অভীক সরকার

অন্ধকার কুটির। জানালাদুটি বন্ধ৷ অল্প হাওয়ায় দরজা কাঁপছে তিরতির করে। অশ্বত্থের কাণ্ড-জটা বেয়ে, বৃক্ষশাখানির্মিত দরজার ফাঁক দিয়ে বিষণ্ণ চাঁদের আলো উঁকি মারছে। চারিদিকে কোনও শব্দ নেই। ঘরের মধ্যে জমাট বাঁধা স্তব্ধতাও যেন শ্বাস বন্ধ করে রয়েছে।
ধীরে ধীরে দরজাটি উন্মুক্ত হল। কয়েকটি ছায়ামূর্তি নিঃসাড়ে, নিঃশব্দে ঢুকে এল ভেতরে। দুজন দরজার বাইরে রয়ে গেল, পাহারা দেওয়ার জন্য।
আগন্তুকরা সবাই মাটিতে গোল হয়ে বসলেন। একটু পরে চকমকি পাথরের ঠোকাঠুকির শব্দ। একটি শুষ্ক গাছের ডাল জ্বলে উঠল। তারপর কেউ সেই অগ্নিশিখাটি নিয়ে একটি প্রদীপ জ্বালালেন।
প্রদীপের অল্প আলোয় ঘরটি আলোকিত হয়ে উঠল। সেই আলোয় দেখা গেল ঘরের মাঝখানে একটি কাঠের তৈরি নীচু চতুর্পদী। তার ওপর একটি বড় মাটির প্রদীপ। পাশে রাখা রয়েছে একটি অতি দীর্ঘ তরবারি।
মৎস্যেন্দ্রনাথ রুদ্ধস্বরে বললেন, ‘প্রকাশচন্দ্রের অজেয় তাংদাও৷ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম তরবারি শিল্পী শাও ফেং-এর বানানো সর্বোত্তম শিল্প।’
উপস্থিত বাকিরা উদগ্র আগ্রহের সঙ্গে তরবারিটিকে দেখতে লাগলেন।
তরবারিটি দৈর্ঘ্যে দু’হাত লম্বা, হাতলটি আধ হাত। হাতলে সোনা আর হাতির দাঁতের বিচিত্রসুন্দর কারুকার্য। লৌহনির্মিত তীক্ষ্ণধার দেহকাণ্ডটি ছয় অঙ্গুলি প্রশস্ত। প্রদীপের স্তিমিত আলোয় ঝিকিয়ে উঠছে ফলার উদ্ধত ঔজ্জ্বল্য। হাতলের বাঁটের কাছে একটি ধাতুনির্মিত বলয়। তাতে কোনও এক অজানা লিপিতে লেখা কয়েকটি অক্ষর। শীর্ষটি ঈষৎ বক্র ও ক্রুর।
‘কীভাবে এটি হস্তগত হল প্রভু?’ প্রশ্ন করলেন কান্তিপ্রভ। তাঁকে দেখে বোঝা যাচ্ছিল যে, তিনি এখনও বিশ্বাস করে উঠতে পারছেন না—প্রকাশচন্দ্রের অজেয় তরবারি এখন তাঁর কুটিরে। এই তরবারি চিরকাল বঙ্গবাসীর মনে যুগপৎ ভয় এবং সমীহ সৃষ্টি করে এসেছে। লোকমুখে প্রচলিত যে, যতদিন এই তরবারি প্রকাশচন্দ্রের হাতে থাকবে, ততদিন তিনি যে-কোনও দ্বন্দ্বে বা রণে অপরাজেয় থাকবেন।
‘আমাদের বন্ধু, কুমার বিনয়াদিত্য জয়াপীড়ের সৌজন্যে।’ মৎস্যেন্দ্রনাথ মৃদু হাসলেন।
জয়াপীড় কিছু বললেন না। এখনও তাঁর মুখের একদিক ফোলা। চোখের নীচে গভীর ক্ষত। ডান বাহুতে একটি কাপড়ের পট্টি বাঁধা। সেটি কালচে রক্তে মাখামাখি। তিনি উদাসীন স্বরে বললেন, ‘গৌড়ের রাজপথে একদা সিংহশিকার করেছিলাম বটে, কিন্তু সে নেহাত বাধ্য হয়েই। কিন্তু ওই উন্মত্ত মহিষের পিঠে চড়া আর স্বয়ং যমরাজকে ভোজসভায় আমন্ত্রণ জানান যে একই ব্যাপার--সেটি পূর্বে অনুমান করিনি। করলে এই কাজে সম্মত হতাম কি না বলতে পারি না।’
‘হুম, কুমারের অভিজ্ঞতা বিশেষ সুখকর হয়নি মনে হচ্ছে।’
কথাটা শুনেই একবার সামান্য কেঁপে উঠলেন জয়াপীড়, তারপর বললেন, ‘বাপরে বাপ কোনওমতে মোষটার পিঠে চড়েছি কি চড়িনি, মনে হল যেন রোখের বশে কোন এক মারাত্মক ঘূর্ণিঝঞ্ঝার টুঁটিই টিপে ধরেছি, আর সে ক্রমাগত আমাকে নীচে ফেলে পিষে মারবে বলে মাথা ঝাঁকিয়ে চলেছে। কী তার আক্রোশ! কী তার উন্মত্ততা! বাপ রে, এমন প্রলয়ঙ্করী জীব জীবনে দুটি দেখিনি।’ বলে একবার চোখ বুজে শিউরে উঠলেন জয়াপীড়।
‘এরজন্যই তো একজন বীরোত্তমের প্রয়োজন হয় কুমার।’ জয়াপীড়ের পিঠে হাত রাখলেন বপ্যট, ‘তবে একজন অভিজ্ঞ যোদ্ধা হিসেবে এ কথা বলতে পারি, আজ আপনি যে অসীম সাহসের পরিচয় দিয়েছেন, তার তুলনা নেই। আপনি বীর ললিতাদিত্য মুক্তাপীড়ের যোগ্য উত্তরসূরি।’
এসব কথা শুনছিলেন না আচার্য শান্তরক্ষিত। তিনি বললেন, ‘এই তরবারির বিশেষত্ব কী, প্রভু?’
প্রদীপের আলো মৎস্যেন্দ্রনাথের শান্ত স্থিতধী মুখের উপর আলোছায়ায় আলপনা আঁকছিল। তিনি স্বগতসুরে বলতে লাগলেন, ‘তরবারিটি যে বিশিষ্ট সে নিয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু তার বিশেষত্বর বিষয়ে জানার আগে আরও কয়েকটি ব্যাপার আমাদের বিশদে জানতে হবে ভ্রাতা৷ মহাঅভ্যুত্থান আমাদের দ্বারপ্রান্তে। এখন সময় এসেছে সমস্ত কিছু বিশদে ব্যক্ত করার।
‘এই মুহূর্তে বঙ্গদেশের ভাগ্য ঘিরে রেখেছে তিনটি প্রধান রহস্যজাল। সেগুলির মীমাংসা না করে এই অভ্যুত্থান সফল করা কঠিন। তার মধ্যে আপাতত খণ্ডিতারাতি বপ্যটের বংশ ও জন্মসংক্রান্ত রহস্যটির সমাধান হয়েছে। আমরা জানি যে কুমার গোপালদেবের বঙ্গদেশের শাসক হওয়ার পূর্ণ অধিকার আছে। যোগ্যতাও যে আছে তার প্রমাণ গোপালদেব নিজেই দেবেন।
‘দ্বিতীয় রহস্যটি হচ্ছে--প্রকাশচন্দ্রের এই অতিলৌকিক, অতিমানবিক শক্তির উৎস কী? এবং প্রকৃতপক্ষে তিনি কী চান। এবং কে এই রানি? কে তিনি? এই রঙ্গমঞ্চে তিনি প্রধানা নায়িকার ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন কী করে?
বহুদিন ধরে আমি এই দ্বিতীয় রহস্য সমাধানের চেষ্টায় রত ছিলাম। এর জন্য আমাকে বহুদিন ধরে বহু শ্রমে বহু অনুসন্ধান করতে হয়েছে। দেশে-বিদেশে অনেক চর প্রেরণ করেছি। বহু মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি। অনেক তথ্য আহরণ করেছি। কিন্তু কিছুতেই কোনও সমাধানসূত্র খুঁজে পাচ্ছিলাম না। হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে দেওয়ার ঠিক পূর্বমুহূর্তে দেবাদিদেব আদিনাথ দয়া করলেন। অকস্মাৎ এক ঝটিকায় সমস্ত রহস্যের উপর হতে যবনিকা উত্তোলিত হল।
প্রতিবেশী দেশগুলি যে সদা সর্বদাই একে অন্য দেশের অভ্যন্তরে নিজ নিজ চর প্রেরণ করে, সে আপনাদের অজানা নয়। চীন দেশেও তিব্বতনরেশ মে অগছোমের প্রেরিত কয়েকটি গুপ্তচর দল সক্রিয়। তাদের মধ্যে একটি দলের অধিনায়ক হলেন রিনছেন সাংপো। গুপ্তচরবিদ্যায় ইনি তিব্বতে প্রায় প্রবাদপুরুষ।
‘আজ থেকে দুই বৎসর পূর্বে রিনছেন সাংপোর হাতে দৈবাৎ রাজকীয় গ্রন্থাগারের কিছু গোপন পুঁথি এসে পড়ে। তাতে তিনি এমন কিছু খুঁজে পান, যা তাঁর কৌতূহল চতুর্গুণ বর্ধিত করে। অনেক গোপন সন্ধান চালানোর পর গত হেমন্তে জনৈক চীনদেশীয় বৃদ্ধের সঙ্গে রিনছেন সাংপো’র যোগাযোগ হয়। এই বৃদ্ধের পিতামহ চীনের সম্রাট গাওজং-এর ঘনিষ্ঠতম মন্ত্রী ছিলেন। তাঁর কাছ থেকে সেই ধুরন্ধর গুপ্তপুরুষটি এক অত্যন্ত গোপন ও চাঞ্চল্যকর কাহিনি উদ্ধার করেন। তিনি সেই দীর্ঘ কাহিনি লিপিবদ্ধ করে তিব্বত রাজপুত্র ঠ্রিসং দেৎসেনের উদ্দেশে একটি দীর্ঘ পত্র প্রেরণ করেন। কুমার দেৎসেন সেটির গুরুত্ব অনুধাবন করে ভন্তে কমলশীলের হাতে দেন। কমলশীল রাজপুত্র পদ্মসম্ভবের সহায়তায় সেই পত্রটি সহ আরও দুখানি অতি মূল্যবান বস্তু সঙ্গে নিয়ে গৌড়ে ফিরে আসতে সমর্থ হয়। সেই পত্রটির সহায়তায় আমি সমগ্র পরিস্থিতি সম্যকভাবে অনুধাবন করতে সক্ষম হয়েছি। অসামান্য এবং অত্যাশ্চর্য কাহিনি। তবে তার আগে চীনদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আপনাদের জানা উচিত। আপনারা মন দিয়ে শুনুন।
আজ থেকে শত বৎসর পূর্বে চীনদেশ শাসন করছিলেন তাং বংশের মহাপরাক্রমশালী সম্রাট তাইজং এবং তাঁর পুত্র সম্রাট গাওজং।
চীন সম্রাটদের মধ্যে রাজ্যের সুন্দরীতম কন্যাদের উপপত্নীরূপে গ্রহণ করার প্রথা আছে। রাজার রক্ষিতা হতে পারা চীনদেশে বিশেষ গৌরবের বিষয়। রাজানুগ্রহপ্রার্থীরা সম্রাটের অন্তঃপুরে নিজ নিজ কন্যাদের পাঠাতে পারলে নিজেদের সৌভাগ্যবান বিবেচিত করেন।
সম্রাট তাইজং-এর উপপত্নীদের মধ্যে একটি চতুর্দশী কন্যা ছিল, নাম য়ু জেতিয়ান। তার পিতা ছিলেন তাং রাজসভার এক উচ্চপদস্থ রাজন্য।
য়ু জেতিয়ান তাঁর সময়ের নারীদের তুলনায় বিদ্যায় ও বুদ্ধিতে অনেকাংশে অগ্রসর ছিলেন। তিনি লিখতে ও পড়তে পারতেন। বিবিধ বাদ্যযন্ত্রে তাঁর নৈপুণ্য ছিল। তাঁর প্রতিভা দেখে সম্রাট তাইজং চমৎকৃত হন এবং য়ু জেতিয়ানকে তাঁর সচিব পদে নিয়োগ করেন।
য়ু জেতিয়ান অত্যন্ত বুদ্ধিমতী এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষী নারী ছিলেন। তিনি দ্রুত রাজকার্য-সংক্রান্ত যাবতীয় নিয়ম ও পদ্ধতি শিখে নেন এবং রাজসভায় তাঁর প্রভাব বিস্তার করতে থাকেন। বিদেশনীতি বা কূটনীতিতে তাঁর আশ্চর্য ব্যুৎপত্তি ছিল। তিব্বতরাজ স্রোংচান গ্যাম্পোর সঙ্গে রাজকুমারী ওয়েনচেং-এর বিবাহও তাঁর বুদ্ধিতেই স্থির করা হয়। ক্রমেই তিনি সম্রাটের নির্ভরযোগ্য সঙ্গিনী হয়ে ওঠেন।
এই সময়েই তাঁর পরিচয় হয় সম্রাট তাইজং এর সন্তান, তরুণ রাজপুত্র গাওজং এর সঙ্গে।
কিন্তু পরিচয় ঘনিষ্ঠ হওয়ার আগেই সম্রাট তাইজং মৃত্যুবরণ করেন।
চীনের প্রথা হচ্ছে সম্রাট দেহরক্ষা করলে রাজার সমস্ত উপপত্নীদের মস্তক মুণ্ডন করে সঙ্ঘের শরণ নিতে হয়, যাতে রাজার উচ্ছিষ্ট অন্য কেউ ভোগ করতে না পারে। সম্রাট তাওজং-এর তিরোধানের পর য়ু জেতিয়ানও সেই প্রথানুসারে সঙ্ঘে প্রবেশ করেন। কিন্তু এরপরেই ঘটে যায় এক আশ্চর্য কাণ্ড। কয়েকমাস পরেই দেখা গেল য়ু জেতিয়ান ফিরে এসেছেন রাজপ্রাসাদে, এবং নির্বাচিত হয়েছেন নতুন সম্রাট গাওজং-এর প্রধানা উপমহিষী রূপে।’
‘এ যে ঘোর অজাচার।’ অস্ফুটস্বরে বললেন বপ্যট।
ম্লান হেসে মাথা নাড়লেন মৎস্যেন্দ্রনাথ। ‘সেই অজাচারের বিষই তো প্রবেশ করেছে বঙ্গদেশের রাজপ্রাসাদে। নইলে রাজকুমার আনন্দচন্দ্রের সঙ্গে তাঁর বিমাতার বিবাহ কি আমরা দুঃস্বপ্নেও আশঙ্কা করেছিলাম মিত্র বপ্যট?’
বপ্যট চুপ করে গেলেন। একটু থেমে আবার বলতে শুরু করলেন মৎস্যেন্দ্রনাথ।
‘সম্রাট গাওজং দুর্দান্ত প্রকৃতির সম্রাট হলেও কোনও এক অজানা রোগে প্রায়শই রাজকর্ম থেকে অব্যাহতি নিতেন। তাঁর পরিবর্তে রাজকার্য সামলাতেন তাঁর প্রিয়তমা উপপত্নী, য়ু জেতিয়ান।
বলা বাহুল্য, য়ু জেতিয়ানের এই উত্থান রাজসভার অনেকেই ভালোভাবে নেননি। তবে তাঁদের ক্ষোভ নিয়ে সম্রাটের ঘনিষ্ঠতম উপপত্নীর কোনও চিন্তা ছিল না। তাঁর দুশ্চিন্তা ছিল অন্য দুই মহিলাকে নিয়ে। সম্রাটের বৈধ পত্নী, সম্রাজ্ঞী ওয়াং; এবং য়ু জেতিয়ানের পূর্বে যিনি প্রধানা উপপত্নী ছিলেন, সেই সুন্দরীশ্রেষ্ঠা ঝাও শুফেই।
সম্রাজ্ঞী ওয়াং সন্তানহীনা ছিলেন। ঝাও শুফেই-এর একটি পুত্র ও দুটি কন্যাসন্তান ছিল। প্রথা অনুযায়ী ঝাও-এর জ্যেষ্ঠ পুত্রেরই পরবর্তী সম্রাট হওয়ার কথা। কিন্তু তাঁরা প্রমাদ গণলেন যখন য়ু জেতিয়ান পরপর দুটি পুত্রসন্তানের জন্ম দিলেন। সম্রাট যদি প্রথার বিরুদ্ধে গিয়ে ঝাও শুফেই-এর পুত্রের বদলে প্রিয়তমা য়ু জেতিয়ানের পুত্রকে উত্তরাধিকারী নির্বাচিত করেন?
এই নিয়ে রাজপ্রাসাদের মধ্যে একটা চোরা স্রোত বইতে লাগল।
এদিকে সম্রাটের শারীরিক অবস্থার দিন দিন অবনতি হচ্ছে। রাজকার্য পরিচালিত হচ্ছে য়ু জেতিয়ান-এর পরামর্শ অনুসারে। রাজবৈদ্য সন্দেহ করছেন রাজার ওপর কোনও দীর্ঘস্থায়ী কিন্তু অব্যর্থ বিষপ্রয়োগ করা হয়েছে। সন্দেহের তীর য়ু জেতিয়ানের দিকেই। কিন্তু তার কোনও প্রমাণ নেই।
এমন সময় য়ু জেতিয়ানের একটি কন্যাসন্তান হয়। আর এখান থেকেই সমস্ত সর্বনাশের শুরু।’
সবাই একটু নড়ে চড়ে বসেন। প্রদীপের শিখা ম্লান হয়ে আসছিল। কান্তিপ্রভ প্রদীপের মধ্যে একটু সর্ষের তেল ঢেলে দিতে পলিতাটি ফের উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
‘যেদিন কন্যা জন্মগ্রহণ করে, সেইদিনই সন্ধেবেলায় তার মৃতদেহ আবিষ্কৃত হয়। শিশুটির গলায় ছিল আঙুলের দাগ। স্পষ্ট বোঝা যায় কেউ শ্বাসরূদ্ধ করে হত্যা করেছে এই সদ্যোজাত নিষ্পাপ শিশুটিকে।
‘য়ু জেতিয়ান অভিযোগ আনেন--সন্তানহীনা সম্রাজ্ঞী ওয়াং ঈর্ষাবশত তাঁর কন্যাকে হত্যা করেছেন। কারণ মৃত্যুর আগে শেষবারের মতো যখন শিশুটিকে জীবিত দেখা যায়, তখন সম্রাজ্ঞী ওয়াং ছাড়া তার কাছে আর কেউ ছিল না। আর এই ঘৃণ্যকর্মে তাঁকে যোগ্য সহায়তা করেছেন ঝাও শুফেই!
তাং বংশের বিচারব্যবস্থা বড়ই কঠিন। সম্রাজ্ঞী ওয়াং এবং ঝাও শুফেই-এর বিরুদ্ধে বিচার শুরু হল। সম্রাজ্ঞীরা নির্দোষ প্রমাণ করতে পারলেন না। তাঁদের হাত পা কেটে মদের জালার মধ্যে ডুবিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হল। য়ু জেতিয়ানের পথ নিষ্কণ্টক হল। তিনি সম্রাট গাওজং-এর প্রধানা মহিষীর পদে অধিষ্ঠিতা হলেন। শিশুটির মৃতদেহ নিয়ে য়ু জেতিয়ান চলে গেলেন তাঁর পিতৃগৃহে, সেখানেই সমাধিস্থ করবেন বলে।
এরপর য়ু জেতিয়ান-এর দ্রুত উত্থান ঘটে। কালক্রমে তিনি মহাচীনের প্রথম এবং অদ্যাবধি একমাত্র নারী শাসকের পদে আসীন হন। কিন্তু এই অবধি যা বললাম, তা সবই প্রকাশ্য কাহিনি৷ তাহলে রিনছেন সাংপো’র হাতে এমন কী তথ্য তুলে দিলেন সেই বৃদ্ধ?
‘তিনি তুলে দিয়েছিলেন য়ু জেতিয়ান-এর শৈশব, পরিবার এবং ওই মৃত শিশুটি নিয়ে এক রোমহষর্ক সত্য, যা বহু সাবধানে গোপন রাখা হয়েছিল রাজপরিবারের পক্ষ থেকে। সেই রোমহর্ষক তথ্যটি জ্ঞাত হওয়া মাত্র গুপ্তচরশ্রেষ্ঠ রিনছেন সাংপো তার গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারেন। তিনি তাঁর অধীনস্থ সমস্ত গুপ্তচরদের আদেশ দেন য়ু জেতিয়ানের শৈশবের ব্যাপারে যাবতীয় সংবাদ সংগ্রহ করে আনতে। তিব্বতী গুপ্তপুরুষেরা বহু কষ্টে যেসব তথ্য উদ্ধার করে এনেছেন, সেসব একত্র করে কাহিনিটিকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দেওয়া গেছে।’
উপস্থিত প্রত্যেকে নিঃশ্বাস বন্ধ করে মৎস্যেন্দ্রনাথের প্রতিটি কথা শুনছিলেন। বাইরে তখন রাতচরা পাখির টি টি শব্দের সঙ্গে মিশেছে মৃদু বাতাসের শব্দ। এই কুটিরটি কমলাঙ্ক গ্রামের একদম শেষপ্রান্তে, অরণ্যের সীমারেখার ভিতরে। বৃক্ষশাখানির্মিত কুটিরটি একটি অতি বৃহৎ অশ্বত্থের পাদদেশে অবস্থিত। সেটির চারিপাশে নেমে এসেছে অশ্বত্থের বৃহৎ কাণ্ডজটারাশি। বহিরাগত কারও পক্ষে এই গোপন গৃহটি আবিষ্কার করা শুধু কঠিনই নয়, অসম্ভবও বটে।
কান্তিপ্রভ’র আদেশ বা অনুরোধে অরণ্যচারী কিরাতদল এই গোপন কুটির প্রস্তুত করে দিয়েছে মাসাধিককাল পূর্বে। ব্রাহ্মণ কান্তিপ্রভ এই কিরাতদের স্পর্শ করেন না বটে, কিন্তু এদের সুখ সুবিধার যথেষ্ট সংবাদ রাখেন। এদের বক্তব্য গ্রামিক বা পঞ্চকুল অবধি পৌঁছে দেওয়া, কারও জটিল রোগব্যাধিতে গ্রামের একমাত্র অম্বষ্ঠ বৈদ্যটির কাছ থেকে ঔষধ এনে দেওয়া, এইসব দায়িত্ব তিনি স্বেচ্ছায় নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন। তাই তারাও তাঁকে ঈশ্বরপ্রতিম শ্রদ্ধা করে। অন্যান্য ব্রাহ্মণেরা এজন্য তাঁকে যথেষ্ট উপহাস করেন বটে, তবে কান্তিপ্রভ সেসব স্মিতহাস্যে এড়িয়ে যান।
আপাতত এই কুটিরের বাইরে উন্মুক্ত তরবারি হস্তে প্রহরারত আছেন রাজকুমার পদ্মসম্ভব এবং বপ্যটপুত্র গোপালদেব। আরও কিছু দূরে ধনুর্বাণ ও কুঠার হাতে আপাতঅদৃশ্য প্রহরাবৃত্ত রচনা করে রয়েছে অরণ্যচারী কিরাতদল। তাদের চোখ এবং কান এড়িয়ে একটি শশকও প্রবেশ করতে পারবে না এই গোপন কুটিরে, এতই নিশ্ছিদ্র সেই প্রহরা।
‘কথিত আছে যেদিন য়ু জেতিয়ান জন্ম নেন, সেইদিন ছিল পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ, যা কি না সমগ্র চীনদেশ জুড়ে দৃশ্যমান ছিল। সেই অত্যন্ত অশুভ সময়ে জন্মগ্রহণ করা নারীটি জন্ম থেকেই কিছু আশ্চর্য ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। আগেই বলেছি, তাঁর বাবা য়ু শিহুও ছিলেন একজন প্রভাবশালী রাজকর্মচারী। তিনি তাঁর একমাত্র কন্যাকে সাধ্যমত শিক্ষাদান করেন, যা ওই দেশের নারীদের পক্ষে বিরল ঘটনা। তবে তার কারণ ছিল।
‘য়ু শিহুও’র পরিবারে বহু প্রাচীন কাল থেকে এক বিশেষ গুপ্তবিদ্যার প্রচলন ছিল--বিষবিদ্যা। বিষ ও বিষের প্রতিষেধক, এ বিষয়ে তাঁদের কাছে সহস্রাধিক বৎসরের সঞ্চিত বিদ্যার আধার ছিল। তাঁরা জানতেন না এহেন বিষের সন্ধান এই পৃথিবীতে নেই। সেই বিষবিদ্যা দিয়ে তাঁরা প্রাণহরণ করতেও জানতেন, প্রাণদান করতেও জানতেন। তাঁরা জানতেন কীভাবে এই বিদ্যার প্রয়োগে মানুষকে দীর্ঘজীবন দান করা যায়, ইচ্ছামৃত্যুর অধিকারী করা যায়, আশ্চর্য ঐশী ক্ষমতা অধিগত করা যায়।
‘য়ু জেতিয়ান শৈশব থেকেই সেই বিদ্যায় অদ্ভুত ব্যুৎপত্তি দেখাতে থাকেন। তাঁর পরিবারের লোকজন নিজেদের মধ্যে বলাবলি করত যে, সাক্ষাৎ নাগমাতা কা দে লু তাঁদের পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছেন। অবিশ্বাস্য দ্রুততায় যাবতীয় বিষবিদ্যা অধিগত করাই শুধু নয়, নিজের প্রতিভায় য়ু জেতিয়ান এক আশ্চর্য উদ্ভাবন করেন। তার রাসায়নিক প্রয়োগে একজন মানুষকে জড়পদার্থে পরিণত করে রাখা যায়। আবার বিরুদ্ধ রসায়ন প্রয়োগে তাকে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনা যায়।
‘তবে যে বিশেষ বিষবিদ্যায় য়ু জেতিয়ান আশ্চর্য প্রসিদ্ধি লাভ করেন তার নাম আমার জানা নেই বটে, কিন্তু তার প্রয়োগের ফলে যে কী অনর্থ উৎপন্ন হয় সেটি আমরা, বঙ্গবাসীরা, অস্থিতে অস্থিতে অনুভব করছি।’
‘কী সে বিদ্যা, প্রভু?’ শুষ্ক স্বরে প্রশ্ন করলেন জয়াপীড়।
‘নাগকন্যা।’ ফিসফিস করে বললেন মৎস্যেন্দ্রনাথ, ‘য়ু জেতিয়ান পারতেন একজন নারীকে অর্ধেক মানুষী, অর্ধেক নাগিনী করে তুলতে৷ সেই নারী তখন তার নিজের ইচ্ছায় একবার মানুষী আরেকবার নাগিনীরূপ ধারণ করতে পারত। তার বিষের তীব্রতা এতই প্রবল যে শিকারের সমস্ত দেহ ঘোর কৃষ্ণবর্ণ ধারণ করে। সেই মৃতদেহ এতই বিষাক্ত হয়ে দাঁড়ায় যে সেটি স্পর্শমাত্রে স্পর্শকের জীবন সংশয় হতে পারে।’
ঘোর উত্তেজনায় উঠে দাঁড়ালেন বপ্যট, ‘এ যে অবিশ্বাস্য! আপনি কী বলতে চাইছেন লোকেশ্বর? বঙ্গদেশের রানি প্রকৃতপক্ষে...’ অন্যান্যরাও শ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে রইলেন মৎস্যেন্দ্রনাথের দিকে।
এই সময়ে দূরে কোথাও যেন একটা ক্ষীণ শিসের শব্দ হল। কিন্তু প্রত্যেকে এতই উত্তেজিত ছিলেন যে কেউ বিশেষ মনোযোগ দিলেন না।
ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন মৎস্যেন্দ্রনাথ। তারপর গম্ভীরস্বরে বললেন, ‘হ্যাঁ ভ্রাতা বপ্যট, তাং সম্রাজ্ঞী য়ু জেতিয়ানের সেই আপাতমৃত কন্যাই এই দেশের রানি।’
উপস্থিত প্রত্যেকে প্রস্তরবৎ বসে রইলেন। কারও মুখে একটি শব্দ উচ্চারিত হল না।
দীর্ঘশ্বাস ফেললেন মৎস্যেন্দ্রনাথ, ‘আমার কাছে প্রত্যক্ষ প্রমাণ নেই বটে, তবে সমস্ত সূত্র একই দিকে ইঙ্গিত করছে। নিজের সদ্যোজাত শিশুকন্যাটিকে উচ্চাকাঙ্ক্ষীর যূপকাষ্ঠে বলি দিয়েছিলেন নাগসম্রাজ্ঞী য়ু জেতিয়ান। নিজের উদ্ভাবিত বিষে তাকে মৃতবৎ আচ্ছন্ন করে রাখেন, এবং তার কণ্ঠে স্বহস্তের পাঁচ অঙ্গুলির ছাপ এঁকে দেন, যাতে সম্রাজ্ঞী ওয়াং এবং ঝাও শুফেইয়ের ওপর সেই ঘৃণ্য অপরাধের কলঙ্কলেপন করা যায়৷ তাঁদের মৃত্যুদণ্ডের দিকে ঠেলে দেওয়া যায়।
তারপর তিনি শিশুটিকে নিয়ে চলে যান তাঁর পিতৃগৃহে, পারিবারিক সমাধিস্থলে৷ সেখানে তিনি শিশুটিকে জীবিতাবস্থায় ফিরিয়ে আনেন। লোকচক্ষুর অন্তরালে শিশুকন্যাটি বড় হতে থাকে, যতদিন না তাকে বৃহত্তর উদ্দেশে উৎসর্গ করা যায়।’
‘কিন্তু লোকেশ্বর, চীনের এক উচ্চাকাঙ্ক্ষী রাজরক্ষিতার সঙ্গে বঙ্গদেশের ভাগ্য এমন অচ্ছেদ্য বন্ধনে জড়িয়ে গেল কী করে?’ প্রশ্ন করলেন শান্তরক্ষিত।
দীর্ঘশ্বাস ফেললেন মৎস্যেন্দ্রনাথ, ‘নিয়তি, নিয়তি কেন বাধ্যতে! নইলে চীন আর তিব্বতের অন্তর্বিরোধের ছায়া বঙ্গদেশের ভাগ্যাকাশে এমন পূর্ণগ্রাস গ্রহণ ডেকে আনবে কেন?
‘তাং বংশ অতি উচ্চাকাঙ্ক্ষী রাজবংশ। মহারাজ তাইজং বিশ্বাস করতেন পূর্ব চীন সমুদ্র থেকে কাম্বোজ দেশ, গান্ধার থেকে ভারতভূমি শাসন করার একমাত্র ঈশ্বরদত্ত অধিকার মহান তাং রাজবংশের। তিনি এও জানতেন ভারতবর্ষ অধিকার করার পথে তাঁর সবচেয়ে বড় কাঁটা তিব্বত। তিব্বত অধিকারে না এলে মহাচীনের পক্ষে ভারতভূমি হস্তগত করার স্বপ্ন সফল হবে না।
কিন্তু তখন তিব্বতে এক নতুন নায়ক মাথা তুলছেন, স্রোংচান গ্যাম্পো। সাহসে দুর্জয়, যুদ্ধে রণদুর্মদ মহাবীর। তাঁকে প্রত্যক্ষ সংগ্রামে পরাস্ত করা দুর্ধর্ষ তাইজং-এর পক্ষেও অসম্ভব। নিয়তির নির্বন্ধে সম্রাটের সামনে এক সুবর্ণসুযোগ এসে উপস্থিত হল।
‘স্রোংচান গ্যাম্পো একবার চীন দেশ ভ্রমণে এসে এক অভিজাতবংশীয়া চীনা তরুণীর সঙ্গে পরিচিত হন এবং প্রথম দর্শনেই তাঁর প্রেমে পড়েন। এঁর নাম রাজকুমারী ওয়েনচেং, সম্রাট তাইজং-এর দূরসম্পর্কের এক ভাই দাওজং-এর কন্যা। স্রোংচান গ্যাম্পো তাং রাজসভায় রাজকুমারী ওয়েনচেং-এর সঙ্গে তাঁর বিবাহের প্রস্তাব পাঠালেন।
‘কিন্তু দাওজং রাজসভার মহা প্রতিপত্তিশালী রাজন্য, একাধারে মহাসান্ধিবিগ্রহিক এবং প্রধান বিচারপতি। তিনি এই অর্ধবর্বর তিব্বতী রাজার সঙ্গে তাঁর মেয়ের বিবাহ দিতে অস্বীকৃত হলেন।
ক্রুদ্ধ স্রোংচান গ্যাম্পো সসৈন্যে তাং রাজধানী লুওই-ইয়াং অবরোধ করলেন। অসভ্য বর্বর তিব্বতী সৈন্যবাহিনীর হাতে তাং রাজবংশের প্রশিক্ষিত সেনাবাহিনীর শোচনীয় পরাজয় ঘটল। প্রত্যাখ্যাত স্রোংচানের ক্রোধাগ্নিতে ভস্মীভূত হতে থাকল লুওই-ইয়াং-এর পার্শ্ববর্তী গ্রাম ও নগরসমূহ।
এইসময় রঙ্গমঞ্চে প্রবেশ করলেন য়ু জেতিয়ান। তিনি প্রশ্ন করলেন—এত অনর্থক বাদ বিসম্বাদ যুদ্ধোদ্যোগ কীসের জন্য? জয়লক্ষ্মী যখন স্বয়ং রাজদ্বারে উপস্থিত, তখন ভল্ল তরবারি সহযোগে তাঁকে তাড়না করার অর্থ কী?’...
কুটিরের বাইরে থেকে অত্যন্ত ক্ষীণ কিছু শাখাপ্রশাখা ভাঙার শব্দ উঠেই থেমে গেল। বপ্যট একবার ভ্রুকুঞ্চন করে দরজার দিকে তাকালেন। তারপর পুনরায় কাহিনিতে মনোনিবেশ করলেন।
‘য়ু জেতিয়ান সম্রাটকে বোঝালেন—তিব্বতকে বশীভূত করার এই হচ্ছে সুবর্ণ সুযোগ। একবার যদি রাজঅন্তঃপুর করায়ত্ত হয়, রাজা যদি চীন রাজকুমারীর সৌন্দর্যে বশীভূত হন, তাহলে তিব্বত রাজসভায় চৈনিক প্রভাব বিস্তার করতে কতক্ষণ? দেশ দখল করতে হলে সদাসর্বদা যে তার ভূমিই দখল করতে হবে তার কী প্রয়োজন!
মহারাজ তাইজং এই যুক্তিতে চমৎকৃত হলেন। বিশ্বস্ত ভ্রাতা দাইজং-কে প্রাসাদে ডেকে প্রভূত পরামর্শ হল। অবশেষে কুমারী ওয়েনচেং তিব্বতনরেশ স্রোংচান গ্যাম্পো’র ঘরণী হয়ে, শাক্যমুনির তরুণ রাজকুমারমূর্তি নিয়ে, পোতালা প্রাসাদে গমন করলেন। চীন সম্রাটের পরিকল্পনা কালসর্প হয়ে তিব্বত রাজ-অন্তঃপুরবাসিনী হল।
কিন্তু য়ু জেতিয়ান আর সম্রাট তাইজং-এর ষড়যন্ত্র সফল হল না।
স্রোংচান গ্যাম্পো’র প্রথমা স্ত্রী ছিলেন লিচ্ছবিরাজ অংশুবর্মণের কন্যা ভৃকুটী। তিনি ভগবান তথাগত’র পুণ্য জন্মস্থান কপিলাবস্তুর ভূমিকন্যা। তিনিও বিবাহের পর তারা, অক্ষোভ্য এবং মৈত্রেয়মূর্তি নিয়ে এসেছেন। তিব্বতরাজ স্রোংচান গ্যাম্পো দুই মহিষীর জন্য দুটি পৃথক মন্দির নির্মাণ করে দিলেন। তাঁর উৎসাহে তিব্বতীয় লিপি ও ব্যাকরণের জন্ম হল। বিভিন্ন বৌদ্ধ পুঁথির পাঠোদ্ধার করে তার তিব্বতীয় অনুবাদ শুরু হল। শুরু হল দুই মহিষীর মধ্যে প্রাধান্য বিস্তারের সংগ্রাম।
তিব্বতের রাজসভায় সামন্তশাসকরা চিরকালই প্রভূত ক্ষমতা ভোগ করে এসেছেন। তাঁরা মহারাজের বৌদ্ধধর্মে মতির কথা শুনে আশঙ্কিত হলেন। স্পষ্ট হয়ে গেল যে সম্রাট সামন্তপ্রভাব খর্ব করে নিরঙ্কুশ প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করতে চান। সামন্তরা প্রায় প্রত্যেকেই তিব্বতের প্রাচীন পোন ধর্মের অনুসারী। তাই রাজদণ্ড এবং সামন্তচক্রের এই দ্বৈরথে মহারাজ স্রোংচান গ্যাম্পো অবলম্বন করলেন বৌদ্ধধর্ম, আর তাতে তাঁর প্রধান সঙ্গী হলেন তাঁর মহিষী ভৃকুটী।
দুই মহিষীর মধ্যে মনোমালিন্যের কথা গোপন রইল না। সামন্তরা দেখলেন শক্তিবৃদ্ধির এই সুবর্ণসুযোগ। তাঁরা গোপনে রাজ্ঞী ওয়েনচেং-এর পক্ষাবলম্বন করলেন। তাং রাজসভার সঙ্গে তাঁদের যোগসূত্র তৈরি হল। তাঁরা সম্রাট তাইজং-কে জানালেন তিব্বতনরেশকে নৈতিক শক্তি যোগাচ্ছেন ভারতীয় বৌদ্ধপণ্ডিত, শ্চেনমুনপা’রা। আরও বিশেষ করে বলতে গেলে বঙ্গদেশের বৌদ্ধপণ্ডিতবর্গ।’
‘সেইদিনই প্রবল ক্রুদ্ধ হলেন তাইজং এবং য়ু জেতিয়ান। তাং বংশ সহস্রাধিককাল রাজত্ব করবে, এই সসাগরা পৃথিবী তার অধীনস্থ হবে, এর কি অন্যথা হতে পারে কখনও? সেই ইশ্বরনির্দিষ্ট পথ রোধ করে রাখবে ক’জন নির্বীর্য বঙ্গদেশী বৌদ্ধপণ্ডিত?
‘সেইদিনই দু’জনে বঙ্গদেশের সর্বাংশে সর্বনাশ সাধনে বদ্ধপরিকর হন। তাঁরা প্রতিজ্ঞা করেন—প্রয়োজন হলে দীর্ঘকালব্যাপী পরিকল্পনা নিতে হবে, যাতে বঙ্গদেশের সমূহ ক্ষতি হয়।
‘কী করে সেই কূটপরিকল্পনা সফল হবে?
তাঁরা স্থির করেন—সর্বাগ্রে বঙ্গদেশের ধর্মনাশ করতে হবে। কারণ সম্রাট তাইজং জানতেন যে, ধর্ম দুষ্ট হলে মানুষ নষ্ট হয়, আর মানুষ নষ্ট হলে দেশ উৎসন্নে যায়। তিনি জানতেন ধর্মহীন, নীতিহীন দেশের থাকা না-থাকা সমান।’
এই সময় বাইরে বেশ কিছু রাতচরা পাখি কাছেই টি টি করে ডেকে উঠল। বপ্যটের ভ্রু কুঞ্চিত হল। তিনি ভ্রুকুঞ্চিত করে মৎস্যেন্দ্রনাথের দিকে তাকালেন। চোখে চোখে কথা হয়ে গেল। বপ্যট তাঁর তরবারি উঠিয়ে নিয়ে নিঃশব্দে বাইরে চলে গেলেন।
‘কিন্তু এই পরিকল্পনা রূপায়ণের পথে মস্ত অসুবিধা ছিল। এর জন্য তাঁদের প্রয়োজন ছিল এমন একজন অলৌকিক শক্তিসম্পন্ন মানুষের, তাং রাজবংশের অনুগত এমন একজন ভৃত্যের, কূটপ্রতিভায় যে অতুলনীয়। যার দেহ বঙ্গদেশের জলবায়ুতে পুষ্ট, কিন্তু বিবেক ও চৈতন্য তাং বংশের কাছে বন্ধকীকৃত। তার জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য সম্রাট তাইজং-এর আদেশানুসারে বঙ্গদেশের সর্বনাশ করা।
আর সেই মাহেন্দ্রক্ষণে য়ু জেতিয়ান-এর কাছে এসে পৌঁছলেন এক তরুণ ক্রীতদাস, যার জন্ম বঙ্গদেশে৷ এবং যার জন্মলক্ষণ তাঁর নিজের জন্মলক্ষণের সঙ্গেও মিলে যায়।’
‘কিন্তু তিনি, মানে প্রকাশচন্দ্র সেখানে পৌঁছলেন কী করে?’ অন্ধকারে প্রশ্নটি ভেসে এল৷
‘প্রকাশচন্দ্রের জীবনের প্রথম দিকের কাহিনি এখানে অনেকেই অবগত। তবু আপনার অবগতির জন্য জানাই, ইনি হরিকেলের চন্দ্রবংশের মহারাজ দিবানাথের ঔরসজাত পুত্র। দিবানাথ যখন হরিকেলের শাসনক্ষমতা অধিকার করেন, তখন বঙ্গদেশ শাসন করছেন সম্রাট দেবখড়্গ। দিবানাথ দুর্দান্ত প্রকৃতির সামন্ত ছিলেন। তাঁকে বশ করতে সম্রাটকে যথেষ্ট কষ্ট স্বীকার করতে হয়েছিল।
‘প্রকাশচন্দ্র পালিত হন মহারাজের আত্মীয়, অনন্তচন্দ্রের গৃহে। অনন্তচন্দ্র বণিক ছিলেন। প্রকাশচন্দ্র যখন পঞ্চদশবর্ষীয় বালক, তখন অনন্তচন্দ্র তাঁকে সঙ্গে নেন যবদ্বীপে বাণিজ্যের উদ্দেশে। সেই যাত্রায় প্রবল সামুদ্রিক ঝড়ে অনন্তচন্দ্রের নৌবহর ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। তাঁর সঙ্গীসাথীদের প্রায় সকলের সলিলসমাধি ঘটে। অনন্তচন্দ্র কোনওক্রমে বেঁচে যান। বহু শ্রমে, বহু ক্লেশে তিনি তাঁর দু-তিনজন জীবিত সঙ্গীদের নিয়ে দেশে ফিরে আসেন। প্রকাশচন্দ্রের কোনও খোঁজ পাওয়া যায় না। সবাই অনুমান করে নেন, প্রকাশচন্দ্রও সেই সামুদ্রিক ঝড়ে নিহত হয়েছেন।’
ঠিক এই সময়েই ঘরের দরজা ক্ষণিকের জন্য উন্মুক্ত হয়েই বন্ধ হয়ে গেল। বায়ুপ্রবাহের জন্য? বুঝলেন না মৎস্যেন্দ্রনাথ। কিছু ক্ষীণ শব্দ ভেসে এল দরজার সামনে থেকে।
‘তার প্রায় বিশ বৎসর পর, তখন বঙ্গদেশের সিংহাসনে আসীন খড়্গসম্রাট রাজভট, প্রকাশচন্দ্র দেশে ফিরে এলেন। সঙ্গে এক অপরূপা সুন্দরী নারী। সেই নারীকে সঙ্গে নিয়ে তিনি চন্দ্রবংশের শাসনভার হস্তগত করেন। বিশ বৎসর ধরে তিনি কোথায় ছিলেন, কী করছিলেন, কীভাবে ফিরে এলেন, ফিরে আসার পর কীভাবে তিনি নিজের পরিচয় প্রমাণ করলেন—সেসব দীর্ঘ কাহিনি। তাতে আমাদের প্রয়োজন নেই। শুধু একদিন অকস্মাৎ জানা গেল, চন্দ্রবংশের শাসনভার অধিগত হয়েছে প্রকাশচন্দ্রের হাতে। তার সঙ্গে হরিকেল জুড়ে তিনি এক নতুন ব্যভিচারী ধর্ম শুরু করেছেন৷
তারপর ধীরে ধীরে তিনি কীভাবে সম্রাট বলভটকে বশ করে সম্রাটের মাতুল চারুদত্ত’র সহায়তায় বঙ্গদেশের শাসনে অধিষ্ঠিত হলেন, সেই কাহিনি আমাদের জানা৷ তবে আমি নিঃসন্দেহ যে তাঁর সঙ্গে আসা নারীটিই সম্রাজ্ঞী য়ু জেতিয়ান-এর সেই কন্যা, এবং বঙ্গদেশের বর্তমান রানি।’
একটু আগের কণ্ঠ ফের বলে উঠল, ‘বাহ বাহ, শৈবযোগী দেখছি একজন অতি উৎকৃষ্ট মহাসান্ধিবিগ্রহিক তথা গুপ্তপুরুষও। দেশ বিদেশের অনেক সংবাদ রাখেন। রাজ সচিব প্রকাশচন্দ্র আর আমাদের রাজ্ঞীর সর্বাঙ্গীন পরিচয় জানার জন্য জীবনপাতই করে ফেলেছেন। তা মহাপ্রাজ্ঞ যোগীপ্রবর আপাতত নিজের সঙ্গীসাথীদের সংবাদ রেখেছেন কি?’
চমকে উঠলেন ঘরের প্রত্যেকে। মুহূর্তে ঘরের ভেতরে ঢুকে এসেছে কয়েকজন মানুষ, তাদের হাতে মশাল। সেই আলোয় দেখা গেল, অন্তত দশজন সশস্ত্র রাজসেবকসৈন্য ঘিরে ধরেছে তাঁদের।
জয়াপীড় হুঙ্কার দিয়ে তাঁর অসিটি কোষমুক্ত করতে যাচ্ছিলেন, একটি তীক্ষ্ণধার ভল্ল তাঁর স্কন্ধস্পর্শ করল।
বাহিনীর প্রধানের দিকে তাকিয়ে মৎস্যেন্দ্রনাথ স্থির কণ্ঠে বললেন, ‘কী সৌভাগ্য, মহাপ্রতীহার শান্তঘোষ স্বয়ং। পথ চিনে আসতে কষ্ট হয়নি মহাত্মন? সব কিছু কুশল ও মঙ্গল তো?’
শান্তঘোষের চোখ একবার জ্বলেই নিভে গেল। শীতলস্বরে বললেন, ‘আমার সব কিছুই অত্যন্ত কুশল ও মঙ্গল যোগীবর। এবার সঙ্গীসাথীসহ গাত্রোত্থান করুন, মহারাজ্ঞী স্বয়ং আপনাদের সঙ্গে কিছু বার্তালাপ করতে চান। আর মহারাজসচিব তথা মহামাত্য প্রকাশচন্দ্র তো আপনাদের সঙ্গে আলাপিত হওয়ার জন্য বড়ই উদগ্রীব হয়ে আছেন।’
মৎস্যেন্দ্রনাথ যুক্তকর মাথায় ঠেকালেন, ‘মহারানির অসীম অনুগ্রহ।’
‘আর তুমি, মূর্খ ব্রাহ্মণ,’ কান্তিপ্রভ’র দিকে ফিরলেন শান্তঘোষ, ‘শেষবার নিজের পত্নী ও কন্যার সঙ্গে দেখা করে যেও। অনেকদিনের সম্পর্ক তো, এটুকু দয়া আমরা করেই থাকি। আমাদের রাজসেবকসৈন্যরা আবার তোমার কন্যার সঙ্গে আলাপ করার জন্য অতি ব্যগ্র হয়ে উঠেছে।’
কান্তিপ্রভ কিছু বললেন না। নির্নিমেষে চেয়ে রইলেন শান্তঘোষের দিকে।
শান্তঘোষ এবার ফিরলেন আচার্য শান্তরক্ষিতের দিকে। ছদ্মবিস্ময়ের ভাব করে বললেন, ‘অহো, বঙ্গদেশের কী অসীম সৌভাগ্য, স্বয়ং আচার্য শান্তরক্ষিত আজ আমাদের মধ্যে এসে উপস্থিত হয়েছে। আপনার চরণস্পর্শে আজ এই দেশের প্রতিটি ধূলিকণা ধন্য হল ভন্তে। রাজ্ঞী আজকের রাত্রিটি আপনার সঙ্গে শাস্ত্রালোচনায় অতিবাহিত করবেন বলে স্থির করেছেন। আপনার আশৈশব ব্রহ্মচর্যের ব্যাপারে তাঁর কিছু জিজ্ঞাস্য আছে বলে মনে হল।’
চোখ বন্ধ করলেন ভারতবর্ষের শ্রেষ্ঠতম পণ্ডিত, শান্তরক্ষিত। ঠোঁট সামান্য নড়ে স্থির হল।
তরবারির অগ্রভাগ দিয়ে জয়াপীড়ের চিবুকটি নিজের দিকে ঘোরাবার চেষ্টা করলেন শান্তঘোষ। ব্যঙ্গস্বরে বললেন, ‘আহা, গৌড়েশ্বর জয়ন্ত উপযুক্ত জামাতাই পেয়েছেন বটে। পরের রাজ্যে তস্করের মতো প্রবেশ করে রাজদ্রোহে ইন্ধন সরবরাহ—এই তো জামাতার উপযুক্ত কর্ম। তবে বঙ্গদেশের জামাতা-আপ্যায়নের সুনাম আছে, সে সুনাম আমরা ক্ষুন্ন হতে দিতে পারি না। গাত্রোত্থান করুন৷ কাল না হয়...’
কথা বলতে বলতে শান্তঘোষ বোধহয় অন্যমনস্ক হয়েছিলেন। এই সুযোগেরই অপেক্ষায় ছিলেন জয়াপীড়। এক ঝটকায় তাঁর ডান কাঁধ স্পর্শ করে থাকা ভল্লটি ধরে টান দিতেই ভল্লধারী সৈন্য উলটে পড়ল সামনের দিকে। একই সঙ্গে বামহাত তাঁর কটিদেশ থেকে বার করে এনেছে একটি ছুরিকা। সেটি তিনি সজোরে বসিয়ে দিলেন শান্তঘোষের উরুদেশে। শান্তঘোষ চিৎকার করে উঠলেন। বাকি সৈন্যরা নিমেষে তাদের ভল্লগুলি তুলে জয়াপীড়ের ওপর লক্ষ স্থির করতেই মৎস্যেন্দ্রনাথ তৎক্ষণাৎ প্রদীপটি উলটে দিলে! জয়াপীড় ঝাঁপ দিলেন প্রকাশচন্দ্রের তরবারির দিকে।
বাইরে সশস্ত্র রাজসেবক সৈন্যরা নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়েছিল কুটির ঘিরে। তখন কুটিরের মধ্যে ঘটে চলেছে, অবিশ্বাস্য নাটক।
আনন্দগুপ্ত দূরে একটি অশ্বত্থের নীচে অপেক্ষা করছিলেন। আকাশে প্রথমার ক্ষীণ চন্দ্রমা। তাঁর মাথার ঠিক ওপরে একটি অশ্বত্থের শাখা দুলছিল। তাঁর মুখ একবার আলোকিত হচ্ছিল, আরেকবার অন্ধকার।
কান্তিপ্রভ’র উপর তাঁর গুপ্তচরদের অনেক দিন ধরেই লক্ষ ছিল। স্থানীয় সমিতি সূত্রে তিনি সংবাদ পাচ্ছিলেন যে, গত কয়েক মাস যাবৎ এই ব্রাহ্মণ কমলাঙ্ক গ্রামের যাবতীয় কিরাত, শবর এবং অন্ত্যজ শ্রেণীর কাছে ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছেন। তাঁর ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা স্থানীয় সমিতির প্রধান তথা গ্রামপতির কাছে ক্রমেই অস্বস্তিকর হয়ে উঠছিল।
বঙ্গদেশের অলিখিত নিয়ম, একমাত্র চন্দ্রবংশের অন্ধ অনুগামী বা তাঁদের অনুমোদিত গুটিকয় ভাগ্যবান ব্যতীত কারও পক্ষে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা নিষিদ্ধ। কারও মধ্যে সেই লক্ষণ দেখা গেলেই চন্দ্রবংশের পোষিত স্থানীয় সমিতির সদস্যরা সর্বশক্তি দিয়ে তার চরিত্র হননে নেমে পড়ে। তার নামে কালিমা, কুৎসা, মিথ্যে অভিযোগ আর স্বকপোলকল্পিত কলঙ্ককাহিনির স্রোত বইয়ে দেওয়া হয়।
কিন্তু শতেক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও এই ব্রাহ্মণের চরিত্রে বিন্দুমাত্র কালিমালেপন সম্ভব হয়নি। কান্তিপ্রভ’র পাণ্ডিত্য, চরিত্র, বিনয় এবং সুমধুর ব্যবহার তাঁকে ক্রমেই কমলাঙ্ক গ্রামে জনপ্রিয় করে তুলছিল। এতে আনন্দগুপ্ত’র উদ্বেগ বেড়েছে বই কমেনি।
ঠিক এই সময়ে অশ্বত্থের শীর্ষদেশ থেকে একটি জলের ফোঁটা আনন্দগুপ্ত’র মাথায় ঝরে পড়ল।...
দিকে দিকে যে চন্দ্রবংশের অরাজক শাসনের বিরুদ্ধে জনসাধারণের ক্ষোভ ক্রমেই ধূমায়িত হচ্ছে এবং ক্ষুব্ধ জনতার নেতৃত্ব দিতে উঠে এসেছেন অন্ত্যজ শ্রেণীর বৌদ্ধ সাধক ও শৈবযোগীদের একটি গোষ্ঠী, সে সংবাদও রাজপদাধিকারীদের মধ্যে গোপন ছিল না। শুধু তাদের অধিনায়কদের চিহ্নিত করা সম্ভবপর হচ্ছিল না।
তাই যেদিন এই অরণ্য-সন্নিহিত স্থানটিতে জনৈক অস্ত্রধারী মানুষ সম্পূর্ণ একটি সশস্ত্র গ্রামরক্ষীবাহিনীকে একাকী ধ্বংস করলেন, সেদিনই আনন্দগুপ্ত’র মস্তিষ্কের ধূসর কোষ জাগ্রত হয়ে উঠেছিল। এই স্পর্ধা তো রাজদ্রোহের সঙ্গে তুলনীয়! এই মানুষটি নিশ্চয়ই তাদের মধ্যেই একজন। নইলে এত সাহস কার হবে?
আনন্দগুপ্ত’র কাছে এ ঘটনা ঘোর বিপদের সংকেত৷ সেদিন এই গ্রামে যা ঘটেছে, কাল বজ্রযোগিনী মন্দিরের পূজাপ্রাঙ্গনে যা ঘটেছে তা অচিন্ত্যনীয়। এতটাই সংগঠিত হয়ে উঠেছে এরা? এত শক্তিশালী? অতর্কিতে এত দ্রুত, এত অব্যর্থ আঘাত হানতে পারে?
আনন্দগুপ্ত জানেন, এর অর্থ একটাই। এর পেছনে অবশ্যই এক বা একাধিক অন্তর্ঘাতকের গুপ্তসহায়তা রয়েছে। অন্যথায় কোনও বহিরাগত শক্তির পক্ষেই প্রকাশ্যে এমন সংগঠিত তাণ্ডব চালান অসম্ভব।
কে বা কারা হতে পারে সেই অন্তর্ঘাতক? অবশ্যই এমন কেউ যার সমাজের সর্বস্তরে যোগাযোগ আছে, যে স্বীয় গুণে খ্যাতিমান পুরুষ, যার কাছে চন্দ্রবংশের অন্ধ আনুগত্য আশা করা অসম্ভব৷
অবশ্য এই মুহূর্তে কে যে চন্দ্রবংশের প্রতি প্রকাশ্যে অন্ধ আনুগত্য প্রকাশ করছে আর গোপনে রাজদ্রোহীদের সহায়তা করছে, সে নিয়ে গুপ্তপুরুষ আনন্দগুপ্ত নিজেও সন্দিহান। তবুও পাশার ঘুঁটিগুলি মেলাতে অসুবিধা হয়নি তাঁর। যে মুহূর্তে আনন্দগুপ্ত’র গুপ্তচর এসে খবর দিল যে কান্তিপ্রভ’র কুটিরে একজন বিদেশী এসে আশ্রয় নিয়েছেন, তার সঙ্গে কমলাঙ্ক গ্রামের পার্শ্ববর্তী অন্ত্যজ গ্রামগুলিতে বেশ কিছু অচেনা মানুষের আনাগোনা দেখা যাচ্ছে, সেদিনই তিনি প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করেছিলেন। তবে সাবধানে, যথাযোগ্য সতর্কতা সহ। মুহূর্তে মুহূর্তে স্থানীয় সমিতির সদস্য তথা রাষ্ট্রীয় গুপ্তচরবাহিনী তাঁকে এই ক’টি পরিবারের প্রতিটি আনাগোনার সংবাদ সরবরাহ করে গেছে।
আজ রাত্রে আনন্দগুপ্ত এমনিতেও এদের এই গুপ্তকুটিরে হানা দিতেন। কিন্তু তার পূর্বেই, বজ্রযোগিনী মন্দিরে পূজা উৎসবের মধ্যেই যে এরা এত বড় আঘাত হানবে, তার কোনও সঙ্কেত তাঁর কাছে ছিল না।
বজ্রযোগিনী পূজার নিরাপত্তার দায়িত্ব তাঁর। বৎসরের এই একটি দিনেই রাজ্ঞী ও রাজসচিব সহ বঙ্গদেশের সপ্তরাজন্য একই স্থানে একত্রিত হন। ফলে অন্তর্ঘাতের আশঙ্কা থেকেই যায়। কিন্তু আনন্দগুপ্ত’র সুচারু পরিচালনায় আজ অবধি এই উৎসবে কোনওদিন ছন্দপতন হয়নি৷ এজন্য তাঁর একটা প্রচ্ছন্ন অহঙ্কারও ছিল।
কিন্তু সেই অহঙ্কার আজ ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। অন্যান্য রাজন্যবর্গ, প্রকাশচন্দ্র এবং স্বয়ং রাজ্ঞীর চোখে সেই অবিশ্বাসের ছায়াই দেখেছেন তিনি। তাতে তাঁর অন্তরাত্মা মরমে মরে গেছে। তার সমুদায় ব্যর্থতার দায়িত্ব তাঁর, একমাত্র তাঁরই।
অশ্বত্থের মাথা থেকে আবারও একটি জলবিন্দু ঝরে পড়ল। উত্তরীয় দিয়ে আবার মাথা একবার মুছে নিলেন আনন্দগুপ্ত।
তাঁর মনের মধ্যে অস্বস্তিকর প্রশ্নটি পুনরায় জেগে উঠল। এত শক্তিশালী এরা? এত সংগঠিত? তিনি গুঢ়পুরুষ বাহিনীর প্রধান আনন্দগুপ্ত। তাঁর অগোচরে এই বিষবৃক্ষ এতদুর শাখা-প্রশাখা বিস্তার করেছে?
কাল থেকে মরমে মরে আছেন আনন্দগুপ্ত। ক্ষুব্ধ, আহত, অপমানিত বাঘের মতো ছটফট করেছেন। যে করেই হোক ভূলুণ্ঠিত সম্মান উদ্ধার করতেই হবে। রাজদ্রোহী, দেশদ্রোহী সারমেয় সন্তানদের প্রকাশ্য রাজপথে রজ্জুবদ্ধ পশুর মতো কশাঘাত করতে করতে নিয়ে যাবেন তিনি। আর কালক্ষেপ করেননি, মহাপ্রতীহার শান্তঘোষের সাহায্য প্রার্থনা করেছেন অভিযান সফল করার জন্য।
দুঃসহ ক্রোধে আনন্ধগুপ্ত’র সর্বাঙ্গ জ্বলে যাচ্ছিল। তাই আবার যখন অশ্বত্থের মাথা থেকে কয়েকটি তরলবিন্দু তাঁর মাথায় ঝরে পড়ল, তখনও ঠিকমতো অনুধাবন করতে পারলেন না তিনি। তাঁর মনের মধ্যে কয়েকটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন খেলা করছিল।
শুরু থেকেই এই গুপ্ত অভিযানের বেশ কিছু লক্ষণ তাঁর ঠিক সুবিধার লাগছে না।
এই কুটিরের সংবাদ তাঁকে এনে দেয় ভাঁড়ুদত্তের নিযুক্ত এক মূক ও বধির চর। চরটির একটি আশ্চর্য প্রতিভা আছে। শ্রবণে অক্ষম হলে কী হবে, বক্তার ওষ্ঠসঞ্চালন দেখে সে প্রতিটি শব্দ অনুধাবনের ক্ষমতা রাখে। বলাবাহুল্য ভাঁড়ুদত্ত’র এই গুপ্তবৃত্তির সংবাদ একমাত্র আনন্দগুপ্ত ব্যতীত আর কেউ রাখেন না। শান্তঘোষও নয়। তার কথামতই তাঁরা এসেছিলেন গ্রামটিকে ঘিরে, অরণ্যের মধ্য থেকে।
প্রথমা’র রাত্রি সত্বেও পথ চিনে আসতে শান্তঘোষ বা তাঁর বিশেষ ক্লেশ হয়নি। আর সৈন্যদের তো এমনিতেও অরণ্যচারণার অভ্যাস আছে। কিন্তু কুটিরের নিকটবর্তী হয়ে যখন তিনি দেখলেন কুটিরটির দ্বারে কোনও প্রহরা নেই, তখন তাঁর মনে সামান্য দ্বিধা উৎপন্ন হয়েছিল। কুটিরের অভ্যন্তরে রাজদ্রোহীদের এমন গুরুত্বপূর্ণ সমাবেশ, আর দ্বারখানি সম্পূর্ণভাবে অরক্ষিত?
তবে তৎক্ষণাৎ এই চিন্তা মন থেকে সরিয়ে দিয়েছিলেন। এই মূর্খের দল ভাবতেই পারেনি যে এমন সাফল্য উদযাপনের দিনেই এমন দারুণ প্রত্যাঘাত নেমে আসতে পারে তাদের উপর৷
দাঁতে দাঁত ঘষেছিলেন আনন্দগুপ্ত। ভালো রে ভালো! ওই আনন্দে ওরা যতটা ডুবে থাকে ততই ভালো।
অশ্বত্থশীর্ষ থেকে ঝরে পড়া তরলবিন্দু উত্তরীয় দিয়ে মুছে নিলেন আনন্দগুপ্ত। এত জল কীসের? তেমন তো বৃষ্টি হয়নি এই অঞ্চলে!
তিনি যেখানে দাঁড়িয়ে আছেন তার থেকে অনতিদূরে কুটিরটি বেষ্টন করে অবস্থান নিয়েছে রাজসেবকসেনা। তাদের মধ্য থেকে পাঁচজন সৈন্য নিয়ে কুটীরের দিকে অগ্রসর হয়েছিলেন শান্তঘোষ।
চারিদিকে নিবিড় আরণ্যক নীরবতা। কুটিরের মধ্য থেকে ম্লান আলোকরেখা আনন্দগুপ্তকে বুঝিয়ে দিচ্ছিল যে তাঁদের লক্ষ্যভেদ অনিবার্য। একবার শুধু ওই কুটিরে শান্তঘোষের প্রবেশের অপেক্ষা। তারপরেই...
কিন্তু...কিন্তু...এই অরণ্যের প্রান্তদেশে আদিম কিরাতজাতির বাস। এই সময়ে মদ্যপ কিরাতদের উল্লাসবাদ্য এবং যৌথনৃত্যের শব্দ বহুদূর হতে শোনা যায়। আজ নৈঃশব্দ্য কেন? এই অঞ্চলের বন্যসারমেয়কূল তাদের ক্ষিপ্রতা, উগ্রতা এবং হিংস্রতার জন্য কুখ্যাত। তাঁরা এতদূর এলেন৷ এদের সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না কেন?
কান্তিপ্রভ’র স্ত্রী এবং কন্যাকে ধরে নিয়ে আসার জন্য রাজসেবকপ্রধান গিরিকিশোর নিজেই গিয়েছিলেন তার কুটিরে। গিয়েছিলেন দুজন রাজসেবকসহ, অভিযান শুরুর কিছু আগেই৷ পরিকল্পনা ছিল, যে মুহূর্তে কুচক্রীদল একত্র হবে, ঠিক সেই মুহূর্তেই কান্তিপ্রভ’র অরক্ষিত অন্তঃপুরে প্রবেশ করবেন গিরিকিশোর। নারীনির্যাতনে গিরিকিশোরের খ্যাতি প্রবাদপ্রতিম। তাঁকে দেখামাত্র নারীরা আতঙ্কে পাণ্ডুবর্ণ হয়ে যায়। গৃহস্থরা তাদের স্ত্রীকন্যাদের তৎক্ষণাৎ অন্দরে লুকিয়ে রাখে। এহেন গিরিকিশোর দুজন অবলা বঙ্গললনার কেশাকর্ষণ করে গ্রামপথ দিয়ে টেনে আনতে এত কালক্ষেপ করছেন কেন?
গিরিকিশোরের সন্ধানে আরও দুজন রাজসেবককে পাঠানো হয়েছে। তারাই বা ফিরে আসতে এত সময় নিচ্ছে কেন?
আবার অশ্বত্থের শীর্ষ থেকে তরলবিন্দু। বিরক্ত হলেন আনন্দগুপ্ত। উত্তরীয় দিয়ে মাথা একবার মুছে নিলেন। এত জল কোথা থেকে আসছে? মুখ তুলে ওপরে তাকাবেন, ঠিক এই সময়ে দুজন সৈন্য নিঃশব্দে আনন্দগুপ্ত’র পিছনে এসে দাঁড়াল৷ ঘাড় না ঘুরিয়েই তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘গিরিকিশোর এসেছে?’
উত্তর এল, ‘না প্রভু। কান্তিপ্রভ’র কুটিরে তাঁকে দেখতে পেলাম না।’
আবার টুপ টুপ করে বেশ কিছু তরলবিন্দু। কিন্তু সেদিকে মন দিলেন না আনন্দগুপ্ত। তিনি পুনরায় অঙ্গবস্ত্রটি দিয়ে মাথা ও ঘাড় মুছে ভ্রুকুটি করে বললেন, ‘দেখতে পেলে না মানে?’
‘কান্তিপ্রভ’র কুটির নিষ্প্রদীপ ও জনশূন্য প্রভু। আমরা চারিদিক ভালো করে দেখে এসেছি৷ কোনও জনপ্রাণীর চিহ্নমাত্র নেই।’
অকস্মাৎ আনন্দগুপ্ত’র ঘাড়ের রোমগুলি দাঁড়িয়ে গেল। তাঁর অবচেতনে কোনও অজানা বিপদের ছায়াপাতমাত্র এই ঘটনা ঘটে৷ কী যেন একটা ঠিক হচ্ছে না! কী সেটা?
‘আর গিরিকিশোর?’
‘তাঁরও কোনও সন্ধান নেই প্রভু।’ উত্তর দিল দ্বিতীয় জন।
এইবারে বুঝলেন আনন্দগুপ্ত। এই স্বরদুটি বিলক্ষণ চেনেন তিনি।
বজ্রযোগিনী মন্দিরের সামনে সমবেত সেই জনারণ্যে তিনি ছিলেন। ছদ্মবেশে সমস্ত ঘটমান পরিস্থিতির ওপর লক্ষ রেখে চলেছিলেন। মন্দিরের সামনে যখন নাটিকাটি চলছিল, তখন তিনি নাট্যদলের দুজন সুবেশ তরুণকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘এখানে কী হচ্ছে ভায়া? এ পূজা কোথায়, এ তো কৌতুকের রঙ্গ মনে হচ্ছে। এই দেশে দেবীপূজা এইরকমই হয় নাকি?’
একজন সকৌতুকে উত্তর দিয়েছিল, ‘মহাশয় এই দেশে নতুন মনে হচ্ছে। পূর্বে কখনও বজ্রযোগিনীর উৎসবে অংশগ্রহণের সৌভাগ্য হয়নি, তাই না?’
অন্যজন গম্ভীরমুখে উত্তর দিয়েছিল, ‘অত কথার কী দরকার ভ্রাত? সরাসরি উত্তর দিলেই তো হয়। শুনুন মহাশয়, একে বুদ্ধনাটিকা বলে।’
অন্য কেউ হলে অত শব্দব্রহ্মের মধ্যে শ্রুত স্বরদুটি স্মরণে থাকত না। কিন্তু আনন্দগুপ্ত গুপ্তচরবৃত্তিতে সিদ্ধপুরুষ। এই দুটি কণ্ঠস্বর তাঁর বিলক্ষণ স্মরণে আছে।
কালকের নাট্যদলের কুশীলবদের স্বর এখানে কেন? রাজসেবকসেনার বেশে এরা কারা?
মুহূর্তের মধ্যে আনন্দগুপ্ত’র চোখের সামনে থেকে আড়াল সরে গেল। আপত অসঙ্গতিগুলির উত্তর পেয়ে গেছেন তিনি। আর উত্তরটি হৃদয়ঙ্গম করা মাত্র ভয়ঙ্কর সত্য তাঁর মস্তিষ্কে বিদ্যুতের মতো গেঁথে গেল।
ওই নাট্যদলই তার মানে মূল চক্রীদের গোষ্ঠী। কালকের ধ্বংসকাণ্ড তাদেরই কর্ম। তাদেরই দুইজন এখন রাজসেবকসেনার বেশ ধরে তাঁর পিছনে দাঁড়িয়ে আছে।
অর্থাৎ পুরো ঘটনাটাই সাজানো। অতি যত্নে তাঁদের জন্য ফাঁদ পাতা হয়েছে এই অরণ্যের মধ্যে। তারা জানত আজ রাত্রে আনন্দগুপ্ত সদলবলে অভিযানে নেমেছেন। তারা জানত মহাপ্রতীহার শান্তঘোষ নিজে আসছেন রাজসেবকসেনা নিয়ে। তা সত্বেও তারা তাদের আয়োজন প্রত্যাহার করেনি। অর্থাৎ তাঁরা যেমন এই কুচক্রীদের আয়োজনের সংবাদ রাখছেন, তারাও তাঁদের সমস্ত অভিযানের অগ্রিম সূচনা পেয়ে যাচ্ছে!
এই অভিযানের সংবাদ জানতেন কেবলমাত্র মহারানি নিজে আর প্রকাশচন্দ্র সহ বাকি ছ’জন রাজপুরুষ। তা সত্বেও এদের কাছে এই অভিযানের সংবাদ ফাঁস হয়ে যাওয়ার একটাই অর্থ।
তাঁদের মধ্যে, এই সপ্তরাজন্যের মধ্যেই একজন বিশ্বাসঘাতক লুকিয়ে আছে!
শিকার করতে এসে এখন তাঁরা নিজেরাই শিকার!
সন্তর্পণে তিনি তাঁর ডানহাতটি কোষবদ্ধ তরবারির হাতলে রাখলেন। সতর্কস্বরে প্রশ্ন করলেন, ‘সন্ধান নেই মানে? তাঁকে যে কান্তিপ্রভর কুটিরে পাঠানো হল?’
অশ্বত্থের শীর্ষদেশ থেকে বামাকণ্ঠে উত্তর এল, ‘আপনাদের পরম অনুগত ভৃত্য, শ্রী গিরিকিশোর আপাতত এখানে, মহামান্য আনন্দগুপ্ত।’
দু’খানি তরবারির অগ্রভাগ তাঁর কাঁধ স্পর্শ করেছে। স্তম্ভিত আনন্দগুপ্ত ওপরে তাকাতেই দেখলেন—অশ্বত্থের শীর্ষদেশে বেঁধে রাখা আছে একটি মানুষের দেহ। আর তার পাশে একটি ছায়ামূর্তি। পরক্ষণেই দেহটি ফেলে দেওয়া হল! সেটি এসে পড়ল আনন্দগুপ্তর পায়ের কাছে।
গিরিকিশোর!
কিন্তু এ কী অবস্থা হয়েছে মহাবীর গিরিকিশোরের! বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে রইলেন আনন্দগুপ্ত। সম্পূর্ণ উলঙ্গ দেহ, অস্ত্রাঘাতে ছিন্নভিন্ন। হাত-পা মুখ বাঁধা। ক্ষীণ চন্দ্রালোকে দেখা যাচ্ছিল তার সমস্ত শরীর ভেসে যাচ্ছে রক্তে। শরীরে সাড় আছে বটে, তবে না থাকার মতোই।
সচকিত হয়ে নিজের উত্তরীয়র দিকে তাকালেন আনন্দগুপ্ত। শ্বেত শুভ্র উত্তরীয়তে কয়েকটি গাঢ় কৃষ্ণবর্ণের দাগ৷ এতক্ষণে বুঝলেন আনন্দগুপ্ত, এই বৃষ্টিহীন রাত্রিতে তাঁর মাথায় ঝরে পড়া তরলবিন্দু জল নয়, ছিল গিরিকিশোরের রক্ত!
সমস্ত শরীর শক্ত হয়ে উঠল আনন্দগুপ্ত’র। মাথার মধ্যে বেজে উঠেছে বিপদসঙ্কেত। বিপদ! সামনে ভয়ঙ্কর বিপদ!
ততক্ষণে অশ্বত্থ-শীর্ষের ছায়ামূর্তিটি সরীসৃপের মতো শাখাপ্রশাখা বেয়ে তরতরিয়ে নেমে এসেছে মাটিতে। কৃষ্ণবস্ত্রাবৃত দেহটি খর্বকায় কিন্তু সবল। একটি খড়্গ আনন্দগুপ্ত’র কণ্ঠদেশে ধরে সেই ছায়ামূর্তি ক্রুরকণ্ঠে বলল, ‘আপনার অনুগত পাপবুদ্ধির অবস্থা দেখলেন তো রাজন্যপ্রবর? এই ধর্ষক পশুটির পুরুষাঙ্গখানি আপাতত অরণ্যের পশুদের খাদ্য হয়েছে। জেনে রাখুন, আর কিছুক্ষণের মধ্যেই আপনার আর আপনার সঙ্গীদের অবস্থাও তাই হতে চলেছে।’
এই অবস্থাতেও বুদ্ধিভ্রষ্ট হননি আনন্দগুপ্ত। বিদেশে এরকম বহু বিপদজনক পরিস্থিতি নিজের স্থিরবুদ্ধি এবং সাহসে ভর করে নির্বিঘ্নে পার করেছেন তিনি।
চারিপাশে তাকিয়ে একবার পরিস্থিতি অনুধাবন করে নিলেন আনন্দগুপ্ত। সামান্য দূরে কুটীরের দিকে ফিরে দাঁড়িয়ে আছে রাজসেবকসেনা। কিছু আগেই অতি সন্তর্পণে কুটিরের অন্দরে প্রবেশ করেছেন শান্তঘোষ। কিছু শব্দ ভেসে আসছে কুটীরটি থেকে। সেনারা জানে না যে কী ভীষণ বিপদের মধ্যে আছেন তিনি।
দ্রুত চিন্তা করলেন আনন্দগুপ্ত। একবার উচ্চকণ্ঠে সংকেত দেওয়ার অপেক্ষামাত্র। রাজসেবকসেনার আঘাত করার দ্রুততা ভয়ঙ্কর কালসর্পের থেকেও ক্ষিপ্রতর। মুহূর্তের মধ্যে এই তিন আততায়ীর দেহ ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবে বটে, কিন্তু তার আগে এরা যে তাঁর মুণ্ডখানি দেহকাণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেবে, সেটা নিশ্চিত।
তাহলে উপায়?
আনন্দগুপ্ত’র অভিজ্ঞতা বলে এইসব ক্ষেত্রে বাক্যবিন্যাসের জাল ছড়াতে হয়৷ কথায় কথায় বিলম্বিত করতে হয় মুহূর্ত। তারপর সঠিক ক্ষণ খুঁজে নিয়ে প্রত্যাঘাত হানতে হয় বিদ্যুতের মতো।
আনন্দগুপ্ত চাপাস্বরে প্রশ্ন করলেন, ‘তোমরা কারা?’
পিছনে দাঁড়ানো দুই অস্ত্রধারীর একজন উত্তর দিল, ‘আজ্ঞে আমরা আপনার আজ্ঞাবহ দাস, প্রভু।’
ব্যঙ্গ গায়ে মাখলেন না আনন্দগুপ্ত? ‘কী চাও তোমরা।’
অন্য স্বরটি গম্ভীরস্বরে উত্তর করল, ‘আজ্ঞে, আপনার মুণ্ড।’
‘তোমরা জানো আমি কে?’
‘না জানলে কি আর এই অশ্বত্থের তলায় আপনার জন্য ফাঁদ পাতি, প্রভু আনন্দগুপ্ত?’ সেই কৌতুকস্বর।
‘আমাকে হত্যা করার ফলাফল জানো তো?’
‘সে নিয়ে আপনাকে না ভাবলেও চলবে। আপাতত বরং যমরাজের কাছে কীভাবে এই ইহজীবনে কৃত অপরাধের দায় থেকে অব্যাহতি চাইবেন, সেই নিয়ে ভাবুন।’ উত্তর দিল দ্বিতীয় স্বর।
‘ওরে মূর্খের দল, রাজাদেশে কৃত অকর্তব্যের দায় অধীনস্থের ওপর বর্তায় না, সে কথা জানিস না?’ এদের উত্তেজিত করতে চাইছেন আনন্দগুপ্ত। কুটিরের মধ্য থেকে কিছু কথা ভেসে আসছে৷ আনন্দগুপ্ত জানেন ও শান্তঘোষের স্বর।
তরবারি দুটি আরও গভীর ভাবে চেপে বসেছে স্কন্ধে। আনন্দগুপ্ত অনুভব করলেন যে তাঁর দেহ থেকে রক্তপাত শুরু হয়েছে। কৌতুকস্বর এবার অকস্মাৎ তীব্র, ‘রাজাজ্ঞার দোহাই দিয়ে নিরীহ মানুষের ওপর কৃত অত্যাচারের পাপ থেকে নিষ্কৃতি পাবেন না আনন্দগুপ্ত। শত সহস্র সর্বহারার চোখের জল, শত সহস্র দরিদ্র কৃষকের হাহাকার, শত সহস্র ধর্ষিতা বঙ্গনারীর লাঞ্ছিত সিঁদুরের অভিশাপ আপনাদের কাউকে অব্যাহতি দেবে না।’
‘সে বিচার ঈশ্বর করবেন। তোমরা বিচার করার কে?’
‘সে তো বটেই। ঈশ্বর যাতে দ্রুত সে বিচার সম্পন্ন করতে পারেন তার জন্যই তো এ আয়োজন।’
‘কে হত্যা করবে আমাকে? এই অবলা নারী?’
নারী দৃপ্তকণ্ঠে স্বরে বলে উঠল, ‘কেন রে পশু, এই অবলা নারী যদি নরাধম গিরিকিশোরের এই অবস্থা করতে পারে, তাহলে তুই কোন বীর?’
এইবার সত্যিই ভয় পেলেন, ভীত হলেন আনন্দগুপ্ত। রক্তস্নাত খড়্গ থেকে উঠে আসছিল জান্তব ঘ্রাণ। মেয়েটি যে মিথ্যে বলছে না, তার প্রমাণ ছিল তার রক্তচক্ষুতে, এই প্রায়ান্ধকারেও যেটি ধক-ধক করে জ্বলছিল।
সামান্য স্খলিতস্বরে প্রশ্ন করলেন, ‘কে তুমি?’
খড়্গটি আরও হিংস্রভাবে চেপে বসল তাঁর কণ্ঠনালীর ওপর। প্রবল ঘৃণার সঙ্গে উচ্চারিত হল, ‘আমি কে, তা জানতে চাস? তবে দেখ,’ এই বলে সেই নারী নিজের মুখখানি অনাবৃত করলেন, ‘আমাকে চিনতে পারিস রে পাপপিণ্ড? আমার কথা মনে পড়ে আনন্দগুপ্ত? আমি অমাত্য জয়নাথের সেই ভাগিনেয়ী, দেদ্দদেবী।’
আনন্দগুপ্ত আতঙ্কে স্থবির হয়ে যাওয়ার ঠিক পূর্বমুহূর্তে কুটির থেকে নিঃশব্দ বিদীর্ণ করে ভেসে এল শান্তঘোষের আর্তচিৎকার। রাজসেবকসেনা তৎক্ষণাৎ দু’হাতে কুঠার আর খড়্গ নিয়ে প্রস্তুতি নিল। কিন্তু তারা কুটিরের দিকে অগ্রসর হতে না হতেই অরণ্য প্রকম্পিত করে ভীমনাদ ভেসে এল, ‘জয় গৌড়, জয় বঙ্গ, জয় শশাঙ্ক।’
সঙ্গে সঙ্গে অরণ্যের বিচিত্র গোপন স্থান থেকে জেগে উঠল কিরাতযোদ্ধাদের ছায়া-অবয়ব। তাদের কটিদেশে তীক্ষ্ণধার দাও, হাতে খর্বকায় অথচ শক্তিশালী ধনু। সেই ধনু থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে ছুটে আসতে লাগল মর্মভেদী বিষাক্ত তীরের দল। আক্রোমণোদ্যত রাজসেবকসৈন্যদের অধিকাংশ তাতেই ধরাশায়ী হল। যারা ধরাশায়ী হল না তাদের জন্য মহাদ্রুমের শাখা-প্রশাখা থেকে কুঠার হাতে লাফিয়ে নেমে এল কিরাত আর শবরের দল। তাদের জান্তব আক্রোশের সঙ্গে মিশেছে সামরিক প্রশিক্ষণের ক্ষিপ্রতা। রাজসেবকসেনা এই প্রশিক্ষিত উন্মত্ততার সঙ্গে পরিচিত নয়। তারা নির্মমভাবে নিহত হতে থাকল।
অরণ্যের মধ্যে সেই ঘোর যুদ্ধটির সমাপ্তি আনন্দগুপ্ত আর শান্তঘোষ কেউই দেখতে পেলেন না। কারণ তাঁদের মুণ্ডদুখানি অরণ্যের মধ্যে দুই যুযুধান প্রতিপক্ষের পায়ের কাছে ইতস্তত ঘোরাফেরা করছিল।
অন্ধকার কারাগারের পাথুরে মেঝে থেকে উঠে আসছিল শব্দগুলো। একদল রক্ষীর হেঁটে আসার শব্দ। তবে তার সঙ্গে আরও একটি চেনা শব্দ ছিল। চেনা অথচ অচেনা। স্মৃতি আজকাল বড় বিশ্বাসঘাতকতা করে। অনেক চিরপরিচিত শব্দ, অর্থ, বা চিত্র বুঝতে পারেন না।
তারা হেঁটে আসছিল দীর্ঘ অন্ধকার অলিন্দ ধরে৷ শব্দগুলি প্রথমে স্তিমিত, তারপর ক্রমেই উচ্চকিত হয়ে উঠছে।
অলিন্দের শেষে বাঁক নিয়েই কয়েকটি অন্ধকার কারাকক্ষ। একজন নারী ভূমিশয্যায় শায়িত। তিনি প্রকাশচন্দ্রের এই গুপ্তকারাগারের একমাত্র বন্দি। তাঁর কান উদগ্রীব হয়—আসছে, খাদ্য আসছে!
এককালে এই দেশের সম্রাটের পট্টমহিষী ছিলেন তিনি। কী ছিল না তাঁর? আদেশ পালনের জন্য নিযুক্ত ছিল শতাধিক দাসদাসী। স্নান করতেন চন্দনজলে, প্রসাধন করতেন দুর্মূল্য কুঙ্কুম আর মহার্ঘ ফুলরেণুতে। তাঁর দেবনিন্দিত দেহকাণ্ডটি বেষ্টন করে থাকত মধুরার মহার্ঘ নীলাম্বরী। তাঁর ইঙ্গিতমাত্র স্বাদুতম খাদ্য ও মহার্ঘতম পানীয়ের ভাণ্ডার সাজিয়ে দেওয়া হতো তাঁর সামনে। আমোদে, আহ্লাদে, গরিমায় এবং ঐশ্বর্যে তিনি সত্যই রাজেন্দ্রাণী ছিলেন।
আর আজ?
বৃদ্ধা সামান্য মাথা তুললেন। এই অন্ধ কারার অন্তরালে কেটে গেছে কতগুলি বছর। কত বছর, তার আর গণনা করেন না। এই নরকের অন্ধকার ছিনিয়ে নিয়েছে তাঁর সবটুকু। তাঁর চোখের জ্যোতি ম্লান হয়েছে, শিথিল হয়েছে চর্মগ্রন্থি। ঘন মেঘতুল্য কৃষ্ণকেশরাশি এখন শণতন্তুর মতো। একদা রাজেন্দ্রাণীর এখন একটি মাত্র ছিন্নকন্থা সম্বল। কারাকক্ষের এককোণে একটি মৃৎপাত্রে দুর্গন্ধযুক্ত জল রেখে যায় ওরা, তৃষ্ণায় তাই পান করেন তিনি।
এককালে তিনি সম্রাজ্ঞী ছিলেন। আজ তিনি সাক্ষাৎ প্রেতিনী।
পায়ের শব্দরা আরও এগিয়ে আসছে। এইবার তিনি অন্য শব্দটি চিনে নিলেন। লৌহশৃঙ্খলের শব্দ। তার মানে নতুন কোনও বন্দিকে নিয়ে আসা হচ্ছে এই নরকে।
তিনি উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। বন্দি মানে মানুষ। একটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক মানুষ, তাঁকে হোক না রাখা পাশের কারাকক্ষে। তবুও, কথা বলার মতো একটি মানুষ তো পাবেন তিনি।
শেষবার এসেছিল একজন। কোন এক বিদেশি গুপ্তচর। সাধারণ গুপ্তচর নয়, খুব উচ্চপদস্থ কেউ। নইলে প্রকাশচন্দ্রের এই বিশেষ অন্ধকূপে আনা হতো না তাকে। রোজই রক্ষীরা তাকে নিপীড়ন কক্ষে নিয়ে গিয়ে চূড়ান্ত অত্যাচার করত গুপ্তসংবাদের খোঁজে। দূর হতে ভেসে আসা সেই অত্যাচারের শব্দে, মানুষটির আর্তনাদের শব্দে সিঁটিয়ে থাকতেন তিনি।
রক্ষীরা তার রক্তাক্ত এবং ক্ষতবিক্ষত দেহটি পার্শ্ববর্তী কারাকক্ষে ফেলে চলে যাওয়ার পর সেই হতভাগ্যটির সঙ্গে ধীরে ধীরে, থেমে থেমে কিছু কথা বলতেন তিনি। তাঁর কাছ থেকেই জেনেছিলেন ওই পিশাচী নারীর সঙ্গে তাঁর প্রাণাধিক সন্তানের বিবাহের সংবাদ। জেনেছিলেন যে তাঁর স্নেহের পুত্তলিটিকে সেইভাবেই হত্যা করেছে ওই পাপিষ্ঠা নাগিনী, যেভাবে নিহত হয়েছিলেন তাঁর স্বামী।
সেই বন্দি অবশ্য বেশিদিন সঙ্গ দেয়নি তাকে। প্রকাশচন্দ্র নিজে এসে তাঁর কারাকক্ষের সামনেই সেই হতভাগ্যর মুণ্ডচ্ছেদ করেন। ওঃ, সে কী রক্ত!
সেইদিন আরও একটি কথা উচ্চারণ করেছিলেন প্রকাশচন্দ্র, সম্পর্কে তাঁর ভ্রাতৃশ্বশুর প্রকাশচন্দ্র, যাঁর অনুগ্রহে তাঁর স্বামী এই বঙ্গদেশের সম্রাট হয়েছিলেন—সেই প্রকাশচন্দ্র। সেই বিদেশি গুপ্তচরের ছিন্ন দেহ দেখে তিনি যখন বমন করছেন, তখন প্রকাশচন্দ্র বলেছিলেন, ‘রক্ত দেখে ঘৃণার উদ্রেক হচ্ছে রে রণ্ডা? উচিত ছিল তোর ওই অবাধ্য মূর্খ সন্তানটিকে তোর সামনে এভাবেই বধ করে তার রক্তমিশ্রিত অন্ন তোকে খাওয়ানো। তবে যদি সম্রাজ্ঞী য়ু জেতিয়ান-এর ঋণের কিছুমাত্র শোধ করতে পারি।’
মুহূর্তের জন্য একবার চোখ বন্ধ করেই খুললেন তিনি। ইশ্বরের নিশ্চয়ই কোনও উদ্দেশ্য আছে। নইলে এখনও তিনি কেন বেঁচে আছেন?
রক্ষীদলের পায়ের শব্দ এসে তাঁর কারাকক্ষের সামনে থামল। ভূমিশয্যা থেকে শ্লথভঙ্গিতে উঠে বসলেন তিনি। দুজন রক্ষী মৃৎপাত্রে করে সামান্য অন্ন ঠেলে দিল কক্ষের মধ্যে। অন্য রক্ষীদের মধ্যে অগ্রগামী রক্ষীটি তাঁর পাশের কক্ষটির লৌহদ্বার উন্মুক্ত করল। বন্দি সেই কক্ষে প্রবেশ করা মাত্র দ্রুত বন্ধ করা হল দ্বার।
তারপর বাকিরা প্রস্থান করলে দুজন রক্ষী ভল্ল হাতে কারাকক্ষের সামনে প্রহরায় রয়ে গেল।
সামান্য আশ্চর্য হলেন তিনি। নিরাপত্তা এতই সুদৃঢ় যে এখান থেকে পলায়নের কথা কেউ ভাবতেও পারে না।
এ হচ্ছে প্রকাশচন্দ্রের নিজস্ব কারা৷ এখানে একমাত্র প্রকাশচন্দ্র ছাড়া আর কারও শাসন চলে না, বঙ্গদেশের সম্রাটেরও নয়। লালিম্ববন পাহাড়ের বিস্তীর্ণ গুহার মধ্যে এর অবস্থান। গুহার সামনে রাজসেবকরক্ষীর এক বিশিষ্ট গোষ্ঠীর কঠিন প্রহরা৷ এদের নিযুক্ত করার পূর্বে প্রকাশচন্দ্র স্বয়ং এদের পরীক্ষা নেন। রক্ষীদের সহায়তার জন্য আছে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হিংস্র কুকুরের দল।
মেঘান্দর একটি শাখা এই গুহার পিছনদিক বেষ্টন করে আবার মূল ধারার সঙ্গে মিলিত হয়েছে। তার গভীরতা অধিক না হলেও স্রোত প্রবল। সেই শাখানদী থেকে একটি নাতিবৃহৎ খাল কেটে কারাগারের সামনে সৃষ্টি করা হয়েছে জলপূর্ণ পরিখা। তাতে প্রকাশচন্দ্রের কয়েকটি প্রিয় পোষ্য বসবাস করে। কুমীর!
পরিখাটি লাফিয়ে পার হওয়া অসম্ভব। কারাগারের মূল দ্বার থেকে পরিখার অন্যদিকে যাতায়াতের জন্য একটি সেতু আছে। আর প্রকাশচন্দ্রের বিশেষ অভিজ্ঞানচিহ্ন ব্যতীত সেই সেতু কখনই নামানো হয় না।
এ কারাগার নয়, সাক্ষাৎ নরক। এখানে একবার যারা আসে, পৃথিবীর বুক থেকে তাদের অস্তিত্ব মুছে যায়।
পরিখার এদিকে থেকে উচ্চৈঃস্বরে ডাক ভেসে এল, ‘পাটাতন নামাও হে সেতুরক্ষী, বন্দির জন্য অন্ন এনেছি।’
পরিখার এপারে সেতুরক্ষীর আদেশে তার সহকারী ধীরে ধীরে একটি কপিকলের রজ্জু আকর্ষিত করতে লাগল। দু’পারের মধ্যে সংযোগ স্থাপিত হওয়ামাত্র ওপার থেকে সেতুর ওপর উঠে এল এক বিশাল অবয়ব। তার ডান হাতে একটি দণ্ডদীপিকা, বাম হাতে বৃহৎ পাত্র।
এপারে এসে দণ্ডদীপিকাটি একটি আকর্ষীতে গুঁজল আগন্তুক। সেতুরক্ষীর সহকারী যুবা অন্নপাত্রটি নামিয়ে সেটি উত্তমরূপে পরীক্ষা করতে লাগল। সেতুরক্ষী আগন্তুকের পরিধেয় বস্ত্র পরীক্ষা করতে লাগলেন।
আগন্তুকের পরিধেয় কৃষ্ণবর্ণ অধোবাস, ঊর্ধ্বাংশ উন্মুক্ত। মুখের অর্ধেক সেই একই বস্ত্রে আচ্ছাদিত। সেতুরক্ষী আগন্তুকের মুখের বস্ত্রখানি উন্মোচিত করে মুখ দেখে নিলেন। তারপর আগন্তুকের কচ্ছটিকা পরীক্ষা করলেন, পাদুকা পরীক্ষা করলেন, মস্তকাবরণ পরীক্ষা করলেন। শুধু আগন্তুকের দক্ষিণ মণিবন্ধের দিকে নির্দেশ করে বললেন, ‘এটি কী?’
মণিবন্ধে একটি চওড়া এবং পুরু চর্মনির্মিত বাহুভূষণ, পট্টির মতো করে জড়ান। আগন্তুক উত্তর দিল, ‘আজ গৃহে দেবী অট্টহাসের পূজা, এ তারই চিহ্ন। তুমি মনে হচ্ছে এই অঞ্চলে নতুন। অট্টহাসের পূজাবিধি কিছুই জানো না!’
পাটাতনরক্ষী এদিকের লোক নন। তার ওপর তিনি বৌদ্ধ নন। তিনি আর কথা বাড়ালেন না। একবার দেবী অট্টহাসের মূর্তি দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল তাঁর। সেই ক্ষুৎকামা, শীর্ণকায়া, ভয়ঙ্করী মূর্তি দর্শনের স্মৃতি খুব একটা সুখকর নয়। তিনি আর কিছু বললেন না।
আগত রক্ষী কটিদেশ থেকে একটি নামাঙ্কিত চতুষ্কী বার করে প্রহরীকে দেখিয়ে নিলেন। ততক্ষণে তাঁর আনা অন্নপাত্রটির পরীক্ষা শেষ হয়ে গিয়েছিল। তিনি পুনরায় দণ্ডদীপিকা এবং পাত্রটি হাতে তুলে এগিয়ে গেলেন একটু দূরের একটি মস্ত বড় গুহামুখের দিকে। ওটিই এই নরকের প্রবেশদ্বার।
গোগ্রাসে অন্ন গ্রহণ শেষ করে মৃৎপাত্রটি কারাকক্ষের বাইরে ঠেলে দিলেন বন্দিনী। সামান্য জল পান করলেন। তারপর নিদ্রার ভান করে কিছুক্ষণ শুয়ে রইলেন।
ধীরে ধীরে রক্ষীদের কিছু কথা কানে আসতে লাগল তাঁর।
‘ইনি কি সেই তিনি?’
‘হ্যাঁ ভাই। ইনিই তিনি।’
‘বিশ্বাস হয় না। ইনি তো শুনেছি ইন্দ্রজালে বিশেষ সিদ্ধিপ্রাপ্ত। ধরা পড়লেন কী করে?’
‘হুঁ-হুঁ বাবা, রাজসেবকসেনা কী যেমন তেমন সৈন্য হে। তাদের প্রশিক্ষণই আলাদা। আর ঐন্দ্রজালিক হন বা সিদ্ধপুরুষ, শেষ অবধি মানুষ তো বটে।’
‘ধরা পড়লেন কী ভাবে?’
‘কাল রাত্রে নাকি এঁদের সন্ধানে কমলাঙ্ক গ্রামের অরণ্যে বিশেষ অভিযান চালানো হয়েছিল। স্বয়ং আনন্দগুপ্ত আর শান্তঘোষ তার দায়িত্বে ছিলেন। সেখানে দুইপক্ষের মধ্যে ঘোরতর যুদ্ধ হয়। দুইপক্ষেরই অনেক অনেক সৈন্য হতাহত হয়েছে। তারপর ওরা যখন জঙ্গলের আরও গভীরে পালিয়ে যাচ্ছিল, ইনি নাকি কোন এক গুপ্তকুটিরের মধ্যে লুকিয়ে বসেছিলেন। জনৈক রাজসেবকসেনা এঁর সন্ধান পেয়ে বাকিদের ডেকে আনে।’
‘কিন্তু অভিযানটি চালানো হল কেন?’
‘কয়েকদিন আগে বজ্রযোগিনী উৎসবের সময়ে যে মহা অনর্থ ঘটেছিল, তার পেছনে নাকি ইনি আর এঁর কয়েকজন সঙ্গীসাথীই প্রধান।’
‘বল কী হে?’
‘শুধু কী তাই? আরও কারা কারা আছেন শুনলে মাথা ঘুরে যাবে।’
‘যেমন?’
‘মহাযোগী মৎস্যেন্দ্রনাথ। ক্ষত্রিয়শ্রেষ্ঠ বপ্যট। বিনয়াদিত্য জয়াপীড়। আরও অনেকে।’
‘বাপ রে! সবাই তো স্বনামধন্য পুরুষ।’
‘সে আর বলতে? আরও চিন্তার বিষয় কী জান? ওদের হয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে অবতীর্ণ হয়েছিল কিরাত আর শবরের দল।’
‘কিরাত আর শবর? ওরাও এঁদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে?’
‘সেটাই তো! আর তারা নাকি যুদ্ধও করেছে একেবারে প্রশিক্ষিত সেনাবাহিনীর মতো। আমাদের সেনার অনেকেই নিহত হয়েছে। আহত আরও বেশি। শুধু তাই নয়, সেই যুদ্ধের পর থেকে শান্তঘোষ আর আনন্দগুপ্ত’র সংবাদ নেই। রাজপ্রাসাদ থেকে বলা হচ্ছে, ওঁরা যুদ্ধে মারাত্মক আহত। কুল্লুকভট্টর অধীনে রাজপ্রাসাদের মধ্যে তাঁদের চিকিৎসা চলছে। এদিকে শোনা যাচ্ছে তাঁরা আর বেঁচে নেই, নিহত হয়েছেন সেই যুদ্ধে।’
‘বলো কী হে?’
‘ঠিকই বলছি ভায়া। আরও যা সব শুনছি—সে সব যেমন ভয়ঙ্কর তেমনই উদ্বেগজনক।’
‘কীরকম?’
‘সে বড় গুহ্যসংবাদ হে, নিজের কাছেই রেখো। আমার শ্যালক অধিরথকে তো চেনো। সদ্য সদ্য সে বিশাখসেনের আপ্তসহায়ক নিযুক্ত হয়েছে। সে আমাকে বলেছে, গত কয়েকদিন ধরেই নাকি করসংগ্রাহকের কাছ থেকে সংবাদ আসছে যে কৃষকেরা সংঘবদ্ধ হচ্ছে৷ কর দিতে অস্বীকার করছে। বলছে—যে রানি দরিদ্রের বস্ত্রের সংস্থান করতে পারেন না তাঁকে আবার করদান কীসের!’
‘বলো কী হে? চিন্তার বিষয়। কিন্তু সামন্তপ্রভুরা কী করছেন? তাঁদের রক্ষীবাহিনী?’
‘সেখানেই তো আরও দুশ্চিন্তা৷ সামন্ত প্রভুরা প্রায় সবাই নিষ্ক্রিয়। তার একটা বড় কারণ হল, রক্ষীবাহিনীর মধ্যেও অনেকে আর দেশের মানুষের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করতে চাইছে না। তাই সামন্তপ্রভুরা সেনাবিদ্রোহের ভয় পাচ্ছেন।’
‘ব্বাবা! তাহলে তো খুবই সঙ্গীন অবস্থা।’
‘সঙ্গীন বলে সঙ্গীন? বিভিন্ন জায়গা থেকে ভয়ঙ্কর সব সংবাদ পাচ্ছি ভায়া। শুনছি, দু-একদিনের মধ্যেই নাকি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিদ্রোহ ঘোষণা করা হবে। তাতে কৃষক আর রক্ষীবাহিনীর অনেকেই যোগ দেবে। সামন্তরাও অনেকে সমর্থন করছেন এই বিদ্রোহ।’
‘চুপ চুপ! বন্দির জন্য খাদ্য আসছে। এখন চুপ থাকো।’
বন্দিনী নিজের কানদুটি বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। এতক্ষণ যা সব শুনলেন, তার সব সত্যি? এই দেশ তাহলে সত্যিই জেগে উঠেছে! এই জীবনে তিনি দেখে যেতে পারবেন? আবেগে তাঁর হাত পা থরথর করে কাঁপতে লাগল।
কিছু পরে এক বিশালদেহী রক্ষী মস্তবড় পাত্রে করে অন্নব্যঞ্জন নিয়ে এল নতুন বন্দির জন্য। সেই সুপক্ব ব্যঞ্জনের সুঘ্রাণে জিভে জল চলে এল বন্দিনীর। আহা, কতদিন হল ভালো খাদ্য জোটেনি তাঁর।
আগত রক্ষী অন্নপাত্র নামিয়ে দিল মাটিতে। প্রহরারত রক্ষীদল পাত্র ঠেলে দিল কারাকক্ষের মধ্যে। আগন্তুক রক্ষীটি ধীর পায়ে প্রস্থান করল।
বন্দি তাঁর পাত্র নিয়ে কক্ষের শেষপ্রান্তে চলে গেলেন। প্রহরারত রক্ষীরা দুজন আবার বিশ্রম্ভালাপে রত হলেন।
বন্দিটি তাঁর অন্নের স্তূপের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে কী যেন সন্ধান করতে লাগলেন। বস্তুটি হস্তগত হতেই উৎফুল্ল দেখাল তাঁকে। সেটি সন্তর্পণে কটিদেশে গুঁজলেন। তারপর খাদ্যগ্রহণে রত হলেন।
নাহ, ব্যবস্থা তো মন্দ নয়! নিজের মনেই চন্দ্রবংশের আতিথেয়তার ভূয়সী প্রশংসা করলেন তিনি। এই কারাগারের ব্যাপারে যতটা নিন্দা শুনেছিলেন তিনি, অবস্থা ততটা নিকৃষ্ট নয়। লোকে বলে এই কারাগারে নাকি একদিন অন্তর অন্তর বন্দিদের খাদ্য পরিবেশন করা হয়, তাও অপক্ব বা দুর্গন্ধযুক্ত। কই, এই তো তাঁকে সুপক্ব শালিধানের সঙ্গে ওলকন্দের ঝোল দেওয়া হয়েছে। সঙ্গে হরিণের মাংস। কে বলে প্রকাশচন্দ্রের এই নরকে বন্দিদের অভুক্ত রাখা হয়? যারা বলে তারা মিথ্যুক, তারা শঠ।
বিশালদেহী রক্ষী পরিখার সামনে এসে বলল, ‘পাটাতন নামানো হোক।’
সেতুরক্ষী নিরাসক্ত কণ্ঠে বললেন, ‘অধ্যাদেশ?’
বিশালদেহী রক্ষীটি ক্রুদ্ধস্বরে বলল, ‘একটু আগেই তো এখান থেকে গেলাম, নবাগত বন্দির জন্য খাদ্য নিয়ে। তুমিই তো পাটাতন নামিয়ে যেতে দিলে হে। এক অধ্যাদেশ বার বার দেখাতে হবে নাকি?’
সেতুরক্ষী শীতল ও নৈর্ব্যক্তিক সুরে বললেন, ‘তুমি মনে হচ্ছে এই অঞ্চলে নতুন। এই কারাগারের নিয়মবিধি জানো না। এই পাটাতন ওঠাবার বা নামাবার সময় প্রত্যেকবার মহামান্য প্রকাশচন্দ্রের অভিজ্ঞান আবশ্যক।’
আগত রক্ষী বুঝল যে একটু আগে তার ওই অট্টহাস পূজা নিয়ে বলা কথাটার প্রত্যুত্তর দিল সেতুরক্ষী। সে ক্রুদ্ধভাবে কটিদেশ হতে তাম্রনির্মিত চতুষ্কী বার করে পাটাতনরক্ষীর সামনে মেলে ধরল। সেতুরক্ষীটি একবারমাত্র দেখেই পাটাতন নামানোর জন্য উদ্যোগী হলেন।
বিশালদেহী রক্ষী হেলেদুলে পার হয়ে গেল পরিখা। ওদিকে একদল রক্ষী দাঁড়িয়ে আছে ভল্ল হাতে, এই বিশালদেহী রক্ষীকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যাবে।
সেতুরক্ষীটির ভ্রুদুখানি কুঁচকে রইল। কী যেন একটা ঠিক হল না। কী যেন একটা হওয়া উচিত ছিল, কিন্তু হয়নি। কিন্তু সেটা কী? কিছুতেই মনে পড়ছে না।
খাদ্যগ্রহণ শেষ হলে শূন্য পাত্র এক পাশে সরিয়ে রাখলেন নবাগত বন্দি। তারপর বেশ হৃষ্টচিত্তে উচ্চৈঃস্বরে বললেন, ‘নাহ, আপনাদের ব্যবস্থা তো বেশ ভালোই দেখছি।’
প্রহরারত রক্ষীদুজন অপ্রস্তুত হল। এই কারাগারে বন্দিদের সঙ্গে বার্তালাপ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। কিন্তু এখন যিনি বন্দি আছেন তিনি সাধারণ মানুষ নন। ইনি নাকি জন্ম থেকেই সহজাত যোগবিভূতির অধিকারী৷ সমস্ত অবিশ্বাস্য এবং অলৌকিক কর্মে এঁর সিদ্ধি প্রবাদপ্রতিম। রক্ষীদের মধ্যে একজন ইতস্তত করে বলল, ‘ইয়ে, আপনার কোনও অসুবিধা হচ্ছে না তো কুমার?’
অন্ধকারের মধ্যেই আকর্ণবিস্তৃত হাসলেন পদ্মসম্ভব। ‘না না অসুবিধা কীসের। দিব্য সুন্দর আপ্যায়ন৷ খাবারের স্বাদও চমৎকার। শুধু আপনাদের পাচককে বলবেন যে হরিণের মাংসে একটু টক দিতে। তাতে স্বাদ বেশ খোলতাই হয়। আর ওলকন্দের ঝোলে মরিচ আরেকটু বেশি হলে খারাপ হতো না। আমাদের কামরূপে আবার, বুঝলেন কী না, পিপ্পলি মরিচ একটু বেশিই খাওয়া হয়। তবে হ্যাঁ, পাচকের রান্নার হাত বড়ই উত্তম।
রক্ষীদুজন মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে থাকে। অন্যজন সাহস করে বলল, ‘আপনার ব্যাপারে অনেক কিছু শুনেছি প্রভু।’
পদ্মসম্ভব শঙ্কিতস্বরে বললেন, ‘খারাপ কিছু শোনেননি তো? দেখুন মশাই, কয়েকটা কথা স্পষ্ট বলে রাখছি। কারণে অকারণে কিছু শত্রু বানিয়ে ফেলেছি বটে, কিন্তু আমার মতো সচ্চরিত্র, জিতেন্দ্রিয়, মানুষ সচরাচর চোখে পড়ে না। আমার নামে যেসব নিন্দেমন্দ শুনবেন তার অধিকাংশই মিথ্যে। দোষের মধ্যে সুরাসক্তি কিঞ্চিৎ বেশি আর পরিহাস করার স্বভাবটা একটু বেয়াড়া ধরনের। তা দোষেগুণে মিলিয়েই তো মানুষ, না কী?’
দুই রক্ষী হাঁ করে চেয়ে রইলেন।
অভিমান ভরে পদ্মসম্ভব বলতে লাগলেন, ‘স্বভাব চরিত্রে আমার মতো সদাশয় মানুষ আপনি দ্বিতীয় পাবেন? এই তো কুমার জয়াপীড়, সামান্য দুশ্চরিত্র হলে কী হবে, অতবড় বীর, আমার নামে কী কুৎসাটাই না করেন!’
একজন প্রহরী জিজ্ঞাসা করল, ‘কী কুৎসা?’
কারাগারের একেবারে সামনে এগিয়ে এলেন পদ্মসম্ভব, ‘শুনবেন? শুনবেন বলছেন? আহা, আপনারা তাহলে শুনুন।
‘এই তো কাল রাত্রে যখন প্রবল লড়াই চলছে, আমি সবেমাত্র চতুর্থ রাজসেবকসেনার মুণ্ডখানি দেহবিচ্ছিন্ন করে জয়াপীড়কে প্রশ্ন করেছি, ‘কী হে ভায়া, তোমার সংবাদ কী?’ সে তার হাতের ভল্লটি অন্য একটি সৈন্যের তলপেটে বিদ্ধ করে বলল, ‘এই তো, সবে ষষ্ঠ সৈন্য বধ করলাম।’ তাতে আমি সন্দেহ প্রকাশ করতেই সেই বহিরাগত কী বলল জানেন?’
রক্ষীদুটি স্তব্ধ।
পদ্মসম্ভব সেদিকে লক্ষ করলেন না। আরও উৎসাহভরে বলতে লাগলেন, ‘বলল, “যাও যাও, তোমরা পূর্বীদেশের মানুষেরা যুদ্ধের জানোটাই বা কী আর বোঝটাই বা কী? তার ওপর তুমি যেমন অলস, তেমন নারীসংসর্গপ্রিয়। তোমার দ্বারা এসব যুদ্ধ টুদ্ধ হবে না ভায়া।” আচ্ছা, আপনারাই বলুন, এ অপমান নয়? কুৎসা নয়? চরিত্রে কলঙ্কলেপন নয়? না হয় মন্দর্ভা আমাকে প্রীতির চোখেই দেখেন। তাই বলে সেটা অমন সবার সামনে ঘটা করে বলার কী দরকার শুনি?’
রক্ষী দুজন স্তম্ভিত চোখে চেয়ে রইল পদ্মসম্ভবের দিকে। এই সেই রাজকুমার? এই নির্বোধ বাচাল লোক? কোথাও কোনও ভুল হচ্ছে না তো?
এদিকে পদ্মসম্ভব বলেই চলেছেন, ‘সেই জন্যই তো আমাকে নেহাত বাধ্য হয়েই ঝটপট করে আরও দুজন রাজসেবকসৈন্য বধ করে ফেলতে হল। নইলে মুখ দেখাতে পারছিলাম না যে। চারিদিকে অত মান্যগণ্য লোক, সবার সামনে অত বড় অপমানটা মেনে নেওয়া কি ঠিক দেখায়? আপনারাই বলুন।’
‘মান্যগণ্য লোক বলতে?’ নির্বোধের মতো প্রশ্ন করে একজন।
‘সে অবশ্য বেশি নয়, এই যেমন ধরুন লোকেশ্বর মৎস্যেন্দ্রনাথ, বিনয়াদিত্য জয়াপীড়, খণ্ডিতারাতি বপ্যট, বপ্যটপুত্র গোপালদেব, এই ক’জনই। ওহো, ভালো কথা, বলি গোপালদেবের নাম শুনেছেন তো? শোনেননি? বলেন কী? সে তো বড় আশ্চর্যের কথা। তাহলে একটা গোপন সংবাদ দেব নাকি?’
রক্ষী দুজন নির্নিমেষে চেয়ে রইল। খাটো করে পদ্মসম্ভব বললেন, ‘এই গোপালদেবই কিন্তু সামনের ক’দিনের মধ্যে আপনাদের রাজা হবেন, বুঝলেন? কথাটা আবার পাঁচকান করবেন না। অত্যন্ত গুপ্তসংবাদ। আপনাদের বেশ হৃদয়বান বলে মনে হচ্ছে বলেই বললাম।’
রক্ষী দুজন দ্বন্দ্বে পড়ে গেল।
পদ্মসম্ভব কিন্তু থামলেন না। তিনি মুষ্টিবদ্ধ দুটি হাত প্রসারিত করে বললেন, ‘সেই গোপালদেবও যখন ফিকফিক করে হাসতে লাগলেন তখন আর থাকা গেল না বুঝলেন। আমার তখন মনটা ভারি খারাপ হল, বলতে গেলে খুবই অপমানিত বোধ করতে লাগলাম। তাই নেহাত বাধ্য হয়েই আপনাদের ওই শান্তঘোষ নামের লোকটার মুণ্ডখানা নামিয়ে দিতে হল। লোকটা অনেকক্ষণ ধরেই একখানা মস্ত তরবারি নিয়ে নেচে বেড়াচ্ছিল৷ বলে কী না সেটা নাকি আপনাদের ওই প্রকাশচন্দ্রের বিশেষ তরবারি।’
রক্ষীদুজনের শিরদাঁড়া দিয়ে শীতল স্রোত নেমে গেল। লোকটা কি উন্মাদ?
পদ্মসম্ভব কারাগরাদের বাইরে হাত দুখানি প্রসারিত করে আক্ষেপের সঙ্গে বলতে লাগলেন, ‘সেই দেখে গোপালদেবের সে কী রাগ! বলে কি না, ‘এই যে আপনাকে অত করে বললাম শান্তঘোষ আমার, আর আনন্দগুপ্ত আপনার, আর আপনিও যে ঘাড় নেড়ে সম্মত হলেন, তার কী কোনও মূল্য নেই?’ লোকটা এমনিতে ভালো আর উদার হলেও রাগলে কাণ্ডজ্ঞান থাকে না। তার ওপর গায়ে হাতির মতো জোর, তেমনই বাঘের মতো ক্ষিপ্র। আপনারা কিন্তু সাবধানে থাকবেন ভায়া। এ মানুষ শাসক হিসেবে প্রকাশচন্দ্রের থেকে কম কঠোর নন।’
রক্ষী দুজনের মাথার মধ্যে বিপদঘণ্টি বেজে উঠল। এসব সংবাদ কারাধ্যক্ষকে জানাতেই হবে। কোথাও একটা মস্ত বড় ভুল হয়ে গেছে। কিছু একটা ঠিক হচ্ছে না...
কিন্তু তারা উঠে দাঁড়াবার আগেই পদ্মসম্ভব আরও গলা নামিয়ে বললেন, ‘তবে গোপালদেবের একটি মস্ত দুর্বলতা আছে৷ জানতে চান নাকি? তাহলে কাছে আসুন। এসব উঁচু স্বরে বলা ঠিক নয়, দেওয়ালেরও কান আছে।’
রক্ষী দুজন কাছে আসতেই দুটি বলিষ্ঠ হাত দিয়ে তাদের কাছে টেনে নিলেন পদ্মসম্ভব, হয়তো বা গোপন কথা বলতেই। সঙ্গে সঙ্গে দুজনেরই মাথা আর ঘাড়ের ঠিক মধ্যস্থলে দু’খানি ক্ষুদ্র এবং তীক্ষ্ণ শলাকা সজোরে বিদ্ধ হল।
সঙ্গে সঙ্গে লাফিয়ে উঠল রক্ষী দুজন। তারা তরবারি বার করল। কিন্তু সেই তরবারি তোলবার আগেই তারা আবিষ্কার করল যে অবশ হয়ে আসছে তাদের হাত।
পদ্মসম্ভব তখন স্থির এবং শীতল চোখে লক্ষ করছেন দুজনকে। রক্ষী দুজন চিৎকার করার চেষ্টা করেই বুঝল যে তাদের গলা থেকে স্বর বেরোচ্ছে না। পালাবার জন্য দু-পা এগিয়েই আর পারল না, অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে গেল।
কপালের ঘাম মুছলেন পদ্মসম্ভব। মস্ত বড় ঝুঁকি নিয়েছিলেন তিনি। শলাকাদুটিতে যে বিষ মাখানো ছিল তাতে একটি পূর্ণবয়স্ক হাতিকে বেশ কয়েক দণ্ডের জন্য নিদ্রাভিভূত করা যায়। এই ভেষজ বিষের উৎসস্থল কামরূপের পূর্বতম প্রান্তের নাগাভূমির গহীনতম পাহাড়ি অরণ্যে। প্রতি বর্ষায় সেই অরণ্যে এক গুল্মলতা জন্মায়। তার ফুলের নির্যাস থেকে প্রস্তুত হয় এই মহাবিষ। নাগাভূমির বাইরে এর বিষয়ে কেউ জানে না। এর তীব্রতা কালনাগিনীর বিষের থেকেও বহুগুণ অধিক।
ভুলক্রমেও যদি শলাকা দুখানি তাঁর নিজের হাতে বিদ্ধ হতো, তাহলে এতক্ষণে তিনি আর বেঁচে নেই!
কটিদেশ থেকে চামড়ার পট্টিটি বার করে আনলেন পদ্মসম্ভব। তাঁর যা যা প্রয়োজন, তার সবই রয়েছে এখানে। মল্ল সিংহোদর তার কথা রেখেছে।
পট্টি থেকে দৈর্ঘ্যে এক অঙ্গুলি পরিমিত একটি অপেক্ষাকৃত স্থূল শলাকা বার করে আনলেন তিনি। তার অগ্রভাগ বিশেষভাবে বক্র।
কারাকক্ষটির লৌহদ্বার যেখানে মিলেছে, সেখানে একটি চতুষ্কণী লৌহফলক। সেখানে একটি ছিদ্রে শলাকা ঢুকিয়ে কিছুক্ষণ নাড়াচাড়া করতে লাগলেন৷ একটু পরেই খুট করে একটা শব্দ হল৷ সন্তর্পণে বাইরে বেরিয়ে এলেন তিনি।
পাশের কারাকক্ষে বন্দিনী নারীটি গরাদ ধরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। সম্পূর্ণ বাক্যালাপ স্বকর্ণে শুনেছেন তিনি৷ রক্ষীদুটির অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে যাওয়াও স্বচক্ষে দেখেছেন। অন্য কোনও নারী হলে আতঙ্কে চিৎকার করে উঠতেন। কিন্তু এককালে এই দেশের রাজ্ঞী ছিলেন তিনি। এখনও তাঁর স্নায়ুর ওপর কিছু দখল অবশিষ্ট আছে।
পদ্মসম্ভব দ্রুত পাশের কারাকক্ষের দ্বার উন্মুক্ত করলেন। তারপর সামান্য সরে দাঁড়িয়ে সসম্ভ্রমে বললেন, ‘আসুন মা।’
নারীটি বাইরে এলেন। উত্তেজনায় কাঁপছেন। অস্ফুটে প্রশ্ন করলেন, ‘কে তুমি?’
‘আপনার এক সন্তান, মা। দ্রুত আমার সঙ্গে চলুন।’
নির্মল শরতের আকাশের দিকে তাকিয়েছিল সেতুরক্ষীটি। অনেকক্ষণ ধরে একটা অস্বস্তি তাঁর মনের মধ্যে কাঁটার মতো বিঁধছে। কিন্তু কী—সেটি কিছুতেই মনে করতে পারছেন না তিনি।
একটু পর সহকারী যুবা এসে সামনে দাঁড়াল। তিনি তার দিকে না তাকিয়েই বললেন, ‘কী চাই?’
‘কালকে আমি হয়তো আসতে পারব না প্রভু।’
ভ্রুকুঞ্চন করলেন সেতুরক্ষী, ‘কেন?’
‘আজ্ঞে কাল আমার একমাত্র ভাগিনেয়র অন্নপ্রাশন।’
‘হুম। ঠিক আছে।’ অন্যমনস্ক ভাবে বললেন সেতুরক্ষী৷ তারপর প্রশ্ন করলেন, ‘তা ভাগিনেয়কে কী দিয়ে আশীর্বাদ করবি?’
‘আজ্ঞে, একটি স্বর্ণনির্মিত অঙ্গদ আর বালা কিনেছি প্রভু...’
লাফিয়ে উঠলেন সেতুরক্ষী, ‘কী বললি আবার বল...’
সামান্য অপ্রস্তুত হল যুবক, কিছু ভুল বলল নাকি? আবার বলল, ‘আজ্ঞে একটি অঙ্গদ আর বালা। নইলে শিশুটির মণিবন্ধ বড় শূন্য দেখায়...’
হাতের ভল্লটি নিয়ে কারাগারের প্রধানদ্বারের দিকে ছুটলেন সেতুরক্ষী। তাঁর মাথার মধ্যে বিপদঘণ্টা বেজে চলছিল।
পদ্মসম্ভব একটু এগিয়ে অলিন্দের মুখে একবার উঁকি দিলেন।
অলিন্দ একটু গিয়ে ডানদিকে বেঁকে গেছে৷ সেই বাঁকের মুখে একটি প্রহরী দাঁড়িয়ে। নিদ্রাহীন, ভাবলেশহীন মুখ।
তাঁরা দুজন যেখানে বন্দি ছিলেন, তার পাশে আরও তিনটি কারাকক্ষ আছে। এই পাঁচটি কক্ষগুচ্ছের সামনে থেকে একটি অলিন্দ এঁকেবেঁকে চলে গেছে কারাগারের মুখ্যদ্বারের দিকে। এরকম আরও দুখানি অলিন্দ এসে যুক্ত হয়েছে সেখানে। কারাগারের মুখ্যদ্বারের পাশেই কারাকর্তার কার্যালয়।
সামান্য নীচু হয়ে অস্পষ্ট শব্দ করলেন পদ্মসম্ভব। রক্ষী এদিকে মুখ ফেরাল। গম্ভীরস্বরে প্রশ্ন করল, ‘শ্রীধর, ভদ্রসেন, সব ঠিক তো?’
কোনও উত্তর নেই।
রক্ষীটি আবারও প্রশ্ন করল, ‘উত্তর দাও শ্রীধর।’
কোনও উত্তর নেই।
রক্ষীটি আকর্ষি থেকে দণ্ডদীপিকা খুলে এগিয়ে আসতে থাকল।
দাঁতে দাঁত চেপে বসে রইলেন পদ্মসম্ভব। জ্ঞানহীন রক্ষীদুজনের দেহ এখন কারাকক্ষের মধ্যে। তাদের একজনের পোশাক তাঁর অঙ্গে, তরবারি তাঁর হাতে৷
রক্ষীটি অলিন্দের ঠিক মুখে আসতেই একটি সূক্ষ্ম শলাকা ঠিক তার ডান কানের পাশে বিদ্ধ হল। রক্ষীটি দ্রুত সেটি টেনে বার করে দূরে নিক্ষেপ করল। তারপর ডানদিকে ঘুরেই দেখল তার ঠিক সামনে তরবারিহাতে দাঁড়িয়ে আছেন সেই মানুষটি—একটু আগেই যাঁকে সদ্য বন্দি করে আনা হয়েছে। দ্রুত বিস্ময় কাটিয়ে সে কোষমুক্ত করল তরবারি। কিন্তু তার আগেই একটি মুষ্ট্যাঘাত তাকে বাধ্য করল জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়তে।
দণ্ডদীপিকা তুলে নিলেন পদ্মসম্ভব। মৃদুস্বরে বললেন, ‘আসুন মা, দেখবেন, যেন শব্দ না হয়।’
সেতুরক্ষী উন্মত্তের মতো কারাদ্বারের সামনে এসে উচ্চৈঃস্বরে বলল, ‘দ্বার উন্মুক্ত করো রক্ষী।’
প্রধান দ্বাররক্ষী উঁকি দিয়ে দেখল। একটু পরেই কপিকলের ঘড়ঘড় শব্দ শোনা গেল। দ্বারখানি সামান্য উন্মুক্ত হতেই ঝড়ের মতো প্রবেশ করল সেতুরক্ষী। তারপর কারাকর্তার কার্যালয়ের দ্বারখানির ওপর সজোরে করাঘাত করতে লাগল। বাকি রক্ষীরা সচকিত এবং বিস্মিত হয়ে তাকাল।
কারাকর্তা বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। বাইরে এসে বললেন, ‘কী ব্যাপার প্রহরী?’
সেতুরক্ষীটি ঊর্ধ্বশ্বাসে বলল, ‘কয়েক দণ্ড আগে যে রক্ষীটি নবাগত বন্দির জন্য অন্নপাত্র নিয়ে এসেছিল, তার সন্ধানে রক্ষী পাঠান প্রভু, এখনই। আর আমার সঙ্গে আরও দুজন রক্ষী দিন, আমি নবাগত বন্দিটিকে একবার দেখে আসতে চাই।’
কারাকর্তা একবার তাকালেন সেতুরক্ষীর উত্তেজিত মুখের দিকে। একজন রক্ষীকে নির্দেশ দিলেন রাজপ্রাসাদে জেনে নিতে, কে এসেছিল অন্নপাত্র নিয়ে। আর নিজেই দণ্ডদীপিকা তুলে নিয়ে বললেন, ‘চলো।’
অলিন্দ দিয়ে দ্রুত পায়ে হেঁটে এলেন দুজনে। প্রথম বাঁক পেরিয়ে গেলেন। প্রথম আর দ্বিতীয় বাঁকের মধ্যে দেওয়ালের গায়ে কোথাও একটি গুপ্তপথ আছে। এই অন্ধকারা থেকে মুক্তি পাওয়ার একমাত্র পথ। তার সন্ধান খুব কম মানুষ জানেন।
সেই গুপ্ত পথটির সন্ধান করতে হবে দুজনকে। পথটি কোথায়, বহুকষ্টে সেই সংবাদ সংগ্রহ করেছেন মৎস্যেন্দ্রনাথ। কিন্তু তাকে চেনার কী উপায়—সে ব্যাপারে কেউ জানে না। সম্পূর্ণ নিজের বুদ্ধি ও কৌশলের ওপর নির্ভর করে তাঁকে খুঁজে বার করতে হবে সেই গুপ্তপথের মুখ।
দ্বিতীয় বাঁকের সামনে এসে পদ্মসম্ভব উঁকি দিলেন একবার। দূরে একজন রক্ষী দাঁড়িয়ে। সে এদিকে ফিরে প্রশ্ন করল, ‘কী ব্যাপার?’
দুজনেরই মুখ কৃষ্ণবস্ত্রে আচ্ছাদিত। পদ্মসম্ভব পিছিয়ে এলেন। সঙ্গিনীকে ইশারায় বললেন নিশ্চল হয়ে থাকতে।
এইবার পরীক্ষা। পদ্মসম্ভব নিজের হৃদপিণ্ডের শব্দ নিজেই শুনতে পাচ্ছিলেন।
পদ্মসম্ভব দেওয়ালের গায়ে ধীরে ধীরে আঘাত করছেন! কোথাও কোনও ফাঁপা শব্দ উঠছে কি? একটি পূর্ণবয়স্ক মানুষ প্রবেশ করতে পারে এমন একটি গুপ্তপথ দেওয়ালের ওপারে থাকলে তার শব্দ অবশ্যই অন্য হবে। কিন্তু শব্দ শোনা গেল না।
দণ্ডদীপিকার আলো কমে আসতে লাগল। একটু পরেই দীপ্যধিকারী আসবে নতুন আলো নিয়ে। তার পূর্বেই গুপ্তপথটির সন্ধান পেতে হবে তাঁদের। এছাড়া আর পথ নেই তাঁদের সামনে। কারাকক্ষের মধ্যে তিনজন কারারক্ষীর মৃতদেহ শায়িত।
তিনি তাঁর প্রচেষ্টা দ্রুততর করলেন। দুপাশের দেওয়ালে বারংবার আঘাত করে দেখতে লাগলেন পূর্ণদৈর্ঘ্যের মানুষের পালাবার মতো পথের সন্ধান পাওয়া যায় কী না। প্রতিটি জোড় বা ফাটলের মুখ পরীক্ষা করে দেখতে লাগলেন।
কিন্তু না, সব চেষ্টাই নিষ্ফল হল৷ প্রার্থিত পথের চিহ্নই পাওয়া গেল না।
স্বেদবিন্দু জমতে লাগল পদ্মসম্ভবের কপালে৷ দণ্ডদীপিকার আলো আরও ক্ষীণ হয়ে এসেছে। দীপ্যধিকারীর আসতে আর বেশি দেরি নেই। যা করার কিছুক্ষণের মধ্যেই করে ফেলতে হবে।
অসহায়ের মতো একবার অলিন্দের ছাদের দিকে তাকালেন পদ্মসম্ভব। কে জানে, পথটি হয়তো...
সঙ্গী নারীটি একবার শব্দ করতে গিয়ে মুখে আঁচল চাপা দিলেন। পদ্মসম্ভব সচকিত হয়ে নীচে তাকালেন। তারপর তাঁর দৃষ্টি অনুসরণ করে দেখলেন—একটি ছোট ইঁদুর দেওয়ালের নীচ দিয়ে কোথায় যেন অদৃশ্য হয়ে গেল।
অর্থাৎ দেওয়ালের নীচে কোনও না কোনও পথ আছে, সেই পথ দিয়ে মূষিকজাতীয় প্রাণী যাতায়াত করে। নিভু নিভু দণ্ডদীপিকাটি হাতে নীচু হয়ে বসলেন পদ্মসম্ভব।
ইঁদুরটি যেখান থেকে অদৃশ্য হয়ে গেছিল, তার চারপাশের দেওয়ালটি হাত দিয়ে পরিষ্কার করতে থাকলেন। ধীরে ধীরে অমসৃণ দেওয়ালের গায়ে একটি বড় বৃত্তাকার পাথর ফুটে উঠল। খুব ভালো করে পরীক্ষা করলে বোঝা যায় যে সেটি এই দেওয়ালের অংশ নয়, আলাদা করে প্রস্তুত করে এনে এখানে বসানো হয়েছে। প্রস্থে সেটি প্রায় দুই মানুষ সমান প্রশস্ত।
পদ্মসম্ভব তার গায়ে ধীরে ধীরে তিনবার আঘাত করলেন।
পরক্ষনে প্রায় লাফিয়ে উঠলেন। তরবারির অগ্রভাগ দিয়ে গোল পাথরটির চারিধারে খোঁচাতে লাগলেন। একটু পরেই পাথরটি নড়তে লাগল। অতি সাবধানে সেটি ধাক্কা দিলেন পদ্মসম্ভব।
পাথরটি ধীরে ধীরে ভেতরের দিকে ঘুরে গেল।
দণ্ডদীপিকাটি তিনি নামিয়ে আনলেন।
ভেতরে একটি গুপ্তপথ। প্রস্থে দুই মানুষ সমান হলে কী হবে, উচ্চতা বেশি নয়। তার মধ্য দিয়ে হেঁটে যাওয়ার উপায় নেই, চতুষ্পদের মতো চার হাতে পায়ে যেতে হবে।
পদ্মসম্ভব উঠে দাঁড়ালেন। প্রবল পরিশ্রমে তাঁর সমস্ত দেহ ঘর্মাক্ত। এইবার আসল পরীক্ষা। দুজনকে এই গুহাপথের ওপারে পৌঁছতে হবে।
সঙ্গিনীর দিকে ইশারা করলেন পদ্মসম্ভব। তাঁর চোখে একটা আতঙ্কের ছায়া দেখে অভয় ইঙ্গিত করলেন। তারপর তাঁকে সেই গুহাপথে প্রবিষ্ট করে নিজেও অগ্রসর হলেন। বহুকষ্টে হস্তপদদ্বয়ের সঞ্চালনে বৃত্তাকার গুহাদ্বারটি বন্ধ করতেই নিকষ অন্ধকার নেমে এল।
সেতুরক্ষী আর কারাকর্তা দ্রুত পায়ে হেঁটে আসছিলেন অলিন্দপথ ধরে। কারাকর্তা প্রথম যে সৈন্যটিকে পেলেন তাঁকে প্রশ্ন করলেন, ‘সব ঠিক আছে প্রহরী?’
সৈন্যটি বিনীতভাবে উত্তর দিল, ‘হ্যাঁ প্রভু, কোথাও কোনও গোলযোগ নেই।’
কারাকর্তা ফিরে তাকালেন সেতুরক্ষীর দিকে। তারপর বললেন, ‘দেখলে তো, সব ঠিকই আছে।’
সেতুরক্ষী বিনীতস্বরে বলল, ‘যখন এতটাই এসেছি প্রভু, নতুন বন্দির সঙ্গে একবার দেখা করে গেলে হতো না?’
‘আচ্ছা, চলো দেখেই আসা যাক।’
সংকীর্ণ গুহাপথ দিয়ে ক্রমাগত সরীসৃপের মতো এগিয়ে যাচ্ছিলেন দুজন। নিবিড় অন্ধকার। আদি নেই, অন্ত নেই, ঊর্ধ্ব নেই, অধঃ নেই। শুধু আছে মুক্তির দিকে এগিয়ে যাওয়া।
দুজনের নিঃশ্বাসের শব্দে বহুদিনের বদ্ধ গুহাপথের কটু বাতাস ভারী হয়ে উঠছিল। কতকাল এই গুহাপথ উন্মুক্ত করা হয়নি কে জানে। প্রথমদিকে তো নিঃশ্বাস নেওয়াই যাচ্ছিল না। তবে বাতাস একটু একটু করে সহনীয় হয়ে উঠছিল, এটাই যা আশার কথা।
গুহাপথটি সমতল নয়, একটু একটু করে উপরদিকে উঠেছে। কিছুটা যাওয়ার পর পরই একটি করে বাঁক। তার মধ্য দিয়ে শরীর নিয়ে যাওয়া এক দুরূহ কর্ম। পদ্মসম্ভব কিছুটা চেষ্টা করে তাও পারছিলেন। কষ্ট হচ্ছিল বৃদ্ধা সঙ্গিনীর। কিন্তু স্বাধীন হওয়ার উদগ্র আকাঙ্ক্ষা তাঁকে দিয়ে সেই অসম্ভব কর্মটিও করিয়ে নিচ্ছিল।
বেশ কিছুটা যাওয়ার পর গুহাপথটি সামান্য প্রশস্ত হল। এবার পথটি মোটামুটি সরল। দুজনে আরও দ্রুতবেগে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেন।
একটি প্রশস্ত স্থান পাওয়া গেল। সেখানে মাথা উঁচু করে বসা যায়। দুজনে সেখানে বসে পরিশ্রান্ত পশুর মতো হাঁপাতে লাগলেন। দুজনেরই গলা শুকিয়ে কাঠ। হাত এবং পায়ের বিভিন্ন অংশে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে।
পদ্মসম্ভব অন্ধকারের মধ্যেই চাতালের বিপরীত দিকের গুহামুখে হাত বুলিয়ে বুঝেছেন যে সামনের পথটি আরও প্রশস্ত।
কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়ার পর দুজনে আবার অগ্রসর হলেন অন্যদিকের গুহাপথ বেয়ে। এবার গুহাপথে বয়ে আসা নির্মল বাতাসের আভাস তাঁদের ক্রমে উজ্জীবিত করতে থাকল। দুজনে এবার তাঁদের শরীরের অন্তিম শক্তিটুকুর সাহায্য এগিয়ে যেতে থাকলেন অন্য প্রান্তের দিকে।
অলিন্দের মধ্যপথে এসে সেতুরক্ষীটি থেমে গেলেন। নত হয়ে মেঝে থেকে কিছু গুঁড়ো হাতে তুলে নিলেন। তারপর নিজের মনেই নিজেকে প্রশ্ন করলেন, ‘এগুলো এখানে কেন? অলিন্দটি কি রোজ পরিষ্কার করা হয় না?’
কারাকর্তা ঈষৎ উষ্ণ হয়ে বললেন ‘তুমি কি এবার এই কারাগৃহের কর্মপরিচালন নিয়েও মাথা ঘামাবে?’
সেতুরক্ষীটি তৎক্ষণাৎ বললেন, ‘আমি তা বলতে চাইনি প্রভু।’
তিনজনে সামনে এগিয়ে গেলেন। প্রথম বাঁকের মুখ পর্যন্ত পৌঁছে সতর্ক হলেন কারাকর্তা। এখানে একজন প্রহরীর প্রহরারত থাকার কথা। অথচ কেউ নেই!
কারাকর্তা সন্তর্পণে ডাকলেন, ‘প্রহরী।’
কোনও উত্তর নেই।
তিনজনে নিজেদের তরবারি কোষমুক্ত করলেন। তারপর ধীরে ধীরে অগ্রসর হতে লাগলেন সামনের দিকে।
ক্রমেই প্রশস্ত হয়ে উঠছিল গুহাপথ। দুজনে চার হাত পায়ে দ্রুত পেরিয়ে যাচ্ছিলেন সামনের দিকে। বাতাস আরও নির্মল হয়ে উঠছিল। একটু পরেই গুহাপথটি ডানদিকে বেঁকে গেছে। দুজনে সেই বাঁকটি ঘুরতেই দেখলেন একটু দূরে পথের শেষ। একটি বৃত্তাকার লৌহদ্বার তার মুখটি অবরুদ্ধ করে আছে।
দুজনে লৌহদ্বারের সামনে জড়োসড়ো হয়ে বসলেন। দুজনের দেহ ঘামে প্লাবিত।
মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় নারীটির চোখ জ্বলজ্বল করছিল। পদ্মসম্ভব ধীরে, অতি ধীরে মরিচা-ধরা লৌহদ্বার বাইরের দিকে খোলার চেষ্টা করলেন। কিন্তু সেটি বিন্দুমাত্র স্থানচ্যুত হল না। শক্তিপ্রয়োগের পরিমাণ বাড়াতে থাকলেন পদ্মসম্ভব। কিন্তু সেই অনড় লৌহদ্বারটি বিন্দুমাত্র বিচলিত হল না। দুবার সজোরে পদাঘাত করলেন তিনি৷ তাতেও কোনও ফললাভ হল না।
প্রচণ্ড ক্রোধে শেষবারের মতো শরীরে সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করতে যাবেন পদ্মসম্ভব, এমন সময় তাঁর সঙ্গিনী তাঁর কাঁধ স্পর্শ করে থামতে বললেন। একটু এগিয়ে এসে দ্বারটির চারিদিক হাত বুলিয়ে ভালোভাবে পরীক্ষা করে পরিধির প্রান্ত থেকে একটি কীলক খুলে নিলেন।
দ্বারটি ভিতরদিকে খুলে এল।
পদ্মসম্ভব খানিকক্ষণ হতভম্ব হয়ে বসে রইলেন। তারপর সশব্দে হা-হা করে হাসতে লাগলেন।
অলিন্দ ধরে উন্মাদের মতো ছুটে আসছিলেন তিনজন। কারাকর্তা মুখ্যদ্বারের কাছে পৌঁছেই চিৎকার করে উঠলেন, ‘দ্বাররক্ষী, বজ্রশিঙা বাজাও। মহারাজসচিবের কাছে সঙ্কটবার্তা পাঠাও। প্রত্যেক প্রহরীকে সমবেত করো।’
প্রহরীরা হতবাক হয়ে গেল। কারাকর্তা শীতল মস্তিষ্কের মানুষ, আজ পর্যন্ত কেউ তাঁকে এত উত্তেজিত হতে দেখেনি। জনৈক প্রহরীপ্রধান ইতস্তত করে প্রশ্ন করলেন, ‘কী হয়েছে প্রভু?’
‘অদ্যাবধি যা হয়নি, তাই হয়েছে। আজ সন্ধ্যাকালে যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বন্দিটিকে আমাদের হাতে সমর্পণ করা হয়েছিল, তিনি পালিয়েছেন। তার সঙ্গে পালিয়েছেন ধর্মচন্দ্রের মহিষী কাঞ্চনাদেবীও।’
প্রহরীদল স্থানুবৎ দাঁড়িয়ে। সংবাদটি তাদের বিশ্বাস হচ্ছিল না। এও কি সম্ভব? এই নরক থেকে পালানো শুধু অসম্ভব নয়, অবাস্তবও বটে।
কারাকর্তা কাঁপতে কাঁপতে বললেন, ‘শুধু তাই নয়; শ্রীধর, ভদ্রসেন, কীর্তিপতি—তিন প্রহরী নিহত। তাদের দেহ পাওয়া গেছে শূন্য কারাকক্ষের মধ্যে। আমি জানি না এরপর কী হবে!’
পদ্মসম্ভব গুহাগহ্বরটি থেকে মাথা বাড়িয়ে এদিক ওদিক দেখলেন। এদিকে রক্ষীদের আসার প্রশ্নই ওঠে না। তাই সতর্কতার কোনও প্রয়োজন নেই।
তাঁর মাথার ঠিক ওপরে লালিম্ববনের পর্বতের শীর্ষদেশ। পর্বতগাত্রটি মসৃণ, পাথুরে এবং উল্লম্ব। কিছু নীচে বয়ে চলেছে মেঘান্দ’র খরস্রোতা শাখানদী। এতদূর থেকেও তার ফেনিল গর্জন শোনা যাচ্ছে। কোনও অবলম্বন ছাড়া এই পর্বতগাত্র বেয়ে নদীতীরে পৌঁছনো প্রায় অসম্ভব।
তিনি কটিদেশ থেকে পুনরায় সেই চর্মপট্টিটি বার করলেন। বেরিয়ে এল দুটি ক্ষুদ্র পাথর। তারপর নিজের পরিধেয় বস্ত্রের শুষ্কতম অংশ ছিঁড়ে তার ওপর অতি যত্নে পাথরদুটি ঘষতে লাগলেন। গুহাদ্বার রইল তাঁর পিঠের দিকে, যাতে বাতাস এসে বিঘ্ন না ঘটায়।
পাথরদুটিতে বোধহয় দাহ্যচূর্ণ সম্পৃক্ত ছিল। সামান্য পরিশ্রমেই শুষ্ক বস্ত্রখণ্ডটি জ্বলে উঠল। পদ্মসম্ভব অতি সাবধানে সেটি বাড়িয়ে ধরলেন বাইরের দিকে।
নদীর ওপারে কয়েকজন এই সংকেতের জন্যই অপেক্ষা করছিল। মুহূর্তের মধ্যে সেদিক থেকে একটি ক্ষুদ্র নৌকা এপারের উদ্দেশে রওনা দিল। একইসঙ্গে লালিম্ববনের শীর্ষদেশে সচল হয়ে উঠল কয়েকটি ছায়ামূর্তি।
একটু পরেই পদ্মসম্ভবের ঠিক সামনে একটি শনের রজ্জু এসে পড়ল। লালিম্ববনের শীর্ষদেশ থেকে কেউ যেন সেটি ঝুলিয়ে দিয়েছে।
পদ্মসম্ভব সঙ্গিনীকে বললেন, ‘আমার পিঠে চড়ে কাঁধ আর গলা জড়িয়ে বসুন মা।’
সঙ্গিনী ইতস্তত করতে লাগলেন। পদ্মসম্ভব বিনীতভাবে বললেন, ‘দেবী, আপনি রাজমাতা, আমার মাতৃসমা। এই অধম সন্তানের কাছে সংকোচ করবেন না মা। মনে করুন আমিই আপনার সেই মৃত সন্তান আনন্দচন্দ্র, আপনাকে এই নরক থেকে উদ্ধার করতে এসেছি।’
নারীটির দুই চোখে ধক করে আগুন জ্বলে উঠল। হ্যাঁ, প্রতিশোধ নিতে হবে তাঁকে। স্বামী আর সন্তান হত্যার প্রতিশোধ।
তিনি পদ্মসম্ভবের পিঠে চড়ে বসলেন। পদ্মসম্ভব দুই হাতে আর পায়ে রজ্জুটি জড়িয়ে নিলেন তারপর ধীরে ধীরে নীচের দিকে নামতে থাকলেন।
ক্রুদ্ধ এবং আহত বাঘের মতো ফুঁসছিলেন প্রকাশচন্দ্র। আজ অবধি তাঁকে কখনও এত ক্রোধান্বিত হতে দেখা যায়নি। শত জটিল সমস্যা, উদ্বেগজনক পরিস্থিতি, বিক্ষোভ সংবাদ—এসবের মধ্যেও তাঁর স্থৈর্য অচঞ্চল ছিল। তিনি সিদ্ধান্ত নিতেন শান্ত ভঙ্গিতে, আজ অবধি তাঁর প্রতিটি সিদ্ধান্ত নির্ভুল প্রমাণিত হয়েছে।
কিন্তু আজ তাঁর পদচালনা অস্থির। আচরণ উন্মত্ত। বাক্য রূঢ় এবং অসংযত। প্রকাশচন্দ্র, বঙ্গের অবিসংবাদী শাসক প্রকাশচন্দ্রের প্রতিটি বাক্যে, পদক্ষেপে, আচরণে ফুটে উঠছিল বুদ্ধিহীনতার লক্ষণ।
বঙ্গদেশের রানি রাজসিংহাসনে আসীন। বজ্রযোগিনীর মন্দিরের বিস্ফোরণের আঘাত থেকে সদ্য নিরাময় হয়ে উঠেছেন তিনি। প্রসাধন সত্বেও তাঁর অনিন্দ্যসুন্দর মুখমণ্ডলে এখনও কিছু ক্ষতচিহ্ন। মুখখানিও আষাঢ়ের মেঘের মতো থমথমে।
চারজন রাজন্য কঠিন মুখ করে বসেছিলেন। সভার মধ্যে কম্পিতদেহে দাঁড়িয়েছিলেন কারাকর্তা আর সেতুরক্ষীটি।
‘কী করে সম্ভব হল মাধব?’ ক্রুদ্ধকণ্ঠে প্রশ্ন করলেন প্রকাশচন্দ্র।
‘প্রভু, এ ত্রুটি সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত...’ আমতা আমতা করে বলার চেষ্টা করছিলেন কারাকর্তা।
‘আমি কোনও মিথ্যা স্তোকবাক্য শুনতে চাইনি মাধব,’ ধমকে উঠলেন প্রকাশচন্দ্র, ‘ওরা পালাল কীভাবে, সেইটি জানতে চেয়েছি।’
কারাকর্তার দিকে তাকিয়েছিল কয়েক জোড়া কঠিন নিষ্করুণ চোখ। সেই দেখে তাঁর দাঁতে ঠকঠকানি লেগে যাচ্ছিল। সেই অবসরে মুখ খুললেন সেতুরক্ষীটি, ‘মহামান্য মহারাজসচিব! কাঞ্চনাদেবী এবং কুমার পদ্মসম্ভব যে কারাকক্ষগর্ভে ছিলেন সেখান থেকে অনতিদূরে, অলিন্দের মধ্যে একটি বৃত্তাকার গুপ্তপথ আবিষ্কৃত হয়েছে। আমরা পরীক্ষা করে দেখেছি যে সেই পথেই দুজনে পলায়ন করেছেন।’
‘গুপ্তপথ?’ ভ্রুকুঞ্চন করলেন প্রকাশচন্দ্র, ‘কোন গুপ্তপথ?’
‘প্রভু, আমরা আবিষ্কার করেছি কারাকক্ষগামী অলিন্দের নিম্নদেশে একটি বিশেষ গুপ্তগুহা আছে। সেটির মুখ একটি বিশেষভাবে প্রস্তুত বৃত্তাকার প্রস্তর দ্বারা নির্মিত। আমরা নিঃসন্দেহ যে এই দুই বন্দি ওই পথেই পলায়ন করেছেন।’
‘এই বন্দিশালা আমার সৃষ্টি। এখানে কোনও গুপ্তপথ থাকার তো কথা নয়।’ প্রকাশচন্দ্রের স্বর প্রস্তরকঠিন। তাঁর মাথার মধ্যে সব গোলমাল হয়ে যাচ্ছিল। তাঁরই নির্দেশে নির্মিত কারাগারে এই গুপ্তগুহার অস্তিত্ব তিনি নিজেও জানতেন না? এ কী করে সম্ভব?
সবাই নিশ্চুপ। সেই অবসরে তিক্ত কাঠিন্যের সঙ্গে প্রকাশচন্দ্র বললেন, ‘আমার বেতনভুক রক্ষীর দল যে পথের সন্ধান পেল না, তার সন্ধান ওরা পেল কী করে? এত অর্থব্যয় করে, এত সযত্নে তোমাদের পুষছি কেন মাধব? এর থেকে তো কয়েকটি জংলি কুকুর পুষলেই বরং ভালো হতো।’
কারাকর্তা মাথা নীচু করে রইলেন।
অগ্নিগর্ভ নৈঃশব্দের পর প্রকাশচন্দ্র বললেন, ‘কারাকক্ষের প্রহরা এড়িয়ে ওঁরা সেই গুপ্তপথ অবধি পৌঁছল কী করে?’
কারাকর্তা কম্পিতস্বরে বলতে লাগলেন, ‘প্রভু, ঘটনাটি এতই আকস্মিক আর অসম্ভব যে এখনও এর পারম্পর্য বুঝে উঠতে পারিনি।’
প্রকাশচন্দ্র কিছুক্ষণ অগ্নিবর্ষী চোখে কারাকর্তার দিকে চেয়ে রইলেন। তারপর সেতুরক্ষীকে প্রশ্ন করলেন, ‘আর তুমি, সেতুপ্রহরী! তোমার কী মত? তুমিই তো শুনলাম সর্বপ্রথম বিপদসংকেত দিয়েছিলে।’
সেতুরক্ষী বলে ওঠে, ‘প্রভু, কুমার পদ্মসম্ভবকে বন্দি করে আনার কিছু পরেই জনৈক রক্ষী তাঁর কাছে রাজপ্রাসাদ থেকে অন্নপাত্র নিয়ে আসে। আমি প্রাথমিক দেহপরীক্ষার সময় লক্ষ করেছিলাম যে রক্ষীটির দক্ষিণ মণিবন্ধে একটি প্রশস্ত চর্মপট্ট বাঁধা আছে। আমার প্রশ্নের উত্তরে সে জানায় যে, সেটি দেবী অট্টহাসের ব্রতধারণপট্ট। আমিও সেই নিয়ে প্রশ্ন করিনি।
সেই রক্ষী চলে যাওয়ার সময় নিয়ম অনুসারে তার দ্বিতীয়বার দেহপরীক্ষা হয়। তখন তাকে আমি যেতে দিই। কিন্তু তার অব্যবহিত পর দৈবগতিকে আমার মনে পড়ে যে, বেরোবার সময় রক্ষীটির মণিবন্ধে সেই চর্মনির্মিত ব্রতপট্টটি ছিল না। আমার সন্দেহ হয়। তৎক্ষণাৎ আমি কারাকর্তাকে সেই বিষয়ে সতর্ক করি...’
হাত তুললেন প্রকাশচন্দ্র, ‘বুঝেছি, আর অধিক বিস্তারের প্রয়োজন নেই৷ কিন্তু বন্দি দুজন যে পথে পালাল, সেই গুপ্তপথটির সন্ধান তোমরা পেলে কী করে?’
ইতস্তত করল সেতুরক্ষী, ‘প্রভু, আমি বন্দিদের সন্ধানে যাওয়ার পথেই লক্ষ করেছিলাম যে অলিন্দের মাটিতে কিছু সূক্ষ্ম প্রস্তরচূর্ণ বিক্ষিপ্ত আছে, যেরকম চূর্ণ কোনও প্রস্তরখণ্ডকে দেওয়ালে বদ্ধ করার কাজে ব্যবহৃত হয়৷ সেই সূত্রে অনুসন্ধান করতে করতে বৃত্তাকার গুপ্তদ্বারটির সন্ধান পাই প্রভু।’
কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন প্রকাশচন্দ্র৷ তাঁর মনের মধ্যে একটা কুটিল সন্দেহ দানা বেঁধে উঠছিল। তাহলে কি তাঁর অজ্ঞাতেই...
‘কে সেই রক্ষী যে অন্নপাত্র নিয়ে গেছিল?’
‘প্রভু, অনেক অনুসন্ধানের পর জেনেছি, তার নাম মল্ল সিংহোদর। সদ্য মগধ থেকে ভাগ্যান্বেষণে এই দেশে এসেছে। তার পূর্বে সে নালন্দা মহাবিহারের দ্বাররক্ষী ছিল। এই ঘটনার পর থেকেই সে উধাও, তার কোনও সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না।’
প্রকাশচন্দ্রের পায়ের কাছে একটি নীচু ত্রিপদী রাখা ছিল। তার ওপর একটি অরিষ্টপূর্ণ রৌপ্যনির্মিত কলস, আর একটি স্বর্ণনির্মিত পানপাত্র। প্রকাশচন্দ্র সেই ত্রিপদীতে সজোরে পদাঘাত করলেন। ঝনঝন শব্দে কলসটি সভার একদিকে নিক্ষিপ্ত হল। মদিরা নির্গত হয়ে দুর্মূল্য গালিচা ভিজিয়ে দিতে লাগল। পানপাত্রটি উড়ে এসে কারাকর্তার কপালে আঘাত করল। তিনি শুধু ক্ষতস্থান একহাতে চেপে ধরলেন, মুখ থেকে একটি শব্দও নির্গত হল না৷ শুধু উষ্ণ রক্তধারা নেমে এল তাঁর আঙুলের ফাঁক দিয়ে।
প্রকাশচন্দ্র আদেশ দিলেন, ‘রক্ষীদল, এই অপদার্থ কারাকর্তাকে এই মুহূর্তে কুমীরের মুখে নিক্ষেপ করো। রাজকর্মে অবহেলার অর্থ রাজদ্রোহ। এ যেন রাজদ্রোহীর উপযুক্ত শাস্তিই পায়। লক্ষ রেখো, এর শরীরের একটি অংশও যেন দাহকার্যের জন্য অবশিষ্ট না থাকে।’
কারাকর্তার হাহাকারে সভার বাতাস আকুল হয়ে উঠল। উপস্থিত রাজন্য বা সামন্তদের কারও ভ্রুকুঞ্চন হল না। সেতুরক্ষীটির হাত-পা ঠকঠক করে কাঁপতে লাগল। হতভাগ্য কারাকর্তা কাঁদতে কাঁদতে রানির কাছে প্রাণভিক্ষা চাইতে লাগলেন৷ রাজ্ঞী এদিকে তাকালেন না।
উপস্থিত রাজসেবকরক্ষীরা হতভাগ্য কারাকর্তাকে টেনে নিয়ে যাওয়ার পর প্রকাশচন্দ্র বললেন, ‘আর তুমি, সেতুরক্ষী, তোমার নাম কী?’
‘আমার নাম রঙ্গলাল, প্রভু।’
‘তুমি মল্ল সিংহোদরের মুখ দেখলে চিনতে পারবে?’
‘অবশ্যই পারব প্রভু। আমি কারও মুখ একবার দেখলে ভুলি না।’
প্রকাশচন্দ্র তাঁর ব্যক্তিগত দেহরক্ষীকে আদেশ দিলেন, ‘সমগ্র কর্মান্তবাসকে প্রহরা চতুর্গুণ করো। আমি নির্দিষ্টভাবে জানতে চাই এই রাজদ্রোহের পিছনে কারা আছে৷ ঘোষণা করে দাও, যে বা যারা বজ্রযোগিনী মন্দিরের সামনে ঘটে যাওয়া অন্তর্ঘাতের সঙ্গে জড়িত কারো সন্ধান দিতে পারবে, তারা এক কলসী রৌপ্যদ্রহ্ম পারিতোষিক পাবে।
আর এই রঙ্গলালের সঙ্গে চৌষট্টিজন বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত রাজসেবক দেওয়া হোক। শোনো রঙ্গলাল, যদি এই মল্ল সিংহোদর, কাঞ্চনাদেবী বা কুমার পদ্মসম্ভব—এদের সন্ধান দিতে পারো, একটি বর্ধিষ্ণু গ্রাম উপহার হিসেবে পাবে। মনে থাকবে?’
রঙ্গলাল সায় দিতেই একজন রক্ষী এসে তাকে বাইরে নিয়ে গেল।
সভাস্থলে আবার অস্বাভাবিক নীরবতা নেমে এল।
কিছু পর প্রকাশচন্দ্র বললেন, ‘জিতসেন, আজ থেকে গূঢ়পুরুষবাহিনীর প্রধানের দায়িত্বও আপনিই নির্বাহ করুন। বঙ্গদেশের বিভিন্ন প্রদেশে নিযুক্ত গুপ্তচরদের মধ্যে যারা দক্ষতম তাদের ডেকে পাঠান। তাদের কর্মান্তবাসকের সর্বত্র নিয়োজিত করুন। আমি জানি, বিদ্রোহীরা আশেপাশেই কোথাও লুকিয়ে আছে। তাদের সেই গর্ত থেকে টেনে বার করে আনতে হবে। তারপর তাদের এমন শাস্তি দেব যা দেখে ঈশ্বরও ভয়ে কেঁপে উঠবেন।’
প্রধানমন্ত্রী অমিতাভভট্ট ইতস্ততস্বরে প্রশ্ন করলেন, ‘শান্তঘোষ আর আনন্দগুপ্ত’র হত্যাকারীদের সন্ধান দেওয়ার জন্য কি অন্য কোনও পারিতোষিক ঘোষণা করা হবে মহামান্য রাজসচিব?’
কিছুক্ষণ অমিতাভভট্ট’র দিকে চেয়ে রইলেন প্রকাশচন্দ্র। মানুষটি অত্যন্ত বিশ্বস্ত এবং রাজসেবায় নিবেদিতপ্রাণ হলে কী হবে, কূটবুদ্ধিতে নিতান্ত শিশু।
প্রকাশচন্দ্র বললেন, ‘না আর্য। প্রথমত, আমরা জানি এই কাজ কাদের। একই কাজের জন্য দুবার পারিতোষিক ঘোষণা অর্থের অপচয় ছাড়া আর কিছু নয়। দ্বিতীয়ত, শান্তঘোষ এবং আনন্দগুপ্ত’র হত্যার সংবাদ এখনও জনারণ্যে প্রকাশ করা হয়নি। তাই পারিতোষিক ঘোষণার প্রশ্নই ওঠে না।’
অগ্নিমিত্র অনুচ্চ স্বরে যোগ করলেন, ‘আমরা কৌশলে রটনা করেছি যে ওঁরা দুজন কোনও এক বিশেষ এবং গোপন রাজকার্যে বিদেশযাত্রা করেছেন।’
শান্তস্বরে প্রকাশচন্দ্র বললেন, ‘আপনাদের মতই শান্তঘোষ এবং আনন্দগুপ্ত ছিলেন বঙ্গদেশের শাসনক্ষমতার অচ্ছেদ্য অংশ। বিদ্রোহীরা তাঁদের হত্যা করেছে, এই সংবাদ প্রচার হলে জনসাধারণের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বৃদ্ধি পাবে। আমরা সেটি হতে দিতে পারি না।’
আচার্য বিশুদ্ধকীর্তি বললেন, ‘তাছাড়া আরও একটি কারণ আছে।’
অন্য রাজন্যরা আচার্য’র দিকে ফিরে চাইলেন। তিনি কঠিনস্বরে বললেন, ‘আমাদের মধ্যে একজন বিশ্বাসঘাতক আছে। তার পরিচয় উদঘাটিত না হওয়া পর্যন্ত এই সংবাদ জনারণ্যে প্রচার করা ঠিক হবে না।’
সভার মধ্যে থমথমে নৈঃশব্দ্য নেমে এল। অগ্নিমিত্র ইতস্ততভাবে বললেন, ‘এরকম অনুমানের কারণ কি আচার্য?’
বিশুদ্ধকীর্তি ওষ্ঠপ্রান্ত সামান্য বিকৃত হল, ‘ঘটনাপ্রবাহের পারম্পর্য বিচার করলেই এ কথার সত্যতা প্রতীয়মান হবে। সেই রাত্রের অভিযানের কথা আমরা সপ্তরাজন্য এবং স্বয়ং মহারানি ছাড়া আর কেউ জানতেন না। সমগ্র অভিজানটির জন্য সর্বোচ্চ পর্যায়ের গোপনীয়তা অবলম্বন করা হয়েছিল। কারণ আমরা চেয়েছিলাম—একই সঙ্গে সব কজন কুচক্রীকে বন্দি করতে।
‘তা সত্বেও তাঁরা যে তাঁদের উদ্দেশ্যপালনে শুধু ব্যর্থ হয়েছিলেন তা নয়, এই দুই মহারথী নির্মমভাবে নিহত হন। রাজসেবকসৈন্যদল প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। বাহিনীপ্রধান গিরিকিশোরের মৃতদেহ এমন নৃশংসভাবে ক্ষতবিক্ষত করা হয়েছে যে তার দিকে তাকানো যায় না।
এই বঙ্গদেশের বুকে দাঁড়িয়ে কেউ এমন শাসকবিরোধী অন্তর্ঘাত ঘটাতে পারে, এ আমরা এতদিন স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারিনি। কিন্তু তাইই ঘটেছে। আমরা প্রথমে ভেবেছিলাম এ হয়তো আমাদের গুপ্তচরদের আত্মতুষ্টির ফল।
‘কিন্তু সেইরাত্রের অভিযানের ক্ষেত্রে তো সমস্তরকম সতর্কতা নেওয়া হয়েছিল। তা সত্বেও এই ঘটনা সম্ভব হল কী করে?
‘যে কয়েকজন রাজসেবক বেঁচে ফিরে এসেছে, তাদের কাছ থেকে জানা গেছে যে শান্তঘোষ এবং আনন্দগুপ্ত যখন রাজসেবকবাহিনী নিয়ে শত্রুদের প্রায় অধিকৃত করে ফেলেছেন, ঠিক তখনই তাঁদের ওপর অতর্কিতে প্রতিআক্রমণ নেমে আসে। বলা বাহুল্য, ওঁরা এর জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। নইলে অত সহজে দুই মহারথী এবং অমন দুর্ধর্ষ, দুর্বধ্য রাজসেবকদের নির্মূল করা অসম্ভব।
প্রশ্ন হচ্ছে, এই আপাত অসম্ভব ঘটনা সম্ভব হল কী করে? এর একটিই উত্তর। এই প্রতিআক্রমণ একমাত্র তখনই সম্ভব, যখন এই অভিযানের সংবাদ আগেই শত্রুদের কাছে যদি যায় পৌঁছে৷
অর্থাৎ আমাদের মধ্যেই এমন কেউ আছেন, যিনি আমাদের সমস্ত আলোচনা শত্রুপক্ষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন।’
প্রত্যেকে পাথরের মতো বসে রইলেন। আচার্য বিশুদ্ধকীর্তির শেষ বাক্যটি যেন অনুচ্চারে সন্দেহের জাল বুনে দিচ্ছিল সবার মনে। আর তার সঙ্গে সবার মনের মধ্যে চারিয়ে যাচ্ছিল ভয়, মহাভয়।
প্রকাশচন্দ্র বললেন, ‘আমি নিশ্চিত যে, আমাদের মধ্যেই কেউ একজন সেই বিশ্বাসঘাতক। তবুও আপনাদের আশ্বস্ত করছি যে, যতক্ষণ না অপরাধী ধরা পড়ছে বা নিজের অপরাধ স্বীকার করছে, ততক্ষণ আপনারা প্রত্যেকে সন্দেহের ঊর্ধ্বে।
কালই আমি আর রানি বিশেষ যজ্ঞসাধনায় বসব। আমি আমার সমস্ত সাধনপ্রকরণ দিয়ে চেষ্টা করব সমস্ত মিথ্যাজাল ছিন্ন করতে। মা বজ্রযোগিনী আমাদের সহায় হোন।’
একটা শিরশিরে ভয় প্রত্যেকের শিরদাঁড়া বেয়ে ব্রহ্মরন্ধ্রের দিকে উঠে আসতে লাগল। উত্তপ্ত পারদের মতো, শান্ত আগ্নেয় লাভার মতো, শীতল মৃত্যুর মতো সেই ভয়।
প্রকাশচন্দ্র বললেন, ‘আর্য অগ্নিমিত্র, আমার ধারণা চূড়ান্ত সংঘর্ষের সময় উপস্থিত। শত্রুরা যে কোনও মুহূর্তে চূড়ান্ত এবং প্রত্যক্ষ সংগ্রামে অবতীর্ণ হতে পারে। এখন কর্মান্তবাসকের সৈন্যশিবিরে কত সৈন্য উপস্থিত?’
‘পঞ্চসহস্রের কিছু অধিক, মহারাজসচিব।’
‘সে কী! আমাদের সৈন্যসংখ্যা তো বিশসহস্রাধিক!’
‘অন্যান্য সৈন্যরা আপাতত বঙ্গদেশের বিভিন্ন সামন্তপ্রদেশে রাজদ্রোহদমনে ব্যস্ত মহারাজসচিব।’
পরের প্রশ্ন এল রাজ্ঞীর থেকে। ‘আশ্চর্য! রাজ্যের সৈন্যবাহিনীর তিন চতুর্থাংশ বিভিন্ন সামন্তরাজ্যে রাজদ্রোহনির্বাপণে সন্নিবিষ্ট, আর সেই সংবাদ আমাকে বা মহারাজসচিবকে কেউ জানায়নি?’
অগ্নিমিত্র সামান্য অপ্রতিভ হলেন, ‘প্রয়াত শান্তঘোষ স্বয়ং এই বিষয়ে অবগত ছিলেন মহারানি। বিগত বেশ কয়েক পক্ষকাল যাবৎ আমরা সংবাদ পাচ্ছিলাম যে, বঙ্গদেশের বিভিন্ন সামন্তপ্রদেশে বিদ্রোহের উদ্রেক ঘটছে। কোথাও সামন্তসৈন্যরা দ্রোহী হয়েছে, কোথাও বা কৃষক এবং অন্যান্য কৃষ্যমানকেরা৷ অনুগত সামন্তরা ক্রমাগত সাহায্য প্রার্থনা করে বার্তা প্রেরণ করছিলেন। তাই তাঁদের সাহায্যার্থে সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করা হয়েছে।’
রাজ্ঞীর মুখমণ্ডলে প্রশ্নচিহ্নের উদয় হল, ‘তার মানে প্রকৃতপক্ষে কর্মান্তবাসক এখন অরক্ষিত, তাই তো?’
‘অরক্ষিত বলা ভুল হবে মহারানি। কর্মান্তবাসকের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার দায়িত্ব অনেকাংশেই রাজসেবক বাহিনী নির্বাহ করে। তবে সৈন্যদলের একটি বৃহদাংশ এই মুহূর্তে অন্যত্র নিয়োজিত, এ কথা সত্য।’
প্রকাশচন্দ্র বললেন, ‘আর যেসব অঞ্চলে সামন্তশাসন অপেক্ষাকৃত নিরুপদ্রব এবং আয়ত্তাধীন, তাঁদের সৈন্যবাহিনী?’
অগ্নিমিত্র অস্বস্তির সঙ্গে বললেন, ‘সেইসব সামন্তদের সৈন্যবাহিনীও ওই একই কর্মে নিয়োজিত হয়েছে, রাজসচিব।’
প্রকাশচন্দ্রের মুখমণ্ডল আরও গম্ভীর হয়ে উঠল। প্রশ্ন করলেন, ‘আর্য অগ্নিমিত্র, যে যে সামন্তপ্রদেশে সৈন্যদল প্রেরণ করা হয়েছে তাদের নাম বলুন।’
অগ্নিমিত্র পাঁচটি সামন্তপ্রদেশের নাম বললেন।
প্রকাশচন্দ্র প্রশ্ন করলেন, ‘এগারোটি সামন্তপ্রদেশের মধ্যে পাঁচটিতে এতই বিদ্রোহের উন্মেষ ঘটছে যে দেশের রাজধানী অরক্ষিত রেখে সেখানে সৈন্যসন্নিবেশ করতে হয়েছে? এমনকী অন্য ছ’টি সামন্তপ্রদেশ থেকেও? কে নিয়েছে এত বড় সিদ্ধান্ত?’
অগ্নিমিত্র বিব্রত হলেন, ‘এই সিদ্ধান্ত একান্তই শান্তঘোষের ছিল, মাননীয় রাজসচিব।’
প্রকাশচন্দ্র খানিকক্ষণ স্থির চোখে চেয়ে রইলেন অগ্নিমিত্রর দিকে। তারপর শান্ত এবং ধীরস্বরে প্রশ্ন করলেন, ‘এই ঘটনা কবে ঘটেছে?’
‘আমরা মাসাধিককাল থেকে এই মর্মে সংবাদ পাচ্ছিলাম, মাননীয় মহারাজসচিব। অবশেষে শরতের প্রারম্ভে উপায়ান্তর না দেখে আমরা সৈন্যপ্রেরণ করতে বাধ্য হই।’
রাজ্ঞী প্রশ্ন করলেন, ‘আর্য জিতসেন, এই পাঁচটি সামন্তপ্রদেশে নিশ্চয়ই আমাদের গুপ্তচরেরা রয়েছে। তাদের কাছ থেকে কী বার্তা এসেছে?’
জিতসেন বললেন, ‘তারাও একই বার্তা প্রেরণ করেছে মহারানি। সর্বত্র পরিস্থিতির গুরুতর অবনতি ঘটেছে। অধিকাংশ স্থানেই সামন্তসৈন্যদল বিদ্রোহী হয়েছে। সামন্তবর্গ এবং তাঁদের অধীনস্থ রাজপদাধিকারীরা প্রাণভয়ে ভীত। বিদ্রোহী সৈন্যদল প্রতিটি সামন্তপ্রদেশের প্রান্তবর্তী অঞ্চলগুলি তো অধিকার করেইছে, অনেক ক্ষেত্রে রাজধানীর দিকেও অগ্রসর হয়েছে। তার সঙ্গে বিদ্রোহী হয়েছে কৃষক এবং অন্যান্য কৃষ্যমানকেরা। তারা কর দিতে অস্বীকার করছে। অন্তত তিনটি সামন্তপ্রদেশে রাজকোষ লুণ্ঠিত হয়েছে। অবশেষে উপায়ান্তর না দেখে আর্য শান্তঘোষ এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন।’
প্রকাশচন্দ্রের মুখমণ্ডল অবিকৃত রইল। তিনি বললেন, ‘আশা করি আর্য শান্তঘোষ সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছিলেন। তবুও নিশ্চিত হওয়ার জন্য একটি বিষয়ে জ্ঞাত হতে চাই আর্য জিতসেন।’
‘আদেশ করুন প্রভু।’
‘আপনারা তো জানেন যে প্রতিটি সামন্তপ্রদেশের রাজপদোপজীবিদের মধ্যে এক বা দুজন এমন গুপ্তপুরুষ আছেন যাঁরা গোপনে আমাদের সহায়তা করেন। তাঁদের থেকে কি এই বিদ্রোহবিষয়ে কোনও সংবাদ পেয়েছেন?’
জিতসেন বললেন, ‘আমরা গণনা করে দেখেছি যে ওই পাঁচটি প্রদেশে ঠিক ছ’জন রাজপুরুষ আছেন যাঁরা কর্মান্তবাসক থেকে নিয়মিত গুপ্ত অর্থ পেয়ে থাকেন। তাঁদের পাঁচজনের কাছ থেকে পাওয়া বার্তায় আমরা একই সংবাদ প্রাপ্ত হয়েছি। আমরা নিঃসন্দেহ যে এই বিদ্রোহসংবাদ সম্পূর্ণ সত্য।’
‘ষষ্ঠজন কে?’
‘বিক্রমপুরাধিপতি ধর্মসেনের কোষাধ্যক্ষ চণ্ডকীর্তি।’
প্রকাশচন্দ্র কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে রইলেন। আচার্য বিশুদ্ধকীর্তি প্রশ্ন করলেন, ‘একটি কথা কিছুতেই বোধগম্য হচ্ছে না আর্য প্রকাশচন্দ্র। যে পথে কুমার পদ্মসম্ভব এবং কাঞ্চনাদেবী পালিয়েছেন, তার সন্ধান ওঁরা পেলেন কী করে?’
প্রকাশচন্দ্র আত্মগতভাবে বললেন, ‘এর একটিই উত্তর সম্ভব আচার্যদেব। আর সেক্ষেত্রে বুঝতে হবে ষড়যন্ত্রের মূল অনেক গভীরে প্রবেশ করেছে। আমি যা ভেবেছিলাম তার থেকেও অনেক বেশি গভীরে। এবং সেক্ষেত্রে প্রতিটি অস্বাভাবিক ঘটনা আমাদের বার বার যাচাই করে দেখতে হবে, তার স্বপক্ষে যতই সাক্ষ্যপ্রমাণ থাকুন না কেন।
‘আর্য অগ্নিমিত্র, স্থানিক সমিতি বা আমাদের গুপ্তভৃতকদের থেকে যে গোপন পত্রগুলি এসেছে, সেগুলি আমি এখনই একবার পরীক্ষা করে দেখতে চাই।’
অগ্নিমিত্র বললেন, ‘সেগুলি আমার সঙ্গেই আছে, আপনি এখনই পরীক্ষা করতে পারেন।’
অগ্নিমিত্র’র ইঙ্গিতে একজন রক্ষী কয়েকটি তালিপত্র এনে দিল প্রকাশচন্দ্রের সামনে। তিনি এক এক করে পড়তে লাগলেন।
কিছুক্ষণ পর প্রকাশচন্দ্র যখন মুখ তুললেন তখন তাঁর মুখ থমথম করছে। তিনি উত্তেজিত স্বরে বললেন, ‘জিতসেন, আপনি এখনই সমস্ত সৈন্যদের কর্মান্তবাসকে ফিরে আসার আদেশ দিন। আর চণ্ডকীর্তির সন্ধানে এক্ষুনি চর প্রেরণ করুন। আমার আশঙ্কা যদি সত্য হয়, ভয়ঙ্কর কিছু একটা ঘটতে চলেছে।’
আচার্য বিশুদ্ধকীর্তি প্রশ্ন করলেন, ‘কী ঘটতে চলেছে মহারাজসচিব? কোন অমঙ্গলের আশঙ্কা করছেন আপনি?’
‘আমার ধারণা আমাদের স্থানিক সমিতির প্রধান বা গুপ্তসচিবরা বন্দি। এই পত্রগুলি হয় তাদের ভয়প্রদর্শন করে লেখানো হয়েছে, অথবা পত্রগুলি নকল।’
জিতসেন বিস্মিতস্বরে প্রশ্ন করলেন, ‘কেন এমন ভাবছেন প্রভু?’
‘পত্রগুলি আপনি যদি পরীক্ষা করতেন, তাহলে লক্ষ করতেন যে তালিপত্রগুলি এক, তাদের আকার এক, পত্রের ভাষা প্রায় এক, ঘটনাপ্রবাহের বিবরণ একেবারে একইরকম৷ বিভিন্ন সামন্তপ্রদেশ থেকে আসা প্রতিটি পত্রের মধ্যে এত সাদৃশ্য হতে পারে!’
সকলে আবার নিশ্চুপ। প্রকাশচন্দ্র অমিতাভভট্টের দিকে ঘুরলেন, ‘আর্য অমিতাভভট্ট, আপনাকে একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় কাজের ভার দিতে চাই। এর জন্য আপনার থেকে উপযুক্ত আর কেউ নেই।’
অমিতাভভট্ট সাগ্রহে বললেন, ‘কী কাজ মহারাজসচিব?’
‘আপনাকে একবার হরিকেল যেতে হবে আর্য। সেখানে আমার এক প্রাচীন মিত্র ইশ্বরচিন্তায় বার্ধক্যাতিপাত করছেন। তাঁকে এখানে নিয়ে আসতে হবে।’
‘আপনার মিত্র? হরিকেলে?’ বিস্মিত হলেন অমিতাভভট্ট, ‘কে তিনি?’
‘আর্য চারুদত্ত।’
মানুষটি দ্রুত হাঁটছিল অন্ধকারের মধ্যে। দুর্ভেদ্য অরণ্য। এর মধ্য দিয়ে দ্রুত চলাফেরা করা অত্যন্ত অসুবিধাজনক। পদে পদে পা জড়িয়ে ধরে নাম না জানা লতা। কোথাও বা গভীর গহ্বর, কোথাও বিষাক্ত লতার ঘন ঝোপ।
আর বন্য জন্তুর তো কথাই নেই। বন্য বরাহ, হিংস্র সারমেয়, শৃগাল, বন্য মহিষ ইত্যাদিতে পূর্ণ এই অরণ্য। আর বিষধর সাপ! রাজগোক্ষুরো থেকে শুরু করে কালাচ, শাঁখামুটি, কেউটিয়া কী নেই অরণ্যে?
মানুষটি তবুও তার যাত্রা থামাল না। তাকে যে করেই হোক পৌঁছতে হবে অরণ্যের অন্য প্রান্তে। কারণ তার পিছনে ধেয়ে আসছে পৃথিবীর হিংস্রতম প্রাণী।
মানুষ।
একটি অপেক্ষাকৃত উন্মুক্ত স্থানে এসে গভীর নিঃশ্বাস নিল মানুষটি। দেহ ঘর্মাক্ত। দেহের বিভিন্ন স্থানে বৃক্ষশাখার আঘাতে সৃষ্ট ক্ষত থেকে রক্তপাত হচ্ছে। কিন্তু সেদিকে তার মন নেই। তার মন পড়ে আছে ফেলে আসা পথের দিকে। কারও পদশব্দ শোনা যাচ্ছে না তো? ধর্মসেনের গুপ্তঘাতকরা তার সন্ধান পেয়ে গেল না তো?
অনেকক্ষণ মনোযোগ সহকারে কান পেতে রাখার পর নিশ্চিন্ত হল মানুষটি। একবার আকাশের দিকে তাকাল সে। নক্ষত্র অবস্থান দেখে দিকনির্ণয় করতে হবে তাকে। কাল দ্বিপ্রহরের মধ্যেই যেনতেন প্রকারেণ কর্মান্তবাসকে পৌঁছনো আবশ্যক। নইলে মহা অনর্থ ঘটে যাবে।
কিন্তু এক পা এগোতেই মানুষটি অনুভব করল যে তার সমস্ত শরীর তীব্র ব্যথার কশাঘাতে জর্জরিত। দেহের প্রতিটি অংশ যেন বিদ্রোহ ঘোষণা করছে৷ মাথা ভার, পা দুটি আর চলতে চাইছে না। অবশ্য তার কারণও আছে।
দীর্ঘ দুই রাত্রি সে প্রায় অনাহারে রয়েছে। বন্য জন্তুর মতো ছুটে বেরিয়েছে বিক্রমপুরের একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত। আশ্রয় ভিক্ষা করেছে পরিচিত মিত্রজনেদের কাছে। কিন্তু না, ধর্মসেনের রুদ্রচক্ষুর সামনে কারও সাহস হয়নি তাকে আশ্রয় দেওয়ার৷
শেষে বহু পুরাতন পরিচিতির সূত্র ধরে জনৈক তস্কর তাকে আজ প্রভাতে এই অরণ্যের প্রান্তে ছেড়ে যায়। অবশ্যই কাঞ্চনমূল্যের বিনিময়ে। সেই থেকে সে এই অরণ্যপথে ক্রমাগত ছুটে চলেছে কর্মান্তবাসকের দিকে। যৎসামান্য ক্ষুন্নিবৃত্তি করেছে বনজ ফলে। অরণ্যের মধ্য দিয়ে বয়ে গেছে মেঘান্দ’র এক ক্ষুদ্র শাখা। তার জলে তৃষ্ণানিবারণ করেছে সে। আর ক্রমাগত কান পেতে বোঝার চেষ্টা করেছে, ধর্মসেনের ঘাতক রক্ষীরা তার সন্ধানে ছুটে আসছে না তো?
মাটিতে বসে পড়ল সে। শরীর আর দিচ্ছে না। চক্ষু বন্ধ করল।
মাসাধিককাল যাবৎ বিক্রমপুরের রাজন্যবৃত্তের মধ্যে সে বেশ কিছু পরিবর্তন লক্ষ করছিল। হঠাৎ করেই গুরুত্বপূর্ণ রাজকর্মচারীদের অন্য দায়িত্বে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছিল। মহামাত্য এবং অন্যান্য কিছু বিশিষ্ট রাজপদাধিকারীদের অসময়ে রাজপ্রাসাদে আনাগোনা বেড়ে গেছিল। ইতিউতি কিছু অসন্তোষের সংবাদও আসতে শুরু করেছিল রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে।
কিন্তু তাতে সে বিশেষ আমল দেয়নি। অমন সহস্রাধিক অসন্তোষের স্ফুলিঙ্গ নিমেষে নির্বাপিত করার ক্ষমতা রাখে ধর্মসেন। শুধু মাত্র নিজের কর্তব্যপালন করে যাচ্ছিল। দিনগত পাপক্ষয়। সুযোগমতো বিশ্বস্ত পারাবত কামিনীর মাধ্যমে আর্য শান্তঘোষের কাছে সংবাদ প্রেরণ করতে হবে।
এদিকে পরিস্থিতি ক্রমাগত জটিল হয়ে উঠছিল। সে বুঝতে পারছিল যে, রাজপ্রাসাদের সর্বত্র একটা থমথমে অবিশ্বাসের আবহাওয়া চারিয়ে যাচ্ছে। ঠিক একমাস পূর্বে এক রাত্রির মধ্যে তার পরিচিত জগত সম্পূর্ণ পালটে গেল।
পরিচারক এসে প্রণাম করে দাঁড়াতেই শয্যার ওপর উঠে বসলেন অগ্নিমিত্র। তাঁর চোখেমুখে চাপা উত্তেজনার ছাপ। এই মুহূর্তটির অপেক্ষা করছিলেন তিনি। অবশেষে, অবশেষে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ এসেছে।
‘তিনি কি একাই এসেছেন?’
‘না প্রভু, ভাঁড়ুদত্তও সঙ্গে আছেন।’
প্রীত হলেন অগ্নিমিত্র। বণিকশ্রেণীর মানুষদের তিনি চিরকালই দেখেছেন শাসকের পক্ষ নিতে। স্বাভাবিক, কারণ শাসকের কোপে পড়া মানে বাণিজ্যের ক্ষতি, অর্থাগমের ক্ষতি। কোনও বণিকই সেই ঝুঁকি নেন না।
তাদের মধ্যেও কেউ কেউ আছেন যাঁরা নিজগুণেই শাসকদের বিশেষ প্রিয় হয়ে ওঠেন। শাসকপক্ষের প্রীতিবর্ধক কাজে সহযোগিতা করেন, শাসকপক্ষের আদিষ্ট কর্ম সম্পাদনে বিশেষ উৎসাহ নেন। ভাঁড়ুদত্ত এমনই একজন মানুষ।
ভাঁড়ুদত্তর আবাসলয়টি এই কর্মান্তবাসকের উচ্চবর্গের আনন্দনিকেতন বিশেষ। সেখানে অনেকানেক বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ক্লান্তি অপনোদন করতে আসেন। তাই বহুদিন থেকেই ভাঁডুদত্ত’র মাধ্বীশালার ওপর রাষ্ট্রশক্তির দৃষ্টি রয়েছে।
শান্তঘোষ একবারই মিলিত হয়েছিলেন ভাঁড়ুদত্তর সঙ্গে। অগ্নিমিত্রও ছিলেন সেই আলাপচারিতায়। এই অর্থলোভী মনুষ্যটিকে স্ববশে আনতে বেশি পরিশ্রম হয়নি তাঁদের।
‘ওঁদের আসতে বলো।’ আদেশ দিলেন অগ্নিমিত্র।
সামান্য অপেক্ষার পর ওঁরা দেখা দিলেন। শাসকবান্ধব ভাঁড়ুদত্ত এবং জনৈক অতিথি। নবাগত অতিথিটির আচার আচরণের মধ্যে অস্বস্তির চিহ্ন প্রবল। মুখচ্ছবি শীর্ণ। অক্ষিমণি চঞ্চল। হাত দুখানি পরস্পরের মধ্যে অঙ্গুষ্ঠবদ্ধ।
নবাগত আগন্তুককে স্বাগতসম্ভাষণ জানালেন অগ্নিমিত্র, ‘আসুন ভন্তে, আপনার জন্যই তো এত আয়োজন। তারপর, কোন মদিরাসেবন ইচ্ছা করেন বলুন, অরিষ্ট না মৈরেয়?’
‘মাহেন্দ্রক্ষণ সমাগতপ্রায় কুমার। আজ রাতেই আমাদের সেই মহাকর্মসাধনে প্রবৃত্ত হতে হবে। আর সময় নেই।’
মানুষটি বসেছিলেন পদ্মাসনে। সামনে একটি প্রদীপ। তার শিখার মৃদু কম্পনে পিছনের দেওয়ালে দুটি মানুষের ছায়াচিত্র ফুটে উঠছিল।
‘কিন্তু লোকেশ্বর,’ সংশয়াকুল স্বরে প্রশ্ন করলেন পদ্মসম্ভব, ‘আপনি এই ঔষধির গুণাগুণ সম্পর্কে নিঃসন্দেহ তো?’
‘যদি আমার চরেরা সঠিক সংবাদ দিয়ে থাকে, তাহলে এই ঔষধি কিছুতেই ব্যর্থ হতে পারে না কুমার। আর যে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে এই লতাগুল্মটি রক্ষিত ছিল, তাতে তো প্রমাণ হয়েই যায় এই সেই প্রার্থিত সর্ববিষহর ঔষধি।’
পদ্মসম্ভব তবুও ইতস্তত করতে লাগলেন। মৎস্যেন্দ্রনাথ বললেন, ‘আমি আপনার চাঞ্চল্যের কারণ অনুমান করতে পারি কুমার। কিন্তু এই মুহূর্তে আমাদের সামনে অন্য কোনও পথ নেই।’
পাশের ঘর থেকে শিলবাটার শব্দ ভেসে আসছিল। কমলশীল প্রাণ হাতে করে যে সর্ববিষহর লতাগুল্মটি নিয়ে এসেছেন, তার থেকে ঔষধ প্রস্তুত করা হচ্ছে। ভিক্ষুণী মন্দর্ভা স্বয়ং তার দায়িত্ব নিয়েছেন৷ আয়ুর্বেদ বিদ্যায় অসামান্য ব্যুৎপত্তি আছে তাঁর। নালন্দা মহাবিহারের শিক্ষার্থীদের চিকিৎসার দায়িত্ব তিনিই নির্বাহ করেন।
তাঁকে সাহায্য করছেন এক তরুণী। তাঁর মুখখানি আবেগহীন এবং গম্ভীর হওয়ায় বয়সের তুলনায় তাঁকে অনেক বয়স্ক দেখায়। এই বিংশতিবর্ষীয়াকে দেখলে কে বলবে অস্ত্র হাতে কী ভয়ঙ্কর হতে পারেন তিনি। রাজসেবকপ্রধান গিরিকিশোরকে সম্মুখ দ্বৈরথে স্বহস্তে বধ করেছেন। তাঁর এক খড়্গাঘাতে ভূলুণ্ঠিত হয়েছে আনন্দগুপ্ত’র মস্তক। তাঁর অসামান্য যুদ্ধকৌশল দেখে বিস্মিত হয়েছেন বপ্যট স্বয়ং।
ঘরের এককোণে চুপ করে বসে আছেন দুজন। গোপালদেব এবং আচার্য শান্তরক্ষিত। গোপালদেব নির্বিকার। তাঁর শান্ত সমাহিত মুখ দেখে মনের মধ্যে কী চলছে বোঝা অসম্ভব। আচার্য শান্তরক্ষিতের মুখে অবশ্য উদ্বেগ এবং উত্তেজনা স্পষ্ট। তিনি শাস্ত্রাধ্যায়ী শিক্ষক। কর্তব্যের প্রেরণায় এই মহাবিদ্রোহের একজন অংশ হয়ে পড়েছেন বটে, কিন্তু স্থৈর্য আয়ত্ত করতে পারেননি।
গোপালদেব চেয়েছিলেন বিংশতিবর্ষীয়া কন্যাটির দিকে। তিনি মহাবীর, ক্ষত্রিয়শ্রেষ্ঠ। জীবন ও মৃত্যুকে দুই হাতে অঙ্গদের মতই ধারণ করেন তিনি। নিঃশঙ্কহৃদয়ে, ভাবনাহীন চিত্তে শত্রুনিপাতে তাঁর দক্ষতা সহজসিদ্ধ। কিন্তু এই কন্যার যুদ্ধক্ষমতা তাঁকে বিস্মিত করেছে। কী অনায়াস অস্ত্রচালনা, কী দ্রুত শরীরসঞ্চালন, কী শান্ত অথচ নির্ভয়চিত্ত একাগ্রতা। বঙ্গদেশের মৃদু, শান্ত, শ্যামল মৃত্তিকায় এমন বীরাঙ্গনা জন্ম নেয় তা হলে?
যুবক গোপালদেবের হৃদয় শ্রদ্ধার সঙ্গে এক অন্য অনুভূতিতে ভরে যাচ্ছিল। একে বীর তিনি, তদুপরি সুপুরুষ। অদ্যাবধি নারীদের কাছ থেকে প্রণয় ইঙ্গিত কম পাননি। কিন্তু কোনও কারণে গোপালদেবের হৃদয়ের গোপন গহীন কন্দর নির্জিতই রয়ে গেছিল। অথচ সেই রক্তাক্ত রাত্রির পর থেকে এই তরুণীর খড়্গধারী উন্মুক্তকেশী চামুণ্ডারূপটি তাঁর হৃদয়ে প্রোথিত হয়ে গেছে। তিনি সেই ভয়ঙ্করসুন্দর রূপ ভুলতে পারছেন না।
মন্দর্ভা কাজ করতে করতে নীচু স্বরে আদেশ দিচ্ছিলেন তরুণীকে। তরুণী যন্ত্রের মতো আদেশ পালন করে যাচ্ছিল। গোপালদেব সামান্য অধৈর্য হয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘আর্যা, আর কতক্ষণ?’
মন্দর্ভা উত্তর দিলেন, ‘আরও কিছু সময় লাগবে, আর্য গোপালদেব। ধৈর্য ধরতে শিখুন। এ আপনার খড়্গের তীক্ষ্ণমার্জনা নয়।’
গোপালদেব অপ্রস্তুত হলেন। আর্যা মন্দর্ভাকে তিনি অত্যন্ত ভয় করে চলেন। বয়সে ছোট হলে কী হবে, এই ভিক্ষুণীর চরিত্রে, ব্যক্তিত্বে, আচরণে এমন একটি দার্ঢ্য আছে যা তাঁর মতো যুদ্ধনায়কের কাছ থেকেও সম্ভ্রম দাবি করে। তিনি শুধু লক্ষ করলেন যে মন্দর্ভার বাক্য শুনে তাঁকে অপ্রতিভ হতে দেখে তরুণীর ওষ্ঠে একটি বঙ্কিমরেখা দেখা গেল।
যাক, এ মেয়ে তাহলে হাসে, পাষাণ প্রতিমা নয়!
গোপালদেব সন্তর্পণে ঘরের বাইরে এসে দাঁড়ালেন। তাঁরা এখন যেখানে আশ্রয় নিয়েছেন তার তুল্য নিরাপদ, গোপন স্থান কর্মান্তবাসকে আর দ্বিতীয়টি নেই। প্রকাশচন্দ্র আর তার বেতনভুক সারমেয়র দল শত চেষ্টাতেও এর সন্ধান পাবে না। নিজের মনেই মহর্ষি মৎস্যেন্দ্রনাথের প্রতি শ্রদ্ধাবনত হলেন গোপালদেব। এই অসামান্য সাংগঠনিক ক্ষমতা সত্যিই শিক্ষণীয়।
স্ফটিকনির্মল আকাশ থেকে হিমঋতুচ্ছায়া সূক্ষ্ম কুয়াশার মতো নেমে আসছে পৃথিবীর ওপর। একটু দূরে কলস্বিনী মেঘান্দ। এখান থেকে তার ক্ষীণ স্রোতগর্জন শোনা যায়। অঙ্গনে কয়েকটি কেতকী, জাতি এবং নাগচম্পার গাছ৷ দূরে দেখা যায় কয়েকটি কক্ষে প্রদীপশিখা। আরও দূরের কোন মন্দির থেকে সান্ধ্যারতির ঘণ্টাধ্বনি ভেসে এল।
আকাশের দিকে চেয়ে রইলেন গোপালদেব। অগণন নীহারিকাপুঞ্জ থেকে স্নিগ্ধ আলোকবিন্দুর মতো নেমে আসছে নক্ষত্রের আলো। সেই অলৌকিক নক্ষত্রালোকে জীবন্ত হয়ে উঠেছে লালিম্ববন পর্বত আর তার সংলগ্ন অরণ্যানী।
আজ হতে প্রায় অর্ধশতবৎসর পূর্বে তাঁর পিতামহ আচার্য দয়িতবিষ্ণু কর্মান্তবাসকের ভূমিতে দাঁড়িয়ে কি এভাবেই দেখেছিলেন আকাশ? কী দেখেছিলেন? অনাগত পরাজয়ের ভবিষ্যদ্বাণী? অবশ্যম্ভাবী সর্বনাশের অভ্রান্ত দিকচিহ্ন?
কয়েক দণ্ড সময় কেটে গেল। কে যেন তাঁকে পিছন থেকে ডাকল, ‘আর্য গোপালদেব, আসুন। আপনার ঔষধি প্রস্তুত।’
গোপালদেব ফিরে তাকালেন। সেই তরুণী তাঁর ঠিক পিছনে দাঁড়িয়ে, হাতে একটি প্রদীপ। গম্ভীর অথচ কমনীয় মুখখানি প্রদীপের শিখায় সদ্যস্নাতা করবীর মতো পবিত্র দেখাচ্ছে। গোপালদেব মৃদু হেসে বললেন, ‘চলুন আর্যা।’
এখান থেকে দেখা যাচ্ছিল, ঘরের মধ্যে একটি পাথরের পাত্র হাতে দাঁড়িয়ে আছেন ভিক্ষুণী মন্দর্ভা৷ তাঁর একপাশে আচার্য শান্তরক্ষিত, অন্যপাশে কুমার পদ্মসম্ভব। আর তাঁদের পিছনে দাঁড়িয়ে আছেন স্বয়ং মৎস্যেন্দ্রনাথ।
এই দৃশ্য দেখে মনে যেটুকু সংশয় ছিল তা কেটে গেল গোপালদেবের। এঁরা যদি সঙ্গে থাকেন তো ত্রিলোকে কাউকে ভয় পান না তিনি। স্বয়ং যমরাজকেও না।
ঘরের দিকে এগোতে যাচ্ছেন, এইসময় তরুণী বলে ওঠে, ‘কুমার, আমার বড় ভয় করছে। অবলোকিতেশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি আপনি যেন সুস্থ থাকেন।’
মুহূর্তের মধ্যে যেন স্তব্ধ হল সৌর আবর্তন। গোপালদেবের বুকের মধ্যে জ্বলে উঠল সহস্র আলোকমঞ্জীর। এক কোমল কস্তুরীঘ্রাণ তাঁর ব্রহ্মরন্ধ্র থেকে অপার্থিব স্রোত হয়ে নেমে আসতে লাগল তাঁর সুষুম্নাকাণ্ড বেয়ে।
গোপালদেব হেসে বললেন, ‘আমার ফিরে আসার জন্য অপেক্ষা করবেন আর্যা। আমাদের অনেক যৌথ সংগ্রাম বাকি রয়ে গেল।’
তরুণী বললেন, ‘আর্যা নয় কুমার। আমার নাম দেদ্দদেবী। আমাকে সেই নামেই ডাকবেন।’
মানুষটি কতক্ষণ বনতলে শুয়েছিল, সে জানে না। এতদিনের পরিশ্রমে অভুক্ত অশান্ত দেহ একেবারে ভেঙে পড়েছিল। তাই চোখ খুলে যখন সে দেখল যে তখনও রাত্রির ঘন অন্ধকার, তখন সে বিশেষ আশ্চর্য হয়নি। আশ্চর্য হল আকাশের দিকে তাকিয়ে।
নক্ষত্রের বিচলন বা চন্দ্রকলার হ্রাসপ্রাপ্তি দেখে দিনক্ষণ গণনা স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু তাঁর স্মৃতি যদি খুব বিশ্বাসঘাতকতা না করে, তাহলে বর্তমান চান্দ্রতিথি জানাচ্ছে যে উপর্যুপরি দুই রাত সে এখানে নিদ্রাভিভূত ছিল।
কথাটি হৃদয়ঙ্গম হতেই একটা শিহরিত অনুভূতি নেমে গেল তার মেরুদণ্ড দিয়ে। দীর্ঘ দুইটি দিন এই হিংস্র উন্মুক্ত অরণ্যপ্রান্তরে ঘুমিয়েছিল সে? তা সত্বেও সে জীবিত? কোনও বন্য পশুর খাদ্য হয়নি? কোনও মহাসর্পের কালদংশনের শিকার হয়নি?
এ নিশ্চয়ই নিয়তিনির্দিষ্ট কাললক্ষণ। অর্থাৎ এত সহজে মরণ হবে না তার!
কথাটা মাথায় আসতেই শরীরে মনে যেন দ্বিগুণ বল ফিরে এল। দ্রুত উঠে পড়ল ভূমিশয্যা ছেড়ে। কোঁচড়ে তখনও কিছু ফল রয়ে গেছিল, তার একটি দ্রুত নিঃশেষ করল সে। তারপর ফের এগোতে লাগল তার উদ্দিষ্ট পথে। কর্মান্তবাসকের দিকে।
যে করেই হোক প্রকাশচন্দ্রের কাছে পৌঁছতে হবেই তাকে। আর পৌঁছতে হবে অতি দ্রুত৷ যে সুনিপুণ ষড়যন্ত্রের জাল ঘিরে ধরেছে কর্মান্তবাসককে, তা ছিন্ন করতেই হবে। চাই কী, হয়তো মহারানি তাকে বিক্রমপুরের সামন্তই করে দিলেন। আর সেদিন সে দেখে নেবে কত বড় সামন্ত হয়েছে ধর্মসেন! মনশ্চক্ষে নিজের নামটিও দেখতে পেল সে, মহাসামন্ত চণ্ডকীর্তি।
আজ থেকে ঠিক এক মাস আগের ঘটনা। নৈশাহার সমাপ্ত করে সবে শয্যাগ্রহণ করতে যাবে, এমন সময় দ্বারে মৃদু করাঘাত। এই করাঘাতের ক্রম এবং ছন্দ তার পরিচিত। দ্বার উন্মুক্ত করতেই দ্রুত প্রবেশ করেছিল তার ব্যক্তিগত চর, ভীম।
ভীম মহাসামন্ত ধর্মসেনের ব্যক্তিগত দেহরক্ষী। ধর্মসেন তাকে নিজের থেকেও বেশি বিশ্বাস করেন। অনেক গুরুত্বপূর্ণ গুপ্ত আলোচনা তার সামনেই হয়। ভীমও প্রভুগতপ্রাণ, বিশ্বাসহন্তা হওয়ার কথা চিন্তাই করতে পারে না।
তবুও বহু আয়াসে, সেই অসম্ভব কর্ম সম্ভব করেছিল চণ্ডকীর্তি। অর্থ নয়, ভয় নয়, নারীসংসর্গবর্জিত ভীমকে ধর্মসেন প্রলোভিত করেছিল নারীদেহ দিয়ে। আর সেই পাপকর্মে তাকে যথাবিহিত সাহায্য করেছিল বিক্রমপুরের উদীয়মান নগরনটী, সেঁউতি। উদ্ভিন্নযৌবনা এই বারবধূর বরতনুর জালে জড়িয়ে পড়েছিল ভীম। ফেরার পথ ছিল না তার।
ভীম সেই রাতে যা বলেছিল, তাতে হাত পা অবশ হয়ে এসেছিল চণ্ডকীর্তির।
বিক্রমপুরনরেশ যে বহুবিধ কারণে কর্মান্তবাসকের প্রতি বিরূপ, সে ইঙ্গিত অনেকবারই পেয়েছে চণ্ডকীর্তি। কিন্তু সে জানত যে, ধর্মসেন যতই প্রতাপশালী দুর্দমনীয় সামন্ত হন না কেন, অযথা চন্দ্রশাসকদের বিরুদ্ধতা করার মতো দুর্বুদ্ধি কখনই হবে না তাঁর।
কিন্তু সেই রাতে ভীম জানিয়েছিল—সেই দুর্বুদ্ধিই হয়েছে ধর্মসেনের। আরও বেশ কয়েকজন সামন্ত’র সঙ্গে যুক্ত হয়ে এক অবিশ্বাস্য অন্তর্ঘাতের পরিকল্পনা করেছেন তিনি।
সেই পরিকল্পনার কথা শুনে স্থির থাকতে পারেনি চণ্ডকীর্তি। ভেবেছিল পরদিন ভোর হওয়ার আগেই পৌঁছে যাবে বিক্রমপুরের গুপ্তচর প্রধানের কাছে। এত বড় স্পর্ধা কী করে হয় ধর্মসেনের, সেই সংবাদটা নেওয়া প্রয়োজন।
কিন্তু পারেনি চণ্ডকীর্তি। গুপ্তচর প্রধানের কাছ থেকে কোনও প্রয়োজনীয় সংবাদই নিষ্কাশন করতে পারেনি সে। ধূর্ত প্রৌঢ়টি যেন কোন জাদুমন্ত্রে বদলে গেছিলেন। মাথা নেড়ে যান্ত্রিক স্বরে শুধু বলে যাচ্ছিলেন, ‘অবস্থা অত্যন্ত সঙ্গীন চণ্ডকীর্তি। এই সময়ে আমাদের নিশ্চুপ এবং নিষ্ক্রিয় থাকা উচিত। ধর্মসেন যা সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন ঠিকই নিচ্ছেন। এতে শেষাবধি বিক্রমপুর তথা বঙ্গদেশের উপকারই হবে।’
তখনই মনে হয়েছিল চণ্ডকীর্তির, কোথাও একটা মস্ত বড় ফাঁকি রয়ে গেছে। প্রাজ্ঞ মানুষটির এই আচরণ অস্বাভাবিক।
পর দিন থেকেই সে বুঝতে পারছিল যে, তার চারিপাশে একটা অদৃশ্য জাল যেন বিছিয়ে দিয়েছে কেউ। কোন অদৃশ্য চোখ যেন নিরীক্ষণ করে চলেছে তার প্রতিটি পদক্ষেপ। সর্বক্ষণ। সে কোথায় যায়, কাদের সঙ্গে কথা বলে, কী খায়, কোন মদিরা পান করে—সব কিছুই যেন কাদের তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণের অধীন।
নিজেকে আরও গুটিয়ে নিয়েছিল চণ্ডকীর্তি।
এদিকে দ্রুত পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছিল বিক্রমপুরের রাজনৈতিক আবহাওয়া। চারদিকে সৈন্যবিদ্রোহের রণধ্বনি, অথচ রাজপ্রাসাদ বিস্ময়জনকভাবে নিরুদ্বেগ। এক এক করে বেশ কিছু ক্ষুদ্র অমাত্য এবং রাজসভাসদরা অকস্মাৎ অদৃশ্য হতে লাগলেন। কয়েকদিন বাদে তাঁদের দেহ পাওয়া যেতে লাগল বিক্রমপুরের বিভিন্ন অস্থানে কুস্থানে। কুখ্যাত শৌণ্ডিকালয়ে, বহুগম্যা বারবণিতাগৃহে, নির্জন অরণ্যপ্রদেশে।
সমস্ত ইন্দ্রিয় প্রখর হয়ে উঠছিল চণ্ডকীর্তির। এই আপাত-বিশৃঙ্খলার মধ্যেও একটি সুচারু সাধারণী সূত্র তার সন্ধানী চক্ষু এড়াতে পারেনি। কোথাও যেন কিছু একটা অসঙ্গতি।
আজ থেকে ঠিক দুইদিন আগে সেই অসঙ্গতি স্পষ্ট হয়ে গেছিল তার কাছে। তারপর থেকেই পালিয়ে বেড়াচ্ছে সে।
নিজের ভাবনা থেকে সহসা জেগে উঠল সে। কোথা থেকে যেন কুলুকুলু ধ্বনি ভেসে আসছে না? এর অর্থ কাছেপিঠেই কোথাও নদী আছে, অর্থাৎ কী না জল! পেয়।
তৃষ্ণায় গলা কাঠ হয়ে গেছিল চণ্ডকীর্তির। সেই শব্দের উৎসের দিকে ছুটল সে।
একটি সুবিশাল অশ্বত্থবৃক্ষ পার হতেই ছোট্ট নদী চোখে পড়ল তার। অরণ্যের কোন অন্ধকার প্রান্ত থেকে বয়ে এসেছে সে, বয়ে গেছে দক্ষিণের দিকে। চণ্ডকীর্তি প্রায় উড়ে গিয়ে সেই ক্ষীণকায়া তটিনীর কূলে শুয়ে আকণ্ঠ জল পান করতে লাগল।
তৃষ্ণাজর্জর বুক শীতল হতেই তার শিক্ষিত কানে এল শব্দটা। আগেই আসা উচিত ছিল যদিও, কিন্তু তৃষ্ণার্ত চণ্ডকীর্তির অন্যান্য ইন্দ্রিয়গুলি স্বাভাবিকভাবে কাজ করছিল না।
ব্রাহ্মমুহূর্ত শুরু হতে আর কয়েকদণ্ড বাকি। রাত্রির তমসা সামান্য স্বচ্ছ হয়ে এসেছে। খানিক দৃষ্টি দিতেই সে দেখতে পেল, নদীর অপর তটপ্রান্ত জুড়ে কয়েকটি দেহ। কয়েকটি নয়। কয়েক সার দেহ। একের পর এক বিচিত্র ভঙ্গিমায় শুয়ে আছে। অন্ততপক্ষে শতখানেক তো বটেই। মৃতদেহ নাকি?
একটু পরেই অবশ্য ভুল ভেঙে গেল তার। খানিকপর একটি আবছায়া দেহ কোথা থেকে যেন উদয় হল দেহগুলির মধ্যে। মনে হল, সে যেন প্রহরা দিচ্ছিল সমগ্র স্থানটি। এক এক করে নাম ধরে ডাকতে লাগল সে, আর এক একটি শরীর তাতে সাড়া দিয়ে জেগে উঠতে লাগল।
এই ঘন আরণ্যক অন্ধকারে এত মানুষ! বোধবুদ্ধি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল চণ্ডকীর্তির। তার মানে ওরা মৃতদেহ নয়? এত মানুষ নদীতীরে নিশ্চিন্তে রাত্রিযাপন করছিল? কিন্তু কেন? এরা তো তীর্থিক নয়! সৈন্য নয়!
তাহলে এরা কারা?
ধীরে, অতি ধীরে নিজের দেহ পিছিয়ে নিতে লাগল চণ্ডকীর্তি৷ ওরা যেন না দেখে ফেলে তাকে। তাকে জানতে হবে এরা কারা। কোথায় যাচ্ছে। এবং কেন।
অশ্বত্থবৃক্ষটির আড়ালে উঠে দাঁড়াল চণ্ডকীর্তি। তারপর সাবধানে তাকাল নদীর অপর প্রান্তের দিকে।
ততক্ষণে আকাশ স্বচ্ছ হয়ে এসেছে৷ ব্রাহ্মমুহূর্ত আগতপ্রায়। শরীরগুলি উঠে দাঁড়াল ছায়ামানুষের মতো। আর তাদের দেখে হাত-পা শীতল হয়ে এল চণ্ডকীর্তির।
নদীর অপর পারে উঠে দাঁড়িয়েছে একের পর এক সারি সারি উলঙ্গ নারীমূর্তি। এই অর্ধতমসাচ্ছন্ন রাত্রিতে কী ভয়ঙ্কর দেখাচ্ছে তাদের সুঠাম দেহ, উদ্ধত স্তন, উন্মুক্ত কেশদাম!
এরা কারা? কোন গহীন পাতাল থেকে উঠে এসেছে এই নগ্ন নারীর দল? কোন সর্বনাশের সঙ্কেত নিয়ে এসেছে?
এক পা, দু’পা করে পিছিয়ে যাচ্ছিল চণ্ডকীর্তি। ঠিক চতুর্থ পদক্ষেপের পর কর্ণমূলে একটি তীক্ষ্ণ ধাতব স্পর্শ পেয়ে থামতে বাধ্য হল সে। কে যেন উৎফুল্লস্বরে বলে উঠল, ‘বারে বা বাহ, এই দেখ, অনেকদিন পর বেশ নধর একটি মানুষ পাওয়া গেছে রে কালী। মনে হচ্ছে ঝলসে খেতে বেশ আনন্দই হবে, কী বলিস? তোরা না হয় হাত পা, পাছা আর মাথাটা নিস। বাকিটা আমার জন্য ছেড়ে রাখিস বুঝলি। আমার আবার মানুষের পাঁজর আর মেটে খুব পছন্দ, জানিসই তো।’
মহার্ঘ অরিষ্টপানে হয়তো কিঞ্চিৎ প্রগলভ হয়ে থাকবেন নবাগত অতিথি। অথবা এমত দুর্মূল্য মদিরাপানের অভ্যাস নেই তাঁর। নইলে ষষ্ঠ পাত্রটি নিঃশেষিত হওয়ার পর কেনই বা অসংলগ্ন স্বরে চিৎকার করে উঠবেন তিনি, ‘অর্থ কই মহামান্য অগ্নিমিত্র? কোথায় সেই অর্থ, যার লোভে আমি আমার ইষ্ট, ইহকাল, পরকাল সব নরকাগ্নিতে সমর্পণ করলাম?’
মদিরাপান করতে করতে সামান্য হাসলেন অগ্নিমিত্র। কূট এবং কৌশলী বাক্যপ্রয়োগে অপরপক্ষ থেকে সংবাদ নিষ্কাশনে তাঁর বিশেষ প্রসিদ্ধি। আর এই নবাগত অতিথি তো জনৈক বিভ্রান্তচিত্ত বৌদ্ধসন্ন্যাসী বই আর কেউ নয়!
আপাতত প্রয়োজনীয় যাবতীয় সংবাদ এই মূর্খটির থেকে নিষ্কাশন করে নিয়েছেন তিনি। আপাতত এর প্রয়োজন শূন্য।
মদ্যপানের অবসরেই অগ্নিমিত্রর অঙ্গুলি ইঙ্গিতে কয়েকটি দীর্ঘদেহী ছায়া প্রবেশ করল এই কক্ষে। সেই ইঙ্গিত অপ্রকৃতিস্থ। নবাগত অতিথি লক্ষ করলেন না। লক্ষ করলেন ভাঁড়ুদত্ত। তাঁর মুখচ্ছবি কঠিনরূপ ধারণ করল।
দীর্ঘদেহী ছায়াশরীরগুলি অধিক সময় ব্যয় করল না। চকিতে একটি বস্ত্রখণ্ড নবাগত অতিথির মুখ চেপে ধরল। সামান্য শারীরী প্রতিবাদের পর নিশ্চল হয়ে পড়লেন অতিথি মহাশয়। ছায়াশরীরগুলি এবং জ্ঞানহীন দেহটি অপসৃত হল।
ঘরটি সাধারণ, মাটি ও পাথর দিয়ে তৈরি। একটি মাত্র বাতায়ন উত্তরদিকে। তার মধ্য দিয়ে ত্রয়োদশীর অন্ধকার ছড়িয়ে আসছিল ঘরটির ভেতরে।
দ্বারপ্রান্তে একটি দীপ জ্বলছে। তাতে অবশ্য কক্ষের অন্ধকার দূর হয়নি। প্রদীপশিখার কাছে স্তূপীকৃত কর্পূর রাখা। কর্পূরের স্নিগ্ধ অথচ তীব্র গন্ধে কক্ষের বাতাস ভারী হয়ে আছে।
কক্ষের ঠিক মধ্যস্থলে একটি কাঠের পাটাতন পাতা। তার ওপর একটি বলিষ্ঠ দেহ শায়িত। দেহটি সম্পূর্ণ নগ্ন, একটি সুতো অবধি নেই। হাত এবং পা রজ্জুবদ্ধ।
লক্ষ করলে বোঝা যায় যে শুয়ে থাকা মানুষটি এখনই স্নান করে এসেছে। তার সিক্ত কেশ থেকে ক্ষীণ জলের ধারা বয়ে নেমে আসছে কাঠের পাটাতন বেয়ে৷ মানুষটির সমস্ত শরীরে অগুরুর স্নিগ্ধ ঘ্রাণ।
তার মাথার কাছে দুইটি মানুষ বসে আছেন। একজন নারী, আর একজন পুরুষ। দুজনের মনের মধ্যে জমে থাকা উদ্বেগ তাঁদের চোখেমুখে স্পষ্ট। দুজনেরই কপালে স্বেদবিন্দু জমে উঠেছে আসন্ন প্রক্রিয়াটির সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কায়।
নারীর হাতে একটি পাথরের পাত্র। তার মধ্যে টলটল করছে ঘনকৃষ্ণবর্ণের এক সান্দ্র তরল। তার গন্ধ অত্যন্ত উগ্র। নারীটি বুঝতে পারছিলেন, হাতে ধরা পাত্রটি ধীরে ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে।
নারীটি মৃদুস্বরে প্রশ্ন করলেন, ‘আর কতক্ষণ ভন্তে?’
পুরুষটি গম্ভীরস্বরে বললেন, ‘অধৈর্য হবেন না ভিক্ষুণী মন্দর্ভা। আর মাত্র কয়েক পলের অপেক্ষা। এখনই কৃত্তিকায় চন্দ্র আর তুলায় রবি প্রবেশ করবেন। সোম এখন কৃত্তিকার আলোকে উজ্জ্বল হবেন, আর রবি নীচস্থ। তখনই আসবে পবিত্র মুহূর্ত।’
মন্দর্ভা চুপ হয়ে গেলেন। পাত্রটি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠছে৷ মন্দর্ভা পাত্রটি একবার এই হাত থেকে ওই হাতে নিতে লাগলেন। তাঁর করতল ক্রমশ রক্তবর্ণ ধারণ করতে লাগল।
সেদিকে একবার তাকালেন আচার্য শান্তরক্ষিত। বললেন, ‘বায়ুস্পর্শে এই তরল ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, সেরকমই প্রয়োগশ্রুতি। আমি জানি আপনার অসুবিধা হচ্ছে। কিন্তু আমি আপনাকে সাহায্য করতে অপারগ ভিক্ষুণী মন্দর্ভা। এই ঔষধ সম্পূর্ণভাবে নারীহস্তে প্রস্তুত হতে হবে, নারীহস্তে রক্ষিত হতে হবে, নারীহস্তে সেবিত হতে হবে। এই এর প্রয়োগবিধি।’
‘কিন্তু কেন ভন্তে?’
মৃদু হাসলেন আচার্য শান্তরক্ষিত, ‘কারণ নারীর কল্যাণস্পর্শের থেকে পবিত্রতম বিষহর আর কিছুই হতে পারে না, আর্যা মন্দর্ভা।’
এই সময় মানুষটি চোখ খুলে চাইলেন। মৃদুস্বরে একবারমাত্র বললেন, ‘আচার্য...’
শান্তরক্ষিত বললেন, ‘সময় এসেছে ভিক্ষুণী, ঔষধ প্রয়োগ করুন।’
মন্দর্ভা বড় যত্নে, বড় আদরের সঙ্গে পাত্রস্থিত তরলটি গোপালদেবের মুখে ঢেলে দিতে লাগলেন। মনে হল যেন মাতৃসমা কনিষ্ঠা বড় মমতার সঙ্গে অসুস্থ অগ্রজের মুখে ঔষধ ঢেলে দিচ্ছেন।
কিছুটা তরল মুখে যাওয়ার পর মুখ বিকৃত করলেন গোপালদেব। সামান্য থামলেন মন্দর্ভা। তারপর পুনরায় তরল ঢালতে লাগলেন।
এইবার খক খক করে কেশে উঠলেন গোপাল। মাথা একদিকে কাত করলেন। মনে হল যেন সেই উগ্রগন্ধী তরল বমন করে দেবেন বাইরে। মন্দর্ভা দ্রুত নাক চেপে ধরলেন গোপালদেবের। তিনি নিঃশ্বাস নেওয়ার জন্য মুখ হাঁ করতেই তরল তাঁর পেটে চলে গেল৷
কিছুক্ষণের নীরবতা। তার পরেই যেন অসহ্য যন্ত্রণায় শরীর মুচড়ে উঠল গোপালদেবের। বলশালী দেহটি প্রবল আক্ষেপে কেঁপে উঠল একবার। তারপর জ্বরগ্রস্ত রোগীর মতো কাঁপতে লাগলেন। প্রবল কষ্টে তাঁর মুখ বিকৃত হয়ে এল৷ মনে হল কাঠের পাটাতন যেন দুটুকরো হয়ে যাবে যে কোনও মুহূর্তে।
সেই দৃশ্যের অভিঘাতে কেঁপে গেলেন মন্দর্ভা এবং শান্তরক্ষিত। আতঙ্কিত মন্দর্ভা অগ্রজের হাত চেপে ধরলেন। শান্তরক্ষিত বললেন, ‘বাকি ঔষধটুকু সেবন করান ভিক্ষুণী।’
সম্পর্কে সহোদর-সহোদরা হলেও সদ্ধর্ম গ্রহণের পর একে অন্যকে সাধারণ ভিক্ষুর মতোই সম্বোধন করেন। কিন্তু আজ আর থাকতে পারলেন না মন্দর্ভা, সজলচোখে বললেন, ‘ভাই, ও যে মরে যাবে।’
আচার্য শান্তরক্ষিত বামহাত অনুজার মাথায় রাখলেন। রুদ্ধস্বরে বললেন, ‘ভয় পাস না বোন, যা হচ্ছে ঠিকই হচ্ছে। জেনে রাখিস, আমরা ধর্মের পথে আছি। স্বয়ং তথাগত আমাদের সহায়। বাকিটুকু খাইয়ে দে, যে করে হোক। লোকেশ্বর মৎস্যেন্দ্রনাথ যে ঔষধ আনিয়েছেন, তার ওপর বিশ্বাস রাখ।’
মন্দর্ভা ধীরে ধীরে সন্তর্পণে বাকি ঔষধটি গোপালদেবের মুখের কাছে আনলেন। আর ঠিক তখনই যেন কোন যাদুমন্ত্রে গোপালের সমস্ত শরীর স্থির হয়ে গেল। আর খুলে গেল দুটি চোখ।
সেই প্রায়ান্ধকার ঘরে, প্রদীপের আলোয় স্তম্ভিত মন্দর্ভা আর শান্তরক্ষিত দেখলেন—গোপালের চোখদুটি লাল, টকটকে লাল। আর অক্ষিকোটরে কোনো মণি নেই!
মন্দর্ভার হাত দুটি ঠকঠক করে কাঁপতে লাগল সেই অতিলৌকিক দৃশ্য দেখে। শান্তরক্ষিতের কপালে স্বেদবিন্দু আরও ঘন হয়ে এল। তিনি কম্পিতস্বরে বললেন, ‘বোন, ওর মুখে বাকি তরলটুকু ঢেলে দে। ভয় পাস না।’
মন্দর্ভা কোনওক্রমে পাত্রটি গোপালদেবের মুখের ওপর নিয়ে যেতেই গোপালের মাথাটি ধীরে ধীরে মন্দর্ভার দিকে ঘুরে গেল। তারপর সম্পূর্ণ অজানা এক কর্কশ স্বর নির্গত হল গোপালদেবের কণ্ঠ থেকে, ‘দয়া করো নারী, দয়া।’
মন্দর্ভা আর পারলেন না। কোনওমতে অবশিষ্ট তরলটুকু গোপালের মুখে ঢেলে দিয়ে জ্যামুক্ত শরের মতো সরে গেলেন ঘরের অন্যপ্রান্তে।
গোপাল তরল গলাধঃকরণ করলেন। তারপর সহসা শান্ত হয়ে গেলেন। যেন সমস্ত দুঃখ-যন্ত্রণা চকিতে অন্তর্হিত হয়েছে। চোখ দুখানি বন্ধ হয়ে এল। সমস্ত শরীর স্থির, নিষ্পন্দ।
একটু পর অনেকখানি সাহস একত্রিত করে গোপালদেবের মুখের ওপর ঝুঁকে এলেন শান্তরক্ষিত। শ্বাস চলছে তো মানুষটির। হৃৎপিণ্ডের শব্দ শোনা যাচ্ছে তো?
ধক করে আবার খুলে গেল গোপালদেবের চোখ। তারা এখন ঘোর কৃষ্ণবর্ণ। অক্ষিগোলক উধাও। অস্বাভাবিক স্বরে গোপালদেব বলে উঠলেন, ‘আহ, বড় কষ্ট, বড় কষ্ট। একটু জল দেবে কেউ? একটু জল দাও না। আর যে পারি না।’
আর সহ্য করতে পারলেন না মন্দর্ভা। দ্রুত ঘরের বাইরে চলে গেলেন। স্থির হয়ে বসে রইলেন শান্তরক্ষিত। আজ সমস্ত রাত্রি গোপালদেবকে এইভাবেই থাকতে হবে। এক বিন্দু জল দেওয়াও নিষিদ্ধ!
গোপালদেবের মাথার কাছে বসে পদ্মাসনে ধ্যানস্থ হলেন নালন্দার অধ্যক্ষ আচার্য শান্তরক্ষিত। সাধনালব্ধ শক্তি তাঁরও কম নয় কিছু। দেখা যাক, যোগবলে তিনি গোপালদেবের যন্ত্রণার কিছু উপশম করতে পারেন কি না।
কাঞ্চনাদেবী বসেছিলেন মেরুদণ্ড ঋজু করে। পদ্মাসনে। পরিধানে একটি শুভ্র কার্পাসবস্ত্র। পলিতকেশরাশি উন্মুক্ত। শুষ্ক হাতদুটি জুড়ে বার্ধক্যের সহস্র শিরা উপশিরা। চোখ স্থির এবং আবেগহীন। তাঁর জরাকবলিত মুখে এখনও রাজকীয় আভিজাত্য এবং দৃঢ়তার অবশেষ খুঁজে পাওয়া যায়।
তাঁর সামনে মৎস্যেন্দ্রনাথ আর বপ্যট বসেছিলেন। তাঁদের সবল সমর্থ শরীরে মৃদু দীপালোক খেলে যাচ্ছিল দীঘির জলে প্রতিফলিত জ্যোৎস্নার মতো। বসার ভঙ্গিতে সম্ভ্রমের ভাব ছিল স্পষ্ট।
মৎস্যেন্দ্রনাথ মৃদুস্বরে বললেন, ‘রাজমাতা...!’
কাঞ্চনা কঠিনস্বরে বললেন, ‘ওই নামে আমাকে সম্বোধন করবেন না আর্য মৎস্যেন্দ্রনাথ। এই সম্মান আমি বহুপূর্বেই হারিয়েছি৷ তাকে আর ফিরে পেতে চাই না।’
মৎস্যেন্দ্রনাথ করজোড়ে বললেন, ‘সন্তানের জন্য মাতার আদেশ শিরোধার্য। কিন্তু এক্ষেত্রে আপনার আজ্ঞাপালনে আমরা অপারগ মাতা। আমাদের কাছে মহারাজ ধর্মচন্দ্র এবং কুমার আনন্দচন্দ্রই বঙ্গদেশের সিংহাসনের বৈধ উত্তরাধিকারী। এই কামোন্মাদ নাগিনীর শাসন আমরা মানি না। আপনিই আমাদের রাজমাতা।’
বৃদ্ধার চিবুক কঠিন হল। তিনি বললেন, ‘আমার স্বামী আর সন্তান মৃত। ন্যায্যত আমি রাজমাতা অভিধার উপযুক্ত নই। তবুও আমি এই নিয়ে তর্ক করব না, কারণ এই সঙ্কটকাল তর্কাতিপাতে কালক্ষেপের জন্য নয়। বলুন, আপনাদের কী সাহায্য করতে পারি।’
বপ্যট বিনয়ের সঙ্গে বললেন, ‘মা, আপনার শুভাশিস আর আশীর্বাদ ব্যতীত আর কিছুই চাই না আমাদের।’
এই প্রথম কাঞ্চনাদেবীর অধরে মৃদু হাসি ফুটে উঠল। তিনি বললেন, ‘আর্য, জানি আপনি মহাবীর, খণ্ডিতারাতি বপ্যট। কিন্তু বিস্মরণ হবেন না, আমি একজন প্রাক্তন মহারানি। কূটনীতিতে আমার অধিকার আপনার থেকে কিঞ্চিৎ অধিক। এক স্বামীহারা, সন্তানহারা মায়ের আশীর্বাদ আপনাদের সঙ্গে সর্বদাই রয়েছে। কিন্তু মহাবল পদ্মসম্ভবের মতো একজন অদ্ভুতকর্মা মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ওই নরক থেকে আমাকে উদ্ধার করে এনেছেন শুধু আশীর্বাদের জন্য, এই কথা বিশ্বাস করতে বলেন?’
বপ্যট অপ্রতিভ হলেন। তিনি কূটনীতিক ভাষাপটুত্বে অভ্যস্ত নন। বুঝলেন যে, এই বৃদ্ধা অত্যন্ত বুদ্ধিমতী এবং স্পষ্টবক্তা। তিনি আর অযথা বাগাড়ম্বরের মধ্যে গেলেন না। সরাসরি প্রসঙ্গে এলেন। বললেন, ‘রাজমাতা, আপনি জানেন যে শতবর্ষব্যাপী মাৎস্যন্যায় এই দেশের ভাগ্যে কী অভাবনীয় দুর্ভোগ এনে দিয়েছে। তার ওপর প্রকাশচন্দ্র আর এই নাগিনীর কুশাসনে বঙ্গদেশের শ্বাসবায়ু ওষ্ঠাগতপ্রায়।
‘অনেকদিন ধরেই সমাজের সর্বস্তরে এই অপশাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ধূমায়িত হচ্ছিল। শুধুমাত্র উপযুক্ত নেতৃত্বের অভাবে সেই বিক্ষোভ কোনও পরিণতিসূচক রূপ নিতে পারছিল না। অবশেষে লোকেশ্বর মৎস্যেন্দ্রনাথের নেতৃত্বে আমরা বিদ্রোহী হয়েছি। এই বিদ্রোহের বিশদ পরিকল্পনা তথা ঘটনাপ্রবাহ বিবৃত করে ধৈর্যচ্যুতি ঘটাব না। শুধু এইমাত্র জেনে রাখুন যে, আমরা চূড়ান্ত সংঘাতের জন্য প্রস্তুত। কেবল একটিমাত্র তথ্য আমাদের অজানা মাতা। সে জন্যই আপনার দ্বারস্থ হওয়া।’
রাজমাতা কাঞ্চনাদেবী। স্থিরস্বরে বললেন, ‘শুধুমাত্র একটি তথ্যের জন্য এত প্রাণপাত? বলুন আর্য, কী সেই অতি মূল্যবান তথ্য, যার জন্য আপনারা এত ঝুঁকি নিয়ে আমাকে উদ্ধার করে এনেছেন।’
বৃদ্ধার বক্তব্যের মধ্যে কিছু তিক্ততা ছিল৷ সেটি অগ্রাহ্য করলেন বপ্যট। বললেন, ‘মাতা, এই বিদ্রোহ তখনই সার্থক হবে, যখন আমরা এই নারকীযজ্ঞের দুই হোতা, বঙ্গরাজ্ঞী এবং তাঁর ভৈরব প্রকাশচন্দ্র, এই দুজনকে হত্যা করতে পারব। তবেই উৎখাত হবে এই কুৎসিত কুশাসন।
‘কিন্তু মহারানিকে হত্যা করা অত সহজ নয়। তিনি শুধু একজন বিষকন্যা নন, অলৌকিক শক্তির অধিকারিণী এক বিশিষ্ট নাগিনী। প্রকাশচন্দ্রও একজন পিশাচসিদ্ধ, চীনাচারতন্ত্রে মহারথ ঐন্দ্রজালিক। এই দুজনের স্বরূপ আপনার থেকে উত্তম আর কেউ জানে না। তদুপরি এঁদের সদাসর্বদাই ঘিরে থাকে শিক্ষিত প্রহরীর দল, ছ’জন উচ্চপদস্থ রাজপদোপজীবি এবং সর্বোপরি প্রকাশচন্দ্রের নিজস্ব অলৌকিক অতিপ্রাকৃত সিদ্ধি। সেই প্রহরাবৃত্ত ভেদ করা প্রায় অসম্ভব।
‘তবুও, সেই প্রহরাবৃত্ত ভেদ করার পরেও, যদিবা আমাদের ঘাতক সেই নাগিনী বা প্রকাশচন্দ্র অবধি পৌঁছে যায়ও, তবুও তাঁদের বধ করার কোনও নির্দিষ্ট উপায় আছে কি না সে বিষয়ে আমরা নিঃসন্দেহ হতে চাই। তাই আপনার শরণাপন্ন হওয়া। আপনি ছাড়া এই নারীকে উত্তমরূপে চেনেন এমন কেউ আমাদের মধ্যে নেই।’
তিক্ত হাসলেন কাঞ্চনাদেবী, ‘উত্তমরূপে চেনা? তাই বটে। সপত্নীকে উত্তমরূপে অন্য কেই বা চেনে।
‘শুনুন আর্য৷ এই নারীর স্বরূপ আপনাদের কাছে ইতিমধ্যে নিশ্চয়ই উন্মোচিত। আশা করি জানেন যে, এঁর শিরায় বইছে প্রাচীন নাগজাতির রক্তধারা। এও জানেন যে, এই নারীর মা ছিলেন মহাচীনের সম্রাজ্ঞী। শুধু তৎকালীন মহাচীনের কেন, এই সসাগরা ধরিত্রীর শ্রেষ্ঠতম বিষবৈদ্য ছিলেন তিনি। তার সঙ্গে তন্ত্রশাস্ত্রে মহাসিদ্ধা ছিলেন তিনি, ডাকিনীবিদ্যায় অলৌকিক বিভূতি আয়ত্ত করেছিলেন।
‘তিনি তাঁর কন্যাকে নাগজাতির শতসহস্র বছরের অধীত বিদ্যা দিয়ে তিলে তিলে প্রস্তুত করেছেন। নিজের অধীত যাবতীয় বিদ্যা এবং প্রকরণ উজাড় করে দিয়েছেন নিজের কন্যার মধ্যে।
শুনুন আর্য মৎস্যেন্দ্রনাথ, এই নারীর হত্যার পরিকল্পনা প্রায় অসম্ভব। কারণ দেহাকৃতিতে মানুষী হলেও ইনি প্রকৃতপক্ষে একটি পিশাচী নাগিনী। এঁর প্রাণ নেই, তাই ইনি চিরজীবী, চিরযৌবনা। এঁর শরীরে মানুষী রক্তমাংস নেই, তাই কোনও সাধারণ অস্ত্রাঘাতে একে বধ করা যায় না। এঁর প্রাণবীজ এক প্রাচীন নাগমন্ত্রে নির্মিত।
‘আরও জেনে রাখুন আর্য, এই সমস্ত ষড়যন্ত্রের মুখ্য আয়ুধ ওই কামুক নাগিনী হতে পারে বটে, কিন্তু মূল চক্রী প্রকাশচন্দ্রই৷ তাঁকে হত্যা করলে তবেই মুক্তি। প্রকাশচন্দ্রই ধনুক, রানি জ্যা’তে আরোপিত তীর। প্রকাশচন্দ্রই যন্ত্রী, রানি যন্ত্র৷
‘প্রকাশচন্দ্র নিজে জন্মসূত্রে আশ্চর্য আধিভৌতিক শক্তির অধিকারী। চৈনিক তন্ত্রসাধনায় তাঁর সেই শক্তি বহুগুণ বর্ধিত হয়েছে। তাঁর সঙ্গে মিলিত হয়ে সেই চীনসম্রাজ্ঞী তাঁর কন্যাকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করার জন্য একটি অসামান্য সাধন সম্ভব করেছিলেন।’
এতক্ষণ দুজনে একাগ্রচিত্তে শুনছিলেন। কাঞ্চনাদেবী থামতে প্রশ্ন করলেন, ‘কী সেই সাধন, রাজমাতা?’
অন্ধকার ঘরে যেন দৈববাণীর মতো শোনাল সেই বৃদ্ধার গম্ভীর কণ্ঠস্বর, ‘প্রকাশচন্দ্র তাঁর জীবনীশক্তির একটি অংশ বঙ্গরনির পৈশাচীবীজে সন্নিবেশিত করে রেখেছেন। তাঁকে হত্যা করতে গেলে আগে রানিকে হত্যা করতে হবে। যতক্ষণ ওই নাগিনী জীবিত আছে, ততক্ষণ প্রকাশচন্দ্রের মৃত্যু নেই।’
স্তম্ভিত হয়ে রইলেন মৎস্যেন্দ্রনাথ এবং বপ্যট। এ তো অসম্ভব! এই অসম্ভবের জন্যই জীবনের সবকিছু ছেড়ে এই মহাবিপ্লবে যোগদান করেছেন তাঁরা? আর শুধু তাঁরা কেন, আচার্য শান্তরক্ষিত, কুমার পদ্মসম্ভব, কুমার জয়াপীড়, ভিক্ষুণী মন্দর্ভা, আরও কত না শৈব সন্ন্যাসী এবং সহজিয়া বৌদ্ধদের দল, গৌড়েশ্বর জয়ন্ত, মুখ্য সামন্তচক্র, কতশত সঙ্গী, সাথী, সহযোদ্ধা—এঁদের এতদিনের তিল তিল করে গড়ে তোলা স্বপ্নসৌধ এক নিমেষে ধূলিসাৎ হয়ে যাবে?
কাঞ্চনাদেবী দুজনের মুখের দিকে তাকালেন। বললেন, ‘নিরাশ হবেন না আর্য। কোনও মানুষী কৌশলই কখনও অভেদ্য, অপরাজেয় হতে পারে না। যুদ্ধে যে পক্ষ ধর্মের পথে থাকে, ঈশ্বর স্বয়ং তাদের সহায় হন।
‘এবার যে কথা বলব, মন দিয়ে শুনবেন। এই গূঢ় তথ্য অতি গোপন, কেবলমাত্র প্রকাশচন্দ্র আর ওই নারীই জানে। আর জানতেন মহারাজ ধর্মচন্দ্র। কোনও এক দুর্বল অসতর্ক মুহূর্তে আমার স্বামীকে জানিয়ে ফেলেছিল ওই নাগিনী। তার পর তাঁর জীবনসংশয় ঘটে। আসন্ন মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা নেই জেনে সেই অতি গোপন, অতি গূঢ় তথ্য তিনি আমাকে জানিয়ে গিয়েছিলেন।
‘পক্ষকাল ধরে এই পিশাচীর বিষগ্রন্থিতে মহাকালকূট বিষ জমা হতে থাকে। পক্ষকালের অন্তে সেই বিষের নিষ্কাশন না হলে ইনি সেই বিষের আবেশে উন্মাদপ্রায় হয়ে যান। আর তখনই এঁর কামতৃষ্ণা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছয়।
‘সেই জন্যই প্রতি পক্ষকালে একটি সমর্থ যুবকের প্রয়োজন হয় এই নারীর। নিজের কামতৃপ্তির জন্যও বটে, নিজের মহাবিষ উদগীরণের জন্যও বটে৷ আর যখন কোনও যুবকশরীর জোটে না, তখন?
তখন প্রকাশচন্দ্রই আসেন সেই নাগিনীর ভয়াল ভয়ঙ্কর কামাবেগ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য। তিনি, একমাত্র তিনিই পারেন ওই কামোন্মত্ত বিষধর নাগকন্যাকে শান্ত করতে, সেই মহাবিষ ধারণ করতে।
এই নারীর বিষগ্রন্থিটির একটি বৈশিষ্ট্য আছে৷ এর মধ্যে দংশনযোগ্য বিষ প্রস্তুত হতে ঠিক এক পক্ষকাল সময় প্রয়োজন। তার পূর্বে এই বিষের মারণক্ষমতা প্রায় শূন্য৷ অর্থাৎ একবার যদি সেই নাগিনীর দংশন ব্যর্থ করে দেওয়া যায়, তবে অন্তত এক পক্ষকাল এঁর সঙ্গে অন্য সাধারণ নারীর কোনও প্রভেদ নেই।
তবে ওই দংশনের কাল এড়ানো বড় কঠিন, প্রায় অসম্ভব। আর সেই দংশনে যা বিষ, দশটি পূর্ণবয়স্ক হাতিকে মুহূর্তের মধ্যে হত্যা করার পক্ষে যথেষ্ট।’
চুপ করলেন কাঞ্চনাদেবী। মৎস্যেন্দ্রনাথ প্রশ্ন করলেন, ‘কিন্তু দেবী, এখানেই তো শেষ নয়। আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য প্রকাশচন্দ্রের সঙ্গে ওই পিশাচীমূর্তিরও সামূহিক বিনাশ। তার যদি কোনও মানুষী শরীর না থাকে, তবে তাকে হত্যা করব কী করে?’
ধীরে ধীরে মাথা ওপর নীচে করলেন কাঞ্চনাদেবী, ‘আছে আর্য, আছে। এই নারীকে হত্যার একটি, কেবলমাত্র একটিই উপায় আছে। যে নাগপিশাচীর আত্মা ওই শরীর অধিকার করে আছে, তা অধিষ্ঠান করে রানির কপালে, ভ্রুমধ্যে। ঠিক সেইখানে অগ্নিবাণ বিদ্ধ করতে হবে। ওটিই একমাত্র উপায়। অগ্নিদাহন ব্যতীত ওই পিশাচীর মৃত্যু নেই।’
কিছুক্ষণ স্তব্ধ রইলেন তিনজন। তারপর মৎস্যেন্দ্রনাথ বললেন, ‘দেবী, ঈশ্বরেচ্ছায় এই নাগিনীকে নিশ্চিহ্ন করার দুটি উপায়ই আপাতত আমাদের করায়ত্ত। আশীর্বাদ করুন, চূড়ান্ত সংগ্রামে যেন বিজয়ী হই।’
উদভ্রান্তের মতো সামনের দিকে হাঁটছিল সর্বাঙ্গধূলিধূসরিত চণ্ডকীর্তি৷ কেশরাশি অবিন্যস্ত। দেহের বিভিন্ন স্থানে ক্ষত। চর্মপাদুকাটি ছিন্নপ্রায়।
চণ্ডকীর্তির পাশে হাঁটছিল আরেকজন। দর্শনমাত্রে বোঝা যায় সে একজন অন্ত্যজ বনচর। কটিদেশে একটি ক্ষুদ্র ছাগচর্ম ব্যতীত দেহটি প্রায় উলঙ্গ। কুঞ্চিত কেশদামের শুভ্রতা দেখে বোঝা যায় যে মানুষটি মধ্যবয়সি। যদিও তার বলিষ্ঠ শরীর যে-কোনও যুবককে লজ্জা দেবে।
আর এই দুজনের পিছনে যারা হাঁটছিল তাদের দিকে চাইতে ভয় করছিল চণ্ডকীর্তির। ভয় করছিল এই দ্বিপ্রহরেও। ভীষণ ভয়। জীবনে এত ভয় কখনও পায়নি সে।
বনচর মানুষটি প্রশ্ন করল, ‘কী রে, আর কতদূর?’
চণ্ডকীর্তি ভীতস্বরে বলল, ‘আর দুইদিনের পথ।’
‘বেশ বেশ।’ প্রসন্ন দেখায় মানুষটিকে, ‘দ্রুত চল। আর পথ ভুল হলে বা প্রভু প্রকাশচন্দ্রের কাছে পৌঁছতে দেরি হলে কী হবে জানিস তো?’
সে আর জানে না চণ্ডকীর্তি? খুব জানে। শুধু এইটি বোধগম্য হচ্ছিল না তার, এই কুৎসিত এবং ভয়ঙ্কর ডাকিনী বাহিনীর প্রয়োজন পড়ল কেন মহারাজসচিবের। বিদ্রোহীরা কী এতই শক্তিশালী?
আজ থেকে ঠিক তিনদিন পূর্বে এই প্রশ্নই মাথায় এসেছিল তার।
শান্তঘোষ যখন তাকে এই কাজের জন্য মনোনীত করেন, তখনই তাকে গুপ্তচরবৃত্তির প্রাথমিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। সতর্কতা ও মন্ত্রগুপ্তি তার প্রধান। তার প্রশিক্ষণ, তার শিক্ষা, তার ষষ্ঠেন্দ্রিয় তাকে বলছিল তার চারিপাশের জাল ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে। কাদের যেন সর্বক্ষণের অদৃশ্য প্রহরা চলে তাকে ঘিরে। যে কোনওদিন, যে কোনওদিন অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে সে। দেহ হয় তো খুঁজে পাওয়া যাবে কোন বারাঙ্গণার দ্বারে..
সেই রাতে শয্যাগ্রহণের আগে আবার সেই করাঘাত। গুনে গুনে ঠিক তিনটি। নির্দিষ্ট ব্যবধানে।
তবুও দরজা খোলেনি সে। দরজার এপার থেকেই প্রশ্ন করেছিল, ‘কে?’
ওপাশ থেকে পরিচিত স্বরে প্রশ্ন এসেছিল, ‘দ্বিতীয় পাণ্ডব।’
দরজা খুলে দিতেই ঢুকে পড়েছিল ভীম। আর যা সংবাদ দিয়েছিল, তাতে হাত পা অবশ হয়ে এসেছিল চণ্ডকীর্তির।
‘রাজগুরু দর্ভপাণি বন্দি হয়েছেন,’ হাঁপাতে হাঁপাতে বলছিল ভীম, ‘তিনি প্রকাশ করে ফেলেছেন আপনার কথা।’
‘সে কী? কী করে?’
‘সেঁউতি ওদের পক্ষে যোগ দিয়েছে। কাল সারারাত্রি সে সেবা করেছে রাজগুরুর। রাজগুরুও মাধ্বীর আবেশে সব কথা বলে ফেলেছেন৷ আজ ভোররাত্রে সে বেরিয়ে গিয়ে প্রতিহারকে সব কিছু জানিয়ে দেয়। সেই থেকে রাজগুরু বন্দি। শুনেছি বন্দিশালায় নাকি অকথ্য অত্যাচার চলেছে তাঁর ওপর। চারজন প্রহরী দুই প্রহর ধরে কণ্টকাকীর্ণ কশা দিয়ে ক্রমাগত আঘাত করেছে তাঁর সর্বাঙ্গে, তারপর সেই ক্ষতে লবনের পট্টি লেপন করে রাখা হয়েছে। এখন নাকি লৌহদণ্ড উত্তপ্ত করা হচ্ছে...’
শুনে দৃশ্যতই শিহরিত হয়েছিল চণ্ডকীর্তি।
‘সেই অত্যাচারের যন্ত্রণায় স্থির থাকতে পারেননি রাজগুরু। আপনার নাম প্রকাশ করে দিয়েছেন তিনি। আপনি পালান চণ্ডকীর্তি! পালান!’
‘কী করে পালাব? কোথায় পালাব?’
‘আমি ঠিক ব্রাহ্মমুহূর্তে ফিরে আসছি। সেঁউতিকে ছেড়ে তো কোথাও যেতে পারব না, ওকে নিয়েই আসছি। একটি গোপন পথ আছে, আমার চেনা। আমরা তিনজনে সেই পথে পালিয়ে যাব পুণ্ড্রের দিকে। কেউ আমাদের ধরতে পারবে না।’
সেই রাতেই পালিয়েছিল চণ্ডকীর্তি। না, ব্রাহ্মমুহূর্তর জন্য অপেক্ষা করেনি সে। পালিয়েছিল তার অনেক আগেই, মধ্যরাত্রেই।
কারণ ধর্মসেনের অনুগত ভৈরবদল ভীমকে স্ববশে আনলে কী হবে, সব কিছু ঠিক করে শিখিয়ে পড়িয়ে পাঠাতে পারেনি। দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তাদের কাছে ছিল না।
এক, রাজগুরু দর্ভপাণি জানতেনই না যে চণ্ডকীর্তি কর্মান্তবাসকের একজন গুপ্তচর। সে সংবাদ তাঁর কাছে গোপন রাখা হয়েছিল শান্তঘোষের নির্দেশে।
দুই, সেঁউতি গত তিন রাত্রি ধরে তাঁর গৃহে গোপনে আশ্রয় নিয়েছে। এই রাষ্ট্রবিপ্লবের আবহাওয়ায় নিজেকে সুরক্ষিত মনে করেনি সে। তাই তার প্রিয়তম এবং সবচাইতে নির্ভরযোগ্য দয়িতের কাছে ছুটে এসেছে। তার পক্ষে পূর্বরাত্রে রাজগুরুর সেবা করা অসম্ভব, কারণ সেই সময় সে চণ্ডকীর্তির শয্যায় শায়িতা।
সেইদিনই পালাতে পালাতে ভেবেছিল চণ্ডকীর্তি, বিদ্রোহীরা এতই শক্তিশালী?
তার ভাবনাসূত্র ছিন্ন হল পাশের বনচর মানুষটির কণ্ঠস্বরে, ‘দুদিন বাদে পূর্ণিমা, না?’
‘হ্যাঁ, অগ্রহায়ণ পূর্ণিমা।’ সংক্ষেপে উত্তর দিল চণ্ডকীর্তি। এই অসভ্য, উগ্র এবং ভয়ঙ্কর বন্যবাহিনীর সঙ্গে বেশি বার্তালাপ করতে চায় না সে।
‘বাহ বাহ,’ অমার্জিত দাঁতগুলো বার করে হাসল বন্য মানুষ, ‘পূর্ণিমার আলোয় শ্মশানে বসে চিতার আগুনে নরমাংস ভোজ বেশ ভালোই হবে, কী বলিস ভাই?’
নিজের কক্ষে বসে দ্বিপ্রাহরিক নিদ্রার আয়োজন করছিলেন আচার্য বিশুদ্ধকীর্তি। কয়েকদিনের পরিশ্রমে বড়ই শ্রান্ত হয়ে পড়েছেন তিনি। গত দুদিন বুদ্ধগুপ্ত’র দেখা নেই। সে থাকলে পরিশ্রমের ভার কিছুটা কমে। আজ বিশুদ্ধকীর্তির বিশ্রামের প্রয়োজন। আজ রাত্রে প্রকাশচন্দ্র বিশেষ পূজার আয়োজন করেছেন। আজ কার্তিকী চতুর্দশী, তন্ত্রমতে কায়াপূজার প্রকৃষ্ট দিন। প্রকাশচন্দ্র বলেছেন, আজকের পূজা তিনিই করবেন।
বড় কৌতূহলে আছেন বিশুদ্ধকীর্তি। প্রকাশচন্দ্রের বহু বিচিত্র কৃৎকৌশলের সাক্ষী তিনি, অনেক অলৌকিক কর্মও অনায়াসে সম্পাদন করতে দেখেছেন। কিন্তু কখনও কোনও পূজাপাঠ সম্পাদন করতে দেখেননি। তবে বিশুদ্ধকীর্তি মনে মনে জানেন এবং স্বীকার করেন যে, আধিদৈবিক এবং আধিভৌতিক, দু’প্রকার সিদ্ধিতেই প্রকাশচন্দ্র অতি উচ্চমার্গের সাধক। বজ্রযানতন্ত্রে বিশুদ্ধকীর্তিরও কিছু কিছু সিদ্ধি আছে বটে, তবে প্রকাশচন্দ্রের কাছে নিতান্ত তুচ্ছ।
একটু আগেই মালিনী তাঁর দ্বিপ্রাহরিক সেবা করে গেছে। প্রৌঢ়ত্বে উপনীত হয়েও যথেষ্ট পরিমাণে সেবা নিতে পারেন বিশুদ্ধকীর্তি। মালিনীও সেবাকলায় যথেষ্ট পটিয়সী। তাঁদের মধ্যে সেবার নামে যেটা হয় তাকে খণ্ডযুদ্ধই বলা চলে।
সদ্যলব্ধ সেবার মৌতাতে নিদ্রাটি বেশ গভীর হয়ে এসেছিল বিশুদ্ধকীর্তির। আবেশ ভাঙল মালিনীর চাপা কণ্ঠস্বরে, ‘প্রভু, জেগে আছেন?’
‘আবার কী হল মালিনী?’ মৃদু হাসলেন বিশুদ্ধকীর্তি, ‘জানো তো, এখন আর আমার দুবার সেবা নেওয়ার ক্ষমতা নেই। বরং বেশি রাত্রের দিকে একবার...’
কথা শেষ করতে দেয় না মালিনী, ‘প্রভু, মহাসান্ধিবিগ্রহিক অগ্নিমিত্র এসেছেন।’
বিস্মিত হলেন বিশুদ্ধকীর্তি, ‘সে কী! অগ্নিমিত্র এখন? এই অসময়ে?’
মালিনী বলে, ‘দেখা করবেন কি?’
আশ্চর্য হন বিশুদ্ধকীর্তি, ‘সে কী? রাজ্যের মহাসান্ধিবিগ্রহিক আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন, দেখা করব না মানে? নিশ্চয়ই গুরুতর কিছু ঘটেছে।’
মালিনী কিছু বলে না, চুপ করে থাকে। সন্দিগ্ধ হলেন আচার্য, প্রশ্ন করলেন, ‘কী ব্যাপার, কিছু বলবে মনে হচ্ছে।’
মালিনী একটু ইতস্তত করে বলে, ‘না, মানে আজ ওঁকে কেমন যেন মনে হল।’
‘বটে? কীরকম?’
‘অতিথিকক্ষে বসে অপেক্ষা করতে বললাম, বসলেন না। বললেন এখনই দেখা করতে হবে, এখানেই, আপনার শয়নকক্ষেই। তাঁর আচরণে কেমন যেন একটা উন্মত্ত অস্থিরতা প্রকাশ পাচ্ছিল। তার ওপর...’
‘তার ওপর কী?’
‘আমার দিকে কেমন বুভুক্ষু চোখে তাকাচ্ছিলেন।’
উচ্চৈঃস্বরে হেসে উঠলেন বিশুদ্ধকীর্তি। মালিনীর প্রতি অনেকেই যে আকৃষ্ট, তা তিনি বেশ বোঝেন এবং উপভোগ করেন। মালিনী তাঁর অহঙ্কার।
তিনি সহাস্যে বললেন, ‘যাও, ওঁকে নিয়ে এসো। নিশ্চয়ই কোনও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা আছে।’
অগ্নিমিত্র কক্ষে প্রবেশ করে আচার্যর সামনের আসনে উপবিষ্ট হলেন। সেই মুহূর্তেই আচার্য বিশুদ্ধকীর্তি অনুভব করলেন যে কোথাও একটি গুরুতর গণ্ডগোল আছে। মহাসান্ধিবিগ্রহিক অগ্নিমিত্র তাঁর শিষ্যস্থানীয়, দেখা হলেই প্রণত অভিবাদন করেন। এখন সেসব কিছুই করলেন না তিনি। সরাসরি আসনে উপবেশন করলেন, আচার্যর অনুমতির অপেক্ষা করলেন না। শুধু তাই নয়, আচার্য বুঝলেন যে, অগ্নিমিত্র আকণ্ঠ মদিরাপান করে এসেছেন, তার গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। আচার্য বিশুদ্ধকীর্তির সামনে সে মদ্যপ অবস্থায় এসেছে, এও এক অবিশ্বাস্য ঘটনা।
আশ্চর্য হলেন আচার্য বিশুদ্ধকীর্তি। প্রগলভস্বরে অগ্নিমিত্র বললেন, ‘অসময়ে এসে আপনার দ্বিপ্রাহরিক বিশ্রামের ব্যাঘাত ঘটালাম নাকি আচার্য?’
এবার সতর্ক হলেন আচার্য বিশুদ্ধকীর্তি, ‘না না অগ্নিমিত্র, আমি কিছুমাত্র বিব্রত হইনি। এই অসময়ে আপনি নিশ্চয়ই কোনও প্রয়োজনীয় সংবাদ নিয়ে এসেছেন। রাষ্ট্রের প্রয়োজন আমার দ্বিপ্রাহরিক বিশ্রামের থেকে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’
‘রাষ্ট্রের প্রয়োজন? বেশ বেশ!’ হাসলেন অগ্নিমিত্র, ‘বঙ্গদেশের রাজগুরু তথা রাজপুরোহিত রাষ্ট্রের কল্যাণের কথা ভাববেন না তো কে ভাববে।’
‘সে তো বটেই। তাছাড়া আমি একা কেন, আপনি আছেন, জিতসেন আছেন, প্রধানমন্ত্রী অমিতাভভট্ট আছেন, মহারাজসচিব প্রকাশচন্দ্র আছেন, সর্বোপরি বঙ্গেশ্বরী স্বয়ং আমাদের মাথার ওপর আছেন, রাষ্ট্রের কল্যাণের কথা ভাবার মানুষ কি কম?’
‘তা তো বটেই, তা তো বটেই।’ মাথা নাড়লেন অগ্নিমিত্র, ‘তবে কিনা রাষ্ট্রকল্যাণের ক্ষেত্রে আমরা হলাম গিয়ে গুল্মলতা, মহীরুহ বলতে তো আপনি ছাড়া আর কাউকে দেখি না।’
বিশুদ্ধকীর্তি শান্তস্বরে বললেন, ‘অগ্নিমিত্র!’ দয়া করে বলবেন, ঠিক কী উদ্দেশে এই বৃদ্ধের কাছে এসেছেন আপনি?’
‘বৃদ্ধ?’ কপট বিস্ময়ে বললেন অগ্নিমিত্র, ‘প্রৌঢ় বলুন। অবশ্য মালিনীর শয্যায় আপনাকে যুবকের থেকে কিছুমাত্র কম মনে হয় না বলেই শালিবন বিহারের গোপন সংবাদ।’
‘বাচালতা বন্ধ করুন অগ্নিমিত্র!’ শীলিতস্বরে বললেন আচার্য বিশুদ্ধকীর্তি, ‘কী প্রয়োজনের এসেছেন, বলুন। এই অর্থহীন বন্ধ্যালাপে আপনার আমার, কারোরই কোনও লাভ হবে না।’ বলতে বলতেই বিশুদ্ধকীর্তি লক্ষ করলেন যে দ্বারপ্রান্তে যবনিকার অন্তরালে দুখানি পায়ের পাতা দৃশ্যমান। মালিনী সব শুনছে।
মুহূর্তের মধ্যে অন্তর্হিত হল সম্মানের আবরণ। স্থির নেত্রে অগ্নিমিত্র বিশুদ্ধকীর্তির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কোন বার্তালাপ বন্ধ্যা, আর কোন বার্তালাপ শ্রেয় সে বিষয়ে তো আপনি ভালোই জানেন আচার্য। মাসাধিককাল পূর্বে জাহোরের এক পরিত্যক্ত প্রাসাদে মৎস্যেন্দ্রনাথের নেতৃত্বে বপ্যট, গৌড়েশ্বর জয়ন্ত, ধর্মসেনসহ অন্যান্য সামন্তদের এক আলোচনাসভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। আশা করি সেখানকার আলোচনা যথেষ্ট অর্থবহ এবং ফলপ্রদই ছিল।’
ঘরের মধ্যে বজ্রপাত হল! সেই সভার সংবাদ এঁর কাছে পৌঁছল কী করে?
বিশুদ্ধকীর্তি অনুভব করলেন তাঁর মেরুদণ্ড দিয়ে হিমেল স্রোত যাচ্ছে। অকম্পিত স্বরে বললেন, ‘আপনি কোন সভার কথা বলছেন অগ্নিমিত্র? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।’
উচ্চৈঃস্বরে হেসে উঠলেন অগ্নিমিত্র। বললেন, ‘সে কী? কিছুই মনে পড়ছে না আচার্যদেব? মনে করাবার অনেক উপায় অবশ্য আমাদের রাজসেবকদের জানা আছে। তবে কি না আপনি বুদ্ধিমান মানুষ, বিষয়টি অতদূর যেতে দেবেন বলে মনে হয় না।’
বিশুদ্ধকীর্তি গর্জে উঠলেন, ‘আপনার এই বাতুল প্রলাপ শোনার সময় আমার নেই অগ্নিমিত্র। এই অবান্তর প্রলাপ বন্ধ হলে আপনি যেতে পারেন।’
‘অনেক সময় আছে আচার্য।’ অগ্নিমিত্রর মুখে ক্রূর হাসি ফুটে উঠল, ‘এত তাড়া কীসের? আপনাদের এতদিনের পরিকল্পনা এত সহজে কয়েক দণ্ডের মধ্যে জেনে যাব—সে কি সম্ভব? তারপর বলুন, কবে থেকে চলছে আপনাদের এই রাষ্ট্রবিদ্রোহের পরিকল্পনা? আর আপনিই বা এর মধ্যে ঢুকলেন কীসের লোভে?’
বিশুদ্ধকীর্তি কণ্ঠস্বরে ক্রুদ্ধভাব ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করলেন, ‘এখনও বলছি, সতর্ক হোন! আর একটিও বাতুল প্রলাপ যদি উচ্চারণ করেন...’
‘তাহলে কী করবেন? আমার নামে প্রকাশচন্দ্রের কাছে অভিযোগ করবেন? সে অবশ্য করতে পারেন। রাজগুরুর কথা প্রকাশচন্দ্র মন দিয়ে শুনবেন বলেই বিশ্বাস। তবে অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পর তিনি কী পদক্ষেপ নেবেন সে কথা মহামান্য রাজগুরু ভেবে রেখেছেন তো?’
বিশুদ্ধকীর্তি কিছু বললেন না। স্থিরচোখে চেয়ে রইলেন অগ্নিমিত্রর দিকে।
অগ্নিমিত্র তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলেন, ‘আমি যে মিথ্যা অভিযোগ করছি না সে আপনি ভালো করেই জানেন আচার্য বিশুদ্ধকীর্তি। প্রমাণ চাই? এই দেখুন।’
এই বলে অগ্নিমিত্র কটিদেশের বস্ত্রপাক থেকে একটি অঙ্গুলিপরিমাণ বস্তু বার করে বিশুদ্ধকীর্তির সামনে মেলে ধরলেন।
বিশুদ্ধকীর্তির কিছু সময় লাগল বস্তুটি কী সেটি অনুধাবন করতে। তারপরে শিউরে উঠলেন।
বস্তুটি শুধু অঙ্গুলিপরিমাণ নয়, একটি আঙুল। একটি কাটা মধ্যমা। ওই মৃত, শুষ্ক অঙ্গুলি একজনেরই।
‘কী হয়েছে বুদ্ধগুপ্তর?’ প্রশ্ন করলেন বিশুদ্ধকীর্তি। আতঙ্কে থরথর কাঁপছিলেন।
‘আহা, কী আর হবে। আপাতত জীবিত আছেন বলেই সংবাদ পেয়েছি৷ তবে কতদিন জীবিত থাকবেন বলতে পারছি না। তার কারণ আপাতত ডানহাতের আঙ্গুলগুলোই দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। এর পর বামহাত আছে। পায়ের আঙুল আছে৷ আমার তো ইচ্ছে কাটা আঙুল দিয়ে একটি মালা প্রস্তুত করে মহামান্য বুদ্ধগুপ্তের গলায় পরিয়ে বজ্রযোগিনীর মন্দিরের সামনে একটি বুদ্ধনাটিকার আয়োজন করাব। নাম দেব ‘এ যুগের অঙ্গুলিমাল।’
বিশুদ্ধকীর্তির চপেটাঘাত অগ্নিমিত্রর গণ্ডে আছড়ে পড়ার আগেই হাত ধরে ফেললেন অগ্নিমিত্র। হিসহিস স্বরে বললেন, ‘এই স্পর্ধা করবেন না আচার্য। এখনও যে আপনাকে আর আপনার সাধের মালিনীকে উলঙ্গ করে, বেত্রাঘাত করতে করতে প্রকাশ্য রাজপথ দিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে যাচ্ছি না, সে আপনার পূর্বপুরুষদের কষ্টার্জিত সুকৃতির ফল। জেনে রাখুন—আপনি যে এখনও জীবিত আছেন, আপনার নশ্বর দেহটি যে মহামান্য রাজসচিবের পোষা কুমীরদের খাদ্য হয়নি, সে কেবলমাত্র আমার দয়ায়। অতএব শান্ত হয়ে বসুন। আমার সঙ্গে সহযোগিতা করুন, তাতে শেষাবধি আপনার কল্যাণ হবে। অন্যথায় আপনার আর আপনার বেশ্যার নিরাপত্তার দায় আমি নেব না।’
উঠে দাঁড়ালেন অগ্নিমিত্র। কক্ষটির এদিক থেকে ওদিক হাঁটা শুরু করলেন। তার সঙ্গে বলতে লাগলেন, ‘বেশ কয়েকদিন পূর্বে একটি ঘটনা ঘটে। অনেক রাত্রি পর্যন্ত সমস্ত ঘটনাবলী নিজের মনশ্চক্ষে পর্যবেক্ষণ করছিলাম, বুঝলেন৷ তখনই
বিশেষ পরিস্থিতিতে আপনার উচ্চারিত একটি বাক্য আমার মনে কিছু প্রশ্ন তুলে দিয়েছিল।
‘বেশ কয়েকদিন পূর্বে কমলাঙ্ক গ্রামের অরণ্যে জনৈক গোপালদেব রাজসেবকদের একটি ক্ষুদ্র বাহিনীকে একাই নিশ্চিহ্ন করেন, আশা করি তার কথা মনে আছে আপনার। তার পরদিন সেই সেবকবাহিনীর প্রধান তথা গ্রামরক্ষকটিকে রাজসভায় ডাকা হয়। উদ্দেশ্য ছিল ঘটনাটির ব্যাপারে বিস্তারিতভাবে অবগত হওয়া। সেই সভায় স্বয়ং মহারানি আর আমাদের সাতজনের বিশিষ্ট গোষ্ঠী ছাড়া আর কেউ উপস্থিত ছিল না। তার আগে সেই দুর্ঘটনার সংবাদ জানতেন একমাত্র শান্তঘোষ আর জানতাম আমি। আর কেউ জানত না।
আপনি সভায় এসেই একটি উক্তি করেছিলেন মহামান্য আচার্যদেব। মনে আছে?’
জ্বলন্ত চোখে তাকিয়ে রইলেন বিশুদ্ধকীর্তি।
‘আপনি অসতর্কভাবে বলে ফেলেছিলেন, ‘‘এই কাপুরুষ গ্রামরক্ষকটিকে এখানে আনা হয়েছে কী করতে?’’ তাই তো?
‘এবার বলুন তো, আপনি কী করে জানলেন যে ওই গ্রামরক্ষক একজন কাপুরুষ? যদি না যেই ঘটনাটির সংবাদ আপনার কাছে আগে থেকেই অবগত থাকে?
‘সেই প্রথম আমার মনে সন্দেহের বীজ উপ্ত হয়।
‘আমরা অবগত ছিলাম, শালিবন বিহারের উপাধিবারিক বুদ্ধগুপ্ত আপনার বিশেষ ঘনিষ্ঠ। আপনার অনুপস্থিতিতে তিনিই শালিবন বিহারের যাবতীয় দায়িত্ব নির্বাহ করেন।
‘তারপর আমি বিশেষভাবে বুদ্ধগুপ্তর জন্য একজন অভিজ্ঞ গুপ্তচরকে নিয়োগ করি।
আমাদের সেই গুপ্তচর জানায় যে, ইনি যে শুধু আপনার ঘনিষ্ঠতম সহচর তাই নয়, আপনার দক্ষিণহস্ত, এমনকী আপনার ওই মালিনী সময়ে অসময়ে বুদ্ধগুপ্তকেও সন্তুষ্ট করে থাকেন।
‘অতএব মহামান্য বুদ্ধগুপ্তর জন্য আমরা গুপ্তজাল বিছিয়েছিলাম। অর্থ, ভয়, আদর্শ, আর আকাঙ্ক্ষা, এই চারটি হচ্ছে প্রধান কারণ—যার জন্য মানুষ পক্ষ পরিবর্তন করে। আমরা জানতে চেয়েছিলাম, বুদ্ধগুপ্তকে কী দিয়ে ক্রয় করা সম্ভব।
অবশেষে বুঝতে পারলাম যে বুদ্ধগুপ্ত অর্থের কাঙাল। তিনি অল্পবয়সে ভিক্ষু হয়েছেন। তাঁর মাতা এবং পিতা, দুজনেই ছিলেন শালিবন বিহারের বৌদ্ধসন্ন্যাসী। তাঁরা পড়ার সময়ে পরস্পরের অত্যন্ত কাছাকাছি আসেন এবং প্রণয়াসক্ত হয়ে পড়েন। বুদ্ধগুপ্ত সেই অবৈধ আসঙ্গলিপ্সার ফসল। তাঁর মাতা এবং পিতা দুজনেই শালিবন বিহার থেকে বিতাড়িত হন। তারপর থেকে কষ্টে, কায়ক্লেশে দিন কেটেছে তাঁদের।
বুদ্ধগুপ্ত তাঁর অসামান্য মেধার অধিকারে শালিবন বিহারে প্রবেশাধিকার পেলে কী হবে, দারিদ্র্যেহর কারণে শৈশব বা যৌবনের রূপরসগন্ধ কিছুই আস্বাদন করতে পারেননি। চিরকাল অর্থাভাবে বিব্রত হয়েছেন।
তাই যখন আমার প্রেরিত গুপ্তপুরুষ তাঁকে এক কলসপূর্ণ রৌপ্যদ্রহ্মের লোভ দেখায়, তিনি আর স্থির থাকতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত গতকাল রাত্রে আমাদের পক্ষে যোগ দিয়েছেন।’
এই বলে বিশুদ্ধকীর্তির ওপর ঝুঁকে এলেন অগ্নিমিত্র, ‘এই মুহূর্তে আমি সব জানি আচার্যদেব। আমি জানি কারা কারা আপনাদের সঙ্গে আছেন। তাঁরা কোথায় লুকিয়ে আছেন। কী আপনাদের পরিকল্পনা। আপনাদের এতদিনের সযত্নলালিত সাধের অভ্যুত্থান পরিকল্পনার প্রতিটি অংশ এখন আমার সামনে উন্মুক্ত। বলুন আচার্য, আমার কী করা উচিত।’
‘কী চান অগ্নিমিত্র?’ শুষ্কস্বরে প্রশ্ন করলেন বিশুদ্ধকীর্তি।
আরও ঝুঁকে এলেন অগ্নিমিত্র। কদর্য মদ্যপ গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল বিশুদ্ধকীর্তির নাসারন্ধ্রে।
‘আমার অর্থ চাই আচার্য। অপরিমিত অর্থ। আজ অবধি বঙ্গদেশের শাসকবর্গ, শ্রেষ্ঠী এবং বণিকশ্রেণী অপরিমিত অর্থ দান করে গেছেন ওই বজ্রযোগিনীর মন্দিরে আর শালিবন বিহারে৷ সেই অপরিসীম সম্পদের কুঞ্জি গচ্ছিত আছে কেবল আপনার কাছে।
জেনে রাখুন আচার্য, এতক্ষণ যা বললাম সেই তথ্য শুধুমাত্র আমার কাছে, কেবলমাত্র আমার কাছেই অধিগত। প্রকাশচন্দ্র বা রাজ্ঞী এই ব্যাপারে কিছুই জানেন না। এই মুহূর্তে আপনাকে, আপনার এই সাধের শালিবন বিহার এবং আপনার মিত্রবর্গকে রক্ষা করতে পারি আমি। একমাত্র আমি।’
এতক্ষণে কথা ফুটল বিশুদ্ধকীর্তির মুখে, ‘সে সম্পদে একমাত্র সদ্ধর্মের অধিকার, অগ্নিমিত্র!’
‘বটে! জেনে রাখুন, নিজের প্রাণ বাঁচানোর থেকে বড় ধর্ম আর নেই। এই মুহূর্তে যাবতীয় স্বর্ণ এখানে একত্রিত করতে আদেশ দিন আচার্য।’
‘কিন্তু তার জন্য সময় চাই অগ্নিমিত্র,’ বোঝানোর চেষ্টা করেন বিশুদ্ধকীর্তি, ‘এত দ্রুত অত বৃহৎ সম্ভার একত্র করব কী করে?’
‘সে আপনার সমস্যা বিশুদ্ধকীর্তি।’ উচ্চস্বরে বলে ওঠেন অগ্নিমিত্র, ‘আমার কাছে সময় নেই। আমি আজ রাত্রের মধ্যেই এই সম্পদ চাই। তারপর আমি আর এখানে নেই। আমি জানি এই দেশ নষ্টদের অধিকারে যাবে, তার আগেই আমি পালাতে চাই৷’
বিশুদ্ধকীর্তি কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, ‘আপনি এখানেই অপেক্ষা করুন। আমি দেখছি।’
অগ্নিমিত্র সহাস্যে বললেন, ‘বেশ, বেশ। তবে একলা অপেক্ষা করার অভ্যাস আমার নেই। মালিনীকে বলুন কিছু উত্তম সুরা সহ আমাকে সঙ্গ দিতে।’
অমিতাভভট্ট যখন হরিকেলে পৌঁছলেন তখন সন্ধ্যা নামছে। কর্মান্তবাসক থেকে হরিকেল কম দূর নয়। একটি অশ্ববাহী রথে দুদিনে এই পথ অতিক্রম করেছেন অমিতাভভট্ট। তিনি, তাঁর সারথি এবং অশ্বদুটি অত্যন্ত শ্রান্ত। অথচ সময় নেই।
কুটিরের সামনে রথ থামতেই প্রায় লাফিয়ে নামলেন অমিতাভভট্ট। উপস্থিত প্রহরীরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে বিশ্রাম করছিল। তারা স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীকে দেখে স্তম্ভিত।
রক্ষীদের ওইভাবে বসে থাকতে দেখে বিরক্ত হলেন অমিতাভভট্ট। কঠিনস্বরে প্রশ্ন করলেন, ‘বাহিনীর অধিনায়ক কে?’
প্রহরীরা সন্ত্রস্ত হয়ে সরে দাঁড়াল। প্রধান প্রহরী এগিয়ে এসে বিনীতস্বরে বলল, ‘আমি প্রভু। অধীনের নাম বিদ্যাধর। আশা করিনি যে আপনি এত দ্রুত এসে উপস্থিত হবেন।’
আশ্চর্য হলেন অমিতাভভট্ট। তাঁর এখানে আসার সংবাদ তো এদের জানার কথা নয়।
তাহলে? গম্ভীরস্বরে বললেন, ‘বিদ্যাধর, আর্য চারুদত্তকে আমি কর্মান্তবাসকে নিয়ে যাব। তাঁকে যাত্রার জন্য প্রস্তুত করে দাও।’
বিদ্যাধর অন্যদের সঙ্গে মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে। অমিতাভভট্ট বললেন, ‘কী হল, কথা কানে যাচ্ছে না?’
বিদ্যাধর বলল, ‘প্রভু, গতকাল রাত্রেই আর্য চারুদত্ত’র দেহাবসান হয়েছে। আমি সঙ্গে সঙ্গে কর্মান্তবাসকের উদ্দেশে দূত প্রেরণ করেছি এই মৃতদেহের দাহসংস্কারের বিষয়ে জানার জন্য। ভাবলাম আপনি হয়তো কোনোভাবে সেই সংবাদ পেয়েই উপস্থিত হয়েছেন। যদিও...’
বিদ্যাধরের কোনও কথাই কর্ণগোচর হচ্ছিল না অমিতাভভট্ট’র। বজ্রাহতর মতো তিনি দাঁড়িয়েছিলেন। একটিমাত্র কাজের ভারই তাঁর ওপর ন্যস্ত করেছিলেন প্রকাশচন্দ্র। তাতেও সম্পূর্ণ ব্যর্থ হলেন তিনি! এখন কোন মুখে গিয়ে প্রকাশচন্দ্রের সামনে দাঁড়াবেন? কী ভাববেন বাকি সতীর্থরা?
কিছুক্ষণ পর বিদ্যাধর ইতস্তত করে ডাকল, ‘প্রভু...!’
শূন্য দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালেন অমিতাভভট্ট৷
‘বলছিলাম যে আর্য চারুদত্ত’র সৎকার বিষয়ে মহামান্য রাজসচিব কি কোনও নির্দেশ দিয়েছেন?’
একটি চপেটাঘাত সশব্দে আছড়ে পড়ল বিদ্যাধরের গালে। চিৎকার করে উঠলেন অমিতাভভট্ট, ‘রাজসচিব, রাজসচিব আর রাজসচিব। কেন, সব কিছুতে রাজসচিবের নির্দেশ প্রয়োজন হবে কেন? তোরা জানিস না আমি এই দেশের প্রধানমন্ত্রী? আমি কি এতই অপদার্থ, যে একটা মৃতদেহের সৎকার বিষয়েও তোরা রাজসচিবের আদেশের অপেক্ষা করবি? কী ভেবেছিস, আমি রাজসচিবের বার্তাবহ দূত? কেন?’
প্রহরীরা হতভম্ব। অমিতাভভট্ট মৃদুভাষী এবং সজ্জন বলে পরিচিত। রূঢ়বাক্য প্রয়োগ করতে শোনেনি তারা। বিদ্যাধর বাম হাত গালে চেপে বসে পড়েছে।
রক্তচক্ষু অমিতাভভট্ট গর্জে উঠলেন, ‘হাঁ করে তাকিয়ে দেখছিস কী? আমাকে মৃতদেহের কাছে নিয়ে চল। আমি যা বলব, ঠিক সেরকম করবি, বুঝেছিস?’
এর থেকে অধিক যত্ন করে বিদ্যাধরকে আজ অবধি কেউই কিছু বোঝায়নি। সে ‘আসুন প্রভু, আসুন,’ বলতে বলতে দ্রুতপদে অন্তর্হিত হল কুটিরের অভ্যন্তরে।
ভিতরে ঢুকতেই উৎকট গন্ধ নাকে এল অমিতাভভট্টর। মৃতদেহে পচন শুরু হয়েছে।
উত্তরীয়ের প্রান্তটি নাকে চেপে একবার ঘরটি দেখে নিলেন অমিতাভভট্ট। অতি সাধারণ ঘর। যেটুকু না হলে জীবনধারণ অসম্ভব, কেবলমাত্র সেটুকুই আছে। শত্রুর শেষ রাখেন না প্রকাশচন্দ্র। তবে এঁর ক্ষেত্রে প্রাণদণ্ড না দিয়ে যা শাস্তিবিধান করেছিলেন সে প্রাণদণ্ডের থেকেও সাঙ্ঘাতিক!
ঘরের মধ্যে এক জায়গায় এসেই দৃষ্টি স্থির হল অমিতাভভট্ট’র। মৃতদেহের পাশে ওটা কী? ভূর্জপত্র নাকি?
প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি অনুসরণ করে বিদ্যাধর। তারপর সন্ত্রস্তস্বরে বলে, ‘আর্য চারুদত্ত শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার পর আমরা কক্ষ একবার পরীক্ষা করে দেখি। চারুদত্ত’র একটি প্রিয় উপাধান ছিল, সেটি কাউকে স্পর্শ করতে দিতেন না। সেই উপাধান থেকে এই ভূর্জপত্র উদ্ধার হয়েছে।’
চকিতে বিদ্যাধরের দিকে ফিরলেন অমিতাভভট্ট, ‘কী আছে ওতে?’
সেই দৃষ্টির সামনে যেন আরও সঙ্কুচিত হয়ে গেল বিদ্যাধর, ‘জানি না প্রভু। প্রথম দর্শনেই বুঝেছিলাম যে ওটি একটি দীর্ঘ পত্র। মহামান্য, মানে ইয়ে, প্রকাশচন্দ্রের উদ্দেশে লিখিত। পত্রটি বহুদিন পূর্বে লেখা।’
‘পড়েছিস?’
‘আজ্ঞে?’
‘পত্রটিতে কী লেখা আছে পড়েছিস?’
‘আজ্ঞে না মাননীয় প্রধানমন্ত্রী।’ যেন শিউরে উঠল বিদ্যাধর, ‘আমি ভেবেছিলাম মহামান্য, মানে ইয়ে, রাজসচিবের উদ্দেশেই যখন পত্রটি লিখিত, সেটি খুলে দেখা ঠিক হবে না।’
স্থিরনেত্রে বিদ্যাধরের দিকে তাকিয়ে থাকেন অমিতাভভট্ট। কর্মান্তবাসক থেকে বহুদূরে প্রকাশচন্দ্রের একজন ঘোষিত শত্রুর মৃত্যু হয়েছে। তারপর তাঁর কাছ থেকে প্রকাশচন্দ্রের নামে লিখিত একটি দীর্ঘ পত্র আবিষ্কৃত হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে যে কোনও ধুরন্ধর ব্যক্তি পত্রটি হস্তগত করত, পাঠ করত, এবং তার বিপুল কূটনৈতিক মূল্যের সদ্ব্যবহার করত!
‘নিয়ে আয়।’
বিদ্যাধর একবার পত্রটির দিকে, আরেকবার অমিতাভভট্টর দিকে করুণচোখে তাকাল৷
‘কী রে, কথা কানে যাচ্ছে না?’ ধমকে ওঠেন অমিতাভভট্ট। ওই পত্রটি তাঁর চাই। জীবনে অনেক তুচ্ছতাচ্ছিল্য সহ্য করেছেন তিনি। আর নয়। এইবার প্রকাশচন্দ্রকে তিনি দেখে নেবেন।
কিছু দোলাচলের পর বিদ্যাধর ভূর্জপত্রটি এনে অমিতাভভট্ট’র হাতে দেয়। অমিতাভভট্ট বহু যত্নে সেটি কুক্ষিগত করেন। তারপর বেরিয়ে আসেন পূতিগন্ধপূর্ণ কক্ষটি থেকে।
বিদ্যাধর পিছনে পিছনে বেরিয়ে আসে গড়ুরহস্ত হয়ে, ‘অধীনের প্রতি কী আদেশ প্রভু?’
রথে উঠে নির্বিকার চিত্তে আদেশ দেন অমিতাভভট্ট, ‘কুটিরটিতে অতি উত্তমরূপে অগ্নিসংযোগ কর। সব কিছু যেন ভস্মীভূত হয়ে যায়। আর হ্যাঁ, এই মুহূর্ত থেকে তোদের কর্ম থেকে অব্যাহতি দেওয়া হল। তোরা নিজেদের গ্রামে ফিরে যা। গিয়ে বল যে বঙ্গদেশের সর্বনাশ হয়ে গেছে, আমাদের আর বাঁচবার আশা নেই।’
বিশুদ্ধকীর্তি যখন ফিরে এলেন তখন তাঁর সমস্ত শরীর স্বেদস্রাবে প্লাবিত। এ এক এমনই কাজ যে কাউকে সঙ্গে নেওয়ার উপায় নেই। বজ্রযোগিনী মন্দিরের সঙ্গে তুলনীয় না হলেও শালিবন বিহারে যে পরিমাণ স্বর্ণ গচ্ছিত আছে, তার পরিমাণ কম নয়। তার একটি বৃহৎ অংশ বয়ে এনেছেন তিনি।
বন্ধ দ্বারের সামনে এসে কিঞ্চিৎ ইতস্তত করতে লাগলেন। কী একটা শব্দ শোনা যাচ্ছে না?
এদিক ওদিক ক্ষণেক দেখে নিলেন। তাঁর বাসস্থান বিহারের এক প্রান্তে। বিশেষ কারণ ছাড়া এদিকে কেউ আসে না।
দ্বারদেশে কান পাতলেন বিশুদ্ধকীর্তি। পরক্ষণে নির্ভুলভাবে চিনতে পারলেন ভেসে আসা শব্দকে। নারীর শীৎকারের শব্দ।
সর্বাঙ্গ জ্বলে গেল বিশুদ্ধকীর্তির। থরথর করে হাত পা কাঁপতে লাগল তাঁর। মনে হল এক পদাঘাতে বন্ধ দ্বার খুলে অগ্নিমিত্র’র ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন তিনি। তারপর যা হওয়ার তাই হবে।
অনেক কষ্টে উদগত ক্রোধ সংবরণ করলেন বিশুদ্ধকীর্তি। নিজেকে প্রবোধ দিলেন। হয়তো সম্মতি ছিল না মালিনীর। পাষণ্ডটা নিশ্চয়ই বলপ্রয়োগে তাকে বাধ্য করেছে।
ভাবতে ভাবতেই মালিনীর শীৎকারমিশ্রিত হাসির শব্দ ভেসে এল। সঙ্গে কিছু অর্ধসমাপ্ত বাক্য। বলছে এমন চরম সুখ বহুকাল পায়নি সে। অগ্নিমিত্র যে কাজকৌশলে বিশুদ্ধকীর্তির তুলনায় কত পটু তাঁর বিবরণ দিচ্ছে।
আর অনুরোধ করছে, অগ্নিমিত্র যেন তাকেও সঙ্গে করে নিয়ে যান!
বিশুদ্ধকীর্তি কাঠের মতো দাঁড়িয়ে রইলেন। যে নারীকে এত প্রেম উপহার দিয়েছেন তিনি, সযত্নে মাথার মণি করে রেখেছেন, এত দ্রুত আনুগত্য পরিবর্তন করে ফেলল? এত কুহকিনী, এত কুলটা, এত ছলনাময়ী হতে পারে নারী?’
একটু পর কঙ্কণের শব্দ ভেসে এল। পোশাক পরছে মালিনী। শোনা গেল অগ্নিমিত্রর কিছু তরল হাস্যপরিহাস।
মালিনীর অনুরোধও শুনতে পেলেন বিশুদ্ধকীর্তি। অতি উৎকৃষ্ট মৈরেয় এনেছিল সে। অগ্নিমিত্র তো সেসব মুখেই দিলেন না। মালিনীকে দেখেই বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়লেন। অত যত্নে আনা পানীয় সেবন করবেন না অগ্নিমিত্র? মালিনীর সেবা কি বৃথা যাবে?
অগ্নিমিত্র’র উচ্চ হাসি ভেসে এল। তিনি বলেছেন, এমন সুন্দরীকে ভোগ করার জন্য এতই ব্যগ্র ছিলেন যে মদিরাপানের জন্য অপেক্ষা করতে পারেননি। তবে মালিনীর স্বহস্তে প্রস্তুত মদিরা তিনি সানন্দচিত্তে গ্রহণ করবেন বইকি!
তার সামান্য কিছু পরে পানীয়তে চুমুকের শব্দ। উচ্চস্বরে মালিনীকে সাধুবাদ দিচ্ছেন অগ্নিমিত্র। দাঁড়িয়ে আছেন বিশুদ্ধকীর্তি। প্রতিটি শব্দ, শূলের মতো বিদ্ধ হচ্ছে তাঁর কর্ণকুহরে।
একটু পর খক খক করে কেশে উঠলেন অগ্নিমিত্র। তারপর একটি ধাতব শব্দ। পানীয়ের পাত্র পড়ে গেল?
আর থাকতে পারলেন না বিশুদ্ধকীর্তি। এক ধাক্কায় দ্বার উন্মুক্ত করলেন। সঙ্গে সঙ্গে সামনের দৃশ্য তাঁর চোখে পড়ল। ঝাঁকুনি খেয়ে তিনি থেমে গেলেন।
শয্যার ওপর শুয়ে ছটফট করছেন অগ্নিমিত্র। চোখের মণি বেরিয়ে আসতে চাইছে। মুখ থেকে বেরিয়ে আসছে শ্বেতস্রাব।
অবিশ্বাসী চোখে মালিনীর দিকে তাকালেন বিশুদ্ধকীর্তি। মালিনীর মুখ রক্তশূন্য। ফিসফিস করে বলল, ‘বিষ। ভিক্ষুণী মন্দর্ভা দিয়েছিলেন।’
মালিনীর সংজ্ঞাহীন দেহটি মাটিতে পড়েই যেত, যদি বিশুদ্ধকীর্তি ধরে না ফেলতেন।
অনুচ্চ পাথুরে টিলা দাঁড়িয়ে আছে সাগরের গা ঘেঁষে। তার পায়ের কাছে আছড়ে পড়ছে সমুদ্রের ঢেউ। টিলার চূড়ায় উঠলে অনেক দূরের দিগন্ত অবধি দৃষ্টিসীমা প্রসারিত হয়৷ এই সন্ধ্যাবেলায় জনহীন টিলার সারা দেহে সূর্যাস্তের আলো।
টিলার চূড়ার দিকে চেয়েছিল অমিতাভভট্টর সারথি সুদাস। একটু দূরে তার অশ্ববাহিত রথটি দাঁড়িয়ে। সুদাস দেখছিল একটি পরিচিত অবয়ব বসে আছে টিলার চূড়ায়। দেখে মনে হয় যেন প্রস্তরমূর্তি। একটু পর নড়ে উঠল সেই প্রস্তরমূর্তি। হাতে ধরা ভূর্জপত্র একটু একটু করে ছিঁড়ে উড়িয়ে দিতে লাগল বাতাসে।
প্রথম থেকেই লক্ষণ ভালো লাগছিল না সিংহোদরের। তাকে বারবার বলা হয়েছিল—যেন গুপ্তগৃহ থেকে এক পক্ষকাল না বেরোয় সে। স্বয়ং পদ্মসম্ভব তাঁকে বিশেষভাবে নিষেধ করেছিলেন। সিংহোদরের এখন মনে হচ্ছে, সেই নিষেধাজ্ঞা তার শোনা উচিত ছিল।
গুপ্তগৃহটি এক অন্ত্যজ কিরাতপল্লীতে। দিনরাত, সেখানে পশুহত্যা, মাংসবিক্রয় লেগেই আছে। সিংহোদর সদ্ধর্মপন্থী, নিরামিষভোজী। পশুহত্যার দৃশ্য, রক্ত, মাংস, এসব দর্শনে তার বমনোদ্রেক হয়। সে পদ্মসম্ভবকে বলেছিল, ‘প্রভু, দয়া করে এই নরকে আমাকে ফেলে যাবেন না।’
পদ্মসম্ভব সেই আর্তিতে কান দেননি। সুপক্ব অজমাংসের সঙ্গে কিরাতদের প্রিয় উগ্রগন্ধী ভাতপচা আরক পান করতে করতে বলেছিলেন, ‘এখানেই পক্ষকাল থাকো। অন্ততপক্ষে যতদিন না চূড়ান্ত লড়াইটা হয়ে যায়।’ সিংহোদর করুণস্বরে জানতে চেয়েছিল যে তার জন্য এই নরকটি পছন্দ করার কারণ কী। পদ্মসম্ভব জানিয়েছিলেন, তার দুইটি কারণ। প্রথমত, এই সংকীর্ণ এবং ঘনবদ্ধ কিরাতপল্লীতে প্রবেশের আগে চন্দ্রবংশের সৈন্যরা দুবার ভাববে। দ্বিতীয়ত, কেউ ভাবতেই পারবে না যে মল্ল সিংহোদরের মতো অহিংস সদ্ধর্মী এই মাংসবিক্রেতা কিরাতদের মধ্যে লুকিয়ে থাকতে পারে।
সেই থেকে রয়ে গেছিল সিংহোদর। অত্যন্ত মুখরা এক কিরাত রমণী তাকে দুবেলা ভাত এবং সিদ্ধ নিরামিষ ব্যঞ্জন পরিবেশন করে যায়। তার কটুবাক্যের ভয়ে সেসব নিঃসাড়ে গলাধঃকরণ করে সিংহোদর।
তবে শান্তিতে ছিল না সিংহোদর। সে জানত যে, চন্দ্রবংশের গুপ্তচর বা রাজসেবকরা তাকে খুঁজছে। তার মুখ নিশ্চয়ই মনে রেখেছে কারারক্ষীরা৷ অন্তত সেতুরক্ষী তো বটেই। তারা নিশ্চয়ই তন্নতন্ন করে খুঁজছে কর্মান্তবাসক। হয়তো বা তার বাইরেও। প্রত্যহ সে ভয়ে ভয়ে থাকত, এই বুঝি তার কুটিরের দ্বার এক আঘাতে ভেঙে ফেলল কেউ। এই বুঝি তার হাত পা বেঁধে পশুর মতো টেনে নিয়ে যাচ্ছে কেউ। এই বুঝি তার দেহে ভারী পাথর বেঁধে তাকে ছুড়ে দেওয়া হল এক মস্ত জলাশয়ে। ছটফট করছে সে, তার দিকে বিকট হাঁ করে এগিয়ে আসছে কুমির...
কতবার যে ঘুম ভেঙে ঘর্মাক্ত কলেবরে উঠে বসেছে সিংহোদর, নিজেও জানে না।
মাঝেমধ্যে পদ্মসম্ভব এসে দেখা করে যান। বিচিত্র সব ছদ্মবেশে আসেন তিনি। আর প্রতিবারই সেই নিখুঁত ছদ্মবেশ আর অসামান্য অভিনয় ক্ষমতা দেখে বিস্মিত হয়েছে সিংহোদর।
কয়েকদিন ধরেই বড় বিষণ্ণ হয়েছিল সে৷ এক নিঃসঙ্গতা তাকে কুরে কুরে খাচ্ছিল এই নির্বাসনে। শেষে নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে বেরিয়ে পড়েছিল সে।
কিরাতপল্লীর সংকীর্ণ এবং জটিল সরু পথ মুখস্থ হয়ে গেছিল সিংহোদরের। অসুবিধা হল পল্লী থেকে নির্গমনের পথটি খুঁজে পেতে। অবশেষে সেই পথ খুঁজে পল্লীর বাইরে বেরোতেই মন প্রসন্ন হয়ে গেল তার।
হেমন্ত শেষ হওয়ার মুখে। পথের পাশে ফুটে আছে বিচিত্র বর্ণের সব বনজ ফুল। একটু দূরে একটি অনুচ্চ টিলা। তার পাশে মেঘান্দ’র একটি ক্ষুদ্র শাখানদী। জনবহুল পথ। হেঁটে যাচ্ছে কৃষক, গৃহবধূ, জালিক, বৃদ্ধ সন্ন্যাসী এবং পণ্যবাহী শ্রমিকদের দল। দুদণ্ড দাঁড়িয়ে বুক ভ’রে নিঃশ্বাস নিল সিংহোদর। তারপর একটু এদিক ওদিক হাঁটাহাঁটি করল। আস্তে আস্তে এতদিনের জড়তা কেটে যাচ্ছিল তার।
সিংহোদর দেখল, পল্লীপথের ঠিক সামনেই একটি অশ্বত্থবৃক্ষের নীচে জড়ো হয়েছে কয়েকজন। মিষ্ট অথচ তীব্র মদিরাগন্ধে চারিদিক ভরপুর। উঁকি দিয়ে দেখল, একটি খর্বকায় মানুষ হাঁড়িতে করে কোনও পুষ্পজাত মদিরা বিক্রয় করছে। তারই গন্ধে ম’ ম’ করছে চারিদিক। একটু পরেই সে বুঝতে পারল, এখানে একটা আশ্চর্য ঘটনা ঘটছে। আজ অবধি সে কোনও মূক এবং বধির মদিরাবিক্রেতা দেখেনি। অথচ এখানে এই খর্বকায় মূক ও বধির মানুষটি সাবলীল ও সহজভাবে তার ক্রেতাদের সন্তুষ্ট করে চলেছে। সমস্ত ক্রয়বিক্রয় হচ্ছে অঙ্গুলি সঙ্কেতে, ওষ্ঠ সঞ্চালনে। আরও একটি আশ্চর্য জিনিস আবিষ্কার করল সিংহোদর। মূক এবং বধির মানুষটি অদ্ভুত ক্ষমতার অধিকারী। সে ক্রেতার ওষ্ঠ সঞ্চালন দেখেই তার উচ্চারিত বাক্যটি বুঝতে পারে।
বেশ কিছুক্ষণ ধরে এই নিরুচ্চার ক্রয়বিক্রয় দেখল সিংহোদর৷ ততক্ষণে মত্ত ক্রেতাদের অনেকেই বিহ্বল। সেই অবসরে সিংহোদর গিয়ে ইশারায় এক পাত্র মদিরা দিতে বলল তাকে।
মূক ও বধির বিক্রেতা তার দিকে কয়েকমুহূর্ত স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তারপর নিষ্পাপ এবং অনাবিল হাসিতে ভরে উঠল তার মুখ।
টিলার ওপর বহুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে আছেন অমিতাভভট্ট। সূর্য নেমে এসেছে দিগন্তের অনেক কাছাকাছি। সমুদ্রের বুক জুড়ে রক্তিম সন্ধ্যা ছেয়ে আসছে। প্রবল বাতাসে উড়ে যাচ্ছে অমিতাভভট্ট’র পোশাক। তাঁর কেশরাশি অবিন্যস্ত। মুখখানি গম্ভীর এবং থমথমে।
চারুদত্ত’র মৃতদেহের পাশ থেকে উদ্ধার করা পত্রটির ছিন্ন অংশগুলি অনেক আগেই মিলিয়ে গেছে বাতাসে। কিন্তু তার অভিঘাত যেন এখনও ক্রুদ্ধ, অসহায় সর্পিণীর মতো পাক খাচ্ছিল তাঁর স্মৃতির মধ্যে।
সেই পত্রের প্রতিটি ছত্রে চারুদত্ত লিখে গেছেন প্রকাশচন্দ্র আর তাং সাম্রাজ্ঞী য়ু জেতিয়ানের যৌথ ষড়যন্ত্রের ইতিহাস। লিখে গেছেন প্রকাশচন্দ্র আর এই নাগিনীর বঙ্গদেশ অধিকারের শিহরন জাগানো কাহিনি। চারুদত্ত স্বীকার করেছেন কীভাবে কোন প্রলোভনে তিনি সহায়তা করেছিলেন এই পাপ কর্মে। হত্যা করেছিলেন তাঁর সম্রাট রাজভটকে। মাদকদ্রব্য ব্যবহারে বশীভূত করেছিলেন ভাগিনেয়কে। তারপর প্রকাশচন্দ্রের হাতে তুলে দিয়েছেন এই দেশ শাসন করার নিরঙ্কুশ ক্ষমতা।
পত্রের শেষের দিকে ঝরে পড়েছে তীব্র আক্ষেপ। অনুশোচনার গ্লানিতে দীর্ণ চারুদত্ত লিখেছেন, ‘সম্ভব হলে আমি সারমেয়’র মতো বঙ্গদেশের প্রতিটি গৃহদ্বারে গিয়ে চিৎকার করে বলতাম, এই পাপবুদ্ধিদের উৎখাত করুন। এদের ধ্বংস করুন। সবংশে নির্মূল করুন। কিন্তু হায়, আমি আজ অসহায়, নির্জীব। ঈশ্বর নিজহস্তে আমাকে পাপের শাস্তি দিয়েছেন। তবে আপনি পার পাবেন না প্রকাশচন্দ্র, আপনার জীবদ্দশাতেই, সজ্ঞানে, সুস্থ অবস্থায় আপনাকে আপনার পারিষদসহ অনন্ত নরকে নিক্ষিপ্ত হতে হবে। এই অভিশাপ দিয়ে গেলাম।’
আকাশের অসীম শূন্যতার দিকে তাকিয়েছিলেন অমিতাভভট্ট। সেই শূন্যতা গ্রাস করেছিল তাঁর মস্তিষ্ক, স্নায়ু, চৈতন্য, সব কিছু।
এদের জন্যই সমস্ত জীবন ব্যয় করেছেন তিনি? নিজের মন, বুদ্ধি, আত্মা, চেতনা—সব কিছু সমর্পণ করেছেন এদের কাছে? নিজের জীবন, যৌবন, আদর্শ, চরিত্র সব বিসর্জন দিয়েছেন এই কুৎসিতবাদের যূপকাষ্ঠে? সর্বনাশের পথে টেনে নিয়ে গেছেন নিজের জন্মভূমিকে?
অসহ্য গ্লানি আর অপরাধবোধের আগুনে অন্তরাত্মা পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছিল অমিতাভভট্টর। এই ঘৃণ্য পাপাত্মাদের জন্যই বিরুদ্ধমতের প্রত্যেককে সবংশে নিশ্চিহ্ন করেছেন তিনি, তাঁরা যতই শুভ চিন্তার, উন্নত চরিত্রের মানুষ হন না কেন। এই পাপ কর্মের জন্যই স্বমতাবলম্বীদের সমস্ত পাপ কাজ নির্বিকার চিত্তে সমর্থন করেছেন, তারা যতই নিকৃষ্ট চরিত্রের প্রাণী হোক না কেন। শিক্ষক থেকে ছাত্র, শ্রমিক থেকে কৃষক, বণিক থেকে ক্রেতা, রাজন্য থেকে অন্ত্যজ, সমাজের প্রতিটি স্তরে নিজেদের একচ্ছত্র অধিকার বিস্তার করেছেন তিনি। উগ্র আকাঙ্ক্ষায় নষ্ট করেছেন সহনশীল সমাজস্থিতি। এক অসহিষ্ণু, ধর্ষকামী অন্ধকারের রাজত্ব বিস্তার করেছেন নিজের জন্মভূমির ওপর।
কেন? কীসের জন্য? কোন স্বার্থে?
তাঁকে এবং তাঁদের বোঝানো হয়েছিল, প্রকাশচন্দ্রের প্রতি অন্ধ আনুগত্যই বঙ্গজাতির মুক্তির একমাত্র দিশা। আর সেই মুক্তির পথে সাধারণ নৈতিকতা কেবলমাত্র চারিত্রিক বিচ্যুতি ব্যতীত আর কিছু নয়। বিনা প্রশ্নে, বিনা বিচারে, প্রকাশচন্দ্রের মতাদর্শের প্রতি নিঃসপত্ন আনুগত্য, এতেই বঙ্গজাতির মুক্তি। প্রকাশচন্দ্র যা বলেন তাই নীতি। প্রকাশচন্দ্র যা অনুমোদন দেন তাই নিয়ম। প্রকাশচন্দ্র যা আদেশ দেন তাই বিচার। প্রকাশচন্দ্রের উচ্চারিত প্রতিটি অক্ষর পবিত্র, প্রকাশচন্দ্রের প্রতিটি আচরণ আচরণীয়, প্রকাশচন্দ্রের প্রতিটি আদেশ অবশ্যপালনীয়। সারাজীবন এই সত্যকেই ধ্রুব জেনে এসেছেন তিনি।
ঘনায়মান অন্ধকারে নিজের দু’হাতের দিকে অনেকক্ষণ স্থির চোখে চেয়ে আছেন অমিতাভভট্ট। বড় ভুল হয়ে গেছে সারা জীবন জুড়ে। মস্ত বড় ভুল। এই ভ্রান্ত, অন্ধ পথের পথিক হয়ে এতদিন দু’হাতে অজস্র কালি মেখেছেন তিনি। অপরিমেয় পাপের ভাগী হয়েছেন। আর কত মাখবেন? কেনই বা মাখবেন? কীভাবে হবে এই অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত?
সারথি সুদাস দেখল তার প্রভু স্খলিত পায়ে এসে দাঁড়িয়েছেন টিলার একেবারে উপান্তে। দু’হাত ক্ষমা প্রার্থনার ভঙ্গিতে উপরে তুলে কী যেন বলছেন তিনি, মনে হয় যেন সর্বশক্তিমানের প্রতি কোনও গভীর অনুযোগ জানাচ্ছেন।
দু’চোখে ধাঁধা লেগে যায় সুদাসের। কী করবে সে এখন?
তবে বেশিক্ষণ দোলাচলের মধ্যে থাকতে হয় না তাকে। সুদাসের স্তম্ভিত এবং আতঙ্কিত চোখের সামনে তার প্রভু ঝাঁপ দিলেন টিলার মাথা থেকে।
নীচে পড়তে পড়তে হাত দু’খানি দুদিকে বাড়িয়ে দেন অমিতাভভট্ট। যেন উদাস উন্মুক্ত বাতাসকে দু’হাতে আঁকড়ে ধরতে চাইছেন তিনি।
একটু পরেই তাঁর দেহটি একটি গ্লানিভারগ্রস্ত পাথরের মতো ডুবে গেল পূর্বসমুদ্রের জলে। সেই সঙ্গেই অন্তরের সমস্ত দ্বন্দ্ব নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল বঙ্গদেশের প্রধানমন্ত্রী অমিতাভভট্ট’র।
মূক ও বধির মদিরা বিক্রেতার পেছনে হাঁটতে হাঁটতে একটা সন্দেহ পাকিয়ে উঠছিল সিংহোদরের মনে। তাকে এ কোথায় নিয়ে যাচ্ছে?
অবশ্য তখন তার স্থির হাঁটার ক্ষমতা লোপ পেয়েছে। পা টলায়মান। চোখদুখানি রক্তিম। মন বড় প্রসন্ন সিংহোদরের। শৌণ্ডিকটি বড় ভালো। একটিমাত্র কপর্দকের বিনিময়ে অন্তত অর্ধকলস মদিরা পান করতে দিয়েছে সিংহোদরকে। আকারে ইঙ্গিতে এও জানিয়েছে যে তার সঙ্গে গেলে আরও উৎকৃষ্ট সুরা এনে দিতে পারে সে। তার সঙ্গে সুন্দরী নারীও। না না, তার জন্য কিছুই দিতে হবে না সিংহোদরকে।
নারীসঙ্গ বহুকাল হয়নি সিংহোদরের। তার স্ত্রী সন্তানসম্ভবা, আপাতত পিত্রালয়ে অবস্থান করছেন। অনেক দিনের রমণীবর্জিত শুষ্ক জীবন বড়ই পীড়া দিচ্ছিল সিংহদোরকে। তার ওপর এই মন উদাস করা মদিরাবেশ। আর এ তো মানুষের শরীর।
পথ ক্রমেই প্রশস্ত হয়ে উঠছিল। প্রদোষকাল আসন্ন। পথে সুবেশ নাগরিকদের দল।
পথটি শেষে একটি সুসজ্জিত গৃহদ্বারে এসে শেষ হল। তার সামনে মধুপায়ী ভ্রমরগুঞ্জের মতো মদ্যপদের ভিড়। ততক্ষণে সিংহোদর কিঞ্চিৎ প্রকৃতিস্থ হয়েছে। সে ইতিউতি চাইতে লাগল। এই স্থান তার চেনা। ভাঁড়ুদত্ত’র প্রসিদ্ধ শৌণ্ডিকালয়। তাকে এখানে আনা হল কেন?
ততক্ষণে মূক ও বধির মানুষটি ভিতরে চলে গেছে। একটু পরেই দেখা দিলেন স্বয়ং ভাঁড়ুদত্ত। উদার হেসে বললেন, ‘কী সৌভাগ্য, কী সৌভাগ্য, স্বয়ং মল্ল সিংহোদর উপস্থিত যে! আসতে আজ্ঞা হোক। বসতে আজ্ঞা হোক। মায়া, দেখো কে এসেছেন। অতিথিকে ভেতরে নিয়ে যাও।’
সিংহোদরের মাথার মধ্যে একটা আশঙ্কা নড়ে উঠল। এক্ষুনি কিছু একটা ঘটে গেল যা হওয়া উচিত নয়। সঙ্গত নয়।
কিন্তু তার আশঙ্কা চাপা পড়ে গেল মায়াকে দেখে। মানুষ এত সুন্দরও হয়?
সেই মুহূর্তে মূক ও বধির মানুষটি বাইরে এসে দাঁড়িয়েছে৷ সে চোখের ইশারায় মায়ার দিকে ইঙ্গিত করে অশ্লীল হাসিতে ভরিয়ে তুলল তার মুখখানি। মায়াও একটি কামাতুর বিলোল কটাক্ষ উপহার দিয়ে বলল, ‘আসুন স্বামী, উৎকৃষ্ট শিধু আছে। আর ক্লান্তি অপনোদনের জন্য শয্যাও প্রস্তুত।’
সিংহোদরের তৃষ্ণার্ত চোখে যেন সহস্র প্রদীপ জ্বলে উঠল। এ কি মানবী, নাকি যক্ষিণী?
অন্ধের মতো সে অনুসরণ করল মায়াকে। আহা, নিতম্ব দুটি কী মায়াময়, কী অনুপম।
পূর্ণিমার পূর্বরাত্রে দুগ্ধ ফেননিভ জ্যোৎস্নায় ভেসে যাচ্ছে মেঘান্দ তীরবর্তী এই শ্মশান। রাতচরা পাখিদের ডাকে রাত্রি কর্ণময়। এদিকে ওদিকে দু-চারটি চিতা জ্বলছে। তবে অন্য মানুষজন ত্রিসীমানায় নেই। চারিদিকে রাজসেবকদের সতর্ক প্রহরা। তাদের নেতৃত্বে মাধব।
কমলাঙ্ক গ্রামের সেই লজ্জাজনক পরাজয়ের পর মাধবের জন্য চূড়ান্ত শাস্তিই ধার্য ছিল। কিন্তু কোনও এক অলৌকিক কারণে বেঁচে গেছে সে। সেই অভাবনীয় করুণার জন্য মহারানির প্রতি তার কৃতজ্ঞতার অন্ত নেই।
মাধব জানে যে আজ এই মহাশ্মশানে বঙ্গদেশের মহামান্য মহারাজ্ঞী এবং মহারাজসচিব প্রকাশচন্দ্র মহাভৈরবীক্রিয়ায় বসবেন। সঙ্গে থাকবেন অন্যান্য রাজন্যবর্গ। তবে তার কাছে সংবাদ আছে যে, রাজন্যবর্গের মধ্যে উপস্থিত থাকবেন কেবলমাত্র রাজগুরু বিশুদ্ধকীর্তি এবং জিতসেন। আনন্দগুপ্ত আর শান্তঘোষের মৃত্যুসংবাদ এখন আর রাজসেবক বাহিনীর উচ্চ পদাধিকারীদের কাছে গোপন নেই। তাঁদের উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছে মহাসান্ধিবিগ্রহিক অগ্নিমিত্র’র আকস্মিক অন্তর্ধান। গতকাল দ্বিপ্রাহরিক আহারের পর একাই কোথায় যেন বেরিয়ে যান তিনি। কোথায় যাচ্ছেন কাউকে বলে যাননি। প্রধানমন্ত্রী গেছেন হরিকেল, মহারাজসচিবের বিশেষ ‘অনুরোধে।’
একটু পরে একটি রথে চড়ে জিতসেন এবং বিশুদ্ধকীর্তি এলেন। মাধব এবং অন্যান্য রক্ষীরা অভিবাদন জানাল। জিতসেন অভিবাদন গ্রহণ করলেন, কিন্তু বিশুদ্ধকীর্তি কোনও উত্তর দিলেন না। আশ্চর্য হল মাধব। বিশুদ্ধকীর্তি অত্যন্ত রসিক এবং স্নেহময় মানুষ। কেউ প্রণত হলেই তিনি স্বস্তিবাচন উচ্চারণ করেন। দুজনে গিয়ে তাঁদের জন্য নির্দিষ্ট আসনে বসলেন। তারপর প্রতীক্ষা মহামান্য মহারানি এবং প্রকাশচন্দ্রের জন্য।
অর্ধকলস পুষ্পজাত মদিরার পর আরও দুই ঘট অতি উৎকৃষ্ট শিধু। তারপর মায়া নামের ওই কামিনী এতক্ষণ ভুমানন্দের চূড়ান্ত শীর্ষে রেখেছিল সিংহোদরকে! সেই আনন্দের তুলনা নেই। এতদিনের বুভুক্ষু কৃচ্ছ্রসাধনের পর আজ যেন ব্রতভঙ্গের উদযাপন চলছিল সিংহোদরের সমস্ত শরীর জুড়ে।
মায়া চলে গেছে কিছুক্ষণ হল। এই মুহূর্তে রমণক্লান্ত মদিরাবিষ্ট সিংহোদরের মাথার মধ্যে একটি অস্বস্তিকর চিন্তা খেলা করে যাচ্ছে।
কী যেন একটা ঠিক হয়নি। কিছু একটা ঘটেছে যা যুক্তিসংগত নয়। কিন্তু সেটি যে কী, তার মস্তিষ্কে ধরা দিচ্ছিল না।
সহসা চোখ খুলে গেল তার। দ্রুত উঠে বসল সে। তার মনে পড়ে গেছে কী সেই অসঙ্গতি। ভাঁড়ুদত্ত’র তো তাকে চেনার কথা নয়। আর মূক মানুষটির পক্ষেও ভাঁড়ুদত্তকে তার নাম জানানো একেবারেই অসম্ভব। তাহলে তিনি কী করে প্রথম দর্শনেই সিংহোদরকে নাম ধরে সম্বোধন করলেন?
মুহূর্তের মধ্যে সমস্ত ইন্দ্রিয় সজাগ হয়ে উঠল সিংহোদরের। ফাঁদে পড়েছে সে। এ সব কিছুই পূর্বপরিকল্পিত। অর্থাৎ এরা জানত যে সিংহোদর ওই কিরাতপল্লীতেই আছে, কিন্তু পল্লীর ঠিক কোথায় সে ব্যাপারে অবগত ছিল না। তাই অনেকদিন ধরেই ওই মূক মানুষটি ওখানে শৌণ্ডিকের ছদ্মবেশে অপেক্ষা করছিল। আর কুমার পদ্মসম্ভবের কথা না শুনে মূর্খের মতো সেই ফাঁদে পা দিয়েছে।
পোশাকের দিকে হাত বাড়াল সিংহোদর। যে করে হোক তাকে এই মুহূর্তে পালাতে হবে। নিজের মুর্খামির জন্য এত বড় সর্বনাশ হতে দিতে পারে না সে। কিছুতেই না।
কিন্তু তার আগেই খুলে গেল কক্ষের দ্বার। ভাঁড়ুদত্ত প্রবেশ করলেন। তার সঙ্গেই প্রবেশ করল আরও একজন যাকে দেখামাত্র সিংহোদরের হৃৎপিণ্ড কণ্ঠনালীতে আটকে গেল। সেই সেতুরক্ষী!
রঙ্গলাল উদার হেসে বলল, ‘আরে মিত্র সিংহোদর যে। সংবাদ সব ভালো তো? মায়া তোমার যথোপযুক্ত যত্ন নিয়েছে তো?’
সিংহোদরের গলায় কোনও স্বর ফুটল না।
রঙ্গলালের পিছন পিছন দুজন ভীমদর্শন রাজসেবক প্রবেশ করল। তাদের শরীর বিশাল, হাতের অস্ত্র কুৎসিত এবং চোখ শীতল।
রঙ্গলালের হাসি আকর্ণবিস্তৃত হল। বিগলিতস্বরে বলল, ‘তোমার সঙ্গে আবার কবে মিলিত হব সেই চিন্তায় রাতের ঘুম হচ্ছিল না হে। আজ অবশ্য নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারব। এখন গাত্রোত্থান করো দেখি। মহামান্য রাজসচিব আবার তোমার সঙ্গে আলাপিত হওয়ার জন্য বড়ই উতলা হয়ে আছেন।’
প্রকাশচন্দ্র আর মহারানি এলেন রাত্রির প্রথম যাম পরে করে। রানি একটি কৃষ্ণবর্ণের শাটিকা পরিহিতা। ঘন কৃষ্ণকুঞ্চিত কেশগুচ্ছ চূড়া করে বাঁধা। শরীর আভরণহীন। মুখখানি রুক্ষ, শুষ্ক এবং গম্ভীর।
প্রকাশচন্দ্রের মুখ দেখে তাঁর মনের ভাব বোঝার উপায় নেই। তিনি তাঁর স্বভাবজ নির্লিপ্তমুখে এসে আসন গ্রহণ করলেন। জিতসেন সশ্রদ্ধ অভিবাদন জানালেন। বিশুদ্ধকীর্তি উচ্চারণ করলেন স্বস্তিবাচন। প্রকাশচন্দ্র নিরাসক্ত মুখে বললেন, ‘আচার্য বিশুদ্ধকীর্তিকে আমার প্রণাম। মিত্র জিতসেনকে অভিবাদন।’
জিতসেন সশ্রদ্ধভাবে প্রশ্ন করলেন, ‘আজকের চক্রের কী আয়োজন প্রভু?’
প্রকাশচন্দ্র উত্তর দিলেন না৷ তার পরিবর্তে তিনি মাধবের দিকে ফিরে বললেন, ‘মাধব, সমস্ত রক্ষীদের এখান থেকে সরিয়ে নিয়ে যাও। আজ এই শ্মশানের ত্রিসীমানায় যেন কেউ না আসে।’
মাধব ইতস্তত করল। যদি কোনও অঘটন ঘটে যায়?
প্রকাশচন্দ্র তার মনের কথা বুঝতে পেরে বললেন, ‘দ্বিধার কোনও কারণ নেই মাধব। আজ কোনও অঘটন ঘটবে না। কারণ আজ কোনও মানুষ বা প্রাণীর এই শ্মশানভূমির নিকটস্থ হওয়ার ক্ষমতা নেই।’
মাধব মাথা নত করে প্রস্থান করল।
বিশুদ্ধকীর্তির মুখ দেখে বোঝা দুষ্কর, কী অবিশ্বাস্য প্রলয় তাঁর মনের মধ্যে ঘটছে। প্রিয়তম শিষ্য বুদ্ধগুপ্ত’র মৃত্যু সংবাদ, অগ্নিমিত্র’র সঙ্গে তাঁর বাদানুবাদ, মালিনীর বিষপ্রয়োগে অগ্নিমিত্র হত্যা, সবই ঘটে গেছে অত্যন্ত দ্রুতলয়ে। মিত্রবর্গের কাউকে জানাতে পারেননি সেই সংবাদ। অগ্নিমিত্র’র মৃতদেহটি কোনওমতে তাঁর কক্ষের পশ্চাতবর্তী অরণ্যের মধ্যে এক গহ্বরে নিক্ষেপ করে এসেছেন। মালিনী স্বাভাবিক অবস্থায় নেই। তাকে একটি ভেষজ ঔষধি প্রয়োগে তিনি গাঢ় ঘুমে আচ্ছন্ন করে এসেছেন। এই চক্রশেষে তিনি শালিবন বিহারে ফিরে মৎস্যেন্দ্রনাথকে সব কিছু বিস্তারিত জানাবেন, এই স্থির করেছেন।
প্রকাশচন্দ্র উঠে দাঁড়িয়ে ঘট থেকে জল নিয়ে বৃত্তাকারে ছিটিয়ে দিলেন। তীব্র কটুগন্ধে চারিদিক ভরে গেল। বিশুদ্ধকীর্তি নাসিকা কুঞ্চিত করলেন। কীসের গন্ধ?
প্রকাশচন্দ্র এবার একটি শুষ্ক কৃষ্ণ বৃক্ষশাখা তুলে নিলেন হাতে। বিশুদ্ধকীর্তি বুঝতে পারলেন বৃক্ষশাখাটি কী। বজ্রপাতে মৃত নিম্ববৃক্ষের শাখা। খুব সম্ভবত কোনও শ্মশানভূমিজাত। প্রকাশচন্দ্র তাই দিয়ে একটি অতি বৃহৎ বর্গক্ষেত্র আঁকলেন মাটিতে। সেই বর্গক্ষেত্রর মধ্যস্থানে রইলেন তাঁরা।
সতর্ক হলেন বিশুদ্ধকীর্তি। বজ্রযানে সিদ্ধ তন্ত্রবিদ তিনি। তিনি জানেন কোন কার্যে এই বজ্রপাতদগ্ধ শ্মশাননিম্বশাখার প্রয়োজন হয়। মায়াবন্ধন।
প্রকাশচন্দ্র যখন মাটিতে আঁচড় কাটছিলেন, তাঁর দিকে তীক্ষ্ণচোখে চেয়ে রইলেন বিশুদ্ধকীর্তি। মায়াবন্ধন সর্বোচ্চস্তরের বন্ধন। শুধু ভূবন্ধন নয়, মায়াবন্ধনে রূপ, সংজ্ঞা, বেদনা, সংস্কার আদি পঞ্চস্কন্ধ বদ্ধ হয়। বদ্ধ হয় সমগ্র প্রকৃতি। প্রতীত্যসমুৎপাদকে বদ্ধ করতে পারে এই বন্ধন।
এই বন্ধনক্ষেত্রে যাবতীয় কার্যকারণ অক্রিয়াশীল, যাবতীয় পঞ্চভূত সান্দ্র এবং যাবতীয় কালচক্র স্তব্ধ হয়ে থাকে। আধিদৈবিক, আধিভৌতিক এবং পারত্রিক, এই ত্রিভূতজগত মায়াবন্ধনে অধিষ্ঠান করে।
প্রকাশচন্দ্র এখানে মায়াবন্ধন করছেন কেন? কী এমন ঘটতে যাচ্ছে?
প্রকাশচন্দ্র বর্গক্ষেত্রটির উত্তরপূর্ব প্রান্তে এসে দাঁড়ালেন। দুহাত ওপরে তুলে অজানা ভাষায় কী যেন একটা উচ্চারণ করলেন তিনি। বিশুদ্ধকীর্তির মনে হল—এ কোনও এক জটিল মন্ত্র। তার সুর আদিম এবং অস্বস্তিকর। শ্রবণমাত্রে প্রাণে ভয় জাগে।
বিশুদ্ধকীর্তি অলক্ষ্যে নিজের দুহাতের আঙুল মুদ্রাবদ্ধ করলেন। তাঁর ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলছে, এখানে এমন কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে, যা স্বাভাবিক নয়।
প্রকাশচন্দ্র সেই একই আচার বর্গক্ষেত্রটির বাকি তিন প্রান্তদেশে করলেন। বিশুদ্ধকীর্তির মনে হল শেষ মন্ত্রোচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে ক্ষেত্রটি ঘিরে এক একটি অদৃশ্য আবরণ নেমে এল।
জিতসেন এদিক ওদিক তাকাচ্ছিলেন, কিছু বুঝতে পারছিলেন না। এর আগে একত্রে অনেক চক্রানুষ্ঠান করেছেন। কিন্তু আজ প্রকাশচন্দ্র যা করছেন তা সম্পূর্ণ অন্যরকম।
প্রকাশচন্দ্র এবার এসে তাঁদের মধ্যে বসলেন। মাটিতে একটি চতুর্শীর্ষ নক্ষত্র আঁকলেন। শীর্ষগুলির প্রান্তদেশে রইলেন চারজন। নক্ষত্রের ঠিক মধ্যস্থানে কয়েকটি শুষ্ক বৃক্ষশাখ এবং গুল্মলতা এনে রাখলেন। কয়েকটি বৃক্ষশাখা চিনতে পারলেন বিশুদ্ধকীর্তি, অশ্বত্থ, দাড়িম্ব, বেল ইত্যাদি। কয়েকটি চিনতে পারলেন না। গুল্মলতাগুলি এতই প্রাচীন, এতই শুষ্ক যে তাদের দেখে চেনার উপায় নেই।
বৃক্ষশাখাগুলি দিয়ে একটি যন্ত্র প্রস্তুত করলেন প্রকাশচন্দ্র। তার মধ্যে গুল্মলতাগুলি রাখলেন। তারপর তাতে অগ্নিসংযোগ করলেন।
অজানা ধূম্রগন্ধ ভেসে এল বিশুদ্ধকীর্তির নাকে। বহুপুরাতন, বহুপ্রাচীন আবেশ মিশে আছে সেই গন্ধে।
বাকিদের মুখের দিকে একবার তাকালেন বিশুদ্ধকীর্তি। জিতসেনের মুখে অস্বস্তি। মহারানির মুখে একটা চাপা উল্লাসের ভাব। তার মধ্যে একটা জান্তব ক্ষুধা মিশে আছে।
নিজের হস্তমুদ্রা দৃঢ় করলেন বিশুদ্ধকীর্তি। অত্যন্ত অস্বাভাবিক কিছু ঘটতে চলেছে। তাঁর সমস্ত ইন্দ্রিয় বলছে—একটা বিপদ আসন্ন! মহাবিপদ।
প্রকাশচন্দ্র গম্ভীরসুরে বললেন, ‘আপনারা জানেন যে আজ আমরা মহাবিপদের সম্মুখীন। একদল বহিরাগত বিদ্রোহী আমাদের দেশের সর্বনাশসাধনে সমুদ্যত। তাদের মধ্যে যেমন সহজিয়া নামের বিকৃত সদ্ধর্মীরা আছে, তেমন রয়েছে কৌপীনধারী উচ্ছৃঙ্খল শৈব সাধকের দল। এদের একমাত্র উদ্দেশ্য আমাদের বঙ্গদেশের সুস্থিতি নষ্ট করা এবং শান্তি ভঙ্গ করে ক্ষমতা কুক্ষিগত করা।
কিন্তু আমরা, দেশের এই সর্বনাশ হতে দিতে পারি না। আমরা চেষ্টা করেছি এদের সমস্ত প্রচেষ্টা প্রতিহত করতে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের প্রতিটি চেষ্টাই ব্যর্থ হয়েছে।’
এত পর্যন্ত বলে অতি দীর্ঘ শ্বাস নিলেন প্রকাশচন্দ্র। তারপর বললেন, ‘আমরা মহারানির অধীনে অর্ধশতাধিক কালের কাছাকাছি এই ভূমি শাসন করে এসেছি। ক্রমে আমরা সপ্তরাজন্য মিলে রাজ্ঞীর ধর্মধ্বজতলে এই শাসন সুসংহত করেছি, সুসংগঠিত করেছি। আমাদের ধর্মের ধ্বজপতাকা উড়ছে সর্বত্র।
‘কিন্তু তদসত্বেও এই বৌদ্ধপাষণ্ড আর বিপথগামী শৈবযোগীদের দল আমাদের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র রচনা করেছে। তার মূল অনেক গভীর। আমরা বজ্রযোগিনী মন্দিরের ঘটনায় তার প্রমাণ পেয়েছি। প্রমাণ পেয়েছি আরও অনেক সূত্রে। আপনাদের জানিয়ে রাখি, কালকের মধ্যেই আমি চূড়ান্ত আক্রমণের আশঙ্কা করছি।
‘আমাদের উচিত ছিল এই কঠিন মুহূর্তে সঙ্ঘবদ্ধ থাকা। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের সঙ্গীদের অনেকেই আমাদের সঙ্গে আর নেই। আনন্দগুপ্ত আর শান্তঘোষের হত্যাসংবাদ আপনাদের জানা। খানিক পূর্বেই আমি আমার সাধনার শক্তিবলে অবগত হয়েছি যে, খুব সম্ভবত প্রধানমন্ত্রী অমিতাভভট্ট আর বেঁচে নেই...’
বিশুদ্ধকীর্তির হস্তমুদ্রা সঞ্চালন মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল।
‘মহাসান্ধিবিগ্রহিক অগ্নিমিত্রও আর আমাদের মধ্যে নেই।’
মুদ্রাসঞ্চালন দ্রুত হল।
‘আজ তাই আমাদের আরও কঠিনভাবে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে৷ সেই জন্যই বিশেষ পূজার আয়োজন করেছি। এই পূজার উদ্দেশ্য মহারানির জন্য এক অতিবিশিষ্ট অতিপ্রাকৃত রক্ষাকবচের ব্যবস্থা করা। কারণ আমরা জানি যে, রানিই স্বয়ং বঙ্গদেশ, বঙ্গদেশই সাক্ষাৎ রানি। তাই তাঁকে রক্ষা করাই আমাদের প্রধানতম দায়িত্ব।’
জিতসেন হতভম্বের মতো একবার বিশুদ্ধকীর্তি আর একবার প্রকাশচন্দ্রের দিকে তাকালেন। তাঁর মাথার মধ্যে কিছু ঢুকছে না।
প্রকাশচন্দ্র চারটি পাত্রে একটি মিষ্টগন্ধী ঘন কৃষ্ণবর্ণের তরল ঢাললেন। তারপর পাত্রগুলি সবার হাতে তুলে দিয়ে আদেশের সুরে বললেন, ‘পান করুন।’
সেই সুমিষ্টগন্ধী তরল ঈষদুষ্ণ মদিরার মতো গলা বেয়ে নামতে লাগল বিশুদ্ধকীর্তির। এক উষ্ণ মাদকতা ছড়িয়ে পড়ল তাঁর শরীরে।
‘আপনাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ জানা প্রয়োজন। আমি বা রাজ্ঞী এতদিন এই সংবাদ আপনাদের থেকে গোপন রেখেছিলাম। আমরা দুজন ছাড়া আর যেক’জন একথা জানতেন তাঁরা আজ আর কেউ বেঁচে নেই। কিন্তু এই তথ্য আপনাদের জানা প্রয়োজন।’
মেরুদণ্ড টানটান করে বসলেন বিশুদ্ধকীর্তি। তিনি বুঝতে পেরেছেন কী বলতে চলেছেন প্রকাশচন্দ্র, কোন মারাত্মক সত্য উন্মোচিত হতে চলেছে তাঁদের সামনে।
‘আপনাদের জানাই যে আমাদের নেত্রী, বঙ্গদেশের মহারানি প্রকৃতপক্ষে কোনও মানুষ নন, একজন নাগকন্যা।’
শ্মশানভূমির মধ্যে চারজন মানুষ পদ্মাসনে বসে ধ্যানমগ্ন। সমগ্র স্থানটির মধ্যে এক রহস্যময় নীরবতা। কোথাও কোনও শব্দ নেই, প্রাণের সাড়া নেই।
বিশুদ্ধকীর্তি একটি আশ্চর্য অনুভূতির মধ্যে ছিলেন। তাঁর মনে হচ্ছিল তিনি যেন মহাশূন্যে ভেসে আছেন। তাঁর চৈতন্য আবিষ্ট, কিন্তু প্রখর। তাঁর চিন্তা নিয়ন্ত্রিত, কিন্তু তীক্ষ্ণ। তাঁর একাগ্রতা এবং ধীশক্তি বহুগুণে বর্ধিত হয়েছে, কিন্তু তার গতি তাঁর ইচ্ছাধীন নয়। তরলের মাদকতা তাঁকে বশীভূত করে ফেলেছে, বুঝতে পারছিলেন বিশুদ্ধকীর্তি। একটা স্থির উত্তেজনার স্রোত ক্রমেই তাঁর নাভিমূল থেকে ঊর্ধ্বমুখে ধাবিত হচ্ছিল, যেভাবে নিঃশঙ্ক শশকের দিকে একাগ্রচিত্তে এগিয়ে চলে ধূর্ত অজগর।
প্রকাশচন্দ্র তাঁদের একটি মন্ত্র দিয়েছেন জপ করার জন্য। মন্ত্রটি বিজাতীয়, শব্দগুলির প্রকরণ শুনে মনে হয়, এ যেন এই পৃথিবীর শব্দ নয়। তার প্রতিটি ধ্বনির উচ্চারণে মস্তিষ্কের কোষ শান্ত, শীতল এবং নিবিড় হয়ে আসে।
একটু পর একটা ক্ষীণ হিসহিসানির শব্দ কানে আসে বিশুদ্ধকীর্তির। কেউ যেন ধীরে, অতি ধীরে শ্বাস নিচ্ছে। তিনি সেদিকে মনোযোগ দিলেন না, মন্ত্রধ্যান করতে লাগলেন।
হিসহিসানির শব্দ ক্রমে বাড়ছে। প্রথমে ক্ষীণ ও ধীরলয়ে। তারপর একটু দ্রুত এবং উচ্চকিত।
চোখ খুলতে গেলেন বিশুদ্ধকীর্তি। কিন্তু তাঁর মস্তিষ্কের মধ্যে প্রকাশচন্দ্রের নির্দেশ ভেসে এল, ‘মন্ত্র জপ করতে থাকুন আচার্য। এখনও সময় হয়নি।’
এর অর্থ, তাঁর মন দখল করে ফেলেছেন প্রকাশচন্দ্র। শুধু তাই নয়, নিজের মানসিক চিন্তাতরঙ্গকেও বিশুদ্ধকীর্তির মস্তিষ্কে প্রক্ষেপণ করতে পারছেন।
এতক্ষণে তরলের মাহাত্ম্য বুঝতে পারলেন বিশুদ্ধকীর্তি। এখন তিনি প্রকাশচন্দ্রের ক্রীড়নক মাত্র!
হিসহিসানির শব্দ ক্রমেই বেড়ে উঠছে। আরও ধীর, আরও গভীর, আরও শীতল৷
সহসা বিশুদ্ধকীর্তি অনুভব করলেন পারিপার্শ্বিকের তাপমাত্রা দ্রুত নেমে আসছে। এই শৈত্য হেমন্তের স্নিগ্ধ শৈত্য নয়। অনেক শীতল, অনেক হিংস্র।
বিশুদ্ধকীর্তির সর্বাঙ্গে সেই শৈত্য ধীর লয়ে কামড় বসাতে লাগল। তাঁর দাঁতে দাঁত লেগে যেতে লাগল। হাত পায়ের সাড় চলে যেতে লাগল। যেন ডুবে যাচ্ছেন তিনি। অজ্ঞান শৈত্যের মধ্যে যেন একটু একটু করে বিলীন হয়ে যাচ্ছেন। কেবল থেকে যাচ্ছে সেই মৃত্যুশীতল হিসহিস শব্দ।
একটু পর সেই ঘন অন্ধকারের মধ্যে একটি ধূসর পর্দা কে যেন টেনে দিল। তার মধ্যে একটি একটি করে ফুটে উঠল অন্ধকারের বিন্দু। প্রথমে স্থির। ধীরে, অতি ধীরে তারা কম্পমান হল। কম্পন ক্রমে বাড়তে লাগল। একটু পরে সেই কম্পনে গতি এল, এল ছন্দ। এল তাল, এল লয়।
তারপর শুরু হল তাদের নাচ। নাচতেই নাচতেই বিন্দুরা একে অন্যের সঙ্গে জুড়ে যেতে লাগল। তৈরি হল বিন্দুসমষ্টি। তারপর সেই বিন্দুসমষ্টি আকার নিতে লাগল। তৈরি করল অবয়ব।
সেই অন্ধকার যেন তার সীমাহীন গর্ভের মধ্যে নিবিড়ভাবে আঁকড়ে ধরেছে বিশুদ্ধকীর্তিকে।
সেই অবয়ব তৈরি করেছে বিভিন্ন চরিত্র। ছবি আরও স্পষ্ট হয়ে এসেছে। একটু পরেই শুরু হল ছায়ানাটিকা।
উন্মাদের মতো, আতঙ্কিত পশুদের মতো পালিয়ে যাচ্ছে একদল নরনারী। পিছনে জ্বলছে বনভূমি। তাদের মধ্যে এক শিশুকন্যা ভীতচোখে তাকিয়ে রয়েছে সেই সর্বগ্রাসী দাবানলের দিকে।
গভীর রাত্রি। উঁচু দুর্গপ্রাকার। ধীরে ধীরে সেই দুর্গপ্রাকার পেরিয়ে কারা যেন নেমে আসছে। তাদের হাতে প্রজ্জ্বলন্ত উল্কা, কটিবন্ধে করাল খড়্গ, চোখে জিঘাংসা। তারপর চারিদিকে আগুন আর আগুন।
এক নারী পেরিয়ে যাচ্ছেন শুভ্র তুষারাবৃত গিরিপথ। একটি কিশোর আর একটি শিশুকন্যার হাত ধরে। সঙ্গী একজন বৃদ্ধ আর দু-একজন বিজাতীয় কিশোর। পথের আড়ালে হারিয়ে যাওয়ার আগে ফেলে আসা জন্মভূমির দিকে একবার সজল চোখে তাকালেন। তারপর চোখের জল মুছে চিবুক কঠিন করে মুখ ফেরালেন সামনের দিকে।
অন্ধকার গর্ভগৃহ। বিচিত্রদর্শন এক পাত্রে জ্বলছে আগুন। একদিকে একটি প্রস্তরনির্মিত নাগমূর্তি। তার সামনে একটি ধ্যানস্থ শিশুকন্যা বসে।
কোনও এক বিদেশীয় রাজগৃহ। অতুলনীয় বৈভব। সেই শিশুকন্যা এখন কিশোরী।
একটি বিশাল রাজশয্যা। একজন অসুস্থ মানুষ শেষ শয়ানে। সেই কিশোরী এখন যুবতী। সে ধরে আছে মৃত্যুপথযাত্রীর হাত। ধীরে ধীরে হাত খুলে গেল। উঠে দাঁড়াল সেই যুবতী।
যুবতীর কোলে সদ্যোজাত শিশুকন্যা। মৃতবৎ। রাজশকট ছুটে চলেছে পার্বত্য প্রদেশের পথ ধরে।
পুনরায় সেই অন্ধকার গর্ভগৃহ। প্রস্তরনির্মিত নাগমূর্তি। সেই মৃতবৎ শিশুকন্যাটি শুয়ে আছে নাগমূর্তির সামনে। যুবতী এখন সম্পূর্ণ নগ্ন। দুই হাত উপরে তুলে, দুলে দুলে এক অদ্ভুত ভাষায় মন্ত্র পড়ছে।
মন্ত্রের ভাষা যদিও পরিচিত। একটু আগেই প্রকাশচন্দ্র এই ভাষার মন্ত্রই জপ করতে বলেছেন বিশুদ্ধকীর্তিকে।
শিশুকন্যার চোখ খুলে গেল হঠাৎ করে। চোখের মধ্যে শুধু অন্ধকার। ঠোঁটের কোণে এক অদ্ভুত হাসি। ধীরে ধীরে হাসি আরও প্রসারিত হল। দন্তহীন মুখখানি খুলে গেল।
ভিতর থেকে বেরিয়ে এল একটি জিহ্বা। মানুষের নয়, সাপের!
আর পারলেন না বিশুদ্ধকীর্তি। সমস্ত মানসিক শক্তি সংহত করলেন। চৈতন্যকে স্থির করলেন সহস্রারে। তারপর প্রবল মানসিক শক্তিতে ধীরে ধীরে নিজের চেতনাকে টেনে তুলতে লাগলেন এই অন্ধকারের করাল গ্রাস থেকে। এই তো, একটু একটু করে চেতনা ফিরে আসছে তাঁর। মনে হচ্ছে যেন তমসার গভীর অন্তরাল থেকে ক্রমেই আলোর দিকে ফিরছেন তিনি।
অকস্মাৎ চোখ খুলে গেল বিশুদ্ধকীর্তির। প্রথমে কিছু দেখতে পেলেন না। হৃৎপিণ্ডের মধ্যে সহস্র অশ্বের ক্ষুরধ্বনি। হাত-পা কম্পমান। এই শীতের মধ্যেও সর্বাঙ্গ স্বেদলিপ্ত।
একটু একটু করে দৃষ্টিশক্তি ফিরে এসেছে বিশুদ্ধকীর্তির। সামনের দিকে তাকাতেই ভয়ে আতঙ্কে বোবা হয়ে গেলেন তিনি।
তাঁর পাশে ধ্যানস্থ জিতসেন। চক্ষু মুদ্রিত। শরীর নিস্পন্দ। মনে হচ্ছে যেন মানুষ নয়, একটি প্রস্তরমূর্তি বসে আছে।
বিশুদ্ধকীর্তির ঠিক সামনে প্রকাশচন্দ্র বসে। তিনি তাকিয়ে আছেন বিশুদ্ধকীর্তির দিকেই। তাঁর পাশে বসে থাকার কথা মহারানির।
কিন্তু কোথায় তিনি?
মহারানি নেই। তার বদলে তাঁর আসনে কুণ্ডলীকৃত একটি অতিবৃহৎ, অতি বিশালকায়, মানুষপ্রমাণ কালনাগিনী। তার বিশাল ফণা স্থির হয়ে তাকিয়ে আছে তাঁদের দিকেই। তার জান্তব এবং রক্তমদির চক্ষুদুটি ক্রূর ও শীতল। সেইদিকে তাকিয়ে বুকের রক্ত হিম হয়ে গেল বিশুদ্ধকীর্তির। সেই নাগিনীর প্রতিটি গাঢ় হিসহিসানি যেন পাতালের বুক থেকে, নরকের আগুন থেকে, সর্বনাশের গর্ভ থেকে উঠে আসছে।
আতঙ্কিত এবং স্তম্ভিত বিশুদ্ধকীর্তির দিকে তাকিয়ে প্রকাশচন্দ্র বললেন, ‘বিশ্বাস করুন আচার্য, আমি চাইনি এই দৃশ্য আপনি দেখুন। কিন্তু কিছু করার নেই। এখন আর ফেরার পথ নেই আমাদের।’
বিশুদ্ধকীর্তির কণ্ঠা দুবার ওঠানামা করল। কোনও স্বর ফুটল না।
উঠে দাঁড়ালেন প্রকাশচন্দ্র। সেই কালনাগিনী উদ্ধত ফণা তাঁর সমান উচ্চতার। তিনি বাম হাতটি নাগিনীর ফণার উপর স্নেহভ’রে রাখলেন। বললেন, ‘আজ আর সত্যিই আমাদের ফেরার পথ নেই আচার্য বিশুদ্ধকীর্তি। আমাদের স্বপ্ন, পরিকল্পনা, যা আমি আর রানি এতদিন ধরে গভীর সংগোপনে লালন করেছি, সবই আজ বিপন্ন। আমার গণনা বলছে, একটা চূড়ান্ত সময় উপস্থিত। আর কালই সেই মাহেন্দ্রক্ষণ।’ সামান্য থামলেন প্রকাশচন্দ্র। ইত্যবসরে একবার জিতসেনের দিকে চাইলেন বিশুদ্ধকীর্তি। নিঃসাড়, নিস্পন্দ দেহ।
‘তাই আজই এই অতি বিশেষ, অতিগূঢ় চক্রের আয়োজন করতে বাধ্য হয়েছি। এর নাম মহানাগিনীচক্র। রানি পরবর্তী অষ্টপ্রহর এই মহানাগিনী অবতারে অধিষ্ঠান করবেন, এই দেহে বা মনুষ্যদেহে। এর মধ্যে তিনি অজেয়া, অযোধ্যা, অপরাজিতা। এই অষ্টপ্রহরের মধ্যে তাঁকে বিনাশ করতে পারে এমন মানুষ, মন্ত্র বা শক্তি ত্রিজগতে নেই।
‘কিন্তু সেই পথে এখনও কিছু ক্রিয়া বাকি।
‘এই মহানাগিনীরূপ ধারণ করতে হলে একটি বিশেষ অর্ঘ্যের প্রয়োজন হয়। তবেই নাগিনীক্ষমতার পূর্ণ বিকাশ ঘটে।’
এতক্ষণে বিশুদ্ধকীর্তির স্বর ফুটল। স্খলিতস্বরে বললেন, ‘কোন অর্ঘ্য প্রভু?’
স্থির চোখে বিশুদ্ধকীর্তিকে দেখলেন প্রকাশচন্দ্র। নাগিনীর ফণা আরও উচ্চ, আরও স্থির, নিষ্কম্প হিসহিসানির শব্দ হয়ে উঠল আরও তীব্র।
‘অনুগত...’
নাগিনীর মুখগহ্বর উন্মুক্ত হল। আদিম জান্তব গন্ধ অসাড় করে দিল বিশুদ্ধকীর্তির নাসারন্ধ্র।
‘ভৃত্যের...’
ফণা সামান্য পশ্চাদগামী হল।
‘দেহকাণ্ড।’
আকস্মিক বিদ্যুৎঝলকে নাগিনীর ফণা নেমে এল স্থির এবং নিস্পন্দ জিতসেনের উপর। পরমুহূর্তেই ফণাটি ঊর্ধ্বমুখী হল৷ বিশুদ্ধকীর্তি বিস্ফারিত নেত্রে এক অপার্থিব দৃশ্য দেখলেন। নির্মল আকাশে চতুর্দশীর চন্দ্রমা। তার প্রেক্ষাপটে কোনও এক আদিম মহাকায় মহানাগ উদরসাৎ করছে তার শিকার। সেই উর্ধ্বোত্থিত নাগমুখে ধীরে ধীরে জিতসেনের মাথা, শরীর এবং শেষে পা’দুখানি অদৃশ্য হয়ে গেল।
এই অবিশ্বাস্য অতিলৌকিক দৃশ্য দেখে হাত পা থরথর করে কাঁপতে লাগল বিশুদ্ধকীর্তির। মনে হল যেন অজ্ঞান হয়ে যাবেন তিনি। তাঁর স্নায়ু আর সুস্থ নেই, তাঁর চৈতন্য বশে নেই।
সেই নাগিনী জিতসেনকে গ্রাস করে কুণ্ডলীকৃত হয়ে বসল। নিমীলিত হল তার ফণা।
প্রকাশচন্দ্র এবার ধীরেসুস্থে এসে বসলেন বিশুদ্ধকীর্তির সামনে। তারপর ধীরস্বরে বললেন, ‘রানি অবশ্য আপনাকেই ভোগ হিসেবে পছন্দ করেছিলেন আচার্য। কিন্তু আমিই আপত্তি করলাম। কেন জানেন?’
বিহ্বলচক্ষে চেয়ে রইলেন বিশুদ্ধকীর্তি।
‘কারণ আনুগত্য প্রশ্নহীন নয় এমন ভৃত্য মহারানির ভোগ হতে পারে না।’
বিশুদ্ধকীর্তির ওষ্ঠ কম্পিত হল মাত্র।
‘মল্ল সিংহোদরকে তো নিশ্চয়ই চেনেন আচার্য। শত হোক, কুমার পদ্মসম্ভবের প্রিয়পাত্র। আপনাদেরও প্রিয়পাত্র। আপাতত তার শরীরের বিভিন্ন অংশ নিয়ে আমাদের সেবকবাহিনী সামান্য ব্যস্ত আছে।’
‘অনেক কথাই অবশ্য সে আমাদের জানিয়েছে। তবে যে অবস্থায় তাকে দেখে এসেছি, খুব সম্ভবত বাকি কথা বলার অবস্থায় সে আর নেই। অগত্যা, রানির ভোগ হওয়ার সৌভাগ্য আর আপনার কপালে জুটল না।’
এই বলে স্মিতহাস্যে বিশুদ্ধকীর্তির সামনে এসে বসলেন প্রকাশচন্দ্র। বললেন, ‘নিন, প্রথম থেকেই শুরু করুন দেখি। তারা এই মুহূর্তে সদলবলে কোথায় আছে?’
এতক্ষণ পর এই প্রথম স্বর ফুটল আচার্য বিশুদ্ধকীর্তির। ক্ষীণকণ্ঠে বললেন, ‘শালিবন বিহারে।’
‘আপনি সঠিক বলছেন এই পরিকল্পনায় বিপদের কোনও আশঙ্কা নেই?’
‘না যোগীবর, এর থেকে প্রকৃষ্ট সুযোগ আর পাবেন না। কাল পূর্ণিমা, মহারানির কামনাতৃপ্তির দিন। কাল প্রভাত থেকেই ঘোষকের দল কর্মান্তবাসক জুড়ে সমর্থ যুবকের সন্ধানে বেরিয়ে পড়বে। এদিকে প্রকাশচন্দ্র আজ প্রভাতে রওনা দেবেন হরিকেলের উদ্দেশে। আপনার পরিকল্পনায় সৈন্যদলের বৃহদংশ অন্যত্র ব্যস্ত। অর্থাৎ কর্মান্তবাসক প্রকৃতপক্ষে অরক্ষিত। এই সুযোগে মহাবীর গোপাল রাজ্যার্থী হয়ে মহারানির শয়নকক্ষে প্রবেশ করে তাঁকে হত্যা করুন। আর আমাদের বাকি সহকর্মীরা না হয় কর্মান্তবাসকের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করুন।’
রাত্রির শেষ প্রহর। শালিবন বিহারের গুপ্তকক্ষে অধিবেশনে বসেছেন বিপ্লবের সমস্ত অধিকর্তারা। আচার্য বিশুদ্ধকীর্তি একটু আগেই ফিরেছেন চক্রানুষ্ঠান থেকে। এসেই তিনি এই পরিকল্পনা জানিয়েছেন। তাঁর মতে, কালই চূড়ান্ত আক্রমণের প্রকৃষ্টতম তিথি। তিনি চান কালই যেন চূড়ান্ত আক্রমণ করা হয়।
সমস্ত কিছু মনে মনে একবার পর্যালোচনা করে নিলেন মৎস্যেন্দ্রনাথ। তারপর বপ্যটের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘আর্য বপ্যট, আপনার বাহিনী প্রস্তুত তো?’
অরণ্যবাসী কিরাত এবং শবরদের প্রশিক্ষণ দিয়ে একটি গুপ্তবাহিনী প্রস্তুত করেছেন বপ্যট। তাদের কর্মক্ষমতা শান্তঘোষ এবং আনন্দগুপ্ত বাহিনীর সঙ্গে সম্মুখ সমরে একবার প্রমাণিত হয়ে গেছে। তিনি উত্তর দিলেন, ‘হ্যাঁ লোকেশ্বর, আমরা প্রস্তুত।’
‘কুমার জয়াপীড়, কুমার পদ্মসম্ভব, আপনাদের কী মত?’
জয়াপীড় বললেন, ‘আমি অনেকদিন থেকেই প্রস্তুত। আপনার অনুমতি পেলেই হয়।’
পদ্মসম্ভব ইতস্তত করছিলেন। সেই দেখে মৎস্যেন্দ্রনাথ প্রশ্ন করলেন, ‘কিছু বলবেন কুমার?’
পদ্মসম্ভব বললেন, ‘আমাকে ক্ষমা করবেন আপনারা, আমার ষষ্ঠেন্দ্রিয় বলছে—আমাদের আরও ধৈর্য ধরা উচিত। কোথাও যেন কিছু একটা ঠিক হচ্ছে না।’
‘কী ঠিক হচ্ছে না আর্য?’
‘বেশ কিছু লক্ষণ সুসঙ্গত নয়। আপনার কি মনে হচ্ছে না লোকেশ্বর, যে সব কিছুই বড় সহজে হয়ে যাচ্ছে? মনে হচ্ছে না, যেন বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা অতি যত্নসহকারে আমাদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে?’
‘এমত মনে হওয়ার কারণ?’
‘আছে যোগীশ্বর, এবং তার স্বপক্ষে আমার কিছু যুক্তিও আছে।’
‘যেমন?’ প্রশ্ন করলেন মৎস্যেন্দ্রনাথ।
‘প্রথমত, প্রকাশচন্দ্র জানেন যে বস্তুতপক্ষে তাঁর রাজধানী অরক্ষিত। বিদ্রোহীরা যে শুধু প্রবল প্রতাপে উদ্যত তাই নয়, তারা কর্মান্তবাসকেই কোথাও আত্মগোপন করে আছে। তিনি নিশ্চয়ই জানেন যে, যে-কোনওদিন, যে-কোনও মুহূর্তে আঘাত নেমে আসতে পারে। তবুও তিনি প্রভাতে কর্মান্তবাসক ত্যাগ করছেন? এত আশঙ্কা মাথায় নিয়েও?’
কেউ কোনও উত্তর দিলেন না। বিশুদ্ধকীর্তির বুক কাঁপছে।
‘দ্বিতীয়ত, মল্ল সিংহোদরের কাল থেকে কোনও সন্ধান নেই। আমি জেনেছি, গতকাল সন্ধ্যাবেলার সামান্য পূর্বে সে তার গুপ্তগৃহ ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে যায়। কারণ অজানা। তারপর থেকে থেকে তার আর কোনও সন্ধান নেই।
‘তৃতীয়ত, আচার্য বুদ্ধগুপ্তরও কোনও সংবাদ নেই অনেকদিন। সে বিষয়ে আমরা অনেকেই অন্ধকারে। তিনি আমাদের অন্তরঙ্গ গোষ্ঠীর একজন। যদি বুদ্ধগুপ্ত এবং সিংহোদর ইতিমধ্যেই শত্রুপক্ষের দ্বারা ধৃত হয়ে থাকেন, তবে?’
সভাস্থ প্রত্যেকে চুপ করে রইলেন। বিশুদ্ধকীর্তির হৃৎস্পন্দন দ্রুততর হল।
‘চতুর্থত, আমরা জানি যে মহারানি সপ্তরাজন্য পরিবেষ্টিত হয়ে এই বঙ্গভূমি শাসন করেন। তাঁদের মধ্যে প্রকাশচন্দ্রকে বাদ দিলে বাকি থাকেন ছয় জন। তাঁদের মধ্যে আচার্য স্বয়ং একজন। বাকি পাঁচজনের মধ্যে শান্তঘোষ আর আনন্দগুপ্তর নিহত হওয়ার সংবাদ আমরা জানি। কিন্তু বাকি তিন জন, অমিতাভভট্ট, অগ্নিমিত্র এবং জিতসেন কোথায় আছেন, কী করছেন, সে সংবাদ আমরা জানি না। যদি শত্রুপক্ষের এই আপাত উদাসীনতা কোনও ষড়যন্ত্র হয়? যদি এমন হয় যে তাঁরা অপেক্ষা করে আছেন আমাদের এই ভুল পদক্ষেপের জন্য?’
পদ্মসম্ভবের বক্তব্য শেষ হলে সভাস্থলে অস্বাভাবিক নৈঃশব্দ্য নেমে এল। প্রত্যেকে পদ্মসম্ভবের প্রতিটি বক্তব্যের যুক্তি বিচার করে দেখছেন।
মৃদু কেশে গলা পরিষ্কার করলেন বিশুদ্ধকীর্তি, ‘মল্ল সিংহোদরের অন্তর্ধানের ব্যাপারে কিছু বলতে পারব না। তবে কুমার পদ্মসম্ভবের অন্য তিনটি প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে আছে।
‘আপনারা নিশ্চয়ই প্রকাশচন্দ্রের একদা ঘনিষ্ঠতম সহযোগী চারুদত্তর ব্যাপারে অবগত আছেন। রাজমাতা কাঞ্চনাদেবীর ব্যাপারে বিশদে তিনিই জানিয়েছিলেন আমাদের। জানিয়েছিলেন তাঁকে উদ্ধারের পথও।
‘আজ সন্ধ্যায় হরিকেল থেকে এক বিশেষ বার্তাবহ কর্মান্তবাসকে এসে পৌঁছেছে। সে জানিয়েছে, কয়েকদিন পূর্বে চারুদত্তর দেহাবসান ঘটেছে। তাঁর উপাধান থেকে একটি গোপন ভূর্জপত্র উদ্ধার হয়েছে। রক্ষীদলের মনে হয়েছে পত্রটি প্রকাশচন্দ্রের উদ্দেশে, এবং অত্যন্ত গোপন বিষয়ে লিখিত। সেই সংবাদ পেয়েই প্রকাশচন্দ্র দ্রুত হরিকেল রওনা হওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছেন।
‘সপ্তরাজন্য’র অপর তিনজনের ব্যাপারে কুমার পদ্মসম্ভব যে প্রশ্ন তুলেছেন তা অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত এবং প্রাসঙ্গিক। অত্যন্ত গোপন সূত্রে আমি সংবাদ পেয়েছি যে অগ্নি মত্র, অমিতাভভট্ট, এবং জিতসেন, তিনজনই এইমুহূর্তে মৃত। কোথায়, কেন, কীভাবে তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা আমি দেব না, দেওয়া সম্ভব নয়। আপাতত আমার কথা সত্য বলে মেনে নিতে সমবেত ভদ্রমণ্ডলীকে অনুরোধ করছি।’
আচার্য বিশুদ্ধকীর্তির বক্তব্য শেষ হলে সভাস্থলে আবার নিস্তব্ধতা নেমে এল। মনে হল প্রত্যেকে শেষ সংবাদটির অভিঘাত সম্যকরূপে গ্রহণের চেষ্টা করছেন।
জয়াপীড় স্বভাবে কিঞ্চিৎ চঞ্চল। সবার প্রথমে তিনিই প্রশ্ন করলেন, ‘কী বলছেন কী আচার্য? এই তিনজন মৃত? আপনি সত্য বলছেন?’
বিশুদ্ধকীর্তি কঠিন দৃষ্টিতে জয়াপীড়ের দিকে তাকালেন, ‘আমার আহরিত সংবাদের যাথার্থ্যতা নিয়ে কি আপনার মনে কোনও শঙ্কা আছে কুমার?’
জয়াপীড় অপ্রতিভ হলেন, ‘না, তা নয়। সংবাদটি এতই আকস্মিক যে সামান্য বিহ্বল হয়ে পড়েছিলাম। প্রগলভতা মার্জনা করবেন।’
বপ্যট বললেন, ‘কিন্তু আচার্য, সেক্ষেত্রে তো বিষয়টি আরও গুরুতর হয়ে দাঁড়ায়। যে সংবাদ আপনি জানেন, আশা করি তা প্রকাশচন্দ্রেরও অগোচরে নেই। সপ্তরাজন্য’র মধ্যে পাঁচজন মৃত, রাজধানী প্রকৃতপক্ষে অরক্ষিত, তা সত্বেও তাঁকে আজই কর্মান্তবাসক ত্যাগ করতে হল?’
বপ্যটের প্রশ্নের মধ্যে সন্দেহের সুরটি বিশুদ্ধকীর্তির কানে বাজল। তাঁর হৃৎস্পন্দন দ্বিগুণ বর্ধিত হয়েছে। অকম্পিত কণ্ঠে বললেন, ‘আমি যা সত্য বলে জানি তাই আপনাদের জানালাম, আর্য বপ্যট। আমার মতে কালই চূড়ান্ত আঘাত হানবার প্রকৃষ্ট সময়। এখন যোগীশ্বর মৎস্যেন্দ্রনাথ যা আদেশ করেন।’
সভার এক প্রান্ত থেকে দেদ্দদেবীর তরুণীকণ্ঠ ভেসে এল, ‘আচার্য, আপনার প্রিয়তম শিষ্য বুদ্ধগুপ্ত কোথায়?’
সামান্য অস্বস্তির সঙ্গে উত্তর দিলেন আচার্য, ‘এই প্রশ্নের উত্তর দিতে কিঞ্চিৎ সঙ্কোচ বোধ করছি আর্যা দেদ্দদেবী। কারণটি হৃদয়বিদারক।’
মন্দর্ভা কৌতূহলী হলেন, ‘কী কারণ আচার্য?’
‘বুদ্ধগুপ্ত পথভ্রষ্ট হয়েছে। তাকে আমি বিশেষ স্নেহ করতাম। আমার অবর্তমানে সেই হতো শালিবন বিহারের আচার্য। কিন্তু, সে কামনার আগুনে নিজের ইহকাল পরকাল নষ্ট করেছে৷’ এত অবধি বলে সামান্য থামলেন বিশুদ্ধকীর্তি। তারপর গভীর আক্ষেপের সঙ্গে বললেন, ‘শুনেছি ভাঁড়ুদত্তর শৌণ্ডিকালয়ের মায়া নামের জনৈক বারাঙ্গনার সঙ্গে সে পলাতক। সংবাদ পেয়েছি তারা বারেন্দ্রীর দিকে গেছে।’
জয়াপীড় হতাশার সুরে বললেন, ‘যাহ, মায়া চলে গেল।’ কথাটি বলেই জয়াপীড়ের চোখ পড়ল মন্দর্ভার দিকে। তিনি কঠিন চোখে তাঁর দিকেই চেয়ে আছেন। ঢোঁক গিলে চুপ করে গেলেন জয়াপীড়।
কুমার পদ্মসম্ভব এবং দেদ্দদেবী মুখে স্মিত হাসি দেখা গেল। পদ্মসম্ভব ছদ্ম সহানুভূতির সুরে বললেন, ‘দুঃখ কোর না ভাই। বঙ্গদেশে এমন সুস্তনী কিঙ্কিণীর অভাব নেই। আমি নিজেই কয়েকজনকে চিনি। তাদের সঙ্গে নাহয় পরে তোমার পরিচয় করিয়ে দেব।’ বলেই তিনি হাসিমুখে দেবী মন্দর্ভার দিকে তাকালেন। মন্দর্ভার দৃষ্টি স্থির, কঠিন এবং অগ্নিবর্ষী।
দেদ্দদেবী একবার কুমার পদ্মসম্ভব আর একবার ভিক্ষুণী মন্দর্ভার দিকে তাকালেন। তারপর বস্ত্রাঞ্চল মুখে দিয়ে হাসি চাপলেন।
মৎস্যেন্দ্রনাথ বিরক্তস্বরে বললেন, ‘এই কি পরিহাসের সময়? এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে চলেছি, আর আপনাদের এই প্রগলভ আচরণ?’
সভাস্থলে গাম্ভীর্য ফিরে এল। বপ্যট বললেন, ‘লোকেশ্বর, তাহলে শেষাবধি কী সিদ্ধান্ত নিতে চলেছি আমরা? আপনার কী অভিমত এই পরিকল্পনার ব্যাপারে?’
উঠে দাঁড়ালেন মহাযোগী মৎস্যেন্দ্রনাথ। ধীরে ধীরে গিয়ে দাঁড়ালেন বাতায়নের সামনে। তাঁর দিকে উৎকণ্ঠিত মুখে তাকিয়ে রইলেন কয়েকজন নারী এবং পুরুষ, যাঁরা নিজেদের জীবন পণ করে নেমেছেন এই মহাসংগ্রামে। মুঠোয় ধরেছেন সাক্ষাৎ মৃত্যুর উদ্যত ফণা। দেশের প্রতি, দেশের মানুষের প্রতি সীমাহীন ভালোবাসায় উৎসর্গ করেছেন নিজেদের অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ--সব কিছু।
স্বচ্ছ আকাশের দিকে নির্নিমেষে তাকিয়েছিলেন মৎস্যেন্দ্রনাথ। রাত্রি শেষপ্রায়। চতুর্দশীর চন্দ্রজোছনা এখন ম্লান। লালিম্ববন পাহাড়ের ঘনকৃষ্ণ অরণ্য সেই দুগ্ধধবল আলোয় ভারি আশ্চর্য, ভারি মায়াবী দেখাচ্ছে।
সেইদিকে তাকিয়ে ভাবছিলেন মৎস্যেন্দ্রনাথ। এতদিন ধরে বহু প্রযত্নে যে আন্দোলন গড়ে তুলেছেন তিনি, প্রস্তুত করেছেন এক মহাবিদ্রোহের পটভূমি, কালই হয়তো তার অন্তিমক্ষণ উপস্থিত। এই দুখিনী, বঙ্গদেশের শতাব্দীব্যাপী দুঃশাসনকাল হয়তো কালই শেষ হবে।
কিন্তু যদি না হয়? যদি তাঁদের প্রস্তুতিতে কোথাও কোনও ত্রুটি থেকে থাকে? যদি তাঁদের পরিকল্পনায় এমন কোনও বিচ্যুতি থেকে যায়, যা তাঁরা লক্ষ করেননি?
পিছনে দাঁড়ান শ্রান্ত, উদ্বিগ্ন এবং উৎকণ্ঠিত মুখগুলি মনশ্চক্ষে ভেসে উঠল মৎস্যেন্দ্রনাথের। এদের অধিকাংশই তাঁর সন্তানসম, কেউ বা তাঁর বয়স্য সহযোগী। তাঁর একটি সিদ্ধান্ত, তাঁর একটি হ্যাঁ বা না এদের এতদিনের স্বপ্ন ধূলিসাৎ করে দিতে পারে। নিমেষে নস্যাৎ করতে পারে এদের এতদিনের উদ্যোগ।
তাঁর সিদ্ধান্ত। একমাত্র তাঁরই সিদ্ধান্ত।
দুই কর যুক্ত করলেন মৎস্যেন্দ্রনাথ। পদ্মপলাশতুল্য চোখ দুটি নিমীলিত হল। ভগবান তথাগত বলে গেছিলেন আত্মদীপ ভব, আত্মশরণ ভব, অনন্যশরণ ভব। নিজেই নিজের প্রদীপ হয়ে জ্বলে ওঠো, নিজেই নিজের আত্মশক্তির শরণ নাও। মানুষ নিজেই এক অনন্তশক্তির উৎস। সে চাইলে নিমেষে স্বর্গ-মর্ত্য-পাতাল এই ত্রিভুবনের অধীশ্বর হতে পারে। মানুষই পারে মানুষের দুঃখকষ্ট মোচন করতে। মানুষই পারে দুর্দম শত্রুর কবল থেকে জীবন পণ রেখে জননীকে, জন্মভূমিকে উদ্ধার করতে। কোনও ঐশী বা দৈবশক্তি নয়, মানুষই মানুষের একমাত্র আশ্রয়, শেষ অবলম্বন।
ব্রাহ্মমুহূর্ত আগতপ্রায়। পুবদিগন্তে আবছায়া আলোর খেলা। জবাকুসুমসঙ্কাশ সূর্যদেব উদিত হতে চলেছে। সেদিকে তাকিয়ে যুক্তকর মাথায় ঠেকালেন তিনি। হে আদিনাথ, হে পূর্ণেশ্বর, হে আমার বৈরাগ্যসুন্দর, তোমার সন্তানদের তুমি আশীর্বাদ করো। তাদের স্বপ্নগুলি যেন সার্থক হয়। এই জগতের সমস্ত অন্ধকার, সমস্ত পাপ, সমস্ত অশিব পেরিয়ে তারা যেন জয়যুক্ত হয়, সদ্ধর্মপথযাত্রী হয়। হে নাথ, অপাবৃত হোক তোমার কল্পতরু মূর্তি। তোমার ইচ্ছাই পূর্ণ হোক প্রভু।
ঘুরে দাঁড়ালেন মহাযোগীশ্বর মৎস্যেন্দ্রনাথ। যে বরাভয়মূর্তি দেখে আসমুদ্রহিমাচল তাঁর শরণাগত হয়েছে, সেই মূর্তি ধারণ করলেন তিনি। বামহাতখানি পদ্মমুদ্রায় বক্ষলগ্ন। দক্ষিণহস্তে মৃগমুদ্রা। তার তর্জনী এবং কনিষ্ঠা প্রসারিত, অন্যান্য অঙ্গুলিগুলি বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠে বদ্ধ। চোখ দু’খানি অবলোকিত।
উপস্থিত সভ্যরা শিহরিত হলেন। মুহূর্তের মধ্যে তাঁরা প্রণত হলেন মহাযোগী লোকেশ্বর মৎস্যেন্দ্রনাথের পদপ্রান্তে। মৎস্যেন্দ্রনাথ বললেন, ‘তোমাদের জয় হোক।’
সভ্যরা হর্ষোল্লাস করে উঠলেন। কালই সেই দিন। শতাব্দীব্যাপী মাৎস্যন্যায় থেকে বঙ্গদেশের মুক্তির দিন।
বজ্রযোগিনী মন্দিরের সামনে ঘোষক উপস্থিত হতেই তার চারিপাশে ভিড় করে এল অপেক্ষমান জনতা। যদিও তারা জানে, কী ঘোষণা করা হতে চলেছে। তারা জানে যে এই ঘোষণার ফলাফল কী, জানে এর অবশ্যম্ভাবী পরিণতি। তা সত্বেও এই পাক্ষিক ঘোষণা শোনার জন্য উৎসুক দর্শকের অভাব হয় না।
এককালে এই পাক্ষিক ঘোষণার পর পরেই কোনও এক বলিষ্ঠ যুবক এগিয়ে যেত ঘোষকের দিকে, ব্যক্ত করত তার মনোবাঞ্ছা। তার দু’চোখে থাকত স্বপ্ন, হৃদয়ে দুঃসহ স্পর্ধা, আকাঙ্ক্ষায় দুর্বার উচ্চাশা। সে নিশ্চিত থাকত যে মাত্র একরাত মহারানিকে তৃপ্ত করতে পারলেই এই বঙ্গদেশের অধীশ্বর হবে সে।
তখন উপস্থিত জনগণ উত্তেজনায় উদ্বেলিত হতো, উৎসাহিত হতো। ভাবত, সত্যই বুঝি এই দেশে এমন কেউ আছে, যে নিজ পৌরুষবলে উদ্ধার করবে এই দীর্ণ বঙ্গভূমি। এমন কেউ আছে, যার বাহুবলে ভর করে উঠে দাঁড়াবে এই ছিন্নক্ষিপ্ত দেশ৷ তার দৃপ্ত শাসনের অধীন হবে সমতট থেকে পৌণ্ড্র, হরিকেল থেকে তাম্রলিপ্ত।
কিন্তু দিনে দিনে সেই আশা ক্ষীণ হতে হতে কবেই মিলিয়ে গেছে। এখন প্রতি পক্ষকালে ঘোষক আদেশানুসারে বজ্রযোগিনী মন্দিরের সামনে এসে দাঁড়ায় বটে, উপস্থিত জনতাও অভ্যাসানুসারে তার সামনে এসে দাঁড়ায়; কিন্তু এখন তাদের উপস্থিতির সঙ্গে এক অর্থহীন তিক্ত নৈর্ব্যক্তিকতা মিশে গেছে।
বহুকাল হল ঘোষকের ঘোষণা শুনে আর কোনও স্পর্ধিত যুবক আসে না। সবাই জেনে গেছে এই অর্থহীন প্রচেষ্টার ফলাফল কী। এখন তাই জনসাধারণ আসে শুধুমাত্র রঙ্গ দেখতে। তারাও জানে, ঘোষকও জানে—এই ঘোষণার কোনও মূল্য নেই। কেউ স্বেচ্ছায় এগিয়ে আসবে না ওই নাগিনীর ভোগ হওয়ার জন্য।
হ্যাঁ, ভোগ। এই অনুষ্ঠান এখন কেবলমাত্র বঙ্গদেশের মহারানির কামভোগের আয়োজন ছাড়া আর কিছু নয়।
এখন রাজসেবকের দল প্রতি গ্রামে, প্রতি পল্লীতে হিংস্র শ্বাপদের মতো শিকার করে বেড়ায় সমর্থ কিশোর বা যুবকের। তারা জানে যে, প্রতি পূর্ণিমা অথবা অমাবস্যায় বঙ্গদেশের মহারানির একটি পূর্ণবয়স্ক পুরুষ-শরীরের প্রয়োজন হয়। তারা জানে যে, রানির পূর্ণ কামতৃপ্তির পর রাজ্যশাসনের অধিকারের আশ্বাস কেবল একটি ফাঁদ মাত্র, মোহজাল। যেভাবে নারী ঊর্ণনাভ কামতৃপ্তির পর, উদ্দেশ্যসাধনের পর, তার পুরুষসঙ্গীটিকে উদরসাৎ করে, সেভাবেই এই কালনাগিনী তার এক রাতের পুরুষসঙ্গীটির জীবনদীপ নির্বাপিত করেন।
ঘোষক তার অভ্যাসানুসারে উচ্চনাদে ঢোলক বাজাতে লাগল। তার পাশে বেশ কয়েকজন রাজসেবক। তাদের শীতল ও সতর্ক চোখগুলি যেন কাউকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। জনতা অপেক্ষা করতে লাগল বহুশ্রুত বাক্যগুলির জন্য।
বেজে উঠল দ্রিমি দ্রিমি রব!
‘শোনো শোনো শোনো বঙ্গবাসী। শ্রীমন্মাহারাজসচিব প্রকাশচন্দ্রের আদেশানুক্রমে ঘোষণা করা হচ্ছে যে, বঙ্গদেশের রাজসিংহাসন একজন সম্রাটের জন্য উৎসাহোন্মুখ। বঙ্গদেশের মহামান্যা মহারানি কামমতি হয়েছেন। যে সক্ষম যুবা একরাত্রের জন্য মহারানিকে পূর্নতৃপ্তির সন্ধান দিতে পারবে, সেই হবে বঙ্গদেশের পরবর্তী সম্রাট। স্বয়ং বঙ্গসম্রাজ্ঞী তাঁর অগ্রমহিষী হবেন, রাজসচিব হবেন তাঁর বিশেষ কিঙ্কর। এই আসমুদ্রহিমাচলব্যাপী বঙ্গদেশ তাঁর শাসনাধীন হবে। বঙ্গদেশের অনন্তসামন্তচক্র হবেন তাঁর আজ্ঞাবহ বশংবদ দাস। শোনো শোনো শোনো, তোমাদের মধ্যে যাঁরা এই সৌভাগ্যের অংশীদার হতে চাও, তাঁরা এই মুহূর্তেই আমাদের সামনে এসো। এই সুযোগ নষ্ট কোরো না, এই আহ্বানের পূর্ণ উপযোগ...’
একটি বলিষ্ঠদেহী তরুণ ভিড় ঠেলে সামনে এসে বলল, ‘ঘোষক, আমি এসেছি। আমি এই সুযোগের সুবিধা নিতে উৎসুক। আমাকে রাজপ্রাসাদে নিয়ে চলো।’
ঘোষক এতই অবাক হয়ে গেল যে তার বাক্যস্ফূর্তি হল না। তার স্মরণে নেই শেষ কবে কোন আত্মঘাতী মূর্খ এই প্রস্তাবে আগ্রহ দেখিয়ে এগিয়ে এসেছে। সবাই জানে এই আহ্বানে সাড়া দেওয়া মানে সাক্ষাৎ মৃত্যুর পথে চলে আসা। সে যুবকের দিকে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে চেয়ে রইল।
যুবকের বামপার্শ্বে এক খর্বকায় তরুণী। তার খরতীব্র চোখ দর্শকের অস্বস্তি জাগায়। তরুণীর ঠিক পিছনে এক পিঙ্গলকেশ তপ্তকাঞ্চনবর্ণ সুদেহী সুপুরুষ যুবা। তার সামান্য পেছনে এক যুবতী। যুবতীর চেষ্টাকৃত ছদ্মবেশ তাঁর অনুপম স্নিগ্ধলাবণ্যকে লুকিয়ে রাখতে পারেনি। তাঁর শান্ত চোখদুটি দেখে বর্ষাশেষের দিঘির কথা মনে পড়ে। যুবতীটির ঠিক ডানপাশে এক দৃপ্তদর্শন তাম্রাভবর্ণ পুরুষ। তাঁর সবল সুঠাম দেহে, পদ্মপলাশতুল্য আঁখিতে, গর্বোদ্ধত গ্রীবায়, এবং সতর্কচঞ্চল দৃষ্টিতে বোঝা যায় যে, ইনি সামান্য কেউ নন।
ঘোষকের সামান্য পিছনে দুজন মানুষ দাঁড়িয়েছিল। তাদের আপাত উদাস মুখে এখন খরতীক্ষ্ণদৃষ্টি। প্রথমজন প্রশ্ন করল, ‘ইনিই গোপালদেব?’
মাধব উত্তর করল, ‘হ্যাঁ রঙ্গলাল, ইনিই গোপালদেব।’
‘কী করে বুঝলে?’
‘মূর্খের মতো প্রশ্ন করো না। এই মহাবল পুরুষটিকে আমি স্বচক্ষে দেখেছি। কমলাঙ্ক গ্রাম সন্নিহিত অরণ্যে ইনি একাই আমাদের সংহার করেছিলেন। কোনওমতে প্রাণ হাতে পালিয়ে এসেছিলাম। আমি ওঁকে চিনব না?’
‘কিন্তু উনি তো একা নন মনে হচ্ছে৷ ওই যে সুদেহী তাম্রবর্ণ পুরুষটিকে দেখছ, ওঁকে আমি নিজের চোখে দেখেছি। উনিই কুমার পদ্মসম্ভব।
‘কিন্তু ওঁর আশেপাশে বাকি যাঁরা আছেন তাঁদের চেন?’
‘পদ্মসম্ভবের পাশে যিনি আছেন, খুব সম্ভবত ভিক্ষুণী মন্দর্ভা। আর ওই পিঙ্গলকেশী গৌরবর্ণ পুরুষটি কুমার জয়াপীড় ব্যতীত আর কেউ হতে পারেন না। কুমার গোপালদেবের পাশে যে তরুনীটি আছে তাঁকে চিনি না। গুপ্তচরেরা সংবাদ এনেছে, হরিকেলের মহামাত্য জয়নাথের সেই অপহৃতা ভাগিনেয়ী নাকি অলৌকিক মন্ত্রবলে জীবিত হয়ে ফিরে এসেছে, যোগ দিয়েছে এই বিদ্রোহীদের সঙ্গে৷ এই তরুণী জয়নাথের ভাগিনেয়ী হলে আশ্চর্য হব না।’
রঙ্গলাল নিমেষে উত্তেজিত হল, ‘তাহলে তো কুচক্রীরা প্রায় সবাই একই সঙ্গে এখানে উপস্থিত৷ রাজসেবকদের ইঙ্গিত করা হোক। এই মুহূর্তে এদের বন্দি করি।’
মাধব দাঁতে দাঁত চেপে বলল, ‘ধৈর্য ধরো মিত্র। এই আত্মঘাতী হঠকারিতার কোনও প্রয়োজন নেই। প্রথমত এরা নিরস্ত্র আসেনি এখানে। এদের প্রশিক্ষিত গুপ্তবাহিনীও আশেপাশেই আছে। তারা মুহূর্তে প্রত্যাঘাত করবে। তাতে গোপালদেবকে এদের থেকে বিচ্ছিন্ন করার মূল উদ্দেশ্যটাই ব্যর্থ হয়ে যাবে।
‘দ্বিতীয়ত, আচার্য শান্তরক্ষিত এবং মহাবল বপ্যট সহ রাজদ্রোহের কাণ্ডারীদের অন্য অনেকেই এখানে অনুপস্থিত। তাদের জন্য প্রকাশচন্দ্র অন্য পরিকল্পনা করেছেন।
‘তৃতীয়ত, প্রকাশচন্দ্রের আদেশ, পুরো ক্রিয়াকাণ্ডটিই যেন নিশ্চুপে সাধিত হয়। তিনি চান না এই নিয়ে কোনও উচ্চকিত গোলযোগ হোক।’
রঙ্গলাল চুপ করে গেল।
গোপালদেবকে সামান্য কৃশ এবং দুর্বল দেখাচ্ছিল। তিনি এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতেই তাঁর পাশে দাঁড়ানো তরুণীটি সবার অলক্ষ্যে তাঁর হাত চেপে ধরল, ‘কুমার...’
গোপালদেব কিছু বললেন না, দেদ্দদেবীর হাতখানি দুর্বলহাতে চেপে ধরলেন।
‘সাবধানে..’
‘জানি আর্যা...’
‘আর্য কমলশীলের আনা যন্ত্রটি...’
‘সঙ্গে আছে আর্যা। ও নিয়ে চিন্তিত হবেন না।’
দেদ্দদেবীর হাত ছাড়িয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলেন গোপালদেব। তর্জনী থেকে তর্জনীর ছোঁয়াটুকু মিলিয়ে যাওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে দেদ্দদেবী পুনরায় চেপে ধরলেন গোপালদেবের অঙ্গুলি। গোপালদেব থমকে গেলেন।
‘কুমার!’
‘বলুন দেবী!’
ওই কামুক ডাকিনীর সঙ্গে যেন...’
ত্বরিতে দেদ্দদেবীর দিকে ফিরে তাকালেন গোপালদেব। সেই দৃষ্টিতে কতখানি কৌতুক, কতখানি স্নেহ, আর কতখানি ভালোবাসা মিশে ছিল বলা অসম্ভব। দু’খানি পদ্মনয়ন চেয়ে রইল গোপালদেবের সতৃষ্ণ আঁখির দিকে।
ফিসফিস করে গোপালদেব বললেন, ‘আমার দেহ, মন, আত্মা আপনারই দেবী, শুধু আপনারই। ওই বিদেশি নাগিনীর কী সাধ্য, আপনার নৈবেদ্য অপবিত্র করে?’
তর্জনি হতে তর্জনি বিযুক্ত হল। গোপালদেব ধীরপদে এগিয়ে গেলেন ঘোষকের দিকে।
নিজের শয্যায় স্থির এবং নিশ্চুপ হয়ে বসে ছিলেন প্রকাশচন্দ্র। তাকিয়ে ছিলেন নিজের প্রসারিত করতলের দিকে।
ঘরটি আশ্চর্যজনকভাবে অতি সাধারণ; প্রসাধন এবং আভরণহীন। বঙ্গদেশের সর্বময় কর্তা যে এরকম নিরলঙ্কার, নিরাভরণ ঘরে থাকতে পারেন সে না দেখলে বিশ্বাস হয় না।
প্রকাশচন্দ্র অনাড়ম্বর জীবনে বিশ্বাস করেন। তাঁর কাছে জাগতিক জীবনের যাবতীয় উল্লাস, আড়ম্বর, বিলাস, ব্যসন সবই অর্থহীন। তাঁর জীবনের একটিই উদ্দেশ্য, একটিই লক্ষ্য, বঙ্গভূমির সামূহিক সর্বনাশ। তিনি চান না কোনও পার্থিব সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের আহ্বান তাঁকে তাঁর লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করুক। তিনি জানেন—তাঁর পুরষ্কার ইহজীবনে নয়, লব্ধ হবে জন্মমৃত্যুর আবর্তনচক্রের চংক্রমণে।
নিজের দুই করতলের দিকে তাকিয়ে ছিলেন প্রকাশচন্দ্র। তাঁর করতল প্রশস্ত ও সুন্দর। শুক্র এবং বৃহস্পতির স্থান সুউচ্চ। রবি অতি বলশালী, চন্দ্রমা ম্রিয়মান। শনি স্তিমিত এবং বক্রী। মঙ্গলের স্থান উচ্চ এবং দৃশ্যত রক্তিম।
কিন্তু করতল নয়, প্রকাশচন্দ্র তাকিয়েছিলেন তাঁর আঙুলগুলির দিকে। দুই হাতে দশটি আঙুল। বৃদ্ধাঙ্গুলি বাদ দিলে আটটি।
সপ্তরাজন্য আর মহারাজ্ঞী। আটজন। আটটি আঙুল।
নিজের হাতের দিকে নির্নিমেষ তাকিয়ে ছিলেন প্রকাশচন্দ্র। দুই হাতের তর্জনীদুটি বাদে বাকি ছয়টি আঙুল ঘনকৃষ্ণবর্ণ ধারণ করেছে।
প্রকাশচন্দ্র জানেন—এর অর্থ কী। ওই ছয় জন মৃত। এই মুহূর্তে একমাত্র তিনি আর রানি, এই ছাড়া তাঁর ঘনিষ্ঠবৃত্তের আর কেউ বেঁচে নেই। একমাত্র বিশুদ্ধকীর্তি ছাড়া। বিশুদ্ধকীর্তি!
একটি তিক্ত হাসির রেখা খেলে গেল প্রকাশচন্দ্রের মুখে। শত্রুর শেষ রাখেন না তিনি। তাঁর কাছে বিশুদ্ধকীর্তি ইতিমধ্যেই মৃত। আজকের রাতটিই আচার্যর জীবনের শেষ রাত।
রাজমাতা ইয়ু জেতিয়ান যে ক’টি অতি গুহ্য নাগসিদ্ধির অধিকার দিয়েছিলেন প্রকাশচন্দ্রকে, এইটি তার অন্যতম। ঘনিষ্ঠবৃত্তের প্রাণচিহ্ন ধারণের অধিকার। সপ্তরাজন্য আর রানি নিজে, যে আটজন মিলে এই প্রকাণ্ড মাৎস্যন্যায়ের আয়োজন করেছেন, তাঁদের প্রত্যেকের প্রাণচিহ্ন নিজ অঙ্গুলিদর্পণে ধারণ করেন তিনি।
নিজের হাতের প্রায় শুকিয়ে আসা ছ’খানি কালো আঙুলের দিকে নিরাসক্ত ভাবে চেয়ে ছিলেন প্রকাশচন্দ্র। এই মুহূর্তে শুধু তিনি আর রানি, এই দুজনেই বেঁচে আছেন নাগমাতা ইয়ু জেতিয়ান আর তাং রাজবংশের শতাব্দীপ্রাচীন স্বপ্ন সফল করার জন্য৷ তাঁদের পাশে আর কেউ নেই।
এই যুদ্ধ তাঁদের জিততেই হবে। যেনতেন প্রকারেণ।
দ্বারে সামান্য শব্দ হল। কেউ তাঁর মনোযোগ আকর্ষণ করার চেষ্টা করছে। প্রকাশচন্দ্র জানেন কে সে।
‘বলো মাধব।’
দ্বারপ্রান্ত থেকে উত্তেজিত স্বর ভেসে এল, ‘গোপালদেব রাজ্ঞীর প্রাসাদে প্রবেশ করেছেন প্রভু। চূড়ান্ত আক্রমণের আদেশ দেওয়া হোক?’
হাসিমুখে উঠে দাঁড়ালেন প্রকাশচন্দ্র। এই আক্রমণ, এই যুদ্ধ তিনিই পরিচালনা করবেন। প্রথম এবং হয়তো শেষবারের মতো।
দ্বিপ্রাহরিক আহারের ব্যবস্থা অতি সাধারণ। উপস্থিত কারোরই ইচ্ছে ছিল না আহার করার। কিন্তু মৎস্যেন্দ্রনাথ জানেন খালি পেটে যুদ্ধ হয় না।
সমস্ত ব্যবস্থা দেখাশোনা করছিলেন মন্দর্ভা এবং দেদ্দদেবী৷ দেদ্দদেবীর মুখখানি ছলছল৷ সবার মুখ গম্ভীর, ভেতরে চাপা উত্তেজনা।
বপ্যট বললেন, ‘দুপুরের পর থেকেই তাহলে আক্রমণ শুরু হোক?’
মৎস্যেন্দ্রনাথ মাথা নেড়ে সায় দিয়ে সামনে রাখা অন্নপাত্রটি টেনে নিলেন। প্রথম গ্রাস মুখে তুলতে যাবেন, এমন সময় দরজার কাছে ত্রস্ত পদশব্দ। কারা যেন দৌড়ে আসছে। উপস্থিত সদস্যরা সতর্ক হলেন। জয়াপীড় এবং পদ্মসম্ভব উঠে দাঁড়ালেন। কারা আসছে?
তাঁদের বেশীক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। শালিবন বিহারের দুজন শিক্ষার্থী হাঁপাতে হাঁপাতে এসে বলল, ‘সর্বনাশ হয়ে গেছে লোকেশ্বর, সর্বনাশ হয়ে গেছে।’
প্রত্যেকে নিমেষের মধ্যে উঠে দাঁড়ালেন। শান্তরক্ষিত ব্যগ্রস্বরে প্রশ্ন করলেন, ‘কী হয়েছে?’
‘সর্বনাশ হয়েছে আচার্য, আমরা অত্যন্ত কুৎসিতভাবে প্রতারিত হয়েছি। ওরা জেনে গেছে—আপনারা এখানেই আছেন, এই শালিবন বিহারেই। ওরা এদিকেই আসছে।’
‘ওরা বলতে কারা?’ এগিয়ে এলেন বপ্যট।
‘রাজসেবকদল, আর...আর...’
‘আর?’
‘তাদের নেতৃত্বে আর কেউ না, স্বয়ং প্রকাশচন্দ্র।’
উপস্থিত প্রত্যেকে বিপুলভাবে চমকিত হলেন। পদ্মসম্ভব দ্রুতবেগে এগিয়ে এলেন, তীব্রস্বরে প্রশ্ন করলেন, ‘আচার্য বিশুদ্ধকীর্তি কোথায়?’
শিক্ষার্থী দুজনের একটু পেছন থেকে কে যেন বিষণ্ণ গম্ভীর স্বরে বলে উঠল, ‘আচার্য বিশুদ্ধকীর্তি নেই রাজকুমার৷ তিনি পালিয়েছেন। সঙ্গে পালিয়েছে তাঁর পোষ্য রক্ষিতাটিও। এবং শুধু তাই নয়, সেই সঙ্গে নিয়ে গেছেন শালিবন বিহারে রক্ষিত ধনসম্পত্তির একটি অতি বিপুল অংশও।’
সবাই তাকিয়ে দেখলেন এসে দাঁড়িয়েছেন শালিবন বিহারের উজ্জ্বলতম শিক্ষার্থী সিদ্ধার্থশর্মা। বিশুদ্ধকীর্তি বা বুদ্ধগুপ্ত’র অবর্তমানে বিহারের যাবতীয় দায়িত্বকর্ম ইনিই নির্বাহ করেন।
পদ্মসম্ভব অক্ষম আক্রোশে সজোরে পদাঘাত করলেন সামনে রাখা ত্রিপদীটির ওপর। সেটি মুহূর্তের মধ্যে ত্রিধাবিভক্ত হয়ে আছড়ে পড়ল সামনের দেওয়ালে। মন্দর্ভা দ্রুত এগিয়ে এসে পদ্মসম্ভবের হাত ধরলেন।
শান্তরক্ষিতের মুখ পাণ্ডুরবর্ণ ধারণ করল। তিনি ভয়ার্তস্বরে প্রশ্ন করলেন, ‘এবার কী হবে?’
মৎস্যেন্দ্রনাথ চুপ করে ছিলেন। তিনি উত্তরীয়টি কোমরে বাঁধলেন। তারপর শান্ত এবং দৃঢ়স্বরে বললেন, ‘এবার সংগ্রাম হবে ভন্তে, প্রত্যক্ষ সংগ্রাম। আজ মুক্তির মন্দিরের সোপানতল আমাদের রক্তে রঞ্জিত হবে। বহু প্রতীক্ষিত সেই সময় আজ এসেছে ভন্তে, প্রস্তুত হন। আর্য বপ্যট, আপনার সেনাদল প্রস্তুত তো?’
‘তারা প্রস্তুত প্রভু। কিন্তু তাদের কাছে সংবাদ পৌঁছতে কিছু সময় লাগবে। ততক্ষণ রাজসেবক-বাহিনীর আক্রমণ প্রতিরোধ করে রাখতে হবে আমাদেরই।’
‘কুমার পদ্মসম্ভব? কুমার জয়াপীড়?’
সিংহবিদারী মহাবীর জয়াপীড়ের মুখমণ্ডল আনন্দে ঝলমল করছিল। তিনি প্রকাশচন্দ্রের মহাখড়্গ কোষ হতে নিষ্কাষিত করে বললেন, ‘আদেশ দিন লোকেশ্বর, শত্রুশোনিতে এই মহাখড়্গ স্নান করাই। পিতামহের পাপস্খালন করি। হর হর মহাদেব।’
পদ্মসম্ভব ইতিমধ্যেই অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে নিয়েছিলেন। তাঁর কোমরে কুঠার এবং দা’ও। পিঠে তূনীর, হাতে নাগাঞ্চিভূমির খর্ব এবং অতি শক্তিশালী ধনু। তিনি শান্তস্বরে বললেন, ‘আহা, কতদিন পর প্রত্যক্ষ সংগ্রামে যাব, শত্রুরক্তে স্নান করব, হত্যামদে মাতাল হব। আদেশ করুন লোকেশ্বর, যেন শত্রুঘ্ন হই।’
বপ্যট ধীরেসুস্থে তাঁর বহুযুদ্ধের সঙ্গী বিশালাকার খড়্গটি নিষ্কাশিত করলেন। তারপর ধীরস্বরে বললেন, ‘দেবী চুন্দার সেবা করেছিলাম বহুদিন। দেবী প্রসন্ন হয়ে আমাকে দুটি অস্ত্র দান করেন। এক, গোপালদেব, আর দুই, এই খড়্গ। এই অস্ত্র মন্ত্রঃপূত, আজ অবধি শোনিতপান না করে কোষবদ্ধ হয়নি৷ আসুন লোকেশ্বর, এই প্রৌঢ়ের যুদ্ধকৌশল না হয় স্বচক্ষেই দেখে যান।’
মৎস্যেন্দ্রনাথ উজ্জ্বল চোখে সবার দিকে তাকালেন। দেদ্দদেবী ইতিমধ্যেই অস্ত্রসাজে সজ্জিত হয়েছেন। তাঁকে দেখে মনে হচ্ছে যেন স্বয়ং দেবী একজটা সমরে অবতীর্ণ হতে চলেছেন। এমনকি আচার্য শান্তরক্ষিত এবং ভিক্ষুণী মন্দর্ভাও তুলে নিয়েছেন দুটি ত্রিশূল। এই ত্রিশূল মৎস্যেন্দ্রনাথ এবং তাঁর অনুগত শৈবযোগীদের যুদ্ধাস্ত্র।
নিজ নিজ অস্ত্র হাতে উঠে দাঁড়ালেন প্রত্যেকে। হুঙ্কার দিলেন, ‘জয় গৌড়, জয় বঙ্গ, জয় শশাঙ্ক।’
প্রশস্ত অলিন্দ ধরে এগিয়ে যাচ্ছিলেন গোপালদেব। অল্প শীত করছিল তাঁর। প্রাসাদের এই প্রান্তে তেমন রোদ আসে না। চারিদিকে অন্ধকার স্যাঁৎস্যাঁতে ভাব।
তাকাতে তাকাতে বিস্মিত হচ্ছিলেন তিনি। কত মহার্ঘ আভরণে সাজানো এই প্রাসাদ। কত অনুপম দ্রষ্টব্যবস্তু ব্যবহৃত হয়েছে এই প্রাসাদ সাজিয়ে তুলতে। চারিদিকে থরেবিথরে কত না শিল্পসৌন্দর্যের আয়োজন।
অথচ বঙ্গদেশের অর্ধেক মানুষ নিরন্ন, অনাহারক্লিষ্ট। তাদের জীবনের নিরাপত্তা নেই, অন্নের সংস্থান নেই। কিন্তু তাই বলে বঙ্গদেশের রাজপ্রাসাদের অলঙ্করণে বিন্দুমাত্র শৈথিল্য হয়নি।
হাঁটতে হাঁটতে আরও একটি বিষয় অনুভব করলেন গোপালদেব। এখন বেলা দ্বিপ্রহর। সচরাচর এইসময় রাজপ্রাসাদে মানুষজনের আনাগোনা, কর্মব্যস্ততা অত্যন্ত স্বাভাবিক। কিন্তু এই অংশটি একেবারে নির্জন। রঙ্গলাল নামের রাজকর্মচারীটি তাঁকে এখানে ঢুকিয়ে দিয়ে ইঙ্গিতে সামনের পথ দেখিয়ে সেই যে চলে গেছে, তারপর থেকে আর একটিও মানুষের দেখা পাননি তিনি।
আশ্চর্য! এত বড় রাজপ্রাসাদে আর মানুষ নেই? নাকি কেউ সামনে আসছে না? পথ নির্দেশ করে দেবে এমন কেউও তো নেই!
অবশ্য পথনির্দেশের তেমন প্রয়োজন ছিল না। অলিন্দটি এঁকেবেঁকে তাঁকে নিয়ে যাচ্ছে নির্দিষ্ট দিকেই।
একটু পরেই অলিন্দপথ শেষ হল। সামনে একটি বিশালাকৃতির দ্বার। তার দেহ বিবিধ কারুকার্য খচিত।
গোপালদেব বুঝতে পারলেন, ক্রীড়ার অন্তিমচরণে এসে উপস্থিত হয়েছেন তিনি। কোমরে হাত দিয়ে একবার অনুভব করে নিলেন, কমলশীলের সযত্নে আনা তিব্বতী যন্ত্রটি সঙ্গে আছে তো?
মনে মনে একবার গৃহদেবী চুন্দার পাদবন্দনা করে নিলেন গোপালদেব। তারপর সুদৃশ্য দ্বার হাত দিয়ে ঠেলে দিলেন।
ঘরের ভিতরটি সুঘ্রাণ ধূমে পরিপূর্ণ। কিছু দেখা যায় না। চারিদিক বড় মায়াময়। সেই মায়াবী ধূম্রজালের মধ্য হতে দুজন অতি অপূর্ব সুন্দরী কিঙ্কিণী বেরিয়ে এসে গোপালদেবের দুই হাত ধরল, ‘আসুন কুমার, আসুন। মহারানি আপনারই অপেক্ষায় আছেন।’
চণ্ডকীর্তি অতি করুণদৃষ্টিতে বনচর সঙ্গীটির দিকে তাকাল। সেই দৃষ্টিতে কাতর অনুনয়ের সঙ্গে মিশে ছিল অনেকখানি অসহায়তাও।
বনচর শবর অবশ্য বিন্দুমাত্র করুণাবিগলিত হল না। কর্কশ স্বরে বলল, ‘তাড়াতাড়ি চল। আমাদের আজ বিকেল বা সন্ধের মধ্যেই যে করে হোক সেখানে পৌঁছতে হবে। প্রকাশচন্দ্র স্বয়ং অপেক্ষা করে আছেন সেখানে। নইলে তুই তো জানিস, আমাদের অনেকেই তোর নধর দেহটার দিকে তাকিয়ে আছে।’
কথাটা শুনেই মেরুদণ্ড দিয়ে শীতল স্রোত বয়ে গেল চণ্ডকীর্তির। এই বিকট, উলঙ্গ নারীবাহিনীর পিছনে পিছনে যারা আসছে, তারা তো আরও ভয়াবহ! তাদের মধ্যে চণ্ডকীর্তিকে একবার ছেড়ে দিলে তো তার দেহের একটি অংশও খুঁজে পাওয়া যাবে না!
শিবাদল! চণ্ডকীর্তি আজ অবধি কখনও দেখেনি যে হিংস্র শিবাদলকেও পোষ মানানো যায়!
সামনে লালিম্ববনের গোপন গিরিখাত। এই পথে অতি দ্রুত শালিবন বিহারের প্রধান দ্বারে উপস্থিত হওয়া যায়। আচার্য বিশুদ্ধকীর্তি এবং মহারাজসচিব প্রকাশচন্দ্র বাদে অতি অল্প কয়েকজনই এর সন্ধান রাখেন।
করুণ চোখে সঙ্গী শবরটির দিকে একবার তাকিয়ে সেই পথে পা রাখল চণ্ডকীর্তি।
মৎস্যেন্দ্রনাথ এবং অন্যরা শালিবন বিহারের সামনের প্রান্তরে উপস্থিত হয়ে দেখলেন সামনের প্রান্তর শূন্য। শুধু লালিম্ববন পাহাড়ের দিক থেকে ধেয়ে আসছে প্রবল বাতাস।
একটু পর একটি অতি ক্ষীণ শব্দ শোনা গেল। হস্তীর বৃংহণ।
তারপর শব্দগুলি আরও স্পষ্ট হতে লাগল। সৈন্যদের ছন্দোবদ্ধ পায়ের শব্দ। রণহুঙ্কার। ঢাকের শব্দ। লালিম্ববনের পাহাড় ছুঁয়ে আসা বাতাসে এবার মিশতে থাকল ভয়। যেমন স্বচ্ছতোয়া নদীজলে মেশে রক্তের ধারা৷ ধীর, কিন্তু অবশ্যম্ভাবী।
একটু পর দিগন্তের ঠিক মধ্যস্থানে দেখা গেল একটি দীর্ঘ লাঞ্ছনের শীর্ষাংশ। চন্দ্রবংশের শাসনদণ্ডের অগ্রভাগ।
একটু পর উজ্বল নির্মল আকাশের বুকে আস্তে আস্তে ফুটে উঠল চন্দ্রশাসনদণ্ডের সম্পূর্ণ অবয়ব। একটি অর্ধচন্দ্র, এবং একটি বজ্র।
তারপর দেখা দিল একটি মস্তক। একটি অতি বৃহৎ হস্তীর মস্তক। বঙ্গদেশের হস্তীবাহিনীর প্রধানতম, বিশালতম এবং ভয়ালতম অস্ত্র বজ্রঘণ্টা’র মাথা।
তারপর ফুটে উঠল মানুষের মাথা। একটি দুটি করে তারা দিগন্তের প্রেক্ষাপটে ফুটে উঠতে লাগল ঘোর অশনির মতো। এবার যুদ্ধহুঙ্কার আর ঢাকের শব্দ আরও প্রবল হয়ে উঠল। আরও ভয়ঙ্কর। আরও ভয়াবহ।
আর সবার শেষে দেখা গেল সেই ষণ্ডবাহিত রথটি। তার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছেন প্রকাশচন্দ্র। অশনি সঙ্কেতের মতো। স্থির বজ্রপাতের মতো। মহাকালের উদ্যত মহাশূলের মতো। একা। নিঃসঙ্গ। ভয়ঙ্কর৷
বপ্যট উচ্চস্বরে আদেশ দিলেন, ‘প্রত্যেকে একত্রিত হন। অস্ত্র হাতে নিন। আমাদের দুই পাশ রক্ষা করবেন পদ্মসম্ভব এবং জয়াপীড়৷ লোকেশ্বর মৎস্যেন্দ্রনাথ মধ্যস্থলে থাকবেন৷ আর সামনে থাকব আমি। দেদ্দদেবী, আপনি আমার ডানপাশে থাকুন। মনে রাখবেন, বিচ্ছিন্ন হওয়া মানেই মৃত্যু।’
সন্ন্যাসী এবং যোগীদের দল নিজেদের অবস্থান সংহত করলেন। ত্রিশূলের গলায় বাঁধা ঘণ্টাগুলি ঝনঝন করে উঠল রৌদ্রস্নাত স্পর্ধার মতো।
বপ্যট বললেন, ‘আমাদের শবরবাহিনীর কাছে সংবাদ পাঠানো হয়েছে। তাদের এসে পৌঁছতে এক দণ্ডের কিছু অধিক সময় লাগবে৷ ততক্ষণ যে করে হোক এদের আক্রমণ প্রতিরোধ করে রাখতে হবে। সঙ্গীরা, মুক্তির জন্য, স্বাধীনতার জন্য, ন্যায়ের জন্য এবং ধর্মের জন্য ঐক্যবব্ধ হও।’
প্রবল রণহুঙ্কার এবং ঢাকবাদ্যসহ ধীরে ধীরে রাজসেবকদল তাঁদের সামনে এসে দাঁড়াল। তাদের চোখ শান্ত, শীতল ও ক্রূর। তাদের সর্বাঙ্গ বিচিত্র যুদ্ধাস্ত্রে সজ্জিত। আর প্রত্যেকের ডানবাহুতে একটি ক্ষুদ্র তাম্রফলক বাঁধা।
তাম্রফলক দেখেই চিনলেন বপ্যট। এরা কালকূট বাহিনী৷ রাজসেবকদের মধ্যেও বিশিষ্টতম ঘাতক গোষ্ঠী।
কালকূট বাহিনীর ঠিক সামনে সেই দুর্মদ রণহস্তী বজ্রঘণ্টা৷ তার বিশাল দন্তদুটি লৌহকণ্টকে আবৃত৷ চোখ রক্তবর্ণ। অল্প অল্প মাথা নাড়ছে সে। একবার মাহুতের ইশারা, ব্যস। এই অল্প কয়েকজন বিদ্রোহীদের পায়ের তলায় পিষে মারতে সে একাই যথেষ্ট।
বাহিনীর শেষে এসে দাঁড়াল প্রকাশচন্দ্রের রথ। ষণ্ডদুখানির শ্বাসের শব্দ এখান থেকেও শোনা যাচ্ছিল। প্রকাশচন্দ্র একবার দেখে নিলেন যুদ্ধপরিস্থিতি। তাঁর ওষ্ঠ প্রান্তে একটি ব্যঙ্গের হাসি খেলে গেল। কতক্ষণ পারবে এরা? এক দণ্ড? দুই দণ্ড?
বামহাতের তর্জনীটি একবার দেখে নিলেন তিনি। আঙুলটি জুড়ে নীল রঙের আভা৷ রানি এখন মহাকামমতী, মহাবিষমতী হয়েছেন। আজ তাঁর দংশন থেকে রক্ষা পাবে—এমন মরমানুষ এই পৃথিবীতে নেই।
প্রকাশচন্দ্রের ইশারায় রণহুংকার আর ঢাকের শব্দ বন্ধ হল। কালকূট বাহিনীর মধ্য থেকে সামনের দিকে এগিয়ে এল একজন ঘোষক। সে উচ্চকণ্ঠে বলল, ‘বিপথগামী বিদ্রোহীরা শোনো। বঙ্গদেশের মাননীয় মহারাজসচিব শ্রীপ্রকাশচন্দ্র বিদ্রোহীদের আহ্বান জানাচ্ছেন অস্ত্র সমর্পণ করে তাঁর শরণাগত হতে। তিনি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন যে, তিনি বিদ্রোহীদের সমস্ত অভিযোগ শুনবেন এবং তার যথাযথ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করবেন। বিদ্রোহীদের নিরাপত্তা এবং সার্বিক কল্যাণ তাঁর দায়িত্ব। তিনি পরম ক্ষমাশীল ও দয়ালু...’
পদ্মসম্ভবের ধনুকটি উঠতে, আর তার জ্যা’তে শরারোপিত হতে বোধহয় এক পলের অধিক সময় প্রয়োজন হয়নি। ঘোষক দয়ালু শব্দটি উচ্চারণ করার সঙ্গে সঙ্গে একটি ক্ষুদ্র শর অব্যর্থ নিশানায় বিদ্ধ হল তার ভ্রুমধ্যে। তারপর পর পর আরও দুইটি, তার দুই চোখে।
কয়েক মুহূর্তের নৈঃশব্দ্য। লালিম্ববন পাহাড়ের বাতাস হাহাকারের মতো বয়ে গেল দুই যুযুধান পক্ষের মধ্যে।
প্রকাশচন্দ্র ক্রুদ্ধভঙ্গিতে উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর মুখ রাগে থমথম করছে। তিনি চিৎকার করে উঠলেন, ‘বজ্রঘণ্টা...’
প্রভুর স্বর শুনে উচ্চনাদে ডেকে উঠল সেই মহাহস্তী। তারপর দুলকি চালে দৌড়তে আরম্ভ করল শত্রুদের দিকে।
ঘরে ঢুকে প্রথমে কিছুই দেখতে পেলেন না গোপালদেব। এই দ্বিপ্রহরেও ঘরখানি ঘিরে আছে ঘন অন্ধকার। মনে হয় হেমন্তের রৌদ্রের প্রবেশ যেন এই ঘরে নিষিদ্ধ। বাতায়নগুলি চীনাংশুকের আবরণে আবৃত। তাদের মৃদু আন্দোলনে যেটুকু সূর্যরশ্মি এই ঘরে প্রবেশ করার অনুমতি পেয়েছে, তাতেই এই ঘরখানি উদ্ভাসিত।
ঘন সান্দ্র সিক্ত ধ্রুম্রজালে ঘরের বাতাস ভারী। সেই ধূম আঘ্রাণমাত্রে গোপালদেবের শরীর জাগ্রত হয়ে উঠল! সারা শরীর জুড়ে বিন্দু বিন্দু কামবীজের ইশারা!
ইতিমধ্যে গোপালদেবের দৃষ্টি স্বচ্ছ হয়ে এসেছে। তিনি লক্ষ করলেন, দরজা বন্ধ করে অন্তর্হিত হয়েছে কিঙ্কিণী দুজন। তাঁর সামনে একটি বিশাল পালঙ্ক। পালঙ্কের গায়ে আঁকা চিত্রবিচিত্র অলঙ্করণ। সবই নরনারীর যৌনক্রীড়ার আখ্যান।
চোখ তুললেন গোপালদেব।
পালঙ্কের ওপর একটি নারীশরীর শায়িত। তার ওপাশে ফেরানো সর্ব অঙ্গে একটি চিত্রিত রেশমবস্ত্রের আবরণ। শয্যায় বিন্যস্ত কুঞ্চিত কেশদাম।
গোপালদেব দু’পা এগোতেই শরীরটি নড়ে উঠল। ধীরে ধীরে শয্যার উপর উঠে বসলেন সেই নারী, তারপর এদিকে ফিরলেন।
স্তম্ভিত হয়ে গেলেন গোপালদেব। নারীশরীর এত সুন্দরও হয়? কী অপরূপা এই রমণী! যেন স্বয়ং মদনদেব তিলতিল করে গড়ে তুলেছেন এঁকে। গাত্রবর্ণ ঈষৎ হরিদ্রাভ৷ সামান্য টানা চোখ দু’খানি মদালস। নাকখানি সামান্য চাপা অথচ অনিন্দ্যসুন্দর। গাল দু’খানি রক্তিম। রেশমবস্ত্রটি কোনওক্রমে উদ্ধত স্তনদুটি আবৃত করার চেষ্টা করছে।
নারীটি গোপালদেবের দিকে তাকিয়ে মদালসনেত্রে সামান্য হাসলেন। তারপর কমনীয় হাত দুটি তুলে কবরীবন্ধন করতে করতে বললেন, ‘এসেছেন প্রভু? আসুন, কত দণ্ড কত পল, কত অনুপল, আপনার অপেক্ষাতেই ছিলাম।’
বলতে বলতেই রেশমবস্ত্রটি বক্ষের আকর্ষণ ত্যাগ করে রমণীর কোলের ওপর পড়ে গেল। উদ্ধত স্তন দু’খানি দর্শনমাত্র গোপালদেব শিহরিত হলেন। আহা, কী ঔদ্ধত্য, কী লাবণ্য, কী মায়াই না ঘিরে আছে ওই কমলপুষ্পদুটি।
কবরীবন্ধন শেষ হলে নারীটি পালঙ্ক থেকে নেমে দাঁড়ালেন। মহার্ঘ রেশমবস্ত্রটি তাঁর পায়ের কাছে অকিঞ্চিৎকর ছিন্নপত্রের মতো পড়ে রইল। গোপালদেব দেখলেন নারীটির ক্ষীণ মধ্যদেশ। দেখলেন রাত্রির মতো গহীন নাভি, দেখলেন পেলব কদলীকাণ্ডের মতো দুই জঙ্ঘা আর দুই জঙ্ঘার মাঝে লাজুক ত্রিকোণদ্বীপ।
গোপালদেবের মস্তিষ্কের মধ্যে জান্তব ইচ্ছার প্রবণতা বুনে দিচ্ছিল সেই সান্দ্র, পিচ্ছিল ধূম্রঘ্রাণ। তাঁর শরীরে ধীরে ধীরে মাথা তুলছে এক অবাধ্য পৌরুষ৷ যেমনভাবে কামার্ত হরিণ খুঁজে ফেরে ঘাইহরিণীকে, তেমনভাবেই সেই পৌরুষ খুঁজে নিতে চাইছে এই স্বয়মাগতা নারীকে।
নারী ধীরে ধীরে অনুপম ছন্দে এগিয়ে এসে দুই বাহু স্থাপন করলেন গোপালদেবের দুই কাঁধে। তারপর কামার্ত আঁখিদুটি গোপালদেবের চোখে রেখে বললেন, ‘এই দুর্ভাগিনীর কথা কি এতদিনে মনে পড়ল নাথ? আসুন, এই অনাথিনীকে পূর্ণ করুন, গর্ভিণী করুন, সম্পূর্ণ করুন।’
বিহ্বল গোপালদেব তাঁর ঘর্মাক্ত হাতদুটি দিয়ে বঙ্গদেশের অধিশ্বরীর দুই গণ্ডদেশ ধারণ করলেন। তারপর তাঁর উদগ্র ওষ্ঠ নামিয়ে আনলেন নারীটির স্ফূরিত অধরের দিকে।
দেদ্দদেবী স্থিরচোখে তাকিয়ে ছিলেন তাঁর দিকে ধাবিত ওই মহাভৈরবের দিকে। তিনি এই জীবনে একবার মরেছেন, দ্বিতীয়বার মরতে ভয় পান না। শুধু গোপালদেবের কথা ভেবে তাঁর কণ্ঠার হাড় দুবার ওঠানামা করল।
তাঁর এই ধর্ষিত, লাঞ্ছিত, অকিঞ্চিৎকর জীবন চলে যায় যাক। কিন্তু উনি যেন বিজয়ী হন, অখণ্ড গৌড়বঙ্গের রাজচক্রবর্তী সম্রাট হন। উনি পাটরানি সমভিব্যহারে রাজ্যশাসন করুন, অনিঃশেষ রাজসুখ ভোগ করুন। সুন্দরী স্ত্রী পাশে নিয়ে...
সুন্দরী স্ত্রী পাশে নিয়ে?
দেদ্দদেবীর কণ্ঠা ওঠানামা বন্ধ হল। গোপালদেবের শয্যায় অন্য কোনও নারী শুয়ে আছে, এই দৃশ্য কি নরকে গিয়েও সহ্য করতে পারবেন তিনি?
না। পারবেন না। তাঁকে বাঁচতে হবে। বাঁচতেই হবে।
বজ্রঘণ্টা দৌড়ে আসছিল তাঁর দিকে। তাঁর দিকে এবং লোকেশ্বর মৎস্যেন্দ্রনাথের দিকে। তার রক্তলাল চোখ থেকে, মদস্রাবী গণ্ড থেকে, উন্মত্ত যুদ্ধবৃংহণ থেকে ছড়িয়ে পড়ছিল হিংস্র মৃত্যুর সঙ্কেত।
তাঁদের মধ্যে দূরত্ব কমে আসছে। কমে আসছে মৃত্যু এবং জীবনের মধ্যে দূরত্ব। তীক্ষ্ণধার বল্লমটি একবার চেপে ধরলেন দেদ্দদেবী। কীভাবে, ঠিক কীভাবে এই মত্ত মাতঙ্গকে প্রতিহত করা যায়!
প্রায় ঘাড়ের কাছে এসে গেছে বজ্রঘণ্টা। তাঁর রক্তাভ মদস্রাবী চোখ দেখে বুকে ভয় জাগে। ঠিক এই সময় কীসের প্রেরণায় বজ্রঘণ্টার দিকে দৌড়চ্ছেন তিনি।
বপ্যট দাঁতে দাঁত চিপে একটি অশ্রাব্য শব্দ উচ্চারণ করলেন। যুদ্ধক্ষেত্রে কোনওপ্রকার অনুশাসন ভঙ্গ করা ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ৷ আর এই উন্মাদ তরুণী...
শুধু উন্মাদ তরুণী? চোখের কোণ দিয়ে তিনি দেখলেন—হাতে একটি দড়ির ফাঁস ঘোরাতে ঘোরাতে বজ্রঘণ্টার দিকে দৌড়ে আসছেন পদ্মসম্ভবও।
আশ্চর্য হলেন বপ্যট। না, পদ্মসম্ভবের এই দুঃসাহস দেখে নয়। আশ্চর্য হলেন দড়িটি দেখে৷ কামরূপের উত্তরাঞ্চলের গহীন জঙ্গলে এক ধরনের ঘাস পাওয়া যায়৷ সেই ঘাস শুকিয়ে তৈরি হয় এই দড়ি। এই দিয়ে অতি বৃহৎ বাণিজ্যতরী অবধি বাঁধা যায়, এতই শক্ত এর বাঁধন।
কই, এর কথা তো পদ্মসম্ভব ঘুণাক্ষরেও বলেননি তাঁদের।
পদ্মসম্ভবের দিকে তাকিয়ে রইলেন বপ্যট৷ তিনি বুঝতে পারলেন, আরও একজনও তাকিয়ে আছেন এই উত্তেজক ঘটনার দিকে। লোকেশ্বর মৎস্যেন্দ্রনাথ।
অতিকায় হস্তিটির আগ্রাসন স্তব্ধ হল। সে বা তার মাহুত, কেউই ভাবতেই পারেনি যে আক্রান্ত মানুষেরা এত আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতে পারেন। তবে এ বিভ্রান্তি সাময়িক। উচ্চ বৃংহণে আকাশ বাতাস মুখরিত করে ফের ধাবিত হল বজ্রঘণ্টা। নিপুণ রণহস্তীটি ততক্ষণে যুদ্ধের স্বাদ পেয়ে গেছে৷
তবে বেশীক্ষণ নয়। ততক্ষণে অব্যর্থ নিশানায় পদ্মসম্ভবের দড়ির ফাঁসটি এঁটে বসেছে উদ্ধত হস্তিশুণ্ড আর হস্তিদন্তের মাঝে। তারপর এক প্রবল টান!
কয়েক মুহূর্তের জন্য উপস্থিত প্রত্যেকে যেন স্তম্ভিত হয়ে গেল এই অসম সংগ্রাম দেখে। একদিকে বঙ্গবাহিনীর সর্বশ্রেষ্ঠ রণদুর্মদ রণহস্তী বজ্রঘণ্টা, অন্যদিকে এক সামান্য মানুষ।
তবে উপস্থিত জনসাধারণ আরও স্তম্ভিত হল পরের ঘটনাপ্রবাহ দেখে।
এই আকস্মিক আক্রমণ বোধহয় বজ্রঘণ্টা আশঙ্কা করেনি। তাই সে নিজের ভারসাম্য রক্ষার্থে সামনের দুই পা একবার তুলেই হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। আর তার প্রবল শুণ্ডচালনে পদ্মসম্ভবের হাতে ধরা দড়িটি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল।
তবে সেই মুহূর্তেই দ্রুত ধাবমান দেদ্দদেবী প্রথম লাফে বজ্রঘণ্টার দন্তাগ্রে এসে পড়লেন, এবং লাফিয়ে উঠলেন তার মাথা লক্ষ্য করে।
উপস্থিত জনতা স্তম্ভিত হয়ে দেখল এক আশ্চর্য দৃশ্য। একটি দেহ উড়ে যাচ্ছে বজ্রঘণ্টার মাথার দিকে। তার পা দুটি ভাঁজ করা। আর উত্থিত দুই হাতে শক্তমুঠিতে ধরা আছে একটি খর্বকায় তীক্ষ্ণধার ভল্ল। সূর্যের আলোয় ভল্লাগ্রটি একবার ঝিকিয়ে উঠল। তারপরেই সেটি আমূল বিদ্ধ হল বজ্রঘণ্টার মাথার ঠিক পিছনে, কাঁধ আর কানের মধ্যবর্তী নরম অংশটায়।
যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে উঠল সেই মহামাতঙ্গ। তারপর এক ঝটকায় উঠে দাঁড়াল সে। তার পিঠ থেকে ছিটকে পড়ে গেল মাহুত। ততক্ষণে দেদ্দদেবী নেমে দাঁড়িয়েছেন একপাশে। তাঁর দিকে দৌড়ে আসছেন পদ্মসম্ভব আর জয়াপীড়।
প্রবলবেগে নিজের মাথা নাড়াল বজ্রঘণ্টা। ঝেড়ে ফেলতে চাইল ঘাড়ে বিঁধে থাকা অস্ত্রটাকে। তারপর তার সামনের পা দুটি একবার তুলেই প্রবল বেগে নামিয়ে আনল মাটিতে পড়ে থাকা মাহুতের বুকে। একরাশ রক্ত ছিটকে উঠল চারিপাশে। প্রবল আক্রোশে দেহটাকে উপর্যুপরি আঘাত করল এই আহত ক্রুদ্ধ মত্তমাতঙ্গ। হতভাগ্য মাহুতের শরীরটা মুহূর্তের মধ্যে রক্তমাংসের দলায় পরিণত হল। তারপর সেই শরীরটাকে শুঁড়ে তুলে দূরে ছুঁড়ে দিল সে। তারপর যন্ত্রণাকাতর আর্তনাদে চারিদিক মথিত করে সে দৌড়তে লাগল লালিম্ববন পাহাড়ের দিকে।
বিস্ফারিত চোখে সমগ্র দৃশ্যটি দেখলেন প্রকাশচন্দ্র। তিনি স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি, এই সামান্য ক’জন বিদ্রোহীকে পরাস্ত করতে গিয়ে তাঁকে তাঁর শ্রেষ্ঠতম রণহস্তীটি হারাতে হবে।
তিনি উচ্চকণ্ঠে চিৎকার করে উঠলেন, ‘কালকূট সেনা, বন্দি করো ওই বিশ্বাসঘাতকদের। ওদের প্রত্যেকের মুণ্ড আমার চাই। আর বন্দি করো ওই দুই নারীকে। ওরা তোমাদের লুণ্ঠিত বস্তু, ওদের শরীর আজ তোমাদের ভোগ্য হোক।’
শিক্ষিত কালকূটসেনার প্রথম অংশ একই ছন্দে নিষ্কাশিত করল অসি। আর একই সঙ্গে তাদের প্রত্যেকের বামহাতে উঠে এল খর্বকায় কুঠার। সামান্য নীচু হল তারা, একইসঙ্গে। তারপর সঙ্ঘবদ্ধ শিয়ালের মতো তারা ছুটে চলল সামনের দিকে।
চুম্বনের ঠিক পূর্বমুহূর্তে কী যেন একটা অস্বস্তি হল গোপালদেবের। মনে হল কে যেন তাঁর মুখটি সামান্য সরিয়ে দিল। দুটি ওষ্ঠ যেন বিকর্ষণ করছে পরস্পরকে।
নারীটি সামান্য অবাক হলেন। তারপর কামজড়িত স্বরে বললেন, ‘কী হল প্রভু, আসুন, আমাদের অধরে অধরে প্রেমের পুষ্প প্রস্ফূটিত হোক।’
পুষ্প শব্দটি শুনেই আচ্ছন্ন, বিহ্বল গোপালদেবের মাথার মধ্যে কী যেন একটি কথা ভেসে উঠল।
মৎস্যেন্দ্রনাথ বলেছিলেন যে বিশেষ ঔষধটি তাঁকে সেবন করানো হয়েছে, তার অনেক গুণাগুণের মধ্যে একটি হচ্ছে বিষবিকর্ষণ। যে কোনও বিষাক্ত বস্তু, দ্রব্য বা প্রাণী থেকে স্বতই বিকর্ষিত হওয়ার ক্ষমতা আছে এর।
কথাটা মাথায় আসতেই সচকিত হলেন গোপালদেব। মাথার মধ্যেকার ধোঁয়াশা ভাবটাও খানিক স্তিমিত হয়ে এসেছে। প্রথমেই তাঁর মাথায় যে প্রশ্নটা এল, কীসে বিকর্ষিত হল তাঁর দেহ?
টানা টানা চোখদুটির দিকে তাকালেন গোপালদেব। আহা, ঈশ্বর স্বয়ং যেন তাঁর তুলিতে নিপুণভাবে এঁকেছেন ওই আঁখিদুটি। কত মায়া, কত প্রেম, কত না বলা কথাই যেন জমে আছে ওই দুটি চোখে।
আর রক্তিম দাড়িম্বর মতো বক্ষদুটি, যেমন উষ্ণ, তেমনই নরম। গোপালদেবের ইচ্ছা হল সপ্রেম হস্তে দলিতমথিত করেন ও দুটি।
আর নদীর বাঁকের মতো ঠোঁটদুটির তো কথাই নেই। যেন নাম না জানা কোনও শিল্পীর অমর সৃষ্টি। আর সেই ঠোঁটদুটির ফাঁকে...
একটু থামলেন গোপালদেব৷ ক্ষণমুহূর্তের জন্য তাঁর মনে হল—কী যেন একটা ওই ঠোঁটদুটির মাঝে উঁকি দিয়েই চলে গেল। কী ওটা?
বিদ্রোহীবাহিনীর উপর বন্যার মতো আছড়ে পড়ল কালকূটসেনা, যেভাবে ক্ষুদ্র দ্বীপের ওপর আছড়ে পড়ে প্রবল ঝঞ্ঝাসংক্ষুব্ধ ঊর্মিমালা, যেভাবে দাবানলের ওপর আছড়ে পড়ে বিপুল নির্ঝরপ্রবাহ।
জয়াপীড়ের প্রথম খড়্গাঘাতেই দুজন কালকূটসেনা মুণ্ডহীন হল। তাঁর রণহুঙ্কার পার্বত্যসিংহের মতো ভীষণ, গম্ভীর এবং ভীতিপ্রদ। তিনি সিংহবিক্রমে কালকূটসেনা সংহারে রত হলেন।
একটু দূরেই ছিলেন পদ্মসম্ভব। তাঁর এক হাতে দা’ও, অন্য হাতে ভীমদর্শন অসি। তিনি সব্যসাচী, তাঁকে দুই হাতে শত্রুসৈন্য নিপাত করতে দেখে মনে হল যেন বহুদিন বাদে অস্ত্রধারণ করতে পেরে ভারি প্রসন্ন হয়েছেন।
দেদ্দদেবীকে দেখে মনে হল যেন একটি জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ড যুদ্ধক্ষেত্রটি দ্রুতবেগে প্রদক্ষিণ করছে৷ তাঁর দ্রুতচকিত চলন বিভ্রান্ত এবং বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছিল কালকূটসেনার সঙ্ঘ গঠন।
আর মৎস্যেন্দ্রনাথ! কে জানত যোগেশ্বর নিজে এমন দুর্দান্ত রণকুশল যোদ্ধা? অমিতবিক্রমে তিনি চালনা করছিলেন তাঁর ত্রিশূলটি। যেন আদিদেব মহাদেব স্বয়ং অবতীর্ণ হয়েছেন এই ধরাধামে।
কিন্তু এতদসত্বেও ঘটনাপ্রবাহ প্রথম থেকেই বিদ্রোহীদের বিপক্ষে যাচ্ছিল। প্রথমত, তাঁরা সর্বাংশে অপ্রস্তুত। দ্বিতীয়ত, কালকূট সেনা বঙ্গদেশের সর্বশ্রেষ্ঠ রণকুশল বাহিনী। তাদের প্রশিক্ষণ, যুদ্ধদক্ষতা, সঙ্ঘশক্তি প্রশ্নাতীত। শৈবযোগী আর সহজিয়া সন্ন্যাসীরা যতই উজ্জীবিত, প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হোন না কেন, রণচাতুর্যে কিছুতেই এদের তুল্য নন।
বিদ্রোহীদলের সদস্যরা একে একে আহত এবং নিহত হতে লাগলেন। বিদ্রোহীদের সংখ্যা ক্রমেই কমে আসতে লাগল।
বপ্যট একটি বিশাল খড়্গ হাতে দুই কালকূট সেনার সঙ্গে যুদ্ধরত ছিলেন। তিনি একবার চারিদিকে তাকিয়ে প্রমাদ গণলেন। কালকূট সেনা আহত হলেও তাদের দৈহিক সক্ষমতা অতুলনীয়, রণভূমি ছাড়ার প্রশ্নই নেই। তাই যুদ্ধরত কালকূট সেনার সংখ্যা খুব বেশি কমছে না। অথচ বিদ্রোহী সেনা সংখ্যা দ্রুত কমে আসছে।
কালকূটসেনা কৌশলে এক এক জন বিদ্রোহী নেতাদের ঘিরে ছোট ছোট বৃত্ত রচনা করছে। তাদের অন্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে। মন্দর্ভা আর শান্তরক্ষিতকে ঘিরে বৃত্তটি ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে। আর হয়তো বেশিক্ষণ নয়। দেদ্দদেবী সেদিকে যেতে চাইলেও তাঁকে বাধা দিচ্ছে চারজন কালকূট সেনা।
ওদিকে মৎস্যেন্দ্রনাথ তাঁর ত্রিশূল নিয়ে প্রাণপণে যুদ্ধ করে করে চলেছেন। তাঁর সর্বাঙ্গ ক্ষতবিক্ষত। এরই মধ্যে একবার আর্তনাদ করে উঠলেন মন্দর্ভা। বপ্যট তাকিয়ে দেখলেন, এক কালকূটসেনা সবলে টেনে ধরেছে তাঁর কেশরাশি। শান্তরক্ষিত নিরস্ত্র, তাঁর হাতের অস্ত্র খসে পড়েছে মাটিতে। একটি অসি উত্তোলিত হল, এই বুঝি ভূলুণ্ঠিত হয় ভারতের শ্রেষ্ঠতম আচার্য শান্তরক্ষিতের মাথা।
এই প্রথম কুমার গোপালদেবের অভাব অনুভব করলেন অসহায় বপ্যট। গোপালদেব একাই এই কালকূটসেনার অর্ধেকের স্পর্ধা দমন করতে পারেন। তিনি থাকলে আজ এই অবশ্যম্ভাবী সর্বনাশের সম্মুখীন হতে হতো না তাঁদের।
কিন্তু সেই তীক্ষ্ণধার অসি আচার্য শান্তরক্ষিতের কণ্ঠায় নেমে আসার আগেই তীর ছুটে এল উত্তোলিত অসি লক্ষ্য করে। বপ্যট তাকিয়ে দেখলেন ঘুরে দাঁড়িয়েছেন কুমার পদ্মসম্ভব, হাতে সেই খর্বকায় নাগাঞ্চি ধনু। তাঁর চারিপাশে মৃত কালকূটসেনার স্তূপ। তাঁর পেশি ফুলে উঠেছে সিংহের কেশরের মতো। উন্মুক্ত কেশরাশি উড়ছে আগুনের মতো। দুচোখে ক্রোধ। রক্তঘামে ভিজে গেছে সমস্ত দেহ।
এই প্রথম পদ্মসম্ভবের বিপুল বলের আভাস পেলেন বপ্যট, আর অত্যন্ত আশ্চর্য হলেন। তিনি চিরকাল পদ্মসম্ভবকে দেখে এসেছেন একজন সাধারণ বুদ্ধিমান কৌতুকপ্রিয় বঙ্গবাসী রূপে। একটু আগেই তাঁকে একবার উত্তেজিত হতে দেখেছিলেন, আর এখন দেখলেন ক্রুদ্ধ ভৈরবাবতারে।
হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন পদ্মসম্ভব। তারপর ধনুর্বাণ ফেলে রক্তস্নাত দা’ও নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন মন্দর্ভার উদ্ধারকল্পে।
শান্তচোখে সমস্ত ঘটনা পর্যবেক্ষণ করলেন প্রকাশচন্দ্র। আর কতক্ষণ? এক দণ্ড? দুই দণ্ড?
একবার বামহাতের তর্জনীর দিকে তাকালেন তিনি। আঙুলটি এখনও নীলাভ হয়ে আছে৷ রানি এখন মহাবিষে পরিপূর্ণ৷ একটিমাত্র দংশন। আর তারপরেই গোপালদেবের কর্তিত মুণ্ড নিয়ে ছুটে আসবে মাধব। সেই রকমই কথা হয়ে আছে।
প্রকাশচন্দ্র কালকূটসেনার দ্বিতীয় অংশকে আদেশ দিলেন আক্রমণের। এই আক্রমণ প্রতিহত করা অসম্ভব।
আরেকদল কালকূটসেনাকে এগিয়ে আসতে দেখে প্রমাদ গণলেন বপ্যট৷ তাঁর কিরাত-শবর সৈন্যদল কোথায়?
ততক্ষণে মৎস্যেন্দ্রনাথ এবং জয়াপীড়কে ঘিরে ফেলেছে কালকূটসেনার একটি বৃহৎ অংশ। দেদ্দদেবী এসে যোগ দিয়েছেন পদ্মসম্ভবের সঙ্গে। তাঁরা রক্ষা করার চেষ্টা করছেন শান্তরক্ষিত এবং ভিক্ষুণী মন্দর্ভাকে। জয়াপীড় একত্রিত হয়েছেন জালন্ধরনাথ, এবং বেঁচে থাকা অল্প কয়েকজন শৈব এবং সহজ সন্ন্যাসীদের সঙ্গে।
প্রকাশচন্দ্র নির্ভারচিত্তে উঠে দাঁড়ালেন। আর অর্ধদণ্ড মাত্র৷ তারপরেই বিজয়লক্ষ্মী তাঁর...
তাঁর ভাবনা মনেই রইল। অগ্রসর দ্বিতীয় কালকূটসেনার দিকে উড়ে এল একঝাঁক তীর। উড়ে এল লালিম্ববনের ভেতর থেকে। সঙ্গে শত শত মোষের শিঙার ধ্বনি। তারপরেই জঙ্গলের আবরণ থেকে বেরিয়ে এল কৃষ্ণকায় ভীমদর্শন কিরাত-শবরের দল।
স্বস্তির শ্বাস ফেললেন বপ্যট৷ তাঁর বাহিনী এসে গেছে।
প্রথমে স্তম্ভিত, তারপর ক্রোধদীপ্ত হলেন প্রকাশচন্দ্র। তুলে নিলেন তাঁর মহাখড়্গ। সারথিকে বললেন তাঁর রথ জয়াপীড়ের দিকে চালনা করতে।
রানি একটানে খুলে নিলেন গোপালদেবের উত্তরীয়। তারপর তাঁকে সবলে আলিঙ্গন করে লেহন করতে থাকলেন কর্ণমূল।
গোপালদেবের সুঠাম বুকে দুটি উদ্ধত এবং কোমল স্তন নিষ্পিষ্ট হচ্ছিল। কর্ণমূলে শিরশিরানির সঙ্গে ভেসে আসছে এক কামার্তা নারীর আকুল নিবেদন, ‘আমাকে গ্রহণ করুন আর্য, বিদ্ধ করুন আপনার পৌরুষে। আমার নারীত্বের অর্ঘ্য গ্রহণ করুন। আমাকে সম্পূর্ণ করুন।’
যে কোনও সমর্থ পুরুষের শরীর এই আহ্বানে সাড়া দিতে, এই আগুনে নিজেকে সমর্পণ করতে বাধ্য। বহু তপস্যায় এমন বরবর্ণিনী তিলোত্তমা স্বয়মাগতা হয়। কিন্তু সেই স্পর্শে গোপালদেবের অস্বস্তি বহুগুণ বর্ধিত হল।
এক অবলা কামিনীর পেলব হাত দু’খানি এমন শক্ত, সবল, লৌহকঠিন হয় কী করে?
হাত দুটির স্পর্শ মাঝেমধ্যে এমন পিচ্ছিল, সর্পিল অনুভূত হচ্ছে কেন?
কর্ণমূলে যে শব্দগুলি ভেসে আসছে তার মধ্যে একটি অতি ক্ষীণ হিসহিস শব্দ শ্রুত হচ্ছে কেন?
গোপালদেব যেন আচম্বিতে সম্পূর্ণ জাগ্রত হয়ে উঠলেন। জেগে উঠলেন অন্ধকার থেকে আলোর দিকে, নিদ্রা থেকে জাগরণের দিকে, বিহ্বলতা থেকে সচেতনতার দিকে। তাঁর মনে পড়ে গেছে তিনি কেন এসেছেন এখানে।
শরীরের সমস্ত শক্তি একত্র করলেন গোপালদেব, তারপর সবলে নিজেকে মুক্ত করলেন সেই কামিনীপাশ থেকে।
নারীশরীর ছিটকে পড়ে গেল শয্যার ওপর। কয়েক মুহূর্তের অপেক্ষা। তারপর ধীরে ধীরে উঠে বসলেন বঙ্গদেশের মহারাজ্ঞী। অন্ধকারের মধ্যে তাঁর চোখ দু’খানি একবার ধক করে জ্বলে উঠেই নিভে গেল। তারপর ধীরে ধীরে তাঁর ওষ্ঠপ্রান্তে একটি হাসি ফুটে উঠল। আদুরে স্বরে তিনি বললেন, ‘কী হল নাথ, অভাগিনীকে কি পছন্দ হল না? নাকি বিদ্রোহের ভার, যুদ্ধদ্যোগের ক্লান্তি আপনাকে গ্রাস করেছে? আসুন, এই শয্যায় একবার উপবেশন করুন প্রভু। আপনার শ্রান্তিভার লাঘব করিয়ে...’
‘স্তব্ধ হ কুলটা নাগিনী।’ ধমকে উঠলেন গোপালদেব, ‘নিজের মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হ। আজ তোর সমস্ত কামজ্বালা জন্মের মতো মিটিয়ে দিতে এসেছি, তোর আর তোর সঙ্গীদের এতদিনের পাপের প্রতিশোধ নিতে এসেছি।’
মহারানি কিছুক্ষণ সর্পিল চোখে চেয়ে রইলেন গোপালদেবের দিকে। তারপর ব্যঙ্গখলখল স্বরে বলে উঠলেন, ‘মৃত্যু? আমার? তোর হাতে?’ বলতে-বলতেই উচ্চৈঃস্বরে হেসে উঠলেন রানি।
আর তখনই তাঁর মুখগহ্বরের দিকে চোখ গেল গোপালদেবের। তিনি দেখলেন রানির জিহ্বাটি মানুষী জিহ্বা নয়। অবিকল সাপের মতো, দু’ভাগে বিভক্ত।
গোপালদেব অসমসাহসী পুরুষ। তবু তিনিও মুহূর্তের জন্য কেঁপে উঠলেন। কী বীভৎস! কী সাঙ্ঘাতিক!
তবে তাঁর আতঙ্কিত হওয়া তখনও বাকি ছিল।
গোপালদেবের ভীত, বিস্ফারিত চোখের সামনেই নারীদেহটি মোচড়াতে শুরু করল। মনে হল যেন অসহ্য যন্ত্রণায় বেঁকেচুরে যাচ্ছে দেহটি। কিন্তু যন্ত্রণার আর্তনাদ নয়, প্রতিটি মোচড়ের সঙ্গে সেই নারীর গলা থেকে ভেসে আসছিল খলখল হাসি।
একসময় দেহটি গড়াতে গড়াতে শয্যার অন্য পাশে পড়ে গেল। হাসির শব্দ তখনও ভেসে আসছে। তবে ক্রমেই তার চরিত্র বদলে যাচ্ছিল। একটা তীব্র হিসহিস শব্দ ক্রমেই দখল করে নিচ্ছিল সেই বীভৎস হাসির স্বর।
একটু পরে সব শব্দ স্তব্ধ হয়ে গেল। সমস্ত ঘর জুড়ে অস্বাভাবিক নৈঃশব্দ্য।
তারপর গোপালদেবের ব্রহ্মরন্ধ্র অবধি কাঁপিয়ে দিয়ে শয্যার ওপাশে উঠে এল অতিকায়, অতি বিশাল, অতি বীভৎস এক মহাভুজঙ্গ। তার উদ্ধত ফণার উচ্চতা গোপালদেবের মাথা পেরিয়ে। তার দেহকাণ্ডের প্রস্থ মানুষ প্রমাণ। তার সমস্ত দেহ ঘন কালো। অতল রাত্রির মতো কালো, সর্বগ্রাসী সর্বনাশের মতো কালো।
বিশাল ফণাটি এদিক ওদিক দুলল খানিকক্ষণ। তারপর তার স্ফটিককৃষ্ণ চোখদুটি স্থির হল গোপালদেবের ওপর। রক্তলাল চেরা জিভটি বেরিয়ে এল। তার প্রান্তভাগ খানিক কাঁপল তিরতির করে৷ তারপর সেই মহাকায় ভুজঙ্গ শয্যা বেয়ে এগিয়ে আসতে থাকল গোপালদেবের দিকে।
প্রকাশচন্দ্রের যুদ্ধপারঙ্গমতা দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন বপ্যট।
তিনি নিজে মহাশূরবীর, শস্ত্রযুদ্ধে মহারথ। তাঁর পুত্র গোপালদেবও মহাবলশালী যোদ্ধা, সম্ভবত বঙ্গদেশের শ্রেষ্ঠতম শূরবীর। তিনি কুমার জয়াপীড় এবং কুমার পদ্মসম্ভবের অতিলৌকিক শারীরিক বল এবং যোদ্ধৃক্ষমতার ব্যাপারে সম্যকরূপে অবগত। কিন্তু তাঁরাও প্রকাশচন্দ্রের ধারেকাছে আসেন না।
প্রকাশচন্দ্র শত্রুনিধন করছিলেন এমন অনায়াসে, দেখে মনে হচ্ছিল যেন কোনও কৃষক হেমন্তের শেষে নীবারকর্তনে রত। তাঁর একটি একটি খড়্গাঘাতে একাধিক বিদ্রোহী সৈন্য ধরাশায়ী হচ্ছিল। এত কুশলতার সঙ্গে, এত অনায়াসে, এত সাবলীল ভাবে যে শত্রুনিধন করা যায়, তা খণ্ডিতারাতি বপ্যটেরও স্বপ্নের অগোচরে ছিল।
যুদ্ধ হচ্ছিল সমানে সমানে। শবরের দল প্রশিক্ষণে কালকূটসেনার থেকে পিছিয়ে থাকলেও সংকল্পে দৃঢ়বদ্ধ। তাদের দৈহিক বল এবং দৈহিক আঘাত সহ্য করার ক্ষমতাও কালকূটসেনার সঙ্গে তুল্যমূল্য। তদুপরি তারা সংখ্যাতেও বেশি।
তবে তারা অসমসাহসী, প্রশিক্ষিত কালকূটসেনার সঙ্গে সমানে সমানে যুঝে চলেছিল তাদের আজন্মসঞ্চিত ক্রোধের ওপর ভর করে। ক্রোধ তাদের এই অবস্থার ওপর, এই শাসনের ওপর, এই শোষণের ওপর, এই মাৎস্যন্যায়ের ওপর। সেই মহাপবিত্র ক্রোধ যেন দাবানলের মতো ভস্ম করে দিতে চাইছিল কালকূটসেনাকে।
জয়াপীড় এবং তাঁর সঙ্গী কিরাত সৈন্যদল ভীমবিক্রমে ধ্বংস করছিলেন কালকূটসেনার দক্ষিণভাগ। পদ্মসম্ভব আজ মহাভৈরবরূপ ধারণ করেছেন। তিনি একাই সর্বগ্রাসী হুতাশনের মতো সংহার করছেন কালকূটসেনার উত্তরাংশ।
প্রকাশচন্দ্রের রথ অনায়াসে এসে উপস্থিত হল জয়াপীড়ের সামনে। জয়াপীড় এক আঘাতে এক কালকূটসেনার মুণ্ডচ্ছেদ করে রক্তস্নাত শার্দূলের মতো প্রকাশচন্দ্রের সম্মুখীন হলেন।
প্রকাশচন্দ্র ধীর, শান্ত অথচ দৃপ্ত পদক্ষেপে অবতারণ করলেন রথ থেকে। তারপর নিজের অস্ত্র উত্তোলিত করে বললেন, ‘তস্করের হাতে বহুমূল্য মণি আর শিশুর হাতে তীক্ষ্ণধার অসি শোভা দেয় না কুমার। ওই মহাখড়্গ মন্ত্রপূত। অনধিকারীর হাতে বিশ্রী দেখায়। ওটি আমার হাতে দিন।’
জয়াপীড় তাঁর খড়্গহাতে হিংস্রভাবে ঝাঁপিয়ে পড়লেন প্রকাশচন্দ্রের ওপর।
গোপালদেব প্রতিবর্ত ক্রিয়ায় পিছিয়ে গেলেন খানিকটা। তারপর দৌড়ে গেলেন দরজার দিকে। বদ্ধ কক্ষে এই মহানাগিনীর সঙ্গে সংগ্রামে রত হওয়া আর মৃত্যুকে আহ্বান করে আনা একই। উন্মুক্ত প্রান্তরে যে কোনও সরীসৃপের আক্রমণ প্রতিহত করা বরং অনেক সহজ।
কিন্তু দরজাটি হাত দিয়ে টেনে বুঝলেন যে দরজাটি বন্ধ। তাঁর জীবিত থাকার কোনও সম্ভাবনাই রাখেনি শত্রুপক্ষ।
ঘুরে দাঁড়ালেন গোপালদেব। মহাসর্প ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে তাঁর দিকে। কটিদেশে হাত দিলেন গোপালদেব। বার করে আনলেন সেই মহাযন্ত্র, যা পোন পুরোহিতদের গোপন ভাণ্ডার থেকে বহু কষ্টে উদ্ধার করে এনেছেন ভন্তে কমলশীল এবং কুমার পদ্মসম্ভব।
যন্ত্রটির আকৃতি বড়ই অদ্ভুত। একটি লৌহনির্মিত নল, দৈর্ঘ্যে এক বিতস্তির কাছাকাছি। নলের শেষের এক তৃতীয়াংশ উল্লম্বভাবে বক্র। বাঁকানো অংশটি তুলনামূলক ভাবে অনেক স্থূল। তার গায়ে কাঠের আবরণ। সেই কাঠের মধ্যস্থল থেকে একটি স্থূল পলিতা বেরিয়ে আছে।
যন্ত্রটি প্রয়োগপদ্ধতি কিঞ্চিৎ জটিল। লৌহনলের সম্মুখভাগ লক্ষ্যের দিকে স্থির করে পলিতায় অগ্নিসংযোগ করতে হয়। তারপরেই মারণাগ্নি ধেয়ে যায় লক্ষ্যের দিকে।
মূল পরিকল্পনা এই ছিল যে গোপালদেব প্রাসাদে প্রবেশ করে রানিকে বলপ্রয়োগে বন্দি করবেন। তারপর কাঞ্চনাদেবীর কথামতো রানির ভ্রূমধ্যে প্রয়োগ করবেন এই মারণ অগ্নি। তাতেই নিহত হবে সেই শতাব্দীপ্রাচীন নাগপিশাচী।
কিন্তু সে সম্ভাবনা এখন সুদূর পরাহত বললে কম বলা হয়।
সেই মহাভুজঙ্গ এসে দাঁড়িয়েছে গোপালদেবের ঠিক সামনে। তার অতি ভয়ঙ্কর, অতি ভীতিপ্রদ উপস্থিতিই কোনও সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত জড়ভরত করে ফেলার পক্ষে যথেষ্ট। তার ঘনকৃষ্ণস্ফটিক চোখদুটি গোপালদেবের ঠিক মুখোমুখি। সেই স্থির, নিষ্কম্প, অচঞ্চল চোখদুটিতে একটিই বার্তা লেখা আছে। মৃত্যু।
গোপালদেব চকিতে ঝাঁপ দিলেন মেঝের ওপর। দরজার অন্যপ্রান্তে এখনও একটি দীপ জ্বলছে ক্ষীণভাবে। আগুন, সামান্য একটু আগুন চাই তাঁর এখন।
কিন্তু তার আগেই সেই মহানাগিনী দ্রুত জড়িয়ে ফেলল তাঁর দেহ৷ প্রথমে পা, তারপর কোমর, তারপর ঊর্ধ্বাঙ্গের অর্ধাংশ। আর হাতের যন্ত্রটি ছিটকে চলে গেল অন্যপ্রান্তে।
ধীরে ধীরে সেই নাগিনীর উদ্যত ফণা উঠে এল গোপালদেবের বুকের ওপর। উঠতে পারছিলেন না তিনি। ক্রমেই তাঁর দেহের ওপর চাপ বাড়ছিল। মনে হচ্ছিল যেন ফুসফুসটি গলা দিয়ে বের হয়ে আসবে। মহাবলশালী তিনি। দেহে অযুতহস্তীর শক্তি ধরেন। তবুও তিনি এই আসুরিক শক্তির সামনে অসহায়ের মতো হাঁ করছিলেন একটু নিঃশ্বাস নেওয়ার জন্য।
সেই বিশালাকার ফণাটি দুদিকে দুলল খানিক। তারপর অনেকটা নীচু হয়ে গোপালদেবের ঠিক মুখোমুখি স্থির হল। ক্রূর, শীতল দৃষ্টিতে খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইল তাঁর বিস্ফারিত, আতঙ্কিত চোখের দিকে। তারপর ধীরে ধীরে মুখ হাঁ করল।
এক প্রাচীন পিশাচগন্ধ নাসারন্ধ্র বন্ধ করে দিল গোপালদেবের। যেন নরকের গভীর থেকে উঠে এসেছে এই পচিত, দূষিত কটুঘ্রাণ।
ফণাটি খানিক উঁচু হল। তারপর দু’খানি বিষদন্ত সজোরে নেমে এল গোপালদেবের বুকের ওপর।
গোপালদেবের পৃথিবী অন্ধকার হয়ে এল।
প্রকাশচন্দ্রের আক্রমণ কিছুটা সামলেই জয়াপীড় বুঝে গেলেন যে ইনি শারীরিক বলে এবং যুদ্ধকৌশলে তাঁর থেকে অনেক এগিয়ে। যেমন অদ্ভুত তাঁর খড়্গচালনা, তেমন দ্রুত তাঁর চলন। জয়াপীড় তাঁর খড়্গ চালনা করছিলেন দুই হাতে৷ আর প্রায় একই আকারের বিশাল খড়্গ প্রকাশচন্দ্র চালনা করছিলেন এক হাতে।
জয়াপীড়ের বিপুল আঘাত এড়িয়ে সরে দাঁড়ালেন প্রকাশচন্দ্র। জয়াপীড় খানিকটা এগিয়ে গিয়েই গড়িয়ে গেলেন। মুহূর্তের মধ্যে প্রকাশচন্দ্রের খড়্গ আছড়ে পড়ল যেখানে জয়াপীড়ের মুণ্ডখানি ছিল। জয়াপীড় এক লাফে উঠে দাঁড়িয়ে প্রতিহত করলেন পরের আক্রমণ। খড়্গে খড়্গে আগুনের ফুলকি ছুটল।
আস্তে আস্তে পিছিয়ে যাচ্ছিলেন জয়াপীড়। প্রায় দুই দণ্ড ধরে একনাগাড়ে যুদ্ধ করে যাচ্ছেন তিনি। মহাবলশালী যোদ্ধা হলে কী হবে, তিনিও মানুষ, তাঁর জীবনীশক্তি অনিঃশেষ নয়। ক্রমেই তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়ছিলেন।
তাঁর পিঠ ঠেকে গেল প্রকাশচন্দ্রের রথে। এক লাফে রথে উঠে পড়লেন তিনি, তারপর রথধ্বজা ভেঙে সেটিকে ভল্লের মতো ছুঁড়লেন প্রকাশচন্দ্রের দিকে। প্রকাশচন্দ্র হেলায় সেটি দ্বিখণ্ডিত করলেন। তারপর তিনিও লাফিয়ে উঠলেন রথে। খড়্গ চালালেন জয়াপীড়ের মাথা লক্ষ্য করে। শরীরের সমস্ত ভারসাম্য দুই উরুতে বজায় রেখে মাথাটি সম্পূর্ণ পিছন দিকে হেলিয়ে দিলেন জয়াপীড়। প্রকাশচন্দ্রের খড়্গ মৃত্যুর শিস তুলে বাতাসে কেটে গেল।
জয়াপীড় লাফিয়ে নামলেন মাটিতে। তারপর এক খড়্গাঘাতে রথের ধুরা আর যুগম কেটে দিলেন। ষাঁড়দুটি মুক্ত হয়ে খুরে খুরে ধুলো উড়িয়ে যুদ্ধরত সৈন্যদের দিকে ধাবিত হল।
প্রকাশচন্দ্র ক্রুদ্ধ হয়ে রথে সজোরে পদাঘাত করলেন। ওই একই আঘাতে রথটি বিপুল শব্দে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে ভেঙে পড়ল। একটি চক্র ছিটকে এসে লাগল জয়াপীড়ের পেটে। জয়াপীড় পড়ে গেলেন। তাঁর খড়্গ ছিটকে গেল অন্যদিকে। জয়াপীড়ের সমস্ত জীবনীশক্তি শেষবিন্দুতে এসে দাঁড়াল।
প্রকাশচন্দ্র ধীরেসুস্থে এসে দাঁড়ালেন মাটিতে শুয়ে থাকা মৃতপ্রায় জয়াপীড়ের কাছে। তারপর হাঁপাতে থাকা জয়াপীড়ের মাথা লক্ষ্য করে খড়্গ তুললেন।
জয়াপীড় বহুকষ্টে তাঁর হাতের কাছে পড়ে থাকা একটি কাঠের টুকরো তুলে নিলেন। তারপর শরীরের জমে থাকা সমস্ত শক্তি দিয়ে গেঁথে দিলেন প্রকাশচন্দ্রের পায়ে।
প্রকাশচন্দ্র আর্তনাদ করলেন না বটে। তবে তাঁর ভারসাম্য সামান্য টলে গেল। তবে সে মুহূর্তের বিক্ষেপমাত্র। তারপর তিনি ফের তুলে নিলেন তাঁর খড়্গ। জয়াপীড়ের মুণ্ডচ্ছেদ কেবলমাত্র সময়ের অপেক্ষা।
ঠিক সেই মুহূর্তেই সাঁই সাঁই শব্দ তুলে ছুটে এল একটি ভল্ল। সেটি প্রকাশচন্দ্রের খড়্গে আঘাত করে তাকে বিচ্যুত করল বহুদূরে। প্রকাশচন্দ্র চমকে ঘুরে দাঁড়ালেন। তাঁর দিকে ভীমবেগে দৌড়ে আসছেন বিদ্রোহীদের প্রধান সেনাপতি, বপ্যট। তাঁর হাতে একটি ভয়ালদর্শন অসি।
প্রকাশচন্দ্র একলাফে পৌঁছলেন জয়াপীড়ের হস্তবিচ্যুত খড়্গটির কাছে, তাঁর অজেয় তাংদা’ও এর কাছে। যে মন্ত্রপূত মহাখড়্গ হাতে থাকলে তিনি অযোধ্যা, অপরাজেয়।
সেই মন্ত্রপূত খড়্গ হাতে প্রকাশচন্দ্র যখন উঠে দাঁড়ালেন তখন তাঁকে দেখে মনে হল যেন বজ্র হাতে উঠে দাঁড়িয়েছেন বৃত্রঘ্ন ইন্দ্র স্বয়ং। সেই দৃশ্য দেখে কালকূটসেনা হর্ষধ্বনি করে উঠল, ‘জয় একেশ্বর প্রকাশচন্দ্রের জয়। জয় বঙ্গরাজ্ঞীর জয়।’ সেই শুনে বিদ্রোহী কিরাত শবরসেনাও মহা হুঙ্কারে প্রতিধ্বনি করল, ‘জয় গৌড়, জয় বঙ্গ, জয় শশাঙ্ক।’
মৃত্যুর নরম অন্ধকার জঠরে শুয়েছিল একটি প্রাণ। তার আকার নেই, অবয়ব নেই, মাত্রা নেই। শুধু প্রাণের উদ্দীপন আছে। জীবনের সাড়া আছে। যদিও সে না থাকার মতই। তার অস্তিত্ব, ইশারা, লক্ষণ—সবই এখন পিণ্ডমাত্র।
এক নীল অন্ধকার সুড়ঙ্গের মধ্যে সব কিছু যেন তলিয়ে যাচ্ছিল। ক্রমে সেই নীল রঙ হয়ে উঠছিল আরও ঘন, আরও গহীন, আরও কালো। তার মাত্রা নেই, বেধ নেই, ঊর্ধ্ব নেই, অধঃ নেই, শুরু নেই, শেষ নেই। শুধু আছে ঘূর্ণির টানে এক নিঃসীম অতলে তলিয়ে যাওয়া।
তলিয়ে যেতে যেতে ক্রমেই গাঢ় থেকে গাঢ়তর ঘুমে ঢলে পড়ছিল সেই প্রাণবিন্দু। তার অসাড় চৈতন্যে রেখাপাত করে যাচ্ছিল কয়েকটি শব্দ, কয়েকটি বাক্য, দুখানি আতুর, আকুল চোখ...
‘কুমার...আমার বড় ভয় করছে...ওই কামুক ডাকিনীর সঙ্গে যেন...’
আলো। ক্ষীণ অথচ অস্পষ্ট কিছু আলোর বিন্দু। তারপর আলোর বিন্দুগুলি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল।
বপ্যট বিপুল বেগে আঘাত করলেন প্রকাশচন্দ্রকে। সেই ধাক্কায় কিছুটা পিছিয়ে গেলেন প্রকাশচন্দ্র। বুঝলেন যে এইবার একজন সমান বলস্পর্ধীকে পেয়েছেন তিনি।
দুই মহারথী বিপুল বিক্রমে একে অন্যকে আক্রমণ এবং অন্যের আক্রমণ প্রতিহত করতে লাগলেন। খড়্গে অসিতে ঝনঝনানিতে অগ্নিস্ফুলিঙ্গতে মনে হল শালিবন বিহারের সামনে যেন পূর্বসমুদ্রের একটুকরো বিপুল ঝঞ্ঝা উঠে এসেছে।
খানিক পরেই বোঝা গেল দৈহিক বলে এবং অস্ত্রকৌশলে দুজনেই তুল্যমূল্য হলে কী হবে, বপ্যটের নড়াচড়া বা চলন প্রকাশচন্দ্রের তুলনায় সামান্য হলেও ধীর। তিনি প্রৌঢ় হয়েছেন, আর নাগসম্রাজ্ঞী য়ু জেতিয়ানের আশীর্বাদে প্রকাশচন্দ্র চিরযৌবনের অধিকারী।
লক্ষ করলেন প্রকাশচন্দ্রও। তিনি ঘুরে ঘুরে আক্রমণ করতে লাগলেন বপ্যটকে। চেষ্টা করলেন যাতে বপ্যটকে আরও বেশি নড়াচড়া করতে হয়, আরও ছুটতে হয়।
বপ্যট ইতিমধ্যেই যুদ্ধক্লান্ত ছিলেন। শ্রান্তি আর অবিরল রক্তক্ষরণ তাঁকে ক্রমাগত দুর্বল করে তুলেছিল। এই ক্রমাগত দ্রুতচলন তাঁকে আরও শ্রান্ত করে তুলছিল। তিনি হাঁপিয়ে যাচ্ছিলেন। ক্রমেই আরও ক্লান্ত, আরও মন্থর হয়ে পড়ছিলেন। লক্ষ্যভ্রষ্ট হচ্ছিলেন বার বার।
একবার প্রকাশচন্দ্রের খড়্গ তাঁর বাম বাহু ছুঁয়ে গেল। রক্তপাত হতে লাগল সেখান থেকে। ক্রুদ্ধ বপ্যট তাঁর অসি দিয়ে ভীমবেগে আক্রমণ করলেন প্রকাশচন্দ্রকে। প্রকাশচন্দ্র নীচু হয়ে সরে গেলেন। তারপর খড়্গচালনা করলেন বপ্যটের পায়ের দিকে। বপ্যট লাফিয়ে উঠলেন। কিন্তু তাঁর এতক্ষণের শ্রান্তি তাঁকে এইবার প্রতারিত করল। সামান্য বিলম্ব হয়ে গেল তাঁর। প্রকাশচন্দ্রের মহাখড়্গ তাঁর গুল্ফে আঘাত করে পায়ের প্রধান শিরাটি কেটে দিল।
পড়ে গেলেন বপ্যট। দ্রুত উঠে আসার চেষ্টা করলেন, কিন্তু পারলেন না। ডান পায়ের পাতা প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। সেই অবস্থাতেই উঠে বসে প্রতিহত করলেন প্রকাশচন্দ্রের পরের আঘাত। কিন্তু বেশিক্ষণ নয়। প্রকাশচন্দ্র এক ঝটকায় তাঁর অসিটি দূরে ফেলে দিলেন। তারপর তাঁর তাংদাও প্রোথিত করে দিলেন বপ্যটের বুকে।
ভলকে ভলকে রক্ত উঠে যুদ্ধক্ষেত্রের মাটি ভিজিয়ে দিল। হাঁ করে একবার লম্বা শ্বাস নিলেন বহুযুদ্ধের নায়ক, খণ্ডিতারাতি বপ্যট। অস্ফূটে উচ্চারণ করলেন, ‘গোপাল, গোপাল।’ তারপর তাঁর মাথাটি একদিকে হেলে গেল।
আর ঠিক সেই মুহূর্তে দুচোখ খুলে গেল গোপালদেবের।
বহুদূর থেকে যুদ্ধের কোলাহল কানে আসছিল ওদের। শুনে বনচর মানুষটি ক্রমেই উতলা হয়ে উঠছিল। বার বার তাড়া দিচ্ছিল চণ্ডকীর্তিকে, ‘তাড়াতাড়ি চল শুয়ার। আর কত দেরি করবি, প্রভু যে আমাদের অপেক্ষায় আছেন।’ তার ব্যবহার ক্রমেই রুক্ষ হয়ে উঠছিল। ভাষা হয়ে উঠছিল অশ্রাব্য৷
ভীত কুকুরের মতো এগিয়ে যাচ্ছিল চণ্ডকীর্তি। এগিয়ে যাচ্ছিল সংকীর্ণ গিরিপথটি বেয়ে। তার গলায় একটি রশি। তার শেষভাগ ধরে রেখেছে সেই বনচর মানুষটি। আর তার পেছনে পেছনে শত শত ভয়াবহ উলঙ্গ ডাকিনীর দল। প্রতি ডাকিনীর সঙ্গে তার পোষ্য শিবা!
ধীরে ধীরে গিরিপথের শীর্ষবিন্দুতে এসে উপস্থিত হল চণ্ডকীর্তি। তারপর একটি পাথরের আড়াল থেকে সামান্য উঁকি দিল।
শালিবন বিহার আর তার সামনের উন্মুক্ত প্রান্তর তাদের সামনে এখন স্পষ্ট।
খানিকক্ষণ স্থির শুয়ে রইলেন গোপালদেব। ধীরে ধীরে কক্ষের চিত্রবিচিত্র ছাদ তাঁর সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠল।
তাঁর সারা দেহ জুড়ে এক আশ্চর্য নির্ভার প্রশান্তি। প্রবল জ্বরের উপশম হলে যেমন বোধ হয়, ঠিক তেমনই বোধ করছেন তিনি।
ধীরে, অতি ধীরে ঘাড় ঘোরালেন গোপালদেব। বাঁদিকে কিছু নেই। এবার ডানদিকে।
ডানদিকে মেঝেতে ও কে শুয়ে? ও কার শরীর?
ধীরে ধীরে উঠে বসলেন গোপালদেব। তাঁর থেকে সামান্য দূরে একটি শীর্ণ, সম্পূর্ণ নগ্ন নারীশরীর শুয়ে আছে শীতল মেঝেতে।
এদিক ওদিক তাকালেন গোপালদেব। তাঁর অস্ত্রটি কোথায়?
স্তম্ভিত হয়ে গেল বিদ্রোহী বাহিনী। তাদের প্রধান নেতাকে নিহত হতে দেখে তাদের মধ্যে পরাজয়ের ভয় চারিয়ে গেল।
কালকূটসেনা দ্বিগুণ উৎসাহে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হল। তারা তখন জয়ের গন্ধ পাচ্ছে।
পরিস্থিতি বুঝলেন পদ্মসম্ভব। তিনি উচ্চৈঃস্বরে চিৎকার করে উঠলেন, ‘বাংলাদেশের সন্তানদল, তোমরা ভয় পাচ্ছ? ভয় পেও না। ওই দেখ, সমগ্র গৌড়বঙ্গ আজ তোমাদের দিকে চেয়ে আছে। ওঠো, জাগো, উঠে দাঁড়াও। ফিরে তাকাও, প্রত্যাঘাত করো। ওরা চায়, ওদের দেখে আমরা কাঁপতে থাকি। আমরা কি ওদের সেই আশা পূর্ণ করব? আমরা কি সেই মায়ের ছেলে? মনে রেখো, এই দেশ তোমার জন্ম দিয়েছে, তোমাকে ধারণ করেছে, লালন পালন করেছে। আর আজ তোমরা সেই দেশের জন্য প্রাণ দিতে পিছপা হচ্ছ? সামনে তাকিয়ে দেখো, কয়েক হাজার কাপুরুষ দাস এক লোভী ঐন্দ্রজালিকের জন্য অস্ত্র ধরেছে। আর নিজেদের দিকে তাকাও, দেখো—আমরা নিজের মাতৃভূমিকে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখাব বলে অস্ত্র ধরেছি। এসো, দেখিয়ে দিই আমরা কতটা ভয়ঙ্কর! ওদের মনে করিয়ে দাও যে আমরা সিংহজাতক, আমরা এই বঙ্গদেশের নির্ভীক দামাল সিংহজাতক...’
মরতে মরতেও উজ্জীবিত হয়ে উঠল কিরাতশবরসেনা। শেষবারের মতো অস্ত্র তুলে ধরল তারা। তাদের চেতনার মধ্যে চারিয়ে গেল এই মহামন্ত্র—হয় স্বাধীনতা নয় মৃত্যু।
বঙ্গদেশের ভূমিপুত্ররা তাদের মাতৃভূমির নামে সংশপ্তক যুদ্ধে রত হল।
মৎস্যেন্দ্রনাথ দ্বৈরথ সমরে রত হলেন প্রকাশচন্দ্রের সঙ্গে। প্রকাশচন্দ্রের মুখে তখন ব্যঙ্গের হাসি। তাঁর মনোবল দ্বিগুণ। তিনি যেন অনেকটা খেলাচ্ছলেই প্রতিহত করতে লাগলেন মৎস্যেন্দ্রনাথের প্রতিটি আক্রমণ।
এদিকে বিদ্রোহীদের সংখ্যা কমতে কমতে প্রায় শূন্যের কোঠায়। অধিকাংশই আহত বা নিহত। কালকূটসেনা অনেক বেশি প্রশিক্ষিত, অনেক বেশি রণদক্ষ, অনেক বেশি কৌশলী। তাদের আঘাত সহ্য করার ক্ষমতাও অনেক বেশি। তারা পুনরায় ছোট ছোট বৃত্তে ঘিরে ধরতে লাগল প্রতিটি বিদ্রোহী নেতাদের।
দেদ্দদেবী আর পারছেন না। তাঁকে ঘিরে অন্তত দশজন কালকূটসেনা। তাদের আড়ালে তাঁকে আর দেখা যাচ্ছে না।
এদিকে যুদ্ধ করতে করতে পড়ে গেলেন শান্তরক্ষিত। দ্রুত তাঁর হাত-পা বেঁধে ফেলল একদল সৈন্য।
পদ্মসম্ভব আর মন্দর্ভা পাশাপাশি যুদ্ধ করছিলেন। ক্লান্ত শ্রান্ত পদ্মসম্ভব যতটা পারছিলেন আড়াল করে রাখছিলেন মন্দর্ভাকে। কিন্তু তাঁর অস্ত্রচালনা ক্রমেই লক্ষ্যহীন, অব্যবস্থিত, বিশৃঙ্খল হয়ে উঠছিল। জয়ের গন্ধ পেয়ে কালকূটসৈন্যরা দ্বিগুণ বেগে আক্রমণ করল তাঁকে। সুযোগ বুঝে কেউ একজন সজোরে আঘাত করল তাঁর ডান হাতে। তাঁর দা’ও ছিটকে পড়ে গেল। অন্য হাতের অসিটি বহু আগেই ভগ্ন হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত তিনিও পারলেন না। দশজন ঝাঁপিয়ে পড়ল তাঁর ওপর। তাঁর দু’হাত চেপে ধরল চার জন বলশালী সৈন্য। পায়ে বেড়ি বেঁধে দিল কেউ।
মন্দর্ভার হাতের অস্ত্র কেড়ে নিয়ে কেউ একজন সজোরে চপেটাঘাত করল তাঁর গালে। তিনি পড়ে গেলেন। তাঁর মুখ ফেটে রক্ত বেরিয়ে এল।
যুদ্ধ করতে করতে হঠাৎ থেমে গেলেন প্রকাশচন্দ্র। থমকে গেলেন মৎস্যেন্দ্রনাথও। নিজের মহাখড়্গ তুলে সেই দৃশ্যটি মৎস্যেন্দ্রনাথকে দেখালেন প্রকাশচন্দ্র। তারপর শান্তস্বরে বললেন, ‘কী যোগীবর, এখনও যুদ্ধের সাধ আছে?’
সেদিকে বেশ কিছুক্ষণ নির্নিমেষে তাকিয়ে রইলেন মৎস্যেন্দ্রনাথ। তাঁর হাত থেকে ত্রিশূলটি মাটিতে পড়ে গেল ঝনঝন শব্দ তুলে।
অবশেষে তিনি পরাজিত। সর্বাংশে, সামূহিকভাবে পরাজিত। এই ধুরন্ধর ঐন্দ্রজালিকের কূটকৌশলের কাছে পরাস্ত হয়েছে তাঁর যাবতীয় পরিকল্পনা, সমস্ত যুদ্ধপ্রস্তুতি। তাঁর বিপ্লবকল্পনার নায়কেরা সকলেই পরাজিত। মহাবীর জয়াপীড় অজ্ঞান, নিশ্চেষ্ট। যোদ্ধৃশ্রেষ্ঠ বপ্যট নিহত। খুব সম্ভবত গোপালদেবও ইতিমধ্যেই নিহত। পদ্মসম্ভব, শান্তরক্ষিত, মন্দর্ভা, দেদ্দদেবী ধৃত। অন্যান্য শৈবযোগী এবং সহজিয়া সাধকদের অধিকাংশই মৃত অথবা সাঙ্ঘাতিকভাবে আহত। তাঁর সমস্ত পরিকল্পনা এখন উলঙ্গ, মৃত বরাহের মতো অনাবৃত শুয়ে আছে নির্মম কসাইয়ের সামনে।
প্রকাশচন্দ্রের সামনে হাঁটু গেড়ে বসলেন মৎস্যেন্দ্রনাথ। দু’হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘এই সমস্ত কর্মকাণ্ড আমারই ইঙ্গিতে চালিত হয়েছে আর্য প্রকাশচন্দ্র। আমিই এর একমাত্র দায়ভাগী, একমাত্র অপরাধী। যা শাস্তিবিধান এদের যোগ্য হয়, সে শুধু মাত্র আমারই প্রাপ্য। আমার কাতর অনুরোধ, এদের ছেড়ে দিন। বিনিময়ে আপনি আমাকে বন্দি করুন। কথা দিচ্ছি, যা শাস্তি দেবেন, মাথা পেতে নেব।’
মৎস্যেন্দ্রনাথের বুকে সজোরে লাথি মারলেন প্রকাশচন্দ্র। মৎস্যেন্দ্রনাথ ছিটকে পড়ে গেলেন সামান্য দূরে। ধীরে ধীরে সেখানে এসে দাঁড়ালেন প্রকাশচন্দ্র। একটা অশ্রাব্য শব্দ উচ্চারণ করলেন৷ তারপর নীচু হয়ে বাঁহাতে লোকেশ্বর মৎস্যেন্দ্রনাথের চুলের মুঠি ধরে তাঁকে সেই ধূলিধূসরিত রণভূমি দিয়ে টানতে টানতে নিয়ে চললেন মন্দর্ভা আর পদ্মসম্ভবের দিকে।
ধীরে ধীরে বনচর মানুষটি উঁকি দিল গিরিপথের পাথরের আড়াল থেকে। তার মুখ দেখে তার মনোভাব বোঝা ভার।
তারপর তার পাশে মাথা বাড়াল আরও কয়েকটি উলঙ্গ নারী। তাদের মুখে এক দুর্বোধ্য হাসি ফুটে উঠল।
তারা যখন যুদ্ধের দৃশ্য দেখতে ব্যস্ত, তখন একটু করে পিছিয়ে যাচ্ছিল চণ্ডকীর্তি। আশা করা যায় যে এই পিশাচী ডাকিনীদলের কাছে তার প্রয়োজন ফুরিয়েছে৷ এবার সে নিশ্চিন্তে তার পৈতৃক প্রাণটি নিয়ে সরে পড়তে পারে।
ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছিল সে। আর একটু ডানদিকে, ব্যস। তারপরেই একটি গোপন গিরিগুহা আছে, যার মধ্যে ঢুকে পড়তে পারলেই সে একেবারে নিশ্চিন্ত। গুহামুখটি চট করে বোঝা যায় না। আর পাথর দিয়ে বন্ধ করে দিলে তো কথাই নেই, এরা আর তার নাগাল পাবে না। গুহার অন্য মুখটি শালিবন বিহারের পিছনে মেঘান্দর তীরে কোথায় উন্মুক্ত হয়, তা সে ভালোভাবেই জানে।
আর দু’পা। আর একটা বাঁক। মুক্তি ঠিক তার সামনে।
ডানদিকে একবার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল সে। গুহামুখ খালি। কেউ নেই।
ডানদিকে ঘুরল চণ্ডকীর্তি। আর একটি মাত্র পদক্ষেপ। তারপরেই সে মুক্ত।
ঠিক তখনই পিছন থেকে কে যেন টেনে ধরল তার চুল। আর একটা বীভৎসদর্শন খড়্গ সবেগে নেমে এল তার কণ্ঠার ওপর। একেবারেই মুক্তি পেয়ে গেল চণ্ডকীর্তি।
মাটিতে পড়ে ধুঁকছিলেন পদ্মসম্ভব। তাঁকে দেখে মনে হচ্ছিল যেন শ্রান্তক্লান্ত পরাজিত সিংহকে ঘিরে ধরেছে একদল রক্তপিপাসু তরক্ষু।
প্রবল রক্তক্ষরণে অজ্ঞানপ্রায় দেদ্দদেবীর চুলের মুঠি ধরে টেনে আনল একদল কালকূটসেনা। তারপর হিংস্র শ্বাপদের দল ঘিরে ধরল কয়েকটি শ্রান্তক্লান্তক্ষিপ্ত মৃতপ্রায় শরীরকে।
মৎস্যেন্দ্রনাথকে সামান্য ভিক্ষুকের মতো টেনে আনতে দেখে উৎসাহে উল্লাসে ফেটে পড়ল সেই শ্বাপদের দল। তারপর তারা দাঁড়াল প্রকাশচন্দ্রকে ঘিরে।
নিজের রক্তস্নাত মহাখড়্গ কোষবদ্ধ করলেন প্রকাশচন্দ্র। তারপর প্রসন্নমুখে বললেন, ‘অভিনন্দন, হে বিজয়ী বীরেরা। তোমাদের বলদর্পেই এই বিশ্বাসঘাতক বিদ্রোহীকূল পরাস্ত হয়েছে৷ এসো, এবার তোমাদের বিজয়স্মারক গ্রহণ করো। আপাতত এই দুই যুদ্ধবন্দিনী নারীদের ভোগ করে তোমাদের কামতৃষা মিটুক। জেনে রাখো, যুদ্ধবন্দিনী ধর্ষণ অবশ্যই ন্যায়সঙ্গত, কারণ আমি, একেশ্বর প্রকাশচন্দ্র, তাকে বৈধ করেছি তোমাদের জন্য...’
বলতে বলতেই নীচু হয়ে মন্দর্ভার ঊর্ধ্বাঙ্গের বস্ত্র টেনে নিলেন প্রকাশচন্দ্র। মন্দর্ভার বরাঙ্গের স্তনদুখানি অনাবৃত হয়ে পড়ল। নিরূপায় ব্যর্থ ক্রোধে চিৎকার করে উঠলেন পদ্মসম্ভব। সেই জান্তব চিৎকার শুনে কালকূটসেনার উল্লসিত হয়ে উঠল। তাদের অশ্লীল শিবারবে মুখরিত হয়ে উঠল চারিদিক।
মৎস্যেন্দ্রনাথ সজল আঁখিদুখানি বন্ধ করলেন। হা, ঈশ্বর এও দেখতে হবে তাঁকে?
তারপর তিনি ধ্যানস্থ হলেন।
এই তো! এই তো সেই যন্ত্র!
গোপালদেব অতি দ্রুত সেই যন্ত্রটি হাতে তুলে নিলেন। তিব্বতের পোনপুরোহিতদের গোপন গুহা থেকে উদ্ধার করে আনা সেই মহাস্ত্র, চন্দ্রবজ্র সব কিছু ঠিক আছে তো?
ধীরে ধীরে সেই নগ্ন, শীর্ণ, ক্লান্ত নারীশরীর ফিরে তাকাল তাঁর দিকে।
একখানি দীপ তখনও জ্বলছিল দীপাধারে। গোপালদেব তাঁর যন্ত্রের পলিতাটি থরথর হাতে সেই দীপালোকে সংযুক্ত করলেন।
হা-হা করে হেসে উঠলেন প্রকাশচন্দ্র। ব্যঙ্গস্বরে বললেন, ‘মহামান্য কুমার পদ্মসম্ভব দেখছি বীরগতি প্রাপ্তির জন্য বড়ই উতলা হয়ে পড়েছেন। ওরে, কে আছিস, এই অর্বাচীনের দেহটি এর প্রেয়সীর ওপরে ফেল। ওই বহুভর্তৃকা ডাকিনীকে ওর প্রেমাস্পদের রক্তে স্নান করা। তবেই তো আনন্দ অধিক হবে রে!’
কয়েকজন কালকূটসেনা টেনে হিঁচড়ে পদ্মসম্ভবের দেহটি উপুড় করে তুলে দিল মন্দর্ভার দেহের ওপর। বাকিরা উল্লাসে চিৎকার করে উঠল।
পদ্মসম্ভবের রক্তস্নাত চোখ দু’খানি চেয়ে রইল মন্দর্ভার দিকে। কত শতাব্দ-সহস্রাব্দের সঞ্চিত কথা যেন বয়ে গেল মৃত্যুক্ষুধাতুর দুই মানুষ মানুষীর দৃষ্টিসঙ্কেতে।
অত যন্ত্রণার মধ্যেও পদ্মসম্ভব ফিসফিস করে বললেন, ‘আর্যা, দেখা হবে শীঘ্রই।’
চোখ বুজলেন মন্দর্ভা। এই মুহূর্ত থেকেই তিনি মৃত।
প্রকাশচন্দ্র পদ্মসম্ভবের মুণ্ডচ্ছেদের জন্য তরবারি তুললেন৷
বহু কষ্টে ফিরে তাকাল সেই নগ্ন শীর্ণ নারী শরীর। তার সারা দেহ ভেঙে পড়েছে শ্রান্তিতে। প্রতি বিষপ্রয়োগের পর এই মৃত্যুগ্রাসী শ্রান্তি তাঁকে গ্রাস করে। তবে প্রতিবার সেই শ্রান্তিক্ষতে প্রলেপ দেয় একটি দৃশ্য। বিছানায় বা মেঝেতে শায়িত একটি মৃতদেহ।
এদিক ওদিক তাকালেন তিনি। কোথায় সেই কাঙ্ক্ষিত মৃতদেহ?
তারপর দৃষ্টি সামান্য ওপরে তুললেন তিনি।
তাঁর দুই ভ্রূর মধ্যে লক্ষ্যস্থির করে রয়েছে একটি ধাতব নল।
প্রকাশচন্দ্র তাঁর মহাখড়্গ তুললেন।
আর ঠিক সেই সময়েই একটি মহিষশিঙার তীক্ষ্ণ ধ্বনি সচকিত করে তুলল চারিদিক।
থেমে গেলেন প্রকাশচন্দ্র। স্তব্ধ হল কালকূটসেনাও। কোথা থেকে আসছে এই ধ্বনি? কে যুদ্ধহুঙ্কার তোলে কালকূটসেনার বিরুদ্ধে?
প্রত্যেকের দৃষ্টি ঘুরে গেল লালিম্ববন পাহাড়ের দিকে।
লালিম্ববনের ঠিক মধ্যস্থানে একটি উন্মুক্ত চাতাল। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে একটি বিশালকায় নগ্নদেহ বনচারী মানুষের অবয়ব। তার ঠিক পিছনে অস্ত যাচ্ছেন দেব দিবাকর।
পদ্মসম্ভব বহুকষ্টে সেদিকে তাকালেন একবার। তারপর অস্ফূটস্বরে বললেন, ‘শবরবজ্র!’
কজঙ্গলের অরণ্যসম্রাট শবরবজ্র দুহাত ওপরে তুলে ধরলেন। তারপর ভীমনাদে চিৎকার করে উঠলেন, ‘কালী, কালী রে!’
মুহূর্তপর একটি খর্বকায় অথচ অতি সুঠাম নারীশরীর এসে দাঁড়াল তাঁর ডানপাশে। তার কোমরে বন্যবাকলের আবরণ। ঊর্ধ্বাঙ্গের অতি সুডৌল স্তন দুটি অনাবৃত। কুঞ্চিত কেশরাশিদাম নেমে এসেছে কটিদেশ অবধি।
চোখ ভয়ঙ্কর লাল। তার গলায় ঝুলছে নরকরোটির মালা। তার ডানহাতে একটি অতি বৃহৎ, অতি বীভৎস, অতি ভয়াল দা’ও।
আর তার বাঁ-হাতে একটি মুণ্ড। চণ্ডকীর্তির কাটা মুণ্ড।
ধীরে ধীরে সেই উলঙ্গিনী খড়্গধারী নারীমূর্তির পাশে এসে দাঁড়াল আরও শত শত উলঙ্গ রমণীর দল।
কালী নামের নারীটি একবার মুখ তুলে তীক্ষ্ণ উলু উলু ডাক তুলল। সঙ্গে সঙ্গে অন্য নগ্ন ডাকিনীরাও সমস্বরে ডেকে উঠল উলু উলু ধ্বনিরবে। ডেকে উঠল শত শত শৃগালের দল।
সেই সমবেত তীব্র-তীক্ষ্ণ ভয়াল চিৎকারে চমকে উঠল লালিম্ববন পাহাড়। চমকে উঠল কলস্বিনী মেঘান্দ। চমকে উঠল বিশ্বচরাচর।
তারপর তারা নেমে আসতে থাকল লালিম্ববনের দেহ বেয়ে।
প্রকাশচন্দ্র স্তম্ভিত চোখে দেখলেন—লালিম্ববন পাহাড় বেয়ে নেমে আসছে শত শত নগ্ন নারীদের দল। নেমে আসছে বন্যার মতো, উল্কার মতো, দাবানলের মতো, ধ্বংসের মতো। তাদের মুখে সেই হাড়হিম করে দেওয়া উলু উলু ধ্বনি।
আর তাদের সঙ্গে লাফিয়ে লাফিয়ে নেমে আসছে ক্ষুধার্ত, হিংস্র, বন্য শিবাদল!
প্রকাশচন্দ্র ধীরে ধীরে পিছতে লাগলেন। পিছু হটতে লাগল তাঁর গর্বের কালকূটসেনাদলও। কারণ বন্য শিবাদের সঙ্গে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নেই।
বাতাস কেটে ভেসে আসা অগ্নিপিণ্ডটির দিকে তাকিয়ে ছিলেন মহারানি। মুহূর্তের মধ্যেই তাঁর ভ্রূমধ্যে আছড়ে পড়ল সেই মৃত্যুর অগ্নিদূত। চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল তাঁর কপাল। আর সেখান থেকে ছিটকে বেরোল একরাশ তরল।
না, লাল নয়, সেই রক্তের রঙ কালো। ঘন অন্ধকারের মতো কালো।
বঙ্গদেশের একচ্ছত্রাধিপ রানির দেহটি পড়ে গেল মাটিতে। আর ধীরে ধীরে সেই নগ্ন শীর্ণ দেহ গলে যেতে লাগল, মিশে যেতে লাগল সেই একরাশ ঘনকৃষ্ণ তরলের মধ্যে।
নিজের বাম হাতের তর্জনী তুলে ধরলেন প্রকাশচন্দ্র। কালো হয়ে গেছে সেটি।
তার মানে রানি মৃত? কিন্তু, কিন্তু কী করে?
অবাক হওয়ারও সময় পেলেন না প্রকাশচন্দ্র। সেই নরমাংসলোলুপ ডাকিনীর দল ঝাঁপিয়ে পড়েছে তাঁর সৈন্যদের ওপর। ঝাঁপিয়ে পড়েছে রক্তপায়ী শৃগালের ঝাঁক।
উল্টোদিকে ফিরে ছুটতে শুরু করলেন প্রকাশচন্দ্র। এরা তাঁকে ধরতে পারবে না। দৌড়তে দৌড়তে তাঁর রথের বাহন একটি ষণ্ডকে সামনে পেয়ে গেলেন তিনি। তার ওপর চড়ে বসলেন প্রকাশচন্দ্র। তাঁর অবয়ব মিলিয়ে গেল বহুদূর।
আর খানিকক্ষণ থেকে গেলে দেখে যেতে পারতেন প্রকাশচন্দ্র, শালিবন বিহারের সামনের প্রান্তর থেকে অতি ভীমনাদে, শত সহস্র ভৈরবীকণ্ঠে জয়ধ্বনি উঠছে, ‘জয় গৌড়, জয় বঙ্গ, জয় শশাঙ্ক।’
সেই মহাযুদ্ধের প্রায় এক পক্ষকাল পর এক শুক্ল ত্রয়োদশী। একদিন পূর্বেই খণ্ডিতারাতি বপ্যটসহ সমস্ত মৃত বিদ্রোহী নায়কদের শ্রাদ্ধবিধি সুসম্পন্ন হয়েছে৷ আচার্য শান্তরক্ষিত স্বয়ং সেই শ্রাদ্ধকার্যের ভার নিয়েছেন। মাতৃভূমির ধর্ম রক্ষার্থে, স্বাধীনতা রক্ষার্থে উৎসর্গীকৃত প্রতিটি প্রাণ যেন তুষিতস্বর্গে স্থান পায়, অবলোকিতশ্বরের কাছে এই কামনাই করেছেন তিনি।
সেইদিন প্রভাত থেকেই বজ্রযোগিনী মন্দিরের সামনে ভেঙে পড়েছে উৎসাহী মানুষের ঢল। চারিদিকে স্বতস্ফুর্ত উৎসবের রেশ। প্রতিটি গৃহবাসী নিজ নিজ বাসস্থান ফুলমালা আর শোলার সাজে সাধ্যমত সাজিয়েছে। হেমন্তশেষের মৃদু উষ্ণ বাতাসে বসন্তের আগমনের বার্তা সুস্পষ্ট। সেই বাতাসে মুক্তির স্বাদ, স্বাধীনতার আস্বাদ। আর তারই ছোঁয়া পেতে দলে দলে শিশু বৃদ্ধ যুবক যুবতী ভিক্ষু বণিক সন্ন্যাসী সংসারী সবাই ছুটে চলেছে মন্দিরের মূল প্রবেশদ্বারের সামনে।
মন্দিরের ঠিক সামনে স্থাপন করা হয়েছে বঙ্গদেশের রাজসিংহাসন। প্রশস্ত সিংহাসনটি স্বর্ণনির্মিত। তার চার কোণে চারটি অনুচ্চ রৌপ্যস্তম্ভ। স্তম্ভগুলি বহুবিচিত্র কারুকার্যখচিত। প্রতিটি স্তম্ভের মাথায় একটি করে সিংহমূর্তি।
সেই সিংহাসনের একদিকে বসে আছেন গোপালদেব। তাঁর পরিধানে পায়ের কণ্ঠা অবধি লম্বিত একখানি কাপাসবস্ত্রের ধুতি। তার শেষপ্রান্তটি ঘুরিয়ে এসে সামনে কটিবন্ধের সামনে দুলছে। তাঁর সুবিশাল ঊর্ধ্বাঙ্গ অনাবৃত। তাঁর ঘনকুঞ্চিত কেশদাম নেমে এসেছে কাঁধ অবধি৷ তাঁর উদ্ধত গ্রীবাদেশে, প্রশস্ত স্কন্ধে, আর চন্দনচর্চিত বলিষ্ঠ বাহুদেশে রাজলক্ষণ সুস্পষ্ট। তাঁর ভুজবন্ধে সুবর্ণ অঙ্গদ। তাঁর গলায় সোনার হার। তাঁর চোখদুটি শান্ত, গভীর এবং সমাহিত।
গোপালদেবের বাঁ পাশে বসে আছেন দেদ্দদেবী। দেদ্দদেবীর পরণে একখানি অতি শুভ্র রেশম শাড়ি, তার পাড় এবং আঁচলটি লাল রঙে ছোপানো। কোমল বক্ষ পটবস্ত্র আবৃত। শাড়ি এবং স্তনপট্ট মন্দর্ভার, তিনি ভগিনীসমা দেদ্দদেবীকে উপহার দিয়েছেন। দেদ্দদেবীর চোখ দু’খানি কাজলে আঁকা৷ কপালের মধ্যিখানে একখানি রক্তচন্দনের টিপ, তাকে ঘিরে অতি অপূর্ব শ্বেতচন্দনের কল্কা। দেবীর পায়ে লাক্ষারস অলক্তক। তাঁর দুহাতে অতি শীর্ণ দুখানি লৌহকঙ্কন, দুটি শঙ্খবালা এবং দুটি রক্তলাল প্রবালের চুড়ি। তাঁর সর্বাঙ্গে আর্দ্র চন্দনপঙ্কের চিত্রকলা। ঘনকৃষ্ণ কেশদাম সুউচ্চ চূড় করে বাঁধা। এই কবরীবন্ধন বড় সাধ করে বেঁধে দিয়েছেন শবরবজ্রের সঙ্গে আগত ভৈরবীরা। এই খোঁপা কজঙ্গলের নারীদের বড় প্রিয়।
একটু পরেই একটি অতি বৃহৎ জলপূর্ণ ঘট নিয়ে এগিয়ে এলেন আচার্য শান্তরক্ষিত। ঘট গোপালদেবের পায়ের কাছে রাখলেন। আর একে একে দশজন এগিয়ে এলেন তাঁদের হাতে ধরা মৃত্তিকাখণ্ড নিয়ে।
প্রথমে এগিয়ে এলেন শবরবজ্র, কজঙ্গলের বরাহদন্তমৃত্তিকা নিয়ে। তারপর এগিয়ে এলেন কমলাঙ্ক গ্রামের শবরপ্রধান, হস্তিদন্তমৃত্তিকা নিয়ে। ভিক্ষুণী মন্দর্ভা নিয়ে এলেন গঙ্গামৃত্তিকা। কুমার পদ্মসম্ভব নিয়ে এলেন লালিম্ববন পাহাড়ের মাটি। কুমার জয়াপীড় নিয়ে এলেন প্রকাশচন্দ্রের রথষণ্ড দুটির শৃঙ্গধূলা। রাজবৈদ্য কুল্লুকভট্ট নিয়ে এলেন রাজপ্রাসাদদ্বারের প্রস্তরখণ্ড। মহাসামন্ত ধর্মসেন নিয়ে এলেন বল্মীকস্তূপের মাটি।
সবশেষে এলেন ভাঁড়ুদত্ত আর তাঁর প্রিয়তম কিঙ্কিণী মায়া! আর এলেন বিশুদ্ধকীর্তি এবং তাঁর সাধের নন্দিনী। বহুবিধ মরণান্তিক অভিজ্ঞতার পর তাঁরা দুজনেই ফিরে এসেছেন কর্মান্তবাসকে। মায়া নিয়ে এসেছেন তাঁর গৃহদ্বারের মৃত্তিকা। বেশ্যাদ্বারমৃত্তিকা!
আচার্য বিশুদ্ধকীর্তি, আচার্য শান্তরক্ষিত এবং লোকেশ্বর মৎস্যেন্দ্রনাথ সেই সব মৃত্তিকাংশ মিশিয়ে দিলেন জলপূর্ণ ঘটটিতে৷ তারপর সেই কলসটি তুলে ধরলেন মৎস্যেন্দ্রনাথ। ধারাস্নানে অভিষিক্ত করে দিতে লাগলেন গোপালদেবকে। সঙ্গে চলতে থাকল মন্ত্রপাঠ, ‘ওঁ রাজাধিরাজায় প্রসহয় সাহিনে। নমো বয়ং বৈশ্রবণায় কুর্মহে...’
ধারাস্নানে ভেসে যাচ্ছিল গোপালদেবের মস্তক। সেইদিকে তাকিয়ে চোখ বুজলেন শান্তরক্ষিত। তিনি পণ্ডিতশ্রেষ্ঠ, এই উপচারের প্রতিটি অর্থ জানেন। রাজা পর্বতশিখরস্থ মৃত্তিকা দ্বারা মস্তক শোধন করবেন, অর্থাৎ শীতল মস্তিষ্কের দ্বারা রাজ্য পরিচালনা করবেন। বল্মীকস্তূপমৃত্তিকা দ্বারা কর্ণশোধন করবেন, অর্থাৎ সাধারণ মানুষের তুচ্ছাতিতুচ্ছ বিষয়ও যেন তাঁর গোচরে আসে। হস্তিদন্তমৃত্তিকা শোধন করবে তাঁর দক্ষিণহস্ত, যাতে তাঁর বাণিজ্য বিষয়ে মতি হয়। ষণ্ডদন্তমৃত্তিকায় বর্ধিত হবে তাঁর বাহুবল, সৈন্যশক্তি। রাজপ্রাসাদদ্বারের মৃত্তিকাস্পর্শে রাজ্যাধিকার বিষয়ে সম্যকরূপে অবগত হবেন৷ আর বেশ্যাদ্বারমৃত্তিকায় তিনি রাজ্যের সর্ববিধ রূপগুণের উৎকর্ষসাধনে রত হবেন।
রাজ্যাভিষেকস্নান শেষ হওয়ার পর এগিয়ে এলেন বিনয়াদিত্য জয়াপীড়। প্রকাশচন্দ্রের মন্ত্রঃপূত অজেয় খড়্গ তুলে রাখলেন গোপালদেবের পায়ের কাছে। হাতজোড় করে নতমস্তকে বললেন, ‘আশা করি এতদিনে পিতামহের কলঙ্কমোচন করতে সমর্থ হয়েছি। আজ থেকে কাশ্মীরবাসীরা বঙ্গদেশের কাছ হতে ঋণমুক্ত হল। আমি, কাশ্মীর নরেশ বিনয়াদিত্য জয়াপীড়, বঙ্গদেশের অধীশ্বর গোপালদেবকে সশ্রদ্ধ অভিবাদন জানাচ্ছি।’
এগিয়ে এলেন মহাসামন্ত ধর্মসেন, নিজের কটিবন্ধনটি খুলে গোপালদেবের পায়ের কাছে রাখলেন। তারপর অতি বিনীতভাবে বললেন, ‘আজ হতে বঙ্গদেশের অনন্তসামন্তচক্র সম্রাট গোপালদেবের আজ্ঞাধীন হল। আমি, মহাসামন্ত ধর্মসেন, ন্যায় ও ধর্মের পথে থেকে সম্রাট গোপালদেবের জন্য জীবনপাত করার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ রইলাম।’
এগিয়ে এলেন বৃদ্ধ গৌড়াধিপতি জয়ন্ত। স্মিতহাস্যে বললেন, ‘আমি পুত্রহীন, উত্তরাধিকারীহীন। আমার জামাতা মহাবীর জয়াপীড় স্থির করেছেন যে তিনি সস্ত্রীক কাশ্মীরে ফিরে যাবেন, গৌড়শাসনের ভার তিনি নেবেন না। তাই গৌড় ও পুণ্ড্রের শাসনভার আমি এই দণ্ডেই মহামতি গোপালদেবের শ্রীহস্তে সমর্পণ করলাম।’
চারিদিক মহাহর্ষধ্বনিতে পরিপূর্ণ হল। বহুজনের বহুদিনের লালিত অখণ্ড গৌড়বঙ্গের স্বপ্ন এবার সত্য হতে চলেছে। কে যেন চিৎকার করে বলে উঠল, ‘জয় গৌড়, জয় বঙ্গ, জয় শশাঙ্ক। পালশাসন দীর্ঘজীবী হোক।’ উপস্থিত জনতা তাতে মুহুর্মুহু সায় দিল।
কোলাহল কিছু স্তিমিত হতে একে একে উঠে দাঁড়ালেন কজঙ্গল হতে আগত চৌষট্টিজন ভৈরবী ডাকিনী। তাঁরা সিংহাসন ঘিরে বিচিত্র আরণ্যস্তোত্র উচ্চারণে, বিচিত্রতর পূজা সমারোহে, অত্যদ্ভুত নৃত্য প্রদর্শনে আশ্চর্য মায়া সৃষ্টি করলেন। উপস্থিত জনতা মোহিত হয়ে সেই আশ্চর্য নৃত্যাভিষেক দেখতে লাগল।
নৃত্যাভিষেক শেষ হলে পর আটজন প্রধান যোগিনী একের পর এক দেদ্দদেবীর মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করে গেলেন। তাঁর উজ্জ্বল গোধূমবর্ণ গণ্ডদেশ লজ্জায় লাল হয়ে উঠল। গোপালদেব মৃদু-মৃদু হাসতে লাগলেন।
তারপর বিভিন্ন উপচার হাতে এগিয়ে এলেন কর্মান্তবাসকের সাধারণ জনবৃত্ত, সমাজের সর্বস্তরের প্রতিনিধিরা। সামন্ত থেকে আচার্য, বণিক থেকে কৃষক, সন্ন্যাসী থেকে সৈন্য, কৃষক থেকে কর্মকার, কুম্ভকার থেকে শৌণ্ডিক, শবর থেকে কিরাত, জালিক থেকে কৈবর্ত...
সবার উপহার নিবেদন শেষ হলে উঠে দাঁড়ালেন গোপালদেব। তাঁর পিছনে চক্রাকারে ঘিরে দাঁড়ালেন সহজিয়া বৌদ্ধ এবং শৈবযোগীদের দল।
উদাত্ত মন্ত্রকণ্ঠে গোপালদেব বললেন, ‘আমি, সর্ববিদ্যাবিশারদ দয়িতবিষ্ণুর পৌত্র, মহাবল খণ্ডিতারাতি বপ্যটের পুত্র গোপালদেব, পরম কারুণিক তথাগত, ভগবান আদিনাথ, একাদশ রুদ্র এবং দশদিকাধিপতিদের সাক্ষী রেখে শপথ করছি, আজীবন সত্য, ন্যায় এবং ধর্মের পথে থেকে গৌড়বঙ্গের সেবা করব। আমি মনে রাখব, দেশের মাটির থেকে বড় মন্দির নেই, দেশের মানুষের থেকে বড় ঈশ্বর নেই, দেশসেবার থেকে বড় ধর্ম নেই। আপনারা আশীর্বাদ করুন, আমার রাজশাসন যেন ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র, দীনাতিদীন মানুষেরও সেবায় সমর্থ হয়...।’
সবার শেষে একটি বৃক্ষের আড়ালে দাঁড়িয়েছিলেন একজন পুরুষ এবং এক নারী। পুরুষটি বামদিকে সামান্য ঝুঁকে বললেন, ‘আর্যা, ওই রাজ্ঞীর আসনে কিন্তু আপনাকেও মন্দ মানাত না।’
মন্দর্ভা ছদ্মকোপে বক্তার বুকে কিল মারতে গেলেন। পদ্মসম্ভব সেই হাত দুটি ধরে তাঁকে নিজের কাছে টেনে নিলেন। মন্দর্ভা চক্ষু বন্ধ করে বললেন, ‘আপনার জন্য আমি ইন্দ্রাণীর পদও প্রত্যাখ্যান করতে পারি নাথ। রাজশাসন তো তুচ্ছ।’
পদ্মসম্ভব তাঁর ঠোঁটদুটি ডুবিয়ে দিলেন প্রেয়সীর অধরে। মন্দর্ভা দুই হাত দিয়ে পদ্মসম্ভবের গলা জড়িয়ে ধরলেন।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন