হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

সম্রাটের এ কক্ষ সুবিশাল কেল্লার এক প্রান্তে শীর্ষদেশে অবস্থিত। খোলা বাতায়ন দিয়ে দূরে দেখা যাচ্ছে যমুনা নদী। দ্বিপ্রহরের সূর্যকিরণে চিকচিক করছে তার জল। চিল বা বাজ জাতীয় কোনও একটা নিঃসঙ্গ পাখি পাক খাচ্ছে শূন্য নদীতটের ওপর। তাকিয়াতে ঠেস দিয়ে বসে রূপোর তামাকের নল ঠোঁটে ছুঁইয়ে যমুনা তটের দিকেই নিস্তব্ধভাবে চেয়েছিলেন মোগল সাম্রাজের ভাগ্য বিধাতা শাহেনশাহ। পাঁচ হাজার লোকের বসবাস এই 'কিলা আগ্রা' বা আগ্রা দুর্গে।
সূর্যোদয়ের সঙ্গে-সঙ্গেই এ কেল্লার আবাসিকরা ছাড়াও বহু মানুষ এসে হাজির হন এখানে। ফকির থেকে শুরু করে ধনাঢ্য আমির-ওমরাহ, সাধারণ কৃষক থেকে যুদ্ধ ব্যবসায়ী, নানা বর্ণের নানা পেশার মানুষ এসে উপস্থিত হয় এই কেল্লায়। তারা কেউ আসেন ভারত সম্রাটের দর্শন লাভের জন্য, আবার কেউ আসেন কেল্লাস্থিত সরকারি দপ্তরগুলোতে নিজ-নিজ কার্য সম্পাদনের অভিলাষে। কোলাহলে মুখরিত হয়ে ওঠে কেল্লা। বিশেষত, দেওয়ানি-আম সংলগ্ন অংশ তো লোকজনের ভিড় আর কথাবার্তার শব্দে গমগম করে। যেখানে প্রজাদের দর্শন দেন বাদশাহ।
কিন্তু দ্বিপ্রহরের এই সময়টা প্রতিদিন কেমন যেন নিস্তব্ধ হয়ে যায়। এদিনও তার ব্যতিক্রম হয়নি। মধ্যাহ্নে সম্রাট দেওয়ানি-আম ত্যাগ করার পর দর্শনার্থীরা দুর্গ ত্যাগ করেছে। দাবদাহ থেকে বাঁচতে প্রহরী-প্রতিহারের দল আশ্রয় নিয়েছে লাল পাথরের তৈরি এই দুর্গের অলিন্দ, খিলানের ছায়ায়। কোথাও কোনও শব্দ নেই। শুধু নীচের বাগিচা থেকে মাঝে-মাঝে ময়ূরের ডাক ভেসে আসছে। সে ডাক যেন কেমন একটা নির্জন বিষণ্ণতা ছড়িয়ে দিচ্ছে দুর্গ প্রাকারের অভ্যন্তরে।
আগ্রা কিলার প্রান্ত সীমায় এ কক্ষ বড় প্রিয় সম্রাটের। বহু স্মৃতিমণ্ডিত এ কক্ষ। মহেশ দাস অর্থাৎ বীরবলের সহাস্য উপস্থিতি, তানসেনের সঙ্গীত মূর্ছনা, ফৈজির ভরাট কণ্ঠের শায়েরী পাঠ, আরও অনেক কিছুর সাক্ষী এই পাথুরে কক্ষ। সম্রাট তার নবরত্ন সঙ্গীদের সঙ্গে ব্যক্তিগত আলাপচারিতা এ কক্ষে বসেই করতেন। সম্রাটের আসন ছাড়া গালিচা বিছানো মেঝের ওপর আরও ন'টি আসন আজও আছে এই কক্ষে। তবে সভাসদদের এই ন'টি আসনের মধ্যে ছ'টি আসনই আজ শূন্য।
সময় যেমন সম্রাটকে ভারত সম্রাট বানিয়েছে তেমনই জীবন থেকে কেড়ে নিয়েছে অনেক কিছু। ভিতরে-ভিতরে বিদ্ধ করেছে সম্রাটকে। প্রথমেই সম্রাটের কাছ থেকে আফগান যুদ্ধের সময় বিদায় নিয়েছিলেন নবরত্নর শ্রেষ্ঠ রত্ন মহেশ দাস। যাকে সম্রাট বীরবল নামে ডাকতেন। বীরবলের পর অজানা কোন শায়েরীর দেশে হারিয়ে গেলেন কবি ফৈজি। তারপর দেশে ঘুরে আসার নাম করে জন্নতের কোন সুরের দেশে চিরবিদায় নিলেন তানসেন। বিদ্রোহ দমন করতে গিয়ে বুন্দেলখণ্ডে নিহত হলেন আবুল ফজলও। আর কিছুদিন আগে এই দুনিয়াদারীর মায়া কাটিয়ে চলে গেলেন ষষ্ঠরত্ন রাজা তোদোরমল্ল।
সম্রাটের নবরত্ন সভাতে এখন রয়ে গেছেন মাত্র তিনজন। প্রধান সেনাপতি রাজা মানসিংহ, ফকির আজিউদ্দিন আর মোল্লা দোপেঁয়াজা। তারা তিনজনই অবশ্য আজ এ কক্ষে উপস্থিত। সম্রাটই তাদের ডেকে পাঠিয়েছেন একটু গল্পগুজব করার জন্য। আসলে সম্রাটের দু'জন বয়স্য তাঁর জীবন থেকে বিদায় নেবার পর বাকি এই তিন রত্নকে আজকাল কাছছাড়া করতে চান না সম্রাট। অবসরের মুহূর্তে তাদের ডেকে নেন শাহেনশাহ আকবর।
আজ তারা তিনজন এ কক্ষে প্রবেশ করার পর কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলেই কেমন যেন নিশ্চুপ হয়ে গেছেন সম্রাট। শাহেনশাহর মনের খবর তো কেউ জানেন না। তাই তিনি থেমে যেতেই অন্যরাও চুপ করে গেছিলেন। সম্রাট যেখানে থেমে গেছেন সেখানে নিজেদের মধ্যে আলোচনা চালিয়ে যাওয়াটা শিষ্টাচার বিরোধী। বাইরে প্রবল দাবদাহ হলেও কক্ষের অভ্যন্তরে শীতলতা আছে। বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে মহার্ঘ আতর আর তামাকের মিষ্টি গন্ধ।
হঠাৎ একটা অন্য রকম শব্দ ভেসে এল দুর্গের নীচের চত্বর থেকে। বৃংহিত—হাতির ডাক। আর সে ডাক শোনামাত্রই সম্রাট বাতায়ন থেকে দৃষ্টি সরিয়ে সোজা হয়ে বসলেন। বার কয়েক হয়ে ডাকটা থেমে গেল। সম্রাট বিষণ্ণভাবে বললেন, 'হাওয়াই-এর ডাক। ও আমাকে ডাকছে। আমার মনে হচ্ছে ওর এন্তেকাল খুব সামনেই।'
সম্রাটের প্রিয় চার রণহস্তী হাওয়াই, জাকিরা, কৈরা আর নওরজা। এদের মধ্যে সম্রাটের সব থেকে প্রিয় হাতি এই হাওয়াই। তার বাল্যকালের সহচর, তার দুর্দমনীয় যৌবনের, যুদ্ধক্ষেত্রের সঙ্গী এই হাওয়াই। অন্য তিন হস্তীযূথ দিল্লির কেল্লায় থাকলেও হাওয়াইকে সম্রাট আগ্রাতে নিয়ে এসেছেন। হাওয়াই বৃদ্ধ হয়েছে। তাছাড়া চিতোর যুদ্ধের সময় হাওয়াইয়ের শুঁড়ে বিষাক্ত তির লেগে যে ঘা হয়েছিল তা আর কোনওদিন সেরে ওঠেনি। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে তা আরও বেড়েছে। হাওয়াইকে তাই নিজের কাছে এনে রেখেছেন সম্রাট। যাতে তার দীর্ঘ দিনের সঙ্গী বৃদ্ধ হাওয়াইয়ের ঠিক মতো পরিচর্যা হয়, চিকিৎসা হয়।
সম্রাট এরপর বললেন, 'এমনই এক দুপুরে হাওয়াইয়ের পদাঘাতে ভেঙে পড়েছিল চিতোরগড়ের সূর্যতোরণ। ওর পিঠে বসে চিতোরে প্রবেশ করেছিলাম আমি। পতন হয়েছিল চিতোরগড়ের। আপনার মনে পড়ে রাজা মানসিংহ?'
মানসিংহ জবাব দিলেন, 'হ্যাঁ, জাহাঁপনা। শুধু চিতোরগড় কেন, কত যুদ্ধেই তো ও আমাদের সঙ্গী ছিল। পাহাড়ের মতো হাওয়াইয়ের পিঠে লৌহ জালিকার খাঁচায় বসা জাহাঁপনাকে দেখলেই শত্রুদের মনে আতঙ্কের সৃষ্টি হত। আর তার সঙ্গে-সঙ্গেই অর্ধেক যুদ্ধ জয় হয়ে যেত আমাদের।'
সম্রাট বললেন, 'হ্যাঁ, ঠিক কথা। কত যুদ্ধ যে ও আমাদের জিতিয়েছে তার হিসাব নেই। বহুবার আমার প্রাণও বাঁচিয়েছে হাওয়াই। কুম্ভমেরুর যুদ্ধে জমিতে দাঁড়িয়ে লড়াই করছিলাম আমি। শত্রু সেনা আমাকে ঘিরে ফেলেছিল। একজনের মাথা কাটলে তার স্থান নিচ্ছিল তিনজন শত্রু সেনা। চারপাশে কেউ নেই। মোগল সেনাদের থেকে আমি সম্পূর্ণ বিছিন্ন হয়ে পড়েছিলাম। একটা ভল্লর আঘাত এসে পড়ল আমার কাঁধে। বর্ম ভেদ করে সে অস্ত্রাঘাত আমার শরীর স্পর্শ না করতে পারলেও আমার ডান বাহু অসাড় হয়ে গেল আঘাতের অভিঘাতে। শত্রু সেনারা ব্যাপারটা আন্দাজ করতে পারল। আমাকে ঘিরে তাদের ব্যূহটা ক্রমশ ছোট হয়ে আসতে লাগল। আমিও বুঝতে পারলাম আমার আর পরিত্রাণ নেই। কুম্ভমেলার যুদ্ধই আমার জীবনের শেষ যুদ্ধ হবে।
কিন্তু এর পরই হঠাৎ শত্রুসেনারা আমাকে ফেলে আতঙ্কে যে যেদিকে পারে ছুটতে শুরু করল। আমি দেখতে পেলাম প্রকাণ্ড পাহাড়ের মতো ধেয়ে আসছে হাওয়াই। মোগল সেনারা আমার খেয়াল না রাখলেও হাওয়াই কিন্তু আমাকে অনুসরণ করছিল। আমি বিপদগ্রস্ত বুঝতে পেরে আমাকে রক্ষা করতে সে ছুটে আসছে। এসে পড়ল হওয়াই। তারপর মুহূর্তের মধ্যে আমাকে শুঁড়ে তুলে নিয়ে বসিয়ে দিল তার পিঠে, লৌহ জালিকার খাঁচায়। তারপর শত্রুসেনাকে পদদলিত করে আমাকে নিয়ে ছুটল নিরাপদ স্থানের উদ্দেশে। শেষ পর্যন্ত কুম্ভমেরু কেল্লাফতে করে ফিরেছিলাম আমি।'
এ কথাগুলো বলে সম্রাট সম্ভবত বেশ কিছুক্ষণের জন্য স্মৃতির অতলে ডুব দিয়ে মৌন হলেন। তারপর হঠাৎ তিনি বললেন, 'এই যে এত যুদ্ধ, এত রক্তপাত করে আমি এতবড় সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করলাম তা কোনও দিন খড়কুটোর মতো ভেঙে যাবে না তো? আমার অবর্তমানে রক্ষিত হবে তো এই মোগল সাম্রাজ্যের পরিধি? আমার মৃত্যুর পর এ সিংহাসনের যোগ্য ব্যক্তি কে? যে ধরে রাখতে পারবে এই সাম্রাজ্যের অখণ্ডতা?'
সম্রাট ইতিমধ্যেই তাঁর উত্তরসূরি হিসাবে নির্বাচন করেছেন পুত্র সেলিমকে। সম্রাটের প্রশ্ন শুনে স্বাভাবিক কারণেই রাজা মান বলতে যাচ্ছিলেন শাহজাদা সেলিমের নাম। কিন্তু তার আগেই সম্রাট ও রাজা মানকে চমকে দিয়ে সম্রাটের রত্ন সভার সদস্য ফকির আজিউদ্দিন বললেন, 'শাহেনশাহর প্রশ্নের অন্তর্নিহিত অর্থ যদি এই হয় যে, মোগল সিংহাসনে এরপর কে বসবেন তার উত্তর হল, শাহজাদা সেলিম। আর এ প্রশ্নের অর্থ যদি এই হয় যে, এ সাম্রাজ্য ধরে রাখার জন্য যোগ্যতম ব্যক্তি কে তা হল প্রধান সেনাপতি রাজা মানসিংহ। তার এই তলোয়ারই তো কাবুল থেকে দোয়াব অঞ্চল পর্যন্ত সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি ঘটিয়েছে।'
ফকির আজিউদ্দিনের কথা শেষ হবার সঙ্গে-সঙ্গে একটা অদ্ভুত নিস্তব্ধতা নেমে এল ঘরে। সম্রাটের মুখটা যেন মৃদু গম্ভীর হয়ে উঠল। আর লজ্জিত মান চোখ নামালেন ভূমির দিকে, যেখানে নামানো আছে খাপে ঢাকা তার দীর্ঘ রাজপুত তলোয়ার। সম্রাটের কক্ষে অস্ত্র নিয়ে প্রবেশ করার অধিকার শুধু রাজা মানেরই আছে। সম্রাট নিজেই সে অধিকার তাকে দিয়েছেন সম্রাটের প্রতি তার বিশ্বস্ততার নিদর্শন হিসাবে। হ্যাঁ, এ কথা ঠিকই যে, এই তলোয়ার দিয়ে সম্রাটের হয়ে সেনাপতি মান যে কত যুদ্ধ জয় করেছেন, কত বিদ্রোহ যে দমন করেছেন তার হিসাব নেই। কিন্তু তা তিনি করেছেন সম্রাটের আজ্ঞা পালনের জন্য, এই সুবিশাল মোগল সাম্রাজ্যের অখণ্ডতা বজায় রাখার জন্য। মোগল সিংহাসনে, ভারতের সিংহাসনে বসার কোনও উচ্চাভিলাষ কাজ করেনি তার পিছনে। সেদিনও করেনি আজও করে না। ফকির আজিউদ্দিনের কথা শুনে তাই বেশ বিব্রত বোধ করলেন রাজা মান। নির্বাক হয়ে গেলেন তিনি।
কিন্তু সম্রাট তারপর সম্ভবত উপলব্ধি করতে পারলেন যে একটা অনাকাঙ্ক্ষিত নিস্তব্ধতা নেমে এসেছে কক্ষে। আর সেটা কাটিয়ে তোলার জন্যই এরপর তিনি হেসে বললেন, 'এ আলোচনার আর দরকার নেই। ভবিষ্যৎ আর কে কবে দেখে যেতে পেরেছে? হাওয়াইয়ের ডাকে এবার একটা মজার ঘটনা আমার মনে পড়ে গেল। শুনবেন?'
মোল্লা দোপেঁয়াজা বললেন, 'জি শাহেনশাহ। জরুর জরুর।'
অস্বস্তি কাটিয়ে রাজা মানও বললেন, 'বলুন সম্রাট।'
আকবর শাহ বললেন, 'ঘটনাটা প্রায় কুড়ি বছর আগের। আপনারা তো জানেন বীরবল কেমন কথার মারপ্যাঁচে নাস্তানাবুদ করতেন সবাইকে। সম্রাট বলে আমাকেও তিনি রেয়াত করতেন না। তিনি সবসময় হাসেন। হাসি কেড়ে নিতে হবে তার মুখ থেকে। তাকে বিপদে ফেলার পরিকল্পনাটা মাথার মধ্যে ছকে নিলাম আমি। কিছুদিনের মধ্যেই একদিন হাতি দেখার নাম করে বীরবলকে নিয়ে হাজির হলাম হাতিশালায় হাওয়াইয়ের কাছে। হাওয়াইকে হাতিশাল থেকে সামনের চকে বার করিয়ে অন্য সব লোককে সরে যেতে বললাম সেখান থেকে। হাওয়াইয়ের সামনে দাঁড়িয়ে আমি বীরবলকে বললাম, হাতি হল শক্তির প্রতীক, ক্ষমতার প্রতীক, সম্পদের প্রতীক। তাই সবাই সমীহ করে চলে এই প্রাণীকে। কিন্তু আপনি হাতি নিয়ে এমন একটা শব্দ বলুন যা বিদ্রুপাত্মক।
বীরবলকে কথায় হারানো সহজ ছিল না। তিনি সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিলেন—হস্তীমূর্খ।
আমি কথাটার ব্যাখ্যা জানতে চাইলাম তার কাছে। তিনি কথা বলা শুরু করতেই তার অলক্ষ্যে একটা সাংকেতিক ইঙ্গিত করলাম হাওয়াইকে। প্রশিক্ষিত রণহস্তী হাওয়াই আমার ইঙ্গিত বুঝতে পেরে সঙ্গে সঙ্গে বীরবলের কোমর জড়িয়ে তাকে শূন্যে তুলে নিল। তারপর ছুটতে শুরু করল চকের ভিতর। আমি বীরবলকে ভয় দেখাবার জন্য চিৎকার করলাম—সাবধান! সাবধান! হাওয়াই পাগল হয়ে গেছে!
সঙ্গে সঙ্গে হাসি উবে গেল বীরবলের মুখ থেকে। সে এক অদ্ভুত দৃশ্য। আতঙ্কিত বীরবলকে শুঁড়ে জড়িয়ে চকের মধ্যে বৃত্তাকারে ছুটছে হাওয়াই! কিছুক্ষণের মধ্যেই অবশ্য আমার নির্দেশ পেয়ে বীরবলকে মাটিতে নামিয়ে তার উদ্দেশে শুঁড় মাথায় তুলে সেলাম জানাল হাওয়াই। হাওয়াই শুধু শত্রুসৈন্যদেরই নয়, বীরবলকে পরাস্ত করতেও সাহায্য করেছিল আমাকে।'
গল্প শেষ করে বেশ কিছুক্ষণ হাসলেন সম্রাট। রাজা মান, ফকির আজিউদ্দিন আর মোল্লা দোপেঁয়াজাও যোগ দিলেন সম্রাটের সঙ্গে।
সম্রাট এরপর বললেন, 'শুনেছি কান্দাহারে একজন হস্তীচিকিৎসক আছেন যিনি নাকি মরা হাতিকেও আবার মাটির ওপর দাঁড় করিয়ে দেন! তাকে আনার জন্য লোক পাঠিয়েছি। হাওয়াইকে সুস্থ করে তোলার জন্য একটা শেষ চেষ্টা করব।'
সভাসদদের এ সংবাদ জানাবার পর সম্রাট গাত্রোত্থান করে কক্ষ ত্যাগ করে রওনা হলেন অন্তঃপুরের উদ্দেশে।
সম্রাটের তিন রত্নও কক্ষ ত্যাগ করলেন। রাজা মানকে আবার আজ ব্যক্তিগত প্রয়োজনে দিল্লি ফিরতে হবে। কিছুদিন তিনি সেখানে থাকবেন, যদি না সম্রাট জরুরি কোনও প্রয়োজনে আগ্রা প্রাসাদে তাকে এত্তালা পাঠান। অশ্বশালার সামনে একদল সৈনিক রাজা মানের জন্য অপেক্ষা করছে তাকে দিল্লি নিয়ে যাবার জন্য।
ফকির আর মোল্লার থেকে বিদায় নেবার আগে মানসিংহ ফকির আজিউদ্দিনকে বললেন, 'আজ আপনি সম্রাটের সামনে ওই কথাটা বলে বেশ লজ্জায় ফেলে দিলেন। সম্রাট কী ভাবলেন কে জানে!'
ফকির আজিউদ্দিন মৃদু হেসে বললেন, 'আমি সত্য ভাষণ দিই। সম্রাট নিজেও জানেন আমার বক্তব্যের মধ্যে কতটা সত্যতা আছে। বীরবল বা আবুল ফজল আজ যদি বেঁচে থাকতেন তবে তারাও একই কথা বলতেন।'
মান বললেন, 'তবু...।'
রাজা মান কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু তার আগেই আজিউদ্দিন বললেন, 'আপনার কাছে আমার একটা অনুরোধ আছে।'
মান জানতে চাইলেন, 'কী অনুরোধ?'
আজিউদ্দিন বললেন, 'দিল্লির উপকণ্ঠে এক দরিদ্রপল্লিতে এক পণ্ডিত ব্রাহ্মণ বাস করেন। আমার পরিচিত তিনি। হর্ষদেব নাম। তাঁর কন্যার বিবাহ ঠিক হয়েছে। কিন্তু কন্যার বিবাহকার্য সম্পাদনের জন্য আর্থিক সামর্থ্য তাঁর নেই। আমার কাছে তিনি সাহায্যপ্রার্থী হয়ে এসেছিলেন। কিন্তু আমি ফকির মানুষ। এই আলখাল্লা আর যষ্ঠি ছাড়া আমার কিছুই নেই। জানেনই তো সম্রাটের থেকে ব্যক্তিগত কোনও অর্থ বা উপঢৌকন আমি গ্রহণ করি না। এবাদতখানার আধিকারিককে আমি সেই ব্রাহ্মণকে কিছু অর্থ সাহায্য করতে অনুরোধ করেছি। যদি আপনিও তাকে ব্যক্তিগতভাবে কিছু অর্থ সাহায্য করেন তবে এই কন্যাদায়গ্রস্ত পিতার মুক্তি ঘটে।'
ফকিরের কথা শুনে সেনাপতি বললেন, 'হ্যাঁ, নিশ্চয়ই করব। কিন্তু কীভাবে? আমি তো কিছুদিনের জন্যে দিল্লিতে যাচ্ছি।'
ফকির আজিউদ্দিন বললেন, 'আমি ব্রাহ্মণকে আপনার দিল্লির বাসস্থানে সাক্ষাৎ করার জন্য বার্তা পাঠাচ্ছি।'
সেনাপতি মান বললেন, 'হ্যাঁ, তাই করুন।'
মানসিংহ তারপর তাদের থেকে বিদায় নিয়ে রওনা হয়ে গেলেন দিল্লি ফেরার জন্য।
দিল্লি কেল্লার সন্নিকটেই সেনাপতি মান সিংহের প্রাসাদ। আসলে এ প্রাসাদ তার সরকারি বাসভবন। লালকেল্লার বাইরে দিল্লি নগরীর সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ অভিজাত অঞ্চল এটি। যারা এখানে বাস করেন তারা সবাই আমির ওমরাহ বা সম্রাটের দরবারে উচ্চপদস্থ কর্মচারী বা নিদেনপক্ষে জায়গিরদার। যেমন সেনাপতি মান সিংহের পাশের প্রাসাদে বসবাস করেন মন্ত্রী বেহারীমল্ল। সাধারণ মানুষরা এই গৃহগুলিকে প্রাসাদ বললেও প্রকৃতপক্ষে এই আবাসস্থলগুলি বৃহৎ বাটিকা মাত্র। রাজা মান সিংহের প্রকৃত প্রাসাদ অবস্থিত অম্বর দুর্গে। সেটি সত্যিই রাজপ্রাসাদ। আকারে তা ভারত সম্রাটের প্রাসাদের চেয়েও বৃহৎ। তবে কাজের চাপে সে প্রাসাদে আর আজকাল যাওয়া হয়ে ওঠে না মান সিংহের। রক্ষীদের তত্ত্বাবধানেই পড়ে আছে সেই প্রাসাদ।
মান আগ্রা থেকে ফেরার পর বেশ কিছুদিন কেটে গেছে। ব্যক্তিগত যে কাজ সম্পাদনের জন্য তিনি দিল্লি এসেছিলেন সে কাজও সম্পন্ন। এবার আগ্রাতে ফিরবেন তিনি। রাজা মান দিল্লিতে থাকলে প্রতিদিনই কিছু মানুষ সাক্ষাৎ করতে আসেন প্রধান সেনাপতির সঙ্গে। এদের অধিকাংশই সামরিক বিভাগের পদস্থ কর্মচারী। সেনাপতি তার প্রাসাদের একতলার একটি কক্ষে অতিথিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সেদিন প্রত্যুষেও সেই কক্ষে বসে সাক্ষাৎপ্রার্থীদের অভাব অভিযোগ শুনছিলেন সেনাপতি। একটু বেলার দিকে কক্ষ তখন ফাঁকা হয়ে গেছে এমন সময় প্রতিহারী এসে বলল, 'একজন ব্রাহ্মণ সেনাপতির দর্শনপ্রার্থী। 'মান সিংহের অনুমতি পেয়ে ব্রাহ্মণ প্রবেশ করলেন তাঁর কক্ষে। ক্ষীণকায় সেই ব্রাহ্মণের পরিচ্ছদ আর চেহারা দেখলেই বোঝা যায় যে, অর্থনৈতিকভাবে তিনি দুঃস্থ। ব্রাহ্মণ তাঁর পরিচয় দিয়ে বললেন, তাঁর নাম হর্ষদেব। ফকির আজিউদ্দিন তাকে পাঠিয়েছেন প্রধান সেনাপতির কাছে।
রাজা মানের মনে পড়ে গেল ব্যাপারটা। তিনি বললেন, 'হ্যাঁ, তিনি আপনার কথা আমাকে বলেছেন। রাজকোষ থেকে কিছু পেলেন? কী পরিমাণ মুদ্রা আপনার প্রয়োজন?'
প্রশ্ন শুনে দরিদ্র ব্রাহ্মণ কপালে হাত ঠেকিয়ে বললেন, 'সম্রাটের অসীম করুণা। রাজকোষ থেকে আমাকে একশো স্বর্ণ মুদ্রা সাহায্য করা হয়েছে। তাতেই বিবাহকার্যর সিংহভাগ খরচ মিটে যাবে। এখন বরযাত্রীদের খরচ জোগাড় হলেই নিশ্চিত হতে পারি। বেশ দূর থেকে বরের সঙ্গে পঞ্চাশ জন বরযাত্রী আসছে। তাদের পথ খরচের জন্য দশটি স্বর্ণ মুদ্রা বা একশোটি রৌপ্য মুদ্রা প্রয়োজন।'
ব্রাহ্মণ হর্ষদেবের কথা শুনে সেনাপতি একজন ভৃত্যকে ডেকে তাকে খাজাঞ্চির কাছ থেকে একশোটি রৌপ্য মুদ্রা আনার নির্দেশ দিলেন। ভৃত্য টাকা আনতে চলে যাবার পর রাজা মান ব্রাহ্মণের কাছে জানতে চাইলেন, 'বরপক্ষ কোথা থেকে আসছেন? আপনার হবু জামাতা কী করেন?'
ব্রাহ্মণ জবাব দিলেন, 'তারা আসবেন রাজস্থানের কমলসীর থেকে। হবু জামাতার পিতা কমলসীর দুর্গের একলিঙ্গদেবের মন্দিরের প্রধান পুরোহিত। জামাতা পিতার সহকারী হিসাবে কাজ করেন সেখানে। কিছুদিনের মধ্যেই অবশ্য পিতার স্থানাভিষিক্ত হবে পুত্র।'
'কমলসীর দুর্গ!' বহু দিন পর এই জায়গার নাম কারো মুখে শুনলেন সেনাপতি মানসিংহ। এক সময় ওই দুর্গ ছিল মেবারের অধীনে। প্রতাপ সিংহের আবাসস্থল ছিল ওই দুর্গ। এখন অবশ্য রাজস্থানের সব দুর্গের মতো কমলসীরও সম্রাটের সাম্রাজ্যের অন্তর্গত। ব্রাহ্মণের কথা শুনে রাজা মানসিংহ বিড়বিড় করে বললেন, 'সেদিন যদি সেখানে সেই ঘটনা না ঘটত তবে হয়তো বা রাজপুতকুলের ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হত।'
তাকে ঠোঁট নাড়তে দেখে ব্রাহ্মণ বললেন, 'সেনাপতি কি আমাকে কিছু বললেন?'
মান বললেন, 'না, কিছু না।'
ভৃত্য টাকার থলি নিয়ে ফিরে এল। মান সেটা তুলে দিলেন ব্রাহ্মণের হাতে। থলিটা নেবার পর ব্রাহ্মণ তার উপবীতটা তুলে ধরে আশীর্বাদের ভঙ্গিতে বললেন, 'শ্রীবিষ্ণু আপনার মঙ্গল করুন। আপনার কাছে আমি চিরকৃতজ্ঞ হয়ে রইলাম।
মানসিংহ হেসে বললেন, 'কৃতজ্ঞতা যদি জানাতেই হয় তবে সম্রাটকে জানিয়ে আসবেন। তিনিই সব। আমি তাঁর সেবক মাত্র। তিনিই কৃতজ্ঞতা প্রাপ্তির অধিকারী।'
কথাটা শুনে ব্রাহ্মণ বললেন, 'হ্যাঁ, বিবাবহকার্য সম্পন্ন হলেই আগ্রাতে গিয়ে আমি সম্রাটকে আমার কৃতজ্ঞতা জানাব।'
এ কথা বলে মান সিংহকে প্রণাম জানিয়ে কক্ষত্যাগ করলেন ব্রাহ্মণ।
ব্রাহ্মণ ছিলেন এদিনের শেষ প্রার্থী। তিনি চলে গেলেন ঠিকই, কিন্তু তার বলে যাওয়া 'কমলসীর' কথাটা যেন নাড়া দিয়ে গেল রাজা মানের মনে। বহু যুগ আগে ওই কমলসীরেই এক তিক্ত ঘটনার সাক্ষী হয়েছিলেন রাজা মান। যে ঘটনা বদলে দিয়েছিল মেবারের ভাগ্যকে। নির্জন কক্ষে বসে কমলসীরের কথা ভাবতে ভাবতে মানসিংহ ফিরে গেলেন অতীতের যুবা বয়সের সেই দিনে। স্মৃতি জেগে উঠল তার।
মানসিংহ তখন মোগল সেনাপতি নন। অম্বরের শাসক। সম্রাট আকবরও তখন অত বড় সাম্রাজ্যের অধীশ্বর হয়ে ওঠেননি। তবে শাহেনশাহ আকবর তখন রাজভূমির দিকে হাত বাড়িয়েছেন। মেবারের চিতোর দুর্গের পতন ঘটেছে। আকবরের প্রবল পরাক্রমের সামনে একে-একে আত্মসমর্পণ করছেন রাজপুত রাজারা। ব্যতিক্রম শুধু রানা প্রতাপ সিংহ।
অম্বরের ভৌগলিক পরিধি খুব সীমিত। মেবার বা জয়শলমেরের মতো বিশাল ভূখণ্ড বা সেনাদল কোনওটাই অম্বরের ছিল না। তাছাড়া অম্বর দিল্লির অনেক কাছে অবস্থিত রাজস্থানের অন্য রাজ্যগুলোর থেকে। অম্বরের চারপাশে রাজারা যখন এক এক করে আকবরের বশ্যতা স্বীকার করলেন তখন বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো চারপাশে শত্রু পরিবৃত হয়ে একলা দাঁড়িয়ে থাকা আর সম্ভব নয় বলে শেষ পর্যন্ত শাহেনশাহর বশ্যতা স্বীকার করলেন রাজা মান।
তিনি তাঁর ভগ্নিকে তুলে দিলেন সম্রাটের হাতে। শাহেনশাহর শ্যালক হলেন মানসিংহ। তিনি যদি আকবরের বশ্যতা স্বীকার না করতেন তবে তিনি যত বড় বীরই হন না কেন সম্রাট নিশ্চিতভাবেই দখল করে নিতেন ক্ষুদ্র অম্বর রাজ্য।
সম্রাটের চেয়ে মানসিংহ বয়সে মাত্র চার বছরের ছোট। যুবা বয়সেও রাজনীতি ভালোই বুঝতেন সম্রাট। তার সঙ্গে মান সিংহের সম্পর্ক স্থাপিত হবার পরই মান সিংহকে সম্রাট তার অন্যতম সেনাপতির পদে বসিয়ে রাজপুত রাজাদের কাছে এ বার্তা পাঠাবার চেষ্টা করলেন যে, ধর্মীয় বা জাতিগতভাবে তিনি রাজপুতদের শত্রু নন। আর দায়িত্ব পেয়ে সেনাপতি মানসিংহও নেমে পড়লেন তার ভগ্নিপতির সাম্রাজ্য বিস্তারের কাজে। সম্রাটের নির্দেশে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে একের পর এক যুদ্ধ জয় করতে লাগলেন মান।
সময় এগিয়ে চলল। বিস্তৃত হতে থাকল মোগল সাম্রাজ্যের পরিধি, মানের সফলতায়, বিশ্বস্ততায় তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠলেন সম্রাট। চিতোর দুর্গ অনেকদিন আগেই সম্রাটের করতলগত। মেবারের পতন ঘটলেও সর্দারের দল মেবারের সিংহাসনের উত্তরাধিকারী নির্বাচন করেছিলেন প্রতাপ সিংহকে। যদিও প্রতাপ কোনও দিন চিতোরে ফেরেননি। তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যতদিন তিনি মেবারের সবক'টা দুর্গ পুনর্দখল না করবেন ততদিন তিনি সিংহাসনে বসবেন না।
মানসিংহ মোগল সেনাপতি হলেও রানা প্রতাপ সিংহকে মনে মনে সেদিনও প্রচণ্ড শ্রদ্ধা করতেন তাঁর বীরত্বের জন্য। তাঁর স্বাধীনচেতা মনোভাবের জন্য। একমাত্র তিনিই তো এখনও অসম্ভব ত্যাগ স্বীকার করে দাঁড়িয়ে আছেন রাজপুত জাতির প্রতীক হয়ে। তবে মানসিংহ এও জানতেন যে, সম্রাট যদি সত্যি প্রতাপ সিংহের বিরুদ্ধে কোনও অভিযান চালান তবে রানার ক্ষুদ্র সেনাদলের পক্ষে সম্রাটের সেনাদলকে প্রতিহত করা সম্ভব নয়। প্রতাপ সিংহ তো কোনও অবস্থাতেই শাহেনশাহর সামনে মাথা নোয়াবেন না। তাই যুদ্ধ বাঁধলে হয় রানাকে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ বিসর্জন দিতে হবে, অথবা যুদ্ধ বন্দি হিসাবে কারাগারে দিন কাটাতে হবে।
মান কোনও দিনই চাইতেন না এ ধরনের কোনও ঘটনা ঘটুক। তাই বিভিন্ন সময় কৌশলে সম্রাটকে প্রতাপ সিংহের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে নিবৃত্ত করতেন। কখনও তিনি সম্রাটকে বলতেন, 'রাজস্থান পুরো আমাদের দখলেই চলে এসেছে, ওই একটা লোককে তো আমরা যে-কোনও সময় পরাস্ত করতে পারব। তার চেয়ে গুর্জর প্রদেশ অভিযান এই মুহূর্তে বেশি জরুরি। কারণ, সেদিক থেকে আক্রমণ আসতে পারে।' আবার কখনও মান বলতেন, 'কিছু বনচারী ভিল আর সামান্য কয়েকজন সৈনিক, দু-তিনটে ভাঙাচোরা দুর্গ নিয়ে প্রতাপ সিংহ আর ক'দিন টিকে থাকবেন? আরও কিছু দিন যাক, নিশ্চয়ই আত্মসমর্পণ করবে। সম্রাট বরং বুন্দেলাখণ্ডের বিদ্রোহ দমনে মনোযোগ দিন।'
এমনই সব কথাবার্তা বলে সম্রাটের মনোযোগ প্রতাপ সিংহের থেকে দূরে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করতেন সম্রাট শ্যালক মান। আর সম্রাটও মোটামুটি তাঁর পরামর্শ মেনেই চলছিলেন। কিন্তু 'নিয়তি কেন বধ্যতে!' এমন একটা ঘটনা ঘটল যে সবকিছু ওলোট-পালোট হয়ে গেল।
সম্রাটের নির্দেশে শোলা দুর্গ জয় করে ফিরছিলেন সেনাপতি মান। পথে প্রাচীন কমলসীর দুর্গ পড়ে। সেনাপতি মান খবর পেলেন ক্ষাত্রকুলপতি প্রতাপ সিংহ তখন সেই দুর্গে অবস্থান করছেন। মান সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি একবার সাক্ষাৎ করবেন রানার সঙ্গে। সৌজন্য সাক্ষাৎকার। সম্রাট যদি খবরটা জানতে পারেন তবে তাঁকে কী বলবেন তা মনে মনে ভেবে নিলেন মান। তিনি বলবেন, তিনি প্রতাপ সিংহের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেছিলেন সম্রাটের মহিমা তাকে অবগত করার জন্য। যাতে প্রতাপ সিংহ আত্মসমর্পনের ব্যাপারে ভাবনা শুরু করেন।
সেনাপতি মান কমলসীর দুর্গে খবর পাঠালেন, তিনি রানা প্রতাপ সিংহের সাক্ষাৎ প্রার্থী। দুর্গ থেকে খবর এল প্রতাপ সিংহ তাকে আতিথেয়তা দানে প্রস্তুত। সম্রাট যাতে তার সঙ্গে অশ্বারোহী সেনাদল দেখে মানের মনে অন্য কোনও মতলব আছে তা মনে না করেন, সে জন্য সেনাপতি মান তার সেনাদলকে পথপার্শ্বে বিশ্রামের আদেশ দিয়ে অশ্বপৃষ্ঠে একলাই রওনা হলেন কমলসীর দুর্গে। মানের ইচ্ছে ছিল একটা রাত কমলসীর দুর্গে কাটিয়ে প্রতাপ সিংহের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে পরদিন দিল্লির পথ ধরবেন।
মান উপস্থিত হলেন কমলসীর দুর্গে। শাঁখ বেজে উঠল। তার ওপর পুষ্পবৃষ্টি করতে থাকল রমণীরা। চন্দন তিলকে যথাযথ মর্যাদায় বরণ করা হল অম্বররাজ মান সিংহকে। মেবার আর অম্বররাজ পরিবারের মধ্যে দীর্ঘ দিনের সম্পর্ক, এমনকী বৈবাহিক সম্পর্কও আছে। প্রথমে তাকে নিয়ে যাওয়া হল অতিথিশালাতে। অতিথি আপ্যায়নের জন্য সব কিছু মজুত ছিল সেখানে। অতিথিশালাতে বিশ্রাম গ্রহণের পর অম্বররাজকে নিয়ে যাওয়া হল ভোজন কক্ষে। সেখানে রূপোর পিঁড়ে পাতা আছে অম্বর রাজের জন্য। পিঁড়ের সামনে সোনার থালাতে থরে থরে সাজানো রূপোর বাটিতে পঞ্চব্যঞ্জন। সেখানে তাকে আপ্যায়নের জন্য উপস্থিত প্রতাপপুত্র অমর সিংহ।
কোমর থেকে তলোয়ার খুলে মাটিতে নামিয়ে রেখে পিঁড়েতে বসলেন অম্বররাজ। থালা থেকে কয়েকটা ভাতের দানা তুলে ইষ্টদেবতার উদ্দেশে সেগুলি উৎসর্গ করার পরই মানের হঠাৎ মনে হল প্রতাপ সিংহ সেখানে উপস্থিত নেই কেন? কোনও রাজা অন্য কোনও রাজার অতিথি হলে দুই রাজা একইসঙ্গে অন্ন গ্রহণ করেন। রাজপুত রাজপরিবারের মধ্যে দীর্ঘকাল ধরে এ প্রথা চলে আসছে। মান জানতে চাইলেন—'অমর সিংহ, আপনার পিতাকে দেখছি না কেন?'
অমর সিংহ জবাব দিলেন, 'পিতার মাথা ধরেছে সেজন্য তিনি এখানে উপস্থিত হতে পারেননি। তাই তিনি আমাকে পাঠিয়েছেন।'
জবাব শুনে অম্বররাজ ব্যঞ্জনের বাটি তুলে বললেন, 'আসুন তবে আমরা এক সঙ্গে অন্ন গ্রহণ করি।'
কিন্তু এ কথার উত্তরে প্রতাপপুত্র বললেন, 'আপনি অন্ন গ্রহণ করুন। আমি প্রত্যুষে আহার সম্পন্ন করেছি।'
মুহূর্তের মধ্যে একটা সন্দেহের সৃষ্টি হল মান সিংহের মনে। ব্যঞ্জনের পাত্রটা নামিয়ে রেখে মান অমরকে বললেন, 'তুমি তোমার পিতাকে গিয়ে বলো যে, একবারটি যেন তিনি এখানে এসে আমাকে দর্শন দিয়ে যান।'
কিন্তু অম্বররাজের কথা শুনেও অমর সিংহ নিশ্চুপভাবে দাঁড়িয়ে রইলেন। এবার সন্দেহটা আরও দৃঢ় হল মান সিংহের মনে। তিনি বললেন রানা যদি এখানে এসে উপস্থিত না হন তবে আমি অন্ন গ্রহণ করব না।'
প্রতাপ সিংহ কিন্তু তখন দূরে কোথাও ছিলেন না। ভোজনকক্ষের বাইরে দাঁড়িয়ে তিনি মান সিংহের অলক্ষ্যে পাথরের জাফরি ঢাকা গবাক্ষ দিয়ে অতিথি সৎকারের ব্যাপারে নজর রাখছিলেন। মান, অন্ন গ্রহণে সম্মত হচ্ছেন না দেখে এরপর বাধ্য হয়ে ভোজন কক্ষে প্রবেশ করলেন প্রতাপ।
মানের আত্মাভিমান তখন প্রবল হয়ে উঠেছে। তিনি নিজেও তো একজন রাজা। অম্বররাজ সরাসরি প্রতাপ সিংহকে প্রশ্ন করলেন, 'আপনারা কেউ আমার সঙ্গে অন্ন গ্রহণ করছেন না কেন? অতিথি সৎকারের প্রথা কি বিস্মৃত হয়েছেন আপনারা?'
প্রতাপ এবার নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। তিনি বলে ফেললেন, 'যারা মুসলমানের অন্ন গ্রহণ করে, তাদের হাতে পরিবারের মেয়েদের তুলে দেয়, তারা ক্ষত্রিয় হলেও পতিত ক্ষত্রিয়। তাদের সঙ্গে বসে অন্ন গ্রহণ করা পাপ।'
এ কথা শুনে মান আহত স্বরে বলে উঠলেন, 'আপনি আমাকে এমনভাবে অপমান করলেন? অথচ আকবরের রোষানল থেকে আমি আপনাকে বারবার রক্ষা করার চেষ্টা করেছি। আমি যদি আমার ভগ্নিকে সম্রাটের কাছে না দিতাম, সম্রাট আমাকে সেনাপতি না করতেন তবে আপনার দুর্গ চূর্ণ হয়ে যেত।'
কথাটা শুনে ক্রুদ্ধ হয়ে প্রতাপও বলে উঠলেন, 'আমাকে রক্ষা করার দায়িত্ব আপনার মতো পতিত ক্ষত্রিয়কে নিতে হবে না। আপনার সম্রাটকে বলবেন তিনি যেন নিজেকে রক্ষা করতে প্রস্তুত থাকেন। এরপর যুদ্ধক্ষেত্রে আপনাদের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হবে। দেখবেন সম্রাটকে রক্ষা করতে গিয়ে নিজের প্রাণ যেন আপনি খুইয়ে না বসেন! এই মুহূর্ত থেকে আপনাকে আর রাজপুত বলে মনে করছি না আমি।'
রানার কথা শুনে রাজা মান বললেন, 'ঠিক আছে আপনি যখন চাইছেন তখন এরপর যুদ্ধক্ষেত্রেই দেখা হবে আমাদের।'
প্রতাপ বললেন, 'সে বাসনাতে অপেক্ষা করব আমি।'
রাজা মান আর কোনও কথা বাড়ালেন না। যে ক'টা ভাতের দানা তিনি ইষ্ট দেবতাকে উৎসর্গ করেছিলেন সেগুলো মাটি থেকে কুড়িয়ে নিয়ে উষ্ণীষে গুঁজে তলোয়ার নিয়ে ভোজন কক্ষ ত্যাগ করলেন। বাইরে এসে যখন তিনি ঘোড়ার পিঠে উঠে বসলেন তখন রানার যে ভৃত্য এতক্ষণ অম্বররাজের ঘোড়া পাহারা দিচ্ছিল, সে মান সিংহকে বিদ্রুপ করে বলে উঠল, 'আবার আসবেন। আর সেবার আসার সময় আপনার ফুফা অর্থাৎ ভগ্নিপতিকেও সঙ্গে আনবেন।'
তার কথা শুনে হাসতে লাগল দুর্গের অন্য ভৃত্যরাও। চূড়ান্ত অপমানিত রাজা মানসিংহ কমলসীর ত্যাগ করে ঘোড়া ছুটিয়ে দিলেন দিল্লির উদ্দেশে। সম্রাটের কাছে এসে সেনাপতি ব্যক্ত করলেন তার অপমানের কথা। সেনাপতির অপমানের মানে তো সম্রাটেরও অপমান। সম্রাট আকবর যুদ্ধ ঘোষণা করে দিলেন প্রতাপ সিংহের বিরুদ্ধে। কিছুদিনের মধ্যেই সেবারের বর্ষার মরশুমে মান সিংহের নেতৃত্বে হলদিঘাটির পার্বত্য প্রান্তরে বন্যার স্রোতের মতো বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ল প্রতাপ সিংহের ক্ষুদ্র সেনাদলের ওপর। তার পরের ঘটনা তো সবারই জানা।
রাজা মান তলিয়ে গিয়েছিলেন কমলসীরের ঘটনার স্মৃতির গভীরে। তার একজন ভৃত্য এসে তাকে সেলাম জানিয়ে বলল, 'আপনার মধ্যাহ্ন ভোজনের সময় হয়েছে মালিক।'
প্রৌঢ় মানসিংহ একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, 'হ্যাঁ, চলো।'
আজকাল শেষ রাতের দিকে ঘুম ভেঙে যায় শাহেনশার। রাতেও খুব ভালো ঘুম হয় না তার। এদিনও তার ব্যতিক্রম হল না। শেষ রাতে ঘুম ভেঙে পালঙ্কে বসলেন তিনি। সোনার তৈরি পিলসুজের ওপর বসানো তেলের প্রদীপটা সারা রাত জ্বলার পর কেমন যেন ম্রিয়মাণ হয়ে এসেছে। দ্বার প্রান্তে মখমলের পর্দার আড়ালে অস্ত্রধারী দ্বাররক্ষীর ছায়াটার মধ্যেও কেমন যেন শৈথিল্যের ভাব। তার তলোয়ারের ফলাটা ভূমির দিকে নেমে এসেছে।
হাতির দাঁতের মানিক্যখচিত পালঙ্কে সোনার সুতোয় বোনা মখমলের চাদরে বসে সম্রাট গবাক্ষ দিয়ে বাইরের দিকে তাকালেন। আকাশে ক্ষীণ চাঁদের আলোতে ঘুমিয়ে আছে যমুনার তট। কিছুদিন হল নানা দুশ্চিন্তা যেন ঘিরে ধরছে সম্রাটকে। তিনি ভারতের ভাগ্য বিধাতা। তাই নিজের মনের দুর্বলতা প্রকাশ করা চলে না কারো কাছে। তাই তিনি নিজের মনের মধ্যেই চেপে রাখছেন তার শঙ্কাগুলো। বিশেষত, একটা দুর্ভাবনার প্রকাশ তাঁর মনের মধ্যে ক্রমশ দানা বাঁধছে। তাঁর জীবনের ওপর, এই সাম্রাজ্যের ওপর অকস্মাৎ কোনও দুর্যোগ নেমে আসবে না তো?
কান্দাহারের সেই পশু চিকিৎসক এসে পরীক্ষা করেছেন হাওয়াইকে। তিনি জানিয়েছেন হাওয়াইয়ের মৃত্যু ঘনিয়ে এসেছে। তবে শেষ একটা চেষ্টা করা যেতে পারে। সে চেষ্টা যেমন অদ্ভুত তেমনই ভয়ঙ্কর! 'বিষে বিষে বিষক্ষয়' বলে একটা কথা আছে। হাওয়াইয়ের শরীরে বিষ ছড়িয়ে পড়েছে। শেষ চেষ্টা স্বরূপ হাওয়াইকে এক ধরনের তীব্র কালকূট খাওয়াতে হবে। হয় তাতে বিষক্ষয় হয়ে হাওয়াই সুস্থ হয়ে উঠবে, অথবা তীব্র কালকূটের প্রভাবে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে। এখন হাওয়াইয়ের ওপর এই কালকূট প্রয়োগ করা হবে কিনা সে সিদ্ধান্ত নিতে হবে স্বয়ং সম্রাটকেই। সে সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধাগ্রস্ত সম্রাট। একবার এক হস্তরেখাবিদ সম্রাটের হস্ত পরীক্ষা করে বলে ছিলেন, হাওয়াই যেমন সম্রাটের পক্ষে পয়মন্ত তেমনই তার মৃত্যুও সম্রাটের পক্ষে ঘোর অমঙ্গলসূচক হতে পারে। হাওয়াইয়ের যদি মৃত্যু হয় তবে সম্রাটের জীবনেও কি মৃত্যু নেমে আসবে? এ প্রশ্নও ঘুরে ফিরে আসছে তার মনে।
ঘুম ভেঙে উঠে বসে বাইরের অন্ধকার পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে সম্রাট আকবর ভাবতে লাগলেন, যদি সেই জ্যোতিষীর কথা সত্য হয়, হাওয়াইয়ের মৃত্যুর পর যদি তার মৃত্যু হয় অথবা তিনি পক্ষাঘাত বা অন্য কোনো গুরুতর অসুখের কবলে পড়ে কর্মক্ষমতা হারান তবে কী হবে তিল-তিল করে গড়ে তোলা এই সাম্রাজ্যের? ইতিমধ্যে যদিও তিনি সেলিমকে তার উত্তরাধিকারী নির্বাচন করেছেন, কিন্তু সেলিম কি পারবে এ সাম্রাজ্য রক্ষা করতে। শাহজাদা সেলিম আরামপ্রিয়। নারী ও সুরার প্রতিও তাঁর প্রবল আসক্তি। পিতার বিরুদ্ধে এক বার সে বিদ্রোহও ঘোষণা করেছিল সিংহাসনের জন্যে।
লোক বলে আবুল ফজলকে বুন্দেনাকে দিয়ে কৌশলে হত্যা করিয়েছিলেন সেলিমই। কারণ, আবুল ফজল সেলিমের পরিবর্তে সম্রাটের জ্যেষ্ঠ পুত্রকেই সম্রাটের যোগ্য উত্তরাধিকারী মনে করতেন। সম্রাটেরও বিশ্বাস সে জন্যেই পথের কাঁটাকে দূরে করেছে সেলিম। কিন্তু এতদসত্ত্বেও সম্রাট তার বিদ্রোহী পুত্রকে ক্ষমা করেছেন, তাকে নির্বাচন করেছেন সম্রাটের ভাবী উত্তরাধিকারী রূপে। এ কাজটা তিনি করেছেন কিছুটা অবাধ্য আত্মজের প্রতি বাৎসল্য ভাবের কারণে। আর কিছুটা করেছেন অন্তঃপুরের রাজনীতির সমতা রক্ষা করার জন্য। হিন্দু হোক বা মুসলিম রাজপরিবার, রাজা বা সম্রাটের উত্তরাধিকারী নির্বাচনের ক্ষেত্রে অন্তঃপুরের মহিষীদের অনিন্দ রাজনীতির একটা বড় ভূমিকা থাকে। আর তাকে অস্বীকার করলে পারিবারিক অন্তঃকলহ বিস্ফোরণ ঘটিয়ে সাম্রাজ্যের অস্তিত্বকে বিপন্ন করে তুলতে পারে।
মাত্র ষোলো বছর বয়সে অভিভাবক বৈরাম খাঁর হাত ধরে মোগল সিংহাসনে বসে সাম্রাজ্য বিস্তারের কাজ শুরু করেন সম্রাট। এখন তার বয়স চৌষট্টি। তাঁর সিংহাসন আরোহণের পঞ্চাশ বছর পূর্ণ হতে চলেছে। অনেক রক্তপাত-ঘাম-পরিশ্রমের বিনিময়ে পঞ্চাশ বছর ধরে গড়ে তোলা এই সাম্রাজ্য কি সেলিম রক্ষা করতে পারবে?
অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে এসব দুশ্চিন্তা করতে করতে হঠাৎ-ই সম্রাটের মনে পড়ে গেল কিছুকাল আগে ফকির আজিউদ্দিনের বলা কথাটা। মোগল সিংহাসনের যোগ্য উত্তরাধিকারী হলেন সেনাপতি মানসিংহ। সম্রাট ভাবতে লাগলেন—'এ কথা ঠিকই, এই সুবিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলার পিছনে মানের কৃতিত্বই বেশি। এ সম্রাজ্যের সব কিছু তার নখদর্পণে। হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সম্রাটের পর সবাই শ্রদ্ধা করে সৎ-চরিত্রবান সেনাপতি রাজা মানকে। সেলিম কোনও দিক থেকেই তার সমকক্ষ নয়। কিন্তু তা বলে তো মানকে সিংহাসনের উত্তরাধিকারী নির্বাচন করা যায় না। মান মোগল বংশদ্ভুত নন। এ সিংহাসনে সেই বসতে পারে, যার ধমনীতে সম্রাটের রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে।'
এ সব নানা কথা ভাবতে লাগলেন সম্রাট। এক সময় শুকতারা ফুটে উঠল আকাশে। তারপর তা মুছে গিয়ে ভোরের আলো ফোটার সময় হল। আজানের শব্দ ছড়িয়ে পড়ল দুর্গস্থিত মসজিদ থেকে। বাগিচা থেকে ভেসে আসতে লাগল পাখির কলরব। সূর্যালোকের একটা অদ্ভুত ক্ষমতা আছে। সব মলিনতাকে সে মুছিয়ে দেবার চেষ্টা করে। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে সম্রাটের বিষণ্ণতাও কিছুটা দূর হল। প্রাতরাশ সাঙ্গ হবার পর সম্রাট রোজ অলিন্দে দাঁড়িয়ে দর্শন দেন জনগনকে। তারপর জেনেনা মহল অর্থাৎ মহিষীদের মহলে প্রবেশ করেন। কিন্তু আজ সম্রাটের দেওয়ানি আম-এ অর্থাৎ দরবারে বসার দিন। তাই তিনি এদিন শয়নকক্ষ ত্যাগ করে এগোলেন গোসলখানার দিকে।
রূপসি দাসী-বাঁদিরা নানা উপকরণ নিয়ে আগেই উপস্থিত ছিল সেখানে। সম্রাটের দেহে সুগন্ধী লেপন করে গোলাপ জলে গোসল করানো হল তাঁকে। তারপর তাঁরা সম্রাটকে সজ্জিত করল বহুমূল্য পোশাক, উষ্ণীষ, অলঙ্কারে। কোমরবন্ধে তুর্কী তলোয়ার বেঁধে নিয়ে এরপর রক্ষীপরিবৃত হয়ে সম্রাট চললেন তার দরবারের উদ্দেশে। পথের দু-পাশে সারবদ্ধ ভাবে দাঁড়িয়ে থাকা দাসীরা পুষ্পবৃষ্টি করতে লাগল তাঁর যাত্রাপথে। বাদ্যকারদের বাদ্য যন্ত্র দুর্গের অলিন্দ প্রাকারে প্রতিধ্বনিত হয়ে জানান দিতে লাগল সম্রাট দরবারে প্রবেশ করতে চলেছেন।
আগ্রা দুর্গের দেওয়ানি আম। ভারত সম্রাটের দরবার। স্বর্ণখচিত স্তম্ভশোভিত এই বিশাল দরবার কক্ষে প্রধান তোরণ থেকে লাল গালিচা বিছানো পথ গিয়ে থেমেছে কক্ষের শেষ প্রান্তে একটা শ্বেত পাথরের বেদির নীচে। বেদির ওপর ভারত সম্রাটের বহুমূল্য রত্নখচিত সিংহাসন। তার মাথার ওপর সোনার সুতোয় বোনা চাঁদোয়ার আস্তরণ। সিংহাসন ঘিরে চামর, পানপত্র, গড়গড়ার নল হাতে দাঁড়িয়ে আছে সুবেশী তরুণীরা। সিংহাসন বেদির ঠিক নীচেই দু-পাশে বেশ কিছু আসন নির্দিষ্ট করা আছে সম্রাটের প্রধান অমাত্য ওমরাহদের জন্য। যেমন সম্রাট যখন সিংহাসনে বসেন তখন তার ডান দিকের বেদির নীচে প্রথম আসনটাই তাঁর প্রধান সেনাপতি মান সিংহের জন্য নির্দিষ্ট। আর বাম দিকের প্রথম আসনে আগে বসতেন মন্ত্রি তোদোরমল্ল। আর এখন সে আসনে বসেন মন্ত্রীসভার সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ বয়ঃজ্যেষ্ঠ সদস্য বেহারীমল্ল। আমির-ওমরাহদের বসবার স্থানের পর পদমর্যাদা অনুসারে বিভিন্ন রাজকর্মচারী ও অতিথি, দর্শনার্থীদের বসার আসন গালিচা বিছানো পথের দু-পাশে।
নিজেদের আসনে উপবিষ্ট আছেন প্রধান সেনাপতি মানসিংহ, মন্ত্রী বেহারীমল্ল সহ অন্যরা। সভাস্থলের অন্য আসনগুলোও পরিপূর্ণ। নাকাড়ার শব্দ বেজে উঠতেই উঠে দাঁড়াল দরবারের প্রত্যেকটি লোক। সিংহাসন-বেদি সংলগ্ন একটা দরজা দিয়ে রক্ষী পরিবৃত হয়ে সভাস্থানে প্রবেশ করে বেদিতে উঠে দাঁড়ালেন সম্রাট। দরবার কক্ষের সবাই মাথা নত করে সম্মান প্রদর্শন করল সম্রাটের প্রতি। সম্রাটও হাত তুলে সম্ভাষণ গ্রহণ করে সবাইকে আসন গ্রহণ করতে বলে নিজের সিংহাসনে বসলেন। দাসীরা চামর দোলাতে শুরু করল। গম্ভীর নাদে একবার ঢেঁরা বাজল। সভার কাজ শুরু হল। যারা সম্রাটের সাক্ষাৎপ্রার্থী তাদের নামের তালিকা আগেই প্রস্তুত করা আছে। প্রধান প্রতিহারী তালিকা ধরে একে একে বিভিন্ন দর্শনপ্রার্থীকে ডাকতে শুরু করলেন। তারা সম্রাটকে কুর্নিশ জানিয়ে সম্রাটের কাছে তাদের মনোবাঞ্ছা নিবেদন করতে লাগল।
নানা ধর্মের নানা জাতির মানুষ তারা। তাদের কেউ এসেছেন বঙ্গদেশের দোয়াব অঞ্চল থেকে, আবার কেউ এসেছেন আফগানিস্থানের দুর্গম পার্বত্য অঞ্চল থেকে ভারত সম্রাটের সাক্ষাতের আশায়। সম্রাটও প্রতিটা লোকের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনে প্রয়োজনবোধে উপস্থিত অমাত্য ও রাজকর্মচারীদের নানা নির্দেশ দিতে থাকলেন। কখনও বা আবার মৃদু রসিকতাও করতে লাগলেন কারো কারো সঙ্গে। একবার যেমন এক জায়গিরদারকে তিনি বললেন, 'ভাবছি আপনার খাজনা দ্বিগুণ করে দেব।'
কথাটা শুনে ভয় পেয়ে সেই জায়গিরদার বললেন, 'কেন শাহেনশাহ? আমি কী অপরাধ করলাম?'
সহাস্যে সম্রাট বললেন, 'আপনার উদর দেখে আমার সন্দেহ হচ্ছে যে আপনি একটা আস্ত জায়গির লুকিয়ে রেখেছেন আপনার ওই বিশাল উদরের মধ্যে।'
ভুঁড়িওয়ালা জায়গিরদারকে বলা সম্রাটের কথায় হাসির রোল উঠল সভাঘরে।
চলতে লাগল দরবার। এক সময় প্রতিহার 'হর্ষদেব' বলে একজনের নাম ডাকলেন। দরবারে প্রবেশ করলেন ব্রাহ্মণ হর্ষদেব। যার কন্যার বিবাহ উপলক্ষে সম্রাটের কোষাগার থেকে অর্থ সাহায্য করা হয়েছিল। অর্থ সাহায্য করেছিলেন মানসিংহও। এই প্রথম সম্রাটের দরবারে পা রেখেছেন দরিদ্র ব্রাহ্মণ সম্রাটকে তার কৃতজ্ঞতা নিবেদনের জন্য। একটু জড়োসড়ো ভাবে তিনি সম্রাটের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। তারপর হাত জোড় করে মাথা ঝুঁকিয়ে সম্রাটকে নিবেদন করলেন তার কৃতজ্ঞতার কথা। তার কথা শুনে সম্রাট খুশি হয়ে বললেন, 'যে-কোনও প্রজাপালক সম্রাটের প্রথম কর্তব্যই হল তাঁর প্রজাদের ভালো-মন্দর দিকে নজর রাখা। মনে পড়েছে, আপনাকে অর্থ সাহায্যের জন্য সুপারিশ করেছিলেন ফকির আজিউদ্দিন। একজন মুসলমান ফকির অর্থ সাহায্যের সুপারিশ করেছেন হিন্দু ব্রাহ্মণের জন্য! বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে এমন ভ্রাতৃত্ববোধ, ভালোবাসা, সহানুভূতির প্রকাশ একমাত্র এদেশেই সম্ভব। আপনার জন্য আমার শুভকামনা রইল।'
ব্রাহ্মণ এবার দরবার কক্ষ থেকে বাইরে যাবার জন্য পা বাড়ালেন। হঠাৎ তার চোখে পড়ল একপাশে বসে আছেন সেনাপতি মানসিংহ। তিনিও ব্রাহ্মণকে অর্থ সাহায্য করেছিলেন। কাজেই তাঁকে দেখতে পেয়ে কৃতজ্ঞতাবশত ব্রাহ্মণ মান সিংহের আসনের দিকে এগিয়ে মান সিংহকেও হাত জোড় করে মাথা ঝুঁকিয়ে প্রণাম জানালেন। মুহূর্তের মধ্যে কঠিন হয়ে উঠল সম্রাটের মুখ। প্রচণ্ড বিব্রত বোধ করলেন সেনাপতি মানসিংহ।
দরবারি কেতা জানা নেই এই ব্রাহ্মণের। সম্রাট যখন উপস্থিত থাকেন তখন কুর্নিশ নেবার অধিকারী একমাত্র সম্রাট। আর দ্বিতীয় অধিকারী সম্রাট যদি কাউকে তার উত্তরাধিকারী নির্বাচন করে থাকেন তিনি। সম্রাট অবশ্য সেই ব্রাহ্মণকে কিছু বললেন না। একজন ভৃত্য তাড়াতাড়ি সেই ব্রাহ্মণকে হাত ধরে দরবার কক্ষের বাইরে বার করে দিলেন। মাথা নীচু করে বসে রইলেন মানসিংহ। সম্রাটের মুখের কাঠিন্য এরপর কিছুটা কমলেও কপালে চিন্তার ভাঁজ কিন্তু রয়েই গেল। সভাও আর বেশিক্ষণ চলল না। আর মাত্র কয়েকজন সাক্ষাৎপ্রার্থীর সঙ্গে গম্ভীরভাবে কথা বলে সিংহাসন ত্যাগ করে দরবার ভেঙে দিয়ে সম্রাট অন্তপুরে যাবার জন্য রওনা হলেন। এ দিনের ঘটনা সম্রাটের মনে সত্যিই এক প্রশ্নের জন্ম দিল—ব্রাহ্মণ হঠাৎ সেনাপতি মানকে কুর্নিশ করতে গেল কেন? সে কি দরবার প্রথা জানে না? নাকি সেনাপতি মানকেই মোগল সিংহাসনের উত্তরাধিকারী ভাবতে শুরু করেছেন সবাই। আবারও একটা অস্বস্তি শুরু হল সম্রাটের মনে। সেদিন সন্ধ্যায় সম্রাট হাবসি খোঁজা কমবক্সকে ডেকে পাঠালেন তার কক্ষে।
আগ্রা কেল্লার পরিধি বিশাল। তাকে একটা ছোটখাটো নগরীই বলা যায়। সম্রাটের প্রাসাদ, দরবার, বাগিচা যেমন আছে, তেমনই আছে নানা চক, বিপণি, মসজিদ, হাতিশালা, অশ্বশালা, সরকারি দপ্তর, সেনাছাউনি, অভিজাত সম্প্রদায়ের বাসস্থান থেকে শুরু করে রূপজীবি নর্তকী, সাধারণ মানুষদের বাসস্থান। সুরম্য উদ্যান শোভিত সম্রাটের প্রাসাদ কেল্লার যেদিকে যমুনা নদী সেদিকেই। দুর্গের সব থেকে শীতল ও আরামপ্রদ অংশ সেটি। নদীর দিক থেকে ঠান্ডা বাতাস ভেসে আসে। আর এ দুর্গে প্রধান সেনাপতির বাসস্থান সম্রাটের প্রাসাদের একদম বিপরীত প্রান্তে সেনা ছাউনির কাছে।
বিকালবেলা রোদের তেজ একটু কমলে সেনাপতি মান তার গৃহ সংলগ্ন যে ছোট্ট উন্মুক্ত জায়গাটা আছে সেখানে একটা পাথরের আসনে বসলেন। বেলা পড়ে এসেছে। পশ্চিমে হেলে পড়েছে সূর্য। দিনের শেষ উড়ান শেষ করে দুর্গ প্রাকারের ওপর ফিরে আসছে পায়রার ঝাঁকগুলো। এক দল সৈনিক দুর্গপ্রাকারের গায়ে পদচারণার যে সঙ্কীর্ণ পথ আছে সেখানে দাঁড়িয়ে প্রাকারের খাঁজে মশাল দণ্ডগুলো গুঁজছে। অন্ধকারে নামতেই সার সার মশাল জ্বলে উঠবে প্রাকারের গায়ে। কেল্লার ভিতর একটা ছোট মন্দিরও আছে। মাঝে মাঝে ঘণ্টাধ্বনি ভেসে আসছে সেদিক থেকে। সব মিলিয়ে চারপাশের পরিবেশ বড় মনোরম।
সেনাপতি মান হঠাৎ দেখতে পেলেন হাতে লাঠি নিয়ে চিরাচরিত আলখাল্লার পোশাকে রাস্তা দিয়ে যাচ্ছেন ফকির আজিউদ্দিন। তাকে দেখে আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন মান। আজিউদ্দিনও তাকে দেখতে পেয়ে তার কাছে এগিয়ে এলেন। সেনাপতি মান তাঁকে প্রশ্ন করলেন 'ফকির আপনি কোথায় যাচ্ছেন?'
আজিউদ্দিন হেসে বললেন, 'নির্দিষ্টভাবে কোথাও যাইনি। আমার যা কাজ, কেল্লার এ মহল্লা ও মহল্লা ঘুরে বেড়াই, নানা মানুষের সঙ্গে কথা বলি। ক'দিন ধরেই আপনার সঙ্গে সাক্ষাতের ইচ্ছা হচ্ছিল, যাক সাক্ষাৎ হয়ে গেল।'
আজিউদ্দিনকে আপ্যায়ন করার উদ্দেশ্যে মান বললেন, 'চলুন, আমার গৃহের ভিতরে চলুন।'
ফকির বললেন, 'না, এখানেই বসি। চারপাশের পরিবেশটা বেশ সুন্দর লাগছে। তাছাড়া গৃহের অভ্যন্তর অপেক্ষা এ জায়গা শীতলবোধ হয়।' কথাটা বলে ফকির আজিউদ্দিন পাথরের বেদির মতো আসনে বসে পড়লেন। কাছেই মানের এক ভৃত্য দাঁড়িয়েছিল। তাকে ফকিরের জন্য শরবত আনতে বলে সেনাপতিও আজিউদ্দিনের পাশে আসন গ্রহণ করলেন। প্রথমে ফকির আজিউদ্দিন কোনও কথা বললেন না। নিষ্পলক দৃষ্টিতে তিনি বেশ অনেকটা সময় চেয়ে রইলেন দুর্গ প্রাকারের আড়ালে অদৃশ্য হতে চলা অস্তাচলগামী সূর্যের দিকে। পাথরের পাত্রে শরবত আর একটা থালায় মিষ্টান্ন নিয়ে হাজির হল ভৃত্য। আজিউদ্দিন শুধু শরবত পান করলেন। ভৃত্য পাত্র নিয়ে চলে যাবার পর মুখ খুললেন আজিউদ্দিন। তিনি বললেন, 'সেদিন ওই কথাটা বলে আমি ঠিক করিনি মনে হয়।'
'কোন কথা?' জানতে চাইলেন মান।
আজিউদ্দিন বললেন, 'ওই যে আপনিই সিংহাসনের বসার উপযুক্ত ব্যক্তি।'
মান হেসে বললেন, 'যা বলার তা তো বলেই ফেলেছেন।'
ফকির কিন্তু হাসলেন না। তিনি বললেন, 'না কাজটা আমি ঠিক করিনি বলেই ক'দিন ধরে আমার মনে হচ্ছে। আর সেদিন আমি দরবারে না থাকলেও সেই ব্রাহ্মণের আপনাকে কুর্নিশ করার ব্যাপারটাও মোল্লা দোপেঁয়াজা আমাকে বলেছেন। এও বলেছেন যে ঘটনার সময় সম্রাটের মুখ কঠিন হয়ে উঠেছিল। ও লোককেও তো আমিই আপনার কাছে পাঠিয়েছিলাম। হয়তো বা আমি কোনও ক্ষতিই করে ফেললাম আপনার।'
সেনাপতি মান বললেন, 'এটা ঠিক যে ওই ব্রাহ্মণ জাঁহাপনার সামনে আমাকে কুর্নিশ করাতে প্রচণ্ড বিব্রতবোধ করেছিলাম আমি। লোকটা যে ও কাণ্ড ঘটাবে তা বুঝতে পারিনি। কিন্তু আপনি ক্ষতির কথা বলছেন কেন?'
আজিউদ্দিন বললেন, 'আপনার কোনও ক্ষতি না হোক সেটাই চাই। কিছুদিন ধরেই কেমন যেন বিব্রত আছেন বলে মনে হচ্ছে সম্রাটকে দেখে। মনে হচ্ছে তিনি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত।'
সেনাপতি মান বললেন, 'হ্যাঁ, এ কথাটা অবশ্য আমারও মনে হচ্ছে সম্রাটকে দেখে।'
ফকির বললেন, 'আসলে কী জানেন, সন্দেহ অত্যন্ত মারাত্মক ব্যাপার। আর সে সন্দেহের সঙ্গে যদি নিরাপত্তাহীনতা যুক্ত হয় তবে তা ক্ষতির কারণ হতে পারে। আর তা যদি সম্রাটের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত হয় তা হলে তো কথাই নেই।'
ফকির আজিউদ্দিনের সম্রাটের সামনে বলা কথায়, ও সেদিন ব্রাহ্মণ দরবারি রীতি ভঙ্গ করাতে সেনাপতি মান বিব্রত বোধ করেছিলেন ঠিকই কিন্তু ঘটনাগুলো তিনি এ ভাবে ভাবেননি। ফকির আজিউদ্দিনের কথা শুনে সেনাপতি মান বললেন, 'আপনি কী বলতে চাইছেন যে, সম্রাট আমাকে তাঁর সিংহাসনের দাবিদার বলে ভাবতে পারেন?'
ফকির বললেন, 'ঠিক তাই। একবার যদি সম্রাটের ধারণা হয় যে, তাঁর অবর্তমানে আপনি সিংহাসনের দাবিদার তবে আপনার বিপদ হতে পারে। নিশ্চিতভাবে সেলিম আপনার থেকে সিংহাসনে বসার ক্ষেত্রে অযোগ্য ব্যক্তি, কিন্তু তিনি সম্রাট পুত্র। তার সিংহাসন আরোহণের ক্ষেত্রে কোনও আশঙ্কার মেঘ ঘনিয়ে আসুক তা সম্রাট কোনও অবস্থাতেই চাইবেন না। এবার থেকে আপনি একটু সাবধানে থাকবেন।'
তাঁর কথায় বিস্মিত হয়ে সেনাপতি মান সিংহ ভাবতে লাগলেন, সত্যিই কী তার সম্পর্কে সম্রাটের এমন ভাবনা আসা সম্ভব? সম্রাটের জন্য জ্ঞাতি কুল সব ত্যাগ করেছেন তিনি। নিজের প্রাণ বাজি রেখে আরকান মুলুক থেকে দোয়াব অঞ্চলে লড়াই করেছেন। একের পর এক ভূখণ্ড তুলে দিয়েছেন সম্রাটের হাতে। রাজপুত তলোয়ার স্পর্শ করে তিনি সম্রাটের সামনে শপথ করেছেন সম্রাটের সকল নির্দেশ তিনি মেনে চলবেন, তার সকল ইচ্ছার মর্যাদা দেবেন। আর গত তিরিশ বছর ধরে নিষ্ঠার সঙ্গে তিনি এ কাজ করে এসেছেন। তবু সম্রাটের সন্দেহের পাত্র হবেন তিনি?
সেনাপতিকে চুপ করে থাকতে দেখে ফকির বললেন, 'আপনাকে চিন্তায় ফেলে দিলাম ঠিকই। কিন্তু আপনাকে সতর্ক করাটা আমার কর্তব্য বলে মনে হল।'
দুর্গ প্রাকারের আড়ালে সূর্য ডুবে গেছে। আকাশের বুকে তার লাল আভাটাই শুধু জেগে আছে। সেদিকে তাকিয়ে মান বললেন, 'কিন্তু এও কি সম্ভব?'
ফকির আজিউদ্দিন বললেন, 'বললাম না সন্দেহ অতি মারাত্মক জিনিস। তা কোনও যুক্তি মানে না। তাছাড়া এ পৃথিবীতে এখন সবই সম্ভব। সেলিম, সিংহাসন লাভের আশায় পিতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করলেন, সেটা সম্ভব হল! তারপর সম্রাট তাকে শুধু ক্ষমাই করলেন না, আবার উত্তরাধিকারী মনোনীত করলেন সেটাও সম্ভব হল! এমনকী, আবুল ফজলের হত্যাকাণ্ডও মেনে নেওয়া সম্ভব হল সম্রাটের পক্ষে।'—এই বলে বিষণ্ণ হেসে আবার চাপাস্বরে তিনি বললেন, 'আপনি যে ভারতের সিংহাসনে বসার যোগ্যতম ব্যক্তি সে কথা কিন্তু মোল্লা দোপেঁয়াজা বা মন্ত্রী বেহারীমল্লও বিশ্বাস করেন। তাতেই রাজ্যের মঙ্গল হত। কিন্তু কী আর করা যাবে! আপনি তো আর সম্রাটপুত্র নন। তবে এ কথা ঠিক যে, আপনি সম্রাটের সিংহাসনে না বসলেও মোগল সাম্রাজের ইতিহাস যদি ভবিষ্যতের মানুষ মনে রাখে তবে আপনাকেও মানুষ মনে রাখবে। মনে রাখবে আপনার ওই তলোয়ারের জন্য। বৈরাম খাঁর পুত্র মীর্জা খাঁ প্রতাপ সিংহের সম্বন্ধে বলেছিলেন—'দুনিয়ায় সবই অনিত্য, কালে আর জলে সবই ধুয়ে মুছে যাবে। কিন্তু মহাপুরুষ প্রতাপ সিংহের কীর্তি বেঁচে থাকবে অনাদিকাল। ঠিক তেমনই আপনাকেও লোকে মনে রাখবে।'
কথাটা শুনেই মান লজ্জিতভাবে বলে উঠলেন, 'না, না, মহারানা প্রতাপের সঙ্গে আমার তুলনা টানবেন না। হতে পারে তীব্র অপমানবোধের কারণে আমি তার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছিলাম। কিন্তু তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যিনি এত শক্তিধর মোগল সাম্রাজ্যের সামনে মাথা ঝোঁকালেন না। আমাদের সব শক্তি ব্যর্থ হয়ে গেল। তিনি সত্যি অপরাজেয়।'
সূর্য ডুবে গেছে। রক্ষীরা এবার মশাল জ্বালাবার প্রস্তুতি শুরু করেছে। দুর্গের অলিন্দগুলোতে নেমে আসতে শুরু করেছে অন্ধকার। আজিউদ্দিন লাঠিতে ভর দিয়ে আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, 'এবার যেতে হবে। ও হ্যাঁ, আর একটা কথা আপনাকে বলা হয়নি। সম্রাটের সিংহাসন আরোহণের তো পঞ্চাশ বছর হতে চলেছে। সে উপলক্ষে, আমি, আপনি, আর মোল্লা, সম্রাটের রত্ন সভার সদস্যদের কিছু করা দরকার। সম্রাট খুশি হবেন তাতে। এ ব্যাপার নিয়ে একদিন আলোচনায় বসা দরকার। মহামন্ত্রী বেহারীমল্লকেও ডেকে নেব। কবে আলোচনাতে বসা যায় বলুন তো?'
মান সিংহ বললেন, 'হ্যাঁ, এ ব্যাপারটা আমার মনেও এসেছে। অবশ্যই কিছু একটা করা দরকার আমাদের পক্ষ থেকে। সরকারিভাবে যে অনুষ্ঠান হবার তা তো হবেই। তবে আমি কালই আবার দিল্লি যাব দু-দিনের জন্য। আপনি হয়তো জানেন যে আমাদের রাজপুতদের মধ্যে 'খড়গ পূজা'-র প্রচলন আছে। যুদ্ধ দেবতার পূজা। মোষ বলি দেওয়া হয়। অম্বরদুর্গেও খড়গ পূজা হয়। সে উপলক্ষে বিশেষ প্রয়োজনে অম্বর দুর্গ থেকে লোক আসবে আমার কাছে। আমি দিল্লি থেকে ফিরে এলেই আলোচনার জন্য সভা করা যেতে পারে।'
ফকির আজিউদ্দিন বললেন, 'ঠিক আছে তবে তাই হবে। সম্রাট জানেন আপনি দিল্লি যাচ্ছেন?'
সেনাপতি মান জবাব দিলেন, 'হ্যাঁ, জানেন।'
ফকির আজিউদ্দিন এরপর রওনা হলেন দুর্গের অন্যত্র যাবার জন্য।
হ্যাঁ, ভাবনাটা যেন কিছুতেই পিছু ছাড়ছে না সম্রাটের। তাঁর বারবার মনে হচ্ছে ঘটনা দুটো কি কাকতালীয়, নাকি কোনও গূঢ় ইঙ্গিত রয়েছে এদের পিছনে? সেদিন ফকির আজিউদ্দিন বললেন, সিংহাসনে বসার উপযুক্ত ব্যক্তি মান, আর তারপর সেই ব্রাহ্মণও তাঁর সামনেই দরবারে কুর্নিশ জানাল মানকে! তবে কি সবাই ভাবতে শুরু করেছে যে, সেনাপতি মান এ সাম্রাজ্যের ভবিষ্যতের উত্তরাধিকারী? আবার এ কথাও সম্রাটের মনে হচ্ছে, সেনাপতি মান কি তার অবর্তমানে সেলিমের দাবিকে অগ্রাহ্য করে সিংহাসনে বসবেন। তাঁর বহুদিনের সহযোগী সেনাপতি মান। বহু দুর্যোগের সময় মানের তলোয়ার রক্ষা করেছে সম্রাটকে, এ সাম্রাজ্যকে। মানের তলোয়ার কি সেলিমের বিরুদ্ধে উঠবে কোনও দিন? পরস্পর বিরোধী ভাবনা ঘুরপাক খেয়েই চলেছে সম্রাটের মনের মধ্যে। কখনও তার মনে হচ্ছে তার সন্দেহই সত্যি, আবার কখনও তার মনে হচ্ছে, না, হতে পারে না। তার এ আশঙ্কা অমূলক।
নাচ মহলে বসে আছেন আকবর। সুরার পাত্র সামনে রাখা। হাজার ঝাড়বাতির আলোতে মসৃণ শ্বেতপাথরের মেঝেতে সারেঙ্গির সুর আর তবলার বোলের ছন্দে নেচে চলেছে রূপসি নর্তকীর দল। কিন্তু তাকিয়াতে ঠেস দিয়ে বসে থাকা সম্রাট যেন দেখেও দেখছেন না কিছু। শুধু যখন তার অনুচরেরা কোনও নর্তকীর বিভঙ্গ দেখে 'কেয়াবাত! কেয়াবাত!' বলে তারিফ করছেন তখন তাদের সঙ্গে মৃদু মাথা নাড়াচ্ছেন সম্রাট। অথচ এই নৃত্যগীতের অনুষ্ঠান সম্রাটের নির্দেশ মতোই করা হয়েছে। সম্রাট ভেবেছিলেন এই অনুষ্ঠান, সুন্দরী রমণীদের নৃত্যকলা হয়তো তার মনকে ভুলিয়ে রাখবে দুঃশ্চিন্তা থেকে। কিন্তু হল না। সম্রাট কিছুতেই ভুলতে পারছেন না ব্যাপারটা।
নৃত্যগীত শেষ হল একসময়। সম্রাটকে কুর্নিশ জানিয়ে ফিরে গেল নর্তকীরা। ব্যাপারটা যেন ভ্রুক্ষেপই করলেন না সম্রাট। যে সুন্দরী পরিচারিকা দুজন সম্রাটের দু-পাশে চামর দোলাচ্ছিল তাদের ইশারায় থামতে বলে আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন সম্রাট। ঠিক সেই সময় প্রতিহার প্রধান তাঁর সামনে এসে বলল, 'হাওয়াইকে যিনি চিকিৎসা করছেন সেই চিকিৎসক আপনার সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য অনেকক্ষণ ধরে প্রতীক্ষা করছেন। তিনি বলছেন আপনার সঙ্গে জরুরি দরকার আছে।'
সম্রাট আদেশ দিলেন, 'হাজির করো তাকে।'
সম্রাটের সামনে হাজির করানো হল ভিনদেশী সেই পশু চিকিৎসককে। যার তত্ত্বাবধানে হাওয়াই বর্তমানে রয়েছে। চিকিৎসক সম্রাটকে কুর্নিশ করতেই সম্রাট জিজ্ঞাসা করলেন, 'আমার হাওয়াইয়ের অবস্থা কেমন?'
চিকিৎসক জবাব দিলেন, 'পরিস্থিতি ভালো নয়। সে জন্যই অসময়ে বিরক্ত করতে এলাম সম্রাটকে। তার ঘা অতি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। গতকাল থেকে আহার গ্রহণ বন্ধ করে দিয়েছে সে। অমন চলতে থাকলে তার আয়ু আর বড় জোর দিন সাতেক। যদি সেই কালকূট প্রয়োগ করতে হয় তবে এখনই করতে হবে। নইলে পরে আর তার কাজে আসার কোনও সম্ভাবনা নেই।'
সম্রাট জানতে চাইলেন, 'এছাড়া কি আর কোনও পথ খোলা নেই? অর্থের জন্য কোনও চিন্তা করবেন না। হাওয়াইকে বাঁচাবার জন্য আমি দশখানা জায়গির দান করতে পারি।'
সম্রাটের কথা শুনে চিকিৎসক বললেন, 'যদি অন্য কোনও পথ খোলা থাকত তবে আমি তা বলতাম আপনাকে। হাওয়াই-এর মৃত্যু সমাগত। ওই কালকূট প্রয়োগ করেই ওকে বাঁচাবার শেষ চেষ্টা করা যেতে পারে। যদি বিষে-বিষে বিষক্ষয় হয়।'
কয়েকমুহূর্ত স্থির দৃষ্টিতে চিকিৎসকের দিকে চেয়ে রইলেন সম্রাট। তারপর যেন অসহায় ভাবে বললেন, 'তাহলে আপনি শেষ চেষ্টাই করুন।' কথাটা বলে তিনি নাচ-ঘর ত্যাগ করলেন।
সম্রাট এসে প্রবেশ করলেন অন্তঃপুরে। যোধাবাঈ আজ রাতে দাওয়াত দিয়েছেন সম্রাটকে। অন্তঃপুরের এক পাশে মহিষীদের সার সার মহল। বাইরের কোনও পুরুষের এ স্থানে প্রবেশাধিকার নেই। সম্রাটের দেহরক্ষীরা তাই প্রবেশ পথে এসে থেমে গেল। এ সব মহলগুলো পাহারা দেয় হাবসি খোজার দল।
সম্রাট প্রবেশ করলেন যোধা বাইয়ের মহলে। একটার পর একটা চিকের পর্দা অতিক্রম করে সম্রাট উপস্থিত হলেন নির্দিষ্ট স্থানে।
সেখানে তার জন্য অপেক্ষা করছিলেন বেগম যোধা। তিনি শুধু সম্রাটের প্রিয়তম মহিষী নন, সেলিম জননীও বটে। এই রাজপুত দুহিতার যৌবন উত্তীর্ণ হলেও দেহের লাবণ্য এখনও অটুট। সম্রাটকে আপ্যায়ন করে তিনি নিয়ে গেলেন ভোজন কক্ষে। নানা ধরনের খাদ্য সম্ভার থরে থরে সাজানো আছে সেখানে। মাথার ওপর থেকে নেমে আসা ঝাড়বাতির আলোতে উজ্জ্বল ভোজন কক্ষ। সোনা রূপোর ভোজন পাত্রে প্রতিফলিত হচ্ছে সেই আলো। খিদমত খাটার জন্য সেখানে দাঁড়িয়ে আছে সুবেশী বাঁদির দল।
আহার গ্রহণ করার জন্য আসন গ্রহণ করলেন সম্রাট। খাদ্য পরিবেশন করার পর বাঁদিদের ইশারায় দূরে সরে যেতে বললেন বেগম। চিকের পর্দার আড়ালে চলে গেল তারা। সোনার হাতলওয়ালা একটা চামর দিয়ে সম্রাটকে বাতাস করতে লাগলেন যোধা। খুব ধীরে আহার গ্রহণ করতে শুরু করলেন সম্রাট। কিন্তু তাঁর খাওয়া দেখে সম্রাটের দীর্ঘ দিনের সঙ্গী যোধাবাইয়ের মনে হল সম্রাট যেন আহারে ঠিক মনোনিবেশ করতে পারছেন না। মশলাদার আহার, বিশেষত কুক্কুটের মাংস অত্যন্ত প্রিয় সম্রাটের। সেই কুক্কুটের মাংস বা স্বর্ণাভ মদিরার পাত্র ছুঁয়েও দেখলেন না সম্রাট। কোনও রকমে আহার শেষ করে উঠে পড়লেন।
যোধাবাই এরপর সম্রাটকে নিয়ে গেলেন নিজের শয়নকক্ষে নিভৃতে কিছু বাক্যালাপের জন্য। একটা বড় প্রদীপ জ্বলছে। তার স্নিগ্ধ আলো ছড়িয়ে পড়েছে যোধাবাইয়ের শয়নকক্ষে। বাতাসে ভাসছে কস্তুরীর সুবাস। সম্রাটের বয়স তখন চৌষট্টি। যৌবন তার শরীর থেকে বিদায় নিয়েছে অনেকদিন আগেই। স্থূলতা এসেছে শরীরে। স্ফীত মুখমণ্ডলের চামড়াও ঈষৎ ঝুলে পড়েছে। প্রদীপের আলোতে যোধা স্পষ্ট দেখলেন সম্রাটের মুখমণ্ডলে জেগে আছে উদ্বেগের ছাপ! একটু ইতস্তত করে যোধা বললেন, 'মার্জনা করবেন সম্রাট। আপনি কী কোনও কারণে চিন্তিত? শরীর ঠিক আছে তো?'
'হ্যাঁ, ঠিক আছে।'—সংক্ষিপ্ত জবাব দিলেন সম্রাট।
'তবে আপনাকে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত লাগছে কেন? কোথা থেকে কি কোনও বিদ্রোহের খবর এসেছে?'
'না।' উত্তর দিলেন সম্রাট।
'তবে কি সেলিম আবার কোনও অসন্তোষের কারণ ঘটিয়েছে?' আশঙ্কিতভাবে জানতে চাইলেন আকবরের প্রিয়তমা।
মৃদু হেসে সম্রাট এবার জবাব দিলেন, 'না, সে আর এখন অসন্তোষের কারণ হবে কেন? আমি তো তাকে আমার উত্তরাধিকারী মনোনীত করেইছি। কাজেই নিশ্চয়ই আর সে পিতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করবে না। তার সিংহাসন আরোহণ তো শুধুই সময়ের অপেক্ষা।'—এ কথাটা মুখে বললেও সেলিমের সিংহাসনে বসার ব্যাপারেই যে তাঁর বর্তমানে দুশ্চিন্তা শুরু হয়েছে সেটা আর বেগমের কাছে ব্যক্ত করলেন না সম্রাট। সেলিমকে তাঁর উত্তরাধিকারী মনোনয়নের ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন যোধাবাই-ই। বলা ভালো কিঞ্চিৎ চাপও সৃষ্টি করেছিলেন! আর এ ব্যাপারে যোধাবাইকে সঙ্গ দিয়েছিলেন সম্রাটের আরো দুই বেগম—রুকাইয়া সুলতানা ও সেলিনা সুলতানা। এই তিন বেগমের পরামর্শ মতোই জ্যেষ্ঠ পুত্র হুসেইনকে বঞ্চিত করে যোধাপুত্র সেলিমকে উত্তরাধিকারী মনোনীত করেছেন সম্রাট। নিজের দুশ্চিন্তা যোধাবাইয়ের মনে ছড়িয়ে দিতে চাইলেন না সম্রাট।
শাহেনশাহ এরপর বেগমকে প্রশ্ন করলেন, 'আশা করি শাহজাদা সেলিম সিংহাসনে বসার পর এ সাম্রাজ্যের অখণ্ডতা বজায় রাখতে পারবে তাই না?'
যোধাবাই সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিলেন, 'হ্যাঁ, নিশ্চিতভাবেই পারবে। যদিও আবুল ফজল আর সেনাপতি মান সিংহ তার মনোনয়নের ব্যাপারে বিরোধিতা করেছিলেন, তবু বলি সেলিম পারবে। শাহজাদার মধ্যে আর যুবা বয়সের প্রগলভতা নেই। যে প্রগলভতার কারণে আপনার বিরুদ্ধে সে একদিন বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল। আপনাকে আগেও বলেছি এখনও বলছি, সম্রাটের যোগ্য উত্তরাধিকারী শাহজাদা সেলিম।'
বেগমের কথা শুনে সম্রাটের পুরোনো কথাটা মনে পড়ে গেল।
হ্যাঁ, সিংহাসনে সেলিমের মনোনয়নের জন্য আহুত পরামর্শ সভায় সেলিমের পরিবর্তে হুসেইনের নাম প্রস্তাব করেছিলেন মান। তার পিছনে আসল কারণ কী...
যোধা আবার ফিরে গেলেন তার আগের প্রসঙ্গে। তিনি বললেন, 'শুনেছি, সম্রাটের প্রিয় হস্তী হাওয়াইয়ের অবস্থা সংকটজনক। তবে কী সম্রাটের দুশ্চিন্তার কারণ সেটাই?'
এবার মুখ খুললেন সম্রাট। তিনি বললেন, 'সেটা অবশ্যই দুশ্চিন্তার কারণ। কিন্তু মাসাধিক কাল ধরে কোনও কিছুই ভালো লাগছে না আমার। যৌক্তিক অযৌক্তিক নানা চিন্তা আমার মনকে বিচলিত করছে। কেমন যেন বিষণ্ণতা গ্রাস করছে আমাকে। সব কিছু থেকে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছি আমি। অথচ কোথাও এমন কিছু গুরুতর ঘটনাও ঘটেনি যার জন্য আমি বিচলিত। এর থেকে মুক্তির উপায় কী বলো তো?' বেগমের থেকে পরামর্শ চাইলেন সম্রাট।
একটু ভেবে নিয়ে মহিষী বললেন, 'আমার মনে হয় কোনও সুরম্য স্থানে, রাজকার্য থেকে নিজেকে দূরে রেখে সম্রাটের বিশ্রামের প্রয়োজন। দীর্ঘদিন এই আগ্রা কেল্লার বাইরে সম্রাট পা রাখেননি। একঘেয়েমি পেয়ে বেসেছে সম্রাটকে। কিছু দিনের জন্য বাইরে গেলে মন দেহ দুই-ই ঠিক হবে।'
কথাটা মনে ধরল সম্রাটের। তিনি বললেন, 'কোথায় যাওয়া যায় বলো তো। আগ্রা কেল্লা ছেড়ে তো আর খুব বেশি দূরে যাওয়া যাবে না। দিল্লি গেলেও সেই একই সমস্যা। দর্শনার্থীরা সেখানে ভিড় করবে।'
যোধাবাই বললেন, 'আপনি বরং সিক্রিতে চলে যান। জায়গাটা কাছেও আবার নিরিবিলিও বটে। প্রয়োজনে ঝিলের জঙ্গলে শিকার খেলে মনোরঞ্জন করতে পারবেন।'
বেগমের এই বক্তব্যও ভীষণভাবে মনে ধরল সম্রাটের। তিনি বললেন, 'আমি তবে শীঘ্রই রওনা হব সেখানে।'—এ কথা বলার পর আরও কিছুক্ষণ অন্য প্রসঙ্গে কথা বলে সম্রাট যোধাবাইয়ের মহল ত্যাগ করে রওনা হলেন নিজের মহলের দিকে।
তিনি যখন খাস মহলে পৌঁছলেন তখন তার জন্য সেখানে প্রতীক্ষা করছিল একজন লোক। খোজা কমবক্স। সম্রাট তাকে প্রশ্ন করলেন, 'কোনও খবর আছে?'
কমবক্স বললেন, 'না, তেমন কোনও খবর নেই। কিছুদিন আগে শুধু জনাব আজিউদ্দিন, সেনাপতি মানের গৃহে সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলেন। সেনাপতির গৃহের সামনে উন্মুক্ত স্থানে বসে কথা বলছিলেন তারা। কাজেই কাছে গিয়ে তাদের কথা শোনার সুযোগ ছিল না। তার পরদিন সেনাপতি দিল্লি যাত্রা করেছিলেন। আজ দ্বিপ্রহরে কেল্লায় ফিরে এসেছেন।'
সম্রাট তাঁর ব্যক্তিগত গুপ্তচরকে বললেন, 'কিছুদিনের জন্য আমি সিক্রি যাচ্ছি। তুমি নজর রাখবে। সন্দেহজনক কিছু দেখলে বা শুনলে আমাকে সেখানে গিয়ে খবর দেবে। সতর্কতার সঙ্গে কাজ করবে। কেউ যেন তোমার প্রতি সন্দেহ প্রকাশ না করে।'
সম্রাটের নির্দেশ নিয়ে তাকে সেলাম জানিয়ে চলে গেল কমবক্স।
পরদিন সকালে সম্রাট ডেকে পাঠালেন মন্ত্রী বেহারীমল্লকে। তিনি তাকে বললেন, 'আজ দ্বিপ্রহরে আমি সিক্রির উদ্দেশে রওনা হব। আপনি তার ব্যবস্থা করুন।'
মন্ত্রী মৃদু বিস্মিতভাবে বললেন, 'আজই যাবেন! ঠিক আছে আমি তবে তার আয়োজন করছি।'
সম্রাট বললেন, 'বিশেষ আয়োজনের দরকার নেই। একটা হাতি, আমার দেহরক্ষীরা আর সামান্য কয়েকজন ভৃত্যই শুধু আমার সঙ্গে যাবে। বাদ্যকার বা অন্য কোনও সমারোহের প্রয়োজন নেই। আর জরুরি প্রয়োজন ছাড়া সিক্রিতে গিয়ে কেউ যেন আমাকে বিরক্ত না করে। ক'টা দিন সেখানে বিশ্রাম নেব আমি। দর্শনার্থীদের সিক্রিতে প্রবেশ নিষিদ্ধ।'
মহামন্ত্রী নিয়ম মাফিক জানতে চাইলেন, 'আপনার অবর্তমানে আগ্রাদুর্গের দায়িত্বভার কার ওপর ন্যস্ত থাকবে? সেনাপতি মান কাল দুর্গে ফিরে এসেছেন।'
সাধারণত সম্রাট দুর্গ ত্যাগ করলে তার অবর্তমানে দায়িত্ব সামলান মন্ত্রী সভার প্রবীণতম সদস্য বেহারীমল্ল আর সেনাপতি মান সিংহ। সম্রাট এবারও তাদের কাঁধেই দুর্গের দায়িত্বভার অর্পণ করবেন বলে ভেবেছিলেন মহামন্ত্রী। কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে সম্রাট বললেন, 'আমার অবর্তমানে দুর্গের দায়িত্ব থাকবেন বেগম যোধাবাই। আমি তাকে খবরটা জানিয়ে দিচ্ছি। প্রয়োজনবোধে তার নির্দেশ মতো কাজ করবেন।'
মন্ত্রী বেহারীমল্ল এরপর সম্রাটের নির্দেশ মতো চলে গেলেন সম্রাটের সিক্রি যাত্রার ব্যবস্থা করতে।
একটু বেলার দিকে সম্রাটের কাছে খবর এল কালকূট প্রয়োগ করা হয়েছে হাওয়াইকে। গত রাতেই কাজ হয়েছে। এবং হাওয়াইয়ের একটু সুস্থতার লক্ষণও নাকি দেখা দিয়েছে। কথাটা উৎফুল্ল করল সম্রাটকে। হয়তো সুস্থ হয়ে উঠবে হাওয়াই। দ্বিপ্রহরে প্রাসাদ ত্যাগ করেন সম্রাট। তাঁকে প্রধান তোরণ পর্যন্ত পদব্রজে এগিয়ে দিলেন মন্ত্রী বেহারীমল্ল। সেনাপতি মান সহ আমাত্যরা। হস্তীতে আরোহণ করার আগে সম্রাট আকবর সেনাপতি মানকে বললেন, 'প্রয়োজন হলে সিক্রিতে আপনাকে ডেকে পাঠাব।'
সমবেত আমাত্যদের অভিবাদন গ্রহণ করে, হস্তীপৃষ্ঠে আরোহণ করে অশ্বারোহী আর কিছু ভৃত্যকে সঙ্গে নিয়ে এরপর আগ্রার কেল্লা ছেড়ে সিক্রির পথে রওনা হয়ে গেলেন ভারত সম্রাট।
বেশ কয়েকদিন হয়ে গেল আগ্রা কেল্লা ত্যাগ করে সিক্রিতে অবস্থান করছেন সম্রাট। সেদিন সন্ধ্যার পর মান সিংহের কেল্লাস্থিত বাটিতে সমবেত হয়েছেন সবাই। অর্থাৎ মন্ত্রী বেহারীমল্ল, ফকির আজিউদ্দিন ও মোল্লা দোপেঁয়াজা। না, তারা কোনও ষড়যন্ত্র রচনার জন্য সমবেত হননি। সমবেত হয়েছেন, সম্রাটের সিংহাসন আরোহণের পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষে বিশেষ ভাবে সম্রাটকে শ্রদ্ধা প্রদর্শনের বিষয়ে আলোচনা করতে।
কক্ষটি রাস্তা সংলগ্ন। কক্ষের ঠিক মাঝখানে পিতলের প্রদীপদানে তেলের প্রদীপ জ্বলছে। তাকে ঘিরে চারটি আসনে বসেছেন সেনাপতি মান সিংহ সহ তাঁর তিন অতিথি। বেশ কিছুক্ষণ আগেই বাইরে অন্ধকার নেমেছে। আর অন্ধকার নামার সঙ্গে সঙ্গেই নিস্তব্ধতা নেমে আসে কেল্লাতে। এদিনও তার ব্যতিক্রম হয়নি। শুধু মাত্র দুর্গ প্রাকারের গায়ে সৈনিকদের চলাচলের অস্পষ্ট শব্দ ছাড়া কোথাও কোনও শব্দ নেই। সে শব্দ অবশ্য আলোচনা কক্ষে প্রবেশ করছে না।
প্রধানমন্ত্রী বললেন, 'সরকারিভাবে সম্রাটের সিংহাসন আরোহণের অর্ধশতক উপলক্ষে বেশ কিছু পরিকল্পনা ভেবে রেখেছি আমি। সাতদিনব্যাপী উৎসব হবে। নৃত্যগীত খানাপিনার আয়োজন হবে। সম্রাটের অধীনস্থ সব রাজা-মহারাজা-সুলতান-অমিরদের আমন্ত্রণ করা হবে দিল্লিতে সেই উৎসবে যোগদান করার জন্য। খ্যাতিমান মোগল যোদ্ধাদের সম্মানিত করা হবে। সেরা নর্তকী আর বাজিকররা মনোরঞ্জন করবে অতিথিদের। এমনকী দরিদ্র মানুষদের জন্যও এই সাতদিন লঙরখানাতে শাহি দাওয়াতের ব্যবস্থা থাকবে।
একটা বিশাল তোরণ নির্মাণ করা হবে দিল্লি বা আগ্রাতে। মিনারও নির্মাণ করা যেতে পারে, যা ভবিষ্যতে মানুষকে স্মরণ করাবে সম্রাটের কীর্তিকে। সম্রাট সিক্রি থেকে ফিরলেই এ প্রস্তাবগুলো আমি তাঁর কাছে পেশ করব অনুমোদনের জন্য। আর সম্রাটের নিজের যা ইচ্ছা থাকবে তা তো তাঁর নির্দেশ মতো পালন করা হবে। এই যেমন সম্রাট একদিন বলছিলেন, কারাগারে যে সব বন্দি দীর্ঘ দিন ধরে বন্দি আছে তাদের মধ্যে কিছু বন্দিকে তিনি কোনও উৎসব উপলক্ষে মুক্তি দিতে চান, কিছু ধর্মস্থানেও নাকি অর্থ সাহায্য করার বাসনা আছে সম্রাটের। এই উৎসবকে হয়তো তিনি সে সব ব্যাপারে কাজে লাগাবেন।'
মোল্লা বললেন, 'সত্যি সম্রাটের জীবন কাহিনি যখন ভাবি তখন বড় বিস্ময় বোধ হয়। আকবর শাহের যখন জন্ম হয় তখন রাজ্যভ্রষ্ট হুমায়ুন অমরকোটের পার্বত্য প্রদেশে আশ্রয় নিয়েছিলেন। কনৌজের যুদ্ধে পরাজিত হুমায়ুনকে আশ্রয় দিতে চায়নি ভারতের কোনও রাজাই। তবু মাঝে মাঝেই লড়াই করে ভাগ্য ফেরাবার চেষ্টা করছিলেন হুমায়ুন। কখনও তিনি গান্ধার জয় করেছেন, আবার কখনও তিনি পালিয়ে গিয়ে আত্মগোপন করেছেন নিষ্প্রাণ মরুভূমিতে বা পূর্বপুরুষের বাসস্থান তাতারে। পেটে খাওয়া নেই, আর এর মধ্যেই আকবরের বেড়ে ওঠা। দিল্লিতে তখন পাঠান শাসন। ঘনঘন সুলতান বদল হচ্ছে। সম্রাটের যখন মাত্র ছ'বছর বয়স তখন থেকেই নিজ হাতে পুত্রকে অস্ত্র শিক্ষা দিতেন হুমায়ুন। অলৌকিক কাহিনির মতো মাত্র বারো বছর বয়সেই সকল প্রকার অস্ত্র চালনাতে পারদর্শী হয়ে ওঠেন বালক আকবর। অবশেষে সুযোগ এল শেষ একটা চেষ্টা করে ভাগ্য ফেরাবার।
সেকেন্দর শাহর গৃহ বিবাদের সুযোগ নিয়ে সরহিন্দে দিল্লির শাসকের সেনা দলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল হুমায়ুনের সেনারা। আর এ যুদ্ধে নেতৃত্ব দিলেন বালক আকবর। তার তালোয়ারের সামনে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল দিল্লির সেনারা। বীরপুত্রের সাহায্যে দিল্লির সিংহাসন ফিরে পেলেন বাদশা হুমায়ুন। কিন্তু সিংহাসন লাভ বেশি দিন সইল না হুমায়ুনের কপালে। পাঠাগারের সিঁড়ি থেকে গড়িয়ে পড়ে মৃত্যু হল তাঁর। চোদ্দো বছর বয়েসে সম্রাট হলেন আকবর। তিনি সিংহাসনে বসার পর কিছুদিনের জন্য অবশ্য এই আগ্রা হাতছাড়া হয়েছিল তাঁর। কিন্তু বৈরাম খাঁর সাহায্যে আগ্রা পুনর্দখল করেন তিনি।
তারপর তিনি চিতোর অভিযান করেন। জয় করেন চিতোর। সেই শুরু। তারপর আর কোনও দিন পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি সম্রাটকে। সঙ্গী হিসাবে পেলেন মান সিংহকে। গড়ে তুললেন আসমুদ্র হিমাচলব্যাপী বিশাল এই সাম্রাজ্য।'—দীর্ঘক্ষণ একটানা কথা বলে নস্যদান থেকে নস্য নিলেন মোল্লা দোপেঁয়াজা।'
বেহারীমল্ল বললেন, 'সম্রাটকে এমন একটা উপহার দিতে হবে তা যেন ভবিষ্যতেও অক্ষয় হয়ে থাকে। সম্রাটের উপযুক্ত কোনও উপহার?'
আজিউদ্দিন বললেন, 'সেটা কী বলুন না?'
বেহরীমল্ল তাঁর পাগড়িটা ঠিক করতে করতে বললেন, 'সেটাই মাথায় আসছে না। আজ যদি বীরবল বেঁচে থাকতেন তবে চট করে কোনও উপায় বাতলে দিতেন।'
ফকির আজিউদ্দিন বললেন, 'উৎসবের দিনগুলোতে বীরবল, ফৈজী, আবুল ফজলের কথা বড় বেশি মনে পড়ে আমাদের। যদি নবরত্ন সভার সবাই জীবিত থাকতেন তবে সবচেয়ে বেশি খুশি হতেন সম্রাট।'
তাঁর কথা শুনে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন মোল্লা দোপেঁয়াজা। তিনি বললেন, 'সুহৃদ আবুল ফজলের হত্যাটা আমি আজও মেনে নিতে পারি না। যুবরাজ সেলিমই কৌশলে হত্যা করলেন তাঁকে। আমি জেনেছি আবুলকে হত্যার করার পর বুন্দেল রাজ তার কাটা মাথাটা পাঠিয়েছিল সেলিমের তাঁবুতে। সেটা শত্রুকে ভয় দেখাবার জন্য নয়, আসলে সেটা ছিল আবুলকে হত্যা করার প্রমাণ আর সেলিমের প্রতি বুন্দেল রাজের উপঢৌকন। আমি যদি তখন সেখানে উপস্থিত থাকতাম আর আমার হাতে একটা জুলফিকার থাকত..।'
প্রসঙ্গটা অন্য দিকে ঘুরে যাচ্ছে দেখে বেহারীমল্ল, দোপেঁয়াজাকে মাঝ পথে থামিয়ে দিয়ে বললেন, 'এ সব আলোচনা এখন থাক। আমরা বরং এখন উপহারের ব্যাপারটা নিয়ে ভাবি।'
মোল্লা জুলফিকারের কথাটা বলাতে হঠাৎই একটা ভাবনা খেলে গেল সেনাপতি মান সিংহের মাথায়। জুলফিকার হল এক বিশেষ ধরনের তলোয়ার। যার দু-পাশেই ধার থাকে। ডাইনে-বাঁয়ে চালিয়ে ছিন্নভিন্ন করে দেওয়া যায় শত্রুকে। সম্রাটের প্রিয় অস্ত্র জুলফিকার। মান সিংহ বললেন, 'উপহার হিসাবে সম্রাটকে এক ধরনের জুলফিকার দেওয়া যেতে পারে যাতে ধরা থাকবে সম্রাটের এই পঞ্চাশ বছরের রাজত্বকালের গৌরবজ্জ্বল ইতিহাস। সে উপহার মোগল সম্রাটের উত্তরাধিকারীদের কাছেও অক্ষয় হয়ে থাকবে। ঠিক যেমন চিতোর দুর্গে বংশ পরম্পরায় একটা খড়গ রক্ষিত হয়, ঠিক তেমনই।'
'ব্যাপারটা কী।' জানতে চাইলেন মোল্লা।
সেনাপতি মান বললেন, 'জুলফিকারের হাতলটা পান্নারাগ মণিখচিত থাকবে। তবে সেটাই তার বিশেষত্ব নয়। আসল বিশেষত্ব তার ফলাতে। জুলফিকারের সূচীমুখ ফলার মাথা থেকে হাতল পর্যন্ত ফলার গায়ে সূক্ষ্ম সোনার পাত দিয়ে লেখা থাকবে সম্রাটের শিরহিন্দে প্রথম যুদ্ধ জয়ের তারিখ থেকে আজ পর্যন্ত যে সব বড় বড় যুদ্ধ জয় করেছেন তার তারিখ। ওই তলোয়ার হবে সম্রাটের বীরত্বের, জয়গাথার স্মারক। সম্রাটের জীবন সংগ্রাম খোদিত থাকবে এই তলোয়ারে।'
কথাটা শুনেই বেহারীমল্ল উৎফুল্লভাবে বললেন, 'অভিনব ব্যাপার। একজন বীর যোদ্ধার কাছে এর চেয়ে উত্তম স্মারক আর কী হতে পারে!'
ফকির আজিউদ্দিনও বলে উঠলেন, 'কেয়া বাত! কেয়া বাত!'
মোল্লা বললেন, 'উৎসব শুরুর দিন সেনাদের অভিবাদনের ব্যবস্থা নিশ্চয়ই থাকবে। তারপর আমরা সম্মিলিতভাবে ওই জুলফিকার তুলে দেব সম্রাটের হাতে। কেমন হবে ব্যাপারটা?'
বেহারীমল্ল বললেন, 'চমৎকার। এক অবিস্মরণীয় ঘটনার মধ্যে দিয়ে উৎসবের সূচনা হবে। সেনাপতি তবে আপনি পরিকল্পনা অনুসারে সেনাদলের সঙ্গে কথা বলুন আর তলোয়ার তৈরির দায়িত্ব নিন।'
সেনাপতি মান বললেন, 'হ্যাঁ, তলোয়ার তৈরির দায়িত্ব আমি নেব আর সেনাদলের আধিকারিকদের সঙ্গে কথাও বলব।'
মোল্লা বললেন, 'হ্যাঁ, আপনার হাতেই আমরা এ দায়িত্ব অর্পণ করলাম।'
মোল্লা হয়তো আরও কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন, হঠাৎ ফকির আজিউদ্দিন গবাক্ষের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'কে! কে ওখানে?'
কক্ষের এক দিকে দেওয়ালের গায়ে পাথরের জাফরি বসানো অলিন্দ আছে। তার ওপাশে রাস্তা। ফকিরের কথা শুনে সবাই চাইলেন সেদিকে। ফকির বললেন, 'মনে হয় ওখানে একটা ছায়া দেখলাম! মনে হল কেউ যেন ওখানে দাঁড়িয়ে আছে!'
যদিও সেই মুহূর্তে জাফরির ওপাশে কাউকে দেখা যাচ্ছে না তবুও কথাটা শুনে মান সিংহ সঙ্গে সঙ্গে লাফিয়ে উঠে তলোয়ার নিয়ে কক্ষ ত্যাগ করে গৃহের বাইরে বেরিয়ে এলেন। আকাশে ক্ষীণ চাঁদ উঠেছে। গবাক্ষের বাইরে আধো-অন্ধকার পথ। তার দু-পাশে ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়িয়ে আছে স্তম্ভ, অলিন্দ সম্মিলিত পাথুরে স্থাপত্য। বেশ কিছুক্ষণ ধরে নিজ বাটিকার সেই গবাক্ষ সংলগ্ন পথটা ভালো করে দেখে কোনও লোককে দেখতে না পেয়ে আবার কক্ষে ফিরে এলেন সেনাপতি। তিনি বললেন, 'না, কাউকে দেখতে পেলাম না।'
তার কথায় ফকির আজিউদ্দিন একটু ভেবে বললেন, 'হয়তো আমার চোখের ভুল হবে। বয়স হচ্ছে, দৃষ্টি শক্তিতেও ব্যাঘাত ঘটছে। আমাকে আপনারা মার্জনা করবেন।'
মূল আলোচনা সমাপ্ত। সেনাপতি তার অতিথিদের জন্য নৈশভোজের ব্যবস্থা করেছেন। তাদের নিয়ে এরপর ভোজন কক্ষে উপস্থিত হলেন সেনাপতি মান। খেতে খেতে টুকটাক নানা কথাবার্তা শুরু হল। বেহারীমল্ল কি একটা কথা প্রসঙ্গে বললেন, 'কিছুদিন ধরে সম্রাটের মধ্যে কেমন যেন একটা বিমর্ষ ভাব লক্ষ করছি।'
মোল্লা দোপেঁয়াজা বললেন, 'ব্যাপারটা আমারও নজর এড়ায়নি। সব সময় কী যেন ভেবে চলেছেন সম্রাট। অথচ রাজ্যের পরিস্থিতি তো স্বাভাবিকই আছে। সব জায়গাতে শান্তি শৃঙ্খলা বিরাজমান। এক, সম্রাটের অন্তঃপুরে বেগমদের মধ্যে যদি কিছু ঘটে থাকে সেটা অবশ্য আমাদের জানার কথা নয়।'
মন্ত্রী বেহারীমল্ল বললেন, 'আমার কেন জানি মনে হয় সম্রাট তাঁর সাম্রাজ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবিত! কিছু দিন আগে আমি সম্রাটের কাছে একটা দলিল স্বাক্ষর করাতে গিয়েছিলাম। পূর্ব ভারতে আমাদের প্রতিবেশী ছোট ছোট পাহাড়ি রাজাদের সঙ্গে শান্তি বজায় রাখা সংক্রান্ত একটা দলিল যা ওই অঞ্চলে সাম্রাজ্যের নিরাপত্তা বজায় রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দলিলে স্বাক্ষর করার পর সম্রাট আমাকে বললেন, 'এই যেমন আপনারা আমার সাম্রাজ্যকে নানাভাবে আগলে রেখেছেন, তেমনই আমার অবর্তমানেও আগলে রাখবেন তো?'
মন্ত্রীর কথা শুনে ফকির আজিউদ্দিন যেন মৃদু চমকে উঠে বললেন, 'আপনি এ প্রশ্নের কী জবাব দিলেন?'
বেহারীমল্ল বললেন, 'আমি মুখে সম্রাটকে বললাম আপনি একশো বছর বাঁচবেন। আর যতদিন জীবিত থাকব আমি এভাবেই সাম্রাজ্যের সেবা করে যাব।' আর মনে মনে বললাম, 'আপনার পর যিনি সিংহাসনে বসতে চলেছেন, তিনি আমাদের পরামর্শ নিতে আগ্রহী হবেন কি?
তিনি তো আমাদের কাউকেই পছন্দ করেন না।'
দোপেঁয়াজা বললেন, 'ঠিক তাই। হয়তো বা উল্টে আমাদের ওপর তার আক্রোশের আগুন নেমে আসবে। কারণ, সে যখন পিতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল তখন আমরা তার পিতার পাশে ছিলাম বলে। যার জন্য চরম মূল্য চোকাতে হল আবুল ফজলকে।'
প্রধানমন্ত্রী বেহারীমল্ল বললেন, 'আমি অবশ্য এ ব্যাপারের চেয়ে বেশি ভাবিত সাম্রাজ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে। যদি যোগ্য কেউ সিংহাসনে বসতেন...।'—এই বলে তিনি চোখের ইশারায় মান সিংহকে দেখালেন।
মান ব্যাপারটা বুঝতে পেরে বললেন, 'দোহাই আপনাদের। বার বার এ কথা বলে আমাকে বিব্রত করবেন না। সম্রাটের সেবক আমি। তার আজ্ঞাবাহী ভৃত্যও বলতে পারেন। সিংহাসনে বসার স্বপ্ন আমার কোনও কালেই ছিল না। মোগল সিংহাসন সম্রাটের আত্মজের জন্য নির্ধারিত ছিল এবং থাকবে। কোনও অলীক ভাবনা ভেবে লাভ নেই।'
বেহারীমল্ল একটু চুপ করে থেকে বললেন, 'হ্যাঁ, ব্যাপারটা হয়তো এখন অলীক আমাদের কাছে, তবে কী জানেন, ভাগ্যদেবী কখন অকস্মাৎ কার প্রতি সদয় হন তা কেউ বলতে পারে না। কেউ কি ভেবেছিল সরহিন্দের যুদ্ধে বালক আকবর জয়ী হবেন? হুমায়ুন আবার রাজ্য ফিরে পাবেন? গড়ে উঠবে এতবড় মোগল সাম্রাজ্য?'
সেনাপতি মান এ কথার কোনও জবাব দিলেন না। কিন্তু ফকির আজিউদ্দিন বললেন, থাক এসব কথা আর আলোচনা করা উচিত নয়। দেওয়ালেরও কান থাকতে পারে। আমার কেন জানি শুধু মনে হচ্ছে আমাদের প্রতি সম্রাটের মনে কোথাও একটা অবিশ্বাসের বাতাবরণ তৈরি হয়েছে!'
মন্ত্রী বেহারীমল্ল বললেন, 'কেন?'
একটু চুপ করে থেকে ফকির বললেন, 'সম্রাট এত দিনের প্রথা ভেঙে আপনাকে আর সেনাপতি মান সিংহকে তার অবর্তমানে আগ্রা কেল্লার দায়িত্ব না দিয়ে সে দায়িত্ব যোধাবাইকে দিলেন কেন?'
নিশ্চুপ হয়ে গেল ভোজনকক্ষ। কিছুক্ষণের মধ্যেই আহার পর্ব সাঙ্গ হল। সেনাপতি মানের থেকে বিদায় নিয়ে নিজেদের ঘরে ফেরার জন্য পা বাড়ালেন তারা।
সিক্রি। ফতেপুর সিক্রি। প্রাকারবেষ্টিত লাল বেলেপাথরের চক, প্রাসাদ-মিনার শোভিত এক শান্ত সুরম্য নগরী। এ নগরীর তোরণ, শ্বেতপাথরের জাফরি বসানো অলিন্দশোভিত প্রাসাদ। ত্রিভুজাকৃতির চকগুলো সম্রাটের শিল্প ভাবনার পরিচয় দেয়। পারসিক ও ভারতীয় শিল্পরীতির সমন্বয়ে এ নগরী নির্মিত হয়েছে সম্রাট আকবরের নির্দেশ মতো। এক সময় সম্রাট কিছু দিনের জন্য এ নগরীকে রাজধানীও ঘোষণা করেছিলেন। পরবর্তীকালে অবশ্য নিরাপত্তাজনিত কারণে রাজধানী অন্যত্র সরিয়ে নেন সম্রাট। তবে সম্রাট এ স্থানে নগরী স্থাপন করলেও এ স্থানেরও প্রাচীন ইতিহাস আছে।
হাজার বছর আগে এখানে জৈনদের বাসস্থান ছিল। এখানে এক ঝিল আছে যার নাম শুকরি। নির্জন শুকরি ঝিলের পাড়ে নির্জনে তপস্যা করতেন জৈন সন্ন্যাসীরা। কালের নিয়মে এক সময় হারিয়ে যায় তা। সম্রাটের পিতামহ বাবর যখন এখানে প্রথম পা রাখেন তখন শুকরি ঝিলের এক অংশে ছিল ঘন জঙ্গল আর অন্য দিকে ছিল একটা ছোট্ট গ্রাম তার নাম 'সিক্রি'। বিশ্রাম নেবার জন্য আর শিকার খেলার জন্য এই নির্জন জায়গা বেশ পছন্দ হয়ে যায় প্রথম মোগল সম্রাটের।
তিনিই প্রথম এখানে একটি ছোট প্রাসাদ নির্মাণ করেন তাঁর অবসর যাপনের জন্য। এই সিক্রি সীমান্তেই বাবর পরাজিত করেছিলেন মহারানা সংগ্রাম সিংহকে।
পরিবারিক ভাবেই এ জায়গা বড় প্রিয় সম্রাট আকবরের কাছে। যৌবনে বহুবার তিনি এসেছেন শুকরি ঝিলে হাঁস আর জঙ্গলে হরিণ শিকার করতে। সম্রাট গুজরাট জয়ের পর সেই জয়কে স্মরণীয় করে রাখতে এ জায়গায় নতুন নাম করেন 'ফতেহপুর'—বিজয় নগরী। লোক মুখে যা ফতেপুর সিক্রি নামে পরিচিত। এ ছাড়া এ নগরী আরও এক বিশেষ কারণে সম্রাটের প্রিয়। এ নগরীতেই তার রাজপুত রানির গর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হয় শাহজাদা সেলিম।—সম্রাটের উত্তরাধিকারী।
অনুচ্চ ঝুল-বারান্দা বিশিষ্ট এক ছোট প্রাসাদ সংলগ্ন চকে পদচারণা করছিলেন সম্রাট। এই প্রাকারবেষ্টিত জায়গাটা বড় প্রিয় সম্রাটের। নগরীর কোলাহল এ স্থানে প্রবেশ করে না। শেষ বিকালের আলো ছড়িয়ে পড়েছে লাল পাথরের তৈরি ছোট প্রাসাদ আর চকের ওপর। ঠান্ডা বাতাস বয়ে আসছে শুকরি ঝিলের দিক থেকে। এক সপ্তাহ হয়ে গেল সিক্রিতে অবস্থান করছেন সম্রাট। স্থান মাহাত্ম্যের কারণেই হয়তো বা এ ক'দিনে সম্রাটের মন অনেকটাই শান্ত হয়ে এসেছে। আশঙ্কার মেঘও যেন অনেকটা কেটে গেছে। তার মন আবার বলতে শুরু করেছে সেনাপতি মান কোনও দিন তাঁর অবর্তমানেও তাঁর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারবে না। যে লোক সব কিছু ত্যাগ করে, সব বিপদকে তুচ্ছ করে তাকে সঙ্গ দিয়েছেন যৌবন থেকে প্রৌঢ় বয়স কাল পর্যন্ত, আজ জীবন সায়াহ্নে পৌঁছে তিনি কেনই বা বিশ্বাসঘাতকতা করবেন তাঁর সঙ্গে?
নিস্তব্ধ চক। মাঝে মাঝে শুধু দু-একটা কবুতরের ডানা ঝাপটানোর শব্দ ভেসে আসছে। বেলা শেষের আলো মেখে নির্জন চকে পদচারণা করতে করতে সম্রাট ভাবছিলেন তার ফেলে আসা দিনের কথা। এই প্রাসাদ, এই ঝুল-বারান্দা, এই চকের সঙ্গে বহু সুখস্মৃতি জড়িয়ে আছে সম্রাটের। পারসিক গালিচা বিছানো হত এই ঝুল-বারান্দার নীচে। বিভিন্ন ধর্মের পণ্ডিতদের তিনি এখানে আমন্ত্রণ জানাতেন তাদের ধর্ম কথা শোনার জন্য। আর সম্রাটের আসন নির্দিষ্ট ছিল মাটি থেকে হাত দশেক ওপরে ওই ঝুল-বারান্দাতে। ওখানে বসেই পণ্ডিতদের ধর্ম কথা শুনতেন সম্রাট। যার ওপর ভিত্তি করে সম্রাট পরবর্তীকালে রচনা করেছিলেন 'দীন-ই-ইলাহী' নামের ধর্ম ভাবনা।
শুধু কি তাই! অনেক সময় তিনি তাঁর সভাসদদের নিয়েও অবসর যাপনের জন্য চলে আসতেন এখানে। সান্ধ্য মজলিশ বসত এখানে। চাঁদের আলোতে তানসেনের সঙ্গীত মূর্ছনা ছড়িয়ে পড়ত চারপাশে। আবার কখনও কবি ফৈজীর উদাত্ত কণ্ঠে পাঠ করা শায়েরী অনুরণিত হত এই লাল পাথরের চকে। ব্যাপারটা কাকতালীয় কিনা তা সম্রাটের জানা নেই, কিন্তু এ গ্রীষ্মের দাবদাহে এই চকেই রাগিনী গেয়ে বৃষ্টি নামিয়েছিলেন তানসেন! ব্যাপারটা অনেকে অতিরঞ্জিত মনে করলেও সম্রাট নিজে সে ঘটনার সাক্ষী ছিলেন। কত স্মৃতি! কত স্মৃতি তাঁর জড়িয়ে আছে এ জায়গাতে!
সূর্য অস্ত গেল এক সময়। সিক্রি প্রাসাদের তোরণের মাথা থেকে ভেসে আসতে শুরু করল সানাইয়ের অনুচ্চ মধুর শব্দ। বৈকালিক ভ্রমণ শেষ করে এবার প্রাসাদের প্রবেশ করতে উদ্যত হলেন সম্রাট। কিন্তু অশ্বখুরের শব্দে ফিরে তাকালেন তিনি। চকের ভিতর প্রবেশ করে ঘোড়া থেকে নেমে দাঁড়িয়ে সম্রাটের উদ্দেশে মাথা ঝুঁকিয়ে কুর্নিশ করল লোকটা। তাকে চিনতে পারলেন সম্রাট। লোকটা বার্তাবাহক। আগ্রা কেল্লা থেকে আসছে। সম্রাট ইশারায় তাকে কাছে ডাকলেন। বার্তাবাহক চকের মাঝখানে সম্রাটের কাছে এসে মাথা নত করে দাঁড়াল।
সম্রাট প্রশ্ন করলেন, 'কী সংবাদ?'
লোকটা বলল, 'আমাকে মার্জনা করবেন সম্রাট। আমি এক দুঃসংবাদ বহন করে এনেছি।'
কথাটা শোনার সঙ্গে-সঙ্গেই সম্রাটের অজান্তেই যেন তাঁর মুখ থেকে বেরিয়ে গেল 'শাহজাদা সেলিমের ব্যাপারে কোনও দুঃসংবাদ আসেনি তো কেল্লায়?'
বার্তাবাহক বলল, 'না, শাহজাদা সহি সলাহমতই আছেন।'
'তবে কী?' ব্যাগ্রভাবে জানতে চাইলেন সম্রাট।
মৃদু কণ্ঠে বার্তাবহক বলল, 'আজ মধ্যাহ্নে হাওয়াইয়ের মৃত্যু হয়েছে। বিষ প্রয়োগের পর ধীরে ধীরে সে সুস্থ হয়ে উঠছিল। কিন্তু আজ হঠাৎই তার হৃৎপিণ্ডের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। চিকিৎসকের ধারণা বিষক্রিয়ায় নয়, বয়সজনিত কারণেই এই মৃত্যু।'
সংবাদটা কানে যেতেই পাথরের মূর্তি বনে গেলেন সম্রাট। সত্যিই হাওয়াই আর নেই! এই তো সেদিনও তিনি হাওয়াইয়ের পিঠে সওয়ার হয়ে শত্রুব্যূহকে ছিন্নভিন্ন করেছেন! এই তো এখনও তার কানে বাজছে হাওয়াইয়ের উন্মত্ত রণহুঙ্কার। সে হুঙ্কার শুনে দিকবিদিক জ্ঞান শূন্য হয়ে ছুটে পালাত শত্রু সেনারা! এই তো তিনি হাওয়াইয়ের পিঠে চেপে বিজয়ী হয়ে বিশাল তোরণ অতিক্রম করে প্রবেশ করছেন চিতোর কেল্লায়! সম্রাট চলেছেন দিল্লি নগরী পরিদর্শনে হাওয়াইয়ের পিঠে চেপে। পথের দু-পাশে সারবদ্ধ নারীরা পুষ্পবৃষ্টি করছে। আর সম্রাটের হয়ে সমবেত জনতাকে শুঁড় তুলে প্রণাম জানাচ্ছে হাওয়াই। সম্রাট চোখের পাতা মুছলেন। সঙ্গে সঙ্গে তাঁর চোখের কোল বেয়ে অশ্রুবিন্দু গড়িয়ে পড়তে লাগল। কাঁদছেন আসমুদ্র হিমাচলের অধিপতি ভারতসম্রাট আকবর!
'সম্রাট কি আমাকে কোনও আজ্ঞা দেবেন?' বেশ অনেকক্ষণ পর বার্তাবাহকের গলার শব্দে আবার চোখ মেললেন সম্রাট। চারপাশে অন্ধকার নেমেছে। জরি বসানো আলখাল্লার হাতা দিয়ে চোখ মুছলেন সম্রাট। তারপর তিনি তার কর্তব্য নিয়ে কিছুটা সময় চিন্তা করলেন। প্রথমে তিনি ভাবলেন, তিনি তখনই রওনা হয়ে যাবেন আগ্রা কেল্লার উদ্দেশে তাঁর প্রিয় সঙ্গীকে শেষ দেখা দেখার জন্য। নিজে উপস্থিত থেকে রাজকীয় মর্যাদাতে তার শেষ কৃত্য সমাপনের জন্য। কিন্তু তারপরই সম্রাটের মনে হল, না, তিনি দর্শন করবেন না তার মৃত সঙ্গীকে। মৃত হাওয়াই নয়, তার মনে চিরদিন জেগে থাকুক জীবিত হাওয়াই। সম্রাট তাকে দর্শন করতে গেলে হয়তো হাওয়াইয়ের মৃতদেহটা সারা জীবন ছাপ রেখে যাবে সম্রাটের মনে। হাওয়াইয়ের কথা ভাবলেই কোনও সুখস্মৃতি নয়, তার মৃতদেহটাই মনে পড়বে সম্রাটের।
সম্রাট শেষ পর্যন্ত বার্তাবাহককে বললেন, 'কেল্লা সংলগ্ন যমুনার তটে আগামী সূর্যাস্তের পূর্বেই হাওয়াইয়ের কবরের ব্যবস্থা করতে হবে পূর্ণ সরকারি মর্যাদাতে। এক হাজার রক্ষী সামিল হবে হাওয়াইয়ের শেষ যাত্রাতে। আর এই সব যাত্রার নেতৃত্বে থাকবেন মহামন্ত্রী বেহারীমল্ল ও প্রধান সেনাপতি রাজা মান সিংহ। কেল্লাতে আগামী তিন দিন কোনও ধরনের আনন্দ উৎসব নিষিদ্ধ। আর ধর্মস্থানগুলোয় যেন হাওয়াইয়ের জন্য প্রার্থনা সভার আয়োজন করা হয়। আমি কেল্লায় ফেরার পর হাওয়াইয়ের সমাধিস্থলে তার শ্বেতপাথরের পূর্ণাবয়ব মূর্তি নির্মাণ করব। তুমি কেল্লায় ফিরে গিয়ে আমার এই নির্দেশাবলী মন্ত্রী বেহারীমল্ল ও সেনাপতি মানকে জানাও। রাজকীয় মর্যাদায় যেন সম্পন্ন হয় হাওয়াইয়ের অন্ত্যেষ্টি।'—কথাগুলো বলে মাথা থেকে পাগড়িটা খুলে হাতে নিয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে সম্রাট এগোলেন চক সংলগ্ন প্রাসাদে প্রবেশ করার জন্য। আর বার্তাবাহক অশ্বপৃষ্ঠে আরোহণ করে কেল্লায় ছুটল সম্রাটের নির্দেশ পৌঁছে দেবার জন্য।
বার্তাবাহক মধ্যরাতেই আগ্রা কেল্লাতে ফিরে এসে সম্রাটের নির্দেশ পৌঁছে দিয়েছিল যথোপযুক্ত স্থানে। পরদিন সকাল থেকে সেই নির্দেশ মতোই কাজ শুরু হল। হাওয়াইয়ের মৃত্যুতে শুধু সম্রাটের মনেই নয়, শোকের পরিবেশ নেমে এসেছে আগ্রা কেল্লাতে। বিশেষত সেনাদের মনে এ শোক প্রবল। বহু যুদ্ধে তাদের সঙ্গী ছিল, তাদের রক্ষা করেছিল হাওয়াই। সেনাপতি মানের মনেও হাহাকার বাজছে। কিন্তু সব কষ্ট চেপে রেখে সম্রাটের নির্দেশ মতো প্রধান সেনাপতি মান তদারক করতে লাগলেন সব কিছু। যমুনার তটে উপযুক্ত স্থান নির্বাচনের পর সকাল থেকেই মজুরের দল বিশালাকৃতির কবর রচনা করতে শুরু করল। কর্মকার আর ছুতোরের দল দ্বিপ্রহরের মধ্যেই নির্মাণ করে ফেলল বিরাট এক শকট। হাওয়াইয়ের মৃতদেহ মসৃণ শুভ্রবস্ত্রে আবৃত করে তোলা হল সেই শকটে। ফুল মালায় সাজানো হল হাওয়াইয়ের দেহ সমেত সেই শকট। নির্দিষ্ট সময় সেই শকট কেল্লা থেকে যাত্রা শুরু করল অন্ত্যেষ্টি স্থলের দিকে। দড়ি বেঁধে শকট ঠেলে নিয়ে চলল একশোজন মজুর। শকটের দু-পাশে উন্মুক্ত তলোয়ার আকাশের দিকে ধরে সেনারা। আর তার পিছনে শুধু সেনাপতি আমির ওমরাহরাই নন, দুর্গের বহু জনতা সামিল হল হাওয়াইয়ের শেষ যাত্রায়। যমুনার তটও তখন লোকে লোকারণ্য। আশেপাশে নানা স্থান থেকে বহু মানুষ তখন সেখানে এসে উপস্থিত হয়েছে।
সূর্যের শেষ আলো তখন ছড়িয়ে পড়েছে যমুনার তটে। অদ্ভুত এক আলো। চারদিকে শোকস্তব্ধ নিশ্চুপ জনতা। শকট থেকে মাটিতে নামানো হয়েছে হাওয়াইয়ের মৃতদেহ। ফুলের স্তুপ রচিত হয়েছে হাওয়াইয়ের মৃতদেহে। বিশেষত বহু হিন্দু, দেবতার প্রতিরূপ মনে করেন হাতিকে। তারা মালা চড়িয়েছেন মরদেহে। এক সময় উপস্থিত সেনা ও মজুরদের শেষ নির্দেশ দিলেন সেনাপতি মান। চাকা লাগানো বিরাট এক কপিকল আনা হয়েছিল সেখানে। এক সময় হাওয়াইয়ের দেহটা জনতার চোখের সামনে থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল সেই বিশাল গহ্বরের মধ্যে। ঠিক সেই সময়ই সূর্য অস্ত গেল। কেল্লার দিকে অথবা গ্রামের দিকে পা বাড়াতে শুরু করল জনতা। শুধু কিছু মানুষ সেখানে রয়ে গেল বাকি কাজ সম্পাদনের জন্য। অন্ধকার নামার পর কিছুটা সময় বিরতি নিয়ে মশালের আলোতে শুরু হল সেই কাজ। প্রথমে মাটি দিয়ে কবরের গর্ত ভরাট করা তারপর তার ওপর শ্বেতপাথরের স্তবক বসিয়ে জায়গাটা আবৃত করার কাজ। যথারীতি একাজের তত্ত্বাবধানেও থাকবেন সেনাপতি মান ও মন্ত্রী বেহারীমল্ল।
সম্রাটের নির্দেশে সব কাজ সুচারুভাবে হতে মধ্যরাত হয়ে গেল। তারপর ক্লান্ত অবসন্ন শরীরে কেল্লার ভিতর ফেরার জন্য পা বাড়ালেন মান সিংহ সহ কয়েকজন।
নিশ্চুপভাবে মাথা নীচু করে চাঁদের আলোতে হাঁটছিলেন মান। তাঁর এক পাশে লাঠি হাতে ফকির আজিউদ্দিন, আর অন্য পাশে মহামন্ত্রী বেহারীমল্ল। চলতে চলতে দুর্গের প্রবেশ তোরণ অতিক্রম করার পর আজিউদ্দিন এক সময় সেনাপতির উদ্দেশে বললেন, 'হাওয়াইয়ের মৃত্যু আপনাকেও বেশ বেদনা দিয়েছে জানি। তার ওপর এই পরিশ্রম। অন্তত দুটো দিন আপনি বাড়িতে বিশ্রাম নিন। শরীর ও মনে শান্তি আসবে।'
মান সিংহ বললেন, 'হ্যাঁ, তাই করব। বড় ক্লান্ত লাগছে। তবে আমার খালি মনে হচ্ছে সম্রাটের কথা। হাওয়াইয়ের মৃত্যুতে তিনি সব থেকে বেশি বেদনা পেয়েছেন। বার্তাবাহক বলছিল যে, হাওয়াইয়ের মৃত্যু সংবাদ পেয়ে সম্রাটের চোখ থেকে জল ঝরছিল। জ্যেষ্ঠপুত্রর অকাল মৃত্যুতেও তার চোখে প্রকাশ্যে অশ্রু বিন্দু দেখিনি আমি। সে সংবাদ আমিই তাকে প্রথমে দিয়েছিলাম। তিনি এখন কী করছেন কে জানে?'
মন্ত্রী বেহারীমল্ল বললেন, 'হ্যাঁ, সম্রাটের অবস্থা অনুমান করতে পারছি। এ সময় আপনারা কেউ যদি সম্রাটের পাশে থাকতে পারতেন, গল্পগুজবে বা আমোদ প্রমোদে বা অন্য কোনওভাবে সম্রাটকে কষ্ট থেকে ভুলিয়ে রাখতে পারতেন তবে ভালো হত।'
ফকির বলল, 'হয়তো তাই। কিন্তু সম্রাট তো বিনা প্রয়োজনে কাউকে সেখানে যেতে বারণ করেছেন।'
সেনাপতি মান বললেন, 'আমি ভাবছি তবু আমি সম্রাটের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাব। হয়তো সম্রাট নিজেই সেখানে আমাদের উপস্থিতি কামনা করছেন, কিন্তু কোনও সংকোচের কারণে আমাদের ডাকছেন না। হয়তো বা কারো কাছে তিনি মনের দুর্বলতা প্রকাশ করতে চান না। হাজার হলেও তিনি সম্রাট। পৃথিবীর কাছে তিনি হয়তো দেখাতে চান যে মনের দিক থেকে তিনি সব সময়ই শক্ত মানুষ। আমি দুটো দিন বিশ্রাম নেব। আর এ সময়ের মধ্যেই আমি ভেবে নেব যে কি আছিলাতে সম্রাটের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাওয়া যায়?'—কথাগুলো বলে সঙ্গীদের থেকে বিদায় নিয়ে সেনাপতি মান সিংহ কেল্লার যে দিকে তার বাসস্থান সেদিকে এগোলেন।
ঠিক এই সময়ই সিক্রিতে তাঁর নিভৃত কক্ষে হঠাৎ ঘুম ভেঙে পালঙ্কে বসলেন সম্রাট। এতক্ষণ এক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখছিলেন তিনি। কোন এক নির্জন জায়গাতে বসে ছিলেন সম্রাট। হঠাৎ কোত্থেকে যেন পাহাড়ের মতো হাওয়াই এসে দাঁড়াল তাঁর সামনে। হাওয়াইয়ের গায়ে জরিবোনা ঝালরের সাজ, পিঠে সোনার শিবিকা। যার মখমলের আসনে সম্রাট আরোহণ করেন ভ্রমণের সময়। যুদ্ধ যাত্রার সময় অবশ্য হাওয়াইয়ের দেহ আবৃত থাকে বেতের বর্মে। আর শিবিকার স্থানে থাকে সেই জালক দিয়ে তৈরি খাঁচা। তার ভিতরে বসে যুদ্ধ পরিচালনা করেন সম্রাট, হাওয়াই সম্রাটের সামনে এসে শুঁড় তুলে সেলাম ঠুকতেই সম্রাট তাকে বললেন, 'তুমি কি আমাকে নিয়ে যেতে এসেছ?'
হাওয়াই যেন সম্রাটের কথায় কুলোর মতো বিশাল কান নেড়ে বলতে চাইল, 'হ্যাঁ, জাঁহাপনা। আমি আপনাকে নিতে এসেছি।' এরপর সে ধীরে ধীরে হাঁটু মুড়ে সম্রাটের কিছুটা তফাতে বসে পড়ল যাতে সম্রাট তার গায়ে বাঁধা রশি ধরে পিঠের শিবিকায় উঠে বসতে পারেন। সম্রাট ইঙ্গিতটা ধরতে পেরে হেসে বললেন, 'হ্যাঁ, চলো। অনেকদিন তুমি আমাকে পিঠে নিয়ে বেড়াওনি। এ কথা বলে উঠে দাঁড়াতে গেলেন শাহেনশাহ। কিন্তু তিনি তার আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়াতে পারলেন না। তিনি যেন আটকে গেছেন তার আসনের সঙ্গে! ব্যর্থ চেষ্টার পর সম্রাট চিৎকার করে বললেন, 'ওরে কে আছিস? আমাকে ওঠা।' কিন্তু তার হাঁকডাকের পরও কেউ এগিয়ে এল না।
সম্রাট এবার হাওয়াইয়ের উদ্দেশে বললেন, 'হাওয়াই আমাকে শুঁড়ে টেনে তুলে তোমার পিঠে বসাও।' কিন্তু হাওয়াই শুঁড় বাড়াল না তাঁর দিকে। বরং সে যেন বুঝতে পারল যে সম্রাট তার পিঠে বসার ক্ষমতা হারিয়েছেন। হওয়াই উঠে দাঁড়াল, তারপর ধীরে ধীরে অন্যদিকে চলতে শুরু করল! তাই দেখে সম্রাট চিৎকার করে উঠলেন, 'হাওয়াই, আমাকে ফেলে তুমি কোথায় যাচ্ছ?' আর এরপরই সম্রাট খেয়াল করলেন, হাওয়াইয়ের পিঠের শিবিকাতে কখন যেন চড়ে বসেছে একজন লোক! সম্রাট ক্রুদ্ধভাবে লোকটার উদ্দেশে বলে উঠলেন, 'কে তুই বেতামিজ? তোর এত বড় সাহস যে তুই হাওয়াইয়ের পিঠে সম্রাটের আসনে বসিস!' সম্রাটের চিৎকার শুনে শিবিকার ভিতর থেকে মুখ বার করে সম্রাটের দিকে তাকাল লোকটা। আর তাকে চিনতে পেরে বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ হয়ে গেল সম্রাটের। হাওয়াইয়ের পিঠে সম্রাটের শিবিকাতে বসে আছে সেনাপতি রাজা মান সিংহ! তাকে দেখে কী বলবেন তা বুঝে উঠতে পারলেন না সম্রাট। মান সিংহকে সম্রাটের আসনে বসিয়ে ক্রমশ দূরে সরে যেতে লাগল প্রিয় হাওয়াই!
এ পর্যন্ত স্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙে গেল সম্রাটের। অদ্ভুত স্বপ্ন! ঘুম ভেঙে উঠে বসে সম্রাট এ স্বপ্নের ব্যাখ্যা খুঁজতে লাগলেন। হাওয়াইয়ের মৃত্যু সংবাদ পাবার পর থেকেই প্রায় দুটো দিন ধরে হাওয়াইয়ের কথাই ভেবেছেন তিনি। রাতে শয্যা গ্রহণ করার সময়ও তিনি হাওয়াইয়ের কথাই ভাবছিলেন। সে জন্যই হয়তো তিনি স্বপ্নে দেখেছেন হাওয়াইকে। কিন্তু স্বপ্নটা এমন অদ্ভুত কেন? তিনি কেন আসন ছেড়ে হাওয়াইয়ের পিঠে উঠতে পারলেন না? আর হাওয়াইয়ের পিঠে সেনাপতি মান সিংহই বা কেন? সে শঙ্কা থেকে গত ক'দিন তিনি প্রায় মুক্ত হয়ে উঠেছিলেন, সে শঙ্কা যেন আবার উঁকি দিতে শুরু করল সম্রাটের মনে। গবাক্ষ দিয়ে প্রাসাদ সংলগ্ন চকটা দেখা যাচ্ছে। লাল পাথরের শূন্য চকে উজ্জ্বল আলো ছড়াচ্ছে শেষ রাতের চাঁদ। সেদিকে চেয়ে রইলেন সম্রাট।
বেশ কিছুটা সময় পর অশ্বখুরের মৃদু শব্দে চিন্তাজাল ছিন্ন হল সম্রাটের। গবাক্ষ দিয়ে ভালো করে বাইরে তাকিয়ে সম্রাট দেখলেন চকে প্রবেশ করেছে একজন অশ্বারোহী। আপাদমস্তক কালো পোশাকে আবৃত হলেও লোকটা কে তা অনুমান করতে অসুবিধা হল না সম্রাটের। এ লোকটাকে সম্রাট তাঁর পাঞ্জা দিয়ে রেখেছেন। চক আর প্রাসাদ ঘিরে সারা দিন-রাত পাহারা দেয় রক্ষীরা। লোকটার কাছে পাঞ্জা না থাকলে এত রাতে সে চকে প্রবেশ করতে পারত না। এত রাতে সে কী সংবাদ বহন করে আনল? লোকটাকে দেখা মাত্রই সম্রাট পালঙ্ক থেকে নেমে কক্ষ সংলগ্ন উন্মুক্ত অলিন্দে এসে দাঁড়ালেন। অশ্বারোহী এসে দাঁড়াল অলিন্দের ঠিক নীচে। মুখ থেকে কালো কাপড়ের আচ্ছাদনটা সরিয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে সম্রাটকে অভিবাদন জানাল।
সম্রাটের অনুমান সঠিক। আগন্তুক হল খোজা কমবক্স। যাকে চরবৃত্তিতে নিয়োগ করেছেন সম্রাট।
তিনি তাকে প্রশ্ন করলেন আগ্রা দুর্গের খবর কী? হাওয়াইয়ের শেষকৃত্য ঠিকমতো সম্পন্ন হয়েছে?'
কমবক্স বললেন, 'হ্যাঁ, হবার কথা। শকটবাহিত হয়ে তার দেহ কেল্লা ত্যাগ করার পরই, অন্যদের ব্যস্ততার সুযোগ নিয়ে সবার অলক্ষে আমি কেল্লা ত্যাগ করে এই সিক্রির উদ্দেশে রওনা হয়েছিলাম। হাওয়াইয়ের শেষকৃত্যের জন্য মহাসমারোহের ব্যবস্থা দেখে এসেছি আমি। এতক্ষণে সে কাজ নিশ্চয়ই সম্পন্ন হয়ে গেছে।'
খবরটা শুনে সম্রাট বললেন, 'এবার বলো তুমি কী সংবাদ দিতে এসেছ?'
প্রশ্ন শুনে চারপাশে তাকিয়ে নিয়ে কমবক্স চাপা স্বরে বলল, 'কয়েক দিন আগে এক সন্ধ্যায় সেনাপতি মান সিংহের বাড়িতে গোপন সভা বসেছিল।'
'গোপন সভা! কে কে ছিলেন সেখানে?' বিস্মিতভাবে জানতে চাইলেন সম্রাট।
কমবক্স জবাব দিল, 'মহামন্ত্রী বেহারীমল্ল, ফকির আজিউদ্দিন আর জনাব পেঁয়াজা উপস্থিত ছিলেন সেখানে। আর প্রধান সেনাপতি তো ছিলেনই।'
কথাটা শুনেই একটা আশঙ্কা যেন দানা বেঁধে উঠল সম্রাটের মনে। ব্যাগ্রভাবে তিনি জানতে চাইলেন, 'কী আলোচনা হয়েছে সেই সভাতে?'
কমবক্স বলল, 'আমি গবাক্ষের আড়ালে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আলোচনা শোনার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু হঠাৎ ফকির আজিউদ্দিনের চোখ পড়ে গেল আমার ওপর। পালাতে হল আমাকে। তবে সামান্য সময়ের মধ্যে আমি এটুকু শুনেছি যে সেনাপতি মান বলছিলেন, তিনি তলোয়ার তৈরির দায়িত্ব নেবেন আর সেনাপতির কথা শুনে মোল্লা দোপেঁয়াজা বললেন, তাঁরা সেনাপতির হাতেই সে দায়িত্ব সমর্পণ করছেন। আর ওর পরই ফকির আজিউদ্দিন জানলার জাফরিতে আমার ছায়া দেখে কে ওখানে বলাতে আমাকে পালাতে হয়।'
কথাটা শুনেই প্রথমে চমকে উঠলেন সম্রাট। তারপর স্থির দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ কমবক্সের দিকে তাকিয়ে থেকে প্রশ্ন করলেন, 'তুমি এ কথাগুলো ঠিক শুনেছ?'
কমবক্স জবাব দিল, 'হ্যাঁ, জাঁহাপনা। মিথ্যা বললে বান্দা কমবক্সের গর্দান হাজির থাকবে জাঁহাপনার পায়ে।'
জাঁহাপনা বুঝতে পারলেন খোজা কমবক্স মিথ্যে বলছে না। একটু চুপ করে থেকে সম্রাট তাকে নির্দেশ দিলেন, 'তুমি কেল্লায় ফিরে গিয়ে ওই চারজনের ওপরই নজর রাখবে। যদি তেমন গুরুত্বপূর্ণ কোনও খবর তুমি আনতে পারো তবে তোমাকে বান্দা থেকে জায়গীরদার বানিয়ে দেব আমি। আর কোনও মিথ্যা তোমার ধরা পড়লে নিজের হাতে আমি তোমার গর্দান নেব।'
সম্রাটের নির্দেশ শোনার পর তাকে সেলাম জানিয়ে কালো কাপড়ে মুখ ঢেকে আগ্রা কেল্লার উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেল খোজা কমবক্স।
সম্রাট ফিরে এসে পালঙ্কে বসে কমবক্সের মুখে শোনা কথাগুলোর অর্থ বোঝার চেষ্টা করতে লাগলেন। তবে কি বিদ্রোহের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। সেলিমকে কি সিংহাসনে বসতে দেবে না তারা। সম্রাটের জীবিতকালেই কি তাকে সিংহাসনচ্যুত করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে? এখন তো কোথাও কোনও যুদ্ধের সম্ভাবনা নেই তবে তলোয়ার প্রস্তুত করা কেন? নিশ্চয়ই অনেক তলোয়ার?—এ সব নানা কথা ভাবতে লাগলেন সম্রাট।
ভোরের আলো ফুটল এক সময়। কিন্তু সম্রাট কক্ষ ত্যাগ করলেন না। দ্বাররক্ষীকে তিনি নির্দেশ দিলেন বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে দিতে। আর কোনও অবস্থাতেই কক্ষে প্রবেশ করে কেউ যেন তাকে বিরক্ত না করে।
বদ্ধ কক্ষে বসে কমবক্সের বলা কথাগুলো আর সাম্প্রতিক অতীতের দুটো ঘটনার কথা ভাবতে ভাবতে শঙ্কার মেঘ ক্রমশ ঘনীভূত হতে লাগল সম্রাটের মনে। তার স্বপ্নের ব্যাখ্যাও যেন খুঁজে পেতে লাগলেন তিনি। তবে কি হাওয়াই এসে তাকে জানিয়ে দিয়ে গেল যে, মোগল সিংহাসনে বসতে চলেছেন সেনাপতি মান, শাহজাদা সেলিম নয়! সম্রাটের মনে পড়ল এক জ্যোতিষী তাকে বলেছিলেন, হাওয়াইয়ের মৃত্যুর পর সম্রাটের জীবনে অমঙ্গলের সূচনা হবে। তবে কী সে সময় এগিয়ে আসছে? সকাল গড়িয়ে দুপুর হল, তারপর বিকাল ছুঁয়ে সন্ধ্যা তারপর রাত। ভেবেই চলেছেন সম্রাট। তিনি যেন এক প্রকার নিশ্চিতই হলেন তাঁর আর সেলিমের বিরুদ্ধে চক্রান্তের ব্যাপারে।
কেন অসময়ে তলোয়ার বানাতে দেওয়া, কেন আজিউদ্দিন সেনাপতি মানকে সিংহাসনের যোগ্য উত্তরাধিকারী বলেছিলেন, কেন সম্রাটের উপস্থিতিতেই ব্রাহ্মণ সেনাপতি মানকে কুর্নিশ করেছিল,—এ সব কিছুই যেন স্পষ্ট হয়ে যেতে লাগল সম্রাটের কাছে। বন্ধ কক্ষে ছটফট করতে করতে পায়চারি করতে লাগলেন সম্রাট। রাত নামল। এক সময় সম্রাটের মনে হল, না, এভাবে দুশ্চিন্তা করা অর্থহীন। মুক্ত হতে হবে এই দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ থেকে। আর তার জন্য সম্রাটের জীবিতকালেই নিশ্চিত করতে হবে শাহজাদা সেলিমের সিংহাসনে আরোহণের বিষয়টি। দরকার হলে তিনি জীবিত অবস্থাতে সিংহাসনে বসাবেন শাহজাদাকে। কারণ, সেলিম তাঁর ঔরসজাত সন্তান। মোগল সিংহাসনের একমাত্র ন্যায্য উত্তরাধিকারী সেলিম। তা সে যে চরিত্রের মানুষই হোক না কেন। সারা রাত ধরে ভাবার পর অবশেষে একটা পরিকল্পনা মাথায় এল সম্রাটের।
ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই সম্রাট এক বার্তাবাহককে পাঠিয়ে দিলেন আগ্রা কেল্লাতে। বার্তাবাহক প্রধান সেনাপতি মানকে জানাল সিক্রি প্রাসাদে পরদিন সায়াহ্নে তাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন সম্রাট। কথাটা শুনে প্রীত হলেন সেনাপতি। এমনিতেই তিনি একটা অছিলা খুঁজছিলেন সম্রাটের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য, সম্রাট কেমন আছেন তা স্বচক্ষে দেখার জন্য। বার্তাবাহককে তিনি বললেন, 'তুমি ফিরে গিয়ে সম্রাটকে আমার কুর্নিশ জানিয়ে বলো, তাঁর এই ভৃত্য তাঁর নির্দেশ মতো সঠিক সময় সিক্রিতে উপস্থিত হবে।' বার্তাবাহক জবাবি বার্তা নিয়ে আবার রওনা হয়ে গেল সিক্রির উদ্দেশ্যে। সে চলে যাবার পর সেনাপতি মান ভাবতে লাগলেন সম্রাট তাঁকে হঠাৎ সিক্রিতে আমন্ত্রণ জানালেন কেন? তিনি কি প্রধান সেনাপতির সঙ্গে কোনও জরুরি আলোচনা করতে চান, বা কোনও নির্দেশ দিতে চান? এক বার তার মনে এ প্রশ্নেরও উদয় হল যে, সম্রাট যদি তার সেনাপতি সম্বন্ধে কোনও ভুল ভাবনা বা শঙ্কা পোষণ করে থাকেন তা নিয়ে আলোচনা করার জন্য সেনাপতি মানকে তিনি ডেকে পাঠাননি তো?
পরদিন মধ্যাহ্নের কিছু আগে অশ্বপৃষ্ঠে কেল্লা ত্যাগ করলেন মান। তিনি যখন শুকরি ঝিলের তীরে লাল পাথরের নগরীর তোরণ দ্বারে পৌঁছলেন তখন শেষ বিকাল। নগরীতে প্রবেশ করার আগে ঝিলের পাড়ে কিছুক্ষণের জন্য একবার ঘোড়া থেকে নামলেন তিনি। এই লাল পাথরের সুরম্য নগরী, এই শুকরি ঝিলের সঙ্গে সেনাপতি মানেরও অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। যুবক আকবর তখন তাঁর সাম্রাজ্য বিস্তারের কাজ শুরু করেছেন। যুদ্ধ লেগেই থাকত। অসম্ভব পরিশ্রমের মধ্যে কাটত দিনগুলো। কিন্তু তারই মাঝে সুযোগ পেলেই সম্রাট তার সভাসদদের নিয়ে ক্লান্তি কাটাবার জন্য চলে আসতেন সিক্রিতে। ওই যে নদীর ওপারের জঙ্গল ওখানে তিনি সম্রাটের সঙ্গে বহুবার হরিণ শিকারে গেছেন। রন্ধনশিল্পের ওপর সম্রাটের বরাবরই প্রবল আগ্রহ। কিছুদিন অগে পর্যন্ত প্রচণ্ড ভোজনরসিক ছিলেন সম্রাট। শুকরির জঙ্গল থেকে শিকার করা হরিণ, কুক্কুট ইত্যাদি নানা পশুপাখির মাংস নিজের হাতে রন্ধন করে সভাসদদের খাওয়াতেন সম্রাট। বীরবল তো একবার সম্রাটকে বলেই ফেলেছিলেন 'পরজন্মে আমি যদি সম্রাট হই তবে আমার রন্ধনশালাতে আপনাকে প্রধান বাবুর্চি করব।' অন্য কেউ কথাটা বললে হয়তো তৎক্ষণাৎ তার গর্দান যেত, কিন্তু সেদিন বীরবলের কথা শুনে খুব হেসেছিলেন সম্রাট। পুরানো দিনের সোনালি স্মৃতি সব।
তবে আজকাল সম্রাট নিজে রন্ধন না করলেও একটা জিনিস কিন্তু সম্রাট এখনও নিজের হাতে বানান, তা হল হজমি গুলি। শুনতে অবাক লাগলেও ভারত সম্রাটের এই হজমি গুলি বানাবার অভ্যাস বহুদিনের। পারস্য থেকে নানা গাছগাছড়া জড়িবুটি আসে সেই হজমি প্রস্তুত করার জন্য। সম্রাট নিজে খান, মাঝে মাঝে সভাসদদেরও দেন।
ঝিলের পাড়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে স্মৃতি রোমন্থন করার পর আঁজলা ভরে শুকরির শীতল জল তুলে চোখে মুখে দিতেই পথের ক্লান্তি কেটে গেল সেনাপতি মানের মনে। সম্রাট হঠাৎ কেন তাকে ডেকে পাঠালেন? নানা কথা ভাবতে ভাবতে এক সময় মান পৌঁছে গেলেন অনুচ্চ প্রাকারবেষ্টিত চক সম্মিলিত প্রাসাদের কাছে। ঘোড়া থেকে নেমে এক ভৃত্যকে ঘোড়ার লাগাম ধরিয়ে দিয়ে হেঁটে চকে প্রবেশ করলেন সেনাপতি মান সিংহ।
লাল পাথর বাঁধানো সিক্রির প্রাসাদ সংলগ্ন সেই চকে প্রবেশ করেই সেনাপতি মান দেখতে পেলেন সম্রাটকে। চকের ঠিক মাঝখানে পরিচিত ভঙ্গিতে দু-হাত পিছনে করে বিদায়ী সূর্যের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন ভারত সম্রাট আকবর। যৌবন তাঁর শরীর থেকে বিদায় নিয়েছে অনেক আগেই, ধনুকের ছিলার মতো ছিপছপে শরীরে মেদ জমেছে, চওড়া হয়েছে রেশমের কোমরবন্ধ। পাগড়ির আড়াল থেকে নেমে আসা ঝুলপির রঙ এখন রূপালি। তবুও তার চিবুক উঁচু করে দাঁড়াবার এই ঋজু ভঙ্গিমা যেন আজও বলে, 'আমিই ভারতশ্রেষ্ঠ, আমিই সম্রাট আকবর, আসমুদ্র হিমাচল আমার পদানত। যে কোনও মাথাকে আমি আজও ঝুঁকিয়ে দিতে পারি আমার তুর্কি তলোয়ারের সামনে।'
অস্তাচলগামী সূর্যের দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবছিলেন ভারত সম্রাট। সেনাপতি মান সিংহ ধীর পায়ে তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে কুর্নিশ করতেই সম্রাট তাকালেন সেনাপতির দিকে। স্থির দৃষ্টিতে বেশ কয়েক মুহূর্ত তিনি তাঁর দিকে চেয়ে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে হাসি ফুটে উঠল সম্রাটের মুখে। যেন কোনও উদ্বেগের অবসান ঘটল সম্রাটের মনে। সেনাপতিও আশ্বস্ত হলেন বহুদিন বাদে সম্রাটের মুখে হাসি দেখে। বোধ করি তিনি ঠিকই আছেন, এ কথা ভাবলেও সেনাপতি সৌজন্যবশত জানতে চাইলেন, 'সম্রাটের স্বাস্থ্য ঠিক আছে তো?'
সম্রাট বললেন, 'হ্যাঁ, সলামতই আছে।'
সেনাপতি বললেন, 'আসলে আমি এ ব্যাপারটা নিয়ে বেশ চিন্তিত ছিলাম। বিশেষত হাওয়াইয়ের মৃত্যুর পর...।'
মান সিংহকে কথা শেষ করতে না দিয়ে সম্রাট বলে উঠলেন, 'হ্যাঁ, হাওয়াইয়ের মৃত্যু সংবাদ পাওয়ার পর আমি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলাম। আপনি আমার পাশে দাঁড়িয়ে বহু যুদ্ধ করেছেন। হাওয়াইয়ের সঙ্গে আমার সম্পর্কটা অন্যদের থেকে আপনি ভালো জানেন। তার মৃত্যুতে আমার প্রচণ্ড মানসিক আঘাত পাওয়াই স্বাভাবিক। তা পেয়েও ছিলাম। কিন্তু পরে ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখলাম মৃত্যু তো জীবনের স্বাভাবিক ঘটনা। মানুষ হোক বা ক্ষুদ্র মাকড় থেকে শুরু করে পর্বত সমান রণহস্তী, মৃত্যুকে এড়াতে পারবে না কেউই। হাওয়াইও পারেনি। আমরাও পারব না। তাই মৃত্যু ভাবনা নিয়ে, হাওয়াইয়ের মৃত্যু নিয়ে অযথা মনোকষ্ট করে লাভ নেই, তার চেয়ে জীবন যতক্ষণ আছে ততক্ষণ তার রূপ রস গন্ধ বর্ণকে উপভোগ করা ভালো।'—একটানা কথাগুলো বলে থামলেন সম্রাট।
হাওয়াইয়ের মৃত্যুশোক সম্রাট কাটিয়ে উঠতে পেরেছেন দেখে ভালো লাগল সেনাপতির। তিনি বললেন, 'একদম সঠিক কথা জাঁহাপনা।' এ কথা বলে সেনাপতি মান সিংহ বললেন, 'সম্রাট কি বিশেষ কোনও বিষয়ে আলোচনা করার জন্য আমাকে ডেকে পাঠিয়েছেন? সম্রাট হেসে বললেন, 'না, তা নয়। ওই যে বললাম বাকি জীবনটা উপভোগ করতে চাই আমি। সন্ধ্যায় দাওয়াতের ব্যবস্থা করেছি। সে জন্যই আপনাকে ডাকা। কাজের কথার বাইরে বহুদিন গল্পগুজব করা হয়ে ওঠেনি আপনার সঙ্গে। আজ আর কোনও কাজের কথা নয়। আজ শুধু গল্প করব আমরা। যুবা বয়সে যেমন করতাম।'
মান সিংহ হেসে বললেন, 'জাঁহাপনার যা মর্জি।'
চকের চারপাশে তাকিয়ে সম্রাট বললেন, 'এ জায়গার কথা মনে পড়ে সেনাপতি? বীরবল, তানসেন, ফৈজি, আবুল ফজল, সবাই মিলে একসঙ্গে আমরা কত সময় কাটিয়েছি এখানে।'
সেনাপতি মান বললেন, সব মনে আছে সম্রাট। নগরীতে প্রবেশ করার আগে আমি শুকরির পাড়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম। তখন মনে পড়ছিল সে সব দিনের কথা। আর এখানে এসেও মনে পড়ছে।'
তারপর পুরানো দিনের সোনালি স্মৃতি রোমন্থন করতে শুরু করলেন সম্রাট ও সেনাপতি। অন্ধকার নামার সঙ্গে সঙ্গেই হাজার প্রদীপ জ্বলে উঠল সিক্রির প্রাসাদে। সম্রাটের নির্দেশেই আজ আলোকমালায় সাজানো হয়েছে এই যুদ্ধ প্রাসাদ।
অন্ধকার নামার পর সম্রাট তাঁর সেনাপতিকে নিয়ে প্রাসাদে প্রবেশ করলেন। বহুদিন পর এ প্রাসাদে পা রাখলেন সেনাপতি মান। সম্রাট প্রথমে সেনাপতিকে নিয়ে প্রবেশ করলেন গালিচা বিছানো বিশাল এক কক্ষে। এ কক্ষও পরিচিত সেনাপতির। কক্ষের শেষ প্রান্তে সম্রাটের সিংহাসন ঘিরে বেশ কয়েকটা কেদারা আছে। সিক্রি প্রাসাদের এ কক্ষে সভাসদদের নিয়ে মজলিশে বসতেন সম্রাট। কক্ষের একপাশের দেওয়ালের গায়ে মখমলের আসনে এখনও তানপুরা সহ বেশ কয়েকটি তারের বাদ্যযন্ত্র রাখা আছে। ওই বাদ্যযন্ত্রগুলো এক সময় তান সেনও ব্যবহার করেছেন। স্মৃতি বিজড়িত সে ঘরে কিছু সময় অতিবাহিত করার পর তারা হাজির হলেন আলোকজ্জ্বল, খাদ্য দ্রব্যের গন্ধে সুরভিত ভোজন কক্ষে। ঘরের ঠিক মাঝখানে কাষ্ঠনির্মিত এক চারপায়ার ওপর বিশাল রূপোর থালার ওপর রাখা আছে মশলা মাখানো ঝলসানো আস্ত একটা ময়ূর। তাছাড়া মধুতে জারিত হরিণের মাংস, সুগন্ধী চাল, ঘৃত মিশ্রিত রুটি থেকে শুরু করে মিষ্টান্ন, শতেক ধরনের খাদ্যবস্তু সেখানে সাজানো আছে। আর স্বর্ণখোচিত পানপাত্রে বহুমূল্য পারসিক সুরা তো আছেই।
সেনাপতি মান অবশ্য সুরা পান করেন না। পাছে তাদের আলোচনায় বিঘ্ন ঘটে তাই খাদ্য পানীয় পরিবেশনের পর পরিচারকদের কক্ষত্যাগ করতে নির্দেশ দিলেন সম্রাট। খাদ্য-পানীয় গ্রহণ করতে করতে ভারতশ্রেষ্ঠ দুই যোদ্ধার মধ্যে শুরু হল যুদ্ধের গল্প। কখনও সরহিন্দের যুদ্ধের গল্প, কখনও শোলা যুদ্ধ, কখনও হলদিঘাটী বা কখনও চিতোর গড়ের যুদ্ধ উঠে আসতে লাগল সম্রাট আর সেনাপতির কথায়। আর এ বিষয়টা তাদের দুজনের কাছেই এতটা আকর্ষণীয় যে অতীতের সেই সব গৌরবজ্জ্বল যুদ্ধের স্মৃতিতে তারা হারিয়ে যেতে লাগলেন।
বাইরে বেড়ে চলল রাত। এক সময় সেনাপতি মান সিংহের খেয়াল হল অনেক রাত হয়েছে, এবার তাকে ফিরতে হবে। মান সিংহ এবার তাই সম্রাটকে বললেন, 'এবার আমাকে যাবার আজ্ঞা দিন সম্রাট। আমাকে আগ্রা কেল্লায় ফিরতে হবে।'
সম্রাট বললেন, 'হ্যাঁ, অনেক রাত হল। তবে যাবার আগে একবার আমার শয়নকক্ষে চলুন।'
ভোজনশালা ত্যাগ করে সম্রাটের সঙ্গে তাঁর শয়ন কক্ষে প্রবেশ করলেন মান। রূপোর প্রদীপদানের মাথায় বিশালকৃতির একটা পিতলের প্রদীপ জ্বলছে ঘরে। তার স্নিগ্ধ আভাতে আর আতরের গন্ধে সুরোভিত ঘর। তার ঠিক মাঝখানে হাতির দাঁতের বিশাল একটা পালঙ্কে সোনার সুতোর অলঙ্কার করা মখমলের বিছানায় সম্রাটের শয়নের ব্যবস্থা। পালঙ্কের পাশে একটা আরাম কেদারা আর উজ্জ্বল রঙিন পাথর বসানো রূপোর চারপায়া আছে।
বর্তমানে শয়ন কক্ষে অন্য কোনও দাসদাসী বা পাখা বরদার নেই। সেনাপতিকে নিয়ে ঘরের মাঝখানে উপস্থিত হলেন সম্রাট। চারপায়ার ওপর থেকে একটা সোনার রেকাবি তুলে নিলেন সম্রাট। তার মধ্যে রাখা দুটো কৃষ্ণবর্ণের গুলি। সম্রাট বললেন, 'আজ গুরুপাক ভোজন হয়েছে। আমি একটা হজমি খাই, আর আপনিও যাবার আগে একটা মুখে দিন। আগের মতোই এই হজমি গুলি আমি নিজের হাতে বানিয়েছি।' এই বলে তিনি একটা হজমি গুলি প্রথমে মুখে দিলেন। সেনাপতি মান অন্য গুলিটা মুখে দেবার পর সম্রাট বললেন, 'ঠিক আছে আপনি এবার যাত্রা শুরু করুন।'
হজমি গুলি মুখে নিয়ে সম্রাটকে বিদায়ী কুর্নিশ জানিয়ে দরজার দিকে এগোলেন মান সিংহ।
সেনাপতি মান দরজার বাইরে পা বাড়াতে যাচ্ছিলেন ঠিক সেই সময় কেমন একটা অস্পষ্ট গোঙানির মতো শব্দ শুনে ফিরে দাঁড়ালেন মান। তিনি দেখলেন কেদারাতে বসে পড়েছেন সম্রাট। তার চোখ দুটো কেমন যেন বিস্ফারিত! সেনাপতি মান সঙ্গে সঙ্গে ছুটে গিয়ে দাঁড়ালেন সম্রাটের সামনে। সম্রাটের সারা শরীর কাঁপছে। বিস্ফারিত চোখে যেন অসার শূন্যতা! মান সিংহ তাঁর এ অবস্থা দেখে বললেন, 'আপনার কী হল জাঁহাপনা! অসুস্থ বোধ করছেন?'
সম্রাট বললেন, 'হাওয়াই আমাকে নিতে এসেছে। ওই তো সে আমাকে নিতে এসেছে।'
সম্রাটের অসংলগ্ন কথা শুনে সেনাপতি মান বললেন, 'কক্ষের ভিতর হাতি প্রবেশ করবে কী ভাবে? তাছাড়া হাওয়াই তো মৃত। সে আসবে কীভাবে? আপনার কি দৃষ্টি বিভ্রম হচ্ছে?'
সম্রাট জড়ানো কণ্ঠে বললেন, 'আমাকে আসন থেকে ওঠাও। আমি উঠব। হাওয়াই আমাকে নিয়ে যাবে। এই বলে তিনি শূন্য দৃষ্টিতে তাঁর হাত দুটো সামনের দিকে বাড়াবার চেষ্টা করলেন। সেনাপতি মান তাঁর হাত ধরতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই সম্রাটের মুখমণ্ডল নীল হয়ে গেল। প্রসারিত হাত দুটো শিথিল হয়ে খসে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে ব্যাপারটা বুঝতে পারলেন সেনাপতি মান সিংহ। কালকূট! হজমি গুলিতেই মেশানো ছিল ওই কালকূট।
কৌশলে মান সিংহকে হত্যা করতে গিয়ে ভুলবশত বিষ মেশানো হজমি গুলিটাই নিজের মুখে দিয়েছেন সম্রাট। আর একটু হলে ব্যাপারটা কী হতে যাচ্ছিল তা কল্পনা করে শিউরে উঠলেন সেনাপতি মান। সম্রাট শেষ একবার শুধু বলে উঠলেন, 'সেলিম।' পরক্ষণেই দুমড়ে-মুচড়ে স্থির হয়ে গেল ভারত সম্রাট আকবরের দেহ। সৈনিকরা মৃত্যুকে চিনতে পারে। সেনাপতি মান সম্রাটের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলেন এ দেহে আর প্রাণ নেই। কালকূট ছিনিয়ে নিয়েছে ভারত সম্রাটের প্রাণ। সেনাপতি চেয়ে রইলেন সম্রাটের মুখমণ্ডলের দিকে।
বেশ কিছুক্ষণ পর ধাতস্থ হলেন সেনাপতি মান। সম্বিত ফিরে পেয়ে তিনি ভাবতে লাগলেন তার কী করা উচিত? কিছুক্ষণের মধ্যেই অবশ্য নিজের কর্তব্য স্থির করে নিলেন তিনি। কেদারা থেকে সম্রাটের দেহটা তুলে তিনি শুইয়ে দিলেন পালঙ্কে। এবার যেন দেখে মনে হচ্ছে সম্রাট ঘুমাচ্ছেন। দরজা বন্ধ করে কক্ষের বাইরে এসে দাঁড়ালেন সেনাপতি। সম্রাটের মৃত্যুর কথা এখনই কাউকে জানতে দেওয়া চলবে না। একজন রক্ষীকে ডেকে তিনি বললেন, 'তুমি এখানে পাহারাতে থাকো। সম্রাটের নির্দেশ কেউ যেন তার কক্ষে প্রবেশ না করতে পারে।'
মন্ত্রী বেহারীমল্ল, ফকির আজিউদ্দিন, মোল্লা দোপেঁয়াজাকে দ্রুত খবর পাঠাতে হবে সিক্রিতে চলে আসার জন্য।
প্রাসাদ ছেড়ে চন্দ্রালোকিত চকে পা রাখলেন সেনাপতি, চক অতিক্রম করে বহিঃতোরণে যাবার জন্য। সেখানকার কোনও অশ্বারোহীকে সেনাপতি আগ্রা কেল্লাতে পাঠাবেন বলে। কিন্তু কিছুটা এগোতেই তিনি উল্টোদিক থেকে একজনকে আসতে দেখলেন। চকের ঠিক মাঝখানে এসে মহামন্ত্রী বেহারীমল্ল মিলিত হলেন প্রধান সেনাপতি মানের সঙ্গে। তিনি সেনাপতিকে বললেন, 'শুনলাম সম্রাট হঠাৎই আপনাকে এখানে তলব করেছেন! ব্যাপারটা একটা আশঙ্কার জন্ম দিয়েছে আমাদের মনে। তাই ফকির আজিউদ্দিন আর মোল্লা দোপেঁয়াজার সঙ্গে আলোচনা করে এখানে চলে এলাম। সব কিছু ঠিক আছে তো?'
একটু চুপ করে থেকে সেনাপতি মান বললেন, 'সম্রাট মৃত। আমাকে হজমি গুলিতে বিষ মিশিয়ে হত্যা করতে গিয়ে ভুলক্রমে সেই গুলি খেয়ে কিছুক্ষণ আগে মৃত্যু হয়েছে সম্রাটের। এবার আমাদের পরবর্তী কর্মপন্থা ঠিক করতে হবে।'
মন্ত্রী বেহারীমল্ল কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, 'কর্মপন্থা আমি ঠিক করে নিয়েছি। কাল আমরা আপনাকে ভারতসম্রাট হিসাবে ঘোষণা করব। শুধু আমরাই নয়, মন্ত্রী পরিষদের সব সদস্য আপনার পাশে থাকবেন। আর সেনাবাহিনী তো আপনার নির্দেশেই পরিচালিত হয়। সেলিম কোনও অবস্থাতেই দখল নিতে পারবে না সিংহাসনের।' একটানা কথাগুলো বলে সেনাপতির জবাবের প্রত্যাশায় তার দিকে তাকালেন বেহারীমল্ল।
সেনাপতি মান বললেন, 'না, তা হয় না। সম্রাট আমার প্রতি যা আচরণই করুন না কেন আমি তাকে কথা দিয়েছিলাম কোনওদিন আমি বিশ্বাস ভঙ্গ করব না তাঁর প্রতি। তার নির্দেশ মেনে চলব। তিনি চেয়েছিলেন শাহজাদা সেলিম সিংহাসনে বসবে।'
বেহারীমল্ল বললেন, 'কিন্তু এই সেলিমই কিন্তু একদিন সিংহাসনের লোভে পিতার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছিলেন। তখন আপনি রক্ষা করেছিলেন এই সিংহাসন। এই সিংহাসনের প্রতি আপনার দাবি কম নেই। তাছাড়া সেলিম সিংহাসনে বসলে আপনার ওপর তার প্রতিহিংসা নেমে আসতে পারে। যেমন নেমে এসেছিল আবুল ফজলের ওপর। সে আশঙ্কা নির্মূল করি আমরা। ভাগ্যদেবী আমাদের সামনে যে সুযোগ এনে দিয়েছেন আসুন আমরা তাকে কাজে লাগাই। এ দেশের বুকে ভবিষ্যতের জন্য নতুন ইতিহাস রচনা করব আমরা।'
মান সিংহ এবার দৃঢ় গলায় বললেন, 'রাজপুতের কথা আর তলোয়ারের দাম সম্রাটের সিংহাসনের থেকে বেশি। তাই সম্রাটের শেষ ইচ্ছা তাঁর মৃত্যুর পরও পাশে থেকে পালন করবে সেনাপতি মান। আমি বা অন্য কেউ নয়, সম্রাটের সিংহাসনে বসবেন শাহজাদা সেলিম। এ বিষয়ে আর কোনও বাক্যালাপ নয়। অতি দ্রুত শাহজাদাকে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করুন। তিনি না এসে পৌঁছনো পর্যন্ত ভারত সম্রাটের মৃত্যুর খবর গোপন থাকবে বাইরের পৃথিবীর কাছে। আর ভারত সম্রাটের মৃত্যুর কারণটা যেন জনসমক্ষে প্রচারিত হয়ে কালিমালিপ্ত না হয়। ভবিষ্যতে আমরা জানব যে খাদ্যে বিষক্রিয়াতে মৃত্যু হয়েছে ভারত সম্রাট আকবরের।'
চাঁদের আলো এসে পড়েছে সেনাপতি মানের মুখে। এক দৃপ্ত, নির্লোভ পুরুষের মুখ। বিশ্বস্ততার প্রতিমূর্তি রাজা মান। যার কাছে ভারত সম্রাটের সিংহাসন তুচ্ছ! সে মুখের দিকে বিস্মিতভাবে বেশ কিছুক্ষণ চেয়ে রইলেন প্রধানমন্ত্রী বেহারীমল্ল। তারপর করজোড়ে সতীর্থকে প্রণাম জানিয়ে বললেন, 'আজ রাতে সিক্রির চকে আমাদের কথোপকথন হয়তো কেউ কোনওদিন জানবে না। জানবে না আপনার এই কাহিনি। কিন্তু ভবিষ্যতের ইতিহাস সম্রাট আকবরের নাম যতদিন মনে রাখবে ততদিন একই সঙ্গে উচ্চারিত হবে সেনাপতি রাজা মান সিংহের নাম।
সেনাপতি মান মৃদু হেসে বললেন, 'ধন্যবাদ। এবার ফিরে যান। শাহজাদা সেলিমকে দ্রুত এখানে আনার ব্যবস্থা করুন। ভারত সম্রাটের সিংহাসনে বসাতে হবে সেলিমকে।
পুনশ্চ : ২৭ অক্টোবর ১৬০৫ ফতেপুর সিক্রিতে জীবনাবসান হয় মোগল সম্রাট আকবরের। সেকেন্দ্রাতে প্রাথমিকভাবে লোকচক্ষুর অজ্ঞাতে তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়। পরবর্তীকালে অবশ্য সেখানে সৌধ নির্মাণ করা হয়। ভারত সম্রাটের মৃত্যুর কারণ হিসাবে সরকারিভাবে ঘোষণা করা হয়েছিল যে খাদ্যে বিষক্রিয়া অর্থাৎ 'ফুড পয়জন'-এর কারণে মৃত্যু হয় তাঁর। কিন্তু কর্নেল জেমস টড সহ বেশ কিছু লেখক, ইতিহাস গবেষক দাবি করেন যে, খাদ্যে বিষক্রিয়াতে নয়, বিষ গ্রহণের ফলেই মৃত্যু হয় সম্রাটের। টড তাঁর 'রাজস্থান' গ্রন্থে লিখেছেন যে সম্রাট তার সেনাপতি মান সিংহকে কোনও অবিশ্বাসের কারণে হজমি গুলিতে বিষ প্রয়োগ করে হত্যা করতে গিয়ে ভুলক্রমে সেই হজমি গুলি গ্রহণ করে মৃত্যু মুখে পতিত হন। কর্নেল টডের সংগৃহীত লোককথার ওপর ভিত্তি করেই রচিত এই উপন্যাস। এ ঘটনার ঐতিহাসিক সত্যতা সম্বন্ধে লেখক কোনও ব্যক্তিগত দাবি রাখেন না। কর্নেল টডের বক্তব্য যদি সত্যি হয়েও থাকে, পুত্র বাৎসল্যে, সেলিমের নিরাপত্তা বিধানের জন্য তিনি যদি মান সিংহকে হত্যার প্রচেষ্টা করেই থাকেন তবুও সেই স্খলনের জন্য তাঁর বীরত্ব, গৌরব, মুক্তচিন্তা কোনও দিন ম্লান হবার নয়। আর সেনাপতি মান সিংহ? ভারতের ইতিহাসে, মোগল সাম্রাজ্যের ইতিহাসে আজও ভাস্মর হয়ে আছেন তিনি। সম্রাট না হয়েও তিনি মোঘল সম্রাটদের সমমর্যাদা লাভ করেছেন ইতিহাসে। সেনাপতি মান সিংহ, অম্বর রাজ মান সিংহ। সততা, বিশ্বস্ততার আর এক নাম—রাজা মান সিংহ।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।