হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

দ্বিপ্রহরের প্রখর সূর্যকিরণের নীচে দাঁড়িয়ে যেন ধারাস্নান করছে গভীর বনভূমি। শব্দ বলতে শুধু মাঝে মাঝে ভেসে আসছে কুইলির ক্ষুদ্র সেনাদলের ঘোড়াগুলোর ডাক। সে শব্দ যেন এই জীর্ণ পাথুরে বাড়িটার চারপাশের নিস্তব্ধতাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে!
এই জীর্ণ, ভগ্নপ্রায় গৃহ কে, কবে এই জঙ্গলের ভিতর বানিয়ে ছিল তা জানা নেই কুইলির। হয়তো এই বাড়িটি কোনও এক সময় কোনও রাজা বা অভিজাত ব্যক্তির মৃগয়া প্রাসাদ ছিল। অথবা এমনও হতে পারে এ বাটিকা ছিল লোকচক্ষুর অগোচরে কোনও ধনীব্যক্তির প্রমোদ প্রাসাদ।
হ্যাঁ, কয়েক মাস ধরে এ স্থানই 'ভিরথালাপথি', অর্থাৎ 'বীর সেনাপতি' কুইলি ও তার গুপ্তঘাতক বাহিনীর আস্তানা। এই বনভূমির অগম্যতার কারণে, এবং অতর্কিত প্রাণঘাতী আঘাতের ভয়ে সাধারণত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ফৌজও জঙ্গলের গভীরে প্রবেশ করতে চায় না।
ঘরটা মাঝারি আকৃতির। গবাক্ষগুলো গরাদহীন। পাথরের মেঝে মাকড়শার জালের মতো চৌচির হয়ে ফাটা। কোনও আসবাবপত্র নেই কক্ষে, থাকার কথাও নয়। শুধু ঘরের দেওয়ালের গায়ে একটু কুলুঙ্গি মতো জায়গাতে রাখা আছে কাঠের তৈরি একটা পেটিকা বা তোরঙ্গ। ওই তোরঙ্গটাই কুইলির একমাত্র সম্পত্তি। না, ওই কাঠের তৈরি অতি সাধারণ পেটিকার মধ্যে হিরে-জহরত বা কোনও দুর্মূল্য স্বর্ণালঙ্কার নেই, ওর মধ্যে জমা রাখা আছে কুইলির অতীত, কুইলির স্মৃতি। ওই কাঠের তোরঙ্গটাই তো কাঁধে করে কুইলির বাবা পেরিয়ামুথন একদিন বালিকা কুইলির হাত ধরে গ্রাম ছেড়ে অজানা জীবনের উদ্দেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন। আর কুইলিও যেখানে যেখানে যায়, সঙ্গে করে নিয়ে যায় তার বাল্যকাল-কৈশোর-যৌবনে পদার্পণ করার স্মৃতি ভর্তি ওই তোরঙ্গটাকে।
তলোয়ারটা পাশে নামিয়ে ঘরের এককোণে পাতার স্তূপের ওপর বসেছিল কুইলি। তার সহকারী শুভলক্ষ্মী নিশ্চয়ই এতক্ষণে ঘোড়াগুলোকে জিন-রেকাব পরাতে শুরু করেছে। বেশ অনেকটা দূরের পথ পাড়ি দিতে হবে কুইলিকে, জঙ্গল ছেড়ে বাইরে বেরোতে হবে কুইলিকে। ঘোড়াগুলোকে প্রস্তুত করে শুভলক্ষ্মী এসে তাকে ডাক দিলেই বেরিয়ে পড়বে সে।
বেশ কিছুদিন তোরঙ্গটা খোলা হয়নি তার। সূর্যরশ্মি কুলুঙ্গিতে রাখা তোরঙ্গের ওপর এসে পড়তেই সেটার দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থাকার পর কুইলি উঠে পড়ল তোরঙ্গটা খোলার জন্য।
কুলুঙ্গির কাছে গিয়ে তোরঙ্গটা যত্ন করে মাটিতে নামিয়ে হাঁটু মুড়ে বসল কুইলি। তোরঙ্গের কোণগুলো লোহার পাত দিয়ে মোড়া। এক সময় তোরঙ্গের গায়ে ফুল পাতার অলঙ্করণ ছিল, কিন্তু সেসব আজ আর নেই। বহু ব্যবহার ও রজ্জুবদ্ধ অবস্থাতে ঘোড়ার পিঠে পরিবহনের ফলে দড়ির ঘষাতে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে সেই অলঙ্করণ। এমনকী পেটিকার পৃষ্ঠদেশে অস্ত্রাঘাতের চিহ্নও আছে। দুর্মূল্য কোনও সম্পদ আছে ভেবেই কুইলির কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতে এসেছিল অস্ত্রধারী দস্যু। তবে শেষ রক্ষা হয়নি। কুইলি নারী হলেও তার সাহস আর সিলামবম অর্থাৎ মার্শাল আর্টের শিক্ষার সঙ্গে পরিচিত ছিল না সেই দস্যু। এই পেটিকার আঘাতেই শেষ পর্যন্ত সেই অস্ত্রধারীর মস্তক চূর্ণ করে দিয়েছিল অদ্ভুত ক্ষিপ্র শারীরিক সক্ষমতার অধিকারিণী যুবতী।
পেটিকার সামনে বসে প্রথমে কুইলি তার ডালাটার ওপর পরম মমতায় একবার হাত বোলাল। যতবার কুইলি এভাবে তোরঙ্গটাকে স্পর্শ করে, ডালাটাকে খোলে ততবারই যেন সে মুহূর্তের মধ্যে পৌঁছে যায় তার শৈশব, কৈশোর, যৌবনের পদার্পণের দিনগুলোতে। তার চারপাশ থেকে মুছে যায় অন্য সবকিছু।
কাপড়ের আস্তরণের ভাজে ভাজে যত্ন করে রাখা আছে জিনিসগুলো। কুইলি প্রথম আস্তরণটা সরাতেই তার আড়াল থেকে বেরিয়ে এল বেশ কয়েকটা ছোট ছোট তির। পুরোনো তিরের ফলাগুলোতে মরচে পড়ে গেছে, পালকগুলো খসে গেছে। তিরগুলো হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখতে লাগল কুইলি। তার চোখে ভেসে উঠতে লাগল দূরের এক অরণ্য প্রদেশে তার ফেলে আসা শৈশবের ছবি। এই তিরগুলো দিয়েই শৈশবে প্রথম অস্ত্রশিক্ষার হাতেখড়ি হয় কুইলির।
তার জন্ম অরুনাথাইয়ার সম্প্রদায়ে। এই সম্প্রদায়ের নারীদের মধ্যে অস্ত্রশিক্ষার চল রয়েছে। তাছাড়া কুইলির মা রুকু চেয়েছিল তার একমাত্র সন্তানকে, কন্যাকে পুরুষের সমকক্ষ করে গড়ে তুলতে।
সব ঠিকই চলছিল, কিন্তু হঠাৎই একদিন নেমে এসেছিল সেই ভয়ঙ্কর দুর্যোগ। কুইলির তখন বারো বছর। মা রুকু তাকে নিয়ে গিয়েছিল জঙ্গল লাগোয়া শস্যখেতে। এমনই দুপুর ছিল সেদিন। একটা গাছের ছায়াতে বসে ঘুমিয়ে পড়েছিল কুইলি। আর খেতে রুকু কাজ করছিল। হঠাৎই একটা খ্যাপা বুনো মোষ জঙ্গল থেকে বেরিয়ে তার ভয়ঙ্কর সিং উঁচিয়ে সোজা ছুটে এসেছিল ঘুমন্ত কুইলির দিকে। তাকে বাঁচাবার জন্য মোষের পথ আগলে দাঁড়িয়ে তাকে লক্ষ্য করে বর্শাও ছুড়েছিল রুকু। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। রুকুর বর্শা বুনো মোষের হৃৎপিণ্ড প্রবেশ করলেও তার পাহাড়ের মতো ধাবমান শরীরটা এসে পড়েছিল রুকুর ওপর। রুকু শেষ একবার চিৎকার করে উঠেছিল 'কুইলি' বলে। আশপাশ থেকে লোকজন ছুটে এসে মৃত মোষটার শরীরের আড়াল থেকে রুকুর দেহটা যখন উদ্ধার করেছিল, তখন আর সে দেহে প্রাণ ছিল না। বুনো মোষের একটা শিং কুইলির মা'র শরীর ভেদ করে দিয়েছিল।
ছোট্ট কুইলি সেসময় বড় ধনুকের ছিলা টেনে বড় তির ছুড়তে পারত না। তাই একটা ছোট ধনুক আর এই ছোট তিরগুলো কুইলির অস্ত্রশিক্ষার জন্য নিজের হাতেই বানিয়েছিল তার মা রুকু।
তিরগুলো কিছুক্ষণ হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করার পর সেগুলো পাশে নামিয়ে রেখে দ্বিতীয় বস্ত্রখণ্ডটা সরাতেই তার নীচে থেকে বেরিয়ে এল কয়েকটা লম্বা লম্বা সূচ আর কয়েকটা চামড়ার টুকরো। কুইলির বাবা পেরিয়ামুথনের হাতের ছোঁয়া আছে এ জিনিসগুলোতে। রুকুর মৃত্যুর পর মন ভেঙে গেছিল পেরিয়ামুথনের। রুকুর স্মৃতিঘেরা সে গ্রামে আর থাকতে মন চায়নি তার। গ্রাম ছেড়ে কুইলিকে নিয়ে ঘুরতে ঘুরতে উপস্থিত হয়েছিল কোম্পানির মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির মাদুরা জেলার শিভগঙ্গা বা শিভাগঙ্গাই রাজ্যে। শিভগঙ্গাতে আসার পর রাস্তার পাশে বসে পাদুকা সেলাই অর্থাৎ মুচির কাজ করত পেরিয়ামুথন। আর সে কাজের সূত্র ধরেই এক সময় তার যোগাযোগ হয়েছিল রানি ভেলু নাচিয়ারের সেনা দলের সঙ্গে, তাদের ঘোড়ার লাগাম তৈরির কাজের জন্য।
এরপর তৃতীয় যে জিনিসটা কুইলি যত্ন করে বার করে আনল, সেটা একটা চওড়া সোনালি জরির পাড় দেওয়া লাল রঙের শাড়ি। বড় শখ করে এই রেশমের শাড়িটা রুকু কিনেছিল বিজয়া দশমীতে পরার জন্য। কিন্তু শাড়িটা দেখে ছোট্ট কুইলি তা নিজে পরার জন্য এমন বায়না ধরেছিল যে, রুকু আর সেটা নিজে গায়ে দিতে পারেনি। শাড়িটা বেশ কিছুক্ষণ বুকে জড়িয়ে বসে রইল কুইলি।
মায়ের গায়ের গন্ধ যেন লেগে আছে শাড়িটাতে।
এরপর তোরঙ্গের ভিতর থেকে আরো দু-চারটে ছোটখাটো জিনিস বার করে কুইলি দেখল। এই যেমন কাঠের ছোট একটা চিরুনি, রঙ চটে যাওয়া ছোট্ট একটা মাটির পুতুল। বিবর্ণ হয়ে যাওয়া চুলের ফিতে। কুইলির শৈশবের জিনিস এগুলো। সেগুলো দেখার পর কুইলি তোরঙ্গের এক কোণে পড়ে থাকা একটা ছোট্ট ধাতব কৌটো তুলে নিল। কৌটো থেকে বার করল একজোড়া কর্ণকুণ্ডল বা দুল।
রুপোর তৈরি অতি সাধারণ দুল জোড়া থেকে ঝুলছে চড়াইপাখির ডিমের আকৃতির দুটো পাথর। না, এই দুল জোড়া রুকুর নয়। এ দুল জোড়ার সঙ্গে জড়িয়ে আছে কুইলির যৌবনের মধুর স্মৃতি।
দুলজোড়া তাকে উপহার দিয়েছিল তিরুমল নামের এক যুবক। বাবা পেরিয়ামুথনের মৃত্যুর পর কুইলি তখন সদ্য শিক্ষানবিশ হিসাবে যোগ দিয়েছিল রানি ভেলুর সেনাদলে। তখনই সৈনিক তিরুমলের সঙ্গে পরিচয় হয় কুইলির। আরও বেশ কয়েকজন সৈনিকের সঙ্গে কুইলির মতো নবীন শিক্ষানবিশদের অস্ত্রশিক্ষা দিতে আসত যুবক তিরুমল। মা রুকুকে অনেক আগেই হারিয়েছিল কুইলি। তারপর বাবা পেরিয়ামুথনের মৃত্যুতে সে সময় বড় একা হয়ে গেছিল সদ্য যুবতী কুইলি। আর সেই নিঃসঙ্গতার কারণেই হয়তো সৈনিক যুবক তিরুমলের সঙ্গে একটা সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল কুইলির। ভালোবাসার সম্পর্ক। কুইলির মতোই তিরুমলেরও তিনকূলে আপনজন বলতে কেউ ছিল না। তিরুমলই একদিন এই দুলজোড়া উপহার দিয়েছিল কুইলির হাতে। ঝুমকোর মতো দুলতে থাকা পাথর দুটো কিন্তু জেল্লাহীন।
আশ্চর্য হয়ে কুইলি জানতে চেয়েছিল, 'এ পাথরের দুল তুমি আমার জন্য বানালে কেন?'
এ প্রশ্নের উত্তরে সৈনিক তিরুমল হেসে জবাব দিয়েছিল, 'তোমার এমন আগুনের মতো রূপ। পাথরের দুল তোমাকেই মানাবে।' এ কথা বলার পর সে গাড় চুম্বন এঁকে দিয়েছিল কুইলির ঠোঁটে।
তিরুমলের সান্নিধ্যে কয়েকটা মাস যেন স্বপ্নের মতো কেটেছিল কুইলির। অন্যরক্ষী বা লোকজনের নজর এরিয়ে মিলিত হত তারা দুজন। কখনও বা রানি ভেলুর ভগ্ন বাসস্থানের কোন অন্ধকার অনিন্দে, কখনও বা কোন আছিলাতে সন্নিকটের অরণ্যে কোন প্রাচীন বৃক্ষের আড়ালে। না, পরিপূর্ণ মিলনের কোন সুযোগ পায়নি তারা। চুম্বন বা স্পর্শর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল তাদের গোপন প্রেম। কিন্তু সেটুকুই যেন ছিল কুইলির নিঃসঙ্গ জীবনে এক ঐশ্বরিক প্রাপ্তি। আজ এত দিন পরও যেন চোখ বন্ধ করলে কুইলি অনুভব করতে পারে তিরুমলের স্পর্শ। তার ওপর নির্ভর করে নিজের একাকিত্ব কাটিয়ে উঠতে শুরু করেছিল কুইলি। হয়তো বা পরিজনহীন তিরুমলের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা একই ঘটেছিল। তিরুমল আসলে ছিল ভাড়াটে সৈনিক। সে মহীশূরের সুলতান হায়দার আলির বেতনভুক অস্থায়ী সৈনিক ছিল। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যখন শিভাগঙ্গাই রাজ্য রাজা মুথুপেরিয়ারকে হত্যা করে দখল করে নিল তারপর থেকেই বিধবা রানি ভেলুকে ও তাঁর নাবালিকা কন্যা ভেলিচিকে আশ্রয়দান, সেনা সাহায্য করে আসছেন হায়দার আলি।
হায়দারের পাঠানো এক ক্ষুদ্র সেনাদলের সঙ্গেই রানি ভেলুর কাছে এসেছিল তিরুমল। কিন্তু একদিন তার মহীশূর থেকে ডাক এল। তিরুমল মহীশূর যাবার সময় কুইলিকে বলে গিয়েছিল মহীশূর থেকে তার পাওনাগন্ডা বুঝে নিয়ে কিছু দিনের মধ্যেই ফিরে আসবে দিন্দিগুলে, স্থায়ীভাবে যোগ দেবে রানি ভেলুর সেনাদলে। তারপর ঘর বাঁধবে কুইলির সঙ্গে।
রানি ভেলু আর তার সেনাদল তখন দিন্দিগুলেই থাকত। কুইলিও থাকত দিন্দিগুলেই রানির শিক্ষানবিশ নারী সেনাদলের সঙ্গে। কিন্তু সৈনিক তিরুমল আর কুইলির কাছে ফিরে আসেনি।
সাতটা বছর কেটে গেছে তারপর। সেদিনের সদ্য যৌবনে পদার্পণ করা অষ্টাদশী কুইলির বয়েস এখন ছাব্বিশ। রানি ভেলুর শিক্ষানবিশ সৈনিক থেকে কুইলি এখন রানির মহিলা বাহিনীর প্রধান। মহীশূর থেকে মাঝে মাঝে সাহায্য নিয়ে লোক আসে। বেশ কয়েকবার তেমন লোকের সঙ্গে দেখাও হয়েছে কুইলির। কিন্তু সংকোচের কারণে সে কোনদিন তাদের জিগ্যেস করে উঠতে পারেনি যে, মহীশূরের সেনাদলে তিরুমল বলে কোনও লোককে তারা চেনে কিনা।
গরাদহীন উন্মুক্ত গবাক্ষ দিয়ে আলো এসে পড়েছে কুইলির হাতের তালুতে রাখা পাথরের ঝুমকো দুলজোড়ার ওপর। সেদিকে তাকিয়ে কুইলির চোখে ভেসে উঠল হারিয়ে যাওয়া সেই যুবকের ছবি। কৃষ্ণবর্ণের পাথর কুঁদে গড়ে তোলা তার শরীর, কাঁধ পর্যন্ত নেমে আসা কুঞ্চিত কেশদাম, পুরু ঠোঁট। যে ঠোঁট নেমে আসত পরম ভালোবাসায় কুইলির ঠোঁটে। গভীর দুটো চক্ষু—যে চোখ আশ্রয় দিত, ভরসা দিত কুইলিকে।
দুল দুটো মুঠিতে ধরে কুইলি এরপর ভাবতে লাগল, তিরুমল কি তবে সত্যিই এ জন্মে ফিরে আসবে না? নাকি হঠাৎই একদিন সে এসে উপস্থিত হবে কুইলির কাছে তার দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণের জন্য? কত অবিশ্বাস্য ব্যাপারই তো প্রতিদিন পৃথিবীতে ঘটে চলে! হয়তো বা তেমনই কিছু ঘটল? হয়তো বা আজই রানি ভেলুর প্রাসাদে গিয়ে সে দেখতে পেল সৈনিক তিরুমলকে?
এসব কথা ভাবছিল কুইলি! তার চিন্তাজাল ছিন্ন হল শুভলক্ষ্মীর কণ্ঠস্বরে—'ভিরথালাপথি, ঘোড়া প্রস্তুত।'
তোরঙ্গর জিনিসগুলো যত্ন করে তার মধ্যে ভরে সেটাকে কুলুঙ্গিতে রেখে ঘরের বাইরে বেরিয়ে এল কুইলি। তিনটে ঘোড়া নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কুইলির সেনাদলের দুই সহকারিণী শুভলক্ষ্মী আর সাবিত্রী। তারাও তাদের সেনাপতির সঙ্গী হবে। তবে কুইলি বা তার সেনাদলের কেউই কখনও সামরিক পোশাক পরে না।
সাধারণ পোশাকে মানুষের ভিড়ে মিশে থাকা যায়, অতর্কিতে তারা হামলা চালাতে পারে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুর ওপর।
কুইলি তার নিজের বিশাল ঘোটকীর পিঠে একলাফে উঠে পড়ল। শুভলক্ষ্মী আর সাবিত্রীও চড়ে বসল তাদের ঘোড়াতে। তাদের গন্তব্য শিভাগঙ্গাই রাজ্যের সীমান্তের প্রান্তদেশে অবস্থিত ভিরুপ্রকাশী। যেখানে তার বাহিনী নিয়ে অবস্থান করছেন 'আম্মা', রানি ভেলু। ভিরুপ্রকাশীর উদ্দেশে রওনা হয়ে গেল তারা।
রাত্রি তৃতীয় প্রহরে জঙ্গল ফাঁকা হয়ে এল। তা দেখে কুইলি বুঝল ভিরুপ্রকাশীতে পৌঁছে গেছে। এ জায়গাও কিন্তু কোম্পানির মানচিত্রে তাদেরই সীমানার অন্তর্গত। তবে রানি ভেলুর সেনাদল এ পর্যন্ত নিজেদের দখলে নিয়েছে। কোম্পানির ফৌজ জঙ্গল অতিক্রম করে এখনও এ চত্বরে আসতে সাহস করছে না!
খুব ছোট্ট একটা শহর ভিরুপ্রকাশী। তাকে গ্রামও বলা যেতে পারে। রানি ভেলুর ছোট প্রাসাদ আর কয়েকটা পাথরের বাড়ি ছাড়া কোনও পাকা ঘর নেই এখানে। প্রায় এক বছর সময় অতিবাহিত হতে চলল রানি ভেলু নাচিয়ার তাঁর কন্যা, কয়েকজন বিশ্বস্ত অনুচর আর তার সেনাদল নিয়ে এখানেই অবস্থান করছেন। এই ক্ষুদ্র প্রাসাদের পশ্চাতেই জঙ্গল শুরু।
জঙ্গল যেখানে শেষ হয়েছে সেখানে ঘোড়া থেকে নেমে পড়ল কুইলি। ঘোড়া নিয়ে প্রাসাদের দিকে এগোনো যাবে না। দিন্দিগুলে যখন রানি ভেলু ছিলেন তখন তো দু-দুবার তাকে গুপ্তঘাতক দিয়ে হত্যার চেষ্টাও চালিয়েছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। ঘটনাচক্রে সেই দু-বারই রানিমার প্রাণ রক্ষা করেছিল কুইলিই।
নিজের ঘোড়ার লাগামটা শুভলক্ষ্মীর হাতে ধরিয়ে দিয়ে জঙ্গলের বাইরে একলা বেরিয়ে এল কুইলি। চাঁদের আলোতে ঘুমিয়ে আছে ছোট্ট ভিরুপ্রকাশী। না, সবাই ঘুমিয়ে নেই। প্রাসাদের মাথার ওপর বিন্দু বিন্দু আলো নড়ে চড়ে বেড়াচ্ছে। প্রাসাদের ছাদে মশাল হাতে পাহারা দিচ্ছে প্রহরীর দল। ওড়নার কাপড় দিয়ে মুখটা ভালো করে ঢেকে নিয়ে প্রাকার অতিক্রম করে কুইলি এগোল প্রাসাদের দিকে। তবে সে সদর দরজা দিয়ে প্রাসাদে প্রবেশ করবে না। রানি ভেলু ও তার বিশ্বস্ত দু-একজন সঙ্গী ছাড়া আর কেউ জানতেই পারে না কুইলির সঙ্গে রানি ভেলু নাচিয়ার সাক্ষাতের বিষয়টা।
কিছু সময়ের মধ্যেই প্রাসাদের কাছাকাছি পৌঁছে গেল রানি ভেলুর গুপ্ত বাহিনীর সেনাপতি কুইলি। প্রাসাদের ছাদে প্রহরারত রক্ষী বাহিনীর অবয়বগুলো এখন স্পষ্ট। তাদের চোখে কুইলি যাতে ধরা না পড়ে তাই মাটিতে শুয়ে পড়ল কালো পোশাক পরা কুইলি। তারপর বুকে হেঁটে গুড়ি মেরে সরীসৃপের মতো এগোতে থাকল প্রাসাদের পিছন দিকে একটা নির্দিষ্ট স্থানের দিকে। পরপর তিনটে গাছ দাঁড়িয়ে আছে সেখানে। তৃতীয় গাছটা প্রাকার সংলগ্ন। এক গাছ থেকে আর এক গাছে নিঃশব্দে কীভাবে উড়ে যেতে হয় সে কৌশল জানা আছে খালি হাতে যুদ্ধের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুইলির।
কুইলি পৌঁছে গেল প্রথম গাছটার কাছে। তিনটি গাছই অতি প্রাচীন, বিশাল গুঁড়ি আর শাখা-প্রশাখা সমন্বিত। গাছগুলোর বিরাট বিরাট ডালপালাগুলো মাথার ওপর চাঁদোয়া রচনা করাতে গুঁড়িগুলোর নীচে চাঁদের আলো তেমন ভাবে এসে পড়ছে না। আধো-অন্ধকার জায়গাটা। কুইলি প্রথম গাছটার গুঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার সতর্ক কানে সহসা অস্পষ্ট শব্দ যেতেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল কুইলি। আবারও শব্দটা কানে এল তার! মৃদু 'ফোঁস' করে একটা শব্দ ভেসে এল গাছের আড়াল থেকে। এ শব্দ কুইলির পরিচিত। কুইলি সন্তর্পণে উঁকি দিল গাছের গুঁড়ির ওপারে। প্রত্যাশামতো সে দেখতে পেল বিশালাকৃতির একটা সাদা ঘোড়া দাঁড়িয়ে আছে সেখানে। ওই ফোঁস শব্দটা ঘোড়াটার নিঃশ্বাস নেবার শব্দ। অন্ধকারের মধ্যে একলা দাঁড়িয়ে লেজ নাড়ছে প্রাণীটা।
এ কার ঘোড়া? এখানে একলা দাঁড়িয়ে কেন?
ঘোড়ার শ্বাস নেওয়া, পা ঠোকা, লেজ নাড়ানো দেখে অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা অনেক কিছু অনুমান করতে পারে। ভালো করে ঘোড়াটার দিকে তাকিয়ে প্রাণীটার লেজ নাড়াবার ধরন দেখে কুইলি অনুমান করল, ঘোড়াটা তার পিঠ থেকে সদ্য কাউকে নামিয়েছে! কিন্তু কে সে?
কুইলি দ্রুত গাছ বাইতে শুরু করল। গাছের মাথায় উঠে নিঃশব্দে অন্তত কুড়ি-পঁচিশ হাত উড়ে দ্বিতীয় গাছে গিয়ে পড়ল। তারপর একইভাবে তৃতীয় গাছে। এই তৃতীয়গাছের একটা ডাল নীচের প্রাচীর অতিক্রম করে প্রাসাদের পিছনে শান বাঁধানো চত্বরটার ভিতর অনেকখানি নেমে গেছে। যে ডাল বেয়ে অনায়াসে চত্বরটাতে লাফিয়ে নামা যায়।
ডাল বেয়ে নীচে নামতে যেতেই কুইলি দেখতে পেল একটি মানুষের অবয়ব। চত্বর থেকে প্রাসাদের ভিতর প্রবেশ করার জন্য যে অলিন্দ আছে তার প্রবেশমুখে দাঁড়িয়ে আছে লোকটা। মুখ দেখা যাচ্ছে না। পাগড়ির কাপড়ে তার মুখ ঢাকা। কোমরবন্ধ থেকে ঝুলছে দীর্ঘ তরবারি। মাঝারি উচ্চতায় বেশ শক্তপোক্ত চেহারার লোক। অলিন্দের ভিতর প্রবেশ করার আগে লোকটা চারপাশে তাকিয়ে সম্ভবত দেখার চেষ্টা করছে আশেপাশে কোনও লোক আছে কিনা? কয়েক মুহূর্ত মাত্র, তারপরই লোকটা অদৃশ্য হয়ে গেল অলিন্দের মধ্যে। ওই অলিন্দ গিয়ে শেষ হয়েছে চারপাশ ঘেরা আরও একটা চত্বরে। যার ঠিক গায়ে রানি ভেলুর বাসস্থান।
এই লোকটাই যে গাছের নীচে দাঁড়িয়ে থাকা ঘোড়াটার আরোহী তা অনুমান করতে অসুবিধা হল না কুইলির। কিন্তু লোকটা এভাবে মধ্যরাতে সন্তর্পণে প্রাকার টপকে প্রাসাদে প্রবেশ করল কেন? এর আগেও এমনই এক রাতে আম্মা ভেলুকে হত্যার করার জন্য বাইরে থেকে এক গুপ্তঘাতককে প্রাসাদে প্রবেশ করিয়েছিল ইংরেজরা। এও তেমনই কোনও গুপ্তঘাতক নয়ত? কথাটা কুইলির মনে হতেই কালক্ষেপ না করে সে গাছের ডাল বেয়ে নিঃশব্দে গিয়ে নামল চত্বরটাতে। এরপর দ্রুত এগিয়ে গিয়ে প্রবেশ করল অলিন্দের ভিতর।
আধো-অন্ধকার অলিন্দ। মাঝে মাঝে শুধু অলিন্দের গায়ের পাথরের জাফরি দিয়ে ক্ষীণ চাঁদের আলো প্রবেশ করছে। এই প্রাসাদটাও এক সময় কোম্পানির ফৌজ দখল করে নিয়েছিল।
কিন্তু তাদের হাত থেকে লড়াইয়ের মাধ্যমে এ প্রাসাদ ছিনিয়ে নিয়েছেন রানি ভেলু নাচিয়ার।
অলিন্দের অন্ধকারে দেওয়ালের গায়ে মিশে এগোতে থাকল কুইলি। কিছুটা এগিয়েই সে দেখতে পেল সেই অস্ত্রধারীকে। লোকটাও সন্তর্পণে এগোচ্ছে। তাকে অনুধাবণ করতে লাগল কুইলি। প্রতিটা বাঁকের মুখে লোকটা থমকে দাঁড়াচ্ছে। উঁকি মেরে দেখে নিচ্ছে বাঁকের অন্যপাশে কেউ আছে কিনা? তারপর আবার সামনে পা বাড়াচ্ছে।
আগন্তুকের এই সন্দিগ্ধ আচরণ দেখে কুইলির এ ধারণা আরও দৃঢ় হতে থাকল যে, এই অস্ত্রধারী নিশ্চয় কোনও গুপ্ত ঘাতক, বা কোম্পানির গুপ্তচর হবে। চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল কুইলির। এক সময় লোকটা পৌঁছে গেল অলিন্দের শেষ প্রান্তে। অলিন্দের ভিতর থেকেই ছোট্ট চত্বরটা দেখা যাচ্ছে। দেখা যাচ্ছে রানিমার কক্ষের ঠিক বাইরে চিকের পর্দাঘেরা জায়গাটাও। যার আড়ালে বসে রানিমা অতিথি-অভ্যাগতদের সঙ্গে কথা বলেন।
একটা ক্ষীণ আলোকরেখা দেখা যাচ্ছে চিকের আড়ালে। প্রদীপের আলো। তা দেখে কুইলির মনে হল আম্মা ভেলু সম্ভবত সেখানেই আছেন। কুইলির সামনের সন্দেহজনক লোকটা কিছুক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে রইল। তারপর অলিন্দ থেকে চত্বরে নেমে ধীর সতর্ক ভঙ্গিতে এগোতে লাগল রানির কক্ষের দিকেই।
কুইলি প্রথমে ভাবল, নিঃশব্দে কাছে ছুটে গিয়ে তলোয়ারের এক কোপে পিছন থেকে আততায়ীর ধড়-মুন্ডু আলাদা করে দেবে। যেমন সে ইতিপূর্বে করে এসেছে। কিন্তু পরক্ষণের কুইলির মনে হল, সেক্ষেত্রে জানা যাবে না এই ঘাতক অথবা গুপ্তচরকে ঠিক কে এখানে পাঠিয়েছে? তাই লোকটাকে না মেরে বন্দি বানাতে হবে।
চত্বরে চারপাশে কেউ নেই দেখে এবার চিকের পর্দা ঘেরা রানির কক্ষের দিকে এগোতে থাকল সেই অস্ত্রধারী। আর দেরি করা যাবে না। অলিন্দ ছেড়ে কুইলিও চত্বরে নেমে পড়ল। তারপর মার্জারের মতো নিঃশব্দে ক্ষিপ্রগতিতে আঙুলের ওপর ভর দিয়ে ছুটল লোকটার দিকে।
আততায়ী তখন চিকের পর্দার প্রায় কাছাকাছি পৌঁছে গেছে, ঠিক সেই সময় কুইলি পিছন থেকে জড়িয়ে ধরল লোকটার গলা। কিন্তু কুইলি যত সহজে তার ঘাড় মুচড়ে দেবে ভেবেছিল তা কিন্তু হল না। কুইলির হাতের স্পর্শ পাওয়া মাত্রই লোকটার ঘাড়ের মাংসপেশী লোহার মতো শক্ত হয়ে গেল। প্রবল ঝটপটি শুরু হল দুজনের মধ্যে। এক সময় দুজনই দু-পাশে ছিটকে পড়ল।
পরক্ষণেই অবশ্য সেই লোকটি মাটি ছেড়ে লাফিয়ে উঠে তার দীর্ঘ তরবারি বার করল। চাঁদের আলোতে ঝলসে উঠল সেই তলোয়ারের ফলা! চকিতে উঠে দাঁড়িয়ে কুইলিও তার তলোয়ার খুলে নিল। তলোয়ার যুদ্ধের কৌশলমতো প্রথমে দুজনেই কিছুটা পিছু হটে গেল। তারপর বৃত্তাকারে ঘুরতে শুরু করল পরস্পরকে লক্ষ্য করে। পাগড়ির কাপড়ের ফাঁক দিয়ে বাঘের চোখের মতো জ্বলছে লোকটার চোখ দুটো। জ্বলছে কুইলির চোখও। ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে বৃত্ত।
ঠিক এমনসময় পরিচিত কণ্ঠস্বর কানে এল কুইলির—'থামুন, থামুন, থামুন, দয়া করে থামুন আপনারা। কেউ কাউকে আঘাত করবেন না।'
রানির প্রধান পরামর্শদাতা গোপালা নায়কার। তিনি কুইলির উদ্দেশে বললেন, 'কুইলি! তলোয়ার নামাও। উনি আমাদের বিশিষ্ট অতিথি। আমাদের রক্ষক। রানির সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এসেছেন।'
কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে কুইলি তলোয়ার নামিয়ে ফেলল। সেই আগন্তুকও ধীরে ধীরে তলোয়ার নামিয়ে খাপে পুরে গোপালা নায়কারের উদ্দেশে মৃদু অনুযোগের সুরে বললেন, 'এখানে রক্ষী কেন? আমি তো বলেছিলাম আমার আগমনবার্তা যেন অন্যদের থেকে গোপন থাকে।'
এবার চিকের আড়াল থেকে লোকটার উদ্দেশে রানিমার কণ্ঠস্বর শোনা গেল—'আমি দুঃখিত সেনাপতি। আপনার কথামতো সব রক্ষীকেই সরিয়ে দিয়েছি। যে মেয়েটি দাঁড়িয়ে ওর নাম কুইলি। আমার নারী বাহিনীর সেনাপতি। ওকে আমার দ্বিতীয় কন্যা ভাবতে পারেন। আমিই ডেকে এনেছি ওকে।' ও আপনার পরিচয় সম্পর্কে বা আপনার আগমন বার্তা সম্পর্কে অবগত নয়।
রানি ভেলু নাচিয়ারের কথায় এবার যেন নিশ্চিন্তবোধ করল লোকটা। মুখ থেকে পাগড়ির কাপড়টা সরিয়ে তাকাল কুইলির দিকে। চাঁদের আলো এসে পড়েছে লোকটার মুখে। ফর্সা ডিম্বাকৃতি মুখমণ্ডলে সরু পাঁকানো গোঁফ। আর সেই মুখমণ্ডলে যেন জেগে আছে দৃঢ় প্রত্যয় আর সম্ভ্রান্তভাব।
রানি ভেলু ফের বললেন, 'আমিই কুইলিকে ডেকেছি যাতে ও আপনার সঙ্গে পরিচিত হতে পারে। এ অবিশ্বাসের পৃথিবীতে যে দু-চারজন আমার জন্য জীবন দিতে পারে তার মধ্যে কুইলি একজন। হয়তো কোনও জরুরি প্রয়োজনে আপনার কাছে ওকে আমি পাঠাতেও পারি। আপনার বিড়ম্বনার জন্য আমি মার্জনা চেয়ে নিচ্ছি।'
এ কথা বলার পর রানি ভেলু, কুইলির উদ্দেশে বললেন, 'কুইলি, তোমার সামনে যিনি দাঁড়িয়ে আছেন তিনি আমার আশ্রয়দাতা মহীশূর অধিপতি, সুলতান হায়দার আলির পুত্র, সেনাপতি টিপু। ওকে প্রণাম জানাও, ক্ষমা চেয়ে নাও। তারপর আমার কাছে এসো।'
রানি আম্মার কথা শুনে অবাক হয়ে গেল কুইলি। মহীশূর সেনাপতি টিপু!! রানিমার কাছে, লোকমুখে তার বীরত্বের অনেক কাহিনি শুনেছে কুইলি। মহীশূরের বাঘ! ফিরিঙ্গিরাও তাঁর নাম শুনে কাঁপে। এ লোকটা যে শুধু সাহসী তাই নয়, কুইলি শুনেছে সে নাকি মস্ত পণ্ডিতও। আট-দশটা দেশি ভাষায় কথা বলতে পারে। তবে, মহীশূর শব্দটার সঙ্গে সঙ্গে মুহূর্তের জন্য কুইলির মনে ভেসে উঠল আরও একজন। কুইলি কয়েকমুহূর্ত বিস্মিত হয়ে চেয়ে রইল টিপুর দিকে। তারপর ধীরে ধীরে হাঁটু মুড়ে বসে মাথা ঝুঁকিয়ে প্রণাম জানাল।
মহীশূর সেনাপতির ঠোঁটের কোণে আবছা হাসি ফুটে উঠল। নিজের ঘাড়ে হাত বুলিয়ে মৃদু কৌতুকের স্বরে কুইলিকে বললেন, 'তুমি এত জোরে আমার ঘাড়টা চেপে ধরেছিলে যে, অন্য কেউ হলে তার ঘাড় ভেঙে যেত। তবে কি জানো, সিলামবম আমিও জানি। আর এ ঘাড়টা হল মহীশূরের বাঘের ঘাড়। ফিরিঙ্গিরাও চেষ্টা চালাচ্ছে এ ঘাড় ভেঙে ফেলার, কিন্তু পারছে না।'
সেনাপতি টিপুর কথা শুনে কুইলি উঠে দাঁড়িয়ে লজ্জিত ভাবে বলল, 'আপনি আমাকে ক্ষমা করবেন।'
কথাটা শুনে টিপু, কুইলির দিকে বরাভয়ের ভঙ্গিতে হাত ওঠালেন।
গোপালা নায়কার এরপর টিপুকে পথ দেখিয়ে বললেন, 'আসুন, এবার আসন গ্রহণ করুন।'
টিপুকে নিয়ে কুইলি আর গোপালা নায়কার চিকের পর্দার সামনে এসে দাঁড়াল। প্রদীপের আলোতে চিকের ওপাশে রানি ভেলুর অবয়বটা দেখা যাচ্ছে। চিকের পর্দার দু-পাশে দাঁড়িয়ে প্রথমে পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবার জন্য মাথা ঝোঁকালেন রাজ্যচ্যুত শিভাগঙ্গাইয়ের রানি ভেলু নাচিয়ার ও মহীশূর সুলতান হায়দার পুত্র টিপু। চিকের এপাশে অতিথির জন্য একটি চারপায়া আছে। সেখানেই উপবেশন করলেন টিপু। তার কিছুটা তফাতে একটা কাষ্ঠনির্মিত আসনে বসলেন রানির পরামর্শদাতা গোপালা নায়কার। আর কুইলি গিয়ে ঢুকল চিকের ভিতর। একটা জৌলুসহীন রঙচটা, কাঠের ছোট তাকিয়ার ওপর বসে আছেন রানি ভেলু। তাঁর বয়স চল্লিশ, কিন্তু, নিদারুণ পরিশ্রম, বিশেষত মানসিক যন্ত্রণা যেন তার বয়সকে আরও বেশ কিছুটা বাড়িয়ে দিয়েছে। চিন্তার স্পষ্ট ভাব জেগে আছে তার মুখমণ্ডলে। তবুও কুইলি তার সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই রানির মুখে একটা হাসি ফুটে উঠল। সন্তানকে দেখলে তার মার মুখে যেমন হাসি ফুটে ওঠে, ঠিক তেমনই। কুইলি আম্মা ভেলুর আশীর্বাদ নিয়ে ঠিক তার পায়ের কাছে মাটিতে বসে পড়ল।
কয়েক মুহূর্তের নিস্তব্ধতা। তারপর রানি ভেলু চিকের ওপারে বসা মহীশূর সেনাপতির উদ্দেশে বললেন, 'আপনার কাছে আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। আপনি যে এ পরিস্থিতিতে এত দূরে আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসবেন তা ভাবতে পারিনি।'
ভেলু নাচিয়ারের কথার জবাবে টিপু বললেন, 'বার্তা বাহকদের মাধ্যমে সবসময় সব পরিস্থিতি তো বোঝা যায় না, তাই আব্বুর নির্দেশে নিজেই চলে এলাম বণিকের ছদ্মবেশে। অবশ্য কিছু অনুচরও সঙ্গে আছে। ফিরিঙ্গিদের চোখে ধুলো দিতেই এই সময়ে আগমন। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই আমি রওনা দেব। ওরা সর্বত্র গুপ্তচর ছড়িয়ে রেখেছে। যে কারণে আমি আপনাকে অনুরোধ জানিয়েছি আমার আগমন বার্তা যেন এখানকার সৈনিকরাও জানতে না পারে।'
রানি বললেন, 'হ্যাঁ। তাদের গুপ্তচর এই প্রাসাদেও থাকতে পারে। এমনকী কোনও ঘাতকও। আপনার আশঙ্কা অমূলক নয়। আমাকেও সজাগ থাকতে হয় সব সময়। আপনি হয়তো জানেন যে, এই কয়েক বছরের মধ্যে দু-বার আমাকে গুপ্ত হত্যার চেষ্টা করেছে ফিরিঙ্গিরা।
প্রথমবার এমনই এক গভীর রাতে তারা এক ঘাতককে পাঠিয়েছিল আমাকে হত্যা করার জন্য। এই কুইলি তখন একজন সাধারণ প্রহরী হিসাবে আমার সেবায় নিয়োজিত ছিল। তার চোখে পড়ে যায় সেই ঘাতক। আমার কক্ষে প্রবেশ করার মুহূর্তেই কুইলি তাকে হত্যা করতে সমর্থ হয়। আমাকে হত্যা করার জন্য কোম্পানির দ্বিতীয় পরিকল্পনা ছিল আরও মারাত্মক। আমার সেনাবাহিনীতে নটরাজন বলে এক সিলামবম শিক্ষক ছিল। কুইলিও তার কাছ থেকেই সিলামবমের শিক্ষা নিয়েছিল। নটরাজনকে উৎকোচ দিয়ে হাত করেছিল কোম্পানি। আপনি তো জানেনই সিলামবমে এমন হত্যা পদ্ধতি আছে, যার প্রয়োগে হত্যা করলে বাইরে থেকে শরীরে আঘাতের কোনও চিহ্ন মেলে না। ফিরিঙ্গিরা সেই চেষ্টাই করেছিল নটরাজনকে দিয়ে। এবং দ্বিতীয়বারও কোম্পানির সেই পরিকল্পনা বানচাল করে আমার প্রাণ রক্ষা করে কুইলি।'
টিপু বললেন, 'কোম্পানি হল ধূর্ত শিয়ালের মতো। এই শিভাগঙ্গাই ওরা কীভাবে দখল নিল ভাবুন! প্রথমে ওরা আর্কটের সুলতানকে দিয়ে আপনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করাল। রাজা পেরিয়ার সেনা পাঠালেন আর্কটের সুলতানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য। আর সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে অরক্ষিত শিভাগঙ্গাই পিছন থেকে আক্রমণ করে দখল করল কোম্পানির ফৌজ। হত্যা করল আপনার স্বামীকে। আমি সব থেকে বেশি ঘৃণা করি কোম্পানির সাদা চামড়ার লোকেদের। কিন্তু আর্কটের সুলতান আর কিছু হিন্দু রাজা এখনও বুঝতে পারছে না, মুসলমান অথবা হিন্দু, এ দেশের কোনও শাসককেই ফিরিঙ্গিরা ছাড়বে না, সব রাজ্যই তারা অজগর সাপের মতো গ্রাস করবে। আমি মারাঠা পেশোয়াকে অনুরোধ জানিয়েছিলাম—আসুন আমরা নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধ রেখে আগে সম্মিলিত শক্তি দিয়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে দেশ ছাড়া করি। তারপর আমরা নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়া করব। কিন্তু পেশোয়া এ ব্যাপারে কোনও সাড়া দিচ্ছেন না।'—শেষ কথাগুলো বেশ ক্ষোভের সঙ্গেই বললেন টিপু।
আবারও কিছুক্ষণের জন্য নিস্তব্ধতা নেমে এল চিকের পর্দার দু-পাশে। খানিকপরে টিপু জানতে চাইলেন, 'এবার এখানকার খবর বলুন? আপনাদের পরিকল্পনার কথা বলুন?'
প্রশ্ন শুনে রানি ভেলু নাচিয়ার বললেন, 'প্রায় বছর ঘুরতে চলল এখানেই আটকে আছি। কুইলির গুপ্তঘাতক বাহিনীর প্রহরা থাকার কারণে হয়তো বা কোম্পানির ফৌজ অরণ্য অতিক্রম করে এখানে আসছে না ঠিকই, কিন্তু আমরাও তেমনই এই অরণ্যভূমি অতিক্রম করে শিভাগঙ্গাইতে প্রবেশ করতে পারছি না। শুনেছি ক্যাপ্টেন মরিস নামের একজন সেনাধ্যক্ষ শিভাগঙ্গাই শহর এবং দুর্গের দায়িত্ব নিয়েছে। লোকটার যদি কারো ওপরে কখনও সন্দেহ হয় যে, সে আমাদের ব্যাপারে সমব্যাথী, তখনই সে নাকি তাকে তোপের মুখে উড়িয়ে দেয়। আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না কীভাবে শিভাগঙ্গাই শহরের দখল নেওয়া যায়। মরতে আমি ভয় পাই না। কিন্তু নিষ্ফল মৃত্যু আমি চাই না। মরবার আগে স্বামীর মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতেই হবে।'
রানি ভেলুর কথা শুনে মহীশূর সেনাপতি বললেন, 'শিভাগঙ্গাই নগরীতে কোম্পানির সামরিক শক্তি কতটা, সে ব্যাপারে কিছু জানেন?'
গোপালা নায়কার বললেন, 'হয়তো কুইলি এব্যাপারে কিছু বলতে পারবে। ও জঙ্গলে থাকে। জঙ্গলের ওপারেই তো শিভাগঙ্গাই শহর।'
কুইলি এতক্ষণ রানি ভেলুর পায়ের কাছে বসে রানি আর টিপুর কথোপকথন শুনছিল। আম্মা ভেলু তাকালেন কুইলির দিকে। তার ইঙ্গিত পেয়ে কুইলি বলল, 'আমরা কোনদিন জঙ্গলের সীমানা পেরিয়ে নগরীতে প্রবেশ করিনি। কিন্তু মাঝে মাঝেই একসঙ্গে ওরা কামান দাগে আমাদের ভয় দেখাবার জন্য বা হয়তো তাদের শক্তি বোঝাবার জন্য। কোম্পানির ফৌজরা জঙ্গলের গভীরে প্রবেশ না করলেও কোনও কোনও সময় তারা ছোট ছোট দলে জঙ্গলে ঢোকে। আমরা আড়াল থেকে তাদের দেখেছি, কখনও বা তির চালিয়ে দু-চারজনকে মেরেওছি। কিন্তু কোম্পানির সিপাইদের সকলের কাছেই বন্দুক থাকে।'
কুইলির কথা শেষ হতে রানি ভেলু মৃদু হতাশার সুরে টিপুর উদ্দেশে বললেন, 'কীভাবে কোম্পানির ফৌজের বিরুদ্ধে লড়ব আমরা? আমাদের কোনও কামান নেই। গাদা বন্দুক আছে সামান্য! তলোয়ার, তির-ধনুক আর বর্শা দিয়ে কি আর কামানের বিরুদ্ধে লড়াই করা যাবে?'
টিপু বললেন, 'কিছু কামান আর ফৌজ আমি আপনাদের সাহায্যের জন্য পাঠাব বলে ভেবে রেখেছি। কারণ, ধূর্ত ইংরেজরা হয়তো আপনার শিভাগঙ্গাই নগরী আক্রমণ করার পূর্বেই জঙ্গল অতিক্রম করে আপনাদের আক্রমণ করে বসতে পারে। তবে আপনারা আক্রমণ করুন বা প্রতিরোধ করুন, এ-দুটো ব্যাপারেই সফলতা পাবার জন্য আপনাদের জানা দরকার শিভাগঙ্গাই নগরী বা দুর্গে ঠিক কী পরিমাণ সৈন্য মজুত রেখেছে তারা। এবং আপনারা যদি শিভাগঙ্গাই নগরীতে প্রবেশ করে ফিরিঙ্গি বাহিনীকে আক্রমণ করেন তবে কোন পথে, কীভাবে আক্রমণ করলে আপনাদের সফলতা আসবে। কাউকে কি শিভাগঙ্গাই পাঠানো যায়, যে এসব খবর জেনে আসতে পারবে সেখান থেকে? সেইমতো সুলতান হায়দার আলি আর আমি আপনাদের সাহায্য করার চেষ্টা করব। শিভাগঙ্গাইতে কোম্পানির শক্তি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা এখন অত্যন্ত জরুরি।'
রানি ভেলু আবারও তাকালেন কুইলির দিকে। তার চোখের ভাষা পড়তে অসুবিধা হল না কুইলির। সে বলল, 'আমি একবার চেষ্টা করে দেখছি শিভাগঙ্গাইয়ের খবর সংগ্রহ করে আনা যায় কিনা। সম্ভবত কাজটা আমি করতে পারব।'
গোপালা নায়কার রানির উদ্দেশে বললেন, 'হ্যাঁ, কুইলিই এ ব্যাপারে সবচেয়ে উপযুক্ত। আমার ধারণা ও-ই সঠিক খবর এনে দিতে পারবে।'
এরপর আরও নানান বিষয়ে কথাবার্তা চলল সেনাপতি টিপু, রানি ভেলু আর গোপালা নায়কারের মধ্যে। সেনাপতি টিপুই মূলত বক্তা, অন্যরা শ্রোতা। টিপু বলে যেতে লাগলেন কোম্পানির ধূর্ততার নানা কাহিনি। কীভাবে দেশীয় নবাব-রাজাদের বিরোধকে কাজে লাগিয়ে ফিরিঙ্গিরা একের পর এক রাজ্য গ্রাস করে নিচ্ছে। কুইলি খুব মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করছিল মহীশূর সেনাপতির কথার ছত্রে ছত্রে ফুটে উঠছে মহীশূরের প্রতি তার হৃদয়ের ভালোবাসা আর ফিরিঙ্গিদের প্রতি তার চরম ঘৃণা।
মহীশূর রাজ্যের প্রতীক হল বাঘ। কথা প্রসঙ্গে টিপু বললেন ইংরেজদের প্রতি ঘৃণা থেকে তিনি নাকি একটা কলের বাঘ বানিয়েছেন। বাঘের থাবার নীচে শুয়ে থাকে একটা ফিরিঙ্গি পুতুল। কলের বাঘটাকে দম দিলে নাকি সে কামড় বসায় কোম্পানির ফিরিঙ্গিকে! আর সেটা তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করেন টিপু।
মহীশূর সেনাপতির কথা শুনতে শুনতে এক সময় জঙ্গলের দিক থেকে শিয়ালের ডাক ভেসে এল। রাত্রি শেষের সংকেতধ্বনি। সংকেতধ্বনি শোনার সঙ্গে সঙ্গে মহীশূরের বাঘ পোশাকের ভিতর থেকে একটা রেশমের থলি বার করে গোপালা নায়কারের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, 'এটা রাখুন। কিছু স্বর্ণমুদ্রা আছে। রানির প্রতি মহীশূরের সুলতান হায়দার আলির সামান্য সত্তগাত। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই আমি কিছু সৈন্য পাঠিয়ে দেব এখানে। তাদের বেতনের কথা আপনাদের ভাবতে হবে না। আমাদের কোষাগার থেকেই তাদের বেতনের ব্যবস্থা করা হবে। শিভাগঙ্গাইয়ের সামরিক শক্তির খবর পাওয়া গেলে আগামী দিনে সেইমতো সেনা সরবরাহের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।'
মহীশূর থেকে সেনা আসবে! কথাটা কানে যেতেই হঠাৎই যেন কুইলির সংকোচের আগল খুলে গেল। এদিকে টিপু উঠে দাঁড়িয়েছেন রানিমার থেকে বিদায় নিয়ে প্রাসাদ ত্যাগ করার জন্য, সেইসময় কুইলি নিজের অজান্তেই বলে ফেলল, 'মহীশূর থেকে যে সেনাদল আগে একবার এসেছিল, তারাই কি আসবে?'
কুইলির কথাটা কানে গেল মহীশূরের বাঘের। তিনি যে উত্তর দিলেন তা শুনে কুইলির মনের গভীরে বেঁচে থাকা আশা যেন ঝিলিক দিয়ে উঠল। তিনি বললেন, 'এর আগে যে দলটাকে রানির সাহায্যের জন্য পাঠানো হয়েছিল তাদের মধ্যে অনেকেই থাকবে এই সেনাদলে।'
ওই দলে তিরুমলও আছে কি? কিন্তু এ প্রশ্ন তো আর মহীশূর সেনাপতিকে জিগ্যেস করা যায় না। তাই বুকের ভিতরের আলোড়ন চেপেই রাখল কুইলি।
মহীশূরের বাঘ টিপু তারপর রানিমার থেকে বিদায় নিয়ে চত্বর ত্যাগ করলেন। তাকে কিছুটা এগিয়ে দেবার জন্য তাঁর পিছনে এগোলেন গোপালা নায়কার।
তারা চলে যাবার পর রানি ভেলু কুইলিকে বললেন, 'কীরে, খবরটা সংগ্রহ করে আনতে পারবি তো?'
কুইলি বলল, 'আপনি, নিশ্চিন্ত থাকুন আম্মা। আমি যেভাবেই হোক খবর সংগ্রহ করে আনব। তেমন হলে নিজেই যাব শিভাগঙ্গাইতে কোম্পানির সব খবর সংগ্রহ করে আনতে।'
চিন্তিত স্বরে রানি বললেন, 'দেখা যাক কী হয়! তোর খবর সংগ্রহ করে আনার ওপরই হয়তো আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। এরপর যেদিন আসবি এখানে, একটা দিন থাকিস। আজকাল আমার বড় একা লাগে।'
কুইলিকেও ভোরের আলো ফোটার আগেই এ স্থান ত্যাগ করতে হবে। ভেলু আম্মার সঙ্গে আরও কিছু কথাবার্তার পর যখন আকাশে শুকতারা ফুটে উঠল তখন রানি ভেলু নাচিয়ারকে প্রণাম জানিয়ে তার প্রাসাদ ত্যাগ করল কুইলি।
শিভাগঙ্গাই নগরী। একদা রাজা মুথুপেরিয়ারের রাজধানী। তাঁর প্রাসাদটা অবশ্য এখন আর নেই। এ নগরী দখল করার সময়েই কোম্পানির ফৌজ উড়িয়ে দিয়েছিল প্রাসাদটা। নগরীর নামও পরিবর্তন হয়ে গেছে। রাজা পেরিয়ারের আমলের সব চিহ্ন এখান থেকে মুছে ফেলতে চায় মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সি কোম্পানি। কোম্পানিকে সাহায্য করার প্রতিদান স্বরূপ আর্কটের সুলতানকে খুশি করার জন্য সুলতানের পূর্বপুরুষের নাম অনুসারে এ নগরীর নামকরণ করা হয়েছে—হুসেন নগর।
শ্রীহীন এক নগরী। পূর্বতন রাজা ও তার পূর্বপুরুষদের আমলে নির্মিত প্রাসাদগুলো এখন নোংরা, আবর্জনাময়, ঘোড়া-খচ্চর রাখার জায়গায় পরিণত হয়েছে। কোম্পানির বেশ কিছু দিশি সেপাইও বাস করে সেখানে। ফোয়ারাশোভিত বাগানগুলি এখন কণ্টকময়—শৃগাল, সর্পকুলের বাসস্থান। পশুদের বিষ্ঠা ছড়িয়ে থাকে নানা জায়গাতে। রাজপথে বসানো পাথরের ইটগুলো খুবলে তুলে নিয়ে শিভাগঙ্গাই দুর্গের বাইরে দ্বিতীয় একটি প্রাকার নির্মাণ করে দুর্গের সুরক্ষা আরও বাড়ানো হয়েছে। কারণ, ওই দুর্গের মধ্যেই বাস করে কোম্পানির সেনাধ্যক্ষ মরিস ও শ্বেতাঙ্গ সৈনিকরা। আর কোম্পানির সেবায় নিয়োজিত অসামরিক লোকজন পরিবার নিয়ে বসবাস করে টিলার ওপর অবস্থিত শিভাগঙ্গাই দুর্গের পাদদেশে।
কোম্পানির শ্বেতাঙ্গ প্রভুরা, তাদের অনুচর এবং সিপাইরা ছাড়া কিছু সাধারণ মানুষও অবশ্য থাকে এ নগরীতে। সংখ্যাতে হয়তো তারা প্রথম তিন শ্রেণির চেয়ে বেশিই হবে। তারা সব অন্ত্যজ মানুষ। কামার, চর্মকার, ঝাড়ুদার, ভারবাহী। পূর্বতন রাজার আমলে এ লোকগুলো অন্তত দু-বেলা নুন ভাত পেত, কিছু হলেও কাজের জন্য মজুরিও পেত। কিন্তু এখন এদের কাজ করার পর প্রাপ্তিযোগ বলতে শ্বেতাঙ্গ প্রভুদের চাবুক আর বুটের লাথি। মাঝে-মাঝেই মরিসের নির্দেশে এদের বেগার খাটতে নিয়ে যাওয়া হয় দুর্গে। কখনও নারীদেরও তুলে নিয়ে যাওয়া হয় শেতাঙ্গ প্রভু বা সৈন্যাধক্ষদের মনোরঞ্জনের জন্য। তাদের কেউ কেউ ক্ষতবিক্ষত শরীর নিয়ে ফিরে আসে, কেউ বা কোনওদিন ফেরে না। কোনও ভগ্ন হাবেলী বা ঝোপের মধ্যে পড়ে থাকে হতভাগ্য নারীদের ক্ষতবিক্ষত মৃতদেহগুলো। এই সব হতভাগ্য নারী-পুরুষের দল শহরের মধ্যেই কয়েকটা জায়গাতে খড় আর কাঠ-কুটো-পাতা দিয়ে কোনওরকমে পল্লী রচনা করে তারা টিকে আছে।
সকালবেলা দুর্গ থেকে নেমে তেমনই এক পল্লীর দিকে এগোচ্ছিলেন দুর্গ অধিপতি মরিসের অনুচর ফ্রাইডে নামের এক শ্বেতাঙ্গ পুরুষ। সঙ্গে একজন দোভাষী কর্মচারী। আর কয়েকজন দেশি সিপাই। দুর্গের কাজের জন্য মজুর ধরার উদ্দেশে বেরিয়েছে তারা।
হঠাৎই চলতে চলতে সাহেবের ঘোড়াটা দাঁড়িয়ে পড়ল। তার সঙ্গে সঙ্গে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল তার অনুচররাও।
রাস্তার পাশে কয়েকটা তাঁবু। তার সামনে বসে আছে কয়েকজন নারী। পরনে নোংরা ঘাগরা আর জামা। পায়ে তামার মল, কানে মাকড়ি। তাদের পোশাকের মতো শরীরটাও ময়লা। জট পড়া চুল, মুখ হাত-পা কালি-ধুলোময়, দেখে মনে হয় অনেকদিন স্নান করে না তারা। তাদের সঙ্গে কয়েকটা শিশুও আছে। রাস্তার ধুলোতে অবলীলায় তারা গড়াগড়ি খাচ্ছে। তাঁবুর সামনে যারা বসেছিল তাদের মধ্যে অনেকেই পাতার চুরুট জ্বালিয়ে ধূমপান করছে।
এদেশে অভিজাত পরিবারের নারীদের মধ্যে কোথাও কোথাও তামাক সেবনের চল থাকলেও, রাস্তাঘাটে মেয়েদের তামাক সেবন করতে দেখা যায় না। হয়তো এ দৃশ্যের জন্য কোম্পানির সাহেবের দৃষ্টি পড়েছে তাদের ওপর। ঘোড়া থামিয়ে সাহেব তার দোভাষীকে প্রশ্ন করল, 'এরা কারা?'
মেয়েগুলোর পোশাক দেখে দিশি দোভাষী তাদের পরিচয় সম্বন্ধে কিছুটা অনুমান করেছিল। তবু সে মেয়েগুলোকে ডেকে বলল, 'এই তোরা কারা? কোথা থেকে এসেছিস? এদিকে আয়।'
তার কথা শুনে মেয়েগুলো তাঁবুর সামনে থেকে উঠে কাছে এসে দাঁড়াল। তাদের মধ্যে একটা মেয়েকে শ্যামাঙ্গী হলেও বেশ সুন্দরী বলা যায়। তার গলাতে অনেকগুলো পাথরের মালা ঝুলছে। তবে তার চেহারা বা পোশাকও অন্যদের মতোই নোংরা, মুখ-হাত ধুলোবালি মাখা। সেই মেয়েটা জবাব দিল, 'আমরা বেদেনী। কচ্ছ থেকে এসেছি।'
দোভাষী লোকটা এমনটাই অনুমান করেছিল। ইতিপূর্বে সে বেদেনীদের দেখেছে। তবু আবার লোকটা সেই বেদেনীকে প্রশ্ন করল 'তোরা এখানে এসেছিস কেন?'
বেদেনী জবাব দিল—'আমরা ভাগ্য গণনা করি, জড়ি-বুটি-ঔষধী বেচি, রোগ ভালো করি, সেই কাজের জন্যই এখানে এসেছি।'
হ্যাঁ, এই যাযাবর বেদেনীরা এই কাজই করে। এ কাজের জন্যই তারা সারা দেশ ঘুরে বেড়ায়। দোভাষী ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলল সাহেবকে। কোম্পানির সাহেবের নিজের দেশেও এ ধরনের মেয়েদের দেখা মেলে। যাদের বলে—জিপসি। তবে সাবধানের মার নেই। এরা অন্য কোনও মতলবে ওখানে আসেনি তো? যতই হোক ওরা ভিনদেশী। তাই ফ্রাইডে নামের শ্বেতাঙ্গ নির্দেশ দিল—'তাঁবুর ভিতরগুলো একবার দেখো।'
সাহেবের নির্দেশমতো কয়েকজন দেশী সেপাই তাঁবুগুলোর ভিতর ঢুকে জড়ি-বুটির আঁটি, কিছু তামার মাদুলি, পাথরের বাটিতে ঔষধী আরক, বিক্রি করার জন্য কিছু চুড়ি ছাড়া তেমন বিপজ্জনক বা সন্দেহজনক কোনও কিছুর সন্ধান পেল না। নিশ্চিন্ত হল সাহেব।
দোভাষী লোকটারও আর সেখানে দাঁড়িয়ে থাকার ইচ্ছা হল না। হঠাৎ তার মনে পড়ল, লোকে বলে এসব বেদেনীরা নানা ধরনের তুকতাক জানে, এরা অভিশাপ দিলে তা নাকি ফলে যায়। তাই এদের থেকে দূরে থাকাই ভালো। কাজেই সে সাহেবকে বলল, 'হুজুর ওদের থেকে বিপদের আশঙ্কা আছে বলে মনে হচ্ছে না। মজুরদের পল্লীতে তাড়াতাড়ি যাওয়া দরকার। নইলে ওরা পালিয়ে যেতে পারে।'
সাহেবও আর এরপর সেখানে দাঁড়ানো প্রয়োজন মনে করল না। কোম্পানির ফ্রাইডে সাহেব তার সঙ্গীদের নিয়ে এগোলেন মজুর ধরে দুর্গে নিয়ে যাবার জন্য।
যে বেদেনী সাহেবের দোভাষীর সঙ্গে কথা বলছিল সে আর কেউ নয়—কুইলি। ফ্রাইডে সাহেবের দল চোখের আড়ালে অদৃশ্য হতেই সে তার পাশে দাঁড়ানো তারই মতো বেদেনীর ছদ্মবেশধারী শুভলক্ষ্মী আর সাবিত্রীকে বলল, 'এবার আমাদের বেরিয়ে পড়তে হবে। সন্ধ্যা নামার আগেই আমরা যতটা সম্ভব খবর সংগ্রহ করে এখানে ফিরে আসব। তারপর অন্ধকার নামলে, রাত একটু গভীর হলে শহর ত্যাগ করব।'
কুইলির কথামতো কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁবু থেকে জিনিসপত্র নিয়ে বেরিয়ে পড়ল সবাই। কেউ নিল জড়িবুটির থলি, কেউ আরক, কেউ বা লাঠির মাথায় বাঁধা চুড়ির গোছা। আগের দিন বিকালে শহরে আসার পর সৈন্যদের বাসস্থানগুলো কোথায় কোথায় সে ব্যাপারে কিছুটা খবর তারা সংগ্রহ করেছে। মোটামুটি সে জায়গাগুলোর দিকেই একজন বা দুজন করে কুইলি বাহিনী এগোল। তাদের মধ্যে কেউ কেউ শিশুদেরও কোলে তুলে নিল। তারা সবাই রওনা হবার পর একটা লোহার আংটাতে একগোছা মাদুলি ঝুলিয়ে নিয়ে কুইলি একলা রওনা হল শিভাগঙ্গাই দুর্গের দিকে।
ক্রমশ কাছে এগিয়ে আসতে লাগল অনুচ্চ পাহাড়ের মাথায় অবস্থিত শিভাগঙ্গাই কেল্লা। সে যত সেই দুর্গের দিকে এগোতে লাগল ততই পথে বাড়তে লাগল সৈনিকদের সংখ্যা। তার মধ্যে ঘোড়সওয়ার শ্বেতাঙ্গ সৈনিকও অছে। শিভাগঙ্গাই রাজ্যের প্রাণভোমরা এই দুর্গ। কাজেই এ দুর্গকে ঘিরে সৈনিকদের আনাগোনা তো থাকবেই।
'ভাগ্য গণনা করাবে? ভাগ্য গণনা? বেদেনী গণনা মিথ্যা হয় না। মাদুলি পরলে তোমার রোগ সারবে, পুত্রহীনের পুত্র হবে, তুমি রাজা হবে।'—এ সব নানা কথা হাঁকতে হাঁকতে, হাতের মাদুলির ঝাঁকা বাজাতে বাজাতে কুইলি এগোল দুর্গের দিকে। আশেপাশের কেউই তাকে বিশেষ বাধা দিচ্ছিল না।
একসময় সে পৌঁছে গেল দুর্গের ঠিক নীচে। সেখান থেকে রাস্তাটা উঁচু হয়ে এগিয়েছে দুর্গতোরণের দিকে। ঠিক এই জায়গাটার একপাশে কোম্পানির দেশীয় কর্মীদের বাসস্থান-মহল্লা। মহল্লার সামনে পৌঁছে কুইলি থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল দুর্গের দিকে মুখ করে। বাইরে থেকে দুর্গের সবকিছুই এখন কুইলির চোখে ধরা দিচ্ছে।
দুর্গটি খুব বেশি বড় নয়, মাঝারি আকৃতির। দুর্গের মাথায় পতপত করে উড়ছে কোম্পানির লাল পতাকা। দ্বিস্তরীয় প্রাকার দিয়ে দুর্গের নিরাপত্তা বলয় রচনা করা হয়েছে। ওপরের প্রাকারের চারদিকে মুখ করে বসানো আছে সার সার কামান। ওপর এবং নীচের প্রাকারের গায়ে সৈনিক চলাচলের যে পথ রয়েছে, সেখানেও সতর্ক দৃষ্টিতে নীচের দিকে তাকাতে তাকাতে ঘুরে বেড়াচ্ছে সৈনিকরা। ওপরের প্রাকার অথবা নীচের কোনও সৈনিকই তিরন্দাজ নয়, সবাই বন্দুকধারী। পাথুরে রাস্তাটা উঁচু হয়ে যেখানে গিয়ে বিশাল দুর্গতোরণে মিশেছে, সেই দুর্গতোরণের দুপাশে সার বেঁধে ঝোলানো বন্দুকের মাথায় বসানো ইস্পাতের ছুরি বা সঙিনগুলো সূর্যের আলোতে ঝিলিক দিচ্ছে। যারা দুর্গতোরণ থেকে ওঠা নামা করছে তারা অধিকাংশই শ্বেতাঙ্গ। সকলেই বন্দুকধারী।
বাইরে থেকে দেখে কুইলি যতটুকু বুঝতে পারল এখানকার কোম্পানি শাসক মরিস ও তার শ্বেতাঙ্গ অনুচরদের বাসস্থান দুর্ভেদ্য। আম্মার সেনাদল বর্শা, তির, তলোয়ার নিয়ে এ দুর্গের দিকে এগোলেই কামান আর বন্দুকের মুখে মুহূর্তে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। যদি কোনভাবে দুর্গের ভিতর প্রবেশ করে ভিতরটা ঘুরে আসা যায় এই ভেবে কুইলি সামনে পা বাড়াতে যাচ্ছিল, ঠিক সেই সময় একজন দেশি ঘোড়সওয়ার তার সামনে এসে দাঁড়াল। তার পরনে সামরিক পোশাক। লোকটা দেশী সৈন্য হলেও তার মাথার পাগড়িতে বসানো কোম্পানির ধাতব চাকতিটা দেখে কুইলি অনুমান করল লোকটা সম্ভবত পদমর্যাদায় কোনও সৈনাধ্যক্ষ হবে। লোকটাকে দেখে কুইলি বেদেনীদের মতো বলে উঠল, 'ভাগ্যগণনা করবে? ভাগ্যগণনা? কবচ দেব, মাদুলি দেব। তুমি ঠিক একদিন সেনাপতি হবে।'
লোকটা এসেছিল কুইলিকে দুর্গের দিকে এগোবার পথ থেকে হটিয়ে দেবার জন্য। কিন্তু কুইলির কথা শুনে সে থমকে গেল। ইতিমধ্যেই কুইলির চোখ দেখে নিয়েছে লোকটার বাঁ-হাতে একটা রুপোর কবচ বাঁধা। অর্থাৎ লোকটার জ্যোতিষ, ভাগ্যগণনা-তুকতাক এসবে বিশ্বাস আছে।
নিজের ভাগ্য জানতে কে না চায়? তাছাড়া এই সৈনিকও শুনেছে বেদেনীরা নাকি ভালো ভাগ্যগণনা করতে পারে। তাই সে একটু ইতস্তত করে শেষপর্যন্ত তার হাতের তালুটা ঘোড়ার পিঠ থেকেই বেদেনীর দিকে বাড়িয়ে দিল।
কুইলি বেশ কিছুক্ষণ ধরে তার হাতটা পরীক্ষা করে, তর্জনী দিয়ে বাতাসে আঁকিবুকি কেটে অঙ্ক কষে বলল, 'তোমার একবার ছেলেবেলাতে অসুখ করেছিল, আর তোমার ওপরওয়ালা লোকটা বিশেষ সুবিধার নয় তাই না?' প্রত্যেক মানুষেরই ছেলেবেলাতে কোনও না কোনও অসুখ হয় আর অধিকাংশ কর্মীরাই সাধারণত তার ওপরওয়ালার প্রতি সন্তুষ্ট থাকে না।—এই সাধারণ ধারণার চাল দিয়েই কুইলি লোকটাকে প্রশ্নগুলো করল।
সেই সৈনিক সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, 'হ্যাঁ, ঠিক। ঠিক।'
কুইলি বুঝতে পারল সৈনিকের মনে আস্থা তৈরি হয়েছে। কুইলি এরপর আবারও বাতাসে কল্পিত আঁক কষল। বেদেনীরা যেমন ভাগ্যফল জানাবার আগে মাটিতে থুতু ফেলে তেমনই থুতু ফেলে বলল, 'আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি তুমি কয়েকবছরের মধ্যে সেনাপতি হবে। নদীতে স্নান করে কাল সূর্যোদয়ের সময় এই মাদুলিটা গলায় পরবে।'—এই বলে সে একটা মাদুলি লোকটার হাতে ধরিয়ে দিল।
খুশি হয়ে সৈনিক জিগ্যেস করল, 'এই মাদুলির জন্য কী দাম দিতে হবে তোমাকে?'
বেদেনী বলল 'এখনই কিছু দিতে হবে না। পাঁচ বছর পরপর আমরা একই জায়গাতে ফিরে আসি। এরপর যখন আসব তখন তুমি সেনাপতি হয়ে যাবে। তখন আমাকে তুমি একটা সোনার মাকড়ি দিও।'
বেদেনীর এই কথা শুনে সৈনিকের বেদেনীর ভবিষ্যৎবাণী সম্পর্কে ধারণা আরও দৃঢ় হল ঠিকই। কিন্তু তার মনে হঠাৎ আবার কর্তব্যবোধও ফিরে এল। সে বেদেনীকে প্রশ্ন করল 'কোথায় যাচ্ছ তুমি?'
কুইলি জবাব দিল, 'আমি দুর্গের ভেতরে যাব। যদি কেউ গণনা করায়? তুমি আমাকে দুর্গে প্রবেশ করাতে পারবে?'
অশ্বারোহী সঙ্গে সঙ্গে বলল, 'না, না। দুর্গে বাইরের কাউকেই প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না। এই যে আমি এক পল্টন সেনাধ্যক্ষ, আমিও যদি দুর্গের ভিতর প্রবেশ করতে যাই, তবে আমারও অনুমতি লাগে। দেশীয় লোকদের মধ্যে যারা কোম্পানির সেরেস্তায়-খাজাঞ্চিখানায় কাজ করে, তারাই একমাত্র দুর্গের ভিতর প্রবেশ করতে পারে। তোমাকে দুর্গের ভিতর প্রবেশ করানোর ক্ষমতা আমার নেই। তাছাড়া ওখানে কোম্পানির সাহেবরা থাকে, তারা ভাগ্য গণনা করায় না। আমি তোমাকে এদিকে আর এগোবার অনুমতি দিতে পারব না।'
কুইলি লোকটার কথা শুনে বুঝতে পারল দুর্গের ভিতর প্রবেশ করে খবর সংগ্রহ করা তার পক্ষে অসম্ভব ব্যাপার। সে হতাশ ভাবে অশ্বারোহী সৈনিকের দিকে তাকিয়ে বলল, 'এত দূর দেশ থেকে এখানে এলাম, তবে কি আমাকে খালি হাতে ফিরে যেতে হবে?'
এই বেদেনী তাকে ভাগ্যগণনা করে বলেছে—সে একদিন সেনাপতি হবে। বিনা পয়সাতে একটা মাদুলিও দিয়েছে। কাজেই বেদেনীর প্রতি একটু দয়া-পরবশ হয়ে অশ্বারোহী সৈনিক বলল, 'এই যে দুর্গের নীচে ঘর-বাড়িগুলো দেখছ ওখানকার পুরুষরা দুর্গের ভিতর কোম্পানির সেরেস্তা, খাজাঞ্চিঘর এসব জায়গাতে কাজ করে। ওখানেও আমরা সাধারণ নগরবাসীকে বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া প্রবেশ করতে দিই না। ওখানে গেলে হয়তো তোমার কিছু বিক্রিবাটা হতে পারে। আমি তোমাকে ওখানে প্রবেশের অনুমতি দিতে পারি। তবে মধ্যাহ্নে যখন দুর্গে ঢেঁড়া বাজবে তখনই তুমি ওখান থেকে বেরিয়ে পড়বে। ওখানে কোনও সৈনিক যদি তোমার পথ আটকায় তবে বলবে সেনাধ্যক্ষ গণেশ তোমাকে সেখানে প্রবেশের অনুমতি দিয়েছে।'—এ কথা বলে গণেশ নিজের ভবিষ্যতের কথা ভাবতে ভাবতে উৎফুল্ল মনে তার গন্তব্যে রওনা হয়ে গেল।
কুইলি কোম্পানির দেশীয় কর্মচারীদের বাসস্থানের দিকে এগোল।
মহল্লার প্রবেশদ্বারের মুখে দুজন সৈনিক দাঁড়িয়েছিল। দূর থেকে তারা দেখতে পেয়েছিল বেদেনীর সঙ্গে কথা বলছিল সেনাধ্যক্ষ গণেশ। কাজেই কুইলি যখন বলল যে, সেনাধ্যক্ষ গণেশ তাকে এ জায়গাতে প্রবেশের অনুমতি দিয়েছে তখন তারা কুইলিকে পথ ছেড়ে দিল। দুর্গে কর্মরত দেশীয় কর্মচারীদের আস্তানায় প্রবেশ করল কুইলি।
এখানকার পথঘাট বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। বড় বড় ঘরবাড়িগুলো সব ইট আর পাথর নির্মিত। কয়েকটা বাড়ি তো বেশ পেল্লায় আকৃতির। দেখে বোঝা যায় কোম্পানির একান্ত অনুগত সেবক ও সম্ভ্রান্ত প্রজারা বাস করে এখানে। নগরীর অন্যান্য জায়গার সঙ্গে এ জায়গার কোনও মিলই নেই। তবে রাস্তায় লোকজনের দেখা নেই, ঘর-বাড়ির দরজা-জানলাগুলো ভিতর থেকে বন্ধ। ভোর হতেই এখানকার পুরুষরা সব চলে যায় দুর্গে। আর মহিলারা গৃহকর্মে বাড়ির ভিতর।
'ভাগ্যগণনা করাবেন, ভাগ্য? বেদেনীর গণনা মিথ্যা হয় না। রোগ সারবে, পুত্রহীনার পুত্র হবে, কন্যা রাজরানি হবে।'—এসব নানান কথা বলে হাঁক দিতে দিতে বেদেনীবেশী কুইলি এগিয়ে চলল।
মহল্লার ভিতরে ঢুকে হাঁক দিতে দিতে সে একটা চকের সামনে এসে দাঁড়াল। চকের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে ঝনঝন শব্দে মাদুলির ঝাঁকাটা বাজাতে বাজাতে জোর গলায় সে বলতে লাগল গতে বাঁধা তার কথা—'ভাগ্যগণনা করাবে, ভাগ্য? বেদেনীর গণনা ঝুট হয় না...।'
কিছুক্ষণ হাঁক-ডাকের পর হঠাৎই একটা বাড়ির দরজা একটু ফাঁক হল। চাকরানি গোছের একজন মহিলা কুইলির উদ্দেশে গলা বাড়িয়ে বলল, 'এই বেদেনী ভিতরে এসো। মালকিন তোমাকে ডাকছেন।'
কুইলি বাড়ির ভিতর প্রবেশ করল। বাড়ির ভিতরটাও বিশাল। রুপোর কাজ করা একটা পালকিও রাখা আছে বাড়ির ভিতর। অর্থাৎ এ বাড়ির মালিক ধর্ণাঢ্য ব্যক্তি। আরও কয়েকজন চাকরানিকেও বাড়ির ভিতর দেখতে পেল সে। নানা কাজে ব্যস্ত তারা। বিশাল উঠোন ও বেশ কয়েকটা অলিন্দ পেরিয়ে কুইলি চাকরানির সঙ্গে হাজির হল একটা বেশ বড় ঘরে। শ্বেতপাথরের মেঝের মধ্যে পা ছড়িয়ে বসে আছে এক স্থূলকায়া মাঝবয়সি রমণী। তার সারা অঙ্গে সোনার গহনা। একজন দাসী তার পা টিপে দিচ্ছিল।
'ইনি আমাদের মালকিন—গৃহকর্ত্রী।'
কুইলি মাথা ঝুঁকিয়ে তাকে অভিবাদন জানাল। গৃহকর্ত্রী কুতকুতে চোখে বেদেনীবেশী কুইলিকে নিরীক্ষণ করার পর জানতে চাইল, 'তুমি সত্যিই ভাগ্যগণনা করতে পারো? ভবিষ্যতের কথা বলতে পারো?'
কুইলি বলল, 'হ্যাঁ পারি। আমার কথা মিথ্যা হয় না। ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়েও দিতে পারি। এই তো সেনাধ্যক্ষ গণেশের হাত দেখে এলাম একটু আগে। সে আমাকে দিয়ে হাত দেখায়। তাকে যা বলেছি সব মিলে গেছে। আরও অনেক বড় মানুষই এখানে আমাকে দিয়ে হাত দেখায়, নইলে কি আমি এ মহল্লাতে ঢোকার অনুমতি পেতাম?'
বলা বাহুল্য গৃহকর্ত্রীকে সত্যি-মিথ্যা মিশিয়েই কথাগুলো বলল কুইলি। সেনাধ্যক্ষ গণেশকে চেনে গৃহকর্ত্রী। তার নাম কুইলি উল্লেখ করাতে গৃহকর্ত্রী আশ্বস্ত বোধ করল। সে তার দাসীদের ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে বলে ইশারায় কুইলিকে তার সামনে এসে বসতে বলল। কুইলি মেঝের ওপর বসে পড়ল। গৃহকর্ত্রী কুইলির দিকে তার হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল, 'দেখো তো, আমার হাতে কী লেখা আছে?'
কুইলি তার হাতটা টেনে গম্ভীরভাবে কিছুক্ষণ দেখার পর বলল, 'লেখা তো অনেক কিছুই আছে। কিন্তু আপনি কী জানতে চাইছেন সেটা আগে বলুন?'
গৃহকর্ত্রী বলল, 'আমার স্বামী দুর্গের সহকারী খাজাঞ্চি। দেখো তো সে কবে প্রধান খাজাঞ্চি হবে, তা আমার হাতে লেখা আছে কি না?'
কুইলি এবার গৃহকর্ত্রীর বৈভবের কারণ অনুমান করতে পারল। শুধু বেতন নয়, তার থেকে দশ গুণ উপরি আয় হয়। এও বুঝল, এই নারীর কাছ থেকে দুর্গের ভিতরের খবর কিছু না কিছু পাওয়া যেতে পারে! এমনকী হয়তো এই মহিলার সাহায্যে দুর্গে প্রবেশের সুযোগ হতে পারে।
কুইলি হাতটা দেখতে দেখতে বলল, 'হ্যাঁ, উনি খাজাঞ্চি হতে পারেন ঠিকই! কিন্তু সামনে একটা বাধা আছে দেখতে পাচ্ছি।'
কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই সেই পৃথুলা নারী বলে উঠল, —'হ্যাঁ, হ্যাঁ, বাধা তো আছেই। প্রধান খাজাঞ্চি বুড়ো হয়েছে। তার ওপর হাঁপের রুগি। কিন্তু লোকটা কিছুতেই মরছে না। সে না মরলে আমার স্বামীও ওই পদে যেতে পারছেন না।'
নকল বেদেনী বলল, 'যদি আমাকে দুর্গে নিয়ে যেতে পারো তবে আমি খাজাঞ্চিখানার দরজার সামনে মন্ত্র পড়ে ধুলো ছিটিয়ে আসতে পারি। বুড়োটা সেই ধুলোতে পা দিলে একমাসের মধ্যে নির্ঘাত মরবে।'
সহকারী হিসাবরক্ষকের স্ত্রী প্রথমে একটু চিন্তিত স্বরে বলল, 'কিন্তু কোম্পানির সাহেবরা তো তাদের কর্মচারী ছাড়া কাউকে দুর্গে প্রবেশ করতে দেয় না। নারীদেরও নয়। আমার স্বামী আমাকে নিয়েও সেখানে প্রবেশ করতে পারবেন না।'
কুইলি বলল, 'বুড়োটাকে মারার অন্য পথ তবে দেখছি। মন্ত্রবাণ মারতে হবে। তাতে বুড়োটার মরতে একটু সময় লাগবে। ধুলোপড়া দিলে কাজটা সহজ হত। কোনভাবেই কি যাওয়া যাবে না দুর্গে?'
হঠাৎ গৃহকর্ত্রীর চোখটা ঝিলিক দিয়ে উঠল। সে বলল, 'হ্যাঁ, একটা দিন অবশ্য তুমি দুর্গে প্রবেশ করতে পারো। দিন পনেরো পর দুর্গাপুজোর বিজয়া দশমী। শুধুমাত্র ওই দিন মহিলাদের দুর্গে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়। 'রাজেশ্বরী আম্মান' মন্দিরে পুজো হয়। ওই দিন মন্দিরে ঢুকে তুমি কাজটা করে আসতে পারো। খাজাঞ্চিখানাটা দুর্গের কোথায় সেটা আমি তোমাকে বলে দিতে পারব।
তুমি ওই দিনই কাজটা করে ফেলো। দুর্গে উঠে রাজেশ্বরী মন্দিরে যাবার পথে ডান দিকে তাকালেই দেখবে একটা থামওয়ালা বিরাট বাড়ি। মাথায় কোম্পানির পতাকা আছে। কেল্লার বুরুজ ছাড়া মরিস সাহেবের বাসস্থান আর ওই খাজাঞ্চিখানার মাথাতেই পতাকা ওড়ে। যদিও সাহেব সৈন্যরা খাজাঞ্চিখানার দরজার বাইরে পাহারা দেয় তবে একটু ধুলো ছড়িয়ে এলে তারা তেমন আপত্তি করবে না। তুমি তো আর খাজাঞ্চিখানা লুট করতে যাচ্ছ না! তাছাড়া ওই দিন খাজাঞ্চিখানা বন্ধ থাকে। পুরুষরা সব ভাঙ খেয়ে রাস্তায় গড়াগড়ি খায়।' কেউ কেউ বেশ্যা সঙ্গও করে। উৎসব উপলক্ষে বেশ্যা, নাচনেওয়ালীর দলও আসে বাইরে থেকে।
গৃহকর্ত্রীর মুখ থেকে যদি আরও কিছু কথা বার করা যায় সেই আশায় কুইলি এরপর বলল, 'দাঁড়ান, এবার গুনে দেখি আপনার ভাগ্যে আর কী কী লেখা আছে!'
একটা কাপড়ের পুঁটলি করে কুইলি কিছুটা বালি এনেছিল। সেটা সে মাটির মধ্যে ছড়িয়ে দিয়ে তাতে গম্ভীর মুখে আঙুল দিয়ে আঁক কষতে কষতে নানা কথা বলতে লাগল গৃহকর্ত্রীর সঙ্গে। এক সময় সে গৃহকর্ত্রীকে বলল, 'আমরা তো সারা দেশ ঘুরে বেড়াই। কোম্পানির অনেক দুর্গে ঢুকেছি ভাগ্যগণনা করার জন্য। কিন্তু এ দুর্গে ঢোকার জন্য এত কড়াকড়ি কেন? শুনেছি এখানকার রাজার অনেক হিরা-জহরত ছিল। সেসব কি ওই খাজাঞ্চিখানাতেই রাখা আছে? সে জন্যই এত কড়াকড়ি? বাইরের লোককে কি সেই জন্যেই দুর্গে ঢুকতে দেওয়া হয় না?'
'রাজা মুথুপেরিয়ারের প্রাসাদ থেকে কোম্পানি অনেক সোনা-হিরা-জহরত পেলেও সেগুলো পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির তোষাখানাতে। দুর্গে সেসব নেই। হ্যাঁ, খাজাঞ্চিখানাতে অবশ্য কোম্পানির কিছু টাকাকড়ি থাকে।' সহকারী খাজাঞ্চির স্ত্রী ধীরে ধীরে কুইলির সামনে মুখ খুলতে শুরু করল।
কুইলি আঁক কষতে কষতে বলল, 'সে তো সব তোষাখানা, খাজাঞ্চিখানাতেই কমবেশি থাকে। তবে যেন এখানে একটু বেশিই কড়াকড়ি।'
গৃহকর্ত্রী একটু চুপ করে থেকে বলল, 'ব্যাপারটা তোমাকেই বলছি। অন্য কারো সঙ্গে আলোচনা করলে বিপদ হতে পারে। এই রাজেশ্বরী মন্দিরের ঠিক পিছনেই বারুদ ঘর। মাদ্রাজের রেসিডেন্ট কমিশনারের কাছ থেকে মাঝে মাঝেই পিপে পিপে বারুদ এনে এই বারুদঘরে জমা করা হয়। কামান-বন্দুক দিয়েই তো শিভাগঙ্গাই দখল করেছে কোম্পানি। দেশি রাজা-নবাবদের কাছে বারুদ-কামান-বন্দুক না থাকায় তারা কোম্পানির পল্টনের কাছে হেরে যায়। আমার স্বামী বলেছিলেন, ওই বারুদ ঘরে নাকি এত বারুদের পিপে জমা আছে যা ব্যবহার করে নাকি শিভাগঙ্গাইয়ের মতো আরো দশটা রাজ্য দখল করে নিতে পারবে কোম্পানি।'
কথাগুলো শুনে কুইলির কাছে এবার সব কিছু জলের মতো স্পষ্ট হয়ে গেল। হ্যাঁ, একটাই কারণ।
আঁক কষতে কষতে এরপর সহকারী খাজাঞ্চির পত্নীর কাছ থেকে দুর্গের ব্যাপারে আরও বেশ কিছু তথ্য সংগ্রহ করে নেয় কুইলি। এক সময় কুইলির কাল্পনিক ভাগ্যগণনা শেষ হল। কুইলির মিথ্যা প্রবচন শুনে গৃহকর্ত্রী তাকে খুশি হয়ে তিনটে স্বর্ণমুদ্রা দিল, এবং বলল যে, কুইলির কথামতো কাজ হলে তাকে একশো স্বর্ণমুদ্রা দেবে।
বিজয়া দশমীর দিন সে অবশ্যই তার কাজ সমাধা করবে এই আশ্বাসবাণী শুনিয়ে তার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে এল কুইলি। বেশ বেলা হয়ে গেছে এখন। কুইলির চোখের সামনে রৌদ্রোজ্জ্বল আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে আছে ইস্ট ইন্ডিয়ার দম্ভের প্রতীক দুর্ভেদ্য দুর্গ। কুইলি কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল সেই দুর্গের দিকে। তারপর রওনা হল নগরীর যে অংশে তাদের তাঁবু রয়েছে সে দিকে।
কুইলি তাঁবুতে পৌঁছবার পর তার অন্য সঙ্গিনীরাও একে একে ফিরে আসতে লাগল। বিকেলের মধ্যেই সবাই ফিরে এল। প্রত্যেকেই কিছু কিছু খবর সংগ্রহ করে এনেছে। তাদের মুখ থেকে সমস্ত কথা শুনে কোম্পানির সেনাবাহিনীর সংখ্যা, শক্তি সম্পর্কে মোটামুটি স্পষ্ট ধারণা তৈরি করতে পারল কুইলি। কুইলি আর তার সঙ্গিনীরা নিশ্চিত, ওই দুর্গ দখল না করতে পারলে রানি ভেলু নাচিয়ারের পক্ষে তাঁর রাজ্য ফিরে পাওয়া কোনদিনই সম্ভব হবে না। আর রানিমার সেনাবাহিনীর পক্ষে এই দুর্গ দখলের ব্যাপারটা প্রায় অসম্ভবই বলা চলে। তির-ধনুক-বর্শা নিয়ে তারা কীভাবে কামানের মোকাবিলা করবে?
বিকেল গড়িয়ে শিভাগঙ্গাই, বর্তমানে কোম্পানির হুসেন নগরীতে সন্ধ্যা নামল এক সময়। রাত্রি একটু গভীর হতে কুইলিরা সন্তর্পণে নগরী ত্যাগ করে রওনা দিল অরণ্যে ফেরার জন্য।
বেশ বেলা হয়ে গেছে। নিজের কক্ষের সামনে ছোট অলিন্দে বসে তার কন্যা ভেলিচির পোশাক সেলাই করছিলেন রানি। নিজেকে আজকাল বড় একা মনে হয় তাঁর। সবথেকে বড় কথা আজকাল যেন হতাশাও গ্রাস করে নিচ্ছে তাঁকে। সাত বছর হয়ে গেল, কিন্তু শিভাগঙ্গাইকে দখল মুক্ত করা যায়নি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাত থেকে। বাকি রয়ে গেছে স্বামী মুথু পেরিয়ারের হত্যার প্রতিশোধ নেবার কাজ। যদিও বা তিনি মহীশূর নবাব হায়দার আলির সাহায্য সহযোগিতায় এ পর্যন্ত এলেন, কিন্তু এখানে এসেই তাকে আটকে যেতে হয়েছে। রানির সাহায্যের জন্য টিপু তাঁর কথামতো আরও একটা ছোট সেনাদল পাঠিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু তাদের নিয়ে কি কোম্পানির থেকে ছিনিয়ে নেওয়া যাবে কোম্পানির শক্ত ঘাঁটি শিভাগঙ্গাই?
রানি ভেলুর শয়ন কক্ষে একটা সাধারণ কাঠের চৌকিতে শুয়ে আছে রানি ভেলুর বালিকা কন্যা ভেলিচি। অলিন্দে বসে রানি ঘরের ভিতর শুয়ে থাকা কন্যাকে দেখতে পাচ্ছেন। আজকাল আরও এক শঙ্কা কাজ করে রানির মনে। এমন যদি হয়, ফিরিঙ্গিদের গুপ্তঘাতক হত্যা করল রানিকে, অথবা যুদ্ধক্ষেত্রে রানি নিহত হলেন! তখন কী হবে তার কন্যার?
ভেলিচির এখনও রাজনীতি বোঝার মতো বয়স হয়নি, সে অস্ত্র চালাতেও পারে না, কিন্তু কোম্পানি কি ছেড়ে দেবে তাকে? রানি শুনেছেন ছোট্ট রাজ্য ভালাইথাড়ু জয় করার পর কোম্পানি শুধু সেখানের রাজা-রানিকেই নয়, তাদের তিন মাসের শিশুপুত্রের মুখেও নুনের পুঁটুলি গুঁজে দিয়ে তাকে হত্যা করেছিল, যাতে সে বড় হয়ে পিতার রাজ্য পুনরুদ্ধারের জন্য কোম্পানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে না পারে। এমনই নৃশংস কোম্পানির ওই লালমুখো ফিরিঙ্গিরা। টিপু ঠিকই বলেন, ফিরিঙ্গিরা হল শিয়ালের থেকেও ধূর্ত, বিষধর সর্পের থেকেও ভয়ঙ্কর, নির্দয়! হঠাৎই সামনের থামের আড়ালে একটা ছায়া দেখে চমকে উঠলেন। হাত কেঁপে গিয়ে একটা আঙুলের ডগাতে সূচ ফুটে গেল। সেই অবস্থাতেই তিনি পাশে রাখা ধারালো কিরিচটা তুলে নিলেন। পরমুহূর্তে যে আত্মপ্রকাশ করল সে কোম্পানির পাঠানো কোনও গুপ্তঘাতক নয়, একজন নারী দ্বাররক্ষী। সে প্রণাম জানিয়ে বলল, 'একজন অশ্বারোহী নারী, আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এসেছে। এই বস্ত্রখণ্ডটা দিয়ে সে বলল এটা দেখালেই আপনি তার পরিচয় বুঝতে পারবেন।'
রক্ষীর হাত থেকে বস্ত্রখণ্ডটা নিলেন রানি। নীল রঙের রেশমের একটা রুমাল। তার এক কোণে সোনালি সুতোয় শিভাগঙ্গাই রাজ্যের প্রয়াত রাজার প্রতীক—একটা প্রস্ফুটিত পদ্ম আঁকা। এই রুমালটা রানি একজনকেই উপহার দিয়েছিলেন। রানি বললেন, 'তাকে আমার এখানে পাঠিয়ে দে।'
রানির কথা শুনে দ্বাররক্ষী চলে গেল তার আজ্ঞা পালন করতে।
চিকের কাছে এসে মুখ থেকে অবগুণ্ঠন সরিয়ে ভগ্ন থামওয়ালা অলিন্দ দিয়ে রানিমার কাছে উপস্থিত হল কুইলি। চৌপায়াতে বসে ছিলেন রানি আম্মা ভেলু। চিন্তাক্লিষ্ট বিষণ্ণ মুখ। কুইলিকে দেখে মৃদু হাসলেন রানিমা। কুইলি প্রতিবারের মতোই রানিমার পা ছুঁয়ে প্রণাম জানিয়ে তার পায়ের কাছে বসল। হঠাৎ কুইলি রানি আম্মার কোলের দিকে তাকাতেই চমকে উঠল। কুইলি বলে উঠল—'রানি আম্মা, আপনার শাড়িতে রক্ত কেন?'
রানি ভেলু তার পাশে মেঝেতে রাখা কাপড় আর সূচ-সুতো দেখিয়ে বললেন, 'ও কিছু নয়। মেয়েটার শাড়িটা ছিঁড়ে গেছে। তাই সেলাই করছিলাম। অসাবধানে হাতে সূচ ফুটে গেছে।'
কুইলি রানিমার তাকিয়ে দেখল তখনও রানি ভেলুর বাম হাতের তর্জনী থেকে বিন্দু বিন্দু রক্ত ঝরছে! কুইলি কোনও কথা না বলে রানি আম্মার হাতটা নিয়ে আঙুলের ক্ষতস্থানের ওপর বস্ত্রখণ্ড চেপে ধরল রক্ত বন্ধ করার জন্য। অন্য কেউ হলে এভাবে রানিমার বিনা অনুমতিতে তার শরীর স্পর্শ করতে সাহস পেত না। তবে রানি ভেলু নাচিয়ার তাঁকে কন্যার মতোই স্নেহ করেন।
বস্ত্রখণ্ড দিয়ে রানি আম্মার আঙুলটা চেপে ধরার পর কুইলির হঠাৎ করে মনে পড়ে গেল শিভাগঙ্গাইতে সেই বিরাট বাড়িতে স্বর্ণভূষণে মোড়া সেই উচ্চাভিলাষী পৃথুলা রমণীর কথা। সেই স্ত্রীলোক আর এই রানি আম্মা তো দুজনেই শিভাগঙ্গাইয়ের মানুষ, অথচ কত পার্থক্য তাদের দুজনের মধ্যে! এদের একজন চেষ্টা চালাচ্ছে কীভাবে তার স্বামী কোম্পানির আরও কাছের মানুষ হয়ে উঠতে পারে, কীভাবে তার পদোন্নতি ঘটিয়ে আরও অর্থ আয় করা যায়। আর, একজন চেষ্টা চালাচ্ছে চরম দারিদ্র্য, কষ্ট সহ্য করে কীভাবে তাঁর নিহত স্বামীর হত্যাকারীদের, বিদেশি বেনিয়াদের বিতাড়িত করে শিভাগঙ্গাইকে স্বাধীন করা যায়!
রানির শরীরে কোনদিন এক চিলতে স্বর্ণালঙ্কারও দেখেনি কুইলি। হিরা-জহরত তো অনেক দূরের ব্যাপার। অথচ একদিন এই শিভাগঙ্গাইয়ের মহারানি ভেলুর কোনও কিছুরই অভাব ছিল না। রাজাকে হত্যা করে সব কিছু দখল নেবার পর আত্মগোপনকারী রানি ভেলুর শরীরে যেটুকু অলঙ্কার ছিল তা রানি সবটুকু খুলে দিয়েছেন কোম্পানির বিরুদ্ধে ফৌজ গঠন করার জন্য। তাঁর আজ এমনই অবস্থা যে, রাজকন্যার জন্য ছিন্নবসন সেলাই করতে হচ্ছে! আর এত সব কৃচ্ছ্রসাধন, ত্যাগের একটাই লক্ষ্য, যেভাবেই হোক কোম্পানির শাসন থেকে মুক্ত করতে হবে শিভাগঙ্গাই রাজ্যকে, প্রতিশোধ নিতে হবে রাজা মুথুপেরিয়ারের হত্যাকাণ্ডের। এসব কথা মনে পড়তেই তার সামনে বসা রানি আম্মার প্রতি অজান্তেই কুইলির মাথা নত হয়ে এল।
আঙুলের রক্তপাত বন্ধ হতেই হাতটা আবার নিজের কোলে টেনে এনে রানি ভেলু জানতে চাইলেন—'শিভাগঙ্গাইয়ের খবর কিছু পাওয়া গেল?'
'হ্যাঁ। আমি বেদেনীর ছদ্মবেশে কয়েকজন সঙ্গীকে নিয়ে শিভাগঙ্গাই শহরে গেছিলাম। কোম্পানির শক্তি সম্পর্কে বেশ কিছু খবরও সংগ্রহ করে এনেছি।'
'সেখানে আমাদের যেসব প্রজারা রয়ে গেছিল তারা কেমন আছে রে?'
কুইলি জবাব দিল, 'যা দেখলাম তাতে গরীব প্রজাদের অবস্থা শোচনীয়। তাদের খাদ্য নেই, বস্ত্র নেই, কোনক্রমে পশুর মতো তারা বেঁচে আছে। কোম্পানির লোকেরা তাদের ধরে ধরে বেগার খাটাতে নিয়ে যায়। মেয়েদের ইজ্জত থাকে না। কাজের সামান্য গাফিলতি হলেই চাবুক চলে। কোম্পানির সাহেবদের কথা না শুনলে অনেক সময়ে তাদের মেরেও ফেলা হয়। তবে হাতেগোনা কিছু লোক যাদেরকে কোম্পানি কাজের জন্য বড় বড় দায়িত্বপূর্ণ পদে নিয়োজিত করেছে তাদের কোনও অভাব নেই। আরাম-আয়েসে দিন কাটাচ্ছে তারা।'
কুইলির কথা শুনে মৃদু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন রানি ভেলু নাচিয়ার। রাজার আমলে শিভাগঙ্গাই রাজ্যের প্রজাদের মুখে পরমান্ন না জুটলেও অন্তত দু-বেলা সাধারণ ডাল-ভাতটুকু জুটত। নারীদের স্পর্শ করা তো অকল্পনীয় ব্যাপার ছিল।
কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর রানি আম্মা বললেন, 'এবার বল, কোম্পানির ব্যাপারে, ওদের ফৌজের শক্তির ব্যাপারে কী কী খবর পেয়েছিস? কী পরিমাণ অস্ত্র আছে ওদের কাছে?'
'আমার সঙ্গীরা সেনা ছাউনিগুলো বাইরে থেকে ঘুরে দেখেছে। ওখানে ছোট-বড় প্রাসাদগুলোকে সেনা ছাউনিতে আর আস্তাবলে রূপান্তরিত করা হয়েছে। দেশি সেপাইরা থাকে শহরের মধ্যে ওইসব ছাউনিতে। আর শ্বেতাঙ্গ সৈনিকরা থাকে শিভাগঙ্গাই দুর্গে। যতটুকু খবর সংগ্রহ করেছি তাতে দেশি ফৌজের সংখ্যা আনুমানিক আড়াই হাজার। আর দুর্গে বাস করে দুর্গ অধিপতি ক্যাপ্টেন মরিসের নেতৃত্বে দুশোজন মতো ফিরিঙ্গি সেনা।'
রানি মৃদু উৎসাহিতভাবে বললেন, 'আমার নিজের সৈন্য সংখ্যা বর্তমানে দেড় হাজার। কয়েকদিন আগে মহীশূর থেকে দেড়শজন অশ্বারোহী সৈনিক পাঠিয়েছেন টিপু। তোর সঙ্গে আছে নারী বাহিনীর একশোর কাছাকাছি যোদ্ধা। অর্থাৎ আমাদের সেনাদলের সঙ্গে কোম্পানির ফৌজের ব্যবধান হাজারখানেক সৈন্যর। টিপু তো বলেছেন কোম্পানির শক্তি সম্পর্কে জানার পর তিনি সেই অনুসারে সেনা পাঠাবার চেষ্টা করবেন। আমাদের সাহায্য করার জন্য কিছুদিনের জন্য হাজার খানেক বাড়তি সেনা পাঠাবার ক্ষমতা নিশ্চয়ই সুলতান হায়দার আলির আছে। সেনা সংখ্যা সমান হলে কি আমরা আমাদের সাহস দিয়ে শক্তি দিয়ে কোম্পানির ফৌজকে পরাজিত করতে পারব না? আমি নিজে থাকব সৈনিকদের সঙ্গে, গোপালা নায়কারের মতো বিচক্ষণ সেনাপতি থাকবেন, তোর মতো সেনাপতি থাকবে। শিভাগঙ্গাইকে কোম্পানির দখল মুক্ত করতে পারব না আমরা?'
কুইলির মন মুহূর্তে নেচে উঠল টিপুর ফৌজ ইতিমধ্যে রানির কাছে উপস্থিত হয়েছে জেনে। হয়তো সৈনিক তিরুমল ফিরে এসেছে তাদের সঙ্গে। যদি ইতিমধ্যে সে কুইলিকে ভুলে গিয়ে অন্য কারও সঙ্গে ঘর বেঁধেও থাকে তবুও তো তিরুমলকে দেখতে পাবে সে। সেটাও অনেক বড় প্রাপ্তি হবে।
কুইলি অবশ্য তার মনের ভাব মুখে প্রকাশ করল না। একটু চুপ করে থেকে বলল, 'আমাদের সেনা সংখ্যার পরিমাণ যদি কোম্পানির ফৌজের সমান বা তাদের থেকে বেশিও হয় তবুও যুদ্ধ জয় সম্ভব নয়।'
'কেন, সম্ভব নয় কেন?'
কুইলি বলল, 'কেন সম্ভব নয় সেটাই বলছি রানিমা। কোম্পানির প্রধান শক্তি ক্যাপ্টেন মরিস আর গোরা সৈনিকদের বাসস্থান শিভাগঙ্গাই দুর্গ। দু-দুটো প্রাকারবেষ্টিত কোম্পানির গোলা-বারুদ মজুত থাকে ওখানেই। নগরীর চার দিকে মুখ করে সার সার ভারী কামান বসানো আছে দুর্গের ওপর। ধরা যাক, আমরা অতর্কিতে শিভাগঙ্গাই নগরীতে হানা দিলাম কোনও রাতে। সেনা ছাউনিগুলোতে হানা দিয়ে বন্দুকধারী দিশি সিপাইদের হত্যাও করলাম, কিন্তু দুর্গের দখল না নিতে পারলে নগরীর দখল তিনদিনও ধরে রাখতে পারব না। টিলার ওপর অবস্থিত দুর্গ থেকে নীচে অবস্থিত নগরীর দিকে তোপ দাগতে শুরু করবে ফিরিঙ্গি গোলন্দাজরা। আমরা নগরীতে লুকিয়ে থাকি, কিংবা দুর্গ দখলের জন্য এগোই, যাই করি না কেন, ইংরেজদের কামানের গোলার মুখে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাব। তাছাড়া গরিব নাগরিকরাও মারা পড়বে। আমি নগরীর রাস্তায় কামানের গোলার ক্ষত দেখেছি। মাঝে মাঝে নিজেদের শক্তি জাহির করার জন্য, নগরবাসীকে ভয়ে রাখার জন্য, কামানের পাল্লার ক্ষমতা পরীক্ষা করার জন্য কোম্পানির শ্বেতাঙ্গ ফৌজ গোলা দাগে। বলতে গেলে পুরো নগরীটাই তাদের কামানের পাল্লার মধ্যে।'
রানি বললেন, 'যদি টিপু আমাদের কয়েকটা কামান দেন?'
'জঙ্গলের মধ্যে রাস্তা বানিয়ে ভারী কামান বয়ে নিয়ে যাওয়া কি সম্ভব? আর কোনক্রমে কয়েকটা কামান যদি নিয়ে যাওয়াও যায় তবে তা কোনও কাজে আসবে না। অবস্থানগত ভাবে ইংরেজ কোম্পানি সুবিধাজনক অবস্থায় আছে। নীচ থেকে আমাদের গোলা দুর্গের ভিতর পৌঁছবে না, কিন্তু ওপর থেকে গোলা দেগে আমাদের সহজেই ধ্বংস করা যাবে।'
রানি ভেলু জানতে চাইলেন, 'তুই দুর্গের ভিতর ঢুকেছিলি?'
কুইলি বলল, 'না। নারী হোক বা পুরুষ, একমাত্র কোম্পানির কাজে নিয়োজিত কিছু উচ্চপদস্থ দেশি লোক ছাড়া ফিরিঙ্গিরা কাউকে দুর্গে ঢুকতে দেয় না। এমনকী দেশি সেনাধ্যক্ষদেরও দুর্গে প্রবেশ করতে গেলে কোম্পানির ফিরিঙ্গিদের অনুমতি লাগে। দুর্গে শুধু ফিরিঙ্গি মরিসের বাসস্থানই নয়, ওখানে কোম্পানির বারুদ ঘর। ওই বারুদের কাছেই তো বার বার পরাস্ত হচ্ছি আমরা, ছোট-বড় দেশীয় রাজ্যগুলো। দুর্গে প্রবেশ করে যাতে ওই বারুদ ঘরের কেউ দখল না নিতে পারে ওই ফিরিঙ্গিরা এ দেশীয় লোকদের দুর্গে প্রবেশ করতেই দেয় না।'
কুইলির কথা শুনতে শুনতে হতাশা নেমে আসতে শুরু করেছে রানির মনে। তিনি বললেন, 'তবে কি শিভাগঙ্গাই রাজ্য দখল করার সম্ভাবনা আমাদের নেই? এত দিনের স্বপ্ন বিফলে যাবে?'
কুইলি একটু ভেবে নিয়ে বলল, 'যদি মহীশূরের সুলতান আমাদের আরও হাজার দশেক সৈন্য দেন, এবং তাদের অর্ধেক সৈন্যকে খোয়াতে যদি রাজি থাকেন, তবে হয়তো কিছু সৈন্য নিজেদের সৈন্যদের মরদেহ মাড়াতে মাড়াতে শেষ পর্যন্ত দুর্গে প্রবেশ করলেও করতে পারে।'
এবার সত্যিই হতাশার ছাপ স্পষ্ট দেখা গেল রানির মুখমণ্ডলে। কুইলি বুঝতে পারল সেটা। সে জানতে চাইল, 'মহীশূর থেকে যে সেনাদল এসেছে তার সেনাপতি কে? কোথায় আছেন তারা?'
রানি বললেন, 'ফতে খান বলে এক প্রৌঢ় সেনাপতি দলটার দায়িত্বে আছেন। আগেও একবার এসেছিল এখানে। আস্তাবলের গায়েই তারা ছাউনি ফেলেছে।'
ফতে খান নামটা যেন চেনা মনে হল কুইলির। হয়তো বা সে যখন এখানে এসেছিল তার সঙ্গে কুইলির পরিচয় হয়ে থাকতে পারে। রানিকে ভরসা দেবার জন্য কুইলি বলল, 'এখনই এত হতাশ হবেন না রানিমা। মহীশূর থেকে পাঠানো সেনাধ্যক্ষকে আপনি ডেকে পাঠান। শিভাগঙ্গাই রাজ্যের বর্তমান অবস্থার কথা জানাই তাকে। তিনি, আপনি, গোপালা নায়কার, আমি, সবাই মিলে আলোচনা করে দেখা যাক শিভাগঙ্গাই দখল করার অন্য কোনও পথ খোলা আছে কিনা।'
রানি কুইলির কথায় একবাক্যে রাজি হয়ে বললেন, 'ঠিক আছে। চাঁদ উঠলে ফতে আলি আর গোপালা নায়কারকে এখানে আসতে বলছি। তুইও থাকবি। দেখা যাক ওনারা কোনও পরামর্শ দিতে পারেন কিনা?'
বেলা গড়াতে শুরু করেছে মধ্যাহ্নের দিকে। এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা ছড়িয়ে আছে চারপাশে। তবে তারই মধ্যে কুইলির মনে মাঝে মাঝে খেলা করছে এক রূপালি আশা। সৈনিক তিরুমল যদি এসে থাকে মহীশূরের সেনাদলের সঙ্গে?
রানি আম্মা বললেন, 'অনেক দূর থেকে এসেছিস তুই। এবার তোর বিশ্রামের প্রয়োজন। আমি তোকে ডেকে নেব।'
রানিমা এরপর কয়েকবার তালি দিলেন। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে কুইলি আবার মুখ ঢেকে নিল। একজন নারী রক্ষী সব সময় রানিমার প্রয়োজনের জন্য চত্বরে দাঁড়িয়ে থাকে। তালির শব্দ শুনে সে হুকুম পালনের জন্য উপস্থিত হল। রানি ভেলু তাকে নির্দেশ দিলেন চত্বরের মধ্যেই একটা কক্ষে কুইলির রাত্রিবাস আর খাবারের ব্যবস্থা করার জন্য।
দুপুরে সেই নারী রক্ষী এসেই খাবার দিয়ে গেল কুইলিকে। এক ধরনের কালো চালের ভাত আর সিদ্ধ করা সবজি-কন্দমূলের মণ্ড। রানি ভেলুর সৈন্যরা এই খাবারই খায়। রানি ভেলু আর তার মেয়েও এই একই খাবার খায়। বিরাট বড় বড় লোহার কড়াইতে খাবার রান্না করে সৈন্যরা। ঘোড়া ও গরুর মাঝামাঝি দেখতে এক ধরনের প্রাণী দেখতে পাওয়া যায় জঙ্গলে—নীলগাই। দৈবাৎ কোনদিন কোনও সেনাদল জঙ্গলে ঢুকে একটা নীলগাই যদি মেরে আনতে পারে, তবে মহা উল্লাস শুরু হয় সৈনিকদের মধ্যে। হয়তো সৈনিকরা কেউ এক টুকরোর বেশি মাংস পায় না, কেউ বা শুধু মাংসের ঝোল। কিন্তু তাতেই তাদের আনন্দ ধরে না। অন্য দিন তাদের এই কালো চালের ভাত আর সবজি মণ্ড খেয়েই দিন কাটাতে হয়। তবু তারা রানি আম্মাকে ভালোবাসে, নিজের দেশের মাটিকে ভালোবাসে।
ভগ্ন কক্ষের মেঝেতে শুয়ে কুইলির মনে পড়তে লাগল তিরুমলের কথা। সে কি ফিরে এসেছে সেনাদলের সঙ্গে? কুইলি যদি আস্তাবলের পিছনে মহীশূরের সেনা ছাউনিতে গিয়ে এখনই দেখে আসতে পারত যে তিরুমল এসেছে কিনা তবে ভালো হত। কিন্তু সে ইচ্ছা থাকলেও এখনই তার খোঁজে সেনা ছাউনিতে যাওয়া উচিত হবে না। সে মনে মনে ভেবে নিল তেমন হলে আরও একটা দিন সে এখানে থেকে যাবে তিরুমলের খোঁজ পাবার জন্য। জঙ্গলে বহু কাল নিশ্চিন্তে ঘুমায় না কুইলি। জঙ্গলের তুলনায় এ স্থান অনেক বেশি নিরাপদ। তিরুমলের কথা ভাবতে ভাবতে বহু দিন নিরাপদে না ঘুমানো কুইলির চোখে ঘুম নেমে এল।
কুইলির যখন ঘুম ভাঙল তখন বনের আড়ালে সূর্য ডুবতে চলেছে। একটা মিষ্টি স্বপ্ন দেখছিল কুইলি। তিরুমল তাকে ঘোড়ার পিঠে চাপিয়ে নিয়ে চলেছে এক নতুন দেশে। সে দেশে কত বড় বড় হর্ম্য প্রাসাদ, ফোয়ারাশোভিত বাগ-বাগিচা, রাস্তার পাশে ফসলের ভারে নুইয়ে পড়া শস্যখেত। পথে ঝলমলে পোশাক পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে মানুষ।
স্বপ্ন দেখতে দেখতে হঠাৎই একটা শব্দ শুনে ঘুম ভেঙে গেল কুইলির। গবাক্ষ দিয়ে সে দেখতে পেল এই জীর্ণ প্রাসাদের মাথার ওপর দিয়ে দিন শেষে জঙ্গলের দিকে ডাকতে ডাকতে ফিরে যাচ্ছে বিরাট একটা টিয়া-পাখির ঝাঁক। সেই শব্দেই ঘুম ভেঙেছে কুইলির। তার মনে হল, আস্তাবলের পিছনে সেনা ছউনিতে বসে তিরুমল কি দেখছে আকাশের বুকে উড়ে যাওয়া এই টিয়াপাখির ঝাঁক? ডাকতে ডাকতে এক সময় টিয়াপাখির দল হারিয়ে গেল জঙ্গলের দিকে।
দরজাতে মৃদু শব্দ শুনে কুইলি যখন দরজা খুলল তখন মাথার ওপর চাঁদ উঠে গেছে। দরজা খুলে কুইলি দেখল নিস্তব্ধ প্রাঙ্গণে চাঁদের আলোতে দাঁড়িয়ে গোপালা নায়কার। তিনি কুইলিকে বললেন, 'রানিমা ডাকছেন তোমাকে। সেনাধ্যক্ষ ফতে খান হাজির হয়েছেন।'
কুইলি অনুসরণ করল তাকে। রানিমার বাসস্থানের কাছে পৌঁছে কুইলি দেখল অলিন্দের সামনে চিকের পর্দার সামনে বসে আছেন সেনাধক্ষে ফতে খান। দীর্ঘদেহী পাঠান ফতে খান। মেহেন্দি রঞ্জিত দীর্ঘ দাড়ি তাঁর। দাড়ি দেখেই কুইলি লোকটাকে চিনতে পারল। হ্যাঁ, এ লোকটাও সেসময় সৈনিক তিরুমলদের দলেই ছিল। তখন সে রানি ভেলুর সৈনিকদের তলোয়ার চালানো শেখাত। এত বছর পর আবার ফিরে এসেছে সেনাধ্যক্ষ হয়ে।
কুইলি তার মুখের আবরণটা সরিয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে সম্ভাষণ জানাল উপস্থিত সকলকে। মহীশূরের সেনাধ্যক্ষও সম্ভবত কুইলিকে চিনতে পেরে মাথাটা একটু নাড়লেন। সেনাপতি গোপালা নায়কার গিয়ে বসলেন ফতে খানের পাশে আর কুইলি তাদের পাশ কাটিয়ে অলিন্দে প্রবেশ করে হাজির হল রানি আম্মার কাছে। একটা তেলের প্রদীপ জ্বলছে অলিন্দের কুলুঙ্গিতে।
আলোচনা শুরু হল। রানি ভেলু বললেন, 'আপনারা আগে কুইলির কাছ থেকে শিভাগঙ্গাই নগরীর বর্তমান অবস্থা আর ওখানকার ফিরিঙ্গিদের কথা শুনে নিন। তারপর এ ব্যাপারে আপনাদের মতামত দেবেন।'
রানি আম্মার নির্দেশ পেয়ে কুইলি মহীশূর সেনাধ্যক্ষ ফতে খান আর গোপালা নায়কারের উদ্দেশে বলতে শুরু করল শিভাগঙ্গাই রাজ্য থেকে সে যা যা দেখে এসেছে, যে খবর শুনে এসেছে সেসব কথা। কুইলির কথা মনোযোগ দিয়ে শুনে যেতে লাগলেন ফতে খান আর গোপালা নায়কার।
এক সময় কুইলির কথা শেষ হল। রানিমা দুই সেনাধ্যক্ষের কাছে জানতে চাইলেন তাদের অভিমত।
গোপালা নায়কার প্রথমে মুখ খুললেন। তিনি বললেন, 'কুইলি যা বলছে তাতে শিভাগঙ্গাই নগর আমাদের পক্ষে কোনভাবেই দখল করা সম্ভব হবে না। যদি না মহীশূরের সুলতান আমাদের সাহায্যের জন্য বিপুল সংখ্যায় সেনাবাহিনী পাঠান। তাদের অধিকাংশই বন্দুকধারী সৈন্য হতে হবে। ধনুক-তলোয়ার-বর্শা দিয়ে ফিরিঙ্গি সেনা বা কোম্পানির ফৌজের বিরুদ্ধে লড়াই করে দুর্গ দখল করা যাবে না।'
কুইলি বলল, 'ঠিক তাই। আমিও একই কথা বলেছি রানি আম্মাকে। বিরাট সেনাদল না হলে আমরা কখনই শিভাগঙ্গাই উদ্ধার করতে পারব না ফিরিঙ্গিদের কাছ থেকে। আর বারুদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য বারুদ চাই। আমি শুনেছি বারুদঘরে এত পরিমাণ বারুদ জমা আছে যে তা দিয়ে নাকি কোম্পানির ফৌজ আরও পাঁচটা রাজ্য দখল করে নিতে পারে!'
রানি ভেলু নাচিয়ার এবার সেনাধ্যক্ষ ফতে খানের উদ্দেশে বললেন, 'শুনেছি মহীশূর রাজ্যে পঞ্চাশ হাজার মতো সৈন্য আছে। কামানও আছে প্রচুর। সেনাপতি টিপু আমাকে আশ্বাস দিয়েছেন প্রয়োজনে তিনি আরও সৈন্য দিয়ে আমাকে সাহায্য করার চেষ্টা করবেন। তিনি আমাদেরকে তাঁর পঞ্চাশ হাজার সৈন্যর মধ্যে থেকে হাজার দশেক সৈন্য দিয়ে সাহায্য করতে পারবেন না? এই সাহায্যের পরিবর্তে আমরা যদি কোম্পানিকে তাড়াতে পারি মহীশূরের 'করদরাজ্য' হতেও আমার কোনও আপত্তি নেই।
রানি ভেলু নাচিয়ারের কথা শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ফতে খান বললেন, 'আপনি বললে আপনার এ প্রস্তাব আমি সেনাপতি টিপুর কাছে পৌঁছে দিতে পারি। কিন্তু আমার ব্যক্তিগত ধারণা, আরও হাজার খানেক সৈন্য দিয়ে মহীশূর আপনাকে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু দশ হাজার সৈন্য দিয়ে আপনাকে সাহায্য করা সুলতান হায়দার আলি বা প্রধান সেনাপতি টিপুর পক্ষে অসম্ভব।'
রানি বললেন, 'কেন? অসম্ভব কেন? মহীশূর বাহিনীতে তো পঞ্চাশ হাজার সৈন্য আছে। এই সাহায্য পেলে আমরা চিরঋণী হয়ে থাকব হায়দার আলি আর টিপুর কাছে।'
অভিজ্ঞ সেনাধ্যক্ষ ফতে খান বললেন, 'হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন আপনি। বিরাট রাজ্য মহীশূর। তার সেনাবাহিনীর সংখ্যাও পঞ্চাশ হাজার। কামানও আছে প্রচুর। কিন্তু তাদের মধ্যে তিরিশ হাজার সৈন্যই বিভিন্ন সীমান্ত শহরে নিয়োজিত আছে। রাজধানীতে সাধারণত কুড়ি হাজার সেনা থাকে। কিন্তু সপ্তাহখানেক পরই দুর্গাপুজো। আর তারপরই খেতের ফসল উঠতে শুরু করবে। ওই সময় প্রতিবারের মতো হানা দেয় মারাঠা বর্গীদের দল। তাদের মোকাবিলার জন্য হাজার পাঁচেক সেনাকে সব সময় আলাদা প্রস্তুত রাখতে হয়। আপনাকে যদি মহীশূর দশ হাজার সেনা দিয়ে সাহায্য করে তবে কার্যত অরক্ষিত হয়ে পড়বে রাজধানী।
ফিরিঙ্গিরা, মারাঠারা সহ আরও বেশ কিছু রাজ্য প্রতিমুহূর্তে গোপনে চেষ্টা চালাচ্ছে মহীশূরের দখল নেবার জন্য। এমতাবস্থায় রাজধানীর, রাজ্যের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করে আপনাকে দশ হাজার সেনা পাঠানো মহীশূর রাজ্যের পক্ষে সম্ভব নয়। উচিতও নয়। হ্যাঁ, আপনার আবেদনে সাড়া দিয়ে হাজারখানেক সৈন্য নিশ্চয়ই পাঠাতে পারেন মহীশূরের সুলতান। কিন্তু তা দিয়ে কি কোম্পানির কাছ থেকে শিভাগঙ্গাই দুর্গ ছিনিয়ে নেওয়া যাবে?'
আলোচনা চলতে থাকল। আর তার সঙ্গে বেড়ে চলল রাত। তারা চারজন মিলে চুল-চেরা-বিচার-বিশ্লেষণ করতে লাগলেন কোন পথে শিভাগঙ্গাই রাজ্য কোম্পানির থেকে ছিনিয়ে আনা যায়। কিন্তু শিভাগঙ্গাই রাজ্য দখল করার পথে হিমালয়ের মতো বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ওই দুর্লঙ্ঘ্য শিভাগঙ্গাই দুর্গ। আরও স্পষ্টভাবে বলতে গেলে বলতে হয়, কোম্পানির ওই বারুদ ঘর। এক সময় রানি হতাশ কণ্ঠে বললেন, 'তবে কি আমি আর কোনওদিনই ফিরিঙ্গিদের হাত থেকে ছিনিয়ে নিতে পারব না শিভাগঙ্গাই রাজ্য? প্রতিশোধ নিতে পারব না স্বামী হত্যার? এ ভাবে আর কতদিন এখানে পড়ে থাকব?'
বেশ কিছুক্ষণের জন্য চারপাশে নিস্তব্ধতা নেমে এল। এক সময় গোপালা নায়কার বললেন, 'আপনি বরং মহীশূরে চলুন রানিমা। সুলতান হায়দার আপনাকে কন্যাসমা স্নেহ করেন, সেনাপতি টিপু আপনাকে শ্রদ্ধা করেন। তারা আপনাকে আশ্রয় দেবেন। এই জনমানবহীন জায়গাতে আর কতদিন পড়ে থাকবেন? চেষ্টার তো কোনও ত্রুটি করলেন না আপনি। কিন্তু...।'
হঠাৎই যেন বাঘিনীর মতো জ্বলে উঠল রানি ভেলু নাচিয়ারের চোখ। তিনি প্রায় গর্জে উঠে বললেন, 'না। আমি ফিরে যাব না! এতদূর এসে এই শিভাগঙ্গাই রাজ্যে পা রেখে আমি কিছুতেই আর পিছনে ফিরব না। তবে এত বছর ধরে এত দুঃখ কষ্ট সহ্য করলাম কেন? আমার শরীরে যে হিরা-জহরতের অলঙ্কার তখনও ছিল তা বিক্রি করেই তো দূরে কোথাও চলে গিয়ে নিরাপদে জীবন কাটাতে পারতাম। আমি আর কিছুতেই ফিরব না। আপনারা যদি চান তবে আমার সঙ্গ ত্যাগ করে যেখানে খুশি চলে যেতে পারেন। তেমন হলে আমি একাই প্রবেশ করব শিভাগঙ্গাই নগরীতে। অন্তত একজন হলেও তো ফিরিঙ্গি সৈন্যকে মারতে পারব আমি, নিজের দেশের মাটিতে তো মরতে পারব আমি। আর তাতে কিছুটা শান্তি পাবে আমার আত্মা।'—একটানা কথাগুলো বলে প্রচণ্ড উত্তেজনাতে কাঁপতে থাকলেন রানি ভেলু। তাঁর এই উত্তেজনা দেখে কুইলি তার পা দুটো জড়িয়ে ধরে বলল, 'আপনি শান্ত হোন, শান্ত হোন রানি আম্মা। আমি তো আছি আপনার সঙ্গে।'
গোপালা নায়কারও বললেন, 'আপনি শান্ত হোন। হ্যাঁ, আপনার সঙ্গে আমরা সবাই আছি। আপনি যে সিদ্ধান্তই নিন না কেন আপনার পাশে থাকব আমরা। আপনাকে ছেড়ে যাবার কোনও প্রশ্নই নেই। আমি আসলে কথাটা বলেছিলাম আপনার নিরাপত্তার কথা ভেবে, আপনার বালিকা কন্যার কথা ভেবে। দীর্ঘ দিন ধরে আমরা একই জায়গাতে আছি। আমাদের অবস্থানের কথা ফিরিঙ্গিরা জানে। কে বলতে পারে যে একদিন তারা জঙ্গল অতিক্রম করে বিরাট সেনাবাহিনী নিয়ে এখানে ছুটে আসবে না আপনাকে, আপনার কন্যাকে হত্যার করার জন্য? ইতিপূর্বে কোম্পানি দু-দুবার আপনাকে হত্যা করার জন্য গুপ্তঘাতক পাঠিয়েছিল। কুইলি আপনার জীবন রক্ষা করেছে তাদের হত্যা করে। কিন্তু প্রতিবারই কোম্পানির গুপ্তঘাতকরা ব্যর্থ নাও হতে পারে। আপনি যতদিন জীবিত থাকবেন, ততদিন শিভাগঙ্গাই দখল করার স্বপ্নও বেঁচে থাকবে। তাই আপনার জীবন মূল্যবান।'
ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে এলেন রানি ভেলু। এই মুহূর্তে রানিকে যারা ঘিরে আছে, তারা প্রত্যেকেই রানির শুভাকাঙ্ক্ষীই শুধু নয়, তারা যে-কোনও মুহূর্তে রানি ভেলুর জন্য জীবনও দিতে পারে। রানি বুঝতে পারলেন তাঁর এবং তাঁর সন্তানের প্রতি প্রগাঢ় ভালোবাসা থেকেই দীর্ঘদিনের বিশেষ পরামর্শদাতা গোপালা নায়কার কথাগুলো বলেছেন। রানি ভেলু নাচিয়ার বললেন, 'আমি দুঃখিত। হঠাৎই বড় উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলাম। হ্যাঁ, নায়কার, আপনার কথাই ঠিক। প্রতিবারই যে কোম্পানির পাঠানো ঘাতক ব্যর্থ হবে এমন হতে পারে না। আমার মৃত্যু নিয়ে আমি চিন্তা করি না এখন, আমার ফিরে যাবার কোনও ইচ্ছা নেই। তবে আমি আমার কন্যা ভেলিচির ভবিষ্যৎ নিয়ে অবশ্যই চিন্তিত। ভাবছি আমি তাকে হায়দার আলির নিরাপদ আশ্রয়ে পাঠিয়ে দেব। তাঁরা ভেলিচিকে উপযুক্ত শিক্ষায় গড়ে তুলতে পারবেন।
আমি যদি শিভাগঙ্গাই উদ্ধারে ব্যর্থ হই, আমার যদি মৃত্যু ঘটে তবে ভবিষ্যতে ভেলিচি হয়তো তার পিতা-মাতা হত্যার প্রতিশোধ নেবার জন্য, শিভাগঙ্গাই কোম্পানির থেকে ছিনিয়ে নেবার জন্য চেষ্টা করতে পারে।'
রানি ভেলুর কথা শেষ হবার সঙ্গে-সঙ্গেই তেল শেষ হওয়া প্রদীপটা দপ করে জ্বলে উঠেই নিভে গেল। চিকের এপাশে অলিন্দ জুড়ে নেমে এল অন্ধকার। ঠিক এই সময় অন্ধকার কক্ষের ভিতর থেকে ভেসে এল ভেলিচির কাতর কণ্ঠস্বর—'মা, মা! তুমি কোথায়? অন্ধকারে আমার ভয় লাগছে।'
একই জায়গাতে বেশ কিছু সময় অন্ধকারে বসে রইল কুইলি। কারণ, রানি আম্মা ঘরে ঢুকে যাবার পরও উঠে দাঁড়িয়ে নিজেদের মধ্যে কিছু কথাবার্তা বলছিলেন দুই সেনাধ্যক্ষ। তারপর এক সময় তারাও পরস্পরের থেকে বিদায় নিয়ে এগোলেন যে যার জায়গায় রাত্রিবাসের জন্য।
কুইলিও ঠিক সুযোগ বুঝে অলিন্দের বাইরে নেমে এল। সে দ্রুত পায়ে এগোল ফতে খানের পিছনে। সেই খবরটা জানার জন্য প্রবল উত্তেজনায় শরীর কাঁপতে শুরু করেছে কুইলির। ফতে খান যখন চকের বাইরে পা রাখতে চলেছেন, ঠিক সেই সময় কুইলি তার উদ্দেশে পিছন থেকে বলে উঠল, 'সেনাধ্যক্ষ, একটু থেমে যান। কিছু কথা ছিল আপনার সঙ্গে।'
'কী কথা?'
কুইলি একটু ইতস্তত করে বলল, 'গতবার যখন আপনারা রানিমার কাছে এসেছিলেন, তখন তিরুমল নামের এক সৈনিক এসেছিলেন আপনাদের সঙ্গেই। তিনি কি এবারও এসেছেন?'
'না, সে আসেনি।'
কুইলি প্রশ্ন করল, 'এখন তিনি কোথায় থাকেন, কেমন আছেন তা জানেন? তাঁর কাছে আমিও অস্ত্রশিক্ষা পেয়েছি। তাই তাঁর খবর জানতে চাইছি।'
কুইলির প্রশ্ন শুনে একটু চুপ করে থেকে সেনাধ্যক্ষ জবাব দিলেন, 'সে আর আমাদের মধ্যে নেই।'
'নেই মানে? আপনাদের সেনাদল ত্যাগ করেছে সে?'
ফতে খান বললেন, 'এখান থেকে একসঙ্গে সবাই মহীশূর ফিরে গিয়েছিলাম আমরা। তিরুমল আমাকে বলেছিল, সুলতানের খাজাঞ্চিখানা থেকে সে তার বকেয়া পাওনা বুঝে নিয়ে চাকরি ছেড়ে দিয়ে বিয়ে করে ঘর বাঁধবে। কিন্তু আল্লাতালার ইচ্ছা অন্য ছিল। আমরা যখন মহীশূর পৌঁছলাম তখন সেখানে উপস্থিত হয়েছে কয়েকজন ফরাসি বণিক। তিরুবনন্তপুরমে তাদের একটা বাণিজ্য কুঠি দখল নিয়েছে ইংরেজদের। ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়ান হায়দার আলির মিত্র। তাছাড়া ইংরেজ কোম্পানির বিরুদ্ধে লড়াইতে তাদের ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বী ফরাসিরা সাহায্য করে থাকে। কাজেই কুঠি উদ্ধারের জন্য সেনা পাঠাতে হবে হায়দার আলিকে।
তিরুমল প্রথমে সেখানে আমাদের সঙ্গে যেতে রাজি ছিল না। কিন্তু সে যখন শুনল ফরাসিরা পাঁচগুণ বেতন দেবে আর কাজ মিটিয়ে সপ্তাহ তিনেকের মধ্যে ফিরে আসতে পারবে, সে আমাদের সঙ্গী হতে রাজি হয়ে গেল। কারণ চাকরি ছাড়ার পর ঘর বাঁধার জন্য তার টাকার দরকার ছিল।'—এ কথা বলে থামলেন ফতে খান।
উত্তেজনা চেপে রাখতে না পেরে কুইলি বলে উঠল, 'তারপর? তারপর?'
মহীশূরের সেনাধ্যক্ষ এরপর চাপা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, 'তারপর আমরা তিরুবনন্তপুরমে গেলাম। যুদ্ধ শুরু হল কোম্পানির ফৌজের সঙ্গে। ইংরেজদের সংখ্যা বেশি ছিল না। কিন্তু সঙ্গে বারুদ কামান ছিল। সে জন্য আমাদের বেগ পেতে হয়েছিল কিছুটা। শেষ পর্যন্ত আমরা ইংরেজ কোম্পানির কাছ থেকে কুঠি দখল করেছিলাম ঠিকই, কিন্তু বেশ কিছু সঙ্গীকে চিরদিনের জন্য হারাতে হয়েছিল। তবে তিরুমলের ব্যাপারটা বড় মর্মান্তিক।
সেদিন বিকেলে যুদ্ধ তখন প্রায় শেষ হয়ে গেছে। ইংরেজদের শেষ করে ফেলেছি আমরা। এবার আমরা কুঠির দখল নেব। কুঠির ঠিক সামনে একটা বেদির ওপর একটা কামান বসানো ছিল। দু-চার জন ফিরিঙ্গি সৈন্য তখনও যারা জীবিত ছিল তারা তখন প্রাণ বাঁচাবার জন্য আশ্রয় নিয়েছে কুঠির ভিতর। বাইরে বিপক্ষের কোনও সৈন্যকে না দেখতে পেয়ে তিরুমল সোজা ছুটল কুঠির সামনে বসানো সেই কামানটার দিকে, তার দখল নেবার জন্য। সে যখন কামানটার প্রায় কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল, ঠিক সেই সময় হঠাৎই একজন ফিরিঙ্গি সেনা আচমকা বাইরে বেরিয়ে এসে কামানের গোলা দেগে দিল। আর আমাদের চোখের সামনেই উড়ে গেল তিরুমলের দেহ। তার শরীরটা গোলার আঘাতে এতটাই টুকরো টুকরো হয়ে উড়ে গেছিল যে, সৎকারের জন্য তিরুমলের দেহের সব অংশ আমরা খুঁজে পাইনি।'—কথা শেষ করলেন মহীশূরের সেনাধ্যক্ষ।
কুইলির পা থরথর করে কাঁপতে শুরু করেছে। চোখের সামনে যেন একটা কালো পর্দা নেমে আসছে। ফতে খান বললেন, 'তোমার আর কিছু জানার আছে?'
বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেছে কুইলি। কোনরকমে মাথা নেড়ে কুইলি জানিয়ে দিল, না, তার আর কোনও প্রশ্ন নেই। মহীশূরের সেনাধ্যক্ষ এবার চত্বর ত্যাগ করলেন আর কুইলি কোনওরকমে টলতে টলতে এগিয়ে গিয়ে তার কক্ষে প্রবেশ করল।
অন্ধকার কক্ষে বসে চোখের জল যেন বাঁধ মানছে না কুইলির। এতদিন ধরে কুইলি তার মনের গভীরে যে দীপশিখাকে বাঁচিয়ে রেখেছিল, তা যেন আজ দমকা ঝড়ে এক লহমাতে নিভে গেল। কুইলির কাছে আর কোনদিনই ফিরে আসবে না তিরুমল । এ জীবনে আর তিরুমলের সঙ্গে দেখা হবে না কুইলির। এই অন্ধকার রাতের মতো কুইলির জীবনে যেন শুধুই অন্ধকার।
একটা সময় নিজেকে কিছুটা শান্ত করতে সমর্থ হল কুইলি। তার মনে এবার জ্বলে উঠতে শুরু করল ফিরিঙ্গিদের প্রতি ঘৃণা আর ক্ষোভের আগুন। ওরাই তো শেষ করে দিল কুইলির ভালোবাসাকে তোপের মুখে উড়িয়ে দিয়ে, ওরাই তো হত্যা করেছে রাজা মুথুপেরিয়ারকে, চেষ্টা করেছে রানি আম্মাকে হত্যা করার। ওদের জন্যই তো ছোট্ট ভেলিচির এমন দুর্দশা। এর কি কোনও প্রতিকার নেই?
কুইলির মন বলে উঠল, 'প্রতিকার আছে। যেভাবেই হোক ফিরিঙ্গিদের ধ্বংস করতে হবে। তাদের থেকে ছিনিয়ে নিতে হবে শিভাগঙ্গাই। সেখানকার একজন ফিরিঙ্গি সেনাকেও বাঁচতে দেওয়া যাবে না। তাদের দেহগুলোকে খণ্ড-দ্বিখণ্ড করে উড়িয়ে দিতে হবে শিভাগঙ্গাইয়ের বাতাসে। ঠিক যেমন করে তারা তিরুমলের দেহটাকে উড়িয়ে দিয়েছিল। ফিরিঙ্গিদের রক্তে তর্পণ হলে তবেই মুক্তি পাবে নিহত তিরুমলের আত্মা।'
এক সময় জঙ্গলে যখন শেষপ্রহরের শিয়াল ডেকে উঠল তখন উঠে দাঁড়াল কুইলি। এ কুইলি যেন এক অন্য নারী। একটা রাতই যেন তাকে অনেকটা পাল্টে দিয়েছে। এতদিন ধরে সে রানি ভেলু নাচিয়ারের সেবা করে এসেছে, তার জন্য নিজের প্রাণ বাজি রেখে যুদ্ধ করেছে, কোম্পানিকে ঘৃণাও করে এসেছে, কিন্তু কোম্পানির প্রতি এত ঘৃণা, এত ক্ষোভ, এত প্রতিশোধ স্পৃহা এর আগে কখনও পুঞ্জীভূত হয়নি কুইলির মনে! যে ভাবেই হোক ধ্বংস করতে হবে, শিভাগঙ্গাইয়ের বুক থেকে মুছে দিতে হবে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ফিরিঙ্গিদের। ভোরের আলো ফোটার আগেই এবার কুইলিকে ফিরতে হবে। তার আগে বিদায় নিতে হবে রানি আম্মা ভেলুর কাছ থেকে।
কুইলি তার কক্ষ ত্যাগ করে চত্বর অতিক্রম করে অলিন্দে উঠে রানি আম্মার কক্ষের সামনে উপস্থিত হল। তারপর দরজাতে টোকা দিয়ে মৃদু স্বরে ডাকল, 'রানি আম্মা, আমি কুইলি।'
রানি ভেলু নাচিয়ারের আজকাল নানা দুশ্চিন্তায় রাতে ঘুম আসে না। জেগেই থাকেন তিনি। এ রাতেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। কুইলির ডাকে সাড়া দিয়ে দরজা খুললেন রানি।
রানি তাকে দেখে বললেন, 'ফিরে যাচ্ছিস?'
কুইলি বলল, 'হ্যাঁ। তবে যাবার অগে আপনার কাছ থেকে একটা ব্যাপারে অনুমতি নিতে চাই।'
'কীসের অনুমতি?' জানতে চাইলেন রানি আম্মা।
কুইলি জবাব দিল, শিভাগঙ্গাই দুর্গে যাবার অনুমতি। আর ক'দিন পর দুর্গাপুজো। তারপর বিজয়া দশমী। ওই দিন দুর্গতোরণ উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় রাজেশ্বরী আম্মার মন্দিরে পুজো দিতে যাবার জন্য। তবে শুধুমাত্র নারীদেরই প্রবেশ করতে দেওয়া হয়। আমার নারী বাহিনী নিয়ে ওই দিন দুর্গে প্রবেশ করে দুর্গ দখলের চেষ্টা করব। যদি খবর পান আমি দুর্গ, বারুদঘর দখল করতে পেরেছি, তবে সঙ্গে সঙ্গে শিভাগঙ্গাই নগরীকে আক্রমণ করবেন। বারুদ না পেলে কোম্পানির ফৌজের অস্ত্র খেলনা হয়ে যাবে। আপনি শিভাগঙ্গাই দখল নিতে পারবেন। আপনি আমাকে দুর্গে অভিযানের অনুমতি দিন।'
কথাটা শুনে রানি আম্মা চমকে উঠে বললেন, 'কিন্তু এ তো আত্মহত্যার সামিল। তোরা দুর্গে প্রবেশ করলেও নিশ্চয়ই দুর্গ অরক্ষিত থাকবে না। অন্তত সেই তিনশো জন ফিরিঙ্গি সেনা তো থাকবেই। তাদের কাছে বন্দুক আছে। কীভাবে তোরা দুর্গের দখল নিবি? শেষ পর্যন্ত কেউই বেঁচে ফিরবি না। তোকে আমি হারাতে চাই না কুইলি।'
'হয়তো আপনার কথা ঠিক রানিমা। কিন্তু শিভাগঙ্গাই দুর্গ দখল করতে না পারলে কখনই রাজ্য উদ্ধার করা সম্ভব হবে না। আপনি আমাকে অনুমতি দিন। যে ভাবেই হোক দুর্গের দখল নিতে হবে, ধ্বংস করতে হবে ফিরিঙ্গিদের।'
রানি ভেলু নাচিয়ারের মনে হল অন্ধকারের মধ্যে যেন কুইলির চোখ বাঘিনীর মতো জ্বলছে!
রানি ভেলুকে চুপ থাকতে দেখে কুইলি বলল, 'আপনি কি চান না শিভাগঙ্গাই রাজ্য উদ্ধার হোক? রাজা মুথুপেরিয়ারের হত্যাকারীরা শাস্তি পাক? ওই অন্ধকার কক্ষে পিতৃহীন যে শিশুকন্যা শুয়ে আছে ভবিষ্যতে সে নিরাপদে থাকুক? যদি তা চান তবে আমাকে অনুমতি দিন রানি আম্মা!'
কুইলির কণ্ঠস্বরে এমন কিছু ছিল যে, রানি ভেলু নাচিয়ার আর শেষ পর্যন্ত না বলতে পারলেন না। তিনি বললেন, 'ঠিক আছে আমি অনুমতি দিলাম। তবে তোর ভাগ্যে যাই ঘটুক না কেন, জানবি তোর রানি আম্মা তোর সঙ্গে আছে।'
কথা শেষ করে তিনি অন্ধকার হাতড়ে কুইলির মাথায় হাত রাখলেন। কুইলি ঝুঁকে পড়ে রানি আম্মার পায়ে হাত রেখে বলল, 'আমি যেন দুর্গ দখল নিতে পারি, ধ্বংস করতে পারি ফিরিঙ্গিদের।'
কিছুক্ষণের মধ্যেই রানি তাঁর কক্ষ থেকে শুনতে পেলেন অশ্বখুরের শব্দ ছুটে যাচ্ছে জঙ্গলের দিকে।
রানি আম্মার কাছ থেকে ফিরে আসার পর প্রায় এক সপ্তাহ কেটে গেছে। নির্জন দুপুরে জঙ্গলাকীর্ণ আস্তানায় নিজের ভগ্ন কক্ষের দেওয়ালে ঠেস দিয়ে বসেছিল কুইলি। যেদিন রানি ভেলু নাচিয়ারের কাছ থেকে এখানে ফিরে এসেছিল, তার পরদিনই শুভলক্ষ্মী আর কয়েকজনকে আবার ছদ্মবেশে শিভাগঙ্গাইতে পাঠিয়েছিল সেখানকার অবস্থা সরেজমিনে দেখে আসার জন্য।
তিনদিন পর তারা সমস্ত খবরাখবর নিয়ে ফিরে আসে। শিভাগঙ্গাই নগরীতে কোম্পানির দিশি সিপাইদের সবথেকে বড় যে ছাউনি আছে সেখানে নাকি 'দুর্গা মাঈয়ের' পুজোর প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। সেই উৎসবের প্রস্তুতির কারণে দিশি সিপাইরা একটু ঢিলেঢালা থাকলেও দুর্গের নিরাপত্তার কোনও ফাঁক নেই। ফিরিঙ্গি সৈনিকদের কঠিন নিরাপত্তার মধ্যে একই ভাবে রয়েছে দুর্গটা। দিনে-রাতে মাছি গলবার জো নেই।
শুভলক্ষ্মী একদিন মধ্যরাতে দুর্গের কাছাকাছি গেছিল সমস্তটা খতিয়ে দেখবার জন্য। সে দেখেছে সারা রাত্রি ধরে দুর্গ প্রাকারে মশাল জ্বালানো থাকে। ফিরিঙ্গি রক্ষীরা বন্দুক হাতে দুর্গ প্রাকারের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত টহল দেয়। গোলন্দাজরা বসে থাকে কামানের সামনে। দুর্গে প্রবেশ করতে হলে ওই একটা মাত্র দিন আছে—বিজয়া দশমী। শুভলক্ষ্মী খবর এনেছে ওই দিন দুপুরে নাকি নদীতে দুর্গা প্রতিমা নিরঞ্জনের জন্য শোভাযাত্রা বের হয়। দিশি সিপাইরা সামিল হয় তাতে। কিছু ফিরিঙ্গি সেনাও থাকে। সেদিন নাকি খুব আমোদ হয়। বড় বড় চৌবাচ্চাতে ভাঙ গোলা হয়। তা খেয়ে রাস্তায় গড়াগড়ি দেয় অনেকে। নাচনেওয়ালী, বেশ্যার দলও উৎসব উপলক্ষে সমবেত হয় সেখানে। তাঁদের নিয়েও মূর্তি করে কেউ কেউ। ফিরিঙ্গি সৈনিকরাও যে সুযোগ গ্রহণ থেকে বঞ্চিত হয় না। আর নগরীর পুরুষরা যখন এসব আমোদে লিপ্ত থাকে তখন তাদের নারীরা ফলের ঝুড়ি নিয়ে দুর্গে যায় রাজেশ্বরী আম্মান মন্দিরে পুজো দিতে। তিনি দেবী দুর্গারই আর এক রূপ।
গত কয়েকদিন রাত জেগেই কাটিয়েছে কুইলি। চিন্তায় তার ঘুম আসছে না। আজ ষষ্ঠী। দেবী দুর্গার বোধনের দিন। মাঝে মাত্র তিনটে দিন, তার পরই বিজয়া দশমী। কাজটা করতেই হবে কুইলিকে। কিন্তু কীভাবে? অন্য নারীদের সঙ্গে না হয় কুইলি আর তার প্রমীলা বাহিনী দুর্গে প্রবেশ করল, ফলের ঝুড়িতে বা বেনীর মধ্যে ছোট অস্ত্রও না হয় নিল, কিন্তু তারপর তারা কীভাবে দখল নেবে দুর্গের, সেই বারুদঘরের? ছুরি দিয়ে কীভাবে তারা বন্দুকধারী ফিরিঙ্গিদের মোকাবিলা করবে? মরতে ভয় পায় না কুইলি বা তার অনুচররা। কিন্তু সে মৃত্যু কী ফলদায়ী মৃত্যু হবে? শুভলক্ষ্মী এ খবরও জোগাড় করেছে—ওই বারুদঘরের পিছনেই নাকি ফিরিঙ্গিদের বাসস্থান, সেনা ছাউনি। অর্থাৎ সেই বারুদঘর দখল করতে গেলেও তো সঙ্গে সঙ্গে তাদের ঘিরে ফেলবে ফিরিঙ্গিরা।
নির্জন কক্ষে দেওয়ালে ঠেস দিয়ে বসে এদিনও একই কথা ভাবছিল কুইলি। ভাবতে ভাবতে শরীর-মন বড় ক্লান্ত হয়ে আসছে, ঘুম আসছে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই স্বপ্ন দেখতে শুরু করল কুইলি। সৈনিক তিরুমল একইভাবে স্বপ্নে এসে হানা দিল তার। কুইলি দেখল তাকে ঘোড়ার পিঠে চাপিয়ে নিয়ে চলেছে তিরুমল। কত পথ শহর নগরী অতিক্রম করে কুইলিকে নিয়ে এগিয়ে চলেছে তিরুমল।
প্রশস্ত পথ, চারপাশে কত মন্দির, প্রাসাদ, বাগ-বাগিচা, ঝলমলে পথ-ঘাট। চারপাশের পথচারীদের মুখশ্রীতে আনন্দ বিরাজমান। নানান গল্প করতে করতে ঘোড়ার পিঠে এগিয়ে চলেছে তারা দুজন। স্বপ্নের মধ্যে এক সময় কুইলি তাকে জিগ্যেস করল, 'তুমি আমাকে কোথায় নিয়ে চলেছ সৈনিক?'
তিরুমল জবাব দিল, 'এক সুন্দর দেশে। যেখানে ফিরিঙ্গিরা নেই, রাজায় রাজায় যুদ্ধ নেই, এমনকী অস্ত্রেরও প্রয়োজন নেই সেখানে। সেখানে ক্ষেত ভর্তি ফসল আছে, নদীতে মাছ আছে, বাগিচাতে ফুল আছে, মানুষের মুখে হাসি আছে। সেই দেশেই আমি তোমাকে নিয়ে যাচ্ছি, ঘর বাঁধার জন্য। আমরা খুব শীঘ্রই সেখানে পৌঁছে যাব, ওই দেখ দূরে নগরীর প্রবেশ তোরণ দেখা যাচ্ছে। রঙিন পতাকা উড়ছে তার মাথায়, ওই তোরণের ওপাশেই শান্তির দেশ।'
কুইলিও দেখতে পেল সেই তোরণ। উৎসাহিত হয়ে সে বলল, 'চলো, চলো, তবে তাড়তাড়ি চলো। ওই শান্তির দেশে যেতে আমার আর তর সইছে না।'
ঘোড়ার পিঠে সেই তোরণের দিকে এগোতে থাকল তারা। যত তারা তোরণের দিকে এগোতে থাকল পথ-ঘাট তত সুন্দর হয়ে উঠতে লাগল। এক সময় তারা পৌঁছে গেল সেই বিশাল তোরণের সামনে। কোনও দ্বাররক্ষী নেই সেই তোরণে। বাইরে থেকে নগরীর ভিতরটা দেখা যাচ্ছে। নগরীর ভিতর কিছুটা দূরে একটা উঁচু জায়গাতে বিরাট এক প্রাসাদ। তার মাথায় সোনালি গম্বুজগুলো সম্ভবত সোনায় মোড়া। সূর্যকিরণে ঝলমল করছে সেগুলো। প্রাসাদের মাথায় একটা পতাকা উড়ছে। তোরণের পাশের বাগিচা থেকে ফুলের গন্ধ ভেসে আসছে। তোরণের ভিতর প্রবেশ করার আগেই কুইলিকে নিয়ে ঘোড়া থেকে নেমে পড়ে তিরুমল। বলল, 'দাঁড়াও, তোরণ অতিক্রম করার আগে একটা কাজ বাকি আছে।'
কুইল বলল, 'কী কাজ?'
সৈনিক বলল, 'এই শান্তির দেশে অস্ত্র নিয়ে প্রবেশ করা যাবে না। তাই এগুলোকে এখানেই ছেড়ে যেতে হবে।'
অস্ত্রগুলো মাটিতে নামিয়ে রেখে গা থেকে সৈনিকের বর্ম খসিয়ে ফেলতে লাগল সৈনিক। কুইলিও তার কোমরে লুকানো গুপ্ত ছুরিকাটা বার করে ছুড়ে ফেলে দিল। তিরুমল আর কুইলি শরীর থেকে এতদিনের সৈনিকের সব চিহ্ন মুছে হাত ধরে তোরণ অতিক্রম করে প্রবেশ করল শান্তির নগরীতে। দু-পাশে পুষ্প সুরভিত উদ্যান। পাখির কলকাকলিতে মুখরিত চারদিক। সত্যিই যেন অপার শান্তি বিরাজ করছে চারদিকে। আর তার মাঝখানে দিয়ে শ্বেত পাথরের প্রশস্ত রাজপথ সোজা এগিয়েছে সোনায় মোড়া রাজপ্রাসাদের দিকে। কুইলি আর তিরুমল এগোল সেদিকেই।
কিছুটা এগোবার পরই হঠাৎ যেন একরাশ কালো মেঘে ছেয়ে গেল আকাশ। বৃষ্টি নামবে নাকি? কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সূর্য ঢেকে গেল, কুইলির চোখের সামনে থেকে মুছে গেল রাজপ্রাসাদ, হারিয়ে গেল পথ-বাগিচা, নিকষকালো এক ভয়ঙ্কর অন্ধকার ঘিরে ধরল কুইলিদের!
কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার অন্ধকার মুছে চারদিক স্পষ্ট হয়ে উঠল! কড়া রোদ কুইলিদের মাথার ওপর। সে রোদ ঝলসে দিচ্ছে কুইলির চোখ! চারপাশে তাকিয়েই অবাক হয়ে গেল কুইলিরা। কোথায় সেই সৌরভশোভিত বাগিচা? সে জায়গাতে কাঁটা আগাছার জঙ্গল! ফুলের সৌরভের বদলে ভেসে আসছে পশুদের বিষ্ঠার দুর্গন্ধ! রাস্তা থেকে উধাও হয়েছে শ্বেতপাথরের ফলক। কামানের গোলাতে খানাখন্দময় পথ তাদের সামনে! তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে তারা। চারপাশের বদলে যাওয়া দৃশ্য দেখে তিরুমল বিস্মিতভাবে বলে উঠল, 'এ তো সেই শান্তির নগরী নয়! এ কোন জায়গাতে তোমায় নিয়ে উপস্থিত হলাম আমি?'
তিরুমলের পাশ থেকেই কে একজন কর্কশ কণ্ঠে জবাবটা দিল—'এ কোনও শান্তির নগরী নয়। তোমরা পথ ভুলে প্রবেশ করেছ শিভাগঙ্গাই শহরে—হুসেন নগরীতে। ওই দেখো তোমাদের সামনে দুর্গটা।'
কথাটা কানে যেতেই সামনে তাকিয়ে কুইলি দেখল, যেখানে সেই রাজপ্রাসাদটা ছিল, সেখানে টিলার ওপর দাঁড়িয়ে আছে শিভাগঙ্গাই দুর্গ। তার মাথায় উড়ছে কোম্পানির পতাকা। প্রাকারের ওপর বসানো আছে সার সার কামান। হ্যাঁ, ওটা শিভাগঙ্গাই দুর্গই!
আর তারপরই যেন ভোজবাজির মতো কুইলিদের চারপাশের মাটি ফুঁড়ে আবিভূর্ত হল কোম্পানির সেনাদল। ফিরিঙ্গি সৈন্য, দিশি সিপাইও আছে সে দলে। তাদের হাতের বন্দুকের নল চারপাশ থেকে তাক করা নিরস্ত্র কুইলিদের দিকে। কোম্পানির সেনাদলের চক্রব্যুহে বন্দি কুইলিরা। কোম্পানির সেনাদলের মধ্যে দুজন লোককে চিনতে পারল কুইলি। তাদের একজন দাড়িওয়ালা লোক, অন্যজন সিলামবমের শিক্ষক নটরাজন! যাদের দুজনকে কোম্পানি নিয়োগ করেছিল রানি ভেলু নাচিয়ারকে হত্যা করার জন্য। শেষ পর্যন্ত যাদের হত্যা করে কুইলি।
তারা দুজনও চিনতে পারল কুইলিকে। তিরুমল ফিরিঙ্গি ফৌজদের উদ্দেশে বলল, 'আমরা নিরস্ত্র। আমাদের ফিরে যেতে দাও। আমরা যুদ্ধ করতে আসিনি।'
কথাটা শুনে অট্টহাস্য করে উঠল দাড়িওয়ালা গুপ্তঘাতক। তারপর সে সঙ্গী নটরাজনের উদ্দেশে বলল, 'আরে, এই সেই কুইলি না? রানি ভেলুর অনুচর?'
নটরাজন বলল, 'হ্যাঁ, হ্যাঁ, এই সেই কুইলি। ওর জন্যই তো আমরা রানি ভেলুকে হত্যা করতে পারলাম না।'
কথাটা শুনে দাড়িওয়ালা ঘাতক বলে উঠল, 'এবার বাগে পেয়েছি ওকে। আজ আমরা প্রতিশোধ নেব। দুজনকেই হত্যা করব। ধর ওদেরকে। দুর্গে নিয়ে চল।'
কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে সমবেত কোম্পানি ফৌজ হিংস্রভাবে চিৎকার করে উঠল, 'হত্যা করো, হত্যা করো।' চিৎকার করতে করতে কোম্পানি ফৌজ ঝাঁপিয়ে পড়ল তাদের দুজনের ওপর। একটা পুরো সেনাদলের সঙ্গে খালি হাতে লড়াই করা যায় না। বাধা দেবার চেষ্টা করলেও ফৌজের হাতে বন্দি হল তারা দুজন। লোকগুলো তাদের দড়ি বেঁধে টেনে নিয়ে চলল দুর্গের দিকে। বন্দিদের নিয়ে দুর্গে প্রবেশ করল ফৌজ। বন্ধ হয়ে গেল রক্ষীপরিবৃত দুর্গের ভারী দরজাটা।
ফিরিঙ্গি ফৌজ তাদের নিয়ে চলল, দুর্গের ভিতর একটা নির্দিষ্ট স্থানের দিকে। চারপাশে ফিরিঙ্গি সৈন্যদের ভিড়। পথে একটা মন্দির পড়ল। বন্দিদের নিয়ে ফিরিঙ্গি ফৌজ উপস্থিত হল একটা মাঠে। তার একপ্রান্তে উঁচু ছাদওয়ালা বিরাট একটা বাড়ি দেখা যাচ্ছে। তার মাথায় একটা সিংহ। ওটাই কি তবে সেই বারুদ ঘর? তার গায়ে লাগানো ফিরিঙ্গিদের বাসস্থানও দেখা যাচ্ছে। মাঠের মাঝখানে এক জায়গাতে প্রথমে এনে দাঁড় করানো হল কুইলিদের। কিছুক্ষণের মধ্যেই কাঠের চাকার ওপর বসানো একটা কামান আর গোলা নিয়ে হাজির হল একদল ফিরিঙ্গি। মাঠের মাঝখানে বসানো হল কামানটা। গোলা ভরা হল তার মধ্যে। তারপর কয়েকজন ফিরিঙ্গি সৈনিক মিলে তিরুমলকে কুইলির থেকে আলাদা করে এগিয়ে নিয়ে চলল কামানটার দিকে। ব্যাপারটা কি ঘটতে চলেছে তা বুঝতে পেরে কুইলি ফিরিঙ্গিদের উদ্দেশে বলে উঠল, 'আমাকে তোমরা হত্যা করো, কিন্তু ওকে তোমরা প্রাণে মেরো না। দোহাই তোমাদের...'
'ফিরিঙ্গিদের কাছে মাথা ঝুঁকিও না কুইলি। আমার জন্য এদের কাছে করুণা প্রার্থনা করো না। তাতে আমি মরবার আগে আরও কষ্ট পাব। আমার মৃত্যুর পর তুমি যদি জীবিত থাকো তবে প্রতিশোধ নিও। তাহলে আমার আত্মা শান্তি পাবে।'
তিরুমলের কথা শুনে থেমে গেল কুইলি। তিরুমলকে নিয়ে গিয়ে বাঁধা হল কামানের মুখে। প্রস্তুত হল গোলন্দাজ। বিশ্বাসঘাতক নটরাজন কুইলিকে বলল, 'ওকে এখন তোপের মুখে ওড়াব। আর ক'দিন ধরে তোকে নিয়ে আনন্দ করব আমরা। তুই সৈনিক হলেও নারী তো। অনেকদিন হয়ে গেল আমাদের আনন্দ দেবার মতো তেমন কাউকে পাইনি। তারপর তোর একটা করে স্তন কেটে নিয়ে তিলে-তিলে কষ্ট দিয়ে খুন করব!' কথাগুলো বলে গোলন্দাজকে ইশারা করল শয়তানটা। প্রচণ্ড শব্দ করে গোলা দেগে দিল গোলন্দাজ। কুইলির চোখের সামনেই ছিন্নভিন্ন হয়ে আকাশের দিকে উড়ে গেল তিরুমলের দেহ! সেই দৃশ্য আর সহ্য করতে না পেরে মূর্ছিত হয়ে মাটিতে পড়ে গেল কুইলি।
কুইলি যখন জ্ঞান ফিরে ধীরে ধীরে উঠে বসল তখন আকাশে চাঁদ উঠে গেছে। নটরাজন তার সঙ্গী দাড়িওয়ালা ঘাতক ও অন্য ফিরিঙ্গিরা কুইলিকে মাঠের মধ্যেই ফেলে রেখে চলে গেছে ফিরে এসে তারিয়ে তারিয়ে হত্যার মজা উপভোগ করবে বলে। মাঠের নানা জায়গাতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে তিরুমলের ছিন্নভিন্ন দেহ। আর তারই মাঝে বসে আছে কুইলি। জীবনে প্রথমবারের জন্য আর্তনাদ করে উঠল কুইলি, 'আমাকে একলা ফেলে তুমি কোথায় গেলে সৈনিক!'
ঠিক এরপরই তিরুমলের কণ্ঠস্বর ভেসে এল কুইলির কানে—'আমি তো তোমার কাছেই আছি কুইলি। এই দেখো আমি তোমার জন্য উপহার এনেছি।'
সেই কণ্ঠস্বর অনুসরণ করে চমকে উঠে সামনে তাকাতেই একটা অদ্ভুত দৃশ্য দেখতে পেল কুইলি। মাটি বেয়ে ঘষটে ঘষটে কনুই থেকে ছিন্ন হয়ে যাওয়া একটা হাত এগিয়ে আসছে কুইলির দিকে। তোপের আঘাতে উড়ে যাওয়া তিরুমলের ছিন্ন হাত! বিস্ফারিত চোখে তিরুমলের কর্তিত হাতটার দিকে চেয়ে রইল কুইলি। হাতটা এসে থামল কুইলির সামনে। মুষ্টিবদ্ধ কাটা হাত। তার হাতের মুঠিটা আস্তে আস্তে খুলে গেল। চাঁদের আলোতে কুইলি দেখতে পেল তিরুমলের কর্তিত হাতের উন্মুক্ত তালুতে রাখা আছে পাথরের তৈরি এক জোড়া দুল! যে দুলজোড়া তিরুমল উপহার দিয়েছিল কুইলিকে! চাঁদের আলোতে চিক চিক করছে পাথরের দুল জোড়া!
ঠিক এই পর্যন্ত স্বপ্নটা দেখেই কীসের একটা শব্দে ঘুম ভেঙে গেল কুইলির। বাইরে থেকে সহকারিণী সাবিত্রীর কণ্ঠস্বর শুনতে পেল সে,—অনেক বেলা হয়ে গেছে, খাবার এনেছি।'
'বাইরে রাখ। আমি একটু পরে আসছি।'
কুইলির স্বপ্নের ঘোর তখনও কাটেনি। সে ভাবতে লাগল এমন অদ্ভুত ভয়ঙ্কর স্বপ্ন সে দেখল কেন? না হয় তিরুমলের মৃত্যুর বণর্না সে ফতে খানের মুখে শুনেছে বলে স্বপ্নের মধ্যে সে তিরুমলকে কামানের গোলাতে উড়ে যেতে দেখেছে। কিন্তু স্বপ্নের শেষ অংশটা? তিরুমলের কাটা হাতটা তার সামনে এভাবে দুল জোড়া হাজির করল কেন? ব্যাপারটা ভাবতে ভাবতে হঠাৎই যেন বিদ্যুৎ চমকের মতো পুরো ব্যাপারটা স্পষ্ট হয়ে গেল কুইলির সামনে!
ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে এল কুইলি। সামনেই দাঁড়িয়ে ছিল শুভলক্ষ্মী আর সাবিত্রী। সে তাদের উদ্দেশে বলল, 'আজই আমরা সবাই রওনা হব শিভাগঙ্গাই নগরীর দিকে। তবে একসঙ্গে আমরা নগরীতে প্রবেশ করব না। ছোট ছোট দলে ছদ্মবেশ ধারণ করে নগরীতে প্রবেশ করতে হবে। কেমন ছদ্মবেশ নেওয়া যায় বলতো?'
একটু ভেবে নিয়ে শুভলক্ষ্মী জবাব দিল, 'শুনে এসেছি পুজোর ক'টা দিন সৈনিকদের আমোদ দেবার জন্য নর্তকী, রূপোজীবীরা নানা স্থান থেকে সেখানে গিয়ে উপস্থিত হয়, ভিখারিনিরাও আসে। অমন কিছু নর্তকীকে আমি ইতিমধ্যে নগরীতে প্রবেশ করতেও দেখেছি। ভগ্ন প্রাসাদগুলোতে অথবা তাঁবু খাটিয়ে আশ্রয় নেয় তারা। দশমীর শোভাযাত্রাতেও অংশ নেয়। তার পরদিন নগরী ত্যাগ করে ফিরে যায়। অমন নর্তকী, রূপোজীবী, ফুলওয়ালি বা বেদেনীর ছদ্মবেশে ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে নগরীতে প্রবেশ করতে পারি আমরা। ছোট ছোট দলে শহরে ছড়িয়ে থাকব আমরা। কারো সন্দেহ হবে না। একটা দিন কোম্পানির ফৌজের লোকেরা আমোদে মেতে থাকে।'
প্রস্তাবটা মনে ধরল কুইলির। সে বলল, 'তাহলে আজ সন্ধ্যা নামলেই আমরা রওনা হব। আর আমার কাঠের তোরঙ্গটাও ঘোড়ার পিঠে বেঁধে নিস। ওটাও আমার সঙ্গে যাবে।'
আজ বিজয়া দশমী। দূর থেকে ভেসে আসা ঘণ্টাধ্বনির শব্দে ঘুম ভাঙল কুইলির। রাজেশ্বরী আম্মান মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি। কুইলি অনুমান করতে পারল সেটা। ভোর হবার সঙ্গে সঙ্গেই আজ খুলে দেওয়া হয়েছে অলিন্দের দ্বার। খোলা গবাক্ষ দিয়ে সকালের আলো প্রবেশ করেছে কক্ষে। গত দু-দিন ধরে পরিত্যক্ত এই জীর্ণ হাভেলিতেই আশ্রয় নিয়েছে কুইলি।
বহুদিন পর বেশ শান্তিতে ঘুমিয়েছে কুইলি। না, কোনও দুঃস্বপ্ন দেখেনি। প্রগাঢ় শান্তির ঘুম। ঘুমটা বেশ প্রয়োজন ছিল তার। ঘণ্টাধ্বনি শুনে ঘুম ভেঙে উঠে কুইলির শরীরটা বেশ চনমনে মনে হল। ক্লান্তি অবসাদ সব যেন কেটে গেছে। মন ঠান্ডা রেখে আজ শেষ কর্তব্য সাধনের জন্য যেতে হবে তাকে। ঘুম থেকে উঠে বসে কুইলি তার ফেলে আসা দিনের সুখস্মৃতির কথা ভাবতে লাগল। সে ভাবতে লাগল জঙ্গলের পাশে তার শৈশবের ছোট্ট গ্রামটার কথা। যেখানে তার মা রুকু তাকে গাছের ঝুরির দোলনায় দোল খাওয়াত। সে ভাবতে লাগল শৈশবে বাবা মুখুপেরিয়ারের সঙ্গে জঙ্গলে শিকারে যাবার কথা। এক সময় কুইলি দেখতে পেল শুভলক্ষ্মী আর সাবিত্রী আসছে হাভেলির দিকে কুইলির অন্তিম নির্দেশ গ্রহণের জন্য।
কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা দুজন প্রবেশ করল কুইলির কক্ষে।
সাবিত্রী যেখানে রাত্রিবাস করছে সে জায়গাটা দুর্গের কাছাকাছি।
সে কুইলিকে বলল, 'দেখে এলাম ভোর হতেই দুর্গতোরণ খুলে দেওয়া হয়েছে। কিছু নারীকে দুর্গে ঢুকতেও দেখলাম। তবে দুর্গতোরণে একইরকম প্রহরাও আছে। এদিকে প্রতিমা নিরঞ্জনের শোভাযাত্রার প্রস্তুতিও শুরু হয়েছে। তারই বাজনা বাজছে।'
শুভলক্ষ্মী জানতে চাইল, 'আমাদের প্রতি তোমার নির্দেশ কী?
এ প্রশ্নের জবাব আগেই ভেবে রেখেছিল কুইলি। সে বলল, 'সাবিত্রীর সঙ্গে থাকবে তিন-চারজন। তারা দুর্গে যাবে না। বাকিদের নিয়ে তুই দুর্গে যাবি। যতটা অস্ত্র সঙ্গে নিতে পারিস গোপনে নিবি। দুর্গের ভিতর তোরণের কাছে, ভিতরে নানা জায়গাতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকবি তোরা। আমি একলা দুর্গে যাব। কোনও ঘটনা ঘটলেই তোরা সঙ্গে সঙ্গে ফিরিঙ্গিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বি দুর্গের দখল নেবার জন্য। আর দুর্গে যাই ঘটুক না কেন তার সংবাদ নিশ্চয়ই নীচে এসে পৌঁছবে। আর সেই সংবাদ নিয়ে সাবিত্রী সঙ্গে সঙ্গে রওনা হয়ে যাবে রানি আম্মার কাছে খবরটা পৌঁছে দেবার জন্য।
এই আমার শেষ নির্দেশ।'
শুভলক্ষ্মী জানতে চাইল, 'কোনও ঘটনা মানে? কী ঘটবে?'
কুইলি জবাব দিল, 'সেটা তোরা যথাসময়ে বুঝতে পারবি। আমাকে বলে দিতে হবে না।'
সেনাপতির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সাবিত্রি ও শুভলক্ষ্মী যে যার কর্তব্য পালন করতে চলল।
সূর্য যখন ঠিক মাথার ওপরে, কক্ষ থেকে বেরিয়ে কুপের শীতল জলে স্নান করে দেহ মন ঠান্ডা করে আবার সেই কক্ষে ফিরে এল কুইলি। ঘরের এক কোণে রাখা আছে তার কাঠের তোরঙ্গটা। তোরঙ্গের ডালা খুলে লাল রঙের শাড়ি আর দুলের কৌটোটা বার করল সে। দূর থেকে ঢাকঢোলের শব্দ কানে আসছে। দেবী দুর্গার বিসর্জনের বাজনা। জরির পাড় বসানো শাড়িটা পরে ফেলল কুইলি। তারপর ভালো করে চুল বাঁধল, চোখে কাজল দিল। টিপ পরল। পায়ে মল বেঁধে দুলের কৌটোটা খুলল সে। বাইরে থেকে আসা সূর্যালোকে ঝিলিক দিয়ে উঠল পাথরদুটো। আবছা হাসি ফুটে উঠল তার ঠোঁটের কোণে। দুলজোড়া হাতে ধরে চোখ বন্ধ করল কুইলি। তার মনের মধ্যে ভেসে উঠল সৈনিক তিরুমলের মুখ। যে যেন হাসছে তার দিকে চেয়ে! চোখ খুলে ধীরে ধীরে দুল জোড়া কানে দিল কুইলি। সে যদি এখন আয়নায় তার প্রতিবিম্ব দেখতে পেত, নিজেকে দেবী দুর্গার প্রতিমূর্তি বলে মনে হত তার। তিরুমল তাই বলত কুইলির রূপ আগুনের মতো—কথাটা মিথ্যা নয়।
তারপর সেই জীর্ণ হাভেলি থেকে বেরিয়ে যাত্রা শুরু করল কুইলি। সে পৌঁছে গেল জনপথে। বেশ লোকজন পথে। পুরুষরা যাচ্ছে নদীর দিকে বিসর্জনের শোভাযাত্রা যেদিকে এগিয়েছে সেদিকে। আর নারীরা কেউ কেউ একা বা দল বেঁধে এগোচ্ছে দুর্গের দিকে মন্দিরে পুজো দেবার জন্য। তাদের কারো মাথায় ফলের ঝুড়ি বা হাতে ধরা আছে পূজার সামগ্রী। তেমনই একটা দলের সঙ্গে মিশে কুইলি এগিয়ে চলল ফিরিঙ্গিদের দুর্গের দিকে।
ভিড়ে মিশে সিড়ি বেয়ে দুর্গ তোরণের দিকে উঠতে শুরু করল কুইলি। সে পৌঁছে গেল তোরণের সামনে। ফিরিঙ্গি সৈনিকরা সেখানে দাঁড়িয়ে আছে ঠিকই। কিন্তু তারা শুধু খেয়াল করছে নারীদের ভিড়ে কোনও পুরুষ আছে কিনা? তারা বাধা দিল না কুইলিকে। দুর্গে প্রবেশ করল কুইলি। মন্দির কোথায় তা বুঝতে অসুবিধা হল না। সেদিক থেকে ঘণ্টাধ্বনি, শাঁখের আওয়াজ আসছে। নারীদের স্রোতও এগোচ্ছে সে দিকে। কুইলিও এগোল সে দিকে। কিছুটা এগিয়ে পথের পাশে সে একটা লম্বা অলিন্দওয়ালা বড় বাড়ি দেখতে পেল। মাথায় কোম্পানির পতাকা উড়ছে। সেই সহকারী খাজাঞ্চির বউ জানিয়েছিল এটাই নাকি খাজাঞ্চিখানা।
পথে মাঝে মাঝে দু-চারজন অস্ত্রধারী ফিরিঙ্গিদের দেখা যাচ্ছে। কিন্তু তাদের দেখে কুইলি বুঝতে পারল লোকগুলোর মধ্যে কিছুটা ঢিলেঢালা ভাব। মন্দিরের পথেই এক জায়গাতে শুভলক্ষ্মীকেও দেখতে পেল কুইলি। মাথায় ফুলের ঝুড়ি নিয়ে কয়েকজন সঙ্গীকে নিয়ে ফুল বিক্রেতার ছদ্মবেশে সে দাঁড়িয়ে।
কুইলি পৌঁছে গেল মন্দিরের সামনে। বেশ বড় মন্দির। জনস্রোত পাক খাচ্ছে মন্দিরের ভিতর আর সম্মুখভাগে। তবে সবাই নারী। মন্দিরে পুরোহিতই শুধু একমাত্র পুরুষ। মন্দিরে প্রবেশ করল কুইলি। বেশ বড় বড় ঘি-এর প্রদীপে আলোকিত মন্দির। ঘণ্টা বাজছে, কাঁসর বাজছে, শঙ্খ বাজছে। নারী কণ্ঠের কোলাহলে কান পাতা দায়।
ভিড়টাই ঠেলতে ঠেলতে কুইলিকে পৌঁছে দিল গর্ভমন্দিরের সামনে। গর্ভগৃহের মধ্যে প্রদীপের আলোতে দাঁড়িয়ে আছেন স্বর্ণালঙ্কার ভূষিতা, অস্ত্রসজ্জিত দেবী রাজেশ্বরী। তিনি দুর্গারই প্রতিরূপ। সবাই তার কাছে অর্ঘ্য নিবেদন করছে মনস্কামনা পূরণের জন্য। দেবী মূর্তির সামনে ক্ষণিকের জন্য দাঁড়িয়ে তাকে প্রণাম জানিয়ে কুইলি মনে মনে বলল—'আমি কোনও অর্ঘ্য আনিনি মা। আমি নিজেকেই অর্ঘ্য হিসাবে তোমাকে উৎসর্গ করলাম। আমাকে তুমি গ্রহণ করো মা।'
ভিড় এরপর কুইলিকে ধাক্কা দিয়ে এগিয়ে দিল একপাশে। সে মন্দিরটা ঘুরে দেখতে শুরু করল। ঘুরতে ঘুরতে এক সময় পৌঁছে গেল মন্দিরের পিছনের অংশে। এ জায়গাটাতে লোকজনের দেখা নেই। আর সেখানে পৌঁছে সে দেখতে পেল মাঠটা। তার অপর প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে ইটের দেওয়াল আর তার মাথায় ইস্পাতের ছাউনি দেওয়া বিশাল একটা বাড়ি। দেখে বোঝাই যায় ওটা একটা প্রকাণ্ড ঘর। তার মাথায় একটা সিংহমূর্তি বসানো আছে। কয়েকজন সৈনিক দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে দ্বিপ্রহরের সূর্যের আলোতে।
হ্যাঁ, ওটাই বারুদ ঘর। তার পিছন দিকে ফিরিঙ্গিদের সেনা ছাউনির কিছুটা অংশ দেখা যাচ্ছে। ওই বারুদ ঘরেই প্রবেশ করতে হবে কুইলিকে। তবে তার আগে একটা কাজ সারতে হবে তাকে। মন্দিরের পিছনের অংশে একটা উপমন্দিরে বিরাট ঘিয়ের প্রদীপ জ্বলছিল। কুইলি সেখানে গিয়ে সবার অলক্ষে প্রদীপ নিভিয়ে ভালো করে ঘি মেখে নিলে তার সারা শরীরে। কাজ মিটল তার। কুইলি মাঠ পেরিয়ে সোজা রওনা হল বারুদ ঘরের দিকে।
বারুদ ঘরের দরজা আগলে দাঁড়িয়েছিল উইলিয়াম নামের এক সেনাধ্যক্ষ ও তার কিছু সঙ্গী। দিশি সিপাইরা তাদের ভাঙের শরবৎ দিয়ে গেছিল, তারা পান করছে সেই ভাঙ। চড়া রোদে দাঁড়িয়ে ভাঙের শরবতে বেশ নেশা হচ্ছে তাদের। মাঠ পেরিয়ে কুইলিকে বারুদ ঘরের দিকে আসতে দেখে প্রথমে বেশ অবাকই হল ফিরিঙ্গি উইলিয়াম। মন্দির ছেড়ে এই নারী এদিকে আসছে কেন? সতর্ক হয়ে দাঁড়াল উইলিয়াম আর তার বন্দুকধারী সঙ্গীরা।
কিছুক্ষণের মধ্যে মলের ছমছম শব্দ তুলে তাদের সামনে গিয়ে দাঁড়াল কুইলি। তার দাঁড়াবার ভঙ্গীমা, চোখের তারায় ফুটে আছে নাম্যময়তা, যৌনতার হাতছানি। শাড়ির আচলের আড়াল থেকে উঁকি দিচ্ছে গভীর বক্ষবিভাজিকা। রূপ যেন ঝরে পড়ছে তার ঘি মাখানো অঙ্গ বেয়ে। সত্যি আগুনের মতো রূপ তার। কয়েকমুহূর্ত সেই সুন্দরী নারীর দিকে তাকিয়ে ফিরিঙ্গি উইলিয়াম বিস্মিতভাবে প্রশ্ন করল, 'তুমি কে? মন্দির ছেড়ে এখানে এসেছ কেন?'
কুইলি খিলখিল করে হেসে বলল, 'বুঝতে পারছ না আমি কে? আমি তোমাদের আমোদ দেবার জন্য এখানে এলাম। একটা মোহর দিলেই চলবে।
হ্যাঁ, এ সময়টা নগরীতে বেশ্যা, নতর্কীরা আসে বটে। ব্যাপারটা জানা আছে ফিরিঙ্গি উইলিয়াম আর তার সঙ্গীদের। পয়সা পেলে ফিরিঙ্গিদের সঙ্গদান করে তারা। ফিরিঙ্গি সেনাধ্যক্ষ উইলিয়ামের তখন চোখে ভাঙের নেশা! এমন সুযোগ বড় একটা আসে না। কাজেই একটু ভেবে নিয়ে সে শেষ পর্যন্ত বলে উঠল—'ঠিক আছে। তুমি আমাদের নাচ দেখাও। তোমাকে আমি একটা সোনার মোহর দেব।'
কথাটা শুনে কুইলি ফিরিঙ্গির হাত ধরে বারুদ ঘরের দরজাটা দেখিয়ে বলল, 'চলো, ওর ভিতরে চলো। আমি এক এক করে সবাইকে নাচ দেখাব। আগে একলা তোমাকে নাচ দেখাই। তারপর তোমার সঙ্গীদেরও দেখাব।'
এ সুযোগ হাত ছাড়া করা যায় না। তাই ফিরিঙ্গি উইলিয়াম বলল, 'ঠিক আছে। ভিতরে চলো।'
সেনাধ্যক্ষের ইশারাতে একজন রক্ষী বারুদ ঘরের তালা খুলে দিল। মলের ছমছম শব্দ তুলে নর্তকীবেশী কুইলি ফিরিঙ্গির সঙ্গে বারুদ ঘরে প্রবেশ করল। দরজা বন্ধ হয়ে গেল বাইরের থেকে।
বিশাল বারুদ ঘর। এ ঘরে অন্য কোনও দরজা-জানলা নেই। শুধু মাথার অনেক ওপরে বসানো ঘুলঘুলি দিয়ে আলো ঢুকছে ভিতরে। এত বড় ঘর যে তার শেষ পর্যন্ত দেখা যায় না। গুদাম ঘরের মেঝেতে, দেওয়ালের গায়ে সার-সার, থাক-থাক সাজানো আছে বারুদ ভর্তি কাঠের পিপে। এই বারুদ দিয়ে সত্যিই পাঁচটা রাজ্য দখল করার ক্ষমতা রাখে কোম্পানি! পিপেগুলোর মাঝে একটা ফাঁকা জায়গাতে কুইলিকে এনে দাঁড় করাল ফিরিঙ্গি।
চারপাশে তাকালো কুইলি। তার চোখে পড়ল বেশ তফাতে ঘরের একপ্রান্তে একটা মুখ খোলা বারুদরে পিপে রাখা আছে। সামান্য কাত করে রাখা পিপেটা বারুদ ভর্তি। তার পাশে রাখা বারুদ মাপার চোখ। সে দিকে তাকিয়ে চোখ আটকে গেল কুইলির। মনে মনে সে ভেবে নিল তাকে পৌঁছতে হবে ওই বারুদপূর্ণ উন্মুক্ত পিপেটার কাছে। তাহলে তার কাজটা অনেক সহজ হয়ে যাবে। তবে ওই পিপের কাছে পৌঁছবার আগে ফিরিঙ্গিটা যেন তাকে বাঁধা না দেয় সে ব্যবস্থা করতে হবে। উইলিয়ামের যেন আর ত্বর সইছে না। সে কুইলির উদ্দেশ্যে বলল, 'এবার শুরু করো। নাচ শুরু করো।'
কুইলির ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল, 'সে বলল, হ্যাঁ, করছি।'
ছমছম শব্দে পায়ের নূপুরের শব্দ তুলে ধীরে ধীরে কুইলি নাচ শুরু করল। নাচে খুব পটু নয় কুইলি। তবে নাচ আসলে এখানে বড় ব্যাপার নয় ফিরিঙ্গির কাছে। আসলে সম্ভোগের আগে ধীরে ধীরে নারী শরীর দর্শন করে নিজেকে উত্তেজিত করে তুলতে চায় ফিরিঙ্গি। তার এই ভাবনা বুঝতে অসুবিধা হল না কুইলির। তাই নাচ করতে করতে ধীরে ধীরে তার শরীর থেকে শাড়িটা খসিয়ে ফেলতে শুরু করল কুইলি। শেতাঙ্গ উইলিয়ামের সামনে ধীরে ধীরে উন্মোচিত হতে লাগল শ্যামাঙ্গী যৌবনবতী কুইলির বক্ষবন্ধনী আবৃত বর্তুলাকার স্তন যুগলের স্পষ্ট অবয়ব, গিরিখাতের মতো বক্ষ বিভাজিকা, গভীর নাভিকুপ। শাড়ির আঁচল খসাতে খসাতে নৃত্যরত অবস্থায় কুইলি ধীরে ধীরে এগোতে লাগল নির্দিষ্ট সেই পিপেটার দিকে। তার শরীরের দিকে তাকিয়ে ক্রমশ বিস্ফোরিত হয়ে উঠতে লাগল ফিরিঙ্গির চোখ। এক সময় শাড়িটা তার শরীর থেকে কুইলি সম্পূর্ণ খসিয়ে ফেলল।
পিপেটার কাছে পৌঁছবার জন্য অর্ধেক দুরত্ব অতিক্রম করে ফেলেছে সে। তার শরীরে এখন শুধু বক্ষ বন্ধনী, আর নিম্নদেশের লজ্জা নিবারণের জন্য একটা কাপড়ের ফালি। মাথার ওপরের গবাক্ষ দিয়ে এক ফালি আলো এসে পড়েছে তার শরীরে। কুইলি নৃত্যরত ভঙ্গীতে সেই বারুদের পিপেটার দিকে সরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফিরিঙ্গিও এবার পায়ে পায়ে কুইলির দিকে। হঠাৎ ফিরিঙ্গি বলল, 'তুমি ওদিকে সরে যাচ্ছ কেন?'
সে হয়তো কথাটা কুইলিকে কাছে পাবার জন্যই বলল, কিন্তু কুইলির মনে হল সে পিপেটার দিকে এগোচ্ছে বলে কোন সন্দেহ জাগেনি তো মদ্যপ শেতাঙ্গর মনে? যেভাবেই হোক ফিরিঙ্গিটাকে মাতিয়ে রাখতে হবে তার দেহের আকর্ষণে। কুইলি তার লক্ষ স্থির করে ফেলেছে। আর সেই লক্ষ পুরনের লজ্জা বোধ ত্যাগ করতে হবে। কুইলি, ফিরিঙ্গির দিকে লাস্যময়ী ভঙ্গীতে হেসে পিপেটার দিকে কৌশলে এগোতে এগোতে প্রথমে উন্মুক্ত করল তার কবরী বন্ধন। তারপর তার দীর্ঘ কেশ দামকে গলার পাশ দিয়ে বুকের সামনে নামিয়ে এক ঝটকাতে খুলে ফেলল তার বক্ষ আবরণ। ফিরিঙ্গির সামনে উন্মুক্ত হয়ে গেল কুইলির কৃষ্ণ কুচ যুগল সমন্বিত বক্ষ।
কামুক ফিরিঙ্গির চোখের দৃষ্টি যেন আঠার মতো আটকে গেল কুইলির স্তন যুগলের ওপর। কুইলি এক-পা এক-পা করে সরে যেতে লাগল পিপেটার দিকে। এক সময় কুইলি পিপেটার বেশ কাছে পৌঁছে গেল। ফিরিঙ্গি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারছে না। উদগ্র কামবাসনা ছড়িয়ে পড়েছে ফিরিঙ্গির রক্তে। এবার তবে পেতে হবে কুইলিকে। তার শরীরকে উদগ্র কামে ছিন্নভিন্ন করবে ফিরিঙ্গি। তাই সে এবার কুইলির কাছে কিছুটা এগিয়ে এসে দু-বাহু তার দিকে প্রসারিত করে বলল, 'এসো, এবার আমার কাছে এসো। বাকি কাপড়টাও খুলে ফেলো তোমার কোমর থেকে।'
তার কথা শুনে কুইলি বলল, 'হ্যাঁ, খুলছি। তবে আগে কান থেকে দুলো জোড়া খুলে ফেলি। নইলে এই ভারী পাথরের দুল দুটো তোমার অসুবিধার সৃষ্টি করতে পারে।'
ফিরিঙ্গি বলল, 'হ্যাঁ, সব কিছু খুলে ফেলো।'
ধীরে ধীরে পাথরের দুল জোড়া খুলে হাতে নিল কুইলি। তার মনে পড়ে গেল এই অদ্ভুত পাথরের তৈরি দুল জোড়া তার হাতে বহু দিকে আগে তুলে দেবার সময় সৈনিক তিরুমলের বলা কথা—'তোমার এমন আগুনের মতো রূপ! এ পাথরের দুল তোমাকেই মানায়।'
হাসি ফুটে উঠল কুইলির ঠোঁটে। তবে সে হাসির যথার্থ পাঠ করার ক্ষমতা ফিরিঙ্গির নেই। কুইলি মনে মনে তিরুমলের উদ্দেশ্যে বলল, 'আমি আসছি তোমার কাছে। এবার আমাদের মিলন হবে।'
ফিরিঙ্গি উইলিয়াম তাকিয়ে আছে কুইলির শরীরের দিকে। এবার নিশ্চই কুইলি তার কটিদেশের বস্ত্রখণ্ড খসিয়ে ফেলে এগিয়ে আসবে তাকে আলিঙ্গন করার জন্য। এ কথা ভেবে নিয়ে হিংস্র নেকড়ের মতো সেই মদ্যপ, কামার্ত উইলিয়াম জিভ দিয়ে নিজের ঠোঁট চাটল।
কুইলি আর উইলিয়াম তাকিয়ে আছে পরস্পরের দিকে। কুইলির ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল আবছা হাসির রেশ। কয়েক মুহূর্তের জন্য নিস্তব্ধতা নেমে এল বারুদ ঘরে। আর এর পরই কুইলির চোখ দুটো যেন ফিরিঙ্গিদের প্রতি প্রবল ঘৃণাতে বাঘিনীর মতো জ্বলে উঠল। ফিরিঙ্গিকে চমকে দিয়ে চিৎকার করে কুইলি বলে উঠল, 'জয় রানি ভেলুনাচিয়ারের জয়! জয় রানি আম্মার জয়!'
কথাগুলো বলেই কুইলি জোরে ঠোকা দিল হাতে ধরা পাথর দুটোতে। জ্বলে উঠল চকমকি! তার দুল জোড়াতে বসানো আগুন পাথর! সেই আগুনের ফুলকি সে ছড়িয়ে দিল তার ঘৃত স্নাত কেশ রাশি আর কটি দেশের বস্ত্রখণ্ডে। হতবাক ফিরিঙ্গি ভালো করে কিছু বুঝে ওঠার আগেই মুহূর্তের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়ল কুইলির ঘি-মাখানো শরীরে।
কুইলি তার জ্বলন্ত শরীরটা নিয়ে বিদ্যুৎগতিতে ছুটল কাছের মুখখোলা পিপেটার দিকে। বারুদের পিপেতে ঝাঁপ দিল কুইলি! ভয়ংকর, অভূতপূর্ব বিস্ফোরণ! বিস্ফোরণের প্রাবল্য এতটাই হল যে, বারুদ ঘরের সঙ্গে সঙ্গে তার লাগোয়া ফিরিঙ্গি ভর্তি ব্যারাকটাও সম্পূর্ণ উড়ে গেল দুর্গ অধিপতি ক্যাপ্টেন মরিসকে নিয়ে। স্থানে স্থানে ধসে পড়ল দুর্গ প্রাকার।
বহু যোজন দূরে জঙ্গল অতিক্রম করে বিস্ফোরণের শব্দ পৌঁছে গেল রানি ভেলু নাচিয়ারের কাছে। শিভাগঙ্গাইয়ে কোম্পানির দুর্গ ধ্বংস করে ফিরিঙ্গিদের নিশ্চিহ্ন করে দিল রানি ভেলুর ভিরথালাপথি—বীর সেনাপতি আত্মঘাতী কুইলি।
রানি ভেলু নাচিয়ার টিপুর পাঠানো সেনাবাহিনীর সাহায্যে অতি সহজেই দখল করে নিলেন শিভাগঙ্গাই।
কিছু কথা : কুইলিকে বলা হয় ভারতবর্ষের প্রথম 'মানব বোমা।' কোম্পানির মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির অন্তর্গত মাদুরা জেলার রামনাদ অঞ্চলে ছিল শিভাগঙ্গাই রাজ্য। দখল করে নিয়েছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। রানি ভেলু নাচিয়ারের আত্মঘাতী মহিলা বাহিনীর সেনাপতি কুইলির আত্মঘাতী হানায় রানি কিছুদিনের জন্য ফিরে পেয়েছিলেন তার রাজ্য। তবে কয়েক বছরের মধ্যেই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আবার শক্তি সংগ্রহ করে ফিরে এসে হানা দেয় শিভাগঙ্গাইতে। প্রচণ্ড পরাক্রমের সঙ্গে কোম্পানির ফৌজের বিরুদ্ধে লড়াই করে শেষ পর্যন্ত মৃত্যু বরণ করেন রাজা মুথু পেরিয়ারের বিধবা পত্নী ভেলু। শিভাগঙ্গাই আবার চলে যায় কোম্পানির দখলে। হায়দার আলির মৃত্যুর পর মহীশূরের সুলতান হন টিপু। কিন্তু তিনিও আর কোম্পানির থেকে ছিনিয়ে দিতে পারেননি শিভাগঙ্গাই। তবে সিপাহী বিদ্রোহের প্রায় আশি বছর আগে রানি ভেলু নাচিয়ার আর তার সেনাপতি কুইলি কোম্পানির শাসনের বিরুদ্ধে যে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন, যে আত্মবলিদান দিয়েছিলেন তা অমর হয়ে আছে ইতিহাসের পাতায়।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।