হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

পতিতপাবন গঙ্গার তীরে অবস্থিত অসংখ্য মন্দির, দেউল, হর্ম্য, ঘাট সম্মিলিত অতি প্রাচীন নগরী এই বারাণসী। সপ্তপুরীর এক পুরীর এই কাশীধাম। এ নগরীতে মৃত্যু হলে মানুষের মোক্ষলাভ, অক্ষয় স্বর্গবাস হয়।
সেই মোক্ষলাভের আশায় এখানে এসে সমবেত হন নানা দেশের, নানা বর্ণের মানুষ। বিশেষত, প্রৌঢ়-বৃদ্ধ মানুষেরা।
পার্শ্ববর্তী মগধ, অঙ্গ, অবন্তীর মতো রাজ্যগুলো থেকে তো বটেই এমনকী সুদূর কম্বোজ বা গান্ধার রাজ্য থেকেও এ নগরীতে এসে উপস্থিত হয় মোক্ষলোভী মানুষ।
শুধু বৈদিক ধর্মই নয়, নবীন জৈন ধর্ম ও বৌদ্ধ ধর্মেরও পীঠস্থান এই প্রাচীন নগরী। তীর্থঙ্করের পদধূলিতে ধন্য। এই নগরীর নিকটবর্তী সারনাথেই গৌতম বুদ্ধ প্রথম তাঁর ধম্ম প্রচার করেছিলেন।
এই পবিত্র নগরীতে বসবাস করতে গেলে পাটলিপুত্র নগরীর মতো রাজ-অনুমতির প্রয়োজন হয় না, সাধারণত বিশেষ সন্দেহের উদ্রেক না ঘটলে নগররক্ষীরা আগন্তুকের পরিচয় জানার জন্যও তেমন আগ্রহী হয় না। এই পুণ্যনগরীর দ্বার সবার জন্য অবারিত । আর যে-কোনো প্রাচীন নগরীর মতোই আবশ্যিকভাবে এখানেও বসবাস করে শ্রেষ্ঠীকুল, নগরীর শোভা বর্ধন করে নটী, রূপোপজীবিনী-বেশ্যার দল।
সূর্যাস্ত হতে চলেছে... ধীবর নৌকা উজানে ভাসছে রাত্রিতে মৎস্যশিকারের আশায়। সন্ধ্যারতির জনাকীর্ণ ঘাটগুলো থেকে অনেকটা দূরত্বে একটি অতিক্ষুদ্র কোলাহলমুক্ত নিঃসঙ্গ ঘাটের পাথুরে সোপানশ্রেণির শেষ ধাপে বসেছিলেন এক ঋজু চেহারার মুণ্ডিতমস্তক ব্যক্তি। তাঁর পিঠে এলিয়ে পড়া দীর্ঘ শিখাটি রাজহংসের পালকের মতো শুভ্র বর্ণের। এটি বুঝিয়ে দেয় নির্জন নদীতটে একাকী উপবিষ্ট ব্যক্তি আজ বার্ধক্যের সীমানাতে উপনীত হয়েছেন।
তাঁর নাম-পরিচয় সম্পর্কে কেউ অবগত না থাকলেও ওই শিখা, শুভ্র গাত্রবর্ণ, বাহুতে জড়ানো রুদ্রাক্ষের মালা, আর উপবীত দেখে ধারণা করা যায় তিনি ব্রাহ্মণ। তাঁর প্রশস্ত ললাট, শ্যেনপক্ষীর মতো বাঁকানো নাসিকা, সর্বোপরি অন্তর্ভেদী স্থির দৃষ্টি দেখলে প্রাজ্ঞ ব্যক্তি অনুমান করতে পারবেন যে এই ব্রাহ্মণ সাধারণ কোনো ব্রাহ্মণ নন, তিনি প্রচণ্ড ধী-শক্তিসম্পন্ন, প্রখর জ্ঞান ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন এক বহুদর্শী মানুষ।
হ্যাঁ কথাটা মিথ্যা নয়। এই ব্রাহ্মণ তাঁর দীর্ঘ জীবনে খুব কাছ থেকে দেখেছেন বহু রাজবংশের উত্থান-পতন, গণিকালয় থেকে পাটলিপুত্রের রাজ-অন্তঃপুর, প্রত্যক্ষ করেছেন বহুকিছুই।
সেই অভিজ্ঞতা থেকে রচনা করেছেন জীবন দর্শনের শ্লোকমালা, রাজনীতি, সমাজনীতির দিকনির্দেশক বেশ কিছু পুস্তক, যা ভবিষ্যতের মানুষের কাছে ধরে রাখবে এই সময়কালকে।
জন্মের পর তাঁর মাতা, তাঁর নামকরণ করেছিলেন—মল্লিনাগ। তবে এই মল্লিনাগ নাম এখন বিস্মৃতপ্রায়। তিনি এখন পরিচিত বহুবিধ নামে। রাজনীতির প্রয়োজনে, পুস্তক রচনার প্রয়োজনে যে ছদ্মনাম বা উপাধিগুলি তাঁকে গ্রহণ করতে হয়েছিল, সেইসব নামে তাঁর কর্ম সম্পাদনের সফলতা মুছে দিয়েছে তাঁর আসল নামটিকে।
দ্রুতগামী সময়ের আবর্তে তক্ষশীলা থেকে পাটলিপুত্র দীর্ঘ যাত্রাপথ পাড়ি দিয়েছেন তিনি। নানা প্রয়োজনে পরিভ্রমণ করেছেন ষোড়শ মহাজনপদের প্রায় প্রত্যেকটির রাজধানী, প্রাচীন নগরীগুলি। ইতিপূর্বে তিনি এই বারাণসী নগরীতেও একসময় বেশ কিছুদিন কাটিয়ে গেছিলেন ধর্মশাস্ত্র অধ্যয়নের জন্য, কাশীরাজের রাজ অতিথিশালাতে।
তবে এবার তিনি এখানে এসেছেন সঙ্গোপনে। একাকী আশ্রয় নিয়েছেন বারাণসী নগরীর জনকোলাহল থেকে দূরে গঙ্গাতীরবর্তী এই নির্জন ঘাটসংলগ্ন এক পরিত্যক্ত জীর্ণ বাটিকায়। এক অর্থে বলা যেতে পারে এ তাঁর অজ্ঞাতবাস। দীর্ঘ বারো বৎসর ধরে ধীরে ধীরে ভিন্ন চরিত্রের এক পুস্তক রচনার কাজ করে চলেছিলেন তিনি। যাতে তিনি বাভ্রব্য, নন্দিকেশ্বর, ঘোটকমুখ, গণিকাপুত্র, কচুমার প্রমুখ ঋষি ও শাস্ত্রজ্ঞদের রচিত কাম দর্শনগুলিকে নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে একসূত্রে গেঁথেছেন।
ইতিমধ্যেই এ গ্রন্থের খণ্ডিত অংশগুলি জনজীবনে, রাজঅন্তঃপুর থেকে গণিকালয়, এমনকি সাধারণ নাগরিক গৃহেও সমাদৃত হতে শুরু করেছে। বিশেষত, তাঁর এই গ্রন্থে 'চৌষট্টি কলা'র উল্লেখ করেছেন তিনি। বলা যেতে পারে, এই চৌষট্টি কলার বাস্তব প্রয়োগ যে অভ্রান্ত, তা ইতিমধ্যে প্রমাণিত। তাঁর বর্ণিত চৌষট্টি কলার অধিকারিণী কোনো নারী বশ করতে পারে যে-কোনো পুরুষকে।
সেই গ্রন্থরচনার কাজ এখন প্রায় শেষ, শুধু তার উপসংহার রচনার শ্লোকগুলি রচনা করা বাকি। তবে যে-কোনো রচনার সারসত্যই তো তার উপসংহার। উপসংহারের মধ্যেই ধরা থাকে লেখকের উপলব্ধি। বিশেষত, দর্শনশাস্ত্রে-উপসংহারই রচনার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে।
কামও তো একটি শাস্ত্র। তাই এই ব্রাহ্মণের রচিত গ্রন্থটির উপসংহার রচনা অত্যন্ত সুচারুভাবে করা প্রয়োজন। সেই কাজ সম্পন্ন করার জন্যই বারাণসী নগরীর নির্জন নদীতীরে ব্রাহ্মণের এই নিভৃতবাস।
ঘাটের শেষ ধাপে বসে একটা শরকাঠি দিয়ে পায়ের সামনের বালুতটে আঁক কাটছিলেন ব্রাহ্মণ। নদীর জল এগিয়ে এসে সেই আঁকগুলো মাঝে মাঝে মুঝে দিয়ে আবার ফিরে যাচ্ছে। সায়াহ্নে নদীর জলের মৃদু কলরব আর মাঝে মাঝে দূরাগত মন্দিরগুলি থেকে ভেসে আসা ঘণ্টাধ্বনি ছাড়া কোথাও আর কোনো শব্দ নেই। বড় মনোরম পরিবেশ।
তিন দিন হল বারাণসীতে এসে উপস্থিত হয়েছেন তিনি। সারাদিন তিনি তাঁর কাজেই কাটান, দিন শেষে রোদ নিভে এলে, সূর্যদেব গঙ্গার বুকে অবগাহনের জন্য প্রস্তুতি শুরু করলে তিনি তাঁর কক্ষ ত্যাগ করে ঘাটের সোপান বেয়ে নেমে এসে ঠিক এই জায়গাতেই উপবেশন করেন। যেমন আজও করেছেন। শরকাঠি দিয়ে বালুতটে আঁকিবুকি কাটতে কাটতে তিনি তাঁর গ্রন্থের উপসংহারের ব্যাপারেই চিন্তা করছিলেন। নির্জন বাসস্থান আর নদীতটে বসে গত তিনদিন ভাবতে ভাবতে অবশেষে এই সায়াহ্নে পরিশিষ্ট রচনার মূল বক্তব্য সম্পর্কে মোটামুটি একটা সিদ্ধান্তে এসে উপনীত হয়েছে মল্লিনাগ। এবার শ্লোক রচনার পালা।
আনমনে আঁক কষতে কষতে আর শ্লোক রচনার কথা ভাবতে ভাবতে একসময় গঙ্গাবক্ষে সূর্য ডুবে গেল। আর সন্ধ্যা নামতেই দূরবর্তী জনাকীর্ণ ঘাটগুলিতে সন্ধ্যারতি শুরু হল। এই সন্ধ্যারতির অনুষঙ্গ হিসাবে তালপাতার ডোঙাতে প্রদীপ ভাসানো হয় মা-গঙ্গার উদ্দেশে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আলোকবিন্দু ছড়িয়ে পড়ছে গঙ্গাবক্ষে, ঢেউয়ের মাথায় ভাসতে ভাসতে হারিয়ে যাচ্ছে অজানার উদ্দেশে। ভারি মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। আঁক কাটা থামিয়ে সে দৃশ্যের দিকে ক্ষণকাল চেয়ে রইলেন ব্রাহ্মণ মল্লিনাগ।
বেশ অনেকটা সময় ধরে সেই আলোকবিন্দুগুলি ভাসতে থাকার পর তারা নির্বাপিত হতে শুরু করল। মন্দির আর ঘাটগুলি থেকে ঘণ্টাধ্বনিও ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে আসতে লাগল। সন্ধ্যারতির কাজ সাঙ্গ হতে চলেছে। অন্ধকার গ্রাস করে নিতে চলেছে মল্লিনাগের পদতলের ক্ষুদ্র তরঙ্গমালাকে।
এবার স্থান ত্যাগ করতে হবে তাঁকে। ফিরে গিয়ে নিভৃত কক্ষের প্রদীপের আলোতে হাঁসের পালকের কলমে ভুর্জপত্রে ফুটিয়ে তুলতে হবে অক্ষরমালা, শুরু করতে হবে তাঁর গ্রন্থের উপসংহার রচনার কাজ।
নদীতট ছেড়ে ফিরে যাবার জন্য উঠে দাঁড়াতে যাচ্ছিলেন ব্রাহ্মণ মল্লিনাগ। ঠিক সেই সময় একটা কণ্ঠস্বর তাঁর কানে এল—'কোনো সিন্ধান্তে উপনীত হতে পারলেন?'
কথাটা শুনেই তিনি মৃদু চমকে উঠে তাকাতেই দেখতে পেলেন, কিছু দূরে সোপান প্রাকারের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা এক ব্যক্তিকে। মল্লিনাগ যে ধাপে বসে ছিলেন, সোপানের সেই একই ধাপে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। যেন এই মুহূর্তে জলতল থেকে উঠে এসে সেখানে আবির্ভূত হয়েছেন। শুভ্র বস্ত্রখণ্ডে আবৃত তাঁর দেহ, আর সেই বস্ত্রখণ্ডের ঊর্ধ্বখণ্ড অবগুণ্ঠন রচনা করেছেন তাঁর মুখমণ্ডলে, অনেকটা নারীদের অবগুণ্ঠনের মতোই।
তবে এই আগন্তুক নারী নয়, পুরুষ। তাঁর দিকে তাকিয়ে আধো-অন্ধকারে মল্লিনাগের এর থেকে বেশি কিছু দৃষ্টিগোচর হল না।
ব্রাহ্মণ জানতে চাইলেন, 'ভদ্রের পরিচয়?'
আগন্তুক বললেন, 'আমি একজন অতি নগণ্য মানুষ। জৈন ভাবনার অনুসারী। আপনি যদি অনুমতি দেন তবে আপনার সঙ্গে কিয়ৎক্ষণ বাক্যালাপে অগ্রসর হই।'
যদিও ব্রাহ্মণ মল্লিনাগের এ স্থান ত্যাগ করার সময় হয়ে এসেছে, তবুও তার প্রশ্নটির কারণেই তাঁর প্রতি মৃদু আগ্রহান্বিত হয়ে মল্লিনাগ বললেন, 'আমার আপত্তি নেই। আপনি উপবেশন করুন।'
তাঁর কথা শুনে সেই জৈন মানুষ মল্লিনাগের থেকে কিছুটা তফাতে সোপানে বসলেন। মল্লিনাগ এরপর তাঁকে প্রশ্ন করলেন, 'বলুন, আপনি আমার কোন সিদ্ধান্তের কথা জানতে চাইছেন? ইতিপূর্বে আপনার সঙ্গে কি আমার কোথাও পরিচয় ঘটেছিল? কোনো বিষয় নিয়ে বাক্যলাপ হয়েছিল? আমার ঠিক স্মরণে আসছে না।'
অবগুণ্ঠনধারী বললেন, 'না। আমাদের মধ্যে কোনো বাক্যালাপ কোনোদিন হয়নি। ইতিপূর্বে সাক্ষাতও হয়নি। আমি জানতে চাইছিলাম 'কামসূত্রমের' পরিশিষ্ট রচনার ব্যাপারে আপনি কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন কি না?'
অবগুণ্ঠিত মানুষটির এই কথায় মল্লিনাগ ভীষণ চমকে উঠলেন। পাটলিপুত্র ত্যাগ করে এ স্থানে কেন এসে উপস্থিত হয়েছেন তা দ্বিতীয় কোনো ব্যক্তিকে তিনি জানাননি। তবে এই গূঢ় সংবাদ এই ব্যক্তি জানলেন কী ভাবে? ইনি কি দৈব ক্ষমতাসম্পন্ন?
মল্লিনাগের সামনে আধো-অন্ধকারে বসে থাকা ব্যক্তি সম্ভবত তাঁর মনের ভাব পাঠ করতে পারলেন। বললেন, 'আমি আপনাকে চিনি। পাটলিপুত্রতে আমি আপনাকে দেখেছি। আপনাকে কী বলে সম্বোধন করি বলুন তো? রাজ-উপদেষ্টা? ন্যায়শাস্ত্র রচনাকার? ব্রাহ্মণ মল্লিনাগ, নাকি যে ছদ্মনামে আপনি কামসূত্র রচনা করেছেন, সেই ''বাৎসায়ন'' নামে?'
মল্লিনাগ বুঝতে পারলেন, এই জৈন তাঁর পরিচয় সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত। পরিচয় গোপনের কোনো স্থান নেই। বিস্মিত মল্লিনাগ বললেন, 'আমি রাজ-উপদেষ্টা পরিচয় পাটলিপুত্রতে ফেলে এই স্থানে এসেছি। অন্য তিনটে পরিচয়ের যে-কোনোটিতে আপনি আমাকে সম্বোধন করতে পারেন। আমি বুঝতে পারছি আমার পরিচয় সম্পর্কে আপনি সম্পূর্ণ অবগত। কিন্তু আমি যে কামসূত্রমের পরিশিষ্ট রচনার কাজে মনোনিবেশ করেছি সে সম্পর্কে আপনি অবগত হলেন কীরূপে?'
জৈন বললেন, 'তাহলে আমি ''বাৎসায়ন'' নামেই আপনাকে সম্বোধন করি।'
সম্মতি জানালেন ব্রাহ্মণ।
একটু থেমে পুনরায় বললেন, 'আপনি যে কামসূত্রের পরিশিষ্ট বা উপসংহার রচনার কাজে মনোনিবেশ করেছেন তা আমি অনুমান করেছি পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে।'
'কীভাবে?'
জৈন বললেন, 'আপনার কামসূত্র গ্রন্থটি ইতিমধ্যেই তক্ষশীলা থেকে কলিঙ্গ, সমগ্র ষোড়শ মহাজনপদে সমাদর লাভ করেছে। কিন্তু তার আসল অংশ, অর্থাৎ গ্রন্থের পরিশিষ্ট বা উপসংহার এখনও রচিত হয়নি। আপনি বার্ধক্যের সীমান্তে উপস্থিত। বার্ধক্য ও জরা আপনার কর্মক্ষমতা ও চিন্তাকে পরিপূর্ণভাবে গ্রাস করে নেবার আগে যে আপনি গ্রন্থটি সম্পূর্ণ করার কাজে নিয়োজিত হবেন তা সাধারণভাবেই অনুমেয়।
পাটলিপুত্র রাজ্যে আপনি অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, রাজ-উপদেষ্টা। প্রত্যাহ রাজকার্যের নানা গুরুত্বপূর্ণ সিন্ধান্তের ক্ষেত্রে আপনাকে সংযুক্ত থাকতে হয়। কিন্তু আপনি যখন পাটলিপুত্র নগরী ত্যাগ করে বারাণসী নগরীর নিভৃত নদীতীরে নিজের বাসস্থান নির্বাচন করেছেন, তখন নিশ্চয়ই কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মনোনিবেশই এর একমাত্র কারণ। এখানে আপনার মনোসংযোগের ব্যাঘাত ঘটবে না।
আপনি, ভাবনার গভীরে বিচরণ করার কারণে আমাকে খেয়াল না করলেও আমি এই তিন দিবস কিছুটা তফাত থেকে আপনাকে লক্ষ করেছি। প্রতিদিনই দেখেছি আপনি আপনার হাতের এই শরকাঠি দিয়ে ভূমিতে আঁক কাটেন। দেখে আমার অনুমান হয়েছে, আপনি কোনো গুরত্বপূর্ণ বিষয় রচনার কাজে নিজের ভাবনাকে কেন্দ্রীভূত করতে চলেছেন। বারবার নদীস্রোত এসে আপনার আঁক মুছে দেয়, তারপর আপনি আবারও আঁক কাটেন, যা আপনার দীর্ঘ, নিবিষ্ট চিন্তার পরিচয়বাহী। এ সব কিছু বিচার-বিশ্লেষণ করে আমি সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি কামসূত্রমের পরিশিষ্টই রচনা করতে চলেছেন আপনি।
তবে আজ আমি খেয়াল করেছি আপনার আঁক কাটার গতি অনেকটা শ্লথ হয়ে এসেছিল। তাতে মনে হয়েছে, আপনার মস্তিষ্কের দ্বন্দ্ব, উত্তেজনা অনেকটাই স্তিমিত হয়ে এসেছে। অর্থাৎ উপসংহার রচনার কাজে আপনি সিদ্ধান্তে উপস্থিত হয়েছেন। যুক্তিগ্রাহ্য অনুমান কোনো বিষয়ের অন্তর্নিহিত সত্যের কাছে মানুষকে পৌঁছে দেয়। তাই আমি আপনার কাছে জানতে চেয়েছি, কামসূত্রমের পরিশিষ্ট রচনার ব্যাপারে কোনো সিন্ধান্তে উপনীত হয়েছেন কি না। আমার ধারণা আপনি তা হয়েছেন।'
একটানা কথাগুলো বলে থামলেন অবগুণ্ঠনধারী।
এই জৈনের পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ ক্ষমতা দেখে এবার সত্যিই প্রবল বিস্মিত হয়ে গেলেন বহুদর্শী ব্রাহ্মণ মল্লিনাগ বা কামসূত্রম্ গ্রন্থকার বাৎসায়ন। এই হেতু এই অচেনা জৈন পুরুষের প্রতি একটা আকর্ষণও অনুভব করলেন। তিনি বললেন, 'আপনার পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ ক্ষমতা সত্যিই বিস্ময়কর। আপনার এ ক্ষমতা দেখে আমি যারপরনাই মুগ্ধ! তাই আমি সত্য বক্তব্যই উপস্থাপিত করছি, আপনার অনুমান অভ্রান্ত। আমি কামসূত্রমের উপসংহার রচনা করার জন্যই এখানে উপস্থিত হয়েছি। এবং সে বিষয়ে নানা বিচার-বিশ্লেষনের পর একটি সিদ্ধান্তেও উপনীত হয়েছি। আজ রাত্রি থেকে সেটি লিপিবদ্ধ করার কাজে আমি মনোনিবেশ করব।
একটু থেমে বাৎস্যায়ন প্রশ্ন করলেন, আপনার পূর্ণাঙ্গ পরিচয় অবগত হলে তৃপ্তিবোধ করব। আমার সঙ্গে ইতিপূর্বে বেশ কিছু জৈন ধর্মাবলম্বীর সাক্ষাতের সুযোগ ঘটেছে। তাঁরা কঠিন অনুশাসনের মাধ্যমে, কৃচ্ছ্রসাধনের মাধ্যমে জীবন নির্বাহ করেন, দেখেছি। তাঁদের সঙ্গে নানা বিষয়ে বাক্যালাপও করেছি। কিন্তু তাঁদের কারো সঙ্গেই কথা বলে আপনার মতো প্রখর বিশ্লেষণ ক্ষমতার অধিকারী বলে মনে হয়নি। অনুগ্রহ করে আপনার পূর্ণাঙ্গ পরিচয় প্রকাশ করুন।'
বাৎস্যায়নের মনে হল তাঁর কথা শুনে অবগুণ্ঠনের আড়ালে জৈন একটু হাসলেন। তারপর বললেন, 'জন্মসূত্রে আমার নিশ্চয়ই একটা পরিচয় ছিল। কিন্তু পূর্বাশ্রমের কথা ব্যক্ত করতে নেই। তাই আমি পরিচয়দানে অপারগ। আমাকে মার্জনা করবেন। এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে অগুনতি জীবের মতো আমিও একজন জীব। এটাই বর্তমানে আমার একমাত্র পরিচয়।'
অভিজ্ঞ শাস্ত্রজ্ঞ ব্রাহ্মণ বাৎস্যায়ন এবার অনুমান করলেন, এই জৈন মানুষটি কোনো জৈন সন্ন্যাসী হবেন। কারণ, গৃহত্যাগী বৈদিক সন্ন্যাসীদের মতো অনেক জৈন সন্ন্যাসীও নিজের পরিচয় ব্যক্ত করেন না। বাৎস্যায়ন তাই প্রত্যুত্তরে বললেন, 'তবে আমি আপনাকে সন্ন্যাসী বলেই সম্বোধন করি?'
জৈন বললেন, 'এই মুহূর্তে এই বস্ত্রখণ্ড আমার অঙ্গ আবৃত করে আছে। সন্ন্যাসী মানে তো সর্বত্যাগী। অতএব সন্ন্যাসী সম্ভাষণ আমার পক্ষে উপযুক্ত নয়। তবে বাক্যালাপের সুবিধার্থে আপনি আমাকে ''জীব'' অথবা ''মানব'' নামেই সম্বোধন করতে পারেন।'
তক্ষশীলার গণিকালয় থেকে পাটলিপুত্রের রাজদরবার পর্যন্ত জীবন সায়াহ্নের এই দীর্ঘ যাত্রাপথে বহু মানুষ দেখেছে, তাঁদের সংস্পর্শে এসেছেন কামসূত্রম্ গ্রন্থের রচয়িতা বাৎসায়ন। জীবনের অভিজ্ঞতায় মানুষ চিনতে তাঁর ভুল হয় না।
এই জৈনের সঙ্গে এই সামান্য কথোপকথনেই তাঁর মনে হয় এই মানুষটি নিশ্চিতরূপেই অন্য সাধারণ মানুষদের থেকে তো বটেই, এমনকী অন্য জৈন সন্ন্যাসীদের থেকেও আলাদা। বাৎসায়ন তাই হেসে বললেন, 'ঠিক আছে, আমি তবে মানব নামেই সম্বোধন করছি। এতে আমাদের আলাপচারিতার সমস্যা হবে না। তা আপনি আমার পরিশিষ্টবিহীন কামসূত্রম্ গ্রন্থটি অধ্যায়ন করেছেন কি?'
মানব বললেন, 'হ্যাঁ। করেছি। সেহেতুই আপনার গ্রন্থের উপসংহার প্রসঙ্গে আমার আগ্রহ প্রবল। আপত্তি না থাকলে উপসংহার প্রসঙ্গে আপনার ভাবনার কথা জানতে চাই।'
বাৎসায়ন বললেন, 'না, তেমন আপত্তির কিছু নেই। আপনি ঠিক কী জানতে চাইছেন, ব্যক্ত করুন।'
মানব বললেন, 'এ কথা ঠিকই যে, আপনি আপনার রচনাতে কাম, অর্থ ও ধর্মকে এইসঙ্গে প্রণাম জানিয়েছেন। আপনি লিখেছেন এই তিনটি বিষয়ই সকল শাস্ত্রের মূল প্রতিপাদ্য। অর্থাৎ ''ত্রিবর্গবাদের'' কথা বলেছেন। আমি জানতে আগ্রহী যে উপসংহার রচনার ক্ষেত্রে আপনি এই ত্রিবর্গের কোন বর্গকে কোন স্থানে রাখবেন?'
কামসূত্রম্ প্রণেতা বাৎসায়ন বললেন, 'অবশ্যই প্রথম কাম, তারপর অর্থ, তারপর ধর্ম। উপসংহার রচনার ক্ষেত্রে আমি এই ভাবনারই অনুসারী হব।'
'বেশ।' মানব বললেন, 'আপনার এ ভাবনার পিছনে যে যুক্তি নিহিত আছে তা যদি অনুগ্রহ করে বিবৃত করেন।'
তাঁদের পায়ের সামনে মৃদু ছলাৎ ছলাৎ শব্দ তুলছে নদীর কালো জল। সেদিকে তাকিয়ে বাৎসায়ন বললেন, 'আমার জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, কামের শক্তি সর্বশ্রেষ্ঠ। কামতাড়না, কামোদ্রেকের ফলেই মনুষ্য জাতির প্রবহমানতা এই নদীর স্রোতের মতোই অনন্তকাল ধরে প্রবহমান। অর্থ বা পুরুষকার বা রাষ্ট্র নারী-পুরুষের আদিমতম সম্পর্ককে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করতে পারে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কামের কাছেই তাদের আত্মবিসর্জন দিতে হয়। আর ধর্মও তো আসলে একটা সামাজিক বিধান মাত্র, অথবা একটা অনুশাসন। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান হল কোনো ভাবনা বিশ্বাসের ব্যবহারিক প্রয়োগ। আপনি নিশ্চয়ই জানেন যে, মুনিঋষিরাও কামের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। দেবতা-দৈত্য-যক্ষ-মানুষ এমন কেউ নেই যে, তাকে কাম পরাস্ত করতে পারে না। তাই এই কামকেই ত্রিবর্গের মধ্যে আমি প্রথম বর্গ হিসাবে স্থান দেব আমার রচনার উপসংহারে। আমার রচিত কামশাস্ত্রের নির্যাস হবে—জগতে কামই শ্রেষ্ঠ।'
মানব বললেন, 'আমাকে মার্জনা করবেন শাস্ত্রজ্ঞ। আমার বিশ্বাস আপনার ভাবনা সঠিক নয়।'
বাৎসায়ন বলে উঠলেন, 'সঠিক নয়! কেন? আমার পূর্ববর্তী রচনাকারদের রচিত অর্থশাস্ত্র, ন্যায়শাস্ত্র, ধর্মশাস্ত্র বিষয়ক রচনাগুলি আমি অধ্যয়ন করেছি। সে বিষয়ে গ্রন্থও রচনা করেছি। এতদসত্ত্বেও আমি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে, মনুষ্যজীবন ধারায় কাম হল সর্বাপেক্ষা ক্ষমতাধর, কামশাস্ত্রই হল সর্বশ্রেষ্ঠ শাস্ত্র। আমার ভাবনাতে ভ্রান্তি আছে বলে মনে হয় না। আপনার এমন বিপরীত ভাবনার হেতু কী?'
মানব বললেন, 'আমি নিশ্চিত, কাম থেকে মানুষকে মুক্ত রাখতে পারে সত্য ধর্ম। যাঁরা এই পৃথিবীর সম্যক সত্যকে উপলব্ধি করতে পেরেছেন, কাম তাঁদের পরাজিত করতে পারে না!'
'ভ্রান্ত ধারণা!' শাস্ত্রজ্ঞ ব্রাহ্মণ তর্কশাস্ত্রেও পণ্ডিত। তিনি বললেন, 'এই ব্রহ্মাণ্ডের যিনি স্রষ্টা, যিনি পৃথিবীর সকল সত্যের আধার, সেই প্রজাপতিও কিন্তু মহর্ষি শান্তনুর অপরূপ লাবণ্যময়ী স্ত্রী অমোঘাকে দেখে কামার্ত হয়েছিলেন। অমোঘাকে দেখে তাঁর বীর্যপাত হয়েছিল। এ পৃথিবীতে সকল জীবের বেঁচে থাকার উৎস যিনি, সেই সূর্যদেব কি প্রত্যাখ্যান করতে পেরেছিলেন অপরূপা নারী কুন্তীর আহ্বান। সত্যবতীকে দেখে কি কাম জাগেনি আদি ধর্মগ্রন্থের বহু সূক্ত ও সংহিতার রচয়িতা পরাশর মুনির মনে? কোনো নারী যদি উপযুক্ত শিক্ষায় নিজেকে শিক্ষিত করে তুলতে পারে, তাকে আত্মস্থ করতে পারে, তবে যে-কোনো পুরুষকে সে কামার্ত করে তুলতে পারে; দেবতা হোক বা ঋষি, অথবা সাধারণ মানুষ, সবাই তার কাছে অর্থাৎ কামের কাছে মাথা নোয়াতে বাধ্য। পুরুষদের কামের কাছে মাথা নোয়ানোর জন্য নারীকে কী কী শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে তা আমি ইতিপূর্বে ব্যক্ত করেছি কামসূত্রম্ গ্রন্থের চৌষট্টি কলা বিবৃত করার মাধ্যমে। যার ব্যবহারিক প্রয়োগ অভ্রান্ত বলে ইতিমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে।
মানব বললেন, 'আপনার বক্তবের কিয়দংশ সত্য। কিন্তু পূর্ণ সত্য নয়। আমি আবারও বলি, যে মানুষ পৃথিবীর সম্যক সত্য সম্বন্ধে জ্ঞান লাভ করেছেন, কাম তাঁর কাছে পরাভূত হবেই। আপনার এই চৌষট্টি কলা অনুশীলন করা নারী হয়তো সাধারণ মানুষের মধ্যে কামোদ্রেক ঘটাতে পারে, কিন্তু প্রকৃত অর্থে পঞ্চ মহাব্রত পালনকারীর মধ্যে সে বিন্দুমাত্র কামভাবের উন্মেষ ঘটাতে সমর্থ হবে না। তাঁর অপরিগ্রহ ভঙ্গ করা সম্ভব নয়।'
জৈন ধর্মের মূল তত্ত্বগুলো শাস্ত্রজ্ঞ বাৎসায়নেরও জানা আছে। জৈন সন্ন্যাসীরা যে পঞ্চ মহাব্রত পালন করে থাকেন তা হল—'অহিংসা' অর্থাৎ কোনো জীবিত প্রাণীর ক্ষতি না করা। 'সত্য' অর্থাৎ সদা সত্য কথা বলার ব্রত। 'অস্তেয়' অর্থাৎ চৌর্যবৃত্তি না করা, অন্যের শ্রম হরণ না করা। 'ব্রহ্মচর্য' অর্থাৎ 'কাম' থেকে নিজেকে দূরে রাখা। এবং পঞ্চম তথা শেষ ব্রত হল—'অপরিগ্রহ'। যে শব্দর অর্থ হল 'অনাসক্তি'।
জৈন ধর্মাবলম্বীরা মনে করেন এই অপরিগ্রহ ব্রতের মাধ্যমেই ব্রহ্মচর্য পালন করা যায়। কিন্তু এই অবগুণ্ঠনধারীর ধর্মতত্ত্বে যাই লেখা থাকুক না কেন, বহুদর্শী বাৎসায়নও কামসূত্রম্ রচনা করেছেন তাঁর অভিজ্ঞতার আলোকে।
কিন্তু এই জৈন সরাসরি বাৎসায়নের অভিজ্ঞতাপ্রসূত রচনার মূল ভাবনাকে খণ্ডন করছেন দেখে বাৎসায়ন মনে মনে মৃদু বিরক্তি পোষণ করে বললেন, 'দেখুন মানব, আপনি যা বলছেন তা আপনার তত্ত্বকথা আর আমার চৌষট্টি কলার বিষয়টি নিছক তত্ত্বকথা নয়, প্রয়োগের মাধ্যমে তা প্রমাণিত। আমার মনে হচ্ছে, আপনার বক্তব্যের বিপক্ষে তর্কে অবতীর্ণ হওয়া হল বায়ু অথবা ছায়ার সঙ্গে অলীক যুদ্ধে শামিল হওয়া।'
বাৎসায়নের বক্তব্যের শ্লেষ অনুধাবন করতে পারলেন অবগুণ্ঠনধারী। একটু চুপ করে থেকে শান্ত স্বরে তিনি বললেন, 'আমার বক্তব্যে আপনি আহত হলে তার জন্য আমি দুঃখিত। তবে সত্যটা সব সময়েই সত্য। আমি জানি আপনি অনেক পরিশ্রম করে আপনার অভিজ্ঞতার আলোকে এ গ্রন্থ রচনা করেছেন। আপনার গ্রন্থে বিবৃত রতিক্রীড়ার কলাকৌশল বিষয়ক অংশগুলি সাধারণ নর-নারীর জীবনের জন্যই অতীব মূল্যবান। আমার অনুমান বাৎস্যায়ন রচিত এই গ্রন্থটি ভবিষ্যতের মানুষের কাছেও অতীব মূল্যবান গ্রন্থ হিসাবে পরিগণিত হবে। দেশ-কালের গণ্ডির সীমারেখা অতিক্রম করে হাজার বছর পরেও মানুষের কাছে সমাদৃত হবে। সেকারণেই আমার অনুরোধ এ গ্রন্থ যেন ত্রুটিযুক্ত না হয়। সত্যের আলোকে আলোকিত হয়।'
বাৎসায়ন বললেন, 'আমার ভাবনাকে সত্যের আলোতে আলোকিত করার পন্থা আপনার জানা আছে কি? আপনার এই অবগুণ্ঠনের মতো আড়াল থেকে নয়, ফলিত বিদ্যার মাধ্যমে যদি আপনি আপনার বক্তব্য প্রমাণ করতে পারেন তবে নিশ্চিতভাবে আমি আমার ভাবনায় পরিবর্তন আনব।'
বাৎসায়নের কথা শুনে কিয়ৎক্ষণ নিস্তব্ধ থেকে মানব বললেন, 'ঠিক আছে। আমি আপনার প্রস্তাবে সম্মত।'
বাৎসায়ন প্রশ্ন করলেন, 'কোন পন্থা অবলম্বন করে আপনি প্রমাণ করবেন, ধর্মের স্থান কামের শীর্ষে?'
মানব বললেন, 'আপনি চৌষট্টি কলায় পারদর্শী কোনো নারীকে নির্বাচন করুন। সে যদি আমার নির্বাচিত পুরুষকে বশীভূত করতে পারে, কামের কাছে তাকে আত্মসমর্পণ করাতে পারে, তবে আমি আমার ভাবনার অসারতার জন্য আপনার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করব। আর বিপরীত ঘটলে আপনি আপনার ভাবনার পরিবর্তন ঘটিয়ে আপনার এই মহামূল্যবান গ্রন্থটিকে ভাবীকালের জন্য ত্রুটিমুক্ত করবেন।'
বাৎসায়ন বললেন, 'উত্তম প্রস্তাব। আপনার আহ্বান গ্রহণে আমি সম্মত। আমার বর্ণিত চৌষট্টি কলায় পারঙ্গম নারীর কাছে, প্রাকৃতিক নিয়মে বীর্যস্খলনে অক্ষম অর্থাৎ শিশু ও অতিবৃদ্ধ ব্যতিরেকে যে কোনো পুরুষ আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য। আমি অপানাকে কথা দিলাম, ''চৌষট্টি কলা'' যদি অভ্রান্ত বলে প্রমাণিত হয়, তবে উপসংহারে নয়, কামসূত্রম্ গ্রন্থের ভূমিকা নতুনভাবে রচনা করব আমি। ব্রাহ্মণের প্রতিশ্রুতি মিথ্যা হবে না।'
একটু থেমে তিনি জানতে চাইলেন, 'আপনার পরিকল্পনা রূপায়ণের জন্য আমরা মিলিত হব কীভাবে?'
অবগুণ্ঠনধারী বললেন, 'আজ যেমন মিলিত হয়েছি, তেমনই আগামীকাল সূর্যাস্তের পর আমরা এই স্থানেই মিলিত হব।'
বাক্যালাপ সমাপ্ত। তাই এবার উঠে দাঁড়ালেন তাঁরা দুজন। বিদায় নেবার আগে শিষ্টাচার মেনে পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে মাথা নত করলেন।
সোপানশ্রেণি বেয়ে এরপর উঠতে শুরু করলেন ব্রাহ্মণ মল্লিনাগ—বাৎসায়ন। সোপানের শীর্ষদেশে পৌঁছে একবার নীচের দিকে তাকালেন বাৎসায়ন। তিনি দেখলেন, সেই অবগুণ্ঠনধারী অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছেন নদীবক্ষের অন্ধকারের মধ্যে। ব্রাহ্মণ বাৎসায়ন এরপর সন্নিকটে তাঁর বাসস্থানের দিকে এগোলেন। সেদিকে পদসঞ্চালন করতে করতে বাৎসায়নের স্মরণে এল এক নারীর কথা। মনে মনে ভাবলেন, 'হ্যাঁ। ওই নারীই এ কার্য সম্পাদনের উপযুক্ত নায়িকা।'
পরদিন যখন সূর্যোদয়ের আগমনবার্তা জানিয়ে আকাশে শুকতারা ফুটে উঠল, তখন অন্য দিনের মতো বাটিকা ত্যাগ করে একই ঘাটে অবগাহনের জন্য উপস্থিত হলেন ব্রাহ্মণ বাৎস্যায়ন। সোপানের শেষ ধাপের পর কিছুটা কাদামাটি। সে জমি অতিক্রম করে তিনি গঙ্গাবক্ষে নামলেন অবগাহনের জন্য। পাটলিপুত্র নগরীতে অবস্থানের সময়েও প্রত্যহ তিনি এমনই সময়ে নদীতে অবগাহন করেন। তাঁর স্নানকার্য যখন সম্পন্ন হল, ঠিক সেই সময়ে সূর্যদেব উদিত হলেন গঙ্গাবক্ষে। বুকজলে দাঁড়িয়ে ব্রাহ্মণ করজোড়ে বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণ করলেন নবারুণের উদ্দেশে।
সূর্যস্তুতি করার পর তিনি পাড়ে উঠে এলেন। কাদাজমি পার হয়ে তিনি সোপানের দিকে এগোতেই সেই নরম মাটিতে পদচিহ্ন চোখে পড়ল তাঁর। সোপানশ্রেণির শেষ ধাপ থেকে সেই মনুষ্যপদচিহ্ন এগিয়ে গিয়ে হারিয়ে গেছে গঙ্গাবক্ষে। এই পদচিহ্ন ব্রাহ্মণের নিজের নয়। পদচিহ্নের গভীরতার জন্য জোয়ারের জল সম্পূর্ণ সে চিহ্ন মুছে দিতে পারেনি। জল সরে যাবার পরও আবছাভাবে মাটির বুকে জেগে আছে সেই চিহ্ন।
এ কার পদচিহ্ন? এই নির্জন ঘাটে তো বাৎসায়ন ভিন্ন অন্য কেউ অবগাহন করেন না। বাৎসায়নের মনে পড়ল, গতকাল তিনি ঠিক এই স্থান দিয়েই সেই জৈন সন্ন্যাসীকে নদীবক্ষে নেমে যেতে দেখেছিলেন। ঘটনাটা স্মরণে আসায় বুঝতে পারলেন এ পদচিহ্ন অবগুণ্ঠনধারী সেই জৈনেরই পদচিহ্ন হবে।
কিন্তু মাটির দিকে তাকিয়ে আর একটি বিষয় অবলোকন করে বিস্মিতও হলেন তিনি। পদচিহ্নগুলি নদীবক্ষে নেমে গেলেও নদী থেকে কোনো পদচিহ্ন ওপর দিকে উঠে আসেনি! অবশ্য এরপরেই বাৎসায়নের মনে হল অনেকেই এক ঘাটে অবগাহন করতে নেমে সন্তরণ করে অন্য ঘাটে গিয়ে ওঠেন। কিছুটা তফাতে তফাতেই গঙ্গাবক্ষে নানা ঘাট। ওই মানব হয়তো বা তেমনই কোনো ঘাটে গিয়ে উঠেছেন।
কিছু সময়ের মধ্যেই বাৎসায়ন ফিরে এলেন তাঁর কক্ষে। সিক্ত বসন পরির্বতন করে তিনি অন্য বসন পরিধান করতে শুরু করলেন। তবে তা বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণের বসন নয়। বণিকের ছদ্মবেশ। ছদ্মবেশ ধারণ করেই তিনি পাটলিপুত্র নগরী থেকে বারাণসী নগরীতে এসে উপস্থিত হয়েছেন।
পরনে দীর্ঘ ঝুলের রঙিন রেশমের কারুকাজ করা চওড়া কোমরবন্ধনী, কণ্ঠে তদ্রূপ উত্তরীয় ও মুক্তামালা ধারণ করলেন। শিখামোচন করে তিনি পরিধান করলেন রত্নশোভিত মস্তকবন্ধনী। তার আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণের শিখা সম্মিলিত মুণ্ডিত মস্তক। ললাটে সমান্তরাল ত্রি-তিলক রচনার পরিবর্তে গ্রহণ করলেন শুধু একটি চন্দনফোঁটা।
সর্বশেষে কাষ্ঠ নির্মিত খড়মের পরিবর্তে পায়ে দিলেন চর্ম পাদুকা। রচিত হল সম্ভ্রান্ত বণিকের ছদ্মবেশ। বণিককুল প্রায়শই এই নগরীতে এসে উপস্থিত হন বাণিজ্য লাভের সন্ধানে। সাজ সম্পন্ন হলে বাৎসায়ন তাঁর বাসস্থান ত্যাগ করে রওনা হলেন তাঁর গন্তব্যের উদ্দেশে। ভোরের রাঙা আলোয় তখন চারিদিক উদ্ভাসিত।
বৈদিক শাস্ত্রমতে পৃথিবীর প্রাচীনতম জনপদ কাশী রাজ্যের এই বারাণসী নগরী। এই নগরীর প্রতিষ্ঠাতা স্বয়ং দেবাদিদেব মহাদেব। জ্যোতির্লিঙ্গ রূপে তিনি অবস্থান করেন গঙ্গাতীরবর্তী নগরীর গগনচুম্বী স্বর্ণমন্দিরে।
বিশ্বেশ্বরের এই আবাসস্থলে তাঁর দর্শন লাভ করে ব্রাহ্মণহত্যা ও ভ্রাতৃহত্যার পাপ থেকে মুক্ত হবার জন্য উপস্থিত হয়েছিলেন পঞ্চপাণ্ডব। বিশ্বনাথ যে নগরীতে অবস্থান করেন, সে নগরী কেউ তাঁর অধিকারে নিতে চাইলে বিশ্বনাথের অভিশাপে সেই নৃপতির ধ্বংস অনিবার্য। তাই ষোড়শ মহাজনপদের বৃহৎ নৃপতিকুল কেউ এ নগরী নিজ অধিকারে নেবার জন্য উদ্যত হলেন না। এমনকী পরম শক্তিধর মৌর্য সম্রাটও নন। তাই নগরীর শান্তি বিঘ্নিত হয় না। নৃপতি অবশ্য একজন এখানে আছেন, কাশীনরেশ ধ্রুবলোক। তিনি বিশ্বনাথের প্রতিনিধি রূপে, তাঁর একান্ত সেবক রূপে এ নগরী শাসন করেন। উত্তরে তক্ষশীলা থেকে একটি সড়ক এসে মিশিছে এখানে। আর অপর দিকে থেকে অর্থাৎ পাটলিপুত্র নগরী থেকেও একটি রাজপথ এসে উপস্থিত হয়েছে এই নগরীতে।
এই দুই মহাসড়ককে সংযুক্ত করেছে বারাণসী। সহস্র বছর ধরে এই মহাসড়কপথ বেয়েই এই নগরীতে উপস্থিত হন নানা মানুষ। ঐশ্বর্যশালী সম্রাট থেকে ছিন্নবসন পরিহিত ভিক্ষুক, বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণ থেকে শূদ্র ব্যাধ, জৈন, বৌদ্ধ নানা ধর্মাবলম্বী মানুষ, নানা পেশার নর-নারী।
গঙ্গাতীরবর্তী বাসস্থান পরিত্যাগ করে বাৎস্যায়ন এসে উপস্থিত হলেন সেই রাজপথে। ভোরের আলোতে জেগে উঠতে শুরু করেছে সহস্র বছরের প্রাচীন নগরী। রাস্তার দু-পাশে গালার প্রলেপ দেওয়া কাষ্ঠনির্মিত অথবা প্রস্তরনির্মিত প্রাসাদের কারুকার্যগুলি সূর্যকিরণে ঝিলিক দিচ্ছে।
বিরাট বিরাট প্রাসাদগুলির অভ্যন্তরের হস্তীশালা, অশ্বশালা থেকে ভেসে আসছে বৃংহিত অথবা হ্রেষারব। আলোর স্পর্শে চঞ্চল হয়ে উঠেছে প্রাণীগুলি। রাজপথেও নামতে শুরু করেছে জনজীবন। কেউ অশ্বপৃষ্ঠে, কেউ চতুর্দোলায়, কেউ বা পদব্রজে যাত্রা শুরু করেছে আপন আপন কর্মোপলক্ষে।
তবে শেষোক্ত ব্যক্তিদের অধিকাংশেরই গন্তব্য স্নানঘাটগুলি। তারা পুণ্যার্থী। গঙ্গাস্নানে দেহ-মন পবিত্র করে বিশ্বনাথ দর্শন করে তার স্বর্গবাসের পথ প্রশস্ত করতে চায়।
বণিকের ছদ্মবেশে সেই জনতার সঙ্গে মিশে বাৎসায়নও এগোলেন সেই পথ ধরে। তাঁর পরিচিত পথ। পথ যত এগোতে লাগল, জনসমাগম তত বৃদ্ধি পেতে লাগল।
বেশ কিছুটা পথ অতিক্রম করার পর তাঁর প্রত্যাশা মতোই তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠল দুটো গগনচুম্বী স্থাপত্যের স্বর্ণমণ্ডিত শীর্ষদেশ। তাদের মাথায় নিশান উড়ছে। দুটি স্থাপত্যের মধ্যে যেটির শীর্ষদেশ অধিক উচ্চ, মাথায় স্বর্ণনিশান ও ত্রিশূল সমৃদ্ধ, সেটি এ নগরীর শ্রেষ্ঠ স্থান বিশ্বনাথ মন্দির। অপরটি, যার মাথায় নীলকণ্ঠ নিশান উড়ছে, সেটি কাশীনরেশের প্রাসাদ। দুটিরই অবস্থান পরস্পরের নিকটে।
দুই স্থানই ব্রাহ্মণ বাৎসায়নের বিশেষ পরিচিত। তবে মন্দির বা রাজপ্রাসাদ পর্যন্ত গেলেন না তিনি। মন্দিরের কিছু আগেই একটি পথ এগিয়েছে নদীর দিকে বিশাল এক ঘাটের উদ্দেশে। পথের পাশে সার বেঁধে বসে আছে ভিক্ষুক-ভিক্ষুণীরা। এই মানুষগুলির অধিকাংশই বৃদ্ধ অথবা পঙ্গু। মহাজনপদের বিভিন্ন রাজ্য থেকে এরা এখানে উপস্থিত হয়েছে মোক্ষলাভের জন্য। দরিদ্র হলেও মোক্ষলাভের বাসনা সবারই থাকে। যতদিন না তাদের মৃত্যু হচ্ছে ততদিন এদের এভাবেই এখানে ভিক্ষাবৃত্তি করে কাটাতে হবে শেষ দিনের অপেক্ষায়। বাৎসায়ন নিজের অভিজ্ঞতায় জানেন, বৃদ্ধা ভিক্ষুণীদের মধ্যে অনেকে এমন আছে যারা যৌবনে নিম্নশ্রেণীর দেহপসারিণী বেশ্যা ছিল। সময় তাদের জীবন থেকে রূপ-যৌবন-শক্তি সব হরণ করে নিয়েছে। এখন শুধুমাত্র তাদের সম্বল ভিক্ষাপাত্র।
এ পথে বর্তমানে যাঁরা যাওয়া-আসা করছেন তাঁরা হয় ব্রাহ্মণ, নয় শহরের সম্পদশালী নাগরিক অথবা রাজকর্মচারী। সূর্যোদয়ের পর একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত এ ঘাটে সাধারণ নাগরিকদের প্রবেশাধিকার নেই। কারণ, কাশীনরেশ প্রত্যহ এখানে স্নান সেরে বিশ্বনাথ মন্দিরে পূজা দিতে যান। তিনিই মন্দিরে প্রথম পূজাদানের অধিকারী। তিনি পুণ্যস্থান সেরে ফিরে যাবার পর অবশ্য ঘাট সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত হয়ে যায়।
বাৎসায়নের পরনে সম্ভ্রান্ত পোশাক। তাঁকে কেউ ঘাটের পথে এগোতে বাধা দিল না। তিনি ঘাটে গিয়ে উপস্থিত হলেন।
দশাশ্বমেধ ঘাট। একদা এই ঘাটে প্রজাপতি ঋষি ব্রহ্মার পৌরোহিত্যে অশ্বমেধ যজ্ঞ সম্পন্ন হয়েছিল। তিনি দশটি অশ্ব বলি প্রদান করেছিলেন এই ঘাটে। তাই এর নাম দশাশ্বমেধ। এ ঘাট দেবতা, ঋষি-মুনি, নৃপতি-সম্রাটদের পদধূলিতে ধন্য। সহস্র-সহস্র বছর ধরে কত পুণ্যাত্মা মানুষ যে এই ঘাট বেয়ে গঙ্গাবক্ষে অবগাহন করেছেন তা শুধু মহাকালের পক্ষেই বলা সম্ভব। এই প্রাচীন নদীর প্রাচীনতম ও সর্ববৃহৎ ঘাট হল এই দশাশ্বমেধ ঘাট।
ঘাটের দু-পাশে দুটি ক্ষুদ্রাকৃতি প্রাসাদ আছে। এ প্রাসাদ দুটি ব্যবহৃত হয় অতিথিশালা রূপে। এর একটি ব্যবহার করেন কাশীনরেশ, আর অপরটি সম্ভ্রান্ত মানুষদের জন্য। আর এই দুটি প্রাসাদের মধ্যে রয়েছে তিনশত হাত বিস্তৃত মর্মর শোভিত একটি স্থান। সেখান থেকে সোপানশ্রেণি নেমে গেছে গঙ্গাবক্ষে। সোপানশ্রেণির প্রতিটি ধাপের প্রস্থ অন্তত কুড়ি হাত। ধাপগুলির দু-পাশে সূর্যতাপ থেকে রক্ষা পাবার জন্য ছত্রী বসানো আছে।
মর্মরনির্মিত চাতালে অবশ্য এই মুহূর্তে ভিক্ষুকদের প্রবেশের অধিকার নেই। সোপানশ্রেণির প্রশস্ত প্রথম ধাপটির একপাশে দাঁড়িয়ে আছেন কাশীনরেশকে আশীর্বাদ জানাবার জন্য, তাঁর অনুগ্রহ লাভ করার জন্য শিখাধারী ব্রাহ্মণকুল, আর অন্যপাশে দণ্ডয়ামান রাজ সন্দর্শনের জন্য কিছু অভিজাত ব্যক্তি।
তাঁদের পোশাক, মস্তকবন্ধনীর বিভিন্নতা দেখে ব্রাহ্মণ বাৎস্যায়ন অনুমান করলেন এই ব্যক্তিবর্গ বিভিন্ন মহাজনপদের বাসিন্দা। তিনি সেই দলে গিয়ে দাঁড়িয়ে কাশীনরেশের আগমনের প্রতীক্ষা করতে লাগলেন। অবশ্য তিনি কাশীনরেশের দর্শনলাভের অভিলাষে এ স্থানে উপস্থিত হননি।
তিনি এখানে এসে উপস্থিত হয়েছেন অন্য একজনের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য। সে কাশীরাজের প্রধানা গণিকা। চন্দ্রকলা।
বাৎসায়ন তাঁর রচিত গ্রন্থটিকে সাতটি অংশে বিভক্ত করেছেন। অধিকরণগুলি হল—সাধারণাধিকরণ, কন্যাসম্প্রযুক্তকারিকরণ, ভার্যাধিকারি-কাধিকরণ, বৈশিকাধিকরণ, পারকাধিকরণ, সাম্প্রযোগিকাধিকরণ ও ঔপনিষাদিকাধিকরণ। এর মধ্যে চতুর্থ অধিকরণের অর্থাৎ 'বৈশিকম'-এর পঞ্চম অধ্যায়তে বেশ্যাদের শ্রেণিবিভাগ রচনা করেছেন তিনি।
বেশ্যারা তিন প্রকার। যারা তাদের আয়ের অংশবিশেষ মন্দির নির্মাণ, তড়াগ অর্থাৎ জলাশয় খনন, আরাম অর্থাৎ উদ্যান নির্মাণ, সেতু নির্মাণ অর্থাৎ সৎ কাজে ব্যয় করে তারা হল গণিকা। এরা কলাবিদ্যায় পরাঙ্গম। যে সব বেশ্যারা কলাবিদ্যায় পারঙ্গম নয়, শুধুমাত্র রূপ দ্বারা পুরুষদের আকৃষ্ট করে এবং সৌন্দর্যমণ্ডিত সামগ্রী প্রীতি আছে তারা হল রূপজীবা। আর যাদের শুধু ধনের প্রতি মোহ আছে তারা হল 'কুম্ভদাসী' বা 'চাকরানি বেশ্যা'।
গণিকা, রূপজীবা আর কুম্ভদাসী এই তিন বর্গের বেশ্যাদের আবার প্রতিটি বর্গ উত্তম, মধ্যমা ও অধমায় বিভক্ত। বেশ্যাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠা হল উত্তম গণিকা। আর নিকৃষ্টতমা হল অধমা কুম্ভদাসী।
গণিকারা কলায় পারদর্শী হয়। অধমা গণিকা ষোলো কলায়, মধ্যমা গণিকা বত্রিশ কলায় আর উত্তম গণিকা বা সর্বশ্রেষ্ঠ গণিকা চৌষট্টি কলাতেই পরাদর্শী হয়।
চন্দ্রকলা নাম্নী যে গণিকার জন্য বাৎসায়ন প্রতীক্ষারত, সে উত্তম গণিকা। চন্দ্রকলার জন্ম পাটলিপুত্রতে। বাৎসায়ন চৌষট্টি কলায় শিক্ষা দিয়েছিলেন তাকে। কিন্তু পাটলিপুত্রয় উত্তম গণিকার আধিক্যহেতু চন্দ্রকলা কাশীরাজের বারাণসীতে এসে উপস্থিত হয়।
উত্তম গণিকাদের প্রধানা রাজদরবারের অমাত্য, সেনাপতিদের মতোই সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত হয়। মন্ত্রীপরিষদের সভাতেও তার মতামত প্রদানের অধিকার থাকে।
রাজা বা সম্রাটরা যখন পুণ্যকর্মে, মন্দিরে বা যজ্ঞস্থলে যান তখন প্রধানা গণিকারাই তাঁর মস্তকে রাজছত্র ধরে থাকে। মৌর্য সম্রাট এ প্রথা চালু করেছিলেন। কিছুদিনের মধ্যেই এই প্রথা ছড়িয়ে পড়েছে অন্য রাজ্যগুলোতেও।
কাশীনরেশ তার ব্যতিক্রম নন। চৌষট্টি কলাতে নিপুণা চন্দ্রকলা বর্তমানে কাশীনরেশ ধ্রুবলোকের প্রধানা গণিকারূপে নিযুক্ত হয়েছে। সে কাশীনরেশের অন্যতম পরামর্শদাতা, তাঁর রাজছত্রবাহক।
হঠাৎ উপস্থিত রাজকর্মচারী ও ব্রাহ্মণদের মধ্যে চঞ্চলতা লক্ষ করলেন ছদ্মবেশী। তাঁর কানে এল বাদ্যযন্ত্রের শব্দ। বুঝতে পারলেন, কাশীনরেশ ধ্রুবলোক দশাশ্বমেধ ঘাটে পদার্পণ করতে চলেছেন। অতি নিকটে পৌঁছে গেল সেই বাদ্যযন্ত্রের শব্দ।
প্রথমে আবির্ভূত হল ভৃত্যের দল। রৌপ্যদণ্ড নির্মিত সম্মার্জনী হাতে পথ পরিষ্কার করতে করতে আসছে তারা। তারপর বাদ্যকারের দল। সেই বাদ্যের তালে এরপর নৃত্যপরিবেশন করতে করতে আসছে একদল নর্তকী।
ঠিক এরপরই দূর থেকেই সোনার রাজছত্র চোখে পড়ল বাৎসায়নের। ক্রমশ এগিয়ে এল সেই রাজছত্র। একদল অস্ত্রধারী রক্ষী ঘিরে রেখেছে কাশীনরেশকে। যদিও তাদের সংখ্যায় খুব বাহুল্য নেই। সেই রক্ষীবলয়ের মধ্যে রয়েছেন তিনজন—কাশীনরেশ ধ্রুবলোক, তাঁর একপাশে রাজব্রাহ্মণ ও কাশীনরেশের ছত্রবাহিকা, প্রধানা গণিকা চন্দ্রকলা। আর কাশীনরেশকে ঘিরে থাকা রক্ষীবাহিনীর পশ্চাতে আসছে বিভিন্ন উপচারবাহী দাস-দাসী।
সর্বশেষে আসছে এক ঐরাবত। তার শরীর মখমলের বসনে আবৃত, গজদন্ত দুটি স্বর্ণ খোলসে খোদিত, পিঠে আছে স্বর্ণসিংহাসন। গঙ্গায় পুণ্যস্নান করে উন্মুক্তপদে বিশ্বেশ্বর মন্দিরে গিয়ে পূজাকার্যাদি সম্প্রদানের পর কাশীনরেশ ওই রাজহস্তীর পিঠে চেপে প্রাসাদে ফেরেন।
সোপানশ্রেণির সন্নিকটে উপস্থিত হলেন কাশীনরেশ ধ্রুবলোক। বাৎসায়ন যার সন্ধানে এখানে উপস্থিত হয়েছেন, তাকেও এবার নিকট থেকে দেখতে পেলেন। সে কাশীরাজের প্রধানা গণিকা, বাৎসায়নের পূর্বপরিচিতা, গণিকা চন্দ্রকলা। স্বর্ণভূষণে সজ্জিতা চন্দ্রকলা যেন সত্যিই চন্দ্রকলার মতোই রূপবতী। মসৃণ গাত্রবর্ণ দুগ্ধ ফেননিভ, স্বর্ণাভ-শুভ্র, জলভরা ঘন মেঘের ন্যায় কুঞ্চিত কেশদাম, অক্ষিদ্বয় যেন সমুদ্রের মতো গভীর, তীক্ষ্ন নাসার নিম্নভাগে রক্তিম ওষ্ঠদ্বয় যেন ফুলের নরম পাপড়ির মতো। সোনার সুতোর রেশম বন্ধনী দ্বারা তাঁর বক্ষ আবৃত থাকলেও সেই বক্ষদ্বয়ের গঠন যে আকাশের দিকে মুখ তুলে জেগে থাকা শঙ্খের ন্যায়, তা অভিজ্ঞ ব্যক্তিমাত্রই অনুমান করতে পারেন।
স্বয়ং সূর্যদেবও যেন আকাশ থেকে চেয়ে আছেন ক্ষীণ কটিদেশ, মৃদঙ্গের মতো ভারী নিতম্ব সমৃদ্ধ এই অসামান্যা নারীর দিকে।
কাশীনরেশ উপস্থিত হতেই উপস্থিত ব্রাহ্মণকুল ও তাঁর দর্শনপ্রার্থীরা তাঁর নামে জয়ধ্বনি দিতে শুরু করলেন। কাশীনরেশ সোপানশ্রেণি বেয়ে নামার আগে চত্বরে কয়েকমুহূর্তের জন্য থামলেন। তাঁর কাছে এবার উপস্থিত হল পরিচারিকারা। নৃপতি নদীতে অবগাহন করবার পূর্বে তাঁর শরীরে সুগন্ধী তৈল মর্দন করবে, স্নানরত অবস্থায় অঙ্গ মার্জন করবে, স্নান শেষে উঠে আসার পর কাশীনরেশের শরীরে চন্দন, সুগন্ধী লেপন করে পট্টবস্ত্র, অলংকারে সজ্জিত করবে।
এদেরকে নিয়ে কাশীনরেশ এগোলেন সোপানশ্রেণির দিকে। ছত্রবাহিকা গণিকা চন্দ্রকলা সোপানের প্রথম ধাপ পর্যন্ত এল ঠিকই, কিন্তু সে নীচে নামার জন্য অগ্রসর হল না।
সেবিকা পরিবৃত হয়ে নদীবক্ষের দিকে অগ্রসর হলেন কাশীনরেশ। সোপানের দু-পাশে দাঁড়ানো অভিজাত ব্যক্তিবর্গ ও ব্রাহ্মণকুল তাঁর উদ্দেশে মাথা ঝুঁকিয়ে প্রণাম জানাতে লাগল। ব্রাহ্মণ বাৎসায়নও কাশীনরেশকে মাথা ঝুঁকিয়ে প্রণাম জানালেন। কাশীনরেশ ধ্রুবলোক তাঁর দিকে দৃষ্টিপাত করলেও সুপরিচিত প্রসিদ্ধ ব্রাহ্মণ বাৎসায়নকে ছদ্মবেশের কারণে চিনতে পারলেন না।
ততক্ষণে চন্দ্রকলা রাজছত্র এক ভৃত্যের হাতে দিয়ে একটু তফাতে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। কাশীনরেশ অবগাহন সম্পন্ন করে উঠে আসার পর সে আবার রাজছত্র গ্রহণ করে কাশীরাজকে মন্দিরে নিয়ে যাবে।
এই মধ্যবর্তী সময়ে প্রধানা গণিকা চন্দ্রকলা আরও একটি কর্ম সম্পাদন করে থাকে। কাশীনরেশের সঙ্গী হিসাবে এ সময় দশাশ্বমেধ ঘাটে উপস্থিত কিছু অভিজাত মানুষ ও ব্রাহ্মণকে প্রত্যহ রাজদরবারে কাশীনরেশের সম্মুখে উপস্থিত হবার ব্যবস্থা করে দেয় সে।
দুজন রাজভৃত্য এসময় গণিকা চন্দ্রকলার পার্শ্বে উপস্থিত হয়। তাদের একজনের হাতের থালায় থাকে শুষ্ক শাল্মলীপত্র, মসিপাত্র ও খাগের লেখনী। অপরজনের হাতের থালায় থাকে কাশীরাজের বিশেষ চিহ্ন অঙ্কিত রৌপ্য ফলক। কাশীরাজের দরবারে তাঁর সঙ্গে আগ্রহী সাক্ষাৎপ্রার্থীরা শাল্মলীপত্রে নিজের পরিচয় লিখে তা তুলে দেয় গণিকা চন্দ্রকলার হাতে।
তা পাঠ করে চন্দ্রকলা যে ব্যক্তিকে রাজসন্দর্শনের উপযুক্ত মনে করবে তার হাতে তুলে দেওয়া হয় দরবারে প্রবেশ অনুমতিপত্র অর্থাৎ কাশীনরেশের চিহ্নশোভিত রৌপ্যপত্র। তবে আবেদনকারীদের মধ্যে প্রতিদিন মাত্র কয়েকজনই এই সৌভাগ্যলাভ করেন। এদিনও এ ব্যবস্থার ব্যতিক্রম হল না।
কাশীনরেশ অবগাহনের জন্য নদীবক্ষে নেমে যাবার পর কাশীনরেশের সঙ্গে সাক্ষাৎ অভিলাষী কিছু অভিজাত শ্রেণির লোক আর ব্রাহ্মণের সঙ্গে ওপরের চাতালে উঠে এলেন বাৎসায়ন। যেখানে দুই ভৃত্যকে নিয়ে দণ্ডায়মান গণিকা চন্দ্রকলা। বেশ কয়েকজন অভিজাত, ব্রাহ্মণ শাল্মলীপত্রে নিজের পরিচয় লিখে উপস্থিত হলেন গণিকা চন্দ্রকলার সামনে। উপযুক্ত মনে না হওয়াতে তাঁদের প্রায় সবাইকেই হাতের ইশারায় ফিরিয়ে দিল চন্দ্রকলা।
একসময় ব্রাহ্মণ বাৎসায়ন শাল্মলীপত্রে সাংকেতিক ভাষাতে নদীতীরবর্তী বর্তমান বাসস্থানের বিবরণ লিখে নিয়ে উপস্থিত হলেন গণিকা চন্দ্রকলার সামনে। পত্রে লেখা আছে চন্দ্রকলা যেন সাক্ষাৎ করে তাঁর সঙ্গে।
কামশাস্ত্র রচয়িতা ব্রাহ্মণ বাৎসায়নের নিকট গণিকা চন্দ্রকলা যে কলাবিদ্যার শিক্ষা লাভ করেছে, তার মধ্যে অন্যতম হল সাংকেতিক গুপ্তভাষার পাঠোদ্ধার। গণিকা প্রথমে তার ছদ্মবেশী আচার্যকে চিনতে না পারলেও বাৎস্যায়নের সাংকেতিক ভাষা পাঠ করে মৃদু চমকে উঠে তাকাল বাৎসায়নের দিকে। রাজগণিকা এবার চিনতে পারল তার ষোড়শ কলার শিক্ষাগুরু বাৎসায়নকে।
বহুদিন পর আচার্য ব্রাহ্মণের দর্শন পেয়ে পুলকিত, রোমাঞ্চিত বোধ করল চন্দ্রকলা। ভূমিষ্ঠ হয়ে আচার্যকে প্রণাম করার বাসনা হলেও মনের ভাব মনেই রাখল বুদ্ধিমতী গণিকা চন্দ্রকলা। সে শুধু তার শিক্ষাগুরুর উদ্দেশে নিম্নস্বরে একটা শব্দ উচ্চারণ করল, 'শেষ প্রহর।'
এ শব্দর অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝতে অসুবিধা হল না বাৎসায়নের। চোখের ইশারায় গণিকার কথায় সম্মতি প্রকাশ করে দশাশ্বমেধ ঘাট ত্যাগ করে নিজের বাসস্থানের উদ্দেশে দ্রুত নিষ্ক্রান্ত হয়ে গেলেন তিনি।
দশাশ্বমেধ ঘাট থেকে গৃহে ফিরে আহারাদি সাঙ্গ করে নিজের রচিত পুঁথি খুলেই বসেছিলেন ব্রাহ্মণ বাৎসায়ন। কামসূত্রমের ষষ্ঠ অধিকরণ অর্থাৎ সাম্প্রযোগিক অধিকরণ মনোযোগ সহকারে পর্যবেক্ষণ করছিলেন তিনি।
কামসূত্রমের সাতটি আধিকরণের মধ্যে এই অধিকরণটি সর্বপেক্ষা জনপ্রিয়তা লাভ করেছে পাঠকবর্গের কাছে, সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের কাছে। এই অধিকরণের দশটি অধ্যায়ে তিনি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিবৃত করেছেন, কীভাবে যৌন মিলনের জন্য প্রস্তুত হতে হয়, লিখেছেন বিভিন্ন আলিঙ্গন বা চুম্বন পদ্ধতি যা বিপরীত লিঙ্গের নর বা নারীর মধ্যে তীব্র কামভাব জাগিয়ে তোলে। বিশেষত রতিক্রয়া বা সংগমের বিভিন্ন পদ্ধতিগুলোও এই অধিকরণের মূল উপজীব্য বিষয়। দীর্ঘকাল ধরে বাৎসায়ন সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-গোত্রের মানুষের যৌনক্রীড়া, রতিক্রিয়া নানাস্থানে প্রত্যক্ষ করেছেন, আর তারই আলোকে তিনি রচনা করেছেন কামসূত্রম্ গ্রন্থের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ অংশটি।
পুঁথির পাতা পাঠ করতে করতে সময় এগিয়ে চলল। নিজের রচনা পাঠ করতে করতে ব্রাহ্মণ বেশ তৃপ্তিবোধ করছিলেন। তাঁর মনে হল, ওই অবগুণ্ঠনধারী জৈনের একটা কথা হয়তো ঠিক। হাজার হাজার বছর পরও তাঁর রচিত কামসূত্রম্ গ্রন্থটি, বিশেষত গ্রন্থের এই অংশটি অন্তত মানুষের কাছে সমাদৃত থাকবে।
দিনের প্রতিটি প্রহরের সূচনায় ঘণ্টাধ্বনি করা হয় নগরীর কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত একটি সুউচ্চ স্তম্ভের মাথা থেকে। শেষ দুপুরে বাইরে সূর্যালোক যখন নরম হতে শুরু করল, তখন দিনের শেষ প্রহরের ঘণ্টাধ্বনি কানে এল বাৎসায়নের। পুঁথির পাতাগুলো সযত্নে গোছাতে শুরু করলেন তিনি। আর এর কিছু সময়ের মধ্যেই মৃদু করাঘাতের শব্দ শুনে দ্বার উন্মুক্ত করলেন ব্রাহ্মণ বাৎসায়ন। এক অবগুণ্ঠিতা এসে উপস্থিত হয়েছে তাঁর দ্বারপ্রান্তে। তার হাতে ধরা রেশম আচ্ছাদিত এক স্বর্ণপাত্র। আচার্য সন্দর্শনের উপঢৌকন।
তার পরিচয় বুঝতে পেরে ব্রাহ্মণ বাৎসায়ন তাকে কক্ষের অভ্যন্তরে প্রবেশ করিয়ে কপাট বন্ধ করলেন। সে নারী প্রথমে তার মুখের আচ্ছাদন উন্মোচন করে স্বর্ণপাত্রটি বাৎসায়নের হাতে সমর্পণ করল। পাত্রের মধ্যে রাখা আছে, ফল, মিষ্টান্ন-পিষ্টক ও একটি স্বর্ণখণ্ড।
পাত্রটি ব্রাহ্মণের হাতে সমর্পণ করার পর গণিকা চন্দ্রকলা ভূমিশয্যা গ্রহণ করে আচার্যকে প্রণাম জানাল। বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণ বাৎসায়ন আশীর্বাদের মুদ্রায় তাঁর দক্ষিণ হস্ত তুলে ধরে আশীর্বাদ করলেন তাকে। উঠে দাঁড়াল গণিকা চন্দ্রকলা। ব্রাহ্মণের প্রতি শ্রদ্ধাবশত তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে ভূমির দিকে তাকিয়ে রইল চন্দ্রকলা। গণিকা চন্দ্রকলার আনত মুখমণ্ডলের দিকে তাকালেন বাৎসায়ন। চন্দ্রকলা পাটলিপুত্র ত্যাগ করে বারাণসীতে চলে আসার ফলে বেশ কয়েক বৎসর গুরু-শিষ্যার এমন নিভৃত সাক্ষাতের সুযোগ ঘটেনি।
গণিকাদের শুধু চৌষট্টি কলাতে পারঙ্গম হলেই হয় না, যে গুণগুলো তাদের অন্য শ্রেণির বেশ্যাদের মতো ধরে রাখতে হয় তা হল রূপ, যৌবন, মাধুর্য, স্থৈর্য, শরীরের শুভ লক্ষণ ও অকপটতা। গণিকা চন্দ্রকলার মুখমণ্ডল উত্তমরূপে নিরীক্ষণ করার পর ব্রাহ্মণ বুঝতে পারলেন এই পঞ্চ বৎসরে চন্দ্রকলার রূপ অনেকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। হয়তো বা তা রাজ-অনুগ্রহে সুখ, শান্তি, নিরাপত্তা, সম্পদের প্রাচুর্যের কারণেই।
চন্দ্রকলা যখন চতুর্দশ বৎসরে পদার্পণ করেছিল তখন আরও কয়েকজন বিভিন্ন বয়সি নারীর সঙ্গে তাকে ষোড়শ কলার পাঠ দান করেন বাৎসায়ন ও তাঁর অধীনস্থ বিভিন্ন দক্ষতায় পারদর্শী পুরুষ ও গণিকারা। চন্দ্রকলা যখন অষ্টাদশ বৎসরে পদার্পণ করে তখন তার পাঠগ্রহণ সম্পন্ন হয়। অতঃপর সে পাটলিপুত্র নগরীতে তিন বৎসর অতিক্রম করে এই বারাণসী নগরীতে এসে উপস্থিত হয়।
বাৎসায়ন হিসাব করে দেখলেন চন্দ্রকলার বয়ঃক্রম বর্তমানে পঁচিশ বৎসর। পূর্ণচন্দ্রের মতোই প্রস্ফুটিত চন্দ্রকলার রূপ-যৌবন। তাকে ভালোভাবে নিরীক্ষণের পর সেই কক্ষে রাখা দুটি কাষ্ঠাসনের একটির দিকে আঙ্গুলি নির্দেশ করে তার মুখোমুখি অন্য আসনটিতে নিজে উপবেশন করলেন বাৎসায়ন। কাশীরাজের প্রধানা গণিকার মর্যাদা লাভ করার কারণে রাজসভাতে গণিকা চন্দ্রকলা ব্রাহ্মণদের সম উচ্চতার আসনেই বসে।
কিন্তু এক্ষেত্রে বাৎসায়ন তাকে কাষ্ঠাসনে বসতে বললেও সে বাৎসায়নের পদতলে হাঁটু মুড়ে বসল। বাৎসায়ন বুঝতে পারলেন আচার্যের প্রতি এখনও শ্রদ্ধা অটুট আছে চন্দ্রকলার।
তিনি বাক্যালাপ শুরু করলেন চন্দ্রকলার সঙ্গে। চন্দ্রকলাকে নিজের নিভৃতবাসের কারণ জানিয়ে কিয়ৎক্ষণ কুশল বিনিময় করলেন তার সঙ্গে। তারপর গণিকা চন্দ্রকলাকে প্রথম প্রশ্ন করলেন, 'তুমি চৌষট্টি কলার নিয়মিত চর্চায় এখনও নিজেকে ব্যাপৃত রেখেছ তো? রাজসভাতে তোমার বর্তমান পদমর্যাদা তোমাকে তোমার অনুশীলন থেকে দূরে সরিয়ে দেয়নি তো?'
রাজগণিকা একমুহূর্ত থেমে বিনীতভাবে জবাব দিল, 'আচার্য আপনার নির্দেশমতো আমি কখনোই চৌষট্টি কলাবিদ্যার অনুশীলন থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করিনি। শুধু ফলিতভাবে তার অনুশীলনই নয়, আমি নিয়মিতভাবে অবসরে আপনার রচিত কামসূত্রম্ গ্রন্থটি অধ্যয়নও করি।'
বাৎসায়ন, গণিকা চন্দ্রকলাকে পরীক্ষা করার জন্য প্রশ্ন করলেন, 'আমার রচিত গ্রন্থে চুম্বনস্থান নির্দেশক শ্লোক তিনটি বিবৃত করো।'
আচার্যের নির্দেশ শুনে কিছু ভেবে নিয়ে গণিকা চন্দ্রকলা তিনটি শ্লোক বলল—
ললাটালককপোলনয়নবক্ষন্তনোষ্ঠামুখেষু চুম্বন্ম।।
ঊরুসন্ধিবাহুনাভিমূলেষু লাটানাম।।
রাগবশাদ্দেশপ্রবৃত্তেশ্চ অন্তি তানি তানি স্থানানি; ন তু সর্বজনপ্রযোজ্যনীতি বাৎস্যায়নঃ।।
প্রথম শ্লোকটির অর্থ—ললাট, অলক, কপোল, নয়ন, বক্ষ, স্তন, ওষ্ঠ ও মুখের মধ্যে চুম্বন করতে হয়।
দ্বিতীয় শ্লোকের মানে—লাটদেশীয় পণ্ডিতদের মতে, তলপেটে, ঊরুর সংযোগস্থলে, নাভিমূলে এবং পুরুষের লিঙ্গ, নারীর যোনিদেশের উপরিভাগেও চুম্বন করা প্রয়োজন।
আর তৃতীয় শ্লোকের মমার্থ হল, বাৎসায়ন বলছেন, দেশ বিভেদে মানুষের শরীরে যে সব স্থানে অনুরাগজনিত চুম্বন প্রচলিত সেই স্থানেই চুম্বন করা প্রয়োজন। তবে তা সর্বজনের ক্ষেত্রে নয়।
তিনটি শ্লোকই নির্ভুলভাবে বিবৃত করেছে চন্দ্রকলা। কামসূত্র প্রণেতা বাৎসায়ন খুশি হলেন। গণিকা চন্দ্রকলাও তার আচার্যের মুখমণ্ডল দেখে বুঝতে পারল তার শ্লোকগুলি শুনে তিনি সন্তুষ্ট হয়েছেন। চন্দ্রকলা তার শিক্ষাগুরুর উদ্দেশে বলল, 'আচার্য যদি নির্দেশ দেন তবে এই গ্রন্থের যে-কোনো শ্লোক আমি মুখস্থ বলতে পারি। তবে আচার্য যদি এ পরীক্ষা গ্রহণের হেতু ব্যক্ত করেন, তবে আমি আরও আনন্দলাভ করে শ্লোকগুলি ব্যক্ত করতে পারি।'
তার কথা শুনে ব্রাহ্মণ বাৎসায়ন মৃদু হেসে বললেন, 'না, এখন আর শ্লোক বিবৃত করার প্রয়োজন নেই। তুমি যে উত্তমরূপে গ্রন্থের শ্লোকগুলি আত্মস্থ করেছ তা আমার একটি প্রশ্নের উত্তরেই বুঝতে পেরেছি। তবে তোমাকে প্রশ্ন করার হেতু নিশ্চয় আছে। তার জবাব দেবার আগে আমি তোমাকে আরও একটা প্রশ্ন করতে চাই, যা আমার গ্রন্থে লিপিবদ্ধ নেই। আমি জানতে চাই পাটলিপুত্র পরিত্যাগ করে আসার পর কত ধরনের পুরুষের সঙ্গে তুমি রতিক্রীড়ায় মিলিত হয়েছ? কত প্রকার পুরুষের মধ্যে কামোন্মাদনার সঞ্চার করেছ?'
চন্দ্রকলা মাথা নত করে জবাব দিল, 'প্রায় সব বর্ণের, সব ধরনের মানুষের সঙ্গে—ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, সদ্য যৌবনে পদাপর্ণকারী কিশোর থেকে গতযৌবন বার্ধক্যের সীমাতে উপনীত ব্যক্তি, গাত্রবর্ণের বিচারে শুভ্রবর্ণ-মধ্যমবর্ণ-কৃষ্ণবর্ণের ব্যক্তি, দৈর্ঘ্যে দানবাকৃতির থেকে বামন—নানা ধরনের পুরুষের আমি মনোরজ্ঞন করেছি, যারা আমাকে উপযুক্ত অর্থ সম্মান দিতে সক্ষম হয়েছে। তবে যে ব্যক্তির মুখে দুর্গন্ধ আছে, আর যার কুষ্ঠরোগ আছে তেমন কোনো ব্যক্তির সঙ্গে আমি মিলত হইনি। কারণ, আপনার গ্রন্থেও আপনি গণিকাদের এদের সঙ্গে মিলন পরিহার করতে বলেছেন।'
আচার্য বাৎসায়ন এরপর সেই অবগুণ্ঠনধারী জৈনের সঙ্গে তাঁর কথোপকথন ব্যক্ত করলেন, রাজগণিকা চন্দ্রকলার কাছে।
তাঁর কথা শেষ হবার পর চন্দ্রকলা কিঞ্চিৎ বিস্মিতভাবে বলল, 'আপনি বেদজ্ঞ, শাস্ত্রজ্ঞ ব্রাহ্মণ। শুধু কামসূত্রই নয়, বহুবিধ গ্রন্থের প্রণেতা আপনি। যে তক্ষশীলায় শ্রেষ্ঠ পণ্ডিতদের বাস, সেখানেও আপনার সমকক্ষ কেউ নেই যাঁর সর্বক্ষেত্রে এমন পাণ্ডিত্য আছে। তবে ওই অজ্ঞাতকুলশীল জৈনের ভাবনাকে আপনি অতখানি গুরুত্ব দিচ্ছেন কেন? আপনার ভাবনার কোনো অন্যপন্থা হতে পারে না।'
বাৎসায়ন বললেন, 'হ্যাঁ, আমি জানি আমার ভাবনা অভ্রান্ত। আসলে ইতিপূর্বে কেউ আমার ভাবনা সম্পর্কে প্রশ্ন চিহ্ন তোলেননি। অবগুণ্ঠনধারীই প্রথম। তার সন্দেহের নিরসন হওয়া প্রয়োজন, তা সে যত ক্ষুদ্র ব্যক্তি হোক না কেন। নীতিশাস্ত্রে লেখা আছে ক্ষুদ্র পিপীলিকাকেও গুরুত্বদান প্রয়োজন। কারণ, অনেক সময় সে মিষ্টান্ন ভাণ্ড অথবা দুর্যোগের সন্ধান দিতে পারে। সব থেকে বড় কথা, মনে না হয় যে আমি বিরুদ্ধমতকে খণ্ডন করতে অসমর্থ ছিলাম। এ ব্যতীত ওই অবগুণ্ঠনধারীর কথাবার্তার মধ্যে এমন কোনো বিচিত্র দৃঢ়তা ছিল যা নিজের অজান্তেই আমাকে প্ররোচিত করল এই যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে। আর আমার তোমাকেই উপযুক্ত মনে হয়েছে।'
আচার্যের কথা শুনে চুপ করে কিছু যেন ভাবতে লাগল চন্দ্রকলা। তা দেখে বাৎসায়ন বললেন, 'এ কাজে আমাকে সাহায্য করার ব্যাপারে তোমার মনে কি কোনো দ্বিধা আছে? এ কাজের সফলতার ব্যাপারে কি তুমি সংশয়গ্রস্ত? তোমাকে শিক্ষাদানের ব্যাপারে আমার কি কোনো ত্রুটি থেকে গেছিল?'
চন্দ্রকলা সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, 'না আচার্য, না। এ ভাবনাকে আপনি মনে স্থান দেবেন না। আপনার শিক্ষাগ্রহণ করেই আমি সামান্য কুম্ভদাসীর কন্যা থেকে আজ কাশীনরেশের প্রধানা গণিকা। আপনার যে-কোনো ইচ্ছা পূরণের জন্য আমি সর্বদা প্রস্তুত। তা পালন করতে পারলে নিজেকে আমি ধন্য মনে করব। কিন্তু আমি ভাবছি দিবা-রাত্রির কোন সময় আমি আপনার নির্দেশ পালনে ব্রতী হতে পারি? প্রত্যুষে প্রথম প্রহরে আমাকে কাশীরাজের ছত্রবাহিকার দায়িত্ব পালন করতে হয়। তার জন্য আমাকে প্রস্তুতি শুরু করতে হয় রাত্রির শেষ প্রহরে। কাশীনরেশ মন্দিরে পূজার্চনা করার পর দ্বিতীয় প্রহর পর্যন্ত আমাকে উপস্থিত থাকতে হয় তাঁর রাজসভাতে। তারপর আমি গৃহে ফিরে গৃহকর্ম, আহারাদি সমাপন করি। সে সব সম্পন্ন করতে করতেই সূর্যদেব গঙ্গাবক্ষে যাত্রা শুরু করেন। তারপর দিনের পঞ্চম প্রহর অর্থাৎ রাত্রির প্রথম প্রহরে আমাকে রাজদেবালয়ে যেতে হয় সন্ধ্যারতির নৃত্য প্রদর্শনের জন্য। রাত্রির একমাত্র দ্বিতীয় প্রহর ও তৃতীয় প্রহর এই দুই প্রহরই বাকি আপনার নির্দেশ পালনের জন্য।'
গণিকা চন্দ্রকলার কথা শুনে আচার্য বাৎসায়ন বললেন, 'ওই দুই প্রহর তোমার সেই অপরিচিতকে কামতাড়নায় উদ্দীপ্ত করার পক্ষে যথেষ্ট সময় বলে মনে হয়। আমি সেই কথাই জানাব সেই অবগুণ্ঠনধারীকে। তুমি আগামীকাল রাত্রিতে নির্ধারিত সময়ে নিজেকে প্রস্তুত রাখতে পারবে তো?'
চন্দ্রকলা বলল, 'নিশ্চয় পারব। কিন্তু আপনি স্থান নির্বাচন করেছেন কি? আমি নির্ধারিত সময়ে সেই স্থানে উপস্থিত হব? নাকি অন্য কোথাও? প্রয়োজনবোধে আমার বাটিকাও আপনি নির্বাচন করতে পারেন। নগরীর দক্ষিণভাগে নদীতীরে এক মনোরম স্থানে আমাকে একটি ক্ষুদ্র অট্টালিকা নির্মাণ করে দিয়েছেন কাশীরাজ। সেই অট্টালিকার শীর্ষদেশে সারারাত্রি আকাশপ্রদীপ জ্বলে।'
বাৎসায়ন বললেন, 'তোমার বাসস্থানই ওই কার্য সম্পাদনের উপযুক্ত স্থান। তুমি তোমার বাটিকার মনোরঞ্জন কক্ষকে নিশ্চয়ই সুচারুভাবে প্রস্তুত রাখো নায়কের মনোরঞ্জনের জন্য। সেই সুবিধা নায়ককে দেওয়া আমার এই বাটিকাতে সম্ভব নয়। মিলনের জন্য উপযুক্ত কক্ষ একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যে কারণে ষোড়শ কলাতেও মিলন কক্ষ কীভাবে প্রস্তুত করা হয়, কীভাবে শয্যা প্রস্তুত করা হয় সে সম্পর্কে শিক্ষাদান করা হয়েছে। তা ছাড়া আরও গুরুতর বিষয় আছে, যার কারণে তোমার গৃহই সর্বাপেক্ষা উপযুক্ত স্থান বলে মনে করি।'
'কী বিষয়?' জানতে চাইল চন্দ্রকলা।
কামশাস্ত্র প্রণেতা বাৎসায়ন মুহূর্ত কয়েক চুপ করে থেকে বললেন, 'তুমি যখন সেই ব্যক্তিকে ধীরে ধীরে কামতাড়নায় উদ্দীপ্ত করবে তখন আমি আড়াল থেকে দেখব কীভাবে তুমি সে কাজ করছ। দেখতে চাই কামশাস্ত্র কত নিখুঁতভাবে প্রয়োগ করতে পারো তুমি।'
গণিকা চন্দ্রকলা জবাব দিল, 'আচার্য। সে ব্যবস্থা অবশ্যই রাখব আমি।'
এ কথার পর আরও বেশ অনেকটা সময় ধরে কর্মপন্থা রূপায়ণের ব্যাপারে আলোচনা করলেন তাঁরা। বাইরে নদীর বুকে যখন সূর্যদেব অবগাহনের প্রস্তুতি শুরু করলেন, তখন গণিকা চন্দ্রকলা তার আচার্যকে প্রণাম জানিয়ে বাসস্থান ত্যাগ করল। তাকে রাজপ্রাসাদে যেতে হবে সন্ধ্যারতিতে যোগদানের জন্য।
এরপর বাৎসায়ন যখন তাঁর কক্ষের বাইরে পদার্পণ করলেন, তখন সূর্যদেব অন্তর্হিত হয়েছেন গঙ্গাবক্ষে। অন্ধকার নামার আগে শুধু তাঁর লাল আভাটুকুই জেগে আছে দিকচক্রবালে।
কক্ষ ত্যাগ করে তিনি প্রথমে উপস্থিত হলেন নিকটবর্তী সেই নির্জন ঘাটে। না, সেই অবগুণ্ঠনধারী জৈন এখনও সেখানে উপস্থিত হননি। ব্রাহ্মণ বাৎসায়ন আগের দিনগুলির মতোই সোপান বেয়ে নেমে এসে বসলেন সোপানের শেষ ধাপে। সন্ধ্যারতির প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে অন্য ঘাটগুলোতে। তিনি দেখতে পাচ্ছেন সেই আলোকগুচ্ছ। ঘাট থেকে, নদীতীরবর্তী মন্দিরগুলো থেকে ভেসে আসতে লাগল ঘণ্টাধ্বনি। আগের দিনের মতোই তালপাতার ডোঙাতে আলোকবিন্দুগুলি গঙ্গাবক্ষে ভেসে চলেছে অনন্ত অজানার উদ্দেশে।
'প্রণাম মহর্ষি বাৎসায়ন।'—অকস্মাৎ তাঁর উদ্দেশে বলা কথা শুনে চমকে উঠে ফিরে তাকাতেই তিনি দেখতে পেলেন, সেই জৈন সন্ন্যাসীকে। কয়েক হাত তফাতে একটি ধাপ ওপরে এসে দাঁড়িয়েছেন তিনি। এত লঘু পদে তিনি এসেছেন যে তাঁর উপস্থিতি টেরই পাননি ব্রাহ্মণ বাৎসায়ন।
তিনি উঠে দাঁড়িয়ে তার উদ্দেশে প্রতি সম্ভাষণ জানিয়ে বললেন, 'স্বাগত মানব। আমি আপনার জন্য প্রতীক্ষা করছিলাম।'
অবগুণ্ঠনধারী সোপানের শেষ ধাপে নেমে এসে এককোণে বসলেন। বাৎসায়নও বসলেন নিজ স্থানে। বেশ কিছু মুহূর্তের জন্য চুপ করে রইলেন তাঁরা দুজনেই। নদীর জলের ছলাৎ-ছলাৎ শব্দ ছাড়া অন্য কোনো শব্দ নেই কোথাও। বাৎস্যায়নই প্রথমে সেই নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে বললেন, 'আপনি আমাকে ''মহর্ষি'' বলে সম্বোধন করলেন শুনলাম। আমি ব্রাহ্মণ হতে পারি কিন্তু ঋষি মা মহাঋষি কোনোটাই নই।'
অবগুণ্ঠনধারী জৈন সন্ন্যাসী বেশ শান্ত স্বরে বললেন, 'আপনার পাণ্ডিত্যের জন্য আপনি ভবিষ্যতের মানুষের কাছে মহর্ষি বলেই সম্বোধিত হবেন।'
এই অবগুণ্ঠনধারী জৈন তাঁকে মহর্ষি সম্বোধন করে বিদ্রুপ করছেন কিনা তা ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না বাৎসায়ন। তবু তিনি বললেন, 'ধন্যবাদ। কিন্তু আপনি একধারে বলছেন আমার পাণ্ডিত্যের জন্য আমাকে ভবিষ্যতের মানুষ ''মহর্ষি'' সম্ভাষণে আখ্যায়িত করবে, আবার অপর দিকে আপনিই আমার অভিজ্ঞতাপ্রসূত ভাবনাকে ছেদন করতে চাইছেন! এ ভারি অদ্ভুত ব্যাপার তো!'
অবগুণ্ঠনধারী বললেন, 'হ্যাঁ, উভয়ই সত্য। আপনি যেমন জ্ঞানী, বহুদর্শী একথা ঠিক, আবার তেমনই আপনার কামসূত্র গ্রন্থ সম্পর্কে আপনার অন্তিম দর্শন সঠিক নয়। জীবনে ধর্মের প্রভাব, কামের থেকে অনেক বড়। মানব জীবনের অন্তিম সত্য হল ধর্ম। কাম জীবনের একটা অনুষঙ্গ মাত্র। বলা যেতে পারে তুচ্ছ অনুষঙ্গ।'
অবগুণ্ঠনধারী জৈন সন্ন্যাসী অত্যন্ত শান্তস্বরে কথাগুলো বললেও তাঁর বক্তব্যের তীব্রতা আজ আরও বেশি, স্বাভাবিকভাবেই ব্রাহ্মণ বাৎসায়নের কাছে গ্রহণীয় নয়। তিনি বললেন, 'এ বিরোধের নিষ্পত্তির ব্যবস্থা আমি করেছি। আশা করি যে পদ্ধতিতে এ বিতর্কের নিষ্পত্তি হবে, সে ব্যাপারে আপনি অবিচল আছেন?'
জৈন সন্ন্যাসী বললেন, 'হ্যাঁ অবশ্যই। আপনার নির্বাচিত কোনো নারী যদি আমার প্রতিনিধি পুরুষকে চৌষট্টি কলার মাধ্যমে জয় করতে পারে তবে জানব আমার ভাবনা মিথ্যা।'
ব্রাহ্মণ বাৎসায়ন বললেন, 'অতি উত্তম। তবে আমার পরিকল্পনা আপনার কাছে বিবৃত করার পূর্বে আমার সামান্য কয়েকটি শর্ত আছে—। আপনি এই পরীক্ষার জন্য যে ব্যক্তিকে নির্বাচন করবেন, সে কোন নারীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে তা বাইরে প্রকাশ করতে পারবে না। কারণ, সেই নারী এ নগরীর সবার কাছে বিশেষভাবে পরিচিত। বর্তমানে সে ধনী-সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি ব্যতীত কারো সঙ্গে মিলিত হয় না। আর দ্বিতীয় কথা উক্ত ব্যক্তি যেন কুষ্ঠরোগাক্রান্ত না হন। কারণ, এ ধরনের ব্যক্তিদের সঙ্গে গণিকারা মিলিত হয় না। আপনার যদি কোনো শর্ত থাকে বলুন।'
জৈন সন্ন্যাসী প্রথমে বললেন, 'যাঁর সত্যদর্শন হয়েছে তাঁর থেকে ধনী সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি আর কে আছে? আপনার শর্তে আমি সম্মত। তবে আমারও দুটি শর্ত আছে। প্রথমত, আমার প্রতিনিধিকে তার নাম-পরিচয় প্রসঙ্গে কোনো প্রশ্ন করা যাবে না। আর দ্বিতীয় কথা, কোনো অবস্থাতেই আমার-আপনার মধ্যে বিরোধের অবসান ঘটাতে গিয়ে কোনো পর প্রাণীর ক্ষতি না হয়। অনেক দেশে নর-নারীকে কামাচারে উদ্দীপ্ত করার জন্য অন্য প্রাণীর সংগম দৃশ্য প্রত্যক্ষ করানো হয়। বলপূর্বক নিরীহ প্রাণীগুলিকে যৌনমিলনে বাধ্য করানো হয়। এমন কোনো ঘটনা যেন না ঘটানো হয়।'
'অবশ্যই।' বাৎসায়ন বললেন, 'আপনি নিশ্চন্ত থাকুন, আপনার পুরুষটিকে তার পরিচয় জিগ্যেস করা হবে না। কোনো ইতর প্রাণীর সংগম দৃশ্যও তাকে প্রত্যক্ষ করানো হবে না।'
এরপর তিনি সোপানশ্রেণির শীর্ষদেশের দিকে আঙ্গুলি নির্দেশ করে বললেন, ওই ওপরে উঠে কিছুটা এগোলেই একটি প্রাচীন বটবৃক্ষ রয়েছে। সেই বৃক্ষ সংলগ্ন বাটিকাটি বর্তমানে আমার আবাসস্থল। আগামীকাল রাত্রির প্রথম প্রহরের তৃতীয় ভাগে আপনি আপনার নির্বাচিত পুরুষটিকে নিয়ে উপস্থিত হবেন আমার বাটিকাতে। আমি তাকে নিয়ে যাব কাশীরাজের প্রধানা গণিকা চন্দ্রকলার অট্টালিকাতে। সেই স্থানে রাত্রির দ্বিতীয় প্রহর ও তৃতীয় প্রহর অতিবাহিত করবে পুরুষ।'
অবগুণ্ঠনধারী জৈন বললেন, নিশ্চিন্ত থাকুন, আগামীকাল নির্দিষ্ট সময়েই সেই পুরুষ আপনার দ্বারপ্রান্তে উপস্থিত হবে।'
কামসূত্র রচয়িতা বাৎসায়ন হেসে বললেন, 'আমার অনুমান চৌষট্টি কলায় দক্ষ গণিকা একটি প্রহরের মধ্যেই বিতর্কের নিষ্পত্তি ঘটিয়ে ফেলতে সমর্থ হবে। আপনার প্রেরিত ব্যক্তি সত্যিই খুব ভাগ্যবান। সে কাশীরাজের প্রধানা গণিকার সঙ্গে মিলনসুখ উপভোগ করবে।'
জৈন হেসে বললেন, 'দেখুন, কার ভাবনা সত্য হয়। পর্যালোচনার জন্য আগামী পরশু এইস্থানে মিলিত হব আমরা।'
বাৎসায়ন বললেন, 'হ্যাঁ অবশ্যই।
কাজের কথা শেষ। বাৎসায়ন আবার দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন নদীবক্ষে। ভাসমান আলোকবিন্দুগুলি সম্পূর্ণ মুছে যায়নি নদীবক্ষ থেকে। সেদিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর বাৎসায়ন বললেন, 'এই ভাসমান আলোকবিন্দুগুলিকে দেখলে আমার কী মনে হয় জানেন? এরা সব জ্ঞানবিন্দু। দূরে কোথাও মিলিত হতে চলেছে।'
জৈন সন্ন্যাসী বললেন, 'যথার্থ, যিনি ওই প্রতিটি জ্ঞানবিন্দুকে একসঙ্গে আহরণ করতে পারেন তিনিই মহাজ্ঞানী। তাঁরা ''কাষায়'' অর্থাৎ সব আসক্তি থেকে মুক্ত থাকেন।'
কথাগুলো বলেই উঠে দাঁড়ালেন সেই জৈন। তারপর মাথা ঝুঁকিয়ে সম্মান জানালেন বাৎসায়নকে। বাৎসায়নও মাথা ঝুঁকিয়ে তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করলেন।
তারপর বাৎসায়নের চোখের সামনেই তিনি ধীরে ধীরে নেমে গেলেন গঙ্গাবক্ষে। বাৎসায়নের মনে হল, এক শুভ্র বস্ত্রখণ্ড যেন অপসৃয়মান আলোকবিন্দুগুলির সঙ্গে ভাসতে ভাসতে হারিয়ে গেল অন্ধকারের মধ্যে।
বাৎসায়ন অনুমান করলেন, হয়তো বা ওদিকেই কোথাও বাসস্থান হবে ওই জৈনের। এমনকী নদীর পূর্বতটেও হতে পারে। ওদিকটায় তেমন জনবসতি নেই। গঙ্গার পশ্চিমতটকে কেন্দ্র করে এই কাশী নগরীর অবস্থান।
নিজ অভিজ্ঞতায় বাৎসায়ন জানেন, জৈন সন্ন্যাসীরা সাধারণত নির্জন স্থানেই থাকতে পছন্দ করেন। তবে ওই অবগুণ্ঠনধারী জৈনের অদ্ভুতভাবে হঠাৎ উপস্থিত হওয়া আবার গঙ্গাবক্ষে ভাসতে ভাসতে অদৃশ্য হওয়া বাৎসায়নের এদিনও আশ্চর্য বলে মনে হল।
নদীবক্ষে শেষ আলোকবিন্দুও যখন মুছে গেল তখন ঘাট ছেড়ে উঠে পড়লেন তিনি। বাটিকাতে ফিরে আসার পর ঘি-এর প্রদীপ জ্বালিয়ে আবার নিজের রচিত পুঁথির পাতা খুলে বসলেন।
নদীতীরবর্তী, উদ্যানসমৃদ্ধ এই মর্মর নির্মিত অট্টালিকা বড়ই মনোরম। নদী সংলগ্ন কোলাহলে মুখরিত বারাণসী নগরীর শব্দ কাশীরাজের প্রধানা গণিকার প্রাসাদকে স্পর্শ করে না। কানন থেকে ভেসে আসা ভ্রমরের অস্ফুট গুঞ্জনধ্বনি আর নদীর বাতাস গবাক্ষপথে খেলা করে মর্মর প্রস্তর আর দারুকাঠ নির্মিত এই বাটিকার অভ্যন্তরে।
প্রখর দাবদাহের দিনেও এ অট্টালিকার অভ্যন্তরে মৃদু-শীতলতা বজায় থাকে, আবার অতি শীতার্ত রাত্রিতেও দারুকাঠের আবরণযুক্ত শয়নকক্ষে অতি শীতলতা দেখা যায় না। কারণ, অধিক উষ্ণতা বা অধিক শীতলতা এ দুই-ই চন্দ্রকলার অতিথি আপ্যায়নের পরিপন্থী। তাই প্রধানা গণিকার অনুরোধ মতো কাশীনরেশ ধ্রুবলোক তাকে এই অট্টালিকা এমনভাবে নির্মাণ করিয়ে দিয়েছেন যাতে এই অট্টালিকার অভ্যন্তরে চন্দ্রকলার অতিথিদের কোনো অস্বস্তি না হয়।
এমনকী এই অট্টালিকার অভ্যন্তরে উন্মুক্ত অঙ্গনে একটি জলাধারও আছে। সেখানে প্রয়োজনবোধে চন্দ্রকলা তার নায়কদের সঙ্গে জলক্রীড়া করে। কাশীনরেশ স্বয়ং বেশ কয়েকবার চন্দ্রকলার এ প্রাসাদে তার আতিথ্য গ্রহণ করেছেন। বলা বাহুল্য, চন্দ্রকলার এই অট্টালিকাতে বর্তমানে যাঁরা তার আতিথ্য গ্রহণ করেন, তাঁরা সবাই হয় এ নগরীর সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি অথবা দূর দেশ থেকে আগত ধনাঢ্য শ্রেষ্ঠীকুল বা সমগোত্রীয় ব্যক্তি।
প্রতিদিনই রাত্রির শেষ প্রহরে সূর্যোদয়ের প্রাক্কালে যখন পূর্ব আকাশে শুকতারা রাত্রিশেষের বার্তা বহন করে আনে, তখন শয্যাত্যাগ করে চন্দ্রকলা। স্নান সেরে, উপযুক্ত বসনে সজ্জিত হয় সে। শিবিকা বাহকরা প্রস্তুতই থাকে। সূর্যালোক পরিস্ফুট হলেই তারা চন্দ্রকলাকে নিয়ে রওনা হয় কাশীনরেশের প্রাসাদের উদ্দেশে।
এভাবেই দিন শুরু হয় গণিকা চন্দ্রকলার। এদিনও চন্দ্রকলার নিদ্রাভঙ্গ হবার সময় ব্যতিক্রম হল না। তবে এদিন চন্দ্রকলার নিদ্রাভঙ্গ হল এক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখে।
এক অন্ধকার কক্ষে এক নায়কের মনোরঞ্জনের জন্য তাকে আলিঙ্গন করেছিল সে। কিন্তু অকস্মাৎ সেই নায়কের দেহ যেন ভীষণ শীতল মনে হতে লাগল তার। এরপর এক উজ্জ্বল আলো বিচ্ছুরিত হতে লাগল সেই নায়কের মস্তক থেকে। অতি উজ্জ্বল অথচ স্নিগ্ধ এক আলো । সে আলোক চোখে জ্বালা ধরায় না, অথচ সব দৃশ্যমান করে তোলে। আলো ছড়িয়ে পড়ল কক্ষে।
চন্দ্রকলা দেখতে পেল, এক মহাসর্পকে আলিঙ্গন করে আছে সে। ওই মহাসর্পের মাথার মণি থেকেই বিচ্ছুরিত হচ্ছে সেই আলো!—
এ স্বপ্ন দেখেই ঘুম ভেঙে উঠে বসল চন্দ্রকলা। অদ্ভুত স্বপ্ন, এতে সন্দেহ নেই। কিছু কিছু দেশে ঘোটক, মেষ, কুকুর ইত্যাদি ইতর প্রাণীর সঙ্গে পশুকামিতা প্রচলিত আছে ঠিকই, কিন্তু চন্দ্রকলার কখনও এই নিকৃষ্ট যৌনাচারে প্রবৃত্তি হয়নি। আর সর্পের সঙ্গে মিলনের কথা ইতিপূর্বে কখনও সে শোনেনি!
তবে হঠাৎ কেন এমন স্বপ্নদর্শন করল? নিদ্রাভঙ্গের পর বেশ কিছুক্ষণ ধরে সে ভাবল তার এই অদ্ভুত স্বপ্ন দর্শন নিয়ে। কিন্তু এ স্বপ্নের কোনো ব্যাখ্যা মিলল না। একসময় উন্মুক্ত গবাক্ষ দিয়ে চন্দ্রকলার চোখে পড়ল পূর্ব আকাশে শুকতারা ফুটে উঠেছে। সে শয্যা ত্যাগ করল।
কিছু সময়ের মধ্যেই স্নান, ফলাহার সাঙ্গ করে বহির্বেশে, রত্নহার, কুমকুমে নিজেকে প্রস্তুত করল সে। এবার তাকে অট্টালিকা ত্যাগ করে রাজপ্রাসাদের দিকে রওনা হতে হবে। কিন্তু সেস্থানে গমনের আগে তার শয়নকক্ষ সংলগ্ন একটি কক্ষে প্রবেশ করল গণিকা।
এই কক্ষটিকে সে নির্বাচিত করেছে তার রাত্রিকালের সেই পুরুষের জন্য। সাধারণত চন্দ্রকলা তার যে সব অতিথিদের সঙ্গদান করে তার নিমিত্ত অন্য কক্ষ আছে। কিন্তু এই কক্ষটি আজ রাত্রিতে চন্দ্রকলা তার কামকলা প্রদর্শনের নিমিত্তে নির্বাচন করেছে এক বিশেষ কারণে। এই কক্ষের একপার্শ্বের দেওয়ালের গায়ে এক কামার্ত মৃগের চিত্র অঙ্কিত আছে। হরিণীর চক্ষে একটি ছিদ্র বর্তমান। যা সহজে নির্ণয় করা সম্ভব নয়। চন্দ্রকলার শয়নকক্ষ থেকে ওই ছিদ্রপথে এ কক্ষের দৃশ্য যাবতীয় প্রত্যক্ষ করা যায়।
বাৎসায়ন বর্ণিত চৌষট্টি কলার নানা বিদ্যার মধ্যে অন্যতম হল 'শয়ন রচনা' বা শীত-গ্রীষ্মের জন্য শয্যা রচনার কৌশল, সেই শয্যাবস্তুর অলংকরণের জন্য 'সূচিকর্ম' শিক্ষা। 'মণি-ভূমিকর্ম' অর্থাৎ নানা বর্ণের পাথর ও মণি দিয়ে দেওয়াল ও মেঝেতে লতা-পাতার নকশা প্রস্তুত করা, 'পুষ্পান্তরণ' অর্থাৎ কক্ষ, শয়ন ফুল দিয়ে নির্মাণ করা বা ফুলশয্যা নির্মাণ, মনোরঞ্জনের জন্য কক্ষে 'উদকবাদ্য' অর্থাৎ জলতরঙ্গ বাদ্য প্রস্তুত রাখা ও তা বাজাবার কৌশল রপ্ত করা ও কক্ষ সুগন্ধীতে প্রস্তুত করা।
চন্দ্রকলা গতরাত্রিতে সন্ধ্যারতির পর সহস্তে ও তার দাসীদের সাহাষ্যে এ কক্ষটিকে চৌষট্টি কলার পাঠ অনুসারে অনেকটাই সজ্জিত করে তুলেছে।
উন্মুক্ত গবাক্ষ দিয়ে আসা ভোরের প্রথম আলোকচ্ছটা প্রবেশ করেছে কক্ষে। অট্টালিকা ত্যাগ করার পূর্বে সেই আলোতে কক্ষটি ভালো করে পর্যবেক্ষণ করল চন্দ্রকলা।
দাসীদের ডেকে নির্দেশ দিল, সেই কক্ষ আরও সৌন্দর্যমণ্ডিত করে তোলার নিমিত্ত ও নিজের অঙ্গরাগের নিমিত্তে ফুল, চন্দন, সুগন্ধী, আরও বেশ কিছু দ্রব্য সংগ্রহ করে রাখার জন্য। সে তাদের এও জানাল, যে সূর্যাস্তের পূর্বে সকল দাস-দাসী যেন এ অট্টালিকা পরিত্যাগ করে এবং পরদিবসে সূর্যোদয়ের পূর্বে যেন কেউ এই অট্টালিকাতে ফিরে না আসে। কারণ, আচার্য এমনই নির্দেশ দিয়েছেন। আজ রাত্রির ঘটনাটি গোপন রাখতে হবে তাকে।
দাস-দাসীদের প্রয়োজনীয় নির্দেশ প্রদান করে শিবিকাবাহিত কাশীনরেশের প্রধান গণিকা যাত্রা করল রাজপ্রাসাদের দিকে। সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সন্ধ্যারতির কাজ সাঙ্গ করার পরই তার অট্টালিকায় ফিরবে। তারপর প্রস্তুত হবে আচার্য যে পুরুষকে সঙ্গে আনবেন তার কামরঞ্জনের জন্য।
প্রতিদিনের মতো আচার্য বাৎসায়নও সূর্যোদয়ের প্রাক্কালে গঙ্গাবক্ষে অবগাহন করলেন। অরুণ কিরণে পৃথিবী যখন উদ্ভাসিত হল, তিনি তখন আবার তাঁর কক্ষে ফিরে নিজের রচিত পুঁথি খুলে বসলেন। সূর্যদেব মাথার ওপর উঠতে শুরু করলেন। দূরে বারাণসী নগরীর জীবন প্রবাহও প্রতিদিনের মতোই শুরু হল। বিশ্বনাথ মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনিও মাঝে মাঝে অস্পষ্টভাবে প্রবেশ করতে লাগল সেই নির্জন কক্ষে।
কিন্তু বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্রাহ্মণ বাৎসায়ন একসময়ে যেন বুঝতে পারলেন পুঁথির পাতায় তিনি মনোনিবেশ করতে পারছেন না। একটা উত্তেজনা যেন সংক্রমিত হতে শুরু করেছে তাঁর মধ্যে। কিন্তু এমন তো হবার কথা নয়, কারণ তিনি নিশ্চিত, এই তর্কের নিষ্পত্তি হবে তাঁর জয়ের মধ্যে দিয়েই। চৌষট্টি কলাতে দীক্ষিত শিষ্যা চন্দ্রকলা প্রমাণ করবে ব্রাহ্মণ বাৎসায়নের বিচারই অভ্রান্ত। কাম ও যৌনতার শক্তি ধর্মের থেকে বেশি। সমাজ-ধর্ম-অর্থ সব কিছুই আসলে কাম দ্বারা পরিচালিত। কিন্তু এতদসত্ত্বেও কেন তিনি উত্তেজনাবোধ করছেন তা বুঝে উঠতে পারছেন না বাৎসায়ন। কিছুতেই মনোসংযোগ না করতে পেরে শেষে পুঁথির পাতা বন্ধ করে দিলেন।
সূর্যদেব তখন প্রায় মাথার ওপর পৌঁছে গেছেন। এই জীর্ণ বাটিকার চারপাশের পরিবেশ নিস্তব্ধ। শুধু নদীবক্ষের মাথার আকাশে যে জলচর পক্ষীকুল মৎস্যশিকারের আশায় প্রদক্ষিণ করে, তাদের কর্কশ ধ্বনি মাঝে মাঝে কানে আসছে।
বাৎসায়নের কক্ষের কিছুটা তফাতেই মাটি থেকে জাগ্রত বিশাল বটবৃক্ষের গুঁড়ি। যার ডালপালা এই বাটিকা সহ বেশ অনেকটা ভূ-খণ্ডকে ছায়াঘন করে রেখেছে। সেদিকে তাকিয়ে ব্রাহ্মণ বাৎসায়নের মনে এল, সেই অবগুণ্ঠনধারী সন্ন্যাসীর কথা। ব্যক্তিটি বড় অদ্ভুত এবং রহস্যময়! কোথা থেকে যে হঠাৎ আবির্ভূত হল কে জানে। তারপর কথার মায়াজালে বাৎসায়নকে আটকে ফেলল তাঁর সঙ্গে তর্কে নামতে।
কেউ বাৎসায়নের ভাবনা সম্পর্কে বা তাঁর লেখনী সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন তুললে যতক্ষণ না শাস্ত্রজ্ঞ, বহু জ্ঞানের অধিকারী বাৎসায়ন সেই ব্যক্তির প্রশ্নের নিরসন ঘটাতে পারেন, ততক্ষণ তিনি ক্ষান্ত হন না। এটি বাৎসায়নের চরিত্রের এক গুণ বা দোষ। ওই জৈন কি বাৎসায়নের চরিত্রের এ বিষয় সম্পর্কে অবগত? তিনি কি এ হেতুই বাৎসায়নের সামনে এ প্রশ্ন তুলে ধরলেন?
শত-সহস্র বছরের প্রাচীন বৈদিক ধর্মের তুলনায় জৈনধর্ম ও বৌদ্ধধর্মকে নবাগত বা শিশুই বলা চলে। তবে এ দুই নবাগত ধর্মের মধ্যে জৈনধর্ম প্রাচীন। 'জৈন' শব্দটির উৎপত্তি 'জিন' থেকে। যার অর্থ হল 'জয়ী'।
জৈন ধর্ম বৈদিক ধর্মের অশ্বমেধ যজ্ঞ বা বলি প্রথাকে সমর্থন করে না। তাঁরা মনে করেন, অহিংসা ও আত্মসংযম হল মোক্ষ বা জন্ম-মৃত্যু চক্র থেকে মুক্তিলাভের উপায়। গৌতম বুদ্ধ যেমন বৌদ্ধধর্মের প্রবর্তন করেছিলেন, তেমনই প্রথম তীর্থঙ্কর ঋষভনাথের সাধনায় এই নবীন ধর্মের সূচনা। মোট চব্বিশজন তীর্থঙ্কর আবিভূর্ত হয়েছেন এই ধরণীতে। সর্বশেষ তীর্থঙ্কর হলেন মহাবীর।
'তীর্থঙ্কর' শব্দের অর্থ 'তীর্থের প্রতিষ্ঠাতা'। 'তীর্থ' বলতে বোঝানো হয় 'সংসার' নামক অনন্ত জন্ম-মৃত্যুর সমুদ্রের মধ্যে দিয়ে প্রসারিত এক সংকীর্ণ পথ। জৈন ধর্মাবলম্বীদের মতে নির্দিষ্ট জীবনচর্চার মাধ্যমে একসময়ে কিছু মানুষের মধ্যে এক দুর্লভ ব্যক্তিত্বের সঞ্চার হয়। ওই দুর্লভ ব্যক্তিত্ব এক বিশেষ পর্যায়ে উপস্থিত হয়ে স্বয়ং সংসার বা জন্ম-মৃত্যু চক্র জয় করার নিমিত্তে গৃহ ও জাগতিক সব কিছু পরিত্যাগ করেন। আত্মার সত্য প্রকৃতি অবগত হবার পর তাঁরা 'সর্বজ্ঞতা' অর্থাৎ শুধুমাত্র জ্ঞান অর্জন করেন ও ধর্ম পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন।
এঁদেরই বলা হয় 'তীর্থঙ্কর'। তাঁরা অন্যদের পারাপারের জন্য সংসার ও মুক্তি বা মোক্ষর মধ্যে একটি সেতু রচনা করেন। এ জন্য তাঁদের 'যাত্রাপথ স্রষ্টা'ও বলা হয়ে থাকে।
ব্রাহ্মণ বাৎসায়ন শুধুমাত্র বৈদিক শাস্ত্রের পণ্ডিতই নন, অন্য ধর্মশাস্ত্রের মৌলিক বিষয়গুলিও তিনি পাঠ করেছেন। তাই তিনি জৈনধর্ম সম্পর্কেও কিছু অবগত। যদিও বিম্বিসার প্রমুখ মগধ সম্রাটদের হাত ধরে এই ষোড়শ মহাজনপদে বৌদ্ধধর্ম যতটা বিস্তার লাভ করেছে, আদিনাথ ঋষভনাথ প্রবর্তিত জৈনধর্ম ততটা করেনি।
একসময় তো বৌদ্ধধর্ম এমনভাবে বিস্তারলাভ করতে শুরু করেছিল যে সনাতন বৈদিক ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে বৌদ্ধ ধর্মালম্বীদের সংঘাত শুরু হয়েছিল। বৌদ্ধ ও বৈদিক ধর্মাবলম্বী রাজন্যবর্গের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষও হয়েছিল।
অহিংসার আদর্শে অনুপ্রাণিত বৌদ্ধ নৃপতিগণও অস্ত্র ধরেছিলেন ধর্ম বিস্তারের জন্য। শেষ পর্যন্ত এই ধর্মযুদ্ধে জয়ী হয়েছেন সনাতন বৈদিক ধর্মাবলম্বীরাই। বিগত কয়েক শত বৎসর ধরে এই ষোড়শ মহাজনপদের অধনীস্থ ছোট-বড় রাজ্যগুলোতে বৈদিক ধর্মই রাজধর্ম রূপে প্রতিষ্ঠিত।
বার্ধক্যের সীমানায় উপনীত হওয়া বহুদর্শী বাৎসায়ন তাঁর সুদীর্ঘ জীবনের পথ পরিক্রমায় জৈন ধর্মাবলম্বীদের কোনো রাষ্ট্র সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে দেখেননি। যদিও তাদেরও সংঘ আছে।
সাধারণত এই ক্ষুদ্র ধর্মগোষ্ঠীর লোকেরা নিজের মতো করে ধর্মাচারণে নিযুক্ত থাকেন। অন্য ধর্মাবলম্বী মানুষের সঙ্গে বড় একটা মেশেনও না। তবে হঠাৎ ওই জৈন পুরুষ, বাৎসায়নের কাছে এমনভাবে আবির্ভূত হলেন কেন? নানা কথা ভাবতে লাগলেন ব্রাহ্মণ বাৎসায়ন আর সেই সঙ্গে সঙ্গে সময়ও এগিয়ে চলল।
দুপুর গড়িয়ে বিকাল, তারপর দিনের শেষ প্রহর ঘনিয়ে এল। গঙ্গাবক্ষে সূর্যদেব ধীরে ধীরে পাটে বসছেন, নামছে সন্ধ্যার ঘনছায়া। দশাশ্বমেধ ঘাট সহ ঘাটগুলিতে ও বিশ্বনাথের মন্দিরে শুরু হল সন্ধ্যারতির প্রস্তুতি। তবে এদিন বাৎসায়ন নদীর ঘাটে গেলেন না, নিজ কক্ষেই অবস্থান করলেন। সূর্য ডুবে গেল, সূচনা হল রাত্রির প্রথম প্রহর।
নিজ কক্ষে বসেই ব্রাহ্মণ শুনতে পেলেন দূরাগত মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি, মানসচক্ষে দেখতে পেলেন সার সার আলোকবিন্দু ভেসে চলেছে। তারপর ধীরে ধীরে চারিপাশে সব কিছু নিস্তব্ধ হয়ে এল।
রাত্রির প্রথম প্রহরের দ্বিতীয় ভাগে বহির্গমনের প্রস্তুতি শুরু করলেন বাৎসায়ন। ঘিয়ের প্রদীপের আলোয় পূর্বের ন্যায় বণিকের ছদ্মবেশ ধারণ শুরু করলেন তিনি। ছদ্মবেশ একসময় সম্পন্ন হল। তাঁর মনে সারা দিন ধরে চলা উত্তেজনা প্রশমিত হবার পরিবর্তে যেন আরও বেড়েই চলেছে। তিনি প্রতীক্ষা করতে লাগলেন নির্দিষ্ট সময়ের জন্য। পৃথিবী তখন চন্দ্রালোকে আলোকিত হতে শুরু করেছে।
রাত্রির প্রথম প্রহরের ঠিক তৃতীয় ভাগের সূচনালগ্ন। তাঁর কক্ষদ্বারে মৃদু করাঘাত। ব্রাহ্মণ বাৎসায়ন কপাট উন্মোচন করলেন।
বাৎসায়ন দেখলেন তাঁর সামনে একজন দাঁড়িয়ে আছে। তার পরনে জৈনদের মতোই জঙ্ঘা থেকে কাঁধ পর্যন্ত শুভ্র বস্ত্রখণ্ড। তবে কোনো অবগুণ্ঠন নেই। চাঁদের আলো ছড়িয়ে পড়েছে তার মুখমণ্ডলে।
এক যুবকের মুখ। চোখদুটি বেশ উজ্জ্বল। একটা প্রশান্তির ভাব যেন ছড়িয়ে আছে তার শ্মশ্রু-গুম্ফহীন শুভ্র মুখমণ্ডলে। তবে জৈন সন্ন্যাসীদের মতো এই যুবকের মস্তক মুণ্ডিত নয়, ঘন কুঞ্চিত কেশদামে আবৃত। শরীরের গঠন সুগঠিত, কিন্তু পেলব। তার উন্মুক্ত দক্ষিণ স্কন্ধ বেয়ে চাঁদের আলো যেন চুঁইয়ে পড়ছে।
ব্রাহ্মণ বাৎসায়ন কয়েকমুহূর্ত তীক্ষ্নভাবে নিরীক্ষণ করলেন তাকে। একটা আবছা হাসি ফুটে উঠল সৌম্যকান্তি যুবকের ঠোঁটে। বাৎসায়নের উদ্দেশে সে করজোড়ে বলল, 'আপনাকে প্রণাম মহর্ষি। আপনার সঙ্গী হবার জন্য আমি উপস্থিত হয়েছি।'
বাৎসায়ন প্রশ্ন করলেন, 'তোমার নিয়োগকর্তা কোথায়? তিনি আসেননি?'
যুবক জবাব দিল, 'তিনি আপনার সঙ্গে আগামীকাল সূর্যাস্তের পরে একই স্থানে সাক্ষাৎ করবেন। আপনি চাইলে আমরা এবার নির্দিষ্ট স্থানের দিকে রওনা হতে পারি। আমি জানি—কোথায়, কী কারণে—আমাকে গমন করতে হবে।'
বাৎসায়ন আর কথা বাড়ালেন না। চন্দ্রকলা তার গৃহের পথনির্দেশ জানিয়ে গেছে তার আচার্যকে। বাটিকা ত্যাগ করে বণিকের ছদ্মবেশে ব্রাহ্মণ বাৎসায়ন সে পথ ধরে যুবককে নিয়ে রওনা হলেন।
নদীর সমান্তরাল ভাবে এগিয়েছে সেই পথ। দু-পাশ ঝোপঝাড়ে পূর্ণ। গোপনীয়তা বজায় রাখার জন্য চন্দ্রকলার পরামর্শ মতো তার অট্টালিকায় যাবার জন্য প্রধান সড়ক পরিহার করে এ পথে যাত্রা করছেন।
প্রথমে চলেছেন বাৎসায়ন, তাঁর কয়েক পা তফাতে সেই যুবক। চন্দ্রালোকিত পৃথিবী। পথ চলতে কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। পার্শ্বের গঙ্গাবক্ষ থেকে উঠে আসছে শীতল মনোরম বাতাস। সেই বাতাসে এক সুগন্ধ অনুভব করলেন বাৎসায়ন। ক্ষণিকের মধ্যে বুঝলেন, যে, সেই সুগন্ধ আসছে তাঁর পশ্চাৎবর্তী যুবকের অঙ্গ থেকেই। শরীরে চন্দনবারি লেপন করেছে সে। কে এই যুবক, সেই অবগুণ্ঠনধারীর শর্ত অনুসারে কোনো প্রশ্ন করা যাবে না। তাই নিশ্চুপভাবেই চলতে লাগলেন বাৎসায়ন। রাত্রিও তাঁদের সঙ্গে এগোতে লাগল দ্বিতীয় প্রহরের দিকে।
একসময় চন্দ্রকলার অট্টালিকার শীর্ষদেশের আকাশ প্রদীপ দেখতে পেলেন বাৎসায়ন। কিন্তু পরক্ষণেই অট্টালিকার নিকটবর্তী এক স্থানে থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন বাৎসায়ন। চন্দ্রালোকে দেখলেন, তাঁদের পথ আগলে শুয়ে এক এক মহাসর্প।
পথের দু-পাশের অঞ্চল জঙ্গলাকীর্ণ। এই সর্পকে যদি রাস্তা থেকে সরানো না যায় তবে আর এগোনো সম্ভব নয়। অথবা সর্প যদি দংশনের জন্য তাঁদের দিকে তেড়ে আসে তবে সমূহ বিপদের সম্ভাবনা। চারপাশে তাকিয়ে বাৎসায়ন একটি দীর্ঘ শুষ্ক কাষ্ঠখণ্ড পড়ে থাকতে দেখে তার মাধ্যমে সর্পটিকে আঘাত করে দূরে সরাতে যাচ্ছিলেন, ঠিক সেই মুহূর্তে তাঁর পশ্চাৎবর্তী যুবাপুরুষ বলে উঠল, 'তিষ্ঠ আচার্যদেব! আপনি ওকে আঘাত করবেন না। আমি ওকে রাস্তা থেকে সরিয়ে দিচ্ছি।'
থেমে গেলেন ব্রাহ্মণ। সেই যুবক এরপর তাঁকে আরও বিস্মিত করে এগিয়ে গেল মহাসর্পের কাছে। ঝুঁকে পড়ে হাত রাখল তার শরীরে। স্পর্শ পেয়েই সেই মহাসর্পের শরীরের অগ্রভাগ বিশালাকৃতির ফণা তুলে মাটির থেকে তিন হস্ত প্রমাণ স্থির হয়ে উঠে দাঁড়াল।
যুবকের মধ্যে আতঙ্কের লেশমাত্র নেই। সে তাকিয়ে রইল সেই সর্পরাজের চোখের দিকে। বাৎসায়নের মনে হতে লাগল এই বুঝি সেই মহাসর্প দংশন করবে যুবকের মুখমণ্ডলে! শেষ পর্যন্ত তেমন কিছু ঘটল না। সেই মহাসর্প ধীরে ধীরে ফণা গুটিয়ে আবার মাটিতে এলিয়ে পড়ল।
যুবক এরপর তার শরীরটাকে তুলে ধরে পথের একপাশে সরিয়ে দিয়ে বাৎসায়নের উদ্দেশে বলল, 'চলুন। এবার আমরা গন্তব্যে যাত্রা করি।'
মহাসর্পকে পাশ কাটিয়ে এরপর যুবককে নিয়ে এগোলেন বাৎসায়ন। প্রাথমিক বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে ব্রাহ্মণ বাৎসায়ন সেই যুবকের উদ্দেশে বললেন, 'তুমি দেখছি সর্পবশীকরণ বিদ্যা অধ্যয়ন করেছ।'
যুবক জবাব দিল, 'না, আচার্য। সে বিদ্যা আমি অধ্যয়ন করিনি।'
বাৎসায়ন বিস্মিতভাবে বললেন, 'অধ্যয়ন করোনি! তাহলে তুমি ওই মহাসর্পের দেহ স্পর্শ করলেও সে তোমাকে দংশন করল না কেন? দংশন করাই তো ওর স্বাভাবিক প্রবৃত্তি।'
যুবক বললেন, 'দংশন করেনি, কারণ ও বুঝতে পেরেছিল আমার দ্বারা ওর কোনো ক্ষতি সম্ভব নয়। আমি কোনো সামান্য কীট-পতঙ্গেরও ক্ষতি করি না। বিসধর সর্প হোক বা দন্তনখযুক্ত সিংহ, ভীত বা ক্ষুধার্ত না হলে আক্রমণ করে না।'
যুবককে নিয়ে পথ চলেছেন ব্রাহ্মণ বাৎসায়ন। কিছু সময়ের মধ্যেই তাঁরা উপনীত হলেন কাশীরাজ ধ্রুবলোকের প্রধানা গণিকা চন্দ্রকলার অট্টালিকার সামনে। পুষ্প উদ্যান-সুরভিত প্রাসাদোপম অট্টালিকা দাঁড়িয়ে আছে চাঁদের আলোতে। অন্য সময় দেউড়িতে রক্ষী থাকে কিন্তু আজ চন্দ্রকলার নির্দেশ মতো কেউ কোথাও নেই।
তাই বাৎসায়ন ও তাঁর সঙ্গীর গতি রুদ্ধ হল না। বাটিকার অভ্যন্তরের বর্ণনা তাঁর শিষ্যার কাছ থেকে অবগত হয়েছিলেন বাৎসায়ন। কাজেই এই যুবক চন্দ্রকলার অট্টালিকাতে প্রবেশ করার পরও কোনো সমস্যা হল না। এ ব্যতীত যে পথে তারা চন্দ্রকলার শয়নকক্ষের দিকে এগোচ্ছেন তার স্থানে স্থানে স্তম্ভ, দেওয়ালের গায়ে পুষ্পস্তবক দিয়ে সজ্জিত।
যুবককে নিয়ে বাৎসায়ন এসে উপস্থিত হলেন নির্দিষ্ট কক্ষের সামনে। সে কক্ষের প্রবেশমুখ উন্মুক্তই ছিল। রুপোর পাতের অলংকরণ বিশিষ্ট দারুকাঠ নির্মিত কপাটগুলি থেকে পুষ্পশৃঙ্খল ঝুলছে। যুবককে নিয়ে সেই কক্ষে প্রবেশ করলেন বাৎসায়ন। সুগন্ধীর গন্ধে সুরভিত সেই কক্ষ। বেশ কয়েকটি প্রদীপদণ্ডে ঘৃতপ্রদীপ জ্বলছে। তার আলোয় আলোকিত সেই কক্ষ।
বাৎসায়ন প্রথমে ভালো করে সেই কক্ষটি দেখলেন। কক্ষের কেন্দ্রস্থলে চন্দনকাঠের খাটে শয্যা প্রস্তুত। সূচিশিল্প সমৃদ্ধ মহার্ঘ রেশমবস্ত্রের আবরণে আচ্ছাদিত। এ ব্যতীত মৃগচর্ম আবৃত কারুকার্যমণ্ডিত একটি ক্ষুদ্র সিংহাসনের ন্যায় দেখতে কাষ্ঠাসনও আছে এ কক্ষে। মেঝেতে তণ্ডুলচূর্ণ ও নানারঙের পাথর দিয়ে আলপনা রচনা করা। যা ষোড়শকলার অন্যতম শিক্ষা। ঘরের কোণে একটি কাঠের আশ্রয়ে রয়েছে তারের বাদ্যযন্ত্র। চারপাশ চিত্র অলঙ্কৃত দেওয়ালের গায়ের কুলুঙ্গিতে কোথাও রাখা আছে স্ফটিক আধারে স্বর্ণাভ সোমরস, মদিরা পাত্র, সুদৃশ্য সোনার সুগন্ধী পাত্র, রুপোর থালাতে রয়েছে স্বচ্ছ বস্ত্রে আবৃত ফল, মিষ্টান্ন ইত্যাদি খাদ্যসামগ্রী।
নায়ককে আপ্যায়নের জন্য কোনো ত্রুটি রাখেনি চন্দ্রকলা। তার ব্যবস্থা দেখে সন্তুষ্ট হলেন আচার্য বাৎসায়ন।
দেওয়ালের গায়ে আঁকা সেই কামার্ত হরিণীর চিত্রের দিকে তাকিয়ে মনে মনে হাসলেন। কক্ষে উপস্থিত মৃগচর্ম আচ্ছাদিত কাষ্ঠাসনটা দেখিয়ে বাৎস্যায়ন সেই যুবককে বললেন, 'তুমি ওই আসনে উপবেশন করো। কিছুক্ষণের মধ্যেই নায়িকা তোমার সামনে উপস্থিত হবে।'
তাঁর কথা শুনে মৃদু হেসে যুবক সেই আসনে বসল। আর বাৎসায়ন সে কক্ষ ত্যাগ করে দরজা কপাট বন্ধ করে পাশের কক্ষে প্রবেশ করলেন। রুপোর প্রদীপদানে একটা মাত্র প্রদীপ জ্বলছে ঘরে। রাজগণিকার মহার্ঘ শয়নকক্ষ। হাতির দাঁতের পালঙ্ক, সোনারুপো নির্মিত আসবাবপত্রতে পরিপূর্ণ সেই কক্ষ।
চন্দ্রকলা তাঁর আচার্যের আগমনের প্রতীক্ষাতেই ছিল। তার বসনে সোনার সুতোয় বোনা নীল রঙের মসৃণ রেশমবস্ত্র। আপাতস্বচ্ছ সেই বস্ত্রের মধ্যে দিয়ে তার শরীরের গোপন আধারগুলি অনুমান করা যায়। উজ্জ্বল রক্তবর্ণের বক্ষবন্ধনী জরির ফিতে দিয়ে উন্মুক্ত পৃষ্টদেশে বাঁধা। কেশদাম মাথার ওপরে চুড়ো করা, যাতে তার গ্রীবা ও পৃষ্ঠদেশ পুরুষকে চুম্বকের মতো আকর্ষিত করে। প্রদীপের কাজল দিয়ে তার হরিণ চোখকে আরও গভীর মোহময়ী করে তুলেছে সে। ওষ্ঠাধর সাজিয়েছে রক্তিমবর্ণে, যা পুরুষের মনে তার প্রতি কামনার উদ্রেক ঘটাবে।
তবে অলংকারের বাহুল্য নেই তার শরীরে। কারণ, অধিক অলংকার কামক্রীড়ায় বিঘ্ন ঘটায়,—এ কথা বাৎসায়ন তাঁর রচিত গ্রন্থতেই লিখেছেন। তিনটি অলংকার শুধু ধারণ করেছে সে। নাকে হীরকের নাকছাবি, নাভিমূলকে বেষ্টন করে সূক্ষ্ম স্বর্ণশৃঙ্খল, পায়ে সোনার নূপুর। কণ্ঠদেশ, বাহু সজ্জিত ফুলমালা দিয়ে।
আচার্য কয়েকমুহূর্ত চেয়ে রইলেন তার দিকে। উপযুক্ত বেশই ধারণ করেছে তাঁর চন্দ্রকলা। সৌন্দর্য আর যৌন আবেদন দুটোই পরিস্ফুট তার অঙ্গসজ্জায়। চন্দ্রকলার প্রসাধনীর সুবাসে আমোদিত কক্ষ।
একটি স্বর্ণপাত্রে মিষ্টান্ন, পিষ্টক ইত্যাদি খাদ্যদ্রব্য সাজিয়ে রেখেছিল চন্দ্রকলা। আচার্যের উদ্দেশে মাথা ঝুঁকিয়ে চন্দ্রকলা চাপাস্বরে বলল, 'আপনি আগে আহার্য গ্রহণ করে আমায় সেবা করার সুযোগ দিন, তারপর আমি রমণ কক্ষে প্রবেশ করব। দেওয়ালের ছিদ্রপথে যুবককে দেখলাম। আমার মনে হয়, স্বল্প সময়ের মধ্যেই ওই যুবকের মধ্যে কামভাব জাগিয়ে তুলতে পারব। এখন তো সবে রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরের সূচনা লগ্ন। হাতে অনেক সময় আছে।'
বাৎসায়ন বললেন, 'এ সবের প্রয়োজন নেই বৎস্যে। আমি আহারাদি সমাপ্ত করে এসেছি। তুমি বরং রমণ কক্ষে গমন করে ওই যুবককে উদ্দীপ্ত করো, সম্ভোগের জন্য উত্তেজিত করো। যত দ্রুত তুমি এ কাজ সম্পন্ন করবে, তত আমার পক্ষে সেটা উপকারী হবে। আমি আমার বাসস্থানে ফিরে গিয়ে মনের দ্বন্দ্ব নিশ্চিহ্ন করে আমার রচনা সমাপ্ত করতে বসতে পারব।'
চন্দ্রকলা বলল, 'আচার্যের নির্দেশ শিরোধার্য। ওই যে দেওয়ালের গায়ে ব্যাঘ্রচর্ম আচ্ছাদিত সিংহাসন প্রস্তুত আছে, ওখানে আপনি উপবেশন করলে ছিদ্রপথে রমণ কক্ষের দৃশ্য প্রত্যক্ষ করতে পারবেন।'
এ কথা বলে আচার্যের নির্দেশ পালনের জন্য কক্ষ ত্যাগের আগে চন্দ্রকলা ভূমিষ্ঠ হয়ে বাৎসায়নের চরণ স্পর্শ করল। আচার্যদেব তাঁর দক্ষিণ হস্তটি আশীর্বাদের ভঙ্গিতে উত্থিত করলেন তাঁর শিষ্যা চৌষট্টি কলায় নিপুণা রাজগণিকা চন্দকলার প্রতি। আচার্যের আশীর্বাদ গ্রহণ করে শয়নকক্ষ ত্যাগ করল চন্দ্রকলা।
বাৎসায়ন এগিয়ে সেই ব্যাঘ্রচর্মের আসনে উপবেশন করে ছিদ্রপথে চোখ রেখে প্রস্তুত হলেন চন্দ্রকলা ও সেই যুবকের মিলনক্রিয়া প্রত্যক্ষ করার জন্য।
ইতিপূর্বে এভাবে আড়াল থেকে বহুবার নর-নারীর যৌন সম্ভোগের দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেছেন, গণিকালয় থেকে গৃহস্থের বাটিকায়, এমনকী রাজঅন্তঃপুরেও। বিশ্লেষণ করেছেন নর-নারীর কামকলার প্রতিটি পর্যায়, প্রতিটি মুহূর্তও। নির্যাস তিনি লিপিবদ্ধ করেছেন কামসূত্রম্ গ্রন্থে।
প্রদীপের উজ্জ্বল আলোতে পাশের কক্ষের সব কিছু বাৎসায়নের চোখে স্পষ্ট দৃশ্যমান। হরিণচর্মের আসনে স্থিরভাবে বসে আছে সেই যুবক। নির্মল, প্রশান্ত মুখমণ্ডল।
বাৎসায়ন মনে মনে হাসলেন। আর কিছু সময়ের মধ্যে ওই মুখমণ্ডলেই ফুটে উঠবে তীব্র কামের আগুন, ওই নির্লিপ্ত চোখ দুটো উজ্জ্বল হয়ে উঠবে সম্ভোগের উত্তেজনায়। বাৎসায়ন দেখলেন, কয়েক মুহূর্তের মধ্যে গণিকা চন্দ্রকলা প্রবেশ করল সেই প্রমোদ কক্ষে। ভিতর থেকে কপাট বন্ধ করল।
নূপুরের মূর্ছনার শব্দ তুলে চন্দ্রকলা হরিণচর্মের সিংহাসনে আসীন যুবকের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে করজোড়ে মাথা ঝুঁকিয়ে প্রণাম জানাল। এটা গণিকাদের রীতি। এর সঙ্গে নায়কের, নায়িকার প্রতি যৌন আগ্রহের একটা সম্ভাবনা সূচিত হয়। কারণ ওভাবে ঝুঁকে প্রণাম জানালে কয়েক মুহূর্তের জন্য নায়িকার বক্ষবিভাজিকা দৃশ্যমান হয় নায়কের চোখে।
চন্দ্রকলা যুবককে প্রণাম জানাতে সেই যুবকও নিজের বুকের কাছে হাতজোড় করে চন্দ্রকলাকে সম্ভাষণ জানাল। আর তার সঙ্গে সঙ্গে এক আবছা হাসি ফুটে উঠল যুবকের ঠোঁটের কোণে।
গণিকা বলল, 'আমার আতিথ্য গ্রহণ করার জন্য আপনাকে কৃতজ্ঞতা জানাই। অতিথি সৎকারের সব ব্যবস্থাই এ কক্ষে প্রস্তুত করে রেখেছি। নানাবিধ ফলাহার, কেশর সমৃদ্ধ দুগ্ধ, মিষ্টান্ন, পিষ্টক, ঘৃতদগ্ধ ছাগ মাংস, মধুজারিত কলাপী মাংস, হরিণ মাংস প্রস্তুত আছে আপনার জন্য। অগ্রে আহার গ্রহণ করুন, তারপর আপনাকে আনন্দ প্রদান করব।'
যুবক ঘাড় নেড়ে বুঝিয়ে দিল, খাদ্যগ্রহণে তার আগ্রহ নেই।
চন্দ্রকলা বলল, 'তবে কিঞ্চিৎ মদিরা সেবন করুন। অতি উৎকৃষ্ট সোমরস। জ্যোৎস্নার উত্তাপে প্রস্তুত করা হয়েছে এই সোমরস। এ নগরীতে এই সোমরস শুধুমাত্র দুজনের অধিকারে আছে। কাশীনরেশ আর আমার। এক পাত্র এই সোমরস হীরকখণ্ডের থেকেও মহার্ঘ। তা আমি আপনার সেবায় নিবেদন করব।'
গণিকা চন্দ্রকলার কথা শুনে স্মিত হাসি ফুটে উঠল যুবকের ঠোঁটে। মাথা নেড়ে এবারও যুবক বুঝিয়ে দিল, তার মদিরার প্রয়োজন নেই।
যুবকের খাদ্য-পাণীয় গ্রহণে অনীহা দেখে চন্দ্রকলা বলল, 'ও, আপনি মনে হয় 'সুর-মদিরা' পানে আগ্রহী? তবে তা দিয়েই আপ্যায়ন করি আপনাকে।'
যুবক এবার আর আপত্তি করল না। ষোড়শ কলার অন্যতম আবশ্যিক কলা হল 'বাদ্যবিদ্যা'। স্বাভাবিক কারণেই চন্দ্রকলা এ বিদ্যায় অতীব পারদর্শী।
তারের বাদ্যযন্ত্রটা নিয়ে এসে যুবকের সামনে বসল চন্দ্রকলা। তার শুভ্র অঙ্গুলি ধীরে ধীরে ঝংকার তুলতে লাগল বাদ্যযন্ত্রে। অপূর্ব সুরের মূর্ছনা ছড়িয়ে পড়ল সারা কক্ষে।
বাৎসায়ন ছিদ্রপথে দেখলেন, বুদ্ধিমতী গণিকা যুবককে আকৃষ্ট করার জন্য নির্দিষ্ট ভঙ্গিতে বাদ্যযন্ত্র বাজাতে বসেছে। তার ঊরু থেকে পায়ের অঙ্গুলি পর্যন্ত উন্মুক্ত। চন্দ্রকলার শুভ্র মসৃণ ঊরু বেয়ে প্রদীপের আলো পিছলে পড়ছে। সেখানে দৃষ্টিপাত করলে পুরুষের মনে শিহরন জেগে উঠবে ওই ঊরুদ্বয় স্পর্শ করার বাসনায়।
যুবক চেয়ে আছে চন্দ্রকলার দিকেই। বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে মাঝে মাঝে পায়ের পাতা নাড়াচ্ছে চন্দ্রকলা। সেই নিক্কণ ধ্বনিতে জেগে উঠছে কামের আমন্ত্রণ।
বেশ কিছু সময় ধরে নায়কের উদ্দেশে বাদ্য পরিবেশন করে থামল চন্দ্রকলা। তারপর প্রশ্ন করল, 'আমার বীণা কেমন উপভোগ করলেন?'
নায়ক জবাব দিল, 'অতি উত্তম।'
আচার্য বাৎসায়নের মনে হল, এই যুবক এবার গণিকার প্রতি আকৃষ্ট হতে শুরু করেছে। বাৎসায়নের মতো ঠিক একই কথা মনে হল গণিকা চন্দ্রকলারও। সে বাদ্যযন্ত্র মাটিতে নামিয়ে রেখে ধীর পায়ে গিয়ে দাঁড়াল নায়কের সন্নিকটে।
ঠিক সেই সময় কক্ষের সব সুগন্ধকে পরাভূত করে চন্দনের গন্ধ অনুভব করল চন্দ্রকলা। নিজের গলা থেকে ফুলমালা খুলে নায়কের কণ্ঠে পরিয়ে দিয়ে তার দক্ষিণ হস্ত তুলে নিয়ে চন্দ্রকলা তাতে চুম্বন করল। যুবক আপত্তি করল না।
চন্দ্রকলা তাকে হাত ধরে তুলে নিয়ে এগোল কুসুম শয্যার দিকে।
এক্ষেত্রেও যুবক আপত্তি করল না। শান্ত পদক্ষেপে এগিয়ে গিয়ে হাতির দাঁত রচিত পালঙ্কে উপবেশন করল। চন্দ্রকলা বসল তার পাশে। দুজন শয্যাতে উপবিষ্ট হবার পর চন্দ্রকলা যুবককে প্রশ্ন করল, 'আমাকে কেমন দেখতে লাগছে আপনার?'
বাৎসায়ন শুনতে পেলেন, যুবক জবাব দিল, 'পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণীই সুন্দর। তুমিও সুন্দর।'
বাম বাহু দিয়ে চন্দ্রকলা যুবকের কোমর আলিঙ্গন করল। যুবক আশ্চর্যরকম নিরুত্তাপ! সে অন্য পুরুষের মতো চন্দ্রকলাকে প্রতি-আলিঙ্গন করল না। আলিঙ্গন, চুম্বন বা দংশন নারী-পুরুষের পূর্ণ মিলনের আগে শরীরকে উত্তেজিত করে তোলার জন্য করা হয়।
পুরুষের বীর্যপাত বা নারীর রাগমোচনের পর আর এসবের প্রয়োজনীয়তা থাকে না। আচার্য বাৎসায়ন তাঁর গ্রন্থে ইতিমধ্যেই তা বিবৃত করেছেন। বিভিন্ন চুম্বনের কথাও বিবৃত করেছেন তিনি। যার শিক্ষা নিয়েছে চন্দ্রকলা।
সাধারণত আলিঙ্গন, চুম্বনের ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করে পুরুষরাই। কিন্তু এক্ষেত্রে এ দায়িত্ব গ্রহণ করতে হবে চন্দ্রকলাকেই।
তাই সে যুবকের কোমর আলিঙ্গন করার পর যখন তার দিক থেকে কোনো সাড়া পেল না, সে যুবকের উন্মুক্ত কাঁধে মুখ নামিয়ে মৃদু চুম্বন করল।
বাৎসায়ন রচিত গ্রন্থে এ চুম্বনের নাম 'প্রশ্ন চুম্বন'। নারী-পুরুষ যখন পাশাপাশি উপবেশন করে তখন একজন অন্যজনের মনে কামেচ্ছা আছে কিনা তা জানার জন্য 'প্রশ্ন চুম্বন' বা জিজ্ঞাসা চুম্বন করে।
কিন্তু এ চুম্বনের পরও নিস্তব্ধ হয়ে রইল যুবক। তা দেখে চন্দ্রকলা এরপর প্রস্তুত হল 'ঘট্টিতক চুম্বনের' জন্য। এ চুম্বনে নারীর ভূমিকাই প্রধান। এ চুম্বন পুরুষকে জানায় নারী লজ্জামুক্ত হতে চলেছে।
চন্দ্রকলা নিজের দক্ষিণ হস্তের করতল দিয়ে যুবকের চোখ আবৃত করে নিজের ফুলের পাপড়ির মতো ঠোঁট নামিয়ে আনল যুবকের ঠোঁটে। তার ঠোঁট স্পর্শ করে এক অদ্ভুত শীতল অনুভূতি হল চন্দ্রকলার। একই সঙ্গে সে বুঝতে পারল সব সুগন্ধকে ছাপিয়ে যুবকের মুখ গহ্বর থেকে নির্গত হচ্ছে চন্দনের সৌরভ। কিন্তু ঘট্টিতক চুম্বনেও একটুও চঞ্চল হল না যুবক, নিস্পৃহ রইল।
যুবকের পরনে জৈনদের মতো বেশ। একটি মাত্র বস্তুখণ্ড দিয়ে তার ঊরু থেকে কাঁধ আবৃত। চন্দ্রকলা কিছু সময় আগে তার পরিয়ে দেওয়া ফুলমালা যুবকের কণ্ঠদেশ থেকে খুলে পাশে নামিয়ে রেখে তার বসন কাঁধ থেকে উদরের নীচে নামিয়ে আনল।
উন্মোচিত হল যুবকের ত্রিভুজাকৃতি উন্নত বক্ষ, মেদহীন কটিদেশ। চন্দ্রকলা এরপর প্রথমে একটা দীর্ঘ চুম্বন করল তার প্রশস্ত বক্ষে। তারপর তার চুম্বনরত ওষ্ঠ ধীরে ধীরে নেমে আসতে লাগল যুবকের শরীর বেয়ে।
বাৎসায়ন খেয়াল করলেন, সঙ্গে সঙ্গে যুবকের চোখের পাতা মুদে আসতে লাগল। বাৎস্যায়ন প্রায় নিশ্চিত হলেন, যুবকের মধ্যে চন্দ্রকলার চুম্বন স্পর্শে কাম উত্তেজনা সঞ্চারিত হতে শুরু করেছে। অনুভূতির ফলে যুবকের চোখের পাতা মুদে আসছে। আর কিয়ৎকালের মধ্যেই চক্ষু উন্মীলিত করে প্রবল যৌন আগ্রহে সে নিষ্পেষণ শুরু করবে চন্দ্রকলাকে।
চুম্বন করে চলেছে চন্দ্রকলা। কখনও ঝুঁকে পড়ে যুবকের উন্মুক্ত ঊরুতে, নাভিতে, কখনও বা মুখ তুলে যুবকের বক্ষে, বাহুতে, স্কন্ধে, গ্রীবাতে। আলিঙ্গনাবদ্ধ অবস্থাতে চন্দ্রকলার চন্দ্রমুখী নরম স্তনযুগল মসৃণ বক্ষবন্ধনীর আড়াল থেকে যুবকের শরীর স্পর্শ করছে। যুবককে চোখ বুজতে দেখে তার মধ্যে কামভাব সঞ্চারিত হচ্ছে, এ কথা বাৎসায়নের মনে হলেও গণিকা চন্দ্রকলার অন্য কথা মনে হতে লাগল।
চন্দ্রকলার মনে হল, চোখ বন্ধ করে যুবক যেন ধ্যানস্থ হতে শুরু করেছে। তার ঘনিষ্ঠ চুম্বনের ফলে যুবকের শরীরে উষ্ণতা জেগে ওঠার পরিবর্তে যেন গভীর শৈত্য নেমে আসছে! চন্দ্রকলা ব্যাপারটাতে বিস্মিত হলেও সে চুম্বনক্রিয়া চালিয়ে যেতে লাগল। কারণ, বহু পুরুষের শয্যাসঙ্গিনী হবার অভিজ্ঞতায় সে জানে যে, যে-সব পুরুষ অতিমাত্রায় নারীসঙ্গ করে, আর দীর্ঘ দিন ধরে যারা নারীসঙ্গে বঞ্চিত, তাদের উভয়ের ক্ষেত্রেই শরীর জেগে উঠতে অনেক বেশি সময় ব্যয় হয়। হয়তো বা এই যুবক এই দুই গোত্রের পুরুষের কোনো একটির অন্তর্গত।
একসময় চন্দ্রকলা যুবককে জাগিয়ে তোলার জন্য 'স্ফুরিতক' চুম্বন করল। অর্থাৎ নিজের ওষ্ঠের ভিতর ধারণ করল যুবকের ওষ্ঠ। মুহূর্তের পর মুহূর্ত কেটে যেতে লাগল ম্ফুরিতক চুম্বনরত অবস্থায়। একটুও চঞ্চল হল না যুবক, সাড়া দিল না। গণিকা চন্দ্রকলার মনে হতে লগল নিজের মুখগহ্বরে ধারণ করা যুবকের ওষ্ঠদ্বয় যেন তুষারের মতো শীতল হতে শুরু করেছে। এর পরই অট্টলিকার পশ্চাৎদেশের নদীতীরের জঙ্গল থেকে শৃগালের সম্মিলিত ধ্বনি জানান দিল রাত্রির দ্বিতীয় প্রহর শেষ হল। চমকে উঠলেন আচার্য বাৎসায়ন।
যুবকের শরীর যখন চুম্বনে সাড়া ছিল না, যখন সে চোখের পাতা খুলল না, তখন তৃতীয় প্রহরের সূচনা লগ্নে নানাবিধ চুম্বনের সঙ্গে চন্দ্রকলা নখরলিখন শুরু করল যুবকের উন্মুক্ত শরীরে। 'নখরলিখন' হল, নখ দিয়ে বিপরীত লিঙ্গের শরীরে চিত্রাঙ্কন করে তাকে উত্তেজিত করা।
গণিকা চন্দ্রকলাকে তার আচার্য বাৎসায়ন যে আট প্রকার নখরলিখন আছে অর্থাৎ—আচ্ছুরিতক, অর্ধচন্দ্র, মণ্ডল, রেখা, ব্যাঘ্রনখ, ময়ূরপদক, শশপ্লুতক ও উৎপলপত্রক-এর পাঠ দিয়েছেন, দংশনের উপযুক্ত নখ প্রস্তুতেরও পাঠ দিয়েছেন। স্বাভাবিক কারণেই চন্দ্রকলার নখও উত্তমভাবে প্রস্তুত করা নখরলিখনের জন্য।
আচার্য বাৎসায়নের পাঠ-অনুসারে নানারূপ নখরলিখন করে চলল যুবকের বক্ষদ্বয় বা বাহুমূলে, গলদেশে, পৃষ্ঠদেশ, উন্মুক্ত বক্ষদেশ, কটিদেশ, নিতম্ব ও ঊরুযুগলে। এমনকী যে স্থান সাধারণত নখরাঘাতের জন্য বিবেচিত হয় না, অর্থাৎ যুবকের পুরুষঅঙ্গের বস্ত্রখণ্ডর ওপর দিয়ে নখরলিখন শুরু করল চন্দ্রকলা। বেড়ে চলল রাত। পুরুষের লিঙ্গ কিছুতেই উত্থিত হল না!
আড়াল থেকে এ দৃশ্য দেখে বাৎসায়ন নিজেও এবার উত্তেজিত হতে শুরু করলেন। না, কামের উত্তেজনা নয়, শ্রদ্ধা তৈরি হতে শুরু করল তাঁর মনের মধ্যে। যে চন্দ্রকলার সামান্য স্পর্শে, চুম্বনে পুরুষের শরীর নিমেষে জাগ্রত হয়, তার এত সময় লাগছে কেন এই যুবকে জাগিয়ে তুলতে? সময় তো তৃতীয় প্রহরের মধ্যভাগের দিকে এগোচ্ছে।
নখরলিখনে সাড়া না মেলায় অভিজ্ঞ গণিকা এরপর অন্য কৌশল গ্রহণ করল। যুবককে সাময়িক আলিঙ্গনমুক্ত করে সে উঠে দাঁড়াল। তারপর সে খসিয়ে ফেলতে লাগল নিজের শরীরের বস্ত্র-আবরণ। সে সম্পূর্ণ নগ্ন প্রায়। সুতো দিয়ে কটিদেশের সঙ্গে বাঁধা শুধু একটা ফিতের মতো বস্ত্রখণ্ড আড়াল করে রেখেছে তার যোনিমুখকে। প্রদীপের আলোয় উন্নত তার শঙ্খের মতো স্তনযুগল। তার বৃন্তগুলো যেন সুতীক্ষ্ন বর্শার সূচিমুখ, যা কামের আগুনে বিদ্ধ করতে পারে দেবতা-যক্ষ-মানবকে।
এতক্ষণ ধরে যুবকের সঙ্গে আলিঙ্গন-ঘর্ষণের ফলে ঘর্মাক্ত হয়ে উঠেছে চন্দ্রকলার শরীর। একফোঁটা স্বেদবিন্দু চন্দ্রকলার গভীর নাভিমুখে জমা হয়ে হীরকের মতো দ্যুতি ছড়াচ্ছে। তার বাহু, কটিদেশ, মৃদঙ্গের মতো স্ফুরিত নিতম্ব, কদলীকাণ্ডের মতো মসৃণ ঊরুযুগল বেয়ে আলো মাটিতে পিছলে পড়ছে। এ শরীর যেন কোনো মানবীর নয়, এ শরীরের জন্ম হয়েছে স্বয়ং রতিদেবের কল্পনা থেকে।
নিজের আসনে এবার সোজা হয়ে বসলেন বাৎসায়ন। তাঁর মনে হল গণিকা চন্দ্রকলার এ শরীরকে অগ্রাহ্য করার ক্ষমতা ত্রিভুবনে কোনো পুরুষের নেই। ছিদ্রপথে চোখ রেখে তিনি প্রত্যক্ষ করতে লাগলেন এর পরবর্তী দৃশ্য—!
নিরাবরণ, নগ্নিকা চন্দ্রকলা এরপর যুবকের কাছে গিয়ে তাকে পুনরায় আলিঙ্গন করল। মুদিত চক্ষু যুবকের শরীরে তার সূচাগ্র স্তনবৃন্ত দিয়ে ঘর্ষণের সঙ্গে সঙ্গে দাঁত দিয়ে মৃদু দংশন শুরু করল। তার কাঁধে, গ্রীবায়, কানের লতিতে। নানা ভঙ্গিমায় এ কাজ করে চলল সে। কখনও বা সে যুবকের হস্তপল্লব তুলে নিয়ে তা স্পর্শ করাতে লাগল নিজের স্তনযুগলে, নিতম্বতে, যোনিমুখে। তবু যুবক স্থির, অচঞ্চল, ধ্যানস্থ। এরই মাঝে সে যুবকের লিঙ্গ স্পর্শ করে বোঝার চেষ্টা করতে লাগল তার পুরুষাঙ্গ উত্থিত হয়েছে কি না। কিন্তু তার কোনো আভাস মিলল না।
বরং চন্দ্রকলার মনে হতে লাগল এই যুবকের শরীর যেন ক্রমে ক্রমে পর্বতগাত্রের তুষারের মতো শীতল হয়ে আসছে। যেন কোনো মৃত ব্যক্তির শরীর আলিঙ্গন করে আছে সে। তবে এই যুবক মৃত নয়, তার বক্ষের মৃদু ওঠানামা জানান দিচ্ছে সে জীবিত।
রাত্রি এগিয়ে চলল তার নিজের নিয়মে। একসময় চন্দ্রকলার মনে হতে লাগল এই তুষারমূর্তির স্পর্শে তার নিজের শরীরও শীতল, অবসন্ন হয়ে পড়ছে।
যুবকে জাগিয়ে তোলার জন্য শেষ পন্থা ভাবল অবসন্ন চন্দ্রকলা—নিজের যোনিতে এই যুবকের লিঙ্গ প্রবেশের চেষ্টা করবে সে। ভাবামাত্র চন্দ্রকলা যুবকের মুখোমুখি দাঁড়াল। তারপর একটানে ছিঁড়ে ফেলল নিজের কটিদেশের সুতোর বাঁধন। ফিতের মতো শেষ বস্ত্রখণ্ডটাও খসে পড়ল তার অঙ্গ থেকে। এখন সে উন্মুক্ত যোনি। লজ্জাহীনা, রাজগণিকা চন্দ্রকলা।
যে যুবকের বস্ত্রখণ্ডটা স্পর্শ করতে যাচ্ছিল তাকে সম্পূর্ণরূপে আবরণহীন করার জন্য, কিন্তু ঠিক সেই মূহূর্তে শৃগালধ্বনি কানে এল! শেষ হল রাত্রির তৃতীয় প্রহর! হতভম্ব কামসূত্র প্রণেতা বাৎসায়ন। গণিকা চন্দ্রকলার শরীরটা এবার পরাজয়ের গ্লানিতে কাঁপতে শুরু করেছে। শৃগালধ্বনির পর ধীরে ধীরে চোখ মেলল সেই যুবক। কয়েকমুহূর্ত সে চেয়ে রইল চন্দ্রকলার নিরাবরণ শরীরের দিকে। তার চোখের সামনে চন্দ্রকলার স্তনযুগল থেকে, যোনিদেশ সবই উন্মুক্ত। তার শরীরের দিকে চেয়ে সেই যুবকের মুখমণ্ডলের বিচিত্র সেই হাসি ফুটে উঠল। নির্লিপ্তভাবের হাসি, প্রশান্তির হাসি। তার চোখের সামনে আরও কয়েকমুহূর্ত নগ্ন অবস্থায় দাঁড়িয়ে রইল চন্দ্রকলা। তারপর কোনোরকমে বস্ত্র পরিধান করে টলতে টলতে কক্ষত্যাগ করল।
ক্লান্ত বিধ্বস্ত চন্দ্রকলা যখন তার শয়নকক্ষে প্রবেশ করল, তখন নিজের আসন থেকে উঠে দাঁড়িছেন আচার্য বাৎসায়ন। নিজের চোখকে যেন তিনি তখনও বিশ্বাস করতে পারছেন না। তবে কি তাঁর কামশাস্ত্র সম্পর্কে এতদিনের সব অভিজ্ঞতা মিথ্যা? অসার তাঁর চৌষট্টি কলাবিদ্যা? জৈন সন্ন্যাসীর কথাই কি তবে ঠিক? কামের আসন শ্রেষ্ঠ নয়?
শয়নকক্ষে প্রবেশ করে দণ্ডায়মান আচার্যের পদতলে নিজেকে সমর্পণ করল গণিকা চন্দ্রকলা। কম্পিত, ব্যথিত কণ্ঠে সে বাৎসায়নের উদ্দেশে বলল, 'আমাকে মার্জনা করুন আচার্য। আমি ব্যর্থ হয়েছি। কিন্তু কেমন এমন হল? আপনি তো সবই লক্ষ করেছেন। কোথাও কি কোনো ত্রুটি ঘটল? আমি কি সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে পারিনি আপনার চৌষট্টি কলা?
কিছুক্ষণ নিশ্চুপ রইলেন বাৎসায়ন। প্রাথমিক বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে নিজে একটু ধাতস্থ হবার পর তিনি চন্দ্রকলার মাথায় হাত রেখে বললেন, 'না। তোমার আচরণে বা চৌষট্টি কলা প্রয়োগে আমি কোনো ত্রুটি খুঁজে পাচ্ছি না। তবে যা ঘটল সেও তো বাস্তব। কিন্তু আমার এতদিনের অভিজ্ঞতা কীভাবে মাত্র দুই প্রহরে ব্যর্থ হয়ে যাবে?'
আচার্য বাৎসায়ন তাঁর শিষ্যার আচরণে কোনো ত্রুটি খুঁজে পাননি বলায় গণিকা চন্দ্রকলা কিছুটা আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়ে বলল, 'আপনার শিক্ষা মিথ্যা হতে পারে না আচার্যদেব। হয়তো আর একটা প্রহর সময় পেলে আমি এই যুবকের কাম জাগিয়ে তুলতে সফল হতাম।'
শিষ্যার কথা শুনে আচার্য বাৎসায়নেরও মনে হল, না, তাঁর অভিজ্ঞতা, অধ্যয়ন কোনোভাবে মিথ্যা হতে পারে না। সেই জৈন সন্ন্যাসীর পরামর্শমতো এই যুবক হয়তো এমন কোনো কৌশল গ্রহণ করেছে যে কারণে সে কামতাড়িত হয়নি।
তিনি চন্দ্রকলাকে বললেন, 'তুমি ঠিকই বলেছ চন্দ্রকলা। আমার রচিত গ্রন্থের নির্দেশ ব্যর্থ হতে পারে না। আর তোমার চৌষট্টি কলার শিক্ষাও মিথ্যা নয়।'
চন্দ্রকলা বলল, 'তবে? আর একটি প্রহর কি আমি পেতে পারি না ওই যুবককে সঙ্গদান করার জন্য?'
একটু ভেবে নিয়ে বাৎসায়ন বললেন, 'আগামীকাল সন্ধ্যায় সেই অবগুণ্ঠনধারী জৈনের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হবার কথা। তাঁর সঙ্গে বাক্যালাপ করে দেখি কোনো সমাধান সূত্র লাভ হয় কি না? তার পূর্বে কালকের দিনটাও আমার এ বিষয় নিয়ে ভাবনার প্রয়োজন আছে। একদিন পর তুমি আমার সঙ্গে অবশ্যই সাক্ষাৎ করবে। আমি এত দ্রুত কোনো ব্যাপারে হাল ছাড়ি না।'
গণিকা চন্দ্রকলা বলল, 'আচার্য, যথা আজ্ঞা। নিশ্চিত সাক্ষাৎ করব আপনার সঙ্গে।'
সেই যুবককে এবার ফিরিয়ে নিয়ে যেতে হবে ব্রাহ্মণ বাৎসায়নকে। তাই তিনি চন্দ্রকলার কক্ষ ত্যাগ করে পার্শ্ববর্তী কক্ষে প্রবেশ করলেন। কিন্তু সেখানে প্রবেশ করে অবাক হয়ে গেলেন। সেই যুবক ইতিমধ্যে অন্তর্হিত।
চন্দ্রকলার প্রাসাদের অন্যত্রও যখন সেই যুবকের সন্ধান মিলল না, তখন চন্দ্রকলার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে অট্টালিকা ত্যাগ করে তিনি রওনা হলেন নিজ বাসস্থানের দিকে। তিনি যখন তাঁর গন্তব্যে পৌঁছলেন তখন শুকতারা ফোটার সময় হয়ে গেছে। এতএব তিনি নিজ বাটিকায় প্রবেশ করার আগে নদীঘাটের দিকে এগোলেন প্রাত্যহিক অবগাহন ও সূর্যপ্রণামের জন্য।
নদীতীরস্থ সেই গৃহে ভাবনাচ্ছন্ন হয়ে এক মানসিক অস্থিরতার মধ্যে সারাদিন অতিবাহিত করলেন ব্রাহ্মণ বাৎসায়ন। নিজের দর্শনের প্রতি এখনও তিনি প্রত্যয়ী। শাস্ত্রে লেখা আছে, চোখের দৃষ্টিতে দেখা বস্তুও সবসময় সত্য হয় না। গতরাতের ঘটনাটা তাঁকে একটু নাড়া দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু তা বলে কি তাঁর এতদিনের অভিজ্ঞতাকে দুই প্রহরের জন্য নস্যাৎ করা উচিত? তিনি তো কল্পনার আশ্রয় নিয়ে তাঁর গ্রন্থ রচনা করেননি! সারাজীবন ধরে যৌনতা সম্পর্কে নিবিড় জ্ঞান অণ্বেষণ ও পর্যবেক্ষণের ফলশ্রুতি হল চৌষট্টি কলাবিদ্যা।
বহুদর্শী ব্রাহ্মণ বাৎসায়ন! তক্ষশীলা থেকে তিনি যে পথ-পরিক্রমা শুরু করেছিলেন তা আজ প্রায় সমাপ্তির মুখে। আর এই দীর্ঘ-পথ-পরিক্রমায় যে জ্ঞান অর্জন করেছেন, বিভিন্ন প্রাচীন পুথি পাঠ করে তা বিশ্লেষণ করেই তিনি এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, 'কামের' আসন সর্বপ্রথম।
কত রাজ্যের উত্থান-পতন ঘটেছে নারী-পুরুষের সম্পর্ককে কেন্দ্র করে। আর সেই সম্পর্কের অন্তর্নিহিত বিষয় হল কাম। নিভৃত কক্ষে সারাদিন ধরে গতরাতের ঘটনার বিচার-বিশ্লেষণ করে বাৎসায়ন শেষ পর্যন্ত এই সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন যে, ব্যাপারটার মধ্যে কোথাও কোনো ফাঁক আছে।
এমনও তো হতে পারে যে ওই যুবক যৌনতায় সাড়া দেওয়ার ক্ষেত্রে শারীরিকভাবে অক্ষম বা এ ধরনের কিছু ব্যাপার আছে? অথবা অধিক নারীসঙ্গের ফলে অতি দীর্ঘ সময় লাগে তার কামপীড়নে উত্তেজিত হতে। যা অনেক সময় বহু রানিদের সঙ্গে সম্ভোগ করা রাজাদের ক্ষেত্রে ঘটে থাকে।
এমনও তো হতে পারে যে, ওই পুরুষকে গতকাল সারাদিন ধরে বহু নারীর সঙ্গে মিলিত করে বহুবার বীর্যস্খলন করানো হয়েছে।
হ্যাঁ, নিশ্চিত এমন কোনো ব্যাপারই লুক্কায়িত আছে ওই যুবকের নিস্পৃহতার পিছনে। চন্দ্রকলা যদি আর একপ্রহর সময় পেত তাহলে অবশ্যই জাগ্রত করতে পারত যুবকের লিঙ্গকে। বাৎসায়নের ভাবনা মিথ্যা হতে পারে না।
দিনের শেষে যখন গঙ্গাবক্ষে সূর্যদেব অবগাহন শুরু করলেন তখন ব্রাহ্মণ বাৎসায়ন বাটিকা ত্যাগ করে রওনা হলেন ঘাটের দিকে। সেই একই ঘাটের সোপানশ্রেণি বেয়ে নীচে নেমে একই স্থানে উপবেশন করলেন তিনি।
ধীরে ধীরে নদীবক্ষে সূর্য ডুবে যাচ্ছে। বেশ মনোরম পরিবেশ। নদীর বুকে ডুবতে থাকা সূর্যের দিকে চেয়ে বাৎসায়ন ভাবছিলেন চোখে প্রত্যক্ষ করা দৃশ্য যে সবসময় সত্যি হয় না তার প্রমাণ ওই সূর্যদেব। সকল প্রাণের আধার সূর্যদেব কি সত্যি নদীবক্ষে হারিয়ে যেতে পারেন? তিনি যা প্রত্যক্ষ করছেন সে তো নিছকই দৃষ্টিবিভ্রম মাত্র। আসলে সূর্যদেব তো নিজের স্থানেই অবস্থান করছেন।
তেমনই গতরাতে তিনি যা প্রত্যক্ষ করেছেন আপাতদৃষ্টিতে তা সত্য মনে হলেও আসলে সত্যি নয়। তাঁর বিচলিত হবার মতো কোনো কারণ ঘটেনি। নদীবক্ষ থেকে শীতল বাতাস উঠে এসে শরীর জুড়িয়ে দিচ্ছে। মানসিক ক্লান্তিভাব কেটে যেতে লাগল তাঁর। তিনি প্রস্তুত হতে লাগলেন জৈনের প্রত্যাগমনের জন্য। কোন পথে তিনি উপস্থিত হন তা বোঝার জন্য বাৎসায়ন চারপাশে লক্ষ করতে লাগলেন।
সূর্য ডুবে গেল। নদীবক্ষে তার শেষ আভাটুকু মুছে গিয়ে অন্ধকার নামতে শুরু করল। একই সঙ্গে নদীতীরে অবস্থিত বৃহৎ ঘাটগুলিতে সন্ধ্যারতির প্রস্তুতিও শুরু হল। নদীবক্ষে ভাসতে শুরু করল প্রদীপমালা। চারপাশে তাকাতে তাকাতে তিনি ভাসমান আলোকবিন্দুগুলোর দিকে কিয়ৎক্ষণ দৃষ্টিপাত করেছেন মাত্র, সহসা শুনতে পেলেন সেই অবগুণ্ঠনধারী জৈনের কণ্ঠস্বর—'প্রণাম মহর্ষি বাৎসায়ন।'
চমকে উঠে বাৎসায়ন দেখলেন তাঁর কয়েক হাত তফাতে উপস্থিত হয়েছেন সেই অবগুণ্ঠনধারী! কিন্তু কয়েকমুহূর্তের মধ্যে ইন্দ্রজালের মতো কীভাবে তিনি উপস্থিত হলেন তাঁর পাশে? প্রশ্নটা করতে গিয়েও সৌজন্যবশত থেমে গেলেন তিনি।
সোপানের একপ্রান্তে অন্ধকারাচ্ছন্ন স্থানে ধীরে ধীরে উপবেশন করলেন অবগুণ্ঠনধারী। কিছুক্ষণের জন্য নীরবতা নেমে এল চারদিকে। তার্কিক বাৎস্যায়ন নিজেকে প্রস্তুত করে নিলেন অবগুণ্ঠনধারীর বক্তব্যের প্রত্যুত্তর দেবার জন্য।
জৈন নীরবতা ভঙ্গ করে বললেন, 'কী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন আপনি? কামের স্থান অগ্রে? নাকি ধর্মের স্থান?'
ব্রাহ্মণ বাৎসায়ন জবাব দিলেন, 'এ কথা ঠিক গতরাত্রিতে আপনার প্রেরিত যুবকের বাহ্যিক আচরণে কামভাব জাগ্রত হয়নি। তবে আমি আমার ভাবনাতে এখনও অবিচল।'
জৈন বললেন, 'কেন? চৌষট্টি কলাতে নিপুণা গণিকা তো আপনার গ্রন্থের নির্দেশ মেনেই যুবককে উদ্দীপ্ত করার চেষ্টা করেছে এবং অবশেষে ব্যর্থ হয়েছে। এবং সে দৃশ্য আপনি নিজেই প্রত্যক্ষ করেছেন হরিণী নয়নের ছিদ্রপথে।'
অবগুণ্ঠনধারীর শেষ কথাটা শুনে স্তম্ভিত হলেন বাৎসায়ন। একটু থেমে বললেন, 'হ্যাঁ, আমি তা প্রত্যক্ষ করেছি। কিন্তু এ কথা সেই যুবক জানল কীভাবে?'
অবগুণ্ঠনধারী বললেন, 'ধর্মাচারণের মাধ্যমে যাঁরা ''জিন'' হন, তাঁরা আসক্তি, আকাঙ্ক্ষা, অহংকার, লোভ, ক্রোধ—এই আবেগগুলোকে শুধু জয়ই করেন না, তা জয়ের মাধ্যমে পবিত্র অনন্তজ্ঞান লাভ করেন। কোনো কিছুই তাঁদের কাছে অজানা থাকে না। সন্ন্যাস ও পঞ্চ মহাব্রত পালনের মধ্যে দিয়ে তাঁরা এ স্তরে উন্নীত হন।'
ব্রাহ্মণ বললেন, 'বৈদিক মুনিঋষিরাও তো অনেকেই অনন্ত বা দিব্যজ্ঞানের অধিকারী। কিন্তু তাঁরাও তো অনেকে কামের কাছে পরাস্ত হয়েছেন। পরাশর মুনি বা ব্যাসদেবও তো কামের কাছে আত্মসমর্পণ করে শূদ্র নারীর সঙ্গে মিলিত হয়েছিলেন। তাঁরা কি মহাজ্ঞানী ছিলেন না? এমনকী সৃষ্টিকর্তা প্রজাপতি ঋষিও কামার্ত হয়েছিলেন। এসব ঘটনা কিন্তু আমার বক্তব্যকেই সমর্থন করে।'
একটু চুপ করে থেকে সেই জৈন শ্রমণ বললেন, 'হ্যাঁ, তাঁরাও দিব্যজ্ঞানী ছিলেন। ইচ্ছা করলে তাঁরাও কামকে জয় করতে পারতেন। চাননি, তাই পারেননি।'
'চাননি! কেন?' বাৎসায়ন বললেন, 'তাঁরা কামকে জয় করতে চাননি কেন? আসলে তাঁরা জানতেন, কামকে জয় করা যায় না। সে কথা আমিও মনে করি।'
এ কথা বলার পর তিনি নদীর দিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে বললেন, 'এই যে নদী দেখছেন, তার উপরিভাগ থেকে সচরাচর মৎস্যকুলকে প্রত্যক্ষ করা যায় না। তার মানে কি মৎস্যকুলের অস্তিত্ব নেই? ধীবরের দল জাল নিক্ষেপ করে অথবা খাদ্যদ্রব্যের প্রলোভন দেখিয়ে তাদের জলের ওপর তুলে আনে। কাম বিষয়টি লুক্কায়িত মৎস্যের মতো। উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করলে তা আত্মপ্রকাশ করে। কোনো মৎস্য শিকারির লৌহকণ্টকে বেষ্টিত খাদ্যবস্তুকে সহজেই গলাধঃকরণ করে, আবার কখনও সেই টোপ মৎস্যকে গলাধঃকরণ করানোর জন্য শিকারিকে দীর্ঘ সময় প্রতীক্ষা করতে হয়। অবশেষে মৎস্যকে সে টেনে তোলে।'
জৈন বললেন, 'আপনার এ বক্তব্যের অন্তর্নিহিত অর্থ কী?'
বাৎসায়ন বললেন, 'এর অর্থ হল, মৎস্যবিহীন নদী যেমন হয় না, তেমনই কাম ভিন্ন শরীর হয় না। অনেক সময় সেই মৎস্যরূপী কামকে সর্বসমক্ষে আত্মপ্রকাশ করাতে হয়তো অধিক সময়ের প্রয়োজন হয়, কিন্তু একসময় সে আত্মপ্রকাশ করবেই।'
এতক্ষণে শ্রমণ মৃদু হেসে বললেন, 'আপনার বক্তব্য এতক্ষণে আমি অনুধাবন করলাম। আপনি বলতে চাইছেন আরও কিছু সময় পেলে গণিকা হয়তো যুবককে কামভাবে জাগ্রত করতে পারত।'
বাৎসায়ন বললেন, 'হয়তো নয়, এটাই আমি বিশ্বাস করি। ওই গণিকা চৌষট্টি কলায় পারদর্শিনী, অভিজ্ঞা। সে এভাবে ব্যর্থ হতে পারে না। যদি না ওই যুবকের মধ্যে কামের অন্তরায় দৈহিক ত্রুটি থাকে।'
বাৎসায়নের কথা শুনে অবগুণ্ঠনধারী আবারও হাসলেন। তারপর বললেন, 'আপনি যা ইঙ্গিত করছেন, তা সঠিক নয়। ওই যুবকের শরীর সম্পূর্ণ ত্রুটিহীন। রাজগণিকা বা আপনি তা পরীক্ষা করে নিতে পারেন। আপনার সন্দেহ নিরসনের জন্য পূর্বের দিনের মতো আগামীকাল একইসময় এই যুবক আপনার বাটিকায় উপস্থিত হবে। আপনি তাকে চন্দ্রকলার প্রাসাদে নিয়ে যাবেন। দেখুন সে দ্বিতীয় প্রচেষ্টাতে সফল হয় কি না।'
বাৎসায়ন বললেন, 'মানব, আপনকে ধ্যনবাদ, চন্দ্রকলাকে দ্বিতীয়বার এ সুযোগ দানের জন্য। আপনার প্রেরিত পুরুষ যদি শারীরিকভাবে ত্রুটিমুক্ত হয়, তবে নিশ্চিতভাবে সফল হবে চন্দ্রকলা।'
এ কথা বলার পর যদিবা জৈন সন্ন্যাসী মত পরিবর্তন করেন সে আশঙ্কাতে বাৎসায়ন উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, 'এবার আমাকে বাটিকায় ফিরতে হবে। এক দিবস পর এই একই স্থানে একইভাবে আমরা মিলিত হব। আমি আগামীকাল সেই যুবকের প্রত্যাশায় থাকব।'
জৈন শ্রমণও উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, 'অবশ্যই।'
তাঁর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাৎসায়ন যখন সোপানশ্রেণির শীর্ষ ধাপে উঠে এলেন, সেই জৈন শ্রমণ তখন ধীরে ধীরে নেমে গেলেন নদীবক্ষে।
নিজ কক্ষে ফিরে এলেন ব্রাহ্মণ বাৎসায়ন। এই দ্বিতীয়বারের সুযোগ কোনোভাবেই নষ্ট করা যাবে না। চন্দ্রকলার মধ্যেমে যেভাবেই হোক জাগ্রত করতে হবে যুবকের কাম। ওই জৈন সন্ন্যাসীর কাছে প্রমাণ করতে হবে বাৎসায়নের ভাবনাই নির্ভুল। কাম অপরাজেয়।
প্রদীপের আলোতে নিজের রচিত কামসূত্রমের পাতাগুলো খুলে বসলেন আচার্য বাৎস্যায়ন। এ গ্রন্থের চতুর্থ অধিকরণে তিনি বিবৃত করেছেন নায়কের উত্তেজিত করার জন্য নায়িকা বা গণিকার কর্তব্যগুলি। অনিচ্ছুক নায়ককে কীভাবে যৌনকার্যে লিপ্ত করা যায় তার কৌশল।
নিবিষ্ট মনে তিনি নিজে গ্রন্থের এই অধিকরণের বিভিন্ন অনুচ্ছেদগুলি পাঠ করতে লাগলেন, যাতে চন্দ্রকলাকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেওয়া যায়। এ অধ্যায় পাঠ সমাপ্ত হতে মধ্যরাত্রি হয়ে গেল।
পরদিন ভোরে উঠে গঙ্গাস্নান সেরে এসে কোনোরকমে নিত্যকার্য সমাধা করে আবার পুঁথি খুলে বসলেন তিনি। পাঠ করতে শুরু করলেন গ্রন্থের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ 'ষষ্ঠঅধিকরণ' বা যৌন মিলন সম্পর্কিত বৃহৎ অধিকরণটি। বিভিন্ন অধ্যায়ে বর্ণিত আছে নারী-পুরুষের যৌনাঙ্গের রূপ, রতিক্রয়ায় বিভিন্ন পদ্ধতি। তাঁর এই পাঠ যখন সমাপ্ত হল তখন দিবার তৃতীয় প্রহর প্রায় অতিক্রান্ত হতে চলেছে। তিনি আহারাদি সাঙ্গ করার কিছু সময়ের মধ্যেই তাঁর বাসস্থানে এসে উপস্থিত হল অবগুণ্ঠনধারী চন্দ্রকলা।
পূর্বদিনের মতো সে গুরু প্রণাম জানিয়ে তাঁর পায়ের সামনে বসল। কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর আচার্য তাঁর সঙ্গে গত সন্ধ্যায় সেই জৈনের কথোপকথন ব্যক্ত করার পর বললেন, 'এ সুযোগ হয়তো বা স্বয়ং কামদেবই আমাদের সামনে উপস্থিত করেছেন। নচেৎ, ওই জৈন শ্রমণ পুনর্বার নিজে থেকেই কেন এই প্রস্তাব উপস্থাপিত করবেন? যে সুযোগ তিনি আমাদের দিয়েছেন তার সদব্যবহার করতে হবে। প্রমাণ করতে হবে চৌষট্টি কলার ক্ষমতা মিথ্যা নয়। তুমি যদি ব্যর্থ হও তবে আমার এতদিনের অভিজ্ঞতা, কামশাস্ত্র বিষয়ে জ্ঞান এসকল মিথ্যা বলে প্রমাণিত হবে।'
চন্দ্রকলা বলল, 'আমার ওপর আস্থা রাখুন প্রভু। আমি নিশ্চিত, এবার সফল হব। আমি প্রমাণ করব আপনার শিক্ষা মিথ্যা নয়। যে শিক্ষার বলে স্বয়ং রাজা-মহারাজারা আমার আলিঙ্গনের জন্য প্রতীক্ষা করে, সে শিক্ষা মিথ্যা হতে পারে না।'
'আলিঙ্গন' শব্দটি শুনে, বাৎসায়ন জানতে চাইলেন, 'ওই যুবকের সঙ্গে যখন তুমি আলিঙ্গনরত ছিলে, তখন তোমার কোনো বিশেষ অনুভূতির সৃষ্টি হয়েছিল কি?'
গণিকা চন্দ্রকলা বলল, 'হ্যাঁ, আচার্য, হয়েছিল। এক আশ্চর্য শীতল অনুভূতি! আমার মনে হচ্ছিল ওই যুবকের দেহ ক্রমে ক্রমে তুষার মূর্তিতে পরিণত হচ্ছে! আমি যেন সত্যিই কোনো তুষার মূর্তিকে চুম্বন করছি, লেহন করছি!'
কথাটা শুনে ভ্রু কুঁচকে ভাবলেন বাৎসায়ন। বললেন, 'তোমার কথা শুনে আমার মনে হচ্ছে ওই যুবকের শরীরে রক্ত সঞ্চালনের কোনো সমস্যা থেকেও থাকতে পারে। তার ফলে তার লিঙ্গোত্থান হচ্ছে না। তুমি, অঙ্গমর্দন ও লেহনের মাধ্যমে তার শরীরকে জাগাবার চেষ্টা করবে। আশা করি তুমি অসফল হবে না।'
এরপর আচার্য বাৎসায়ন আসন্ন রাত্রিতে চন্দ্রকলার কর্তব্য সম্পর্কে আরও কিছু প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিলেন। আচার্যের নির্দেশ গ্রহণ করে বাটিকা ত্যাগ করল চন্দ্রকলা। তাকে প্রথমে যেতে হবে রাজপ্রাসাদে সন্ধ্যারতির জন্য। তারপর নিজের বাসস্থানে ফিরে আচার্যের নির্দেশমতো রাত্রির জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। চন্দ্রকলা বাৎসায়নের গৃহ ত্যাগ করার কিছু সময়ের মধ্যেই গঙ্গাবক্ষে সূর্য ডুবল।
পূর্বের ন্যায় রাত্রির প্রথম প্রহরের তৃতীয়ভাগে মৃদু করাঘাত শুনলেন বাৎসায়ন। তিনি বহির্গমনের জন্য বণিকের ছদ্মবেশে প্রস্তুত হয়েই ছিলেন। কপাট খুলতেই প্রত্যাশা মতো তিনি দেখলেন, চন্দ্রালোকে দাঁড়িয়ে আছে সেই যুবক। তার মুখে অবিচল স্মিত হাসি। সেই চন্দনের সৌরভও এসে লাগল ব্রাহ্মণ বাৎসায়নের নাসারন্ধ্রে।
যুবক বাৎসায়নকে দেখে করজোড়ে প্রণাম জানিয়ে বলল, 'প্রণাম ব্রাহ্মণ। আমরা তবে যাত্রা শুরু করি?'
মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে বাৎসায়ন যুবককে নিয়ে রওনা হলেন রাজগণিকা চন্দ্রকলার অট্টালিকার উদ্দেশে।
মাথার ওপর চাঁদ যেন হাসছে। বাতাসে যুবকের দেহনিঃসৃত চন্দনের গন্ধ। একই পথ ধরে তাঁরা এগিয়ে চললেন। এই যুবকের সম্বন্ধে বাৎসায়নের মনে আগ্রহ থাকলেও, শর্তানুসারে তাকে কোনো প্রশ্ন করা যাবে না। তাই নিশ্চুপভাবে পথ চলতে লাগলেন।
একসময় সেই স্থানে তাঁরা উপস্থিত হলেন, যেখানে দেখা মিলেছিল সেই মহাসর্পের। এদিনও সে দৃশ্যের ব্যতিক্রম ঘটল না। একই স্থানে একইভাবে শুয়ে আছে সেই নাগরাজ। তাকে দেখে থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন বাৎসায়ন। যুবক যথারীতি আগের দিনের মতোই সর্পের কাছে গিয়ে তাকে যত্ন করে তুলে নিয়ে পথপার্শ্বে সরিয়ে দিল।
অতঃপর আবার যাত্রা শুরু করলেন তাঁরা। বাৎসায়নের চোখে ধরা দিল গণিকা চন্দ্রকলার প্রাসাদের শীর্ষদেশের আকাশ প্রদীপ। এরপরই একটা শব্দ পেয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন বাৎসায়ন। তাঁর মনে হল পথের শুকনো পাতা মাড়িয়ে তাঁদের দুজনের পিছনে কেউ যেন আসছে!
বাৎসায়ন সেই শব্দ অনুসন্ধানের জন্য পিছনে তাকিয়ে একই সঙ্গে বিস্মিত ও আতঙ্কিত হলেন। সেই মহাসর্প তাঁদের অনুসরণ করে আসছে! যুবক বাৎসায়নের মনের ভাব পাঠ করে বলল, 'এই সর্পকে নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হবার কারণ নেই। ও কোনো ক্ষতি করবে না। আসলে ও আমাকে অনুসরণ করেই আসছে।'
ব্রাহ্মণ বাৎসায়ন বিস্মিতভাবে জানতে চাইলেন, 'কেন? ও তোমাকে অনুসরণ করে আসছে কেন?'
যুবক বলল, 'কারণ আমরা এই ব্রহ্মাণ্ডের সকল জীবের প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন। মানুষ হোক বা ক্ষুদ্র কীট-পতঙ্গ, আমরা সকলকেই একই প্রেমের দৃষ্টিতে দেখি। কোনো জীবের যাতে ক্ষতি না হয় তার জন্য সবসময় সচেষ্ট থাকি। এই মহাসর্প বিষয়টি অনুধাবন করতে পেরেছে। তাই সে আমার সঙ্গলাভের প্রত্যাশী।'
যুবকের বক্তব্যে সন্তুষ্ট না হলেও, বাৎসায়ন তার বক্তব্যের বিরোধিতা না করে শুধু বললেন, 'কিন্তু এই সর্প তোমাকে অনুসরণ করে চন্দ্রকলার অট্টালিকাতেও প্রবেশ করবে নাকি?'
যুবক তাঁকে আশ্বস্ত করে বলল, 'না। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। এই সর্প প্রাসাদে অনধিকার প্রবেশ করবে না।'
গণিকা চন্দ্রকলার প্রাসাদোপম অট্টালিকার সামনে এসে উপস্থিত হলেন তাঁরা। অট্টালিকায় প্রবেশের প্রাক-মুহূর্তে পিছনে ফিরে তাকাল সেই যুবক। তাকালেন বাৎসায়নও। সেই মহাসর্প তাঁদের অনুসরণ করে আসছে। যুবক তার দক্ষির হস্ত ওপরে তুলে যেন তাকে থামার নির্দেশ দিল সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেল সেই সর্প। বিস্মিত ব্রাহ্মণ বললেন, 'তোমার নিশ্চিত সর্পবশীকরণ বিদ্যা রপ্ত আছে! নচেৎ এসব তুমি করতে পারতে না।'
বাৎসায়নের কথার উত্তর না দিয়ে যুবক শুধু বলল, 'চলুন, এবার বাটিকার অভ্যন্তরে গমন করা যাক।'
বাৎসায়ন, যুবককে নিয়ে প্রবেশ করলেন প্রাসাদের অভ্যন্তরে। পূর্বদিনের ন্যায় গণিকা চন্দ্রকলা তার নায়কের যাত্রাপথ সাজিয়ে রেখেছে পুষ্পবলয়, তণ্ডুল চূর্ণের আলপনা দিয়ে। বাৎসায়ন তাকে নিয়ে উপস্থিত হলেন সেই নির্দিষ্ট কক্ষের সামনে। তার কপাট আগের দিনের মতোই সজ্জিত। যুবককে নিয়ে কক্ষে প্রবেশ করলেন তিনি। পূর্বদিনের ন্যায় কক্ষ নানা উপচারে সজ্জিত।
পার্থক্য বলতে শুধু এইটুকুই, এ কক্ষের সবকিছুই আজ আচার্য বাৎসায়নের নির্দেশে রক্তবর্ণে সজ্জিত করা হয়েছে। কারণ, রক্তবর্ণ মানুষের মনে উত্তেজনার সৃষ্টিকারী বর্ণ বলে মনে করা হয়। শয্যার মখমলের রং, ফুলমালা সবকিছুই আজ রক্তবর্ণের। তারের বাদ্যযন্ত্রের পরিবর্তে আজ এ কক্ষে 'উদকবাদ্য' বা জলতরঙ্গ বাদ্যের উপচার। জলপূর্ণ সেই নানা আকারের স্ফটিকের পাত্রগুলি সুচারুভাবে মাটিতে সাজানো আছে। এই উদকবাদ্য সহযোগে সংগীত পরিবেশন মনে কামের উদ্রেক ঘটাতে সহায়ক। এবং এই সংগীতও বিশেষ প্রকৃতির যা কামাচারে লিপ্ত হবার জন্য রাজারা শ্রবণ করেন।
'আজ নিশ্চয় এসব উপচারের মাধ্যমে এই যুবকের মধ্যে কামভাব জাগিয়ে তুলতে পারবে চন্দ্রকলা।'—এ কথা মনে মনে ভেবে নিয়ে সেই কক্ষে যুবককে উপবেশন করিয়ে রেখে বাৎসায়ন প্রবেশ করলেন পার্শ্ববর্তী কক্ষে। উপযুক্ত সাজে সজ্জিত হয়ে তাঁদেরই আসার প্রতীক্ষা করছিল গণিকা চন্দ্রকলা। সে আচার্যের সামনে এসে দাঁড়াল। তিনি দৃষ্টিপাত করলেন শিষ্যার দেহবল্লরীতে।
আচার্য বাৎসায়নের নির্দেশমতো সোনার সুতোর সূচিশিল্প সমৃদ্ধ রক্তবর্ণের পোশাক পরিধান করেছে চন্দ্রকলা। এবং আজ কোনো অবগুণ্ঠন নেই। সেই বক্ষবন্ধনী এতই নিবিড় যে চন্দ্রকলার বক্ষ বিভাজিকার প্রায় সম্পূর্ণ অংশটাই দৃশ্যমান। সমুদ্রের জলোচ্ছ্বাসের মতোই চন্দ্রকলার স্তনযুগল মুক্ত হতে চাইছে বক্ষবন্ধনীর নিষ্পেষণ থেকে।
বক্ষবন্ধনীর নীচ থেকে কটিদেশ পর্যন্ত চন্দ্রকলার দেহ উন্মুক্ত। চন্দ্রকলার গভীর নাভি যেন শুষে নিচ্ছে কক্ষের প্রদীপের আলো। শরীরের নিম্নাংশে একটি স্বল্পদৈর্ঘের বস্ত্রাবরণ চন্দ্রকলার জঙ্ঘা পর্যন্ত আবৃত করেছে। হাঁটু থেকে চন্দ্রকলার রঞ্জিত নখর সমৃদ্ধ মসৃণ পদযুগল সম্পূর্ণ দৃশ্যমান।
মহাজনপদের, 'অঙ্গ' রাজ্যের উত্তর-পূর্বে 'প্রাগজ্যোতিষপুর' নামে এক প্রাচীন নগরী বিদ্যমান। সেই স্থানে নীলাচল পর্বতে দেবী কামাখ্যার মন্দির বর্তমান। শিব-পার্বতীর সংগমস্থল ওই নীলাচল পর্বত। বিষ্ণুর সুদর্শন চক্রে কর্তিত হয়ে সতীর যোনি নিক্ষিপ্ত হয়েছিল সে স্থানে। কামাচারের জন্য ওই নীলাচল পর্বত বিখ্যাত। বাৎসায়ন নিজেও ওই স্থানে কামশাস্ত্র-কামাচার অধ্যয়নের নিমিত্তে পরিভ্রমণ করেছিলেন। ওই স্থানের নারীরা যে কোনো পুরুষকে মেষ বানিয়ে দিতে সক্ষম। অর্থাৎ পুরুষকে কামার্ত করে তুলে তাদের কাছে আত্মসমর্পণ করতে পারে ঠিক পোষ্য মেষের মতোই।
বাৎসায়নের নির্দেশমতো গণিকা চন্দ্রকলা আজ যে বেশ পরিধান করেছে, সে ওই প্রাগজ্যোতিষপুর-স্থিত নীলাচল পর্বতের নারীদের মতনই। চন্দ্রকলার দেহ থেকে নির্গত মৃগনাভির গন্ধ আমোদিত করে তুলেছে তার শয়নকক্ষকে। সে তার অঙ্গ কস্তুরীমথিত করেছে তার আচার্যের পরামর্শ মতোই। কারণ, কস্তুরীর ঘ্রাণ কামোদ্দীপক। যুবকের সামনে গণিকা চন্দ্রকলাকে উপস্থিত করার ক্ষেত্রে আজ কোনো সামান্যতম ত্রুটি রাখতে চান না কামসূত্রম্ প্রণেতা বাৎসায়ন।
তিনি শিষ্যাকে ভালো করে নিরীক্ষণ করে সন্তুষ্ট হলেন। তারপর প্রশ্ন করলেন, 'আমার নির্দেশাবলি তোমার স্মরণে আছে তো?'
চন্দ্রকলা জবাব দিল, 'হ্যাঁ, আচার্য।'
এ কথা বলে সে পদস্পর্শ করল তার আচার্যের। বাৎসায়ন তাকে আশীর্বাদ করে বললেন, 'বিজয়ী ভব।'
আচার্যের আশীর্বাদ নিয়ে কক্ষ ত্যাগ করল চন্দ্রকলা। বাৎসায়ন নির্দিষ্ট স্থানে উপবেশন করে চোখ রাখলেন দেওয়ালগাত্রের ছিদ্রে। অনতিবিলম্বে পার্শ্ববর্তী কক্ষে প্রবেশ করল গণিকা চন্দ্রকলা।
পূর্ব রাত্রির মতনই চন্দ্রকলা কক্ষে প্রবেশ করে যুবকের সামনে উপস্থিত হয়ে প্রণাম জানাল। চন্দ্রকলার শরীরের দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট হাসি ফুটে উঠল যুবকের মুখে। তবে কি চন্দ্রকলার নতুন সাজ আকৃষ্ট করল যুবককে? মনে মনে ভাবলেন বাৎসায়ন।
পূর্ব রাত্রির মতোই যুবককে পানাহার গ্রহণের জন্য আবেদন জানাল গণিকা চন্দ্রকলা। যুবক একইভাবে তা প্রত্যাখ্যান করল। চন্দ্রকলা অতঃপর বলল, 'তবে আমি উদকবাদ্য সহযোগে সংগীত পরিবেশন করে শোনাই?'
চন্দ্রকলার এ প্রস্তাবে সম্মতি দিল যুবক। মেঝেতে রাখা সার সার জলপূর্ণ স্ফটিক পাত্রের সামনে উপবিষ্ট হয়ে চন্দ্রকলা শলাকা নিয়ে বাজাতে শুরু করল পাত্রগুলি।
নিপুণা বাদ্যকার গণিকার শলাকা সঞ্চালনায় এক অদ্ভুত সুরতরঙ্গ ছড়িয়ে পড়তে আরম্ভ করল কক্ষময়। সঙ্গে সঙ্গে কণ্ঠসংগীত পরিবেশন শুরু করল সে। অতি মধুর কণ্ঠ তার।
এই সংগীতের অন্য একটি বৈশিষ্ট্যও আছে। দেব-যক্ষ-নরকুলের নানা কামকলা বর্ণিত হয়েছে এ সংগীতে। যা শ্রবণ করলে মনে যৌন ভাবনায় উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠে। একমাত্র চৌষট্টি কলাতে নিপুণা গণিকারাই এ সংগীত প্রদর্শনে পারদর্শী হয়। উদকবাদ্য আর চন্দ্রকলার সংগীত মূর্ছনায় যেন স্বর্গের নন্দন কাননের পরিবেশ সৃষ্টি হল সেই কক্ষে। বাৎসায়নের মনে হল যুবক উপভোগ করছে এই সংগীত মুর্ছনা।
অনেকক্ষণ ধরে সংগীত পরিবেশন করে থামল চন্দ্রকলা। তারপর উঠে গিয়ে যুবকের সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করল, 'সংগীত, বাদ্যযন্ত্র কেমন উপভোগ করলেন?'
যুবক জবাব দিল, 'তোমার কণ্ঠ ও বাদ্যপরিবেশন সত্যিই মধুর।'
চন্দ্রকলা যুবকের হাত ধরে নিয়ে বসাল শয্যাতে। এরপর সে আজ আর কোনো প্রথম স্পর্শের লজ্জা প্রদর্শন না করে সরাসরি দীর্ঘ চুম্বন সূচিত করল যুবকের ওষ্ঠাধারে।
আচার্য বাৎসায়ন এ পুরুষকে কামভাবে জাগিয়ে তোলার জন্য যে নির্দেশ দিয়েছিলেন সে কাজেই নিযুক্ত হল গণিকা চন্দ্রকলা। যুবকের অঙ্গমর্দন বা সংবহন শুরু করল গণিকা চন্দ্রকলা। বাৎসায়ন তাঁর ষষ্ঠ অধিকরণের 'আলিঙ্গন বিচার' অনুচ্ছেদে এই সংবহন বা অঙ্গমর্দনের পদ্ধতি সম্পর্কে নির্দেশ দান করেছেন। সে মতোই যুবকের শরীর মর্দন করতে শুরু করল গণিকা চন্দ্রকলা। হস্ত দিয়ে শরীর মর্দন তো অছেই, এ ব্যাতীত নিজের ঊরু দিয়ে, নিতম্ব দিয়ে, স্তন দিয়ে নায়ককে মর্দন করতে শুরু করল।
নায়ককে জাগিয়ে তোলার জন্য দীর্ঘ সময় মর্দন করে চলল সে। রাত এগিয়ে চলল তার সঙ্গে সঙ্গে। ধীরে ধীরে চোখের পাতা আবৃত হয়ে এল সেই যুবকের।
এইসময় শৃগালকুলের সম্মিলিত চিৎকারে নতুন প্রহর সূচিত হল। নিজের উত্তেজনা যেন আর ধরে রাখতে পারছেন না কামশাস্ত্র প্রণেতা বাৎসায়ন। আর একটি প্রহর বাকি! এবার নিশ্চয়ই যুবককে যে কোনো মুহূর্তে কামভাবে জাগিয়ে তুলতে সমর্থ হবে গণিকা চন্দ্রকলা।
রাত্রি তৃতীয় প্রহরে পদার্পণ করার সঙ্গে সঙ্গেই নিজের শরীরে সমস্ত বস্ত্র উন্মোচন করে সম্পূর্ণ নগ্ন হল চন্দ্রকলা। আর একটা সুতোও রইল না তার শরীরে। তার কণ্ঠদেশ থেকে স্তনবিভাজিকার ফাঁক গলে প্রদীপের আলো যেন পিছলে নীচে নেমে নাভিমূলকে আলিঙ্গন করে এসে হারিয়ে যাচ্ছে যোনি বিভাজিকায়। চন্দ্রকলার অঙ্গ সঞ্চালনের সঙ্গে সঙ্গেই তার ভারী নিতম্ব ঘুঙুরের মতো নেমে উঠছে।
নিজের শরীরের বস্ত্র উন্মোচনের পরই চন্দ্রকলা যুবকে শরীরের বস্ত্রখণ্ডও সম্পূর্ণরূপে সরিয়ে নিল। দৃশ্যমান হল যুবকের পুরুষাঙ্গ। যুবকের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তার ঊরুযুগলকে প্রসারিত করে তার শিবদণ্ড স্পর্শ করল গণিকা চন্দ্রকলা। যুবকের মতোই শান্ত-সমাহিত তার পুরুষ দণ্ডটি।
আচার্য বাৎসায়ন তাঁর গ্রন্থে পুরুষ লিঙ্গ সম্পর্কে লিখেছেন, 'শশে বৃষোহশ্ব লিঙ্গতো নায়কবিশেষাঃ'। অর্থাৎ পুরুষের লিঙ্গ তার দৈর্ঘ্য অনুসারে তিন প্রকার। উত্থিত অবস্থায় যে লিঙ্গের দৈর্ঘ্য ছয় আঙুল প্রমাণ, তা 'শশক লিঙ্গ', নয় আঙুল প্রমাণ হলে 'বৃষ লিঙ্গ' আর বারো আঙুল প্রমাণ হলে তা 'অশ্ব লিঙ্গ' রূপে চিহ্নিত হয়।
উত্তম রতিক্রিয়ার জন্য শশক লিঙ্গের উপযুক্ত মৃগী নারী, বৃষের ক্ষেত্রে বড়বা বা ঘোটকী রমণী এবং অশ্ব লিঙ্গের উপযুক্ত হল হস্তিনী নারী। কারণ, এই ক্ষেত্রগুলিতে নারীর যোনি গর্ভের গভীরতা লিঙ্গের দৈর্ঘের অনুরূপ হয়।
যুবকের লিঙ্গ উত্থিত না থাকলেও অভিজ্ঞ গণিকা চন্দ্রকলা তা স্পর্শ ও দর্শন করে বুঝতে পারল এই যুবকের লিঙ্গ 'বৃষ লিঙ্গ'। চন্দ্রকলা নিজে বড়বা গোত্রের নারী। এই পুরুষ যদি জেগে ওঠে তবে তাদের মিলন হবে আদর্শ মিলন। যেভাবেই হোক জাগিয়ে তুলতে হবে এই লিঙ্গকে।
না, কোনো খুঁত নেই এই লিঙ্গে। শয্যার কিনারে চোখ মুদ্রিত করে বসে যুবক। দু-পাশে প্রসারতি তার জঙ্ঘা। চন্দ্রকলা মেঝেতে হাঁটু মুড়ে উপবেশন করে। যুবকের উন্মুক্ত ঊরুর মধ্যবর্তী স্থানে মস্তক প্রবেশ করিয়ে, করপুটে লিঙ্গ তুলে নিয়ে লেহন শুরু করল।
চন্দ্রকলার নিজের শরীরও এবার উত্তেজিত হতে শুরু করেছে, সিক্ত হয়ে উঠছে তার যোনি। সে দৃশ্য প্রত্যক্ষ করে উত্তেজিত হয়ে উঠছেন আচার্য বাৎসায়নও। তবে উত্তেজনার কারণ যৌনতা নয়, উৎকণ্ঠা। রাত যে এগিয়ে চলেছে।
যুবকের লিঙ্গ নানাভাবে লেহন করে চলেছে চন্দ্রকলা। কিন্তু যুবকের পুরুষযন্ত্র যেন উষ্ণ হয়ে ওঠার পরিবর্তে শীতল থেকে শীতলতর হয়ে আসছে। অবশ হয়ে আসছে চন্দ্রকলার জিহ্বা।
এরপর শেষ অস্ত্র প্রয়োগ করার জন্য প্রস্তুত হল গণিকা চন্দ্রকলা। ধাক্কা মেরে যুবককে চিত করে শুইয়ে ফেলে তার শরীরের ওপর দুই ঊরু প্রসারিত করে উঠে বসল সে। পুরুষ লিঙ্গের সঙ্গে যোনির সংযোগ ঘটাবার জন্য এই বিশেষ ভঙ্গিতে উপবেশন করাকে বলে—'সম্বেশন'।
যুবকের লিঙ্গকে জাগ্রত করার জন্য সম্বেশনের মাধ্যমে যোনি দিয়ে লিঙ্গ ঘর্ষণ করে চলল গণিকা চন্দ্রকলা। চেষ্টা করতে লাগল যাতে যুবকের লিঙ্গ জাগ্রত হয়ে তার যোনিকে বিদ্ধ করে। প্রবল ঘর্ষণ!
বাৎসায়ন দেখলেন স্বেদবিন্দু ঝরছে চন্দ্রকলার শরীর থেকে। কিন্তু তবু থামছে না সে। নিজের কর্তব্য সম্পাদনের জন্য প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। উত্তেজনায় ঘামছেন বাৎসায়নও। নিজের হৃৎপিণ্ডের শব্দ শুনতে পাচ্ছেন!
এরপরেই শৃগালধ্বনি ভেসে এল। সে ধ্বনি যেন পরিহাস করে উঠল চৌষট্টি কলার রচয়িতা কামশাস্ত্র প্রণেতা বাৎসায়নকে। সঙ্গে সঙ্গে আর্তনাদ করে শয্যা ত্যাগ করে, যুবকের শরীর ত্যাগ করে মাটিতে নেমে এল গণিকা চন্দ্রকলা।
পরমুহূর্তেই চোখ মেলে উঠে বসল সেই যুবক। বিধ্বস্ত, নগ্নিকা চন্দ্রকলার দিকে তাকিয়ে তার মুখমণ্ডলে স্মিত হাসি ফুটে উঠল।
আচার্য বাৎস্যায়ন আর সে দৃশ্য সহ্য করতে পারলেন না। উঠে দাঁড়িয়ে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে স্বগতোক্তির স্বরে বললেন, 'অবশেষে বাৎসায়ন পরাজিত হল সেই জৈন সন্ন্যাসীর কাছে!'
কিছু মুহূর্তের মধ্যেই সে কক্ষে প্রবেশ করল চন্দ্রকলা। এতটাই সে বিপর্যস্ত যে কক্ষ ত্যাগের সময় বস্ত্র পরিধান করতেও ভুলে গেছে। তার সংবিত নেই যে নগ্ন অবস্থাতেই সে আচার্যের সামনে উপস্থিত হয়েছে! নগ্ন গণিকা এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল বাৎসায়নের পদতলে।
নিজের আচরণের প্রতি আর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারলেন না বাৎসায়ন। ক্ষোভে তিনি বলে উঠলেন, 'আমার চৌষট্টি কলা মিথ্যা, তোর শিক্ষাও মিথ্যা!
বলেই তিনি পদাঘাতে চন্দ্রকলাকে সরিয়ে দিয়ে সেই মুহূর্তেই কক্ষ ত্যাগ করে অগ্রসর হলেন ফেরার জন্য।
কক্ষের ভিতর থেকে চন্দ্রকলার কাতর আবেদন ভেসে এল, 'আমাকে এ ভাবে পরিত্যাগ করবেন না আচার্য! ক্ষমা করুন, ক্ষমা করুন...!'
চন্দ্রকলার অট্টলিকা ত্যাগ করলেন বাৎসায়ন।
পরদিন সূর্য ওঠার পর গঙ্গাস্নান থেকে ফিরে এসে সারাদিন নিজের কক্ষেই কাটালেন বাৎসায়ন। তবে এদিন আর পুঁথির পাতা খুললেন না তিনি। অদ্ভুত বিষণ্ণতায় আচ্ছন্ন মন। এতদিন ধরে তিনি যে ভাবনা লালন করেছেন, তা চূর্ণ-চূর্ণ করে দিয়েছে ওই যুবক আর জৈন সন্ন্যাসী। পরাজয়ের হতাশা তো আছেই, তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিষ্যার প্রতি তাঁর নিজের ওই কঠোর, ভ্রান্ত আচরণ। সেই আচরণ মুহুর্মুহু দংশন করছে আচার্য বাৎসায়নকে। আরও একটা প্রশ্ন তাঁকে অস্থির করে তুলেছে, এতদিন ধরে এমন মিথ্যা ভাবনা নিজের মধ্যে তিনি পোষণ করে রাখলেন কেন?
দিন কেটে গেল একসময়। কক্ষ সংলগ্ন বটবৃক্ষে দিনশেষে ফিরে আসা পাখির কলরব শুনে তিনি বুঝতে পারলেন, সূর্য ডুবতে চলেছে। সেই জৈন সন্ন্যাসী সন্ধ্যা ঘনালেই সাক্ষাৎ করতে আসবেন তাঁর সঙ্গে!
এ কথা মনে আসতেই গাত্রোত্থান করলেন বাৎসায়ন। সিদ্ধান্ত নিলেন সেই জৈন শ্রমণের সঙ্গে সাক্ষাৎ সেরে তিনি চন্দ্রকলার গৃহে গিয়ে সাক্ষাৎ করে তার নিকট দুঃখ প্রকাশ করবেন।
ছদ্মবেশ ধারণ করেই বাইরে বেরোলেন তিনি। নদীর পাড়ে এসে উপস্থিত হলেন বাৎসায়ন। সূর্য ডুবে যাচ্ছে নদীবক্ষে। বাতাসে পালতোলা বেশ কয়েকটা ধীবর নৌকা উজানের দিকে ভেসে যাচ্ছে রাত্রিতে মৎস্য শিকারের আশায়। আর তাদের মাথার ওপর দিয়ে ডাকতে ডাকতে পক্ষীকুল নদী পেরিয়ে উড়ে যাচ্ছে বাসায় ফেরার জন্য। দশাশ্বমেধ ঘাট থেকে ভেসে আসছে ঘণ্টাধ্বনি। ভারী সুন্দর পরিবেশ। কিন্তু চারপাশের এই মনোরম পরিবেশও বিষণ্ণ মনে হচ্ছে বাৎসায়নের। বারবার মনে হচ্ছে, এতদিন ধরে তিনি মিথ্যা ভাবনা ধারণ করে এলেন কেন?
সূর্য ডুবে গেল। অন্ধকার নামতে শুরু করল নদীবক্ষে। প্রতিদিনের মতোই আলোর ডোঙাগুলো ভাসতে লাগল নদীর বুকে। সেদিকে বিষণ্ণ দৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন বাৎসায়ন। ভাবতে লাগলেন, 'কেন এমন হল?'
'প্রণাম মহর্ষি।—জৈন সন্ন্যাসীর কথা শুনে চিন্তাজাল ছিন্ন করে ব্রাহ্মণ তাকিয়ে দেখলেন, কখন যেন সোপানশ্রেণির নির্দিষ্ট স্থানে এসে উপবিষ্ট হয়েছেন অবগুণ্ঠনধারী।
বাৎসায়ন করজোড়ে তাঁকে নমস্কার করে বিষণ্ণকণ্ঠে বললেন, 'আর আমাকে মহর্ষি সম্বোধন করে উপহাসের প্রয়োজন আছে কি? হ্যাঁ, আপনি জয়লাভ করেছেন।'
জৈন শ্রমণ বললেন, 'আমি ব্যঙ্গার্থে আপনাকে মহর্ষি বলে সম্বোধন করছি না। ভাবীকাল আপনাকে এই নামেই সম্বোধন করবে আপনার সৃষ্টির জন্য। আর এ ঘটনায় ব্যক্তিগত জয়-পরাজয়ের কোনো ব্যাপার নেই। আমি আপনাকে সত্য দর্শন করাতে চেয়েছি। যাতে আপনার সৃষ্টি ত্রুটিমুক্ত হয়। আমি আপনাকে জানাতে চেয়েছি ধর্মের আসন সর্বদা কামের আগে। এমনকী শুধু ধর্মই নয়, অর্থের স্থানও কামের অগ্রে। কারণ, সৎভাবে অর্থ বা সম্পদ উপার্জনের জন্য পরিশ্রম, সততা, ত্যাগ ও একনিষ্ঠ ভাবের প্রয়োজন হয়, যা ধর্মাচরণের অঙ্গ।'
এই কথা শুনে ব্রাহ্মণ বাৎসায়ন কিছুক্ষণ নিশ্চুপ রইলেন। বললেন, 'জনমানসে আমার সম্পর্কে একটা কথা বিশেষভাবে প্রচলিত আছে। একাগ্রতা ও ধৈর্যের নাম ব্রাহ্মণ মল্লিনাগ। হয়তো বা তা সত্যি। নচেৎ আমি তক্ষশীলা থেকে ছিন্ন বসনে উপস্থিত হয়ে পাটলিপুত্রের রাজসভায় সম্রাটের প্রধান পারিষদের আসন অলঙ্কৃত করতে পারতাম না। কিন্তু ব্রাহ্মণ মল্লিনাগ একগুঁয়ে, জেদি যাই হোক না কেন, সে কথার খেলাপ করে না। যেভাবেই হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত আপনার ভাবনার কাছে আমার ভাবনা পরাজিত হয়েছে। কাজেই আমার গ্রন্থে আমি আপনার বক্তব্যকেই অর্থাৎ ধর্মকে কামের অগ্রে আসন দেব।'
ব্রাহ্মণ বাৎসায়নের কথা শুনে জৈন সন্ন্যাসী বললেন, 'আপনি যে আপনার বচন রক্ষা করেন, আমি জানি। কিন্তু আপনার কথা শুনে আমার যেন ধারণা হচ্ছে আপনার মনের গভীরে তবুও এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে কোথাও যেন একটা প্রশ্ন এখনও রয়ে গেছে।'
বাৎসায়ন বললেন, 'হ্যাঁ, আপনার অনুমান সত্যি। প্রশ্নটা হল, আমার ভাবনা যদি মিথ্যাই হয়ে থাকে তবে সেই মিথ্যা ভাবনাকে আমি এতদিন ধরে পোষণ করলাম কীরূপে? আমার মধ্যে কোনো সন্দেহের উদ্রেক ঘটল না কেন?'
বাৎসায়নের কথায় অবগুণ্ঠনধারী কিয়ৎক্ষণ ভাবলেন। তারপর বললেন, 'কারণ, বেগবান নদী যেমন তার যাত্রাপথে তার দু-পাশের সবকিছুকে উপেক্ষা করে প্রবাহিত হয়, তেমনই আপনার ভাবনাও নিজের গতিতে চারপাশের সবকিছুকে উপেক্ষা করে একমুখে প্রবাহিত হয়েছে। তবে আমি চাই না যে আপনার মনের কোণে কোথাও একবিন্দু কালো মেঘ জমা থাকুক, যা ভবিষ্যতে আপনার মনকে আবার আচ্ছন্ন করে তুলতে পারে। ভবিষ্যতে আপনার যেন মনে না হয় যে আমাকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষায় আপনি আপনার গ্রন্থে ধর্মকে কামের অগ্রে স্থান দিয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু ব্যাপারটার মধ্যে ধোঁয়াশা রয়ে গেছে। ভবিষ্যতে সে ভাবনা হয়তো বা আপনার পক্ষে অসংগতও নয়।'
বাৎসায়ন বললেন, 'আপনার এ আশঙ্কার হেতু কী?'
অবগুণ্ঠনধারী তাঁকে চমকে দিয়ে বললেন, ' ''ন্যায়শাস্ত্র'' গ্রন্থের টীকায় আপনিই লিখেছেন যে, কোনো সত্যকে তিনবার পরীক্ষা করে তবে তাকে গ্রহণ করা উচিত।'
ব্রাহ্মণ বলে উঠলেন, 'হ্যাঁ, হ্যাঁ, সে গ্রন্থে আমি এ কথা লিখেছি। কিন্তু এ ক্ষেত্রে ব্যাপারটা আমার স্মরণে আসেনি।'
জৈন সন্ন্যাসী হেসে বললেন, 'এখনও আসেনি ঠিকই। ভবিষ্যতে আপনার মনে প্রশ্নচিহ্নের জন্ম দিতে পারে। আপনার মনে হতে পারে, আপনার গ্রন্থে কামের অগ্রে ধর্মকে আসন দিয়ে উচিত কাজ করেননি। কারণ, এ সত্য তিনবার পরীক্ষিত নয়। আমি ভবিষ্যতের এই ভাবনা সংকট থেকে আপনাকে মুক্ত করতে চাই। যাতে সত্য উপলব্ধি সম্পর্কে আপনার মনে কোনো সংশয় না থাকে।'
বাৎসায়ন প্রশ্ন করলেন, 'তা কীভাবে সম্ভব?'
বাৎসায়নকে প্রগাঢ় বিস্মিত করে রহস্যময় জৈন সন্ন্যাসী বললেন, 'ওই যুবক আগামীকাল শেষবারের মতো গণিকা চন্দ্রকলার প্রাসাদে গমন করবেন 'তিন সত্য' প্রতিষ্ঠার জন্য।'
মুহূর্তে বাৎসায়নের মনে যেন বিদ্যুৎ চমক খেয়ে গেল। উত্তেজনার বশে তিনি উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, 'এ সুযোগ দানের জন্য আমি আপনার কাছে কৃতজ্ঞ। এই শেষবারেও যদি গণিকা চন্দ্রকলা যুবকের মধ্যে কামভাব জাগ্রত করতে অসমর্থ হয়, যুবক যদি তার সত্য তৃতীয়বারের জন্য প্রতিষ্ঠিত করতে পারে, তবে ধর্মের আসন যে কামের অগ্রে তা নিয়ে বিন্দুমাত্র সংশয়ের আর অবকাশ থাকবে না আমার। সত্যদর্শন সম্পর্কে নিশ্চিত হব আমি।'
অবগুণ্ঠনধারীও এবার ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর বললেন, 'মহর্ষি, আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, আগামীকাল নির্দিষ্ট সময়ে সে পুনরায় উপস্থিত হবে আপনার কাছে। রাত্রির দ্বিতীয় প্রহর ও তৃতীয় প্রহর সে অতিবাহিত করবে রাজগণিকার প্রাসাদে।'
বাৎসায়ন বললেন, 'আর আপনার সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ কি পূর্ব নিয়ম মেনে একদিবস পর এই স্থানেই হবে?'
অবগুণ্ঠনধারী জবাব দিলেন, 'হ্যাঁ, এই স্থানেই। তবে একদিবস পরে নয়, আগামী রাত্রির শেষক্ষণে এই স্থানেই মিলিত হব আমরা।'
বাৎসায়ন বললেন, 'অতি উত্তম। চন্দ্রকলার প্রাসাদ থেকে ফিরে এই স্থানে উপস্থিত হব আমি।'
এ কথা বলে অবগুণ্ঠনধারী জৈন পুরুষের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সোপানশ্রেণি বেয়ে ওপরে উঠতে শুরু করলেন তিনি। আর সেই অবগুণ্ঠনধারী ধীরে ধীরে নেমে গেলেন গঙ্গাবক্ষে।
বণিকের ছদ্মবেশ ধারণ করাই আছে ব্রাহ্মণ বাৎসায়নের। সুতরাং কালবিলম্ব না করে রওনা হয়ে গেলেন চন্দ্রকলার প্রাসাদ অভিমুখে।
অন্ধকার মুছে আকাশে গোল থালার মতো চাঁদ উঠতে শুরু করল। বাৎসায়ন সেই চাঁদের গঠন দেখে মনে মনে হিসাব করে দেখলেন আগামীকাল পূর্ণিমা তিথি।
বাৎসায়ন যখন সেই প্রাসাদের কাছে পৌঁছলেন, তখনও রাত্রির প্রথম প্রহর মধ্যভাগে পৌঁছোয়নি। আজ আর আকাশ প্রদীপ জ্বলেনি প্রাসাদশীর্ষে। কোনও আলোও আসছে না প্রাসাদের অভ্যন্তর থেকে।
ব্যাপারটা দেখে বিস্মিত হলেন বাৎসায়ন। তবে কি গণিকা চন্দ্রকলা গৃহে উপস্থিত নেই?
প্রাসাদের সম্মুখস্থিত উদ্যান অতিক্রম করে একটু দ্বিধাগ্রস্ত হয়েই বাৎসায়ন ঘা দিলেন সদর দরজার কপাটে। না, চন্দ্রকলা গৃহ পরিত্যাগ করেনি। বাৎসায়ন বেশ কয়েকবার করাঘাত করার পরে কপাট উন্মোচন করল স্বয়ং চন্দ্রকলা। তার হাতে ধরা একটা প্রদীপ। সেই আলোয় বাৎসায়ন দেখলেন চন্দ্রকলার প্রসাধনহীন মুখমণ্ডলে জেগে আছে তীব্র বিষণ্ণতা। চন্দ্রকলার অঙ্গে কোনও স্বর্ণভূষণও নেই, যা দেখে আচার্যের অনুমান হল চন্দ্রকলা সম্ভবত এ দিবসে তার অট্টালিকা ত্যাগ করেনি।
আচার্যকে আবার তার প্রাসাদে প্রত্যাগমন করতে দেখে বিস্ময় ফুটে উঠল চন্দ্রকলার মুখমণ্ডলে। বাৎসায়ন তাকে প্রশ্ন করলেন, 'আকাশপ্রদীপ জ্বালোনি কেন? তোমার দ্বাররক্ষী, দাস-দাসীরা কোথায়?'
রাজগণিকা চন্দ্রকলা জবাব দিল, 'তাদের উপস্থিত থাকতে নিষেধ করেছি। রাজপ্রাসাদেও সংবাদ পাঠিয়েছি যে আগামী কয় দিবস আমি উপস্থিত থাকতে পারব না। এ কয়দিন আমি একাকী কাল অতিবাহিত করতে চাই। আমি মানসিকভাবে দুর্বল বোধ করছি।'
তার কথা শুনে আচার্য মর্মে মর্মে অনুভব করলেন চন্দ্রকলার এই মানসিক বিপর্যয়ের কারণ, তার ব্যর্থতা ও গণিকা চন্দ্রকলার প্রতি তার আচার্যের নির্দয় ব্যবহার। তাকে দেখে বড় বেদনাবোধ হল আচার্য বাৎসায়নের। চন্দ্রকলা গণিকা হলেও তাঁদের দুজনের মধ্যে সম্পর্ক গুরু-শিষ্যার। নতমুখে দাঁড়িয়ে চন্দ্রকলা।
কয়েকমুহূর্ত অতিবাহিত হবার পর চন্দ্রকলার খেয়াল হল আচার্যকে সে দাঁড় করিয়ে রেখেছে। সংবিত ফিরে পেয়ে লজ্জিতভাবে সে বলল, 'দয়া করে আপনি ভিতরে প্রবেশ করুন আচার্যদেব।'
চন্দ্রকলার অট্টালিকায় প্রবেশ করলেন বাৎসায়ন। চন্দ্রকলা তাঁকে নিয়ে উপস্থিত হল নিজের শয়নকক্ষে। হাতের প্রদীপটা, প্রদীপদণ্ডে স্থাপন করে ব্যাঘ্রচর্মাবৃত একটা কাষ্ঠাসনে বাৎসায়নকে যত্ন করে উপবেশন করাল। তারপর তাঁর পায়ের সমেনে বসে কান্নায় ভেঙে পড়ে বলল, 'আপনার শিক্ষার মর্যাদা রক্ষা করতে সক্ষম হলাম না আমি। তার জন্য যা শাস্তি প্রাপ্য আমাকে প্রদান করুন।'
আচার্য বাৎসায়ন ক্রন্দনরত গণিকা চন্দ্রকলার মাথায় হাত রেখে আর্দ্র কণ্ঠে বললেন, 'তোমাকে পদাঘাত করা আমার অতীব অনুচিত হয়েছে। ঘটনার অভিঘাতে সে সময় আমার স্বাভাবিক বিচার-বুদ্ধি অবলুপ্ত হয়েছিল। তোমার প্রতি আমার আচরণে আমি ব্যথিত ও লজ্জিত।'
কথাটা শুনে ক্রন্দনরত চন্দ্রকলা বলে উঠল, 'আপনি লজ্জিত বা ব্যথিত হবেন না গুরুদেব। যে শিষ্যা গুরুর মর্যাদা রক্ষা করতে অসমর্থ, তার পদাঘাতই প্রাপ্য। আমার ব্যর্থতার কারণে আপনার ভাবনা মিথ্যা প্রতিপন্ন হল।'
কথাটা শুনে বাৎসায়ন বললেন, 'না, এখনও মিথ্যা প্রতিপন্ন হয়নি।'
গণিকা চন্দ্রকলা বলল, 'আপনি আমাকে নিশ্চিত পরিহাস করছেন আচার্যদেব!'
আচার্য বাৎসায়ন বললেন, 'না, আমি পরিহাস করছি না। যে-কোনও বিষয়কে সত্যরূপে গ্রহণ করতে হলে তাকে তিনবার পরীক্ষা করে তবে গ্রহণ করতে হয়। শাস্ত্রকাররা এ কথা রচনা করে গেছেন। আমিও আমার ন্যায়শাস্ত্র গ্রন্থে তা বিবৃত করেছি, যা আমি বিস্মৃত হয়েছিলাম।'
এ কথা বলার পর আচার্য বাৎসায়ন জৈন সন্ন্যাসীর সঙ্গে তাঁর কথোপকথন ব্যক্ত করলেন চন্দ্রকলার কাছে। তাঁর কথা শুনে চন্দ্রকলা অশ্রু মুছে তাকাল বাৎসায়নের দিকে।
আচার্য তাকে উৎসাহিত করার জন্য বললেন, 'যৌনতা হল ভস্ম চাপা অগ্নির মতো। ভস্ম অপসৃত হলেই অগ্নির দর্শন মেলে। হয়তো বা তুমি এই দুই রাত্রির প্রচেষ্টায় ভস্ম অপসারণ করে অগ্নির নিকটস্থ হয়েছ। আগামী রাত্রিতেই যুবকের কামাগ্নি দৃশ্যমান হবে। আমি নিশ্চিত তুমি সে কাজে সমর্থ হবে।'
আচার্যের আশ্বাসবাণী শুনে চন্দ্রকলার বিষণ্ণ মুখমণ্ডল আবার উজ্জ্বল হয়ে উঠতে শুরু করল, আত্মবিশ্বাস সঞ্চারিত হতে শুরু করল তার মনে।
আচার্য এরপর তার উদ্দেশে বললেন, 'তুমি রাজগণিকা! স্বয়ং মহারাজ তোমার কামকলার সামনে অবনত, তুমি গণিকাশ্রেষ্ঠা, চৌষট্টি কলায় নিপুণা, তোমার পক্ষে ওই যুবকের যৌনতা জাগানো সম্ভব। যে-কোনও পুরুষকেই কামকলায় পরাভূত করতে পারো তুমি।'
আচার্যের কথায় আত্মবিশ্বাস ফিরে পেল চন্দ্রকলা। সে বলে উঠল, 'হ্যাঁ, আমাকে সফল হতেই হবে। আপনার আশীর্বাদে সফল হব আমি। আর তা সফলভাবে সম্পন্ন করার জন্য আমি কী কৌশল গ্রহণ করব, সে সম্পর্কে নির্দেশ দিন।'
আচার্য বাৎসায়ন বললেন, 'না। আমি তোমাকে কোনও নির্দিষ্ট কৌশল অবলম্বনের পরামর্শ দেব না। পরিস্থিতির বিচারে কৌশল নির্ধারণ করবে তুমি। আমি আমার গ্রন্থেও কিন্তু লিখেছি যে পরিস্থিতি-বিচার কৌশল নির্ধারণই সর্বোত্তম। শুধু একটা কথাই স্মরণে রাখবে—তুমি গণিকাশ্রেষ্ঠা! আত্মবিশ্বাস হারাবে না।'
আচার্যের কথা শুনে চন্দ্রকলা একটু ভেবে নিয়ে বলল, 'যদি ওই যুবককে ভালো করে পর্যবেক্ষণ করা যেত, তবে তার আচার-ব্যবহার-রুচি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেত, যা হয়তো বা কাজে আসতে পারে।'
বাৎসায়ন বললেন, 'তুমি ঠিকই বলেছ। রুচির সঙ্গে যৌনতার সম্পর্ক আছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে তা তো সম্ভব নয়। যুবকের পরিচয়, বাসস্থান কিছুই আমার জানা নেই।'
চন্দ্রকলা বলল, 'নদীর পূর্ব তীরে জঙ্গল ঘেরা পাহাড়ের গুহায় জৈন সন্ন্যাসীদের অতি প্রাচীন উপাসনাস্থল আছে। সে জায়গা আমি দূর থেকে দেখেছি। আমার ধারণা ওই যুবক ওই স্থানেই অবস্থান করে।'
বাৎসায়ন প্রশ্ন করলেন, 'তোমার এমন অনুমানের কারণ?'
চন্দ্রকলা বলল, 'গতরাতে আপনি যখন আমাকে পদাঘাত করে এ কক্ষ ত্যাগ করলেন, তখন আমি আপনার কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করার জন্য আপনার পশ্চাদ্ধাবনের চেষ্টা করি। কিন্তু আমি যখন অট্টলিকার বাইরে পা রাখলাম ততক্ষণে আপনি আমার দৃষ্টিপথের বাইরে চলে গেছেন। এরপর আমি আমার অট্টালিকায় প্রবেশ করলাম। সেই সময় বাটিকার পশ্চাৎভাগের উন্মুক্ত অলিন্দ দিয়ে আমি দেখলাম ওই যুবক নদীবক্ষে নেমে যাচ্ছে। এরপর দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও আমি সেই যুবককে উঠে আসতে দেখিনি। আমার প্রাসাদের অপর পার্শ্বেই বিপরীত কূলে সেই জঙ্গলাকীর্ণ পাহাড়। আমার ধারণা ওই যুবক সন্তরণ করে সে স্থানে পৌঁছেছে। সে স্থানেই তার বাসস্থান।'
বাৎসায়ন ধীরে ধীরে মস্তক আন্দোলিত করলেন। বললেন, 'হ্যাঁ, তোমার অনুমান সত্যি হতে পারে। কারণ, আমি সেই অবগুণ্ঠনধারী জৈন সন্ন্যাসীকেও একইভাবে একই দিকে ভেসে যেতে দেখেছি।'
চন্দ্রকলা বলল, 'তবে নিশ্চিত তাঁরা দুজনেই ওই স্থানেই অবস্থান করছেন। আজ রাত্রে আপনি আমার বাটিকায় অবস্থান করে আমাকে আপনার সেবা করার সুযোগ দিন। কাল প্রত্যুষে ছদ্মবেশ ধারণ করে নৌকাযোগে ওপারে যাব আমরা। গোপনে প্রত্যক্ষ করার চেষ্টা করব ওই যুবকের জীবনযাত্রা। তারপর আবার ফিরে আসব।'
চন্দ্রকলার প্রস্তাবে সম্মত হলেন বাৎসায়ন। কারণ, তিনিও মনে করলেন শেষ রাত্রির আগে যুবককে একবার পর্যবেক্ষণ করা ভালো। এ ব্যতীত ওই অবগুণ্ঠনধারী জৈন সন্ন্যাসী ও যুবক—দুজনেরই প্রকৃত পরিচয় জানার ব্যাপারে ব্রাহ্মণ বাৎসায়নের যথেষ্ট আগ্রহ আছে। তিনি চন্দ্রকলাকে বললেন, 'তুমি আমার আহার ও শয্যার ব্যবস্থা করো।'
পরদিন সূর্যোদয়ের মুহূর্তে যথারীতি চন্দ্রকলার বাটিকাসংলগ্ন ঘাটে অবগাহন করলেন আচার্য বাৎসায়ন। তারপর ছদ্মবেশে সজ্জিত হলেন। তবে এবার বণিকের ছদ্মবেশ নয়, কাঠুরের ছদ্মবেশ।
চৌষট্টি কলায় ছদ্মবেশ গ্রহণের শিক্ষাও প্রদান করা আছে। চন্দ্রকলা নিজেও ছদ্মবেশ গ্রহণে বিশেষ পারদর্শিনী। সে-ও অনুরূপ ছদ্মবেশ ধারণ করল। রাত্রেই যাত্রার সমস্ত প্রস্তুতি সেরে রেখেছিল চন্দ্রকলা।
পশ্চাৎবর্তী ঘাট থেকে একটা তরণী নিয়ে তারা রওনা হয়ে গেল নদীর অপর পারের উদ্দেশে। ভোরের আলো তখন ছড়িয়ে পড়েছে নদীবক্ষে। বৃহৎ ময়ূরপঙ্খীগুলি যাত্রীপণ্য নিয়ে নদীবক্ষে ভাসতে শুরু করেছে। সারা রাত্রি মৎস্য শিকারের পর জেলে ডিঙিগুলি পাড়ে এসে লাগছে। মন্দিরে বাজছে প্রভাতকালীন ঘণ্টাধ্বনি।
কিন্তু এ সবই নদীর পশ্চিম পাড় কেন্দ্রিক। জনহীন পূর্বকূলে অপার নিস্তব্ধতা বিরাজমান। কিছু সময়ের মধ্যেই নৌকা বেয়ে অপর পারের অতি জীর্ণ একটি প্রাচীন ঘাটে উপস্থিত হলেন তাঁরা। জল যেখানে শেষ হয়েছে তারপর কিছুটা কর্দমাক্ত জমি অতিক্রম করে সেই জীর্ণ সোপানশ্রেণিতে উঠতে হয়।
নৌকা থেকে তাঁরা সেই কর্দমাক্ত জমিতে নামলেন। তারপরেই তাঁদের চোখে পড়ল সেই কর্দমাক্ত জমিতে জেগে আছে মানুষের পদচিহ্ন। কেউ যেন জল থেকে উঠে এগিয়েছে সোপানের দিকে। তা দেখে চন্দ্রকলা উৎসাহিত হয়ে বলল, 'এ পদচিহ্ন নিশ্চিত সেই যুবকেরই হবে। এই জনমানবহীন অঞ্চলে অন্য মানুষের পদচিহ্ন আসবে কীরূপে?'
পদচিহ্ন অনুসরণ করে জীর্ণ সোপানশ্রেণি অতিক্রম করে ওপরে উঠে এলেন তাঁরা। দু-পাশে ঘন জঙ্গল। পাখির কলকাকলি ব্যতীত কোথাও অন্য কোনও শব্দ নেই। বাৎসায়নের হাতে কুঠার, চন্দ্রকলার হাতে কাষ্ঠ বন্ধনের রজ্জু।
ছদ্মবেশী গুরু-শিষ্যা সেই নির্জন বনপথ ধরে চলতে থাকলেন।
বেশ কিছু সময় চলার পর তাঁরা উপস্থিত হলেন এক অনুচ্চ পাহাড়ের পাদদেশে। তার পাদদেশে ছোট-বড় নানা গুহা। কোনও একসময় এই সব গুহাগুলিতে বসবাস করতেন প্রাচীন জৈন শ্রমণরা। চারপাশে অরণ্য ঘেরা এই স্থান সাধনার পক্ষে উপযুক্তই বটে।
এক অদ্ভুত নিস্তব্ধ পরিবেশ বিরাজ করছে চারদিকে। তবে কোথাও কোনো জৈন ধর্মাবলম্বী বা অন্য কোনও মানুষ চোখে পড়ল না তাঁদের। বাৎসায়ন চন্দ্রকলাকে সঙ্গী করে সেই গুহাগুলি পরিভ্রমণ শুরু করলেন। কিন্তু সেখানেও কোথাও কোনও মানুষের চিহ্ন নেই!
তবে একসময় যে এই স্থানে জৈন সন্ন্যাসীরা বসবাস করতেন তার চিহ্ন এখনও গুহাগুলির গায়ে অঙ্কিত অস্পষ্ট অলংকরণগুলিতে বিদ্যমান। ব্রাহ্মণ বাৎসায়নের গুহাগুলি পরিক্রমণ করতে করতে ধারণা হল যে জৈনদের বাসস্থান হিসাবে এই স্থল বহুকাল আগেই পরিত্যক্ত হয়ে গেছে।
হয়তো বা বৎসরের কোনও নির্দিষ্ট দিনে তারা এখানে উপাসনা করতে আসে, তারপর ফিরে যায়।
গুহাগুলির ভিতর বিরাজ করছে শূন্যতা আর কোথাও জমাটবাঁধা অন্ধকার। আচার্য বাৎসায়ন আর চন্দ্রকলা অনুসন্ধান চালাতে লাগলেন গুহাগুলোয়, যদি কোথাও কোনও কিছুর সন্ধান মেলে সেই আশাতে।
শেষ পর্যন্ত তাঁরা গিরিশিরা গাত্রের শেষ প্রান্তে একটা গুহার সামনে উপস্থিত হলেন। এই গুহা অন্য গুহামুখগুলি থেকে বেশ অনেকটা তফাতে একাকী অবস্থান করছে। অথবা বলা যেতে পারে এই গুহাটির থেকে অন্য গুহাগুলি যেন সম্ভ্রমের দূরত্ব বজায় রেখেছে। বাৎসায়নের দেখে মনে হল এই গুহাটাই সম্ভবত গুহাগুলির মধ্যে প্রাচীনতম গুহা। মাথার ওপরের ছাদের ফাটল বেয়ে আলো ঢুকছে সেই গুহার ভিতর।
বাৎসায়ন আর চন্দ্রকলা পা রাখলেন গুহার অভ্যন্তরে। তাঁরা দেখতে পেলেন গুহার দেওয়ালের গায়ে অনুচ্চ একটা বেদির ওপর দণ্ডায়মান রয়েছে প্রস্তর নির্মিত এক মনুষ্যমূর্তি! আকৃতিতে তা মানুষেরই সমান।
মূর্তিটি বড় অদ্ভুত। তার পরনে কোনো বস্ত্র বা অলংকার নেই। তার প্রতিটি অঙ্গই দৃশ্যমান। শরীরের গঠন সুগঠিত, একইসঙ্গে তার মধ্যে পেলবতাও বর্তমান। চক্ষু দুটি মুদিত। মূর্তির দক্ষিণ হস্তটি উত্থিত, অপর হস্তটি করমুক্ত অবস্থায় দেহের সমান্তরালে স্থাপিত। যেন দণ্ডায়মান অবস্থায় ধ্যান করছে এই মূর্তি।
মূর্তির উত্থিত হস্তের উন্মুক্ত করতলে সূর্যরশ্মি এসে পড়েছে। বাৎসায়ন খেয়াল করলেন সেখানে আঁকা আছে একটি চক্রচিহ্ন! প্রাচীন মূর্তিটিকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণের পর বিস্মিতভাবে চন্দ্রকলার কাছে জানতে চাইলেন, 'এই ধ্যানরত, নিরাবরণ পুরুষমূর্তি কার তুমি জানো?'
চন্দ্রকলা জবাব দিল, 'না আচার্যদেব। আমার এ সম্বন্ধে কিছু জানা নেই। তবে একবার এক ব্যক্তির মুখে শুনেছিলাম এ স্থানে নাকি কোনো এক রাজপুত্রের মূর্তি আছে। প্রাচীনকালে বারাণসীর রাজপুত্র ছিল সে।'
বাৎসায়ন বললেন, 'এ মূর্তি যদি রাজপুত্রের হয়ে থাকে তবে এমন নিরাবরণ কেন?'
চুপ করে রইল গণিকা চন্দ্রকলা। এ প্রশ্নের উত্তর তার জানা নেই। চন্দ্রকলা আতঙ্কিতভাবে কিছুটা পিছিয়ে এল। তার দৃষ্টি অনুসরণ করে বাৎসায়ন দেখলেন, গুহার কোণে কুণ্ডলীকৃত অবস্থায় শুয়ে আছে এক মহাসর্প! জঙ্গলাচ্ছন্ন প্রাচীন গুহায় সর্পের অবস্থান আশ্চর্যের কিছু নয়।
কিন্তু এই সর্পকে দেখে বাৎসায়নের মনে পড়ে গেল সেই যুবককে অনুসরণ করা সর্পের কথা। তবে রাত্রিকালে দেখা সেই সর্প আর এই সর্প একই কি না নির্ণয় করতে পারলেন না। মূর্তিটার মুখমণ্ডলে আরও একবার ভালোভাবে দৃষ্টিপাত করে চন্দ্রকলাকে নিয়ে স্থান ত্যাগ করে ফেরার পথ ধরলেন।
একই পথে জঙ্গল অতিক্রম করে ফিরে এসে ঘাট বেয়ে নেমে তাঁরা নদীবক্ষে নৌকা নিয়ে ভেসে পড়লেন। দাঁড় বাইতে বাইতে চন্দ্রকলা বলল, 'ওই যুবকের দেহ সর্পের মতোই শীতল। জানেন, কয় দিবস পূর্বে আমি এক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখেছিলাম। দেখেছিলাম এক সর্পকে আলিঙ্গন করে শুয়ে আছি।'
পাছে চন্দ্রকলা আতঙ্কিত হয়, তাই এ কথা শোনার পর তাকে আর সেই অনুসরণকারী সর্পের কথা জানালেন না আচার্য বাৎসায়ন। চন্দ্রকলা এরপর বলল, 'কিন্তু ওই যুবকের শরীরে এত শীতলতা কেন? যৌনতা বৃদ্ধির জন্য যেমন নানা ধরনের আরক পান করা হয়, তেমনই আবার শরীরের যৌন উত্তেজনা কমানোর জন্যও আরক আছে। তেমন কোনো পানীয় ওই যুবককে পান করিয়ে আমার কাছে তাকে পাঠানো হচ্ছে না তো? যে কারণে তার শরীর অমন শীতল?'
চন্দ্রকলার বলা এ সম্ভাবনার কথা ইতিপূর্বে মাথায় আসেনি বাৎসায়নের। তিনি বললেন, 'ঠিক বলেছ। অসম্ভব নয়।'
গণিকা চন্দ্রকলা বলল, 'তেমন যদি হয়ে থাকে তবে আমি সেই শীতলতা কাটাবার জন্য ওই যুবককে যৌন উদ্দীপক আরক পান করাতে সচেষ্ট হব। মৃগনাভি চূর্ণ দিয়ে জৈয়িত্রী ফলের পানীয়।' দাঁড় বাইতে বাইতে নদী অতিক্রম করে যে ঘাটে আচার্যের বাসস্থান, সে ঘাটে উপস্থিত হল তারা। বাৎসায়ন নৌকা ত্যাগ করার পর তাঁর থেকে বিদায় নিয়ে চন্দ্রকলা ফিরে চলল নিজের প্রাসাদ-ঘাটে।
এই রাত্রিই নির্ধারণ করবে কামসূত্রম্ প্রণেতা বাৎসায়নের মনে দীর্ঘদিন ধরে লালিত ভাবনা সঠিক কি না! ধর্ম নাকি কাম, শ্রেষ্ঠ আসন কার?
আসন্ন রাত্রির প্রতীক্ষায় সারাদিন ধরে নিজ কক্ষে প্রচণ্ড উত্তেজনার মধ্যে অতিবাহিত করলেন বাৎসায়ন। তবে একটা বিষয় তিনি স্থির করে রেখেছেন,—এই শেষ রাত্রের ফলাফল যদি তাঁর ভাবনার বিপক্ষে যায়, তবে তিনি আর মনে দ্বন্দ্ব পোষণ করবেন না। সংশয়হীন চিত্তে তিনি মেনে নেবেন ধর্মের আসন কামের অগ্রে প্রতিষ্ঠিত। ধর্ম পরাভূত করতে পারে কামকে।
সত্যকে গ্রহণ করবেন ব্রাহ্মণ বাৎসায়ন। কারণ সত্যই পথপ্রদর্শক। কক্ষে কাষ্ঠাসনে রক্ষিত তাঁর কামসূত্রম্ পুঁথি, রাজহংসীর পালকের কলম, মসিভাণ্ড। সেদিকে তাকিয়ে উৎকণ্ঠার মধ্যে ব্রাহ্মণ বাৎসায়ন আসন্ন রাত্রির চিন্তায় সারাটা দিন কাটিয়ে দিলেন।
সময় আর নদীপ্রবাহ কোনোটাই থেমে থাকে না। তাই আপন নিয়মেই দিনশেষে গঙ্গাবক্ষে সূর্যদেব অবগাহন করলেন। রাত্রি ঘনাতে শুরু করল। নির্দিষ্ট সময়ে ব্রাহ্মণ বাৎসায়ন পোশাক পরিবর্তন করে প্রস্তুত হলেন বহির্গমনের জন্য। রাত যত বাড়ছে বাৎসায়নের উত্তেজনা তত বৃদ্ধি পাচ্ছে। নিজের মনকে শান্ত রাখার চেষ্টা করে, দ্বার উন্মোচন করে যুবকের প্রতীক্ষা করতে লাগলেন তিনি।
নির্দিষ্ট সময়ে যথারীতি বাতাসে চন্দনের গন্ধ অনুভব করলেন তিনি। আর তার পরই তাঁর সামনে এসে উপস্থিত হল সেই চন্দন পুরুষ—সেই যুবক। চাঁদের আলোতে তার মুখমণ্ডলে ফুটে আছে নির্মল হাসি। তাকে দেখমাত্রই আর কালক্ষেপ না করে দরজার কপাট বন্ধ করে পথে নামলেন বাৎসায়ন। সেই মুহূর্তেই তিনি দেখতে পেলেন আরও একজনকে। যুবকের কিছুটা তফাতে উপস্থিত হয়েছে সেই মহাসর্প। ব্রাহ্মণ বাৎসায়ন এ ব্যাপারে যুবককে কিছু প্রশ্ন করার আগেই চন্দনগন্ধী পুরুষ স্মিত হেসে বলল, 'সর্প আমার সঙ্গী হয়েই এখানে উপস্থিত হয়েছে। চলুন, আমরা নিশ্চিন্তে যাত্রারম্ভ করি।'
আজ পূর্ণিমা তিথি। মাথার ওপর থেকে চন্দ্রদেব যেন উজাড় করে আলো ছড়িয়ে দিচ্ছেন পৃথিবীর বুকে। জ্যোৎস্না উচ্ছলিত রাত্রিতে রাজগণিকা চন্দ্রকলার প্রাসাদের দিকে এগিয়ে চললেন তাঁরা দুজন। আর তাঁদের অনুসরণ করে চলল সেই মহাসর্প।
একসময় দুজনে পৌঁছে গেলেন চন্দ্রকলার প্রাসাদের দ্বারে। প্রাসাদে চন্দ্রকলা ব্যতীত অন্য কেউ উপস্থিত না থাকলেও এ প্রাসাদ আজ আলোকমালায় সাজিয়ে তুলেছে চন্দ্রকলা। আকাশ প্রদীপও জ্বলছে।
অট্টালিকায় প্রবেশের আগের মুহূর্তে বিগত রাত্রির মতোই একবার থমকে দাঁড়িয়ে পিছনে ফিরে, হাত তুলে অনুসরণকারী সর্পরাজকে থামতে নির্দেশ দিল যুবক। থেমে গেল সেই মহাসর্প।
অতঃপর ব্রাহ্মণ বাৎসায়নের সঙ্গে সে প্রবেশ করল অট্টালিকার ভিতর। পথের দু-পাশে যুবককে অভ্যর্থনার জন্য আজ সার সার প্রদীপ জ্বালিয়ে রেখেছে চন্দ্রকলা। ভূমিতলে কোথাও ফুল, কোথাও কড়ি, কোথাও বা শঙ্খচূর্ণ বা তণ্ডুলচূর্ণের আলপনা দিয়ে সাজানো।
সে পথ অতিক্রম করে বাৎসায়ন যুবককে নিয়ে প্রবেশ করলেন নির্দিষ্ট সেই কক্ষে। এ কক্ষের ভূমিতল, দেওয়ালগাত্র আজ সাজানো হয়েছে নানা বর্ণের ফুলে। তার সৌরভে পরিপূর্ণ হয়ে আছে সেই কক্ষ। তবে আজ আর প্রথমে সেই হরিণচর্ম আচ্ছাদিত কাষ্ঠাসনে নয়ে, যুবককে নিয়ে গিয়ে কুসুম আচ্ছাদিত শয্যায় উপবেশন করিয়ে সে কক্ষ ত্যাগ করে আচার্য বাৎসায়ন প্রবেশ করলেন চন্দ্রকলার কক্ষে।
পট্টবস্ত্র বা স্বচ্ছ রেশমবস্ত্রের পরিবর্তে আজ গণিকা চন্দ্রকলার পরনে ফুলের পাপড়ি নির্মিত আচ্ছাদন। গহনাও ফুলসাজে তৈরি। তাকে স্বর্গের অপ্সরার ন্যায় দেখতে লাগছে। তাকে নিরীক্ষণ করে হাসি ফুটে উঠল আচার্যের মুখে। সন্তুষ্টির হাসি, ভরসার হাসি।
'আজ চন্দ্রকলার রূপের কাছে মেনকা, ঊর্বশী, রম্ভারাও নিশ্চিত পরাজয় স্বীকার করবে, আর ওই যুবক তো সাধারণ মানুষ মাত্র!'—এ কথা মনে মনে ভাবলেন আচার্য বাৎসায়ন।
ক্ষণিকের জন্য দৃষ্টি বিনিময় হল গুরু-শিষ্যার মধ্যে। রাজগণিকা, চৌষট্টি কলা নিপুণা চন্দ্রকলার মুখমণ্ডলে ফুটে উঠেছে আত্মপ্রত্যয়। আচার্যের পদস্পর্শ করল সে আশীর্বাদ গ্রহণের জন্য। আচার্য বাৎসায়ন তার কেশদাম স্পর্শ করে আশীর্বাদ করলেন—'জয়তু ভব।'
আচার্যের আশীর্বাদ গ্রহণ করে কক্ষ ত্যাগ করল গণিকা চন্দ্রকলা। আর বাৎসায়ন সে কক্ষে তাঁর নির্দিষ্ট আসন গ্রহণ করে দেওয়ালগাত্রের ছিদ্রে চোখ রাখলেন। শৃগালধ্বনিতে রাত্রির দ্বিতীয় প্রহর সূচিত হবার সঙ্গে-সঙ্গেই পার্শ্ববর্তী কক্ষে প্রবেশ করল গণিকা চন্দ্রকলা। আচার্য বাৎসায়ন ছিদ্রপথে দেখতে লাগলেন পরবর্তী দৃশ্য।
ফুলসাজে সজ্জিতা রাজগণিকা চন্দ্রকলা প্রথমে করজোড়ে প্রণাম জানাল যুবককে। তারপর অন্য দিনগুলির মতোই তাকে খাদ্য-পানীয় গ্রহণের অনুরোধ করল। যুবক আগের দু-দিনের মতনই মৃদু হেসে জানাল, খাদ্য বা পানীয় গ্রহণের প্রয়োজন নেই।
কিন্তু গণিকা চন্দ্রকলা আজ অন্য আয়োজন করে রেখেছে। সে বলল, 'আমার এই অট্টালিকায় যাঁরা আতিথ্য গ্রহণ করেন তাঁর খাদ্য-পানীয় গ্রহণ করে আমাকে অতিথি সৎকারের পুণ্যলাভের সুযোগ করে দেন। সে সুযোগ থেকে আমাকে বঞ্চিত করবেন না। আজই আমার সঙ্গে আপনার শেষ সাক্ষাৎ। খাদ্য না হোক, পানীয় গ্রহণ করুন। আমি সুমিষ্ট এক পানীয় প্রস্তুত করেছি।'
যুবক বলল, 'আমি সুরা পান করি না।'
চন্দ্রকলা বলল, 'না, সুরা নয় দেব। অতি উত্তম এক পানীয়।'
কিন্তু এ কথা শোনার পরও যুবক নিশ্চুপ রইল।
বুদ্ধিমতী ছলা-কলায় নিপুণা গণিকা এবার অন্য অস্ত্র প্রয়োগ করল। মুখমণ্ডলে করুণভাব ফুটিয়ে তুলে বলল, 'আমি শুনেছি আপনাদের মধ্যে বর্ণভেদ, জাতিভেদ প্রথা নেই। সর্বপ্রকার মানুষ, এমনকী সর্বপ্রকার জীবকে আপনারা সমদৃষ্টিতে দেখেন। কিন্তু আমার সে শোনা সঠিক ছিল না বলেই মনে হয়। আমি বুঝতে পারছি আমি গণিকা বলে আমার হাত থেকে জলস্পর্শ করতেও রাজি নন। ধিক আমার এই নারীজন্ম!'
গণিকা চন্দ্রকলার কথা শুনে যুবক কয়েকমুহূর্ত স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার দিকে। তারপর হস্ত প্রসারিত করে জানিয়ে দিল, 'দাও।'
চন্দ্রকলা আর দেরি না করে তার তৈরি কামোত্তেজক পানীয়, স্ফটিক পাত্রে পূর্ণ করে তুলে দিল যুবকের হাতে। যুবক প্রথমে মৃদু চুমুক দিল তাতে। বাৎসায়ন সে দৃশ্য দেখে বেশ উৎসাহিত বোধ করলেন। তুষার গলতে শুরু করেছে!
চন্দ্রকলা যুবকের উদ্দেশে বলল, 'আপনি ধীরে ধীরে পান করুন, আর আমি আপনাকে নৃত্য পরিবেশন করে দেখাই?'
যুবক এবারও সম্মত হল চন্দ্রকলার প্রস্তাবে।
ঘুঙুরছড়া পায়ে বাঁধল চন্দ্রকলা। তারপর ধীরে ধীরে তার নৃত্য পরিবেশন শুরু করল। ছমছম শব্দে মুখরিত হতে শুরু করল সেই কক্ষ। ধীর লয়ে শুরু হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে লাগল তার নৃত্যের গতি। চৌষট্টি কলায় নিপুণা চন্দ্রকলা নৃত্য প্রদর্শন করলে রাজা-মহারাজারাও মোহিত হয়ে যান। এমনই তার অপূর্ব নৃত্যকলা!
যুবক মাঝে মাঝে তার পান পাত্রে চুমুক দিচ্ছে আর একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে নৃত্যরতা গণিকার দিকে। ধীরে ধীরে শেষ হয়ে আসছে সেই কামোদ্দীপক পানীয়ের পাত্র। চন্দ্রকলা যেন ইন্দ্রের রাজসভাকে নামিয়ে এনেছে সেই কক্ষে।
যুবকের মদিরার পাত্র যখন শেষ হয়ে এল, তখন নৃত্যরত অবস্থাতেই চন্দ্রকলা তার ফুলসাজ খসিয়ে ফেলতে লাগল। প্রথমে উন্মুক্ত হল তার শঙ্খের মতো শুভ্র স্তনযুগল, তারপর মুদ্রা আকৃতির কূপসদৃশ গভীর নাভি, ক্ষীণ কটিদেশের পশ্চাতে ঘোটকীর মতো পৃথুলা নিতম্ব।
অবশেষে যুবক যখন তার পানপাত্রে শেষ চুমুক দিয়ে নিঃশেষিত করে নামিয়ে রাখল, তখন চন্দ্রকলা তার শেষ পাপড়ি বসনও সরিয়ে ফেলল। উন্মুক্ত হল তার পাপড়িসদৃশ যোনি।
সে গিয়ে আলিঙ্গন করল যুবককে, বস্ত্রখণ্ড তার শরীর থেকে সরিয়ে ফেলল। তারপর তার সারা অঙ্গে চুম্বন, লেহন শুরু করল। কখনও যুবকের ওষ্ঠাধারে, কখনও স্কন্ধে, কখনও বাহুমূলে, ঊরুতে চুম্বন করেই চলল চন্দ্রকলা। বাৎসায়ন খেয়াল করলেন, আজ আর চোখের পাতা মুদে আসছে না যুবকের!
তবে নিশ্চয়ই প্রচণ্ড কামোত্তেজক আরক কাজ করতে শুরু করেছে তার শরীরে।—মনে মনে ভাবলেন বাৎসায়ন। আড়াল থেকে রুদ্ধশ্বাসে বাৎসায়ন প্রত্যক্ষ করতে লাগলেন সেই দৃশ্য। সময় যে কীভাবে এগিয়ে চলেছে তা বুঝতেই পারেননি তিনি!
বাৎসায়ন ভাবতে লাগলেন, 'না, এই আরক পানীয়ের প্রভাব বিফলে যাবে না, বিফলে যাবে না তাঁর চৌষট্টি কলার শিক্ষা। এবার উত্থিত হবে যুবকের লিঙ্গ।'
কিন্তু একসময় শৃগালের ডাক জানিয়ে দিল দ্বিতীয় প্রহর শেষ!
আর এক প্রহর মাত্র বাকি! প্রবল উত্তেজনা বোধ করতে শুরু করলেন কামশাস্ত্র প্রণেতা বাৎসায়ন। তীব্র উত্তেজনা শুরু হয়েছে চন্দ্রকলার মনেও। সময় যে বয়ে যাচ্ছে!
যুবকের পুরুষদণ্ডকে নিজ যোনিতে প্রবেশ করিয়ে লিঙ্গোত্থান করার কাজে রত হল সে।
প্রথমে তার যোনি ও যুবকের লিঙ্গের সংযোগ ঘটিয়ে নিজের ঊরু দিয়ে যুবকের ঊরুতে বেষ্টন করে 'বেষ্টিতক' চেষ্টায় রত হল। তারপর যুবককে শুইয়ে ফেলে তার পাশে শুয়ে 'পার্শ্বসম্পুট' মিলনের চেষ্টা করল।
তাতেও ব্যর্থ হয়ে সে 'বাড়বক' অর্থাৎ ঘোটকী সংগমের প্রচেষ্টা নিল। এই প্রচেষ্টায় যোনিমুখ দিয়ে লিঙ্গকে কামড়ে ধরার চেষ্টা করা হয়।
যুবকের চক্ষুদ্বয় আজ উন্মীলিত। আরক পানীয়ের গুণেই হোক বা অন্য কোনো কারণেই হোক, তার শরীরের স্পর্শে আজ তেমন শীতলতা অনুভব করছে না চন্দ্রকলা। যে আসনে সে, যুবকের শরীর সঞ্চালনের চেষ্টা করছে তাতেও কোনো বাধা দিচ্ছে না যুবক। শুধু তার মধ্যে কোনোভাবেই যৌনতা সঞ্চারিত হচ্ছে না!
তবে যুবকের ঠোঁটের কোণে জেগে আছে আবছা হাসির রেশ। সে যেন উপভোগ করছে রাজগণিকা চন্দ্রকলার ব্যর্থ প্রচেষ্টাগুলিকে। প্রতিটি ধরনের সংগম প্রচেষ্টাতেই বেশ খানিকক্ষণ করে সময় অতিবাহিত হচ্ছে।
তৃতীয় প্রহর এগিয়ে চলেছে। 'বাড়বক' অর্থাৎ 'ঘোটকী সংগমের' প্রচেষ্টার পর চন্দ্রকলা নিজের হাঁটু দুটো মুড়ে তা যুবকের নাভির নীচে স্থাপন করে 'কর্কটক' সংগম অর্থাৎ কাঁকড়ার মতো সংগম চেষ্টা শুরু করল। তারপর চেষ্টা করল যুবককে উপবেশন করিয়ে নিজের পা দুটোকে যুবকের স্কন্ধে স্থান করে 'জৃন্তিতক' মিলনের।
বাৎসায়ন নির্বাক চক্ষে দেখে যেতে লাগলেন রাজগণিকা চন্দ্রকলার একের পর এক নিবিড় প্রচেষ্টা। না, কোনো ত্রুটি নেই গণিকা চন্দ্রকলার চৌষট্টি কলার শিক্ষাতে।
রাত এগিয়ে চলল চতুর্থ প্রহরের দিকে। আর তার সঙ্গে সঙ্গে গণিকা চন্দ্রকলাও চালিয়ে যেতে লাগল কামসূত্রম্ গ্রন্থে বর্ণিত নানা সংগম প্রচেষ্টা—যুবকের বুকে স্তন স্থাপন করে স্তন দিয়ে তাকে পীড়ন করে 'উৎপীড়িতক' সংগম, উতল অবস্থা অর্থাৎ চিত হয়ে শুয়ে ঊরু ওপরে তুলে 'ভূগ্নক' সংগম, যুবককে অর্ধাশয়িত করে 'বেণুদারিতক' সংগম, যুবকের একটি পা নিজের মাথার ওপর তুলে 'শূলাচ্চিতক' সংগম। আর সময় নেই! শেষ হয়ে আসতে লাগল তৃতীয় প্রহর।
আর তা বুঝতে পেরেই শেষ পর্যন্ত যেন উন্মাদিনী হয়ে উঠেছে চন্দ্রকলা। সে দংশন করে, নখরাঘাত করে, পায়ে ঘুঙুরের আঘাত করে যুবকের মধ্যে বন্যকাম জাগাবার চেষ্টা করতে লাগল। সাধারণ শৃঙ্গার দংশন বা নখরাঘাত নয়, প্রচণ্ড আঘাত। চন্দ্রকলার নিরন্তর প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় সে হিংস্র হয়ে উঠেছে। সে যেন যুবকের শরীর চিরে বার করে আনতে চাইছে তার ভিতরে লুকিয়ে থাকা যৌনতাকে। চন্দ্রকলার দংশনে, নরখাঘাতে যুবকের শরীরের নানা অংশ থেকে রক্ত ঝরতে শুরু করল।
বাৎসায়নের মনে হল এই যুবকের জায়গায় যদি অন্য কোনো পুরুষ হতো তাহলে সে নিশ্চয়ই এই মুহূর্তেই বধ করত উন্মাদিনী গণিকা চন্দ্রকলাকে। ঠিক যেমন কুন্তলদেশের রাজা শতকর্ণের পুত্র সাতবাহন সংগম প্রচেষ্টার সময় তাঁর রানি মলয়দেবীর মাথায় 'কর্তরী' অর্থাৎ বাঁকানো আঙুলের আঘাত করে তাকে হত্যা করেছিলেন।
কিন্তু এত আঘাত সহ্য করেও এ যুবকের মুখমণ্ডলে ফুটে আছে অমলিন হাসি। এত সহ্যক্ষমতা যুবক পেল কীভাবে?
বাৎসায়ন স্তম্ভিতভাবে দেখতে লাগলেন যুবকের প্রতি চন্দ্রকলার উন্মত্ত আচরণ। সব ব্যর্থ! কিছু সময়ের মধ্যেই নদীতীর থেকে ভেসে আসা শৃগালের ধ্বনি জানিয়ে দিল—সব শেষ!
সঙ্গে সঙ্গেই যুবকের শরীর থেকে ছিটকে উঠে শয্যা থেকে মেঝেতে আছড়ে পড়ল গণিকা চন্দ্রকলার দেহ। বাৎসায়নের কক্ষের প্রদীপশিখাটি দপ করে জ্বলে উঠে নিভে গেল। দেওয়ালগাত্রের ছিদ্র থেকে চোখ সরিয়ে নিলেন বাৎসায়ন।
অন্ধকার কক্ষে অনেকক্ষণ পাথরের মূর্তির মতো বসে রইলেন চৌষট্টি কলা প্রণেতা, কামসূত্রম্ রচয়িতা ব্রাহ্মণ বাৎসায়ন।
একসময় তাঁর মন ধীরে ধীরে শান্ত সমাহিত হয়ে এল। হ্যাঁ, সত্য উপলব্ধি করলেন তিনি। সে কক্ষ ত্যাগ করে তিনি উপস্থিত হলেন পার্শ্ববর্তী কক্ষে। সারা কক্ষ এখনও চন্দনের সুবাসে সুরভিত। তবে সেই চন্দন পুরুষ ততক্ষণে অন্তর্হিত হয়েছে সেই কক্ষ থেকে।
তবে কক্ষত্যাগের আগে মূর্ছিত চন্দ্রকলাকে সে মাটি থেকে সস্নেহে তুলে শুইয়ে দিয়ে গেছে পুষ্পশয্যায়। একটা বস্ত্রখণ্ড দিয়ে আবৃত করে গেছে তার শরীর। মূর্ছিত চন্দ্রকলার মাথায় একবার পরম স্নেহে হস্ত সঞ্চালন করে সে কক্ষ ত্যাগ করে ফেরার পথ ধরলেন চৌষট্টি কলা প্রণেতা ব্রাহ্মণ বাৎসায়ন।
শেষ রাত্রে বাৎসায়ন সোপানশ্রেণি বেয়ে শেষ ধাপে এসে দাঁড়ালেন। চন্দ্রালোকে উদ্ভাসিত চরাচর। জোয়ারের জল তাঁর পায়ের সামনে ছলাৎ ছলাৎ শব্দে নাচছে। তাদের শীর্ষে চাঁদের প্রতিবিম্ব। যেন বিন্দু বিন্দু চাঁদের কণা নেমে এসে ধরা দিয়েছে নদীবক্ষে। গভীর সুষুপ্তিতে বারাণসী নগরী, পদতলের জলতরঙ্গের শব্দ ছাড়া কোথাও কোনো শব্দ নেই। অপার শান্তি বিরাজ করছে চারিপাশে।
ব্রাহ্মণ বাৎসায়নের মনও আশ্চর্য রকমের শান্ত হয়ে এসেছে। একসময়ে বাৎসায়ন দেখলেন সোপানশ্রেণি বেয়ে নেমে আসছেন সেই অবগুণ্ঠনধারী জৈন। তাঁরই প্রতীক্ষা করছেন বাৎসায়ন।
শ্রমণ নেমে এসে দাঁড়ালেন বাৎসায়নের কিছুটা তফাতে। মাথা ঝুঁকিয়ে পরস্পরকে নীরব সম্ভাষণ জানালেন তাঁরা। কিছুক্ষণের নিস্তব্ধতা। তারপর সেই অবগুণ্ঠনধারী কামসূত্রম্ প্রণেতা বাৎসায়নকে প্রশ্ন করলেন, 'আপনার মনে আর কোনো সংশয় নেই তো?'
'না, নেই।' চৌষট্টি কলার নির্দেশক বাৎসায়ন শান্ত স্বরে জবাব দিলেন, 'ধর্ম, অর্থ, পুরুষকারের স্থান কামের চেয়ে বড়। ধর্ম—পুরুষকার, কামকে পরাজিত করতে পারে।'
অবগুণ্ঠনধারী আবারও প্রশ্ন করলেন, 'নিঃসংকোচে বিশ্বাস করছেন?'
বাৎসায়ন হেসে জবাব দিলেন, 'অবশ্যই। এ ব্যাপারে অবিশ্বাসের আর কোনো প্রহ্নই নেই। তবে আমি ভাবছি অন্য কথা। আমার এই গ্রন্থের আর প্রয়োজন আছে কি? মানুষের জীবনে কাম কি আদৌ আবশ্যিক?'
'নিশ্চয়ই প্রয়োজনীয়।' ব্রাহ্মণ বাৎসায়নকে আশ্বস্ত করে অবগুণ্ঠনধারী বললেন, 'গৃহীর জীবনের আবশ্যিক অঙ্গ কাম। এই কাম বাঁচিয়ে রেখেছে জীব সৃষ্টির ঊষালগ্ন থেকে আজ পর্যন্ত মানুষের জীবন প্রবাহকে। কাম হল ভালোবাসার এক রূপ, যার সুরম্য কৌশল আপনি বর্ণনা করেছেন আপনার গ্রন্থে। আপনার শ্রম ব্যর্থ হবে না। ভাবীকালের মানুষ তাদের জাগতিক আনন্দের নির্দেশকরূপে স্মরণ করবে মহর্ষি বাৎসায়নকে। আমি শুধু আপনাকে জানাতে চেয়েছিলাম ধর্মের আসন সর্বশ্রেষ্ঠ।'
কামশাস্ত্র প্রণেতা বাৎসায়ন বললেন, 'আপনি আমাকে চিন্তামুক্ত করলেন।'
অবগুণ্ঠনধারী এরপর ব্রাহ্মণকে বললেন, 'আর কিছু সময়ের মধ্যেই শুকতারা ফুটে উঠবে। এবার আমাকে বিদায় দিতে হবে মহর্ষি।'
বাৎসায়ন বললেন, 'বিদায়কালে শেষ একটা অনুরোধ আপনার কাছে। আমাকে যিনি সত্য দর্শন করালেন তাঁর পরিচয় জানতে আমি বিশেষভাবে আগ্রহী। আর একান্তই যদি পরিচয়দান সম্ভব না হয় তবে একবারের জন্য তাঁর মুখমণ্ডল দর্শনের সুযোগ দেবেন আমাকে?'
কয়েকমুহূর্তের জন্য আবারও নিস্তব্ধতা। অবগুণ্ঠনধারী খসিয়ে ফেলল তাঁর গায়ের বসন-অবগুণ্ঠন। ঠিক সেই মুহূর্তে হারিয়ে যাবার আগে চন্দ্রদেব যেন তাঁর সব আলো উজাড় করে দিলেন এই ঘাটে। চন্দনের সৌরভে ভরে উঠল বাতাস।
বাৎসায়ন বিস্মিত হয়ে দেখলেন, তাঁর সামনে সম্পূর্ণ নিরাবরণ শরীরে দাঁড়িয়ে আছে সেই চন্দন পুরুষ! তিন রাত্রির পরিচিত সেই যুবক! বাৎস্যায়নের দিকে তাকিয়ে হাসছে সে।
তারপরই সেই যুবক মূর্তি অন্য আর-এক পুরুষের রূপ ধারণ করল। এক জ্যোতির্ময় পুরুষের রূপ। দক্ষিণ হস্ত উত্থিত তার। সেই হাস্তের করতলে অঙ্কিত আচে চক্র। দ্যুতি নির্গত হচ্ছে সেই চক্র থেকে।
সে মূর্তিকেও চিনতে অসুবিধা হল না বাৎস্যায়নের। এ মূর্তি তিনি দর্শন করেছেন সেই প্রাচীন গুহায়।
বাৎসায়ন খেয়াল করলেন, কোথা থেকে যেন মহাসর্পও এসে উপস্থিত হল সেই অনিন্দ্যসুন্দর মূর্তির পদতলে। মাত্র কয়েকমুহূর্তের জন্যই বাৎসায়ন প্রত্যক্ষ করলেন এই আশ্চার্য সুন্দর দৃশ্য।
এরপরই অকস্মাৎ চাঁদ অদৃশ্য হয়ে গেল। গাঢ় অন্ধকার নেমে এল চারপাশে। বাৎসায়নের সামনে থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল সেই মূর্তি। অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে রইলেন আশ্চর্য দৃশ্য প্রত্যক্ষকারী বাৎসায়ন।
শুকতারা ফুটে ওঠে একসময়। বাৎসায়ন দেখলেন, তিনি একলা দাঁড়িয়ে আছেন ঘাটে। কিছুপরে পুবের আকাশে রং ছড়িয়ে আবির্ভূত হতে শুরু করলেন সূর্যদেব।
বাৎসায়ন প্রতিদিনের মতোই নদীতে নামলেন অবগাহনের জন্য। গঙ্গাস্নান করে সূর্যপ্রণাম করে তিনি যখন পাড়ে উঠতে যাচ্ছেন, তখন তিনি লক্ষ্য করলেন একটি জেলেডিঙি এগিয়ে আসছে ঘাটের দিকে।
সাধারণত এ ঘাটে কোনো নৌকা আসে না। তাই ব্রাহ্মণ বাৎসায়ন নৌকাটাকে দেখে সোপানশ্রেণিতে উঠে কৌতূহলী হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন। জেলেনৌকা ঘাটে এসে থামল।
বেশ কয়েকজন মৎস্যশিকারি রয়েছে নৌকাতে। তাদের কথোপকথন শুনে বাৎসায়ন বুঝতে পারলেন, সারারাত মৎস্য আহরণের পর ফিরছিল তারা। কিন্তু ভোরের আলো ফোটার আগে কোনো ভারী কিছু আটকেছে তাদের জালে। তাদের অনুমান সেটা কোনো মহামৎস্য হবে। আর তা এত ভারী যে তাকে জালসমেত দূরবর্তী ঘাটে টেনে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
তাই তারা এই ঘাটে নৌকা ভিড়িয়েছে জাল টেনে তোলার জন্য।
কৌতূহলী বাৎসায়ন সেই মহামৎস্য দর্শনের জন্য ধীবরদের জালটানা দেখতে লাগলেন। কিছু সময়ের মধ্যেই জাল টেনে পাড়ে উঠিয়ে ফেলল তারা।
কিন্তু মৎস্য কই? তাদের জালে উঠে এসেছে এক পাথুরে মূর্তি! মূর্তিটি দেখে বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে গেলেন বাৎসায়ন। এ তো সেই প্রাচীন গুহায় রক্ষিত নিরাবরণ পুরুষের মূর্তি! তাঁরই দর্শন তিনি পেয়েছেন শেষ রাতে। ভালো করে সে মূর্তিকে লক্ষ্য করে বাৎসায়ন দেখলেন মূর্তির পদতলে পাথরের তৈরি এক সর্পও অবস্থান করছে!
মৎস্যের পরিবর্তে পাথরের তৈরি পূর্ণাবয়ব মনুষ্য মূর্তি দেখে এক বিস্মিত ধীবর তার সঙ্গীদের কাছে জানতে চাইল, 'এ কার মূর্তি?'
এক বৃদ্ধ ধীবর তার প্রশ্নের জবাবে বলল, 'এ মূর্তি আমি নদীর পূর্ব উপকূলে প্রাচীন গুহায় একবার দেখেছি। কিন্তু এ মূর্তি নদীতে এল কীভাবে কে জানে! এ হল পার্শ্বনাথের মূর্তি। ওই সর্প তাঁর প্রতীক। তিনি একসময় কাশীর রাজপুত্র ছিলেন। এক জৈন আমাকে এই মূর্তি চিনিয়ে ছিলেন।'
পার্শ্বনাথের মূর্তি ইতিপূর্বে না চিনলেও তাঁর নামের সঙ্গে পরিচিত শাস্ত্রজ্ঞ ব্রাহ্মণ বাৎসায়ন। তীর্থঙ্কর জিতেন্দ্রিয় পার্শ্বনাথ! বাৎসায়নের কাছে এতক্ষণে দিব্যালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে গেল সব, তাঁর সত্য দ্রষ্টার পরিচয়। মূর্তির উদ্দেশে প্রণাম জানিয়ে বাৎসায়ন বাটিকাতে ফেরার পথ ধরলেন।
নিজ কক্ষে ফিরে এসে নতুন বস্ত্র পরিধান করে পুঁথি খুলে বসলেন বাৎসায়ন। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, যে সত্য তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন সে তাঁর গ্রন্থের সূচনাতেই লিপিবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন, পরিশিষ্টে নয়। যাতে ভবিষ্যতে যারা এই কামসূত্রম্ গ্রন্থ পাঠ করবে তারা এই গ্রন্থের নির্যাস সম্বন্ধে অবগত থাকে। সেই সত্য হল, ধর্ম, অর্থ, কাম—এ তিনটি বিষয়ই গৃহীর জীবনে অপরিহার্য, কিন্তু ধর্ম ও অর্থের আসন কামের অগ্রে।
এই সিন্ধান্তই আগামী পৃথিবীর মানুষের কাছে কামসূত্রম্ গ্রন্থের প্রথম শ্লোকরূপে গৃহীত হবে।
বাইরের নবীন সূর্যালোক এসে পড়েছে কামসূত্রম্ রচনাকার ব্রাহ্মণ বাৎসায়নের পুঁথিতে। ওই সূর্যের আলোর মতোই সত্যের আলোকে উদ্ভাসিত বাৎসায়নের ভাবনা।
মনে মনে সেই চন্দন পুরুষের উদ্দেশে প্রণাম জানিয়ে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ কামশাস্ত্রের রচয়িতা মহর্ষি বাৎসায়ন রাজহংসীর পালকের কলম দিয়ে পুঁথির পাতায় রচনা করলেন তাঁর প্রথম শ্লোক—
'ধর্মার্থকামেভ্য নমঃ!'
অর্থাৎ, 'ধর্ম, অর্থ ও কামের উদ্দেশে নমস্কার জানাই।'
ধর্মকে সর্বাগ্রে স্থান দিলেন কামসূত্রম্ প্রণেতা মহর্ষি বাৎসায়ন।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।