। বলো তো, এই শিশুসুলভ অভিমান কি মহা তেজস্বী জয়াপীড়কে মানায়?’
জয়াপীড় তবুও মুখ নিশ্চুপ কালো করে রইলেন। পদ্মসম্ভব একটু অপ্রতিভ হলেন। কৌতুক তাঁর চরিত্রের স্বাভাবিক অলঙ্কার। তাতে কেউ আহত হলে তিনি অপ্রস্তুত হয়ে পড়েন।
ইতিমধ্যে শরৎসূর্যের স্বর্ণাভ আলোয় চতুর্দিক উদ্ভাসিত। পুণ্যার্থীরা গৃহাভিমুখী। নদীতীর শূন্যপ্রায়। মেঘান্দের জলে এখন ভাঁটার টান। সেই স্রোতে অগণিত ফুলমালারাশি ভেসে যাচ্ছে৷
এইসময় দুজনের পশ্চাতে একজন এসে দাঁড়ালেন। বলে উঠলেন, ‘দু’খানি কপর্দক দান করে এই ভিক্ষুককে কিঞ্চিৎ সাহায্য করবেন ভদ্রজনেরা, জগন্ময়ী বজ্রযোগিনী আপনাদের সহায় হবেন।’
জয়াপীড় পিছন না ফিরেই বললেন, ‘আপনি অন্য কোথাও ভিক্ষা অন্বেষণ করুন প্রভু। আমরা দরিদ্র কৃষক। আমাদের কাছে এই উত্তরীয় ভিন্ন আর কিছুই নেই।’
পদ্মসম্ভব কিছু বললেন না।
ভিক্ষার্থী পুনরায় বললেন, ‘উত্তরীয় দুটিই দান করুন ভদ্র। ভারতবর্ষের দুই মহাবীরের উত্তরীয় বিক্রয় করে দুই কপর্দক তো পাবই।’
সঙ্গে সঙ্গে দুজনে পিছন ফিরলেন। জয়াপীড়ের ডান হাত তাঁর কটিদেশে, সেখানে একটি তীক্ষ্ণ ছুরিকা লুকোনো৷ পদ্মসম্ভব সচরাচর অস্ত্র বহন করেন না৷ তিনি কয়েকমুহূর্ত নির্নিমেষে ভিক্ষুকের দিকে তাকিয়েই উঠে দাঁড়ালেন। করজোড়ে বললেন, ‘আদিদেব শঙ্করের মূর্ত অবতার লোকেশ্বর মৎস্যেন্দ্রনাথকে প্রণাম।’
জয়াপীড় বিহ্বলচক্ষে ভিক্ষুককে দেখতে লাগলেন। ইনিই তাহলে সেই আসমুদ্রহিমাচল ভারতভূমির শ্রেষ্ঠতম যোগী মহেশ্বর মৎস্যেন্দ্রনাথ?
জয়াপীড় আভূমি প্রণাম করলেন, ‘যোগীশ্রেষ্ঠ মৎস্যেন্দ্রনাথের চরণ বন্দনা করি। অধমের নাম বিনয়াদিত্য জয়াপীড়, একদা ভারতবিজয়ী ললিতাদিত্য মুক্তাপীড়ের পৌত্র, বর্তমান গৌড়েশ্বরের জামাতা। আপনাকে যে এই বেশে দেখতে পাব—ভাবিনি আচার্য। ঔদ্ধত্যের অপরাধ ক্ষমা করবেন।’
মৎস্যেন্দ্রনাথ জয়াপীড়কে সবলে আলিঙ্গন করলেন। জয়াপীড় যথেষ্ট বলশালী পুরুষ, তবুও এই সবল সস্নেহ আলিঙ্গনে প্রায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে পড়লেন। মুক্ত হয়ে বললেন, ‘মৎস্যেন্দ্রনাথের প্রথম স্নেহ আলিঙ্গন আমার স্মৃতিতে চিরভাস্বর হয়ে থাকবে।’
পদ্মসম্ভব নিরীহ স্বরে বললেন, ‘বুকের পাঁজরগুলি ভাঙেনি তো ভাই?’
জয়াপীড় বলে ওঠার আগেই মৎস্যেন্দ্রনাথ সহাস্যে বললেন, ‘ভ্রাতৃপ্রতিম পদ্মসম্ভবের কথায় কিছু মনে করবেন না রাজন। কৌতুক ওঁর চরিত্রের স্বাভাবিক ধারা। কিন্তু সেই কৌতুকরসের মাপকাঠিতে এই অদ্ভুতকর্মা মানুষটির দৃঢ়তা, বীরত্ব এবং দুঃসাহসের পরিমাপ করা অসম্ভব। রাজপুত্র পদ্মসম্ভব ভগবান বিষ্ণুর অবতার।’
পদ্মসম্ভব সখেদে বললেন, ‘আপত্তি নেই। কিন্তু আচার্য যদি একবার ষোল হাজার গোপিনীর বিষয়টা নিশ্চিত করে দিতেন, আমার দাবিটা তবে বেশ পাকাপোক্ত হতো।’
মৎস্যেন্দ্রনাথ এবং জয়াপীড় দুজনেই উচ্চৈঃস্বরে হেসে উঠলেন। শূন্য মেঘান্দ তীরের দ্বিপ্রহর সেই হাসির কলরোলে মুখর হয়ে উঠল।
মৎস্যেন্দ্রনাথ ক্লান্তস্বরে বললেন, ‘আমি অত্যন্ত শ্রান্ত৷ এই বিশাল মেঘান্দ নদীর ওপার হতে সাঁতার কেটে এপারে আসতে আসতে শক্তি নিঃশেষিত। আপাতত আমাদের গুপ্তগৃহে যাওয়া যাক না কি?’
জয়াপীড় এবং পদ্মসম্ভব দুজনেই শশব্যস্ত হলেন। পদ্মসম্ভব অপরাধী সুরে বললেন, ‘আচার্য শান্তরক্ষিত আমাদের বলেছিলেন আজ মেঘান্দতীরে আপনার জন্য প্রতীক্ষা করতে। তাঁর কাছে গুপ্তসংবাদ ছিল। কিন্তু আপনি যে এই বিশাল নদী সাঁতরে আসবেন—সেটি কারোরই ধারণার মধ্যে ছিল না প্রভু। চলুন, আচার্য আপনার বিশ্রামের ব্যবস্থা করে রেখেছেন।’
তিনজনে ধীর পদক্ষেপে চলে যাওয়া মাত্র কাছের বিশাল অশ্বত্থ গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল একজন মানুষ। তার দেহ ধূলিধূসরিত, কটিতে কৌপীন, মাথায় মস্ত জটা, উন্নত কপাল চন্দন ও সিন্দূরে চর্চিত। মানুষটি মূক ও বধির। সকাল হতে সে ভিক্ষাপাত্র হাতে বসেছিল গাছতলায়। স্নানার্থীদের দল তাকে ভিক্ষুক ভেবে সিন্দুরচর্চিত ফলমূল এবং কপর্দকরাশি উদারহস্তে বিলিয়ে গেছে।
কিন্তু ঈশ্বর তাকে মূক ও বধির করে পাঠালে কী হবে, সেই অক্ষমতা পূরণ করে দিয়েছেন অবিশ্বাস্য দুটি ক্ষমতা দিয়ে। এক, নির্মল আবহাওয়ায় সে অন্তত অর্ধক্রোশ দূরের দৃশ্য দেখতে পায়। দুই, মূক ও বধির হলেও সে মানুষের ওষ্ঠের চলন দেখে বক্তব্য অনুধাবন করতে পারে!
চারিদিক নিস্তব্ধ হলে সে কপর্দকগুলি কটিদেশে বেঁধে, ভিক্ষালব্ধ ফলগুলির কিছু গলাধঃকরণ করে দ্রুতপদে ধাবিত হল গন্তব্যের দিকে।
প্রভু ভাঁড়ুদত্ত তার অপেক্ষায় আছেন।
একই দিনের দ্বিতীয় প্রহরের প্রথম দণ্ড। নির্মল আকাশ, সূর্য মধ্যগগনে। বজ্রযোগিনীর মন্দিরের সামনে লোকে লোকারণ্য। শতাধিক পুণ্যার্থী একত্রিত হয়েছেন পূজার্চনার উদ্দেশে। ফুলের মালায় সজ্জিত। মন্দিরচত্ত্বর চন্দনজলে ধৌত, চন্দনগন্ধে চারিদিক আমোদিত।
মূল গর্ভগৃহ থেকে মন্দিরের দুয়ার অবধি দুদিকের প্রাচীর বরাবর বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তি৷ এঁরা বঙ্গদেশের বিভিন্ন ধনীগৃহে নিয়মিত পূজা পেয়ে থাকেন। এই দিনটিতে তাঁদের বজ্রযোগিনী মন্দিরে এনে রাখা হয় সাধারণের পূজা পাওয়ার জন্য। সবকটি মূর্তি তাম্রনির্মিত, পাতলা সোনার পাতের আবরণ। সূর্যের আলোয় তাদের ঔজ্জ্বল্য বহুগুণ বর্ধিত। অধিকাংশই তারাদেবীর মূর্তি। কিছু মঞ্জুশ্রী, জম্ভল, অমিতাভ ও অন্য বোধিসত্ত্ব মূর্তিও আছে৷ প্রতিটি দেবদেবীর মাথার ওপর প্রকাণ্ড ছত্র। তার স্বর্ণনির্মিত দণ্ড, দুর্মূল্য পশম বা রেশমের বস্ত্র৷ ছত্রে সোনার সূতার কাজ করা ঝালর, তার প্রতিটি প্রান্ত থেকে একটি করে মুক্তা ঝুলছে।
উত্তর পূর্ব কোণে কয়েকটি ভয়ালদর্শন মূর্তি রাখা। যেমন হেরুক, চণ্ডরোষণ, একজটা, বজ্রচর্চিকা ইত্যাদি। এসব মূর্তির পূজারীরা বজ্রযানী তন্ত্রমতে পূর্ণাভিষিক্ত সাধক এবং উচ্চপদস্থ শাসকবর্গ। নইলে এইসব ক্রোধী দেবদেবীদের গৃহস্থপূজা যে-সে মানুষের কর্ম নয়।
মন্দিরের গর্ভগৃহের সামনে সাতজন শ্রমণ তারাদেবীর স্রগ্ধরা স্তোত্র পাঠ করছে। ভন্তে বুদ্ধগুপ্ত আজ অত্যন্ত ব্যস্ত। পূজাপর্বের সুষ্ঠু পরিচালনার দায়িত্ব তাঁর। মন্দিরের প্রধান দ্বারের সামনে অতিবৃহৎ যূপকাষ্ঠ। কয়েকজন ভীমদর্শন ডোম তাদের খড়্গের ধার পরীক্ষায় ব্যস্ত। পূজা শেষে একশত আটখানি মহিষ বলি হবে। তাদের এক এক করে মন্দিরের পিছনদিকে এনে বেঁধে রাখা হচ্ছে৷
উপস্থিত পুণ্যার্থীদের উচ্চ স্বরে সমগ্র অঞ্চল কোলাহলপূর্ণ। সকলে অপেক্ষা করছেন কখন প্রকাশচন্দ্র এবং রাজ্ঞী এসে পূজাপাঠ সমাপন করবেন। পুণ্যার্থীদের দলের একেবারে সামনে আছেন বজ্রযানী সন্ন্যাসীরা। তাঁদের উলঙ্গ ভস্মাবৃত দেহ, দীর্ঘ জটা আর খর্পর-খট্বাঙ্গ দেখে অন্যান্যরা একটু দূরে রয়েছেন।
আছেন কিছু সহজযানী সাধক। এঁদের অবস্থান সংসার এবং সন্ন্যাসাবস্থার মধ্যের বিন্দুতে। অনেকেরই বিবাহিতা স্ত্রী আছেন, বাকিদের সম্বল সাধনসঙ্গিনী। অধিকাংশই অন্ত্যজ এবং নিম্নবর্গীয় জাতিভুক্ত, স্থায়ী উপার্জন বলতে তেমন কিছু নেই। এঁরা নিষ্কাম ও নিঃস্বার্থ হলে কী হবে, স্বভাবে উদাস ও যাযাবর প্রবৃত্তির। সহজিয়া সাধকদের স্ত্রী বা সঙ্গিনীরা জন্মসূত্রে ডোম, রজক, মালি বা অন্যান্য অন্ত্যজ ঘরের কন্যা হয়ে থাকেন।
সাধকদের প্রায় সকলের মস্তক মুণ্ডিত। মুখমণ্ডল গুম্ফশ্মশ্রুতে আবৃত। আজানুলম্বিত বেশ, সেটি বিভিন্ন আকারের এবং বিভিন্ন রঙের ক্ষৌম, দুকূল, কৌষেয় এবং পট্টবস্ত্রের পট্টি বুনে প্রস্তুত।
দূর হতে ঢাক ঢোল ও মৃদঙ্গরব ভেসে এল। উপস্থিত জনতা সরে গিয়ে মন্দিরের প্রধানদ্বারের সম্মুখের স্থান উন্মুক্ত করে দিল। এইবার দেবীগর্জন শুরু হবে। প্রাকৃত সাধারণের ভাষায়, গাজন।
ভীষণদর্শন চণ্ডালের দল ঢাক ঢোল কাড়া নাকাড়া মৃদঙ্গ বাজাতে বাজাতে, ভয়ঙ্কর রণহুংকার দিতে দিতে এগিয়ে আসতে থাকল। বাদ্যকারদের পেছনে পেছনে আরেক সারিবদ্ধ দল, বঙ্গদেশের সেনাবাহিনীর পদাতিক যোদ্ধা। তাদের একহাতে লাঠি এবং অন্যহাতে হ্রস্বদৈর্ঘ্যের তরবারি। প্রস্তরকঠিন দেহগুলি তৈলাক্ত, শরীর বেয়ে নেমে আসছে স্বেদবিন্দু। ঊর্ধ্বাঙ্গ অনাবৃত, নিম্নাঙ্গে ক্ষুদ্র অধোবাস মালকোচা করে পরা।
গর্জনদলের প্রথমে একটি ক্ষুদ্র রথ। ফল ফুল মালা দীপ ধূপে পূর্ণ। রথের চারিদিকে চারটি অতিদীর্ঘ বল্লম। বল্লমগুলি রৌপ্যনির্মিত, ফলা স্বর্ণের। রথটির মধ্যস্থানে একটি বংশদণ্ড প্রোথিত, তার মাথায় উড়ছে চন্দ্রবংশের পতাকা৷ তার সামনে স্বর্ণনির্মিত থালার ওপর একটি অদ্ভুতদর্শন তরবারি রাখা। প্রকাশচন্দ্রের অজেয়, অব্যর্থ তরবারি।
এই দলের ঠিক পেছনেই ভয়ালদর্শন ডোমের দল। তাদের সারা শরীরে বিচিত্র সব উল্কি, মুখে নানা রঙ, হাতে অতিদীর্ঘ ভল্ল। ভল্লগুলির শাণিত ফলার ওপর সূর্যের কিরণ পড়ে ঝলসাচ্ছে। এরা একটি বর্গাকার ব্যূহে শ্রেণীবদ্ধ হয়ে আসছে৷ মাঝখানে চারজনের সারি করে ষোলজন অশ্বারোহী, তাদের ঘিরে চৌষট্টিজন পদাতিক। তাদের গম্ভীর রণহুঙ্কারে চারদিকের বাতাস কেঁপে উঠতে লাগল। শিশুরা কেঁদে উঠল। মায়েরা তাদের মুখে আঁচল চাপা দিলেন।
এই ডোমসৈন্য বঙ্গদেশের রণবাহিনীর প্রধান অংশ। এঁদের বীরত্বের কথা আসমুদ্রহিমাচল বিদিত। যতবার বঙ্গভূমি বৈদেশিক শক্তির কাছে পরাভূত হয়েছে, ততবার দেখা গেছে যে পরাজয়ের কারণ সৈনাপত্য ও রণনীতি। বঙ্গসেনার বীরত্ব নিয়ে কারও মনে কোনওদিনই কোনও সন্দেহ ছিল না। বঙ্গদেশের দেবী পূজার্চনায় চণ্ডাল, ডোম, শবর, এঁদের অধিকার সর্বাগ্রে।
ভন্তে বুদ্ধগুপ্ত স্মিত গাম্ভীর্যের সঙ্গে প্রধান দ্বারে এসে দাঁড়ালেন। সৈন্যদলের যিনি প্রধান, এগিয়ে এসে একটি ফল এবং একটি স্বর্ণখণ্ড ভন্তের হাতে দিলেন। বুদ্ধগুপ্ত দুহাত তুলে স্বস্তিবাচন উচ্চারণ করলেন। চারজন সৈন্য অগ্রবর্তী রথখানি তুলে ধর্মস্তূপের সামনে রাখতেই উপস্থিত শ্রমণেরা শঙ্খধ্বনি করলেন। পুণ্যার্থীর দল সহর্ষে ‘জয় দেবী বজ্রযোগিনীর জয়’ বলে চিৎকার করে উঠল।
এবার ডোমসৈন্যের দল দুপাশে সরে গিয়ে পথ করে দিতেই বজ্রযানী সন্ন্যাসীরা খট্বাঙ্গগুলি দুহাতে উপরে তুলে ধরে হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন। আরেকদল সন্ন্যাসী ভীষণ গালবাদ্যে চারিদিক সন্ত্রস্ত করে তুললেন। ভন্তে বুদ্ধগুপ্ত মন্দিরের প্রধান ঘণ্টা বাজিয়ে দিতেই সন্ন্যাসীর দল একে একে মন্দিরে প্রবেশ করে গর্ভগৃহের সামনে বিচিত্র ভঙ্গিতে নাচতে লাগলেন৷ সঙ্গে উচ্চকণ্ঠে গাইতে লাগলেন, ‘এক সো পদ্ম চৌষঠী পাখুড়ী/ তঁহি চড়ি নাচঅ ডোম্বী বাপুড়ী।’
প্রধান দ্বারের বাইরে তখন এসে দাঁড়িয়েছে পুলিন্দ, ব্যাধ ও শবরের দল। পুরুষ ও মহিলা উভয়েই আছে এই দলে। পুরুষদের অনেকের হাতে লাউয়ের খোলা আর আধহাত লম্বা বাঁশের টুকরো আর শুকরের অন্ত্রের তার দিয়ে বানান বাদ্যযন্ত্র। দু-এক জনের ঠোঁটে বাঁশি। এক বৃষস্কন্ধ প্রৌঢ়ের হাতে একটি বহুব্যবহৃত বীণা। তারা একটি বুদ্ধনাটিকার আয়োজন করেছে। নাটকের মূল নায়ক এক সহজযানী সাধক। তাঁকে ঘিরে তাঁর সঙ্গিনী নাচতে নাচতে গাইছেন,
‘তেন ন চ্ছুপই হরিণা পিবই না পাণী।
হরিণা হরিণীর নিলয় না জাণী।।
হরিণী বোলও সুন হরিণা তো।
এ বন চ্ছাড়ী হোহু ভান্তো।।’
প্রণয়ী সাধক উত্তর দিচ্ছেন,
‘কইসনি হালো ডোম্বী তোহেরি ভাভরী আলী।
অন্তে কুলিণজন মাঝে কাবালী।
কেহো কেহো তোহেরে বিরুআ বোলই।
বিদুজন লোঅ তোরেঁ কণ্ঠ না মেলই।।
কাহ্নে গায় তু কামচণ্ডালী
ডোম্বীত আগলি নাহি চ্ছিনালী।।’
অভিনেতা এবং অভিনেত্রী দুজনেই সাবলীল। তাদের লীলা, লাস্য, গান, অভিনয় সবই অতি অপূর্ব। তার সঙ্গে বাকি বাদ্যকর এবং সহশিল্পীরাও যথাযথ সঙ্গত করছেন। বাকি অভিনেতারাও যথেষ্ট সুঠাম দেহী৷
এরপর নাটক আরও বেশ সরস এবং আকর্ষণীয় হয়ে উঠল। নায়িকা চটুল চপল লাস্যের সঙ্গে নায়কের গলা জড়িয়ে বলছেন,
‘যোইণি তঁই বিণু খনহিঁ ন জীবমি।
তো মুহ চুম্বী কমলরস পীবমি।’
নায়ক তার উত্তরে সোল্লাসে গেয়ে উঠলেন,
‘ভব নির্ব্বাণে পড়হমাদলা।
মনপবণ বেণি করণ্ড কসালা।
জঅ জঅ দুংদুহি সাদ উছলিআঁ।
কাহ্ন ডোম্বি বিবাহে চলিআ।’
এই রসসিক্ত আলাপে উপস্থিত জনগণের অনেকে উল্লসিত হয়ে বাহবা দিলেন, অনেকে আদিরসাত্মক টিপ্পনি কাটলেন। যুবতীরা সামান্য লজ্জা পেলেন, যুবকেরা আমোদ। হো হো হাসির শব্দে সমগ্র স্থানটি পরিপূর্ণ হল।
ততক্ষণে পূজাস্থল সাধারণ পুণ্যার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। বজ্রযানী সন্ন্যাসীরা পূজাপাঠ সমাপান্তে নিজ নিজ শিবিরে প্রত্যাগমন করেছেন। সাধারণ পুণ্যার্থীরা মন্দিরে পূজা দিয়ে ফের প্রধান দ্বারের কাছে ফিরে আসছেন। এখনও নাটক শেষ হয়নি। তাছাড়া পূজার যে মূল আকর্ষণ, রাজ্ঞী ও প্রকাশচন্দ্রের পূজার্পণ এবং একশো আটখানি মহিষ বলি, সেটি তখনও অনুষ্ঠিত হওয়া বাকি।
নাটক প্রায় তুঙ্গমুহূর্তে, এমন সময় দূর হতে বজ্রনির্ঘোষ শোনা গেল। বঙ্গভূমির রানি এবং মহারাজসচিব প্রকাশচন্দ্র আসছেন।
চারিদিকে সাজো সাজো রব পড়ে গেল। মন্দিরচত্বর শূন্য করে দেওয়া হল দ্রুত। নাট্যদল তাঁদের রঙ্গ বন্ধ করে মিশে গেল প্রধানদ্বারের দুইপাশে জনতার মধ্যে। কেবলমাত্র শ্রমণেরা এবং বুদ্ধগুপ্ত ছোটাছুটি করছেন। যদিও বুদ্ধগুপ্তর বিশেষ ভূমিকা নেই। প্রকাশচন্দ্র এবং রানির সঙ্গে আচার্য বিশুদ্ধকীর্তিও আসছেন। বিশিষ্ট অতিথিদের পূজা এবং যজনের ভার তাঁরই ওপরে।
একজন শ্রমণ মন্দিরের প্রধান দ্বারের সামনে রাখা যূপকাষ্ঠটি মেঘান্দের জলে ধুইয়ে দিয়ে গেলেন। আরেকজন অতি দ্রুত সিন্দূর, রক্তচন্দন, দূর্বাঘাস এবং ফুলদল দিয়ে যূপকাষ্ঠ সজ্জিত করে দিলেন। বলশালী শৌনিকদল এক এক করে মহিষগুলিকে সামনে এনে রাখতে শুরু করল।
কাড়া, নাকাড়া এবং মৃদঙ্গের অতি উচ্চ নিনাদের সঙ্গে ধীরে ধীরে অত্যুজ্জ্বল সুসজ্জিত রথশ্রেণী এগিয়ে আসতে থাকে। সামনে বাদ্যকরের দল। তার পিছনে প্রথম রথ। তাতে অধিষ্ঠিত আছেন রাজগুরু বিশুদ্ধকীর্তি এবং প্রধানমন্ত্রী অমিতাভভট্ট স্বয়ং। দুজনেই যথেষ্ট সম্মানীয় মানুষ। উপস্থিত জনতা তাঁদের সশ্রদ্ধ প্রণতি জানাল।
দ্বিতীয় রথে রয়েছেন মহাদণ্ডনায়ক জিতসেন এবং রাজসেবক বাহিনীপ্রধান গিরিকিশোর। জিতসেন বঙ্গজনের কাছে মূর্তিমান আতঙ্ক। রুক্ষ, দৃঢ় এবং কঠোর শাসনদণ্ডে বিশ্বাস রাখেন। কিন্তু গিরিকিশোর চিরলম্পট৷ তিনি নারীদের দিকে অসভ্য ইঙ্গিত করতে লাগলেন।
তৃতীয় রথে রয়েছেন মহাসান্ধিবিগ্রহিক অগ্নিমিত্র এবং মহাপ্রতীহার শান্তঘোষ। তাঁদের আপাত-উদাস মুখভার দেখে তাঁদের মনের মধ্যে কী চলছে বলা দুষ্কর। কিন্তু দুজনেই অতি উচ্চপদস্থ রাজন্য, জনতা সম্ভ্রমের সঙ্গে মাথা নত করে অভিবাদন জানাচ্ছিল।
চতুর্থ এবং সর্বশেষ রথটিই আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। অন্যান্য রথগুলি অশ্ববাহিত, এই রথের বাহন চারটি অতি ভীষণদর্শন বৃষ। রথখানিও অতীব সুসজ্জিত। স্বর্ণনির্মিত ছত্রের রক্তবর্ণ ধ্বজে একটি অর্ধচন্দ্র, এবং একটি তরবারি অঙ্কিত। এই লাঞ্ছন চন্দ্রবংশের বহু প্রাচীন ধ্বজচিহ্ন।
রথ ঘিরে ভীষণদর্শন খড়্গ এবং সুতীক্ষ্ণ ভল্ল হাতে কৃষ্ণবস্ত্রে সজ্জিত ষোলোজন যোদ্ধৃপুরুষ। সবাই জানে তারা কারা।
রথের ওপর রয়েছেন প্রকাশচন্দ্র এবং রানি। রানি প্রকাশচন্দ্রের বামদিকে অবস্থান করছেন, সদা সর্বদা তাই থাকেন। প্রকাশচন্দ্রের ঊর্ধ্বাঙ্গে একটি দশাযুক্ত ক্ষৌমবস্ত্র। অধোবাসে ত্রিকচ্ছ কৌষেয় পট্ট। কাঁধ অবধি নেমে আসা কেশরাশি একখানি সরু বস্ত্রখণ্ড দিয়ে মাথার পেছনদিকে বাঁধা। বাহুদুটি আজানুলম্বিত, বৃষস্কন্ধ সবল এবং কটিদেশে সিংহসদৃশ। ললাট সুপ্রশস্ত, হনুদেশ কঠিন এবং চোখদুটি অন্ধকার৷
রানির পরনে একটি অতিসূক্ষ্ম নীলাম্বরী চীনাংশুক। তসরের পট্টবস্ত্রে বক্ষ আবৃত। ভুজবন্ধে সুবর্ণনির্মিত অঙ্গদ। দেবদুর্লভ কুঞ্চিত কেশরাশি কবরীবন্ধনে মাথার উপর শিখণ্ডের মতো করে বাঁধা৷ তাতে মল্লিকাফুলের মালা জড়ানো। দুই কর্ণে বজ্রহীরকের কর্ণাভরণ। অনাবৃত বাহুদুটিতে চন্দনপঙ্ক এবং মৃগনাভির প্রলেপ, তার স্নিগ্ধ অথচ তীব্র সুগন্ধে চারিদিক আমোদিত। পদ্মপত্রতুল্য চক্ষু কাজলে সজ্জিত, সস্মিত ওষ্ঠে অলক্তরাগ, কণ্ঠে একটি বহুমূল্য স্বর্ণহার। তাঁকে দেখে উপস্থিত পুণ্যার্থীদের মধ্যে প্রণামের হুড়োহুড়ি পড়ে গেল।
চারটি রথ ধীরে ধীরে মন্দিরের সামনে এসে দাঁড়াল। প্রধান দরজার সামনে প্রকাশচন্দ্র এবং রানির রথ। বাকি তিনটি রথ কিছু দূরে। প্রকাশচন্দ্র রথ থেকে নামলেন। তাঁর হাত ধরে সম্রাজ্ঞীও। বাকি তিনটি রথ থেকে অন্যান্য রাজপদাধিকারীরা নেমে এলেন। আচার্য বিশুদ্ধকীর্তি রানিকে অভিবাদন করে বললেন, ‘হে বঙ্গমাতৃকা, প্রতি বৎসরের মতো এই বৎসরেও দেবী বজ্রযোগিনীর মহাপূজার জন্য আমি, ভন্তে বিশুদ্ধকীর্তি, আপনাকে সশ্রদ্ধ আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। বঙ্গদেশের কল্যাণ হোক, শান্তি ও কল্যাণ বারিধারার মতো ঝরে পড়ুক এই দেশের সর্বত্র। পরমেশ্বর প্রকাশচন্দ্র এবং আপনার স্নেহশাসনে এই দেশের জনসাধারণ ঘৃতমিশ্রিত অন্ন, মৎস্য এবং মাংসে পরমসুখে প্রতিপালিত হতে থাকুক। আসুন দেবী, পরমমাতৃকা ব্রজযোগিনীর কাছে আমরা সমবেতভাবে সৌভাগ্য ও সমৃদ্ধি প্রার্থনা করি। যেন আমাদের এই পরমপূজ্য মাতৃকাভূমির অক্ষয় সৌভাগ্যচিহ্ন...’
‘ঘৃতে, অন্নে, মৎস্যে, মাংসে তো দেহখানি দিব্যি বানিয়েছেন মশাই। দশটা বাঘে খেয়েও শেষ করতে পারবে না। সাধারণ মানুষ কী খেয়ে বেঁচে আছে জানেন?’
উপস্থিত জনতার মধ্যে কে যেন উচ্চৈঃস্বরে বলে উঠল কথা ক’টি। সঙ্গে সঙ্গে হাসির রোল উঠে থেমে গেল৷
রাজগুরু থমকে গেলেন। বাকি ছয় জন স্তম্ভিত। রানি এবং প্রকাশচন্দ্র স্থির।
এবার অন্যদিক থেকে কে যেন বলে উঠল, ‘রাজগুরু, আপনি না ধর্মপুরুষ? এই কুলটা, বহুভোগ্যা নারীর পাদবন্দনা করতে আপনার লজ্জা হচ্ছে না?’
উপস্থিত জনতা নিঃশব্দ। ক্রুদ্ধা মহাসর্পিণীর মতো ঘুরে দাঁড়ালেন রানি। তাঁর কবরী খুলে গিয়ে কেশরাশি নেমে এল কটিদেশ অবধি। চক্ষু জ্বলছে৷
বাকি ছয় জন এগিয়ে এসে রানির রথের সামনে দাঁড়ালেন। গিরিকিশোর কর্কশকণ্ঠে চিৎকার করে বললেন, ‘কার এতদূর স্পর্ধা আমাদের সম্রাজ্ঞীর চরিত্র নিয়ে কুকথা উচ্চারণ করে? সাহস থাকলে সামনে আয়। তোর জিহ্বা ছিঁড়ে কুকুরকে খাওয়াব।’
এবার উত্তর এল সম্পূর্ণ অন্য দিক থেকে, ‘ওরে লম্পট, তোর না হয় লঘুগুরু জ্ঞান নেই। রাজপদ লেহন করে তোর আর তোর উপগৃহিণীদের সংসারযাত্রা নির্বাহ হয়। কিন্তু আমাদের মতো বঙ্গবাসী এই স্বৈরিণী নারী আর প্রকাশচন্দ্র নামের ওই কূট কাপালিকের শাসনে কীভাবে জীবনধারণ করছে—তার কোনও সংবাদ রাখিস?’
রাজন্যবর্গ বিভ্রান্ত। কারা উচ্চারণ করছে এই কুবাক্য? এই সাহস, এই স্পর্ধা সাধারণ জনতার হল কীভাবে?
তবে দ্রুত তাঁরা সুস্থিত হলেন। জিতসেন দাঁতে দাঁত চেপে বললেন, ‘রাজসেবকদল, তোমাদের আদেশ দিচ্ছি, এই দণ্ডেই এই দুর্মুখ প্রজাদের আমাদের কাছে উপস্থিত করো।’
রাজসেবকসৈন্য প্রশ্ন করে না। শুধু আদেশ পালন করে। তারা রথশ্রেণীর সামনে এসে দাঁড়াল। তাদের একহাতে খড়্গ, অন্যহাতে ভল্ল। তাদের যদি বলা হয়, সমবেত জনতার প্রত্যেককে হত্যা করতে হবে, তারা তাই করবে। আদেশ পালন অথবা মৃত্যু, এই হচ্ছে তাদের ধর্ম।
কিন্তু তারা আগুয়ান হওয়ার আগেই আদেশ ভেসে এল, ‘আপনার আদেশ প্রত্যাহার করুন মহাদণ্ডনায়ক। পূজাপ্রাঙ্গণে রক্তপাত শ্রেয় নয়।’
প্রকাশচন্দ্রের কণ্ঠ শুনে থেমে গেল সৈন্যদল। শান্তঘোষ প্রকাশচন্দ্রের কাছে এসে বললেন, ‘আপনার আশঙ্কাই তাহলে সত্য হল প্রভু। বিদ্রোহ তাহলে কর্মান্তবাসকের রাজদ্বারে পৌঁছে গেল!’
প্রকাশচন্দ্র শান্তস্বরে বললেন, ‘তাই তো মনে হচ্ছে আর্য শান্তঘোষ।’
অপমানে রাজ্ঞীর হাত দুটি কাঁপছিল। চাপা ক্রুদ্ধস্বরে প্রশ্ন করলেন, ‘এরা কারা, নাথ? এদের এত স্পর্ধা হয় কী করে যে, সর্বসমক্ষে আমার নামে এই দুর্বাক্য উচ্চারণ করে?’
প্রকাশচন্দ্র নির্বিকার মুখে বললেন, ‘এরা তাঁরাই, যাঁদের কথা বলেছি রানি।’
‘কিন্তু এই জনারণ্যে এমন অসভ্যতা?’ প্রশ্ন করলেন বিস্মিত অমিতাভভট্ট।
‘জনসমাগমই অপরাধীর জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ যবনিকা, প্রধানমন্ত্রী মহোদয়। জনতার মুখ নেই, অবয়ব নেই, চরিত্র নেই। তার নিশ্চল অন্তরালে থেকে মহত্তম অপরাধ সংঘটিত করা সম্ভব।’
‘অর্থাৎ?’
‘অর্থাৎ আমাদের প্রতিস্পর্ধীরা আমাদের থেকে কম চতুর নয় মন্ত্রীমশাই!’
প্রকাশচন্দ্র বলতে বলতেই জনতার মধ্যে থেকে কারা যেন সমস্বরে বলে উঠল, ‘এই উন্মাদ রানির শাসনের অবসান চাই। চৈনিক ঘটদাস প্রকাশচন্দ্রের হাত থেকে মুক্তি চাই।’
রাজপদাধিকারীরা, বুদ্ধগুপ্ত এবং উপস্থিত শ্রমণেরা হতভম্ব। কর্মান্তবাসকের মাটিতে যে কোনওদিন এই ধ্বনি উঠতে পারে—এ তাঁদের স্বপ্নেরও অগোচর ছিল। কিন্তু তাঁদের বিস্ময় বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়ে এবার আরও অধিক মানুষের কণ্ঠে ধ্বনিত হল, ‘চন্দ্রবংশ ধ্বংস হোক। সপ্তরাজন্যর কুশাসন উৎসন্ন হোক। জয় গৌড়, জয় বঙ্গ, জয় শশাঙ্ক।’
বিস্মিত হলেন অগ্নিমিত্র, ‘এত কণ্ঠ? এত মানুষ আমাদের বিরুদ্ধে?’
প্রকাশচন্দ্র বললেন, ‘অনেক নয় অগ্নিমিত্র, মাত্র কয়েকজনের কণ্ঠস্বর।’
রানি বললেন, ‘কিন্তু অনেকের স্বর শোনা যাচ্ছে যে নাথ।’
‘অনেকের স্বর শোনা যাচ্ছে, কারণ অনেকের স্বর শোনানো হচ্ছে।’
‘কিন্তু...কিন্তু এ কী করে সম্ভব মাননীয়?’ আচার্য বিশুদ্ধকীর্তি বিস্মিতস্বরে প্রশ্ন করলেন।
‘খুবই সম্ভব মাননীয় রাজগুরু। এ অতি বিচিত্র বিদ্যা, এর নাম অভিস্বরক্ষেপণ। এর দ্বারা আপনি ওষ্ঠ বিন্দুমাত্র কম্পিত না করে স্বরপ্রয়োগ করতে পারেন। স্বরকে উৎস থেকে বিচ্ছিন্ন করে দূরাগত ধ্বনিতে পরিবর্তন করতে পারবেন। একই কণ্ঠ থেকে বহুজনের স্বর উৎপন্ন করতে পারবেন।’
‘এ কেমন বিদ্যা প্রভু?’
‘আশ্চর্য বিদ্যা, আচার্য। এর উদ্ভব অতিদূর পাশ্চাত্য দেশে। মহান সম্রাট গাওজং-এর রাজসভায় এই বিদ্যায় পারদর্শী এক পাশ্চাত্যদেশী যুবক এসেছিল। তার কাছেই আমি গোপনে এই আশ্চর্য শব্দবিদ্যা শিখেছি। আমাদের শত্রুরা এখন সেই বিদ্যারই প্রয়োগ করছে।’
বিশুদ্ধকীর্তি বিহ্বলভাবে বললেন, ‘কিন্তু সেই বিদ্যা এদের কাছে পৌঁছল কী করে মহোদয়?’
‘প্রশ্ন সেটি নয় রাজগুরু’, সামান্য অধৈর্য হলেন প্রকাশচন্দ্র, ‘প্রশ্ন হচ্ছে এই মুহূর্তে ওদের ঠিক কতজন উপস্থিত আছে এখানে।’
ছ’জন উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী, রানি, প্রকাশচন্দ্র এবং ভন্তে বুদ্ধগুপ্ত তাকালেন উপস্থিত জনতার দিকে। এই প্রথম তাঁরা অনুভব করলেন যে তাঁরা কতটা একা। এবং কতটা অসহায়।
প্রকাশচন্দ্র নিম্নস্বরে বললেন, ‘রাজগুরু, দ্রুত পূজা সম্পন্ন করুন।’
বিশুদ্ধকীর্তি দ্রুতপদে মন্দিরের ভিতরে অন্তর্হিত হলেন। প্রতিবার রানি ও প্রকাশচন্দ্র মন্দিরে আগত অন্যান্য মূর্তিগুলিকে প্রথমে অর্চনা করেন, তারপর বজ্রযোগিনীর আরাধনা সম্পন্ন করেন। কিন্তু আজ কেউ সেসবের মধ্যে গেলেন না। সরাসরি গর্ভগৃহের মধ্যে ঢুকে পড়লেন। বুদ্ধগুপ্তর সঙ্গে বাকি শ্রমণেরা উচ্চৈঃস্বরে সমবেতভাবে যোগিনীমন্ত্র পাঠ করতে লাগলেন। একজন সেবক সজোরে ঘণ্টা বাজাতে লাগল।
তখন মন্দিরের ঠিক বাইরে বলিপ্রদত্ত মহিষগুলিকে সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড় করানো হয়েছে। শৌনিকদল তাদের বৃহৎ খড়্গগুলির ধার পরীক্ষা করে নিচ্ছে শেষবারের মতো। প্রথম বলি প্রকাশচন্দ্র নিজের হাতে দেবেন। একটি অতি উৎকৃষ্ট কৃষ্ণবর্ণ মহিষ তার জন্য প্রস্তুত৷
কিছু পরেই প্রকাশচন্দ্র ও বাকিরা বেরিয়ে এলেন। প্রকাশচন্দ্রের প্রশস্ত ললাট জুড়ে আশীর্বাদী সিন্দুর। উন্মুক্ত সুঠাম নির্লোম বক্ষে অজস্র মুক্তার মতো স্বেদবিন্দু। প্রকাশচন্দ্রের ডানহাতে তাঁর অজেয় খড়্গ। উচ্চতায় সেটি তাঁর কোমর অবধি।
এই তরবারি সম্রাট গাওজং-এর ব্যক্তিগত তরবারিসহায়ক, শাও ফেং-এর নিজের হাতে প্রস্তুত। দীক্ষাদাত্রী য়ু জেতিয়ান এই ‘তাংদাও’-টি স্বয়ং শোধন করে প্রকাশচন্দ্রের হস্তে অর্পণ করেন। যতদিন এই তরবারি প্রকাশচন্দ্রের অধিগত থাকবে, ততদিন নাকি কোনও যুদ্ধে তাঁর পরাজয় হবে না।
প্রধান শৌনিক কৃষ্ণবর্ণ মহিষটিকে যূপকাষ্ঠে বদ্ধ করলেন। প্রকাশচন্দ্র তাঁর অজেয় তাংদাও নিয়ে মহিষটির দক্ষিণদিকে এসে দাঁড়ালেন। ‘জয় দেবী বজ্রযোগিনীর জয়’ ধ্বনিতে চারিদিক কম্পিত হল। সেই বিপুল কোলাহলে মহিষদল চঞ্চল হতে অপরাপর শৌনিকেরা তাদের গলার রশিগুলি শক্ত করে ধরল।
বিশুদ্ধকীর্তি দুই হাত তুলে অধীর জনতাকে শান্ত হতে বললেন। চারিদিকে উৎসুক নৈঃশব্দ্য নেমে এল। সবাই অপেক্ষা করে আছে প্রথম বলির জন্য। একটু আগেকার সাময়িক কটুবাক্যর কথা যেন কারও মনেই নেই।
প্রকাশচন্দ্র তাঁর তরবারি মাথার ওপর তুললেন।
চারিদিকে সগর্ভ নৈঃশব্দ্য। নিশ্চুপ উল্লাস।
বিশুদ্ধকীর্তি মুখ খুললেন বধমন্ত্র উচ্চারণ করার জন্য।
কিন্তু তাঁর মুখ হতে প্রথম শব্দটি উচ্চারিত হওয়ার আগেই মাথার ওপর একটি তীব্র সাঁই সাঁই শব্দ শোনা গেল। উপস্থিতজন মাথা তুলে দেখলেন একটি তীরবিদ্ধ গোলাকার কৃষ্ণবর্ণ বস্তু উড়ে আসছে মন্দিরের প্রধান দ্বারের দিকে। তীরবিদ্ধ বস্তুটি যূপকাষ্ঠের ঠিক সামনে এসে পড়ল। অতি সাধারণ দর্শন একটি গোলাকার কন্দুক, তার মুখে একটি জ্বলন্ত পলিতা।
অন্যান্য রাজপুরুষরা হেসে উঠলেন। জিতসেন বললেন, ‘বিদ্রোহীরা কি তাহলে আমাদের কন্দুকক্রীড়ায় আহ্বান করছে প্রভু প্রকাশচন্দ্র?’
প্রকাশচন্দ্র কিন্তু হাসছিলেন না। তিনি বিস্ফারিত চোখে মুহূর্তকাল চেয়ে রইলেন জ্বলন্ত কন্দুকটির দিকে, তারপর চিৎকার করে উঠলেন, ‘সাবধান, সাবধান রাজন্যবর্গ! এই মুহূর্তেই ভূমিশয্যা নিন।’
এই বলে একহাতে রানিকে ধারণ করে ভূতলে শায়িত হলেন।
পরক্ষণেই অত্যুজ্জ্বল আগুনের সঙ্গে কর্ণবিদারী শব্দ। মনে হল যেন শতসহস্র বজ্রপ্রভা বিস্ফোরিত হল। প্রথমেই ছিন্নবিচ্ছিন্ন হল যূপকাষ্ঠটি। যূপকাষ্ঠবদ্ধ মহিষটির ছিন্নমুণ্ড তীব্রবেগে আকাশে উত্থিত হয়ে গর্ভগৃহের সামনে গিয়ে পড়ল।
কয়েক ক্ষণের বিমূঢ় স্তব্ধতা। তারপরেই সহস্রককণ্ঠের অসহায় আর্তচিৎকার, আর আতঙ্কিত কলরোলে মুখরিত হয়ে উঠল মন্দিরপ্রাঙ্গণ। ভীত জনতার আর্তনাদ, শিশু ও নারীদের ক্রন্দন, আর উপায়হীন মানুষের অসহায় হাহাকার।
রাজন্যরা প্রকাশচন্দ্রের আদেশমাত্র ভূমিশয্যা নিয়েছিলেন, রাজসেবকদের প্রতিটি সেনাও তাই। একটু পর তাঁরা উঠে দাঁড়ালেন। পরক্ষণে তাঁদের চোখের সামনে সমগ্র দৃশ্যটির স্বপ্নাতীত পরাবাস্তবতা প্রকট হল।
এই বিস্ফোরণ এবং উপস্থিত জনতার আর্তনাদ বিচলিত করে তুলেছে মহিষদলকে। সবলে মুক্ত হয়ে দিগ্বিদিকজ্ঞানশূন্য ভাবে ছুটে আসছে মন্দিরের প্রধানদ্বারের দিকে। ফলে এই অশান্ত মহিষদল এবং আতঙ্কতাড়িত জনরাশি, এখন এরা তাঁদের দিকেই সর্বগ্রাসী মৃত্যুর মতো ধাবমান!
আর সেই উন্মত্ত মহিষদলের মধ্যমণি যে পর্বতপ্রমাণ মহিষটি, তার পিঠের ওপর শৃঙ্গদুখানি ধারণ করে আছে কে? ও কার অবয়ব?
রাজসেবকসেনা ততক্ষণে তাদের অভ্যস্ত দায়িত্ববোধে ফিরে এসেছে। তারা তৎক্ষণাৎ রাজ্ঞী, প্রকাশন্দ্র এবং অন্যান্য রাজন্য, বুদ্ধগুপ্ত এবং শ্রমণদের ঘিরে দাঁড়াল।
তারপরেই যেন পাতালের গহীন অন্ধকার থেকে পূর্বসমুদ্রের ভয়াবহতম ঝঞ্ঝা ঝাঁপিয়ে পড়ল তাঁদের ওপর।
কেউ জানে না কত দণ্ড পর, এই ঝঞ্ঝাবিক্ষোভ থামল। সবাই উঠে দাঁড়ালেন৷ মন্দিরপ্রাঙ্গণ শূন্য, কেবল ইতিউতি কয়েকটি আহত দেহ পড়ে আছে। আর পড়ে আছে ধ্বংসলীলার হৃদয়বিদারক চিহ্ন। সৌভাগ্যক্রমে মন্দিরের মধ্যে কেউ প্রবেশ করেনি। কিন্তু তাতেও ক্ষতি যা হয়েছে তাও কম নয়। আচার্য বিশুদ্ধকীর্তি ভূমিশয্যা থেকে ওঠার চেষ্টা করে ফের শুয়ে পড়েছেন। ভন্তে বুদ্ধগুপ্ত এবং বাকি শ্রমণেরা নিজেরাও অল্পবিস্তর আহত। তবুও তাঁরা চেষ্টা করছেন আচার্য বিশুদ্ধকীর্তিকে তুলে ধরার। জিতসেন এবং শান্তঘোষ শক্তধাতের মানুষ, তাঁদের সৈন্যাভ্যাস আছে।
তাঁরাও যথেষ্ট আহত, তবুও এইসব আঘাত সামলে নিয়ে তাঁরা উঠে দাঁড়িয়েছেন। মহাসান্ধিবিগ্রহিক অগ্নিমিত্র তাঁর বিধ্বস্ত রথের চক্রটি অবলম্বন করে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন। তিনি দৃশ্যতই বিস্রস্ত, বিচলিত এবং বিধ্বস্ত। প্রধানমন্ত্রী অমিতাভভট্ট নরম মনের এবং নরম শরীরের মানুষ। কিন্তু তাঁর মানসিক বল অসাধারণ। সর্বাঙ্গ রক্তাক্ত, তবুও ইতিমধ্যেই তিনি উঠে বসেছেন। চক্ষু দু’খানি মুদিত করে কী যেন বিড়বিড় করছেন।
শুধুমাত্র প্রকাশচন্দ্র অবিচলিত!
তাঁকে দেখে মনে হচ্ছে যেন যুদ্ধক্ষেত্রে উঠে দাঁড়িয়েছেন আহত এবং ক্রুদ্ধ পশুরাজ। তাঁর দুই বাহুর পেশিগুলি ফুলে উঠেছে বিস্ফোরণোন্মুখ আগ্নেয়গিরির মতো। প্রশস্ত বক্ষ থেকে চুঁইয়ে পড়ছে রক্তবর্ণ মুক্তাবিন্দু। চোখে ঝলসে উঠছে প্রতিশোধের অগ্নি। তাঁর পায়ের কাছে অবশ লতার মতো লুটিয়ে আছেন বঙ্গদেশের অবিসংবাদী কর্ত্রী, বঙ্গসম্রাজ্ঞী। তাঁর দেহে প্রাণ আছে কি না বোঝা যাচ্ছে না। প্রকাশচন্দ্র ক্ষণিকের জন্য নীচু হয়ে রানির নাকের কাছে নিজের করতল প্রসারিত করলেন। তারপর চিৎকার করে উঠলেন, ‘ওরে কে কোথায় আছিস? রানিকে প্রাসাদে নিয়ে চল, রাজবৈদ্যকে সংবাদ দে।’
বলেই তিনি চকিতে চারিদিকে ক্ষিপ্ত শার্দূলের মতো তাকালেন৷ কই, তাঁর মহাখড়্গ কই? যা দিয়ে তিনি এতদিন শাসন করে এসেছেন এই অভিশপ্ত ভূমি, য়ু জেতিয়ান-এর আশীর্বাদধন্য সেই অজেয় তাংদাও কোথায়?
ক্রোধবহ্নি কিঞ্চিৎ প্রশমিত হলে কঠোর সত্যটি হৃদয়ঙ্গম করলেন প্রকাশচন্দ্র। আরও অনেককিছুর মতো এই বিপর্যয় নিয়ে গেছে তাঁর অবলম্বনটিকেও।
তাঁর অজেয় খড়্গ উধাও!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন